লিসা কার্টিজ অথবা পশ্চিমা মনের ইসলাম-ভীতি ও দ্বিধা

লিসা কার্টিজ অথবা পশ্চিমা মনের ইসলাম-ভীতি ও দ্বিধা

গৌতম দাস

হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়ার গবেষণা ফেলো হলেন লিসা কার্টিস (Lisa Curtis)। বাংলাদেশের দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার আমেরিকান সংবাদদাতা লিসা কার্টিসকে কিছু লিখিত প্রশ্ন পাঠিয়েছিলেন, যার লিখিত জবাব তিনি দিয়েছেন আর মানবজমিন পত্রিকায় তা গত ৬ এপ্রিল ২০১৪ ছাপা হয়েছে।

থিঙ্কট্যাংক হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ও আমেরিকান বিদেশনীতি
হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, আমেরিকার থিঙ্কট্যাংকগুলোর মধ্যে প্রথমসারির। থিঙ্কট্যাংক মানে রাষ্ট্রের স্বার্থ ও নীতি কি হওয়া উচিত তা নিয়ে আগাম চিন্তাভাবনা ও নিজস্ব গবেষণা করে এতে পাওয়া ফলাফল জনসমক্ষে হাজির করা হয়, তা পরে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নীতি হবার ক্ষেত্রে নির্ধারক ভুমিকা রাখে। তবে থিঙ্কট্যাংক বেসরকারি দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে চলে, সরকারী কোন প্রতিষ্ঠান সে নয়। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের বিশেষত্ত্ব হল, ১৯৭৩ সালে প্রেসিডেন্ট রিগানের প্রভাবে এই প্রো-ইহুদি থিঙ্কট্যাংক জন্ম নেয়। ঘোষিত লক্ষ্য হল, ঘোষণা দিয়ে বলে কয়েই রক্ষণশীলভাবে চিন্তা করা। রক্ষণশীলভাবে ভেবে দেখা আমেরিকার রাষ্ট্রনীতি কি হতে পারে, হওয়া উচিত। আর হেরিটেজ মনে করে আমেরিকান রাষ্ট্র যেন অবশ্যই বেসরকারি উদ্যোগ ও খাতের মাধ্যমে প্রায় সব কিছু করতে ও পরিচালিত হতে দেয়, রাষ্ট্র দায় কম নেয় এবং সব বিষয়ে রাষ্ট্র যেন সীমিত সংশ্লিষ্টতার ভুমিকায় থাকে এবং ব্যক্তি স্বাধীনতায়, প্রচলিত আমেরিকান মুল্যবোধ আর শক্ত আমেরিকান জাতীয় প্রতিরক্ষাবোধের কথা খেয়াল রাখে।

কিন্তু ছাপা হওয়া লিসা কার্টিজের এই প্রশ্নোত্তরকে আমাদের এত গুরুত্ব দেবার কি আছে? আমেরিকান সরকারগুলোর নীতিতে কোন থিঙ্কট্যাংকের ভুমিকা ও গুরুত্ব কি তা বুঝতে হলে মনে রাখতে হবে, আমেরিকান সমাজের কোন গ্রুপের কোন নীতি বা অবস্থান সরকারের নীতি হয়ে উঠার আগের ধাপটা হল থিঙ্কট্যাংকের উদ্যোগে করা চিন্তা, গবেষণা ও পরামর্শ। তবে আবার এটা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের জন্য ঠিক কোন বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একেবারেই তা সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা। আর থিঙ্কট্যাংকের কাজের ধরণ হল, সিরিয়াস গবেষণা শেষে ফলাফল স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাডেমিক, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দল নেতা, দেশের ও প্রয়োজনে বিদেশের রাজনৈতিক নেতাসহ সকলের সাথে তা শেয়ার করা, আর গোলটেবিল, সেমিনার আলোচনা সভার মাধ্যমে সে নীতি অবস্থানকে যতদুর সম্ভব একটা প্রতিনিধিত্বমুলক করে আকার দিয়ে তোলা। আর সবশেষে সরকারি অফিসের লোকজন চাইকি গুরুত্ত্বপুর্ণ বিষয় হলে সর্বোচ্চপদ মন্ত্রণালয়ের সচিব (আমেরিকান হিসাবে আন্ডার সেক্রেটারিকে) সেসব সভায় দাওয়াতে হাজির করে থিঙ্কট্যাংকের অবস্থান চুড়ান্ত করা। কিন্তু মনে রাখতে হবে এরপরেও থিঙ্কট্যাংকের নীতি-অবস্থান কোন আমেরিকান সরকার তার নীতি হিসাবে গ্রহণ করতে বাধ্য না হলেও সাধারণত দেখা যায় থিঙ্কট্যাংকের ঐ অবস্থান আংশিক অথবা পুরাটাই সরকারের নীতি হয়। আর অনেক সময় কোন সরকারের কেউ নিজেই “অনানুষ্ঠানিকভাবে” বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে কোন থিঙ্কট্যাংককে কোন একটা বিষয়ে এমন উদ্যোগ নিতে পরামর্শ দিয়ে থাকে।

হাসিনা সরকার টিকে যাবার জন্য কি ভারত, চীন ও রাশিয়ার সমর্থন দায়ী
লিসা কার্টিজ এই প্রশ্নোত্তরে ৫ জানুয়ারির পরও হাসিনার টিকে যাওয়ার জন্য ভারত, চীন ও রাশিয়ার স্ব স্ব বাংলাদেশ নীতিকে সরাসরি দায়ী করেছেন। লিসা কোন আমেরিকান সরকারী পদবীধারী কেউ নন। ফলে তার মুখ দিয়ে এমন সরাসরি অভিযোগ করা মন্তব্য নিয়ে ভারত, চীন বা রাশিয়া সরকারের কারও হেরিটেজের লিসা কার্টিজের অথবা আমেরিকার ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের (আমাদের হিসাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) কাছে ব্যাখ্যা চাইবার কিছু নাই। আবার লিসার বক্তব্য “আনুষ্ঠানিক” সরকারি না হয়েও আবার আসলে পরোক্ষে সরকারিই। লিসার বক্তব্যকে আমরা আমেরিকান সরকারি নীতি নির্ধারকদের প্রটোকল, কূটনীতির ভাষা, ফরমালিটির নিয়মকানুন থেকে মুক্ত হয়ে তাঁরা মন খুলে কথা বলতে পারলে কি বলতেন তেমন বক্তব্যের এক মহড়া মনে করতে পারি; এবং তা নীতি নির্ধারকদের সবার চিন্তার প্রতিনিধিত্বমূলক না হলেও অন্তত প্রভাবশালী একটা ধারার বক্তব্য হিসাবে দেখতে পারি। ফলে লিসা কার্টিজের বক্তব্যকে আমরা সেখান থেকে দেখে পাঠ করে এটাকে উসিলা করে তা নিয়ে আলোচনার সুত্রে মুল্যায়নে কিছু বলার সুযোগ হিসাবে নিব।
প্রথমত প্রকৃত তথ্য হিসাবে এক ভারত ছাড়া চীন অথবা রাশিয়া কি আসলেই হাসিনার সরকার টিকে যাবার কারণ, তাদের সমর্থনের উপর কি হাসিনা টিকে গেছে? তা মনে করার কোন কারণ আমরা দেখি না। এমন কোন ফ্যাক্টসের খবর কারও কাছে আছে অথবা বাস্তবে এটা তাই -এর কোন সত্যতা নাই। আমার আগের লেখায় বলেছি, ফ্যাক্টস হল ভারত আমেরিকা চীন রাশিয়া সবাই বাংলাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কট (যে যেমনটা দেখতে চায় তেমন) একটা আকার নিয়ে থিতু হয়ে বসুক তা নিজের স্ব স্ব স্বার্থে চায়। আবার এর সমস্যা ও এর জটিলতাগুলোও বুঝে ও মানে। ফলে এথেকে বেরোনোর পথ হিসাবে ভারতের নির্বাচনের দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। কারণ সেটা বর্তমান ভারসাম্যের প্রায় স্থবির অবস্থাটা ভেঙ্গে নতুন ভারসাম্য তৈরির নিয়ামক হতে পারে। আমার ঐ লেখাতেও আমি চীনের অবস্থান কোনভাবেই হাসিনার সরকারে টিকে থাকুক এমন তথ্য বা ব্যাখ্যা দেখাই নাই। কারণ ব্যাপারটা অলীক। বরং চীনের এ পর্যন্ত দেয়া রাষ্ট্রদুতের বিবৃতিগুলো, তাদের ফরেন অফিসের মন্তব্য এমন কোন সাক্ষ্য বহণ করে না। আর চীন বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশ আসার অপেক্ষায় আছে কথা সত্য তবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে হাসিনা আবার গেড়ে বসার পরেও সে এটাকে সঠিক ও উপযুক্ত সময় মনে করতে পারে নাই; অপেক্ষা করছে এক স্থিতিশীল রাজনীতি ও সরকার দেখার জন্য। এর সর্বশেষ প্রমাণ বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যানের বক্তব্য। (বিনিয়োগ বোর্ডের অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে) তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন চীনের দিক থেকে এব্যাপারে কোন নড়াচড়া নাই। ফলে লিসা কার্টিজের অভিযোগ আমরা দেখছি ভিত্তিহীন, কোন সারবত্তা নাই।
তবে লিসা আর এক অভিযোগ তুলেছেন সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি প্রসঙ্গে। ঐ প্রশ্নোত্তরে বলেছেন, “বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের চেয়ে এই দেশটিতে কিভাবে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করা যাবে সেদিকেই মস্কো ও পেইচিংয়ের মনোযোগ বেশি”। লিসা কার্টিজের এই অভিযোগকে পেটি ঈর্ষাজাত ক্ষোভ হিসাবে আমরা বড়জোর দেখতে পারি। প্রথম কথা চীনা সাবমেরিন বা অন্যান্য অস্ত্র বিক্রির বিষয়টা ৫ জানুয়ারির বহু আগের ঘটনা; অন্ততপক্ষে ২০১১ সালের ডিল, একালেরই নয়। আর যদিও একথা সত্য যে পরিসংখ্যান বলে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অস্ত্র সরবরাহের তালিকায় বিলের অঙ্কে এবং পরিমাণে চীনা অস্ত্র আমেরিকার চেয়ে বহুগুণে বেশি। কিন্তু এর কারণ চীনের আমাদের উপর বিশেষ আগ্রহ একথাটা ভিত্তিহীন। অথবা চীন আমাদেরকে মুখ্যত তার অস্ত্রের বাজার হিসাবে দেখে এটা কোন গবেষকের মুখ থেকে শোনা হাস্যকর বললে কম বলা হয়। এই বিদ্যা অথবা মুল্যায়ন এসেসমেন্ট দিয়ে কারও পক্ষে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক কোন গবেষণাকর্ম করা অসম্ভব। এতে ঘোড়ায়ও হাসবে। একথা বলে লিসা কার্টিজ নিজেকেই তুচ্ছ করেছেন। এর বেশি এনিয়ে আর কি বলব! পরিসংখ্যানের যে কথা বলছিলাম, খুব সম্ভবত অস্ত্রের মুল্য এবং অস্ত্রের উপর আস্থা মানে আমাদের বাজেট ও বাজেট অনুপাতে পাওয়া মান এগুলোই এখানে মুল ফ্যাক্টর। ফলে চীনা অস্ত্র কিনতে আমাদের মানে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বের চেয়ে বাহিনীর আগ্রহই বেশি ও মুখ্য। আর েব্যাপারে যারা খোঁজ রাখে তাঁরা কে না জানে আমেরিকার যেকোন অস্ত্র বা সরঞ্জামের মুল্য সর্বাধিক, তাতে কোয়ালিটি ও হাইটেক সুবিধা যত উচ্চমানেরই হোক। ফলে আমাদের বাহিনীর সিদ্ধান্ত – এটা প্রাকটিক্যাল, স্বাভাবিক এবং সর্বপরি আমাদের বাজেট বাস্তবতা যে তাঁরা সঠিকভাবেই মুল্যায়ন করতে জানেন এর প্রমাণ। ওদিকে, ভারতের উপর পুরা নির্ভরশীল ও মুখাপেক্ষি হাসিনার সরকারের নীতিতে দোষের শেষ নাই, একথা সত্য। কিন্তু এবিষয়ে আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রয়োজন, বাহিনীর নিজস্ব যুক্তি অবস্থান ও আগ্রহের প্রসঙ্গে গত পাঁচ বছরে হাসিনা যথোপযুক্ত উতসাহ ও সাড়া দেন নাই, প্রাধান্য দেন নাই এমন কথা বলা ও ভাবা ভুল হবে। একথা লুকানো নয় যে হাসিনা সর্বক্ষেত্রে ভারতের উপর নির্ভরশীল, বহু আন্ডারহ্যান্ড ডিল আন্ডারষ্টান্ডিং ভারতের সাথে তাঁর আছে, বাইরে থেকে দেখে আমরা অনুমান করতে পারি। আবার সামরিক বাহিনীর নিজস্ব স্বার্থজাত সিদ্ধান্তকে হাসিনা রাজনৈতিক অনুসমর্থন জানায় নি এমন উদাহরণ একেবারে নাই যে তা নয় (যেমন বিডিআর হত্যাযজ্ঞ ইস্যু)। তাসত্ত্বেও মোটের উপর হাসিনার রেকর্ড ভাল। যেমন ভারতের আপত্তি আর বিরূপ প্রচারণা সত্ত্বেও আমাদের জন্য গুরুত্বপুর্ণ চীনা সাবমেরিন কেনার সামরিক বাহিনীর প্রস্তাবে উদ্যোগে সাড়া দিতে তিনি পিছপা হন নাই। আমেরিকা এবং ভারতের অখুশি, আপত্তি, চোখ বড় বড় করে তাকানো সত্ত্বেও গত ২০১১ সাল থেকে চীনের সাথে ভাল ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পর্কও বজায় রেখেছেন, সফর বিনিময় অব্যাহত আছে এবং তা গুরুত্বের সাথেই, এবং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আগ্রহে সাড়া দিয়ে রেখেছেন। এককথায় বললে চীনের সাথে সম্পর্ককে হাসিনা ভারতের সাথে সম্পর্কের একই ঝুড়িতে রেখে ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেন নাই, আলাদা আলাদা বক্সে রেখেছেন যাতে কোন ঠোকাঠুকি না লাগে এমন করে বুদ্ধিবিবেচনার সুযোগ করে নিয়েছেন, গুরুত্ব দিতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এথেকে এমন সিদ্ধান্তে আসা বা বোকামিরও সুযোগ নাই যে হাসিনার সরকার ভারতের সাথে সাথে চীনেরও সমর্থনের উপর টিকে থাকা এক সরকার।
এমন সিদ্ধান্ত টানার সুযোগ না থাকার মুল কারণ (গত মাসের লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করেছি, এখানে সংক্ষেপে বলি) চীনের বিদেশনীতি এখন পর্যন্ত আমাদের মত দেশে কেমন সরকার বা কে সরকারে থাকবে এধরণের কোন পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগিদারী কর্তৃত্ত্ব না হলে চীনের বিদেশনীতি আগাবে না অথবা আমেরিকার মত চাপ দিয়ে আদায় করার নীতিতে চলে এমন করে তা সাজানো নয়। কিন্তু বাংলাদেশকে ঘিরে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ অবশ্যই আছে কিন্তু সেটা রাজনৈতিক বা পরাশক্তিগত কর্তৃত্ত্বের মাধ্যমে আদায় করে চলে এমন নয়। আবার লিসা কার্টিস যেমন এক জবরদস্তিতে আরোপিত ধারনা দেবার চেষ্টা করেছেন, চীনের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব যেনবা বাংলাদেশ চীনের কাছে অস্ত্রের লোভনীয় বাজার ফলে খাতক মাত্র। আর চীনও যেনবা অস্ত্র বিক্রি ব্যবসার উপর দাড়িয়েই রাইজিং চীনের অর্থনীতি হয়েছে, দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো ডাহা ভিত্তিহীন কথা এবং প্রপাগান্ডা। কেউ গবেষক হতে চাইলে তাঁর প্রথম পাঠ হল, অন্তত প্রপাগান্ডা আর তথ্যের ফারাক করে চলতে শেখা। এম্পায়ার আমেরিকার খাসলত দেখতে দেখতে লিসা কার্টিসের হয়ত একপেশে ধারণা হয়ে গেছে যেন আমেরিকা বা পশ্চিমের খাসিলতই চীনের খাসলত হতেই হবে। আগামিতে চীনের খাসলত কি দাঁড়াবে সেটা আগামিই বলতে পারে। কিন্তু এখনই পশ্চিমের খাসলত দিয়ে আগাম চীনের ঘাড়ে তা খামোখা চড়িয়ে আরোপ করে এখনকার চীনকে ব্যাখ্যা করার কোন অর্থ হয় না; তবে হয়ত পেটি ঈর্ষাজাত মনের সুখ পাওয়া যেতে পারে। তাহলে হাসিনা তাঁর সমস্ত বেকুবি নীতির দোষ থাকা সত্ত্বেও তিনি আমাদের সামরিক বাহিনীর চীনা অস্ত্র কেনার ব্যাপারে সম্মতি জানাতে সক্ষম হয়েছে। এটাই বাস্তব। এটা কতটা সামরিক বাহিনীর সাথে দুরত্ব তৈরি করার রিস্ক বা চটানো তিনি সহ্য করতে পারবেন বা পারবেন না সে কথা ক্যালকুলেশন করে রেখে করেছেন অথবা করেন নাই এনিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু বটম অব দা ফ্যাক্ট হল বাস্তবে তিনি এগুলো করে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন, এর কারণ যাই হোক। আবার লিসা কার্টিজের “চীনের অস্ত্রবিক্রির ধান্দা” এমন কথার প্রেক্ষিতে যদি বলি, আমাদের সামরিক অফিসারদের উপর প্রভাবের দিক থেকে যদি দেখি তবে তাদের ট্রেনিং সেমিনার ভিজিট ব্যক্তিগত সম্পর্ক ইত্যাদিতে আমেরিকার প্রভাবের সমতুল্য এর ধারে কাছে আর কোন রাষ্ট্র নাই। এমনকি ঘোর অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমেরিকার হাত মুচড়ানিতে পড়ে আমাদের সেনাবাহিনী এই তো সেদিন ১/১১ এর ক্ষমতা দখল করে দিয়েছে। এরচেয়ে বড় উদাহরণ আর কি হতে পারে! কিন্তু এজন্য আমি কেন কেউই বলবে না যে সেনা অফিসারদের উপর আমেরিকার প্রবল প্রভাব আছে অতএব আমেরিকার সমর্থনে হাসিনা টিকে আছে এগুলো তার প্রমাণ! অথবা লিসা যেভাবে বলেছেন যে বাংলাদেশে চীন “কিভাবে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি” করতে পারে সেই তালে আছে – তেমন করে কেউ বলবে না যে, আমেরিকা কেবল আমাদের অফিসারদেরকেই হাত করার তালে আছে। কারণ এতে বক্তার নিজের কান্ডজ্ঞানশুণ্য আর গাভর্তি রাগ ক্ষোভকে প্রমাণ করবে।

এবার হাসিনার টিকে থাকার ব্যাপারে রাশিয়ার ভুমিকা প্রসঙ্গে আসি। হ্যা, একথা সত্যি যে রাশিয়ার মধ্যে প্রবল অস্থিরতা আছে। যেখানেই কোন সরকারের সাথে আমেরিকার নুন্যতম বিরোধ সংঘাত আছে, রাশিয়া দেখে, সেখানেই ঐ সরকারের পক্ষে সমর্থন দিয়ে দাঁড়ায়ে পড়তে হবে -এমন সরল করে পরিস্থিতি মুল্যায়নের ও অস্থির মতির সিদ্ধান্ত নেবার একটা ঝোঁক রাশিয়ার আছে। এটা শত্রুর শত্রু মানেই আমার বন্ধু –এমন এক সরল তত্ত্ব। অথচ বন্ধুত্বের সম্ভাবনার এই যুক্তির ভিত্তি যথেষ্ট দুর্বল এবং আমাদের অভিজ্ঞতাও এর পক্ষে সায় দেয় না। মুল কারণ প্রতিটা বন্ধুত্ত্বের সম্পর্কের নিজস্ব পজিটিভ ভিত্তি লাগে। আর তাছাড়া একটা শেষ কথা আছে। রাশিয়ার এই ঝোঁক থাকা সত্ত্বেও এটাই তার নীতি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বা শেষ কথা নয়, শেষ বিচার্য ব্যাপারটা এমনও নয়। আরও বিবেচনাও আছে। আমেরিকা বা পশ্চিম বিরোধী ও পশ্চিমা বলয়ের বাইরে কোন স্বার্থজোট গড়ার আগ্রহ রাশিয়ার প্রবলভাবেই আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু একা সেকাজ করার মত সক্ষমতা রাশিয়ার নাই, বাস্তবতা নাই এটাও রাশিয়া ভালভাবেই জানে। কারণ রাশিয়ার যতই রাগ ক্ষোভ থাক এটা রাশিয়া-আমেরিকার দুই ব্লকে ভাগ হয়ে থাকার যুগ নয়, দুনিয়াও নয়, সেদিন গত হয়েছে বহু আগেই এটা সে ভালই হুশ রাখে। বরং রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর জোট (BRICS Bank এর মত প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে) এর পক্ষে তেমনি একটা সম্ভাবনা, তাই সে মানে। উতসাহী রাশিয়ার এমন মান্যি করাটা টের পাওয়া যায় যদি আমরা মনে রাখি প্রথম ব্রিকস সম্মেলন ডাকার আয়োজক হয়েছিল রাশিয়াই, ২০০৯ সালে। ওদিকে এব্যাপারে চীন ততোই ধীর স্থির ঠান্ডা মাথার। কোন হুড়োহুড়ি অস্থিরতা, এখনই সব জবরদস্তিতে করে ফেলার চেষ্টা করতে হবে এমন অবিবেচক সে নয়, তা দেখায়নি। চলতি গ্লোবাল অর্থনীতির অর্ডারটা ভেঙ্গে এরই প্রতিদ্বন্দ্বী নতুন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড় করানো এবং আমেরিকার বদলে নতুন নেতৃত্বে নতুন অর্ডার চালু করার কাজটা সফল করতে যেখানে পরিস্থিতিকে পরিপক্ক করে তুলার কাজটা কিলিয়ে কাঠাল পাকিয়ে করা মত কাজ নয়। বরং পরিপক্ক হতে যেখানে যতটুকু সময় ও মনোযোগ লাগবে সেখানে ঠিক ততখানিই দিতে হবে এব্যাপারে সে পরিস্কার। আমরা তাই দেখেছি। এছাড়া ব্যাপারটা পরিপক্ক বা ম্যাচিয়র হওয়াটা আবার ভলিন্টারিলি ও আপন ইচ্ছায় হতে হবে এমন দিকটাও তার নজর এড়ায়নি। যেমন একথা আজ পরিস্কার কেবল ব্রিক ব্যাংকই এখনও ফাংশনাল হতে পারল না ভারতের দ্বিমুখি দ্বিধাগ্রস্থতার কারণে। একদিকে পুরানো বা চলতি অর্ডারটা থেকে আমেরিকার তরফে বেশি সুবিধা পাবার লোভে পড়েছে ভারত আর অন্যদিকে ততটাই নতুন অর্থনৈতিক অর্ডারটা খাড়া করার ক্ষেত্রে ভারতের তাই পিছুটান ফলে ব্রিক ব্যাংক বিষয়ে ধীরে চলা – এই হল ভারতের দ্বিমুখি দ্বিধাগ্রস্থতা। ভারত এখনও তাই মনস্থির করে ব্রিক ফেনোমেনার পক্ষে দৃঢ় ও শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। কিন্তু সেজন্য চীনের ভারত নীতিতে আমরা কোন চাপাচাপি দেখিনি।

ভারতের দ্বিধামুখে বা দুমুখে খেলার আর এক প্রতীকী উদাহরণ
ভারতের দ্বিমুখি ঝোঁকের প্রতীকী ও আদর্শ উদাহরণ সম্ভবত ‘সাংহাই কর্পোরেশন’ উদ্যোগ। “সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন” (Shanghai Cooperation Organization (SCO) – ১৯৯৬ সালে শুরু হবার সময় মনে হয়েছিল এটা সম্ভবত এক সামরিক বা ষ্ট্রাটেজিক জোট হতে যাচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ক্রমশ এটা মূলত এক অর্থনৈতিক জোট হওয়ার চেষ্টা করছে। সম্ভবত সে কারণে এখনও আমেরিকান মিডিয়া থিঙ্কট্যাংক (কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন) এটাকে আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সামরিক জোট – ন্যাটোর মত এর পাল্টা সমান্তরাল এক সামরিক জোট, “চীনের ন্যাটো” বলে চিত্রিত করেছে। এর মূল উদ্যোক্তা চীন ও রাশিয়া, সাথে নেয়া হয়েছে সেন্ট্রাল এশিয়ার চারটি দেশ, Kazakhstan, Kyrgyzstan, Tajikistan, and Uzbekistan। জন্মের শুরুর দিকে ১৯৯৬ সালে SCO এক বিবৃতি দিয়েছিল এই বলে যে কবে “আমেরিকান সামরিক বাহিনী সেন্ট্রাল এশিয়া অঞ্চল থেকে গুটিয়ে চলে যাবে এর তারিখ তারা জানতে চায়”। তবে ঐ বিবৃতিতে আমেরিকাকে চলে যেতে হবে ঠিক এমন দাবী তারা করেনি কেবল তারিখ জানতে চেয়েছে আর আমেরিকার যে যাওয়া দরকার এতে এই তাদের আকাঙ্খার প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু ক্রমশ এই জোট একালে তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে আফগানিস্তান ২০১৪ পরবর্তি পরিস্থিতিতে। ২০১৪ পরবর্তি মানে আমেরিকার নিজস্ব পরিকল্পনা অনুসারে এবছর ২০১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে তাদের সব সৈন্য (ন্যাটোও) প্রত্যাহার করবেই। এটা তিন বছর আগেই নির্ধারিত ও সিধান্ত হিসাবে ঘোষিত। মূলত খরচ যোগাতে অসমর্থ অর্থনৈতিক অপারগতা -আমেরিকান নিজস্ব এই সীমাবদ্ধতার কারণে এই ঘোষণা। যদিও ২০১৫ সাল থেকে কি হবে, কেবল ট্রেনিং এর নামে (১০ হাজার রাখার ইচ্ছা আমেরিকার) কতজন সৈন্য থাকবে এবিষয়ে কোন নতুন চুক্তি কারজাই করেন নি। আফগানিস্থানে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শেষ হয়েছে চলতি মাসে কিন্তু ফলাফল এখনও প্রকাশ হয়নি, প্রক্রিয়াধীন। নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ঠিক করবেন নতুন আয়োজনে কিছু আমেরিকান সৈন্য রাখার চুক্তি কেমন হবে বা আদৌও হবে কি না। বাস্তব এই প্রদত্ত পরিস্থিতিতে SCO ভাবনা-চিন্তা করছে এবছরের শেষে ন্যাটো ও আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলে তারা সামরিক নয় বরং এক ব্যাপক বিনিয়োগ সম্পর্কে প্রবেশ করতে চায় আফগানিস্তানে। SCO তে অবজারভার ষ্টেটাসের সদস্য রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এর উপস্থিতিতে গত কয়েক বছর তা নিয়ে আলোচনা চলছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান ইরান, মঙ্গোলিয়া এবং ভারত এই পাঁচ রাষ্ট্র এখনও পর্যন্ত SCO এর অবজারভার সদস্য, পুর্ণ সদস্য নয়। তবে প্রতি বছরের SCO সম্মেলনে তারা গুরুত্ব দিয়ে অন্তত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাঠিয়ে থাকে। গত বছর ২০১৩ সেপ্টেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমন খুরশিদ কিরগিজস্তানে অনুষ্ঠিত SCO সম্মেলনে গিয়েছিলেন এবং ভারত পুর্ণ সদস্য হতে চায় সে ইচ্ছা ব্যক্ত করে এসেছেন। (দেখুন, India aspires to become full SCO member) কিন্তু একই সাথে তার স্ববিরোধীতা বা পিছুটানও ব্যক্ত করেছেন ঐ রিপোর্টে। বলেছেন, We are not sure of a timeline অর্থাৎ সময়সীমা বা কবের মধ্যে হব জানি না। এককথায় ব্যাপারটা হল, পুরানা গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার ভেঙ্গে পড়ার লক্ষণ হিসাবে আমরা দেখছি পালটা উদ্যোগগুলো একটা যেমন “ব্রিকস ফেনোমেনা” ঠিক তেমনই আর এক উদ্যোগ হল এই SCO গঠন। কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে, “ব্রিকস ফেনোমেনা” এই উদ্যোগের মতই SCO গঠন উদ্যোগেও ভারতের ভুমিকা দোলাচালে, আছি আবার নাই এমন দোদুল্যমান নন-কমিটেড। কিন্তু ধীরস্থির চীন বরাবরের মতই; ভারতের চিন্তা ও ভুমিকা সে জানে কিন্তু সেজন্য চীন ভারতকে তাড়া লাগায় নি, কোন ধরনের চাপ সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়নি, নিজে কায়দা কৌশল করে চাপ বা শর্ত তৈরি করেনি ভারতের উপর। বরং ছেড়ে দিয়ে রেখেছে ভারতের ভলিন্টারি ও আপন ইচ্ছার উপর। পরিস্থিতি পরিপক্ক হতে যতটা সময় লাগছে, দিচ্ছে। আবার আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিকঃ চীন বা রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর নেতৃত্বে নতুন গ্লোবাল অর্ডারের নৌকা ভাসানো মানে ব্যাপারটা যে পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা অথবা তাদেরকে একঘরে করা তা যে নয় এটা চীন সযত্নে খেয়াল রাখতে চায়। সকলকে মনে করায় রাখতে চাই। রাশিয়ার মত তাই চীন ব্যাপারটাকে প্রতিহিংসায় রি রি করে উঠার বিষয় মনে করে না, কারণ আসলে তো ব্যাপারটা পশ্চিমের উপরে প্রতিশোধ নেয়ারও নয়। ঠিক যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে, ইউরোপের কলোনী মালিক (বৃটিশ, ফরাসী, স্প্যানিস, ডাচ, পর্তুগীজ ইত্যাদি) যাদের সাম্রাজ্যের সুর্য নাকি কখনই অস্ত যাবে না বলে বড়াই শোনা যেত একদিকে তা ভেঙ্গে চুড়মার হয়ে গেল আর অন্যদিকে এর বদলে আমেরিকার নেতৃত্ত্বে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের সুচনা হয়েছিল কিন্তু আমেরিকা ব্যাপারটাকে ইউরোপের উপর আমেরিকার প্রতিশোধ হিসাবে ঘুর্ণাক্ষরেও দেখেনি, ইউরোপকে একঘরে করা হিসাবেই দেখেনি। কারণ আমেরিকা মানে তার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট (১৯৩৩-৪৫ পরপর চারবারের প্রেসিডেন্ট) এটা পরিস্কার ছিলেন যে এই পালাবদলের অর্থ প্রতিশোধ বা একঘরে করার মত তা একেবারেই নয়। বরং তাঁর নেতৃত্ত্বে এটা আরও সকলের সাথে ইউরোপকেও সাথে নিয়েই নতুন এক গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার সুচনা করার কাজ। ব্যাপারটা রুজভেল্টের দয়া বা উদারতার চোখে দেখার বিষয় নয়, বরং বাস্তবতা ও ঘটনাবলির বাস্তব অর্থও এটাই। এমনকি নীতিগতভাবে ষ্টালিনের রাশিয়াকেও কোন নীতিগত কারণে (যেমন কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র বলে) বা কোন প্রিযুডিস বা আগাম অনুমানে ধরে তার নেতৃত্বে আসন্ন নতুন গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডারের বাইরে রাশিয়াকে রাখার কথা তিনি ভাবেননি। এজন্য উদ্যোক্তাদের প্রথম সভায় টানা ২২ দিনের ব্রেটনহুড সম্মেলনে রাশিয়া উপ্সথিত ছিল। এনিয়ে বিস্তার করে অন্য কোথাও লিখতে হবে। এবারের পালাবদলেও ব্যাপারটাও তাই, এখানে সাদৃশ্য আছে। এখনকার প্রসঙ্গের জন্য সারকথা এতটুকুই যে রাশিয়ার ইতিউতি উঁকি মারা বা অস্থিরতায় থাকলেও অন্তত চীনকে বাদ দিয়ে এককভাবে হাসিনাকে চোখবন্ধ সমর্থন দিয়ে রাশিয়া এগিয়ে যাবে এই অনুমান ভিত্তিহীন। হাসিনার সাথে ৫ জানুয়ারির পরের পরিস্থিতিতে একসাথে কাজ করার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত রাশিয়ান বিবৃতিতেও এমন কিছু নাই যেটা একই প্রসঙ্গে আমেরিকা বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিবৃতিতে নাই। ফলে রাশিয়াকেও জড়িয়ে লিসা কার্টিসের অভিযোগ ভিত্তিহীন ও মনগড়া অনুমানের।

হাসিনাকে দানব বানানোর তিন দেশীয় সমর্থনের এই অভিযোগ তাহলে উঠল কোন সূত্র থেকে
একটা কথা বলে রাখা ভাল, লিসা কার্টিসের এই অভিযোগ তাহলে উঠল কোথা থেকে? একেবারেই কি তা সুত্রহীন? না, সুত্র সম্ভবত একটা আছে। সেই সুত্র ভারত নিজে। একটা হুইস্পারিং ক্যাম্পেইন বা কানকথা ভারত ছড়িয়েছে। ধীরস্থির চীনের বিপরীতে অস্থির প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে যেমন রাশিয়া ঠিক তেমনই আর এক প্রান্ত হল ভারত, হাত নিশপিশ করা ভারত। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আমেরিকার সাথে তার সুখের হানিমুন ভেঙ্গে যাওয়াতে এই হাত নিশপিশ, পারলে আমেরিকাকে এখনই একটা শিক্ষা দিয়ে দেয় এমন ভাব। উপরে বলেছি, এতদিন ভারত আমেরিকার লোভের ফাঁদে পড়ে কেবল নিজের জন্য পুরানো বা চলতি অর্ডা্রটা ও এর সংশ্লিষ্ট পরাশক্তিগত ভারসাম্যটাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে থাকলে আমেরিকার কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা পাবে এই বেকুবি লোভে ও আশায় ব্রিক ব্যাংকের উদ্যোগকে ধীরে চল নীতিতে আটকে রেখেছিল। আজ আমেরিকার সাথে বিরোধে হঠাত স্বপ্নভঙ্গ হওয়াতে সে প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠেছে। মিথ্যা ভয় ছড়িয়েছে, প্রপাগান্ডায় মেতেছে যে ভারত, চীন ও রাশিয়া একজোট হয়ে উঠতেছে ফলে এবার আমেরিকাকে শিক্ষা দেয়া হবে। যদিও এই বাস্তবতা পরিপক্ক হতে এখনও ঢেড় সময় লাগবে এবং ব্যাপারটা মোটেও ঠিক শিক্ষা দেবার বা প্রতিশোধ নেবার মত নয়। কিন্তু সার কথা সেটা অন্তত একদুই কয়েক বছরের মধ্যে ঘটবার মত তো নয়ই। আর সেকাজটাও তো খোদ ভারতই ধীরে চল নীতিতে ফেলে রেখেছে, দোদুল্যমান ও লোভী হয়ে মনোযোগ দেয়নি। এটা সে ভাল করেই জানে। এবং এখনও মনস্থির কিনা আমাদের জানা নাই। ফলে কানকথা ছড়িয়ে শত্রু আমেরিকার যদি কিছু ক্ষতি করা যায়, ভয় দেখিয়ে কিছু বাগে আনা যায় – তো তাতেই মনের সুখ ভারতের। আর এই কান কথা ছড়ানোর প্রপাগান্ডা মেশিনের দায়িত্ত্ব দিয়েছে বা নিয়েছে হাসিনা সরকার। মন্ত্রী হবার পর, ভারত সফর করা (১৮-২২ জানুয়ারী, ২০১৪) বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রী হলেন তোফায়েল আহমেদ। ভারত সফর থেকে ফিরে ঢাকায় তিনি সাংবাদিক সম্মেলন ডেকেই এই কানকথাগুলো ছড়িয়েছেন। খুব সম্ভবত সেখান থেকেই লিসা কার্টিজের – ভারত, চীন রাশিয়া – এই তিন “অক্ষশক্তিকে” হাসিনা সরকার টিকিয়ে রাখার খলনায়ক হিসাবে প্রপাগান্ডা। এটাকে ভারতের প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে লিসা কার্টিসের প্রপাগান্ডার কৌশল বলা যেতে পারে। কিন্তু গুরুত্ত্বপুর্ণ দিকটা হল, প্রপাগান্ডার লড়াই করা – এই কাজ কোন গবেষকের হতে পারে না। লিসা এখানে গবেষক মর্যাদা থেকে পতিত স্খলিত হয়েছেন।

সত্য লুকানো
লিসা বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্র তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না। মার্কিন কর্মকর্তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের বর্তমান বাংলাদেশ নীতি খুবই ক্ষুদ্রদৃষ্টিসম্পন্ন”। একথা বলে লিসা সত্য লুকালেন। বেশিদিন আগে নয় ২০০৭ সালে এই হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের গোলটেবিল বৈঠকে “দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকা ভারতের চোখে নিজের নিরাপত্তা ইস্যুটাকে দেখবে” বিষয়টা সাব্যস্ত হয়েছিল সেসময়ের আন্ডার সেক্রেটারী অব ষ্টেট (২০০৫ – ৮) নিকোলাস বার্ণসের উপস্থিতিতে। নিকোলাস বার্নসকে বলা হয় ইন্ডিয়ার সাথে আমেরিকান নতুন ও বিশেষ সম্পর্কের (বিশেষ করে পারমানবিক টেকনোলজি, অন্য অস্ত্র ভারতকে সরবরাহ এবং নিরাপত্তা চুক্তির প্রধান নিগোশিয়েটর) কারিগর। আমেরিকা নিজের তথাকথিত নিরাপত্তার অজুহাতে কি বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক রাখেনি, সারাজীবন আমাদের মত দেশে কে ক্ষমতায় থাকবে বা থাকবে না তা ঠিক করার যাতাকাঠিটা কি ভারতে হাতে ব্যবহার করতে ধার দেয়নি? এসবই ২০০৭-৮ সালের ঘটনা, আমাদের তা ভুলে যাবার কোন কারণ নাই, লিসারও নয়।
অর্থাৎ চীনের রাইজিং ইকোনমি তথা অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে দাড়াবার বিরুদ্ধে ভারতকে পক্ষে টেনে তার মন পাবার জন্য আমেরিকা কেবল “ভারতের প্রেসক্রিপসনের” নয়, বাচ্চা যা চায় তা সব পূরণ করার চেষ্টা করেছে। আর তাতে বাংলাদেশের জন্য এমন দানব ভারতের আবির্ভাব ঘটিয়েছে যে তার একক স্বার্থে গড়া যেন এক কলোনি বাংলাদেশ সরকার হাজির করেছে ২০০৯ সাল থেকেই। আজ খোদ ভারত ও হাসিনা সরকার লিসার আমেরিকাকে কলা দেখিয়েছে, তুচ্ছ করছে – এতে এখন বেয়ারা বাচ্চা কথা শুনে না বলে লিসার গোস্যা করার কি আছে? এমনটাই কি হবার সম্ভাবনা সবসময় ছিল না অথবা কথা নয়।
তবে এটা ঠিক সর্বশেষ গত তিন বছর ২০১১ সাল থেকে আমেরিকা ও ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে মুখোমুখি সংঘাত দেখা দিয়েছে। ফলে লিসার কথা কেবল এখন অর্থে সঠিক যে “যুক্তরাষ্ট্র এখন আর তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না”। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বাচন-মরণ এমন নির্ধারক ভারত ফ্যাক্টর হয়ে উঠল কবে থেকে? তা কি আমেরিকার প্ররোচনাতেই হয় নাই?
যদি মানবজমিনের অনুবাদের কিছু বাদ পরে না যেয়ে থাকে তবে দেখা যাচ্ছে লিসা বলছেন “যুক্তরাষ্ট্র তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না”। অর্থাৎ বাক্যটা আমেরিকা “ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর কখনও নির্ভর করে নি অথবা করে না” – এমন নয়। লিসা সুযোগ রেখে দিয়েছেন, যেন প্রছন্নে ধরে নিয়ে বলতে চাইছেন – “আগে করত এখন করছে না”। তো সেক্ষেত্রে “ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর” আগে নির্ভর করা আর এখন না করা সবকিছুর দায়ভার কাফফারা সবই তো আমেরিকারই।
এছাড়া এখন লিসা আবিস্কার করে বলছেন, “মার্কিন কর্মকর্তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের বর্তমান বাংলাদেশ নীতি খুবই ক্ষুদ্রদৃষ্টিসম্পন্ন”। খুবই ভাল কথা, সত্যি কথা। কিন্তু সত্যি কথাটা অনুভব করতে আমেরিকা বড্ড দেরি করে ফেলেছে। এর দায় এবং দুর্ভোগ দুটার জন্য আমেরিকার তৈরি হওয়াটাই লিসার কপাল! নয় কি? আমেরিকান নীতির দায় খেসারত তো আমেরিকারই। এতে বাংলাদেশে আমাদের দুর্দশার কথা তাকে আর নতুন করে কিইবা বলার আছে এখানে!
তবে লিসা এখন হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন। মানবজমিন জানাচ্ছে, “লিসা বলেন, “যে কোন পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসন শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধেই যাবে”। “যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বর্তমান বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না,এটা সত্য”। অর্থাৎ লিসা হাসিনা সরকারকে এখন চিহ্নিত করছেন, “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” সরকার বলে। বিগত ৫ বছর অর্থাৎ গত ৫ জানুয়ারির ইলেকশনের আগে পর্যন্ত কি এটা ভিন্ন কিছু ছিল? লিসা বাক্যের মধ্যে অর্থের একটা ফাঁক রেখে দিতে চেয়েছেন, পরিস্কার করেননি। বাংলাদেশের আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, এটা ২০০৯ সাল থেকে এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই,আমাদের কাছে কোন কিছুই নতুন ঠেকে নাই। তাহলে কি লিসা এতদিন খবর নেন নাই, রাখেন নাই? না, আসলে ব্যাপারটা তা না। পুরা প্রশ্নোত্তরে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে লিসার বক্তব্যে ছত্রে ছত্রে আমেরিকার বাংলাদেশ নীতির উপর হতাশা ফুটে বের হয়ে আছে। এটা আসলে নিজ কর্মফলের উপর নিজেরই হতাশা। সেই হতাশা থেকে এখন “দায়ী কে” বলে নিজের দিকে না তাকিয়ে বাইরের শত্রু খোজার চেষ্টা আছে। যেমন যেকথা দিয়ে শুরু করেছি, “লিসা কার্টিস বলেন,শেখ হাসিনা সরকারকে চীন,রাশিয়া ও ভারতের এই নিঃশর্ত সমর্থন বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে পশ্চিমা দেশগুলোর বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলেছে”। অর্থাৎ তিনি দোষী খুজে পেয়েছেন, ভারত চীন ও রাশিয়াকে। এই তিন রাষ্ট্রের তাদের স্ব স্ব বাংলাদেশ নীতিকে। কেন তিনি এভাবে বাইরের শত্রু খুজছেন?

আমেরিকা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ান
লিসার দরকার থাপ্পড় খাবার পরও আমেরিকার বাংলাদেশ নীতিকে একটা ইতিবাচক ভাবাদর্শগত টোপড় পড়িয়ে আড়াল টানা। যেটাকে বলে আমেরিকান নীতির পক্ষে ইডিওলজিক্যাল ন্যায্যতা জোগাড় করা। লিসার দিক থেকে তিনি জানেন, আমেরিকান নীতির সততা প্রমাণ করতে চাইলে আসলে আগে দরকার বিপরীতে ভিলেন ক্যারেকটার চিহ্নিত ও চিত্রিত করা। ভিলেনকে যত নোংরাভাবে আঁকা তিনি আঁকতে পারবেন আপনাআপনি নায়ক আমেরিকা বা ওর নীতির সততা ততোই উজ্জ্বল হবে। সিনেমার মত এই হল তাঁর ফর্মুলা।
লিসার সম্ভাব্য বা হবু প্রমাণিতব্য বিষয় হল এতদিনের আমেরিকার বাংলাদেশ নীতি যেন বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলার ততপরতাই এবং সর্বশেষ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ভিতর দিয়ে এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” খপ্পরে পড়েছে তা থেকে উদ্ধার করার ততপরতা। এখানে তাঁর ফোকাস শব্দ গণতন্ত্র। আমেরিকাকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ান হিসাবে হাজির করা।
এই প্রসঙ্গে তিনি চিন ও রাশিয়ার বাংলাদেশ নীতির ‘নোংরা’ বা ভিলেন ভুমিকার পিছনের কারণ সম্পর্কে বলছেন। মানবজমিন লিখছে, “বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার দৃশ্যত ভিন্নমাত্রার সম্পর্ক বিষয়ে লিসা বলেন, ‘৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন সত্ত্বেও রাশিয়া ও চীন শেখ হাসিনা সরকারের পাশে দাঁড়াবে- এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কেননা, এই দেশ দু’টির নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই। তাই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অধিকার কিংবা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা খুব কমই উদ্বিগ্ন”। এটা লিসার দেয়া খুবই ইন্টারেষ্টিং একটা তথ্য সন্দেহ নাই । চিন ও রাশিয়ার “নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই”। তাই তারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মর্ম বুঝল না, দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসন তারা কায়েম করল। এবং তা আবিস্কার করে লিসা আশ্চর্য হন নাই। লিসার এই যুক্তির পাটাতনটা আমেরিকা-রাশিয়ার ঠান্ডা-যুদ্ধের সময়কালের। যখন আমেরিকা রাশিয়ার ‘গণতন্ত্রের ঐতিহ্য ভিত্তি নাই, ফলে বুঝল না’ বলে প্রপাগান্ডা করত আর বিপরীতে নিজে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন প্রমাণ করতে আমাদের মত সবদেশেই মার্শাল ল’ এর দানব শাসনের সরকার কায়েম করত। পুরা ঠান্ডা যুদ্ধের কালেই লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আমাদের মত সব দেশগুলো চলেছে আমেরিকান সমর্থিত সামরিক শাসনে। এটা বেশ মজার যে লিসা কার্টিজ সেই ক্লিশে বিগতযৌবনা যুক্তি একালে সবাই যেখানে একই গ্লোবাল পুঁজিতন্ত্রে সম্পর্কিত সেকালে আবার হাজির করছেন। সেসব বাজে ফালতু কথা থাকুক। আমরা বরং প্রশ্ন করি, যে কোন রাষ্ট্রের বিদেশনীতিতে মুল পরিচালক নির্ধারক ফোকাস কোনটা? আরেক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা নাকি নিজের পরাশক্তিগত অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক অথবা ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ হাসিল করা? এটা লুকিয়ে লাভ নাই যে প্রশ্নাতীতভাবে এর জবাব দ্বিতীয়টা। এবং এটা ঠান্ডাযুদ্ধের সেকাল এবং একাল যেটাই হোক সবকালেই অর্থাৎ সবসময় এটা সত্য। তবে হ্যা এটা কাঁচা সত্য অর্থাৎ কূটনৈতিক ভাষায় এই সত্য এই লক্ষ্য বা ফোকাসের কথা সরাসরি বলা হয় না, বলা যাবে না। বলা হবে মোড়ক, রেঠরিক বা বাকচাতুরি দিয়ে। যেমন ‘গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য’, কিংবা ‘গণতন্ত্র মহান’ এসব বাকচাতুরির ভাষায়। বেশিদিন আগের নয়, ‘সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ তো আমরা সেদিনও বাংলাদেশে দেখেছি।
তাহলে দাড়ালো এই যে বাংলাদেশের জন্য লিসার আমেরিকা গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন আর চীন বা রাশিয়ার নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নাই বলে গণতন্ত্রের মর্ম বুঝল না – এই তত্ত্বের বেইল নাই। এটা ক্লিশে বিগতযৌবনা যুক্তি। কিন্তু তবু লিসার তত্ত্বে আর একটা জিনিষ কিছুতেই বেড় পায় নাই মানে চওড়ায় আটাইতে পারে নাই। লিসার এই তত্ত্ব ভারতের বেলায় খাটাতে গিয়ে তিনি বিপদ টের পেয়েছেন। গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়নরা ভারতকে “বৃহৎ গণতন্ত্রের” পরাকাষ্ঠা বলতে বলতে মুখের ফেনা তুলে ফেলে থাকে। ফলে চীন বা রাশিয়ার মত ‘নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নাই’ বলে সব সমস্যাকে এসেন্সিয়াল করার লিসার বিগতযৌবনা যুক্তি বা তত্ত্বটা এখানে খাটছে না। তাই এবার নতুন পাঞ্চ, নতুন টুইষ্ট বা প্যাঁচ। মানবজমিন লিখছে, “লিসা কার্টিস বলেন, ভারতে যদিও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ গতিশীল এবং দেশটি তার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করে থাকে, কিন্তু নিজ দেশের গণ্ডির বাইরে গণতন্ত্র উত্তরণে নয়া দিল্লিকে কখনও বড় রকমের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি”।
আগে বলেছি, বাংলাদেশে গণতন্ত্র দেখতে চাওয়া না চাওয়াটা এমনকি কোনটাকে গনতন্ত্র করা হচ্ছে বলে চালিয়ে দেয়া হবে এর সবটাই নির্ভর করে ভারতসহ যেকোন বিদেশীদের বিদেশনীতিতে কোনটা তাদের নিজেদের আপন স্বার্থে যায় এর উপর। অর্থাৎ সুপ্রিম হল, ভিন্ন রাষ্ট্রের আপন স্বার্থ। কেউই বাংলাদেশে গণতন্ত্র কায়েম করার জন্য নিজের রাষ্ট্রে দোকান খুলে নাই। বাংলাদেশের জনগণও তা করতে কাউকে দিতেও পারে না। প্রশ্নও উঠে না। য়ার ২০০৯ সালে কি আমেরিকা ভারতের হাত দিয়ে আমাদেরকে হাসিনার মহান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও শাসন উপহার দেয়নি? আসলে লিসা এই প্রশ্নোত্তর লিখার সময় তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, লিসা কার্টিজ একজন কূটনৈতিক নন বরং গবেষক, হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো। গবেষক হিসাবে তাঁর কাজ কোন বিদেশনীতিকে ক্রিটিক্যাল ও এনালাইটিক্যাল চোখে অর্থাৎ বিশ্লেষক হিসাবে ঘটনাবলিকে দেখার বিরাট সুযোগ তার ছিল এবং আছে। বিদেশী রাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতি বাস্তবের মুখোমুখিতে পড়লে ওর সমস্যাগুলো কি, কি চেহারা নিয়ে তা দাড়ায় তা নিয়ে বিশ্লেষক অন্তর্দৃষ্টি হাজির করা হত পারত তার আসল ভুমিকা। সম্ভবত একাজে তাঁর ঘাটতি খামতি ঢাকতেই তিনি গবেষকের বদলে স্বচ্ছন্দে তিনি যেন কূটনৈতিক – এই ভুমিকায় নেমে পড়েছেন।

আমেরিকার নীতিটাই স্ববিরোধী ও আত্মপ্রবঞ্চনামূলক
মানবজমিনের প্রশ্নোত্তরের রিপোর্টিংয়ের শুরুতে বলেছে, “গণতন্ত্রের পক্ষে দুর্বার গণআন্দোলনই বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে পারে। গণতন্ত্রের দাবিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব বেশি অস্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ বিষয়ে ভারত তার অবস্থান পরিবর্তন করবে বলে মনে হয় না”। একথাগুলো লিসা কার্টিজের প্রশ্নোত্তরে বলা তার নিজেরই কথা কি না আমরা পরিস্কার হতে পারিনি। হতে পারে তা লিসা কার্টিজের লেখা জবাবের কোন অংশ পড়ে মানবজমিন রিপোর্টারের মনে যে ছাপ তৈরি হয়েছে সেই সুত্রে লেখা। যাই হোক সেটা, এই প্রসঙ্গে একটা কথাই বলা যেতে পারে। সর্বশেষ গত একবছরের বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবাদ বিক্ষোভের কথাই যদি বলি যখন গণবিক্ষোভ আন্দোলনের তোড়ে এক পর্যায়ে ঢাকা ঢাকার বাইরে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ হাসিনার বিরুদ্ধে তাদের সাধ্যমত সর্বোচ্চ প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছিল। কিন্তু লক্ষ্যণীয় হল সেসময় এর প্রতি আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গি। চলমান ঐ গণআন্দোলন যতই মাত্রা লাভ করছিল আমেরিকাসহ বাংলাদেশের পশ্চিমা কূটনীতিকরা ততোই একে ‘সহিংসতা’ বলে ব্যাখ্যা করছিল বললে কম বলা হবে। বলতে হবে অভিযুক্ত করেছে একতরফা ভাবে। আর তথাকথিত ‘অহিংস’ প্রতিবাদের কথা নসিহত করছিল আমাদের। কিন্তু এই প্রতিবাদ বিক্ষোভকে হাসিনা সরকারের রাস্তায় প্রতিবাদ “বিক্ষোভ দেখা মাত্রই আর্মড গাড়িতে চড়ে সরাসরি গুলি” এই মারাত্মক মোকাবিলার ধরণ সম্পর্কে কোন কার্যকর নোটিশ তারা করেছে এমন প্রমাণ তারা রাখে নাই। অর্থাৎ সরকারের সরাসরি গুলি এটা সহিংসতা নয়, নৃশংসতা নয়। যারা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে সেটা সহিংসতা করা। পশ্চিমা কূটনীতিকদের ভাষ্যের পিছনে এমন নীতিটাই আমরা দেখেছি।
অর্থাৎ দেখা গেছে আমেরিকার নীতিটাই স্ববিরোধী ও আত্মপ্রবঞ্চনামূলক। যদি তারা সত্যিই বিশ্বাস করে হাসিনা এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” বিপদ ডেকে আনছে তবে সততার সাথে তা বলতে হত, করতে হত। উলটা জনগণের প্রতিবাদ বিক্ষোভকে ‘সহিংসতা’ বলে লেবেল লাগিয়ে পালটা প্রচারণায় তাদের নামার কথা নয়। কিন্তু তারা সেটাই করেছে। নিজেদের স্ববিরোধী নীতিটারই বাইরে সরব প্রকাশ ঘটিয়েছে। কূটনীতিকদের কথা সে জগতে থাক। লিসা কার্টিজ বা হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রসঙ্গে সেদিকে আর না যাই। কূটনীতিকদের কথা বাদ রেখে এনিয়ে খোদ লিসার আর এক লেখা (৫ জানুয়ারি নির্বাচনের দুসপ্তাহ আগে লেখা) থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে কিছু সারকথা বলা যাক। লেখার শিরোনাম, দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামিজমের বিরুদ্ধে লড়াঃ বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে রাখা। এখানে দেখুন। [Combating Islamism in South Asia: Keeping Bangladesh on the Democratic Path] এই লেখা হেরিটেজ ফাউন্ডেশন থেকে স্পনসর করা লিসা কার্টিজের কাজ। ওর সারাংশ দেয়া আছে রিপোর্টের শুরুতে সেখান থেকে একটা বাক্য, “While the threat from terrorism had diminished to some extent under the government of Prime Minister Sheikh Hasina, the recent execution of an Islamist politician and the sentencing to death of other opposition leaders accused of war crimes during Bangladesh’s war of independence in 1971 have unleashed furor among Islamists.”। অর্থাৎ লিসা দাবি করছেন হাসিনা সরকারের অধীনকালে নাকি সন্ত্রাসবাদের বিপদ কিছুটা কমেছে। কিন্তু লিসা কিভাবে বুঝলেন যে বিপদ কমেছে। তাঁর বুঝাবুঝির নির্ণায়ক, মানে কি দেখে তিনি বুঝলেন? আমরা জানি না। কিন্তু এক নিশ্বাসে একই বাক্যের পরের অংশে বলছেন, “একজন ইসলামিষ্ট রাজনীতিকের ফাঁসি দেয়া হয়েছে”। অর্থাৎ লিসা সরাসরি বলছেন না তবে তার নির্ণায়ক কি সেটা তিনি ইঙ্গিতে বলছেন।
কিন্তু কোন ‘ইসলামি রাজনীতিকের’ ফাঁসির সাথে সন্ত্রাসবাদের সম্পর্ক কি? হাসিনা কি তাঁকে ফাঁসি দিয়েছেন “সন্ত্রাসবাদের” জন্য? আমেরিকা “সন্ত্রাসবাদ” মনে করে তেমন কোন ততপরতার জন্য এই ফাঁসি দেয়া? লিসা সেটা খোলসা করে না বরং ইঙ্গিতে ধরে নিতে বলেছেন। চিন্তার এই ফাঁকি ও অসততাটা লক্ষণীয়। আবার তিনি বলছেন ফাঁসিটা “‘৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযুক্ত হিসাবে তবে এটা ইসলামিষ্টদের বিক্ষুব্ধ করেছে”।
তিনি যদি বুঝাতে চেয়ে থাকতেন, ৭১ সালের একটা কৃত যুদ্ধাপরাধের ফাঁসি এটা তাহলে এটা কোনই সমস্যার হত না। যদিও সেক্ষেত্রে সেই অপরাধী ইসলামিষ্ট কিংবা ইসলামিষ্ট নয় তাতে কিছুই এসে যাবার কথা নয় কারণ এটা গৌণ দিক। মুখ্য দিক হবার কথা তিনি যুদ্ধাপরাধী। কিন্তু তিনি এই ফাঁসির ঘটনাকে সম্পর্কিত করছেন ১) হাসিনাকে “সন্ত্রাসবাদের হুমকি” কমানোর নায়িকা হিসাবে। (২) ফাঁসির কারণে যারা বিক্ষুব্ধ হয়েছেন তাদেরকে বিক্ষোভকে “ইসলামিষ্টদের বিক্ষোভ” হিসাবে চিহ্নিত করে।
একটা কথা লিসাসহ এমনভাবে যারা ভাবেন তাদের সবাইকে পরিস্কার করে বলতে হবে। ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ কি একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ? যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচার? আমাদের মনে রাখতে হবে, আলকয়েদা বা তা সংশ্লিষ্ট দল বা গ্রুপের ততপরতা অথবা আলকায়েদার মত ততপরতাকে আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ মনে করে।

যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচার
কোন প্রশ্ন না রেখে ধরে নিচ্ছি আমেরিকায় সংজ্ঞায় যেটাকে সন্ত্রাসবাদ বলা হয় সেটাই সন্ত্রাসবাদ। আদালতে কোন অপরাধের বিচার এবং শাস্তি হয়ে গেলে তা থেকে বুঝার উপায় কি যে ঐ অপরাধ সন্ত্রাসবাদের অপরাধ ছিল কি না? তার আগে একটা কথা পরিস্কার করে নেই। অপরাধটা যদি কোন “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” করেন (লিসা কার্টিস Islamist politician বলে এক শব্দ ব্যবহার করেছেন) তাহলেই কি সেটাকে সন্ত্রাসবাদের অপরাধ বলে বুঝব? না তা অবশ্যই বুঝা যাবে না, বুঝা ঠিকও হবে না। কারণ মূল বিষয় হল, দেশের কোন আইনে অভিযোগটা দায়ের করা হয়েছে এটাই সবকিছুর নির্ধারক। এটাই এবিষয়ে সব তর্কের অবসানের মুখ্য উপায়। ফলে অভিযোগ যদি দায়ের ও গ্রহণ করা হয়ে থাকে “যুদ্ধাপরাধ আইনে” (আমাদের মূল ইণ্টারনাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল এক্ট ১৯৭৩ যা সংশোধিত হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে কয়েকবার তার সর্বশেষ সংশোধনীসহ) তাহলে কেউ “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” হন আর নাই হন তিনি একমাত্র যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন বা ফাঁসি হয়েছে বলা যাবে, বলে বুঝতে হবে। আর অভিযোগ যদি দায়ের ও গ্রহণ করা হয়ে থাকে আমাদের “সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনে (আমাদের মূল সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০০৯ যা ২০১৩ সাল পর্যন্ত সংশোধিত হয়েছে তা সহ) তাহলে কেউ “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” হন আর নাই হন তিনি একমাত্র সন্ত্রাসবাদের অপরাধ করেছেন, অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন বা ফাঁসি হয়েছে বলা যাবে, বলে বুঝতে হবে। এই কথা থেকে পরিস্কার যে, ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ কোনভাবেই নয়। এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচা্র তাও কোনমতেই নয়। যেসব জামাতের নেতাদের বিচার চলছে বা ফাঁসি হয়ে গেছে এরা কেউই “সন্ত্রাসবাদের অপরাধে” এখনও বিচারের কাঠগড়ায় অথবা বিচার শেষে রায়ে শাস্তিপ্রাপ্ত বা ফাঁসিপ্রাপ্ত তা একেবারেই নয়। মুল কারণ তাদের সবার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে ইণ্টারনাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল এক্ট ১৯৭৩ – এই আইনে। এরপর আশা করি জামাতের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধাপরাধের (আসলে সঠিক আইনী ভাষায় ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’) বিচার বা শাস্তিকে কেউ “সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে” বিচার হচ্ছে বলে বুঝবেন না, ভুল করবেন না, মিথ্যা ছড়াবেন না। এমনকি জামাতের কোন নেতাকে (লিসা কার্টিসের মত করে) কেউ Islamist politician বলে মনে করেন কিংবা না করেন তাতে কোন ফারাক পড়বে না।
এখান লিসা কার্টিসের চিন্তার ফাঁকিটা গ্রেফতার করা যায়। এরপরেও জবরদস্তিতে লিসা কার্টিজ যদি মনে করেন, ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধটাও একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ। তাতেও আমাদের অসুবিধা নাই। কিন্তু লিসা কার্টিজসহ যারা এভাবে মনে করবেন তাদেরকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে তাহলে আমেরিকা নিজেই ঐ “সন্ত্রাসবাদের” অংশ। আজ ৭১ সালের ঘটনাগুলো যুদ্ধাপরাধ বলেন অথবা “সন্ত্রাসবাদ” বলেন যে নামেই লিসা কার্টিজ ডাকেন এর দায়ভার আমেরিকারও। কারণ তখন আমেরিকান অবস্থান মুসলিম লীগ বা জামাতে ইসলামসহ পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকের পক্ষে ছিল, সমর্থন ছিল।
ধরে নিচ্ছি আমেরিকান সন্ত্রাসবাদ সংজ্ঞায়নের এসব বিপদ টের পেয়ে এবার হয়ত লিসা কার্টিজ জোর দিবেন তাঁর ব্যবহৃত “ইসলামিষ্ট” শব্দটার উপর। অর্থাৎ ইসলামিষ্ট রাজনীতি মানেই “সন্ত্রাসবাদ”, ফলে সন্ত্রাসবাদের বিপদ দেখতে পাওয়া। লিসাদের জেনে অথবা না জেনে অথবা চিন্তায় ফাঁকি দিয়ে সন্ত্রাসবাদের ভুত দেখে বেড়ানোটাও আরও মারাত্মক বিপদের। কারণ জামাত ইসলামি ইসলামি রাজনীতি করে তাতে সন্দেহ নাই। এই অর্থে লিসা যদি “ইসলামিষ্ট” শব্দটা ব্যবহার করে থাকেন তবে তাঁকে মনে করিয়ে দিতে চাই বিচারটা হয়েছে যুদ্ধাপরাধের আইনে কোন এন্টি-টেরর ল জাতীয় কোন “সন্ত্রাসবিরোধী আইনে” নয়। ফলে আমেরিকার “সন্ত্রাসবাদ” খুজে ফেরা চোখে লিসা কার্টিজ বড়জোর একজন আমেরিকান নাশনালিষ্ট নাগরিক, কোন মতেই কোন গবেষক নন। এছাড়া আমরা আরও বুঝব লিসাও হাসিনার বাকচাতুরির ফাঁদে পড়েছেন। এই ফাঁসি কোন এন্টি-টেরর এক্টে হচ্ছে কি না – এই সহজ দিকটা খেয়াল করার মত বুদ্ধি তিনি দেখাতে পারেন নাই। যদি লিসা দেখতেন, জানতেন তবেই সেটা খুব সহজেই আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদী ঘটনা তিনি বলতে পারতেন ও সে ঘটনাকে তাঁর ‘ইসলামিষ্টের বিচার’ কথার কোন অর্থ হত।
হুশ হারানো বুদ্ধি বিবেচনার এই স্ববিরোধ লিসা কার্টিজের একার নয়। আমেরিকাসহ প্রায় সব পশ্চিমা কূটনীতিকদেরও একই অবস্থা। ইসলামিষ্ট কথাটাকে তারা জবরদস্তি তাদের সংজ্ঞার সন্ত্রাসবাদ বলে ইঙ্গিত মেরে প্রচ্ছন্নে বুঝাতে চান। এভাবে তাদের নিজেদের সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা বা ক্রাইটেরিয়া তারা নিজেরাই গুলিয়ে ফেলেন। অথবা ইচ্ছা করে করে রাখেন। কিন্তু বটম লাইন হল, জামাত আওয়ামি লীগের মতই একটা আধুনিক রাষ্ট্রের কনষ্টিটুশনাল আইনী রাজনৈতিক দল, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া যাদের উভয় দলের লক্ষ্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বা পাড়ায় আওয়ামি লীগের মতই জামাতও চাপাতি ধরণের সন্ত্রাস করে। কিন্তু চাপাতির সন্ত্রাস করলেও যেমন আওয়ামি লীগ সশস্ত্র বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যের কোন রাজনৈতিক দল নয় ঠিক তেমনি জামাতও আওয়ামি লীগের মতই কোন সশস্ত্র বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যের রাজনৈতিক দল নয়। এমনকি একথা ১৯৪২ সাল থেকে শুরু হওয়া মওলানা মওদুদির রাজনৈতিক চিন্তার ও দলের ক্ষেত্রেও সমান সত্য ও প্রযোজ্য।

যদিও সমস্যাটা কেবল লিসা কার্টিজের নয়, কেবল পশ্চিমা কূটনৈতিকদেরও নয়। এমনকি আমাদের অনেকেই ইসলামি রাজনীতি অপছন্দ করি বলে এই জবরদস্তি জেনে অথবা না জেনে করি। সে যাক, পশ্চিমা কূটনৈতিকরা মনে করতেই পারেন তারা তাদের সন্ত্রাসবাদের লড়াই করবেন আর সেকাজে বাংলাদেশে একটা “গণতান্ত্রিক” মেকানিজম ও প্রক্রিয়া চালু রেখে বা দেখতে চেয়ে তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ মোকাবিলা করবেন। এটা হতেই পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সবার আগে তাদের মনে খোলা হতে হবে। “ইসলামিষ্ট” শব্দটা শুনে কোন আগাম ধারণার বশবর্তি হয়ে দ্বিধাগ্রস্থতার কিছু নাই। অন্তত আইডিয়ালি বললে একাজে তারা কোন ব্রান্ডের “ইসলামিষ্টদেরকেও” না পাবার কোন কারণ নাই। কারণ শুনে ইসলামিষ্ট লাগলেও মর্ডান রাষ্ট্রের মত এক লিবারেল রাষ্ট্রই তাদের কল্পনা – এটুকু আছে কিনা সেটাই তো মূল বিবেচ্য হওয়ার কথা।
তাহলে, মুল সমস্যাটা পশ্চিমা মনের। এই স্ববিরোধের কারণে তাই একদিকে লিসা কার্টিজ হাসিনা সরকারকে সন্ত্রাসবাদ লড়াইয়ে খামোখা সার্টিফিকেট দেন আবার অভিযোগ করেন হাসিনার বাংলাদেশ এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” বিপদ ডেকে আনছে।

একটা সতর্কবাণী দিয়ে শেষ করি। এতক্ষণ কথাগুলো বলেছি, বাইরের মানুষ আমাদেরকে কি করে দেখে সেদিক থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে নতুন রাষ্ট্র গঠনের কাজটা আমাদের। এবং একান্তই আমাদের। একমাত্র আমাদেরকেই তা বাস্তব করে তুলতে হবে। সেকাজে আন্দোলন সংগ্রামই আমাদের পথ। লিসা কার্টিস সহ বাইরের কেউ আমরা কি করি জানতে আগ্রহ থাকতে পারে। তাতে তাদের দেখার স্ববিরোধীতাটা কোথায় তা তারা ঠিক জানুক আর নাই জানুক, আমাদের কাজ আমাদেরকেই করতে হবে। আশা করি সেদিকটা আমলে রেখে আমরা লেখাটা পাঠ করব।

SHORT LINK:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (৩), তৃতীয় কিস্তি

তৃতীয় কিস্তি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (৩)

চীনের বাংলাদেশ নীতি ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে চীনের ভুমিকা

গৌতম দাস

১৮ এপ্রিল ২০১৪

http://wp.me/p1sCvy-5E

বাংলাদেশে বসে চীন প্রসঙ্গে প্রায় সব আলোচনায় সবচেয়ে যেটা সমস্যা হয়ে দেখা দেয়, লেখক ও পাঠক উভয়েই প্রসঙ্গে প্রবেশ ও পাঠ শুরু করে এটা ধরে নিয়ে যে চীন একটা ‘কমিউনিষ্ট’ বা ‘সমাজতন্ত্রী’ রাষ্ট্র। কমিউনিষ্ট বা সমাজতন্ত্র বলতে প্রচলিতভাবে কমিউনিষ্ট বা সমাজতন্ত্র শব্দটা সম্পর্কে যে পপুলার বুঝ আছে এর উপর দাঁড়ানো ধারণাটাকে বুঝিয়েছি। আর সেই সাথে, কমিউনিষ্ট চোখে দেখা অর্থাৎ ঠান্ডাযুদ্ধের ব্লক রাজনীতির যুগে আশির দশক পর্যন্ত দুনিয়াকে যেমন বলে মনে করা হত, যে চোখে দেখা ও ব্যাখ্যা করা হত সেই বুঝ দিয়ে চীনকে বুঝা বা ব্যাখ্যা করার অভ্যাস – এই সবটাকে বুঝিয়েছি। কিন্তু ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়ার কারণে পুরানা সেই চিন্তার ফ্রেম ও অভ্যাস যার উপর দাঁড়ানো ছিল সেই বাস্তবতাই আমুল বদলে গেছে, দুনিয়ার অজস্র পরিবর্তন এসেছে। আবার আমূল পরিবর্তন শুধু সোভিয়েত রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে দুনিয়ায় ঘটেছে তাই নয়। সোভিয়েত রাষ্ট্র ১৯৮৯ সালে ভেঙ্গে পড়ার অন্তত ১৮ বছর আগে ১৯৭১ সালের আর এক ঘটনা ছিল সেটা। ১৯৭১ সালের পর থেকে ক্রমশ চীন-আমেরিকার সম্পর্কের বাস্তব প্রেক্ষিতটাই যখন বহু কিছুকে আমুলে পরিবর্তিত করে দিয়ে গেছে। খুব কম মানুষই বিশেষ করে ‘কমিউনিষ্ট’ মহলে এই গুরুত্বপুর্ণ বদল নজর আমলে এসেছে। অর্থাৎ ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়ার ঘটনাটা ঘটলে বা না ঘটলেও এর থেকে স্বধীন ভাবে ঘটেছিল সেই ঘটনা। এসবের দিকে বেশিরভাগ লেখক ও পাঠকের কোন নজর হুশ সেখানে থাকেনি। সেসব বিস্তারে এখানে না যেয়ে বিষয়টাকে এককথায় বললে, এখন চীন আমেরিকা উভয়েই একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম অধীনস্ত একক অর্থনীতিতে গভীরভাবে সম্পর্কিত দুটা রাষ্ট্র। এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে পড়লে অথবা না পড়লেও এটা একইভাবে সত্য – এই বাস্তব দিকটায় নজরে আনতে চায় না কেউ। বরং আশির দশকের ধারণা ও ব্যাখ্যা দিয়েই দুনিয়ার ঘটনাবলিকে এখনও ব্যাখ্যা ও বুঝবার কসরত করতে দেখা যায়। এমনকি সর্বশেষ গত ২৫ বছরের রাইজিং চীনের পরিবর্তনগুলোর বিষয়ে মৌলিক তথ্য সংগ্রহের ও তাতে নজর দেবার বিষয়ে সবাই পিছিয়ে। অথচ পুরান কায়দায় বাস্তবতাহীন দৃষ্টিভঙ্গির ও অকেজো তত্ত্ব ও ব্যাখ্যার বিপরীতে একেবারে গোড়ার কথাটা হলো, চীন-আমেরিকার সম্পর্ক একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম অধীনস্ত হবার ভিত গাড়া ঘটেছিল সেই সত্তরের দশকের শুরু থেকে। আবার রাষ্ট্র দুটার সম্পর্কিত হওয়া মানে আর তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিরোধ নাই তা একেবারেই নয়। আগে অনুমান করা হত রাশিয়া-আমেরিকা অথবা চীন-আমেরিকা ব্যাপারটা “সমাজতন্ত্র বনাম পুঁজিতন্ত্র” ধরণের বিরোধ, যেটা ইডিওলজিক্যাল। সেই অনুমান মিথ্যা নয়। কিন্তু এব্যাপারে এর চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্টটা আমাদের চোখের আড়ালে থেকে গেছে। তা হল, বিরোধটা ইডিওলজিক্যাল কি না এরচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হলো তখন চীন-আমেরিকা (অথবা রাশিয়া-আমেরিকা) এমন দুই রাষ্ট্র ছিল নিজেদের মধ্যে কোন লেনদেন বাণিজ্যের সম্পর্কহীন এবং প্যারালাল, ফলে দুই আলাদা অর্থনীতির। আর সত্তরের দশকের পর থেকে চীন-আমেরিকা (এবং রাশিয়ার বেলায় তা ১৯৯১ সালের পর থেকে) ক্রমশ হয়ে পড়েছে সবাই একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম অধীনস্ত। উভয়েই একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে থাকলেও সেই সাথে তাদের মধ্যে ভালরকমের স্বার্থগত বিরোধ প্রতিদ্বন্দ্বিতাও তাতে আছে। কিন্তু হাতে গুণে মনে রাখতে হবে সেটা আর ‘পুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্র’ ধরনের ইডিওলজিক্যাল নয়। আবার আগের মতই কিন্তু নতুন রূপে পরাশক্তিগত বিরোধ আছে তাদের মধ্যে শুধু তাই না, তা বাড়ছে কিন্তু কোনভাবেই তার ভিত্তি আগের মত ইডিওলজিক্যাল নয়। এটা “রাইজিং ইকোনমির” চীন বা রাশিয়া।

“রাইজিং ইকোনমির” চীন অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা
লেখার শুরুতে নতুন পাঁচ পরাশক্তির উত্থানের কথা তুলেছিলাম। এই পাঁচের – ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন ও সাউথ আফ্রিকা – মধ্যে আবার সবাই “রাইজিং ইকোনমির” দেশ বলে একদর হলেও এক মোটা দাগে চীন অন্য চারটার চেয়ে ভিন্ন, আলাদা গুরুত্ত্ব বিবেচনা রাখে। রাইজিং ইকোনমি মানে যার জিডিপি ভাল, দুই ডিজিটের দিকে তরতর করে আগাচ্ছে, প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ যেখানে ছুটে যাচ্ছে, গ্লোবাল বাজার শেয়ার যার বাড়ছে ইত্যাদি। কিন্তু ভিতরে হাত দিয়ে দেখলে বুঝা যাবে, এক চীন ছাড়া আর চার রাষ্ট্রের কারও অর্থনীতির ভিত্তি ম্যানুফাকচারিং বা ইন্ডাষ্টিয়াল প্রডাকশন নয়। অবস্থাটা হলো, ঐ চার রাষ্ট্রের অর্থনীতিও চীনের মতই বিদেশি বিনিয়োগ হজম করছে কিন্তু তা মূলত মাটির নিচের সম্পদ (তেল, কয়লা, মিনারেল ইত্যাদি) তুলে আনা আর তা বিদেশে রপ্তানী বিক্রি করতে। এরপর তা বেচে-খেয়ে শেষ। ইন্ডাষ্টি বলে নতুন কোন অর্থনীতির চক্র শুরু সেখান থেকে আবার হয় নাই। যদিও বৈদেশিক রিজার্ভ আনার তথ্যের দিকে তাকালে দেখা যাবে তা এদের সবার শক্ত হচ্ছে, উদ্বৃত্বের অর্থনীতি বলেও তা আপাতত হাজির হচ্ছে। কিন্তু ইন্ডাষ্টিয়াল প্রডাকশনের কোন ভিত্তি এর নাই। আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের রাষ্ট্রের মাটির নিচের সম্পদের অন্য রাষ্ট্রের অর্থনীতির কারণে বিপুল চাহিদা তৈরি করে আছে, বাজার আছে, বিক্রি হচ্ছে, তবেই সেগুলো ‘সম্পদ’ বলে বিবেচিত হচ্ছে। নইলে তা মাটির নিচের আবর্জনা বৈ কিছু নয়। রাশিয়ার কথাই ধরা যাক। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২০০৭-৮ সাল পর্যন্ত ১৭০ ডলার ব্যারেল ছিল। এরপর মহামন্দা দেখা দিলেও এখনও তা ১০০ ডলারের আশেপাশে, এর নিচে যায় নাই। ফলে রাশিয়ান উদ্বৃত্ত্ব অর্থনীতি বলে কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে। আভ্যন্তরীণ বাজারমুখি ইন্ডাষ্টিয়াল ভিত্তি একটা ওর আছে ঠিকই কিন্তু উতপাদন দক্ষতা, মান ও ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা চরমে ফলে তা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানীযোগ্য নয়; একারণে রাশিয়ার ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ভিত্তি কোরিয়ারও সমতুল্য নয়। ফলে রপ্তানী দূরে থাক তা টিকে থাকার জন্য ধুকছে। এসবের বিপরীতে চীনের ভিত্তি একই সাথে ইন্ডাষ্টিয়াল প্রডাকশনের এবং তা রপ্তানীর আর নিজ ব্যাপক জনসংখ্যার গুণে নিজের আভ্যন্তরীণ বিশাল ভোক্তা বাজারের উপর দাঁড়ানো। তাহলে মুল কথা হল, রাইজিং অর্থনীতির চীন অন্য চার রাইজিং অর্থনীতির চেয়ে বিশেষ। আবার অন্য দিক থেকে, এখন সারা দুনিয়া জুড়েই প্রায় রাইজিং অর্থনীতিরসহ সব রাষ্ট্রই একই এবং একটাই – এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে ও পরস্পর গভীরভাবে সম্পর্কিত ও নির্ভরশীল। এই কথাটা মনে রেখে ঘটনাবলির দিকে তাকানো, মাঠের তথ্য সংগ্রহ ও এর ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হতে হবে আমাদের। এর ভিতরেই এবার পরাশক্তিগত পাশ ফেরা অদলবদল নতুন কি ঘটছে তাই এই লেখার প্রসঙ্গ। ১৯৯০ সাল থেকে হিসাব করলে আমেরিকাসহ পশ্চিমের রপ্তানী বাজারমুখি দখলের প্রতিযোগিতায় বড় প্রতিদ্বন্দ্বী খেলোয়ার হয়ে চীন প্রায় পঁচিশ বছর কাটিয়েছে। আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো রাষ্ট্রীয় ঋণে চীনের কাছে ঋণী। এক আমেরিকায় চীন রাষ্ট্র তিন ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের (ক্রয় করা আমেরিকান সরকারি বন্ড, অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি ইত্যাদি) মালিক।
কিন্তু যেটা খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ বিষয় তা হল, (১) এখন পর্যন্ত চীনের এই প্রচেষ্টা পশ্চিমের এম্পেরিয়াল কায়দায় কাঁচামাল সংগ্রহ ও বাজার দখলের মত নয়। এম্পেরিয়াল কায়দা মানে পরাশক্তিগত রাজনৈতিক সামরিক শক্তি বা যাতাকাঠি ব্যবহার করে, প্রভাব বিস্তার করে জবরদস্তি খাটিয়ে সস্তায় কাচামাল সংগ্রহ ও সেই দেশে নিজের জন্য পণ্যবাজার দখল করে আগানো। বৃহত্তর অর্থে, দুনিয়ায় আগের মতই পরাশক্তিগত এম্পেরিয়াল কায়দাই চালু আছে। কিন্তু এর ভিতরেই চীন একটু আলাদা তুলনামূলকভাবে, কোন পলিটিক্যাল যাতাকাঠি ব্যবহার না করেই এক ধরনের প্রতিযোগিতাপুর্ণ “ভাল ডিল” দিয়ে ব্যবসা বাগানোর যে সুযোগ আছে তাকেই ব্যবহার করে এগিয়ে চলছে চীন। এতটুকু তুলনামূলক অর্থে এটা ভিন্ন। এককথায় বললে অন্য রাষ্ট্রের সরকারে কে থাকবে, কাকে উঠিয়ে ফেলে দিতে হবে -একাজে ‘পলিটিক্যাল লিভারেজ’ ব্যবহার করে নিজের অর্থনীতি আগিয়ে নেয়ার নীতি এখন পর্যন্ত চীনের নয়। এখনও পর্যন্ত তাই আমাদের মত ভিন দেশে চিনের স্বার্থের প্রকৃতি রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক। এই নীতির পক্ষে দাঁড়িয়ে চীন আগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। (২) দুনিয়ায় চলমান গ্লোবাল দ্বন্দ্ব বিরোধে তা কোন ধরনের সামরিক ঝগড়া বিরোধের দিকে মোড় নিলে সেখানে আর নিজেকে জড়িত না করা। বড় জোর কূটনৈতিক পর্যায় পর্যন্ত জড়িয়ে থাকা। এটা রাইজিং চিনের আর এক লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট। চীনের এই নীতিতে ব্যতিক্রম আছে তা হল, নিজ রাষ্ট্রের ভুখন্ডগত স্বার্থের (তাইওয়ান ইস্যু সহ) বিষয় হলে তবেই সামরিক দিকও সেখানে একটা অপশন। এককথায় বললে পলিটিক্যাল খবরদারী ও সামরিক ষ্টেক বা ভাগীদার হিসাবে নিজেকে না জড়িয়ে কেবল ব্যবসা, নিজের অর্থনীতি এগিয়ে নেয়া – এই হল এখন পর্যন্ত চীনা বৈশিষ্ট। এথেকে এমন বুঝা বা দাবী করা ভুল হবে যে এই নীতি চীন আগামিতে সবসময় বজায় রাখবে। তবে এখন পর্যন্ত এটা চিনের আগাবার লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট – এদিকটা যেন আমাদের নজর না এড়ায়।
উপরের যে দুটো গুরুত্ত্বপুর্ণ বিষয় আমলে আনলাম, গত ২০০৯ সালের পর থেকে ওর প্রথম বিষয়টায় চীন আরও কিছু পালক লাগিয়েছে। এককথায় বললে তা হল, পশ্চিম থেকে ধীরে ধীরে পুব বা এশিয়ামুখি হয়ে অর্থনীতিকে আগানো। এশিয়ামুখি মানে? এশিয়ামুখি ভারকেন্দ্র করে কোন এম্পেরিয়াল কায়দার মত করে ব্যবসা ও অর্থনীতি? না অবশ্যই তা নয়। কারণ, (১),পলিটিক্যাল খবরদারী বা লিভারেজ ছাড়াই প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা এই নীতি এখনও অটুট। (২) চীন এশিয়ার পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে এক পরস্পর নির্ভরশীল ও একসাথে বেড়ে উঠার অর্থনীতি দাঁড় করাতে চায়। লো টেকনোলজি এবং শ্রমঘন গার্মেন্টসের আমাদের মত পিছিয়ে থাকা দেশের রপ্তানী শিল্পের ক্রেতা হতে চায় সে নিজে। আর এর ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ মূল মেশিনারিজ, কাপড়ের মেশিনারি ও কাচামাল তৈরি থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, বিদ্যুৎ ইত্যাদি আমাদের দেশের অবকাঠামোগত খাতগুলোতে সব বিষয়ে বড় বিনিয়োগ চীন এগিয়ে আসবে, প্রবেশ করবে। অর্থাৎ এশিয়ার পিছিয়ে থাকা দেশগুলো যে যা রপ্তানী করতে সক্ষম এমন পণ্যগুলোর ক্রেতা হবে সে নিজে, নিজের বাজারে তাদের প্রবেশ সহজ করবে আর তুলনায় হাইটেক কারখানা বা অবকাঠামোগত খাতে বিনিয়োগে সে এগিয়ে প্রবেশ করবে। এভাবে লেনদেন বিনিময়ের এক নতুন যুগের এশিয়া গড়তে চায় চীন। এভাবেই এশিয়ায় পরস্পর নির্ভরশীল ও একসাথে বেড়ে ঊঠার এক এশিয়া ভারকেন্দ্রের অর্থনীতির সুচনা করতে চায় চীন। এই ইচ্ছা ও পরিকল্পনা সম্ভব হবার বা তা যে কাজ করবে এর কারণ বা পিছনে মুল শর্ত উপস্থিত আছে। ইতোমধ্যেই চীনের শ্রমমুল্য পিছিয়ে পড়া এশিয়ার দেশের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে গেছে। ফলে আমরা সেসব রপ্তানী পণ্যের ক্রেতা হবে চীন যেসব সে নিজে উতপাদন করতে চাইলে চীনের শ্রমমুল্য বেশি বলে তা তাদের পোষাবে না। এসবেরই সারকথা হলো, চীন বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশে আসার জন্য আমাদের পলিটিক্যাল ষ্টাবলিটির অপেক্ষায় আছে। একথাগুলো মাথায় রেখে এই প্রসঙ্গে ২০১২ সালের অক্টোবরে ডেইলি ষ্টার পত্রিকায় বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদুতের এক সাক্ষাতকার ও একই প্রসঙ্গে পত্রিকার নিজস্ব একটা রিপোর্ট এর লিঙ্ক দেখা যেতে পারে। উপরে বাংলাদেশের প্রতি চীনা নীতির এপ্রোচ বা পেশ হওয়া প্রসঙ্গে যে ছবি এঁকেছি ডেইলি ষ্টারের এই দুই লিঙ্ক থেকে এর স্বপক্ষে কিছু যুক্তি প্রমাণ পাওয়া যাবে।

আমেরিকা বিদেশনীতি ও সেই সুত্রে ভারতের বিদেশনীতি ক্রিয়ার চীনের প্রতিক্রিয়া
উপরে যেদিকের কথা দিয়ে শুরু করেছি তা, অবশ্যই চীনের প্রতিক্রিয়া। মানে ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া। কোন ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া? লেখার শুরুতে বলা পরাশক্তিগত ওলটপালট আসন্ন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ও ভারতের ক্রিয়ার বিরুদ্ধে। কথা শুরু করেছিলাম ২০০৭ সালের আমেরিকার বিদেশ নীতির বৈশিষ্ট – এই ক্রিয়া থেকে। শুরুতে ভারতের পিঠে হাত রাখার জন্য আমেরিকান ক্রিয়ার কথা বলেছিলাম। আজকের একই পুঁজিতন্ত্রে গাথা দুনিয়ায় প্রত্যেক রাষ্ট্রের বিদেশনীতি মতিগতি আগের যে কোন সময়ের চেয়ে একেবারেই উদোম হয়ে চলে। ফলে আমেরিকা ও সেই সূত্রে ভারতের চীন নীতিতে কি আছে কি বদল এসেছে তা আর কোন গোপন বিষয় নয়। বিপরীতে চীনা প্রতিক্রিয়া এবং নীতিও। পরাশক্তিগত পালাবদলের পুরা সার্ভে রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর গত ২০০৯ সালে ওবামা চীন সফরে গিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য শুরুতে মিডিয়ায় চীনের বিরুদ্ধে হম্বিতম্বি দামামা ছিল। কিন্তু যখন ওবামা ফিরলেন তখন মিডিয়া জুড়ে কেবল অর্থনীতির নানান ক্ষেত্রে চীন-আমেরিকা সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তি আর সেই সাথে ওবামার ব্যাগে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসার খবর। সাধারণ্যে আমরা চীন-ভারত ব্যবসায় খবর খুব কম রাখি, বিরোধ দ্বন্দ্বের খবরই ছেয়ে থাকে উপরে। চীন-ভারতের ব্যবসা বা বাজারের আকার ছিল ২০০২ সালে ৫ বিলিয়ন ডলার, আর ২০১১ সালে তা বেড়ে দাড়ায় প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ আমেরিকা ও সেই সূত্রে ভারতের চীন নীতি পরাশক্তিগত পাস-ফেরার ইঙ্গিতে যতই মারমুখি সামরিক হয়ে উঠতে চেষ্টা করেছে এর বিরুদ্ধে চীনা প্রতিক্রিয়া ততই এদের প্রতি ব্যবসায়িক ও সহযোগিতামূলক, গরম ক্রিয়াকে ঠান্ডা করতে ঠান্ডা পানি ছিটানোর প্রতিক্রিয়া। বড়ভাই আমেরিকা পিঠে হাত রাখায় ভারত ২০০৭ সাল থেকেই নিজেকে পরাশক্তি ভাবা শুরু করে। অপ্রয়োজনীয় মাসল দেখানোর ভিতর দিয়েই সব সমস্যা বিরোধের মীমাংসা হবে এমন ভাবা শুরু করেছিল। “এই চীন আসছে” ধরণের খবরে ভারতের মিডিয়াগুলো মুখর হয়ে থাকত। এমনিতেই সবাই জানে ভারতের মিডিয়া বা থিঙ্কটাংকগুলোও স্বীকার করে যে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ ভারতীয় বাহিনীর মনে একটা ট্রমাটিক অবস্থা তৈরি করে দিয়ে গেছে। যদিও সেই থেকে চীন-ভারতের বাস্তব বিরোধ মূলত অরুণাচল প্রদেশের সীমানা নিয়ে, মূলত এই এক ইস্যুতে। সর্বশেষ গত বছর ২০১৩ এর শেষে, সীমান্ত বিষয়ক সেই সন্দেহের গোড়া উতখাত করেছে চীন। প্রথমে গত ২০১৩ সালের মে মাসে চীনা প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করেছিলেন আর এর পাঁচ মাস পরে পালটা সফরে অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর চীন সফরে, সেখানেই চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ মিটানো বিষয়ে Border Defence Cooperation Agreement (BDCA) নামের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চীন-ভারত সহযোগিতা সম্পর্কের দিক থেকে এই চুক্তি সুদুরপ্রসারি ইঙ্গিতময়। এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের যুগ খুলেছে। আর এটা ঠিক ততটাই ভারতের যুদ্ধংদেহী বাজপাখি নীতির অনুসারিদের এবং সারা পশ্চিমা মিত্রসহ আমেরিকার জন্য চপেটাঘাত।
এই লেখার শুরুতে উল্লেখ করেছিলাম আমেরিকার সার্ভ রিপোর্টের কথা। আমেরিকা নিজের একক পরাশক্তিগত ভুমিকার পতন আসন্ন রিপোর্টের এই ইঙ্গিতে দিশেহারা হয়ে এশিয়ার রাইজিং চীন-ভারত দুই ইকোনমির মধ্যে পরস্পর লাগালাগি যত তীব্র করে রাখতে পারবে ততদিন নিজের সম্ভাবনা তার আশা জীবিত থাকবে অনুমান করে আমেরিকা নিজের এশিয়া-নীতি রচনা করেছিল। ভারতের পিঠে হাত রেখে চীনকে দাবড়ানো –এভাবে সাজাতে মনস্ত করেছিল। ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান চীন-ভারতের মাঝখানে বলে সর্বশেষ ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশকে নিজের ষ্ট্রাটেজিক গুরুত্বে আমল করতে শুরু করতে ততপর হয়েছিল। স্বভাবতই চীন-ভারতের এই সীমান্ত চুক্তি সেসব পরিকল্পনার আগুনে পানির ছিটা দেবার মত। এরই কিছুটা ঝলক পাওয়া যাবে foreignpolicy জার্ণালের এই রিপোর্টে। [দেখুন,India-China Border Agreement: Much Ado about Nothing]। এর শিরোনামটাই অদ্ভুত অর্থপুর্ণ, সব বলে দেওয়া। Much Ado about Nothing – এই বাক্যাবলী আসলে সেক্সপিয়ারের এক কমেডি নাটকের শিরোনাম। দুলাইনে বললে ওর কাহিনীটা হলো, এক রাজ-সৈনিকের রাজকন্যার সাথে প্রেম। ক্লোডিয়া নামে ঐ সৈনিকের এই প্রেমে বন্ধুবেশি তার শত্রু ডন জন সবরকমভাবে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত সৈনিক ও রাজকন্যার মিলন ও বিয়ে হওয়া ঠেকাতে পারে নাই। বিয়ে মিলন হয়েছিল। আশা করি পাঠক বুঝতে পারছেন কেন শিরোনামটা বহু অর্থবোধক।
সে যাই হোক, ভারত ও চীন উভয় পক্ষও পারস্পরিক সম্পর্কের দিক থেকে এই চুক্তিকে “landmark legal document” অথবা “strategic benchmark” বলে উল্লেখ করেছে। চুক্তির সারকথা হল, উভয়ে ভূমিতে যে যেখানে দখল অবস্থানে আছে তা অমীমাংসিত অবস্থায় রেখেও পরস্পর মুখোমুখি হয়ে গেলে একটাও গুলি না ছুড়ে পরস্পরের প্রতি সৌজন্য দেখিয়ে পরিস্থিতি যেন কোন ধরনের সশস্ত্র বিরোধের দিকে না যায় তা নিশ্চিত করবে – এভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়।

চীন কি আসলেই ভারতকে মুক্তার মালার মত ঘিরে ফেলার পরিকল্পনায়
তবে শুধু সীমান্ত চুক্তিই নয়, চীন-ভারতের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠতার দিক থেকে নতুন মোড় ফেরার উপাদানও মনমোহনের ঐসফরে অন্য আর চুক্তির ফলে তৈরি হয়েছে। এটা আমেরিকার জন্য চপেটাঘাতের অনুভুতি আরও তীব্র হয়েছে।
গত ২০০৭ সালের দিকে চীনা বিনিয়োগ আগ্রহের বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট দুটা গুরুত্ত্বপুর্ণ প্রকল্প ছিল, (১) মাঝখানে প্রায় ৪৩ কিমি বার্মা পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে পুর্ব চীনের কুয়েমিন প্রদেশ পর্যন্ত যোগাযোগের রাস্তা নির্মাণ প্রকল্প আর (২) বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্প। দুটো প্রকল্পই নিজস্ব বিনিয়োগে করে দেবার ব্যাপারে চীন আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়া ও থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো এই আগ্রহকে ব্যাখ্যা করেছিল চীন নাকি ভারতকে মুক্তার মালার মত চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করছে, এমন ভীতি ছড়িয়েছিল। অর্থাৎ চিনের বিদেশনীতির লক্ষ্য ও ফোকাস অর্থনীতি নয় বরং ভারতকে ঘিরে ধরার মত সামরিক-ষ্ট্রাটেজিক। কিন্তু এভাবে ব্যাখ্যা করে ভীতি ছড়িয়ে যা আড়াল করে ফেলা হয়েছিল তা হল এই প্রকল্প দুটার প্রতি আগ্রহ চিনের নিজেরই অর্থনীতি বা অবকাঠামোগত স্বার্থ। ম্যাপের দিকে তাকালে আমরা দেখব চিনের কেবলমাত্র পুর্বদিকে সমুদ্রের সীমানা আছে, প্রায় পুরা পুবদিক (পুব চীন সাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত) নৌপথের জন্য খোলা, এটাই চিনের একমাত্র নৌ গেটওয়ে। বাকি তিন (পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ) দিক ল্যান্ডবর্ডারে আবদ্ধ – নৌ পথে বাইরে বের হবার সুযোগ নাই। চীনের সব অঞ্চলে সুষম সুযোগ সৃষ্টির জন্য বিশেষ করে দক্ষিণ দিকে (kunming Province) ও পশ্চিম দিকে (Xinjiang and Tibet Province) অঞ্চলগুলোকে কাছাকাছি নৌপথের যোগাযোগের আওতায় নিয়ে আসা – এটা প্রধানত চীনের নিজের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্বার্থ। এর উপায় হিসাবে চীন তার দক্ষিণ ও পশ্চিম দুটা দিক থেকেই কাছাকাছি কোথাও গভীর সমুদ্রবন্দরের কথা চিন্তা করে। এর একটা পাকিস্তানের বেলুচিস্থানের গোয়াদার (Gwadar port) আর অন্যটা বাংলাদেশের মহেশখালির সোনাদিয়ায়। প্রথমটা চিনের পশ্চিম দিক (Xinjiang and Tibet Province) আর দ্বিতীয়টা দক্ষিণ দিকের (kunming Province) প্রদেশগুলোকে নৌপথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কাছের হয়। গোয়াদার পোর্ট চীনা বিনিয়োগে এবং চীনা কোম্পানীর হাতে ২০০৭ সালে কনস্ট্রাকশন শেষ হয়েছে, কিন্তু পোর্টকে কেন্দ্র করে আশেপাশে রপ্তানীর জন্য উতপাদন এলাকা গড়ে তোলা আর পোর্ট অপারেশনের দায়িত্ত্ব দিয়ে চুক্তি হয় সিঙ্গাপুর পোর্ট অথরিটির সাথে। কিন্তু অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভজনকভাবে তা চালাতে না পারার কারণে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এই চুক্তির দায়দেনাসহ নতুন হস্তান্তরের চুক্তি হয় এক চীনা সরকারি অপারেটর কোম্পানীর সাথে। সেই থেকে গোয়াদার পোর্ট চীনা সরকারি অপারেটর কোম্পানির দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এখন অর্থনৈতিক অর্থে ষ্ট্রাটেজিক দিক থেকে দেখলে গোয়াদার পোর্ট থেকে সবার চেয়ে বেশি লাভবান হবে চীনের অর্থনীতি। না সেটা পোর্ট পরিচালনা থেকে ব্যবসায় মুনাফা করার কারণে নয়। মুনাফা অবশ্যই হবে তবে আসল অর্থনৈতিক লাভের তুলনায় এটা নস্যি। চীন আরব দেশগুলো থেকে বছরের তার মোট চাহিদার ৬০% তেল কিনে। এই তেল আরব সাগর হয়ে বঙ্গোপসাগর মানে ভারত-শ্রীলঙ্কা ঘুরে, এরপর আরও দক্ষিণে নেমে, ডানে ইন্দোনেশিয়া বায়ে মালয়েশিয়ার মাঝের চিকণ মালাক্কা প্রণালি নৌপথ ধরে সিঙ্গাপুর পেরিয়ে একেবারে বায়ে মোড় নিলে তবেই দক্ষিণ চীন সাগরে মানে চীনের বন্দরে পৌছাবে। আর ভুখন্ডগত দেখলে এটা পুরাপুরি চিনের পশ্চিম অঞ্চল থেকে চিনের পুবে ভ্রমণ। কিন্তু গোয়াদার পোর্ট মূলত আরব সাগরের মুখে (এককালে তা ওমানের অধীনস্ত এলাকা ছিল। বেশিদিন নয় গত ১৯৫৮ সালে ওমানের কাছ থেকে তিন মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কিনে নেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার।) ফলে নৌপথে মধ্যপ্রাচ্যের তেল আরব সাগর থেকে বের হবার মুখেই গোয়াদার পোর্টে নামিয়ে তা পাকিস্তানের কারাকোরাম হাইওয়ে সড়ক ধরলে উত্তর-পশ্চিম দিকে (Xinjiang and Tibet Province) অঞ্চলগুলো যাওয়া সবচেয়ে সহজ, কম খরচে ও কম সময়ে। এটাই চীনের অর্থনৈতিক অর্থে ষ্ট্রাটেজিক বিরাট লাভ। এজন্য ভবিষ্যতে পাইপ লাইন স্থাপন করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে গোয়াদার হয়ে সরাসরি তেল কেনা ও পাইপলাইনে পরিবহণ করে নেবার পরিকল্পনা চীনের আছে।
তার মানে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়তে বিনিয়োগে যাওয়া সবার উপরে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে বিরাট গুরুত্বপুর্ণ। এটা ছাড়াও তুলনায় গৌণ স্বার্থ হলেও বিষয়টাকে সামরিক অর্থে ষ্ট্রাটেজিক দিক থেকে দেখলে অবশ্যই চীনের সেই সুবিধাও আছে সন্দেহ নাই। তবে এটা বাড়তি পরে পাওয়া সুবিধা। বাড়তি পরে পাবার সুবিধা নিয়ে অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যেকার প্রতিযোগিতা সবসময় থাকে এবং চলছে। যেমন, আগেই বলেছি আইনীভাবে গোয়াদার পোর্টের অবস্থান পাকিস্তানের নৌসীমান্তের ভিতর অন্তর্ভুক্ত হলেও ঐ সীমান্ত ডাঙ্গার দিক থেকে একই সঙ্গে তা পাশের ইরানের সাথে পাকিস্তানেরও সীমান্ত। আর ঠিক ইরানী ঐ সীমান্তে আর একটি নৌবন্দর তৈরি হয়েছে প্রায় সমকালীন সময়। ইরানের ঐ নৌবন্দরের নাম চাহ-বাহার (Port of Chabahar), প্রশাসনিকভাবে এটা ইরানের সিসতান ও বেলুচিস্তান প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত। আর এই পোর্ট তৈরির অর্ধেক বিনিয়োগ করেছে ভারত সরকার এবং এই পোর্ট মূলত ভারত ব্যবহার করে ইরানের ভিতর দিয়ে সড়ক পথে আফগানিস্তানে ভারতীয় পণ্য আনা-নেয়ার জন্য। ফলে স্বভাবতই ভারতের অর্থনৈতিক ছাড়াও সামরিক ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ ঐ চাহ-বাহার পোর্টের কারণে এসেছে। তাহলে সামরিক ষ্ট্রাটেজিক দিক থেকে দেখলে ঐ পোর্টের কারণে যেন ভারতও পাকিস্তানকে (ফলে ভারতের চীনে প্রবেশেরও) ঘিরে টুটি চেপে ধরেছে (মুক্তামালার মত) এমন অর্থও করা সম্ভব। কিন্তু তুলনায় এই ধরনের অর্থ করে মিডিয়া প্রচারণা আমরা দেখিনা। আসলে পরাশক্তিগত পারস্পরিক অর্থনৈতিক ছাড়াও সামরিক ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের প্রতিযোগিতা একটা স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু কোনটাকে ভয়ভীতির বিষয় বলে আভ্যন্তরীণভাবে নিজের নাগরিক বা অনেক সময় আঞ্চলিক শ্রোতাকে লক্ষ্য করে প্রপাগান্ডা করবে সেটাই গুরুত্বপুর্ণ দিক। আর এর ভিতর দিয়ে ঐ রাষ্ট্রের বিদেশনীতির একটা প্রকাশ আমরা দেখি। আমার কথা আরও স্পষ্ট হবে, বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে ভারতের আগের অবস্থান আর এখনকার অবস্থান লক্ষ্য করলে।

বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর গড়তে চীনা আগ্রহঃ
এই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের বিনিয়োগ আগ্রহের মুল কারণ চীনের কুনমিং প্রদেশের যোগাযোগ সহজ করা এই অর্থনৈতিক স্বার্থ। কিন্তু ভারত এই ব্যাপারটাতে নিজের পুবের রাজ্যগুলোর সাথে নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে বিরাট লাভজনক ও প্রয়োজনীয় মনে করলেও তা চীনের উদ্যোগ আগ্রহের, ফলে ষ্ট্রাটেজিক সামরিক দিক বিবেচনা থেকে ২০০৭ সালে থেকেই প্রবল সন্দেহের চোখে তা দেখতে থাকে। সে সন্দেহ মিডিয়ায় প্রকাশ করতে থাকে। শুধু তাই না, যতদুর সম্ভব বাংলাদেশকে প্রভাবিত করে তাকে বিরত বা অনাগ্রহী রাখার চেষ্টা করে। বার্মাকেও প্রভাবিত করেছিল একই অবস্থান নিতে। বার্মা ভারতের দ্বারা প্রভাবিতও হয়েছিল। কারণ বার্মার জন্য সেসময়টা ছিল দীর্ঘ কয়েকযুগ আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনৈতিক অবরোধে একঘরে অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেখতে পাবার সময়। সুযোগটা এসেছিল ভারতের মধ্যস্থতায়। কারণ ভারতের মাধ্যমে পশ্চিমের সাথে রফা করে অবরোধ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগটা সৃষ্টি হয়েছিল তখন সেখানে। ফলে সেদিকে তাকিয়ে ভারতের প্রভাবে বার্মাও চীনা প্রকল্পে অনাগ্রহ দেখিয়েছিল। আর এই ঘটনায় তখন চীন প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ মজার। দুরদর্শী তো বটেই। চীনের পররাষ্ট্র অফিস বলেছিল, যেদিন বার্মিজ জনগণ আগ্রহ বোধ করবে সেদিনের জন্য এই প্রকল্প-প্রস্তাব আপাতত তুলে রাখা হল।

ভারত কি হুশে ফিরেছে নাকি এখনও দ্বিধান্বিত ও কৌশলী প্রকাশেই আছে
গত দেড় দুই বছর ধরে এখন ভারতই এই দুই প্রকল্পের ব্যাপারে উল্টা আগ্রহ দেখানো শুরু করেছে। এমনকি ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে মনমোহনের ঐ সীমান্তচুক্তি বিষয়ক চীন সফরে এক জয়েন্ট ষ্টেটমেন্টে স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাতে আরও আগ বাড়িয়ে Bangladesh-China-India- Myanmar economic corridor গড়ার লক্ষ্যে নতুন এক চুক্তি করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখিত হয়েছে।
এর মানে দাঁড়াল এতদিন চীনা প্রকল্প-প্রস্তাব নিয়ে তা নাকি মুক্তামালার মত ভারতকে ঘিরে ফেলার চীনা ষড়যন্ত্র বলে ভারত যে গল্প ছড়িয়েছিল তা ভিত্তিহীন ছিল -এটা ভারত নিজেই স্বাক্ষ্য দিল। তবে মূল বিষয় হল, ভারতের একটা অনাস্থা চীনের উপর ছিল যদিও তা তৈরি করার পিছনে দায়ী খোদ ভারতের আমেরিকান নীতি। বিস্তারে না গিয়ে সংক্ষেপে বললে এবিষয়টা হল এই যে পাঁচ রাইজিং ইকোনমির উত্থান এই ফেনোমেনাকে কেন্দ্র করে আমেরিকার একক পরাশক্তিগত ভুমিকার সমাপ্তি এবং তা উলটপালট ঘটিয়ে দুনিয়ার নতুন পরাশক্তিগত বিন্যাস আসন্ন -একথা লেখার শুরু থেকে বলে আসছি। কিন্তু এটা শুধু পরাশক্তিগত নতুন বিন্যাস নয়, এই ফেনোমেনার মূল তাতপর্য হলো, এটা ১৯৪৪ সাল থেকে তৈরি ও চলে আসা আমেরিকার নেতৃত্ত্বে যে গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার চালু হয়েছিল (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ বা বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে) তার আয়ু শেষ হতে চলছে আর এটা প্রতিস্থাপিত হতে যাচ্ছে চীন বা রাইজিং অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোর নেতৃত্ত্বে। চলতি অর্ডারটাকে যদি অতীত বলি তবে দুনিয়ার গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের আগামি আসছে চীন বা রাইজিং অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোর নেতৃত্ত্বে। এটা চারদিক থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্রমশ। এবং এটা কোনভাবেই পুরানা আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এর মত প্রতিষ্ঠানগুলোকে রেখেই এর পুনর্গঠন (চীন, রাশিয়া বা ভারতকে আরও বেশি জায়গা ছেড়ে দিয়ে) এভাবে হচ্ছে না। হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমশ ননফাংশনাল বা অকেজো প্রভাবহীন হয়ে পড়া আর চীনের নেতৃত্ত্ব নতুন সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার মধ্যদিয়ে। এটা শুধু আমেরিকা তার সার্ভে রিপোর্টে টের পেয়েছে তাই নয়, ২০০৯ সালে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এর বার্ষিক সম্মেলন হয়েছিল তুরস্কে। সে সভায় ঐ প্রতিষ্ঠান দুটো আসন্ন গ্লোবাল অর্ডারে পরিবর্তন টের পেয়ে বা ব্যাপারটাকে পরোক্ষে স্বীকৃতি দিয়ে ঐ সম্মেলন আহবান জানিয়েছিল চীনকে। চীনের মুদ্রা ইউয়ানকে তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময়ের মুদ্রা হিসাবে (ডলার, পাউন্ড, ইউরো ও ইয়েনের পাশাপাশি) জায়গা দিতে রাজি বলে জানিয়েছিল। কিন্তু এপর্যন্ত চীন সেই পথে সাড়া দেয় নাই। না দেবার পিছনের কারণ হল, (১) চীনের প্রতি এই প্রস্তাবের অর্থ হল আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এর মত প্রতিষ্ঠানগুলো যেগুলো আমেরিকার নেতৃত্ত্বে ও নিয়ন্ত্রণে এখন যেমন আছে ওর ভিতরেই চীনকে জায়গা দেয়া কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ অটুট থেকে যাওয়া যা চীনের স্বার্থ নয়। (২) চীনের স্বার্থ এধরণের প্রতিষ্ঠানগুলো এবং ঐ নিয়ন্ত্রণ সম্পুর্ণ ভেঙ্গে (নতুন ম্যান্ডেটে) নতুন ভারসাম্যের প্রতিষ্ঠান দেখতে চাওয়া। (৩) চীনের কাছে এবং বাস্তবত ব্যাপারটা গায়ের জোরের বা চাপ দিয়ে দাবী আদায় করে নেবার বা কারও অনুগ্রহে তা পাবার বিষয় নয়। চীন সেজন্য তার আন্তর্জাতিক বিনিময় বাণিজ্য যত বেশি সম্ভব ইউয়ানের মাধ্যমে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয়। এবছর ২০১৪ জানুয়ারিতে ইউয়ান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মুদ্রার তালিকায় সপ্তম স্থান দখল করে। বিশেষ করে হংকং মার্কেটে লেনদেনের ৭৩% এককভাবে সম্পন্ন হয় ইউয়ানে।
আমরা মনে রাখতে পারি, ১৯৪৪ সালে আইএমএফ গঠনের সময় তা আমেরিকান ডলারের ভিত্তিতে সাজানো ও আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ নেতৃত্ত্ব সম্পন্ন হয়েছিল, অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র তা মানতে বাধ্য হবার পিছনে মুল কারণ সেসময় আন্তর্জাতিক লেনদেন বাণিজ্যে ডলারে বিনিময় ছিল সর্বোচ্চ ও একক আধিপত্যে এবং আমেরিকা একমাত্র উদ্বত্ত্ব বাণিজ্য অর্থনীতির রাষ্ট্র ছিল তাই। ফলে আইএমএফে আমেরিকান কর্তৃত্ত্ব ও নেতৃত্ত্ব এসেছিল সামরিক বা পরাশক্তিগত আধিপত্যের কারণে নয়। যদিও প্রতিষ্ঠানগতভাবে পুরানা গ্লোবাল অর্ডার ভেঙ্গে পড়া আর বদলে নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রতিস্থাপন যা নতুন গ্লোবাল অর্ডারের জন্ম দিবে তা ঠিক (আইএমএফ অথবা বিশ্বব্যাংকের মত) কোন প্রতিষ্টানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাবের মধ্যে দিয়ে ঘটবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। কিন্তু সামগ্রিকভাবে আসন্ন নতুন গ্লোবাল অর্ডার এই ফেনোমেনা কে BRICS ফেনোমেনা অথবা ২০০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া প্রতি বছরের BRICS সামিট এই কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে চিহ্নিত করা যায়। আর এই সামিট থেকে BRICS ব্যাংক নামে কার্যক্রম যা মূলত বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হিসাবে ধেয়ে আসছে। আমাদের এখনকার আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক অংশ হিসাবে সারকথাটা হল, চলতি গ্লোবাল পুজিতান্তিক অর্ডারটাকে দুনিয়ার অতীত বললে দুনিয়ার আগামি হল BRICS ফেনোমেনা।
কিন্তু আমেরিকার দেয়া প্রলোভনে পড়ে BRICS ফেনোমেনাকে মনোযোগে আগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে ভারতের ভুমিকা সবচেয়ে নেতিবাচক। এককথায় বললে এখন পর্যন্ত কংগ্রেস দলের নেতৃত্ত্বে ভারতের নীতিনির্ধারকেরা দ্বিধাগ্রস্থ। একদিকে তারা বুঝে স্বীকার করে বলেই মনে হয় যে দুনিয়ার আগামি ফলে শেষ বিচারে ভারতের মূল স্বার্থেরও আগামি হল BRICS ফেনোমেনা এবং একে আগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে নিজের ভুমিকা অংশ সম্পন্ন করা। কিন্তু আমেরিকার অফার করা সুবিধাদির লোভে অর্থাৎ পুরানা গ্লোবাল অর্ডারটা থেকে কেবল নিজের জন্য কিছু সুবিধা নিংড়ে নিতে গিয়ে সে BRICS ফেনোমেনাকে আগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে নিজের ভুমিকা অংশ সম্পন্ন করতে গড়িমসি করে চলেছে। এরই বাইরের প্রকাশ হল, এতদিন খামোখা চীনের সাথে সামরিক সংঘাতের জুজুর ভয় দেখিয়ে আমেরিকার সাথে গাঁটছাড়া বাধাটাকে নিজের জনগণ ও নিজের দ্বিধাগ্রস্থ ভুয়া নীতির পক্ষে ন্যায্যতা হিসাবে দেখানো। এই হোল তার মারাত্মক দ্বিধার দিক। ওদিকে ভারতের এই দ্বিধার দিকটা, খামোখা চীনের সাথে “আগামির সম্পর্কটাকে” সামরিক সংঘাতপুর্ণভাবে দেখানোর চেষ্টাটা চীনের কাছে পরিস্কার। কিন্তু চীন জানে এবং বাস্তবতই তাই যে BRICS ফেনোমেনাকে এগিয়ে নেয়া এটা জবরদস্তির বিষয় নয়, প্রতিহিংসার বিষয় নয় ভারতের সম্পুর্ণ স্বইচ্ছার বিষয়, নিজের স্বার্থ বিষয়ে হুশে আসার বিষয়। তাই এবিষয়ে চীনা নীতি অবস্থান ধৈর্য ধরার নীতি। এবং চীন তাতে বিজয় লাভ করছে। একদিকে বাংলাদেশ নীতিতে ভারত-আমেরিকার হানিমুনের জায়গায় বিরোধ সংঘাত হাজির হবার কারণে আর ওদিকে চীন-ভারতের সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর আগ বাড়িয়ে Bangladesh-China-India- Myanmar economic corridor গড়ার লক্ষ্যে ঝাপিয়ে পড়তে চায় ভারত। অথচ এই অর্থনৈতিক করিডরের উদ্যোগের কাজটা এতদিন ফেলে রেখেছে ভারতের আমেরিকার সাথে এতদিনের গাটছাড়া বেধে চলার নীতি, পুরানা গ্লোবাল অর্ডারটা থেকে স্বার্থপরের মত একা নিজের জন্য সুবিধা নিংড়ে নেয়া যাবে বলে অনুমানে চলার নীতি। এছাড়া ভারতের নীতিনির্ধারকেরা কি আসলে কতটা সিনিসিয়ারলি মনস্থির করেছে যে আমেরিকান দেখানো লোভ ছেড়ে গ্লোবাল অর্ডারের আগামির পক্ষে তার নিরলস কাজ করা উচিত? আমরা এখনও নিশ্চিত নই। যতদুর বুঝা যাচ্ছে ভারত এখনও ব্যাপারটাকে আমেরিকাকে শায়েস্তা করার বিষয় হিসাবে দেখছে। হয়ত ভাবছে এভাবে আমেরিকাকে চাপে ফেলতে পারলে ২০০৭ সালের মত আবার আমেরিকার যাতা কাঠি ব্যবহার করার সখ্যতায় আমাদের মত দেশের উপর রুস্তমি চালিয়ে যাওয়া যাবে। ফলে একদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী সালমন খুরশিদের সর্বশেষ ডিসেম্বর ২০১৩ তে ওয়াশিংটন সফর থেকে ফিরে জানিয়েছিলেন আমেরিকা যেন ভারতের চোখে দক্ষিণ এশিয়ার নিজের নিরাপত্তা স্বার্থকে দেখে – অর্থাৎ ভেঙ্গে অকেজো হয়ে পড়া এই পুরানা ২০০৭ সালের ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের ভিত্তিটাই আবার ফিরে আসুক সালমন খুরশিদ সে আকাঙ্খার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। অথচ একই সময়ে মনমোহন চীন সফরে গিয়ে Bangladesh-China-India- Myanmar economic corridor গড়ার লক্ষ্যে ঝাপিয়ে পড়তে তাগিদ দিয়ে চীনের সাথে যৌথ বিবৃতিতে ঘোষণা দিচ্ছেন। এই হল ভারতের মারাত্মক স্ববিরোধী বিদেশনীতি।ঘটনার এখানেই শেষ নয়। সম্প্রতি নতুন মন্ত্রী হবার পর তোফায়েল আহমেদ ভারত সফরে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে তাকেও ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারে প্রবল সোচ্চার হতে দেখেছিলাম আমরা প্রেস মিটিংয়ে। যদিও গুরুত্ত্বপুর্ণ একটা টুইষ্ট ছিল সেখানে। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের দিনটা পার হয়েছিল একা ভারত এর পক্ষে আর অন্য পক্ষ সব দেশ, যারা বাংলাদেশে কি হয় তাতে তাদের ষ্টেক বা স্বার্থ আছে বলে অনুভব করে তারা এমন নির্বাচন দেখতে চায়নি এমন পরিস্থিতিতে। অন্যভাবে বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বললে ভারত আর আমেরিকার মুখোমুখি অবস্থানের চরম প্রকাশ ঘটেছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা আরও নির্মম। সরকারের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা ফেল করায় আমাদের চলতি বাজেট ঘাটতি ফলে এডিপিতে কাটছাট আর আগামি জুনের বাজেটেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে চলতি সরকার। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বাজেটের ঘাটতি পূরণ আর স্থবির বিদেশি বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে যেন চীন বিশাল ত্রাতা হিসাবে এখনই হাজির হয়ে যাবে। আর বাংলাদেশ যেন পশ্চিমের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলবে অথবা পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য কিছুই যায় আসে না। এমনই ধারণা ছুড়েছিলেন সেদিন তোফায়েল আহমেদ।
নিজের নয় ভারতের বাংলাদেশ নীতির উপর পুরা ঠেস দিয়ে দাড়ানো হাসিনা সরকার বা এর কোন মন্ত্রী আমাদের এই ধারণা দিতে শুরু করেছিল অর্থনৈতিক সমস্যা মিটানোর জন্য এই তো চীন এসে গেছে। যেন এতদিন পশ্চিমা দেশ বিশেষ করে বড়ভাই আমেরিকার ভারতের পিঠে হাত রাখা, যাতাকাঠি ধার দেয়া, নিজেকে পরাশক্তি ভাবতে শুরু করা ইত্যাদির লোভ ভারত ত্যাগ করেছে, সেই সুবাদে আমাদের উপর আমেরিকার ধার দেয়া যাতাকাঠি ব্যবহার করে সরকারে কে থাকবে তা নির্ধারণের লোভ ত্যাগ করেছে? যেন ভারত এতদিন দ্বিধা শুণ্য একাগ্র মনে আগামি গ্লোবাল অর্ডারের পক্ষে চীনের সাথে কাজ করেছে। অথচ এটা সোনার পাথরের বাটির মত। কংগ্রেসের ভারত নিজেকে পরাশক্তি ভাবার ভান করে আমাদের উপর খামোখা রুস্তমি দেখাতে চায়, আমেরিকার সাথে বাংলাদেশ নীতিতে সাংঘার্ষিক করে, একলাই রাজা ভাব দেখাতে চায়। এই হলো তার স্ববিরোধী নীতি। আমাদের উপর খামোখা রুস্তমি দেখানোর সময় ভুলে যায় ঐ রুস্তমির পিছনের যাতাকাঠিটা নিজের নয়, নিজে সে কোন পরাশক্তি নয়, ওটা আমেরিকার ধার দেয়া। আবার, চীনের সাথে সীমান্ত চুক্তি এবং Bangladesh-China-India- Myanmar economic corridor যদি আজ এতই গুরুত্বপুর্ণ মাইলষ্টোন বলে অনুভুত হবে তাহলে আমেরিকার পাল্লায় পড়ে গত সাত বছরের চীন বিদ্বেষী নীতি – চীন আসতেছে, এই সীমান্ত হামলা দিল বলে আমেরিকার কোলে উঠে পড়া – সম্পর্ককে খামোখা শত্রুতামূলক করে দেখা এসব তাহলে মারাত্মক ভুল পথ ছিল – এটা নিজেই প্রকারন্তরে স্বীকার করছে। এককথায় বললে গত সাত বছর কংগ্রেসের ভারত এক যুদ্ধবাজ মুই কি হনু রে নীতি অনুসরণ করেছে। বাংলাদেশকেও বিপদের মুখে রেখেছে। কোন হোমওয়ার্ক ছাড়া ভারতের এসব কাজকে পোলাপানি নাদান নীতি বললেও সম্ভবত কম বলা হবে। অথচ আমাদের মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে বেকুব বানিয়েছেন যে চীনের সঙ্গে ভারতের ইকোনমিক করিডর প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু হবার কারণে আর চিন্তা নাই চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতির সব সমস্যা সমাধান করে দিচ্ছে। আর মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে বেকুব হয়ে এবার আমাদেরকেও বেকুব বানাতে ঐ প্রেস ব্রিফিংয়ে ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারটা যেন আমাদের উদ্ধারকর্তা ঘটনা। একথা ঠিক যে ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারটা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বড় ইতিবাচক ভুমিকা রাখবে। কিন্তু কঠিন সত্যটা হল ভারতের আমেরিকার কোলে চড়ে বসে থাকা আর চীন প্রসঙ্গে ভয়ভীতি ছড়িয়ে রাখার নীতির কারণেই ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারটা শুরুই করা যায়নি, এখন হোমওয়ার্ক শুরু হয়েছে মাত্র। যার ফল আসতে কমপক্ষে ১০ বছর পিছনে আমরা।
আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক চীনের বিদেশ নীতির সারকথাগুলো দাঁড়াচ্ছে, ভারতের বাংলাদেশ নীতির বিপরীতে চীনের নীতির মৌলিক দিকগুলো গত প্রায় দুই দশক ধরে কোন এদিক ওদিক চড়াই উতরাই ছাড়াই একতালের। আর এর সবচেয়ে গুরুত্ত্বপুর্ণ ও নতুন বৈশিষ্টের দিক হল, চীনের নীতি কোন পলিটিক্যাল ষ্টেক বা রাজনৈতিক খবরদারি পাবার দিকে না তাকিয়ে মুলত অর্থনৈতিক। কোন কাজের চুক্তি পাবার জন্য রাজনৈতিক লিভারেজের উপর ভরসা করে তা পাবার চেষ্টা করা নয়। সরকারে কে থাকবে না থাকবে সে ব্যাপারে কোন মাথা সে ঘামায় না। গত একবছরে চীনা এমবেসি ছয়বার বিবৃতি দিয়েছে। এমন প্রতিটা বিবৃতিতেই এই নীতির প্রতিফলন থেকেছে।
তবে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে গতবছরের শেষ দিকে জাতিসংঘের কোন ভুমিকা বা মধ্যস্থতায় একটা সমাধান আনা যায় কি না এনিয়ে আমেরিকার নেতৃত্ত্বে পশ্চিমা কুটনৈতিকদের প্রচেষ্টা ছিল। ঐ প্রচেষ্টায় সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানটা জাতিসংঘ বলেই ভেটো ক্ষমতাওয়ালা চীনকেও ঐ উদ্যোগে জড়িত ও অন বোর্ড বা নৌকায় তোলার তাগিদবোধ করেছিল পশ্চিম। সেই সুত্রে আমরা চীনকে দেখেছিলাম বিবৃতি দিতে। আবার পশ্চিম একা কোন উদ্যোগ নিলে তা যেন চীনের কাছে নিজ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে সন্দেহজনক বা বিরোধাত্মক বলে মনে না হয় সেটা এড়ানোর কথা ভেবে পশ্চিমা উদ্যোগ নিজেই চীনকে অন বোর্ড করার তাগিদবোধ করেছিল। এছাড়া আরও একটা দিক আছে চীনকে অন বোর্ড করা মানে রাশিয়াকেও অন বোর্ডে পাবার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া।
চীন প্রসঙ্গে এখানেই শেষ করছি। পরের চতুর্থ ও শেষ কিস্তি রাশিয়া প্রসঙ্গে।

পরবর্তি কিস্তির লেখাগুলোঃ
প্রথম কিস্তি
দ্বিতীয় কিস্তি
তৃতীয় কিস্তি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (১), প্রথম কিস্তি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (১)

গৌতম দাস

০১ এপ্রিল ২০১৪

https://wp.me/p1sCvy-57

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানান বিদেশি ফ্যাক্টর কাজ করে, এটা আমরা জানি। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব, সহাবস্থান ও আঁতাতের বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে এই ফ্যাক্টরগুলো আমাদের রাজনীতিতে কি ভুমিকা নিতে পারে সে বিষয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা খুব একটা চোখে পড়ে নি। এখানে তার প্রাথমিক কিছু আলোচনা হাজির করছি।

প্রথম কিস্তিঃ
দুনিয়া এখন একটাই গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক দুনিয়া
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেশের ভিতরের ফ্যাক্টরগুলো ছাড়াও বাইরের বিদেশি ফ্যাক্টরগুলো কেন বিরাট ভুমিকা নেবার সুযোগ পাবে এযুগে এনিয়ে প্রশ্ন তোলা যতোটুকু না রাজনৈতিক তার চেয়ে অধিক নৈতিক। অর্থাৎ আমরা নৈতিক জায়গা থেকেই তর্ক তুলে বলি যে কোন বিদেশী শক্তি আমাদের দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা উচিত না বা করতে পারবে না। সেটা ভাল, কিন্তু বহু আগে থেকেই আমরা এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে বিশ্বব্যাপী লেনদেন, বিনিময় বা বাণিজ্যে ও নির্ভরশীলতার সম্পর্কের ভিতর প্রবেশ করে আছি, যেটা এক বিকল্পহীন বাস্তবতা। অর্থাৎ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আমরা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এই বিকল্পহীন বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছি। বা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। কারণ এই ভ্রমণের উলটা পথে পিছন ফিরার কথা চিন্তা করা এখন অকল্পনীয় এবং অবাস্তব। আমরা প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক অবস্থায় যেমন ফিরে যেতে পারি না, ঠিক তেমনি চাইলেই ‘হস্তক্ষেপ’ বন্ধ করতে পারি না। দুনিয়ার কোন দেশই এখন আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। এযুগে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের অর্থনীতি হয়ে থাকা অবাস্তব ও অসম্ভব।
আবার, দুনিয়া আগের মতো ‘পুঁজিতান্ত্রিক’ আর ‘সমাজতান্ত্রিক’ শিবিরে আর বিভক্ত নয়। দুনিয়া এখন একটাই, সেটা একটাই গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক দুনিয়া। অতএব একে মাথায় রেখেই আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবার নীতি ও কৌশল ঠিক করতে হবে। দুনিয়ার সকল দেশের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত থাকার বাস্তবতা মেনেই বিদেশি রাজনীতি ও স্বার্থের ফ্যাক্টরগুলোকে মোকাবিলা করতে হবে। নিজস্ব স্বার্থ যতটা সম্ভব সুরক্ষা করার রাজনীতিই আমাদের একমাত্র গন্তব্য।

শেখ হাসিনার পক্ষে ক্ষমতায় থাকা কিম্বা বিরোধীদলের ক্ষমতা আসার সম্ভাবনা অনেকাংশেই এর এই বিবেচনাগুলো আমলে নেবার উপর নির্ভরশীল। ক্ষমতায় থাকবার জন্য কিম্বা ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা থেকে অপসারণের নীতি ও কৌশল নির্ণয়ও নির্ভর করে এই ফ্যাক্টরগুলোকে বাস্তবচিতভাবে বিবেচনার ওপর। ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতার বাইরের শক্তি কে কিভাবে সেটা করছে তার ওপর রাজনীতিতে তাদের পরিণতি অনেকাংশেই ঠিক হবে। সেটা নিশ্চিত। আবার, জনগণের দিক থেকে এই দুই পক্ষের কোন পক্ষের স্বার্থ রক্ষা প্রধান বিবেচনা হতে পারে না। বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের দিকগুলো নির্মোহ ভাবে চিহ্নিত করা, বোঝা ও বিচার করার ওপর আমাদের সামষ্টিক স্বার্থের জায়গাগুলো কোথায় নিহিত সেটা নির্ধারণ করা দরকার। এই লেখাটি সেই আলোকেই লেখা হচ্ছে। এই তিনটি স্বার্থের ক্রম নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আমাদের অনুমান হচ্ছে বিশ্ব ও আঞ্চলিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রথম ও প্রধান স্বার্থ অর্থনৈতিক এবং এর পরে সামরিক। সামরিকতার প্রশ্নকে আমরা গণশক্তি বিকাশের অন্তর্গত বিবেচনা বলে মনে করি। এর বিকাশ ছাড়া বাংলাদেশের মতো এখনকার রাষ্ট্রের পক্ষে জনগণের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং নিজেদের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে নিজের সিদ্ধান্তে চলবার শক্তি কখনই অর্জন করতে পারবে না।
অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থেই আলাদা করে রাজনৈতিক স্বার্থের চিন্তা করা দরকার। রাজনৈতিক স্বার্থ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কোনই সন্দেহ নাই। সেই ক্ষেত্রে প্রধান ও প্রাথমিক বিবেচনা হচ্ছে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে বিশ্ব সভায় বাংলাদেশের টিকে থাকা। সেই লক্ষ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদ যেভাবে বাংলাদেশের জনগণকে বিভক্ত করছে এবং রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসী কায়দায় জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষত ক্রমাগত গভীর করে চলেছে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দরকার। তার জন্য জাতিবাদী অথবা ধর্মবাদী আত্মপরিচয়ের রাজনীতির বিপরীতে দরকার গণশক্তি নির্মাণের রাজনীতি। যার মর্ম মচ্ছে নাগরিক চেতনা ও বোধকে শক্তিশালী করা। দল, মত, ধর্ম বা মতাদর্শ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষাই এই দিক থেকে এখনকার প্রধান রাজনীতি, কোন প্রকার দলবাজি বা জনগণকে বিভক্ত করে এমন মতাদর্শিক ফেরেববাজিতে পা দিয়ে নিজেদের ধ্বংস ত্বরান্বিত করা নয়। কিন্তু বিধ্বংসী রাজনীতিতেই আমাদের প্রবল উৎসাহ, নির্মাণের রাজনীতিতে নয়। নানান মতাদর্শিক বিতর্ক আমাদের সমাজে ও রাজনীতিতে আছে এবং আরও বহুদিন থাকবে। সেগুলোর এটা বা সেটার ভিত্তিতেই রাষ্ট্র গড়তে হবে এমন জিদ আত্মঘাতি। বরং সে তর্কবিতর্কগুলো চলতে দিয়ে, এই অর্থে এড়িয়ে একটা কমন কনসেনসাসের ভিত্তিতে নাগরিক চেতনা ও বোধে রাষ্ট্র পুনর্গঠন করে নেয়া এখনকার প্রধান কাজ।
এই বাস্তবতাগুলো মনে রেখে এবং সজ্ঞান ও সচেতন তরুণদের কথা মনে রেখে এই লেখাটি পেশ করা হচ্ছে। যাদের জাগতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশ ত্বরান্বিত করা এবং সম্পদ বন্টনে সুষম ও সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সুযোগ প্রাপ্তিতে সাম্য নিশ্চিত করার ওপর। যেদিক থেকেই বিচার করি, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের জন্য শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করাই এখনকার কাজ। সেই ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব, বিরোধ, প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলোকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাবার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টি অর্জন করা দরকার। বাংলাদেশের এখন যে বিভাজন ও বিভক্তির রাজনীতি সেখান থেকে এই ব্যাপারে প্রত্যাশার কিছুই নাই। সে কারণেই বাংলাদেশের সেই সকল তরুণদের কথা মনে রেখে এ লেখা লিখছি যারা দেশের ভেতরের অবস্থা ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাস্তবচিত নতুন রাজনীতির জন্ম দিতে আগ্রহী। বাংলাদেশে বর্তমান রাজনীতির নানান অশুভ পক্ষের টানাপড়েনে অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবার বিপরীতে যারা সাঁতার দিতে প্রস্তুত। অসম ও অন্যায্য অবশ্যই, কিন্তু আমরা একই অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার মধ্যেই সবাই বসবাস করি, এই ব্যবস্থার মধ্যেই আমাদের নিজেদের জন্য সর্বোচ্চ শক্তিশালী জায়গা করে নিতে হবে। সেটা কেউই আমাদের দয়া করে দেবে না।
এই পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশের প্রতি আগামি দিনে ভারত, আমেরিকা, চিন ও রাশিয়ার সম্ভাব্য অবস্থান কী হতে পারে সেটা আগাম আন্দাজ করা আমাদের দরকার। যাতে এব্যাপারে আমাদের কর্তব্য সম্পর্কে কিছু আগাম ধারণ আমরা করতে পারি। কয়েকটি কিস্তিতে এই লেখাটি লিখছি। এই আন্দাজ যে, তা আমাদের আগামি দিনে সামষ্টিক স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি জাতীয় অবস্থান নির্ণয়ে সহায়ক হবে বলে আশা করি।

দিল্লী ও ওয়াশিংটনের বিদেশ নীতিতে নতুন পরাশক্তিগত বিন্যাস
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্তিশালী দেশগুলো কে কী ভূমিকা পালন করছে সেটা কমবেশী হয়তো আমরা অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি, কিন্তু আগামি দিনে সুনির্দিষ্ট ভাবে তাদের ভূমিকা কী রূপ নিতে পারে সেটা অনুমান করার চেষ্টা আমাদের এখনি করা দরকার। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যে যে ভূমিকাই নিক সবাই ভারতের আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল কী দাঁড়ায় সেদিকে এখন সকলেই তাকিয়ে আছে, অপেক্ষা করছে।
কেন আসন্ন ভারতীয় নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার জন্য বিদেশি শক্তি সবাই অপেক্ষামান? কারণ আগের যেকোন ভারতীয় নির্বাচনের চেয়ে এবারকার ভারতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক। চলতি বাংলাদেশের সরকার বিগত সরকারেরই ধারাবাহিকতা। তারা ২০০৯ সালে প্রথম ক্ষমতায় এসেছিল। এই সরকারের দুই আমলেই গুমখুন, সন্ত্রাস, ও আইন বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড প্রকট আকার ধারণ করেছে, বিরোধী মত ও চিন্তা ও বিরোধী দলীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনরা কার্যত একটি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিবাদী আবেগ ও মুক্তিযুদ্ধের দলীয় বয়ানের ওপর দাঁড়িয়ে জাতিবাদী উগ্রতার যে রূপ এই সরকার প্রদর্শন করছে তাকে ফ্যসিবাদ বললে কমই বলা হয়। সংবিধানের পরিবর্তন করে নাগরিক ও মানবিক অধিকার হরণ, বিচার বিভাগ ও আইন শৃংখলা প্রতিষ্ঠানের চরম দলীয়করণ ইত্যাদির নানান বৈশিষ্ট্য বিচার করে ফ্যাসিবাদের এই বিশেষ রূপের আরও পরিচ্ছন্ন পর্যালোচনা দরকার। কিন্তু যেটা আশ্চর্যের সেটা হোল এই নিপীড়ক, ফ্যাসিষ্ট এবং ঘোরতর ভাবে গণবিচ্ছিন্ন চেহারা নিয়েও এই সরকার টিকে আছে। টিকে থাকার পিছনে প্রধান কারণ দিল্লীতে ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি একক সমর্থন। বাংলাদেশে পরাশক্তির ভূমিকা বা বিদেশী ফ্যাক্টরগুলো আগামি দিনে কী করতে পারে সেই আন্দাজ বর্তমানের এই বাস্তবতা থেকে শুরু করাই সংগত। বাংলাদেশ মূলত দিল্লীর বর্তমান কংগ্রেস সরকারের অধীনস্থ ও অনুগামি একটি সরকার। এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতেই আগামি দিনে পরাশক্তির ভূমিকা কি হতে পারে আমরা তা আন্দাজ করবার চেষ্টা করতে পারি।
গত ২০০৯ সালে হাসিনা সরকার আসার পিছনের দুবছরে (২০০৭-৮ সালে) ধরে চলা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ঠিক হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের চরিত্র এমনই হবে। এটা যখন বাস্তবায়িত হচ্ছিল তখন এই ক্ষেত্রে ভারতের এমন বাংলাদেশ নীতির সাথে আমেরিকার অনুমোদন ও সহায়ক সমর্থন ছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশে দিল্লীর স্বার্থের এক সরকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল ওয়াশিংটন। আবার সেটা গত তিন বছর হল উলটে গিয়েছে। আমেরিকার বাংলাদেশ নীতি আর ভারতের বাংলাদেশ নীতির মধ্যে গুরুতর ফারাক ঘটে গেছে। বাংলাদেশ নীতি প্রসঙ্গে ভারতের সাথে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্য ঘটেছে এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বও দেখা দিয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই ভারতের নির্বাচনের ফল বাংলাদেশে কী প্রভাব ফেলবে সেটা ভাবতে হবে।
আসন্ন ভারতীয় নির্বাচনে কংগ্রেস সরকার তৃতীয়বারের মত নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করবে এমন সম্ভাবনা একেবারেই নাই বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ভারতের রাজনীতির যাঁরা বিশ্লেষক তাঁরা এই বিষয়ে কমবেশী একমত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলো কে কী ভূমিকা নেবে সেটা এই কারণেই ভারতের নির্বাচনের মুখাপেক্ষি হয়ে রয়েছে।
আগেই বলেছি, ২০০৭-৮ সালে বাংলাদেশ নীতিতে আমেরিকা ও ভারত হাতে হাত মিলিয়ে একই অবস্থান নিয়েছিল। কারণ সেটা ছিল আমেরিকার বিদেশ নীতিতে মৌলিক দুটো ইস্যুতে অবস্থান বদলের সময়কাল। ওবামা প্রেসিডেন্সীর প্রথম টার্ম শুরু হয় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। এর আগের প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশের ওয়ার অন টেররের ব্যর্থ নীতি মার্কিন নীতি নির্ধারকদের একটা অংশের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। মার্কিন জনমতের মধ্যেও। সেই বিদেশনীতি থেকে সরে এসে নতুন কি করা যায় তা নিয়ে আমেরিকার জন্য ভাবনার প্রস্তুতিমূলক সময় ছিল সেটা। তখনও হিলারি ক্লিনটনের ‘স্মার্ট পাওয়ার এপ্রোচ’ পুরাপুরি দানা বাঁধে নি; গণ কূটনীতির (public diplomacy) আলোকে সরকার বিরোধী জনমতকে উসকিয়ে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যর স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে সংস্কারের বুদ্ধি সবে দানা বাঁধছিল। যার ফল আমরা পরবর্তীতে ‘আরব স্প্রিং’ নামে হাজির হতে দেখেছি। অর্থাৎ নতুন “আরব স্প্রিংয়ের” নীতি তখনও স্থির বা থিতু হয় নাই। জুনিয়র বুশের শেষ আমলের এই অন্তর্বর্তী পরিস্থিতিতে, দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে আমেরিকা ও ভারতের হাতে হাত মিলানো অবস্থাটা পুরাপুরি বহাল হয়েছিল। এই সময়কালটাতে বাংলাদেশের “১/১১ এর সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের” কেচ্ছা এই বলয় পরিস্থিতির মধ্যেই পাঠ করতে হবে। চিনের উত্থানকে মোকাবিলার জন্য দিল্লী ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বিভিন্ন নিরাপত্তা চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং ভারত প্রকৃতিগত কারনেই (natural ally) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু এই ধারণাও দুই দেশে জোরে শোরে প্রচারিত হচ্ছিল। তবে দক্ষিণ এশিয়া বা আমাদের ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলে আমেরিকার বিদেশ নীতিতে আমেরিকা ও ভারত হাতে হাত মিলিয়ে চলার নীতি নিতে হবে এমন সিদ্ধান্তের পিছনের তাগিদ হিসাবে দ্বিতীয় আরেকটি ইস্যু ছিল। সেই ইস্যুই আমেরিকার এই গুরুত্বপুর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রভাবক ভুমিকায় পালন করেছে। কী সেই ইস্যু?
অল্প কথায় বললে, সেটা হল একক পরাশক্তি ও গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার একক এম্পায়ার বা সাম্রাজ্য ভুমিকায় বদল অনিবার্য ও আসন্ন হয়ে ওঠা। নীতি নির্ধারকের তা দেখতে পাচ্ছিল। এই সংক্রান্ত আমেরিকান সরকারি এক বিস্তারিত সার্ভে রিপোর্টের চুম্বক অংশগুলো প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল ২০০৭ সালে। পরিপুর্ণ রিপোর্ট আসে ২০০৮ সালে। [2025_Global_Trends_Final_Report] ঐ রিপোর্টের সারকথা সংক্ষেপে এভাবে বলা যায়:
১. গ্লোবাল পরাশক্তিতে আমেরিকা আর একক ভুমিকায় থাকছে না, পরাশক্তিগত গ্লোবাল ক্ষমতা অন্তত পাঁচভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। আর আমেরিকা বড় জোর ঐ পাঁচের একটা হয়ে ছোট হয়ে যাচ্ছে;
২. গ্লোবাল অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক পুঁজির প্রবাহ পশ্চিম থেকে পূবে এশিয়ামুখী হচ্ছে। আর এটা আগামি ভবিষ্যতে কখনও আর উলটা প্রবাহ নিবে না বা পরিগ্রহণ করবে না; ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্থায়ী ভারকেন্দ্র হয়ে উঠছে এশিয়া। আগে অর্থনীতি বিষয়ক আলোচনায়, পশ্চিমে উন্নত বা ডেভলপড অর্থনীতি আর বাকি সবাই উন্নয়নশীল বা ডেভলপিং অর্থনীতি বলে একটা ভাগ করতে দেখা যেত। ঐ রিপোর্টে নতুন একটা বিভাজক শব্দ বা ধারণা চালু করা হয় “রাইজিং ইকোনমি” – নতুন পাঁচ পরাশক্তির বেলায় এই নতুন নাম প্রয়োগ করা হয়। ঘটনাচক্রে ঐ পাঁচ রাইজিং ইকোনমির দুটাই এশিয়ার – চিন ও ভারত। (বাকি তিনটা ব্রাজিল, রাশিয়া ও সাউথ আফ্রিকা)। আমেরিকান বিদেশ নীতিতে দ্বিতীয় ইস্যু হাজির হবার পিছনে এই রিপোর্ট সেই পটভুমি, আপাতত সংক্ষেপে এতটুকুই।

স্বভাবতই রিপোর্টটা পরাশক্তিগত দুনিয়ার এক আসন্ন মোচড়ানির নির্দেশক বা ইঙ্গিত । তাই, আমেরিকার বিদেশনীতিতে দ্বিতীয় বদলটা আসে এই রিপোর্টকে কেন্দ্র করে। ওয়াশিংটন সিদ্ধান্ত নেয় এশিয়ার দুই রাইজিং ইকোনমির একটাকে (ভারত) কাছে টেনে, পিঠে হাত রেখে দ্বিতীয়টাকে (চিন) ঘায়েল করা। লক্ষ্য, তাতে যদি পরাশক্তিগত নিজের অবস্থান কিছু হেরফের ঘটিয়ে অন্য সম্ভাব্য পাঁচের চেয়ে কিছুটা উপরে করা যায়। মনে রাখতে হবে, পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার এই তুমুল টালমাটালের যুগে কোন রাষ্ট্রের পরাশক্তিগত ভুমিকায় হাজির হবার পুর্বশর্ত হচ্ছে সবার আগে অর্থনীতির দিক থেকে পরাশক্তি হওয়া। অর্থাৎ অর্থনীতিতে শীর্ষ ভুমিকার সবলতা ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন, গ্লোবাল অর্থনীতিতে এক বড় শেয়ার দখল করে হাজির হওয়া, বৈদেশিক বাণিজ্যে একটা ভালরকম উদ্বৃত্তের অর্থনীতি হওয়া ইত্যাদি। চিনের অর্থনীতিগত উত্থান আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরণের পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে। আমেরিকার ঐ সার্ভে রিপোর্টে গ্লোবাল অর্থনীতিতে নতুন এই পালাবদলের পরিস্কার ইঙ্গিত ফুটে উঠেছিল। এই সূত্রে আমেরিকার নতুন বিদেশনীতির আগ্রহে আমেরিকা-ভারতের সখ্যতার শুরু ২০০৭-৮ সাল থেকে। আর আঞ্চলিক সখ্যতার প্রথম প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশে। আমাদের ১/১১ এর সময়ে তা “মাইনাস-টু” ঘটাতে হবে এমন নিয়ত নিয়েই শুরু হয়েছিল। কিন্তু এই নিয়ত মাঝপথে হঠাৎ করেই হাসিনামুখি হয়ে যায়। হাসিনার হাতে ক্ষমতা দিয়ে কেটে পড়ার দিকে ১/১১ এর ক্ষমতাসীনরা তৎপর হয়ে পড়ে। কিন্তু আগেই বলেছি, সেসময়টা ছিল বুশের ওয়ার অন টেররের নীতির ব্যর্থতা থেকে আমেরিকার সরে আসার সময় কিন্তু এর বদলে নতুন “আরব স্প্রিং” এর নীতি তখনও ঠিক গুছিয়ে থিতু হয় নাই। ফলে ভারতের সাথে আমেরিকার সখ্যতার নীতিটা দাড়িয়েছিল ওয়ার অন টেররের ব্যর্থ নীতির অপসৃয়মান আলোছায়ায়। ফলে সখ্যতা আসলে দাড়িয়েছিল এক তথাকথিত কমন ‘সিকিউরিটি ইন্টারেস্ট’ এর উপর। ওয়ার অন টেররের নীতির বৈশিষ্ট হলঃ ইসলামের কোন রূপের রাজনীতির সাথেই সখ্যতা নয়, বরং ইসলামের সকল প্রকার অভিপ্রকাশ ও রাজনীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ, ইসলামকে বিশ্বসভ্যতার খাতা থেকে মুছে দেওয়া। বিপরীতে “আরব স্প্রিং” ধরনের নীতির বৈশিষ্টটা হলঃ বিশেষ ধরনের (“আরব স্প্রিং”) ইসলামি রাজনীতির সাথে সখ্যতা, বাকি সব রূপের ইসলামি রাজনীতির সাথে আগের মতই বিরোধিতা, উৎখাত, দমন, নির্মূল ইত্যাদি। তবে তা অবশ্যই আর যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে “ওয়ার অন টেরর” শ্লোগান না দিয়ে, লো প্রোফাইলে।
কিন্তু ভারতের দিক থেকে আমেরিকা “ওয়ার অন টেরর” মোডে থাকলেই দিল্লীর – বিশেষত কংগ্রেসের বেশি পছন্দের। ফলে ২০০৭-৮ এর পর থেকে আমেরিকা যতই নতুন “আরব স্প্রিং” এর নীতিতে থিতু হয়েছে, ইসলামকে একাট্টা গণ্য করে এর সকল রূপের বিরুদ্ধে লড়বার নীতি থেকে সরে এসেছে, ততই সেটা ভারতের সাথে সখ্যতার নীতিতে একটা খচখচে কাঁটা হয়ে উঠেছে। তবে আমেরিকা-ভারত সখ্যতার মধ্যের মূল কাঁটা এটা নয়। নতুন আরও বড় কাঁটা পরবর্তীতে হাজির হয়।
আগে একটা কথা বলে নেয়া ভাল, দুই রাইজিং ইকোনমির একটাকে (ভারত) কাছে টেনে পিঠে হাত রেখে দ্বিতীয়টাকে (চীন) ঘায়েল করা – কথাটা বলা যত সহজ বাস্তবে তা ঘটানো আমেরিকার জন্য এত সরল সিধা ব্যাপার নয়। ঐ রিপোর্টের ইঙ্গিত অনুযায়ী, একালে চীন-আমেরিকার এই পরাশক্তিগত নতুন টেনশন, প্রতিযোগিতা ইত্যাদি ঘটছে ২০০১ সাল পরবর্তী গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির পটভুমিতে। এটা কোনভাবেই আর আগের ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময়ের (১৯৫০-৯০) আমেরিকা-রাশিয়া দুই ব্লকে বিভক্ত দুনিয়ার টেনশন প্রতিযোগিতার মত নয়, কোন অর্থেই। কারণ, ঐ ব্লক রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট ছিল, দুই ব্লক মানে দুটা আলাদা অর্থনীতি। আলাদা বলতে, এই দুই অর্থনীতিতে পরস্পরের মধ্যে পণ্য লেনদেন বাণিজ্যসহ কোন প্রকার অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, ফলে কোন নির্ভরশীলতা সরাসরি প্রায় ছিল না বললেই চলে – এমনই আলাদা। উভয়ের মধ্যে পুঁজির চলাচল, প্রবাহ, কোন বিনিয়োগ সম্পর্ক একেবারেই ছিল না। এমনকি এটা কেবল রাশিয়ার (ততকালীল ইউএসএসআর) মধ্যেও সীমাবদ্ধ তো নয়ই; রাশিয়ান ব্লকের কোন দেশকে (যেমন পোল্যান্ড) আইএমএফ লোন দিতে চাইলেও আমেরিকা তা নাকচ করে দিয়েছিল এমন রেকর্ড আছে। এমনই দুটো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত টিকে ছিল ব্লক রাজনীতিতে গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, এটাই ছিল পুরা স্নায়ু যুদ্ধের মৌলিক বৈশিষ্ট। বিপরীতে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে পড়ার সময় থেকেই দুটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ধরনের অবস্থানের যুগের শেষ হয়। এরপর থেকে আজকের গ্লোবাল অর্থনীতি মানে সব রাষ্ট্রই একই গ্লোবাল পুঁজির অধীনস্থ ও পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত; পরস্পর নানান সম্পর্কে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে তবে ওর ভিতরেই পরস্পরের স্বার্থের প্রতিদ্বন্দ্বিতা লড়াইয়ে ঝগড়ায় সবাই নিয়োজিত। অর্থাৎ আমেরিকা-রাশিয়ার দুই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ অর্থনীতির টেনশন প্রতিযোগিতার বিপরীতে একালে আমেরিকা-চীনের মধ্যেও ক্রম-উদীয়মান টেনশন প্রতিযোগিতা অবশ্যই আছে কিন্তু এবার এরা দুই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ অর্থনীতির নয় বরং উভয় অর্থনীতি দুনিয়া জোড়া একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনস্থ ও পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। চীন আর আমেরিকার মধ্যে এমন নতুন সম্পর্কের সুত্রপাত বা খাতা খোলা অনেক পুরানো, সেই ১৯৭১ সাল থেকে এর পক্ষে কাজ শুরু হয়েছিল। পরস্পরের কুটনৈতিক, সামরিক ও ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের কথা মনে রেখে নানান চুক্তি, আইন-কানুন স্থির করা এবং সেগুলোর সুরক্ষাকবচ ঠিকঠাক করে আমেরিকান নেতৃত্বে পুঁজির প্রবাহ ঢেলে চীনকে সাজানোর একটা লম্বা প্রস্তুতি পর্ব পার করে আসতে হয়েছে। আজকে যে চিন আমরা দেখছি, সেই চিন গড়তে পুর্বপ্রস্তুতিমূলক সময়ে কেটে যায় ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। এরপর আমেরিকান পুঁজিবাজারের প্রতীকি কেন্দ্র ওয়াল ষ্ট্রিট নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে পুঁজির প্রবাহ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করে। এর পরিণতিই আজকের রাইজিং ইকোনমির চিন। দুনিয়াজুড়া একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনস্থ হয়ে এক নতুন গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়ে চীন এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে।
কিন্তু এর ফলে একইসাথে নতুন পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা বা গ্লোবাল অর্ডার পরিগঠনের পার্শ্বফল হিসাবে নতুন এক স্ববিরোধী দিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হাজির হয়। আমেরিকান রাষ্ট্রের স্বার্থ আর আমেরিকান ওয়াল ষ্টিটের স্বার্থ আর একতালে না থেকে ক্রমশ সংঘাতমূলক চরিত্র নিয়ে হাজির হতে শুরু করে। যেমন, নিজে ফুলে-ফলে রাইজিং অর্থনীতির হিসাবে চিনের উত্থান এক বিশাল সম্ভাবনা যা আসলে ক্রমশ পুঞ্জীভুত ও আকারে বেড়ে ওঠা গ্লোবাল পুঁজির প্রতীকি কেন্দ্র ওয়াল ষ্ট্রীটের ফুলে ফেঁপে উঠা, বিশ্বপুঁজির নিজেরই সম্ভাবনা, ফলে তা ওয়াল স্ট্রিটের কাছে আদরণীয়। সম্ভাবনা এজন্য যে, পুঁজির আদি ও ইন্টিগ্রাল স্ববিরোধ হল একদিকে মুনাফাসহ ফিরে আসা পুরান বিনিয়োগ এবার আকারে বড় হবার কারণে সবসময় আরও নতুন বড় বিনিয়োগের বাজার আকাঙ্খা ও দাবী করে। কিন্তু বিনিয়োগ বাজারকে সঙ্কুচিত করে ফেলার কারণ সে নিজেই। কারণ বাজার থেকে যতই যে বড় করে মুনাফা তুলে আনে তত পরিমাণই সেটা বাজারের ভোগ/চাহিদা (ফলে নতুন উতপাদন/বিনিয়োগের বাজার) কমিয়ে ফেলে। এই স্ববিরোধে হয়রান হয়ে এটা সে সমাধানের উপায় খুজে সবসময় নতুন আন-এক্সপ্লোরড বাজার (সাধারণত কোন ছোট হয়ে থাকা অর্থনীতির রাষ্ট্রে নতুন করে) যোগাড়ের তালাশে। যদিও সেখানেও আবার সমস্যা হলো, যেহেতু সেটা নিজ রাষ্ট্র নয় ফলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে ফলে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে নাকি ঐ রাষ্ট্র কোন এক পর্যায়ে বিনিয়োগ মালিকানা তার নিজের জাতীয়করণ বা রাষ্ট্রীয়করণ করে ফেলে কি না এও এক বিশাল টেনশন। এসব বিচারে আমেরিকার ওয়াল ষ্ট্রিটের চোখে চিন লকলকে লোভে লোভনীয় এক বাজার। তার ক্রম-পুঞ্জিভুত আকার বেড়ে চলা পুঁজির আয়ু, টিকে থাকার সম্ভাবনা। তবে নিজের বিনিয়োগ নিরাপত্তা বিষয়ক চুক্তি, আইনকানুন, আন্ডারষ্টাডিং ঠিকঠাক করতে প্রথম বিশ বছর (১৯৭১-৯০) কেটে গিয়েছিল।
কিন্তু আবার রাইজিং ইকোনমির চিনের এই পরিণতিতে রাষ্ট্র হিসাবে আমেরিকান রাষ্ট্রের জন্য তা প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তিও হয়ে উঠছে। এই দিক থেকে আমেরিকান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বার্থ আর ওয়াল ষ্ট্রীটের অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রবলভাবে পরস্পর বিরোধী। চীন রাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি হলে আমেরিকান রাষ্ট্র এতে তার বিপদ দেখে আর ওয়াল ষ্ট্রীট মনে করে এতে তার কিছু আসে যায় না। গ্লোবাল লেনদেন বাণিজ্য ব্যবস্থা দাঁড় করাতে আমেরিকার নেতৃত্বে ১৯৪৪ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ, ও মুদ্রার মান নির্ণয় (এটাই আইএমএফ প্রতিষ্ঠানের ম্যান্ডেট) ও বড় পুঁজি বিনিয়োগ বাণিজ্যের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ (এটাই বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানের ম্যান্ডেট) ইত্যাদি নিশ্চিত করতেই গড়ে তোলা হয় আইএমএফ- বিশ্বব্যাঙ্কের মত প্রতিষ্ঠান। অথচ আজ ওয়াল ষ্ট্রিটই (তার হয়ে বিশেষ করে ‘গোল্ডম্যান স্যাসে’ কোম্পানী) চীন রাষ্ট্রকে বুদ্ধি পরামর্শ ও তাগিদ দিচ্ছে চিনের নেতৃত্বে নতুন করে আগামি বিশ্বব্যাংকের মত প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রিকস (BRICS) ব্যাংক গঠন করে এগিয়ে যেতে।
কাজেই যেকথা বলছিলাম, আমেরিকার দুনিয়ায় একক পরাশক্তি হয়ে থাকার ভুমিকার জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বী নতুন পরাশক্তিগুলোর উত্থান ঠেকানো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরোধ মীমাংসা কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের জন্য সরল কাজ নয়। ঠান্ডা যুদ্ধের কালের মত সরল কাজ ও সময় তো এটা নয়ই। তবু সরল নয় বলে ওবামার রাষ্ট্র তো চুপ করে বসে থাকতে পারে না। যতদুর সম্ভব প্রাণপণ চেষ্টা করছে, করবে। তাই, দুই রাইজিং ইকোনমির একটাকে (ভারত) কাছে টেনে পিঠে হাত রেখে দ্বিতীয়টাকে চিন ঘায়েল করে দাবড়ানোর চেষ্টা – আমেরিকার বিদেশনীতিতে দ্বিতীয় ইস্যু বা মূল বৈশিষ্ট এটাই। যতোই পুঁজি গ্লোবাল আন্তর্জাতিক হয়ে উঠছে ততোই শক্তির ভারসাম্য ওয়াশিংটন থেকে সরে ওয়াল স্ট্রিটে পুঞ্জিভূত হচ্ছে। নিজের এই আভ্যন্তরীণ স্ববিরোধিতার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সরাসরি চিনের উত্থান বিরোধিতা করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিদেশনীতিতে এই দ্বিতীয় ইস্যু যাত্রা শুরু করে ২০০৭ সালে থেকেই। কিন্তু থিতু হয়ে আরও গোছানো ভার্সনে প্রবলভাবে প্রয়োগে আসা শুরু করে ২০১১ সালের শুরুতে। নতুন এই ভার্সনে এবার ঠিক আগের মত আর চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে পিঠে হাত রেখে আদর বা কোলে তুলে নেয়া নয়। বরং চীন-ভারত দুই রাইজিং ইকোনমির বিরোধ বা দ্বন্দ্বের মাঝে অবস্থান নেয়া যাতে নিজের একটা ভারকেন্দ্র বা ভারসাম্যের ভুমিকা নিশ্চিত করা যায়। আর সেকাজের উপায় বা টুল হিসাবে এশিয়ায় নিজের সামরিক উপস্থিতি ঘটানো ও ব্যবহার করা।

ফলে এর দুটো প্রকাশ আমরা দেখি। এক. চীনের নৌপ্রবেশ পথ দক্ষিণ চীন সাগর থেকে বঙ্গোপসাগর হয়ে আরব সাগর পর্যন্ত নৌসামরিক উপস্থিতির ব্যাপারে আমেরিকার তৎপর হওয়া। আসলে এটা চিনের অর্থনীতির লাইফ লাইন; মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানী তেলসহ কাঁচামাল আনা আর নিজের পণ্য বিতরণ ইত্যাদির মুখ্য লাইন। আর দুই. বাংলাদেশকে তার রাজনৈতিক ও সামরিক স্ট্রাটেজির গুরুত্ত্বপুর্ণ গুরুত্বপূর্ণ এক অপারেশনাল কেন্দ্র বানানো। ম্যাপের দিক তাকালে আমরা দেখব বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান চীন-ভারতের মাঝখানে। আগে আমেরিকার ষ্টেট ডিপার্টমেন্ট বা আমাদের হিসাবে যেটা ওদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সেখানে বাংলাদেশ ডেস্ক বলে আলাদা কিছু ছিল না; ইন্ডিয়ান ডেস্কেরই অন্তর্গত ছিল বাংলাদেশ। নীতির নতুন পর্যায় বা গুরুত্বের কারণে এবার ২০১১ সাল থেকে আলাদা করে বাংলাদেশ ডেস্ক খোলা হয়। আর নৌ-উপস্থিতির কারণ ঠিক কোন যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়া নয়। বরং চিনের অর্থনৈতিক উত্থানের ফলে পরাশক্তিগত বা ষ্ট্রাটেজিক উৎকণ্ঠার কারনে এশিয়ার ছোট ছোট রাষ্ট্র ভীত হতে পারে এই আগাম অনুমানে ভীতুদের কাছে “অভয়” বিক্রি করা। বিনিময়ে তাদেরকে নিজের বলয়ে আনা, নিজের ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার বানানো। এজন্য আমেরিকার পররাষ্ট্র নীতিতে নতুন এক বয়ান হাজির হয় “পার্টনারশিপ ডায়লগ”। এই অঞ্চলের সবদেশের সাথে আমেরিকা “পার্টনারশিপ ডায়লগ” নামে চুক্তির জন্য তৎপর হয়ে উঠতে দেখছি আমরা। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই “পার্টনারশিপ ডায়লগ” বিষয়ক চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী। ধরনের দিক থেকে “পার্টনারশিপ ডায়লগ” এর ফোকাস অর্থনৈতিক নয়, বরং ষ্ট্রাটেজিক, অর্থাৎ রাজনৈতিক ও সামরিক।
ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের নতুন মাত্রা ও যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৭ সাল থেকে। তখন থেকে অস্ত্র, পারমানবিক সরঞ্জাম, সূক্ষ্ম বা প্রিসিশন টেকনোলজি ইত্যাদি পাবার বিষয়ে আমেরিকার সাথে বিবিধ লোভনীয় চুক্তি ও বিশেষ সুবিধা ভারত পেয়ে আসছে । আবার, অন্তত ১৭-১৮ টা বিষয়ে আলোচনা ডায়লগ করার জন্য জয়েন্ট থিঙ্ক ট্যাঙ্ক জাতীয় কমিটি গঠন ও পরস্পরের সুবিধা অসুবিধা আলাপ আলোচনা করে সহযোগিতার একক নীতি তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল তখন থেকেই। “পার্টনারশিপ ডায়লগ” বিষয়ে আলাপও হয়েছে, কিন্তু ভারত “পার্টনারশিপ ডায়লগ” চুক্তিতে এসেছে বলে স্পষ্ট জানা নাই। অথবা হলেও ওর অগ্রগতি নাই। এর মূল কারণ, আমেরিকার বিদেশ নীতির যে দুই ইস্যু বা বৈশিষ্ট নিয়ে কথা শুরু করেছিলাম শুরুর চার বছরের মধ্যে ২০১১ সালের পর থেকে এটা আর তেমন স্বাদের নয় বলে ভারতের দিক থেকে অনুভুত হতে শুরু করে। দিল্লির দিক থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক রচনায় অস্বস্তির মুল কারণ অনেকগুলো। যেমন,
এক. ওয়ার অন টেরর থেকে সরে সহনশীল একটা ইসলাম বা আরব স্প্রিং এর দিকে আমেরিকার ঝুঁকে পড়াটা ভারতের কাছে ঠিক আগ্রহের নয়। বুশের হকিশ বা বাজপাখি যুদ্ধবাজ লাইনের ওয়ার অন টেরর ভারতের বেশি পছন্দের।
দুই. চিনের ভয়ে বড়ভাই আমেরিকার ভারতের পিঠে হাত রাখা, আমাদের মত দেশকে যাতা দেবার কাঠি দিল্লিকে একচ্ছত্র ভাবে ব্যবহার করতে দেওয়া তা খুবই উপভোগ্য ছিল। এই সময় মার্কিন নীতি ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় “নিরাপত্তা নীতিতে” দিল্লীর চোখে দেখা নীতিই মার্কিন নীতি। দিল্লির কাছেও তাই এই নীতি লোভনীয় ছিল।

কিন্তু ২০১১ এর পর থেকে ওয়াশিংটনের দিল্লির হয়ে এই অঞ্চলে নিজের স্বার্থ দেখার নীতি থেকে সরে আসতে শুরু করে। বরং স্বরূপে দক্ষিণ এশিয়ায় হাজির থাকা এবং ওর মধ্য দিয়ে নিজস্ব ষ্ট্রাটেজিক সামরিক এলিমেন্ট চর্চা শুরু করে – এটা দিল্লির জন্য জন্য অস্বস্তির কারণ। বলতে গেলে মিঠা ফল আমেরিকা ক্রমশ তিতা লাগতে শুরু করে ভারতের কাছে। বিরোধ ও অস্বস্তি ফেটেফুটে প্রকাশ হয়ে পড়ার ঘটনাটা ঘটে গতবছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট বা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ওদিক কূটনৈতিক পর্যায়ে দেবযানী খোবরাগোড় এর ইস্যুতেও। এককথায় বললে দক্ষিণ এশিয়ায় দিল্লির একচ্ছত্র আধিপত্য ওয়াশিংটন মেনে নিক দিল্লি সবসময়ই এটা আকাঙ্খা করে। ওয়াশিংটন ভারতের চোখ দিয়ে নিজের স্বার্থ দেখুক, ভারতকে এ অঞ্চলের সর্দার বানাক এমনটাই ভারতের সবচেয়ে পছন্দের। এই সম্পর্কের চর্চা বেশ কিছুকাল চললেও ২০১১ সাল থেকে আমেরিকা আর সেজায়গায় থাকতে চায়নি বা পারেনি। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে নৌ ফ্লিট নিয়ে উপস্থিত থাকবার আমেরিকান আকাঙ্খাটা প্রকাশ হয়ে পড়ার পর থেকেই দিল্লি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ককে পুনর্মূল্যায়ন শুরু করেছে। তার নিজের ষ্ট্রাটেজিক ও সামরিক স্বার্থের দিক থেকে একে সংঘাতসংকুল বলে মুল্যায়ন করতে ও সতর্ক হতে শুরু করেছে। সার করে বললে, এই অঞ্চলে চীনের পরাশক্তিগত উত্থান ইস্যুতে একসাথে কাজ করা পর্যন্ত ঠিক আছে কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের স্বার্থ নিজে সরাসরি দেখভাল করবে, দিল্লী একে বিপদ হিসাবেই দেখতে শুরু করে। কারণ এর ফলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এতে দিল্লীর ভাগে টান পড়ে, একটা বড় ধরণের পরিবর্তন এতে অনিবার্য হয়ে ওঠে।

পরবর্তি কিস্তির লেখাগুলোঃ
প্রথম কিস্তি
দ্বিতীয় কিস্তি
তৃতীয় কিস্তি

[লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল, ২৮ মার্চ ২০১৪।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত,চিন,রাশিয়া ও আমেরিকা (১)
গৌতম দাস || Friday 28 March 14 |
http://chintaa.com/index.php/chinta/showAerticle/268/ ]

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (২), দ্বিতীয় কিস্তি

দ্বিতীয় কিস্তি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (২)

ভারতের নির্বাচন ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বদলের সম্ভাবনা

গৌতম দাস

https://wp.me/p1sCvy-2g

১ এপ্রিল ২০১৪

ভারতে নতুন নির্বাচন আসন্ন। দুমাস ধরে নয় পর্বে অনুষ্ঠিত হয়ে তা ফলাফল ঘোষণাসহ শেষ হবে মে মাসের ১৬ তারিখে। এপর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সময়ে একের পর এক প্রকাশিত একজিট পোলগুলো বলছে, ৫৪৩ আসনের আইনসভায় (লোকসভা) সরকার গড়তে দরকার ২৭২ আসন। কিন্তু কংগ্রেস ও তার জোট ইউপিএ মিলিয়ে তার ভাগ্যে জুটার সম্ভাবনা মাত্র ৯৮-১০২ আসন, অর্থাৎ ১০০ আশেপাশে, এর বেশি নয়। ফলে ইউপিএ এর সরকার যে হচ্ছে না এখন পর্যন্ত সবগুলো এক্সিট পোলই সে ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর সোজা মানে আমেরিকার সাথে (কংগ্রেস দলসহ) ভারত সরকারের গত সাত বছরের যে সখ্যতা ও সর্বশেষ বিরোধের সম্পর্ক – তা কোনভাবেই আর আগের জায়গায় থাকছে না, এতে পালাবদল আসন্ন। বাংলাদেশে একমাত্র ভারতের সমর্থনের হাসিনার সরকার, এর প্রধান খুটি যা, বাইরের সমর্থনের দিক থেকে তা এই প্রথম ভীষণ নড়বড়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়তে শুরু করেছে। তাহলে কি বিজেপির নরেন্দ্র মোদির সরকার ক্ষমতায় আসছে? না তাও একেবারে নিশ্চিত করতে পারেনি কোন একজিট পোল। সবগুলো একজিট পোলের ফলাফলে দেখা গিয়েছে বিজেপি জোটে ২৩৩ আসনের নিচে থেকেছে এই পর্যন্ত। [এখানে দেখুন,] আবার ১৬ তারিখের পর আসল ফলাফলে কোন কারণে এটাও যদি না হয় তবে ১৯৯৬ সালের দেবগৌড়ের সরকারের মত আঞ্চলিক দলগুলোর জোট ক্ষমতায় আসতে পারে। সেক্ষেত্রে ভারতে এক দুর্বল সরকার মানে দুর্বল রাজনৈতিক কর্তৃত্ত্বের সরকার গঠিত হবে সন্দেহ নাই। এসব দিকে নজর রেখে আমেরিকার সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের অঞ্চলের ডেস্কের নিশা দেশাই সপ্তাহ তিনেক আগে বিজেপির মোদির সাথে বিস্তারিত আলাপ করতে এসেছিলেন। (যদিও সফরের প্রকাশ্য মূল এজেন্ডা ছিল ভারতের ট্রেড বিষয়ক বিরোধগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সাথে কথা বলা।) ঘটনা শেষ পর্যন্ত যাই দাঁড়াক, এবার আমেরিকার বাংলাদেশ নীতি যে ভারতের বাংলাদেশ নীতির উপর সুবিধা পাবে, পশ্চিমা স্বার্থের সাথে সমন্বয় করে হাজির হতে সুযোগ পাবে তা বলাই বাহুল্য। অন্ততপক্ষে আমেরিকা ও ভারত উভয়ের বাংলাদেশ নীতি নতুন ভারসাম্য পরিস্থিতি নতুন করে রচিত করার সুযোগ তৈরি হতে যাচ্ছে। কংগ্রেস সরকারের সাথে মুখোমুখি বিরোধে জড়িয়ে তা যতটা সংঘাতপুর্ণ বা অকেজো হয়ে আছে তা নতুন রাস্তা নিবে। কারণ ভারতের এই নির্বাচনের ফলাফলে যে কোন অ-কংগ্রেসী সরকার গঠিত হলে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কে গত তিন-চার বছরে যুক্ত হওয়া নতুন বাস্তবতা, নতুন করে হাজির হওয়া উপাদানগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে নতুন ভারসাম্যে রচিত হবে সন্দেহ নাই। উভয় রাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতির কমন ভিত্তি খুজে বের করা ও রচনা হবে। অন্তত কংগ্রেস সরকারের মত “যেকোনভাবেই হোক আমার হাসিনা সরকারকেই চাই” এই জবরদস্তিমূলক অবস্থানে আর থাকছে না। এটা অবস্থাদৃষ্টে পরিস্থিতি যেদিকে বিকশিত ও মোচড় নিচ্ছে সেদিকে তাকিয়ে এক অনুমান মাত্র। তবে একেবারেই হাওয়াই অনুমান নয়। এই অনুমানের পিছনের একটা বড় কারণ, মোদি এবং এবারের মোদির বিজেপির নীতি (তুলনায় ওল্ড হাগার্ড আদবানির বিজেপি নয়)।

মোদির বিজেপি কেমন নীতি ক্ষমতা নিয়ে হাজির হতে পারে
বিজেপি “সেকুলার” নয় অথবা মুসলমান-বিদ্বেষী এই অভিযোগ মোদি এই নির্বাচনে সিরিয়াস আমলে নিয়েছেন বলে মনে করার কারণ আছে। মোদি ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন “বল্লভ ভাই প্যাটেলের মত তিনিও সেকুলার”। [দেখুন,] প্যাটেল কে ছিলেন? স্বাধীন ভারতে ১৯৪৭ এর আগষ্টের পর নেহেরুর প্রথম সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন প্যাটেল। এই “প্যাটেলের সেকুলার” কথার অর্থ তাতপর্য কি তা নিয়ে আলাদা কোথাও বিস্তারে আলোচনা করতে হবে। আপাতত সংক্ষেপে – কংগ্রেস ও বিজেপি এবারের নির্বাচনে কমন যে ইস্যুতে বিতর্কে লিপ্ত তা হল, ভারতের অখন্ডতা। সব জনগোষ্ঠীকে এক ভারতে ধরে রাখা এই সুত্রে অখন্ডতা আলাপ। আর এক ‘সেকুলার ভারত” এটা ভারতকে অখন্ড রাখার জন্য নাকি গুরুত্বপুর্ণ উপাদান। এই হলো অখন্ডতার আলাপের মধ্যে সেকুলার শব্দটা ঢুকে পড়ার সম্পর্ক সুত্র। বুঝাই যাচ্ছে এসব কথাবার্তাগুলো আসলে সমস্যার মুল এড়িয়ে শব্দের ফুলঝরি বা রেঠরিক। যেভাবে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নতুন করে আরও ভাগ টুকরা করে নতুন নতুন রাজ্য গঠনের দাবী বেড়েই চলেছে (এক পশ্চিমবঙ্গকেই আরও দুই তরফে আরও নতুন দুই ভাগে ভাগ করার দাবী আছে) এই ফেনোমেনার মুল তাতপর্য হল, ক্ষুদ্র (উত্তরপুর্ব ভারত) অথবা বড় (দক্ষিণ ভারত) ধরনের জনগোষ্ঠিগুলোকে কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল করে রাখা। এককথায় বললে এগুলো কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রক্ষমতাকে অপ্রতিনিধিত্ত্ব করে রাখার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। প্রায়ই “বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন” নাম দিয়ে এগুলোকেই নেতিবাচক লক্ষণ বা ফেনোমেনা বলে এমন বয়ানে চিনানোর চেষ্টা হতে দেখি আমরা। এক ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কোথাও তৈরি আছে যার হদিস নাগাল করার জন্য পাবার জন্য এগুলো মূলত ক্ষমতায় উপযুক্ত অংশীদারিত্ত্ব না পাওয়া অথবা শ্রুত হবার জন্য বঞ্চিত জনগোষ্ঠির আর্তনাদ। নিজের উপর এই ফেটিস বা ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার দানবীয় শাসন এরা টের পায় কিন্তু সেক্ষমতাকে ধরতে পারে না, ভাগ পায় না। কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় সে অপ্রতিনিধিত্বশীল থেকে যায়। কিন্তু কথার মারপ্যাচে ক্ষমতায় অপ্রতিনিধিত্বশীলতার সব সমস্যাগুলোর সমাধান যেনবা সেকুলারিজম – এমন এক ইঙ্গিত দিয়ে সমস্যাকে ঝুলিয়ে বা ধামাচাপা দিয়ে রাখতে চায়। ফলে “সেকুলারিজম” বলে বয়ানের আড়ালে বাকচাতুরি রেঠরিকে কংগ্রেস-বিজেপির মিছা লড়াই চলতে থাকে। বিগত ত্রিশ বছরে ধরে একনাগাড়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত হয়ে আসছে কেবল আঞ্চলিক দলের সমর্থনে, কোয়ালিশনে। সাধারণভাবে কোয়ালিশন সরকার মানেই তা খারাপ লক্ষণ তা বলা হচ্ছে না। খেয়াল করতে হবে এটা বিজেপি বা কংগ্রেসের মত তথাকথিত সর্বভারতীয় দলগুলোর পরস্পরের কোয়ালিশন নয়। বরং বিজেপি বা কংগ্রেসের সাথে “আঞ্চলিক দলের” কোয়ালিশন। এটাই ভারতের অখন্ডতা সমস্যার মূল দিক, মৌলিক বিপদ। কংগ্রেস বা বিজেপি নিজেদের সর্বভারতীয় দল দাবী করে আসলেও তাই এর অন্তর্সারশুণ্যতা এখানেই। পুরা দক্ষিণ ভারতে আঞ্চলিক দলের প্রভাব একচেটিয়া, একনাগাড়ে এবং বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছরের। “আঞ্চলিক দল” এই ফেনোমেনোটার অর্থ তাতপর্য কি? এককথায় বললে, ভুতুড়ে কেন্দ্রীভুত ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। নেহেরুর ভারত রাষ্ট্র গঠনতান্ত্রিকভাবে ১৯৪৮ সালের শুরু থেকেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভুত ও কুক্ষিগত করে রাখতে হবে, একমাত্র তাহলেই অখন্ড ভারত রাখা যাবে, বিশাল ভারতকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে – এই নীতিতে রাষ্ট্র গঠন করে রাখা হয়েছে। অথচ নানান আঞ্চলিক দলের উত্থান ফেনোমেনো চোখে আঙুল দিয়ে বারবার বলছে ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার রাষ্ট্র নয় ফেডারল ধরনের রাষ্ট্রক্ষমতাই এর একমাত্র সমাধান। এই প্রসঙ্গ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার সুযোগ নিতে হবে কখনও। কিন্তু গুরুত্ত্বপুর্ণ যেটা – বাইরের পড়শি রাষ্ট্র, “সীমাপাড়-কী আতঙ্কবাদ” এগুলোই নাকি ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সমস্যা তৈরি করছে, এগুলো নাকি বাইরের তৈরি, মুসলমানদের তৈরি ফলে ‘সেকুলারিজম’ এর সমাধান এমন মুলা ঝুলিয়ে মূল সমস্যা ‘ক্ষমতায় অপ্রতিনিধিত্ত্বশীলতা” এদিকটাকে আড়াল করে রাখা হয়েছে, ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা তৈরির পথ চালু রাখা হয়েছে। আর এব্যাপারে কংগ্রেস ও বিজেপির মৌলিক মিল আছে, যদিও সমাধান প্রশ্নে অবস্থান ভিন্নতা আছে। যেমন, বিজেপি এপর্যন্ত ব্যাখ্যা করে এসেছে এর সমাধান “হিন্দু জাতিয়তাবাদের ভিত্তিতে ঐক্য” আর কংগ্রেস দাবী করেছে সেকুলারিজমের ঐক্য এই বয়ানের আড়ালে আর এক ব্রান্ডের হিন্দু জাতিয়তাবাদ। উভয় দলের মিলটা হল কেউই রাষ্ট্র গঠনের শুরু থেকেই ভারত রাষ্ট্রের ক্ষমতা গঠনের ভিতরেই যে সমস্যা সেদিকটা নিয়ে সরাসরি আলাপ তুলতে সাহস রাখে না। সমস্যাটা নাকি রাষ্ট্রের বাইরে থেকে আসছে এই দাবির ব্যাপারে উভয়ে একমত। এরা অস্বীকার করতে চায় সমস্যা রাষ্ট্রের বাইরে থেকে তৈরি করা, উস্কানি দিবার চেষ্টা থাকতেই পারে থাকবে কিন্তু এটা তখনই ইস্যু হবে, খচখচে কাঁটা হয়ে উঠবে যদি রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ ক্ষমতা গঠনে সমস্যা থাকে, ক্ষমতা অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল হয়ে থাকে। পঞ্চাশ রাজ্যের ফেডারল রাষ্ট্র আমেরিকার অখন্ডতাকে কি বাইরের শত্রু রাষ্ট্রের উস্কানি দিয়ে ভেঙ্গে দিবার মত শত্রু রাষ্ট্রের অভাব আছে, না কি কোন কালে ছিল? কিন্তু কখনই আমেরিকা তা অনুভব করে নাই কেন?
বড় ভুগোল, বড় জনসংখ্যা, ভিতরে অনেক ধরনের আভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠিগত বিভক্তি-চিহ্ন এবং বড় অর্থনীতি ইত্যাদি পরিস্থিতিতে ঐ দেশের জন্য একে এক রাষ্ট্রে সংগঠিত করতে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রক্ষমতা গাঠনিক দিক থেকে দেখলে এপর্যন্ত সারা দুনিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে ভাল রাষ্ট্র অভিজ্ঞতা হলো আমেরিকান রাষ্ট্র, ফেডারল ভিত্তির রাষ্ট্র। ফেডারল ধরণের রাষ্ট্র কথাটা বিস্তার করতে পারলে ভাল হত। প্রসঙ্গ অন্যদিকে চলে যাওয়া এড়াতে সংক্ষেপে কেবল বলব, একে বুঝবার জন্য আইন পরিষদ ( আমেরিকান প্রতিনিধি পরিষদ বা আমাদের সংসদ) থাকার পরও কোন আইন সংসদে পাশ হবার পর তা আবার সিনেটেও পাশ হতে হবে, কারা এই সিনেট গঠন করেছে এদিকটাসহ ফেডারল রাষ্ট্রে ক্ষমতা গঠন নীতির দিকে নজর দেয়া যেতে পারে। অনেকে তর্ক তুলতে পারেন ভারতে সিনেট নামে না থাকলেও রাজ্যসভা নামে তো কিছু আছে। এর জবাব হল, ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্র ভুমিকা ২৭২ জন লোকসভার (সংসদ) সদস্যদের মধ্যে। কিন্তু ফেডারল আমেরিকা রাষ্ট্রের ক্ষমতা কেবল আইনসভা (প্রতিনিধি পরিষদ) কেন্দ্রিক কোন একটা ক্ষমতা-কেন্দ্র নাই, ফলে সেখানে কেন্দ্রীভুতও নয়। তাই ভারত রাষ্ট্রের ক্ষমতাগঠন প্রক্রিয়া ও কাঠামো এক ভুতুড়ে অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল কেন্দ্রীয় ক্ষমতাই তৈরি করবে সবসময়, এপর্যন্ত করে এসেছে। ফলে একই মাত্রায় তা বিরোধ সংঘাতে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে পড়ার বিপদ মাথায় নিয়ে ঘুরবে। এর আদি পাপ ১৯৪৭ সালে অখন্ড ভারত গঠন কাঠামোর মধ্যে যেখানে মুল যে বিষয়ে জোর দেয়া হয়ে হয়েছিল তা হলো নির্ভেজাল একছত্র “বলপ্রয়োগ”। আমাদের অনুমান থাকতে পারে যে বৃটিশ ভারত বোধহয় অখন্ড কিছু একটা ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালে যখন বৃটিশরা ছেড়ে যায় তখনও ছোটবড় মিলিয়ে অন্তত ৫০০ রাজার রাজ্যকে ইন্টিগ্রেট করে অখন্ড ভারত খাড়া করার বিপদ নেহেরুকে মোকাবিলা করতে হয়। এর মুল নীতি ছিল বলপ্রয়োগ; স্ব-ইচ্ছার ইউনিয়নও নয়, ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ত্বশীলতার প্রশ্ন সেখানে নির্ধারক নয়। নেহেরুর প্রধানমন্ত্রীত্ত্বে গুজরাটি বল্লভ ভাই প্যাটেল ছিলেন ওই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অর্থাৎ বলপ্রয়োগ ঘটাবার কাজটা তাকেই করতে হয়েছিল। একটা উদাহরণ দেই। যেমন, এখনকার অন্ধ্রপ্রদেশ যা হায়দ্রাবাদকে রাজধানী করে পুনগঠিত হয় ১৯৪৭ সালের পরে। কিন্তু কেবল ঐ হায়দ্রাবাদ আসলে ছিল এক রাজার রাজ্য। এই রাজ্যের নিজাম (রাজা) বৃটিশ করদ দেয়া শর্তে স্বাধীন রাজার রাজ্য ছিল। হায়দ্রাবাদকে অন্তর্ভুক্ত করে অখন্ড ভারত বানাতে গিয়ে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে যেতে হয়েছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাটেলকে। বলপ্রয়োগ আর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এই ছিল তর্কের বিষয় – এনিয়ে মন্ত্রীসভার বৈঠকে প্যাটেলকে ‘কমিউনিষ্ট’ বলে গালি দিয়েছিলেন নেহেরু। এতকিছু শব্দ থাকতে ‘কমিউনিষ্ট’ কেন? নেহেরুকে যেখানে ‘প্রগতিশীলেরা’ কমিউনিষ্ট না হলেও সমাজতন্ত্রী বলেই চিত্রিত করতে পছন্দ করে দেখা যায়!

এর সংক্ষিপ্ত জবাব ১৯১৭ সালে রাশিয়ান বিপ্লবের পর রাষ্ট্র গঠনে লেনিনকে নানান জাতিগোষ্ঠিকে (যেগুলো আসলে ছিল রাশিয়া ও এর পড়শি জার সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা নানাঞ্জনগোষ্ঠি) ঐ রাষ্ট্রে ইন্ট্রিগ্রেশেন যা মুলত ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যা তা মোকাবিলা করতে হয়েছিল। নেহেরুর মন্ত্রী প্যাটেলের মতই লেনিনের মন্ত্রী (রুশ ভাষায় commiserate বা মন্ত্রণালয়ের কমিসার বলা হত) ছিলেন জর্জিয়ান জোসেফ ষ্টালিন। ষ্টালিনীয় নির্মম বলপ্রয়োগ তা ঘটানো হয়েছিল। [যদিও লেনিনের নীতিগত অবস্থান ছিল, জনগোষ্টিগত উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রতিরোধ সংগ্রাম, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই সমর্থন করতে হবে। কিন্তু এটা নীতিগত। ষ্টালিনের হাতে বাস্তবে প্রয়োগে এটা যা দাড়িয়েছিল এর সাথে লেনিনের নীতির আর কোন সামঞ্জস্য খুজে পাওয়া যায় নাই। বিপ্লব ঘটেছিল কেবল রাশিয়ায়। কিন্তু একছত্র ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে দানবীয় করতে রাশিয়ার তথাকথিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পড়শি পর পড়শি রাষ্ট্র বা অঞ্চল জোড়া দিতে দিতে সীমান্ত বাড়িয়ে সেই রাশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন নাম ধারণ করে। এই পড়শি জোড়া দেয়া ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত চলেছিল, একই সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে তবে সাইজ সীমান্ত বাড়িয়ে, থামে নাই। সোভিয়েত রাষ্ট্র ১৯৮৯ সালে ভেঙ্গে ছত্রাখান হয়ে পড়ার পর এবার এতদিন জোর করে দাবিয়ে রাখা জাতিগত প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যা ফেটে প্রকাশিত হয়তে শুরু করে। উলটা পথ, আবার ম্যাপ সীমান্ত আঁকা। ষ্টালিনের শখের সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আবার তা ছোট্ট রাশিয়া হয়ে যায়। আলাদা দুই রাষ্ট্র হয়ে ষ্টালিনের জর্জিয়া লেনিনের রাশিয়ার সাথে এখন সীমান্ত যুদ্ধে লিপ্ত। কসোভো, বসনিয়া এবং এমনকি হাল আমলের ইউক্রেন বা ক্রিমিয়া এভাবে প্রতিটা সমস্যার আদি গোড়া একটাই -ভুতুড়ে রাষ্ট্রে “বলপ্রয়োগে ইন্ট্রিগেশন” -জবরদস্তি। আমেরিকা ফেডারেল রাষ্ট্রের জন্ম ১৭৭৬ সালে। কিন্তু কেউই রাষ্ট্রগঠন ইতিহাসের এই গুরুত্বপুর্ণ অভিজ্ঞতাকে আমল করে নাই; না সোভিয়েত ইউনিয়ন না ভারত।] সেই সুত্রে প্যাটেলকে ‘কমিউনিষ্ট’ বলে গালি দিয়েছিলেন নেহেরু। এবারের নির্বাচনে কংগ্রেসের সেকুলারিজমের বিপরীতে বিজেপির মোদির নির্বাচনী কালার ‘প্যাটেলের সেকুলারিজম’ কথার অর্থ তাতপর্য এখন থেকে পাওয়া যেতে পারে। আকার ইঙ্গিত রেঠরিক বাকচাতুরি যে যতই করুক মুল কথা ইন্টিগ্রেটেড ইন্ডিয়া বা অখন্ড ভারত ধরে রাখা। কিন্তু কি ভিত্তিতে সেটাই মূল প্রশ্ন। অথচ এটাই ভারত রাষ্ট্রের মাথার উপর সবসময় টিকটিক করা বিখন্ড হয়ে পড়ার বিপদ – এটাই নানান ইঙ্গিতে নানান ছলে ইস্যু হিসাবে এই নির্বাচনে হাজির – বিজেপি ও কংগ্রেস রেঠরিক নানা কথার টোপড়ের আড়ালে এর স্বীকৃতি দিচ্ছে।

কিন্তু এবারের নির্বাচনের আর একটা দিক, ভারতের মুসলমান ভোটাররা আর একটা ফ্যাক্টর হয়ে হাজির, এই অর্থে যে মুসলমানেরা আর ‘সেকুলার ভারত’ এমন কথার লোভে কংগ্রেস বা কমিউনিষ্টদের কনষ্টিটুয়েন্সি হয়ে থাকতে চাইছে না; এটা পরিস্কার। মোদি ও তার দল ইতোমধ্যে পাবলিক মিটিংয়ে মুসলমানদের কাছে শুধু মাফ চান নাই, শুধু একবারের মত সুযোগ যেন তারা দেয় এই আকুতি জানিয়েছেন। [“apologize to you by bowing our heads” দেখুন,]। পশ্চিমবঙ্গের মমতার মুসলিম কনষ্টিটুয়েন্সী হাসিল করার প্রচেষ্টাও প্রায় একই রকম।

মোদির নীতি ক্ষমতার সম্ভাব্য ফোকাস
মোদি বা বিজেপি প্রসঙ্গে দ্বিতীয় যে দিকটা নিয়ে কথা বলব সেটা আলোচনার সুত্রে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। গুজরাটের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, একনাগাড়ে পরপর তিন টার্মের মুখ্যমন্ত্রী তিনি। সারা ভারতে মূলত ব্যবসায়ে অগ্রসর জনগোষ্ঠি হিসাবে গুজরাতিদের একটা একক পরিচয় আছে। মোদি টাইটেলটাও এর সূচক। যদিও গত কয়েক বছরে তার পরিচয় ছাপিয়ে উঠেছে দাঙ্গায় মুসলমান হত্যার নেতা-লোক হিসাবে। কিন্তু একইসাথে তার গুজরাট মানে রাইজিং ইকোনমির গুজরাট। আর একাজে সে সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে জাপান থেকে। তাঁর খাতির, সম্পর্ক বেশির ভাগটাই জাপানের পলিটিক্যাল ও বিজনেস এলিটদের সাথে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে সে সরাসরি দাওয়াত দিয়ে গুজরাটে এনে সম্বর্ধনা দিয়েছে। এদিক থেকে যদি দেখি তবে গ্লোবাল পরিসরে তার রাজনীতিবোধটাকে বলা যায়, মুলত বিজনেস ওরিয়েন্টেড পলিটিক্স। শুধু জাপান নয়, একই সাথে চিন, জার্মান, ফ্রান্স, আমেরিকার সাথে মোদির গভীর সম্পর্কের দিকটা বুঝার জন্য এই আর্টিকেলটা মনোযোগ দেয়া যেতে পারে। আবার, আসামের নির্বাচনী বক্তৃতায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আর চীন সীমান্তে অরুণাচলের নির্বাচনী বক্তৃতায় চীন প্রসঙ্গে তিনি কথা বলেছেন যা যুদ্ধবাজ বাজপাখী অথবা সাম্প্রদায়িক মনে হলেও তা রেঠরিক হিসাবে দেখার সুযোগ আছে। কারণ তিনি কিছুই না বললে সমালোচকরা সেটা নিয়েই কথা যাতে না তুলতে পারে তারই ব্যবস্থা হিসাবে দেখার সুযোগ আছে। [দেখুন,]
আবার আমেরিকার বিদেশনীতি বিষয়ক গুরুত্বপুর্ণ জার্ণাল foreignpolicy তে এক বিশেষ নিবন্ধে [দেখুন Decoding Modi’s Foreign Policy] দেখা যাচ্ছে মোদির নীতির ফোকাসের ব্যাপারটা তাদেরও নজরে এসেছে। বলছে, Despite his roots in a nationalistic, right wing BJP, the highlight of Modi’s foreign policy will likely be economics, and not security. While taking a rhetorical hard line on India’s national interests suits his political ideology, Modi appears to understand that as prime minister he will need to prioritize boosting trade and fixing India’s economy. নিজের দায়িত্বে বাংলায় বললেঃ “এক ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী বিজেপির ভিতর মোদির শিকড় পোতা থাকলেও তাঁর বিদেশনীতির বৈশিষ্ট হবে খুব সম্ভবত নিরাপত্তা নয়, অর্থনীতি। ভারতের জাতীয় স্বার্থ বিষয়ক ইস্যুগুলোতে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে খাপখায় এমন হার্ডলাইনের রেঠরিক ঠাটবাট বাকচাতুরি তার আছে। কিন্তু মোদি বুঝে একজন প্রধানমন্ত্রী হতে গেলে তাকে তাঁর কোন চাহিদাটা প্রধান করতে হবে আর সে প্রাধান্যের বিষয়টা হল, বাণিজ্যকে চাঙ্গা করা, ভারতের অর্থনীতিতে বাধা ও সমস্যাগুলোকে সমাধান করা”।
এখানেই বর্তমান কংগ্রেস সরকারের অনুসৃত বিদেশনীতির থেকে বিজেপির মোদির বড় নীতিগত পার্থক্য। যদিও মোদির সম্ভাব্য ভারতের জন্য কঠিন কাজটা রয়ে গেছে। সেটা হল, ভারতের সাথে আমেরিকা ও চীনের সম্পর্ককে নিজের স্বার্থের দিক আমলে রেখে একটা ফাইন ব্যালেন্সের উপর দাঁড় করানো। এটা ঠিক আমেরিকা ও চীন এদের একের বিরুদ্ধে অন্যটাকে ব্যবহারও নয়, আবার কোনটাকে বাদ দিয়ে নয়। কংগ্রেসের ভারত যেটা করতে শোচণীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। [অবশ্য আমেরিকার উস্কানি লোভ দেখানিও ছিল।] এটাই এই অঞ্চলের আমাদের সবার জন্য সঠিক এক পদক্ষেপ হবে।
সংক্ষেপে একটা কথা বলে রাখি। বিজেপির পুরানা রাজনৈতিক লাইন – মুসলমান বিদ্বেষ কেন্দ্রিক হিন্দু জাতিয়তাবাদ – এর প্রতীকী নেতা হয়ে থেকে আছেন আদবানি, সাথে আছেন সুষমা স্বরাজ প্রমুখ। নরেন্দ্র মোদির ব্যবসা বা অর্থনীতি ফোকাসের লাইন এটাই আন্ত-পার্টি সংগ্রাম হিসাবে আদবানিকে পরাজিত করে ‘বিজেপি জিতলে মোদি প্রধানমন্ত্রী হবেন’ হিসাবে হাজির হয়েছে। এটা কেবল ফোকাস বা প্রাইয়োরিটি সরিয়ে আনা। এতটুকুওই বদল। তবু এই বদলটাই তাতপর্যপুর্ণ। বিশেষত বাংলাদেশের দিক থেকে। কারণ এটা কংগ্রেসের মত তথাকথিত নিরাপত্তা বিষয়ক যুদ্ধবাজ লাইনে ফোকাস নয়। তবে কোন কারণে মোদি সরকার গঠন পর্যন্ত পৌছাতে না পারলে বর্তমানে কোনঠাসা আদবানিরা পুরানা ফোকাসের বিজেপি আবার জেগে উঠবে বলে মনে হয়।


সবমিলিয়ে শেষ কথাটা হলো, ব্যবসায়ী মোদির সরকার যদি গঠন হতে সুযোগ পায় তবে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতা সখ্যতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীতা সম্পর্কের নতুন অধ্যায় বা তৃতীয় পর্যায় শুরু হবার সম্ভাবনা দেখা যায়। বর্তমান কংগ্রেস সরকারের বিদেশনীতির ফোকাসটা হলো, সিকুইরিটি মানে তথাকথিত নিরাপত্তা। এককথায় বললে, এটা আসলে “মুই কি হনু রে” ধরনের পথে আশেপাশের সবাইকে দাবড়ে বেরিয়ে নিজের প্রিভিলেজ সুবিধাটা নিশ্চিত ও হাসিল করতে চাওয়া। বিপরীতে তুলনা করে বললে, মোদির লক্ষ্য ব্যবসা ও অর্থনীতিতে এক রাইজিং ইন্ডিয়া হাজির করা আর সেকাজে দলের পুরান ইমেজ পরিচয় মুসলমান বিদ্বেষী এক বিজেপি এই পরিচয়কে ফিকে করে ফেলা। একমাত্র একাজ করেই সে ভোটারদের মনে এই নতুন বিজেপির পরিচয়কে স্থায়ীত্ব দিতে চায়। পুরানো পরিচয়গুলোকে যেন ছাপিয়ে উঠে রাইজিং ইন্ডিয়ার মোদি ও বিজেপি। এমন এক ইঙ্গিত মোদি হাজির রেখে চলেছেন। সেটা শেষ পর্যন্ত কোথায় কি হয় সেটা অবশ্যই হতে দেখবার বিষয়, আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। যদি তাঁর ইঙ্গিত সত্যি ও অর্থপুর্ণ হয়, সে প্রেক্ষিত মাথায় রেখেই বলেছি সেক্ষেত্রে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতা সখ্যতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীতা সম্পর্কের নতুন অধ্যায় বা তৃতীয় পর্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। তবে আমাদের জন্য মূল কথা হল, ঘটনা যেদিকেই যাক, বটম লাইন হল, সরকার বদলের সাথে বর্তমান ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে বদল আসছেই। তাতে অন্তত বাংলাদেশে ফ্যাসিজমের ভিত আলগা হচ্ছে। বাইরের গুরুত্বপুর্ণ সমর্থন নাই হয়ে যাচ্ছে, এব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই। “আমার হাসিনা সরকারই চাই” আগামি ভারত সরকারের এমন অবস্থান আর থাকছে না।

পরবর্তি কিস্তির লেখাগুলোঃ
প্রথম কিস্তি
দ্বিতীয় কিস্তি
তৃতীয় কিস্তি

[লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল, ২৮ মার্চ ২০১৪।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত,চিন,রাশিয়া ও আমেরিকা (১)
গৌতম দাস || Friday 28 March 14 |
http://chintaa.com/index.php/chinta/showAerticle/268/ ]
]