বিচারকের ‘জাতির সম্মিলিত বিবেকের’ নামে প্রতিহিংসা চর্চা


রাষ্ট্রের কারও বিচার করা মানে কীঃ
‘জাতির সম্মিলিত বিবেকের’ নামে প্রতিহিংসা চর্চা করা
গৌতম দাস
০৭ মার্চ ২০১৬, সোমবার
http://wp.me/p1sCvy-LB

অবশেষে জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ)  ছাত্রসংসদের নেতা কানহাইয়া কুমারকে ভারতের আদালত জামিন দিয়েছে। তিনি এখন মুক্ত। দেশদ্রোহ মামলায় গত ফেব্রুয়ারি মাসের নয় তারিখ থেকে তিনি গ্রেফতার ছিলেন। ভারতের মিডিয়া এতদিন জেএনইউ আর কানহাইয়া শব্দে  তাদের পাতা ভরিয়ে রেখেছিল। সে উত্তেজনা সীমান্ত ছাড়িয়ে বাংলাদেশেও এসে পড়েছিল।  আবেগ শুণ্য হয়ে বিষয়টা একটু রিভিউ করার এবার সম্ভবত সময় হয়েছে।

মুল ঘটনার সংক্ষেপ হল, ২০০১ সালে ডিসেম্বরে ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে এক সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছিল। অনুমান করা হয় কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাজ এটা। পাঁচজন হামলাকারীসহ মোট ১৪ জন ওই হামলায় নিহত হন। পরে ওই হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় অন্য অনেকের সাথে এক আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। আদালতের রায়ে তার ফাঁসির আদেশ হয়। কিন্তু ওই আদেশ সঙ্গোপনে বাস্তবায়ন করা হয় এবং ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেলখানার ভেতরেই তাকে কবর দেয়া হয়েছিল। ফাঁসি্র দড়িটানার দিনক্ষণ কবে কখন তা স্ত্রী, পরিবার, আত্মীয়স্বজন কাউকেই আগে জানানো হয়নি। তবে ফাঁসি কার্যকর করার পরের দিন সকালে তা সকলকে জানানো হয়। আর জনরোষের ভয়ে আফজাল গুরুর লাশ স্ত্রী,পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকে কখনই দেয়া হয়নি। এমনকি জেলে আফজালের ব্যবহার্য জিনিসপত্রও কখনই ফেরত দেয়া হয়নি। তার বিচার সঠিক হয়নি, ত্রুটিপূর্ণ ইত্যাদি অভিযোগ সে সময়ই উঠেছিল; কিন্তু সেগুলো সুরাহা না করেই ফাঁসি দেয়া হয়েছিল- ভারতের জনসমাজের কোথাও কোথাও এমন অনুমান এখনও বজায় আছে।

রাজনৈতিক কমিউনিটি তৈরি করে না নিলে বিচ্ছিন্নতাবাদ আসে
ভারত এক এককাট্টা ভুখন্ড এক রাষ্ট্র, আজ বেশির ভাগের মানুষের মনে ধারণাটা এমন। যদিও খোদ বৃটিশ আমলেও তা এককাট্টা বৃটিশ-ইন্ডিয়া রাষ্ট্র ছিল না। ছিল তিন প্রেসিডেন্সী (বেঙ্গল, মাদ্রাজ ও বোম্বে) আর প্রায় ৫৫০ টার মত ছোট-বড় নানান করদ রাজ্য বা প্রিন্সলি স্টেট – এই সবকিছু মিলিয়ে কালেকটিভ ভুখন্ডটাকে বৃটিশ-ইন্ডিয়া বলা হত। অবশ্য সময়ে নানান এলাকাকে প্রশাসনিকভাবে প্রদেশও ঘোষণা করা হয়েছিল। এককথায় বললে, অন্ততপক্ষে আজ ভারত যেমন নানান রাজ্যে সীমানায় (সর্বশেষ সম্ভবত ২৯টা) বিভক্ত, সেরকম কোন রাজ্য বা সীমানা ধারণা তখন ছিল না। এই সীমানা টানা হয়েছে ১৯৪৭ সালের পরের সময়ে বিভিন্ন রাজার রাজ্য একেক রাজ্যের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে অথবা বিচ্ছিন্ন করে। তাহলে দাড়াল, বৃটিশ-ইন্ডিয়ার পুরা প্রায় ২০০ বছর ভারত বলতে কোন ইন্টিগ্রেটেড বা সম্মনিতভাবে অন্তর্ভুক্ত কোন ভুখন্ডকে বুঝান হত না। বৃটিশ-ইন্ডিয়ার পরিসমাপ্তিতে ১৯৪৭ সালে ইউনিয়ন রাষ্ট্র বা ইউনাইটেড ভারত বলে একটা কিছু খাড়া করা হয়েছিল বটে কিন্তু তা করা হয়েছিল উপাদান হিসাবে একমাত্র বলপ্রয়োগকে ব্যবহার করে, সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে। আর কোন উপাদানের কথা ভাবাও হয় নাই, উপস্থিত ছিলও না। তবে এক উপাদানের কথা বলা যেতে পারে, হিন্দুত্ত্ব বলে এক ধারণা। এসব কারণে ভারত ভুখন্ডের “রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি” হিসাবে আবির্ভাব অথবা রাজনৈতিক কমিউনিটি বা এক রাজনৈতিক পরিসর হিসাবে আবির্ভাব সব সময়ই খুবই দুর্বল  থেকে গেছে। এটাকে আর এক দিক থেকে কেউ বিশাল ভারতের ইন্টিগ্রেশনের দুর্বলতাও বলতে পারেন, যেটা ১৯৪৭ সালে জন্ম থেকেই এবং একমাত্র বলপ্রয়োগ করে তা মোকাবিলার চেষ্টাও সেই থেকে। বৃটিশ আমলে ভারতে বৃটিশরা ছিল খোলাখুলি বলে কয়ে কলোনি শাসক এবং এক ধরণের দুর্বল ইন্টিগ্রেটেড ভুখন্ড বৃটিশ-ভারত। আর ১৯৪৭ সালের পর জবরদস্তিতে জড়ো করা সেটাকেই দাবি করা হল এককাট্টা এক ভুখন্ড। আর কলোনির বদলে এবার দাবি করা হল সেটা একটা  মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্র। এসব কিছুরই বিপরীত দিকটা বা প্রতিক্রিয়াগত দিকটা হল বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতির আবির্ভাব। কাশ্মীর ভারতের তেমন এক বিচ্ছিন্নতাবাদিতার সমস্যার নাম।

রাষ্ট্রদ্রোহ নাকি খোদ রাষ্ট্রেরই নাগরিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করা
বিতর্কিত বিচারে কাশ্মিরি বিচ্ছিন্নতাবাদীর ফাঁসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো ভারতে কি বৈধ হবে, না রাষ্ট্রদ্রোহ মনে করা হবে – এমন আদলের এক তর্ক ও মামলা এখানে জড়িয়ে আছে। আফজাল গুরুর ফাঁসি দেয়া হয়েছিল ২০১৩ সালের ০৯ ফেব্রুয়ারি। সে হিসাবে এবার তৃতীয় বার্ষিকীতে তা স্মরণ করতে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল জওয়াহেরলাল নেহরু  বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক কিছু ছাত্র সংগঠন। পালটা জমায়েত নিয়ে এর বিরোধীতায় নামে বিজেপির ছাত্র সংগঠন। এতে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়াতে মাঝখানে পুলিশ এসে দাড়ায়। কানহাইয়া বামপন্থী সিপিয়াই এর রাজনীতিতে জড়িত। তাঁর দাবি ছাত্র সংসদের সভাপতি হিসাবে উত্তেজনা থামাতে তিনিও সেখানে গিয়েছিলেন। আর মোদীর দল ও পুলিশের দাবি তিনিই সেখানে রাষ্ট্রবিরোধী শ্লোগান দিয়েছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন। এতে কানহাইয়াসহ মোট সাতজন অন্যান্য ছাত্রও গ্রেফতার হয়ে ছিলেন। সাধারণ ছাত্রছাত্রী এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি মনে করছে এটা অন্যায় এবং মোদি সরকারের এই পদক্ষেপ বাড়াবাড়ি। যদিও তাদের বিরুদ্ধে বিজেপি-মিডিয়ার ভাষ্য হলো, তারা ভারত ‘কাশ্মির দখল করে রেখেছে’, ‘ভারত ধ্বংস (ভারত কা বরবাদি তক) হয়ে যাওয়া পর্যন্ত কাশ্মিরের স্বাধীনতা (আজাদী) আন্দোলন চলবে’ ইত্যাদি বক্তব্য ও স্লোগান দিয়েছে যেগুলো দেশদ্রোহী স্লোগান। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং টুইটারে লিখেছেন, তিনি ‘এন্টি ন্যাশনাল এলিমেন্টদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে’ যেতে দিল্লি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে রেইড দেয়া ছাড়াও ‘অ্যান্টি ন্যাশনাল স্লোগান’ দেয়ার জন্য দেশদ্রোহিতার অভিযোগে মামলা দিয়েছেন। আলজাজিরার দিল্লি ব্যুরো চিফ অমল সাক্সেনা লিখেছেন, রাজনাথ বলেছেন, ‘কেউ যদি ভারতবিরোধী স্লোগান দিয়ে থাকে জাতির সার্বভৌমত্ব ও সংহতিকে চ্যালেঞ্জ করে এটা সহ্য ও বরদাশত করা হবে না’। ও দিকে এর পাল্টা উদার রাজনীতির (লিবারেল) বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বক্তব্য হলো, ‘সরকার ভিন্নমত অধিকার ছিনিয়ে নিচ্ছে’, ‘তারা মুক্ত চিন্তার ওপর আক্রমণ করছে’, ‘নিরীহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা টার্গেট হয়েছে’ ইত্যাদি। তাই এর বিরুদ্ধে সেই থেকে ধারাবাহিকভাবে ছাত্রছাত্রীরা ধর্মঘট-আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী, বামজোট সিপিএমের নেতা সীতারাম ইয়াচুরি বিশ্ববিদ্যালয় গ্রেফতারের দুদিনের মাথায় ক্যাম্পাসে এসে এই আন্দোলনের সাথে সংহতি জানানোর পড় থেকে তা ভারতের জাতীয় রাজনীতির এক ইস্যু হয়ে উঠেছিল। এর এক দিন পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং অভিযোগের ক্যাম্পেইন প্রপাগান্ডা আর এক ধাপ চড়িয়ে ছিলেন। তিনি টুইটে দাবি করলেন ওই স্লোগান তোলার ঘটনায় পাকিস্তানের সন্ত্রাসী সংগঠন লস্করই তৈয়বার প্রধান নেতা হাফিজ সাঈদয়ের মদদ ছিল। পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা এ প্রসঙ্গে শিরোনাম করে লিখেছিল এটা ‘তিলকে তাল করা’। রাজনাথ দাবি করেছিলেন ‘জনগণকে বুঝতে হবে’ হাফিজ সাঈদ পাকিস্তান থেকে ওই দিনের কর্মসূচিকে সমর্থন করার জন্য আহ্বান রেখেছেন। কিন্তু পরদিন জানা গেল ওই কথিত বিবৃতি পাকিস্তানের হাফিজ সাঈদের নয়, আসলে ওই নামে একটা নকল বেনামি অ্যাকাউন্টের। দিল্লি পুলিশই সেটা নিশ্চিত করেছিল। আবার খোদ হাফিজ সাঈদ পাকিস্তান থেকে নিজে বিবৃতি দিয়ে এটা অস্বীকার করেছিল। কিন্তু ততক্ষণে রাজনাথ সিং প্রপাগান্ডা করার যা কিছু সুখ পাওয়া যায় তা কামাই করে নিয়ে ফেলেছেন। গ্রেফতার করা ছাত্ররা বেশির ভাগই পিএইচডি এর ছাত্র। ইতোমধ্যে তাদের দফায় দফায় বর্ধিত রিমান্ড শেষ হয়েছে। কিন্তু পরপর দুদিন দিল্লির পাতিয়ালা এলাকা আদালতপাড়ায় জামিনের জন্য যাতায়াত করার সময় এক অবাক করা এবং মারাত্মক কাণ্ড ঘটেছিল। আদালতপাড়ায় পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় আসামি কানহাইয়া ও তাঁর উকিল বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের সমর্থক ওপ উকিলদের হাতে মার খেয়েছেন। আর শুধু তিনি নন, তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠি বন্ধু, শিক্ষক এমনকি সাংবাদিকেরাও সেখানে মার খেয়েছেন পরপর দু’দিনই। আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, “চলতি সপ্তাহে পাটিয়ালা হাউজ কোর্টে পরপর দু’দিন বিজেপি এবং সঙ্ঘ পরিবারের সমর্থকদের হাতে মার খেয়েছিলেন জেএনইউয়ের শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী এমনকি সাংবাদিকেরাও। বুধবার পুলিশি ঘেরাটোপে থাকা সত্ত্বেও আক্রান্ত হন কানহাইয়া, যা দেখে শিউরে ওঠে পুলিশ কমিশনারের কাছে রিপোর্ট তলব করে শীর্ষ আদালত। এরপরই সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে জামিনের আবেদন করার সিদ্ধান্ত নেন কানহাইয়ার হয়ে মামলা লড়তে আসা সোলি সোরাবজি, রাজু রামচন্দ্রন, রাজীব ধবনের মতো প্রবীণ আইনজীবীরা”। আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে হামলায় নেতৃত্ব দেন দিল্লির বিজেপি বিধায়ক ও পি শর্মা।
কিন্তু সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে জামিন চাওয়াতে কিছুটা হিতে বিপরীত ঘটে গেছিল। কানহাইয়ার উকিলেরা আদালতে কানহাইয়ার নিরাপত্তা ও পাটিয়ালা হাউজ কোর্টের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির যুক্তি দেখিয়ে  হাহকোর্টও ফেলে সরাসরি তাদের সুপ্রিম কোর্ট আসার কারণ ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু সুপ্রীমকোর্টের বিচারপতিরা বলেন, ওই জেলা আদালতের ‘অস্বাভাবিক’ পরিস্থিতি সম্পর্কে তারাও অবহিত। কিন্তু সে ক্ষেত্রে হাইকোর্টে যাওয়া উচিত ছিল। কানহাইয়ার আইনজীবীরা যুক্তি দেন, পাটিয়ালা হাউজ কোর্ট ও দিল্লি হাইকোর্ট একই চত্বরে। তাই তারা নিরাপত্তার অভাব বোধ করাতে সেখানেও যান নাই। সরকারি আইনজীবীরা পাল্টা বলেন, হাইকোর্টে নিরাপত্তার সমস্যা নেই। বিচারপতিরা তখন বলেন, “সুপ্রিম কোর্টই একমাত্র নিরাপত্তা দিতে পারে, বাকি আদালত পারে না তারা এমন কোনো বার্তা দিতে চান না। আর এতে সবাই কিছু হলেই সরাসরি সুপ্রিম কোর্টেই জামিন চাইতে আসার জন্য উৎসাহিত হয়ে যাবে”। আনন্দবাজার মন্তব্য করে লিখছে, “বিচারপতিদের কথায় যুক্তি আছে অবশ্যই। কিন্তু এ থেকে ভারতের খোদ রাজধানীর এক জেলা আদালতের পরিস্থিতি সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া গেল তা ভয়ঙ্কর”। বাংলাদেশের আদালতপাড়ায়ও বিচারকের উপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে প্রভাবিত করাসহ নানা সমস্যা আছে সন্দেহ নেই। কিন্তু জামিন চাইতে এসে হেফাজতে থাকা আসামি এবং আসামির উকিলকে সরকারি দলের হাতে মার খেতে হয়েছে, এটা আমরা এখানে এখনো কল্পনা করতে পারিনি।
আনন্দবাজার আরও জানিয়েছিল, “তবে সুপ্রিম কোর্ট মামলা না শুনলেও দিল্লির পুলিশের ওপর নিরাপত্তা দেয়ার নির্দেশ জারি করার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে গেছে। এমনকি শুধু নির্দেশ নয়, এ বিষয়ে কেন্দ্রের সলিসিটর (অ্যাটর্নি) জেনারেল রঞ্জিত কুমারের কাছ থেকে রীতিমতো আশ্বাস আদায় করে নিয়েছেন বিচারপতিরা”। অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে সঠিক জায়গা আর ঠিক সময়মতো ধরতে পারলে ভারতের বিচার ব্যবস্থায়ও ‘মার খাওয়ার’ বিরুদ্ধে প্রতিকার আছে।

হিন্দুত্বগিরি ভুলে লিবারেল গণতন্ত্রী হওয়ার হাওয়া কেন
কিন্তু হঠাৎ করে ভারতে বিজেপি বিরোধীদের এমন এক হাওয়া বইছে, যেন ভারত হিন্দুত্বগিরি ভুলে গেছে। লিবারেল গণতন্ত্রী হয়ে গেছে সবাই এবং যেন এমন চিন্তাকারিরাই সারা ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রধান ধারা হয়ে গেছে। ভারতের বেশির ভাগ মিডিয়া অথবা এদের সম্পাদকীয় নীতিতে কে কার চেয়ে কত উদার এবং হিন্দুত্ব বা বিজেপিবিরোধী তা প্রমাণের যেন প্রতিযোগিতা লেগেছে। অথচ ভারতে প্রধান ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর নিজ রাষ্ট্র প্রসঙ্গে মতাদর্শিক অবস্থানের ফলাফল হল, হিন্দুত্বের ভিত্তিতে তৈরি এটা এক উগ্র জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র। বিশেষ করে পাকিস্তানের সাথে পাল্লা দিতে পাল্টাপাল্টি উগ্র জাতীয়তাবাদের এই প্রতিযোগিতা চলে আসছে ১৯৪৭ সালে উভয় রাষ্ট্রের জন্মের সময় থেকেই। কংগ্রেস এবং বিজেপির লালন করা এই উগ্র জাতীয়তাবাদকে এমন ক্যাটাগরিতে স্পষ্টতই হুবহু ফেলা যায়। তবে এই বিচারে ভারতের ‘বাম প্রগতিশীলরা’ নিজেদের আলাদা মনে করতে পারেন; বিশেষত তারা জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করেন না দাবি করতে পারেন। কিন্তু কোনো হিন্দুত্বের ভিত্তি ছাড়া এক ভারত রাষ্ট্রে ভারতের সব অংশকে ধরে রাখা যাবে কি না- এ প্রশ্নে তারাও সৎভাবে অন্তত একান্তে এটা স্বীকার করবেন মনে করা যায়। আর কংগ্রেস একটু ব্যতিক্রম – এক সেকুলার জামার আড়ালে থেকে সে একই কথাগুলো হাজির করতে চাইবে হয়ত। এ ছাড়া ভারতের রাজনীতিবিদেরা আচার-আচরণে হিন্দুত্বের ভিত্তিকে অবশ্যম্ভাবী প্রয়োজনীয় গণ্য করে থাকেন। নকশালি র‌্যাডিকেল কিছু রাজনৈতিক ধারা ছাড়া ভারতের বাকি প্রায় সব রাজনৈতিক দল দৃঢ়বিশ্বাস করে যে, ‘হিন্দুত্বের ভিত্তি’ ছাড়া ভারতকে এক রাষ্ট্রে ধরে রাখাই সম্ভব নয়। তবে অবশ্যই এটা ভারতের রাজনৈতিক দল-জগতের খবর। একাদেমিসিয়ান এর ব্যতিক্রম হতে পারেন; তাদের কথা এখানে ধরা হয়নি।
আসলে জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে যেটা চলছে, এটা আসলে ছাত্র-শিক্ষকের বুদ্ধিবৃত্তিক দুনিয়ার লিবারেল আকাক্সক্ষা বিজেপিবিরোধী কংগ্রেস-সিপিএম রাজনৈতিক দলগুলোর সস্তা ভোটের রাজনীতির পড়ে বলি হয়ে যাওয়া।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারও যে এমন ন্যাক্কারজনক হামলার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে রাজধানীর পুলিশ কমিশনারকে ব্যবহার করে তা দেখে আমরা বেশ পুলকিত হতে পারি এই ভেবে যে, আমরাও ভারতের চেয়ে বেশি খারাপ নই। রাজধানী হলেও দিল্লি এক জেলা শহর বটে, তবে দিল্লি অন্তত কাশ্মিরের মতই বেইনসাফি ও দমবন্ধের স্থান নয় বলে যে ধারণা আমাদের ছিল কানহাইয়ার জামিনবিষয়ক রিপোর্ট পড়ে সে ধারণা বেশ চোট পায় বৈ কি! যেমন একই ২০ ফেব্রুয়ারির আনন্দবাজার থেকে তুলে আনা আরো কিছু অংশ “জেএনইউয়ের ঘটনায় মোদি সরকার, বিজেপি-সঙ্ঘ পরিবারের পাশাপাশি আঙুল উঠেছে দিল্লির পুলিশ কমিশনার বি এস বসসীর দিকেও। বুধবার আদালত চত্বরে কানহাইয়াকে মারার ঘটনা বেমালুম অস্বীকার করে গিয়েছিলেন বসসী। কিন্তু রাতে তিহার জেলে বুকে ব্যথা অনুভব করেন কানহাইয়া। তাকে রামমনোহর লোহিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার মেডিক্যাল রিপোর্টে বলা হয়েছে, কানহাইয়ার নাক, উরুসহ বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও জানিয়েছে, আদালত চত্বরে পুলিশের সামনেই কানহাইয়ার ওপর হামলা সংঘটিত এবং তা পূর্বপরিকল্পিত। তার ওপর মানসিক চাপ দেয়া হয়েছিল বলেও ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে”। যাক এ রিপোর্ট স্বব্যাখ্যাত তাই কিছু বলার নেই। কেবল একটা বিষয় ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশের মতোই দাঁত-নখহীন এমন ধারণা করা একেবারেই ভুল হবে। এমনকি ভারতের আদালতের রিপোর্ট ও অবজারভেশনও বিশাল গুরুত্ব রাখে।

পেনাল কোড ১২৪এ – রাষ্ট্রদ্রোহ
ভারতীয় পেনাল কোড বা আইপিসির ‘সেকশন ১২৪এ’ হলো সেডিশন-বিষয়ক (বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ) অপরাধের ধারা। এই পেনাল কোড ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে একই। কারণ ব্রিটিশ কলোনিয়াল আমলে ১৮৬০ সালে এই পেনাল কোড চালু হয়েছিল। ফলে সেই সুত্রে এই তিন দেশই এখনো সেই একই পেনাল কোড অনুসরণ করে থাকে। সেডিশন ধারার মূল অভিযোগ হলো ঠিক রাষ্ট্র নয়, সরকারের বিরুদ্ধে গণদাঙ্গাহাঙ্গামা সৃষ্টি করা বা উসকানি দেয়া। এই অর্থে এটা আইনানুগ সরকারের বিরুদ্ধে দ্রোহিতার অপরাধ। তবে লিগ্যাল শব্দ হিসেবে এটা সঠিকভাবে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বা ‘দেশদ্রোহী’ না হলেও ; পপুলারলি আমরা এমনটা বলে থাকি।
অতীতে ভারতের বিচার বিভাগ বহু সেডিশনের অভিযোগের (আইনানুগ সরকারের বিরুদ্ধে দ্রোহিতার অপরাধ) মামলা নাকচ করে দিয়েছেন। সেডিশনের মামলায় কোনো অভিযোগ প্রকৃত বলে টিকে গেছে এমন মামলার সংখ্যা খুবই কম। এসব মামলার রায়ে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শুধু বক্তৃতা দিলেই সেখানে সেডিশন হয়েছে বলে তা বিবেচিত হবে না যদি না ওই বক্তৃতার ফলে দাঙ্গাহাঙ্গামা সৃষ্টি হয়, অথবা কাজে ততপরতায় জনশৃঙ্খলায় এটি ব্যাঘাত করে থাকে। ফলে ভারতের বিভিন্ন পত্রিকা সেসব মামলার রেফারেন্স দিয়ে রিপোর্ট করেছে যে কানহাইয়ার মামলারও একই পরিণতি হবে। শুধু “ভারত নিপাত যাক”, এমন স্লোগান দিলেই সেটাকে সেডিশনের অভিযোগ হিসেবে মানতে ভারতের আদালত রাজি নয়। বহু আগে থেকেই এমন মামলাগুলো আদালত নাকচ করে দিয়ে আসছে। কিন্তু তবু নিজ বিরোধীদের হেনস্তা করতে সরকারগুলো রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দেয়া বন্ধ করেনি। এ ব্যাপারে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের কোনো সরকারই কারো চেয়ে কম যায়নি।
গত ২০১৪ সালের মে মাসে বিজেপির মোদি সরকার বিপুল জনসমর্থনে ক্ষমতায় এসেছিল। ওই নির্বাচনে বিজেপি নিজস্ব জোটবদ্ধতার সমর্থন ছাড়াও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল। বিপরীতে কংগ্রেসের আসনসংখ্যা ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদে মোট ৫৪০ আসনের মধ্যে হয়ে যায় ৫০-এরও নিচে, মানে ১০ শতাংশ আসনেরও কম। সিপিএমের অবস্থা আরো খারাপ। কিন্তু সেই থেকে মোদি সরকারের বয়স প্রায় দু’বছর পার হলেও কোনো ইস্যুতে স্পষ্টতই জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে চলে গেছে এমনটি ঘটেনি। তবে কোন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে মোদির দলের শোচনীয় পরাজয় হয়েছে এমন রেকর্ড আছে। কিন্তু ওই সব আঞ্চলিক বা রাজ্যের নির্বাচনে কংগ্রেসের ভূমিকা কোনো বড় নির্ধারকের নয়। বাম জোটের গোনায় ধরে না গুরুত্ব পায় না অবস্থা। ফলে কংগ্রেস ও সিপিএম অনেক মরিয়া হয়ে অনেক দিন থেকে খুঁজছিল যেকোনো ইস্যুতে খাড়া হয়ে যাওয়া যায় কি না। কংগ্রেস বা বামজোটের সিপিএমের দিক থেকে তাকিয়ে বললে তারা সম্ভবত এই প্রথম কিছু আশার আলো দেখতে যাচ্ছে। ফলে সস্তা ভোট রাজনীতির বেশি কিছু আমল করার মত সিরিয়াস এগুলো নয়। যদিও এটা কেবল জেএনইউ নয়, ভারতের বহু বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্রছাত্রীরা এই আন্দোলনের পক্ষে সাড়া দিয়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে। আর ঠিক ততটাই মোদি সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে গেছিল যে, এটা যে আসলেই একটা আইনানুগ সরকারদ্রোহিতার বা সেডিশন অপরাধ হয়েছে তা জনগণকে বিশ্বাস করানো। জনগণের কাঠগড়া ছাড়াও ও দিকে আদালতের কাঠগড়ায়ও মোদি সরকার সেডিশন প্রমাণ করতে পারবে না সে আলামতও পরিষ্কার হয়েছে।
আবার বাংলাদেশের সরকারের সাথে এ জায়গায় মোদি সরকারের মিল খুব বেশি। ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক-বিরোধী ভিন্ন রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে সেডিশনের অভিযোগ দিয়ে ঘায়েল করা, সস্তা প্রচার-প্রপাগান্ডা চালানোর ব্যাপারে ওখানে মোদি সরকার আর এখানে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে খুবই মিল। যেমন মুক্তিযুদ্ধে ‘৩০ লাখ’ ইস্যু অথবা ডেইলি স্টারের মাহফুজ আনামের মাফ চাওয়ার ইস্যু এগুলোকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা সেডিশনের অভিযোগে ঝুলিয়ে দেয়া, “পাকিস্তানি মনোভাব” বলে ভুতুড়ে অভিযোগ করা, পাকিস্তানি চিন্তা ইত্যাদি শব্দটা জড়িয়ে প্রপাগান্ডা করা ইত্যাদির ব্যাপারে দুই সরকারের মিল ব্যাপক। এ ধরণের অভিযোগ তোলার পেছনের অনুমান হলো জনগণ আসলে খুবই বোকা, তাদের বিবেচনাবোধ নেই, তারা আবেগি এই মনে করা হয়ে থাকে।

উগ্র জাতীয়তাবাদের রাজনীতির কারণে মানবাধিকার রাজনীতিতে  নির্বাসিত ইস্যু
ভারতের কোনো ক্ষমতাসীন সরকারের আমলে বিচ্ছিন্নতাবাদী কোন ইস্যু সামলাতে তার কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপের কারণে মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটেছে, সরকারের বিরোধীরা এমন কোনো অভিযোগ কখনো করেছেন, এমন দেখা যায় না। ভারতের রাজনীতি ও রাষ্ট্র ‘হিন্দুত্বভিত্তিক উগ্র জাতীয়তাবাদে’ ভরপুর বলে এমনটি হয় তা মনে করার কারণ আছে। এমনকি, কমিউনিস্ট কোনো দলকেও সরকারের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তুলতে দেখা যায় না। প্রধান ধারার রাজনৈতিক দলগুলো কাশ্মিরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা বা ইস্যুতে- সরকারের দিক থেকে এই ইস্যু মোকাবেলা করতে গিয়ে মানবাধিকারের দিকটি রক্ষা করছে কি না, তা দেখে না। এমন অভিযোগ করে না এই ভয়ে যে, সেটা করলে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রটাই চোট খায় কি না। যেন মানবাধিকারের রেকর্ড শক্ত করলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে যায়। এই কারণে ভারতের রাজনীতিতে একমাত্র বিবেচ্য হয়ে গেছে, হিন্দুত্বের ভিত্তিক উগ্র জাতীয়তাবাদের দাপট। এ পর্যন্ত কংগ্রেসের তুলনায় বিজেপি খুবই কম সময়ে সরকারে এসেছে বা সরকার গঠন করেছে। ফলে কংগ্রেসের ধারণা, সরকারে থাকলে রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন গোয়েন্দা বা ইন্টেলিজেন্স স্বার্থের পক্ষে থাকতে গিয়ে দলকে পাবলিকলি অপ্রিয় হতে হয়। বিপরীতে, বিরোধী দলে যে থাকে, সে এসব ব্যাপারে উদাসীন থাকার কিছু সুবিধা পায়; গা-ছাড়া ভাব দেখাতে পারে। এবারই প্রথম কংগ্রেস খুবই শোচনীয় অবস্থায় মাত্র ১০ শতাংশেও নিচে সদস্যসংখ্যা নিয়ে পার্লামেন্টে আছে। বিপরীতে জোট ছাড়াই এতে বিজেপি সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তাই কংগ্রেস এবার পালটা ‘গা-ছাড়া ভাব দেখানোর’ সুবিধা নিতে চাইছে। অতএব সারকথা, কাশ্মিরি বিচ্ছিন্নতাবাদী আফজাল গুরুর ফাঁসিবার্ষিকীতে প্রতিবাদ সমাবেশ ডাকা রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ কি না- এই প্রশ্নে বিজেপি মনে করে এটা রাষ্ট্রদ্রোহী। বিপরীতে, কংগ্রেস ও সিপিএমের অবস্থান- এটা রাষ্ট্রদ্রোহী নয়। ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’কে শায়েস্তা করার দায় এবার বিজেপি নিক আর নিজেরা এর সুবিধা নিয়ে পপুলার হোক। তবে কংগ্রেসের এই অবস্থান ভুঁইফোড়ের মতো। ভারতের রাজনীতিতে এমন অবস্থান নেয়াকে বলা হয়, ভোটের রাজনীতি অথবা ভোটব্যাংকের রাজনীতি করা। অর্থাৎ কোনো নীতিগত কারণ মেনে আচরণ না করা, না চলা, অবস্থান না নেয়া; কেবল ভোট পাওয়ার লোভে যেদিকে সুবিধা, সেদিকে অবস্থান নেয়া। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যুগুলোতে, যেগুলোকে তথাকথিত সন্ত্রাসবাদী ঘটনা বলে চালানো হয়, এসব ঘটনাকে ভারতের রাজনীতিতে মানবাধিকারের দিক থেকে দেখার চল নেই। বরং মিথ্যা প্রপাগান্ডা, উগ্র জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্ট ব্যবহার করে নগদ সুবিধা লাভ করাই মুখ্য এবং এ কাজে কংগ্রেস বা বিজেপি তো বটেই, সিপিএমও কোনো অংশে ভোটের রাজনীতি করতে পিছপা নয়। এর সবচেয়ে হাতের কাছের নগদ উদাহরণ হলো- বছর দেড়েক আগে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে বোমা হামলার ঘটনা। সিপিএম বিজেপির মতো একই ভাষায় সেসময় মমতার বিরুদ্ধে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন করে গিয়েছিল। কারণ, মমতা সিপিএমের মুসলমান ভোট নিয়ে গেছে। কিন্তু পরে মাঝপথে মোদি সরকার কোনো কারণে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের পশ্চিমবঙ্গ-নীতির সাথে আর না থাকার সিদ্ধান্ত নেয়াতে ওই ইস্যু ধামাচাপা পড়ে যায়। আজকে কোথায় ‘বর্ধমান বোমা’ ইস্যু? অথচ আনন্দবাজার পত্রিকাকে সাথে নিয়ে ইসলামবিদ্বেষী প্রপাগান্ডা তখন তুঙ্গে উঠেছিল। আজ সেই আনন্দবাজার আবার বিজেপির বিরুদ্ধে।
জেএনইউ রাষ্ট্রদ্রোহিতা ইস্যু তাই কংগ্রেস ও সিপিএমের কাছে আসলে বড়জোর ভোটব্যাংকের একটি ইস্যু। বিজেপিবিরোধী জোট প্রথমবারের মতো শক্ত ভিত গড়াই এর সঙ্কীর্ণ লক্ষ্য। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি এটা আরো স্পষ্ট হয়েছে। বিগত কংগ্রেস সরকারের চার বছরের (২০০৮-২০১২) কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মাদ্রাজি কংগ্রেস নেতা পি. চিদাম্বরম। তিনি দলীয় পরিচয় ফেলে হঠাৎ করে ‘ব্যক্তি’ হয়ে গেছেন। আফজাল গুরুর ফাঁসির সময়ও তিনি মন্ত্রী ছিলেন, তবে আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নন। মন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও ফাঁসি ঠেকাতে তখন কিছু না করে এখন বলছেন, ‘আফজাল গুরুর বিচার সঠিক ছিল কি না, সন্দেহ হয়।’ বলছেন, এটা তার ব্যক্তিগত মতামত আর তিনি ফাঁসি হওয়ার বছরখানেক আগে থেকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন না। তাই তার কিছু করার ছিল না। এই অর্থে ওই “ভুল ফাঁসির দায়” তিনি নিজ দলের সরকার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিয়েছেন। এ দিকে কায়দা করে আজ পর্যন্ত চিদাম্বরমের বক্তব্যের দায় কংগ্রেস স্বীকার বা অস্বীকার করেনি। কিন্তু এতে সুবিধা হলো, কংগ্রেস ও সিপিএম এখন ছাত্র-শিক্ষকদের প্রতিবাদকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয়, বরং একটা ন্যায্যতা দিতে পারল। তিনি এখন বলছেন, “আফজাল গুরুকে যাবজ্জীবন দেয়া যেত এবং এই প্রতিবাদ করা কোনো রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয়”।
ওদিকে এসব ঘটনা ফুটা করে দিয়ে আফজাল গুরুর বউ তাবাসসুম গুরু খাড়া কিছু বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলছেন, “চিদাম্বরম ‘ভোটব্যাংকের রাজনীতির’ জন্য ‘এত দেরিতে’ এমন কথা বলছেন। ‘ভোটব্যাংকের রাজনীতি’ অর্থাৎ এই প্রথম বিজেপির বিরুদ্ধে একটা জোট খাড়া করে তা থেকে আগামী ভোটে সুবিধা পাওয়ার জন্য এটা করছেন। আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে বেইনসাফি ও অপরাধ হয়েছে কি না, এটা আসলে চিদাম্বরমের কাছে ইস্যু নয়। যদি হতো, তবে তো তিনি সে সময়ই পদক্ষেপ নিতে পারতেন। অথচ চিদাম্বরম ‘ঠুঁটো’ দর্শক হয়ে সে সময় দাঁড়িয়েছিলেন কেন? ‘তিনি বরং এখন এসব কথা বলে আমাদের কাটা ঘায়ে লবণ ছিটাচ্ছেন”। তাবাসসুম গুরু বরং আরেক মারাত্মক কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, “দিল্লিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আফজালের ফাঁসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আসলে ভারতের গালেই থাপ্পড় মেরেছে”।
অতএব সারকথা, ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের আন্দোলন- বুদ্ধিবৃত্তিজীবী এরা সৎ ও আন্তরিক হলেও এদের প্রভাব একাডেমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে। কিন্তু এই লিবারেল রাজনৈতিক প্রভাবও কংগ্রেস ও সিপিএমের সস্তা ‘ভোটব্যাংকের রাজনীতিতে’ পরে বিক্রি হয়ে যাবে। বিজেপির বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হবে। কিন্তু মূল বিষয়, ভারতের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনে কাজে আসবে না।

বিচারক ‘জাতির সম্মিলিত বিবেকের’ নামে প্রতিহিংসা চর্চা করছেন
আগে বলেছি, ভারতের জনসমাজের কোথাও কোথাও এমন অনুমান এখনও বজায় আছে যে আফজাল গুরুর বিচার ত্রুটিপুর্ণ। যেমন,পুলিশের কাছে আফজালের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী ভারতের আদালত মানে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট তা “স্বেচ্ছায় প্রদত্ত” হিসাবে “গ্রহণযোগ্য” মনে করেনি। কিন্তু আবার পরিস্থিতি ও পরিবেশগত প্রমাণের দিক থেকে ঐ একই আদালত মনে করে “আফজাল প্রত্যক্ষ হামলাকারি না হলেও হামলাকারিদের সহযোগী ছিল এবং এই সহযোগিতা প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মতোই গুরুত্বপূর্ণ”। ওদিকে আফজালের বিশ্বাস ছিল, যেহেতু সে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত কেউ নয়, এ ছাড়া স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সে ধরা দিয়েছে,ফলে বিচারের রায়ে তাঁর অন্তত ফাঁসি হওয়ার কথা নয়। ফলে এটাও একটা ক্ষোভের কারণ। কিন্তু এর চেয়েও আর বড় একটা কারণ হল, যে ভাষায় এর রায় লেখা হয়েছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা “মৃত্যুদন্ড বহাল রাখার সময় সুপ্রিম কোর্ট সে সময় কী বলেছিল” শিরোনামে এক রিপোর্ট করেছে – সেখান থেকে নেয়া উদ্ধৃতিতে আমার অনুবাদে, “অপরাধ এতই ওজনদার ছিল যে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। প্রচুর হতাহত ঘটানো ঐ ঘটনা সারা জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল ফলে অপরাধীকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিলেই একমাত্র সমাজের সম্মিলিত বিবেক বা চেতনা (কালেকটিভ কনসাসনেস অব দা সোসাইটি) শান্তি পেতে পারে”। ………”ভারতের সার্বভৌমত্ব, সংহতি ও ঐক্যের চ্যালেঞ্জটা হলো …একমাত্র সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েই পূরণ করা সম্ভব। আপিল-দরখাস্তকারী একজন (ফিরে আসা) আত্মসমর্পণকারী জঙ্গি, কিন্তু আবার জাতির বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার কাজে যোগ দিয়েছিল; ফলে সে সমাজের জন্য হুমকিধারী আপদ এবং তার জীবন অবশ্যই নিভে যেতে হবে। তাই, আমরা তার মৃত্যু পরোয়ানার রায় বজায় রাখলাম”।
রায়ের ইউনিক এই দিকটার কথা অনেকেই গুরুত্ব দেন নাই। এটা এক তামাসা যে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত একটা ফাঁসির আদেশের ন্যায্যতা টানছেন মামলার মেরিট থেকে নয়। টানছেন গণমন একটা কল্পনা করে নিয়েছেন আগে; এরপর ঐ কল্পিত গণমনের কলিজা কিসে ঠান্ডা হবে বলে বিচারকরা মনে করছেন তা দিয়ে শাস্তির মাত্রা ঠিক করছেন। এটা সত্যিই ইউনিক। অথচ বিচারকেরা বলতে পারতেন ওমুক মাত্রার অপরাধের জন্য শাস্তি এই। কিন্তু এর ব্যত্যয় ঘটানোর অবিচার করেছে আদালত। আদালত সে জায়গায় বিমুর্তভাবে “গণমনের কলিজার” “মানসিক শান্তি” হবে কিসে – ধরণের আজীব ধারণার কথা টেনেছে। আর সেটা বিচারকেরা মাপলেন কী দিয়ে সেও এক বিরাট প্রশ্ন! যেন বিচারকেরা অন্তর্যামি হয়ে গিয়ে তা মেপে ফেললেন। আমাদের শাহবাগে “ফাঁসি চাই” বলে একটা বিক্ষোভ হয়েছিল ফলে আমাদের বিচারকেরাও মন-গণক অন্তর্যামি হয়ে গেছিলেন। সহজেই বুঝে গিয়েছিলেন গণমনের কলিজা কিসে ঠান্ডা হবে।
সবশেষ আর এক গুরুত্বপুর্ণ মাত্রার দিক তুলব। “সমাজের সম্মিলিত বিবেক বা চেতনার শান্তির” কথা তুলে বিচারকেরা প্রমাণ করেছেন বিচারের নামে ওটা ছিল এক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার । কালেকটিভ কনসাসনেস অব দা সোসাইটির মানসিক শান্তি মানে কী ?কোন  বিচারালয়ে বিচারকের কাছে কালেকটিভ কনসাসনেস কী বস্তু? যে কালেকটিভ কনসাসনেস আবার অসুস্থ অশান্ত যার মানসিক শান্তি দরকার ? এটা একটা অসুস্থতা – তাই কী বিচারকেরা স্বীকার করে নিয়েছেন না? আর সেজন্যই কী অপরাধীর বিচার করার নামে সে নিজের  প্রতিহিংসা মিটাতে চাচ্ছে না? এমন অর্থই সেখানে দাড়িয়েছে।
কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে মানসিক শান্তির জন্য কাউকে শাস্তি দেয়া এটা নির্জলা “প্রতিহিংসা” ছাড়া আর কিছুই নয়। বিচারকেরা নিজে মানসিক শান্তি পাবার জন্য অথবা কাউকে পাইয়ে দিবার জন্য শাস্তির রায় ঘোষণা করেন না। করতে পারেন না। আসলে এভাবে মানসিক শান্তি পাওয়াকে প্রতিহিংসা বলে। আর প্রতিহিংসা এটা এক মানসিক ডিসঅর্ডারের নাম। রাষ্ট্রের পুলিশ বা বিচারকদের ভুমিকা কোনভাবেই নিজের ব্যক্তি “প্রতিহিংসা” অথবা “জাতির” প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা নয়। প্রতিহিংসা এক মানসিক অসুস্থতার নাম। ফলে স্বভাবতই এর নিদান চিকিতসা করানো।
তাহলে সারকথা হল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আফজাল গুরুকে ফাঁসি দিয়ে আর রাষ্ট্রে সংশ্লিষ্ট সকলে তা বাস্তবায়ন করে জনগোষ্ঠিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছে। এরা সকলে মানসিকভাবে অসুস্থ।
ফাঁসি শাস্তি দিলেই একমাত্র যে “জাতির” কলিজা ঠাণ্ডা হয় সেই কলিজা যে সমস্যাযুক্ত ও ত্রুটিপূর্ণ,এই সন্দেহ পাঠকমাত্র আসা উচিত। আর এমন কলিজা যে ‘জাতির’,সে কলিজা অবশ্যই অসুস্থ। এর চিকিৎসা দরকার। এ ছাড়া এমনকি বিষাক্ত পোকামাকড় বা গাছ লতাপাতাকেও মানুষ নিজের সমাজ থেকে বিলুপ্ত করার দরকার মনে করে না, কেবল নিজের গার্হস্থ্য সমাজ থেকে বাইরে রাখে। এর থেকে মানুষের মৌলিক স্বভাব টের পাওয়া যায়। অথচ বিচারকেরা প্রমাণ করতে গেছেন, আফজাল গুরু নামের মানুষের জীবনটাকেই নিভিয়ে দেয়া ছাড়া ভারতের জনমানুষদের নাকি আর কোনো উপায়ই ছিল না। বিচারকেরা আফজাল গুরুর জীবনকে যতই খামাখা এবং জীবিত নাগরিকদের জীবনের তুলনায় তুচ্ছ প্রমাণ করতে গেছেন, ততই ওটা আর বিচারের রায় না থেকে যেন প্রতিহিংসার দলিল হিসেবে হাজির হয়েছে। অথচ কোনো রায় তো কখনো প্রতিহিংসাপত্র নয়।

আশা করি কানহাইয়াকে নিয়ে মাথায় তুলে নাচবার আগে না হলেও সাথে সাথে আমরা এসব প্রসঙ্গের দিকেও নজর দিব। তবে অবশ্যই কানহাইয়ার দেশদ্রোহ মামলার সাথে বাংলাদেশেরও দেশদ্রোহ মামলার বিশাল মিলের দিক আছে, সে প্রসঙ্গ আলাদা।

[উপরের লেখাটা আফজাল গুরু ও জেএনইউ-কানহাইয়া ইস্যুতে সগের লেখা প্রায় চারটা লেখার সার করে লেখা, চুড়ান্ত ভার্সান। আগের লেখাগুলো দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ, দৈনিক নয়াদিগন্তে প্রকাশিত হয়েছিল।]
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s