কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

গৌতম দাস

২৯ নভেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-29P

ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হয়েছেন প্রায় তিন সপ্তাহ হতে চলেছে। ইতোমধ্যে তিনি তাঁর প্রশাসন কাদের নিয়ে সাজাবেন এর ঝাড়াই-বাছাইয়ের ব্যস্ততার মধ্যে আছেন। সেই নেয়া আর না-নেয়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এবং নানান জল্পনা-কল্পনাও চলছে। রিপাবলিকান দলের কোন অংশ ও কারা ট্রাম্পের সঙ্গী হচ্ছেন, কেন হচ্ছেন তা নিয়েও মিডিয়ায় জল্পনা-কল্পনা্র অন্ত নাই। ইতোমধ্যে গত ২২ নভেম্বর ট্রাম্প তাঁর ক্ষমতার শপথ নিবার পরের প্রথম ১০০ দিনে করণীয় কাজ কী হবে এর তালিকা প্রকাশ করেছেন। এটাকে বলা যেতে পারে প্রথম বাস্তব প্রতিশ্রুতি; আর সেটা এই অর্থে যে, আগে যা কিছু তিনি বলেছিলেন, সেগুলো ভোট পাওয়ার আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সাধারণত বাড়িয়ে কথা বলার ফুলঝুরিতে ভরপুর থাকে। আবার বাস্তব প্রতিশ্রুতি যেগুলোকে বলছি, এর মানে এই নয় যে, এগুলো অবশ্যই ভালো ফল বয়ে আনবে বা ট্রাম্প এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবেনই। মূলত বাস্তব প্রতিশ্রুতি বলতে আমরা বুঝব, নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পর আগের দেয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো সংশোধন করে নেয়ার একটা সুযোগ পাওয়া এবং নেওয়া। ট্রাম্প সেটাই নিচ্ছেন। এর কতটুকু তিনি কাজে লাগানোর সুযোগ নিচ্ছেন, সেটাই দেখার বিষয়।

কয়েকটি মিডিয়া এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছে উলটা করে, কী কী নাই তা নিয়ে। অর্থাৎ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কী কী প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় নাই। যেমন- ২২ নভেম্বর ২০১৬ সিএনএন২২ নভেম্বর ২০১৬ বিজনেস ইনসাইডার রিপোর্ট করেছে, ওবামা প্রশাসনের করা বিখ্যাত স্বাস্থ্যসেবা আইন (অ্যাফোর্ডেবল হেলথ অ্যাক্ট) বিষয়টি নিয়ে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বলেছিলেন এই আইন তিনি বাতিল করবেন। কিন্তু এই আইন বাতিল করা অথবা এর কোন সংশোধনী আনা – কোনটাই প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নাই। অবশ্য নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পরের দিন ওবামার সাথে ঝাকুনি-বিহীন ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে আলাপ করে ফিরে এসেই ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই আইন সম্ভবত তিনি বাতিল করছেন না, তবে কিছু সংশোধনী আনবেন। যদিও আমরা এমন বলতে পারি না যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় এ ইস্যুটি নেই মানে, ১০০ দিন পরে এটা আসবে না তা-ও নয়।
এবার দ্বিতীয় যে বিষয়টি ১০০ দিনের তালিকায় নাই তা হল, আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তুলে দেয়া প্রসঙ্গ। বলা হয়েছিল, ড্রাগ পাচারকারী বা অবৈধ অভিবাসীর অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য সীমান্তে দেয়াল তুলে বাধা দেয়া হবে।
এ ছাড়া আরেকটি বহুল বিতর্কিত বিষয়, আমেরিকায় মুসলমানদের প্রবেশ ঠেকানো বা মুসলমানদের নাম রেজিস্ট্রি করা। এ বিষয়েও কোনো উল্লেখ ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নেই।
তবে ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় যা আছে, তা হল টিপিপি (বা ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) –  এই মুক্তবাণিজ্য জোট থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার। আর এটা আছে একেবারে এক নাম্বারে। টিপিপি আসলে ইচ্ছা করে চীনকে বাইরে রেখে আমেরিকাসহ ১২টি প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাষ্ট্রের মধ্যকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তি। ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তি আমেরিকার জনগণের কাজের সংস্থান সীমিত বা নষ্ট করবে; তাই তিনি এটা বাতিলের পক্ষে। ওবামার এই উদ্যোগে মার্কিন কংগ্রেস এখনও অনুমোদন দেয়া শেষ করে নাই। বলেছিল ট্রাম্প বা নতুন প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত আসা পর্যন্ত স্থগিত করে রেখেছিল। আর এখন  ১০০ দিনের করণীয়তে ট্রাম্পের এই ঘোষণায় জাপান ইতোমধ্যে হতাশ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, “আমেরিকা না থাকলে আর টিপিপি করার কোনো অর্থ নেই”। (TPP ‘has no meaning’ without US, says Shinzo Abe)। বিশ্ববাণিজ্যের ৪০ শতাংশ বাণিজ্য এই টিপিপি রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে হয়ে থাকে। ট্রাম্প ইতোমধ্যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় জানিয়েছেন, টিপিপি থেকে তিনি আমেরিকার নাম প্রত্যাহারের জন্য নোটিশ পাঠাবেন। এ থেকে স্পষ্ট যে, তিনি সত্যি সত্যিই গ্লোবালাইজেশনের বিরুদ্ধে এবং প্রটেকশনিস্ট বা সংরক্ষণবাদী অর্থনীতির পথে হাঁটার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। টিপিপি থেকে নাম প্রত্যাহারকে কেন ট্রাম্পের গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী অবস্থান বলে অর্থ করছি? সেটা আমার নিজের বরাতে বলার চেয়ে আমেরিকা, চীন ও জাপান এর নেতাদের বরাতে বলা যাক। ট্রাম্পের বিজয়ের পরে পরেই অনুষ্ঠিত প্রথম এক বাণিজ্য জোটে এপেক (APEC, Asia-Pacific Economic Cooperation) গত ২০ নভেম্বর ২০১৬ পেরুর রাজধানী লিমাতে আগেই নির্ধারিত এবছরের শীর্ষ বৈঠকে মিলিতে হয়েছিল। আমেরিকা, চীন ও জাপান সহ অন্যান্যরা এপেকের সদস্য এবং এই তিন রাষ্ট্র প্রধান ঐ সভায় উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের বরাতে মানে এপেকের বরাতে কথা বলব। ট্রাম্পের বিজয়ে তাঁর হবু প্রশাসনের টিপিপি বা নাফটা (NAFTA, North American Free Trade Agreement) থেকে বের হয়ে আসার ঘোষণা-অবস্থান জানান। এই অবস্থানকে এপেকের নেতারাই সবার আগে এটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের “এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থান” ফলে এটা তাঁর সংরক্ষণবাদী (Protectionist) অবস্থান – এভাবেই চিহ্নিত করেছেন। ট্রাম্পের অবস্থানে এই তিন নেতা এতই বিপদ দেখেছেন যে এপেকের সভায় শেষ দিনে গৃহীত এক ঘোষণা-প্রস্তাব পাস করেছেন। তাহল এরকম, “আমরা আমাদের বাজার খুলে রাখা এবং সব ধরণের প্রটেকশনিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পক্ষে আমাদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি”। (We reaffirm our commitment to keep our markets open and to fight against all forms of protectionism -Members’ closing declaration)

এখানে বলে রাখা ভাল আমার আগের লেখায় বলেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে আমেরিকা গ্লোবাল অর্থনীতির নেতৃত্ব নিজের হাতে নিতে পেরেছিল। আর আগের সীমিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯) পর থেকে পরের ২৫ বছর প্রায় পুরাপুরি স্থবির হয়ে ছিল। আমেরিকা সেই স্থবিরতাই শুধু কাটায় নাই বরং  আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু হতে পুর্বশর্ত  আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসাবে সর্ব-সম্মতিতে সেকালের একমাত্র যোগ্য ডলারকে কেন্দ্র করে নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থা সাজায়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই নতুন মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করা আর এর ভিতর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা চালু করতে ১৯৪৪ সালে গঠন করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ (IMF)। এরপর (১৯৪৫-১৯৭৩) এই সময়কালটাকে বলা যায় যুদ্ধপরবর্তি ইউরোপের পুনর্গঠন আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গেড়ে বসার কাল। ১৯৭৩ সালে আইএমএফ আবার পুনর্গঠন করা হয়। এরপর থেকেই প্রত্যেক রাষ্ট্র নিজ নিজ আভ্যন্তরীণ বাজার বিদেশের পণ্যের প্রবেশ থেকে বাধা দিয়ে রাখার সংরক্ষণবাদী বা প্রটেকশনিষ্ট অবস্থান যেটা দুনিয়ায় ক্যাপিটালিজমের শুরু থেকেই সবাই অনুসরণ করত, তা ভেঙ্গে “গ্লোবালাইজেশন” এর পথে চলা করেছিল গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। আস্তে আস্তে গ্লোবালাইজেশন মূল ধারা হয়ে যায়। ভিন্ন ভাষায় এটাই “এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকনমি” বা রপ্তানী অভিমুখি করে অর্থনীতি সাজানোর যুগ। বাজার আগলে রাখার প্রটেকশনিষ্ট অবস্থানের সাথে তুলনায় এই নতুন পথে ভাল এবং মন্দ দুটা দিকই আছে। আবার ভাল-মন্দ সেটা যাই থাক করণীয় অপশন হিসাবে কী কী পথ খোলা আছে এর মধ্যে কম-খারাপটা বেছে নেয়া অর্থে গ্লোবালাইজেশন অবশ্যই ভাল অপশন। কারণ আমাদের মত রাষ্ট্রের সাথে অসম বাণিজ্য আছে এবং তা এমনি এমনি চলে যাবে না। মাথাব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলা যেমন কোন সমাধান বা অপশন নয় তেমনি। বাংলাদেশে এটা শুরু হয় মোটা দাগে বললে আশির দশকের শুরু থেকে, বিশেষ করে এরশাদের ক্ষমতা নিবার পর থেকে। সংরক্ষণবাদী হয়ে এক পাট-রপ্তানিতে আর আকড়ে না থেকে তৈরি পোষাক বা চামড়া ইত্যাদিতে ধরে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে প্রবেশ – এই হল ফেনোমেনাটা। আর বটম লাইন হল, অন্যের বাজারে প্রবেশ করতে গেলে অন্যকেও নিজের বাজারে প্রবেশ করতে দিতে হবে। তবে অসম ক্ষমতা, অসম বাণিজ্য সম্পর্কের কারণে সেটা অন্যকে বেশি দেয়া হয়ে যায়। কিন্ত সে জন্য কোন বাণিজ্য লেনদেনেই যাওয়া যাবে না এটাই মাথাব্যাথায় মাথাকাটার তত্ত্ব হয়ে যাবে। তবে মজার কথা হল,  সেই আমেরিকা এখন একালে ট্রাম্পের হাতে পরে মুক্তবাণিজ্য থেকে পালাইতে চাইতেছে।

দুইঃ
হেনরি কিসিঞ্জারের নাম বাংলাদেশে নানা কারণে পরিচিত। আমেরিকার অন্ত্যত দুজন প্রেসিডেন্টের সাবেক বহুলালোচিত পররাষ্ট্র সেক্রেটারি এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন এবং আমেরিকান ফরেন সার্ভিসের অনেক আমলার তাত্ত্বিক গুরু তিনি। এখন বয়স প্রায় ৯৩ বছর, তবুও সক্রিয় কাজকর্ম করেন; ডিকটেশন দিয়ে বই ছাপান। বৈদেশিক নীতি ও তত্ত্ব দিয়ে বেড়ান এখনো। বর্তমানে “কিসিঞ্জার অ্যাসোসিয়েটস” নামে এক কনসাল্টিং ফার্ম বা পরামর্শদাতা কোম্পানি চালাচ্ছেন। বিগত আশির দশকের পর থেকে সব প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সাক্ষাৎ করে তাদেরকে নিজের পরামর্শ দিয়েছেন। সেই কিসিঞ্জার ট্রাম্পের সাথেও দেখা করেছেন গত ২০ নভেম্বর।
অভ্যন্তরীণভাবে, আমেরিকাতেও ট্রাম্পকে নিয়ে বিতর্কও কম নয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পরিবেশ রক্ষার (এনভায়রণমেন্ট-বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো সহ) সম্মেলনে আমেরিকার দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো থেকে ট্রাম্প সরে আসতে চান, একারণে। কারণ তিনি এগুলো সব ‘চীনাদের ভুয়া প্রচার’ বলে দাবিতে উড়িয়ে দিতে চান। শুধু তাই নয়, প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকার দ্বিতীয় নম্বরে আছে ওবামা প্রশাসনের দেয়া – নানান প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছিলেন – ট্রাম্প সেসব জায়গা থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করতে চান। এছাড়া ওবামা জ্বালানিবিষয়ক যেসব বিধিনিষেধ মেনে নিয়েছিল, গ্রিন হাউজ গ্যাস ২০৩০ সালের মধ্যে ৩২ শতাংশ কমিয়ে আনবেন বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; ট্রাম্প সেসব থেকে বেরিয়ে আগের জায়গায় ফিরে যেতে চান। ট্রাম্পের যুক্তি হল, জ্বালানি উৎপাদনে এসব বিধিনিষেধ আরোপের কারণে আমেরিকান জনগণ চাকরি হারিয়েছে। এগুলো ‘জব-কিলিং’ বাধানিষেধ। অর্থাৎ ট্রাম্প বলতে চাইছেন, পরিবেশের চরম ক্ষতি করে হলেও নোংরা জ্বালানি উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট চাকরিগুলা চালু রাখতে হবে। তিনি সস্তা জনপ্রিয়তার পথে হাঁটাকে প্রাধান্য দিয়ে চলতে চাইছেন।
এমন পরিস্থিতিতে কিসিঞ্জার ট্রাম্পকে নিয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, অন্তত দুটা সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি কী বলেছেন, ট্রাম্পকেইবা কী পরামর্শ দিলেন আর আমাদেরই বা ট্রাম্প সম্পর্কে তাঁর কী মূল্যায়নের কথা জানাতে চান; এটা জানতে দেশে-বিদেশে আগ্রহ আছে। কিসিঞ্জার ট্রাম্পের কাছে গিয়ে দেখা করার পর সোজা চলে যান সিএনএনের অফিসে ফরিদ জাকারিয়ার কাছে; যেখানে তিনি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।
সাধারণভাবে বললে, কিসিঞ্জার ট্রাম্প সম্পর্কে সহানুভূতির সাথে কথা বলেছেন। কেমন ট্রাম্পকে তিনি দেখলেন প্রথমেই এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন, “এমন ট্রাম্পকে তিনি দেখে এলেন যে নানা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেয়ার অবস্থা থেকে বের হয়ে আমেরিকাকে নেতৃত্ব দিতে বাস্তব সবচেয়ে ভালো নীতি-পলিসির কৌশল বা স্ট্র্যাটেজি কী হতে পারে, তিনি তা হাতড়াচ্ছেন। এমন মধ্যবর্তী স্থানে ট্রাম্পকে আমি দেখে এলাম”। এরপর ট্রাম্পের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে তিনি বলছেন, তার দেখা প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ট্রাম্প “সবচেয়ে ইউনিক বা অনন্য”। কারণ ট্রাম্প আগে কখনো কোনো স্তরেরই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। সেজন্য তিনি সমাজের চেনা কোনো গোষ্ঠী প্রতিনিধি নন, তার পছন্দের নীতি-পলিসি সম্পর্কেও কোনো আগাম ধারণা-অনুমান বেশির ভাগেরই নেই। ফলে তিনি পুরনো কোনো দায়ভারহীন অথবা চিহ্নবিহীন। কিসিঞ্জার আরও বলেছেন, ট্রাম্পের কোনো ‘ব্যাগেজ নেই’। তা বটে; কথা সত্য। কিন্তু জাকারিয়া এবার চীন প্রসঙ্গে ট্রাম্পের রক্ষণশীল অবস্থানের কথা তুললেন। কিন্তু কিসিঞ্জার তাতে সরাসরি ব্যক্তি ট্রাম্প সম্পর্কে বলা এড়িয়ে গেলেন। আর, গিয়ে এবার তত্ত্বের দিক দিয়ে জবাব দিলেন। তিনি এক তত্ব-কথায় জবাব দিলেন। বললেন, “গ্লোবালাইজেশনের ফলে এর ফলে কেউ লুজার বা হারু পার্টি আর কেউ উইনার বা জেতা পার্টি হয়ে তো হাজির হবেই। ফলে হারু পার্টি তখন নানাভাবে নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ্যে আনবেন”।

কিসিঞ্জারের এমন জবাবের অর্থ কী? তিনি কী বলতে চাইছেন – ট্রাম্পের আমেরিকা গ্লোবালাইজেশন করতে গিয়ে ওর ফলাফলে এখন হারু পার্টি? তাই ট্রাম্পের হাত ধরে আমেরিকা এখন গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী প্রটেকশনিস্ট অর্থনীতির ভূমিকায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে চাচ্ছে? আর সেজন্যই ট্রাম্পের এমন অবস্থানকে কিসিঞ্জার সহানুভুতির-সমর্থন দিচ্ছেন? তাই কি? এর জবাবে সম্ভবত বলা যায় – হ্যাঁ কিসিঞ্জার স্পষ্ট করে না বললেও এটাই, তার সহানুভূতি টাম্পের দিকে। আর প্রত্যক্ষভাবে না হলেও তত্ত্বের মাধ্যমে বলে তিনি স্বীকার করে নিচ্ছেন, আমেরিকা হারু পার্টি। এরপর তিনি এক গুরুতর কথা বলছেন। তিনি স্বগতোক্তি করে বলছেন, ‘ট্রাম্পকে ইতিবাচকভাবে লক্ষ্য খুঁজে নিতে আমাদের সুযোগ দেয়া উচিত।’

মাসিক ‘দ্য আটলান্টিক’ এর সাক্ষাতকার
আমেরিকার একটি মাসিক ম্যাগাজিনের নাম ‘দ্য আটলান্টিক’। সেই পত্রিকায় কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল আগে থেকেই। এক লম্বা আর বিভিন্ন সেশনে ভাগ করে, নতুন-পুরনো বহু ইস্যুতে কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল। নির্বাচনের পরের দিন ১০ নভেম্বরে নেয়া সাক্ষাৎকারে চলতি ‘গরম বিষয়’ ট্রাম্পের বিজয় প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল। ঐ সাক্ষাতকারে রিপাবলিকান হেনরি কিসিঞ্জার স্বীকার করেন যে তিনি মনে করেছিলেন নির্বাচনে ট্রাম্প নয়, হিলারিই বোধহয় জিতবেন। ওখানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রশ্নেও কিসিঞ্জার একইভাবে ‘ট্রাম্পকে সুযোগ দেয়া উচিত’ বলেছেন। প্রচ্ছন্নভাবে স্বীকার করছেন আমেরিকা হারু পার্টি ইত্যাদি। যেমন দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, ট্রাম্পের জেতার ফলে দুনিয়াকে আমেরিকার নেতৃত্ব দেয়ার ভূমিকা কী হবে বলে আপনি মনে করেন? কিসিঞ্জার বলেন, ‘আসলে, এই জেতাটা আমাদের বিদেশ নীতি আর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে।’ [অর্থাৎ তিনি ‘সামঞ্জস্য নেই’ এটা ধরে নিয়ে কথাটা বলেছেন। পরের বাক্যেই তিনি সেটা স্পষ্ট করছেন। বলছেন, ‘আমেরিকার বৈদেশিক ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জনগণের ধারণা আর এলিটদের ধারণার মাঝে নিঃসন্দেহে গ্যাপ বা ফারাক আছে। আমার মনে হয়, নতুন প্রেসিডেন্ট আমাদের এই ফারাক ঘুচাতে সুযোগ নিতে পারেন। তিনি সুযোগ পাবেন; কিন্তু তা নিতে পারবেন কি না এটা তার ওপর নির্ভর করে।’
তৃতীয় প্রশ্নটি ছিল ট্রাম্পকে বেশ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। প্রশ্ন, ‘ট্রাম্পের যোগ্যতা, সক্ষমতা বা সিরিয়াসনেস সম্পর্কে কি আপনি আস্থা রাখেন?’ কিসিঞ্জার কিছুটা অথরিটির ভূমিকায় জোর দিয়ে জবাব দেন, ‘এ রকম তর্ক আমাদের বন্ধ করা উচিত। তিনি আমাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তার শাসন-দর্শন (ফিলোসফি) তৈরি করার জন্য আমাদের অবশ্যই তাকে সুযোগ দিতে হবে।’
‘ট্রাম্প আমাদের প্রেসিডেন্ট’ এ কথা বলে আসলে কিসিঞ্জার ধমকালেন কেন? এ জন্য যে, ট্রাম্পকে নিয়ে হিলারি-শিবিরসহ তথাকথিত লিবারেলরা হাসি-মশকারা করে কথা বলে, যেটা প্রশ্নকর্তার (তিনি নিজেই ওই পত্রিকার সম্পাদক) প্রশ্নের মধ্যেও ছিল। কিসিঞ্জার যেন বুঝাতে চাইছেন, গ্লোবালাইজেশনের প্রতিযোগিতায় পড়ে আমেরিকা হারু পার্টি হয়ে গেছে- যেটা বুঝতে আমেরিকান পাবলিক আর এলিট পারসেপশনে ফারাক আছে। ফলে আপাতত ট্রাম্পকে মফস্বলের মনে হচ্ছে বটে, কিন্তু ট্রাম্প আসলে তা নন। উপায়ান্তর নেই বলে ট্রাম্প কিছুটা প্রটেকশনিস্ট হয়ে বিপদ কাটিয়ে আমেরিকাকে উঠে দাঁড় করাতে চাইছেন। এ দিকটা কিসিঞ্জার বুঝতে পারছেন বলেই ট্রাম্পকে নিয়ে হাসি-মশকারা তিনি কাউকে করতে দিতে রাজি নন। তাই কি? কিসিঞ্জার সাক্ষাৎকারে কথাগুলো এভাবে স্পষ্ট করে বলেননি, আকার-ইঙ্গিতে বলেছেন- এমন অনুমান করার সুযোগ আছে।
একটা সমান্তরাল উদাহরণ টেনে শেষ করব। অনেকের প্রটেকশনিস্ট বা রক্ষণশীল কথাটি বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। অথচ ব্যাপারটা আমাদের কাছেরই। সত্তরের দশকে মোটাদাগে বললে, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একমাত্র উপায় আমাদের ছিল পাট। এটা সেই প্রটেকশনিস্ট সময়। এর বিপরীতে, আশির দশকের শুরু থেকেই বিশেষ করে ১৯৮২ সাল থেকে আমরা গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশ করি। এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকোনমি, অকস্মাৎ রফতানিমুখী নারী মেশিন, মাল্টিফাইবার এগ্রিমেন্ট, আমেরিকা-ইউরোপের দয়ায় তাদের বাজারে তৈরী পোশাকের প্রবেশাধিকার, বিনিময়ে নিজের বাজার পুরো খুলে দেয়া, বৈদেশিক বিনিয়োগ পাওয়া ইত্যাদি আমাদের গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশের চিহ্ন। এ দুই দশার মধ্যে কোনটা আদর্শ বা ভালো, সে তুলনা করে বলা অপ্রয়োজনীয়। কারণ বিষয়টি হলো, যেসব অপশন আমাদের হাতে ছিল ও আছে, এমন অ্যাভেলেবল অপশনের মধ্যে তুল্য বিচার করা দরকার। এ বিচারে গ্লোবাইজেশনই ভালো। অবশ্য যে কারণে প্রশ্নটি তুলেছি, তাতে ভালো-মন্দ বিচার এখনকার প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, গ্লোবালাইজেশনের ভেতরে একবার ঢুকে গেলে সে অর্থনীতি আর কি ফিরে প্রটেকশনিস্ট অবস্থানে যেতে পারে, সম্ভব? ব্যবহারিক বিবেচনার জায়গা থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, এটা অসম্ভব। গ্লোবালাইজেশনের সারকথা হলো- বিপুলভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে দুনিয়াব্যাপী বিনিয়োগ, পণ্য, টেকনোলজি, কাঁচামাল বাজার ইত্যাদির পারস্পরিক লেনদেন ও বিনিময়ে একবারে জড়িয়ে পড়া এবং তাতে অসাম্য থাকলেও জড়িয়ে যাওয়া; কিন্তু একবার এমন লেনদেন বিনিময়ে জড়িয়ে পড়লে তা থেকে আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া যায় না। অতএব প্রশ্নটা হল, ট্রাম্প আমেরিকাকে প্রটেকশনিষ্ট পথে নিয়ে যাবেন কীনা তা একেবারেই নয়, বরং একালে আমরা কী প্রটেকশনিষ্ট পথে আবার ফিরে যেতে পারব? সম্ভব? এককথায় অবশ্যই না।

তাহলে ট্রাম্প কেন প্রটেকশনিস্ট অবস্থান নিচ্ছেন বলে অন্তত দেখাচ্ছেন? তিনি বা তার পরামর্শকেরা নিশ্চয়ই এর অর্থ বোঝেন। কারণ প্রটেকশনিস্ট জায়গায় ফেরা আর সম্ভব নয়। তাহলে? আসলে প্রটেকশনিস্ট মনে হওয়া এটা আপতিক। সম্ভবত গ্লোবালাইজেশনের মধ্যেই থেকে, কিন্তু প্রটেকশনিস্ট হওয়ার ভাবভঙ্গি করে নতুন করে এক লেনদেন-বাণিজ্য ‘বেটার ডিল’ পেতে চাইছেন ট্রাম্প। কিসিঞ্জারের অনুমান, ট্রাম্প এতে সফল হতে পারেন এবং সেটাকে ওবামাসহ পুরনো আমেরিকান প্রশাসনগুলোর ধারাবাহিকতা বলে হাজির করাও সম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রথম ছয়-নয় মাসের পরে চীন-রাশিয়াও এতে আস্থা পাবে, এটাকে মানবে। কিসিঞ্জার এমনটিই মনে করেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে ২৭ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও অনেক এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে প্রকাশিত হল।]

আমেরিকার উত্থান-পতনে অস্থিরতা

আমেরিকার উত্থান-পতনে অস্থিরতা
গৌতম দাস
২৬ নভেম্বর ২০১৬, শনিবার
http://wp.me/p1sCvy-26p

বড় এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন অস্থিরতা আবার এই প্রথম। সাম্প্রতিক নির্বাচনে অনেক উত্তেজনা ছড়ানোর পর আমেরিকা এক নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পেয়েছে, এ জন্যই কি অস্থিরতা? কিন্তু প্রেসিডেন্ট তো পেয়েই গেছে, তাহলে আর অস্থিরতা কেন? আসলে আমেরিকার নির্বাচনকে মাধ্যম করে অস্থিরতা এর ভেতর দিয়ে বাইরে প্রকাশ্যে এসেছে। তাহলে ভেতরের দিক, মানে অস্থিরতা উৎস কোথায় ও কেন? তাই এখন বোঝা দরকার।
যে প্রসঙ্গ ধরে এর জবাব খুঁজব তা হল, গ্লোবাল নেতৃত্ব। গ্লোবাল নেতৃত্বে এখন আছে কে, কবে থেকে? এবং কোন প্রক্রিয়ায় সে সমাসীন হয়েছিল এই দিকগুলো খুজে দেখে আগাব। আমাদের অনেকের হয়ত পছন্দ হবে না। বিশেষ করে যারা স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নের বয়ানের বাইরে আর কোন বয়ান এবং বিশেষত, ঐ বয়ানের সাথে মিলে না এমন কোন ফ্যাক্টস বা ইনফরমেশন থাকতেই পারে না বলে মনে করেন, তাদের কথা বলছি। তাদের পছন্দ না হলেও কথা সত্য যে , আমেরিকা বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ার নেতৃত্ব নিয়েছে ও নেতৃত্ব দিয়ে আসছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল থেকে। তাতে আমাদের পছন্দ অনুযায়ী আমরা এ’ঘটনাকে ভাল অথবা মন্দ বলে যে যাই বিবেচনা করি না কেন, এটাই কঠিন সত্যি। আর মোটা দাগে বললে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) মাঝামাঝি ১৯৪১ সালের আগস্টে আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রত্যক্ষ পক্ষ নেয়ার, অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। ততকালের পরপর চারবারের (১৯৩২-১৯৪৪) নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হলেন ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট (Franklin Delano Roosevelt, known as FDR)। আর বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন উইলস্টন চার্চিল (Sir Winston Leonard Spencer-Churchill)। রুজভেল্ট-চার্চিল ১৯৪১ সালের ১৪ আগষ্ট স্বাক্ষরিত বিখ্যাত চুক্তির নাম আটল্যান্টিক চার্টার (Atlantic Charter 1941)। এই আটল্যান্টিক চুক্তিকে বলা যায় সেরা কলোনি মাস্টার ও বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে লিখে দেওয়া দাসখত স্বাক্ষর। আর আর এক দিক থেকে বলা যায় ঐ চুক্তি হাতে পেয়ে রুজভেল্ট নিশ্চিত হন যে দুনিয়ায় তখন থেকে আমেরিকান নেতৃত্বে আসা নিশ্চিত হয়েছে। কেন এমন বলছি? ঐ চুক্তিকে দাসখত বলছি এজন্য যে ঐ চুক্তিতে আটটা পয়েন্ট আছে যার তৃতীয় পয়েন্টে হল যে, যে কোন রাষ্ট্রের নাগরিকের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার (self government) এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ত্ব (sovereign rights) এই নাগরিক অধিকার ঐ দুই নেতা স্বীকার করেছিলেন ও সম্মান দেখাতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আমরা হয়ত এখনও বুঝি নাই তাতে কী? তাতে বিরাট কিছু। কারণ আমরা তখনও ছিলাম বৃটিশ কলোনি – কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়ার বাসিন্দা। তার মানে ঐ চুক্তিতে চার্চিল স্বীকার করে নিয়েছেন যে বৃটিশ-ইন্ডিয়ার নাগরিক আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার (self government) এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ত্ব (sovereign rights) এই দুই নাগরিক অধিকার আছে। আর এই অধিকার থাকার অর্থ বৃটিশ সরকারের ইন্ডিয়াকে কলোনি করে রাখা অবৈধ। আর এটাই খোদ বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী আটলান্টিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে স্বীকার করে নিয়েছেন।  কে স্বীকার করছেন? করছেন বৃটিশ মাস্টার। যে বৃটিশ কলোনি সাম্রাজ্য দম্ভ আর গর্ব  করে বলত, “বৃটিশ কলোনি সাম্রাজ্যের সুর্য নাকি কোনদিন অস্ত যাবে না”।আর এটাই ছিল রুজভেল্টের চার্চিলের বৃটেনকে যুদ্ধে সামরিক সাহায্য সহযোগিতা ও হিটলারের বিরুদ্ধে তাদের পক্ষ নেবার শর্ত। এজন্যই যুদ্ধের পর দুনিয়া জুড়ে  কলোনি-মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যেতে দেখেছিলাম। এর সাথে অবশ্য বৃটিশ বিরোধী বা কলোনি বিরোধী স্থানীয় জনগণের যেসব আন্দোলন ছিল এসবের ভুমিকাও ফেলনা নয়। অর্থাৎ কোনটাই অগুরুত্বপুর্ণ না, সংযুক্ত উপাদান।

তবে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল কেন রুজভেল্টের শর্তে আটল্যান্টিক চুক্তি করেছিলেন? আর তাতে কলোনি শব্দটা উচ্চারণ না করেও তবে ভিন্ন ভাষায় কোন রাষ্ট্রকে “কলোনি করে রাখা অবৈধ” – তা স্বীকার করেছিলেন কেন? এর প্রধান কারণ, হিটলারের জর্মানির হাতে ততদিনে ফ্রান্সের পরাজয় ঘটে গিয়েছে। মানে ফ্রান্স ১৯৪০ সালের জুন থেকে জর্মানির দখলে চলে গেছে। আর ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডের মাঝে হল ইংলিশ চ্যানেল। অর্থাৎ বৃটেনের দিক থেকে দেখলে চার্চিল, বৃটেন থেকে ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে ফ্রান্সকে দেখছিলেন যে হিটলারের হাতে ইতোমধ্যে চলে গিয়েছে। যার মানে শত্রু ইংলিশ চ্যানেলের অপর পাড় পর্যন্ত এসে গিয়েছে। ওদিকে ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই বৃটেনের গোলাবারুদসহ যুদ্ধের উপকরণের অভাব চলছিল। একমাত্র সাপ্লায়ার আমেরিকার নিজের “ক্যাশ এন্ড ক্যারি আইন ১৯৩৭”, আর “নিউট্রালিটি এক্ট ১৯৪০” (যে সে যুদ্ধে কোন পক্ষে জড়াবে না) – এই দুই আইনের কারণে কেবল নগদ সোনায় মুল্য পরিশোধের শর্তে তাও সীমিত পর্যায়ে সাপ্লাই বজায় রেখেছিল। বৃটেনের নগদ সোনার সামর্থও ১৯৪০ সালের শেষ নাগাদ ফুরিয়ে আসে। এই মরিয়া অবস্থাকে বাঁচার জন্য চার্চিলের একমাত্র পথ খোলা ছিল রুজভেল্টের শর্তে আটলান্টিক চার্টার স্বাক্ষরে রাজি হওয়া।

অতএব তখন থেকেই যুদ্ধের পরিণতি, যুদ্ধের বিজয়, বিজয়-পরবর্তী নতুন করে দুনিয়া সাজানো ইত্যাদি সব কিছুতে নির্ধারক ভূমিকা নিয়ে আমেরিকা নেতৃত্বে চলে আসার সুযোগ তৈরি হয়ে এসেছিল। কিন্তু রুজভেল্টের দিক থেকে কলোনি অবৈধ বা কলোনি মুক্তি শর্ত হল কেন?  আর তাতে আমেরিকার কী লাভ? প্রথমত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বব্যাপী একটা যুদ্ধ ছিল ঠিকই, তবে সেদিকের চেয়ে এর প্রধান গুরুত্ব হল- এই যুদ্ধের হাত ধরে তদানীন্তন দুনিয়ার এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়ায় প্রবেশ ঘটেছিল। কী সে নতুন সম্পর্ক? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় ১৯৪৫ সালে। ফলে ১৯৪৫ সালকে বেঞ্চমার্ক ধরলে তার আগের দুনিয়ার বৈশিষ্ট্য ছিল, সেটা কলোনি শাসন সম্পর্কের দুনিয়া। ইউরোপের ব্রিটিশ ও ফরাসিরাসহ মোট পাঁচ-ছয়টি সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র সমগ্র দুনিয়ার বাকি রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিজেদের কারো না কারো ভাগের দখলি কলোনি করে নিয়ে রেখেছিল। এশিয়া ও আফ্রিকা দুটা পুরা মহাদেশকে উপনিবেশ বা কলোনি বানিয়ে রাখা কলোনিকর্তা ছিল ইউরোপ। কেবল আমেরিকা এসবের ভেতরে ছিল না, আলাদা অবস্থান ছিল তার। এই ছিল সেই কলোনি-সম্পর্কের দুনিয়ার শাসন চিত্র। আর এর বিপরীতে ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়ার বৈশিষ্ট্য হল – কলোনি শাসন-সম্পর্কের অবসান। দুনিয়া কলোনিমুক্ত হওয়ার যুগ। ফলে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও তারা এরপর থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র; অন্তত প্রত্যক্ষ বিদেশী শাসনের অধীনে আর তারা রইল না। তবে এক নতুন সম্পর্ক – আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সম্পর্কের ভেতরে তাদের প্রবেশ ঘটে। বলা বাহুল্য, আগের কলোনি শাসন সম্পর্কের বদলে এটা তুলনামূলক অর্থে, অবশ্যই ভাল। কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র তারা বটে, তবে নিজের দুর্বল অর্থনীতি, অগ্রসর অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোর সাথে অসম সম্পর্ক, দুর্বল চুক্তি করার ক্ষমতা, দুর্বল বিনিয়োগ সক্ষমতা ইত্যাদি এগুলো বৈশিষ্ট্য তাদের। এক ভিয়েতনাম (১৯৭৫) বাদ দিলে এশিয়ার কলোনিমুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হতে পুরো পঞ্চাশের দশক পার হয়ে যায়। আর আফ্রিকায় দক্ষিণ আফ্রিকাকে (১৯৯৪) বাদ দিলে কলোনি শেষ হতে সেখানে সত্তরের দশক পর্যন্ত লেগে যায়। এভাবে বহু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এটাই সেই আমেরিকার নেতৃত্বে ক্যাপিটালিজমের এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়া। কলোনি-ক্যাপিটালিজমের সাথে তুলনায় বিপরীতে আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল-ক্যাপিটালিজমের এক নয়া দুনিয়া। ততকালে উঠে আসা ব্যাপক পুজি বিনিয়োগ সক্ষমতার গ্লোবাল পুজি বাজারের আড়ত – ওয়াল স্ট্রিট – এর স্বার্থ ছিল আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল-ক্যাপিটালিজম।
দ্বিতীয়ত, আমেরিকার পক্ষে এই নেতৃত্ব নেয়া বা দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেয়া কেন সম্ভব হয়েছিল, এ দিক থেকে ঘটনা ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, এর মৌলিক কারণ আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা। বলা হয় ১৮৮০ সাল থেকেই অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত সঞ্চয় ও পুঞ্জীভবনের দিক থেকে আমেরিকা সেকালের সবচেয়ে বড় কলোনিমাস্টার, এম্পেরিয়াল ইংল্যান্ডকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নাৎসিবিরোধী অ্যালায়েড ফোর্স – এই জোটের সব রাষ্ট্রকেই আমেরিকা এককভাবে সাহায্য করতে সক্ষম ছিল এবং তা করেছিল। অর্থাৎ মোট যুদ্ধখরচের এক প্রধান অংশ আমেরিকা একাই বহন করতে সক্ষম ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নসহ নাৎসি ব্লক-বিরোধী সবাইকে আমেরিকা অর্থ (তৈরী পণ্য পাঠিয়ে যেমন- যুদ্ধজাহাজ, প্লেন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের খাদ্যদ্রব্য বা সেনা-ইউনিফর্মসহ সবকিছু) ধার দিয়েছিল। ধার লিখলাম বটে; কিন্তু কবে কিভাবে এটা পরিশোধ হবে, তা উহ্য রেখে এই সাহায্য দেয়া হয়েছিল। আমেরিকার ‘লেন্ড অ্যান্ড লিজ অ্যাক্ট’ নামে এক আইনের অধীনে এটা দেয়া হয়েছিল। এই আইনের অনেকগুলো ভার্সন আছে। আইনটি শুরু হয়েছিল ১৯৩৫ সাল থেকে cash & Carry act এবং  Neutrality act নামে বিভিন্ন সংশোধিত ভার্সান থেকে। এরপর Lend-Lease Act”  ১৯৩৯ আর শেষে ১৯৪১ সালের সংশোধিত ভার্সনই এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। কংগ্রেস ও সিনেটে পাস হওয়া এই আইনের মূল কথা- আমেরিকার নিরাপত্তার স্বার্থে প্রেসিডেন্টকে এক অবাধ ক্ষমতা দেয়া হয়। যেমন- প্রেসিডেন্ট যদি মনে করেন অমুক রাষ্ট্রকে একটা নতুন যুদ্ধজাহাজ দেয়া কিংবা ১০০ টন চিনি পাঠিয়ে দেয়া আমেরিকা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি, তবে প্রেসিডেন্ট ওই রাষ্ট্রকে এই আইনে তা দিতে পারেন। অর্থাৎ মূল শর্ত হল, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ‘মনে করলেই’ (deem) যথেষ্ট। এখানে লক্ষণীয় হল, এটা অনুদান বলা হয় নাই। বরং সুনির্দিষ্ট করে আমেরিকা সরকারের দেয়া ধার অথবা লিজ। ফলে তা পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু কবে কিভাবে, তা নিয়ে কোনো শর্ত নেই। উল্লেখও নাই। ইচ্ছা করে এ দিকটি উহ্য রাখার নিয়ম করা  হয়েছিল, যাতে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট সেটা পরে কোনো এক সময় উভয় রাষ্ট্রের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় নিয়ে তা ঠিক করতে পারেন। চাই কী মাফ করে দিতে পারেন। যুদ্ধ শেষে এক হিসাবে দেখা যায়, আমেরিকা এই আইনে ধার অথবা লিজ দেয়া মোট সম্পদ হস্তান্তর করে ফেলেছে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের। (এখনকার ২০১০ সালের সমতুল্য মুল্যে এটা ৭৫০ বিলিয়ন ডলার)। ওর মধ্য কেবল সোভিয়েত ইউনিয়নকে দেয়া হয়েছিল ১১ বিলিয়ন ডলারের (মোট ৫০ বিলিয়ন ডলারের ২২% ) সাহায্য-পণ্য। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে আমেরিকার লেন্ড এন্ড লিজ আইনে করা সাহায্য চুক্তির প্রটোকল এখানে দেখা যেতে পারে। যুদ্ধ শেষে এই খরচের বেশির ভাগই মওকুফ করে দেয়া হয়। কোনো জাহাজ বা প্লেন যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট হলে তা নিজেদের এলায়েড যুদ্ধজোটের  পক্ষ থেকে হয়েছে বলে তার কোনো দাম ধরা হয়নি। আর বাকিটা দীর্ঘ ৬০ বছরের কিস্তিতে ২ শতাংশ সুদে পরিশোধ করার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এই পরিশোধের চেয়েও তখন বড় প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছিল, সারা ইউরোপে যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে বিনিয়োগ কে কোথা থেকে জোগাড় করবে? কে দেবে? সে সময় সক্ষম একমাত্র রাষ্ট্র ছিল আমেরিকা। ইতালিতে দুর্ভিক্ষাবস্থা সামলাতে অনুদান দেয়া থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটসহ সারা ইউরোপে ভেঙে পড়া অবকাঠামো আবার নির্মাণ, কারখানা পুনর্নির্মাণ এবং তা চালু করার পুঁজি, এভাবে সব কিছুতেই বিনিয়োগ ঢেলে দেয় একা আমেরিকাই। বলা হয়, যুদ্ধের খরচের প্রায় সমপরিমাণ বিনিয়োগ শুধু অবকাঠামো পুনর্নির্মাণেই ব্যয় করতে হয়েছিল। ইতোমধ্যে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ আর ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গঠন করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এই প্রথম সচল হতে শুরু করেছিল। অপর দিকে, ইউরোপের জার্মানি আর এশিয়ায় জাপানের যুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসেবে পুনর্গঠনের জন্য আমেরিকা বিশেষ বিনিয়োগ প্রোগ্রামে ‘মার্শাল প্লান’ নিয়েছিল। এভাবেই আমেরিকার নেতৃত্বে এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম গড়ে উঠেছিল। সেই থেকে নানা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, জাতিসঙ্ঘ এবং ১৯৪৮ সালের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ইত্যাদির মাধ্যমে গ্লোবাল নিয়মশৃঙ্খলার এক অর্ডার কায়েম করেছিল আমেরিকার নেতৃত্ব। আর স্বভাবতই নিজের স্বার্থকে প্রাধান্যে রেখে একক দুনিয়া চালিয়ে আসছিল দেশটি।
ইউরোপের কলোনি ক্যাপিটালের ভেতরেই যেমন আমেরিকার অর্থনৈতিক উত্থান ঘটেছিল ১৮৮০ সালের দিকে, ঠিক তেমনি ১৯৭২ সাল থেকে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে ফাইনালি চলতি একুশ শতক থেকে নতুন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীন হাজির হয়েছে। আর ততটাই চীন আমেরিকান সক্ষমতার বিপরীতে চ্যালেঞ্জ আকারে হাজির হচ্ছে। আমেরিকার ক্রমেই সক্ষমতার দিক থেকে ঢলে পড়ছে। আর এই পথে সে যেতে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনা হল, আমেরিকার আফগানিস্তান (২০০১) ও ইরাকে(২০০৩) হামলা। এক দিকে সমাপ্তিহীন এ যুদ্ধ, আবার যুদ্ধের ফলাফল নিজের পক্ষে তেমন না আসা, আর সব কিছুর ওপর যুদ্ধের সীমাহীন ব্যয়- এসব কারণে আমেরিকার অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খায় সে এখান থেকে। এছাড়াও আবার এরপর গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা নেমে আসে ২০০৭ সালের শেষে। এভাবে অর্থনৈতিক দিক থেকে রাষ্ট্রকে পুরাপুরি বিপদে ফেলার কাজটি ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট বুশ তার দুই টার্মে (২০০১-০৮)। এরপর বারাক ওবামা। প্রথম টার্মে তিনি প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়েছিলেন জানুয়ারি ২০০৯ সালে। আর দ্বিতীয় টার্মে ২০১৩ সালে। এর মধ্যে সর্বপ্রথম ২০১১ সালে, আমেরিকার পুরাতন নীতি-পলিসিগুলো নতুন করে সাজানোর প্রথম সুযোগ পান ওবামা। ইতোমধ্যে তিনি যুদ্ধ থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের সময়সীমা সাব্যস্ত করেছিলেন ২০১৪ সাল। কিন্তু দেশের অর্থনীতির শুকিয়ে যাওয়া দেখে তো বটেই, সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত দেখে (আমেরিকান অহঙ্কারে ঘা লেগেছে) এগুলো যে আমেরিকার নেতৃত্ব ও সক্ষমতা ঢলে পড়ার ইঙ্গিত- এ নিয়ে দেশের ভেতরে আলোচনা প্রবল হতে থাকে। ওদিকে ২০১১ সালেই ওবামা প্রথম অনেকটা সরাসরি চীন ঠেকানোর “এশিয়া নীতি” (PIVOT to Asia Policy) ঘোষণা করেছিলেন। আর ঐ বছরেরই মে মাসে ওবামা একসাথে ইউরোপের ছয় রাষ্ট্র সফরে বের হয়েছিলেন।
প্রথমেই আয়ারল্যান্ড ও ব্রিটেন সফরের সময় থেকেই তিনি মনোবল বাড়ানো বা ফেরানোর জন্য বক্তৃতা শুরু করেছিলেন। ‘আমরাই এখনো দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেবো’, ‘পাশ্চাত্য এখনো দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেবে’, এই ছিল তার নতুন বয়ান। বৃটিশ পার্লামেন্টে বক্তৃতায় ওবামা যা বলেছেন তা নিয়ে ২৫ মে ২০১১ বিবিসির ভাষ্য ছিল এরকম,

“……But he rejected arguments that the rise of superpowers like China and India meant the end for American and European influence in the world.
“Perhaps, the argument goes, these nations represent the future, and the time for our leadership has passed. That argument is wrong. The time for our leadership is now,” he said.
“It was the United States, the United Kingdom, and our democratic allies that shaped a world in which new nations could emerge and individuals could thrive.”

এটা তিনি চালিয়ে গিয়েছিলেন ২০১৪ সাল পর্যন্ত। আমেরিকার ওয়েস্ট পয়েন্ট মিলিটারি অ্যাকাডেমির গ্র্যাজুয়েশনে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘উদাহরণ হয়ে আমেরিকাকে দুনিয়াতে নেতৃত্ব দিতে হবে।’ পরের সপ্তাহেই চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্যাপারটা নিয়ে ঠাট্টা করেন।  সে যাই হোক, কিন্তু আসল কথা তত দিনে সবাই বুঝে গেছে, আর কিছুই ফিরবে না। আমেরিকার অ্যাকাডেমিক, থিঙ্কট্যাঙ্ক ইত্যাদি সব জায়গায় একই বিতর্ক বিষয়, আমেরিকান নেতৃত্ব, সক্ষমতার ঢলে পড়া। ইতোমধ্যে ২০১১ সালে আমেরিকার ভেতরের চাকরি বা কাজের সুযোগ, উৎপাদন ও পড়ে যাওয়া বাজার ঠিক করতে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ককে পুনঃদরকষাকষিতে নিয়ে কিছু চাকরি এবং সুবিধা ফিরিয়েছিলেন ওবামা। কিন্তু খুব বেশি কিছু হয়নি বা আগায় নাই তাতে। আমেরিকান প্রডাক্ট অথবা লেবার, প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়েছে, এটা এখন প্রতিষ্ঠিত। এসব কিছুর প্রভাবে এক ব্যাপক সামাজিক হতাশা চার দিকে ছেয়ে বসেছে।

এইবারের (২০১৬) আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মূল ইস্যু ছিল আসলে এটাই। এ কাজে ‘রেগুলার পলিটিক্যাল অ্যাপ্রোচ’ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার যারা গিয়েছেন সেই লিবারেলদের পক্ষে কোনো আবেদন ছিল না। তাই যার রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, কখনো কোনো স্তরে জনপ্রতিনিধি ছিলেন না যিনি, এমন এক ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পই নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের কাছে প্রধান ভরসা হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। নির্বাচনে জেতার পর আমেরিকার এখন দরকার এক কল্পিত শত্রু – যার বিরুদ্ধে জনগণকে ক্ষেপিয়ে অভ্যন্তরীণ গণসংহতি তৈরি করতে হবে। স্বভাবতই চাকরির দিক থেকে অবৈধ অভিবাসী, বিদেশী এবং ‘মুসলমান’ এদের বিরুদ্ধে লোক ক্ষেপানো তুলনামূলকভাবে সহজ ও ফলদায়ক বলে মনে করা হয়। অভ্যন্তরীণভাবে এই কৌশলকে যারা সঠিক ও উপযুক্ত মনে করেন, তাদের নতুন নামকরণ হয়েছে উগ্র ডানপন্থী অথবা বিকল্প ডানপন্থী বলে। এরা মনে করেন, এই পথ এখন সবচেয়ে কার্যকর। যেমন ট্রাম্প জিতে গেছেন এখন কে কে ট্রাম্পের সাথে প্রশাসনে বসবেন – তাদেরকে বেছে নিবার লড়াই চলছে। সে লড়াইয়ে এখনও কারা “মুসলমানদের আলাদা রেজিস্ট্রিতে নাম লেখাতে হবে” এর পক্ষে থাকতে চান এটা সেখানে ইস্যু। বিকল্প ডানপন্থীরা মনে করছে, এমন অবস্থান না নিলে নির্বাচিত হিসেবে ক্ষমতার জনভিত্তি দেয়া যাবে না। আবার উল্টো দিকে বিকল্প ডানপন্থীদেরই কারবার দেখে প্রচলিত রিপাবলিকান যারা আছেন, তারা রেসিজম বা ইসলামোফোবিয়ার অভিযোগ বিরোধীরা আনবেন এই ভয়ে বা লিবারেলদের প্রচারণার ভয়ে ভীত। তারা চাচ্ছেন, বিকল্প ডানপন্থীরা যেন ট্রাম্পের আশপাশে মন্ত্রী-উপদেষ্টা হয়ে না আসেন। এই লড়াইটাই এখন এ দু’পক্ষের।
অপর দিকে, ট্রাম্পের মাধ্যমে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার চাপের মুখোমুখি চীন হতে যাচ্ছে, তা তারা বুঝে গেছে। তাই চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উদ্বিগ্ন হয়ে আগেই বলে বেড়াচ্ছেন, (ট্রাম্পকে) মাথা ঠাণ্ডা করে মুখোমুখি বসতে হবে। ডায়ালগ ছাড়া আমাদের উভয়ের বিকল্প নেই। অর্থাৎ শঙ্কা, ট্রাম্পের কোনো গোঁয়ার্তুমিতে গ্লোবাল মন্দায় পড়ে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না। চার দিকে এক বিশাল অস্থিরতা বিরাজ করছে। সব মিলিয়ে এটা স্পষ্ট, সামনের পথ আরো অস্থিরতার, কোনো সহজ পথের আলো কোথাও নেই।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইন ২২ নভেম্বর সংখ্যায় (প্রিন্টে পরের দিন) কিছুটা ছোট করে ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার অনেক সংযোজন ও এডিট করে নতুন এডিশন হিসাবে আবার ছাপা হল।]

সাবধান, ট্রাম্পের দেখানোর দাঁত আর খাওয়ার দাঁত আলাদা

সাবধান,  ট্রাম্পের দেখানোর দাঁত আর খাওয়ার দাঁত আলাদা

গৌতম দাস
১৬ নভেম্বর ২০১৬, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-26g

গত সপ্তাহে আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হয়েছেন ডোনাল্ড জন ট্রাম্প । প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনকে ভোটে হারিয়ে তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। এর চেয়েও বড় কথা, আমেরিকার ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান- এই দুই দলেরই (বাইপার্টিজান) এলিটরা মিলিতভাবে নিজ নিজ দলের কথা চিন্তা বাদ দিয়ে ‘ট্রাম্প ঠেকাও’-এর কাজে নেমে পড়েছিলেন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে ০২ নভেম্বর  সিএনএন রিপোর্ট করেছিল ৩৭০ জন অর্থনীতিবিদ (যাদের মধ্যে কয়েকজন নোবেল প্রাইজ পাওয়া অর্থনীতিবিদও আছেন), তারা সবাই এক বিবৃতিতে কেন ট্রাম্পকে ভোট দেয়া ঠিক হবে না, তা জানিয়েছিলেন। ফলে নির্বাচনের আগেই একটা আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল যে  ট্রাম্পের বোধ হয় আর কোনো সম্ভাবনা নেই; তাকে হারিয়ে হিলারিই জিতে যাইতেছেন। রয়টার্সের মতো মিডিয়া বলা শুরু করেছিল, হিলারি জিততেছেন এটা নাকি প্রায় ৯০ শতাংশ নিশ্চিত হয়ে গেছে। ফলে ট্রাম্পের জেতার আর যেন কোনো সম্ভাবনা নেই, চার দিকে সে কথাই কেবল প্রচার হচ্ছিল। কিন্তু ফলাফল এখন সবাই জানেন, মিডিয়ার সবার সব অনুমান সেখানে উল্টে গেছে।  তাহলে এই অবস্থা তৈরি হয়েছিল কেন, আর প্রপাগান্ডার সব কিছু আসলে এক মিথ্যা ফানুস ছিল – এমনইবা শেষে প্রমাণ হলো কেন?

এটা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এটা সেই আমেরিকা যে এখনো গ্লোবাল অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র, নির্ধারক রাষ্ট্র – যদিও এটা শেষযুগে যৌবন ঢলে পড়ার কালে। সেই রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী, অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট, তারই নির্বাচন এটি। ফলে এই নির্বাচনকে ঘিরে একে প্রভাবিত করতে সরব মুখ খোলার কথা সমগ্র দুনিয়ার নানান স্বার্থের গোষ্ঠী-মানুষের। তবে মনে রাখতে হবে, সামগ্রিক দিক বিচারে বললে এই নির্বাচনে আসলে মোটা দাগে তিনটি পক্ষ ছিল। এক পক্ষ হল আমেরিকার বাইরের গ্লোবাল স্বার্থ-সুত্রে সম্পর্কিত মানুষ। অন্য দিকে যারা আমেরিকার ভেতরের, এদের মধ্যে আবার আরও দুই পক্ষ। এভাবে মোট তিনটা পক্ষ। মুল প্রসঙ্গটা আমেরিকান ভোটারের, ফলে এখানে ভেতরের মানে আমেরিকান নাগরিক যে ভোটার আর, বাইরের অ-নাগরিক মানে না-ভোটারের। ভেতরের মধ্যে মোটা দুই পক্ষের এক পক্ষ – এই দলে পড়বেন যারা আমেরিকাকে চালায় এমন বড়লোক, এলিট, নীতিনির্ধারক, ইন্টেলেক্ট, ওয়াল স্ট্রিটসহ ব্যবসায়ী জগৎ প্রভৃতি, যাদেরকে এখানে বলার সুবিধার্থে এখন থেকে একসাথে অভ্যন্তরীণ ‘এলিট’ বলে ডাকব। এলিট অর্থাৎ আমেরিকার ভেতরের ‘আম-ভোটার’দের থেকে যারা আলাদা। এই এলিটরাই সবচেয়ে বেশি কথা বলার সুযোগ রাখেন। সাধারণ সময়ে আমেরিকার বাইরের অ-নাগরিক আর ভেতরের এই এলিট অংশ এরাই মূলত মিডিয়া দখল করে রাখেন, কেবল এদের বয়ানই মিডিয়ায় আসে। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে। সেটা একমাত্র নির্বাচনের সময়। এই সময় এই দুই কুতুবের বাইরে নিরব কুতুব যারা সবকিছুর নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।  মিডিয়ার বয়ান ও দৃষ্টিভঙ্গির বাইরেরও ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ ওদের বাইরেও তৃতীয় (অভ্যন্তরীণভাবে দেখলে দ্বিতীয়) পক্ষ, এঅংশটি হল ‘আম-ভোটার’। ভোটে এরাই নির্ধারক, প্রবল সংখ্যাধিক্যের কারণে। আর সবচেয়ে বড় এই অংশটাই  মিডিয়ার অগোচরেই থেকে যায়, বিশেষত আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। অতএব ভোটের সময় এরা স্থানীয় মিডিয়ায় যদি থেকে যায় সেকথা বাইরে থেকে আমরা জানতে পারি না। এই ‘আম-ভোটার’ অংশটি সবচেয়ে বড় বলে ভোট দেয়া ও গণনায় সময় তাদের ভূমিকা নির্ধারক। অন্য যেকোনো গ্রুপের চেয়ে এরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা। আর ভোটের সময়ের ঠিক এর উলটা দশা হল প্রথম দুই পক্ষের (বাইরের অনাগরিক আর ভেতরের এলিট)। কারণ এদের মধ্যে কেবল ভেতরের এলিটদের কিছু ভোট দেয়ার ক্ষমতা আছে, অন্যটার ভোট নেই। তাহলে দাঁড়াল, আমেরিকান নির্বাচনে একমাত্র নির্বাচনের সময়ই সবচেয়ে নির্ধারক হল – আম-ভোটার। অথচ আম-ভোটারদের চেয়ে যাদের ভোটই নেই অথবা ন্যূনতম কিছু ভোট আছে  এরাই নির্বাচনে পুরো মিডিয়া দখল করে রাখে এবং সেখানে কেবল তাদের স্বার্থের বা গ্লোবাল স্বার্থের কথা বয়ানগুলোকে মুখ্য করে রাখে। অতএব এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আম-ভোটারকে অ্যাড্রেস করতে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা কী ভাষায়, কী চাতুরীতে বা কী কৌশলে কথা বলবে, প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এগিয়ে এই আম-ভোটারের কাছে পৌঁছবে, প্রভাবিত করবে, এটা খুবই নির্ধারক। জিততে চাইলে প্রভাবিত করার সেই ভাষ্য অবশ্যই মিডিয়ার আমেরিকার বাইরের ও ভেতরের এলিটদের ভাষ্য থেকে ভিন্ন করাই হবে সহজ কৌশল। ট্রাম্প সম্ভবত তাই করেছেন। তিনি ব্যাপক আম-ভোটারের ভাষারপ্ত করে তাদের তাতিয়ে কথা বলেছেন। তার সেসব কথা মিডিয়া বা আন্তর্জাতিক মূল্যবোধের চোখে হয়তো অচল। তবুও তা পরোয়া না করে এই ভোটারদের জীবনধারায় দেখা দৃষ্টিভঙ্গি, চাওয়া-পাওয়ার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ট্রাম্প ভোট চেয়ে কথা বলেছেন। কারণ মনে রাখতে হবে, আম-ভোটারদের কাছে তাদের নেতারা বিষয়ে তাদের মুখ্য বিবেচ্য একটাই – তা হল, সরকার তাদের জন্য অনেক কাজ আর ভাল বেতনের ব্যবস্থা করতে পারছেন কিনা, অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে পেরেছেন কিনা ইত্যাদি। যদি পারেন আর তা পারতে গিয়ে অন্য দেশের তেল লুট করে নাকি মানুষ খুন করে সব সাফা করে এনেছেন এসব তাদের বিবেচনার কোন বিষয় হয় না। কারণ তারা জানে এলিটরা হার-হারামজাদা। এলিটরা একমাত্র নিজের সংকীর্ণ স্বার্থের ধান্ধায় পরিচালিত। আর এটাই আম-ভোটারদেরকেও বিপরীত এক সংকীর্ণ স্বার্থের ভিতর দিয়ে নিজেদের দেখতে বাধ্য করে থাকে। ফলে ভিন দেশে গিয়ে আমেরিকান নেতা বা সরকার খারাপ বা অনৈতিক কী করছেন সে বিচারে বসার অবস্থায় তাঁরা থাকেন না। অন্তত নেতাদের আকামের বিচারে বসার চেয়ে বরং তাদের নিজের জন্য অনেক কাজ ও ভাল বেতনের বিষয় – এটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। যেমন ট্রাম্প কেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে বললেন; মেক্সিকো বা চীনের বিরুদ্ধে ট্রেড বেরিয়ার (আমদানি বাণিজ্যে বাধার নীতি) ইত্যাদিতে কথা বলেছেন। সে বিষয়গুলো আম-ভোটাররা নিজের স্বার্থের দিক থেকে দেখবেন, গ্লোবাল মিডিয়ার দিক থেকে নয়। এ ছাড়া আরেকটা বিরাট দিক আছে – মাইগ্রেন্ট বা প্রবাসী শ্রমিক। অথবা রিফিউজি নামে প্রবাসী বা বিদেশী শ্রমিক। এটা এমন এক জিনিস, যখন অর্থনীতি ভাল চলে তখন সরকার অথবা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশী শ্রমিকও কাজের প্রাচুর্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনুভব করে না। কোন সমস্যা দেখে না। বরং সুবিধার দিকটা দেখতে পায়। ফলে কে দেশের বাইরে থেকে এল, বিদেশী কিনা  তা তার কাছে বিবেচ্য হয় না। অর্থনীতি ভালো চললে, বাইরের শ্রম মানেই তুলনায় সস্তায় পাওয়া শ্রম, যে শ্রম তখন সবার দরকারও। তাই তা আদরণীয়। অথচ অর্থনীতি শ্লথ হয়ে গেলে ঠিক এর উল্টো। তখন মনে হয়, কালো বা বাদামি, বিদেশী বা মুসলমান সব খেদাও, এরাই নিয়ে গেল সব। জাতীয়তাবাদের জিগির উঠবে। এসব ক্রাইসিসের দিক খেয়াল রেখে নির্বাচনে ভোট পাওয়ার জন্য ট্রাম্প জেতার উপযুক্ত ভাষ্যটি সঠিক বানিয়েছিলেন। সেই ভাষায় কথা তুলে যিনি ভোট চাইবেন, স্বভাবতই তিনি সফল হবেন। নির্বাচনে ট্রাম্পের মূল শ্লোগান “মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন” (make America Great again) – ’। আম-ভোটারদের আকৃষ্ট করার ভাষ্য হিসাবে, এটাই সঠিক শ্লোগান। শেষের ঐ ‘এগেইন’ শব্দটা গুরুত্বপুর্ণ। হৃত-গৌরব মনে করিয়ে দিয়ে সুরসুরি দেয়া। আন্তর্জাতিক দিক নয়, জাতীয়তাবাদ।

কিন্তু সমস্যা হয়েছে অন্যখানে। আমরা ট্রাম্পের যত রকম কথা শুনেছি, সেগুলো আমরা আসলে ট্রাম্পের আম-ভোটারের চোখ দিয়ে না দেখে বরং ওর বাইরের অন্য দুই পক্ষের দিক থেকে দেখেছি। সমগ্র দুনিয়ার আমরা প্রথমত, আমাদের নিজ নিজ স্থানীয় প্রেক্ষিত থেকে অথবা গ্লোবাল প্রেক্ষিতে। আমরা ভুলে গেছি, আমেরিকার বাইরের যারা, তারা যত ক্ষমতাবানই হোন না কেন, তারা তো ভোটার নন। আর এটা তো আসলে কেবল ভোটেরই লড়াই। ফলে যারা বাইরের লোক বা সংখ্যায় ক্ষুদ্র দেশি-এলিট এদের নিন্দা-মন্দ কথা আমল করার কী আছে? কিছু নেই। নিন্দা-মন্দ আমল করলে তাতে ভোট সংখ্যা বাড়বে না।  ট্রাম্প এটা ঠিকই ধরেছেন। আর তাঁর জয়লাভের মূল কারণ সম্ভবত এখানে। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, আমেরিকার বাইরের অনাগরিক বা ভেতরের এলিট এসব স্বার্থ সন্তুষ্ট করে ভাষ্য তৈরি করে কোনো লাভ নেই। ভোটের বাক্সে এর কোনো প্রভাব নেই। তাই এ’দুই পক্ষের দিকে তাকিয়ে তিনি কথা বলেননি। দ্বিতীয়ত, একটা বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল, হাতির দেখানোর দাঁত দিয়ে চিবায়ও না, খায়ও না। চিবানোর দাঁত আলাদা। অথচ আমরা দেখানোর দাঁত দিয়ে চিবানো দেখতে চাচ্ছি। ট্রাম্প ভোটে জিতে যাবার পর আমরা এখন চাচ্ছি ট্রাম্প যেন ভোট চাইবার ভাষাতেই তার হবু সরকারের নীতি সাজাক। আর তাতে আমরা যেন আরামে ট্রাম্পের গুষ্ঠি উদ্ধাস্র করতে পারি। আমরা ভোট পাওয়ার জন্য দেয়া পপুলার শ্লোগান (বা বয়ান) আর জিতে যাবার পর তা ‘হুবহু’ সরকারের নীতি-পলিসি করা যেন বাধ্যবাধকতা! অথচ দেখানো আর চিবানোর দাঁত তো আলাদা, তা আলাদাও হতে পারে, হয়। এটা খেয়াল করে দেখি নাই।
আমেরিকা রাষ্ট্রের বাইরের মানুষ, ভিনদেশী আর সাথে ভিতরের কেউ কেউ এমন অনেকেই মনে করে যে ট্রাম্প খুবই খারাপ মানুষ – রেসিস্ট, রেপিস্ট ইত্যাদি ধরনের সব কিছু অভিযোগ যার বিরুদ্ধে আনা যায়, নির্বাচনে ট্রাম্পের হেরে যাওয়া উচিত। অর্থাৎ তারা এখানে এথিকস এবং স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন ভঙ্গের কথা তুলছেন, তুলবেন। এ কথাও ঠিক যে ট্রাম্পের অনেক কথায় এথিকস ও আইনের ফিল্টার পার হবে না, আটকে যাবে এবং তা আসলে খুবই অগ্রহণযোগ্য। তাহলে?

ট্রাম্পের বয়ান-অবস্থানের কী সমালোচনা করা যাবে না? সমালোচনা করা কি ভুল হবে? এক কথায় এর জবাব, অবশ্যই যাবে। তবে থিতু হতে একটু অপেক্ষা করেন। ইতোমধ্যে তিনি কী কী বলেছেন, সেগুলোর বিস্তারিত নোট নেন। কিন্তু কোনোভাবে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন না। নেয়া ঠিক হবে না। আগামী বছর ২০ জানুয়ারি ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নেবেন। এর আগেই ও পরে কিছু কিছু করে কয়েক মাসের মধ্যেই ট্রাম্পের ‘আসল’ (অর্থাৎ খাবার দাঁত) নীতি-পলিসি পরিষ্কার হয়ে যাবে। নির্বাচনে দেয়া তার বিভিন্ন বক্তব্যে কোথায় কোথায় এখন তিনি ফিল্টার দেবেন, ফাইন টিউন করে এরপর তা তার সরকারের নীতি-পলিসি হিসেবে ঘোষণা করবেন, তা বোঝা যাবে। এর আগে ট্রাম্প প্রসঙ্গে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া ভুল হবে। এ পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

যেমন, ইতোমধ্যে ট্রাম্প তাঁর মুসলিমবিরোধী বক্তব্য সেটা তিনি নির্বাচনী ওয়েবসাইট থেকে নামিয়ে ফেলেছেন। ওদিকে সর্বশেষ আর এক খবর হল – ওবামার স্বাস্থ্য বীমা পলিসি (অনেকে যেটা তামসা করে ওবামা-কেয়ার বলে), সেটা তিনি নির্বাচনী প্রচারের সময় ‘রিপিল’ করবেন বলেছিলেন। ইংরেজি রিপিল মানে ফিরিয়ে নেয়া, প্রত্যাহার করা বা উল্টো আইন করে বাতিল করে দেয়া। এখন তিনি জানাচ্ছেন, “আমি সম্ভবত রিপিল করছি না। তবে কিছু সংস্কার করব”। এই গুমোর খুলেছেন তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেয়া ট্রাম্পের প্রথম ইন্টারভিউয়ে। এর কিছু পরে ১২ নভেম্বর বৃটিশ দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট ঐ ইন্টারভিউয়ের উপর একটা রিপোর্ট করে বিস্তারিত। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভাষায় এটা ট্রাম্পের ইউটার্ণ; খবরের শিরোনাম হল, “Donald Trump: I may not repeal Obamacare, President-elect says in major U-turn”।

একটা অবজারভেশন হিসাবে বলা যায়, নির্বাচনের সময় সমগ্র দুনিয়ায় প্রার্থীরা অনেক প্রতিশ্রুতি বা নীতির কথা চাঁছা-ছোলা খোলা কথা বলে থাকে। কিন্তু জিতলে পরে যেটার ওপর কম অথবা বেশি ফিল্টার চড়ানো হয়, টোপর পরানো হয় বা ফাইন টিউনে একে বিচার-বিবেচনা করে বদলে নেবার পরেই কেবল তা  সরকারের নীতি হিসাবে ঘোষণা করা হয়। দেখা গেছে, সময়ে কোন রাষ্ট্রের ক্রাইসিস যত তীব্র থাকে নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি বা নীতির কথা তখন চাঁছা-ছোলা আনফিল্টার করে বলা হতে থাকে। আবার মনে রাখতে হবে নির্বাচনী কথার প্রতিশ্রুতির সাথে এরপর জিতে তা সরকারের নীতি হুবহু না হওয়াতে তা নিয়ে সমালোচনা করে নির্বাচনের ফল হবার পরে তা নিয়ে খুব বেশি আগানো যায় না বা কাজে লাগে না। আর একটা প্রশ্ন থেকেই যাই। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যাই তাই পরে সেটা তখনও কল্পনা তা সবাই মনে রাখে। তুলনায় পরে কংক্রিট ভাষায় সরকারের নীতিতে কী থাকছে সেটাই আসল, বাস্তব। ফলে নির্বাচন উত্তর পরিস্থিতিতে মানুষ কল্পনার চেয়ে বাস্তব নিয়েই কথা বলা অর্থপুর্ণ মনে করে। তবে হ্যা নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন সময়ে  কোনো প্রার্থীর সমালোচনা একমাত্র তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কাজে লাগে। এবং সেটা কেবলমাত্র নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন সময়ে , পরে আর নয়।  তাই আমাদের উচিত, চোখ-কান খুলে অপেক্ষা করা।

তাহলে ট্রাম্পই কি প্রথম ব্যক্তি যিনি নির্বাচনে দেয়া ‘হুবহু’ প্রতিশ্রুতিতে চলেন না? বরখেলাপ করেন? না, তা একেবারেই নয়। লিবারেল সুশীলদের প্রতিভূ শ্রী ওবামার কথাই ধরা যাক। তিনি তাঁর নির্বাচন চলাকালীন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জিতলে তিনি রেনডিশন প্রথা (আমাদের মতো দেশে তাদের আসামি পাঠিয়ে টর্চার করিয়ে আনা, কারণ ওমন টর্চার নির্যাতন করা আমেরিকান আইনে নিষিদ্ধ ) বন্ধ করে দেবেন, গুয়ানতানামো বে কুখ্যাত কারাগার উঠিয়ে দেবেন, আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহার করবেন ইত্যাদি। যার একটিও তিনি করেননি এবং পরবর্তিতে তিনি নিজে সরাসরি অপারগতা জানিয়েছেন। তবে আফগানিস্তানে ১০ হাজার আমেরিকান সৈন্য রেখে হলেও বাকিটা প্রত্যাহার করেছেন। আর এক উদাহরণঃ গত ২০১৪ সালে ভারতের নির্বাচন চলাকালীন সময়ে মোদি হুঙ্কার ও ভয় পাইয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তিনি জিতলে জেতার পরের দিন থেকে ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের’ বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত মোদির সে কথার পরবর্তী কথা কাজ বা তৎপরতা নেই। যেন এমন কথা তিনি কখনও বলেননি অথবা নিজেই ভুলে গেছেন।

তাহলে আমি কি বলতে চাইছি ট্রাম্পের ওবামা বা মোদীর মতই সব কথা ভুয়া, তাল ঠিক নেই? না, তাও একেবারেই সত্যি নয়। বরং ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ট্রাম্প দিচ্ছেন যে খুব সম্ভবত আমেরিকান রাষ্ট্রনীতিতে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসন্ন। আজকের যে আমেরিকাকে আমরা দেখে অভ্যস্ত, চিনি এই আমেরিকার গড়ন আকার লাভ করে থিতু হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে; আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়া নতুন অর্ডারে সাজিয়ে হাজির হয়ে আছে তখন থেকে। সে অবস্থাকে বলা হয় আমেরিকা দুনিয়ার এক এম্পায়ারের (সাম্রাজ্যবাদ নয়) ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়েছিল। এরপর থেকে তা সরাসরি আমেরিকার  নিজের প্রত্যক্ষ ভোগে বা কাজে লাগুক আর  নাই লাগুক – এমন বহু বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেম এরপর থেকে তা চলে এখনও টিকে আছে। আর এর পরিচালন চালিয়ে টিকিয়ে রাখার পুরা দায়ভার আমেরিকাকেই বইতে হয়ে আসছে। মুখস্ত বা অভ্যাসের মত, সেই থেকে কোন রিভিউ ছাড়াই এগুলো চলে আসছে। এমন সব প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেমের দায়দায়িত্ব এই প্রথম রিভিউ করে কাটছাঁট ও পুনর্গঠন করা হতে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসাবে যেমন, ন্যাটো। এর ৭৩ শতাংশ খরচ আমেরিকা একা বহন করে। ট্রাম্প এটা রিভিউ করার পর ঠিক করতে চান, এটা নিয়ে কী করা হবে। পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো কোল্ড ওয়ার লড়াইয়ের যুগ শুরুর শুরুতেই ১৯৪৯ সালে গঠন করা হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে সামরিক মোকাবোলায় ন্যাটোর সদস্য সকল রাষ্ট্রের একসাথে এক্ট করতে একটা বাধ্যবাধকতা চালু করা, যাতে তা বড় এক রক্ষাকবজ নয়। ট্রাম্প যাকে আমাদের পাগল বেতাল লোক বলে প্রমাণ করতে চাইছি, বা যা মনে চায় তা বলে নির্বাচনে জিতার লোক মনে হচ্ছে – এমন প্রপাগান্ডা হয়েছে হচ্ছে যার নামে  – সেই ট্রাম্প প্রশ্ন তুলছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই কবে ভেঙ্গে গেছে, দুনিয়াতে এখন সব রাষ্ট্রই এখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের মধ্যে সম্পর্কিত হয়ে আছে – অর্থাৎ সেই শত্রুতাও আর তেমন নাই। উলটা এখনকার একমাত্র জলন্ত হুমকি হল “টেররিজম”। তাহলে ন্যাটোকে একইভাবে রেখে দেওয়ার মানে কী? ন্যায্যতা কোথায়? অন্তত এবিষয়ে একটা  রিভিউ  করে এটা ভেঙ্গে দেয়া যায় কী না তা দেখা উচিত। আর দরকার হলে “টেররিজমের” মোকাবোলায় উপযোগী কিছু প্রতিষ্ঠান জন্ম দেয়া হক।  ব্যাপারটা নিয়ে ইতোমধ্যেই ইউরোপের অনেকের সাথে বাকবিতন্ডা শুরু হয়ে গেছে। ট্রাম্পের কথা ফেলনা নয়, যুক্তি আছে।

একইভাবে তিনি প্রশ্ন তুলে বলছেন – ট্রেড ব্যারিয়ার বা অবাধ পণ্য চলাচলে বাধা প্রসঙ্গে। চীনের সাথে বাণিজ্যে তিনি সস্তা জাতীয়তাবাদী হয়ে বাধা দেবেন না। তবে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক পুনরায় নেগোশিয়েট করে একটা তুলনামূলক ভালো ডিল (আমেরিকানদের জন্য চাকরি বা আউটসোর্সিং) তিনি পেতে চাইবেন। স্বভাবতঅই এটাই নির্বাচন উত্তর থিতু ভাষ্য। নির্বাচন চলাকালীন সময়ে ভোটের লোভে এই বিষয়টাকেই তিনি চীনের বিরুদ্ধে হুঙ্কারের মত শোনায় একন ভাষাতেই বলেছিলেন।

আবার সিরিয়া প্রসঙ্গে এক নতুন অবস্থান নিতে যাচ্ছেন। তাতে আসাদ থাকল না গেল, সেখান থেকে সরে আসবেন। রাশিয়ার ওপর আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রের অবরোধ উঠানো নিয়ে কথা আগাবেন। আইএস মোকাবেলা ও দমনে রাশিয়ার সাথে দায় শেয়ার করবেন সম্ভবত। এগুলো সবই বিশ্বাযোগ্য কথা ও পদক্ষেপ তিনি নিতে যাচ্ছেন।  কেবল একটা জায়গায় ফাঁকি দিক ছিল। খুব সম্ভবত তিনি হিলারির বিরুদ্ধে পুতিনের দেয়া ইন্টেরলিজেন্স ব্যবহার করতে পুতিনের সাথে অপ্রমাণিত ডিল করেছিলেন। ট্রাম্প বলতে পারেন যে হিলারিও তো ওবামার প্রভাব ব্যবহার করে “সরকারী মেল ব্যক্তিগত সার্ভারে রেখে” তিনি ঠিক করেন নাই তবে নিরাপত্তা ভঙ্গ হয় এমন কিছু ঘটান নাই বলে ছাড়পত্র এনেছিলেন। অর্থাৎ ওবামা-হিলারি এসব তথাকথিত লিবারেলরা কোন ধোয়া তুলসিপাতা নয় এটা মনে রাখতে হবে।  ওবামা-হিলারিরা কোন স্টান্ডার্ড বা আদর্শ নয়।

সৌদি, জাপান, কোরিয়া, জার্মানি প্রভৃতি দেশে যেখানে যেখানে আমেরিকান ঘাঁটি আছে সে ঘাঁটি রাখার খরচ কে বইবে – এই প্রশ্নটা  ট্রাম্প সামনে আনতে চান।  অথবা রাখা আদৌ আমেরিকার জন্য কোনো লাভ হচ্ছে কি না এটা পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে চান। এটা খুবই জেনুইন প্রশ্ন। এককালে আমেরিকার অর্থভান্ডারের অবস্থা ভাল ছিল পরে নিজ খরচে ভিন দেশে ঘাঁটি পোষা হয়ত গায়ে লাগত না। এখন লাভ-ক্ষতি হিসাব করা, বাস্তববাদী হওয়া অবশ্যই জায়েজ।

আমরা যদি মনে রাখি, ট্রাম্প একজন ব্যবসায়ী, তাহলে ট্রাম্পকে বুঝতে আমাদের তা কাজে লাগতে পারে।  উপরের সবগুলো প্রসঙ্গের একটা কমন দিক আছে। সেই বিচারে সবগুলো ইস্যু সম্পর্কিত। আমেরিকার এম্পায়ার ভুমিকা খাটো হয়েও গেছে, শুকিয়েছে। ফলে সে বাস্তব পরিস্থিতি মোতাবেক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আবার নতুন করে সাজানোর সময় পার হয়ে গেছে।  সারকথায় আমেরিকার এখনকার মানে শুকানো ভুমিকা মোতাবেক বড় খরুচে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তত ঢেলে সাজানো যায়। এককথায় যেটাকে দক্ষ সরকার – ম্যানেজমেন্ট এবং খরচের দিক থেকে স্মার্ট চটপটে সরকার কায়েম করার উদ্যোগ – নিঃসন্দেহে অনেক সুদুর প্রসারি ও বাস্তব চিন্তা।

আর একটা প্রসঙ্গ বলে শেষ করব। ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা ইতোমধ্যে ট্রাম্প জিতে যাওয়ার পর এক মজার মন্তব্য করেছেন। তিনি চীনা নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংক সমতুল্য ব্যাংক এআইআইবি (AIIB), এই ব্যাংক জন্মের সময় ওর গঠন উদ্যোগের বিরোধিতা করা আমেরিকার দিক থেকে  ‘স্ট্র্যাটেজিক মিসটেক’ বলে মন্তব্য করেছেন। এমন মন্তব্য খুবই উলটা বাওয়া মন্তব্য হলেও কথা মিছা না। বাস্তবতা হল এক আমেরিকা আর তাঁর পার্টনারস ইন ক্রাইম জাপান – এই দুই দেশ ছাড়া এখন AIIB সদস্য হতে কোন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপুর্ণ দেশ বাকী নাই। সর্বশেষ আমেরিকার পিছনে পিছনে চলা কানাডাও ঐ ব্যাঙ্কে যোগ দিয়েছে। আর সেই বিগত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকার নেতৃত্ব মেনে পিছেপিছে চলা শুরু করেছিল ইউরোপ। এই প্রথম নিজের স্বার্থ আমেরিকার চেয়ে আলাদা বলে অনুভব ও দাবি করে এরাও (মানে ইউরোপের প্রধান তিন প্রভাবশালী – জর্মন, বৃটিশ ও ফরাসী) চীনের নেতৃত্বে AIIB উদ্যোগে পতাকা তুলতে দেরি করে নাই।  যদিও এই প্রসঙ্গে খোস ট্রাম্প কী অবস্থান নিবেন এখনও কিছুই জানা যায় নাই।

ওবামার এক আদরের নীতি হল বিশেষ বাণিজ্য চুক্তি বা চুক্তি জোট গড়া। ওসব উদ্যোগে ওবামা মুখ্য বিশেষ্যত্ব হল ঐ চুক্তি বা বাণিজ্য জোট গুলোতে চীনকে বাদ রাখতে হবে।  চীনকে বাদ দিয়ে এরপর বাকিদের নিয়ে আমেরিকাসহ নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি (টিপিপি অথবা নাফটা) – এগুলো পুনর্গঠনের পক্ষে ট্রাম্প কথা বলছেন।খুব সম্ভবত চীনকে বাদ রাখা এটা খুব কাজের মানে কার্যকর সুবিধা আমেরিকাকে দিবে না অসুবিধা ডেকে আনবে – এটাই সম্ভবত ট্রাম্পের কাছে ইস্যু।

এক কথায় বললে চীনের উত্থানে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নতুন বিন্যাস ও অবস্থানের দিক থেকে আমেরিকার ভূমিকা কী? আর যাই হোক এতা নিশ্চয় আর আগের মত জায়গায় নাই। ফলে যে সব কোর বিশ্বাস বুঝাবুঝির উপরত আমেরিকার গত সত্তর বছর ধরে দাড়িয়ে ছিল তা বদলবার স্ময় হয়েছে।  ট্রাম্প সম্ভবত এ বিষয়গুলো এই প্রথম ঢেলে ভিন্ন দিক থেকে দেখে নতুন কিছু করতে চাইছেন। স্বভাবতই ট্রাম্পের প্রসঙ্গগুলো যত বিশাল, সে তুলনায় আমাদের কাছে তথ্য যেন আপাতত ততই কম। ফলে কোথায় তা কত দূর যেতে পারবে, আদৌ সম্ভব কি না তা দেখা-বোঝার জন্য আমাদের অনেক অপেক্ষা করতে হবে। তবে কোনোভাবেই বিষয়গুলোকে ট্রাম্পের নির্বাচনপূর্ব রেঠরিক মাত্র এই সংকীর্ণতা দিয়ে বুঝতে চাওয়া অর্থহীন হবে। একবাক্যে বললে, ট্রাম্প সম্ভবত চীন-আমেরিকার সম্পর্ক কোন নতুন মাত্রার দিক থেকে দেখতে চাইছেন যেদিক থেকে আগে কখনই দেখা হয় নাই। যদিও বিষয়গুলো যথেষ্ট প্রকাধ্য হয় নাই এখনও।

এ প্রসঙ্গের লেজ ধরে আরেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাহলে সামনে উদয় হয়। চীন-আমেরিকার সম্পর্ককে এখন থেকে কোন নতুন মাত্রার দিক থেকে দেখতে চাইলে স্বভাবতই ট্রাম্পের আমেরিকার সাথে ভারতের অথবা বাংলাদেশ নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। কারণ চীন দাবড়াতে হবে – এই অনুমানের উপরেই বর্তমান বহুপাক্ষিক ও বহুমাত্রিক সম্পর্কগুলো সাজানো। অতএব ট্রাম্পের নতুন দৃষ্টভঙ্গীতে এর ভেতর কোনো বিশেষ এবং নতুন দিক থাকবে কি না সে বিষয় এশিয়ার ভারত বা বাংলাদেশ এই দুই দেশেই আপাতত ক্লুহীন। হাসিনার দ্বিধা মনে ট্রাম্পকে স্বাগত জানানোটা সে আলোকে দেখা যেতে পারে। তবে চীনের সাথে ট্রাম্পের নতুন সম্পর্ক সাজানোর দিকটি মাথায় রাখলে তাতে ভারত ও বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ওপর তার কিছু কিছু ছাপ, নতুন বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়ার কথা। সম্ভবত ওবামার ‘চীন ঠেকানো’ টাইপের অবস্থান – – এটাকেই  ট্রাম্প ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন। ট্রাম্প এ রকম বহু প্রসঙ্গ তুলেছেন তা চূড়ান্ত নয়, বরং এগুলো ডেভেলপিং বলাই ভাল। তাই এক কথায় সব কিছুই  – ওয়েট অ্যান্ড সি, ডোন্ট কনক্লুড।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল।  আজ ১৬ নভেম্বর ঐ লেখা আরো সংযোজন ও এডিট করে আবার এখানে ছাপা হল। ]

 

সার্ক ভুলিয়ে দেওয়া যায় নাই

সার্ক ভুলিয়ে দেওয়া যায় নাই

গৌতম দাস
১৪ নভেম্বর ২০১৬,সোমবার,

http://wp.me/p1sCvy-21x

গত সেপ্টেম্বর মাসে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার “বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক দিনব্যাপী এক আলোচনার আয়োজন করেছিল যার আমন্ত্রণে ঢাকায় এসেছিলেন সুহাসিনী হায়দার। তিনি দক্ষিণী ভারতের প্রাচীন এক ইংরেজি দৈনিক ‘দি হিন্দু’ পত্রিকার ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর বা পররাষ্ট্রবিষয়ক সম্পাদক। দেশে ফিরে যাওয়ার আগে তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেটা গত ১৪ অক্টোবর “দি হিন্দু” পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।
সেই সাক্ষাৎকারটা নেওয়া হয়েছিল এমন এক সময়ে যখন এ’বছরের পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক সম্মেলন বাংলাদেশসহ কিছু দেশের বয়কট এবং বাতিল ঘোষণা হয়েছিল, এর পরপরই। প্রফেশনাল সাংবাদিক সুহাসিনীর একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড হল, তিনি আমেরিকার বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে ব্রডকাস্টিং জার্নালিজম বিষয়ে এমএ করেছেন। এরপর প্রায় ২০ বছর ধরে সাংবাদিকতা পেশায়। এর আগে তিনি ভারতীয় সিএনএন-আইবিএন টিভির এঙ্কর ও পররাষ্ট্রবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। ফলে একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড আর কেরিয়ার দেখে এটা বলার সুযোগ নেই যে তিনি অভিজ্ঞ নন। তাই, প্রধানমন্ত্রীকে করা তার প্রশ্ন কোনো নাদানের প্রশ্ন তা মনে করার কারণ নেই। কিন্তু লক্ষণীয় দিকটি হল, তার করা প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী হাসিনাও বিরক্ত হয়েছেন। আমার ধারণা, যারা এই সরকারের বিরোধী, বাংলাদেশের এমন যে কেউও সুহাসিনীর প্রশ্নে বিরক্ত হবেন এবং অপছন্দ করবেন।
কিন্তু কী ছিল সে সাক্ষাতকারে? বাংলাদেশে গত সংসদ নির্বাচনের (২০১৪ জানুয়ারি) আগে-পরের সময় থেকে হাসিনা সরকারের নির্বাচনী বৈধতার ব্যাপারটি বিতর্কিত হয়ে আছে। ঐ নির্বাচনের আগের মাসে, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের তখনকার পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসে স্পষ্ট প্রকাশ করে দিয়ে যান যে, এক “অনির্বাচিত নির্বাচনই” তাদের পছন্দ ও সমর্থনের। এভাবেই তারা আওয়ামী লীগ সরকারকেই “নির্বাচিত” দেখতে চান। আর সেই থেকে বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অগ্রহণযোগ্য হয়ে আছে; যদিও বাংলাদেশ সরকারের সাথে ব্যবহারিক কাজের সম্পর্ক তারা রেখেছেন। তবে নির্বাচনী বৈধতার ব্যাপারটি বিতর্কিত হয়ে আছে, সেটা জানাতেও ভোলেন না। এরপর থেকে “ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থে” বাংলাদেশ চলে, এমন বয়ান অনেকেই রাখেন। বাংলাদেশ একটা Vassal State বলে জাপানভিত্তিক ‘ডিপ্লোম্যাট’ পত্রিকা এক আর্টিকেল ছেপেছিল। সারকথায়, এটা ভারতের দয়ায় চলা ভারতের দিকে ঝুঁকে থাকা সরকার, এমন অভিযোগ মাথায় নিয়েই এই সরকার চলছে। অনেক সময় মন্ত্রী ও নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে এমন অভিযোগের অনুকূলে কথা প্রকাশ হয়ে পড়ে। এই হলো পটভূমিগত পরিস্থিতি। এমন পরিস্থিতির কথা সুহাসিনী হায়দারের অজানা থাকার কোনো কারণ নেই। এসব বিষয়ে তার নিজেরই অনেক রিপোর্ট আমরা দেখেছি। অথচ ঐ সাক্ষাতকারে ঠিক এর বিপরীত – সুহাসিনীর প্রায় সব প্রশ্নের পেছন এক ধরে নেয়া অনুমান থেকেছে যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কেন যথেষ্টভাবে ভারতের তল্পিবাহক হচ্ছেন না অথবা তার আরো হওয়া উচিত, এ ধরনের। এ ছাড়া তার প্রায় সব প্রশ্নই ভিতরেই একধরনের বোকামি বা নাদানিতে ভরপুর উপাদান রয়েছে। যেমন সব রাষ্ট্রেরই সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন  ইস্যুতে তার নিজস্ব কিছু বয়ান-অবস্থান থাকে, যা একান্তই তার বয়ান। আর সেটা অন্য রাষ্ট্র বা ভিন নাগরিককেও মানতে হবে, এটা সে আশা করে না বা সেদিকে তাকিয়ে ঐ বয়ান অবস্থান নেয় না। কিন্তু এর পরও সে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে পারস্পরিক স্বার্থে বিভিন্ন মাত্রায় সম্পর্কে জড়ায়। অর্থাৎ নিজের অবস্থানের সাথে অপর রাষ্ট্র একমত না হয়েও সম্পর্ক গড়ে ওঠে, আগায়। সেখানে  অপর রাষ্ট্রকে নিজ রাষ্ট্রের সাথে একমত হতে হবে এমন কোন পূর্বশর্ত থাকে না বা সেটা জরুরিও নয়। এসব বিষয়গুলো ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর হিসেবে সুহাসিনীর জানা না থাকার কিছু নেই। কিন্তু প্রতিটি প্রশ্নে সুহাসিনী বলতে চেয়েছেন, হাসিনা কেন বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের বয়ান-অবস্থানের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন না? কখনও কখনও এটা এমন জায়গায় গেছে যে মনে হয়েছে  হাসিনা কেন ভারতীয় অবস্থান নিচ্ছেন না সে প্রশ্ন তুলে হাসিনাকে অভিযুক্ত করতে বা জবাবদিহিতা চাইতেই যেন এই সাংবাদিক দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং বাংলাদেশে এসেছেন। অর্থাৎ তিনি পেশাদার সাংবাদিক কম বরং জাতীয়তাবাদী সৈনিক বেশি হয়ে উঠা বেশি – হয়ে পড়েছিলেন।
তার প্রথম প্রশ্ন ছিল, এবারের পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক সম্মেলন বাতিল হওয়া এবং বাংলাদেশের তাতে না যাওয়া প্রসঙ্গে। তিনি প্রশ্ন করছেন- এর ফলে সার্ক কি শেষ হয়ে গেল?
এখানে আগে এই প্রশ্নের পিছনের কিছু তথ্য বলে নেয়া ভাল। ভারতের উরি সামরিক ঘাঁটিতে কথিত হামলার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য মোদি সরকার জনমতকে ক্ষিপ্ত করে তুলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষে যুদ্ধে না গিয়ে ‘বিদেশের সাথে সম্পর্কের দিক থেকে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করব’ এটাই মোদির চরম অ্যাকশন হবে বলে তিনি কথা শেষ করেছিলেন। আর পরদিন থেকে ভারতের সব মিডিয়া ‘জাতীয়তাবাদী জোশে’ বাস্তবতা ভুলে মোদির কথা সফল করতে উঠে পড়ে লেগেছিল। ফলে সুহাসিনীর প্রশ্নের ভেতর সেই সস্তা জোশই আমরা দেখেছিলাম। যেন সাংবাদিকতায় অবজেক্টিভ থাকার বিষয়টা তিনি  ‘জাতীয়তাবাদী’ থাকা দিয়ে বদলে নেয়েছেন। অথচ সস্তা জাতীয়তাবাদ কোনো পেশাদার সাংবাদিকের সাথে কোনোভাবেই মানানসই নয়। আসলে ভারতের মিডিয়ার এক রেওয়াজ হল, পাকিস্তানের সাথে যে কোন যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে (সত্য-মিথ্যা অথবা সরকারের সংকীর্ণ নিজ দলের পক্ষে ভোট পাবার স্বার্থের কারনে যুদ্ধের হুঙ্কার বা পরিস্থতি তৈরি করলেও) বিচার-বিবেচনা শুণ্য উগ্র জাতীয়তাবাদী হয়ে সরকারের পক্ষে দল বেধে দাঁড়িয়ে যাওয়াটাই সাংবাদিকতা হয়ে যায় তখন। সেই রেওয়াজে এবারও ভারতের প্রায় সব মিডিয়া চিন্তাশূন্য হয়ে বেকুবের মতো বিশ্বাস করে নিয়েছিল, মোদির হুঙ্কার সত্যি জেনুইন। অথচ জোশ কিছু ঢিলা হবার পরে এই মিডিয়াই লিখেছিল যে আসন্ন ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে ভাল রেটিং পাবার সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে মোদী সরকার পাকিস্থানের সাথে যুদ্ধ-যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন। অর্থাৎ পেশাদারিত্ব ভুলে  ভারতের মিডিয়া এভাবেই বাস্তবতার বিচার-বিবেচনা শুণ্য হয়ে যাওয়া কোন ব্যাপারই না। যেমন মোদীর যুদ্ধের দামামা বা পাশা উল্টে যাবার পরে, (সুহাসিনীর ঐ প্রশ্ন প্রকাশের ছয় দিন পরে) ২০ অক্টোবর আনন্দবাজার লিখেছিল, “পাকিস্তানকে সন্ত্রাসের জন্মদাত্রী হিসেবে তুলে ধরতে মোদির আহ্বানে সাড়া দেয়নি বেইজিং। …ব্রিকসে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করতে চেয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু আগবাড়িয়ে খেলার সেই রণকৌশল নিয়ে আখেরে যে কোনো লাভ হয়নি, বারবার তা সামনে চলে আসছে। চীন, আমেরিকার পরে ব্রিটেনও জানিয়ে দিলো, পাকিস্তানকে সন্ত্রাসের জন্মদাত্রী আখ্যা দিয়ে মোদির সুরে সুর মেলাতে রাজি নয় তারা। এমনকি বেইজিংয়ের সুরেই লন্ডনের ব্যাখ্যা, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ত্যাগ স্বীকার করেছে ইসলামাবাদ”। অর্থাৎ এবার খোদ আনন্দবাজারই নিজ দেশের সরকারের সমালোচনা করা ছাড়া উপায় দেখে নাই।

ওদিকে  পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করবেনই – মোদীর এমন প্রতিজ্ঞার প্রকাশের পর এটা নিয়েও ভারতের মিডিয়া – ‘রাজা যত বলেন পারিষদ বলে তার ততগুণ’ – অবস্থা করে ছেড়েছিল। যেন মোদী তা করেই ফেলেছেন। ব্রিকস – রাইজিং ইকোনমির পাঁচ দেশের অর্থনৈতিক জোটের এবারের সামিট সম্মেলন ডাকা হয়ে ছিল ভারতের গোয়ায়। সাথে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল যে ব্রিকসের শেষদিনে আর এক দক্ষিণ এশিয়া জোট (BIMSTEC) (The Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) এর সাথে মিলে যৌথ বৈঠক হবে। বিমসটেক ((BIMSTEC)) আসলে সার্কের পাঁচ রাষ্ট্র আর সাথে বার্মা ও থাইল্যান্ডকে সাথে নিয়ে তৈরি। আর ওদিকে ভারতের কূটনৈতিক খায়েশ ছিল (খায়েশ বলতে হচ্ছে কারণ এটা ভারতের এক এবসার্ড মুরোদধীন কল্পনা। নিজের বাস্তব মুরোদে না, অন্যের ঘাড়ে চড়ে স্বপ্ন-জাল বুনা) যে বিমসটেককে এমনভাবে সামনে আনা যাতে সার্কের প্রয়োজন বা অস্তিত্বের কথা আর মনে না পড়ে। তা সার্কের বিকল্প হয়ে উঠে। ফলে পাকিস্তান বাদ পড়ে। বাস্তবে থাকুক আর নাই, কথার ফুলঝুড়ি তুলতে ওস্তাদ কলকাতার আনন্দবাজার, ০৪ অক্টোবর এক রিপোর্ট লিখেছিল যার শিরোনাম হল, পাকিস্তানকে এড়িয়ে ‘সার্ক-টু’ করতে চায় নয়াদিল্লি” । আর তাতে প্রথম বাক্য লিখেছিল, “পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে সার্ক সম্মেলন!”। আসলে স্বপ্ন দেখাটা সমস্যা নয়। সমস্যা হল কেন সেই স্বপ্ন বাস্তব হবে না তা ভেবে দেখা ত্যাগ করাটাই সমস্যা।  আর সাথে তো আছেই  ‘মুই কী হনু রে’ ভাব নেয়া। ব্যাপারটা যেন সবচেয়ে বেশি লেপ্টে গেছে বাংলাদেশে ভারতের এক প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত (২০০৭-০৮ সালে) পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীকে ঘিরে। তিনি বর্তমানে আমেরিকান সাপোর্টে চলা একটি ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক ওআরএফের (Observer Research Foundation (ORF)) ফেলো। তার ঢাকায় পোস্টেড থাকার সময়ও তিনি ‘মুই কী হনু রে’ ভাব রেখে গেছেন।  প্রায় একই ঐসময়ে বাংলাদেশের কিছু বিশেষ সাংবাদিক ভারতে গিয়েছিলেন। গত ৪ অক্টোবর যুগান্তর সেকথা ছেপেছিল এক রিপোর্ট। পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর জবানে যুগান্তর লিখছিল, তিনি বলেন, “এখন সার্কের কথা ভুলে যান। বিমসটেকের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে আমি বাংলাদেশকে আহ্বান জানাই”। কথাগুলো পিনাক বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় বলেছেন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে  পিনাক চক্রবর্তীও মোদির কথা সত্যি হয়ে গেছে বা আছে বলে বিশ্বাস করেছিলেন।

ব্যাপারটা কীভাবে শেষ হল?  আমাদের প্রথম আলো পত্রিকায় গত ২৬ অক্টোবর এক রিপোর্টের শিরোনাম হল, “সার্কের বিকল্প হচ্ছে না বিমসটেক”। আসলে কোন কিছু বিশ্বাস করার ভিত্তি কী এরা কী করে তা চিন্তা করে আল্লায় জানে। যেন “ভারত চাইছে” – এটুকুই যথেষ্ট সেকথা বিশ্বাস করা জন্য। আসলে গ্লোবাল অর্থনীতির বিকাশ ও এর সাথে ছড়িয়ে পড়া জটিল সম্পর্কের কারণে চীন ও আমেরিকার (আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমাস্বার্থের ওয়ার অন টেররের লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় স্প্রিংবোর্ড রাষ্ট্র হল পাকিস্তান) পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের গভীরতা ও নির্ভরশীলতা ভারত পড়তে অক্ষম – এটা তাই প্রমাণ করে। যেন ভারত এমনই এক আদুরে সন্তান যার খেয়ালকে চীনসহ পশ্চিমারাষ্ট্রগুলোকে নিজ স্বার্থ ভুলে গুরুত্ব দিতেই হবে। এবং এটা সম্ভব। এসবের নিট ফয়াফল হল এমন এবসার্ড স্বপ্ন-জাল বুনা। আর এদের চক্কড়ে পড়েছে চিন্তাভাবনা ত্যাগ করা বাংলাদেশেরও কিছু মিডিয়া ও সাংবাদিক। প্রথম আলোর রিপোর্টার রাহীদ এজাজ লিখেছেন, ‘গত মাসে নাটকীয়ভাবে স্থগিত হয়ে যায় সার্ক শীর্ষ সম্মেলন। এরপর থেকেই গোয়ায় ব্রিকস-বিমসটেক আউটরিচ শীর্ষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জোটের নতুন মেরুকরণ নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। পাকিস্তানকে ছাড়া সার্ক, এমন একটি ভাবনা সামনে এলেও শেষ পর্যন্ত সেটি ফলপ্রসূ হয়নি। বিশেষ করে সার্কের বিকল্প জোট হিসেবে বিমসটেক যে যথেষ্ট কার্যকর হবে না, সেটি স্পষ্ট হয়েছে গোয়ায় ১৬ অক্টোবর শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের পর”। এখন কথা হল যে ভারতের মিডিয়া এসব গ্লপগাথা বিশ্বাস করছে করুক কিন্তু প্রথম আলো বা রাহিদ এজাজ এরাও এটা বিশ্বাস করেছিল। কেন? কোন টানে বা সুত্রে?
মূলত এমন ঘটনাগুলো ঘটবার পিছনের আর কিছু সমস্যা হল, এটা ঠিক যে  চীন ঠেকাতে মরিয়া হয়ে আমেরিকা ভারতকে পাশে চায়। আর তাতে ভারতকে হিতাহিত জ্ঞান ও বাস্তবতা ভুলে অসম্ভব বায়না ধরা বালকের মতো আচরণ করতে হবে কেন? বাস্তবতার মধ্যে বিচরণ করলে তো কোন সমস্যা নাই। তাও হয়তো এটা তেমন সমস্যা মনে হতো না। কারণ আমেরিকার দুর্দশা থেকে ভারত ফায়দা লুটতে চাইলে বলার কী আছে? আর ভারতের তা না নিবার কিছু নাই। কিন্তু বড়ভাই পিঠে হাত রেখেছে বলে, ভারত নিজেই আপনা আপনি এক অর্থনৈতিক বা স্ট্রাটেজিক পরাশক্তি হয়ে গেছে, এই ‘মুই কী হনু রে’-এমন ভাবনাই ভারতের ইন্টেলিজেন্সিয়ার আসল সমস্যা। পিনাকি বা সুহাসিনী এর নমুনা। অথচ মূল সূত্র হল, সবার আগে রাষ্ট্রকে নিজ মুরোদে অর্থনৈতিক অর্থে পরাশক্তি হয়ে উঠতে হয়। সেটাও কেউ বিপদে পড়ে ঘুষ দিয়েছে বা পিঠে হাত রেখেছে- এভাবে অর্জনের জিনিস নয়। দুনিয়ার প্রথম সারির উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের অর্থনীতির দেশ হতে হয় আগে। এটা অর্জনের বিষয়। কারও দান অনুগ্রহে বা বিপদে পড়ে দেয়া ফেবার থেকে এটা অর্জন করা যায় না।

আর এক মজার দিক হল, সার্কের ম্যান্ডেট যেভাবে লেখা আছে সেই ম্যান্ডেট হিসেবে সার্ক বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নিয়ে কথা ওঠার কথাই নয়। ফলে সার্ক বৈঠকে বসতেতে না চাওয়ার পক্ষে কোন শক্ত যুক্তি নাই। তবুও এটাই সত্য যে ভারতের কূটনৈতিক লবির ‘সাফল্য হিসেবে’ বাংলাদেশ ও ভারত এবং আরো দুই রাষ্ট্র সার্ক বর্জন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এই বর্জনের আসল কারণ প্রকাশ্যে স্বীকার করতে হবে, ব্যাপারটা এমন একেবারেই নয়। কিন্তু সুহাসিনী জিদ ধরেছেন, হাসিনাকে প্রশ্নের চাপে ফেলে এটা স্বীকার করাবেনই। তাই তাঁর প্রশ্ন, “পাকিস্তান সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদ ছড়ানো দেশ। এটা কি আপনার সার্ক বর্জনের প্রধান কারণ নয়? সার্ক পরিত্যাগ কি পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য নয়?”। মহা সমস্যা, এই সুহাসিনীকে কে বুঝাবে যে এই ব্যাখ্যা বয়ান একান্তই ভারতের। এটা ভারতের আভ্যন্তরীণ কনজাম্পশনের জন্য। ভারতের পক্ষে কাজ করতে চাইলেও হাসিনা এই বয়ান তারও বয়ান-অবস্থান বলে স্বীকার করে নেয়া জরুরি না।  কিন্তু সুহাসিনীরা মনে করেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ‘ভারতের পক্ষে সার্ভিস ও কূটনৈতিক সাড়া’ সুহাসিনী যেভাবে দেখতে চাইছেন ঠিক সেভাবে দিতেই হবে। অন্য  কোনভাবে হলে এতেও তার মন ভরবে না। তবুও শেখ হাসিনা ধৈর্য ধরে ঠাণ্ডা মাথায় জবাব দিয়ে বলেছেন, “পাকিস্তানের ভেতরের কিছু কারণে (অর্থাৎ পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদের জন্য বা ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্বে ভারতের পক্ষে থাকার জন্য নয়) আমরা সার্কে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ভারত-পাকিস্তানেরও দ্বিপক্ষীয় বিরোধ আছে। কিন্তু আমি এটা নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না। ভারত উরির জন্য সার্কে যায়নি, আর বাংলাদেশের কারণ এ থেকে ভিন্ন”। অর্থাৎ “মন্তব্য করতে না চাওয়ার কথা” বলে হাসিনা ইঙ্গিত দিচ্ছেন তাকে চাপাচাপি করা সুহাসিনীর ঠিক হচ্ছে না। তবু এমন জবাব পেয়েও সুহাসিনী সন্তুষ্ট নন। তিনি আবার প্রশ্ন করছেন, “আপনি কি কাশ্মিরের সীমান্তরেখা এলওসি পার হয়ে পাকিস্তানে ঢুকে সন্ত্রাসী মারতে ভারতের যাওয়া সমর্থন করেন না?”। হাসিনা আবারো মাথা ঠাণ্ডা রেখে জবাব দিচ্ছেন, “আমার মনে হয়, এলওসি বরাবর উভয় পক্ষের নীরবতা বজায় রাখা উচিত, যাতে তা শান্তি আনে”। কিন্তু সুহাসিনী হাসিনার মুখ দিয়ে যেন ভারতের বয়ান-অবস্থানের ভাষায় কথা বলাবেনই বলে জিদ ধরেছেন। তাই তিনি আবার প্রশ্ন করেছেন, “আপনি কি এর নীতিগতভাবে সমর্থক নন? গত বছর সরকার ঘোষণা করেছিল, তারা সীমানা পেরিয়ে মিয়ানমারে সন্ত্রাসবাদীর সন্ধানে যাবে। আপনি কি বাংলাদেশের এমন অ্যাকশন করা সমর্থন করবেন?”।
এবার হাসিনার পক্ষে আর ধৈর্য রাখা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, “শোনেন, এই প্রশ্ন আপনি আপনার সরকার আর প্রধানমন্ত্রীকে গিয়ে করুন। আমি মনে করি, ভারত-পাকিস্তান সীমান্তরেখা, এই এলওসি মান্য করতে হবে”।

এতে সুহাসিনীর কী শিক্ষা হয়েছিল, তিনি কী বুঝেছিলেন আমরা বলতে পারব না। তবে তার দ্বিতীয় ধারার প্রশ্ন এবারঃ “আপনি কিছু দিন আগে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বলেছিলেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নেবেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তৎপর হতে এত সময় লাগল কেন, বিশেষত যেখানে অনেক মৌলবাদী গ্রুপ এর আগে অনেক হিন্দু আর ব্লগারকে মেরে ফেলেছে?”।
জবাবে অনুমান করি প্রধানমন্ত্রী আবার ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তিনি বলেছেন, “কথা সত্য নয়। বাংলাদেশই প্রথম সন্ত্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে অ্যাকশনে গেছে। তদন্ত করতে সময় লাগে, শুধু আমার দেশে নয়, সব দেশেই। তাই বলে এটা বলা ঠিক নয় যে, আমরা তৎপর হচ্ছি ধীরগতিতে”।
এবার সুহাসিনীর রাস্তা ভিন্ন, যা দিয়ে প্রশ্ন করলে শেখ হাসিনা ‘জব্দ’ হবেন আর সুহাসিনীর ক্রেডিট বাড়বে, এমন লাইনের প্রশ্ন।
“মানবাধিকার গ্রুপগুলো অভিযোগ করছে যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হেফাজতে থাকা আসামিকে হত্যা, গুম অথবা হাঁটুতে গুলি করছে…”। সুনির্দিষ্ট করে হাটুতে গুলির কথা এসেছে এজন্য যে এর আগের সপ্তাহে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ‘হাঁটুতে গুলি’ করা নিয়ে এক লম্বা রিপোর্ট করেছিল, সেই বরাতের প্রশ্ন। ফলে এইবার শেখ হাসিনা তাকে থামিয়ে দিয়ে জবাব দিয়েছেন, ‘এটা খুবই দুর্ভাগ্যের যে, মানবাধিকার গ্রুপগুলো আজকাল ভিক্টিমের মানবাধিকারের বদলে ক্রিমিনালের মানবাধিকার নিয়ে বেশি সোচ্চার। আমেরিকায় কী হচ্ছে? তাদের স্কুলে বা কোথাও যখন টেরর আক্রমণ হয়, তখন তাদের বাহিনীগুলো কী করে? তারা কি আক্রমণকারীদের মেরে মানুষকে উদ্ধার করে না? আমাদের বাহিনী কি সন্ত্রাসীদের মারবে? না, যারা আক্রমণ করেছে, তাদের মারবে?’। মনে হচ্ছে এতে সুহাসিনী কিছু ঠান্ডা হয়েছেন।
এরপর সুহাসিনীর সেই পুরান প্রশ্ন, আইএস আছে, আইএস নেই। “আইএস নিজেই বলছে, প্রধান সন্দেহভাজনদের তারাই ট্রেনিং দিয়েছে। আপনি অস্বীকার করছেন- এই অভিযোগ করলে আপনার জবাব কী?”।
হাসিনা এখানে এসে আগের এতদিনের অস্বীকারের জায়গা থেকে একটু হেলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘হতে পারে আইএস ওদের কাউকে কাউকে আকর্ষণ করে। কিন্তু আমাদের এখানে আইএসের ঘাঁটি নেই। কেউ যদি দাবি করে, তাহলে আগে প্রমাণ দিক। আমরা আক্রমণকারীদের চিহ্নিত করেছি। আমরা জানি, তারা কোথা থেকে এসেছে এবং এরা সবাই স্থানীয়”।
সুহাসিনী বলছেন, “আপনি বলছেন যুদ্ধাপরাধের বিচার জনগণের দাবি। কিন্তু নির্বাচিত জামায়াত নেতারা ফাঁসিতে ঝুলছেন, না হলে জেলে। অনেক বিএনপি নেতা গ্রেফতার না হলেও বিদেশে পালিয়েছেন। আপনি কি আপনার রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনকে যুদ্ধাপরাধের বিচার বলে চালিয়ে দিচ্ছেন না?”।
“না, এটা আমার রাজনৈতিক বিরোধীদের বিষয় নয়। আপনি যদি একটা স্বাধীন দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, তাহলে আপনি স্বাধীনতাবিরোধীদের কিভাবে সমর্থন করেন? বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। বিএনপি নেতাদের নিয়ে মামলার বিষয়গুলো আলাদা, এগুলো হয় দুর্নীতি, না হয় অপরাধের মামলা। যদি এসব নেতা মনে করেন তারা নির্দোষ, তারা বিচারপ্রক্রিয়া মোকাবেলা করুন। আমি যখন বিরোধী দলে ছিলাম, তারা আমার বিরুদ্ধেও ডজন ডজন মামলা দিয়েছিল”। (এই শেষের বাক্যটি বলে হাসিনা কিন্তু অজান্তে প্রকারান্তরে অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছেন।)

প্রসঙ্গ আপাতত এখানেই শেষ করতে হচ্ছে। এই সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থা স্বস্তিকর নয়। আমরা জানি না, পরে আর কখনো এই মহিলাকে সাক্ষাৎ দেয়া যাবে না, এমন সিদ্ধান্ত সেখানে হয়েছে কি না!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -২

ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -২

গৌতম দাস
০৪ নভেম্বর ২০১৬, বৃহস্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-1Zw

দ্বিতীয় ও শেষ পর্বঃ
গত পর্বে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতের্তের প্রসঙ্গে বলেছিলাম, গত ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬, তিনি প্রেসিডেন্ট ওবামাকে “বেশ্যার ছেলে” ( ‘son of a whore’) বলে প্রকাশ্যে গালি দিয়ে ছিলেন। এমন শব্দের ব্যবহার খুব ভালো কথা নয় নিশ্চয়ই। ফলে তা প্রশংসার বিষয় নয়। কিন্তু এসবের পেছনে অর্থাৎ আমেরিকার বিরুদ্ধে দুতের্তের ক্ষোভের কারণ ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়াগুলো বোঝার দরকার আছে। সাধারণভাবে বললে, গালি দেয়ার কারণ – প্রেসিডেন্ট দুতের্তে নিজ দেশে অবৈধ ড্রাগের বাড়াবাড়ি বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে ড্রাগ ডিলার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিচারবহির্ভূতভাবে শুধু গুলি করেই মারছে না। দুতের্তে প্রকাশ্যেই দাবি করে বলছেন, “ড্রাগ ডিলাররা তার বৈধ টার্গেট। এরা আরো মরবে”। এ পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় চার্চ, মানবাধিকার সংগঠন, জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর সবশেষে ওবামা মানবাধিকার লঙ্ঘনের আপত্তি তোলায় সবাইকে অশ্লীল ভাষায়, প্রেসিডেন্টের পদমর্যাদার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ভাষায় তিনি পাল্টা গালাগালি করেছেন। দুতের্তে বলতে চান, বিচারবহির্র্ভূতভাবে হত্যাকাণ্ডগুলোকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার দিক থেকে দেখে অথবা দেখার সুযোগ নিয়ে অন্য কারো আপত্তি বা সমালোচনা তিনি শুনতে চান না। “তিনি বা তার দেশ যেহেতু এখনো স্বাধীন সার্বভৌম এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রের উপনিবেশ নয়, তাই তাদের ডিকটেশন বা সমালোচনা তিনি শুনবেন না”। এ কথা ঠিক যে, যে কোন রাষ্ট্রের যে কোন উছিলায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ নাই, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনাকে ইস্যু করে আমেরিকার কাছে এমন মানবাধিকার ইস্যু ভিনদেশে হস্তক্ষেপ করার হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা করা হয় সময়ে – এটাও গ্রহণযোগ্য নয়। ফিলিপাইনে ড্রাগের সমস্যা সঙ্কট মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছেছে, তা সমাধানের পদক্ষেপ নেয়া জরুরি, সে কথাও ঠিক। কিন্তু এসব কিছু ছাপিয়ে বড় কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রেসিডেন্ট দুতের্তে, তাঁর যে কোন সমালোচককে অভদ্র ভাষায় বাপ-মা তুলে গালি দিয়ে বেড়াচ্ছেন। সবার মূল কথা তাই হয়ে দাঁড়িয়েছে এই যে, অন্তত ভদ্রতার খাতিরে ভদ্র ভাষা ব্যবহার করেও তো দুতের্তে তার পয়েন্ট, তার সমস্যা ও বক্তব্য  তুলে ধরতে পারতেন। এমন না করার দোষে তিনি দুষ্ট।
যা হোক, গালাগালি করার এমন পরিস্থিতির ফলে স্বভাবতই ওবামা এরপরে দুতের্তের সাথে তাদের নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করে দেন। যদিও এর পরের দিন দুতের্তে সাংবাদিকদের মাধ্যমে ওবামাকে ‘স্যরি’বলে ক্ষমা চেয়েছিলেন। কিন্তু তা কোন কিছুকেই আগের মত স্বাভাবিক করেনি; বরং তা ন্যূনতম একটি কাজ চালানোর মতো কার্যকর সম্পর্কের স্তরেও আর ফিরে আসেনি। এটা সেই থেকে আমেরিকা-ফিলিপাইন সম্পর্ককে পুরান গভীর ঘনিষ্টতার বিপরীতে বিরাট অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

ওবামা-দুতের্তে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, আঞ্চলিক জোট ‘আসিয়ান’-এর সভা, যা এবার আয়োজিত হয়েছিল লাওসে, সেখানেই সাইড লাইনে। মানে মূল অনুষ্ঠান সূচির ফাঁকে। ফলে দুতের্তে-ওবামা দ্বিপক্ষীয় সভা বাতিল হলেও পরোক্ষে তাদের দেখা হয়েছিল ওই আসিয়ান সম্মেলনে, সভার সদস্য হিসেবে। কিন্তু সরি বলার পরও কেন সম্পুরক-পরিস্থতিতে কোন উন্নতি হয় নাই এ বিষয়ে আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ম্যাগাজিন এক এক্সক্লুসিভ বিশেষ রিপোর্ট ছেপেছিল। কিছু ব্যক্তিগত রেফারেন্স থেকে পাওয়া এটা এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। ঐ রিপোর্ট বলছে, দুতের্তে  সাংবাদিকদের মাধ্যমে ওবামাকে ‘স্যরি’ বলার পর দুতের্তে-ওবামা দ্বিপক্ষীয় সভা আবার আয়োজনের চেষ্টা হচ্ছিল। কিন্তু সম্মেলনেই এক ডিনারের টেবিলে এক ফাঁকে দুতের্তে ওবামার সাথে কথা বলতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেষ্টা করেছিলান। কিন্তু ওবামা দুতের্তের সাথে ঠিকমত কোনো মুখের কথাও বলেনি শুধু তাই নয় ওবামা উল্টো নিজের জুনিয়র স্তরের আমলা প্রতিনিধির সাথে দুতের্তেকে বৈঠকে বসতে প্রস্তাব করেছিলেন। (Mr. Obama said a follow-up would come from White House staff, not himself) এতেই দুতের্তে প্রচণ্ড অপমানিত বোধ করেন এবং আমেরিকা-ফিলিপাইন গভীর সম্পর্ক এরপর একেবারে আরো খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ায়।

বলা হইয়ে থাকে, আমেরিকা-ফিলিপাইন এদুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিগত প্রায় সত্তর বছরের পুরনো এবং সেকালের আসন্ন কমিউনিস্ট বিপ্লব ঠেকাতে গিয়ে বন্ধুত্বের ঘনিষ্ঠতা, আর সেই থেকে আমেরিকান সেনাঘাঁটি স্থাপন হয়ে আছে ফিলিপাইনে। সেই সম্পর্ককে একেবারেই ছিন্ন করে উল্টো পথে হাঁটতে চাইছেন দুতের্তে। অন্তত রাগের মাথায় তাই বলছেন তিনি। সে দিকে বিস্তারে যাওয়ার আগে কোন পশ্চাৎ পটভূমিতে এসব ঘটনাবলি ঘটছে, সেগুলোর একটু স্মরণ ও ঝালাই করে নেব।

একালে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীনের অর্থনৈতিক আসন্ন ও চলতি  উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকার ওবামা প্রশাসন বিগত ২০১১ সালে এক ‘এশিয়া নীতি’ ঘোষণা করেছিল। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ঠেকাও, এই লক্ষ্যে সাজানো ওই নীতিতে আমেরিকা নিজের ভূমিকাকে কেন্দ্রীয় ত্রাতার (পিভোটাল রোল) জায়গায় দেখিয়ে প্রকাশ করেছিল। ভৌগোলিক দিক থেকে আমেরিকার এই এশিয়া নীতির কেন্দ্রীয় প্রসঙ্গ সমুদ্রপথে চীনা ভূখণ্ডে প্রবেশদ্বার- চীন সাগর; বিশেষত দক্ষিণ চীন সাগরের কথা মনে রেখে।।
চীনা মূল ভূখণ্ড থেকে সমুদ্রে অথবা সমুদ্র থেকে মূল ভূখণ্ডে প্রবেশের প্রবেশদ্বার একটাই- চীনের পূর্ব দিকে। এই সাগর আসলে একই চীন সাগরের দুই দিক, দুই নামে তা দক্ষিণ চীন সাগর আর পূর্ব চীন সাগর নামে পরিচিত। এর মধ্যে দক্ষিণ চীন সাগরাঞ্চল আরো এগিয়ে তা মহাসাগরে মিশে যাওয়ার আগে চীনের প্রবেশদ্বারের চার দিকে ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম ও তাইওয়ান- এসব দেশের সমুদ্রসীমান্ত। ফলে এসব দেশের সবার সাথে সমুদ্রসীমান্ত বিষয়ে চীনের অমীমাংসিত বিরোধ বিতর্ক আছে। বাইরে থেকে বলা হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগরের পানির নিচ, সেটা পুরোটাই তেলসহ নানান সমুদ্র সম্পদে সমৃদ্ধ। সে জন্যই এই বিরোধে সবাই সিরিয়াস। কিন্তু এসব সম্পদের হিসাবের কথাগুলো সত্যি না হলেও চীনের কাছে এর গুরুত্ব আলাদা ও বিশেষ ভাবে থাকে, আছে। কারণ, দক্ষিণ চীন সাগর চীনের কাছে নিজের একমাত্র সমুদ্রপথে চলাচল অবাধ রাখা, এবং তা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা – খুবই জরুরি ও নির্ধারক। কারণ নিজের মরা-বাঁচার মত ইস্যু এটা। এদিক তাক করেই আমেরিকা চীনকে বিরক্ত করার এশিয়া নীতি সাজিয়েছে। যার মধ্যে আমেরিকার ভান করার দিক হল, চীনের পড়শিদের স্বার্থ রক্ষা করতেই যেন আমেরিকার এই সুদূর এশিয়ায় সামরিক উপস্থিতিতে আসার উদ্দেশ্য। নিজেকে পিভোটাল (pivotal বা ক্ষমতা কেন্দ্র) ত্রাতার ভূমিকায় দেখিয়ে হাজির করা। আমেরিকার তৎপরতার ভেতর এসব দিকের কথা চীনের পড়শি সব রাষ্ট্র জানতে পেরেছে সেই ২০১১ সাল থেকে। কিন্তু তারা কেউ সেসময়ই আমেরিকার কথায় মাতেনি। কেন? সারকথায় বললে, তারা আমেরিকার পক্ষে চীন-বিরোধী কোনো যুদ্ধপক্ষের জোট বা ঘোটের মধ্যে ঢুকে নিজেদের জড়াতে বা দেখতে চান না। যুদ্ধ রিস্কি জিনিষ -পুঁজিপাট্টা গায়েব হয়ে যায়। তবে নিজ নিজ ভুখন্ড সীমান্ত-সার্বভৌমত্ব রক্ষার করতে কোন আপোষ করতে তারা যায় না। তাই আশা করে কোনো নীতির ভিত্তিতে সব বিতর্ক সমাধান হয়ে যাক, এটা তারা চায়। এব্যাপারে শুরুতে সবচেয়ে ভোকাল ছিল ফিলিপাইন, যদিও ইতোমধ্যে আমেরিকার প্ররোচনায় সেই ফিলিপাইনই একমাত্র রাষ্ট্র, যে সমুদ্রসীমা বিরোধ মীমাংসার জাতিসঙ্ঘের ট্রাইব্যুনাল ‘আনক্লস’ ( UNCLOS, United Nations Convention on the Law of the Sea)-এ মামলা করেছিল। এই মামলায় আমেরিকার প্রভাবে ফিলিপাইন সম্প্রতি চীনের বিরুদ্ধে নিজের পক্ষে একটা রায় পেয়েছে। যদিও ওই আদালত গঠন নিয়ে আগেই চীনের আপত্তি ছিল আর তা উপেক্ষা করার কারণে চীন মামলা চলার সময়ে সক্রিয়ভাবে কনটেস্ট করেনি। তাই রায় প্রকাশের পরে চীন এই রায় গ্রহণ করেনি বলে জানিয়েছে। তবে রায় প্রকাশের পরে কোনো পক্ষ থেকেই তা সামরিক পদক্ষেপের দিকে যায়নি। তবে রায় প্রকাশের অনেক আগে থেকেই (২০১২ সালে) বাস্তব মাঠে, মাছ ধরার দিক থেকে ফিলিপাইনকে মাছ ধরা থেকে বিরত রেখে আসছিল চীন, সেটাও এখনও তেমনই আছে। এক কথায় বললে, রায় প্রকাশের পর ফিলিপাইনের দিক থেকে তারাও কোনো সামরিক দখল উদ্যোগের দিকে যায়নি বা যাওয়ার কোনো নীতি গ্রহণ করেনি। ইতোমধ্যে ২০১৬ সালের ৩০ জুন দুতের্তে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের শপথ নেন। এরপর থেকে সমুদ্রসীমা বিতর্কে ফিলিপাইনের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে নিজ অবস্থানের কথা তিনি জানান। কিন্তু এ নিয়ে কোনো যুদ্ধে জড়ানোর আশঙ্কা তিনি নাকচ করে দেন। ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট দুতের্তে খোলা ভাষায় পরিষ্কার করে বলছিলেন, চীনের সাথে কোনো যুদ্ধের ব্যাপারে তিনি আগ্রহী নন; বরং দুতের্তে ক্ষমতা নেয়ার পর মাছ ধরার ইস্যু নিয়ে চীনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিল। এগুলো সবই ‘ওবামাসহ সবাইকে গালাগালির প্রসঙ্গ’ হাজির হওয়ার আগেকার ঘটনা। তাই গালাগালির প্রসঙ্গ এবার চীন-ফিলিপাইন সম্পর্ক, আমেরিকার এশিয়া নীতি, আমেরিকা-ফিলিপাইন সামরিক সম্পর্ক ইত্যাদি সব কিছুকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর দিকে ঠেলে দিয়েছে।

আসিয়ানের লাওস সম্মেলন ছিল গত ৬ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। ওখান থেকে দেশে ফিরে দুতের্তে খুব দ্রুত আমেরিকার সাথে পুরনো সম্পর্ক প্রায় ছিঁড়ে ফেলা আর বিপরীতে চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক করার উদ্যোগ নিতে থাকেন।

আমেরিকা বা ওবামার সাথে শুধু সম্পর্ক ছিন্ন নয়, বরং আমেরিকার সাথে নতুন বিরোধে জড়াতে গত ১৯ অক্টোবর ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট দুতের্তে নিজেই চীন সফরে যান। শুধু তাই নয়, ২০ অক্টোবর রয়টার্স জানাচ্ছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাকে আমরা ‘দুই ভাই’ বলে বরণ করে নিয়েছেন। রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনামই হল, ‘Brothers’ Xi and Duterte cement new-found friendship।  দুতের্তে সেখানে ঘোষণা করেছেন, পুরনো বন্ধু আমেরিকা বাই বাই, দক্ষিণ চীন সাগরে আমেরিকার সাথে যৌথ টহল বাতিল, আর এখন থেকে রাশিয়া ও চীন থেকে অস্ত্র কিনবেন তিনি ইত্যাদি। তিনি আরো পরিষ্কার করে বলেছেন, ফিলিপাইন নিজেকে ঢেলে সাজিয়েছে। ফলে এখন ফিলিপাইন, চীন আর রাশিয়া এই হলো তাদের নতুন কৌশলগত অ্যালাইনমেন্ট ইত্যাদি। অর্থাৎ পুরো উল্টো দিকে বেয়ে চলছেন তিনি। তবে এটা সত্যি যে, দুতের্তের ভাষ্যে অনেক রেঠরিক বা বাকচাতুরির প্রপাগান্ডা শব্দ মেশানো আছে। তাই আমরা দুতের্তের নীতিকে ঠাণ্ডা মাথায় বুঝতে তার বদলে তাঁর অর্থনৈতিক উপদেষ্টার মন্তব্য শুনব। চীন সফর শুরু হওয়ার পর তিনি এক বিবৃতি দিয়ে ব্যাখ্যা করে বলছেন, ‘এশিয়ান অর্থনৈতিক সমন্বয়ের বিষয়টি অনেক দিন ধরেই ছিল, আপডেট করা হয়নি আমরা সেগুলোতে মনোযোগ দিয়েছি; এর মানে আমরা পশ্চিম থেকে পিঠ ফিরিয়ে নিচ্ছে ঠিক তা নয়।’ …(his top economic policymakers released a statement saying that, while Asian economic integration was “long overdue”, that did not mean the Philippines was turning its back on the West.)

অপর দিকে ফিলিপিনো অর্থসচিব কার্লোস ডোমিঙ্গোজ এবং অর্থপরিকল্পনা সচিব আর্নেস্তো পারনিয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমরা পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক আগের মতোই বজায় রাখব। কিন্তু আমরা প্রতিবেশীর সাথে গভীর সম্পর্কের সমন্বয় কামনা করছি। আমরা আমাদের অঞ্চলের প্রতিবেশীদের সাথে একই কালচার শেয়ার করি আর তাদের ভালো বুঝতে পারি।’ (“We will maintain relations with the West but we desire stronger integration with our neighbors,” said Finance Secretary Carlos Dominguez and Economic Planning Secretary Ernesto Pernia in a joint statement. “We share the culture and a better understanding with our region.”)

উপরে তিন সচিবের দুই বিবৃতি প্রথমত, এটা প্রেসিডেন্ট দুতের্তের গরম ভাষ্যগুলোর থিতু ভার্সন। তবে এটা আমেরিকার সাথে একেবারে সম্পর্ক ছিন্ন নয় অবশ্যই। কিন্তু এটা ফিলিপাইনের সত্যি সত্যিই, আমেরিকার কৌশলগত বলয় থেকে দূরে চলে যাওয়া নির্দেশ করে। ওদিকে এ বিষয়ে আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের ভাষ্য ছিল, ফিলিপাইন আমাদের এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে আগামী সপ্তাহে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে আমেরিকার সেক্রেটারি ডেনিয়েল রাসেল ফিলিপাইন সফর করে নতুন ব্যাপারগুলোর ব্যাখ্যা চাইবেন।

এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে, আমেরিকা-ফিলিপাইনের সম্পর্কের শুরু সেই ষাটের দশকে সশস্ত্র কমিউনিস্ট গেরিলা বিপ্লব ঠেকাতে সরাসরি সামরিক উপস্থিতি দিয়ে সহযোগিতা করা থেকে এখনো ফিলিপাইনে আমেরিকান সামরিক উপস্থিতি আছে। সামরিক বাজেট খরচের অনেক কিছুই এখনো আমেরিকা শেয়ার করে। ফলে আমেরিকাকে ছাড়তে গেলে বহু কিছু এখন ঢেলে সাজাতে হবে। যদিও দুতের্তে প্রকাশ্য ঘোষণায় বলা শুরু করেছেন, তিনি দীর্ঘ সময় প্রেসিডেন্ট থাকলে ফিলিপাইনের সাথে আমেরিকার সামরিক ‘ডিফেন্স ডিল’-এর কথা আমেরিকাকে ভুলে যেতে হবে।

তাহলে মূল বিষয় চীন-ফিলিপাইন সমুদ্রসীমা বিতর্ক বা দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক- নতুন পরিস্থিতিতে এখন কী হবে? দুতের্তে জানাচ্ছেন, সমুদ্রসীমা বিতর্ককে আপাতত তিনি পেছনের বেঞ্চে ফেলে রাখতে চান। বিশেষত যত দিন চীনের সাথে বর্তমানে শুরু করা আলোচনা একটা নির্দিষ্ট আকার না নেয়। অথবা এরপর চীনারা নিজে এ বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী না হওয়া পর্যন্ত। (Duterte on Wednesday said the South China Sea arbitration case would “take the back seat” during talks, and that he would wait for the Chinese to bring up the issue rather than doing so himself.)

আর চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট শি-এর বরাতে তারা বলেছেন, যেসব বিতর্ক তাৎক্ষণিক সমাধান করা যাচ্ছে না, সেগুলো আপাতত সরিয়ে রাখা হবে। দুতের্তে জানাচ্ছেন এসবের অর্থ, তিনি “জাতিসঙ্ঘের হেগ ট্রাইব্যুনালে ফিলিপাইনের পক্ষে পাওয়া রায়কে ত্যাগ করছেন বা ছুড়ে ফেলে দিচ্ছেন না, অথবা ফিলিপাইনের সার্বভৌমত্ব কোথাও চীনের কাছে বন্ধকও রাখছেন না।’ আর চীন এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় বলছে, ‘তারা দুতের্তের এই সেন্টিমেন্টকে সমর্থন করেন”। (China has welcomed the Philippines approaches, even as Duterte has vowed not to surrender any sovereignty to Beijing, which views the South China Sea Hague ruling as null and void.)
তাহলে মাছ ধরার ব্যাপারটা কী হবে? গত ২০১২ সালে ‘স্কারবোর্গ শোল’ নামে দ্বীপ থেকে ফিলিপিনো জেলেদেরকে চীন বের করে দিয়ে দখল নিয়েছিল। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী লি এই শোল দ্বীপের বিষয়ে বা জেলেদের মাছ ধরার অধিকার বিষয়ে কিছু উল্লেখ না করে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন- আমরা উভয় দেশ কোস্টগার্ড ও জেলেদের বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা করতে একমত হয়েছি। আর আমেরিকান সিএনএন দাবি করছে দুতের্তে বলেছেন, ‘মাছ ধরার বিষয়টি আমি চীনাদের ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’

হেগ ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে আমার আলাদা বিস্তারে লেখার পরিকল্পনা আছে। তবে আপাতত একটা সারসংক্ষেপ করে বলা যায়, দক্ষিণ চীন সাগর সীমানা বিতর্ককে উসকে দিয়ে আমেরিকা তার এশিয়া পলিসি সাজিয়েছিল, যেখানে আমেরিকা নিজের ভূমিকা কেন্দ্রীয় বা পিভটাল বলে মনে করে। কিন্তু এটা এখন পরিষ্কার যে, আমেরিকার এশিয়া নীতি এই প্রথম মারাত্মক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেল। ফিলিপাইনের আমেরিকাকে ত্যাগ করা এটা আমেরিকার জন্য মারাত্মক থাপ্পড় খাওয়া। বিশেষ করে ফিলিপাইনের পথ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাকি সব রাষ্ট্রের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে – সেদিক থেকে দেখলে। কারণ আমেরিকান এশিয়া নীতি ঘোষণা করার আগে এদের সবার অবস্থান ছিল তারা কেউ কোনো সামরিক বিবাদে জড়াতে চায় না; বরং সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে চীনের সাথে যুক্ত থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদনে উন্নতি করতে চায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই দ্বিতীয় পর্ব আগে দৈনিক নয়াদিগন্তে ৩০ অক্টোবর ২০১৬ (প্রিন্টের পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। আজ এখন সেটা আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ছাপা হল। ]

ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -১

ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -১

গৌতম দাস
০২ নভেম্বর ২০১৬, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-1Vh

কোল্ড ওয়ারের শুরুর দিকের পটভুমিতে একাত্তর বছর আগে জন্ম নেয়া এক সম্পর্ক হল ফিলিপাইন-আমেরিকার সম্পর্ক। সম্পর্কের এমন ঘনিষ্ঠতার পিছনে একটা বড় কারণ ছিল সেকালের ফিলিপাইনে সশস্ত্র কমিউনিস্ট আন্দোলনকে মোকাবিলা। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত সেই থেকে ফিলিপাইনে আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি স্থাপনা পর্যন্ত গড়ায়। সেই থেকে একাল পর্যন্ত আমেরিকা ফিলিপাইনের এক নম্বর বন্ধু হিসাবেই ছিল। ছিল বলছি এজন্য যে এই সম্পর্কে ভাল রকমের চির ধরেছে। ফিলিপিনো সদ্য নির্বাচিত বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন রডরিগো দুতের্তে। সর্বশেষ গত ২০ অক্টোবর ২০১৬, তিনি চীন সফরে গিয়ে আমেরিকাকে প্রকাশ্যে “বাই বাই” বলেছেন। না এটা ভাবা ভুল হবে যে তিনি নিজ ভাষায় না ইংরাজিতে বলেছেন ফলে কোন ভাষান্তর সমস্যা হয়েছে কিনা। কারণ তিনি জানিয়েছেন তিনি নিজ মাতৃভাষার চেয়ে ইংরাজিতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। সেকথার সাথে নিচের ইংরাজি উদ্ধৃতি দেখুন।

Duterte did not hesitate to say that America, which is part of the New World Order, “has lost now. I’ve realigned myself in your ideological flow [China], and maybe I will also go to Russia to talk to Putin and tell him that there are three of us against the world—China, the Philippines, and Russia. It’s the only way.”

Keep in mind that Duterte is not against the West’s achievement in science, medicine, and even in language. Duterte admitted to a reporter that “I am more articulate in English than in my own dialect.”

তো দীর্ঘ এত পুরানা বন্ধু হঠাত উলটা বইতেছেন কেন তা এখানে জানব। ফিলিপাইন সম্পর্কে বিশেষ করে ওর আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গঠন ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের দেশে খুব বেশী জানাশুনা নাই। তাই প্রেসিডেন্ট দুতের্তের চিন্তা বা কর্মসুচীর মুল ফিচারগুলো কী তা বলবার উছিলায় আগে ফিলিপিনো রাজনীতি জনগণ সম্পর্কে পটভুমির দিক থেকে কিছু বলে নিব। তাই লেখাটার দুই অংশ। দ্বিতীয় অংশ আলাদা পোষ্ট হিসাবে আসবে। সেখানে আমেরিকার সঙ্গে ফিলিপাইনের সম্পর্কের অবনতির বিস্তারিত দিকটা জানা যাবে।

প্রথম ভাগঃ ক্রসফায়ার : বাংলাদেশ ও ফিলিপাইন
ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতের্তে। নির্বাচনে জিতে চলতি বছর, ২০১৬ সালের জুন থেকে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। আর এর আগে ছিলেন দক্ষিণ ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের সবচেয়ে অগ্রসর শহর ডাভাও এর মেয়র। দুতের্তের নিজ ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি রাজনৈতিক ফ্যামিলির সন্তান। বাবা ভিনসেন্ট গনজালেস দুতের্তে ছিলেন ফিলিপাইনের ডাভাও প্রদেশের গভর্নর এবং সিনেটর।  নিজে আইনে গ্র্যাজুয়েট, আইনজীবী ও প্রাক্তন সরকারি প্রসিকিউটর। প্রেসিডেন্ট হয়ে ক্ষমতায় আসার পর তিনি এক কঠিন কর্মসূচি নিয়েছেন। ফিলিপাইনে ড্রাগ ব্যবসার দাপট আর ড্রাগ এডিক্টেট মানুষ ও পরিবারের সংখ্যা দুইই  সামাজিক রাজনৈতিক সমস্যার এক বিরাট ইস্যু। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট দুতের্তে বলছিলেন, পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে এমন ড্রাগগ্রহীতার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। এও সংখ্যা তার আমলসহ ধরে।  ড্রাগের সাথে সম্পর্কিত সমস্যা ও অপরাধের ব্যাপকতা বা সংখ্যা – এটাই দুতের্তের বিচার-বহির্ভুত হত্যা করে অপরাধীদের মেরে ফেলার পক্ষে একমাত্র যুক্তি। (যারা আরও ডিটেল চান তাদের জন্য। এমন পাঠকেরা এবিষয়ে তাঁর পয়েন্টগুলো ডিটেইল শুনতে আগ্রহী হলে গত ১৫ অক্টোবর আলজাজিরা টিভির নেয়া দুপর্বের সাক্ষাতকার ইউটিউবে দেখুন।) দুতের্তের আমলের মাত্র প্রায় তিন মাস – এর মধ্যেই প্রায় সাড়ে তিন হাজার লোক বিচার বহির্ভুতভাবে নহত হয়েছেন।  তবে অন্য যে কোন কারও চেয়ে দুতের্তে স্পষ্ট করে বলেন, “আমি যদি এখন সবল হস্তক্ষেপ না করি আমাদের পরবর্তি প্রজন্মের ভবিষ্যত শুন্য হয়ে যাবে। অতএব এই ক্রিমিনাল এরা আমার বৈধ টার্গেট  আমি তাদের হত্যা করব”।  বুঝা যাচ্ছে আইনী দিক থেকে ব্যাপারটা অ-অনুমোদনের সন্দেহ নাই। কিন্তু এধরণের মরিয়া কথা থেকে  ফিলিপিনো সমাজে ড্রাগের ভয়াবহতার রূপ প্রকাশ পায় হয়ত। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট দুতের্তের পক্ষে জনমতের সমর্থন নিয়ে এক জরিপে দেখা গেছে তাঁর রেটিং ৭৬ ভাগ। অর্থাৎ সেই পুরানা কথা যা পপুলার তা আইন সম্মত বা সমর্থিত নাও হতে পারে।

আমাদের দেশে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ওয়্যার অন টেরর কর্মসূচিতে প্রেসিডেন্ট বুশের আমেরিকার দেয়া ফর্দ ও টার্গেটের বাধ্যবাধকতা পূরণ ও পালন। যদিও স্থানীয়ভাবে সে কথা মানুষকে বলার নয় বলে সেকথা আড়ালেই থেকে গেছে। অপর দিকে ফেলে যাওয়া এর আগের মানে হাসিনার প্রথম আওয়ামী সরকারের (১৯৯৬) আমলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে মানুষজন অতিষ্ঠ ছিল। ফলে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে র‌্যাবের হাতেই বিচার বহির্ভুত হত্যার সংস্কৃতি বা ‘ক্রসফায়ার’ ফেনোমেনা শুরু হয়েছিল। এতে র‌্যাব বিশাল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যেন ত্রাতা। যেন ক্রসফায়ার করার জন্যই র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল, এমন আড়ালও এসে যায় এতে। ক্ষমতায় আসার পর দুতের্তেও এমন জনপ্রিয় একটি কর্মসূচি নেন, যে ড্রাগ ডিলার বা ব্যবসায়ী অথবা ড্রাগ সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িত যে কেউ, এদের দেখামাত্র গ্রেফতার ও গুলি। যার আনুষ্ঠানিক আর আইনি আড়াল দেয়ার নাম ক্রসফায়ার, তা চালু করেন। তবে একটু সংশোধন দরকার। এর আগে থেকেই দুতের্তে আসলে বিখ্যাত হয়ে এসেছেন ড্রাগ অপরাধীদের ক্রসফায়ার করেই। ফলে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর নতুন না, বরং মেয়র থাকার সময় এটাই ছিল প্রথম  তাঁর মুখ্য কাজ ও পরিচিতি। দুতের্তে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন এ বছর, ২০১৬ সালের ৩০ জুন। এরপর প্রথম দুই মাসেই এমন মৃত্যুর সংখ্যা হয় ২৪০০-এর বেশি, এটা সরকার-ঘোষিত সংখ্যা। অর্থাৎ গড়ে বিরতিহীনভাবে প্রতিদিন নিয়মিত ৪০ জন করে হত্যা করা হয়েছে। (উপরে বলা আলজাজিরাকে দেয়া ঐ সাক্ষাতকারে আপডেটেড সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার বলে প্রথম স্বীকৃত হয়)
ক্রসফায়ার, সোজা কথায় এটা হল খুন করে মেরে ফেলার পর যে শব্দ দিয়ে খুনটা আড়াল করা হয়। মানবাধিকার ও আইনের চোখে এ ধরনের ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে। সমাজে কোনো অপরাধের বিচারের দায়িত্ব দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্র পুলিশকে দেয় না। অপরাধের বিচারের দায়দায়িত্ব বিচার বিভাগের, মানে একমাত্র আদালতের। আর সেখানে ঐ আদালতে পুলিশের কাজ হল যাকে পুলিশের অপরাধী মনে হবে, সন্দেহ হবে, তাকে আদালতের সামনে হাজির করে, অভিযোগ এনে তা প্রমাণের চেষ্টা করতে পারে তাঁরা। এতটুকুই। সে অপরাধী কি না সে সিদ্ধান্ত দেয়ার এখতিয়ার পুলিশের নেই। এই এখতিয়ার একমাত্র আদালতের এবং আদালতও সে রায় দিতে পারেন একমাত্র বিচার-আচার মূল্যায়ন পরীক্ষার সবশেষে। কিন্তু এসবের পাল্টা ক্রসফায়ারকারী পুলিশ বা সরকারের পাল্টা বক্তব্য হল – এমন বিচার-আচারের পথ, এটা অনেক লম্বা সময়ের ব্যাপার, আসামি জামিন নিয়ে বের হয়ে যায় ইত্যাদি। তবে একথাও তো সত্য যে আবার অনেক সময় জেনুইন অপরাধ আদালতে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, উপযুক্ত প্রমাণ ও আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রমাণের অভাবে। এ দিকে সমাজে অপরাধী বেড়েই চলে। অতএব আমরা নিজেরাই কাউকে অপরাধী বলে শনাক্ত করি ও সিদ্ধান্ত নেই। তাকে শাস্তি হিসেবে মেরে ফেলি। আর আইনের চোখে বিষয়টিকে ন্যায্যতা দিতে ক্রসফায়ারের গল্প বানিয়ে এভাবে বলি যে, আমার হেফাজতের আসামিই আমাকে আক্রমণ করাতে আত্মরক্ষার্থে তাকে গুলি করে মেরেছি।ীসব পালটা যুক্তির পরও দেশি বা আন্তর্জাতিক আইন এমন হত্যার পক্ষে কোনভাবেই সমর্থন দেয় না।  আর সবচেয়ে বড় কথা হল, ক্রসফায়ারের বিচারবহির্ভূত দিক ছাড়াও আরো বড় এক অপরাধ হল, সরকার যাকে তাকে এই পদ্ধতিতে মেরে ফেলতে পারে। তাকে ‘জঙ্গি’ বা ‘ড্রাগ ডিলার’ অথবা যেকোন কিছু বলে সাজিয়ে। সরকারের অপছন্দ, রাজনৈতিক বিরোধী, প্রতিদ্বন্দ্বী যে কাউকে মেরে সরিয়ে দেয়া সহজ হয়ে যায়। মূল ত্রুটি বা সমালোচনার কথা হল, নিহত ব্যক্তি  যে কথিত অপরাধেই অপরাধী ছিল তা তো কোন আদালতের মত প্রক্রিয়া পদ্ধতিতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভাবে পরীক্ষা করা হয় নাই। এটাই সরকারের হাতে যাকে তাকে খুন করার লাইসেন্স হিসাবে হাজির হয়।

ফলে স্বভাবতই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ও অপরাধকে মানবাধিকার ও আইনের চোখে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলা হয়। অর্থাৎ পুলিশের দায়িত্ব হল যেখানে অপরাধীকে কেবল বিচারের আওতায় আনা, বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা, সেখানে পুলিশই তাকে কোন বিচার ছাড়াই মেরে ফেলেছে। ফলে এখানে বিচার বা শাস্তি প্রক্রিয়া সেটা ব্যাহত হয়েছে বলে এটা বিচারবহির্ভূত এবং তা সাদা এক হত্যাকাণ্ড। যদিও সারা দুনিয়ায় বিভিন্ন দেশে যত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, এর গল্প কিন্তু একই- ক্রসফায়ার। যেমন ভারতে একই অর্থে তবে অন্য প্রচলিত শব্দ হল – এনকাউন্টার। যা হোক শব্দে কিছু যায় আসে না, ঘটনাটা সারমর্মে একই।

বিগত অক্টোবর মাসের ১ তারিখে এক মার্কিন উপসহকারী মন্ত্রী (ডেমোক্র্যাসি, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লেবার শাখা) রবার্ট বারশিনস্কি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তিনি ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে আলাপকালে ক্রসফায়ার প্রসঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান ব্যক্ত করছিলেন। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানে ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উল্টো ফল দিতে পারে।’ এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্যের বিস্তার গত ০৪ অক্টোবর প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছিল। আমি সেখান থেকে একটু লম্বা অংশ টুকে আনছি। রবার্ট বারশিনস্কি বলেন, “৯/১১-এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ, মানবাধিকার সংস্থা ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ে নানা বিতর্ক হয়ে আসছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ খুবই বিপজ্জনক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও দায়িত্বরত অবস্থায় পুলিশ নিহত হয়। কিন্তু তার পরও দোষী ব্যক্তির ক্ষতি করা বা তাকে আঘাত করার বিষয়টি কখনোই মেনে নেয়া হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যখনই সম্ভব, তখনই দায়ী ব্যক্তিকে গ্রেফতার বা আটক করা হয়। কারণ, তাহলেই ওই নেটওয়ার্কের সবাইকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। যেকোনো পরিস্থিতিতে আমাদের অবস্থান হলো, প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও স্বচ্ছ তদন্ত হতে হবে”।
তিনি আরও বলেন, “ক্রসফায়ার’ বা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ কারণ হিসেবে প্রায়ই বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করা হয়। এতে সুবিচার নিশ্চিত করা যায় না, আসামি জামিনে বের হয়ে যান বলে বিভিন্ন যুক্তি দেয়া হয়। এ সম্পর্কে রবার্ট বারশিনস্কির মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। এ দেশের সাক্ষ্য আইন ঔপনিবেশিক আমলের। শুধু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর ওপর নির্ভর করায় বিচারপ্রক্রিয়ায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে আসামির ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি জানান, আইনগুলোর আধুনিকায়নে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা দিচ্ছে”। আশা করি পাঠক যা বোঝার বুঝেছেন। আমেরিকান মন্ত্রীর বক্তব্য মিথ্যা নয়। তবে তাঁর বক্তব্য তুলে আনায় তাঁকে ও আমেরিকাকে কোন ‘ন্যায়ের আদর্শ প্রতীক’ বলে ধারণা করা ভুল হবে। আর নেপথ্যে বলে রাখি, আমেরিকার এত সাধু সাজার সুযোগ নেই। কারণ র‌্যাব তাদের সরাসরি পরামর্শে আর তাদের আসামিকে বাংলাদেশে এনে টর্চার করে স্বীকারোক্তি বের করার জন্যই গঠন করা হয়েছিল। কারণ তাদের দেশে রেখে টর্চার করলে তা সংশ্লিষ্ট ওই অফিসারের জন্য বেআইনি ও ব্যক্তিগত অপরাধ বলে গণ্য হবে। আমেরিকান পরিভাষায় এটাকে রেনডিশন বলে। ওবামা রেনডিশন করার প্রশাসনিক অভ্যাস তুলে দেয়ার প্রতিজ্ঞা করে ক্ষমতায় এসেছিলেন, কিন্তু রাখতে পারেননি।
তবে আরেক বাস্তবতা হল, উপরে বাংলাদেশের ক্রসফায়ার প্রসঙ্গে আমেরিকান বক্তব্য সঠিক। আবার সরকারের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের কথা তুলে এমন বক্তব্যের ভেতর দিয়ে আমেরিকা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর একটা যেন অথরিটি হিসেবে হাজির হওয়ার সুযোগ নেয়। এটাও আরেক সত্যি। আর তা নেয়ার সুযোগ থাকে এ জন্য যে, জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস তদারকির প্রতিষ্ঠানকে আমেরিকা প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে।
ফলে হিউম্যান রাইটস ইস্যুটি দু’ধারী তলোয়ারের মতো আমেরিকার হাতে অস্ত্র হিসেবে হাজিরও হয়। এক দিকে আমাদের সরকারগুলো ক্রসফায়ার করার দোষে দোষী। ফলে আমেরিকা সে অভিযোগ সঠিকভাবে তুলে আনে ঠিকই। আবার সেটা তুলে বাংলাদেশের ওপর নিজের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিতে একে ব্যবহার করে এ কথাও সত্যি।

প্রেসিডেন্ট দুতের্তের ক্ষেত্রে তার ড্রাগ-ডিলারের হত্যার বেলায় একই ঘটনা ঘটেছিল। প্রেসিডেন্ট ওবামা এ প্রসঙ্গে তার সাথে দেখা করে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও তার উদ্বিগ্নতা ইত্যাদি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। এর আগে দীর্ঘ দিন ধরেই ম্যানিলার ক্যাথলিক চার্চ, জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সংগঠন ও অন্যান্য দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু সেগুলোকে দুতের্তে সবলে উড়িয়ে দিতে আর উপেক্ষা করতে পেরেছিলেন। দুতের্তের সাথে প্রেসিডেন্ট ওবামার সাক্ষাতের কথা ছিল গত ৫ সেপ্টেম্বর, লাওসের ভিয়েনতিয়েনে আসিয়ান জোটের সভায় দুই প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের সময়ে, সাইডলাইনে বসে। কিন্তু ওবামার সাথে কথিত সেই সাক্ষাতের আগেই দুতের্তে এক কাণ্ড করে বসেন। লাওস রওনা দেয়ার আগেই তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে সেই কান্ড করেন। এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন যে, “ওবামা কি তাঁকে বিচারবহির্ভূত ড্রাগ-ডিলার হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলবেন না”- এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি রাগে ফেটে পড়েন। সম্ভবত দুতের্তে ওবামার সাথের ওই সাক্ষাৎ এড়াতে চেয়েছিলেন তাই ওই রকম জবাব। তিনি অকথ্য ও অশ্লীল ভাষায় ওবামার মাকে বেশ্যা বলে গালি দিয়ে কথা বলেছিলেন; যেটা স্বভাবতই কোনো প্রেসিডেন্টের পদমর্যাদার সাথে মানানসই নয়। তবে কোন প্রেসিডেন্ট অবশ্যই ক্ষুব্ধ হতে পারেন। এমনকি সে ক্ষেত্রে যদি “তিনি ক্ষুব্ধ” একথাটাই মুখে বা আচরণে এতটুকুই প্রকাশ করেন- এটাই তার উদ্দেশ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট হত। কিন্তু তিনি বলেন, “তার (ওবামার) সম্মান বজায় রেখে কথা বলা উচিত। আমার ওপর যেন যা মনে চায় প্রশ্ন আর স্টেটমেন্ট ছুড়ে না দেয়। এমন হলে, বেশ্যার ছেলে, ওই ফোরামে আমি তাকে ছিঁড়ে ফেলব। উনি যদি তা করেন তবে আমরা তাকে শুয়োরকে যেমন করে কাদায় পুঁতে তেমন করে পুঁতে ফেলব”।

আচ্ছা, দুতের্তে কি হঠাৎ এমন কথা বলছেন; নাকি তিনি এমনই? তা বুঝতে পেছনের কিছু তথ্য দেখা যাক। এর আগে তিনি ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের দাভাও শহরের মেয়র ছিলেন। ড্রাগের সমস্যা আর খুনোখুনি সেখানে লাগাতার ছিল। সেখানেও তিনি ড্রাগ ডিলারদের সম্পর্কে বলতেন তারা “আরো মরবে। অনেকে মরবে। যতক্ষণ না শেষ মাদকপাচারকারীকে বের করা সম্ভব হবে, ততক্ষণ আমরা কাজ চালিয়ে যাবো”। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের সেকালের রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, তিনি বলছিলেন, ‘যদি আমার সিটিতে আপনি অবৈধ কাজ করেন, যদি আপনি ক্রিমিনাল হন, কোনো সিন্ডিকেটের অংশ হন, যারা শহরের নিরীহ লোকদের শিকার বানায়, তবে যতক্ষণ আমি মেয়র আছি ততক্ষণ আপনি আমার হত্যার বৈধ টার্গেট।’ এটা ২০০৯ সালে মেয়র হিসেবে তার বয়ান। শেষ বাক্যটি মারাত্মক আপত্তিকর। এখানে আইনি লুকোছাপা তিনি রাখেননি। একেবারে প্রকাশ্যে স্পষ্ট ভাষায় সরাসরি হত্যা করার কথা বলছেন। এই বাক্যটাই তার অভিযুক্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। ওদিকে প্রায় একই ভাষায়, একই কারণে ইইউকে এবং জাতিসঙ্ঘকেও তিনি গালাগালি করেন।
স্বভাবতই দুতের্তের খারাপ গালাগালির পরে ওবামা সেই সাক্ষাৎ বাতিল করেন। কিন্তু পরের দিন পরিস্থিতি রিভিউ করার পর (খুব সম্ভবত তার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পরামর্শকদের কারণে) দুতের্তে সাংবাদিকদের মাধ্যমে ওবামাকে স্যরি বলে ক্ষমা চেয়ে নেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রায় ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফিলিপাইনের সাথে নিরবচ্ছিন্ন কৌশলগত মিত্র ছিল আমেরিকা। ফিলিপাইন-আমেরিকান সেই সম্পর্ক এখন খারাপ থেকে চরম খারাপ হয়ে এখন প্রায় পুরো বিচ্ছিন্ন হওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা দুই আলাদা দিনে দুই অংশ ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় – ২৩ অক্টোবর ২০১৬ প্রথম বা চলতি পর্ব অনলাইনে (প্রিন্টে ২৪ অক্টোবর)। এখানে সেই লেখা পর পর দুই পোষ্ট আকারে আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ছাপা হল। এটা প্রথম পর্ব।] পরের পর্ব আগামিকাল পরশুর মধ্যে।