অন্যের বাড়িঘর দেশ দখল করে তাদেরই হত্যা করার ‘সেলফ ডিফেন্স’

অন্যের বাড়িঘর দেশ দখল করে তাদেরই হত্যা করার ‘সেলফ ডিফেন্স’

গৌতম দাস

http://wp.me/p1sCvy-7N

১৯ জুলাই ২০১৪।
জায়নিস্ট ইসরায়েলের হাতে গাজায় ফিলিস্তিনিদের হত্যার উৎসব চলছে। আর এ হত্যাযজ্ঞের পক্ষে ছদ্ম-ন্যায্যতার ইসরায়েলি বয়ান হল, ইসরায়েল নাকি নিজের ‘সেলফ ডিফেন্সের’ জন্য এটা করছে, সুতরাং এটা জায়েজ। ইসরায়েল রাষ্ট্রের সঙ্গে গলা মিলিয়ে আমেরিকা, ব্রিটেন ইত্যাদির বয়ান হল, তারা ইসরায়েলের সেলফ ডিফেন্সের অধিকার সমর্থন করে। পশ্চিম র‍্যাশানাল, বুদ্ধির যুক্তি ছাড়া তারা কথা বলে না। তো তাদের সেলফ ডিফেন্সের শঠতা চাপাবাজি যদি মেনে নিই, তো তাহলে ফিলিস্তিনিদেরও সেলফ ডিফেন্সের অধিকার থাকার কথা। শুধু তা-ই না, অন্তত জায়নিস্টদের চেয়ে তা দ্বিগুণ বেশি হওয়ার কথা। কারণ ইসরায়েল এমন এক রাষ্ট্র, যে অন্যের বাড়িঘর খোদ রাষ্ট্রের ওপর দখলদার। এছাড়া এর রাষ্ট্রীয় সীমানা প্রতিদিন বাড়ে, এমন অদ্ভুত এক রাষ্ট্র। ফলে প্রথমত. ফিলিস্তিনিদের নিজের রাষ্ট্রভূমি রক্ষার জন্য সেলফ ডিফেন্স প্রতিরোধ সব আন্তর্জাতিক আইনে বৈধ ও স্বীকৃত। দ্বিতীয়ত. নিজের জান ও মাল রক্ষা, আত্মরক্ষার জন্য সেলফ ডিফেন্সে পাথর ছুড়ে মারা, গুলতি মারা, হাতে তৈরি রকেটসহ আরও কিছু সবই বৈধ ও স্বীকৃত। কিন্তু তা পশ্চিমা শঠতা হল এব্যাপারে তারা নিশ্চুপ।

রুজভেল্ট ও চার্চিলের আটলান্টিক চার্টার ১৯৪১
পরপর চারবারের (১৯৩৩-৪৫) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে নাকে খত দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেয়া দলিল হল, আটলান্টিক চার্টার ১৯৪১। না আমি এতটুকুও বাড়িয়ে বলছি না, এটা আসলেই নাকে খত দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেয়া দলিল। এর প্রমাণ হল, ‘হিজ ম্যাজেস্টির’ ব্রিটেন মানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তখনো সবচেয়ে বড় রুস্তম কলোনি মাস্টার, আমরাও তখন ব্রিটিশ-ভারত কলোনির অধীন। অথচ ওই আটলান্টিক চার্টারে চার্চিল স্বীকার করে সই করছেন, যা বলে ওর সারকথা হলো কলোনি দখল করা যাবে না, কলোনি দখল অন্যায়। যেমন— ঐ চার্টার ছিল মূলত আমেরিকা ও ব্রিটেনের এক যৌথ ঘোষণা। ওখানে আটটা দফা আছে, যার প্রায় সবই দুনিয়ায় কলোনি দখল ও শাসন আর না চালানো সংক্রান্ত, যদিও কলোনি শব্দ উচ্চারণ না করে তা লেখা হয়েছে। প্রথম দফা বলছে “দুই রাষ্ট্র নিজ ভূখণ্ড বড় করতে কামনা করে না (seek no aggrandizement, territorial or other)”। দ্বিতীয় দফা বলছে, “তারা অন্যের ভূখণ্ড নিয়ে নিজ ভূখণ্ড বড় করার খায়েস রাখে না যদি সে ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের স্বাধীনভাবে প্রকাশিত হওয়ার ইচ্ছা না থাকে”। তৃতীয় দফা বলছে, “কোন ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের নিজ পছন্দের সরকার বেছে নেয়ার অধিকারকে তারা সম্মান করে। তাদের সার্বভৌম নিজ সরকার যা জোর করে অন্যে উত্খাত করেছে, সেটা পুনঃস্থাপন করা হয়েছে দেখতে চাওয়া— ওই জনগোষ্ঠীর ‘অধিকার’ এবং আমাদের তা সম্মান জানাতে হবে”। অতএব দেখা যাচ্ছে, দুনিয়ার সবচেয়ে বড় রুস্তম কলোনি মাস্টারকে দিয়ে এসব স্বীকার করিয়ে নেয়া নাকে খত দেয়া ছাড়া আর কি! আগ্রহীরা পুরা আটলান্টিক চার্টার ১৯৪১ দেখে নিতে পারেন এখানে। বাঘ ঘাস খায় না। তবে কখনও কখনও বাধ্য হয়ে খায়। কখন ও কেন ঘাস খায় তা কি পরিস্থিতিতে তৈরি হয়েছিল, রুজভেল্টের স্বপ্নের আগামী দুনিয়াটা কি ছিল, তা নিয়ে অন্য কোথাও আলোচনা করব। আপাতত দু-একটা বাক্য খরচ করব কেবল। ১৯৩৯ সালে অর্থাৎ আটলান্টা চুক্তির দেড়-দুই বছর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছিল। হিটলারের জার্মানি ফ্রান্স দখল শেষ করে ফেলেছে। আর ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে দাঁড়িয়ে এবার ব্রিটেন দখলের বুদ্ধি আঁটছিল। তাই চার্চিল এসেছিলেন রুজভেল্টের কাছে ভিক্ষা মাঙতে যেন তিনি পক্ষ নেন, পাশে দাঁড়ান। ফলে ব্রিটিশ এম্পায়ারের বিস্তর কলোনি যায় যাক, খোদ নিজ ভূখণ্ডটা যদি রক্ষা করা যায়, চার্চিলের কাছে সেই মামলা ছিল ওটা। আর রুজভেল্টের দিক থেকে দেখলে, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর আগামী দুনিয়াটা দেখতে কেমন হবে দেখা সে স্বপ্নের প্রথম দলিল ছিল আটলান্টা চার্টার। কলোনি সম্পর্কের দুনিয়া রুজভেল্টের চোখে হারাম ছিল। তিনি চেয়েছিলেন এক গ্লোবাল ক্যালিটালিজম, ওয়াল ষ্ট্রিটের চোখে দেখা সে স্বপ্নে দুনিয়াটা ছিল পুঁজি বিনিয়োগের বাজার আর বাজার। নিজের সেই স্বপ্নে সায় দেয়ার বিনিময়ের শর্তেই কেবল রুজভেল্টে ইউরোপকে উদ্ধারে রাজি হতে চেয়েছিলেন। তাই ওটা ইউরোপের কলোনি মাস্টারদের দাসখতের দলিল। পরের বছর ১৯৪২ সালের পয়লা জানুয়ারী তারিখে এই “আটলান্টিক চার্টারকেই ভিত্তি” মেনে জাতিসংঘ গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। এই জাতিসংঘের কাজ কী হবে, সেসবের বিস্তারিত যা জাতিসংঘ চার্টার নামে খ্যাত সেসব লিখে, গৃহীত হয়ে জাতিসংঘ পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় ১৯৪৫ সালে। সেলফ ডিফেন্স, রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব, আত্ম-নিয়ন্ত্রণাধিকার কথাগুলোর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়ার প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে জাতিসংঘ। কাজেই ইসরায়েল নিজের সেলফ ডিফেন্সের জন্য গাজায় রক্তের নদী বইয়ে দেয়া জায়েজ বলে দাবি পশ্চিমের র‍্যাশানাল মনের বুদ্ধির যুক্তিতেই নাজায়েজ এবং একশ ভাগ মিথ্যা; ভণ্ডামি হিপক্রাসি।

যেভাবে জায়নিস্ট ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের ভূমিতে জবরদখল নিল
ফিলিস্তিনিদের দুঃখের শুরু শুধু না, তাদের ফোরফ্রন্টে রেখে সারা দুনিয়াকে বে-ইনসাফ, অনাচার অত্যাচার হত্যা নিপীড়নের দুনিয়া বানানোর কারবারের শুরু বলা যেতে পারে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন থেকে। কলোনি লোভি ব্রিটিশের বাসনা ছিল যে, ভূমধ্যসাগর দিয়ে মিসর ফিলিস্তিন হয়ে আগেই দখল হয়ে থাকা ব্রিটিশ-ভারত পর্যন্ত ভূখণ্ডগতভাবে পুরাটাই নিজের কলোনি বিস্তার ছড়ানো। ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের খলিফা ব্রিটিশ ও ফরাসি আক্রমণের মুখে সারা দুনিয়ার প্রতি যে আহ্বান (যেখান থেকে খেলাফত আন্দোলনের সূচনা) রেখেছিলেন, তা আংশিক হলেও আজ সত্যি হয়েছে। মিসর, ফিলিস্তিনসহ সারা মধ্যপ্রাচ্য ১৯১৮ সালের আগে ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন। সাম্রাজ্য রক্ষার প্রতিযোগিতায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিল তার প্রধান প্রতিযোগী ও শত্রু। ওদিকে লেট কামার উদীয়মান জার্মান ছিল তাই তার টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে ইউরোপীয় পার্টনার। সেই সূত্রে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (আগস্ট ১৯১৪-নভেম্বর ১৯১৮) পক্ষ-বিপক্ষ ভাগের দিক থেকে তুরস্ক ছিল জার্মানির পক্ষে আর ব্রিটিশ ও ফরাসিদের বিপক্ষে। সে যুদ্ধে জার্মানির সঙ্গে অটোমান তুরস্কেরও পতন হয়। যুদ্ধ শেষে অটোমান এম্পায়ার এলাকাগুলো ভাগ করে নেয় ব্রিটিশ ও ফরাসিরা। এই হলো মোটাদাগে ইতিহাসের ঘটনা। ব্রিটিশ ও ফরাসি দুই কূটনীতিকের (Sir Mark Szkes এবং Georges Picot) স্বাক্ষরিত ভাগবাটোয়ার গোপন চুক্তি হয়েছিল, যার নাম Szkes-Picot Agreement of 1916 অর্থাৎ চলমান যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে ১৯১৬ সালে এই চুক্তি হয়েছিল। এ চুক্তি অনুসারে একদিকে বাগদাদকে রাজধানী করে উত্তরে মসুল আর দক্ষিণে বসরা এ তিন অঞ্চলকে নিয়ে নতুন রাষ্ট্র ইরাকের জন্ম দেয় ব্রিটিশরা, সঙ্গে ভূমধ্যসাগরের তীরের মিসর ও ফিলিস্তিনকে নিজের ভাগে নেয়। অন্যদিকে এ দুয়ের মাঝখানে লেভান্ট অংশ দেয়া হয় ফরাসিদের। Levant ইতালি-ফরাসি উৎসের এ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ইংরেজিতে রাইজিং অর্থাৎ উদিত হওয়া, মানে যেখানে সূর্য সবার আগে ওঠে, সেই অঞ্চল, এই অর্থে। একসময় ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীরের গ্রিস থেকে মিসর পর্যন্ত সব দেশকেই এক শব্দে লেভান্ট অঞ্চল বলা হত। ভুমধ্যসাগরের পুর্ব তীরের দেশগুলোতে আগে সুর্য উঠে বলে এই নামের উতপত্তি। কালক্রমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর তার শাসিত সিরিয়া, লেবানন এবং আজকের ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল উভয়ের কিছু অংশ, যা ফরাসিদের দিয়ে দেয়া হয়, ফরাসিরা একত্র এই ভূখণ্ডকে লেভেন্ট অঞ্চল নামে ডাকত। [নেপথ্যে বলে রাখি চলমান ইরাকে খলিফা রাষ্ট্র ঘোষণার সময়ে ISIL শব্দের অর্থ ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড লেভেন্ট। অর্থাৎ যারা ব্রিটিশ-ফরাসিদের ইরাক ও লেভেন্ট বলে কলোনি ভাগবাটোয়ারা মানেনা। এই হল লেভান্ট নামের তাতপর্য।] তবে অটোমান সাম্রাজ্য অঞ্চলকে ব্রিটিশ-ফরাসিরা ভাগ করে নিলেও এর আইনি কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতায় একটা রাখঢাক ছিল। বলা হয়, ‘লীগ অব নেশান’-এর কাছ থেকে ব্রিটিশ-ফরাসিরা এ অঞ্চলগুলোয় ‘ম্যান্ডেট’ হিসেবে শাসন অধিকার পেয়েছিল। [লীগ অব নেশন হলো জাতিসংঘের আগের রূপ ও ভার্সন। গঠিত হয় ১৯২০ সালে, কিন্তু শুরুর দশ বছরের মধ্যে কার্যত অকেজো হয়ে পড়ে, ওর সদস্যদের একে অন্যকে কলোনি দখল করে নেয়ার বিরুদ্ধে বাকি সকলে ন্যূনপক্ষে নিন্দা করতে না পারার কারণে। এরপর তা অকার্যকর পড়েছিল ১৯৪১ সালে আটলান্টা চুক্তি স্বাক্ষরের আগ পর্যন্ত। এরপর লিগ অব নেশনের পুনর্জীবন ঘটে নতুন নামে নতুন চুক্তিতে। ১৯৪২ সালের এক ঘোষণায় এর নাম হয় জাতিসংঘ।] অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের তিনশ বছরে ব্রিটিশ ও ফরাসি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন কলোনি দখল করে কেটেছে অথচ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পর এবার যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ আদায়ের উছিলার যুক্তিতে জার্মানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করে আর অটোমান সাম্রাজ্যকে ভাগ করে নেয়। ওই ক্ষতিপূরণ আদায় এবং অটোমান সাম্রাজ্যের নতুন ভাগবন্দোবস্ত দেয়ার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯২০ সালে লিগ অব নেশন গঠিত হয়েছিল। ম্যান্ডেট কথার কাগজপত্রের কনসেপ্টটা হলো, অটোমান সাম্রাজ্যের রাজ্যগুলো লীগ অব নেশানের ‘ট্রাস্টি পরিষদ’ নামের এক বিভাগের হাতে হাওলা করা হলো। এরপর ট্রাস্টি পরিষদ ওর নতুন বিলি বন্দোবস্ত দিল ব্রিটিশ ও ফরাসিদের। এ নতুন বিলিবন্দোবস্তের আইনি নাম ‘ম্যান্ডেট’। লীগ অব নেশন গঠনের আর্টিকেল ২২, এটা ম্যান্ডেট সংক্রান্ত আর্টিকেল।

ম্যান্ডেটঃ লীগ অব নেশন গঠনের আর্টিকেল ২২
আর্টিকেল ২২ বলছে, ‘গত যুদ্ধের ফলে যেসব কলোনি ও ভূখণ্ড, যেগুলো আগের রাষ্ট্রের সর্বভৌমত্বের শাসন অধীনে আর নেই, যেগুলোয় বসবাসকারী বাসিন্দারা শক্তি দেখানোর আধুনিক বিশ্বে (strenuous conditions of the modern world) নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে চলার উপযুক্ত হয়নি, এগুলোয় এ মূলনীতি প্রয়োগ করা হবে যে, এসব জনগণের ভালোমন্দ ও বিকাশ দেখাশোনার জন্য এক সভ্যতার বিশ্বস্ততা ট্রাস্ট (sacred trust of civilisation) গঠন করা হবে এবং তাদের নিরাপত্তা বিষয়টা এ ট্রাস্টের ওপর ন্যস্ত হবে আর ট্রাস্ট পরিষদ গঠন বিষয়টা লীগ অব নেশন উদ্যোগ চুক্তির অংশ গণ্য হবে”।
“এই মূলনীতিকে বাস্তবায়নের সবচেয়ে ভালো উপায় হবে, এসব জনগণকে কোনো অগ্রসর জাতির অভিভাবকত্বে (tutelage) হাওলা করে দেয়া, যারা তাদের সম্পদ, অভিজ্ঞতা অথবা তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ দায়িত্ব পালনে সমর্থ হবে, যারা নিজ ইচ্ছায় এই দায়িত্ব নিতে ইচ্ছুক এবং লিগ অব নেশনের তরফ থেকে এ অভিভাবকত্ব ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হিসেবে দেয়া হবে ও তারা চর্চা করবে”।
“ম্যান্ডেট দায়িত্বপ্রাপ্তরা ট্রাস্টি কাউন্সিলের কাছে অর্পিত দায়িত্ব বিষয়ে এক বার্ষিক রিপোর্ট পেশ করবে। ম্যান্ডেট দায়িত্বপ্রাপ্তদের কর্তৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ অথবা প্রশাসন ক্ষমতা কীভাবে চর্চা করবে, তা এককভাবে ট্রাস্টি কাউন্সিল নির্ধারণ করে দেবে, যদি না এ বিষয়ে লিগের সদস্যদের দ্বারা আগে থেকেই একমতের কোনো সিদ্ধান্ত থাকে।
একটা স্থায়ী কমিশন গঠন করা হবে, যারা ম্যান্ডেট দায়িত্বপ্রাপ্তদের দেয়া বার্ষিক রিপোর্ট গ্রহণ ও নিরীক্ষা করবে এবং তাদের পর্যবেক্ষণের সব বিষয়ে ট্রাস্টি কাউন্সিলের কাছে পরামর্শ রাখবে”।
আগ্রহিরা মূল কপির বিস্তারিত এখানে পাবেন, এখানে সবচেয়ে বড় তামাশাটা হলো, পশ্চিমা ‘সভ্যতা’ কলোনি দখলটাকে নিজ সভ্যতার গৌরব বলে চালিয়ে দেয়া হলো। আবার নিজেই স্বীকার করছে, যে দুনিয়াটাকে তারা “শক্তি দেখানোর আধুনিক বিশ্ব” বানিয়েছে। মানে কলোনি মাস্টারের মাসল দেখানোর ঠেলায় অন্যের নিজ ভূখণ্ড, রাষ্ট্র ও জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার কাজটা তারাই অসম্ভব করে রেখেছে। এছাড়া স্টাডির বিষয় হলো, কথার চাতুরিতে কীভাবে ম্যান্ডেটের নামে আবার কলোনি দখলকে ন্যায্যতা দেয়া হয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় নভেম্বর ১৯১৮। কিন্তু এর অন্তত এক বছর আগে অর্থাৎ অটোমান সাম্রাজ্য তখনো বহাল, এ অবস্থায় ইসরায়েলি রাষ্ট্র গঠনের ভ্রূণ তৈরি করে রাখা হয়েছিল। দলিলের নাম বেলফোর ঘোষণা (Balfour Declaration 1917), বেলফোর (Arthur James Balfour) ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের তত্কালীন পররাষ্ট্র সচিব। তিনি একটা চিঠি লিখেছিলেন Walter Rothschildকে। ওয়াল্টার হচ্ছেন জার্মান ইহুদি বাবা লর্ড নাথন রথসচাইল্ডের (জার্মান উচ্চারণে রথশিল্ড) সন্তান, পুঁজি ব্যবসায়ী, সরকারি বন্ডের প্রধান ব্যবসায়ী। ইউরোপের চার দেশের চার শহরে চার ছেলে বসে সে সময় পারিবারিকভাবে তারা প্রতিদিনের আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময় হার ঠিক করতেন। আজকের হিসাবে ওই পরিবারটাকে সেসময়ের আইএমএফ বলা অত্যুক্তি হবে না। বেলফোরের চিঠিটা ঠিক কোনো সরকারি ঘোষণা নয়। তবে তিনি ইহুদিদের জায়নিস্ট রাষ্ট্রের স্বপ্নের পক্ষে তার সরকারের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত ও সহানুভূতির কথা জানাতে এ চিঠি লেখেন। পরে এ চিঠিকেই বেলফোর ঘোষণার দলিল হিসেবে আবির্ভূত ও দাবি করা হয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো এক. ফিলিস্তিনিদের ভূমির ওপরই একক জায়নিস্ট রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্ন অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্রিটিশ সরকার কে? কারণ ওই ভূখণ্ডের ওপর তখনও বৃটিশের কোনো কর্তৃত্ব নেই, এখতিয়ার নেই। তখনো তা অটোমান সাম্রাজ্যের অংশ। দুই. ঐ চিঠিতেই বেলফোর আবার বলছেন, “এতে ওই ভূমিতে বসবাস করছে, এমন অ-ইহুদিদের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকারের বিরুদ্ধে যায়— এমন কিছু করা হবে না। অথবা অন্য দেশে বসবাসরত ইহুদিদের অধিকার ও রাজনৈতিক স্ট্যাটাস সেখানে যা ভোগ করছে, তা এখানেও অটুট রাখা হবে”। অর্থাৎ মুখে বলছেন, অ-ইহুদিদের ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করবেন, কিন্তু বাস্তবে তা অসম্ভব কারণ তিনি এক জায়নিস্ট রাষ্ট্রের স্বপ্ন অনুমোদন করছেন। এছাড়া অন্যের ভূখণ্ডের ওপর কীভাবে এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন, তাদের নির্মূল বা উত্খাত না করে। সুতরাং তারা আগেই জানতেন এটা কথার কথা। অর্থাৎ আজ তো এটা পরিষ্কার যে, বেলফোরের সরকারের নিজ প্রতিশ্রুতিও নিজে রক্ষা করেনি। দ্বিতীয়ত. অন্য দেশে বসবাসকারী ইহুদিদের তিনি মাইগ্রেট করে আনার পরিকল্পনা করছেন এটাও পরিষ্কার। শুধু তাই না, সেসব দেশে ইহুদিরা যেমন রুস্তম হয়ে ছিলেন, জায়নিষ্ট রাষ্ট্রে এখানেও তাদের তেমন রুস্তমি নিশ্চিত করবেন। বাস্তবে আজ সেটাই হয়েছে। কিন্তু এর আইনগত দিকটা আরো মারাত্মক। অন্যকে তাঁর নিজ বাড়িঘর জমিজমা এমনকি দেশ থেকে উত্খাত করে সেখানে কারো স্বপ্নের রাষ্ট্র বাস্তবায়ন করতে চাওয়া— আইনগতভাবে একথা চিঠিতে বলা এটাই মারাত্মক প্রমাণিত অপরাধ।
জায়নিস্ট ইসরায়েল রাষ্ট্র কায়েমের ঘোষণা করা হয় ১৯৪৮ সালে। দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের ঘোষণার সময় ওর ভূখণ্ড কোনটা কতটুকু তা ওই ঘোষণার অঙ্গ। কিন্তু যতবার আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ হয়েছে, (১৯৬৭ বা ১৯৭৩) প্রত্যেকবার নতুন নতুন ভূমি দখল করে তাকেও নতুন সীমানা বলে দাবি করা হয়েছে। এসবই হয়েছে জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক সব আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। আর পশ্চিমের পরাশক্তিগত দাপটই সেখানে একমাত্র রুস্তম কর্তা, নির্ধারক। আসলে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রগুলোর ওপর চাপ ধরে রাখতেই এমন নুইসেন্স টিকিয়ে রাখা হয়েছে। পশ্চিমের পরাশক্তিগত রুস্তমি হল জায়নিষ্ট ইসরায়েলি রাষ্ট্র টিকে থাকার উৎস। অতএব একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, গ্লোবাল পুঁজিতন্ত্রের ওপর বর্তমান পরাশক্তিগত রুস্তমির সমাপ্তি এবং ভারসাম্য উলট-পালট ও দুর্বল হয়ে গেলেই জায়নিষ্ট ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটবে। দুনিয়ায় যে কোনো জায়নিস্ট রাষ্ট্রের বিলুপ্তি অনিবার্য। প্যালেষ্টাইনী প্রতিরোধ, হামাসের প্রতিরোধ লড়াইয়ের বিজয় অনিবার্য।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক। লেখাটা গত ১৯ জুলাই ২০১৪ দৈনিক বণিকবার্তা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে আরও কিছু এডিট করে আবার ছাপা হল। এছাড়া চিন্তা ওয়েবেও একটা ভার্সান ছাপা হয়েছে।]

মোদি কি হাসিনার থেকে ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” কিনতে আগ্রহী

মোদি কি হাসিনার থেকে ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” কিনতে আগ্রহী
হাসিনা লোভনীয় সম্পদ নাকি দায়

গৌতম দাস

০২ জুলাই ২০১৪।
ভারতের নবগঠিত মোদি সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তিনদিনের সফরে বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন। তাঁর সফরকে কেন্দ্র করে ভারতীয় মিডিয়ায় দাদাগিরি মন্তব্য আর মুই কি হনুভাব আবার চেগে উঠেছে। ভারতের নির্বাচন শুরু হবার পর থেকে ফলাফল প্রকাশ শেষে সুষমার বাংলাদেশ সফরের আগে পর্যন্ত – সব মিলিয়ে প্রায় চার-পাঁচ মাস এসব উতপাতে ভাটা পড়েছিল। এমনিতেই ভারতের সব তরফের দাদাগিরিতে আমরা অস্থির অসহ্য থেকেছি গত প্রায় ছয় বছর। এর উপরে আরও সবচেয়ে অসহ্য ঠেকে ভারতের মিডিয়া, সেরের উপর যেন সোয়া সের। “রাজার চেয়ে পারিষদ বলে শতগুণ”। এরা বুঝতেই পারে না সবকিছুর একটা সহ্য সীমা লিমিট আছে। এরপর সেটা বুমেরাং হয়।
ভারতীয় মিডিয়া তবু যদি গ্লোবাল ইকোনমিক বা পলিটিক্যাল অভিমুখ বুঝতে নজর দেবার ক্ষমতা দেখিয়ে তাতে ভারতের কি সম্ভাবনা – ভারত কোন উচ্চতায়, সম্ভাব্য কোন ভুমিকায় তার অবস্থানের গুরুত্ত্ব, মোদি সেটা কিভাবে পাঠ করছেন ও নীতি নিচ্ছেন এনিয়ে যদি তাদের উগ্রজাতিবাদী জোশমুক্ত ও নির্মোহ কোন বাস্তব মুল্যায়নের উপরে দাঁড়ানো কথা বলতে দেখা যেত তাও নাহয় সহ্য করা যেত। সেদিকে না গিয়ে বরং গায়ে মানে না আপনি মোড়লি মন্তব্যের নামে উস্কানিমূলক কলাম আবার প্রতিদিন একটা না একটা পত্রিকায় ছাপা শুরু হয়েছে।
কাকে ফেলে কার কথা দিয়ে শুরু করব? দ্যা হিন্দু পত্রিকার সুহাসিনী হায়দার, না টাইমস অব ইন্ডিয়ার এডিটোরিয়াল নাকি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের শুভজিত রায়ের কথা? এছাড়া বিখ্যাত আঁতেল ডঃ সুবীর ভৌমিক তো নিয়মিতই আছেন। মোদির বিপুল জয়লাভের পর আবার দেখা গেল কেউ কেউ পুরা ভোল পালটিয়ে ফেলেছেন। যেমন, ডঃ সি রাজামোহন, গত দশ বছরের কংগ্রেস শাসনে তিনি নয় বছরই কংগ্রেসের বাংলাদেশ নীতির সমর্থক ছিলেন। যা আসলে সেসময়ের ভারতের পিঠে হাত রাখা আমেরিকার সমর্থিত কংগ্রেসের নীতি ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের সাথে আমেরিকার বিবাদ শুরুর পরের সময়ে তিনিও কংগ্রেসের শেষের বছর একটু দুরত্ত্ব রাখছিলেন। আর সেই তিনি এখন একেবারে মোদি ভরসা। সপ্তাহ দুয়েক আগে তিনি বাংলাদেশে এসে সভা সেমিনারে বক্তৃতা দিয়ে গিয়েছেন। সেই সাথে গত ১৩ জুন চ্যানেল আই টিভিতে টকশোর সময়ে এক সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সুবীর আর রাজামোহন মূলত আমেরিকান খুটি ভরসা মানে আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রাখায় বলশালী অনুভব করে কথা বলতেন। তাদের ভারতই বিশাল রুস্তম এই ভাবের উপর দাঁড়িয়ে তাঁরা বাংলাদেশের রাজনীতি ও জনগণকে তুচ্ছ জ্ঞান করে কথা বলতেন।

অর্থনৈতিক উন্নতি বনাম রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা
মোদির উত্থানে কংগ্রেস টানা দশ বছর ক্ষমতায় কাটানোর সমাপ্তি ঘটল। এই শাসনকালের শুরুটা কেটেছিল ওয়ার ওন টেররের রমারমা কোলে। বুশের আমেরিকার দরকার ছিল ভারতকে কোলে তুলে নিবার, পিঠে হাত রাখার। কিন্তু কংগ্রেসের ভুল ছিল সে ঐকালকে বুঝেছিল আমেরিকা পিঠে হাত রাখায় আশেপাশে পড়শির উপর রুস্তমি দেখাবার কাল হিসাবে। কংগ্রেসের অযোগ্যতা হল ঐ সময়ের আসল দিকটা পাঠ করতে না পারা। সেটা হল, গ্লোবাল ইকোনমিক বা পলিটিক্যাল অভিমুখ মোচড় দিয়ে পরিবর্তিত হয়ে, এশিয়ামুখি হয়ে পাশ ফিরে শুতে চাচ্ছে। তথাকথিত “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা” হাসিলের নামে রুস্তমি করলে নিজ অর্থনীতি বিকশিত হবে নাকি গ্লোবাল অর্থনীতি এশিয়ামুখি হওয়াতে যেসব সুবিধা ভারতের জন্য ধেয়ে হাজির হচ্ছে তাকে কাজে লাগানোই নিজ অর্থনীতি বিকশিত করার পথ – রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নাকি অর্থনীতি কোনটা ফোকাস হবে এখান থেকেই এর পয়েন্ট অব ডিপারেচার; পথ আলাদা হয়ে বিভক্ত। কংগ্রেস তথাকথিত “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা” বলে বিষয়টাকে বুঝছিল। আর এরই তৈরি আবর্জনার নাম বাংলাদেশের বর্তমান হা্লের হাসিনার সরকার। গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে এটা সবার কাছে দিনের মত পরিস্কার ছিল যে বিগত কংগ্রেস সরকার হাসিনাকে তাদের বিশেষ পছন্দের সরকার হিসাবে পেয়েছিল। অবস্থা এমনও দেখা গেছে যেন বাংলাদেশ আলাদা রাষ্ট্র হলেও নিজের স্বার্থকে ভারতের স্বার্থের অধীনস্ত রেখে সরকার চালানো – এমন নীতিতে সাজানোর জন্যই হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সেটা ভরা নদী ভরাট করে ভারতীয় যান চলাচলে বিনা খরচের ট্রানজিট দেয়া থেকে শুরু করে সীমান্তে বিএসএফের নির্বিচারে বাংলাদেশি হত্যার জন্য উলটা ভারতের পক্ষেই সাফাই গাওয়া পর্যন্ত সবকিছুতে। এছাড়া খুবই কৌশলে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে অসংখ্য অমীমাংসিত ইস্যু থাকা সত্ত্বেও সেগুলো যেন কেবল দুটো -তিস্তার পানি আর সীমান্তে ভুমি বিনিময় – এভাবে নামিয়ে আনতে মিডিয়া প্রচার প্রপাগান্ডায় সফলতা দেখিয়েছেন হাসিনা। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে ঐ দুটা ইস্যুও কোন ধরণের মীমাংসা ছাড়াই কংগ্রেস সরকারের সময়কাল শেষ হয়েছে। এরপরও হাসিনার পাঁচ বছর শাসনের শেষে ভারতের আবদার আর হাসিনার খায়েসের শেষ হয়নি। বাংলাদেশে ভারতের হাসিনাকেই আবার ক্ষমতায় চাই, তাতে বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্খা জাহান্নামে যাক – এই অবস্থান নীতি নিয়েছিল। এভাবে বাংলাদেশ ছিল ভারত সরকারের তাদের তথাকথিত “নিরাপত্তা স্বার্থের” নামে এক অবারিত অভয়ারণ্য – কংগ্রেসের এই আগ্রাসী ও জবরদস্তির নীতির সহায়ক ছিল ভারতের আমলা, কূটনীতিক ও গোয়েন্দা বিভাগ, আর সবার উপরে ছিল ভারতীয় মিডিয়ার ঐ দঙ্গল। সবাই একটা বিষয়ে একমত হয়ে কাজ করেছিল যে ভারতের “নিরাপত্তার স্বার্থের” নামে তাদের পড়শি অপর রাষ্ট্রে যা খুশি করার জন্য বাংলাদেশকে নিজেদের অবারিত অভয়ারণ্য করে নিতে পারে। যেন এটা জায়েজ। আর এটাই নাকি বাংলাদেশের ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র, ভারতের সাথে সম্পর্ক ভাল হয়ে থাকার মডেল। এই প্রচার ভারতের মিডিয়ায় তুঙ্গে করে রেখেছিল এই খেদমতগারেরা। বাংলাদেশের সাথে ভারতের অমীমাংসিত ইস্যু নাকি কেবল দুইটা এটা প্রতিষ্ঠা করার পরও তা নিয়ে কোন অগ্রগতি না হওয়াতে ভারতের ঐ ম্যানেজড মিডিয়াও লজ্জায় পড়ে। মুখ লুকানোর জায়গা খুজে না পেয়ে এদের কেউ কেউ শেষ বছরে কংগ্রেস সরকারের মৃদু সমালোচনা শুরু করে, সরকারের সাথে নিজেদের দুরত্ত্ব প্রকাশের চেষ্টা করে। দায়দায়িত্ত্ব অস্বীকার করে।
এটা পরিস্কার যে নতুন মোদির সরকার কংগ্রেসের এই নীতি ভারতের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকারক হয়েছে এমন ভাবতে শুরু করেছে। বহুবার বলেছি, মোদি বিজেপির প্রধানমন্ত্রী এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু বিজেপির অতীত কেমন তা দিয়ে এবারের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে বুঝতে চাওয়া ভুল হবে। অন্তত মোদির প্রথম দুই বছরে কি ফলাফল অভিমুখ তৈরি হয় সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ফলে বিজেপির মোদি নয়, মোদির বিজেপি কি তা বুঝতে চেষ্টার দরকার আছে। মোদির বিদেশনীতির মুখ্য ফোকাস অর্থনৈতিক উন্নতি বা নিজের জনগণকে কাজ দেবার চ্যালেঞ্জ। অন্যভাবে বললে, আসন্ন গ্লোবাল অর্থনৈতিক উলটপালটের সুবিধা বুদ্ধিমানের মত ব্যবহার করে এক ফাইন টিউনের মধ্য দিয়ে নিজের বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে হাজির হবার যে সুযোগ দেখা দিয়েছে তাকে উপযুক্তভাবে ব্যবহার করা। বিপরীতে কংগ্রেসের ফোকাস ছিল তথাকথিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা। মোদির হুশজ্ঞানের সাথে যদি তুলনা করি তবে বলতে হয় কংগ্রেস অবুঝ শিশু, পোলাপান। প্রথমত ভারতের গ্লোবাল সম্ভাবনার কথা কংগ্রেস বুঝেই নাই। অথবা বুঝেছে আমেরিকান স্বার্থের ফাঁদে পড়ে। ওয়ার অন টেররের নীতির দিক থেকে। যেটা আগে বলেছি কংগ্রেস মনে করেছে গ্লোবাল অর্থনৈতিক উলটপালটে হাজির সুবিধা কথার অর্থ আমেরিকার ভারতের পিঠে হাত রাখা। আর তাতে ভারত অর্থনৈতিক অর্থে নয় রাজনৈতিক ষ্ট্রাটেজিক অর্থে পরাশক্তির ভুমিকায় এসে গেছে। এভাবে এতটুকুই বুঝেছে। কিন্তু নিজেকে মৌলিক প্রশ্নটা করে নাই যে নিজের অর্থনৈতিক ভিতের উপর না দাঁড়িয়ে কেউ রাজনৈতিক পরাশক্তি হতে পারে কি না। কারও যাতাকাঠি ধার করে রাজনৈতিক পরাশক্তি ভাবের মাসল দেখিয়ে পড়শিকে ধরব মারব কাটব – এটা কি ধার করে দেখানোর জিনিষ? কংগ্রেস আমেরিকার ওয়ার অন টেররের মধ্যে নিজের বিশাল সম্ভাবনা দেখেছে, আমেরিকান যাতাকাঠি হাতে পেয়ে নিজের আঞ্চলিক মোড়ল হবার চকচকে লোভে পড়েছে, ফাঁদে পড়েছে। অথচ গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরাশক্তিগত যে উলটপাল্ট চলছে এর প্রধান অভিমুখ ও ইঙ্গিত হল ভারতের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হবার সম্ভাবনা। আর কোন রাষ্ট্র নিজ সক্ষমতায় অর্থনৈতিক পরাশক্তি হলে সেই সাথে এবার তার রাজনৈতিক ষ্ট্রাটেজিক পরাশক্তি হিসাবে উদয় হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর সেটা এমন নিজের পায়ে দাঁড়ানো যা অন্য কেউ চাইলেও অস্বীকার করতে পারে না। মোটা বুদ্ধির শর্টকাটে মারা লোভি কংগ্রেস এসব দিকে খবর না রেখে নিজদেশের গত দশ-বার বছর নষ্ট করেছে পিছিয়ে দিয়েছে – শুধু নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছে, নিজের অর্থনীতি ধুঁকে মরার অবস্থায় নিয়ে গেছে তাই নয়, এই অঞ্চলে সবচেয়ে ক্ষতি করেছে বাংলাদেশের।
এই ব্যাপারটাকে এককথায় বললে, কংগ্রেসের ফোকাস ছিল অর্থহীন তথাকথিত “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা” আর বিপরীতে মোদির ফোকাস অর্থনীতি। আবার এর মানে এমন নয় যে মোদি ভারতের সত্যিকারের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে খাটো করছেন, তা নয়। যেমন উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, পাকিস্তানের নওয়াজ শরীফকে তিনি কি বলতে পারেন? ডিল রফা করবেন এভাবে যে কাসাবদের বোম্বাই হামলার মত বিষয়গুলো আর না ঘটার বিষয়ে তিনি পাকিস্তানের নীতিগত সক্রিয়তা ও নিশ্চয়তা চান। আর এই নিশ্চয়তা নিয়েই তিনি পাকিস্তানসহ এই অঞ্চলের সকলে মিলে এক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট করে সব দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির পথে হাটতে চান। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটা আসলে বিচ্ছিন্ন আলটপকা আলাদা বিষয় নয়, গ্লোবাল অর্থনৈতিক উলটপাল্টের সুবিধায় এশিয়ার যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে সেই অর্থনীতি ফোকাসে পথ চলার অবিভাজ্য অংশ।
অর্থনৈতিক উন্নতি বনাম রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা – বলে দুই ফোকাসের ভাগ দেখালাম এটা কি কাল্পনিক? মোদির উপরে নিজের মনের ভালভালাইয়া সৎ খেয়ালে আরোপ করা? মোটেও নয়। মোদির সরকারের বয়স মাত্র একমাস। ওর নীতিগত দিক কি হতে যাচ্ছে তার অনেককিছু অনুমান করা, অপ্রত্যক্ষে জানা গেলেও লিখিত ডকুমেন্টে এখনও তা যথেষ্ট হাজির নয়। কিন্তু তবু সুষমার এই সফরে তাঁর এক লিখিত বক্তব্য আমরা ইতোমধ্যেই হাতে পাই। সুষমার টাইট কর্মসুচীতে বিকেলে এক সেমিনারে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। ওখানে এক লিখিত বক্তব্য তিনি পড়েছিলেন যা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটেও গুরুত্ত্বের সাথে পাবলিক করে দেয়া হয়েছে। সুষমার এই সফরে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক প্রস্তুতি করেই যে তিনি এসেছিলেন এর ছাপ সব জায়গায় আছে। যেমন ভারতের নতুন সরকারের দিক থেকে দেখলে প্রথমত গত ছয় বছরে কংগ্রেস বাংলাদেশে যথেচ্ছাচার তান্ডব করেছে, অথচ তাতে অর্থনৈতিক বা ষ্ট্রাটেজিকভাবে ভারতের জন্য এমন কোন লাভালাভ ফল আনে নাই যা নিজে টিকে থাকে। বরং এটা অজস্র দায় ও আবর্জনা তৈরি করেছে। বিশেষত ঐ আবর্জনা পরিস্কার না করে ওর উপরে মোদির নতুন কোন নীতি কার্যকর হবে না – তা মোদি ও তাঁর নীতিনির্ধারক টিমের লোকজনের উপলব্দি হয়েছে বলে মনে করার কারণ আছে। যেমন ভারতের অর্জনের দিক থেকে দেখলে এখন ভারতের সামনে আষ্টেপৃষ্টে বাধা এক হাসিনার বাংলাদেশ আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু এটা ভারতের জন্য এক বিশাল দায়। এর মূল কারণ ক্ষমতা ভিক্ষা করা হাসিনার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশই হাসিল করে আছে ঠিকই কিন্তু হাসিনারই নিজ দেশে কোন বেইল নাই। অন্তত পাবলিক রেটিং এর দিক থেকে যদি বলি এটা যতটাই শুণ্য এটা ভারতের জন্য ততটাই বোঝা। হাসিনা ও তার কিছু সুবিধাভোগি ছাড়া সারা বাংলাদেশের সব কোনা আজ ভারত বিরোধি হয়ে উঠেছে। এমনকি বাম রাজনীতিক যারা এর আগে কখনই ভারতের জবরদস্তির বিরুদ্ধে কিছু বললে সেটা নাকি “সাম্প্রদায়িক হয়ে যাবে” এই পবিত্র শুদ্ধ থাকার লোভে কখনও এনিয়ে কথা বলে নাই সেই বামেরাও এখন সোচ্চার হতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি বহু আওয়ামি বন্ধুকে বলতে শুনেছি হাসিনা নিজেকে বিক্রি করছে কাজটা খারাপ। কিন্তু কি করব আমি আমার ফয়দাটাই কেবল এখান থেকে তুলে নিচ্ছি কিন্তু কোন দায় নিব না। কংগ্রেসের হাসিনার বাংলাদেশ রেটিং আজ এমন দুরবস্থায়। কিন্তু তবু এই রেটিং শুণ্য হাসিনাকে দিয়েই বাংলাদেশ থেকে কোন লাভালাভ সুবিধা ভারত যদি আদায় করতে চায় তবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আরও জবরদস্তির উজান নৌকা তাকে বাইতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্খার সরাসরি বিরুদ্ধে গিয়ে মোদির ভারতকে দাঁড়াতে হবে। স্বভাবতই এটা ভারতের সুবিধা নয়, লায়াবিলিটি। ওদিকে মোদি যে স্বপ্ন দেখে তাতে তাঁর দরকার বাংলাদেশকে এক গুরুত্ত্বপুর্ণ অর্থনৈতিক পার্টনার হিসাবে, কংগ্রেসের মত ভারতের তথাকথিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে এক দাস বাংলাদেশ নয়। যেমন প্রেমের বেলায় পুর্বশর্ত হল, কেউ কারও দাস হলে চলবে না, পার্টনার উভয়কে উভয়ের জবরদস্তি থেকে মুক্ত হতে হবে। যে মাত্রায় মুক্ত সেই মাত্রায় লেবেলের প্রেম-সম্পর্ক হবে। জমিদারের প্রেমাকাঙ্খা নিজ কুলবধুর সাথে মিটে না, কারণ ওখানে বধুর ভুমিকা কেবল কুল বা বংশরক্ষা ও বিস্তারের মধ্যেই সীমিত। তাই জমিদার দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাতে বাঈজির কাছে যায়। আসলে জমিদারের দরকার কুলবধু আর বাঈজি এই দুই ভুমিকার মিলিত এক বধু। আবার সেটা যদি হাসিলই হয় তখন দেখা যাবে জমিদার আবার জমিদার নাই। জমিদারি পরিচয় লোপ পেয়ে নিজেই অর্থনৈতিক উতপাদনের উদ্যোক্তা হয়ে গেছে। মোদি জানে নিজের উদ্যোক্তা ভুমিকা। ফলে তাঁর দাস নয় বা দাসের বোঝা নয়, এক মুক্ত ও সক্রিয় পার্টনার বাংলাদেশকেই তার চাই।
মুক্ত ও সক্রিয় পার্টনার বাংলাদেশকেএগুলো কোন সুখস্বপ্ন কল্পনা নয়। সুষমা লিখিত বক্তব্যে বলছেন, “We are convinced that India’s development cannot be complete and sustainable unless we succeed in building productive partnerships with our immediate neighbours. We will, therefore, devote our energy to working much more closely with our neighbours in pursuit of our development goals. We will walk the extra mile to create opportunities and to build virtuous cycles of prosperity in the region. We will pursue the goal of economic integration and interconnectedness through trade, investment, transportation, capacity building, environment friendly practices and means that promote equitable development in the region”। নিজ দায়িত্ত্বের এর বাংলা করে বললে সুষমা বলছেন, “আমরা বুঝতে পেরেছি ভারতের (অর্থনৈতিক)বিকাশ নিজে টিকে থাকার মত স্থায়ী ও সম্পুর্ণ হতে পারে না যদি সংলগ্ন পড়শীদের সাথে কার্যকর সক্রিয় পার্টনার সম্পর্ক আমরা তৈরি করতে না পারি। তাই আমরা আমাদের বিকাশের লক্ষ্য অভিমুখে আমাদের পড়শিদের সাথে আরও ঘনিষ্টভাবে কাজ করতে আমাদের শক্তি ব্যয় করব। এই অঞ্চলের এমন সুযোগ সুবিধা আর দায়িত্ত্ববান সমৃদ্ধির চক্র (virtuous cycles of prosperity) তৈরি করতে আমরা নিজেই আগবাড়িয়ে বাড়তি পথ হাটব। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যাতায়াত,অবকাঠামোগত সক্ষমতার এক প্রকৃতি-পরিবেশ সহায়ক চর্চা তৈরির মাধ্যমে ও উপায়ে আমাদের অর্থনীতিগুলোকে পারস্পরিক পরিপূরক ও আন্তঃনির্ভরশীল করার লক্ষ্যে আমরা জোর দিব যা এই অঞ্চলে সবার সমান বিকাশ (equitable development)আগিয়ে নিবে”।

BCIM জোটের তাতপর্য
অনেকের মনে হতে পারে কুটনীতিক বাকচাতুরি ভাষায় এরকম অনেক কথাই তো বলা হয়,এটাকে এত গুরুত্ত্ব দিবার কি আছে। না, এটা কুটনীতিক বাকচাতুরি ভাষার কথার কথা নয়। সেজন্য আরও কিছু পটভুমির কথা বলব, যে পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আমাদের কথাগুলো পাঠ করতে হবে।
অনেকবার বলেছি,১)গ্লোবাল অর্থনীতি এখন এশিয়ামুখি। ২)দুনিয়ার আগামি নির্ধারক দুই অর্থনীতি চীন ও ভারতকে কেন্দ্র করেই এশিয়ামুখি গ্লোবাল অর্থনীতি আবর্তিত হবে। ৩) চীন ও ভারতের মধ্যে অর্থনৈতিক সক্ষমতার উচানিচা আছে আর এই দেশদুটোর ঠিক মাঝেই বাংলাদেশের অবস্থান। ফলে সক্ষমতার উচানিচার ভিতর জোটের (BCIM জোট, বাংলাদেশ,চীন,ভারত ও মায়ানমার মিলিয়ে যে অর্থনৈতিক জোট)নীতিগত সাম্য এবং ভারসাম্য তৈরিতে বাংলাদেশের ভুমিকা খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ হবে। [আমেরিকার প্ররোচনায় পড়ে কংগ্রেসের ভারত এতদিন এই সম্ভাবনাকে ছুপিয়ে রেখেছিল, উপেক্ষা করেছিল। মাত্র গত ২০১৩ সালের অক্টোবরে বিষয়টাকে আমেরিকার উপর প্রতিহিংসা ও রাগ দেখানোর বিষয় হিসাবে উপস্থাপন করে এবার সে নিজেই BCIM ঢোল পিটিয়েছিল।ঐ সময় চীনের সাথে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ভিতর দিয়ে ভারত-চীনের পারস্পরিক সীমান্ত হামলার সন্দেহের সমাপ্তি হয়।যদিও ভারতের বেশির ভাগ মিডিয়াই এখনও এই তথ্য আড়াল করে ভারত-চীনের কোন প্রসঙ্গ আসলেই তাকে সেনসেটিভ করে উস্কানি দেয়ার খাসিলত ত্যাগ করে নাই।] ৪) BCIM জোট খাড়া করা মানে এটা কোনভাবেই আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা মিটানো নয়। আমেরিকার কাছে নিজের দাম বাড়ানোর জন্য চীনের কোলে চলে যাবার ভয় দেখানো নয়। আমাদেরকে কাজ করে দেখাতে হবে। এই চার দেশের অর্থনীতিতে সব অঞ্চলে সম উন্নয়নের সিরিয়াস বিষয় এটা। ৫) কেবল ভৌগলিক অবস্থান নয়,BCIM জোটের তাতপর্য যতটা না এই অঞ্চলের চার দেশের বাইরের বাকি দেশগুলোর সাপেক্ষে নিজেদের জোটবদ্ধ শক্তি হওয়া এরচেয়েও বেশি গুরুত্ত্বপুর্ণ হল জোটের বাইরে নয় বরং এই চার দেশের প্রত্যেকের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সুষম বিকাশের দিকটা। মূল কারণ এই BCIM অঞ্চলটা মুলত চীন ও ভারত উভয়েরই ল্যান্ডলকড পুর্বাঞ্চল। যার আবদ্ধ অবস্থা থেকে সরাসরি সড়ক রাস্তাঘাটের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত যোগাযোগের দুয়ার খোলার উপায় BCIM জোট। ফলে তা এই অবরুদ্ধ অঞ্চলগুলোতেও স্ব স্ব মূল রাষ্ট্রের সব জায়গার মতই সমান অর্থনৈতিক বিকাশের উপায়। আর এই মুক্তি ঘটবে বাংলাদেশ ও বার্মার ভুমির উপর দিয়ে এবং বাংলাদেশে নির্মিতব্য গভীর সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে। ফলে “ভারতের বিকাশ পড়শিদের উপর নির্ভরশীল আর স্থায়ী ও সম্পুর্ণ হবার উপায়” – একথাটা একেবারেই বাকচাতুরি কূটনৈতিক রেঠরিক নয়। সুষমা বা মোদি একথা “বুঝতে পেরেছে” তা স্বীকার করলে বা না করলেও তখনও এটা সত্যি। এছাড়া প্রত্যেকের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিকাশের দিক মুখ্য করে এই অর্থনৈতিক সহযোগিতার জোট যদি ঠিকমত দাঁড়িয়ে যেতে পারে তবে এশিয়ার বাকি অঞ্চলের উপরে এই জোট ভারকেন্দ্র ভুমিকায় চলে আসবে। কল্পিত সে পরিস্থিতি -এটা আর শুধু বাংলাদেশ থেকে সংকীর্ণ ভারতের জবরদস্তিতে ও বিনাপয়সায় ট্রানজিট আদায় করার মত মুদি দোকানি ভাবনা নয়। যেমন, কংগ্রেসের ভারত যে কতবড় ছেচড়া খুদে মুদি দোকানি তা বুঝা যায় তাদের আগাবার পদ্ধতির দিকে দেখলে। তারা জোর দিয়েছিল বাংলাদেশ থেকে ট্রানজিট অনুমতির কাগজ যোগাড়ে এবং তা বিনা পয়সায় হতে হবে। কিন্তু অনুমতি সে তো একটা কাগজ মাত্র। কাগজের উপর দিয়ে তো ভারতীয় মালামাল পারাপার হবে না,বাস্তব রাস্তাঘাট অবকাঠামো লাগবে,আর সেটা যে সে না ভারি যানবাহন চলার অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক ট্রাফিক রুল,প্রটোকল, ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি অনেক কিছু। এমনকি বাংলাদেশের নিরাপত্তা স্বার্থকথা যদি বাদও দেই তো তবু তাতে ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলে একটা কিছু লাগবে। ফলে অন্তত ৫০০ কিমি ভারি রাস্তানির্মাণের বিনিয়োগ লাগবে যেটা তা বাংলাদেশ দূরে থাক ভারতও যোগানোর সামর্থ রাখে না। ফলে BCIM কেই জোটবদ্ধভাবে এর প্রয়োজনীয় ফান্ড যোগাড় করতে হবে। এবং এটা অবশ্যই সম্ভব শুধু নয় অন্য বিনিয়োগ দাতারা অপেক্ষা করছে। কিন্তু এই বাস্তব দিকে ভারতের কোন আগ্রহ নাই। মুদি দোকানি যেন ধরেই নিয়েছে ভারতের ট্রানজিটের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ চাহিদা বাংলাদেশের অর্থনীতিই পূরণ করবে। কিন্তু কেমন করে – এটা ভারতের ভাবনার বিষয় নয়। বরং ভাবটা এমন যেন হাসিনার ক্ষমতায় রাখার বিনিময়ে ওর কাছ থেকে একটা অনুমতির কাগজ হলেই তো ভারতের হবে। এজন্যই একে মুদি দোকানি বলছি যে নিজেকেও ক্ষুদ্র করে রাখে,নিজেকে অবাস্তব ও ক্ষুদ্রস্বার্থের আলোকে হাজির করে। অন্যদিকে ব্যাপারটাকে আবার বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে তার ভারতের শত্রু হয়ে থাকার কোন কারণ নাই,মতলব উদ্দেশ্য লক্ষ্যও হতে পারে না,কোন ফয়দা নাই,যদি না সেটা যে করেই হোক বাংলাদেশের স্বার্থ নয় সংকীর্ণ কেবল হাসিনার ক্ষমতায় থাকতেই হবে এই স্বার্থ হয়। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের অমীমাংসিত ইস্যুর শেষ নাই বরং বাড়ছে। সেগুলোকে জবরদস্তিতে অমীমাংসিত ফেলে রেখে কেবল ভারতের এবং সংকীর্ণ করে তা ট্রানজিটের কাগজ ধরণের উপস্থাপনের চিন্তায় কংগ্রেস গত ছয় বছর চালিয়ে গেছে। বাংলাদেশের অমীমাংসিত সব ইস্যুগুলোর একটা প্যাকেজ ফয়সালা হলে ভারতের সাথে BCIM এ জোটবদ্ধভাবে সবার অর্থনৈতিক বিকাশে সামিল না হতে বাংলাদেশের আপত্তির কিছু নাই, থাকতে পারে না। সেখানে তখন কেবল ভারতের ট্রানজিট খুবই ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ বিষয়। বরং BCIM এর ট্রানজিট হাব হওয়ার মধ্যেই আসলে বাংলাদেশের স্বার্থ লুকিয়ে আছে। তবে অবশ্যই তা কোন জবরদস্তিতে নয় সমান ও সমলাভের জোট পার্টনার হিসাবেই।
সুষমা এই কথারই প্রতিধ্বনি করছেন। তাঁর virtuous cycles of prosperity শব্দ ব্যবহার যেটার অনুবাদ করেছি “দায়িত্ত্ববান সমৃদ্ধির চক্রে প্রবেশ” -একথার অর্থ বুঝতে হবে অন্য আর এক অনুমিত বিপরীত শব্দের প্রেক্ষিতে। “দায়িত্ত্ববান সমৃদ্ধি” শব্দের বিপরীতটা হল, পরস্পর রেষারেষি তথাকথিত “দেশের নিরাপত্তা স্বার্থ” এই নীতি থেকে যা উতসারিত। যেটা এতদিন কংগ্রেস অনুসরণ করেছে। মোদির সুষমা এর বিপরীতে “দায়িত্ত্ববান” হতে, হয়ে সম্ভাবনাময় সমৃদ্ধির চক্রে প্রবেশ করতে আহবান রাখছেন। ফলে এটা কংগ্রেসের নীতি সম্পর্কে মোদির মূল্যায়ন এবং তা পরিত্যাগও।
সুষমা আগের উদ্ধৃতির শেষে আরও বলছেন,”Building a comprehensive and equitable partnership with Bangladesh is essential for the realization of our vision of a stable, secure and prosperous South Asia. History and geography have destined us to live together. How we do so is within our hands, and our hands alone.”- এর বাংলা করে বললে,”এক সুস্থির,সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া দেখার আমাদের স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ এক সামগ্রিক ও সমমর্যাদার পার্টনার, এই সম্পর্ক তৈরি করা মৌলিকভাবে জরুরি। আমাদের ইতিহাস ও ভুগোল আমাদের একত্রে বসবাসের ভাগ্য ঠিক করে দিয়েছে। এটা কি করে করব তা আমাদেরই হাতে, একান্তই আমাদের হাতে”। এখানে comprehensive and equitable partnership অর্থাৎ অনুবাদে “সামগ্রিক” ও “সমমর্যাদার পার্টনা” শব্দদুটো বিশেষ গুরুত্ত্ব বহন করে।

সাত রাজ্যের বিদ্রোহ সমস্যাটা আসলে কি
অর্থনীতি বনাম তথাকথিত নিরাপত্তা – কার কি ফোকাস প্রসঙ্গে এভাবে কংগ্রেস ও মোদির বিজেপির তুলনা করছি। কংগ্রেস মনে করেছিল উত্তরপুর্ব ভারতের সাত রাজ্যের বিদ্রোহ সমস্যাটা নাকি ভারতের নিরাপত্তার সমস্যা। জবরদস্তি উত্তরপুর্ব ভারতে ওদের পিটাপিটি দিয়ে আর বাংলাদেশে শিখন্ডি হাসিনার ক্ষমতা থাকা নিশ্চিত করার ভিতরেই ভারত সাত রাজ্য সমস্যার সমাধান। গত সাত বছর কংগ্রেস সমস্যাটা দেখেছে “সাতরাজ্য যেন বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়” এই নীতিতে। ফলে কংগ্রেসের চোখে এটা ভারতের নিরাপত্তা ইস্যু হিসাবে থেকেছে, আর এই নষ্টা বয়ানকে মিডিয়া তাল দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মোদির দেখবার চোখ সম্পুর্ণ ভিন্ন। মোদি অত্যন্ত সঠিকভাবে সমস্যার গোড়ায় তাকাতে পারেন। মোদির চোখে ভারতের পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলোর এমন সমস্যার সমাধান বলপ্রয়োগ বা নিরাপত্তা নয়। রিসোর্স এলোকেশন মানে সম্পদের বরাদ্দ বিনিয়োগ বাড়াতে পারলেই একমাত্র এর সমাধান। এসব রাজ্যগুলো ছোট অর্থনীতির ফলে উদ্বৃত্ত সম্পদ মানে বিনিয়োগেরও ক্ষমতা কম,ফলে নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি। মোদি কথাটা তুলেছিলেন ঠিক সাত রাজ্যকে কেন্দ্র করে নয়,মমতার পশ্চিমবঙ্গের প্রসঙ্গে। মমতার দেখার মধ্যেও সংকীর্ণতা আছে,আছে অর্থনীতিকে মানবতা দেখানোর কাজ ভেবে বিচার করার ঝোক। তিনি গরীব মানুষকে প্রায় সরাসরি নগদ অর্থ বিতরণ ধরণের বছরে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের এক কর্মসুচী চালাচ্ছেন। মমতা বলছেন তিনি তার রাজ্যের অর্থমন্ত্রীকে অর্থ যোগাড় সম্ভব কি না জিজ্ঞাসা করেছিলেন তিনি যোগাড়ে সমর্থ হয়েছেন। তাই তিনি এটা চালাচ্ছেন। ছোট অর্থনীতির পশ্চিমবঙ্গও এমনিতেই ছোট উদ্বৃত্ত সম্পদের ফলে সবসময় সক্ষমতা্র অভাবে ভুগবে এটাই স্বাভাবিক। আর এই অভাবের আকাঙ্খা মিটাতে মমতা মনে করেন কেন্দ্রের বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। এভাবেই এর সমাধান। বিপরীতে মোদি গত নির্বাচনের আগে এই সাক্ষাতকারে বলছেন,এটা কোন সমাধান নয়। বসিয়ে ভর্তুকিতে খাওয়ানো নয়,বরং কাজ সৃষ্টি ফলে বিনিয়োগ এর সমাধান। ফলে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিনিয়োগ যোগাড় করে দেয়া কেন্দ্রের দায়িত্ত্ব মনে করেন তিনি। তিনি কেন্দ্রে গেলে এটাই করবেন।অর্থাৎ আমরা দেখছি কংগ্রেস যেটাকে যুদ্ধবাজি দমনের সংকীর্ণ চোখে “নিরাপত্তার” সমস্যা হিসাবে দেখে মোদি সেটাকে বিনিয়োগ অর্থনীতিক বিকাশে সমাধান দেখেন। দুটো এপ্রোচের আকাশ-পাতাল ফারাক এখানে।

সুষমার আমলা বাঁচানো নাকি ড্যামেজ কন্ট্রোল তৎপরতা
গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কংগ্রেসের সক্রিয় হস্তক্ষেপে পক্ষ নেয়া ও কূটনীতিক সীমালঙ্ঘন করে হাসিনাকে পুন-ক্ষমতায় আনা এটা আমাদের দেশে ও বিদেশে সবাই অবাক বিস্ময়ে নজর করেছে। বাংলাদেশের জনগণ যাকেই ভোট দিতে চাক নিজেদের প্রতিনিধি মনে করতে চাক সেগুলো তুচ্ছ। কংগ্রেসের হাসিনাকেই ক্ষমতায় চাই – এই ছিল কংগ্রেসের নীতি অবস্থান। ভারতের পররাষ্ট সচিব সুজাতা সিং নির্বাচনের ঠিক আগে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে এসে প্রকাশ্যেই সেসব ততপরতা চালিয়েছিলেন। এর কয়েকমাসের মধ্যে ভারতের নির্বাচনে খোদ সেই কংগ্রেস মোট আসনের ১০ ভাগেরও কম আসনপ্রাপ্তিতে ভরাডুবি এবং বিপুল ভোটে মোদির উত্থান – এই পটভুমিতে নতুন সরকা্রের সুষমার বাংলাদেশ সফর ঘটেছে। কংগ্রেসের ভুমিকা হাসিনা ও তার কিছু সুবিধাভোগী ছাড়া বাংলাদেশের সবার মনে দগদগে ঘাঁ এর মত জ্বলজ্বলে হয়ে আছে। সুজাতা ছাড়াও এর আর এক প্রকাশ্য প্রবক্তা হলেন হাইকমিশনার পঙ্কজ সরণ। তিনিও চাকুরিজীবি আমলার সীমায় থাকেন নাই। কংগ্রেসী হয়ে গেছিলেন। তিনিও ভারতের নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের আগে পর্যন্ত বলে গেছেন ভারতের বাংলাদেশ নীতি অপরিবর্তিত থাকবে বলে। অন্তত দুবার প্রকাশ্যে তা উচ্চারণ করেছিলেন। এটা তাঁর সীমা লঙ্ঘন। চাকুরিজীবি আমলাকে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বের অধীনতা মেনেই কাজ করতে হয়। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বই রাষ্ট্রের নীতি ঠিক করেন যেখানে সেটা অনুসরণ করাই তার আমলা ভুমিকা। আর তিনি কিভাবে জানবেন কে নির্বাচিত হতে যাচ্ছে? আর কংগ্রেস আবার নির্বাচিত হলেও তো নিজের আগের নীতিতে সবটা অথবা কিছু পরিবর্তন করতে পারেন। কিন্তু তিনি প্ররোচিত হয়ে হাসিনার সমর্থকদের আশঙ্কা দূর করতে নিজেকে বলি দিলেন। নিজেকে কংগ্রেসী রাজনীতির অংশ করে ফেললেন। কিন্তু মোদির বিপুল বিজয়ের পর পঙ্কজ ঠিক সময়মত তওবা পড়ে নিয়েছেন। একাত্তর টিভিতে দেয়া সাক্ষাতকারে যেটা বিডিনিউজ২৪ ট্রান্সস্ক্রিপ্ট করে ছাপিয়েছিল। ট্রান্সস্ক্রিপ্ট থেকে এবিষয়ের প্রয়োজনীয় অংশ তুলে আনছি। ইমরোজ খালিদী প্রশ্নকর্তা, বিডিনিউজের মালিক সম্পাদক।
খালিদী: আপনি আগে বলেছিলেন, সরকার পাল্টালেও স্বার্থের পরিবর্তন হয় না। দিল্লিতে ক্ষমতার পালাবদল হলেও ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের হেরফের হবে না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের কোন কোন স্বার্থগুলো কখনোই পরিবর্তন হবে না বলে আপনি মনে করেন?
সরণ: আমি আমার সেই বক্তব্য স্পষ্ট করতে চাই। আমি বলতে চেয়েছি, সাধারণ বিবেচনায় দুই দেশের স্বার্থ একই থাকে এবং তা রক্ষায় সম্পর্কের মূল নীতিতে খুব একটা পরিবর্তন হয় না। কিন্তু আমি আগে যে বক্তব্য দিয়েছিলাম তার সঙ্গে আজকের সময়ের অনেক পার্থক্য আছে। সবচেয়ে বড় তফাত হলো আমাদের এখন নতুন একটি সরকার আছে। ফলে যে প্রশ্নগুলো উঠেছিল, সেগুলোর উত্তর দেয়াটাও জরুরি।
খালিদী: তাহলে আগের ওই বক্তব্য নিয়ে আপনি একটু চিন্তিত?
সরণ: না, ওটা নিয়ে আমি চিন্তিত নই। আমি যা বলতে চাই তা হলো- নতুন সরকারের অগ্রাধিকার ঠিক করে প্রেসিডেন্ট লোকসভায় একটা বক্তব্য দিয়েছেন।
বলছে। তবে ভারত ওই নির্বাচনকে ‘সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিও কি একই রকম থাকবে?
সরণ: আমার মনে হয়, সেসময় আমাদের বক্তব্য ছিল- সাংবিধানিক প্রয়োজনেই নির্বাচন হয়েছে, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে- এমনটাই আশা করা হয়েছিল। আমি মনে করি, আমাদের এখন বর্তমানকে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। পুরনো বিষয় নতুন করে সামনে আনার কোনো প্রয়োজন আমি দেখি না, এখনকার এজেন্ডাই ভিন্ন।

যদিও এটা ঘরের “আমরা আমরাই তো” ধরণের সাক্ষাতকার তবু পঙ্কজের পিছ-পালানোটা বেশ রগড়-তামশার। পঙ্কজ বলছেন, “কিন্তু আমি আগে যে বক্তব্য দিয়েছিলাম তার সঙ্গে আজকের সময়ের অনেক পার্থক্য আছে। সবচেয়ে বড় তফাত হলো আমাদের এখন নতুন একটি সরকার আছে”। “সময়ের অনেক পার্থক্য আছে”, “বড় তফাত হলো আমাদের এখন নতুন একটি সরকার” – এই বাক্যাবলিতে তিনি এবার আগের পাপের হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। সুজাতা বলেছিলেন, “সাংবিধানিক প্রয়োজনেই নির্বাচন হয়েছে” এই প্রসঙ্গ সেখানে এসেছিল। সুজাতার বক্তব্য তিনি এখানেও সমর্থন করেন তবে একটু পুনঃব্যাখ্যা করে নিয়ে। কিন্তু পঙ্কজ নিশ্চয় মানবেন, বাংলাদেশের জনগণ খোদ সংবিধানই বদলে নিতে পারেন, ১৯৯১ সালের মত অমান্য করতে পারেন এমন বহু কিছু। আর গুরুত্ত্বপুর্ণ হল এটা তো বাংলাদেশের জনগণ ও রাজনীতির আভ্যন্তরীণ প্রশ্ন এবং বাংলাদেশের রাজনীতি এই ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে আছে। সেখানে ভারতের কোন একপক্ষের দিকে পছন্দ প্রকাশ মারাত্মক গর্হিত ও এমন “মন্তব্য করাটা ভারতের জন্য ধৃষ্টতার সামিল”। এবং লজ্জার মাথা খেয়ে সুজাতা তাই করেছিলেন।
এই “এরেঞ্জড সাক্ষাতকার” দিয়ে পঙ্কজ তওবা পড়ার ব্যবস্থা করে নিয়েছেন,ফলে বাংলাদেশে তাঁর চাকরি রক্ষা করে তিনি টিকে আছেন। অনুমান করা যায় এই তওবা পড়ার কাজটা সুষমাকে না জানিয়ে পঙ্কজ ঘটান নাই।এতে সুষমার এক সমস্যা মিটল এতে।কিন্তু আরও বড় কালপ্রিট সুজাতা সিং তিনি তো এখনও পররাষ্ট্র সচিব। এখানে সুষমার সমস্যা হল,নিজের মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ছাড়া তিনি বাংলাদেশে আসতে পারেন না। অন্তত খারাপ দেখাবে সেটা। আবার সুজাতার কৃতকর্মের জন্য তিনিও বাংলাদেশে প্রেসের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে যেতেও পারেন। এই সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে সুষমার এই সফর ছিল কংগ্রেসের কৃত পাপ-আবর্জনা থেকে নিজ সরকারকে মুক্ত করার সফর। ড্যামেজ কন্ট্রোলের সফর। তাই,সুষমা নিজেকে এবং সুজাতাকেও বাংলাদেশে মিডিয়া থেকে দূরে রেখেছিলেন। ভারতের মন্ত্রী বা সচিবের বাংলাদেশ সফরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এর আগে কখনই সঙ্গি হন নাই। কিন্তু এবার মন্ত্রী ও সচিব দুজনই আসা সত্ত্বেও তিনি এসেছেন এবং একা এককভাবে প্রেস সামলানোর ভার তাঁর উপরে। সেই সাথে অবশ্য নিয়ে এসেছেন,আসার আগে নিজ সরকারের সবাই মিলে হোমওয়ার্কে সাব্যস্ত করা বক্তব্যটা। সেটাই তিনি সব জায়গায় বলেছেন, -”সরকার সরকারের সাথে কাজ করে” আর সেই সাথে “তারা বাংলাদেশের জনগণের সাথেও কাজ করতে চান”। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট হাসিনা তাদের আগ্রহের বিষয় নয় – একথাটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রকাশ করলেন। অনেকে মনে করতে পারেন এটা জোর করে অর্থ টেনে বের করে ভারতীয় মুখপাত্রের কথা পাঠ করছি। আসলে তা নয়। এর প্রমাণ হিসাবে আগে উদ্ধৃত সুষমার ঐ লিখিত বক্তব্যের আর কিছু অংশ তুলে আনব।
“I am aware that the Indian general elections in April and May this year were followed closely in Bangladesh. I thank you for all the good wishes that we received. These elections were not just the largest democratic exercise in the world. They mark a turning point in the evolution of India’s democratic polity. They were an election of Hope. I stand before you as the representative of a Government that has come to power through an election process, in which, after a gap of nearly 30 years, the people of India have given a clear verdict in favour of a single political party. … My Government’s foreign policy will be based on the principles of developing peaceful and friendly relations with all countries, anchored in enlightened national self-interest. … We know from experience that democracy requires building strong institutions and promoting a culture of tolerance, inclusion and respect for differences. The strength of democracy lies in its ability to manage differences and resolve them through peaceful means. We all espouse same universal values where there can be no place for violence. We will be glad to share our experiences and best practices, if asked to do so.নিজ দায়িত্ত্বের বাংলায় বললে,“ আমি জানি এবছরের এপ্রিল মে মাসে ভারতীয় নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি বাংলাদেশে খুব মনোযোগের সাথে অনুসরণ করা হয়েছে। অনেকে আমাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এজন্য আমি ধন্যবাদ জানাই। এই নির্বাচন কেবল দুনিয়ার এক বৃহত্তম গণতান্ত্রিক চর্চা ছিল না। এটা একই সাথে ভারতের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিকতা পরিমাপে এক মোড় ঘুরানোর মত ঘটনা ছিল। এটা ছিল আশাভরসার নির্বাচন। আমি আপনাদের সামনে সরকারের এক প্রতিনিধি হিসাবে দাঁড়িয়ে আছি যারা একটা নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে; যেটা বিরাট এক ত্রিশ বছরের গ্যাপ, এবারই ভারতের জনগণ কোন একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে পরিস্কার রায় দিয়েছে।…… আমার সরকারের বিদেশনীতি হবে সব দেশের সাথে শান্তিপুর্ণ ও বন্ধুত্ত্বপুর্ণ সম্পর্কে উন্নতি করার নীতিতে অ-সংকীর্ণ করে দেখা (enlightened) জাতীয় স্ব-স্বার্থ অনুসরণ করবে। …… অভিজ্ঞতা দিয়ে আমরা বুঝি গনতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী (রাষ্ট্রীয়) প্রতিষ্ঠান তৈরি আর মতভিন্নতাকে সহ্য করা, সাথে নেবার ও সম্মান করার সংস্কৃতি দরকার হয়। মতভিন্নতাকে সামলানোর এবং শান্তিপুর্ণ উপায়ে তা মীমাংসার সক্ষমতা ভিতর দিয়ে গণতন্ত্রের শক্তি প্রমাণ করা যায়। আমরা কিছু সার্বজনীন মুল্যবোধ ধারণ করি যেখানে সহিংসতার কোন জায়গা নাই। এব্যাপারে যদি চাওয়া হয়, আমরা আমাদের চর্চার ভালমাপের উপায় ও আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো অন্যান্যদের সাথে আনন্দে শেয়ার করতে পারি”।

বিএনপির প্রেস ব্রিফিং
উদ্ধৃতিটা টুকে এনেছি তিনটা অংশ থেকে। সে প্রসঙ্গে কিছু বলার আগে একটা অন্য কথা। খালেদা জিয়ার সাথে সুষমার সাক্ষাতে কি কথা হয়েছে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসম্পর্কে বিএনপির মঈন খান জানিয়েছেন —“বাংলাদেশে গণতন্ত্র অনুপস্থিত। তথাকথিত সংসদ জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত করে না। বিশ্বের সর্ববৃহত্ গণতন্ত্রের দেশ তার প্রতিবেশী দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেখতে চায় কি না,তা আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে”(২৭ জুন প্রথম আলো থেকে)। মঈন খানের এটা খুবই দাসত্ত্বমূলক মনোভাব। যদিও খালেদা ঠিক এই ভাষায় সুষমাকে এই প্রসঙ্গে বলেছেন কিনা জানার উপায় নাই। বলে থাকলে সেটাও দাসত্ত্বমূলক। অর্থাৎ বিএনপি কোন হোমওয়ার্ক করে যায় নাই অথচ মনের ভিতর ভারতের দাসত্ত্বভাব রয়ে গেছে;এরই প্রকাশ এটা। ভারত বাংলাদেশে কেমন অথবা এমন গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেখতে চায় কি না – ভারতকে এই সুযোগ বা অপশন আমরা দিতে পারি না। এটা যেচে ভারতের দাসত্ত্ব নেয়া। দেশ একাজ করতে বিএনপিকে দায় দেয় নাই। বরং বিএনপির দিক থেকে যেটা খাড়া অথচ কূটনৈতিক শোভন কথা হতে পারত -”বাংলাদেশের গত নির্বাচন উপলক্ষ্যে ভারতের বিগত সরকারের নেয়া একপেশে ও পক্ষপাতিত্ত্বমূলক (ইচ্ছা ও সাহসে কুলালে “কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভুত” শব্দ বিএনপি যোগ করতে পারে) অবস্থান আমাদের হতাশ করেছে। এরই ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্র অনুপস্থিত। তথাকথিত সংসদ জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত করে না। ভারতের নতুন সরকার বিষয়টাকে কিভাবে দেখে আমরা জানতে আগ্রহী” -এভাবে বলা যেত। ঠিক এভাবেই বলতে বলা হচ্ছে না,তবে মূলভাবটা অবশ্যই এমনই হতে হত। অর্থাৎ ভারতকে নাক গলানোর কোন অপশন দেয়া নয় বরং তাদের নীতি কি,ওর পরিণতি কি এসম্পর্কে অসন্তুষ্টি জানানো। বিএনপির মত “অবিপ্লবী” দলের পক্ষে ভারতের নীতিতে “হতাশা” জানানো কঠিন কোন কাজ নয়। এটা খুবই স্বাভাবিক কূটনৈতিক রেওয়াজি শব্দ।
টুকে আনা সুষমার উদ্ধৃতির প্রথম অংশঃ এতে স্পষ্টতই সুষমার পরোক্ষে হাসিনাকে নিজেদের মনোভাব বুঝিয়ে দেয়া যে ভারত গণতন্ত্র বা জনগণের প্রতিনিধিত্ত্বের মত কোর বিষয়কে কিভাবে দেখে এবং হাসিনা তেমন প্রতিনিধি নয় সেটাই মনে করিয়ে দেয়া। সুষমার দলের মত ত্রিশ বছর অপেক্ষা করে হলেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশন ধরণের প্রাতিষ্ঠানিকতাগুলোকে দুর্বল করে দেয়া উচিত নয়,জবরদস্তি খাটিয়ে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করা উচিত নয়। ঝিকে মেরে বঊকে শিখানোর মত করে কথাগুলো এভাবেই সুষমা বলে গেছেন।

“enlightened” মোদি
উদ্ধৃতির মাঝের অংশঃ এটা একটাই বাক্যের, এই উদ্ধৃতিটা সাদামাটা কূটনৈতিক বাক্যই তবে একটা শব্দ ছাড়া। শব্দটা হল enlightened national self-interest। বাংলা করেছি,“অ-সংকীর্ণ করে দেখা (enlightened) জাতীয় স্ব-স্বার্থ”। শব্দটা ইন্টারেষ্টিং। যে কোন রাষ্ট্রের কাজই হল স্ব-স্বার্থ মানে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ দেখা, সেজন্যই ওটা রাষ্ট্র। মুখ্যত কেবলমাত্র নিজ ভুখন্ডের জনগোষ্ঠির কমন স্বার্থ দেখভাল করাই ওর কাজ। কিন্তু স্ব-স্বার্থ মানে কি? অনেক সময় আঞ্চলিক স্বার্থের ভিতর নিজের মুখ্য স্বার্থ থাকে সেগুলো সংকীর্ণ চোখে না দেখাই বুদ্ধিমানের, আরও বড় লাভের দিক থেকে দেখার মত চোখ সেখানে খুব গুরুত্ত্বপুর্ণ। এই অর্থে enlightened। শব্দটা প্রয়োগের প্রশংসাই করতে হয়। ছোট মুদি দোকানদারের চোখ থাকে দুএক পয়সার দিক পর্যন্তও। একজন বড় রপ্তানিকারক সফল ব্যবসায়ী হতে চাইলে এত ছোট চোখে চলে না। তাঁর যে ডিষ্টিবিউটর যার মাধ্যমে তার মালামাল খুচরা বাজারে ছড়িয়ে পড়ে তাদেরও স্বার্থের ভিতরে নিজের স্বার্থ দেখে বড় ব্যবসায়ী উতপাদক। ফলে সে ব্যবসায়ীকে enlightened বলা যায় অবশ্যই।
টুকে আনা সুষমার বক্তৃতার শেষ অংশঃ মতভিন্নতাকে জায়গা করে দেয়া, অন্তর্লীন করে নেয়া বা একপাত্রে ধরা -কেন গুরুত্ত্বপুর্ণ সে প্রসঙ্গে এটা সুষমার সবক। এখানে বড় তামাশাটা হল,হাসিনার আওয়ামি লীগ নিজেদের সেকুলার রাজনৈতিক শক্তি বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করে,বিপরীতে বিজেপি সম্পর্কে তাদের রিডিং হল ওটা সাম্প্রদায়িক দল। কিন্তু এখানে সেই বিজেপি সরকারের কাছ থেকেই হাসিনাকে জনগণের প্রতিনিধিত্ত্বের অর্থ কি, গণতন্ত্রের কোর ভ্যলু মতভিন্নতাকে কিভাবে দেখতে হয় এর সবক শুনে যেতে হল।
সুষমার এই সফরকে সামগ্রিক দিক থেকে বলা যায়,কংগ্রেসের বাংলাদেশ নীতির বিপদ ও আত্মঘাতি দিক মোদির বিজেপি উপলব্দি করেছে। কিন্তু অন্য দেশ সফরে এসে তা প্রকাশ্যে খোলাখুলি বলতে পারেনা, বলা যায় না। এটা হাসিনার কারবার নয় যে নিউইর্য়কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মিটিংয়ে গিয়ে বিগত খালেদা সরকারের নীতির বিরুদ্ধে কথা বলবে। কিন্তু তাদের উপলব্দি কি সেটা তারা পরিস্কার করেছে সুষমার ঐ সেমিনারের লিখিত বক্তৃতায়। আর সেই সঙ্গে সামনে এগিয়ে যাবার নতুন নীতির কথা বলে আসলে পুরানো কংগ্রেসের নীতি যে ভুল ছিল সেটাই পরোক্ষে বলে গেলেন সুষমা। মোদি পরিস্কার করেছেন তাঁর স্বপ্ন অনেক উচু। অনেক উচুতে বসে enlightened হয়ে তিনি নিজের স্বার্থ দেখতে পারেন। এটা কংগ্রেসের মত ফাকা বুলি ও আকামের তথাকথিত “ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ” নয়।

ভারতের মিডিয়ায় অসময়ী কংগ্রেসী প্রপাগান্ডা
ভারতের মিডিয়ার কথা দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। এরা মোদির চিন্তা অভিমুখ নীতি কি সেদিকে খবর নাই। সুষমার সফরকে ঘিরে এরা কংগ্রেসের “ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ” নামের নীতি অনুসরণ করে পরামর্শ কলাম রিপোর্ট লিখেই চলেছে। এর কতটা পুরানা অভ্যাস আর কতটা হাসিনা-গওহরের মিডিয়া প্রভাবিত করা বা পেজ কিনে নেবার ক্ষমতা তা আলাদা করা মুশকিল। এমন রিপোর্টেগুলোর মধ্যে ভয়াবহ সীমা ছাড়ানি লেখাটা হল টাইমস অব ইন্ডিয়া। এটা মূলত টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকার এডিটোরিয়াল তাই লেখকের কোন নাম ছাপা হয় নাই। ১৯৭৪ সাল থেকে পেন্ডিং ইন্দিরা-মুজিব সীমান্ত চুক্তি বা ছিটমহল বিনিময় চুক্তি ভারতীয় সুপ্রিম আপিল কোর্টের রায় হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও এখনও লটকে আছে। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা এবার এর বিস্তর আলাপ আলোচনা টেকনিক্যাল কাজ শেষে কেবল ভারতীয় সংসদে পাস হওয়া বাকি। কিন্তু টাইমস অব ইন্ডিয়া সেটাকে আবার নতুন করে ঘোলাটে করার উদ্যোগ নিয়েছে। বলছে, বাংলাদেশের তেতুলিয়া সীমান্তে নতুন করে চার কিলোমিটার করিডোরে দিলে ভারতের পুর্বাঞ্চলে পৌছানোর রাস্তা ৮৫ কিমির মত কমবে তাই মোদির এব্যাপারে বাংলাদেশকে চাপ দেওয়া দরকার। যেন ব্যাপারটা এমন যে ভারত বাংলাদেশকে চাপ দিলেই সব পেয়ে যেতে পারে। তো হাসিনাকে চাপ দিয়ে গোটা বাংলাদেশটাই নিয়ে নিলেই তো হয়? নাকি? যদি প্রশ্ন করা হয় বাংলাদেশ কেন দিবে? একথার পিছনে টাইমসের যুক্তি জ্ঞানবুদ্ধি কি? না সেসব কিছু পাওয়া যায় নাই। দাদাগিরি একটাই কথা ভারতের দরকার। ভারতের দরকার এটাই একমাত্র র্যাাশনালি। এটা কংগ্রেসের দাদাগিরির চেয়ে বড়, মিডিয়া দাদাগিরি।
আবার, দ্যা হিন্দু পত্রিকার ডিপলোমেটিক এডিটর সুহাসিনী হায়দার। তিনিও হিন্দু পত্রিকায় এক উপসম্পাদকীয় লিখেছেন। টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতই বুঝা যায় সুহাসিনীরও মোদির লক্ষ্য নীতি সম্পর্কে তার কিছুই জানা হয় নাই। জানার দরকার অনুভব নাই। বরং এখনও কংগ্রেসের নীতিতে বিভোর আছেন। কংগ্রেস-হাসিনা নীতির পক্ষে মিথ্যা প্রপাগান্ডার সোরগোল তোলাই এর লক্ষ্য। তাঁর লেখা তথ্যের সত্য-মিথ্যায় ভরপুর এবং কষ্ট না করে আওয়ামি পছন্দের লোকে ব্রিফে লেখা এই উপসম্পাদকীয়। যেমন সুহাসিনী লেখার আগেই অযাচিতভাবে ঠিক করেছেন আবার বিএনপি-জামাতের ক্ষমতায় আসা ভারতের স্বার্থের বিরোধী ফলে এটা প্রমান করবেন যে তাদের আগের আমলে ভারতের স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়েছে। সুহাসিনী ২০০৩ সাল থেকে কাহিনী শুরু করেছিলেন। জামাত-বিএনপির ঐ আমলে বাংলাদেশ ভয়াবহ এন্টি-ইন্ডিয়ান সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্র হয়ে গিয়েছিল এর ঘটনাবলির ইতিহাস ধারা বর্ণনা দিচ্ছেন। কিন্তু একথা বলতে বলতে হঠাত বছর সাল পিছিয়ে ২০০১ সালে পদুয়ার ১৬ বিএসএফ জওয়ানের মৃত্যর কথায় চলে আসলেন। কিন্তু সুহাসিনী খবর রাখেন নাই যে পদুয়ার ঘটনা শুধু ২০০১ সালের বলে নয় এটা তাঁর প্রিয় হাসিনা সরকারের আমলেরই ঘটনা। ইণ্ডিয়া টুডে এর ঐ সময়ের এক রিপোর্ট বলছে ২২ এপ্রিল ২০০১ প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে ফোন করে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ির ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ফলে সুহাসিনী যে প্রেমিজের উপর দাঁড়িয়ে তাঁর লেখার যে বিএনপি মানেই ভারতের স্বার্থবিরোধী সন্ত্রাসের বাংলাদেশ এটা ডাহা মিথ্যা কথা। আর ১৬ বিএসএফ জওয়ানের মৃত্যুর ঘটনাকে যদি তিনি ভারত বিরোধী সন্ত্রাসের নমুনা হিসাবে উপস্থাপন করতে চান তবে ঐ সন্ত্রাসের কারিগর হন শেখ হাসিনা। নিশ্চয় এটা তার পছন্দ হবে না। সুহাসিনী আরও বলছেন ২০০৩ সালে বিএনপির-জামাতের আমলে হুজির হেড কোয়ার্টার নাকি হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, আমরা পছন্দ করি আর নাই করি আফগান ফেরত বাংলাদেশিদের ইসলামি রাজনীতিক উত্থান ১৯৯৩ সালের পর থেকে, হুজিও তাদের তেমনই এক সংগঠন ও প্রকাশ। হুজির হামলাগুলো তাই হাসিনার ১৯৯৬-২০০১ পাঁচ বছরের আমলেও ছিল, উদিচী, নারায়নগঞ্জ ঘটনা পর্যন্ত। অর্থাৎ হুজির এই উত্থানের সাথে হাসিনা অথবা খালেদা কার সরকারের আমল এমন কোন তাল মিল রেখে ঘটেছে এমন কোন সম্পর্কই নাই। অর্থাৎ বাংলাদেশের বোমাবাজির ঘটনাগুলো কোন সরকারের আমলে ঘটেছে এর ভিত্তিতে ঐ সরকারের তাতে পৃষ্ঠপোষকতা আছে এমন বয়ান খাড়া করে প্রপাগান্ডা চালাতে চাইলে অভিযোগ করলে হাসিনাও দোষী হবেন। একথা সুহাসিনী খেয়াল রাখেন নাই। ফলে বলা বাহুল্য সুহাসিনীর এই রিপোর্ট মিথ্যা ও বায়াসড অথবা পেজ বিক্রি করার চুক্তিতে এক প্রপাগান্ডা রিপোর্ট।
সুষমার সফর উপলক্ষ্যে ভারতের মিডিয়া রিপোর্টগুলো কমবেশি এরকমই। ব্যতিক্রম হিসাবে চোখে পড়েছে ইংরাজি অনলাইন ফাষ্ট পোষ্ট এর এসএনএম আবদির লেখা আর্টিকেল যেখানে তিনি মোদিকে সাবধানে বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে পরামর্শ রেখেছেন। আর ওদিকে রয়েছে হিন্দুস্তান টাইমসের এক কলাম যেটা থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষক Syed Munir Khasru এর লেখা। এই কলামে তিনি বাংলাদেশের অসন্তুষ্টি এবং স্বার্থক্ষুন্ন হওয়ার ইস্যুগুলো এবং প্রণব বন্দোপাধ্যায়ের দেয়া প্রতিশ্রুতির বরখেলাপের তালিকা – সব তুলে এনেছেন। ওদিকে আর এক আগ্রাসী নীতির ডঃ সুবীর ভৌমিক সুষমার সাথে বাংলাদেশেও এসেছিলেন কিন্তু নির্বাচনের পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ নিয়ে কিছু লিখেছেন চোখে পড়েনি।

শেষের কথা
সামগ্রিক বিচারে সুষমার সফরে হাসিনা বেচতে চেষ্টা করেছেন ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” রক্ষার্থে তিনি কত কিছু করেছেন সেকথা। কিন্তু মোদির চিন্তাভাবনার গতিপ্রকৃতি নীতি কিছুই হাসিনা ষ্টাডি করেন নাই। মোদি আসলে এগুলো কিনতেই আসেন নাই। ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” কিনতে তিনি আগ্রহী নন। এটা তাঁর ফোকাসও নয়। তার ফোকাস আঞ্চলিক অর্থনীতিতে এক বড় ভুমিকা রাখা যেখানে তাঁর লক্ষ্য আরও অন্য অনেক কিছু, দেয়ানেয়ার equitable partner পার্টনার হিসাবে বাংলাদেশ। ফলে বলা বাহুল্য অপ্রতিনিধিত্ত্বের হাসিনাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে কোন মদদে তাঁর ঠেকা নাই। হাসিনা মোদির কাছে নিজ চাহিদার পক্ষে কোন সম্পদ নয়, লায়াবিলিটি। ফলে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সুষমার সফর শেষ হচ্ছে, হাসিনার দিক থেকে অবিক্রিত পসরা মাথায় তিনি হাট থেকে ফিরছেন। আর সুষমার দিক থেকে তাঁর পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং যে ইমেজ ড্যামেজ করে রেখেছিলেন তা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছেন এমন ধারণায় এটা গুড ষ্টার্টার ভাবছেন।।