আমেরিকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন

আমেরিকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
গৌতম দাস

২৬ জানুয়ারি ২০১৬,মঙ্গলবার
http://wp.me/p1sCvy-D3

আধুনিক রাষ্ট্রের জমানায় বাণিজ্য চুক্তি করার রেওয়াজ উঠেছিল আশির দশকের শুরু থেকে। অর্থাৎ যারা গরিব দেশ বা ছোট অর্থনীতির রাষ্ট্র বলা হয়, এদের সাথেও বাণিজ্য চুক্তি করার দরকার-বোধের শুরু তখন থেকে। বাণিজ্য চুক্তি বলে এটিকে বাড়িয়ে বলার অর্থ হয় না। সারকথায় বললে আমেরিকা তার নিজ বাজারে নিজ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় গরিব দেশগুলোকে পণ্য রফতানি করতে দেয়া শুরু করেছিল। কথাটিকে আরেকভাবে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক পর মূলত ইউরোপের বাজার বিনিয়োগ-পুঁজিতে পরিপূর্ণ সয়লাব হয়ে গেলে উন্নত অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো মনে করা শুরু করেছিল, তাদের কেবল গরিব দেশে নিজ পণ্য রফতানিকারকের এত দিনের একক ভূমিকায় থাকা বোকামি হচ্ছে। ইউরোপের বাজার স্যাচুরেটেড হওয়ার এর পরে কে? তাই এশিয়ায় আসতে সময় লেগেছিল। অন্তত গ্লোবাল বিনিয়োগ-পুঁজির খাতক হতে পুঁজিবাজারের ক্রেতা বা ঋণগ্রহীতা আরো বাড়াতে চাওয়া- এ দরকারি দিক থেকে দেখে মূলত আমেরিকা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ফলে বিশ্বব্যাংকের মুখ্য স্লোগান হয়েছিল- গরিব দেশকে “রফতানিমুখী অর্থনীতি” করে ঢেলে সাজাতে হবে। বাংলাদেশে সে সময়ের এ’বিষয়টার  দুটো ঘটনায় চিহ্নিত করা আছে।

বাংলাদেশে ‘রফতানিমুখী অর্থনীতি’ করতে বিশ্বব্যাংক ১৯৮২ সালে এরশাদ দিয়ে ক্ষমতা দখল করিয়ে বিশ্বব্যাংকের সংস্কার কর্মসূচি চালু করে দিয়েছিল। এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন বা সংক্ষেপে ইপিজেড ধারণা সাথে আসে সেই থেকে। অন্যদিকে সে ঘটনা-সময়ের দ্বিতীয় চিহ্নটি সামাজিক সাংস্কৃতিক ধরনের। কবি ফরহাদ মজহারের এক কবিতার বই আছে ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি বইমেলায় বেরিয়েছিল, বইটার নামই “অকস্মাৎ রপ্তানিমুখী নারী মেশিন”। বইয়ের তাতপর্যপুর্ণ এ’নামটাই অনেক কিছুর নির্দেশক। কলোনি আমল থেকেই আমাদের প্রচলিত রফতানি পণ্য ছিল পাট, কাঁচা পাট অথবা পাটজাত পণ্য। সে আমলে যাকে বলা হত অর্থকরি ফসল। বিশ্বব্যাংকের ওই সংস্কার কর্মসূচিতে এই প্রথম আমাদের সেখান থেকে সরিয়ে এনে মুখ্য রফতানি পণ্য করা হয় রেডিমেড গার্মেন্টস, আর আমাদের পরিচিতি দাঁড়ায় এরই রফতানিকারক দেশ। গার্মেন্ট রফতানির অর্থনীতিতে রূপান্তর করে দেয়া হয়।

এখানে একটা কথা স্পষ্ট করা দরকার। বাংলাদেশের মতো দেশের অর্থনীতিকে রফতানিমুখী করে সাজানো শুরুর আগে আমরা আমেরিকায় কোনো পণ্য রফতানি করতে চাইলে তাতে আইনগত কোনো বাধা ছিল তা নয়। তাহলে রফতানিমুখী করে সাজানো – এই পরিস্থিতিতে নতুন যে বিষয়টি তা হলো, আমেরিকাতে কোন কোন পণ্য রফতানিতে বাংলাদেশ কর মওকুফ বা ছাড় পাবে, এমন কিছু পণ্য সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের জন্য সেই পণ্যই রেডিমেড গার্মেন্ট। আর এর সাথে কর মওকুফের এক কোটা ব্যবস্থা। এই হল আমাদের মতো দেশের সাথে প্রথমবারের মতো আমেরিকায় রফতানিকারকের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে বাণিজ্য চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট হওয়া। আমাদের মতো দেশের সাথে আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি করার ইতিহাসের শুরু। এর মূল বৈশিষ্ট্য হল, আমাদের মতো দেশকে আমেরিকা কতটা এবং কী কী পণ্য নিয়ে প্রবেশ করতে দেবে, এমন একপক্ষীয় করে নেয়া ব্যাপারের উপর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ।

তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ইস্যুতে ১৯৪৭ সাল থেকেই জাতিসঙ্ঘের ব্যানারে নানান বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ শুরুল হয়েছিল। জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস এন্ড ট্রেড, গ্যাট (GATT) থেকে শুরু হয়ে ১৯৯৪ সালে ডব্লিউটিও-তে এসে যা শেষ হয়। এতে আমাদের দিক থেকে পড়ে পাওয়া কিছু সুবিধার রাস্তা তো অবশ্যই খুলেছিল। যেমন আমরা উন্নত দেশের তৈরি সব ধরনের পণ্যের ক্রেতা হওয়া সত্ত্বেও উল্টো খোদ আমেরিকায় কিছু পণ্যের রফতানিকারক হয়ে গিয়েছিলাম। স্বভাবতই তা শুধু সেসব রফতানি পণ্য, তুলনামূলকভাবে যা টেকনোলজির দিক থেকে কম জটিল আর একেবারেই কম দক্ষ শ্রম লাগে আর তা প্রচুর গা-গতরের শ্রম, এমন। কিন্তু সেটাও এমনি আসেনি। অবস্থা তৈরি করা হয়েছিল, যেন তারা আমাদের তাদের বাজারে মহান প্রবেশদাতা হিসেবে হাজির হয়। অর্থাৎ বাজারে আমাদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ যেন আমেরিকার হাতে থাকে। কথাটা বলার কারণ বিষয়টি রেসিপ্রোকাল নয় বা পাল্টাপাল্টি ধরনের নয়। যেমন আমাদের বাজারে আমেরিকার প্রবেশের ক্ষেত্রে তো এটা খাটে না। আমরা সেখানে কোনো দাতা হিসেবে হাজির নই। আমাদের বাজারে প্রবেশে আমেরিকার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণের বালাই নেই। যা হোক, এসবের ভেতর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সেই থেকে প্রবল কথাবার্তার জোয়ার উঠেছিল। ‘গ্রুপ-৭৭’ বা ‘উরুগুয়ে রাউন্ড’, ‘দোহা রাউন্ড’ ইত্যাদিতে সাতটি রাউন্ড বিস্তর আলোচনা দরকষাকষির পরে নতুন করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তা বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিও হিসেবে হাজির হয়েছিল। কিন্তু এভাবে হাজির হতে হতে আমেরিকা আবার এ ধরনের গ্লোবাল বাণিজ্য সংস্থায় আস্থা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। এর মূল কারণ মনে করা হয়, ডব্লিউটিও’র কার্যকারিতা যত বাড়ছিল ততই অর্থনৈতিকভাবে গরিব এলডিসি বা লিস্ট ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রিজসহ নানা ক্যাটাগরির জোটবদ্ধতা শুরু হতে দেখা যায়। আমেরিকার বিরুদ্ধে সবার জোটবদ্ধ হয়ে যাওয়া- এটাই আমেরিকার নিরুৎসাহিত হয়ে যাওয়ার কারণ। আর এর বদলে সেই সাথে আমেরিকার নতুন উৎসাহের বিষয় হয়ে ওঠে দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি- বাই-লেটারাল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট। এর ভেতরে মুক্ত শব্দটি যত জ্বলজ্বল করে, ততটাই এটা বন্দিত্বের ফাঁদ।
আমেরিকার ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টে নতুন উৎসাহের ফলে ডব্লিউটিও কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেনি ঠিকই; তবে আমেরিকার কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে বিভিন্ন রাষ্ট্রের আমেরিকার সাথে বাই-লেটারাল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট। দ্বিপক্ষীয় ধরনের চুক্তি আমেরিকার দিক থেকে সবচেয়ে উপযুক্ত বলে ধারণা প্রবল হতে থাকে। এর কারণ ভিন্ন এক পরিস্থিতি। যেকোনো বাণিজ্য চুক্তি আসলে আইডিয়ালি ‘উচিত অর্থে’- রাষ্ট্রস্বার্থের ভিত্তিতেই হওয়ার কথা। কিন্তু একটা চুক্তির মাধ্যমে ‘রাষ্ট্রস্বার্থে বাণিজ্য’ ঘটানো ব্যাপারটা বাস্তবে অলীক না বললেও খুবই কঠিন। ফলে গণস্বার্থের বদলে নামেই এখানে একটা কোটারি স্বার্থ তৈরির সম্ভাবনা থাকে সব সময়। মূলত পুঁজিমালিক বা ব্যবসায়ীর স্বার্থটাই জনস্বার্থের নামে হাজির হয়ে যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আরেক বিপদ দেখা যায়।

যেমন- বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ধরা যাক। এখানে সরকারের স্বার্থ মানে আসলে সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থ অথবা যেভাবেই হোক ক্ষমতায় থাকার স্বার্থ। জনস্বার্থের সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে আমেরিকা বাংলাদেশের সাথে কোনো বাণিজ্য চুক্তির বেলায় ক্ষমতাসীন সরকারের দুর্বলতাগুলোকে কাজে লাগায়। বিশেষ করে জনগণের রাজনৈতিক মানবিক মৌলিক অধিকার রক্ষা না করা, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার রক্ষা না করার মতো ব্যাপার থাকলে তা আড়াল, উপেক্ষা অথবা ন্যায্যতা আমেরিকার দেয়া অথবা না দেয়াকে ব্যবহার করে যেকোনো বাই-লেটারাল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট করে নেয়া সম্ভব। কারণ, এখানে ক্ষমতাসীন সরকার নিজের সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থে অথবা নিজের ক্ষমতাসীন থাকার স্বার্থে খোদ রাষ্ট্রস্বার্থ বা গণস্বার্থকে বিক্রি করে দেয়া সম্ভব। কারণ আমাদের মত দেশের রাজনৈতিক সাংবিধানিক ব্যবস্থা, পাবলিক কন্ট্রোল ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। আর এটাই আমেরিকার জন্য সুযোগ। অথচ আমেরিকাকে একই বিষয়ে চুক্তি ডব্লিউটিও’র ভেতর জোটবদ্ধ এলডিসি রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে করতে হলে, সেখানে কোনো একটা রাষ্ট্রের ‘সরকারের দুর্বলতা’কে ব্যবহার করা যেত না। কারণ সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর সাধারণ স্বার্থের সাথে সমঝোতা চুক্তি, ফলে শুধু একটা রাষ্ট্রের ও শাসকের দুর্বলতাকে পুঁজি করার সুযোগ সেখানে নেই। তাহলে দাঁড়াল, আমেরিকার পছন্দ দ্বিপক্ষীয় ধরনের ফ্রি বাণিজ্য চুক্তি। এটা হলো এমনই ফ্রি বা স্বাধীন যে, নিজে ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে, দলবাজির স্বার্থে স্বাধীনভাবে দেশ বা গণস্বার্থ বেচে দেয়া যায়।
এখানে দ্বিপক্ষীয় ধরনের ফ্রি বাণিজ্য চুক্তি বলতে তা শুধু দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যেই এটা হতে হবে এমন বোঝা ভুল হবে। এর আরেক রূপও আছে, যেটা প্রায় যেন একটা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি- ওই ফরম্যাটই কয়েক রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার – এভাবে একসাথে করা হয়ে থাকে। সাধারণত একই স্তর বা মানের অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোর সাথে আমেরিকা এমন দ্বিপক্ষীয় ধরনের ফ্রি বাণিজ্য চুক্তি জোট করে থাকে। অথবা অনেক সময় ভৌগোলিক এলাকা বা অঞ্চলের কয়েকটা রাষ্ট্রের সাথে এমন বাণিজ্য চুক্তি করেছে আমেরিকা। যেমন ল্যাটিন আমেরিকার এমন দু’টি বাণিজ্য চুক্তি হল- উত্তর আমেরিকা ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট ১৯৯১ (নাফটা) এবং সেন্ট্রাল আমেরিকান ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট ২০০৬ (সাফটা)। আমেরিকার করা এ ধরনের বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোকেও তারা বাই-লেটারেল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট বা দ্বিপক্ষীয় এফটিএ বলে ক্যাটাগরি,  নামকরণ করে ফেলেছে।

এ ছাড়া একই ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট ধরনেরই ইদানীং আরেক সর্বশেষ ধাপ হলো, যেমন ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ বা সংক্ষেপে টিপিপি এবং ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ বা টিটিআইপি। তবে এখানে এবার ‘পার্টনারশিপ’ শব্দটি নামের শেষে রাখার একটা রেওয়াজ চালু হয়েছে।

পার্টনারশিপ
শব্দটির প্রতীকী কিন্তু এর গুপ্ত বা অনুচ্চারিত দিক হল, রাইজিং ইকোনমির চীন বা আগামী দিনের নতুন গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারের নেতা চীনের বিরুদ্ধের রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে একসাথে আমেরিকার করা দ্বিপক্ষীয় ধরনের ফ্রি বাণিজ্য চুক্তি- এরই জোট এটা। এর আগে সাধারণভাবে আমেরিকা দ্বিপক্ষীয় ধরনের যেসব বাণিজ্য চুক্তি করে চলছিল, এমনকি চলতি শতকে এসেও সে একই কাজ করছিল; তবে একই ধরনের এবারের চুক্তিগুলোতে চীনবিরোধী এক বাড়তি বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়েছে। যেমন- টিপিপি, এটা করা হয়েছে মূলত চীনে সমুদ্রপথে প্রবেশের চার পাশের পড়শি কাছে-দূরের রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে। মূলত এমন রাষ্ট্রগুলো হল- অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, জাপান, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম আর স্বাগতিক আমেরিকা। তবে ব্যতিক্রমভাবে এখানে কানাডা আর কিছু ল্যাটিন আমেরিকান দেশ, যেমন- চিলি, মেক্সিকো ও পেরুও আছে। এ ছাড়া অন্য যে দ্বিতীয় বাণিজ্য চুক্তি ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ বা টিটিআইপি – এটা হলো আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার হবু বাণিজ্য চুক্তি।

টিপিপি আর টিটিআইপি এ দুই চুক্তির মধ্যে নামের শেষ পার্টনার শব্দ যোগ হয়ে আছে সে কথা ছাড়াও এ দুই চুক্তির বড় মিলের দিক হল, এটা চীনবিরোধী বৈশিষ্ট্যের জোট। এ ছাড়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মিলের দিক হল বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যেমন- এ দুই চুক্তিরই প্রস্তুত প্রক্রিয়া চলছে অত্যন্ত সঙ্গোপনে। নিজ জনগণকে দূরে রেখে। লন্ডনের ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকার ভাষায়, ‘এ গোপনীয় ধরনের অগণতান্ত্রিক চুক্তি প্রক্রিয়া এখনো চলছে এবং এ রিপোর্টে তুলে ধরা চুক্তিবিষয়ক প্রায় সব তথ্যই লিকেজ হয়ে আসা তথ্য অথবা তথ্য পাওয়ার অধিকার- ‘রাইট টু ইনফরমেশন’ আইনে অনুরোধ পাঠিয়ে সংগ্রহ করা তথ্য’। অন্য দিকে এ চুক্তির বিরুদ্ধে ব্রিটেনে জনমত সংগঠিত করার সংগঠন ‘ওয়ার অন ওয়ান্ট’-এর নির্বাহী পরিচালকের ভাষায়, তিনি মনে করেন এ হবু চুক্তি ইউরোপ ও আমেরিকান সমাজের সাধারণ মানুষের ওপর বহুজাতিক কোম্পানির আক্রমণ।

এই হলো সংক্ষেপে আমেরিকার করা ধারাবাহিক বাণিজ্য চুক্তির ইতিহাস। সাধারণভাবে বললে, আমেরিকার ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট করার উদ্দেশ্য হল, বড় বড় বিজনেস হাউজ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে যেসব রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুন-রীতি মেনে চলতে বাধ্য হয় এমন নিয়ন্ত্রণ আইনগুলোর যে আইনি বাধা আছে, সেগুলো আলগা করে দেয়া। চুক্তি করার আগে প্রায়ই আমেরিকার ‘পার্টনার’ রাষ্ট্র ওই চুক্তি করার খাতিরে নিজ আইনের নিয়ন্ত্রণ আলগা করে ফেলে থাকে। যেমন নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক নিয়ন্ত্রণ আইন, পরিবেশবিষয়ক নিয়ন্ত্রণ আইন, ব্যাংকবিষয়ক নিয়ন্ত্রণ আইন অথবা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষমতা বিষয়ক আইন- এগুলোকে পাশ কাটিয়ে ইচ্ছামতো ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুবিধা নেয়া এসব চুক্তির সাধারণ উদ্দেশ্য। আর এই মূল উদ্দেশ্যের অধীনে অন্যান্য উপ-উদ্দেশ্যে যেমন চীনবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি জোট অথবা আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে আমাদের মতো রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি (জিএসপি’র মতো) করা হয়ে থাকে।

নতুন ফেনোমেনা : মানবাধিকার
প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে আমেরিকা এমন বাণিজ্য চুক্তি করে যাচ্ছিল, কোনো সমস্যা বা আপত্তি দেখা যায়নি। কিন্তু এবারই প্রথম এসবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলার এক পাল্টা প্রয়াস লক্ষ করা যাচ্ছে। এই প্রথম টিপিপি এবং টিটিআইপি- এ দুই চুক্তির বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে সাবধান করেছেন জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের (ইউএন-এইচআরসি) হেডকোয়ার্টার জেনেভা থেকে এর র‌্যাপোটিয়ারেরা বা র‌্যাপোরচারেরা। ফরাসি শব্দ ‘র‌্যাপোটিয়ার’-এর তুল্য ইংরেজি শব্দ ইনভেস্টিগেটর। অর্থাৎ নিরপেক্ষ তদন্ত অনুসন্ধান করে রিপোর্টদাতা। বিভিন্ন দেশের হিউম্যান রাইটস লঙ্ঘনের ঘটনায় অথবা কোনো সদস্য রাষ্ট্রের হিউম্যান রাইটসের দশা পরিস্থিতি বিষয়ক ঘটনাকে সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও রিপোর্ট করার জন্য জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের নিয়োগ দেয়া বিভিন্ন বিষয়ের র‌্যাপোটিয়ার আছেন। কাউন্সিল থেকে এরা এক ধরনের নিয়োগ নেন বটে, কিন্তু কোনো পারিশ্রমিক নেন না বা পান না। তবে কোনো ব্যক্তি সহকারী বা বস্তুগত লজিস্টিক সাপোর্ট লাগলে তা কাউন্সিল থেকে নিতে পারেন। সে জন্য এদের নিরপেক্ষ র‌্যাপোটিয়ার বলা হয়। যেকোনো ইস্যুতে এই র‌্যাপোটিয়ারদের সরজমিনে সংগ্রহ ও পেশ করা রিপোর্টকে মাঠের ফ্যাক্টস বা ভিত্তি মেনে এর ওপর এরপর সদস্যদের আলোচনা শুরু হয় ও সিদ্ধান্ত রেজুলেশনে পৌছানো হয়। এমন কাজ করে সুনাম কামিয়েছেন, এমন নামকরা ১০ জন র‌্যাপোটিয়ার উদ্বেগ জানিয়ে এক যৌথ বিবৃতি দিয়েছিলেন গত ২০১৫ সালের জুন মাসে। ওই বিবৃতিতে সবার আগে তারা স্পষ্ট করে নিয়েছেন যে, তারা যেকোনো বাণিজ্য চুক্তির প্রয়োজন বোঝেন। ফলে তাদের ইস্যু কোন বাণিজ্য চুক্তির বিরোধীতা করা নয় বরং ওই চুক্তি করতে গিয়ে করা মানবাধিকার লঙ্ঘন।

এ ছাড়া শুধু উদ্বেগ জানানো নয়, ওই বিবৃতিতে সবশেষে কী করা উচিত সে বিষয়েও কিছু পরামর্শ তাঁরা দিয়েছেন। যেমন- কাজ গোপনে না করে কাজে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা আনা, জনপ্রতিনিধিদের সামনে সব কিছু উন্মুক্ত রাখা, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে-পরে মানবাধিকারের ওপর এর প্রভাব কী হতে পারে তা বিবেচনায় নেয়া, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় মানবাধিকার সমুন্নত রাখা এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা কী থাকছে সেদিকে নজর দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া ইত্যাদি।

ওই বিবৃতির প্রায় ছয় মাস পরে গত ১২ জানুয়ারি ২০১৬ আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় হিউম্যান রাইটসবিষয়ক দাতব্য সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ বা সংক্ষেপে এইচআরডব্লিউ একই ইস্যুতে নিজেরই তৈরি আটটি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার ছলে টিপিপি’র কার্যক্রমকে প্রশ্ন করেছে। টিপিপি চুক্তিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো জানিয়ে নিজের অবস্থান প্রকাশ করেছে সেখানে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যদিও দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং আমেরিকান কোনো সরকারি দান তারা গ্রহণ করে না বলে জানিয়েছে। এছাড়া এরা নিজ সরকারি নীতি অনুসরণ করে কাজ করে সিদ্ধান্ত নেয় এমন নয়। যেমন- মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা নিপীড়ন ইস্যুতে এইচআরডব্লিউ শক্ত সমালোচনামূলক অবস্থান নিয়েছিল। বিশেষত যেখানে ওবামা প্রশাসনসহ সারা পশ্চিম জগৎ ব্যবসার লকলকে লোভে এই ইস্যুতে চুপচাপ ছিল। পরবর্তীকালে ওবামা দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জেতার পরের সপ্তাহে প্রথম মিয়ানমার সফরে এসে মানবাধিকার বিষয়ে নিজ সরকারের অবস্থানের বদল ঘটিয়েছিলেন। তবে স্বভাবতই এই সংগঠন প্রত্যক্ষ সঙ্ঘাতের ভাষায় না বললেও স্পষ্ট আপত্তির ভাষায় টিপিপি ইস্যুতে নিজের আলাদা অবস্থান ব্যক্ত করেছে। ফলে সুযোগ রেখেছে যেন চাইলে ওবামা সরকার নীতি বদলিয়ে নিজেকে সংশোধন করে নিতে পারে। যেমন- দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরের শুরুতে এইচআরডব্লিউ বলছে, আমেরিকার ফ্রি টেড অ্যাগ্রিমেন্ট ভালো না মন্দ- এ বিষয়ে তাদের কোনো অবস্থান নেই। কিন্তু টিপিপি চুক্তিতে কিছু মারাত্মক হিউম্যান রাইটস লঙ্ঘনের ইস্যু উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বলে তারা মনে করে। বিশেষত “শ্রমিকের অধিকার, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ, সুস্বাস্থ্য থাকার অধিকার, মুক্তভাবে নিজেকে প্রকাশ এবং ইন্টারনেটে প্রাইভেসির অধিকার” বিষয়ে। তবে তাদের অবস্থান হল, টিপিপিতে হিউম্যান রাইটস বিষয়ক যে সমস্যা সৃষ্টি করেছে, তা সংশোধনযোগ্য। এছাড়া একটা হিউম্যান রাইটস ফ্রেন্ডলি টিপিপি কেমন হতে পারে এর একটা ধারণাও তারা রেখেছে। ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার স্বভাবতই। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা নিজেদের স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট রাজনীতির শক্তিতে সংগঠিত না করে কেবল মানবাধিকার সংগঠনের মুখ চেয়ে থাকা পরিস্থিতি তৈরি করে রাখলে তা আমেরিকার জন্য এমন আরো টিপিপি স্বাক্ষর করিয়ে নেয়া সহজ হয়ে যেতে পারে।

goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদশ পত্রিকা ২৪ জানুয়ারি ২০১৬ প্রিন্টেড সংখ্যায় এবং দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকা ২৫ জানুয়ারি ২০১৬ প্রিন্টেড সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। তা এখানে আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান আকারে আবার ছাপা হল। ]

তেল রফতানি বাজারে আমেরিকার প্রবেশ ঠেকানো

তেল রফতানি বাজারে আমেরিকার প্রবেশ ঠেকানো
গৌতম দাস
২২ জানুয়ারি ২০১৬
http://wp.me/p1sCvy-zG

ব্যাপারটা শেষ বিচারে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে বিক্রির প্রতিযোগিতা। চলতি মাসের ১৪ তারিখে রয়টার্সের বরাতে দৈনিক ‘বণিকবার্তা’ বলছে, ১৫০ ডলার ব্যারেলের তেল এখন দাম কমতে কমতে প্রায় ৩০ ডলারেরও নিচে নেমে গেছে। বিগত শেষ ২ বছর থেকে এ কমতি দশা। বিশেষ করে বিগত প্রায় ১৩ বছর ধরে ক্রমে একটানা বাড়তিতে ২০০৮ সাল থেকে যে তেলের দাম ১৫০ ডলার উঠেছিল প্রথমে পরে সেই দাম নামতে নামতে ৭০ ডলারে থিতু হয়েছিল। কিন্তু গত ৬ মাস থেকে এটাই আবার নামতে নামতে এখন এ ২৭ ডলারে নেমে যাওয়ার দশা। প্রায় ১ বছরের কিছু আগে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর রয়টার্সের এক নিউজ রিপোর্ট শঙ্কা ব্যক্ত করেছিল যে, তেলের দাম ২০ ডলারে পৌছাতে পারে। মনে হচ্ছে, ঘটনা সেই দিকে যাচ্ছে। আল-জাজিরার টক শো “ইনসাইড স্টোরি”তে তেলের দাম ১০ ডলারে নেমে যেতে পারে কিনা তা নিয়ে আলোচনা তুলেছিল গত সপ্তাহে।

তেলের দাম এত উঠাপড়ার সাধারণ কারণ কি আছে
মোটা দাগে বললে, একেক পর্যায়ে তেলের দাম ওঠা বা পড়ার কারণ একেক ধরনের। তাই সাধারণীকরণ না করে প্রতি ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কারণের দিক থেকে তা বুঝতে হবে। যেমন, যে ১৩ বছর ধরে বিশেষত ২০০৩ সাল থেকে দাম উঠতির কথা বলছিলাম এর প্রধান কারণ ছিল রাইজিং ইকোনমি। ব্যাপারটা মূলত চীনকে ঘিরে। চীনের মাও মারা যান ১৯৭৬ সালে। তাঁর মৃত্যুর আগের শেষ ৬ বছরের সময়কালে পশ্চিমের সঙ্গে (মূলত আমেরিকার সঙ্গে) চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের বড় ধরনের রদবদল ঘটায় নতুন করে তা সাজানো হয়েছিল। যার সারকথা হলো, চীন আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিম থেকে বিপুল পরিমাণ পুঁজি নেবে, চীনে ব্যাপকভাবে বিদেশি পুঁজি আসতে দেবে। অবকাঠামো নির্মাণ খাতে এবং বাণিজ্যিক বিনিয়োগ খাতেও। এককথায় গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডারের দুনিয়ার ভেতর কমিউনিস্ট চীন পুরোপুরি প্রবেশ করবে। অন্যভাষায় বললে, কমিউনিস্ট চীন নিজে এক ব্যাপক পুঁজিতান্ত্রিক রূপান্তরে যাবে এবং এ কাজে প্রয়োজনীয় পুঁজি চীন আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিম থেকে আসতে দেবে। এরই মৌলিক নীতিগত রফাদফা সম্পন্ন হওয়ার কাল ছিল ঐ শেষ ছয় বছর। বিস্তারিত রফাদফার খুঁটিনাটি শেষ করে চীনের নিজের অভ্যন্তরীণ আইনকানুন নতুন পরিস্থিতি অনুযায়ী নতুন নিয়্মে সাজাতে সাজাতে সময় লেগে যায় প্রায় ১৫ বছর, ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। এটাকে প্রস্তুতিমূলক বা পিকআপ নেয়ার আগের সময় বলা যেতে পারে। পরের ১৯৯০-২০১০ এই ২০ বছরকে বলা হয় রাইজিং ইকোনমির বা উদীয়মান অর্থনীতির চীন। এই এক নতুন টার্ম, যেটা উন্নত পশ্চিম আর আন্ডার ডেভেলপড (অনুন্নত) তৃতীয় বিশ্ব এই দুই শব্দের বাইরে; নতুন এক শব্দ। মূলত চীনের একেবারে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর প্রভাবে আর যে চার অর্থনীতি – ভারত, ব্রাজিল, রাশিয়া ও সাউথ আফ্রিকা উঠে দাঁড়িয়েছিল মোট এ পাঁচ অর্থনীতিকে বোঝাতেই এই নতুন টার্ম রাইজিং ইকোনমি।

তাহলে কথা দাঁড়াল, তেলের দাম দিয়ে গ্লোবাল অর্থনীতির মতিগতি বুঝতে সেকালে তেলের দাম বৃদ্ধির এক অন্যতম কারণ ছিল রাইজিং ইকোনমি – এটা বুঝতে হবে। এমনটা ঘটার বড় কারণ ছিল ১৯৯০-২০১০ এ ২০ বছরে চীনের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ডাবল ডিজিটের জিডিপিতে, যেটা খুবই মূল্যবান লক্ষণ মানা হয় এবং কোন রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সচরাচর তা দেখা যায় না এমন। বলার অপেক্ষা রাখে না, চীনা অর্থনীতির এ প্রবৃদ্ধির সে সময়ের আর এক লক্ষণ ছিল, ক্রমবর্ধমানভাবে চীনের জ্বালানি তেলের চাহিদা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলা। এ বেড়ে চলা চীনের চলতি যে জ্বালানি প্রয়োজন হচ্ছিল শুধু সেজন্য নয়, বরং পরের কমপক্ষে ২০ বছরের পরিকল্পনায় চীনের জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটাতে সরবরাহের প্রবাহ যেন একই ধরনের থাকে, এজন্য বিভিন্ন দেশের প্রমাণিত রিজার্ভের তেল খনিতে আগাম বুকিং বা ক্রয়চুক্তি করেছিল চীন। অর্থাৎ সার কথা হলো, চীনের অর্থনীতিতে তেলের চাহিদা – এ ক্ষুধার খবর বাজারে রটে থাকাতে তেলের বাজারে বিপুল বিনিয়োগকারীর আনাগোনায় দাম ১৫০ ডলারে উঠেছিল। অতএব ওই সময়ের তেলের উচ্চমূল্য রাইজিং ইকোনমিগুলোর উচ্চ চাহিদার নির্দেশক ছিল।

এখানে মনে রাখা ভাল চীনের অর্থনীতির ওই ক্রমবর্ধমান উচ্চ চাহিদার প্রভাবে গ্লোবাল অর্থনীতিও বৃদ্ধি দেখা দিয়েছিল ও নাড়াচাড়া পড়েছিল। বিশেষ করে তেল বিক্রির দেশ এবং বাকি রাইজিং ইকোনমির দেশের অর্থনীতিও চাঙা হয়েছিল। তেল বিক্রির দেশ, যেমন রাশিয়া, ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল, আলজিরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, ইকুয়েডর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, কাতার, সৌদি আরব, দুবাই এদের সবারই বাজেটের বড় বা মূল আয়ের উৎস হল তেল বিক্রি থেকে আয়। কোনো কোনো এমন দেশের ৯০ থেকে ১০০ ভাগ বিদেশি মুদ্রা আয় বা রাজস্ব আয় হল তেল বিক্রি থেকে আসা অর্থ। ফলে চীনের তেলের চাহিদা বৃদ্ধি মানে এসব তেল বিক্রি করা দেশের অর্থনীতি চাঙা করে রাখা। অর্থাৎ একটা চেইন ইফেক্ট বা পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতার এক লম্বা শিকলের মতো অর্থনীতি ওখানে ওই পরিস্থিতিতে তৈরি হয়েছিল। তবে একেক দেশের তেল উতপাদন বা তোলার বিনিয়োগ ইত্যাদির খরচে ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় হলো এ হিসাবে দেখা গেছে, তেল রাজস্বের ওপর নিজের বাজেট নির্ভরশীল বলে মোটামুটি ৯০ থেকে ১০৫ ডলার – তেলের দাম ঐ জোনের মধ্যে বা উপরে থাকলে তা প্রায় সব তেল বিক্রি করে চলা দেশের অর্থনীতি চাঙাভাবে থাকে। রাষ্ট্র হাত খুলে বাজেট তৈরি ও খরচ করতে পারে। আবার মধ্যপ্রাচ্য রাষ্ট্রগুলোর সবার বেলায় তেল-রাজস্ব ঠিক মত না এলে ঠিক বাজেট ছাঁটতে হবে এমনটা নয়। বিশেষ করে সৌদি আরব। যদিও এবারই প্রথম এবারের ঘোষিত সৌদি বাজেট ঘাটতি বাজেট বলে দেখানো হয়েছে। বলা হচ্ছে, সৌদি অর্থনীতি প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন বা হাফ বিলিয়ন ডলার আয় কম হচ্ছে এই অর্থে সে ঘাটতিতে আছে। আইএমএফের এক অনুমিত হিসাব মতে, গালফ রাষ্ট্রগুলো এ বছর ৩০০ বিলিয়ন ডলারের মতো আয় হারাবে। একা সৌদি আরব ইতোমধ্যে গত একবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৭৪২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৬৪৮ বিলিয়ন ডলার হয়েছে বলে সৌদি মনিটারি এজেন্সীর বরাতে আলজাজিরা জানাচ্ছে। 

অন্যদিকে আর একটা খবর আমাদের এ দিকের মিডিয়ায় নজরেই আসে নি। সেই খবরটা হলো, আমেরিকা এখন তেল রফতানিকারক দেশ। অনেকে অবশ্য হতে পারে আগে খেয়াল করেননি অথবা নিশ্চিত ছিলেন না যে আমেরিকা কি তেল রফতানিকারক দেশ ছিল নাকি! জবাব হচ্ছে হ্যাঁ, আগে ছিল না। তবে কথাটা ভেঙে বলতে হবে- ছিল না মানে কী? রফতানি করার মতো তেল ছিল না নাকি, তেল ছিল কিন্তু আইন করে রোধ বা নিষেধাজ্ঞা দেয়া ছিল? হ্যাঁ, দ্বিতীয়টা। অর্থাৎ আমেরিকার রফতানি করার মতো তেল থাকা সত্ত্বেও আইন করে নিষেধাজ্ঞা দেয়া ছিল, যাতে রফতানি করা না যায়। এমনকি আমেরিকার যেসব স্টেট বা রাজ্য তেল তুলে বেচার ব্যবসায় জড়িত ও তেল বেচা আয়ের উপর রাজ্য বাজেট বড়ভাবে নির্ভরশীল এমন রাজ্যগুলোর রাজস্ব আয় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আছে, যেমন আলাস্কা, নর্থ ডাকোটা, টেক্সাস, ওকলাহামা, লুসিয়ানা ইত্যাদি রাজ্যগুলো।

কবে থেকে এবং কেন?
কারণের বিস্তারে যাওয়া যাবে না এখন, সে অন্য প্রসঙ্গ হয়ে যাবে তাই। তবে সংক্ষেপে বললে, তৃতীয় আরব-ইসরাইলের যুদ্ধ, আরব জাতীয়তাবাদী হয়ে ১৯৭৩ সালে তৃতীয় ও শেষবার ইসরাইলের বিরুদ্ধে আরব-ইসরাইলের যুদ্ধ হয়েছিল।ঐ যুদ্ধে আরবেরা খুব খারাপভাবে হেরে গিয়েছিল। কিন্তু এতে এর চেয়ে বড় ব্যাপার হয়ে ওঠে এরপর সবাই আরব জাতীয়তাবাদের ঝাণ্ডা ফেলে নিজ নিজ রাষ্ট্রবাদী-জাতীয়তাবাদ আঁকড়ে ধরেছিল; সেই থেকে আরব জাতীয়তাবাদের ঝাণ্ডা আর কেউ বইতে রাজি হয় নাই। যেমন আরব জাতীয়তাবাদী জামাল নাসেরের মিসর এর পর থেকে হয়ে যায় মিসরীয় জাতীয়তাবাদে। এখানে বলে রাখা ভালো, বাক্যগুলোকে এভাবে লেখা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু  এটা “আরব জাতীয়তাবাদ” হারানোর কোন শোক থেকে একেবারেই নয়। বরং কথাগুলোকে আরব জোটবদ্ধতা হারানোর শোক হিসেবে দেখা যেতে পারে। সেভাবেই লেখা। আরব জোটবদ্ধ যেটা ইসরাইলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য এখনও খুবই জরুরি পূর্বশর্ত। কিন্তু সেসময়ে যুদ্ধে হেরে আরবদের দিক থেকে রাগের মাথায় একটা খুব বাজে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত “তেল অবরোধ” নামে পরিচিত। শুনতেও খুব ভাল, জাতীয়তাবাদী জোশে উঠে দাড়ানোর মত। ব্যাপারটা হল জ্বালানি তেলে সমৃদ্ধ আরবেরা সে সময়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিল পশ্চিমকে আর তেল বেচবে না। এই ছিল সিদ্ধান্তের সারকথা। মনে করা হয়েছিল এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পশ্চিমকে খুব বড় বিপদে ফেলা যাবে। কারণ পশ্চিমা সভ্যতা ও এর অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে ফসিল ফুয়েল বা মাটির নিচের জ্বালানির ওপরে। দুনিয়াতে যে জ্বালানির বিরাট এক অংশ মধ্যপ্রাচ্যে আরবদের দেশে ও দখলে । ফলে পশ্চিমারা বিরাট অসুবিধায় পড়বে। কথা সত্য কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু অন্য এক সত্যও আছে। রিলেশনাল, মানে পশ্চিমের সাথে সম্পর্কিত হয়ে থাকার দিকটা কেউ ভালো করে দেখেনি। তেল না বেচলে ক্রেতার কী দশা হবে, কী অসুবিধায় পড়বে এটা যত বেশি নজর করা হয়েছিল, এর কণামাত্র নজর দেয়া হয়নি এতে বিক্রেতার কী দশা হবে। এতে ধরে নেয়া হয়ে গিয়েছিল যেন তেল বিক্রি করা বিক্রেতার একটা ঐচ্ছিক ব্যাপার খেয়াল বা শখ। তেল বিক্রি যেন বিক্রেতার দিক থেকেও গভীর প্রয়োজনের বিষয় নয়। অথচ ব্যাপারটা ছিল ঠিক এর উল্টো।  প্রতিটি আরব রাষ্ট্রের অর্থনীতি বিশেষ করে বাজেটের রাজস্ব আয়ের (৯০-১০০%) একমাত্র উৎস ছিল ফসিল ফুয়েল বিক্রি। ফলে তেল বিক্রি না করলে পশ্চিমা শক্তি বিশাল বিপদে পড়বে সন্দেহ নেই; কিন্তু তেল বিক্রেতা আরব দেশগুলোর অর্থনীতি চলবে কীভাবে? এ দিকটাতে কোন গুরুত্বই দেয়া হয়নি। অতএব বলা বাহুল্য, এই সিদ্ধান্তের ফলাফল শেষ বিচারে আত্মঘাতী হিসেবে হাজির হয়েছিল। আরব জাতীয়তাবাদ থেকে মিসরীয় জাতীয়তাবাদ অথবা সিরীয় জাতীয়তাবাদ হয়ে যাওয়ার পেছনে এই ফ্যাক্টরগুলোও কাজ করেছিল। শেষ বিচারে তেল অবরোধ হয়ে ওঠে আরবদের জন্যই বুমেরাং, কাউন্টার প্রোডাকটিভ। এ ছাড়া যুদ্ধ কোন ব্যয়-বিনিয়োগ প্রকল্প নয়, বরং আয়বিহীন বা রিটার্ণ না আসা এক বিনিয়োগ। ফলে  একদিক থেকে দেখলে যুদ্ধ মানে একটি রাষ্ট্রের আয়বিহীন এক ব্যয়ে জড়িয়ে পড়া। আরব-ইসরায়েলের যুদ্ধে সব আরব রাষ্ট্রের দশা ছিল তাই। ফলে যখন তেল বিক্রির আরব রাষ্ট্রগুলোর দরকার আরও আয় যাতে যুদ্ধ মানে ওই আয়বিহীন একটি ব্যয়ে ভারসাম্য ফেরে। অথচ তাঁরা পদক্ষেপ নিয়েছিল প্রয়োজনের উলটা – তেল অবরোধ। ফলে তেল অবরোধ সিদ্ধান্ত না টেকার পেছনে এটাও বড় একটা কারণ।
তবু “তেল অবরোধ” নামে তৎপরতাটাই, তা সে যত কম দিন কার্যকর থাকুক তা পশ্চিমকে ভয় পাইয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট হয়েছিল। এরই প্রমাণ হলো আমেরিকার থেকে তেল রপ্তানি নিষিদ্ধ আইন। পরবর্তিতে ১৯৭৫ সালে আমেরিকা তেলে উদ্বৃত্ত হোক আর না হোক, আমেরিকান তেল কোনো ব্যবসায়ী রফতানি করতে পারবে না বলে আইন পাস হয়েছিল। আইনটা পাসের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছিল, “আমেরিকার নিজের মজুদ তেল সংরক্ষণের (মানে আমেরিকান নিজের তেল একমাত্র শেষ হতে হবে কেবল নিজেরা ভোগ করে, বিক্রি করে নয়) জন্য রফতানিকে নিরুৎসাহিত করতে এই বিল আনা দরকার”, তাই। ‘সংরক্ষণের’ এ কথা থেকে বোঝা যায় তাদের ভয়ের মাত্রা সম্পর্কে।

চল্লিশ বছর এতদিনে পরে এখন সেই আইন সংশোধন করে নেয়া হলো। অর্থাৎ এখন থেকে আমেরিকান তেল রফতানি করা যাবে। লন্ডন ইকোনমিস্ট ১৮ ডিসেম্বর বলছে, মূলত রিপাবলিকানদের উৎসাহ ও তাদেরই আনা বিল এবং তেল ব্যবসায়ী লবি যারা গত দু’বছর ধরে চেষ্টা করছিল এদেরই মিলিত আগ্রহে বিলটা আসে। আর ডেমোক্র্যাটরা যারা সংখ্যালঘু, এখন তারা অন্য একটি কিছু পাওয়ার আসায় সেই বিনিময়ে আনা এই আইনকে পাস হতে সম্মতি দিয়েছে। সব মিলিয়ে আইনটি পাস হয়েছে ১৮ ডিসেম্বর ২০১৫। প্রায় এক মাস আগে। এই অর্থে এটা কোনো একটা দলের একক প্রচেষ্টা আর অন্যটার বাধা দেয়া নয়, বরং বাই-পার্টিজান বা আমেরিকান দুই পার্টি মিলে নেয়া যৌথ সিদ্ধান্ত। আমেরিকান পুঁজিবাজারবিষয়ক মুখ্য পত্রিকা ১৬ ডিসেম্বর ২০১৫ ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ মন্তব্য করে লিখেছে, চল্লিশ বছর নিষিদ্ধ থাকার পরে ‘এই সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক’ এবং ‘এতে আমেরিকান তেল উৎপাদনকারীদের বাজারে চাপে ও তোড়ের মুখে পড়ে আমেরিকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পটবদল’ প্রতিফলিত। এসব বক্তব্য থেকে বোঝা গেল চল্লিশ বছর নিষিদ্ধ থাকার ঘটনাটা। কিন্তু ‘তেল উৎপাদনকারীদের বাজারে চাপে ও তোড়ে’ ঘটা ঘটনাটা কী? মানে ঠিক এখনই কেন তেল রফতানির অবরোধ তুলে নেয়া?

নতুন ধরনের এক তেলের উৎস একালে চালু হয়েছে- শেল অয়েল। চালু হয়েছে কথাটা টেকনোলজির দিক থেকে বলা- নতুন এক টেকনোলজি চালু হওয়াতে শক্ত শ্লেট থেকে তেল উৎপাদন করা যাচ্ছে। শ্লেট-পেন্সিলে লেখার শ্লেটের মতো দেখতে, স্তরের ওপর স্তর পড়া শক্ত মাটির শ্লেট  – মাটির নিচে এর ওপর উচ্চ চাপ ও তাপের পানি পাঠিয়ে তা থেকে উত্থিত তেল ও গ্যাস সংগ্রহ করার টেকনোলজি ব্যবহার করে এই তেল উৎপাদন করা হয়। সম্ভবত এটাও আরেক ধরনের জীবাশ্ম, তবে এটা থেকে তেল বের করার কার্যকর টেকনোলজি ছিল না বলে এর ব্যবহার আগে ছিল না। এখন এই টেকনোলজির পর্যাপ্ত উপস্থিতি ও খরচ পোষায় মনে করাতে শেল অয়েলের ব্যবসায় একটা উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা চলছে। এভাবে তেল বের করার এই টেকনোলজিটাকে বলা হয় ফ্রেকিং। তাই অনেকে এটাকে ফ্রেকিং অয়েলও বলে। অথবা শ্লেট জাতীয় উপাদান বা কাঁচামাল থেকে এই তেল বের করা হয় বলে একে শেল অয়েলও বলা হয়। এ ছাড়া এই টেকনোলজিতে প্রচুর পানি ব্যবহার করতে হয় বলে এবং এর প্রক্রিয়ায় প্রচুর অব্যবহৃত তাপ উদ্ভব হয়, যেখানে দুনিয়ার তাপমাত্রা কমানোটাই এখন ইস্যু সেখানে পরিবেশগত দিক থেকে এটা পরিবেশ বিনষ্ট আরো বাড়িয়ে তোলে এমন এই টেকনোলজি। ফলে অনেকে একে নোংরা তেল বা ডার্টি অয়েল নামেও ডাকে। মাটির নিচে  মজুদ শ্লেটের এর দিক থেকে বড় বা শীর্ষে থাকা দেশ হল আমেরিকা, জর্ডান, কানাডা ইত্যাদি। বলা হচ্ছে, আমেরিকান মজুদের পরিমাণ এত বেশি যে, তা দিয়ে আমেরিকান জ্বালানি চাহিদা মেটানো তো বটেই এমনকি তা মিটিয়েও আমেরিকা শেল অয়েল রফতানি করতে পারে। তাই, গত কয়েক বছর ধরে আমেরিকায় এই শেল অয়েল উৎপাদনের জোয়ার উঠেছে। ফলে গত তিন বছর ধরে এই জোয়ার ওঠাতে আমেরিকান মিডিয়ায় শেল অয়েলের বিরুদ্ধে নেগেটিভ দিক যেগুলো আছে তা খুব কমই ছাপা হচ্ছে। এই টেকনোলজির আরেক বড় নেগেটিভ দিক হল এই টেকনোলজি ব্যবহারের তুলনামূলক খরচ মানে তেল বের করা বা তেল তুলার খরচ অনেক বেশি। বলা হয়েছিল বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলারের বেশি হলে বেশ আয়েশে এই ব্যবসা করা যায়। সারকথায় তরল জীবাশ্ম তেল উৎপাদনের চেয়ে এর খরচ বেশি। সেটা যাই হোক, আমেরিকার এই শেল অয়েল বা ফ্রেকিং অয়েল উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে বলেই এই তেল উৎপাদনকারীদের লবি চাপ ইত্যাদিতে পরে এখন চল্লিশ বছর পরে আমেরিকা থেকে তেল রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হল।

আর ঠিক এখানেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। জীবাশ্ম তরল তেল উৎপাদকদের (মূলত মধ্যপ্রাচ্যের) এক কার্টেল-জোট হল ওপেক (OPEC)। ওপেকের সাথে পশ্চিমের স্বার্থবিরোধ অনেক পুরনো। আমেরিকান রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া উপলক্ষে লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট গত মাসে ১৮ ডিসেম্বর এক রিপোর্ট বের করেছে। ওই রিপোর্টের প্রথম বাক্যটা অনুবাদ করলে হয় এরকম : “যুগ যুগ ধরে ‘বাজার’ শব্দটা বিশ্বব্যাপী তেলবাণিজ্যে এক আনফিট শব্দ হয়ে আছে। তেল উৎপাদনকারীদের আন্তর্জাতিক কার্টেল ওপেক শুধু তেলের বাজারে ইচ্ছামতো হস্তক্ষেপ করেছেই শুধু নয়, নিজের জন্য নানা মাত্রার সফলতাও বের করে নিয়ে গেছে।” এই বাক্য থেকে ওপেকের সাথে আমেরিকার স্বার্থবিরোধের তীব্রতা টের পাওয়া যায়। সারা দুনিয়ায় যে তেল উৎপাদন হয় এর এক-তৃতীয়াংশ করে ওপেক সদস্যরা সবাই মিলে। আর ওপেকে উৎপাদনেরও এক তৃতীয়াংশের কিছু বেশি একাই উৎপাদন করে সৌদি আরব- এটা প্রতিদিন মোটামুটি ১০ মিলিয়ন ব্যারেল, যেখানে এখন দুনিয়ায় দৈনিক মোট উৎপাদন ৮০ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি। ফলে ওপেকের কোনো সিদ্ধান্তে সৌদি আরবের প্রভাব প্রায় একচেটিয়া। ফলে তেলের বাজারে আমেরিকার শেল অয়েল নিয়ে প্রবেশ ঠেকাতে সৌদি আরব লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ কাজে সে সহজেই ওপেককে নিজের পেছনে দাঁড় করিয়ে নিতে পেরেছে। এখানে শেল অয়েলকে ঠেকানোর সৌদি কৌশল হল- শেল অয়েলের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি, সেটাকে কাজে লাগানো। এ কারণে এক দিকে সৌদি আরব ক্রমান্বয়ে তেলের দাম ফেলে দিচ্ছে। আবার একই সাথে ওপেকে জোটবদ্ধ হয়ে উৎপাদন না কমিয়ে (তেলের দাম বেড়ে যাবে বলে) বরং বাড়িয়ে চলেছে। এভাবে তেলের দাম ফেলে দিয়ে ২০০৩ সালের সমান ২৭ ডলারে নামিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাজার থেকে হটানোর মতো ফল এতে পেয়েছে। যেমন ব্রিটিশ বিপিসহ বহু তেল কোম্পানি ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই লাখ কর্মী ছাঁটাই করেছে, নতুন বিনিয়োগ বন্ধ করে রেখেছে, নতুন করে রিগ বসানোর যত পরিকল্পনা তেল তোলা কোম্পানিগুলোর ছিল, সব স্থগিত হয়ে গেছে। এতে ক্ষতি সৌদি আরবের কম হয়নি। বলা হয়, প্রতিদিন নাকি সৌদি আয় ৫০০ মিলিয়ন ডলার মানে হাফ বিলিয়ন ডলার কম হচ্ছে। আইএমএফ হিসাব করে বলছে, এ বছরে মধ্যপ্রাচ্য মোট ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হারাবে। আইএমএফ সৌদি আরবকে সাবধান করেছে এভাবে সীমাহীন তেল উৎপাদন বাড়ানোর বিপদ স্মরণ করিয়ে দিয়ে।

সৌদিদের এই লড়াইয়ে জেতার কৌশল সহজ। তারা মনে করে, দীর্ঘ দিন ২০ ডলার বা কম দামে তেল বিক্রি করে লোকসান সহ্য করার ক্ষমতা একমাত্র তারই আছে। সুতরাং প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগে দেউলিয়া বানানোর পরেই সে বাজারের লাগাম টেনে ধরবে, উৎপাদন কমিয়ে তেলের দাম বাড়াবে। এ ব্যাপারে সৌদিদের অনুমিত সময়কাল এক বছর। অর্থাৎ আগামী বছর থেকে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে বা সৌদিরা দাঁড় করানোর সুযোগ পাবে। এ বছরের জুন মাসের পর থেকে এসব ব্যাপারে আলামত ফুটতে শুরু করবে সৌদি আরবের বিশ্বাস। এ কাজে তার প্রধান টার্গেট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রথমত আমেরিকান শেল অয়েল। আর এর পরের টার্গেট আবার বাজারে ফিরে আসা ইরান। দেখা যাক কার নার্ভ কত শক্ত, কে কতক্ষণ টেকে!

goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ১৭ জানুয়ারি.২০১৬ সংখ্যায়  এবং ১৬ জানুয়ারি দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আবার এখানে ছাপা হল।]

চীনের বিশ্বব্যাংকের অপারেশন কী প্রভাবিত হবে

দক্ষিণ চীন সাগরে দ্বীপ মালিকানা বিতর্ক
চীনের বিশ্বব্যাংকের অপারেশন কী এতে প্রভাবিত হবে

গৌতম দাস
১৭ জানুয়ারী, ২০১৬
http://wp.me/p1sCvy-zk

এআইআইবি-চীনের বিশ্ব ব্যাংকের সংক্ষিপ্ত নাম। সংক্ষেপ ভাঙলে চীনের নেতৃত্বে এই ব্যাংকের পুরা নাম এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক। এআইআইবি শুধু ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সমতুল্য ব্যাংকই নয়, বলা হয়ে থাকে এআইআইবি জাপান-আমেরিকার নেতৃত্বে গড়ে উঠা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকেরও প্রতিদ্বন্দ্বী। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর রয়টার্স চীনা অর্থমন্ত্রীর বরাতে চীনা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে জানিয়েছে, ২০১৬ সালের মধ্য জানুয়ারিতে নতুন ব্যাংকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবে। এছাড়া ৩০ ডিসেম্বর রয়টার্স এক রিপোর্টে আরও কিছু অগ্রগতির খবর জানিয়েছে। যেমন- আগেই সাব্যস্ত ছিল এই ব্যাংক ১০০ বিলিয়ন ডলারের পরিশোধিত ক্যাপিটাল নিয়ে যাত্রা শুরু করবে। আর এর প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা সদস্যরা প্রাথমিকভাবে ওই ১০০ বিলিয়ন ডলারের ২০ শতাংশ পরিশোধ করবেন, যা পরিশোধিত হওয়ার পথে। এছাড়া ১৭ উদ্যোক্তা সদস্য রাষ্ট্র মোট শেয়ারের মূল্যের ৫০ শতাংশ পরিশোধ করে ফেলায় এই ব্যাংক (এখানে এখন থেকে ব্যাংক বলতে এআইআইবি বুঝতে হবে) আর নেহাত এক আইডিয়া বা কল্পনা নয়, এক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুরু থেকেই আমেরিকা এই ব্যাংকের জন্ম নেয়ার বিরুদ্ধে যা যা বাধা দেয়া সম্ভব এর সবই করেছে। শুরুর দিকে তা কিছুটা কাজও করেছিল। এশিয়ায় আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অথবা আমেরিকার সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারের সম্পর্ক রেখে চলে এমন রাষ্ট্রগুলো যেমন অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, জাপান ইত্যাদির ওপর আমেরিকার এ কূটনৈতিক চাপ ভালোই কাজ করেছিল। যদিও এসব রাষ্ট্র নিজ নিজ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে চেয়ে বুঝেছিল আমেরিকার মুখ চেয়ে এই ব্যাংক উদ্যোগের বিরুদ্ধে নিরাসক্ত ভাব নেয়া, দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখানোটা নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধাচরণ হচ্ছে। তাই প্রথম বাঁধভাঙার ঘটনাটা ঘটে ইউরোপের নেতা রাষ্ট্র ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি- এ তিনের তরফ থেকে; এরপর এশিয়া আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব রাখেনি।নে নেতৃত্ব কথাটার অর্থ ব্যাংকের সবচেয়ে বড় মালিকানা শেয়ার হোল্ডার কোন রাষ্ট্র। স্বভাবতই এর ফলে গঠন ও পরিচালনে সে রাষ্ট্রের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ইতোমধ্যেই ঘোষণা এসে গেছে যে, এই ব্যাংকের অপারেশন বা কার্যকারিতা শুরু হবে ২০১৬ সাল থেকে। ইতোমধ্যে প্রস্তুতিমূলক অনেক কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। সম্প্রতি জানা যাচ্ছে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে এ মাসেই, ১৬-১৮ জানুয়ারি। এই উপলক্ষে আমাদের অর্থমন্ত্রী মাল মুহিত ইতোমধ্যেই চীন রওয়ানা দিয়েছেন।

ওদিকে নতুন এক ইস্যু “দক্ষিণ চীন সাগর দ্বীপ মালিকানা বিতর্ক” – কয়েক বছর ধরে আস্তে আস্তে কাঁটার মতো খচখচ করে সব প্রসঙ্গের মধ্যেই বিঁধতে দেখা যাচ্ছে। সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর-সমুদ্রপথে চীনে পৌছানোর একমাত্র প্রবেশদ্বার। আসলে এই সাগর কেবল চীনের দক্ষিণে নয় বরং পূর্ব অবধিও বিস্তৃত। পূর্বের অংশকে আলাদা করে পূর্ব চীন সাগর বলা হয় যদিও কিন্তু সাগরের দক্ষিণ অংশ আর পূর্ব অংশ এ দুইয়ের মাঝে কোনো দেয়াল বা বিচ্ছেদ নেই। আর চীনের প্রবেশদ্বারের একেবারে মুখ এলাকা হিসেবে দক্ষিণ চীন সাগর অংশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আশপাশে পড়শি রাষ্ট্রের ভিড়ভাট্টা দক্ষিণ দিকে বেশি। তাই দ্বীপ মালিকানা-বিষয়ক বিতর্কটা দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক নামেই পরিচিত। এই দক্ষিণ-পূর্ব কোণটা ছাড়া চীনের সীমান্তের বাকি সব দিক দিয়েই স্থলাবদ্ধ,ল্যান্ড লকড।
কিন্তু নতুন এক ইস্যু আস্তে আস্তে কাঁটার মতো খচখচ করতে শুরু করে। সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর- সমুদ্রপথে চীনের একমাত্র প্রবেশ দ্বার। চীন বাকি তিনদিকেই স্থলাবদ্ধ, ল্যান্ড লকড।

আজ চীন যেমন অর্থনৈতিক শক্তি হওয়ার বিভিন্ন বিবেচনার দিক থেকে আমেরিকার তুলনায় ক্রমেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনি ১৮৮০ সালেই আমেরিকান অর্থনীতি সাইজের দিক থেকে তৎকালীন কলোনি মাস্টার ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এভাবে ১৯২০ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে সব বিবেচনাতে ব্রিটেনসহ ইউরোপের সবার উপরে আমেরিকা উঠে যায়। সেকালে উত্থানের যুগে আমেরিকা নিজ রাষ্ট্রের সমুদ্রপথের প্রবেশে আশপাশের সব সমুদ্র অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। এমন আচরণের একটা সাধারণ দিক আছে। উদীয়মান রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ চ্যালেঞ্জিংভাবে সবার চেয়ে বড় হয়ে গেলে এ ঘটনার সঙ্গে এর নিরাপত্তার প্রশ্নটাই বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বড় অর্থনীতি মানে কাঁচামালের বড় আমদানি জাহাজ এবং বড় পণ্য রফতানি জাহাজের আনাগোনা। ফলে এখান থেকেই সমুদ্রপথে বাধাহীন, ভয়হীন ‘বস্নুওয়াটার’ এলাকায় বয়ে যাওয়ার চাহিদা সৃষ্টি হয়। এ বিষয়টি অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠা রাষ্ট্র যে কোনোভাবে হোক নিশ্চিত করাকে নিজের রাষ্ট্রস্বার্থ গণ্য করে থাকে। আজ চীনের প্রবেশপথ দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে চীনের অবস্থানও সে রকম। সে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে বঙ্গোপসাগর হয়ে আরব সাগর পর্যন্ত অবাধ নৌবাণিজ্য জাহাজ চলাচলের ব্যাপারে সেনসিটিভ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে চীনের প্রবেশমুখ দক্ষিণ চীন সাগরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনেক দ্বীপের মালিকানা দখলে নিতে ও রাখতে মারমুখী হয়ে উঠেছে। আর তা থেকে সামরিক-কূটনৈতিক টেনশন মারাত্মক। জাপান, কোরিয়া, ফিলিপাইন, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম ইত্যাদির সঙ্গে ছোট-বড় দ্বীপ মালিকানা বিরোধ সবার সঙ্গে তৈরি হয়েছে। এ সুযোগে আমেরিকা বিরোধে বিরোধী রাষ্ট্রকে তাল দিয়ে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ শব্দটা হয়ে উঠেছে দ্বীপ মালিকানা বিরোধের প্রতীক। চীনা নেতৃত্বের এআইআইবি উদ্যোগে যোগ দিতে অন্তত অংশগ্রহণে দ্বিধা করার ক্ষেত্রে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ বিষয়টি অনেকের কাছেই তাই একটা ইস্যু।

US in 1880
আমেরিকান এমন আচরণের একটা সাধারণ দিক আছে। উদীয়মান রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ চ্যালেঞ্জিংভাবে সবার চেয়ে বড় হয়ে গেলে অনুষঙ্গ হিসেবে ওই অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের সমুদ্র-চলাচল বিষয়ক নিরাপত্তার প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ বড় অর্থনীতি মানে কাঁচামালের বড় আমদানি জাহাজ এবং বড় পণ্য রফতানি জাহাজের আনাগোনা। ফলে এখান থেকেই সমুদ্রপথে আসা-যাওয়া জাহাজের বাধাহীন, ভয়হীন ‘ব্লু-ওয়াটার’ নেভিগেশন এলাকা পাবার চাহিদা  ও নির্ভয়ে জাহাজ চলাচলের চাহিদা সৃষ্টি হয়। এ কারণে  দুনিয়াতে অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে চাওয়া যেকোন রাষ্ট্র এ বিষয়টাকে যে কোনোভাবে হোক নিজের জন্য নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রস্বার্থ গণ্য করে থাকে।
আমেরিকান স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার ফিলিপাইন- দ্বীপ মালিকানা বিরোধে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ এ রাষ্ট্রের কাছে একটা ইস্যু। উদ্যোক্তা সদস্য হওয়ার স্বাক্ষর সে করেছে; কিন্তু বাকি আনুষ্ঠানিকতা পূরণ করতে এ ব্যাংক উদ্যোগে সদস্য হিসেবে ভাগে পাওয়া শেয়ারের অর্থ পরিশোধ করতে এত দিন সে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। যে চীনের সঙ্গে দ্বীপ মালিকানা নিয়ে তার বিরোধ তুঙ্গে যাচ্ছে, সেই চীনের উদ্যোগেই এআইআইবি ব্যাংকে যোগদান শেয়ার মালিকানা ও সদস্য হওয়া কি ঠিক হচ্ছে- এ ছিল ফিলিপাইনের দ্বিধার সুনির্দিষ্ট বিষয়।
ফিলিপাইনের জন্য এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর শেষদিন ছিল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫। আমেরিকান অর্থনৈতিক বা গ্লোবাল পুঁজিবাজারবিষয়ক ম্যাগাজিন বস্নুমবার্গ ৩০ ডিসেম্বর জানিয়েছে, ফিলিপাইন সরকার পরিপূর্ণ যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং নিজের ভাগের ১৬৫ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার কেনার অর্থ ৫ বছরে যা পরিশোধযোগ্য তার অর্থ জমা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ৩০ ডিসেম্বর এক রিপোর্টে জানিয়েছে, ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের ফাইলে স্বাক্ষর দিয়েছেন। ফিলিপাইনের জন্য সিদ্ধান্তটি কেন এবং কত কঠিন তা বোঝা যায় পরিপূর্ণ যোগদানের সিদ্ধান্ত জানানোর সময় এর সপক্ষে যেসব বিবেচনা অর্থসচিব তুলে ধরেছেন তা থেকে। ফিলিপিনো অর্থসচিব বলছেন, ‘সদস্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উপস্থিত বহু রাষ্ট্রীয় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের (বিশ্বব্যাংক, এডিবি) ভূমিকার দিক থেকে এআইআইবি এক সহায়ক ও পরিপূরক এবং এক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। স্বচ্ছতা, স্বতন্ত্রতা ও জবাবদিহিতার ব্যাপারে এ প্রতিষ্ঠান আস্থা রাখার মতো এবং আমাদের সে আস্থা আছে।’ বোঝা যাচ্ছে, ফিলিপাইনের ঋণ চাহিদা প্রবল আর তা পূরণে এক ইতিবাচক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সে এআইআইবিকে দেখে থাকে।
একজন চীনা মুখপাত্রকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, সদস্যদের সবার অংশগ্রহণে লেখা ওর গঠনপ্রণালিতে যেভাবে লেখা আছে এআইআইবি নিজের অপারেশনের সময় সেটা অনুসরণ করেই ফিলিপাইন লোন পাবে কিনা তা নির্ধারিত হবে, অন্য কিছু নয়।
মনে হচ্ছে, চীনের দিক থেকে এআইআইবির বিষয়াদিতে বাইরের কোনো বিবেচনা নয়, ব্যাংকের নিজস্ব গঠনপ্রণালি ও রুল অনুসরণ করে চলতে চায় চীন। এখন দেখা যাক, বাস্তবে চীন সেটা কতটা কীভাবে করে।

দুইঃ কাপলান ও দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক
দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে আগেই বলেছি, কোনো রাষ্ট্র অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠতে থাকলে ওর সমুদ্রপথে প্রবেশদ্বার সেনসেটিভ ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সামরিক-স্ট্র্যাটেজিক ইস্যু হয়ে যায় সেটা। এর মূল কারণ, সমুদ্রপথে জ্বালানি তেলসহ কাঁচামালের আমদানি এবং উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি নিরাপদ ও অবাধ রাখতে হয়। বাণিজ্য-নিরাপত্তার স্বার্থ বলে এটা সামরিক স্বার্থও। কিন্তু কঠিন সত্য হলো, এই সামরিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ অন্যের দান, দয়াদাক্ষিণ্য, আইনের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলে রাখতে কোনো রাষ্ট্রই পারে না।
মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা যেমন লজিক র‌্যাশনালিটি বা আইনের দ্বারা ন্যায্য বলে সাব্যস্ত  হওয়ার অপেক্ষায় ছেড়ে দিয়ে রাখা যায় না, কেউ রাখতে পারে না চীনের কাছে দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর একক রুস্তমি করতে চাওয়া ঠিক তেমনি। এই ব্যাপারটাকে প্রতীকীভাবে ধরে এক নতুন শব্দ চালু হয়েছে ‘ব্লু ন্যাশনাল সয়েল’।
সাধারণত সাগর-উপসাগর বলতে আমাদের কল্পনা হলো, যার অন্তত একটা দিক, সাধারণত তীর বা উপকূলের উল্টো দিক অসীম আর অবারিত। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের চারদিকেই চীনের নানা পড়শি রাষ্ট্রের ভূখণ্ড।
আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘের অধীনে জন্ম নেওয়া সমুদ্রসীমাবিষয়ক বিভিন্ন কনভেনশনের রেওয়াজ অনুসারে রাষ্ট্রীয় সমুদ্রসীমা টানা ও মানা হয়ে থাকে। ফলে দক্ষিণ চীন সাগরের চারদিকের প্রায় সব পড়শি রাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সমুদ্রসীমা বা জেগে ওঠা দ্বীপের মালিকানাগত বিরোধ হাজির হয়েছে ও চলছে কয়েক বছর ধরে। পূর্ব চীন সাগরে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মালিকানা নিয়েও জাপানের সঙ্গে বিরোধ-বিতর্ক আছে; গত বছর যা তুঙ্গে উঠেছিল।
এখন সার করে বললে চীনের জন্য ইস্যুটা হলো, লজিক আইনের ঊর্ধ্বে, নৌ-বাণিজ্য জাহাজের অবাধ চলাচলের স্বার্থ। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, রেওয়াজ, সালিস ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা রাষ্ট্রের সমুদ্রসীমাবিষয়ক বিরোধ মীমাংসার পথও একটা বাস্তবতা। চীনের জন্য এই দুই সত্য সংঘাতময়, বিরোধাত্মক। ফলে চীনকে দেখাতে হচ্ছে কতটা সৃজনশীল হয়ে সে এই দুই সত্যের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত বিরোধ মীমাংসার ফর্মুলা হাজির করতে সক্ষম হয়। চীনের নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জটি এখানেই।
আমেরিকায় থিংক-ট্যাংক বা চিন্তার দোকানের শেষ নেই। আমেরিকা দুনিয়ায় রুস্তমি করে চলেছে মূলত এদেরই বদৌলতে। এই দুনিয়ার তেমনই এক শেঠ রবার্ট ডি কাপলান। নামের শেষ অংশ দিয়েই বেশির ভাগ মানুষ তাকে চেনে। ২০১৪ সালের মার্চে তার লেখা একটা বই প্রকাশিত হয়েছে : এশিয়ার ফুটন্ত কড়াই : দক্ষিণ চীন সাগর ও শান্ত প্রশান্ত মহাসাগরের দিন শেষ।
ওই বইয়ে তিনি চীনের প্রয়োজন ও বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে চীনের সপক্ষে এক শক্ত পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। যার শিরোনাম, “বেইজিংয়ের ক্যারেবিয়ান লজিক”।
কাপলান প্রথমত আমেরিকার উত্থান ইতিহাসে গিয়েছেন। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আজ চীন যেমন প্রায় সব বিবেচনায় আমেরিকাকে ক্রমে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে ১৮৮০ সালে আমেরিকান অর্থনীতি আকারের দিক থেকে তৎকালীন ঔপনিবেশিক প্রভু ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাওয়া শুরু করেছিল। পরে এভাবে ১৯২০ থেকে ১৯৪৫ সাল সময়ের মধ্যে সব বিবেচনায় ব্রিটেনসহ ইউরোপের সবার ওপরে আমেরিকা উঠে যায়। এই উত্থান পর্যায়ে আমেরিকা নিজ রাষ্ট্রে সমুদ্রপথের প্রবেশের ক্ষেত্রে লাগোয়া প্রতিটা সমুদ্র অঞ্চলে ব্রিটেনের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।
সেকালে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রুরাষ্ট্র ছিল ইউরোপ; যাদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আমেরিকাকে পরাশক্তি হিসেবে উঠে আসতে হয়েছে।
সমুদ্রপথে মেক্সিকো উপসাগরসহ বৃহত্তর ক্যারিবিয়ান সাগর অঞ্চলে যেন ইউরোপের কোনো রাষ্ট্রের অবাধ আনাগোনা না থাকে, ইউরোপের সব রাষ্ট্রকে দূরে রেখে তা কেবল যেন আমেরিকার জন্য অবারিত থাকে- ১৮৮০ থেকে প্রত্যেক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট এই নীতি অনুসরণ করেছেন।
কাপলান আমেরিকান সেই নীতির রেফারেন্স দিয়ে বলছেন, আমেরিকা অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উত্থিত হওয়ার দিন ছিল সেগুলো- ফলে আমেরিকা বৃহত্তর ক্যারিবিয়ান নৌ-অঞ্চলে নিজের জন্য ‘ব্লু ন্যাশনাল সয়েল’ নীতি অনুসরণ করেছিল। সেকালে তা ন্যায্যতা পেলে আজ দক্ষিণ চীন সাগরে চীন যা করছে, তা কেন পাবে না?
কাপলানের এই লজিকের পক্ষে এক বাস্তবতা দেখা গিয়েছিল গত বছর। দক্ষিণের মতোই পূর্ব-চীন সাগরের দ্বীপ মালিকানা নিয়ে চীনের সঙ্গে জাপানের বিরোধ আছে। আমেরিকা গত বছর এই বিরোধকে ধারালো করতে জাপানকে তাতিয়ে তুলছিল। একপর্যায়ে এটা চরমে যায়।
এই দেখে ওয়াল স্ট্রিট কারবারিরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ, শঙ্কিত ও বিরক্ত হয়ে ওঠে। পরের সপ্তাহের লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিস্ট পত্রিকার কাভার স্টোরিতে তা উঠে আসে। ওখানে দুটো পয়েন্ট ছিল : চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠছে, কেউ এমন পরাশক্তি হলে ব্লু-ওয়াটার ধরনের ইস্যুতে তার পেশি দেখানো স্বাভাবিক এবং এটা আমাদের নিচু গুরুত্বে দেখা উচিত। কারণ, আমরাও এমন করেছিলাম। এর চেয়েও বড় কথা, ২০০৮ সাল থেকে শুরু হওয়া দুনিয়াব্যাপী মহামন্দার ভেতর আমরা এখনো আছি। এ সময়ে চীনের মতো রাইজিং ইকোনমি না থাকলে আমাদের অবস্থা আরও করুণ হতো। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে বিবাদের খাতা খোলার চেষ্টা অর্থহীন ও আত্মঘাতী। এরপর থেকে এই ইস্যুতে জাপান লো-প্রফাইলে চলে যায়। যদিও পুব চীন সাগরের অপর অংশ দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুটা এখনো জীবন্ত, বিশেষ করে ভিয়েতনাম বা ফিলিপাইনের দিক থেকে।

goutamdas1958@hotmail.com
[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এর ০৩ জানুয়ারী সংখ্যায়, দৈনিক নয়াদিগন্তের ০৪ জানুয়ারী সংখ্যায় এবং সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকায় ০৯ জানুয়ারি সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এখানে সেগুলোকে আবার একসাথে এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

ইরান-সৌদি দ্বন্দ্ব কোন শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব নয়

ইরান-সৌদি দ্বন্দ্ব কোন শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব নয়

গৌতম দাস
১২ জানুয়ারি ২০১৬
http://wp.me/p1sCvy-yg

সৌদি আরব ও ইরানের দ্বন্দ্ব ক্রমেই বড় থেকে আরও বড় হচ্ছে। ৩৫ বছর ধরে ছোট-বড় একটা না একটা ইস্যুকে মুখ্য করে সৌদি আরব ও ইরানের লেগে থাকা দ্বন্দ্বের এবারের ইস্যুও বেশ বড়, ফলে এবারের দ্বন্দ্বও তেমনি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে। সৌদি আরবের জনগোষ্ঠী মূলত সুন্নি ধারার; তবে মাঝে মাঝে কোথাও ক্ষুদ্র খোপ বা পকেট আকারে শিয়া জনগোষ্ঠীও আছে। বিশেষত যা কোনো প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ঘটনায় দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সৌদি আরবের তেলসমৃদ্ধ জনপদ ইস্টার্ন প্রভিন্স বা পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের কাতিফ জেলা তেমনই এক শিয়া অধ্যুষিত জনপদ। কাতিফের শিয়া ধর্মীয় নেতা ছিলেন শেখ নিমর আল নিমর। “বিদেশি হস্তক্ষেপ ডেকে এনে রাজনৈতিক অসন্তোষ সৃষ্টির” অভিযোগে রাজকীয় আদালত তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করে ২০১৪ সালের অক্টোবরে। আর পরবর্তিতে ২ জানুয়ারি এ দণ্ড কার্যকর করা হয়। স্বভাবতই ভারতের কাশ্মীর, বাহরাইন, লেবানন, ইরাক, ইরান ইত্যাদি শিয়া রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী দুনিয়ায় যেসব দেশে বা শহরে নজরে পড়ার মতো আছে সেখানে এ মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় আকারে এবং পরে আরও ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আসে ইরানে, তেহরানের সরকারি প্রতিক্রিয়া থেকে। ইরান সরকার সৌদি দূতাবাসের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে এনে প্রতিবাদ জানায়। আর ওদিকে ইরানি বিক্ষোভকারীরা তেহরানের সৌদি দূতাবাস আক্রমণ করে বসে, পেট্রলবোমা ও ইট-পাথরও ছোড়ে। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে একেবারে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। শুধু তাই নয়, গালফ কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল বা মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর জোট জিসিসির সদস্য রাষ্ট্রগুলোও সৌদি সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে।

মৃত্যুদণ্ড এখন কার্যকর হলেও এই  ঘটনার শুরু ২০১১ সালে। যখন দুনিয়াজুড়ে ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলনের ছোঁয়া চারদিকে লেগেছিল। আমেরিকার খায়েশ মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতে কর্তৃত্ববাদী স্বৈরাচারীর বদলে লিবারেল রাজনীতি এবং এ রাজনীতিতে সাজানো সরকার দেখতে চাওয়া। এই খায়েশের নাম ‘আরব বসন্ত’। আরব বসন্ত আলাদা কিছু নয়, এটা ওতপ্রোতভাবে আমেরিকার ওয়ার অন টেরর বিদেশনীতিতে পরিপূরক আরেক দিক বা বৈশিষ্ট। বুশের ওয়ার অন টেররকেই আবার নরম চেহারা করে সাজানো ফুলের নাম আরব বসন্ত। ফলে এটা একই আমেরিকার অপর এক পরিপূরক নীতি। সারকথায় ওয়ার অন টেররের নীতিতে পরিচালনের কারণে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোতে আমেরিকা-বিরোধী যে সেন্টিমেন্ট তৈরি হচ্ছিল মূলত তা হালকা করে দেয়ার উদ্যোগ। ওইসব রাষ্ট্রগুলোতে যতটা সম্ভব এক লিবারেল ইসলামী সরকার কায়েম করে দিলে ঐ দেশের নাগরিকেরা  আমেরিকাবিরোধী এবং আল কায়দার সমর্থক হয়ে ওঠার বদলে নিজ নিজ রাষ্ট্রে লিবারেল শাসন নিয়ে খুশি ও ব্যস্ত হয়ে উঠবে। সব মনোযোগের কেন্দ্র হয়ে উঠবে নিজ নিজ রাষ্ট্র। এ বিবেচনায় আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে লাগানো আর এক বৈশিষ্ট্যের পালকের নাম আরব বসন্ত। আমেরিকার দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো হল আরব বসন্তের জন্য সবচেয়ে ভাল টার্গেট বা খাতক রাষ্ট্র। এ টার্গেট লক্ষ্য করে আমেরিকার দিক থেকে দেশে দেশে আরব বসন্তের উসকানি দেয়া শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে। এ উসকানিতে পরে প্রায় একচেটিয়া সুন্নি জনসংখ্যার মধ্যপ্রাচ্যে যেখানে ক্ষুদ্র শিয়া জনগোষ্ঠীও আছে, তারা প্রান্তিক কোণঠাসা অবস্থা থেকে বেরিয়ে সংগঠিত হয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার সুযোগ নিয়েছিল। তেমনই নিজেদের অন্যদের মাঝে শুনানো অবস্থায় হাজির করার এক আওয়াজ ছিল সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের কাতিফ জেলায় শিয়া ধর্মীয় নেতা শেখ নিমর আল নিমরের নেতৃত্বে রাস্তায় সংগঠিত প্রতিবাদ। সৌদি রাজসরকার নিজ দেশে নিজ সুন্নি জনগোষ্ঠীকেও রাস্তায় সংগঠিত হয়ে কোনো প্রতিবাদ-বিক্ষোভের প্রকাশ ঘটাক, তা সহ্য করে না। ফলে ধর্মীয় নেতা নিমরের পদক্ষেপকে সৌদি সরকার ইরানের ষড়যন্ত্র, বিদেশি রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র, শিয়া ষড়যন্ত্র ইত্যাদি অভিযোগ তুলে কঠোর হাতে দমন-নির্যাতনের পথে যায়। এভাবে ২০১৪ সালেই সৌদি আদালত তাকে মৃত্যদণ্ডে দণ্ডিত করেন। বিবিসি জানাচ্ছে, ২০১১ সালে তিনি বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, “তিনি সৌদি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্রের বদলে শব্দের গর্জনকেই পছন্দ করেন। বুলেটের চেয়েও শব্দের অস্ত্র অনেক বেশি শক্তিশালী। কেননা, যদি অস্ত্রের যুদ্ধ হয়, তবে কর্তৃপক্ষই লাভ ঘরে তুলবে”। অর্থাৎ এককথায় বললে, তিনি একেবারেই নিরস্ত্র গণআন্দোলনের পথেই অাঁকড়ে থাকতে চেয়েছিলেন এক সিভিল লিবার্টি মুভমেন্ট আকারে। সৌদি রাজতন্ত্রের জন্য সহ্য করার দিক থেকে বরং সেটাও বড় ভয়ঙ্কর ছিল।

সুতরাং এদিক থেকে দেখলে শেখ নিমর আল নিমর প্রাণ দিয়ে আমেরিকার “মধ্যপ্রাচ্য নীতির” স্ববিরোধিতাকেই উৎকটভাবে তুলে ধরেছেন। এ নীতি একদিকে সেই ১৯৭৩ সাল থেকে চলে আসা সৌদি বাদশাতন্ত্রকে পেলেপুষে বড় করেছে, আমেরিকার ফসিল ফুয়েলের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির লাইফ লাইনকে, তথাকথিত সিভিলাইজেশনকে জীবিত রাখার প্রয়োজনে এক বাদশাহতন্ত্রকেই পালছে। আবার আমেরিকা নিজেই নিজের ভিলেন চেহারা ঢাকতে সেই বাদশাহতন্ত্রের ভেতরেই এক আরব বসন্তের উসকানি তৈরি করে চলেছে। এরই নিট ফল হল- শেখ নিমর আল নিমরের মৃত্যু।

অনেকেরই ধারণা, একেবারে প্রায় দৃঢ় ধারণা যে, সৌদি-ইরানের বিরোধের উৎস নাকি ইসলামের শিয়া-সুন্নি বিভাজন। এ দাবি ভিত্তিহীন। বরং এ বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হল বাদশাহতন্ত্র বা ইসলামে আমিরগিরি। মধ্যপ্রাচ্যে কোনো এমিরেট বা আমিরগিরি টিকিয়ে রাখা।

এককথায় বললে, এই আমিরগিরির পক্ষে কোনো লিবারেল শাসন সহ্য করাও অসম্ভব। আমিরগিরির সঙ্গে সবকিছুই অচল। ফলে ইসলাম থেকে যে কোনো রেডিকেল তত্ত্ব, জিহাদ বা বিপ্লব করার তত্ত্ব বেরিয়ে আসা আমিরগিরির দিক থেকে জোঁকের মুখে নুন। তাতে সেই তত্ত্ব সুন্নি জিহাদ বা গ্লোবাল বিপ্লব করার তত্ত্ব হোক অথবা শিয়া আয়াতুল্লাহর ইরান বিপ্লবের তত্ত্বই হোক। কোনো ফারাক তাতে নেই। কারণ মূল বিষয়, আমিরগিরির সহ্য করার মুরোদের দিক থেকে – তা কোনো রেডিকেল চিন্তা থেকে দূরে থাকা কোন লিবারল চিন্তাকেও সহ্য করার মুরোদ রাখে না। ফলে উৎখাতের বিপদের মুখে প্রার দিক থেকে লিবারেল চিন্তাই আমিরগিরির জন্য ভয়ানক।

বাদশাহতন্ত্র নিজের এ ভয়ানক বিপদকে আড়াল করতে দাবি করে, বারবার চিৎকার করে বলে, ইরানের সঙ্গে তার বিরোধ নাকি শিয়া-সুন্নি বিভাজনের সঙ্গে সম্পর্কিত। নিজের আমিরগিরি বা বাদশাহতন্ত্রকে আড়াল করতেই এটাকে সে ‘শিয়া-সুন্নি বিরোধ’, ‘বিদেশি রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র’ বলে হাজির করে। অথচ ১৯৭৯ সালের আগে ইরান যখন শাহের ইরান ছিল, আর এক বাদশাহতন্ত্র ছিল, শাহের বাদশাহতন্ত্র যখন ইরানের তেল ব্রিটিশ-আমেরিকান-ডাচ ও ফরাসি কোম্পানির এক জোটের হাতে তুলে দিয়েছিল ১৯৫৩-১৯৭৮ এই সময়কালে তখনও তো সেই ইরান শিয়া ইরানেই ছিল। অথচ সৌদি বাদশাহতন্ত্র তখন এর ভেতর কোনো শিয়া-সুন্নি বিরোধ দেখেনি, কেন? শাহের শিয়া ইরান আমির-বাদশাহদের বন্ধুই ছিল কেন? কোন সূত্রে? ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পরেই কেন সৌদি বাদশাহ ইরানের সঙ্গে সব বিরোধ আবিষ্কার করলেন? ইরানের বাসিন্দারা কী ১৯৭৯ সালেই প্রথম শিয়া হয়েছে!

অতএব মূল কথা হলো, ইসলাম থেকে বের করে আনা যে কোনো রেডিকেল তত্ত্ব মধ্যপ্রাচ্যের আমিরগিরির জন্য ভয়ঙ্কর শুধু নয়, আরব বসন্তের মতো লিবারেল ইসলামও আমিরগিরিতে অচল। ফলে সৌদি-ইরানের দ্বন্দ্বের শুরু আসলে ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লব থেকে, কারণ সেটা ছিল এক রেডিকেল বিপ্লব।

তবে সম্প্রতি বাড়তি যে বিষয়টা যোগ হয়েছে তা হলো, এক. আমেরিকার অর্থনীতির মাজাভাঙা দুর্দশা বিশেষ করে আরেকবার ফুট সোলজার পাঠিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে কোথাও যুদ্ধ করার খরচ জোগানোর অক্ষমতা। দুই. আইএসের ভয়ানক উত্থান- এ দুই বাস্তবতাতে আমেরিকা ইরানকে পাশে পেতে চায় নিজের মধ্যপ্রাচ্য এভাবে সাজিয়েছে, ইরানকে পাশ পাওয়ার নীতি  সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাইরের দিক থেকে যেটাকে ইরান-আমেরিকার ৫+১ মিলে পারমাণবিক চুক্তি হিসেবে আমরা দেখছি। এতে আমেরিকার লাভ হল, অন্তত আইএস হামলায় আইএসের হাতে ইরাকের পতনের ঘটে যাওয়ার বিরুদ্ধে ইরান প্রতিরোধে এগিয়ে আসবে, এভাবে ইরানের সাহায্য আমেরিকা পাবে। তবে অবশ্যই ইরান নিজের স্বার্থেই ইরাক সরকারকে রক্ষা বা উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। কিন্তু এটা নিশ্চিত করতে গিয়ে বিনিময়ে আমেরিকাকে যে মূল্য চুকাতে হয়েছে তা কম নয়। ইরান বিপ্লবের পর থেকে যে আমেরিকা বিপ্লবী ইরানকে স্বীকার করেনি অথচ আজ তা স্বীকার করে নিতে হয়েছে। আর এখান থেকে সৌদি আরব ও আমেরিকার এতদিনের কমন স্বার্থের বিচ্ছেদ ঘটে গেছে।  ফলে এ বিশেষ ফ্যাক্টরটা সৌদি-ইরান বিরোধকে মুখোমুখি উদোম করেছে। তবু সৌদি-ইরান বিরোধ শিয়া-সুন্নি বিরোধ একেবারেই নয়। শিয়া-সুন্নি বিরোধ হিসেবে দেখালে সুন্নি কনস্টিটুয়েন্সিকে নিজের পক্ষে ও ইরানের বিরুদ্ধে ক্যাশ করার উদ্দেশ্যেই সৌদিদের একথা বলা।

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ জানুয়ারি ২০১৬ সংখ্যা দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে ফাইনাল এডিট করে আবার প্রকাশিত হল।]