মমতার বাংলাদেশ সফর ও প্রত্যাশা

মমতার বাংলাদেশ সফর ও প্রত্যাশা

গৌতম দাস
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-9n

mamota

পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ঢাকা সফরে এসেছেন। এমন সময়ে তার আসা যখন আমরা বিরাট রাজনৈতিক সংকট, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। এই সংকটে ভারতের অবস্থান কোন দিকে এ’সম্পর্কে জানতে আমরা আগ্রহী, বিশেষত দিল্লি আর কলকাতার অবস্থানের ঐক্য ও পার্থক্য আমরা বুঝতে চাই। বলা বাহুল্য, এখানে ভুল করার বিশেষ কোন অবকাশ নাই যে মমতা একটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কোন প্রতিনিধি তিনি নন, প্রতিনিধিত্ব তিনি করছেনও না, করার সুযোগও নাই। তাহলে মমতার এই সফরের প্রয়োজন দেখা দিল কেন?
এর দুটো দিক আছে। এক, হাসিনা সরকার কেন মমতার সফরে আগ্রহ দেখালেন? আর দুই, মমতা এই সফর কেন প্রয়োজন মনে করলেন? এই দুটো বিষয় নিয়ে আমরা এখানে কথা তুলব।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্কের দিক থেকে বিচারে ভারতের কোন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা থাকতে পারে তবে দিল্লির নীতি নির্ধারক শক্তি হিসাবে মনেকরে তাকে গণনায় নেবার কোন কারণ নাই। না রাষ্ট্রীয় প্রটোকল হিসাবে না ব্যবহারিক সুবিধার কারণে। ভারতের যে কোন রাজ্য সরকারের সাথে আমাদের সৌজন্যমূলক সম্পর্ক থাকাটাই যথেষ্ট, কারণ খামাখা সম্পর্ক খারাপ করার কোন মানে হয় না। ভারতের কনষ্টিটিউশনে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক অনুসারে যেসব প্রাকৃতিক সম্পদ রাজ্যের ভাগে পড়েছে সে বিষয়ে কোন বৈদেশিক চুক্তির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে হলে রাজ্য সরকারের মতামতের সঙ্গে সমন্বয় করার বাধ্যবাধকতা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আছে। তবে আবার কোন বিদেশি কোম্পানীকে কারখানার জমি বরাদ্দ দেবার ক্ষেত্রে রাজ্যের ভুমিকাই প্রধান, কেন্দ্র সেই ক্ষেত্রে পিছনে। ইত্যাদি। কিন্তু বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজ্যগুলোকে নিয়েই যে ভারত ইউনিয়ন সেই সমগ্র ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করার এখতিয়ার একমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের। কেন্দ্রীয় সরকার কি করে রাজ্য সরকারকে নিজের প্রতিনিধিত্বের অধীনে আনবে সেটা নিশ্চিত করবার দায়ও কেন্দ্রীয় সরকারের। যেমন কেন্দ্রীয় সরকার নদীর পানি নিয়ে বাংলাদেশের সাথে কোন চুক্তি করার সময় রাজ্য সরকারকে কেমন করে দিল্লির সিদ্ধান্ত-বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করে সেটা তাদের ব্যাপার। আমাদের সাথে চুক্তি করতে আসবে কেন্দ্রীয় সরকার, তার দায়দায়িত্বও কেন্দ্রীয় সরকারের । তবে বুদ্ধিমানের মত “ইনফরমালি” আমাদের জেনে রাখা জরুরি ও ভাল যে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি রাজ্যের সম্মতি রয়েছে কিনা। ঐ সম্মতি সাথে নিয়ে কেন্দ্রের প্রতিনিধি এসেছেন কি না। অর্থাৎ ঐ ইস্যুতে ভারতের যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী-আমলা কথা বলতে এসেছেন ‘বাস্তবে’ তিনি রাজ্যেরও প্রতিনিধিত্ব সত্যিই করছেন কিনা সেটা আমাদের জানা থাকা দরকার। কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে কোন মতদ্বৈততা থাকতে পারে যা না জানলে দিল্লির সঙ্গে কোন বিষয়ে চুক্তি এক হাওয়াই চুক্তি হয়ে থেকে যেতে পারে। এমন রেকর্ডও আছে যেমন, কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী-আমলা জানতেন যে তারা রাজ্যকে সহমতে না নিয়েই বাংলাদেশে চুক্তি করতে আসছেন। তবু তারা এসেছেন আর আসার আগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে বলে এসেছেন যে চুক্তিটা হয়ে যাবার পরে আপনার আপত্তি আমাদের কেন্দ্রীয় সরকারকে জানিয়ে চিঠি দিলে আমরা এরপর চুক্তির বাস্তবায়ন না করে ফেলে রাখব। ফলে আপনার অসুবিধা হবে না। এতে সত্যমিথায় যাই থাকুক দিল্লি এটা করে এবং দুর্বল প্রতিবেশির সঙ্গে তাদের এ ধরনের অসৎ সম্পর্ক চর্চা অস্বাভাবিক কিছু নয় বাংলাদেশে এই বিশ্বাস বেশ প্রবল। গত তিস্তাচুক্তির সময় এমন কথা শোনা গেছিল। এরপর আমাদেরকে জানানো হল যে মমতার জন্যই নাকি ঐ চুক্তিটা হয় নাই। অথচ এটা তো আমাদের জানার বা শোনার কথা নয়। কারণ আমাদেরকে যদি এমন কথা শুনতেই হয় তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলে যারা আমাদের কাছে এসেছিলেন সেই মনমোহন সিং বা প্রণব মুখার্জি আসলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কেউ ছিলেন না, তারা প্রতিনিধি ছিলেন না। ভারতের প্রতিনিধিত্বের ম্যান্ডেট বাস্তবে তাদের ছিল না। সরকারে থেকেও তারা সরকারি নন। ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছিল যেন যার গোডাউনে মাল নাই অথবা যে মাল আছে সেটা তাঁর নিজের নয় সেই পার্টির সাথে পণ্য বিনিময় চুক্তি করতে গিয়েছিলাম আমরা। এই পরিস্থিতিতে আমরা কি দেখলাম? দেখলাম যে চুক্তি হতে গিয়েছে দিল্লির সঙ্গে, কিন্তু তার কোন খবর নাই, আর অন্যদিকে কলকাতার মুখ্যমন্ত্রীর সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, খাতির জমানোর চেষ্টা করতে থাকলাম। অর্থাৎ যেটা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দায় এবং কাজ উভয়ই আমরা নিজের কাঁধে নিলাম। সেই থেকে বাংলাদেশে কলকাতার মুখ্যমন্ত্রীর গুরুত্ব আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করেছি কিম্বা ভারতের রাজনীতিবিদরা আমাদের প্রতারিত করবার জন্য কি ধরনের ছুতা ব্যবহার করে তার বৈশিষ্ট্য ও মাত্রা সম্পর্কে আমাদের ভালই অভিজ্ঞতা হয়েছে।
ভারতের এই কপট কূটনীতি প্রসঙ্গে আরও দুটো কথা বলা জরুরি। এমনিতেই হাসিনার এই ভারত-খাতিরের জমানায় আমরা ভারতের সাথে বাংলাদেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলো যেন কেবল তিস্তা আর ল্যান্ড বাউন্ডারির দুই ইস্যু সেই স্তরে নামিয়ে এনে দিয়েছিলাম। সীমান্ত হত্যা, বাকি নদীর পানি বন্টন ইত্যাদি আর কোন ইস্যু যেন আমাদের আর নাই। ওদিকে ল্যান্ড বাউন্ডারি – আমাদের সাধারণ্যের প্রচলিত ভাষায় ছিটমহল বিনিময় চুক্তি – তা মুলত ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরার মধ্যে সেকালে স্বাক্ষরিত হওয়া এক চুক্তি। ফলে সেকালের ঐ চুক্তিতেই তা শেষ হবার কথা। কিন্তু সেকালে চুক্তি একটা হয়েছিল বটে কিন্তু বাস্তবায়নের খবর আজও হয় নাই। অর্থাৎ আজও কাগজে কলমে মীমাংসিত বিষয়টা আসলে একটা অমীমাংসিত ইস্যু হয়ে আছে। ছিটমহল বিনিময় চুক্তির শর্ত অনুসারে দুই রাষ্ট্রের সংসদে ঐ স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুসম্মতি জানিয়ে অনুমোদন দেবার কথা ছিল। বাংলাদেশে আমরা তা সততার সঙ্গে করেছিলাম সেকালেই, কিন্তু ভারতের পার্লামেন্ট এখনও তা করেনি। আদালতে মামলা আছে এই অজুহাতে এখনও সেটা পেন্ডিং। যদিও ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে ঐ চুক্তি হতে পারে বলে রায় দিয়ে মামলা চূড়ান্ত নিস্পত্তি করে দিয়েছে গত ১৯৯৪ সালেই। সেই থেকে ইস্যুটা ঝুলে ছিল। এদিকে এখনকার পার্লামেন্টে চুক্তির বিপক্ষে দেওয়া আপত্তির যুক্তি বেশ অদ্ভুত। ভারতের বিগত পার্লামেন্টে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি বা মমতার দলের আপত্তি ছিল এরকম যে, যেহেতু এখানে সমান পরিমাণ ছিটমহলের জমি বিনিময় হবে না, ভারত কম পাবে তাই এই চুক্তি তারা পার্লামেন্টে পাশ করবে না। প্রথম ধাক্কায় শুনতে অনেকের মনে হতে পারে যে এই কথায় বোধহয় যুক্তি আছে। কিন্তু সে ধারণা ভিত্তিহীন। অল্পকথায় ভারতের সুপ্রীম কোর্ট চুক্তিটা হতে পারে বলে রায় দিয়েছিল ওর যুক্তিটা শুনলে আমরা বুঝব যে এসব কথা ঈর্ষাকাতর এক পেটি-মনের চিন্তা ও  ছলনা মাত্র।
যেকোন আধুনিক রাষ্ট্রের গঠনের ভিত্তিগত ধারণা বা পিছনের চিন্তা হল, নতুন রাষ্ট্র ঘোষণা মানেই ওর ভুখণ্ডগত সীমারেখাসহ তা উল্লেখ করে তার ওপর ঐ রাষ্ট্রের সার্বভৌম এখতিয়ার ঘোষণা। পরবর্তিতে রাষ্ট্রের কোন নির্বাহী (প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী বা পার্লামেন্ট) ঐ ঘোষিত রাষ্ট্রীয় ভুখন্ডের কোন অংশ অন্য কোন রাষ্ট্রকে দিয়ে দিতে বা বিনিময় করার ক্ষমতা রাখে না। এই যুক্তিতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার ঐ চুক্তি অবৈধ এবং পার্লামেন্ট ঐ চুক্তির পক্ষে অনুসিদ্ধান্ত জানাতে পারে না বলে আদালতে মামলা করা হয়েছিল। এর বিপরীতে এই মামলা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে নিস্পত্তি করার যুক্তি হল – ঠিকভাবে দেখলে এটা ভারতের ভূখন্ড বাংলাদেশকে দিয়ে দেওয়া বা বিনিময় করার মত কোন চুক্তি নয়। মূলত এটা, ১৯৪৭ সালে তৎকালীন ভারত-পাকিস্তান দুটো আলাদা রাষ্ট্র গঠনের সময় উল্লেখিত ভুখণ্ডের কোন অদল-বদলও নয়। বরং চুক্তিটা হল, ঐ গঠন-ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ে সীমা চিহ্নিত করণের পর্যায়ে দীর্ঘকালীন বিষয়টি অমীমাংসিত ফেলে রাখা বিষয়ের মীমাংসা। অতএব এই চুক্তি হতে পারে। অর্থাৎ এটা মাঠ পর্যায়ে সীমা চিহ্নিত করণের মামলা মাত্র। কোন জমি অদলবদলের চুক্তি নয়।
একই যুক্তিতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এখন একমাত্র সমান পরিমাণ জমির বিনিময়ই কেবল এই চুক্তি হতে পারে বা হতে হবে এমন কথার কোন ভিত্তি নাই। তাহলে বিনিময় বলা হচ্ছে কেন? কারণ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশ ঘেরা ভুখন্ডে অথবা বাংলাদেশের নাগরিকের বেলায় উলটা ভারতের ভুখন্ডে এই অবস্থায় আছে। ফলে উভয় পক্ষেই নাগরিকেরা নিজ নিজ মুল রাষ্ট্র ও ভুখন্ডের সাথে যুক্ত হবে তাই বিনিময় ধরণের একটা ধারণা এখানে প্রচলিত হয়েছে। কিন্তু আইনী ভাষায় এটা মূলত উভয় রাষ্ট্রের অমীমাংসিত সীমানা চিহ্নিত করণের মামলা। এখানে চিহ্নিতকরণের পরের হিসাবে কারও ভাগে জমি কম বেশি হতেই পারে। কিন্তু সেই হিসাবটা চুক্তির ভিত্তি নয়, সেটা চুক্তির জন্য কোন বিবেচ্য বিষয়ই নয়। অতএব ভারতের পার্লামেন্টের বিরোধীদের যুক্তি ভিত্তিহীন। এছাড়া বাংলাদেশের চোখে দেখলে, এটা মমতার বা তার রাজ্য সরকারের বিষয় নয়। এটা সমগ্র ভারতের প্রতিনিধিত্ত্ব করে বলে দাবিদার কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয়। তাদেরই আইনী বাধ্যবাধকতা। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার আপত্তি কি এটা শোনা বা দেখার দায়দায়িত্ত্ব আমাদের নয়। ফলে মমতার কাছে আমাদের দেনদরবার করার কোন যুক্তিই নাই। রাষ্ট্র হিসাবে আমরা চিনি কোন রাজ্য সরকার নয় কেবল কেন্দ্রীয় সরকারকে, যে ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করে দাবি করে আমাদের সাথে চুক্তি করতে আসে বা এসেছিল।
দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা হল পানি চুক্তি, বিশেষ করে তিস্তা পানি চুক্তি। মমতাসহ যারা এই চুক্তির বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছিল তাদের যুক্তির প্রসঙ্গে যাব। এ প্রসঙ্গে প্রায়ই একটা কথা শুনতে পাই যে, নদীতে পানিই নাই ভারত দিবে কোথা থেকে। অথবা প্রাকৃতিক পানি এখন কমে আসছে তাই আমরা কতদুর কি করতে পারি। অথবা মমতার ক্লাসিক যুক্তি – তিস্তার পশ্চিমবঙ্গ অংশের অববাহিকা অঞ্চলের লোকেরাই চাষাবাদের পানি পাচ্ছে না, আমরা আর কি দিব। ইত্যাদি। অর্থাৎ পানি চুক্তির প্রসঙ্গটা যেন ভারতের প্রয়োজন মিটানোর পর আমাদের দিবার মত পানি থাকে কি না এর ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া এই “প্রয়োজন” কথাটাকে কি দিয়ে ব্যাখ্যা করব? বুঝব? পশ্চিমবঙ্গের মানুষের পানির ‘প্রয়োজন’-এর সীমা কিভাবে কোথায় টানব? মানুষের প্রয়োজনও অসীম। এখানে পুরা তর্কটাকে পর্যবসিত করা হয়েছে আগে পশ্চিমবঙ্গের “প্রয়োজন” মিটাতে হবে এরপর বাংলাদেশ। না থাকলে নাই। ভারতের দিক থেকে এটা একটা ম্যানেজমেন্টের প্রশ্ন। কিভাবে তারা তাদের “প্রয়োজনের” সমস্যাটাকে আগে মিটিয়ে নেবে তারপর বাংলাদেশের জন্য কি করতে পারে সেটা বিবেচনা করবে। অর্থাৎ ভারত সদয় পানিদাতা আর আমরা ঐ দাতার ভিক্ষাপ্রার্থী। আন্তরাষ্ট্রীয় কমন নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশ আমরা, উজানের দেশ ভারত পানি আটকে রেখে দিয়েছে আর আমরা তার ভিক্ষা প্রার্থী? তাই কি? আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের দেনাপাওনা ভিক্ষা বা দয়ার উপর দাঁড়ায় না। বিশেষত স্বার্থের প্রশ্নে দয়া বা ভিক্ষা চলে না। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি দয়াদাক্ষিণ্য প্রদর্শনে পর্যবসিত হয়।
না আমরা মোটেই পানিভিক্ষাপ্রার্থী না। আন্তর্জাতিক নদী আইন বলছে, উজান দেশের মত ভাটির দেশও সমান কমন নদীর পানির ভাগীদার। এটা তার হক। এছাড়াও উজানের দেশ নদীর মুল ধারা থেকে খাল কেটে বা বাঁধ দিয়ে পানি সরিয়ে নিতে সে পারে না। তিস্তা নদীর ক্ষেত্রে নদীর সিকিম অংশে তাই করা হয়েছে। তাহলে দাঁড়ালো, পানি ভাগাভাগির আসল ভিত্তি হল, ভাটির দেশের হক ও অধিকার। উজানের দেশের কাছে সে পানির জন্য ভিক্ষাপ্রার্থী নয়। আগে উজানের দেশের পানির প্রয়োজন মিটানো এরপর যদি থাকে তবে বাংলাদেশ পাবে এই সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে দিল্লিকে দেয়া হয় নি, দেয় না। অতএব ভারতের পানির প্রয়োজন কত তা জানারও কোন প্রয়োজন আমাদের নাই। অথচ পানি ভাগাভাগির আলাপ উঠলেই ভাগের ভিত্তি কি এটা অস্পষ্ট থেকে যায়। ভাগের ভিত্তি কি তা অস্পষ্ট রেখে মিডিয়াসহ সব জায়গার আলাপ শুরু হয়ে যায় ভারতের প্রয়োজনের গল্প। আজ পর্যন্ত কোন পানির আলোচনায় পানি ভাগের ভিত্তি কি এনিয়ে কোন কথা আমরা শুনি নাই। সব খানে বয়ানটা হল ভারত পানির সদয় দাতা। আশা করি মমতার এই সফরেও আমরা এই একই গান শুনতে পাব। মমতা দির দয়ার ওপর তিস্তার পানি পাওয়া না পাওয়া নির্ভর করছে গণমাধ্যমগুলো এই বাজে তর্ক করে যাবে।

দুই
মমতার দিক থেকে তাঁর বাংলাদেশ সফরের তাগিদটা কি? আমার আগের লেখায় বলেছিলাম, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচন আগামি বছর ২০১৬ সালের মে মাসে। ইতোমধ্যে মমতা এক বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন। ৩৪ বছরের বামফ্রন্টকে পরাজিত করে গত ২০১১ সালে নির্বাচনে রাজ্য সরকার দখলের চেয়েও প্রভাবের দিক থেকে এটা আরো বড় বিপ্লব। বড় তার তাৎপর্য। কে কি ধরণের মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করে ভোটে জিতেন সেই ভোটারদেরকে বলা হয় কনস্টিটুয়েন্সী। আমরা এই ধারণাকে নামিয়ে ক্ষুদ্র করে অর্থ করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এমপি কোন এলাকা থেকে জিতে এসেছেন ঐ “এলাকার” অর্থে আমরা কনস্টিটুয়েন্সী শব্দটাকে নামিয়ে এনেছি। যদিও এর মূল অর্থ এমপি কাদের প্রতিনিধি, কোন ভোটাররা তাকে ভোট দিয়েছেন তারাই ঐ এমপির কনস্টিটুয়েন্সী – এটাই এর অর্থ।
তো এই অর্থে মমতার দল তৃণমুলের মূল কনস্টিটুয়েন্সী এখন পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটাররা। যেখানে মুসলমান ভোটার মোট ভোটারের ২৮%। যারা এরআগে প্রথমে কংগ্রেস ও পরে বামফ্রন্টের ভোটার ছিল। এখন মমতার অবদান তিনি মুসলমান ভোটারদের মুসলমান হিসাবেই মুক্তি দিয়েছেন, তাদের এখন আর “সেকুলার” ভোটার বলে অকেজো ধারণার আড়ালে লুকানোর দরকার নাই। তারা যা তাই। পিছিয়ে পড়া দশা থেকে বের হতে তাঁরা এখন কেন্দ্র ও রাজ্যের রিসোর্স বরাদ্দে নিজের অংশ দাবি করতে পারে। আগামি দিনে কতদুর এর বাস্তবে পারবে কি দাঁড়াবে সেসব আলাদা প্রশ্ন। অর্থাৎ এসবের প্রতি রাজনৈতিক স্বীকৃতির প্রসঙ্গ এখন সামনে এসে গেছে। একধরণের রাজনৈতিক স্বীকৃতি এসেছে, এখন দেখার বিষয় অর্থনৈতিক অর্থে এটা কতটা কতদিনে বাস্তবায়িত হয়। মুসলমান ভোটারদের ইস্যু বাকি সব কলকাতা কেন্দ্রিক দল যেমন বিজেপি, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের জন্য বিরাট মাথাব্যাথার ইস্যু হয়ে গেছে।
এর অর্থ বাকি ৭২% ভোট এখন তৃণমূল সহ চারটা দলের মধ্যে ভাগ হবে, ভোটের সংখ্যার এই সংখ্যাতত্ত্ব পশ্চিমবঙ্গের আগামি নির্বাচনে মূল নির্ধারক, মূল নির্বাচনি ইস্যু। এখান থেকেই দলগুলোর রাজনৈতিক বয়ানের ভিন্নতা এবং মিল। যেমন ইদানিং বিজেপি ও বামফ্রন্টের বয়ানের ফারাক খুজে পাওয়া মুশকিল হয়ে গেছে। কারণ এখন মূল বয়ান হতে হবে এন্টি-মুসলমান যেটা এন্টি-তৃণমূল হয়ে কাজ করবে, তৃণমূলকে কাটবে। কিন্তু সরাসরি এন্টি-মুসলমান বয়ান তো দেয়া যায় না, এতে সেকুলারদের সেকুলার জামা আর গায়ে থাকে না, আপনাতেই খুলে পড়ে। আবার ভারতের নির্বাচনী আইনে ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই বয়ানটা কিছুটা বদলে হয়েছে – আড়াল করতে করা হয়েছে ‘জঙ্গী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বয়ান’। জঙ্গী-সন্ত্রাসী মানেই তো মুসলমান এই সূত্রে। শুধু তাই নয় পড়শি বাংলাদেশ। বাংলাদেশ মানে একটা হিন্দু-মনের চোখে মুসলমান, হিন্দুর ‘অপর’ — এ ছাড়া কলকাতা ভিন্ন কিছু ভাবতে পারে তার প্রমাণ খুবই কম। আর কি! বাংলাদেশকে এটাতে জড়াতে পারলে বয়ান আরও পোক্ত হবে। ফলে এই হল, বাংলাদেশ-জঙ্গী-সন্ত্রাস বয়ানের সুত্র। মমতা বাদে বাকি তিন দলের আসন্ন নির্বাচনে প্রপাগান্ডার কৌশলও তাই মুসলমানদের কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে।
মমতার বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীদের প্রচার। বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের সময় শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষী সেকুলারদের তুষ্ট করার চেষ্টা করবেন মমতা। কলকাতায় হিন্দুত্ববাদীদের প্রচারের বিপরীতে একদিকে মুসলমানদের ভোটের ক্ষেত্রে একচেটিয়া সমর্থন ধরে রাখা, অন্যদিকে বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষী সেকুলারদের সঙ্গে অতিরিক্ত মৈত্রী প্রদর্শন করে কলকাতার হিন্দুদের অভিমান হ্রাস করা — এই দোদুল্যমান রাজনীতি মমতা ব্যানার্জির। বাংলাদেশ সফরে নিজের ভাবমূর্তি ধরে রাখাই তার প্রধান উদ্দেশ্য। আমাদের ইমপ্রেস হবার কিছু নাই। এখনকার সফরে বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষী সেকুলারদের প্রতি তাঁর অতিরিক্ত আগ্রহ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বিরক্তি উৎপাদন করলেও পশ্চিম বঙ্গের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সহমর্মিতার প্রয়াস বাংলাদেশের জনগণ সমর্থন করবে। ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং ইসলাম বিদ্বেষী রাজনীতির বিপরীতে সীমান্তের দুই পাশের জনগণের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জি কী ভূমিকা রাখেন তা দেখার জন্য নজরে এই দেশের জনগণের আগ্রহ আছে।
বর্ধমান জেলায় একটা বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল গত বছর অক্টোবরে। সেটা কাজে লাগিয়ে এই প্রপাগান্ডায় আলো-বাতাস লাগানো হয়েছে। ওদিকে সারদা কেলেঙ্কারি নামে এক অর্থ কেলেঙ্কারিতেও মমতার দল অভিযুক্ত হয়ে আছে। (সারদা কেলেঙ্কারি হল আমাদের ‘ডেসটিনি” কেলেঙ্কারির মত সমতুল্য ঘটনা।) এই দুইয়ে মিলে প্রপাগান্ডার গল্প জমিয়ে তোলা হয়েছে। এই গল্পকে আরও সুনিপুণ করতে বাংলাদেশের জামাতকেও টেনে আনা হয়েছে। যাতে মূলত এন্টি-মুসলমান ক্যাম্পেনটাকে জামাত-জঙ্গী-সন্ত্রাসী এসব শব্দের মোড়কে হাজির করা যায়। সেটা জায়েজ এমন একটা ন্যায্যতাও টানা যায়। জামাত পর্যন্ত প্রসঙ্গ টানা শুরুর কারিগর মূলত পশ্চিমবঙ্গ বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর। গত ২০১৪ মে মাসের কেন্দ্রীয় নির্বাচনের আগে নির্বাচন উপলক্ষ্যে কলকাতা বামফ্রন্টের প্রধান সমাবেশ থেকে তিনি এই বয়ান দিয়েছিলেন। মুসলমান কনস্টিটুয়েন্সী মমতার কাছে হারানোর দুঃখের তীব্রতা আমাদের এভাবেই তিনি জানিয়েছিলেন। তখনও বর্ধমান ইস্যু হাজির হয় নাই। পরে এই ইস্যু হাজির হলে বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি অমিত শাহ — যিনি পশ্চিমবঙ্গের আগামি নির্বাচনে দলকে জিতানোর মূল দায়িত্বে এখন আসীন — তিনি বিমান বসুর বয়ানটাকেই এবার বাড়তি আকার দেন। ফলে পশ্চিমবঙ্গে আগামি নির্বাচনে তখন থেকে অনেকবার উচ্চারিত শব্দ হয়েছে বাংলাদেশ, আগামিতেও থাকবে, নির্বাচন পর্যন্ত। কিন্তু অমিত শাহের এসব কারবারে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদী সরকার নিজেকে দূরে রাখতে চান। যদিও তার বিশ্বস্ত প্রধান অমিত শাহকে তিনিই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে দলকে ক্ষমতাসীন করার এসাইমেন্ট সঁপেছেন। তবু নিজের হাত ধুয়ে রাখতে, আর তা রেকর্ডে রাখতে মোদী ইতোমধ্যেই ভারতীয় পার্লামেন্টে নিজের এক মন্ত্রীর লিখিত বিবৃতি পাঠ করিয়ে পরিস্কার করেছেন যে, বাংলাদেশ-বর্ধমান-সারদা ইস্যু এসব মিলিয়ে যে বয়ান তার পক্ষে  তদন্তকারি গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ এর রিপোর্টে প্রমাণ করার মত তথ্য মিলেনি। অমিত শাহ ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসন, র কে আর সেই সাথে এনআইএ-এর বাংলাদেশ সফর, পালটা বাংলাদেশ থেকেও আমাদের গোয়েন্দাদের সফর ইত্যাদিতে প্রশাসন পর্যায়ে অনেকদুর ব্যবহার করেছেন। মোদী সরকারের বিবৃতির পরে তবুও পশ্চিমবঙ্গ পর্যায়ে প্রপাগান্ডা এখনও একই রকম রয়ে গেছে। কারণ জঙ্গী-সন্ত্রাসের ভীতিটা রয়েই গেছে।

মমতার প্রত্যাশা
এই পটভুমিতেই মমতা বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি কি চাইবেন হাসিনার কাছে?
মমতা চাইবেন, হাসিনা যেন পশ্চিমবঙ্গের চলতি নির্বাচনী প্রপাগান্ডার লড়াইয়ে, বাংলাদেশকে জড়িয়ে যে জঙ্গী-সন্ত্রাসের বয়ান চলছে একে পরিপুষ্ট না করেন। হাসিনা নিজে এমন কোন বয়ান যোগ না করেন যেটা এই বয়ানকে পরিপুষ্ট করে। বরং বাংলাদেশের নাম যতই উঠুক তিনি যেন এটা ভারতের এক আঞ্চলিক এবং একেবারেই নির্বাচনী রেঠরিক সেদিক থেকে দেখেন। যার বিপরীতে কলকাতার বয়ানের বিরুদ্ধে যায় হাসিনার নিজস্ব পালটা বয়ানে যদি তেমন কিছু হাসিনা যোগ করতে রাজি হন তাহলে সেটা মমতার চরম পাওয়া হবে। আর যদি তা না-ই পারেন, তবে যেন চুপ থাকেন, তাহলেও মমতার জন্য এটা ভাল কাজে লাগবে। এই হবে মমতার চাওয়া। এটাই তার বাংলাদেশ সফরের মুল উদ্দেশ্য। অবশ্য সেটা যাই হোক এই সফর থেকে একটা বাড়তি সুবিধা তিনি পাবেন। মমতা যে বাংলাদেশ থেকে “যাওয়া” জঙ্গী সন্ত্রাসীর আশ্রয় প্রশ্রয় দেবার নেত্রী নন — যে প্রপাগান্ডা কলকাতায় তাঁর বিরোধীরা জারি রেখেছে – তার প্রমাণ তিনি এবার করতে পারবেন। সেটা হবে এরকম যে, তিনি বাংলাদেশ সফরে এসেছেন এবং হাসিনার দ্বারা ভাল আপ্যায়িত হয়েছেন। তিনি জঙ্গী সন্ত্রাসীর আশ্রয় প্রশ্রয়দাত্রী হলে কি এই মর্যাদা পেতেন!
কিন্তু মমতা যেভাবে যা চাইবেন তাই হাসিনা দিবেন এমন কোন কারণ নাই। তাহলে হাসিনা কিসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিবেন? তাঁর সিদ্ধান্ত নিবার ভিত্তি হবে মমতা কি দিতে পারেন যা তার ক্ষমতাকে পোক্ত করতে কাজে লাগতে পারে। হাসিনার সরকারের পক্ষে মোদীর সমর্থন আনার ক্ষেত্রে মমতা সঠিক লোক নন, বরং উলটা। তবে তিস্তার পানি বা ল্যান্ড বাউন্ডারি ইস্যুতে তিনি আপত্তি করবেন না এমন ধারণা মমতা ঘোষণা করতে পারেন। যদিও এমন ঘোষণা মানেই এগুলো সরাসরি বাংলাদেশের পেয়ে যাওয়া নয়। যদিও ল্যান্ড বাউন্ডারি ইস্যু আগামি ২৩ মার্চের মধ্যে ভারতের পার্লামেন্টে চুড়ান্ত হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে এবং তা মোদীর ক্রেডিটে আসবে। তার চেয়েও বড় কথা হাসিনার কাছে এর মূল্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে সরাসরি তাকে সাহায্য করে এমন কোন ইস্যু নয়। বাংলাদেশের চলতি সংকটের যাত্রায় যদি হাসিনা ক্ষমতায় টিকে যেতে পারেন তবে এরপরে হয়ত প্রপাগান্ডায় এটা তাঁর কাজে লাগতে পারে। সারকথায় মমতা যা দিতে পারেন তা হাসিনার চলতি ক্ষমতা-সংকটকে সরাসরি সাহায্য করতে পারে এমন কিছু নয়। ফলে মমতার অফার হাসিনার জন্য বড়জোর অপ্রত্যক্ষ এক সুবিধা মাত্র। আগামিতে কাজে দিবে এমন। এধরণের বিচারের প্রেক্ষিত থেকে হাসিনার সিদ্ধান্ত পরিচালিত হবে বলে অনুমান করা যায়। এই সফরের বাকিটা হবে হাসিনা ও মমতার উভয়ের জন্যই শো-আপ এর লাভালাভ।
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫।
[এই লেখাটা গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার সামান্য এডিট করে ছাপা হল।]

Advertisements

বাংলাদেশে গণতন্ত্রঃ দিল্লি-ওয়াশিংটনের নতুন সম্পর্কের আলোকে

বাংলাদেশে গণতন্ত্রঃ দিল্লি-ওয়াশিংটনের নতুন সম্পর্কের আলোকে

গৌতম দাস

ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-99

২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ phil reiner

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র পরিচালক ফিল রেইনার (Phil Reiner) গত ০৩ ফেব্রুয়ারি এক প্রেস কনফারেন্স আয়োজন করেছিলেন। বিষয় ছিল সদ্য সমাপ্ত ওবামার ভারত সফর সম্পর্কে প্রেসকে অবহিত করা। ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস ২৬ জানুয়ারি। এ বছরের প্রজাতন্ত্র দিবস অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসাবে ওবামা ২৫-২৭ জানুয়ারি ভারত সফরে এসেছিলেন। ফিল রেইনার ওবামার ভারত সফরে সঙ্গী ছিলেন। ঐ প্রেস কনফারেন্স ছিল মূলত ভারত সফরে ওবামার দিক থেকে নিজের তাৎপর্য বিশেষত অর্জনগুলো তুলে ধরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ স্টেটের ওয়েবসাইটে রেইনারের প্রেস কনফারেন্সটিকে সেই ভাবেই পেশ করা হয়েছে। (আগের লিঙ্কে দেখুন, From President Obama’s Trip to India: Perspectives on U.S.-India Relations।
গত কংগ্রেস সরকারের শেষ তিন বছর ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ক্রমশ অমীমাংসিত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিরোধে জড়িয়ে স্থবির হয়ে পড়েছিল। এসব বিরোধগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ইস্যুতে বিশেষত বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে ঘিরে উভয়ের বিরোধ আরও প্রকাশ্য ও চরমে উঠেছিল। জানুয়ারি ২০১৪ সফরটা ছিল স্বল্প সময়ের মধ্যে ওবামা-মোদীর দ্বিতীয় মুলাকাত। গতবছর মে মাসে ভারতের নির্বাচনের ফলাফলে মোদীর জয়লাভ ও সরকার গঠনকে ভারত এবং আমেরিকা উভয়েই তাদের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে বিরোধ মিটানোর উপায় হিসাবে দেখেছিল। কারণ উভয়ে অনুভব করছিল যে সম্পর্ক স্থবির রাখাতে উভয়েই ভালোরকম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ফলে মোদীর দিক থেকে আটমাসের সরকারের সাফল্য হল, দ্রুততর সময়ে বিরোধ নিষ্পত্তি। সেখানে ওবামা-মোদীর নানান দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের প্রসঙ্গে আলাপের সময় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছিল।

ফিল রেইনার এর প্রেস কনফারেন্সের খবরটা আমাদের মিডিয়ায় প্রচার হতে শুরু হয়েছিল গত সপ্তাহে, ৪ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে। খবরটা হল, গত মাসের শেষে ওবামার ভারত সফরে ওবামা-মোদী দুজনের আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছিল। আসারই কথা, এটা অনুমান করা খুব কষ্টকল্পিত কিছু ছিল না। কিন্তু তাদের আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছে ব্যাপারটা তথ্য হিসাবে কোন সংবাদপত্রে আসা এক কথা আর যেচে তার প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি ভিন্ন। শেষেরটা অবশ্যই কষ্টকল্পিত। যদিও ভারত অথবা আমেরিকার দিক থেকে এই স্বীকারোক্তি দেয়া বা না দেয়াটা খুব জরুরি নয়। এমনকি ভারত-আমেরিকার শীর্ষ আলাপে ভিন্ন দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে মন্তব্য রেওয়াজ সম্মতও নয় বলে কেউই এ বিষয়ে তেমন কিছু প্রকাশ্যে আশা করে নাই। ফলে বাংলাদেশ বিষয়ে কোন কথা হয়ে থাকলে সেক্ষেত্রে হয়ত আমরা ভারত বা আমেরিকার সরকারি ভাবে না, বরং শুনতাম বড়জোর কোন অনুসন্ধানী দেশি বা বিদেশি মিডিয়া কর্মীর বিশেষ রিপোর্ট থেকে। এভাবেই কূটনৈতিক বিষয়গুলো প্রকাশিত হওয়া রেওয়াজ।

কিন্তু আমরা ব্যতিক্রম দেখছি। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র পরিচালক ফিল রেইনার না চাইতে বৃষ্টির মত অনেক তথ্য আমাদের ঢেলে দিয়ে জানাচ্ছেন, যার মধ্যে বাংলাদেশ প্রসঙ্গও আছে। লক্ষ্য করার মত বিষয় হল, তিনি প্রেসিডেন্টের হোয়াট হাউস অথবা স্টেট বা পররাষ্ট্র ডিপার্টমেন্টের নেহায়েতই কোন মুখপাত্র নন। অর্থাৎ আমেরিকা তার স্টেট ডিপার্টমেন্টের কোন মুখপাত্রের মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ বা প্রচার করতে চাইছেন না। সাদামাটা রুটিনের বদলে চাইছেন এই প্রকাশ ও প্রচার গুরুত্ব পাক। তাই বক্তব্য এসেছে একজন একজিকিউটিভ কর্মকর্তার মুখ দিয়ে। ফিল রেইনার মিডিয়াতে এসে অনেক প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিচ্ছেন। এটাও একটা ব্যতিক্রম। যেমন “বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ হয়েছে কি না” । এই তথ্য বড়জোর মিডিয়া কর্মীর মাধ্যমে প্রকাশ্যে এলেই যেখানে যথেষ্ট হত। তা ছাড়িয়ে — অফিসের মুখপাত্রও না — একেবারে আমেরিকার দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের এক পরিচালকের মুখ দিয়ে প্রকাশ করা হল। এখানে কেবল একটাই স্বাভাবিক অথবা বলা যেতে পারে দৃশ্যমান ছুতা: সদ্য সমাপ্ত ওবামার ভারত সফরে তাঁর অর্জন প্রেসকে অবহিত করা। এখানে ইংরেজি ‘রিড আঊট’ কথাটা ‘তাৎপর্য “অর্জন” ইত্যাদি অনুবাদে সতর্কভাবেই ব্যবহার করতে হচ্ছে কারণ এটা আমেরিকার দিক থেকে শুধু বিরাট অর্জনই নয়, ওবামার এই সফরকে রেইনার ‘গেম চেঞ্জিং’ বলে উল্লেখ করেছেন।
অর্থাৎ পাশা খেলায় দান বা চাল দিয়ে খেলার অভিমুখ উলটানোর মত ঘটনা। তা সেটা ছিল অবশ্যই। অনেক মিডিয়াতেও এই শব্দটাই ব্যবহার করা হয়েছে। সে প্রসঙ্গের বিস্তারে এখানে যাব না। তবে ঐ প্রেস কনফারেন্স বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এসেছিল অবশ্য সাইড টক হিসাবে। তবু সেই “সাইড টকের” প্রসঙ্গেই ফিল রেইনার অনেক বেশি লম্বা সময় ব্যয় করেছেন। আর সেসব কথা বলতে গিয়ে ফিল রেইনার অনেকটা যেচে বাড়তি তথ্য দিয়েছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশের প্রতি মার্কিন নীতি বুঝতে হলে সরকারী ভাষ্যগুলো সরাসরি ইংরেজিতে মূল দলিলে পড়াই ভাল। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের অনুবাদ বা ব্যাখ্যা নয়। মুল মানে অরিজিনাল ইংরাজি হুবহু বক্তব্য পাঠ করার পিছনে আরও একটা কারণ আছে। মানবজমিন তাদের প্রতিবেদনে “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” বলে একটা কথার অনুবাদ যেভাবে ব্যবহার করেছে তাতে বিভ্রান্তির সুযোগ আছে। ফিল রাইনার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” মানে ইংরাজিতে “পারটিসিপেটরি ইলেকশন” বা “অল পার্টি ইলেকশন” ধরণের কোন কথা বলেন নাই। বরং তাঁর বক্তব্যে তিনি কখনও “ডেমোক্রাটিক প্রসেস” আবার কখনও “ডেমোক্রাটিক ফোর্স” শব্দ ব্যবহার করেছেন । অর্থাৎ তিনি গণতন্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করে ওর শক্তি দেখিয়ে -এই পথে দেশি-বিদেশি সবার অন্তর্ভুক্তির তাগিদ নিয়ে আগাতে চান। যাতে আওয়ামি লীগ, বিএনপিসহ কোন ‘গণতান্ত্রিক’ পক্ষ বাদ না পড়ে। আবার ওদিকে ভারত ও আমেরিকাও ঐক্যমত্যে আসতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে মানবজমিন এটাকেই তার পাঠকের জন্য “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” বলে অনুবাদ করেছে। গণতন্ত্রিক ব্যবস্থা চালু আর ওর শক্তি দেখানোর কথা বলে আসলে ফিল রাইনার বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির মত নির্বাচনকে ভারতের সমর্থন করার সমালোচনা করেছেন। নিজ দেশে কোন দলকে কায়দা করে নির্বাচনে জিতিয়ে আনার কথা ভারত যেমন ভাবতেই পারবে না সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশে একটি দলকে ভারতের জিতিয়ে আনার কথাও ভাবা যায় না। কিন্তু এ ধরনের নীতি দিল্লি নিল কি করে? এই দিকটা নিয়ে ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রশংসা করে আর এর সাথে তুলনা করে ফিল রেইনার প্রকারান্তরে বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির মত নির্বাচনের প্রতি ভারতের সমর্থন করারই সমালোচনা করেছেন। আবার “ডেমোক্রাটিক প্রসেস” বা “ডেমোক্রাটিক ফোর্স” এর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবার আহ্বান জানিয়ে ভারত-আমেরিকার ঐকমত্যের ভিত্তি দাঁড় করাতে চাইছেন। ফিল রেইনার বলছেন,
“আমি একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি, প্রেসিডেন্ট ওবামা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেছি, যেটি একটি উদাহরণ। আমরা সাম্প্রতিক শ্রীলংকায়ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেছি। নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা উত্তেজনাপূর্ণ। এ সফরে দুই নেতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শক্তি ও নাগরিক শক্তির যে উত্থান হয়েছে তাতে একমত পোষণ করেছেন। আমরা বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই নেতার মধ্যে এখনও আলোচনা অব্যাহত আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন”(দেখুন, মানব জমিন, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)
অনেক লম্বা বক্তব্য। আর এতে প্রথমেই তার বক্তব্য নিবদ্ধ করেছেন “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” শব্দ দিয়ে। অর্থাৎ বাংলাদেশে যে সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” হয়নি – কথা সেদিক নিবার প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। সাধারণভাবে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বিভিন্ন দেশের “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের” উদাহরণ তুলে তিনি বলতে চেয়েছেন ভারত ও শ্রীলঙ্কায় “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়নি।

ফিল রেইনারের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে প্রসঙ্গ করার আর এক তাৎপর্য আছে। বাংলাদেশে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার আর ওবামা সরকারের মধ্যে বড় ধরণের প্রকাশ্য বিরোধ দেখা দেয়। সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রশ্নে আমেরিকা পক্ষে আর ভারত বিপক্ষে অবস্থান প্রকাশ করে। শুধু তাই না ভারতের এই অবস্থানের প্রাকটিক্যাল মানে হল, হাসিনার পাবলিক রেটিং যত নিচেই হোক, নির্বাচনের নামে যা হয় হোক, বাংলাদেশের মানুষ কাকে ভোট দিতে চায় তাতেও ভারতের কিছুই আসে যায় না, যে কোনো উছিলায় দিল্লি আওয়ামী লীগকেই আবার ক্ষমতায় দেখতে চায়। রেইনার সম্ভবত সেকথা স্মরণ করে আমাদের জানালেন যে, এসব নিয়ে ভারত-আমেরিকার বিরোধ আগে যে জায়গায়ই থাক এবারের মোদী-ওবামা আলোচনায় ভারত-আমেরিকার নীতি ও স্বার্থ বিষয়ে পুরানা অনেক বিরোধে এলোমেলো সংঘাতময় অবস্থান এবার ইস্ত্রি করে সোজা করা হয়েছে। সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” এই কমন নীতিগত অবস্থান তেমনি একটা। কিন্তু রেইনার এখানেও থামেন নাই। আরও বাড়তি বলছেন, “বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিটিকে (দুটি দেশ) অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে” নিয়েছেন। অর্থাৎ অতীতের সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে এখন ভারত-আমেরিকা একমত হয়েছে শুধু তাই নয়, বরং ঐ ভুয়া নির্বাচনের পরিণতিতে বাংলাদেশের বর্তমান “অস্থিতিশীল পরিস্থিতির” দিকেও তারা নজর রেখেছেন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল শেষ বাক্য –“বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই নেতার মধ্যে এখনও আলোচনা অব্যাহত আছে”। অর্থাৎ তাদের অতীতের গুরুতর অনৈক্য ঘটে যাওয়া বিষয়ে এখন শুধু ঐকমত্য প্রকাশ করা নয়, বরং এখন সেই ঐকমত্যের বাস্তবায়ন বা কারেকশনের জন্য তারা কাজ করে যাচ্ছেন।

যেচে এসে ফিল রেইনারের এসব তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের আর এক উদ্দেশ্য সম্ভবত আছে। বাংলাদেশ নীতি প্রশ্নে আমেরিকা-ভারতের অবস্থানের সংঘাত ২০১১ সাল থেকে। এরপর সেই স্বার্থ বিরোধ ২০১৩ সালে এসে চরম স্থবির অবস্থায় পড়ার কথা আমরা সবাই জানতাম। এই স্থবির দশা এরপর কোনদিকে যাবে আদৌ কোনো দিকে যাবে কিনা, নাকি কতদিন এমনই দিশাহীন পড়ে থাকবে এসব কেউ জানত না। পরবর্তিতে ২০১৪ সালের মে মাসে মোদীর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নির্বাচিত হয়ে আসা, আর আস্তে আস্তে ভারত-আমেরিকার পুরান স্থবির বিরোধের ঝাঁপি খুলে দেখতে দেখতে এটা ছিল মোদী-ওবামার খুবই স্বল্প সময় মাত্র সাড়ে তিন মাসের মধ্যে মোদীর দ্বিতীয়বার ওবামার সাথে সাক্ষাত। এর আগের লেখায় বলেছিলাম, ভারত-আমেরিকার বিরোধ যতটা না ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস সরকার ও রাজনীতিবিদের এর চেয়ে সম্ভবত আরও বেশি আমেরিকার সাথে ভারতের গোয়েন্দা-আমলার পর্যায়ের বিরোধ। এপ্রসঙ্গে আমরা আমেরিকায় ভারতের কূটনৈতিক দেবযানী খেবড়াগোড়া কাহিনী আর এর পালটা ভারতে আমেরিকান কূটনীতিকদের বিশেষ সুবিধা কেড়ে নেওয়া এমনকি নিরাপত্তা কমিয়ে দেওয়ার বিষয়টা স্মরণ করতে পারি।
ভারতের ২০১৪ নির্বাচনের আগে এবং পরে বহুবার আমরা বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ কে বলতে শুনেছি যে ভারতের নির্বাচনের ফলাফলে কংগ্রেস-ভিন্ন অন্য দলের বিজয়ে সরকার বদল হলেও ভারতের বৈদেশিক নীতিতে এর প্রভাব পড়ে না, বদল হয় না, হবে না। একথার অর্থ আরও পরিষ্কার করে তিনি গত জুন ২০১৪ সালে অর্থাৎ মোদীর জয়লাভে প্রধানমন্ত্রীত্ব নিবার পরেও বলেছিলেন, বাংলাদেশে “০৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রয়োজনে। আমরা ঐ ইস্যু এখন আর আবার ফিরে মূল্যায়ন করতে চাই না কারণ এখন এজেন্ডা ভিন্ন হয়ে গেছে”।( About the January 5 elections, Pankaj Saran said that was a constitutional requirement. “I do not see that issue will be revisited today because today the agenda is different.” – ১৫ জুন ২০১৪ ঢাকা ট্রিবিউন।)
পঙ্কজ শরণের এমন কথার অর্থ কি? এর মুল উদ্দেশ্য হাসিনাকে সাহায্য করা এভাবে যে, কংগ্রেস সরকার আবার জিতে না আসতে পারছেনা টের পেয়ে যাতে হাসিনার কর্মি-সমর্থক নিজের নিজের ভাগ্য গুছাতে হাসিনাকে ফেলে কেটে না পড়ে। বলাবাহুল্য এটা একজন হাইকমিশনারের সীমাছাড়ানি কাজ । পঙ্কজের বাড়াবাড়ি। অথচ পঙ্কজ জানেন, একদিকে ভারত-আমেরিকার সামগ্রিক সম্পর্ক স্থবির হয়ে আছে, বাংলাদেশ নীতিতে উভয়ে দুই মেরুতে আছে, পরবর্তীতে এই সম্পর্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যু উভয়পক্ষের জন্য এক জায়গায় আসা জরুরি এই তাগিদ আছে। সেটা আদৌ হবে অথবা হবে না তার কোন দিশা নাই। অন্যদিকে মে মাসের ২০১৪ সালেই ভারতের নতুন দল ক্ষমতায় এসেছে। নির্বাচনের আগেথেকেই জানা যাচ্ছিল নতুন প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রায়োরিটি ও এজেন্ডা কংগ্রেস থেকে একেবারেই আলাদা হবে। নতুন প্রধানমন্ত্রী মোদী আমেরিকার সঙ্গে ভারতের নিজস্ব অমীমাংসিত ইস্যুগুলো (এবং এরই ফাঁকে বাংলাদেশ নীতিতে বিরোধ) নিয়ে ভারতের নিজের কারণেও নতুন করে সমাধানে উদ্যোগী হতে বাধ্য । ফলে তা কোনদিকে মোড় নিয়ে কিভাবে কোথায় গিয়ে দাড়ায়, ঐক্যমত্যে আসে কি না সেসব আগাম অনুমান করা কঠিন। কিন্তু সে যাই হোক পঙ্কজ শরণ এর জন্য অপেক্ষা করতে একেবারেই রাজি নন। তিনি আগেই হাসিনার সমর্থকদের চাঙ্গা করে রাখতে চান। সেজন্য আগেই নিজ দায়িত্বে জবরদস্তিতে ঘোষণা দিয়ে রাখলেন যে মোদী প্রধানমন্ত্রী হলেও তাতে ভারতের নীতিতে কোন বদল হবে না, ভারত যেভাবেই হোক হাসিনাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষেই থাকবে, ইত্যাদি। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ভারতের গোয়েন্দা-আমলা যতই শক্তিশালী হোক না কেন রাজনীতিকরাই শেষ কথা বলার ক্ষমতা রাখেন এবং এটা আইনি, আমলাদের বিজনেস রুল ও রেওয়াজের দিক থেকেও সত্য। ভারতের গোয়েন্দা-আমলারাও এটা মেনে চলতে অভ্যস্ত। তবু পঙ্কজ যেন কি বিশেষ কারণে মরিয়া। তিনি ধরেই নিতে চান এবং প্রমাণ করতে চান নতুন দলের প্রধানমন্ত্রী মোদী আমেরিকার সাথে স্থবির অমীমাংসিত ইস্যুতে যাই করেন, যেভাবে নতুন আকার দেন না কেন তা পঙ্কজ তথা গোয়েন্দা-আমলাদের হিসাব, পথ ও কথা না শুনে মোদী করতে পারবেন না। যেন করতে দেয়া হবে না। এককথায় বললে, এটা রাজনীতিবিদদের উপর আমলাদের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার বালখিল্য ধারণা প্রসূত এক কল্পনা। রাজনীতিবিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য খোলা স্পেস ছেড়ে না দিয়ে উলটা তাদের নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা।
বালখিল্য ওমন কাজের ফলাফলেই কি ইতোমধ্যেই মোদীর হাতে সচিব পর্যায়ের তিনজনের বাধ্যতামূলক অপসারণ? এমন মনে করার কারণ আছে। যাই হোক আপাতত আমাদের প্রসঙ্গের দিক থেকে এসবের সারকথা হল, গোয়েন্দা-আমলা বিশেষত সুজাতা সিং বা পঙ্কজ শরণ ধরণের ব্যক্তিত্বের মনোভাব এবং ভারতের বিদেশনীতিতে সাধারণ ভাবে গোয়েন্দা-আমলাদের প্রভাবের একটা ফলাফল হল মোদী ক্ষমতায় আসার পর দিল্লী তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে কী ধরণের সম্পর্ক রচনা করতে চায় সেই বিষয়ে অ্নিশ্চয়তা। দৃশ্যত মোদী কংগ্রেসের চেয়ে আলাদা এবং নতুন এজেন্ডা নিয়ে আবির্ভূত হাজির। সাড়ে তিন মাসের মধ্যে দু’বার ওবামার সঙ্গে সাক্ষাত করে এক নতুন নীতিগত ঐক্যমত্যের আবহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি নীতিতে ভারত-আমেরিকা কোন ঐকমত্যে আসতে পেরেছে কি না সেটা এরপরও বোঝা যাচ্ছিল না। বিশেষত সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে। যদিও বোঝা যাচ্ছিল তাঁরা একটা একমতে এসেছেন সে ব্যাপারে বেশ কিছু আলামত দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে এতদিন নিশ্চিত হয়ে কেউই কিছু বলতে পারছিলেন না। পুরানা এক ষ্টেলমেট পরিস্থিতিই বিরাজ করছিল। কোনদিকে নড়াচড়া করছিল না। এমনকি গত ২৬ জানুয়ারি ওবামা-মোদীর মধ্যে এইসব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করলেও এর কোন ছাপ অন্তত বাংলাদেশে পড়ছিল না। দৃশ্যমান হচ্ছিল না। ফিল রেইনার যেন ওবামা-মোদীর নীতিগত ঐকমত্যের দিকটা দৃশ্যমান করতেই ঐ প্রেস কনফারেন্সে স্পষ্ট ও বিস্তৃত স্বীকারোক্তি হাজির করেছিলেন।
এতে একটা জিনিষ পরিষ্কার হয়েছে। মোদীর জয়লাভের পরও পঙ্কজ শরণের “সাংবিধানিক প্রয়োজনে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন” হয়েছিল, অথবা “এটা অতীতের মৃত ঘটনা এটা নিয়ে আবার ভেবে দেখার কিছু নাই” – এধরণের বক্তব্য যেটা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে এখন চাকরি হারানো পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং এর বক্তব্যেরই কপি – এই সব কিছুকে ফিল রেইনারের বক্তব্য সরাসরি নাকচ করে। বিশেষ করে রেইনারের সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে বক্তব্য পঙ্কজ শরণের ভারতের অবস্থান বলে যা প্রচার করছেন তাকে সরাসরি নাকচ করে। গত ৩ জানুয়ারি রেইনারের বক্তব্য প্রচারের পর দশ দিনের বেশি দিন গত হতে চলল, কিন্তু এখনও খোদ পঙ্কজ শরণ নিজে অথবা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেইনারের বক্তব্য নিয়ে কোন আপত্তি অথবা ভিন্ন বক্তব্য জানাতে আমরা দেখি নাই।

ফিল রেইনারের বক্তব্যের সারকথার আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি দাবি করছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় “শান্তি ও স্থিতিশীলতার” ব্যাপারে দুই নেতা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন। এই বিষয়টা ওবামা-মোদীর স্বাক্ষরিত ৫৯ দফা “যৌথ ঘোষণার” ৪৬ নম্বর দফায় এবং আলাদা করে স্বাক্ষরিত “এশিয়া নীতি বিষয়ে যৌথ ষ্ট্রাটেজিক ভিশন”র শুরুতেও উল্লেখিত হয়েছে। এগুলো ভারত-আমেরিকার নীতিগত ঐকমত্যের দিক। কিন্তু কি উপায়ে এসব নীতি বাস্তবায়ন করা হবে এপ্রসঙ্গে ফিল রেইনার দাবি করছেন, -ওবামা ভারতের সক্রিয় “গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া” ও “এর নির্বাচন” এবং “এটা যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে” এবং এর মাধ্যমে “গণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা”, এবং “জনগণের সব অংশের ক্ষমতাবান হয়ে উঠা” এসব কিছু হতে পারে সেই উপায়। এব্যাপারে উভয় নেতা একমত হয়েছেন। তাই এই ‘উপায়কে’ তারা উভয়ে খুব গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন এবং উৎসাহিত করতে থাকবেন। “উভয় নেতার কথোপকথন দেখে (I was able to see in terms of the conversation)” এটাই ফিল রেইনারের অনুভব ও মন্তব্য।
মোদী-ওবামার মিটিংয়ে সম্পর্কের অগ্রগতি দেখে উচ্ছ্বসিত ফিল রেইনার বক্তব্য এভাবে উপস্থাপনের আর একটা কারণ আছে। ওবামার ভারত সফরের পরে সিএনএনের ফরিদ জাকারিয়ার সঙ্গে কথোপকথনে, ওবামা চীন প্রসঙ্গে কথা বলছিলেন। কারণ ইতোমধ্যে এই সফর চীনের বিরুদ্ধে ভারত-আমেরিকার জোট পাকানো কিনা তা নিয়ে মিডিয়ায় কথা উঠে গিয়েছিল। ওবামা জানিয়েছেন, এসব “বুলি” বা উস্কানিমূলক ধরণের আলোচনা থেকে দূরে থেকে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের বন্ধনের পক্ষে কাজ করে যেতে চান তিনি।
এশিয়ায় চীন-আমেরিকা-ভারতের অবস্থা এখন এমনই যে কোন দৈব ঘটনাবলে এরা তিন পক্ষ মিলে কোন চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারলে এরপরেও পারস্পরিক কিছু সন্দেহ অবিশ্বাসের বাস্তবতা থেকেই যাবে। এর মূল কারণ বাকি দুপক্ষের তুলনায় চীনের উত্থিত অদম্য “অর্থনৈতিক সক্ষমতা” এবং তীব্র প্রতিযোগিতা। এর ফলাফলে এই তিন পক্ষের যে কেউ অন্য দুইয়ের চেয়ে, তুলনামূলকভাবে আগের চেয়ে ভাল অবস্থানে থাকার চেষ্টা করবেই। এক্ষেত্রে চীনের চেয়ে ভারত ও আমেরিকার অন্তত একটা বাড়তি সুবিধা হল, ভারত ও আমেরিকা নিজেদেরকে “আভ্যন্তরীণভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা অনুসরণের শক্তি” মনে করে। তাদের বিচারে যা চীনের নাই। ফলে যদি তারা উভয়ে মিলে একাগ্রভাবে এশিয়ার জন্য প্রত্যেক দেশে ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুসরণের পক্ষে’ থাকে তবে এশিয়ায় জোট পাকানোর ক্ষেত্রে তারা চীনের চেয়ে এগিয়ে থাকবে বলে তাদের উভয়ের দৃঢ় অনুমান। চীনের উত্থান দেখে পালটা যতদূর সম্ভব গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের পক্ষে থাকা, ড্রাম বাজানো – এই অনুমানের অরিজিনাল উদ্গাতা হলেন এখনও সক্রিয় তবে বুড়ো তাত্ত্বিক হেনরি কিসিঞ্জার। যদিও চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের এইকালে পাশাপাশি একই সাথে ইসলাম কিছু প্রশ্ন তুলে সামগ্রিকভাবে পশ্চিমকে কুপোকাত করে ফেলেছে। আর একে ওয়ার অন টেররের নীতিতে মোকাবিলা করতে গিয়ে কিসিঞ্জারের তত্ত্বও অকেজো এবং কথার কথা হয়ে আছে। এসব আমেরিকাসহ পশ্চিমের অজানা নয়। তবু যেসব অঞ্চলে চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার বিষয় আছে সেসব জায়গায় কিসিঞ্জারের তত্ত্ব কিছু কাজে লাগতে পারে এই আশা আমেরিকা ছেড়ে দেয় নাই। যেমন, ভারত-আমেরিকার প্রসঙ্গ উঠলেই আমরা কূটনীতিতে সেখানে দেখব বলা হচ্ছে দুনিয়ার দুই “বৃহৎ কার্যকর গণতন্ত্র চর্চার দেশ”, “গণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা” – ইত্যাদি। অর্থাৎ ওবামা তাঁর চীনকে ঘায়েল করার “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির ফাঁদের মাহাত্ম ও সুবিধার লোভ দেখিয়ে ভারতকে কাছে টানতে চাচ্ছে। চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় ভারত-আমেরিকার “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির কমননেস বা সাধারণ দিক এরই ভিত্তি বলে ড্রাম পিটতে চাইছে।
তবে ভারত-আমেরিকা ড্রাম বাজাতে চাইছে কথা সত্য হলেও এতে ভারতের কিছু পুরান জামা খুলে পড়ারও লক্ষণ এটা। যেমন, নেহেরু আমলের ভারত তখনও বৃহৎ “গণতান্ত্রিক” নাকি তথাকথিত “সমাজতান্ত্রিক” রাষ্ট্র ছিল এর ফয়সালায় কোন স্পষ্ট উচ্চারণ আজ এখনও নাই। কেউ সাহস করে নাই এখনও । তবু মাঝামাঝি ষাটের দশকের সময়ে রাশিয়া-আমেরিকার বাইরে “জোটনিরপেক্ষ দেশের” একটা তকমা নেহেরুর ভারতের ছিল অনেকদিন। তাসত্ত্বেও ঐ অবস্থাতেই কালক্রমে নেহেরুর আমল থেকেই অস্ত্রের চালানের প্রয়োজনে ভারত যতই রাশিয়া মুখি হয়েছিল ততই ভারতের মুখে আর “আমাদের বৃহৎ গণতন্ত্রের” ঢাক শোনানোর দরকার দেখা যায় নাই। বরং সত্তর দশক থেকে ইন্দিরা আমলে “সমাজতন্ত্র” আর “সেকুলারিজম” ভারতের প্রধান পরিচয় বলে তিনি স্পষ্ট দাবি করতে শুরু করেন। তামাশার দিকটা হল, সেটাই আবার ইন্দিরার “জরুরী আইন” জারি করে ভারত চালানোর কাল। এরপর ১৯৮৫ সালের পর থেকে নেহেরুর নাতি রাজীবের আমলে ক্রমশ “সমাজতান্ত্রিক” রাষ্ট্র কথাটা কার্পেটের তলে চলে যেতে থাকে আর “বৃহৎ গণতন্ত্র” কথাটা প্রথম সামনে আসতে থাকে। তবুও তখনও একটা জিনিষ – আমেরিকা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিনা এই সার্টিফিকেট ভারত আমেরিকাকে দেয় নাই, মূলত রাশিয়ান ব্লক রাজনীতির পুরান দায় বা লিগ্যাসির কারণে। না দিয়ে চলতে হয়েছিল। শেষে গত ২০০৪ সাল থেকে কংগ্রেসের ইউপিএ এর সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে আমেরিকার সাথে ষ্ট্রাটেজিক এলায়েন্সের দিকটা স্পষ্ট আকার নিতে থাকে। কংগ্রেসের প্রণব মুখার্জির মুখে আমরা ভারত দুনিয়ার “বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ” এই বয়ান শুনেছি। অর্থাৎ তিনি আর ভুয়া “সমাজতন্ত্রের” জামা পড়তে চাচ্ছেন না। ভারত এবার পরিষ্কার করে “বৃহৎ গণতন্ত্রের” ভারত হল। আর এর সম্ভবত আরও চূড়ান্ত দিকটা ঘটল এবারের মোদী সরকারের হাতে। ভারতের কনষ্টিটিউশন গ্রহণ ও কার্যকর হবার দিন ২৬ জানুয়ারি, যেটা তাদের ভাষায় প্রজাতন্ত্র দিবস। সম্ভবত ২০০৪ সাল থেকে ভারতে গত কয়েক বছরের এক নতুন রেওয়াজ চালু করা হল যে, ঐদিন কোন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রধান অতিথি করে আনা হবে। আর গত বছর থেকে। আমেরিকার সাথে ভারতের জটিল ও জট পাকিয়ে যাওয়া সম্পর্কের গিট-ছুটাতে একটা শো-আপ করা মোদীর খুবই দরকার হয়ে পড়েছিল। মোদী তাই ওবামার প্রতি আন্তরিকতা ও ব্যক্তিগতভাবে ছুঁয়ে থাকার ইমেজ দেখাতে ওবামাকে হঠাৎ করে প্রজাতন্ত্র দিবসের মূল অতিথি হিসাবে এবার দাওয়াত দেন। শুধু তাই নয়, প্রকাশ্য এই ঘোষণা প্রথম তিনি নিজেই প্রকাশ করেন নিজের টুইটার একাউন্ট বার্তা থেকে। কিন্তু প্রজাতন্ত্র দিবস তো নিজেই রাষ্ট্রের জন্য প্রতীকী। “প্রগতিশীলতার” শ্লোগান ধরে রাখার লোভে আমেরিকাকে “সাম্রাজ্যবাদ” বলে নিজের প্রজাতন্ত্র দিবসে দাওয়াত দিবার কথা এর আগে সম্ভবত ভারতের কোন নেতা কেউ ভাবতেও চায়নি। মোদী সেটাই করে দেখায়ে দিলেন। কিন্তু এটা ভাবা ভুল হবে যে মোদী আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদ তকমার বদলে গণতন্ত্রী বলে সার্টিফিকেট দিতে চান বলে এটা করেছেন। মনে রাখতে হবে, এবারের মোদী-ওবামা সাক্ষাতে যৌথ ঘোষণায় যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এর প্রায় সব ইস্যুগুলোই গত কংগ্রেসের আমলে ২০০৫ থেকে চালু ছিল তবে অকেজো অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। এবার সেগুলোই অর্থাৎ আমেরিকার সাথে সব পুরান চুক্তিই এবারের চুক্তিগুলোর বিষয়। কারণ বাস্তবায়নের শুরু থেকেই নানান বিরোধ সংঘাত একটা করে বের হতে হতে গত দশ বছরে ভারত-আমেরিকা সামগ্রিক সম্পর্কই স্থবির হয়ে গিয়েছিল। ভারতের দিক থেকে মোদীর সাফল্য এই যে তিনি মাত্র আট মাসে ওবামার সাথে দ্বিতীয় সাক্ষাতেই প্রত্যেক ইস্যুতে জটগুলো মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন, চুক্তিগুলো নবায়ন করেছেন। ভারতের বৈদেশিক সম্পর্কের নানান সমস্যা ও সম্ভাবনার ক্ষেত্রে যেমন, চীন বা জাপানের সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অর্থনৈতিক মুখ্য ইস্যু, আমেরিকার সাথে ঠিক তেমনটা নয়। আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক অর্থনৈতিকও বটে তবে মুখ্য ইস্যুগুলো হল সামরিক, ষ্ট্রাটেজিক এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ-ঝগড়া বিষয়ক নীতি নিয়ে। ফলে তা যথেষ্ট জটিলও। মোদীর দিক থেকে, আমেরিকার সাথে এসব মুখ্য ইস্যুগুলোকে সুরাহা করে, পার হয়ে তবেই নিজের মুখ্য ফোকাস – অর্থনীতি বা ইনফ্রাষ্টাকচার উন্নয়নের দিকে তাঁকে যেতে হবে। তাই কাজের মানুষ মোদীর এই তাড়া। কিন্তু এই বিষয়গুলো ভারতের জন্য কি লাভালাভ আনবে, কতটুকু কাজে লাগবে সেই বিস্তারিত আলোচনা এখন না অন্য কোথাও তুলতে হবে।
এখনকার প্রসঙ্গে আমাদের জন্য এতটুকুই প্রাসঙ্গিক যে এযাত্রায় মোদী ওবামার সাথে মিলে “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির মাহাত্মে যদি মেতে উঠেন, ফিল রেইনারের বক্তব্য যদি অর্থপূর্ণ হয় তাহলে অন্তত – বাংলাদেশের ভোট, ভোটার বা নির্বাচন আমরা কিছু বুঝি না, ভারতের জন্য বাংলাদেশের ওমুক দলকেই আমরা ক্ষমতায় দেখতে চাই ভারতের এই অন্যায় দুঃসহ আবদার থেকে আমাদের আপাতত মুক্তি মিলতে পারে। আমাদের নগদ লাভ এখানেই। তবে এখানে এসব কথার অর্থ আরও পরিষ্কার করার দরকার আছে। যেমন এর অর্থ এমন নয় যে আমাদেরকে চীনের বা আমেরিকার পক্ষপুষ্ট হয়ে বা যেয়ে ভারতের বিরুদ্ধে যাওয়া। এমন মনে করা ভুল হবে। সাধারণভাবে বললে, এশিয়ায় ভারত, চীন বা আমেরিকা এই তিন শক্তির কোন একটার ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের দিকে ঢলে পড়ে অপর দুটোর কোন একটার বিরুদ্ধে এটাকে ব্যবহার করার চিন্তা করাই যাবে না। বরং কারও ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের পক্ষে না গিয়ে বিশেষত কারও ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের বিপক্ষে অন্যকে সুবিধা দিবার আত্মঘাতী পথে না গিয়ে বাংলাদেশের নিজের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে এক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান অবশ্যই নিতে হবে। এটাই একমাত্র রাস্তা আমাদের টিকে থাকার জন্য খোলা আছে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসের দশা এক্ষেত্রে সেরকমের উদাহরণ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে এমন রাজনৈতিক ক্ষমতার দল করা যাবে না যে, নিজের জনসমর্থন হারিয়ে, আকণ্ঠ লুটপাটে নিমজ্জিত হয়ে এরপর চীন অথবা ভারতকে বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে নিজে ক্ষমতায় থাকতে চায় – এই দুর্গতির পথে হাটা যাবে না। এটা বর্তমান আওয়ামী লীগের সরকার, আগামী সম্ভাব্য বিএনপি অথবা আসন্ন যেকোনো দলের বেলায় কঠিন ভাবে সত্যি। এদিকটা খেয়াল রেখে এজন্য উপযোগী রাজনৈতিক ক্ষমতা, পদ্ধতি কাঠামো তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। তবেই আমরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে সক্ষম হতে পারি। এছাড়া আভ্যন্তরীণ কোন বিভাজনের ইস্যু যেমন সেকুলারিজম বনাম ইসলাম ধরণের বিভাজন পরিহার করে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির দিকে মনোযোগী হতে হবে।
এসব ঘটনাবলী ঘটছে খুবই দ্রুত। স্বভাবতই ফিল রেইনারের এই প্রেস বক্তব্য হাসিনা সরকার ও সমর্থকদের মনোবল ভাঙ্গার জন্য যথেষ্ট। ফলে এর পালটা কিছু প্রোপাগান্ডাও আমরা লক্ষ্য করছি। দৃশ্যত এর কেন্দ্রবিন্দু বিবিসি, তবে বিবিসি কলকাতার বাংলা বিভাগ। প্রথম রিপোটটা এসেছিল কেন্দ্রীয় বিজেপি নয়, কলকাতা বিজেপি সুত্রে। দুদিন পরে, এরপর ছাপা হয়, “বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে হাসিনা সরকার পঙ্কজ সরণকে আশ্বস্ত করেছেন”। পঙ্কজের নামে চালানো তবে পঙ্কজ নয় “বিশেষ সুত্রে পাওয়া” এমন বরাতে, যে পঙ্কজ সরণকে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে হাসিনা সরকার কি বলেছেন। অর্থাৎ যেন পঙ্কজ সেটা ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কাছে কিভাবে রিপোর্ট করেছেন সেই ভঙ্গিতে। আদৌও পঙ্কজ সেটাই রিপোর্ট করেছেন কি না তা আমরা কেউ জানি না। আর এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলাদেশের কোন সরকারই ফরমালি পঙ্কজ সরণকে এটা বলবে না যে নিজ সরকারের হাতে দেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নাই। ফলে বাংলাদেশের সরকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছেন, ড্রাইভিং সিটে আছেন এমনটাই স্বাভাবিকভাবে হাসিনা পঙ্কজকে বলবেন। আস্থা রাখতে বলবেন। কিন্তু তাতে ভারতের হাইকমিশনার আশ্বস্ত হয়ে গেছেন কিনা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব রিডিং কি সেটা একেবারেই আলাদা বিষয়। এরপর আবার ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ও সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব পঙ্কজের রিডিং কতটুকু কিভাবে গ্রহণ করবেন, একমত হবেন বা হয়েছেন সেটা আরও আলাদা। কিন্তু বাংলা বিবিসির রিপোর্টে এই পুরা বিষয়টাকে প্রোপাগান্ডা করতে শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে, “আশ্বস্ত করেছেন” বলে দাবি করে। একথা সত্যি যে হাসিনা সরকার পঙ্কজকে “আশ্বস্ত করাতেই চাইবেন”। কিন্তু সেটাকে পঙ্কজের আশ্বস্ত হওয়া এবং তাতে ভারতের সচিব ও রাজনৈতিক নেতৃত্বও “আশ্বস্ত হয়েছেন” বলে ইঙ্গিত করে চালিয়ে দেয়া মিডিয়া টুইষ্টিং। এটা আর নিউজ নয়, বড় জোর এক লেখকের কলাম বা ভিউজ। কারও রাজনীতির প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার হওয়া এমনটা হয়ত মিডিয়ায় হয়, করে থাকে কিন্তু সেটাকে অন্তত নিউজ দাবি করে করা যায় না। তবু আপাতত এসব প্রোপাগান্ডার চল আমরা দেখছি।

[লেখা এই রচনা এর আগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫  চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে সামান্য এডিট করে আবার ছাপা হল।]