মোদীর পাকিস্তান সফর আচমকা না পরিকল্পিত

মোদীর পাকিস্তান সফর আচমকা না পরিকল্পিত
মোদির পাকিস্তান সফরের অর্থ কী
গৌতম দাস 

http://wp.me/p1sCvy-tV
৩১ ডিসেম্বর ২০১৫

 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চমক দিতে ভালোবাসেন। বিশেষ করে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ ধরনের ফালতু ও অবাস্তব শব্দ ও বাজে ধারণাগুলো বাদ দিয়ে সরিয়ে রাখলে যে কোনো দুইটি রাষ্ট্র মানেই দুইটি আলাদা আলাদা স্বার্থ এবং যে সম্পর্ক আসলে আবার মৌলিকভাবে স্বার্থ-সংঘাতমূলক। কিন্তু তবু এরই ভেতর সাময়িক কোনো কোনো ইস্যুতে এক কমন অবস্থান হাজির করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। তার সুযোগ নিতে হয়, দরকার হয়ে পড়ে। তাই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক মাত্র এক জটিল বিষয়। হয়তো দেখা যাবে, ৯০ ভাগ বিষয়ে দুই রাষ্ট্রের অবস্থান ফাটাফাটি সংঘাতের, কিন্তু বাকি ১০ ভাগের কমননীতি-অবস্থানের (তবে তা সাময়িক) কারণে কোনো উদ্যোগ নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার অবস্থায় তাকে আনতে হতে পারে, আনা হয়। তো সারকথা হলো, তাই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কমাত্রই এক জটিল জিনিস। কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোদির এ চমক সৃষ্টি করার ঝোঁক সবসময়; মোদির এই ঝোঁক একদিক থেকে যেন পরোক্ষে তাঁর স্বীকার করে নেয়া যে, কূটনৈতিক সম্পর্ক জিনিসটা জটিল বলেই চমক সৃষ্টি করে মোদি একে সহজ করার কিছু সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করে থাকে। আবার আরেক দিক থেকে এ জটিল জিনিসটিকে সামলাতেই শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারস্পরিক এক গুড ইম্প্রেশন তৈরির চেষ্টা থাকে। যেটাকে আমরা ব্যক্তিগত ইমোশন শেয়ার বা ভাবের সম্পর্ক তৈরি ইত্যাদি বলি, মোদি বলতে চান এগুলো জটিল কূটনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখে। কথা সত্যি, জটিল স্বার্থ-সংঘাতের ইস্যুকে নরম করতে, অন্তত ডায়ালগ শুরু করার দিক থেকে পারস্পরিক বোঝাবুঝি ভালো থাকলে তা একটা ইতিবাচক ভূমিকা অবশ্যই রাখে। অতএব এ কথাটাকেই আমরা ভিন্নভাবে বলি যে, মোদি চমক তৈরি করতে ভালোবাসেন।

মোদি আসলে গিয়েছিলেন পুতিনের রাশিয়া সফরে। সেখান থেকে ফেরার পথে তিনি হঠাৎ পাকিস্তানে থেমেছিলেন। দুই দিনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ সফরে গত বুধবার ২৩ ডিসেম্বর তিনি রাশিয়া পৌঁছেছিলেন। কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, সেই ’৫০-এর দশক থেকেই রাশিয়া বা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতে ভারী অস্ত্র, যুদ্ধ টেকনোলজির সরবরাহকারী। তবে মাঝে ২০০৫ সাল থেকে প্রথম আমেরিকান অস্ত্র; বিশেষত পারমাণবিক টেকনোলজি পাওয়াসহ ভারী অস্ত্র কেনা, একসাথে যৌথ উদ্যোগে নানানভাবে ভারতে এর স্থানীয় উৎপাদন ইত্যাদি অনেক বিষয়ে সম্পর্কের দুয়ার খুলেছে। কিন্তু তা খুললেও এখনো অস্ত্রবিষয়ক সম্পর্ক ও যৌথ উদ্যোগে উৎপাদন ও সরবরাহের বিষয়ে অর্থসহ সব ধরনের অঙ্ক বা ফিগারের দিক থেকে এখনো রাশিয়া সবার চেয়ে আগে এবং একমাত্র।
ফলে গুরুত্বপূর্ণ এবার যৌথভাবে লাইট কার্গো হেলিকপ্টার উৎপাদন, যৌথভাবে ট্যাংক তৈরি, যৌথভাবে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান উৎপাদন, পারমাণবিক ক্ষমতায় চলা অ্যাটাক সাবমেরিন লিজ বা ভাড়া নেয়া এবং শত্রুর ছোড়া মিসাইল আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রাশিয়ান মিসাইল শিল্ড কেনা ইত্যাদি বিষয়ে চুক্তি শেষ করে দিল্লি ফেরার পথে শুক্রবার কয়েক ঘণ্টার জন্য মোদির আফগানিস্তানের কাবুল যাওয়ার কথা ছিল। আবার আফগানিস্তান কেন? অনেকেই জানেন, আফগানিস্তান সরকারের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পাশাপাশি ভারতের সাথেও প্রায় একই ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক আফগানিস্তানের আছে। এ দিকটা জানতে আগ্রহীরা ছাড়া এর বাইরের লোকেরা খুব কমই জানেন। আফগানিস্তানে আমেরিকান স্বার্থ ও প্রভাবের কারণে এর ফায়দা যেন শুধু পাকিস্তান না তোলে, ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের বাড়তি সুবিধা হিসাবে না হাজির হয়ে যায়, ভারতের ভাষায় তা যেন ভারসাম্যহীন না হয়, তা ঠেকাতে এর বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে ভারতের এমন সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করেছে আমেরিকা। আফগানিস্তানের সঙ্গে এসব রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক সূত্রে মান রাখার জন্য ভারত ৯০ মিলিয়ন ডলার অনুদান হিসেবে খরচ করে আফগানিস্তানের জন্য এক নতুন পার্লামেন্ট ভবন তৈরি করে দিয়েছে। ওই ভবন উদ্বোধন করতেই মোদির সংক্ষিপ্ত কাবুল সফর। এই সফরের খবর নিরাপত্তার কারণে খুব সীমিত বা লো-প্রোফাইল রাখাতে অনেকেই জানতেন না মোদি আসবেন। আর কাবুলে কর্মসূচির শেষে ওই দিনই বিকেলে তার দিল্লি ফিরে যাওয়ার কথা।
কিন্তু চমক ঘটল কাবুল কর্মসূচি সমাপ্তিতে। মোদি এ ধরনের চমকের খবর সবার আগে নিজেই টুইট করে ঘোষণা বা প্রকাশ করতে ভালোবাসেন। ফেরার পথে তিনি টুইট করলেন যে, ভারতে ফিরে যাওয়ার আগে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সাথে দেখা করতে লাহোর যাচ্ছেন। শুক্রবার নওয়াজ শরিফের জন্মদিন, তাই তিনি শুভেচ্ছা জানাতে যাচ্ছেন আর একই সাথে শরিফের নাতির বিয়ে, ফলে শরিফের লাহোরের বাসায় তিনি যাবেন।
ব্যাপারটাকে মানুষের শরীরের সাথে তুলনা করা যায় যে, এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন মানুষ তৎক্ষণাৎ সেই কাজ করার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে, যেন সেই ব্যাথা যা তাকে তাড়িত করছে তা রিলিজ বা উপশমের জন্য। ভারত-পাকিস্তান এ দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ককে নিয়ে কেচ্ছা-কাহিনীর শেষ নেই। বেশির ভাগ সময় সেটা ঝগড়া-বিবাদের, চরম ও গরমের। তবুও ভারত-পাকিস্তান এখন এমনই এক পরিস্থিতিতে পড়েছে; কোনো এক ব্যথা তাদের এমন তাড়িত করছে যে, তারা পরস্পরের কাছাকাছি আসতে, পুরনো কিছু বিবাদ প্রসঙ্গে মারমুখী হওয়ার বদলে তা লঘু করতে দিল্লি তৎপর হওয়া খুবই জরুরি মনে করছে। অতএব ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কাবুল সফর থেকে দিল্লি ফেরার পথে আচমকা পাকিস্তানে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। অন্তত তার মুখে বলা উদ্দেশ্য হলো, ২৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের জন্মদিন ছিল। ফলে মোদি জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য পথে শরিফের লাহোরের বাসায় এক ঘণ্টা কাটিয়ে (পাকিস্তানে মোট ব্যয়িত সময় আড়াই ঘণ্টা) দিল্লি ফিরে গেলেন। কিন্তু এমন কী সেখানে ঘটেছে, যা এ দুই শীর্ষ নেতাকে এমন বেচাইন করছে? ভারতের মোদীকে বেচাইন করেছে আইএস। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার এক রিপোর্টের শিরোনাম থেকে ধার করা ভাষায়, “ঘাড়ে নিশ্বাস এবার, আইএস এখানে অপারেশনে নামছে”।

সেটা আজকের প্রসঙ্গ!
এতক্ষণ চমকের দিক থেকে ধারাবর্ণনা করলেও আসলে মোদির পাকিস্তান ইস্যু নিয়ে তাগিদবোধ অনেক আগে থেকেই। সুনির্দিষ্ট করে বললে, আইএসের প্যারিস হামলা বা আক্রমণের পর প্যারিসের জলবায়ু সম্মেলনে শরিফের সাথে দেখা হওয়াকে পরিকল্পিতভাবে মোদি নতুন করে মিলিত হয়ে কথা বলার কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন ও লাগিয়েছিলেন।

আসল টেররিজম এর পানি কানে ঢুকছে
ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের মধ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে পরস্পরের আপত্তি ও মতবিরোধের শেষ নেই। এবং এর প্রায় প্রতিটি ইস্যু আজন্ম। ফলে পুরানা সেসব দিকে না গিয়ে একালের বিরোধের মূল ইস্যু নিয়ে কথা তুললে বলতে হয়, ভারত মনে করে, ভারতে আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতা ইতোমধ্যেই ঘটেছে, অ্যাকশন প্রস্তুতি চলছে ধরনের অবস্থায় আছে। এ বিষয়টা মোদীর কাছে পাকিস্তানের সাথে দ্রুত ডায়লগ শুরু করতে নগদ তাগিদ হিসেবে হাজির হয়। অর্থাৎ ২০০১ সাল আলকায়েদা ফেনোমেনা উত্থানের পর থেকে ভারতে এরা সরাসরি হাজির ও তৎপর না হলেও কাশ্মির-কেন্দ্রিক সশস্ত্র ইসলামি বিচ্ছিন্নতা রাজনৈতিক তৎপরতাগুলোকেই ভারত আলকায়েদার ‘টেররিজম’ বলে চালিয়ে এসেছে। কিন্তু এখন এই প্রথম ভারতকে আলকায়েদা বা একালের আইএস বিষয়ে মানে প্রকৃত “টেররিজম” মোকাবিলার জন্য তৈরি হতে হচ্ছে। ভার্তের দাবি করা এতদিন যাকে সে ছলনা করে টেরিজম বলে এসেছে তা অন্ততপক্ষে সেটা “গ্লোবাল টেররিজম” ছিল না,অথবা আমেরিকার ভাষায় যা “টেররিজম” তা এটা ছিল না। এবার আইএসের টেররিজম, “গ্লোবাল টেররিজম” – একে মোকাবেলার জন্য মোদী ভারতকে উপযুক্ত করে সাজাতে তৎপর হয়েছেন। সম্ভবত মোদি সরকারের ইচ্ছা ও অনুভব হলো, এত দিন ধরে টেররিজম বলে চালিয়ে দেয়া বিচ্ছিন্নতা আন্দোলন আর আইএসের ‘টেররিজম’এ দুইয়ের সাথে একসাথে লড়তে গেলে ভারতের সক্ষমতা ও রিসোর্সে টান পড়তে পারে, তাতে উপযুক্তভাবে মোকাবিলার কাজে নাও করা যেতে পারে। এর বদলে প্রথমটার বিষয়ে পাকিস্তানের সাথে বা পাকিস্তানের মাধ্যমে কোনো রফা করতে পারলে অথবা কমপক্ষে একে তুলনামূলক কম ভয়ঙ্কর হিসেবে হাজির রাখতে পারলেও তা ভারত সরকার ও রাষ্ট্রের সুবিধা হয়। হয়ত এটাই মোদির জন্য স্বাভাবিক ও সঠিক অনুমান। কিন্তু গোল বেধেছে তাহলে কাশ্মির ইস্যুকে সুরাহা করতে ভারতকে কোনো একটা ফর্মুলা প্রস্তাব করতেই হবে এমনকি তা কেবল নিজ পছন্দমত কান্নি মারা করে হলেও। সেটা ভারত চায় না বলে মনে করার কারণ আছে। ফলে ভারতের ইচ্ছা কাশ্মির ইস্যু পাশ কাটিয়ে আইএসের টেররিজম মোকাবেলার ইস্যুতে পাকিস্তানকে যতটা সম্ভব পাশে পাওয়া চেষ্টা করে যাওয়া। পাকিস্তানের সাথে মোদীর প্রবল তাগিদের উৎস এখানে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান পাল্টা বলতে চায়, ডায়লগ সেও অবশ্যই করতে চায় কিন্তু কাশ্মির ইস্যু পাশ কাটিয়ে শুধু টেররিজম নিয়ে ডায়লগ সে চায় না। এটাই ছিল এতদিন ভারত-পাকিস্তানের একালের মতবিরোধের মূল বিষয়। তাহলে সার বিতর্ক হলো, “টেররিজম বিষয়ে আলাপ হবে” না “কাশ্মীর ইস্যুসহ টেররিজম নিয়ে আলাপ হবে”।
এই বিরোধে দীর্ঘ দিন এভাবে নন-ডায়লগ হয়ে পড়ে থাকার পর মোদি এবার পাকিস্তানের সাথে মতবিরোধের স্থবিরতা কাটাতে উদগ্রীব হয়েছেন। এ বিষয়ে, গত ২৫ ডিসেম্বরের নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখছে, মোদি বুঝেছেন, “তিনি যে পাকিস্তানের সাথে ডায়লগে যুক্ত হচ্ছেন, এটা দেখানো তার দরকার, কারণ তিনি আমেরিকা ও সৌদিদের চাপে আছেন”। টাইমস এ কথাগুলো লিখছে এক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক অশোক মালিকের বরাতে। মালিক অবশ্য আরেক কথা বলেছেন যে, “পাকিস্তানের আগের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সম্প্রতি বদল করে সেখানে সেনাপ্রধানের পছন্দের লোক আনা হয়েছে। কিন্তু মোদি এটাকে তার জন্য সুবিধা হিসেবে দেখেছেন, কারণ তিনি সরাসরি পাকিস্তান সেনাদের সাথে কাজ করতে চান”। অনেকে খোঁচা দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের প্রকৃত ক্ষমতা সেনাদের হাতে। নওয়াজের ভুল পদক্ষেপের কারণে নিজের আগের সরকারের আমলে তাঁর সেনাদের সাথে সম্পর্কের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না; যেটা জেনারেল মোশাররফের বিমান আকাশে আটকে রাখা আর পাল্টা তাদের ক্যু-এর ক্ষমতা দখল পর্যন্ত গিয়েছিল। তাই এবারো এমন কোনো জটিলতা যেন না সৃষ্টি হয়, সেজন্য নওয়াজের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নেয়ার আগের সময়ের ইনফরমাল ডিল হলো, কেবল সামরিক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সেনাদের অবস্থান বেশি গুরুত্ব পাবে, বাকি অন্য সব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের। এ বিষয়টাকে অনেকে খোঁচা দেয়ার কাজে ব্যবহার করে। তবে মোদী জানেন, পাকিস্তান থেকে তিনি যা চান তা পেতে গেলে তার জন্য সরাসরি সেনাদের সাথে ডিল করা ভাল, কারণ শেষ বিচারে তারাই তা দিতে পারে।
এসব পটভূমি মাথায় রেখে মোদি প্যারিস জলবায়ু মিটিংয়ে নওয়াজ শরিফের সাথে সমঝোতা করে ডায়লগ ওপেন করেন যে, দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা টেররিজম ইস্যুতে সহযোগিতা নিয়ে ডায়লগ করবে। আর পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে একই সাথে কাশ্মির ইস্যুতে ডায়লগ চলবে। যদিও এটা মনে করার কোন কারণ নাই যে সব আলাপ প্যারিসের ঐ সাইড-টকে শুরু হয়েছিল। পাকিস্তানে ভারতের রাষ্ট্রদুতের মাধ্যমে পুর্বপ্রস্তুতিমূলক আলাপ অনেক আগে থেকেই চলছিল। নওয়াজের সাথে মুখোমুখি আলাপের মাধ্যমে দুই প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতে তা একধরণের ফরমাল বা চুড়ান্ত আকার পেয়েছিল। সেই রফা অনুযায়ী ৬ ডিসেম্বর ব্যাংককে দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ে টেররিজম ইস্যুতে ডায়লগ হয়। আর এর দুই দিন পর ৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানে সুষমা স্বরাজের সফরে কাশ্মির ইস্যুতে ডায়লগ হয়।
বলা যায়, মোদি ভারতে আইএস তৎপরতা ছড়ানোর সম্ভাবনা ও তা মোকাবেলাকে মাথায় রেখে, এটাকে সব বিবেচনার মূল কেন্দ্রে রাখার কারণে তিনি পাকিস্তানের সাথে আলোচনা করতে সিরিয়াস হয়েছিলেন। যদিও ভারতে কাশ্মির ইস্যুতে কিন্তু পাকিস্তান-কেন্দ্রিক যেসব সশস্ত্র ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা আছে, এগুলো ২০০১ সালে আলকায়েদা ফেনোমেনা হাজির হওয়ার আগে থেকেই আছে বা ছিল।
ফলে  আভ্যন্তরীণ মুল্যায়নে ভারতের কখনই ধরে নিবার কারণ নাই যে, এরা আর আলকায়েদা ফেনোমেনা এক। কিন্তু তবুও ভারত কাশ্মীর-কেন্দ্রিক ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতাকেই কল্পিত জঙ্গিবাদ ও টেররিজম বলে, নিজের ভূমিতে অনুপ্রবেশ ইত্যাদি কথার প্রচার চালিয়ে গেছে। উদ্দেশ্য, কল্পিত টেররিজমের সরবরাহকারীর অজুহাতে বাংলাদেশকে কব্জার মধ্যে রাখা, ভারতের জন্য বাংলাদেশের ওপরে বাণিজ্য সুবিধা আদায় করা আর ট্রানজিট করিডোর আদায় করে নেয়ার কাজে ব্যবহার করে নেওয়া। সম্প্রতি আইএস ভারত ও বাংলাদেশে উপস্থিত হয়ে থাকতে পারে, এটা তারা স্বীকার করছে। ফলে বাংলাদেশ সরকারের ভাষ্যের সাথে ভারতের রাষ্ট্রের ভাষ্যের এ প্রথম অমিল দেখা গেছে। এমনকি আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ অমিল-গরমিলকে স্বীকার করে নিয়ে গত সপ্তাহে বলেছেন, তারা ভারতের পাওয়া তথ্যের সাথে নিজের বোঝাবুঝি ও অমিলের কারণ খুঁজছে। তাহলে এ কথা মনে করার কারণ আছে যে, মোদির পাকিস্তান সফর কোনো চমক বা কারিশমা দেখানো নয়। নিউইয়র্ক টাইমসের ২৫ ডিসেম্বরের রিপোর্টে ভারতের ইংরেজি একটি দৈনিকের ডব্লিউআইআরই (WIRE)-এর সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভারাদ্বারজনের এক মন্তব্য তুলে এনেছে। “In a way, he is sending a signal to everyone that there will be no more U-turns,” said Siddharth Varadarajan, a founding editor at The Wire, an Indian news site. “He is putting his personal political brand on this process. He can’t walk away that easily now.”
মোদী সম্পর্কে ভারাদ্বারজন বলছেন, “একভাবে দেখলে চমকের পাকিস্তান গমন করে মোদি আসলে সবার কাছে এক বার্তা দিয়ে ফেলেছেন, যা থেকে তিনি আর সরে আসতে পারবেন না। তিনি আসলে নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ইমেজ এই প্রক্রিয়ার মধ্যে জড়িয়ে ফেলেছেন। ফলে তিনি এখন আর সহজে এখান থেকে সরে যেতে পারবেন না”।

“সমালোচকদের পাকিস্তা্ন পাঠিয়ে দিবার রাজনীতি” – ভারত আর বাংলাদেশে একই
বিজেপি তার সমালোচককে বাংলাদেশের মতই কিছু হলেই পাকিস্তান পাঠিয়ে দেয়। বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়েই যে যখন যেভাবে সুবিধা মনে করেছে পাকিস্তান ইস্যুকে অ্যান্টি-পাকিস্তানি হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ – এক উগ্র বর্ণবাদ প্রচার করে থাকে ভোটের বাক্স ভরার দিকের নজর থেকে। কিন্তু রাষ্ট্র সরকার চালাতে গেলে তার তো একটা পাকিস্তান নীতি, পাকিস্তানের সাথে সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো কিভাবে ডিল করবে তা থাকতেই হবে। আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নির্বাচনী বক্তৃতায় ভোট পাবার জন্য পাকিস্তান-বিরোধী উস্কানি, সুড়সুড়ি জাগিয়ে ভোটের বাক্স ভড়তে যা বলা হয় তার সাথে বৈদেশিক পাকিস্তান নীতির কোন সম্পর্ক নাই। ফলে সবসময় তাদের যার যার সরকারের পাকিস্তান নীতিতে আর তাদের স্ব স্ব কালে যেকোনো নির্বাচনে পাকিস্তানবিরোধী ঝড় তুলে ভোটের বাক্স ভরার রাজনীতির মধ্যে কখনো মিল-সামঞ্জস্য রাখতে পারেনি। বরং সময়ে স্থানীয় নির্বাচনে জেতার বিষয়টিকে মুখ্য বিবেচ্য রাখতে গিয়ে বেশির ভাগ সময়ে সরকারের পাকিস্তান নীতিতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি। এসব সমস্যার কথা খেয়াল করে ভারাদ্বারজন ওই মন্তব্য করেছেন।
কম-বেশি প্রায় এই একই সমস্যা আমাদের দেশেও হয়ে আছে। সরকারের সক্ষমতা ও মনোযোগ এরই মধ্যে (নকলভাবে) জঙ্গি বলে সাংবিধানিক রাজনীতির জামায়াত-বিএনপি দমনের কাজে সরকার ব্যবহার করে চলেছে। আবার সাম্প্রতিককালে আসল ‘টেররিজম’ আইএস বা জেএমবি দমনের কাজেও এটা ব্যবহার করছে। অর্থাৎ সরকারের মোট সক্ষমতাটা তাদেরকে দুইভাবে ভাগ করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এভাবে কত দিন চলতে পারবে, সক্ষম থাকবে কি না জানি না। তবে কেবল জেএমবি দমনের কাজে মনোযোগী থাকার জন্য সক্ষমতা কেবল সেদিকে নিবদ্ধ রাখতে আপাতত সাংবিধানিক রাজনীতিতে বিরোধীদের সাথে কোনো ডায়লগ, আঁতাত, বোঝাবুঝি কোনো কিছুর আলামত দেখা যাচ্ছে না, যাতে সরকার সব রিসোর্স সক্ষমতা একমুখী করতে পারে।

মোদির পাকিস্তান সফরে ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়া
মোদির সফরে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রতিক্রিয়া হয়েছে অদ্ভুত ও মারাত্মক; তবে এককথায় এবং দূরে সেভ জায়গায় দাঁড়িয়ে বললে বলতে হবে, মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তো এমন প্রতিক্রিয়াগুলোকে কয়েকটা খোপে ভাগ করে বললে, প্রথম খোপ  হল তারা যারা সরাসরি শুধু ভোটের রাজনীতির বিবেচনায় লাভালাভের দিক চেয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। এরা হলো খোদ কংগ্রেস, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ও তার জনতা দল ইউনাইটেড। খোপ দুই, যারা জম্মু ও কাশ্মীর অথবা পাকিস্তান-ভারতের জন্মের সময় থেকেই লম্বা বিবাদে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। যেমন এককথায় বললে, ভারতীয় কাশ্মীরকেন্দ্রিক সব ধরনের দল মোদির পাকিস্তান সফরকে ইতিবাচক বলেছেন। এছাড়া এদের সবার একই কথা “ডায়ালগ”; নিরবচ্ছিন্ন ডায়ালগই প্রধান কার্যকর করণীয় মনে করেন সবাই। এমনকি যারা কাশ্মীড় ইস্যুতে বিচ্ছিন্নতাবাদী লাইন অনুসরণ করে তারাও মোদিকে স্বাগত জানিয়েছেন। শ্রীনগরের মডারেট দল হুরিয়াত এটাকে সরকারের নেয়া “ইতিবাচক সঠিক পদক্ষেপ” বলেছে। আর হার্ডলাইনের আলী শাহ জিলানি বলছেন, “ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টার বিরুদ্ধে তাদের কোনো আপত্তির কিছু নেই”। বর্তমানে ভারতীয় কাশ্মীর রাজ্যে বিজেপির সঙ্গে চলতি জোট সরকার গঠনের পার্টনার স্থানীয় মডারেট দল পিডিপির নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী মুফতি মোহাম্মদ সাঈদও খুবই উচ্ছ্বসিত হয়ে এটাকে ‘সঠিক দিকে পদক্ষেপ’ বলেছেন। ওদিকে হায়দ্রাবাদকেন্দ্রিক এমআইএম দলের নেতা ও কেন্দ্রীয় লোকসভার সদস্য ব্যারিস্টার আসাদুদ্দিন ওয়ার্সীও মোদির সফরের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ডায়ালগ চালিয়ে যাওয়ার কথা তুলেছেন। কাশ্মীরের স্থানীয় দল ন্যাশনাল কংগ্রেসের শেখ আবদুল্লাহর নাতি ওমর আবদুল্লাহও স্বাগত জানিয়েছেন; তবে এমন পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয় না, ছুটে যায় বলেও আক্ষেপ করেছেন। ওদিকে বাম কমিউনিস্টদেরও (সিপিএম, আরএসপি) এই খোপে ফেলা যায়, একই ধরনের স্বাগত জানানোর কারণে। তবে এদের বাড়তি কিছু শব্দ আছে। যেমন তারা ‘টেররিজমও নিপাত যাক’ সঙ্গে যোগ করে তাদের কথা বলেছেন।

এই সফরের খবর ভারতীয় মিডিয়ায় আসার পর কংগ্রেস প্রতিক্রিয়ায় বলেছিল, “এই সফরের কোন তালমিল প্রটোকল রাখা হয়নাই। ফলে এটা একটা ফালতু তামশা ব্যাপার হয়েছে। এর খারাপ পরিণতি হবে। এর আগে বাজপেয়ির এমন সফরের পরে কারগিল যুদ্ধ এসেছিল”। যেমন, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এনডিটিভি, দি হিন্দু,। কংগ্রেস এমন মন্তব্য করার সময় ধরেই নিয়েছে যেন আগে কোন ইনফরমাল আলাপ ছাড়াই মোদী পাকিস্থান সফরে গিয়েছেন। এর আর এক অর্থ আইএস ইস্যুতে মোদীর সরকার কী করে তাতে তাদের কোন মাথাব্যাথা নাই। আভ্যন্তরীণ ইস্যুতে নিজ দলের সুবিধাই আসল কথা।  সোনিয়ার কংগ্রেসকে কেবল ভোটের রাজনীতির বিবেচনায় বক্তব্য অবস্থান নেয়া ও প্রকাশের দলে বা খোপে ফেলাতে অনেকে বিস্মিত হতে পারেন। কিন্তু ব্যাপারটা ইদানীং এমন অবস্থাতেই ঠেকেছে। বিশেষ করে লোকসভা ২০১৪-এর নির্বাচনে কংগ্রেস শোচনীয়ভাবে হেরে মোট আসনের মাত্র ১০ ভাগেরও নিচে আসন সংখ্যা হয়ে যাওয়ার পর। যেমন মোদি সরকারের ‘ল্যান্ড বিল’ বা জমি অধিগ্রহণ আইন নামে একটি আইনের প্রস্তাব করেও বিরোধীদের বিরোধীতায় তা শেষ পর্যন্ত পাস করাতে পারেনি, পক্ষে-বিপক্ষে ভাগ হয়ে গেছে। শেষে মোদী বিলটা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বা বলা যায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাস হয়নি বলে এমনিতেই এটা প্রত্যাহার হয়ে গেছে ধরতে হবে। ওই বিলের সারকথা ছিল একদিকে চাষাবাদের জন্য জমি, অন্যদিকে অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য বা শিল্প-কারখানার জন্য জমি এ দুই ধরনের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্যের লাইনটা কোথায় টানা হলে সঠিক হবে, সব কুল রক্ষা পাবে। এ বিলের ইস্যুতে কংগ্রেসের অবস্থান খুবই সঙ্কীর্ণ বিরোধিতার। সিদ্ধান্তের পেছনে তাদের মূল বিবেচনা ছিল, কোনো চটকদার পপুলার কথা বললে তাতে দল চাঙা হবে। অথচ বিষয়টা একালের সব রাষ্ট্রের জন্যই খুব নির্ধারক এক নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। পার্লামেন্টে আলোচনার সময় রাহুল গান্ধী দলের মূল অবস্থান-বক্তব্য রেখেছিলেন। রাহুলের বক্তৃতার পর মিডিয়াসহ কংগ্রেসের নিজের দলের আলোচনার বিষয় ছিল, ‘রাহুলের পারফরম্যান্স’। রাহুল ‘কী বলেছেন’ সেটা নয়, ‘কোন অভিনয়ে’ বলেছেন সেটাই বিবেচ্য ও চর্চার বিষয় হয়েছিল। দল কি অবস্থান নিয়েছে, সেদিক নিয়ে কারও কোনো আগ্রহ ছিল না। কথাগুলো তুলে আনলাম, ভারতের এখনকার বিরোধী দল কংগ্রেসের রাজনীতির কোয়ালিটি বোঝানোর জন্য। তবে একথাও ঠিক, বিজেপি যখন বিরোধী অবস্থানে ছিল, তখনও কমবেশি এসব সমস্যা একই ছিল। সরকার ও বিরোধী দল এভাবে ভাগ করে দেখা ছাড়াও যদি একই ক্ষমতাসীন বিজেপির নির্বাচনীর রাজনীতির অবস্থান আর সরকারের নীতি বা সংসদে আনা বিলের বেলায় অবস্থান এভাবে ভাগ করে দেখি তো সেখানেও বিশাল ফারাক আর ছলচাতুরিতে ভরা অবস্থান দেখতে পাব। নভেম্বরের বিহার নির্বাচনে বিজেপির মধ্যে পাকিস্তান-বিরোধী ঘৃণা ছড়ানো কাড়াকাড়ি ছড়াছড়ি গেছে। এছাড়া ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘বিজয় দিবসে’ প্রচারণায় নামতে ভারতীয় বাহিনীকে খোদ মোদির টুইট বার্তার আহ্বান জানিয়েছিল। বিজেপির এগুলো সবই ভোটের রাজনীতি। সস্তা ইসলামবিদ্বেষ ছড়ালে ভোটের বাক্স ভরে উঠবে এ বিশ্বাসে কাজে নেমেছিল। আবার সেই মোদিই এখন পাকিস্তান সফরের মাধ্যমে চমক সৃষ্টি করার চেষ্টা থাকলেও এক সিরিয়াস বিজনেসে পাকিস্তানের সঙ্গে জড়াতে চান, একথা শতভাগ সত্যি।

সারকথায় দেখা যাচ্ছে, ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশেই আইএস ইস্যুটা এখনও মুখ্য ইস্যু হতে এবং যথাযথ গুরুত্ব পাবার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের বিরোধী কোনঠাসার আভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে  বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

[এই একই প্রসঙ্গে আমার দুটো লেখা কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে এবং ভিন্ন ভিন্ন পয়েন্ট তুলে  দুটি দৈনিকে ছাপা হয়েছিল। প্রথমটা ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫ দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় আর দ্বিতীয়টা ২৭ ডিসেম্বর ২০১৫ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে ঐ লেখা দুটোর পয়েন্টগুলোকে একসাথে করে এরপর নতুন করে পরিবর্ধন ও এডিট করে এখানে আবার ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

goutamdas1958@hotmail.com

ইউরোপের মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন

ইসলামবিদ্বেষের ছায়ায় দেখা
মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন

গৌতম দাস
http://wp.me/p1sCvy-qH

২০১৫ ডিসেম্বর ২৯

আইএস কারা, কোথা থেকে কোন দেশ থেকে এসেছে; কী ধরণের মানুষ এরা যারা আইএস সংগঠনে এসে যোগ দিচ্ছে ইত্যাদি প্রশ্নে আমরা জানি মূলত এদের এক বিশাল অংশ পশ্চিমা সমাজগুলো থেকে। কিন্তু পশ্চিমা সমাজের কারা কারা কোন ধরণের সামাজিক, অর্থনৈতিক বা পারিবারিক ব্যকগ্রাউন্ডের সন্তানেরা আইএসে যোগ দিচ্ছে এনিয়ে পশ্চিমা সমাজগুলোর অভ্যন্তরে বিশেষত ইউরোপের দেশগুলোতে পরিচালিত সামাজিক গবেষণার শেষ নাই। কী ধরণের মানুষেরা বিশেষ করে আইএস সংগঠনে যোগ দিচ্ছে এবিষয়ে প্রচলিত ধারণাগুলো মিথ্যা দাবি করে – আমেরিকান উচু কদরের দ্বিমাসিক জর্নাল “ফরেন এফেয়ার্স” এর চলতি ডিসেম্বরে প্রকাশিত জানু-ফেব্রু ২০১৬ সংখ্যায় – এক রিপোর্ট করেছে। যারা পশ্চিমা নেতা দেশ- দুনিয়া চালায় ও নীতি নির্ধারক, এমন গুরুত্বপুর্ণ লোকেদের চিন্তা ও পাঠের জন্য জরুরি বলে মনে করা হয় এই জর্নালকে – এই অর্থে এটা প্রেস্টিজিয়াস জর্নাল বলেন কেউ কেউ। যেমন হিলারি ক্লিনটন, ওবামা সরকারের সেক্রেটারি অব স্টেট থাকা অবস্থাতে এখানে লেখা ছেপেছেন। সেই জর্নালে আলোচ্য আর্টিকেলটা লিখেছেন ভারতে জন্ম বৃটিশ নাগরিক কেনান মালিক ()।
মানুষ কেন সন্ত্রাসবাদী ভাবাদর্শ (র‍্যাডিক্যালিজম) আপন করে নেয় এবিষয়ে মোটা দাগে প্রচলিত চারটা তত্ত্বের কথা তুলেছেন লেখক কেনান মালিক।  সেগুলোর “প্রথম তত্ত্ব বলে – লোকে জঙ্গী হয় কারণ তারা ধর্মীয় অনুমোদন পিছনে আছে  এমন কিছু জঙ্গীবাদী ভাবাদর্শ সহজে তাদের  নাগালে আসে, তাই। কেনান বলছেন, কিন্তু বৃটিশ আভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা বিভাগ ২০০৮ সালে MI5 পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে (লিক হয়ে বেরিয়ে পড়া রিপোর্ট) “ধর্মীয় জোশ উন্মাদনায় উজ্জীবিত হওয়া দূরে থাক বরং যোগদানকারীদের বিরাট এক অংশ নিয়মই ধর্মকর্ম পালন করে না”। (• Far from being religious zealots, a large number of those involved in terrorism do not practice their faith regularly. Many lack religious literacy and could actually be regarded as religious novices. ) ওদিকে দ্বিতীয় তত্ত্ব বলে, অন্যান্য জঙ্গীবাদী ভাবাদর্শ সাধারণত যেভাবে মানুষে অর্জন করে তা থেকে ভিন্ন ভাবে এরা ভাবাদর্শ লাভ করে। প্রচলিত ধরে নেয়া ধারণা হল এদের ভাবাদর্শ ঘৃণা-ছড়ানী-প্রচারকদের থেকে এসেছে “ideology comes from hate preachers”, তাই। গবেষণায় এর পক্ষেও সমর্থন মিলেনি। তৃতীয় তত্ত্ব বলে, এটা যেন ভারী কিছুকে যান্ত্রিকভাবে বইবার এক কনভেয়ার বেল্ট এর মত; যার শুরু হয়  ক্ষোভ অসন্তোষে মানুষের ঐ বেল্টের উপর উঠে বসা থেকে। এরপর তা এক ধর্মভাবের ভিতর দিয়ে পার হয়ে এমন এক রেডিকেল বিশ্বাসের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয় যা পরিণতিতে সন্ত্রাসবাদে পৌছায়। কেনান বলছেন কিন্তু ২০১০ সালের আর এক বৃটিশ গবেষণা রিপোর্টও কনভেয়ার বেল্ট তত্ত্বকে নাকচ করে বলেছে এটা ভাবাদর্শ বিষয়টাকে অযথা ফুলিয়ে ফাপিয়ে দেখিয়েছে। ……conveyor belt thesis “seems to both misread the radicalization process and to give undue weight to ideological factors.”। আর চতুর্থ তত্ত্ব , এরা বারেবারে বলে মানুষকে বিশ্বাস করাতে চায় সন্ত্রাসবাদে যোগদানকারীরা হল সমাজের সেই গ্রুপ যারা সামাজিক অসাম্য ও সমাজের সাথে অ-সম্পৃক্ততার সমস্যার শিকার। ফলে মানুষ অমন সন্ত্রাসবাদী ভাবাদর্শকে আপন করে নেয়। কিন্তু কেনান বলছেন, লন্ডনের কুইন মেরী কলেজের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, “সন্ত্রাসবাদীওরা আর যাই হোক এরা সামাজিক অসাম্য ও সমাজের সাথে অ-সম্পৃক্ততার সমস্যার ভুগা ব্যাকগ্রাউন্ডের জনগোষ্ঠী থেকে আসা কেউ নয়। বরং যারা জিহাদী্ গ্রুপে যোগ দিয়েছে এরা  বয়সে আঠারো থেকে বিশ বছরের মধ্যে, এরা অবস্থাপন্ন পরিবারের সন্তান, বাসায় ইংরাজিতে কথা বলে, হাইস্কুল শিক্ষায় শিক্ষিত; কখন কখনো তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েরও। আসলে  তারুণ্য, অর্থসম্পদ ও শিক্ষিত – এ’তিনটাই গুরুত্ত্বপুর্ণ নির্ণায়ক; এমন ক্যটাগরিই সন্তানদের বেশি বিপদজনক”।

কেনান মালিক এভাবে সামাজিক গবেষণার ক্রিটিকগুলো জড়ো করে দাবি করে বলছেন, “পশ্চিমের সমস্যা হল, তারা এইসব পুর্ব-অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তাদের আভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী নীতি সাজিয়েছে; যেগুলোর সবই ভুল”। ইউরোপে পরিচালিত বিভিন্ন সামাজিক গবেষণার বরাতে কেনান মালিক এবার নিজ বরাতে এর কারণ বলছেন এভাবেঃ “দেখা গেছে যোগ দেয়া বেশির ভাগ তরুণ টিনএজ বয়সের – এই to little interaction with others in the society. Theirs is a much more existential form of alienation. তরুণেরা জিহাদী সন্ত্রাসে যোগ দিবার কারণ হল কিছু একটা তারা খুঁজে ফেরে যেগুলো খুব বেশি বর্ণনা করা যায় না তবু সেগুলো যেমনঃ পরিচয় খুঁজে ফেরা, অর্থ খোঁজ করা, সামিল বোধ করা, সম্মানবোধ করা। আর এটা মোটেও সত্যি না যে হবু জিহাদীরা মুল সমাজের সাথে দুর্বলভাবে যুক্ত থাকে এই অর্থে যে তারা স্থানীয়ভাষা বলতে পারে না অথবা স্থানীয় আদব-কায়দা রপ্ত নাই অথবা সমাজের অন্যান্যদের সাথে আলাপ আলোচনায় অংশ নিতে পারে না বা নেয় না। কিন্তু তাদের অস্তিত্ত্বমানতাবোধ বিষয়ক এক বিচ্ছিন্নতাবোধ আছে”।

শেষের এই বাক্যটা বলার জন্য লেখক কেনান মালিকের এতক্ষণকার কসরত। “বিচ্ছিন্নতাবোধ”। এই শব্দ ও ধারণা মার্কসবাদীদের মধ্যে বহুল প্রচলিত। বিশেষত সাহিত্যের এস্থেটিকস বা সৌন্দর্যতত্ত্ব চর্চায়। “বিচ্ছিন্নতাবোধ” ধারণাটা সার কথায় বললে, ক্যাপিটালিজম উতপাদন সম্পর্কের মধ্যেকার এক নতুন ফেনোমেনা হল, এখানে শ্রমিক নিজের উতপাদ্য বা প্রডাক্ট থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করে। নিজ উতপাদ্য, নিজের সৃষ্টির ভিতর  নিজে কোথায় সে অস্তিত্ত্বমান আছে তা খুজে পায় না। অন্তত কোনটা তাঁর শ্রমের অংশ বা ক্রেডিট তা চিনতে পারে না। এথেকে  অর্থাৎ উতপাদন থেকে উতপাদকের বিচ্ছিন্নতাবোধ, এক বিরহ সৃষ্টি হয়। এই অর্থে যে, উতপাদনের আগে বাজার দরে শ্রমিককে শ্রমমুল্য দিলেও তা উতপাদিত পণ্যে হাজির হবার পর ওর বাজার মুল্য আগের মোট সব খরচের চেয়ে বেশি হবে – যেটাকে আমরা মুনাফা বলে ধরে নেই। অর্থাৎ পণ্যের আসল এডেড ভ্যালু  ওর কাঁচামাল, মেশিনারিস ই্ত্যাদির উপর পরিশোধিত শ্রমমুল্য এসবের যোগফলের সমানের চেয়ে বেশি হবে। প্রতিটা উতপাদিত পণ্যের সাথে তৈরি হয় এই বাড়তি মুল্য। এটাই মার্কসের সারপ্লাস ভ্যালু বা “বাড়তি মুল্য তত্ত্ব”। বাড়তি মুল্য থেকে প্রমিক বঞ্চিত হয়ে চলেছে সব সময়। এটাই মুল্য হিসাবে  তা না পাবার কারণে তাঁর বিচ্ছিন্নতাবোধ  অথবা বলা যায় উতপাদিত পণ্যকে নিজের মনে না করতে পারার বিচ্ছিন্নতাবোধ। এছাড়া, কাঁচামাল থেকে  ফিনিশ প্রডাক্ট যত জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসবে  ততই প্রডাক্টের কোন অংশটা কোন শ্রমিকের শ্রমে তৈরি তা আলাদা করা মশকিল হয়ে যাবে। সবমিলিয়ে এক বিচ্ছিন্নতা বা বিরহ বোধের সৃষ্টি হবে। অনেকা যেন বাচ্চা জন্ম দিবার পর কোন কারণে মা বাচ্চার সাথে সম্পর্কিত বা টান বোধ না জাগা ধরণের সমস্যা। মানুষের মৌলিক স্বভাব বৈশিষ্ঠগুলোকে মুখ্য করে সিনেমা বানানো বা সিনেমায় সেগুলোকে আনার ক্ষেত্রে  Rainer Werner Fassbinder নামের এক জর্মন ফিল্মমেকারের কথা অনেকেই জানেন; যিনি এনিলিয়েশন বা বিচ্ছিন্নতাবোধের উপর সিনেমা বানিয়ে খ্যাত।

বুঝা যাচ্ছে, আমাদের আলোচনার কেনান মালিক  আসলে এই বিচ্ছিন্নতাবোধ তত্ত্বের একজন খাতক। সার করে বললে, কেনান মনে করেন পশ্চিমকে রেডিক্যাল ইসলামি বিপ্লবীর সমস্যার মুখোমুখি  হতে হয়েছে তাদের জিহাদী ভাবাদর্শের জন্য – একথা তিনি মানতে নারাজ। ইসলামি রেডিক্যালিজম এর কোন কারণ নয়। এজন্য নানান গবেষণা ফলাফল হাজির করে তিনি তা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তবে তিনি মানেন এক ধরণের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অপরের প্রতি টান বা আগ্রহ কমে যাবার সমস্যা পশ্চিমা সমাজে আছে, তৈরি হয়ে আছে  এটা তিনি মানেন।আসলে তিনি ইউরোপসহ পশ্চিমকে এসবের খাস জবাব বিচ্চিন্নতাবোধ দিয়ে দিতে চান, দেয়া সম্ভব দাবি জানাতেই এই রচনা।

তিনি বলছেন,  ইতোমধ্যেই হবু জিহাদীরা প্রধান ধারার সংস্কৃতি, ভাব এবং আচারনিয়ম ইত্যাদিতে ভালভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকা সত্ত্বেও তা ত্যাগ করেছে আর এর বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গীর খোঁজে নেমেছে। এটা মোটেই বিস্ময়কর নয় যে, জিহাদী হতে ইচ্ছুক অনেকে হয় নতুন করে ইসলামে ধর্মান্তরিত নয়ত, মুসলিম যারা দেরিতে নিজেদের ধর্মের দিকে নজর ফিরিয়েছে এমনও আছে। তবে উভয় ক্ষেত্রে তাদের সমাজ নিরাসক্ততা, বিচ্ছিন্নতা তাদেরকে সাদা-কালো ভাবে মরাল কোডের চরম ইসলামিজমের দিকে ঝুকিয়ে ফেলেছে। ফলে “এটা ঠিক কোন রেডিক্যাল ভাবাদর্শের বিষাক্ত করে ফেলা নয় বরং এটা অবশ্যই সমাজের প্রচলিত প্রধান ধারার মরাল কাঠামোর প্রতি অনাস্থা এবং একই সাথে এক বিকল্পের খোঁজে লেগে পরা”। কেনন বলছেন, “অতীতে সমাজের প্রধান ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন সহানুভুতিহীন মানুষ রাজনৈতিক রূপান্তরের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল, চরম বাম ধারা থেকে শ্রমিক আন্দোলন অথবা কোন রেসিজম- বিরোধী আন্দোলন এমন অনেক কিছুতেই যোগ দিয়েছেন”। ফলে কেনন বলছেন, স্বভাবতই সামিল থাকাহীনতা, সংশ্লিষ্টহীনতা বোধ, “এটা কোন মুসলিম সমস্যা নয়”। মুসলিম সমস্যা বলে ালিয়ে দেয়া যাবে না।

কেননের মুখে মুসলমানেদের দায়ী না করে দেখে – এটা দেখে আমাদের ঠিক খুশি হবার কিছু নাই। আর কেনন কারণ মূল প্রশ্ন হচ্ছে, কেন পশ্চিমের বিশেষত ইউরোপের শত শত মুলত টিনএজ তরুণ আইএস এর মত সংগঠনে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। এটা আশির দশকে পপুলার বিচ্ছিন্নতাবোধ বা এলিনিয়েশন বা (মানুষ বা শ্রম তার উৎপাদিত উৎপন্নের ভিতর নিজেকে খুজে পায় না) তত্ব দিয়ে একালে আর ব্যাখ্যা করা যাবে না। কারণ এই দৃষ্টিভঙ্গি খুবই সস্তা একপেশে এবং বস্তুবাদী। এটা অর্থনীতিবাদী বা স্টালিনিস্ট ধারণাও বটে। কারণ ‘আধুনিক রাষ্ট্রে’ মানুষ (বা তাঁর শ্রম) যেমন নিজের বস্তুগত সৃষ্টির থেকে বিচ্ছিন্নতা বোধ করে, এক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় ঠিক একইভাবে মানুষের প্রতি মানুষের স্পিরিচুয়াল টান অনুভব, সকলের সাথে একই তৌহিদে মিলিত হবার আকুতি ও আকাঙ্খাও তাঁর ভিতর কাজ করে। এরও এক অভাব বোধ হয়। কারণ মানুষ শুধু শ্রমের এক আধার, বৈষয়িক অর্থনীতির এলিমেন্ট মাত্র নয়; বরং একই সাথে সে স্পিরিচুয়াল বিয়িং। সকল অপরের সাথে সম্পর্কহীনতা – এই অভাব মানুষের মধ্যে এক হাহাকারের জন্ম দেয়, সে অস্থির হয়ে উঠে, দমবন্ধ লাগে। এটাও আর এক চরম বিচ্ছিন্নতাবোধ। অতএব বিচ্ছিন্নতাবোধ মানেই কেবল বস্তুগত বিচ্ছিন্নতা্বোধ নয়; স্পিরিচুয়াল বিচ্ছিন্নতাবোধ সম্ভবত প্রভাবে এর দিক থেকে বস্তুগত বিচ্ছিন্নতা্বোধ এর চেয়েও বড়। এদিকটাই কেনান মিস করেছেন। তিনি আশির দশকে পড়ে থাকতে চাইছেন। কেননের এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে আমাদের এই সমালোচনা আরো জায়েজ মনে হয় এজন্য যে তিনি এরপরে লিখছেন, “একালের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মধ্যে মানুষের নিরাশক্তবোধ, রাজনৈতিকভাবে স্বরবিহীন থাকা অবস্থা ছেয়ে গেছে। এধরনের উদ্বেগ ও অভাবগুলোকে কোন চার্চ বা ট্রেড ইউনিয়ন বুঝবে না”। অর্থাৎ কেনান একালে ২০১৫ সালে এসে এখনও বস্তবাদ-সর্বস্ব “এলিনিয়েশন বা বিচ্ছিন্নতাবোধ” তত্ত্ব আউড়িয়ে সব রোগ সারানোর ধনন্তরি ওষুধ মনে করতে চাইছেন। বিচ্ছিন্নতা্বোধ চার্চ, মসজিদ মন্দির – বলে নজর আন্দাজ করতে চাইছেন। আমাদের দেশে “বিরহ” বলে গানের ধারা আছে; ময়মনসিংহ থেকে মানিকগঞ্জ, কুষ্টিয়া ইত্যাদি। যারা আমাদের এলিনিয়েশন ত্ত্ত্ব বুঝবার নাগাল পাবার অনেক আগে থেকে স্পিরিচুয়াল আবহে “বিরহ” গান করে আসছে।

কেননের এই রচনার ছোট শিরোনাম “ইউরোপের বিপদজনক মাল্টিকালচারালিজম”। অর্থাৎ ভারতীয় অরিজিনের বৃটিশ  নাগরিক হলেও তিনি বৃটিশ মাল্টিকালচারালিজম নীতির সমালোচক। আবার এটাই তাঁর একই নিশ্বাসে ইউরোপের ফ্রান্সের ক্ষেত্রে ফরাসি এসিমিলিয়েশন বা ‘সবাইকে একরকম করণ’ নীতির পক্ষে দাঁড়ানো। আসলে মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন – কথা দুটোরই কোন সারবত্তা নাই। তবুও বুঝবার জন্য শব্দদুটোর অর্থ খোলসা করা দরকার। মাল্টিকালচারালিজম বলতে বৃটিশ বুঝটা হল – বৃটিশ সমাজটাকে সে নানান কমিউনিটির মিলিত এক বড় কমিউনিটি হিসাবে রাখতে, দেখতে চায়। বৃটিশ কলোনি মাস্টারের দেশ সমাজে কলোনি প্রজা দেশ থেকে আসা সবাই যে যার ফেলে আসা নৃতাত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগলিক ইত্যাদি পরিচয় বজায় রেখেই “উপরি এক বৃহত্তর বৃটিশ সমাজের”নিচে এক বৃটিশ পরিচয়ে বড় হোক; এটাই চায়। বিপরীতে ফরাসী পছন্দের এসিমিলিয়েশন (এক ছাঁচে ঢালাই করার নীতি) শুনতে ভাল লাগলেও কিন্তু আসলে অনেক বেশী বলপ্রয়োগে জবরদস্তি করে নাগরিক সবাইকে একরকম করণের প্রচেষ্টা এটা। অর্থাৎ এখানে আর ফরাসি কলোনি মাস্টারের দেশ সমাজে সবাই যে যার ফেলে আসা নৃতাত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগলিক ইত্যাদি পরিচয়ের স্বীকৃতি নাই। বরং সব ভুলে যেতে হবে, বাদ দিতে হবে। বাধ্য করা হবে। কিন্তু এই বাধ্যবাধকতার দিকটা ফরাসীরা আড়ালে রাখতে চায় বা থেকে যায়। সবাইকে “সুন্দর” ইউনিফর্ম একরকম করার নামে (ইংরাজি সিমিলার বা একরকমকরণ থেকে এসিমিলিয়েশন ) জবরদস্তিতে সবাইকে ফরাসি হতে, ফরাসি কালচারই একমাত্র চর্চার কালচার হতে, করতে বাধ্য করা। যতটুকু ও যেভাবে বর্ণনা করলাম তা থেকে মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন এর ভিন্নতা্র সবটা বুঝা বা বুঝানো যাবে না। কারণ এসব ভারি কথার আড়ালে মুল আরও এক বিষয়কে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

প্রথম কথা হল, পশ্চিম মাইগ্রেন্ট শ্রমিকের আমদানি ঘটায় একেবারে একমাত্র নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থে, সস্তা শ্রম পাবার স্বার্থে, সবসময় এটাই সে করে এসেছে। নইলে লো-স্কিল না নো-স্কিল লেবার নিতে হত কেবল নিজ দেশীয় চামড়া থেকে ফলে এর মুল্য কমপক্ষে দ্বিগুণ তাদের যোগাতে হত। ফলে একমাত্র সস্তা মাইগ্রেন্ট শ্রমিক পাবার স্বার্থেই তাকে নিজের সমাজে এসব “মাল্টিকালচারালিজম বা এসিমিলিয়েশন” বলে বকোওয়াজের জন্ম দিতে হয়েছে। এটা প্রথম সত্য। তবে নিজ অর্থনীতি সমৃদ্ধিতে ভাল চলা অথবা মন্দা হয়ে চলার সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য অন্য চামড়ার শ্রমিক কতজনকে আসতে সে অনুমতি দিবে এটা সময়ে সময়ে তাকে কড়া নিয়ন্ত্রণে করতে যেতে হয়। অর্থনীতি ভাল মানে বেশি শ্রমিক প্রয়োজন নইলে উলটা হলে সব খেদাও – এটাই হল আসল নীতি। সবারই নীতি তবে দোষ দেয়া হয় তথাকথিত ডানপন্থি্র।

এরপর দ্বিতীয় আর এক আজব সত্য হল, কলোনি দখলের ফেলে আসা বছরগুলোতে  কপাল গুণে বৃটিশের কলোনির তুলনায় ফরাসি কলোনির বাসিন্দারা বেশির ভাগই মুসলমান বা ইসলাম ধর্মপালনকারী। এরফলে কলোনি প্রজা দেশ থেকে সস্তা শ্রমের মধ্যে মুসলমান প্রজার হার ফ্রান্সের বেলায় বেশি। তাই সস্তা শ্রম ঢুকার অনুমতি দিতে গিয়ে একই ইউরোপে বৃটিশ ও ফরাসী হয়েও তাদের নীতি ও অভিজ্ঞতা একই রকম নয়। এভাবে ফ্রান্সে মুসলমানের সংখ্যা বলা হয় ৫০ লাখ। এসব তথ্যের দিকে নজর করে আগাম ব্যবস্থা হিসাবে ফরাসী সরকার পছন্দ করেছে – এসিমিলিয়েশন নীতি। কারণ এসিমিলিয়েশনের কথা বলে স্কার্ফ হিজাব বা কোন মুসলমান চিহ্ন প্রকাশিত হওয়া ঠেকিয়ে দেয়া যায়। ফেলে আসা নৃতাত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগলিক ইত্যাদি যেকোন পরিচয় বা চিহ্ন ভুলে গিয়ে সব কিছু ফরাসি হতেই হবে বলে বাধ্য করা যায়। অতএব “মাল্টিকালচারালিজম বা এসিমিলিয়েশন” – ফরাসি না বৃটিশ কোনটা ভাল – এসব কথা তাই আসল কথা লুকিয়ে বকোওয়াজ।

তাহলে কথা দাড়ালো, সস্তা শ্রম থেকে বেশি মুনাফার লোভে ক্যাপিটালজম কলোনি প্রজা দেশ থেকে শ্রম আনতে বাধ্য। আবার সেই শ্রম কে কীভাবে ম্যানেজ করার সুবিধা দেখে সে ভিত্তিতে “মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন” এর কূটতর্কও সে হাজির করবে। কারণ নইলে আসল কথাগুলো সরাসরি বলতে হবে। কেনান মালিক তবু “মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন” এর ভুয়া তর্কের মধ্যে “মাল্টিকালচারালিজমকে বেশি বিপদজনক বলছেন। কারণ বৃটিশরা নাকি “মাল্টিকালচারালিজমের কথা বলে মুসলমান ধর্মীয় নেতাদেরকে কমিউনিটির প্রতিনিধি মনে করেন ভুল করে, বেশি গুরুত্ব দেন; ইত্যাদি। কেনানের কথা শুনে বৃটিশদেরকে বোকা ভাবার কোন অর্থ নাই। আবার বৃটিশদের নীতিটা বেশি ভাল তাও নয়। ব্যাপারটা হল ম্যানেজমেন্ট। নাগরিকদের বা অপজিশনকে লিবারেল স্পেসের মধ্যে রাখলে তাদের কথা বলতে দেয়া, বিরোধীতা করতে দেয়ার আইনি সুযোগ যতটা সম্ভব বেশি রাখলে তাদের সকলের বিরোধীতা সামলে রাখা তুলনামুলক সহজ হবে বলে মনে করা হয়। বৃটিশ প্রশাসন মনে করে এই লিবারেল নীতি তাদের জন্য বেশি ফলদায়ক হচ্ছে। আর ধর্মীয় নেতার প্রসঙ্গটা হল, ধর্মীয় নেতারা যদি প্রতিদ্বন্দ্বী কোন নেতার চেয়ে বেশি প্রভাবশালি হন তাহলে বৃটিশ প্রশাসন কী তা অস্বীকার করার মত বোকামি করতে পারে? বরং একথা বলাতে কেনানের কথায় ইসলাম বিদ্বেষের ছায়া দেখা যাচ্ছে। কেনান মালিক নিজেই বলেছেন “মাল্টিকালচারালিজম বা এসিমিলিয়েশন” দুটোর মধ্যেই ভাল মন্দ দুটাই আছে। তবু কোন ব্যাখ্যা ছাড়াই তিনি শিরোনামে “মাল্টিকালচারালিজমকে” বেশি বিপদজনক বললেন। এথেকেও মনে করার কারণ রয়েছে যে তিনি ফরাসিদের মত ইসলাম-বিদ্বেষ জারি রাখার সুযোগটা হারাতে চান না।

গৌতম দাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ২১ ডিসেম্বর তারিখে। অনেক জায়গায় অপুষ্ট বা সংক্ষিপ্ত রেখেই তা ছাপতে হয়েছিল। এখানে সেসবের অনেক কিছু পরিপূরণ করে, সংযোগ ও সম্পাদনা করে আবার এখানে ছাপা হল। ]

নিজের হত্যাকারীকে দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনা

নিজের হত্যাকারীকে দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনা
গৌতম দাস
http://wp.me/p1sCvy-nD

 

খবরটা প্রথম প্রচারিত হয় ১৫ ডিসেম্বরের বিদেশি মিডিয়ায়। সৌদি আরব নাকি নিজের নেতৃত্বে ৩৪ ইসলামী দেশের এক সন্ত্রাসবিরোধী জোট গঠন করে ফেলেছে। আমাদের দেশে খবরটা পৌঁছায় পরের দিন। দেশে খবরটা আবার প্রচারিত হয়েছে এককাঠি অতিরিক্ত গুরুত্বে যে, বাংলাদেশ ওই জোটে অংশগ্রহণে সম্মতিও প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের দুইজন মন্ত্রীও এ খবরে সায় দিয়ে জানিয়েছেন, খবর পাকা। ফলে খবরে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা নিয়ে আর সন্দেহের অবকাশ থাকেনি। কিন্তু গোল বেঁধেছে মূল খবরটা আসলে কী, কিইবা এর তাৎপর্য এসব বিষয়ে। খবরটা নিয়ে মিডিয়ায় যতই  খোঁড়াখুঁড়ি চলছে, ততই দেখা যাচ্ছে বিভ্রান্তি বাড়ছে; সেটা দেশি এবং বিদেশি মিডিয়া, দুই জায়গাতেই। এই লেখা যখন লিখছি তখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে মূল খবরটা আসলে যতটা  প্রচারিত হয়েছে বাস্তবে  জোটের পুর্ন প্রস্তুতির ব্যাপারটা তখনও ততদুর আগায় নাই। অথচ বড় করে তা অনেক আগেই প্রচার হয়ে গেছে এবং করা হয়েছে। এছাড়া খবরের ভেতরেই শুরু থেকে বড় বড় ফাঁক রয়ে গেছে বা রেখে দেয়া হয়েছে। যেমন বেশিরভাগ খবরের শিরোনাম, “সৌদি আরব ৩৪ দেশের এন্টি-টেররিজম কোয়ালিশন গড়েছে” এটা আল জাজিরা থেকে নেয়া। এমন ধরনের শিরোনাম যতটা ভারি ওজনের ভেতরের খবর ততটা ভারি ও পোক্ত মোটেও নয়। যেমন সরাসরি আইএস বিরোধী না বলে  সাধারণভাবে “এন্টি-টেররিজম” জোট বলা হয়েছে। তবু এর অর্থ আইএস বিরোধীতাই হয়েছে। অনেকে সেই কারণেই আইএসের প্রতি ইঙ্গিত থাকে এমন শিরোনাম  দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, এটা কী ধরনের জোট? এর ম্যান্ডেট কী? এছাড়া এই জোটের ম্যান্ডেট কী হবে তা নিয়ে কোনো খসড়া কি তৈরি হয়েছে, যা থেকে হবু সদস্যরা পরিষ্কার জানবে কেমন ধরনের জোট হচ্ছে আর ওই জোট ঠিক কী করবে!  জোটে সরকার অংশগ্রহণ করবে বাংলাদেশের মন্ত্রীরা তা স্বীকার করে নেয়াতে এনিয়ে মোটা মোটা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। ১৭ ডিসেম্বর দৈনিক মানবজমিন ‘মিশ্র প্রতিক্রিয়া’ শিরোনামে রিপোর্ট করেছিল। ওই রিপোর্টে লিখেছিল, “বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, এটি সামরিক জোট নয়”। স্বভাবতই এ আধা-তথ্যে মানুষ বিষয়টা সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু উত্তর পাওয়ার চেয়ে নতুন নিরুত্তর প্রশ্নের সংখ্যাই বাড়াবে। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘প্রাথমিক আলোচনায় সৌদি আরব আমাদের যে ধারণা দিয়েছে  তা হচ্ছে এটা যুদ্ধ করার সামরিক জোট নয়। এটি মূলত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের একটি কেন্দ্র হবে। এ জোটের সঙ্গে যুদ্ধের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই”।  স্পষ্টতই মিডিয়ার খবরগুলো ইতোমধ্যেই যে উচ্ছ্বাস আগ্রহের উত্তাপ বা হাইপ এরই মধ্যে তৈরি করে ফেলেছে, প্রতিমন্ত্রীর এ বক্তব্য তাতে পানি ছিটিয়ে গুরুত্ব লঘু করার চেষ্টা। এ থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার যে, সৌদি ফরেন অফিস বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলার সময় জোট কী করবে, ফোকাস কী, কোথায় গিয়ে থামবে, সুনির্দিষ্ট কী উদ্দেশ্য ইত্যাদি প্রসঙ্গ ছিল না। বরং এদিকে হওয়ার চেয়ে যেনবা সৌদি ফরেন অফিস থেকে বাংলাদেশকে জিজ্ঞাস করা হয়েছিল সৌদি কোনো উদ্যোগকে বাংলাদেশ সমর্থন করবে কিনা এবং সঙ্গে থাকবে কিনা এতটুকুতেই সীমিত ছিল। জোটের সম্ভাব্য কাজ ভুমিকা ম্যান্ডেট ইত্যাদি ছিল খুব গৌণ। কেবল “সৌদি উদ্যোগ” এই প্রেস্টিজিয়াস জিজ্ঞাসার প্রতি আমরা সমর্থন দিচ্ছি কীনা এটাই মুখ্য বিষয় ছিল। ধাবিত ছিল। ওদিকে ১৮ ডিসেম্বরের প্রথম আলো “সৌদি জোটের ভবিষ্যৎ সংশয়ে” এই শিরোনামে এ’বিষয়ে আরও কিছু সংযোজন করেছে। প্রতিমন্ত্রী ওখানে বলেছেন, “এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে সাধারণত আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় দলিল সই হয়ে থাকে। কাজেই এখানেও বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আলোচনা করে চূড়ান্ত করার সুযোগ থাকছে”। প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্য আমাদের অনুমানকে পোক্ত করে। এ বিষয়টাকে তাই আমরা বলছি হবু জোটের ‘উদ্দেশ্য লক্ষ্য’ বিষয়ক কোনো খসড়া এখনও চালাচালিই শুরু হয়নি। তবে একথা ঠিক যে, বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রীর ব্রিফিং থেকে বিস্তারিত না জানলেও যা জানা গিয়েছে এসব বিষয়ে ভিন্ন কিছু বক্তব্য ১৫ ডিসেম্বরের রয়টার পরিবেশিত খবর আমাদের আরও কিছু জানাচ্ছে। সেখানে যেমন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল জুবায়েরকে প্যারিসে সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন করেছেন “জোটের পক্ষে কোনো সামরিক শক্তি মাঠে নামবে কিনা” এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন, “সব সম্ভাবনাই টেবিলে আছে”। অর্থাৎ জোটের সামরিক তৎপরতাও থাকতে পারে। তিনি নাকচ করেননি। আবার ৩৪ দেশের জোট গঠনের বিষয়ে সৌদি রাজধানী রিয়াদে ঘোষণা নিয়ে সাংবাদিকের সামনে প্রথম এসেছিলেন সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী মুহম্মদ বিন সালমান। তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, “সন্ত্রাসবিরোধী বলতে তিনি শুধু আইএস নয়, আইএসসহ সব সন্ত্রাসবাদীকেই বুঝিয়েছেন”। তাহলে আমাদের প্রতিমন্ত্রী এখনও অনেক বিষয় আমাদের ব্রিফ করার সময় হয়নি মনে করলেও সেসব প্রশ্নে সৌদি মন্ত্রীদের মনের অনেক ডিটেইল অবস্থান জানা গেছে। তবে একথা ঠিক যে, পূর্বপ্রস্তুতিমূলক বহু কাজ শেষ না করেই এর আগেই সৌদি কূটনীতিকরা মিডিয়ায় হাজির হয়েছিলেন। বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো দেশের ওপর সৌদি আরবের যে প্রভাব তাকে কাজে লাগিয়ে সৌদি কূটনীতিকদের ঘাটতি তারা আপাতত উতরে গেছেন বা সুবিধা নিয়েছেন। তবে পাকিস্তান তার নাম সৌদিদের তালিকায় দেয়ার আগে কেন তাকে আগে জানানো হয়নি এ নিয়ে প্রথমদিন বিস্ময় প্রকাশ করলেও পরের দিন থেকে তা হজম করে মিটিয়ে ফেলেছে। আর বাংলাদেশ প্রথমদিন থেকেই হাফ ব্রিফিংয়েই সম্মতি জানানোর কথাই সরাসরি স্বীকার করেছে।
ওদিকে এই জোট গঠনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রায় সব বিদেশি মিডিয়া যেদিক প্রশ্ন তুলেছে তা জেনুইন। তারা বলছে, সৌদি প্রস্তাবিত এই জোটে কোনো শিয়া-ইসলাম শাসিত সরকার, যেমন ইরান বা ইরাক সরকারের নাম নেই। ফলে বাস্তবত এটা শিয়া-বিরোধী সুন্নিদেরই জোট হয়ে গেছে। এছাড়া ইয়েমেনের হুতি প্রশ্নে কয়েক মাস আগেও সৌদিরা এমনই এক জোট (দুবাই, বাহরাইন, জর্ডান, মিসর ও সৌদিদের) তৈরি করে জোটের ব্যানারে নির্বিচারে ইয়েমেনে আকাশ বোমা হামলা চালিয়েছিল। সেখানেও শিয়াবিরোধী সুন্নিদেরই জোটের ছায়া বজায় ছিল এবং ওই বোমাবাজি ৬ হাজার হুতির জীবননাশ ছাড়া ইয়েমেনের সংঘাতের কোনো রাজনৈতিক সমাধানের কিছুই করতে পারেনি। তবে মনের ঝাল হয়তো মিটেছে। এদিকটাতেই সব মিডিয়া ইঙ্গিত করে সৌদি জোট একপেশে শিয়া-বিরোধী জোট হতে চায় বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। ওদিকে এনিয়ে আমেরিকান প্রতিক্রিয়া বেশ মজার ডিপ্লোম্যাটিক। আমেরিকা স্বাগত জানিয়েছে এং আরও বিস্তারিত শোনার জন্য অপেক্ষা করছে বলে জানিয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ-বিরোধী কোনো অবস্থান তারা নিতে চায়নি। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হল, ১৯৭৩ সাল থেকে চলে আসা আমেরিকান মধ্যপ্রাচ্য নীতি এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একালে আর সৌদি স্বার্থের সঙ্গে তালমিল রেখে মন যুগিয়ে চলতে পারছে না। বিশেষত যেদিন থেকে আমেরিকা ইরানের সঙ্গে ‘পারমাণবিক ডিল’ করার জন্য উদগ্রীব হয়েছিল আর শেষে ঐ ডিল স্বাক্ষর হয়েছিল।

মুল বিষয় সৌদি-আমেরিকান সম্পর্কের অবনতি
খুব সংক্ষেপ করে বললে, আমেরিকান ওয়ার অন টেরর ১৪ বছরে পা দিল অথচ এই যুদ্ধে ন্যূনতম কিছু অর্জন হয়েছে অথবা যুদ্ধ সমাপ্তি বা থামার নামগন্ধ আছে এমন কোন ইঙ্গিতও কোথাও নেই। ওদিকে ২০০৭ সালের শেষ দিক থেকেই এই যুদ্ধের প্রভাব বিশেষত যুদ্ধের খরচ বইতে গিয়ে আমেরিকান অর্থনীতিকে তা ক্রমান্বয়ে ভেঙে ফেলেছে। এককথায় বললে, আমেরিকান সামরিক সক্ষমতা এখনও একই রকম বহাল আছে, কিন্তু অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমছে বলে তা সামরিক সক্ষমতার অপারেশনাল কস্ট যোগাতে অযোগ্য হওয়াতে কার্যত তা সীমিত হয়ে গেছে, অকেজো করে ফেলছে। এই দশা থেকে মুক্তি পেতেই আমেরিকাকে ইরানের সঙ্গে ডিল করতে যেতে হয়েছে। কারণ ডিল হওয়াতে এখন আইএস বিরোধ ইরানকেও আমেরিকার পক্ষে মাঠে পাওয়া যাবে। নিজের অক্ষমতার কিছুটা হাল হবে। এটাই আমেরিকান স্বার্থ। আর ঠিক এটাই সৌদি স্বার্থবিরোধী। আসলে ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের উতখাতের সময় থেকেই কেবল ইরাক প্রশ্নে কার্যত একটা ঐক্যমত ছিল যে পরবর্তিতে  শিয়াদের দিকে কান্নি মারা এমন একটা ইরাক সরকার হবে যেটা একইসাথে আমেরিকা ও ইরানের পছন্দের। কিন্তু এই ঐক্যমত বা ডিল এর কোন প্রকাশ্য স্বীকৃতি ছিল না। কেবল কার্যত তা প্রতিফলিত হতে দেখা যেত। কিন্তু নতুন করে আইএস হাজির হওয়াতে এই অস্বীকৃত এলায়েন্স আর অপ্রকাশ্য রেখে বেশি দূর যাওয়া যাচ্ছিল না। তা থেকেই ইরান-আমেরিকার প্রকাশ্য পারমানবিক ডিল স্বাক্ষর করার বাস্তবতা তৈরি হয়। কিন্তু তাতে আমেরিকার জন্য এক নতুন সমস্যা হাজির হয়। সৌদি সরকার ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পর থেকেই কোন ইরান-আমেরিকার এলায়েন্সের ঘোরতর বিরোধী হল। সৌদি রাজতন্ত্র মনে করে খোদ ইরান বিপ্লবসহ ইরানের দুনিয়ায় হাজির থাকাটাই সৌদি রাজতন্ত্রের জন্য হুমকি। তবে আগে ইরান-আমেরিকার এলায়েন্সের কোন প্রকাশ্য কিছু না থাকায় এটা সৌদিরা সহ্য করে নিয়েছিল। কিন্তু পারমাণবিক ডিল স্বাক্ষর হয়ে যাবার পর ১৯৭৩ সালের পর থেকে এই প্রথম সৌদি ফরেন পলিসি আমেরিকার থেকে বড় ধরণের ভিন্ন হয়ে যেতে বাধ্য হয়। ফলে পরস্থিতি এমন যে  আমেরিকার পক্ষে দুই বগলে দুজন সৌদি আর ইরানকে নিয়ে হেঁটে চলতে সক্ষম থাকা একেবারে অসম্ভব। কারণ এমন কোনো কার্যকর কমন ফর্মুলা নেই, আমেরিকা খুঁজে পায়নি, যাতে সৌদি ও ইরান দুই পক্ষই আমেরিকার সঙ্গে একই সঙ্গে থাকে। এজন্য এরপর থেকে আমেরিকার সঙ্গে পরপর তিনটা সৌদি বিরোধের ঘটনা ঘটে গেছে। প্রথম ঘটনা মিসরে জেনারেল সিসিকে সৌদিদের ক্ষমতায় আনা এবং এর চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ হল সেটা আমেরিকাকে উপায়হীনভাবে মেনে নিতে হয়েছে। দ্বিতীয়টা হলো, ইয়েমেনে হুতিদের ওপর সৌদি নেতৃত্বে জোটের বোমা হামলা। এখানেও সৌদি আর আমেরিকান নীতির ভিন্নতা ছিল এবং এখনও আছে। ফলে একা সৌদি ইচ্ছায় ঘটনা গড়িয়েছে। যেটার কোন ফল সৌদিদের পক্ষে আসুক আর নাই আসুক তবে – “আমাদেরটা আমারাই করে নিতে পারি” ধরণের একটা স্বান্ত্বনা সৌদিরা নিজেদের জন্য এনেছে। ইতোমধ্যে সৌদি সরকারের আর এক মরিয়া উদ্যোগ নিয়েছিল যেটা কার্যকর হয় নাই তা হল,আমেরিকার জায়গায় রাশিয়াকে অস্ত্রের সোর্স এবং নিজ ফরেন পলিসি ও রাজস্বার্থের পক্ষে পার্টনার হিসাবে পাবার চেস্টা করে দেখাওপেন দেখা সাক্ষাত আলোচনা করা হয়েছিল। কিন্তু দুই রাষ্ট্রস্বার্থ এক কমন পয়েন্ট বের করতেে নাই। আর এবারের সৌদি নেতৃত্বে ৩৪ দেশের যে জোট, তা এখনও স্পষ্ট নয় যে, তাদের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য কী, কোথায় ফোকাস করবে। অথচ সৌদি প্রভাব যা মূলত নগদ অর্থের প্রভাব। এছাড়া বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো দেশের জন্য সৌদি প্রভাবে সায় না দিলে নিয়োজিত শ্রম চাকরিচ্যুতি ঘটিয়ে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারে, এই ভয়। যেটাকে আমরা প্রভাব বলছি। অথচ আমাদের বিপরীত স্বার্থ হলো, আমরা কী সৌদিদের পো-ধরার মাধ্যমে আইএসের খামোখা চক্ষুশূল হওয়ার রিস্ক নিচ্ছি না!এভাবে শত্রুকে দাওয়াত দিয়ে আনছি কিনা সে প্রশ্ন উঠবেই।
ওদিকে এখনও আমাদের সরকারি ভাষ্য হলো, বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নেই। সর্বশেষ গত সপ্তাহেও আমেরিকান সচিব প্রতিমন্ত্রী নিশা দেশাইদের সাক্ষাতের সময় এটাই বলা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন আরও ভালোভাবে উঠবে যে, সৌদি জোটে আমরা যাব কেন? অর্থাৎ আর পাঁচ জায়গায় সরকার যেমন তার সিদ্ধান্তের পক্ষে কোন ন্যায্যতা দেখাতে বা প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলেও গায়ের জোরে তা বাস্তবায়ন করে যায়। ফলে এখানেও আমাদের সৌদি ইচ্ছাকে কদর করতে হবে। এছাড়া খামোখা শিয়া-সুন্নি কোন সম্ভাব্য গোষ্ঠীদাঙ্গায় বিপজ্জনক সম্প্রদায়গত পক্ষ নিতে হবে।

এখানে আর একটা দিক আছে। গত মাসে প্যারিস হামলার পরের পরিস্থিতিতে সেটা আরও উন্মোচিত। এককথায় বললে, একেবারে মরিয়া বা অস্তিত্ব ঠেকে যাওয়া অবস্থা না হলে সারা পশ্চিমের কোন রাষ্ট্র কারও পক্ষেই আইএসের বিরুদ্ধে শুধু আকাশ বোমা নয়, মাঠে নেমে মোকাবিলার অর্থনৈতিক সামর্থ্য নেই। যুদ্ধের খরচ জোগানোর সামর্থ্য নেই। তাই হামলার পরে ফরাসি প্রেসিডেন্টের মেলা হম্বিতম্বির আইওয়াশ আমরা দেখলাম। আইএসবিরোধী জোট এই হয়ে যাচ্ছে, সর্বাত্মক যুদ্ধ এই তো সামনে যেন। অথচ সব ভুয়া শো-আপ মাত্র। আসলে তারা কেবল আকাশ পথে বোমা হামলার খরচটাই শেয়ার করল। এসব আলাপের শেষের দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির অনুরোধে ওআইসির এক মিটিং ডাকা হয়। কেরির ইচ্ছা ছিল যদি কিছু খরচ শেয়ার করতে সৌদিরা রাজি হয়! কিন্তু আমরা দেখলাম, সৌদিরা আবার স্বমূর্তিতে; ইয়েমেনের হুতি ইস্যুতে অকেজো নীতির মতোই আবার এক নীতি নিয়ে সৌদিরা হাজির। এ নীতি শুনতে অনেক ভালো লাগছে যে, ৩৪ দেশের জোট। কিন্তু সৌদি নেতৃত্বে এটা কতদূর যাবে, যেতে পারে! এতে আমেরিকার অবস্থা বেয়ারা বাচ্চার বাবার মতো। না সে বাচ্চা বাবার কথা শোনে, না বাবা তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে, না শাসন করতে পারে। সেজন্য আমেরিকা সৌদি উদ্যোগকে সরাসরি বিরোধিতা বা উড়িয়ে না দিয়ে কূটনৈতিক কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে। সৌদি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে এবার বিস্তারে পরিকল্পনা কী তা জানাতে বলছে। আসলে প্রকারান্তরে বলতে চাচ্ছে, সৌদিরা কোনো কার্যকর পরিকল্পনা দিতে পারবে না। ফলে হতাশ হয়ে যদি সে আমেরিকার নীতির কাছে আবার ফিরে যায়!
সর্বশেষ দেখা গেল চীনও সৌদিদের সমর্থন জানিয়েছে। এটাও চীনের কূটনৈতিক কৌশলগত অবস্থান। আমেরিকার কুটনৈতিক দুর্দশার সময়ে সৌদিদেরকে “চালিয়ে যাও” বলে পিঠ চাপড়ে দেয়া।

তবে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখলে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত উদ্বেগ জানিয়ে যত প্রতিক্রিয়া আমরা প্রকাশিত হতে দেখেছি তা জেনুইন। এই জোট যদি কার্যকর হওয়ার একটু-আধটু চেষ্টা করে তবে তা হবে শত্রুকে একেবারেই দাওয়াত দিয়ে ঘরে ডেকে আনার মতো ঘটনা। এছাড়া আমাদের বাড়তি এক বোনাস মিলবে – শিয়া-বিদ্বেষী এক জনগোষ্ঠী পরিচয়। অন্যের জন্য ভাড়া খাটা।

[লেখাটার প্রথম ভার্সন এর আগে গত ১৯ ডিসেম্বর দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে প্রকাশিত হল।]

চীনা ইউয়ানকে আইএমএফের মুদ্রার স্বীকৃতি

চীনা ইউয়ানকে আইএমএফের আন্তর্জাতিক মুদ্রার স্বীকৃতি
গৌতম দাস
০৮ ডিসেম্বর, ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-mF

 

আইএমএফের মালিক শেয়ারহোল্ডার রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধি ২৪ সদস্যের নির্বাহী বোর্ড ৩০ অক্টোবরের সভায় চীনের মুদ্রা ইউয়ানকে আইএমএফে রিজার্ভ জমা রাখার মুদ্রা হিসাবে স্বীকৃত চারটি (ডলার,ইউরো,পাউন্ড ও ইয়েন) মুদ্রার পাশাপাশি পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংক্ষেপে বললে, দুনিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় এমন আগের টপ চারটি মুদ্রার মতোই চীনা মুদ্রা ইউয়ানকেও এবার আইএমএফ তার পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে স্বীকার করেছে। এ স্বীকৃতির অর্থ কী? তাৎপর্যই বা কী, সেসব নিয়ে এখানে কথা বলব।

দেশের অর্থনীতি নিয়ে সাধারণ্যে যেসব ধারণা আলোচনা হয় সেখানে পুঁজিতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র বলে ভাসাভাসি কিছু ধারণা থাকলেও সে আলোচনা কখনও মুদ্রা পর্যন্ত যেতে দেখা যায় না। অর্থাৎ মুদ্রার কাজ বা ভূমিকা কী সে সম্পর্কে এর ভালো-মন্দ অলিগলি দিক সম্পর্কে আমাদের সাধারণ ধারণা আরও কম। বলা হয়ে থাকে, কোনো জিনিসকে মুদ্রার মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে গেলে ওর তিনটা গুণ থাকা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ মুদ্রা মানে যার ঐ তিন বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন এক. গ্রহণযোগ্যতা : অর্থাৎ যে কেউই ওই মুদ্রার বিনিময়ে পণ্য বেচতে রাজি। শুধু তাই না, পণ্য বেচে ওই মুদ্রা পেতে অথবা পাওয়া মুদ্রা দিয়ে অন্য পণ্য কিনতেও সবাই রাজি। সার কথায়, বিনা দ্বিধায় বাজারের যে কেউ ওই মুদ্রায় কিনতে ও বেচতে রাজি। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য, লিকুইডিটি : এটাকে বলা যায় গ্রহণযোগ্যতার মাত্রার কমবেশি। যেমন ব্যাংকের চেকের চেয়ে নগদ মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা বেশি। অর্থাৎ নগদ মুদ্রার লিকুইডিটি সব সময় অন্য যে কোনো ধরনের মুদ্রার চেয়ে বেশি। আবার একেবারে মফস্বলের হাটে ১ হাজার টাকার নগদ নোট দিয়ে সওদা নিতে চাইলে এত বড় নোটের খুচরা পাওয়া সহজ নয় বলে সেখানে ১০ থেকে ২০ টাকার নোটের গ্রহণযোগ্যতা ১ হাজার টাকার চেয়ে বেশি। এভাবে মুদ্রার এই দুই বৈশিষ্ট্যই আসল বৈশিষ্ট্য মনে করা হয়। কেন?
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য, মুদ্রার বদলে সোনা: ব্যাংকে গিয়ে মুদ্রার বদলে সোনা চাইলে তৎক্ষণাৎ তা পাওয়া যায় এমন হতে হবে। এ গুণটা এখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। অর্থাৎ আগেকার দিনে যে কোনো ব্যাংক কাগুজে মুদ্রা ছাপার আগে সমমূল্যের সোনা ভল্টে রিজার্ভ রেখে নিত। এখন তা আর করে না। বিশেষত আইএমএফের ১৯৪৪ সালে জন্মের সময়ের ম্যান্ডেট বা ঘোষণাপত্রে বদল এনে ১৯৭৩ সালে নতুন করে আইএমএফ গঠন করে নেয়ার পর থেকে কাগুজে মুদ্রার বদলে সোনা ফেরত দেয়ার আইনগত বাধ্যবাধকতাও উঠে গেছে। সারকথায় তাই, এখন মুদ্রা হতে গেলে প্রথম দুই বৈশিষ্ট্যই যথেষ্ট।
উপরের আলোচনায় সাধারণভাবে মুদ্রা নিয়ে কথা তুলা হয়েছে। কিন্তু ওই মুদ্রা কি কোনো একটা রাষ্ট্রের মুদ্রা নাকি একই সঙ্গে তা আন্তর্জাতিক মুদ্রা, সেটা পরিষ্কার করে বলা হয়নি। তাই এবার দেশি ও বিদেশি (আন্তর্জাতিক মুদ্রা) এভাবে মুদ্রাকে ভাগ করে, ভাগ মনে রেখে কিছু কথা। একালে দেশি মুদ্রা মানে কাগুজে মুদ্রা যা মূলত রাষ্ট্রীয় ভূখন্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ মুদ্রা। অর্থাৎ নিজ ভূখন্ডের বাইরে যে মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা নেই। বাংলায় বললে, চলে না। নিজ ভূখন্ডের মধ্যে দেশি মুদ্রায় সব ব্যবসা-বাণিজ্য লেনদেনে একচেটিয়াভাবে চলতে পারে। অন্যভাবে বললে, শুধু নিজ মুদ্রার ওপর নিজ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের) একক নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের সীমানা পর্যন্ত কার্যকর ও বিস্তৃত থাকে। রাষ্ট্রের সীমানার বাইরে হলে আর থাকে না। তাহলে সারকথা দাঁড়াল, প্রথমত মুদ্রা ছাড়া কোনো বাণিজ্য লেনদেন নেই, হবে না। আবার দেশি মুদ্রামাত্রই ওর ভূখন্ডগত সীমাবদ্ধতা থাকবে, নিজ রাষ্ট্র সীমানা পার হলেই ওই মুদ্রা অচল হয়ে যাবেই। তাহলে যেকোনো দুই রাষ্ট্র বাণিজ্য বিনিময় করবে কীভাবে, কোন মুদ্রায়? স্বভাবতই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য লেনদেন ঘটাতে চায় বলে সব রাষ্ট্রেরই বাকি সব রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য এক মুদ্রা বা আন্তর্জাতিক মুদ্রার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। তবে বেশি দিন আগের কথা নয়, আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় সব রাষ্ট্রের স্বীকৃত মুদ্রা বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা প্রথম চালু হয়েছিল মাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। আইএমএফ গঠন করার পেছনে ১৯৪৪ সালে প্রধান যেসব তাগিদ কাজ করেছিল তা হল, এর আগে অচল হয়ে ভেঙে পড়ে থাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেন বিনিময়কে নতুন করে এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে এক সিস্টেম ব্যবস্থা হিসেবে হাজির করা। এ আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই আইএমএফ বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। এককথায় বললে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় চালু থাকার পূর্বশর্ত হল এক আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্য মুদ্রা চালু থাকা। এটাই আইএমএফের মুখ্য কাজ। অবশ্য বলা বাহুল্য, আইএমএফের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ব বড়লোক রাষ্ট্রের পক্ষে কান্নি মারা। কারণ আইএমএফের মালিকানা শেয়ার যে রাষ্ট্রের ভাগে সবচেয়ে বেশি আইএমএফের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্বের ওপর প্রভাব তার সবচেয়ে বেশি। এই নিয়মে সাজানো আছে ও পরিচালিত হয় আইএমএফ। যেমন সর্বশেষ মালিকানা শেয়ার অনুসারে আমেরিকা (একাই ১৬ শতাংশ) ও ইউরোপে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ আর ছয়টা রাষ্ট্র মিলে ৪৩ শতাংশ মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করে আছে। আমেরিকা আর ঘনিষ্ঠ ছয় রাষ্ট্র নিজেদের মধ্যে নীতি সমন্বয়ের মাধ্যমে বিশেষ করে গরিব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেদের ঐকমত্য রক্ষা করার এক ক্লাব সংগঠন আছে, যার নাম গ্রুপ অব সেভেন কান্ট্রিস, সংক্ষেপে ‘গ্রুপ সেভেন’ নামে; প্রতি বছর কমপক্ষে একবার ‘গ্রুপ সেভেন’ রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতারা বসে থাকে, এমন সম্মেলন তারা নিয়মিত করে থাকে। এ গ্রুপ সেভেন আইএমএফের মালিকানার ৪৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এ সাত রাষ্ট্রের মালিকানার বিপরীতে বাংলাদেশের মতো গরিব রাষ্ট্রের মালিকানা সাধারণত এক পার্সেন্টেরও অর্ধেক হয় বলে গ্রুপ সেভেনের পক্ষে ৪৩% মালিকানা দিয়ে পুরা আইএমএফকে নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। কিন্তু তাই বলে আমাদের মতো গরিব দেশের জন্য ‘আইএমএফ নিপাত যাক’ বলা সঠিক শ্লোগান হবে না। অথবা আইএমএফ আমাদের দরকার নেই সেটাও সঠিক কথা বা দাবি হবে না। কারণ আইএমএফ নিপাত যাওয়া বা নেই এর মানে আমাদের রাষ্ট্রের জন্যও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পণ্য ও পুঁজির বিনিময় লেনদেন এবং মুদ্রাও নাই হয়ে যাবে। অথচ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ইত্যাদি আমাদের অবশ্যই দরকার। অর্থাৎ মূল পয়েন্ট হল, ব্যবস্থাটার নিপাত যাওয়া নয় বরং এটা আন ফেয়ার, অসাম্য এক ব্যবস্থা হয়ে আছে একদিকে কান্নি মারা হয়ে আছে। এর অবসান দরকার।
একালের একটা বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার মালিকরা যেমন ওই ব্যাংকের পরিচালনার নিয়মকানুন সবটা নিজের ইচ্ছামত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বে এবং দেশের ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুসারে বাণিজ্যিক ব্যাংক পরিচালিত হয়ে থাকে, হতে বাধ্য। তবে এ কর্তৃত্বের অধীনে থাকা মেনেও এরপর যতটুকু মালিকানার ইচ্ছা প্রয়োগের সুযোগ থাকে তা অবশ্য করা হয়। অর্থাৎ বাণিজ্যিক ব্যাংকের মালিক মানেই সে-ই মূল নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের অথরিটি নয়। কারণ ব্যাংকের মালিক আর ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ অথরিটি আলাদা আলাদা। অথচ আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ক্ষেত্রে এ বিষয়টা ঠিক উল্টো। আইএমএফের মালিক রাষ্ট্রগুলোর এক বড় শেয়ার মালিকানা একটা মালিক-জোটের হাতে এবং ঐ জোটই আবার এর নিয়ন্ত্রণ অথরিটি এবং তা অনেক সরাসরি। এই সমস্যার রেডিকেল সমাধান দরকার। একথাটাকেই আরেক ভাষায় প্রায়ই হালকা সরল করে বলা হয় যে, আইএমএফের পরিচালনা সিদ্ধান্তে গরিব রাষ্ট্রের গলার স্বর আরও বেশি বা উঁচু করা দরকার। সারকথায় বললে, আইএমএফের ওপর কর্তৃত্বের চলতি কাঠামো এটা ভাঙা দরকার কিন্তু তা অবশ্যই এটা আবার ঢেলে সাজিয়ে গড়ার লক্ষ্যে। শুধু নিপাত যাক বলাটা সম্ভবত আগের বাক্যের ভেঙে আবার গড়া ধারণার সমার্থক নয়, তাই।
তাহলে দাঁড়াল, আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেন বিনিময়ের জন্য এক দরকারি প্রতিষ্ঠান। যদিও এর সংস্কারও দরকার। বিশেষত আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাজন, শ্রমের দক্ষতা বাড়ানোর দিক থেকে এর আন্তর্জাতিক মানের দিক থেকেও এটা গুরুত্বপূর্ণ। অতএব এসব অর্জনের পূর্বশর্ত এক আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা থাকা এটাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুদ্রা নেই তো বাণিজ্য বিনিময় নেই। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুদ্রার মান, যেটাকে আমরা অনেক সময় মুদ্রার বিনিময় হার বা এক্সচেঞ্জ রেট বলি।
নিজের ঘোষণাপত্র অনুসারে আইএমএফের ম্যান্ডেটরি কাজ হচ্ছে মূলত দুইটি। বিভিন্ন সদস্য দেশের মুদ্রার মান নিয়ন্ত্রণ এবং সদস্য রাষ্ট্রের ‘ব্যালেন্স অব পেমেন্ট’ এর দিকে নজর রাখা। কোনো রাষ্ট্রের বার্ষিক আমদানি-রফতানিতে আয়-ব্যয়ের চলতি হিসাবের খাতায় আয়ের তুলনায় ব্যয় সেটা ঘাটতি বা বাড়তির দিকে, এটাকেই ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বলা হয়। সেদিকে নজর রাখা এবং সেক্ষেত্রে ঘাটতি হলে তা মোকাবিলার জন্য ওই রাষ্ট্রকে ধার ও পরামর্শ দেয়া ইত্যাদি। এখানে লক্ষণীয় যে, নিজ রাষ্ট্র অর্থনীতি পরিচালনা করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রায় ঘাটতি ফেলালে তবেই ধার নিতে হবে। আর ধার নেয়া মানেই সঙ্গের শর্ত-পরামর্শও শুনতে হবে। নইলে নয়। মানে ঘাটতি নেই তো উটকো পরামর্শও নেই।
আইএমএফ প্রসঙ্গে আর একটা মৌলিক দিক হল, আইএমএফের সদস্যপদ লাভ করতে চাইলে শুরুতেই চাঁদা পরিশোধ করতে হয়। এটা ঠিক, চাঁদা বলতে যা বুঝি যে, প্রদেয় চাঁদার অর্থ জমা করার পরে তা প্রতিষ্ঠানের আয় বা সম্পত্তি হয়ে যায়। আইএমএফের বেলায় এক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। বরং আইএমএফ প্রতিষ্ঠানে সব সদস্য রাষ্ট্রের নিজ নামে একটা অ্যাকাউন্ট থাকে, প্রদেয় চাঁদা ওই নিজ অ্যাকাউন্টে জমা হয়। এটা অনেকটা কোনো আমদানিকারকের মাল জেলায় জেলায় বেচার জন্য জেলা পরিবেশক হওয়ার মতই, যেন আমদানিকারকের কাছে আগে প্রদেয় ডিপোজিটেড বা জমা রাখা অর্থ। এর পরিমাণ কত তা ঠিক হবে বছরে কী পরিমাণ মালামাল নিয়ে বিক্রি করতে পারব এ আকারের অনুপাতে। এবং আগাম জমা রাখতে হবে এমন এক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ। এরপর যা মালামাল তুলেছি প্রতি তিন মাস পরপর এর বকেয়া মূল্য পরিশোধ করে দিতে হয়। আইএমএফের সদস্য ফি আগাম জমা দেয়া অনেকটা এরকমই এক ব্যবস্থা। কিন্তু এর সুবিধা কী?
সুবিধা হলো, ওপরে যে ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বা চলতি হিসাবে ঘাটতি আয়-ব্যয়ের কথা বলছিলাম তেমন কোনো পরিস্থিতিতে ঘাটতি মেটাতে আইএমএফ ওই সদস্য রাষ্ট্রকে কতদূর ধার দেবে, তা হিসাব করা হয় এভাবে যে, আইএমএফে আমার রাষ্ট্রের অ্যাকাউন্টে জমাকৃত অর্থের ১২৫ শতাংশ পর্যন্ত।

এই ফাঁকে একটা কথা বলার সুযোগ নেই।
আইএমএফের তহবিলে সব সদস্য রাষ্ট্রের অ্যাকাউন্টে জমাকৃত অর্থ হিসাব করা হয় অদ্ভুত নামের এক ভার্চুয়াল (নামে আছে কিন্তু বাস্তবে নেই) মুদ্রায়। নামটা হল স্পেশাল ড্রয়িং রাইট বা এসডিআর। এজন্য আইএমএফের মুদ্রার নাম বলা হয় এসডিআর। এ মুদ্রার মান মানে, যেমন কয়টা বাংলাদেশী টাকা দিলে তা এক এসডিআরের সমান হবে, তা কীভাবে ঠিক হয়?
প্রতিদিন আইএমএফের ওয়েবসাইটের প্রথম পাতায় দেখা যাবে ওই দিনের এসডিআর রেট দেয়া আছে। যেমন আজ ৬ ডিসেম্বর এক এসডিআর = ০.৭২৯৯৮৮ ডলার। এ হিসাবে এক এসডিআর = ১০৮.৪০ টাকা। এখন প্রতিদিনের এসডিআর রেট এটা কীভাবে হিসাব করা হয় বা সাব্যস্ত করা হয়?
প্রতিদিনে টপ চারটা মুদ্রা আমেরিকান ডলার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড আর জাপানি ইয়েন – এদের বিনিময় হার বাজারে কত ছিল তা থেকে এক গড় বিনিময় হার বের করা হয়। আর সেটাকে ডলারে প্রকাশ করলেই সেটাই ওই দিনের এসডিআর রেট। অর্থাৎ এখন ওই চারটা মুদ্রার গড় বিনিময় হারই ওই দিনের এসডিআর এর মান। আর এসডিআর মান বের করতে শুধু ওই চারটা মুদ্রাকেই বেছে নেয়ার কী কারণ? কারণ, দুনিয়াতে এখন যত ব্যবসা-বাণিজ্যিক লেনদেন হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় এমন শীর্ষ চার মুদ্রা ওগুলো তাই। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লেনদেনের মুদ্রা তালিকায় সবার উপরের চার মুদ্রাগুলো তাই। আর প্রতি পাঁচ বছর পরপর মূল্যায়ন করে দেখা হয় শীর্ষ চার মুদ্রা কারা ছিল? যেমন ২০০০, ২০০৫ ও ২০১০ এভাবে। এবারের ২০১৫ সালের মূল্যায়নে এবং গত ১০ বছরের মূল্যায়নেও দেখা যাচ্ছিল চীনের মুদ্রা ইউয়ানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্রমেই বাড়ছে। এর স্বীকৃতি হিসেবে এবারের আইএমএফের নির্বাহী বোর্ড সভায় আইএমএফের টেকনিক্যাল কর্মীদের গণনা ফলের সুপারিশ এর পক্ষে শেয়ার মালিকানার নির্বাহী বোর্ড সায় দিয়েছে। তাই পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে ইউয়ানকে গ্রহণ করা হয়। এর ফলে এখন থেকে মিডিয়া রিপোর্টে আর এক টেকনিক্যাল শব্দের দেখা মিলবে ‘কারেন্সি বাস্কেট’ বা ‘বাস্কেট কারেন্সি’। উপরে বলেছিলাম, চারটি টপ আন্তর্জাতিক মুদ্রার গড় বিনিময় হারই হল ওই দিনের এসডিআর মান। তো এজন্য ওই চার আন্তর্জাতিক মুদ্রাকে আইএমএফের ‘বাস্কেট কারেন্সি’ বলে। যার ভাবটা এরকম যে, এসডিআর মুদ্রার মান নির্ধারণের জন্য একটা ঝুড়িতে থাকা টপ চারটা আন্তর্জাতিক মুদ্রাকে ওখান থেকে তুলে আনা হয়েছে। এবার ওই বাস্কেট কারেন্সিতে চীনা ইউয়ানকে অন্তর্ভুক্ত করে মর্যাদা দেয়া হলো। তবে টেকনিক্যাল রুল হল, আগামী বছর ২০১৬ সাল থেকে এটা কার্যকর হবে। অর্থাৎ আগামী বছর ১ অক্টোবর থেকে ইউয়ানসহ পাঁচ টপ মুদ্রার গড় থেকে আইএমএফের এসডিআর মান নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ তখন থেকে প্রতিদিনের এসডিআর মান কত হবে তা সাব্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে চীনা ইউয়ান একটা ফ্যাক্টর হবে।
শুধু কী তাই? না আরও আছে। উপরে আইএমএফের সদস্য রাষ্ট্রের নিজ নামের এক অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা রাখার কথা বলেছিলাম। কত অর্থ সেখানে আগাম জমা রাখতে হবে তা নির্ভর করে আমার অর্থনীতিতে লেনদেনের সাইজ কেমন এরই এক অনুপাতিক পরিমাণ। কিন্তু এতে সাব্যস্ত হওয়া মোট পরিমাণের ৭৫ ভাগ অর্থ জমা রাখতে হয় সোনা অথবা ডলারে। আর বাকি ২৫% নিজ দেশি মুদ্রায়। এটা আইএমএফের জন্মের সময়কার ১৯৪৪ সালের নিয়ম ছিল। কিন্তু দিনকে দিন প্রতিটা সদস্য রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ বেড়েই চলেছে ফলে সে অনুপাতে আইএমএফের জমা রাখা সোনা ও ডলারের পরিমাণও। কিন্তু দুনিয়াতে সোনা ও ডলার তো অফুরন্ত নয়। তাই এই সমস্যা সমাধানে ১৯৬৯ সালে বাস্কেট কারেন্সি ধারণা চালু হয়েছিল। এর ফলে নতুন সংযুক্তি আইন হল, ডলার ও সোনা ছাড়াও বাস্কেট কারেন্সিতে থাকা অন্যান্য মুদ্রাতেও আইএমএফের সদস্য চাঁদা সম্পদ রিজার্ভ রাখা যাবে। অতএব কোনো রাষ্ট্র এখন ইউয়ানেও তার জন্য ধার্য আইএমএফের সদস্য চাঁদার সম্পদ রিজার্ভ রাখতে পারবে। এর অর্থ শুধু আইএমএফে নয়, দুনিয়ার নানা রাষ্ট্র ব্যক্তি বা কোম্পানি সবাই নিশ্চিন্তে এখন থেকে স্ব-স্ব সম্পদ চীনা ইউয়ানে রূপান্তরিত করে ধরে রাখতে শুরু করবে। আইএমএফের হিসাবে ইউয়ানকে বাস্কেটে স্বীকৃতি দেয়ার আগে বাস্কেট মুদ্রাগুলো কতটা গ্লোবাল লেনদেনের মুদ্রার দখলে আছে এর হিসাবে ডলারের ভাগে ৪১.৯ শতাংশ, ইউরো ৩৭.৪ শতাংশ, পাউন্ড ১১.৩ শতাংশ আর ইয়েন ৯.৪ শতাংশ। আর আগামী বছর থেকে তা সম্ভবত হবে ডলার ৪১.৭৩ শতাংশ, ইউরো ৩০.৯৩ শতাংশ, ইউয়ান ১০.৯২ শতাংশ, পাউন্ড পাউন্ড ৮.০৯ শতাংশ আর ইয়েন ৮.৩৩ শতাংশ।
এটা গেল কেবল শুরুতে কার কত বাজার শেয়ার দাঁড়াবে এর হিসাব। তবে আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্রায় সবাই একযোগে যে কথাগুলো বলছে যেমন, আইএমএফের স্বীকৃতি চীনের দিক থেকে ‘বিরাট রাজনৈতিক অর্জন’ এবং চীনের ওপর আস্থার প্রকাশ ও চীনের জন্য এটা ‘প্রেস্টিজিয়াস বিষয়’। এ ছাড়া মুদ্রা যেহেতু শুধু পণ্য বিনিময়েই কাজে লাগে তাই নয়। সম্পদ ধরে রাখার মুদ্রা হিসেবেও এর কদর আছে। বিশেষত যে আন্তর্জাতিক মুদ্রার মান বা হার স্থিতিশীল, বাজারের উঠতি মুদ্রা এবং আস্থার মুদ্রা সেই মুদ্রায় রূপান্তরিত করে সম্পদ রাখতে মানুষ আগ্রহী হবেই। এই বিচারে ব্লুমবার্গ ম্যাগাজিন আগাম অনুমান করে বলছে, প্রথম বছরেই ইউয়ানে সম্পদ ধরে রাখার জন্য বাজারে এক প্রবল জোয়ার উঠবে। এর ধাক্কায় আবার পণ্য বিনিময় বাজারে ইউয়ানের বাজার-শেয়ার বেড়ে যাবে। আর ততটাই ডলার বাজার হারাবে। এ রকম কিছু চেন রিয়াকশন বা চক্রাকার প্রতিক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আবার কিছু মিডিয়ার ঈর্ষা ছড়ানোর প্রপাগান্ডাও আছে। যেমন কেউ কেউ সন্দেহ বাতিকের রিপোর্ট করেছে, আইএমএফ কি আসলেই ঠিক মতো যাচাই করে দেখে বোর্ডের কাছে সুপারিশ করেছে? এ রকম। তবে খোদ আইএমএফ এ দিকটা আগেই আঁচ করতে পেরেছে বলেই মনে হয়। ইউয়ানকে স্বীকৃতি দেয়ার দিনেই আইএমএফ নিজ ওয়েব সাইটের প্রথম পাতায় ‘সহসাই যেসব প্রশ্ন উঠে’ শিরোনামে নিজেই প্রশ্নোত্তরে এসব সন্দেহ-কৌতূহলেরও বহু আগাম প্রশ্নের বাড়তি জবাব দিয়ে রেখেছে। অনেক বেশি আন্তরিক আর খোলামেলাভাবে সেসব জবাব দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আইএমএফের মতো বহুরাষ্ট্রিক প্রতিষ্ঠানের চীন ও আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থান বিরোধের বেলায় সাধারণভাবে ২০০৯ সাল থেকেই আইএমএফের ব্যুরোক্র্যাট নির্বাহীদের ভূমিকা কী হলে সঠিক হবে, সে প্রশ্নে এপর্যন্ত লক্ষ্য করা গেছে যে, তারা একেবারেই প্রফেশনাল অবস্থান নিয়েছে। রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব বা পক্ষ নিতে চাননি। সাধারণভাবে বলা যায়, ব্যক্তিনিরপেক্ষভাবে যা সত্য, যা সঠিকÑ এর পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলেছে। যেমন, আইএমএফের সংস্কারের দাবি বিষয়ে তাদের অবস্থান সংস্কারের পক্ষে। আর তাদের সুপারিশের ফাইল আমেরিকান সিনেটে গিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে। চীনা ইউয়ানকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রশ্নেও আইএমএফের ব্যুরোক্র্যাট নির্বাহীদের একই ধারাবাহিকতার অবস্থান দেখা গিয়েছে। ইউয়ানকে আমলে নিয়ে আইএমএফের সম্পদের ইউনিট গণনা আগামী বছর থেকে শুরু হবে বলা হলেও বিভিন্ন ব্যক্তি কোম্পানির ধরে রাখা সম্পদ ইউয়ানে রূপান্তর করে রাখার ঝোঁক এ বছর থেকেই শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাস্তবে কি দাঁড়ায় সেটি দেখা যাক।

গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ ডিসেম্বর দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এবং একই প্রসঙ্গে ০৭ ডিসেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্তে ছাপা হয়েছিল। সে লেখা দুটো একসাথে মিলিয়ে আরও সংযোজন ও আবার এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল।]

তুরস্ক-রাশিয়া সামরিক উত্তেজনা : রাশিয়া পশ্চিমের নজর চায়

তুরস্ক-রাশিয়া সামরিক উত্তেজনা
রাশিয়া পশ্চিমের জোটে অন্তর্ভুক্তি, অবরোধ তুলে নেয়া ইত্যাদিতে নজর চায়

গৌতম দাস ০৫ ডিসেম্বর ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-iw

 

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেছে সেই কবে পঁচিশ বছর আগে। শুধু তাই নয় ভেঙ্গে রাশিয়া নামে এমন এক ক্ষুদ্র আকার নিয়েছে যে সেই রাশিয়া এখন সব গাইগুই ছেড়ে পুঁজিতান্ত্রিক মুল ধারা বা গ্লোবাল অর্ডারের অংশ। সোভিয়েত ধারার অর্থনীতি বলতে কিছুই ওর ভিতর অবশিষ্ট নাই। কিন্তু তবু সোভিয়েত ভক্ত পুরান কমিউনিষ্টদের মাথা ঠেকিয়ে ভক্তি দিবার জায়গার অভাব হয় নাই। তারা এখনও প্রবল ভক্তি সহকারে একালের মাফিয়া রাষ্ট্র পুতিনের রাশিয়াকে পুরান সোভিয়েৎ ইউনিয়নের জায়গায় বসিয়ে ভক্তি সেবা দেয়। মাফিয়া রাশিয়ার হয়ে প্রপাগান্ডায় মেতে উঠে। এটা সত্যিই এক আশ্চর্যের বিষয়। প্রেমের আবেগের সামনে জ্ঞান বুদ্ধি বিবেচনার যে আজও অচল সেটাই বরং আবার প্রমাণিত।
আজকের দুনিয়ার আইএস বা ইসলামী স্টেট ইস্যুটা দিনকে দিন বিশ্ব-রাজনীতিকে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলছে। ব্যাপারটি অনেকটা ‘কুইনাইন সারাবে কে’ অবস্থার মত। ম্যালেরিয়া তাড়ানোর জন্য রোগীকে কুইনাইন খাওয়ানো হয়েছিল। এতে কুইনাইনে ম্যালেরিয়া তাড়ানো গিয়েছিল কিনা, সেকথা চাপা পড়ে গিয়ে এর চেয়েও বড় ঘটনা হয়ে গিয়েছিল নতুন রোগ – কুইনাইন এ নতুন রোগ ডেকে এনেছে। তা থেকে আবার আরও অনেক নতুন নতুন রোগের বিস্তার ঘটেছে। এই অবস্থা। এভাবে সর্বশেষ জটিল ঘটনাটি হল, তুরস্কের বোমারু এফ-১৬ বিমান এক রাশিয়ান বোমারু এসইউ-৩০ বিমানকে গোলা মেরে ভূপাতিত করেছে। আগেই বলেছি, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও কমিউনিস্ট প্রগতিশীলদের চোখে রাশিয়াই এখন সেই তাদের চোখে পুরান সহানুভূতি পাবার রাষ্ট্র হিসেবে সে জায়গা নিয়েছে। সিরিয়াতে সেই রাশিয়ার বিমান হামলা শুরু হয় গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ থেকে। প্রথম এক সপ্তাহ টানা বোমাবাজি করে এরপর থেকে থেমে থেমে যেন গড়ে দিনে একটা করে এবং বেছে বেছে জায়গায় বোমা ফেলা, যেখানে ফেললে তা আসাদের রাষ্ট্র যুদ্ধকৌশলের দিক থেকে সুবিধা পায়- এভাবে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল রাশিয়া। কিন্তু রাশিয়ার নতুন যুদ্ধবিমান খুয়ানোর ঘটনাটা ২৪ নভেম্বরের। ওই দিন তুরস্কের বোমারু বিমান রাশিয়ান এক বোমারু বিমানকে গোলা মারার ঘটনাটা ঘটে। এ ঘটনাটি নিয়ে বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া কার কী ধরনের, কে কী বলেছে এর একটা সঙ্কলন রিপোর্ট তৈরি করেছে আল জাজিরা টিভি নেটওয়ার্ক। সেই রিপোর্ট অনুসরণ করে এখানে কথা এগোব।

তবে এর আগে কেন তুরস্ক রাশিয়ান বোমারু বিমান ভূপাতিত করল সেদিকে কিছু আলোকপাত করা যাক। বিষয়টা নিয়ে এর স্বপক্ষে অনেক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আর রাশিয়ান প্রপাান্ডা থাকলেও সিরিয়া-তুরস্কের সীমান্তে হামলা হওয়া ওই অঞ্চলের কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড তথ্যের দিকে মনোযোগ দেব। যে অঞ্চলে তুরস্ক-রাশিয়ান বোমারু বিমানে হামলা হয়েছে, অথবা বলা যায় সিরিয়ার যে অঞ্চলে রাশিয়া বিমান হামলা করতে গিয়েছিল সেটা সিরিয়া-তুরস্কের একেবারে সীমান্ত অঞ্চল। সিরিয়ার দিক থেকে তা লাটকিয়া প্রদেশ আর তুরস্কের দিক থেকে সেটা হাতায়ে প্রদেশ- এই হলো দুই প্রদেশের সীমান্ত সেটা। শুধু তাই না, ওই অঞ্চলের বসবাসকারীরা আধুনিক রাষ্ট্রের সীমানা টানার বহু ঐতিহাসিক যুগ আগে থেকেই সিরিয়ার ‘সিরিয়ান টার্কম্যান’ বা অরিজিনাল টার্কি বংশোদ্ভূত তবে সিরিয়ায় বসবাসরত বলে সিরিয়ান। অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে যেহেতু আজকের সিরিয়া বলে কোনো আলাদা রাষ্ট্র ছিল না; বরং আজকের সিরিয়া, ইরাকসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যই তুরস্কের শাসনাধীন একই অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনস্থ সীমানা অঞ্চল ছিল। ফলে আজকের সিরিয়ান তুর্কিরা তুরস্কের মূল তুর্কি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার একই অংশ ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অটোমান সুলতানের পরাজয়ের পর ওই সাম্রাজ্য ব্রিটিশ-ফরাসিরা গোপন চুক্তির কারণে ভাগাভাগিতে সিরিয়া বলে আলাদা রাষ্ট্র সীমানা টানার সময় লাটকিয়া অঞ্চল নতুন রাষ্ট্র সিরিয়ার ভাগে চলে যায়। এ হলো পুরনো ঐতিহাসিক দিক। আর একালের সংযোজিত গুরুত্বপূর্ণ আরও দুই তথ্য হলো- এক. সিরিয়ান আরব স্প্রিং বা সিরিয়ান গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই সিরিয়ান টার্কম্যানরা আসাদ সরকারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে লিপ্ত হয়েছিল এবং এখনও আছে। আর রক্ত এবং আত্মীয়তা সূত্রে তুরস্ক থেকে সব ধরনের সাহায্যপ্রাপ্তিও সেই থেকে তারা পেয়ে আসছে। তুরস্কের সরকারের দিক থেকে সরকারও নিজ টার্ক-জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক সূত্রে সিরিয়ান টার্কম্যানদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা নিজের সমাজের দা্বি । তথ্য দুই. এটা আমাদের প্রসঙ্গের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। লাটকীয়া অঞ্চল সিরিয়ান গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই আইএস অথবা পরবর্তীতে যারা আইএস হয়ে হাজির হচ্ছে তাদের কোনো তৎপরতা বা প্রভাব এখানে নেই, তাদের অনাগ্রহের এলাকা বা মুক্ত এলাকা।
কিন্তু রাশিয়ান বিমান ধ্বংস হওয়ার পর রাশিয়ান বয়ানে সুনির্দিষ্ট করে কেন রাশিয়ার বিমান লাটকিয়ায় গিয়েছিল, তা কোথাও উল্লেখ করে নাই, করতে চায় না। শুধু সামগ্রিকভাবে দাবি করে চলছে যে, পুরো সিরিয়াতে তারা আইএসের ওপর বোমাবাজি করতেই গিয়েছিল। অথচ মাঠের তথ্য হলো, লাটকিয়া প্রদেশ টার্কি বংশোদ্ভূত সিরিয়ানদের সশস্ত্র প্রতিরোধ তৎপরতা সিরিয়া-তুরস্কের এক ধরনের ঘরোয়া মামলা, যার মধ্যে আইএস নেই, স্বার্থসংশ্লিষ্টতার কিছু নেই। অতএব রাশিয়া লাটকিয়াতে আইএস মারতে গিয়েছিল- এ বয়ান অচল; কারও হজম হচ্ছে না। নিঃসন্দেহে রাশিয়া ওখানে আইএস মারার উসিলায় আসাদ সরকারকে সামরিক সুবিধা দিতে আর সিরিয়ান স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ হাসিলে আসাদের পক্ষ হয়ে সিরিয়ান টার্কম্যানদের উচ্ছেদ করতে গিয়েছিল। এ কাজ করতে যাওয়ার আগে রাশিয়া স্পষ্টত যেদিকটা আমলে নেয়নি তা হল, লাটকিয়ার বাসিন্দাদের রক্ষা করার স্বার্থ তুরস্ক সরকারেরও আছে। রক্ত ও আত্মীয়তা সূত্রে সিরিয়ায় থেকে যাওয়া টার্কদের রক্ষা করতে নিজ জনগণের কাছে তুরস্ক সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তাহলে সার কথা দাঁড়াচ্ছে, লাটকিয়া আসলে সিরিয়া ও তুরস্কের পারস্পরিক স্বার্থে সরাসরি সংঘাতের এক ইস্যু। সিরিয়ায় সশস্ত্র গৃহযুদ্ধ সংঘাতের শুরু থেকেই লাটকিয়ার বাসিন্দাদের তুরস্ক সব সময় সিরিয়ান বিমান হামলা থেকে সুরক্ষা করে গেছে। একালে রাশিয়া আইএস মারার উসিলায় তুরস্ক-সিরিয়ার স্বার্থ সংঘাতের ইস্যুতে নিজের হাত ঢুকালে তুরস্ক একইভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াবে এবং তা-ই দাঁড়িয়েছে। ২৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের পার্লামেন্টে দেয়া ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করছিল আল জাজিরা টিভি। তুরস্কের নিজের এই স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানোর কারণকেই ওখানে তিনি ব্যাখ্যা করছিলেন। তবে স্বভাবতই তুরস্কের এ স্বার্থের কথা তিনি পটভূমি হিসেবে বলছিলেন। রাশিয়ান বিমান ভুপাতিত করে দেয়ার পক্ষে আইনি বা কূটনৈতিক যুক্তি হিসেবে নয়। হামলার পক্ষে তুরস্কের আইনি যুক্তি হল- রাশিয়ান বিমান তুরস্কের আকাশসীমা ভঙ্গ করে তুরস্কের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে এবং তুরস্ক বিমান বাহিনীর পাঁচ মিনিটে ১০ বার ওয়ার্নিং রেডিও মেসেজ দেয়ার পরও রাশিয়ানরা তা উপেক্ষা করেছে। তুরস্ক ওই মেসেজের অডিও মিডিয়ায় উন্মুক্ত করে দিয়েছে। আল জাজিরায় প্রচারিত মেসেজে শোনা যাচ্ছে ওই সাবধান বাণী। সেই সঙ্গে রাশিয়ান ওই বিমানের দুই পাইলটের বেঁচে যাওয়া একজন পাইলটের দাবিও আল জাজিরা আমাদের দেখিয়েছে। ওখানে তিনি দাবি করছেন, তুরস্ক থেকে কোনো ওয়ার্নিং দেয়া হয়নি।
অবস্থাদৃষ্টে সবমিলিয়ে বললে, বয়ানের ন্যায্যতা ও গাথুনির দিক থেকে রাশিয়া পিছিয়ে পড়েছে। রাশিয়া নিজ বয়ানের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই।

বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রতিক্রিয়া যেটা রয়টার্স থেকে আল জাজিরা টুকে এনেছে; ওখানে দেখা যাচ্ছে, পুতিনের ভাষ্যটা যেন হার স্বীকার করা হারু পার্টির ভাষ্য। যেমন- পুতিন দাবি করছেন, বিমানটা বোমার গোলা খাওয়ার পর ওর ভাঙা অবশেষ সীমান্তে সিরিয়ার দিকে চার কিলো ভেতরে পড়েছে। অতএব আমরা সিরিয়ান সীমার ভেতরেই ছিলাম, তুরস্কের সীমানায় ঢুকিনি। – এগুলো খুবই হাস্যকর যুক্তি। কোন মীমাংসায় আসা যায় না এমন দাবি, তবে মুখ রক্ষায় কাজে লাগে এমন যুক্তিও। সাধারণত যে কোনো বোমারু বিমান এক মিনিটে কমপক্ষে ১০-১৫ কিলোমিটার পার হয়ে যায়, এছাড়া টার্কিশ আকাশ সীমায় গুলি খেয়েও কোনো বিমানের পড়ার মাটি সিরিয়া হতেও পারে। সুনির্দিষ্টভাবে এক্ষেত্রে তুরস্কও দাবি করছে, রাশিয়ান বিমান তুরস্কের আকাশে প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করেছিল এবং ১৭ সেকেন্ড ধরে ছিল। কাজেই সিরিয়া-তুরস্কের এসব সেকেন্ড-মিনিট দিয়ে মিডিয়া বয়ান কারও নিজের পক্ষে প্রমাণ হিসাবে কাজে আসবে না। বরং যে প্রশ্নে রাশিয়ানরা চুপচাপ তা হল, লাটকিয়া আইএসবিহীন অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়ান বিমান ওখানে কেন গিয়েছিল! সেখানে আমাদের জবাব খুঁজতে হবে। যুদ্ধবিমান গোলা খাওয়ার পরে পুতিন অভিমানের ভাষায় বলছেন, “বিশ্বাসঘাতকতা করে তার পিঠে ছুরি মারা হয়েছে।” এছাড়াও বলছেন, “তারা (মানে তুরস্ক) কি ন্যাটোকে আইএসের পক্ষে খেদমতে লাগাতে চায়?” পুতিনের এ দুই বয়ানের পিঠে আগাম ধরে নেয়া আছে যে, রাশিয়ান পাইলটরা যেন আইএস মারতে ওখানে গিয়েছিল আর সেই যোদ্ধা রাশিয়ার সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। অথচ রাশিয়ান পাইলটরা ওখানে কোনো আইএস মারতে গিয়েছিল, তাই তো প্রতিষ্ঠিত নয়। পুতিন আমাদের ধরে নিতে বলছেন, সিরিয়ার যে কোনো জায়গায় রাশিয়ান বিমানের যাওয়া মানেই তা শুধু আইএসের ওপর বোমা মারতে যাওয়া। অথচ রাশিয়ার ভালোভাবেই জানা থাকার কথা যে, লাটকিয়ায় সিরিয়া রাষ্ট্রের স্বার্থ আর তুরস্ক রাষ্ট্রের স্বার্থ সরাসরি মুখোমুখি সংঘাতপূর্ণ হয়ে আছে। ফলে আইএসবিহীন ওই অঞ্চলে রাশিয়া যাওয়ার অর্থই হল আসাদের পক্ষে ভারসাম্য আনতে সরাসরি তুরস্কের বিপক্ষে সামরিকভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়া। অতএব তুরস্কের গুলি খেয়ে বিমান হারানোর রিস্ক রাশিয়া তো আগে থেকেই জেনেশুনে নিজেই নিয়েছে। এছাড়া যেদিন রাশিয়ান বিমান ভূপাতিত হয় সেদিনই রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তুরস্ক সফরের কথা ছিল, যা ঐদিনের ঘটনা প্রেক্ষিতে পরে বাতিল করা হয়। ফলে কোনো বিশেষ কারণে রাশিয়াকে যদি লাটকিয়ায় বোমারু বিমান নিয়ে যেতেই হয়, তবে তা নিয়ে ওই সম্ভাব্য সভায় তুরস্কের সাথে মুখোমুখি বসে আগেই রাশিয়ার সিদ্ধান্ত সমন্বয় করে নেয়া যেত। অথচ রাশিয়া যেন ধরেই নিয়েছিল, আইএস মারার নাম করে রাশিয়া আসাদের পক্ষে মাঠের পরিস্থিতি এনে দেবে আর কেউ কিছুই বুঝতে পারবে না!
এ বিষয়ে ওবামার বক্তব্যের ভেতর একটা বাক্য আছে। ওবামা বলছেন, লাটকিয়ায় রাশিয়ানরা ‘মডারেটবিরোধী’ (মানে আইএস বাদে অন্য মধ্যপন্থী আসাদবিরোধীরা) বিরুদ্ধে অ্যাকশনে চলে গেছে। অর্থাৎ ওবামাও তার বক্তব্যে পুতিনকে বকা দিয়ে কথা বলেছেন।
সেকালের কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধী আমেরিকা ও ইউরোপের মিলিত যুদ্ধজোট হল ন্যাটো বা নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন,যার জন্ম ১৯৪৯ সালে। আর তুরস্ক ওর সদস্যপদ পায় বা নেয় ১৯৫২ সালে।
ফলে রাশিয়ান বিমানের ভূপাতিত হওয়ার পর এ ইস্যুতে সাধারণভাবে সব ন্যাটো সদস্যই তুরস্কের পক্ষে দাঁড়াতে ন্যাটোর ম্যান্ডেটের কারণে বাধ্য। তাই দেখা যায়, হামলার পরের বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় প্রথমবাক্যেই তুরস্কের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু পরের বাক্যে তুরস্ক ও রাশিয়ার দুই রাষ্ট্রের প্রতি আবেদন রেখেছেন যেন সামরিক টেনশন আর না বাড়ানোর ব্যাপারে দুই পক্ষ সংযত থাকে। অর্থাৎ ইঙ্গিতটা হলো, বাকি ন্যাটো সদস্যরা তুরস্কের পক্ষে দাঁড়ালেও ন্যাটোর কোনো সদস্য বিষয়টা নিয়ে আরও কোনো উত্তেজনা, কোনো সামরিক সংঘাতের দিকে যাওয়ার কথা ভাবছে না। তারা বরং মূল শত্রু আইএসের ব্যাপারে সবাই একজোট হয়ে অ্যাক্ট করতেই চাচ্ছে।
এ ব্যাপারে সিরিয়ান সরকারের বিবৃতি স্বভাবতই রাশিয়ার পক্ষে। তবে রাশিয়ার পক্ষে এক আইনি যুক্তি সাজানোর চেষ্টা করেছে সিরিয়া। রাশিয়ার বিমান ভূপাতিত করায় তুরস্কের এ কাজকে “অ্যাক্ট অব এগ্রেশন” বলে চিহ্নিত করেছে সিরিয়া। এটা জাতিসংঘের আইনি ভাষা। অর্থ “আইন লঙ্ঘন কর হামলা করা”।
তাই তুরস্ক সরকারের বিবৃতিতে সিরিয়ান অভিযোগের পাল্টা জবাব দেয়া হয়েছে। বলেছে, “তুরস্কের তৎপরতা (বিমান ভূপাতিত করা) অন্যের ভূমিতে বেআইনি প্রবেশ করে হামলাকারী হওয়ার মতো কাজ নয়”। এই হল, তোলা অভিযোগ আর এর বিরুদ্ধে কাটান দেওয়ার কেচাল। এসবের বাইরে, ফরাসি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য এসব পাল্টাপাল্টির বাইরে যাওয়ার চেষ্টা। কারণ তাঁর রাষ্ট্রস্বার্থ আইএস বিরোধী জোটে রাশিয়ান অন্তর্ভুক্তি দেখতে চাওয়ার তাগিদ আছে। তিনি বলছেন, (রাশিয়া-তুরস্কের মধ্যে) সামরিক উত্তেজনা আর যেন না ঘটে, সেদিকে আমাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য আইএস দমনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেলের প্রতিক্রিয়া এবং ওবামার প্রতিক্রিয়ার প্রথম অংশ এভাবে সবারই প্রতিক্রিয়ার সাধারণ দিক হল, সবাই জোর দিচ্ছেন রাশিয়া-তুরস্কের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আর না বাড়ানো এবং আইএসবিরোধী জোটে সবাইকে সামিল করা।
সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে, নিট ক্ষতিটা হলো রাশিয়ার। রাশিয়ান এসইউ-৩০ যুদ্ধবিমান একেবারেই নতুন হাইটেক বিমান- এমন যুদ্ধবিমান রাশিয়াকে খোয়াতে হল। অথবা বলা যায়, আইএসবিরোধী পশ্চিমা জোটে অন্তর্ভুক্তি পেতে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে পশ্চিমা অবরোধের মধ্যে থাকা রাশিয়াকে যে মূল্য দিতে হল তা বোধহয় বেশ বেশি। তবু এটা রাশিয়াকে পশ্চিমের সাথে জোটে ঢুকিয়ে দেয়ার পক্ষে তা এক কদম আগাম পদক্ষেপ। রাশিয়ার কাছে এটা যথেষ্ট দামি। তবে মাঝখান থেকে রাশিয়া-তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্য বিনিময় অচল হয়ে গেছে। কারণ যুদ্ধবিমান হারিয়ে রাশিয়া তুরস্কের বিরুদ্ধে বাণিজ্য অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। পুতিনের রাগ, ক্ষোভ তো কারও কারও ওপর পড়ে তবেই না প্রশমিত হতে হবে! তবে লাটকিয়ায় পুতিনের বেকুবি থেকে তিনি কী কোনো শিক্ষা নেবেন? দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

দুইঃ

বিশ্বযুদ্ধ কোন ছেলেখেলা নয়!
রাষ্ট্র মাত্রই ওর পরিচালনার মধ্যে নিজের পক্ষে প্রপাগান্ডা করা একটা কাজ। কিন্তু সে প্রপাগান্ডা আপনি বিশ্বাস করে বসবেন কিনা,ঐ প্রপাগান্ডাকে সত্যি মনে করে নিজের চিন্তা সে আলোকে মানে নিজেকেও সাজাবেন কী না এর দায়দায়িত্ব সম্পুর্ণ আপনার নিজের। কানাডায় রেজিষ্টার্ড অফিস নিয়ে বসা রাশিয়ার এক প্রপাগান্ডা ওয়েব সাইট আছে, “গ্লোবাল রিসার্চ” নামে। রাশিয়ান ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্টের বরাতে বা বরাত উল্লেখ করা ছাড়াই বিভিন্ন খবর ওখানে ছাপা হয়। অর্থাৎ বুঝা যায় রাশিয়ান ইন্টেলিজেন্স ডাটা ও রিপোর্টে ঐ গ্লোবাল রিসার্চের কর্তাদের একসেস বা প্রবেশাধিকার আছে। তা খারাপ কী! ওয়েষ্টার্ণ সুত্রর বরাতের বাইরে এই উছিলায় আমরা কিছু তথ্য ও ব্যাখ্যা ওখান থেকে পেতে পারি। কিন্তু সেসব তথ্য নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আমাদের অবশ্যই সাবধান হতে হবে, ‘ইন-বিটুইন দা লাইন’ নিজের মত করে পাঠ নিতে হবে কারণ ওসব তথ্যের সাথে আবার রাশিয়ান প্রপাগান্ডা-স্বার্থও মিশান আছে। ফলে টুইষ্ট আছে। সেদিকে খেয়াল রেখে তা বাদ রেখে বেছে পড়তে হবে। ঐ সাইটের টার্গেট পাঠক আপনিও হতে পারেন যদি দেশে দেশে এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রগতিবাদী সমাজতন্ত্রীদের একজন খাতক হিসাবে আপনি নিজেকে এখনও মনে করেন। আর সেই সাথে যদি মনে করেন রাশিয়ান রাষ্ট্রের স্বার্থই আপনার স্বার্থ,মানে রাশিয়ান রাষ্ট্রের বৈদেশিক স্বার্থ-ব্যাগেজ বইবার দায় আপনি নিয়েছেন।
তো ঐ সাইটের অনেক প্রপাগান্ডা ইস্যু ও মেটেরিয়ালের মধ্যে একটা হল “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন” এমন একটা দামামা বছরের পর বছর ধরে বাজিয়ে চলা। প্রায়ই বাংলাদেশে দেখা যায় অনেক পুরান কমিউনিষ্ট পুরান অভ্যাসে বাছবিচারহীনভাবে ঐ দামামা বাজানোতে প্রভাবিত হয়ে পড়েন। তেমনই এক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে গত ২৬ নভেম্বর দৈনিক মানবজমিনে – “মুখোমুখি তুরস্ক-রাশিয়া তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কী আসন্ন?” – এই শিরোনামে।
দুনিয়াতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কোন দিন হতে পারে না – এমন কথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু এটা তাড়াতাড়ি হচ্ছে না কেন; হলে আমেরিকার পতন হবে ফলে এমনটা দেখতে চাওয়ার একটা প্রবল কামনা রাশিয়ার আছে। এবং সেটাও হয়ত তেমন দোষেরও কিছু নয় যতক্ষণ না এটা যুক্তিবুদ্ধি বিচারহীন ম্যানিয়াক হয়ে না চাওয়া হয়, প্রপাগান্ডার ঘ্যানর ঘ্যানর করে ফেলা না হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য রাশিয়ার বিশেষত পুতিনের রাশিয়ার সে সমস্যা প্রবল। ১৯৯১ সালের আগে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন (আজকের রাশিয়ার পুর্বসুরি) আমেরিকার সাথে পরাশক্তিগত টক্কর দিত রাশিয়ার আর সেই যৌবন নাই। অথচ আমেরিকা অটুট আছে শুধু না, ইতোমধ্যে এক মেরুর দুনিয়া ভোগ করার সুবিধা নিয়েছে। এটা যেন রাশিয়ার কিছুতেই আর সহ্য হয় না। যদিও আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়াও আর টিকছে না। সেই নেতৃত্বে বিশ্বঅর্থনৈতিক অর্ডার শৃঙ্খলা একালে ক্রমশ ভাঙছে এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু তা ঘটাবার ক্ষেত্রে রাশিয়ার কোন ভুমিকা নাই; এটা রাশিয়ার হাতে নাই – না এটা ঘটাতে, না এটা ত্বরান্বিত করতে। বরং সবচেয়ে বড় নির্ধারক ভুমিকা আছে চীনের, তবে সেটাও অবজেকটিভ। অর্থাৎ এটা চীনা নেতাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা প্রসুত নয় বরং চীনের বৈষয়িক অর্থনৈতিক অর্জন উন্নতির কারণে পরোক্ষে পড়ে পাওয়া লাভ। এটা ঠিক আমেরিকার দুনিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর উদ্দেশ্যেই করা চীনের ততপরতা নয় বরং নিজের অর্থনৈতিক উত্থানের পক্ষে কাজ করে যাওয়া চীনের কারনে যেটা পরোক্ষ অর্থে – আমেরিকার দুরবস্থা এবং বিশ্বঅর্থনৈতিক অর্ডার শৃঙ্খলার নেতৃত্ব থেকে আমেরিকার অপসারণ ও নতুন অর্ডার জন্ম আসন্ন হয়ে উঠা। এই পালাবদলটা কেমন হতে পারে তা নিয়ে ষ্টাডি, আগাম অনুমান করা বলতে পারা ইত্যাদির জন্য বারদিকে বিস্তর গবেষণা পড়ালেখা চলছে। গত অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ সংখ্যায় লন্ডন ইকোনমিস্ট পত্রিকা এবিষয়ে এক রিপোর্ট ছেপেছে। ওর সারকথা হল, দুনিয়াতে একালের পালাবদল পরিবর্তন বিষয়টার কিছুটা সমতুল্য পুরান ঘটনা হল ১৩৫ বছর আগের। সেটা হল, ১৮৮০ সালে বৃটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে আমেরিকান অর্থনীতি যখন দিনকে দিন ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। আর দুনিয়ার ব্যবসা বাণিজ্য ১৯১৩ সালের দিক আর পাউন্ড-স্টার্লিংয়ে না ঘটে বরং এর চেইয়ে বেশি আমেরিকান ডলারে হওয়া শুরু করেছিল। ইকোনমিষ্টের উদ্দেশ্য হল, সেকালের ঘটনাবলি পাঠ করে সেখান থেকে একালে কোন আগাম অনুমান করা যায় কীনা! কতটা করা যায় ইত্যাদি। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে জিনিষটা সুনির্দিষ্টভাবে নিজের মত ঠিক করা লম্বা পা ফেলে আগাচ্ছে এবং যার উপর রাশিয়ার কোন হাত নাই তা নিয়ে প্রপাগান্ডা করা যে – “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন” বলে দামামা বাজানো যে কোন সময় বুমেরাং হতে পারে। বিশেষ করে আজকের রাশিয়ান অর্থনীতি হল, মাটির নিচের তেল-গ্যাস সম্পদ বিক্রি করে জমিদারি ফিউডাল দশায় যেন ফিরে যাওয়া অর্থনীতি, যার কোন শিল্প-ইন্ডাষ্টি ভিত্তি নাই। একালে রাশিয়ার যা আছে তুলনায় সেটা উন্নত শিল্প ভিত্তির ইউরোপের কোন রাষ্ট্র দূরে থাক, দক্ষিণ কোরিয়া লেবেলেরও নয়। সার কথায় রাশিয়ার পরাশক্তি ষ্টাটাস খুবই নড়বড়ে, কোন শক্ত শিল্প অর্থনৈতিক ভিতের উপর তা দাঁড়ানো নয় বরং তেল-গ্যাস বেচা অর্থনীতি। ফলে খুব সহজেই ৪০ ডলারে নেমে যাওয়া তেলের কারণে আর এর উপরে পশ্চিমা দেশের অবরোধে রাশিয়ার অর্থনীতি আরও চরম দুর্দশায় পড়েছে, পশ্চিম এঅবস্থায় রাশিয়াকে ফেলতে পেরেছে। সারকথায় আমেরিকান অর্থনীতি দুর্বল হয়ে তার বিশ্ব-অর্থনৈতিক অর্ডারে নিজের নেতৃত্বের স্থান থেকে চ্যুত হওয়াটা বাস্তবে চীন বা অন্যান্য রাষ্ট্রের রাইজিং অর্থনৈতিক অর্জনের মধ্য দিয়ে ঘটাবার, বাস্তবে করে দেখানোর মত কাজ। এটা প্রপাগান্ডা চালিয়ে অর্জন করার মত কাজ নয়। এছাড়া শকুনের বদ-দোয়ার কারণে বেশি বেশি করে গরু মরে ভাগাড়ে আসে না। এটা তো জানা পুরান প্রবাদের কথা। ফলে বদ-দোয়া দিয়ে, কামনা করে, প্রতিহিংসা দিয়ে আমেরিকান অর্থনীতিকে দুর্বল করা যাবে না। হবে না।
এছাড়া বারবার যে কথা বলি, কোল্ড ওয়ার (১৯৫০-৯০) কালের চল্লিশ বছরে একটা বিশ্বযুদ্ধ লেগে যাবার সম্ভাবনা যত বেশি ছিল সে তুলনায় এখন বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা ঠিক এর উলটা, অর্থাৎ আরও কম। এর মূল কারণ সেকালে বিবদমান পক্ষ রাশিয়া-আমেরিকার মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যে পুঁজি, পণ্য বা ভাবের লেনদেন বিনিময় তেমন কিছু ছিলনা বললেই চলে। দুটা দুই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন লেনদেনহীন অর্থনীতি ছিল। সে তুলনায় আজ রাশিয়া, চীন ও আমেরিকাসহ সবাই একই গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতির বিভিন্ন অংশ; পরস্পর পরস্পরের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যে পুঁজি, পণ্য বা ভাব ইত্যাদির লেনদেনে আষ্টেপৃষ্ঠে সংশ্লিষ্ট ও একে অন্যের উপর সরাসরি নির্ভরশীল। ফলে চীনের বোমায় আমেরিকা ধবংস হয়ে গেলে সেটাতে চীনেরই ক্ষতি হয় এবং তা আমেরিকার বোমার বেলায়ও ভাইস ভারসা। অতএব একটা বিশ্বযুদ্ধ ঘটে যাবার সম্ভাবনা এখন আগের মানে কোল্ড ওয়ার সময়ের চেয়ে তুলনামূলক ভাবে কম। অবশ্য এর অর্থ আবার এমন নয় যে বিশ্বযুদ্ধ ঘটতেই পারে না। ঠিক এই জিনিষটাই প্রতিফলিত হয়েছে এই সপ্তাহে তুরস্কের ক্ষেপনাস্ত্র হামলায় রাশিয়ান বোমারু বিমান ভুপাতিত হবার পরের পরিস্থিতি। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়াতে ন্যাটোর ম্যান্ডেটের বাধ্যবাধকতায় বাকী সদস্য সারা পশ্চিমাদেশ তুরস্কের পক্ষে দাড়িয়েছে ঠিকই কিন্তু সাথে যোগ করা এক নিঃশ্বাসে বলা তাদের পরের বাক্যই হল – তুরস্ক ও রাশিয়া যেন আর উত্তেজনা না বাড়ার দিকে খেয়াল রাখে; এছাড়া আইএসের বিরুদ্ধে সকলের সমন্বয় গড়ে তোলা এখনকার করণীয়। ওদিকে মানবজমিনের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, যেসব বিশ্লেষণ মেনে সে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয় ছড়াচ্ছে তা সবই রাশিয়ান উৎসের বয়ান। যা এমনকি পারমানবিক যুদ্ধ বাধাবার ইঙ্গিত হুমকিতে ভরপুর। আসলে এটা রাশিয়ার এক নতুন যুদ্ধবিমান হারিয়ে এবার ইজ্জত ইমেজ রক্ষার ততপরতা মাত্র।
আর আমরা? অনেক তো হল, এবার আমাদের পরিপক্ক হওয়া দরকার। একালে রাশিয়ান বেকুবি, রাষ্ট্রের মাফিয়াগিরি আর রাশিয়ান স্বার্থের প্রপাগান্ডা দূরে রেখে নিজ হুশ জ্ঞানে বাস্তবতা বুঝা ও ব্যাখ্যা করতে পারার তাকত অর্জন দরকার। আমাদের সে তৌফিক হোক এই কামনায় -।

 

[লেখাটা আর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের ২৮ নভেম্বর সংখ্যায় এবং শেষের অংশ সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকায় ০৩ ডিসেম্বর সংখ্যায় এর আগে ছাপা হয়েছিল। এখানে তা নতুন করে আরও সংযোজন ও এডিট করে সর্বশেষ এডিটেড ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল।]

 

কানে পানি গেছে, এবার কী সত্যিই বাঘ এসেছে!

কানে পানি গেছে,
এবার কি সত্যিই বাঘ এসেছে!

গৌতম দাস
০১ ডিসেম্বর ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-hR

বাংলাদেশে “আইএস এসেছে, আইএস আসে নাই” মনে হচ্ছে এই ছুপাছুপি খেলার অবসান ঘটতে শুরু করেছে। ২৮ নভেম্বর শুরুর প্রথম প্রহরে চ্যানেল আইয়ের টকশোতে এসেছিলেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত। আলোচনার এক ফাঁকে তিনি সরাসরি উপস্থাপক মতিউর রহমান চৌধুরীকে বলেই ফেললেন,”দাবিক” ম্যাগাজিনটা দেখেছেন নিশ্চয়! বলা বাহুল্য, দৈনিক মানবজমিনের মালিক সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীই সম্ভবত সবার আগে তাঁর পত্রিকায় দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্টের রিপোর্ট ছাপিয়েছিলেন। বলা যায়, “আইএস আছে” দাবির পক্ষে প্রথম স্থানীয় মিডিয়ার স্বীকারোক্তি সেটা।

আইএসের মুখপত্র বলা হয়ে থাকে বা স্বীকৃত মাসিক ম্যাগাজিন হলো দাবিক। বিদেশী গোয়েন্দা ইনটেলিজেন্স জগতে দাবিককে আইএসের মাসিক মুখপত্র মনে করা হয়। আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো থেকেও স্বীকারোক্তি মিলা শুরু হয়েছে। ওদিকে ভারতের অবস্থান বেশ তামাশার। অথবা বলা যায়, ‘দাবিক আইএসের মুখপত্র নয়’এমন উল্টা দাবি কোনো মহল থেকেই এখনো কাউকে করতে দেখা যায়নি। বিশেষত দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্ট ছাপা হবার পর। তবে মাস খানেক আগে “আইএস বলে কিছু নাই। সব জামাত এর কাজ।” এই ভাষ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা এজেন্সীর বরাতে বহু রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়া ০৬ অক্টোবর সংখ্যা। বাংলাদেশের ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো এই রিপোর্টের বরাতে নিজ নিজ পত্রিকায় পরের দিন লেখা ছাপিয়েছে। টাইম অব ইন্ডিয়া ভারতের ইন্টেলিজেন্স সুত্রের বরাতে আমাদেরকে ‘নিশ্চিত করছে’ বলে পত্রিকাটা দাবি করেছিল যে দুই বিদেশী হত্যায় আইএসের সংশ্লিষ্টতা নেই। সেই সাথে আমাদের জানিয়েছিল বাংলাদেশ সরকারের মতোই বরং একাজের জন্য তারা জামায়াতে ইসলামিকে দায়ী মনে করে।  ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল (অব.) সৈয়দ আতা হাসনাইন দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে একটি উপস্থাপনা দেন। তারপর প্রশ্নোত্তর পর্বে উপস্থিত একজন জানতে চান, বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি আছে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, আমার মনে হয়, বাংলাদেশে বিস্তৃতভাবে আইএস নেই। ভারত ও পাকিস্তানেও একইভাবে আইএসের বিস্তৃত উপস্থিতি নেই। হাসনাইন সাহেব ন্যদের চেয়ে একটু বুদ্ধিমান দেখা যাচ্ছে। তিনি যেন অস্বীকার করলেন না তবে বিস্তৃত উপস্থিতি নাই।  অথচ এক মাসও যায়নি, মনে হচ্ছে এবার কানে পানি ঢুকেছে। হিন্দুস্থান টাইমস ২৮ নভেম্বর লিখছে, বগুড়ায় হামলার ঘটনায় আইএস-সংশ্লিষ্টতা নেই, সরকারি এই দাবিকে সন্দেহের মুখোমুখি করেছে। এছাড়া ভারতের দি হিন্দু পত্রিকা দাবিক পত্রিকায় আইএসের বক্তব্য সিরিয়াসলি নিয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে “বেঙ্গল” নামে ঢাক দেয়াটাকে। এককথায় বললে ভারতে বড় সব প্রিন্টেড মিডিয়া আইএসের উপস্থিতি প্রসঙ্গে আগের অস্বীকার অবস্থান ছেড়ে স্বীকার করে রিপোর্ট করা শুরু করেছে।
ভারতের মিডিয়ার অবস্থান তামশার বলছি আর এক কারণে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ভারতী জৈন নামের সাংবাদিক  ০৬ অক্টোবর (যে নিউজটা প্রথম আলো অনুবাদ করে ছেপেছে পরের দিন ০৭ অক্টোবর) ভারতের জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা লিখছেন, “জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের কার্যক্রম সারা বিশ্বেই আছে। দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চরমপন্থীদের সম্পৃক্ততা আছে—এমনভাবে প্রচার চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী; যেন কাজটি করেছে আইএস। এটি করা হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। জামায়াতে ইসলামীর এর পরের পরিকল্পনা হতে পারে, এটা দেখানো যে ‘হাসিনা সরকার বাংলাদেশে বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।” অথচ ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়া গত ১৫ সেপ্টেম্বর ভারতীয় জামাতে ইসলামির আর এক রিপোর্ট ছেপেছে। এম পি প্রশান্ত নামের সাংবাদিক লিখছেন, ভারতের জামাতে ইসলাম আইএসের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামতে যাচ্ছে। “Jamaat-e-Islami to launch campaign against ISIS” – এই হল ঐ রিপোর্টের শিরোনাম। কারণ ভারতীয় জামাত মনে করে আইএস ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে।  কারণ তারা অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছে। আর আইএসের খলিফাগিরিও এক নকল কারবার”। তাহলে এই রিপোর্ট থেকে বুঝা যাচ্ছে আইএস কে জামাত কিভাবে মুল্যায়ন জানা যাচ্ছে। তাহলে ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্টের বরাতে ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়ার – “বাংলাদেশে জামাতই আইএস” এই প্রপাগান্ডার মানে কী?

সিরিয়ার উত্তরে আলেপ্পো প্রদেশের এক শহরের নাম দাবিক। এই নামের গুরুত্ব হল, বলা হয়ে থাকে কোনো এক হাদিসে এই শহরের নামের উল্লেখ আছে যে, এই শহরে রোমান অর্থাৎ খ্রিষ্টানদের সাথে মদিনা থেকে আসা সৈন্যদের শেষ লড়াই হবে। এবং ক্রুসেডাররা পরাজিত হবে। হাদিসের মত ওল্ড স্ক্রিপ্টে এই শহরের নামের রেফারেন্স থেকে সম্ভবত সে কথা স্মরণ করে আইএসের পত্রিকার নাম দাবিক রাখা হয়েছে। এর আগে দাবিকের প্রথম সংখ্যায় তাঁরা নিজেদেরকে পরিচিত করার প্রতীকী স্লোগান হিসেবে লেখা হয়েছিল, ‘আনটিল ইট বার্নস দি ক্রুসেডর আর্মিস ইন দাবিক অর্থাৎ “প্রত্যাদেশ মোতাবেক দাবিক শহরে খ্রিষ্টান ক্রুসেডর সেনাদের পুড়িয়ে শেষ করার আগে পর্যন্ত”।
দাবিক যে কারণেই নাম রাখা হোক না কেন আমাদের প্রসঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল এই ১২তম সংখ্যাতেই প্রথম ‘বেঙ্গল’ নাম উল্লিখিত হয়েছে। মোট ৬৫ পৃষ্ঠার এই সংখ্যায় ৩৭ নম্বর পৃষ্ঠায় কোনো এক আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির রচিত একটা লেখা ছাপা হয়েছে। আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির ওই লেখার শিরোনাম “দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল”। ঐ রিপোর্টের লক্ষণীয় ব্যাপার হল, নামের মধ্যে বাঙালি ও বেঙ্গল শব্দের বহুল ব্যবহার। বাংলাদেশকে কেন “বেঙ্গল” নামে তারা ডাকছে এর একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা বা নোট দিয়েছে। বলছে ১৯৭১ এর আগের (সম্ভবত বুঝাতে চেয়েছে বৃটিশ আমলের বাংলা) ন্যাশনালিষ্ট বাংলাকে বুঝাতে তারা “বেঙ্গল” নামটা নিয়েছে। এথেকে আমরা আবার “তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি” বলে মিলিয়ে যেন ভুল না বুঝি। তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি ধরণের মোটেও নয়। বরং যেকোন ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদে তাদের আপত্তি সেজন্য।

যাহোক সেটা, শুধু তা-ই নয় বাংলাদেশে আইএসের এফিলিয়েশন বা স্বীকৃতি দেয়া সংগঠন হিসেবে জেএমবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। আর বিএনপি (ন্যাশনালিস্ট মুরতাদ্দিন) এবং জামায়াতকে (পার্লামেন্টারি মুরতাদ্দিন) সংগঠন আর আওয়ামী লীগকে ‘তাগুতি সরকার’ হিসেবে চিহ্নিত ও ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া জেএমবির মূল নেতা আদালতের রায়ে ফাঁসিতে মৃত্যু হওয়া শায়েখ আব্দুর রহমানকে বীর শহীদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি ভাষ্যে দাবিক ম্যাগাজিনের বক্তব্যের সত্যতা বা এর অস্তিত্ব স্বীকার করে এমন বক্তব্য দেখা যায়নি। অর্থাৎ সরকারি ভাষ্য “বাংলাদেশে কোনো আইএস জঙ্গি নেই” এই বয়ান এখনো অটুট আছে। বাংলাদেশে নিরাপত্তাবিষয়ক এক গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামান অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি থাকার পক্ষে সম্ভাবনার কথা বলে গেছেন। এমনকি কাজের ধরন হিসেবে আইএস স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের এফিলিয়েটেড হিসেবে ঘোষণা করে ওই সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ভেতর দিয়ে নিজেরা হাজির থাকে সে কথাও বলেছিলেন। দাবিকের ১২তম সংখ্যা সম্পর্কে বাংলা দৈনিক মানবজমিনের রিপোর্টের পর আমেরিকার এনবিসি টিভি নেটওয়ার্কের বরাতে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকাও এক রিপোর্ট করেছে। মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামানের বরাতে প্রথম আলো ওখানেও লিখছে যে তিনি বলেছেন,‘যেহেতু আইএসের নিজস্ব প্রকাশনায় (দাবিক) বাংলাদেশ সম্পর্কে এত বিস্তারিতভাবে লেখা হয়েছে। তাই বিষয়টি আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। যদি এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে এদের প্রতিহত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’

বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মিথ্যাগুলো অদ্ভুত। সরকার নিজেও জানে এটা মিথ্যা, আমরাও যে জানি সরকার এটা মিথ্যা বলছে, সেটাও সরকার জানে। কিন্তু এর পরেও সরকার নিজের মিথ্যা বয়ানটাকে আঁকড়ে থাকবে। আর আমাদেরকে বলতে থাকবে‘বুঝোই তো আমার বয়ান মিথ্যা, তবু আমাকে মিথ্যা বলতে সুযোগ দাও।’ তেমনই এক বয়ান হলো, ‘এই দেশে আইএস বলে কিছু নোই।’ দাবিকের ১২তম সংখ্যা প্রকাশের পর সরকারের এই মূল বয়ানে কোনো বদল আসেনি। তবে এখন কেবল বাড়তি যে কথাগুলো সরকারি বয়ানে যোগ হয়েছে তা হলো, কখনো বলে জামায়াত বা কখনো বিএনপি এগুলো করছে। কখনো বলে জামায়াত জেএমবির নামে করছে। কখনো বলে জামায়াত আইএস নাম দিয়ে করছে। প্রথম আলোর ওই রিপোর্টেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “এ দেশে আইএস বলে কিছু নেই। ইতালীয় নাগরিক তাবেলাকে বিএনপি নেতা কাইয়ুম তার ভাইকে দিয়ে শুটার ভাড়া করে হত্যা করেছে। তাদের কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এসব ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে তারাই আইএসের নামে এসব প্রচার করছে। এসব প্রচারণাকে আমরা গুরুত্ব দিই না”। অর্থাৎ আইএস নেই এখনো সে কথা আঁকড়ে ধরে আছে। তবে বাড়তি স্বীকারোক্তি হল, এক. আইএসের নাম দিয়ে অন্যেরা কেউ করছে। দুই. জামায়াত-বিএনপি এগুলো করেছে। এ কথা ঠিক যে জামায়াত-বিএনপিকে জড়িয়ে মিথ্যা বয়ান দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের আর একধরনের উদ্দেশ্য আছে। তা হলো, সরকারবিরোধী সাংবিধানিক ধারার বিরোধী দল জামায়াত-বিএনপির ওপর দমনপীড়ন বা চলতি গণগ্রেফতারের পক্ষে এক ন্যায্যতার বয়ান খাড়া করা। ফলে “আইএস আছে” স্বীকার করে নিলে জামায়াত-বিএনপির ওপর নিপীড়নের পক্ষে বয়ানের ভিত্তি থাকে না। এমনিতেই এ বয়ান জনগণ বা খোদ সরকার কেউ বিশ্বাস করে না। সবাই বোঝে এটা সরকারের মুখরক্ষার বয়ান মাত্র।
তবে এ কথাও সত্যি যে, কিছু টেকনিক্যাল সমস্যাও আছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতা বিষয়ে সরকার কোনো স্বীকারোক্তি বয়ান দিয়ে দিলে কতকগুলো অসুবিধা ও জটিলতা সৃষ্টি হবে যেগুলো সরকার এড়াতে চায়। যেমন, কোনো দেশে ‘সন্ত্রাসবাদী’ তৎপরতা ও উপস্থিতি আছে, এমন অফিসিয়াল স্বীকৃতি থাকলে হয়ত বিদেশী দূতাবাস বা প্রতিষ্ঠানকে কিছু রুটিন নিরাপত্তা বিষয়ক করণীয় এমন পদক্ষেপ নিতেই হবে। যেমন, অতি জরুরি স্টাফ ছাড়া বাকিদের দেশে পাঠিয়ে দেয়া, ইমারজেন্সি উন্নয়ন কর্মসূচি ছাড়া বাকি সব তৎপরতা বন্ধ করে দেয়া, স্ব স্ব দেশের যেসব নাগরিক বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারি প্রকল্পে নিয়োজিত আছে নিরাপত্তার জন্য তাদেরকে দেশে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ ও চাপ দিতে হবে ইত্যাদি। আর এরই সার প্রভাবটা পড়বে বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্যে অর্থনীতিতে। তাই সরকার এসব বিপর্যয় হয়ত এড়াতে চায়। তবে অবশ্যই এমন স্বীকারোক্তি না দেয়ার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলকে দমনের কাজে এই বয়ানকে খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার মারাত্মক বিপজ্জনক এবং অগ্রহণযোগ্য।

দুই.
ইসলামি রাজনীতির পক্ষে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই কি তাকে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন বলা ঠিক হবে? এমনিতেই পশ্চিমের “টেররিজম” – এর সংজ্ঞাও কোন স্পষ্ট ভিত্তি নাই। এককথায় তা সাবজেকটিভ; আমি চাই তাই ধরনের। অনেকটা যেন আমি অমুক সংগঠনকে টেররিস্ট বলতে চাই তাই – এরকম। কিন্তু কেন বলতে চাই – এর কোন জবাব নাই,  বলব না, নিরুত্তর।  বিভিন্ন দলিলে বলা হয়েছে টেররিস্ট দল কারা এক তালিকা আছে। ঐ তালিকায় যাদের নাম আছে ওরাই টেররিষ্ট। এভাবে আসলে কোন সংজ্ঞা না দিয়েই টেররিজম কোনটা বা টেররিষ্ট কারা এর ছদ্ম ভিত্তি দাঁড় করানো হয়েছে। এটা আমেরিকান কায়দা। আবার ঠিক এই কায়দা অনুসরণ করে জাতিসংঘেরও এক নিজস্ব টেররিস্ট তালিকা ও কায়কারবার।
তো যে কথা বলছিলাম, পশ্চিমা সংজ্ঞার দিক থেকে বিচারেও ব্যাপারটা সম্ভবত ঠিক তা নয় যে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই সে পশ্চিমের চোখে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন। বরং সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কার ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার কোথায় এই প্রশ্ন বিচারে আমরা ভিন্ন এক ভাগ-বিচার দাঁড় করতে পারি। যেমন, যেগুলো পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর যেগুলো তা নয় এমন দুইয়ের ভাগ-বিচারের মধ্যে বড় ফারাক হল, পাকিস্তানের ভূমিতে ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার আছে, এমন সংগঠন সম্পর্কে একটা অনুমান আমরা করতে পারি যে এসব সংগঠন নিজেদের এজেন্ডা যা-ই থাক, মাঝে মধ্যে পাকিস্তান সরকার বা এর গোয়েন্দা বাহিনীর দেয়া অ্যাসাইনমেন্টও সম্পন্ন না করে দিলে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ওসব সংগঠনের তৎপরতা পাকিস্তানের চলতে দেয়ার কথা নয়। যেটাকে আমরা বলতে পারি ট্যাক্স দিয়ে চলা। কারণ, সশস্ত্র সংগঠন মানেই যেকোনো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক আইনের চোখে তা বেআইনি তৎপরতাই হবে। ফলে সেই বেআইনি দিক উপেক্ষা করে কাজ করতে দিতে পারে একমাত্র সরকার বা এর কোনো এজেন্সি। কথাটা আরেকভাবে বলা যায়, সশস্ত্র ওসব সংগঠনের কোনো তৎপরতা যদি সরাসরি পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইচ্ছার সাথে সংঘাতের বিষয় হয়, তাহলে পাকিস্তান সরকার এসব সশস্ত্র সংগঠনকে নিজ ভূমিতে থেকে তৎপরতা চালাতে দিবে না। দিতে পারে না। এই বিচারে আলকায়েদা ও আইএস ছাড়া বাকি প্রায় সব সংগঠন পাকিস্তানভিত্তিক। ফলে পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর পাকিস্তানভিত্তিক নয়, এভাবে দুটো ভাগ আমরা করতে পারি।
আবার পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোর আর এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল, এরা দুনিয়াব্যাপী তৎপরতার সংগঠন নয়। এমনকি এরা ঠিক আঞ্চলিক সংগঠনও নয়। মানে আমাদের অঞ্চলের সব রাষ্ট্রেই সংগঠনের শাখা ও তৎপরতা আছে তা নয় এবং সব সরকারের বিরুদ্ধে তৎপর এ কথাও সঠিক নয়। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রে তৎপর এবং এই অর্থে বলা যায়, বেশির ভাগই কাশ্মির ইস্যু কেন্দ্রিক সংগঠন। এটাই তাদের মূল কাজের এলাকা। তবে উপচে পড়া এফেক্ট হিসেবে বাংলাদেশেও এদের তৎপরতা থাকতে পারে। কিন্তু মূল কথা আলকায়েদা বা আইএসের সাথে সম্পর্ক বা এফিলিয়েটেড সংগঠন এরা কেউ নয়।
তাহলে পাকিস্তানভিত্তিক আর আন্তর্জাতিক- এভাবে ভাগ দেখানোর আর এক কারণ হল, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো ৯/১১-এর আগেও হাজির ও তৎপর ছিল। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিজ নিজ স্বার্থে পরস্পরের বিরুদ্ধে এবং অপর রাষ্ট্রের ভেতর কাউন্টার ইনটেলিজেন্স বা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালানোর বহু পুরনো রেওয়াজের ধারাবাহিকতা সংগঠন। পশ্চিমা বা আমেরিকানরা যে অর্থে সন্ত্রাসবাদী বা টেরর সংগঠন বলতে বোঝে, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো এর পুরো অর্থ বহন করে না। অটল বিহারি বাজপেয়ির বিজেপি সরকার ২০০৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত  ভারতে ক্ষমতাসীন ছিল। পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোকে এরা সে সময় এক নতুন নামে ডাকত, বলত  “সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদ”। অর্থাৎ সীমান্তের অপর পাড় থেকে মানে পাকিস্তান থেকে যারা আতঙ্ক বা সন্ত্রাস ছড়াতে এসেছে। এই নাম খুবই অর্থপূর্ণ। পশ্চিম তাঁর সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদী বলতে যাদেরকে বোঝাতে চায় ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদীরা’ ঠিক সে সংগঠন এরা নয়।
এসব বিচারে এবার স্পষ্ট করে বলা যায়, আলকায়েদা বা আইএসের সন্ত্রাসবাদ ভারত অথবা বাংলাদেশ এপর্যন্ত কখনও দেখে নাই। এর আগে কখনোই অভিজ্ঞতা নেয়া বা মোকাবেলা করতে হয়নি। মনে হচ্ছে, এবারই প্রথম করতে হবে। তাহলে এত দিন ভারতের ভোকাবুলারিতে সর্বক্ষণ যে জঙ্গিবাদের কথা শুনে এসেছি সেগুলো কী ছিল? দু’টি পয়েন্টের দিক থেকে তা ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রেওয়াজি অন্তর্ঘাতী তৎপরতা যেগুলো ছিল, আফগান যুদ্ধফেরত যোদ্ধাদের ফেরার কারণে যেটা আরো বড় মাত্রা পেয়েছিল; সেকালে নাইন ইলেভেন আমেরিকায় হামলার পর আমেরিকা ভারতের সমর্থন চাওয়াতে ভারত তার নিজ অভিজ্ঞতার ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদকে’ আমেরিকান বুঝের ‘সন্ত্রাসবাদ’ বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বলে চালানোর সুযোগ পেয়েছিল এবং নিয়েছিল। কিন্তু তবু ভারত অভ্যন্তরীণভাবে নিজস্ব মূল্যায়নে পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র তৎপরতা আর আন্তর্জাতিকভাবে আলকায়েদা ও আইএসের তৎপরতাকে পরিষ্কার আলাদা ভাগ করেই বুঝে থাকে। তবে এত দিন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সে তৎপরতায় ভারতের নিষ্ঠা আছে, অথবা বাংলাদেশে তার সিকিউরিটি স্বার্থ আছে এসব কথা ছড়িয়ে সে বাংলাদেশে নিজের পছন্দের সরকার রাখাকে জায়েজ করেছে। বিনিময়ে ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থ আদায় করা আর সবচেয়ে বড় স্বার্থ বাংলাদেশ থেকে মাগনা ট্রানজিট আদায় করা এগুলো চালু রেখেছে। আজ সম্ভবত সময় ঘনিয়েছে। কানে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতার বিপক্ষে ভারতের নড়াচড়া প্রস্তুতি নিতেই বা  করতেই হচ্ছে তাকে। আইএস তৎপরতার উপস্থিতি, হোক না তা স্থানীয় সংগঠনকে এফিলিয়েশন দেয়া তৎপরতা, এটা ভারতের পক্ষে আর কোনোভাবেই খাটো করে দেখা সম্ভব হচ্ছে না। এই জায়গায় এসে বাংলাদেশ সরকারের স্বার্থের পক্ষে ‘আইএস নেই’ সে কথা বলবার অবস্থায়  ভারত আর নেই। যদিও সর্বশেষ গত অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে দুই বিদেশী হত্যার পরেও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে তাল মিলিয়ে ও নিজের গোয়েন্দা তথ্যের সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিল আইএস নেই। একই সাথে এবার ভারতীয় মিডিয়াগুলোর ভোল বদলও লক্ষণীয়। অন্তত নিরাপত্তার প্রশ্নে এই ইস্যুতে হাসিনার বয়ান ও স্বার্থকে ভারত আর নিজের স্বার্থের সাথে মিলিয়ে দেখতে ও চলতে পারছে না।
বলা বাহুল্য, ভারতের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ, নিরাপত্তাবিষয়ক জেনুইন কোনো হুমকি ইত্যাদি – এসবকে অন্য সব কিছুর ওপর তাকে স্থান দিতেই হয়। সবার আগে চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা।

goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গতকাল ৩০ নভেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এরই ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আরও সংযোজন এডিট করে এখানে আজ আবার ছাপা হল।]

সর্বশেষ এডিটঃ ০১ ডিসেম্বর, ভোর ০২ঃ৫২