নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা

নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা
গৌতম দাস
২৩ আগষ্ট ২০১৬, সোমবার

http://wp.me/p1sCvy-1Jc

 

 

নেপালের রাজনীতিতে আবার কিছু উত্তাপ দেখা দিয়েছে। মাওবাদী নেতা ৬১ বছর বয়সী পুষ্পকমল দাহাল (প্রচণ্ড) আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আবার বলছি এ জন্য যে, তিনি নেপাল থেকে রাজতন্ত্র উৎখাতের নায়ক। রাজতন্ত্র উৎখাতের পর নেপালে ২০০৮ সালে এই মাওবাদী গেরিলা নেতা প্রথম নির্বাচিত ও পপুলার প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন । কিন্তু এর পরের ও সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে নেপালের ৫৯৫ জনের আসনের পার্লামেন্টে প্রাপ্ত আসন বিন্যাসে নেপাল রাজনীতিতে প্রধান তিনটা দলের অবস্থান ছিল, নেপালি কংগ্রেস ১৯৬ আসন, লিবারেল কমিউনিস্ট দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল বা সিপিএন (ইউএমএল) এর ১৭৫ আসন আর মাওবাদী কমিউনিস্ট ইউসিপিএন (মাওবাদী সেন্টার)-এর ৮০ আসন। এটাই চলতি   সংসদের আসন বিন্যাস। এভাবে মোট ৪৫১ আসন (৭৫% আসন) এই তিন দলের ভাগে আর বাকি ১৪৪টা আসন আরো প্রায় ২৭টা ছোট ছোট দলের (মাধেসি ও ত্বরাই অঞ্চলের দলসহ) মধ্যে বিভক্ত। ফলে এমন আসনবিন্যাস অনুসারে মূল তিন দলের প্রতি দুই দলের জোট হলেই সরকার গঠন সম্ভব। কারণ তাতে কোয়ালিশন অর্থে কোনো সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখানো সম্ভব। ২০১৩ সালের নির্বাচনের পর থেকে এর আগে দু-দু’বার কোয়ালিশন সরকার হয়েছিল, যা এবা্রেরটা নিয়ে তৃতীয়বারের কোয়ালিশন সরকার হল। প্রথমটা ছিল নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্বে লিবারেল কমিউনিস্টদের সমর্থনে সরকার গঠন । আর টিকেছিল ফেব্রুয়ারি ২০১৪ থেকে অক্টোবর ২০১৫ পর্যন্ত। যেখানে মাওবাদী ছিল বাইরে বিরোধী দলে। নেপালের প্রথম কনস্টিটিউশন অনুমোদিত ও গৃহীত হয়েছিল ঐ সরকারের আমলে, তবে প্রধান তিন দলেরই সক্রিয় জোটবদ্ধ সমর্থনে। এরপর ওই প্রথম কোয়ালিশন সরকার ভেঙে দ্বিতীয়বার কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়েছিল। সেবার তা হয়েছিললিবারেল কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে খাড়গা প্রসাদ অলিকে প্রধানমন্ত্রী করে  আর মাওবাদী কমিউনিস্টদের সমর্থনে, যা টিকেছিল গত ২৪ জুলাই ২০১৬ পর্যন্ত মাত্র ৯ মাস। আর সেখানে নেপালি কংগ্রেস ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দলে ছিল। আর এবার আবার মাওবাদী নেতৃত্বে আর নেপালি কংগ্রেসের সমর্থনে সরকার গঠন হয়েছে, আর লিবারেল কমিউনিস্টরা আছে ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দলে। অর্থাৎ সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে কারো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় ঝুলন্ত পার্লামেন্ট তৈরি হওয়ায় এটা স্বাভাবিক যে এ পর্যন্ত তৃতীয়বার কোয়ালিশন সরকার দেখা হয়ে গেল।

গত ৪ আগস্ট ২০১৬ মাওবাদী নেতা ৬১ বছর বয়সী পুষ্পকমল দাহাল প্রচণ্ড প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এর আগের দিন পার্লামেন্ট ভোটে এই নেতা দাহাল, কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন লাভ করেছিলেন। কিন্তু সরকার বদলের ঘটনায় আনসিন বা অদেখা অংশে কী ঘটেছিল?
বলা হয়ে থাকে নেপালের প্রধান তিন দল নেপালি কংগ্রেস, লিবারেল কমিউনিস্ট দল সিপিএন (ইউএমএল) আর মাওবাদী কমিউনিস্ট ইউসিপিএনের মধ্যে ভারত নিজের দিক থেকে সে যার ওপর সবচেয়ে খাপ্পা সে দল হলো বিগত প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রসাদ অলির লিবারেল কমিউনিস্ট। ভারতের এক থিংকট্যাংক জাতীয় সংগঠন যার নাম  “সাউথ এশিয়া অ্যানালাইসিস গ্রুপ”। তাদের রাগ-ক্ষোভ পাঠ করে আমরা ব্যাপারটাকে বুঝতে চেষ্টা করব। নেপালের রাজনৈতিক পরিবর্তনে মাওবাদী দাহাল সরকার শপথ নেয়ার দিন ছিল গত ৪ আগস্ট আর ওই দিন প্রকাশিত হয় ড. এস চন্দ্রশেখরের নামে একজনের লেখা তাদের এই রিপোর্ট। বিগত প্রধানমন্ত্রী অলি সম্পর্কে তিনি লিখছেন, “অলি ছিল তিতা। (বলতে চাচ্ছেন পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী অলির সমাপনী বক্তৃতার ভাষা ছিল তিতা) তাঁর তিতা হওয়ার কারণ আছে। কারণ নেপালি কংগ্রেস আর মাওবাদী দুই দলই তাকে নিচু করেছে, নিচু দেখিয়ে ছেড়েছে। অলি বলেছেন, যেভাবে তার সরকারকে নামানো হয়েছে এটা নীতিবিহীন ও তা কাম্য ছিল না”। লেখক চন্দ্রশেখর নেপালের সংসদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলির দেয়া ১১০ মিনিটের সমাপনী বা শেষ বক্তৃতার কথা বলছিলেন। চন্দ্রশেখর বলছেন, ‘সবাই অলিকে অদক্ষতা ও অযোগ্য শাসকের অপবাদ দিয়ে ক্ষমতা থেকে নামিয়েছে অথচ এসবই আগের সব সরকারের ব্যর্থতার ফসল”। না, চন্দ্রশেখর সবটা ঠিক বললেন না। কারণ, নেপালের বিরুদ্ধে চালানো ভারতের সাড়ে চার মাসের সড়ক-রফতানি অবরোধের কারণে বাজারে জ্বালানি তেলের যে কালোবাজারি তৈরি হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে অলি সরকার কড়া অ্যাকশন নিতে সক্ষমতা দেখাতে পারলে জনগণের কিছু কষ্ট লাঘব নিশ্চয়ই করা যেত। কিন্তু সরকার তা পারেনি। এটা তো অন্যের সরকারের আমলের কাহিনী না। ফলে অলি সরকার যার সমর্থনের সরকার ছিল, সেই মাওবাদীরা আগেই কয়েকবার অলি সরকারের এই অযোগ্যতার কঠোর সমালোচনা করেছিল, সরকারকে সাবধান করেছিল। আসলে চন্দ্রশেখর যেন বলতে চাইছেন অন্যেরা অলি সরকারের বিরুদ্ধে যা অভিযোগ এনেছিল সেগুলো ভুল। বরং চন্দ্রশেখর বিগত অলি সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বিশেষ অভিযোগ আনতে চান যে অভিযোগগুলোি একমাত্র সাচ্চা। খোঁচা মেরে তিনি বলছেন, “অলির যদি নেপালের রাজনীতিতে কোনো অবদান থাকে তা হল, তিনি নেপালের রাজনীতিকে পাহাড়ি আর মাধেসি বলে পুরোপুরি দুই ভাগে বিভক্ত করে ছেড়েছেন”। এই বয়ানেও চন্দ্রশেখর ভারতের সব আকামের দায় আবর্জনাও অলির মাথায় ঢেলে দেয়ার চেষ্টা করলেন। ফ্যাক্টস হল, ভারতের অবস্থা এখন সব হারিয়ে কাশ্য গোত্র। ভারতের ভুল নীতির কারণে নেপালের প্রধান তিনটা দলের সাথেই ভারতের কাজের সম্পর্ক অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে ভারতের স্বার্থ তাদের মধ্য দিয়ে এই তিন দলের কোন একটার ভিতর দিয়ে পার করে আনার ন্যূনতম সুযোগ সেখানে আর ভারতের জন্য অবশিষ্ট নেই। ভারত তাই সব হারিয়ে কম বা ছোট প্রভাবের মাধেসিদের দলগুলোকে একমাত্র ভরসা করতে গিয়েছে। এই নিরুপায় অবস্থা এটাই ভারতের ভালনারেবিলিটির প্রকাশ।  আবার সেসব ছোট দল গুলোকেও প্রভাবিত করেছে যাতে তারা সব ধরনের চরম আপসহীন লাইন ধরে। যাদেরকে কেবল সবকিছুতে ‘মানি না’ বলতে পারাটাকে অর্জন বলে বুঝানো হয়েছে। অথচ শেষ বিচারে অপরাপর নেপালি জনগোষ্ঠির প্রতিনিধির সাথে একটা কার্যকর কাজের সম্পর্কে পৌছানো, নিগোশিয়েশন এখানেই তাদের আসতে হবে। এরা জানে না, নিজের স্বার্থ আদায় অর্জনের পথ কোনটা। ভারত সাড়ে চার মাসের  তাদের সহায়তায় অবরোধ চালিয়েছে। এভাবে চলে অবস্থা এখন এমন যে মাধেসিদেরও নেপালের রাজনীতিতে তাদের যতটুকু গুরুত্ব ছিল তা খুইয়ে তাদের পথে বসিয়ে ছেড়েছে ভারত। ভারত এখন নিজের সব আকামের ফলাফল থেকে হাত ধুয়ে ফেলে এর সব দায়ও অলির ওপর চাপাচ্ছে।
চন্দ্রশেখর এর পরও বলছেন, ‘আমিই বরং আমার আরো কিছু নিজের গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ অলির ওপর চাপাব।’ বলছেন, অলি নাকি “ভারত-নেপাল সম্পর্কের ওপর আর কিছুতেই কাটানো যাবে এমন কিছু ক্ষতি” করে ফেলেছেন। চন্দ্রশেখরের দাবি, “আগামীতে অলিকে সবাই স্মরণ করবে ভারতের ওপর নেপালের অতি নির্ভরতা কমানোর উদ্যোক্তা পিতার ভূমিকার জন্য এবং চীনের সাথে সম্পর্কের রাস্তা খোলার জন্য। যদিও এটা সম্ভবত খুব একটা সফলতা দেখাতে পারবে না। তবে তার উদ্যোগ নেপালে প্রশংসার চোখে দেখা হবে”। অর্থাৎ মনে চরম ক্ষোভের কথা কিছু মিষ্টি শব্দে প্যাঁচ দিয়ে হাজির করলেন তিনি। চন্দ্রশেখরণের এই মন্তব্য নিয়ে খুব কিছু বলার নেই, কারণ এটা প্রকারান্তরে ভারতেরই আপন দোষ স্বীকারের আর স্বব্যাখ্যাত ধরনের। তবে ভারত নিজেকে আত্মজিজ্ঞাসায় ফেলার, নিজ দোষ মূল্যায়নের একটা এক্সারসাইজ করে দেখতে চাইলে তা করার সুযোগ নিতে পারে। আমাদের সিপিবি বা মেননের গোত্রের স্ট্যান্ডার্ডের এক লিবারেল কমিউনিস্ট দল হল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অলির দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট লেলিনিস্ট)। ভারত এমন কী নীতি নিল যে, কেন এরা এমন চরম ভারতবিরোধী হয়ে গেল, নেপালের অতি ভারতনির্ভরতা কমানোর আর চীনের সাথে যেচে সম্পর্ক গড়ার নায়ক হয়ে গেল? অথচ এরা তো নামেই কমিউনিস্ট কিন্তু আজীবন এরা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়া দূরে থাক, রাজতন্ত্রের অধীনে আইন মানা এক নির্বাচনী দল ছিল মাত্র। সেই দল কেন কিসের ফেরে পড়ে এমন ভারতবিরোধী রেডিক্যাল অবস্থানের দল হয়ে গেল? ভারতের থিংকট্যাংক ওয়ার্কিং অ্যাকাডেমিকদের এর জবাব সবার আগে নিজেকে নিজে দেবেন। একমাত্র এরপরই তাদের উচিত হবে তাদের সরকারকে কোনো পরামর্শ দেয়া। তাই নয় কী! মনে রাখতে হবে, আমরা অলির দলের কথা বলছি। আমরা মাওবাদী দাহালের কথা বলছি না। যেটা হলে সহজেই এরা নিজেদের বেকুবি আড়াল করতে পারতেন আর এসব অ্যাকাডেমিকদের পণ্ডিতি ফলানো সহজ হতো হয়তো।
এটা কমবেশি এখন পরিষ্কার যে মাওবাদী আর নেপালি কংগ্রেস জোটের বর্তমানের নতুন গঠিত সরকার আগামী ২০১৮ সালে নেপালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ভাগাভাগি পালা করে ক্ষমতায় থাকার এক চুক্তি করেছে এবং এর প্রথম টার্মে মাওবাদী দাহাল ক্ষমতা নিয়েছে। এ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী দাহালের সরকার ক্ষমতায় থাকবে আগামী ১১ মাস। চন্দ্রশেখরণ এবার তার লেখায় প্রধানমন্ত্রী দাহালের সমস্যা কী হবে তা নিয়ে কথা বলছেন। চন্দ্রশেখরণের ভাষায়, দাহালের সমস্যাঃ
১. “দাহাল কোনো ঐকমত্যের সরকার গড়তে পারবেন না। কারণ মাধেসি ইস্যুতে কনস্টিটিউশন সংশোধনের দরকারে অলির দল তাতে বাধা সৃষ্টি করবে”। কথাটা বদ-দোয়ার মত শোনালেও কথা সত্য সংসদের আসনের বিন্যাসের হিসেবে অলির দলের সমর্থন ছাড়া দাহালের পক্ষে এমন কোনো বিল পাস সম্ভব নয়। কিন্তু মজার দিক হলো, এর ভেতর দিয়ে মাওবাদী দাহাল এক গঠনমূলক ও সঠিক উদ্যোগ নেয়ার মত এবং যোগ্যতা দেখানোর মত এক রাজনীতির নেতা – একথা ভারতের এই অ্যাকাডেমিক স্বীকার করে নিচ্ছেন। আর তাহলে মাধেসি ইস্যুতে এবং মাধেসিদের বিরুদ্ধে দাহালের কোনো ক্ষোভ-ঘৃণা তো না-ই, বরং নিজ সমগ্র জনগোষ্ঠীকে একক রাজনৈতিক কমিউনিটিতে গড়ার কাজটা সম্পর্কে তিনি খুবই সচেতন, এমনটাই প্রমাণ হচ্ছে। মাধেসিরা অবরোধের সাড়ে চার মাসে ভারতের স্বার্থের পুতুলের ভূমিকাকে প্রধান করে ভারতেরই রাজনীতি করে গেছে। তবুও সেটা নিয়েও দাহাল তাদেরকে কোনো শাস্তি দিতে চান এমন মনোভাব নেই। এখন তাহলে বাকি থাকল অলির দল। সে ক্ষেত্রে অলির দল কেন মাধেসি ইস্যুতে শুধুই বিরোধিতা করবে? মাধেসিদের ওপর অথবা দাহালের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসায়? এটা খুব ভালো কনভিন্সিং ব্যাখ্যা হলো না। এটা আসলে ভারতের স্বার্থের খায়েশ হয় তো! যদি অলি খামাখা এক বিরোধী অবস্থান নেয় তবে সেটা ভারতকে নেপালি রাজনীতিতে ঢুকে পড়ার বা অনবোর্ড হওয়ার একটা অছিলা হয়ে হাজির হতে পারে? কিন্তু শকুনের বদ-দোয়ায় কি গরু মরে!
২. দাহালের দ্বিতীয় সমস্যা হিসেবে চন্দ্রশেখরণ লিখছেন, “দ্বিতীয়টা হলো ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন কমিশন ইস্যু”। একথা ঠিক, এবার প্রধানমন্ত্রিত্বে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার দাহালের আগ্রহের পেছনে অন্যতম কারণ এই ইস্যু।  চন্দ্রশেখরণ লিখছেন, “মাওবাদীদের সশস্ত্র রাজনীতি করার সময়ে ঘটা কিছু নিষ্ঠুরতার ঘটনা থেকে নিজেদের বেমালুম খালাস করিয়ে নেয়ার তাগিদ কাজ করেছে। এ ধরনের কয়েক হাজার মামলা থেকে সহজে এরা পার পাবে না”। এই উপস্থাপনও তো দেখা যাচ্ছে চন্দ্রশেখরের বদ-দোয়া দেয়ার।
প্রথম কথা হল, নেপালের রাজনীতিতে বেইল হারানো, প্রভাব হারানো ভারত নিজেকে গোনায় ধরানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। খড়কুটোও আঁকড়ে ধরতে চাইছে। এমনকি তারা নিজের জ্ঞানবুদ্ধির ওপরও ভরসা রাখতে পারছে না। তাই নেপালের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কার কী দুর্বলতা বা ভুল আছে, সেগুলো খুঁজে খুঁজে ভারত তা ক্যাশ করার তালে নেমেছে। কিন্তু সেকাজেও তারা পটু নয়। যথেষ্ট হোম-ওয়ার্ক করে তারা নামে নাই। বরং নেপালের দলগুলো প্রতিহিংসার রাজনীতি করুক এটা কামনা করছে। যেগুলো আসলে কামনা না বদমানুষের বদ-দোয়া। এভাবে কারো কিছুই অর্জন হয় না। দিন চলে না, চলবে না। কারণ শেষ বিচারে জীবন খুবই ইতিবাচক। ভারতেরও এই সত্য আঁকড়ে ধরা উচিত।
এবার প্রসঙ্গের আরো ভেতরে যাওয়া যাক। কথা সত্য যে, এই ইস্যুতে দাহাল বহু সময় উদ্বিগ্ন হয়েছেন। কারণ বিশেষ করে এই ইস্যু থেকে হিউম্যান রাইটের ভায়োলেশনের কোনো কেস বানিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত আইসিসিকে প্রভাবিত করতে ভারতের তৎপরতা আছে, যাতে দাহালকে যদি ফাঁসাতে পারে তবে শকুনের বদদোয়ায় গরু মরার মতো হয় ব্যাপারটা। ফলে ভারতের আঙুল ঢুকানোর আর খোঁচাখুঁচির খবর দাহাল পাচ্ছিলেন। ফলে তিনি এই ইস্যুটা ফেলে রাখা, হেলেদুলে গাফিলতি দেখানো অদক্ষতা করার বিরুদ্ধে বিগত সরকার অলির কাছে বৈঠক করে অসন্তোষ জানিয়েছিলেন। কিন্তু চন্দ্রশেখরণের এটাকে দ্বিতীয় সমস্যা বলে হাজির করতে গিয়ে – এর বয়ানে ভারতের বদ মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করে ফেলেছেন।
চন্দ্রশেখরণ খেয়াল করেননি তিনি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন’ নিয়ে কথা বলছেন। কোন আদালতের বিচার নিয়ে নয়।  দক্ষিণ আফ্রিকার ডেসমন্ড টুটুর দেখানো এই পথ অবশ্যই এক ন্যায়বিচার ইনসাফের রাস্তা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা থেকে জাত। কিন্তু তা প্রচলিত আদালতের পথে নয়। কারণ এটা আজকাল সবাই মানেন যে, আদালতের পথেও ন্যায়ভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে প্রয়োজনীয় আরো অনেক কিছু মানবিক উপাদান উপেক্ষায় হারিয়ে যেতে পারে। তাই সবচেয়ে বড় কথা ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন’ কোনো ধরনের প্রতিহিংসার পথ নয়। যে্মন প্রতিহিংসা চন্দ্রশেখরণ তার এই পুরো রচনার ছত্রে ছত্রে হাজির রেখেছেন। ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনে একটা সত্য, তা সে যতই তিতা হোক তাকে সামনে আনতে হয় আর সেটি কমিউনিটির সব মানুষকে নিয়ে পুনর্গঠন করার পথ। কেবল আদালতে ধরে এনে শাস্তিই দিয়ে এটা অর্জন করা যাবে না। কষ্ট দেয়া আর কষ্ট পাওয়া এমন উভয়ের আত্মশুদ্ধি আর ক্ষত সারানো এক লম্বা প্রক্রিয়া এটা। একটা সামাজিক ও কমিউনিটি পুনর্গঠন এর লক্ষ্য। কোনো হিংসার বদলে প্রতিহিংসার শাস্তি  – এমন কোনো চেইন কোথাও তৈরি থাকলে তৈরি হয়ে গেলে তা ভেঙে দেয়াই এর লক্ষ্য। আর সোজা কথা আগে বলেছি, এটা কোনো আদালতের পথ নয়। তবে অবশ্যই ইনসাফ সন্ধানের পথ। এখন দাহালের সমস্যা দূরে থাক, সমস্যা আসলে চন্দ্রশেখরণের। তার মনে রয়ে গেছে যেন কোন আফালতের বিচার নিয়ে তিনি কথা বলছেন অথচ মুখে তিনি দাবি করছেন যে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনের কথা তিনি বলছেন। অথবা হতে পারে অজ্ঞতায় দুটাই তার চোখে একই ঠেকে। অথচ তিনি এর ভেতর এটা দাহালের ‘হোয়াইট ওয়াশ অব এট্রোসিটি’ আকাক্সক্ষা খুঁজছেন, দেখতে পাচ্ছেন? মানে একটা  ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনকে তিনি দেখছেন এটা নাকি নিষ্ঠুরতা থেকে হাত ধুয়ে ফেলে বেচে যাওয়ার উপায় হিসাবে। তার মানে ডেসমন্ড টুটুও তাই করেছিলেন। এটা তার উদ্দেশ্য ছিল বলে তিনি অভিযোগ করছেন। তার মানে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনে কি কেউ নিজেকে হোয়াইট ওয়াশ অব এট্রোসিটি করতে পারে? একথা বলে চন্দ্রশেখ্রণ প্রমাণ করলেন তিনি ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এর প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোন ধারণাই তাঁর নাই। অথচ এই পদ্ধতি হল, কেউ কাউকে যে কষ্ট দিয়েছে তা খোলা মনে নিজেই স্বীকার করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটা। শুধু তা-ই নয়, তা আবার এমন খোলা নিষ্পাপ মনে হতে হবে যেন তা ভিকটিমের মন ছুঁয়ে যায়। স্পর্শ করলে বুঝতে হবে খোলা মনে সব স্বীকার করেছে। তবেই ভিকটিম বা তার আত্মীয় স্বজনের মনের সব ক্ষোভ দূর হবে সব হিংসা-প্রতিহিংসা মিলিয়ে যাবে। এখানে পুরা প্রক্রিয়ায় কারো কোনো নিষ্ঠুরতার “হোয়াইট ওয়াশ” বা ধুয়ে আনা দেখার সুযোগ কোথায়? আসলে চন্দ্রশেখরের কথার মানে কেউ অপরাধ করেছে আর তিনি এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে নিজের জিঘাংসা চরিতার্থ ব্যবহার করতে চাইছেন। মন ভর্তি জিঘাংসা নিয়ে থাকলে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন কেউ মুখে যতই উচ্চারণ করুক না কেন তিনি বিষয়টিই বুঝবেন না। আসলে ভারতের বা সেই অর্থে চন্দ্রশেখরের সমস্যা হল, দাহালের ওপর প্রতিহিংসার শাস্তি দেয়ার সুযোগটি হারিয়ে যাওয়ার জন্য তারা আক্ষেপ শুরু করেছেন। আর কেন দাহাল তাদের এই সুযোগ দিচ্ছে না, এতেও দাহালের দোষ খুঁজছেন। সত্যিই অপূর্ব মানুষের জিঘাংসা মনের প্রতিহিংসা!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় গত ৭ আগষ্ট ২০১৬ অনলাইনে (প্রিন্টে ৮ আগষ্ট ২০১৬) ছাপা হয়েছিল। তা আবার আরও এডিট ও সংযোজন করে এখানে আবার ছাপা হল।]

 

কমিউনিটিতে মৃত মানুষের প্রতি জীবিতদের দায়

কমিউনিটিতে মৃত মানুষের প্রতি জীবিতদের দায়
গৌতম দাস
১৮ আগস্ট ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-1Hu

সম্প্রতিকালের বাংলাদেশ ‘জঙ্গী’ হামলার ব্যাপকতা দেখার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। গত এক-দেড় বছর ধরে কিছু বিশেষ ধরণের সশস্ত্র হামলা, গলা কেটে দেওয়া বা বোমা হামলার মত ঘটনাগুলো আমরা দেখছিলাম। হামলার বৈশিষ্ঠের দিক থেকে এগুলোর কোনটাই ঠিক হামলাকারির আত্মঘাতি ধরণের তৎপরতা ছিল না। এর পরবর্তিতে আমরা বড় ব্যতিক্রম দেখলাম গুলশানের ‘হলি আর্টজান বেকারি’ নামের রেস্টুরেন্টে ‘সন্ত্রাসী’ হামলার ঘটনা। এটাকে ব্যতিক্রম বলছি এজন্য যে এই ঘটনাটা প্রথমে জিম্মি করা আর পরে সকলকে হত্যা করা ধরণের। যদিও এরপর সেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জিম্মি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা কালে পাঁচজন হামলাকারির মৃত্যু ঘটে। এই অর্থে হামলাকারিরা মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়েই বা আত্মঘাতি প্রস্তুতি পরিকল্পনা নিয়েই এই হামলা চালিয়েছিল বলা যায়। এর আগে কখনও এমন  বৈশিষ্ঠের হামলা আমরা দেখি নাই। আগে হামলাকারিরা কখনও আক্রমণস্থলে নিহতও হন নাই। এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হামলাকারি গ্রেফতারও না হয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পেরেছে। এসব দিক থেকে বিবেচনায় গুলশানের হামলার ধরনটা ভিন্ন – জিম্মি করে হত্যা করা আর শেষে নিজেরাও নিহত হওয়া – এটা একেবারে নতুন।

এই নতুনত্ব শুধু হামলার ধরণেই নয় আরও অনেক জায়গায় নতুনত্ব এনেছে। যেমন আগে সমাজে ‘জঙ্গিবিষয়ক’ নানা আলাপ হতে দেখা যেত, যেখানে সত্য-মিথ্যা প্রচারণা করতে দেখা যেত। যার বিবেচনা যে তাঁর শত্রু সে আসলে জঙ্গি হোক আর নাই হোক তাঁর বিরুদ্ধে ‘জঙ্গি’ প্রচারণায় নামতে আমরা দেখেছিলাম। অথবা, কারা জঙ্গী হয় এই প্রশ্নে একচেটিয়া বাছবিচার ছাড়া মাদ্রাসাগুলোকে দায়ী করে প্রচারণা ইত্যাদি এসবও আমরা দেখে আসছি গত প্রায় ১৫ বছর ধরে। কিন্তু এবার বড় ব্যতিক্রম। স্পষ্ট হাতেনাতে প্রমাণে জানা গেল হামলাকারিরা সমাজেরই উচু ঘরের। একেবারে রাজধানী শহরের সবচেয়ে উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য। তাদের শিক্ষালাভ দেশের মর্ডান ইংলিশ স্কুলের ও দেশি বিদেশি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এককথায় বললে তা মাদ্রাসা তো নয়ই, বরং তারা একেবারে আধুনিক উচ্চস্তরের শিক্ষা, মর্ডান কারিকুলামের ভিতরে থেকে তাদের পড়াশুনা করছিলেন। ফলে হামলাকারিদেরকে ‘পশ্চাদপদ’ বলে নাক সিটকানো, গরীব মাদ্রাসার তুচ্ছ ও দায়ী করা অথবা লজিক্যাল র‍্যাশনাল মন থাকলে সবকিছুর সমাধান পাওয়া যেত ইত্যাদিতে আধুনিকতার শ্রেষ্ঠত্ব ধারণা যা এতদিন করে খাচ্ছিল সেই ভ্যানিটি আর মিথ্যা গৌরব সবকিছুই এবার তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়েছিল। এটাও একটা বিশাল ব্যতিক্রমি ঘটনা মানতে হয়। এরকম করে হয়ত আরও  অনেক ব্যতিক্রমী দিক আমরা খুঁজলে বের করতে পারব। কিন্তু আসল  উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম যা এখানে লেখার মুল প্রসঙ্গ তা হল, হামলাকারি ‘জঙ্গিদের’ মৃত্যু পরবর্তি জটিলতা। অর্থাৎ মৃত ‘জঙ্গিদের’ মাটি পাওয়া বা দেওয়া। যতদুর মিডিয়া দেখে জানা গেছে তাতে মৃত ‘জঙ্গিদেরকে’ মাটি দেওয়া বা সৎকারের কাজ করার ব্যাপারে খোদ নিজ পরিবারের প্রধানদেরকে প্রকাশ্য অনীহা প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। পরিবারের পক্ষ থেকে এমনকি লাশ গ্রহণ না করার পক্ষেই প্রকাশ্যে ঘোষণা বা অনীহা প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

মানুষ মারা গেলে সে তখন লাশ মাত্র – একে সৎকার করতে হবে। এটা মৃত মানুষের প্রতি তাঁর রেখে যাওয়া আত্মীয় স্বজন পড়শির কমিউনিটি-দায়। গোত্র বা ধর্মীয় নানান রীতিনীতি অনুশাসন অনুসরণে করে দুনিয়ার সব সমাজ কমিউনিটিই তা পালন করে থেকে। আমাদের যার যার ধর্ম ও সমাজ সভ্যতার রীতিনীতি সম্পর্কে যত প্রাচীন অভিজ্ঞতার কথা জানা যায় সব ধরণের কমিউনিটিতে লাশের সৎকার করার বাধ্যবাধকতা সব সমাজেই আছে থাকে দেখা যায়। এছাড়া আর একটা দিক হল, জীবিত অবস্থায় মানুষ কারও কাছে অথবা অনেক মানুষের কাছে বন্ধু হয়,আবার শত্রুও হয়। একারণে মানূষের কাজ ততপরতার মুল্যায়নে জীবিত অবস্থাতেই সে খুবই ঘৃণিতও হয়, হতেই পারে। প্রচন্ড অন্যায়কারি বা অত্যাচারিও হতে পারে। আবার মানুষের যা কিছু স্বভাব বা বদস্বভাব এর মুল্যায়ন শুধু তার জীবতকালে এবং মারা যাবার পরও চলে, চলতে থাকে। তবে মারা যাবার পর কেবল একটা জায়গায় তফাত হয়। মৃত্যুর পর তাঁর সম্পর্কে নানান মূল্যায়ন তখনও জারি থাকে। যেটা থাকে না তা হল মুল্যায়ন-উত্তর করণীয় একশন – অর্থাৎ মুল্যায়নে যদি দোষ পাওয়া যায় তবুও ওখানেই তার সমাপ্তি টানা হয়। দোষের জন্য আমরা কোন বিচার বা শাস্তির পদক্ষেপ আর থাকে না। মানে আমাদের মুল্যায়নে যদি দেখা যায় যে উনি জীবিত অবস্থায় খারাপ ছিলেন, ধরা যাক অত্যাচারি ছিলেন – তবুও মারা যাবার পর এর জন্য তাকে কোন শাস্তি দেওয়া, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা ইত্যাদি থেকে আমরা বিরত থাকি। কারণ তখন এগুলো অর্থহীন। কিন্তু পরিস্কার রাখার জন্য মনে করিয়ে দেই, মৃত মানুষের মুল্যায়ন মৃতের-বাসায় না হোক সমাজে বন্ধ হয় না। কিন্তু তবু মুল্যায়ন করার পর সেটা আর বিচার শাস্তি বা অভিযোগের পদক্ষেপের দিকে যায় না, আমরা নেই না। কারণ বাস্তবে সে তখন শাস্তির উর্ধে।  এধারণাটাই অনুসরণ করে আধুনিক রাষ্ট্রের আদালতেও মৃত ব্যক্তির পক্ষে তাঁর ডেথ সার্টিফিকেট দাখিল করলে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় কিন্তু মৃত অপরাধীকেও আদালত ঐ ব্যক্তির নামে আনা সব অভিযোগ থেকে তাকে রেহাই ও মুক্ত করার রায় দেন।

মুল্যায়ন বিচার কথাটা ব্যাপক দিক থেকে দেখলে, মানুষের বিচার দুই দুনিয়াতেই হয় বলে মনে করা হয়। এই দুনিয়ার বিচার মানে রাষ্ট্রের আইন আদালত। রাষ্ট্রের আদালত কোন মৃত মানুষের বেলায় দুনিয়ায় তাঁর কৃতকাজের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ থেকে তিনি মুক্ত বলে রায় দেয়। আর অন্য দুনিয়া বেলায়, সেখানে আবার  বিচারের এক্তিয়ার আর আমাদের নয়, একমাত্র আল্লাহর। এই পরেরটার ব্যাপারে আমরা কেউ জানি না সেই বিচারে কার কী হবে, কে কীসে দোষী না বেকসুর বলে সাব্যস্ত হবে। আমাদের মানুষের এক্তিয়ারের বাইরে সেটা। তাহলে দেখা যাচ্ছে মানুষ মারা যাবার পর মুল্যায়ন তখনও চলে কিন্তু বিচার বা মুল্যায়ন-পরবর্তি কোন একশন আর চলে না। মানুষের সাধ্য নাগালের বাইরে এটা। তাহলে দাঁড়াল, দুনিয়ার আদালত তাকে মুক্ত করেই দেয়। আর আল্লাহর এক্তিয়ার তো আমাদের নয়। এটা আল্লাহর উপরই ছেড়ে রাখতে হয় আর সেটাই বিধানও বটে।

এই অর্থে সারকথাটা হল,মানুষ মারা গেলে সে সব বিচার-শাস্তির উর্ধে চলে যায়। কারণ সব অভিযোগ তখন অর্থহীন হয়ে যায়।

গুলশান ঘটনার পর সরকারের দিক থেকে সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করার তাগিদ অনুভব খুবই স্বাভাবিক এক ঘটনা। সরকার জনগণের সাথে বন্ধুমুলক মানে যাকে ফ্রেন্ডলি বা পপুলার বলি – তা হোক আর নাই হোক সব সরকারই এমন ঘটনার পর হামলা ঘটনার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টাই করে থাকে। এদিক থেকে তা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তুই কতদুর এটা স্বাভাবিক? যতদুর তা মাটি দেওয়ার বিরুদ্ধেও জনমত তৈরির ব্যাপার পর্যন্ত প্রসারিত না হয়।

তাহলে অভিভাবক পিতারা কেন অনীহা দেখাচ্ছেন,কেন প্রকাশ্যে লাশ নিতে চাচ্ছেন না? মনে হচ্ছে তারা বাবা হিসাবে নিজ মৃত সন্তানের সৎকারের দায় আর ব্যক্তি বা সমাজের একজন হিসাবে দায় – এই দুইয়ের মধ্যে গন্ডগোল পাকিয়ে ফেলেছেন।

ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে আমাদের এমন গন্ডগোলে পড়ার কথা না। সমাজে একই মানুষের একই সাথে নানান রকমের ভুমিকা পালন করতে হয়, থাকে। মুল ব্যাপারটা হল, নিজ সন্তান ‘জঙ্গি’ হবার পথে গিয়েছে অথবা কাউকে হত্যা করে শেষে নিজেও নিহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এখানে প্রথম কথা হল, যেভাবে যাই ঘটুক, শেষ বিচারে সাবালক সন্তানের কৃতকর্মের দায় ঐ সন্তানের। লিগাল দায় সন্তানের, পিতা বা অভিভাবকের নয়। রাষ্ট্রীয় আইন আদালতের ক্ষেত্রেও এটা এমনই। এমনকি শুধু সন্তান কেন, যে কোন একজনের দায়ে অন্য জনকে শাস্তি দেওয়া যায় না। আর ওদিকে ধর্মীয় বা আখিরাতের বিচারেও দুনিয়ায় যার যার কৃতকর্মের দায় তাঁর নিজের। এমনকি, চুরি ডাকাতি করে সংসার চালানো পিতার ঐ সংসার থেকে ভরণপোষণ পাওয়া পোষ্য সদস্যদের কারও উপর কোন চুরি ডাকাতির দায় বর্তায় না। না এই দুনিয়া না সেই দুনিয়ার বিচারে। যদিও সন্তান ‘জঙ্গী’ বলে পিতা বা অভিভাবকের মনে অস্বস্তি থাকতে পারে, সন্তাহ হারানোর বেদনাও সেখানে  থাকে, এমনকি সন্তান যাকে হত্যা করেছে তার বা তাঁর পরিবারের প্রতিও সমবেদনা থাকে – সেগুলো আলাদা জিনিষ।

অতএব ‘সন্ত্রাসী’ হামলার ততপরতার বিরুদ্ধে সমাজ বা রাষ্ট্র জনমত তৈরি করলে সেখানেও  কোন মৃত ‘জঙ্গির’ পিতাও সমাজের একজন হিসাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন। তিনি একইসাথে কোন মৃত সন্তানের পিতা হন আর নাই হন। স্বাভাবিক অংশগ্রহণই তিনি করবেন। এমনকি ‘সন্ত্রাসী’ রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি যদি নিন্দা জানাতে মনস্থ করেন সক্রিয় অথবা নিষ্ক্রিয়ভাবে – তবে তাও করবেন, একদম স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু তাই বলে সেই একই পিতা সন্তানের সৎকারের প্রসঙ্গে তার করণীয় যা, সৎকারে আয়োজনের ক্ষেত্রে পিতার যা ভুমিকা হয় তাও পালন করবেন, তাকে করতে হবে। কেননা এটা শুধু পিতা বলে নয়। মনে রাখতে হবে, এটা মৃত মানুষের প্রতি তাঁর রেখে যাওয়া আত্মীয় স্বজন পড়শির কমিউনিটি-দায়ও।

আমরা আশা করব অভিভাবক পিতারা ‘জঙ্গী’ ততপরতার বিরুদ্ধে জনমত তৈরির ব্যাপারের অংশগ্রহণের সাথে সাথে, মৃত সন্তানের  লাশ গ্রহণ ও  সৎকারের  প্রসঙ্গে পিতা হিসাবে তার যা কিছু দায় তারও প্রতিটা তিনি পালন করবেন। এই দুইয়ের মধ্যে কোন স্ববিরোধ নাই।

আচ্ছা, কোন পিতা বা অভিভাবক যদি লাশ না নেন, অস্বীকার করেন তাহলে সেক্ষেত্রে লাশের কী হবে? এখান একটা কথা মনে রাখতে হবে – ধর্মীয় রীতিনীতি যাই থাক, জীবিত মানুষ নিজের ব্যবহারিক স্বার্থেই মৃত মানুষকে কবরস্ত করে। পাশে রেখে ঘুমায় না। এটাও জীবন বাস্তবতার আর এক দিক। কারণ লাশ পাশে রেখে বা পচিয়ে ঘর সংসার পরিবার করা চলে না। পচনশীলতার ম্যানেজমেন্ট দিক থেকে সে হিসাবেও লাশ সম্মানের সাথে কবরস্তই সঠিক ও বাস্তব বিধান। একাজ  মৃতের  পিতা বা অভিভাবক না করলেও সমাজ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কাউকে না কাউকে তা করতেই হবে। এবং সেটা করতে হবে একেবারে সম্মানের সাথে। কারণ মৃত মানুষের ভিতরে আমরা জীবিতরা  প্রত্যেকেই নিজেকে দেখতে পাই। আমার মৃত্যুর পর যেহেতু  আমিও আমার অসম্মান দেখতে চাইতে পারি না। তাই আমার মৃত্যুর আগেই সমাজে সৎকার ব্যবস্থা – এটা সমাজের রেওয়াজ হিসাবে গড়ে উঠুক, আমরা সবাই তা চাই। তাই আমরা দুনিয়ার সব লাশ এমনকি একেবারে অচেনা অজানা লাশকেও অজান্তে মনের গভীর থেকে সম্মান করি। তবুও কেউ কেউ, কাউকে হত্যা করে সেই লাশের উপর নৃত্য করার রেফারেন্স দিতে চাইতে পারেন।  হা পারেন তবে সেটাকে আমরা জিঘাংসা বলি। জিঘাংসা এক মানসিক রোগ যা থেকে বের হয়ে আসার উপায় বা পাথেয় হল মনোরোগের চিকিৎসা। কী আর করা,  জিঘাংসা মানুষের মৌলিক স্বভাব না হলেও আমরা অনেক মানুষকে জিঘাংসার ভিতর সুখ খুজতে দেখি।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

হাজী শরীয়তুল্লাহ ও গণ-প্রতিরোধ

হাজী শরীয়তুল্লাহ ও গণ-প্রতিরোধ
গৌতম দাস
আগস্ট ১২, ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-1EO

 

 

ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ার সময়কালের রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহে (১৭৫৭-১৯৪৭) বাংলা ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও নির্ধারক ভূমিকা যিনি রেখেছিলেন, তিনি হাজী শরীয়তুল্লাহ। তাঁর ভূমিকা প্রভাবশালী ও নির্ধারক বলছি এই অর্থে যে, ব্রিটিশ শাসন-উত্তরকালে পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য কী রূপ ধারণ করতে পারে, তা নির্ধারণে এক সুদূরপ্রসারী ভূমিকা তিনি রেখেছেন। এমনকি আজকের বাংলাদেশেও আমাদের যা কিছু ‘বিশেষ বৈশিষ্ট্য’ তাকে বুঝতে হলে হাজী শরীয়তুল্লাহ যে বিশেষ ঐতিহাসিক বাস্তবতায় ইসলামচর্চা করেছেন, সেদিকে নজর না ফিরিয়ে উপায় নেই। অনেকে কখন কীভাবে এ দেশে ইসলামের আগমন ঘটেছে, সেই গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস অনুসন্ধান করছেন। বিশেষত তলোয়ারের দ্বারাই যদি এ অঞ্চলে ইসলাম কায়েম হয়ে থাকে, তাহলে দিল্লির আশপাশের চেয়েও দিল্লি থেকে বহুদূরে কীভাবে তা সম্ভব হল, তা নিয়ে তর্কবিতর্ক করছেন। এ দেশের জনগণের আত্মপরিচয়ের স্বরূপ কিংবা সেই স্বরূপ নিয়ে বিতর্ক বোঝার জন্য ইসলামের আগমনকেই নির্ধারক মনে করা হয়। কিন্তু ইসলাম কীভাবে এই ভূখণ্ডের ইহলৌকিক বাস্তব লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে মূর্ত করেছে, সে হদিস আমরা বিশেষ নিতে চাই না। এ পরিপ্রেক্ষিতে হাজী শরীয়তুল্লাহ আমাদের জন্য নতুন ঐতিহাসিক প্রশ্ন হিসেবে হাজির হন। হাজী শরীয়তুল্লাহর সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন ইসলামের এক বিশেষ ঐতিহাসিক পর্বের দিকে আমাদের নজর ফেরাতে বাধ্য করে। যাকে শুধু ইসলামের আগমন দিয়ে বোঝা যাবে না। এমনকি শুধু ধর্ম দিয়েও নয়। বরং আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ইসলাম গণমানুষের লড়াই-সংগ্রামে কী ভূমিকা রেখেছে, সেদিকেই আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করার তাগিদ তৈরি করে। হাজী শরীয়তুল্লাহর ভূমিকা প্রভাবশালী ও নির্ধারক এ অর্থেই।

হাজী শরীয়তুল্লাহর জীবনকাল ১৭৮১ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ। তিনি ধর্মীয় সংস্কারক এবং ব্রিটিশ-ভারতের বাংলায় সবচেয়ে প্রভাবশালী ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা। তার জন্ম হয়েছিল ফরিদপুরে; মানে, সেকালের ফরিদপুরের এক মহকুমা, যা একালের মাদারীপুর জেলা, এরই শামাইল (বাহাদুরপুর) গ্রামে। বেশির ভাগ লিপিকার তাঁর সম্পর্কে পরিচিতি দেয়া এভাবে শুরু করেন যে, “তিনি শুধু ধর্মীয় সংস্কারক ছিলেন না, বরং কৃষক, তাঁতি এবং অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করার জন্য সংস্কার আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন”।

হাজী শরীয়তুল্লাহর জন্ম এক ‘তালুকদার’ পরিবারে বলে জানা যায়। তিনি হজ করতে মক্কা শরিফে যান ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে। হজ শেষে ১৮১৮ সালে বাংলায় আসেন। দেশে ফিরে তিনি ফরায়েজি আন্দোলন শুরু করেন। শরীয়তুল্লাহর নামানুসারেই বাংলাদেশের শরীয়তপুর জেলার নামকরণ করা হয়েছে।

‘ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া’ নামে একটি কথা চালু আছে। যারা আমাদেরকে কলোনি বানিয়ে আমাদের ওপর এক দখল শাসন কায়েম করেছিল। সেকালের অবিভক্ত ভারতবর্ষ ব্রিটিশ কলোনির শাসনাধীন থাকার সময়কালকে বোঝাতে সাধারণত ব্রিটিশ- ইন্ডিয়া লেখা হয়। যদিও ব্রিটিশ কলোনির শাসনাধীন বলতে বাস্তবে সরাসরি ব্রিটিশ সরকার নয়, বরং শুরুতে ছিল এক ব্রিটিশ জয়েন্ট স্টক কোম্পানির শাসন, যে কোম্পানির নাম ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া (সংক্ষেপে এখন থেকে শুধু ‘কোম্পানি’ বলা হবে)। আমাদের অতি পরিচিত ১৭৫৭ সালের পলাশি যুদ্ধেও ব্রিটিশ দখলদারীর আগের অনেক কিছুরই তখন শেষ হয়নি, চূডান্ত ফয়সালা হয়নি।

সেদিক থেকে পরবর্তীতে নির্ধারক আরেক ঘটনা হল, ১৭৬৪ সালের ‘বক্সারের যুদ্ধ’ (বক্সার বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্যে অবস্থিত)। ওই যুদ্ধে মোগল সম্রাট, অযোধ্যার নবাব ও বাংলার নবাব এই ত্রয় ছিল কোম্পানির বিপক্ষের ক্যাম্পে। এদের পরাজয়ের পরই বাস্তবে বাংলায় কোম্পানির শাসন বা ব্রিটিশ কলোনির পত্তন ঘটেছিল। যদিও আমাদের পপুলার ধারণা হল, বাংলার পলাশীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয় হওয়া থেকেই বাংলায় কোম্পানির শাসন শুরু হয়ে যায়। ব্যাপারটা ঠিক তা না হলেও পপুলারলি আমরা তা বলে থাকি এই অর্থে যে, আমরা বোঝাতে চাই পলাশির পরাজয়ের পর কোম্পানি শাসন সঙ্গে সঙ্গে না এলেও কোম্পানি শাসন আসার বীজ বপন করা হয়ে গিয়েছিল। পলাশিতে মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা থেকে নবাব সিরাজের পরাজয়ের পর আসলে কোম্পানির সহায়তায় পাপেট নবাব হয়েছিলেন মীরজাফর। কিন্তু মীরজাফর কোম্পানির পক্ষে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল কোম্পানির ভারতে পণ্য আমদানি-রফতানিতে ট্যাক্স না দেয়ার সুবিধাদি ও নগদ অর্থ কোম্পানিকে দেয়ার আঁতাতের শর্তের বিনিময়ে। এতে সে নিজে নবাবও হয়েছিল, কিন্তু ওসব দেনা-পাওনার শর্ত পরে বাস্তবে কাজ করেনি। দুপক্ষই শর্ত ভেঙেছিল। ফলে কিছুই থিতু হতে পারেনি। এরই মধ্যে মীরজাফরের মৃত্যুর পর ১৭৬০ সালে তাঁর জামাই মীর কাশেম বাংলার নবাব হন। আর কোম্পানির সঙ্গে পুরানা অসন্তোষের বিষয় আরো প্রকট হতে থাকে। মীর কাশেম নিজের কৌশলগত নিরাপত্তা সুবিধা পাওয়ার স্বার্থে নদীপথের ব্রিটিশদের কর্তৃত্বের নাগাল থেকে দূরে থাকতে তারা রাজধানী নিয়ে যান বিহারের মুঙ্গেড়ে। ফলে সব পক্ষের অসন্তোষের ফয়সালার যুদ্ধ হয়ে উঠেছিল বিহারের বক্সারের যুদ্ধ। ওই যুদ্ধে কোম্পানির হাতে পরাজয়ের পর বিজয়ী হিসেবে কোম্পানির দেয়া শর্ত হিসেবে এই প্রথম আইনগত ভিত্তিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে। অষ্টাদশ মোগল সম্রাট শাহ আলম (দ্বিতীয়), যুদ্ধে হারার খেসারত বা শর্ত হিসাবে কোম্পানিকে বাংলার দেওয়ানি লিখে দিয়েছিলেন। যুদ্ধে হেরে যাওয়ায় আরও যেসব শর্তে নবাব ও সম্রাটরা কোম্পানীর সাথে চুক্তি করেছিলেন তাই বিখ্যাত ‘এলাহাবাদ চুক্তি’, যার অংশ ছিল এই দেওয়ানি লিখে দেওয়া।  দেওয়ানি মানে খাজনা-রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনিক দেখভালের কর্তৃত্ব। বাংলার দেওয়ানি লাভ কোম্পানির দিক থেকে এক গুরুত্বপুর্ণ মাইলস্টোন অর্জন। কারণ দেওয়ানি লাভের পর ভূমি খাজনা আদায় ব্যবস্থায় কোম্পানি এক আমূল বদল আনে। আগের মোগল আমলের ভূমি মালিকানা ব্যবস্থায় দেওয়ান বা দেওয়ানের প্রতিনিধিকে জমির খাজনা দেয়ার বিনিময়ে জমির ভোগদখল করত আবাদি কৃষক যাদের ‘রায়ত’ বলা হত। কিন্তু এবার দেওয়ানি অধিকারপ্রাপ্ত কোম্পানি আর খাজনাদাতা জমির ভোগদখলকারী কৃষকের মাঝে তৃতীয়পক্ষ এক জমিদারকে এনে এক ‘জমিদারি ব্যবস্থা’ চালু করা হয়। জমিদার কোম্পানিকে প্রতি বছর নির্দিষ্ট দিনে আগাম ও স্থায়ীভাবে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা দেবে এ শর্তে স্থায়ীভাবে জমিদারকে জমিদারিস্বত্ব দেয়ার রেওয়াজ শুরু হয় এই ‘জমিদারী আইন’ থেকে। এর পর জমিদার ইচ্ছামত পরিমাণ খাজনা আদায় করে প্রজাদেরকে জমি বন্দোবস্ত বা পাট্টা দিত। ভূমি মালিকানা ও চাষাবাদ ব্যবস্থায় এভাবে এক মৌলিক পরিবর্তন ঘটায় জমিদারি আইন। জমিদারি আইন কথাটা প্রচলিত ভাষায় বলা, আর তা আনুষ্ঠানিক নামে বলা হয় – চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন ১৭৯৩ (বা পার্মানেন্ট সেটেলমেন্ট অ্যাক্ট, ১৭৯৩)।

মোগল আমল থেকেই পুরো ভূমি বন্দোবস্ত ব্যবস্থাপনাটা দাঁড়িয়ে ছিল মূলত দুটো পক্ষ দেওয়ান ও আবাদি কৃষক, এদের সম্পর্কের উপরে। যেখানে ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে দেওয়ানের পক্ষে কালেক্টর বা তালুকদার বা কানুনগো ইত্যাদি নানা নামের আর এক পক্ষকে দেখা যেত। কিন্তু যারা কোনোমতেই দেওয়ানের ঠিকাদার নয়, বরং অবশ্যই তাঁর বেতনভোগী বা কমিশনভোগী কর্মচারী। এবং তারা আগাম কোনো অর্থ দিয়ে দেওয়ানের কাছ খাজনা তোলার অধিকার লাভ করা কোনো ঠিকাদারও নয়। পুরানা মোগল ভূমি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য ছিল যে, এ অঞ্চলের কৃষিকাজ একেবারেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। এতে ফসলের ভালো-মন্দ বা কম-বেশি হওয়াটা একেবারেই প্রকৃতি নির্ভরতার তালে এগিয়ে চলত। ফলে জমি থেকে ফসল বা আয় প্রাপ্তির ব্যাপারটা বা এই প্রকৃতি নির্ভর থাকার অনিশ্চয়তাটার দায়ক্ষতি মোগল শাসকরা রায়তের সঙ্গে শেয়ার করত। কিন্তু ব্রিটিশরা এসে সেটা আর করতে চাইল না। এছাড়া তারা নতুন বলে, নিজেদের ব্রিটিশ রাষ্ট্র চালিয়ে আসা লোক বলে মনে করেছিল তারা বাংলাকে আগের চেয়ে ভাল, আরো বেশি প্রফিট আদায় অর্থে ভাল এক ব্যবস্থা চালু করতে পারবে। আর তা করতে গিয়েই নতুন ব্যবস্থা – জমিদারি আইন। তবে এখানে ব্রিটিশ শাসকরা জমিদারকেই নিশ্চিত ও স্থায়ী পরিমাণ খাজনা জমা দিতে বাধ্য করার পুরা দায় ও এজেন্ট হিসেবে হাজির করাতে গিয়ে তাকে এক স্বৈরাচারী দানব বানিয়ে দিবার সব শর্ত পুরণ করেছিল। ফলে এবার ভূমি বন্দোবস্ত ব্যবস্থাপনাটা পরিষ্কার তিনপক্ষ ব্রিটিশ দেওয়ানি, বাংলার নতুন শ্রেণী জমিদার আর আবাদি কৃষক – এভাবে করে সাজানোতে প্রথম দুপক্ষই তাদের স্ব স্ব স্বার্থটা নিংড়ে বের করে নিতে পেরেছিল ঠিকই, আর তা করা গিয়েছিল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ আবাদি কৃষক ঘাড়ে চড়ে, তাদেরকে চুষে শুষে নিয়ে। অর্থাৎ আবাদী কৃষকের স্বার্থ দেখার কেউ সেখানে ছিল না। নতুন জমিদারি ব্যবস্থায় আবাদি কৃষকরা তাই হয়েছিল সব হারানো, কেবল জমিদারের প্রজা। মোগল আমলে  রায়ত হিসাবে জমির টাইটেল ছিল খাজনাদাতা আবাদি কৃষকের নামে। জমিদারি আইনে জমির ঐ টাইটেল রায়তের থেকে কেড়ে নিয়ে তা দিয়ে দেওয়া হয় জমিদারকে।

এ জমিদারি ব্যবস্থার ভেতর আরো এক অত্যাচার হাজির ছিল। বলা হয়ে থাকে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলায় জমিদারকেন্দ্রিক ভূমি ব্যবস্থা পছন্দ করেছিলেন। সেটা নাকি এই যুক্তিতে যে, এভাবেই ব্রিটেনের মত বাংলার কৃষিতেও একটা ক্যাপিটালিজম সম্ভব হবে। যদিও এটা প্রমাণের জন্য তাদের বক্তব্যকে আপসে মেনে নেবার মতো কোনো যুক্তি দেখা যায় না। বরং বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সাথে বাংলাসহ সারা বৃটিশ-ভারতের সম্পর্ক তো কলোনির  – কেন এটাকে কলোনিয়াল বলছি – এই প্রশ্নটাকে পাশ কাটিয়ে উহ্য রেখেই বরং জমিদারি ব্যবস্থাপনা নিয়ে পণ্ডিতদেরকে কথা বলতে দেখা যায়। কেন প্রকৃতি-নির্ভরতার কৃষিতে ফসল না হওয়া বা কম হওয়ার দায় শাসক বা রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপনাও শেয়ার করবে না, দায় সবাই শেয়ার করে উন্নত কোনো ব্যবস্থাপনার উদ্যোগই যেখানে সমাধান, সেখানে এ নিয়ে এটা যেন কোনো প্রশ্নই নয়, এমন মনে করা হয়েছে। শাসকের এ দায় শেয়ার না করে কেবল শাসক হওয়ার চেষ্টা— এ স্বভাবটাই তো ‘ফরেন’ এবং ‘কলোনিয়াল’। ইউরোপ থেকে এসেছে ওরা তাই ‘ফরেন’ ঠিক তা নয়। ফলে সেকালে কৃষিতে ‘অর্থকরী ফসল’ বলে একটা ধারণা ছিল। ব্রিটিশ শাসকের হাতে পড়ে তা কেবল শুধু পাট চাষ নয়, বরং আরো ভয়ঙ্করভাবে তুতগাছের চাষ বা নীলচাষ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আর শুরু থেকেই কোম্পানি এ্তে এতই উত্সাহী ছিল যে, জমিদার ব্যবস্থার পাশাপাশি সরাসরি বহু ব্রিটিশ ব্যবসায়ীকে নীলচাষের জন্য জমি দেয়া হয়েছিল। ওই ব্যবসায়ীরা এতই মরিয়া ছিলেন যে, নির্মম অত্যাচারের ভূমিদাস ব্যবস্থা (বন্ডেড লেবার বা ফোর্সড লেবার) চালু করে হলেও তারা এ কাজে সফলতা পাওয়ার চেষ্টা করে গিয়েছিলেন। এটাই ইতিহাসে নৃশংসতায় নীলকরের নীলচাষ।

সিনেমা উপন্যাসের স্ক্রিপ্টে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলো ভিলেন। অনেকের মনে হতে পারে, না, এর উত্তর হবে নায়ক। আসলে ভিলেন মানে হল নেগেটিভ নায়ক। সামাজিক দ্বন্দ্বের বা গল্পে দ্বন্দ্বের নেগেটিভ দিকটা, যার মাধ্যমে প্রকাশ করার সুযোগ নেয়া হয়। ভিলেন যত নেগেটিভ করে ফুটিয়ে তোলা যাবে, ততই স্পষ্ট বোঝা যাবে ওখানে নায়কের ভূমিকা কত ইতিবাচক, কেন সে নায়ক। ঠিক সেরকম, এতক্ষণ বাংলার কলোনিয়াল ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ভিলেনের দিক থেকে বর্ণনা করা হয়েছে। এবার এতে নায়কের প্রবেশ ঘটবে। অথবা আরেক দিক থেকে বললে, এতক্ষণ বাংলার কলোনিয়াল ভূমি ব্যবস্থাপনাকে যেন নৈব্যক্তিক দিক থেকে তুলে ধরা হয়েছে। এবার এতে সাবজেক্টিভ অ্যাক্টর বা কর্তাস্বত্বা হাজির হবে।

গণ-প্রতিরোধ শব্দটা একালের, বিশেষত ‘রাজনীতি’ বলে আমাদের ভু-অঞ্চলে কোনো ফেনোমেনা হাজির হওয়ার পরের। এমনকি জনগণ, বা ইংরেজি mass শব্দটাও ‘রাজনীতি’ বলে শব্দ হাজির হওয়ার পর, ওরই অনুষঙ্গ শব্দ হয়ে এসেছে। আগে নয়; রাজনীতি শব্দটা ফুটিয়ে তোলার দরকারে। কারণ রাজা, সম্রাট বা বাদশা-নায়েব নবাবের আমলে আবার জনগণ কী জিনিস!, জনগণ বলে কিছু ছিল না।  এ বিচারে বলা যায়, বাংলায় ব্রিটিশ কলোনি শাসনের সবচেয়ে বড় চিহ্ন ‘জমিদারি ব্যবস্থা’। এর বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত প্রতিরোধ এবং গণ-প্রতিরোধের ঘটনাটা ঘটেছিল হাজী শরীয়তুল্লাহর হাতে।

আগেই বলেছি, তিনি হজ করে দেশে ফিরে আসেন ১৮১৮ সালে। ফিরে তার প্রধান কাজ হয়েছিল ধর্ম সংস্কারের কাজে মনোযোগ  দেয়া। বলা হয়, সেই ৮০০ বছর আগে ভারতবর্ষে ইসলামের আবির্ভাব হয়েছিল। কিন্তু ১৭৯৯ সালে দেশ ছেড়ে হজে যাওয়ার আগেও তিনি দেখে গেছেন, ফলে জানেন যে ন্যূনতম ইসলামের রিচুয়াল বা ফরজ কাজ যেগুলো, তাও করতে অভ্যস্ত ছিল না সে সময়ের বাংলার আম-মুসলমানরা। সেজন্যই ফিরে এসে তাঁর ধর্ম সংস্কারের কাজে নামা। সবাই একালে তাই হাজী শরীয়তুল্লাহ পরিচয় দিতে গিয়ে প্রথমেই তাঁর ধর্ম সংস্কারের প্রসঙ্গ আনেন। কিন্তু ধর্ম সংস্কার কথাটা এই অর্থে যে, মুসলমানদের ন্যূনতম ফরজ কাজগুলো করতে উদ্যোগী করার দিকটা জোর দিয়ে তিনি কাজে নেমেছিলেন। যেজন্য তাঁর ধর্ম ও সামাজিক সংস্কারের আন্দোলনকে ‘ফরায়েজি’ বলা হয়ে থাকে। কিন্তু তিনি ধর্মীয় সংস্কারের আন্দোলনকে জীবনের বৈষয়িক দিকের সঙ্গে সম্পর্কহীন মনে করেননি। ফলে উপরে যে জমিদারকেন্দ্রিক কলোনি ভূমি ব্যবস্থার কথা বলেছিলাম, যেটা তিনি হজের পর দেশে এসে পেলেন, এটা তার চোখ এড়ায়নি। কারণ বাংলায় জমিদারি ব্যবস্থা তত দিনে ১৭৯৩ সালে জন্মের পর থেকে ২৫ বছর পার করে ভিত পুঁতে ফেলেছে। জমিদার ও কলোনি শাসকরা মিলে প্রজাদের ওপর তাদের অত্যাচার, শোষণ নির্মমতাগুলোও স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। তাই এখানে আমরা যে মুসলমান ফেনোমেনার কথা বলছি, তা ঠিক কলেমা পড়লেই যাকে মুসলমান বলি এতটুকু অর্থে নয়।

ব্রিটিশ-ভারতের আইন অনুযায়ী জমিদারদের খাজনা আদায় বৈধ। বলা হয়, জমিদারদের ৯০ ভাগ ছিল হিন্দু। এর ওপর আবার তাদের বারো মাসের তেরো পূজা পার্বণের চাঁদা/খাজনা থেকে শুরু করে সন্তানের অন্নপ্রাশন, বিয়ে বা  ‘জামাই খরচা’ ইত্যাদি নানা নামে জমিদারদের বাড়তি খাজনার দাবি লেগেই থাকত। ফলে শরীয়তুল্লাহ মূল খাজনার ব্যাপারে আপত্তি না তুলে (কারণ সেক্ষেত্রে জমিদারদের ম্যাজিস্ট্রেটসি ক্ষমতা দেয়া ছিল, যা সীমিতভাবে হলেও পেয়াদা দিয়ে ধরে নিয়ে গিয়ে প্রজাকে নিজের জেলে রেখে শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা জমিদারদের ছিল) বরং বাড়তি খাজনাগুলো না দেয়ার ছলে জমিদারের সর্বময় ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা শিখিয়েছিলেন শরীয়তুল্লাহ। এই হলো বিশেষ ‘মুসলমান’ ফেনোমেনা। তিনি প্রজার আপত্তি-যুক্তিকে আরো জোরদারে হাজির করতে দাবি করতেন প্রজারা ‘মুসলমান’। ফলে কেন তাঁরা পূজার চাঁদা দেবে? সেকালে জমিদার মানে প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী, যার স্বার্থ আর কলোনি শাসকের স্বার্থ এক সুতায় গাঁথা, জমিদারের ক্ষমতা দুর্বল হওয়া মানে তা কলোনি শাসকেরও। এদিক থেকে দেখলে জমিদারের সর্বময় ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার তাত্পর্যটা বোঝা যাবে। আবার অনেকের মনে হতে পারে, এখানে শুধু জমিদারের ক্ষমতা বিষয়টা সবকিছুর কেন্দ্র ভাবা হচ্ছে, এটা কি ঠিক?

বলা হয় সব সমাজেই মানুষের সঙ্গে মানুষের মাঝে অসংখ্য কিসিমের স্বার্থের বিরোধ, ছোট-বড় সংঘাত কাজ করে থাকে। কিন্তু তাসত্ত্বেও এর ভেতর প্রধান কিছু একটা বিরোধ থাকে, যেটা বাকি সব বিরোধের ওপর প্রধান, মাও সে তুংয়ের ভাষায় যেটাকে সমাজের ‘প্রধান দ্বন্দ্ব’ বলে। এই দ্বন্দ্বে সমাজের সবচেয়ে বেশি মানুষ অ্যাফেক্টেড থাকে, আর এ বিরোধ ক্রমে সবার আগে তাই মানুষ সমাধান চায়। পুরা ব্রিটিশ শাসনকালটাই অন্তত বাংলার সমাজজুড়ে প্রধান দ্বন্দ্ব হয়ে থেকেছিল, জমিদার-প্রজা সম্পর্কের দ্বন্দ্ব বা ভূমি মালিকানা বন্দোবস্ত ব্যবস্থায় দ্বন্দ্ব। আবার সেকালের সমাজের অর্থনীতিক জীবন বলতে পঁচানব্বই ভাগজুড়েই বোঝাত কৃষির অর্থনীতি। এ কারণে ভূমি মালিকানা বন্দোবস্ত ব্যবস্থার দ্বন্দ্বকে বলা যায়, – প্রধান দ্বন্দ্ব – যা সমাজের প্রায় সবাইকে অ্যাফেক্টেড করে রেখেছিল। অর্থাৎ প্রত্যন্ত মাঠেও ব্রিটিশ ক্ষমতার প্রভাব উপস্থিতি টের পাওয়া যেত জমিদারি শাসনের উপস্থিতি থেকে। সারা বাংলার কৃষির প্রত্যন্ত মাঠ থেকে কৃষির উদ্বৃত্ত পুঞ্জীভূত সেই সারপ্লাস এটাই ছিল ব্রিটিশ কলোনির রুস্তমি আর নিজ দেশ বৃটেনে উদ্বৃত্ত পাচার এমন সবকিছুর রসদ। আর একদিকে এই কৃষি-উদ্বৃত্ত আবার এর স্থানীয় দিক ‘কলকাতা’, এর প্রাণশক্তি। এভাবে কলকাতা মূলত কলোনি মাস্টার আর জমিদারের শহর, তাদের পোষ্য কিংবা তাদেরও পোষ্য শ্রেণীর কায়কারবারের শহর।

অতএব, সবকিছুর কেন্দ্র এ জমিদারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নায়ক হিসাবে কাউকে না কাউকে উঠে দাঁড়াতেই হত। হাজী শরীয়তুল্লাহ সেই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, যিনি বাংলার সবার হয়ে কাজটা করেছিলেন। সেটা শ্রেণী-সংগ্রাম বা রাজনীতি বুঝি, তা বলার কাল ছিল না। কারণ ১৮৩২ সাল, যাকে মনে রেখে কথাগুলো বলছি, যেটা ছিল তাঁর সক্রিয়তা ও প্রভাবের তুঙ্গ বছর। তিনি বলেছিলেন, জমিদারের কালচার বা আচার যেটা, সেটা তো প্রজার নয়, হতে পারে না। ফলে কলোনির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রত্যক্ষ শোষক জমিদারের বিরুদ্ধে তিনি কালচারাল শ্রেণী সেপারেশনের দিক থেকে কথা তুলেছিলেন। এজন্য তিনি বরং তার মত করে মুসলমান প্রজাদের নতুন লাইফ স্টাইলের কথা বলেছিলেন। না লাইফ স্টাইল বলে একালের কোন ফ্যাশন শো- এর মেয়েদের ক্যাটস ওয়ার্ক বুঝাই নাই। এমন বুঝাটাও ডাহা ভুল।  লাইফ স্টাইল কথার মূল অর্থ , মানুষ জীবন সম্পর্কে স্পিরিচুয়ালি বা মেটারিয়ালি যা বুঝে সেটাই প্রকাশিত হয়ে পড়ে তার বাস্তব জীবনে। তাই মানুষ যেভাবে তাঁর স্পিরিচুয়ালি বা মেটারিয়ালি জীবন প্রকাশ করে তাই লাইফ স্টাইল। হাজী শরীয়তুল্লাহ যে লাইফ স্টাইল আমাদের শিখিয়েছিলেন সেই চিহ্ন বা trait তা আজও বাংলার মুসলমানদের মৌলিক বৈশিষ্ট হয়ে আছে। তবে এ কথা বুঝলে ভুল হবে যে, তিনি ছাড়া আর কেউ জমিদারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা বলেননি বা করেন নি। অবশ্যই বলেছেন। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে ও সংগঠিত ভাবে বলেছেন এবং টিকে থেকেছেন বাংলায় মুসলমান মানুষের স্পিরিচুয়াল ও বৈষয়িক জীবন এক গ্রন্থিতে একসঙ্গে প্রভাবিত করে গেছেন, এমন ঘটাতে পেরেছেন একমাত্র তিনি। এখানেই তিনি অদ্বিতীয়। ১৮৪০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর ফরায়েজি আন্দোলনের হাল ধরেন তার ছেলে মোহসেন উদ্দিন দুদু মিয়া। এই আমলেই আন্দোলন ধর্মীয় সংস্কার রূপের দিকের চেয়ে কলোনি-জমিদারি ক্ষমতার বিরুদ্ধে ফরায়েজিদের সাংগঠনিক ক্ষমতা বিস্তারের দিকের রূপটা সবচেয়ে ভারী হয়ে উঠেছিল। স্থানীয়ভাবে এক সরকার অর্থে পাল্টা এক সরকারের মতো কাঠামোতে নিজ কমিউনিটিতে ধর্ম নির্বিশেষে বিচার-আচার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। পরে ১৮৬২ সালে দুদু মিয়ার মৃত্যুর পরও তার সাংগঠনিক কাঠামো কার্যকর ছিল। তবে ধর্ম সংস্কারের দিকটা আবার প্রাধান্যে আসে।

ফরায়েজি আন্দোলন সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো প্রামাণিক গ্রন্থটা হল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মুঈন উদ-দীন আহমদ খান স্যারের ‘বাংলায় ফরায়েযী আন্দোলনের ইতিহাস’ বইটা। এ বইটা আসলে উনার পিএইচডি থিসিস ও গবেষণা গ্রন্থ। ১৯৬১ সালে তিনি এ পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। শরীয়তুল্লাহ সম্পর্কে একটা কথা অনেকে দাবি করে থাকেন যে, তাঁর ফরায়েজি আন্দোলন আসলে ওহায়েবি আন্দোলন। এ বিষয়টা নাকচ করেছেন মুঈন উদ-দীন আহমদ খান। যদিও হাজী শরীয়তুল্লাহ  ওহায়েবি ছিলেন কিনা, সে তর্কে তাঁর সম্পর্কে আমাদের উপরের মূল্যায়নের হেরফের হয় না। হাজী শরীয়তুল্লাহ সবচেয়ে কার্যকরভাবে ‘মুসলমান’ নাম ধারণ বা মুসলমান পরিচয়েই সবচেয়ে ভালোভাবে কলোনি-জমিদার কোটারি স্বার্থের বিরুদ্ধে লড়বার পথ দেখিয়েছেন। তিনি আমাদের শরীয়তুল্লাহ। মুঈন উদ-দীন খান তার বইয়ে শরীয়তুল্লাহর সমসাময়িক অন্তত আরো তিনটা ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনেছেন, তাদের মধ্যে তুলনা করেছেন। ফরায়েজিদের প্রতিযোগী মওলানা কেরামত আলী জৈনপুরীর ‘তাইউনী’ ধারার সঙ্গে বাহাসের বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন সত্যিকারের একজন গবেষকের ভূমিকায়। সেখানেই তিনি দেখিয়েছেন, কেউ তাকে ওহায়েবি বলেননি। আবার শরীয়তুল্লাহ ওহায়েবি ধারার অনুসারি হলেই সেটা দোষের, তাও আমরা বলতে পারি না। বরং তার ফরায়েজি ধারার সমান্তরাল লড়াকু  হয়ে জমিদার ফেনোমেনাকেই প্রধান আক্রমণের কেন্দ্র বিবেচনা করে লড়াই প্রতিরোধ সাজাতে আমরা আর কাউকে দেখিনি। তাই বাংলায় ‘মুসলমানেরা’ কেন নিজেকে ভিন্ন আত্মপরিচয়ে হাজির করেছিল এবং সেটা করতে গিয়ে সমাজের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য কীভাবে বদলে গেল, সেটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরিপ্রেক্ষিতে হাজী শরীয়তুল্লাহর নেতৃত্বে গণ-মানুষের লড়াই সংগ্রামের অর্থনৈতিক মর্মের মধ্যেই আমরা খুঁজে পাই। ‘মুসলমান’ এ নাম নিয়ে কার্যকর গণ-প্রতিরোধের পথপ্রদর্শক তিনি।

ইতিহাসের পদ্ধতিগত দিক থেকে বিচার করলে আমরা এটুকু দাবি পেশ করে শেষ করতে চাই যে, বিচ্ছিন্নভাবে ধর্মের ইতিহাস আলোচনা, কিন্তু ইতিহাস থেকে ধর্মের ইতিহাস বাদ দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের ইতিহাসের বিচার সম্ভব নয়। এতে কিছুই বোঝা যাবে না। ‘মুসলমান’ ইতিহাসের বিচারে নিছকই একটি ধর্মীয় পরিচয় নয়। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর ‘মুসলমান’ আত্মপরিচয় নিছকই ধর্মীয় পরিচয় মাত্র নয়। ঔপনিবেশিক দখলদারি এবং তাদের আরোপিত ভূমি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ঐতিহ্যের মধ্যে ‘মুসলমান’ পরিচয়ের ঐতিহাসিক তাত্পর্য নিহিত।

এ পরিচয়ের চাবিকাঠি উন্মোচনের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের সময়ের বহু সমস্যাকে নতুনভাবে চিহ্নিত ও মীমাংসা করতে পারব বলে আশা করি।

গৌতম দাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক বণিকবার্তা ১১ আগষ্ট প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যায় । তা এখানে আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ছাপানো হল।]

শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা

শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা
গৌতম দাস
০২ আগষ্ট  ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1lk

তুরস্কের সামরিক ক্যু নিয়ে এর পক্ষে-বিপক্ষে তর্কবিতর্ক চার দিকে চলছে,মোটামুটি তা দুনিয়াজুড়েই। তবে তুরস্ককে ইউরোপের সাথে জড়িয়ে দেখলে মানতে হবে এই বিতর্কের শুরু আজকের নয়,অনেক পুরনো। বলা চলে অন্তত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) অথবা তারও আগের সময় থেকে এই ঝগড়া বা বিতর্ক। তবে একেবারে মূল সংশ্লিষ্ট যে ঘটনা যা থেকে এই তর্কবিতর্ক উৎসারিত তা হল, দুনিয়ায় যখন সাম্রাজ্যের যুগ চলছিল সেখান থেকে। সাম্রাজ্যের যুগ মানে সারা দুনিয়া যখন ৫-৭ টা সাম্রাজ্য শাসকের হাতে ভাগ হয়ে শাসিত ছিল। সেকালে এমন প্রায় সব সাম্রাজ্যই ছিল খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর বড় হওয়া দুনিয়ায়। আর এর একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল অটোমান এম্পায়ার, যা ইসলামি সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার অংশ। নিঃসন্দেহে এই অংশটা ছিল এক গুরুত্বপুর্ণ ব্যতিক্রম যা খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার বাইরে। যদিও বয়সকাল বিচারের দিক থেকেও অটোমান সুলতান এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যের অভিজ্ঞতা ইউরোপের ক্রিশ্চান অভিজ্ঞতার সাম্রাজ্যের দিক থেকে অনেক দীর্ঘ।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারে থাকার কাল ধরা হয় ১৪৯৭ সাল থেকে,আয়ারল্যান্ডে কলোনি বসানো বা ‘প্লানটেশন অব আয়ারল্যান্ড’ থেকে। আর এটা টিকেছিল এর পরের ৪৫০ বছর বা কিছু বেশি কাল অবধি। এককথায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের (১৯৪৫) সাথে বৃটিশ সাম্রাজ্য যুগেরও সমাপ্তি। সে তুলনায় অটোমান সুলতানের এম্পায়ার আনুষ্ঠানিকভাবে ১২৯৯ সাল থেকে শুরু হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এর পরাজয়ের (১৯১৮) আগে পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয়শ’ বছর টিকে ছিল। আজকের তর্কবিতর্কের শুরু সেই এম্পায়ার বা সাম্রাজ্য যুগ থেকে। প্রবল পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান ইউরোপের সব সাম্রাজ্য শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা করে নিজ যোগ্যতা ও সফলতায় টিকে ছিল। আর একটা কথা বলা দরকার। দুনিয়া এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যে ভাগ হয়ে শাসিত হওয়া,শাসনের সেই কালে ইউরোপের প্রথম পাঁচটি সাম্রাজ্য শাসক ছিল- ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ-ওলন্দাজ। এরা সবই খ্রিষ্টীয় সমাজ সভ্যতার অভিজ্ঞতার ভিতরে বড় হওয়া অংশ। আগে বলেছি যার বিপরীতে ছিল একমাত্র সুলতানের এম্পায়ার। ফলে পাঁচ সাম্রাজ্য শাসকের পরস্পরের মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা থাকলেও সুলতানের এম্পায়ারের সাথে প্রত্যেক এম্পায়ারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সবার রেষারেষিতে অতিরিক্ত এক ভিন্ন মাত্রা ছিল। তবে মনে রাখতে হবে এটা মূলত এম্পায়ারের লড়াই। এই লড়াইকে কোনো ‘সভ্যতার সঙ্ঘাতের’ বা সিভিলাইজেশনের লড়াই বলে ইঙ্গিত করা হচ্ছে না, করছি না। এটা এম্পায়ার টিকানোর লড়াই – ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শাসকগুলোর সাথে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই করে নিজ সাম্রাজ্য টিকিয়ে ছিলেন পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা। সভ্যতার লড়াই বড় জোর এমন এম্পায়ার টিকানোর অধীনস্ত কিছু একটা।
কিন্তু অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা এত কিছু করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। কিছুটা কপাল খারাপ ছিল বলা যায় সে কারণে,আর কিছুটা নিজের পক্ষে কাজটা ফল দেয়নি- তাদের নেয়া এমন কিছু সিদ্ধান্ত। যেমন প্রথমত,সেকালের ইউরোপে উল্লেখযোগ্য একমাত্র জার্মানির সাথে দীর্ঘ ও পুরনো অ্যালায়েন্স ছিল সুলতানদের। সেসব সূত্রে,প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ-ফরাসি জোটের বিরুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নিয়েছিল তুরস্ক। ফলে যুদ্ধে জার্মানির হারের সাথে তুরস্কের এম্পায়ারেরও পরাজয় ঘটে। যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ ও ফরাসিরা পুরো অটোমান এম্পায়ার নিজেদের মধ্যে ভাগ বন্টন করে নেয়। তবে প্রথম কারণ যেটা বলেছি,জার্মানির সাথে মৈত্রী – এটা অটোমান সুলতানেরা এড়াতে পারতেন বলে মনে হয় না। আর দ্বিতীয় কারণ যুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নেয়া ও যুদ্ধ করা – এটা কষ্ট করে হলেও এড়াতে পারলে হয়ত ইতিহাস আজ অন্য দিকে যেত। তবে ইতিহাস যদি বা কিন্তু দিয়ে চলে না।
খেয়াল রাখতে হবে,তুরস্কের সুলতানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইউরোপের যে পাঁচ ‘কুতুব’ – সাম্রাজ্য শাসকের কথা বলেছি তাদের মধ্যে কিন্তু জার্মানি নেই। এটাই ইউরোপের মধ্যে কেবল জার্মানির সাথে অটোমান তুরস্কের অ্যালায়েন্সের কারণ। ঘনিষ্ঠ লেনদেন,পণ্য বিনিময় আর বিশেষ করে জার্মান টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্ট জ্ঞান শেয়ার করত অটোমান তুরস্ক। অন্যভাবে বললে, ইউরোপের সাম্রাজ্য বা এম্পায়ার শক্তি হিসাবে জার্মানির আবির্ভাবকে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়, জর্মানরা লেট কামার; মানে সবার শেষে আসা। জার্মান ক্যাপিটালিজমের এক দারুণ পূর্ণতা আসা ও এরপর কলোনি মালিক হয়ে ওঠার দিক থেকে – ইউরোপের মধ্যে জার্মানিতে ক্যাপিটালিজম এসেছে, পুষ্ট হয়েছে সবার চেয়ে দেরিতে।
বলা হয়ে থাকে, ইউরোপে – আধুনিক রাষ্ট্র কায়েম, ক্যাপিটালিজম গড়ে তোলা ও কলোনি সাম্রাজ্য গড়া – এই তিন বৈশিষ্ট্যের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা উঠে আসার ব্যাপারটা তিন রকমভাবে তিন কালে ঘটেছে। প্রথমে অর্থনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে আধুনিক বিপ্লব ঘটেছিল ব্রিটেনে,এর পরে রাজনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল ফ্রান্সে আর সবশেষে এবং দেরিতে দর্শনগত দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল জার্মানিতে। তবে দেরিতে হলেও জার্মানি টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্টের দিক থেকে দ্রুত তারা শীর্ষে আসতে পেরেছিল। জার্মানির কখনও এম্পায়ার হয়ে উঠা হয় নাই,তবে হয়ে ওঠার পথে ছিল বলে অটোমানের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মুখ্য ছিল না। আর ঠিক এ কারণেই অটোমান সুলতানের তুরস্কের সাথে জার্মানির গভীর সখ্য হয়েছিল। আর এই দুই সখা তাদের কমন শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী যারা ছিল এরা হল – ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ। এই পাঁচ কুতুবের মধ্যে আবার ব্রিটিশদের সাথেই সুলতানের তুরস্কের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রেষারেষি ছিল। কিন্তু পরাক্রমী সুলতানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেরে না ওঠে ব্রিটিশসহ সবাইকেই সুলতানের ক্ষমতাকে সালাম করে চলতে হত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর প্রথম চোটে তাই ব্রিটিশ-ফরাসি গোপন আঁতাতে তারা আর দেরি করেনি- পুরো অটোমান সাম্রাজ্যই নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছিল।

শুধু তাই নয়, ছোট বড় মিলিয়ে যে আটটি ক্রুসেডে ইউরোপ এতদিন বারবার হেরে যাওয়ার ভেতরে ছিল, সর্বশেষ ১২৮৯ সালে (আজকের লিবিয়া) ত্রিপোলী জয়ের মধ্য দিয়ে শেষ ক্রুসেডেও পরাজয় ঘটেছিল ইউরোপের। সেই পটভূমিতেই অটোমান সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু অবশেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে ১৯১৮ সালে এর প্রতিশোধ নেয় ব্রিটেন। জেরুসালেমসহ আজকের ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ভূখণ্ড পুরোটাই ব্রিটেন নিজের ভাগ দখলে নিয়েছিল। আর আরেক বড় তামাশা হল, যুদ্ধে পরাজয়ের পর তুরস্ক কার্যত ব্রিটিশদের ভাগ দখলে চলে যায়। অথচ সামরিক অফিসার মোস্তফা কামাল আতাতুর্ককে দিয়ে ব্রিটিশরা তাদের দখলি-তুরস্কতেই একটা ক্যু করিয়েছিল। উদ্দেশ্য,তাকে দিয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘোষণা করানো। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা,তখন থেকে ‘বিশেষ সেকুলারিজমে’ তুরস্ককে এক আধুনিক রাষ্ট্রের আদলের ক্ষমতা বলে ঘোষণা দেয়ানো হয়। এটা ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম ধারণা, সেটা নয়। এটা একেবারে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
আরেক দিক থেকে,এটা চেঙ্গিস খানের দোস্ত ইউরোপীয়দের অক্ষম খ্রিষ্টীয় ক্রুসেডারের স্বপ্ন পূরণ। সেই থেকে ‘ইউরোপের ইচ্ছা’ কথাটা ট্রান্সেলেট করলে ওর একনাম হবে ‘তুরস্কের সেকুলারিজম’। এই সেকুলারিজম শব্দ তুরস্কের জনগণের মুখে সেটে দেয়া হয়। এরপর থেকে “সেকুলার নামের আড়ালে” ইউরোপের শাসন -এই শাসন সবসময় গণ-ম্যান্ডেটের বদলে ক্যুর ওপর ভর করে চলেছে। আজ আবার এরদোগান ও তুরস্কের জনগণ সেই একই পথ- ক্যুর মুখোমুখি।

না, এখানে ইতিহাস বলতে বসিনি। এতক্ষণ পুরানো এসব কথা তুলে আনার কারণ ভিন্ন। জার্মানির স্থানীয় ভাষার এক পত্রিকায় (বাংলায় বললে যার নাম ফ্রাঙ্কফুর্টের সাময়িক পত্রিকা) তুরস্কের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। এর লেখক জনাথন লরেন্স। তিনি ‘টেররিজমের ওপর ইসলামের প্রভাব আছে’ শিরোনামে এক কলামের প্রতিক্রিয়ায় পালটা বিতর্ক তুলেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন,একালে ইউরোপের ইসলাম নিয়ে যে প্যাথলজি বা রোগগ্রস্ততায় পেরেশানি – এটা আসলে ইউরোপের শতাব্দী পুরনো এক আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা- যেন এক ভূমিকম্পের পরবর্তী ঝাঁকুনি-ঝটকা। এটাকে এক ‘সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে নেয়া এক পলিসিও বলা যায়’।

মজার ব্যাপার হল,স্থানীয় ভাষায় লেখা বলে এটা আমরা পাঠকদের নজরে আসার কথা নয়, পড়েও নাই। কিন্তু সেই আর্টিকেলটাকে আমাদের নজরে এনেছে লন্ডনের সাপ্তাহিক ‘ইকোনমিস্ট’, ২৬ জুলাই সংখ্যায়। ইকোনমিস্ট জনাথনের বক্তব্যকে ‘টনক নড়ার মত করে’ খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। ইকোনমিস্ট লিখছে, “১৯১৬ সালের বসন্তকাল (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, তবে শেষ হওয়ার দুই বছর আগে) থেকে ব্রিটিশ সরকার অটোমান সুলতানের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও বিশেষ করে স্পিরিচুয়াল কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটি আরব বিদ্রোহ ঘটানোর জন্য উসকানি দিয়েছে। এ থেকেই শেষে ব্রিটিশদের নেতৃত্বে জেরুসালেম দখল ঘটেছিল এবং লেভান্ট অথবা সৌদি আরবে ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলোর ওপর অটোমানের যে দেখভাল নিয়ন্ত্রণ ছিল,তা ভেঙে দিয়েছিল। এরাই আরবদের ওপর অটোমানের শাসনের বিকল্প হিসেবে শুরুতে হাশেমি রাজতন্ত্রকে প্রশ্রয় ও সমর্থন দিয়ে খাড়া করেছিল, যা এখনো জর্ডান শাসন করে যাচ্ছে। অবশ্য এর শেষ সুবিধাভোগী হচ্ছে সৌদ রাজপরিবার,যারা ১৯২৪ সালে মক্কা ও মদিনা দখল করেছিলেন”।

[এখানে ফুটনোটের মত করে বলে রাখি, লেভান্ট মানে হল – প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে পরাজিত হওয়া অটোমান সাম্রাজ্য ব্রিটিশ ও ফরাসিরা আগে থেকে করা গোপন চুক্তির শর্তে নিজেদের মধ্যে ভাগ করাতে এতে ফরাসিদের ভাগে পড়েছিল ভুমধ্যসাগরের পুর্ব উপকুলীয় অঞ্চল এলাকা। এই অঞ্চলকে লেভান্ট বলা হত। লেভান্ট শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল, যেখানে সুর্য সবার আগে উদয় হয়। এছাড়া আইএস বা আজকের ইসলামি স্টেট – এর আগের নেয়া সাংগঠনিক নাম হল ইসলামি স্টেট অব ইরাক এন্ড লেভান্ট, সংক্ষেপে আইএসআইএল। অর্থাৎ বৃটিশ-ফরাসির ভাগ করে নিবার আগের একক অটোমান সাম্রাজ্য – তার ইরাক ও লেভান্ট অঞ্চল পুনরুদ্ধার প্রকল্প ]

লেখক জনাথন লরেন্স বোস্টন কলেজের একজন প্রফেসর। জনাথন আসলে বলতে চাইছেন,সাম্রাজ্য চালানোর দিক থেকে সুলতান ইউরোপের সবার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ এবং সুলতানের ৭০০ বছরের (ইউরোপের চেয়ে আড়াইশ বছর বেশি) পুরনো তুরস্ক অটোমান সাম্রাজ্য সৌদি রাজতন্ত্রের চেয়ে মুসলমানদের নেতা ও শাসক হিসেবে অনেক পরিপক্ব অগ্রসর ও যোগ্য ছিল। অথচ সুলতানের সেই তুরস্ক সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দুনিয়ায় ইসলামের কেন্দ্র হিসেবে তুরস্কের ভুমিকার বদলে ব্রিটিশরা সৌদি রাজপরিবারকে খাড়া করেছিল। অথচ আগের তুরস্ক সাম্রাজ্য ছিল ইসলামের প্রায় সব ধারার মিলনস্থল; সুলতান ইসলামের কোনো সুনির্দিষ্ট ফেকড়াকে প্রশ্রয় দিতেন, সমর্থন করতেন তা বলা যায় না। ফলে সুলতানের তুরস্কের হাতে ইসলাম একটা ধারাবাহিক ও স্বাভাবিক ও ইনক্লুসিভ বিকাশের পথ চলার যে সম্ভাবনা ছিল সৌদি আরবের হাতে গিয়ে,পরে সে গতি রুদ্ধ হয়ে যায়। এটা ইউরোপের পক্ষে যায় নাই। শুধু তাই নয়, সুলতানের পতনের পর সেকুলারিজমের নামে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষের মোহর তুরস্কের জনগণের কপালে সেঁটে দেয়া হয়। এক দমবন্ধ অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হল। এতে ক্রুসেডে হারার জিঘাংসা হয়ত মিটেছে কিন্তু তাতে পরের ঘটনাবলি ইউরোপের পক্ষে বা স্বার্থে গিয়েছে এমন দুরদৃষ্টির সিদ্ধান্ত এটা ছিল না। তুরস্ককে যুদ্ধে হারানো এক জিনিষ আর পরাজয়ের পর ধর্মীয় প্রতিশোধের নামে যা কিছু করা হয়েছে তাতে মনে জিঘাংসার শান্তি এনেছে হয়ত সেকুলারিজমের নামে এরপর থেকে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষ আজ স্পষ্ট হয়ে গেছে, পুরা পরিস্থিতি আজ ইউরোপের বিরুদ্ধে খাড়া হয়ে গেছে। এটাকেই জনাথন লরেন্স এক শ’ বছর আগের পুরনো ভুল,আত্মঘাতী কাণ্ডের কুকর্ম মনে করছেন।

সবশেষে জনাথন এক মারাত্মক মন্তব্য করেছেন। জনাথনের বরাতে সে কথা ইকোনমিস্ট লিখেছে এভাবে, “মিস্টার লরেন্স যেভাবে ব্যাপারটাকে দেখেছেন, আসলে সবচেয়ে প্রাচীন খলিফাকে উৎখাত করে একটা শূন্যতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এরপর শতকজুড়ে সে শূন্যতা পূরণ করা হয় আরো কালো বিকল্প দিয়ে এবং তাতে অন্তর্ভুক্ত আছে সর্বশেষ নিজেকে ইসলামি স্টেটের নতুন খলিফা দাবিকারী আবু বকর আল-বাগদাদি পর্যন্ত।’

এই ভুলের মাশুল এখন পশ্চিমকে গুনতে হচ্ছে। তবে হয়ত এটা কিছু ভালো দিক যে,কোথাও অন্তত এই ভুলের উপলব্ধি দেখা দিতে শুরু করেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সন হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে ৩০ জুলাই (প্রিন্টে ৩১ জুলাই ২০১৬) ছাপা হয়েছিল। এবার তা আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ওয়ার্ডপ্রেস ভার্সন হিসাবে আবার এখানে ছাপা হল। ]