লিবারেল স্পেস ও ক্ষমতা

লিবারেল স্পেস ও ক্ষমতা

গৌতম দাস
২৫ অক্টোবর ২০১৬,সোমবার
http://wp.me/p1sCvy-1S5

আধুনিক রাষ্ট্রধারণার গুরুত্বপূর্ণ এক অনুষঙ্গী ধারণা হল ‘লিবারেল স্পেস’। রাষ্ট্রধারণার সাথে জড়াজড়ি করে আছে এই ধারণা। ইংরেজি স্পেস শব্দের সাধারণ বা আক্ষরিক অর্থ জায়গা। তবে সুনির্দিষ্ট পটভূমিতে বললে এর অর্থ জায়গা দেয়া। ‘জায়গা’ কী অর্থে? রাষ্ট্র তার নিয়মকানুন, আইন ও ক্ষমতার কারণে ও প্রয়োজনে জনগণকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখবে না। একটু ঢিলেঢালা রাখবে, এই অর্থে জায়গা। মানে হল, রাষ্ট্র, আমি তোমার নিয়মকানুনের মধ্যেই আছি। কিন্তু আমাকে একটু জায়গা দাও খোলামেলা শ্বাস নেয়ার জন্য, ভালোভাবে দাঁড়ানোর জন্য কিংবা মুক্ত অনুভব করার জন্য, যাতে করে আরামে দাঁড়াতে ও নড়াচড়া করতে পারি। তবে এর সাথে অব্যক্ত ও অনুল্লেখ থাকে আর এক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা অংশ। তা হল – তাতে আমি তোমার ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করব না, করছি না। অথবা উল্টো করে বলা যায়, তোমার ক্ষমতা যাতে চ্যালেঞ্জ না হয়ে পড়ে ওই পর্যায়ে পৌঁছানোর আগের মাত্রা পর্যন্ত আমাকে একটু মুক্ত জায়গা দাও। সারকথায়, এটা এক রিলেটিভ মানে তুলনামূলক বা সাপেক্ষ অবস্থা; ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করা হবে না এই ‘সাপেক্ষে মুক্ত’ থাকতে চাই, এটাই এর সূক্ষ্মতর ও অনুল্লেখিত দিক। ওদিক স্পেস এর আগের শব্দ লিবারেল, ইংরেজি ‘লিবারেল’ কথাটার অর্থ মুক্ত। ‘লিবার্টি’ শব্দ থেকে এসেছে এটা।
তাহলে পুরো কথা দাঁড়াল, লিবারেল স্পেস কথার ভেতর লিবারেল শব্দটি ঠিক অবাধ অর্থে ‘মুক্ত’, এমন ধারণা বহন করে না, বরং ‘সাপেক্ষে মুক্ত’- এই ধারণা ও অর্থ বহন করে। যেমন কোনো স্বামী-স্ত্রীর বেলায় আমরা প্রায়ই এমন শুনি, এদের কোনো একজন অপরজনের বিরুদ্ধে অনুযোগ করছেন, সে স্পেস দেয় না। অর্থাৎ এখানে অনুযোগ করে বলা ‘স্পেস’ শব্দের আদর্শ অর্থ হল, প্রথমজন বলতে চাচ্ছেন তার আকাঙ্খা হল, তাদের দাম্পত্য সম্পর্কের ওপর প্রভাব না পড়ে অথবা দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য কোনো ক্ষতিকর না হয় ইত্যাদি দিক খেয়াল রেখে বা এই সাপেক্ষে সে তৃতীয় লোকজনের সাথে ওঠাবসা, মেশামিশি ও চলাফেরা করতে চায়। এতে অন্যজন সেটা অনুমোদন করছে না। এই অর্থে এখানে স্পেস কথার মানে, ‘সাপেক্ষে মুক্ত’ থাকতে চাওয়ার এক আকাঙ্ক্ষা।

রাজনীতিতে লিবারেল স্পেস
আমরা সমাজ বা পরিবারের মধ্যে ‘লিবারেল স্পেস’ শব্দের অর্থের দিক আলোচনা করলাম। রাজনীতিতে লিবারেল স্পেস ধারণা পরিবারের ভেতরের মতো সরল নয়। রাজনীতির একটা অর্থ হল, আইডিয়া বা মতাদর্শ। অন্য আর এক অর্থ হল, ক্ষমতা। এই ক্ষমতা সম্পর্কিত ধারণা লিবারেল স্পেস কথার সাথে আরো স্পষ্ট করে সম্পৃক্ত ও ঘনিষ্ঠ। আমরা অনেকে ‘লিবারেল ধারার’ রাজনীতি বলে একধরনের রাজনীতির কথা শুনে থাকি। এ ছাড়া, পশ্চিমা জগতের রাষ্ট্র এবং ওই জগতের প্রায় সব রাজনৈতিক ধারা প্রত্যেকেই নিজেকে লিবারেল রাজনীতিক ধারার রাজনীতি, এমন নাম-পরিচয় ও বৈশিষ্ট্যে চেনাতে পছন্দ করে। যদিও পশ্চিমের ট্র্যাডিশনাল বা যারা চিন্তাভাবনা সহজে বদলাতে চায় না, এমন অর্থ ও বৈশিষ্ট্যের রাজনৈতিক দল বুঝতে বলা হয়, রক্ষণশীল (ইংরেজিতে কনজারভেটিভ, যেমন ইংল্যান্ডের টোরি দল, যার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ডেভিড ক্যামেরন) দল বলা হয়। আর এই দলের বিপরীত বুঝাতে ‘লিবারেল’ শব্দ ব্যবহার করে লিবারেল দল বলার রেওয়াজও আছে। তবে এগুলো দাবি করা অর্থে। মূলত উভয় ধারাই মোটা দাগে লিবারেল ধারার রাজনীতি করে। সোজা কথায়, রাজনৈতিক দলকে লিবারেল বলার ভেতরেও একধরনের বাড়াবাড়ি দাবি সেখানে থাকে। যেমন পশ্চিমের লিবারেল ধারা মুখে যা-ই বলুক, আসলে সে যে ক্ষমতায় আছে, এটা অটুট থাকা সত্ত্বেও সে একটা মিথ্যা ভাব বজায় রাখতে চায় যে, তার ‘অপর’ বা বিরোধী যারা- এরা ঠিক যেন ‘তার ক্ষমতাসাপেক্ষে শুধু মুক্তই’ না, তার সমাজ-রাষ্ট্রে যেন সবাই পুরোপুরি ও অবাধভাবেই মুক্ত। ফলে যেন দাবি করা হয়, ঐ সমাজ ও রাষ্ট্রে ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। ফলে যেন কোনো ক্ষমতার সাপেক্ষে লিবারেল স্পেস নয়, অথবা যেন কোনো বলপ্রয়োগ সেখানে অনুপস্থিত। অতএব ওই সমাজে সবাই মুক্ত এবং সবাই কোনো বাধাহীন অর্থে এক লিবারেল স্পেসে বসবাস করে। অর্থাৎ সমাজে জলজ্যান্ত ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগের উপস্থিতি সত্ত্বেও তাকে আড়াল করে দাবি করা যে, সবাই পুরো স্বাধীন বা মুক্ত। এটাই সেই বাড়াবাড়ি মিথ্যা দাবি। এই অর্থে, এটাকে পশ্চিমের ছলনা বলছি। তাহলে সারকথা হল, লিবারেল ধারার রাজনীতি যত লিবার্টি বা মুক্তসমাজের কথার প্রপাগান্ডা চালাক, অথবা এমন ছলনা করুক না কেন- সব সময় মনে রাখতে হবে, আসলে এখানে মুক্ত মানে অটুট একটা ক্ষমতার সাপেক্ষে মুক্ত, যদি আপনি ওই ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ না করেন, এই সাপেক্ষে এই শর্তে ও সীমায় আপনি অবশ্যই মুক্ত। যতক্ষণ না ক্ষমতাকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ করেন ততক্ষণ আপনি মুক্ত। পশ্চিমের লিবারেল ধারার এমন রাজনীতিরই ব্রান্ড নাম ‘গণতন্ত্র’- এই ব্র্যান্ডেই এটা প্যাকেটজাত হয়ে আমাদের দেশেও হাজির আছে।

রাজনৈতিক আইডিয়া বা মতাদর্শে লিবারেল স্পেস
সব সমাজেই রাজনীতিতে নানা আদর্শ বা আইডিওলজি সদর্পে আছে ও থাকে। এভাবেই এটা কাজ করে এবং থাকবেই। এমন নানান রাজনৈতিক আইডিয়ার ধারাগুলোকে মোটা দাগে তিনটি ভাগ বা প্রকরণে ফেলতে পারি – কমিউনিস্ট, গণতান্ত্রিক (পশ্চিমা অথবা লিবারেল) আর ইসলামি। লিবারেল স্পেস ধারণাটির প্রতি এই তিন ধারারই মনোভাব কেমন অথবা কিভাবে এরা দেখে, সেদিক থেকে এখন কথা তুলব। যেকোনো রাজনৈতিক আইডিয়ায় কোনো লিবারেল স্পেস ধারণা আছে কি না, কেমন করে আছে আর থাকলে কিভাবে কতটুকু কী অর্থে আছে, তাই পরখ করব। এ কাজটি করার একটা সহজ উপায় নিব তা হল, তিন রাজনৈতিক ধারারই প্রত্যেক প্রবক্তাকে জিজ্ঞেস করা, তার রাজনৈতিক ধারার বিরোধীদের প্রতি তার মনোভাব কী? যারা তার বিরোধী বা ‘অপর’, তাদের তিনি কিভাবে দেখেন? যারা তার আইডিয়া বা বয়ানের সাথে একমত হবে না, একমত নয় বলে জানাবে, তাদেরকে তিনি কী করবেন? কোথায় রাখবেন?
প্রথমে কমিউনিস্ট ধারা- দেখা যাক এ ক্ষেত্রে কী বের হয়। এরা বলবে, লিবারেল স্পেস, সেটা  আবার কী? সমাজ মাত্রই শ্রেণী বিভক্ত সমাজ। শ্রেণী বিভক্ত সমাজে, শ্রমিক-কৃষক শ্রেণীর প্রতিনিধি হয়ে আমরা এখন ক্ষমতায় আছি (অথবা যাব)। আমার বিরোধী ‘অপর’ মানে, সে তো আমার শ্রেণী-শত্রু। তাকে আবার ‘লিবারেল স্পেস’ দেয়ার কী আছে? বরং শত্রু-শ্রেণীকে দাবড়ের উপর তটস্থ রাখাই তো আমার কাজ। সঠিক শ্রেণী সংগ্রাম। অর্থাৎ লিবারেল স্পেস বলে ছোটখাটো ছলনা অথবা অবাধ ও লিবার্টিতে মুক্ত দাবি করে বড় কোনো ছলনা – কমিউনিস্টরা এমন কোনটারই ধার ধারতে চায় না। এ জন্য এদেরকে ঘোষিত ‘নো লিবারেল স্পেস’ ধারা গোত্রের বলা যায়।
এবার পশ্চিমা লিবারেল গণতন্ত্রের ধারা- এর ক্ষেত্রে দেখা যাক। প্রথমত এরা বলবে মানে ভুয়া হলেও দাবি করবে, আমার সব ‘অপরই’ মুক্ত। ওরা মুক্ত থাকবে; আমাকে সমালোচনা ও প্রতিবাদ করবে, মানি না বলে স্লোগান দেবে, আমার বিরুদ্ধে আর্টিকেল লিখবে- কোনো অসুবিধা নেই। কেবল একটা খালি ‘কিন্তু’ আছে। সেটা হল, খালি আমি যদি বুঝি যে, ওরা আমার ক্ষমতার জন্য বিপদ, আমাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে বা করছে, তাহলে কিন্তু রাষ্ট্রের আইনে থাকুক আর না-ই থাকুক, আইন ছাড়াই অথবা নতুন আইন বানিয়ে নিয়ে (আমেরিকায় যেমন প্যাট্রিয়ট ল, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইত্যাদি এবং বাংলাদেশে বিশেষ ক্ষমতা আইন) অথবা নানান নিবর্তনমূলক নির্যাতনের আইনের মাধ্যমে আমি তাদের কোনো ধরনের খাতির না করে,  একেবারে নির্বিশেষে সরাসরি নির্মূল করব। দেখা যাচ্ছে, এরা প্রকৃতপক্ষে লিবারেল না, বরং কিছু শর্তসাপেক্ষে লিবারেল। অবশ্য মুখে এরা দাবি করে যাবে, তারা অবাধ ও লিবারেল।

এবার পরের ধারার যাবার আগে বর্তমান সরকারকে একটু মূল্যায়ন করা যাক। উপরের দুই ক্যাটাগরি অনুসারে বর্তমান সরকারকে  কোন ক্যাটাগরিতে ফেলব? অবশ্যই প্রথমটা। তবে একটা জায়গায় একটু বদল হবে। কমিউনিস্টদের বেলায় তারা বলে তারা শ্রমিক-কৃষক শ্রেণীর ক্ষমতা। এখানে সে জায়গায় হবে – মুক্তিযোদ্ধা-শ্রেণী অথবা চেতনা-শ্রেণীর ক্ষমতা। যেমন সরকার বলছে এই সরকারের চেতনার মানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার। ফলে এই শ্রেণীর অথবা সরকারের বিরোধী বা শত্রু যারা, তারা তাহলে রাজাকার। ক্ষমতাসীন সরকারের দৃষ্টিতে এই সরকারের বিরোধী বা ‘অপর’ যারা তারা যেহেতু রাজাকার অতএব তাদের তাদের দমন ও দাবড়ে রাখাই তো সরকারের কাজ। অতএব তাদের জন্য আবার স্পেস কী?

এবার ইসলামি ধারার ক্ষেত্রে দেখা যাক- বাংলাদেশে হয়ত অনেককে পাওয়া যাবে, যাদের এমন ধারার ক্যাটাগরিতে ফেলা যায়। কিন্তু সবার আগে একটা কথা বলে নেয়া দরকার। এই রচনার পুরো অংশজুড়ে এটা ধরে নেয়া হয়েছে যে, এখানে ক্ষমতা বলতে, গণ-আন্দোলনের পথে বা কনষ্টিটিউশন মেনে নির্বাচিত হতে – এভাবে ক্ষমতা পেতে যারা আগ্রহী তাদেরকেই ধরে নেয়া হয়েছে। যেসব ক্ষমতা কনষ্টিটিউশন মেনে নির্বাচিত নয়, সেগুলো নিয়ে আলোচনার সুযোগ এই রচনার বাইরে। তাই নির্বাচিত ক্ষমতাগুলোর ক্ষেত্রে সবার সাধারণ দিকটি আমল করে কথা বলব। এদের অনেকে হতে পারে যারা নিজের রাজনীতি ইসলামি বলে মনে করে ও দাবি করে। এখন তারা যদি নির্বাচিত হয় তবে নিজেদের ক্ষমতাকে তাদের কেউ কেউ ইসলামি ক্ষমতা বা ইসলামি শাসন বলে দাবি করবে। অবশ্য কেউ কেউ নাও করতে পারে। তবে যারা তাদের ক্ষমতাকে আল্লাহর শাসন বা কুরআনের শাসন বলে দাবি করবে, তাদের কথা বলছি। নির্বাচিত নিজের ক্ষমতাকে আল্লাহর শাসন অথবা ইসলামি রাজনীতির শাসন বলার বা দাবি করার ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা আছে। কারণ, যেকোনো ক্ষমতা মাত্রই কেউ না কেউ এর বিরোধিতাকারীও হবে, থাকবেই এবং এটা স্বাভাবিক। জটিলতা দেখা দেবে সে ক্ষেত্রে। এ জন্য যে, ওই নির্বাচিত ক্ষমতার বিরোধিতা করলে সেটা আল্লাহর শাসন বা কুরআনের শাসনের বিরোধিতা করা হচ্ছে কি না, এই প্রশ্ন উঠতে পারে। অথচ যে বিরোধিতা করছে, তার এমন কোনো সচেতন ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য না-ও থাকতে পারে। ফলে একটা জটিলতা দেখা দেবে। তাই এ দিকটি নিয়ে ভাবার দরকার আছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা পুর্ব-পাকিস্তানের বৈষম্য-বিরোধী যে কোন বক্তব্য বয়ানকে নিজেদের শাসনের বিরোধী ফলে তা ইসলামি রাজনীতির বিরোধী বলে পাল্টা প্রপাগান্ডা হাজির করত। স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি ইসলামি শাসনের বিরোধীতা বলে চিনানোর চেষ্টা করত। এটা কনষ্টিটিউশনে কী লেখা আছে বা ছিল সে মামলা নয়। যেমন বর্তমানে কনষ্টিটিউশনে যাই লেখা থাক ফ্যাক্টস হল, বাস্তবে এই ক্ষমতার বিরোধী হবার সুযোগ খুবই সীমিত। একইভাবে নিজেকে ইসলামি ক্ষমতা বলে দাবি করতে চায় যারা তারা নিজেদের সম্ভাব্য ক্ষমতার বিরোধী বা সমালোচককে কিভাবে দেখা হবে, এই প্রশ্নেও চিন্তা করার দরকার আছে। ইসলামি রাজনীতিতে লিবারেল স্পেস ধারণা নিয়ে খুব বেশি চিন্তাভাবনা করা হয়নি। এটা করা উচিত। পুরনো উদাহরণ যেগুলো আছে, সেগুলোর বেশির ভাগই ‘নো লিবারেল স্পেস’ ক্যাটাগরির।

পাবলিক পারসেপশনে রাজনৈতিক দল
রাজনৈতিক দল কেমন হবে? একালের পাবলিক পারসেপশনে মানে – ঠিক বাস্তবের কথা নয়, বাস্তবে সেটা কী ঠিক তা নয় তবে পাবলিক সেটা সম্পর্কে কী মনে করে ধারণা করে। আবার পাবলিকের মনে আঁকা ছবিতে থাকা আকাঙ্খা বা গণ-অনুমিত আকাঙ্খাটা কেমন? সেটা বোঝার চেষ্টা করব। কিন্তু ‘একালের’ কেন? বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের পর থেকে রাজনৈতিক শাসনে এক বিশেষ ধারার বৈশিষ্ট্যের শাসন যুক্ত হয়েছে। অবশ্য মাঝের দুই বছর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক শাসন- এই ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে পপুলার ভাষায় বললে, একটা দ্বিদলীয় রাজনীতির শাসন শুরু হয়েছিল। আর এই দ্বিদল স্বীকার করে নিয়েছিল, লিবারেল স্পেস আছে বা রাখতে হবে। সেটা যেমন চেহারার বা ছলনার হোক না কেন, একটা লিবারেল স্পেসের ধারণার অন্তত মৌখিক স্বীকৃতি সেখানে ছিল।অবশ্য এটা হওয়া সম্ভব হয়েছিল, এর মূল কারণ হল সোভিয়েত ইউনিয়ন বা সোভিয়েত ব্লকের পতন। েই ঘটনার সাথে সম্পর্কিত করেই কেউ দেখতে পারে। তবুও ১৯৯১ সাল থেকে পরের তিন টার্মের বেশি আমরাও ক্ষমতার বিরোধীদের লিবারেল স্পেস আর দিতে পারিনি।
মাঝের দুই বছর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক শাসনে তো বটেই এবং এরপর থেকে যে শাসন খাড়া হল, তা যেন পরিকল্পনা করেই নিজেকে লিবারেল ‘স্পেস রাখার দরকার কী’ বলে সাজিয়েছে। “এর কোন দরকার নেই”- এই ধারার ক্ষমতা হিসেবে নিজেকে হাজির করেছে। বিশেষত ২০১৪ সাল থেকে তৈরি করা ক্ষমতা। আগেই বলেছি এটা কমিউনিস্ট উদাহরণের ‘নো লিবারেল স্পেস’ ধারণাটিকে অনুসরণ করে বেড়ে উঠেছে। যার ভয়ানক জায়গা হল, যারা ‘চেতনার বিরোধী’, তাদের জন্য আবার সরকার বিরোধিতার অধিকার বা ‘লিবারেল স্পেস কী’- এই ধারণার ওপর দাঁড়ানো।

অনেকের মনে হতে পারে আমি ১৯৯১ সাল কেন রেফারেন্স হিসাবে টানছি? এরশাদের পতন আর এরপর পরপর তিনি নির্বাচিত সরকার গঠন হয়েছিল – সেজন্য। এককথায় বললে শুধু সেজন্য তা একেবারেই না। আরও বড় গ্লোবাল পটভুমি একটা আছে। পুরান সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯৯০ সাল থেকেই নিজেই ভেঙে যাওয়ার এক প্রক্রিয়া শুরুর ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। যা আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায় ১৯৯২ সালে। ফলে শুরু থেকেই এর আর আগের নিজ প্রভাবিত দুনিয়া অংশকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় এর মুঠি আলগা হতে শুরু করেছিল। আর এর ফলে আমেরিকা এক মেরুর এক দুনিয়া পেয়ে যায়। ফলে এটাই আমেরিকার পক্ষে এবার দুনিয়ায় নতুন করে (সামরিক শাসন দিয়ে সরকার চালানোর বদলে ) “লিবারেল দ্বিদলীয় শাসনের” সূত্রপাত করার মতো নতুন শর্ত হিসেবে উপস্থিত হয়। আমেরিকা সেটাকে আমল করে কাজে লাগিয়ে বাস্তব করে তুলেছিল। আমাদের মতো দেশে এরই মধ্যে আবার এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত জনগণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এখান থেকেই একালে রাজনীতি সম্পর্কে পাবলিক পারসেপশনে বা গণ-অনুমিত আকাঙ্ক্ষাটা হলো রাজনৈতিক দলমাত্রই সেটা তো এক ‘লিবারেল’ দলই হবে। আমাদের পপুলার ভাষায় ভোটের রাজনীতির দল।

অন্য আর একটা বিষয়, কনষ্টিটিউশনাল রাজনৈতিক দল, বা আইনী রাজনৈতিক দল কথার মানে আসলে কী? কথাটাকে বুঝতে হবে মোটা দাগে রাজনৈতিক দল দুই ধরণের হয়। মানে তার ঘোষিত লক্ষ্য হাসিলের জন্য শুরু থেকেই সশস্ত্র অথবা নিরস্ত্র পথের দল হতে হয়। নিরস্ত্র পথের দল মানেই ‘মাস লাইন’ বা গণ-আন্দোলনের দল। এই ‘মাস লাইন’ বা গণ-আন্দোলনের দলকেই কনষ্টিটিউশনাল রাজনৈতিক দল, বা আইনী রাজনৈতিক দল বলা যায়। কারণ সে সশস্ত্র নয় বলে অন্তত কৌশল্গত কারণে আর দলের লিখিত দলিলে সে ঐ দেশের কনষ্টিটিউশন মেনে চলে। সম্ভব হয়। তাই এটাকে আইনি দল বলা যেতে পারে। সশস্ত্র দল মানেই তা কনষ্টিটিউশনের চোখে বেআইনি দল হবেই। সে হিসাবে যেমন, সর্বশেষ ৮০’র দশকেও কমিউনিস্টদের মধ্যে রাজনৈতিক তর্কের এক বড় ইস্যু ছিল পার্টি কেমন হবে ‘মাস লাইনের’ না ‘সশস্ত্র লাইনের’। একালের ভোকাবুলারিতে ‘মাস লাইন’ কথাটাও পরিচিতি হারিয়ে ফেলেছে। এখন অচল, হারিয়ে যাওয়া ধারণা। ইংরেজি রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘মাস’ মানে, জনগণ বা ‘গণ’ বলতে যা বুঝি তাই। তাই মাস লাইন মানে হল, দলকে আগানোর জন্য দলের তৎপরতা ‘গণ-আন্দোলনে’ সংগঠিত করে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে আগাবে। সবকিছুই হবে প্রকাশ্য তৎপরতার মাধ্যমে; জনগণকে আকৃষ্ট করে সরাসরি অংশগ্রহণ করানোর এক প্রকাশ্য ‘পপুলার উইল’, ‘রাজনৈতিক পরিসর’ ‘কমিউনিটি’  তৈরি করার মাধ্যমে। এমন দলকে কনস্টিটিউশনাল দলও বলা হয়। কারণ অন্তত মুখে ও পার্টির প্রকাশ্য কাগজপত্র দল দেশের কনস্টিটিউশন মানে বলে স্বীকার করে সে তৎপর থাকে। এছাড়া মনে বা রাজনৈতিক চিন্তায় যাই থাক, সে ভাব ধরে যে, উপস্থিত রাজনৈতিক শাসন ক্ষমতাকে সে চ্যালেঞ্জ করছে না। ফলে লিবারেল স্পেসে নড়াচড়া তৎপরতার সুযোগ সে চায় এবং পায়। এমনকি নির্বাচন কমিশনে দলের নাম রেজিস্ট্রেশন নেয়ার সুযোগও নিয়ে থাকতে পারে। তবে চলতি হাসিনা সরকারের আমলে এ লিবারেল স্পেস ক্রমেই নাই হতে চলেছে।

তবে একালের পাবলিক পারসেপশন বা গণ-আকাঙ্ক্ষায় এটা এখন স্পষ্ট- জনগণের আকাঙ্খা হল, আপনি যে ধারার রাজনীতি নিয়ে আসেন না কেন – একটা লিবারেল স্পেস দেওয়ার বিষয়টা আপনার রাজনৈতিক চিন্তার প্যাকেজে থাকতেই হবে। লিবারেল স্পেস থাকা বিষয়ে জনগণের আকাঙ্খা এবং পারসেপশন আপনাকে পুরণ করেই একমাত্র আপনি হাজির হতে পারেন। চিন্তার একটা লিবারেল স্পেস থাকতেই হবে। লিবারেল স্পেসে নড়াচড়া, তৎপরতার সুযোগ থাকতেই হবে, এ আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে উঠছে ক্রমেই।

আসলে আপনি আপনার ক্ষমতার বিরোধীকে কী করতে চান, বিরোধী অপরের বিরোধিতা কীভাবে মোকাবিলা বা হ্যান্ডেল করতে চান সেকথা আপনাকে আগাম বলতেই হবে। আর এর ভিতর দিয়েই আপনার চিন্তা-রাজনীতি কেমন – তা ধরা পড়ে যাবে। আপনাকে চিনা যাবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ০৮ অক্টোবর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার নতুন কিছু সংযোজন ও এডিট করে আবার ছাপা হল। লেখাটা এরও আগে একেবারেই ভিন্ন কোণ থেকে গত বছর দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশেও ছাপা হয়েছিল।   ]

চীনা প্রেসিডেন্টের সফরঃ গভীর সমুদ্রবন্দরের কী হবে

চীনা প্রেসিডেন্টের সফর

গভীর সমুদ্রবন্দরের কী হবে

গৌতম দাস

১৬ অক্টোবর ২০১৬, রবিবার
http://wp.me/p1sCvy-1RU

[লেখাটা গত ১৪ অক্টোবর শুক্রবার চীনা প্রেসিডেন্টের সফরের দিনেই লেখা। তবে খুব সকালে বসে লেখা যখনও তিনি ঢাকায় অবতরণ করেন নাই। অর্থাৎ এটা চীনা প্রেসিডেন্টের সফর-পুর্ব সময়ে লেখা। কী আশা করা যেতে পারে, এই সফরে কী হতে পারে ইত্যাদি চিন্তা করে লেখা। সফর শেষের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন, কিছুটা যা অনুমান করা গিয়েছিল তাই। সেসব নিয়ে আর একটা লেখা লিখতে হবে। আজ এই সফর-পরবর্তি পরিস্থিতিতে বসে আপাতত সফর-পুর্বের লেখা মনে রেখে এ’লেখা পড়তে হবে।]

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। চীনের প্রেসিডেন্টের এই সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সরকারের উৎসাহ ও প্রচার ছিল লক্ষণীয়। যার অন্তর্নিহিত বার্তা সম্ভবত এই যে ১. অনির্বাচিত ভাবে ক্ষমতায় থাকা বর্তমান সরকার দেখাতে চায় যে চীনা প্রেসিডেন্টের মত গুরুত্বপুর্ণ ও ক্ষমতাধর বাংলাদেশে এসেছে, অতএব আমার স্বীকৃতির প্রসঙ্গ এতে অনেকটাই কেটে গেছে।  আর ২. বর্তমান সরকার ভারত-নির্ভরশীল ও ভারতের গভীর সমর্থনের উপর দাঁড়ানো হলেও সরকার চীনের প্রেসিডেণ্টের এই সফরের গুরুত্ব বুঝেছে ও গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই কি? খুব সম্ভবত তা নয়। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় থেকে যেভাবে হঠাৎ করে গভীর সমুদ্রবন্দর ইস্যুতে সরকার থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল কারণ ভারত চাইছে সরকার দূরে থাকুক; সে থেকে ‘চীনকে দূরে রাখতে হবে’ বলে একধরনের ‘চীন-শীতলতা’ আমরা দেখে আসছিলাম, সে অবস্থান কী হিলেছে? নাই? হিসাব পরিবর্তিত হয়ে গেছে এবং তাও ভারতের কোন স্বার্থেই- তাই কী? এর স্পষ্ট চিত্র বুঝতে আর একটু অপেক্ষা করতে হবে। ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিডিয়ায় বক্তব্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফর থেকে আমাদের সরকার বিশেষ আশাভরসা নিয়ে অপেক্ষা করছে, তা আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। তবে এটা সরকারের ভারত নির্ভরশীলতাকে ছাপিয়ে চীনা প্রেসিডেন্টের সফরকে গুরুত্ব দেয়া হিসেবে পাঠ করার অবস্থায় যায়নি- এটা মনে করাই সম্ভবত সঠিক হবে। যেমন একটা প্রশ্ন করে আগানো যাক, প্রায় মৃত গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প- সেটা সোনাদিয়া বা অন্য কোথাও যেখানেই হোক- তা কি এখনো জীবিত এবং এবারের সফরে বিনিয়োগ প্রকল্প স্বাক্ষরের তালিকায় আছে বা থাকবে কি? সোনাদিয়া হয়তো থাকবে না এটা আগাম ধরে নেয়াই যায়। তবে কী অন্য কিছু হতে পারে! আমাদের কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে। যদিও সে প্রসঙ্গে কিছু কথা স্পষ্ট করে এখনই বলে দেয়া যায়। তা হল, আসলে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর এবারের বাংলাদেশ সফরে বন্দর প্রসঙ্গে যদি কিছু না হয় তবে এই সরকারের আমলে কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর আর হচ্ছে না। বন্দরের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা – এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে কথাটা বুঝে বলা।  কারণ কথা হল, এমন সম্ভাব্য বন্দর নির্মাণ প্রকল্পে চীন সরকার জড়িয়ে থাকলে একমাত্র তবেই হবু বন্দরের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বজায় থাকবে, নইলে নয়। কারণ একা চীনই বড় ব্যবহারকারী হবে। দেশটি ল্যান্ড-লকড দক্ষিণ-পূর্ব দিককে সমুদ্র পর্যন্ত উন্মুক্ত করতে সড়ক ধরে এসে বন্দর ব্যবহারের জন্য  চীন খুবই আগ্রহী। আর তা করতে চীনের একারই এক গভীর সমুদ্রবন্দর দরকার। আর চীনের ব্যবহারের ভলিউম এতই বিরাট হবে যে, একা চীনই সে বন্দর ব্যবহার করে বিনিয়োগ তুলে আনার দেয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে। সে তুলনায় ব্যবহারকারী হিসেবে ভারতের থাকা না থাকাটা অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার দিক থেকে প্রভাবহীন ফলে অগুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত বড় কোনো ব্যবহারকারী নয়। ফলে ঠিক এই কারণে চীনকে ব্যবহারকারী হিসেবে বাইরে রাখা কথাটার সোজা অর্থ বাংলাদেশের কোন গভীর সমুদ্র বন্দর না হতে দেওয়া। অন্য ভাষায় চীন ছাড়া এক্সক্লুসিভ ভারতের ইচ্ছায় গভীর সমুদ্রবন্দর পায়রায় হওয়ারও সম্ভাবনা নাই। কারণ একক ব্যবহারকারি  যদি ভারত হয় সেক্ষেত্রে ঐ হবু বন্দরের বিনিয়োগ তুলে আনা অসম্ভব। ফলে এক্ষেত্রে আগ্রহী বিনিয়োগকারী খুঁজে পাওয়ার সমস্যাও দেখা দিবে। আর অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা দুর্বল হলে সেই সমস্যা আরো বেশি। সারকথায়, একা চীন ও বাংলাদেশ ব্যবহারকারী হলেই বাংলাদেশে কোন গভীর সমুদ্রবন্দরের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার (বন্দরের আয় থেকে বিনিয়োগ ফেরত আনা) জন্য তা যথেষ্ট হবে। কিন্তু একা ভারত ও বাংলাদেশ ব্যবহারকারী হলে তা যথেষ্ট হবে না। ওদিকে আবার বন্দর বিষয়ে ভারতের অবস্থান হল, সে চায় না চীন ব্যবহারকারী বা বিনিয়োগকারী কোনোটা হিসেবেই এই প্রকল্পে জড়িয়ে থাকুক। এই অবস্থায় মিডিয়ার অনুমিত ভাষ্য হল, এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী হাসিনার গত চীন সফরের সময় শেষ মুহূর্তে বন্দর বিষয়ে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। নিজ সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতের সমর্থন নির্ধারক বিবেচনা করে বলে অতএব ভারতের এই ইচ্ছা-স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়া এই সরকারের জরুরি। এই বিচারের জায়গায় বসে দেখলে বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর এই সরকারের আমলে হওয়ার সম্ভাবনা নাই। যদি না ইতোমধ্যে নতুন কিছু ডেভেলপমেন্ট না থাকে। অর্থাৎ ওপরে যেটা বলেছি, ইতোমধ্যে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিডিয়ায় বক্তব্য এই অর্থে ‘নতুন কিছু ডেভেলপমেন্ট’ দেখা দিয়েছে কি না সে সন্দেহ রাখা যায়। আগামীকালের মধ্যে তা স্পষ্ট জানা যাবে আশা করা যায়। প্রথম আলো লিখেছে, প্রেসিডেন্ট শি এর সফরে নাকি ২৯টি বিনিয়োগ প্রকল্প আছে যার মোট পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন ডলার – যা আলোচনার টেবিলে আছে। কিন্তু কী কী সেই প্রজেক্ট তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে তারা উল্লেখ করতে পারেনি।
এ ছাড়া আর একটা সম্ভাবনা আছে। প্রথম আলো লিখছে, “শি জিনপিংয়য়ের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ বা ওবোর নামে পরিচিত উন্নয়ন কৌশল ও রূপরেখায়” বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হতে সম্মতি জানালে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো গড়তে ‘চীনের সিল্করোড ফান্ড (এই উদ্যোগে যুক্ত দেশগুলোর জন্য চীনের সরকারি বিনিয়োগ তহবিল) থেকে স্বল্পসুদে ও সহজ শর্তে ঋণ’ পাবে। কিন্তু প্রথম আলো যা জানায়নি তা হল, কোনো গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিকল্পনা সাথে যদি সংযুক্ত না থাকে তাহলেও কি চীন ওই সিল্করোড ফান্ড উন্মুক্ত করবে? এটাই খুবই নির্ধারক প্রশ্ন? বাংলাদেশ মাতারবাড়ি বা অন্য কোথায় চীনকে গভীর সমুদ্রবন্দর করতে দিতে রাজি হলে বা উভয়ে একমত হলে তবেই বিড়ালের ভাগ্য এসব শিকা ছিঁড়বে, তা আগেই বলে দেয়া যায়।

কোল্ড ওয়ারের কালের (১৯৫০-৯২) গ্লোবাল অর্থনীতি থেকে এ কালের গ্লোবাল অর্থনীতি বা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম মৌলিকভাবে আলাদা। যেমন, একালে একই চীনের সাথে ভারতের ব্যবসা বিনিয়োগ লেনদেনের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ গভীর ও ভালো বটে। কিন্তু আবার আগামীতে অন্য সম্ভাব্য কোনো রাষ্ট্রের সাথে ভারতের যুদ্ধ লাগার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি কার সাথে ভারত দেখে  – এই বিচারে সেই নামের তালিকায় এক নম্বরে আছে চীন। এটাই একালের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিশেষ আলাদা বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ভারতের মিডিয়া – তারা এই আলাদা বৈশিষ্ট্য আমল করার যোগ্য এর প্রমাণ রাখতে পারে নাই। ফলে চীনের সাথে ভারতের বৈরিতা, সম্ভাব্য যুদ্ধ বা শত্রু কেবল এই দিকগুলো প্রবলভাবে সবসময় তারা হাজির করে থাকে এবং কোল্ড ওয়ারের সময়ের চশমায় দেখা  -বিরোধ ভাবনা বা জাতীয়তাবাদ ভাবনা মাথায় রেখে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা চালিয়ে থাকে। যেন আমরা কোল্ড ওয়ার সময়ে বসবাস করছি।
ভারতের মিডিয়ায় বিষয়গুলো এতই প্রকট যে চীনের মিডিয়ারও তা নজর এড়ায় নাই। প্রেসিডেন্ট শি-এর সফর উপলক্ষে ভারতের মিডিয়াকে কিছু হেদায়েত করার কথা খেয়াল করে চীনের সরকারি এক মিডিয়া ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকায় গত ১২ অক্টোবর একটা কলাম ছাপা হয়েছে। ওর শিরোনাম হল, “India has nothing to fear from closer relationship between China and Bangladesh” – অর্থাৎ চীন-বাংলাদেশের কাছাকাছি আসা এই সম্পর্কের দিকে তাকিয়ে ভারতের ভীত হবার কিছু নাই। আর এই উপসম্পাদকীয় বা কলাম নিয়ে ভারতের প্রায় সব দৈনিকে একটা করে রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। গ্লোবাল টাইমসের কলামের সার কথা হল, ভারতীয় মিডিয়ার খামোখা চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা আর কোল্ড ওয়ার যুগের সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদ যা একালে অকেজো- এসব প্রচারকে নাকচ করে এমন কিছু মৌলিক তথ্য সে হাজির করতে চায়। সেজন্য ওই কলামের প্রথম বাক্যের চতুর্থ শব্দ হল, ‘মিসকনসেপশন’ অর্থাৎ মিথ্যা ধারণা কাটানো। কিন্তু গ্লোবাল টাইমসের এই উদ্যোগ সত্ত্বেও ভারতের প্রত্যেকটা মিডিয়া তাদের রিপোর্টে এই শব্দটা বাদ দিয়ে আর সব শব্দ দিয়ে তাদের পুরনো মিথ্যা ধারণাগুলোকেই আবার পুষ্ট করেছে।
যেমন এনডিটিভি সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে ‘জেলাস’ (ইংরেজি জেলাস, বাংলায় ঈর্ষা) শব্দের ওপর। শব্দটা কলামের শেষ দুই প্যারায় ছিল। তবে তা কিছুটা তামাশা করে বা মজা করে লেখার স্বার্থে। ওই দুই প্যারা, সারকথায় বললে, বলছে, ‘বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা দেখে ভারতের ঈর্ষা করার কিছু নাই। কারণ এই সম্পর্ক বাড়লে এর অবকাঠামোগত সুবিধার ভাগ এই অঞ্চলের সবাই তথা ভারতও পাবে।’ ফলে “এ দিকটা আমল করে ভারত যদি চীনের সাথে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করতে নিজে চাপ অনুভব করে, সে আলোকে এই অঞ্চলে নিজের স্ট্র্যাটেজি পুনর্মূল্যায়ন করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে বিশেষ করে ভারতের গোয়ায় আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে”, তবে সেটা বাড়তি পাওনা হবে। অর্থাৎ ‘ঈর্ষা’ শব্দটা এখানে ঠিক নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হয় নাই। যেমন ‘ভারতের স্ট্র্যাটেজি বদলানো উচিত’ এভাবে বাক্যটা লেখা হয় নাই। বরং বলা হয়েছে ‘ it would not necessarily be a bad thing’,  – অর্থাৎ ‘হলে খারাপ হয় না’ অথবা ‘সেটা বাড়তি পাওনা হবে’- এমন কথা বুঝানো হয়েছে। আর আসলেই তো তাই। কারণ এই সফরে যে অবকাঠামো বিনিয়োগ ঋণচুক্তির কথা বলা হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের প্রস্তাব হল, নির্মীয়মান পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে নতুন যশোর-ঢাকা রেল যোগাযোগ প্রকল্প, এখানে চীনের কাছ থেকে সরকার বিনিয়োগ আশা করছে। আর এই যোগাযোগ করিডোর অবকাঠামো ভারতকে দেয়ার জন্যই। ফলে চীন-বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বিনিয়োগ সম্পর্কের সুবিধা তো ভারতের স্বার্থেই।
ওদিকে আনন্দবাজার পত্রিকা এই সফর উপলক্ষে শিরোনাম করেছে স্বভাবসুলভ ‘জবরদস্তি করে পাকিস্তান বিরোধিতা দিয়ে’। তারা শিরোনাম লিখেছে, “ঢাকা সফরে আসছেন চিনা প্রেসিডেন্ট, মহা উদ্বেগে পাকিস্তান’।  বাংলাদেশে চীনের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ (বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নয়, কম সুদের ঋণ চুক্তি) খুব বড় নয়। চার লেনের সড়ক অথবা বিদ্যুৎ উতপাদন ইত্যাদি যা আছে তা চীনের বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং ঠিকাদার কোম্পানী – এরাই বেশি। কিন্তু এসব নিয়ে পাকিস্তানের উদ্বেগ – এটা খুবই আজব কথা। অমিত বসুর ঐ পুরা লেখায় পাকিস্তানের উদ্বেগ কী তা নিয়ে কিছুই লেখা হয় নাই। পুরা ঘটনা কাশ্মীর নিয়ে। মানে ভারত-পাকিস্তানের কাশ্মীর ইস্যুতে। অযথা কাশ্মীরের কথা টেনে একবার লেখা হল,  “… আগুন কত দূর ছড়াবে স্পষ্ট নয়। অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে ১৪ অক্টোবর দু’দিনের বাংলাদেশ সফর চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর”।  কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের টেনশন থাকতে পারে কিন্তু এর সাথে চীনের প্রেসিডেন্টের সফপ্রের সম্পর্ক কী? আর বাংলাদেশেরই বা কী? আবার চীনা প্রেসিডেন্ট তো কেবল বাংলাদেশেই আসছেন না। তিনি বাংলাদেশ সফর শেষে এখান থেকে ভারতের গোয়ায় যাচ্ছেন। মানে অমিত বসুর “মেরা ভারত মহান” – সেই ভারত সফরেই তো যাচ্ছেন। তো সেক্ষেত্রে কেবল বাংলাদেশ সফরকে খোচা দিয়ে বা বাকা চোখে তুলে ধরার অর্থ কী? চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশের সফর যদি ভারতের স্বার্থের বিরোধী হয় তাহলে ঐ একই চীনা প্রেসিডেন্টের খোদ ভারত সফর – এটাকেও কী চোখে দেখা হবে? এখানে সফরকে খোচা দিয়ে বা বাকা চোখে দেখা হবে না কেন? আর যদি না থাকে তাহলে চীন একই সাথে ভারতের বন্ধুও। তাহলে ভারতের বন্ধু বাংলাদেশে আসলে ভারতের চোখ টাটানোর কী আছে? বা থাকতে পারে? রাস্তার ধারের চা দোকানে বসে আমরা অনেককে বিরাট দিগগজের মত রাজাউজির মারতে দেখি। অমিত বসুর এসব আলাপ মানের দিক থেকে এর চেয়েও নিচে। চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরে  “পাকিস্তানের উদ্বেগ” দেখেছিলেন অমিত বসু। লেখার ভিতর পাকিস্তানের উদ্বেগ কী নিয়ে এর কোন হদিশ না দিয়ে শেষ প্যারায় লিখছেন, “এই সব টানাপড়েনের মধ্যেই জিনপিংয়ের ঢাকা সফর নিয়ে কিন্তু ঘোর চিন্তায় পাকিস্তান। যে চিনকে দাদা বলে নিজের অপকর্ম চালিয়ে যেতে চাইছে পাকিস্তান, সেই চিন কিনা শত্রু বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ বাড়াচ্ছে! ঢাকার সঙ্গে বেজিঙের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি মানেই তাদের ক্ষতি, এটা হাড়ে হাড়ে বোঝে ইসলামাবাদ। তাই উদ্বেগ তো হবেই”। আচ্ছা,  “ঢাকার সঙ্গে বেজিঙের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি মানেই তাদের ক্ষতি” – মানে পাকিস্তানের ক্ষতি কেন কোথায় কীভাবে? এটা আসলে ভারতের পাকিস্তানবিদ্বেষ, যেটা বাংলাদেশের ঘাড়েও জবরদস্তিতে আছে বলে দাবি করা ছাড়া আর কী? রাষ্ট্রীয় শত্রুতা বলতে যা বুঝায় তা পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু তাই বলে পাকিস্তান-বাংলাদেশের সম্পর্ক এটাও কী তাই? এখানে বিরোধ, মনোমালিন্য আছে,  ঘনিষ্টতা নাই – এটাই সত্য। ভিন রাষ্ট্র মাত্রই কমবেশি তা থাকে। যেমন চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে আসছেন। তো চীনের সাথে কী বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধ নাই? অবশ্যই আছে। দগদগে ভাবে আছে। সব রাষ্ট্রই নিজের আপন আপন স্বার্থের যায়গা থেকে অবস্থান নিবে। সেখানে কেবল যেখানে যেখানে স্বার্থ কমন হয়ে এবং সময়ে তা দেখা দিবে কেবল সে ইস্যুতে ঘনিষ্টতা। এর চেয়ে বেশি কেউ কারও স্বার্থের পক্ষের কেউ না।   কিন্তু পাকিস্তান-ভারতের মত পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় শত্রুতা বাংলাদেশের নাই। অমিত বসুর ধারণা তাঁর ন্যারো পেটি আর অহেতুক ইর্ষার চোখ দিয়ে সবাইকে মানে আমাদেরকেও সব দেখতে হবেই।

তো চীনা মিডিয়া জানে ভারতের মিডিয়া জুড়ে এসব অমিত বসুদের সংখ্যাই বেশি। সেকথা মনে রেখে গ্লোবাল টাইমস পত্রিকা ‘চীন বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে ভারতের ভয় পাওয়ার কিছুই নাই’ শিরোনামে লেখা ছেপেছিল। এরপর প্রথম প্যারাতে বলা হয়েছে, ভারতের একটা মিসকনসেপশন আছে যে ‘ভারতের সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে চীন অখুশি’। গ্লোবাল টাইমসে – মিসকনসেপশন বলে – এই ধারণাকে নাকচ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় প্যারায় বলা হয়েছে, ‘ভারতের অনেকের ধারণা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়েএর সফর যেন ভারতের কোল থেকে বাংলাদেশকে ছিনিয়ে নেয়ার সফর।’ বলা হয়েছে এমন ধারণাগুলোও ভিত্তিহীন। এমনকি, “চীনের ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পও যেন ভারতকে আটকে রেখে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা” – এটাও ভিত্তিহীন। “ওদের জানা উচিত এই প্রকল্প উদ্যোগটা কেবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার না। বরং সাড়ে চার বিলিয়ন জনসংখ্যাকে ছুঁয়ে এবং মোট ৬৫টি রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে এই প্রকল্পের সড়ক বিস্তৃত থাকবে”। আর সবচেয়ে বড় কথা “এতে যুক্ত হওয়া না হওয়া- এই রুটে পড়েছে এমন সংশ্লিষ্ট যে কোন রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ নিজ ইচ্ছার ওপর তা নির্ভর করে”।
ফলে আসলেই এখানে জোড়াজুড়ির কিছু নাই। প্রভাবিত করার কিছু নাই। ভারতকে আটকে রেখে বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রিত করার কিছু নাই। বলা হয়েছে, চীনের প্রতি কোনো রাষ্ট্রের এই ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পে বড় করে আগ্রহ দেখালে তবেই একমাত্র চীন সেই রাষ্ট্রকে সিল্ক রুট ফান্ডে জড়িত করবে। যেমন কলকাতা থেকে বাংলাদেশ হয়ে, বার্মা হয়ে চীন- এই পথে (বিসিআইএম ইকোনমিক করিডোর) ভারত যুক্ত হতে চাইলে সেটা তার ইচ্ছা, নইলে নাই। কিন্তু এটা তো গেল ভারতের যুক্ত হওয়ার স্বার্থ ও ইচ্ছা। বাংলাদেশের স্বার্থ ও ইচ্ছা বোধ করলে তবেই। এই প্রকল্পে ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী মিডিয়াতে তার আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছেন। তবে খোদ চীনের বেলায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের কোথাও যুক্ত করা যায় এমন কোনো একটা গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকলে এই পথে চীনের আগ্রহী হওয়ার কিছু নাই, এ কথাও সত্য। সে ক্ষেত্রে ভারতের কী ইচ্ছা এর আর কোনো অর্থ নাই। বাংলাদেশেরও সিল্ক রোডে যুক্ত হওয়ার ইরাদার কোনো অর্থ নাই। ফলে চীনকে বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ থেকে রুখতে হবে, এ কাজে বাংলাদেশকে প্রভাবিত করতে হবে ভারতের এমন কাজ তৎপরতা আসলেই ভারতের পক্ষে যাবে কিনা তা ভারতকেই ভেবে চিনতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখানে ‘বাংলাদেশ যেন ভারতের, ফলে চীনকে দূরে রাখতে হবে’- এসব বাতুল অকেজো আলাপ দূরে রাখতেই হবে।

আজ রবিবার কিছু বাড়তি সংযোজন
চীনা প্রেসিডেন্টের সফর শেষ হয়েছে। তিনি ভারতের গোয়া রওনা দিয়েছেন সেখানে ব্রিকসের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিবার জন্য। এদিকে এই সফরে গভীর সমুদ্র বন্দর অথবা চীনের ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পে বাংলাদেশের যোগদান – এমন কোনটাতেই কিছুই অগ্রগতি নাই। কোন ব্রেক থ্রু নাই। অবস্থা আগের মতই, যেখানে ছিল। এসবের সার কথা  গভীর সমুদ্র বন্দর এই সরকারের আমলে হচ্ছে না, কোন সম্ভাবনা নাই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ অক্টোবর দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে ১৫ অক্টোবর) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার কিছু এডিট ও সংযোজন করে আবার ছাপা হল।]

নির্বাচনী সুবিধা নিবার স্বার্থে মোদীর কথিত অপারেশন

 নির্বাচনী সুবিধা নিবার স্বার্থে মোদীর কথিত অপারেশন

গৌতম দাস
০৪ অক্টোবর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1RL

গত সপ্তাহে লিখেছিলাম মোদি যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে গত ২৪ সেপ্টেম্বর কেরালার কোঝিকোড়ে শহরে জনসভায় জানিয়েছেন যে তিনি সামরিক যুদ্ধ বা যুদ্ধের কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রতিযোগিতা করতে চান না। বরং কোন দেশ কত বেশি উন্নয়ন করতে পারে, এর প্রতিযোগিতা করতে চান। ফলে সেই প্রতিযোগিতার আহ্বান জানাতে জনসভা থেকে তিনি পাকিস্তানের জনগণের উদ্দেশ্য করে নাম ধরে বক্তব্য রেখেছিলেন। অর্থাৎ যুদ্ধ বিষয়ে যেন তা লেগেই যাচ্ছে এইভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গরম কথা বলে মোদি নিজ জনগণকে আগে তাতিয়েছিলেন, শেষে কোঝিকোড়ে শহরের বক্তৃতায় সব উত্তেজনায় নিজেই ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়েছিলেন। স্পষ্ট করে বলেছিলেন যুদ্ধ নয়, তিনি উন্নয়ন চান। আর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘কূটনৈতিক ব্যবস্থা’ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর দিকে তিনি যাবেন না। ‘কূটনৈতিক ব্যবস্থা’ কথার অর্থ কী, সেটাও তিনি স্পষ্ট করেছিলেন। বলেছিলেন, পাকিস্তানকে তিনি ‘টেরোরিজমের’ অভিযোগে বড় প্রভাবশালী বা ছোট রাষ্ট্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন এবং আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে প্রচার চালিয়ে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন। এখন আমরা দেখছি “সার্জিক্যাল অপারেশনএর” নামে আবার এক বুঝরুকি। মোদীর প্রপাগান্ডার লড়াই, যা এখন উভয় পক্ষের দিক থেকেই প্রপাগান্ডার লড়াইয়ে পর্যবসিত হয়েছে।  অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে মোদী সবশেষে কোন সিরিয়াস যুদ্ধের দিকে যদি না-ই যাবেন, তিনি তা হলে গরম কথায় যুদ্ধের মত হুমকি দিয়েছিলেন কেন?
আমাদের ভুললে চলবে না, মূল ইস্যু ছিল ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন। যেটা এখন প্রায় ৮০ দিনের বেশি টানা কারফিউ এর সত্ত্বেও চলছে। ওদিকে কাশ্মিরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। ইসলামি ঐক্য সংস্থা গত মাসে ২১ আগষ্ট ২০১৬ শক্ত ভাষায় ভারতের সমালোচনা করেছিলেন । (OIC Secretary General Iyad Ameen Madani Monday expressed concern over the situation in Kashmir and called for an immediate cessation of atrocities by India, urging the Indian government for peaceful settlement of the dispute ‘in accordance with wishes of Kashmiri people and the UNSC resolutions’.।) বিগত ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নেয়া এক প্রস্তাব হল কাশ্মীরবাসী ভারতে থাকতে চায় কি না তা জানতে গণভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। ওআইসি সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নের দাবি জানায়েছিল।  ওআইসি কাশ্মীরের প্রতিরোধ লড়াইকে তাদের “আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের জন্য লড়াই” মনে করে, তাও জানিয়েছিলেন। কাশ্মীরের নিরস্ত্র গ-আন্দোলনের ধারার রাজনৈতিক দল হুরিয়াত কনফারেন্স। ওআইসির বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়ে তাদের বিবৃতির ভাষা ছিল আরও কড়া। তারা তুরস্ক সরকারের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং মিশন পাঠাবার সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়েছিল।  ওদিকে এ বিষয়ে জাতিসংঘে ভারত ও পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি পরস্পরের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কারণে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস সংগঠন হিউম্যান রাইট কাউন্সিল  দুই রাষ্ট্রের দুই কাশ্মির অংশেই সরেজমিন গিয়ে তদন্ত ও প্রত্যক্ষ দেখে যাচাই করে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পাকিস্তান ও ভারত উভয় সরকারের কাছে পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত জানিয়ে অনুমতি চেয়েছিল। জবাবে পাকিস্তান তৎক্ষণাৎ রাজি বলে জানালেও ভারত এখনো এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। ওদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং তা মিডিয়ায় আসা শুরু করেছিল এই বলে যে, ক্রসফায়ারের নামে গ্রাম ঘিরে তরুণ নেতা বুরহান ওয়ানিকে খুঁজে বের করে হত্যা করলে যে জনগণ কার্ফু ভেঙ্গে দাঁড়িয়ে যাবে – এ’সম্পর্কে ভারতের গোয়েন্দা বাহিনী কিছুই আগাম জানাতে পারে নাই। এখানেই এবং এ’ঘটনা থেকেই ভারতের কাশ্মিরে কেন্দ্রীয় সরকারের এক মারাত্মক গোয়েন্দা ব্যর্থতা ঘটেছে। এই ব্যর্থতার কারণেই কাশ্মিরের বহু জেলা শহর এখন প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নিয়মিত আনন্দবাজারের মতো পত্রিকা মোদি সরকারের কাছে এসব বিপদের দিক তুলে ধরেছিল। আর প্রতিদিন ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী মিডিয়া এই ব্যর্থতা নিয়ে সোচ্চার হচ্ছিল। ফলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠার আগে জনগণের দৃষ্টিকে ও মিডিয়াকে কাশ্মির থেকে সরানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করেছিলেন মোদি। তাই ভারতের সীমান্ত শহর উরির ব্যারাকে হামলায় ১৮ সেনা হত্যা – তা সে যেই ঘটাক, একে ইস্যু করে মোদি দৃষ্টি সরানোর কাজ করতে সফল হন। মিডিয়া ও জনগণ থেকে কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন বা লাগাতর কারফিউ কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটনার উল্লেখ এতে হাওয়া হয়ে যায়। নতুন প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে ‘ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ আসন্ন কি না’, আর ‘পাকিস্তান থেকে আসা কথিত জঙ্গি’ এসব হয়ে যায় মিডিয়ার মূল প্রসঙ্গ। এগুলোই যেনবা সব সমস্যার কারণ। এই দৃষ্টি ঘুরাতেই মরিয়া হয়ে যুদ্ধের হুমকির গরম বক্তৃতার আশ্রয় নিতে হয়েছিল মোদিকে।
কিন্তু তাতে ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায়  – ম্যালেরিয়া হওয়াতে রোগীকে কুইনাইন খাওয়ানো হয়েছিল। কিন্তু এখন কুইনাইনের প্রভাব প্রতিক্রিয়া শরীরে ছেয়ে মারাত্মক হয়ে গেছে, ফলে তা কমানো হবে কী দিয়ে? নিজেরই বাজানো ও ঝড় তোলা যুদ্ধের দামামা এখন কমাবে কী দিয়ে? অবস্থা দেখে খোদ বিজেপি-আরএসএসের কর্মীরাই নাখোশ, হতাশ হয়ে পড়েছিল। সব দিক বিবেচনা শেষে গত ২৪ সেপ্টেম্বরে নেতাকর্মীদের হতাশার মধ্যেই সবার আগে পাবলিক বক্তৃতায় ‘যুদ্ধ নয়, উন্নয়ন চাই’ আর ‘কেবল কূটনীতি হবে চরম পদক্ষেপ’ বলে নিজের মূল অবস্থান পরিষ্কার ও প্রচার করে নেন মোদী।

আর এর সাথে পরদিন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ মোদি নিয়েছিলেন। এক হল, সর্বদলীয় মানে সংসদের সব দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে ডাকা সভা থেকে নিজের ‘যুদ্ধ না, উন্নয়ন আর কূটনীতি’ নীতির পক্ষে উপস্থিত সবার সমর্থন নিয়ে নেন তিনি। দুই. তিনি সব মিডিয়ার কাছে ওই নীতির পক্ষে সমর্থন চান। স্বভাবতই তা অন্তরালে। এটি এক কমন ফেনোমেনা এবং চর্চা যে ভারতের জাতীয় ইস্যুতে বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ ইস্যুতে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো আর সরকারের প্রকাশ্য সমালোচনা বা বিরোধিতা করে না। এবং সেই সাথে সব মিডিয়াও সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তের পক্ষে প্রোপাগান্ডায় মেতে ওঠে। ফলে পরের দিন ২৫ সেপ্টেম্বর কেউ কেউ মোদির বক্তৃতার নেতি রিপোর্ট ও সমালোচনা করলেও ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ভারতীয় মিডিয়া মোদির ‘যুদ্ধ না, উন্নয়ন আর কূটনীতি’ নীতির পক্ষে অবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি একযোগে মোদী সরকারের পক্ষে সামলে নিয়ে আসতে শুরু করে। বলা যায়, দুই দিনের মাথায় পরিস্থিতি মোদির পক্ষে ঘুরে যায়। এ কাজে মিডিয়াও আবার সাহায্য নিয়েছিল কয়েকটি ইস্যুর। যেমন এক. আগামী সার্ক সম্মেলনে একসাথে চার সদস্য দেশের যোগদানের অনীহা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। চার দেশের যোগ না দিতে অনীহার কারণ আলাদা আলাদা ছিল। কিন্তু তা ভারতের কূটনৈতিক লবির কারণে একসাথে প্রকাশ হওয়াতে ভারতের অভ্যন্তরীণ ভোটার কনস্টিটোয়েন্সির কাছে ব্যাপারটাকে ‘মোদির প্রতিশ্রুতি কাজ করছে’ এটা সাফল্য হিসেবে হাজির করতে সক্ষম হয় ভারতীয় মিডিয়া। এ ছাড়া দ্বিতীয় ইস্যু ছিল, ভারত-পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সিন্ধু নদীর পানিবণ্টনের চুক্তি বাতিলের হুমকি। গত ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় নদীর পানিবণ্টন বিরোধ মিটিয়ে এই চুক্তিতে উপনীত হতে পেরেছিল এই দুই রাষ্ট্র। আসলে ভারত-পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী মোট ছয়টি। ওই চুক্তিতে প্রতিটি রাষ্ট্র তিনটি করে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ভাগ করে নেয়, যাতে প্রতি তিন নদীর পানিপ্রবাহের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব এক এক রাষ্ট্রের। এভাবে ওই চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছিল। উভয় পক্ষই এতে এত দিন খুশি ছিল, এখনো পানির পরিমাণ ও ভাগের দিক দিয়ে উভয়ই খুশি। কিন্তু একটি টেকনিক্যাল দিক আছে। তা হল, ওই ছয়টি নদীরই উজানের দেশ হল ভারত। অর্থাৎ ভাটির দেশ হল পাকিস্তান। সোজা কথায় প্রথমে ভারত হয়ে, এরপর ওইসব নদী পাকিস্তানে প্রবেশ করে। ঠিক বাংলাদেশের মত। ফলে নদীর পানিপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ করার ভূ-অবস্থানগত সুবিধাগুলো ভারতের পক্ষে। যদিও আন্তর্জাতিক নদী আইনে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ভাটির দেশকে প্রাপ্য পানিবঞ্চিত করা সম্পুর্ণ বেআইনি। কিন্তু মোদি ব্যাপারটিকে অন্তত প্রোপাগান্ডায় নেয়ার জন্য ওই চুক্তিকে রিভিউ বা পুনর্মূল্যায়ন করে দেখার জন্য সরকারি আমলা ও টেকনিক্যাল লোকদের প্রতি নির্দেশ জারি করেছেন। বাস্তবে ভারত এই চুক্তি ভঙ্গ ও অমান্য করবে কি না, বাঁধ অথবা কোনো বাধা তৈরি করবে কি না সেটা অনেক পরের ব্যাপার; কিন্তু ইতোমধ্যে মোদির ওই নির্দেশ ভারতীয় মিডিয়া ব্যাপক প্রচারে নিয়ে গেছে। মোদী হুশিয়ারী দিয়ে বলছেন, “রক্ত ও জল একসঙ্গে বইতে পারে না, হুঁশিয়ারি মোদীর”। ফলে সাধারণ ভারতীয়দের মনে মোদী যুদ্ধ করার উসকানি যতটা তাতিয়েছিল, তা অনেকটাই এবার প্রশমিত হয়েছে এতে। যদিও মিডিয়ার এক কোণে ভারতীয় টেকনিক্যাল লোক বা প্রকৌশলীরা মন্তব্য করেছেন, এই পানি নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব, কারণ এটি প্রবল খরস্রোতা ও খাড়া প্রবাহিত পাহাড়ি নদী। আবার পাকিস্তান থেকেও ওখানকার মিডিয়ায় পাল্টা হুঙ্কার দিয়ে বলা হয়েছে, বাঁধ দেয়ার চেষ্টা করা হলে তা বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেয়া হবে। তবে সুবিধা হল, ভারতীয় মিডিয়া এই খবরটাকে নিজ দেশে তেমন প্রচারে নেয়নি। অবশ্য প্রথম দিন রাশিয়া-পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পূর্বনির্ধারিত এক যৌথ মহড়া এ সময়ে শুরু হওয়ার কথা ছিল, আর তা যথাসময়েই শুরু হয় বলে এটাকে ভারতের জনগণের মন খারাপ করা খবর ও ভারতের কূটনৈতিক পরাজয় হিসেবে ফুটে উঠেছিল। কিন্তু ভারতের মিডিয়া সেটাও সফলভাবেই সামলে নেয়।

অপর দিকে পাকিস্তানের ডন পত্রিকা আরেক খবর ছাপে যে, লাহোরে চীনা অ্যাম্বাসির কনসাল জেনারেল পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের (প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ছোট ভাই) সাথে দেখা করার সময় ভারত-পাকিস্তান বিরোধে চীন পাকিস্তানের পক্ষে থাকবে বলে জানিয়েছে। শাহবাজের তরফ থেকে বিবৃতির সূত্রে খবরটি ছাপা হয়। এই খবরটি পাক্কা দুই দিন টিকে থাকতে পেরেছিল। দুই দিন পরে চীনের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের রেগুলার ব্রিফিংয়ে এমন খবর তাদের জানা নেই বলে জানায়। তবে এ বিষয়ে চীনের অবস্থান প্রকাশ করে। তা হল, উভয় দেশ যেন সামরিক বিরোধে না জড়িয়ে বসে ডায়ালগে সমাধান খোঁজে, চীন এর আহ্বান জানায়। ভারতীয় মিডিয়া এ খবরটি ব্যাপক প্রচারে নিয়ে যাওয়াতে এটিও মোদির পক্ষে জনগণের সমর্থন আনতে সাহায্য করে মিডিয়া। শুধু তাই নয়, ভারতের মিডিয়ায় প্রচার শুরু করে যে, আমেরিকা ভারতের পক্ষে আছে। যেমন- আনন্দবাজারের এক খবরের শিরোনাম হলো, ‘চাপের মুখেও পাক তর্জন, মার্কিন প্রশাসন পাশে আছে ভারতের।’ কিন্তু এটাকে প্রোপাগান্ডা বলছি কেন? অথবা আসলেই চীন ও আমেরিকার ভারত-পাকিস্তান বিরোধে অবস্থান কী, কেন? আর সেটাই বা কত দিন থাকবে বা জেনুইন কি না? পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার সমস্যা হিসেবে কংগ্রেস নেতা, সাবেক কূটনীতিক, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, কেরালার এমপি শশী থারুর তাকে উদ্ধৃত করে হংকংয়ের এক মিডিয়া জানাচ্ছে, পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা খুবই চ্যালেঞ্জের কাজ। কারণ, বিভিন্ন রাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ এর মধ্যে জড়িয়ে আছে। আমেরিকার আফগানিস্তানের কারণে পাকিস্তানকে দরকার। চীন পাকিস্তানে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের এক একক বড় প্রকল্প নিয়েছে। যেটা দক্ষিণে বেলুচ সমুদ্রসীমায় এক গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে সেখান থেকে দক্ষিণ থেকে উত্তর অবধি পাকিস্তানের বুক চিরে এরপর চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে, এমন সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলা হচ্ছে। এ বছর শেষে তা প্রথম পর্যায় শেষ করা হবে। উদ্দেশ্য, এই সড়ক চীনের একমাত্র মুসলমান জনসংখ্যা অধ্যুষিত প্রদেশ জিনজিয়াংয়ের কাশগড় পর্যন্ত যাবে। এভাবে পিছিয়ে পড়া এবং ভূমিবেষ্টিত এই প্রদেশকে সমুদ্র পর্যন্ত এক্সেস দেয়া, যাতে পণ্য আনা-নেয়া সহজ হয়ে যায়। এটা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর নামে পরিচিত। ফলে এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে চীন থেকে আলাদা করা সত্যিই কঠিন।

এ তো গেল দ্বিপক্ষীয় কারণ। এর চেয়েও বড় কারণ আছে- গ্লোবাল অর্থনীতি অর্থাৎ গ্লোবাল ক্যাপিটালের স্বার্থ। গত মাসে চীনে জি-২০ এর সভা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। জি-২০ মানে হল, অর্থনীতির সাইজের দিক থেকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উপরের দিকের রাষ্ট্র যারা – এমন টপ ২০টি বড় অর্থনীতির দেশের সম্মেলন। উদ্দেশ্য গ্লোবাল অর্থনীতিতে কিছু কমন সাধারণ স্বার্থের দিক নিয়ে একমত হওয়া ও সিদ্ধান্ত নেয়া। যেমন এবারের মূল ঐকমত্য হল, গ্লোবাল মন্দা বিষয়ে। দুনিয়াজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়ায় ১৯৩০ সালে প্রথম মহামন্দা আসে। মহামন্দার সারার্থ হলো, সব রাষ্ট্রের নিজ মুদ্রার মান-দাম কমিয়ে অন্যের ওপর বাজার সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে অন্যকে ডুবিয়ে নিজে টিকে থাকার চেষ্টা। এই ঘটনার লেজ ধরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এসেছিল, যা থেকে প্রতিকার হিসেবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম। এ প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ হলো আবার যাতে মন্দা না হয় তা ঠেকানো। তবুও ২০০৭-০৮ সালে আবার মন্দা দেখা দিয়েছিল। আফগানিস্তান-ইরাকে যুদ্ধে গিয়ে আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের বিপুল যুদ্ধ খরচের এই ভারসাম্যহীনতা থেকে এর জন্ম বলে মনে করা হয়। আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর বিপুল অর্থ ঢেলে ব্যক্তি-কোম্পানিগুলোর ধস ঠেকায়। অথচ পশ্চিমের বাইরে চীন তখনো ডাবল ডিজিটের অর্থনীতি টেকাতে পেরেছিল, কারণ সে যুদ্ধের বাইরে। ফলে পশ্চিমাদের চোখে গ্লোবাল মন্দা ঠেকানোর ক্ষেত্রে চীনকে এক ত্রাতা হিসেবে দেখা হয়েছিল। চীন টিকলে তার ছোঁয়া ও প্রভাবে পশ্চিম তার সঙ্কট কাটাতে সুবিধা পাবে তাই। মন্দা দুনিয়াজুড়ে ছেয়ে যেতে বাধা হবে চীন তাই। পশ্চিম সেই থেকে মন্দা একেবারে কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ওদিকে গত দুই বছর চীনের অর্থনীতি নিচের দিকে; কিন্তু ইতোমধ্যে ভারতে আগের কংগ্রেস আমলে ডুবে যাওয়া ভারতের অর্থনীতি এবার মোদির আমলে এখনো উঠতির দিকে। গ্লোবাল অর্থনীতিতে যে রাষ্ট্রের অর্থনীতিই উঠতির দিকে পশ্চিমের চোখে সে আকর্ষণীয় ও আদরের। অতএব কোনোভাবেই ২০০৭-০৮ সালের মহামন্দা আবার ফিরে আসুক তা ঠেকাতে সবার মিলিত প্রচেষ্টাই এবারের জি-২০ এর মূল প্রতিপাদ্য ছিল। ফলে এবার জি-২০ এর সর্ব সম্মতিতে, সবাই মিলে প্রতিশ্রুতি ও সিদ্ধান্ত নেয়, সঙ্কটের মুখে নিজ মুদ্রার মান-দাম কমানো এমন পদক্ষেপের পথে কেউ যাবে না। এ কথা থেকে এটা স্পষ্ট যে, সম্ভাব্য ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের ফলাফলে তা গ্লোবাল অর্থনীতিকে ডুবিয়ে মন্দার দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। অতএব এই বৈশ্বিক সাধারণ স্বার্থের কারণে বড় অর্থনীতির কোনো রাষ্ট্রই সম্ভাব্য এই যুদ্ধকে নিজের স্বার্থের বিপক্ষে, নিজের জন্য বিপদ হিসেবে দেখে। যেন বলতে চায়, যুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন দেয়ার বা পাওয়ার এটা সময় নয়।
গ্লোবাল উদ্বেগ ও ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের এ দিকটি সম্পর্কে মোদির জানা, সবাই তাকে সতর্ক করেছে; কিন্তু তবুও মোদির কিছু একান্ত স্বার্থ আছে। একালে দলের সঙ্কীর্ণ স্বার্থকে রাষ্ট্রের স্বার্থ হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চল শুরু হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সবচেয়ে বড় উত্তর প্রদেশে (সাথে পাঞ্জাবসহ আরো কয়েকটি) রাজ্য সরকারের নির্বাচন। এই নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মোদি বা বিজেপি এখানে হেরে গেলে এখান থেকেই নীতিশ-মমতার নেতৃত্বে আগামী ২০১৯ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনের লক্ষ্যে আঞ্চলিক দলগুলোর জোট গঠনপ্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। ফলে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পাকিস্তান ইস্যু হওয়ার সম্ভাবনা।
ওপরে লিখেছিলাম, মিডিয়াসহ মোদি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এর তৃতীয়টি হল, খুবই সীমিত পর্যায়ে সামরিক অ্যাকশন, যাতে আগামি ভোটে মোদির মুখ রক্ষা হয়। ভোটের বাক্স ভরে উঠে। এক কথায় বললে, “যুদ্ধ না উন্নয়ন আর কূটনীতি” এই নীতির পক্ষে ভারতের মিডিয়া একযোগে দাঁড়িয়েছিল খুবই সফলভাবে। মানুষের মন থেকে যুদ্ধে না যাওয়ার পক্ষে আগের তাতানো ক্ষোভ প্রায় সবটাই প্রশমিত করে আনতে পেরেছিল; কিন্তু সম্ভবত সামরিকবাহিনীকে আগেই প্রধানমন্ত্রী মোদী সীমিত হামলার কোনো পরিকল্পনা তৈরি করে আনতে বলেছিলেন, যা তারা হাজির করেছিল একা মিডিয়াই তাতানো ক্ষোভ প্রায় সবটাই প্রশমিত করতে পারার পরে। সেই অর্থে আবার এই সামরিক এডভেঞ্চার তা ছোটখাট বলা হলেও মোদীর সেদিকে না গেলেও চলত।  কিন্তু সম্ভবত লোভে পড়ে, বাড়তি লাভের আশায় মোদী এই সামরিক অ্যাকশনের পক্ষে সম্মতি দিয়ে দেন। এই পরিকল্পনা মোতেও ছট খাটও নয়, রিস্কবিহীনও নয়। বরং মোদীর ভারতের জন্য আগুন নিয়ে খেলার মত রিস্কি। কিন্তু মোদী আগামি ফেব্রুয়ারির গুরুত্বপুর্ণ রাজ্য নির্বাচনে ভাল করার লোভে এই আগুন নিয়ে খেলা খেলতে গিয়েছেন। এর অর্থ এখন মূল্যায়ন বসলে পরিস্কার দেখা যাবে, আগামী নির্বাচনে ভোটে সুবিধা দেয়ার কাজেই সামরিক বাহিনী ও এর ঐ পরিকল্পনা দেশের নয় দলের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে গেছে। বিশেষত সামরিক হামলা তা যত ছোট দিয়ে শুরু হোক না কেন, এখন পাল্টাপাল্টি বড় থেকে আরো বড় হামলার দিকে দুই দেশ জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠবে। এ সম্ভাবনা ক্রমশ বাড়তেই থাকবে। শেষে এটা পুর্ণ যুদ্ধে না পরিণত হয়। যেটা তারা উভয়ে কেউ চায় না; কিন্তু সেখানেই গিয়ে পৌঁছবে। বিশেষ করে ভারত “সার্জিক্যাল অপারেশন” এই গালভরা নামের হামলা করতে গিয়ে যে কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে, ইচ্ছা না থাকলেও ভারতকে এরপর আরেক দফা হামলায় যেতে হবে। কারণ ভারতের ঐ গালভরা নামের হামলায় এক ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের হাতে ধরা পরে আছে। ভারত প্রথম হামলা করার পর  মিডিয়াকে বীরদর্পে জানিয়েছিল, নিজের কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই তারা নাকি পাকিস্তানের ‘অনেক’ ক্ষয়ক্ষতি করে দিয়ে এসেছে। যেন বলা হচ্ছিল, এখন ভারতের মিডিয়া মোদীর পক্ষে নির্বাচনী ক্রেডিট বিতরণ করতে নেমে পড়তে পারে। কিন্তু সন্ধ্যা লাগতেই জানা গেল, এক ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের হাতে আটকা পড়ে আছে। অথচ এটা আগে থেকেই এটা জানা সত্ত্বেও ভারতীয় বাহিনীর নেতারা তা লুকিয়ে অস্বীকার করে রেখেছিলেন। এটা ছাড়া যেটা এখন আর এক সবচেয়ে বড় সমস্যা তা হল – দুই দেশের বাহিনীই এখন প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে ঢুকে গেছে। ফলে ক্ষয়ক্ষতির নিরপেক্ষ সত্যতা জানা প্রায় অসম্ভব। তবে কি পূর্ণ যুদ্ধের (পারমাণবিক বোমা পকেটে রেখে) দিকেই যাবে বা যাচ্ছে পরিস্থিতি? সেই সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। দুই পক্ষই তা না চাইলেও নিজ নিজ জনগণের কাছে বীরত্ত্ব আর  ‘ইজ্জত রক্ষার স্বার্থ’ দেখাতে গিয়ে পূর্ণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ভাল সম্ভাবনা আছে।  এই সম্ভাবনা প্রবলতর হবে যদি না মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীন-আমেরিকা যৌথভাবে এগিয়ে আসে ও মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায় । পুরনো ইতিহাস বলছে, মধ্যস্থতাকারীর কিছু ভূমিকা আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ০২ অক্টোবর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে ০৩ অক্টোবর) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও সংযোজন ও এডিট করে আবার ছাপা হল। ]