চীনের হাতে পড়ে ‘উন্নয়ন’ ধারণার নতুন মাত্রা

চীনের হাতে পড়ে ‘উন্নয়ন’ ধারণায় নতুন মাত্রা
গৌতম দাস

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, মঙ্গলবার
http://wp.me/p1sCvy-GP

 

[আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ওয়াল স্ট্রিট পুঁজিবাজারের ক্রেতা বাড়ানোর কর্মসুচির আর এক নাম ‘উন্নয়ন’। কাঁধ বদল করে এই ব্যবস্থা চীনের নেতৃত্বে খাড়া হতে যাচ্ছে। পরিবর্তি এই পরিস্থিতিতে উন্নয়ন শব্দ ও ধারণা কোথায় কোথায় বদল ও প্রসারিত হতে যাচ্ছে, কোথায় ইতোমধ্যেই ঘটে গেছে এসব নিয়েই এই রচনা। গত বছর ২০১৫ এপ্রিলে এই প্রসঙ্গে প্রথম একটা লেখা লিখেছিলাম। ওর শিরোনাম ছিল “চীনের বিশ্বব্যাংক, উন্নয়নের অর্থ কি বদলে যাবে“। এরপর এবিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক জার্নালে কোন লেখা ছাপা হয়েছে এমন চোখে পড়ে নাই। সম্প্রতি আমার অনুমানকে শক্তিশালী করে এমন এক ইন্টারেস্টিং লেখা ছাপা হয়েছিল “প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের” সহযোগিতায়। এটা ছাপা হয়েছিল ১৩ জানুয়ারি ২০১৬  WORLD ECONOMIC FORUM এর ওয়েব জার্নালে, কিন্তু আমার নজরে এসেছে সম্প্রতি। আমার লেখার উপস্থাপন ছিল সাদামাটা। কিন্তু ‘প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে’ ঐ লেখার শিরোনাম ছিল অনেক এগ্রেসিভ; “কার গ্লোবাল উন্নয়ন মডেল ধারণা টিকবে – পশ্চিমেরটা না চীনের” (Whose global development model will prevail – the West’s or China’s)। ফলে এই প্রসঙ্গে আরও কিছু অনুসন্ধান ও পাঠের পর চলতি এই রচনা; উন্নয়ন শব্দ ও ধারণার ব্যবচ্ছেদ করে দেখা।]

 

উন্নয়ন শব্দটার সাথে আজ আমরা সবাই নানাভাবে নানা অর্থে ও সুত্রে পরিচিত। এআইআইবি বা এশিয়ান ইনফ্রাষ্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক – যেটাকে চীনের বিশ্বব্যাংক বলা হয় এটা  গড়ার তোড়জোরের প্রেক্ষিতে গেল বছর ২০১৫ এপ্রিলে আমার একটা লেখা চীনের বিশ্বব্যাংক, উন্নয়নের অর্থ কি বদলে যাবে শিরোনামেরচনাটা লেখা হয়েছিল। “উন্নয়ন” শব্দটা আমেরিকার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরের এক বিশেষ ফেনোমেনা – এরই নতুন অর্থ তাতপর্যের  নাম। যেখানে উন্নয়ন শব্দের অন্তত একটা অর্থ অবকাঠামোগত উন্নয়ন। আমেরিকার নেতৃত্বে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ বাড়ানোর উন্নয়ন। তাহলে নতুন কোনো গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডার যদি চলতি আমেরিকার নেতৃত্বের বদলে আসন্ন আগামিতে চীনা নেতৃত্বে শুরু হয় তাহলে নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে কী কী নতুন বদল ঘটবে এবার; ‘অবকাঠামোগত উন্নয়ন’ কথাটার অর্থ কি ভিন্ন হবে? চীনারা কি সেটাকেও ‘উন্নয়ন’ নামে ডাকবে? বৈশিষ্ট্যগুলোতে  কী কী বদল আসবে? নাকি সেটা শুধু ডাকনাম বদলই নয়, অর্থ তাৎপর্যেও বদল, নতুন বৈশিষ্ট্য আনবে? যদিও ঐ লেখার শিরোনাম ছিল ‘চীনের বিশ্বব্যাংক, উন্নয়নের অর্থ কি বদলে যাবে’ – আর  এবারের প্রসঙ্গটা মূলত সেরকমই কিছুটা, তবে ভিন্নভাবে।

গ্লোবাল পলিটিক্যাল ইকোনমিক লিটারেচারে ‘ডেভেলপমেন্ট’ বা ‘উন্নয়ন’ শব্দটা পরিচিত ও চালু হতে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। এর সাথে আর একটা শব্দও ছিল- ‘রি-কনস্ট্রাকশন’, যেটার বাংলা হতে পারে পুনর্গঠন । ঠিক যেমন বিশ্বব্যাংকের পুরা নাম  ‘রি-কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ ব্যাংক। বিশ্বব্যাংক জন্মের সময় কী ধরনের সংগঠন এটা হতে যাচ্ছে তা বুঝানো ও প্রকাশ করাটা মুখ্য ছিল। ফলে ওর নাম ছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রি-কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’, সংক্ষেপে আইবিআরডি। পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ সালে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও একই বৈশিষ্ট্যের নিজের ব্যাংকের নাম ‘ইউরোপিয়ান ব্যাংক ফর রি-কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ রাখা হয়েছিল। তবে পপুলার পর্যায়ে সংক্ষেপিত হয়ে সাধারণ্যে শব্দটা আর ‘পুনর্গঠন ও উন্নয়ন’ না থেকে শুধু ‘উন্নয়ন’ হয়ে যায়। কিন্তু কী সে বৈশিষ্ট্য যার ভেতর উন্নয়ন শব্দের অর্থ লুকানো আছে?
পুনর্গঠন ধারণা বা শব্দটা এসেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের ক্ষতিগ্রস্ত  হয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে পুনর্গঠনের প্রয়োজনের বিষয়টাকে বুঝাতে। কিন্তু উন্নয়ন জিনিসটা কী? ‘অবকাঠামোগত উন্নয়ন’ কথাকে সংক্ষেপ করে উন্নয়ন বলা হয়। আগে ছিল এখন ক্ষতিগ্রস্ত এমন অবকাঠামো অথবা নতুন অবকাঠামোর বিস্তৃতি ঘটানোর অর্থে অবকাঠামো উন্নয়ন। কিন্তু অবকাঠামোই বা কী? যেসব সুবিধাদি আগে থেকে থাকলে কেউ নতুন কারখানা উৎপাদন ও পণ্য চলাচলের ব্যবসা-বাণিজ্য ধরনের অর্থনৈতিক তৎপরতায় প্রচুর দেশী-বিদেশী বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নিয়ে আগ্রহী হয়ে এগিয়ে আসে – ফিজিক্যাল ঐসব সুবিধাদি হল “অবকাঠামো” । যেমন একটা স্কুল থাকা, রাস্তাঘাট ব্রিজ করা, বিদ্যুৎ, পানি, পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা খাড়া করা, ন্যূনতম চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, দক্ষ ও সংগঠিত প্রশাসন গড়ে রাখা ইত্যাদি; এগুলো সবই অবকাঠামোগত সুবিধা। এগুলো থাকা বা করে রাখা মানে ঐ সমাজে অবকাঠামো সুবিধাদি ভাল। স্বভাবতই ওখানে এগুলো বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পুর্বশর্ত পূরণ করে রাখা আছে বলে সব বিনিয়োগকারি বিবেচনা করবে। অবকাঠামোগত সুবিধাদি থাকলে কারখানা পণ্য উৎপাদন ও পণ্য বিনিময় বাণিজ্যে বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়। অবকাঠামো থাকলে বিনিয়োগ আসে বলে অবকাঠামো গড়াকে কোনো দেশের অর্থনীতিতে গতি আনার ক্ষেত্রে পয়লা বা মুখ্য ধাপ মনে করা হয়। কিন্তু অবকাঠামো আর বিনিয়োগ এ ধারণা দুটোর মধ্যে আরেক সম্পর্ক আছে। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে অবকাঠামো আগাম থাকা লাগে কথাটি সত্য। কিন্তু অবকাঠামো গড়তেও আবার বিনিয়োগ লাগে। কিন্তু প্রথম বাক্যের বিনিয়োগ যাকে আকৃষ্ট করার জন্য এত আয়োজন সে বিনিয়োগ বলতে ‘বাণিজ্যিক বিনিয়োগ’ বুঝতে হবে। আর অবকাঠামো গড়তে যে বিনিয়োগের দরকারের কথা বলছি সেটাও বিনিয়োগ বটে তবে নামমাত্র বা না-সুদে কেবল সার্ভিস চার্জের ঋণে আনা বিনিয়োগ। বড় এবং মুল ফারাক “বাণিজ্যিক সুদ” এবং “না-সুদ” – এদুয়ের ফারাক। তাই দুই বিনিয়োগ ধারণায় যেন বিভ্রান্তি না লাগে তাই প্রথমটা ‘বাণিজ্যিক বিনিয়োগ’ আর পরেরটাকে ‘অবকাঠামোগত বিনিয়োগ’ বলা হয়। ‘অবকাঠামোগত বিনিয়োগ’ জোগাড় করতে পারলে অবকাঠামোগত সুবিধা গড়ে রাখা যায়। অবকাঠামোগত সুবিধা গড়া থাকলে ‘বাণিজ্যিক বিনিয়োগ’ আকৃষ্ট করা যায়।
দুই বিনিয়োগ ধারণার মধ্যে অনেক বিষয়ে ফারাক থাকলেও আগে বলেছি, মূল ফারাক সুদের হারে। অবকাঠামোগত বিনিয়োগেও মুনাফার বিষয় থাকে। কিন্তু তা নামমাত্র বা খুবই কম মুনাফা (অবশ্যই তা এক ডিজিটের সুদে এবং তা সাধারণত ৫%-এর ওপরে তো নয়ই, বরং ১%-এর নিচে হতে পারে) হতে পারে। আর অবকাঠামো বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য মুনাফা করা নয়। মুনাফা কেমন করে আরো বেশি করা যায় এমন উদ্দেশ্যে এটা পরিচালিতও হয় না। সে জন্য এটা বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নয়। তাহলে এর উদ্দেশ্য কী? এর উদ্দেশ্য বরং গ্লোবাল পুঁজি বাজারে যাকে প্রতীকীভাবে ওয়াল স্ট্রিট বলা হয় সেই বাজারে বাংলাদেশ যেন আরও বড় পূঁজির খাতক হয়। বাংলাদেশ সরকার যেসব কোম্পানীকে কারখানা-পণ্য-উৎপাদন ও পণ্য বিনিময়ের ট্রেডিং বাণিজ্যে বিনিয়োগের অনুমতি দিবে এরাই ওয়াল স্ট্রিট থেকে ধার করে বাণিজ্যিক ঋণ-বিনিয়োগ আনবে। এভাবে পুঁজি এনে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক বিনিয়োগের করবে যারা এদের বিনিয়োগ আনার অর্থ হবে গ্লোবাল পুঁজি বাজারে বাংলাদেশকে বড় বিনিয়োগ পূঁজির খাতক বলে হাজির করা।  বিপরীতে একটা স্কুল খোলা, রাস্তাঘাট-ব্রিজ করা, বিদ্যুৎ, পানি, পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা করা, ন্যূনতম চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা ইত্যাদি। এসব অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং বলা বাহুল্য, এগুলো অবাণিজ্যিক – এগুলো যদি অবাণিজ্যিকভাবে করা না থাকে এর অর্থ হবে  তাহলে দুই ডিজিটের মুনাফার বাণিজ্যিক বিনিয়োগে স্কুল খুলতে হবে। ফলে এসব স্কুল থেকে বের হওয়া দক্ষ-শ্রমিককে চাকরিতে নিয়োগ দিতে গেলে বেতন দিতে হবে হয়তো ১০ গুণ। নতুন কারখানা খোলার ক্ষেত্রে যার এক মারাত্মক নেগেটিভ নিরুতসাহ প্রভাব পড়বে। আর খুব কমসংখ্যক লোকই এখানে সন্তানকে ভর্তির সামর্থ্য রাখবে। কিন্তু স্কুল বা শিক্ষায় অবকাঠামো বিনিয়োগে পরিচালিত করা মানে সমাজের অর্থনৈতিক উৎপাদনের দিক থেকে দেখলে দক্ষ শ্রম সহজে সস্তায় পাওয়ার ব্যবস্থা করা।
আবার, বাণিজ্যিক বিনিয়োগ আসে গ্লোবাল পুঁজিবাজার ও দেশীয় বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে, তবে বাণিজ্য ও মুনাফার উদ্দেশ্যে। বিপরীতে অবকাঠামো বিনিয়োগ আসে বহু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক, এডিবি অথবা এ কালের এআইআইবি ধরনের অবকাঠামো ব্যাংকের কাছ থেকে। স্বভাবতই এগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংক নয় বলে ব্যক্তি বা কোম্পানি এর মালিক নয়। কেবল অনেকগুলো রাষ্ট্রের জোট এর মালিক। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের নামের সাথেও ব্যাংক শব্দটা থাকলেও এগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংক নয়, তা বুঝাতে নামের মধ্যে ‘উন্নয়ন’ বা ‘অবকাঠামো’ বা ‘পুনর্গঠন’ এমন একটা না একটা শব্দ থাকবেই। তাই বিশ্বব্যাংকের নাম ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রি-কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’, এডিবির নাম এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। এআইআইবি এর নাম এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ইত্যাদি। ওপরের ধারণাগুলোকে জড়ো করে পপুলারলি তা এক শব্দে প্রকাশিত হওয়া শব্দ হলো উন্নয়ন। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, মুনাফা- এসব পরিচিত ধারণার বাইরে সংযুক্ত হওয়া নতুন শব্দ অবকাঠামো ব্যাংকের বিনিয়োগে অবকাঠামো উন্নয়ন। ইউরোপে এটা এসেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে। আর আমাদের মতো দেশে আরো অনেক পরে, বাংলাদেশে সত্তরের দশকে।
অবকাঠামো বা উন্নয়নের সাথে নিজের সম্পর্কের ব্যাপারটা আজ গ্রামের মানুষও সহজেই একভাবে নিজের মতো করে বুঝেছে। তার গ্রামে অবকাঠামো বিনিয়োগ এলে তার কাজ বা চাকরি পাওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হয়, এসব নানান বাধার অপসারণ ঘটে- এইসব বিষয়গুলো সে বোঝে নিজের মত করে। তাই মফস্বলের ভাষায় অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ধারণার পপুলার নাম হলো উন্নয়ন। তাঁর বাড়ি থেকে উপজেলা বাজার, নিজের জেলা শহর বা রাজধানীতে পৌঁছানোর যোগাযোগব্যবস্থা যত সহজ হবে এর সাথে তার ভাগ্য খোলা, জীবনযাপনের মান বেড়ে যাওয়া, কাজ পাওয়া ইত্যাদি যে সরাসরি সম্পর্কিত এটা বুঝতে তার আর বাকি নেই। উন্নয়ন কথাটা সে এভাবে তার মতো করে বুঝে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) আগে যেটাকে উপনিবেশ যুগ বা কলোনি শাসনের যুগ বলা হয় সেকালে সারা দুনিয়া ইউরোপের চার-পাঁচটা কলোনি সাম্রাজ্য শাসকের দখলে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। এমন কোনো দেশ বাকি ছিল না যে, কলোনি হয়নি; কোনো না কোনো কলোনি সাম্রাজ্য শাসকের দখলে চলে যায়নি। এ সময়টাতেই আমরা যেমন ব্রিটিশ কলোনি সাম্রাজ্য শাসকের দখলে ছিলাম- আমাদের মতো দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনে যা মূলত কৃষি – এর সব উদ্বৃত্ত ইউরোপের ব্রিটেনে পাচার হয়ে গিয়ে জড়ো হয়েছিল। এগুলো সঞ্চিত হতে থাকা উদ্বৃত্ত সম্পদ। আরেক দিক থেকে দেখলে এগুলোই আবার বিনিয়োগ পুনঃবিনিয়োগ নামে আমাদের মত দেশে ফিরে হাজির হতে সক্ষম। এক কথায় এটাই ইউরোপের বিনিয়োগ সক্ষমতা। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেবল ইউরোপে নিজ নিজ মাস্টারের দেশেই এই বিনিয়োগ সক্ষমতার প্রয়োগ হয়েছিল। কিন্তু আমাদের মতো দেশে ফিরে বিনিয়োগ হতে যোগ্য হলেও তা হয়নি, ব্রিটেনের সাথে আমাদের ‘কলোনি সম্পর্কের’ কারণে। তবে ঐ বিনিয়োগ আমাদের মত দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হওয়া বা পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার মতো ঘটনাটা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তখনও ওর মালিকানা বিদেশের এবং মালিকের ইচ্ছার প্রাধান্যেই সে থাকে তবে আমাদের মতো দেশ বিনিয়োজিত হতে এবার আগ্রহী হয়। বাধ্য হওয়ার মত কারণটা হল,  ওই যুদ্ধের ফলাফলে সব ওলটপালট হয়ে তত দিনে হিটলারের পতনসহ পুরনো সকল কলোনি মাস্টারদের রুস্তমির দিন শেষ হয়েছে আর সারা ইউরোপে সবার নতুন নেতা, অর্থ ধারদাতা, ত্রাতা হয়ে উঠে এসেছিল আমেরিকা। এবং গুরুত্বপূর্ণ যে, আমেরিকা নিজের নতুন ভূমিকা সম্পর্কে পরিষ্কার নিশ্চিত ছিল। সেটা হলো, আমাদের মতো দেশের সাথে বৃটেনের পুরনো কলোনির ধরণের সম্পর্ক আর নয়, সমাপ্ত। এবার বরং পুঁজি বিনিয়োগকারী হিসেবে আমেরিকা আমাদের মতো দেশের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে। ফলে আমেরিকার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিশ্ব-পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সম্ভাব্য বিনিয়োগ খাতক হিসেবে আমরা তার জন্য লোভনীয় বিনিয়োগ পুঁজিবাজারের ক্রেতা হতে পারি। আমরা তার ক্রেতা হই এটা আমেরিকার দরকার। এরই প্রাতিষ্ঠানিক তৎপরতা হলো আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গড়ে ওঠা। আর এর ভেতর দিয়ে পুরানা দীর্ঘ অতীতে  লুণ্ঠিত ও পাচার হয়ে যাওয়া উদ্বৃত্ত নানা হাত ঘুরে যা এবার ‘বিনিয়োগ’ নাম নিয়ে কেবল নতুন শর্তে আমাদের মতো দেশে ফিরতে প্রস্তুত। শর্ত হলো ওই উদ্বৃত্ত বা বিনিয়োগের মালিক আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের গ্লোবাল পুঁজি বাজার।  ওর নিজের স্বার্থকে প্রাধান্যে রেখে আমাদেরকে গ্লোবাল পুঁজিবাজারের খাতক হতে দিতে চায়। সে বাংলাদেশে বিনিয়োজিত হতে চায় বিনিময়ে সে একটা সুদ চায়। এর আইনগত দিকগুলো সম্পন্ন হয়েছিল আগেই কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশ বিনিয়োগ অবস্থায় ফিরে আসতে সত্তর দশক লেগে যায়। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক নামের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে মূলত ঐ বিনিয়োগ, মাগনা অনুদান, নামমাত্র সুদের অবকাঠামোগত ঋণ হিসাবে আস্তে আস্তে আমাদের দেশে এসেছে। এবং এসবের পরিপ্রেক্ষিতে যতটা আকর্ষণীয় বাজার আমরা হতে পেরেছি সে মাত্রায় বাণিজ্যিক বিদেশী বিনিয়োগ এখানে এসেছে। একমাত্র এভাবে এ চেহারা ও শর্তেই কলোনি আমলে লুণ্ঠিত উদ্বৃত্ত নানা হাত ঘুরে ততটুকুই বাংলাদেশে ফেরত আসতে পেরেছে।
আমেরিকার হাতে পড়ে ‘উন্নয়ন’ শব্দটা এভাবে গ্লোবালি ও আমাদের দেশে নতুন অর্থ নিয়ে হাজির হয়েছিল। আবার গ্লোবাল পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখলে, অবকাঠামোগত বিনিয়োগে ‘উন্নয়ন’ কতটা হয়েছে কথাটার অর্থ আমরা গ্লোবাল বাণিজ্যিক বিনিয়োগের নামে কতটা উদ্বৃত্ত ফিরিয়ে আনতে পেরেছি, আমরা কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছি এরই গ্লোবাল সক্ষমতার প্রকাশ। কারণ এ দিয়েই বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট কোনো এক রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে কতটা তাল মিলিয়ে চলতে পারছে এর নির্ণায়কও। সম্ভবত এককথায় এভাবে বলা যায়, কলোনি সম্পর্কে ব্রিটিশের হাতে লুণ্ঠিত আমাদের উদ্বৃত্ত এবার আমেরিকার মাধ্যমে এরই যত কিঞ্চিৎ অনুদান, নামমাত্র সুদের অবকাঠামোগত ঋণ এবং মূল বাণিজ্যিক বিদেশী বিনিয়োগ হিসেবে ফেরত এসেছে- এভাবে ফেরত আসাটাকেই আমরা আসলে ‘উন্নয়ন’ বলে বুঝছি। এটাও উন্নয়ন ধারণার আর এক মাত্রা।

ওদিকে, মোটাদাগে চলতি একুশ শতকের শুরু থেকেই নতুন পরিস্থিতি নতুন আলামত দেখা দিতে শুরু করেছিল। ইতোমধ্যে ধীরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ঘটে গিয়েছিল। এর ভিত্তি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ফলাফলে গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নেতৃত্বে বদল। আমেরিকার বদলে চীনের নেতৃত্বের এক নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্ম হওয়া ও তা কার্যকর হওয়া শুরু করেছে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক নামের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে আমেরিকা আমাদের জন্য যা করতে পেরেছে তা হলো, আমরা কেবল পশ্চিমের পণ্যের খাতক না। আমাদের জন্য অন্তত গার্মেন্ট আর একেবারে কাঁচা-মাইগ্রেটেড অদক্ষ শ্রমের রফতানিকারক- এই পরিচয়ে একটা জায়গা করে দিতে সক্ষম হয়েছে আমেরিকা। উন্নতি বলতে এতটুকুই। আমেরিকার দেয়া উন্নয়নের অর্থ এর মধ্যেই সীমিত ছিল। ওর বৈশিষ্ট্যগত দিক হলো পশ্চিম বা আমেরিকা আবার নিজ বাজারে আমাদের পণ্য প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করেছে আর সামগ্রিকভাবে গ্লোবাল বাজারকে নিজের পক্ষে রেখে দিয়েছে।

কিন্তু এবার চীনের নতুন ভূমিকার কারণে চীন ধারণা দিচ্ছে – সে আরো কিছু সম্ভবত পারবে, যেটা আমেরিকার হাতে যা ঘটেছে এত প্রিমিটিভ নয়। যেমন এতদিন অবকাঠামো ধারণাটা কোনো একটা দেশের অভ্যন্তরীণ সীমায় সীমাবদ্ধ থাকত। অবকাঠামো গড়ে উঠত গরিব রাষ্ট্রের ভেতরেই। চীন পুরনো অবকাঠামো ধারণার ভেতরেই বাড়তি যে নতুন ধারণা হাজির করেছে সেটা ইন্টারন্যাশনাল অথবা বলা যায় আন্তঃরাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্যের। যেমন এক-বেল্ট-এক-সিল্ক-রোড বিনিয়োগ প্রকল্প। এটা ইউরোপ থেকে সড়কপথে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে, মধ্যএশিয়া হয়ে, চীন হয়ে এরপর সারা এশিয়ায় সবাইকে একই সড়ক অবকাঠামোতে যুক্ত করার প্রকল্প। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ওয়েবসাইটে এসব নিয়ে একাডেমিক আলোচনা শুরু হয়েছে। পুরনো বিশ্ব-অর্থনীতি যে ফর্মুলায় আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম পরিচালিত করত তা হল – গরিব দেশ থেকে কাঁচামাল তুলে নিয়ে আসা, গরীব দেশকে নিজ পশ্চিমের দেশে তৈরি পণ্যের ক্রেতা বানানো ইত্যাদি। এই ব্যবস্থার বদলে চীন মনে করে অন্তত এশিয়ার স্ব স্ব দেশেই ওই কাঁচামাল দিয়ে তাদের শিল্প সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলা সম্ভব, এমনকি চীনের নিজের ভারী শিল্পগুলোকে স্থানান্তর করে দেয়াও সম্ভব। এবং স্থানান্তরিত কারখানার পণ্য চীন নিজে আমদানি করতে রাজী। বিনিময়ে আরো জটিল চীনা পণ্য এশিয়ার অন্যেরা কিনে নিবে – এভাবে এগিয়ে যেতে চীন ভীত নয়। আমেরিকান ইকোনমিষ্টের ভাষায় এটা চীনের “build-it-and-they-will-come path”। এ জন্যই সে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্যের অবকাঠামো প্রকল্প যেমন এক-বেল্ট-এক-সিল্ক-রোড অথবা কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প যা গুচ্ছ কয়েক রাষ্ট্র ব্যবহার করবে, এসব বিশাল অবকাঠামো গড়তে আগ্রহী।
চীন বাংলাদেশে অবকাঠামোগত খাতে বিপুল বিনিয়োগ করতে সক্ষম ও আগ্রহী এ কথা গত ২০১০ সাল থেকেই জানিয়ে আসছে। বলা বাহুল্য, চীনের দিক থেকে ‘উন্নয়ন’ শব্দের পুরনো অর্থ চীন এখানে নিঃসন্দেহে বদলে ফেলবেই। এসব বিষয়ে আমাদের দিক থেকে এর ভালো-মন্দ অলিগলি বুঝে নেয়ার কাজ আমাদের জন্য পড়ে থাকছে। প্রয়োজন সে দিকে উপযুক্ত আগ্রহে সময় দেয়া।

[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৬ সংখ্যায় এবং দৈনিক নয়াদিগন্ত ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৬ সংখ্যায় আলাদা আলাদা লেখা আগের ভার্সান হিসাব ছাপা হয়েছিল। ঐ দুই লেখা একসাথে এখানে পরিবর্ধন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

goutamdas1958@hotmail.com

রাষ্ট্র কী কাউকে জামিনদার রেখে গড়ার কাজ

রাষ্ট্র কী কাউকে জামিনদার রেখে গড়ার কাজ

ভারতকে জামিনদার রেখে নেপালি রাষ্ট্র গড়ার খায়েস
৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬,বুধবার

গৌতম দাস
http://wp.me/p1sCvy-Fa

গত প্রায় চার মাস ধরে ল্যান্ড লকড নেপালে পণ্য প্রবেশ ও যাতায়াত রুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এটা মূলত ভারতের আরোপ করে অবরোধ। জ্বালানি তেল, রান্নার গ্যাসসহ ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামাল সব কিছুর সরবরাহ এতে ব্যাহত হচ্ছে। এক কথায় বললে ভারত থেকে নেপালে যাওয়া সব পণ্যের চালানের উপর অবরোধ চলছে। নেপাল ল্যান্ড লকড ভূখণ্ড বলে সে ভারতের মধ্য দিয়ে পণ্য আনা-নেয়ায় নির্ভরশীল।
গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ নেপাল তার নতুন রাষ্ট্র গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ কনষ্টিটিউশন প্রণয়ন ও রচনার সমাপ্তিতে তা কার্যকর-চালুর ঘোষণা দিয়েছিল। প্রত্যেক রাষ্ট্রের জন্য এটা এক গুরুত্বপুর্ণ প্রক্লেমেশন। এই প্রক্লেমশনে ভিন-রাষ্ট্রের খুশি বা দুঃখ পাবার কো বিষয় নয়। কিন্তু সেই থেকে অখুশি অসন্তুষ্ট ভারত পণ্য অবরোধের রাস্তা ধরেছিল। ভারতের ব্যাখ্যা অনুসারে, দেশটি স্বীকার করে না যে- ভূমি আবদ্ধ নেপালে পণ্য সরবরাহের একমাত্র পথ ভারত অবরুদ্ধ করেছে। যদিও এটা প্রমাণিত যে ভারতীয় কাস্টম এবং বর্ডার গার্ড বিএসএফ স্পষ্ট বলছে যে ‘ওপরের নির্দেশে’ তারা এটা বন্ধ রেখেছে। তবু ভারতের ব্যাখ্যা হলো, নেপাল-ভারত সীমান্তের অধিবাসী যারা সমতলীয় ‘ত্বরাই’ অঞ্চলের বাসিন্দা ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এদেরই বড় অংশ হলো মাধেসি জনগোষ্ঠী। যারা মনে করে নতুন কনস্টিটিউশনে তাদের প্রতিনিধিত্ব সঠিক ভাবে হয় নাই, কম করে রাখা হয়েছে। এজন্য তারা অসন্তুষ্ট হয়ে নেপাল-ভারত সীমান্ত অবরোধ করে রেখেছে। ভারত থেকে পণ্য আসা বন্ধ করেছে। ব্যাখ্যা যার যাই হোক, বাস্তবতা হল এটা কার্যত নেপালের জন্য সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক অবরোধ। আর সেই সূত্রে তা নেপালের রাজনীতিতে রাজনৈতিক স্থবিরতা তৈরি করেছিল। সম্প্রতি এই স্থবিরতা কাটার লক্ষণ দেখা দিয়েছে।
নেপালের জনগোষ্ঠী গঠনের মধ্যে এমনিতেই সমতল-পাহাড়ি এমন ভূবৈশিষ্ট্যগত বিভেদ আগে থেকে ছিল। কিন্তু একালে নেপাল-ভারত সীমান্তের জনগোষ্ঠী সমতলী অঞ্চলের মাধেসি নেতারা তাদের স্বার্থ নেপালে ভারতের স্বার্থের সাথে মাখিয়ে গাঁটছড়া বেঁধে তুলে ধরাতে নিজ নেপালিদের জনগোষ্ঠীগত স্বাভাবিক বিভেদকে অস্বাভাবিক ও বড় করে ফেলা হয়েছে।

নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৮ সালে ঐতিহাসিক পাশ ফেরার মতো প্রধান ঘটনা হল গত ২৪০ বছরের নেপালের শাসক ‘শাহ’ রাজবংশের শাসনের পরিসমাপ্তি। যেটাকে আমরা রাজনৈতিকভাবে নতুন এক বিপ্লবী গণরাজনৈতিক ক্ষমতার উত্থানের ফলে রাজতন্ত্রের শাসনের অবসান ও রাজতন্ত্র ব্যবস্থার সমূলে উচ্ছেদের ঘটনা হিসেবে দেখতে পারি। ব্যাপারটাকে প্রতীকী দিক থেকে বললে এতে রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে একটা রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে, এর বদলে এক প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এ ছাড়া এসব ঘটনাবলির ভেতর দিয়ে প্রকাশিত আরেক ঐতিহাসিক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী সত্য হল, নেপালের রাজতন্ত্র ব্যবস্থা উচ্ছেদের লড়াইয়ে ভারতের ভূমিকা ছিল আমেরিকার সহায়তায় কেবল ইতিবাচক সহযোগী বা সমর্থকের নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারকের। রাজতন্ত্র উচ্ছেদের লড়াই – শুরু করার দিক থেকে এতে একক নির্ধারক ভূমিকা রেখেছিল নেপালের নতুন মাওবাদী রাজনৈতিক ধারার দল ইউনাইটেড কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওবাদী) বা ইউসিপিএন (মাওবাদী)। যারা এ লড়াইকে কেবল নিজ মাওবাদীদের নয়, সারা নেপালি জনগোষ্ঠীর লড়াই এবং এটা নেপালিদের সাধারণ ও প্রধান স্বার্থ হিসেবে হাজির করতে সক্ষম হয়েছিল। এরপর নেপালের সব সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে এর পক্ষে সমর্থক হিসেবে সংগঠিত করা- কাজের এই শেষের অংশে আরো দুই প্রচলিত রাজনৈতিক দলের ভূমিকা ছিল। এরা হলো আমাদের সিপিবির মতো কনস্টিটিউশনাল কমিউনিস্ট দল- কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড এমএল ) এবং নেপালি কংগ্রেস। নেপালের রাজনীতিতে মাওবাদীরাসহ এ তিনটি দলই সেই থেকে ৮০-৮৫ শতাংশ নেপালি জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। বলা যায়, রাজতন্ত্র-উত্তর রাজনৈতিক ক্ষমতা ও শক্তির নিয়ন্ত্রক হল এই তিনটি দল, যাদের মধ্যে তা ভাগাভাগি হয়ে আছে। আর এ তিনটি দলের জোটের পেছনেই ভারত পূর্ণ সমর্থন জুগিয়ে নেপালের রাজতন্ত্রে সমাপ্তিতে ইতিবাচক ও নির্ধারক ভূমিকা রেখেছিল।
কিন্তু রাজতন্ত্র উৎখাত হলেও নেপালে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করা যায়নি। নেপালের প্রধান রাজনৈতিক সমস্যা এখানেই। প্রধান কারণ, নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে উত্থিত ক্ষমতায় ভারতের কোনো ভাগ বা স্টেক নেই। নেপালি রাষ্ট্রক্ষমতায় ভারতের স্বার্থের প্রতিনিধি কেউ নয়, নেই। কারণ রাজতন্ত্র উৎখাতে নির্ধারক পর্যায়ের ভূমিকা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে ভারত এটা নিজগুণে বিষাক্ত করে ফেলেছে। ভারতের ট্র্যাজেডি হল সে ঠিক কী চায়, কিভাবে চায় এ ব্যাপারে হোমওয়ার্ক করা সুনির্দিষ্ট ও উপযুক্ত – নেপালের স্বার্থের ভেতর দিয়ে তা ভারতেরও স্বার্থ এভাবে এমন কোনো নীতি-পলিসি পেশ করা ও এর পক্ষে সমর্থন আদায় করতে না পারার কারণে সে নেপালের ক্ষমতার স্টেক থেকে বিচ্ছিন্ন। মনে রাখা যেতে পারে, মাওবাদীদের ১৯৯৬ সালে ৪০ দফার দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলনের শুরুর সময় তারা নেপাল-ভারত কলোনিয়াল চুক্তির (১৯৫০ সালের চুক্তি) বিরুদ্ধে আঙুল তুলে এবং ভারতকে নেপালের প্রধান শত্রু বলে চিহ্নিত করে ওই আন্দোলন শুরু করেছিল। ফলে খুব সম্ভবত ঐ চুক্তি ও ভারত সম্পর্কে এই মূল্যায়ন প্রসঙ্গে এ তিন দলের কিছু অভিন্ন মূল্যায়ন, অলিখিত সমঝোতা আছে। তৈরি হয়েছে। ফলে এই তিন দল যাদের নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও নেপালের বর্তমান নতুন শক্তি ক্ষমতা তাদের হাতে ও নিয়ন্ত্রণে। সব ক্ষমতা এ তিন দলের হাতে ভাগাভাগি হয়ে আছে। আর এরই প্রতীকী প্রকাশ তারা ঘটিয়েছে নেপালের নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দিয়ে ও পরবর্তীকালে সরকার গঠন করে। নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দেয়ার পর থেকে মাওবাদী দলের সমর্থনে অপর কমিউনিস্ট দল সিপিএন (ইউএমএল) এখন সরকার গঠন করে ক্ষমতায়, যার প্রধানমন্ত্রী খার্গা প্রসাদ শর্মা অলি। আর এই সরকার গঠনের আগে সংসদের ভোটাভুটিতে নেপালি কংগ্রেস এ’দুই কমিউনিস্ট দলের জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছে হেরে গিয়ে বিরোধী দলে আসন নিয়ে আছে।
আর এটাই ভারতের রাজনীতিবিদ ও আমলাদের ব্যর্থতা-অযোগ্যতাকে রেজিস্টার্ডভাবে প্রমাণিত করেছে যে, এ তিন দলের হাতে ভারতের স্বার্থ উপেক্ষিত। এ তিন দল ভারতকে দায় মনে করে, ব্যাগেজ হিসাবে দেখে। ভারতের ব্যাগেজ বইতে এরা কেউ এখনো রাজি নয়। ফলে নেপালের তৈরি হওয়া নতুন ক্ষমতায় ভারতের কোনো স্টেক নেই। উপায়ান্তর না দেখে ভারতকে এখন ভরসা করতে হচ্ছে নেপালের অ-প্রধান ধারার জনগোষ্ঠী, সমতলীয় ত্বরাই অঞ্চলসহ অন্যান্য অধিবাসী মূলত মাধেসিদের রাজনীতির ওপর।
এককথায় বললে এই রাজনৈতিক উপস্থাপন সেকটারিয়ান, বাংলায় আমরা যেটা সাম্প্রদায়িক বিভক্তির রাজনীতি বলে চিনি। যদিও ভারতে – এরা ভারতের সব মিডিয়া এই রাজনীতিকে হাজির করছে, যেন নেপালি সংখ্যালঘুদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর জন্য ভারত এটা করছে। অথচ সত্যিকার ঘটনা হলো ২০০৬-২০০৯ সাল, যেটা নেপালের রাজনীতির মৌলিক বদলের দিক থেকে টার্নিং পয়েন্ট- এটাই আনুষ্ঠানিকভাবে নেপাল থেকে রাজতন্ত্র উঠে যাওয়ার তাৎক্ষণিক আগের ও পরের সময় – সে সময়ে নেপালের রাজনীতিতে মাধেসি বলে কোনো ইস্যু কোনো কিছু ছিল না।
নেপালের জনসংখ্যার বিন্যাসের দিক থেকে এটা বলা হয়, পাহাড়ি-সমতলি হিসেবে জনসংখ্যা প্রায় সমান দু’ভাগে বিভক্ত। আবার কেবল মাধেসিদের নিয়ে রাজনীতি করে নেপালে এমন আঞ্চলিক দলের প্রায় শেষ নেই। আর এমন আঞ্চলিক দল খোলার হিড়িক লেগেছিল ২০০৯ সালে, যখন ‘মাধেসি’ ইস্যু হতে শুরু করে। এর আগে মাধেসিরা সবাই প্রধান ধারার ওই তিন দলের কোনো একটা করত, বেছে নিত। আর এর মধ্য দিয়েই নিজেদের প্রতিনিধিত্ব পেত। অর্থাৎ ওই তিন প্রধান রাজনৈতিক দল দুই কমিউনিস্ট ও নেপালি কংগ্রেস এর আগে মাধেসিসহ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর পুরোটাকেই প্রতিনিধিত্ব করত। তবে মাধেসিদের নানান আঞ্চলিক দল হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও যারা প্রো-ইন্ডিয়ান অবস্থান নিয়েছে এরা ছাড়াও  মাধেসিসহ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর একটা বড় অংশকে এখনো ঐ তিন দলই প্রতিনিধিত্ব করে।
যেমন যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম অবরোধে আটকে থাকা নেপাল বা নেপাল-ভারত সম্পর্ক, এর জট খোলার আলামত দেখা যাচ্ছে। সংসদে নেপালের কনস্টিটিউশনে প্রথম সংশোধনী আনা হয়েছে। গত ২৩ জানুয়ারি তা পাস হয়েও গেছে। মোট ৬০১ মোট সদস্যের এই সংসদে প্রো-ইন্ডিয়ান অবস্থানের মাধেসি সদস্য যারা ভোটাভুটির সময়ের আগেই ওয়াকআউট করে গেছে, এরা হলো মাত্র ৩৫ জন। সংশোধনীটা পাস হয়েছে মোট ৬০১ সদস্যের মধ্যে ৪৬১ সদস্যের পক্ষ ভোটে। সাত সদস্যের বিপক্ষ ভোটে। আর ঐদিনের সভায় অনুপস্থিত সদস্য মোট ১২৮ জন, যার মধ্য মাধেসি  ঐ ৩৫ জনও অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ যারা অবরোধের পক্ষে এমন মাধেসি সংসদ সদস্য মাত্র ৩৫ জন। ফলে ভারত প্রচার চালাবার সময় মাধেসিসহ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠি গুলো জনসংখ্যার অর্ধেক বলে প্রপাগান্ডা করলেও ফ্যাক্টস হল, মাধেসি জনগোষ্ঠি আঞ্চলিক প্রো-ইন্ডিয়ান দলগুলোকে ভোট দেয় নাই। এজন্য তারা মোট ৬০০ জনের মধ্যে মাত্র ৩৫ জন।
প্রো-ভারত মাধেসি দলগুলোকে নিয়ে আঞ্চলিক সবচেয়ে বড় জোট হলো ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক মাধেসি ফ্রন্ট। গত চার মাসের অবরোধে রাজনীতিতে তারা শুধু শাসক ক্ষমতাসীনদের থেকেই নিজেদের বিচ্ছিন্ন করেনি ও বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি, বরং একই সাথে নেপালের সাধারণ মানুষ, প্রধান ধারার পাহাড়ি জনগোষ্ঠী থেকেও নিজেদের দূরে দাঁড় করিয়েছে। নিজেদের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শত্রুর কাতারে দাঁড় করিয়েছে। একই ভূখণ্ড ও রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানান ধরনের স্বার্থবিরোধ থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বার্থবিরোধ থাকা এক জিনিস, আর সেই বিরোধকে শত্রুতায় রূপ দেয়া আরেক জিনিস। গত পাঁচ মাসে এই বিপজ্জনক শত্রুতার আগুন নিয়ে খেলার কাজটা ভারতের প্ররোচনায় মাধেসিরা করেছে।
নেপালের কনস্টিটিউশনে প্রথম সংশোধনী আনার পরের পরিস্থিতিকে ভারতের হিন্দুস্থান টাইমস বর্ণনা করছে এভাবে, বলছে “এর পরও ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক মাধেসি ফ্রন্ট এই সংশোধনী প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলছে এটা তাদের কিছু দাবি মেনেছে, সব নয়। কিন্তু নেপালের এই নতুন অবস্থান নেপাল ও ভারতকে কাছাকাছি এনেছে”। হিন্দুস্থান টাইমসের এই মন্তব্যে অনেক কিছুর ইঙ্গিত আছে। যেমন- এখনকার এক নম্বর বাস্তবতা হলো পাঁচ মাস ধরে অবরোধ চালানোর পরে মাধেসিদের পক্ষে এই আন্দোলন আর চালানোর অবস্থায় নেই। এমন ধারণা ভারত দিতে চাইছে। গত ২৬ জানুয়ারি রয়টার্সের এক রিপোর্টে এ বিষয়ে এক ডিটেইল নিউজ এসেছে। ওদিকে নেপালি সংসদে সংশোধনী পাস হওয়ার পর ভারত একে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও আসলে ভারত ও প্রো-ভারত মাধেসিদের অবস্থান হল, তারা সম্ভবত অবরোধ একেবারে না তুলে ধীরেসুস্থে তুলতে চাচ্ছে। কারণ, এত দিন তারা আন্দোলন এমনভাবে পরিচালিত করেছে, যেন তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন করছে, নেপাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। ফলে সে চিন্তায় বিচ্ছিন্নতার জায়গা থেকে ফেরত আসতে সময় লাগবে। এ ছাড়া আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের কথা চলছে। ওই সফর শেষে অবস্থা বুঝে এরপর পরিস্থিতি আস্তে ধীরে সহজ হতে পারে। যদিও লিখিতভাবে ভারতের স্বাগত জানানো বিবৃতিতে অবরোধ পরিস্থিতি এখন থেকে স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো সংবিধানে সংশোধনী আনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রো-ভারত ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক মাধেসি ফ্রন্টের নেতা রাজেন্দ্র মাহাতোর দাবি। তিনি দুটো অদ্ভুত দাবি করেছেন। যার ভেতর দিয়ে নেপালের নতুন ক্ষমতায় স্টেক হারানো ভারতের করুণ দুর্গতিই প্রকাশ করে। আবার এই দাবির ভেতর দিয়ে একই সাথে মাধেসি সেক্টরিয়ান বা বিভক্তির রাজনীতির আগুন নিয়ে খেলার বিপজ্জনক দিকটি উদোম হয়েছে। যে আগুন ভারতের জন্যও সমান বিপদের হতে পারে। মাহাতোর দাবি, ভারতকে তিনি নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জড়িত হোক বা হস্তক্ষেপ করুক দেখতে চান। আর দ্বিতীয়ত, নেপাল সরকার যেসব আইনি সংশোধনী যা আনছেন তা বাস্তবায়নে তিনি ভারতকে জামিনদার বা গ্যারান্টার হিসেবে দেখতে চান।

সত্যিই এমন তামাশা সহজে খুব একটা দেখা মেলে না। ভারতের সেক্টরিয়ান রাজনীতির মহিমা এমনই যে, মাধেসি নেতারা এখন বলছেন নেপাল সরকারকে বিশ্বাস নেই, ভারতকে জামিনদার হিসেবে চাই! খবরটা ১৮ জানুয়ারির ভারতের দি হিন্দু পত্রিকার বরাতে একই দিন ১৮ জানুয়ারি আমাদের দৈনিক বণিক বার্তা ছেপেছে। অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে, মাধেসি নেতাদের কী বলা উচিত আর কী নয়, এসব শিখিয়ে-পড়িয়ে আনার ব্যাপারেও ভারত একেবারেই নাদান। মাহাতোর এই কথা প্রমাণ করেছে তিনি রাষ্ট্র সম্পর্কে মৌলিক ধারণাও রাখেন না। তিনি রাষ্ট্র কী তা-ই বোঝেননি। ফলে তার এমন দাবি। অথচ রাষ্ট্র গঠন করা ভিনরাষ্ট্রকে জামিনদার রেখে করার জিনিস নয়। আবার রাষ্ট্র গঠনের কাজ নিজে করার কাজ; বাইরের কাউকে হস্তক্ষেপ করতে ডেকে করার কাজও নয়। নিজ জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভিন্ন নাগরিক ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠিত হয়। আর ঐ ভিত্তির গাঠনিক দলিল হল কনস্টিটিউশন। বাইরের জামিনদার নয়। তাই রাজেন্দ্র মাহাতো তিনি আসলেই বড়জোর নেপাল রাষ্ট্রে ভারতের স্বার্থের এজেন্ট হয়েই থাকতে চান। এতটুকুর জন্যই তিনি যোগ্য। এটা যেন বাবাকে জামিনদার রেখে কেউ বিয়ে করতে চাওয়ার শখ প্রকাশ করছে। অথচ যেখানে জামিনদার রাখার কথা ভাবতে হয় সেটা কি বিয়ে!
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে ৩১ জানুয়ারি দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এর প্রিন্ট পত্রিকায় এবং পরের দিন ০১ ফেব্রুয়ারি দৈনিক নয়া দিগন্ত প্রিন্ট পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। খানে তা আবার পরিমার্জন সংযোজন এবং এডিট করে ছাপা হল।]