ট্রাম্পের পর ভারতও – ‘এক-চীন’ নীতিতেই

ট্রাম্পের পর ভারতও, ‘এক-চীন’ নীতিতেই

গৌতম দাস

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার

http://wp.me/p1sCvy-2d3

ভারতও এক-চীন নীতি মেনে চলতে চায় বা মেনে চলছে – পরোক্ষে সেকথাই ভারত চীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। একচীন নীতি মানে হল, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’- এটা স্বীকার করা। ‘এক চীন নীতি’ মেনে নিয়ে গত ০৯ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনালাপ করেছেন, সে খবর জেনে দুনিয়া হাঁফ ছেড়ে একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়েছিল। কারণ চীন-আমেরিকার কোন স্বার্থ সংঘাত থেকে কোন সামরিক উত্তেজনা তৈরি করুক সেটার মুখোমুখি হতে দুনিয়ার বেশির ভাগ সংশ্লিষ্ট পক্ষ এখন চায় না।  কিন্তু এ খবর শুনে কেউ কেউ দুঃখে হতাশও হয়েছিল। সম্ভবত তেমন রাষ্ট্র হল ভারত। ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে বিশেষ করে জয় লাভের পরে, আরও শক্ত করে ক্রমাগত চীনবিরোধী ‘রেঠরিক’ তুলে চলছিল। যেমন- আমেরিকায় চীনা পণ্যের প্রবেশের উপর ৪৫ শতাংশ ট্যাক্স বসাব, চীন কারেন্সি ম্যানিপুলেটর (মুদ্রা বিনিময় হারের উপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ করা), চীন আমেরিকানদের চাকরি নষ্ট করছে, পরিবেশবাদীদের পরিবেশ ক্ষতির আওয়াজ আসলে চীনা প্রচারণা, এক চীন নীতি মানতে আমরা বাধ্য নই ইত্যাদি আপত্তির বোলচাল হাজির করেছিল। এভাবে এক কথায় বললে ট্রাম্প যেন বিশাল এক ‘চীন-লড়ানি’ দিতে আসতেছেন বক্তব্যের এমন ভাব তৈরি করে ট্রাম্প দুনিয়াকে উদ্বিগ্নতায় অস্থির করে ফেলেছিলেন। বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্পের সেসব তৎপরতা ও বোলচালে সবচেয়ে বেশি আস্থা স্থাপন করেছিল ভারত। ট্রাম্প এভাবে  সামনে খাড়ায় গেলে তাঁকে আড়াল হিসেবে রেখে সে আড়ালকে ব্যবহার করার সুযোগ দেখেছিল ভারত। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে ট্রাম্পের আমেরিকার ওপর ভারতের আস্থা রাখা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। মানুষ অন্যের মাথায় কাঁঠাল রেখে খায়, কথা সত্য। কিন্তু বুদ্ধিমানেরা কেবল এই সুবিধার দিকটাই দেখে না, সম্ভাব্য অনুষঙ্গি অসুবিধা বা ক্ষতির দিকেও চোখ রাখে। মনে হচ্ছে, ভারত সেটা রাখতে পারেনি।  দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প ‘পল্টি’ দিয়ে অবস্থান বদল করলে কী হবে, সেটা নিয়ে কমই ভেবেছিল ভারত। তাই ভারত তাইওয়ানের এক সরকারি প্রতিনিধিদলকে (তিনজন এমপিসহ ব্যবসায়ীরা) ভারতে তিন দিনের সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে সফরের আয়োজন করেছিল। ইতোমধ্যে সে সফর সম্পন্নও হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আফটার এফেক্ট বা পরবর্তি-প্রতিক্রিয়া রেখে গেছে।

বিগত ’৭০-এর দশক থেকেই এক চীন নীতি মেনে চলার আমেরিকান প্রতিশ্রুতি অস্বীকার করে ট্রাম্প তা মানতে না চাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন- এই মাসল ফুলানো দেখে ভারত সেটাকে নিজের মাসল মনে করে বসেছিল। ভুলে গিয়েছিল যে ভারতও এক চীন নীতি মেনে এই শর্তেই চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ও সে সম্পর্কে আছে। ফলে স্বভাবতই ভারত তাইওয়ানকে স্বাধীন সরকার গণ্য করতে পারে না। অর্থাৎ তাইওয়ানের সাথে ভারতের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। কিন্তু ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে, যেটা চীন সরকারও আপত্তি করে না।
যেমন তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেতে ভারতের ‘কার্যত এক অ্যমবেসি’ আছে যেটার আনুষ্ঠানিক নাম হল ইন্ডিয়া-তাইপে সমিতি (ভারত-বাংলাদেশ সমিতির মত)। কারণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি সম্পর্ক নেই বলে তাইপে-তে ভারতীয় অ্যামবেসি খোলা সম্ভব নয়। তবে লক্ষ করার বিষয় রাষ্ট্র পরিচয়ে ইন্ডিয়া বলা হলেও এর সমান্তরালে ‘তাইওয়ান’ বলা হয়নি, ধরা হয়নি। তাইওয়ানকে রাষ্ট্র বিবেচনা করা হয়নি। (রাষ্ট্রের নামের জায়গায় রাজধানীর নাম) তাইপে বলা হয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে এখানে নাম বলার লজিকে মিল নেই, ইচ্ছা করে রাখা হয়নি। কারণ বলতে হত হয় ইন্ডিয়া-তাইওয়ান, না হলে দিল্লি-তাইপে। এর কোনোটাই না হয়ে নাম রাখা হয়েছে ইন্ডিয়া-তাইপে অ্যাসোসিয়েশন (সমিতি)। আর এর বিপরীতে  দিল্লিতে তাইওয়ানের সমিতি অফিসের সমতুল্য হিসাবে তাইপে-তে অফিসটির নাম রাখা হয়েছে – ‘তাইপে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’, মাত্র ১৯৯৫ সালে যা প্রতিষ্ঠিত। চীনের সাথে অন্য যেকোনো রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক বিনিময়ের শর্ত হলো তাইওয়ান চীনের অংশ, এটা মানতে হবে। ফলে কোন রাষ্ট্র তাইওয়ানের সাথে রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সম্পর্ক রাখতে পারবে না। তবে তাইওয়ানের সাথে ‘অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক’ সম্পর্ক রাখা যাবে। যেমন, তাইওয়ানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কও ‘অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক’। কোনো কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই। আসলে এটাই কোনো রাষ্ট্রের একই সাথে তাইওয়ান ও চীনের সাথে সম্পর্ক রাখার একমাত্র উপায় – এই একটাই উপায়  চীন খুলে রেখেছে। আমেরিকা, ভারত বা বাংলাদেশসহ সবাই তাই এই পথের পথিক।

যেটা বলছিলাম ভারত ট্রাম্পের আড়ালে সুযোগ নিতে চেয়েছিল। তাইওয়ানের সংসদীয় দলের প্রতিনিধি হিসেবে তিন এমপিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এবং গত সপ্তাহে তাদের ভারত সফর সমাপ্ত হয়। এরপরই চীনা কড়া প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। প্রতিশ্রুত এক চীন নীতি থেকে ভারতের সরে যাওয়ার কথা চীন স্মরণ করিয়ে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কড়া’ আপত্তি জানায়। কূটনৈতিক ভাষায় এ ধরনের আপত্তি তোলাকে ‘সলেম রিপ্রেজেন্টেশন’ (solemn representation) বলে। অর্থ হল, যথেষ্ট ভাবনা চিন্তা করে শপথ করে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলার জন্য দেখা করা।  দু’টি উৎস থেকে চীনের এই আপত্তির খবর জানা যায়। এক. চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের প্রেস-ব্রিফিংয়ের প্রশ্ন-উত্তরে। আর দুই. চীনের গ্লোবাল টাইমস পত্রিকা থেকে। এটা ‘বিশেষ’ এক সরকারি পত্রিকা। চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয় যেসব কথা, মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া বা মনোভাব যেটা তাদের মনের আসল কথা কিন্তু নানান জটিলতা এড়াতে আনুষ্ঠানিকভাবে তা বাইরে বলতে চায় না অথচ চীনা সরকারি অবস্থান কী, কী ভাবছে তারা এটা দেশে-বিদেশে সবাইকে জানাতে চায়, সেই প্রয়োজন আর এমন সব পাঠকের কথা চিন্তা করে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে আসছে। দেশী-বিদেশী মিডিয়া পাঠকেরা তাই এই চোখেই গ্লোবাল টাইমস পাঠ করে থাকে। বিশেষ করে এই পত্রিকার নিয়মিত সম্পাদকীয় এর মাধ্যমে চীনা সরকারি অবস্থান অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে বলে মনে করা হয়। গ্লোবাল টাইমস ১২ ফেব্রুয়ারিতে লেখা এক সম্পাদকীয়তে তাইওয়ানিজ প্রতিনিধি দলের ভারত সফর সম্পর্কে চীনের বিস্তারিত মনোভাব ও আপত্তির দিক জানিয়েছে। এর শিরোনাম হল – “নয়াদিল্লি তাইওয়ান কার্ড খেললে হারার ক্ষতিতে ভুগবে”। (New Delhi will suffer losses if it plays Taiwan card)।

ইতোমধ্যে চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং বলেছেন,  “We hope India would understand and respect China’s core concerns and stick to the One-China principle and prudently deal with Taiwan-related issues and maintain sound and steady development of India-China relations.”। বাংলা করে বললে, “আমরা আশা করি, এক চীন নীতি চীনের মুখ্য স্বার্থ এটা ভারত জানে। ফলে তা ভারতের বোঝা ও সম্মান করা উচিত। অতএব বুদ্ধিমানের মতো করে সে তাইওয়ান সম্পর্কিত ইস্যু নাড়াচাড়া করবে এবং চীন-ভারতের সম্পর্ককে নিস্তরঙ্গে ও ধারাবাহিকতায় বিকশিত করবে”। ওই মুখপাত্র এক চীন নীতিতে তাইওয়ান সম্পর্কিত ভারতের দেয়া প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “আমরা সব সময় (তাইওয়ানের সাথে) সরকারি যোগাযোগ, কূটনৈতিক সম্পর্ক বা কোনো সরকারি প্রাতিষ্ঠানিকতা গড়ার বিরোধিতা করে এসেছি”। এ বিষয়টা মিডিয়ায় সবচেয়ে বিস্তারিতভাবে এসেছে ভারতের হিন্দুস্তান টাইমসের বেইজিং প্রতিনিধি- সুতীর্থ পত্রনবীশের এক বিস্তারিত রিপোর্টে। যেটা হিন্দুস্তান টাইমসসহ অন্যান্য বিদেশী পত্রিকাতেও অনুমতি নিয়ে কপি ছাপা হয়েছে।

চীনা গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে লেখা প্রথম বাক্য হল – এক চীন নীতিতে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টে গেছেন তখন ভারত উসকানিদাতা (‘provocateur’) হতে চাচ্ছে। এ সফর আয়োজনে ভারতের মতলব কী ছিল, সে সম্পর্কে চীন কী মনে করে তা জানা যায় পরের প্যারা থেকে। এখানে তা অনুবাদ করে তুলে আনছি : ‘কিছু ভারতীয় তাইওয়ান প্রশ্নকে চীনের গোড়ালিতে কাঁটা মনে করে। এরা দীর্ঘ দিন ধরে তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর ও দালাই লামা ইস্যুকে চীনের বিরুদ্ধে দরকষাকষিতে ব্যবহার করতে চেয়ে আসছে। সাম্প্রতিককালে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর [এটা প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প; পাকিস্তানের গভীর সমুদ্রবন্দর Gwadar Port থেকে দক্ষিণ-উত্তর এভাবে সারা পাকিস্তানের বুক চিরে যে সড়ক চীনের ল্যান্ড লকড পশ্চিমাংশে প্রবেশ করেছে – এই ব্যাখ্যা আর্টিকেল লেখকের] প্রকল্পের অগ্রগতিতে চীনের বিরুদ্ধে ভারতের স্ট্রাটেজিক সন্দেহ বাতিকতা বাড়ছে। ভারত জেনেশুনে গোঁয়ারের মতো চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্পকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছে, যেটা আসলে যেসব রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে যাবে তাদের সবাইকে সুবিধা দেবে- এমনকি ভারতকেও একইভাবে (যদি ভারত চায়)। ওই অর্থনৈতিক করিডোর যেহেতু পাকিস্তান কাশ্মিরের ভেতর দিয়ে কিছু অংশ যাবে (কাশ্মিরের পাকিস্তান অংশ তুলনায় রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হলেও ভারতের চোখে যেহেতু পুরো কাশ্মিরই বিতর্কিত) ফলে সেটা বিতর্কিত ভারতের কিছু কূটবুদ্ধিদাতা এই যুক্তিতে মোদি সরকারকে তাইওয়ানিজ কার্ড খেলার পরামর্শ দিয়েছেন। উদ্দেশ্য হল, ভারত চীনের এক চীন নীতি মেনে চীনের সাথে সম্পর্ক করেছে তাই এর বিনিময়ে (পুরো কাশ্মির ভারতের এই) ‘এক ভারত’-এর পক্ষে চীন সমর্থন চেয়ে বসুক। কিন্তু তাইওয়ান প্রশ্নে চীনকে চ্যালেঞ্জ করে ভারত আসলে আগুন নিয়ে খেলছে। এই দ্বীপ (তাইওয়ান) ভারতের কোনো কাজে আসবে না, না তাকে ব্যবসা বিনিয়োগের উন্নতিতে, না মেনল্যান্ড চীনকে ঠেকিয়ে দিতে। ওদিকে স্টিল, টেলিকম ও আইটি ব্যবসায় মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিতে তাইওয়ানিজ বিনিয়োগ বাড়ছে। তবে মেনল্যান্ড-চীন ভারতের এক মেজর ট্রেডিং পার্টনার আর এই সম্পর্কের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধও কিছু পুরনো ঝগড়ার কারণে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সময়ে কঠিন হয়ে যায়”।

এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্প
এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্প

এত দূর বলে সম্পাদকীয় এবার দুটো বাক্যে – একটি সাবধান বাণী আরেকটিতে পরামর্শ রেখেছে। সাবধান বাণী হল, তাইওয়ান ও মেনল্যান্ড চীনের বিবাদে ভারত যেন ব্যবহৃত না হয়ে যায়, তাইওয়ানের এমন উদ্দেশ্য আছে। আর পরামর্শ হল – ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পে [যেটা এশিয়া (পাকিস্তান) থেকে ইউরোপ পর্যন্ত এক সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা, যার বিভিন্ন স্থানে গভীর সমুদ্রবন্দরের কানেকশন থাকবে] যোগদানের সুবিধা নিয়ে ভারত চীন থেকে প্রচুর বিদেশী বিনিয়োগ আনতে পারে।
এ তো গেল চীনের প্রতিক্রিয়া। কিন্তু ট্রাম্পের পিছু হটার পর এবং ভারতের কেসে চীনের শক্ত আপত্তি তোলার পর ভারতের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? চীনের একটা শক্ত আপত্তির পয়েন্ট ছিল তাইওয়ান-ভারতের সম্পর্ককে কখনোই সরকারি ছাপ দেয়ার চেষ্টা বা সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা অতীতে করা হয়নি। এখন কেন ভারত দাওয়াত দিচ্ছে? এ প্রশ্নে বাস্তবতা কী তা সহজে সবচেয়ে ভালোভাবে আমরা জানতে পারি হিন্দুস্তান টাইমসের পত্রনবীশের লেখা রিপোর্ট থেকে। সবচেয়ে মুল্যবান রিপোর্ট সেটা। তিনি জানাচ্ছেন এই গত বছর মে মাসের কাহিনী, সময়টা ছিল এখনকার তাইওয়ানিজ প্রেসিডেন্টের নির্বাচিত হওয়ার পর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের। তিনি ভারতকে সরকারি পর্যায়ে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু ভারত সেখানে কোনো প্রতিনিধি পাঠাতে রাজি হয়নি। এই উদ্ধৃতি দেয়ার পর পত্রনবীশ প্রশ্ন তুলে বলছেন, তাই এখন “তাইওয়ানিজ ডেলিগেশনকে দাওয়াত দেয়ার অর্থ ভারত তার নীতি থেকে সরে গেছে, বদল ঘটিয়েছে”। অর্থাৎ পত্রনবীশের চোখেও ভারতের আচরণ অস্বাভাবিক ও বেমিল।
ভারতের দিক থেকে চীনা অভিযোগের জবাবে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপের সাফাই বক্তব্য আছে। ভারতের লাইভমিন্ট পত্রিকা থেকে নিয়ে তা অনুবাদ করে বললে তা এ রকম : “ব্যবসা, ধর্মীয় বা টুরিজমের উদ্দেশ্যে এমন বেসরকারি (ইনফরমাল) ভারত সফর এর আগেও হয়েছে। আমার জানা মতে তাঁরা এমন সফরে চীনেও যায়। তাই এই সফরের মধ্যে নতুন বা অস্বাভাবিক কিছু নেই। আর এর ভেতরে রাজনৈতিক মানে খোঁজারও কিছু নেই”।

কূটনীতির ভাষা হয় ক্যালকুলেটিভ, আগেভাগে হিসাব-কিতাব করে বলা কথা। বিকাশ স্বরূপ তাই করেছেন। তার বক্তব্যের মূল অর্থ বহনকারী শব্দগুলো হল – ‘ইনফরমাল’, ‘নতুন বা অস্বাভাবিক’, ‘রাজনৈতিক মানে’ ইত্যাদি। তিনি প্রথমেই সব কিছু ঠাণ্ডা করতে এই সফর বা দাওয়াত সরকারি নয়, ‘ইনফরমাল’- এই অস্ত্র চেলে দিয়েছেন। এভাবে সব অভিযোগ নাল ও ভয়েড করে দিয়েছেন তিনি।  যদিও ডেলিগেশনে ‘সংসদীয় প্রতিনিধি কেন’ এই প্রশ্নে তিনি কিছু বলতে না পারায় এটা তাঁর সাফাইকে একটু দুর্বল করেছে। তাই তিনজন ‘সংসদীয় এমপি’ এদের এই পরিচয়টি উহ্য রেখে আড়াল করে তিনি বলতে ছেয়েছেন – ওরা ব্যবসা, ধর্মীয় বা টুরিজমের উদ্দেশ্যে ভারতে আসা লোকজন। এই বলে পরিচয়টি হালকা করতে চেয়েছেন। দ্বিতীয়ত, তাইওয়ানিজরা চীন সফরে যায় এ কথাও সত্য। এমনকি তারা চীনের বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য যে নতুন ব্যাংক (AIIB) হয়েছে, তারও আলাদা সদস্য হয়েছে তাইওয়ান। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এ কথাগুলো সত্ত্বেও একটাই ফারাক যে, এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টতা বা সফরের একটাও চীনের সরকারি পর্যায়ে দেয়া দাওয়াত নয়। চীনা নীতি হল রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সম্পর্ক বা স্বীকৃতি না হলেই হল। মূলত ব্যবসায়ী যোগাযোগ, এটা করা জায়েজ। বিকাশ স্বরূপ তাই ব্যবসার কথা এনে সবশেষে তাইওয়ানিজদের সাথে এই যোগাযোগের কোনো ‘রাজনৈতিক মানে’ নেই দাবি করছেন। অর্থাৎ এটা রাজনৈতিক যোগাযোগ বা সম্পর্ক নয়, তাই তিনি বলে সাফাই আনতে চাইছেন।

তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ মিডিয়ার অনেকে এটা ভারতের নীতি পরিবর্তন বলে ভারত সরকারকে অভিযোগ করেছে। আবার অনেকে এটাকে – চীনা দাবি ভারতের ‘উড়িয়ে দেয়া’ এমন বিশেষণ লাগিয়ে হাজির করেছেন। স্বভাবতই ‘উড়িয়ে দেয়া’ বিশেষণ এটা জাতীয়তাবাদী ব্যাখ্যা। কিন্তু আসলেই কি এটা বিকাশ স্বরূপের চীনকে ‘উড়িয়ে দেয়া’?
অবশ্যই নয়। প্রথমত, ভারতের বক্তব্যের সারকথা হল, আমরা এক চীন নীতি ভাঙিনি, নীতির বাইরে যাইনি, নতুন কিছু করিনি। এটা আগের মতোই। এবং সর্বপরি, এটা ইনফরমাল” – এই কথাটা গুরুত্বপুর্ণ।  কথার সোজা অর্থ হলো ভারত এক চীন নীতিকে দেয়া প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে চায়, চলেছে এবং মেনে চলা দরকার মনে করে। অমান্য করতে চায় না। ভারতও এক-চীন নীতি মেনে চলতে চায় বা মেনে চলছে – পরোক্ষে সেকথাই ভারত চীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে ভারত। ফলে তাইওয়ানের সাথে সরকারি যোগাযোগ ভারত করতে চায় না। অর্থাৎ আমি আইন মানা ভারত- এটাই বলতে চাওয়া। ভারত চীনকে চ্যালেঞ্জও করছে না। ট্রাম্পের মতো উড়িয়ে দেয়া নয় এটা।
অতএব এটা ট্রাম্পের মতো অবস্থান নয়। ভারত বলছে না এক চীন নীতি মানতে হবে কেন? অথবা মানব কি না তা নিয়ে দরকষাকষি করতে চাই; অথবা আমাকে অমুকটা দিলে তাহলে মানব- এমন অবস্থান এটা নয়। তাহলে এটা উড়িয়ে দেয়া হয় কী করে? এটা উড়িয়ে দেয়া নয়।
আরো স্পষ্ট করে বললে ভারত মনে করে, মেনল্যান্ড চীনের সাথে সম্পর্ক ভারতের কাছে তাইওয়ানের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ ভাবটাই ভারত প্রকাশ করেছে। ব্যাপারটা বাস্তবেও তাই।
আসলে ব্যাপার হল, চীনের সাথে কোন রাষ্ট্রের এক চীন নীতি মানতে না চাওয়ার মানে হল ওই রাষ্ট্র চীনের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলতে পরোয়া করে না। ক্ষেপাটে ট্রাম্প চিন্তা-ভাবনা ছাড়া এমন অনেক কথা বলতেই পারেন। কারণ পরিণতি চিন্তা না করে তা বলা একেবারেই সহজ। কিন্তু সম্পর্ক ছিন্নের অর্থ চীনে আমেরিকার যেসব ছোট বা বড় ব্যবসায়ী, ওয়ালস্ট্রিট বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে ভালো বোঝেন। যারা  চীনে ব্যবসা করে টিকে আছেন, এখন তাদের সবাইকে চীনের সাথে সম্পর্কহীন হতে হবে। এটা কি সম্ভব? এটা কেউ কি রাজি হবেন? অর্থাৎ এই এখানে ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নেয়ার আসলে কেউই নন। আর ভারতের ক্ষেত্রেও কি ব্যাপারটা কম-বেশি এমন নয়? বাস্তবতা হল চীনের বিনিয়োগ, ভারতে শিল্পায়ন, বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য ভাইটাল। অবশ্যই চীনের কাছেও এই সম্পর্ক কোনোভাবেই তুচ্ছ নয়। ছয় মাস আগে ভারতের প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল চীনা বিনিয়োগ আনতে চীন সফরে গিয়েছিল। চীনের সাথে ভারতের বিনিয়োগ আনার সম্পর্ক এটা রিয়েলিটি। আসলে দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় উদ্বৃত্ত বিনিয়োগ পুঁজি, সক্ষমতা যে কালে যেখানে যে রাষ্ট্রে আছে, বিনিয়োগ সেখান থেকেই আসবে। সেদেশ সবচেয়ে অপছন্দের হলেও। এটাই স্বাভাবিক। তবুও ট্রাম্পের কোলে চড়ে কিছু যদি বাড়তি ভারতের হাতে লেগে যায়- এমন ব্যর্থ প্রচেষ্টার ব্যতিক্রমও আমরা দেখতে পাবো।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

ট্রাম্পের প্রথম আপোষ

ট্রাম্পের প্রথম আ্পোষ

গৌতম দাস

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2cS

 

 

 

হাওয়া কি এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে? অনানুষ্ঠানিক আলাপে আমরা কাউকে যেমন পাগলা বলি, ঠিক তেমন আমেরিকান নতুন প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে নিজের নামের আগে আমাদের দেশী ভাষায় এই ‘পাগলা’ বিশেষণ লাগিয়ে ফেলার মত কাজ করেছেন – পাগলা ট্রাম্প। তো সেই ব্যক্তি কি এত তাড়াতাড়ি চীনের ইস্যুতেই ঠাণ্ডা আর থিতু হয়ে গেলেন? কিভাবে? হোয়াইট হাউজের এক বিবৃতি থেকে জানা যাচ্ছে, ৯ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ফোন করেছিলেন এবং তার সাথে কথা বলেছেন। যে সে কথা নয়; ঐ বিবৃতির ভাষা অনুযায়ী,  “এক ‘দীর্ঘ ফোনালাপ’ [“a lengthy telephone conversation”] করেছেন। বিস্ময়কর তথ্য আরো আছে।

একই বিবৃতির আরো ভাষ্য বা বক্তব্য হল, “The two leaders discussed numerous topics and President Trump agreed, at the request of President Xi, to honor our “one China” policy.  Representatives of the United States and China will engage in discussions and negotiations on various issues of mutual interest”.
বাংলায় অনুবাদ করে বললে, “চীনা প্রেসিডেন্ট শি’র অনুরোধে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘একচীন নীতি’কে সম্মান জানাতে একমত হয়েছেন। … চীন ও আমেরিকা উভয় রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা এখন পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা ও দরকষাকষিতে বসবেন”। এ থেকে বোঝা গেল, অন্তত এই একটা ইস্যুতে ট্রাম্পের অপরিপক্ক হম্বিতম্বি এমনভাবে শেষ হল যে,  ট্রাম্পের আমেরিকাকে মেনে নিতে হল যে গত সত্তরের দশক থেকে তাদের পুর্বপুরুষ নেতৃত্ব যে ‘একচীন নীতি’ স্বাক্ষর করেছিলেন, মেনে চলেছিলেন নিজ নিজ প্রশাসনের আমলে তারা গবেট ছিলেন না। আর এটাই ট্রাম্পের প্রথম পিছু হটা এবং আপসরফা। এমন নাকে-খতের পথ তাকে আরও নিতে হবে।

একচীন নীতি মানে হলো, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’- এটা স্বীকার করা। এই পূর্বশর্ত পূরণ করার পরই এর ভিত্তিতে চীন যেকোনো রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করে থাকে। আমেরিকার সাথে মাওয়ের চীন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল গোপনে অন্তত ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে। পরের বছর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেকালের প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চীন সফর দিয়ে সেটা প্রকাশ্যে ঘটেছিল। আর এসব ঘটনার পরম্পরায় শেষে ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত এক পারস্পরিক চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পারস্পরিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও সম্পর্ক শুরু করেছিল চীন-আমেরিকা। বলা বাহুল্য, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’ এই শর্ত মেনেই আমেরিকা তাতে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ট্রাম্প ১১ ডিসেম্বর ২০১৬ ফক্স নিউজ কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন বয়ান দেয়া শুরু করেছিলেন যে, আমেরিকা কেন সেই ‘পুরনো কমিটমেন্টে আটকে’ থাকবে। প্রশ্নের ভঙ্গিতে তিনি কথাটা তুলেছিলেন। এর আগে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট তাকে স্বাগত জানানোর উছিলায় ফোনকল করেছেন বলে তাতে ট্রাম্প সাড়া দিয়ে কথা বলেছিলেন। এ রকম অন্তত আরো তিনটি ঘটনা আছে যেখানে ‘একচীন নীতি’ ট্রাম্প মানতে চান না অথবা মানবেন না কিংবা দরকার হলে চীনের সাথে ট্রাম্প সংঘাতে যেতে চাইতে পারেন, তা প্রকাশ পেয়েছিল। যেমন ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেকস টিলারসন তার প্রার্থিতা সিনেটে অনুমোদনের শুনানিতে জবাবে, সাউথ চায়না সি থেকে চীনাদের তাড়ানোর জন্য সামরিক বলপ্রয়োগের কথা বলেছিলেন। জন বোল্টন জুনিয়র বুশের প্রথম টার্মে (২০০১-২০০৫) জাতিসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাইওয়ানের পক্ষে লবি করার এক বড় প্রবক্তা মনে করা হয় তাকে। কূটনীতিতে বলপ্রয়োগ বা চাপে ফেলে আমেরিকান নীতির পক্ষে অন্য রাষ্ট্রের সমর্থন আদায়ে সিদ্ধহস্ত এই কূটনীতিক। ট্রাম্পের বিজয়ের পর তিনি সরব হয়ে উঠেছিলেন। ধারণা করা হয়েছিল, তিনি ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বা সেক্রেটারি অব স্টেট) হতে যাচ্ছেন হয়ত। কারণ ট্রাম্পের বিজয়ের পরে তিনি ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎও করেছিলেন। এছাড়া, স্টেফান ইয়েটস, বুশের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির ডেপুটি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। তিনিও ট্রাম্পের পরোক্ষ দূত হিসেবে আন-অফিসিয়ালি তাইওয়ান সফরে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরেই তিনিই প্রথম তর্ক উঠান যে, ‘একচীন নীতি’তে দেয়া প্রতিশ্রুতিতে আমেরিকাকে আটকে থাকতে হবে কেন?
এই তিন ঘটনা ছাড়াও, চীনের অর্থনীতির উত্থানের কারণে আমেরিকানদের কাজ ও চাকরি নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন ট্রাম্প। পুরা নির্বাচনী প্রচারণা জুড়ে এটাই ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল। ফলে ট্রাম্প আমেরিকার বাজারে চীনা পণ্য প্রবেশের উপর  ৪৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে তা ঠেকাবেন- এজাতীয় সস্তা জাতীয়তাবাদী স্লোগান ছিল নির্বাচনে ভোটের বাক্স ভরতে ট্রাম্পের পপুলার দাবি। এসব মিলিয়ে সত্তরের দশক থেকে ক্রমশ দাঁড়ানো চীন-আমেরিকার গভীর সম্পর্ক ট্রাম্পের আমলে এক বিরাট ধাক্কা খেতে যাচ্ছে মনে করে দুনিয়ার সংশ্লিষ্ট সবাই শঙ্কিত হয়ে উঠছিলেন। টলারশন সামরিক হুমকি দিয়েছেন আর ট্রাম্প চীনের সাথে সংঘাতে যেতে চান এমন ধারণাগুলো প্রচার করা সত্ত্বেও আমেরিকার কোনো ব্যবসায়ী, ওয়াল স্ট্রিট অথবা কোনো করপোরেট গ্রুপ – কেউই ট্রাম্পের সামরিক পথে অবস্থানের ইচ্ছা বা সঙ্ঘাতমূলক পন্থা গ্রহণকে সমর্থন করতে পারেনি, তাতে চীন-আমেরিকান কোন সম্ভাব্য সংঘাতে তাদের অবস্থানের যে দিকেই থাকুক। কিন্তু কেউই নিশ্চিত থাকতে পারছিলেন না যে, এই পাগলা প্রেসিডেন্ট শেষে হঠাৎ না কী করে বসেন। এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে  ট্রাম্প আর শি জিনপিংয়ের ফোনালাপ তাই সবাইকে একধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে।

ব্যাপারটাকে চীনের দিক থেকে দেখলে, এ প্রসঙ্গে চীনা অবস্থান শুরু থেকেই ছিল খুবই পরিপক্ব ও মাপা। ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের তারিখ ছিল ২০ জানুয়ারি। ফলে ওই তারিখের আগে মিডিয়ায় যতই নতুন নতুন উসকানিমূলক খবর নিয়মিত প্রকাশ পাক না কেন, চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সব সময় এই প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছিল। কেবল বলেছিল,  ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার আগে সব মিডিয়া রিপোর্টই জল্পনাকল্পনামূলক, আনুষ্ঠানিক কিছু নয়। তাই অনুমাননির্ভর বিষয়ে চীন কথা বলবে না। তবে, কেবল ৮ নভেম্বর ২০১৬  ট্রাম্প নির্বাচনে জিতেছিল। তাই এই ফল প্রকাশের পর থেকে চীন-আমেরিকার সম্পর্কের মূলনীতি বিষয়ক একটা কথা চীন বলে এসেছে যে, গ্লোবাল অর্থনীতির দিক থেকে চীন-আমেরিকার ভবিষ্যৎ ভাগ্য এক সুতায় বাঁধা পড়েছে। ফলে একমাত্র পরস্পর ডায়লগ করেই এক সাথে হাঁটতে হবে। চীন এ কথা ক্রমাগত প্রচার করে গেছে। ওদিকে আবার নির্বাচনে বিজয়ের পর ট্রাম্পের একচীন নীতি নিয়েও আবার দরকষাকষি করতে চাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করার পর প্রতিক্রিয়ায় চীন পরিষ্কার করে বলেছে, ‘চীনের একচীন নীতি কোনো দরকষাকষির বিষয়ই নয়’।

তবে ২০ জানুয়ারি ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর থেকে দুটো কারণে চীন প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন হতে শুরু করেছিল।  সাধারণভাবে বললে তখন থেকে, চীন গাজর-লাঠি (হয় গাজর খাও, না হলে লাঠির বাড়ি) নীতিতে চলে যায়। তা হল, আমেরিকান লোকদের কাজ বা চাকরির সমস্যা নিয়ে চীনের সাথে বসে আলোচনায় সমাধান সম্ভব। চীন সেখানে ছাড় দিতেও রাজি। ওবামা আমলে ২০১১ সালে এমন এক আপসরফা হয়েছিল। কিন্তু চাকরির সমস্যাকে উছিলা করে সঙ্ঘাতের রাস্তায় সামরিক বা কূটনৈতিক উত্তেজনার পথ ধরলে মুখোমুখি মোকাবেলার পথে যাওয়া হবে – এই ছিল চীনের ম্যাসেজ। এটা হলো অনেকটা এক জামাইয়ের বড়লোক শ্বশুরের মেয়ে বিয়ে করার অবস্থা। বিয়ের পর বউ-সন্তান নিয়ে জামাইয়ের দিন-খারাপ কাটছিল না। কিন্তু হঠাৎ করে জামাইয়ের মনে হল, বিয়ের আগের তুলনায় এখন তাঁর সংসার খরচ বেড়ে গেছে। তাই সে বউ তালাক দিতে চায়। এ কথা শুনে শ্বশুর প্রথমে জামাইকে তোষামোদ করে আর মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে তাকে তালাকের সিদ্ধান্ত থেকে সরানোর চেষ্টা করছিলেন। শেষে না পেরে একপর্যায়ে শ্বশুর বললেন, হয় তুমি আলাপ আলোচনায় আস, তাতে সংসার চালানোর অর্থে টান পড়লে ভর্তুকিও দেয়া হতে পারে। কিন্তু তুমি যদি না মানো, তবে তোমাকে লাঠিপেটা করা হবে।’ এই গাজর-লাঠির নীতিতে কাজ হয়েছিল। জামাই আলোচনার টেবিলে বসে সব সমস্যার সমাধান করেছিল। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে,  ট্রাম্প বিরতিহীন গরম কথা বলতে বলতে তাথেকে এই প্রথম অন্তত একটা ইস্যুতে তাঁকে  পিছু হটতেই হল। কারণ ট্রাম্পের এখন সেই জামাইয়ের দশা। ইতোমধ্যে চীন দক্ষিণ চীন সাগর রক্ষা নিয়ে সামরিক মহড়াসহ পালটা প্রস্তুতি হিসাবে অনেক কিছুই তাকে আমরা করতে দেখেছি। তবে সেটা যা-ই করুক আর না করুক, চীনের মূল উদ্বিগ্নতা ছিল আরো ব্যবহারিক। কী সেটা?
কয়েক দিন আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ট্রাম্পের ফোনালাপ মাঝপথে হঠাৎ থেমে যায়। নির্ধারিত সময় অর্ধেক শেষ হওয়ার আগেই ট্রাম্প ফোন রেখে দিয়েছিলেন এবং ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় হঠাৎ থেমে যাওয়া সেই ফোনালাপের ঘটনা কী পরিস্থিতিতে থেমে যায় তা ফাঁস হয়ে যায়। এই ঘটনার কথা চিন্তা করে চীনা সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল। ‘পাগলা’ ট্রাম্পের সাথে চীনা প্রেসিডেন্ট কিভাবে কথা বলবেন – ট্রাম্প যদি সেখানেও অর্ধেক কথা বলেই ফোন রেখে দেন? এরপর যদি একইভাবে সবকিছু মিডিয়ায়  ফাঁস হয়ে যায় তবে তো তিনিও বিব্রত হবেন, এই ভয় পেয়ে বসেছিল শিং জিনপিংকে। ফলে কূটনৈতিক পর্যায়ে চীন-আমেরিকার পররাষ্ট্র বিভাগ বসে আগেই সব কিছু ঠিক করে নেন। প্রেসিডেন্ট-দ্বয় কে কিভাবে কথা বলবেন, কতটুকু কোথায় রাজি হবেন ইত্যাদি নিয়ে আগেই কথা বলে নিয়েছিলে উভয় পক্ষ। অর্থাৎ আগে স্ক্রিপ্ট আর পরে সেই স্ক্রিপ্ট মোতাবেক শুটিং। এই ফরম্যাট মোতাবেক আগের দিন মানে বুধবার ট্রাম্পের অফিস সংবাদমাধ্যমকে জানায় যে, পরের দিন তিনি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে কথা বলবেন। এরপর তাদের ফোনালাপ শেষে দুই পররাষ্ট্র অফিস থেকে দুটো আলাদা পূর্বনির্ধারিত বিবৃতি যায়। সব কিছু আগেই আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি করে নেয়া হয়েছিল। সবই পাগলা ট্রাম্পের মহা কৃতিত্ব।

একটা বাড়তি পাওয়া প্রসঙ্গ আছে – তাইওয়ানের প্রতিক্রিয়া। বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখছে,
“Taiwan’s presidential office spokesman Alex Huang said in a statement that the island’s government and the United States “both maintain close contact and communication so as to keep a ‘zero accident’ approach” to their relationship”.
“হাতছুট কোন দুর্ঘটনা শুণ্যে নামিয়ে রাখা – এই এপ্রোচ নিয়ে  দ্বীপ (তাইওয়ান) সরকার ও আমেরিকা দুই পক্ষ ঘনিষ্ট সংযোগ ও যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে”। কারণ চীন-আমেরিকার কোন উত্তেজনায় প্রথম বোমাটা তাইওয়ানেরই খাবার সম্ভাবনা।

এখন পুরা ঘটনা থেকে অন্তত একটা জিনিস পরিষ্কার হল যে, এখনো ট্রাম্পের প্রশাসনের কিছু লোক আছেন যারা ট্রাম্পকে পরামর্শ শুনতে বাধ্য করতে পারেন। ট্রাম্প কি এখন থেকে থিতু হয়ে কথা বলবেন? যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করে করে কথা বলবেন?

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

 

“টেলিভিশন”: সিনেমার গল্পের সমস্যা

টেলিভিশন”: সিনেমার গল্পের সমস্যা

গৌতম দাস
Sunday 03 February 13

http://wp.me/p1sCvy-2cM

television

মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর সিনেমা ‘টেলিভিশন’ রিলিজ হয়েছে সম্প্রতি সিনেমা হলে। কিছু তরুণ বন্ধুদের উৎসাহে শুক্রবার সকালে দশটায় অর্থাৎ প্রথম দিনের প্রথম শো দেখতে গিয়েছিলাম। দর্শকরা ছবিটি কিভাবে নেয়, কি ধরণের প্রতিক্রিয়া জানায় ইত্যাদি জানার দিক চিন্তা ভাবনা করে বন্ধুরা বলাকা হল বেছে নিয়েছিল।

সে হিসাবে যথারীতি সকালে যাওয়া। গিয়ে দেখা গেল টিকেটের চাহিদা এত বেশি যে বলাকা-২ বা আগের নাম বিনাকা হলে, তাও ব্যালকনি নয়, নীচতলার টিকেট পাওয়া গেল। সকাল দশটার আগেই হাউসফুল বোর্ডও টাঙানো হয়েছিল দেখেছিলাম। সকাল নয়টার দিকে বাসা থেকে রওয়ানা দেবার সময় ভেবেছিলাম এই শৈতপ্রবাহের সকালে নিশ্চয় হলে গিয়ে দেখব ভীড় তেমন নাই। দর্শকেরা হয়ত পরের শোগুলোতে ভীড় করবে। কিন্তু সিনেমা শুরু হবার এক ঘন্টার বেশি আগে পৌঁছে গিয়েও দেখি তরুণ আর তরুণ -অর্থাৎ আমার অনুমান একেবারেই ভুল। সেই আশির দশকের পরে আর বাংলাদেশের সিনেমা হলে যাওয়া হয়নি নানান কারণে, কেবল মাস ছয়েক আগে বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে গিয়েছিলাম এক বার। যে হিসাবে তরুণ বলছি তাদের জন্ম সেই আশির দশকে। সিনেপ্লেক্সের তুলনায় বলাকা চত্তরে একটা বাড়তি সুবিধা পেয়েছিলাম। লাইনে দাঁড়ানো হবু দর্শক সকলকে সহজেই এক ক্যামেরার চোখে একবারে ধরে দেখে বোঝার একটা সুবিধা ছিল সেখানে। বুঝেছিলাম দর্শকেরা প্রায় সবাই স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ধরণের। নতুন প্রজন্ম। অনুমানে মনে হলো, বড় জোর এর দশ ভাগ হবে তরুণী। একটা প্রাথমিক ভাল লাগাও কাজ করেছিল তাদের সকলের উৎসাহের কথা ভেবে যে, ফারুকী ও তার দলবল তরুণদের মাঝে অন্তত এইটুকু জনপ্রিয়তা বা আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে যে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এবং কনকনে শৈত্যপ্রবাহের এই সাতসকালে গরম-ওম ফেলে তারা সিনেমা হলে ছুটেছে। এসব দিক, ব্যাখ্যা নিয়ে ভাবছিলাম। ফলে একটা ভাল লাগাও কাজ করেছিল এই ভেবে যে এই প্রজন্মের কিছু অংশের সাথে বসে সিনেমাটা উপভোগ করা যাবে। দুঘন্টার সিনেমা, তাই একটু ঢিলেঢালা সময় জ্ঞানে, এগারোটায় সিনেমা শুরু হয়েছিল।

দর্শকেরা প্রায় সবাই স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ধরণের। নতুন প্রজন্ম। অনুমানে মনে হলো, বড় জোর এর দশ ভাগ হবে তরুণী। একটা প্রাথমিক ভাল লাগাও কাজ করেছিল তাদের সকলের উৎসাহের কথা ভেবে যে, ফারুকী ও তার দলবল তরুণদের মাঝে অন্তত এইটুকু জনপ্রিয়তা বা আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে যে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এবং কনকনে শৈত্যপ্রবাহের এই সাতসকালে গরম-ওম ফেলে তারা সিনেমা হলে ছুটেছে।

এর আগে বাংলাভিশন টিভিতে চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে ঘটনাচক্রে ‘টেলিভিশন’ নিয়ে প্রচারিত প্রায় এক ঘন্টার প্রমো-টা দেখেছিলাম। সেখানে সিনেমার গানগুলো সিনেমার কলাকুশলীসহ উপস্থাপন করা হয়েছিল। এরও আগে ‘টেলিভিশন’ টিমের কোরিয়া সফর সম্পর্কে যেসব মিডিয়া রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল তা দেখেছিলাম। এটুকু ছিল আমার পূর্ব ধারণা অথবা পুঁজি, যা নিয়ে সেদিন সিনেমা হলে গিয়েছিলাম। যদিও এ থেকে কী নিয়ে এই সিনেমা সে কাহিনীর খোঁজখবর রাখিনি। আবার ঠিক কি নিয়ে একটা সিনেমা দেখতে এসেছি, কি দেখব এখানে বিশেষ তেমন প্রত্যাশাও কাজ করেনি। এসব না থাকলেও, ফারুকী ও তার দলবল কি ভাবছে, কি করছে এখন, তা বুঝবার দেখার একটা সুযোগ, ফলে সে নিয়ে একটা ভাল কৌতুহল অবশ্যই ছিল।

 

কা হি নী  সং ক্ষে প

যারা ছবিটি দেখেন নি, (কিম্বা দেখবেন না, তাদের সুবিধার জন্য সারকথায় গল্পটি পেশ করছি। তবে এক্ষেত্রে আমাকে সহায়তা করেছেন আমাদের আরেকজন তরুণ ছবি পরিচালক, তাসমিয়া আফরিন মৌ। তাঁর বয়ানে গল্পটা হচ্ছে এরকমঃ

টেলিভিশন – এই গল্পের শুরু এমন এক গ্রামে যেখানে নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কোন উপায় নেই। সেই গ্রামে ইন্টারনেট চাট করে তরুণেরা কেউ তবে টেলিভিশন প্রবেশের অনুমতি নেই। গ্রামের চেয়ারম্যান ধার্মিক পরহেজগার যার একচ্ছত্র আধিপত্যে গ্রামে টেলিভিশন দেখা বা কেনার অনুমতি কারো নেই। তবে মুসলমান ছাড়া অন্য কোন ধর্মের মানুষ টেলিভিশন কিনলে নীতিগত কারণে তাকে বাধা দিতে পারে না কারণ, তার ধর্মে “টেলিভিশন” দেখায় নিষেধ নেই।

গল্পের শুরুতে একজন টেলিভিশন সাংবাদিক (বাংলাভিশন) এই চেয়ারম্যানের (রুমি) সাক্ষাৎকার নিতে আসে যার সাথে চেয়ারম্যান জবাব দিয়ে অস্বস্তিতে পড়েন। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। পরিস্থিতি খারাপ জায়গায় যেতে পারে তাই সাক্ষাতকার শেষ করে দেয়া হয়। দেখা যায় চেয়ারম্যান আবার প্রথম আলো পত্রিকা পড়েন, যেখানে ছবিসহ বিজ্ঞাপনগুলো আগেই সাদা কাগজ দিয়ে চেয়ারম্যানের সহচর ঢেকে দিয়েছে। চেয়ারম্যান একজন খুবই ভালো মানুষ, তার এলাকায় জনপ্রিয় এবং সবাই তার কথা মান্য করে। চেয়ারম্যানের একমাত্র ছেলে সুলেমান (চঞ্চল) প্রেম করে সেই গ্রামের এক উচ্চ মধ্যবিত্ত প্রবাসী ব্যক্তির কন্যা কোহিনূরের (তিশা) সাথে, যে কম্পিউটার চালনায় দক্ষ। সুলেমান বাবার কথার বাধ্য ছেলে, বাবার প্রতি তার সর্মথন আছে। বাবার ব্যবসা দেখা শোনা করলেও তার মোবাইল ফোন কেনার অনুমতি নেই। সুলেমানের কর্মচারি ও সহকারী মজনু (মোশাররফ) ট্রিকস খাটিয়ে চেয়ারম্যান বাবার কাছ থেকেই মোবাইল কেনার অনুমতি পাইয়ে দেয় সোলেমানকে। আবার মজনু ছেলেবেলা থেকে কোহিনূরের খেলার সাথী ছিল। সে মনে মনে কোহিনূরকে ভালোবাসে, এক সময় তাকে বলেও ফেলে। অন্যদিকে সুলেমানের সাথে কোহিনূরের প্রেমে নিয়মিত সহায়তা করলেও, মজনু নানাভাবে কোহিনূরকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে।

ঝামেলা বাধে সেই গ্রামে এক হিন্দু শিক্ষক টেলিভিশন নিয়ে প্রবেশ করলে। হিন্দু ধর্মে টেলিভিশন দেখার কোন সমস্যা নেই, এই ধারণার কারণে চেয়ারম্যান অনেক ভেবেচিন্তে তাকে বাধা দেয় না। তবে শর্ত দেয়, কোন মুসলমান তার বাসায় টেলিভিশন দেখতে যেতে পারবে না। পরবর্তীতে হিন্দু শিক্ষক এই শর্ত মেনে চলতে পারে না দুইটি কারণে। এক. গ্রামের মানুষের অত্যাধিক আগ্রহের জন্য চাপ তৈরী হয়। দুই. তার কোচিং সেন্টার টেলিভিশনের আকর্ষণে জমজমাট হয়ে উঠে।

মুসলমানরা হিন্দু শিক্ষকের বাসায় টেলিভিশন দেখতে যায় এই খবর পেয়ে চেয়ারম্যান সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে সেখানে যায়। সেই টেলিভিশনের নিয়মিত দর্শক কোহিনূর সেখানে ওদিনও উপস্থিত ছিল। বেয়াদবির অপরাধে সবার সামনে কোহিনূরকে কান ধরে উঠবস করায় চেয়ারম্যান। এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে কোহিনূর প্রথমে সুলেমানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়, পরে সুলেমানকে শর্ত দেয় টেলিভিশন কিনে বাবার বিরুদ্ধে দাঁড়ালে সে সম্পর্ক মূল্যায়ন করবে।

সুলেমান বাধ্য হয়ে তাই করে। বাবার লোকজনের সাথে তারা মারামারি হয়। চেয়ারম্যান পিছু হঠে। আবার পরে সুলেমানের অপরাধবোধ তৈরী হয়, সে মাফ চায়, তার বাবা তাকে মাফ করেও দেয়।

ওদিকে চেয়ারম্যান হ্বজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু পাসপোর্টের জন্য ছবি তুলতে হবে বলে তিনি খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে ম্রিয়মান হয়ে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ছবি তুলে পাসপোর্ট করেন কিন্তু ঢাকায় এসে বুঝতে পারেন তিনি হ্বজ এজেন্সি দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন। তিনি যেতে পারছেন না। মনভাঙ্গা সেই পরিস্থিতিতে বাড়িতে না ফিরে তিনি এক হোটেলে খানাদানা বন্ধ রেখে পড়ে থাকেন। তার ম্রিয়মানতা ভাঙ্গে ‘লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’ ধ্বনি শুনে। পাশের রুমের টেলিভিশনে তিনি হজ্জ্ব দৃশ্য দেখতে পান। তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে হোটেলে নিজের রুমের টেলিভিশন ছাড়েন এবং কাঁদতে কাঁদতে টেলিভিশনের সাথে গলা মেলান। নিজেকে সমর্পন করে দেন বোকা বাক্সের আদর্শে। এই হোল মোটামুটি গল্প।

 

ঝা প সা  ফো কা স  বা  বি ষ য় নি ষ্ঠা হী ন গ ল্প

আসলে কি ছবিটি টেলিভিশান নিয়ে? অর্থাৎ টেকনলজির সঙ্গে প্রাচীন ও সংরক্ষণশীল মনের সংঘাত, নাকি ত্রিভূজ প্রেমের কাহিনীটাই এখানে আসল গল্প !

ছবি তোলা বা টেলিভিশন দেখা ঠিক না – এক প্রত্যন্ত গ্রামের চেয়ারম্যান এক বয়স্ক মুরুব্বীর এই মুল্যবোধের সঙ্গে একালের অবারিত মিডিয়ার – এই দুই এর সংঘাতকে অনুষঙ্গ করে আবর্তিত হতে চেয়েছে সিনেমার কাহিনী। এক বাক্যে এভাবে বললাম বটে, কিন্তু লিখতে গিয়ে টের পাচ্ছি এক বাক্যে এটা বলা কতটা ঠিক হচ্ছে। দ্বিধা আমার নিজের, কিন্তু ভেবে দেখলে দ্বিধার উৎস আমি নই। কারণ, সিনেমায় এটা স্পষ্ট যে গল্পকার বা পরিচালক গল্পের ফোকাস বা নিষ্ঠা অস্পষ্ট করে ফেলেছেন। চেয়ারম্যানের মনের বা বিশ্বাসের সংঘাতের জায়গাটিকে মুখ্য করে রাখতে পারেননি, ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় সেই ফোকাসটা থাকেনি। তাছাড়া বিজ্ঞান বা টেকনোলজির সঙ্গে ধর্মের দ্বন্দ্ব খুবই ক্লিশে, প্রাচীন ছকে বুঝেছেন, আর সেভাবেই মীমাংসা করেছেন। ছবি এই দ্বন্দ্বকে নতুন কোন দিক থেকে আমাদের বুঝতে সহায়তা করে নি।

চেয়ারম্যান গ্রামের কাউকে টেলিভিশন দেখতে দেন না – এই পটভুমির উপর দাঁড়িয়ে আরেকটি আলাদা গল্প এখানে আছে। চেয়ারম্যানের ছেলে সুলেমান (চঞ্চল), তাঁর প্রেমিকা (তিশা) আর ওদিকে বাসার বা ব্যবসায়ের কর্মচারী (মোশাররফ) এই তিনজনের ট্রয়কা প্রেমও সিনেমার মধ্যে গল্পের মুখ্য ফোকাস হয়ে উঠেছে। এই উপ-গল্প ও চরিত্র তিনটা এত সময়, বিস্তার ও ট্রিটমেন্ট পেয়েছে যে মনে করার কারণ ঘটেছে যে এটাই গল্পের ফোকাস। আবার ওদিকে গল্প শেষ হচ্ছে – চেয়ারম্যানকে নিজের মুল্যবোধ বা বিশ্বাস ধরে রাখতে অক্ষমতার পরিবেশে ফেলে দিয়ে; হ্বজে যাবার জন্য আপোষ করে নিজের ছবি তোলা আবার প্রতারিত হয়ে হ্বজে না যেতে পেরে টিভিতে হ্বজ দেখে লাব্বায়েক লাব্বায়েক ধবনিতে শতচ্ছিন্নে ভেঙে পড়ার ভিতর দিয়ে। ফলে চেয়ারম্যানের আত্ম-সংঘাত কি গল্পের ফোকাস? না কি এটা কেবল গল্পের পটভুমি, যে-পটভুমিতে দাঁড়িয়ে অন্য এক প্রেমের গল্প আছে, সেটাই গল্পের মুল বিষয় – এই দুই এর মধ্যে গল্পের ফোকাস দোল খেয়ে ফিরেছে। কোথাও তা স্থির হয়ে বসতে পারেনি, কিম্বা দুই গল্পের মধ্যে কোন শক্ত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি।

ফলে লিখতে গিয়ে আমিও দ্বিধায়। এই দ্বিধা বেশ জটিল। সমস্যাটা সিনেমা দেখার অর্ধ সময়ের পর বা ইন্টারভ্যাল থেকেই টের পাচ্ছিলাম। কারণ ততক্ষণে পরিস্কার হয়ে গেছে, চেয়ারম্যানের চরিত্র ও তার সংঘাত – সেই দিকে গল্প বিস্তারের আর সময় নাই, এই দিকটি আর উপযুক্ত ট্রিটমেন্ট পাবে না। সেই সুযোগ আর গল্পকার পাবেন না বা নিবেন না। অথচ গল্প শেষ হচ্ছে যেখানে সে অনুসারে এটাই গল্পের ফোকাস। সার কথায় চরিত্রটা উপযুক্ত ট্রিটমেন্ট পায়নি।

কোন গল্প সাজানোর সময় সেটা নানা দিকে যেতে পারে, নানান বিস্তারে যেতে হয়, একটা পরিস্থিতি তৈরীর প্রয়োজন থাকে। কোন দিকটায় গল্প কতটুকু বিস্তার হবে তা নির্ভর করে গল্পকার কোনটা ফোকাস করতে চাইছেন তার উপর, সেই প্রয়োজন দ্বারা নির্ধারিত। টিভি সিরিয়ালের তুলনায় সিনেমার ক্ষেত্রে এটা মেনে চলতেই হয়। গল্পের ফোকাস বিচারে সিরিয়ালে প্রত্যেক পর্বেই আলাদা আলাদা ফোকাস চাইলে রাখা সম্ভব। আর সিরিয়ালে পর্ব কয়টা হবে, সেই হিসাবও কিছু অদলবদল করা চলে। তার সীমার বাঁধন অন্তত সিনেমার মত ২-৩ ঘন্টা মেপে সীমাবদ্ধ নয়। ফলে গল্পের ফোকাস বিচারে সিনেমার স্ক্রিপ্ট সাজাতে হয় একটা কিছুকে মুখ্য দৃষ্টিনিবদ্ধ করে।

তবুও ধরে নেয়া যাক, ‘টেলিভিশন’ সিনেমার -স্ক্রিপ্টের ফোকাস হিসাবে গল্পকারের মনে চেয়ারম্যানই ছিল মূল। কিন্তু এই ধরে নেয়া নিয়ে আমরা বেশিদুর অগ্রসর হতে পারি না। সেক্ষেত্রে প্রধান গরমিল বেঁধে যায় মোশাররফের চরিত্রটা। কারণ এই চরিত্র সেক্ষেত্রে একেবারেই নাও যদি থাকে তাতে গল্প ও তার ফোকাসের কোন সমস্যা হয় না। অথচ উলটা, মোশাররফের চরিত্রটা যথেষ্ট গুরুত্বপুর্ণ ও বড়। এটাকে যথেষ্ট প্রমিন্যান্ট একটা চরিত্র করা হয়েছে। এবং এমনভাবে তা করা হয়েছে যে মনে হয়েছে, চঞ্চল যদি তিশার প্রেমিক হতে পারে তবে কোন যুক্তিতে মোশাররফও সমান প্রতিদ্বন্দ্বী ও যোগ্য প্রার্থী নয়। নায়িকার সাথে তার সম্ভাব্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রেমিক হিসাবে বরং মোশাররফকেই বেশি যোগ্য করে দেখানো হয়েছে। ফলে এতে দর্শকের মনে সাজেশন দেয়া হয়েছে যে, এর একটাই কারণ মোশাররফের সোশাল ক্লাস, সোশাল ক্ষমতা চঞ্চলের চেয়ে নীচে। ফলে গল্পের একটা নতুন ডাইমেনশন এখানে তৈরি হয়েছে। অথচ কেন এই গুরুত্ব, মুল ফোকাসের বাইরে এই বিস্তার – এর কোন প্রাসঙ্গিকতা ছবিতে হাজির নাই। ফলে মোশাররফ চরিত্র হয়ে গেছে উদ্দেশ্যবিহীন। অন্যভাবে বললে, এই দিকটাকে প্রমিন্যান্ট করার কারণে স্ববিরোধী একটা ইঙ্গিত তৈরি হয়েছে যেন এটা গল্পের ফোকাস। ফলে গল্পের ফোকাস চেয়ারম্যান চরিত্রের সাথে তুলনায় মোশাররফ চরিত্র বিস্তারে, ট্রিটমেন্টে অন্যায্য ও অসামঞ্জস্য চোখে ভাসে। কমবেশি একইভাবে আবার দিশা ও সুলেমানের (চঞ্চলের) সম্পর্ককেও কখন গল্পের মুল বিষয় মনে হয়েছে। সেক্ষেত্রে চেয়ারম্যান ও মোশাররফ এই দুই চরিত্রের কোনটাকেই এমন প্রমিন্যান্ট ও ডিটেইল করার কোন কারণ থাকে না। এই দিক থেকে ফিল্ম হিশাবে ছবিটি দেখতে বসে একটা বড় অস্বস্তি টের পাওয়া গেছে। এটা গল্পকার কেন করলেন তার ব্যাখা খুঁজে পাওয়া যায় না।

তবু গল্পকার গল্পের ফোকাস ঠিক রাখতে পেরেছিলেন কি পারেন নি সে প্রশ্ন উহ্য রেখে বলা যায় খুব সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন, চেয়ারম্যান কেন্দ্রিক চরিত্র ও তাঁর সমস্যাটাই গল্পের ফোকাস। অনুমান করছি গল্পকার এটাই চেয়েছিলেন। নইলে নামও দেবেন কেন ‘টেলিভিশন? নাম দিতে পারতেন ত্রিমুখী প্রণয় বা এইরকম কিছু।

তিন জনের মধ্যে প্রেম, প্রতিযোগিতা আর সংঘাতের ব্যাপারটাও ছকের ব্যাপার মনে হয়েছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নতুন কোন দিক নজরে পড়ে না, বা আমাদের ভাবায় না। 

 

গ ল্পে র  দ্ব ন্দ্ব  বা ক ন ফ্লি ক্ট

মানুষের ছবি তোলা ঠিক না এই অর্থে টেলিভিশন দেখা ঠিক না এমন বিশ্বাসে বিশ্বাসী একজন বয়স্ক মানুষের সমস্যা আছে ছবিতে। এই মানুষ সামাজিক দিক থেকে প্রতিপত্তিশীল, ফলে যে গ্রামের তিনি চেয়ারম্যান সেই গ্রাম টেলিভিশন-শূন্য। সেখানে কাউকেই টেলিভিশান দেখতে দেওয়া হয় না। এই বাক্য পড়ে পাঠক বা দর্শক তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করবে – তো? তো এনিয়ে পরিচালক কী বলতে চান? এর মানে হলো, পাঠক বা দর্শক জানতে চাইছেন গল্পের দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্টটা অথবা গল্পে তুলে আনা সমস্যাটা কি নিয়ে। এই সমস্যাটাকে গল্পকার বা পরিচালক কি করে ট্রীট করেছেন? আমাদের আজকের আধুনিক জীবনের সাদা চোখে, ছবি তোলা ঠিক না এই অর্থে টেলিভিশন দেখা ঠিক না -এতটুকু যদি কাউকে বলি – এমন ধারণা শুনলে আমরা বলব এটা একটা অচল ধারণা, (সিনেমা শেষে পরিচালকও যেটা প্রমাণ করেছেন যে চেয়ারম্যান একটা ‘অচল মাল’)। কিন্তু সমস্যা হলো, এটা তো একটা সহজ স্বতঃসিদ্ধ ষ্টেটমেন্টে। দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট কই? একটা ‘অচল মাল’ দেখিয়ে আর কতটুকু দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট টেনেটুনে হাজির করা যাবে? সিনেমার গল্পে দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট – সেখান থেকে টান টান টেনশন – চাইলে টেনশনের আরও টুইষ্ট বা মোচড় – আর শেষে সে টেনশনের নিরসন তৈরি করে সিনেমা্র গল্প বানানো হবে। তবে নির্দ্বিধায় বলা যায়, গল্পকার-পরিচালক এই প্রশ্ন মোকাবিলা করতে গিয়ে আগেই ধরে নিয়েছেন, টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বটা হলো, ‘ধর্মের কুপমন্ডুকতা বনাম প্রগতিবাদিতা’ এমনই সরল অর্থাৎ ব্যাপারটা সেই পুরানা সেকুলারিজম বনাম ইসলামের দ্বন্দ্ব। আর এই দ্বন্দ্বের সরল সমাধান আমরা জানি, তা হলো ইসলামের উপরে আধুনিকতার বিজয়। যেন গল্প-স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করতে গিয়ে গল্পকার বা পরিচালক কুপমন্ডুকতার উপর সেকুলারিজমের বা আধুনিক জীবনের বিজয়ের ওপর এক গাথা লিখে ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এটা একটা ক্লিশে বিজয়গাথা বা প্রপাগান্ডা হতে পারে – নতুনদিনের নতুন ভাবনার সিনেমা হবে কি না, সেটা সন্দেহ। এই ধরনের ক্লিশে জিনিস দিয়ে পুরানা ভাবনাকে নতুন ভাবে ঘটনার বিন্যাসের মধ্য দিয়ে ভিন্ন ভাবে দেখাবার আগ্রহ তৈরী করবে না। পুরানা জিনিসই মনে হবে। ঘটনাকে নতুন করে দেখবার, দেখানোর আগ্রহ তৈরি করবে না।

ছবি দেখার পর আমাদের অনেকে বলছিলেন, একালে টেলিভিশন দেখা যাবে না -এমন বয়ান আকড়ে ধরে থাকার লোক কি আছে? আবার যদি ধরে নেই কোনাকাঞ্চি কোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুএকজন রয়ে গেছেন তাহলে সেই চেয়ারম্যান আবার ‘দৈনিক প্রথম আলো’ পড়েন কিভাবে? ধর্মচিন্তা, নীতিনৈতিকতা বা সুনির্দিষ্ট ভাবে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বদ্ধমূল ধারণারই উদ্গীরণ ঘটেছে চেয়ারম্যানের চরিত্রে। সিনেমায় চেয়ারম্যান চরিত্র আমাদের কাছে তুলে ধরবার জন্য দেখান হচ্ছিল যে পত্রিকায় ছাপা এড জাতীয় ছবিগুলোর উপর ছোট সাদা কাগজের তালি দিয়ে ঢেকে তিনি পত্রিকা পড়েন। যুক্তির দিক থেকে হয়ত কথা সত্যি। তবুও মেনে নিতে রাজি যে রেয়ার ও ব্যতিক্রম চরিত্র নিয়েও তো গল্পস্ক্রিপ্ট হয়। এমনকি কাল্পনিক এমন রেয়ার চরিত্র বানিয়ে নিয়েও ভাল স্ক্রিপ্ট হতে পারে। সেটা কোন বড় সমস্যা নয়। আর সিনেমায় চুলচেরা বাস্তবতা খোঁজার চেয়ে গল্প কি বলতে চায় তা মোটামুটি ধরা গেলেই চলে; তাতে সবকিছু খাটি রিয়েলিসটিক না হলেও দর্শক সেসব ত্রুটি উপেক্ষা করে গল্প বুঝতে রাজি থাকে বলেই আমার ধারণা। ফলে এটা কোন বড় পয়েন্ট নয়। কিন্তু একালে টেলিভিশন দেখা যাবে না এমন রেয়ার ও ব্যতিক্রমী বয়ানধারী চরিত্র হাজির করে যদি শেষে তাকে একটা ‘অচল মাল’ বলে নাকচ করে দেয়া হয় তাহলে তা গল্প হওয়া খুবই কষ্টকর। ‘ব্যতিক্রমী লোক অচল’ এটাই তো স্বতঃসিদ্ধ। তাহলে সেখান থেকেই গল্প-স্ক্রিপ্ট কতটুকুই বা আগাবে, বের হবে? অন্যভাবে বললে, সিনেমার গল্প-স্ক্রিপ্টে এক বা একাধিক দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট – সেখান থেকে টান টান টেনশন – আর শেষে সে টেনশনের নিরসন -এভাবে মোটাদাগে কোন গল্পের একটা মৌলিক কাঠামো থাকে ধরে নিলে, সেক্ষেত্রে ‘ব্যতিক্রমী লোক অচল’ এমন স্বতঃসিদ্ধ ধারণার উপর দাঁড়িয়ে ও থেকে আবার দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট বের করা আসলেই কঠিন। কারণ স্বতঃসিদ্ধ ধারণা মানে আগেই যা নিরসিত, ফলাফল আগেই নির্ধারিত। দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট বের করার আগেই এটা ছিবড়া। স্ক্রিপ্ট ন্যারেশন করতে করতে কনফ্লিক্ট–টেনশন-নিরসন এভাবে ধাপে ধাপে না হয়ে নিরসিত দ্বন্দ্ব দিয়ে শুরু করা মানে আগেই গল্পকে হত্যা করা বা এর আর গল্পমুল্য নাই না বললেও এর গল্পমুল্য আগেই দুর্বল হয়ে থাকে। তাই ঘটেছে এখানে।

ছ বি র  ভি লে ন  কে ?  না  থা কা র  স ম স্যা

দর্শকের চোখে ভিলেন বা নেতি চরিত্র যদি সবল ঘৃণা তৈরি করতে পারে তবে গল্পকার সার্থক। দর্শকের জন্য সেক্ষেত্রে উপযুক্তভাবেই ভিলেন বা নেগেটিভ চরিত্র ঘৃণিত। কিন্তু গল্পকারের কাছে? তাঁর কাছে ঘৃণিত আর প্রিয় বলে কিছু নাই; কারণ নেগেটিভ চরিত্র নির্মাণ আর নায়ক বা পজিটিভ চরিত্র নির্মাণ তার কাছে একই কথা, একই কাজের দুই দিক। কোনটাই তার কাছে এতটুকু কম গুরুত্বের নয়। অন্যভাবে বলা যায়, শক্ত নেগেটিভ চরিত্র নির্মাণ করতে পারলে একমাত্র তখনই তুলনায় এবং বিপরীতে পজিটিভ চরিত্রটা ততই শক্তপোক্ত হয়। নেগেটিভ চরিত্র যত শক্তপোক্ত তা ততটাই বিপরীত চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলে, জেগে উঠবার শর্ত তৈরি করে। অনেকটা পরিমিত মাত্রার সাদা-কালোর কনট্রাস্টের মত। নেগেটিভ চরিত্র নির্মাণের সময় তাঁর পক্ষে সম্ভাব্য সমস্ত ন্যায্যতা, শক্ত যুক্তির অভাব খামতি ঘটলে সব শেষ। এর কারণে, কোনভাবেই এ থেকে পজিটিভ চরিত্র দাঁড়াবে না, গল্প-স্ক্রিপ্টও মাঠে মারা যেতে বাধ্য। এটা মনে করা বেকুবি যে যেটা নেগেটিভ চরিত্র সেই চরিত্র তো শেষে পরাজিতই দেখানো হবে; তাহলে আর এর মুখের ডায়লগে সম্ভাব্য পুঙ্খানুপুঙ্খ সব যুক্তি, বিবেচনা পরিস্থিতি দেবার দরকার কী? না, বরং নেগেটিভ চরিত্রের পক্ষে সম্ভাব্য পুঙ্খানুপুঙ্খ সব যুক্তি, বিবেচনা পরিস্থিতি – এক কথায় আপাত ন্যায্যতাগুলো থাকার পরও পালটা একটার পর একটা তা নাকচ করার একটা প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়েই একমাত্র পালটা চরিত্রটা ইতিবাচক বা নায়ক হয়ে উঠে। ফলে কোনটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক চরিত্র হবে এটা স্রেফ গল্পকার বা পরিচালকের আগাম ধরে নেবার বিষয়ই নয়। পরতে পরতে নির্মাণ করার বিষয়। এক অর্থে গল্পকার অর্থাৎ ভিজুয়াল গল্পকার মানে মানুষের মনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, কষ্ট-সুখ, ভাল লাগা-মন্দ লাগা ইত্যাদি নিয়ে সফল মুন্সিয়ানায় খেলা করতে পারা। এটা কোনভাবেই গল্পকারের নিজেই কেবল দর্শক হয়ে যাওয়া নয়। গল্পকার যদি আগেই ধরে নেয়, চেয়ারম্যান চরিত্র তো ঘৃণিত এক রক্ষণশীল ‘এযুগের অচল মাল -যেটা গল্পকার করতে পারে না -ফলে ঐ চরিত্রের পক্ষে আর শক্ত সাফাই জাষ্টিফিকেশন কি থাকতে পারে তো -সেক্ষেত্রে তিনি আর গল্পকার নয়, বড়জোর তিনি একজন কেবলই দর্শক। বলা বাহুল্য এতে স্ক্রিপ্ট-সিনেমার ওখানেই মৃত্যু।

ভিলেন কে ছবির? বা যার বিপরীতে প্রধান চরিত্র অর্থবহ হয়ে ওঠে?

যেমন ‘টেলিভিশন’ গল্পে নেগেটিভ চরিত্র কে? চেয়ারম্যান? আর বিপরীতে পজিটিভ চরিত্র তার ছেলে সুলেমান? কিংবা সুলেমানের উপর শর্ত বা প্রণোদণাদাত্রী হিসাবে নায়িকা? সিনেমায় কোনটাই একেবারে স্পষ্ট নয়। তবে আকার ইঙ্গিত আছে মাত্র। আবার, চেয়ারম্যান কি নৈতিক বা মরাল দিক থেকে কোথাও স্খলিত? মোটেও না। কোথাও কোন দৃশ্যে তিনি তা নন। তার একটাই অপরাধ তিনি একটা ভ্যালু অথবা বিশ্বাস যেভাবে বুঝেছেন তাতে অটল। এভাবে তো নেগেটিভ চরিত্র গড়া কঠিন। বিপরীতে, ওদিকে সুলেমান? সে কি কোন সুনির্দিষ্ট ভ্যালু অথবা বিশ্বাস লালন বা ধারণ করে? মোটেই না, এমন কোন লক্ষণও নাই। আর নৈতিক বা মরাল দিক থেকে সে চেয়ারম্যানের ধারে কাছে নয়। বরং তুলনায় কার্য-স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অন্ততপক্ষে সে একজন ম্যানিপুলেটর; সে ছলনা বা মিথ্যা আশ্রয়ী। এর চেয়েও বড় কথা সে চেয়ারম্যানের বিপরীতের নতুন সমাজের একজন ভোক্তা কনজুমার কেবল, এবং বাছবিচারহীন, কর্তাসত্ত্বাহীন। ফলে এই চরিত্র নেগেটিভের চরিত্রের তুলনায় খাটো, মোটেও পজিটিভ নয়। সে ভাবেও নির্মিত হয়নি। করা কঠিনও। অথচ আকার ইঙ্গিতে এটাকে ইতিবাচক বলার চেষ্টা আছে মাত্র।

ওদিকে চেয়ারম্যান চরিত্রের পরিণতি হলো, অচল মাল, সমাজের সাথে আনফিট । তিনি কম্প্রোমাইজ করে হ্বজে যাবার টেকনিক্যাল কারণে ছবি তুলতে বাধ্য হচ্ছেন আবার হ্বজ কোম্পানীর শঠতায় পড়ে যেতে পারেন নাই, চিটেড হয়েছেন। কিন্তু এসব কোনটাই তাঁর বিশ্বাস, মুল্যবোধে হঠাৎ ঘাটতি এসেছে সেজন্য তিনি করেছেন তা নয়। বরং, প্রতারিত হবার জন্য তিনি দায়ীই নন। নতুন সমাজ যা তাকে করতে বাধ্য করছে তাই তিনি করেছেন, এর পরেও তিনি প্রতারিত।

ক ম ন  শ ত্রু -গ ল্প কা রে র  আ ত্ম স ম র্প ণ

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, চেয়ারম্যানের মুল্যবোধ ও বিশ্বাস ধরে রাখার ক্ষেত্রে যা বাধা বা শত্রুর ভুমিকায় তা হলো, নতুন পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের সমাজ বা দুনিয়া, অথবা এর গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া টেলিভিশন টেকনোলজি। আর তার ছেলে সুলেমান ঐ সমাজেরই ভোক্তা, কনজুমার মাত্র, এবং সে বাছবিচারহীন, কর্তাসত্ত্বাহীন। অর্থাৎ উভয়েরই শত্রু একই। কিন্তু তা সত্বেও সেই কমন শত্রু ফেলে পিতা-পুত্র এক আপতিক বিরোধে জড়িয়ে গেছে, আর ঐ কমন শত্রুই এই বিরোধ তৈরির কারণ। অথচ এইদিকটা গল্পকার দেখতে পাচ্ছেন এমন কোন ইঙ্গিতও নাই। ফলে পিতা চেয়ারম্যান বা পুত্র সুলেমান এই শত্রুর কাছে সারেন্ডার করছেন না, আসলে আত্মসমর্পণ করে ফেলেছেন খোদ গল্পকার ও পরিচালক।

কিন্তু এর মানে কি আমি পিতা-পুত্রকে পিছনের ফেলে আসা কোন সময়ে, সমাজে ফিরে যেতে বলছি, মোটেই না। তবে সে জন্য একটা বোধোদয়, আত্ম উপলব্ধি বা আত্মসচেতনতার দিকেও তাদেরকে যেতে হবে। সে কাজ গল্পকার করতে পারতেন হয়ত। কথাটা অন্যদিক থেকে তুলব।

গল্পের মুল প্রসঙ্গ, ছবি না তোলা বা দেখা, সেই সুত্রে টিভি না দেখা। আর সিনেমায় এই ধারণার পরিণতি দেখানো হয়েছে এই মুল্যবোধ ও বিশ্বাসকে বলি দিয়ে। একধরণের প্রশ্নহীন ও আগাম অনুমান দিয়ে সরাসরি ধরে নেয়া হয়েছে, ছবি না তোলা বা দেখা, সেই সুত্রে টিভি না দেখা -এই ধারণাটাই ভুল। সোজাসাপ্টা এক সরলীকরণ সমাধান টেনে অন্তত বলা হয়েছে -এটা অচল ধারণা। সমস্যা সঙ্কটটাকে কোন ক্রিটিক্যাল দিক থেকে দেখার চেষ্টাও সেখানে নাই। যেমন, নিস্তরঙ্গ ফ্লাট ধরে নেয়া হয়েছে ছবি না তোলা বা দেখা -এটা স্রেফ বিশ্বাস মাত্র। প্রশ্নহীন ধরে নেয়া হয়েছে এটা কুপমন্ডুকতা অথবা নেহায়তই এক রক্ষণশীলতা। কেন এই বিশ্বাস, এই বিশ্বাস এমন কেন, কারণ কি? – সে প্রশ্ন তোলার বা খুজে দেখার চেষ্টা কোথাও নাই। ধরেই নেয়া হয়েছে, এটা স্রেফ বিশ্বাস মাত্র, ওর পিছনে কোন যুক্তি বা ব্যাখ্যা নাই। চেয়ারম্যানের মুখ দিয়ে সে সম্পর্কে কোন যুক্তি বা ব্যাখ্যা দেয়ার কারণে চেয়ারম্যান চরিত্রটাকে পুষ্ট হতে দেয়া হয় নাই। ফলে সে একটা ক্লাউন; অচল মাল ছাড়া আর কিছুই হয়ে উঠতে পারে নি।

গ ল্পে র  বি ষ য় ব স্তু  বা ছা ই

এযুগে টেলিভিশন দেখে না, দেখতে দেয় না – এখান থেকে শুরু করে কৌতুককর কাহিনী তৈরি করা যেতেই পারে। খুবই সহজ কাজ সেটা। কিন্তু গল্পকার যা ভেবেই গল্পের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করুন না কেন, চিন্তার বিষয়বস্তু হিসাবে এই প্রসঙ্গটা গভীর ও সিরিয়াস।

প্রথম কথা হলো, প্রশ্নটা ছবি তোলা বা না তোলার একেবারেই না। ইসলামের দিক থেকে মানুষ, জীবজন্তু বা যে কোন প্রাণ কোন প্রকার (ছবি, অক্ষর ইত্যাদি) চিহ্নব্যবস্থায় প্রতিফলন ঘটানো বা তাকে নিছকই মূর্তি করে তুলে সৃষ্টবস্তুর মূল সত্তাকে গৌণ করে ফেলার বিরুদ্ধে ইসলাম আপত্তি জানায়। এটা একটা দিক। আরেকটি জটিল ও গভীর দিক হচ্ছে, নিরাকার ধারণা। ইসলামে নিরাকার বা আল্লাহর নিরাকার ধারণা একটা ফান্ডামেন্টাল বিষয়। যেটা একেবারেই মৌলিক ধারণা। আবার এটা নেহায়তই ইসলামের জন্য নয়, মানুষের চিন্তা, ভাব, দর্শনের জট খুলবার জন্য এক মৌলিক ও সিরিয়াস ধারণা। অজান্তে অজ্ঞতায় সেই গুরুত্বপুর্ণ দিক যাতে মানুষ হারিয়ে না ফেলে তা থেকে সাবধান থাকতেই ছবি তোলা বা না তোলার, আকার দেয়া না দেয়ার প্রসঙ্গটা এসেছে।

আকার দিয়ে নিরাকারের ধারণা ধরা যায় না। আকার দিয়ে নিরাকারের ধারণা ধরতে গেলেও তা ‘অধরা’ই থেকে যাবে। আর আকারের ভিতর নিরাকার ধারণা তো অধরা থেকে যাবারই কথা। কারণ তখনও আকারের নেতি হিসাবেই নিরাকারের চিন্তা করা হয়, হেগেলের ভাষায় ‘আকার’-এর মধ্যস্থতায় নিরাকারের হাজির হওয়া। তবু মানুষ আকার, আইকন, চিহ্ন করে, করে ফেলে। করতেই হয়। কোন কিছু বুঝতে নেবার প্রচেষ্টার প্রথম মুহুর্ত থেকেই এই স্ববিরোধটা ঘটে। কিন্তু ইসলাম দাবি করে নিরাকারকে কোন মধ্যস্থতা ছাড়া চিন্তা করবার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। ইসলাম আমরা মানি বা না মানি এই প্রস্তাবের দার্শনিক গুরুত্বকে যতো হাল্কা আমরা গণ্য করি, ব্যাপারটা মোটেই হাল্কা ব্যাপার নয়। ফলে ছবি দেখা না দেখার বিষয়টা সেই জায়গা থেকে এসেছে। আসলে ছবি দেখা বা সে অর্থে টেলিভিশন দেখা আদৌ নিষিদ্ধ কিনা ইসলামের ভেতর থেকেও তার তত্ত্ব-উপায় আছে। কিন্তু চেয়ারম্যানের চরিত্রের মধ্য দিয়ে তার নৈতিক সিদ্ধান্তকে মুখ্য করে আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ দিকে যাবার সুযোগ ছিল। কিন্তু তাকে একটা হাস্যকর চরিত্রে পরিণত করা হয়েছে।

এ বিষয় নিয়ে যাঁরা লিখবার অধিকারী, তাঁরা লিখবেন। তবে আমার নিজের কাছে যেসকল প্রশ্নগুলো হাজির হয় তার কিছুটা নমুনা দিলে বোঝাতে পারব, ছবিতে টেলিভিশন দেখা না দেখাকে যতো ক্যারিকেচার পরিণত করা হয়েছে, আকার/নিরাকারের তর্ক আরও অনেক গভীর ও জটিল।

যেমন, উচ্চারণে যদি ধরা বুঝা শুরু করতে চাই, তাহলে নিরাকার ধারণা তো একমাত্র নৈ-স্বরে, নৈ-স্বরাকারে অথবা নৈ-উচ্চারণেই ধরতে পারার কথা, আলাদা আলাদা শব্দ-উচ্চারণে না। জানি ওরাল বা গলার স্বরে নিরাকার ধরা যাবে না, তবু ওরাল স্বরই আমাদের ভরসা। অধরা ভাবের ভিতর দিয়ে ওরাল স্বরের সীমাবদ্ধতা খেয়াল রেখেই নিরাকার ধারণা করা সম্ভব। অন্তত অর্থহীন স্বর তাকে হতেই হবে। যেমন আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশীয় সনাতন ধর্মীয় আবহে গড়ে উঠা রাগ সঙ্গীত, তা অর্থহীন স্বর অথবা অনন্ত অর্থের এক স্বর হবার পিছনে এটা ছিল অন্তত একটা কারণ। ধ্রুপদি সঙ্গীতে ইসলামের বিশেষ আগ্রহের এটা একটা কারন হতে পারে।

নানান অক্ষর-বর্ণমালা দিয়ে আমরা আমাদের লেখা পুস্তক সাজাই, ওদিয়ে ধারণা ধরার চেষ্টা করি। কিন্তু নিরাকারের ধারণা? একমাত্র অক্ষরগুলোর বিভেদ নিরাকরণে ঘুচলেই নিরাকার ধারণা আসতে পারে। তবু আলাদা আলাদা অক্ষর না আঁকলে, চিহ্ন আইকনে তাদের বিভেদ না করে নিলে লেখা, পুস্তকে কোন ভাব, ধারণা ধরা অসম্ভব। এটা স্ববিরোধ এবং এই সীমাবদ্ধতা খেয়াল রেখেই নিরাকার ধারণা করা সম্ভব।

ভিজুয়ালাইজেশনঃ এতে আলাদা আলাদা ছবি সব, ছবি চিহ্ন আইকনের বিভেদ আমাদের শিখতেই হয়। জানা হয়। এই বিভেদের ভিতর দিয়েই এই সীমাবদ্ধতা খেয়াল রেখেই এবার চোখ বন্ধ করলে নিরাকার ধারণা করা সম্ভব।

একটা চকমকে কাগজে আল্লাহু লিখলে ঐ কাগজ সেটা আল্লাহ নয়। আল্লাহকে তাতে উচ্চারণ করে পড়ে স্বরে, লিখিত অক্ষরে বা অক্ষর দেখে ভিজুয়ালাইজেশন ধরা যাবে না। তবু আমরা আল্লাহু লেখা কাগজ দেখি আমাদের মনে একটা ভাব তৈরি হয়। আমাদের কালচারে তা ফুটে উঠে। ঐ কাগজ কেউ অজান্তে পায়ে দলে দিলে কিছু হবার কথা না কারণ ঐ কাগজ নিজে আল্লাহু নয়। কিন্তু পায়ে দলা যদি ডেস্পারেট এটেম্পট হয় তবে ঐ ভাব গুণাহ কাজ বলে মানা হয়; আমাদের কালচার তা ধারণ করে চলে। সাবধান থাকার পরামর্শ ইঙ্গিত জারি রাখে।

আমরা সবাই আলাদা আলাদা নাম ধারণ করি। একের থেকে অন্যের বিভেদ, তফাত না করলে চিনা জানা মনে রাখা সম্ভব না। প্রকৃতিতে যাই দেখি তাকেই এক একটা আলাদা আলাদা নাম দেই। এগুলো আমাদের চিনা, জানা, মনে রাখার প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু নিরাকার ধারণার একটা ব্যত্যয় তো বটেই এটা। জানাজানি সচেতনতার প্রক্রিয়ায় এই স্ববিরোধ এবং এই সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সতর্ক খেয়াল রাখলেই তবে নিরাকার ধারণা করা সম্ভব। ফলে সেদিকটা বিবেচনা করে আমরা আল্লাহর গুণবাচক অর্থ –সমার্থক নাম রাখি, একটা কালচার গড়ে ঊঠেছে। যদিও তাতে সবদিক সামাল দেয়া যায়নি। প্রকৃতিতে এত কিছু কত কত দেখি আমাদের অনেক নামবাচক শব্দ দরকার। সব কুলকিনারা করা যায়নি। কেবল মানুষের নামের ব্যাপারটায় একটা কালচার তৈরি হয়েছে দেখি আমরা যদিও সেটাতেও ভাঙ্গা গড়া আছে।

টেলিভিশন’ সিনেমায় যেভাবে টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বের অতি সরলীকরণ করে বিষয়টা আনা হয়েছে এটা ইসলামের কোন বিষয়ই নয়, মুল প্রশ্ন ইসলামের নিরাকার ধারণা। একদিকে পিতা বা চেয়ারম্যান যেমন নিরাকার ধারণার বদলে টেলিভিশনে আটকে গেছেন অন্যদিকে পুত্র সোলেমান বা তার নায়িকা টেলিভিশন দেখতেই হবে এই বেহুদা মুক্তির বিপ্লবীপনায় আটকে গেছেন। আর ডন কুইকজোটের যুদ্ধ লড়েছেন। কেউই এই ছদ্ম-লড়াই থেকে বের হবার পথ তালাশ করেন নাই। এই তালাশের প্রথম কাজ হত – কেন এই বিশ্বাস, এই বিশ্বাস এমন কেন, পিছনের কথা, বয়ানগুলো অনুসন্ধান, বুঝবার চেষ্টা করা।

পশ্চিম দিকে কাবা শরীফের দিকে কেবলা বেধে নামাজ পড়ার নিয়ম। এর মানে কি আর দশ দিকে আল্লাহ নাই? মোটেই না। এটা ঠিক পুব-পশ্চিমের ব্যাপার না, বরং দশ দিক কেন্দ্রে এসে সমপাতিত হয়, মিলে মিশে একাকার নিরাকার হয়। নৈ-দিক হয়ে যায়। মানুষের ঐক্য, একটা একতাবদ্ধ মানুষের কমিউনিটি গড়ার উদ্দেশ্যের কথা মাথায় রেখে একই কেবলা অভিমুখী করে, কিন্তু নিরাকারের উপাসনার প্রতীকায়িত ঘটনা এটা। এখানে বেশ মজার কিন্তু গভীর একটা দিক আছে। ধরা যাক, ওখানে কাবা ঘর নাই। কিন্তু দুনিয়ার দশ দিকের নানান স্থান অবস্থানের মানুষ সবাইকে একই দিকে অভিমুখী বা কেবলা করতে গেলেও প্রতিটা দিকের অবস্থানের মানুষকে ঐ অবস্থানের ক্ষেত্রে একটা দিকের কথা বলতে হত যেদিকে দশ দিক সমপাতিত হয়। সেক্ষেত্রে সব অবস্থানের দিকের সেই সমপাতিত স্থান হলো যেন কাবা শরীফ। এতে দশ দিকের দশ দশ রকম মানুষের ভিন্নতার সমস্যা মিটিছে – একমুখী করা গেছে। যদিও ব্যবহারিক দিক থেকে একটা আইকন হিসাবে কাবা শরীফ এতে থেকে গেছে। এটা আকারের দুনিয়ায় নিরাকারের ধারণা আনার ব্যবহারিক সমস্যা।

এমন অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়। প্রতিমুহুর্তে নানান আকার দেয়ার ঘটনা ঘটছে; চিহ্ন, প্রতীক আইকনে দুনিয়াও নানান আকার প্রকারে হাজির। আমাদের চিনা, জানা, মনে রাখার প্রক্রিয়া জারি রাখতে গিয়ে নিরাকার ধারণার একটা ব্যত্যয় ঘটিয়েই একমাত্র এগুলো করা সম্ভব। তাই এই আপাত স্ববিরোধ। কিন্তু মুল প্রসঙ্গ, এই কাজ করতে গিয়ে এই স্ববিরোধে আমরা যেন নিরাকার ধারণা হারিয়ে না ফেলি। তাই প্রসঙ্গটা আসলে ছবি তোলা বা না তোলার একেবারেই নয়, মুল প্রসঙ্গ নিরাকারের ধারণা যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি, বেকুবি অজ্ঞতায় না ডুবে যাই। হারিয়ে চিন্তার, ভাব, দর্শনের চরম সঙ্কটে না পড়ি।

কাজেই মুল ইস্যু নিরাকারের ধারণা রক্ষা করা। নিরাকারের ধারণা ফেলে, ভুলে আমরা যেন চিন্তার গলিঘুপচিতে আটকে না যাই। এইখান থেকেই সতর্কতায়, নবীজির কোন ছবি আঁকা বা আদল দেয়া নিষিদ্ধ। লালনের শিষ্যরা একই কারণে লালনের ছবি বা মুর্তির বিরুদ্ধে। যাতে সেই ছবি, আইকন প্রতীকের ফেরে পড়ে কেবল এসব প্রতীকই সত্য, মুখ্য হয়ে না যায় আর নিরাকারের কনসেপ্ট এর নীচে চাপা পড়ে গড়াগড়ি না খায়। লালনের অনুসারীদের ক্ষেত্রে অবশ্য বলা হয় তাঁরা ছবি পূজা করেন না, মানুষ ভজনা করেন। ফলে নবীজির কোন ছবির ব্যাপারে ইসলাম কেন এত কঠোর এটা স্রেফ মোল্লাদের কুপমন্ডুকতা, পশ্চাদপদতা বা রক্ষণশীলতা একেবারেই নয়। এর পিছনে শক্তিশালী দার্শনিক কারণ আছে এবং আমাদের তা রক্ষা করা দরকার।

অতএব, ‘টেলিভিশন’ সিনেমায় যেভাবে টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বের অতি সরলীকরণ করে বিষয়টা আনা হয়েছে এটা ইসলামের কোন বিষয়ই নয়, মুল প্রশ্ন ইসলামের নিরাকার ধারণা। একদিকে পিতা বা চেয়ারম্যান যেমন নিরাকার ধারণার বদলে টেলিভিশনে আটকে গেছেন অন্যদিকে পুত্র সোলেমান বা তার নায়িকা টেলিভিশন দেখতেই হবে এই বেহুদা মুক্তির বিপ্লবীপনায় আটকে গেছেন। আর ডন কুইকজোটের যুদ্ধ লড়েছেন। কেউই এই ছদ্ম-লড়াই থেকে বের হবার পথ তালাশ করেন নাই। এই তালাশের প্রথম কাজ হত – কেন এই বিশ্বাস, এই বিশ্বাস এমন কেন, পিছনের কথা, বয়ানগুলো অনুসন্ধান, বুঝবার চেষ্টা করা। গল্পকার সেদিকে তার গল্প প্ররোচিত করতে পারতেন। ফলে সেটা গল্পের পরিসমাপ্তি অর্থাৎ দ্বন্দ্ব নিরসন বা একটা সমাধান হতে পারত।

গল্পে যেটা সবচেয়ে দৃষ্টিকটু তা হলো, নায়িকা যেভাবে নায়ককে টেলিভিশনকে মুক্ত করার শর্ত দিয়েছে। নায়িকা যদি সুলেমানকে ভালবাসেই তবে কেন তাঁর হবু শ্বশুর কেন এমন, তিনি ঠিক কি বলতে বুঝাতে চান – সেটা বুঝবার কোন দায়িত্বই সে অনুভব করে নাই। ধরেই নিয়েছে শ্বশুরের উৎখাতেই তার মুক্তি, তাদের প্রেমের মুক্তি – ফলে সুলেমানকে প্ররোচনামুলক শর্ত।

গল্পে যেটা সবচেয়ে দৃষ্টিকটু তা হলো, নায়িকা যেভাবে নায়ককে টেলিভিশনকে মুক্ত করার শর্ত দিয়েছে। নায়িকা যদি সুলেমানকে ভালবাসেই তবে কেন তাঁর হবু শ্বশুর কেন এমন, তিনি ঠিক কি বলতে বুঝাতে চান – সেটা বুঝবার কোন দায়িত্বই সে অনুভব করে নাই। ধরেই নিয়েছে শ্বশুরের উৎখাতেই তার মুক্তি, তাদের প্রেমের মুক্তি – ফলে সুলেমানকে প্ররোচনামুলক শর্ত।

এই বয়ানটা বাছবিচারহীন ধরে নেয় তথাকথিত আধুনিকতা বনাম ইসলামের লড়াইটাই হচ্ছে প্রগতিশীলতার লড়াই। অথচ এটা অনিবার্য এমন নয়। আবার এর মানে এও নয় যে এনলাইটমেন্ট অথবা আধুনিকতা থেকে মানুষের কিছুই নেবার নাই। আসলে মুল প্রশ্ন হলো, বাছবিচার করতে শিখা। ক্রিটিক করতে শিখা। আধুনিকতাকে টপকে যাওয়া। স্বভাবতই এর প্রথম কাজ জিনিষটা কি তা আকরসহ বুঝা। তবেই না বাছবিচার, ক্রিটিক! এটা অবশ্যই সমর্পণ না। মানুষের অনন্ত সম্ভাবনা মনে রাখা।

যা  হ তে  পা র ত

উপ-শিরোনাম দেখে মনে করার কারণ নাই যে যা হতে পারত সেসবের সীমা টেনে দিচ্ছি। না মোটেই তা নয়। কি হতে পারত সারকথায় এর কিছু ধারণা দিচ্ছি কি বলতে চাই তা বুঝানোর জন্য। যা হতে পারতঃ

১। টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বকেই মুখ্য করে প্রকারান্তরে চেয়ারম্যান কেন এমন, ঠিক কি বলতে বুঝাতে চায় তা – নায়িকা বা নায়ক যে কেউ একজনকে দিয়ে – সেটা বুঝবার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোন একটা সমাধান, দ্বন্দ্ব নিরসনে গল্পের এক মানবিক পরিসমাপ্তি হতে পারত। গল্পকার গল্পে চেয়ারম্যান কেন টেলিভিশন দেখার বিরোধিতা করছে এর কারণ কী সেটা গুমর হিসাবেই রেখে দিয়েছেন। এটা গুমরাহ রেখে দেয়াটাই এই গল্পের ভিত্তি একমাত্র যা থেকে একে সেকুলারিজম বনাম ইসলামের লড়াই অথবা তথাকথিত ধর্মীয় রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে আধুনিকতার লড়াই হিসাবে একে খাড়া করা যায়। অথচ এই গুমোরকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট – উত্তজনা টেনশন চরমে নেবার পর গুমোর ভেঙ্গে দেখানো ভিতর দিয়ে দ্বন্দ্ব নিরসন করা যেতে পারত। তাতে এই ছবি আমাদের সামাজিক চিন্তায় চিন্তা করার ভিন্ন দ্বার খুলতে পারত।

২। গল্পকার বা পরিচালক ধরা যাক, নিজের তৈরি টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্ব নিজেও সমাধান করতে চায় না, বা দেখাতে চায় না। কিন্তু একটা মানবিক সমাধানের পরিসমাপ্তি আকুতি তাঁর আছে, সে চায়। এই মানবিক সমাধান অত্যন্ত আন্তরিকভাবে সে খুজছে এটাই সে ফুটিয়ে তুলতে পারত। ফলে খোলা রেখে দিতে পারত। এটা বলছি, গল্পকার বা পরিচালক একদিকে একজন বিশ্বাসী বয়স্ক লোকের কোন ত্রুটি, (যা সে বিশ্বাস করে তাই সে করেছে) কোন স্খলন দেখাতে পারেনি বা দেখায় নি অথচ তাকে বিশ্বাসের বাইরে যেতে বাধ্য করেছে কিন্তু গিয়েও সে প্রতারিত হয়েছে যার জন্য সে কোনভাবেই দায়ী নয়। অন্যদিকে নায়িকা এক টেলিভিশন দেখার লোভ এতই অমানবিক ও লোভী যে এতে হবু শ্বশুর মরল কি বাঁচল তাতে তার কিছু যায় আসে নাই। এসবের বিপরীতে এটা কমপক্ষে একটা মানবিক সমাধান হত পারত। সিনেমা দেখার পর দর্শকও সেসব প্রশ্নে নানান সামাজিক তর্ক বিতর্কে জড়িয়ে এর সমাধান খুজে ফিরত। কিন্তু এই গল্পে গল্পকার সহজেই পরিণতি দিয়েছেন, এটা নেহাতই এক রক্ষণশীল ‘অচল মালের’ সমস্যা।

৩। এটা হতেই পারে যে গল্পকার বা পরিচালকের টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্ব সমাধান কি করে করবে তা নিজের কাছে জানা নাই। কিন্তু আমাদের সমাজের চেয়ারম্যান ধরণের চরিত্র কে, কেন এটা এমন – তা সে আন্তরিকভাবে অনুসন্ধিতসু, সে বুঝতে চায়। ফলে বিশ্বাসী বয়স্ক মানুষটা কি রকম সব অমীমাংসিত সঙ্কটে পড়েছে এর কেবল মানবিক কষ্ট, সাফারিং – এর সব দিক সে খুটিয়ে প্রকাশ করতে চায়। এটাই তার মুল ফোকাস হতে পারত।

উপরে আমি সম্ভাব্য তিনটা ফোকাস ও পরিণতির কথা বলেছি। এখানেই থামলাম। এর মানে এমন নয় যে আর কোন কিছু হতে পারে না। বরং এমন অনেক কিছুই হতে পারে। কিন্তু তা হবে না, হয় নাই। কারণ, যতক্ষণ আগাম ধরে নেয়া থাকবে যে, টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বটা হলো, ‘ধর্মের কুপমন্ডুকতা বনাম প্রগতিবাদী’ এমনই সরল অর্থাৎ সেকুলারিজম বনাম ইসলামের দ্বন্দ্ব আর আমরা এভাবে বুঝা দ্বন্দ্বের সমাধান জানি তা হলো ইসলামের উপরে আধুনিকতার বিজয় ততক্ষণ আমাদের গল্পগুলো ‘টেলিভিশন’ এর মত এমনই হবে। আর গল্পে দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট দুর্বল ফলে গল্পই দুর্বল থেকে যাবে।

গল্পকার যা ভেবেই গল্পের বিষয়বস্তু নির্ধারণ বাছাই করুন না কেন, চিন্তার বিষয়বস্তু হিসাবে এই প্রসঙ্গটা গভীর ও সিরিয়াস। যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে তাই এই ধরণের সিরিয়াস বিষয়কে গল্পের বিষয়বস্তু করতে হবে।

 

goutadas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে অনেকগুলো ভার্সানে অনেক জায়গায় ছাপা হয়েছে। এখানের ভার্সানটা ২০১৩ সালের ০৩ ফেব্রুয়ারি, চিন্তা ওয়েব পত্রিকার ভার্সানটারই কপি করে এখানে ছাপা হল। ]

ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদ কাজ করবে না

ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদ কাজ করবে না

গৌতম দাস

০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2cF

 

 

 

বলার অপেক্ষা রাখে না দুনিয়াজুড়ে সবার উপরে এক ট্রাম্প-জ্বর চেপে বসেছে। ট্রাম্প মানে, গেল মাসে শপথ নেয়া আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জন ট্রাম্প। ট্রাম্পের আগমণের মুল ম্যাসেজ হল, আমেরিকার সাথে সম্পর্কিত দুনিয়াজুড়ে যত ঘটনা আছে তা আর আগের মতো করেই আগের নিয়মে, অভ্যাসে বা আইনে ঘটবে না এটাই আজকে ধরে নিতে হবে, তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। তবে এর চেয়ে বড় কথা ‘ট্রাম্প কেন এমন’ গভীরে গিয়ে তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। যদিও বলা হচ্ছে ট্রাম্প আনপ্রেডিক্টেবল লোক। মানে লোকটা কখন কী করে তা আগে বলা যায় না, এর তালঠিকানা নেই। কিন্তু যে লোক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তার তালঠিকানা নেই এটা বুঝতে হবে, সেটা আবার কেমন কথা? হ্যাঁ, তা ঠিক। ব্যাপারটা হল, আসলে আমরা বলতে চাচ্ছি, কোনো আমেরিকার প্রেসিডেন্টের যেসব কাজ যেভাবে করা্র কথা না বা যেভাবে বলার কথা না বা অথবা যেসব নীতি নেয়া অসম্ভব অথবা হওয়ার কথা নয় বলে আমরা মনে করতাম; ট্রাম্পকে আমরা তেমন কাজ করা ও সিদ্ধান্ত নিতেই  দেখছি। ফলে কাম্য অর্থে আমরা বলছি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তালঠিকানা নেই। ব্যাপারটা যেন এ রকম যেমন, আমেরিকা এক এম্পায়ার, মানে এক মোড়ল বলে ধরতে পারি। এখন যে লোক মোড়ল তার বাসায় সারা দিন বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের লোকের আসা লেগেই থাকবে। ফলে স্বভাবতই তাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থাও মোড়লকে করতে হবে। এই আপ্যায়ন বলতে ন্যূনতম চা-নাশতা আর এর চেয়েও প্রধান বিষয় যথেষ্ট বসার জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে। এখন মোড়ল যদি হঠাৎ বলে এখন থেকে আর বসার কোনো ব্যবস্থাই থাকবে না, দাঁড়িয়ে কথা শেষ করতে হবে তাহলে সমাজ বলবে এই মোড়লের তালঠিকানা নেই।

ট্রাম্পের নীতি কেমন এই প্রশ্নে মিডিয়া বলছে সে প্রটেকশনিস্ট, মানে সংরক্ষণবাদী। সংরক্ষণবাদী মানে কী? মানে হল যে নিজ বাজার বিশেষত অন্য অনেক কিছুর সাথে নিজ জনগণের চাকরির বাজার সংরক্ষণ করে আগলে রাখতে চায়। সাধারণ অর্থে এটা দোষের কিছু নয়। সবচেয়ে স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হল কী ভাবে? যেভাবে করতে চাওয়া হচ্ছে তা কী কাজ করবে? অন্য কোন পথ কী নাই?  ট্রাম্প নিজে তার এই নীতির দিকটা ঠিক ‘সংরক্ষণবাদী’ বলে পরিচয় করান না। বলছেন, এটা নাকি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’, মানে সবকিছুতে সবার আগে আমেরিকা – এই নীতি। তার শপথ নেয়ার পরবর্তী বক্তৃতার প্রথম প্রসঙ্গ ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ প্রসঙ্গে ট্রাম্পের বয়ান।
আবার অনেকে  বলছেন,  ট্রাম্পের নীতি অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন। সংরক্ষণবাদী মানে এর আর এক অর্থ ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন’ ত বটেই।  সেই সত্তরের দশক থেকে আমেরিকা এত দিন সবাইকে গ্লোবালাইজেশন যোগ দিয়ে নিজ নিজ বাজার খুলে দিতে প্ররোচিত করত চাপ দিত। আজ, সেই আমেরিকা ট্রাম্পের জমানায় এসে উল্টো দিকে চলা শুরু করেছে। যেমন সে ওবামার আমলে সে চীন বাদে ১২ রাষ্ট্রের বাণিজ্য জোট – টিপিপি করেছিল। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে প্রথম সপ্তাহেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমেরিকাকে ওই বাণিজ্য জোট থেকে বের করে এনেছে।

কিন্তু গ্লোবালাইজেশন আর বাজার এর সম্পর্ক কী – এসম্পর্কে আমাদের পরিস্কার থাকতে হবে।  গ্লোবালাইজেশন মানে অবশ্যই নিজ বাজার খুলে দেওয়া। কিন্তু এটাই এর একমাত্র অর্থ বা দিক বৈশিষ্ট নয়। বাজার খোলা মানে অন্যের বাজার খোলা পাওয়াও বটে। অন্যের বাজার খোলা পেয়েছি বলেই ত গার্মেন্ট বেচে বছরে ৩২-৩৮ বিলিয়ন ডলার কামাতে পারি। যদিও আমেরিকার মাতব্বরি তাই গ্লোবালাইজেশনে এসে কম অথবা অকার্যকরও হয়ে যায় নাই। আমাদের বাজার খুলে দিবার মানে গ্লোবালাইজেশনের অংশ হবার আগেও যেমন আমাদের উপর আমেরিকান দাদাগিরি ছিল এখনও প্রায় তেমন কার্যকর আছে। এমনকি গার্মেন্টস নিয়ে আমেরিকার বাজারে সব পণ্য কোডে ঢুকতে যাতে না পারি সেজন্য কোটার নিয়ন্ত্রণ দেয়া আছে। এতসব কিছুর পরও ব্যাপারটা হল – কিছু কিছু ছিদ্র আছে, শর্ত পরিস্থিতি আছে, ক্যাপিটালিজমের লজিক আছে, স্ববিরোধীতা আছে  যেখানে আমেরিকা মুরুব্বির ক্ষমতা থাকলেও তা প্রয়োগ করতে পারে না। কাজে লাগে না। তাদের আরো বড় ক্ষতি হবে বলে। এদিকে আমাদের নিজ সক্ষমতা আছে, দক্ষতা আছে, নিজ শ্রমের বাজারমুল্য বিদেশের তুলনায়  সস্তা এবং দক্ষ (নুন্যতম মজুরি বাড়িয়ে দিলেও তা সস্তা থাকবে) – এই ধরণের আরও অনেক তুলনামূলক-সুবিধা (কমপিটিটিভ এডভ্যানটেজ) আছে – এগুলো আমেরিকা চাইলেও ঠেকায় রাখতে পারে না। আমাদের এসব সুবিধার দিক গুলো নিয়ে –  লেগে থাকা স্টাডি, আর বুদ্ধি খরচ করে চলতে পারলে আমাদের জন্য বন্ধ বাজার (প্রটেকশনিজম) এর  চেয়ে তুলনায় গ্লোবালাইজেশন এর সুবিধা বেশি। ফলে আজকের যুগের লড়াইটা  – গ্লোবাল বাজারে নিজের শেয়ার বাড়ানোর, এটা ঠিক নিজ বাজার সংরক্ষণের নয়, বা অন্যের প্রবেশ ঠেকানো নয়

চলতি শতকের শুরু থেকেই চীনের অর্থনৈতিক উত্থান স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। ফলে বুশের দ্বিতীয় টার্ম (২০০৫ সাল) থেকে শুরু করে ওবামার দুই টার্ম এই পুরা সময় ধরে আমেরিকা এশিয়ায় চীনা কনটেনমেন্ট নীতি বা ‘চীন ঠেকানোর আমেরিকার নীতি’ চালু রেখেছিল। এই নীতির সার কথা হল – চায়না ঠেকানো ( China Containment)। মানে দুই রাইজিং ইকোনমির (ভারত ও চীন) একটাকে কাছে টেনে ফেবার করে, সুযোগ সুবিধা দিয়ে অন্যটার বিরুদ্ধে লাগা ও লাগানো। ভারতকে কাছে টেনে কিছু বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে, নিজের মোড়লি-শক্তির কিছু ভাগ ভারতকে দিয়ে তাকেও চীন ঠেকানোয় কাজে লাগানো। গত প্রায় ১০-১২ বছর ধরে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি এটাই।   কিন্তু এই ব্যাপারে ট্রাম্পের নীতি সম্ভবত ভিন্ন হতে যাচ্ছে, না চাইতেও। যেমন চীন বা ভারতের সাথে ট্রাম্প যে আমেরিকা সাজাতে চাইছে তাতে এই দুই রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের ভিত্তি হবে – আমেরিকান কাজের বাজার এই চীন বা ভারত কে কোথায় নষ্ট করছে সেটা দেখা ও ঝগড়া করে ঠেকানো। যে যেখানে আমেরিকান কাজের বাজার নষ্ট করছে সেখানে তার সাথে বিরোধিতা চরমে নেওয়ার নীতি এটা। এজন্য যদিও ট্রাম্প পরিষ্কার করে বলেননি যে চীন ঠেকানোর পুরনো নীতি তার আমলে কী হবে। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, আমেরিকান কাজের বাজার কেউ নষ্ট না করুক এটাই ট্রাম্পের ফোকাস। আর সেটাকে বাধা দেয়াকে মুখ্য করে বিদেশ নীতি সাজানো ট্রাম্পের নীতি।

তাহলে সার কথা দাঁড়াল, চীনের বিরোধিতা ওবামারও ছিল। অর্থাৎ  ‘চীন ঠেকানোর’ “এশিয়াতে আমেরিকা পিভোট বা ভারসাম্য আনয়নকারী হয়ে থাকবে” এই নীতি ওবামা চালিয়ে গিয়েছেন। মানে সেটা এশিয়ায় চীনা প্রভাব ঠেকানো অর্থে। এদিকে ট্রাম্পও চীন-বিরোধী তবে সেটা আমেরিকার কাজের বাজার কতটা চীন ধ্বংস করছে সেটা ঠেকানো অর্থে। আর ওদিকে ভারতের বেলায়, ওবামা (এবং তারও আগে বুশও ছিল) ভারত-তোয়াজের পক্ষে, চীন ঠেকানো তত্ত্বের কারণে। কিন্তু ট্রাম্প ইতোমধ্যে ভারত-বিরোধী অবস্থান নিয়েছে, তবে সম্পুর্ণ ভিন্ন ভাবে। কারণ ভারতের আইটি শিল্প এই টেকনোলজি আমেরিকান নাগরিকের চাকরি খাচ্ছে বলে মনে করেন ট্রাম্প। প্রসঙ্গটাকে আমরা ‘H1-B ভিসা কর্মসূচি’ দিয়ে বুঝতে পারি। এটা একটা বিশেষ ক্যাটাগরির ভিসা কর্মসূচির নাম। আমেরিকার আইটি শিল্প বা সফটওয়্যার ব্যবসার বাজারটা মোটামুটি ১২০-১৫০ বিলিয়ন ডলারের। এর প্রায় ৭০ ভাগ বাজার ভারতের দখলে। ভারতীয় মালিকানার তবে আমেরিকায়ও রেজিষ্টার্ড তিন-চারটা কোম্পানী এই বাজার দখল করেছে। আমেরিকায় রেজিস্টার্ড ভারতীয় মালিকানা কোম্পানিগুলো ওই ভিসা ক্যাটাগরিতে ভারত থেকে প্রোগ্রামারদের এনে আমেরিকার প্রোগ্রামারের থেকে কম বেতনে কাজে নিয়োগ করে আসছিল। যদিও ওই ভিসা ক্যাটাগরির পেছনের আইনে বলা ছিল যে এই ক্যাটাগরিতে ভারতীয় বা বিদেশীদের আনতে গেলে তাদের ন্যূনতম বেতন বছরে ৬০ হাজার ডলার বা এর বেশি হতে হবে। শ্রম আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর সাফাই ছিল যে, যেসব দক্ষ ও মেধাবী শ্রমগুলো (যাদের বেতন ৬০ হাজার ডলার এই মাপকাঠির ) আমেরিকায় যথেষ্ট পাওয়া যায় না আর সেকারণে তারা বিদেশ থেকে আনতে চাইছে। এই কথা আরো পোক্ত করতে বলা হত যে, ভারতীয়দের মাস্টার্সও আছে, আমেরিকানদের বেলায় মাস্টার্স করা চাকরিপ্রার্থী থাকে খুব কম জনের।
ট্রাম্প এই ভিসা ক্যাটাগরিতে শ্রম আমদানির বিপক্ষে তবে সেটা সে করতে চায় শর্তগুলোকে আরও কঠিন করে দিয়ে। তবে আরও শর্ত আরোপ করে এই ভিসা ক্যাটাগরিতে শ্রম আমদানির বিরুদ্ধে কেবল ট্রাম্প নয়; এমনকি কংগ্রেসে ও সিনেটে এখন সংখ্যাগরিস্ট রিপাবলিকান – ট্রাম্পের দল শুধু এই রিপাবলিকানরাও নয়, এই দলে অনেক ডেমোক্র্যাটও আছেন। তাই ট্রাম্পের শপথ নেয়ার আগেই গত ৫ জানুয়ারি থেকে কংগ্রেসে ‘হাই-স্কিল্ড ইনটিগ্রিটি অ্যান্ড ফেয়ারনেস অ্যাক্ট, ২০১৭’ নামে বিল আনার তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। এই কাজে এখনই চার থেকে পাঁচটা প্রস্তাবিত আইন কংগ্রেসে ঘোরাফেরা করছে। সেগুলোর অন্তত একটা বাই-পার্টিজান মানে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান দুই দলের দুই সদস্যের যৌথ প্রস্তাব। শুরুর দিকের প্রস্তাবগুলোতে সংশোধিত  ‘H1-B ভিসা কর্মসূচিতে’ মুখ্য দুই পরিবর্তনের মধ্যে ছিল ন্যূনতম বেতন বছরে এক লাখ ডলার করা; আর মাস্টার্স ডিগ্রি থাকাকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করা। এমন প্রস্তাবের পেছনে যুক্তি হল, বছরে এক লাখ ডলার মানে মাসে আট হাজার ডলারের বেশি দিয়ে বিদেশী-ভারতীয় লোক আনতে গেলে সেটা আর আমদানিকারক কোম্পানীর কাছে লাভজনক থাকবে না। কারণ ওর চেয়ে কম বেতনে আমেরিকা থেকেই স্থানীয়ভাবে প্রোগ্রামার পাওয়া যাবে। আর মাস্টার্স ডিগ্রি থাকার শর্ত উঠিয়ে দেয়া মানে স্থানীয়ভাবে গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামাররা ওই চাকরির আবেদন করতে পারবে ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হতে পারবে। এদিকে ট্রাম্পের শপথের পরে আরো যেসব নতুন বিল বা আইনের প্রস্তাব কংগ্রেসে উঠেছে সেগুলোতে ন্যূনতম বেতন বছরে এক লাখ ত্রিশ হাজার রাখা হয়েছে। বলা বাহুল্য ভারতীয়দের মাথায় হাত। ইতোমধ্যে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর ভারতে রেজিস্টার্ড অংশে শেয়ার বাজারে দরপতন হয়েছে গড়ে শতকরা ৯ ভাগ। আমেরিকান শেয়ারবাজারের এক অ্যানালিস্ট হিসাব করে বলছেন ভারতীয় তিন শীর্ষ কোম্পানিকে [টিসিএস (টাটা), ইনফোসিস ও উইপ্রো] নতুন হবু আইনে ৬০-৭০ ভাগ বেশি বেতন গুনতে হবে। ফলে আনুপাতিক মুনাফা কমে যাবে। অর্থাৎ অবস্থা খুবই বেগতিক। এসব কোম্পানির এক মালিক সমিতি আছে নাম ন্যাসকম (NASSCOM)। তারা খুবই তৎপর হয়ে লবিং করছে। তাদের কোম্পানীগুলো আমেরিকায় ব্যবসা করে কত ট্যাক্স দেয়, কত নতুন আনুষঙ্গিক কাজ সৃষ্টি করেছে এর এক স্টাডির ফিরিস্তি দিয়ে ট্রাম্পের দলবলের মনগলানোর চেষ্টা করছে। ওদিকে মজার কথা হল, মোদি সরকার নিশ্চুপ, প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। অথচ গত নভেম্বরে ট্রাম্পের বিজয়ের পর থেকে এই বিপদ যে আসছে তা সরকার ও সংশ্লিষ্টরা সবাই জানে। তাহলে? বিষয়টা হল, কৌশল আর এক পুরনো বিশ্বাস। প্রকাশ্যে আপত্তি হইচইয়ের থেকে গোপনে যেভাবে সে আমেরিকার বিশেষ নজরের বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছিল এতদিন, সেটার অপেক্ষায় থাকা আর সে দিকে চেষ্টা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মোদি সরকার। আনন্দবাজার পত্রিকার এমনই এক রিপোর্টের শিরোনাম, ‘ট্রাম্পের শরণার্থী বিতর্ক এড়িয়ে আপন স্বার্থে নজর ভারতের’।  ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ার পর মোদি পঞ্চম রাষ্ট্রপ্রধান যিনি ট্রাম্পকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। এরপরে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ শেষে ২৫ জানুয়ারি সরকারপ্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ফোনে কথা বলেছেন। কিন্তু সেখানে কী আলাপ হয়েছে কোন আশার আলো আছে কিনা এসব বিষয়ে তেমন কোনো ব্রিফিং নাই।  ভারতের উদ্বিগ্নতার ইস্যুগুলো নিয়ে কোনো আলাপ হয়েছে কি না তেমন কোন কিছু জানা যায়নি। তবে কয়েকজন আমেরিকান বিশেষজ্ঞের মতামত হল, ভারত আমেরিকানদের চাকরি খেয়েছে – এই জায়গা থেকে কোনো ছাড় দেয়া অথবা সরে আসার কোন সম্ভাবনা তারা দেখেন না।

অনেক পাঠকের মনে হতে পারে যে, ট্রাম্প বা যেকোনো জাতীয়তাবাদী তো এমন সংরক্ষণবাদী অবস্থান নেবেই, ফলে এই সিদ্ধান্ত সঠিক। সরি, আসলে ব্যাপারটা তা নয়, এত সরলও নয়। বরং সস্তা জাতীয়তাবাদ, তাই এটা এযুগে অচল। যদিও আপাতদৃষ্টিতে তা সঠিক মনে হচ্ছে। কেন?
মূল বিতর্ক হল – শ্রম আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর যুক্তি হল, যেমন একজন বলছেন –

Mr. Levie said, “When you have incredible talent that wants to work in your organization but you are preventing them from doing so, that is disastrous to innovation and competition.”

বাংলা করলে, ‘এক দিকে বিরাটসংখ্যক ট্যালেন্ট আমাদের সংগঠনের সাথে কাজ করতে চাইছে আর আমরা তাদের আটকে রাখতে চাইছি, এটা উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতার দিক থেকে ধ্বংসাত্মক’। ইমোশনাল না হয়ে দেখলে আসলে, এখানে ট্যালেন্ট বলে ডেকে কোম্পানীগুলোর অবস্থানের পক্ষে এই সাফাই তৈরি করা হয়েছে। যার পিছনের সত্যি কথাটা হল, এই ‘ট্যালেন্টদের’ ভারত থেকে সস্তায় কম বেতনে পাওয়া যায় বলেই তাদেরকে গৌরবান্বিত করে এমন ট্যালেন্ট ডাকা হচ্ছে। কোনো কারণে যদি আমেরিকাতেই তুল্য দক্ষ শ্রম সস্তায় পাওয়া যেত, তবে সেসব আমেরিকানরাই সেক্ষেত্রে আবার ট্যালেন্ট হয়ে যেত। আসল কথা আমাদেরকে ক্যাপিটালিজমের স্বভাব বৈশিষ্ট্য খেয়াল রাখতে হবে। সে অবশ্যই সস্তা শ্রমের পক্ষে সব ধরনের যুক্তি-সাফাই গাইবেই। এখন প্রশ্ন হল, ক্যাপিটালিজমের স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধে আইন বানিয়ে ট্রাম্পের পক্ষে জয়লাভ করতে পারা সম্ভব কি না?

না, পারার কথা নয়। কেন? এই আইন কার্যকর হলে বিদেশী নয় আমেরিকানদের চাকরি হবে। কথা সত্য। কারণ সে ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা কোম্পানীগুলোর ভারতীয়দের চেয়ে স্থানীয়দের নিয়োগ দিলে বেতনের বিবেচনায় লাভজনক হবে। কিন্তু ঘটনার এখানেই শেষ নয়। এটাই একমাত্র বিবেচনার বিষয় নয়, আরও দিক আছে। মূলকথা এই স্থানীয় নিয়োগের বেলার এদের বেতন কিন্তু এখনকার তুলনায় ৬০-৭০ ভাগ বেশি হবে।  যার অর্থ এই সেক্টরের সফটওয়ার প্রডাক্টে ক্রেতাদেরকে  বেশি মূল্যে সফটওয়্যার ও সার্ভিস কিনতে হবে। অর্থাৎ আমেরিকানদের চাকরি দিতে গিয়ে – এই জাতীয়তাবাদ দেখাতে গিয়ে রাষ্টের পুরা সবাইকে  আমেরিকান – জাতিকে বেশি মূল্যে পণ্য কিনতে হবে। কিন্তু সে বাড়তি মূল্য দেয়া অপ্রয়োজনীয়, এই অর্থে কারো ভোগে লাগবে না। পুরোটাই লস। ব্যাপারটা হলো যেন সব আমেরিকান মিলে চাঁদা দিয়ে পকেট থেকে পয়সা গুনে বেকার আমেরিকান আইটি গ্র্যাজুয়েটদের বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াল। এর চেয়ে বেকারভাতা দেয়া কি সহজ ছিল না? এটা কি ন্যাশনাল প্রডাকশন বাড়ল না ন্যাশনাল লস? কোন খাতে ফেলব? প্রশ্নটা কাজ দেওয়ার, নাগরিকের পকেট কাটা নয়।  অতএব বলে দেয়া যায় – এই সস্তা জাতীয়তাবাদ টিকবে না।

এক গোড়ার সত্য বলি। সত্য এক. আমাদের মতো গরিব ছোট অর্থনীতির দেশের শ্রম (দক্ষ বা অদক্ষ দু’টিই) উন্নত বা বড় অর্থনীতির দেশের শ্রমের চেয়ে সস্তা ও প্রতিদ্বন্দ্বী হবেই। এখনো অনেক দিন এটা হবে। আর সত্য দুই. ক্যাপিটালিজমের সাধারণ ঝোঁক হবে এই সস্তা শ্রমের পক্ষ নেয়া, কারণ ওখানে মুনাফা বেশি হবে। এই সত্য অস্বীকার করে কেউ টিকবে না।

বাংলাদেশের গার্মেন্টস আমেরিকা যায় – এর তাৎপর্য হল, এতে আমেরিকার শ্রমের বাজারে শ্রমের ন্যূনতম মূল্য তুলনীয় বিচারে কম রাখা সম্ভব হয়, হবে। কেন? আমেরিকান ঐসব শ্রমজীবিরা আমেরিকান বাজারে তাদের পোশাকের চাহিদা মিটাতে পারবে তুলনামূলক কম পয়সায়, এর ফলে আমেরিকায় ন্যূনতম মজুরি তুলনায় কম রাখা সম্ভব। আবার অন্যদিকে,  বাংলাদেশের কৃষিতে ভর্তুকি দেয়া মানে বাংলাদেশের গার্মেন্টসে মজুরি তুলনায় কম রাখা সম্ভব করা।

তাহলে সোজা কথাটা হল, অল্প কিছু যেসব পণ্যে আমরা আমেরিকার চেয়ে দামে ও মানে প্রতিদ্বন্দ্বী ও যোগ্য এসবের বাজার আমাদের হাতে আজ অথবা কাল তাদেরকে ছাড়তেই হবে। এ কথা যে যত তাড়াতাড়ি বুঝবে সে ভালো টিকবে। তবে সস্তা জাতীয়তাবাদের সুড়সুড়ি দিয়ে ভোট জোগাড় সেটা হয়ত ফাঁকফোকরে চলতেই থাকবে। রাজনীতিতে মিথ্যা ব্লাফ তো থাকেই।

ঘটনার আরেক মাত্রা আছে। ট্রাম্পের আমলে খুব সম্ভবত আমেরিকার কাছে ভারতের গুরুত্ব ওবামা আমলের মতো আর থাকছে না। কারণ এখন পর্যন্ত ওবামার ‘চীন ঠেকানোর নীতি’ ট্রাম্প চালু রাখবেন কি না, ওবামার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করবেন কি না এর সপক্ষে ট্রাম্পের কোনো অ্যাকশন, নীতি বা কোনো আলামত দেখা যায়নি। বরং এশিয়ায় চীনবিরোধী কোনো জোট গড়ার ওবামার নীতির পথে ট্রাম্প হাঁটছেন না, ইচ্ছাও নাই – তাই স্পষ্ট হচ্ছে। এটাই প্রকাশিত। যেমন যত সহজে ট্রাম্প অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ফোনালাপ ‘গেট লস্ট’ বলে শেষ করলেন সেখানে এর ইঙ্গিত আছে। অথচ ওবামার এই আমলে তার এশিয়া নীতিতে একমাত্র অস্ট্রেলিয়াতেই আমেরিকান মেরিন ঘাঁটি গাড়া হয়েছে। এই অঞ্চলে আমেরিকান নীতি স্ট্রাটেজির সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিল অষ্ট্রেলিয়া।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]