মোদির ‘মিত্রোঁ’ ডাক এখন ভয়ঙ্কর আতঙ্ক

মোদির মিত্রোঁ ডাক এখন ভয়ঙ্কর আতঙ্ক

গৌতম দাস

১১ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2cn

 

রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতার ভাষা মানে জনগণকে কী বলে ডাকবেন, সেই সম্বোধনের ভাষা একেক নেতার একেক স্টাইলে হয়। যেমন অনেকে ডাকেন- ‘বন্ধুরা আমার’ অথবা ‘বন্ধুরা’। শেখ মুজিবের একান্ত স্টাইলের রূপ ছিল ‘ভায়েরা আমার’ বলা। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশেষ স্টাইল হলো- ‘মিত্রোঁ’ বলে ডাকা। হিন্দিতে ‘মিত্রোঁ’ বলে জনগণকে ডাকলে বা সম্ভাষণ করলে এক আন্তরিক ভাব প্রকাশ পায় বলে অনেকের ধারণা। ‘বন্ধু’ বোঝাতে আমরা বাংলায় অনেকে সংস্কৃতঘেঁষা বাংলা শব্দ ‘মিত্র’ ব্যবহার করি। সেই মিত্র থেকে হিন্দিতে ‘মিত্রোঁ’। সম্প্রতি ভারতেই মিডিয়া মনিটর করে পাওয়া রিপোর্ট হচ্ছে, মোদি জনগণের উদ্দেশ্যে ‘মিত্রোঁ’ সম্ভাষণ বন্ধ করে দিয়েছেন। কিভাবে তা বুঝা গেল? আনন্দবাজার পত্রিকা জানাচ্ছে, দিল্লীর এক পানশালার খবর। টিভির দিকে চেয়ে থাকা সেখানকার ম্যানেজার ঘোষণা দিয়েছিলেন মোদী এরপর বক্তৃতায় ‘মিত্রোঁ’ বলে ভারতের কোথাও ভাষণ শুরু করেছেন যদি দেখা যায় তবে যত বার মোদী ‘মিত্রোঁ’ বলবেন, “তত বার বিয়ার বা কোনও পানীয়ের ‘শট’ পাওয়া যাবে মাত্র ৩১ রুপীতে। পর্দায় চোখ ঠিকরে বসে ছিলেন গ্রাহকেরা। কিন্তু ফাঁকি দিয়েছে ‘মিত্রোঁ’”। ম্যানেজার বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু কেন? মোদি তাঁর প্রিয় শব্দ ব্যবহার কেন ত্যাগ করলেন?
একেবারে গোড়ার ঘটনা মানে ঘটনার পিছনের ঘটনা হল, গত ৮ নভেম্বর রাত সোয়া ৮টার সময় মোদি হঠাৎ টিভিতে এসে এক ঘোষণা-বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই ঘোষণা ভারতের প্রত্যেক মানুষকে তো বটেই, বিশেষত গরিব মানুষের কাছে তা ছিল তাদের জীবন উথালপাথাল করে দেয়ার মতো ঘটনা। মোদি ঘোষণা করেছিলেন,  ভারতের ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিল করা হয়েছে আর সে ঘোষণা ঐ রাতের  ১২টা থেকে কার্যকর হবে। কোন সরকারের হয়ে বাজারে কাগুজে নোট চালু করা, বিতরণ করা অথবা বাজার থেকে তুলে নেয়ার কর্তৃপক্ষ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের মত ভারতের বেলায় ওর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাম রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (RBI বা আরবিআই)। চালু যে কোন নোট “এখন থেকে আর রাষ্ট্রস্বীকৃত নোট নয়”, এমন ঘোষণা দিয়ে সেই নোট প্রত্যাহার করে নেয়া আইনসিদ্ধ। আইনি টেকনিক্যাল ভাষায় এটাকে de-monetization বলা হয়। এটা monetization  এর উলটা কাজ। বৈধ মুদ্রা বা নোট হিসাবে অনেক কিছুই চালু থাকতে পারে। যাদুর ছোয়ার মত এক ঘোষণা দিয়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই নোটের মুদ্রা-গুণ কেড়ে নিতে পারে। তখন থেকে সেটা হয়ে যাবে অস্বীকৃত অথবা অবৈধ মুদ্রা। এটাই ডি-মনিটাইজ। মনিটাইজড গুণ কেড়ে নেওয়া। এভাবেই মোদির সরকার ভারতের বাজারে চালু ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট ডিমনিটাইজড বা বাতিল ঘোষণার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল। অন্যান্য দিনের মত ওই ৮ নভেম্বর ২০১৬ সন্ধ্যায় ‘মিত্রোঁ’ বলে সম্ভাষণের পর মোদি হঠাৎ ঘোষণা করেছিলেন, রাত ১২টার পর থেকে ঘোষণা কার্যকর হবে। ফলে পাবলিকের কাছে এরপর থেকে মোদির মুখে ওই ‘মিত্রোঁ’ সম্বোধন একটা ভয়ঙ্কর আতঙ্ক ও ত্রাস সৃষ্টিকারি শব্দ হয়ে যায়।মোদির কথামাফিক রাত ১২টার পর থেকে নোট বাতিল ঘোষণা কার্যকর হয়ে যায়। অর্থাৎ এরপর থেকে ওই দুই নোটে কোনো লেনদেন ও কেনাবেচা বন্ধ হয়ে যায়। আর সরকার এর মধ্যে নোট বদলে দিবার কিছু অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা নিয়েছেল যার মধ্যে একটা হল, পরের দিন থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাতিল নোটগুলো ব্যাংক থেকে বদলে নতুন নোট নেয়া যাবে। কিন্তু প্রতিদিন ৪০০০ রুপির বেশি তোলা যাবে না। না প্রথম দুদিন মানুষ ওই ঘোষণা বাস্তবায়নকে কষ্টকর হলেও গ্রহণ করেছিল। এরপর তারা বুঝে যায় যে  এই সিদ্ধান্তে জীবনযাপন চালিয়ে নেয়া এক মানবেতর দশায় পড়া,  মানূষের নাভিশ্বাস তুলে ফেলা।
ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে একটা চুটকি বা কার্টুন প্রকাশিত হয়েছে। যেটা থেকে সাধারণ মানুষের জীবন-মনে ডিমনিটাইজেশন কেমন চোট ফেলেছে আন্দাজ করা যায়। কার্টুনে দেখা যাচ্ছে, মোদি ২০১৬ সালের শেষে রাত ১২টার কিছু আগে টিভিতে এসেছেন। তিনি কিছু একটা ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন, কিন্তু যেই না তিনি স্বভাবসুলভ ভাষায় ‘মিত্রোঁ’ বলে ডেকেছেন; তা শুনেই হাজার হাজার ভারতীয় অজ্ঞান হয়ে গেছেন! কারণ ‘মিত্রোঁ’ বলে ডাকার পর তিনি নোট বাতিলের মতো আবার নতুন কী ভয়ঙ্কর ঘোষণা দেন, তা শোনার আগেই ভয়ে মানুষ অজ্ঞান। অর্থাৎ ‘মিত্রোঁ’ বলে ডাক শোনার পর কী হয়েছে, মোদি আর কী বলেছেন তা কেউ শোনেনি। তার আগেই অজ্ঞান হয়ে গেছে। তবে ওই কার্টুনে শেষে দেখাচ্ছে, মোদি ২০১৬ সাল শেষ হওয়ার কিছু আগে টিভির ওই ঘোষণায় ‘মিত্রোঁ’ বলে ডাকার পরে খুবই স্বাভাবিক এক ঘোষণা ছিল সেটা। তিনি বলেছিলেন, আর কিছুক্ষণ পর ২০১৬ সাল শেষ হয়ে যাবে, আমার সালাম গ্রহণ করুন। যা হোক, এক চুটকি দিয়ে আমরা ‘মিত্রোঁ’ শব্দের ত্রাস সৃষ্টির ক্ষমতা সম্পর্কে জানলাম। সত্যি সত্যিই মোদি এখন তার বক্তৃতায় ‘মিত্রোঁ’ বলা ছেড়ে দিয়েছেন বলে অনেক মিডিয়া দাবি করছে। কিন্তু কেন এই ত্রাসবোধ?
আমরা টের পাই আর না পাই, অর্থনীতিতে মুদ্রার সবচেয়ে বড় ভূমিকা হল- বিনিময়ের ঘটক সে। বিশেষ করে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতিটি লেনদেন-বিনিময় ঘটনায় ঘটক হলো মুদ্রা। সেই স্তরে  ঘটক বা ‘উপায়’ হিসেবে হাজির থাকার মাধ্যমেই যেকোনো কেনাবেচা নগদ বিনিময় সম্পন্ন হয়। হাটে মুরগি বিক্রি করে পাওয়া মুদ্রা দিয়ে আবার লবণ বা কেরোসিন কিনে বাড়ি ফেরার মত ব্যাপার এটা। একটা দেশের অর্থনীতির আকার বাড়াতে, একে খুবই গতিশীল করতে উপযুক্ত নীতি-পলিসি থেকে শুরু করে বহুবিধ কাঠখড় পোড়াতে হয়। কিন্তু উল্টো তাকে শ্লথ করে দিতে চাইলে সবচেয়ে সহজ উপায় হল মুদ্রার সরবরাহ কমিয়ে বা বন্ধ করে দেয়া। ভারতের অর্থনীতি যতই বড় আর গতিশীল হোক, প্রতিটি কারখানায় উৎপাদন এবং বাজারে পণ্যের চাহিদা আগের দিনের মত যতই থাক, তা থাকলেও মুদ্রা সরবরাহের অভাবে সব ধরনের কেনাবেচা-বিনিময় থমকে দাঁড়াবেই। আর স্পষ্ট করে বললে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে যতটুকু (বাতিল নোটের বদলে) নতুন নোটের সরবরাহ সরকার করবে, আগের বাজার সীমিত হয়ে সেটুকুতে সীমাবদ্ধ হয়ে ধুঁকতে থাকবে।
মোদি তাঁর নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে মন্ত্রী সচিবসহ তাঁর কাছের খুব কম লোককে তিনি জানিয়েছিলেন, শেয়ার করেছিলেন। অনেকে বলেন মন্ত্রীরা এবং রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্ণরও আগে থেকে এবং ভাল মত জানতেন না।  বিশেষত বিশেষজ্ঞ বা আমলা সচিবদের সাথেও যথেষ্ট শেয়ার করেননি। বাস্তবায়নের ভালো-মন্দ দিক কৌশল নিয়েও পরামর্শ করেননি এই ভয়ে যে, তাতে সিদ্ধান্ত ফাঁস হয়ে গেলে আগেই নগদ অর্থ ব্যাংকে হস্তান্তর শুরু হয়ে যাবে এবং এতে পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে। এই ভয়ে সিদ্ধান্ত আড়ালে রাখতে গিয়ে আগেই পর্যাপ্ত নতুন নোট ছাপানোর কাজ তিনি করেননি। এর ফল হয়েছে মারাত্মক। প্রতিদিন ব্যাঙ্কে জনপ্রতি লোক মাত্র চার হাজার টাকা পর্যন্ত বাতিল নোট বদলাতে পারবেন, এই ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। চাহিদা মেটানোর মতো নতুন নোট রিজার্ভ ব্যাংকের হাতে ছিল না বলেই এমন সিদ্ধান্ত, তা ধরে নেয়া যায়। অর্থাৎ প্রতিদিনের চাহিদার মাফিক নোট সরবরাহ  নয় বরং নোট ছাপানোর টেকনিক্যাল সক্ষমতায় ঠিক করে দিয়েছে প্রতিদিন কী পরিমাণ নোট  বাহারে দেয়া হবে। এভাবে প্রকৃত চাহিদা চেপে রেখে সীমিত করে চাহিদা মেটানোর পরিকল্পনা করতে হয়েছে। এর সোজা মানে, বাজারে নগদ অর্থের চাহিদা-জোগানের সম্পর্ক দিয়ে নয় বাজারে নোট সরবরাহ করা হয় নাই। বরং খুবই সীমিতভাবে রিজার্ভ ব্যাংক যতটা নোট সরবরাহ করেছে, অর্থনীতি বা বাজারের সাইজ নির্ধারিত হয়েছে একমাত্র সেই ভিত্তিতে। একটা চালু বাজার কেনাবেচা-বিনিময় লেনদেনকে টুঁটি চেপে ধরে সঙ্কুচিত করা হয়ে গেছে। এতে পুরো অর্থনীতিই সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। তবে এটা ভাবা ভুল হবে যে মোদি খোদ অর্থনীতিকে সঙ্কুচিত করে শুকিয়ে মারার জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাহলে কী ছিল তার উদ্দেশ্য?

কালো টাকা বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ ছিল মোদির ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য। কিন্তু তিনি তার এ লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগেই অন্য কোথাও চলে গেছেন। টনসিল অপারেশন করতে গিয়ে গলাই কেটে ফেলেছেন। আর সফল হয়ে যেতে পারলে পরবর্তী যেকোন নির্বাচনে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবেন কল্পনায় এটা দেখে তিনি এতই আপ্লুত হয়ে গেছিলেন  যে, এই সিদ্ধান্ত ফেল করলে কী হবে, যথেষ্ট প্রটেকশন তিনি নিচ্ছেন কি না, এসব চিন্তা করতে তিনি ভুলে গেছেন। সফলতার স্বপ্ন – সফল হয়ে যেতে পারলে তিনি হিরো হবেন এসব ভাবনা তাকে এতই বিভোর করে ফেলেছিল যে বাস্তবায়নের রিস্কগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব তিনি দেন নাই।
নোট বাতিল করলে কালো টাকাওয়ালা বা দুর্নীতিবাজেরা তাদের অবৈধ অর্থ পুড়িয়ে ফেলবে, নয়তো নদীতে ভাসিয়ে দেবে। এভাবে নিমেষেই দেশের দুর্নীতি হাওয়ায় মিশে যাবে। এমন কল্পনার লোভ তাঁকে কাবু করে ফেলেছিল। যেমন ধরা যাক, ব্যাপারটা কালো টাকা বা কালোবাজারের টাকা বলা হয় বটে, কিন্তু এভাবে কথা বলার মানে হল ‘অনৈতিক দিক’টাকে মুখ্য করে তুলে ধরা। কিন্তু বাস্তবে অনৈতিকতার বিচার ত সেকেন্ডারি – বিশেষ করে অনৈতিক হলেও তা যদি কাজের সংস্থান করতে পারে।  কালো টাকা কথার সোজা মানে হল ১. কর ফাঁকি দিয়ে পাওয়া টাকা, ২. দুর্নীতি করে জমানো টাকা অথবা ৩. কিছু জাল নোট। এ বৈশিষ্টের দিকগুলো ছাড়া কালো টাকা সব অর্থে অন্য সব টাকার মতোই। এমনকি অর্থনীতিতে এর ভূমিকা সবটুকু নেতিবাচক নয়। কালো টাকাও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ভূমিকা রাখে। অতএব কালো টাকার বিরুদ্ধে অ্যাকশন সতর্কতার সাথে নিতে হবে, যেন তা মূল অর্থনীতির বেচাকেনা-বিনিময় ও কাজ সৃষ্টির ভূমিকাকে আঘাত দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। অর্থনীতিতে ইনফরমাল সেক্টর বলে একটা খাত আছে। সোজা কথায় সরকারের মূল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সমাজের যে যে অংশের মানুষকে কাজ দিতে পারে নাই, স্পর্শ করতে পারে – এমন ঘটনাবলী স্বাক্ষ-প্রমাণ হল “ইনফরমাল সেক্টর” এর উপস্থিতি। কারণ ইনফরমাল মানেই যে কাজের সংস্থান (আসলে কাজ না) সরকারের পরিকল্পনা ব্যার্থতাতে পৌছাতে পারে নাই। কিন্তু তাতে না খেয়ে বসে না থেকে আন্ডারপ্রাইসিংয়ে শ্রম বিক্রি, আধাপেটে খেয়ে হলেও কিছু একটা করে কিছু ভাতের যোগাড় করা। যেমন রাস্তার ধারে বসা অনিয়মিত ফেরিওয়ালা, ছাই বিক্রি করা ফেরিওয়ালা। মিডিয়া ফিল্ড রিপোর্ট বলছে সেই ইনফরমাল সেক্টরকেই সবচেয়ে বড় নাড়া দিয়েছে। এমনিতেই এই সেক্টরকে চালু রাখতে কালো টাকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বড় ভূমিকা থাকে। ফলে গরীব মানুষকে এই নোট বাতিল বড় আঘাত করেছে। দিল্লীর অনলাইন পত্রিকা WIRE এক ফিল্ড রিপোর্ট ছেপেছে।  আমাদের কাওরান বাজারের যেমন এটা হল সেই পাইকারি বাজার খুচরা বিক্রেতা যার ক্রেতা এই অর্থে এটা খুচরা-পাইকারির মিলনমেলা বাজার – দিল্লীর এমনই এক বাজারের সরজেমিন রিপোর্ট। ওই বাজারে মাল উঠানো-নামানো, ওজন করে দেয়া, গোডাউন সাজানোর যেসব শ্রমিক কাজ করে এরাই কাজশুণ্য হয়ে গেছে। কারণ মনে রাখতে হবে  পুরা বাজারটাই আর সবচেয়ে বিপুল পরিমানে যেখানে বেচাকেনা নগদ নোটে চলে। কয়েকদিন তারা কাজশুন্য পেট বাঁচাতে বাতিল নোটেই মজুরি নিয়েছে। এরপর বাকি বেকার সময় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নোট বদলিয়েছে। প্রতিদিনের ছয়শত টাকা আয় গড়ে চারশ টাকায় নেমে গেছে। একথা ঠিক এক দিকে রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায় ও আয় বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে, নেয়া দরকার। কিন্তু তা করতে গিয়ে যেন অর্থনীতিকে অথবা কাজ সৃষ্টিকে সঙ্কুচিত করা না হয়। এসব বিষয় মাথায় রেখে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হ্ত। মোদি এ দিকটি খেয়াল রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন।

কিছু মৌলিক পরিসংখ্যান জেনে নেয়া যাক, যার বেশির ভাগ ডাটা এখানে সাপ্তাহিক লন্ডন ইকোনমিস্ট থেকে নেয়া)। এবার বাতিল হওয়া দুই ধরনের নোট (৫০০ ও ১০০০ রুপি নোট) ভারতে ছাপানো সব ধরনের নোটের মোট অর্থমূল্যের ৮৫ শতাংশই এরাই বহন-ধারণ করে। অর্থাৎ ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল মানে ৮৫ শতাংশ কেনাবেচা-বিনিময় বন্ধ। দ্বিতীয়ত, ছাপানো মোট নোটের সংখ্যা (নোটের অর্থমূল্য নয়) মোটামুটি ২২ বিলিয়ন। আর ছাপাখানার নোট ছাপার ক্ষমতা মাসে তিন বিলিয়ন। অর্থাৎ ছয়-সাত মাসের আগে সব বাতিল নোটের বিকল্প ছাপা সম্ভব নয়। তবে এক হাজারের নোটের বদলে নতুন সব দুই হাজারের নোট হওয়াতে কিছু সুবিধা হয়েছিল। এ দিকে নোট বাতিলের পর ইতোমধ্যে কেবল দুই মাস পার হয়েছে। তৃতীয়ত, ট্রেডার-ব্যবসায়ী কেনাবেচা নয়, শেষ ভোক্তাপর্যায়ে কেনাবেচা-বিনিময়ে ভারতের নগদ টাকায় এই বিনিময় হল মোট বিনিময়ের ৯৮ শতাংশ। (এটা চীনের বেলায় ৯০ শতাংশ) । এখন এই তথ্যের সাথে যদি মিলিয়ে দেখি, নোট বাতিলের পর থেকে মাথাপিছু প্রতিদিন মাত্র চার হাজার টাকার বদল নোট (এটিএমে দুই হাজার টাকা) কেউ পেতে পারে – এই তথ্যকে। তবে বুঝা যায় নোট সরবরাহ সঙ্কোচনের এই সিদ্ধান্তই অর্থনীতিতে সবচেয়ে নেতিকর প্রভাব ফেলেছে। অর্থনীতি সঙ্কোচনের ক্ষেত্রে এটাই মূল ফ্যাক্টর।

মোদির সিদ্ধান্ত কি কাজের হয়েছে, লাভ হয়েছে? নাকি হয়নি?
ভারতের অর্থনীতিতে ছড়ানো ছাপানো নোটের মোট মূল্য ১৪ ট্রিলিয়ন রুপি। ব্যাংক সূত্র বলছে, নোট বাতিলের এক মাসের মধ্যেই বাতিল নোট ফিরে এসেছে ৮.৫ ট্রিলিয়ন রুপি। মোদির সিদ্ধান্তের পক্ষের লোক আর বিরোধীপক্ষ – সবারই কম-বেশি অনুমান হল, আরো ৩ ট্রিলিয়ন রুপি শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ফিরে আসবে বা এসেছে। এর বাইরে আরো আড়াই ট্রিলিয়ন থেকে যাবে, যা ফিরে আসা-না আসা নিয়ে সন্দেহ বা বিতর্ক আছে। মোদির খুব দেখার ইচ্ছা, এই আড়াই ট্রিলিয়ন বা প্রায় ১৫ শতাংশ বাতিল নোট ফিরে না আসুক। অর্থাৎ ব্যাংকে জমা দিতে না আসুক ফলে বদল চাইবার বা বদলে দিবার দাবি করার কেউ না হাজির হোক। মোদির এই আকাঙ্খার বিপরীতে ওয়ার (WIRE)পত্রিকাসহ অনেক মিডিয়া রিপোর্ট করেছে, মোট ৮৫% নয় বরং ৯৫% বাতিল নোটই সম্ভবত বদলে নতুন নোট ফেরত দিতে হবে (..….over 95% of the invalidated currency may come into the banking system)…। যদিও এখন পর্যন্ত জমা দেয়া বাতিল নোটের প্রকৃত সংখ্যা বা মূল্য কত, তা কোথাও সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি। অতএব ৯৫ শতাংশ বাতিল নোট যদি ফেরত এসে থাকে তবে প্রমাণিত হবে যে, মোদির নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত ব্যর্থ, নইলে নয়। সাধারণ মানুষকে সীমাহীন কষ্ট দেয়া ছাড়া এতে কোন লাভ হয় নাই। কারণ নোট ছাপার পর তা রিজার্ভ ব্যাংকে ফেরত না এলে এই ফেরত না আসা, অর্থাৎ বদল নতুন নোট দাবিকারী না থাকার অর্থ রিজার্ভ (বা নোট ছাপা) ব্যাংকের সমপরিমাণ সম্পদ লাভ ঘটেছে। কিন্তু ৯৫% বাতিল নোটই যদি বদল নেবার দারিদার হাজির থাকে তবে রিজার্ভ ব্যাংক পন্ডশ্রম করেছে। তবে এক অর্থে বললে মোদি ইতোমধ্যেই তাঁর ব্যর্থতা মেনে নিয়েছেন, যদিও তা পরোক্ষে। গরিব মানুষকেও ১০ রুপি দিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে; তবেই সময়ে নানান সরকারি সুবিধা বিতরণ যেমন কৃষককে ভর্তুকি দেয়া,  সে পাবে। এই নীতিতে মোদি ‘জন-ধন’ নামে কর্মসূচি অনেক আগেই চালু করেছিলেন। এখন বলা হচ্ছে, অনেক গরিব মানুষ অর্থের বিনিময়ে অন্যের বাতিল টাকা নিজ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে জমা দিয়েছেন। তাই ফেরত মোট বাতিল নোটের পরিমাণ অযাচিতভাবে বেড়ে গেছে। মোদি এমন ঘটনার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দিয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন। কিন্তু এই সাফাই সাধারণ মানুষ কষ্ট লাগবে কোন ভুমিকা নাই। ফলে কথা সত্য-মিথ্যা যাই হোক, এই সাফাইয়ের ভাত নাই।

মোদি যে হেরে গেছেন এর আর এক স্বীকৃতি হল কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাব – এর মধ্যে মোদী নিজেই অফার করেছেন। গত ২৯ নভেম্বর ২০১৬ আনন্দবাজার লিখেছে, কালো টাকায় গরিব কল্যাণ, ফের কালো আয় ঘোষণার জানলা খুলল কেন্দ্র। রাজস্ব সচিব হাসমুখ অধিয়া বলেন,  “……কর, জরিমানা ও সারচার্জ হিসেবে গুনতে হবে ৫০%”, ……… ‘‘আয়ের উৎস জানতে চাওয়া হবে না। সম্পদ কর বা অন্যান্য কর আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। যাঁদের বিরুদ্ধে বিদেশি মুদ্রা পরিচালন আইন, আর্থিক নয়ছয় আইন, ড্রাগ পাচার বা বেনামি সম্পত্তি আইনে মামলা চলছে, তাঁরা অবশ্য ছাড় পাবেন না।’’

 

ঘটনা হল, মোদির নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের ফল-প্রভাব ভালো হচ্ছে – বিজেপি দলের লোক ছাড়া এখন পর্যন্ত অন্য কাউকে এমন দাবি করতে দেখা যায়নি। বরং অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, বিশ্বব্যাংকের কনসালটেন্ট কৌশিক বসু, অর্থনীতিবিদ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, সাবেক অর্থমন্ত্রী ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি- এরা সবাই এ সম্পর্কে খুবই নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন ও যুক্তি তুলে ধরেছেন। সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট বলেছে, এটা ‘দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে ব্যর্থ সিদ্ধান্ত।’ (India’s currency reform was botched in execution)। খোদ মোদি অথবা তার অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিও পরোক্ষভাবে তা স্বীকার করে নিয়েছেন। যেমন, অরুণ জেটলি বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এটা ভালো ফল দেবে। এর অর্থ, স্বল্পমেয়াদে বা বর্তমানে এটা ব্যর্থ। মোদি ভারতে নগদ রুপি ছাড়াই লেনদেনের অর্থনীতি গড়তে চান, এর ঢাক বাজানো শুরু করছেন। মোদি ইঙ্গিতে বলতে চাচ্ছেন যেন নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য এটাই ছিল। অর্থাৎ খেলায় গোল হচ্ছে না, দিতে পারেননি এটা বুঝতে পেরে এখন খোদ গোলপোস্টকেই সরানোর জন্য টানাটানি করছেন। এত সব মিলিয়ে পরিণতি কী হতে যাচ্ছে? সবচেয়ে মারাত্মক দিক হল, ভারতের সম্ভাব্য জিডিপি সাড়ে সাত থেকে দুই শতাংশ কম হবে বলে অর্থনীতিবিদেরা সবাই অনুমান করছেন। অর্থাৎ বিগত কংগ্রেস সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে (২০১০-১১) যে অর্থনৈতিক পতন ঘটেছিল, ভারত সেখানে ফিরে যাচ্ছে। সর্বশেষ গত ৫ জানুয়ারি এইচএসবিসি ব্যাংকের এক রিপোর্টেও বলা হয়েছে, চলতি কোয়ার্টার থেকে জিডিপি নেমে ৫ শতাংশর কাছে যেতে পারে। ব্যবসায়ী মহল হতাশ হয়ে হয়ে পরেছে যে আগামি ছয়মাসের বাজার স্বাভাবিক হবে না।
এসব কিছুর তাৎক্ষণিক ফলাফল হবে পরের ফেব্রুয়ারি মাসের ১১ তারিখ থেকে উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাবসহ পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনে এর বিরাট ছাপ পড়বে। বিজেপি ফলাফল খারাপ করবে। এসবের সামগ্রিক প্রভাব ২০১৯ সালে পরবর্তী কেন্দ্রীয় নির্বাচনে পর্যন্ত গড়িয়ে যেতে পারে। এটা মোদির দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাবনায় ধস আনবে। মোদির এসব ব্যর্থতা নিয়ে সোচ্চার হওয়ার দিক থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে এগিয়ে আছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ও তাঁর দল। সময়ে কংগ্রেসের রাহুলের চেয়েও সমালোচক হিসেবে তিনি আগে। কারণ মমতার অ্যাপ্রোচ হল, গরিব মানুষের জায়গা থেকে দেখা ও সরব হওয়া। দৈনিক মজুরিতে কাজ করা লোকেরা এবং গরিব মধ্যবিত্তরা কাজ হারিয়ে সবচেয়ে কষ্টকর জীবনে পড়েছে। কলকাতা থেকে বিরাট এক  স্বর্ণকার পেশার জনগোষ্ঠি বোম্বাই বা গুজরাটের রাজধানী শহরে মাইগ্রেট করে নিজেকেসহ আরও চার-পাঁচকে সহযোগীকে নিয়ে পেশা জমিয়ে বসেছিল, নিয়মিত দেশে ঞ্জের পরিবারকে অর্থ পাঠাতে পারছিল। এই পুরা গোষ্ঠি এখন সবকিছু গুটিয়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে গেছে। WIRE এর ভাষায়, পুরো ‘ইনফরমাল সেক্টর’ এভাবে ডুবে যাচ্ছে। তাই মমতা ব্যানার্জি এদের দিক থেকে দেখে শুরু থেকেই মোদির সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করছেন। “নোট বাতিল” এখন ভারতের রাজনীতির মূল ইস্যু বা কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে গেছে। ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত এটা থাকবে অনুমান করছেন অনেকেই। আর এতে মোদির জন্য এটা সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ, ‘মোদির নোট বাতিল’ সাধারণ মানুষের কাছে তামাশার ইস্যু হয়ে গেছে। এর চরম মূল্য মোদিকে চুকাতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে ০৯ জানুয়ারি ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টেও পরের দিন) প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তা আবার নানা সংযোজন ও এডিট করে ছাপা হল।]