ব্রেক্সিট : কার বিরুদ্ধের অসন্তোষ কার পাতে

ব্রেক্সিট : কার বিরুদ্ধের অসন্তোষ কার পাতে

গৌতম দাস

৩০ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-1pe

ব্রেক্সিট গণভোটের ফলাফলে জানা গেল সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করে যাওয়ার পক্ষে হয়েছে। ব্রেক্সিট ইস্যুতে ভোটের ফলাফলে ত্যাগের পক্ষ জয়ী হয়েছে শতকরা ৫২-৪৮ অনুপাতে। এতে গণভোট-উত্তর পরিস্থিতি যা হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছিল তা একের পর এক ঘটা শুরু হয়েছে। ফলাফলের নেতিবাচক গ্লোবাল প্রভাব পড়েছে সর্বব্যাপী। বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও এর প্রভাব পড়বে তা সংশ্লিষ্টরা মানছেন। গতকাল  বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সংসদকে জানিয়েছেন যে বাংলাদেশের “পোশাক খাত চ্যালেঞ্জের মুখে” পড়েছে। ওদিকে ইতোমধ্যে প্রতি বৃটিশ পাউন্ড গণভোটের আগের তুলনায় দশ টাকা করে মূল্য হারিয়েছে। পরিস্থিতি আরো কতটা খারাপের দিকে যাবে তা নিয়ে অনুমান চলছে।
এ নিয়ে গভীরে প্রবেশের আগে কিছু ধারণা পরিষ্কার করা দরকার। যেমন- ব্রিটেনের ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়া মানে কী? ব্যাপারটা কী, বিভিন্ন রাষ্ট্র যেমন নানান কিসিমের রাষ্ট্রজোটে অন্তর্ভুক্ত হয় যার কোনটা অর্থনৈতিক অথবা রাজনৈতিক বা সামরিক ইত্যাদি সে রকম কোনো রাষ্ট্র-জোট ত্যাগ করা? অথবা ধরা যাক,  জাতিসঙ্ঘ ধরনের বহুরাষ্ট্রীয় জোট প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো সদস্যরাষ্ট্রের তা ছেড়ে যাওয়া সেরকম?  অথবা  বহুরাষ্ট্রীয় (মাল্টিল্যাটারাল) ক্যাটাগরির আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কে ওর কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ছেড়ে যাওয়া, এ ধরনের? অথবা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেমন ধরা যাক, আমাদের সার্ক জোট ছেড়ে গেলে কী হবে তেমন একটা কিছু? এরকম নানা ধরনের রাষ্ট্রজোটের উদাহরণ আর না বাড়িয়ে এবার উত্তরের দিকে যাওয়া যাক। প্রথমত কোনো সদস্য রাষ্ট্রের জোট ত্যাগ করার উদাহরণ খুব একটা নেই, তুলনায় জোটের অকার্যকর হয়ে পড়ার উদাহরণ পাওয়া যাবে। তবে আলোচনা সেদিকে নিব না। তাহলে আমরা এখানে কথা বলছি – ইইউ ধরণের বিশেষ রাষ্ট্রজোটের।
ব্রিটেনসহ ধরলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছিল মোট ২৮ সদস্য-রাষ্ট্রের। এখন এই ইইউ ধরনের রাষ্ট্রজোটের সাথে অন্য আর সব ধরনের রাষ্ট্রজোটের একটা প্রধান ফারাক আমরা এখন টানব। তা হল, ইইউ ছাড়া অন্য সব রাষ্ট্রজোটের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা সদস্যরাষ্ট্র একেকটা সার্বভৌম ইউনিট, এটা বজায় রেখে বা মেনে নেয়ার পরই এসব রাষ্ট্রজোট গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ একাধিক রাষ্ট্র নিয়ে জোট অথবা জাতিসঙ্ঘের মতো প্রায় সব (বর্তমানে ১৯৩ সদস্যের) রাষ্ট্রের রাষ্ট্রজোট হবার পরও জাতিসংঘ নিজে এর যেকোনো সদস্যরাষ্ট্রের ওপর কর্তৃত্বধারী কোনো সুপার স্টেট নয়। যেমন বাংলাদেশ সম্পর্কে যেকোনো ইস্যুতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার একমাত্র বাংলাদেশ রাষ্ট্রের, জাতিসঙ্ঘ অথবা এর অধীনস্থ কোনো প্রতিষ্ঠান বা কমিটির নয়। জাতিসঙ্ঘ কি সার্বভৌম – এই ধারণার উপরে জন্ম দেয়া প্রতিষ্ঠান? যেকোনো সদস্যরাষ্ট্রের ওপরে কী জাতিসংঘ সার্বভৌম ক্ষমতা, এখতিয়ার রাখে? এককথায় জবাব মোটেও না। প্রশ্নই আসে না। প্রত্যেক সদস্য-রাষ্ট্রই কেবল সার্বভৌম যার উপর কেউ নাই, আর কোন মাতব্বর নাই।  ফলে জাতিসঙ্ঘের কোনো সিদ্ধান্ত মানার ব্যাপারটি কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ঘটে কী এই অর্থে যে, ওই সিদ্ধান্ত বা আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামে জাতিসঙ্ঘের সব সদস্যের সম্মতিতে অনুমোদিত হয়েছে শুধু সেজন্য? না সেজন্য নয়। বরং ওই আইনের অনুরূপ করে লেখা একটা আইন (যেটা রেটিফিকেশন বলে পরিচিত) আমরা আমাদের সংসদে পাস করিয়ে নিয়েছি সেজন্য। সারকথায় জাতিসঙ্ঘের কোনো আইন বা কনভেনশন ইত্যাদি আমরা মানি এ জন্য যে, সেটার অনুরূপ এক আইন আমাদের নিজের সংসদ পাস করে নিয়েছে, তাই। নিজের আইন তো নিজে মানবই। জাতিসঙ্ঘ কখনোই এমন কোনো তৎপরতা দেখায় না বা এমন কোনো রেওয়াজ নেই, যা থেকে আমরা অর্থ করতে পারি যে সে আমাদের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে অথবা আমাদের রাষ্ট্রের ওপরে অবস্থিত এক চূড়ান্ত কর্তৃত্বের কর্তৃপক্ষ হল জাতিসঙ্ঘ। বরং রাষ্ট্রই সার্বভৌমত্বের শেষ কথা। এর ওপর কাউকে রাখা হয়নি। এভাবে দুনিয়ার যেকোনো রাষ্ট্রজোট তার আলাদা আলাদা সদস্যরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অটুট রেখেই নানান রাষ্ট্রজোটের অংশ হয়।

কিন্তু এই ধারণার একমাত্র ব্যতিক্রম বা ব্যতিক্রম হওয়ার উদ্যোগ হল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কী অর্থে? যেহেতু ইইউ গড়ার লক্ষ্য হল সদস্যরাষ্ট্রগুলো একটা লম্বা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একদিন প্রত্যেকের আলাদা রাষ্ট্ররূপ বিলুপ্ত করে সবাই মিলে একক এক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তবে এখনই সেই প্রক্রিয়ার পুরোটা সম্পন্ন হয়ে যায়নি। তাই ইইউ এখনই কোনো সার্বভৌম অস্তিত্ব নয়। তবে ইইউর কিছু কিছু ফোরামে নেয়া সিদ্ধান্ত সব সদস্যরাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক হয়েছে। এই অর্থে ওসব জায়গায় ইইউ নিজের সদস্যরাষ্ট্রের উপর সুপ্রীম কর্তৃপক্ষ।  যেমন ইইউর ফোরামে গৃহীত প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রে কাজের দৈনিক শ্রমঘণ্টা  কত হবে- এ বিষয়ক ইইউ ফোরামে নেয়া সিদ্ধান্ত সব সদস্যরাষ্ট্রের জন্য এখনই বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট এখানে ইইউর ভূমিকা সদস্যরাষ্ট্রের ওপর সুপার স্টেট ধরনের। আর এটাই প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্র তার নিজ নিজ সংসদে আগে অনুমোদন দিয়েছে যে ঐসব ক্ষেত্রে ইইউ এর সিদ্ধান্ত সদস্য-রাষ্ট্রের উপর সুপ্রীম, তাই এটা বৈধ। সারকথায় রাষ্ট্রজোটের নানা ধরনের মধ্যে একমাত্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন হল আলাদা ধরণের কারণ এটা হবু সুপার স্টেট। এক সুপার ষ্টেট হবার লক্ষ্যে সে আগাচ্ছে তাই।
ব্রেক্সিট গণভোটের মাধ্যমে ব্রিটিশ জনগণ সিদ্ধান্ত জানাল যে ব্রিটেন ইইউর মধ্যে নিজ রাষ্ট্র একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিলীন করার যে সিদ্ধান্ত সে আগে নিয়েছিল (ব্রিটেন ১৯৭৩ সালে ইইউতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল) সে সিদ্ধান্ত বদল করে তারা এবার নিজের ব্রিটেন রাষ্ট্রই অটুট রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল।
ব্রেক্সিট গণভোটে ব্রিটেনের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল রক্ষণশীল টোরি আর লিবারেল লেবার- এরা কেউই ইইউ ত্যাগের পক্ষে নয়, বরং ইইউর সাথে থেকে যাওয়ার পক্ষে বলে দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, প্রচারও করেছিল। ফলে আর অন্য ছোট দল হিসেবে যারা ইইউ ত্যাগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল ও প্রচার চালিয়েছিল, তেমন এক দল হলো ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি (আইপি)। গণভোটের ফলাফল ত্যাগের পক্ষে যাওয়ার পর মিডিয়া এই পার্টির সেক্রেটারিকে প্রশ্ন রেখেছিল- কেন তারা জিতলেন বলে মনে করেন? তিনি বললেন, আমাদের সিদ্ধান্ত আমরা জনগণ নিজেরাই নিতে চাই, তাই। এটা অবশ্যই সঠিক জবাব নয়। একই ভাবে আর এক নেতা তিনি “না-ভোট প্রচারক” কমিটির যুগ্ম-আহবায়ক। নাম (Michael Gove) বা মাইকেল গভ। কিন্তু তিনি আসলে আবার মাইকেল ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল টোরি পার্টির এমপি। তিনি তার ওয়েব সাইটে তাঁর নাভোটের পক্ষে থাকার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। যেখানে তিনিও UKIP দলের মত বললেন। এককথায় বললে, যেসব নেতারা ইইউ-ত্যাগের পক্ষে কাজ করেছেন, এরা মূলত সাধারণ মানুষের নানান ক্ষোভ অসন্তোষকে সস্তা ও উগ্র জাতীয়তাবাদী সুরসুরি দিয়ে আরও বড় করে কাজে লাগিয়েছেন। যেমন মাইকেল লিখছেন, তার আপত্তি্র পয়েন্ট হল তাঁর “রাষ্ট্র বৃটেনের ভাগ্য অন্য জাতেই রাষ্ট্রের রাজনীতিবিদের ঠিক করছেন “decided by politicians from other nations”। এটা খুবই বাজে ও ফালতু যুক্তি। এক রংপুরের রাজনীতিবিদ যদি বলে, বাংলাদেশের বাজেট দিচ্ছেন এক (ভিন্ন জেলা অর্থে ভিনজাতের) সিলোটি নেতা … এটা বললে যেমন বুঝতে হবে এগুলো মাথায় শয়তান ভর করা লোকের সস্তা সুরসুরি মার্কা কথা – ঠিক তেমনি। আমরা নানা জেলার মানুষ মিলিয়েই বাংলাদেশ গঠন করেছি। ফলে কেউ যদি সংসদে সিলেটি হয়ে রংপুরের ভাগ্য নির্ধারণ করে তবে কোথাও আবার রংপুরিয়াও সিলটির ভাগ্য নির্ধারণ করবে। ইইউ তে বৃটিশ না হয়েও ধরা যাক সে জর্মন, যাদের সিদ্ধান্ত বৃটেনের উপর প্রযোজ্য হচ্ছে, বৃটিশের সিদ্ধান্তও অন্য কোথাও জর্মনের উপর প্রযোজ্য হচ্ছে। সুতরাং এটা কোন পয়েন্টই না। পরিস্কার দগদগে উগ্র জাতিবাদি বিদ্বেষ, রেসিজম। যদি ইইউ ভাইস ভারসা ভাবে জর্মনী বা অন্য জাতি রাষ্ট্রের উপর বৃটিশ (ইইউ এমপি বা MEP )র সিদ্ধান্ত কার্যকর না হত তাহলে এসব কথা বলার সুযোগ থাকত। এছাড়া সবার উপরে বৃটেন কী স্ব-ইচ্ছায় ১৯৭৩ সালে ইইউ তে যোগ দেয় নাই? স্ব-ইচ্ছায় যোগ দেয়ার মানে কী  এটা না যে অ-বৃটিশেরও মতামত মাতব্বরি শুনতে ইউ তে যোগ দিতে যাওয়া হচ্ছে?  অতএব এসব ফালতু জাত-বিদ্বেষী বক্তব্যকে যদি জবাব হিসেবে আমাদের গ্রহণ করতে হয়, তবে মানতে হবে এত দিন বেআইনি বা অবৈধভাবে ব্রিটেনবাসীকে বঞ্চিত করে, তাদের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে ইইউ সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল, যেন সেটার অবসান ঘটালেন তারা গণভোটে ভোট দিয়ে। কিন্তু না তা তো নয়। আইনে যা লেখা আছে তা মেনেই সেই ১৯৫১ সাল থেকে শুরু হওয়া এক ক্রমপ্রক্রিয়ায় ব্রিটেন ইইউর ভেতরে বিলুপ্ত হওয়ার লক্ষ্যে ও সেজন্য এগিয়ে যাচ্ছিল। ইইউ তো কোন জবরদস্তি প্রক্রিয়া তো ছিল না।
আবার সেই ইইউ প্রক্রিয়া যেহেতু এখনো শেষ বা সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়নি, ফলে ২০০৭ সালের লিসবন চুক্তি, যার আরেক নাম ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তি, যেটা তার আগের করা ইইউ বিষয়ক সব চুক্তির আপডেটেড বা সর্বশেষ রূপ, এর আর্টিকেল ৫০ অনুসারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রক্রিয়া থেকে এখনও যেকোনো সদস্যের বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ বৈধভাবেই ছিল। যেটার সুযোগ নিতেই ব্রিটেনের জনগণ তাদের আগের সিদ্ধান্ত বদলানোর সুযোগ নিয়েছে এই গণভোট করে। এটাও বৈধ। ফলে ১৯৭৩ সালে ইইউতে ব্রিটেনের যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত এবং এই গণভোটে ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দুটোই আইনি দিক থেকে বৈধ সিদ্ধান্ত। তাহলে আসলে এখন কী ঘটেছে? আর কেন সেটা ঘটল?

সাধারণ নির্বাচন বা গণভোট মানে ঐ একবারই যখন সিদ্ধান্ত সাধারণ জনগণের পর্যায়ে নেমে আসে। কার তুলনায়? সরকার গঠন হয়ে গেলে যে সংকীর্ণ গোষ্ঠি এবার সরকারের নীতি-সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের ক্ষমতার তুলনায়। গ্লোবাল অর্থনীতিতে বা গ্লোবাল কাপিটালিজমে অনেক প্রভাবশালী অর্থনীতি আছে। এরাসহ সব আধুনিক রাষ্ট্রেই পুঁজি ব্যবসায়ী, শিল্পকারখানা বা ট্রেডার ব্যাংকার সমাজের এ অংশটিই তাদের পক্ষে রাষ্ট্রের মৌলিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে থাকে। নির্বাচন একবার হয়ে গেলে পরের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত এসময়গুলোতে রাষ্ট্র কার্যত থাকে এই গোষ্ঠির প্রভাবে। মূলত এসব সময়গুলোতে নেয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ জনগণ ক্রমেই অসন্তুষ্ট হয়ে উঠছিল। যেমন ২০০৮ সাল থেকে চলে আসা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব এখনো গ্লোবাল অর্থনীতিতে কাটেনি। আর ওই মন্দা আসলে ডেকে এনে ছিল যেন এক প্রতিযোগিতা! কীসের? ঐ মহামন্দায় দেইলিয়া হয়ে পড়া কোম্পানী পুঁজির কারবারিদের দায়দেনা ও ক্ষতি জনগণ বা রাষ্ট্রের কাঁধে কেমন লটকিয়ে দেয়া যায় এরই প্রতিযোগিতা। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ঢেলে সব ব্যক্তি কর্পোরেট কোম্পানীর দায়দেনা ও ক্ষতি মিটানো হয়েছিল। এরপর আবার শুরু হল (austerity) অস্টারিটি মানে অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রসাধন। অর্থাৎ রাষ্ট্র তখন আর সামাজিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিনিয়োগ কমিয়ে দিবে আর স্বাস্থ্য শিক্ষা ধরনের সামাজিক বেনিফিটে কাটছাঁট করবে, যার সবচেয়ে আর সব দিক থেকে চাপটা এসে পড়বে কেবল শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সমাজের নিচের কম আয়ের জনগণের ওপর। এর ওপর আবার বিগত ২০০১ সাল থেকেই –  ‘ইসলামি জঙ্গি’ মারতে গিয়ে লম্বা শেষ নাই এমন যুদ্ধে আটকে গিয়েছে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো। এর অর্থনৈতিক দায় বইতে পশ্চিমা রাশ্ট্রগুলোর অসমর্থ হওয়া ছিল সব কিছুর  প্রধান ফ্যাক্টর।  ঐ যুদ্ধের ঘটনার লেজে লেজে যেখান থেকে আবার দুনিয়াতে রিফিউজি বা উদ্বাস্তু সমস্যা খাড়া হয়ে গেছে। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে ইউরোপেরই নিচের মানুষদের চেয়েও কম বেতনে রিফিউজিরা খারাপ দুস্থদশায় বলে কাজ করতে রাজি – ফলে এরাই প্রতিদ্বন্দ্বী শ্রমজীবীদের বাজারে হাজির হতে চাইছে। ফলে ইউ যেটাকে যুদ্ধের রিফুইজি ঠেলে ফেলতে পারে না, জাতিসংঘ উদ্বাস্তু কমিশনে কমিটমেন্ট ইত্যাদির কারণে রফুইজি নিচ্ছে বা প্রতিদানে অর্থের সংস্থান করেদিচ্ছে। এগুলো প্রতিটার ক্ষেত্রে  ইউরোপেরই নিচের মানুষদের স্বার্থ আর তাদের শাসকদের স্বার্থ পরস্পুর মুখোমুখি। ফলে শ্রমজীবিদের চোখে ইইউ এক ভিলেন। ফলে সব কিছুকে উল্টে ফেলে দেয়ার অছিলা খুঁজছিল ইউরোপেরই নিচা আয়ের জনগণ। কারণ স্ব স্ব রাষ্ট্রে এসব সিদ্ধান্ত ও কাজ করা হচ্ছিল ইইউর আইনি বাধ্যবাধকতা আছে, ইইউ এর ওমুক আইনের বাধা আছে অথবা যেমন- ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের রুল আছে তাই অস্টারিটি করতে হচ্ছে অথবা ইইউর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তাই উদ্বাস্তু নিতে হবে- এভাবে ইইউকে দেখিয়ে সামনে রেখে নিজের রাষ্ট্র এগুলো করছিল। ফলে স্বভাবতই জনগণ সেই ইইউ নামে ভুতুড়ে ক্ষমতাকেই উপড়ে ফেলার পক্ষে চলে যায়। অর্থাৎ সমাজে এসব অসন্তোষ বাড়ছিল। এই অসন্তোষ নিরসন বা আমলে নেয়ার নামে ক্যামেরন ভেবেছিলেন ইইউতে থাকা না থাকাকে গণভোটে দিলে আবার ইইউতে থাকাই জিতবে। ফলে গণক্ষোভ প্রশমিত করার রাস্তা তার নাগালেই আছে। তাই আগবাড়িয়ে ২০১৩ সালে তিনি গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ দিকে সমাজের ওপরের অংশ এবং দুই প্রধান দল ধরেও নিয়েছিল, গণভোটে ইইউ ত্যাগের পক্ষ জিততেই পারে না। এটা তাদের কাছে অসম্ভব কল্পনা মনে হয়েছিল। কিন্তু যত গণভোটের নির্ধারিত দিন এগিয়ে আসতে থাকে ততই গ্লোবাল অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজমকে পরিচালনের রাষ্ট্রনেতা, বিভিন্ন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান নেতারা ততই ইইউ ত্যাগ করে গেলে কী বিপর্যয় ঘটবে, একের পর এক এর ভয়াবহতা উল্লেখ করতে থাকে। এর প্রতিক্রিয়া হয় আরো নেতিবাচক। বিবিসি যে আটটা কারণ তুলে ধরেছে, তার এক নম্বর কারণ হিসেবে “ব্রেক্সিটের নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাবে উল্টো ফলকে” । ব্রিটিশ সাধারণ ভোটাররা ব্যাপারটিকে তাদেরকে ভয় দেখানো বা হুমকি দেয়া হিসেবে দেখেছিল। ফলে চাপের ভেতরে তাদের দিশেহারা অবস্থা। এর ওপর আবার সর্বক্ষণ হবু সুপার স্টেট ইইউর দোহাই দেয়াতে এই ভুতুড়ে আড়ালি ক্ষমতাকেই মাস জনগণ সবার আগে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এটা মনে করা যেতে পারে।
ব্রিটেনের ভাষায় ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি (আইপি) হলো এক ‘ডানপন্থী’ পার্টি। এরা এই গণভোটকে উগ্র জাতীয়তাবাদ ছিটানোর মহাসুযোগ পাওয়া গেছে হিসেবে নিয়েছিল। এভাবে তারা জনগণকে মিথ্যা আওয়াজ তুলেছে যেন উগ্র জাতীয়তাবাদের স্লোগান তুললে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সব সঙ্কট দূর হয়ে যাবে। ইসলামি জঙ্গি মারার নামে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের যে সঙ্কটকে আরো বাড়িয়ে তোলা হয়েছে, তা আপনাআপনিই মিটে যাবে, এই মিথ্যা স্লোগান দেয়া হয়েছে। ব্রিটিশ সংস্কৃতি মূল্যবোধ সবার চেয়ে ভালো এই উগ্র প্রচার করেছে। ফলে বৃটিশরা  নিজেরাই নিজেদের সিদ্ধান্ত নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে বলে মূল সমস্যা থেকে অতিষ্ঠ সাধারণ জনগণের দৃষ্টি সরাতে সক্ষম হয়েছিল। এসব কিছুর নিট ফলাফল হলো গণভোটের ইইউর ত্যাগের সিদ্ধান্তের জয় লাভ।

ইইউ ত্যাগের পক্ষের প্রাক্তন মেয়র বরিস জনসন ও অন্য প্রবক্তারা জানেন, যে তারা মিথ্যা প্রলোভনে ত্যাগের পক্ষকে জিতিয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে প্রাক্তন মেয়র বরিস জনসনকে মিথ্যা বলার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বরিস জনসনের ছবিসহ ঐ সম্পাদকীয়ের শিরোনাম হল ব্রেক্সিটের প্রবক্তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে।   অথচ সবাই জানত ইইউ-ত্যাগের পক্ষে জিতলেও গরিব শ্রমজীবীর মূল ক্ষোভ অসন্তোষ এতে কাটবে না। তাই নিউইয়র্ক টাইমস গত ২৬ জুন আর এক রিপোর্টে বলছে ইইউ-ত্যাগ ভোটের জিতার পরে অনেক নেতা উলটা প্যাডেল মেরে ভাগতেছে কারণ জিতলে তারা কী করবে এনিয়ে তাদের কোন অর্থনৈতিক পরকল্পনা ছিল না।  প্রতিদিন ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড নাকি ইইউকে দিতে হত খামোখা বলে বরিস জনসনরা প্রচার চালিয়েছিল। এখন স্বীকার করছে ওটা ভুল ছিল।  তাই তারা এখন ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া যত দেরিতে শুরু করা যায়, এর পক্ষে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। যেমন ইইউ ত্যাগের আইনগত পদ্ধতি হলো কোনো সদস্যরাষ্ট্র নিজ রাষ্ট্রের আইন বা কনস্টিটিউশনাল বাধ্যবাধকতা পালনের মুখোমুখি হয়ে পড়লে (যেমন- বৃটেন এখন গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বাধ্য) সে ইইউ ছেড়ে যাওয়ার জন্য সবার আগে ইইউকে নোটিশ দেবে। এটাই সর্বশেষ লিসবন ইইউ চুক্তির আর্টিকেল ৫০ অনুসারে ইইউ ত্যাগ করতে চাওয়া দেশের ত্যাগের প্রক্রিয়া শুরুর প্রথম পদক্ষেপ। অর্থাৎ বৃটেনে গণভোট হয়ে ফলাফল চলে এলেও আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ এখনো বৃটেনের কাছ থেকে ত্যাগের ইচ্ছার কথা জানে না। আর এই ইচ্ছা জানানোর এখতিয়ার বা জানানোর পার্টি হল, যে ত্যাগ করতে চায়। সে হিসেবে কেবল ব্রিটেন। তাই সাবেক মেয়র বরিস জনসন আর্টিকেল ৫০ স্মরণ করিয়ে বলছেন, এটা তাদের এখতিয়ার এবং তারা আগামী অক্টোবরের আগে ইইউকে আনুষ্ঠানিক নোটিফাই করতে চিঠিই দেবেন না। ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে আর্টিকেল ৫০-কে সক্রিয় করে জানানোর প্রক্রিয়া শুরু করলে এর পরের কমপক্ষে দুই বছরের আগে এই বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শেষ হবে না। ফলে যারা ইইউ-ত্যাগ পক্ষকে জিতিয়েছেন, সেই প্রবক্তারা তাই যদ্দুর সম্ভব আগামীতে নিজেদের সম্ভাব্য ব্যর্থতা লুকিয়ে রাখার সুযোগ নিতে চান। বিপরীতে যে ছয় রাষ্ট্র ১৯৫১ সালে ইইউর প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেছিল সেই মূল ছয় রাষ্ট্র- জর্মান, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, লেদারল্যান্ডস, ইতালি ও লুক্সেমবার্গ- এদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মিলিত হয়ে এক যৌথ আহ্বান রেখেছেন ব্রিটেনের প্রতি। দাবি করেছেন ইতোমধ্যেই গণভোটের ফলাফল গ্লোবাল বাজারের আনাচে-কানাচে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। মার্কেটে উথাল পাথাল ঘটা শুরু হয়েছে। ফলে ব্রিটেনের বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করতে ব্রিটেন যেন দ্রুত শুরু করে, যাতে ব্রিটেন বাদে ইইউ (২৭ সদস্যরাষ্ট্র) নিজেদের আরো কোনো বিপর্যয়ের হাতে না পড়ে এর বিপক্ষে প্রস্তুতি নিতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, এই বিচ্ছেদ কি সহজেই ঘটতে পারবে, নাকি আরো গ্লোবাল বিপর্যয়ের মুখোমুখি করবে দুনিয়ার সবাইকে- এটাই এখন দেখার বিষয়!
দ্বিতীয় ও শেষ পর্বের এখানেই শেষ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখার প্রথম পর্ব যার শিরোনাম ছিল, “ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ : গড়ার ভাঙনের শুরু” ঐ লেখা বিগত ১৯ জুন দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় আগে ছাপা হয়েছিল। আর চলতি শেশাহ পর্বের লেখাটা আগে ২৬ জুন ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্তে ছাপা হয়েছিল। দুটো লেখায় আবার নানান সংযোজন ও সম্পাদনার পর এখানে ছাপা হল।

ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ : গড়ার ভাঙনের শুরু

ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ : ভাঙন মানেই ভাঙাগড়া
গৌতম দাস
২৯ জুন ২০১৬, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-1j7

আজ প্রথম পর্বঃ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্র বৃটেন বের হয়ে যাওয়ার পক্ষে এক গণভোটে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত এখনও আভ্যন্তরীণ। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ কে এখনও জানায় নাই। ইতোমধ্যে গ্লোবাল অর্থনীতিতে এর উল্টাপাকল্টা প্রভাব পড়া শুরু করেছে। বৃটেনের গণভোটের এই সিদ্ধান্তে গ্লোবাল প্রভাবশালী শেয়ার বাজারগুলোতে টালমাটাল অবস্থা শুরু হয়রছে। এই প্রেক্ষিত মাথায় রেখে বর্তমান লেখাটা শুরু করেছিলাম গত ২৩ জুন গণভোট অনুষ্ঠানের আগে। চলতি পর্ব সেটাই। এছাড়া গণভোটের পরেও এলেখা শেষ অংশ লেখা হয়েছে যা পরবর্তিতে দ্বিতীয় বা শেষ পর্ব আকারে এখানে প্রকাশিত হবে।

ব্রেক্সিট, একটা নতুন শব্দ। নতুন পরিস্থিতিতে পড়ে জন্ম নেয়া একটা নতুন শব্দ এটা। দু’টি শব্দ – ব্রিটেন আর এক্সিট, এদুইয়ের সংমিশ্রণ করা হয়েছে। পুরনো শব্দ দু’টি মিলিয়ে পয়দা করা হয়ে হয়েছে নতুন শব্দ ব্রেক্সিট। কেন? বিগত ১৯৭৩ সাল থেকে  ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য। ব্রিটেন ইইউ ছেড়ে যাবে কি না তা জানতে গণভোট ডাকা হয়েছে। ব্রিটেন ইউরোপের পুরনো ও বড় মাতবর । কলোনি ইতিহাস সাথে ধরে নিলে দেশটা কলোনি সাম্রাজ্যকালের মাস্টার রাষ্ট্রগুলোরও শিরোমণি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে বৃটিশ, ফ্রেঞ্চ, ডাচ, পর্তুগীজ বা স্পানিশ ইত্যাদি  সবার কলোনি সাম্রাজ্যের মাস্টারি পরিসমাপ্তি ঘটে যায়। কিন্তু তা  গেলেও এর পরবর্তীকালে আমেরিকার নেতৃত্বের নতুন করে সাজানো দুনিয়াতে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র ব্রিটেন ইউরোপের সবার উপরে আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়ে জায়গা দখলে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। আজ যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন যা ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোকে আর আলাদা আলাদা না থেকে ক্রমশ ধাপে ধাপে এক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হবার পরিকল্পনা সেই প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছিল ১৯৫১ সালে। ইতোমধ্যে ১৯৯৩ থেকে ২০০৯ প্রায় প্রতিবছর নতুন নতু কমন আইনের অনুমোদনে রাষ্ট্রগুলো এক ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হবার পথে অনেক দূর এগিয়ে যায়। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠিত হলেও এরমধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী তিন রাষ্ট্র হয়ে থাকে – বৃটেন ও বাকি দু’টি ফ্রান্স ও জার্মানি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সদস্য দেশগুলো একই কারেন্সি হিসেবে ইউরোকে গ্রহণ করে ১৯৯৯ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে। যদিও ব্রিটেন এর পরও বিশেষ বিবেচনায় তার নিজ মুদ্রা পাউন্ড নিয়েই ইউরো জোনের বাইরে থেকে যায়। ব্রিটেনকে ইইউ’র সদস্য হয়ে থেকেও বিশেষ ব্যবস্থায় তাকে ইউরোর বাইরে থাকতে জায়গা করে দেয়া হয়েছিল। চলতি মাসেই ২৩ জুন ব্রিটেনে এক গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল। যেখানে নাগরিকেরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে থাকবে না বের হয়ে যাবে এই প্রশ্নে গণভোটে মতামত দেয়। অর্থাৎ গণভোটের ফলাফলে ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় এসেছে বলে ব্রিটেন এখন আর “ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য থাকবে না”। এর প্রাথমিক শর্ত পুরণ হয়েছে। এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউকে জানানোর পরে বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই আনুষ্ঠানিকতা ও নিগোশিয়েশন শেষ হতে কমপক্ষে দুই বছর লাগবে।
গণভোটের ঘটনাটাকে মনে হতে পারে সাধারণ যেকোনো একটা রাষ্ট্রের গণভোটের ইস্যু। আইনি আনুষ্ঠানিকতার দিক থেকে এটা তাইও। কিন্তু এটা শুধু বৃটেন নয় খোদ গ্লোবাল ইকোনমিতেই ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। এক কথায় বললে, এর প্রধান কারণ দুনিয়াতে এখন একটাই অর্থনীতি, পরস্পর পরস্পরের সাথে আষ্টপৃষ্টে জড়িয়ে যাওয়া নির্ভরশীল হয়ে পড়া একক অর্থনীতি। দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের অর্থনীতিই সেই একক গ্লোবাল অর্থনীতির একেকটা অংশ মাত্র। যারা পরস্পর পরস্পরের সাথে পণ্য, বিনিয়োগ, বাজার কাঁচামাল ইত্যাদি মাখামাখি একাকার হয়ে শেয়ার করে চলে। পরস্পর বিনিময় লেনদেনে জড়িয়ে আছে, ফলে তাদের সব কিছুই গভীরভাবে আবদ্ধ ও পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল ও সংযুক্ত হয়ে পড়েছে। কথাগুলো গ্লোবাল অর্থনীতি অর্থেও সত্য, এমনকি আবার ইইউ’র সাথে ব্রিটেনের সম্পর্ক অর্থেও সত্যি।
নেদারল্যান্ডের মাসট্রিক্ট শহরে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ১৯৯২-৩ সালের স্বাক্ষরিত চুক্তির ভেতর দিয়ে ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন’ এক রাষ্ট্র জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। যে এই জোট বাধা শুরু হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে ভিন্নভাবে কেবল ইউরোপীয় উৎপাদক কোম্পানিগুলো কিছু পণ্যের কমন বাজার জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশে। বিগত ১৯৫১ সালে জন্ম নেয়া ঐ প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ‘ইউরোপীয় কয়লা ও ইস্পাত কমিউনিটি’। পরবর্তীকালে এটা আর কয়েকটি পণ্য থেকে শুধু সব পণ্যই বিক্রির কমন বাজারের জোট নয় – কমন মুদ্রা, কমন শ্রমবাজার ও কমন পণ্যবাজার ইত্যাদি বিষয়ে সদস্য রাষ্ট্রের জন্য এক কমন মার্কেট কায়েম করে ফেলেছিল। এটাই আরো এগিয়ে কমন আদালত, কমন পার্লামেন্ট, বিভিন্ন ইস্যুতে যেমন পরিবেশ বিষয়ে এক কমন নীতি ইত্যাদি শেষ করে এগিয়ে যাচ্ছিল যার লক্ষ্য ছিল কমন এক রাষ্ট্রে পৌঁছানো। এ সব কিছুর মূল তাৎপর্য ছিল নিজেদের বিশাল কমন বাজার। যেকোনো ইউরোপীয় রাষ্ট্রের কোন পণ্য উৎপাদক কোম্পানী কমন ইউরোপীয় বাজারের আয়তনের কথা চিন্তা করে নিজ উৎপাদন পরিকল্পনা, প্রতিযোগিতা সাজাতে পারে। কমন ইউরোপীয় একজোটের শক্তি হয়ে এবার গ্লোবাল বাজার শেয়ার কতটা নিজের জোটের পক্ষে আনা যায় এজন্য লড়তে পারে। আবার চাকরিজীবী বা শ্রম অবাধে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রের যেকোনো জায়গা থেকে যেকোনো জায়গায় ভ্রমণ করতে ও অবাধে চাকরি নিতে পারে। মূলত এই দিকগুলোর সুবিধার কথা ভেবে সব সদস্য রাষ্ট্রের ভোটাররা এক ইইউ’র পক্ষে থাকার ভোট দিয়ে থেকেছে। অর্থাৎ ইইউ’র পক্ষে থাকলে বিরাট কমন বাজারের সুবিধা পাবে এটা কোম্পানীগুলো যার যার জায়গা থেকেই দেখতে পায়। আর যেকোনো শ্রমজীবী চাকরি খোঁজার বিরাট বাজার পাবে, এই লোভে ইইউ’র পক্ষে থাকে।
এগুলো গেল ইইউ’র অভ্যন্তরীণ দিকের সুবিধা। আবার বাইরের দিক হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপের কলোনি মালিকদের কলোনি ক্যাপিটালিজমের রুস্তমির দিন শেষ হয়ে যায়। শুরু হয় আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ কোম্পানির ক্যাপিটালিজমের যুগ। এখানে আমেরিকার সাথে তুলনায় ইউরোপের কোনো রাষ্ট্রই আর প্রতিযোগী হিসেবে হাজির হওয়া দূরে থাক,  আমেরিকান অর্থনীতির ধারে-কাছে গোনায় ধরার মতো কেউ ছিল না। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনে বাজার, শ্রম ও মুদ্রার কমন ব্যবস্থা তৈরির পেছনে প্রধান প্রণোদনা ছিল যে এই নতুন উদ্যোগের পরিণতিতে তারা আমেরিকার প্রতিযোগী না হতে পারলেও অন্তত গোনায় ধরার মত অবস্থায় পৌছাবে আর গ্লোবাল পণ্য বাজার শেয়ারের এক উল্লেখযোগ্য অংশ যেন ইইউ’র দখলে আসে। এই লক্ষ্যে তাই তাদের মূল চালিকাশক্তির মৌলিক অবস্থান ছিলঃ নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা করে শক্তি ক্ষয় না করা, বরং আপন সক্ষমতাগুলোর সমন্বয় করা। আর সেই মিলিত সম্মিলিত ক্ষমতা দিতে ইইউ’র বাইরের সবার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা করা। এভাবে গ্লোবাল বাজার শেয়ার নিজেদের পক্ষে বাড়ানো। তবে ব্রিটেন শুরু থেকেই অমনোযোগী ছাত্রের মত আচরণ করে গেছে। ১৯৫১ সালের ইইউ উদ্যোগে যোগ দিয়েছে ১৯৭৩ সালে। এভাবে ইইউ’র একই মুদ্রা ইউরো তো ঢুকেই নাই এ’বাদে প্রায় সব কিছুতে ইইউ’র সাথে নানান স্পেশাল খাতিরের শর্তে। ফলে এভাবে এক কথায় বললে বিগত প্রায় ষাট বছরের বেশি সময় ধরে ধীরে ধীরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্যবস্থাটি গড়ে উঠেছে। আর এখন এক দিনের গণভোটের ফলাফলে ইইউ ভেঙে ব্রিটেন বেরিয়ে চলে যাওয়ার পথে।
গণভোটে ইইউ ত্যাগের পক্ষ যে জিতেছে সেটা মূলত কার ওপর নির্ভর করে? সমাজের কোন অংশ?  বলা বাহুল্য সাধারণ ভোটার, চাকরি বা শ্রমজীবী এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। অর্থাৎ ইইউ ত্যাগের পক্ষে গেলে ব্রিটেনবাসী আমজনতার চাকরি পাওয়ার সুবিধা বাড়বে  এই বিবেচনা এটা এখানে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। চাকরির সুবিধা বাড়বে কি না সেটা তো এখন বোঝা যাবে না। বাস্তবে কী দাঁড়াবে তা তো বোঝা যাবে বাস্তবে ইইউ ত্যাগ করে যাওয়া কার্যকর হবার পরে। তাহলে এখন কিসের ওপর নির্ভর করবে? নির্ভর করবে কাজ-চাকরির সুবিধা বাড়বে কি না এ নিয়ে যে পারসেপশন, মানুষের যে ধারণা অনুমান (অনুমান মানে শ্রেফ আন্দাজে অনুমান, যা সত্যি নাও হতে পারে) তার ওপর। এই পারসেপশন তৈরি করছে কী কী ফ্যাক্টর তা খুঁজে দেখতে হবে। তবে তা বলার আগে আমাদের কাছে এ বিষয়ে একটা আগের উদাহরণ হলো গ্রিস। গ্লোবাল মহামন্দা (২০০৮)-এর ধাক্কা  দুনিয়ার সবাইকে কম-বেশি সবাইকে সহ্য করতে হলেও তা সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় গ্রিসে। বাস্তবতা হলো রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে যায় এতে। আর তা থেকে ছুটে বের হতে গ্রিস শেষে ইইউ’র কাছে আগামি  ত্রিশ বছর ঋণগ্রস্ত গোলাম হয়ে থাকার পথ বেছে নেয়। আর এর অন্যথা অন্য একটা ছিল – ইইউ থেকে মানে ইউরো মুদ্রার জোন থেকে বেরিয়ে গ্রিসের নিজ পুরানা মুদ্রায় ফিরে যাওয়া, যার সার কথা নতুন মুদ্রার মূল্য ইউরোর প্রায় অর্ধেক বলে ঘোষণা দেয়া বা ডিভ্যালুয়েশন। কিন্তু গ্রীসে এ নিয়ে কয়েকবার গণভোট বা সাধারণ নির্বাচন হওয়ার পরও দেখা গেল গ্রিসে তবু ইইউ এ থেকে যাওয়ার পক্ষ জয় লাভ করেছে। এর সম্ভাব্য কারণ মনে করা হয় যে, কেবল গ্রিসের বদলে সারা ইউরোপে কাজ খোঁজা ও পাওয়ার সুবিধা পাওয়া যাবে, সাধারণ ভোটার চাকরিজীবী, শ্রমজীবী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই লোভ ত্যাগ করতে পারল না বা কাজ পাওয়ার দিক থেকে ইইউ ত্যাগ সেটা বেশি বড় বিপদের মনে করল।
গ্রিস ইইউ থেকে বের হয়ে আসবে কীনা তা নিয়ে উঠা তখনকার সামাজিক রাজনৈতিক  উত্তাপ এখনকার ব্রিটেনের চেয়ে কয়েক গুণে উত্তপ্ত ও সরব ছিল। কিন্তু গ্রীসে বারবার ভোটের ফলাফল দেখা যায়,  ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষ জিতেছে। ব্রিটেনের পরিস্থিতিতে জনমত জরিপ অবশ্য আগে থেকেই ইঙ্গিতে বলছিল যে ইইউ-ত্যাগের পক্ষ জয় লাভ করবে। অনেকে যদিও বলছে ইদানীং জরিপের ফল বাস্তবের উল্টা দিচ্ছে। সে কথাও ঠিক।
তবে সাধারণ ভোটার বলতে চাকরিজীবী বা শ্রমজীবীদের সবাইকে এক কাতারে সাধারণ করে দেখিয়েছি বটে, কিন্তু ভোটের প্যাটার্নের দিক থেকে এরা সবাই একমুখী নয়। যেমন বাংলাদেশী অরিজিন, যারা হোটেল-রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সাথে জড়িত তারা ইইউ ত্যাগের পক্ষে ভোট দিয়েছে বলা হচ্ছে। তাদের কাছে সারা ইউরোপ কাজ চাকরি পাওয়ার দিকটি ততটা লোভনীয় নয়। এর চেয়ে ত্যাগ-পক্ষ জিতলে তাহলে তাদের কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনকার প্রতিদ্বন্দ্বী রোমানীয়রা ব্রিটেন ছেড়ে বিদায় নেবে। এতেই তারা তাদের ফায়দা দেখে নাকি ভোট দিয়েছে। আপাতত এটাই তাদের মুখ্য লক্ষ্য। ফলে তাদের ধরনের কাজ ব্রিটেনেই পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে বলে তারা আশা করছে।
এত গেল শ্রমের কাজ পাওয়া না পাওয়ার পারসেপশন। কিন্তু ত্যাগ পক্ষের জিতে যাওয়ার অর্থ হবে ভয়াবহ; এর অর্থ হবে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া, টাক্স বেড়ে যাওয়া, বাজেট কাটছাঁট করা, হাউজিংয়ের মতো খাত ধসে পড়া এটাই একলা চলতে চাওয়া ব্রিটেনের অর্থ। সাধারণভাবে এর মূল কারণ হল, ইইউতে অন্তর্ভুক্ত থাকা মানে বাজার বড় বলে অনেক খরচই ভাগাভাগি হয়ে কমে যায়, একই অবকাঠামো সবাই শেয়ার করা যায় বলেও খরচ কমে আসে। বহু অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতায় পরস্পরের সক্ষমতা  খোয়ানো তাতে এড়িয়ে যাওয়া যায়। তাই ইইউ ত্যাগ করলে এই খরচগুলো এবার চেপে বসবে। এ কারণে ইইউ ত্যাগ না করার পক্ষে ব্যবসায়ী, ট্রেডার ব্যাংকার বা বিনিয়োগকারী ধরণের সবাই সোরগোল তুলেছে। যদিও এটা ঠিক কেবল ব্যবসায়ী, ট্রেডার ব্যাংকার বা বিনিয়োগকারী ধরনের লোকদের স্বার্থের বিষয় নয়। আবার যদিও টপ সাত শিল্পায়িত রাষ্ট্রপ্রধানের ক্লাব জি-৭ বা গ্রুপ সেভেন বহু আগে থেকেই রীতিমতো বিবৃতি দিয়ে সুপারিশ করে যাচ্ছিল, যাতে গণভোটে ব্রিটেন ইইউ ত্যাগের পক্ষে সিদ্ধান্ত না নেয়। ইতোমধ্যে আইএমএফও ত্যাগের বিপক্ষে বিরাট বিরাট বিপদের হুঁশিয়ারির কথা বলে গিয়েছিল। এর প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চান লাগার্ডে বলেছিলেন, শেয়ার মার্কেট ক্রাশ করতে পারে। ইতোমধ্যে তা হওয়ার আলামত শুরু হয়ে গেছে। সেন্ট্রাল ব্যাংক, ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, অর্থনৈতিক মহামন্দা চেপে বসতে পারে। ইতোমধ্যে চীনের শেয়ারবাজার শঙ্কিত হয়ে উঠেছে। বড় কারণ ব্রিটেন হল, চীনা ইউয়ান মুদ্রা বিনিময়ের বাজার, ইউয়ান ভাঙ্গিয়ে অন্য গ্লোবাল মুদ্রায় নিয়ে যাওয়ার মূল মার্কেট। ব্যাংকার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে জর্মানির দুটো ব্যাংক, যারা ব্রিটেনে ব্যবসা করে এরাও প্রায় একই রকম বিপদের হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। ওদিকে প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষে নিজের অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি প্যারিস সফরে গেলে প্যারিসের প্রধানমন্ত্রীও তাকে ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষে থাকতে বলেছিলেন। ত্যাগ-পক্ষ জিতলে ফ্রান্সে আশ্রয় নেয়া রিফিউজিরা ব্রিটেনে চলে যেতে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে, সীমান্তে ভিড় করতে পারে এই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তবে এগুলো পড়ার সময় মনে রাখতে হবে এসব মন্তব্যগুলো তখন কেবল ব্রিটেনের ক্ষতির কথা ভেবে বলা হয় নাই। কারণ ব্রিটেন বের হয়ে গেলে ইইউও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটা বিখ্যাত পত্রিকা লল্ডন ইকোনমিস্টের অবস্থান। ফলে চেইন রিয়াকশনে সারা গ্লোবাল ইকোনমিতে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। এসব ভেবে এই হুঁশিয়ারি।
এবার শেষ করব, আরেক অদ্ভুত প্রতিক্রিয়ার কথা বলে। আমেরিকার একটি পত্রিকাটির নাম ‘ফাইনান্সিয়াল সেন্স’। নাম শুনে কিছুটা আন্দাজ করতে পারেন অনেকে যে, এটা ওয়াল স্ট্রিট বা বিশাল বিনিয়োগ পুঁজি বা পুঁজিবাজার কোম্পানির আড়ত মোকাম আছে ওয়াল স্ট্রিট নামে ঐ জগতের পত্রিকা। এই আর্টিকেলের লেখক ড্যানিয়েল পার্ক পুঁজিবাজারের বিশেষজ্ঞ পরামর্শক, তাদেরই মন্তব্যের পত্রিকা এটা। ঐ রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘ব্রেক্সিট গণভোট তো শুরু কেবল’। কিন্তু কিসের শুরু? কিসের কথা বলছেন তিনি? তার কথাগুলো সার করে এখানে বলব।

তিনি বলছেন মূল সমস্যা হলো, “একবার যদি মানুষের হাতের সঞ্চয় ফুরিয়ে যায়, আয় বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায় আর সেই সাথে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার স্থবির পালা হয়ে চলাচলহীন জমে ওঠে ফলে যা আবার ধার দিবার জন্য উদ্গ্রীব – খুবই নিচু শূন্যের কাছাকাছি অথবা শূন্য সুদে ধার দেয়ার জন্য তৈরি  হয়ে বসে আছে, কিন্তু বিতরণ করতে পারছে না কারণ বাজারে ধার গ্রহণের লোক নেই, ঋণ গ্রহিতা ক্রেতা নাই, ক্রেতার বাজার নেই বা ক্রেতারা বাজারে নাই”। এবার তিনি এক বিজ্ঞাপন সাথে এনেছেন তার কথাটা প্রমাণ করার জন্য।নিচে বিজ্ঞাপনটা কপি করে দেয়া হল। DODGE – এটা আমেরিকান এক গাড়ী প্রস্তুতকারক কোম্পানীর নাম।

https://i0.wp.com/www.financialsense.com/sites/default/files/users/u199/images/2016/June-Zero-No-Payments-238x488-Website-Panos-en-0002-caravan-238x488.jpg

তিনি বলছেন, আজকের গাড়ি বিক্রির বাজারে ঠিক এই বাস্তবতাই আমরা দেখছি। ডজ গাড়ি বিক্রির এক বিজ্ঞাপন দেখিয়ে তিনি বলছেন, “এরা শূন্য সুদে তিন, পাঁচ বা সাত বছরের (৮৪ মাস) জন্য ঋণ দিতে চাচ্ছে। এর উপর আবার প্রথম ৯০ দিন কোনো কিস্তি দিতে হবে না বলছে। এছাড়া পরবর্তিতে নতুন নতুন মডেলের গাড়িতে আপগ্রেড করে নেয়ার সুযোগের অফার দিচ্ছে”। ‘ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে এমন যে, আমার ক্রেতা খুবই কম অথবা নেই। তাই আমি আমার সম্ভাব্য ক্রেতার হাতে অর্থ তুলে দিয়ে হলেও আমার ব্যবসার সার্কুলেশন চক্র চালু রাখতে চাচ্ছি। দেনার ওপর দেনা বাড়িয়ে হলেও টিকে থাকতে চাচ্ছি। ঋণ-গ্রহীতার বাজারের এমনই দুরবস্থায় পৌঁছেছে।” তাহলে কিসে তিনি এ থেকে সমাধান দেখছেন?
তিনি বলছেন রেডি হওয়ার জন্য। কিসের জন্য রেডি? তিন দশক ধরে যে দম ধরা অবস্থা চলছে এর ভেঙেচুরে পড়া বা ছেদ সমাপ্তি দরকার, তিনি চান। সব দেউলিয়া হয়ে ভেঙ্গে পড়ুক, এরপর পুনর্গঠন করে নিবার সুযোগ আসবে, রাজনৈতিক অস্থিরতা আসুক  – ইত্যাদি সব এগুলো দেখার জন্য তৈরি হতে হবে। দুনিয়া এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, এর পরিশুদ্ধতা ( খ্রিষ্ট ধর্মীয় এক শব্দ ও  ধারণা -‘ক্যাথরেসিস’ ব্যবহার করেছেন তিনি) দরকার। এ জন্য প্রবল উদ্যমী একটা ‘সৃষ্টিশীল ধবংসের’ (ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন) কথা তিনি প্রস্তাব করেছেন, যা পরিশেষ আমাদের বাসাবাড়িগুলোতে বসবাসকারিদের হাতে সঞ্চয়ের ঢল নামাবে। এটা ঘটার আগে ‘ব্রেক্সিট মেক্সিট বহু কিছু বিপর্যয় আমরা দেখব। এভাবে আমরা বহু ভাঙন আর পুনর্গঠন দেখতে পাবো, কিন্তু তাতে আমরা যেন আঁতকে না উঠি।’

[আগামিকাল দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্ত হবে।]

 

 

শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা

শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা
গৌতম দাস
১৮  জুন ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-1jc

 

‘শাঙ্গরি-লা ডায়লগ’ বা Shangri-La Dialogue। এটা প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় এমন একটি নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলনের নাম। পুরা নাম IISS Shangri-La Dialogue। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রায়.৫০ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক প্রধানদের নিয়ে সিঙ্গাপুরে এর আয়োজন হয়। তাদের মধ্যে আমেরিকা, চীন, জাপান, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ইত্যাদি ছাড়াও এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্য অনেক রাষ্ট্রও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। শাঙ্গরি-লা নামটা মূলত ইন্ট্যারনাশনাল এক চেইন হোটেল গ্রুপের। আর ওদিকে আইআইএসএস- ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। এটা ইংল্যান্ড ভিত্তিক এক থিঙ্কটাংক বা গবেষণা স্টাডি ধরনের প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ আইআইএসএস ও সিঙ্গাপুর সাংরিলা হোটেলের যৌথ উদ্যোগে ২০০২ সালে জন্মের পর থেকে সিঙ্গাপুরের শাঙ্গরি-লা হোটেলে প্রতি বছর এই নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন হয়ে থাকে। আর শাঙ্গরি-লা হোটেলে নাম থেকে শাঙ্গরি-লা শব্দটা ধার নিয়ে এই সম্মেলনের নামকরণ করা হয়েছে ‘শাঙ্গরি-লা ডায়লগ’। সে হিসাবে একইভাবে এবারের সম্মেলন শুরু হয়েছিল ৩ জুন ২০১৬ থেকে। চলেছিল রোববার ৫ জুন পর্যন্ত।

হংকংয়ের সবচেয়ে পুরানা এক দৈনিক পত্রিকা হল, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। শাঙ্গরি-লা ডায়লগ প্রসঙ্গে তারা বিরাট রিপোর্ট ছেপেছে। যার মূল বক্তব্য হল, সম্মেলনের এবারেরও ফোকাস আবার সেই দক্ষিণ চীন সাগর। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে চীন ও আমেরিকা উভয়পক্ষ চাচ্ছে কোনো রেটরিক বা উচ্চবাচ্য থেকে যেন উত্তেজনা না ছড়িয়ে যায়। উভয় পক্ষ কোনোভাবেই চায় না যে সমুদ্রসীমা বিতর্ক চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে অচল ও তেতো বানিয়ে ফেলে।
যেমন ওয়াশিংটনভিত্তিক এক থিঙ্কট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারনাশনাল স্ট্রাডিজ’-এর ড. বন্নি গ্লসার মনে করেন দক্ষিণ চীন সাগর সমুদ্রসীমা বিতর্ক ইস্যুতে চীন ও আমেরিকা প্রত্যেকেই নিজ অবস্থানে শক্ত হয়ে দাঁড়াবেন। কিন্তু কোনোভাবেই তারা উভয়েই এই মিটিংকে তাদের বিরোধ প্রকাশ বা প্রদর্শনের জায়গা বানাবেন না। গ্লসার বলছেন, “এ কথা সত্যি যে দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে আমাদের মৌলিক কিছু স্বার্থ সঙ্ঘাত আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনোভাবেই শাঙ্গরি-লা ডায়লগ আমাদের বিরোধে কোনো ফয়সালা আনার স্থান নয়”।
ঐ রিপোর্ট লিখছে, “আমেরিকা চায় এই অঞ্চল শান্তি, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে তাকে বিবেচনা করুক ও তার ওপর আস্থা রাখুক। কিন্তু একইসাথে এ অঞ্চল চীন-আমেরিকার সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রভূমি হয়ে উঠুক এটাও চায় না। এটা আমেরিকা বুঝে। তাই শাঙ্গরি-লা ডায়লগে আমেরিকার প্রচেষ্টা থাকার কথা এ দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা”। একারণে আমরা দেখছি এই রিপোর্টের শুরুতে উপরে উধৃত এই লম্বা বাক্যটা আছে। কিন্তু তাতে একটা ছোট শব্দ আছে বাংলায় বললে তা হলো ‘আগলে ধরে রাখা’ বা ইংরাজিতে contain। বলা হচ্ছে চীন ও আমেরিকা দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে উত্থিত যেকোনো টেনশন আগলে ধরে রাখার পক্ষে পদক্ষেপ নিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে একমত হয়েছে।

ঐ রিপোর্ট সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও চীন-আমেরিকার সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হুয়াঙ জিং কে উদ্ধৃত করেছে। তিনি বলছেন, “চীন-আমেরিকার বিরোধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে, এটা দাঁড়িয়ে দেখা উভয়ের কারও স্বার্থের পক্ষে যায় না”। হুয়াঙ শাঙ্গরি-লা ডায়লগের অর্গানাইজিং কমিটির একজন সদস্যও। তিনি ভিতরের তথ্য জানাচ্ছেন, “আসলে দক্ষিণ চীন সাগর টেনশনের ইস্যু সম্মেলনের তিন দিনের পাঁচ সেশনে কখনই আনা হবে না। এর বদলে বরং শেষের দুই দিনের অনুষ্ঠিতব্য যে ছয়টা সাইড মিটিং হওয়ার কথা তার কোন একটাতে এনিয়ে কথা হবে”। অর্থাৎ মূল আলোচনায় নয় পার্শ্ব-আলোচনার বিষয় হিসেবে সাউথ চায়না সি বিতর্ক রাখা হয়েছে। হুয়াঙ বলছেন, “চীন ও আমেরিকা উভয়েই চায় তাদের অবস্থানের মতভেদকে নিচুস্বরে নামিয়ে রাখতে এবং শাঙ্গরি-লা ডায়লগের হোস্ট সিঙ্গাপুরও চায় না যে তার আয়োজিত এই সভা দক্ষিণ চীন সাগরে ইস্যুর ভেতরে হাইজাক হয়ে যাক”। অবশ্য এখানে আর এক মজার তথ্য তিনি শেয়ার করেছেন। হুয়াঙ জিং বলছেন, দিনকে দিন নিজের দাবিনামা নিয়ে চীন যেভাবে সরব অগ্রসর হচ্ছে তাতে সেটাকে আমেরিকা কী করে মোকাবেলা করবে, মুখোমুখি হবে – এ প্রশ্নে আসলে খোদ আমেরিকাতেই ‘হোয়াইট হাউজ বনাম পেন্টাগনের’ মধ্যে বিতর্ক ও মতভেদ আছে। তবে সেই বিতর্ক ও মতভেদ থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কোনোভাবেই চীন-আমেরিকার পরস্পরের দিকে থুথু ছিটিয়ে ঝগড়া করুক তা হতে দেবেন না। কারণ আগামী সপ্তাহ থেকে চীন-আমেরিকার মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক “স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক ডায়লগ” অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটা উভয় রাষ্ট্রের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর সমন্বয়ের লক্ষ্যে প্রতিবছর নিয়মিত হয়ে আসছে। সেটার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাক ওবামা তা হতে দিতে পারেন না।
তাই হুয়াঙ ও গ্লসার উভয়েই নিশ্চিত করে বলছেন, শাঙ্গরি-লা ডায়লগ অনুষ্ঠানে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী এস্টন কার্টার যে নির্ধারিত বক্তৃতা রাখার কথা আছে সেখানেও এস্টনের স্বভাবসুলভ গরম বক্তব্যও নিচুস্বরে হাজির করা হবে। যেমন এস্টন কার্টার এর আগে – চীন তার দাবির পক্ষে জোরাজুরি করতে গিয়ে ‘বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার এক গ্রেট ওয়াল’ রিস্ক নিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। চীন এই শাঙ্গরি-লা মিটিংয়ে কোন মন্ত্রী নয় বরং এক সামরিক কর্তা এডমিরাল সান জিয়াঙগুয়ের নেতৃত্বে যোগ দিয়েছে। ফলে এমন প্রশ্নের জবাবে, এডমিরাল সান সম্ভবত নিজেদের পুরানা অবস্থানই রক্ষা করে চলবেন। এসব দিক বিবেচনা করে গ্লসার বলছেন, ‘আমি মনে করি না যে, চীনা পক্ষের আগামীকালের বক্তৃতায় আমরা নতুন কোন কথা শুনব’। এই “সাংরিলা মঞ্চ নিজের পার্থক্য নিয়ে কথা বলার একটা খুবই ভালো জায়গা, কিন্তু আসলে একটা ভারসাম্য অবস্থা বের করে আনার পক্ষেই আমাদের কাজ। সে জন্য আমি মনে করি না যে এই সভা থেকে কোনো শক্ত কথার মার বা ধারালো রেটরিক কিছুই শুরু হবে না। বিশেষত যখন চীন-আমেরিকার মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক ‘স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক ডায়লগ’ অনুষ্ঠান যখন পরের সপ্তাহে”।
এমন ঠাণ্ডা বাতাবরণ যে ইতোমধ্যে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এর আর এক লক্ষণ হল, ভিয়েতনামের ততপরতা। দক্ষিণ চীন সাগর সমুদ্রসীমা বিতর্কে চীনের সাথে একমাত্র ভিয়েতনামের সম্ভবত সবচেয়ে তিক্ত সম্পর্কটা হয়ে গেছে। সেই ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির নৌবহরকে ভিয়েতনামের কোনো এক পোর্টে নোঙর করে অতিথির বেড়ানো বেড়িয়ে যেতে দাওয়াত দিয়েছে। ভিয়েতনামের প্রতিরক্ষা দফতরের মুখপাত্র সুত্রে এটা জানা গেছে।
সাউথ চাইনা মর্নিং পোষ্ট এই রিপোর্টের শেষে কিছু ছোট মজার মন্তব্য করেছে। যেমন ওই রিপোর্টে তথ্য দিয়ে বলেছে, “ভিয়েতনাম চীনা নৌবহরকে দাওয়াত দিয়েছে এমন সময় যখন ভারতের দুইটা যুদ্ধজাহাজ ভিয়েতনামের ‘ক্যাম রণ বে’ বন্দর গত বৃহস্পতিবার ত্যাগ করে গেছে। এ ছাড়া পোস্টের আর একটা মন্তব্য বাক্য, ‘দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে কিন্তু আমেরিকার মত ভারতেও কোনো দাবি বা স্টেক নেই; ফলে বিরোধ-বিবাদের সে কোনো পক্ষও নয়’।
পোষ্টের এই মন্তব্যে অনেক কথা লুকানো আছে। সময়ের অভাবে সব এখানে আনার সম্ভব হবে না। শুধু ভিয়েতনাম চীনা নৌবহরকে দাওয়াতের এক ঘটনাই আবহাওয়া সম্পর্কে অনেক কিছুর নির্দেশক। অর্থাৎ গুমট পরিস্থিতির ভেতরে কোথাও থেকে একটা ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। না হলে এটা দাওয়াতপত্র পর্যন্ত গিয়েছে তা হতো না।
তবে এখানে আমরা গত বছরের শাঙ্গরি-লা ডায়লগের কথা স্মরণ করতে পারি। সে সময়কাল প্রায় একই ছিল, ২৯-৩১ মে ২০১৫ সাল। ইস্যুও প্রায় একই। দক্ষিণ চীন সাগরের পূর্ব দিক পূর্ব চীন সাগর চীন সীমান্তের যার অপর পাড়েই জাপান। পূর্ব চীন সাগর  নিয়ে চীন ও জাপানের সমুদ্র সীমা বিতর্ক আছে। আমেরিকার উস্কানিতে জাপান  গতবার পূর্ব চীন সাগর ইস্যুকে তেতে উঠেছিল।  গত বছরের প্রথম থেকেই এই ইস্যু নিয়ে চীন-জাপানের বিরোধ বিবাদকে তাতিয়ে তুলে চলছিল আমেরিকা । কিন্তু এবারের মত একইভাবে গতবারও আমেরিকা জাপানকে গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নেয়ার অবস্থা করেছিল। বছরের শুরু থেকেই জাপানকে দিয়ে চীনের সাথে  ঝগড়ার মুখোমুখি করিয়ে যেন এখনই যুদ্ধ লেগে যাচ্ছে এমন এক অবস্থায় এনে শেষে শাঙ্গরি-লা ডায়লগে যখন উভয়ের মুখোমুখি হয়ে গেল তখন এখানে এসে পূর্ব চীন সাগর ইস্যুতে আমেরিকার পুরা উল্টো অবস্থান। ভোল পালটে মিটিংয়ে আমেরিকানরা এবার জাপানিজদের খালি জামা টেনে ধরা শুরু করেছিল। কি জানি যদি জাপানিজরা চীনাদের সাথে যদি ঝগড়া বাধিয়েই ফেলে তবে সেটা তো আমেরিকাকেও জাপানের সাথে মিলে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে যাওয়ার অবস্থায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে। আর পৌঁছালে তখন কী হবে? এই আসল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল আমেরিকা। অর্থাত এশিয়ায় আমেরিকার এই নীতির মূল কথা হলো যেন, কোন রাষ্ট্র বিরোধ ও স্বার্থসঙ্ঘাত দেখা দিলেই সেটাকে যুদ্ধের দিকে নিতে হবে, ঠেলে দিতে হবে। অথচ এটা তো কোনো কাজের কথা নয়। একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এমন নীতি বাস্তবায়ন অসম্ভব বলে একেবারে না করে দেয়া যাবে না। তবে এটা খুবই এক্সষ্ট্রীম পথ, সর্বশেষ অবলম্বন; সব পথ ফেল করার পর যা করা হয়। তাই গতবারের সাংরিলার পর আজ পর্যন্ত আমরা দেখছি খোদ জাপানসহ সবাই যেন ভুলে গেছে যে পূর্ব চীন সাগরে দ্বীপের মালিকানা নিয়ে চীনের সাথে জাপানের কোন ইস্যু ছিল।
পাঠক কেউ যেন বুঝতে ভুল না করেন। তাই কিছু কথা পরিস্কার করে বলে রাখা ভাল। তা হল, এখানে উপস্থাপিত বক্তব্যে এটা বলা হচ্ছে না যে চীন এক মহাপরাক্রমশালী হয়ে গেছে ফলে জাপান ভিয়েতনাম ইত্যাদিরা যেন চীনকে ‘লাড়তে’ না যায়! এমন ওকালতি আমরা এখানে করতে বসিনি। চীনের পক্ষে এমন খেয়ে না খেয়ে এজেন্ট বা চীনের বিদেশনীতির ব্যাগ বহনকারী দালাল সাজার আগ্রহ আমাদের নেই। এর কোনো অর্থও হয় না।
বিষয়টা হল, যুদ্ধ সম্পর্ক আমাদের দেখা বা জানা পুরানা ইতিহাসের অভিজ্ঞতার ভিতর ইতোমধ্যে এক ব্যাপক বদল ঘটে গেছে। বিশেষ করে এই সদ্য পেছনে ফেলা কোল্ড ওয়ারের কালের (১৯৫০-৯২) যুদ্ধ ধারণা। ঐ সময়ের যেকোনো দুই রাষ্ট্রের বিরোধ মানেই শেষ বিচারে আসলে তা সোভিয়েত-আমেরিকান মতাদর্শিক, রাজনীতি বা অর্থনৈতিকসহ সবকিছুতে স্বার্থবিরোধ সঙ্ঘাত। কিন্তু তবু কেবল একটা বিষয় ছাড়া সেসব বিরোধের অন্য সব দিক প্রায় সবই এখনকার মতোই । সে অমিলের দিকে সবার মনোযোগ দিতে বলব। কোল্ড ওয়ারের ওই সময়কালে যেকোনো সঙ্ঘাতের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল সেই স্বার্থবিরোধে সোভিয়েত অথবা আমেরিকা পরস্পর পরস্পরকে যুদ্ধের মাঠেই একমাত্র ফয়সালা করবে এভাবে ঠেলে দিতে পারত, সম্ভব ছিল। অর্থাৎ শত্রু মানেই নির্মূল। যেন একই কথা। নির্মুল ছাড়া শত্রু মোকাবিলা বলে আর কিছুই হতে পারেনা, এমন ধরেই নেয়া হত।  এটাই ছিল একমাত্র পথ ও লক্ষ্য। এর মাধ্যমেই যেকোনো বিরোধের মীমাংসা করতে হবে এটা সহজেই ভাবা যেত। কোনো স্বার্থবিরোধ দেখা দিলেই কূটনীতি বা ডায়লগের ন্যূনতম কথা বলার চেষ্টাও না করে তাকে শত্রু নিশ্চিহেৃর লাইনে ভাবা সম্ভব ছিল।
এমন ভাবনার মূল কারণ, দুনিয়ায় তখন ছিল দুটো অর্থনীতি। যাদের মধ্যে আবার কোনো লেনদেন বিনিময় বলতে কিছু ছিল না, এমনিভাবে দুনিয়া দুই ধরণের অর্থনীতি ও পরস্পর সম্পর্কহীন হয়ে বিরাজ করত। কেউ কারও সাথে লেনদেন বিনিময়েওর সম্পর্কে নাই। কেবল দুইটা অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ নিজ নিজ ব্লকের ভিতর আলাদা আলাদা বিনিময় ব্যবস্থার এমন দুই জোটে বিভক্ত ছিল। ফলে একের বোমা হামলায় অপরের অর্থনীতি ও প্রাণসহ বৈষয়িক সব কিছু নিশ্চিহৃ হয়ে গেলেও তাতে বোমা আক্রমণকারীর কোনোই ক্ষতি ছিল না। যেমন, আমেরিকা পক্ষের কোনো পুঁজি পণ্য লেনদেন বিনিয়োগ অপর সোভিয়েত ইউনিয়নে কোথাও বি-নিয়োজিত ছিল না। ফলে সারা সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বংস হয়ে গেলেও তাতে এর লেনদেন বিনিয়োগ প্রভাব আমেরিকায় পড়বে না। রাশিয়ায় কোনো আমেরিকান বিনিয়োগকারীই ছিল না বলে আমেরিকারই ফেলা বোমায় কোনো আমেরিকান বিনিয়োগ নষ্ট হবে এমন কোনো সম্ভাবনা ছিল না। আর একালে ঠিক এর উলটা। দুটো অর্থনীতি বলতে দুনিয়ায় এখন কিছু নেই, বরং আছে একটাই, একই গ্লোবাল পুজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা। ফলে এখন চীনে আমেরিকা বোমা ফেললে তাতে অবশ্যই কোনো না কোন আমেরিকান বিনিয়োগ বা অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপরই সে বোমা পড়বে। একারণে রাষ্ট্র স্বার্থবিরোধে একমাত্র যুদ্ধই করতে হবে, যুদ্ধে ফয়সালা করতে হবে অথবা এটাই একমাত্র সমাধানের পথ একথা আর সত্য নয়, বাস্তবতাও নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের (১৯৯২) পরে অথবা কোল্ড ওয়ার যুগের সমাপ্তিতে এটাই আমাদের যুদ্ধ ও স্বার্থ ধারণায় ইতোমধ্যেই এক বিরাট পরিবর্তন এনে দিয়েছে। যদিও তা আমরা অনেকেই টের পাইনি অথবা কিছু হলেও অনেকেই পেয়েছেন।
অথচ এই নতুন বাস্তবতাতেও সবাই আমাদের চোখে পট্টি পড়াতে চাচ্ছে। সবাই আমরা একালের স্বার্থ বিরোধকে সেকালে কোল্ড ওয়ার কালের চোখ দিয়ে দেখগাতে চাচ্ছে। পুরনো চশমায় যুদ্ধ পরিস্থিতি বুঝার কল্পনা করার চেষ্টা করছি। অথচ এটা ভুল, অবাস্তব। বরং এভাবে আমেরিকা যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে নিজের যুদ্ধ বা স্ট্রাটেজিক জোটের খোলে ছোটবড় দেশকে তুলে নিতে চাচ্ছে। আর বুঝে না বুঝে এতে তাল ধরেছে ভারত। চীনের সাথে যেন ভারতের যেন একটাই সম্ভাব্য সম্পর্ক  – যুদ্ধ। আমেরিকা প্রতিবারই সারাবছর চীনের বিরুদ্ধে সে এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর জন্য খুবই একটা দরকারি শক্তি এটা প্রমাণ করতে গরম অবস্থা তৈরি করে থাকে। কিন্তু শেষে শাঙ্গরি-লা সম্মেলন এলেই তাকে ক্ষেমা দিতে হয়। কারণ এটা ডায়লগের আসর। ডায়লগের আসরে হুমকি চলে না। আর যদি যুদ্ধ লেগে যায় সেটা হবে – দেশ ভিন্ন, কিন্তু  সেই ভিন দেশের কোন না কোন আমেরিকান বিনিয়োগ এর উপরে তাহলে আমেরিকাকেই বোমা মারার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমেরিকা জানে এটা এবসার্ড, এটা সে করতে পারে না। এখন কথা হল শাঙ্গরি-লা ডায়লগ এলেই সব ঠাণ্ডা পানি ঠেলে দেয়া হয় কেন? ঠাণ্ডা পানিই যদি বাস্তবতা হয় তবে ভুয়া গরম সৃষ্টি করা আমেরিকার ও তার সাগরেদদের দিক থেকে এক মারাত্মক দায়িত্বহীনতা। আর এমন সাগরেদ হয়ে ভারতের নিজ জনগণকে মিথ্যা বলছে, প্রতারণা করে চলছে – কোল্ড ওয়ার যুগের মত মিডিয়া গরম করে বলে যাচ্ছে – চীন এই নিয়ে গেল সেই নিয়ে গেল। চীন ভারতের সব উন্নতির পথে বাধা! অথচ কে না জানে এটা কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫০-১৯৯২) দুই অর্থনীতির সম্পর্কহীন  লেনদেন হীন সময় নয়। এখানে দুই রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধ প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বীতা সবই আছে।, আবার চীন-ভারতের ঘনিষ্ঠ  বছরে ৭৩ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন আছে। কারণ তারা একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অন্তর্গত একই অর্থনীতির দুই অংশ মাত্র। যে কারণে ঐ চীনকেই আবার মোদির “বিকাশের প্রোগ্রামের” ভারত , নিজেরর আগামির জন্য নতুন পাচ শহরের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব দিয়ে চুক্তি করেছে। আমরা নতুন ধরণে যুগে প্রবেশ করে গেছি। একে বুঝতে আমরা যেন অন্তত আশির দশকের কোল্ড ওয়ারের ধারণা ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করতে না যাই। কারণ ওটা অচল, আনফিট।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে ০৬ জুন (প্রিন্টে ০৭ জুন) ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ওয়েবে প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তা আবার পরিবর্ধিত ও এডিট করে আবার ছাপা হল।]

“টেলিভিশন”: সিনেমার গল্পের সমস্যা

“টেলিভিশন”: সিনেমার গল্পের সমস্যা
গৌতম দাস
১৮ জুন ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-6v

[এই লেখাটা হুবহু আগে প্রকাশিত হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৩ তারিখে। সেখান থেকে কপি করে এখানে ছাপা হল।]

মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর সিনেমা ‘টেলিভিশন’ রিলিজ হয়েছে সম্প্রতি সিনেমা হলে। কিছু তরুণ বন্ধুদের উৎসাহে শুক্রবার সকালে দশটায় অর্থাৎ প্রথম দিনের প্রথম শো দেখতে গিয়েছিলাম। দর্শকরা ছবিটি কিভাবে নেয়, কি ধরণের প্রতিক্রিয়া জানায় ইত্যাদি জানার দিক চিন্তা ভাবনা করে বন্ধুরা বলাকা হল বেছে নিয়েছিল।

সে হিসাবে যথারীতি সকালে যাওয়া। গিয়ে দেখা গেল টিকেটের চাহিদা এত বেশি যে বলাকা-২ বা আগের নাম বিনাকা হলে, তাও ব্যালকনি নয়, নীচতলার টিকেট পাওয়া গেল। সকাল দশটার আগেই হাউসফুল বোর্ডও টাঙানো হয়েছিল দেখেছিলাম। সকাল নয়টার দিকে বাসা থেকে রওয়ানা দেবার সময় ভেবেছিলাম এই শৈতপ্রবাহের সকালে নিশ্চয় হলে গিয়ে দেখব ভীড় তেমন নাই। দর্শকেরা হয়ত পরের শোগুলোতে ভীড় করবে। কিন্তু সিনেমা শুরু হবার এক ঘন্টার বেশি আগে পৌঁছে গিয়েও দেখি তরুণ আর তরুণ -অর্থাৎ আমার অনুমান একেবারেই ভুল। সেই আশির দশকের পরে আর বাংলাদেশের সিনেমা হলে যাওয়া হয়নি নানান কারণে, কেবল মাস ছয়েক আগে বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে গিয়েছিলাম এক বার। যে হিসাবে তরুণ বলছি তাদের জন্ম সেই আশির দশকে। সিনেপ্লেক্সের তুলনায় বলাকা চত্তরে একটা বাড়তি সুবিধা পেয়েছিলাম। লাইনে দাঁড়ানো হবু দর্শক সকলকে সহজেই এক ক্যামেরার চোখে একবারে ধরে দেখে বোঝার একটা সুবিধা ছিল সেখানে। বুঝেছিলাম দর্শকেরা প্রায় সবাই স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ধরণের। নতুন প্রজন্ম। অনুমানে মনে হলো, বড় জোর এর দশ ভাগ হবে তরুণী। একটা প্রাথমিক ভাল লাগাও কাজ করেছিল তাদের সকলের উৎসাহের কথা ভেবে যে, ফারুকী ও তার দলবল তরুণদের মাঝে অন্তত এইটুকু জনপ্রিয়তা বা আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে যে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এবং কনকনে শৈত্যপ্রবাহের এই সাতসকালে গরম-ওম ফেলে তারা সিনেমা হলে ছুটেছে। এসব দিক, ব্যাখ্যা নিয়ে ভাবছিলাম। ফলে একটা ভাল লাগাও কাজ করেছিল এই ভেবে যে এই প্রজন্মের কিছু অংশের সাথে বসে সিনেমাটা উপভোগ করা যাবে। দুঘন্টার সিনেমা, তাই একটু ঢিলেঢালা সময় জ্ঞানে, এগারোটায় সিনেমা শুরু হয়েছিল।

দর্শকেরা প্রায় সবাই স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ধরণের। নতুন প্রজন্ম। অনুমানে মনে হলো, বড় জোর এর দশ ভাগ হবে তরুণী। একটা প্রাথমিক ভাল লাগাও কাজ করেছিল তাদের সকলের উৎসাহের কথা ভেবে যে, ফারুকী ও তার দলবল তরুণদের মাঝে অন্তত এইটুকু জনপ্রিয়তা বা আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে যে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এবং কনকনে শৈত্যপ্রবাহের এই সাতসকালে গরম-ওম ফেলে তারা সিনেমা হলে ছুটেছে।

এর আগে বাংলাভিশন টিভিতে চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে ঘটনাচক্রে ‘টেলিভিশন’ নিয়ে প্রচারিত প্রায় এক ঘন্টার প্রমো-টা দেখেছিলাম। সেখানে সিনেমার গানগুলো সিনেমার কলাকুশলীসহ উপস্থাপন করা হয়েছিল। এরও আগে ‘টেলিভিশন’ টিমের কোরিয়া সফর সম্পর্কে যেসব মিডিয়া রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল তা দেখেছিলাম। এটুকু ছিল আমার পূর্ব ধারণা অথবা পুঁজি, যা নিয়ে সেদিন সিনেমা হলে গিয়েছিলাম। যদিও এ থেকে কী নিয়ে এই সিনেমা সে কাহিনীর খোঁজখবর রাখিনি। আবার ঠিক কি নিয়ে একটা সিনেমা দেখতে এসেছি, কি দেখব এখানে বিশেষ তেমন প্রত্যাশাও কাজ করেনি। এসব না থাকলেও, ফারুকী ও তার দলবল কি ভাবছে, কি করছে এখন, তা বুঝবার দেখার একটা সুযোগ, ফলে সে নিয়ে একটা ভাল কৌতুহল অবশ্যই ছিল।

কা হি নী সং ক্ষে প

যারা ছবিটি দেখেন নি, (কিম্বা দেখবেন না, তাদের সুবিধার জন্য সারকথায় গল্পটি পেশ করছি। তবে এক্ষেত্রে আমাকে সহায়তা করেছেন আমাদের আরেকজন তরুণ ছবি পরিচালক, তাসমিয়া আফরিন মৌ। তাঁর বয়ানে গল্পটা হচ্ছে এরকমঃ

টেলিভিশন – এই গল্পের শুরু এমন এক গ্রামে যেখানে নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কোন উপায় নেই। সেই গ্রামে ইন্টারনেট চাট করে তরুণেরা কেউ তবে টেলিভিশন প্রবেশের অনুমতি নেই। গ্রামের চেয়ারম্যান ধার্মিক পরহেজগার যার একচ্ছত্র আধিপত্যে গ্রামে টেলিভিশন দেখা বা কেনার অনুমতি কারো নেই। তবে মুসলমান ছাড়া অন্য কোন ধর্মের মানুষ টেলিভিশন কিনলে নীতিগত কারণে তাকে বাধা দিতে পারে না কারণ, তার ধর্মে “টেলিভিশন” দেখায় নিষেধ নেই।

গল্পের শুরুতে একজন টেলিভিশন সাংবাদিক (বাংলাভিশন) এই চেয়ারম্যানের (রুমি) সাক্ষাৎকার নিতে আসে যার সাথে চেয়ারম্যান জবাব দিয়ে অস্বস্তিতে পড়েন। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। পরিস্থিতি খারাপ জায়গায় যেতে পারে তাই সাক্ষাতকার শেষ করে দেয়া হয়। দেখা যায় চেয়ারম্যান আবার প্রথম আলো পত্রিকা পড়েন, যেখানে ছবিসহ বিজ্ঞাপনগুলো আগেই সাদা কাগজ দিয়ে চেয়ারম্যানের সহচর ঢেকে দিয়েছে। চেয়ারম্যান একজন খুবই ভালো মানুষ, তার এলাকায় জনপ্রিয় এবং সবাই তার কথা মান্য করে। চেয়ারম্যানের একমাত্র ছেলে সুলেমান (চঞ্চল) প্রেম করে সেই গ্রামের এক উচ্চ মধ্যবিত্ত প্রবাসী ব্যক্তির কন্যা কোহিনূরের (তিশা) সাথে, যে কম্পিউটার চালনায় দক্ষ। সুলেমান বাবার কথার বাধ্য ছেলে, বাবার প্রতি তার সর্মথন আছে। বাবার ব্যবসা দেখা শোনা করলেও তার মোবাইল ফোন কেনার অনুমতি নেই। সুলেমানের কর্মচারি ও সহকারী মজনু (মোশাররফ) ট্রিকস খাটিয়ে চেয়ারম্যান বাবার কাছ থেকেই মোবাইল কেনার অনুমতি পাইয়ে দেয় সোলেমানকে। আবার মজনু ছেলেবেলা থেকে কোহিনূরের খেলার সাথী ছিল। সে মনে মনে কোহিনূরকে ভালোবাসে, এক সময় তাকে বলেও ফেলে। অন্যদিকে সুলেমানের সাথে কোহিনূরের প্রেমে নিয়মিত সহায়তা করলেও, মজনু নানাভাবে কোহিনূরকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে।

ঝামেলা বাধে সেই গ্রামে এক হিন্দু শিক্ষক টেলিভিশন নিয়ে প্রবেশ করলে। হিন্দু ধর্মে টেলিভিশন দেখার কোন সমস্যা নেই, এই ধারণার কারণে চেয়ারম্যান অনেক ভেবেচিন্তে তাকে বাধা দেয় না। তবে শর্ত দেয়, কোন মুসলমান তার বাসায় টেলিভিশন দেখতে যেতে পারবে না। পরবর্তীতে হিন্দু শিক্ষক এই শর্ত মেনে চলতে পারে না দুইটি কারণে। এক. গ্রামের মানুষের অত্যাধিক আগ্রহের জন্য চাপ তৈরী হয়। দুই. তার কোচিং সেন্টার টেলিভিশনের আকর্ষণে জমজমাট হয়ে উঠে।

মুসলমানরা হিন্দু শিক্ষকের বাসায় টেলিভিশন দেখতে যায় এই খবর পেয়ে চেয়ারম্যান সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে সেখানে যায়। সেই টেলিভিশনের নিয়মিত দর্শক কোহিনূর সেখানে ওদিনও উপস্থিত ছিল। বেয়াদবির অপরাধে সবার সামনে কোহিনূরকে কান ধরে উঠবস করায় চেয়ারম্যান। এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে কোহিনূর প্রথমে সুলেমানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়, পরে সুলেমানকে শর্ত দেয় টেলিভিশন কিনে বাবার বিরুদ্ধে দাঁড়ালে সে সম্পর্ক মূল্যায়ন করবে।

সুলেমান বাধ্য হয়ে তাই করে। বাবার লোকজনের সাথে তারা মারামারি হয়। চেয়ারম্যান পিছু হঠে। আবার পরে সুলেমানের অপরাধবোধ তৈরী হয়, সে মাফ চায়, তার বাবা তাকে মাফ করেও দেয়।

ওদিকে চেয়ারম্যান হ্বজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু পাসপোর্টের জন্য ছবি তুলতে হবে বলে তিনি খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে ম্রিয়মান হয়ে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ছবি তুলে পাসপোর্ট করেন কিন্তু ঢাকায় এসে বুঝতে পারেন তিনি হ্বজ এজেন্সি দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন। তিনি যেতে পারছেন না। মনভাঙ্গা সেই পরিস্থিতিতে বাড়িতে না ফিরে তিনি এক হোটেলে খানাদানা বন্ধ রেখে পড়ে থাকেন। তার ম্রিয়মানতা ভাঙ্গে ‘লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’ ধ্বনি শুনে। পাশের রুমের টেলিভিশনে তিনি হজ্জ্ব দৃশ্য দেখতে পান। তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে হোটেলে নিজের রুমের টেলিভিশন ছাড়েন এবং কাঁদতে কাঁদতে টেলিভিশনের সাথে গলা মেলান। নিজেকে সমর্পন করে দেন বোকা বাক্সের আদর্শে। এই হোল মোটামুটি গল্প।

ঝা প সা ফো কা স বা বি ষ য় নি ষ্ঠা হী ন গ ল্প

telviison_1

আসলে কি ছবিটি টেলিভিশান নিয়ে? অর্থাৎ টেকনলজির সঙ্গে প্রাচীন ও সংরক্ষণশীল মনের সংঘাত, নাকি ত্রিভূজ প্রেমের কাহিনীটাই এখানে আসল গল্প !

ছবি তোলা বা টেলিভিশন দেখা ঠিক না – এক প্রত্যন্ত গ্রামের চেয়ারম্যান এক বয়স্ক মুরুব্বীর এই মুল্যবোধের সঙ্গে একালের অবারিত মিডিয়ার – এই দুই এর সংঘাতকে অনুষঙ্গ করে আবর্তিত হতে চেয়েছে সিনেমার কাহিনী। এক বাক্যে এভাবে বললাম বটে, কিন্তু লিখতে গিয়ে টের পাচ্ছি এক বাক্যে এটা বলা কতটা ঠিক হচ্ছে। দ্বিধা আমার নিজের, কিন্তু ভেবে দেখলে দ্বিধার উৎস আমি নই। কারণ, সিনেমায় এটা স্পষ্ট যে গল্পকার বা পরিচালক গল্পের ফোকাস বা নিষ্ঠা অস্পষ্ট করে ফেলেছেন। চেয়ারম্যানের মনের বা বিশ্বাসের সংঘাতের জায়গাটিকে মুখ্য করে রাখতে পারেননি, ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় সেই ফোকাসটা থাকেনি। তাছাড়া বিজ্ঞান বা টেকনোলজির সঙ্গে ধর্মের দ্বন্দ্ব খুবই ক্লিশে, প্রাচীন ছকে বুঝেছেন, আর সেভাবেই মীমাংসা করেছেন। ছবি এই দ্বন্দ্বকে নতুন কোন দিক থেকে আমাদের বুঝতে সহায়তা করে নি।

চেয়ারম্যান গ্রামের কাউকে টেলিভিশন দেখতে দেন না – এই পটভুমির উপর দাঁড়িয়ে আরেকটি আলাদা গল্প এখানে আছে। চেয়ারম্যানের ছেলে সুলেমান (চঞ্চল), তাঁর প্রেমিকা (তিশা) আর ওদিকে বাসার বা ব্যবসায়ের কর্মচারী (মোশাররফ) এই তিনজনের ট্রয়কা প্রেমও সিনেমার মধ্যে গল্পের মুখ্য ফোকাস হয়ে উঠেছে। এই উপ-গল্প ও চরিত্র তিনটা এত সময়, বিস্তার ও ট্রিটমেন্ট পেয়েছে যে মনে করার কারণ ঘটেছে যে এটাই গল্পের ফোকাস। আবার ওদিকে গল্প শেষ হচ্ছে – চেয়ারম্যানকে নিজের মুল্যবোধ বা বিশ্বাস ধরে রাখতে অক্ষমতার পরিবেশে ফেলে দিয়ে; হ্বজে যাবার জন্য আপোষ করে নিজের ছবি তোলা আবার প্রতারিত হয়ে হ্বজে না যেতে পেরে টিভিতে হ্বজ দেখে লাব্বায়েক লাব্বায়েক ধবনিতে শতচ্ছিন্নে ভেঙে পড়ার ভিতর দিয়ে। ফলে চেয়ারম্যানের আত্ম-সংঘাত কি গল্পের ফোকাস? না কি এটা কেবল গল্পের পটভুমি, যে-পটভুমিতে দাঁড়িয়ে অন্য এক প্রেমের গল্প আছে, সেটাই গল্পের মুল বিষয় – এই দুই এর মধ্যে গল্পের ফোকাস দোল খেয়ে ফিরেছে। কোথাও তা স্থির হয়ে বসতে পারেনি, কিম্বা দুই গল্পের মধ্যে কোন শক্ত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি।

ফলে লিখতে গিয়ে আমিও দ্বিধায়। এই দ্বিধা বেশ জটিল। সমস্যাটা সিনেমা দেখার অর্ধ সময়ের পর বা ইন্টারভ্যাল থেকেই টের পাচ্ছিলাম। কারণ ততক্ষণে পরিস্কার হয়ে গেছে, চেয়ারম্যানের চরিত্র ও তার সংঘাত – সেই দিকে গল্প বিস্তারের আর সময় নাই, এই দিকটি আর উপযুক্ত ট্রিটমেন্ট পাবে না। সেই সুযোগ আর গল্পকার পাবেন না বা নিবেন না। অথচ গল্প শেষ হচ্ছে যেখানে সে অনুসারে এটাই গল্পের ফোকাস। সার কথায় চরিত্রটা উপযুক্ত ট্রিটমেন্ট পায়নি।

কোন গল্প সাজানোর সময় সেটা নানা দিকে যেতে পারে, নানান বিস্তারে যেতে হয়, একটা পরিস্থিতি তৈরীর প্রয়োজন থাকে। কোন দিকটায় গল্প কতটুকু বিস্তার হবে তা নির্ভর করে গল্পকার কোনটা ফোকাস করতে চাইছেন তার উপর, সেই প্রয়োজন দ্বারা নির্ধারিত। টিভি সিরিয়ালের তুলনায় সিনেমার ক্ষেত্রে এটা মেনে চলতেই হয়। গল্পের ফোকাস বিচারে সিরিয়ালে প্রত্যেক পর্বেই আলাদা আলাদা ফোকাস চাইলে রাখা সম্ভব। আর সিরিয়ালে পর্ব কয়টা হবে, সেই হিসাবও কিছু অদলবদল করা চলে। তার সীমার বাঁধন অন্তত সিনেমার মত ২-৩ ঘন্টা মেপে সীমাবদ্ধ নয়। ফলে গল্পের ফোকাস বিচারে সিনেমার স্ক্রিপ্ট সাজাতে হয় একটা কিছুকে মুখ্য দৃষ্টিনিবদ্ধ করে।

তবুও ধরে নেয়া যাক, ‘টেলিভিশন’ সিনেমার -স্ক্রিপ্টের ফোকাস হিসাবে গল্পকারের মনে চেয়ারম্যানই ছিল মূল। কিন্তু এই ধরে নেয়া নিয়ে আমরা বেশিদুর অগ্রসর হতে পারি না। সেক্ষেত্রে প্রধান গরমিল বেঁধে যায় মোশাররফের চরিত্রটা। কারণ এই চরিত্র সেক্ষেত্রে একেবারেই নাও যদি থাকে তাতে গল্প ও তার ফোকাসের কোন সমস্যা হয় না। অথচ উলটা, মোশাররফের চরিত্রটা যথেষ্ট গুরুত্বপুর্ণ ও বড়। এটাকে যথেষ্ট প্রমিন্যান্ট একটা চরিত্র করা হয়েছে। এবং এমনভাবে তা করা হয়েছে যে মনে হয়েছে, চঞ্চল যদি তিশার প্রেমিক হতে পারে তবে কোন যুক্তিতে মোশাররফও সমান প্রতিদ্বন্দ্বী ও যোগ্য প্রার্থী নয়। নায়িকার সাথে তার সম্ভাব্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রেমিক হিসাবে বরং মোশাররফকেই বেশি যোগ্য করে দেখানো হয়েছে। ফলে এতে দর্শকের মনে সাজেশন দেয়া হয়েছে যে, এর একটাই কারণ মোশাররফের সোশাল ক্লাস, সোশাল ক্ষমতা চঞ্চলের চেয়ে নীচে। ফলে গল্পের একটা নতুন ডাইমেনশন এখানে তৈরি হয়েছে। অথচ কেন এই গুরুত্ব, মুল ফোকাসের বাইরে এই বিস্তার – এর কোন প্রাসঙ্গিকতা ছবিতে হাজির নাই। ফলে মোশাররফ চরিত্র হয়ে গেছে উদ্দেশ্যবিহীন। অন্যভাবে বললে, এই দিকটাকে প্রমিন্যান্ট করার কারণে স্ববিরোধী একটা ইঙ্গিত তৈরি হয়েছে যেন এটা গল্পের ফোকাস। ফলে গল্পের ফোকাস চেয়ারম্যান চরিত্রের সাথে তুলনায় মোশাররফ চরিত্র বিস্তারে, ট্রিটমেন্টে অন্যায্য ও অসামঞ্জস্য চোখে ভাসে। কমবেশি একইভাবে আবার দিশা ও সুলেমানের (চঞ্চলের) সম্পর্ককেও কখন গল্পের মুল বিষয় মনে হয়েছে। সেক্ষেত্রে চেয়ারম্যান ও মোশাররফ এই দুই চরিত্রের কোনটাকেই এমন প্রমিন্যান্ট ও ডিটেইল করার কোন কারণ থাকে না। এই দিক থেকে ফিল্ম হিশাবে ছবিটি দেখতে বসে একটা বড় অস্বস্তি টের পাওয়া গেছে। এটা গল্পকার কেন করলেন তার ব্যাখা খুঁজে পাওয়া যায় না।

তবু গল্পকার গল্পের ফোকাস ঠিক রাখতে পেরেছিলেন কি পারেন নি সে প্রশ্ন উহ্য রেখে বলা যায় খুব সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন, চেয়ারম্যান কেন্দ্রিক চরিত্র ও তাঁর সমস্যাটাই গল্পের ফোকাস। অনুমান করছি গল্পকার এটাই চেয়েছিলেন। নইলে নামও দেবেন কেন ‘টেলিভিশন? নাম দিতে পারতেন ত্রিমুখী প্রণয় বা এইরকম কিছু।

three

তিন জনের মধ্যে প্রেম, প্রতিযোগিতা আর সংঘাতের ব্যাপারটাও ছকের ব্যাপার মনে হয়েছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নতুন কোন দিক নজরে পড়ে না, বা আমাদের ভাবায় না।

গ ল্পে র দ্ব ন্দ্ব বা ক ন ফ্লি ক্ট

মানুষের ছবি তোলা ঠিক না এই অর্থে টেলিভিশন দেখা ঠিক না এমন বিশ্বাসে বিশ্বাসী একজন বয়স্ক মানুষের সমস্যা আছে ছবিতে। এই মানুষ সামাজিক দিক থেকে প্রতিপত্তিশীল, ফলে যে গ্রামের তিনি চেয়ারম্যান সেই গ্রাম টেলিভিশন-শূন্য। সেখানে কাউকেই টেলিভিশান দেখতে দেওয়া হয় না। এই বাক্য পড়ে পাঠক বা দর্শক তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করবে – তো? তো এনিয়ে পরিচালক কী বলতে চান? এর মানে হলো, পাঠক বা দর্শক জানতে চাইছেন গল্পের দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্টটা অথবা গল্পে তুলে আনা সমস্যাটা কি নিয়ে। এই সমস্যাটাকে গল্পকার বা পরিচালক কি করে ট্রীট করেছেন? আমাদের আজকের আধুনিক জীবনের সাদা চোখে, ছবি তোলা ঠিক না এই অর্থে টেলিভিশন দেখা ঠিক না -এতটুকু যদি কাউকে বলি – এমন ধারণা শুনলে আমরা বলব এটা একটা অচল ধারণা, (সিনেমা শেষে পরিচালকও যেটা প্রমাণ করেছেন যে চেয়ারম্যান একটা ‘অচল মাল’)। কিন্তু সমস্যা হলো, এটা তো একটা সহজ স্বতঃসিদ্ধ ষ্টেটমেন্টে। দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট কই? একটা ‘অচল মাল’ দেখিয়ে আর কতটুকু দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট টেনেটুনে হাজির করা যাবে? সিনেমার গল্পে দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট – সেখান থেকে টান টান টেনশন – চাইলে টেনশনের আরও টুইষ্ট বা মোচড় – আর শেষে সে টেনশনের নিরসন তৈরি করে সিনেমা্র গল্প বানানো হবে। তবে নির্দ্বিধায় বলা যায়, গল্পকার-পরিচালক এই প্রশ্ন মোকাবিলা করতে গিয়ে আগেই ধরে নিয়েছেন, টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বটা হলো, ‘ধর্মের কুপমন্ডুকতা বনাম প্রগতিবাদিতা’ এমনই সরল অর্থাৎ ব্যাপারটা সেই পুরানা সেকুলারিজম বনাম ইসলামের দ্বন্দ্ব। আর এই দ্বন্দ্বের সরল সমাধান আমরা জানি, তা হলো ইসলামের উপরে আধুনিকতার বিজয়। যেন গল্প-স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করতে গিয়ে গল্পকার বা পরিচালক কুপমন্ডুকতার উপর সেকুলারিজমের বা আধুনিক জীবনের বিজয়ের ওপর এক গাথা লিখে ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এটা একটা ক্লিশে বিজয়গাথা বা প্রপাগান্ডা হতে পারে – নতুনদিনের নতুন ভাবনার সিনেমা হবে কি না, সেটা সন্দেহ। এই ধরনের ক্লিশে জিনিস দিয়ে পুরানা ভাবনাকে নতুন ভাবে ঘটনার বিন্যাসের মধ্য দিয়ে ভিন্ন ভাবে দেখাবার আগ্রহ তৈরী করবে না। পুরানা জিনিসই মনে হবে। ঘটনাকে নতুন করে দেখবার, দেখানোর আগ্রহ তৈরি করবে না।

ছবি দেখার পর আমাদের অনেকে বলছিলেন, একালে টেলিভিশন দেখা যাবে না -এমন বয়ান আকড়ে ধরে থাকার লোক কি আছে? আবার যদি ধরে নেই কোনাকাঞ্চি কোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুএকজন রয়ে গেছেন তাহলে সেই চেয়ারম্যান আবার ‘দৈনিক প্রথম আলো’ পড়েন কিভাবে? ধর্মচিন্তা, নীতিনৈতিকতা বা সুনির্দিষ্ট ভাবে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বদ্ধমূল ধারণারই উদ্গীরণ ঘটেছে চেয়ারম্যানের চরিত্রে। সিনেমায় চেয়ারম্যান চরিত্র আমাদের কাছে তুলে ধরবার জন্য দেখান হচ্ছিল যে পত্রিকায় ছাপা এড জাতীয় ছবিগুলোর উপর ছোট সাদা কাগজের তালি দিয়ে ঢেকে তিনি পত্রিকা পড়েন। যুক্তির দিক থেকে হয়ত কথা সত্যি। তবুও মেনে নিতে রাজি যে রেয়ার ও ব্যতিক্রম চরিত্র নিয়েও তো গল্পস্ক্রিপ্ট হয়। এমনকি কাল্পনিক এমন রেয়ার চরিত্র বানিয়ে নিয়েও ভাল স্ক্রিপ্ট হতে পারে। সেটা কোন বড় সমস্যা নয়। আর সিনেমায় চুলচেরা বাস্তবতা খোঁজার চেয়ে গল্প কি বলতে চায় তা মোটামুটি ধরা গেলেই চলে; তাতে সবকিছু খাটি রিয়েলিসটিক না হলেও দর্শক সেসব ত্রুটি উপেক্ষা করে গল্প বুঝতে রাজি থাকে বলেই আমার ধারণা। ফলে এটা কোন বড় পয়েন্ট নয়। কিন্তু একালে টেলিভিশন দেখা যাবে না এমন রেয়ার ও ব্যতিক্রমী বয়ানধারী চরিত্র হাজির করে যদি শেষে তাকে একটা ‘অচল মাল’ বলে নাকচ করে দেয়া হয় তাহলে তা গল্প হওয়া খুবই কষ্টকর। ‘ব্যতিক্রমী লোক অচল’ এটাই তো স্বতঃসিদ্ধ। তাহলে সেখান থেকেই গল্প-স্ক্রিপ্ট কতটুকুই বা আগাবে, বের হবে? অন্যভাবে বললে, সিনেমার গল্প-স্ক্রিপ্টে এক বা একাধিক দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট – সেখান থেকে টান টান টেনশন – আর শেষে সে টেনশনের নিরসন -এভাবে মোটাদাগে কোন গল্পের একটা মৌলিক কাঠামো থাকে ধরে নিলে, সেক্ষেত্রে ‘ব্যতিক্রমী লোক অচল’ এমন স্বতঃসিদ্ধ ধারণার উপর দাঁড়িয়ে ও থেকে আবার দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট বের করা আসলেই কঠিন। কারণ স্বতঃসিদ্ধ ধারণা মানে আগেই যা নিরসিত, ফলাফল আগেই নির্ধারিত। দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট বের করার আগেই এটা ছিবড়া। স্ক্রিপ্ট ন্যারেশন করতে করতে কনফ্লিক্ট–টেনশন-নিরসন এভাবে ধাপে ধাপে না হয়ে নিরসিত দ্বন্দ্ব দিয়ে শুরু করা মানে আগেই গল্পকে হত্যা করা বা এর আর গল্পমুল্য নাই না বললেও এর গল্পমুল্য আগেই দুর্বল হয়ে থাকে। তাই ঘটেছে এখানে।

ছ বি র ভি লে ন কে ? না থা কা র স ম স্যা

দর্শকের চোখে ভিলেন বা নেতি চরিত্র যদি সবল ঘৃণা তৈরি করতে পারে তবে গল্পকার সার্থক। দর্শকের জন্য সেক্ষেত্রে উপযুক্তভাবেই ভিলেন বা নেগেটিভ চরিত্র ঘৃণিত। কিন্তু গল্পকারের কাছে? তাঁর কাছে ঘৃণিত আর প্রিয় বলে কিছু নাই; কারণ নেগেটিভ চরিত্র নির্মাণ আর নায়ক বা পজিটিভ চরিত্র নির্মাণ তার কাছে একই কথা, একই কাজের দুই দিক। কোনটাই তার কাছে এতটুকু কম গুরুত্বের নয়। অন্যভাবে বলা যায়, শক্ত নেগেটিভ চরিত্র নির্মাণ করতে পারলে একমাত্র তখনই তুলনায় এবং বিপরীতে পজিটিভ চরিত্রটা ততই শক্তপোক্ত হয়। নেগেটিভ চরিত্র যত শক্তপোক্ত তা ততটাই বিপরীত চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলে, জেগে উঠবার শর্ত তৈরি করে। অনেকটা পরিমিত মাত্রার সাদা-কালোর কনট্রাস্টের মত। নেগেটিভ চরিত্র নির্মাণের সময় তাঁর পক্ষে সম্ভাব্য সমস্ত ন্যায্যতা, শক্ত যুক্তির অভাব খামতি ঘটলে সব শেষ। এর কারণে, কোনভাবেই এ থেকে পজিটিভ চরিত্র দাঁড়াবে না, গল্প-স্ক্রিপ্টও মাঠে মারা যেতে বাধ্য। এটা মনে করা বেকুবি যে যেটা নেগেটিভ চরিত্র সেই চরিত্র তো শেষে পরাজিতই দেখানো হবে; তাহলে আর এর মুখের ডায়লগে সম্ভাব্য পুঙ্খানুপুঙ্খ সব যুক্তি, বিবেচনা পরিস্থিতি দেবার দরকার কী? না, বরং নেগেটিভ চরিত্রের পক্ষে সম্ভাব্য পুঙ্খানুপুঙ্খ সব যুক্তি, বিবেচনা পরিস্থিতি – এক কথায় আপাত ন্যায্যতাগুলো থাকার পরও পালটা একটার পর একটা তা নাকচ করার একটা প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়েই একমাত্র পালটা চরিত্রটা ইতিবাচক বা নায়ক হয়ে উঠে। ফলে কোনটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক চরিত্র হবে এটা স্রেফ গল্পকার বা পরিচালকের আগাম ধরে নেবার বিষয়ই নয়। পরতে পরতে নির্মাণ করার বিষয়। এক অর্থে গল্পকার অর্থাৎ ভিজুয়াল গল্পকার মানে মানুষের মনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, কষ্ট-সুখ, ভাল লাগা-মন্দ লাগা ইত্যাদি নিয়ে সফল মুন্সিয়ানায় খেলা করতে পারা। এটা কোনভাবেই গল্পকারের নিজেই কেবল দর্শক হয়ে যাওয়া নয়। গল্পকার যদি আগেই ধরে নেয়, চেয়ারম্যান চরিত্র তো ঘৃণিত এক রক্ষণশীল ‘এযুগের অচল মাল -যেটা গল্পকার করতে পারে না -ফলে ঐ চরিত্রের পক্ষে আর শক্ত সাফাই জাষ্টিফিকেশন কি থাকতে পারে তো -সেক্ষেত্রে তিনি আর গল্পকার নয়, বড়জোর তিনি একজন কেবলই দর্শক। বলা বাহুল্য এতে স্ক্রিপ্ট-সিনেমার ওখানেই মৃত্যু।

tinjon

ভিলেন কে ছবির? বা যার বিপরীতে প্রধান চরিত্র অর্থবহ হয়ে ওঠে?

যেমন ‘টেলিভিশন’ গল্পে নেগেটিভ চরিত্র কে? চেয়ারম্যান? আর বিপরীতে পজিটিভ চরিত্র তার ছেলে সুলেমান? কিংবা সুলেমানের উপর শর্ত বা প্রণোদণাদাত্রী হিসাবে নায়িকা? সিনেমায় কোনটাই একেবারে স্পষ্ট নয়। তবে আকার ইঙ্গিত আছে মাত্র। আবার, চেয়ারম্যান কি নৈতিক বা মরাল দিক থেকে কোথাও স্খলিত? মোটেও না। কোথাও কোন দৃশ্যে তিনি তা নন। তার একটাই অপরাধ তিনি একটা ভ্যালু অথবা বিশ্বাস যেভাবে বুঝেছেন তাতে অটল। এভাবে তো নেগেটিভ চরিত্র গড়া কঠিন। বিপরীতে, ওদিকে সুলেমান? সে কি কোন সুনির্দিষ্ট ভ্যালু অথবা বিশ্বাস লালন বা ধারণ করে? মোটেই না, এমন কোন লক্ষণও নাই। আর নৈতিক বা মরাল দিক থেকে সে চেয়ারম্যানের ধারে কাছে নয়। বরং তুলনায় কার্য-স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অন্ততপক্ষে সে একজন ম্যানিপুলেটর; সে ছলনা বা মিথ্যা আশ্রয়ী। এর চেয়েও বড় কথা সে চেয়ারম্যানের বিপরীতের নতুন সমাজের একজন ভোক্তা কনজুমার কেবল, এবং বাছবিচারহীন, কর্তাসত্ত্বাহীন। ফলে এই চরিত্র নেগেটিভের চরিত্রের তুলনায় খাটো, মোটেও পজিটিভ নয়। সে ভাবেও নির্মিত হয়নি। করা কঠিনও। অথচ আকার ইঙ্গিতে এটাকে ইতিবাচক বলার চেষ্টা আছে মাত্র।

ওদিকে চেয়ারম্যান চরিত্রের পরিণতি হলো, অচল মাল, সমাজের সাথে আনফিট । তিনি কম্প্রোমাইজ করে হ্বজে যাবার টেকনিক্যাল কারণে ছবি তুলতে বাধ্য হচ্ছেন আবার হ্বজ কোম্পানীর শঠতায় পড়ে যেতে পারেন নাই, চিটেড হয়েছেন। কিন্তু এসব কোনটাই তাঁর বিশ্বাস, মুল্যবোধে হঠাৎ ঘাটতি এসেছে সেজন্য তিনি করেছেন তা নয়। বরং, প্রতারিত হবার জন্য তিনি দায়ীই নন। নতুন সমাজ যা তাকে করতে বাধ্য করছে তাই তিনি করেছেন, এর পরেও তিনি প্রতারিত।

ক ম ন শ ত্রু -গ ল্প কা রে র আ ত্ম স ম র্প ণ

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, চেয়ারম্যানের মুল্যবোধ ও বিশ্বাস ধরে রাখার ক্ষেত্রে যা বাধা বা শত্রুর ভুমিকায় তা হলো, নতুন পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের সমাজ বা দুনিয়া, অথবা এর গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া টেলিভিশন টেকনোলজি। আর তার ছেলে সুলেমান ঐ সমাজেরই ভোক্তা, কনজুমার মাত্র, এবং সে বাছবিচারহীন, কর্তাসত্ত্বাহীন। অর্থাৎ উভয়েরই শত্রু একই। কিন্তু তা সত্বেও সেই কমন শত্রু ফেলে পিতা-পুত্র এক আপতিক বিরোধে জড়িয়ে গেছে, আর ঐ কমন শত্রুই এই বিরোধ তৈরির কারণ। অথচ এইদিকটা গল্পকার দেখতে পাচ্ছেন এমন কোন ইঙ্গিতও নাই। ফলে পিতা চেয়ারম্যান বা পুত্র সুলেমান এই শত্রুর কাছে সারেন্ডার করছেন না, আসলে আত্মসমর্পণ করে ফেলেছেন খোদ গল্পকার ও পরিচালক।

কিন্তু এর মানে কি আমি পিতা-পুত্রকে পিছনের ফেলে আসা কোন সময়ে, সমাজে ফিরে যেতে বলছি, মোটেই না। তবে সে জন্য একটা বোধোদয়, আত্ম উপলব্ধি বা আত্মসচেতনতার দিকেও তাদেরকে যেতে হবে। সে কাজ গল্পকার করতে পারতেন হয়ত। কথাটা অন্যদিক থেকে তুলব।

গল্পের মুল প্রসঙ্গ, ছবি না তোলা বা দেখা, সেই সুত্রে টিভি না দেখা। আর সিনেমায় এই ধারণার পরিণতি দেখানো হয়েছে এই মুল্যবোধ ও বিশ্বাসকে বলি দিয়ে। একধরণের প্রশ্নহীন ও আগাম অনুমান দিয়ে সরাসরি ধরে নেয়া হয়েছে, ছবি না তোলা বা দেখা, সেই সুত্রে টিভি না দেখা -এই ধারণাটাই ভুল। সোজাসাপ্টা এক সরলীকরণ সমাধান টেনে অন্তত বলা হয়েছে -এটা অচল ধারণা। সমস্যা সঙ্কটটাকে কোন ক্রিটিক্যাল দিক থেকে দেখার চেষ্টাও সেখানে নাই। যেমন, নিস্তরঙ্গ ফ্লাট ধরে নেয়া হয়েছে ছবি না তোলা বা দেখা -এটা স্রেফ বিশ্বাস মাত্র। প্রশ্নহীন ধরে নেয়া হয়েছে এটা কুপমন্ডুকতা অথবা নেহায়তই এক রক্ষণশীলতা। কেন এই বিশ্বাস, এই বিশ্বাস এমন কেন, কারণ কি? – সে প্রশ্ন তোলার বা খুজে দেখার চেষ্টা কোথাও নাই। ধরেই নেয়া হয়েছে, এটা স্রেফ বিশ্বাস মাত্র, ওর পিছনে কোন যুক্তি বা ব্যাখ্যা নাই। চেয়ারম্যানের মুখ দিয়ে সে সম্পর্কে কোন যুক্তি বা ব্যাখ্যা দেয়ার কারণে চেয়ারম্যান চরিত্রটাকে পুষ্ট হতে দেয়া হয় নাই। ফলে সে একটা ক্লাউন; অচল মাল ছাড়া আর কিছুই হয়ে উঠতে পারে নি।

গ ল্পে র বি ষ য় ব স্তু বা ছা ই

এযুগে টেলিভিশন দেখে না, দেখতে দেয় না – এখান থেকে শুরু করে কৌতুককর কাহিনী তৈরি করা যেতেই পারে। খুবই সহজ কাজ সেটা। কিন্তু গল্পকার যা ভেবেই গল্পের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করুন না কেন, চিন্তার বিষয়বস্তু হিসাবে এই প্রসঙ্গটা গভীর ও সিরিয়াস।

প্রথম কথা হলো, প্রশ্নটা ছবি তোলা বা না তোলার একেবারেই না। ইসলামের দিক থেকে মানুষ, জীবজন্তু বা যে কোন প্রাণ কোন প্রকার (ছবি, অক্ষর ইত্যাদি) চিহ্নব্যবস্থায় প্রতিফলন ঘটানো বা তাকে নিছকই মূর্তি করে তুলে সৃষ্টবস্তুর মূল সত্তাকে গৌণ করে ফেলার বিরুদ্ধে ইসলাম আপত্তি জানায়। এটা একটা দিক। আরেকটি জটিল ও গভীর দিক হচ্ছে, নিরাকার ধারণা। ইসলামে নিরাকার বা আল্লাহর নিরাকার ধারণা একটা ফান্ডামেন্টাল বিষয়। যেটা একেবারেই মৌলিক ধারণা। আবার এটা নেহায়তই ইসলামের জন্য নয়, মানুষের চিন্তা, ভাব, দর্শনের জট খুলবার জন্য এক মৌলিক ও সিরিয়াস ধারণা। অজান্তে অজ্ঞতায় সেই গুরুত্বপুর্ণ দিক যাতে মানুষ হারিয়ে না ফেলে তা থেকে সাবধান থাকতেই ছবি তোলা বা না তোলার, আকার দেয়া না দেয়ার প্রসঙ্গটা এসেছে।

আকার দিয়ে নিরাকারের ধারণা ধরা যায় না। আকার দিয়ে নিরাকারের ধারণা ধরতে গেলেও তা ‘অধরা’ই থেকে যাবে। আর আকারের ভিতর নিরাকার ধারণা তো অধরা থেকে যাবারই কথা। কারণ তখনও আকারের নেতি হিসাবেই নিরাকারের চিন্তা করা হয়, হেগেলের ভাষায় ‘আকার’-এর মধ্যস্থতায় নিরাকারের হাজির হওয়া। তবু মানুষ আকার, আইকন, চিহ্ন করে, করে ফেলে। করতেই হয়। কোন কিছু বুঝতে নেবার প্রচেষ্টার প্রথম মুহুর্ত থেকেই এই স্ববিরোধটা ঘটে। কিন্তু ইসলাম দাবি করে নিরাকারকে কোন মধ্যস্থতা ছাড়া চিন্তা করবার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। ইসলাম আমরা মানি বা না মানি এই প্রস্তাবের দার্শনিক গুরুত্বকে যতো হাল্কা আমরা গণ্য করি, ব্যাপারটা মোটেই হাল্কা ব্যাপার নয়। ফলে ছবি দেখা না দেখার বিষয়টা সেই জায়গা থেকে এসেছে। আসলে ছবি দেখা বা সে অর্থে টেলিভিশন দেখা আদৌ নিষিদ্ধ কিনা ইসলামের ভেতর থেকেও তার তত্ত্ব-উপায় আছে। কিন্তু চেয়ারম্যানের চরিত্রের মধ্য দিয়ে তার নৈতিক সিদ্ধান্তকে মুখ্য করে আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ দিকে যাবার সুযোগ ছিল। কিন্তু তাকে একটা হাস্যকর চরিত্রে পরিণত করা হয়েছে।

এ বিষয় নিয়ে যাঁরা লিখবার অধিকারী, তাঁরা লিখবেন। তবে আমার নিজের কাছে যেসকল প্রশ্নগুলো হাজির হয় তার কিছুটা নমুনা দিলে বোঝাতে পারব, ছবিতে টেলিভিশন দেখা না দেখাকে যতো ক্যারিকেচার পরিণত করা হয়েছে, আকার/নিরাকারের তর্ক আরও অনেক গভীর ও জটিল।

যেমন, উচ্চারণে যদি ধরা বুঝা শুরু করতে চাই, তাহলে নিরাকার ধারণা তো একমাত্র নৈ-স্বরে, নৈ-স্বরাকারে অথবা নৈ-উচ্চারণেই ধরতে পারার কথা, আলাদা আলাদা শব্দ-উচ্চারণে না। জানি ওরাল বা গলার স্বরে নিরাকার ধরা যাবে না, তবু ওরাল স্বরই আমাদের ভরসা। অধরা ভাবের ভিতর দিয়ে ওরাল স্বরের সীমাবদ্ধতা খেয়াল রেখেই নিরাকার ধারণা করা সম্ভব। অন্তত অর্থহীন স্বর তাকে হতেই হবে। যেমন আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশীয় সনাতন ধর্মীয় আবহে গড়ে উঠা রাগ সঙ্গীত, তা অর্থহীন স্বর অথবা অনন্ত অর্থের এক স্বর হবার পিছনে এটা ছিল অন্তত একটা কারণ। ধ্রুপদি সঙ্গীতে ইসলামের বিশেষ আগ্রহের এটা একটা কারন হতে পারে।

নানান অক্ষর-বর্ণমালা দিয়ে আমরা আমাদের লেখা পুস্তক সাজাই, ওদিয়ে ধারণা ধরার চেষ্টা করি। কিন্তু নিরাকারের ধারণা? একমাত্র অক্ষরগুলোর বিভেদ নিরাকরণে ঘুচলেই নিরাকার ধারণা আসতে পারে। তবু আলাদা আলাদা অক্ষর না আঁকলে, চিহ্ন আইকনে তাদের বিভেদ না করে নিলে লেখা, পুস্তকে কোন ভাব, ধারণা ধরা অসম্ভব। এটা স্ববিরোধ এবং এই সীমাবদ্ধতা খেয়াল রেখেই নিরাকার ধারণা করা সম্ভব।

ভিজুয়ালাইজেশনঃ এতে আলাদা আলাদা ছবি সব, ছবি চিহ্ন আইকনের বিভেদ আমাদের শিখতেই হয়। জানা হয়। এই বিভেদের ভিতর দিয়েই এই সীমাবদ্ধতা খেয়াল রেখেই এবার চোখ বন্ধ করলে নিরাকার ধারণা করা সম্ভব।

একটা চকমকে কাগজে আল্লাহু লিখলে ঐ কাগজ সেটা আল্লাহ নয়। আল্লাহকে তাতে উচ্চারণ করে পড়ে স্বরে, লিখিত অক্ষরে বা অক্ষর দেখে ভিজুয়ালাইজেশন ধরা যাবে না। তবু আমরা আল্লাহু লেখা কাগজ দেখি আমাদের মনে একটা ভাব তৈরি হয়। আমাদের কালচারে তা ফুটে উঠে। ঐ কাগজ কেউ অজান্তে পায়ে দলে দিলে কিছু হবার কথা না কারণ ঐ কাগজ নিজে আল্লাহু নয়। কিন্তু পায়ে দলা যদি ডেস্পারেট এটেম্পট হয় তবে ঐ ভাব গুণাহ কাজ বলে মানা হয়; আমাদের কালচার তা ধারণ করে চলে। সাবধান থাকার পরামর্শ ইঙ্গিত জারি রাখে।

আমরা সবাই আলাদা আলাদা নাম ধারণ করি। একের থেকে অন্যের বিভেদ, তফাত না করলে চিনা জানা মনে রাখা সম্ভব না। প্রকৃতিতে যাই দেখি তাকেই এক একটা আলাদা আলাদা নাম দেই। এগুলো আমাদের চিনা, জানা, মনে রাখার প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু নিরাকার ধারণার একটা ব্যত্যয় তো বটেই এটা। জানাজানি সচেতনতার প্রক্রিয়ায় এই স্ববিরোধ এবং এই সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সতর্ক খেয়াল রাখলেই তবে নিরাকার ধারণা করা সম্ভব। ফলে সেদিকটা বিবেচনা করে আমরা আল্লাহর গুণবাচক অর্থ –সমার্থক নাম রাখি, একটা কালচার গড়ে ঊঠেছে। যদিও তাতে সবদিক সামাল দেয়া যায়নি। প্রকৃতিতে এত কিছু কত কত দেখি আমাদের অনেক নামবাচক শব্দ দরকার। সব কুলকিনারা করা যায়নি। কেবল মানুষের নামের ব্যাপারটায় একটা কালচার তৈরি হয়েছে দেখি আমরা যদিও সেটাতেও ভাঙ্গা গড়া আছে।

‘টেলিভিশন’ সিনেমায় যেভাবে টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বের অতি সরলীকরণ করে বিষয়টা আনা হয়েছে এটা ইসলামের কোন বিষয়ই নয়, মুল প্রশ্ন ইসলামের নিরাকার ধারণা। একদিকে পিতা বা চেয়ারম্যান যেমন নিরাকার ধারণার বদলে টেলিভিশনে আটকে গেছেন অন্যদিকে পুত্র সোলেমান বা তার নায়িকা টেলিভিশন দেখতেই হবে এই বেহুদা মুক্তির বিপ্লবীপনায় আটকে গেছেন। আর ডন কুইকজোটের যুদ্ধ লড়েছেন। কেউই এই ছদ্ম-লড়াই থেকে বের হবার পথ তালাশ করেন নাই। এই তালাশের প্রথম কাজ হত – কেন এই বিশ্বাস, এই বিশ্বাস এমন কেন, পিছনের কথা, বয়ানগুলো অনুসন্ধান, বুঝবার চেষ্টা করা।

পশ্চিম দিকে কাবা শরীফের দিকে কেবলা বেধে নামাজ পড়ার নিয়ম। এর মানে কি আর দশ দিকে আল্লাহ নাই? মোটেই না। এটা ঠিক পুব-পশ্চিমের ব্যাপার না, বরং দশ দিক কেন্দ্রে এসে সমপাতিত হয়, মিলে মিশে একাকার নিরাকার হয়। নৈ-দিক হয়ে যায়। মানুষের ঐক্য, একটা একতাবদ্ধ মানুষের কমিউনিটি গড়ার উদ্দেশ্যের কথা মাথায় রেখে একই কেবলা অভিমুখী করে, কিন্তু নিরাকারের উপাসনার প্রতীকায়িত ঘটনা এটা। এখানে বেশ মজার কিন্তু গভীর একটা দিক আছে। ধরা যাক, ওখানে কাবা ঘর নাই। কিন্তু দুনিয়ার দশ দিকের নানান স্থান অবস্থানের মানুষ সবাইকে একই দিকে অভিমুখী বা কেবলা করতে গেলেও প্রতিটা দিকের অবস্থানের মানুষকে ঐ অবস্থানের ক্ষেত্রে একটা দিকের কথা বলতে হত যেদিকে দশ দিক সমপাতিত হয়। সেক্ষেত্রে সব অবস্থানের দিকের সেই সমপাতিত স্থান হলো যেন কাবা শরীফ। এতে দশ দিকের দশ দশ রকম মানুষের ভিন্নতার সমস্যা মিটিছে – একমুখী করা গেছে। যদিও ব্যবহারিক দিক থেকে একটা আইকন হিসাবে কাবা শরীফ এতে থেকে গেছে। এটা আকারের দুনিয়ায় নিরাকারের ধারণা আনার ব্যবহারিক সমস্যা।

এমন অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়। প্রতিমুহুর্তে নানান আকার দেয়ার ঘটনা ঘটছে; চিহ্ন, প্রতীক আইকনে দুনিয়াও নানান আকার প্রকারে হাজির। আমাদের চিনা, জানা, মনে রাখার প্রক্রিয়া জারি রাখতে গিয়ে নিরাকার ধারণার একটা ব্যত্যয় ঘটিয়েই একমাত্র এগুলো করা সম্ভব। তাই এই আপাত স্ববিরোধ। কিন্তু মুল প্রসঙ্গ, এই কাজ করতে গিয়ে এই স্ববিরোধে আমরা যেন নিরাকার ধারণা হারিয়ে না ফেলি। তাই প্রসঙ্গটা আসলে ছবি তোলা বা না তোলার একেবারেই নয়, মুল প্রসঙ্গ নিরাকারের ধারণা যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি, বেকুবি অজ্ঞতায় না ডুবে যাই। হারিয়ে চিন্তার, ভাব, দর্শনের চরম সঙ্কটে না পড়ি।

কাজেই মুল ইস্যু নিরাকারের ধারণা রক্ষা করা। নিরাকারের ধারণা ফেলে, ভুলে আমরা যেন চিন্তার গলিঘুপচিতে আটকে না যাই। এইখান থেকেই সতর্কতায়, নবীজির কোন ছবি আঁকা বা আদল দেয়া নিষিদ্ধ। লালনের শিষ্যরা একই কারণে লালনের ছবি বা মুর্তির বিরুদ্ধে। যাতে সেই ছবি, আইকন প্রতীকের ফেরে পড়ে কেবল এসব প্রতীকই সত্য, মুখ্য হয়ে না যায় আর নিরাকারের কনসেপ্ট এর নীচে চাপা পড়ে গড়াগড়ি না খায়। লালনের অনুসারীদের ক্ষেত্রে অবশ্য বলা হয় তাঁরা ছবি পূজা করেন না, মানুষ ভজনা করেন। ফলে নবীজির কোন ছবির ব্যাপারে ইসলাম কেন এত কঠোর এটা স্রেফ মোল্লাদের কুপমন্ডুকতা, পশ্চাদপদতা বা রক্ষণশীলতা একেবারেই নয়। এর পিছনে শক্তিশালী দার্শনিক কারণ আছে এবং আমাদের তা রক্ষা করা দরকার।

অতএব, ‘টেলিভিশন’ সিনেমায় যেভাবে টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বের অতি সরলীকরণ করে বিষয়টা আনা হয়েছে এটা ইসলামের কোন বিষয়ই নয়, মুল প্রশ্ন ইসলামের নিরাকার ধারণা। একদিকে পিতা বা চেয়ারম্যান যেমন নিরাকার ধারণার বদলে টেলিভিশনে আটকে গেছেন অন্যদিকে পুত্র সোলেমান বা তার নায়িকা টেলিভিশন দেখতেই হবে এই বেহুদা মুক্তির বিপ্লবীপনায় আটকে গেছেন। আর ডন কুইকজোটের যুদ্ধ লড়েছেন। কেউই এই ছদ্ম-লড়াই থেকে বের হবার পথ তালাশ করেন নাই। এই তালাশের প্রথম কাজ হত – কেন এই বিশ্বাস, এই বিশ্বাস এমন কেন, পিছনের কথা, বয়ানগুলো অনুসন্ধান, বুঝবার চেষ্টা করা। গল্পকার সেদিকে তার গল্প প্ররোচিত করতে পারতেন। ফলে সেটা গল্পের পরিসমাপ্তি অর্থাৎ দ্বন্দ্ব নিরসন বা একটা সমাধান হতে পারত।

গল্পে যেটা সবচেয়ে দৃষ্টিকটু তা হলো, নায়িকা যেভাবে নায়ককে টেলিভিশনকে মুক্ত করার শর্ত দিয়েছে। নায়িকা যদি সুলেমানকে ভালবাসেই তবে কেন তাঁর হবু শ্বশুর কেন এমন, তিনি ঠিক কি বলতে বুঝাতে চান – সেটা বুঝবার কোন দায়িত্বই সে অনুভব করে নাই। ধরেই নিয়েছে শ্বশুরের উৎখাতেই তার মুক্তি, তাদের প্রেমের মুক্তি – ফলে সুলেমানকে প্ররোচনামুলক শর্ত।

nayika

গল্পে যেটা সবচেয়ে দৃষ্টিকটু তা হলো, নায়িকা যেভাবে নায়ককে টেলিভিশনকে মুক্ত করার শর্ত দিয়েছে। নায়িকা যদি সুলেমানকে ভালবাসেই তবে কেন তাঁর হবু শ্বশুর কেন এমন, তিনি ঠিক কি বলতে বুঝাতে চান – সেটা বুঝবার কোন দায়িত্বই সে অনুভব করে নাই। ধরেই নিয়েছে শ্বশুরের উৎখাতেই তার মুক্তি, তাদের প্রেমের মুক্তি – ফলে সুলেমানকে প্ররোচনামুলক শর্ত।

এই বয়ানটা বাছবিচারহীন ধরে নেয় তথাকথিত আধুনিকতা বনাম ইসলামের লড়াইটাই হচ্ছে প্রগতিশীলতার লড়াই। অথচ এটা অনিবার্য এমন নয়। আবার এর মানে এও নয় যে এনলাইটমেন্ট অথবা আধুনিকতা থেকে মানুষের কিছুই নেবার নাই। আসলে মুল প্রশ্ন হলো, বাছবিচার করতে শিখা। ক্রিটিক করতে শিখা। আধুনিকতাকে টপকে যাওয়া। স্বভাবতই এর প্রথম কাজ জিনিষটা কি তা আকরসহ বুঝা। তবেই না বাছবিচার, ক্রিটিক! এটা অবশ্যই সমর্পণ না। মানুষের অনন্ত সম্ভাবনা মনে রাখা।

যা হ তে পা র ত

উপ-শিরোনাম দেখে মনে করার কারণ নাই যে যা হতে পারত সেসবের সীমা টেনে দিচ্ছি। না মোটেই তা নয়। কি হতে পারত সারকথায় এর কিছু ধারণা দিচ্ছি কি বলতে চাই তা বুঝানোর জন্য। যা হতে পারতঃ

১। টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বকেই মুখ্য করে প্রকারান্তরে চেয়ারম্যান কেন এমন, ঠিক কি বলতে বুঝাতে চায় তা – নায়িকা বা নায়ক যে কেউ একজনকে দিয়ে – সেটা বুঝবার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোন একটা সমাধান, দ্বন্দ্ব নিরসনে গল্পের এক মানবিক পরিসমাপ্তি হতে পারত। গল্পকার গল্পে চেয়ারম্যান কেন টেলিভিশন দেখার বিরোধিতা করছে এর কারণ কী সেটা গুমর হিসাবেই রেখে দিয়েছেন। এটা গুমরাহ রেখে দেয়াটাই এই গল্পের ভিত্তি একমাত্র যা থেকে একে সেকুলারিজম বনাম ইসলামের লড়াই অথবা তথাকথিত ধর্মীয় রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে আধুনিকতার লড়াই হিসাবে একে খাড়া করা যায়। অথচ এই গুমোরকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট – উত্তজনা টেনশন চরমে নেবার পর গুমোর ভেঙ্গে দেখানো ভিতর দিয়ে দ্বন্দ্ব নিরসন করা যেতে পারত। তাতে এই ছবি আমাদের সামাজিক চিন্তায় চিন্তা করার ভিন্ন দ্বার খুলতে পারত।

২। গল্পকার বা পরিচালক ধরা যাক, নিজের তৈরি টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্ব নিজেও সমাধান করতে চায় না, বা দেখাতে চায় না। কিন্তু একটা মানবিক সমাধানের পরিসমাপ্তি আকুতি তাঁর আছে, সে চায়। এই মানবিক সমাধান অত্যন্ত আন্তরিকভাবে সে খুজছে এটাই সে ফুটিয়ে তুলতে পারত। ফলে খোলা রেখে দিতে পারত। এটা বলছি, গল্পকার বা পরিচালক একদিকে একজন বিশ্বাসী বয়স্ক লোকের কোন ত্রুটি, (যা সে বিশ্বাস করে তাই সে করেছে) কোন স্খলন দেখাতে পারেনি বা দেখায় নি অথচ তাকে বিশ্বাসের বাইরে যেতে বাধ্য করেছে কিন্তু গিয়েও সে প্রতারিত হয়েছে যার জন্য সে কোনভাবেই দায়ী নয়। অন্যদিকে নায়িকা এক টেলিভিশন দেখার লোভ এতই অমানবিক ও লোভী যে এতে হবু শ্বশুর মরল কি বাঁচল তাতে তার কিছু যায় আসে নাই। এসবের বিপরীতে এটা কমপক্ষে একটা মানবিক সমাধান হত পারত। সিনেমা দেখার পর দর্শকও সেসব প্রশ্নে নানান সামাজিক তর্ক বিতর্কে জড়িয়ে এর সমাধান খুজে ফিরত। কিন্তু এই গল্পে গল্পকার সহজেই পরিণতি দিয়েছেন, এটা নেহাতই এক রক্ষণশীল ‘অচল মালের’ সমস্যা।

৩। এটা হতেই পারে যে গল্পকার বা পরিচালকের টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্ব সমাধান কি করে করবে তা নিজের কাছে জানা নাই। কিন্তু আমাদের সমাজের চেয়ারম্যান ধরণের চরিত্র কে, কেন এটা এমন – তা সে আন্তরিকভাবে অনুসন্ধিতসু, সে বুঝতে চায়। ফলে বিশ্বাসী বয়স্ক মানুষটা কি রকম সব অমীমাংসিত সঙ্কটে পড়েছে এর কেবল মানবিক কষ্ট, সাফারিং – এর সব দিক সে খুটিয়ে প্রকাশ করতে চায়। এটাই তার মুল ফোকাস হতে পারত।

উপরে আমি সম্ভাব্য তিনটা ফোকাস ও পরিণতির কথা বলেছি। এখানেই থামলাম। এর মানে এমন নয় যে আর কোন কিছু হতে পারে না। বরং এমন অনেক কিছুই হতে পারে। কিন্তু তা হবে না, হয় নাই। কারণ, যতক্ষণ আগাম ধরে নেয়া থাকবে যে, টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বটা হলো, ‘ধর্মের কুপমন্ডুকতা বনাম প্রগতিবাদী’ এমনই সরল অর্থাৎ সেকুলারিজম বনাম ইসলামের দ্বন্দ্ব আর আমরা এভাবে বুঝা দ্বন্দ্বের সমাধান জানি তা হলো ইসলামের উপরে আধুনিকতার বিজয় ততক্ষণ আমাদের গল্পগুলো ‘টেলিভিশন’ এর মত এমনই হবে। আর গল্পে দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট দুর্বল ফলে গল্পই দুর্বল থেকে যাবে।

গল্পকার যা ভেবেই গল্পের বিষয়বস্তু নির্ধারণ বাছাই করুন না কেন, চিন্তার বিষয়বস্তু হিসাবে এই প্রসঙ্গটা গভীর ও সিরিয়াস। যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে তাই এই ধরণের সিরিয়াস বিষয়কে গল্পের বিষয়বস্তু করতে হবে।

 

স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস

একা ভারত এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস
গৌতম দাস
০৭ জুন, ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-1g9

যুদ্ধে প্রথম পারমানবিক বোমা ব্যবহারের অভিজ্ঞতা আমেরিকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ফলাফল আমেরিকার পক্ষে আসন্ন এটা নির্ধারিত হয়ে উঠার পরও আমেরিকা ১৯৪৫ সালে এই বোমা জাপানের উপরে ব্যবহার করেছিল। এমন করার পিছনের কারণ যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে এর ব্যবহারের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাখা এবং এর ভয়াবহতার মাত্রা কেমন হয় সেটাও বুঝে রাখতে। বলা বাহুল্য কোন হুশজ্ঞানওয়ালা চিমটি কাটলে লাগে টের পায় এমন মানুষের জন্য সেটা খুবই খারাপ ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। সম্ভবত সেটাই এরপর থেকে আজ পর্যন্ত  দুনিয়া আর কোথাও এই অস্ত্রের ব্যবহার আমরা আর দেখেনি। কিন্তু এসব বাজে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তবু বিভিন্ন রাষ্ট্রের পারমানবিক অস্ত্র অর্জন এবং ভান্ডারে রাখার আগ্রহ কমাতে পারে নাই। বিগত ১৯৭৬ সালের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান পারমানবিক বোমা অর্জন করে ফেলেছিল। এটা উপমহাদেশীয় বা একদিকের পরিস্থিতি। কিন্তু ততদিনে অন্যদিকে অর্থাৎ পশ্চিমে বা কোল্ড ওয়ার লড়ার দুই মাতবর আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দুনিয়ার পরিস্থিতি তাদেরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে – এটা বিপদ বুঝতে পেরে গিয়েছিল।  তাই, পারমানবিক অস্ত্র আর ব্যবহার করবে না বলে পরস্পর পরস্পরের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক চুক্তি স্বাক্ষর দিয়ে ফেলেছিল।  এটাই Non-Proliferation Treaty অথবা NPT – সেই আন্তর্জাতিক চুক্তি, ১৯৬৮ সালে যা স্বাক্ষরিত হয়। সে বিষয়ে পরে আসছি। কিন্তু এখানে আলোচনার জন্য গুরুত্বপুর্ণ হল, ভারত ও পাকিস্তান; যাদের পারমানবিক অস্ত্র আছে তা সবাই জানে। কিন্তু এরা দুজন আজ পর্যন্ত কখনই এনপিটি তে স্বাক্ষর করে নাই। এটা ঠিক যে অস্ত্র হিসাবে পারমানবিক অস্ত্র পশ্চিমের কাছে ডেড ইস্যু, খামোখা পয়সা নষ্ট ধরণের বিষয় আর এর সবচেয়েও বড় দিক খতরনাক। কিন্তু এতটুকুওই সব বা শেষ কথা নয়। যেমন, এই অস্ত্রই যদি আবার এশিয়ার কোন দেশ যদি এখনও তা অর্জন করতে চায় তবে সে ঘটনাতে পশ্চিমা যে কোন মাতব্বর দেশ নড়চড়ে বসে আর নিজের জন্য হুমকি গণ্য করে থাকে।

তা সত্ত্বেও এই পরিস্থিতিতে “ভারত ও এনপিটি” আবার এখন ইস্যু। সারকথায় বললে এর মূল কারণ, ভারত এনপিটিতে স্বাক্ষর না করলেও একালে আমেরিকা যেচে পড়ে ভারতকে পারমানবিক টেকনোলজি ও মালামাল দিবে বলে উস্কানি দিয়েছে। এবং সেটা ভারত এনপিটিতে এবার স্বাক্ষর না করেই হাসিল করতে পারে এমন লোভের মুলা ঝুলিয়েছে আমেরিকা। এর উদ্দেশ্য হল, ভারতের কথিত চীন-ভীতির বিপরীতে দেখানো যে ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে আমেরিকা কত কেয়ার করে! ভারত আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার হয়ে আরও কাছে আসুক। এছাড়াও আমেরিকান খায়েসটাকে গুছিয়ে বললে তা হল এরকম যে প্রতিদানে, নতুন যে গ্লোবাল অর্থনীতিক অর্ডার আসন্ন, যাতে মনে করা হচ্ছে চীনের স্টেক হবে হাই বা অনেক বেশি। তাতে ভারত যেন আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনের সাথে সে নতুন অর্ডারের পক্ষে অবস্থান না নেয়। অর্থাৎ পুরান বা চলতি গ্লোবাল অর্ডার, যেটা আমেরিকান নেতৃত্বে সাজানো তা এখনও ভারতের স্বার্থের দিক থেকে লোভনীয় বলে যেন ভারত মনে করে। পারমানবিক ইস্যুর দিক থেকে এই বিষয়টা বুঝতে আজকের প্রসঙ্গ সেদিকে নিব।

গত ২০০৫ সাল, সেটা ছিল প্রেসিডেন্ট বুশের প্রথম টার্মের শাসন রাজত্বের শেষ বছর। আর একই সাথে আমেরিকার দিক থেকে সেটা ছিল ভারতকে কাছে টানার কৌশলের অথবা চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে উস্কে তোলা শুরুর বছর। চীন ও ভারতের নিজেদের পারস্পরিক স্বার্থে নিজেদের ভিতর মিল-অমিল, ঝগড়া-বন্ধুত্ব বহু কিছু আছে। থাকাও স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘস্থায়ী দিক থেকে দেখলে তাদের কিছু গভীর কমন স্বার্থ আছে ফলে এই অর্থে তারা ঘনিষ্ট বন্ধু, কিন্তু আপাত দিক থেকে এটাই আবার পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতারও এবং নানান স্বার্থ-বিরোধেরও। তাই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বুশের লক্ষ্য ছিল, চীন-ভারতের সম্পর্কের ভিতর যতই ভালভালাইয়া থাকুক সেটার ফলাফল হিসাবে তা থেকে উভয়েই যেন একসাথে আমেরিকা তাদের ‘কমন এনিমি’ এই জ্ঞান না করে বসে, এই প্রশ্নে যেন তারা এককাট্টা হয়ে দাড়িয়ে না যায়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বুশ জুলাই ২০০৫ সালে প্রথম ভারত সফরে আসেন। এক যৌথ ঘোষণাও স্বাক্ষরিত হয় ১৮ জুলাই ২০০৫। সেই সাথে এই প্রথম পাবলিক হয়েছিল যে ভারত ও আমেরিকার সামরিক সম্পর্কই শুধু নয় কী ভিত্তিগত কাঠামোর মধ্যে ভারত-আমেরিকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পর্ক  হবে তাও ইতোমধ্যেই তারা চুড়ান্ত করে ফেলেছে।

একেবারে জন্মের সময়ের পটভুমির দিক থেকে বললে,  ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একচেটিয়া সরবরাহকারী ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বা বর্তমান রাশিয়া) কে কেন্দ্র করে সাজানো অর্থাৎ কোল্ড ওয়ার সময় থেকেই ওর মূল সরঞ্জাম ও এর সরবরাহ মূলত রাশিয়া ঘরাণার। কোল্ড ওয়ার মানে দুনিয়াটা দুই ব্লকে বিভক্ত থাকবার সময় বা বিভক্ত হয়ে ছিল যখন। ছোট-বড় সব রাষ্ট্রকে যখন হয় সোভিয়েত ব্লক নয়ত আমেরিকান ব্লকে ঢুকে যেতেই হয়েছিল। যখন দুটা থেকেই বাইরে থাকার উপায় ছিল না বা যেত না। এটা ছিল সেই ব্লক যুগ বা কোল্ড ওয়ারের যুগ। কোল্ড ওয়ার – মানে ঠিক যুদ্ধ লাগিয়ে জড়িয়ে যাওয়া নয় কিন্তু সব সময় যুদ্ধে জড়িয়ে থাকার মতই টেনশনে থাকা। আর গোয়েন্দা আর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স, সাবভারসিভ এক্টের ষড়যন্ত্র চারদিকে।  সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে (১৯৯২) যাবার পর থেকে কার্যত সেই কোল্ড ওয়ার এখন মৃত, দুনিয়া আর এখন ব্লকে ভাগ করা নাই। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে সে সময়ের তৈরি হওয়া অস্ত্রের ঘরানা সেই হিসাব, কেবল তাই এখনও প্রচ্ছন্নে বহাল আছে।

ইতোমধ্যে ১৯৯২ সাল নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আলাদা ১৫ রাষ্ট্র হয়ে যাওয়া – এটাকে কোল্ড ওয়ার যুগের সমাপ্তি সুচনা বলা যায়। ওদিকে এই ঘটনার পরের দুই টার্ম (১৯৯৩-২০০১) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিল ক্লিনটন। আর ক্লিনটন যুগের পরিসমাপ্তিতে, এরপরেই ২০০১ সাল থেকে জুনিয়র বুশও পরপর দুই টার্ম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ক্লিনটনের সময়কালটা ছিল –“কোল্ড ওয়ার শেষ হয়েছে এখন তারা একলাই রাজা” ধরণের আমোদে থাকার। কারণ কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তিতে দুনিয়াতে আর আমাদের মত দেশগুলোকে সোভিয়েত অথবা আমেরিকান কোন না কোন ব্লকে ঢুকে টিকে থাকতে হবে এই বাস্তবতার অবসান ঘটেছিল। একথাকেই আর একভাবে বলা যে দুনিয়া তখন থেকে আর বাইপোলার নয়। মানে, পরাশক্তি অর্থে দুনিয়া আর দুই মেরুতে বিভক্ত থাকে নাই। এতে স্বভাবতই আমেরিকান বিদেশ নীতিতে সেই প্রথম বিরাট পরিবর্তন এসেছিল। নতুন মৌলিক কিছু বদল তখনই মানে, ক্লিনটনের আমলেই হয়েছিল। যেমন আমাদের মত দেশে আমেরিকা সমর্থিত কোন সরকার ক্ষমতায় থাকলে তাকে আর ‘আগের মত’ সামরিক সরকার হতে হবে না। স্টেট ডিপার্টমেন্টের নতুন নির্দেশিকা অবস্থান হল, বেসামরিক সরকারের পক্ষে থাকতে হবে। সর্বোতভাবে চেষ্টা করতে হবে ক্ষমতা বেসামরিক হাতে রাখতে। কোল্ড ওয়ারের যুগে আমেরিকা ব্যতিক্রমহীনভাবে আমাদের মত যে কোন দেশে কোথাও বেসামরিক সরকার টিকাতে পারে নাই। ফলে আমেরিকা সমর্থিত সরকার মানেই সেটা সামরিক সরকারই হতে দেখা গিয়েছিল। এই অর্থে ক্লিনটনের সময়কালটা ছিল আমেরিকার দিক থেকে বেসামরিক সরকার টিকানোর সফলতা উপভোগের কাল। অবশ্য এটাও বাইরের দিক থেকে তাকিয়ে বলা। আর ভিতরে ভিতরে তা ছিল নতুন পরিস্থিতিতে এক মেরুর কালে আমেরিকান নতুন বিদেশনীতিতে আর কী বৈশিষ্ট আনা যেতে পারে,  কী হওয়া উচিত তা নিয়ে আরও বিস্তারে ভাবনা চিন্তার কাল। তবে আমেরিকান নতুন বিদেশ নীতির আরও পোক্ত রূপ হাজির করতে এবং তার বাস্তবায়ন শুরু হতে হতে ক্লিনটন আমল পেরিয়ে বুশের আমল চলে আসে।  আর এসব নতুন চিন্তা ভাবনা থেকেই পুরানা চিন্তা ও ব্লক ভেদাভেদ দৃষ্টিভঙ্গী ভেঙ্গে আমেরিকা ভারতের দিকে এগিয়ে আসার নতুন নীতি নেয়। বুশের আমল থেকে আমরা আমেরিকার নতুন ও পোক্ত বিদেশ নীতির বাস্তবায়নের কাল হিসাবে দেখতে পারি।

ওদিকে জুনিয়র বুশের প্রথম টার্মই আবার একই সাথে ভিন্ন আর এক ফেনোমেনা স্পষ্ট দৃশ্যমান হাজির হবার বছর। সেটা ছিল চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের দু’দশকের কালপর্ব (১৯৯০-২০১০), ডাবল ডিজিট জিডিপি গ্রোথের সেকেন্ড ডিকেড বা দ্বিতীয় দশ বছর। যদিও চীনের এই উত্থানের ফলে আমেরিকা-রাষ্ট্রের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের উপর এর প্রভাব পরিণতি কী হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আমেরিকান সরকারি স্পষ্ট গবেষণা লব্ধ ফল আসা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালের পর থেকে, যার চুড়ান্ত রিপোর্ট এসেছিল ২০০৮ সালে। এসবের আগে যদিও অনুমান নির্ভর কিছু খবর যেমন, প্রজেক্টেড রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল ২০০৪ সালেই (ষ্টাটিষ্টিক্যাল প্রজেকশন রিপোর্টের জন্য আমেরিকান বিখ্যাত ম্যাগাজিন)  ফর্বস ম্যাগাজিনের সৌজন্যে। ফলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন-ভারত একজোটে কোন কমন স্টাটেজিতে যেন না দাঁড়ায়  সে উদ্দেশ্যে ভারতকে কাছে টেনে বাড়তি খাতির করে চীন ও ভারতের মধ্যে দুরত্ত্ব তৈরি করা ছিল সেকালে আমেরিকান বিদেশ নীতির এক বিশেষ বৈশিষ্ট। জুনিয়র বুশের ২০০৫ সালের জুলাইয়ের ভারত সফরকে এই আলোকে দেখলে অনেক প্রশ্নের ব্যাখ্যা মিলবে। ঐ সফরের ফোকাস ঘটনা ছিল, ভারতকে আমেরিকার নিউক্লিয়ার টেকনোলজিসহ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বা বিক্রির সিদ্ধান্ত।

আগেই বলেছি, নিউক্লিয়ার বোমা বা পারমাণবিক বোমা পশ্চিমের হাতে এসে মারাত্মক অস্ত্র হিসাবে কার্যকর হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ কালে। এরপর সেখান থেকে এই অস্ত্রের গবেষণা ও বিকাশ বিস্তা্র সবচেয়ে বেশি ঘটে কোল্ড ওয়ারের সময় (মোটামুটি ১৯৫০-১৯৯২) কালে। যদিও ঠিক এর উলটা অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্রের উতপাদন বৃদ্ধি ও বিস্তার রোধে পরাশক্তিগত ততপরতাও শুরু হয় ১৯৬৮ সাল থেকে। স্বাক্ষরিত হয় NPT চুক্তি। অর্থাৎ প্রো-লাইফারেশন কথার সোজা বাংলা অর্থ “আয়ু দেয়া” বা “সহজেই যা বিস্তার লাভ করে”। কাজেই পারমাণবিক NPT  কথার মানে বাংলা করলে দাড়ায়, পারমানবিক অস্ত্র বা এর টেকনোলজির বিস্তার রোধের চুক্তি। আমেরিকান সরকারি ইতিহাস অনুসারে ১৯৬১-৬৮ প্রায় এই ৭ বছর ধরে নিগোশিয়েশনের ফসল হল এই চুক্তি। এর আবার তিন পৃথক পর্যায় বা অংশ আছে – নন-প্রোলিফারেশন, ডিসআর্মামেন্ট ও পিসফুল ইউজ। অর্থাৎ বিস্তার রোধ (অস্ত্রে ব্যবহারের লক্ষ্যে গবেষণা ও উতপাদন বন্ধ), নিরস্ত্রীকরণ (যে অস্ত্র তৈরি হয়ে গেছে এর ধ্বংস বা ব্যবহার বন্ধ করা) ও (যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে নয় তবে এই টেকনোলজির) শান্তিপুর্ণ ব্যবহার। প্রথম চোটে আমেরিকা, বৃটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এতে স্বাক্ষর করেছিল ১৯৬৮ সালে। কিন্তু তবুও  চীন ও ফ্রান্স  ১৯৯২ সালের আগে স্বাক্ষর করে নাই বলে একমাত্র এরপরই জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্যরেই স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়। অন্যভাবে বলা যায় এই চুক্তিতে স্বাক্ষরের বিষয়টাই ১৯৯২ সালের আগে অর্থাৎ  কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তির আগে কার্যকর করা যায় নাই। বিশেষ করে যারা ভেটো-ক্ষমতাধারী এবং যাদের সবার হাতে পারমানবিক অস্ত্র মজুদও আছে, একারণে। এছাড়া যাদের হাতে অস্ত্র মজুদ নাই তারাসহ বর্তমানের মোট স্বাক্ষর করা দেশের (তাইওয়ানসহ) সংখ্যা ১৮৯। কিন্তু স্বাক্ষর করতে একেবারেই ইচ্ছুক নয় (এদের মধ্যে যাদের পারমানবিক অস্ত্র আছে জানা যায় বা অনুমান করা যায়) এমন রাষ্ট্র হল  ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও সাউথ সুদান। সাউথ আফ্রিকাকেও এই দলে ফেলা যেত সে সময়। কিন্তু ১৯৯৪ সালে বর্ণবাদিতা বিরোধী সরকার কায়েমের পরে সে এনপিটি স্বাক্ষর করা দেশ হয়ে যায়। ওদিকে উত্তর কোরিয়া স্বাক্ষর করেছিল প্রথমে কিন্তু আবার প্রত্যাহার করেছে ২০০৩ সালে। এদের মধ্যে কেবল ভারত ও পাকিস্তান হল এমন রাষ্ট্র যাদের হাতে পারমানবিক অস্ত্র থাকার ব্যাপারটা সবাই জানে এবং তারা নিজেরাও স্বীকার করে। নিজ স্বীকারোক্তির ১৯৭৪-৬ সাল থেকেই পারমানবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হলেও এরা এনপিটি তে স্বাক্ষর করতেও চায় না। চলতি একবিংশ শতকের আগে এনপিটি বিষয়টা এভাবেই ছিল।  আর এসবের টেকনিক্যাল খুটিনাটি দিক তদারক করা এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে রিপোর্ট করার প্রতিষ্ঠান হল IAEA (ইন্টারন্যাশনাল এটমিক এনার্জি এসোশিয়েশন)।

এনপিটি স্বাক্ষরিত দেশগুলোর মধ্যে পশ্চিমের যেসব দেশের হাতে পারমানবিক অস্ত্র ও টেকনোলজি আছে এবং যারা সেটা অন্য রাষ্ট্র কাউকে (কেবল শান্তিপুর্ণ ব্যবহারের জন্য) দিতে চায় তাদের সেই  দেওয়ার বিষয়টা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ৪৮ সদস্যের এক নিয়ন্ত্রণ গ্রুপ আছে যার নাম NSG, নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ বা এনএসজি। গ্রুপের সদস্যরা মূলত পারমানবিক টেকনোলজি অথবা মালামাল সরবরাহে সক্ষম। ফলে শান্তিপুর্ণ ব্যবহার যেমন বিদ্যুৎ উতপাদনে এবং বৈধভাবে ব্যবহার করতে চাইলেও কোন এক এনএসজি গ্রুপের সদস্যকে ধরতে  হবে।  তবে কিছু ব্যতিক্রমি পরিস্থিতি এখানে স্পষ্ট করা দরকার। যেমন ইরান, অনুমান করা হয় সে পাকিস্তান (ব্যক্তিগতভাবে বিজ্ঞানী কাদের খান) বা উত্তর কোরিয়া অথবা উভয়ের কাছ থেকে মালামাল ও টেকনোলজি সংগ্রহ করেছে। অর্থাৎ এনএসজি এর কেউ তাকে সরবরাহে রাজি হয় নাই। ভিন্ন আর এক ব্যতিক্রম ভারত। ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশ ভারত সফরে পারমানবিক টেকনোলজি ও মালামাল সরবরাহ বিষয়ে চুক্তি করেছিল।

এই হল পিছনের পটভুমি। এখন ভারত ঐ চুক্তি কার্যকর হয়েছে দেখতে চাইলে তাকে আর এক বাধা পার হতে হবে। সেটা হল, উপরে যে নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ বা এনএসজি এর কথা বলেছি, ভারতকে ঐ গ্রুপের সদস্য হয়ে নিতে হবে। কারণ ভারতের সাপ্লায়ার আমেরিকা ভারতকে সরবরাহ দিতে পারে যদি ভারত এনএসজি এর সদস্য হয়। অন্য ভাষায় বললে এই গ্রুপের পালনীয় নিয়মকানুন মেনে সরবরাহকৃত মালামাল ও টেকনোলজি ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতি দেয়। আমেরিকার সরবরাহ পেতে ভারতকে আগে এনএসজি এর সদস্যপদ পেয়ে নিতে হবে এব্যাপারে খোদ ভারত বা আমেরিকার কোন বিতর্ক নাই। তাহলে বিতর্ক কী নিয়ে? বিতর্কে ভারতের দাবি, আমার অতীত আচরণ ও ট্রেক রেকর্ড ভাল ফলে আমি আমেরিকা এই NSG থেকে সাপ্লাই পাবার যোগ্য।  কিন্তু স্পষ্ট করে যেটা ভারত বলছে না তা হল, এর অর্থ কী ভারতের NSG এর সদস্য গণ্য করে নিতে হবে, অথবা আর কোন বিবেচনায় না গিয়ে সদস্যপদ দিয়ে দিতে হবে? এছাড়াও NPT স্বাক্ষরের কী হবে? ভারত NPT তে স্বাক্ষর না করলেও NSG এর সদস্য গণ্য হতে পারে? এর মানে NPT তে স্বাক্ষর করা NSG এর সদস্য হবার ক্ষেত্রে পুর্বশর্ত নাও হতে পারে? তাই কী?

যারা এনপিটি এর সদস্য অর্থাৎ পারমানবিক মালামাল ও টেকনোলজি যারা কেবল শান্তিপুর্ণ কাজে, অস্ত্র নয় বিদ্যুৎ উতপাদনের মত কাজে ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বলে স্বাক্ষর করেছে কেবল তাদেরকে নিয়েই এনএসজি বা সরবরাহকারিদের গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। অর্থাৎ এনএসজি এর সদস্য হবার পুর্বশর্ত হল এনপিটি তে স্বাক্ষর করে আসা, এর সদস্য হওয়া। কিন্তু ভারত কখনই এনপিটিতে স্বাক্ষর করে নাই। ফলে সে এনপিটি এর সদস্যই নয়। ফলে তর্কের বিষয় এটা যে, এনপিটি সদস্য না হয়েও ভারত এনএসজি এর সদস্য বলে গৃহীত হবে কী না?

সোজা ভাষায় ভারত চাচ্ছে বা চেষ্টা করছে, এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেই সে আমেরিকার টেকনোলজি ও মালামাল পেতে চায়। কিভাবে?

ভারতের মিডিয়া চলতি মে মাসে অভিযোগের রিপোর্ট ছেপেছে যে আমেরিকা থেকে ভারতের নিউক্লিয়ার বিষয়ক সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে  চীন বাধা সৃষ্টি করছে।  যেমন ইংরাজি ‘দি হিন্দু’ এর শিরোনাম “চীন ও পাকিস্তানের আপত্তি উল্টায়ে দিয়ে আমেরিকা বলছে ভারত এনএসজি এর সদস্য হবার জন্য রেডি”। এটা শিরোনাম, আর রিপোর্টের বডিতে আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র জন কিরবি এর উদ্ধৃতিতে বলা হচ্ছে, তিনি বলেছেন, “ ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট (ওবামা) ভারত সফরের সময় তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে, আমেরিকার ব্যাখ্যায় ভারত মিসাইল টেকনোলজি কনট্রোল রেজিমের শর্তাবলী পূরণ করে এবং ভারত এনএসজি এর সদস্য হবার জন্য রেডি (India meets missile technology control regime requirements and is ready for NSG membership,)”। বুঝাই যাচ্ছে আমেরিকা সরাসরি একথা বলছে না যে ভারত এনপিটি এর সদস্য না হলেও এনএসজি এর সদস্য বিবেচিত হতে পারে কীনা। এছাড়া আমেরিকার বুঝ ব্যাখ্যার কথা বলা হচ্ছে। তার মানে অন্য কারো ব্যাখ্যা আর এক রকম হতেও পারে। এসবের বিপরীতে চীন বলছে। আমেরিকার সাথে ভারতের চুক্তি সেটা এখানে ইস্যু নয়। সেটার ভিতর চীনের আপত্ দেখার কিছু নাই। তার অবস্থান হল, ভারত এনপিটি এর সদস্য হয়ে নিলেই সব সমাধান। এর কারণ হিসাবে চীন বলছে গত বছর এনএসজি এর সভায়, এনপিটি এর সদস্য হতে হবে আগে – এটাই এনএসজি এর সদস্য হবার পুর্বশর্ত হিসাবে বলা হয়েছে। ফলে এখানে চীনের বাড়তি পরামর্শ হল বিষয়টা নিয়ে এনএসজির যারা সদস্য তাদের সাথে কথা বলে ভারত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারে। অর্থাৎ এটা পরিস্কার ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক বা তাদের কোন চুক্তির বিরোধিতা বা ঠেকায় দেয়া দিবার কোন ইচ্ছা এখানে চীনের নাই।

‘দি হিন্দু’ স্টেট ডিপার্টমেন্টের জন কিরবিকে উদ্ধৃত করে আরও বলছে, “কেউ এনএসজি এর সদস্য হতে পারবে কীনা তা নিয়ে দেয়া বক্তব্য বর্তমান সদস্যদের আভ্যন্তরীণ বিষয়”। অর্থাৎ এনিয়ে ভারতের বলার কিছু নাই।

তাহলে শেষে কোথায় দাড়াল বিষয়টা? শেষ কথা হল, মিডিয়াগুলোকে – ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক জমে উঠতে চীন বাধা দিচ্ছে এমন এক ধারণা – ছড়াতে ব্রিফ করা হয়েছে। আর এই খামোখা চীন বিরোধিতা তাতিয়ে দিয়ে খোদ ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি এখন চীন সফরে আছেন। আর আলোচনার মূল বিষয় এনএসজি এর সদস্যপদ, একেবারে ‘হর্সেস মাউথ’ ফয়সালা।

কে না জানে, এনপিটি স্বাক্ষরের সোজা অর্থ পরমাণুর অস্ত্রে ব্যবহার তাহলে এরপর আর করা যাবে না। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের পাঁচ ভেটো ক্ষমতার রাষ্ট্র সহ প্রায় সকলে এই কনভেনশনে স্বাক্ষরদান করে ফেলেছে। ফলে কারই আর যে সুবিধা নাই এবং সবাই স্বাক্ষর দিয়ে প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ যে আর পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না। তাহলে কীসের ভিত্তিতে কেন আমেরিকা বা এদের কারো সহয়তাতেই অস্ত্র বানানো ও প্রয়োগের ভারতের একা সুবিধা থাকবে? এবং থাকবে সেটা আমেরিকার হাত দিয়ে, সুপারিশে? ভারত কী আশা করে দুনিয়ায় এনপিটি স্বাক্ষর না-কারি রাষ্ট্র হবে একমাত্র ভারত! যাকে আবার তোলা তোলা করে বিশেষ খাতিরে আমেরিকা পরমাণু টেকনোলজি ও মালামালও দিবে। কারণ আমেরিকার চীনের উত্থানের এতই ঠেকেছে! আর এই সুবিধা আর কারো থাকবে না। তবে একা ভারত ঐ টেকনোলজি ও মালামাল দিয়ে অস্ত্র বানানোর দিকেও চাইলে চলে যেতেও পারবে! কী তামশা! বলা বাহুল্য ভারত স্বপ্নের ঘোরে আছে। আর কেউ স্বপ্নে খেলে পোলাও খাওয়াই উচিত!

 

[লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্তের ৩০মে ২০১৬ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও বর্ধিত আকারে ও এডিট করে ছাপা হল।]