শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা


শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা
গৌতম দাস
১৮  জুন ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-1jc

 

‘শাঙ্গরি-লা ডায়লগ’ বা Shangri-La Dialogue। এটা প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় এমন একটি নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলনের নাম। পুরা নাম IISS Shangri-La Dialogue। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রায়.৫০ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক প্রধানদের নিয়ে সিঙ্গাপুরে এর আয়োজন হয়। তাদের মধ্যে আমেরিকা, চীন, জাপান, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ইত্যাদি ছাড়াও এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্য অনেক রাষ্ট্রও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। শাঙ্গরি-লা নামটা মূলত ইন্ট্যারনাশনাল এক চেইন হোটেল গ্রুপের। আর ওদিকে আইআইএসএস- ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। এটা ইংল্যান্ড ভিত্তিক এক থিঙ্কটাংক বা গবেষণা স্টাডি ধরনের প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ আইআইএসএস ও সিঙ্গাপুর সাংরিলা হোটেলের যৌথ উদ্যোগে ২০০২ সালে জন্মের পর থেকে সিঙ্গাপুরের শাঙ্গরি-লা হোটেলে প্রতি বছর এই নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন হয়ে থাকে। আর শাঙ্গরি-লা হোটেলে নাম থেকে শাঙ্গরি-লা শব্দটা ধার নিয়ে এই সম্মেলনের নামকরণ করা হয়েছে ‘শাঙ্গরি-লা ডায়লগ’। সে হিসাবে একইভাবে এবারের সম্মেলন শুরু হয়েছিল ৩ জুন ২০১৬ থেকে। চলেছিল রোববার ৫ জুন পর্যন্ত।

হংকংয়ের সবচেয়ে পুরানা এক দৈনিক পত্রিকা হল, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। শাঙ্গরি-লা ডায়লগ প্রসঙ্গে তারা বিরাট রিপোর্ট ছেপেছে। যার মূল বক্তব্য হল, সম্মেলনের এবারেরও ফোকাস আবার সেই দক্ষিণ চীন সাগর। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে চীন ও আমেরিকা উভয়পক্ষ চাচ্ছে কোনো রেটরিক বা উচ্চবাচ্য থেকে যেন উত্তেজনা না ছড়িয়ে যায়। উভয় পক্ষ কোনোভাবেই চায় না যে সমুদ্রসীমা বিতর্ক চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে অচল ও তেতো বানিয়ে ফেলে।
যেমন ওয়াশিংটনভিত্তিক এক থিঙ্কট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারনাশনাল স্ট্রাডিজ’-এর ড. বন্নি গ্লসার মনে করেন দক্ষিণ চীন সাগর সমুদ্রসীমা বিতর্ক ইস্যুতে চীন ও আমেরিকা প্রত্যেকেই নিজ অবস্থানে শক্ত হয়ে দাঁড়াবেন। কিন্তু কোনোভাবেই তারা উভয়েই এই মিটিংকে তাদের বিরোধ প্রকাশ বা প্রদর্শনের জায়গা বানাবেন না। গ্লসার বলছেন, “এ কথা সত্যি যে দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে আমাদের মৌলিক কিছু স্বার্থ সঙ্ঘাত আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনোভাবেই শাঙ্গরি-লা ডায়লগ আমাদের বিরোধে কোনো ফয়সালা আনার স্থান নয়”।
ঐ রিপোর্ট লিখছে, “আমেরিকা চায় এই অঞ্চল শান্তি, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে তাকে বিবেচনা করুক ও তার ওপর আস্থা রাখুক। কিন্তু একইসাথে এ অঞ্চল চীন-আমেরিকার সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রভূমি হয়ে উঠুক এটাও চায় না। এটা আমেরিকা বুঝে। তাই শাঙ্গরি-লা ডায়লগে আমেরিকার প্রচেষ্টা থাকার কথা এ দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা”। একারণে আমরা দেখছি এই রিপোর্টের শুরুতে উপরে উধৃত এই লম্বা বাক্যটা আছে। কিন্তু তাতে একটা ছোট শব্দ আছে বাংলায় বললে তা হলো ‘আগলে ধরে রাখা’ বা ইংরাজিতে contain। বলা হচ্ছে চীন ও আমেরিকা দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে উত্থিত যেকোনো টেনশন আগলে ধরে রাখার পক্ষে পদক্ষেপ নিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে একমত হয়েছে।

ঐ রিপোর্ট সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও চীন-আমেরিকার সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হুয়াঙ জিং কে উদ্ধৃত করেছে। তিনি বলছেন, “চীন-আমেরিকার বিরোধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে, এটা দাঁড়িয়ে দেখা উভয়ের কারও স্বার্থের পক্ষে যায় না”। হুয়াঙ শাঙ্গরি-লা ডায়লগের অর্গানাইজিং কমিটির একজন সদস্যও। তিনি ভিতরের তথ্য জানাচ্ছেন, “আসলে দক্ষিণ চীন সাগর টেনশনের ইস্যু সম্মেলনের তিন দিনের পাঁচ সেশনে কখনই আনা হবে না। এর বদলে বরং শেষের দুই দিনের অনুষ্ঠিতব্য যে ছয়টা সাইড মিটিং হওয়ার কথা তার কোন একটাতে এনিয়ে কথা হবে”। অর্থাৎ মূল আলোচনায় নয় পার্শ্ব-আলোচনার বিষয় হিসেবে সাউথ চায়না সি বিতর্ক রাখা হয়েছে। হুয়াঙ বলছেন, “চীন ও আমেরিকা উভয়েই চায় তাদের অবস্থানের মতভেদকে নিচুস্বরে নামিয়ে রাখতে এবং শাঙ্গরি-লা ডায়লগের হোস্ট সিঙ্গাপুরও চায় না যে তার আয়োজিত এই সভা দক্ষিণ চীন সাগরে ইস্যুর ভেতরে হাইজাক হয়ে যাক”। অবশ্য এখানে আর এক মজার তথ্য তিনি শেয়ার করেছেন। হুয়াঙ জিং বলছেন, দিনকে দিন নিজের দাবিনামা নিয়ে চীন যেভাবে সরব অগ্রসর হচ্ছে তাতে সেটাকে আমেরিকা কী করে মোকাবেলা করবে, মুখোমুখি হবে – এ প্রশ্নে আসলে খোদ আমেরিকাতেই ‘হোয়াইট হাউজ বনাম পেন্টাগনের’ মধ্যে বিতর্ক ও মতভেদ আছে। তবে সেই বিতর্ক ও মতভেদ থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কোনোভাবেই চীন-আমেরিকার পরস্পরের দিকে থুথু ছিটিয়ে ঝগড়া করুক তা হতে দেবেন না। কারণ আগামী সপ্তাহ থেকে চীন-আমেরিকার মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক “স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক ডায়লগ” অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটা উভয় রাষ্ট্রের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর সমন্বয়ের লক্ষ্যে প্রতিবছর নিয়মিত হয়ে আসছে। সেটার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাক ওবামা তা হতে দিতে পারেন না।
তাই হুয়াঙ ও গ্লসার উভয়েই নিশ্চিত করে বলছেন, শাঙ্গরি-লা ডায়লগ অনুষ্ঠানে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী এস্টন কার্টার যে নির্ধারিত বক্তৃতা রাখার কথা আছে সেখানেও এস্টনের স্বভাবসুলভ গরম বক্তব্যও নিচুস্বরে হাজির করা হবে। যেমন এস্টন কার্টার এর আগে – চীন তার দাবির পক্ষে জোরাজুরি করতে গিয়ে ‘বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার এক গ্রেট ওয়াল’ রিস্ক নিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। চীন এই শাঙ্গরি-লা মিটিংয়ে কোন মন্ত্রী নয় বরং এক সামরিক কর্তা এডমিরাল সান জিয়াঙগুয়ের নেতৃত্বে যোগ দিয়েছে। ফলে এমন প্রশ্নের জবাবে, এডমিরাল সান সম্ভবত নিজেদের পুরানা অবস্থানই রক্ষা করে চলবেন। এসব দিক বিবেচনা করে গ্লসার বলছেন, ‘আমি মনে করি না যে, চীনা পক্ষের আগামীকালের বক্তৃতায় আমরা নতুন কোন কথা শুনব’। এই “সাংরিলা মঞ্চ নিজের পার্থক্য নিয়ে কথা বলার একটা খুবই ভালো জায়গা, কিন্তু আসলে একটা ভারসাম্য অবস্থা বের করে আনার পক্ষেই আমাদের কাজ। সে জন্য আমি মনে করি না যে এই সভা থেকে কোনো শক্ত কথার মার বা ধারালো রেটরিক কিছুই শুরু হবে না। বিশেষত যখন চীন-আমেরিকার মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক ‘স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক ডায়লগ’ অনুষ্ঠান যখন পরের সপ্তাহে”।
এমন ঠাণ্ডা বাতাবরণ যে ইতোমধ্যে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এর আর এক লক্ষণ হল, ভিয়েতনামের ততপরতা। দক্ষিণ চীন সাগর সমুদ্রসীমা বিতর্কে চীনের সাথে একমাত্র ভিয়েতনামের সম্ভবত সবচেয়ে তিক্ত সম্পর্কটা হয়ে গেছে। সেই ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির নৌবহরকে ভিয়েতনামের কোনো এক পোর্টে নোঙর করে অতিথির বেড়ানো বেড়িয়ে যেতে দাওয়াত দিয়েছে। ভিয়েতনামের প্রতিরক্ষা দফতরের মুখপাত্র সুত্রে এটা জানা গেছে।
সাউথ চাইনা মর্নিং পোষ্ট এই রিপোর্টের শেষে কিছু ছোট মজার মন্তব্য করেছে। যেমন ওই রিপোর্টে তথ্য দিয়ে বলেছে, “ভিয়েতনাম চীনা নৌবহরকে দাওয়াত দিয়েছে এমন সময় যখন ভারতের দুইটা যুদ্ধজাহাজ ভিয়েতনামের ‘ক্যাম রণ বে’ বন্দর গত বৃহস্পতিবার ত্যাগ করে গেছে। এ ছাড়া পোস্টের আর একটা মন্তব্য বাক্য, ‘দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে কিন্তু আমেরিকার মত ভারতেও কোনো দাবি বা স্টেক নেই; ফলে বিরোধ-বিবাদের সে কোনো পক্ষও নয়’।
পোষ্টের এই মন্তব্যে অনেক কথা লুকানো আছে। সময়ের অভাবে সব এখানে আনার সম্ভব হবে না। শুধু ভিয়েতনাম চীনা নৌবহরকে দাওয়াতের এক ঘটনাই আবহাওয়া সম্পর্কে অনেক কিছুর নির্দেশক। অর্থাৎ গুমট পরিস্থিতির ভেতরে কোথাও থেকে একটা ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। না হলে এটা দাওয়াতপত্র পর্যন্ত গিয়েছে তা হতো না।
তবে এখানে আমরা গত বছরের শাঙ্গরি-লা ডায়লগের কথা স্মরণ করতে পারি। সে সময়কাল প্রায় একই ছিল, ২৯-৩১ মে ২০১৫ সাল। ইস্যুও প্রায় একই। দক্ষিণ চীন সাগরের পূর্ব দিক পূর্ব চীন সাগর চীন সীমান্তের যার অপর পাড়েই জাপান। পূর্ব চীন সাগর  নিয়ে চীন ও জাপানের সমুদ্র সীমা বিতর্ক আছে। আমেরিকার উস্কানিতে জাপান  গতবার পূর্ব চীন সাগর ইস্যুকে তেতে উঠেছিল।  গত বছরের প্রথম থেকেই এই ইস্যু নিয়ে চীন-জাপানের বিরোধ বিবাদকে তাতিয়ে তুলে চলছিল আমেরিকা । কিন্তু এবারের মত একইভাবে গতবারও আমেরিকা জাপানকে গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নেয়ার অবস্থা করেছিল। বছরের শুরু থেকেই জাপানকে দিয়ে চীনের সাথে  ঝগড়ার মুখোমুখি করিয়ে যেন এখনই যুদ্ধ লেগে যাচ্ছে এমন এক অবস্থায় এনে শেষে শাঙ্গরি-লা ডায়লগে যখন উভয়ের মুখোমুখি হয়ে গেল তখন এখানে এসে পূর্ব চীন সাগর ইস্যুতে আমেরিকার পুরা উল্টো অবস্থান। ভোল পালটে মিটিংয়ে আমেরিকানরা এবার জাপানিজদের খালি জামা টেনে ধরা শুরু করেছিল। কি জানি যদি জাপানিজরা চীনাদের সাথে যদি ঝগড়া বাধিয়েই ফেলে তবে সেটা তো আমেরিকাকেও জাপানের সাথে মিলে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে যাওয়ার অবস্থায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে। আর পৌঁছালে তখন কী হবে? এই আসল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল আমেরিকা। অর্থাত এশিয়ায় আমেরিকার এই নীতির মূল কথা হলো যেন, কোন রাষ্ট্র বিরোধ ও স্বার্থসঙ্ঘাত দেখা দিলেই সেটাকে যুদ্ধের দিকে নিতে হবে, ঠেলে দিতে হবে। অথচ এটা তো কোনো কাজের কথা নয়। একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এমন নীতি বাস্তবায়ন অসম্ভব বলে একেবারে না করে দেয়া যাবে না। তবে এটা খুবই এক্সষ্ট্রীম পথ, সর্বশেষ অবলম্বন; সব পথ ফেল করার পর যা করা হয়। তাই গতবারের সাংরিলার পর আজ পর্যন্ত আমরা দেখছি খোদ জাপানসহ সবাই যেন ভুলে গেছে যে পূর্ব চীন সাগরে দ্বীপের মালিকানা নিয়ে চীনের সাথে জাপানের কোন ইস্যু ছিল।
পাঠক কেউ যেন বুঝতে ভুল না করেন। তাই কিছু কথা পরিস্কার করে বলে রাখা ভাল। তা হল, এখানে উপস্থাপিত বক্তব্যে এটা বলা হচ্ছে না যে চীন এক মহাপরাক্রমশালী হয়ে গেছে ফলে জাপান ভিয়েতনাম ইত্যাদিরা যেন চীনকে ‘লাড়তে’ না যায়! এমন ওকালতি আমরা এখানে করতে বসিনি। চীনের পক্ষে এমন খেয়ে না খেয়ে এজেন্ট বা চীনের বিদেশনীতির ব্যাগ বহনকারী দালাল সাজার আগ্রহ আমাদের নেই। এর কোনো অর্থও হয় না।
বিষয়টা হল, যুদ্ধ সম্পর্ক আমাদের দেখা বা জানা পুরানা ইতিহাসের অভিজ্ঞতার ভিতর ইতোমধ্যে এক ব্যাপক বদল ঘটে গেছে। বিশেষ করে এই সদ্য পেছনে ফেলা কোল্ড ওয়ারের কালের (১৯৫০-৯২) যুদ্ধ ধারণা। ঐ সময়ের যেকোনো দুই রাষ্ট্রের বিরোধ মানেই শেষ বিচারে আসলে তা সোভিয়েত-আমেরিকান মতাদর্শিক, রাজনীতি বা অর্থনৈতিকসহ সবকিছুতে স্বার্থবিরোধ সঙ্ঘাত। কিন্তু তবু কেবল একটা বিষয় ছাড়া সেসব বিরোধের অন্য সব দিক প্রায় সবই এখনকার মতোই । সে অমিলের দিকে সবার মনোযোগ দিতে বলব। কোল্ড ওয়ারের ওই সময়কালে যেকোনো সঙ্ঘাতের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল সেই স্বার্থবিরোধে সোভিয়েত অথবা আমেরিকা পরস্পর পরস্পরকে যুদ্ধের মাঠেই একমাত্র ফয়সালা করবে এভাবে ঠেলে দিতে পারত, সম্ভব ছিল। অর্থাৎ শত্রু মানেই নির্মূল। যেন একই কথা। নির্মুল ছাড়া শত্রু মোকাবিলা বলে আর কিছুই হতে পারেনা, এমন ধরেই নেয়া হত।  এটাই ছিল একমাত্র পথ ও লক্ষ্য। এর মাধ্যমেই যেকোনো বিরোধের মীমাংসা করতে হবে এটা সহজেই ভাবা যেত। কোনো স্বার্থবিরোধ দেখা দিলেই কূটনীতি বা ডায়লগের ন্যূনতম কথা বলার চেষ্টাও না করে তাকে শত্রু নিশ্চিহেৃর লাইনে ভাবা সম্ভব ছিল।
এমন ভাবনার মূল কারণ, দুনিয়ায় তখন ছিল দুটো অর্থনীতি। যাদের মধ্যে আবার কোনো লেনদেন বিনিময় বলতে কিছু ছিল না, এমনিভাবে দুনিয়া দুই ধরণের অর্থনীতি ও পরস্পর সম্পর্কহীন হয়ে বিরাজ করত। কেউ কারও সাথে লেনদেন বিনিময়েওর সম্পর্কে নাই। কেবল দুইটা অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ নিজ নিজ ব্লকের ভিতর আলাদা আলাদা বিনিময় ব্যবস্থার এমন দুই জোটে বিভক্ত ছিল। ফলে একের বোমা হামলায় অপরের অর্থনীতি ও প্রাণসহ বৈষয়িক সব কিছু নিশ্চিহৃ হয়ে গেলেও তাতে বোমা আক্রমণকারীর কোনোই ক্ষতি ছিল না। যেমন, আমেরিকা পক্ষের কোনো পুঁজি পণ্য লেনদেন বিনিয়োগ অপর সোভিয়েত ইউনিয়নে কোথাও বি-নিয়োজিত ছিল না। ফলে সারা সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বংস হয়ে গেলেও তাতে এর লেনদেন বিনিয়োগ প্রভাব আমেরিকায় পড়বে না। রাশিয়ায় কোনো আমেরিকান বিনিয়োগকারীই ছিল না বলে আমেরিকারই ফেলা বোমায় কোনো আমেরিকান বিনিয়োগ নষ্ট হবে এমন কোনো সম্ভাবনা ছিল না। আর একালে ঠিক এর উলটা। দুটো অর্থনীতি বলতে দুনিয়ায় এখন কিছু নেই, বরং আছে একটাই, একই গ্লোবাল পুজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা। ফলে এখন চীনে আমেরিকা বোমা ফেললে তাতে অবশ্যই কোনো না কোন আমেরিকান বিনিয়োগ বা অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপরই সে বোমা পড়বে। একারণে রাষ্ট্র স্বার্থবিরোধে একমাত্র যুদ্ধই করতে হবে, যুদ্ধে ফয়সালা করতে হবে অথবা এটাই একমাত্র সমাধানের পথ একথা আর সত্য নয়, বাস্তবতাও নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের (১৯৯২) পরে অথবা কোল্ড ওয়ার যুগের সমাপ্তিতে এটাই আমাদের যুদ্ধ ও স্বার্থ ধারণায় ইতোমধ্যেই এক বিরাট পরিবর্তন এনে দিয়েছে। যদিও তা আমরা অনেকেই টের পাইনি অথবা কিছু হলেও অনেকেই পেয়েছেন।
অথচ এই নতুন বাস্তবতাতেও সবাই আমাদের চোখে পট্টি পড়াতে চাচ্ছে। সবাই আমরা একালের স্বার্থ বিরোধকে সেকালে কোল্ড ওয়ার কালের চোখ দিয়ে দেখগাতে চাচ্ছে। পুরনো চশমায় যুদ্ধ পরিস্থিতি বুঝার কল্পনা করার চেষ্টা করছি। অথচ এটা ভুল, অবাস্তব। বরং এভাবে আমেরিকা যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে নিজের যুদ্ধ বা স্ট্রাটেজিক জোটের খোলে ছোটবড় দেশকে তুলে নিতে চাচ্ছে। আর বুঝে না বুঝে এতে তাল ধরেছে ভারত। চীনের সাথে যেন ভারতের যেন একটাই সম্ভাব্য সম্পর্ক  – যুদ্ধ। আমেরিকা প্রতিবারই সারাবছর চীনের বিরুদ্ধে সে এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর জন্য খুবই একটা দরকারি শক্তি এটা প্রমাণ করতে গরম অবস্থা তৈরি করে থাকে। কিন্তু শেষে শাঙ্গরি-লা সম্মেলন এলেই তাকে ক্ষেমা দিতে হয়। কারণ এটা ডায়লগের আসর। ডায়লগের আসরে হুমকি চলে না। আর যদি যুদ্ধ লেগে যায় সেটা হবে – দেশ ভিন্ন, কিন্তু  সেই ভিন দেশের কোন না কোন আমেরিকান বিনিয়োগ এর উপরে তাহলে আমেরিকাকেই বোমা মারার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমেরিকা জানে এটা এবসার্ড, এটা সে করতে পারে না। এখন কথা হল শাঙ্গরি-লা ডায়লগ এলেই সব ঠাণ্ডা পানি ঠেলে দেয়া হয় কেন? ঠাণ্ডা পানিই যদি বাস্তবতা হয় তবে ভুয়া গরম সৃষ্টি করা আমেরিকার ও তার সাগরেদদের দিক থেকে এক মারাত্মক দায়িত্বহীনতা। আর এমন সাগরেদ হয়ে ভারতের নিজ জনগণকে মিথ্যা বলছে, প্রতারণা করে চলছে – কোল্ড ওয়ার যুগের মত মিডিয়া গরম করে বলে যাচ্ছে – চীন এই নিয়ে গেল সেই নিয়ে গেল। চীন ভারতের সব উন্নতির পথে বাধা! অথচ কে না জানে এটা কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫০-১৯৯২) দুই অর্থনীতির সম্পর্কহীন  লেনদেন হীন সময় নয়। এখানে দুই রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধ প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বীতা সবই আছে।, আবার চীন-ভারতের ঘনিষ্ঠ  বছরে ৭৩ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন আছে। কারণ তারা একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অন্তর্গত একই অর্থনীতির দুই অংশ মাত্র। যে কারণে ঐ চীনকেই আবার মোদির “বিকাশের প্রোগ্রামের” ভারত , নিজেরর আগামির জন্য নতুন পাচ শহরের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব দিয়ে চুক্তি করেছে। আমরা নতুন ধরণে যুগে প্রবেশ করে গেছি। একে বুঝতে আমরা যেন অন্তত আশির দশকের কোল্ড ওয়ারের ধারণা ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করতে না যাই। কারণ ওটা অচল, আনফিট।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে ০৬ জুন (প্রিন্টে ০৭ জুন) ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ওয়েবে প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তা আবার পরিবর্ধিত ও এডিট করে আবার ছাপা হল।]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s