বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথার পিঠে কিছু মন্তব্য

বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথার পিঠে কিছু মন্তব্য
গৌতম দাস
২৮ জুলাই ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-aR

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এক সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে গত মাসের ২৩ জুন দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায়। বিগত আশি’র দশকে তাকে আমরা নিজেদের মধ্যে সংক্ষেপে SIC বা সিক স্যার বলে ডাকতাম। সে সময়ে উনি কী বলেন তা শোনার, কী লিখতেন তা পড়ার একটা আগ্রহ কাজ করত, ফেসবুকের ভাষায় যাকে বলে, তাকে ফলো করতাম। যদিও গত কয়েক বছর ধরে তার কোনো লেখা ধৈর্য ধরে পড়েছি বলে আর মনে পড়ে না। গত ৮০’র দশকের শেষ থেকে আগ্রহে ভাটা পড়ে গেছে। এর কারণ সম্ভবত ওই সময় থেকে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট বুঝতে তার কথা আর কোনই কাজে লাগছিল না। অর্থাৎ ৮০’র দশকের প্রথম দিকে মনে হতো যে, বোধহয় কাজে লাগছে। ফলে একালে আলোকিত বাংলাদেশের ওই সাক্ষাৎকার পড়ার পর থেকে নিঃসন্দেহে আবার নতুন এক ধরনের আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। যা থেকে এ’লেখার সুত্রপাত।

বাংলাদেশে সেক্যুলারিজম নিয়ে তত্ত্ব করা ও পক্ষে তত্ত্ব দেয়া তার চেয়ে বেশি বোধহয় আর কেউ করেননি। বদরুদ্দীন উমরসহ কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লিটারেচারে যারা লিখেছেন ‘সেক্যুলারিজম’ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রসঙ্গ হিসেবে সেখানে ছিল অবশ্যই। কিন্তু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর “সেক্যুলারিজম” এর বয়ান তফসির সেগুলো থেকে আলাদা। কেন আলাদা, কোথায় আলাদা তা তখন বুঝতে বা বুঝিয়ে বলতে পারতাম না, শুধু ফারাকটা টের পেতাম। পেছন ফিরে দেখলে এখন মনে হয় সম্ভবত ফারাকটা বুঝতে পারি।

বাংলাদেশের কমিউনিস্টরা ইউরোপকে, ইউরোপের ইতিহাসকে যা জেনেছে তা শুধু লাল বই পড়ার ভেতর দিয়ে। লাল বইয়ের বাইরে দিয়ে অন্য কোনো বই পড়ে ইউরোপকে জানার চেষ্টা কমিউনিস্ট রেওয়াজে নিরুৎসাহিত করা হয়, তাই। অর্থাৎ ইউরোপের নিজের সম্পর্কে নিজস্ব লেখা পড়ে সেখান থেকে ইউরোপকে জানার চেষ্টা কমিউনিস্টদের চর্চা-অভ্যাসে নেই। নেই এজন্য যে, লাল বইয়ের বাইরের কোনো কিছু মানে ‘বুর্জোয়া’ জ্ঞান; যা কমিউনিস্টদের চোখে শত্রুর বয়ান, মানে অনাস্থা রাখতে হবে তাতে – এই ধারণা প্রবলভাবে কাজ করে। এটা করত বলা ভাল কারণ এখন সব আউলায়া গেছে, কমিউনিস্টরা আর সে ধারণা ধরে রাখতে, টিকাতে পারে নাই।

বিপরীতে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঠিক কোনো দলীয় ধারার কমিউনিস্ট নন, আর নিজেকে তিনি কমিউনিস্ট বলার চেয়ে ‘প্রগতিশীল’ বলতে পছন্দ করেছেন দেখা গেছে। এছাড়া তিনি লন্ডনে পড়াশোনা করেছেন, সেখানে বসে ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি করেছেন। ইংরেজি সাহিত্য বোঝার প্রয়োজনে ইংলিশ সামাজিক রাজনৈতিক পটভূমি তিনি জানতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ কারণে তিনি ইউরোপের ঘরের বই শুধু নয়, তিনি ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক, সামাজিক আন্দোলন “এনলাইটমেন্ট আন্দোলন ও আধুনিকতা” সম্পর্কে জেনেছেন, নিজের শখের পড়াশোনা সূত্রে নয়, বরং বাধ্য হয়ে, ইংরেজি ভাষার উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক ঘটনা ও এর ফলে ভাষায় বদলকে বোঝার প্রয়োজনে। একজন কমিউনিস্টের চোখে এনলাইটমেন্ট আন্দোলন ও আধুনিকতাকে বুঝা, পারলে তত্ত্বের দিকসহ বিস্তার করে বুঝা, জানা ও পড়াশোনা কোন কাজের বিষয় নয়। কারণ মোটা দাগে এগুলো সবকিছুই ‘বুর্জোয়া’ জ্ঞান যা শত্রুর বয়ান, যা এত জানার কিছু নয়। ফলে এখানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একজন সক্রিয় কমিউনিস্টের চেয়ে একেবারেই আলাদা। অতএব তাঁর আধুনিকতা ও সেক্যুলারিজমের বর্ণনা কমিউনিস্টদের চেয়ে বিস্তারিত ও ভিন্ন হতে বাধ্য। এখন বুঝি, এই ফারাকটাই পাঠক হিসেবে আমাকে আকর্ষণ করত। তবে অবশ্যই তিনি যাই লিখতেন তা বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতিকেই সমাজে পুষ্ট করত। নিজের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রগতিশীল, আধুনিক, বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্য রাজনীতির মতাদর্শ সরবরাহকারী, পোক্তকারী।

ফলে একালে আলোকিত বাংলাদেশের এই সাক্ষাৎকার নিঃসন্দেহে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে যিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের মতাদর্শ সরবরাহকারী, তাদের আধুনিকতা ও সেক্যুলারিজম সম্পর্কে বয়ান যার কারণে পোক্ত হয়েছে, তিনি একালে এসে যখন সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেন, “বাঙালি জাতীয়তাবাদের এখন আর দেয়ার কিছু নেই” তখন এটা খুবই ইন্টারেস্টিং ও কৌতূহল উদ্রেককারী।

পত্রিকার সম্পাদকের চোখে সাক্ষাৎকারের এদিকটা শিরোনাম হওয়ার যোগ্য হওয়ারই কথা। হয়েছেও তাই। কিন্তু আমার মন আকর্ষিত হয়েছে শুধু এদিকটার কারণে নয়। অন্য কারণে। যারা বয়সে ১৯৪৭ সালে কমপক্ষে সজ্ঞান কিশোর বা টিনএজে ছিল, তাদের নিয়ে আমার এক বিশেষ কৌতূহল আছে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব। তাঁর জন্ম ১৯৩৬ সালে, বয়স এখন ৮০ বছর। তাঁর প্রজন্মের সদস্যরা এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ অথবা দেহ রেখেছেন। এদের সেকালের প্রবল রাজনৈতিক আন্দোলন হল “পাকিস্তান আন্দোলন”, যার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাধারী ছিলেন তাদের প্রজন্ম। এ সাক্ষাৎকারেও আমরা সেটাই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু “পাকিস্তান আন্দোলনের” প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাধারী এই প্রজন্ম গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ ষাটের দশকের পর থেকে পুর্ববঙ্গের বা পুর্ব-পাকিস্তানের রাজনীতিতে ‘পাকিস্তান আন্দোলনকে’ আর নিজের মনে না করা এবং এর সাথে সম্পর্ককে অস্বীকারের নতুন বয়ান খাড়া করা শুরু হয়ে যায়। এছাড়াও ১৯৭১-২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সিক স্যারের প্রজন্ম সাধারণ কথাবার্তার মধ্যেও ‘পাকিস্তান আন্দোলনের’ কথা ঘুণাক্ষরেও যেন রেফারেন্স হিসেবে না এসে যায় সেজন্য মুখে কুলুপ আঁটেন, একাজে নিজেকে প্রশিক্ষিত করে নেন। কারণ তাদের কৈশোর বা তরুণ বয়সের অভিজ্ঞতা, তখন যা তাদের আন্দোলিত করেছিল, চরম সত্য মনে হয়েছিল তা স্বাধীনতার পরের কালে উচ্চারণ করলে নিজ পরিবারের তরুণের হাতে নিগৃহীত না হলেও কটুকথা শোনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কারণ তারা রক্ষণশীল, প্রাচীনপন্থী শুধু নয়, পরাজিত চিন্তাধারার প্রতীক বলে চিহ্নিত হতে পারেন। এভাবে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শী প্রজন্ম কিন্তু সেই যে ঐকালে মুখে কুলুপ আঁটলেন সে অভিজ্ঞতা কাউকে আর তাঁরা বলেন না। এমনকি নাতি-নাতনিদেরকেও না। যদিও শুধু রাজনীতির মাঠে নয়, সেসময়ের পুর্ববঙ্গের প্রতিটা মুসলমান পরিবারের ঘরে ঘরে প্রত্যেক সদস্যের কাছে পাকিস্তান আন্দোলনে কোথায় কি হচ্ছে তা সকলের জীবনের আপন ঘটনাবলী হিসাবে লেগে ছিল। সেই প্রজন্মের এরা আজ বয়সের ভারে একে একে সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। এই প্রজন্ম শেষ হয়ে যাওয়ার আগে, আমরা তাদের অভিজ্ঞতাকে মানি আর নাই মানি, তাদের অভিজ্ঞতা একালে সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের কারণে আমাদের ইতিহাস বয়ান শুরু হয় ১৯৫২ সাল থেকে। যেন এর আগে পুর্ববঙ্গে আমরা কেউ ছিলাম না। ভুঁইফোঁড়ের মতো ১৯৫২ সাল থেকে যেন আমাদের আবির্ভাব ঘটেছিল। এর আগে পাকিস্তান আন্দোলন বলে যেন কিছুই ঘটেনি। অথচ মানুষ তো ভুঁইফোঁড় নয়, হতে পারে না। অতীতের সবই ভালও নয় আবার সবই মন্দও নয়। এমন অতীতের উপরেই বর্তমান জন্মায়, দাঁড়িয়ে থাকে। আবার ফাউন্ডেশনাল কিছু বৈশিষ্ট্য থাকেই, যার ওপর বর্তমান খাড়া হয়ে থাকে। পাকিস্তান আন্দোলন তেমনই একটা কিছু। এটা ভীষণ আগ্রহ ও কৌতূহলের যে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার নিজের পাকিস্তান আন্দোলনের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলছেন। আমাদের সঙ্গে শেয়ার করছেন। এখানে নিচে সেসব নিয়ে কিছু অবজারভেশন ও মন্তব্য বলে এই লেখা শেষ করব।

এক. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী পাকিস্তান আন্দোলন ওন করছেন বা আপন বলে ধারণা দিচ্ছেন।
তিনি বলছেন, ‘ব্রিটিশ ভারতে আমাদের জন্ম, ব্রিটিশ-বিরোধী লড়াই, পাকিস্তান আন্দোলন দেখে বড় হচ্ছি। ফলে বেড়ে ওঠার মধ্যেই একটা রাজনীতি সচেতনতা ছিল।’ অর্থাৎ পাকিস্তান আন্দোলন খারাপ কিছু ছিল না, যা তিনি সে সময় দেখেছেন এবং এখন স্মরণ করার মতো তা গুরুত্বপূর্ণ ভাবছেন। যদিও পরের প্রশ্নের জবাবে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনকে নতুন গড়ে ওঠা মুসলমান মধ্যবিত্তের আকাঙ্খার বাহক হিসেবে দেখছেন। তার এ’কথাটা সত্য, তবে আংশিক ও খন্ডিত। খুব সম্ভবত তার কাছে যা ইমিডিয়েট বা চোখের সামনে, শুধু সেই শহুরে মধ্যবিত্তের কথাই তিনি এখানে ফোকাসে এনেছেন। কেন খন্ডিত বলছি?

আসলে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান এবং একনিষ্ঠ শক্ত সমর্থক ছিল গ্রামের কৃষক-প্রজা। সব সমাজে সব কালের রাজনীতিতে কোনো না কোনো একটা প্রধান বা মুখ্য স্বার্থ দ্বন্দ্ব থাকে। যাকে ঘিরে সমাজের বাকি সব স্বার্থ দ্বন্দ্বের সংঘাত আবর্তিত হয়, আকার নেয়, অ্যালায়েন্স করে। পাকিস্তান আন্দোলনের কালে সে সমাজের প্রধান দ্বন্দ্ব ছিল জমিদার-প্রজা; এমন প্রধান দ্বন্দ্ব হয়ে তা বিরাজিত ছিল পেছনের দেড়শ’ বছরের বেশি। কলকাতা কেন্দ্রিক বা কলকাতাগামী দৃশ্যমান মুসলমান মধ্যবিত্তের উত্থান বা জন্ম ১৯০০ সালের পর থেকে। এরপরেই একমাত্র এর আগে থেকে চলে আসা গ্রামের কৃষক-প্রজার জমি পাওয়ার আন্দোলনের সঙ্গে শহুরে মধ্যবিত্তের যে রাজনৈতিক অ্যালায়েন্স গঠিত হয় সেটাকেই আমরা অন্য ভাষায় পাকিস্তান আন্দোলন বলে চিনি। এই শ্রেণীমৈত্রীর রাজনৈতিক শক্তির বাহকের নাম মুসলিম লীগ। স্মরণ করিয়ে দেয়ার দরকার আছে যে, এটা ১৯৭১ সালের মুসলিম লীগ নয়। এমনকি এটা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের পরের সব ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে কুক্ষিগত করে সাজানো দাপটে চাপা পড়া পূর্ব পাকিস্তান, এমন সময়কালের মুসলিম লীগের কথাও বলা হচ্ছে না। ১৯৪৭ সালের আগের কথা বলছি, যখন পূর্ববঙ্গের গ্রাম-শহরের এমন কোনো মুসলিম প্রজন্ম পাওয়া যাবে না যারা সেকালের মুসলিম লীগকে তাদের ভবিষ্যৎ, তাদের সব আকাঙ্খার বাহক সংগঠন মনে না করত। তৎকালের জমিদারি উচ্ছেদের প্রধান এবং একমাত্র দাবিদার সংগঠন মুসলিম লীগ। এ অর্থে মুসলিম লীগ বিপ্লবী। পূর্ববঙ্গের চোখের মণি এই আন্দোলনের নাম “পাকিস্তান আন্দোলন”। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সেই স্মৃতির কথা বলছেন।

দুই. মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলনকে তিনি ‘জাতীয়তাবাদী আন্দোলন’ বলছেন
এটা খুবই ইন্টারেস্টিং যে, তিনি পাকিস্তান আন্দোলনকে ‘জাতীয়তাবাদী আন্দোলন’ বলছেন। কথাটা বলছি এজন্য যে, ১৯৪৭ বা পাকিস্তান আন্দোলন সম্পর্কে ভারতের ঐতিহাসিকদের সাধারণ মূল্যায়ন বয়ান এবং অভিযোগ হলো এটা ‘ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের আন্দোলন’, ‘জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব’ ইত্যাদি। অতএব মুসলিম লীগের এই রাজনীতি নেতিবাচক, ‘সাম্প্রদায়িক’ ও ঘৃণিত। পূর্ববঙ্গের অনেক কমিউনিস্ট বা প্রগতিশীল এই বয়ান অনুমোদন করেন বা আপন মনে করেন। এই পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িকতা ও সেক্যুলারিজম নিয়ে বই-পুস্তক, কলাম লিখে যিনি বিখ্যাত সেই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তা আজও মনে করছেন না। পাকিস্তান আন্দোলনকে ‘জাতীয়তাবাদী আন্দোলন’ বলছেন এটা নিঃসন্দেহে ইন্টারেস্টিং। অনেকের মনে হতে পারে, এটা তার হাতছুট বা মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া কোনো কথা। তাদের নিশ্চিত করার জন্য বলছি – না তা নয়। তাঁর দ্বিতীয় প্রশ্নের লম্বা জবাবের শেষ প্যারায় তিনি আবার পাকিস্তান আন্দোলন সম্পর্কে আর একটু পরিষ্কার করে বলছেন, এটা ‘পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ’। বলছেন জিন্নাহর বক্তৃতার (১৯৪৮) প্রতিক্রিয়ায় “… এই সূত্রেই পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যাত্রা শুরু হলো।”

অর্থাৎ এখানে তার সার মূল্যায়ন হলো, পাকিস্তান আন্দোলন কোনো নেতিবাচক আন্দোলন তো নয়ই, কোনো ‘ঘৃণিত’ বা “সাম্প্রদায়িক” ধর্মভিত্তিক আন্দোলনও নয়; বরং জনগণের আকাঙ্খার ধারক, জনগণকে দেয়া এক প্রতিশ্রুতির আন্দোলন। তবে ১৯৪৮ সালের পর থেকে জিন্নাহর বক্তৃতায় এটা বিপথগামী বা বিচ্যুত হয়ে যায়।

তিন. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ সাক্ষাৎকারেও নিজে একটা প্রগতিশীল পজিশন নিচ্ছেন বলে মনে করছেন।
তিনি কোনো দলীয় কমিউনিস্ট সদস্য বলে আমার জানা নেই। তবে তিনি নিজেকে কমিউনিস্টদের প্রতি নেক আছে এমন ধারণার প্রগতিশীল বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন, দেখেছি। চতুর্থ প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রশ্ন তুলে বলছেন, “কমিউনিস্ট পার্টি কিন্তু মধ্যবিত্তেরই পার্টি আসলে। কমিউনিস্ট পার্টির এখানে প্রধান দুর্বলতা হলো, তারা কৃষকের কাছে যেতে পারেনি। এজন্য দেশে বিপ্লব হয়নি।”

এখানে আমরা দেখছি মূলত তার অভিযোগ দুইটাঃ ‘মধ্যবিত্তেরই পার্টি’ আর ‘তারা কৃষকের কাছে যেতে পারে নাই।’ খুবই মারাত্মক অভিযোগ, সন্দেহ নেই। তবে অভিযোগ অবশ্যই জেনুইন এজন্য যে, কমিউনিস্ট পার্টি কখনও ‘জমিদারি উচ্ছেদ’ এর পক্ষে কখনও কোনো অবস্থান নেয়নি। তবু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কমিউনিস্টদের প্রতি যথেষ্ট সিমপ্যাথিটিক। তাই সাতচল্লিশের পরের কথা বলছেন, ‘পাকিস্তান রাষ্ট্রও কমিউনিস্টদের খুব অত্যাচার করতে শুরু করল।’ তার মতো অনেক কমিউনিস্ট বা একাদেমিসিয়ানরাও তাই মনে করে থাকেন যে, স্বাধীন পাকিস্তানেও কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধই থেকে গিয়েছিল। কিন্তু এগুলো বাস্তব সত্য কিন্তু সবটা সত্যি না এবং একপেশে। সেকালের এবং একালের আমাদের অনেকে মনে করতে পারেন, আয়ুব খানই পাকিস্তানে প্রথম ক্যু করেন। এ কথাটাও সঠিক নয়। প্রথম ক্যু করে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেন কমিউনিস্টরা মার্চ ১৯৫১ সালে এবং তাতে ব্যর্থ হলে তাদের দল নিষিদ্ধ হয়ে যায়, এসব জিন্নাহর মৃত্যুর পর লিয়াকত আলী খানের প্রধানমন্ত্রীর আমলের ঘটনা। ইতিহাসের খাতিরে “রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র” নামে খ্যাত এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত প্রসঙ্গ সামনে আনার দরকার আছে। ফলে একথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে সারা পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্টরা ধর্মবিরোধী বলে অজুহাতে বা আমেরিকার প্ররোচনাতে নিষিদ্ধ ছিল না।

চার. “পাকিস্তান ধর্মরাষ্ট্র হবে এমনটা তারা চায় নাই”
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এই বক্তব্য পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম লীগ সম্পর্কে বহু অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণ করে। পঞ্চম প্রশ্নের জবাবে তিনি নিজের এ গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন পেশ করছেন। আবার একদিকে স্বীকার করছেন, ‘পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ছিল ধর্ম।’ কিন্তু এই পাকিস্তান আন্দোলনের সপক্ষে আবার শক্ত ন্যায্যতা নিজেই দিয়েছেন। বলছেন, “তারা একটা রাষ্ট্র (অর্থাৎ পাকিস্তান) চেয়েছে, যেখানে তারা মুক্ত হতে পারবে। তারা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা চেয়েছে। জমিদার হিন্দু, মহাজন হিন্দু, চাকরি-বাকরিতে হিন্দু, ব্যবসা-বাণিজ্যে হিন্দু ওদের হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য পাকিস্তান দরকার”।
তবু তাঁর এই শক্ত ন্যায্যতার প্রশংসা করার পরেও একটা ক্রিটিক্যাল সমালোচনার দিক মনে রাখার দরকার আছে। একথা সত্যি সেসময়ের সমাজ বলতে সেটা ছিল হিন্দুদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক একচেটিয়া ক্ষমতা আধিপত্যের সমাজ। বিপরীতে মুসলমানদের অবস্থান হিন্দু জাত-বর্ণপ্রথায় নমশুদ্রেরও নীচে, এমনকি মুসলমানেরা বাঙালি বলেও কোন স্বীকৃতি ছিল না। এরপরেও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যেভাবে পরিস্থিতিটাকে হাজির করেছেন যে জমিদারগিরি, মহাজনগিরি, চাকরি-বাকরিতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ইত্যাদি সবকিছুতে হিন্দু প্রাধান্যে ছিল বলে পাকিস্তান আন্দোলন জমিদার হিন্দু, মহাজন হিন্দুকে সরিয়ে মুসলমান জমিদার, মুসলমান মহাজন কায়েমের আন্দোলন ছিল না। ফলে কমিউনিষ্টদের মধ্যে যেমন সব কিছুকে অর্থনীতিবাদী ঝোঁকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা থাকে এটা তা ছিল না। বরং খোদ জমিদার-প্রজা সম্পর্কটাই উতখাত, ‘জমিদারি উচ্ছেদ’ এই ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের দাবি এবং এক ঐতিহাসিক অর্জন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের পরে পুর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ কমিটি বাস্তবে পশ্চিম পাকিস্তান মুসলিম লীগের অধীনস্ত, উচ্ছিষ্টভোগী হয়ে পড়ে একথা সত্য। ফলে অচিরেই (১৯৪৯) আওয়ামি মুসলিম লীগ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। কিন্তু সেজন্য পাকিস্তান আন্দোলনের বিখ্যাত অর্জন ১৯৫১ সালের ১৫ মে জমিদারি উচ্ছেদ আইন (THE STATE ACQUISITION AND TENANCY ACT, 1950) পাশ করা সবচেয়ে বিপ্লবী ঐতিহাসিক ঘটনা। একে খাটো করতে পারি না। আজও স্বাধীন বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে আমাদের জন্য এটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল। ফলে এটা হিন্দু জমিদারের জায়গায় মুসলমান জমিদার বসানোর আন্দোলন ছিল না। এই তাতপর্য যেন আমাদের চোখ না এড়ায়।

পাঁচঃ “নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এই দিক থেকে দেখতে হবে”
এতক্ষণ রাষ্ট্র আলোচনায় ধারণাটাকে তিনি ‘আধুনিক রাষ্ট্র বনাম ধর্ম রাষ্ট্রের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু এবার ষষ্ঠ প্রশ্নে এসে ‘পুঁজিবাদী রাষ্ট্র’ বলে এক নতুন ধারণা আমদানি করেছেন। তিনি বলছেন, “নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এই দিক থেকে দেখতে হবে”। ‘নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র’ এ কথার একটাই অর্থ হতে পারে যে, নিপীড়ন বলতে তিনি শ্রেণী বা অর্থনীতিবিষয়ক নিপীড়নের কথা বলছেন। কিন্তু অর্থনীতিবিষয়ক ছাড়াও ভিন্ন ধরণের নিপীড়ন হতে পারে। যেমন জাতিগত নিপীড়ন বলতে মুখ্যত তা রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনাই বোঝায়।
তবে এর চেয়েও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এক মারাত্মক মন্তব্য এখানে আছে – জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট বিষয়ে। তিনি ধারণাটা অপ্রয়োজনীয় দাবি করে বলছেন, ‘পৃথিবীতে জাতিরাষ্ট্র বলে কোনো রাষ্ট্র নেই। এখানে (বাংলাদেশ) একটা জাতিপ্রধান আছে বটে, কিন্তু অন্য জাতিগোষ্ঠীও আছে।’ তার কথা হয়তো সঠিক। তবে ইংরেজি শব্দ ‘রেস’ ও ‘নেশন’ ধারণার বিভ্রান্তি থেকে এসবের ভুল ধারণার উৎপত্তি। তিনিও এই বিভ্রান্তি নতুন করে ছড়ালেন। মুল সমস্যা হল, ‘রেস’ ও ‘নেশন’ দুইটি শব্দকেই বাংলায় ‘জাতি’ অনুবাদ করে সে বিভ্রান্তিকে আরও উসকে দেয়া হয়েছে। ফলে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এসব বিভ্রান্তির বাইরে এমন দাবি করা যাচ্ছে না। যেমন তিনি বলছেন, ‘রাষ্ট্র এবং জাতি এক না। একটা রাষ্ট্রে একাধিক জাতি থাকতে পারে। রাষ্ট্র হচ্ছে একটা রাজনৈতিক প্রপঞ্চ, আর ‘জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ’। এর প্রথম দুই ছোট বাক্য হয়ত সঠিক। কিন্তু “জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ” এ কথাটা তিনি যথেষ্ট ভেবে বলেছেন বলে মনে হয় না। কারণ এ বাক্যটাও ‘রেস‘ ও ‘নেশন’ বিষয়ক বিভ্রান্তির বাইরে নয়। রেস অর্থে ‘জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ’, কথাটা সঠিক। কিন্তু নেশন কথাটার বেলায় “নেশন অর্থে জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ’, এই কথাটা সঠিক নয়। ‘নেশন’ অবশ্যই পলিটিক্যাল ক্যাটাগরি। রাজনৈতিকভাবে কনস্ট্রাকটেড বর্গ ও ধারণা। রেস ধারণার মতো তা প্রাকৃতিক বা ‘নৃতাত্ত্বিক বর্গ’ নয়, বরং রাজনৈতিক বর্গ।
তবে হয়তো এটা বলা যায় যে, ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণাটা অপ্রতুল ও অস্পষ্টই শুধু নয়, বেকুবি এবং অনিবার্যভাবেই তা বর্ণবাদিতায় ঢলে পড়বেই, এমন ধারণা।
এই প্রসঙ্গটা শেষ করার আগে, “নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের…” প্রসঙ্গে –
বাংলাদেশে পাহাড়িদের ওপর বাঙালি রাষ্ট্রের নিপীড়ন, এটা কি ‘পুজিবাদী রাষ্ট্রের’ কারণে ঘটছে? আমরা কি তাই বলতে পারি না এগুলো অর্থহীন কথাবার্তা হবে? আসলে এসব ‘শ্রেণী বিলাসী’ চিন্তা আমাদের ত্যাগ করতে হবে। অনেক হয়েছে। তবে তার শেষ বাক্য, তাই, “জাতিরাষ্ট্র নয়, আমরা চেয়েছি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” – এ কথা বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা কখনও মানবে না। বোঝা যাচ্ছে, শেষ বয়সে এসে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে হাত ছেড়ে দিতে চাইছেন। প্রসঙ্গটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, এ স্বল্প পরিসরের বাইরে সময় নিয়ে বিস্তারিত আলাপ তুলতে হবে।

ছয়ঃ “হেফাজতের সঙ্গে গণজাগরণের যে দূরত্ব সেটা আসলে শ্রেণীদূরত্ব”
গত ২০১৩ থেকে শাহবাগ অন্দোলন সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কিছু সাহসী মন্তব্য করেছেন। সাধারণ কমিউনিষ্টদের থেকে ব্যাতিক্রমী মন্তব্য করেছেন তিনি। বলেছেন, “শাহবাগ আন্দোলন পর্বে আত্মপরিচয়ের রাজনীতির চেয়ে আমার কাছে বড় দিক মনে হয়েছে শ্রেণী পরিচয়। শ্রেণী-বিভাজনটাই সেখানে ছিল প্রধান ইস্যু। হেফাজতের সঙ্গে গণজাগরণের যে দূরত্ব সেটা আসলে শ্রেণীদূরত্ব। গ্রামে মাদ্রাসাগুলোতে যারা পড়ছে তারা দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত। আমরা এখানে যারা পড়ছি তারা সুবিধাপ্রাপ্ত। এখানে দূরত্ব আছে। গণজাগরণ মঞ্চে তুমি কিন্তু শ্রমজীবীকে টানতে পারছ না। যে রিকশাঅলা তোমাকে ওখানে পৌছে দিয়ে যায় সে কিন্তু মঞ্চে যাচ্ছে না। রাস্তায় যেসব শ্রমিকরা আছে তারাও কিন্তু আসছে না। এমনকি তোমরা ভদ্রলোকরা যে সভা করছে সে তার বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়ে যেতে পারে। যে ওটা বড়লোকদের ব্যাপার, নাচানাচি করতেছে, গান বাজনা করতেছে। শ্রেণীর সমস্যাটাই হচ্ছে প্রধান সমস্যা। শ্রেণীর দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখলে এগুলো ব্যাখ্যা করা যাবে না”। তাঁর কথায় হয়ত পয়েন্ট আছে কিন্তু কোন কমিউনিষ্ট এমনকি “দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ” করার সুযোগ হিসাবে যারা “শাহবাগকে” দেখেছেন, নিয়মিত সাময়িকী বের করেছেন, টক শোতে কমিউনিষ্ট হয়েও লীগ ও সরকারের পক্ষে সাফাই, তত্ত্ব দিয়েছেন এমন কাউকেই এমন অবস্থান নিতে দেখা যায় নাই। সে হিসাবে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এমন মন্তব্য সাহসী ও ব্যতিক্রমী অবশ্যই।

সাতঃ “আমার রাষ্ট্রের প্রধান সমস্যা কী? একটা হলো নদীর সমস্যা”
কোন রাখঢাক না রেখে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলছেন, “বাঙালি জাতীয়তাবাদ আছে, কিন্তু তার এখন আর দেওয়ার কিছু নাই। আমার রাষ্ট্রের প্রধান সমস্যা কী? একটা হলো নদীর সমস্যা। আমাদের চুয়ান্নোটি অভিন্ন নদীর প্রবাহ যে শুকিয়ে আসছে সেটা নিয়ে কি জাতীয়তাবাদীরা কথা বলছে? হিন্দির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কি তারা কথা বলছে? নরেন্দ্র মোদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দিতে বক্তৃতা দিয়ে গেলেন। পাকিস্তানের কেউ যদি উর্দুতে বক্তৃতা দিত আমরা মানতাম? অথচ মোদিকে আমরা হাততালি দিলাম। জাতীয়তাবাদের কথা বললে। জাতীয়তাবাদের প্রধান উপাদান তো ভাষা”।
এটা খুবই তাতপর্যপুর্ণ যে “প্রগতিশীল” আশি বছরের তরুণ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সরাসরি ভারতের বাংলাদেশ নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অথচ এখনও অনেক কমিউনিষ্টকে আমরা পাই যারা এমন সমালোচনাকে “সাম্প্রদায়িক” হিন্দু বিরোধীতার কাজ মনে করেন। এর আগেই কখনও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে “চুয়ান্নোটি অভিন্ন নদীর প্রবাহ” নিয়ে কথা বলতে শুনেছি বলে মনে করতে পারলাম না। তাকে অজস্র ধন্যবাদ জানাই সকলকে সাহস যোগানোর জন্য। মনে হচ্ছে টেক্কা কে টেক্কা বলতে চাইছেন তিনি। আপাতত সবাইকে এর তাতপর্য অনুধাবণ করতে বলব।

[লেখাটা এর আগে কিছুটা সংক্ষিপ্তভাবে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল গত ২৭ জুলাই ২০১৫ তারিখে। এখানে পরিপুর্ণভাবে আরও অনেক কিছু সংযোজন ও এডিট করে আবার ছাপা হল।]

[কোন ব্যাপার নজরে আনতে বা লেখকের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে goutamdas1958@hotmail.com এই ঠিকানায় মেল করতে পারেন।]

চীনের বিশ্বব্যাংক : গঠন কাঠামো, আর্টিকেল স্বাক্ষরিত

AIIB সিরিজ

চীনের বিশ্বব্যাংক : গঠন কাঠামো, আর্টিকেল স্বাক্ষরিত
গৌতম দাস

ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-aB

চীনের নেতৃত্বে বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যাংক, ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ বা সংক্ষেপে AIIB এর গঠন প্রক্রিয়া চলছে, আগামী বছর থেকেে এর কর্মতৎপরতা শুরুর কথা জানিয়েছিলাম। ইতোমধ্যে উদ্যোক্তা-স্বাক্ষরদাতা সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে পরবর্তী কাজ ‘আর্টিকেলস অব অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা ব্যাংকের গঠনতন্ত্রের মুসাবিদা করার যে কাজ চলছিল তা শেষ হয়েছে এবং তা প্রণয়ন শেষে তাতে সম্মতি স্বাক্ষরের দিন ছিল ২৯ জুন ২০১৫। ‘আর্টিকেলস অব অ্যাগ্রিমেন্ট’ দলিলে কী কী বিষয়ে একমত হওয়া গেছে, এর তাতপর্য কি সে আপডেট হলো এবারের লেখার প্রসঙ্গ।

প্রথমতঃ ২৯ জুন ২০১৫, স্বাক্ষর শেষে কারা কারা সদস্য রাষ্ট্র হল, তা বলা এখন সহজ হয়ে গেছে। আমেরিকা ও জাপান তাদের প্রভাবাধীন রাষ্ট্রগুলো যাতে AIIB ব্যাংকের সদস্য না হয় সেজন্য গত এক বছর ধরে এই দুই রাষ্ট্র প্রবল কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছিল। কিন্তু ২৯ জুনের পর দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও জাপান এরা নিজেরা বাদে এদের প্রভাবাধীন সব রাষ্ট্রই AIIB এর ‘আর্টিকেলস অব অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা ব্যাংকের গঠনতন্ত্রে সম্মতি স্বাক্ষর দিয়েছে। এখন মোট সদস্য রাষ্ট্র সংখ্যা ৫৭, যার ৫০ জন এরই মধ্যে স্বাক্ষর করে ফেলেছে আর বাকি ৭ জন নিজ নিজ রাষ্ট্রের সম্মতি স্বাক্ষরের পক্ষে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পথে আছে।

বিগত ২৫ বছর ধরে গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীন ক্রমেই আমেরিকার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছে আর আমেরিকান প্রভাবকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এদিক থেকে বিচারে চীনের AIIB উদ্যোগে দুনিয়ার পাঁচ মহাদেশকেই AIIB ব্যাংক গঠনে শামিল করা – এটাকে গ্লোবাল কূটনৈতিক তৎপরতায় চীনের সর্বোচ্চ সাফল্য ও সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ একদিকে আমেরিকা ও জাপানের সক্রিয় বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে চীন, অন্যদিকে ইউরোপের প্রভাবশালী প্রায় সব রাষ্ট্রকে ব্যাংক গঠন উদ্যোগে শামিল করতে পেরেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি লগ্নে বিশ্বব্যাংকের জন্ম হয়েছিল, সেই থেকে ইউরোপের অর্থনৈতিক ভাগ্য আমেরিকার সাথে গাঁটছাড়ায় বাধা পড়েছিল। সেই গাটছাড়া এই প্রথম অস্বীকার উপেক্ষা করে ইউরোপ এক তাতপর্যপুর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিল।

যদিও পাঁচ মহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সব রাষ্ট্রই এর সদস্য, তবু গঠনতন্ত্রে এ ধারণা পরিষ্কার রাখা হয়েছে যে, এই ব্যাংক এশিয়ান রাষ্ট্রগুলোর প্রাধান্যের ব্যাংক। যেমন বলা হয়েছে, শুধু এশিয়া অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সবাই মিলে এ ব্যাংকের কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ ভোটের মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করবে। আর ব্যাংকের মোট মালিকানার এই ৭৫ ভাগের মধ্যে চীন একা ২৬ দশমিক ০৬ শতাংশ ভোট শেয়ার মালিকানা নিবে। এটি সর্বোচ্চ একক মালিকানা। অর্থাৎ চীন বিনিয়োগের যোগানদার হবে। (২৬ দশমিক ০৬ শতাংশ ভোট শেয়ার মানে এটা মালিকানা বোর্ডের ভোট শেয়ারের অনুপাত। চীনের বিনিয়োজিত অর্থের অনুপাত নয়। সংখ্যা হিসাবে সমতুল্য অর্থের অনুপাত একটু বেশি। ২৬ দশমিক ০৬ শতাংশ ভোট শেয়ার এর সমতুল্য অর্থের মালিকানা শেয়ার হল ৩০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক পরিচালনা সিদ্ধান্ত গ্রহণে চীনের মোট ভোট ২৬ দশমিক ০৬ শতাংশ।

চীনের এ মালিকানা বা ভোটের ক্ষমতার তাৎপর্য কী?

তাৎপর্য : এক
ব্যাংকের (এখন থেকে AIIB ব্যাংককে সংক্ষেপে এখানে ব্যাংক বলব) প্রণীত গঠনতন্ত্রে বেশ কিছু প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পূর্বশর্ত দেয়া হয়েছে যে, শুধু ৭৫ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তা অনুমোদিত হতে হবে। অর্থাৎ ৭৫ ভাগ ভোট ওই সিদ্ধান্তের পক্ষে থাকতে হবে। এমন বিষয়গুলো হল যেমন, ব্যাংকের সভাপতি নির্বাচন অথবা কোনো সদস্য রাষ্ট্রের সদস্যপদ স্থগিত করে রাখার সিদ্ধান্ত। আর এছাড়া খোদ গঠনতন্ত্রেই কোনো পরিবর্তন বা সংশোধনী আনতে চাওয়ার মতো মৌলিক কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে এ পূর্বশর্ত প্রযোজ্য হবে। এর সোজা অর্থ এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চাইলে চীনের সম্মতিকে সঙ্গে না নিতে পারলে তা সফল করা যাবে না। কারণ চীন ছাড়া সব সদস্য রাষ্ট্র একজোট হলেও মোট ভোটের পরিমাণ ৭৫ শতাংশের কমই থাকবে, যেহেতু একা চীনের হাতে ২৬ শতাংশের চেয়েও বেশি ভোট ক্ষমতা আছে, তাই। যেমন চেয়ারম্যান এমন ব্যক্তি নির্বাচিত বা বেছে নিতে হবে, যার ওপর চীনের আশীর্বাদ আছে।

তাৎপর্য : দুই
ব্যাংকের মালিকানা শেয়ার বিতরণে চীনের একার হাতে সর্বোচ্চ ২৬ দশমিক ০৬ শতাংশ শেয়ার ভোট রাখা হয়েছে তা আগেই বলেছি। কিন্তু দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট হলো ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, আর এ ভোটধারী রাষ্ট্র হলো ভারত। একইভাবে তৃতীয় হলো, ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ ভোটের অধিকারী রাষ্ট্র রাশিয়া। এমন ধারাবাহিকতায় এশিয়ার বাইরের রাষ্ট্র হিসেবে ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী জার্মানির ভাগে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, ফ্রান্স ৩ দশমিক ৪ শতাংশ আর লাতিন আমেরিকার ব্রাজিলের ভাগে ৩ দশমিক ২ শতাংশ শেয়ার ভোট। অর্থাৎ এসবের সোজা অর্থ হলো, এ ব্যাংক পরিচালনে চীনের প্রধান সহযোগী হবে ভারত ও রাশিয়া। এসব বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি (এশিয়ান ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক) প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করে বলা যায়, বিশ্বব্যাংক যেমন আমেরিকান কর্তৃত্বে আর ইউরোপ ও জাপানের সহযোগী ভূমিকায় চলে, আর, এডিবি তেমনি জাপানের কর্তৃত্বের প্রতি আমেরিকান সমর্থনে পরিচালিত হয়। ঠিক তেমনি, AIIB ব্যাংকের বেলায় এটি চীনের নেতৃত্বে ভারত ও রাশিয়ার সহযোগী ভূমিকায় পরিচালিত হবে। অর্থাৎ পুরনো বা চলতি গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারের কোনো মাতবর বা মাতবরের সহযোগী এমন কেউই নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী অবকাঠামো ব্যাংকের পরিচালন মাতব্বরিতে নেই, রাখা হয়নি। নতুন উত্থিত মাতবর চীন আর তার প্রধান সহযোগী ভারত ও রাশিয়া, যারা কেউই পুরনো অর্ডারের মধ্যকার প্রভাবধারী কেউ নয়। ফলে নিঃসন্দেহে বলা যায়, পুরনো বা চলতি গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারের বদলে এর প্রভাব কমে আগামীতে নতুন এক গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারে আসার ক্ষেত্রে সে প্রতিযোগিতায় জিতার এক হাতিয়ার গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান হয়ে হাজির হচ্ছে AIIB ব্যাংক। ব্যাংকের মালিকানা শেয়ারবিন্যাস আমাদের সে ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ বিষয়গুলো ইউরোপের প্রধান প্লেয়ার সদস্য রাষ্ট্র জর্মান, ফ্রান্স বা বৃটেন বুঝেনি তা মনে করা ভুল হবে। অবশ্যই বুঝেছে, তবে বাস্তবতা হলো, গ্লোবাল অর্থনীতির মূলকেন্দ্র হয়ে গেছে এশিয়া (ইউরোপ বা আমেরিকা নয়) বলে এ বাস্তবতা তারা মেনে নিয়েছে। এই ফাকে একটা তুলনামূলক তথ্য দিয়ে রাখি। বিশ্বব্যাংকের মালিকানা-বিন্যাসেও জার্মানির মালিকানা শেয়ার ৪ দশমিক ৩ শতাংশ আর আমেরিকার একক সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ।  আমেরিকার নেতৃত্বে পুরনো বা চলতি গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের বদলে চীনের নেতৃত্বে নতুন কোনো গ্লোবাল অর্ডার চালু হলে আমেরিকার বদলে চীনের সহযোগী হতে ইউরোপের লিডিং অর্থনীতিগুলোর আপত্তি থাকবে না, এ ব্যাপারে তারা মনস্থির করে ফেলেছে – AIIB ব্যাংকের গঠন কাঠামো খুব সম্ভবত এমন ধারণার পক্ষে ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তাৎপর্য : তিন
ভারতকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শেয়ার মালিকানা দেয়া খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। আমি বহুবার বলে এসেছি, দুনিয়ায় গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা শৃঙ্খলায় আমেরিকান নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে, পরিবর্তন নিশ্চিতভাবে আসন্ন হয়ে উঠছে। চারদিকে সেসবের আলামত ফুটে উঠছে। পুরনো বা চলতি আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের জন্ম বা কায়েম হওয়ার প্রস্তুতিপর্ব অর্থে সময়কাল ছিল দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের ২৫ বছর। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, ১৯৪৪ সালের আশপাশে যেটা পরিণতি পায়। আমাদের এখনকার সময়টাও মানে বিগত মোটামুটি ১০ বছর ধরে আমরাও এবার আমেরিকার বদলে চীনের নেতৃত্বে নতুন কোনো গ্লোবাল অর্ডার চালু হওয়া আসন্ন হয়ে ওঠার কালে যেন আছি। এ পর্যায়ে চীনের পরে চীনের মতোই (চীনের গতিতে না হলেও) রাইজিং অর্থনীতির দেশ হলো ভারত। এভাবে বিচার টানার পেছনে বড় কারণ ও উপাদান হলো, নিজ অভ্যন্তরীণ বাজার হিসেবে ভারত চীনের মতোই বড় ও প্রবল সম্ভাবনাময়। যদিও এখনও অনেক পথ ভারতকে ঠিক ঠিক বুদ্ধিমানের মতো ঈর্ষা ত্যাগ করে হাঁটতে হবে। এ বিচারে চীন ও ভারত যদি রাইজিং ইকোনমি হয়, তবে আমেরিকার বেলায় বলতে হবে ডাউনিং ইকোনমি। ফলে স্বভাবতই ডাউনিং বা নিম্নগামী অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে চীন ও ভারতের নতুন অর্ডার কায়েমের কাজ করণীয় অনেক – একথা মনে রাখলে মানতেই হবে যে, ঢলে পড়া আমেরিকান নেতৃত্বের অর্ডারের বিরুদ্ধে  চীন ও ভারত এরা দুজন পরস্পর ‘ন্যাচারাল এলি’। কারণ তাদের লক্ষ্য করণীয় কাজ এক আর কমন প্রতিদ্বন্দ্বী আমেরিকা। কিন্তু এটি শুধু পুরনো অর্ডারের বিরুদ্ধে লড়ে এক নতুন অর্ডারের জন্ম দেয়ার ক্ষেত্রে। বাকি বিশেষত এই দুই রাষ্ট্রের নিজ নিজ নিরাপত্তা বা সামরিক স্বার্থের বিষয়ে এদের পরস্পরিক রেষারেষি, সন্দেহ, অচিহ্নিত সীমান্ত এবং সবার উপরে চীনের তুলনায় ভারতের খুবই অসম সামরিক সক্ষমতা – এগুলোও সমান বাস্তবতা। আর এ রেষারেষি, সন্দেহকে নিয়মিত আমেরিকান নানান থিঙ্কট্যাঙ্কের মাধ্যমে আমেরিকা ভারতের ইন্টেলিজেন্সিয়া, মিডিয়া ও জনগণের কাছে আরও ভীতিকরভাবে উপস্থাপনের প্রোপাগান্ডা করে যাচ্ছে আমেরিকা। আবার চীন-ভারত সম্ভাব্য কোনো সামরিক বিরোধ যদি দেখা দেয়, তবে সেক্ষেত্রে অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে ভারত শুধু আমেরিকাকেই ভাবতে পারে। এটিও বাস্তবতা। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি, ‘ন্যাচারাল এলি’ কথাটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সীমিত বলে নিতে হবে, চীন-ভারত সম্পর্কের ভেতর সামগ্রিক অর্থে যেন আমরা ভেবে না বসি। ফলে বুঝতেই পারা যায়, চীন-ভারত কুটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি সাদা-কালোর মতো সরল নয়, বরং যথেষ্ট জটিল ও ক্রিটিক্যাল।
সম্ভবত এসব গুরুত্বপূর্ণ দিক চীন-ভারত ঠান্ডা মাথায় আমল করতে পেরেছে, অন্তত কিছু গুরুত্বপুর্ণ ক্ষেত্রে; যে কারণে চীনের পরই ভারতের ভোট শেয়ার মালিকানা প্রদান। এছাড়া, চীনের দিক থেকে পরিপক্ক চিন্তা যে ইউরোপের চেয়েও ভারতের অগ্রাধিকারের ও উপযুক্ত গুরুত্বের স্বীকৃতি দেয়া। পুঁজির অর্থের পরিমাণের দিক এটি প্রায় ৮ দশমিক ৫২ শতাংশ; (সমতুল্য ভোটের শেয়ার অর্থে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ) এভাবে শেয়ার মালিকানা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ তারা নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে। মোদি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবার পরে, মোদি-ওবামা প্রথম দেখা হয়েছিল ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে। সে সময় থেকেই আমেরিকা AIIB ব্যাংক উদ্যোগ থেকে ভারতকে দূরে রাখতে সব ধরণের কূটনৈতিক লবিং করে গেছে। যদিও শেষে শুধু ভারত নয়, এশিয়ায় আমেরিকার আরও দুই বিশেষ ঘনিষ্ঠ স্ট্র্যাটেজিক বন্ধু – অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াকেও AIIB উদ্যোগ থেকে দূরে রাখতে প্রাণান্ত চেষ্টা করেছে। কিন্তু সবার বেলায় নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। প্রচুর গড়িমসির পর আজ দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়া AIIB ব্যাংকে যথাক্রমে পঞ্চম ও ষষ্ঠ বড় শেয়ারহোল্ডার মালিক।

তাৎপর্য : চার
আমরা হয়তো অনেকেই জানি না বিশ্বব্যাংকের গঠনতন্ত্র অনুসারে, সেখানে আমেরিকার একক সর্বোচ্চ মালিকানা শেয়ার ছাড়াও প্রত্যক্ষভাবে আমেরিকাকে ভেটো ক্ষমতা দেয়া আছে। জন্ম থেকেই এ ক্ষমতা দেয়া। ২০১০ সালে ইউরোপের জার্মানি প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে আমেরিকাকে এ ভেটো ক্ষমতা ত্যাগ করতে আহ্বান জানিয়েছিল।

এসব সূত্রে AIIB ব্যাংক উদ্যোগের কালেও কানাঘুষা উঠে যে, চীন সম্ভবত ব্যাংকের গঠনতন্ত্র প্রণয়নকালে নিজের জন্য ভেটো ক্ষমতা দাবি করবে। না তা হয় নাই। জল্পনা-কল্পনা মিথ্যা প্রমাণ করেছে, চীন তেমন কিছু করেনি। তবে ২৬ শতাংশ শেয়ার মালিকানা নিজের জন্য রেখে দেয়ার বিষয়ে কিছু মন্তব্য করেছে। চীনের ভাইস অর্থমন্ত্রী মিডিয়াকে জানিয়েছে, “চীন উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোনো ভেটো ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার দরকার বোধ করে না। তবে যাত্রার শুরুতে এই ব্যাংককে ফাংশনাল করতে গিয়ে চীনকে বেশি বিনিয়োগ দিতে হয়েছে, ফলে ‘ন্যাচারাল আউটকাম’ হিসেবে চীনের মালিকানা বেশি হয়েছে। আগামীতে এশিয়ার অন্য শেয়ারহোল্ডাররা যখন তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াবে, তখন চীনের এমন মালিকানা আর থাকবে না, কমে আসবে। চীন বিশ্বাস করে, ভবিষ্যতে যে কোনো সিদ্ধান্তে চীন তার শরিকদের বুঝিয়ে বলে তাদেরকে একমতে আনতে চীন সক্ষম হবে”।

কিছু খুচরা তথ্য : ব্যাংকের হেড অফিস কোথায় হবে এ নিয়ে ইন্দোনেশিয়া শুরু থেকেই তা নিজের দেশে স্থাপনের অফার দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু গঠনতন্ত্রে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, হেড অফিস চীনেই হবে, তবে সাব-অফিস অন্যান্য দেশে হতে পারে।

ব্যাংকের অফিসিয়াল ভাষা কী হবে- এ প্রশ্নে ইংরেজি সাব্যস্ত হয়েছে। এছাড়া কে ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হবেন এ প্রশ্নে আর্টিকেলে লিখে বলা হয়েছে, “এক উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ও উন্নতমানের নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এশিয়ান সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্য থেকে কোনো নাগরিককে বেছে নেয়া হবে”। এছাড়া আপাতত অফিসিয়াল মুদ্রা হবে আমেরিকান ডলার।
স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও উচু মাত্রার প্রফেশনালিজমের ব্যাপারে চীনের পক্ষ থেকে এসব প্রসঙ্গে যেচে কথা বলার কারণ, শুরুর দিকে আমেরিকা প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলেছিল যে এই ব্যাংক উদ্যোগ বিশ্বব্যাংক বা এডিবির পর্যায়ের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও উচু মাত্রার প্রফেশনালিজম দেখাতে পারবে না; এই বলে উদ্যোগকে তুচ্ছ করতে চেয়েছিল। এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোকে যোগ না দিতে উতসাহিত করতে বিভ্রান্তিতে ফেলা ও চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল। আমেরিকার সে প্রপাগান্ডার জবাব দিতেই চীনের এমন যেচে কথা বলা।

[এই লেখাটা লিখেছিলাম গত ১১ জুলাই, এরপর তা ছাপা হয়েছিল ১৩ জুলাই, ২০১৫ তারিখের দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশে। ছাপা হবার পর এটা আবার আরও আপডেট ও সম্পাদনা করে এখানে ছাপা হল। ]

গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

পুরান প্রধানমন্ত্রীর আলখাল্লা গায়ে চড়িয়ে মোদি বাংলাদেশ সফর করলেন

পুরান প্রধানমন্ত্রীর আলখাল্লা গায়ে চড়িয়ে মোদি বাংলাদেশ সফর করলেন

গৌতম দাস
০৬ জুলাই, ২০১৫

লেখার লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-aw

গত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে মোদির বাংলাদেশ সফর শেষ হয়েছিল। মোদি নিজে আগাম অনুমান করে বলেছিলেন তাঁর ফেরত যাবার পরে এই সফর নিয়ে চর্চা শুরু হবে। তা তো অবশ্যই হবে, হচ্ছেও। তবে, এগুলোর সার কথা হচ্ছে দেনা পাওনার দিক থেকে। “হিসাব কিতাবে মোদির দিকেই পাল্লাই ভারি”– এই সফর শেষে এটাই আমরা শুনছি। এমনটা না হবার কোন কারণ নাই। সাত জুন তারিখ দিন শেষে রাত বারোটায় (আইনত আট তারিখের শুরুতে ) সংবাদ পর্যালোচনায় চ্যানেল আই টিভিতে এসেছিলেন ভারতের দৈনিক টেলিগ্রাফ পত্রিকার এক বাঙলি সাংবাদিক,দেবদ্বীপ পুরোহিত। তিনিও বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করছিলেন বাংলাদেশ সবকিছুই দিচ্ছে,এটা একপক্ষীয় লেগেছে তাঁর কাছেও। তিনি বলছিলেন বাণিজ্যিক স্বার্থের দিক থেকে কিছু দেয়া আর বিনিময়ে কিছু পাওয়া এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু এমন কিছু তিনি দেখতে পাচ্ছে না। শেষে ব্যাপারটা তিনি ব্যাখ্যা খুজে না পেয়ে বললেন, “শেখ হাসিনা খুবই উদার। মোদি তাঁকে বিনিময়ে কি দিবেন সেদিকে তিনি কিছুই চিন্তা করেন নাই”। আগের দিন বাংলাদেশের কোন সাংবাদিক নাকি তাঁকে বলেছিলেন, “ভারত কিছু চেয়েছে, পেতে আগ্রহ জানিয়েছে অথচ বাংলাদেশ তাকে তা দেয়নি এমনটা কখনও ঘটে নাই!” – দেবদ্বীপ অবলীলায় এসব স্বীকার করছিলেন। ওদিকে প্রতিদিনই মিডিয়া অসম লেনদেনের বিভিন্ন ইস্যু তুলে ধরছে। ভারতীয় ব্যবসায়ীদেরকে অসমভাবে বেশি সুবিধা দেয়ায় কিছু দেশী ব্যবসায়ী নরম স্বরে কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে আপত্তি জানানো শুরু করেছে। সারকথায় সবাই বলতে চাইছে মোদীর সফর ছিল এক বিরাট অসম বিনিময়ের সফর – কূটনৈতিক ইতিহাসে দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মধ্যে এই ধরণের অসম বিনিময়ের নজির পাওয়া কঠিন।
আসলে কি তাই? না,কোন অসম বিনিময় এখানে হয় নাই। বাংলাদেশের দিক থেকে ১০০ ভাগের বিনিময়ে যদি ভারতের দিক থেকে মাত্র ১ ভাগ দেয়ার চুক্তি হয়ে থাকে তবু এটাও অসম নয়, হবে না। এজন্য যে যখন বিনিময়ে কারও ক্ষমতায় থাকার পক্ষে সমর্থন যোগানোর ব্যাপারটা লেনদেনের মধ্যে একটা ইস্যু হিসাবে হাজির থাকে; তখন ভারত বিনিময়ে কিছুই না দিলেও সেটা সম-বিনিময় অবশ্যই। কারণ এখানে সাথে বিনিময় হয়েছে ক্ষমতায় থাকার ন্যায্যতা লাভ।
বাংলাদেশের ক্ষমতায় থাকার জন্য শেখ হাসিনা আভ্যন্তরীণভাবে যেসব রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছেন এসবের মধ্যে মুখ্য বিষয়টা হল,তাঁর নিজের করুণ পাবলিক রেটিং বা জনসমর্থনের ঘাটতি। মোদির সফরের ফলে বাংলাদেশের মানুষ যে বার্তা পেল তা হল যে হাসিনার বাংলাদেশকে দিল্লির খুবই দরকার,অন্তত গোয়েন্দা-আমলাদের ভারতের পারসেপশনে। যেসব সুবিধা তারা পাচ্ছে সেটা সহজে দিল্লি ত্যাগ করতে চায় না, করবে কেন! হাসিনা তাদের জন্য “সন্ত্রাসবাদ” মোকাবিলা করে দিচ্ছে, “তারা বাংলাদেশে গনতন্ত্র চায় মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ চায় না” এসব কথার আড়ালে বাংলাদেশকে দিল্লি নিজেদের পক্ষে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ষ্ট্রাটেজিক সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে। বিনিময়ে হাসিনাকে একক বৈদেশিক সমর্থনের যোগানদাতা হয়ে থাকাটা খুবই যুক্তিসংগত পররাষ্ট্র নীতি। এই সুবিধা তারা ছাড়তে চাইবে কেন!
কিন্তু মনে রাখতে হবে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে বৈদেশিক বা বিদেশীদের সমর্থন মানে সেটা দেশের জনগণের সমর্থনের প্রকাশ নয়। এতে মানুষ বড় জোর বুঝল যে এই ক্ষমতা যেভাবেই হোক নিজের পক্ষে ভারতীয় সমর্থন যোগাড় করতে পারছে হয়ত কিন্তু সেটা নিজের প্রতি পাবলিক রেটিং বা জনসমর্থন বাড়বার লক্ষণ নয়। অর্থাৎ শেখ হাসিনার মুল প্রয়োজন যদি জনসমর্থন হয় সেটা ভারতের সমর্থনের কারণে পুরণ হচ্ছে না,হবে না, হবার নয়। ব্যাপারটা এমনও নয় যে ভারত হাসিনার পক্ষে প্রবল সমর্থন তৈরি করেছে এতে হাসিনার বিদেশী ক্ষমতার ভিত্তি শক্তিশালী দেখে নত ও ভীত হয়ে হাসিনার প্রতি পাবলিক সমর্থন ঘুরে যাবে। না,এমন ভাবার কোন কারণ নাই। কিছুটা এমন হতেও পারত যদি বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভারতের অন্তত কিছুটা সুনাম থাকত। চুক্তি করে ৬৮ বছর ধরে খেলাপী হয়ে থাকা ভারত রাষ্ট্র এবার সবে স্থল সীমান্ত চুক্তি সম্পন্ন করে বিরাট এক কাজ করেছে বলে দেখাতে চাইছে। আবার যেন এই সীমান্ত চুক্তির সুবিধা কেবল বাংলাদেশই পাবে, ফলে বাংলাদেশকেই যেন দয়া করছে দিল্লি এমন একটা ভাব তৈরির চেষ্টা করেছে। তাই এই উপস্থাপন, এতেও দিল্লীর প্রতি বাংলাদেশের জনগণের বড় একটি অংশ বিরক্ত হয়েছে। ছিটমহলের হবু বাংলাদেশি জনগণ এর সুবিধা ভোগ করবে তাই যেন ভারত এই চুক্তি সম্পন্ন করে একতরফা এক বিরাট অনুগ্রহ বা ফেবার বাংলাদেশকে করল। এই মিথ্যা ইমেজ থেকে আমাদের সকলের মুক্ত থাকা দরকার। এই চুক্তির আসল ভোক্তা যারা ভারতের হবু নাগরিক হতে চায় তারাও। ফলে এটা বাংলাদেশকে একতরফা দেয়া ভারতের কোন অনুগ্রহ একেবারেই নয়। আর এটা বার্লিন ওয়াল ভেঙ্গে পড়ার সাথে তুলনা দেয়া শুধু অতিকথন নয়, ডাহা অর্থহীন। কারণ কাঁটা তারের বেড়া এতে উঠে যায় নি, সীমান্তে বাংলাদেশিরা নিয়মিত মরছেই। এই লেখা যখন লেখা হচ্ছে তার আগের দিনও ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বাংলাদেশীদের হত্যা করেছে।
লাইন অব ক্রেডিট
গত ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পরের বছর হাসিনার প্রথম রাজভেট দেবার ভারত সফর ছিল বিগত ২০১০ সালের জানুয়ারি। সেবারই সফর শেষে দেশে ফিরে এসে, তিনি ভারত থেকে এক বিলিয়ন ডলারের ঋণ এনেছেন – এটাই তাঁর পক্ষে সবচেয়ে বড় বিশাল অর্জন বলে দাবি করেছিলেন। তখনকার প্রধানমন্ত্রী হাসিনার ভারত সফরের বিরাট অর্জন হল ঋণ প্রাপ্তি – এই কথাটাকে হাসিনা নিজের মিডিয়া হাইলাইট ও মটিভেশনের প্রধান ইস্যু করেছিলেন। তখন থেকেই জানা যায় লাইন অফ ক্রেডিটের রহস্য। সবাই জানি, ভারতের অর্থনীতি এমন স্তরে পৌছায় নাই যে ভারত বাংলাদেশকে বিলিয়ন ডলার ঋণ সাধতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশকে কনশেসনাল সুদ হারে (১শতাংশের নীচে) ঋণ দিবার চেয়ে বরং এমন ঋণ পেলে ভারতই নিতে আগ্রহী। তাহলে এই লাইন অব ক্রেডিট ব্যাপারটা কি?
এককথায় বললে, ভারতের কিছু পণ্য বিশেষত সেই পণ্য ভারতীয় ইস্পাত যার কাঁচামাল — যেমন রেল লাইন, বগি, বাস ট্রাক ইত্যাদি – সেই সকল উৎপাদিত পণ্যের বিরাট অংশ প্রতি বছর অবিক্রিত থেকে যায়। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কোম্পানীগুলোকে এসব অবিক্রিত মালামালের দায় থেকে পরিত্রাণ পাইয়ে দিতে নিজে একটা ফান্ড তৈরি করেছে। এই ফান্ড পরিচালিত হয় সরকারি বিশেষ ব্যাংক “এক্সিম ব্যাংক” এর মাধ্যমে আর Export-Import Bank of India Act 1981 আইনের অধীনে। এই ব্যাংকের কাজ হল, সম্ভাব্য ক্রেতাকে লাইন অব ক্রেডিট এর আওতায় লোন দিয়ে এসব অবিক্রিত মালামাল ঋণে কিনতে সাহায্য বা বাধ্য করা। আর এভাবে প্রকারন্তরে অবিক্রিত পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা যাতে বছর শেষে উতপাদক কোম্পানীগুলোর বিক্রি না হবার লোকসান কমে আসে। সারকথায়,এই ব্যাংকের উদ্দেশ্য হল, ভারতের নিজেদের অবিক্রিত মালামাল লোনে বিক্রির ব্যবস্থা করা,যাতে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলো চালু থাকে, প্রায় ৫০ হাজার কর্মচারি যেন বেকার না হয়। লাইন অব ক্রেডিটে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করলে শ্রম বেকার হওয়ার হাত থেকে বাঁচে ভারতের এমন শ্রমিকের সংখ্যা কত এর একটা ধারণা আমাদেরকে দিয়েছে ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকা। তারা এই ইস্যুতে ভারতের Export Import Bank of India (সংক্ষেপে এক্সিম ব্যাংক) এর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াদুয়েন্দ্র মাথুরের এক সাক্ষাতকার নিয়ে ছাপিয়ে আমাদেরকে সংখ্যাটা জানিয়েছেন, (দেখুন, মোদি বাংলাদেশ সফরের দ্বিতীয় দিন,৭ জুন ২০১৫ এর টাইমস অব ইন্ডিয়া)।
সেজন্য এই আইনের আরও কিছু মূলশর্ত আছে। যেমন এই লোনের খাতক বাংলাদেশকে কিছু শর্ত মানতে হবে। যেমন,
১. যেসব ভারতীয় পণ্য (ভারতীয় ইস্পাত যার কাঁচামাল যেমন রেল লাইন, বগি, বাস ট্রাক ইত্যাদি) এই আইনে ঋণে বিক্রিযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে কেবল তাই কিনতে হবে। ভারতের বা ভারতের বাইরের যে কোন পণ্য নয়।
২. এই ঋণের টাকায় অন্তত ৭৫% মামামাল ও সার্ভিস অবশ্যই ভারতীয় উৎস থেকে কিনতে হবে। অর্থাৎ এই ঋণ ভারত ছাড়া অন্য দেশ থেকে কোন পণ্য কিনতে ব্যবহার করা যাবে না। যেটাকে আইনি ভাষায় সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট বলা হয়।
৩. পারফরমেন্স গ্যারান্টি বলে আরও একটা ক্লজ আছে যার সুদ বাংলাদেশের বেলায় আরও আড়াই পার্সেন্ট যেটার কথা এখানে আড়ালে রেখে কেবল ১% সুদের বিষয়টাই উল্লেখ করা হচ্ছে। (আগ্রহিরা দেখুন Export-Import Bank of India – Role, Functions and Facilities, clause 1.2.5 Guarantee Facilities)
৩. বিশ্বব্যাংকের লোনের বেলায়, তুলনা করে বললে এর পরিশোধের সময় ৪০ বছর, প্লাস শুরুতে ১০ বছর গ্রেস পিরিয়ড মানে পরিশোধের হিসাব শুরু হবে ১০ বছর পরে থেকে। এর তুলনায় ভারতের লাইন অফ ক্রেডিটের বেলায় পরিশোধের সময় এখানে ২০ বছর প্লাস ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ড।
৫. এটা বিক্রেতার দেয়া ঋণে ক্রয় বলে, বিক্রেতা মালামালের মুল্য কত নিবে তা বাজার যাচাই করে কিনার সুযোগ নাই। বিক্রেতার ইচ্ছা মাফিক দামই শেষ কথা।
যেহেতু এই ঋণের উদ্দেশ্য মালামাল উতপাদক ভারতীয় কোম্পানীকে অবিক্রিত মালামালের লোকসানের হাত থেকে বাচানো ফলে, মালামালের ক্রেতা দেশটির স্বার্থ দেখা এই ঋণের কোন উদ্দেশ্যই নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশকে এই ঋণের খাতক বানানো মানে ভারতীয় উৎপাদক কোম্পানীর স্বার্থ পরিপুরণই এখানে প্রধান। এই শর্তগুলো মেনে নিয়েই বাংলাদেশ নিজেকে জড়িত করছে। ভারতীয় কোম্পানীর স্বার্থকে প্রাধ্যন্যে মেনে নিয়ে নিজেকে ঐ কোম্পানীর অবিক্রিত মালামালের খাতক বানানো। এই হল লাইন অব ক্রেডিট। এর সম্ভাব্য ক্রেতা সার্ক দেশ, এই হিসাবে মোট ৬ বিলিয়ন ডলারের একটা ফান্ড তৈরি করা আছে এক্সিম ব্যাংকে।

বিশেষজ্ঞ বা সিপিডির দুর্দশা
হাসিনার সাথে মোদিও বলছেন, “কানেকটিভিটি (যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা) শুধু দুই দেশের জন্য নয়,এই অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ”। কানেকটিভিটি নিশ্চিত করার মানে কি? বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিতে পারবে কিনা, পছন্দের নেতা নির্বাচিত করতে পারবে কি না – এসব রাজনৈতিক মৌলিক বিষয় বাধাগ্রস্থ রেখে কানেকটিভিটি নিশ্চিত করা? এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়া কার্যকর হতে না দিয়ে “কানেকটিভিটিকে এই অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ” বলে মনে করা খুবই বিপদজনক বক্তব্য। এই বিষয়ে প্রিন্ট পত্রিকায় যতগুলো আলোচনা বের হয়েছে সেখানে বিশেষজ্ঞ বা সিপিডির দুর্দশা দেখার মত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রশ্ন সংকটগুলোকে উহ্য বা লুকিয়ে রেখে এই সফর শেষ হয়েছে কিন্তু বিশেষজ্ঞরা কেউ তা নিয়ে কথা তুলতে চাচ্ছেন না। রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো বাদে অর্থনীতিক বাণিজ্যিক মূল্যায়ন বা বিচারেও কি হাসিনা-মোদির স্বাক্ষরিত এই ২২ চুক্তি ঠিক আছে? প্রথম আলো শিরোনামে বলছে “ভারতের সুবিধা বেশি, সুযোগ আছে বাংলাদেশেরও”। বলার এই ধরণটাই বলছে অর্থনীতিক বাণিজ্যিক বিচারেও এই চুক্তি ঠিক নাই। এটা অসম।

“সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিগুলো খুবই ইতিবাচক। কিন্তু এগুলোর আলোকে পরিকল্পিত বিনিয়োগ করতে হবে, প্রকল্প ঠিক করতে হবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে”।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, “সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিগুলো খুবই ইতিবাচক। কিন্তু এগুলোর আলোকে পরিকল্পিত বিনিয়োগ করতে হবে, প্রকল্প ঠিক করতে হবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, ‘বাংলাদেশের বন্দর, সড়ক, নৌপথ বা অন্য কোনো সুবিধা ব্যবহারের জন্য মাশুলের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্য হার রয়েছে। সেই অনুযায়ী মাশুল নিতে পারলে আমরা লাভবান হব।’ – প্রথম আলো ০৯ জুন ২০১৫। অর্থাৎ মোস্তাফিজ আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে চান যে এই সফরে ট্রানজিটে দিবার চুক্তিতে গুরুত্বপুর্ণ পুর্বশর্ত বিদেশি বিনিয়োগ পরিকল্পনার কোন খবর নাই। তাই তিনি যেন বলতে চাইছেন – চুক্তি হয়ে গেছে কিছু করার নাই কিন্তু এখন বিদেশি বিনিয়োগ সংগ্রহ করতে হবে, অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। ট্রানজিটের মাসুল প্রদান পরিকল্পনারও কোন খবর নাই। অথচ যেটাকে মাসুল প্রদান পরিকল্পনা বলছি ওটাই আসলে ট্রানজিট অবকাঠামোর জন্য বিদেশি বিনিয়োগ নিলে তা পরিশোধ যোগ্য হবে কি না তা বুঝবার একমাত্র উপায়। কারণ সংগ্রহিত মাসুল বা টোল থেকে নেয়া ঋণ কিস্তিতে পরিশোধ সম্ভব এটা কাগজ কলমে প্রমাণ করে না দেখাতে পারলে কোন বিনিয়োগ দাতা বিনিয়োগ দিবার প্রশ্ন আসে না, আগ্রহি হবে না। মোদি-হাসিনা স্বাক্ষরিত “সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিগুলোর” মধ্যে এগুলো মারাত্মক নেতিবাচক দিক। কিন্তু এই মারাত্মক নেতি কথাগুলোকেই তিনি ইতিবাচক ভাব তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। সারকথায় বললে, তিনি আসলে বলছেন, “সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিগুলো খুবই ইতিবাচক। কিন্তু এগুলোর আলোকে বিনিয়োগ পরিকল্পনা নাই বলে এগুলো নেতিবাচক। কে না জানে, মাসুল প্রদান হার বা আদায় পরিকল্পনার উপর নির্ভর করছে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা, বিনিয়োগ পাওয়া আদৌ সম্ভব হবে কি না। আপাতত ভারতের দিক থেকে বিনা বিনিয়োগে পারলে বিনা মাশুলে যা পাওয়া যায় তাই আদায়ের চেষ্টা আছে –দেখছি এই স্তরে আছি আমরা। অথচ কথা তো পরিস্কার যে মাসুল আদায় পরিকল্পনা এবং তা এমন পরিমাণ হতে হবে যেন তা ট্রানজিট অবকাঠামো বিনিয়োগ পরিশোধের সামর্থের হয় – এই প্রসঙ্গটা ছাড়া ট্রানজিট বা কানেকটিভিটি নিয়ে বাংলাদেশের কারও ভারতের সাথে গলায় গলা মিলিয়ে কথা বলা মানে নিজের সাথে প্রতারণা করা। কারণ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ কেমন করে যোগাড় করা হবে সে কথা তোলা এবং চিন্তা না করার মানে হল, বাংলাদেশের নিজ অর্জিত রাজস্ব আয় ব্যয় করে গড়ে তোলা উপস্থিত ট্রানজিট অবকাঠামো ভারতের বাণিজ্য পেতে খরচ হতে দেওয়া। আর দুএক বছরের মধ্যে উপস্থিত ও সীমিত অবকাঠামো অতি ব্যবহারে ভেঙ্গেচুরে পড়ার পর ঐ সমস্ত পথ-অবকাঠামোকে বাংলাদেশের নিজেরও অর্থনীতিকে অবকাঠামোর অভাবকে সংকটে স্থবির করে ফেলা। সোজা কথা, বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, প্রতিশ্রুতি ও বাজার ব্যবস্থার হিসাব কষে সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিনিয়োগ উঠে আসা ও লাভের মুখ দেখার হিসাব নিকাশ পরিচ্ছন্ন না করে ট্রানজিট চুক্তি করা মানে বাংলাদেশের নিজের অর্থনীতিকেই মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটে ঢুকিয়ে দেয়া।
অর্থনৈতিক যুক্তির দিকে থেকে বলা সহজ ভারতকে ট্রানজিট অবশ্যই দেয়া সম্ভব হয়ত তবে এর প্রথম শর্ত হল, ট্রানজিটের রাস্তাঘাট অবকাঠামো বিনিয়োগ মাসুল ইত্যাদি শুরু থেকেই পরিকল্পনার মধ্যে রাখা এবং এই বিনিয়োগে দুই দেশের জনগণ কেমনে লাভবান হবে তার অর্থনৈতিক হিসাবনিকাশ স্পষ্টভাবে করা । মোদি-হাসিনার যে চুক্তি সম্পন্ন হল তাতে এমন পরিকল্পনা একেবারে অনুপস্থিত। এই বিষয়ে আলোচনার কেন্দ্রিয় বিষয় – অবকাঠামো বিনিয়োগ – মাসুল আদায়। এটা মোস্তাফিজ অস্বীকার করতে পারছেন না। তাই প্রথম আলোর বেলায় বলেছিলেন – যদি অবকাঠামো বিনিয়োগ – মাসুল ইত্যাদি পরিকল্পনা থাকে তবে “সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিগুলো খুবই ইতিবাচক”। মোস্তাফিজ ভাল মতই জানেন এসব পরিকল্পনার খবর স্বাক্ষরিত চুক্তিতে নাই। বলাবাহুল্য ট্রানজিট প্রসঙ্গে আমরা কেবল অর্থনৈতিক অবস্থানের জায়গা থেকে কথা বলছি। রাজনৈতিক বিতর্ক – বিশেষত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটি এসবের বাইরে ভিন্ন একটি গুরুতর রাজনৈতিক বিষয়।
কিন্তু সমকাল পত্রিকার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে মোস্তাফিজ এবার আর বুদ্ধিমান থাকলেন না, নিজেকে সারেন্ডার করালেন। সমকাল পত্রিকার বেলায় এসে আরও বড় ধরণের মিথ্যায় মাতলেন, যাকে তথ্যগত জোচ্চুরি বলা যায়। “সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন”, সমকাল জানাচ্ছে, “বর্তমানে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ৯০ ভাগই হয় স্থলপথে। উপকূলীয় বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন হলে সমুদ্রপথে বাণিজ্য বৃদ্ধির ব্যাপক সুযোগ তৈরি হবে। তিনি বলেন, ভারত কিংবা এ অঞ্চলের সঙ্গে ‘কানেক্টিভিটি’ প্রশ্নে বাংলাদেশে অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের দরকার হবে। ভারত নতুন যে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা দিয়ে রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন করা যাবে”। মোস্তাফিজের শেষ বাক্যটা ডাহা মিথ্যা কথা, মিথ্যা প্রলোভনের প্রলাপ।
প্রথম কথা হল, ট্রানজিটের অবকাঠামো খাতে ব্যবহারের জন্য ভারত আমাদের কোন ঋণ অফার করে নাই। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ট্রানজিট অবকাঠামোতে বিনিয়োগের দায় ভারত নিবে কি না তা আমরা কেউই জানি না। আলোচনার টেবিলে বিষয়টি এখনও ইস্যু হতে পারে নাই। এছাড়া ট্রানজিট ব্যবহার করে ভারত আদৌ মাসুল দিবে কিনা – দিলেও সেটা নাম কা ওয়াস্তে হবে নাকি এর পরিমাণ বিদেশি অবকাঠামোগত বিনিয়োগ পরিশোধের মত পরিমাণের হবে কি না – তা আমরা কেউ এখনও পর্যন্ত কিছুই জানি না।
এই পরিস্থিতিতে মোস্তাফিজ খামোখা দাবি করে বলছেন, “ভারত নতুন যে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা দিয়ে রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন করা যাবে”। তাঁর এই দাবির ভিত্তি কি আমরা জানি না। বরং আমরা ইতোমধ্যেই এটা জানি যে, ভারতের লোনের প্রতিশ্রুতি ভারতের অবিক্রিত ইস্পাত মালামাল বিক্রিকে প্রমোট করার জন্য – এটাই এর মুল ঘোষিত উদ্দেশ্য।
এসব নিয়ে মোস্তাফিজকে চ্যালেঞ্জ করে অনেক কথা অবশ্যই বলা যায়। সেসব তর্ক-বিতর্কমুলক বক্তব্য নিজে না তুলে মোস্তাফিজেরই সিনিয়র, তাঁর সংগঠন সিপিডির ডিষ্টিংগুইজ ফেলো দেবব্রত ভট্টাচার্যের মুখ থেকে শোনা যাক।
প্রথম আলোর ঐ একই রিপোর্টে দেবপ্রিয় বলছেন, “২০০ কোটি ডলার অনুদান হিসেবে রূপান্তরিত করে বহুপক্ষীয় যোগাযোগের জন্য অনুদান হিসেবে দেওয়াটাই উত্তম বলে মনে করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন,১০০ কোটি ডলারের মধ্যে ২০ কোটি ডলার পদ্মা সেতুতে অনুদান দেওয়া ছাড়া বাকি ঋণের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়”।
অতএব দেবপ্রিয় আমাদের পরিস্কার করছেন, নিজের রিডিং আমাদের বলছেন,
১। এবারের মোদি সফরের লাইন অব ক্রেডিটে ২০০ কোটি বা ২ বিলিয়ন লোন এটা ট্রানজিটের (বহুপক্ষীয় যোগাযোগের) জন্য দেয়া নয়, দেবপ্রিয় আশা করেন এটা হওয়া উচিত।
২। এই অর্থ বাংলাদেশকে বিনা সুদে ও বিনা আসল ফেরতে অনুদান হিসাবে দেয়া উচিত।
৩। ২০১০ সালে হাসিনার ভারত সফরে তিনি প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলেন ১০০ কোটি ডলারের। দেবপ্রিয় ব্যাপারটা ন্যাংটা করে না খুলে সংক্ষেপে এবং ভদ্রলোকের ষ্টাইলে ও ভাষায় বলছেন, ঐ “ঋণের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়”।
অর্থাৎ “ভারত নতুন যে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে” – মোস্তাফিজুর রহমানের এই মিথ্যা দাবি দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যই বিরোধীতা করছেন, সঠিক মনে করছেন না। এখানে সিপিডির দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এর বাইরে থেকে আমরা আর বাড়তি কি যোগ করব!
দক্ষ ও ভোকাল প্রাক্তন আমলা্দের মধ্যে একমাত্র আকবর আলি খানকেই দেখা যায় বিভিন্ন সময় সরাসরি ট্রানজিট নিয়ে কথা বলছেন। ট্রানজিট প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থান হল, (এবং এটাই সঠিক অবস্থান) ভারত ট্রানজিট পেতে চাইলে এবং বাংলাদেশের নিজের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের দিক থেকে যদি ট্রানজিট দেওয়া ইতিবাচক মনে করে থাকে তাহলে ট্রানজিট অবকাঠামোর সমস্ত খরচ ভারতের বাংলাদেশকে বিনা সুদে বিনিয়োগ হিসাবে দেওয়া উচিত। অর্থাৎ বিনা সুদে বিনিয়োগ জোগাড়ের দায়িত্ব ভারতকে নিতে হবে। এছাড়া, বাংলাদেশ বিনিয়োগ পরিশোধ করতে হয় এমন পরিমাণের মাসুল দিতে ভারতকে প্রস্তুত হতে হবে। আকবর আলির বক্তব্যের যুক্তি হোল, যেহেতু বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশ নিজেই নিজস্ব রাজস্ব বিনিয়োগ করে ফেলেছে এবং ব্যবহার করছে। ফলে ভারত নিজের জন্য যে অবকাঠামো ব্যবহার করবে বিনা সুদে তার বিনিয়োগ বাংলাদেশকে প্রদান বা যোগাড় করে দেবার দায়দায়িত্ব একান্তই ভারতের। এবং স্বভাবতই ঐ অবকাঠামো ব্যবহারের মাসুল এমন হতে হবে যেন তা থেকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ পরিশোধ করতে সমর্থ হয়।
যেমন নৌট্রানজিট , — যেটা এবার চুক্তি হয়েছে — সেটা একেবারেই অসম ও মাঙনায় করা হয়েছে, উপরের এই ন্যূনতম নীতিও মানা হয় নাই। শেখ মুজিবের আমলের এই চুক্তিতে লামসাম মাসুল অর্থ বছরে পাঁচ কোটি টাকা ধরা ছিল। এখন এটাকে আবার লামসাম হাঁকাও পরিমাণ ১০ কোটি টাকা করা হয়েছে। অনেকের মনে হতে পারে ভারতকে নৌট্রানজিটে দিতে আবার অবকাঠামোগত খরচ কি? কাষ্টমস অফিস আর ষ্টাফ বসানো ছাড়া বাংলাদেশের কোন খরচ এখানে নাই। ধারণাটা একেবারেই ভিত্তিহীন। নৌচলাচল উপযোগী রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং করা গুরুত্বপুর্ণ নইলে ঐপথ চলাচলের অনুপযোগী হবে। ইতোমধ্যেই ভারতের তাগিদে ড্রেজিং করা হচ্ছে। আর ভারতের দেয়া লোনে ভারতের নির্ধারিত দামেই ভারতীয় ড্রেজার কিনতে হচ্ছে। এছাড়া নৌট্রানজিট মাসুল বাণিজ্যিকভাবে নির্ধারিত হয় নাই। ঠিক আছে আপনারা চাপানি খাইয়েন – জাতীয় এক লামসাম পরিমাণ সেখানে আছে। তাও সে চা খাওয়ার পয়সাও নিয়মিত পরিশোধ করা হয় না, কয়েক বছরের বাকি পড়ে আছে।
যাই হোক, দ্বিতীয় পয়েন্টে দেবপ্রিয় সম্ভবত আকবর আলি খানের অবস্থানটাই নিতে চাইছেন। কিন্তু দেবপ্রিয়ের একটা শব্দের অর্থে গড়মিল আছে – “অনুদান”। অনুদান শব্দটা দেবপ্রিয় ব্যবহার করেছেন যেটা ইংরাজি গ্রান্ট শব্দের বাংলা। অর্থ হল, কাউকে কিছু একটা করতে যেমন একটা স্কুল গড়তে এককালীন অর্থ গ্রান্ট দিয়ে সাহায্য করা। স্বভাবতই দিয়ে দেওয়া এই অর্থের আসল এবং সুদ কোনটাই ফেরত দেবার বালাই নাই, থাকে না। বিদেশি দাতাদের আমাদের সরকারকে দেয়া grant aid শব্দটার অর্থ এটাই। কিন্তু দেবপ্রিয় সুদ দিতে হবে না তবে আসল ফেরত দিতে হবে এই অর্থে ‘অনুদান’ শব্দটা ব্যবহার করেছেন। দেবপ্রিয়ের জন্য সঠিক শব্দ হত “বিনা সুদের ঋণ” – অনুদান নয়।
মোদি দক্ষ সেলসম্যান
মোদির সফর নিয়ে কংগ্রেস প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন নাকি বলেছেন মোদি তার চেয়ে বেশি দক্ষ সেলসম্যান। কারণ মনমোহন কোন প্রতিশ্রুতিই পূরণ না করেই ২০১১ সালে বাংলাদেশ সফরে ট্রানজিট নিতে এসেছিলেন, পারেন নাই। কিন্তু মোদি সেই একই প্রতিশ্রুতি না মিটানোর বান্ডিল নিয়েই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন কিন্তু এবার ট্রানজিট হাসিল করে নিয়ে গিয়েছেন। মোদির বেলায়, তাঁর মালামাল না দিবার লিষ্ট ভিন্নভাবে প্যাকেজ করার জন্যই নাকি মোদির এই সফলতা। বিষয়টা সত্যিকারের খবর নাকি কংগ্রেসের মিডিয়ার জল্পনা-কল্পনা ছাপিয়ে দেওয়া খবর তা নিশ্চিত নই। কিন্তু ইস্যুটা যেহেতু উঠেছে ওর সারকথা হল, হাসিনা ২০১১ সালে ট্রানজিট দেন নাই। সম্ভবত ভেবেছিলেন কাকাবাবু প্রণব প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে বাড়াবাড়ি করে ফেলছেন, তাকে বাংলাদেশের মানুষের সামনে বেইজ্জতি করছেন তাই তিনি থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। এছাড়া তিনি তখন তাঁর বৈধ সরকারের ক্ষমতাকালের মাঝমাঝি, ফলে বৈধতার কোন সংকটে ছিলেন না। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন, হাসিনার নিজেরই গরজ বড় প্রবল। আভ্যন্তরীণ পাবলিক রেটিং, রাজনৈতিক সংকটের তীব্রতা ভারতের সমর্থন দিয়ে পুরণ হবার বিষয় নয় জেনেও যতটা যা পাওয়া যায় তাই পুরনের কোশেশে লেগে পড়েছেন। এটাই মনমোহনের পুরানা প্রতিশ্রুতি বা পুরানা মালামাল মোদির হাত থেকে সাদরে কিনবার জন্য হাসিনার আগ্রহ বলে দাবি করা হচ্ছে। স্বভাবতই এটা পুরাপুরি মিথ্যা পাঠ।
তবে এবারের সফর থেকে উঠে আসা এক তাৎপর্যপুর্ণ দিক হল, আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের হাহুতাশ আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষত পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বিদ্যুতপ্লান্ট তৈরির কাজ ভারতের কোম্পানী রিলায়েন্স ও আদানির লুটে নেওয়ায়। এপর্যন্ত শুধু এই ইস্যুতে এর বিরুদ্ধে প্রথম আলো দশটা রিপোর্ট করে ফেলেছে। এথেকে বোঝা যায় পশ্চিমা ও তাদের সমর্থক সুশীল রাজনীতি গ্রুপের হতাশা কত তীব্র ও গভীর। তবু এপ্রসঙ্গেও আকবর আলি খানের মন্তব্য সঠিক। তিনি বলেছেন, আমাদের চলতি রাজনৈতিক সংকটের উত্তরণে মোদির এই সফরের কোন ভুমিকা নাই। হাসিনার জন্য কোন লিভারেজ নয় এটা।
গত ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসার সময় পরিকল্পনা ও শর্ত ছিল ভারতকে ট্রানজিট দিয়ে দেওয়া। হাসিনার ২০১০ সালের ভারত সফরের ফিরতি সফর ছিল মনমোহনের ২০১১ সালের বাংলাদেশ সফর। সেখানেই ট্রানজিট দেওয়ার চুক্তি হবার কথা ছিল। এই অর্থে ষ্টেজ যেভাবে সাজানো ছিল,সে পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১১ সালে যা অভিনীত হবার কথা ছিল তা পিছিয়ে যায়। অঙ্ক কিছুটা স্থগিত হয়ে যায়। ইতোমধ্যে একালে এসে রাজাই খোদ বদল হয়ে যায়, মনমোহনের বদলে মোদি। তবু পুরান সেই অভিনয়টা যেহেতু এইবার খোদ হাসিনারও শেষ করার আগ্রহের প্রাবল্য, তাই মোদি এবারের সফরটা হল, প্রণবের প্রম্পটে বহু আগেই নির্ধারিত প্রধানমন্ত্রীর ভুমিকায় অভিনয় করতে আসা; যেন মোদি এখন নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়েও মোদির ভুমিকায় নন, পুরান প্রধানমন্ত্রী মনমোহনের পেন্ডিং ভুমিকায় – তারই হয়ে পুরানা আলখাল্লার ভাড়া খেটে গেলেন। এই অর্থে মোদির এবারকার সফর তাঁর আমলা-গোয়েন্দার প্রম্পটের অধীনতার সফর। এটা মোদির নয়, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পদটার কিছু পুরানা দায় বহন করা। সেভাবে দেখতে হবে। তাই, আগামি ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে মোদি নিজের নতুন বাংলাদেশ নীতি দেখাতে না পারলে বুঝতে হবে তার “বিকাশের” রাজনীতি, “সবকা বিকাশ সবকা সাথ” – এসবই ভুয়া বলে প্রমাণিত হবে। বাংলাদেশের জনগণ কি নিজের পছন্দ মত ভোট দেয়া ও নেতা নির্বাচনের সুযোগ কি পাবে!