ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” এর ভিতর বাংলাদেশী টুপি

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এর ভিতরে বাংলাদেশী টুপি

গৌতম দাস

২৪ জানুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2cx

 

 

 

আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়ম মোতাবেক গত ২০ জানুয়ারি শপথ নিয়েছেন। শপথ নেয়ার দিন রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে দাঙ্গাহাঙ্গামা প্রতিবাদ বিক্ষোভ যেমন হয়েছে, তেমনি ট্রাম্পের শপথের সব আনুষ্ঠানিকতাও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা ও দায়িত্বভার বুঝে নেয়ার জন্য গঠিত ট্রাম্পের দলবল গত দুই মাসে তাদের সব কাজের মধ্যে একধরনের প্রতিহিংসা মাখানো পদক্ষেপের চিহ্ন রেখেছে। সেই সাথে প্রবল চাপাবাজি, আর প্রপাগান্ডায় সব কাজে “আমরাই শ্রেষ্ট, আমরাই একমাত্র” ধরনের লোক-দেখানো কর্মতৎপরতায় ভরপুর। সেসব আচরণ শপথ নেয়ার সময় পর্যন্ত বজায় ছিল। এমনকি ট্রাম্পের প্রশাসনের হবু উপদেষ্টারা (আমাদের ভাষায় মন্ত্রী) যাদেরকে ট্রাম্প বেছে নিয়েছেন কিন্তু সিনেটের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছেন, তারাও সিনেটের শুনানিতে প্রশ্নের জবাবের সময়ও একই প্রপাগান্ডা, চাপাবাজি আর জনপ্রিয়তাবাদি ভাষায় কথা বলা চালিয়ে গেছেন। যেমন ট্রাম্পের হবু পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (মন্ত্রী) হলেন শীর্ষ তেল কোম্পানী Exxon Mobil Corp এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী রেক্স টিলারসন। তিনি সিনেটের শুনানি চাপাবাজি হুঙ্কার দিয়ে বলছেন সাগরপথে  চীনের প্রবেশপথ “দক্ষিণ চীন সাগরে বিতর্কিত দ্বীপে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না”। কিন্তু কিভাবে তিনি এই আওয়াজ বাস্তবায়ন করবেন তা নিয়ে তিনি বা ট্রাম্পের মুখপাত্ররা কেউ আর মুখ খুলতে নারাজ। ওদিকে এসব ছাড়া ট্রাম্পসহ সবাই এমন একটা ভাব বজায় রেখে কথা বলে গেছেন, যেন ট্রাম্পের আগে রিপাবলিকান বা ডেমোক্রাট নির্বিশেষে ওবামাসহ যত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ছিলেন এরা স্কলে ছিলেন এক একজন বিদেশি শোষক, বিদেশীদের স্বার্থের প্রতীক। বিশেষ করে ওবামা হল ট্রাম্পের বিশেষ টার্গেট। তাই শপথ অনুষ্ঠানের বক্তৃতার শুরুতেই ট্রাম্প বলছেন, “আজকের এই ক্ষমতা হস্তান্তর বিশেষ অর্থপূর্ণ। কারণ দীর্ঘ দিন ধরে আমাদের এক ক্ষুদ্র অংশ রাজধানীতে বসে সব মাখন খেয়েছে। ওয়াশিংটন ঝলমল করে উঠেছে কিন্তু জনগণের সাথে তারা সম্পদ শেয়ার করেনি। রাজনীতিবিদরা উন্নতি করেছেন আর ওদিকে চাকরি হারিয়ে গেছে, ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। এটা একদল আর একদলকে অথবা এক সরকার আর এক সরকারকে ক্ষমতা হস্তান্তর করার দিন নয়। আজ জনগণের ক্ষমতা জনগণকে ফিরিয়ে দেয়ার দিন”। যেন ট্রাম্প হয়ে গেছেন শ্রমিকের দুঃখ বেচে সহানুভুতি জড়ো করা ট্রেড ইউনিয়ন কমিউনিস্ট নেতা। আর টাম্পের সবকথার শেষ কথা হল, “এখন ট্রাম্প নির্বাচিত হয়ে এসে গেছেন, ফলে সব ঠিক হয়ে যাবে”। এ কারণেই যেন তিনি দেখাতে চাচ্ছেন, ওবামার নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক ও কর্মচারীরা যেন খুবই দ্রুত বিদায় নেন, পারলে ওবামা চলে যাওয়ার পরপরই আর তাদের কাউকে দেখা না যায়। তিনি ইঙ্গিত দিতে চান যেন, এরা সবাই গণস্বার্থবিরোধী তৎপরতার প্রতীক । । ট্রাম্পের এই বক্তৃতা শুনে মনে হয়েছে ব্রিটিশ কলোনি আমলে নেটিভ কোনো নেতা বক্তৃতা দিচ্ছে যেখানে ওবামা যেন লর্ড ক্লাইভ। আর ট্রাম্প হলেন জনদরদি একমাত্র দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী।

এগুলো নিঃসন্দেহে বাড়াবাড়ি রকমের লোকরঞ্জন ততপরতা। ট্রাম্প আর এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ওবামা আমলের যত আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ছিলেন বিশেষ করে যারা পেশাদার কূটনীতিক নন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নিয়োগপ্রাপ্ত, তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দেশ পাঠানো হয়েছিল যেন তারা ২০ জানুয়ারির আগেই বিদেশে চাকরির দায়িত্ব ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। এই নির্দেশনা প্রতিহিংসার উদাহরণ। এই রাষ্ট্রদূতেরা এক-দুই মাস অথবা অন্তত দুই সপ্তাহ স্বপদে বেশি থেকে গেলে তাতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কিছু নেই। আমেরিকার প্রশাসনিক রেওয়াজও এটাই। অর্থাৎ রেওয়াজ ভাঙার অপ্রয়োজনীয় এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ইঙ্গিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে যে- ওবামাসহ পুরনো রাজনীতিবিদেরা সব বিদেশী চর। তাই তাদের ছায়া যেন ট্রাম্পের ওপর না পড়ে। এ নিয়ে অনেক কার্টুন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প একটা বড় খেলনা রঙের পিচকারি বন্দুক নিয়ে ওবামার অফিসে ঢুকে ওবামাসহ সবাইকে তাড়া করছেন, রঙ ছিটাচ্ছেন আর বলছেন অফিস থেকে বের হয়ে যেতে।
এখানে ট্রাম্পের বক্তৃতা থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্ধারক অংশ হুবহু অনুবাদ হাজির করব যেখানে ট্রাম্পের সস্তা জাতিবাদী বুঝ এবং সুড়সুড়ি কত ভয়ানক হতে যাচ্ছে তা বোঝা যাবে, এ’থেকে। ট্রাম্প বলছেন, “বহু যুগ ধরে আমরা আমেরিকান শিল্পের ঘাড়ে চড়ে বিদেশী শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছি। অন্য দেশের সেনাবাহিনীকে ভর্তুকি দিয়ে পালছি আর আমাদের বাহিনী শুকিয়ে মেরেছি। বিদেশী অবকাঠামোর পেছনে ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছি আর আমেরিকার বেলায় সেগুলো রিপেয়ার না করায় ক্ষয়ে গেছে। আমরা অন্য দেশকে সমৃদ্ধ করেছি অথচ তা করতে গিয়ে নিজেদের সম্পদ, সামর্থ্য, আস্থা সব লোপাট করেছি। একটা একটা করে আমাদের ফ্যাক্টরি ভেঙে পড়ছে, আমাদের উপকূল ছেড়ে গেছে আর আমাদের লাখ লাখ শ্রমিককে বেকার ফেলে রেখে গেছে। আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ঘর থেকে তাদের সব সম্পদ টেনে বের করে সাড়া দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই দিন শেষ। এগুলো এখন অতীত। আমরা এখন শুধু ভবিষ্যতের দিকে তাকাব। আমরা আজ এখানে সমবেত হয়েছি এবং এক ডিক্রি জারি করছি, যা দুনিয়ার সব রাজধানীতে প্রতিটা ক্ষমতার কেন্দ্রে শোনা যাবে। আজ থেকে এক নতুন স্বপ্ন আমাদের ভূমিকে শাসন করবে। এখন এই মুহূর্ত থেকে সবসময় “সবার আগে আমেরিকা, আমেরিকার স্বার্থ”। বাণিজ্য, ট্যাক্স, ইমিগ্রেশন, বিদেশনীতি ইত্যাদি সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তা আমেরিকার শ্রমিক ও আমেরিকান পরিবারের বেনিফিটের দিকে তাকিয়ে নেয়া হবে”।

এখানে তামাশার দিকটা হল, কমবেশি এই বক্তৃতাটাই এত দিন আমাদের মতো কম আয়ের বিভিন্ন রাষ্ট্রে জাতিবাদী বা কমিউনিস্টরা “আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ”-এর বিরুদ্ধে দিয়ে এসেছে। আজ ট্রাম্প তা নিজ দেশের রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে উগড়িয়েছেন।

আসলে ট্রাম্প নির্বাচনে দাঁড়ানোর শুরু থেকে পুরো ব্যাপারটাই এমন। যেমন, ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের মূল স্লোগান – “Making America Great Again” বা অনুবাদ করে বললে, “আমাদের আমেরিকাকে আবার মহান বানাব”- এটাই সবচেয়ে বড় চাপাবাজি; অর্থহীন কথাবার্তা। খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসর প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্পের শ্লোগান – এখানে যে গ্রেট বলা হয়েছে, এই গ্রেট মানে কী? কী হলে তা গ্রেট হবে, এর সংজ্ঞাই বা কী? যদি এ শব্দ দিয়ে সম্পদ বা সম্পদের দিক থেকে গ্রেট বোঝানো হয়ে থাকে তবে তিনি এক পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলছেন, ‘১৯৮০ থেকে ২০১৪, মাত্র এই ৩৪ বছরেই আমেরিকার সম্পদ বেড়েছে ২১ গুণ। এর অর্থ আবার আমেরিকান ধনী মাত্র এক শতাংশ, এদের সম্পদের ১৯৪ গুণ বৃদ্ধি পাওয়া। তার অর্থ আমেরিকা গ্রেট ছিল না, এ কথা তো সত্যি নয়। কিন্তু সে আর কত গ্রেট হবে! তাই ধরে নেয়া যায়, সম্পদের চেয়েও ভিন্ন, সম্পদ ছাড়িয়ে আরো বড় কিছুর দিক থেকে গ্রেট হওয়ার কথা ট্রাম্প বলছেন। তা হল, সম্পদের সঞ্চয় নয়, সম্পদের বিতরণ। ওই প্রফেসর বলছেন, এ কথা দিয়ে আসলে ব্যাখ্যা করা যায় ট্রাম্প কাদের পটিয়ে ভোট নিয়েছেন; কলেজ-না-পৌঁছানো যে শ্রমগোষ্ঠী আছে প্রকারান্তরে তাদের কথা বলছেন। যাদের কথা বলছেন তাদের বেলায় হয়ত  কথা ঠিক কিন্তু তাদের জন্য তিনি তা আনতে পারবেন না। কারণ বিষয়টা এত সহজ-সরল নয়।’
কোল্ড ওয়্যার যুগের সস্তা জাতিবাদী বুঝি। সব ধরনের আমদানি করা পণ্যের ওপর ৪৫ শতাংশ হারে কর আরোপ করলেই সব কিছু আমেরিকায় উৎপাদন করা আবার শুরু হয়ে যাবে এটা বোকার মতো কথাবার্তা। যদি তা-ই হতো তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সত্তর দশকের মধ্যে, এর আগে সুন্দর দিন কাটানোর আমেরিকা ভেঙে গ্লোবালাইজেশনে যাওয়া হয়েছিল কেন? খামোখা? নিজের পায়ে কুড়াল মারার জন্য? আমেরিকা নিশ্চয় বাংলাদেশ নয়। ফলে কে এবং কী তাকে বাধ্য করেছিল? নাকি আসলে প্রলুব্ধ করেছিল?
আঙুর ফল মিঠা হলেও সময়ে তা হয় উল্টা, আঙুর ফল খাট্টা বলার সময় হয়ে যায় একটা সময়। আপনি অন্যকে বাজারে প্রবেশে বাধা দেয়া মানে, সেও তার বাজারে অন্য পণ্যে আপনাকে প্রবেশে বাধা দেবে। আবার খুব সাবধান, এখানে বাজার বলতে শুধু ‘তৈরী ভোগ্যপণ্যের বাজার’ বুঝানো হয় নয়। ‘বাজার’ মানে আসলে বিনিয়োগপুঁজি, কাঁচামাল, টেকনোলজি, মেশিনারি, শ্রম ইত্যাদি সব কিছুরই বাজার। ‘বাজার’ মানে শুধু প্রান্তিক ভোগ্যপণ্য যা কনটেইনার জাহাজে ভরে আনা-নেয়া করে শুধু তা-ই নয়  – বরং সব কিছুই। এমনকি পুঁজি এবং শ্রমও। ফলে আমেরিকা শুধু সে তার নিজ দেশে বিদেশী পণ্য রফতানি হতে দেবে না, তা বাস্তবে করা সম্ভব নয়। কারণ যে দেশ পণ্য রফতানি করবে সে পুঁজিবিনিয়োগও করবে। এটা ঠেকানো যাবে না সবকিছুই করবে – এর ব্যতয় ঘটানো এক কথায় অসম্ভব। যেমন আমেরিকা সরকারের আয়-ব্যয়ের এক বড় উৎস সরকারি বন্ড। দেশি বা বিদেশিরা এই বন্ড কিনে। আজ যেখানে চীন ও জাপান প্রত্যেকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি (চীনেরটা আরো বেশি) করে বন্ড কিনে রেখেছে, সেখানে পণ্য প্রবেশ বন্ধ করার যুদ্ধ কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব?

তত্ত্ব দিয়ে এই প্রসঙ্গে আলোচনা অনেক করা যায়। দেখানো যায়, এটা কেন অসম্ভব। তবে এর চেয়ে বরং ট্রাম্পের শপথের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ট্রাম্পের সমর্থক তরুণ যারা নানান রাজ্য পেরিয়ে ট্রাম্পের ‘ভোট দেয়ার বিপ্লবে’ যোগ দিতে ওয়াশিংটনে এসেছিলেন তাদের কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরা যাক। সংবাদ সংস্থা ‘রয়টার্স’ ট্রাম্পের নির্বাচনে নানা ইস্যুতে শুরু থেকেই সমালোচক। বিশেষ করে, ট্রাম্পের ভোটে জয়লাভের পর থেকে যেসব ক্যারিকেচারও স্ববিরোধিতা ফুটে বের হচ্ছে সেগুলো তুলে আনার ক্ষেত্রে। শপথ নেয়ার দিনে রয়টার্সের এমন এক নিউজ হল, ‘ট্রাম্প রেড ক্যাপ’ প্রচার অভিযান নিয়ে। ‘ট্রাম্প রেড ক্যাপ’ বা লাল টুপির ঘটনা হল, উগ্র জাতিবাদী ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বাণীর বাস্তবায়ন করতে যাওয়া হয়েছে লাল টুপি পরে। রয়টার্স ওই তরুণদের টুপি খুলিয়ে দেখাচ্ছে যে, তাদের সব টুপিই বিদেশে তৈরি, হয় বাংলাদেশের, না হয় ভিয়েতনামের, না হয় চীনের। কেন? কারণ ট্রাম্পের টুপি প্রচারাভিযানের মূল প্রপাগান্ডা অফিসে যেসব টুপি বিক্রির জন্য রাখা ছিল ওগুলো খোদ আমেরিকায় তৈরি ফলে এর দাম বেশী, কমপক্ষে ত্রিশ ডলার বা তারও বেশি। কত বেশি? বিদেশী (বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম বা চীনের) টুপির  তুলনায় বেশি, বিদেশী ওই তিন দেশের টুপির দাম বিশ ডলার বা এর নিচে। ফলে স্বভাবতই ঐ প্রচারাভিযানে সবাই সস্তা নামে পাওয়া টুপি পড়েই এসেছে – বাজারের স্বভাব অনুসারে। অর্থাৎ আমেরিকার তৈরি টুপি নিজ সমর্থকেরাই কম পরেছে। এই হলো ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট”-এর তামাশা এবং পরিণতি।

মনে রাখতে হবে, ট্রাম্পের এই আমেরিকাই গত সত্তরের দশক থেকে দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশন যেতে বাধ্য করেছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক-আইএমএফ আমাদেরকে নিজ বাজারের রক্ষণশীলতা ছেড়ে গ্লোবালাইজেশনে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাপাচাপির মাধ্যমে বাধ্য করে এসেছিল। আজ ট্রাম্প নিজেই গ্লোবালাইজেশন ছেড়ে উলটা সংরক্ষণবাদিতা বা প্রোটেকশনিজমে যাওয়ার কথা বলছেন।

আজ সোজা কথাটা হল, গ্লোবাল বাণিজ্য বেচাকেনা বিনিময়ের মাধ্যমে একটা পরস্পর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়ে গেছে এবং তা যে স্তরে যে জায়গায় চলে গেছে, এ থেকে আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া কঠিন। চাল-ডাল মিশে গেলে যেমন এগুলোকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেয়া কঠিন। ট্রাম্পের জয়লাভের পর গত দুমাসে গ্লোবাল অর্থনীতির সমন্বয় আর গ্লোবাল বাণিজ্যবিষয়ক দু’টি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। প্রথমটা ল্যাটিন আমেরিকার পেরুর লিমা শহরে ‘এপেক’ (বাণিজ্য) সম্মেলন। আর দ্বিতীয়টা সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলন, যেটার অংশগ্রহণকারি গ্লোবাল। তবে দুটোতেই সুর পরিষ্কার, আমেরিকা সংরক্ষণবাদী হতে চাইলে তাকে পেছনে ফেলে বা উপায়ান্তে তার হাত ছেড়ে দিয়ে হলেও চীনের নেতৃত্বেই দুনিয়া গ্লোবালাইজেশনে এগিয়ে যাবে। যেতে হবে। জাপান ট্রাম্পের ওপর হতাশ হয়ে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে চাচ্ছে। চীন-ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক উষ্ণ হতে যাচ্ছে। দুনিয়া সাজানোর সব হিসাব নতুন করে সাজতে বাধ্য। আসলে বিষয়টা হল- গ্লোবাল বাজার নিজের শেয়ার বাড়ানোর, নিজ বাজার সংরক্ষণের নয়

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ২২ জানুয়ারী ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে যেকোন যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

মোদির ‘মিত্রোঁ’ ডাক এখন ভয়ঙ্কর আতঙ্ক

মোদির মিত্রোঁ ডাক এখন ভয়ঙ্কর আতঙ্ক

গৌতম দাস

১১ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2cn

 

রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতার ভাষা মানে জনগণকে কী বলে ডাকবেন, সেই সম্বোধনের ভাষা একেক নেতার একেক স্টাইলে হয়। যেমন অনেকে ডাকেন- ‘বন্ধুরা আমার’ অথবা ‘বন্ধুরা’। শেখ মুজিবের একান্ত স্টাইলের রূপ ছিল ‘ভায়েরা আমার’ বলা। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশেষ স্টাইল হলো- ‘মিত্রোঁ’ বলে ডাকা। হিন্দিতে ‘মিত্রোঁ’ বলে জনগণকে ডাকলে বা সম্ভাষণ করলে এক আন্তরিক ভাব প্রকাশ পায় বলে অনেকের ধারণা। ‘বন্ধু’ বোঝাতে আমরা বাংলায় অনেকে সংস্কৃতঘেঁষা বাংলা শব্দ ‘মিত্র’ ব্যবহার করি। সেই মিত্র থেকে হিন্দিতে ‘মিত্রোঁ’। সম্প্রতি ভারতেই মিডিয়া মনিটর করে পাওয়া রিপোর্ট হচ্ছে, মোদি জনগণের উদ্দেশ্যে ‘মিত্রোঁ’ সম্ভাষণ বন্ধ করে দিয়েছেন। কিভাবে তা বুঝা গেল? আনন্দবাজার পত্রিকা জানাচ্ছে, দিল্লীর এক পানশালার খবর। টিভির দিকে চেয়ে থাকা সেখানকার ম্যানেজার ঘোষণা দিয়েছিলেন মোদী এরপর বক্তৃতায় ‘মিত্রোঁ’ বলে ভারতের কোথাও ভাষণ শুরু করেছেন যদি দেখা যায় তবে যত বার মোদী ‘মিত্রোঁ’ বলবেন, “তত বার বিয়ার বা কোনও পানীয়ের ‘শট’ পাওয়া যাবে মাত্র ৩১ রুপীতে। পর্দায় চোখ ঠিকরে বসে ছিলেন গ্রাহকেরা। কিন্তু ফাঁকি দিয়েছে ‘মিত্রোঁ’”। ম্যানেজার বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু কেন? মোদি তাঁর প্রিয় শব্দ ব্যবহার কেন ত্যাগ করলেন?
একেবারে গোড়ার ঘটনা মানে ঘটনার পিছনের ঘটনা হল, গত ৮ নভেম্বর রাত সোয়া ৮টার সময় মোদি হঠাৎ টিভিতে এসে এক ঘোষণা-বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই ঘোষণা ভারতের প্রত্যেক মানুষকে তো বটেই, বিশেষত গরিব মানুষের কাছে তা ছিল তাদের জীবন উথালপাথাল করে দেয়ার মতো ঘটনা। মোদি ঘোষণা করেছিলেন,  ভারতের ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিল করা হয়েছে আর সে ঘোষণা ঐ রাতের  ১২টা থেকে কার্যকর হবে। কোন সরকারের হয়ে বাজারে কাগুজে নোট চালু করা, বিতরণ করা অথবা বাজার থেকে তুলে নেয়ার কর্তৃপক্ষ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের মত ভারতের বেলায় ওর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাম রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (RBI বা আরবিআই)। চালু যে কোন নোট “এখন থেকে আর রাষ্ট্রস্বীকৃত নোট নয়”, এমন ঘোষণা দিয়ে সেই নোট প্রত্যাহার করে নেয়া আইনসিদ্ধ। আইনি টেকনিক্যাল ভাষায় এটাকে de-monetization বলা হয়। এটা monetization  এর উলটা কাজ। বৈধ মুদ্রা বা নোট হিসাবে অনেক কিছুই চালু থাকতে পারে। যাদুর ছোয়ার মত এক ঘোষণা দিয়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই নোটের মুদ্রা-গুণ কেড়ে নিতে পারে। তখন থেকে সেটা হয়ে যাবে অস্বীকৃত অথবা অবৈধ মুদ্রা। এটাই ডি-মনিটাইজ। মনিটাইজড গুণ কেড়ে নেওয়া। এভাবেই মোদির সরকার ভারতের বাজারে চালু ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট ডিমনিটাইজড বা বাতিল ঘোষণার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল। অন্যান্য দিনের মত ওই ৮ নভেম্বর ২০১৬ সন্ধ্যায় ‘মিত্রোঁ’ বলে সম্ভাষণের পর মোদি হঠাৎ ঘোষণা করেছিলেন, রাত ১২টার পর থেকে ঘোষণা কার্যকর হবে। ফলে পাবলিকের কাছে এরপর থেকে মোদির মুখে ওই ‘মিত্রোঁ’ সম্বোধন একটা ভয়ঙ্কর আতঙ্ক ও ত্রাস সৃষ্টিকারি শব্দ হয়ে যায়।মোদির কথামাফিক রাত ১২টার পর থেকে নোট বাতিল ঘোষণা কার্যকর হয়ে যায়। অর্থাৎ এরপর থেকে ওই দুই নোটে কোনো লেনদেন ও কেনাবেচা বন্ধ হয়ে যায়। আর সরকার এর মধ্যে নোট বদলে দিবার কিছু অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা নিয়েছেল যার মধ্যে একটা হল, পরের দিন থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাতিল নোটগুলো ব্যাংক থেকে বদলে নতুন নোট নেয়া যাবে। কিন্তু প্রতিদিন ৪০০০ রুপির বেশি তোলা যাবে না। না প্রথম দুদিন মানুষ ওই ঘোষণা বাস্তবায়নকে কষ্টকর হলেও গ্রহণ করেছিল। এরপর তারা বুঝে যায় যে  এই সিদ্ধান্তে জীবনযাপন চালিয়ে নেয়া এক মানবেতর দশায় পড়া,  মানূষের নাভিশ্বাস তুলে ফেলা।
ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে একটা চুটকি বা কার্টুন প্রকাশিত হয়েছে। যেটা থেকে সাধারণ মানুষের জীবন-মনে ডিমনিটাইজেশন কেমন চোট ফেলেছে আন্দাজ করা যায়। কার্টুনে দেখা যাচ্ছে, মোদি ২০১৬ সালের শেষে রাত ১২টার কিছু আগে টিভিতে এসেছেন। তিনি কিছু একটা ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন, কিন্তু যেই না তিনি স্বভাবসুলভ ভাষায় ‘মিত্রোঁ’ বলে ডেকেছেন; তা শুনেই হাজার হাজার ভারতীয় অজ্ঞান হয়ে গেছেন! কারণ ‘মিত্রোঁ’ বলে ডাকার পর তিনি নোট বাতিলের মতো আবার নতুন কী ভয়ঙ্কর ঘোষণা দেন, তা শোনার আগেই ভয়ে মানুষ অজ্ঞান। অর্থাৎ ‘মিত্রোঁ’ বলে ডাক শোনার পর কী হয়েছে, মোদি আর কী বলেছেন তা কেউ শোনেনি। তার আগেই অজ্ঞান হয়ে গেছে। তবে ওই কার্টুনে শেষে দেখাচ্ছে, মোদি ২০১৬ সাল শেষ হওয়ার কিছু আগে টিভির ওই ঘোষণায় ‘মিত্রোঁ’ বলে ডাকার পরে খুবই স্বাভাবিক এক ঘোষণা ছিল সেটা। তিনি বলেছিলেন, আর কিছুক্ষণ পর ২০১৬ সাল শেষ হয়ে যাবে, আমার সালাম গ্রহণ করুন। যা হোক, এক চুটকি দিয়ে আমরা ‘মিত্রোঁ’ শব্দের ত্রাস সৃষ্টির ক্ষমতা সম্পর্কে জানলাম। সত্যি সত্যিই মোদি এখন তার বক্তৃতায় ‘মিত্রোঁ’ বলা ছেড়ে দিয়েছেন বলে অনেক মিডিয়া দাবি করছে। কিন্তু কেন এই ত্রাসবোধ?
আমরা টের পাই আর না পাই, অর্থনীতিতে মুদ্রার সবচেয়ে বড় ভূমিকা হল- বিনিময়ের ঘটক সে। বিশেষ করে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতিটি লেনদেন-বিনিময় ঘটনায় ঘটক হলো মুদ্রা। সেই স্তরে  ঘটক বা ‘উপায়’ হিসেবে হাজির থাকার মাধ্যমেই যেকোনো কেনাবেচা নগদ বিনিময় সম্পন্ন হয়। হাটে মুরগি বিক্রি করে পাওয়া মুদ্রা দিয়ে আবার লবণ বা কেরোসিন কিনে বাড়ি ফেরার মত ব্যাপার এটা। একটা দেশের অর্থনীতির আকার বাড়াতে, একে খুবই গতিশীল করতে উপযুক্ত নীতি-পলিসি থেকে শুরু করে বহুবিধ কাঠখড় পোড়াতে হয়। কিন্তু উল্টো তাকে শ্লথ করে দিতে চাইলে সবচেয়ে সহজ উপায় হল মুদ্রার সরবরাহ কমিয়ে বা বন্ধ করে দেয়া। ভারতের অর্থনীতি যতই বড় আর গতিশীল হোক, প্রতিটি কারখানায় উৎপাদন এবং বাজারে পণ্যের চাহিদা আগের দিনের মত যতই থাক, তা থাকলেও মুদ্রা সরবরাহের অভাবে সব ধরনের কেনাবেচা-বিনিময় থমকে দাঁড়াবেই। আর স্পষ্ট করে বললে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে যতটুকু (বাতিল নোটের বদলে) নতুন নোটের সরবরাহ সরকার করবে, আগের বাজার সীমিত হয়ে সেটুকুতে সীমাবদ্ধ হয়ে ধুঁকতে থাকবে।
মোদি তাঁর নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে মন্ত্রী সচিবসহ তাঁর কাছের খুব কম লোককে তিনি জানিয়েছিলেন, শেয়ার করেছিলেন। অনেকে বলেন মন্ত্রীরা এবং রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্ণরও আগে থেকে এবং ভাল মত জানতেন না।  বিশেষত বিশেষজ্ঞ বা আমলা সচিবদের সাথেও যথেষ্ট শেয়ার করেননি। বাস্তবায়নের ভালো-মন্দ দিক কৌশল নিয়েও পরামর্শ করেননি এই ভয়ে যে, তাতে সিদ্ধান্ত ফাঁস হয়ে গেলে আগেই নগদ অর্থ ব্যাংকে হস্তান্তর শুরু হয়ে যাবে এবং এতে পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে। এই ভয়ে সিদ্ধান্ত আড়ালে রাখতে গিয়ে আগেই পর্যাপ্ত নতুন নোট ছাপানোর কাজ তিনি করেননি। এর ফল হয়েছে মারাত্মক। প্রতিদিন ব্যাঙ্কে জনপ্রতি লোক মাত্র চার হাজার টাকা পর্যন্ত বাতিল নোট বদলাতে পারবেন, এই ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। চাহিদা মেটানোর মতো নতুন নোট রিজার্ভ ব্যাংকের হাতে ছিল না বলেই এমন সিদ্ধান্ত, তা ধরে নেয়া যায়। অর্থাৎ প্রতিদিনের চাহিদার মাফিক নোট সরবরাহ  নয় বরং নোট ছাপানোর টেকনিক্যাল সক্ষমতায় ঠিক করে দিয়েছে প্রতিদিন কী পরিমাণ নোট  বাহারে দেয়া হবে। এভাবে প্রকৃত চাহিদা চেপে রেখে সীমিত করে চাহিদা মেটানোর পরিকল্পনা করতে হয়েছে। এর সোজা মানে, বাজারে নগদ অর্থের চাহিদা-জোগানের সম্পর্ক দিয়ে নয় বাজারে নোট সরবরাহ করা হয় নাই। বরং খুবই সীমিতভাবে রিজার্ভ ব্যাংক যতটা নোট সরবরাহ করেছে, অর্থনীতি বা বাজারের সাইজ নির্ধারিত হয়েছে একমাত্র সেই ভিত্তিতে। একটা চালু বাজার কেনাবেচা-বিনিময় লেনদেনকে টুঁটি চেপে ধরে সঙ্কুচিত করা হয়ে গেছে। এতে পুরো অর্থনীতিই সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। তবে এটা ভাবা ভুল হবে যে মোদি খোদ অর্থনীতিকে সঙ্কুচিত করে শুকিয়ে মারার জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাহলে কী ছিল তার উদ্দেশ্য?

কালো টাকা বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ ছিল মোদির ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য। কিন্তু তিনি তার এ লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগেই অন্য কোথাও চলে গেছেন। টনসিল অপারেশন করতে গিয়ে গলাই কেটে ফেলেছেন। আর সফল হয়ে যেতে পারলে পরবর্তী যেকোন নির্বাচনে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবেন কল্পনায় এটা দেখে তিনি এতই আপ্লুত হয়ে গেছিলেন  যে, এই সিদ্ধান্ত ফেল করলে কী হবে, যথেষ্ট প্রটেকশন তিনি নিচ্ছেন কি না, এসব চিন্তা করতে তিনি ভুলে গেছেন। সফলতার স্বপ্ন – সফল হয়ে যেতে পারলে তিনি হিরো হবেন এসব ভাবনা তাকে এতই বিভোর করে ফেলেছিল যে বাস্তবায়নের রিস্কগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব তিনি দেন নাই।
নোট বাতিল করলে কালো টাকাওয়ালা বা দুর্নীতিবাজেরা তাদের অবৈধ অর্থ পুড়িয়ে ফেলবে, নয়তো নদীতে ভাসিয়ে দেবে। এভাবে নিমেষেই দেশের দুর্নীতি হাওয়ায় মিশে যাবে। এমন কল্পনার লোভ তাঁকে কাবু করে ফেলেছিল। যেমন ধরা যাক, ব্যাপারটা কালো টাকা বা কালোবাজারের টাকা বলা হয় বটে, কিন্তু এভাবে কথা বলার মানে হল ‘অনৈতিক দিক’টাকে মুখ্য করে তুলে ধরা। কিন্তু বাস্তবে অনৈতিকতার বিচার ত সেকেন্ডারি – বিশেষ করে অনৈতিক হলেও তা যদি কাজের সংস্থান করতে পারে।  কালো টাকা কথার সোজা মানে হল ১. কর ফাঁকি দিয়ে পাওয়া টাকা, ২. দুর্নীতি করে জমানো টাকা অথবা ৩. কিছু জাল নোট। এ বৈশিষ্টের দিকগুলো ছাড়া কালো টাকা সব অর্থে অন্য সব টাকার মতোই। এমনকি অর্থনীতিতে এর ভূমিকা সবটুকু নেতিবাচক নয়। কালো টাকাও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ভূমিকা রাখে। অতএব কালো টাকার বিরুদ্ধে অ্যাকশন সতর্কতার সাথে নিতে হবে, যেন তা মূল অর্থনীতির বেচাকেনা-বিনিময় ও কাজ সৃষ্টির ভূমিকাকে আঘাত দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। অর্থনীতিতে ইনফরমাল সেক্টর বলে একটা খাত আছে। সোজা কথায় সরকারের মূল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সমাজের যে যে অংশের মানুষকে কাজ দিতে পারে নাই, স্পর্শ করতে পারে – এমন ঘটনাবলী স্বাক্ষ-প্রমাণ হল “ইনফরমাল সেক্টর” এর উপস্থিতি। কারণ ইনফরমাল মানেই যে কাজের সংস্থান (আসলে কাজ না) সরকারের পরিকল্পনা ব্যার্থতাতে পৌছাতে পারে নাই। কিন্তু তাতে না খেয়ে বসে না থেকে আন্ডারপ্রাইসিংয়ে শ্রম বিক্রি, আধাপেটে খেয়ে হলেও কিছু একটা করে কিছু ভাতের যোগাড় করা। যেমন রাস্তার ধারে বসা অনিয়মিত ফেরিওয়ালা, ছাই বিক্রি করা ফেরিওয়ালা। মিডিয়া ফিল্ড রিপোর্ট বলছে সেই ইনফরমাল সেক্টরকেই সবচেয়ে বড় নাড়া দিয়েছে। এমনিতেই এই সেক্টরকে চালু রাখতে কালো টাকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বড় ভূমিকা থাকে। ফলে গরীব মানুষকে এই নোট বাতিল বড় আঘাত করেছে। দিল্লীর অনলাইন পত্রিকা WIRE এক ফিল্ড রিপোর্ট ছেপেছে।  আমাদের কাওরান বাজারের যেমন এটা হল সেই পাইকারি বাজার খুচরা বিক্রেতা যার ক্রেতা এই অর্থে এটা খুচরা-পাইকারির মিলনমেলা বাজার – দিল্লীর এমনই এক বাজারের সরজেমিন রিপোর্ট। ওই বাজারে মাল উঠানো-নামানো, ওজন করে দেয়া, গোডাউন সাজানোর যেসব শ্রমিক কাজ করে এরাই কাজশুণ্য হয়ে গেছে। কারণ মনে রাখতে হবে  পুরা বাজারটাই আর সবচেয়ে বিপুল পরিমানে যেখানে বেচাকেনা নগদ নোটে চলে। কয়েকদিন তারা কাজশুন্য পেট বাঁচাতে বাতিল নোটেই মজুরি নিয়েছে। এরপর বাকি বেকার সময় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নোট বদলিয়েছে। প্রতিদিনের ছয়শত টাকা আয় গড়ে চারশ টাকায় নেমে গেছে। একথা ঠিক এক দিকে রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায় ও আয় বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে, নেয়া দরকার। কিন্তু তা করতে গিয়ে যেন অর্থনীতিকে অথবা কাজ সৃষ্টিকে সঙ্কুচিত করা না হয়। এসব বিষয় মাথায় রেখে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হ্ত। মোদি এ দিকটি খেয়াল রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন।

কিছু মৌলিক পরিসংখ্যান জেনে নেয়া যাক, যার বেশির ভাগ ডাটা এখানে সাপ্তাহিক লন্ডন ইকোনমিস্ট থেকে নেয়া)। এবার বাতিল হওয়া দুই ধরনের নোট (৫০০ ও ১০০০ রুপি নোট) ভারতে ছাপানো সব ধরনের নোটের মোট অর্থমূল্যের ৮৫ শতাংশই এরাই বহন-ধারণ করে। অর্থাৎ ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল মানে ৮৫ শতাংশ কেনাবেচা-বিনিময় বন্ধ। দ্বিতীয়ত, ছাপানো মোট নোটের সংখ্যা (নোটের অর্থমূল্য নয়) মোটামুটি ২২ বিলিয়ন। আর ছাপাখানার নোট ছাপার ক্ষমতা মাসে তিন বিলিয়ন। অর্থাৎ ছয়-সাত মাসের আগে সব বাতিল নোটের বিকল্প ছাপা সম্ভব নয়। তবে এক হাজারের নোটের বদলে নতুন সব দুই হাজারের নোট হওয়াতে কিছু সুবিধা হয়েছিল। এ দিকে নোট বাতিলের পর ইতোমধ্যে কেবল দুই মাস পার হয়েছে। তৃতীয়ত, ট্রেডার-ব্যবসায়ী কেনাবেচা নয়, শেষ ভোক্তাপর্যায়ে কেনাবেচা-বিনিময়ে ভারতের নগদ টাকায় এই বিনিময় হল মোট বিনিময়ের ৯৮ শতাংশ। (এটা চীনের বেলায় ৯০ শতাংশ) । এখন এই তথ্যের সাথে যদি মিলিয়ে দেখি, নোট বাতিলের পর থেকে মাথাপিছু প্রতিদিন মাত্র চার হাজার টাকার বদল নোট (এটিএমে দুই হাজার টাকা) কেউ পেতে পারে – এই তথ্যকে। তবে বুঝা যায় নোট সরবরাহ সঙ্কোচনের এই সিদ্ধান্তই অর্থনীতিতে সবচেয়ে নেতিকর প্রভাব ফেলেছে। অর্থনীতি সঙ্কোচনের ক্ষেত্রে এটাই মূল ফ্যাক্টর।

মোদির সিদ্ধান্ত কি কাজের হয়েছে, লাভ হয়েছে? নাকি হয়নি?
ভারতের অর্থনীতিতে ছড়ানো ছাপানো নোটের মোট মূল্য ১৪ ট্রিলিয়ন রুপি। ব্যাংক সূত্র বলছে, নোট বাতিলের এক মাসের মধ্যেই বাতিল নোট ফিরে এসেছে ৮.৫ ট্রিলিয়ন রুপি। মোদির সিদ্ধান্তের পক্ষের লোক আর বিরোধীপক্ষ – সবারই কম-বেশি অনুমান হল, আরো ৩ ট্রিলিয়ন রুপি শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ফিরে আসবে বা এসেছে। এর বাইরে আরো আড়াই ট্রিলিয়ন থেকে যাবে, যা ফিরে আসা-না আসা নিয়ে সন্দেহ বা বিতর্ক আছে। মোদির খুব দেখার ইচ্ছা, এই আড়াই ট্রিলিয়ন বা প্রায় ১৫ শতাংশ বাতিল নোট ফিরে না আসুক। অর্থাৎ ব্যাংকে জমা দিতে না আসুক ফলে বদল চাইবার বা বদলে দিবার দাবি করার কেউ না হাজির হোক। মোদির এই আকাঙ্খার বিপরীতে ওয়ার (WIRE)পত্রিকাসহ অনেক মিডিয়া রিপোর্ট করেছে, মোট ৮৫% নয় বরং ৯৫% বাতিল নোটই সম্ভবত বদলে নতুন নোট ফেরত দিতে হবে (..….over 95% of the invalidated currency may come into the banking system)…। যদিও এখন পর্যন্ত জমা দেয়া বাতিল নোটের প্রকৃত সংখ্যা বা মূল্য কত, তা কোথাও সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি। অতএব ৯৫ শতাংশ বাতিল নোট যদি ফেরত এসে থাকে তবে প্রমাণিত হবে যে, মোদির নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত ব্যর্থ, নইলে নয়। সাধারণ মানুষকে সীমাহীন কষ্ট দেয়া ছাড়া এতে কোন লাভ হয় নাই। কারণ নোট ছাপার পর তা রিজার্ভ ব্যাংকে ফেরত না এলে এই ফেরত না আসা, অর্থাৎ বদল নতুন নোট দাবিকারী না থাকার অর্থ রিজার্ভ (বা নোট ছাপা) ব্যাংকের সমপরিমাণ সম্পদ লাভ ঘটেছে। কিন্তু ৯৫% বাতিল নোটই যদি বদল নেবার দারিদার হাজির থাকে তবে রিজার্ভ ব্যাংক পন্ডশ্রম করেছে। তবে এক অর্থে বললে মোদি ইতোমধ্যেই তাঁর ব্যর্থতা মেনে নিয়েছেন, যদিও তা পরোক্ষে। গরিব মানুষকেও ১০ রুপি দিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে; তবেই সময়ে নানান সরকারি সুবিধা বিতরণ যেমন কৃষককে ভর্তুকি দেয়া,  সে পাবে। এই নীতিতে মোদি ‘জন-ধন’ নামে কর্মসূচি অনেক আগেই চালু করেছিলেন। এখন বলা হচ্ছে, অনেক গরিব মানুষ অর্থের বিনিময়ে অন্যের বাতিল টাকা নিজ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে জমা দিয়েছেন। তাই ফেরত মোট বাতিল নোটের পরিমাণ অযাচিতভাবে বেড়ে গেছে। মোদি এমন ঘটনার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দিয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন। কিন্তু এই সাফাই সাধারণ মানুষ কষ্ট লাগবে কোন ভুমিকা নাই। ফলে কথা সত্য-মিথ্যা যাই হোক, এই সাফাইয়ের ভাত নাই।

মোদি যে হেরে গেছেন এর আর এক স্বীকৃতি হল কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাব – এর মধ্যে মোদী নিজেই অফার করেছেন। গত ২৯ নভেম্বর ২০১৬ আনন্দবাজার লিখেছে, কালো টাকায় গরিব কল্যাণ, ফের কালো আয় ঘোষণার জানলা খুলল কেন্দ্র। রাজস্ব সচিব হাসমুখ অধিয়া বলেন,  “……কর, জরিমানা ও সারচার্জ হিসেবে গুনতে হবে ৫০%”, ……… ‘‘আয়ের উৎস জানতে চাওয়া হবে না। সম্পদ কর বা অন্যান্য কর আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। যাঁদের বিরুদ্ধে বিদেশি মুদ্রা পরিচালন আইন, আর্থিক নয়ছয় আইন, ড্রাগ পাচার বা বেনামি সম্পত্তি আইনে মামলা চলছে, তাঁরা অবশ্য ছাড় পাবেন না।’’

 

ঘটনা হল, মোদির নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের ফল-প্রভাব ভালো হচ্ছে – বিজেপি দলের লোক ছাড়া এখন পর্যন্ত অন্য কাউকে এমন দাবি করতে দেখা যায়নি। বরং অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, বিশ্বব্যাংকের কনসালটেন্ট কৌশিক বসু, অর্থনীতিবিদ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, সাবেক অর্থমন্ত্রী ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি- এরা সবাই এ সম্পর্কে খুবই নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন ও যুক্তি তুলে ধরেছেন। সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট বলেছে, এটা ‘দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে ব্যর্থ সিদ্ধান্ত।’ (India’s currency reform was botched in execution)। খোদ মোদি অথবা তার অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিও পরোক্ষভাবে তা স্বীকার করে নিয়েছেন। যেমন, অরুণ জেটলি বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এটা ভালো ফল দেবে। এর অর্থ, স্বল্পমেয়াদে বা বর্তমানে এটা ব্যর্থ। মোদি ভারতে নগদ রুপি ছাড়াই লেনদেনের অর্থনীতি গড়তে চান, এর ঢাক বাজানো শুরু করছেন। মোদি ইঙ্গিতে বলতে চাচ্ছেন যেন নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য এটাই ছিল। অর্থাৎ খেলায় গোল হচ্ছে না, দিতে পারেননি এটা বুঝতে পেরে এখন খোদ গোলপোস্টকেই সরানোর জন্য টানাটানি করছেন। এত সব মিলিয়ে পরিণতি কী হতে যাচ্ছে? সবচেয়ে মারাত্মক দিক হল, ভারতের সম্ভাব্য জিডিপি সাড়ে সাত থেকে দুই শতাংশ কম হবে বলে অর্থনীতিবিদেরা সবাই অনুমান করছেন। অর্থাৎ বিগত কংগ্রেস সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে (২০১০-১১) যে অর্থনৈতিক পতন ঘটেছিল, ভারত সেখানে ফিরে যাচ্ছে। সর্বশেষ গত ৫ জানুয়ারি এইচএসবিসি ব্যাংকের এক রিপোর্টেও বলা হয়েছে, চলতি কোয়ার্টার থেকে জিডিপি নেমে ৫ শতাংশর কাছে যেতে পারে। ব্যবসায়ী মহল হতাশ হয়ে হয়ে পরেছে যে আগামি ছয়মাসের বাজার স্বাভাবিক হবে না।
এসব কিছুর তাৎক্ষণিক ফলাফল হবে পরের ফেব্রুয়ারি মাসের ১১ তারিখ থেকে উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাবসহ পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনে এর বিরাট ছাপ পড়বে। বিজেপি ফলাফল খারাপ করবে। এসবের সামগ্রিক প্রভাব ২০১৯ সালে পরবর্তী কেন্দ্রীয় নির্বাচনে পর্যন্ত গড়িয়ে যেতে পারে। এটা মোদির দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাবনায় ধস আনবে। মোদির এসব ব্যর্থতা নিয়ে সোচ্চার হওয়ার দিক থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে এগিয়ে আছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ও তাঁর দল। সময়ে কংগ্রেসের রাহুলের চেয়েও সমালোচক হিসেবে তিনি আগে। কারণ মমতার অ্যাপ্রোচ হল, গরিব মানুষের জায়গা থেকে দেখা ও সরব হওয়া। দৈনিক মজুরিতে কাজ করা লোকেরা এবং গরিব মধ্যবিত্তরা কাজ হারিয়ে সবচেয়ে কষ্টকর জীবনে পড়েছে। কলকাতা থেকে বিরাট এক  স্বর্ণকার পেশার জনগোষ্ঠি বোম্বাই বা গুজরাটের রাজধানী শহরে মাইগ্রেট করে নিজেকেসহ আরও চার-পাঁচকে সহযোগীকে নিয়ে পেশা জমিয়ে বসেছিল, নিয়মিত দেশে ঞ্জের পরিবারকে অর্থ পাঠাতে পারছিল। এই পুরা গোষ্ঠি এখন সবকিছু গুটিয়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে গেছে। WIRE এর ভাষায়, পুরো ‘ইনফরমাল সেক্টর’ এভাবে ডুবে যাচ্ছে। তাই মমতা ব্যানার্জি এদের দিক থেকে দেখে শুরু থেকেই মোদির সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করছেন। “নোট বাতিল” এখন ভারতের রাজনীতির মূল ইস্যু বা কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে গেছে। ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত এটা থাকবে অনুমান করছেন অনেকেই। আর এতে মোদির জন্য এটা সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ, ‘মোদির নোট বাতিল’ সাধারণ মানুষের কাছে তামাশার ইস্যু হয়ে গেছে। এর চরম মূল্য মোদিকে চুকাতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে ০৯ জানুয়ারি ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টেও পরের দিন) প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তা আবার নানা সংযোজন ও এডিট করে ছাপা হল।]

 

ট্রাম্পের টুইট – তাঁর নিউক্লিয়ার জ্ঞান

ট্রাম্পের টুইট – তাঁর নিউক্লিয়ার জ্ঞান

গৌতম দাস
০৫ জানুয়ারি ২০১৭,  বৃহষ্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-2aU

রাজনীতিবিদ অথবা সরকারপ্রধান বা মন্ত্রীদের আজকাল সোস্যাল মিডিয়াতে পাওয়া খুবই সহজ বিষয় হয়ে গেছে। বিশেষ করে রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট অনেক খ্যাতিমানেরা প্রায়ই টুইটার ব্যবহার করেন। তুলনায় তারা অবশ্য ফেসবুকে কমই আসেন। তাদের টুইটার ব্যবহারে বেশি আগ্রহের মূল কারণ সম্ভবত টুইটারের ১৪০ অক্ষরের সীমা। এমন কোন সীমা ফেসবুকে নাই। টুইটারে অক্ষরের সীমা থাকার কারণে ফেসবুক থেকে এর বৈশিষ্ট অনেক দিক থেকে আলাদা হয়ে গেছে। যেমন- প্রথমত, এটাকে ব্লগ থেকে পৃথক ক্যাটাগরি ‘মাইক্রো-ব্লগ’ বা ছোট ব্লগ বলে আলাদা করা যায়। দ্বিতীয়ত, যে কথা লিখা হবে তা আগে চিন্তা করে গুছিয়ে এরপর লিখতে হবে। তবেই অল্পে কথা হবে। ফলে টুইটারের লেখা সাধারণত কম্প্যাক্ট হয়। তৃতীয়ত, টুইটার ইন্টারেকটিভ নয়, মানে মন্তব্য কথোপকথন এর মত করে সে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করে তৈরি করা হয়নি। এই অর্থে টুইটারকে আসলে ওয়ান ওয়ে বা একপক্ষীয় মিডিয়া বলা যায়। টিভির মতো যে একাধারে নিজে বলেই যায়, শ্রোতাকে বলতে দেয় না। এ দিকে অবশ্য এটাও ঠিক, সেলিব্রিটি বা খ্যাতিমানেরা কাউকে বলতে দিতে চান না, কেবল শোনাতে চান। আর তাদের শোনার সে সময় কই?
এভাবে টুইটারের বৈশিষ্ট নিয়ে আরো অনেক পয়েন্ট লেখা যায় হয়ত। থাক সে কথা। আসল কথা হল – ১৪০ অক্ষর। ফলে এখানে অল্প লিখে ফাঁকি দেয়াও যায়। কিন্তু টুইটারের বিষয়ে আলাপ তুললাম কেন? আর তার সাথে ফাঁকির কী সম্পর্ক? সম্পর্কের নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। টুইট লিখলে যেহেতু কম কথা লিখতে হয়, ফলে লেখার সাথে আবার কোনো ছোট বা বড় ব্যাখ্যা লিখতে হয় না ফলে পাঠল কেউ আশা করে না। কারণ ব্যাখ্যা লেখার সুযোগ বা জায়গা নেই। এ এক বিরাট অজুহাত। ফলে যা লিখছি এর ব্যাখ্যা জানি আর না-ই জানি, তা ব্যাখ্যা করার দরকার হয় না বলে অজ্ঞদের জন্য টুইট খুবই কাজের জিনিস। না, আমি এটা বলছি না যে- যারা টুইট করেন তারা সব অজ্ঞ। তবে বলছি, অজ্ঞদের টুইট লেখার বিশেষ সুযোগ আছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিউক্লিয়ার বা পারমাণবিক যুদ্ধের অস্ত্র বিষয়ে একটি টুইট লিখেছেন এভাবেঃ “The United States must greatly strengthen and expand its nuclear capability until such time as the world comes to its senses regarding nukes”। এখান থেকে আমার অনুমান অচিরেই হয়ত বেইজ্জতি এড়াতে ট্রাম্পকে টুইট লেখা বন্ধ করে দিতে হবে। কেন?
টুইটের বক্তব্য বাংলা করে লিখলে হবে, “আমেরিকাকে অবশ্যই বেশ বিশাল করে তার নিউক্লিয়ার সক্ষমতা শক্তিশালী ও বৃদ্ধি করা উচিত, ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না দুনিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র সম্পর্কে হুঁশ আসে।” – এই ছিল বিদ্যাধর ডোনাল্ড ট্রাম্পের টুইট – ১৪০ অক্ষর।
অনুবাদ লেখকের; যারা মূল খবরের উৎস থেকে পড়তে চান তারা দুই দিন আগে ২২ ডিসেম্বরের রয়টার নিউজ এজেন্সির রিপোর্ট দেখে নিতে পারেন। ট্রাম্পের টুইটের কয়েক ঘণ্টা পরই ওই রিপোর্ট লিখে প্রকাশিত হয়েছিল।

সময়ের বিচারে দুনিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্রের ইতিহাস বা আয়ু খুবই স্বল্প। যুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে দুনিয়াতে এর প্রথম জোড়া ব্যবহারটাই শেষ ব্যবহার হয়েছিল। আর স্বল্প তিন দিনের গ্যাপে এই জোড়া ব্যবহার, দুটোই ঘটেছিল জাপানের ওপর; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট আমেরিকার হাতে এই তিন দিনের ব্যবধানে। তাও সেটা ওই যুদ্ধে শত্রু জাপানের বিরুদ্ধে আমেরিকার জয়-পরাজয় নির্ধারণের জন্য নয়, বরং জয় নিশ্চিত হয়ে গেলে পরেও, এ সুযোগে বোমা ব্যবহারের পরীক্ষা করে এর পরিণতি জেনে রাখার জন্য করা হয়েছিল। আর তাতেই – এর মারাত্মক ভয়াবহতা যা বোঝাবুঝি তা শেষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের চতুর্থ টার্মের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন হ্যারি ট্রুম্যান। ১৯৪৫ সালের জানুয়ারি মাসে চতুর্থবার প্রেসিডেন্টের শপথ নেয়ার কয়েক মাসের মধ্যে, ১২ এপ্রিল ১৯৪৫ রুজভেল্টের স্বাভাবিক মৃত্যু হলে পরে ওই দিন থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ৩৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। আর এর প্রায় চার মাসের মাথায় ঐ ৬ আগস্ট ও ৯ আগস্ট ১৯৪৫ ট্রুম্যান জাপানের ওপর পারমাণবিক বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত দেন এবং তা পালিত হয়।

কিন্তু এরপরই হ্যারি ট্রুম্যান মূলত এই বোমা ব্যবহারের বিরোধী হয়ে যান। যদিও কোরিয়া যুদ্ধে (১৯৫০-৫৩) আমেরিকার জড়িয়ে যাওয়ার পটভূমিতে ১৯৫০ সালের ৩০ নভেম্বর এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রশ্নের মুখে তাকে স্বীকার করতে হয় যে ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের জন্য তৈরি’। কিন্তু পরের বাক্য যোগ করে তিনি বলেন, ‘এই অস্ত্র দ্বিতীয়বার তিনি ব্যবহার করতে চান না’। এটাকে ‘এক ভয়ঙ্কর অস্ত্র’, এটা ‘কারো ব্যবহার করা উচিত না’ বলে কথা শেষ করেন। আর ১৯৫৩ সালে ১৫ জানুয়ারি (তিনি দুই টার্মে প্রেসিডেন্ট ছিলেন) কংগ্রেস বা আমেরিকান সংসদে তার বিদায় ভাষণে যিশুর নামে কসম কেটে তাকে কৃতকর্মের পক্ষে সাফাই-মূলক প্রচুর কথা খরচ করতে হয়। কেন তিনি পারমাণবিক বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন এর একটি দুর্বল সাফাই তার ছিল। যেমন- “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকানোর জন্য” নাকি তাকে এটা করতে হয়েছিল। এ ছাড়া আর এক দুর্বল সাফাই ছিল তাঁর যে, ইতোমধ্যে আমেরিকার বোমা ফেলার আট বছর পার হয়ে গেছে ইতোমধ্যে অন্যান্য রাষ্ট্রও (ব্রিটেন ১৯৫২, সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৯) এমন বোমার অধিকারী হয়ে গেছে। অর্থাৎ তিনি আর একা দোষী নন যেন এটাই বুঝে নিতে বলছিলেন। আর সেই সাথে তিনি বুঝেছিলেন তার সাফাই যথেষ্ট নয়। আর তাই প্রকারান্তরে তা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘স্টার্টিং আ অ্যাটমিক ওয়ার ইজ টোটালি আনথিঙ্কেবল ফর এ র‌্যাশনাল ম্যান’। বাংলা বললে, ‘যুক্তিবুদ্ধিতে চলা মানুষের পক্ষে একটা পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু করা অচিন্তনীয়’। মডার্ন যুগ মানে, আধুনিক রাষ্ট্র-কায়েমের কালে আধুনিক দুনিয়ায় পশ্চিমের পৌঁছানোর পর থেকে, সেই সমাজের মাপকাঠিতে ‘র‌্যাশনাল’ মানুষ মানে আল্লাহর ভয় থাকুক আর না-ই থাকুক কিন্তু ‘সর্বোচ্চ যুক্তিবুদ্ধিতে হুঁশজ্ঞানওয়ালা মানুষ’ মনে করা হয় যাকে।
পরবর্তীকালে ১৯৬০ সালের মধ্যে চীন আর ফ্রান্সসহ আমেরিকা, ব্রিটেন আর সোভিয়েত ইউনিয়ন এই মোট পাঁচ রাষ্ট্র পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়ে যায়। যদিও ট্রুম্যান সেই ১৯৪৬ সাল থেকেই জাতিসঙ্ঘের অধীনে এই অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিষিদ্ধ করার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু অন্য চার রাষ্ট্র বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়ন তাকে বিশ্বাস করেনি। করার কারণও ছিল না। কারণ ট্রুম্যানের প্রস্তাবের মূল সমস্যা ছিল, তিনি এমন প্রস্তাব দিচ্ছেন যখন ইতোমধ্যে আমেরিকা বোমা প্রস্তুত ও ব্যবহারকারী এবং সব টেকনিক্যাল ও ব্যবহারিক ডাটা একমাত্র নিজ রাষ্ট্রের হেফাজতে। ফলে তিনি সব রাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়েই আছেন। মানে সে বাদে ওই পাঁচ রাষ্ট্র একেবারে বোমা হাসিল করে আমেরিকার সমান হওয়ার আগে এই বোমা নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণের পথ ধরা সঠিক মনে করার কোনো কারণ নেই। ইতিহাসে পাওয়া যায়, এ দিকটাও ট্রুম্যান প্রশাসনের মন্ত্রী-উপদেষ্টারা চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু তারা নিজেরাই বিভক্ত হয়ে পড়েন এভাবে যে, একদল সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে এই টেকনোলজির সব কিছু শেয়ার করার পক্ষে ছিল। অন্য পক্ষ মনে করে- সব কিছু শেয়ার করার পর এই বোমা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবে সোভিয়েতরা যদি উল্টে যায়, আমেরিকা যদি প্রতারিত হয় তাহলে কী হবে? সারকথায় বিশ্বাসের অভাব ছিল মারাত্মক। এ ছাড়া প্রত্যেকে বোমা হাতে পেলেই (মানে আসলে টেকনোলজি করায়ত্ত হওয়া) একমাত্র আমেরিকার সমান হবে এই ভাবনার কারণে বোমার নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার জন্য সমঝোতা হয়নি।
কিন্তু তবু প্রস্তাব চালাচালি অব্যাহত ছিল। যেমন ট্রুম্যানের পরের প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ারও ১৯৫৩ সালের সাধারণ পরিষদের বক্তৃতায় প্রস্তাব রেখেছিলেন। ১৯৫৪ সালে লিখিত প্রস্তাবও রেখেছিলেন। তবে দুনিয়াব্যাপী পারমাণবিক বোমাবিরোধী মনোভাব বাড়ছিল। এটা ধরা পড়ে ১৯৫৮ সালে সারা দুনিয়ার ১০ হাজার বিজ্ঞানী একসাথে স্বাক্ষর করে জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারির দৃষ্টি আকর্ষণ করে এক আবেদন পাঠিয়েছিলেন। তবে ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেই বোমার অধিকারী হয়ে যাওয়াতে আর অনেক নিগোসিয়েশনের পর ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে প্রথম জাতিসঙ্ঘের অধীনে বোমা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ‘আন্তর্জাতিক অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন’ গঠিত হয়। এরপরও প্রায় ১০ বছর পরে ১৯৫৮ সালে প্রথম সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা পারমাণবিক বোমাবিরোধী আন্তর্জাতিক সমঝোতা চুক্তি এনপিটি বা নন প্রোলিফারেশন ট্রিটি তে স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুসারে এটা ২৫ বছর পরে রিভিউ হওয়ার কথা ছিল। ১৯৯৫ সালে এটা আবার রিভিউ হয়ে নতুন করে গৃহীত হয়। এবং সংযোজিত আর এক নতুন চুক্তিতে আরো পোক্ত হয়। এবার শুধু বোমা বানানো নয়, পারমাণবিক বোমা পাওয়ার লক্ষ্যে ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বোমা বানিয়ে বাস্তবে টেস্ট করাও নিষিদ্ধ করার চুক্তি ‘সিটিবিটি’ নতুন সংযোজন হিসেবে এবার এটাও স্বাক্ষরিত হয়। অবশ্য ১৯৯১-৯২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া ও কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তি এ ক্ষেত্রে এসব চুক্তি করতে পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করেছিল। ওদিকে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর বাইরে বোমা বানানোতে নিজে স্বীকৃত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভারত পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া যুক্ত হয়েছে। ভারত ১৯৭৪ সালে, পাকিস্তান ১৯৯৮ সালে সফল পরীক্ষাকারীর দলভুক্ত হয়। গত ১৯৯৮ সালে ভারত নতুন করে বোমা বানিয়ে সফল পরীক্ষা করার পর ক্লিনটনের আমেরিকা ভারতের ওপর অবরোধ আরোপ করেছিল। একইভাবে পাকিস্তানের ওপরও। কিন্তু এখনো এনপিটিতে স্বাক্ষর না করা রাষ্ট্র হিসেবে ভারত-পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া বহাল আছে। যদিও এই টেকনোলজি ও ম্যাটেরিয়াল পাওয়ার ক্ষেত্রে সরবরাহকারী রাষ্ট্রগুলোর ক্লাব নিউক্লিয়ার সাপ্লাই গ্রুপ (বা এনএসজির) সভায় ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তাদের শর্ত আরো কঠিন হয়ে আছে।
সারসংক্ষেপে এটাই পারমাণবিক বোমার জন্ম ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ ইতিহাস। বললাম কেন? বললাম এ জন্য যে ট্রাম্প এক টুইট করে এই ৬৬ বছরের ইতিহাস মুছে ফেলে আবার যেন ১৯৫০ সালে আমেরিকায় ফেরত যেতে চান, তা-ই বলছেন। তিনি আমেরিকার নিউক্লিয়ার সক্ষমতা শক্তিশালী ও বৃদ্ধি করা দরকারের কথা অবলীলায় মাত্র ১৪০ অক্ষরের মধ্যে খুবই সহজে সেরে ফেলেছেন। এটা তাদের দ্বারাই সম্ভব, যারা পারমাণবিক বোমার জন্ম ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পৌঁছানোর ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ। কারণ অজ্ঞদের সুবিধা সবার চেয়ে বেশি। আমরা কল্পনা করতে পারি, এক খোশমেজাজি পার্টির কথা, যেখানে রাজনীতিবিদ বন্ধুদের সাথে সহপাঠী ব্যবসায়ী বন্ধুদের অনেক দিন পরে দেখা হয়েছে। তো ব্যবসায়ী বন্ধুরা যেভাবে সহজেই সরকার চালানো বন্ধুদের বিভিন্ন ইস্যুতে সবক দিয়ে থাকে তেমনই আর কী! যেন বলছে ও তোরা ওমুক জিনিসটা কন্ট্রোল করতে পারলি না? আমাকে একবার প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে দে, দেখো আমি দুই দিনে করে সব ঠিক করে দেখাচ্ছি!
এমন কথা আমরা অনেকেই বলতে শুনেছি ও দেখেছি। অন্তত ‘এক দিনের মুখ্যমন্ত্রী’ এই কল্পনায় তৈরি হিন্দি সিনেমা ‘নায়ক’ দেখেছেন অনেকেই। তখন একজন ট্রাম্প হওয়া সহজেই সম্ভব। কিন্তু যেসব ইস্যু দুনিয়ার রাষ্ট্রস্বার্থগুলোর নানা লড়াই-ঝগড়া আর আপসের ফলাফলে সবসময় নির্মিত হয়ে চলে এগুলো নিয়ে তুড়ি বাজিয়ে পার্টিতে সমাধান বাতলানো তখনই সম্ভব, যখন আমরা ইতিহাসের ঘটনাবলি সম্পর্কে বেখবর থাকি। কারণ অজ্ঞতা এক বিশাল বাড়তি সুবিধা দেয়। কিন্তু ব্যবসায়ী ট্রাম্প যে এখন আর কোনো পার্টির চাপাবাজ নন, বাস্তবেই তিনি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট? তাহলে এখন কী হবে?
ওপরে যে পারমাণবিক বোমার ধারাবাহিকতা আমরা দেখেছি তা আসলে এ বোমার উদ্ভব, তৈরি, ব্যবহার এবং পরিণতিতে এর ভয়াবহতা বোঝার পর সেই ১৯৪৫ সাল থেকে এ টেকনোলজিকে নিয়ন্ত্রণ এবং পরে সম্পূর্ণ বন্ধের দিকে গেছে। এখন এ গ্রাফের ঝোঁক হলো এ টেকনোলজি লুপ্ত করে ফেলা। এটা এ ইতিহাস দেখে যে কারো বোঝার কথা। আমেরিকার মতো দেশের যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন তার কী এতটুকু আক্কেলজ্ঞান নেই, যে টেকনোলজি গ্লোবাল ঝোঁক লুপ্তপ্রায়ের দিকে তাকে আবার জাগাতে চাওয়াটা কী সম্ভব, না করা উচিত? যেখানে এমনকি এ টেকনোলজির বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারও জার্মানি ও জাপানের মতো দেশ ২০২৫ সালের পর সম্পূর্ণ বন্ধ করার পরিকল্পনা করে ফেলেছে সেখানে এ টেকনোলজির ‘সক্ষমতা শক্তিশালী ও বৃদ্ধি করা উচিত’ এ কথা কী করে একজন হবু প্রেসিডেন্ট বলেন?
প্রেসিডেন্টের মুখ ও লিখিত নির্দেশ কোনো (পার্টির চাপাবাজি ধরনের) বেফাঁস কথা বলে বিপর্যয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করা খুব সহজ। কারণ প্রেসিডেন্টকে সাহায্য করতে প্রত্যেক বিষয়ে অজস্র মন্ত্রী-উপদেষ্টা এক্সপার্ট নিয়োগ দেয়া থাকে। তাদের ব্রিফিং সব নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। কিন্তু টুইট করা? প্রেসিডেন্ট উপদেষ্টার পরামর্শ নিয়ে টুইট করবেন? না এটা খুবই হাস্যকর। কিন্তু কী আর করা। রয়টার জানাচ্ছে, এখনই ট্রাম্পের নিয়োজিত এক মুখপাত্র আছে। যাকে নিয়মিত মিডিয়ার চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। কারণ বোকা বোকা টুইট লিখে ট্রাম্প যেন খুব মজা উপভোগ করেন। মজার খেলা একটা তিনি পেয়েছেন আর ওদিকে মুখপাত্রের প্রাণ যায়। রয়টার্স বলছে, ওই মুখপাত্র নানাভাবে ট্রাম্পের টুইট খেলাকে গুরুগম্ভীর দিকে অর্থ টানার কসরত করেই চলছেন। তিনি এবার বলেছেন, ট্রাম্পের ওই টুইটকে যেন ‘এ বিষয়ে আমেরিকার কোনো নতুন পলিসি বদল হিসেবে কেউ না দেখে, প্লিজ’। আচ্ছা এ কথাটাই কী ট্রাম্প মজা করা এক বালক মাত্র, তাই বলছেন না?
এখন একটাই পথ বাকি আছে। ট্রাম্প যদি টুইট করা বন্ধ না করেন, তবে শপথ নেয়ার পরের কয়েক মাসের মধ্যে তিনি ইজ্জত নিয়ে টানাটানির মুখোমুখি হবেন, সম্ভবত।
ওদিকে ট্রাম্পের এ টুইটের বক্তব্য স্ববিরোধী। তিনি বলছেন, একালে আমেরিকার আসল শত্রু ‘টেররিজম’। ফলে কোল্ড ওয়ারে শত্রুতা সোভিয়েতের কথা ভেবে এখনো ন্যাটো টিকিয়ে রাখা অপ্রয়োজনীয়। এ ছাড়া জার্মানিতে বা জাপানের মতো যেখানে এখনো আমেরিকান মিলিটারি ব্যারাক আছে, তাদের খরচ নিজ নিজ রাষ্ট্র বহন করুক। তাহলে সেই ট্রাম্প আবার পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জা বাড়ানোর পক্ষে কথা বলেন কী করে? পোলাপান কখন কী করলে সে যে মজা পায়, সে নিজেও জানে না! তাই কী?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ২৫ ডিসেম্বর অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার এডিট করে আবার ছাপা হল।]