৩৩ বছরের পরিবহন নৈরাজ্য


৩৩ বছরের পরিবহন নৈরাজ্য

গৌতম দাস

০৭ মার্চ ২০১৭,  মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2dl

 এ যেন দুর্ভোগের মহামিছিল। মাঝ রাস্তায় হঠাৎ করে গাড়ি বন্ধ করে যাত্রীদের জোর করে নামিয়ে দেন পরিবহনশ্রমিকেরা। রাস্তা থেকে উধাও হয়ে যায় অধিকাংশ গণপরিবহন। এই দুর্ভোগের মধ্যে শত শত মানুষ কোনো উপায় না পেয়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে বাধ্য হন। ছবিটি গতকাল ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দুপুর ১২টার দিকে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার থেকে তোলা l হাসান রাজা, প্রথম আলো
এ যেন দুর্ভোগের মহামিছিল। মাঝ রাস্তায় হঠাৎ করে গাড়ি বন্ধ করে যাত্রীদের জোর করে নামিয়ে দেন পরিবহনশ্রমিকেরা। রাস্তা থেকে উধাও হয়ে যায় অধিকাংশ গণপরিবহন। এই দুর্ভোগের মধ্যে শত শত মানুষ কোনো উপায় না পেয়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে বাধ্য হন। ছবিটি গতকাল ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দুপুর ১২টার দিকে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার থেকে তোলা . হাসান রাজা, প্রথম আলো

 

 

বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন সেক্টরে সীমাহীন নৈরাজ্য চেপে বসেছে। বসারই কথা।  গত ২০১১ সালে সিনেমা বানানোর দুই গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব মিশুক মুনীর আর তারেক মাসুদ এরা দুজন মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। স্বভাবতই সেসময়ের ঐ চাঞ্চল্যকর মৃত্যুতে সমাজে প্রচুর নাড়াচাড়া পড়েছিল। যে বাসের সাথে মিশুক-মুনীরদের মাইক্রোবাসের সংঘর্ষ হয়েছিল সেই বাস ড্রাইভারের বিরুদ্ধে একটা মামলাও হয়েছিল। এখন ড্রাইভারের যাবৎজ্জীবন জেলের সাজা শুনিয়ে সেই মামলার রায় প্রকাশিত হয়েছে গত মাসে। সেই রায় প্রকাশিত হওয়াকে কেন্দ্র করে পরিবহন নৈরাজ্য আবার প্রকাশ্যে জাঁকিয়ে এসেছে। আগামীতেও এটা আসতেই থাকবে বলে অনুমান করা যায়। কারণ সেই ১৯৮৪ সাল থেকে আজ অবধি আমরা কখনোই দেশের যানবাহনের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা কিংবা কোনো নিয়ম দাঁড় করানোর পক্ষে আমাদের সরকার বা সংশ্লিষ্ট পক্ষকে আন্তরিক ও দৃঢ় থাকতে দেখিনি। বরং ইন্টারেস্ট গ্রুপগুলো তাদের স্ব স্ব সংকীর্ণ স্বার্থে পরিবহন সমস্যাকে শুধু নিজের পক্ষে সুবিধাজনক করে নিয়ে কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে টেনে নিয়ে চলতে চেয়েছে।
আমাদের সামাজিক ধারণায় এখনো বল প্রয়োগকেই কোনো সরকারি আইন বা নির্দেশ-নিয়ম বাস্তবায়নের একমাত্র উপায় বলে মনে করা হয়। ড্রাইভার বা সাধারণ মানুষকে আইন মানতে সহায়তা করে, সে দিকে তাকিয়ে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করলে যে আইন বাস্তবায়ন করা সহজে সম্ভব এবং দরকার সে দিকটা খুব কমই খতিয়ে দেখা হয়েছে। তাই আদালত মিশুক মুনীর আর তারেক মাসুদের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু সম্পর্কিত মামলায় যে রায় দিয়েছেন তা শক্ত হাতে তামিল করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এটা মনে করা হয়েছিল। কিন্তু ড্রাইভার তথা বাস-শ্রমিকেরা তা উলটে দিয়েছে। কারণ কখনই কোন নিয়মনীতি মানতে না চাওয়া পরিবহন শ্রমিকেরা বরাবরের মত মনে করছেন, এই শাস্তি দেয়া ঠিক হয়নি। (রায় মানতে না চাওয়ার অর্থে ঘটনাটা আদালত অবমাননাকর কিছু হয়ে যাচ্ছে কি না সে আইনি প্রশ্নের দিকে এখানে যাওয়া হয়নি সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ বলে। হয়ত তা অবমাননাকর কিছু হয়েছে অথবা না।) কিন্তু পরিবহন শ্রমিকদের বক্তব্যটা আসলে কী? তারা কী চান? দুর্ঘটনা ইত্যাদি যা কিছুই ঘটুক – বিচার আদালত বা অভিযোগ তাদের কোনো কিছুর মুখোমুখি হতে হবে না? ব্যাপারটা তাদের অনেকের কাছে সেরকমই। এমন একটা ধারণা ড্রাইভারসহ শ্রমিক ও মালিকদেরও আছে। কেন আছে, সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। তবে এবারো শ্রমিক ও মালিকদের পক্ষ হয়ে এ ব্যাপারে তাদের মনোবাঞ্ছা যতটা সম্ভব ঢেকেঢুকে উপস্থাপন করেছেন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। শ্রমিকদের সব চেয়ে প্রভাবশালী ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতিও নাকি শাজাহান খান। কোনো ট্রেড ইউনিয়নের সভাপতি একই সাথে যদি মন্ত্রী হন তদুপরি শ্রমিকদের প্রতিনিধি হিসেবে কোনো সভায় যখন দরকষাকষি ও যুক্তিতর্ক করতে বসেন, সেটা বড়ই অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও বেমানান হতে বাধ্য। মন্ত্রী মানে, সরকারের মানে জনগণের প্রতিনিধি। আমাদের দেশের বিচারে জনগণের না হলেও সরকারের প্রতিনিধি তো অবশ্যই। অন্তত সেই মন্ত্রী যখন একই সাথে কেবল শ্রমিকদের প্রতিনিধি হিসেবে মিটিংয়ে বসতে চান, তখন আসলে কে কার সামনের টেবিলে মুখোমুখি বসে? আসলে কে কারই বা প্রতিনিধি, এটা তালগোল পাকিয়ে যায়। শাজাহান খানকে নিয়ে এমন ঘটনা আগে অনেকবারই ঘটেছে। তাই সেখানে মন্ত্রী শ্রমিকদের ধর্মঘটের পক্ষে কথা বলার মানে কী? সেটা কি সরকারের বক্তব্য হয়ে যায় না? তারপরেও মন্ত্রী পরিবহন শ্রমিকদের হয়ে কথা বলেছেন। যেমন এ কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক। মন্ত্রী সাফাই দিয়ে বলছেন (শ্রমিকেরা) “সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করতেই পারেন। এটাকে ধর্মঘট নয় ‘স্বেচ্ছায় অবসর’ বলা যেতে পারে। সমাধান হবে, তবে সময় লাগবে” – এটা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেছেন, “বাসচালক নেতারা কোনো নির্দেশ মানতে চাইছেন না”।
তিনি বলেন, “দুনিয়ার কোথাও দুর্ঘটনার জন্য ফাঁসি বা যাবজ্জীবন দেয়ার আইন বা বিধান নেই। আমি মনে করি, চালকদের তিন বছর শাস্তি হওয়া উচিত। সারা পৃথিবীতে এসব অপরাধের জন্য বেশি হলে পাঁচ থেকে সাত বছরের শাস্তি হয়। খুন করা হলে ৩০২ ধারার মামলা হতেই পারে। কিন্তু ফাঁসি দিয়ে বা যাবজ্জীবন দিয়ে খুন বন্ধ করা যায় না। এ ধারণাটি তৈরি করছেন বুদ্ধিজীবীরা”। ………”আমি মনে করি, তিন বছরের বেশি শাস্তি হওয়া উচিত নয়। দুনিয়ার কোথাও মৃত্যুদণ্ড নেই। বেশি হলে পাঁচ থেকে সাত বছরের শাস্তি হয়। অবশ্যই আপনি চালকদের সাবধান করতে পারেন। উত্তেজিত নয়। বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু নিয়মকানুন মেনে হতে হবে”। মন্ত্রীর বক্তব্য ২৮ ফেব্রুয়ারি সংখ্যার প্রথম আলো থেকে টুকে এনেছি।

আবার তিনিই এসব উদ্ধৃতিতে দেখা যাচ্ছে, শাজাহান খান একাধারে সরকারের প্রতিনিধি, শ্রমিকদের প্রতিনিধি এবং এক অর্থে তিনি বিচারকও। তিনি বলছেন, যখন তখন কোনো আগাম নোটিশ না দিয়েও ধর্মঘট ডাকা যায়। আবার তিনিই বলেন এটা ধর্মঘট নয়, “কর্মবিরতি”। অর্থাৎ তিনি জানেন, এখানে আগাম নোটিশ না দিয়ে ধমর্ঘট ডাকাতে আইনভঙ্গের ঘটনা ঘটেছে। তাই শব্দচাতুরি করছেন। আবার দুর্ঘটনায় মৃত্যুর শাস্তি প্রসঙ্গে মন্ত্রী ঠিক কী বলবেন, তা নিয়ে তিনি নিজেই দ্বিধাগ্রস্ত।
শাস্তি একবার তিন বছর বলছেন, আবার “পাঁচ-সাতও” হতে পারে বলছেন। শুধু তাই নয়, তিনি আবার সাধারণভাবে কাউকে শাস্তি হিসেবে ফাঁসি দেয়ার চরম বিরোধী।ীই তো ২০১৩ সালে শাহবাগে ফাঁসি ফাঁসি করে এত কিছু হয়ে গেল আমরা একদিনও জানতেই পারিনি, খোদ সরকারের মধ্যেই এত সিনসিয়ার একজন ফাঁসিবিরোধী মন্ত্রী বসে আছেন। আর তার রাজনৈতিক ফতোয়াও যথেষ্ট ভারী। তিনি বলছেন, দুনিয়াতে কোথাও নাকি “ফাঁসি দিয়ে বা যাবজ্জীবন দিয়ে খুন বন্ধ করা যায় না। আর এ ধারণাটি তৈরি করছেন বুদ্ধিজীবীরা”। দেখা যাচ্ছে “বুদ্ধিজীবী” সাজার শখ শাজাহান খানেরও কম না।

আমরা দেখতে পাচ্ছি নৌমন্ত্রী পরিবহন শ্রমিক ও জনগণকে পরস্পরবিরোধী ও মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, এবং তা-ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে। আর সরকারের অবস্থা হয়েছে এই যে, একবার মিশুক মুনীর আর তারেক মাসুদের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুতে পাবলিক সেন্টিমেন্টের পক্ষে কাজ করে কাঠগড়া থেকে ড্রাইভারের যাবজ্জীবন সাজার ব্যবস্থা করেছে সে। আর পর মুহূর্তেই পরিবহন শ্রমিকেরা তা মানতে না চাওয়ায় খোদ মন্ত্রী এই শ্রমিকদের পক্ষে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। মনে হয়, সরকার এভাবে একেকবার একেকজনকে খুশি করে চলতে চাইছে। অথচ গুরুত্বপূর্ণ করণীয়টা হল, ড্রাইভারদের আরো উপযুক্ত ট্রেনিং দেয়া, সহজে কম পয়সা খরচ করে ট্রেনিং পাওয়ার ব্যবস্থা করা। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্বল আর দুর্নীতিপরায়ণ ব্যবস্থাটা হল, লাইসেন্সিং। এ ব্যাপারে একটা সুষ্ঠু ও সহজ স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা দাঁড় করানো, যাতে করে সঠিক ট্রেনিং শেষে স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতে পরীক্ষায় পাস করা ও লাইসেন্স পাওয়া যায় এবং লাইসেন্সের মানও বজায় থাকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এটাই। এই মুখ্য কাজগুলো মনোযোগ দিয়ে সম্পন্ন করলে দুর্ঘটনা ঘটার সংখ্যা কমবে, ফলে শাস্তির সংখ্যাও কমে আসবে। এ ছাড়া কী করলে দুর্ঘটনা কমবে সেটা নিয়ে নিরন্তর গবেষণা ও বিশেষণের ব্যবস্থাও করতে হবে। এক কথায় বললে লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ বিআরটিএকেই দুর্নীতিমুক্ত বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠান করে গড়ে তুলতে হবে আগে। সাফল্যের সব চাবিকাঠি একটা বিআরটিএ গড়ে তোলার মধ্যে।
অথচ এ কাজটাই সব সময় সবচেয়ে দুর্বল করে ফেলে রাখা হয়েছে। এবার ২০১৭ সালের  ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুতে যেন ড্রাইভারের ফাঁসির আদেশ জারি না হয় এমন দাবিতে হঠাৎ সব যানবাহন বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। আর ওদিকে আজ থেকে ঠিক একেবারে ৩৩ বছর আগে, ১৯৮৪ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারিতে সেই একই দাবি – যেন ড্রাইভারের ফাঁসির আদেশ দেয়া না হয় এ জন্য এক সপ্তাহ ধরে পরিবহন ধর্মঘট চলছিল। সেটা এরশাদের সামরিক শাসনামলের তৃতীয় বছর। সে দিন তৎকালীন ঢাকার একমাত্র বাসস্ট্যান্ড গুলিস্তানে এর প্রাচীর সীমানায় দাঁড়িয়ে বিকেলে পাশের রাস্তা দিয়ে যাওয়া ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের মিছিলকে হাততালি দিয়ে স্বাগত জানিয়েছিলেন পরিবহন শ্রমিকেরা। এতে ছাত্র-শ্রমিকদের মুহুর্মুহু শ্লোগানের মিলিত আওয়াজ উঠেছিল। কিন্তু তা সহ্য করতে না পেরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের ট্রাক ডাইভার ও ভিতরে বসে থাকা পুলিশ সার্জন পরিকল্পিতভাবে সজোরে মিছিলকে পিষে চালিয়ে দেয়া হয়েছিল। জঘন্য এই কাজের বদনাম থেকে বাঁচতে সরকার দ্রুত আপসের উদ্যোগ নিয়েছিল। পরিবহন শ্রমিকদের সাথেও আপসরফা করে নেয় সরকার, ফাঁসির সাজা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। কিন্তু এই ঘটনার সবচেয়ে নিট পাওনা হল, এ থেকেই সড়ক পরিবহনের লাইসেন্সিং ও ফিটনেস ইত্যাদির জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) জন্ম নেয়। এটাও পরিবহন শ্রমিকদের আর এক গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল। কারণ এর আগে জেলার ডিসি অফিসের এক ডেস্ক থেকে মোটরযানের লাইসেন্সের বিষয়গুলো দেখা হত। অথচ যানবাহনের চাহিদা বাড়ার সাথে তাল মিলিয়ে এই অফিস ডেস্ক ঢাকার বিপুল যানবাহনকে সার্ভিস দিতে পারত না। তাই পূর্ণাঙ্গ অফিস হিসেবে ডিসি অফিস থেকে আলাদা করে বিআরটিএ খোলা হয়েছিল।
তেত্রিশ বছর পর দেখা যাচ্ছে আজ কিছু আগায়নি। অবশ্য আগানোর কথাও না। আমরা বিপ্লব আন্দোলন পরিবর্তন ইত্যাদি শুনলে যতটা সহজে আপ্লুত হই, কোনো সিস্টেম বা প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে শুনলে আমরা ততটা নিরুৎসাহিত থাকি। ফলে ১৯৮৪ সালে সেকালের একচেটিয়া পরিবহন নেতা সিপিবির কমিউনিস্ট  মঞ্জুরুল আহসান খান থেকে আজকের শাজাহান খান পর্যন্ত দাবি একটাই- ড্রাইভারের ফাঁসি যেন না হয়। ড্রাইভারের কোন সাজা যেন না হয় আর নৈরাজ্য যেন চলতে থাকে। চোর-পুলিশের ঘুষের খেলা চলছে, দুর্ঘটনা এড়ানোর উপযোগী ট্রেনিংপ্রাপ্ত দক্ষ-ড্রাইভার জনশক্তি কিভাবে গড়া যাবে সে দিকে তাকিয়ে সিস্টেম প্রতিষ্ঠান গড়ার চেষ্টা নেই।
জন্মের ৩৩ বছর পরেও বিআরটিএ এমন দুর্বল ও অকেজো প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণ হল, এই প্রতিষ্ঠানটা ১৯৮৪ সালে শ্রমিকদের দাবির মুখে তৈরি হয়েছে। ফলে তারা ট্রেনিংপ্রাপ্ত দক্ষ-ড্রাইভার জনশক্তি গড়ার পরিবর্তে কিভাবে পয়সার বিনিময়ে এই প্রতিষ্ঠান থেকে লাইসেন্স বা ফিটনেস ‘কিনে নিতে’ পারেন শুরু থেকে সে দিকে ধাবিত হয়েছিলেন। আর জন্ম থেকেই এর সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারীরা এটাই চেয়েছেন। মাঝখান থেকে জনস্বার্থ যেটা ‘যানবাহনে নিরাপত্তা’ সেটা সবার দ্বারা সব ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হয়েছে, হয়ে আসছে। বিআরটিএ’কেও আজ শ্রমিকেরা দেখে বাধাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে, যে তার পেশায় বাধা দেয়। ফলে শ্রমিকেরা চায় এই প্রতিষ্ঠান তাদের ছিটানো পয়সা খেয়ে ও খেতে গোলাম হয়ে থাকুক এই প্রতিষ্ঠান। অথচ দক্ষ জনশক্তি গড়া ও উপযুক্ত লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ হওয়ার কথা ছিল এই প্রতিষ্ঠানের।
তাই পয়সা দিয়ে সেই বাধা অপসারণ সঠিক মনে করা হচ্ছে। দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা, ট্রেনিং নেয়া, দক্ষ-ড্রাইভারসহ জনশক্তি গড়ে তোলা ইত্যাদি এই মূল বিষয়টা এগুলো  যেন বিআরটিএর কাজই নয়। পরিবহন শ্রমিকেরাও মনে করেন না, আশা করেন না এমন সার্ভিস দেয়া বিআরটিএর কাজ। শ্রমিকেরা নগদে বিশ্বাসী, ঠকে ঠকে কাউকে আর সে বিশ্বাস করতে পারেন না। তাই তাদের এখন একজন ‘শাজাহান খান’ দরকার। প্রতিদিন পরিবহন সেক্টরে চাঁদা এত ওঠানো হয় কেন? কারণ শ্রমিক এবং মালিকেরা সব কিছু এই নগদ টাকা দিয়ে কিনে সমাধান করতে চান। টাকা বড় অস্ত্র। অথচ যানবাহনে চলাচলের নিরাপত্তা ফিরলে; চোর-পুলিশের ঘুষের খেলা ফেলে রেখে, দুর্ঘটনা এড়ানোর উপযোগী উপযুক্ত ট্রেনিংপ্রাপ্ত দক্ষ-ড্রাইভার জনশক্তি কিভাবে গড়া যাবে সে দিকে তাকিয়ে সিস্টেম ও প্রতিষ্ঠান গড়ার চেষ্টা হলে ড্রাইভারদেরও জীবন মূল্যবান হতে পারে। মনে রাখতে হবে ড্রাইভারের ফাঁসি হলো কিনা সেটা নয়, যানবাহনে চলাচলের নিরাপত্তা ফিরল কিনা এটাই মূল বিষয়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

[এই লেখাটা এর আগে অনলাইন দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার গত ০৫ মার্চ ২০১৭ সংখ্যায় (প্রিন্টে পরেরদিন) ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল। ]

[এছাড়াও এই প্রসঙ্গে ২০১১ সালে মিশুক-তারেকের দুর্ঘটনা ঘটবার কয়েকদিন পরে আর একটা লম্বা লেখা লিখেছিলাম। যার শিরোনাম ছিল, “আজকের পরিবহন নৈরাজ্য কোথা থেকে শুরু হয়েছিল?”। এটা ছাপা হয়েছিল চার বছর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১১ আমার নিজের সামহয়ার ইন ব্লগে।  ২০১১ সালের এই বিস্তারিত লেখাটাকে বলা যায় চলতি লেখাটার পিছনের পটভুমি। ফলে যাদের হাতে সময় আছে আরও বিস্তারে পড়তে আগ্রহী তারা সামহয়ার ইন ব্লগ থেকে সে লেখা পড়ে আসতে পারেন।]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s