ভারত-চীনের সাথে সম-সম্পর্ক রক্ষার মানে কী

ভারত-চীনের সাথে সম-সম্পর্ক রক্ষার মানে কী
গৌতম দাস
২৩ নভেম্বর ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-d1

বাংলাদেশে যোগ দেয়া শ্রীলঙ্কার নতুন রাষ্ট্রদূত গত ১২ নভেম্বর বাংলাদেশের কূটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (ডিকাব) সাথে এক মতবিনিময়-বিষয়ক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে দৈনিক মানবজমিনে এক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে পরের দিন, গত ১৩ নভেম্বর। মানবজমিন লিখেছে, “ভারত ও চীনের সঙ্গে সমান সম্পর্ক রক্ষা করে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা দুই দেশ বেশি সুফল পেতে পারে” বলে মনে করেন ঢাকায় নিযুক্ত শ্রীলঙ্কান হাইকমিশনার ইয়াসোজা গুনাসেকেরা।
রাষ্ট্রদূতের এই বাক্যের কথা আপাতভাবে খুবই সাদামাটা মনে হতে পারে; কিন্তু আসলে তা নয়। ওই বাক্যে গুরুত্বপুর্ণ শব্দ হলো, সমান বা সমান সম্পর্ক। অর্থাৎ তিনি চীন ও ভারতের সাথে শুধু সম্পর্ক রক্ষা নিয়ে কথা বলেননি, বলেছেন ‘সমান সম্পর্ক’ রাখার কথা। আর সমান সম্পর্ক রাখাটা হবে ‘বেশি সুফলের’, সে কথা তিনি বলছেন। কেন? সেটাই আজকের লেখার প্রসঙ্গ।

গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিসরে এক বিস্তর পালাবদলের কালে
এই শতকে দুনিয়াতে গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিসরে এক বিস্তর পালাবদল চলছে। আমেরিকার পরাশক্তিগত অবস্থান নড়বড়ে হওয়ার কথা আগেই শুনা গিয়েছিল এখন বাস্তবে ফলতে শুরু করেছে। কোনো রাষ্ট্র পরাশক্তিগত অবস্থান পায় বা দেখাতে পারে, যখন এর আগেই  অর্থনীতি শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে দেশটির অর্থনীতি প্রথম দুই বা বড়জোর তিন রাষ্ট্রের পর্যায়ে উন্নীত হয়ে গিয়ে থাকে। বলা যায়, দুনিয়ায় অর্থনীতিগত শ্রেষ্ঠত্বের অবস্থানের ওপর ভর করে কোনো রাষ্ট্র পরাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। অর্থনীতিগত অবস্থানের দিক থেকে চীন আমেরিকাকে কয়েক বছর ধরে ছাড়িয়েই যাচ্ছে বলেই আমেরিকার পরাশক্তিগত অবস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দ্বিতীয় আর এক ঘটনা হলো, বিশ্ব অর্থনীতিতে পুঁজিপ্রবাহের অভিমুখ পশ্চিম থেকে পুব দিকে এশিয়ামুখী হয়ে পড়েছে। দুনিয়ায় অর্থনৈতিক তৎপরতার মোকাম বা ভারকেন্দ্র হয়ে উঠেছে এশিয়া। এসবের মিলিত ফলাফলে এশিয়ায় আরো দুটো ইস্যু তৈরি হয়েছে। একটা আমাদের সাউথ এশিয়া অঞ্চলের ধরাধরি আর অন্যটা সাউথ চায়না সি বা চীনের প্রবেশ পথ দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চলের উত্তেজনা। এমন উত্তেজনার মূল কারণ বিশ্বে আমেরিকার পরাশক্তিগত প্রভাব কমে যাওয়া টের পেয়ে আমেরিকা নিজেই এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর কাছে নিজের সামরিক ক্ষমতাজাত সার্ভিস বিক্রির চেষ্টা করছে। সে এই বলে  এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোকে যে, চীনের নব উত্থান ও এর কোনো সম্ভাব্য খারাপ প্রভাব থেকে বাঁচতে তোমাদের সামরিক সহযোগিতা দরকার হবে। এই বরকন্দাজ হতে সার্ভিস দিতে চাই আমি। বিনিময়ে তোমরা আমার সাথে এক টিপিপি (ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে আমাকে ব্যবসায় দিবে। সাউথ চায়না সিকে কেন্দ্র করে আমেরিকার তৈরি করা দ্বন্দ্ব ও টেনশন ছড়ানোর বৈশিষ্টটা এ রকম।
আর অন্য দ্বিতীয় বিষয়টা হল, আমাদের অঞ্চলে মানে, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলেরটা আর একটু অন্য রকম। বাড়তি আরো কিছু বৈশিষ্টের কারণে। সেটা হলো, আমেরিকা ভারতকে তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে বা পাশে আছে ধরনের ধারণা তৈরি করে  ভারত-চীনের দ্বন্দ্ব উসকে দিতে চাইছে। এটা করার সুযোগ নিতে পারছে কারণ ভারত ও চীনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দ্বন্দ্বের ইস্যু আছে। আর তা মূলত অসম সামরিক সক্ষমতার কারণে। ভারতের সামরিক সক্ষমতার ঘাটতি – যেটা আমেরিকা বিক্রি ও সরবরাহ দিবার উছিলায় সে ভারতের ঘনিষ্টতা চাইছে। আবার ভারতও সম্ভাব্য সামরিক বিরোধের কথা ভেবে আমেরিকাকে অস্ত্রের উৎস এবং বিরোধে অন্তত মধ্যস্থতাকারীর ভুমিকা নিতে পারে – এমন দরকার অনুভব করছে। এছাড়া ১৯৬২ সালের অভিজ্ঞতা ভারতের ভাল নয়। এসব মিলিয়ে সারকথায় চীন নিয়ে ভারতের ভীতি ও সন্দেহ আছে, আর আমেরিকা সেটাকেই ভালোমতো ব্যবহার ও উসকে দিয়ে রাখতে চায়। আবার চীন-ভারতের সম্পর্ক সবটাই বিরোধাত্মকতা নয়। বরং আর বিপরীত দিকে ভারত-চীনের পারস্পরিক ব্যবসায়িক সহযোগিতার প্রয়োজন এবং স্কোপ আছে। এবং সে সুযোগ পরস্পর নিচ্ছে। বাণিজ্য-ব্যবসায়ের দিক থেকে উভয়ের উভয়কে দরকার। কিন্তু আর এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আর এক দিক আছে। আমেরিকার নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে পরিচালিত চলতি অর্থনৈতিক গ্লোবাল অর্ডারটা যেটা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। BRICS ও AIIB ধরণের উদ্যোগের আবির্ভাব এর প্রমাণ। পুরানা অর্ডারটাকে ভেঙে আমেরিকার কর্তৃত্বের বাইরে এক নতুন গ্লোবাল অর্ডার দাঁড় করাতে ভারত ও চীনের একসাথে কাজ করা উভয়ের ভবিষ্যতের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ দিকটা খেয়াল করে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে ভারতের দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের দিকগুলো উদোম করে উসকানি দিয়ে প্রধান ও মুখ্য করে তোলার নীতি নিয়েছে। এসবের মিলিত প্রভাব ও ফলাফলে এশিয়া, বিশেষত আমাদের অঞ্চলে মূল তিন শক্তি আমেরিকা, ভারত ও চীন – এশিয়ায় পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ছে, টানাহিঁচড়া করছে, এশিয়ার বাদবাকি প্রত্যেকটা রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার প্রবল চেষ্টা করছে। এ অঞ্চলের প্রতিটা দেশের রাজনীতিতে এই তিন শক্তির প্রভাব তাই আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রবল। অন্য দিকে প্রতিটা দেশের ভেতরে প্রতিদ্বন্দ্বী মুল দু-তিনটা রাজনৈতিক দল থাকে, সম্পর্কের দিক থেকে এরা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। যদিও এটাই স্বাভাবিক। তবু অনেক সময় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্ব বিদেশী তিন রাজনৈতিক শক্তির দ্বন্দ্বের আলোকে সাজানো হয়ে যায়, জড়িয়ে যায়। যা হওয়া উচিত নয়। কারণ যার যার নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের দিক থেকে এমন অবস্থা মারাত্মক আত্মঘাতী।
আমেরিকা, ভারত ও চীন এই তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের স্বার্থের লড়াই, পারস্পরিক শত্রুতা ইত্যাদি প্রত্যেকেই নিজ রাষ্ট্রস্বার্থে করছে, লড়ছে; এগুলো করারই কথা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল একটা বিষয় বাদে তা হবার কথা। তা হলো, আমেরিকার নেতৃত্বে-কর্তৃত্বে পরিচালিত চলতি অর্থনৈতিক গ্লোবাল অর্ডারটা ভেঙে নতুন গ্লোবাল অর্ডার দাঁড় করানো – এ বিষয়টায় চীন ও ভারতের কোর স্বার্থ একই।
কিন্তু এতে আমাদের কী? এটা কী শুধুই আমেরিকা, ভারত ও চীন এই তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের নিজ নিজ স্বার্থের লড়াই যেখানে আমরা দর্শকমাত্র যার কিছুই আসে যায় না? না একেবারেই তা নয়। এটা দূরে দাঁড়িয়ে দেখা পরাশক্তিগত লড়াইয়ের মত নয়। আমাদের সুনির্দিষ্ট স্বার্থ আছে। এটাতে আমাদের মতো গরিব রাষ্ট্রসহ সবারই এখানে গভীর ও এক  কমন স্বার্থ আছে। গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময়ের চলতি বিশ্বব্যবস্থা যেটা আমেরিকার মত মোড়ল ও তার সাগরেদদের দিকে কান্নি মেরে সাজানো ও দাঁড়ানো ব্যবস্থা বলে যেটাকে আমরা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা বলে অভিযোগ করি – এরই তো ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা তৈরি হয়েছে। অল্প বিস্তর ভাঙ্গা শুরু হয়েছে। এটা পুরা ভেঙ্গে নতুন আসন্ন ব্যবস্থাটায় আমাদের জন্য কতটুকু কী রিলিফ দিবে তা তো কেউ এমনি দিবে না, আর তা বুঝে নিবার ব্যাপার ও কাজ আছে। সেজন্য আমাদের প্রথম কাজ হল, পরিবর্তনের অভিমুখ রবং কোথায় কী পরিবর্তন হতে পারে কতটুকু তা ঠিকমত বুঝে পদক্ষেপ নেয়া, নিজের অবস্থান নেয়া, দল জোট পাকানো ইত্যাদি। ফলে চীন ও ভারতসহ এই ইস্যুতে যারাই নতুন গ্লোবাল অর্ডার বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য বিনিময়ব্যবস্থা দাঁড় করানোর পক্ষে থাকবে তাদের পক্ষে থাকা আমাদের কাজ। এই ইস্যু বাদে অন্য সব বিষয়ে আমেরিকা, ভারত ও চীনের লড়াই আসলে তাদের নিজ নিজ একান্ত স্বার্থে নিজের লড়াই। আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থ তাতে নেই। অতএব সাবধান, এসব ধরনের লড়াইয়ে এই তিন শক্তির কোনো একটার পক্ষ নেয়া আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য বিপজ্জনক। বিশেষত এই তিন রাষ্ট্রের কোনো একটার কোলে ঢুকে অপর দুই অথবা কোনো একটার পক্ষে দাঁড়ানো আরো বিপজ্জনক। যেমন, চীনের কোলে বসে চীন-ভারতের বিরোধকে কাজে লাগিয়ে চীনের পক্ষ নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে চীনের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানো। অথবা ঠিক একই কাজ কিন্তু উল্টা ভাইস ভারসা – ভারতের পক্ষে জোটবদ্ধ হয়ে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। অর্থাৎ ভারত অথবা চীন কোনো একটার পক্ষ নিয়ে নিজের স্বার্থে অপরটার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো বা খেলার চেষ্টা – এটা অতিবুদ্ধিমানের গলায় দড়ির অবস্থাই তৈরি করবে।
এ ধরনের ঘটনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাধারী দেশ হলো শ্রীলঙ্কা। সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। তার আগে আমরা খুঁজছি রাষ্ট্রদূতের ‘সমান সম্পর্ক’ কথাটার অর্থ ঠিক কী হতে পারে বা হওয়া উচিত।

কী কী নির্ণায়ক মেনে চললে সেটা ‘সমান সম্পর্ক’ কথাটার অর্থ হবে :
০১. আমেরিকা, ভারত ও চীন – কোনো এক রাষ্ট্র অন্য দুইয়ের যে কারো উপর বাড়তি সামরিক স্ট্র্যাটেজিক সুবিধা পায়, এমন কাজে সহযোগিতা করার বিষয়কে বাংলাদেশের জন্য হারাম জ্ঞান করতে হবে।
০২. তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে অবশ্যই গভীরে নেয়া যাবে। কেবল কাউকে একচেটিয়া, বিশেষ করে অন্যকে বঞ্চিত করে একচেটিয়া বাণিজ্যিক সম্পর্ক করা বা দেয়া যাবে না।
০৩. এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় মাপকাঠি হিসেবে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি সিদ্ধান্তের মুখ্য বিষয় অবশ্যই নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ হতে হবে। এদিক থেকে তাকিয়ে কাজ করলেই তখন আর কোনো সিদ্ধান্তকে ‘কারো বিরুদ্ধে কাউকে বাড়তি সুবিধা’ দেয়ার জন্য করা হচ্ছে এমন হবে না। কেউ আঙুল তুলতেও পারব না।
০৪. এই তিন রাষ্ট্রের কোনো একটার সামরিক স্বার্থকে বাংলাদেশের সাথে করা ওর বাণিজ্যের সম্পর্ক আলাপ ডিলের ভেতর আনা যাবে না। সযত্নে দূরে রাখতে হবে। যেমন গভীর সমুদ্রবন্দর এটা একমাত্র বাণিজ্যিক বিষয়, পারস্পরিক একমাত্র বাণিজ্য সহযোগিতার বিষয় হিসেবে আসতে হবে। এর ভেতর কোনো ধরনের ইস্যু যেমন, সামরিক বিষয় আনা যাবে না। মিলানো যাবে না, হারাম জ্ঞান করতে হবে। বন্দর প্রজেক্টকে পরবর্তিতে কখনও প্রয়োজনে বা সময়েও সামরিক ব্যবহার করা যাবে না এই সুযোগ আগে থেকেই মুখবন্ধেই ঘোষণা দিয়ে নাকচ করে রাখতে হবে।
০৫. তিন রাষ্ট্রের কারো সাথে এমন কোনো সম্পর্কে যাওয়া যাবে না, যেটা দেশের নয় বরং ক্ষমতাসীন নিজ দলকে ক্ষমতা রাখতে সুবিধা পাওয়ার জন্য করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলকে মনে রাখতে হবে – কারণ এর অর্থ হবে, নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী দলকেও একই কাজ করতে উসকানি দেয়া ও আগাম নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট দিয়ে রাখা।
০৬. এই তিন রাষ্ট্রের যেকোন কারো কাছ থেকেই যেকোনো সামরিক হার্ডওয়ার অবশ্যই কেনা যাবে; কিন্তু কোনো সামরিক সহযোগিতা চুক্তি, যেটা বিশেষত অন্য দুইয়ের যেকোনো এক অথবা দুটোরই বিরুদ্ধে তৎপরতা মনে হয় এমনটতে জড়ানো যাবে না। যেমন, চীনা সাবমেরিন বা আমেরিকান হার্ডওয়ার বা পুরান নেভি আইটেম কেনা, বা অল্প দামে পাওয়া ঠিক আছে। কিন্তু এর বদলে অন্য দুই যে কোন রাষ্ট্রের সাথে কোন সামরিক সহযোগিতা চুক্তি বিশেষত যেটা এই তিনের অন্য যেকোন রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে যায় তা করা যাবে না।
০৭. কোনো “প্রতিহিংসায়” তিনের কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, পথ চলা বা পরিচালিত হওয়া যাবে না। তাতে অতীতে ওই রাষ্ট্র আমাদের নিজ দেশেরই কোনো এক রাজনৈতিক দলের সাথে বিশেষ খাতিরের সম্পর্ক রক্ষা করে থাকুক না কেন। এর কারণ, আমাদের কোথাও না কোথাও ফুলস্টপ বলতে হবে। কেয়ামত সে কেয়ামত সেটা চলতে দেয়া যাবে না। কারণ প্রতিহিংসার সূত্রে আবার ভবিষ্যতে এই তিনের আর এক রাষ্ট্রকে কোনো বিশেষ ফেবার দেয়া অথবা বঞ্চিত কোনোটাই দিতে করতে শুরু হতে দেয়া যাবে না। যেমন ভারতের এখনকার ভূমিকার জন্য প্রতিহিংসা করা যাবে না। ভারত অথবা চীনকে শাস্তি দেয়ার জন্য আমেরিকার সাথে কোনো সামরিক সহযোগিতায় জড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

ওপরের এই সাতটা পয়েন্ট দিয়ে যা বলতে চাচ্ছি তা হল পুরা বিষয়টা বুঝিয়ে বলার সুবিধার জন্য কেবল। এটা অবশ্যই এই সাত পয়েন্টই সব কথা বা শেষ কথা, তা মনে করে নেয়া ভুল হবে।

ঘটনার ব্যকগ্রাউন্ড শ্রীলঙ্কা
শ্রীলঙ্কার পরপর দু’বারের বিগত সরকারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রাজা পাকসে। তার ক্ষমতায় আসার ঠিক আগে কয়েক যুগ ধরে চলে আসা শ্রীলঙ্কার তামিল বিদ্রোহকে তাঁর কালে প্রথম বলপ্রয়োগে দমন ও বিদ্রোহী সশস্ত্র গ্রুপকে সমূলে উৎখাত করে দেয়া হয়েছিল। এ কাজে চীনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা ছিল। জাতিসংঘে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ও এসংক্রান্ত চাপ সামলাতে ভূমিকা রেখেছিল দেশটি। ফলে বিদ্রোহ দমন-উত্তর পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কার পাকসের সরকারকে চাপ সামলানোর দিক থেকে চীনের খুবই উল্লেখযোগ্য সহযোগিতার ভূমিকা ছিল। এ ছাড়া আবার ঐ আমলে চীনের বিপুল বিনিয়োগও শ্রীলঙ্কায় এসেছিল। আর সর্বশেষ চীনের দুই সাবমেরিনের বহর তিনি শ্রীলঙ্কার বন্দরে নোঙর করতে দিয়েছিলেন। কী বয়ানে কী সম্পর্কে চীনা সাবমেরিন এসেছিল, তা সাধারণ্যে যথেষ্ট স্পষ্ট জানা না গেলেও ভারতের সরকারের ও মিডিয়ায় এর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল প্রবল। কারণ টেনশন কমিয়ে দূরে রাখার জন্য অনেক সময় ‘শুভেচ্ছা সফরেও’ নৌজাহাজ আমেরিকারটা চীনে অথবা চীনেরটা আমেরিকায় যায়। এমনকি আবার ‘যৌথ সামরিক মহড়াও’ হতে দেখা যায়।

মুক্তামালায় ঘিরে ধরার গল্প
এছাড়া  এ প্রসঙ্গে আর এক কথা বলা ভালো। বিগত ২০০৫ সালে বুশের আমলে ভারত-আমেরিকার বিশেষ সম্পর্ক শুরু হয়। এমনটা শুরু হওয়ার আগে ভারত সরকারের সামরিক, স্ট্র্যাটেজিক, নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলোয় থিংক ট্যাংক বা এমন বিষয়ে গবেষণা খাতের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ভারত সরকারি বিনিয়োগ খুবই কম ছিল। এরই অবসান ঘটেছিল, সামরিকসহ বহুবিধ খাতে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতা চুক্তির যুগ ২০০৫ সালে শুরু হলে থিংক ট্যাংক বা গবেষণা খাতেও আমেরিকা সহযোগিতা দেবে এমন চুক্তি হয়। ফলে প্রতিষ্ঠান গড়তে সহযোগিতা দেবে বা আমেরিকান থিংক ট্যাংক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ভারতীয় শাখা খুলবে, আমেরিকান পিএইচডি স্কলারশীপে বা কাজের খরচ যোগাতে স্কলারশিপে যৌথ গবেষণার কাজ করবে,   ইত্যাদি নানা কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। এতে আসল যে ঘটনাটা ঘটে যায় তা হল, আমেরিকান থিংক ট্যাংক-গুলোর বয়ান, দৃষ্টিভঙ্গি এরপর থেকে ভারতীয় ইনটেলেক্টদেরও বয়ান দৃষ্টিভঙ্গি হতে শুরু করে যায়। বিশেষত আমেরিকার চীনবিরোধী বা ক্যাম্পেইনমূলক যেসব প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোর বয়ান ভারতে ভালোমতো ছড়িয়ে পড়েছিল। আর সেসব বয়ানগুলোই আবার এদের লেখা কলাম বা বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য সুত্রে ভারতীয় মিডিয়াতে ছেয়ে ফেলে। যেমন চীন নাকি গভীর সমুদ্রবন্দর বানিয়ে ভারতকে চার দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। অথবা চীন ভারতকে সামরিক দিক থেকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা নিয়েছে। লাফলে ভারতীয় মিডিয়ার কল্যাণে এগুলো অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ও পপুলার প্রপাগান্ডা এবং একচেটিয়া বয়ান হয়ে দাঁড়ায়। যদিও এই প্রপাগান্ডা বয়ানের দুর্বল দিক হল, যেন গভীর সমুদ্রবন্দর বানানো বিষয়টা সামরিক উদ্দেশ্যেই একমাত্র হয়, এটা ধরে নেয়া হয়েছে। অথচ বন্দর বানানোর প্রধান উদ্দেশ্য অবশ্যই হতেই হয় বাণিজ্য। বাণিজ্য উদ্দেশ্য সাধিত হবার পরে পড়ে পাওয়া সুবিধা হিসাবে সামরিক কাজে এর ব্যবহার এটা অপ্সহনাল ব্যাপার। কখনই মুল উদ্দেশ্য হয় না। কারণ একমাত্র বাণিজ্যিক আয় দিয়েই কোন বন্দর বানানোর কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিপুল খরচ তুলে আনা সম্ভব। সে জন্য বাণিজ্যই একমাত্র ও  মুখ্য উদ্দেশ্য হতে বাধ্য। যদিও এরপর বন্দর মালিক রাষ্ট্রের অভিপ্রায় থাকলে এর দ্বৈত ব্যবহার হিসেবে সামরিক কাজে তা ব্যবহার হতে পারে। কিন্তু যদি বলা হয় কেবল ভারতকে ঘিরে ফেলার উদ্দেশ্যেই এই গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো করা হচ্ছে, তবে তা সত্যের অপলাপ এবং প্রপাগান্ডাই হবে। এ ছাড়া মুক্তোর মালা বা ঘিরে ফেলা বলতে যে ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে, সেটাও কতটা সত্যি তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
এপর্যন্ত পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় দুটো গভীর সমুদ্রবন্দর হয়েছে, তাতেই মুক্তোর মালা বা ঘিরে ফেলা বয়ান শুরু হয়। বাংলাদেশের সোনাদিয়া তখনো আলাপে আসেনি।বা এখনও বাস্তবায়নের আলাপ নাই। কিন্তু এই প্রপাগান্ডায় যে ফ্যাক্টসকে পরিকল্পিতভাবে আড়াল করা হয় তা হল, চীনের উত্তরপুর্ব দিক ছাড়া বাকি তিন দিকের ভুখন্ড ল্যান্ড লকড – ভুবেষ্টিত। সমুদ্রে বের হবার পথ নাই। বিশেষ করে চীনের পুরা দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পুর্ব দিক পাহাড় পর্বতে অগম্য। তবে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পুর্ব সীমান্ত পুরাপুরিভাবে ল্যান্ড লকড হলেও তা ছুটাবার কিছু সুযোগ আছে। যদিও ওসব দিক দিয়ে কোন সমুদ্রে বের হওয়ার উপায় নেই, কিন্তু চীনের পশ্চিম, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব (কুনমিং) অঞ্চলের মানুষকে পুরা চীনের সাথে সমানতালের বিকাশে আনতে চাইলে চীনকে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশকে বন্দর বানিয়ে দিয়ে ওই বন্দর নিজেরও বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্রেতা হিসেবে হাজির হলে তা উভয় দেশেরই লাভ হতে পারে। যার মূল কারণ চীনও ওসব বন্দরের ব্যবহারকারি হবে বলে এই অর্থে বিনিয়োগ পরিকল্পনার খরচ তুলে আনা ভায়াবল হয়, তাই। অন্য দিকে চীনেরও ল্যান্ড লকড দশা ঘোচে। অর্থাৎ মুক্তোমালার গল্প থুয়েও আমরা এর ভিন্ন ও আর এক বয়ান পেতে পারি। অর্থাৎ পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও সম্ভাব্য বাংলাদেশ এই তিন দেশ যদি বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগ চীনকে দেয় তবে সবারই বাণিজ্যিক লাভ হয়। তাই চীনের ল্যান্ড-লকড দশার দিকে নজর না দিয়ে কেবল ভারতকে ঘিরে ধরার জন্য এই বন্দর নির্মাণ করছে এই বয়ান খুবই নিম্নমানের প্রপাগান্ডা। এখন এই তিন দেশ যদি বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগের উপরে চীনকে সামরিক ব্যবহারের সুযোগ খুলে তখন ভারতের প্রপাগান্ডা অর্থপুর্ণ হতে পারে। আপাতত এবিষয়ে  কোন সামরিক সহযোগিতা চুক্তির ছায়া চিহ্নও নাই।

গল্পের বিকল্প ও বুদ্ধিমান হওয়া
তবু ভারতের মনে সন্দেহ আছে এটা বাস্তবতা। এই আলোকে ভারত বুদ্ধিমানভাবে ইতিবাচক হতে পারে। যেমন এসব বন্দর ব্যবহারের চুক্তি যেন অ-সামরিক থেকে যায় এই স্বার্থকে লবি বা পারশু করা। বিশেষত ভারতও ওসব বন্দর ব্যবহারকারি হয়ে নাম লিখানো সবচেয়ে ভাল। সেক্ষেত্রে ঐ বন্দর “কেবল বাণিজ্যিক কাজেই” ব্যবহারকারি সকলে ব্যবহার করবে একথা মুখবন্ধ ঘোষণায় অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া সহজ। যেমন  বাংলাদেশের বেলায় তো এটাই সহজ পথ।
বিশেষ করে যেমন, বাংলাদেশে কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর যদি হয়, তবে বাস্তবতই এর ব্যবহারকারী হবে চীন ও ভারত উভয়েই। কারণ এরা উভয়েই – চীনের বেলায় ওর দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব অংশ (কুনমিং) এবং ভারতের বেলায় ওর পুরা সাতভাই পূর্ব দিক ল্যান্ড লকড। কারণ এখানেও আবার বন্দরের ব্যবহারকারী বেশি হবে বলে বন্দর বানানোর বিনিয়োগ খরচ তুলে আনার সম্ভাব্যতা সম্ভাব্য এই বন্দরের সবচেয়ে ভালো এবং কম সময়ে ঘটবে। আর সে জন্য এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, বাংলাদেশকে আগেই ঘোষণা করে বলতে হবে এবং বলা সম্ভব যে বিদেশীদের এই বন্দরের সামরিক ব্যবহার নিষিদ্ধ। কারণ যে বন্দরের সম্ভাব্য ব্যবহারকারী চীন ও ভারত উভয়েই, সেখানে একমাত্র আগেই নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়ে তবেই এই প্রকল্প নেয়ার পথে আগানো সম্ভব।

যা-ই হোক, আমাদের শ্রীলঙ্কা প্রসঙ্গে ফিরে যাই।  শ্রীলঙ্কার হাম্বনটোটা গভীর সমুদ্রবন্দর এমনিতেই অনেক আগে থেকেই ‘মুক্তামালায় ঘিরে ধরার’ প্রপাগান্ডার শিকার। এর ওপর আবার শ্রীলঙ্কায় চীনা সাবমেরিন আসাটা, বোঝা যায় এটা যথেষ্ট সেনসিটিভিটি বা সতর্কতার সাথে করা হয়নি, তা আজ বলাই বাহুল্য। এর ফলাফল হয়েছিল মারাত্মক। শ্রীলঙ্কার গত নির্বাচনে রাজাপাকসেকে সরাতে ভারতের বিশেষ হস্তক্ষেপ তৎপরতার অভিযোগ পাকসে ক্যাম্প থেকে উঠেছিল। শ্রীলঙ্কায় পরপর দু’বার নির্বাচন ঘটিয়ে পাকসের বিপরীত ক্যাম্প ‘চীনের সে বাড়তি প্রভাব’ দূর করেছে। আপাতত নতুন সরকার থিতু হয়েছে। সেসবের বিস্তারে এখানে না গিয়েও বলা যায়, রাজা পাকসের অতিরিক্ত চীনের দিকে ঢুকে যাওয়ার অভিযোগ কমবেশি সত্য। এই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেই শ্রীলঙ্কার নতুন রাষ্ট্রদূত সম্ভবত বলেছেন, ‘ভারত ও চীনের সাথে সমান সম্পর্ক রক্ষা করে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা দুই দেশ বেশি সুফল পেতে পারে।’
আবার সমান সম্পর্ক বলতে এক ধরণের ভারসাম্যমূলক এক সম্পর্কের কথা তিনি বলছেন। কিন্তু এখানে সমান মানে ‘সমান দূরে’ ঠিক তা নয়। আবার ভারসাম্য বলতেও লাঠির এক দিকে চীনকে, অন্য দিকে ভারতকে বেঁধে কাঁধে নেয়ার ভারসাম্য ঠিক তাও নয়। বরং ওপরে যে সাতটি পয়েন্ট উল্লেখ করেছি সে আলোকে এটা বোঝা যেতে পারে। যার সারকথা হলো, বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কাকে ভারত-চীনের দ্বন্দ্ব অবিশ্বাস ও সন্দেহের ভেতরে, ওর অংশ হওয়া যাবে না। এটা ভুল হবে। এই অর্থে এটা সমান সম্পর্ক বা ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক।

সতর্কতা
এ ছাড়া মনে রাখতে হবে, এ কালের যেকোনো দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সম্পর্ক সব সময় বিশেষ। েই অর্থে যে, তা কোনভাবেই আর আগের দিনের (১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার আগের) মত নয়। কোনোভাবেই তা রাশিয়া-আমেরিকার কোল্ড ওয়ারের কালের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝার চেষ্টা করা যাবে না, গেলে ভুল হবে। স্পষ্টতই কারণ এখানে চীন-ভারতের দ্বন্দ্বের কথা যেমন বলা হচ্ছে ঠিক, তেমনই সেই চীনের সাথেই আবার মোদি সরকারের আমলে ভারতের ২০ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছে, কাজ চলছে। চীন-ভারত উভয় পক্ষের বাণিজ্যের বাজার ৭০ বিলিয়ন ডলারের কম নয়। এ দিকগুলো মনে রেখে ভারত-চীন সম্পর্ক বুঝতে হবে।

অস্থির উথালপাথাল সময়ে বুদ্ধিমান প্রুডেন্ট হওয়াই একমাত্র ভরসা।

[এই লেখাটার আগের ভার্সান দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। সেটা আরও পরিবর্তন, সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল]

বিহারে মোদির বিজেপির পরাজয় কী টার্নিং পয়েন্ট হবে

বিহারে মোদির পরাজয় কী ভারতের রাজনীতিতে টার্নিং পয়েন্ট হবে
গৌতম দাস
১১ নভেম্বর ২০১৫

https://wp.me/p1sCvy-cU

ভারতের বিহারে মোদির বিজেপি শোচনীয়ভাবে হেরে গিয়েছে। বিহারের প্রাদেশিক নির্বাচন যেটাকে ভারতের কনস্টিটিউশনের ভাষায় বিধানসভা বলা হয়, সেই রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে পাঁচ পর্বে নেয়া এ ভোটের ফল ০৮ নভেম্বর সকাল থেকে প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়েছিল। ফলাফলের খুঁটিনাটি বিস্তার আসতে সারা দিন লেগে যায়। সেসব বাদ দিয়ে মোটা দাগে কোন দল কতটা আসন পেয়েছে, এরই মধ্যে সে তথ্য এসে গেছে। মোট আসন সংখ্যা ২৪৩ বলে সরকার গঠনের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় আসন সংখ্যা ১২২। আর ভোটের ফল হলো বিজেপি- বিরোধীদের মহাজোট পেয়েছে ১৭৮ আসন, বিজেপি পেয়েছে ৫৮ এবং অন্যরা ৭ আসন। ফল দেখে এরই মধ্যে পরাজয় স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী মোদি বিরোধী জোটের নেতা নীতিশ কুমারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বিরোধী মহাজোট মূলত তিন দলের জোট, এর মধ্যে আছে দুই আঞ্চলিক দল লালু প্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল (এ নির্বাচনে যার প্রাপ্ত আসনসংখ্যা ৮০) এবং চলতি মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড (আসনসংখ্যা ৭১), আর এদের সঙ্গে সোনিয়া গান্ধীর কংগ্রেস দল (আসনসংখ্যা ২৭)। আমাদের লেখার প্রসঙ্গ এই হারের ফলে ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রতিফলন প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে। ফলে এ লেখার জন্য নির্বাচন বিষয়ক আপাতত এতটুকু তথ্যই যথেষ্ট। এখন থেকে মোদি সরকারের নতুন অভিমুখে কী হওয়ার সম্ভাবনা, তা নিয়ে কথা বলব। কী সে সম্ভাবনা?
মোদি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন যে নির্বাচন থেকে, ভারতের ভাষায় লোকসভার সে নির্বাচন শেষে ওর ফল হয়েছিল ২০১৪ সালের মে মাসে। ওই নির্বাচনে মোদির দল হিন্দুত্ববাদী বিজেপি হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুত্ব নয়, মোদির মুখ্য শ্লোগান ছিল “বিকাশ”, মানে উন্নয়ন। উন্নয়ন কথাটা ভেঙে বললে ওর মানে হল অর্থনীতিতে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন। মূলত উন্নয়ন খাতে মূলত বিদেশি (তবে সরকারিও) বিপুল বিনিয়োগ ঘটানো হবে – এটাই বলতে চাওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাতেই বা কী হবে? সে বর্ধিত অর্থ হল,  বিকশিত অবকাঠামোর সুবিধা নিয়ে, সুবিধা নিতে প্রলুব্ধ হয়ে কারখানা-ইন্ডাস্ট্রি খাতে এবার প্রাইভেট, পাবলিক এবং দেশি-বিদেশি ব্যাপক বাণিজ্যিক বিনিয়োগ ঘটবে। আর এসব কিছুর নিট ফল গরিব মানুষের জন্য বিপুল পরিমাণ কাজ সৃষ্টি, কাজ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এক কথায় ব্যাপারটা হল, দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ ঘাটতিতে ধুঁকে মরা ভারতের অর্থনীতিকে দুনিয়ার মধ্যে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগের লোভনীয় স্থান করে সাজানো। এ পুরো বিষয় বা প্রক্রিয়াটাকে এককথায় প্রতীকীভাবে উন্নয়ন শব্দে বা হিন্দিতে বিকাশ শব্দের ভেতর ধরা হয়েছে।
কিন্তু বিজেপির মতো এক হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিক দলের প্রধানমন্ত্রীর মুখে মুখ্য শ্লোগান “বিকাশ” হওয়ার তাৎপর্য ব্যাপক। কেন? প্রথমত, মোদির “বিকাশ” শ্লোগান নেহাত কথার কথা নয়। বরং ব্যক্তি হিসেবে এ পর্যন্ত দেখা ভারতের রাজনীতিকদের মধ্যে সত্যি সত্যিই তিনি এটা মিন করেন এবং সবচেয়ে অর্থপূর্ণভাবে এ কথা বলছেন।  এবং এরই মধ্যে গুজরাট রাজ্যে তিনবার মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় এমনটা করে দেখিয়েছেন তিনিই। এমন রেকর্ড একমাত্র তাঁরই আছে। এছাড়া এরই মধ্যে মোদির ১৮ মাসের প্রধানমন্ত্রিত্বের কালে এরই মধ্যে অনেক অর্থনৈতিক নীতি-সংস্কার তিনি করেছেন, উদ্যোগের ঝড় তুলেছেন, তা উল্লেখযোগ্য এবং সাহসী। দেশে-বিদেশে সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে। জিডিপির বাড়ার বিচারেও তা যথেষ্ট ভাল, গেল বছর সাড়ে সাত ভাগের পর এখন অবশ্য সাত ভাগ। বিগত কংগ্রেস সরকারের শেষ সময়ে যা সাড়ে ছয়ে বা কখনও পাঁচে নেমে গিয়েছিল।
এখন একটা ইমাজিনড চোখে কিছু বলা যাক। ধরা যাক “বিকাশ” শ্লোগানের মোদির ভারত সরকার ৫ বছর সমাপ্তিতে উল্লেখযোগ্য সফলতা নিয়ে হাজির হল এবং তা এমনভাবে যে, বাস্তবে এটা যে কাজ করেছে, ফল দেখানো শুরু করছে তা সাধারণ মানুষের নজরে এবং দেশি-বিদেশি এক্সপার্টের চোখেও স্বীকৃতি পেতে শুরু করল। সেক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে বলা যায়, মোদির সামগ্রিক রাজনীতির ভিত্তি এর পর আর বিজেপি-হিন্দুত্ব না থেকে এর বদলে ‘বিকাশ’ হয়ে যেতে বাধ্য। মূল কারণ হিন্দুত্বের জিগিরের চেয়ে “বিকাশ” বেশি জনপ্রিয় হয়ে গেলে দল “বিকাশ” মুখ্য শ্লোগান করে রাজনীতি করবে।  পরের নির্বাচনে মোদি আরও জোর দিয়ে বিকাশের কথা বলে ভোট চাইবেন। আর দলের হিন্দুত্ত্বের বয়ান ঠিক ততটাই অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিজেপি মুসলমান বা ‘অ-হিন্দু’ বিদ্বেষী রাজনীতিকে অন্তত সেকেন্ডারি করে পেছনে ফেলে বিকাশের সাফল্যকে প্রধান ও একমাত্রভাবে হাজির করতে বাধ্য হবে। এমনিতেই ক্যাপিটালিজমের এক কমন স্বভাব হল, ক্যাপিটালিজম যেন এক বিরাট মেল্টিং পট, সবকিছু গালিয়ে ঘুটা দেয়ার পাত্র। এই পাত্র যে পড়ে এর আগের তার কোন বৈশিষ্ঠ আর অবশিষ্ট থাকে না, লোপ পায়। নানা ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের পদার্থকে এক পাত্রে নিয়ে একটা ঘুটা দেয়ায় এরা এরপর সবাই পুরনো আলাদা বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলা এক নতুন বস্তুর ঘুটা। তবে এর পর হয়তো নতুন বৈশিষ্ট্যের কোন দ্বন্দ্ব তাতে হাজির হতে পারে। কিন্তু পুরনো ধরনের ভিন্নতা ভেদ-বিভক্তি আর কারও মধ্যে থাকে না। ফলে সফল “বিকাশ” রাজনীতির সাফল্যের মানে সার কথায় বললে ‘অ-হিন্দু’বিদ্বেষী, হিন্দুত্বের রাজনীতি করার বাস্তব পরিস্থিতি বাস্তবতা নিজে নিজেই লোপাট হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। এটা বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতি স্বেচ্ছায় ত্যাগ করা নয়; বরং বিকাশের রাজনীতিতে সাফল্যের সামনে পড়ে অনিচ্ছায় হিন্দুত্বের রাজনীতির বাস্তবতা শুকিয়ে যাওয়া; ফোকাস হারিয়ে নিদেনপক্ষে সেকেন্ডারি দুর্বল হয়ে যাওয়া; কথার কথা হয়ে থাকা এক দশা।
এটাই হলো বিকাশের সাফল্যে পড়ে বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতি টিকে থাকার সম্ভাবনা্কে নিজেই নাকচ করা এবং রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা।
ইমাজিনেশন ছেড়ে এবার বাস্তব মূল্যায়ন আসা যাক। মুল্যায়ন করলে দেখা যায় বিকাশের রাজনীতির দিক থেকে মোদির সরকারের প্রথম বছর খুবই সফল। এমনকি প্রথম পাঁচ মাসের মধ্যে দুনিয়ার মুখ্য ইকোনমিক প্লেয়ার হিসেবে চীন, জাপান ও আমেরিকার সঙ্গে বিনিয়োগ বিষয়ক চুক্তি এবং সেই সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয়ে ডিল সম্পন্ন করা দ্রুততম সময়ের দিক থেকে উদাহরণ। এজন্য হোমওয়ার্ক, নীতি পরিকল্পনা, হার্ড ওয়ার্ক ও কমিটমেন্ট এসবই ‘বিকাশ’ এর ব্যাপারে মোদি সিরিয়াসনেসের প্রকাশ ঘটিয়ে দেখানোর প্রমাণ। যদিও বছর শেষের আগেই মতাদর্শিক গুরু সংগঠন আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ধরনের প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা “ঘর ওয়াপসি” বা চার্চে হামলা ইত্যাদির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থান ও অ্যাকশন মোদিকে দেখাতেই হয়। মোদি পেরেছিলেন। মনে হয়েছিল, মোদি ‘বিকাশ’ রাজনীতি থেকে ফোকাস সরিয়ে নষ্ট হতে পারে অথবা অন্য কিছুর ছায়া এর ওপর পড়তে পারে, এমন কিছু থেকে একে রক্ষা করার ব্যাপারে তখনও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতাদের প্রকাশ্যে সমালোচনাও করেছিলেন। আর যে কোনো নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রক্ষা করতে তার সরকার নীতিগতভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ – প্রকাশ্যে তা জানিয়েছিলেন।
কিন্তু তার প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম বছর পার হতে না হতেই তার আগের দৃঢ়তায় ঢিলা পড়তে দেখা যায়। এবছরের এপ্রিলে শুরুতে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হয়েছিল। ঘটনার শুরু গোমাংস ইস্যুতে।  মহারাষ্ট্র
রাজ্যের বিজেপির সরকার গরু জবাই করার বিরুদ্ধে আইন তৈরি করে প্রয়োগ শুরু করেছিল। এতদিন প্রধানমন্ত্রী মোদি সবসময় কোনো রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত থেকে অথবা নিজ বিজেপি বা আরএসএসের কার্যকলাপ থেকে তার কেন্দ্রীয় সরকার ভিন্ন – এ কথা প্রচার করেছেন ও মেনে চলেছেন। আইনত এ কথা সত্যিও বটে। ফলে ওদের সিদ্ধান্ত বা ততপরতার কোনো দায়দায়িত্বও নেননি, পৃষ্ঠপোষকতাও দেননি। “ঘর ওয়াপসি” বা চার্চে হামলার বিরুদ্ধে যে কোন নাগরিক ধর্ম পালনের অধিকার রক্ষার তাঁর সরকারের নীতি ঘোষণা এর প্রমাণ।  মোদির কাছে – দল ও সরকার ভিন্ন – এভাবে মেনে চলা নীতি অনুসারে গরু জবাই তাঁর সরকারের সিদ্ধান্ত নয়। ফলে এর কোনো দায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর বা তাঁর সরকারের বা মন্ত্রীর নয়; সংশ্লিষ্টতা থাকার কথাও নয়। কিন্তু আমরা দেখলাম, তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বাংলাদেশের সীমান্তে এসে বিএসএফের সঙ্গে মিটিংয়ে গরু জবাইয়ের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়ে গেলেন। বললেন, বাংলাদেশে যাতে গরু পাচার হয়ে না যায়, বাংলাদেশ যেন দামবৃদ্ধির ঠেলায় গরুর মাংস খাওয়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এভাবে নাকি হিন্দু ভারতের গরুপ্রীতি রক্ষা করতে হবে। বক্তৃতায় এত দূর গেলেন। অথচ গরু জবাইয়ের বিরুদ্ধে তার কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো আইনই নেই। অর্থাৎ ভারতের সব রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ নয়। মহারাষ্ট্র রাজ্যের সিদ্ধান্ত ও আইন অন্য রাজ্যে বা কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর প্রযোজ্যও নয়। অথচ এ অসামঞ্জস্য ততপরতা প্রকাশ্যে ঘটতে শুরু করল।
কেন এটা হলো? নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম বাধাহীন পালন করার সুযোগকে মোদির যেচে এটা অ-হিন্দু নাগরিকেরও অধিকার বলে স্বীকার করে নেয়া এবং ওই অধিকার রক্ষা নিজ সরকারের নীতি বলে ঘোষণা দেয়ার কথা যেটা আগে বলেছিলাম। মোদির এমন সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর ও সাহসী ছিল বটে, আমরাও আগে মোদির এমন কঠোর ঘোষণাকে আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ওপর মোদির নিয়ন্ত্রণ বা লাগাম টেনে দেয়া বলে বুঝলেও এখন বুঝা যাচ্ছে সেটা ছিল বাইরের একটা প্রকাশ্য দিক। অন্তরের দিক ঠিক এমন নয়। অন্তরের দিকে খুব সম্ভব মোদির “নাগরিকের ধর্ম পালন রক্ষার দায়িত্ব নেয়া” ঘোষণার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় মোদি সরকার আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়ে পড়েন। যার ফলাফল তিনি হেরে যাওয়ায় তাকে আঁতাত সমঝোতায় যেতে হয়। এরই বাইরের পয়লা প্রকাশ্য দিক হলো গরু ইস্যুকে কোন ঘোষণা ছাড়াই উহ্য রেখে নিজের বলে মোদি সরকারের হাতে তুলে নিয়েছিল। মনে রাখতে হবে, নরেন্দ্র মোদি ছোট বেলা থেকেই আরএসএসের ভেতরেই বড় হয়েছেন এমন কোর সদস্য। ফলে মোদি ও আরএসএস পরস্পর পরস্পর থেকে দূরের কেউ নয়। তাই একসঙ্গে বসে পরস্পরের কনসার্নগুলো পরস্পরের কাছে তুলে ধরে
কমন এক  সিদ্ধান্তে আসার তাগিদবোধ ও সম্ভাবনা দূরের কোনো বিষয় হয়নি। যদিও ২০১৩ সালে মোদির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করাতে মোদি সফল হয়েছিলেন আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদকে নিজের পক্ষে সমর্থনে নিয়ে। আর বিপরীতে  বিজেপির এলকে আদভানি, মুরলি মনোহর যোশী, অরুণ সুরী, যশবন্ত সিংসহ ৭০ বছরের বেশি বয়সের বয়স্ক যত নেতা আছে, তাদের কোণঠাসা করে। এদের তিনি (দল নয়) সরকারে অংশগ্রহণে বদলে অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়াতে সক্ষম হন। সে সময় এভাবেই  বুড়াদের প্রভাব খর্ব করে মোদি দল বিজেপিকে নিজের একক কর্তৃত্বাধীনে আনেন। একমাত্র কেবল বাজপেয়িকে নিজের পক্ষে মুরব্বি পরামর্শক রেখেছিলেন মোদি। এই হল “কেন এটা হল” এসম্পর্কে পুরানা কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড ফ্যাক্টস। তবে আরও কিছু আছে।
সম্প্রতি দিল্লীতে ৪- ৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে আরএসএস ও মোদি সরকারের মধ্যে এক বিশেষ সাক্ষাত-বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। সবাইকে পাবলিকলি জানিয়ে তবে একান্তে এই বৈঠক হয়েছে। এনডিটিভি, দ্য হিন্দু ইত্যাদি মিডিয়ার গোপন সোর্সের খবর অনুসারে এটা নাকি ছিল মোদি সরকারের প্রথম বছরের পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন বৈঠক। সরকারের শীর্ষ নীতি বিষয়ে মুরব্বি আরএসএসের পরামর্শ নিয়ে তা সমন্বয় করা হয় সেখানে। মাস তিনেক আগে  গুজরাটের এক অখ্যাত হৃদ্দিক প্যাটেল তার নিজের প্যাটেল বা পতিদার সম্প্রদায়কে অবহেলা এবং এর পক্ষে সরকারি সুযোগ-সুবিধার কোটা দিবার দাবিতে গুজরাটের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করে সারা ভারতের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। এখন মিডিয়ায় কানাঘুষা চলছে, এর পেছনে ছিলেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সভাপতি পারভীন তোগোদিয়া এবং বিজেপির সভাপতির দূর থেকে সমর্থনের কথাও সেখানে উঠেছে। সবশেষে বর্তমানে হৃদ্দিক প্যাটেল জেলখানায় ডিটেইন্ড। তাই এমন মনে করার কারণ আছে যে, এটা কি তবে আরএসএস এফিলিয়েটেড সংগঠনের সঙ্গে (হয়ত ঠিক আরএসএসের প্রধান নেতারা নয়) মোদি ক্ষমতা প্রদর্শনের লড়াই ছিল, যে কারণেই কি প্রকাশ্যে দিল্লিতেই আরএসএস ও মোদি সরকার মধ্যে সমন্বয় বৈঠক! এখানে মনে রাখতে হবে, ওখানে মোদি ও তার মন্ত্রীরা বৈঠক করেছেন বিজেপির নেতা হিসেবে নয়, খোদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী হিসেবে। তবে এতে সরকারী নীতির গোপনীয়তা যারা রাষ্ট্রের শপথ নেননি, এমন লোকজনের সঙ্গে শেয়ার করার অসাংবিধানিক কাজ করেছে বলে কংগ্রেস অভিযোগ তুলেছিল।
এতসব কথার সারকথা, মোদি সরকার গঠনের পর থেকে জানিয়ে ও মেনে আসছিলেন যে, সরকার ও বিজেপি দুটি আলাদা সত্তা তিনি মেনে চলবেন। এরই সর্বশেষ প্রকাশ হলো, মোদির যে কোনো নাগরিকের ধর্ম পালনের অধিকার রক্ষা তার সরকারের কর্তব্য বলে ঘোষণা করা। কিন্তু এর পর থেকে শুরু হয় আভ্যন্তরীণ সংগ্রাম এবং মোদির হার শুরু হয়। ফলে পরিণতি একেবারে উল্টো। এখন আরএসএসের নির্দেশ-পরামর্শ শুনতে অধীনস্থ হয়েছে এবং জবাবদিহিতা নেয়ার উচ্চ কর্তা হিসাবেও আরএসএস হাজির হয়েছে। এটাই কার্যত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এজন্য গরু জবাই, মাংস খাওয়া ইস্যুটা মোদি সরকারই আরও সবলভাবে সর্বত্র হাজির করেছে। বিজেপি দল আর সরকার বলে কোনো ফারাক সেখানে আর নেই। বিহারের নির্বাচনেও দ্বিধা ঝেড়ে এবং বিচ্ছিন্নভাবে নয়, দলের দায়দায়িত্বে গরুপ্রীতি, গরু জবাই, মাংস খাওয়া ইত্যাদি সরাসরি দলের প্রচার-প্রোপাগান্ডায় ইস্যু করা হয়েছিল। এমনকি বিহারে গরুপ্রীতি ও ভক্তি দেখিয়েএক পোস্টার ছাপানো হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে,  গরুকে জড়িয়ে ধরে এক মেয়ে আদর করছে। ার ঐ পোস্টারে  বিরোধীরা (যারা বিহার নির্বাচনে সদ্য জিতে গেল) এরা কেন গরু বিষয়ে বিজেপির মতো অবস্থান নিচ্ছে না, জনগণকে এর জন্য জবাবদিহিতা চাইতে বলা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে যারাই বিজেপির বিরুদ্ধে ‘অসহিষ্ণুতার’ অভিযোগ তুলছেন, অভিনেতা শাহরুখ খানসহ সবার বিরুদ্ধেই দল ও সরকারের মন্ত্রীরা তাকে পাকিস্তানের এজেন্ট বলে পাল্টা অভিযোগ ও আক্রমণ করেছেন। একই সূত্রে নেপালের কনস্টিটিউশন ইস্যুতে নেপালকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়ার দাবি বিহার বিজেপি থেকে করা হয়েছিল। নেপাল-ভারত সীমান্ত বিহার পর্যন্ত বিস্তৃত; ফলে কিছু অংশ সীমান্ত এখানেও শেয়ার হয়েছে।


যে কথা নিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম, বিকাশের রাজনীতি বনাম বিজেপির হিন্দুত্বঃ যেখানে প্রথম বছর আশাবাদ রেখেছিলাম, ‘বিকাশের’ রাজনীতি মুখ্য ফোকাসে থেকে সাফল্য দেখাতে পারলে হিন্দুত্ব ভুলে বা হিন্দুত্বকে পেছনে ফেলে বা চাপা দিয়ে ভারতের হিন্দুত্ব রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আড়ালে চলে যেতে পারে। কিন্তু ঘটনা আকস্মিক সেদিকে না গিয়ে এর বদলে এক ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে মোদিই কার্যত হেরে গেছেন দেখা যাচ্ছে। ফলে মোদি সরকারের ১৮ মাসেই দেখা যাচ্ছে, কী ভয়াবহভাবে মোদি ক্রমেই হিন্দুত্বের রাজনীতির তলে হারিয়ে যাচ্ছেন।
৮ নভেম্বর নির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন শেষে ভারতের মিডিয়ায় প্রধান আলাপ উঠেছে এখন বিহারে বিজেপির হারের পর মোদি নিশ্চয়ই তার নীতিতে ‘কারেকশন’ আনবেন, ‘সহিষ্ণুতায়’ ফিরিয়ে আনবেন ইত্যাদি। উপরের আলোচনা থেকে এটা মনে করাই স্বাভাবিক যে, এমন আশাবাদ ভিত্তিহীন। মোদি, বিজেপি অথবা আরএসএস এখন কি পিছু হটে আসার কথা ভাববেন? মনে হয় না। অন্তত আজকের টিভি টকশো দেখে মনে হয়নি। বরং মোদি সরকারের বাকি সাড়ে ৩ বছর কীভাবে কাটবে, সে শঙ্কাই প্রবল হবে। স্বভাবতই এর আঁচ পড়শিদেরও ভোগাবে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি ও প্রতিক্রিয়াঃ
উপরে বয়স্ক নেতা যাদের কথা বলছিলাম এদের চারজন এলকে আদভানি, মুরলি মনোহর যোশী, যশবন্ত সিং এবং শান্তা কুমার প্রকাশ্যে সরকারকে চিঠি দিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। মিডিয়ায় সে চিঠি প্রকাশিত হয়েছে। ওর সারকথা হল, এর আগে দিল্লীতে হেরে যাবার পরও কোন শিক্ষা নেয়া হয় নায়। আর কাদের জন্য এই ব্যর্থতা তা চিহ্নিত ও দায়ী না করে আগের মতই এবারও চেপে যাওয়া হয়েছে। চিঠির পুর্ণ টেক্সট এখানে আগ্রহিরা দেখতে পারেন।

শেষ কথাঃ বিকাশের রাজনীতি বনাম বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতি এই লড়াইয়ে শুরু থেকেই বিকাশ বিষয়টা মোদির এক ব্যক্তিগত সাফল্যের শখ বা অবসেশন এর বিষয় যেন এমনই থেকে গেছিল। অপরদিকে হিন্দুত্বের রাজনীতি – এটা জনগোষ্টির উগ্র হিন্দুত্ব-জাতীয়তাবাদের আবেগ তুলে সেই আবেগের উপর ভর করে ক্ষমতা তৈরি এবং এটা ক্ষমতায় যাওয়ার বেশ কাজের বিরাট হাতিয়ার – এই বোধও প্রবল। যেমন মোদি প্রথমবার গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রী হবার পরে ২০০২ সালে দাঙ্গাটা করেছিলেন। এতে পরপর আরও দুবার মোট তিনবার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু এরপরে আর দাঙ্গার পথে যান নাই। আবার লোকসভা ২০১৪ নির্বাচনে যেখান থেকে মোদি প্রধানমন্ত্রী হলেন, ঐ নির্বাচনে কেবল উত্তর প্রদেশ রাজ্যে একই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটিয়েছিলেন কিন্তু ফলাফল (মোট আশির মধ্যে বাহাত্তর আসন) নিজের পক্ষে আনতে পেরেছিলেন। ঐ ঘটনায় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ এক মামলায় প্রধান আসামি, তবে মামলা পেন্ডিং। আবার মোদী সরকার গঠনের পর ১৮ মাসে আরও দাঙ্গার ব্যাপারে চুপচাপ। তবে দলের ভিতর দুই লাইনের লড়াই আছে। এতে ইচ্ছা বা উভয় পক্ষ যেখানে একমত হয় যে দুটাই – বিকাশ ও হিন্দুত্ব – করতে হবে। সম্ভবত “বিকাশ” পক্ষে দ্রুত কাজ ততপরতার করলেও ফল দেখাতে বা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত তাদের চোখে ও মাঠে হাজির হতে সময় লাগতে পারে। তাই হিন্দুত্বের লাইন ততপরতা এই অপশনটা সমান্তরালে রেখে দিচ্ছে। কিন্তু এমন যুক্তি বা ভাবনা ভিত্তিহীন। কারণ ২০১৪ নির্বাচনে মোদির “বিকাশ” শ্লোগানের অর্থ বুঝতে তো গরীব মানুষের কোন অসুবিধা হয় নাই। তাঁরা হয়ত ফিগার ডাটা অথবা তত্ত্ব দিয়ে বুঝে না কিন্তু বুঝে নিজের কায়দায়। নইলে গত ৩০ বছরের নির্বাচনে যেখানে কেন্দ্রে কোন একক সংখ্যাগরিষ্টের সরকার আসে নাই। কংগ্রেস বা বিজেপির মত কোন সর্বভারতীয় দল একক সংখ্যাগরিস্টতা (অর্ধেক আসনের চেয়ে এক বেশি) পায় নাই।  সেই ট্রেন্ড থমকে দাড় করিয়ে মোদির জোটকে না কেবল একা বিজেপিকে জনগণ একক সংখ্যাগরিষ্টের দল হিসাবে ক্ষমতায় আনল। এবং খুব সম্ভবত জনগণকে মোদি ব্যর্থ করে দিলে জনগণ আবার বিগত দিনের ট্রেন্ডে ফিরে যাবে। আর কোন দিন ফিরে আসবে না। যে জনগণ শুধু শ্লোগান শুনেই অর্থ বুঝতে পারে তারা সরকারের সুদ্ধান্ত, ততপরতার অগ্রগিতি বুঝবে না এটা গ্রহণযোগ্য নয়।

আবার আসলে, বিকাশ বনাম হিন্দুত্ব এর মধ্যে সম্পর্কটাই এমন বিরোধী যে দুটা একসাথে থাকতে চলতে পারে না। কারণ বিকাশ কার্যকর হতে গেলে সেখানে হিন্দুত্ত্বের দাঙ্গা অনিরাপত্তা অথবা ভারতের চলতি হালের ভাষায়, “অসহিষ্ণুতা” থাকতে পারবে না। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহনের মোদিকে  পরামর্শের ভাষায়  “অসহিষ্ণুতা” চললে যেসব বিদেশী পুঁজি, সম্পর্ক, আস্থা তৈরি তিনি করেছেন এগুলো সব ফিরে চলে যাবে। ওবামাও কমবেশি তাকে একই কথা বলেছিলেন। ঘর ওয়াপসি বা চার্চে হামলা দেখে প্রকাশ্যে তবে পরামর্শের ভাষায় সাবধান করেছিলেন বলেই মোদি সময় একেবারে শেষ হবার আগেই নিজের নীতি ঘোষণা করেছিলেন, “নাগরিকের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার করা তাঁর সরকারের প্রতিশ্রুতি” – তা বলতে পেরেছিলেন।  লক্ষণীয় যে আধুনিকতার চিন্তা ফ্রেমে এটা ইউরোপের কোন রাষ্ট্রের ভাষা নয়; আমেরিকার কনষ্টিটিউশনের ভাষা। বলা বাহুল্য উগ্রজাতিয়তাবাদী  হিন্দুত্বের বিজেপির রাজনীতির সাথে “নাগরিকের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি” সামজ্ঞস্যপুর্ণ নয়। তবু মোদি এটাকেই তাঁর সরকারের নীতি বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।  কিন্তু এতে উত্থিত সংঘাত সামলাতে পারেন নাই। যেখান থেকে পরবর্তি নতুন আরও বিরোধ সংঘাতের মুখোমুখি তিনি।

এনডিটিভি এই মিডিয়া প্রশ্ন তুলেছিল বিহারের নির্বাচনে গরু আদর করা মেয়ের ছবির পোস্টার করার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলে বলছিলেন, মোদি যদি বিকাশের” কথাই বলবেন রাজনীতি করবেন তাহলে এই পোস্টারের সাথে বিকাশের যোগসুত্র কী?

আসলেই মোদি এদুটোর মধ্যে সম্পর্ক কী তা কখনই দেখাতে পারবেন না। দলের আভ্যন্তরীণ গঠন প্রকৃতির জন্য আগামিতেও নিজেকে সংশোধন করে নিতে পারবেন – এমন আশা করার সুযোগও খুবই কম। বিশেষ করে গরুর মাংস আর বিহারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিজেপির বয়ানের যে মান হাজির হয়েছে। 

ওদিকে মোদির “বিকাশ” রাজনীতি ব্যর্থ হবার অর্থ হল, ভারতের ভবিষ্যত, ভারতের রাজনীতি অতলে হারিয়ে যাবার এক প্রবল সম্ভাবনা। বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে – “বিকাশের”, মানে এক বিকশিত ভারত আমাদের জন্য কাম্য। না, এটা ভাবভালবাসার উইশ বা ফর্মালিটির কথা নয়। কারণ এর অর্থ হিন্দুত্বের রাজনীতির দিন শেষ হবে। এটা এই অঞ্চলের জন্যও কাম্য।

[এই লেখাটা গতকাল দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় সংক্ষিপ্ত রূপে ছাপা হয়েছিল। এখানে পুরা ভার্সান ছাপা হল। ]

গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

১. ল্যাণ্ড-লকড নেপালঃ অতীত ও বর্তমানের ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতা

১. ল্যাণ্ড-লকড নেপালঃ অতীত ও বর্তমানের ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতা
 গৌতম দাস

 [এখানে তুলে আনা আমারই লেখা  আগে ১১ অক্টোবর ২০১৫ ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায়। এখানে হুবহু কাট পেস্ট করে তুলে আনা হয়েছে – কপি সংরক্ষণের জন্য আর আমার এখানের পাঠকদেরকেও জানানোর জন্য। ]

নেপালি জনগণের নতুন গঠতন্ত্র প্রণয়ন এবং গঠনতান্ত্রিক সভায় তা অনুমোদন ও গ্রহণ নেপালের প্রতি বাংলাদেশে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নেপালের জনগণ সম্পর্কে জানা এবং বোঝা বাংলাদেশের জন্য জরুরী। লেখা কোথা থেকে শুরু করতে হবে সে এক জটিল বিষয়। নেপাল প্রসঙ্গের ডাইমেনশন অনেক। অনেক দিক থেকে প্রসঙ্গ তুলে কথা বলতে হবে। আবার সব মিলিয়ে এক সামগ্রিক অর্থপুর্ণ চিত্র সাজিয়ে তোলা দরকার। কোন বিষয়ের পরে কোন বিষয় কতোটুকু আসবে সেটাও গুরুত্বপুর্ণ। সেসব নিয়ে তথ্য জোগাড় করা, চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্তে আসা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। সর্বোপরি কিভাবে আনলে তা সহজে বাংলাদেশের পাঠকের বোধগম্যতায় আনা যাবে সেই বিষয়েও ভাবনার দরকার আছে। নেপাল নিয়ে বিভিন্ন বিষয় ধরে ধরে আলোচনা এখানে আলাদা আলাদা কিস্তি হিসাবে পেশ করা হচ্ছে।

নেপালের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সরাসরি তার ভূগোল অর্থাৎ ল্যান্ডলক হবার সঙ্গে জড়িত। ল্যান্ড-লকড হবার কারনেই নেপাল পড়শি রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে এক প্রকার অদৃশ্য অথচ ব্যবহারিক-বাস্তবিক অর্থেই কলোনী বা ঔপনিবেশিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। নেপালের জনগণের লড়াই সে কারণে নেপালের ভৌগলিক অবস্থান দ্বারা নির্ধারিত ঔপনিবেশিক সম্পর্ক থেকে মুক্তির লড়াই — অসম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক থেকে মুক্ত হতে চাওয়ার আদর্শ উদাহরণ।

জাতিসংঘের অধীনে এমন রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষার পক্ষে আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশন প্রণয়ন ও কর্মসুচী গ্রহণের উদ্যোগ চলছে। জাতিসংঘের আঙ্কটার্ড এর অধীনে নিবন্ধিত এমন ল্যান্ডলক রাষ্ট্রের সংখ্যা ৩১ টা। আঙ্কটার্ডের অধীনে ২০১৪-২৪ সালের মধ্যে অর্জন করতে হবে এমন কিছু প্রোগ্রাম আছে। নেপাল ইতোমধ্যেই ঐ কর্মসুচী নেপালে বাস্তবায়নের দাবী তুলেছে, আন্তর্জাতিক সংগঠনের দৃষ্ট আকর্ষণ করেছে।

নেপাল ও ভারতের বিরোধ বৃটিশ কলোনী মাস্টার ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমল থেকে। আর এর উৎস হচ্ছে নেপাল ‘ল্যান্ডলক’। ভূমিবেষ্টিত। ফলে অন্য দেশের ভিতর দিয়ে যাওয়া ছাড়া সরাসরি সমুদ্রে বা সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের কোন উপায় তার নাই। তাই ল্যান্ড লক কথাটার সহজ অর্থ হচ্ছে যে দেশের সমুদ্র বন্দর নাই। এই বাস্তবতায় থেকে মুক্তি চাওয়া থেকেই ভারতের সঙ্গে নেপালের সংঘাতের সূত্রপাত। ভূগোল কিভাবে রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের নির্ণায়ক হয়ে ওঠে নেপাল তার ভাল একটি নজির। ফলে ভারত যতই অসংখ্য রাজার রাষ্ট্রের বদলে সংগঠিত একক কোন কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে বড় রাষ্ট্র হয়ে হাজির হয়েছে ততই সেই একক ভারত নেপালকে ল্যান্ডলক দেশ হিসাবে হাজির করেছে। আর নেপালকে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে দেবার বিনিময়ে নিজের ‘করদ’ রাজ্যে পরিণত করে রাখার সুযোগ বেড়েছে, বা রাখা সহজ হয়েছে। মোগল আমলে অবশ্য এমন সমস্যার কথা জানা যায় না।

ভারত ১৭৫৭ সালে বৃটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অধীনে দখল ও গোলাম হয়ে যাবার পর থেকে এর প্রভাব নেপালের উপর হয় মারাত্মক। নেপাল ও বৃটিশদের (ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর) যুদ্ধ যা এংলো-নেপালিজ যুদ্ধ নামে খ্যাত তা চলেছিল ১৮১৪-১৬ সাল, দুবছর ধরে। যুদ্ধের ফলাফল কোম্পানীর পক্ষে যায়। ফলে এই যুদ্ধ শেষে বাস্তবে করদ রাজ্যের মত বৃটিশদের সাথে চুক্তির কিছু শর্ত সাপেক্ষে নেপালকে সীমিত স্বাধীনতা মেনে নিতে হয়। এই চুক্তির নাম সুগৌলি চুক্তি ১৮১৬ (Treaty of Sugauli)। এটা নেপালকে “ভাগ করে নেয়ার চুক্তি” বলেও পরিচিত। কারণ ঐ চুক্তি অনুসারে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নেপালের ভুমি — বিশেষত যেগুলো কোম্পানীর চোখে ষ্ট্রাট্রজিক গুরুত্বসম্পন্ন বলে মনে করা হয়েছিল সে ভুমিগুলো বৃটিশ-ভারতের সাথে রেখে দেওয়া হয়। যেমন দার্জিলিং, সিকিম, পুরানা কুমাউন রাজত্ব, গোড়য়াল রাজত্ব, আজকের উত্তর ভারতের মিথিলা, নৈনিতাল এবং আজকের নেপালের হটস্পট দক্ষিণে সমতলী তরাই এলাকার বেশীর ভাগ অংশ – নেপালের এইসব এলাকা।

Sanguli

এছাড়া নেপালের গোর্খা অঞ্চল থেকে কোম্পানী নিজের সেনাবাহিনীর জন্য অবাধে জনবল সংগ্রহ করতে পারবে, কোম্পানী ছাড়া আর কোন পশ্চিমা নাগরিকের নেপালে আনাগোনা্র উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় – এগুলো শর্তও ছিল।

বৃটিশ কোম্পানীর প্রবল ক্ষমতা ও আধিপত্যের মুখে নেপালের রাজা তোষামোদীর ছলে বৃটিশ নীতি সমর্থন করে তাদের খুশি করার বিনিময়ে নিজের কাজ উদ্ধার করার রাস্তা ধরেছিল। ফলে পরবর্তিতে ১৮৫৭ সালে বৃটিশ-ভারতে সিপাহী বিদ্রোহের সময় নেপালের রাজা কোম্পানীর পক্ষে অবস্থান নেয়। বিদ্রোহ দমন শেষে এতে খুশি হয়ে বৃটিশ কোম্পানী (ততদিনেবৃটিশ-রাজ শাসক সরাসরি কোম্পানী অধিগ্রহণ করে নেয়) নেপালের পুরা এক তৃতীয়াংশ ফেরত নেয়, তবে ব্যাঙ্কে, বারদিয়া, কাইলালি, কাঞ্চনপুর এসব আগের নেপালের জেলা ও এভাবে তড়াই সহ কিছু অঞ্চল নেপালী রাজাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। তা সত্ত্বেও সিকিম এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।

এভাবে পরবর্তিতে ১৯২১ সালে আরও কিছু ছাড় আদায়ের পরিস্থিতির উদয় হয়। মূলত সেটা ঘটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ সরকারকে নেপালের রাজার দেয়া সমর্থন ও সার্ভিসের কারণে। ফলশ্রুতিতে ১৯২৩ সালে “নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯২৩” স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি আগের সুগৌলি চুক্তিকে প্রতিস্থাপিত অর্থে বাতিল করছে বলে লেখা হয়েছিল। সাত দফার এই চুক্তিতে প্রথমেই নেপালকে স্বাধীন দেশ বলে মেনে নেওয়া হয়। বৃটিশদের সাথে আগের সমস্ত চুক্তির বন্ধন থেকে মুক্ত করে দেয়া হয়। অর্থাৎ এখন থেকে একমাত্র চুক্তির বাঁধন ১৯২৩ সালের চুক্তি। এর দ্বিতীয় দফা বলছে, বৃটিশ-ভারতের স্বার্থহানি ঘটে এমন অবস্থা দেখা দিলে তা আগাম বৃটিশদেরকে নেপাল জানাবে যাতে এথেকে কোন সংঘাত বা ভুল বুঝাবুঝি তৈরি না হয়। একে অপরের নিরাপত্তার দিক খেয়াল রেখে অন্যের ভুমি ব্যবহার করবে। অর্থাৎ নেপালের আলাদা স্বাধীন কোন নিরাপত্তা নীতি থাকতে পারবে না। নেপাল ভারতের ভিতর দিয়ে অস্ত্রশস্ত্রসহ যে কোন মালামাল আমদানী করতে পারবে – যতক্ষণ বৃটিশ-ভারত মনে করবে নেপালের আচরণ বন্ধুত্বপুর্ণ এবং ভারতের জন্য তা হুমকি নয়। মালামাল আমদানিতে ভারতের বন্দর ব্যবহারের সময় ভারত সরকার আবার এর উপর কোন শুল্ক আরোপ করবে না, অবাধে কেবল বন্দর ফি দিয়ে নেপাল যে কোন পণ্য আমদানি করতে পারবে। এই ছিল চুক্তির সারকথামূলক দিক।

অর্থাৎ ১৯২৩ সালের এই চুক্তিতে দেখা যাচ্ছে ইতোমধ্যে বৃটিশ স্বার্থের পক্ষে সবসময় নেপালের রাজার অবস্থান নেয়া এবং সার্ভিস খেদমতে সন্তুষ্টি হবার পরই এবার ল্যান্ডলক নেপালের স্বার্থের ব্যাপারে কি করা যায় এটা এখানে এবারের চুক্তিতে মুখ্য হয়ে ভেসে উঠতে পেরেছে। এই চুক্তির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট হল – আগের দিনের করদ রাজ্য বা প্রিন্সলি ষ্ট্রেটের ধরণটা হত – প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয় দুটাকেই বৃটিশ কলোনী মাস্টারের হাতে ছেড়ে দেওয়া; আর সাথে কিছু রাজস্ব শেয়ার করা। এই দুটো করলে তবেই বৃটিশ আমলে করদ রাজ্যের রাজা হয়ে থেকে যাওয়া যেত। কিন্তু ল্যান্ডলক নেপালের রাজার বেলায় বৃটিশরা যে ফর্মুলা অনুসরণ করেছিল তা হল, সাধারণভাবে “মাস্টারের সন্তুষ্টি” সাপেক্ষে রাজার দেশ সবই করতে পারবে। এভাবে বলার সুবিধা হল, অসন্তুষ্টির [এই আবছা অস্পষ্ট গ্রে এরিয়ার সুযোগে] কথা বলে যে কোন প্রদত্ত সুবিধাই যে কোন সময় প্রত্যাহার করে নেয়া যায়।

সামগ্রিকভাবে এভাবেই নেপাল বৃটিশ মুখাপেক্ষি থেকে যায়। অন্যদিকে আবার বৃটিশ-ভারতের ভুমি ব্যবহার করে নেপালের বাইরের সাথে সব ধরণের যোগাযোগের অধিকার বৃটিশ কলোনী মাস্টার নিজে একেবারে যেচে না চাইতেই চুক্তিতে উন্মুক্ত করে রেখেছিল। বৃটিশদের এতে সুবিধা হল, বিনিময়ে নেপালের সর্বত্র ভারতের বিচরণের সুযোগ অবধারিত হয়ে যায়। অথচ নেপালের দিক থেকে দেখলে ভারতে প্রবেশ এবং ব্যবহারের সব সুবিধা থাকা নেপালের রাষ্ট্রস্বার্থ হিসাবে জরুরি না হলেও এবং নিজের পক্ষে তা কাজে লাগাতে অক্ষম হলেও তা তাকে নিয়েছি বলতে হচ্ছে। কিন্তু সমতুল্য সুযোগ ভারতকে দিতে হচ্ছে। এই সুযোগে ভারতের একচেটিয়া বাজারে পরিণত হওয়া ছাড়া নেপালের আর কোন গতি থাকছে না।

দুনিয়ায় এখন জাতিসংঘ আছে, এই কালে কোন রাষ্ট্রকে কলোনী করে রাখা কোন দখলদারের পক্ষে খুব আরামের বা সুখকর অনুভুতি নয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ব্যাপারটা এমনকি ন্যায্য বলেও এক ধরণের সম্মতি পেতে দেখা যেত। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের কলোনী যুগের বিচারে ১৯২৩ সালের চুক্তিটা নেপালের আগের যে কোন চুক্তির চেয়ে্ তুলনায় কাম্য ছিল। কিন্তু এখনকার বিচারে এটা একেবারেই কাম্য নয়।

ঐ চুক্তিতে কবে এর কার্যকারিতা শেষ হবে এমন তারিখ উল্লেখ করা ছিল ৩১ জুলাই ১৯৫০। বৃটিশরা ১৯৪৭ সালে ভারত ছেড়ে চলে গেলে স্বভাবতই চুক্তির আইনী দায় এবং দায়িত্বের মালিক হয় নেহেরুর ভারত। কিন্তু নেহেরুর গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত নিজের জন্য কলোনীতন্ত্র উৎখাত হয়ে যাবার ষোল আনা সুবিধা নিলেন। কিন্তু নেপালের বেলায় সেটা হতে দিলেন না। নেপালের কলোনী মাস্টার হিসাবে বৃটিশের জায়গায় নেহেরুর ভারতকে বসিয়ে নিলেন। ফলে বৃটিশ কলোনী নেপালের সাথে চুক্তির ক্ষেত্রে যে নীতিগত দিক অনুসরণ করেছিল সবজায়গায় সেটাই হুবহু নীতি নেহেরুর ভারত অনুসরণ করেছিল। নেপালকে গণপ্রজাতন্ত্রী-ভারতের কলোনী করে রাখার কোন সুযোগ নেহেরু হারাতে চান নাই। তাই পুরাণ চুক্তির নীতিগত আদলে নতুন করে “১৯৫০ জুলাইতে ভারত-নেপাল তথাকথিত মৈত্রী ও বন্ধুত্ব চুক্তি” করা হয়। এবার চুক্তিতে দশটা পয়েন্ট। কিন্তু সার কথা হল একই – সন্তুষ্টি বা ভারতের নিরাপত্তার কথা তুলে নেপালকে ভারতের মুখাপেক্ষি করে রাখা। যেদিকটা মাথায় রেখে চুক্তির খসড়া করা হয়েছে তা হল, নেপালের কোন স্বাধীন পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা বা অর্থনীতি – এককথায় কোন স্বাধীন নীতিই যেন সম্ভব না হয়। নেপাল যেন ভারতের মুঠো থেকে বেরিয়ে না যায় – যেটা কলোনি আমলে করদ রাজ্যের বেলায় অনুসরণ করা হত। মোটাদাগে বললে, ১৯৫০ সালের চুক্তি পুরানা ১৯২৩ সালের চুক্তিরই প্রতিচ্ছবি। কেবল “বৃটিশ” এই শব্দের জায়গায় যেন ভারত বসানো। প্রথম পাঁচ দফাও প্রায় হুবহু এক। নেপাল বাইরে থেকে অস্ত্র ও যুদ্ধের মালামালসহ যেকোন মালামাল আনার অনুমতি প্রসঙ্গে পুরান চুক্তিতে বৃটিশ “সন্তুষ্টির” কথা বলা হয়েছিল। এখানে কায়দা করে বলা হয়েছে সবই আনতে পারবে। কিন্তু কি ব্যবস্থাপনায় তা আনতে পারবে তা চুক্তিতে স্পষ্ট বলা নাই। সে প্রসঙ্গে বলা হয়েছে সেটা চুক্তির বাইরে প্রত্যেক কেস ভিত্তিতে দুই দেশ বসে ঠিক করবে। অর্থাৎ এখানে এটা আরও অনিশ্চিত করে রাখা হয়েছে। কোন সাধারণ নীতি এখানে লিখিত না থাকায় সাধারণভাবে অনুসরণযোগ্য কোন নীতি না লিখে রাখার সুযোগ এখানে নেওয়া হয়েছে; ভারতের সঙ্গে নতুন চুক্তি আগের চুক্তির বৃটিশ “সন্তুষ্টির” চেয়েও বড় বাপ হয়ে আছে।

অথচ মূল কথা হল, নেপালের মূলত দরকার সমুদ্র বন্দরে প্রবেশাধিকার এবং সে বন্দর থেকে নিজের ভুসীমান্ত পর্যন্ত সে মালামাল নিয়ে আসা বা পাঠানোর অধিকার। অথচ চুক্তিতে তাকে দেয়া হয়েছে – ভারতে বসবাস, সেখানে সম্পত্তি কেনা, ব্যবসা করা ইত্যাদির অবাধ অধিকার – এগুলো নেপাল চায় নাই, তার জন্য জরুরিও নয়। এগুলো নেপাল কাজে লাগাতে না পারলেও বা কাজে না লাগলেও নেপালকে দেয়া হয়েছে। ভ্রত চেয়েছে এগুলো চুক্তির কাগজে লেখা থাকুক। তাহলে পালটা বিনিময় অধিকার হিসাবে নেপালকে ভারতীয়দের জন্যও এসব সুবিধাগুলো উন্মুক্ত অবারিত করে দিতে হবে। আর কে না জানে ভারতের অর্থনীতির সাইজ সক্ষমতা অগ্রগতির তুলনায় নেপালের অর্থনীতি নস্যি। ফলে উন্মুক্ত নেপালে পাওয়া সুযোগ ভারতীয়দের নেয়ার সক্ষমতা নেপালকে সমান সুযোগ ভারতে দিলেও এর সুবিধার নেপালীরা নিতে সক্ষম নয়, পারবে না। পাল্লা ভারতের দিকেই যাবে। ফলে ভারতের অর্থনীতির অধিনস্ত হয়ে ভারতের অনুগ্রহের অর্থনীতি হওয়াই নিবার্য ভাবেই নেপালের ভাগ্য হবে।

এছাড়া ওদিকে দফা নম্বর ছয় নেপালের জন্য ভয়ঙ্কর। বলা হচ্ছে ভারতীয়দেরকে নেপালে ব্যবসা করার জন্য নেপালীদের মতই সমান “ন্যাশনাল ট্রিটমেন্ট” দিতে হবে। যেমন কোন ব্যবসায় ব্যাংক নেপালী ব্যবসায়ীকে ঋণ দিলে একই সুবিধা ভারতীয় ব্যবসায়ীকেও দিতে হবে। স্বভাবতই এর পালটা নেপালীরা একই সুবিধা ভারতে পেলেও এই বিনিময় সুবিধা নেপালীরা কাজে লাগাতে সক্ষমই নয় এখনও। ফলে সমান “ন্যাশনাল ট্রিটমেন্ট” বিষয়টা নেপালীদের বিরুদ্ধেই যাবে। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা এই “ন্যাশনাল ট্রিটমেন্ট” বিনিময় করা তো নেপালের উদ্দেশ্য বা দরকার ছিল না। নেপালের দরকার নিজেকে ল্যান্ডলক মুক্ত করা।

ভারতের ভিতর দিয়ে নেপালের সমুদ্র বন্দরে প্রবেশাধিকারের সমতুল্য সুবিধার বিপরীত হতে পারে নেপালের ভিতর দিয়ে ভারত কোথায় যেতে চাইলে একই সুযোগ। কেবল ততটুকু। যদিও স্বভাবতই ভারত তখন প্রশ্ন তুলবে ঐ সুবিধা ভারতের জন্য জরুরি নয়। তবে ভারত যদি এই যুক্তি দিতে চায় যে নেপালকে অবাধে প্রবেশ ও যাতায়াতের সুবিধা দিবার মোট বিনিময়মুল্য হল সারা নেপালকে ভারতের কাছে বন্ধক থাকতে হবে – এটাও খারাপ হয় না। কারণ নেপালকে প্রবেশাধিকার দিলে ভারত এখানে নেপালে নিজের ব্যবসায়িক সুবিধা হারায়। তাই এসব কিছু এর কাফফারা। এটা খুবই ভাল কথা। তাহলে স্বভাবতই বাংলাদেশের কাছে থেকে ট্রানজিট আদায়ের সময়ও তো ভারতের এই নীতিই আমাদের অনুসরণ করা উচিত। ভারত কি সেক্ষেত্রে রাজি হবে? অর্থাৎ নেপালকে চাপে ফেলে নিজের আজ্ঞাবহ রাজ্যই বানিয়ে রাখতে চায় ভারত – ঠিক তেমন?

হাসিনার আমলে ভারতের সাথে চুক্তিতে যেমন ট্রানজিটের বেলায় অহেতুক ভারতকে দেয়া সুবিধার বিপরীতে রেসিপ্রোকাল সাম্যের উছিলায় বাংলাদেশকেও সুবিধা দেয়ার কথা লেখা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের কাছে সেসব সুবিধা নিজের কাজে লাগানোর সুবিধা নয় মোটেও।

এসব বিষয়গুলো নিয়েই মাওবাদীদের ৪০ দফায় প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে যে ৪০ দফা দাবিতে তারা সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেছিল সেখানে এসব প্রশ্ন তুলে ১৯৫০ সালের চুক্তি বাতিলের কথা লেখা আছে। এছাড়া মাওবাদীরা ভারতকে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে প্রধান শত্রু মনে করে। ভারতকে সামন্ততন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের দোসর বলে আখ্যায়িত করেছিল।

এদিক থেকে দেখলে নেপালের জনগণের সব সংগ্রামের সারকথা ল্যান্ডলক দেশ হবার অভিশাপের কারণে ভারতের আধিপত্য থেকে মুক্তির উপায় খুজে ফেরা। অমীমাংসিত সেই লড়াইয়ের ছায়াতেই নেপালের উপর ভারতের চলতি অবরোধ আরোপ এবং তা নেপালের জনগণের মেনে না নেওয়ার সংগ্রাম। ফলে একদিক থেকে যেটাকে রাজতন্ত্র উৎখাতের সংগ্রাম বলে মনে হয় সেটাই আবার অন্যদিক থেকে ভারতের আধিপত্য থেকে মুক্তির সংগ্রাম।

মাওবাদীরা ২০০৮ সালে প্রথম সরকার গঠন করার পরে এবিষয়ে একই মুল্যায়নে ও অবস্থানে থাকতে পারে নাই। দল তিনভাগ হয়ে গিয়েছে। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

২. নেপালি মাওবাদ ও গণরাজনৈতিক পরিসর নির্মানের চ্যালেঞ্জ
গৌতম দাস

[এখানে তুলে আনা আমারই লেখা  আগে ১১ অক্টোবর ২০১৫ ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায়। এখানে হুবহু কাট পেস্ট করে তুলে আনা হয়েছে – কপি সংরক্ষণের জন্য আর আমার এখানের পাঠকদেরকেও জানানোর জন্য। ]

নেপালে রাজতন্ত্রের পতন ও উৎখাতের ঘটনা ২০০৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে শুরু। প্রথম চোটে রাষ্ট্রের  সেনাবাহিনী ও পুলিশকে রাজার অধীনস্থতা ও নির্দেশে পরিচালিত হবার আইন বাতিল করে তাদেরকে জাতীয় সংসদ, অর্থাৎ জনগণের অধীনে আনা হয়। এটা ছিল এর আগে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে চলা ইউনাইটেড কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (UCPN) বা যারা পপুলারলি মাওবাদী (Maoist) বলে পরিচিত তাদের সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগ্রামের ফসল।

নেপালের মাওবাদীরা  ১৯৯৬ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে নেপালের তৎকালীন সরকারের কাছে ৪০ দফা দাবীনামা পেশ করে। সরকারকে তারা জানিয়েছিল, যদি এই দাবি মেনে না নেওয়া হয়, অর্থাৎ  আগামি দুসপ্তাহের মধ্যে  দাবি না মেনে নেবার  ইঙ্গিত দেখলে  সেক্ষেত্রে উপস্থিত রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নিতে আমরা বাধ্য হব”। লিখিত এই পত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন তৎকালীন মাওবাদী পার্টির দ্বিতীয় নেতা বাবুরাম ভট্টরায়। তিনি ছিলেন মূলত  মাওবাদী সহ কয়েকটি ছোট দলের জোট “ইউনাইটেড পিপলস ফ্রন্ট” এর তৎকালীন চেয়ারম্যান। আর তখন মাওবাদী পার্টির চেয়ারম্যান হলেন পুস্পকমল দাহাল, দলে যার পরিচিতি  নাম ‘প্রচণ্ড’।

সুতরাং নেপালে রাজতন্ত্রের উৎখাত এক সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিণতি। লেনিনের ধ্রুপদি গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারণার আলোকে  নেপালের রাজনীতিতে কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলি – অর্থাৎ রাষ্ট্রগঠনের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সভায় নেপালের জন্য একটি গঠনতন্ত্র প্রণয়নের ধারণা নিয়ে আসেন মাওবাদীরা। সশস্ত্র সংগ্রামের সফলতার এক পর্যায়ে কিভাবে বিপ্লবী অর্জনকে রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণের রাজনীতিতে রূপান্তর করতে হয় নেপালের মাওবাদ সেই দিক থেকে বিপ্লবী রাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নজির। এখানেই নেপালের মাওবাদের বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও সঠিক সময়ে কৌশলে আগু-পিছু করে নেয়ার দিক থেকেও মাওবাদীরা বিভিন্ন সময় খুব ফলপ্রসূ নীতি পদক্ষেপ নিতে সক্ষমতা দেখিয়েছে। 

যেমন ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে “আর্মড পুলিশ ফোর্সের” আইজিকে এক মাওবাদী অপারেশনে হত্যা করা হয়। নেপালের আর্মড পুলিশ ফোর্স আমাদের র‍্যাব এর সমগোত্রীয়। মাওবাদীদের দমনে এটা আলাদা করে গঠন করা হয়েছিল ২০০১ সালের জানুয়ারিতে। কিন্তু এর পরেও পরিস্থিতির উপর মাওবাদীদের নিয়ন্ত্রণ বহাল ছিল। দেখা যায় এঘটনা সত্ত্বেও পরে মে মাসে সরকারের সাথে সাময়িক অস্ত্রবিরতিতে তারা আসতে পারছে। অস্ত্রবিরতির কোড অব কনডাক্ট সম্পন্ন করতে পারছে। আবার খুব সফলতার সাথে তারা ঠিক সময়ে একতরফাভাবে অস্ত্রবিরতি ভেঙেও দিয়েছে, অর্থাৎ ক্ষমতাসীনদের শক্তি প্রদর্শন ও সমঝোতার দুই নীতিই কাংখিত রাজনৈতিক ফলাফল আদায় করে নেবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছে। সমরক্ষেত্র ও রাজনীতির ক্ষেত্র দুই ক্ষেত্রেই লড়াই চালিয়েযেতে পেরেছে।  তারপরও নেপালের মাওবাদ সম্পর্কে বিস্তর সমালোচনা-পর্যালোচনা হতে পারে। তাদের সফলতা-ব্যর্থতার খতিয়ান নেওয়া দরকার। তবে এখানে আমরা তার সফলতার মধ্য দিয়ে যে বৈশিষ্ট্যসূচক দিক ফুটে উঠেছে সেই দিকেই নজর দেবো। এর কারণ নেপালের জনগণের লড়াই সংগ্রাম থেকে শিক্ষণীয় সারবস্তু বের করে আনাই আমাদের প্রাথমিক কাজ।

মাওবাদীদের দাবিনামার মূল সুর ছিল নেপালের রাজনৈতিক সংকটে নেপালের করণীয় নির্ধারণ এবং সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি নেপালের সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে একমতে আনা। রাজতন্ত্র উৎখাতের জন্য করণীয় নির্ধারণের ব্যাপারে সকল পক্ষকে একটি সর্ব সম্মত সাধারণ অবস্থানে নিয়ে আসা। বলাবাহুল্য বিপ্লব ও উদার গণতন্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে মাওবাদীদের মধ্যে তর্ক ছিল না তা নয়, এছাড়া দিল্লীর সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নেও বিরোধ ছিল। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণের ধারণাই শেষাবধি প্রাধান্য পেয়েছিল। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করবার কৃতিত্ব মাওবাদীদের। তাই নতুন কনস্টিটিউশান বা গঠনতন্ত্র  প্রণয়নের প্রসঙ্গ শুরু হয়েছিল রাজতন্ত্র উৎখাতের সঙ্গে সঙ্গেই। আবার নেপালে প্রথম কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলি বা  নির্বাচিত গঠনতন্ত্র প্রণয়ন সভা (বা সংবিধান সভা) গঠিত হয় ২০০৮ সালে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই সভা একটা কনস্টিটিউশন বা রাষ্ট্রগঠনের প্রশ্নকে কোন গঠনতান্ত্রিক দলিলে রূপ দিতে পারে নি।  সকলকে নিয়ে এমন কোন ঐক্যের স্তরে পৌছাতে পারে নি, যাতে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে নেপালের শক্তিশালী আবির্ভাব ঘটতে পারে।  কিন্তু খুবই ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসাবে নেপাল আবার  দ্বিতীয়বার নতুন করে সংবিধান সভার নির্বাচন করতে সক্ষম হয় ২০১৪ সালে। এই হিসাবে  ইতিহাসের সাত বছর পর দ্বিতীয় গঠনতন্ত্র প্রণয়ন সভায়  নেপালে নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন এবং গঠনতান্ত্রিক সভায় তা অনুমোদন ও গ্রহণের ঘোষণা এসেছে।

বিগত ২০০৬ সালে রাজতন্ত্রকে নড়বড়ে করে দেবার পর থেকে পুরানা  রাজতন্ত্রের খুঁটি বর্গা ভেঙ্গে পড়েছিল ঠিকই কিন্তু  নতুন করে নেপাল রাষ্ট্র গঠন সম্পন্ন হচ্ছিল না। ফলে দেশে স্থিতিশীলতা আসছিল না, এখন অন্তত কনস্টিটিউশনাল রাষ্ট্র বলে ঘোষণা ও দাবি করার জায়গায় নেপাল পৌঁছাতে পারল। যদিও অমীমাংসিত কিছু বিষয় নতুন চেহারা ধারণ করে হাজির রয়েছে এবং ভারত সীমান্ত সংলগ্ন ত্বরাই  অঞ্চলের মাধেসি ও থারুদের নিয়ে সংকট রয়েছে।  তবু গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ নেপালের  গঠনতন্ত্র প্রণয়ন সভায় নতুন গঠনতন্ত্র গৃহীত হয়েছে বলে যে প্রোক্লেমেশন জারি হয়েছে তা নিঃসন্দেহে নেপালের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

নেপাল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ‘কনস্টিটিউশন’, ‘গঠনতন্ত্র’, ‘রাষ্ট্র গঠন’, ‘কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলি’ বা‘রাষ্ট্রগঠন’  ইত্যাদি শব্দগুলো বারে বারে এসেছে। বিপ্লবী রাজনীতি সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণা হচ্ছে বিপ্লব একান্তই সশস্ত্র বল প্রয়োগের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের ব্যাপার মাত্র। ফলে মাওবাদী কমিউনিস্টরা সশস্ত্র সংগ্রামের এক পর্যায়ে সমাজের অন্যান্য ক্ষমতাশালী শ্রেণি ও শক্তির সঙ্গে মৈত্রী রচনায় মধ্য দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র প্রণয়ন প্রক্রিয়ার শুরু করবে, সেটা বাংলাদেশে আমরা সাধারণত চিন্তা করতে পারি না। এর ফলে বাংলাদেশের বহু বিপ্লবী তরুণে জীবন বিসর্জন দেবার পরেও বাস্তবিক রাজনীতি দূরের কথা ধারণাগত ক্ষেত্রগুলোতেও আমরা অগ্রসর হতে পারি নি। অথচ বিপ্লবের স্তর অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট ভাবে কী ধরনের রাষ্ট্র গঠন কর্তব্য তা সবসময়ই ধ্রুপদী  বিপ্লবী রাজনীতির নীতি ও কৌশলগত তর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। বাংলাদেশে ‘বিপ্লব’ সম্পর্কে আমাদের মধ্যে যে ধরণের অনুমান কাজ করে সেই বুঝের জায়গা থেকে নেপালে মাওবাদীদের কৃতিত্বের দিকটি বোঝা যাবে না। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অন্যান্য শ্রেণি ও শক্তির সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক মৈত্রী রচনায় সাফল্য দক্ষিণ এশিয়ার জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। মাওবাদীদের সম্পর্কে ভিন্ন সমালোচনা বা পর্যালোচনা থাকলেও এই দিকটার প্রতি আমাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

বাংলাদেশে  বিপ্লবী চিন্তায় রেওয়াজে ‘কনস্টিটিউশান’ বিষয়টা যেন বা “বুর্জোয়াদের” বিষয় এমনই মনে করা হয়।  এনিয়ে কোন আলোচনাই প্রায় হয় না।  যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ন অথবা নয়াচীনের বিপ্লব নিয়ে সারা দুনিয়ার বিপ্লবীদের উচ্ছ্বাস থাকলেও এই দুই বিপ্লবে ক্ষমতা দখলের পরে “কনস্টিটিউশন” বা “রাষ্ট্রগঠন” বলে কোন পর্যায় তাদের ছিল কি না আমরা তা খুব কমই খুঁজতে যাই। পুরানা  ট্রাডিশনাল  বিপ্লবী চিন্তায় কোন বিপ্লবী রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা দখলের পরে রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র তৈরির বিষয়ের উপর জোর দেয়া, গঠনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠনতন্ত্র প্রণয়ণ প্রক্রিয়া সফল ভাবে  সম্পন্ন করার কর্তব্য গুরুত্ব পায় না। এককথায় পুরানা রাজতন্ত্র বা অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জায়গায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন গুরুত্বপুর্ণ কর্তব্য ও করণীয় হয়ে ওঠে না।  বরং এগুলোকে সবসময়ই খুবই অপ্রয়োজনীয় “বুর্জোয়া” কাজ মনে করা হয়েছে। একারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন অথবা নয়াচীন রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশান তৈরির বিষয় ইতিহাসের তেমন কোন গুরুত্বপুর্ণ অধ্যায় বলে বাংলাদেশের বিপ্লদের কাছে বিবেচিত ছিল না। একারণে আমরা আশির দশকে বিপ্লবী বয়সে রাশিয়া বা চীনের অনেক বিপ্লবের ইতিহাস পড়েছি; মুখস্থ না করলেও অনেক কিছু নাড়াচাড়া করেছি, কিন্তু এই দুই বিপ্লবী রাষ্ট্রের “কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস”  বলে আদৌ কিছু ছিল কিনা আমরা তা খতিয়ে দেখি নি। কোন তাগিদও বোধ করি নি। বা থাকলেও নিষ্ঠার সঙ্গে তা জানবার বা বুঝবার অধ্যবসায় চর্চা করি নি।

গঠনতন্ত্র প্রণয়ন উল্লেখযোগ্য কোন ইতিহাস বা ঘটনা বলেও মনে করা হয় না, কোন সামাজিক অথবা রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্কের ভিতর দিয়েও গঠনতন্ত্র প্রণয়নের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠির মুর্ত ভাবে হাজির হবার প্রশ্ন জড়িত সেটাও বাংলাদেরশের বিপ্লবী রাজনীতির ডিসকোর্সে দেখা যায় না।  বরং কনস্টটিউশনালিজম বা গঠনতন্ত্রকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বিষয়টাকে নিছকই “বুর্জোয়া” বা আজাইরা কচকচানি বলে নাক সিটকানোর চর্চা বাংলাদেশে আশির দশক অবধি প্রবল ও প্রকট ভাবেই ছিল। এখনও আমরা অনেক এভাবেই  ভাবতে অভ্যস্ত রয়ে গিয়েছি।  তবে পরবর্তিতে রাষ্ট্র বিষয়ক ধারণা গুলো আরও পরিস্কার  ও পুষ্ট হওয়াতে আগে সেসব যে ভুল হয়েছিল তা একালে বিপ্লবী চিন্তা ও চর্চায় অনেক পরিষ্কার হয়েছে। ফলে একালে সশস্ত্র গণযুদ্ধ এবং সেই সংগ্রামের একটি পর্যায়ে সমাজের অন্যন্য গণতান্ত্রিক শ্রেণি ও শক্তির সঙ্গে মৈত্রী ও গণ অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে পুরানা রাষ্ট্রের পতন ঘটিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য গঠনতন্ত্র সভা আহ্বান এবং নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়নের মধ্য দিয়ে নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন – এই ধাপগুলোর প্রয়জনীয়তা ও অনিবার্যতা অনেক পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের বৈপ্লবিক গণতান্ত্রিক রূপান্তর কথাটার ব্যবহারিক অর্থ আগের তুলনায় বিপ্লবীদের কাছে অনেক স্বচ্ছ। গণ-অভুত্থানের মধ্য দিয়ে কোন বিপ্লবী রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে তার পরের পদক্ষেপ হিসাবে ‘কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস’ বা গঠনতন্ত্র প্রণয়নের কাজ শুরু করার গুরুত্ব অপরিসীম ।  নেপাল তাই নতুন দিনের বিপ্লবের উদাহরণ। এই দিক থেকে বাংলাদেশের বিপ্লবী রাজনীতির ভবিষ্যতের দিক থেকে আমাদের হাতের কাছের নেপাল নতুন, কিন্তু খুবই ভাল  উদাহরণ হয়ে উঠেছে,  যা আরও  খুঁটিয়ে দেখা, বোঝা ও বিচার করার সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে।  

নেপালের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে ২০০৬ সালের ৬ এপ্রিল খুবই তাৎপর্যপুর্ণ। এদিন রাজার ক্ষমতার বিরুদ্ধে মাওবাদীরা সহ সব রাজনৈতিক দল  সারা নেপালবাসীর এক গ্রান্ড এলায়েন্স গঠন ও রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে সক্ষম হয়। বলাবাহুল্য পরিণতিতে সেটাই রাজার পরাজয়ের কাল হয়ে ওঠে।

কিন্তু এমন মৈত্রী গঠিত হবার পিছনের পটভুমির খবর আমাদের নিতে হবে। মাওবাদীদের সশস্ত্র আন্দোলন নেপালের রাজনীতিতে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠতে এবং  নির্ধারক ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে অনেক সময় লাগে। আগেই বলেছি সশস্ত্র সংগ্রামের পথ শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। নেপালে ২০০২ সালের অক্টোবরের আগে নেপালে ক্ষমতার ভাগিদার বা স্টেক হোল্ডাররা হল এরকমঃ  এক. রাজতন্ত্রী রাজনীতির সমর্থকরা সহ খোদ রাজা। দুই. রাজতন্ত্রী কিন্তু কনস্টিটিউশন মেনে চলা আইনী দলগুলো (মাওবাদীরা বাদে মূলত নেপালি কংগ্রেস, ওর ভাঙা দলছুট অংশ এবং সিপিএন(ইউএমএল – যারা ভারতের সিপিআই, সিপিএমের নেপাল ভার্সন) ও ছোটখাট নানান কমিউনিস্ট বা লিবারেল দল। সবমিলিয়ে এমন মোট ৭টা দল । তিন. কস্টিটিউশানাল রাজতন্ত্র উচ্ছেদের লক্ষ্যে সশস্ত্র মাওবাদী দল; চার. ল্যান্ডলকড নেপালের উপর ছড়ি ঘুরানো ভারত। আর ৫. আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমাস্বার্থ। – এভাবে পাঁচটা পক্ষ।

দেখা যায় ২০০৫ সালের প্রথমার্ধের আগে পর্যন্ত এই পাঁচ পক্ষের চার পক্ষই একদিকে এবং মাওবাদীর বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ থাকতে পেরেছিল।  উপযুক্ত কৌশল ব্যবহার করে ঐ চার  পক্ষীয় জোটে ভাঙন আনা, তাদের একসাথে কাজ করা অসম্ভব করে তোলা এবং মাওবাদী  রণকৌশলের মধ্য দিয়ে সফল ভাবে মৈত্রী স্থাপনের রাজনৈতিক শর্ত তৈরি করা সেই সময় সহজ ছিল না। সর্বোপরি একমাত্র দায়িত্ববান সম্ভাবনার যে রাস্তা মাওবাদীরা খুঁজে নিতে সক্ষম হয়। সে রাস্তার কথা যে মাওবাদীরা প্রস্তাব করতে পারে এবং দায়িত্ব নিয়ে তারা করেছেও বটে তা প্রশংসার যোগ্য। মাওবাদীদের রাজনৈতিক কৌশলের কারনে রাজার পক্ষের বাকী  তিন পক্ষই রাজার হাত ছেড়ে দিয়ে মাওবাদীদের সাথে অগ্রসর হতে বাধ্য হয়েছিল। বা বলা যায়, মাওবাদীদের সঙ্গে থাকাটাই রাজনোইতিক দিক থেকে ব্যাটার অপশান মনে করেছিল।  ২০০৫ সালের প্রথমার্ধের পরে অনানুষ্ঠানিকভাবে, পরে ডিসেম্বর ২০০৫ সালে  ১২ দফা ঐক্যমতের দাবীনামা — যেটা পরবর্তিতে ২০০৬ সালের এপ্রিলে রাজার বিরুদ্ধে গ্রান্ড এলায়েন্সের পিছনের পটভুমি হিসাবে কাজ করেছে – মাওবাদীদের ক্রম বিজয় সুস্পষ্ট হতে শুরু করে।  দেখা যায় মোট পাঁচ পক্ষের রাজা ও মাওবাদী ছাড়া মোট তিন পক্ষ ২০০৫ সালের আগে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে রাজার পক্ষেই থেকেছিল। আর ২০০৫ সালের পরে মাওবাদীদের পক্ষে আর রাজার বিপক্ষে চলে যেতে বাধ্য হয়। কথিত এই তিন পক্ষ হল, ভারত, আমেরিকা এবং রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলো (নেপাল কংগ্রেস ও ভা্রতের সিপিআই, সিপিএমের মত নেপালী কমিউনিস্ট)। এদেরকে মাওবাদীরা নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রতি আস্থায় আনতে সক্ষম হল কেন? এই প্রশ্নটি ব্যাখ্যা করা যাক।

সশস্ত্র মাওবাদী বলতে প্রচলিত ধারণা বা ছবিটা হল ১. যারা কবে সশস্ত্রতা শেষ করবে তার কোন দিন ঠিকানা তাদের নিজেরই জানা নাই। চিন্তাও করে না; ২. সশস্ত্রতার কৌশল  কাজ করুক, ফল দিক আর নাই দেক,  কৌশল আগে পিছে করার কোন ইচ্ছা যাদের নাই, কিম্বা থাকলেও কিভাবে সেটা সম্ভব যা তাদের জানা নাই; ৩. রাজনৈতিক লড়াই শেষে কোন স্থিতিশীল রাষ্ট্রগঠন, দেশের অর্থনীতিকে স্বাভাবিক করে আনার লক্ষ্যে বাস্তব কৌশল নিতে যারা জানে না;  ৪. “বুর্জোয়া, পুজিবাদী” নির্বিশেষে সকলের সাথে রাজনৈতি পরিসর নির্মাণের খাতিরে কথা বলতে ও ডায়লগ করতে জানে না, ইচ্ছুক নয় এবং দরকারিও মনে করে না;  ৫.  তাদের রাজনীতির ভিতর সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থ তুলনামূলকভাবে অন্যদের চেয়েও সবচেয়ে ভাল ভাবে অন্তর্ভূক্ত এবং একমাত্র তাদের নেতৃত্বেই সেই স্বার্থ  রক্ষিত হতে পারে বলে যারা দেখাতে পারে না; ৬. সর্বোপরি সকলকে সাথে নিয়ে  রাষ্ট্রগঠন, কনষ্টিটিউশন প্রণয়ন এবং বহুবিধ দলের সাথে ইনক্লুসিভভাবে কাজ করার পরিকল্পনা এবং মানুষের মন জয় করে মানুষকে বদলানোর কাজ করতে যারা জানে না। সশস্ত্র মাওবাদী কিম্বা যে কোন সশস্ত্র শ্রেণি সংগ্রামে বিশ্বাসী রাজনীতি সম্পর্কে এটাই মানুষের বদ্ধমূল ধারণা। মাওবাদীরা নেপালে এই ছকবাঁধা বদ্ধমূল  ধারণা ভেঙ্গে ইতিবাচক সম্ভাবনার দল হিসাবে নিজেদের হাজির করতে সক্ষম হয়েছিল।

নেপালের রাজনীতিতে মাওবাদীদের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারত, আমেরিকা এবং রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলো  দিনকে দিন রাজার সাথে একসাথে ঐক্য বজায় রেখে টিকে থাকা অসম্ভব দেখছিল। এই তিন পক্ষের সঙ্গে রাজার সম্পর্ক দূরবর্তী হয়ে উঠছিল। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ হোল যখন তারা টের পেল মাওবাদী হলেও  নেপালের মাওবাদী ভিন্ন রকম। সশস্ত্র রাজনৈতিক দল সম্পর্কে যে প্রথাগত ধারণা রয়েছে নেপালি মাওবাদীরা সেই রকম নয়। বিশেষ করে সশস্ত্র রাজনীতি প্রসঙ্গে তাদের অবস্থান হল এই যে, তারা বাধ্য হয়ে সশস্ত্র হয়েছে, রাজতন্ত্রের বদলে রিপাবলিক বা জনরাষ্ট্র গড়তে রাজি হলেই তারা স্থিতিশীল রাষ্ট্রগঠন, দেশের অর্থনীতিকে স্বাভাবিক করে আনা, সশস্ত্রতা শেষ করে নিজেদেরকে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা –  সব কিছুতেই তারা আগ্রহী। তারা যে জনরাষ্ট্রীয় বা গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্রের জন্য একনিষ্ঠভাবে লড়ছে এবং বহুদলের ইনক্লুসিভ রাজনীতিতে  তাদের কোন আপত্তি নাই — এসব জানার পর ভারত, আমেরিকা ও রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলোর কাছে মাওবাদীরা নমস্য না হোক –কথা না বলা বা সংলাপ  না করবার কোন কারণ থাকে নি। আমেরিকার দিক থেকে ২০০৫-৬ সালে ওয়ার অন টেররে ব্যতিব্যস্ত থাকার সময় এটা ছিল হাতে চাঁদ পাবার মত। নইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে  ইসলামি ছাড়াও এই অঞ্চলে মাওবাদীদের দমন করবার জন্য আরেকটি ফ্রন্ট খুলবার ঝুঁকি নিতে হত।

মাওবাদীদের সশস্ত্র আন্দোলন নেপালের রাজনীতিতে গুরুত্বপুর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারক ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে সময় লেগেছিল ।  ২০০২ সালের অক্টোবরের আগে মাওবাদী এমন ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে নাই যে তাদের বাদে বাকী ভাগীদারেরা একজোট হয়ে কাজ করার সক্ষমতাকে অসম্ভব করে তুলতে পারে। অবশ্য সেসময় এক সুবিধা ছিল যে আর্মিকে মাওবাদী মোকাবোলায় নামানো হয় নাই। রেগুলার পুলিশ আর নতুন বানিয়ে নেয়া রক্ষীবাহিনীর মত প্যারামিলিটারি ‘আর্মড পুলিশ ফোর্স’ দিয়ে মাওবাদীদের মোকাবেলা করা হত। ভারত আর আমেরিকার সহযোগিতা ও উৎসাহে, আর রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলের সহযোগিতায় রাজা সহজেই চলতে পেরেছিল। কিন্তু দিনকে দিন মাওবাদীদের আক্রমণের সক্ষমতা বাড়তে থাকায়  ক্ষমতাসীনদের প্রত্যেক পক্ষই  মনে করতে থাকে যে সুনির্দিষ্ট ভাবে তাদের পরামর্শ যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে মেনে না চলার কারণে  ব্যার্থতা বাড়ছে। ফলে প্রত্যেকেই অপরের উপর অধৈর্য হয়ে উঠেছিল।

২০০১ সালের জুন ১ তারিখে রাজপরিবারে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে পারস্পরিক খুনাখুনি শেষে রাজা জ্ঞানেন্দ্র ক্ষমতা দখল করেন। তিনি নেপালী কংগ্রেসের কৈরালার বদলে একই দলের শের বাহাদুর দুবেকে প্রধানমন্ত্রী করেন। ২০০১ সালের ২৬ নভেম্বর, নতুন রাজা জ্ঞানেন্দ্র দেশ জুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন আর মাওবাদী মোকাবোলায় সারা দেশে আর্মি নামিয়ে দেন। ২০০২সালের শুরুতে আমেরিকা ১২ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেয় সেনা ট্রেনিং ও অস্ত্র সাহায্যের জন্য। মে মাসে আর্মি প্রথমবারের মত মাওবাদী চেয়ারম্যান পুস্পকমল দাহালসহ চার নেতার ছবি প্রচার করে। ২২ মে তারিখে নতুন প্রধানমন্ত্রী দুবে সংসদ ভেঙ্গে দেন যাতে বিরোধীরা সেখানে রাজার বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় না তুলতে পারেন। এককথায় বললে, এই প্রথম নতুন রাজার সাথে রাজতন্ত্রী কনষ্টিটিউশনাল দলগুলোর বিরোধ শুরু হয়। রাজা একেকবার একেক সেটকে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বানিয়ে অপরের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে থাকেন। এভাবে পরের দুবছর দুমাসে ৪টা সরকার গঠন করেন আর ভেঙ্গে দেন। তবে সবচেয়ে বড় ঘটনা হল ২০০২ সালের ৪ অক্টোবর। রাজা এদিন প্রথম রাষ্ট্রের নির্বাহি ক্ষমতাও নিজের হাতে নেন। ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে মাওবাদীদের দিক থেকে বিরাট সাফল্যের ঘটনা হল,  আর্মড পুলিশ ফোর্স এর আইজিকে হত্যা করা। মাঝের বছরগুলোতে প্রায় সময়ই মাওবাদীরা ডাক দিয়ে একক যুদ্ধবিরতি পালন করেছে, এক বা তিন মাসের জন্য। মূলত এগুলো তারা করেছে কৌশলের আগাপিছু করা, কি কারণে তাদের সশস্ত্র সংগ্রাম সেকথা জনগণকে মনে করিয়ে দেয়া, পপুলার করা। সার কথায় মনে করিয়ে দেয়া যে তারা অস্ত্র-পাগল কেউ নয়, তাদের হাতে অস্ত্র শেষ উপায় মাত্র। রাজতন্ত্র উচ্ছেদ এবং রিপাবলিকান জনগণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র  প্রণয়নের ঘোষণা দিলেই তারা অস্ত্র ত্যাগের ঘোষণা দিবে। তেমনই এক যুদ্ধবিরিতি ঐ ২০০২ সালের  আর্মড পুলিশ ফোর্স এর আইজিকে হত্যা করার পরও দেয়া হয়েছিল। কি করে যুদ্ধবিরতি পালিত হবে এর কিছু আচরণবিধিও নির্ধারিত ও স্বাক্ষর হয়েছিল মে মাসে। কিন্তু আগস্ট মাসে এসে মাওবাদী হুমকি দিয়ে জানায় যে তাদের দাবীর ব্যাপারে কোন সাড়া শব্দ না পাওয়াতে তারা একশনে ফিরে যাবে।  ২০০৩ সালের শেষাশেষি এসে দেখা যায়, ততদিনে রাজার সাথে  রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলোর বিরোধ চরমে উঠেছে। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছেন না। আমেরিকান সেক্রেটারি অব ষ্টেট ক্রিস্টিনা রাকা নেপালে এসেছিলেন  ২০ ডিসেম্বর ২০০৩, বিরোধ মিটাতে কিছু করা যায় কিনা শেষ চেষ্টা করতে। নেপালের ইংরাজী দৈনিক কাটমান্ডু পোষ্টের ২১ ডিসেম্বর সংখ্যার চারটা রিপোর্টের শিরোনাম হল,

১। Anti-king remarks intolerable: Lohani, ২। Rocca mum over US support to parties, ৩। Crisis resolution need of hour: Nepal, ৪। Exchange of intelligence required to hook Maoist leaders: Indian envoy,

প্রথমটার লোহানী হলেন রাজার আজ্ঞাবহ এক্টিং প্রধানমন্ত্রী, প্রকাশ লোহানী। তিনি একাধারে পররাষ্ট্রমন্ত্রীও। তিনি একথা বলছেন কারণ ততদিনে রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলোর ছাত্র সংগঠনগুলোও রাজাকে হাসি তামাশার পাত্র বানানো শুরু করে দিয়েছে। দ্বিতীয় খবরটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ, আমেরিকান এসিট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট ক্রিশ্চিনা রাকা এসে বিরোধ মিটাতে গিয়ে হয়রান হয়ে গেছেন। পত্রিকার রিপোর্ট বলছে এই সত্যিকার দিকটা লুকিয়ে নেপালি কংগ্রেস ও সিপিএন(ইউএমএল) মুখে বলছেন,“পরাশক্তিগুলো রাজা ও তাদের দলগুলোর ইউনিটি দেখতে চায়, গণতন্ত্রের ব্যাপারে আমেরিকা ইতিবাচক”। ওদিকে আসলে এই দল দুটো রাকাকে চেপে ধরেছে রাজার বিরুদ্ধে অজস্র অভিযোগের বাক্স খুলে। আর জবাবে হয়রান হয়ে রাকা বলছে বিশ্বাস করেন আমি মনে করি রাজা ইতিবাচক, কিন্তু সব কথা ডিপলোমেটিক কারণে আমি বলতে পারছি না। এই জবাবটা রাকা দিচ্ছেন সিপিএন(ইউএমএল) উপনেতা এন অলিকে। অলি বর্তমানে এই নেপালি সিপিএম দলের প্রধান নেতা।

আসলে পরবর্তিকালে দেখা যাচ্ছে রাকার এই সফরটা ছিল মাওবাদী বিরোধী রাজতন্ত্রীর পক্ষে ভারত-আমেরিকাসহ চার  স্টেক হোল্ডারের সর্বশেষ জোটবদ্ধ অবস্থান। কিন্তু এরপরেই পাশার দান উলটে যায়। প্রত্যেকে এরপর রাজার হাত ছেড়ে দিয়ে,  রাজাকে ত্যাগ করে, কত দ্রুত মাওবাদীদের  হাত ধরা যায়, সেই এলায়েন্স খুজতে শুরু করেছিল। রাকা ঐ সফরে এরপর পালটা রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলোকে আক্রমণ করে বলেছিল আপনাদের মধ্যে ঐক্য নাই বলেই তো  সব সমস্যা। শুধু তাই নয় উলটা রাকার  চলে যাবার পরে  রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলো যেন রাজার সাথে বিরোধে জড়িয়ে না পড়ে সেটা নিশ্চিত করবার শেষ চেষ্টা রাকা করেছিলেন। তাই রাকা মনে করিয়ে দিতে বলেছিলেন, “কারণ, তাদের বিরোধ তো আসলে কমন শত্রু মাওবাদী  বিরুদ্ধে”।    রাকার এই সফরের পর থেকেই ক্রমশ  আমেরিকার উলটা দিকে অবস্থান নেয়া শুরু হয়।

সেসময়ের ভারতীয় অবস্থান নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। ভারত সেসময় আমেরিকার সাথে রাজার পক্ষে। দিল্লি সরাসরি চেয়ারম্যান পুস্পদাহাল  ও দ্বিতীয় নেতা বাবুরাম ভট্টরায়কে গ্রেফতার করার প্রয়োজনের কথা তুলে নেপালি ইনটেলিজেন্সের উপর নিজেদের প্রভাব বাড়াবার চেষ্টা করছে। পত্রিকা রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতের রাষ্ট্রদুত শ্যামশরণ বলেছেন, চেয়ারম্যান পুস্পদাহাল  ও দ্বিতীয় নেতা বাবুরাম ভট্টরায়কে ধরার জন্য ইনটেলিজেন্স তথ্য বিনিময় দরকার। বলছেন সেজন্য দুদেশের মধ্যে গোপন তথ্য বিনিময় ও আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা দরকার। মাওবাদীদেরকে তিনি দুদেশের শত্রু হিসাবে উল্লেখ করেন। তরুণ জার্নালিস্টদের এক সভায় তিনি এসব কথা বলছিলেন।  ২১ ডিসেম্বর ২০০৩ এই দিনের পত্রিকার খবর বিস্তারিত  বললাম কারণ এরপরের ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারীর আগে পর্যন্ত প্রায় এক বছরে রাজার পক্ষে ধামাধরা রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে একেকবার একএকজনকে প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী করে কাজে লাগানোর সব সুযোগ নিঃশেষ করে ফেলে। এরপর পয়লা ফেব্রুয়ারী ২০০৫ সালে রাজা নিজেই নিজেকে  নির্বাহি ক্ষমতায় বসান। এবং জরুরি অবস্থা জারি করেন। এতে একটা জিনিষ পরিস্কার হয়, তাহল নেপালী কংগ্রেস বা কমিউনিস্ট সিপিএন-ইউএমএলের মত রাজতন্ত্রী দলগুলোর পক্ষে রাজা জ্ঞানেন্দ্রের চামচা হয়ে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী হবার যে শেষ সুযোগ ছিল সেটাও আর থাকল না। কারণ রাজা নিজেই এবার প্রধান নির্বাহী হয়ে গেছেন। অন্যদিক থেকে বললে, রাজার এই সিদ্ধান্ত রাজতন্ত্রী দলগুলোকে কনস্টিটিউশনাল নিয়মতান্ত্রিক দল হিসাবে ফাংশনাল  থাকার শর্ত ও সুযোগ নাই করে দিলেন। ফলে রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায়। ফলে ভারত এবং আমেরিকার পক্ষে আর রাজার পক্ষে সমর্থন টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে ওঠে। অন্যদিকে তুলনায় মাওবাদীরা নিজেদেরকে সকলের কাছে ব্যবহারিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে অবস্থান পরিস্কার করে ফেলে। এতে মাওবাদীদের সাথে রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলোর এলায়েন্সের কমন পয়েন্টগুলো কি হতে পারে তা স্পস্ট হয়ে যায়। এই দুই ধরণের রাজনীতির মধ্যে পুরা নিগোশিয়েশনটা কোথায় কোন পয়েন্টে হয়েছে এর সবচেয়ে প্রামাণ্য দলিল হল, এদের পারস্পরিক বুঝাবুঝির কমন দলিল – ১২ পয়েন্ট মতৈক্য। বিশেষত ওর দ্বিতীয় পয়েন্ট পড়লেই জানা যায়। সেখানে বলা হয়েছে —

“মাঠে সক্রিয় সাত বিরোধী দলীয় জোট [মাওবাদী বাদে এতদিন যারা রাজতন্ত্রী সাংবিধানিক আইনী রাজনৈতিক দল হিসাবে কাজ করত] সর্বশেষ পার্লামেন্টকে যাকে রাজা বাতিল বলে ঘোষণা করেছে তাকে আবার কার্যকর করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এবং এই সিদ্ধান্ত অর্থাৎ পার্লামেন্ট চালু হলে তা যেসব কাজ করবে তা হল, সর্বদলীয় সরকার গঠন, মাওবাদীদের সাথে ডায়লগ করে তাআদের সাথে নিয়ে একটা কনষ্টিটুয়েন্ট এসেম্বলির (রাষ্ট্র গঠন সভা) নির্বাচনের পথে অগ্রসর হওয়া। তারা মনে করে এটাই বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাত শেষ করে বেরিয়ে আসা এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার একমাত্র পথ। মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি কথা দিয়েছে দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে নিয়ে এক জাতীয় রাজনৈতিক কনভেনশন আয়োজন করবে।  সেই সভা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিভাবে হবে সে  বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে, কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলির (রাষ্ট্র গঠন সভার) সদস্য কারা হবেন তা নির্ধারণের নির্বাচন আয়োজন করবে যাতে আমাদের সকলের সম্মতিতে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করা যায়। সাত দলীয় জোট এবং সিপিএন-মাওবাদী দল এক ডায়লগে বসবে এবং পদ্ধতিগত দিকগুলো নিয়ে ঐক্যমতের পথ খুঁজে বের করবে। এই লক্ষ্য অর্জনে জনগণের ক্ষমতাই একমাত্র বিকল্প – বলে সকলে একমত হয়েছে”। [১২ দফা ঐক্যমতের দ্বিতীয় দফার হুবহু অনুবাদ]

সারমর্মে আমরা বলতে পারি নেপালের মাওবাদ থেকে শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে সশস্ত্র সংগ্রাম বিপ্লবী রাজনীতির নীতিগত দিক নয়, কৌশলগত দিক, তা নেপালের মাওবাদীরা দেখাতে পেরেছে। অর্থাৎ যা শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক ভাবে অর্জন সম্ভব সেই ভাবে তা অর্জনের কৌশল অবলম্বনে তাদের যেমন সায় আছে, আবার সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে সশস্ত্র যুদ্ধে তা আদায় করে নিতে মাওবাদীরা পিছপা নয়। তারা দেখাতে পেরেছে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে জয়ী হতে হলে রাজতন্ত্র বিরোধী সমাজের সকলকে ঐক্যবদ্ধ করা দরকার এবং নেপালি জনগণের সার্বভৌমত্ব কায়েম করবার পূর্বশর্ত হচ্ছে একটি জনপরিসর বা গণ মানুষের রাজনৈতিক ক্ষেত্র গড়ে তোলা যার মধ্য দিয়ে জনগণ তাদের দাবি দাওয়া প্রকাশ ও রাজনৈতিক বিষয়ে জানাজানির ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পায়। নেপালের বাস্তবতায় যতোটুকু সাফল্য অর্জন সম্ভব, বলা যায় তার চেয়ে অধিক সাফল্যই তারা অর্জন করেছে। আগামি দিনে নেপালের রাজনীতিতে মাওবাদীরা প্রধান দল হিসাবে থাকবে কিনা কিম্বা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কিনা তা দিয়ে মাওবাদীদের সফলতা ব্যর্থতার খতিয়ান টানা যাবে না। আজ নেপাল যেখানে এসেছে – ১. রাজতন্ত্র থেকে নেপালকে জনরাষ্ট্রে (Republic) রূপান্তরের সাফল্য, ২.স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নেপালি জনগণের মধ্যে ঐক্য, ৩. ল্যাণ্ড-লকড হবার কারনে ভারত যে ঔপনিবেশিক সুবিধা পাচ্ছে ও আদায় করে নিচ্ছে তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং সর্বোপরি জনগণের মধ্যে বিপ্লবী দীক্ষা ও চেতনার সম্প্রসারণ – ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রে মাওবাদিরা নির্ধারক ভূমিকা রেখেছে। এব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই।

ভারতের ব্যর্থ নেপাল-নীতির পরিণতি কী নির্দেশ করে

ভারতের ব্যর্থ নেপাল-নীতির পরিণতি কী নির্দেশ করে
গৌতম দাস
১০ নভেম্বর, ২০১৫

http://wp.me/p1sCvy-cG

নেপালে গত সাত বছরের মধ্যে দুই বারের কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি বা সংবিধান সভার নির্বাচন ও সভা পরিচালনা শেষে গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ নতুন কনষ্টিটিউশন গৃহীত ও প্রণয়নের কাজ সমাপ্তির ঘোষণা দিতে সক্ষম হয়। এর মধ্য দিয়ে নেপাল এক রিপাবলিক জনরাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু ভারত প্রকাশ্যেই এর বিরুদ্ধে নিজের আপত্তি অসন্তুষ্টি জানায়। কোন রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশন প্রণয়ন সমাপ্তি ও গৃহীত হবার ঘোষণা বিষয়গুলো একান্তই সে রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ নিজস্ব ব্যাপার। এটা ভিন রাষ্ট্রের আপত্তির বিষয়ই নয়।  ফলে এনিয়ে ভিন রাষ্ট্রের আপত্তির এক উদাহরণ দেখলাম আমরা।

“নিজে গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে ভারত নিঃসন্দেহে সীমা ছাড়িয়ে পা ফেলেছে, শুধু তাই নয় পড়শি ছোট দেশের উপর নিজের খায়েস চাপানোর চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ভারত বারবার যে কোন রাষ্ট্রের আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে আওয়াজ তুলে গেছে। দুর্ভাগ্যবশত এই নীতি ভারত নেপালের বেলায় প্রয়োগে ইচ্ছুক নয়” – ডিপ্লোম্যাট ৭ অক্টোবর ২০১৫।  ডিপ্লোম্যাট এশিয়া প্যাসিফিক জোনে ফোকাস করে  জাপান থেকে প্রকাশিত ওয়েব ম্যাগাজিন। এশিয়ায় আমেরিকা-জাপান মিলিত উদ্যোগে কমন ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থে পরিচালিত এক থিঙ্কট্যাংকের মন্তব্য, বিশ্লেষণ প্রকাশ করে থাকে। এতে ভারতকেও সামিল করে নেয়া হয়। নিজেদের স্বার্থের দিক থেকে মূলত চীনের বিকাশ, উত্থানকে ষ্টাডি করা  এর মূল ফোকাস। এর এডিটরিয়াল ষ্টাফদের বেশির ভাগই ভারতীয়।

তো এই ডিপ্লোম্যাট পত্রিকার পক্ষেও ভারতের নেপাল নীতি ও পদক্ষেপকে কঠিন সমালোচনা না করে থাকা সম্ভব হয় নাই। নিরবে কিন্তু কঠিন শব্দের এই মন্তব্যে ভারতের মৌলিক নীতিগত বিচ্যুতি দিক ভুলে আঙুল তুলে এটাকে “ওভারষ্টেপিং” বলা হয়েছে। ডিপ্লোম্যাটের অবস্থান ও বিশ্লেষণ খুব ইন্টারেষ্টিং। ভারতের ইন্ডায়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা দাবি করেছে, নেপালের কনষ্টিটুশন সংবিধান সভায় অনুমোদিত হয়েছে এই ঘোষণা আসার পরও ভারত সাতটা অনুচ্ছেদে পুনরায় সংশোধন আনার জন্য অফিসিয়ালি এক তালিকা হস্তান্তর করে দাবি জানিয়েছে। ভারত এতই মরিয়াভাবে  হস্তক্ষেপ করেছে। ভারত এই রিপোর্ট অস্বীকার করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে থেকে অস্বীকার করলেও বিবৃতি দিলেও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস নিজের দাবি থেকে এক চুলও পিছু হটে নাই।

নতুন নেপাল রাষ্ট্র বৈশিষ্ঠের দিক থেকে সাত প্রদেশে বিভক্ত এক ফেডারল কাঠামোর রাষ্ট্র। যদিও প্রদেশগুলোর সীমানা বিষয়ক বিতর্ক এখন জারি আছে, তা টানার কাজ এখনও চূড়ান্ত করা হয় নাই, হবে। কিন্তু এটা নিয়ে নেপাল-ভারত সীমান্তের মাধোসি (Madhesi) ও তরাই সমতলি অঞ্চলের বাসিন্দাদের অসন্তোষকে উস্কে দিয়ে যেন কনষ্টিটিউশন প্রনয়নের কাজ সমাপ্ত হয় নাই – এবং হয় নাই বলার ভিতর দিয়ে নেপালের রাষ্ট্রগঠন ও ক্ষমতা তৈরিতে ভারতের এক ভাগীদার বা স্টেক আছে তাই সে প্রমাণ রাখতে চেয়েছে। নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের (মিলিত আসন সংখ্যা ৮৪%) এদের অভিযোগ ভারত মাধোসি ও তরাইদের মধ্যে অসন্তোষ ও উস্কানি ছড়াচ্ছে। পরিশেষে ভারত নেপালের বিরুদ্ধে অঘোষিত ভাবে বাস্তবে কার্যকর এক অবরোধ আরোপ করেছে। ল্যান্ড-লকড নেপাল, পণ্য চলাচলের দিক থেকে যা সম্পুর্ণত ভারতের উপর নির্ভরশীল, বিশেষত তেল-গ্যাস জ্বালানীর সরবরাহের দিক থেকে ১০০ ভাগ নির্ভরশীল নেপালের উপর এই অবরোধ আরোপ করে ভারতের নেপাল উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ কত গভীর তা জাহির করতে গিয়েছিল। একথা ঠিক যে অবরোধের প্রথম ৪২ দিন ধরে নেপালের প্রতিটা নাগরিক তা হারে হারে নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছিল যে ভারতের কত শক্তি । তবে ভারতের এই শক্তির ব্যবহার নেপালীদের কাছে অত্যাচারীর নির্যাতনকারির হিসাবেই হাজির হয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ার এতে ভারতের প্রাপ্তি পুরা জনগোষ্ঠির বদ-দোয়া। নেপালের জনগণ আশা করে না যে ভারত তাদের বসিয়ে খাওয়াবে। আবার এটাও আশা করে না যে ভারত তাদের স্বাভাবিক জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে।

প্রকৃতির নিয়ম কোন জায়গা খালি থাকে না। ফলে ভারত নেপালকে জ্বালানি সরবরাহ না দিয়ে মারবে এই সিদ্ধান্ত খোদ ভারতের জন্যই বিশাল বিপদ হয়ে হাজির হতে বেশি সময় লাগে নাই। জ্বালানি সরবরাহ-হীন পরিস্থিতি নেপালকে মরিয়া হয়ে বিকল্পের সন্ধানে নামতে বাধ্য করেছিল। গত সপ্তাহ ০২ নভেম্বর থেকে ভারতের মিডিয়ার মনে পড়েছিল যে ট্রাডিশনালি ভারত নেপালের একমাত্র জ্বালানীদাতা, যা এখন আর নয়। সে জায়গা পুরণে এখন চীন হাজির হয়ে গেছে। ভারতের মিডিয়া শিরোণাম এখন এই হারানোর ব্যাথা প্রকাশ করা শুরু করে দিয়েছে। ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া শিরোনাম করে লিখেছিল, “চীন নেপালে তেল সরবরাহ পাঠানো শুরু করে দিয়েছে, ভারতের একচেটিয়া সরবরাহকারির ভুমিকা হারাল”।

নেপাল ভুখন্ড পুব-পশ্চিম দিক করে বিস্তৃত যার পুরা দক্ষিণ সীমান্ত জুড়ে আছে ভারত। আর ঠিক একইভাবে উত্তর সীমান্ত জুড়ে আছে চীন। নেপালের উত্তর দিক  দক্ষিণ দিকের চেয়ে আরও বেশি উচু পাহাড়ি, সমুদ্রের খবর দক্ষিণ দিকের চেয়ে উত্তর সীমান্ত দিকে আরও বেশি দূরে। এছাড়া ট্রাডিশনালি ভারতের সাথে ও দিক থেকে নেপালের বহিঃবাণিজ্যের আনা-নেওয়া চালু বেশি। এবারের ভারতের নেপাল অবরোধ বিপরীত ফল বয়ে আনতে শুরু করেছিল, ভারতের একচেটিয়ার অবসান ঘটাতে যাচ্ছে তা। নেপাল-চীনের সীমান্তে চলাচলের রাস্তা ও সড়ক কাস্টম দুয়ার চার স্থানে। এর মধ্যে সবচেয়ে চালু ও যোগাযোগ সুবিধাজনক “তাতোপানি” এবং “কেরুঙ” স্থল সীমান্ত। গত ভুমিকম্পে দুটা সীমান্তেই পাহাড়ের পাথর ধ্বস নেমে পুরা রাস্তা ব্লক হয়ে গিয়েছিল। জরুরি ভিত্তিতে তা পরিস্কার করে রাস্তা উন্মুক্ত করা হয়েছে এখন। জ্বালানী তেল সরবরাহের চুক্তি নিয়ে কথা চলছে, চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। দর আর বিস্তারিত বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। এর আগে শুভেচ্ছা স্বরূপ অনুদান হিসাবে ১০০০ টন জ্বালানীর চালান আসা শুরু হয়ে গেছে গত ১ নভেম্বর থেকে। নেপালের মোট চাহিদার কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ নেপাল চীন থেকে আমদানির স্থায়ী চুক্তি করতে চায়। এই অবস্থা দেখে ভারতের মিডিয়ার সুর নরম ও হতাশার। নেপালকে চাপ দিয়ে ধরার অস্ত্র ভোতা অকেজো হয়েছে দেখে এখন উলটা তা ভারতের উপর চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করেছে বলে। ভারতের ভুল নেপাল নীতি এখন সকলের কাছে পরিস্কার হতে শুরু করেছে। ফলে নেপালকে চীনের দিকে নিজেরাই ঠেলে দিয়েছে বলে ভারতীয় মিডিয়ায় এখন আত্মসমালোচনা শুরু হয়ে গেছে। এই অবস্থায় প্রতিযোগিতা অনুভব করে, দোষ কিছু কাটাতে ভারত কিছু কিছু সীমান্ত অবরোধ শিথিল করে তেল ট্যাঙ্কার নেপাল প্রবেশ করতে দেয়া শুরু হয়েছে।
সার করে বললে, ভারতের চাপের কৌশল ভাঙতে, অকেজো করতে নেপাল সরকার সফল হয়েছে। স্বভাবতই এখন ক্রমশ তা বাকি পণ্যে অবরোধ দুর্বল হতে থাকবে।
এই প্রেক্ষিতে ভারতের নেপাল নীতিতে যে সুরে পরিচালিত এর প্রাপ্তি কী তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে । ফলাফল ও ভবিষ্যত নিয়েও মুল্যায়ন শুরু হয়েছে।

ভারতের দিক থেকে ভারত-নেপালের সম্পর্ককে শুরু থেকেই এপর্যন্ত কলোনি অধস্তন সম্পর্ক হিসাবে দেখা হয়েছিল। ভারত সেখানে দাতা বড় ভাই। শুরু থেকে মানে ১৯৫০ সালের ৩১ জুলাই মাসে স্বাক্ষরিত ভারত-নেপাল শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের সময় থেকে। ভারতের বিরুদ্ধে এমন এক অভিযোগ করে কথা শুরু করতে হল কারণ এই চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল পুরানা আগের চুক্তির ধারাবাহিকতায়। আগের কলোনি মাস্টার বৃটিশ-ইন্ডিয়া ও নেপাল সরকারের মধ্যকার চুক্তির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার প্রয়োজনে। কলোনী মাস্টারের সাথে নেপালের রাজার সর্বশেষ চুক্তিটা স্বাক্ষর হয়েছিল ১৯২৩ সালে, যেখানে ঐ চুক্তির কার্যকারিতা সমাপ্তির তারিখ উল্লেখ করা ছিল ৩১ জুলাই ১৯৫০। সেকারণেই স্বাধীন ভারতের নেহেরু ও নেপালের রানা রাজবংশে রাজার মধ্যে ঐ ৩১ জুলাই ১৯৫০ তারিখেই নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে ভারতের সাথে নেপালকে চুক্তি করতে হবেই কেন? বাধ্যবাধকতাটা কোথায়? আর এটা আসলে কীসের বা কী বিষয়ক চুক্তি? সংক্ষেপে এর জবাব হল, পুরান কাল থেকেই নেপাল এক ল্যান্ড-লক ভুখন্ড; অর্থাৎ এভুখন্ড সমুদ্র যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, নেপালকে অন্য রাষ্ট্রের ভুমি মাড়িয়ে তবে সমুদ্রের নাগাল পেতে হয়। একমাত্র এভাবেই দুনিয়ার তৃতীয় যে কোন দেশের সাথে নেপালের বৈদেশিক বাণিজ্য বিনিময় সম্ভব হয়। ফলে বৃটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমল থেকেই ভারতের ভুমি ব্যবহার করে নেপালকে বৈদেশিক বাণিজ্য বিনিময় চালু রাখতে হয়েছে। আর তাই এই প্রয়োজনে সবসময়ই নেপালকে ভারতের সাথে ভুমি ব্যবহারের চুক্তির উপর নির্ভর করে, হাত জোর করে থাকতে হয়েছে। নির্ভর মানে আক্ষরিক অর্থেই বিষয়টা শুরু থেকেই সবসময় ভারতের ইচ্ছাধীন থেকেছে। প্রত্যেকবার চুক্তির ভারসাম্য ভারতের পক্ষে থেকেছে, এমন শর্ত লিখে চুক্তি করতে হয়েছে যেন নেপাল সমুদ্র বদরে প্রবেশ পেতে বিনিময়ে পুরা দেশ দাসখত হিসাবে লিখে দিয়েছে। বৃটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমলে প্রথম চুক্তি হয়েছিল ১৮১৬ সালে (Treaty of Sugauli 1816)। সে সময় এই চুক্তি করা হয়েছিল নেপালের এক তৃতীয়াংশ ভূমি বৃটিশ-ভারত কলোনী মাস্টারকে দিয়ে দেয়ার বিনিময়ে। বৃটিশ রাজ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে সদয় সন্তুষ্ট হয়েই তুলনামূলক ছাড় দেয়া এক নতুন চুক্তি করেছিল ১৯২৩ সালে। সে চুক্তির পঞ্চম দফাতেও লেখা ছিল নেপাল সরকার অস্ত্র-শস্ত্রসহ সবকিছুই আমদানী করতে পারবে (“British Government is satisfied that the intentions of the Nepal Government are friendly”) যতক্ষণ বৃটিশ সরকার সন্দেহাতীতভাবে সন্তুষ্ট থাকবে। কিন্তু কী হলে বা বৃটিশ সরকার কীসে সন্তুষ্ট হবে এর কোন তালিকা বা তাল ঠিকানা দেয়া হয় নাই। অথবা সুনির্দিষ্ট করে কোন তালিকা করে কখনও বলা হয় নাই যে কী কী জিনিষ নেপাল আমদানী করতে পারবে। অর্থাৎ কিছুই স্পষ্ট করে উল্লেখ না করে পুরা ব্যাপারটা বৃটিশ সরকারের খেয়ালী ইচ্ছাধীন করে রাখা হয়েছিল।

কেন এরকম করে রাখা হয়েছিল, রাখতে পারে কী না – এমন প্রশ্ন করার সুযোগ ঐকালে ছিল না। অন্য রাষ্ট্রকে দখল করে কলোনি দাস বানিয়ে রাখা অন্যায় – এমন কোন আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন বলতে কোন কিছু ১৯৪৪-৪৫ সালে জাতিসংঘ গঠিত হবার আগে দুনিয়াতে ছিল না। ফলে বরং কলোনি দখলের পক্ষে এক ধরণের জোর-যার এর সাফাই এর ইঙ্গিত তখন কাজ করত। কিন্তু জাতিসংঘ গঠিত হয়েছিল আটলান্টা চার্টার চুক্তির উপর ভর করে। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ও আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মধ্যে ১৯৪১ সালে ঐ চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। “দুনিয়ায়ে আর কলোনী শাসন চলবে না” – ঠিক এমন ভাষায় না লিখে তবে কলোনী শব্দটা এড়িয়ে আটলান্টা চুক্তির সার কথাটাই ছিল। লিখা হয়েছিল “প্রত্যেক জনগোষ্ঠী নিজের ইচ্ছাধীনের সরকার গঠন, কার অধীনে থাকবে তা নির্ধারণের সার্বভৌমত্ত্ব অধিকার থাকবে”– এই ভাষায়। অর্থাৎ যুদ্ধশেষে জাতিসংঘ গঠন হয়ে যাবার পরে যে কলোনি দখল ও শাসন বেআইনি ও নিন্দনীয় হয়ে যাবে সেটা বুঝা যাচ্ছিল। হয়েছিলও তাই।
কিন্তু তা সত্ত্বেও নেহেরুর ভারত ১৯৫০ সালে আগের কলোনী বৃটিশের অধীনস্ততা চুক্তিটাকেই রাস্তা দেখিয়ে দেয়া মডেল মনে করে, ধরে নিয়ে নেপাল-ভারতের মধ্যে নতুন আর এক দাসখত চুক্তি করেছিল।
দাসখত বলছি এজন্য যে ১৯২৩ সালের চুক্তিতে  তাল ঠিকানাহীন বৃটিশ সরকারের “সন্তুষ্টির” উপর দাড় করানো হয়েছিল। আর ১৯৫০ সালের চুক্তিতে দশ দফা শর্তের পঞ্চম দফায় সন্তুষ্টি কথাটা সরিয়ে আরও অস্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কী শর্তে নেপাল অস্ত্র-শস্ত্র আনতে পারবে তার প্রক্রিয়া কী হবে তা চুক্তির বাইরে কেস টু কেস ভিত্তিতে পরবর্তিতে দু সরকার বসে ঠিক করবে। এছাড়া ষষ্ঠ দফায় নেপালে ভারতীয় ব্যবসায়ীদেরকে নেপালী নাগরিকের মতই সমান সুযোগ সুবিধা দেয়ার শর্ত আরোপ করা হয়। আর সপ্তম দফায় ভারতে নেপালীরা বসবাস, সম্পত্তির মালিক হওয়া, ব্যবসা করা, চলাচল ইত্যাদির সুবিধা পাবে বলে এর “রেসিপ্রোকাল” বা পালটা নেপালে ভারতীয়দেরও একই সুবিধা দেয়ার শর্ত রাখা হয়। েটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সুবিধা দেয়া আর তা নিতে পারা বা কাজে লাগানোর মধ্যে বিরাট ফারাক আছে। মূলত নেপালের অর্থনীতির ক্ষমতা ও সাইজ ভারতের তুলনায় নস্যি বলে শেষের ষষ্ঠ ও সপ্তম দফার মাধ্যমে রেসিপ্রোকাল সুবিধার কথা বললেও এর সুবিধা নিবার যোগ্যতার দিক থেকে ভারতীয়রাই এগিয়ে থাকবে, ভারতের ব্যবসায়ীরাই তা নিবার যোগ্য হবে। নেপালীরা পারবে না। ফলে কার্যত এটা বিরাট অসাম্য।  ফলে এই ছলে কৌশলে চুক্তিটাকে ভারতের পক্ষে কান্নি মারা ভাবে হাজির করা হয়েছে। এই কারণে ১৯৫০ সালে স্বাধীন ভারতে নেহেরুর করা চুক্তিটাকেও নতুন ধরনের এক কলোনি চুক্তি বলা যায়।
নেপালের দিক থেকে আইডিয়াল চুক্তি হতে পারে, নেপালকে সবকিছুই বাধাহীন আমদানি করতে দিবার বিনিময়ে ভারত বিনিময়ে ঠিক কি চায়, কী শর্তপূরণে তা দিতে চায় এর মধ্যে কোন অস্পষ্টতা না রাখা, ভারতের খেয়ালের উপর ছেড়ে না দেওয়া, সন্তুষ্টি-জাতীয় আবছা নন-কমিটনেন্টের শব্দ এড়ানো সঠিক উপায় হতে পারে। এছাড়া ভারতের দেয়া বিনিময় শর্তের ইকোনমিক মূল্য কত তা যাচাই করা এবং শর্তের পক্ষে ভারতের ন্যায্যতা কী তা শুনতে চাইতে হবে। যেমন ভারতে ব্যবসা করার সুযোগ নেপালীদের দরকার নাই। নেপালের দরকার সমুদ্রে প্রবেশের অধিকার। অথচ এটাকে কি যুক্তি র‍্যাশনালিতে ষষ্ঠ ও সপ্তম দফা হাজির করা হয়েছে তা অস্পষ্ট।
ভারতের দিক থেকে বললে প্রথমত, বৃটিশ উপনিবেশিক বাস্তবতায় সেকালে নেপালের সঙ্গে চুক্তিতে কলোনী দাসখতের বিষয়াদি থাকবে হয়ত এটা স্বাভাবিক।  কিন্তু সে চুক্তি ভারতের সাথে সম্পন্ন হবার কালে তখন বাস্তবতা ভিন্ন। কলোনি শাসন ইতোমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে ভারতের পুরান বৃটিশ চুক্তিটাকে অনুসরণ করার কোন কারণ নাই। এটা ভালোমানুষি প্রশ্ন নয়। রাষ্ট্রস্বার্থ ভালমানুষির কাজ বা বিষয় নয়। বিষয়টা হল, পুরাণ বৃটিশ-নেপাল চুক্তিটাকে অনুসরণ করা মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে দুনিয়াটা নতুন কী আকার নিল – এর সম্মক উপলব্দি করতে কোন বোধবুদ্ধি না থাকার প্রমাণ। দুনিয়ার এই পরিবর্তনের এর বৈশিষ্ঠসূচক দিক গুলো আঙ্গুলে গুণে নোট নিতে অক্ষমতার প্রমাণ রাখা। যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে দুনিয়াটা দেখতে কেমন হবে – ইমাজিন করে কল্পনায় একে দেখতে রুজভেল্ট চেয়েছিলেন যে, আগের কলোনি ধরণের দখল ও শাসনের কারণে বিশ্ববাণিজ্য বিনিময় খুবই সীমিত পর্যায়ে রয়ে গেলে। কলোনি সম্পর্কের উচ্ছেদ ঘটিয়ে রুজভেল্ট ব্যাপকতর বিশ্ববাণিজ্য বিনিময়, পণ্য ও পুঁজি চলাচলের এক নতুন দুনিয়া দেখতে চেয়েছিলেন। মূল এই বিষয়টা অর্থনের লক্ষ্য তিনি মেপে প্রতিটা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তবে শুরুর ইমাজিনেশন সবসময় ও সবটা পরবর্তিতে বাস্তবে হাজির হয় না। কিন্তু কলোনি সম্পর্ক উচ্ছেদের বিষয়টার ক্ষেত্রে তা হয়েছিল। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠানও অনেক সীমাবদ্ধতা, অকেজো, ঠুঠো হয়ে থাকা, কান্নি মেরে থাকা সত্ত্বেও অনেক আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, নর্মস হাজির করতে পেরেছে। শুধু তাই না ল্যান্ড লকড রাষ্ট্রগুলোর তৃতীয় রাষ্ট্র মাড়িয়ে সমুদ্রে প্রবেশ বিষয়টাকে কতগুলো বিশেষ আগাম শর্তে রাষ্ট্রগুলোর অধিকার হিসাবে আন্তর্জাতিক কনভেনশন ডেকে স্বীকৃতি দিবার পক্ষে এখন কাজ চলছে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের সদস্য এমন ৩১টা ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্র এই উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের আঙ্কটার্ডের অধীনে সমবেত হয়েছে। ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষার্থে তাদেরকে যেন পড়শী রাষ্ট্রের কলোনি-খায়েশের খোরাক না হতে হয় এর জন্য আইন কনভেনশন আনা – এটার এর মূল উদ্দেশ্য। এসব থেকে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রস্বার্থ বিষয়ক আন্তর্জাতিক চিন্তা প্রকৃতির সাধারণ অভিমুখকে চিনিয়ে নেয়া সম্ভব। এবং বলা যায়, দুনিয়া অন্তত আর কলোনি দখল ও শাসনকে আইনি ন্যায্যতা দিবে না। এমনকি ল্যান্ড-লকড বলে পড়শীর কলোনি-খায়েশের শিকার না হতে হয়, সমুদ্র পর্যন্ত প্রবেশ যেন তারও অধিকার হিসাবে দেখা হয় সে চেষ্টা এখন চলছে।
কাজেই নেহেরু পুরান কলোনিচুক্তি সুত্রে নেপালের উপর আবার কলোনি চুক্তি চাপিয়ে দিবার সুযোগ পাওয়া গেছিল বলেই তা নিতে হবে, নিয়েছেন সেটা কোন দুরদৃষ্টিসম্পন্ন কাজের কথা নয়। এছাড়া, কলোনি সম্পর্কের বিরোধীতা প্রত্যেক জনগোষ্ঠির কাছে একটা নীতিগত ইস্যু। নিশ্চয় ভারতের বেলায় বৃটিশদের কলোনি খায়েশ খারাপ আর নেপালের বেলায় ভারতের কলোনি খায়েশ ভাল – এটা কোন নীতিগত অবস্থান হতে পারে না। তবে আবার একথাও ঠিক যে কোন রাষ্ট্রেরই পড়শী রাষ্ট্রের ভিতর নিজের স্বার্থ দেখতে পাওয়া দোষের নয়। কিন্তু তা পাবার চেষ্টা করতে হবে আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশন এসবের সীমা বজায় রেখে। আর সবচেয়ে ভাল হবে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের ততপরতায় বল প্রয়োগে পাবার পথে না হেঁটে এর বিপরীতে সদিচ্ছায় পড়শি নাগরিকের মন জয় ক্তে হবে দেয়া-নেয়ার বিনিময় ও বাণিজ্যের মাধ্যমে।

বিগত ষাট বছরে ভারতের কূটনীতি চেয়েছে পরিচালিত হয়েছে নেপালে একটা বশংবদ দল ও নেতা তৈরি করে পুরান বৃটিশ কলোনি পথে নেপালকে নিজের অধীনে রেখে নিজের স্বার্থ আদায় করা। আজ নেপালে দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক দল্গুলো ভারতের হাত থেকে এক এক করে সবাই হাতছুটে চলে গেছে। সব হারিয়ে নেপালের একমাত্র মাধোশি-তরাই জনগোষ্ঠিই ভারতের ভরসা। ভারতের নীতির ভুলে অবস্থা এমন যায়গায় পৌচেছে যে নেপালী কংগ্রেসের পক্ষেও আজ নেপালে বসে ভারতের পক্ষে থাকা কথা বলার সুযোগ ভারতই রাখেনি। কারণ পুরা নেপাল আজ ভারত-বিরোধী হয়ে গেছে। অথচ বিগত ষাট বছরে রাজা ও নেপালী কংগ্রেসের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ভারত খেদমত পেয়েছে। রাজনীতি ও রাষ্ট্রস্বার্থ বিষয়ে আইন কনভেনশনের রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ক গ্লোবাল ট্রেন্ড বুঝবার ক্ষেত্রে ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা যে নাদানিতে আছে এব্যাপারে নেপাল একটা ভাল উদাহরণ। রাষ্ট্র হিসাবে এদের কাছে এমন মডেল হল বৃটিশ কলোনি এমপায়ার। অথচ একালটা  আর এমপায়ার হওয়ার না। না হয়েও বহু কিছু ভোগ অর্জন করা সম্ভব। বল থাকলেই বড়ভাই সেজে, ক্ষমতা দেখিয়ে তা ব্যবহার করতে হবে এই পথে সব কিছু আদায় করতে হবে – এটা খুবই আনকুথ একটা কাজ। এভাবেই আদায় করতে হবে এটা খুব কাজের কথা নয়।
ইতিহাস স্বাক্ষী নেপালের বিরাট তাতপর্যপুর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ ও একটা রিপাবলিক রাষ্ট্রের পক্ষে নেপালের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সমবেত করে দেবার ক্ষেত্রে ভারতের ইতিবাচক ভুমিকা নির্ধারক ও অনুঘটকের এবং এক ইন্টারলকেটর হোস্ট এর। এমনকি আমেরিকার পক্ষেও ইতিবাচক ভুমিকা রাখা সম্ভব ও সহজ হত না ভারতের এমন ভুমিকা না নিলে। তাহলে এটা আজ জ্বলজ্বল করা প্রশ্ন সেই ভারতকে আজ নেপালের মূলধারার তিনসহ সব রাজনৈতিক দল বাদ একমাত্র ভরসা নাম ও যোগ্যতাহীন মাধোসী কেন? মাধোসি যারা নিজেদেরই এখনও কোন পরিপক্ক রাজনৈতিক শক্তি নয়, নেপালের রাজনৈতিক ক্ষমতা গঠনে গোনায় ধরে এমন স্টেকহোল্ডার মাধোসিরা কেউ নয়, হয়ে উঠতে পারে নাই। তাহলে কী বুঝে ২০০৫ সালে ভারত নিজের কোন স্বার্থের কথা ভেবে নেপালের রাজনীতিতে ভুমিকা রাখতে গিয়েছিল? অথচ প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের ভারতের বড় প্রভাব রাখার সুযোগ কী সে সময়টাতেই ছিল না! নেপালে ভারতের যা জেনুইন স্বার্থ তা খোলাখুলি সৎ ভাবে এই দলগুলোর সাথে আলাপ করতে পারত। না কোন চুক্তির পুর্বশর্ত হাজির করার জন্য নয়। সে হিসাবে না। উদ্দেশ্য হত ভারতের জেনুইন স্বার্থ প্রসঙ্গে নেপালি রাজনীতিবিদদেরকে স্পষ্ট ধারণা দিয়ে রাখা। আগানোর এপ্রোচের ধরণ দেখে মনে হয় না ভারত এমনভাবে ভেবেছে। বরং আমরা দেখি ভারত সব সময় বশংবদ নেপালি রাজনৈতিক দল পালা-পুষে আগানোর পথে হেটেছে। চিন্তার এই ধারাটাই উপনিবেশিক ও পশ্চাতপদ। ফলে অযোগ্যতা। এই প্রশ্ন উঠছে তাহলে ভারত নেপালি কংগ্রেস আর দুই কমিউনিষ্ট পার্টিকে – প্রধান এই তিন দলকে কেন সাহায্য করেছিল, কী বুঝে করেছিল?
এটাই কী ভারতের রাজনীতিক, আমলা-গোয়েন্দাদের যোগ্যতার সঙ্কটের ইঙ্গিত নয়! এটা অবিশ্বাস্য যে ভারত ২০০৫ সালে নেপালকে আজকের নেপাল হতে নির্ধারক ভুমিকা রেখেছিল সেই তারা আজ নেপালের ধুলায় গড়াগড়ি যাওয়া ভিলেন কেন হবে? চিন্তার অযোগ্যতার পরিণতি এমন করুণই হয়!

[লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়া দিগন্ত ০৮ নভেম্বর ২০১৫ সংখ্যায়। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও সম্পাদনার পর ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

“জঙ্গীবাদের” মূল হোতা নাকি সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও এরশাদ

“জঙ্গীবাদের মূল হোতা সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও এরশাদ”
গৌতম দাস
০৫ নভেম্বর, ২০১৫

http://wp.me/p1sCvy-cx

পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর, একাডেমিক চর্চায় নিয়োজিত গবেষক এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বলে দাবিকারি ব্যক্তি, তাঁর পক্ষে কি – মিথ্যা প্রপাগান্ডা করা সাজে, না এটা তাঁর কাজ হতে পারে? কিন্তু তাই ঘটেছে। এখানে,এই লেখার মূল প্রসঙ্গ এবং উদ্দেশ্য, বাংলাদেশে নিশ্চিতভাবে আইএস এসে গেছে বা অথবা আছে কি নাই মোটেই তা নয়। তবে আছে এবং নাই বলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে যার যার স্বার্থে নিজের মাছ ভেজে নেবার মত বহু পক্ষ তৎপর হয়েছে তাই দেখা যাচ্ছে – এটাই এখানে বলবার, দেখাবার চেষ্টা করব।

প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খান গত ২৮ অক্টোবর ২০১৫, দুজন নিরাপত্তা বিশ্লেষকের দুটো সাক্ষাতকার নিয়ে ছেপেছেন। বাংলাদেশে আইএস এসেছে আর আসে নাই – এই দুইয়ের তর্কের মধ্যে এই সাক্ষাতকার গ্রহণ বেশ তাৎপর্যপুর্ণ। দুই দেশের দুই নিরাপত্তা বিশ্লেষক – ঢাকার মেজর জেনারেল (অব.) মুনিরুজ্জামান এবং জার্মান হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক ড.সিগফ্রিড ও.উলফ, এমন দুইজনের দেয়া এই দুই সাক্ষাৎকার। তবে এটা আবার প্রথম আলোর দ্বিতীয় উদ্যোগ। কারণ প্রথমবার একই ভাবে এই দুই সাক্ষাৎকারদাতার প্রথম জোড়া সাক্ষাৎকার এর আগে প্রথম আলো ছেপেছিল এক মাস আগে, গত ০১ অক্টোবর ২০১৫। কিন্তু প্রথম আলো কেন বারবার সিগফ্রিড উলফকে পছন্দ করেছেন তা তারাই ভাল বলতে পারবে। এখানে লেখার প্রসঙ্গ কথিত জর্মন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সিগফ্রিড ও.উলফ ( Dr. Siegfried O. Wolf) কে নিয়ে।

ঠিক একমাস আগে তার প্রথম সাক্ষাতকার ছাপা হয়। সেই সময় থেকেই দ্বিতীয় সাক্ষাতকার পর্যন্ত তিনি একের পর এক মারাত্মক সব আপত্তিকর মন্তব্য করে গিয়েছেন।

যেমন, প্রথমবারে তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশের এই জঙ্গিবাদের মূল হোতা হলেন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এইচ এম এরশাদ”। দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাবে বলা প্রথম বাক্য দেখুন। বলা বাহুল্য গত সাত বছরের হাসিনা-ইনুর বাংলাদেশে “জঙ্গীবাদ” শব্দটার বিশেষ অর্থ হয়েছে, আছে। যদিও দুনিয়াতে আলকায়েদা ফেনোমেনা উত্থানের সাথে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো এই ফেনোমেনাকে চিনাতে টেররিজম শব্দের চল শুরু হয়। আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০০১ সালের আগে কেউ জঙ্গীবাদ শব্দটা আজকের মত নেতি অর্থে ব্যবহার করেনি বা ব্যবহৃত হতে দেখেনি। ফলে জিয়া অথবা এরশাদের শাসন আমলেও তাদের স্ব স্ব ক্ষমতার বিরোধীদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগকারি ছিল স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু এদের চরম বিরোধী কেউ সেকালে এদের বিরুদ্ধে “জঙ্গীবাদ” বা “এরা জঙ্গী” এমন অভিযোগ তুলে নাই। এমনকি সেকালের কমিউনিষ্টরাও তুলে নাই। কারণ আগেই বলেছি ২০০০ সালের আগে বাংলাদেশের রাজনীতিতে য়াজকের মত নেতি ও বিশেষ অর্থে জঙ্গীবাদ শব্দটা কেউ ব্যবহার করে নাই বা হতে দেখে নাই। জাসদের “জঙ্গী মিছিলের” কথা শুনেছি, তারা নিজেরাই নিজেদের অগ্রসর লড়াকু ও নির্ধারক মনোবল বুঝাতে ইতিবাচক অর্থে শব্দটা ব্যবহার করত।
তাই এককথায় বললে, জিয়া এবং এরশাদ “জঙ্গীবাদের হোতা” একালে এমন কথা বললে বিশেষত যখন পশ্চিমের চোখে “জঙ্গীবাদ” শব্দের বিশেষ অর্থ সর্বত্র আছে – তখন তা অ-ঐতিহাসিক। এটা ইতিহাসে জবরদস্তিতে আরোপ করে বলা কথা ও চাপিয়ে দেয়া একটা দাবি। ২০০১ সালে প্রচলিত একটা শব্দ কোন ভাবেই আগের ইতিহাসে জিয়ার আমলে (১৯৭৫-৮১) ব্যবহৃত হতে পারে না, সম্ভব নয়।
আলকায়েদা ফেনোমেনাকে বুঝাতে ও নেতিবাচক চিহ্নে চিহ্নিত করতে ২০০১ সালে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলোর চালু নতুন শব্দ হল টেরর বা টেররিজম। এরই বাংলা করা হয়েছে জঙ্গীবাদ। কিন্তু এর আগে এমনিতে কমিউনিষ্ট লিটারেচারে, বা রাশিয়া থেকে প্রকাশিত প্রচার পুস্তকে টেরর শব্দটা ইতিবাচক ও কাম্য অর্থে ব্যবহৃত হত। ফলে তা একই ভাবে প্রগতিশীল মহলেও পছন্দের ছিল। সুর্যসেনদের মত সন্ত্রাসবাদী গ্রুপ “অনুশীলন” ও “যুগান্তর” – এর যোদ্ধাদের ততপরতাকে সমাজ ইতিবাচক ভাবেই দেখত, দেখান হত। ফলে সে সময় থেকেই ত্রাস, সন্ত্রাস বা সন্ত্রাসবাদ ইত্যাদি শব্দগুলো আমাদের সমাজে ইতিবাচক অর্থেই ব্যবহৃত হত। আর সর্বশেষ গত সাত বছরে হাসিনা-ইনুর আমলে “জঙ্গীবাদ” শব্দটা একটা ঘৃণিত অর্থ বুঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে, বিশেষত যারা হাসিনার রাজনীতির ঘোর বিরোধী তাদের গায়ে কালিমা আরোপের জন্য। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি – এটাও ২০০৮ সালের আগে এমন ছিল না। অতএব জিয়া ও এরশাদের বিরুদ্ধে অনেকের অনেক জেনুইন অভিযোগ থাকতে পারে কিন্তু তাঁরা “বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের মূল হোতা” – এটা মিথ্যা, অবাস্তব কথা। এমনকি জিয়ার আমলের জিয়ার বিরুদ্ধে আওয়ামী-প্রগতিশীলদের অনেক অভিযোগ থাকলেও কোন কমিউনিষ্ট দল বা খোদ আওয়ামি লীগের জিয়ার বিরুদ্ধে “জঙ্গীবাদের হোতা” বলে অভিযোগ তুলেন নাই।

২। ঐ একই সাক্ষাতকারে জর্মন সিগফ্রিড ঢাকায় ইতালির এনজিও কর্মী সিজার তাবেলার হত্যাকাণ্ড বিষয়ে মন্তব্য করে বলেছেন, “প্রতীয়মান হচ্ছে যে এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে আইএস বাংলাদেশে প্রথম আক্রমণের সূচনা ঘটাল”। কিন্তু “এই হত্যাকাণ্ড আইএস করেছে” কোথা থেকে এই তথ্য তিনি নিশ্চিত হলেন সে সম্পর্কে কোথাও কোন রেফারেন্স তিনি দেন নাই। ইতালীয় নাগরিক খুন হন ২৮ সেপ্টেম্বর আর সিগফ্রিডের ঐ সাক্ষাতকার ছাপা হয়েছিল ১ অক্টোবর – অর্থাৎ সাক্ষাতকার দিয়েছেন ধরে দিচ্ছি আগের দিন মানে ৩০ সেপ্টেম্বর। অর্থাৎ তাবেলা হত্যার মাত্র একদিন পরেই এটা সিগফ্রিডের রেফারেন্স ছাড়া এক মনগড়া দাবি। বুঝা যাচ্ছে তিনি বিরাট গুণীন লোক! গুণে বলে দিতে পারেন!  আজ এক মাস পরেও যেখানে নিশ্চিত করে দেশি-বিদেশি সরকার কেউই বলতে পারছে না কে খুন করেছে সেখানে সিগফ্রিড খুনের একদিনে পরের তাৎক্ষণিক সাক্ষাতকারে তা আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে এটা আইএস। আমরা দেখছি, একজন গবেষক বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক লোক, এধরণের ফালতু প্রপাগান্ডায় সামিল হয়ে পড়েছেন।

৩। আঁতেল সিগফ্রিড এরপর বলছেন, “সালাফি মতবাদে বিশ্বাসী আইএস কিন্তু গভীরভাবে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীর আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট”। কিন্তু তিনি “সালাফি মতবাদ” বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছেন তা আমাদের জানার উপায় রাখেন নাই। কারণ সুন্নি ধারার যে কোন রাজনৈতিক দল তা সে গণ আন্দোলনের দল হোক কিংবা সশস্ত্র দল – সব ধারার মধ্যেই সালাফি চিন্তার ছাপ কম-বেশি থাকতে দেখা যায়। এর উপর আবার মওদুদীর আদর্শও তিনি যেন বুঝেন এমন ধারণা দিয়েছেন আমাদের। এর মানে এই বাক্য বলার আগে তাঁকে সালাফি মতবাদ, আইএসের রাজনীতি এবং মওদুদীর আদর্শ সম্পর্কে জানা থাকতে হবে। কিন্তু এ সম্পর্কে তাঁর নুন্যতম জানা আছে এমন কোন প্রমাণ তার সাক্ষাতকার থেকে জানা যায় না। একথা ঠিক যে “মওদুদী আদর্শ” সম্পর্কে সুন্নী রাজনৈতিক জগতেই বিভিন্ন ধারারই অনেক ধরণের আপত্তি বা বিরোধীতা আছে। এবং এটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু “মওদুদী আদর্শ” এর ঠিক কোন বা কোন কোন অংশের প্রতি আইএস “আকৃষ্ট” এমন কোন ধারণা তিনি রাখেন নাই। যেন তিনি কেবল আমাদের বুঝাতে চান যে সালাফি বা মওদুদী এসব শব্দগুলো তিনি জানেন তাতে এর অর্থ তাতপর্য ফারাক তাঁর জানা থাক আর নাই থাক। কারণ প্রথম কথা হল, মওদুদীর রাজনৈতিক চিন্তা “সশস্ত্র বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখল” ধরণের নয়। ফলে কথিত “মওদুদীর আদর্শ” অন্তত আর যাই হোক “জঙ্গীবাদ বা টেররিজম” ক্যাটাগরির রাজনীতি একেবারেই নয়।

রাজনীতির দুই ধারাঃ লিবারেল সংসদীয় রাজনৈতিক দল আর সশস্ত্রভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের দল
মোটা দাগে রাজনৈতিক চিন্তা বা রাজনৈতিক দলের ধরণ অর্থে আমরা দুটো ধরণে এর ভাগ দেখাতে পারি। এক, গণ-আন্দোলনের (মাস-পার্টি) দল। এরা দেশের প্রচলিত কনষ্টিটিউশন মেনে ওর আইনের অধীনে রেজিষ্টার্ড দল হিসাবে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়, জনগনকে সাথে নিয়ে রাস্তায় প্রকাশ্যে মিছিল মিটিং আন্দোলন করে কিন্তু নিরস্ত্র ভাবে তা করে। নিরস্ত্র মানে কোন ফায়ার আর্মস তারা ব্যবহার করবে না। এভাবেই ক্ষমতায় যাবার পথ চর্চা করে। এদের আর এক সাধারণ নামে ডাকা হয় কনষ্টিটিউশনাল লিবারেল দল বলে। আর এক অর্থে বলা যায়, এরা সংসদীয় রাজনৈতিক দল। যেমন, জামাত একটা সংসদীয় রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক কালচারে আওয়ামি লীগ বা বিএনপির ছাত্র সংগঠন যে অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাপাতি ও পিস্তল ব্যবহারের পরও লিবারেল সংসদীয় রাজনৈতিক দল ঠিক একই অর্থে জামাতে ইসলামিও লিবারেল সংসদীয় রাজনৈতিক দল। আর এসবের বিপরীতে আর এক ধরণের দল হল, সশস্ত্র বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখলের দল। প্রচলিত আইন ও কনষ্টিটিউশনের চোখে এরা ব্যাতিক্রমহীনভাবে বেআইনী দল হয়। ফলে কোন নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ, কোন প্রকাশ্য দলীয় তৎপরতার সু্যোগ এদের থাকে না। জঙ্গী দল, টেররিষ্ট রাজনীতি বলতে এধরণের রাজনৈতিক দলকে বুঝায়। এই বিচারে মওদুদীর আদর্শ বা তাঁর চিন্তা –প্রথম টাইপের – অর্থাৎ গণআন্দোলন টাইপের। তাঁর চিন্তা কোন ভাবেই সশস্ত্র বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখল ধরণের নয়, ফলে পশ্চিমের চোখে যা টেররিজম তা মওদুদীর রাজনৈতিক চিন্তা বা লক্ষ্য নয়। তবু অনেকে উসখুস করতে পারেন। তাদের জন্য বলছি, আমরা মওদুদীর চিন্তা ভুল মনে করতে পারি, বিপদজনক ক্ষতিকর বা আমার বিরোধী, অপছন্দনীয় মনে করতে পারি। অবশ্যই করতে পারি। কিন্তু তবু মওদুদীর চিন্তাকে পশ্চিমের চোখে দেখেও টেররিষ্ট চিন্তা বা রাজনীতি বলতে পারি না। অনেকের মুখে বা স্মরণে পাকিস্তান আমলের কাদিয়ানি বিরোধী দাঙ্গাহাঙ্গামার উদাহরণ আসতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে ওটা তাঁর বল প্রয়োগে অস্ত্রের জোরে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের কৌশল – এর উদাহরণ ছিল না। কাদিয়ানিদের অমুসলমান বলে আলাদা করে অবশিষ্টদের এক সেকটোরিয়ান বা সাম্প্রদায়িক প্রচেষ্টা্র রাজনীতি করা বলতে পারি। কিন্তু এটা তবুও গণআন্দোলন ধরণের ততপরতা গোপন সশস্ত্র ততপরতার নয়, বড় জোর আমরা একে গণআন্দোলন ধারার মধ্যেই আর এক খারাপ প্রচেষ্টার ধরণ বলতে পারি। কারণ সেটা সশস্ত্রতায় রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের কোন উদ্যোগ বা ততপরতা ছিল না। ফলে “টেররিষ্ট” রাজনীতি এটা নয়।
এছাড়া, অনেকের ৭১ এর উদাহরণ মনে আসতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে সেটাও ঠিক রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের উদাহরণ নয়, কারণ সেটা পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের লক্ষ্যে জামাতের কোন সশস্ত্র রাজনীতি ছিল নয়। বরং ইয়াহিয়াকে সমর্থন করার রাজনীতি। তবে অবশ্যই বাঙালী মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্রতায়।

মওদুদীর চিন্তাঃ ‘সৎ’ ও ‘আল্লাভীরু’ ক্যাডারের লিবারেল দল
আবার মওদুদীর চোখে তাঁর আকাঙ্খিত রাজনৈতিক দল -এটা রাজনৈতিক চিন্তা ওরিয়েন্টেশনে প্রশিক্ষিত ক্যাডারদের দল হতে হবে– এটাই তার ইমাজিনেশনে ইসলামি রাজনীতির অগ্রগামি পথ দেখানোর সৈনিক অর্থে ক্যাডারের কথা তিনি ভেবেছিলেন, প্রস্তাব করেছিলেন। ক্যাডার বলতে কিন্তু এটা সশস্ত্র ক্যাডার নয়। কারণ তিনি ইমাজিন করতেন ইসলামি নৈতিকতায় এক দঙ্গল “সৎ”, “আল্লা ভীরু” লোকের কথা। একথাগুলো বলে আমি বলছি না মওদুদীর রাজনীতি ঠিক কি বেঠিক ছিল, তিনি যা ভেবেছেন তাই করতে পেরেছিলেন কী না,’সৎ’ ও ‘আল্লাভীরু’ ক্যাডারের দল কথাগুলো অকেজো অর্থহীন কী না অথবা সেটাই সঠিক ইসলামি রাজনীতি ছিল কী না – এগুলো এমন অর্থ করা এমন কিছু আমার বলবার বিষয় নয় বা বুঝানোর ইচ্ছা নয়। আমি কেবল বলছি মওদুদীর আদর্শ বা রাজনীতি – গণ-আন্দোলনের (মাস-পার্টি) দল ধরণের। এটা কোন ভাবেই টেররিষ্ট ক্যাটাগরির চিন্তা আদর্শ বা রাজনীতি নয়। অতএব “মওদুদীর আদর্শের ভিতর আইএসের আকৃষ্ট” বোধ করার কোন সুযোগই নাই। যদিও মওদুদীর আদর্শ আর আইএস এর রাজনীতি এদুটোই ইসলামের ভিতরকার যে সকল রাজনৈতিক প্রবণতা আছে,তার মধ্যে সালাফ অর্থে পূর্বসরী বা একটা বিশেষ প্রজন্মকে ইসলামের ব্যখ্যা বা চর্চার জন্য অথরিটেভি মান্য করা,সে অর্থে সালাফি রাজনীতির দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।

তাহলে জর্মান একাডেমিক সিগফ্রিড যেটা করছেন বলছেন এটা স্পষ্ট এক প্রপাগান্ডা। যা কোন একাডেমিকের কাজ নয়, হতে পারে না। জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে দক্ষিণ এশীয় ইনস্টিটিউট খুলে করার মত সামঞ্জস্যপুর্ণ কাজও এটা নয়।

জামাতের নাম বললে নিজের ইসলাম বিদ্বেষ, ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য আড়াল করা যায়
প্রথম আলোর প্রথম সাক্ষাতকারে এই প্রচারকের ব্যকগ্রাউন্ড হিসাবে কিছু পরিচয় তুলে ধরেছিল। সেখান থেকে জানা যাচ্ছে, “ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাকিস্তান সিকিউরিটি রিসার্চ ইউনিট এবং দিল্লির Centre de Sciences Humaines (New Delhi, India) সাবেক রিসার্চ ফেলো। বর্তমানে তিনি জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আফগানিস্তান-পাকিস্তান টাস্কফোর্সের বহিস্থ বিশেষজ্ঞ গ্রুপের অন্যতম সদস্য”। অর্থাৎ এই উপমহাদেশ বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা বা এক্সপোজার হল ভারতের এক একাডেমিক ইন্সটিটিউট। ফলে একারণে মনে করার কারণ আছে যে মওদুদীর নাম ও কাজ সম্পর্কে পরিচয় হয়েছে বড় জোর, সালাফি চিন্তা সম্পর্কে পরিচিতি এগুলো তিনি কেবল নাম জানেন, জানাশুনা ষ্টাডি বলতে যা বুঝায় তা তার কিছুই নাই। এছাড়া খুব সম্ভবত বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতীয় চিন্তায় কোনটা তারা প্রপাগান্ডার জন্য বলে থাকে আর কোনটা ফ্যাক্টস এর কোন ফারাক রেখে বলে না বলে তিনিও ভারতীয় গোয়েন্দা প্রপাগান্ডাগুলোকেই ফ্যাক্টস মনে করে বসে আছেন দেখা যাচ্ছে। যেমন ভারতীয় গোয়েন্দাসহ ইনটেলিজেন্সিয়া কেন যে কোন ইসলামি তৎপরতার বিপক্ষে বলার দরকার বোধ করলেই সেটা জামাতে ইসলামির তৎপরতা বলে দাবি ও দোষারোপ করবে। সেটার সঙ্গে জামাতের নুন্যতম সম্পর্ক নাই এটা নিশ্চিত জানলেও তা করবে। কারণ সেটা জামাতের কাজ বললে একটা বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়। জামাত উচ্চারণ করে ওরা বুঝাতে চায় যারা ৭১ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে ছিল – অর্থাৎ এরা নৈতিকভাবে দাগ লাগা গোষ্ঠি – ফলে অর্থ দাড়াল ইসলামের নামে যে কোন তৎপরতাই অনৈতিক, কালিমালিপ্ত। নিজের ধর্মের জায়গায় বসে এতে সহজেই আর একটা ধর্মকে খারাপ বলে ফেলা যায়, ঘৃণা ছড়ানো যায়, নিজেরা ভাল মহান বলে ইঙ্গিত রাখা যায় ইত্যাদি। ঠিক যেমন শাহরিয়ার কবির যে কোন ফ্যাকড়ার ইসলামি রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক তৎপরতা মাত্র তা জামাতের বলে চিহ্নিত করবেই। না বুঝা চিন্তার দৌড়ে জর্মান সিগফ্রিড এমন ভারতীয় বা শাহরিয়ার কবিরের প্রপাগান্ডার পথটাকেই অনুসরণ করেছেন।
মজার কথা হল, দ্বিতীয় বা ২৮ অক্টোবরের সাক্ষাতকারে সিগফ্রিড এবার আর জামাত এবং আইএসকেও আর আলাদা রাখেন নাই। বলছেন, “আইএসের মতো আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় জিহাদি গোষ্ঠীর সঙ্গে তার নতুন স্থানীয় সহযোগী জামায়াতের যোগসাজশকে অবশ্যই মনোযোগের কেন্দ্রে আনতে হবে”। জামাত নাকি আইএসের স্থানীয় সহযোগী। দায়দায়িত্বহীন সুইপিং মন্তব্য করা – এটা একজন একাডেমিকের জন্য সবচেয়ে নিন্দিত কাজ। এই যে দাবি তিনি করলেন এর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ তার কাছে কী আছে? তার এই মন্তব্য শুনে মনে হচ্ছে, তিনি একজন একাডেমিক নন, হাসিনার মত পল্টনে বা সোহরওয়ার্দি উদ্যানে রাজনৈতিক বক্তৃতা দিচ্ছেন যেখানে আমাদের রাজনৈতিক কালচারে এমন গণ বক্তৃতায় প্রমাণ হীন যা মনে চায় এমন দায়বিহীন উড়া মন্তব্য দেয়া যায়। অথচ এমপ্ন যুতসই প্রমাণ থাকলে হাসিনা সকলের আগে এমন ঠোস প্রমাণের ভিত্তিতে বহু আগেই জামাতকে নিষিদ্ধ করে দিতেন। আর আমরাও এন্টি-জামাত বিষয়ক প্রপাগান্ডার নামে ধর্মবিদ্বেষী প্রপাগান্ডার রাজনীতির হাত থেকে বেচে যেতাম। সিগফ্রিড এর একথা থেকে এটা পরিস্কার যে তাঁর না জামাত না আইএসের রাজনীতি সম্পর্কে কোন ধারণা আছে। বলা বাহুল্য আমেরিকার এমন বেকুবি উদ্ভট চিন্তা নাই। এমনকি ভারতের র ও মনে করে যে বাংলাদেশে বিদেশীদের হত্যা এটা আইএসের কাজ নয়, তবে জামাত হতে পারে। প্রথম আলো ৭ অক্টোবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার বরাতে জানাচ্ছে – এই কাজে আইএসের যোগসুত্র নাই। এই খবরের ফলে এক মজার তামশার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভারত বলছে, এই কাজে আইএসের যোগসুত্র নাই, তবে জামাত হতে পারে। তার মানে কী দাঁড়াল? দাঁড়াল এই যে ভারতের র মনে করে জামাত অন্তত আইএস এর স্থানীয় সহযোগী নয়।
সিগফ্রিডের এসব বেকুবি কথাবার্তা এমনই উদ্ভট এবং স্ববিরোধী যে শেষে সাক্ষাতকার গ্রহিতা প্রথম আলোর মিজানেরও আর তা হজম হয় নাই। চরম অসহ্য ঠেকেছিল। তিনি সাক্ষাতকার গ্রহিতা হওয়া সত্ত্বেও বলেই ফেলেছেন যে, এখানে কি আপনার বক্তব্য স্ববিরোধী মনে হচ্ছে না? এরপরেও সিগফ্রিড এতই নাদান যে তিনি বুঝতেও পারেন নাই মিজান তাকে সতর্ক করছে, সুযোগ দিচ্ছে।

এই জায়গায় এসে সিগফ্রিডের অবস্থান হাসিনা সরকারের মত স্ববিরোধী এবং ইসলামফোবিক বিদ্বেষী। এছাড়া যে প্রশ্নটা মাথায় তাড়া করে বেড়াচ্ছে তা হল, প্রথম আলো সিগফ্রিডের মত এই নিম্ন যোগ্যতার লোককে ধরে আনল কেন? এভাবে কাকে সার্ভ করল? তা বিস্ময়কর হয়ে থাকল!

[লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়া দিগন্ত ০১ নভেম্বর ২০১৫ সংখ্যায়। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও সম্পাদনার পর ছাপা হল।]