চীনের বিশ্বব্যাংকের অপারেশন কী প্রভাবিত হবে


দক্ষিণ চীন সাগরে দ্বীপ মালিকানা বিতর্ক
চীনের বিশ্বব্যাংকের অপারেশন কী এতে প্রভাবিত হবে

গৌতম দাস
১৭ জানুয়ারী, ২০১৬
http://wp.me/p1sCvy-zk

এআইআইবি-চীনের বিশ্ব ব্যাংকের সংক্ষিপ্ত নাম। সংক্ষেপ ভাঙলে চীনের নেতৃত্বে এই ব্যাংকের পুরা নাম এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক। এআইআইবি শুধু ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সমতুল্য ব্যাংকই নয়, বলা হয়ে থাকে এআইআইবি জাপান-আমেরিকার নেতৃত্বে গড়ে উঠা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকেরও প্রতিদ্বন্দ্বী। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর রয়টার্স চীনা অর্থমন্ত্রীর বরাতে চীনা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে জানিয়েছে, ২০১৬ সালের মধ্য জানুয়ারিতে নতুন ব্যাংকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবে। এছাড়া ৩০ ডিসেম্বর রয়টার্স এক রিপোর্টে আরও কিছু অগ্রগতির খবর জানিয়েছে। যেমন- আগেই সাব্যস্ত ছিল এই ব্যাংক ১০০ বিলিয়ন ডলারের পরিশোধিত ক্যাপিটাল নিয়ে যাত্রা শুরু করবে। আর এর প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা সদস্যরা প্রাথমিকভাবে ওই ১০০ বিলিয়ন ডলারের ২০ শতাংশ পরিশোধ করবেন, যা পরিশোধিত হওয়ার পথে। এছাড়া ১৭ উদ্যোক্তা সদস্য রাষ্ট্র মোট শেয়ারের মূল্যের ৫০ শতাংশ পরিশোধ করে ফেলায় এই ব্যাংক (এখানে এখন থেকে ব্যাংক বলতে এআইআইবি বুঝতে হবে) আর নেহাত এক আইডিয়া বা কল্পনা নয়, এক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুরু থেকেই আমেরিকা এই ব্যাংকের জন্ম নেয়ার বিরুদ্ধে যা যা বাধা দেয়া সম্ভব এর সবই করেছে। শুরুর দিকে তা কিছুটা কাজও করেছিল। এশিয়ায় আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অথবা আমেরিকার সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারের সম্পর্ক রেখে চলে এমন রাষ্ট্রগুলো যেমন অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, জাপান ইত্যাদির ওপর আমেরিকার এ কূটনৈতিক চাপ ভালোই কাজ করেছিল। যদিও এসব রাষ্ট্র নিজ নিজ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে চেয়ে বুঝেছিল আমেরিকার মুখ চেয়ে এই ব্যাংক উদ্যোগের বিরুদ্ধে নিরাসক্ত ভাব নেয়া, দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখানোটা নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধাচরণ হচ্ছে। তাই প্রথম বাঁধভাঙার ঘটনাটা ঘটে ইউরোপের নেতা রাষ্ট্র ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি- এ তিনের তরফ থেকে; এরপর এশিয়া আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব রাখেনি।নে নেতৃত্ব কথাটার অর্থ ব্যাংকের সবচেয়ে বড় মালিকানা শেয়ার হোল্ডার কোন রাষ্ট্র। স্বভাবতই এর ফলে গঠন ও পরিচালনে সে রাষ্ট্রের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ইতোমধ্যেই ঘোষণা এসে গেছে যে, এই ব্যাংকের অপারেশন বা কার্যকারিতা শুরু হবে ২০১৬ সাল থেকে। ইতোমধ্যে প্রস্তুতিমূলক অনেক কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। সম্প্রতি জানা যাচ্ছে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে এ মাসেই, ১৬-১৮ জানুয়ারি। এই উপলক্ষে আমাদের অর্থমন্ত্রী মাল মুহিত ইতোমধ্যেই চীন রওয়ানা দিয়েছেন।

ওদিকে নতুন এক ইস্যু “দক্ষিণ চীন সাগর দ্বীপ মালিকানা বিতর্ক” – কয়েক বছর ধরে আস্তে আস্তে কাঁটার মতো খচখচ করে সব প্রসঙ্গের মধ্যেই বিঁধতে দেখা যাচ্ছে। সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর-সমুদ্রপথে চীনে পৌছানোর একমাত্র প্রবেশদ্বার। আসলে এই সাগর কেবল চীনের দক্ষিণে নয় বরং পূর্ব অবধিও বিস্তৃত। পূর্বের অংশকে আলাদা করে পূর্ব চীন সাগর বলা হয় যদিও কিন্তু সাগরের দক্ষিণ অংশ আর পূর্ব অংশ এ দুইয়ের মাঝে কোনো দেয়াল বা বিচ্ছেদ নেই। আর চীনের প্রবেশদ্বারের একেবারে মুখ এলাকা হিসেবে দক্ষিণ চীন সাগর অংশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আশপাশে পড়শি রাষ্ট্রের ভিড়ভাট্টা দক্ষিণ দিকে বেশি। তাই দ্বীপ মালিকানা-বিষয়ক বিতর্কটা দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক নামেই পরিচিত। এই দক্ষিণ-পূর্ব কোণটা ছাড়া চীনের সীমান্তের বাকি সব দিক দিয়েই স্থলাবদ্ধ,ল্যান্ড লকড।
কিন্তু নতুন এক ইস্যু আস্তে আস্তে কাঁটার মতো খচখচ করতে শুরু করে। সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর- সমুদ্রপথে চীনের একমাত্র প্রবেশ দ্বার। চীন বাকি তিনদিকেই স্থলাবদ্ধ, ল্যান্ড লকড।

আজ চীন যেমন অর্থনৈতিক শক্তি হওয়ার বিভিন্ন বিবেচনার দিক থেকে আমেরিকার তুলনায় ক্রমেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনি ১৮৮০ সালেই আমেরিকান অর্থনীতি সাইজের দিক থেকে তৎকালীন কলোনি মাস্টার ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এভাবে ১৯২০ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে সব বিবেচনাতে ব্রিটেনসহ ইউরোপের সবার উপরে আমেরিকা উঠে যায়। সেকালে উত্থানের যুগে আমেরিকা নিজ রাষ্ট্রের সমুদ্রপথের প্রবেশে আশপাশের সব সমুদ্র অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। এমন আচরণের একটা সাধারণ দিক আছে। উদীয়মান রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ চ্যালেঞ্জিংভাবে সবার চেয়ে বড় হয়ে গেলে এ ঘটনার সঙ্গে এর নিরাপত্তার প্রশ্নটাই বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বড় অর্থনীতি মানে কাঁচামালের বড় আমদানি জাহাজ এবং বড় পণ্য রফতানি জাহাজের আনাগোনা। ফলে এখান থেকেই সমুদ্রপথে বাধাহীন, ভয়হীন ‘বস্নুওয়াটার’ এলাকায় বয়ে যাওয়ার চাহিদা সৃষ্টি হয়। এ বিষয়টি অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠা রাষ্ট্র যে কোনোভাবে হোক নিশ্চিত করাকে নিজের রাষ্ট্রস্বার্থ গণ্য করে থাকে। আজ চীনের প্রবেশপথ দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে চীনের অবস্থানও সে রকম। সে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে বঙ্গোপসাগর হয়ে আরব সাগর পর্যন্ত অবাধ নৌবাণিজ্য জাহাজ চলাচলের ব্যাপারে সেনসিটিভ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে চীনের প্রবেশমুখ দক্ষিণ চীন সাগরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনেক দ্বীপের মালিকানা দখলে নিতে ও রাখতে মারমুখী হয়ে উঠেছে। আর তা থেকে সামরিক-কূটনৈতিক টেনশন মারাত্মক। জাপান, কোরিয়া, ফিলিপাইন, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম ইত্যাদির সঙ্গে ছোট-বড় দ্বীপ মালিকানা বিরোধ সবার সঙ্গে তৈরি হয়েছে। এ সুযোগে আমেরিকা বিরোধে বিরোধী রাষ্ট্রকে তাল দিয়ে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ শব্দটা হয়ে উঠেছে দ্বীপ মালিকানা বিরোধের প্রতীক। চীনা নেতৃত্বের এআইআইবি উদ্যোগে যোগ দিতে অন্তত অংশগ্রহণে দ্বিধা করার ক্ষেত্রে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ বিষয়টি অনেকের কাছেই তাই একটা ইস্যু।

US in 1880
আমেরিকান এমন আচরণের একটা সাধারণ দিক আছে। উদীয়মান রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ চ্যালেঞ্জিংভাবে সবার চেয়ে বড় হয়ে গেলে অনুষঙ্গ হিসেবে ওই অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের সমুদ্র-চলাচল বিষয়ক নিরাপত্তার প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ বড় অর্থনীতি মানে কাঁচামালের বড় আমদানি জাহাজ এবং বড় পণ্য রফতানি জাহাজের আনাগোনা। ফলে এখান থেকেই সমুদ্রপথে আসা-যাওয়া জাহাজের বাধাহীন, ভয়হীন ‘ব্লু-ওয়াটার’ নেভিগেশন এলাকা পাবার চাহিদা  ও নির্ভয়ে জাহাজ চলাচলের চাহিদা সৃষ্টি হয়। এ কারণে  দুনিয়াতে অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে চাওয়া যেকোন রাষ্ট্র এ বিষয়টাকে যে কোনোভাবে হোক নিজের জন্য নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রস্বার্থ গণ্য করে থাকে।
আমেরিকান স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার ফিলিপাইন- দ্বীপ মালিকানা বিরোধে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ এ রাষ্ট্রের কাছে একটা ইস্যু। উদ্যোক্তা সদস্য হওয়ার স্বাক্ষর সে করেছে; কিন্তু বাকি আনুষ্ঠানিকতা পূরণ করতে এ ব্যাংক উদ্যোগে সদস্য হিসেবে ভাগে পাওয়া শেয়ারের অর্থ পরিশোধ করতে এত দিন সে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। যে চীনের সঙ্গে দ্বীপ মালিকানা নিয়ে তার বিরোধ তুঙ্গে যাচ্ছে, সেই চীনের উদ্যোগেই এআইআইবি ব্যাংকে যোগদান শেয়ার মালিকানা ও সদস্য হওয়া কি ঠিক হচ্ছে- এ ছিল ফিলিপাইনের দ্বিধার সুনির্দিষ্ট বিষয়।
ফিলিপাইনের জন্য এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর শেষদিন ছিল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫। আমেরিকান অর্থনৈতিক বা গ্লোবাল পুঁজিবাজারবিষয়ক ম্যাগাজিন বস্নুমবার্গ ৩০ ডিসেম্বর জানিয়েছে, ফিলিপাইন সরকার পরিপূর্ণ যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং নিজের ভাগের ১৬৫ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার কেনার অর্থ ৫ বছরে যা পরিশোধযোগ্য তার অর্থ জমা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ৩০ ডিসেম্বর এক রিপোর্টে জানিয়েছে, ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের ফাইলে স্বাক্ষর দিয়েছেন। ফিলিপাইনের জন্য সিদ্ধান্তটি কেন এবং কত কঠিন তা বোঝা যায় পরিপূর্ণ যোগদানের সিদ্ধান্ত জানানোর সময় এর সপক্ষে যেসব বিবেচনা অর্থসচিব তুলে ধরেছেন তা থেকে। ফিলিপিনো অর্থসচিব বলছেন, ‘সদস্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উপস্থিত বহু রাষ্ট্রীয় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের (বিশ্বব্যাংক, এডিবি) ভূমিকার দিক থেকে এআইআইবি এক সহায়ক ও পরিপূরক এবং এক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। স্বচ্ছতা, স্বতন্ত্রতা ও জবাবদিহিতার ব্যাপারে এ প্রতিষ্ঠান আস্থা রাখার মতো এবং আমাদের সে আস্থা আছে।’ বোঝা যাচ্ছে, ফিলিপাইনের ঋণ চাহিদা প্রবল আর তা পূরণে এক ইতিবাচক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সে এআইআইবিকে দেখে থাকে।
একজন চীনা মুখপাত্রকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, সদস্যদের সবার অংশগ্রহণে লেখা ওর গঠনপ্রণালিতে যেভাবে লেখা আছে এআইআইবি নিজের অপারেশনের সময় সেটা অনুসরণ করেই ফিলিপাইন লোন পাবে কিনা তা নির্ধারিত হবে, অন্য কিছু নয়।
মনে হচ্ছে, চীনের দিক থেকে এআইআইবির বিষয়াদিতে বাইরের কোনো বিবেচনা নয়, ব্যাংকের নিজস্ব গঠনপ্রণালি ও রুল অনুসরণ করে চলতে চায় চীন। এখন দেখা যাক, বাস্তবে চীন সেটা কতটা কীভাবে করে।

দুইঃ কাপলান ও দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক
দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে আগেই বলেছি, কোনো রাষ্ট্র অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠতে থাকলে ওর সমুদ্রপথে প্রবেশদ্বার সেনসেটিভ ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সামরিক-স্ট্র্যাটেজিক ইস্যু হয়ে যায় সেটা। এর মূল কারণ, সমুদ্রপথে জ্বালানি তেলসহ কাঁচামালের আমদানি এবং উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি নিরাপদ ও অবাধ রাখতে হয়। বাণিজ্য-নিরাপত্তার স্বার্থ বলে এটা সামরিক স্বার্থও। কিন্তু কঠিন সত্য হলো, এই সামরিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ অন্যের দান, দয়াদাক্ষিণ্য, আইনের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলে রাখতে কোনো রাষ্ট্রই পারে না।
মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা যেমন লজিক র‌্যাশনালিটি বা আইনের দ্বারা ন্যায্য বলে সাব্যস্ত  হওয়ার অপেক্ষায় ছেড়ে দিয়ে রাখা যায় না, কেউ রাখতে পারে না চীনের কাছে দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর একক রুস্তমি করতে চাওয়া ঠিক তেমনি। এই ব্যাপারটাকে প্রতীকীভাবে ধরে এক নতুন শব্দ চালু হয়েছে ‘ব্লু ন্যাশনাল সয়েল’।
সাধারণত সাগর-উপসাগর বলতে আমাদের কল্পনা হলো, যার অন্তত একটা দিক, সাধারণত তীর বা উপকূলের উল্টো দিক অসীম আর অবারিত। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের চারদিকেই চীনের নানা পড়শি রাষ্ট্রের ভূখণ্ড।
আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘের অধীনে জন্ম নেওয়া সমুদ্রসীমাবিষয়ক বিভিন্ন কনভেনশনের রেওয়াজ অনুসারে রাষ্ট্রীয় সমুদ্রসীমা টানা ও মানা হয়ে থাকে। ফলে দক্ষিণ চীন সাগরের চারদিকের প্রায় সব পড়শি রাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সমুদ্রসীমা বা জেগে ওঠা দ্বীপের মালিকানাগত বিরোধ হাজির হয়েছে ও চলছে কয়েক বছর ধরে। পূর্ব চীন সাগরে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মালিকানা নিয়েও জাপানের সঙ্গে বিরোধ-বিতর্ক আছে; গত বছর যা তুঙ্গে উঠেছিল।
এখন সার করে বললে চীনের জন্য ইস্যুটা হলো, লজিক আইনের ঊর্ধ্বে, নৌ-বাণিজ্য জাহাজের অবাধ চলাচলের স্বার্থ। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, রেওয়াজ, সালিস ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা রাষ্ট্রের সমুদ্রসীমাবিষয়ক বিরোধ মীমাংসার পথও একটা বাস্তবতা। চীনের জন্য এই দুই সত্য সংঘাতময়, বিরোধাত্মক। ফলে চীনকে দেখাতে হচ্ছে কতটা সৃজনশীল হয়ে সে এই দুই সত্যের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত বিরোধ মীমাংসার ফর্মুলা হাজির করতে সক্ষম হয়। চীনের নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জটি এখানেই।
আমেরিকায় থিংক-ট্যাংক বা চিন্তার দোকানের শেষ নেই। আমেরিকা দুনিয়ায় রুস্তমি করে চলেছে মূলত এদেরই বদৌলতে। এই দুনিয়ার তেমনই এক শেঠ রবার্ট ডি কাপলান। নামের শেষ অংশ দিয়েই বেশির ভাগ মানুষ তাকে চেনে। ২০১৪ সালের মার্চে তার লেখা একটা বই প্রকাশিত হয়েছে : এশিয়ার ফুটন্ত কড়াই : দক্ষিণ চীন সাগর ও শান্ত প্রশান্ত মহাসাগরের দিন শেষ।
ওই বইয়ে তিনি চীনের প্রয়োজন ও বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে চীনের সপক্ষে এক শক্ত পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। যার শিরোনাম, “বেইজিংয়ের ক্যারেবিয়ান লজিক”।
কাপলান প্রথমত আমেরিকার উত্থান ইতিহাসে গিয়েছেন। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আজ চীন যেমন প্রায় সব বিবেচনায় আমেরিকাকে ক্রমে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে ১৮৮০ সালে আমেরিকান অর্থনীতি আকারের দিক থেকে তৎকালীন ঔপনিবেশিক প্রভু ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাওয়া শুরু করেছিল। পরে এভাবে ১৯২০ থেকে ১৯৪৫ সাল সময়ের মধ্যে সব বিবেচনায় ব্রিটেনসহ ইউরোপের সবার ওপরে আমেরিকা উঠে যায়। এই উত্থান পর্যায়ে আমেরিকা নিজ রাষ্ট্রে সমুদ্রপথের প্রবেশের ক্ষেত্রে লাগোয়া প্রতিটা সমুদ্র অঞ্চলে ব্রিটেনের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।
সেকালে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রুরাষ্ট্র ছিল ইউরোপ; যাদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আমেরিকাকে পরাশক্তি হিসেবে উঠে আসতে হয়েছে।
সমুদ্রপথে মেক্সিকো উপসাগরসহ বৃহত্তর ক্যারিবিয়ান সাগর অঞ্চলে যেন ইউরোপের কোনো রাষ্ট্রের অবাধ আনাগোনা না থাকে, ইউরোপের সব রাষ্ট্রকে দূরে রেখে তা কেবল যেন আমেরিকার জন্য অবারিত থাকে- ১৮৮০ থেকে প্রত্যেক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট এই নীতি অনুসরণ করেছেন।
কাপলান আমেরিকান সেই নীতির রেফারেন্স দিয়ে বলছেন, আমেরিকা অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উত্থিত হওয়ার দিন ছিল সেগুলো- ফলে আমেরিকা বৃহত্তর ক্যারিবিয়ান নৌ-অঞ্চলে নিজের জন্য ‘ব্লু ন্যাশনাল সয়েল’ নীতি অনুসরণ করেছিল। সেকালে তা ন্যায্যতা পেলে আজ দক্ষিণ চীন সাগরে চীন যা করছে, তা কেন পাবে না?
কাপলানের এই লজিকের পক্ষে এক বাস্তবতা দেখা গিয়েছিল গত বছর। দক্ষিণের মতোই পূর্ব-চীন সাগরের দ্বীপ মালিকানা নিয়ে চীনের সঙ্গে জাপানের বিরোধ আছে। আমেরিকা গত বছর এই বিরোধকে ধারালো করতে জাপানকে তাতিয়ে তুলছিল। একপর্যায়ে এটা চরমে যায়।
এই দেখে ওয়াল স্ট্রিট কারবারিরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ, শঙ্কিত ও বিরক্ত হয়ে ওঠে। পরের সপ্তাহের লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিস্ট পত্রিকার কাভার স্টোরিতে তা উঠে আসে। ওখানে দুটো পয়েন্ট ছিল : চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠছে, কেউ এমন পরাশক্তি হলে ব্লু-ওয়াটার ধরনের ইস্যুতে তার পেশি দেখানো স্বাভাবিক এবং এটা আমাদের নিচু গুরুত্বে দেখা উচিত। কারণ, আমরাও এমন করেছিলাম। এর চেয়েও বড় কথা, ২০০৮ সাল থেকে শুরু হওয়া দুনিয়াব্যাপী মহামন্দার ভেতর আমরা এখনো আছি। এ সময়ে চীনের মতো রাইজিং ইকোনমি না থাকলে আমাদের অবস্থা আরও করুণ হতো। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে বিবাদের খাতা খোলার চেষ্টা অর্থহীন ও আত্মঘাতী। এরপর থেকে এই ইস্যুতে জাপান লো-প্রফাইলে চলে যায়। যদিও পুব চীন সাগরের অপর অংশ দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুটা এখনো জীবন্ত, বিশেষ করে ভিয়েতনাম বা ফিলিপাইনের দিক থেকে।

goutamdas1958@hotmail.com
[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এর ০৩ জানুয়ারী সংখ্যায়, দৈনিক নয়াদিগন্তের ০৪ জানুয়ারী সংখ্যায় এবং সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকায় ০৯ জানুয়ারি সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এখানে সেগুলোকে আবার একসাথে এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s