বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (২), দ্বিতীয় কিস্তি


দ্বিতীয় কিস্তি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (২)

ভারতের নির্বাচন ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বদলের সম্ভাবনা

গৌতম দাস

ভারতে নতুন নির্বাচন আসন্ন। দুমাস ধরে নয় পর্বে অনুষ্ঠিত হয়ে তা ফলাফল ঘোষণাসহ শেষ হবে মে মাসের ১৬ তারিখে। এপর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সময়ে একের পর এক প্রকাশিত একজিট পোলগুলো বলছে, ৫৪৩ আসনের আইনসভায় (লোকসভা) সরকার গড়তে দরকার ২৭২ আসন। কিন্তু কংগ্রেস ও তার জোট ইউপিএ মিলিয়ে তার ভাগ্যে জুটার সম্ভাবনা মাত্র ৯৮-১০২ আসন, অর্থাৎ ১০০ আশেপাশে, এর বেশি নয়। ফলে ইউপিএ এর সরকার যে হচ্ছে না এখন পর্যন্ত সবগুলো এক্সিট পোলই সে ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর সোজা মানে আমেরিকার সাথে (কংগ্রেস দলসহ) ভারত সরকারের গত সাত বছরের যে সখ্যতা ও সর্বশেষ বিরোধের সম্পর্ক – তা কোনভাবেই আর আগের জায়গায় থাকছে না, এতে পালাবদল আসন্ন। বাংলাদেশে একমাত্র ভারতের সমর্থনের হাসিনার সরকার, এর প্রধান খুটি যা, বাইরের সমর্থনের দিক থেকে তা এই প্রথম ভীষণ নড়বড়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়তে শুরু করেছে। তাহলে কি বিজেপির নরেন্দ্র মোদির সরকার ক্ষমতায় আসছে? না তাও একেবারে নিশ্চিত করতে পারেনি কোন একজিট পোল। সবগুলো একজিট পোলের ফলাফলে দেখা গিয়েছে বিজেপি জোটে ২৩৩ আসনের নিচে থেকেছে এই পর্যন্ত। [এখানে দেখুন,] আবার ১৬ তারিখের পর আসল ফলাফলে কোন কারণে এটাও যদি না হয় তবে ১৯৯৬ সালের দেবগৌড়ের সরকারের মত আঞ্চলিক দলগুলোর জোট ক্ষমতায় আসতে পারে। সেক্ষেত্রে ভারতে এক দুর্বল সরকার মানে দুর্বল রাজনৈতিক কর্তৃত্ত্বের সরকার গঠিত হবে সন্দেহ নাই। এসব দিকে নজর রেখে আমেরিকার সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের অঞ্চলের ডেস্কের নিশা দেশাই সপ্তাহ তিনেক আগে বিজেপির মোদির সাথে বিস্তারিত আলাপ করতে এসেছিলেন। (যদিও সফরের প্রকাশ্য মূল এজেন্ডা ছিল ভারতের ট্রেড বিষয়ক বিরোধগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সাথে কথা বলা।) ঘটনা শেষ পর্যন্ত যাই দাঁড়াক, এবার আমেরিকার বাংলাদেশ নীতি যে ভারতের বাংলাদেশ নীতির উপর সুবিধা পাবে, পশ্চিমা স্বার্থের সাথে সমন্বয় করে হাজির হতে সুযোগ পাবে তা বলাই বাহুল্য। অন্ততপক্ষে আমেরিকা ও ভারত উভয়ের বাংলাদেশ নীতি নতুন ভারসাম্য পরিস্থিতি নতুন করে রচিত করার সুযোগ তৈরি হতে যাচ্ছে। কংগ্রেস সরকারের সাথে মুখোমুখি বিরোধে জড়িয়ে তা যতটা সংঘাতপুর্ণ বা অকেজো হয়ে আছে তা নতুন রাস্তা নিবে। কারণ ভারতের এই নির্বাচনের ফলাফলে যে কোন অ-কংগ্রেসী সরকার গঠিত হলে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কে গত তিন-চার বছরে যুক্ত হওয়া নতুন বাস্তবতা, নতুন করে হাজির হওয়া উপাদানগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে নতুন ভারসাম্যে রচিত হবে সন্দেহ নাই। উভয় রাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতির কমন ভিত্তি খুজে বের করা ও রচনা হবে। অন্তত কংগ্রেস সরকারের মত “যেকোনভাবেই হোক আমার হাসিনা সরকারকেই চাই” এই জবরদস্তিমূলক অবস্থানে আর থাকছে না। এটা অবস্থাদৃষ্টে পরিস্থিতি যেদিকে বিকশিত ও মোচড় নিচ্ছে সেদিকে তাকিয়ে এক অনুমান মাত্র। তবে একেবারেই হাওয়াই অনুমান নয়। এই অনুমানের পিছনের একটা বড় কারণ, মোদি এবং এবারের মোদির বিজেপির নীতি (তুলনায় ওল্ড হাগার্ড আদবানির বিজেপি নয়)।

মোদির বিজেপি কেমন নীতি ক্ষমতা নিয়ে হাজির হতে পারে
বিজেপি “সেকুলার” নয় অথবা মুসলমান-বিদ্বেষী এই অভিযোগ মোদি এই নির্বাচনে সিরিয়াস আমলে নিয়েছেন বলে মনে করার কারণ আছে। মোদি ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন “বল্লভ ভাই প্যাটেলের মত তিনিও সেকুলার”। [দেখুন,] প্যাটেল কে ছিলেন? স্বাধীন ভারতে ১৯৪৭ এর আগষ্টের পর নেহেরুর প্রথম সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন প্যাটেল। এই “প্যাটেলের সেকুলার” কথার অর্থ তাতপর্য কি তা নিয়ে আলাদা কোথাও বিস্তারে আলোচনা করতে হবে। আপাতত সংক্ষেপে – কংগ্রেস ও বিজেপি এবারের নির্বাচনে কমন যে ইস্যুতে বিতর্কে লিপ্ত তা হল, ভারতের অখন্ডতা। সব জনগোষ্ঠীকে এক ভারতে ধরে রাখা এই সুত্রে অখন্ডতা আলাপ। আর এক ‘সেকুলার ভারত” এটা ভারতকে অখন্ড রাখার জন্য নাকি গুরুত্বপুর্ণ উপাদান। এই হলো অখন্ডতার আলাপের মধ্যে সেকুলার শব্দটা ঢুকে পড়ার সম্পর্ক সুত্র। বুঝাই যাচ্ছে এসব কথাবার্তাগুলো আসলে সমস্যার মুল এড়িয়ে শব্দের ফুলঝরি বা রেঠরিক। যেভাবে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নতুন করে আরও ভাগ টুকরা করে নতুন নতুন রাজ্য গঠনের দাবী বেড়েই চলেছে (এক পশ্চিমবঙ্গকেই আরও দুই তরফে আরও নতুন দুই ভাগে ভাগ করার দাবী আছে) এই ফেনোমেনার মুল তাতপর্য হল, ক্ষুদ্র (উত্তরপুর্ব ভারত) অথবা বড় (দক্ষিণ ভারত) ধরনের জনগোষ্ঠিগুলোকে কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল করে রাখা। এককথায় বললে এগুলো কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রক্ষমতাকে অপ্রতিনিধিত্ত্ব করে রাখার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। প্রায়ই “বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন” নাম দিয়ে এগুলোকেই নেতিবাচক লক্ষণ বা ফেনোমেনা বলে এমন বয়ানে চিনানোর চেষ্টা হতে দেখি আমরা। এক ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কোথাও তৈরি আছে যার হদিস নাগাল করার জন্য পাবার জন্য এগুলো মূলত ক্ষমতায় উপযুক্ত অংশীদারিত্ত্ব না পাওয়া অথবা শ্রুত হবার জন্য বঞ্চিত জনগোষ্ঠির আর্তনাদ। নিজের উপর এই ফেটিস বা ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার দানবীয় শাসন এরা টের পায় কিন্তু সেক্ষমতাকে ধরতে পারে না, ভাগ পায় না। কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় সে অপ্রতিনিধিত্বশীল থেকে যায়। কিন্তু কথার মারপ্যাচে ক্ষমতায় অপ্রতিনিধিত্বশীলতার সব সমস্যাগুলোর সমাধান যেনবা সেকুলারিজম – এমন এক ইঙ্গিত দিয়ে সমস্যাকে ঝুলিয়ে বা ধামাচাপা দিয়ে রাখতে চায়। ফলে “সেকুলারিজম” বলে বয়ানের আড়ালে বাকচাতুরি রেঠরিকে কংগ্রেস-বিজেপির মিছা লড়াই চলতে থাকে। বিগত ত্রিশ বছরে ধরে একনাগাড়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত হয়ে আসছে কেবল আঞ্চলিক দলের সমর্থনে, কোয়ালিশনে। সাধারণভাবে কোয়ালিশন সরকার মানেই তা খারাপ লক্ষণ তা বলা হচ্ছে না। খেয়াল করতে হবে এটা বিজেপি বা কংগ্রেসের মত তথাকথিত সর্বভারতীয় দলগুলোর পরস্পরের কোয়ালিশন নয়। বরং বিজেপি বা কংগ্রেসের সাথে “আঞ্চলিক দলের” কোয়ালিশন। এটাই ভারতের অখন্ডতা সমস্যার মূল দিক, মৌলিক বিপদ। কংগ্রেস বা বিজেপি নিজেদের সর্বভারতীয় দল দাবী করে আসলেও তাই এর অন্তর্সারশুণ্যতা এখানেই। পুরা দক্ষিণ ভারতে আঞ্চলিক দলের প্রভাব একচেটিয়া, একনাগাড়ে এবং বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছরের। “আঞ্চলিক দল” এই ফেনোমেনোটার অর্থ তাতপর্য কি? এককথায় বললে, ভুতুড়ে কেন্দ্রীভুত ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। নেহেরুর ভারত রাষ্ট্র গঠনতান্ত্রিকভাবে ১৯৪৮ সালের শুরু থেকেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভুত ও কুক্ষিগত করে রাখতে হবে, একমাত্র তাহলেই অখন্ড ভারত রাখা যাবে, বিশাল ভারতকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে – এই নীতিতে রাষ্ট্র গঠন করে রাখা হয়েছে। অথচ নানান আঞ্চলিক দলের উত্থান ফেনোমেনো চোখে আঙুল দিয়ে বারবার বলছে ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার রাষ্ট্র নয় ফেডারল ধরনের রাষ্ট্রক্ষমতাই এর একমাত্র সমাধান। এই প্রসঙ্গ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার সুযোগ নিতে হবে কখনও। কিন্তু গুরুত্ত্বপুর্ণ যেটা – বাইরের পড়শি রাষ্ট্র, “সীমাপাড়-কী আতঙ্কবাদ” এগুলোই নাকি ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সমস্যা তৈরি করছে, এগুলো নাকি বাইরের তৈরি, মুসলমানদের তৈরি ফলে ‘সেকুলারিজম’ এর সমাধান এমন মুলা ঝুলিয়ে মূল সমস্যা ‘ক্ষমতায় অপ্রতিনিধিত্ত্বশীলতা” এদিকটাকে আড়াল করে রাখা হয়েছে, ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা তৈরির পথ চালু রাখা হয়েছে। আর এব্যাপারে কংগ্রেস ও বিজেপির মৌলিক মিল আছে, যদিও সমাধান প্রশ্নে অবস্থান ভিন্নতা আছে। যেমন, বিজেপি এপর্যন্ত ব্যাখ্যা করে এসেছে এর সমাধান “হিন্দু জাতিয়তাবাদের ভিত্তিতে ঐক্য” আর কংগ্রেস দাবী করেছে সেকুলারিজমের ঐক্য এই বয়ানের আড়ালে আর এক ব্রান্ডের হিন্দু জাতিয়তাবাদ। উভয় দলের মিলটা হল কেউই রাষ্ট্র গঠনের শুরু থেকেই ভারত রাষ্ট্রের ক্ষমতা গঠনের ভিতরেই যে সমস্যা সেদিকটা নিয়ে সরাসরি আলাপ তুলতে সাহস রাখে না। সমস্যাটা নাকি রাষ্ট্রের বাইরে থেকে আসছে এই দাবির ব্যাপারে উভয়ে একমত। এরা অস্বীকার করতে চায় সমস্যা রাষ্ট্রের বাইরে থেকে তৈরি করা, উস্কানি দিবার চেষ্টা থাকতেই পারে থাকবে কিন্তু এটা তখনই ইস্যু হবে, খচখচে কাঁটা হয়ে উঠবে যদি রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ ক্ষমতা গঠনে সমস্যা থাকে, ক্ষমতা অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল হয়ে থাকে। পঞ্চাশ রাজ্যের ফেডারল রাষ্ট্র আমেরিকার অখন্ডতাকে কি বাইরের শত্রু রাষ্ট্রের উস্কানি দিয়ে ভেঙ্গে দিবার মত শত্রু রাষ্ট্রের অভাব আছে, না কি কোন কালে ছিল? কিন্তু কখনই আমেরিকা তা অনুভব করে নাই কেন?
বড় ভুগোল, বড় জনসংখ্যা, ভিতরে অনেক ধরনের আভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠিগত বিভক্তি-চিহ্ন এবং বড় অর্থনীতি ইত্যাদি পরিস্থিতিতে ঐ দেশের জন্য একে এক রাষ্ট্রে সংগঠিত করতে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রক্ষমতা গাঠনিক দিক থেকে দেখলে এপর্যন্ত সারা দুনিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে ভাল রাষ্ট্র অভিজ্ঞতা হলো আমেরিকান রাষ্ট্র, ফেডারল ভিত্তির রাষ্ট্র। ফেডারল ধরণের রাষ্ট্র কথাটা বিস্তার করতে পারলে ভাল হত। প্রসঙ্গ অন্যদিকে চলে যাওয়া এড়াতে সংক্ষেপে কেবল বলব, একে বুঝবার জন্য আইন পরিষদ ( আমেরিকান প্রতিনিধি পরিষদ বা আমাদের সংসদ) থাকার পরও কোন আইন সংসদে পাশ হবার পর তা আবার সিনেটেও পাশ হতে হবে, কারা এই সিনেট গঠন করেছে এদিকটাসহ ফেডারল রাষ্ট্রে ক্ষমতা গঠন নীতির দিকে নজর দেয়া যেতে পারে। অনেকে তর্ক তুলতে পারেন ভারতে সিনেট নামে না থাকলেও রাজ্যসভা নামে তো কিছু আছে। এর জবাব হল, ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্র ভুমিকা ২৭২ জন লোকসভার (সংসদ) সদস্যদের মধ্যে। কিন্তু ফেডারল আমেরিকা রাষ্ট্রের ক্ষমতা কেবল আইনসভা (প্রতিনিধি পরিষদ) কেন্দ্রিক কোন একটা ক্ষমতা-কেন্দ্র নাই, ফলে সেখানে কেন্দ্রীভুতও নয়। তাই ভারত রাষ্ট্রের ক্ষমতাগঠন প্রক্রিয়া ও কাঠামো এক ভুতুড়ে অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল কেন্দ্রীয় ক্ষমতাই তৈরি করবে সবসময়, এপর্যন্ত করে এসেছে। ফলে একই মাত্রায় তা বিরোধ সংঘাতে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে পড়ার বিপদ মাথায় নিয়ে ঘুরবে। এর আদি পাপ ১৯৪৭ সালে অখন্ড ভারত গঠন কাঠামোর মধ্যে যেখানে মুল যে বিষয়ে জোর দেয়া হয়ে হয়েছিল তা হলো নির্ভেজাল একছত্র “বলপ্রয়োগ”। আমাদের অনুমান থাকতে পারে যে বৃটিশ ভারত বোধহয় অখন্ড কিছু একটা ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালে যখন বৃটিশরা ছেড়ে যায় তখনও ছোটবড় মিলিয়ে অন্তত ৫০০ রাজার রাজ্যকে ইন্টিগ্রেট করে অখন্ড ভারত খাড়া করার বিপদ নেহেরুকে মোকাবিলা করতে হয়। এর মুল নীতি ছিল বলপ্রয়োগ; স্ব-ইচ্ছার ইউনিয়নও নয়, ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ত্বশীলতার প্রশ্ন সেখানে নির্ধারক নয়। নেহেরুর প্রধানমন্ত্রীত্ত্বে গুজরাটি বল্লভ ভাই প্যাটেল ছিলেন ওই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অর্থাৎ বলপ্রয়োগ ঘটাবার কাজটা তাকেই করতে হয়েছিল। একটা উদাহরণ দেই। যেমন, এখনকার অন্ধ্রপ্রদেশ যা হায়দ্রাবাদকে রাজধানী করে পুনগঠিত হয় ১৯৪৭ সালের পরে। কিন্তু কেবল ঐ হায়দ্রাবাদ আসলে ছিল এক রাজার রাজ্য। এই রাজ্যের নিজাম (রাজা) বৃটিশ করদ দেয়া শর্তে স্বাধীন রাজার রাজ্য ছিল। হায়দ্রাবাদকে অন্তর্ভুক্ত করে অখন্ড ভারত বানাতে গিয়ে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে যেতে হয়েছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাটেলকে। বলপ্রয়োগ আর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এই ছিল তর্কের বিষয় – এনিয়ে মন্ত্রীসভার বৈঠকে প্যাটেলকে ‘কমিউনিষ্ট’ বলে গালি দিয়েছিলেন নেহেরু। এতকিছু শব্দ থাকতে ‘কমিউনিষ্ট’ কেন? নেহেরুকে যেখানে ‘প্রগতিশীলেরা’ কমিউনিষ্ট না হলেও সমাজতন্ত্রী বলেই চিত্রিত করতে পছন্দ করে দেখা যায়!

এর সংক্ষিপ্ত জবাব ১৯১৭ সালে রাশিয়ান বিপ্লবের পর রাষ্ট্র গঠনে লেনিনকে নানান জাতিগোষ্ঠিকে (যেগুলো আসলে ছিল রাশিয়া ও এর পড়শি জার সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা নানাঞ্জনগোষ্ঠি) ঐ রাষ্ট্রে ইন্ট্রিগ্রেশেন যা মুলত ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যা তা মোকাবিলা করতে হয়েছিল। নেহেরুর মন্ত্রী প্যাটেলের মতই লেনিনের মন্ত্রী (রুশ ভাষায় commiserate বা মন্ত্রণালয়ের কমিসার বলা হত) ছিলেন জর্জিয়ান জোসেফ ষ্টালিন। ষ্টালিনীয় নির্মম বলপ্রয়োগ তা ঘটানো হয়েছিল। [যদিও লেনিনের নীতিগত অবস্থান ছিল, জনগোষ্টিগত উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রতিরোধ সংগ্রাম, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই সমর্থন করতে হবে। কিন্তু এটা নীতিগত। ষ্টালিনের হাতে বাস্তবে প্রয়োগে এটা যা দাড়িয়েছিল এর সাথে লেনিনের নীতির আর কোন সামঞ্জস্য খুজে পাওয়া যায় নাই। বিপ্লব ঘটেছিল কেবল রাশিয়ায়। কিন্তু একছত্র ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে দানবীয় করতে রাশিয়ার তথাকথিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পড়শি পর পড়শি রাষ্ট্র বা অঞ্চল জোড়া দিতে দিতে সীমান্ত বাড়িয়ে সেই রাশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন নাম ধারণ করে। এই পড়শি জোড়া দেয়া ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত চলেছিল, একই সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে তবে সাইজ সীমান্ত বাড়িয়ে, থামে নাই। সোভিয়েত রাষ্ট্র ১৯৮৯ সালে ভেঙ্গে ছত্রাখান হয়ে পড়ার পর এবার এতদিন জোর করে দাবিয়ে রাখা জাতিগত প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যা ফেটে প্রকাশিত হয়তে শুরু করে। উলটা পথ, আবার ম্যাপ সীমান্ত আঁকা। ষ্টালিনের শখের সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আবার তা ছোট্ট রাশিয়া হয়ে যায়। আলাদা দুই রাষ্ট্র হয়ে ষ্টালিনের জর্জিয়া লেনিনের রাশিয়ার সাথে এখন সীমান্ত যুদ্ধে লিপ্ত। কসোভো, বসনিয়া এবং এমনকি হাল আমলের ইউক্রেন বা ক্রিমিয়া এভাবে প্রতিটা সমস্যার আদি গোড়া একটাই -ভুতুড়ে রাষ্ট্রে “বলপ্রয়োগে ইন্ট্রিগেশন” -জবরদস্তি। আমেরিকা ফেডারেল রাষ্ট্রের জন্ম ১৭৭৬ সালে। কিন্তু কেউই রাষ্ট্রগঠন ইতিহাসের এই গুরুত্বপুর্ণ অভিজ্ঞতাকে আমল করে নাই; না সোভিয়েত ইউনিয়ন না ভারত।] সেই সুত্রে প্যাটেলকে ‘কমিউনিষ্ট’ বলে গালি দিয়েছিলেন নেহেরু। এবারের নির্বাচনে কংগ্রেসের সেকুলারিজমের বিপরীতে বিজেপির মোদির নির্বাচনী কালার ‘প্যাটেলের সেকুলারিজম’ কথার অর্থ তাতপর্য এখন থেকে পাওয়া যেতে পারে। আকার ইঙ্গিত রেঠরিক বাকচাতুরি যে যতই করুক মুল কথা ইন্টিগ্রেটেড ইন্ডিয়া বা অখন্ড ভারত ধরে রাখা। কিন্তু কি ভিত্তিতে সেটাই মূল প্রশ্ন। অথচ এটাই ভারত রাষ্ট্রের মাথার উপর সবসময় টিকটিক করা বিখন্ড হয়ে পড়ার বিপদ – এটাই নানান ইঙ্গিতে নানান ছলে ইস্যু হিসাবে এই নির্বাচনে হাজির – বিজেপি ও কংগ্রেস রেঠরিক নানা কথার টোপড়ের আড়ালে এর স্বীকৃতি দিচ্ছে।

কিন্তু এবারের নির্বাচনের আর একটা দিক, ভারতের মুসলমান ভোটাররা আর একটা ফ্যাক্টর হয়ে হাজির, এই অর্থে যে মুসলমানেরা আর ‘সেকুলার ভারত’ এমন কথার লোভে কংগ্রেস বা কমিউনিষ্টদের কনষ্টিটুয়েন্সি হয়ে থাকতে চাইছে না; এটা পরিস্কার। মোদি ও তার দল ইতোমধ্যে পাবলিক মিটিংয়ে মুসলমানদের কাছে শুধু মাফ চান নাই, শুধু একবারের মত সুযোগ যেন তারা দেয় এই আকুতি জানিয়েছেন। [“apologize to you by bowing our heads” দেখুন,]। পশ্চিমবঙ্গের মমতার মুসলিম কনষ্টিটুয়েন্সী হাসিল করার প্রচেষ্টাও প্রায় একই রকম।

মোদির নীতি ক্ষমতার সম্ভাব্য ফোকাস
মোদি বা বিজেপি প্রসঙ্গে দ্বিতীয় যে দিকটা নিয়ে কথা বলব সেটা আলোচনার সুত্রে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। গুজরাটের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, একনাগাড়ে পরপর তিন টার্মের মুখ্যমন্ত্রী তিনি। সারা ভারতে মূলত ব্যবসায়ে অগ্রসর জনগোষ্ঠি হিসাবে গুজরাতিদের একটা একক পরিচয় আছে। মোদি টাইটেলটাও এর সূচক। যদিও গত কয়েক বছরে তার পরিচয় ছাপিয়ে উঠেছে দাঙ্গায় মুসলমান হত্যার নেতা-লোক হিসাবে। কিন্তু একইসাথে তার গুজরাট মানে রাইজিং ইকোনমির গুজরাট। আর একাজে সে সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে জাপান থেকে। তাঁর খাতির, সম্পর্ক বেশির ভাগটাই জাপানের পলিটিক্যাল ও বিজনেস এলিটদের সাথে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে সে সরাসরি দাওয়াত দিয়ে গুজরাটে এনে সম্বর্ধনা দিয়েছে। এদিক থেকে যদি দেখি তবে গ্লোবাল পরিসরে তার রাজনীতিবোধটাকে বলা যায়, মুলত বিজনেস ওরিয়েন্টেড পলিটিক্স। শুধু জাপান নয়, একই সাথে চিন, জার্মান, ফ্রান্স, আমেরিকার সাথে মোদির গভীর সম্পর্কের দিকটা বুঝার জন্য এই আর্টিকেলটা মনোযোগ দেয়া যেতে পারে। আবার, আসামের নির্বাচনী বক্তৃতায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আর চীন সীমান্তে অরুণাচলের নির্বাচনী বক্তৃতায় চীন প্রসঙ্গে তিনি কথা বলেছেন যা যুদ্ধবাজ বাজপাখী অথবা সাম্প্রদায়িক মনে হলেও তা রেঠরিক হিসাবে দেখার সুযোগ আছে। কারণ তিনি কিছুই না বললে সমালোচকরা সেটা নিয়েই কথা যাতে না তুলতে পারে তারই ব্যবস্থা হিসাবে দেখার সুযোগ আছে। [দেখুন,]
আবার আমেরিকার বিদেশনীতি বিষয়ক গুরুত্বপুর্ণ জার্ণাল foreignpolicy তে এক বিশেষ নিবন্ধে [দেখুন Decoding Modi’s Foreign Policy] দেখা যাচ্ছে মোদির নীতির ফোকাসের ব্যাপারটা তাদেরও নজরে এসেছে। বলছে, Despite his roots in a nationalistic, right wing BJP, the highlight of Modi’s foreign policy will likely be economics, and not security. While taking a rhetorical hard line on India’s national interests suits his political ideology, Modi appears to understand that as prime minister he will need to prioritize boosting trade and fixing India’s economy. নিজের দায়িত্বে বাংলায় বললেঃ “এক ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী বিজেপির ভিতর মোদির শিকড় পোতা থাকলেও তাঁর বিদেশনীতির বৈশিষ্ট হবে খুব সম্ভবত নিরাপত্তা নয়, অর্থনীতি। ভারতের জাতীয় স্বার্থ বিষয়ক ইস্যুগুলোতে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে খাপখায় এমন হার্ডলাইনের রেঠরিক ঠাটবাট বাকচাতুরি তার আছে। কিন্তু মোদি বুঝে একজন প্রধানমন্ত্রী হতে গেলে তাকে তাঁর কোন চাহিদাটা প্রধান করতে হবে আর সে প্রাধান্যের বিষয়টা হল, বাণিজ্যকে চাঙ্গা করা, ভারতের অর্থনীতিতে বাধা ও সমস্যাগুলোকে সমাধান করা”।
এখানেই বর্তমান কংগ্রেস সরকারের অনুসৃত বিদেশনীতির থেকে বিজেপির মোদির বড় নীতিগত পার্থক্য। যদিও মোদির সম্ভাব্য ভারতের জন্য কঠিন কাজটা রয়ে গেছে। সেটা হল, ভারতের সাথে আমেরিকা ও চীনের সম্পর্ককে নিজের স্বার্থের দিক আমলে রেখে একটা ফাইন ব্যালেন্সের উপর দাঁড় করানো। এটা ঠিক আমেরিকা ও চীন এদের একের বিরুদ্ধে অন্যটাকে ব্যবহারও নয়, আবার কোনটাকে বাদ দিয়ে নয়। কংগ্রেসের ভারত যেটা করতে শোচণীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। [অবশ্য আমেরিকার উস্কানি লোভ দেখানিও ছিল।] এটাই এই অঞ্চলের আমাদের সবার জন্য সঠিক এক পদক্ষেপ হবে।
সংক্ষেপে একটা কথা বলে রাখি। বিজেপির পুরানা রাজনৈতিক লাইন – মুসলমান বিদ্বেষ কেন্দ্রিক হিন্দু জাতিয়তাবাদ – এর প্রতীকী নেতা হয়ে থেকে আছেন আদবানি, সাথে আছেন সুষমা স্বরাজ প্রমুখ। নরেন্দ্র মোদির ব্যবসা বা অর্থনীতি ফোকাসের লাইন এটাই আন্ত-পার্টি সংগ্রাম হিসাবে আদবানিকে পরাজিত করে ‘বিজেপি জিতলে মোদি প্রধানমন্ত্রী হবেন’ হিসাবে হাজির হয়েছে। এটা কেবল ফোকাস বা প্রাইয়োরিটি সরিয়ে আনা। এতটুকুওই বদল। তবু এই বদলটাই তাতপর্যপুর্ণ। বিশেষত বাংলাদেশের দিক থেকে। কারণ এটা কংগ্রেসের মত তথাকথিত নিরাপত্তা বিষয়ক যুদ্ধবাজ লাইনে ফোকাস নয়। তবে কোন কারণে মোদি সরকার গঠন পর্যন্ত পৌছাতে না পারলে বর্তমানে কোনঠাসা আদবানিরা পুরানা ফোকাসের বিজেপি আবার জেগে উঠবে বলে মনে হয়।


সবমিলিয়ে শেষ কথাটা হলো, ব্যবসায়ী মোদির সরকার যদি গঠন হতে সুযোগ পায় তবে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতা সখ্যতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীতা সম্পর্কের নতুন অধ্যায় বা তৃতীয় পর্যায় শুরু হবার সম্ভাবনা দেখা যায়। বর্তমান কংগ্রেস সরকারের বিদেশনীতির ফোকাসটা হলো, সিকুইরিটি মানে তথাকথিত নিরাপত্তা। এককথায় বললে, এটা আসলে “মুই কি হনু রে” ধরনের পথে আশেপাশের সবাইকে দাবড়ে বেরিয়ে নিজের প্রিভিলেজ সুবিধাটা নিশ্চিত ও হাসিল করতে চাওয়া। বিপরীতে তুলনা করে বললে, মোদির লক্ষ্য ব্যবসা ও অর্থনীতিতে এক রাইজিং ইন্ডিয়া হাজির করা আর সেকাজে দলের পুরান ইমেজ পরিচয় মুসলমান বিদ্বেষী এক বিজেপি এই পরিচয়কে ফিকে করে ফেলা। একমাত্র একাজ করেই সে ভোটারদের মনে এই নতুন বিজেপির পরিচয়কে স্থায়ীত্ব দিতে চায়। পুরানো পরিচয়গুলোকে যেন ছাপিয়ে উঠে রাইজিং ইন্ডিয়ার মোদি ও বিজেপি। এমন এক ইঙ্গিত মোদি হাজির রেখে চলেছেন। সেটা শেষ পর্যন্ত কোথায় কি হয় সেটা অবশ্যই হতে দেখবার বিষয়, আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। যদি তাঁর ইঙ্গিত সত্যি ও অর্থপুর্ণ হয়, সে প্রেক্ষিত মাথায় রেখেই বলেছি সেক্ষেত্রে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতা সখ্যতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীতা সম্পর্কের নতুন অধ্যায় বা তৃতীয় পর্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। তবে আমাদের জন্য মূল কথা হল, ঘটনা যেদিকেই যাক, বটম লাইন হল, সরকার বদলের সাথে বর্তমান ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে বদল আসছেই। তাতে অন্তত বাংলাদেশে ফ্যাসিজমের ভিত আলগা হচ্ছে। বাইরের গুরুত্বপুর্ণ সমর্থন নাই হয়ে যাচ্ছে, এব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই। “আমার হাসিনা সরকারই চাই” আগামি ভারত সরকারের এমন অবস্থান আর থাকছে না।

পরবর্তি কিস্তির লেখাগুলোঃ
প্রথম কিস্তি
দ্বিতীয় কিস্তি
তৃতীয় কিস্তি

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s