মোদীর ভারত এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে বদল (২)

মোদীর ভারত এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে বদল (২)

গৌতম দাস


http://wp.me/p1sCvy-91

২৩ জানুয়ারি ২০১৫

 

পরাশক্তি হওয়ার নির্ণায়ক
কোন রাষ্ট্রের পরাশক্তি (সুপার পাওয়ার অথবা গ্লোবাল পাওয়ার বলে যেটা আমরা বুঝাই) খেতাব পাবার নির্ণায়ক কি? অনেকের মনে হতে পারে পারমাণবিক বোমা বানানোর ক্ষমতা আর সে বোমা কোন রাষ্ট্রের সংগ্রহে থাকলেই তাকে বোধহয় পরাশক্তি বলা যায়। আসলে এই ধারণার কোন ভিত্তি নাই। তবু কারও কারও এমন ধারণা থাকে। সেটা তৈরি হবার পিছনের কারণটা হল – কোন রাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা এটা নিঃসন্দেহে তার সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতার একটা মাত্রা ও সেই মাত্রাকে প্রকাশ করা মাত্র। কিন্তু শুধু ঐ একটা মাত্র দিয়ে ঐ রাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা প্রকাশ পায় একথা সত্যি না – ভুল অনুমান এখানে। অর্থাৎ সার কথাটা হল, কেবল পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতাকে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা বলে বুঝা – এটা ভুল। আবার পরাশক্তি ধারণা মানে  কেবল কোন সামরিক সক্ষমতার প্রশ্নও নয়, বরং সামরিকের সাথে ষ্ট্রাটেজিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন এবং সর্বোপরি সব ধরণের সক্ষমতার মূল ভিত্তি হল ঐ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন। কারণ কারও পরাশক্তি হয়ে উঠার প্রথম শর্ত নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হলে, উদ্বৃতের অর্থনীতিতে পৌছালে তা বাকি সামরিক, স্ট্রাটেজিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার পুর্বশর্ত বলে এরপর পরাশক্তি হয়ে উঠা কিছু সময়ের ব্যাপার কেবল। যদিও, এটা ঠিক যে নিজের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র হাতে থাকলে শত্রুর কাছ থেকে বড় বা সর্বাত্মক ধরণের হামলা বা আক্রমণ আসার সম্ভাবনা এটা কমায় মাত্র। আবার শত্রুর উপর এই বোমা ব্যবহার করে পাল্টা হামলা চালানোর সুযোগও একই কারণে খুবই সীমিত হয়ে যায়। যেমন ভারত-পাকিস্তান কখনও কোন বড় বা সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়ায় না একারণেই। দুদেশের হাতেই পারমাণবিক অস্ত্র আছে বলে কেউই যুদ্ধকে বড় করতে বা ছড়াতে চায় না – সীমিত স্তরে রাখতে চায়। কারণ কোন পক্ষ অপর পক্ষের হাতে চরম নাস্তানাবুদ হয়ে গেলে সে অপমাণিত বোধ থেকে এটা তাকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে উস্কানি দেয়া হয়ে যেতে পারে। এছাড়া এই অস্ত্র ব্যবহারের আগে প্রকৃতি ও মানুষের উপর বিকিরণ বিষয়ে পার্মানেন্ট ক্ষতির কথাও বিবেচনায় নিতে হয়। না নিয়ে গত্যন্তর থাকে না। কারণ বিকিরণের প্রভাব তার নিজ ভুখন্ডেও আসতে পারে। ফলে সামগ্রিক বিবেচনায় পারমাণবিক বোমা মূলত আত্মরক্ষামূলক; এবং তাও সীমিত অর্থে।
আত্মরক্ষামূলক কথার আরও মানে হল সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা যাই থাক না কেন, কোন রাষ্ট্রের সে সক্ষমতা তার প্রতিপক্ষের তুলনায় ছাড়িয়ে গেলেও হামলা করার সময় আক্রমণকারী যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করবে। করবে এই ভয়ে যে সেক্ষেত্রে উপায়হীন দেখে আক্রান্ত প্রতিপক্ষ, দুর্বল হলেও, নিজের কাছে মজুদ থাকা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা ভেবে বসতে পারে, সেদিকে যেন উস্কানি দেয়া না হয়। আবার আক্রমণকারী শত্রুরও যদি পারমাণবিক সক্ষমতা থাকে সেক্ষেত্রে উভয় পক্ষই যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করে থাকে, উভয়কেই কড়া সর্তক থাকতে হয় যেন কেউ কাউকে পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে না দেয়। সর্বশেষ ভারত-পাকিস্তান কারগিল যুদ্ধে এই প্রবণতাই দেখা গিয়েছিল। ফলে নিট ফলাফল হচ্ছে পারমাণবিক বোমা সংগ্রহে থাকার কারণে উভয় পক্ষকেই যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করতে হয়, উভয়কেই একটা স্ব-আরোপিত সীমা তৈরি করে ও তা মানতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ পারমাণবিক বোমা প্রয়োগ করে শত্রুকে ঘায়েল বা ক্ষতি করার জন্য নয়, বরং ভয় দেখানো এবং ভয় পাবার দিক থেকে এটা আত্মরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করে।
আবার ২০০১ সালের পরে আমেরিকার আফগানিস্তান বা ইরাক হামলার বেলায় ব্যাপারটা কিছুটা ভিন্ন; ঐক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন নয় যে আমেরিকার পারমাণবিক সক্ষমতা আছে বলেই সে সহজে ঐ দুই দেশকে আক্রমণ করে পদানত ও দখল জারি করতে পেরেছিল। যদিও আফগানিস্তান বা ইরাকের হাতে পারমানবিক বোমা থাকলে ফারাক কিছু হতেও পারত। পারমাণবিক বোমা মূলত ভয় দেখানোর অস্ত্র, যতটা ঠেকিয়ে রাখার অস্ত্র ততটাই তা ব্যবহারের নয়। এসব কারণে, জাপানে ১৯৪৫ সালে এই বোমা ব্যবহারের পর বিশ্বে কোন যুদ্ধ সংঘাতে আর কোথাও এর ব্যবহার হয় নাই। এছাড়া ইদানীং বোমা কেন, পরমাণু এনার্জির ব্যাপারেও প্রত্যেক দেশেই জনগণ যেভাবে শঙ্কিত হয়ে উঠেছে, ব্যবহার-বিরোধী জনমত প্রবল হচ্ছে তাতে বোমা সংগ্রহে থাকলেও তা ব্যবহারের বিরুদ্ধে খোদ নিজ জনগণেরই মনোভাব প্রবল বাধা হয়ে উঠতে পারে, এটা নাকচ করা যায় না। অতএব বাস্তবে এই অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োগ সম্ভাবনা খুবই সীমিত।
আবার আর একদিক থেকে দেখলে, পারমাণবিক সক্ষমতা মানে নুইসেন্স করার ক্ষমতাও বটে; যেমন উত্তর কোরিয়া। সে তার পারমাণবিক সক্ষমতাকে ব্যবহার করছে দেশের ভিতরে ও বাইরে একটা ভয়ের রাজত্ব তৈরির কাজে। একদিক থেকে মনে হতে পারে উত্তর কোরিয়ার শাসক এই বোমার জোরে নিজ সার্বভৌমত্ত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হচ্ছে। কিন্তু আবার অন্যদিক থেকে যদি প্রশ্ন করি, সার্বভৌমত্ব রক্ষা মানে কি? এর অর্থ খুঁজতে ভিতরে ঢুকলে দেখা যাবে, উত্তর কোরিয়ায় এর আসল অর্থ হয়ে আছে নিজ অর্থনীতিকে ক্ষুদ্র বামন করে রাখা, এমনকি বর্তমান ক্ষমতার অধীনেই ন্যূনতম সংস্কার করার আগ্রহ না দেখানো, জনগণের উদ্যমকে দাবিয়ে রাখা, জীবনের মান অচলায়তনে আটকে ধুঁকে ধুঁকে মরা ইত্যাদি। ফলে এগুলো করে কার সার্বভৌমত্ব রক্ষা হচ্ছে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হই আমরা। সবমিলিয়ে দেশের ভিতরে বাইরে সবার কাছেই উত্তর কোরিয়ার বর্তমান ক্ষমতাসীনদের হাতে পারমাণবিক সক্ষমতা অন্যদের চোখে ‘নুইসেন্স’ হিসাবেই হাজির হয়ে আছে। অতএব এখানেও আমরা দেখছি, উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক বোমার অধিকারী বলেই পরাশক্তি হিসাবে গণ্য নয়।
যদিও পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়ে উঠাকেই পরাশক্তির হয়ে উঠা বলে ভুল অনুমানের ধারণা এক সময় বেশ প্রকট হয়েছিল। কিন্তু ইতোমধ্যে নতুন বিশ্ব বাস্তবতায় কোন রাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা বলতে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়া বাদে অন্যান্য দিক বিকশিত করবার দিকে ঝোঁক ক্রমশ বেড়েছে। আগের কিস্তিতে বলেছিলাম সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কোন রাষ্ট্রের কেমন থাকবে কি থাকবে না অথবা তা কতটা হবে এটা মূলত নির্ভর করে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও শক্তি অর্জনের উপর। পারমাণবিক সক্ষমতা তো নয়ই এমনকি সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কথাটাও ঠিক কারও পরাশক্তি হবার পরিমাপক অথবা নির্দেশক নয়। কারণ সামরিক খরচ বইবার মত একটা সামঞ্জস্যপুর্ণ উপযুক্ত ও যোগ্য অর্থনীতি সবার আগে থাকতে হবেই। এর উপরই দাঁড়াতে পারে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কথাটার অর্থ। এক্ষেত্রে এখনকার রাশিয়া এক আদর্শ উদাহরণ। সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে থাকার সময় এর যে সামরিক সক্ষমতা ছিল এখন রাশিয়ান ফেডারেশন হয়ে যাবার পর সে নিজ অর্থনীতির মাপে নিজের আগের সামরিক সক্ষমতাকে ছেঁটে কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। সেটাও বহাল রাখতে পারছে অর্থনীতির ইন্ডাষ্টিয়াল সক্ষমতা্র ভিত্তি দিয়ে নয়, মাটির নিচের তেল-গ্যাস বিক্রির অর্থনীতি দিয়ে, ধুঁকে ধুঁকে।
অতএব, নতুন পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় যে কোন রাষ্ট্রের জন্য সবার আগে দরকার একটা দ্রুত প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি অর্জনের সক্ষমতা নীতি গ্রহণ করা। এর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে সম্পদ বিতরণ ও বণ্টনের নীতি ও কার্যকর ব্যবস্থা যেন আভ্যন্তরীণ সংকট রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে ভেতর থেকে দুর্বল করতে না পারে। এই দুটো দিক অর্জিত হলে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা আসা কোন ব্যাপারই নয়। কিন্তু তারপরও কোন দেশ নিজেকে পরাশক্তি বলে গণ্য নাও করতে চাইতে পারে। অর্থাৎ গণ্য হওয়াটা ঠিক অনিবার্য বা জরুরিও নয়।
মনে রাখতে হবে পরাশক্তি ধারণাটা মূলত ঐতিহাসিক। অর্থাৎ দুনিয়ায় একটা বিশেষ সময়ে বিশেষ শর্তে এই ফেনোমেনা হাজির হয়েছে যেটা ভিন্ন সময় শর্ত পরিস্থিতি এটা উধাও হতে পারে। ফলে অনিবার্য বা চিরন্তন কিছু নয়। দুনিয়ায় কলোনি শাসনের আবির্ভাবের কাল থেকে ধারণাটার উদ্ভব। ধারণাটা মূলত কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল প্রভাব আধিপত্য কেমন এরই এক নির্দেশক। আবার অন্যদিক থেকে নেতিবাচক। আন্তঃরাষ্ট্রীয় লেনদেন বিনিময় সম্পর্ককে কেবল জবরদস্তি খাটানো বিনিময় সম্পর্ক হিসাবে জারি রাখা, জবরদস্তিতে নিজের মতাদর্শগত দিকটা দুনিয়ার অন্য জনগোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দেওয়া, নিজেকেই একমাত্র সভ্যতার ধারক-বাহক, আদর্শ বিবেচনা করা -এগুলো হল পরাশক্তি ধারণাটার ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য। পরাশক্তির এটা খারাপ অর্থ। তবে আগামী দিনের নতুন কোন গ্লোবাল অর্ডারে যদি পরাশক্তি ধারণার প্রত্যক্ষ ও খারাপ অর্থগুলো কমতে কমতে নাই হয়ে যায় তবু এরপর কোন রাষ্ট্রের নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতার উপর ভর করে সামরিক সক্ষমতার সূত্রে গ্লোবাল প্রভাব রাখার বিষয়টা থেকে যাবে, সম্ভবত সহসাই উবে যাবে না।

সম্ভাবনা সম্পন্ন হয়তো, কিন্তু ভারত পরাশক্তি নয়
পরাশক্তি শব্দটার এই স্বল্প ব্যবচ্ছেদ থেকে আমরা এতটুকু স্পষ্ট হতে পারি যে, পরাশক্তি ধারণার বিচারে ভারত কোন পরাশক্তি এখনও নয়। কিন্তু তবু আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভারতকে পরাশক্তি বিবেচনা করার কথা উঠেছে। এর কিছু কারণ নিশ্চয় আছে, সেদিক যাব। যেমন, ২০০৪ সালের মে মাসে কংগ্রেসের ইউপিএ সরকারের প্রথম টার্মে ক্ষমতায় আসার পরের বছর ২৭ জুন ২০০৫, ভারত-আমেরিকা একটা “ডিফেন্স প্যাক্ট” সই করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার সহায়তায় ভারতের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো। এ উপলক্ষে টাইমস অব ইন্ডিয়া ২৯ জুন ২০০৫ এর রিপোর্টিং এর প্রথম বাক্যটা এরকম, “India and the United States have signed a 10-year defence relationship agreement that gives credence to the Bush administration’s pledge to help India become a major world power in the 21st century.” এই বাক্যের ভিতরের পরের অংশটা ইন্টারেস্টিং। বলছে, “ভারতকে ২১ শতকে ‘মেজর ওয়ার্ল্ড পাওয়ার’ বা পরাশক্তি হতে সাহায্য করার যে প্রতিশ্রুতি আমেরিকা দিয়েছিল এই চুক্তি তার পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে”। এখন পরাশক্তি কথার আমরা আসল যে অর্থ, গ্লোবাল অর্থনীতিতে ন্যূনতম শীর্ষ তিন-চার জনের একজন হওয়া -এমন অর্থবোধে গত দশ বছরেও ভারত পরাশক্তি হয়েছে এমন কোন রিপোর্ট অথবা দাবি আমরা কোথাও দেখি নাই। তাহলে এই মিডিয়া রিপোর্টটা এমন কেন? এটা পড়ে অনুমান করা যায় যে অর্থে ভারতের পরাশক্তি হওয়া মানে করা হয়েছে, তাও আবার আমেরিকার সহায়তায়, এটা কারো পরাশক্তি হওয়া বুঝায় কি না? অন্য রাষ্ট্রের সহায়তায় কেউ পরাশক্তি হতে পারে কি না এমন প্রশ্ন বা সন্দেহ এই রিপোর্টে নাই। এছাড়া এই রিপোর্টটা মূলত ভারতকে আমেরিকার সামরিক হার্ডওয়ার ও টেকনোলজি সরবরাহ সংক্রান্ত। অর্থাৎ এতে ভারতের বড়জোর সামরিক সক্ষমতা বাড়বে। কিন্তু তাতে ওয়ার্ল্ড পাওয়ার বা পরাশক্তি হবার সম্পর্ক কি – সে প্রশ্ন করতে মিডিয়া ভুলে গেছে। রিপোর্টের এসব ভুয়া অনুমান উদোম করতে এই রিপোর্ট থেকে আরও কিছু প্রসঙ্গ তুলে আনব।
প্রথমত রিপোর্ট জানাচ্ছে, “Hugely ambitious in its size and scope, the agreement envisages a broad range of joint activities, including collaborating in multinational operations ‘when it is in their common interest,’ ”। অর্থাৎ ঐ ডিফেন্স প্যাক্টে আছে, দুই রাষ্ট্রের কমন স্বার্থ বলে উভয়ে মনে করলেই ‘টেররিজম ধ্বংস’ জাতীয় কোন কিছুর উছিলা তুলে ভারত আমেরিকার সাথে বহুজাতিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে ঐ “টেররিষ্ট” দেশের বিরুদ্ধে লড়তে সম্মতি জানাচ্ছে। এই পত্রিকার রিপোর্ট নিজে অবশ্য চুক্তিতে কেবল এমন অনুচ্ছেদ থাকাকে ভারতের “উচ্চাকাঙ্ক্ষা” হিসাবে দেখছে। আর এই চুক্তি অনুমান করছে এভাবেই নাকি “two militaries to promote security” তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পক্ষে আগিয়ে যাবে। রিপোর্টের আর এক অংশ বলছে, “The framework agreement also envisages what is tantamount to the U.S and India jointly policing the world.”। এখানে পত্রিকা প্রতিরক্ষা চুক্তিটা সম্পর্কে নিজস্ব মন্তব্য লিখে বলছে, যেন ভারত-আমেরিকা যৌথভাবে বিশ্ব-পুলিশের ভূমিকায় নামতে যাচ্ছে। অর্থাৎ বিশ্ব-পুলিশী করার খায়েস রাখার বিপদের দিকটা নিয়ে পত্রিকা আপত্তি তুলছে। তৃতীয়ত, ঐ ডিফেন্স প্যাক্টে সই করেছিলেন, যুদ্ধবাজ বুশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফিল্ড আর ভারতের তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী প্রণব মুখার্জি। চুক্তি স্বাক্ষর শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে প্রণবকে এক রিপোর্টার প্রশ্ন করেছিলেন, এটা “playing a subservient role to a uni-polar US agenda” অর্থাৎ ভারতের দিক থেকে দুনিয়াতে এক মেরুর মাতবর আমেরিকার এজেন্ডার অধীনস্থ হওয়া হয়ে যাচ্ছে কি না। এর জবাবে প্রণব আমেরিকাকে বিশাল ঠকান ঠকিয়ে এই চুক্তি জিতে এনেছে এমন এক মিচকি হাসি দিয়ে বলেছেন, “This is the real deal…we have both put down what we want for the next decade… “he didn’t expect convergence or agreement on all issues at all times.”। তর্জমা করলে, “এটাই তো আসল খেলা, … পরের দশক পর্যন্ত আমরা কি চাই তা উভয়েই ওখানে লিখে রেখেছি।… সব ইস্যুতে সবসময় আমাদের উভয়ের একমত হতে বা মিলতে হবে এটা আমি আশা করি না”। প্রণবের এমন আস্থাবাচক মুচকি হাসির কারণ, ঐ প্যাক্টের আর এক অনুচ্ছেদ হল এরকম, “এই চুক্তি ভারতের স্বতন্ত্র অবস্থান নেয়ার অধিকার খর্ব করে না”। “ The agreement does not preclude India’s right to its independent views.”। এই হোল প্রণবের “ভারত পরাশক্তি” নামক প্রপাগান্ডার ফানুস। তবে ফানুস উড়িয়ে একটা ভাব তো ছড়ানোই যায় যে আমরা এই তো চাঁদে চলে যাচ্ছি। সে যাক, কিন্তু ‘আমেরিকাকে মহা ঠকিয়েছে’ ভাবটা প্রণব বেশিদিন ধরে রাখতে পারেন নি। ভারত প্রথম ধাক্কা খায়, ২০১১ সালের প্রথম অর্ধে যখন বঙ্গোপসাগরে আমেরিকার সপ্তম নৌবহর রাখার পরিকল্পনা প্রকাশ হয়ে পড়ে। স্বভাবতই ওবামার এই ইচ্ছার ভিতরে ভারত এবার খোদ নিজেরই নিরাপত্তার জন্য হুমকি আর বিপদের দিকটা দেখেছিল। ভারত আমেরিকান পরাশক্তির যাঁতাকাঠি ধার পেয়েছিল ২০০৬ সালের শেষ থেকে; বাংলাদেশে কে সরকারে আসবে থাকবে, কি শর্তে থাকবে তা ঠিক করার কর্তা হওয়ার ভিতর দিয়ে। এটাও প্রণবের চোখে পরাশক্তি ভাবার সুখবোধ হতে পারে।

দুই হাজার চৌদ্দ সালের সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে কথাবার্তার পর নরেন্দ্র মোদী ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে মার্কিন কম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। ভারতে প্রতিরক্ষা খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সীমা ছিল ২৬%, সেটা এখন বাড়িয়ে ৪৯% করা হয়েছে। দুই হাজার পনেরো সালে ভারত ও মার্কিন প্রতিরক্ষা চুক্তি শেষ হবার কথা ছিল। মোদীর মার্কিন সফরের পর সেটা আরও দশ বছর বাড়ানো হয়েছে।

কিন্তু ধরাকে সরা জ্ঞান করার ভারতের সেই সুখবোধে টান পড়তে শুরু করে প্রায় একই সময় ২০১১ সাল থেকে। এরই এক প্রকাশ্য রূপ হল, বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে ভারত-আমেরিকার দুই মেরুতে অবস্থান। অর্থাৎ আমেরিকার বিদেশনীতি আর ভারতের বিদেশনীতি হরিহরাত্মার মত একই আত্মা না হলেও “নিরাপত্তা”, “টেররিজম” এসব শব্দের আড়ালে উভয় রাষ্ট্র উভয়কে এভাবে ফাঁকি দিয়ে চলছিল। এই হরিহর মিলনের মধ্যে কোন খটমটর নাই, আসবে না এই ভাব ছড়ানো হয়েছিল। এমন মিথ্যা ধারণাটা উন্মোচিত হয়ে যেতে শুরু করেছিল ২০১১ সাল থেকে। অথচ ভারত ও আমেরিকা দুজনেই জানত যে মূলত আমেরিকার চীন ঠেকানোর ইচ্ছা থেকে এসব ঘটছে এবং ঘটানো হচ্ছে। যদিও আসলে চীন ঠেকানো অসম্ভব এটাই অবজেক্টিভ বাস্তবতা। একেই আগের কিস্তিতে “উদ্বৃত্ত বাস্তবতা” বলেছিলাম। এই বাস্তবতা অস্বীকার করে যতটুকু ও যতদিন আমেরিকা পরাশক্তি হিসাবে নিজের উঁচু জায়গা জাগিয়ে রাখতে পারে সেই উদ্দেশ্য সাধনে সাময়িক সে ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল। কিন্তু উভয়েই এই জানা জিনিষটা লুকানোর ভাব ধরেছিল। বিশেষত ভারত ভাব ধরে ছিল যে সাদা চোখে ধরা পড়া জিনিষটাও সে দেখেও দেখে নাই। যেন এটাই তার পরাশক্তি হবার পথ, যেন আমেরিকা তাকে পরাশক্তি হতে সহায়তা করছে, এই ধারণা প্রণবের সরকারই মিডিয়াতে ছড়িয়েছিল।

আজকের দুনিয়ার মুল দ্বন্দ্ব
আজকে চীন আমেরিকার প্রতিযোগিতা দ্বন্দ্বের মুল বিষয় হল, আগামি গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার কে নিয়ন্ত্রণ করবে? একালেও ব্রিটেনের সাথে আমেরিকার ছোটখাটো স্বার্থবিরোধ দ্বন্দ্ব আছে কিন্তু এই দ্বন্দ্ব তুলনায় তেমন একেবারেই কিছু নয়। তবে এককালে, ব্রিটেন ও আমেরিকার সত্যিকারের একটা বড় দ্বন্দ্ব ছিল, যা ক্রমশ চরমে উঠা আর ফয়সালার সময়কাল ছিল দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়টা (১৯১৪-১৯৪৪), এই ত্রিশ বছর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উপনিবেশিক সাম্রাজ্যের কর্তা হিসাবে ব্রিটেনের পতন ও পরাজয় নিশ্চিত করে আমেরিকার মাতব্বরিতে নতুন গ্লোবাল অর্ডার সাজিয়ে নেয়া হয়েছিল। যদিও বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে হাজারো বই-পুস্তক সিনেমায় হাজির বয়ান আছে। যেখানে যুদ্ধের মুল প্রতিপাদ্য হল হিটলারের জার্মানি, ইটালি বনাম বাকি পশ্চিমা শক্তি – যেন এমন এক “ন্যায়ের যুদ্ধ” সেটা। জেনারেলদের বীরত্বের এক এক গাথা সেগুলো। কিন্তু কোন বর্ণনায় যেটা বলে না তা হল, ঐ যুদ্ধের সবচেয়ে নির্ধারক তাতপর্য। তা হল, সারা দুনিয়াকে উপনিবেশ বা কলোনিতে ভাগ করে নেয়া, এক একটা সাম্রাজ্যের অধীন করে রেখে দেয়া আর শিরোমনি হিসাবে থাকা বৃটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা সীমিত বিকশিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারটা ঐ বিশ্বযুদ্ধ শেষে হস্তান্তর হয়ে আমেরিকার হাতে চলে যাওয়া। সেটা ছিল আমেরিকার দিক থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণে -এই প্রথম জাতিসংঘ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ইত্যাদি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিকতা দিয়ে এক নতুন গ্লোবাল অর্ডার সাজিয়ে নেয়া আর নিজের পরাশক্তিগত উত্থান। অর্থাৎ আগে বৃটিশ সাম্রাজ্যের নেতৃত্বে নড়বড়ে অবিকশিত এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার ছিল কিন্তু এর কোন আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তো ছিলই না। এমনকি কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও ছিল না, ছিল Rothschild family এর পারিবারিক ব্যাংকের মত কিছু প্রতিষ্ঠান মাত্র। এসবের বিপরীতে কায়েম হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে এক প্রাতিষ্ঠানিক গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার। তবে তা ছিল তখনকার “উদ্বৃত্ত বাস্তবতায়” আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতার জোরে, সামরিক বা গায়ের জোর দেখিয়ে নয়। আর, ব্রিটেন সেকালের উদীয়মান শক্তি আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজের পুরানা কলোনি ব্যবস্থা অর্থাৎ তখনকার গ্লোবাল অর্ডারকে টিকানো বাস্তবত অসম্ভব ছিল বলে কিছুই করতে পারে নাই। তবে পরাজিত হবার পর ব্রিটেন আবার আমেরিকার নেতৃত্বে যে নতুন গ্লোবাল অর্ডারটা খাড়া হল সেখানে আমেরিকার খুবই ছোট পার্টনার হয়ে আমাদের মত ছোট অর্থনীতির উপর রুস্তমির ভাগ যতদূর পায় তা টুকিয়ে সেই থেকে দিন চালাচ্ছে।

আজ চীন আমেরিকার প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব ১৯৪৪ সালের ব্রিটিশ-আমেরিকান প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বড় দ্বন্দ্বের মতই। দ্বন্দ্বটা একই ধরণের, পুরান ঢলে পড়া গ্লোবাল অর্ডার বনাম আসন্ন নতুন গ্লোবাল অর্ডার; এর নিয়ন্ত্রণ করবে কে –সেটাকেই আমরা আর এক অর্থে মাতবর বা পরাশক্তি হবার লড়াই বলছি। আজ চীন আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারটা চ্যালেঞ্জ করে ফেলেছে। এটা ভেঙ্গে দিয়ে নিজের নেতৃত্বে নতুন গ্লোবাল অর্ডার কায়েম করতে চাইছে। দ্বন্দ্বের সারকথা এটাই। ফলে চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব লড়াইয়ের মুখে আমেরিকা ভারতকে পাশে রাখতে চায় যাতে ভারত চীনের সাথে নতুন গ্লোবাল অর্ডার খাড়া করবার সহযোগী সাথী না হয়ে ওঠে। সে লক্ষ্য হাসিল করতে আমেরিকা ভারতকে পরাশক্তি হবার মিথ্যা লোভ দেখিয়েছে। মিথ্যা এজন্য যে, পরাশক্তি হওয়াটা কারও সহযোগিতায় পাওয়া না পাওয়ার উপর নয় বরং আপন অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করার উপর নির্ভর করে। ফলে বিষয়টা দাঁড়িয়েছে আমেরিকা প্রলুব্ধ করেছে আর প্রণবের কংগ্রেস সে লোভে মশগুল থেকেছে। এভাবেই স্বপ্ন দেখতে দেখতে কংগ্রেস ইউপিএ সরকারের দশ বছর পার হয়েছে। আর সেই থেকে ভারত একটা পরাশক্তি এমন ভুয়া ধারণা মিডিয়ায় খামাখা চালু হয়ে রয়েছে।

আগে বলেছি ভারতের সামরিক শক্তিতে শ্রীবৃদ্ধি হলেও এর মানে তার পরাশক্তি হওয়া নয়। তাছাড়া মুল কথা, কোন রাষ্ট্র কাউকে সহযোগিতা দিয়ে পরাশক্তি বানিয়ে দিতে পারে না। তবু সামরিক হার্ডওয়ার টেকনোলজির আকাঙ্ক্ষা ও লোভে ভারত আমেরিকার এই প্ররোচনায় পা দিয়েছে। তাও হয়ত হতে পারে। কিন্তু, আমেরিকা কি চীন ঠেকাতে গিয়ে ভারতকে পরাশক্তি হবার সম্ভাবনা বাস্তব করে তুলতে পারে? অর্থাৎ আমেরিকা যদি চীনের পরাশক্তি হওয়া খর্ব করতে চায় সেই আমেরিকা আবার আর এক পরাশক্তি হতে ভারতেকে কি সহযোগিতা আদৌ করতে পারে? কেন করবে? জবাব হল করতে পারে না, কোন কারণ নাই। তবু ভারত সেটা বিশ্বাস করে যে সে পরাশক্তির হতে চলেছে বা হয়ে গয়েছে। এমন স্বপ্নে দিল্লী বিভোর থেকেছে।

তাহলে সারকথা, ভারতের পরাশক্তি হবার আকাঙ্ক্ষা থাকতেই পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সঠিক মৌলিক করণীয় কাজ হল সবার আগে অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করা, সবার আগে অর্থনীতি ফোকাস করে এগিয়ে যাবার নীতি গ্রহণ করা। “নিরাপত্তার” নামে বাকচাতুরি, আমেরিকাকে ফাঁকি দিতে পারছে মনে করা -এগুলো আসলে নিজেকেই ফাঁকি দেওয়া, সদর রাস্তা থুয়ে ব্যাকডোরে কাজ হাসিল করার মত শর্টকাট কাজ – পণ্ডশ্রম। আবার অন্যদিকে প্রণবের কংগ্রেসের দশ বছরে সর্বোচ্চ জিডিপি ছিল একমাত্র ২০১০ সালের প্রথম দুই মাস, ডাবল ডিজিটে। এরপর এটা পড়তে পড়তে কংগ্রেসের বাকি আমল ছিল পাঁচের নিচে। গত বছর কংগ্রেসের পতনের পরে, এসবের বিপরীতে যা কিছু বুঝে বা মনে করেই হোক মোদীর ভারতের উত্থান অর্থাৎ অর্থনীতি ফোকাস করে নিজের আগানোর নীতি নির্ধারণ স্বভাবতই সঠিক পদক্ষেপ। যদিও মোদী আমেরিকার সাথে ডিল করবে কি করে সে প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিতই রয়েই গেছে।

জুন-সেপ্টেম্বর মোদীর ক্ষমতার প্রথম চার মাসের পরে
আগের কিস্তিতে বলেছিলাম বিগত কংগ্রেসের শেষ কাল থেকে আমেরিকার সরে গেলেও ‘পরাশক্তি ভাব’ ধরা ভারতের তিতে বলেছিলাম বিগত কংগ্রেসের শেষ কাল থেকে আমেরিকার সরে গেলেও ‘পরাশক্তি ভাব’ ধরা ভারতের গোয়েন্দা-আমলাদের মানসিক আমোদ, আদর্শ এবং সুখবোধের উৎস হয়ে থেকে গেছে। আমলাদের এমন মনোগাঠনিক প্রভাব সত্ত্বেও মোদি নিজেকে পরিচালিত করতে সুযোগ পেয়েছিলেন প্রথম চার মাস। এর মধ্যেই ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে ওবামার সাথে শীর্ষ বৈঠকের সময় ঘনিয়ে আসে। ফলে আমেরিকার সাথে ভারতের সামরিক হার্ডওয়ার পাবার বিষয়সহ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সামনে আসে, গোয়েন্দা-আমলাদের মনোগাঠনিক প্রভাবের বাইরে মোদি আর থাকতে পারেন নাই। এর সম্ভাব্য কারণ, মোদী এবং তাঁর টিম ভারতকে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাব্য যে পথে পরিচালিত করতে চান এনিয়ে স্বপ্ন পরিকল্পনায় যতটা হোমওয়ার্ক করেছেন ততটা সময় আমেরিকার সাথে ডিলিং এর বিষয়ে দিতে পারেন নাই। এর কারণ ভারত-আমেরিকার দেনাপাওনার ফোকাস সিম্পল অর্থনৈতিক নয়। এছাড়া ভারতের চাওয়াগুলো কি করে আদায় করবেন, এমনকি তা কোন জায়গায় রেখে কংগ্রেস সরকার বিদায় নিয়েছে সেখান থেকে এর বাধাগুলো চিহ্নিত করা এবং উত্তরণের পথ কি হতে পারে এনিয়ে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তার টিমকে স্টাডির কাজ দিয়ে হয়ত শুরু করতে হত। আর মুখ্য বিষয় কংগ্রেসের অকেজো “নিরাপত্তা” লাইনের বদলে নিজের “অর্থনীতি” লাইনে চলতে চাইলেও আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের সামরিক হার্ডওয়ার পাবার বিষয়সহ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সেই একই রয়ে গেছে।
ওদিকে নতুন গ্লোবাল অর্ডার যা ভারতেরও অর্থনৈতিক স্বার্থ, তা নির্মাণে BRICS ও AIIB মত প্রতিষ্ঠানগুলো গড়তে মোদী কি চীনের মতই পাশে থেকে সক্রিয় উদ্যোগ নিবেন? নাকি আমেরিকার প্ররোচনায় সেই উদ্যোগে গড়িমসি করে বিনিময়ে আমেরিকার থেকে নিজের অমীমাংসিত স্বার্থগুলো আদায়ে একে ব্যবহার করবেন? বিগত কংগ্রেস এই বিনিময়ের লাইন বজায় রেখে এগিয়েছিল, যদিও বাস্তবে তাতে ভারতের কোন স্বার্থই হাসিল হয়নি, কোনদিকে তেমন ফল দেয় নাই।

সমান মালিকানা শেয়ার, সমান ভোট ফলে মতামতের সমান ওজন
দ্বিতীয় আর এক দোনোমনা অবস্থা ভারতের রয়ে গেছিল। BCIM অথবা BRICS গড়ার প্রশ্নে। যেসব প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত বা নতুন সিস্টেম গড়ার প্রাইমারি মূলধন বিনিয়োগের প্রশ্ন ছিল সেখানেই চীনের শেয়ার যাতে কোনভাবেই বেশি না হয় তা ঠেকানোর বিষয়টাকে মুখ্য বিবেচনা করে এগিয়েছে। অন্যভাবে বললে ভারত এমন নিয়ম আরোপের পক্ষে কাজ করেছে যাতে উদ্যোক্তাদের সবার বিনিয়োগ সমান হতে হবে, এই নিয়ম আরোপের পক্ষে যুক্তি তুলেছিল। বাস্তবে যে কথার মানে হল, BCIM অথবা BRICS প্রতিষ্ঠানগুলো আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্যারালাল প্রতিদ্বন্দ্বী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাঁড়াতে নিজস্ব প্রাইমারি মূলধন চাহিদা যাই থাক এবং তা পূরণের চাহিদা সম্মিলিতভাবে থাক আর না থাক, তাকে ছেঁটে ভারতের নিজের নিচু বিনিয়োগ ক্ষমতার মাপের সীমায় আটকে বামন ও অকার্যকর করে রাখা। ফলাফলে এগুলো প্রভাবশালী কার্যকর প্রতিষ্ঠান হোক না হোক তা ভারতের বিবেচনার বিষয় নয়। অথবা সেকেন্ডারি বিবেচনা। একথা ঠিক আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের গঠন নীতি অনুসারে, ওসব প্রতিষ্ঠানে আমেরিকান শেয়ার সবার চেয়ে বেশি বলে, যে কোন বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাধারণ মালিকানা নীতি অনুসারে মালিকানা শেয়ার যার বেশি মানে ভোটের ক্ষমতা তার বেশি, মানে তার নিজের অবস্থান মতামতের ওজন অন্য সবার চেয়ে বেশি। এর ফলাফলে এগুলো হয়েছে আমেরিকান স্বার্থে কান্নি মারা প্রতিষ্ঠান। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের গঠন নীতি অনুসরণে নতুন করে BCIM অথবা BRICS গড়তে গেলে তা একই সমস্যার জন্ম দিবে। ফলে ভারতের উদ্বেগ জেনুইন। কিন্তু এই উদ্বেগের সমাধান করবার ফর্মুলা কোনভাবেই উদ্যোক্তা মালিকানা সবার শেয়ার সমান করে দেয়া হতে পারে না। কারণ এর অর্থ তাতে প্রতিষ্ঠানগুলো বামন ও অকার্যকর করে রাখা হবে। ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাপ মানে ততোধিক নিচু মূলধন বিনিয়োগের ক্ষমতা। মনে রাখতে হবে আমরা এই প্রাইমারি মূলধন বিনিয়োগ বলতে বাণিজ্যিক বিনিয়োগের কথা বলছি না। এটা অবকাঠামোগত অথবা নতুন অর্থনৈতিক সিস্টেম গড়ার প্রাইমারি বীজ-পুঁজির কথা বলছি। যে বিনিয়োগের লক্ষ্য মুনাফা নয়, এই বিনিয়োগ থেকে মুনাফা আসবে আধা পার্সেন্টের নিচে অথবা হয়ত কোন মুনাফাই নয় এমন। ফলে ভারতের এমন বিনিয়োগ সক্ষমতা বাণিজ্যিক বিনিয়োগ সক্ষমতার চেয়েও কম হবে। তাহলে আমাদের এই পথে নয়, অন্য সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। অর্থাৎ ভারতের উদ্বেগ অস্বস্তি জেনুইন, কিন্তু সমাধানের প্রস্তাবনা নয়। কি হতে পারে সম্ভাব্য সমাধান?
মালিকানা শেয়ার ভিত্তিতে ভোট বা বক্তব্যের ওজন – সিদ্ধান্ত ও পরিচালনা নীতি এমন না করে সদস্যদের মালিকানা শেয়ার অবশ্যই অসমান হবে আর তা যার যাই হোক, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি যদি হয় কনসেনসাস বা ঐক্যমত্য এবং অবজেক্টিভ টেকনিক্যাল সিদ্ধান্ত বিবেচনা তাহলে সহজেই এই সমস্যার একটা সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে। অর্থাৎ কারও মালিকানা ভোটকে তার অবস্থান বক্তব্যের ওজন থেকে বিচ্ছিন্ন করা। অবস্থান মতামতকে নিজ মেরিটে গুরুত্বপূর্ণ বা প্রভাবশালী হতে হবে, ভোটের ক্ষমতার জোরে নয়। এটা করতে পারলে প্রধান সুবিধা যা পাওয়া যাবে তা হল, চীনের হাজির প্রবল বিনিয়োগ সক্ষমতাকে BCIM অথবা BRICS ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়তে পরিপূর্ণভাবে সদ্ব্যবহার করা। যেটা BCIM অথবা BRICS বা AIIB এসব প্রতিষ্ঠানকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মত প্যারালাল সমতুল্য প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হিসাবে হাজির করতে পারে। ঠিক এরকম অন্য কারও কোন প্রস্তাবও হতে পারে। কিন্তু মূলকথা, মালিকানা ভোটের ভয়ে নব প্রতিষ্ঠানগুলোকে বামন করে রাখা যাবে না। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বিপরীতে নতুন কিন্তু বামন প্রতিষ্ঠান করা আর না করা সমান। কোন অর্থ হয় না তাতে।
প্রণবের বিপরীতে মোদীর ভারত কি এসব দিকে ভাবতে রাজি? আমরা একেবারেই নিশ্চিত নই। আমরা অপেক্ষা করছি। মোদী সম্পর্কে মূল্যায়নে শেষকথা বলার সময় এখনও আসেনি। আর তাঁর “অর্থনীতি” ফোকাসের নীতির কারণে এই নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মোদীর পক্ষে এমন চিন্তা করা অবশ্যই সম্ভব হলেও তিনি তা করবেন, তাঁর গোয়েন্দা-আমলাদেরকে পিছনে ফেলে আগাতে পারবেন এতদূর এখনই বলা ঠিক হবে না। তবে আরও কিছু ফেভারেবল দিক আছে; যেমন, চীনের প্রতি তাঁর সাধারণ মনোভাব অন্তত প্রণবের মত নয়। আমেরিকার প্রতি সাধারণ মনোভাবও অন্তত প্রণবের কংগ্রেস বা ভারতের গোয়েন্দা-আমলাদের মত নয়। আমেরিকা ভারতকে একটা “পরাশক্তি ভাব” দিবার সক্ষমতা বাস্তবতায় থাক আর না থাক তাকে ঢলে পড়তে হবে, না দিলে আবদার অথবা আকাঙ্ক্ষার সুখবোধে বিভোর থাকতে হবে – এমন একেবারেই নয়। তবুও মোদীর অবস্থান দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ওবামার সাথে মুলাকাতের প্রথম পর্ব মোদীর শেষ হয়েছে গত বছরের সেপ্টেম্বরে। তাতে মোদীর ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের অমীমাংসিত এবং জট পাকিয়ে যাওয়া ইস্যুগুলোর সাথে সাক্ষাত বাস্তবতার সাথে পরিচিত হয়েছেন। আমরা অনুমান করতে পারি, আমেরিকার সামরিক হার্ডওয়ার টেকনোলজি পাবার বিষয়ে তিনি যতদূর নমনীয় হওয়া সম্ভব হবেন। কিন্তু সেটা BRICS বা AIIB এসব প্রতিষ্ঠানকে অকেজো করে রাখার বিনিময়ে নয়। এই ভরসা রাখছি এজন্য যে শেষ বিচারে মোদী তাঁর অর্থনীতি” ফোকাস থেকে সম্ভবত কোনভাবেই সরবেন না। কারণ তাঁর “অর্থনীতি” ফোকাস আকাঙ্ক্ষাকে জীবিত রাখতে চাইলে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব তাঁর চেয়ে ভাল আর কে বুঝে। এই পটভূমিতে ওবামা এমাসেই ভারত সফরে আসছেন বিশেষ দাওয়াতি হিসাবে। ভারতের “প্রজাতন্ত্র দিবস” মানে কনষ্টিটিউশন গৃহীত হবার দিন, ২৬ জানুয়ারি উৎযাপনে, প্রধান অতিথি হিসাবে। থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অবজারভার হিসাবে খ্যাত সি রাজামোহন এটাকে বলছেন ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের দিক থেকে মোড় ঘুরার সফর। অর্থাৎ ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে যে দোলাচল আছে তা অনেকটা থিতু হবার সফর। তিনি একটা বিশেষ দিকে নজর এনেছেন যার সারকথা হল, গত সেপ্টেম্বরের মোদীর সফরের সময় ওবামা-মোদী উভয়ে তাদের আমলা প্রশাসনের অবস্থান মতামতকে পিছনে ফেলে বাণিজ্য বিষয়ে ঝগড়ার মীমাংসা করেছিলেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, পত্রিকায় তিনি লিখছেন, … suggests that the two leaders had personally driven their bureaucracies to bring the dispute on trade facilitation to an end.। ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে সামরিক ইস্যু ছাড়াও অন্য মুল ইস্যু হল WTO সম্পর্কিত বাণিজ্য সুবিধাদি নিয়ে বিতর্ক। অর্থাৎ আমলা প্রশাসনের মতামতের ভিত্তিতে পুরাপুরি পরিচালিত না হয়ে বরং এর উপরে নিজেদের রাজনৈতিক বিবেচনাকে স্থান দেবার একটা চল মোদী-ওবামা উভয়ের মধ্যে আছে। এই বিচারে ওবামার এই সফর থেকে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক কোথায় গিয়ে থিতু হচ্ছে এর আরও কিছু অগ্রগতি এখানে আমাদের দেখতে পাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও রাজামোহনের দৃষ্টিতে এই সফরকে দেখার করার দরকার নাই। মনে রাখতে হবে, তিনি ভারতকে আমেরিকার “ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার” হিসাবে দেখতে চাইবার লোক। এখানে “ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার” কথাটা ভাঙলে এর সারার্থ, চীন বিরোধী হয়ে ভারত-আমেরিকার আগানোর ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ জোট।

নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রতি প্রণব মুখার্জির দৃষ্টিভঙ্গী
প্রণবের বিপরীতে মোদীর ভারত কি এসব দিকে ভাবতে রাজি? সে প্রসঙ্গে যাবার আগে পুরানা গ্লোবাল অর্ডারের প্রতি প্রণবের মনোভাব সম্পর্কে কিছু কথা বলে নেয়া যাক। এটা শুধু প্রণবের মনোভাব নয় বরং বিগত কংগ্রেসের সরকার যে রাজনৈতিক লাইন অনুসরণ করেছে তা হল – ভারত চীনের সাথে এসব প্রতিষ্ঠান গড়তে চলে যেতে পারে আমেরিকাকে এই ভয় দেখিয়ে এটাকে জিম্মির বুটি বানিয়ে এ থেকে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা। সারকথায় পুরানা গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারটার আয়ু আরও লম্বা করে দেওয়া। যেমন, ভারতের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি হয় নি সেটা বিবেচ্য না, কিন্তু ভারতের লোভ বর্তমান জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে চীন বা আমেরিকার মতই ভেটো মেম্বার কিভাবে হওয়া যায়। আর এই লোভের কথা টের পেয়ে আমেরিকারও তাকে মুলা ঝুলিয়ে নাচিয়ে বেড়াচ্ছে। এই মিথ্যা লোভের তীব্রতা বুঝার জন্য ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে হাসিনার প্রথম ভারত সফরে মনমোহন-হাসিনার যে ৫১ দফা যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষর হয়েছিল এর ৪৮ নম্বর দফা দেখা যেতে পারে। ঐ দফা বলছে, “ভারতের ভেটো মেম্বার হবার খায়েসে বাংলাদেশ ভারতকে সমর্থন করে”। অর্থাৎ এর অর্থ হল, প্রণবের ভারত কল্পনায় নিজেকে এমন এক আগামী দুনিয়ার স্বপ্ন দেখে যেখানে আদতে পুরানা গ্লোবাল অর্ডারটাই থাকবে আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম ভারতকে চীন ঠেকানোর পুরস্কার হিসাবে তাদের স্বার্থে সাজানো গ্লোবাল অর্ডারকে টিকিয়ে রাখে এমন জাতিসংঘের মত প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের মতই সমান গ্লোবাল ক্ষমতায় ভারতকে পাশে বসাবে। এভাবে পুরান ময়লার ভিতরে প্রণবের ভারত নিজের ভবিষ্যৎ দেখে, এর বেশি ভাবতে পারে না। এটা ভারতের কংগ্রেস নেতৃত্বের চিন্তা-প্রতিবন্ধতার সমস্যা, তারা স্বপ্ন দেখতেও শিখেনি। তারা জানতে শিখতে খবর করতে এখনও অক্ষম যে ১৯৪৪ সালে কোন শর্ত বা পরিস্থিতিতে পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এসব গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো আমেরিকা গঠন করে নিতে পেরেছিল। কাদের মধ্যে ভেটো ক্ষমতা ভাগ করে নেয়া হয়েছিল, কেন তা সম্ভব হয়েছিল। এ সম্পর্কে স্টাডি করে সেটা না বুঝলে এটা বুঝা যাবে না এই অর্ডার ভেঙ্গে পড়বে কেন এবং কখন। কোন্‌ আলামত দেখলে তা বুঝা যাবে। অথবা কেন তারা আজ গ্লোবাল অর্ডারের পড়তি দশায় ভারতকে তাদের সমান আসনে বসাবে অথবা আদৌ বসিয়ে দিতে পারে কি না। একদম মৌলিক প্রশ্ন – জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা কি কেউ কাউকে অনুগ্রহ করে অথবা চীনকে জিম্মি করার বুটি হিসাবে দিবার বিষয়? নাকি নিজেই নতুন গ্লোবাল অর্ডার গড়ে নিজেই তা নিবার বিষয়? প্রণবের কংগ্রেস চিন্তা কতবড় নাবালক এরই প্রমাণ এগুলো। ভারতের ভেটো সদস্য হবার স্বপ্ন দেখাটা শুধু স্বপ্ন অর্থ কোন সমস্যার নয়। কিন্তু চিন্তার দেউলিয়াত্ব বা সমস্যা হল, নতুন গ্লোবাল অর্ডার গড়ে উঠার উদ্যোগে সামিল না হয়ে বরং আমেরিকার অনুগ্রহে পাবার চেষ্টা আর পুরান অর্ডারের ময়লা ঘেঁটে এর মধ্যেই নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপায় মনে করা। তারা ভুলে থাকতে চায় অথবা খেয়াল করেই হয়ত দেখেনি যে, আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম ভারতকে তাদের সমমর্যাদা দিবার লোভ দেখানোর অর্থ কি? এটা কি পশ্চিমের নিজেদেরই ঢলে পড়া গ্লোবাল অর্ডারে নিজেদের গুরুত্ব বা মর্যাদাকে চ্যুত করা নয়? সারকথায় পশ্চিমের উপস্থিত সমস্যা হল, পুরান গ্লোবাল অর্ডারের পড়ে যাওয়াটাকে কি করে ঠেকানো যায় অথবা অন্ততপক্ষে দেরি করিয়ে দেয়া যায়। সেই দশায় সে কাকে কি দিতে পারে? কেন দিবে? আমাদের সৌভাগ্য যে প্রণবের এসব এবসার্ড স্বপ্ন তাদের সরকার ক্ষমতা থাকা অবস্থাতেই অকেজো, ফলহীন বৃক্ষ হয়ে হাজির হয়ে গিয়েছিল। তাসের ঘরের মত প্রণবের স্বপ্নের ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক নন-ফাংশনাল হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এটা আজ প্রমাণিত যে এই লাইন অনুসরণ করে ভারতের পাতে কিছুই আসেনি। আমেরিকার সাথে তার জমে উঠা দূরে থাক, এশিয়ায় আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থকে জায়গা করে দিতে গেলে এখন খোদ ভারতের মৌলিক স্বার্থ জলাঞ্জলি যায় এটা আজকের বাস্তবতা। ফলাফলে আমেরিকার সাথে মনোমালিন্য আর ঝগড়া তুঙ্গে নিয়ে কংগ্রেস ভারতের ক্ষমতাকাল শেষ করেছিল।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, প্রণবের এই অবাস্তব ও অকেজো আমেরিকান অনুগ্রহ পাবার স্বপ্নের বলয়ের মধ্যেই বাংলাদেশে শেখ হাসিনার রাজনীতি ঘুরপাক খেয়েছে। হাসিনা-প্রণব সম্পর্কের গভীরতা বাংলাদেশকে দিল্লি হয়ে মার্কিন অনুগ্রহের মধ্যে রাখা সম্ভব হয়েছিল, ঢাকা ওয়াশিংটনের বিভিন্ন ইস্যুতে দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও। প্রণবের দিল্লি বোঝাতে চেয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার দায় দিল্লির, বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন মনোমালিন্য সেই ক্ষেত্রে বড় কোন সংকট হয়ে ওঠে নি। প্রশ্ন হচ্ছে দিল্লীর মার্কিন অনুগ্রহ পাবার মধ্যে বাংলাদেশের স্বার্থ কি? সেটা বোঝা যাবে ভারতের মনমোহনের সাথে শেখ হাসিনার যৌথ ঘোষণার মধ্যে। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে যা স্বাক্ষরিত হয়েছে। অর্থাৎ হাসিনার ক্ষমতায় আসার প্রায় ঠিক একবছর পর। এটা ভারতের সমর্থনে হাসিনার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার স্বপ্ন, হাসিনা মানে দিয়েছিলেন যে তার স্বার্থই বাংলাদেশের স্বার্থ। এমনকি দল হিসাবে এটা আওয়ামী লীগের স্বার্থ এটাও অনিবার্য ধরে নেয়ার কারণ নাই। প্রণবের সরকারের আয়ু-দশাতেই এটা প্রমাণিত যে প্রণব ও কংগ্রেসের স্বপ্নটাই অবাস্তব। ইতোমধ্যে ভারতে সরকারই বদলে গিয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা এখনও সে পথেই আছেন। ভারতের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যে সকল বিষয় ভারতের স্বার্থে যায় তাকেই হাসিনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানদণ্ড মেনে সিদ্ধান্ত দিয়ে যাচ্ছেন।। এই ভরসায় যে দিল্লী তাতে অনুরাগ বোধ করবে এবং মূল্য হিসাবে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা ভারতের স্বার্থ হয়ে উঠবে। প্রণব যেমন ছিলেন, এখন মোদীও যেন হাসিনার পক্ষে ভারতের সমর্থন নিয়ে হাজির হন বা হবেন। কিন্তু এর মিসিং লিঙ্ক হল, প্রণব বা কংগ্রেস সরকার ক্ষমতাচ্যুত। যদিও একই চিন্তার লাইনের গোয়েন্দা-আমলারা রয়ে গেছেন। কিন্তু মোদী কি গোয়েন্দা-আমলাদের দ্বারা প্ররোচিত প্রভাবিত হবেন? এখনও কিছুই স্পষ্ট নয়। আপাতত এতটুকু বলা যায় যে মোদীর সরকার পরিচালনা নীতি স্পষ্টতই সেদিকে নয়। মোদী প্রণবও নন।

[এই রচনা প্রথমে চিন্তা ওয়েবে ছাপা হয়েছিল এখানে গত ১৮ জানুয়ারী ২০১৫। এখন এখানে আরো আপডেটসহ আবার এডিট করে ছাপা হল।]

 

মোদির ভারত এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে বদল

মোদির ভারত এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে বদল

গৌতম দাস

১২ জানুয়ারি ২০১৫

http://wp.me/p1sCvy-8C


MODI & Globe
পুঁজির গোলকায়ন দুনিয়ার অর্থব্যবস্থায় মৌলিক কিছু রূপান্তর ঘটিয়েছে ও ঘটাচ্ছে এ কথা সবসময়ই বলে আসছি। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের দিক থেকে এর তাৎপর্য উপলব্ধির জায়গাগুলো বুঝব কী করে? এই প্রশ্ন মনে রেখে নরেন্দ্র মোদির ভারত নিয়ে এই লেখা। দুনিয়াব্যাপী বিস্তৃত পুঁজিতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় ভারকেন্দ্র এশিয়া – বারাক ওবামার ভাষায় এশিয়ার থিয়েটার বা নবোদ্ভূত এশিয়ার রঙ্গমঞ্চ। এই থিয়েটারে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যারা জয়ী হবে তারাই আগামি বিশ্বের নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হবে। এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক শক্তি হিসাবে ভারতের পরিবর্তনের অভিমুখগুলো ঠিক ঠিক বুঝতে হবে বাংলাদেশের কথা ভেবে। একই সঙ্গে নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের চীন, ভারত ও আমেরিকা নীতি কি হতে পারে তা মাথায় রেখেই লেখাটি তৈরি; অনুমান হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগামি দিনে চিন্তাশীল ও সবলেরাই নেতৃত্ব দেবেন, বর্তমান পরিস্থিতি টিকবে না। বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের নেতৃত্ব অক্ষূণ্ণ রাখতে যে সূক্ষ্ম দড়ির ওপর তাঁদের হাঁটতে হবে তারই কিছু ধারণা দেবার চেষ্টা হয়েছে এখানে। ভারত প্রসঙ্গ এখানে ভারি হওয়া সেই উদ্দেশ্য মনে রেখেই।

নিরাপত্তা বনাম অর্থনীতিঃ ভারতের বিদেশ নীতির দুই মুখ
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ক্ষমতায় আসীন হওয়ার প্রায় সাত মাস পার হতে চলল। মোদীর জয়লাভ ও সরকার গঠন আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় পরিসরে নানান পরিবর্তন ও ছাপ ফেলেছে। আর এতে বাংলাদেশের উপর সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে, কী নতুন সম্ভাবনা হাজির হচ্ছে সেসব নিয়ে আগের কিছু লেখায় আমরা আলোচনা করেছিলাম। সেখানে গুরুত্বপুর্ণ বিষয় ছিল আগের কংগ্রেস সরকারের বিদেশনীতিতে মোদীর নতুন সরকার মৌলিক কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসার সম্ভাবনা এবং তার সম্ভাব্য প্রভাব।

বিগত কংগ্রেসের নীতির মূল ফোকাস ছিল “নিরাপত্তা”। একে কংগ্রেস নীতির ভারকেন্দ্র গণ্য করলে ভুল হবে না। এর পরিবর্তে মোদির নীতির মুল ফোকাস “অর্থনীতি”। ভারতের বিদেশ নীতির অভিমুখ কোথায় বদলাতে পারে সেটা বোঝার জন্য এভাবে ভাবা যেতে পারে। মোদি এই নির্বাচনের প্রচারের সময় থেকেই এবং এখনও তার নীতির ভারকেন্দ্র ‘অর্থনীতি’ এই ধারনা দিচ্ছেন।

কংগ্রেস নীতির “নিরাপত্তা” ধারণাটিকে ভেঙ্গে অর্থ করলে সেটা দাঁড়ায় পড়শীদের উপর আগ্রাসী বা হকিস নীতি যা চীন অবধি বিস্তৃত; আর ভারতের ভিতরেও যেকোন বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যুতে সেকুলারিজমের আড়ালে সামরিক জবরদস্তির পথে চাপিয়ে দেয়া সমাধানের উপর অতি নির্ভরতা।

একে অন্যভাবেও আমরা বলতে পারি। কোন রাষ্ট্রের সামরিক-বেসামরিক আমলা — বিশেষত গোয়েন্দা বাহিনী যদি সরকার চালায়, কিম্বা সরকারের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা রাখে, তাহলে দেশের ভেতর বাইরের যে কোন সমস্যা ও অসন্তোষকে রাজনৈতিক দিক থেকে দেখা ও সমাধানের ক্ষমতা হ্রাস পায়, উপেক্ষিত থেকে যায়। এর কারনে মারমুখি (hawkish) বা হকিস সমাধানই সাধারণত মুখ্য হয়ে ওঠে। ‘নিরাপত্তা’ কংগ্রেসের নীতির ফোকাস বা ভারকেন্দ্র বলার মানে এটাই । অর্থাৎ ধর-মারো দিকটা প্রাধান্যে নিলে স্বভাবতই অন্য অপশনগুলো — যেমন, রাজনৈতিক সমাধান অথবা অর্থনৈতিক-উন্নয়ন ঘটিয়ে সমাধান – ইত্যাদি পদ্ধতিগত দিক গৌণ কিম্বা অকেজো হয়ে যায়। কিম্বা তাদের অকেজো করেই রাখা হয়। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এখানে কাজ করে না, আমলাতান্ত্রিক সমাধান সে কারনে ধরো আর মারো জাতীয় সমাধানে পর্যবসিত হয়। এ ছাড়াও যে যে ভিন্ন পথ হতে পারে সেটা উপেক্ষিত থাকে। অথবা একেবারে উপেক্ষিত যদি নাও হয় তবে বড়জোর সেকেন্ডারি অপশান হয়।

আগের কংগ্রেসের ইউপিএ জোট সরকার একনাগাড়ে দুই টার্ম অর্থাৎ ১০ বছর (২০০৪-২০১৪) ক্ষমতায় ছিল। একে আমরা বলতে পারি বড় দাদাদের যুগ। সেটা কেমন? এর শুরুটা ছিল আমেরিকার যুদ্ধবাজ জর্জ বুশের ‘ওয়ার অন টেররের’ অনুরূপ নীতি, নাইন-ইলেভেন পরবর্তি যুগ। বলা বাহুল্য এটা কংগ্রেসের “নিরাপত্তামুখি” নীতি গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রধান প্রভাবক এবং সহায়কও ছিল। বুশেরও আট বছরের দুই টার্মের সেই যুগে (২০০১-২০০৯) ভারতের ওপর আমেরিকার প্রভাব-সম্পর্ক তৈরি হবার যুগ। দাদা বুশ ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল। আর তাতে ভারত কোন পরাশক্তি না হয়েও পরাশক্তির ভাব ধরেছিল। ভারতের পরাশক্তি হয়ে ওঠার বাসনা এই সময়টাতেই দানা বেঁধেছিল। দাদা বুশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাশক্তিগত যাঁতাকাঠি ভারতকে সাময়িক ব্যবহার করতে দিয়েছিল। যদিও ইউপিএ সরকারের শেষ দুই বছর আমেরিকার সাথে “নিরাপত্তা” বিষয়ক সহযোগিতার মধুচিন্দ্রমা আর টিকে থাকে নি। শুধু তাই নয়, উল্টা ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক প্রকাশ্যে চরম তিক্ততায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। কংগ্রেসের “নিরাপত্তামুখি” নীতিকে এভাবেই দাদার জোরে বুক ফুলিয়ে চলার নীতি বলেও বোঝা যেতে পারে।

বিপরীতে মোদীর নীতিতে “অর্থনীতি” মুল ফোকাস। সরকারের মুখ্য কর্তব্য কাজ সৃষ্টি আর সেটা অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়েই সম্ভব, পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থায় সেটা অবকাঠামোগত বিনিয়োগ আর প্রাইভেট বিদেশী বিনিয়োগের মধ্য দিয়েই হতে হবে – মোদির অর্থনীতিবাদকে ভেঙে বুঝতে চাইলে এভাবেই আমাদের বুঝতে হবে। কাজ সৃষ্টিকে অর্থনৈতিক উন্নতির কেন্দ্রবিন্দু মানার অর্থ অবকাঠামো ও আনুষঙ্গিক বিষয়সহ উন্নয়নের দিকে মুল মনোযোগ ধাবিত করা, তাকেই চালিকাশক্তি মেনে পরিচালনা করা ।

এই ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, এতে নিরাপত্তা বিষয়টাকে অবশ্যই ভুলে যাওয়া হয়েছে সেটা বলা হচ্ছে না। কিম্বা কংগ্রেসের কোন উন্নয়ন নীতি ছিল না, সেটাও নয়। মূল বিষয় হচ্ছে ভারতের ‘নিরাপত্তা’ কথার আড়ালে দেশের ভিতরে বাইরে সবাইকে দাবড়ে বেড়ানোর আগ্রাসী নীতি এটা নয়। দিল্লী নিজের খাসিলত ছেড়ে দিয়েছে সেটা বলা হচ্ছে না। এখন কিন্তু সেটা মারমুখী নয়। নিরাপত্তার সামরিক দিক তো থাকবেই, কিন্তু আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বসঙ্ঘাতের সমাধান কিম্বা প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক অবসানের জন্য মারমুখী নীতি ছাড়াও অন্যান্ন রাজনৈতিক ষ্ট্রাটেজিক দিক এক্সপ্লোর করে দেখার প্রবণতা নরেন্দ্র মোদির রাজনীতি থেকে পাঠ করা যায়। এই অর্থেই কংগ্রেসে ‘নিরাপত্তা’ নীতির বিপরীতে মোদির নীতি “অর্থনীতি” নির্ভর। আর মোদির পপুলার ভাষায় এটা হল উন্নয়ন বা হিন্দীতে “বিকাশ”।

ভারতের বিদেশ নীতি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি
আবার আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে, মোদির নীতি এখনকার বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে খুবই সামঞ্জস্যপুর্ণ, আর এর বিশেষ তাৎপর্য আছে। দুনিয়া গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের এক অর্ডারের মধ্যে ১৯৪৪ সালের পর থেকে আমরা যে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে বাস করছিলাম তা চলতি শতাব্দীর শুরু থেকে — বিশেষ করে গত দশ বছরের বেশি সময় ধরে তার বিন্যাসের মধ্যে ক্রমশ স্পষ্ট দৃশ্যমান রূপান্তর দেখা দিতে শুরু করেছে । এটা শুধু বিশ্ব অর্থনীতির অভিমুখ পশ্চিমমুখিতার বদলে পুর্ব দিকে ঢলে পড়া নয়; কিম্বা শুধু চীনের উত্থান কিম্বা চীনসহ অন্তত পাঁচটা ‘রাইজিং ইকোনমির’ উত্থানও নয়, এটা একই সাথে এক কেন্দ্রিক দুনিয়ার ক্রম অবসানের ইঙ্গিত। আমেরিকান পরাশক্তিগত ক্ষমতার শাসনের বদলে চীনকে মুখ্য করে অন্তত আরও চার-পাঁচটা রাষ্ট্রের পরাশক্তিগত উত্থানে তা ভাগ হওয়া আসন্ন। এর ফলে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের মৌলিক চরিত্র বদল হয়ে যাবে সেটা ভাবার কোন কারন নাই। এর যে আগ্রাসি, দখলদারি বা রুস্তমিও দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে না। তবে এটা ভুমিকম্পের পর ভুগর্ভের ওজন কে অথবা কে কে বহন করবে তেমনি ভূগোলে প্লেট চেঞ্জ ঘটনার মত। এতে বিশ্ব ব্যবস্থা রক্ষার ভার অন্যের কাঁধে চলে যাতে পারে। রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক সম্পর্ক চুক্তি এসবের ভিতরে কিছু বদল আসবে অবশ্যই। কাঁধ-বদলের মত ঘটনাগুলো শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে।
এতদিন অবধি বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য আমরা বহাল দেখে এসেছি। ১৯৪৪ সাল থেকে আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যংক এর মত প্রতিষ্ঠান খাড়া করে এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক বিধি বিধানের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ষ্ট্রাটেজিক অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষূণ্ণ রাখতে পেরেছে। আমেরিকার নেতৃত্বে বিশ্ব অর্থনীতি পশ্চিমের দিকে কান্নি মেরে সাজানো হয়েছিল; তা এবার ভেঙ্গে পড়ার আলামত শুরু হয়েছে, নতুন নতুন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্ম হচ্ছে, তাতে নতুন ভাবে বিশ্ব অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিন্যাস ঘটছে। ধারনা করা যায় পরিশেষে নতুন ধরণের এক বিশ্ব অর্থনৈতিক শৃংখলার জন্ম হবে। সেই শৃংখলার নতুন বিধি বিধান আইন কানুনও থাকবে। এটা আসন্ন, চারদিকে আলামত ফুটে উঠছে।

নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক শৃংখলায় আমাদের মত দেশগুলো জন্য শ্বাস নেবার তুলনামূলক বড় জায়গা মিলবে, এটাই কমবেশী অধিকাংশ অর্থশাস্ত্রবিদদের ধারণা। যেকোন আন্তর্জাতিক চুক্তি বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য তুলনামূলক ভাবে বেশি ফেভারবল হবে। প্রতীকিভাবে বললে, অবকাঠামোগত ঋণ পাবার ক্ষেত্রে ওয়ার্ল্ডব্যাংক আর একছত্র কর্তৃত্ব খাটানোর প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকবে না, থাকছে না। শুরু হয়েছে সমান্তরাল অবকাঠামো ঋণ পাবার প্রতিষ্ঠান। সেটা বোঝা যায় Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB), এবং BRICS ব্যাংকের আবির্ভাব দেখে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আইএমএফ ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এই দুই প্রতিষ্ঠানের আলাদা আলাদা ভুমিকা রয়েছে। BRICS অবশ্য শুরুতে আপাতত একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যংকের মত দুই ভুমিকা পালন করে দুটোরই বিকল্প হতে চাইছে। আইএমএফ মূলত মুদ্রামান নির্ধারণ ও যাচাই এবং তাদের নির্দেশিত মূদ্রানীতি আমাদের মতো দেশকে মানতে বাধ্য করা আর অন্যদিকে কোন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবের ঘাটতিতে ঋণ দেওয়াকে নিজের ম্যান্ডেট মনে করে। সারকথায়, মূদ্রামান ব্যবস্থাপনা ও ব্যলান্স অফ পেমেন্টে ঘাটতি হলে পূরণ এই দুই কাজ পালনকারি প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করেছে। এই প্রতিষ্ঠানটিও আর মূদ্রামান ব্যবস্থাপনা ও ব্যলান্স অফ পেমেন্টে ঘাটতি পুরণ করবার একচ্ছত্র ও একমাত্র কর্তৃত্ববান প্রতিষ্ঠান হিসাবে টিকে থাকতে পারছে না। চলতি হিসাবের ঘাটতিতে ঋণ পাওয়ার বিকল্প উৎস হিসাবে BRICS আইএমএফের মতই ভুমিকা নিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবের ঘাটতিতে ঋণ বিতরণ করবে, সেটা ইতোমধ্যেই জানিয়েছে। সবমিলিয়ে ক্রমশ বিদ্যমান বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিকল্প দুনিয়ায় হাজির হবার ঘোষণা এসেছে। এতে বর্তমান আইএমএফ-ওয়ার্ল্ডব্যাংক কার্টেলের নিগড় থেকে আমাদের মত দেশের অন্তত তুলনামূলক অর্থে কিছুটা মুক্তি মিলবে।

আর সবচেয়ে বড় কথা, গ্লোবাল অর্থনীতির এই পাশ ফেরা মোচড় দেয়া যেটা শুরু হয়েছে সেই অভিমুখের আর উল্টাপথে চলার সম্ভাবনা নাই। এটা এখন এমনই একমুখী ফেনোমেনা। চীনের অর্থনীতি ক্রমশ বড় থেকে আরও বড় উদ্বৃত্ব অর্থনীতির দেশ হচ্ছে, ফলে চীনের এই বিশাল বিনিয়োগ সক্ষমতার কারণে আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যংক টাইপের বিকল্প নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার শর্ত হাজির হয়েছে। দুয়ার সহজেই খুলে গেছে। ওদিকে এমন বিনিয়োগ সক্ষমতার ক্ষেত্রে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পশ্চিমের সক্ষমতা ততই কমছে। অর্থাৎ আমেরিকা চাইলেও রূপান্তরের এই অভিমুখ নিকট আগামিতে উল্টাতে পারবে না, উদ্বৃত্ব অর্থ তেমন জমা হচ্ছে না বলে চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় নামার কথাও তাদের চিন্তার অতীত, অবাস্তব। দুনিয়া জুড়ে এই এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

তাহলে এখন প্রশ্ন, আমেরিকা কি নিজের কবর খননের এই ফেনোমেনা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে? স্বভাবতই এই জবাব হল না। প্রচলিত আইএমএফ-ওয়ার্ল্ডব্যাংক কার্টেল সংস্কার করে ভিতরে চীনকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে নতুন চিনকেও একই পাত্রে ধারণ করতে পারত হয়ত কিন্তু তাতেও চীনের বিশাল সক্ষমতার ভলিউমের কারণে গ্লোবাল কর্তৃত্ব চীনের হাতেই চলে যাওয়া ঠেকানো যেত না। ফলে আইএমএফ-ওয়ার্ল্ডব্যাংক কার্টেলের সংস্কার পথ পরিহার করে মরণ কামড়ে যতটা এই রূপান্তরের গতিকে শ্লথ রাখা যায় সে চেষ্টায় রত হয়েছে আমেরিকা। এতে প্রথম দিকে রূপান্তরের গতির হয়ত সাময়িক কিছু হেরফের ঘটাতে পারে।

আমেরিকা এর জন্য অনেকখানি নির্ভর করছে ভারতের উপর। ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের উপর। কিভাবে? তা আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, আমেরিকা চায় ভারত ঢলতি বা পুরান গ্লোবাল অর্ডারের প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যংকের আয়ু লম্বা করুক, সেজন্য AIIB, এবং BRICS ধরণের বিকল্প প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চিনেের সাথে সক্রিয় উদ্যোক্তার ভুমিকা না নেক। এভাবে ঢলে পড়া পুরান প্রতিষ্ঠানগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার হাত থেকে বাঁচাক। বিনিময়ে আমেরিকা কি অফার করতে পারে? বা কি দেখিয়ে ভারতকে প্রলুব্ধ করছে?

ভারতের লোভ কিম্বা বাসনাঃ সামরিক অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধের লজিস্টিক
আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের পাবার সবচেয়ে লোভনীয় দিকটি হচ্ছে ভারতের সামরিক বাহিনীকে সক্ষম করবার জন্য আমেরিকান সহযোগিতা পাওয়া। রাজনৈতিক দিক থেকে এই আকাংখা দিল্লী-ওয়াশিংটন সম্পর্কের অনেক খানি নির্ধারণ করে। বুশের আমলের ভারত-আমেরিকার সখ্যতার শুরুতে সেই সম্পর্ক রচনার একটি প্রধান উপাদান ছিল ভারতে অস্ত্রের সরবরাহকারি ও উৎস দেশ হিসাবে আমেরিকার প্রবেশ। পারমাণবিকসহ সবকিছুতেই সামরিক সহযোগিতা্র অনেকগুলো চুক্তি হয় ২০০৫ সালে। যদিও গত কয়েক যুগ ধরে অস্ত্রের ক্ষেত্রে ভারত মুলত রাশিয়া নির্ভর হয়ে ছিল। এই চুক্তিগুলো ২০০৫ সালে যখন হয় তখন আমেরিকার উস্কানিতে এবং ভারতেরও মনে মনে যে চীন নিয়ে ভীতি ছিল এই পটভুমিতে ঘটেছিল। সামরিক সক্ষমতা ভারতের ইতোমধ্যে কিছু বেড়ে থাকুক আর না থাক ভারতীয় মিডিয়া বলে থাকে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের অভিজ্ঞতাটা ভারতের কাছে এখনও একটি ট্রমা হয়ে থেকে গেছে। কিন্তু মনের পুরানা টেনশনে নয় চীন-ভারতের স্বার্থ সংঘাতের এখন প্রধান ইস্যু চীন-ভারতের দীর্ঘ সীমান্তের অনেক জায়গা অচিহ্নিত বা বিতর্কিত থেকে যাওয়া। সম্ভাব্য প্রত্যক্ষ স্বার্থ-বিরোধের জায়গাটা এটাই। কিন্তু ইতোমধ্যে এই ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতিও সাধিত হয়েছে।

গত ২০১৩ সালটা ছিল চিন-ভারত দুপক্ষের সরকার প্রধানের পালটা পালটি সফর বিনিময় এবং সফর শেষে একটি সীমান্ত বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরে উপনীত হবার বছর। ঐ চুক্তির সারকথা হল, সীমান্ত অচিহ্নিত থাকার সুত্র ধরে কোন ছোটখাট টেনশন থেকে বড় কিছু যেন না হয়ে যায়। যেন কোন পক্ষই ইচ্ছা অনিচ্ছায় যুদ্ধের উস্কানি তৈরি না করে বসে বরং সংযত থাকার যথাসাধ্য চেষ্টা করে; ফ্লাগ মিটিং, হট লাইনে কথা বলা ইত্যাদির মাধ্যমে টেনশন কমানো, এসব উপায় আরো বিস্তৃত করা ইত্যাদি বিষয়ে একমত হয় ঐ চুক্তি। আর যত দ্রুত সম্ভব বিতর্কিত সীমান্ত চিহ্নিত করার ব্যাপারে দুপক্ষই সক্রিয় উদ্যোগ নেবার অঙ্গীকার করেছে। সীমান্ত সমঝোতার উপর দাঁড়িয়ে এরপর পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও বিরাট উল্লম্ফনে নেবার এক ঘটনা ঘটানো হয়। তা হল, BCIM-EC বা BCIM ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারে জোট গঠনে উভয়ে উদ্যোগী হতে একমত হওয়া।
এই ইকোনমিক করিডর মানে কলকাতা থেকে বাংলাদেশ ও মায়ানমার হয়ে চিনেের কুনমিং পর্যন্ত যোগাযোগ অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা করা, পণ্য চলাচলের ব্যবস্থা করা, আর বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি ইত্যাদি। গত বছর ২৩ অক্টোবর ২০১৩ মনমোহনের ফিরতি চীন সফরে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয় আর তখনই তাদের যৌথ ঘোষণায় বিষয়টা প্রথম সামনে আসে। এক বছর পর ইকোনমিক করিডর প্রসঙ্গে এমাসের শুরুতে আমাদের কক্সবাজারে BCIM জয়েন্ট ইকোনমিক ষ্টাডি গ্রুপের দ্বিতীয় মিটিং হয়েছে।

কিন্তু এতকিছুর পরও চিন-ভারতের সীমান্ত বা যুদ্ধ বিষয়ক টেনশন বা ট্রমা যাই বলি সেটা যায় নি। চুক্তি ও করিডরের আলাপে অগ্রগতির পরেও তা ভারতের পাবলিক মাইন্ডে একই রকম জায়গায় রয়ে গেছে। আসলে বলা উচিত ভারতের মিডিয়া জগতে একই রকম রয়ে গিয়েছে। সম্পর্কের নতুন অগ্রগতি সত্ত্বেও চিন প্রসঙ্গে ভারতীয় গণ মনোভাবে কোন পরিবর্তনের ছাপ পড়েনি। ফলে জন মনে এর কোন প্রভাব নাই। ওদিকে সীমান্ত চুক্তি বিষয়ক অগ্রগতির পরে কংগ্রেস সরকারের স্বাভাবিক আয়ু আরও ছয়মাস ছিল। ফলে বিগত দশবছর ধরে কংগ্রেস সরকারের “নিরাপত্তা” কেন্দ্রিক চিন্তা বা মারমুখী যে নীতি ছিল সেখানেও বিশেষ বদল ঘটে নি। চিনের সঙ্গে সীমান্ত সংক্রান্ত টানাপড়েন হ্রাস করার প্রয়াসের কোন ছাপ দেখা যায় না। সবসময় ভারতের চিন বিরোধি রেঠরিক বা কথার যে যুদ্ধ চলছিল কোন বদল বা ছাপ পাবলিকলি প্রদর্শন না করে তার আগেই কংগ্রেস সরকার ক্ষমতা ছেড়ে যাবার সুযোগ নেয়। এদিকে চুক্তি সইয়ের দিক থেকে দেখলে এরপর একবছর হয়ে গেছে, ইতোমধ্যে মোদীর জয়লাভ ও তাঁর অর্থনীতি কেন্দ্রিক নীতিও এসে গেছে তবু ভারতের কোন পক্ষের মিডিয়ার অবস্থানে কোন বদল হয়নি, বরং মিডিয়ায় চীন প্রসঙ্গে সন্দেহ ছড়ানো যেমন ছিল এখনও তেমনই আছে। যেন সীমান্ত চুক্তি বা করিডর এসব ইস্যুতে অগ্রগতি চীন-ভারত সম্পর্কের জন্য কোন নতুন উপাদান নয়, যেন এসব কিছুই ঘটেনি বা ঘটলেও তার প্রভাব শূন্য।

এর সম্ভাব্য একটা কারণ, আমেরিকা। গত দশ বছরে ভারতীয় ইন্টেলিজেন্সিয়া – জনমত বা পলিসি অবস্থান যারা তৈরি ও প্রভাবিত করে– তাদের করা গবেষণা, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি যা কিছু হয়েছে তা গড়ে উঠেছে আমেরিকার হাত ধরে অথবা কোন না কোন ধরণের মার্কিন সহযোগিতায়। ধরণ হিসাবে সেগুলো যেমন, মার্কিন কোন থিঙ্কট্যাংক প্রতিষ্ঠানের অধীনে ভারতীয় একাডেমিকের পিএইচডি বা গবেষণা অথবা কোন মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক জয়েন্ট কোলাবরেশনে যেমন, Carnegie Endowment for International Peace এর মত প্রতিষ্ঠানের সাউথ এশিয়া বিভাগকে আমেরিকার তত্ত্বাবধানে ইন্ডিয়ান স্কলার দিয়ে চালানো। অথবা বড়ভাই পিঠে হাত রাখায় যে পরাশক্তির সুখবোধ হচ্ছিল সেটাই ভারতের জন্য আদর্শ – এই বোধের প্রাক্তন সামরিক-বেসামরিক আমলাদের দিয়ে চালানো কোন ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক। এসবের সাধারণ তাৎপর্য হল, আমেরিকান চোখ দিয়ে চীন-ভারতের সম্পর্ককে দেখা। এককথায় বললে, এর ফলে চীন বিষয়ে যে সকল ভারতীয় একাডেমিক এক্সপার্ট তৈরি হলেন বা যাদের মিডিয়ায় হাজির হতে দেখা যাচ্ছে তারা প্রায় সবাই আমেরিকান প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, কিম্বা তাদের তত্ত্বাবধানে অথবা মার্কিন স্বার্থ সুরক্ষার চিন্তার কাঠামো বা ওরিয়েন্টেশনে গড়ে উঠেছেন। তারা ভারতের বিদেশ নীতি নিয়ে যা ভাবেন বা ভাবছেন সেখানে আমেরিকা যেভাবে ভারতকে দেখতে চায় তারই ছাপ প্রবল ভাবে হাজির দেখা যায়। চীন-ভারত সম্পর্কের কিছু অগ্রগতি সত্ত্বেও ভারতীয় মিডিয়ায় এর কোন ছাপ না পড়ার কারণ সম্ভবত এটাই। এর ফলে চিনের প্রতি ভারতের জনমতে বিশেষ বদল ঘটে নি। যার প্রভাব মোদির বিদেশ নীতিতে পড়তে বাধ্য।
তো এটা গেল একটা কারণ। কিন্তু মূল কারণ নয়। তাহলে আসল কারণ কি?

“ভারত একটি পরাশক্তি হয়ে উঠতে পারবে কি?’- ইকনমিস্ট পত্রিকার প্রশ্ন। ভারতের দরকার একটি পেশাদার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ঐক্যবদ্ধ প্রতিরক্ষা কর্মী যাতে তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করতে পারে। দরকার তাদের ক্ষয়িষ্ণু রাষ্ট্র পরিচালিত ডিফেন্স ইন্ড্রাস্ট্রিতে বেসরকারি ও দেশি বিনিয়োগ বাড়ানো। রাষ্ট্র পরিচালিত প্রতিরক্ষা খাত সব সময়ই এই ধরণের সমালোচনার মুখে রয়েছে।

সামরিক বিষয় কিম্বা প্রতিরক্ষা ব্যয় উভয় ব্যাপারে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বা প্রগতিশীলদের মনে বিরাট অনীহা কাজ করে। বঞ্চিত মধ্যবিত্তের ক্রোধ ছাড়া এই নব্য গড়ে ওঠা শ্রেণির মধ্যে রাষ্ট্র সম্পর্কে বিশেষ কোন ধারণা এখনও গড়ে ওঠে নি। প্রতিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তাদের কাছে খুব দূরের একটি বিষয়। এর সঙ্গে যেহেতু সেনাবাহিনীর সম্পর্ক সরাসরি তাই এর বিরোধিতাই তারা সঠিক বলে মনে করে। সামরিক মানে সব অপচয় অথবা একটা ট্যাঙ্কের টাকায় কয়টা স্কুল করা যেত ধরণের তর্কে এরা নিজেরা বুঁদ হয়ে থাকে আর সমাজেও শ্রেণিগত কারণে তার প্রভাব আছে। ফলে সামরিক শাসন বা সামরিক শাসনের বিরোধিতা করা, কিম্বা সামরিক অফিসারদের দুর্নীতি ও গরিব দেশের তুলনায় অন্যায় ও অতিরিক্ত সুবিধাভোগের তর্ককে তারা সেনাপ্রতিষ্ঠান বিরুদ্ধে তর্কে পর্যবসিত করে ফেলে। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে উপযুক্ত সামরিক প্রতিষ্ঠান বা সুস্পষ্ট প্রতিরক্ষার নীতি কী করে প্রণয়ন করা যায় সে বিষয়ে চিন্তা ভাবনা এদের শূন্যই বলা যায়।
মূলত এমন ধারণার সুত্রপাত করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, কোল্ড ওয়ারের যুগে আমেরিকাকে ঘায়েল করতে প্রপাগান্ডা হিসাবে। আমরা সবাই জানি, সেকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজ সামরিক খাতে ব্যয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে কোন অংশে পিছিয়ে ছিল না। ফলে স্পষ্টত কথাটা রাশিয়ানরা নিজে বিশ্বাস করার জন্য নয় অথবা পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থায় রাষ্ট্র গঠন ও তা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসাবে হাজির হয় নি। তৃতীয় বিশ্বের সেনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তার অবস্থান স্নায়ুযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রপাগাণ্ডার প্রয়োজন মনে রেখে সাজানো হয়েছিল। বাস্তবে তৃতীয় বিশ্বের সেনাবাহিনী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ধারক ও কমিউনিজম মোকাবিলার প্রথম সারির মিত্র ছিল অবশ্যই। বিপ্লবোত্তর যে কোন রাষ্ট্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক নিয়ে তাত্ত্বিক-ব্যবহারিক আলোচনা রয়েছে। যার মূল্য অনস্বীকার্য। কিন্তু বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে সেনাপ্রতিষ্ঠান ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিক অবস্থান নেওয়ার অর্থ কোনভাবেই পুরানা স্নায়ুযুদ্ধের আমলের চিন্তাভাবনা বয়ে বেড়ানো হতে পারে না। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা সেই ওজনের ভার বয়ে বেড়াচ্ছি।

ফলে একালে গণপ্রতিরক্ষার আলোকে সৈনিকতা, সেনাবাহিনী, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন ভাবে ভাববার দরকার আছে, একাট্টা সৈনিকতা, সামরিকতা বা প্রতিরক্ষার চিন্তাকে গৌণ করে ভাবার কোন উপায় নাই। একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি শুধু অর্থনৈতিক শক্তির জোরে টিকে থাকে না, একালে কেউই বিশ্বাস ভরে জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা বিরোধী কোন ধারণা গ্রহণ করতে পারে না। সেটা হবে কঠিন বাস্তবতায় পা না নামিয়ে হাওয়ায় ঘুরে বেড়ানো।

কারণ, কঠিন দিকটা হল, বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষার শক্তির সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। তাকে আলাদা করারা কোন উপায় নাই। প্রদত্ত বাস্তবতায় ভারতের মতো একটা রাষ্ট্র অর্থনৈতিক দিক থেকে যতই সক্ষম ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে, তার প্রভাবে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্তরে ষ্ট্রাটেজিক চিন্তা ভাবনায় বদল ঘটাতেই হবে বা ঘটবে। আর এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণভাবে সামরিক সক্ষমতায় সমৃদ্ধ হতেই হবে। সামরিক খরচ বাড়াতে হবে, নইলে ছাগলে সব মুড়ে খাবে। সামরিক ব্যয়টা আবার এমন জিনিষ যা নিজস্ব রাজস্ব আয় থেকেই হতে হবে, বাণিজ্যিক বিষয়ের মত এজন্য বিদেশি লোন পাওয়া যাবে না। এছাড়া অস্ত্রের সোর্স কে হবে মনমত তা খুঁজে পাবার সমস্যা তো আছে। তবে বড় জোর কিস্তিতে অস্ত্রের মুল্য পরিশোধ করার সুবিধার চেষ্টা করা যেতে পারে। ফলে পুরা বিষয়টা হল, একদিকে সামরিক সক্ষমতা যেমন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সমৃদ্ধির উপর নির্ভর করে আবার ঐ অর্থনীতিকে প্রটেক্ট করার জন্যই সামরিক সক্ষমতা জরুরি।
ব্লু ওয়াটার বলে একটা ধারণা আছে। এর অর্থ হল, নিজ রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে সমুদ্রে আমার পণ্যবাহী জাহাজ অবাধে চলাচল করতে পারার সুযোগ থাকবে কি না। থাকলে তা আমার জন্য ব্লু ওয়াটার। যদি না থাকে, কেউ ইচ্ছা-অনিচ্ছায় যদি বাধা সৃষ্টি করে তা মোকাবিলার উপায় বের করার সামরিক সক্ষমতা অর্জন একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিকাশের গুরুত্বপুর্ণ উপাদান। ফলে নিজ সামরিক সক্ষমতা বা ব্যয় বাড়াব কি বাড়াব না সেটা কোন রাষ্ট্রের সুবোধ ইচ্ছাধীন ব্যাপার নয়। আবার সামরিক সক্ষমতা থাকা মানেই অস্ত্র হাতে সবাইকে দাবড়ে বেড়ানোও না। সেটা বিশুদ্ধ মাস্তানি হতে পারে, যার কোন রাষ্ট্রিক বা অর্থনৈতিক তাৎপর্য নাই। কারও সাথে নিজের বা পারস্পরিক স্বার্থ প্রসঙ্গে সরাসরি যুদ্ধের মাঠে চলে যাওয়া সবসময়ই যে কোন রাষ্ট্রের জন্যই বিপজ্জনক। কিন্তু টেবিলে বসে আলোচনা করার সময় আমার পকেটে যে পিস্তল আছে সেটা জানিয়ে পকেট উচা করে রাখলে আমার গলার স্বর একরকম গুরুত্ব পাবে আর না থাকলে স্বর অন্য রকম হবে। হয়ত কথা গুরুত্বই পাবে না, পাত্তা পাবে না। এই খুটিনাটি দিক থেকে চিন্তা করলে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানেই আমরা সামরিক ব্যাপারটা কিছুটা বুঝতে পারব।
ভারতের এসব সাধারণ হুঁশজ্ঞান সবসময়ই ছিল, না থাকার কোন কারণ নাই। কিন্তু সেই সাথে নেহেরুর আমল থেকে ভারতের একটা নীতি হল, ইন্ড্রাস্টিয়াল পণ্য বিদেশ থেকে সরাসরি আমদানি না করে বরং সরবরাহ কোম্পানীর সাথে ভারতীয় কোম্পানীর যৌথ উদ্যোগে লোকালি ঐ পণ্য বানানোর কারখানা করা। ভারতের জনসংখ্যা বড় ফলে বাজারও বড় বলে এই ধরণের নীতি সফল হয়েছে কমবেশি। কিন্তু অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম উড়োজাহাজ নৌজাহাজ সংগ্রহ করার বেলায় একই নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে ভারতের অসফলতা সীমাহীন। অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনান্ট জেনারের বিনয় শংকর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় লিখেছেন, “দেশের ভেতরে অস্ত্রশস্ত্র তৈয়ারিতে ক্ষেত্রে ভারতকে আরও দক্ষ হতে হবে। বিনয় শংকরের নিবন্ধ থেকে বোঝা যায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা– বিশেষত অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম তৈয়ারির ক্ষেত্রে ভারত নিজে সফল হয় নি। এখনও দেশটি পরনির্ভর। এই বাস্তবতা ভারতের বিদেশ নীতির ওপর প্রভাব ফেলতে বাধ্য”। এগুলো হাইটেক বলে শুরুতে ভারতের পরিকল্পনা ছিল স্পেয়ার পার্টস তৈরি আর এসেম্বল দিয়ে শুরু করে আস্তে আস্তে পুরা জিনিষটা তৈরির দিকে যাওয়া হবে। আর সে অনুপাতে তৈরি পণ্য আমদানি কমিয়ে আনা হবে। কিন্তু তা ঘটে নাই। অসফলতার কারণ বিবিধ। ভারতীয় স্টিলের কোয়ালিটি, অথবা ম্যানেজমেন্টের অক্ষমতা, সামরিক বিষয়ক সবকিছুই সরকারি মালিকানাধীন কারখানা প্রতিষ্ঠান বলে ইত্যাদির অদক্ষতাসহ জানা অজানা সম্ভাব্য কারণ যাই হোক – শেষ কথায় ভারতের সামরিক সরঞ্জাম স্থানীয় ভাবে উৎপাদনের প্রজেক্ট ফেল করেছে।
একথার আরও প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার ঐ একই রিপোর্টে থেকে। রিপোর্ট বলছে, “The problem is with technology, quality as well as cost and delivery schedules”। গত ৩০ মার্চ ২০১৩ প্রভাবশালী ইকোনমিষ্ট একই বিষয়ে আলোকপাত করে বলছে, “The defence ministry is chronically short of military expertise”। ভারতে সামরিক হার্ডওয়ার সংগ্রহ ও অর্জনের দুর্বলতার বিষয়টা নীতি বিষয়ক কাগজপত্রে সামরিক খাতে “আত্মনির্ভরতা” বা “সেলফ রিলায়েন্স” শব্দে আলোচনা করা হয়। গত বছর ১৪ মে ২০১৩ দি হিন্দু পত্রিকা লিখছে, “The government has finally started taking small steps to change procurement policy but what is required is to free it from the inefficient public sector”। অর্থাৎ অদক্ষ সরকারি মালিকানাধীন সামরিক উৎপাদক কারখানাগুলোকে সব সমস্যার গোড়া মনে করছে। এছাড়া কোন সামরিক কারখানায় আগে ২৬% পর্যন্ত বিদেশি মালিকানা থাকতে পারত যা বাড়িয়ে ২০১৩ সালে ৪৯% করাতে এটাকে সামরিক হার্ডওয়ার সংগ্রহ বা প্রকিউরমেন্ট নীতিতে খুবই “সামান্য পদক্ষেপ” বলে বর্ণনা করছে। সামরিক উতপাদন খাতে “আত্মনির্ভরতার” বুলির ভারে ভারতের সামরিক সক্ষমতা কিভাবে ধুঁকছে তা ধারণা করা যায় এসব রিপোর্ট থেকে।
সামরিক উড়োজাহাজ আকাশেই দুর্ঘটনায় পড়া অথবা সাবমেরিন নিজেই মৃত্যুকুপ হয়ে উঠায় এগুলো ইতোমধ্যেই ভারতের বাহিনীর কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে ভারতের এনডিটিভির আলোচনা থেকে জানা যাচ্ছে সেখানে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনার ইস্যু হল বাহিনীর পায়ের বুটের অভাব, রাইফেল ও অস্ত্রের বুলেটের অভাব আর বাহিনীর ক্ষোভ।
না ভারতীয় বাহিনীকে খাটো করে দেখার কোন অবকাশ নাই। সেই ভাবনা উস্কে দেওয়াও বাতুলতা। বরং সমস্যার মাত্রার গভীরতা এখান থেকে বুঝতে হবে। অর্থাৎ হাইটেক বিষয়াদি থেকে বুট বুলেট সরবরাহ পর্যন্ত এই অব্যবস্থাপনা বিস্তৃত। ভারতের সামরিক সক্ষমতার দুর্দশার গভীরতার চিত্র এগুলো। অর্থাৎ ভারতের জন্য এটা স্রেফ বিদেশ থেকে সামরিক সহযোগিতা পেলেই হচ্ছে না বরং কেমনভাবে সে সহযোগিতা নিব সে প্রশ্নও বটে।
আজকের দুনিয়ায় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আইডিওলজি বা অন্যকিছুর যতোই ভিন্নতা বা বিরোধ থাকুক, সারা দুনিয়া একই গ্লোবাল পুজিতন্ত্রের অন্তর্গত হয়ে, পরস্পরের সাথে পরস্পর গভীর থেকে গভীরতর নির্ভরশীলতায় পুঁজির চলন ও বিচলনের সুত্রে বিনিময় লেনদেনে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে। নতুন এই বাস্তবতায় তাই সহসাই রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের স্বার্থের বিরোধ বড় আকারে যুদ্ধের দিকে মোড় নেবে এমন সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কমে এসেছে। এমনকি চীন-আমেরিকা অথবা চীন-ভারতের ক্ষেত্রেও এটা সত্য। যদিও শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর তাদের আধিপত্য কায়েম রাখবার চেষ্টা অবশ্য অব্যাহত রাখবে।
তবু এক সিনারিও ধরে নেয়া যাক। যদি দুর্ঘটনাবশত যুদ্ধের পরিস্থিতি হাজির হয়ে যায় এই কল্পনায়, ভারতের সাথে স্বার্থবিরোধে সম্ভাব্য যেসব রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ হতে পারে সে তালিকায় এক নম্বরে যে থাকবে, যার সাথে যুদ্ধে ইজ্জত রক্ষা করা বা অন্তত ইজ্জতের সাথে যার মুখোমুখি দাড়ানোটা সম্ভবত সম্ভব এবং খুবই জরুরি সেই রাষ্ট্র হল চীন। তাতে সে বাস্তবতায় চিন-ভারত সম্পর্ক গভীর সহযোগিতামূলক কোন গ্লোবাল এলায়েন্সে যুক্ত থাকুক আর না থাকুক অথবা আজকের মত সম্পর্কে থাকুক – এখন এটাই বাস্তবতা। আগামি দু-তিন যুগেও এই অবস্থার সহসা বদল হবে না।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের অস্ত্র সরঞ্জাম পাবার নির্ভরযোগ্য সম্ভাব্য প্রধান উৎস আমেরিকা এমন ইমাজিনেশনের বাইরে অন্য কিছু কল্পনা করাও ভারতের সংশ্লিষ্ট লোকেদের জন্য খুব সহজ নয়। সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্টের ভারত সফরে মোদী জাপানের সাথে প্রতিযোগিতা লাগিয়ে চীনের বিনিয়োগ হাসিল করেছেন। ফলে বাণিজ্যিক বা অর্থনীতিমূলক গভীর সম্পর্ক চিনের সাথে ভারতের অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু সামরিক সহযোগিতার দিকটা নয়। অস্ত্র, অস্ত্রের টেকনোলজি, হাইটেক ইত্যাদির ক্ষেত্রে ভারত চীনের ওপর নির্ভর থাকবে না, কিম্বা হতে পারবে না বা থাকতে চাইবেও না। আগামিতে ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে সামরিক সক্ষমতার যে প্রয়োজন দেখা দিবে তাতে কোন সামরিক সহযোগিতার বিষয় চীনের সাথে ঘটা অসম্ভব। কারণ সামরিক সংঘাত চীনের সাথে ঘটবার সম্ভাবনা থাকায় সেই চীনের সাথেই আবার ভারতের সামরিক সহযোগিতা হবার সম্ভাবনা সেটা নাকচ করে। সামরিক ইস্যুর এই বাস্তবতার দিকটার জন্য ভারতের রাজনৈতিক দল, নেতা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় যুক্ত যে কেউই আমেরিকান সহযোগিতা পাবার আশা ত্যাগ করে অন্য কিছু ভাবতে পারে না। তাদের লোভের জায়গাটা এখানে। ফলে মার্কিন সামরিক সহযোগিতা – এটাই আমেরিকার কাছে ভারতীয়দের মনোবাসনা। মোদিরও বটে।
কিন্তু এই কামনা পূরণে ভারত কতদুর আমেরিকার কাছে ধরা দিতে পারে? কামনা পূরণের বিনিময়ে ভারত আমেরিকার কাছে নিজের কোন স্বার্থ এবং কতটা ছাড় দেয়া সঠিক গণ্য করবে। এই মাত্রা নির্ণয়ও ভারতের জন্য খুবই জটিল ও গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। আজ অথবা সামনে আমেরিকান নেতৃত্বের পুরান বা চলতি গ্লোবাল অর্ডারটা আর চলতে পারবে না, তা ভেঙ্গে না পড়লেও ঢলে পড়া শুরু হয়েছে। আলামত ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। আর বিকল্প চ্যালেঞ্জকারি সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তব হতে শুরু করে দিয়েছে। আগামি গ্লোবাল অর্ডারের প্রতিষ্ঠানগুলো আকার নেয়া শুরু করে দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে যত দেরিতে ভারত যোগ দিবে, যতই (covenant) উদ্যোক্তা হতে দ্বিধা করবে, নানান কৌশলে এড়িয়ে থাকার চেষ্টা করবে, এসব প্রতিষ্ঠানগুলো জন্ম নেবার গতি কমিয়ে রুদ্ধ করতে অংশ নিয়েও ক্রমাগত ওজর আপত্তি তুলে দেরি করাবে অথবা অংশগ্রহণই করবে না ততই ওসব প্রতিষ্ঠানে শুরুর দিকে আকার নেবার ক্ষেত্রে ভারতের ভুমিকা কমে যাবে বা থাকবেই না। সেটা হবে ভারতের জন্য বিশাল এক পার্মানেন্ট ক্ষতি।
যেমন BRICS ব্যাংকের জন্মের লক্ষ্যে প্রথম সামিট হয় ২০০৯ সালে। কিন্তু সদস্যদের বিশেষত ভারতের নানান ওজর আপত্তিতে এখনও এটা কাতরাচ্ছে। স্পষ্ট বাস্তব আকার নিতে পারে নাই। আপাতভাবে ভারত আছে ভিতরে কিন্তু গতি কমানোর ভুমিকায়। বিপরীতে AIIB এর ক্ষেত্রে, আইডিয়াটা চীন প্রকাশ বা হাজির করেছে মাত্র গত বছর অক্টোবরে ২০১৩ তে, আর এবছরই তা আকার নিয়ে ফেলেছে। BRICS গড়ার ক্ষেত্রে গড়িমসি দেখে এটা চীনের বিকল্প পথ বা পালটা চাপ ও ক্ষমতা দেখানোর ব্যবস্থা। ভারতও AIIB তে অন্তর্ভুক্ত না থেকে পারে নাই। আমেরিকার নিউইয়র্ক টাইমস ০৯ অক্টোবর ২০১৪ এব্যাপারে একটা বিশ্বস্ত সুত্রের খবর ছেপেছে। অনুবাদ করে বললে তা হল, AIIB এর বিষয়ে, “চিনা উদ্যোগের সাথে সম্ভাবনায় ইচ্ছুক পার্টনার যারা তাদের সাথে নিরবে ঢিলেঢালা আলাপের পরিবর্তে এই ব্যাংকের বিরুদ্ধে আমেরিকান কর্মকর্তারা সচরাচর আশা করা হয় না এমন প্রত্যয়ের সাথে ব্যাংক প্রজেক্ট যাতে ঝুলে যায় সেজন্য প্রচার ও বুঝানোর কাজে নেমে পড়েছে – সিনিয়র আমেরিকান কর্মকর্তা ও অন্যান্য সরকারের প্রতিনিধিদের তরফে এটা জানা গেছে”।

এই রিপোর্টের এক সপ্তাহ আগে মোদী পাঁচ দিনের আমেরিকা সফরে ছিলেন। এর প্রথম তিনদিন কাটিয়েছেন নিইয়র্কে জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলির মিটিংসহ কাজে, শেষের দুদিন মূলত ছিল ওয়াশিংটনে সফর, ওবামার সাথে দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে। দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলোর মধ্যে ক্রুসিয়াল ছিল বিগত দশ বছরের সামরিক চুক্তির নবায়ন। যেটা স্বাক্ষর হয়েছিল ২০০৫ সালে, শেষ হচ্ছে আগামি বছর। মোদী প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় আসীন হবার পর ইতোমধ্যে গত বছর আগষ্টে আমেরিকার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা চাক হেগেলের ভারত সফর করেছিলেন। সে সময়ে ঐ চুক্তি আরও দশ বছর নবায়ন করার ব্যাপারে নীতিগতভাবে উভয়ে একমত প্রকাশ করেছিলেন। মোদী-ওবামা বৈঠকে এতে কি কি বিষয় নতুন যুক্ত হবে বা বাদ পড়বে, বদলাবে এসব খুটিনাটির ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের খসড়া তৈরির কাজ চলছে তা নিয়ে কথা আগিয়ে নেয়া হয়। ভারতের সামরিক সংগ্রহ ও ক্রয়ের ৩০ ভাগ নিজেরা করতে পারে, বাকিটা আমদানি। আবার সামরিক হার্ডওয়ারের নির্ভরতার ৭০ ভাগই উৎস রাশিয়া। বাকি ৩০ ভাগে মূলত আমেরিকা, তবে ফ্রান্সও আছে। এছাড়া গত দশ বছরে আমেরিকার সাথে ডিফেন্স প্যাক্টের আওতায় মোট ১০ বিলিয়ন ডলারের আমদানি ঘটেছে। আর ভারী কিছু তুলে বহন করার হেলিকপ্টার ও এট্যাক হেলিকপ্টার এবং এন্টি-ট্যাংক মিশাইলের সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের ক্রয় নিয়ে আলোচনা চলছে।
কিন্তু এপর্যন্ত এগুলোতে ভারতে স্থানীয়ভাবে যৌথ উৎপাদন, যৌথ উন্নয়ন ও ডিজাইন কাজ অথবা টেকনোলজি হস্তান্তর বিষয়ক কোন কিছুই ঘটেন, যেটা গত চুক্তি অনুসারে হবার কথাছিল। এছাড়া গত চুক্তির আগে যদিও কোন যৌথ মালিকানা সামরিক প্রজেক্টে ২৬ ভাগ বিদেশি মালিকানায় করার আইনি সম্মতি আগে দেয়া ছিল সেটা সম্প্রতি ৪৯ ভাগে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।এসব এসত্ত্বেও তা ঘটেনি। এই তথ্যগুলোর বেশির ভাগই নেয়া হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ভারতের আইবিএনলাইভ ওয়েবসাইট থেকে। অর্থাৎ ভারতের আমেরিকার কাছ থেকে কাম্য বহু কিছুই পাওয়া হয়নি, ফলে ভারত আকাঙ্খী। আবার উপরে চিনের AIIB ব্যাংক এর বিষয়ে, সম্ভাব্য রাষ্ট্রগুলোকে এর উদ্যোক্তা সদস্য হওয়া ঠেকাতে আমেরিকার মরিয়া প্রচেষ্টা সম্পর্কে নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে তাতে মিডিয়া জগতে এই অনুমান শুরু হয়েছে যে ওবামা-মোদীর আলোচনায় ওবামা মোদীকে AIIB এবং BRICS ধরণের উদ্যোগে সামিল হতে নিরুৎসাহ হবার শর্ত না হলেও পরামর্শ রেখেছিলেন। শর্ত এই অর্থে যে আমেরিকার সাথে হবু সামরিক চুক্তির ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট ফাইনালি কি দাঁড়াবে, কি কি অন্তর্ভুক্ত হবে তা সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর বিষয়ে কতটা কি থাকবে এরই বিনিময় শর্ত। যদিও টাইমসের রিপোর্টে কোন কোন রাষ্ট্রকে কান ফুসলানি দিয়ে AIIB থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছে কিন্তু ওসব রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট নাম দেয়া হয়নি। শুধু বলা হয়েছে ব্যাংক বিষয়ে “China’s potential partners” এবং আমেরিকার “important allies” এদেরকে – এভাবে। যদিও অন্যান্য কিছু মিডিয়া রিপোর্টে দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও অষ্ট্রেলিয়ার নাম সুনিদিষ্ট করে এসেছে। এদের মধ্যে প্রথম দুদেশ AIIB এর উদ্যোক্তা স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণই করেনি। আর অষ্ট্রেলিয়াও অনুপস্থিত ছিল তবে পরের মাসে আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছে। ওবামা মোদীকে যাই বলে থাকুক তবু ভারত পরের মাসে ২৪ অক্টোবর ২০১৪ AIIB এর উদ্বোধনে গিয়েছে এবং উদ্যোক্তা সদস্য হয়ে স্বাক্ষর করেছে। তবে ওবামা-মোদীর আলোচনায় AIIB এবং BRICS প্রসঙ্গটা কিভাবে এসেছে তা জানতে একাডেমিক ও মিডিয়া লেভেলে জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছে। ওবামা মোদীকে শর্ত অথবা পরামর্শ যাই দিয়ে থাকুক অথবা না AIIB বিষয়টা এমনই যে BRICS ব্যাংকের মত গতি কমানোর ভুমিকা নেবার সুযোগ ভারতের এখানে নাই। শুধু তাই না আমেরিকার কাছ থেকে সামরিক সহযোগিতা পাবার লোভে ভারত AIIB তে যোগ না দিলে ভারতেরই আবার অন্য নগদ কিছু স্বার্থ হারাবার সম্ভাবনা আছে। কারণ AIIB তে অংশগ্রহণকারির সংখ্যা এবং তাদের আগ্রহ আর সর্বোপরি এশিয়াতে অবকাঠামো খাতে ঋণ প্রাপ্তির চাহিদার ৯০ ভাগই ঘাটতি আছে, অর্থাত পুরণ হয় নাই। এশিয়ায় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবির হাত দিয়ে প্রাপ্য যোগ্য ঋণ বা প্রতিষ্ঠান দুটোর ঋণ বিতরণ সক্ষমতা এদের সদস্য দেশগুলোর চাহিদার দশভাগের একভাগ মাত্র। অর্থাৎ কাড়াকাড়ি ধরণের ঘাটতি আছে এখানে।
এশিয়ায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অবকাঠামোগত ঋণের চাহিদা কত এ বিষয়ে এডিবির এক ষ্টাডি বলছে আগামি আট বছরের প্রজেকশন অনুযায়ী এর মোট চাহিদা বছরে এক ট্রিলিয়ন করে। তাই ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের চলতি প্রেসিডেন্ট কিম এই পরিস্থিতিকে “massive need” বলে উল্লেখ করে AIIB এর আগমনকে স্বাগত জানিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি পেশাদার থাকতে চেয়েছেন, রাজনৈতিক বা কোন রাষ্ট্রস্বার্থের প্রত্যক্ষ পক্ষে দাড়াতে চান নাই। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ম্যান্ডেট অনুসারে এর কর্মিদের কোন মন্তব্যে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে্র ক্ষেত্রে সরাসরি কোন রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে অথবা এর রাজনৈতিক বিষয়াদিতে জড়িত হতে নিষেধ করা আছে। এই অর্থে পেশাদার কথাটা পড়তে হবে। অতএব সারকথা দাড়াল আমেরিকার ভাল লাগুক আর নাই লাগুক, এশিয়া চীনের উদ্যোগের AIIB এর আগমনকে প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র নিজ নিজ স্বার্থে স্বাগত জানায়। যদিও ওবামার আমলা প্রশাসন ২৪ অক্টোবর AIIB এর উদ্যোক্তা সদস্য সামিট শেষ হবার পর নিজেদের জন্য এক সান্ত্বনা বাক্য প্রকাশ করেছে। বলছে, এশিয়ায় ভারত ছাড়া বড় অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো AIIB তে যোগ দেয় নাই। যেসব রাষ্ট্র যোগ দিয়েছে তাদের সংখ্যা ২২ আর সর্বসাকুল্ল্যে এদের ঋণ চাহিদা পুরণ করতেই ৫০ বিলিয়ন ডলার যথেষ্ট বলেই চীন AIIB তে ৫০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু করেছে। অর্থাৎ এটা যেন তাদের ভাঙড়ি দেবার কুটনৈতিক তৎপরতা সফল। কিন্তু এশিয়ায় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবির মিলিত ঋণ বিতরণের ফান্ডের থলেটা বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের। এর তুলনায় চীনের একা ৫০ বিলিয়ন কম নয়। এছাড়া এরচেয়ে বড় কথা এই সংখ্যাটা চীনের সামর্থের প্রকাশ নয়। বরং বলা যায় এটা ঋণ নিতে আগ্রহিরা তাদের চাহিদা মিটাতে কেমন এগিয়ে আসে তা দেখার। ফলে এটা প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি। কারণ চীনের সক্ষমতা এখনকার দুনিয়ার যে কোন রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি। এছাড়া AIIB ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়তে এর বীজ-পুঁজি সরবরাহের উৎস হবার ক্ষমতা অর্থাৎ উদ্বৃত্ব অর্থনীতির কোন রাষ্ট্র আছে এই প্রশ্নে চীন অপ্রতিদ্বন্দ্বি, একচেটিয়া। এক হিসাবে দেখা যায় AIIB বা BRICS ধরণের প্রতিষ্ঠান (অর্থাৎ বাণিজ্যিক বাজার মুনাফার প্রজেক্ট নয়) গড়তে এই মুহুর্তে চীনের বিনিয়োগের ক্ষমতা তিন ট্রিলিয়ন ডলারের মত। অতএব এখানে আলোচ্য প্রসঙ্গের জন্য মুলকথা হল AIIB তে যোগ না দিলে বা গরিমসি করলে অবকাঠামো ঋণ গ্রহিতা হিসাবে ভারতেরই ক্ষতি। ফলে এখানে ভারতের (covenant) উদ্যোক্তা হতে দ্বিধা দেখানোরও সুযোগ নাই। বরং এখানে নিজ অর্থনীতির সাইজ হিসাবে চীনের পরেই দ্বিতীয় ষ্টেকহোল্ডারের গুরুত্ত্ব থাকায় সে অনুযায়ী AIIB তে প্রভাব সে রাখতে পারবে, যা না নিলে সে সুযোগ হারাবে। অনুমান করা যায় এসব বিবেচনা থেকে ওবামা যাই বলে থাকুক ভারত বিনাবাক্যে কোন মিডিয়া নিউজ তৈরি না করেই AIIB তে যোগদান করেছে।

এবিষয়ে আর একটা উদাহরণ হলঃ অষ্ট্রেলিয়া। আমেরিকার কাছে ভারতের তুলনায় অনেক কাছের রাষ্ট্র অষ্ট্রেলিয়া, সাউথ-ইষ্ট এশিয়ার জগতে অস্ট্রেলিয়া সবার আগেই আমেরিকার এশিয়া নীতির পক্ষে পতাকা তুলে আছে, দেশটি আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার। চীনকে প্রাথমিক কথা দিয়েও সে আমেরিকার প্ররোচনায় AIIB তে উদ্যোক্তা সদস্য না হতে সে খোঁড়া অজুহাত তুলেছিল যে সে অপেক্ষা করে দেখতে চায় এই প্রতিষ্ঠানটা স্বচ্ছ হয় কি না। আর তা নিয়ে অষ্ট্রেলিয়ার আভ্যন্তরীণ প্রচন্ড বিতর্কের মুখে এবং AIIB সামিট শেষে পরের সপ্তাহে চীনের সাথে দ্বিপাক্ষিক ফ্রি ট্রেড চুক্তি স্বাক্ষরের পর আর দ্বিধা টিকাতে পারে নাই। এখন সদস্য হবার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আসলে এমন কিছু অবজেক্টিভ বাস্তবতা তৈরি হয় যেটা কোন একটা রাষ্ট্র অন্য সব রাষ্ট্রের উপরে অধিক সুবিধা পেয়ে যায়। এমন ক্ষমতা পড়ে পাওয়া বাস্তবতা হিসাবে আসে যেটা অন্য কেউ চাইলেই অস্বীকার করতে পারে না। যেমন ১৯৪৪ সালে আইএমএফ গঠনের সময় ডলারকে আইএমএফের এর একমাত্র আন্তর্জাতিক বিনিময় মুদ্রা হিসাবে গ্রহণ করা ছাড়া অন্য সদস্য রাষ্ট্র কারও উপায় ছিল না। ফ্রান্স তবু আপত্তি তোলার বা এড়ানোর চেষ্টা করেছিল কিন্তু টিকাতে পারে নাই। কারণ বিশ্বযুদ্ধের সেকালে নিজ অর্থনীতির ব্যালেন্সশীটে উদ্বৃত্ব অর্থনীতির রাষ্ট্র ছিল একমাত্র আমেরিকা। আর বিপরীতে উদ্বৃত্ব দূরে থাক আমেরিকার কাছে ক্যাশ ও কাইন্ডের ঋণে ও অনুদানে আকন্ঠ নিমজ্জিত ছিল এককালের কলোনি সাম্রাজ্য রুস্তম-রাষ্ট্রগুলো বৃটেন, ফ্রান্সসহ সবাই। কমবেশি তেমনই “উদ্বৃত্বের” বাস্তবতায় এখন আমেরিকায় জায়গায় চীন হাজির হয়েছে। চীনের এমন উদ্বৃত্ব এখন তিন ট্রিলিয়ন ডলার।

ভারতের দিক থেকে দেখলে, চীনের এই “উদ্বৃত্ত্ব বাস্তবতার” পরিস্থিতির প্রভাব আরও প্রায় সব জায়গায় পড়ছে। যেমন BRICS অথবা করিডর কেন্দ্রিক BCIM এর গঠনে। এখানে চীনের সাথে সে নিজেকে সমমর্যাদা ও সমগুরুত্ত্বের স্বার্থের সদস্য হিসাবে তুলে ধরতে চাইছে। কিন্তু বিনিয়োগ সক্ষমতার প্রশ্নে যে বিনিয়োগ আবার বাণিজ্যিক বাজার মুনাফা ধরণের বিনিয়োগ নয় অর্থাৎ এই বিনিয়োগে সুদ ফিরে আসবে খুবই কম ১% এর নীচে, এমন বিনিয়োগ সক্ষমতার দিক থেকে চীনের সাথে সে কোনভাবেই তুলনীয় নয়। বরং সে ঐ বিনিয়োগের গ্রহিতা দেশ, দাতা নয়। এই বাস্তবতায় চীন কেন বেশি বিনিয়োগের সক্ষমতার জোরে কোনও কোনও বিষয়ে সবার চেয়ে উপরে থাকবে এগিয়ে থাকবে এসব প্রশ্ন তুলে লাভ নাই, এমনকি ঈর্ষা করেও লাভ নাই। তবে চীনের সাথে কোন উদ্যোগে জড়িয়ে গিয়ে তাতে নিজের মারাত্মক বা পার্মানেন্ট ক্ষতি যেন না হয় অথবা ভবিষ্যতে বড় কোন সমস্যায় না পড়ে এগুলো দেখে বুঝে নেবার, নিশ্চিত করার দরকার আছে। কিন্তু সেগুলোও বুঝে নেবার অন্য মেকানিজম বের করতে হবে। কিন্তু নিজের বিনিয়োগ সক্ষমতার মাপে BRICS প্রতিষ্ঠানে সবার সমান বিনিয়োগের মাপ-মাত্রা হতে হবে এমন আবদার ধরে বসে থাকলে BRICS প্রতিষ্ঠান এমন ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান হিসাবে থেকে যাবে, গ্লোবাল অর্থনীতিতে এমন ক্ষুদ্র প্রভাবের প্রতিষ্ঠান হবে যে তা জন্ম হওয়া আর না হওয়ার কোন ফারাক থাকবে না। BRICS প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্দেশ্যই এখানে মাটি হয়ে যাবে। একই ধরণের সমস্যা হচ্ছে আর থমকে দাঁড়িয়ে আছে করিডর কেন্দ্রিক BCIM এর গঠন। এসব নিয়ে আরও বিস্তারে এদিক আবার ফিরে আসব পরের কিস্তির লেখায়। এছাড়াও মোদীর “অর্থনীতি” মুল ফোকাস নীতি এটা কিভাবে প্রথম চার মাস জুন-সেপ্টেম্বর মোদী পার করল সেদিকে কথা আগাতে হবে। পরের কিস্তিতে যাব সেদিক নিয়ে।
এখন চলতি কিস্তির সারাংশ হল, একদিকে চীনের শক্তি “উদ্বৃত্ত্ব বিনিয়োগ ক্ষমতা” এই বাস্তবতার ক্ষমতা অন্যদিকে আমেরিকার কাছে থেকে ভারতের কাম্য সামরিক সহযোগিতা ইস্যুগুলো আদায়; এই দুইয়ের টানাপোরেনেতে সামরিক চাহিদার কামনা পূরণ করতে বিনিময়ে ভারত আমেরিকার কাছে নিজের কোন স্বার্থ এবং কতটা ছাড় দেয়া সঠিক হবে – এই মাত্রা নির্ণয়ও ভারতের জন্য একটা খুবই জটিল ও গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। এটা ভারতের দিক থেকে চীনের প্রতি রাগ বা ঈর্ষা করে আমেরিকার দিকে হাটা দিবার মত সিম্পল নয়। আর আজ অথবা কাল গ্লোবাল অর্থনীতিতে আসন্ন নতুন অর্ডার কেবল সাধারণভাবে সারা দুনিয়ার আগামি ভবিষ্যত বলে শুধু সেটাই নয়, রাইজিং ইকোনমির ভারতের কাছেও এটা আরও গুরুত্বপুর্ণ, কারণ ভারতের নিজ অর্থনীতিরও ভবিষ্যতও এটা। আমেরিকার প্ররোচনায় চীন ঠেকানোতে ভারতের মেতে উঠার খেলার সোজা মানে হবে – ঢলে পড়া পুরানা গ্লোবাল অর্ডারটাকে জোর করে আয়ু দেয়া। আর নতুনের আগমনকে দেরি করিয়ে দেয়া মানে নিজের রাইজিং ইকোনমির ভবিষ্যতের পায়ে কুড়াল মারা। রাইজিং ইকোনমি কথাটার অর্থ তখনই মেলে ধরে ফুটে উঠতে পারে যখন এর অর্থ পুরান অর্ডারের স্বাভাবিক বিনাশ আর নতুন অর্ডারের মধ্যে নিজের প্রভাবের জায়গাগুলো যতটা সম্ভব তা নিশ্চিত করা। গ্লোবাল অর্থনীতির অবজেকটিভ ট্রেন্ড এটাই। আবার তা এমন নয় যে ভারত চাইলেই রুপান্তরের এই ট্রেন্ডকে থামিয়ে দিতে পারে বা গতি কমাতে পারে। বরং ঢলে পড়ছে বলেই ভারতের অর্থনীতি রাইজিং, নইলে নয়। এটা আমরা যেন ভুলে না যাই। আবার এর অর্থ দিকবিদিক হারিয়ে চীনের কোলে ঝাপিয়ে পড়াও নয়। ভারতের এখন এই সুক্ষ্ম দড়ির উপর দিয়ে সামলিয়ে এক ব্যালেন্সিং এক্টে করে আমেরিকা-চীনের সাথে সম্পর্কে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি করে এগিয়ে যাওয়ার সময়। কিন্তু সেক্ষেত্রে একটাই বিবেচ্য গ্লোবাল অর্থনীতির অবজেকটিভ ট্রেন্ড, পুরান অর্ডারটার ঢলে পড়া এটাকে স্বাভাবিক রাখা, নতুন আয়ু না দেওয়া। এই বিষয়টা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সমান সত্য। বিশেষ করে ভারতের পো ধরা বাংলাদেশ, আর পো ধরার সুবিধা দিলে সে বাংলাদেশর কোন বিশেষ দলকে ক্ষমতায় রাখবে এভাবে বাংলাদেশকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টাও অসফল হবে। সেক্ষেত্রে ভারতের অর্থনীতি ডুববে, আর সেই সাথে বাংলাদেশও। পরের কিস্তিতে দেখা হবে।

[একই শিরোনামে লেখাটা ৩০ ডিসেম্বর ২০১৪ ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েবে। সে লেখা এখানে আবার অনেক জায়গায় আপডেট ও এডিট করে ছাপা হল।]

বিজেপির নাকি মোদীর সমর্থন, কোন দিকে

বিজেপির নাকি মোদীর সমর্থন, কোন দিকে

গৌতম দাস

১০ জানুয়ারি ২০১৫।
গত ০২ জানুয়ারি ২০১৫ পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির এক নেতা তথাগত রায় বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি বাংলাদেশের হিন্দুদের এক ধর্মীয়-সামাজিক সংগঠনের অনুষ্ঠানে এসে বক্তৃতায় বলেছেন, “বিজেপি সরকার উপলব্ধি করেছে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন দেওয়া উচিত এবং সেই কাজটি তারা করেছে। এটা আমি আপনাদের নিশ্চিত করেই বলতে পারি” – -প্রথম আলো ২ জানুয়ারি ২০১৫। এখানে সমর্থন মানে কি? বিগত কংগ্রেস সরকারের মত ও মাত্রায়? বিগত কংগ্রেস সরকার যেভাবে বাংলাদেশে পছন্দের সরকারের থাকার ব্যাপারে মরিয়া হয়েছিলেন অথবা ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগের মাসে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং যেমন ঐ নির্বাচনের ব্যাপারে মরিয়া অবস্থান নিয়েছিলেন তেমন? এই প্রশ্নটা নিয়ে নাড়াচাড়া করব।

প্রথমত, আমার মনে হয়, বিজেপি নেতা তথাগত রায়ের বক্তব্য সংক্রান্ত এই খবরটা নিশ্চিত খবর বা মোদী সরকারের অবস্থান হিসাবে নিতে আমাদের আরও দুচারদিন অপেক্ষা করা সঠিক হবে। কারণ হাসিনা ও মোদী সরকারের সম্পর্কের মধ্যে এমন কোন ফরমাল বা দৃশ্যমান প্রকাশ কিছু দেখা যায় নাই যা থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে মোদী কংগ্রেসের মতন ও মাত্রায় হাসিনার সমর্থক হয়ে উঠছেন। বিজেপির নেতা তথাগত রায়ের পরিচয় তিনি বিজেপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাবেক সভাপতি। অর্থাৎ তিনি মোদীর বিজেপি সরকারের ঠিক কেউ নন অথবা এই বিষয়ে কথা বলার সরকারি মুখপাত্র ধরণেরও কেউ নন। তিনি নিজে এটা দাবিও করেন নাই। এমনকি এব্যাপারে তিনি যে সতর্ক তা জানাতে তিনি ওখানে বলছেন, “যদিও ভারত একটি দেশ। তারা আরেকটি দেশের সঙ্গে কাজ করবে এটি স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে বিজেপি নেতা হিসেবে আমার বলা উচিত না, তার পরও আমি আপনাদের জানাতে চাই…………” । একই বিষয়ে দৈনিক মানবজমিন বলছে, “আমি বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে এটা বলতে পারি না। আমরা একটি দেশের সঙ্গে দেশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করি। তবে বাংলাদেশের বিষয়টা ভিন্ন। আপনাদের (উপস্থিতদের উদ্দেশে) বোঝার জন্য বলছি”। অর্থাৎ তিনি মূলত বলছেন, সরকারি প্রতিনিধি তিনি নন ফলে আইনী দিক আর তাছাড়া কুটনৈতিক দিক থেকে কথাটা তার বলা উচিত না। এদিকটায় তিনি সচেতন তবু তাঁর অনুমিত একটা “সত্য” কথা তিনি আমাদের জানাচ্ছেন। অর্থাৎ এতটুকু নিশ্চিত বলা যায় খবরটা কেন্দ্রীয় বিজেপি দলের হয়ত কিন্তু মোদীর সরকারের নিশ্চিত অবস্থান হিসাবে না নিয়ে বরং তা নিশ্চিত হতে আমাদের অপেক্ষা করাই উচিত হবে। অপেক্ষা বললাম এজন্য যে অনুমান করি, এখন বাংলাদেশের অনেক পত্রিকারই “কলকাতা প্রতিনিধি” বা “দিল্লি প্রতিনিধি” আছে। ফলে দুচারদিনের মধ্যে উতসাহী তাদের কেউ সরাসরি প্রধানমন্ত্রী মোদী বা নুন্যতম তাঁর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আকবরউদ্দিনের কাছে সরাসরি জিজ্ঞাসা করে আমাদের জন্য খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে আনবেন।

দ্বিতীয় কারণ
অপেক্ষা করতে চাওয়া বা নিশ্চয়তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করার আরও কারণ আছে। এমন দ্বিতীয় ও তৃতীয় এভাবে আরও দুটো কারণ এখানে বলব। দ্বিতীয় কারণটা এককথায় বললে, ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিন্যাস পরিস্থিতিতে এক গুরুত্বপুর্ণ বদল ঘটেছে। সেই পটভুমির মধ্যে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় কারণটা বলব। বিগত পাঁচ বছরে একনাগাড়ে কিন্তু ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন এক রাজনৈতিক বিন্যাস বা পোলারাইজেশন বিরাট তাতপর্য নিয়ে হাজির হয়েছে। গত বছর ২০১৪ সালের ভারতের কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনের (যেটার ফলাফলে মোদী প্রধানমন্ত্রী) সময়ে থেকে এর এক চুড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে। আর আগামি ২০১৬ সালের মে মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে প্রাদেশিক বা বিধানসভা নির্বাচন। কিন্তু এর সাথে বাংলাদেশের কি সম্পর্ক তা বুঝতে একটু বিস্তারে যেতে হবে। সেই পোলারাইজেশনের তাতপর্য না বুঝলে বাংলাদেশের সাথে এই প্রাদেশিক নির্বাচনের সম্পর্ক সবটা বুঝা যাবে না। তাই পশ্চিমবঙ্গের ভিতরের রাজনৈতিক গঠন বিন্যাস প্রসঙ্গে আগে একটু বিস্তারে যাব।
আগামি ২০১৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত তখন বাংলাদেশের সরকারে যেই থাক পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাংলাদেশ নামটা নানা উছিলায় বারবার উচ্চারিত হতে থাকবে। আমি পশ্চিমবঙ্গ বলেছি ভারত বলি নাই। এই নির্বাচনে নির্ধারক ঘটনা হল, পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের ২৮% ভোটার মুসলমান। এই তথ্য এখন খুবই নির্ধারক এক তথ্য। ইতোমধ্যেই এই মুসলমান ভোটারদের ব্যাপক অংশ ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের তৃণমুল কংগ্রেসের ভোটার সমর্থক হয়ে নতুন এক সমীকরণে একাত্ম হয়েছেন। আগে ১৯৪৭ সালের পর থেকে এরা প্রথমে কংগ্রেসের ভোটার, আরও পরে আশির দশক থেকে সিপিএমের ভোটার পরিচয়ে এতদিন ছিল। ইতোমধ্যেই তারা মমতার তৃণমুল কংগ্রেসের পক্ষে একচেটিয়া পোলারাইজ হয়েছে্ন। আগের কংগ্রেস অথবা সিপিএমের ভোটার থাকায় সময় এরা উভয় ক্ষেত্রে “সেকুলার” ভোটার হয়ে ছিল। অর্থাৎ সেকুলার পরিচয় তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সঠিক অবস্থান ভাবতেন। কিন্তু এখন মমতা তাদেরকে “তারা যা তাই”, অর্থাৎ “সাচার কমিটি রিপোর্টের” ভাষায় অবহেলিত এবং মুসলমান পরিচয়েই গ্রহণ করেছেন। ভারতের বিশ্লেষকেরা বলে থাকেন, ২০০৬ সালের শেষে প্রকাশিত ভারতের মুসলমানদের দুরাবস্থা বিষয়ক যে ডিটেল সার্ভে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, “সাচার কমিটি রিপোর্ট” নামে যা পরিচিত, এটা প্রকাশিত হবার পর থেকে ধীরে ধীরে এর প্রভাব পড়তে থাকে পশ্চিমবঙ্গের ভোট ও ক্ষমতার প্যাটার্ণে। ঘটনার প্রভাবের প্রথম দৃশ্যমান প্রকাশ ঘটে ২০১১ সালে; যখন বিগত ৩৪ বছর ধরে একনাগাড়ে আসীন সিপিএমের বামফ্রন্ট সরকার প্রাদেশিক বিধানসভার নির্বাচনে মমতার তৃণমুলের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। বিধানসভা ২০১১ এর ফলাফলে মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে ১৮৪ আসন একাই মমতার পক্ষে যায়। মমতা মুখ্যমন্ত্রী হন। মুসলমান ভোটারদের সাথে মমতার এলায়েন্স তখনও তেমন পোক্ত হয় নাই। কিন্তু মমতা মুখ্যমন্ত্রী হবার পরে ভোটার ভাগিয়ে আনার শুধু তাঁর মুখের প্রতিশ্রুতি নয়, পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের যেসব সামাজিক আইনী বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলোর সাথে ক্ষমতায় আসা মমতার সরকারের দেয়ানেয়া রফাগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। এর প্রকাশ হিসাবে মমতা রাজ্যসভায় মুসলমান ভোটারদের নেতা প্রতিনিধি হিসাবে মোহম্মদ হোসেন ইমরানকে মনোনীত করে পাঠান। ভারতের পার্লামেন্ট লোকসভা আর প্রাদেশিক বিধানসভার সমন্বয়ে আরও একটা আইন প্রনয়নী প্রতিষ্ঠান হল রাজ্যসভা। রাজ্যসভার সদস্য প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন না। প্রত্যেক প্রাদেশিক সরকারের রাজ্যসভায় সদস্য মনোনয়ন দেয়ার কোটা থাকে। মুসলমান ভোটারদের সাথে মমতার এই এলায়েন্সের গড়ে নেবার পরে এই এলায়েন্সের তাতপর্যের চরম প্রকাশ ঘটে গত বছর ২০১৪ সালের কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনে। নির্বাচনের ফলাফলে লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের ভাগে পড়া মোট ৪২টা আসনের ৩৪টাই একা মমতা দখল করে। যেটা আগের ২০০৯ সালের নির্বাচনে ছিল মাত্র ২০ আসন। যদি মনে রাখি ২০১৪ সালের কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনের মোদী-ঝড় বা জ্বরের কথা যেখানে প্রায় সব আঞ্চলিক দল উড়ে ধরাশায়ী হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই ঝড়েও উলটা মাত্র দুটো আঞ্চলিক দল, তামিলনাডুতে (মাদ্রাজ) এক আঞ্চলিক দল এবং কলকাতায় তৃণমুল, আগের চেয়ে আরও বড় সংখ্যাগরিষ্টতার আসন সমর্থন নিয়ে টিকে গিয়েছিল। মমতা টিকে যাওয়ার প্রধান কারণ বলা হয় তিনি মুসলমান ভোটারদের সাথে আগেই এলায়েন্স পোক্ত করে ফেলেছিলেন তাই।
ওদিকে মোদী ঝড়ের গত নির্বাচনের পরে আরও কিছু প্রতিক্রিয়া আছে। ঐ নির্বাচনের সময় থেকে উঠা মোদী-ঝড়ের সুবিধায় বিজেপিও পশ্চিমবঙ্গে তাদের মোট ভোটের শেয়ার বাড়িয়ে আগের ৪% থেকে ১৭% এ নিতে সমর্থ হয়। ভোটার পোলারাইজেশন ট্রেন্ড বিচারে দেখা গেছে, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস এদের সেকুলার ব্লক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, তাদের ভোটাররা ছুটছে তৃণমুলের দিকে। আর এই ছুটাছুটিতে আবার বিজেপি ভোট বেড়েছে সম্ভবত মোদীর দেখানো অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্নের কারণে। ফলে এখন আগামি পশ্চিমবঙ্গ ২০১৬ প্রাদেশিক নির্বাচনে ক্ষমতা পেতে বিজেপি প্রচন্ডভাবে আকাঙ্খী ও আগ্রাসী দল হয়ে উঠেছে। তাই আগামি ২০১৬ নির্বাচনে “২৮% মুসলমান” এই তথ্যটা প্রধান ফ্যাক্টর ও একে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খাচ্ছে, দলগুলো নিজের নির্বাচন কৌশল সাজানো শুরু হয়ে গেছে। কারণ সবাই বুঝে গেছে “২৮% মুসলমান” ভোটারের বাক্স এখন মমতা যেটা সহজে বদল হচ্ছে না। ফলে বাকি হিন্দু ও অন্যান্য ৭২% ভোটার ভাগ হবে তৃণমুল, বিজেপি, বামফ্রন্ট আর কংগ্রেসের মধ্যে। ফলে “মুসলমান” শব্দটা ইতোমধ্যেই মমতার সাথে গাটছাড়া বেধে ফেলেছে, আর বাকি বিরোধী বিজেপি, সিপিএম ও কংগ্রেসের কাছে আক্রমনের শব্দ মুসলমান, আর শব্দটা টেনেটুনে এর আরও নতুন অনেক অর্থ হচ্ছে যেমন – “জঙ্গী”, “অনুপ্রবেশকারি”, “জামাত”, “বাংলাদেশী” ইত্যাদি। এককথায় এই শব্দগুলোর সুত্রে বাংলাদেশ নামটা বহু বিচিত্রভাবে আ্সা শুরু হয়েছে। এসবের সারকথা, এগুলো পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটারদের মমতার দিকে পোল বদলের বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রতিক্রিয়া। আর এসব নির্বাচনী প্রপাগান্ডার ট্যাগ আমাদের উপরেও নানান উতপাত নিয়ে আসছে।
বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে, আমরা এখন মোদী-হাসিনার সম্পর্ক কেমন সে বিষয়ে এই চারটা দল যে যখন যেভাবে বললে নিজের নির্বাচনী কৌশলের পক্ষে বা বিপক্ষে কাজে লাগে সেভাবেই নানান ব্যাখ্যা দিতে দেখতে পাচ্ছি, আগামিতে আরও পাব। বিজেপি নেতা তথাগত রায় বাংলাদেশে এসে যে বয়ান দিয়েছেন তা এই আলোকে দেখাই বুদ্ধিমানের হবে। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে এই বক্তব্যগুলো সত্য-আধাসত্য-মিথ্যা যাই হোক এগুলো মুলত একেবারেই পশ্চিমবঙ্গের দলগুলোর আঞ্চলিক নির্বাচনী স্বার্থমূলক বক্তব্য, তাও আবার একেবারেই নির্বাচনী রেঠরিক বয়ান। কোনমতেই এই রেঠরিকগুলোকে মোদীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ভারত সরকারের বৃহত্তর স্বার্থ বয়ান নয়, ফলে আমাদের জন্য সেভাবে দেখাও হবে মারাত্মক ভুল।

তৃতীয় কারণ
তৃতীয়ত, নরেন্দ্র মোদী তাঁর সরকার ও বিজেপি দলের মধ্যে ব্যবহারিক একটা সুক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ ফারাক বজায় রাখতে চান। এনিয়ে গত ২০১৪ নির্বাচনের প্রচারণা চলার সময় থেকেই তিনি মিডিয়াতে ধারণা দিয়ে আসছেন। এখন বাস্তবেও এর প্রমাণ রেখেছেন। যেমন, কেন্দ্রীয় বিজেপির সভাপতি অমিত শাহকে কলকাতার আগামি ২০১৬ নির্বাচনে দলকে জিতিয়ে আনার প্রকাশ্য এসাইমেন্ট সঁপেছেন মোদী। কলকাতায় দলকে জিতানোর জন্য মমতার চরম বিরোধী হয়ে সর্ববিধ কৌশল ঠিক করবেন তিনি একক দায়িত্বে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদী আবার সেই মমতার সাথেই সখ্যতার এক ওয়ার্কেবল সম্পর্ক রেখে চলবেন, চলতে চান। অর্থাৎ বিজেপি দলের প্রাদেশিক স্বার্থ আর কেন্দ্রীয় সরকারের স্বার্থ, কর্মকাঠামোর মধ্যে এমন একটা ব্যবহারিক ফারাক তিনি বজায় রাখতে চান। এই হল সরকার ও দলের ফারাক বিষয়ে মোদীর ভাবনা। পশ্চিমবঙ্গের এসাইমেন্ট কাজে নেমে অমিত শাহ সারদা অর্থ কেলেঙ্কারি ও বর্ধমানের খাগড়াগোড়ে বোমা হামলা নিয়ে, গোয়েন্দা র ও তদন্তকারী সংস্থা NIA কে যতটা সম্ভব ম্যানিপুলেট করে নিজের ষড়যন্ত্র প্রপাগান্ডায় সামিল করেছেন। যতদুর এই কেন্দ্রীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুল কাজ কেন্দ্রীয় সরকারের বৃহত্তর স্বার্থে পরিচালিত হওয়া তা ক্ষুন্ন না হয়। এমনকি খাগড়াগোড়ে বোমা হামলা নিয়ে বাংলাদেশে ভারতীয় গোয়েন্দাদের সফর করিয়েছেন। অমিত শাহ নিজে নয়, কেন্দ্রিয় গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান আর মোদীর পররাষ্ট্র প্রশাসনের মাধ্যমে হাসিনা সরকার ও তার গোয়েন্দা বাহিনীর সাথে সম্পর্ক করিয়েছেন, সফর বিনিময় করিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে না জড়িয়েই তিনি এটা করাতে পেরেছেন। কারণ ভারতের পররাষ্ট্র বিভাগ যেকোন প্রাদেশিক ইস্যুতে পররাষ্ট্র বিষয়ে সার্ভিস সহায়তা দিতে পারে। অমিত শাহ বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি হলেও তিনি মোদীর সরকারের কেউ নন, সরাসরি কোন পদে বা মন্ত্রীসভায় তিনি নাই। কিন্তু মোদী এসব বিষয়ে নিজেকে জড়াবেন না, ঐ প্রতিষ্ঠানগুলোও মোদীর বৃহত্তর স্বার্থ নীতির উপর আঁচ-প্রভাব না ফেলে, না ফেলার সীমার মধ্যে থেকে যতদুর সম্ভব অমিত শাহকে সমর্থন দিতে পারে এভাবে কাজ করেছে। যেমন, অমিত শাহ কলকাতার জনসভায় মমতাকে বাংলাদেশ থেকে জঙ্গী আমদানি করেছেন, সারদা কেলেঙ্কারির অর্থ খাগড়াগোড়ে বোমা হামলায় মমতা ব্যবহার করেছেন – এসব অভিযোগ এনে আক্রমণ করেছেন। সারদা অর্থ কেলেঙ্কারি কথার অর্থ, সারদা হল বাংলাদেশের ডেসটিনির মত এক কোম্পানীর নাম; ফলে ডেসটিনির মতই কলকাতায় প্রকাশ হয়ে সারদার অর্থ কেলেঙ্কারি। মমতাকে সারদা অর্থ কেলেঙ্কারির, “জঙ্গী”, “অনুপ্রবেশকারি”, “জামাত”, “বাংলাদেশী” এসব শব্দে অভিযোগ তুলে পর্যদুস্ত করা অমিত শাহের পশ্চিমবঙ্গে জেতার নির্বাচনী কৌশল, তাই। কিন্তু অমিত শাহ বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি হলেও এগুলো ঠিক আবার মোদী সরকারের বাংলাদেশ নীতিকে প্রতিফলিত করে না। মোদীর কেন্দ্রীয় সরকার ভারতের বৃহত্তর কেন্দ্রীয় স্বার্থের পক্ষে কাজেই মূলত নিমগ্ন থাকতে চাই। তাই মোদীর সরকারের এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টে লিখিত বিবৃতিতে বলেছেন, সারদার অর্থ পাচার আর বোমা হামলা, বাংলাদেশ এগুলোর মধ্যে কোন সম্পর্ক নাইকেন্দ্রীয় তদন্ত প্রতিষ্ঠান NIA তারও ফরমাল ফাইন্ডিং রিপোর্টে একই কথা বলেছে। এমনকি তারা রিপোর্টে বাংলাদেশ বা জেএমবির নাম আনে নাই, তবে সন্দেহের পর্যায়ে -খুজে নিশ্চিত হতে হবে ধরণের কিছু কথা সেখানে রেখেছে। অর্থাৎ অমিত শাহের কলকাতার পাবলিক বক্তৃতা যা উভিযোগ তুলেছেন সেকথার সাথে মোদীর মন্ত্রী সামঞ্জস্য রাখে নাই। এই অসামঞ্জস্য নিয়ে মিডিয়ায় কথাও উঠেছে। এখানে নেপথ্যে বলে রাখা যায়, আমাদের অর্থমন্ত্রী সপ্তাহ দুয়েক আগে কলকাতায় বিজনেস চেম্বারের এক সভায় গিয়ে এক কলকাতার সাংবাদিককে বলেছেন, “সারদার টাকা ঘুরপথে গিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা হয়েছে এবং সেখান থেকে সেই অর্থ বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন জেএমবিকেও দেওয়া হয়েছে – এমন কোন তথ্য মেলেনি”। আর এসব তর্ক থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থেকেছেন মোদী তবু কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ম্যানিপুলেট না করে স্বাভাবিক কাজের পক্ষে অবস্থান উপরে রেখেছেন। দলের অবস্থানকে প্রাধান্য দিয়ে সে ভিত্তিতে সরকারের বক্তব্য সাজাতে যান নাই। তবে এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল, দল আর সরকারের মধ্যে ফারাক রাখার নীতি মোদীর অনুসরণ করার কারণ ঠিক কোন নৈতিক বা কনষ্টিটিউশনাল বাধ্যকথার দিক ভেবে নয়। মূল কারণ হল, মোদী সারা ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়ে থাকতে চান যেন অভিযোগ না আসে যে তিনি কোন একটা বা দুইটা প্রদেশ বা রাজ্যের দিকে কান্নি মারা প্রধানমন্ত্রী। তিনি গুজরাট বা পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থের দিকে কান্নি মারা ভারতের প্রধানমন্ত্রী – এই পরিচয় তিনি একেবারেই চান না। সেজন্য এই নীতিগত অবস্থান।
আবার পশ্চিমবঙ্গের ২০১৬ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সরকারের সাথে চার প্রাদেশিক দল বা শাখা দল -তৃণমুল, বিজেপি, সিপিএম ও কংগ্রেস এরা সবাই দেখাতে চায় তাদের সম্পর্ক খুবই ভাল এবং স্ব স্ব নির্বাচন কৌশলের পক্ষে বাংলাদেশ আছে। এমনটা দেখানোর একটা সুক্ষ্ম প্রতিযোগিতা সবার আছে। যদিও এই দল চারটার চোখে সবার ইস্যু একটাই, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটার। তবে সেখানে তফাত হল, মমতার অবস্থান মুসলমান ভোটারদের পক্ষে আর বাকি তিন দলের বিপক্ষে। যেমন আগামি ফ্রেব্রুয়ারি মাসে মুখ্যমন্ত্রী মমতার আসন্ন বাংলাদেশ সফরে নুমান করি, নিজের নির্বাচন কৌশল কেন্দ্রিক যে ধারণা আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে দিবেন তা হল, মমতা “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ” বা জঙ্গী অনুপ্রবেশ ঘটছে এই বয়ান মানেন না, বিরোধী তিনি এটা আমাদেরকে বুঝানো। কারণ মনে রাখতে হবে নির্বাচনী কৌশল হিসাবে বিজেপি, সিপিএম ও কংগ্রেস কমবেশি এদের সবার অবস্থান মমতার অবস্থানের বিরোধী। আর মমতা বাদে বাকি তিনদল প্রত্যেকের বয়ান কমবেশি – সারদা অর্থ কেলেঙ্কারির, “জঙ্গী”, “অনুপ্রবেশকারি”, “জামাত”, “বাংলাদেশী” এইসব অভিযোগ দিয়ে সাজানো। অনেকে অবাক হতে পারে কিন্তু “সেকুলারিজমের” বড়াই করা দশার কমিউনিষ্ট সিপিএমের বয়ানও কমবেশি এটাই। সিপিএমের বাংলাদেশি কাউন্টার পার্ট হল মেনন-ইনু, মূলত মেননের দল। সেজন্য তারাও হাসিনা সরকারকে নিজেদের রাজনৈতিক মিত্র বা কাছের সমভাবাপন্ন মনে করে।
অতএব তৃতীয় এই কারণে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি নেতা তথাগত রায়ের বক্তব্যকে নিশ্চিত মোদী সরকারের অবস্থান বলে সিদ্ধান্তে না গিয়ে আমি তাই অপেক্ষার কথা বলছি।
সারকথা, আগামি ২০১৬ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক দল বা শাখার বক্তব্যগুলো তাদের নির্বাচনী কৌশলের আলোকে দেখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ঝাপিয়ে পরা যাবে না। তা বোমা হামলা, জঙ্গী “অনুপ্রবেশকারী” অথবা হাসিনাকে সমর্থন এমন যাই ইস্যু হোক। মোদী সরকারের অবস্থান সরাসরি মোদীর মুখ থেকে বা কোন মুখপাত্রের মুখ থেকে শুনলে তবেই তা নিশ্চিত বলে বুঝতে হবে।

সর্বশেষ অমিত শাহের খালেদাকে ফোন বিষয়ে
লেখার উপরের এই পর্যন্ত অংশটা লিখে শেষ করেছিলাম ঠিক ৬ জানুয়ারি ভোরবেলায়। প্রকাশ করা হয় নাই। পরে আরও বড় বিস্তারিত করতে চেয়েছিলাম। তাও হয় নাই। আপাতত তাই, কোন আপডেট না করে নোট আকারেই প্রকাশ করলাম। ইতোমধ্যে গতকাল থেকে ঢাকায় অমিত শাহের ফোন বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে।
উপরের কথাগুলো সাজানোর কাঠামো অনুসারে অমিত শাহের ফোন করা বা না করা যাই হোক তা থেকে একই কারণে এটা মোদী সরকারের অবস্থান হিসাবে নিশ্চিত ধরে নেয়াটা এখনই ঠিক হবে না। কারণ আগেই বলেছি অমিত শাহ মোদী সরকারের কেউ নন, কোন মুখপাত্রও নন। কিন্তু অমিত শাহ ফোন করেছেন অথবা করেন নাই মোদী সরকারের হাসিনার প্রতি মনোভাবে বাংলাদেশের চলমান খালেদা “অবরোধ” প্রেক্ষিতে কি নেতিবাচক হয়ে গেছে? অবশ্য অবশ্য অবশ্যই হয়েছে। কংগ্রেসের মতন করে হাসিনার পক্ষে তো নয়ই বরং ডায়লগ ও নতুন নির্বাচনের পক্ষে মোদীর ভারত সরকার ঘুরতে যাচ্ছে। এই প্রাথমিক ইঙ্গিতকে চিহ্নিত করা যাচ্ছে, ফলে তা তাতপর্যপুর্ণ মনে করছি – অমিত শাহ এর কথিত ফোনের প্রেক্ষিত থেকে তা নয় বরং বিশেষ কিছু মিডিয়া রিপোর্ট থেকে। যেমন টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে বিএনপির নজরুল ইসলাম খানের সাক্ষাৎকার বিষয়ে একই দিনে দুদুটা রিপোর্ট টাইমস অব ইন্ডিয়ায় ছাপিয়েছে। এছাড়া টাইমস অব ইন্ডিয়ায় সম্পাদকীয় বিভাগের রুদ্রনীলের ব্লগে লেখা মুল্যায়ন, রুদ্রনীল ঘোষের নিজের নামে বাংলায় প্রায় একই সারকথা মানবজমিন ০৯ জানুয়ারি ২০১৫ পত্রিকার লেখা “রাজনৈতিক অস্পৃশ্যতা ঘুচাতে এখনই সংলাপ দরকার”। আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় একই মুল্যায়নের একেবারে সম্পাদকীয় লিখে নিজেরই আগের অবস্থান উলটে দেয়া।
ভারতে যেসব মিডিয়া বিজেপিকে বেশি কাভারেজ দেয় এদের মধ্যে জি-নিউজ টিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া এবং আনন্দবাজার অন্যতম। বিশেষত গত নির্বাচনের পরে অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গে এসাইনমেন্টে আসার পর থেকে আনন্দবাজারের অমিত শাহকে সার্ভিস সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। অমিত শাহ যখন সারদা আর বোমা হামলা নিয়ে নির্বাচনী প্রপাগান্ডায় ঝাপিয়ে পড়লেন তখন থেকে তাঁর প্রধান মিডিয়া হাতিয়ার আনন্দবাজার। সময়ে তা এমন জায়গায় গেছে যে সোর্সছাড়া খবর, গোয়েন্দা সুত্রের নামে চালানো বাপ-মাহীন রিপোর্ট, একেবারে অমিত শাহের মমতা ও বাংলাদেশের অনুপ্রবেশী মুসলমান বা জামাতের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডার কার্বন কপিও ছাপা হয়েছে। এই চক্রের ফ্যারে পড়ে সেসব প্রপাগান্ডা আবার বাংলাদেশের প্রথম আলো আনন্দবাজারের সুত্রে ছাপিয়ে বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিয়েছে। রিপোর্টের টার্গেট ছিল, মমতার রাজ্যসভার সদস্য ইমরান-সারদা-বর্ধ্মানের বোমা হামলা-জামাত এসব কিছুকে এইসুত্রে গেথে গল্প লেখা। সেই সন্ধ্যায় আওয়ামি ঘরানার তিন টিভি আবার প্রথম আলোর ঐ মিথ্যা রিপোর্টের বরাত দিয়ে খবর প্রচার করেছে। মাত্রাছাড়ানি টের পেয়ে অথবা কোন কারণে প্রথম আলো সে অবস্থান থেকে সরে আসে দুদিন পরে। আর ড্যামেজ কন্টোল ও ব্যালেন্স করতে এবার শুধু ইমরানের পালটা ডিফেন্স বক্তব্য নিয়ে রিপোর্ট ছাপে। উপরে বলেছি এসব প্রপাগান্ডা মোদী সরকারের মন্ত্রী, অনুসন্ধান রিপোর্ট সবাই নাকচ করে দিয়েছে। সেই আনন্দবাজার এবার খোদ সম্পাদকীয় মানে নিজ সম্পাদকীয় অবস্থান ব্যক্ত করেছে। খালেদাকে আটকে রাখার উদ্বেগ, গনতন্ত্রের জন্য উদ্বেগ ইত্যাদি জানিয়ে উলটা হাসিনাকে অভিযুক্ত করে বলছে – এগুলো হাসিনার “কেমন ধরনের গণতন্ত্র?”, এগুলো হাসিনার “প্রতিহিংসার ক্রিয়া”, “অর্থনৈতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িবার আশঙ্কা প্রবল”, “মৌলবাদীরা তাহার সুযোগ লইতে পারে” ইত্যাদি। আনন্দবাজার বিএনপি-জামাত জোটের পক্ষে সাফাই দিয়ে বলছে, “বিএনপি ও তাহার জোটসঙ্গী জামাতে ইসলামির যৌথ আন্দোলন সহজেই হিংসাত্মক হয়, তাহা সত্য। কিন্তু অতিরিক্ত দমন নীতি জনসাধারণের এক বৃহৎ অংশের ক্ষোভ-বিক্ষোভ বাহিরে আসার পথটিই রুদ্ধ করিতে পারে, স্বাভাবিক নিষ্ক্রমণের পথ না পাইয়া এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ অন্তর্ঘাতেই বিস্ফোরণের পথ খুঁজিবে”। হাসিনাকে দোষী করে তাঁকে নমনীয় হতে বলেছে আর খালেদার আন্দোলন ন্যায্য বলে সাফাই দিয়েছে। আনন্দবাজারের এই অবস্থান পরিবর্তন বিজেপির অমিত শাহের অবস্থান পরিবর্তন বলে মনে করার ইঙ্গিত বলে মনে করার কারণ আছে। তবুও এখনই এটাকে মোদী সরকারের অবস্থান বলে নিশ্চিত বুঝতে দেরি করতে বলব। তবে অবশ্যই এটা প্রাথমিক ইঙ্গিত।

মোদীর সাথে অমিত শাহ এর সম্পর্ক
মোদীর সাথে অমিত শাহ এর সম্পর্ক কি কেমন তা জানা থাকলে নজরুল ইসলাম খানের সাক্ষাতকার থেকে আনন্দবাজারের সম্পাদকীয় পর্যন্ত ঘটনাবলীর আঁকা গ্রাফ থেকে বের হওয়া ইঙ্গিতগুলোর সম্ভবত কিছু তাতপর্য উদ্ধার পাওয়া যেতেও পারে। বলা হয়ে থাকে, রাজনীতিতে রাজনীতিক নেতাকে অনেক ডার্টি-কাজ করার বা ময়লাঘাটার প্রয়োজন অনুভব করতে হয়, যেগুলো খাস প্রমাণ না থাকলেও কানাঘুষায় বা আধাপ্রমাণে তা অপ্রকাশিত থাকে না। ফলে সেসব কাজ এটা মূল নেতা করলে আবার তাঁর ইমেজের বিরাট কাল দাগ লেগে ক্ষতি হয়। সেটা এড়াতে মূল নেতা তা খুব কাছের বিশ্বস্ত একজনকে দিয়ে করিয়ে থাকেন। মোদীর তেমন বিশ্বস্ত লোক হলেন অমিত শাহ। মোদীর প্রথমবার গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় গুজরাটের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে অমিত শাহের উত্থান। আর সর্বশেষ ২০১৪ সালের কেন্দ্রীয় লোকসভার মোট ৫৪০ আসনের নির্বাচনে একা সবচেয়ে বড়ভাগের আসন সংখ্যা হল ৮০ আসনের রাজ্য, উত্তর প্রদেশ। মোদী সেই উত্তর প্রদেশ জয় করে আনার জন্য গুজরাট থেকে অমিত শাহকে এসাইমেন্ট নায়কের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়ে দেন। অমিত শাহকে তখন কেন্দ্রীয় বিজেপির সেক্রেটারিও করে দেয়া হয় আগে। নির্বাচনের ফলাফলে চমক দেখিয়ে তিনি ৮০ আসনের ৭২ টাই একা বিজেপির পক্ষে আনেন। তবে সেজন্য তার দুর্ধর্ষ নামের সাথে আরও কালি লেগেছিল। এই নির্বাচনের কয়েক মাস আগে উত্তরপ্রদেশের মুজাফফরনগরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অভিযোগে আদালতের মামলাগুলোতে তিনি আসামি। তাঁর এসাইমেন্টের সফলতার কৌশল বড় অদ্ভুত, সময়ে অবিশ্বাস্য। দাঙ্গার অভিযোগ তার নামে থাকে কিন্তু তিনিই আবার কোন সংখ্যালঘু অথবা জাত-ধারণায় সময়ে কোন উচুজাত অথবা নিচুজাতের কাউকে ঐ স্থান থেকে বিজেপির হয়ে নির্বাচন করিয়ে এবং জিতিয়েও আনতে পারেন। এসব ডার্টি কাজে গুজরাট থেকে উত্তর প্রদেশ পরিক্রমায় তার নামে যতগুলো মামলা আছে এর সব পেন্ডিং আর তিনি জামিনপ্রাপ্ত। গুজরাটের পর থেকে এপর্যন্ত তিনি আর কখনও কোন বিজেপি সরকারে সরকারি পদ নেন নাই, আড়ালে ক্ষমতাধর থেকেছেন। চলতি মোদী সরকারেরও তিনি কেউ নন। তিনিই হলেন এখন কেন্দ্রীয় বিজেপির সভাপতি এবং পশ্চিমবঙ্গের ২০১৬ নির্বাচনে দলকে জিতানোর এসাইনমেন্টে মুল দায়িত্বপ্রাপ্ত।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে অমিত শাহ মোদীর হয়ে আগমনী বার্তা দেবার ভুমিকা নিয়ে থাকতে পারেন। অর্থাৎ মোদী এখনই সরকারকে জড়াতে চান না, হয়ত কিছু প্রস্তুতি বাকির কারণে। এমনটা হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে একাজ তাঁর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী এসাইমেন্টের সাথে সম্পর্কিত কিছু নয়। অসম্ভব নয় যে এটা আলাদা এসাইনমেন্ট। অর্থাৎ অমিত শাহ আর মোদীর অবস্থানের এখানে এক হতে পারে। এখানে তিনি মোদীর আগমনী বার্তার বাহক। ফলে এটা দল-সরকারের ফারাকের দিক থেকে বুঝতে চাওয়া ভুল হবে। বরং মোদীর আগমনী বার্তা মানে মোদী যে রাজনৈতিক অবস্থান নিতে যাচ্ছেন তা আগাম জানাচ্ছেন অমিত শাহ এভাবে অনুমান করতে সমস্যা নাই। আপাতত এই পর্যায়ে এটা অনুমান হিসাবেই থাক। তবে বেশিদিন নয়, এমাসের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে সম্ভবত এটা আরও স্পষ্ট পরিস্কার হয়ে সকলের কাছে ধরা দিবে। দেখা যাক।

লেটেষ্ট আপডেটঃ সকাল, ১৪ জানু ২০১৫

[ইতোমধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিন মিডিয়ায় মুখ খুলেছেন, গত পরশু ১২ জানুয়ারি ২০১৫। তাঁর বক্তব্যের অর্থ কি, নতুন কি বললেন আর কি বললেন না তা নিয়ে আমার কিছু মন্তব্য নিচে সংযোজিত করে দেয়া হল।]
অমিত শাহের টেলিফোন করা না করা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিতর্কিত হয়ে আছে। এর ভিতরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিনের এক বক্তব্য আজ প্রথম আলোসহ অনেক মিডিয়া ছাপিয়েছে। প্রথম আলো বলছে তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারতের কোনো ভূমিকা নেই, আগামী দিনেও থাকবে না। বাংলাদেশ কিভাবে চলবে তা সে দেশের সরকার ও জনগণই ঠিক করবে”।
এখন এই বক্তব্য কি অমিত শাহের টেলিফোন করা না করা নিয়ে বাংলাদেশে বিতর্কের কোন অবসান ঘটাল? প্রত্যক্ষভাবে অবশ্যই নয়। দৈনিক যুগান্তর থেকে জানা যাচ্ছে, অমিত শাহ বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলেও তিনি এর জবাবে বলেন, “বাংলাদেশে কী ধরনের সমাজ থাকবে, কোন বিষয় প্রাধান্য পাবে, তা ঠিক করে দেওয়ার কেউ ভারত নয়। বাংলাদেশের সরকার ও সে দেশের জনগণই ঠিক করবে কোন সমাজে কীভাবে তারা থাকবে”।
তাহলে কি দাড়াল?
তবু অনেকে এই বক্তব্য -অমিত শাহ ফোন করেন নাই – এমন অর্থ বের করার জন্য চেষ্টা করবেন হয়ত। সে চেষ্টা বিফলে যাবে সন্দেহ নাই, আর বিতর্কের অবসানও হবে না। তবে এই বক্তব্য থেকে সবাই মানবেন এমন কিছু সিদ্ধান্তে আসা যায়।
যেমন, হাসিনার প্রথম পাঁচ বছর আর পরের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসে যেভাবে দাবি করছিলেন ওর সারকথা ছিল –যা কিছুই হোক তাদের হাসিনাকেই চাই। এমন প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের জায়গায় মোদীর সরকার এখন নাই এটা আকবরউদ্দিন পরিস্কার করেছিলেন। সুজাতা সিং চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে আমাদের মিডিয়াকে সেসময় নিজে দুটো বাক্য বলেছিলেন। এক, নির্বাচন হবার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় হাসিনার এগিয়ে যাওয়া উচিত। দুই, সকলকে নিয়ে নির্বাচনের চেষ্টার বদলে যত বেশি দলকে পারা যায় তাদের নিয়ে নির্বাচনে যাওয়া উচিত। আর ওদিকে এরশাদের সাথে দেখা করে তাঁকে বলেছিলেন, জামাত ক্ষমতায় এসে যাবে সেটা ঠেকাতে এরশাদের নির্বাচনে যাওয়া উচিত। এখন সৈয়দ আকবরউদ্দিন আমাদের বুঝিয়ে দিলেন তিনি কোনভাবেই সুজাতা সিং নন। সুজাতা সিং এখনও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব থাকলেও তিনি আর এখন কংগ্রেসের না মোদীর সরকারের সচিব হয়ে আছেন। একথাটাও সৈয়দ আকবরউদ্দিন প্রচ্ছন্নে আমাদের জানালেন। তবে সুজাতার চক্ষুলজ্জা ফিরে এসেছে কিনা আমরা এখনও জানি না। গত বছর তিনি মোদীর পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বাংলাদেশ সফরের সময় সঙ্গী হয়ে এসেছিলেন। কিন্তু মোদী সরকার চান নাই সেই তিনি আবার বাংলাদেশের মিডিয়ার মুখোমুখি হন অথবা সুজাতার পুরান বক্তব্য ঘেঁটে মোদী সরকারকে কোন বিব্রত পরিস্থিতির মুখে ফেলেন। ফলে আমরাও জানতে পারিনি সুজাতা সিংয়ের চক্ষুলজ্জা ফিরেছে কি না। সেই থেকে সৈয়দ আকবরউদ্দিনই মিডিয়ায় বাংলাদেশ ইস্যু সামলাচ্ছেন। অবশ্য উপরের কথাগুলোর অর্থ এমনও না যে বিড়াল মাছ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। অর্থাৎ সব রাষ্ট্রই নিজের স্বার্থ, সক্ষমতা আর সুযোগ অনুযায়ী অন্যকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে থাকে। এটা বন্ধ হবার হয়ে গেছে বা যাবে সেকথা এখানে বলা হচ্ছে না। তবে সেটা কূটনৈতিক সীমা, কনভেনশন আর শোভন বা চক্ষুলজ্জা ইত্যাদি সীমায় থেকে অপ্রকাশ্যে চলতেই থাকবে। এটাই স্বাভাবিক।
সৈয়দ আকবরউদ্দিনের এই বক্তব্য একইসাথে এবছরের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা তথাগত রায়ের বাংলাদেশে এসে দাবি করা বক্তব্যকেও নাকচ করে।
ওদিকে কলকাতার আনন্দবাজার ১০ জানুয়ারি জানিয়েছে, “বিজেপির মুখপাত্র রবিশঙ্কর প্রসাদ এ দিন দিল্লিতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করলেও খালেদাকে তাঁর দলের সভাপতির ফোন করা বা না-করা নিয়ে একটি কথাও বলেননি। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক থেকেও সরকারি ভাবে কোনও বিবৃতি দিয়ে বিষয়টির মীমাংসা করা হয়নি”। এই পরিস্থিতি দেখে আনন্দবাজার নিজে ঐ রিপোর্টের শেষে মন্তব্য করেছে, “তবে কি বিজেপি বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না, নাকি বিএনপি-র সঙ্গে ভবিষ্যৎ বোঝাপড়ার পথ খোলা রাখতেই মুখ বন্ধ রাখার কৌশল?”।