যুদ্ধ নয়, মোদি এখন ‘উন্নয়নের’ পতাকা তুলেছেন


যুদ্ধ নয়, মোদি এখন ‘উন্নয়নের’ পতাকা তুলেছেন
গৌতম দাস
২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1RC

 

 

যেকোনো আন্দোলন, বিক্ষোভ বা প্রতিরোধের পন্থা দেখা যায় – হয় সেটা গণ-আন্দোলন না হয়, সশস্ত্র তৎপরতায় পথে ঘটে। ভারতের দখলকৃত কাশ্মীরে জনগণের আন্দোলন শুরু থেকেই নানান পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এটা সেখানে প্রতিষ্ঠিত যে ভারতের দখলের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গণ-আন্দোলনের পথ এখানে বেশি কার্যকর। আর সেখান থেকেই অল পার্টি হুরিয়াত কনফারেন্স নামে এক সামাজিক রাজনৈতিক জোটের জন্ম এবং এর নেতা হিসাবে সৈয়দ আলি শাহ গিলানি, মিরওয়াইজ উমর ফারুক অথবা ইয়াসিন মালিক ইত্যাদি নামে গণ-আন্দোলন পন্থার নেতাদের আবির্ভাব। এথেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে সময়ে সশস্ত্রভাবে ভারতীয় সেনা ব্যারাকে গিয়ে দুটো সেনা মেরে আসার চেয়ে রাজপথের আন্দোলন অনেক বেশি শক্তিশালী ও ফলদায়ক। সামরিকভাবে হামলার চেয়ে কার্ফু ভেঙ্গে রাস্তায় সাধারণ মানুষের নেমে আসা অথবা জানাজায় অংশগ্রহণ, কোন গৃহবধুর রাস্তায় নামা ইত্যাদি এগুলো অনেক বেশী শক্তিশালী। কাশ্মীরে দিল্লীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো এখানে উদোম করে চোখ আঙুল দিয়ে সারা দুনিয়াকে দেখানো সহজ হয়ে যায়। এই কারণ কাশ্মীরে সশস্ত্র প্রতিরোধ চলুক এটা দিল্লীর সরকারেরও পছন্দের দিক। দিল্লী তাই এই প্রতিরোধ আন্দোলন মোকাবিলার পথ একটাই – এদেরকে জঙ্গী বলে প্রপাগান্ডা করা। এরা জঙ্গি, পাকিস্তান থেকে আসা “সীমা পারকে আতঙ্কবাদী” অর্থাৎ কাশ্মীর ভারতের দখলকৃত থাকার বিরুদ্ধে কাশ্মীরের জনগণের কোন চাওয়া নাই, কোন প্রতিরোধ নাই – সব সমস্যার গোড়া হল “শান্তির” কাশ্মীরে পাকিস্তান থেকে পাঠানো সন্ত্রাসবাদ। এই বলে প্রপাগান্ডা করা। অতএব “ওরা জঙ্গী” এটা বলতে পারলেই একমাত্র ভারত সরকারের তাদেরকে সরাসরি গুলি করে মারার পক্ষে ন্যায্যতা হাজির করতে পারে। এসব কারণে কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থার স্তরে গণ-আন্দোলন বেশী ফলদায়ক। তবে খেয়াল রাখতে হবে, বর্তমান স্তরে বলেছি, সব সময় বলি নাই।  কারণ কে না জানে বিজয় লাভ করতে হলে চুড়ান্ত দিনগুলোতে সাধারণত সশস্ত্র পথেই তা ঘটাতে দেখা যায়। কারণ সব পথ তখন একটাই, সশস্ত্র প্রতিরোধ, মোকাবিলা। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ এর এক আদর্শ উদাহরণ। এগুলো সবাই জানে। কিন্তু যেটা মানুষ কম জানে বা খেয়াল করেনি, তা হলো ‘সফট ল্যান্ডিং’ বলে একটি ব্যাপার আছে। ‘সফট ল্যান্ডিং’ ধারণাটি উড়োজাহাজ সংশ্লিষ্ট, সেখান থেকে ধার করে এনেছি। এর মানে হল, উড়োজাহাজে যাত্রা আকাশে যতই আরামদায়কভাবে উড়ুক বা ঘটুক না কেন, সেটা আসল আরামদায়ক ভ্রমণ কি না, এর বিচার করা হবে ওই উড়োজাহাজের মাটিতে নামা মসৃণ ছিল কি না তা দিয়ে। অর্থাৎ মাটিতে নামার সময় ল্যান্ডিং বা নেমে আসাকে অবশ্যই কোনো বড় ঝাঁকুনি বা কোনো দুর্ঘটনা না ঘটিয়ে একেবারে মসৃণভাবে ঘটতেই হবে। নইলে সব বৃথা। ঠিক সে রকম আন্দোলন যদি গণ-আন্দোলন থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধের স্তরে যাওয়ার সময় মসৃণ না হয়, পরিপক্ব হওয়ার আগে অস্ত্র ধরা হয় অথবা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর অস্ত্র ধরা হয়- দুই ক্ষেত্রেই ওই আন্দোলন ভণ্ডুল হয়ে যাবে। এতে তা আত্মঘাতী হতে বাধ্য। উড়োজাহাজের  গোত্তা খেয়ে মাটিতে পড়ার মত হবে।
কাশ্মিরের নিরস্ত্র গণ-আন্দোলন বিক্ষোভ প্রতিরোধ পঁচাত্তর দিনেরও বেশি কারফিউ অমান্য করে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু উরির ব্যারাকে হামলা করিয়ে কেউ না কেউ অপরিপক্ব অবস্থায় ওর মধ্যে সশস্ত্রতার আমদানি ঘটিয়ে দিয়েছে। কাশ্মিরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার ব্যারাক উরিতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর এক হামলায় ১৮ জন সেনার মৃত্যু ঘটেছে। এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারত দাবি করে যে, এই হামলা পাকিস্তান থেকে এসে ‘সীমা পার কি জঙ্গীরা’ করেছে। জবাবে স্বভাবতই পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এটা প্রমাণহীন এবং কোনো ইনভেস্টিগেশন বা তদন্তের আগেই করা প্রপাগান্ডা বলে দাবি করেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ‘‘পাকিস্তানের মাটি থেকে কোনও রকম অনুপ্রবেশ হয়নি।’’

কিন্তু আসল ব্যাপার হল, এমন দাবি আর পাল্টা দাবিতে কে ঠিক বলছে, তাতে আর কিছুই আসে যায় না। কারণ ভারতের নিট উদ্দেশ্য লাভ এতে ঘটে গিয়েছে। কাশ্মিরে লাগাতার প্রায় তিন মাস হতে চলা বিক্ষোভ আর সেটা মোকাবেলায় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর লাগাম ছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে দিল্লি সরকার যখন ছেঁড়াবেড়া অবস্থা, তখন মোদির সরকার এখন স্থানীয়সহ গ্লোবাল মিডিয়াকে ভুলিয়ে দিতে পেরেছে যে, আসল ইস্যু ছিল কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন এবং এতে নির্যাতন-নিপীড়ন। তা আর আজ ইস্যু নয়। এখন ইস্যু হল ভারত-পাকিস্তানের বিবাদ। মূলকথা উরির সামরিক ব্যারাকে হামলা যেই করুক, কাশ্মিরে চলা গণ-আন্দোলনকে আড়ালে ফেলে ভারত-পাকিস্তানের সম্ভাব্য যুদ্ধকে সফলভাবে সামনে এনে ভারত গণ-আন্দোলনকে স্যাবোটাজ করতে পেরেছে। আর এরই নিট বেনিফিট নিয়েছে, বেনিফিসিয়ারি হয়ে মোদি সরকার যুদ্ধের ঢোল পেটাচ্ছে। কি মজা!
গত কয়েক দিন ধরে অনেকেই জানতে চেয়েছে, যুদ্ধ কি লেগে যাবে নাকি? তাদের আশঙ্কার বড় কারণ জানা গেল যে, শেখ হাসিনা সরকার এই ইস্যুতে ‘মোদি সরকারের পাশে থাকবে’ বলে বিবৃতিতে জানিয়েছে সেখান থেকে। ‘মোদি সরকারের পাশে থাকবে’ বলাতে আমাদের এতে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই সেকথা বলে তাদেরকে আশ্বস্ত করে কথা বলা সহজ হয়েছে। কারণ এ পর্যন্ত মানে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিডিয়ায় যা এসেছে, তাতে যুদ্ধ আসন্ন- এমন মনে করার মতো কিছু চোখে পড়েনি। তবে মূলকথা হল, সেনাছাউনিতে সশস্ত্র হামলার ঘটনার বেনিফিসিয়ারি হিসেবে মোদি ভারত-পাক যুদ্ধের দামামা তুলতে পেরেছে। আর সেখান থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, উরির ঘটনার চিত্রনাট্য ইন্ডিয়ার নিজেরই তৈরি কি না। প্রথমে প্রশ্নটা তুলেছিল পাকিস্তানি মিডিয়া, পরে খোদ ইন্ডিয়ান মিডিয়া। এবিষয়ে আনন্দবাজার লিখেছে, কিন্তু একই ভাবে উরি হামলার মুহূর্তটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমও। তবে সেই ভারতের মিডিয়া এই সন্দেহের কথা তুলেছিল কিছু ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের বরাতে, পরোক্ষভাবে। যেমন, ভারতের দাবি অনুসারে চারজন কথিত হামলাকারী জয়স-ই মোহাম্মদ জঙ্গি। ব্যারাকে জঙ্গি হামলায় পরে নাকি এরা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রিটায়ার্ড এয়ার ভাইস মার্শাল কপিল কেকের বরাতে হিন্দুস্তান টাইমস প্রশ্ন তুলছে- এই চার জঙ্গির দাফনের জন্য কেন এত তাড়াহুড়া করা হলো। ওই রিপোর্টের শিরোনাম হলো, (“Should India have waited? ‘Hurried’ burial for Uri attackers raises eyebrows”) “দাফন করতে ভারতের দেরি করা উচিত ছিল।’ তাড়াহুড়া না করে এর বদলে তারা এই লাশগুলো সংরক্ষণ করে পাকিস্তানের কাছে জবাবদিহি চাইতে পারত।

কপিল কেক পুরানা রেফারেন্স দিয়ে বলছেন, এ ধরনের জঙ্গি হামলার ক্ষেত্রে সাধারণত ‘হামলাকারীদের মৃতদেহগুলা সংরক্ষণ করা হয়, পাকিস্তানকে তলব করা হয়, প্রমাণাদি পেশ করা হয়। মৃতের পরিবারকে খবর দিতে বলা হয়, যাতে তারা লাশ নিয়ে গিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করতে পারেন।’ কপিল বলছেন, কমন প্র্যাকটিস হলো… “এর আগে গত জানুয়ারি মাসে পাঠানকোট এয়ারবেজ হামলার ঘটনায় জঙ্গিদের লাশ চার মাস ধরে রাখার পর দাফন হয়েছিল। আর ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলায় নিহত ৯ জন লস্কর-ই তাইয়্যেবা জঙ্গির লাশ প্রায় এক বছর মর্গে রাখা হয়েছিল। ২০০১ সালের পার্লামেন্ট ভবনে আত্মঘাতী হামলার ঘটনায় পাঁচ জঙ্গির লাশ দাফন করা হয়েছিল প্রায় এক মাস বাদে”। এ ছাড়া সব ক্ষেত্রেই লাশ নিয়ে গিয়ে দাফন-কাফন করার জন্য পাকিস্তানকে আহ্বান জানানো হয়েছিল, যদিও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। অথচ উরিতে শেষ রাতের এই হামলা ঘটে যাওয়ার ঘণ্টাখানেকের ভেতর জানানো হলো যে, এই জঙ্গিরা সবাই পাকিস্তানি। এমনকি এ ক্ষেত্রে জঙ্গি হামলার লাশ দাফনের প্রচলিত জায়গাও বদলানো হয়েছে।
আবার ২১ সেপ্টেম্বরের হিন্দুস্তান টাইমস পাঁচটা পয়েন্ট তুলে দিয়ে ব্যাখ্যা করেছে, কেন পাকিস্তানে হামলা করা ভারতের জন্য সহজ হবে না। এ ছাড়া ওই রিপোর্টে হামলার ঘটনার পর আন্তর্জাতিক কমিউনিটি কে কিভাবে দায়সারা করে এই হামলার নিন্দা করছে তা উল্লেখ করেছে। প্রায় প্রত্যেকেই শুধু হামলার নিন্দা করছে কিন্তু কেউ পাকিস্তানের নাম নেয়নি, দায়ী করে নাই বা উল্লেখ করেনি। এমনকি বাংলাদেশের নিন্দার বিবৃতিতেও পাকিস্তানের নাম নেয়া হয়নি। অর্থাৎ হামলায় ভারতীয় ভাষ্য বাইরের দুনিয়ার প্রায় সবাই এড়িয়ে গেছে, সম্ভবত এই দাবি প্রমাণসাপেক্ষ বলে। যেমন রাশিয়ার পুতিন মন্তব্য করেছেন কোনো দায়দায়িত্ব না নিয়ে খুব সাবধানে। বলেছেন, ‘ইন্ডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী’। (stating: “We are also concerned about the fact that, according to New Delhi, the army base near Uri was attacked from Pakistani territory.”) আমেরিকানদের বক্তব্যও একই রকম সাবধানের, পাকিস্তানের নাম না নিয়ে বলেছে কাশ্মির (“an attack in the Valley”) ‘ভ্যালিতে যে হামলা হয়েছে আমরা তার নিন্দা করি”। – ওদিকে ব্রিটিশ সরকার উল্টা ডুবিয়েছে। উরি হামলার নিন্দা করে তারা বলেছে, ‘ইন্ডিয়া অ্যাডমিনিস্ট্রেডেট কাশ্মির’ (Uri as a part of “India-administrated Kashmir)। অর্থাৎ বলতে চেয়েছে যেন কাশ্মির ভূখণ্ডটি আসলে ঠিক ভারতের না।
ওদিকে বিবিসি ‘ভারত কি পাকিস্তানে হামলা চালাতে পারবে?’ এই শিরোনামে ২০ সেপ্টেম্বর এক রিপোর্ট করেছে। লিখেছে, ভারতের একজন নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অজয় শুক্লা মনে করেন, “নরেন্দ্র মোদি সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নানা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম রেখেছে। কিন্তু কোনো সন্ত্রাসী হামলার বিপরীতে কড়া জবাব দেয়ার মতো সামরিক শক্তি এবং পরিকল্পনা তৈরি করেনি নরেন্দ্র মোদির সরকার। এখন মনে হচ্ছে সরকার তার নিজের বাগাড়ম্বরের মধ্যেই আটকা পড়ে গেছে”। অর্থাৎ মোদি কাশ্মিরের গণপ্রতিরোধ থেকে দেশি বিদেশি সবার চোখ সরাতে পেরেছেন ঠিকই, কিছু যুদ্ধের প্রস্তুতিতে বা মুডে নেই। ওই রিপোর্টের শেষ বাক্য হল, “অনেক বিশ্লেষক মনে করেন ভারতকে মাথা ঠাণ্ডা রেখে সুচিন্তিত এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। এর বিপরীতে শুধু রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর করলে সেটি শুধু ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতায় ক্ষতি করবে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন”। অথচ ঠিক সেই সমস্যাই ইতোমধ্যে তৈরি করে ফেলেছেন মোদি।
মোদিসহ বিজেপি নেতারা এখন কেরালার কোঝিকোড়ে শহরে, শনিবার ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে তিন দিনব্যাপী বিজেপির জাতীয় কমিটির সভা চলছে। ভারতের মিডিয়াতে এক নতুন শব্দের আমদানি হয়েছে- jingoism বা ‘জিঙ্গ-ইজম’। যার অর্থ উগ্র জাতীয়তাবাদী গরম কিন্তু ফাঁপা কথা বলে যুদ্ধের দামামা বাজানো। ১৮৭৮ সালের রাশিয়ান গানবোটের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের যুদ্ধনীতির সপক্ষে একটা বাগাড়ম্বর গান লেখা হয়েছিল, সেখানে jingo বলে এক শব্দ ছিল। তাদের কারবারকে ঠাট্টা করতে “jingoism’ শব্দ দিয়ে তাদেরকে চিনানো শুরু হয়েছিল। তাই থেকে ‘জিঙ্গ-ইজম’ এই শব্দের উৎপত্তি। সমালোচকদের সবার অভিযোগ মোদিসহ দলের নেতারা ‘জিঙ্গ-ইজমে’ ভুগছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তবু এতে জনগণ দূরে থাক, নিজ বিজেপি দলের কর্মীদেরই সন্তুষ্ট করা জবাব দিতে পারছেন না নেতারা। আনন্দবাজার গত প্রায় দশ দিনের বেশি হবে কাশ্মির ইস্যুতে সরকারের গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও পরাজয়ের কাহিনী নিয়ে বিস্তারিত লিখে চলছিল। শনিবার ২৪ তারিখের আনন্দবাজারের অনলাইন সম্পাদক সম্পাদকীয়তে দুঃখ জানিয়ে লিখছেন, ‘যুদ্ধের বিরোধিতাও যেন দেশদ্রোহিতার নামান্তর!’ এরপর ওইদিনের এক রিপোর্টের শিরোনাম হল, “কড়া জবাব কোথায়, ফুঁসছে বিজেপি, নতুন করে ভাবনাচিন্তা করতে হচ্ছে”। অর্থাৎ মোদি এখন নিজ দলের কর্মীদের সামলাতে হয়রান হয়ে গেছে – নিজের কর্মীরাই ফুঁসছে। ওই রিপোর্টের প্রথম বাক্য হল, “দাঁতের বদলে গোটা চোয়াল প্রথম দিনেই খুলে নিতে চেয়েছিলেন যিনি, তার গলাতেই আজ নরম সুর”। এটা বলতে আনন্দবাজার বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধবের কথা বুঝিয়েছে। মোদির সবচেয়ে বিশ্বস্ত লাঠি হল বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। আর তাঁর পরের ব্যক্তিত্ব, মূল সংগঠন ‘সঙ্ঘ পরিবার’ থেকে এসে বিজেপির সাধারণ সম্পাদক এই নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন রাম মাধব। তিনি এক গরম বক্তৃতায় আগের দিন ‘দাঁতের বদলে গোটা চোয়াল’ খুলে নেয়ার কথা বলেছিলেন। সেই বরাতে আনন্দবাজারের ওই কথা। রিপোর্টে আনন্দবাজার এর পরে লিখেছে, “পাকিস্তানকে জবাব দিতে কূটনীতি ছাড়া আর কোনো পদক্ষেপের হদিস দিতে পারেননি” রাম মাধব। অসন্তুষ্ট ক্ষুব্ধ দলের কর্মীদের চাপের মুখে পরে দলের আরেক সচিব শ্রীকান্ত শর্মা বোঝানোর চেষ্টা করেন, “প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সেনার তরফে গোড়া থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। সেনাকে পদক্ষেপ করার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এবার সেনা কিভাবে কাজ করবে, সেটি তাদের এখতিয়ারে পড়ে। এর বেশি আর কী করা যেতে পারে এ মুহূর্তে?” – আনন্দবাজার থেকে কোট করে আনা কথাগুলো।  ওদিকে কাশ্মীর ঘটনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে মন্ত্রীসভায় কিছু মন্ত্রীর মতভেদ প্রকাশ হয়ে পড়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ কয়েকটা গুরুত্বপুর্ণ সভায় উপস্থিত থাকেন নাই এমন রিপোর্টও ভারতীয় মিডিয়ায় এসেছে।  কেরালায় বিজেপির অভ্যন্তরীণ ঐ সভার প্রথম দিন পাকিস্তান প্রসঙ্গে মোদি কী করতে চান, তা তুলে ধরতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি কোঝিকোড়ে শহরে এক জনসভায় বক্তৃতা দিয়েছেন। ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ওই বক্তৃতা থেকে কোট করে তা দশটা পয়েন্ট হিসেবে তুলে এনে ছাপিয়েছে। এই দশটা পয়েন্ট পড়লে যে কেউ বুঝবে মোদি পাকিস্তানের সাথে কোনো যুদ্ধের চিন্তা করছেন না, এটা তার মাথাতেই নেই।

ওই দশ পয়েন্টের দ্বিতীয় এবং সাত থেকে দশ নম্বর পয়েন্ট- এগুলো পড়লে যে কেউ এটা বুঝবে। দ্বিতীয় পয়েন্টটি হল, ‘উরিতে যে আঠারোজন সেনা নিহত হয়েছেন তাদের আত্মত্যাগ জাতি স্মরণ করবে”। (Indians will never forget the gruesome act of killing 18 soldiers in Uri.) অর্থাৎ সম্ভবত এর মানে হল, ওই আঠারোজনই সবচেয়ে বড় সংখ্যার ‘শহীদ’। এরা ছাড়া আগামিতে আর কোন সেনা শহীদ হচ্ছে না। মোদি ইতোমধ্যে তা জেনে গেছেন। আর ওই আঠারোজনের জীবনের বিনিময়েই মোদী কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন থেকে দৃষ্টি সরাতে সক্ষম হলেন- সেজন্য কি? এর জবাব আগামীতে পরিষ্কার হবে।
পরের সাত ও আট নম্বর পয়েন্টে দেখা যাচ্ছে মোদি পাকিস্তানের সরকারের বদলে পাকিস্তানের জনগণের সাথে কথা বলতে চাইছেন। সেজন্য তাদের অ্যাড্রেস করে বক্তব্য রেখেছে। কংগ্রেস মোদীর বক্তৃতার সেদিকটাতে খোচা দিতে পরেরদিন টিপ্পনি করে বলেছে, মোদী সম্ভবত আগামি নির্বাচন “পাকিস্থান থেকে লড়বেন”।  অর্থাৎ সার কথা হল, তিনি যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধে যাচ্ছেন না, এর ইঙ্গিত সেটা। যেমন সাত নম্বরের প্রথম বাক্যটা হল, তিনি “পাকিস্তানের জনগণকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছেন- আসেন একটা যুদ্ধ লড়ি।’ এটুকু পড়ে পাঠকের মনে সামরিক যুদ্ধের কথাই ভেসে উঠবে। কিন্তু না, মোদি সামরিক যুদ্ধের কথা বলছেন না। পরের বাক্যে জানা গেল যে – “কে কত বেশি উন্নয়ন করতে পারে, এরই প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানকে জেতার চ্যালেঞ্জ” দিচ্ছেন তিনি। বলছেন, “এটা হবে কে আগে বেশি চাকরি সৃষ্টি করা, দারিদ্র্য দূর করা আর শিক্ষার হার বাড়াতে পারে- এরই চ্যালেঞ্জ”। এ কথা থেকে এটা পরিষ্কার যে, তিনি আর যুদ্ধ নয়, যুদ্ধের বয়ানে৪ও নাই। এখন “উন্নয়নের” (তার শ্লোগান ‘সবকা বিকাশ সবকা সাথ’) চিন্তার ভেতরেই সরে আসতে চাইছেন। যুদ্ধে যাওয়ার মানে উন্নয়ন-বিরোধী কাজ, (যা তিনি করেছেন সব ডুবে যাবে, সব বেপথে যাবে- এটা পরিষ্কার করে তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন। ফলে মোদির পরিষ্কার যুদ্ধবিরোধী পথের ইঙ্গিত।
আট নম্বর পয়েন্টও একই ইঙ্গিত। তিনি বলছেন, পাকিস্তানের জনগণের তাদের নেতাদেরকে জিজ্ঞাসা করা উচিত যে, “আমরা দুই দেশ একই সময়ে স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু আমরা করি সফটওয়্যার রফতানি আর পাকিস্তান করে সন্ত্রাসবাদ রফতানি, কেন”। অর্থাৎ একই চিন্তা কাঠামোর বক্তব্য- “যুদ্ধ বনাম উন্নয়ন আর তিনি উন্নয়নের পক্ষে”। এরপর ৯ নম্বর পয়েন্ট। এটা হলো পাকিস্তান বিষয়ে তিনি সর্বোচ্চ কী করবেন, সে প্রসঙ্গে। এক কথায় বললে, কেবল কূটনৈতিক তৎপরতা এবং এটাই হবে সেই সর্বোচ্চ করণীয়। তিনি পাকিস্তানকে পশ্চিমাসহ প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন। অর্থাৎ যুদ্ধ নয়, কূটনীতি তার পথ।
শেষে দশ নম্বর পয়েন্ট। এটা বদ দোয়া দিয়ে সান্ত্বনা পাওয়ার মত। মোদি বলছেন,”একদিন পাকিস্তানের জনগণ নিজ ঘরের তৈরি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে”। যুদ্ধের ভুয়া দামামা বাজানোর চেয়ে তবুও এটা ভালো নিঃসন্দেহে। দশ পয়েন্টের সারকথা, যুদ্ধ বনাম উন্নয়নে মোদি উন্নয়নের পক্ষে।
আনন্দবাজারের রিপোর্টের শেষ দুই বাক্য এ রকম- “পাকিস্তানে সামরিক পদক্ষেপ না করতে পারা নরেন্দ্র মোদি এই বিদ্রোহী নেতাদের আগামীকাল সংবর্ধনা দেবেন। তার পরই “গরিবি হটাওয়ের স্লোগান দেবেন তিনি। লক্ষ্য, উত্তর প্রদেশ, পঞ্জাবের ভোট”। অর্থাৎ লক্ষ্যণীয় যে মোদিকে আনন্দবাজার পত্রিকা পরিচয় করাচ্ছে এই বলে যে, তিনি হলেন- ‘পাকিস্তানে সামরিক পদক্ষেপ না করতে পারা নরেন্দ্র মোদি।’ এরপর আর কোনো মন্তব্য নিঃপ্রয়োজন। যুদ্ধ বিষয়ে কোনো খবর আর নেই। কাজকর্ম যেমন চলছিল, তেমনি রুটিন। সামনের কাজ আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন, আর এর কৌশল নির্ধারণ। বিজনেস এজ ইউজুয়াল! আসলে হিন্দুত্ত্ব – এর শ্লোগান তুলে ভোটের বাক্স ভরে তোলা যায় হয়ত তবে যুদ্ধের বাজারে এই শ্লোগান একেবারেই অচল। কোনই কাজে আসে না, উলটা মিথ্যার ভান্ড ফুটে যাবার  বিপদ ঢেকে আনে। বলাই বাহুল্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (প্রিন্টে ২৬ সেপ্টেম্বর) ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s