সিরিয়ায় পুতিনঃ প্রপাগান্ডার বোমাবাজি আর কোল্ড ওয়ার ফিরে আসার ভুয়া আশাবাদ


সিরিয়ায় পুতিনঃ প্রপাগান্ডার বোমাবাজি
আর কোল্ড ওয়ার ফিরে আসার ভুয়া আশাবাদ

গৌতম দাস
১৮ অক্টোবর ২০১৫

http://wp.me/p1sCvy-ci

গত ৩০ সেপ্টেম্বর সিরিয়ায় রাশিয়ান বিমান হামলা শুরু হয়েছে। রাশিয়ার দাবি সে নাকি আইএস (অথবা ISIL) তাড়াতে একাজ করছে। আর এসুযোগে অনেকেই প্রপাগান্ডায় নেমেছে, কোন বাছবিচার বিবেচনা ছাড়াই রটনা শুরু করেছে যেন দুনিয়াতে রক্ষক বা ত্রাতা হিসাবে রাশিয়া এসে গেছে আর চিন্তা নাই। রাশিয়ানরাও এটাই চেয়েছে। তাদের প্রপাগান্ডা ওয়েব সাইট “গ্লোবাল রিসার্চ” এর প্রপাগান্ডা লাইনও এটাই।  কারণ তারা ভাল মতই জানে যে, দেশে দেশে পুরানা কমিউনিস্টরা “পুণ্যভুমি” সোভিয়েত রাষ্ট্রের স্বার্থে আত্মস্বার্থ ভোলা দিওয়ানা। কোরবানি হয়ে যেতে উদ্গ্রীব। তারা নিজ নিজ বসবাসের রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থ ভুলে দিওয়ানা হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন এই ভিন রাষ্ট্রের স্বার্থে কোরবানি হয়ে যাওয়াকে শহীদি কাজ মনে করে এসেছে নিজ নিজ জন্ম থেকেই। এখন সোভিয়েত ইউনিয়ন নাই তাই শহীদ হবার সুযোগ হারায়ে তারা কষ্ট পাইতেছে। তারা সবসময় “কথিত এক বিশ্ব বিপ্লবের জোশে” এক “বিশ্ববিপ্লবের” জন্য  কাজ খুঁজে ফিরে থাকে। সোভিয়েত রাষ্ট্র স্বার্থে নিজ আত্ম- বলিদানকে তারা সেই কথিত বিশ্ববিপ্লবের পক্ষে কাজ বলে ইমান রাখে। অতএব সোভিয়েত রাষ্ট্রের জন্য শহীদ হয়ে যাওয়া সেটা শুধু সঠিক নয় বরং পুণ্যের কাজ। ফলে নিজের কর্তব্য জ্ঞান করাই স্বাভাবিক। তাই পুতিন নিশ্চিত এবং সঠিকভাবেই নিশ্চিত যে একালেও তারা রাশিয়ান স্বার্থের ভিতরেই নিজ নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ নিহিত মনে করার ভুল করবে।

তাই হতে দেখছি আমরা। সেই পুরান সোভিয়েত ইউনিয়ন আবার এসে গেছে জাগছে এই প্রপাগান্ডা উসকিয়ে বাংলাদেশেও তাদের দামামা বাজাতে দেখছি আমরা। এটা ঠিক যে ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পর এই প্রথম রাশিয়া পুরান সোভিয়েত এলাকার বাইরে সৈন্য, অস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ সমাবেশ ঘটিয়েছে। এই হিসাবে সিরিয়ায় নতুন রাশিয়ার প্রথম অভিযান। এর অর্থ তাতপর্য আছে। কিন্তু একে কোনভাবেই পুরান কোল্ড ওয়ারের মত রাশিয়ার দিন আবার ফিরে আসতেছে বলে বুঝা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা ভিত্তিহীন এবং অর্থহীন। এটা রাশিয়াও ভালভাবে জানে। সাথে রাশিয়া এটাও জানে বাস্তবে লুপ্ত হয়ে যাওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের দিওয়ানা দেশে দেশের দ্বিবাস্বপ্ন দেখা পুরান কমিউনিস্টরা এখনও আছে। তাদের পড়ে পাওয়া সমর্থন পুতিন নিজের স্বার্থে ও কাজে না লাগানোর কোন কারণ দেখেন নাই।

তবে একটা কথা হল, আমাদের দেশে একটা কথা প্রচলিত আছে খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। অর্থাৎ প্রপাগান্ডা যখন ঘটনার চেয়ে বড় ঘটনা হয়ে হাজির করার চেষ্টা করা হয়। যেকোন ঘটনার মধ্যে প্রপাগান্ডা একটা প্রয়োজনীয় অনুসঙ্গ দিক । কিন্তু খেয়াল রাখতে হয় মাত্রাজ্ঞান যেন থাকে, লোপ পেয়ে না যায়। প্রপাগান্ডা যেন ঘটনার চেয়ে বেশি গুরুতপুর্ণ না হয়ে উঠে। অথচ সেটাই হয়েছে দেখা যাচ্ছে।
রাশিয়ার দিক থেকে মূলত জিনিষটা হল – সিরিয়ার আসাদের শাসনের পক্ষে রাশিয়ান ক্যাম্পেইন। ক্যাম্পেইন শব্দটা সাধারণত দুই অর্থে ব্যবহার হয়। প্রচার প্রপাগান্ডা অর্থে আবার অভিযান – সামরিক অভিযান বোমাবাজি অর্থে। এখানে দুটো অর্থই প্রযোজ্য। রাশিয়া বলতে চাইছে সিরিয়ার আসাদ – সে এত খারাপ কেউ না, তাকে রেখেও সিরিয়ায় একটা সমাধান ভাবা যেতে পারে – এরকম। কিন্তু এমন কথাগুলোর ক্যাম্পেইনে কেউই সরাসরি এই মুল উদ্দেশ্যের কথাগুলো স্বীকার করে তা করবে না, করে না। বরং একটা পপুলার দিক খুজবে, যেভাবে সবাই খুজে ও করে সেটা হল – রাশিয়া আইএসের (“দ্যা মোস্ট কালপ্রিট”, যেন “সব দোষের গোড়া”) বিরুদ্ধে রাশিয়ানরা এবার মাঠে নেমেছে। এমন ভাষ্য খাড়া করে কাজটা করবে। হয়েছেও তাই। “আমেরিকা যেখানে গিয়ে থেমে গেছে” সেখান থেকে রাশিয়ান ততপরতা শুরু। ফলে আর চিন্তা নাই। প্রপাগান্ডায় একথাগুলো অহেতুক হয়ে গেছে, বাড়াবাড়ি রকমভাবে যা নয় তেমন জায়গায় চলে গিয়ে কথাটা বলা হচ্ছে। রাশিয়া এবং তার বন্ধুরা এখানেই কদুর চেয়ে কদুর বিচি বড় করে এঁকে ফেলেছেন।

আকাশ থেকে বোমা মারা আর মাঠে নেমে যুদ্ধের ফারাক
গত ২০০১ সাল থেকে দুনিয়াতে আল-কায়েদা ফেনোমেনা এসে আমাদের সবাইকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। এখনও শিখাচ্ছে। যেমন যুদ্ধ মানে কী, এছাড়া প্রতিরক্ষা? এসব ধারণাগুলো কী? স্টাডির বিষয় হিসাবে এগুলোর ধারণা আল-কায়েদা ফেনোমেনা আসার আগে আরামে একভাবে বিকশিত হয়েছিল। যেমন তখন বুঝা হয়েছিল, যুদ্ধ মানেই বুঝতে হবে কনভেনশনাল যুদ্ধ– অর্থাৎ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভিন রাষ্ট্রের যুদ্ধ; ফলে ‘সেনাবাহিনী’ ধারণাটাও একই তাল ছন্দ রেখে বেড়েছিল। ব্যারাকে রেখে, জনগণ থেকে আলাদা করে পেলে-পুষে বড় করার সেনাবাহিনী এমন অর্থ-পথ ধরেই ধারণায় আগিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই এমন পথে ধারণাগুলো পরিচালিত হয়েছিল। আর তা হবার পিছনে আর এক বড় কারণ হল সেই দুনিয়াতে ৪৫ বছর ধরে প্রধান ঘটনা ছিল কোল্ড ওয়ার। সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম আমেরিকার কোল্ড ওয়ার। এই কোল্ড ওয়ার ধারণার মধ্যে যুদ্ধ ধারণাটা যার ভিতর সেকালে পোক্ত ও পুষ্ট হচ্ছিল এই ভেবে যে, যুদ্ধ মানে কেবল দুটো পক্ষ, দুটা গ্রুপে রাষ্ট্রগুলোর পক্ষভুক্ত হয়ে যাওয়া – সোভিয়েত পক্ষ না হলে আমেরিকান পক্ষ। এর আর গুরুত্বপুর্ণ বৈশিষ্ট ছিল, সম্ভবত সবচেয়ে নির্ধারক কিন্তু সবচেয়ে দৃষ্টির বাইরে থেকে যাওয়া বৈশিষ্ট হল, কোল্ড ওয়ারের পক্ষভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর পরস্পরের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রায় নাই – এমন অবস্থা । অর্থাৎ লেনদেন, পণ্য বিনিময়, মুদ্রা ফলে ভাব সংস্কৃতিও প্রায় নাই অবস্থা। দুনিয়ায় যেন দুটা অর্থনীতির দুনিয়া হয়ে গেছিল। যেন সাদা আর কালো। আর ধরে নেয়া হয়েছিল যেন যুদ্ধ মানে সারা দুনিয়ায় মাত্র দুটা পক্ষই থাকবে – বেছে নিবার চয়েজ হয় এটা না হয় ওটা এদুই অপশনের মধ্যে। অতএব যুদ্ধবিষয়ে এধারণারই আরও অনেকদিকে এক্সটেনশন ঘটেছিল – যেমন সেই বুদ্ধিমান যে দূর থেকে শত্রু মারতে পারে। যুদ্ধে লোক-ক্ষয় করা যাবে না। ফিজিক্যাল মুখোমুখি লড়াই করা যাবে না এই তত্ত্ব বিকশিত হয়েছিল। যেন ভিয়েতনামের খারাপ অভিজ্ঞতা এরানো যায়। যাতে যুদ্ধে সৈন্যের লাশের কফিন দেখে আমেরিকান পাবলিক খেপার সাইকোলজি এড়ানো যায়। অতএব দূর থেকে মিসাইল রকেট মারো। আর তা থেকে বাচতে আবার এন্টি-মিসাইল শিল্ড এর ধারণা আনা হয়। জাল টাঙিয়ে ভিতরে বসার মত করে বসে আমেরিকা ও তার গুরুত্বপুর্ণ বন্ধুরাষ্ট্রের দেশের আকাশ এন্টি-মিসাইল প্রতিরক্ষা শিল্ড কায়েম করতে পারলেই আর কোন কথা নাই। যেন একেবারে মাছিও আসতে পারবে না আরামে ঘুমানো যাবে এমনই বেহুলা-লখিন্দরের আয়রণ-শিল্ড। ধরে নেয়া হয়েছিল বাইরে মানুষের জীবন আমেরিকা যতই অতিষ্ঠ করে সুক না কেন, নিজ ঘরে ফিরে মিসাইল শিল্ডের ভিতর আরামে বসে লুডু খেলা যাবে কারণ বাইরে থেকে হামলাকারি তাকে তো মিসাইল বা রকেট হয়েই শিল্ড ভেঙ্গে পেরিয়ে তবে ভিতরে আসতে হবে। অথচ চিন্তাই করা হয় নাই যে খোদ প্যাসেঞ্জার প্লেনই যাকে ঘুর্ণাক্ষরেও রকেট বা মিসাইল মনে করা হয় নাই,‌ গণ্য হয় নাই, কত সহজে তা রকেট মিসাইলের চেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। প্যালেস্টাইনীরা অবশ্য আগেই দেখিয়েছিল পরে আল-কায়েদা ফেনোমেনা ধারণাটাকে আরও ব্যাপক এবং পোক্ত করে দেখাল যে পশ্চিমের যুদ্ধ ধারণা একটা ফালতু ব্যাপার, কত তুচ্ছ। সামান্য সুইসাইড বোমার প্রতিরোধ, আত্মঘাতি স্কোয়াড কেমন ভয়ঙ্কর হতে পারে তা পশ্চিম টের পাওয়া শুরু করল। আগের যুদ্ধ ধারণায় ধরে নেয়া হয়েছিল – শত্রু মানে সেনাবাহিনী, ফলে ধরে নেয়া ছিল শত্রু মাত্রই যার জীবনের মায়া আছে, থাকবেই। এই আগাম অনুমান ধারণার উপর দাঁড়িয়ে পুরা যুদ্ধ ধারণা, অস্ত্রের ডিজাইন করা হয়েছিল। ফলে যখন শত্রুর অর্থ দাড়াল যার জীবনের মায়া বলে কিছু নাই এর উর্ধে, ডেসপারেট শুধু নয় স্পিরিচুয়ালি স্পিরিটেড – সেক্ষেত্রে যুদ্ধ, প্রতিরক্ষা, সেনাবাহিনী, দূর থেকে মারব, প্রতিরক্ষা শিল্ড ইত্যাদি – সবকিছু অকেজো আজাইরা ধারণা হয়ে গেছে। শুধু তাই না এখন নতুন ভোকাবুলারি চালু হয়ে গেছে। বলা হচ্ছে নন-স্টেট একটর। অর্থাৎ যারা ভিন রাষ্ট্র না, তেমন শত্রু না। অথচ রাষ্ট্রের মতই গোনায় ধরতে হবে এমন পাল্টা ক্ষমতাধর শক্তি। তাই এবার স্বীকার করে নেয়া হচ্ছে ভিন রাষ্ট্র ছাড়াও মারাত্মক শত্রু কেউ কেউ হতে পারে। আলকায়েদা ধরণের ফেনোমেনার দিকে তাকিয়ে বলা হচ্ছে এরা “নন-স্টেট একটরদের” প্রধান উদাহরণ। রাষ্ট্র না হয়েও কেউ মারাত্মক শত্রু হতে পারে। আর এরাই মূলত রাষ্ট্র-ওয়ালাদের চেয়ে ভয়ঙ্কর। যাদেরকে যুদ্ধ প্রতিরক্ষা ধারণায় গোনায় ধরা হয় নাই।
সাদ্দাম হোসেন তার ক্ষমতার শেষদিনগুলোতে পশ্চিমকে একটা হুশিয়ারি দিয়েছিল। কেউ তেমন গুরুত্ব দেয় নাই। প্রপাগান্ডা, বকওয়াজ মনে করা হয়েছিল। কথাগুলো হারে হারে সত্য ছিল, পরবর্তিতে সত্য হয়েছে। তবুও আমাদের অনেক বন্ধু সেটা বুঝে নাই টের পায় নাই। বরং এখনও আমোদে আছে। সাদ্দাম হোসেন ১৯৮৯-৯০ সালে কুয়েত আক্রমণের পর থেকেই – নিজের আকাশেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। আমেরিকার নো-ফ্লাই জোনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মাঝে মধ্যেই তবে নিয়মিত বোমা হামলা খেয়েই থেকেছেন, নিজের কোন যুদ্ধ-উড়োজাহাজ আর কোনদিন স্টার্ট করতেও পারেন নাই। কিন্তু তা সত্ত্বেও ২০০৩ সাল পর্যন্ত সাদ্দাম বহাল তবিয়তে তিনি ক্ষমতায় ছিলেন, থেকেছেন। কোন সমস্যা হয় নাই। তাঁর ক্ষমতায় থাকা নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠে নাই। টুইন টাওয়ার, আফগানিস্তানে হামলার ঘটনা দুনিয়ায় হাজির না হলে হয়ত সাদ্দামকে আরও অনেকদিন ক্ষমতায় দেখা যেত; তাঁর ক্ষমতার এক ভিন্ন রূপ ও স্বাভাবিক পরিসমাপ্তি আমরা দেখতাম। সাদ্দাম হোসেন তখন যা বলেছিলেন ওর সারকথা হল, আমেরিকা ইরাকের আকাশের উপর কর্ত্তত্ব নিয়েছে বটে কিন্তু যদি আকাশ থেকে ইরাকের মাটিতে সরাসরি নেমে আসে তবে সেটা আমেরিকার জন্য শেষ দিন ডেকে আনা হবে। নিজের খতমের দিনকে দাওয়াত দেয়ার সামিল হবে।

মাটিতে সৈন্য নামানো
“মাটিতে সৈন্য নামানো”। কথাটা সহজে হয়ত চোখ এড়িয়ে যায় কিন্তু খুবই তাতপর্যপুর্ণ কথা। আবার সাদ্দামের শেষ সময়ের কালে তাঁর মুখ থেকে এসেছিল বলে সবাই বকওয়াজ মনে করে কথাটা নিয়েছিল। “মাটিতে সৈন্য নামানো” মানে কী? কাউকে শত্রু ঘোষণা দিয়ে ঐ শত্রু-রাষ্ট্রের আকাশের কর্তৃত্ব নিজ অধীনে নেয়া চাইলে এমনকি বোমা মেরে তাকে পর্যদুস্থ করে ফেলা রাখাও একটা খুবই সহজ কাজ। কিন্তু সাবধান সেটাকে কথিত শত্রুর রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার শেষদিন বলে মনে করা হবে চরম বেকুবি, এমন ঘোষণা দেয়া বা দাবি করা ভিত্তিহীন। সাদ্দাম নো-ফ্লাই জোনের ভিতরেই দশ বছরের বেশি ক্ষমতায় থেকে তা দেখিয়ে গেছে। তাই “মাটিতে সৈন্য নামানো” কথাটার সার দিক হল, দূরে আকাশ থেকে না, মাঠে নেমে শত্রুর সামরিক শক্তি, প্রতিরোধ ক্ষমতা  নিঃশেষ করা। ফলে এরপর সহজেই তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা। এগুলো এক জিনিষ আর বিপরীতে শত্রু বা শত্রু রাষ্ট্রকে কেবল আকাশ পথে হামলা করে বিধ্বস্থ করে রেখে দেওয়া এমন অকেজো করে দেয়া আর এক জিনিষ। কারণ দ্বিতীয় বিষয়টার সারার্থ হলে সেক্ষেত্রে ঐ বোমা হামলা খাওয়া রাষ্ট্রের শাসকের ক্ষমতায় থাকা একেবারে অসম্ভব হয় এমন নয়। সে থেকে যায়। কেবল নিজের আকাশ পথটাই অরক্ষিত হয়ে যায়, বাকী সব প্রায় ঠিকই থাকে। আর একই সাথে ঐ আকাশ পথে আবার নিজ কোন শত্রুর বিরুদ্ধে আকাশ পথে হামলা করতে চাইলে আর পারে না। কেবল এমন সক্ষমতার দিকটা অকেজো হয়ে যায়। তবে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, এরপর যে আমি (যেমন আমেরিকা) নোফ্লাই জোন কার্যকর করে রেখেছে সেই আমিই যদি আর বাড়তি পরের পদক্ষেপ হিসাবে এবার  “মাটিতে সৈন্য নামানো” না করি বা পাঠাই, বা না ব্যবস্থা করি তবে ঐ বোমা হামলা খাওয়া শত্রু এর পরেও ক্ষমতায় থাকবে। কোন অসুবিধা অনুভব করবে না। তবে কেবল সে নিজে আবার আকাশ পথে কাউকে হামলা করতে পারবে না হয়ত। যেমন লিবিয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকা নোফ্লাই জোন আরোপ করেছিল, আর আমেরিকাসহ ন্যাটো নিজেরা নির্বিচারে উলটা লিবিয়ায় বোমাবাজি করেছিল। তবে আমেরিকা নিজে লিবিয়ার মাটিতে না নামলেও, সৈন্য না পাঠালেও অ-আমেরিকান এবং স্থানীয় সশস্ত্র গ্রুপের সাথে আঁতাত করে তাদের পাঠিয়েছিল বা নামিয়েছিল। এবং তারা মাঠের সিআইএ অপারেটিভের সহযোগিতায় মাঠে নামা ও কাজে লাগার মত যোগ্য ও সক্ষম ছিল বলে গাদ্দাফীর পতন হয়েছিল। ফলে এক্ষেত্রে আমেরিকা নিজে লিবিয়ার মাটিতে না নামলেও অন্য সক্ষম কাউকে নামাতে পারার কারণে গাদ্দাফীকে পরাস্ত করে লিবিয়া দখল করতে পেরেছিল। আবার আর এক মোক্ষম উদাহরণ হল, একালে সৌদি আরব। মিসর আর দুবাই এর সাথে জোট করে সৌদিরা ইয়েমেনে মাটিতে না নেমে কেবল আকাশ পথে হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বোমাবাজি করেছিল। ফলে তা সত্ত্বেও ঐ যুদ্ধের ফলাফলকে নিজের পক্ষে এবং নিজের নির্ধারক ভুমিকায় আনতে পারে নাই। সম্ভব হয় নাই। এতদিন সৌদি বাদশারা আমেরিকাকে গালি দিয়েছিল, অস্থির হয়েছিল যে সৌদিদের পক্ষে সৌদিদের মত করে কেন আমেরিকা বোমাবাজি করছে না। তাই শেষে ভেবেছিল সৌদিদের নিজেদের এত এত জঙ্গী বিমান আছে তা দিয়ে এবার তারা নিজেরাই আকাশ বোমাবাজি করে দেখিয়ে দিবে। আর সহজেই এতে নিশ্চয় তাদের জিত অনিবার্য হয়ে যাবে। কিন্তু আকাশ পথে বিস্তর বোমাবাজির পরও তারা যুদ্ধকে নিজেদের পক্ষে আনতে পারে নাই, নিজেদের বিজয় হয়েছে একথাও তারা বলতে পারছে না। যুদ্ধ স্থবির বা স্টেলমেট হয়ে গেছে। এর পরই আমেরিকানদের দুঃখ দুরবস্থার কথা সৌদিরা নিজ অভিজ্ঞতায় বুঝতে পেরেছিল। কারণ সৌদিদের পক্ষে মাটিতে নেমে লড়াই করার কেউ নাই। সেকাজে হুথিরা যথেস্ট শক্তিশালী, তাদের মোকাবিলার কেউ নাই। আর বোমাবাজির সময়ে এর হাত থেকে আত্মরক্ষার কৌশলে যাওয়াই একমাত্র ও সঠিক কাজ। লুকিয়ে আড়ালে যতটুকু নিজেকেসহ অস্ত্রশস্ত্র যা রক্ষা করা যায়, বেচে যায় এগুলোর কারণেই সে যুদ্ধে না হেরে আবার মাঠের দখল বজায় রাখতে পারে ফলে ক্ষমতায় থেকে যেতে পারে। ইয়েমেনে হুতিরা তাই করেছিল। এবং এখন সৌদিদেরকে আবার তাদের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি নিগোশিয়েশনের কথা ভাবতে হচ্ছে।

তাহলে মাঠে মাটিতে সহজে কেউ নামতে চায়না কেন?
মূল কারণ, এককথায় বড় বাধা খরচ। ১। মাঠে নেমে যুদ্ধ করার ফ্রন্টে এর অর্থ, নন-স্টেট একটরদের হারানো সহজ নয়। কেবল আকাশ পথে দূর থেকে হামলা যত ব্যপকই হোক, এক্ষেত্রে সবসময় কেউই হারে না, একটা পর্যায়ে এসে দাবার স্টেলমেট এর মত সবসময় এটা স্থবির হয়ে রয়ে যায়। আকাশপথে বোমাবাজি খামোখা হয়ে যায়। ২। একারণেই আবার সেক্ষেত্রে লম্বা যুদ্ধে জড়িয়ে পরার আশঙ্কা তৈরি হয়। কারণ মাঠে নামা মানে নেভার এন্ডিং বা একেবারে অনিশ্চিত সমাপ্তির যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া হবে। আর লম্বা যুদ্ধে ননস্টেট একটরেরা যতদিন টেনে টিকে থাকতে সক্ষম আমেরিকার মত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক এর উলটা ঘটে। এছাড়া লম্বা যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া মানে আমেরিকার বেলায় এটা যুদ্ধের সীমা ছেড়ে আমেরিকার অর্থনীতিকে আক্রান্ত করে ফেলে থাকে, ফেলবেই। তছনছ করে দিবে, দিয়েছেও। মনে রাখতে হবে শত্রু শেষ হবার আগেই যুদ্ধ অমীমাংসিত রেখে আফগানিস্তান, ইরাক থেকে আমেরিকার মাঠের সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের কারণ যুদ্ধের খরচ যোগাতে রাষ্ট্রীয় বাজেটের অক্ষমতার কারণে ঘটেছে। ফলে তিন বছর আগেই ঘোষণা দিয়ে বলা হয়ছিল যে ডিসেম্বর ২০১৪ তে সৈন্য প্রত্যাহার করা হবেই, তাতে যুদ্ধের সুনির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য অর্জন এর ভিতর অর্জিত হোক আর নাই হোক। অর্থাৎ সিদ্ধান্তের ভিত্তি যুদ্ধের অর্জন কতটুকু হলে হবে তা একেবারেই নয়। বরং ২০১৪ এর পর আর যুদ্ধের খরচ চালিয়ে যাওয়ার ভার অর্থনীতির উপর চাপানো অনুচিত হবে এটাই ছিল সিদ্ধান্তের ভিত্তি ও মুল বিবেচনা। তাই সেই থেকে আমেরিকা কোথাও আর মাঠে সৈন্য নামায় নাই। সাদ্দাম হোসেনের মাঠে সৈন্য নামানোর বিরুদ্ধে হুশিয়ারির তাতপর্য এখানেই। কারণ যুদ্ধ এসময়ে একদিকে অর্থনৈতিক দিক থেকে আমেরিকার জন্য দুর্দশা হয়ে উঠেছিল, আবার অন্যদিকে ঐ সুযোগে চীনের অর্থনৈতিক সাফল্য, উদ্বৃত্ব অর্থনীতির পাহাড় হয়ে উঠা – মিলিত ফলাফলে আমেরিকার পরাশক্তির মুকুট দিন কে দিন কেড়ে নিবার অবস্থায় দিকে সেই থেকে অবধারিত ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। অবস্থা এমন, আমেরিকা হয়ত এখনও সিংহ-ই আছে ঠিকই কিন্তু বুড়া, দাত নখের ধার নাই, বিগত যৌবনা। এটা এখন নিজেই স্বীকার করা শুরু করে দিয়েছে।

এবার আমরা দেখব আমেরিকান দুর্দশা বুড়া সিংহ হওয়াতেই শেষ হয় নাই। একের পর এক দুর্দশা লেজ ধরে আসছেই। ইরান বিপ্লবের (১৯৭৯) পর থেকে এই প্রথম আমেরিকা ইরানের সাথে পারস্পরিক সব বিরোধের মীমাংসা করল। বলা যায় বাধ্য হল। জাতিসংঘকে স্বাক্ষী রেখে পি৫+১ মানে, ভেটো ক্ষমতার নিরাপত্তা কাউন্সিলের পাঁচ সদস্য + জর্মানি – এই কমবিনেশন সবাইকে নিয়ে এক সাথে টেবিলে বসে (কোন যুদ্ধের কথা মুখে না তুলে) আমেরিকাকে ইরানের সাথে নিগোশিয়েশনে বিরোধ মীমাংসা করতে হয়েছে। এটাকে বলা যায়, মূলত আমেরিকার ইরান বিপ্লবকে সর্বশ্রেষ্ট স্বীকৃতি জানানো, একেবারে আদব-লেহাজের সাথে – এই প্রথম। একাজের ফলে ইরানের বিপ্লব আজ সত্য বলে ইরানবাসীর আকাঙ্খা ও একাজকে সালাম জানাতে দুনিয়ার কেউ আর বাদ থাকল না। সেই সাথে ইরানের হাতে পারমানবিক বোমা আছে কি আছে না সেটা বড় কথা নয় – ইরান সক্ষম, ইচ্ছা করলে সে পারমানবিক বোমার অধিকারি হতে পারে একথা আমেরিকা ও তার বন্ধুদের স্বীকার করে নিতে হল।

কেন? এই দুর্দশা! জবাব বুড়া সিংহ! ইরানের সাথে এই চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা প্রকারন্তরে স্বীকার করে নিল যে সে বুড়া সিংহ হয়ে গেছে। সামর্থ নাই। সামরিক সক্ষমতা এখনও আগের মতই আছে কিন্তু খরচ যোগানোর অর্থ নাই। মাঠে সৈন্য পাঠানো বিষয়টা আলাদা অধ্যায়, আলাদা অর্থ। ওদিকে সেকথা বুঝতে চাওয়ার কথা নয়। ফলে মাঠে ইরাকে নতুন করে আইএস উঠে এসেছে। কিন্তু আবার সেখানে মাঠে সৈন্য পাঠানোর মত কোন অবস্থাতেই আমেরিকা আর নাই। এই দুর্দশা ঘাটতি অভাব মিটাতে আমেরিকার দরকার বাইরের রি-ইনফোর্সমেন্ট, বাইরের শক্তিতে নিজের ঘাটতি মিটানোর পথে হাটা দেওয়া, যাকে ছাড়া নিজের পক্ষে কিছু সম্ভব নয়। তাই সব উপায় হারিয়ে আমেরিকা এখন ‘আগে ব্যবহৃত হয় নাই’ এমন ফোর্স হিসাবে ইরানকে সে গোনায় ধরছে। যাতে সে আইএস এর বিরুদ্ধে আমেরিকার পক্ষের ফোর্স হিসাবে ভুমিকা নেয়। এখানেই আমেরিকার সক্ষমতার পরাজয়ের ঘন্টার সুচনা। কিন্তু সেসব ইজ্জত মান সম্মানের দিক নিয়ে ভাববার অবস্থাতেও সে নাই। আমেরিকার এখন অন্যের সহায়তায় জিতে গেলে টিকে থাকতে পারলে বাপের নাম অবস্থা। তাতে সে অন্য মানে ইরান হলেও কিছু ভাবার মত ক্ষমতায় সে নাই। আমেরিকা-ইরান ডিল চুক্তির মূল ইঙ্গিত তাতপর্য এটাই। আমেরিকা কম দুঃখে পড়ে এমন ইঙ্গিত তাতপর্য তৈরি করে নাই। এটাই সৌদিরা বুঝতে চায় নাই।

অতএব কেউ কারও দেশের উপর আকাশপথ দখলে নিল কি না, ব্যাপক বোমাবাজি ঘটাল কি না এটা তেমন কোন নির্ধারক বিষয় নয়। মাঠে নামার এবং যা মূলত খরচ যোগানোর সামর্থের সাথে সম্পর্কিত – তা করল কি না এবং সে সামর্থ আছে কি না –এটাই নির্ধারক। কারণ মাঠে নামা মানে এর সোজা অর্থ নেভার এন্ডিং বা একেবারে অনিশ্চিত সমাপ্তির যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া। এটাই বিশাল ভাইটাল পয়েন্ট। এদিকটা বুঝে না নিয়ে, বিচার না করেই কেবল রাশিয়ার বোমাবাজি দেখে উচ্ছসিত হওয়া অর্থহীন। কোন মানে নাই। মূল বিষয় রাশিয়া কী মাঠে সৈন্য নিয়ে নিজে নামবে অথবা অন্য তবে যোগ্য কাউকে মাঠে নামাতে পারবে? এদিকটা নির্ধারক। আন্দাজ করা যায় এই সক্ষমতা রাশিয়ারও নাই।
উপরের কথাগুলো যখন লিখেছিলাম নিচের রিপোর্ট্টটা হাতে আসে নাই। এটা ইংরাজি মস্কো টাইমসের ৩০ সেপ্টেম্বরের একটা রিপোর্ট। বলছে, “We won’t enter a risk zone, where we would be dragged into a long-term conflict or when our servicemen’s lives are at stake,” – foreign affairs committee, Konstantin Kosachyov, told the Rossiya-24 television। অর্থাৎ  মাঠে সৈন্য নামানোর বিপদ সম্পর্কে রাশিয়া পুরা ওয়াকিবহাল তা বুঝা গেল। সেজন্য রাশিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় বিষয়ক সংসদ নেতার risk zone, dragged into a long-term conflict, servicemen’s lives ইত্যাদি শব্দগুলো আমাদের বক্তব্যকেই পুষ্ট করে। এছাড়া ঐ একই রিপোর্ট থেকে চেচেনের পুতিনের পছন্দের মুসলমান নেতার প্রতিক্রিয়া থেকেও জানতে পারি। তিনি বলছেন তিনি খুশি যে রাশিয়া সিরিয়ায় নেমেছে। কিন্তু তিনি হতাশ যে রাশিয়া গ্রাউন্ড ফোর্স মাঠে নামাবে না।

তবে রাশিয়া যা যতটুকু করল তা কেন করল?
প্রথমত সিরিয়ায় রাশিয়ার এটা আমেরিকা থেকে গোপন রাখা কোন ততপরতা নয়। বা আমেরিকাকে আগাম কোন ধারণা না দিয়ে ঘটানো কোন ঘটনা না। গত সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই রাশিয়া আমেরিকার সাথে এবিষয়ে আলোচনার আগ্রহ জানিয়েছিল। সাধারণভাবে রাশিয়ার দিক থেকে কথা বলতে তাগিদ অনুভব করার আসলে এর প্রধান কারণ ইরানের সাথে আমেরিকার চুক্তিতে সাফল্যকে স্মরণ করা এবং হয়ত তা এর প্রতি একটু অপ্রয়োজনীয় অতি উতসাহে। তবু রাশিয়ান বার্তাটাকে অর্থ করা যায় এভাবে যে, “ইরান ইস্যুতে তো রাশিয়া-আমেরিকা আমরা একসাথে কাজ করতে পারলাম, সাফল্যও আসল। এখন সিরিয়া ইস্যুতে একটু চেস্টা করে দেখা যাক না কিছু করা যায় কি না!” রাশিয়ার আলোচনা প্রস্তাবে ওবামা প্রশাসনের দুটো মতামত এসেছিল। নিউইয়র্ক টাইমস ১৬ সেপ্টেম্বর বলছে, আলাপের প্রস্তাব পেয়ে আমেরিকা প্রশাসন প্রথমে দ্বিধাগ্রস্থ ও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল, “এক পক্ষ তর্ক করছিল, ইউক্রেন ও সিরিয়া যেহেতু দুনিয়ার গুরুত্বপুর্ণ সংঘাতপুর্ণ এলাকা তাহলে তো ঐ দুই ইস্যুতে রাশিয়াকে সংশ্লিষ্ট করেই আমাদের সমাধান তালাশ করতে হবে। অর্থাৎ রাশিয়ার সাথে কথা বলতে হবে। বিপরীতে অপর পক্ষ বলছিল, এবিষয়ে রশিয়ার সাথে কথা বলতে আগ্রহী হবার ক্ষেত্রে তাদের সুশ্চিন্তার দিকগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছিল। বলছিল, এর অর্থ হবে পুতিনের নিয়ন্ত্রণে নাচা আর আন্তর্জাতিক পরিসরে তার নানান বকওয়াজ আর প্রপাগান্ডাকে তাল দেয়া”।
ওবামার পুতিনের প্রতি মনোভাব প্রসঙ্গে ঐ রিপোর্ট বলছে ওবামা কথা না বলার চাইতে বলা সঠিক হবে বলে মনে করেন। বিশেষ করে পুরান শত্রু কিউবা ও ইরানের ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা তাকে তাই বলে। ইউক্রেনে হামলা আর ক্রিমিয়া দখল করে নেয়ার পর থেকে ওবামার সাথে পুতিনের সম্পর্ক খুবই খারাপ যাচ্ছিল। তবু এই পরিস্থিতিতে কথা না বলা অবস্থান ভেঙ্গে শেষ পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি রাশিয়ান পরারাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই লাভরভের সাথে বৈঠক করেছিলেন। ঐ মিটিং থেকে কোন অগ্রগতি না হলেও পরস্পরকে সিরিয়া ইস্যুতে জানা শোনা বাডানো গেছিল।
যদিও তারা পরিস্কার মনে রেখেছিল যে মাইনাস-আসাদ সিরিয়া ইস্যু সমাধানের পথে বিরোধী গোষ্ঠির সাথে যাবার ব্যাপারে আমেরিকার কমিটমেন্ট আছে। সিরিয়ার বিদ্রোহীদের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ট্রেনিং প্রকল্প অকেজো হয়ে গেলেও এখনও তা চলমান। ফলে এখানে রাশিয়ার সাথে তার অবস্থানগত মৌলিক বিরোধ আছে যেটা সহজে মিটানো বা সিমেন্টেড হবে না। তা সত্ত্বেও তারা সিরিয়া ইস্যুতে একসাথে কথা বলতে বসেছিল। কোন সমন্বিত কিছু করার উদ্যোগ সেখান থেকে না আসলেও পরস্পরকে জানা আরো আপডেটেড হয়েছিল সরাসরি বসে। তবে কোন মনোমালিন্যের মত কিছুই হয় নাই সেখানে। কিন্তু এরপর সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বাতসরিক সভায় পরস্পরকে ঠেস দিয়ে কথা বলায় প্রপাগান্ডার টেনশন উঠেছিল, পুতিন বক্তৃতায় ওবামাকে ঠেস দিয়ে কথা বলেছিল, এতটুকুই। সারকথা হল, এটা রাশিয়ার বোমাবাজি করে আমেরিকাকে দেখিয়ে দেয়ার মত কোন ঘটনাই নয়। বরং আমেরিকান উদ্যোগের পাশাপাশি রাশিয়ার কিছু করতে চাওয়ার মধ্যে কিছু সমন্বয় করে আগানো।
খুব সম্ভবত রাশিয়ার দিক থেকে এর সার উদ্দেশ্য সিরিয়া বিষয়ক কোন সমাধান পশ্চিম চিন্তা করতে গেলে যেন রাশিয়া সেখানে গোনায় ধরা থেকে বাদ না পরে। নিজেকে অতটুকু মিনিংফুল করাটাই এখানে উদ্দেশ্য; তাতে আসাদকে রাশিয়া রাখতে পারুক কিংবা খরচ করে ফেলতে হোক – এটা সেকেন্ডারি।

এছাড়া পুতিনের আর এক উদ্দেশ্য হল, পশ্চিমের থেকে বিচ্ছিন্ন বা একঘরে হয়ে থাকা দশা থেকে নিজেকে একটু মুক্ত করা। ইউক্রনে হামলা এবং ক্রিমিয়াকে দখল করে একে রাশিয়ার ভিতরে অন্তর্ভুক্ত করে নেবার পর থেকে সের বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। রাশিয়ান মস্কো টাইমসে মস্কোর মিলিটারি এনালিস্টের বরাতে একথাই লেখা হয়েছে।

[লেখাটা এক সংক্ষিপ্ত ভার্সান আজ ১৮ অক্টোবর ২০১৫ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছে।]

সর্বশেষ এডিট করা হয়েছেঃ ২১ অক্টোবর ২০১৫, ০৯ঃ৫৫ সকাল

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s