ইরান-সৌদি দ্বন্দ্ব কোন শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব নয়

ইরান-সৌদি দ্বন্দ্ব কোন শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব নয়

গৌতম দাস
১২ জানুয়ারি ২০১৬
http://wp.me/p1sCvy-yg

সৌদি আরব ও ইরানের দ্বন্দ্ব ক্রমেই বড় থেকে আরও বড় হচ্ছে। ৩৫ বছর ধরে ছোট-বড় একটা না একটা ইস্যুকে মুখ্য করে সৌদি আরব ও ইরানের লেগে থাকা দ্বন্দ্বের এবারের ইস্যুও বেশ বড়, ফলে এবারের দ্বন্দ্বও তেমনি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে। সৌদি আরবের জনগোষ্ঠী মূলত সুন্নি ধারার; তবে মাঝে মাঝে কোথাও ক্ষুদ্র খোপ বা পকেট আকারে শিয়া জনগোষ্ঠীও আছে। বিশেষত যা কোনো প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ঘটনায় দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সৌদি আরবের তেলসমৃদ্ধ জনপদ ইস্টার্ন প্রভিন্স বা পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের কাতিফ জেলা তেমনই এক শিয়া অধ্যুষিত জনপদ। কাতিফের শিয়া ধর্মীয় নেতা ছিলেন শেখ নিমর আল নিমর। “বিদেশি হস্তক্ষেপ ডেকে এনে রাজনৈতিক অসন্তোষ সৃষ্টির” অভিযোগে রাজকীয় আদালত তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করে ২০১৪ সালের অক্টোবরে। আর পরবর্তিতে ২ জানুয়ারি এ দণ্ড কার্যকর করা হয়। স্বভাবতই ভারতের কাশ্মীর, বাহরাইন, লেবানন, ইরাক, ইরান ইত্যাদি শিয়া রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী দুনিয়ায় যেসব দেশে বা শহরে নজরে পড়ার মতো আছে সেখানে এ মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় আকারে এবং পরে আরও ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আসে ইরানে, তেহরানের সরকারি প্রতিক্রিয়া থেকে। ইরান সরকার সৌদি দূতাবাসের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে এনে প্রতিবাদ জানায়। আর ওদিকে ইরানি বিক্ষোভকারীরা তেহরানের সৌদি দূতাবাস আক্রমণ করে বসে, পেট্রলবোমা ও ইট-পাথরও ছোড়ে। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে একেবারে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। শুধু তাই নয়, গালফ কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল বা মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর জোট জিসিসির সদস্য রাষ্ট্রগুলোও সৌদি সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে।

মৃত্যুদণ্ড এখন কার্যকর হলেও এই  ঘটনার শুরু ২০১১ সালে। যখন দুনিয়াজুড়ে ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলনের ছোঁয়া চারদিকে লেগেছিল। আমেরিকার খায়েশ মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতে কর্তৃত্ববাদী স্বৈরাচারীর বদলে লিবারেল রাজনীতি এবং এ রাজনীতিতে সাজানো সরকার দেখতে চাওয়া। এই খায়েশের নাম ‘আরব বসন্ত’। আরব বসন্ত আলাদা কিছু নয়, এটা ওতপ্রোতভাবে আমেরিকার ওয়ার অন টেরর বিদেশনীতিতে পরিপূরক আরেক দিক বা বৈশিষ্ট। বুশের ওয়ার অন টেররকেই আবার নরম চেহারা করে সাজানো ফুলের নাম আরব বসন্ত। ফলে এটা একই আমেরিকার অপর এক পরিপূরক নীতি। সারকথায় ওয়ার অন টেররের নীতিতে পরিচালনের কারণে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোতে আমেরিকা-বিরোধী যে সেন্টিমেন্ট তৈরি হচ্ছিল মূলত তা হালকা করে দেয়ার উদ্যোগ। ওইসব রাষ্ট্রগুলোতে যতটা সম্ভব এক লিবারেল ইসলামী সরকার কায়েম করে দিলে ঐ দেশের নাগরিকেরা  আমেরিকাবিরোধী এবং আল কায়দার সমর্থক হয়ে ওঠার বদলে নিজ নিজ রাষ্ট্রে লিবারেল শাসন নিয়ে খুশি ও ব্যস্ত হয়ে উঠবে। সব মনোযোগের কেন্দ্র হয়ে উঠবে নিজ নিজ রাষ্ট্র। এ বিবেচনায় আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে লাগানো আর এক বৈশিষ্ট্যের পালকের নাম আরব বসন্ত। আমেরিকার দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো হল আরব বসন্তের জন্য সবচেয়ে ভাল টার্গেট বা খাতক রাষ্ট্র। এ টার্গেট লক্ষ্য করে আমেরিকার দিক থেকে দেশে দেশে আরব বসন্তের উসকানি দেয়া শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে। এ উসকানিতে পরে প্রায় একচেটিয়া সুন্নি জনসংখ্যার মধ্যপ্রাচ্যে যেখানে ক্ষুদ্র শিয়া জনগোষ্ঠীও আছে, তারা প্রান্তিক কোণঠাসা অবস্থা থেকে বেরিয়ে সংগঠিত হয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার সুযোগ নিয়েছিল। তেমনই নিজেদের অন্যদের মাঝে শুনানো অবস্থায় হাজির করার এক আওয়াজ ছিল সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের কাতিফ জেলায় শিয়া ধর্মীয় নেতা শেখ নিমর আল নিমরের নেতৃত্বে রাস্তায় সংগঠিত প্রতিবাদ। সৌদি রাজসরকার নিজ দেশে নিজ সুন্নি জনগোষ্ঠীকেও রাস্তায় সংগঠিত হয়ে কোনো প্রতিবাদ-বিক্ষোভের প্রকাশ ঘটাক, তা সহ্য করে না। ফলে ধর্মীয় নেতা নিমরের পদক্ষেপকে সৌদি সরকার ইরানের ষড়যন্ত্র, বিদেশি রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র, শিয়া ষড়যন্ত্র ইত্যাদি অভিযোগ তুলে কঠোর হাতে দমন-নির্যাতনের পথে যায়। এভাবে ২০১৪ সালেই সৌদি আদালত তাকে মৃত্যদণ্ডে দণ্ডিত করেন। বিবিসি জানাচ্ছে, ২০১১ সালে তিনি বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, “তিনি সৌদি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্রের বদলে শব্দের গর্জনকেই পছন্দ করেন। বুলেটের চেয়েও শব্দের অস্ত্র অনেক বেশি শক্তিশালী। কেননা, যদি অস্ত্রের যুদ্ধ হয়, তবে কর্তৃপক্ষই লাভ ঘরে তুলবে”। অর্থাৎ এককথায় বললে, তিনি একেবারেই নিরস্ত্র গণআন্দোলনের পথেই অাঁকড়ে থাকতে চেয়েছিলেন এক সিভিল লিবার্টি মুভমেন্ট আকারে। সৌদি রাজতন্ত্রের জন্য সহ্য করার দিক থেকে বরং সেটাও বড় ভয়ঙ্কর ছিল।

সুতরাং এদিক থেকে দেখলে শেখ নিমর আল নিমর প্রাণ দিয়ে আমেরিকার “মধ্যপ্রাচ্য নীতির” স্ববিরোধিতাকেই উৎকটভাবে তুলে ধরেছেন। এ নীতি একদিকে সেই ১৯৭৩ সাল থেকে চলে আসা সৌদি বাদশাতন্ত্রকে পেলেপুষে বড় করেছে, আমেরিকার ফসিল ফুয়েলের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির লাইফ লাইনকে, তথাকথিত সিভিলাইজেশনকে জীবিত রাখার প্রয়োজনে এক বাদশাহতন্ত্রকেই পালছে। আবার আমেরিকা নিজেই নিজের ভিলেন চেহারা ঢাকতে সেই বাদশাহতন্ত্রের ভেতরেই এক আরব বসন্তের উসকানি তৈরি করে চলেছে। এরই নিট ফল হল- শেখ নিমর আল নিমরের মৃত্যু।

অনেকেরই ধারণা, একেবারে প্রায় দৃঢ় ধারণা যে, সৌদি-ইরানের বিরোধের উৎস নাকি ইসলামের শিয়া-সুন্নি বিভাজন। এ দাবি ভিত্তিহীন। বরং এ বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হল বাদশাহতন্ত্র বা ইসলামে আমিরগিরি। মধ্যপ্রাচ্যে কোনো এমিরেট বা আমিরগিরি টিকিয়ে রাখা।

এককথায় বললে, এই আমিরগিরির পক্ষে কোনো লিবারেল শাসন সহ্য করাও অসম্ভব। আমিরগিরির সঙ্গে সবকিছুই অচল। ফলে ইসলাম থেকে যে কোনো রেডিকেল তত্ত্ব, জিহাদ বা বিপ্লব করার তত্ত্ব বেরিয়ে আসা আমিরগিরির দিক থেকে জোঁকের মুখে নুন। তাতে সেই তত্ত্ব সুন্নি জিহাদ বা গ্লোবাল বিপ্লব করার তত্ত্ব হোক অথবা শিয়া আয়াতুল্লাহর ইরান বিপ্লবের তত্ত্বই হোক। কোনো ফারাক তাতে নেই। কারণ মূল বিষয়, আমিরগিরির সহ্য করার মুরোদের দিক থেকে – তা কোনো রেডিকেল চিন্তা থেকে দূরে থাকা কোন লিবারল চিন্তাকেও সহ্য করার মুরোদ রাখে না। ফলে উৎখাতের বিপদের মুখে প্রার দিক থেকে লিবারেল চিন্তাই আমিরগিরির জন্য ভয়ানক।

বাদশাহতন্ত্র নিজের এ ভয়ানক বিপদকে আড়াল করতে দাবি করে, বারবার চিৎকার করে বলে, ইরানের সঙ্গে তার বিরোধ নাকি শিয়া-সুন্নি বিভাজনের সঙ্গে সম্পর্কিত। নিজের আমিরগিরি বা বাদশাহতন্ত্রকে আড়াল করতেই এটাকে সে ‘শিয়া-সুন্নি বিরোধ’, ‘বিদেশি রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র’ বলে হাজির করে। অথচ ১৯৭৯ সালের আগে ইরান যখন শাহের ইরান ছিল, আর এক বাদশাহতন্ত্র ছিল, শাহের বাদশাহতন্ত্র যখন ইরানের তেল ব্রিটিশ-আমেরিকান-ডাচ ও ফরাসি কোম্পানির এক জোটের হাতে তুলে দিয়েছিল ১৯৫৩-১৯৭৮ এই সময়কালে তখনও তো সেই ইরান শিয়া ইরানেই ছিল। অথচ সৌদি বাদশাহতন্ত্র তখন এর ভেতর কোনো শিয়া-সুন্নি বিরোধ দেখেনি, কেন? শাহের শিয়া ইরান আমির-বাদশাহদের বন্ধুই ছিল কেন? কোন সূত্রে? ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পরেই কেন সৌদি বাদশাহ ইরানের সঙ্গে সব বিরোধ আবিষ্কার করলেন? ইরানের বাসিন্দারা কী ১৯৭৯ সালেই প্রথম শিয়া হয়েছে!

অতএব মূল কথা হলো, ইসলাম থেকে বের করে আনা যে কোনো রেডিকেল তত্ত্ব মধ্যপ্রাচ্যের আমিরগিরির জন্য ভয়ঙ্কর শুধু নয়, আরব বসন্তের মতো লিবারেল ইসলামও আমিরগিরিতে অচল। ফলে সৌদি-ইরানের দ্বন্দ্বের শুরু আসলে ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লব থেকে, কারণ সেটা ছিল এক রেডিকেল বিপ্লব।

তবে সম্প্রতি বাড়তি যে বিষয়টা যোগ হয়েছে তা হলো, এক. আমেরিকার অর্থনীতির মাজাভাঙা দুর্দশা বিশেষ করে আরেকবার ফুট সোলজার পাঠিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে কোথাও যুদ্ধ করার খরচ জোগানোর অক্ষমতা। দুই. আইএসের ভয়ানক উত্থান- এ দুই বাস্তবতাতে আমেরিকা ইরানকে পাশে পেতে চায় নিজের মধ্যপ্রাচ্য এভাবে সাজিয়েছে, ইরানকে পাশ পাওয়ার নীতি  সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাইরের দিক থেকে যেটাকে ইরান-আমেরিকার ৫+১ মিলে পারমাণবিক চুক্তি হিসেবে আমরা দেখছি। এতে আমেরিকার লাভ হল, অন্তত আইএস হামলায় আইএসের হাতে ইরাকের পতনের ঘটে যাওয়ার বিরুদ্ধে ইরান প্রতিরোধে এগিয়ে আসবে, এভাবে ইরানের সাহায্য আমেরিকা পাবে। তবে অবশ্যই ইরান নিজের স্বার্থেই ইরাক সরকারকে রক্ষা বা উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। কিন্তু এটা নিশ্চিত করতে গিয়ে বিনিময়ে আমেরিকাকে যে মূল্য চুকাতে হয়েছে তা কম নয়। ইরান বিপ্লবের পর থেকে যে আমেরিকা বিপ্লবী ইরানকে স্বীকার করেনি অথচ আজ তা স্বীকার করে নিতে হয়েছে। আর এখান থেকে সৌদি আরব ও আমেরিকার এতদিনের কমন স্বার্থের বিচ্ছেদ ঘটে গেছে।  ফলে এ বিশেষ ফ্যাক্টরটা সৌদি-ইরান বিরোধকে মুখোমুখি উদোম করেছে। তবু সৌদি-ইরান বিরোধ শিয়া-সুন্নি বিরোধ একেবারেই নয়। শিয়া-সুন্নি বিরোধ হিসেবে দেখালে সুন্নি কনস্টিটুয়েন্সিকে নিজের পক্ষে ও ইরানের বিরুদ্ধে ক্যাশ করার উদ্দেশ্যেই সৌদিদের একথা বলা।

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ জানুয়ারি ২০১৬ সংখ্যা দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে ফাইনাল এডিট করে আবার প্রকাশিত হল।]