ট্রাম্পের ১০০ দিনের মূল্যায়ন


ট্রাম্পের ১০০ দিনের মূল্যায়ন

গৌতম দাস

০৯ মে ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:৪০

http://wp.me/p1sCvy-2fj

আমেরিকার চলতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জন ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণের ১০০ দিন পূর্ণ হয়ে গেল। তিনি শপথ গ্রহণ করেছিলেন গত ২০ জানুয়ারি। গত ২৯ এপ্রিল সে ক্ষমতার ১০০ দিন পূর্ণ হল। লন্ডনভিত্তিক সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট (২৮ এপ্রিল ২০১৭) বলছে, “আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ১০০ দিনের কাজ ও তৎপরতা মাপার ব্যাপারটা প্রায়ই খুব চাতুর্যপূর্ণ হয়”। (Measuring the performance of presidents is often tricky. ) কথা সঠিক। আসলে এটা যেন নির্বাচনী প্রচারণা শেষ হয়ে গেলেও এর এক সর্বশেষ অংশ। ঐ প্রচারণায় সত্য-মিথ্যা বহু কিছু বলা হয়, আমাদের ঘরোয়া ভাষায় যাকে আমরা চাপাবাজি বলি, এর চূড়ান্ত মাত্রা ঘটতে দেখা যায়। এ ছাড়া, এটাকে কথা বিকৃত (টুইষ্ট) করা অথবা কায়দা করে মিথ্যা বলার এক চূড়ান্ত মহড়াও বলা যায়। আর ‘ক্ষমতার ১০০ দিন হল’ অনেকটা এমন বলা যে, আমরা বেশি মিথ্যা বলিনি। তা আমরা ক্ষমতা পেলেই প্রথমে কী কী করব বলছি, এর তালিকা দেখে বুঝতে পারবেন। বলা যায়, এটা হল – নির্বাচনের মিথ্যা আর চাপাবাজি থেকে প্রথম সংযত হয়ে বাস্তবে ফেরার প্রয়াস। সে জন্য ঐ ১০০ দিনে বেছে কিছু কাজ ও সিদ্ধান্তের তালিকাও প্রকাশ হতে আমরা দেখি।

তাই,  ট্রাম্প “আমেরিকাকে আবার মহান বানাবেন”  – এই লক্ষ্যে প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনার তালিকা একটা ছিল যাতে ১৮ টা সিদ্ধান্ত-পদক্ষেপ নেবার কথা আর কংগ্রেসে ১০টা নতুন আইনের প্রস্তাব আনার কথা লেখা ছিল। এগুলোর মধ্যে গুরুত্বপুর্ণ তিনটা ইস্যুও ছিল – ১. আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে বাস্তবিকই কংক্রিটের দেয়াল তুলে বেআইনি অভিবাসীর অনুপ্রবেশ বন্ধ করবেন, সন্ত্রাস-প্রবণ মুসলমান দেশ থেকে প্রবেশকারীদের আমেরিকার প্রবেশ ঠেকাবেন। (যদিও এখানে কথাটা সন্ত্রাস আর মুসলমান শব্দ দিয়ে পরিচিত করে হাজির করা হয়েছিল। কিন্তু এর আসল উদ্দেশ্য ছিল সন্ত্রাসের কথা তুলে এর আড়ালে আরও কিছু অবৈধ ও চাকরিপ্রার্থী অভিবাসী ঠেকানো/কমানো)। আর চীনের নিজ মুদ্রামান কারসাজি করে আমেরিকার বাজারে নিজ পণ্য প্রবেশের সুবিধা গ্রহণকারী (ম্যানিপুলেটর) হিসেবে করা তৎপরতা বন্ধ করবেন- এমন বিষয়ও ওই ১৮ কাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু প্রকৃত অর্থে ১০০ দিনের ব্যাপারটা কী, তা নিয়ে  তার ঐ লেখায় ‘ইকোনমিস্ট’  কী মনে করে এমন এক ব্যাখ্যা দিয়েছে। সাময়িকী বলছে, “(১০০ দিন) এই সময়কাল আসলে সে বছর প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ব্যবহার কত উঁচুমাত্রায় উঠেছিল তা দেখার একটা সুযোগ। ওই সময়টা আসলে প্রেসিডেন্ট জনপ্রিয়তা উপভোগ করেন, আবার আগের প্রচারণা থেকে নির্বাচন পর্যন্ত পথ চলার পর বিজয়লাভ ঘটে গেলে তাতে তিনি যে জোশ পেলেন, তা ঐ ১০০ দিনে খরচ করেন যাতে এবার তিনি পরের চার বছরের কাজের এজেন্ডা কী হবে, তা ঠিক করেন আর কংগ্রেসকে কী কী আইন পাস করাতে চাপ দেবেন, সে পরিকল্পনা হাতে নেন”। ইকোনমিস্টের কথা একদিক থেকে সঠিক। তবে এর সার কথা হল, বিজয়লাভ করেছ এবার উচ্ছ্বাস থুয়ে বাস্তবের মাটিতে পা নামাও।

ইকোনমিস্ট বলছে, ১০০ দিনের ‘অগ্রগতি খুবই ধীর’ (progress has been slow. )। তবে এর চেয়েও আমাদের আগ্রহ জাগায়, এমন ব্যাপার হল, ইকোনমিস্ট নিজের উদ্যোগে ২২ এপ্রিলে করা, আমেরিকান নাগরিকের ওপর এক সার্ভের খবর দিয়েছে আমাদের। অবশ্য এটা ছোট স্যাম্পলের, ১৫০০ জন। আর ওখানে যাচাইয়ের বিষয় ছিল – “প্রেসিডেন্ট উত্তরদাতাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছেন কিনা”। জবাবদাতাদের মধ্যে ওখানে বড় একটা ভাগ হল, কারা নিজেদের ডেমোক্র্যাট/রিপাবলিকান হিসেবে অর্থাৎ কারা নিজের পার্টিজান পরিচয় দিয়েছেন আর কারা দেননি। সে হিসেবে কোনো না কোনো পার্টিজান পরিচয় যাদের আছে, তাদের মধ্যকার ৩০ শতাংশ মনে করেন, তাদের আশা পূরণ হয়েছে। কিন্তু যারা ওই ৩০ শতাংশের বাইরে (মানে বাকি ৭০ শতাংশ) তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি মূল্যায়ন দেখা গেছে। যেমন এই ৭০ শতাংশের ৪১ শতাংশ ডেমোক্র্যাট আর ২৮ শতাংশ রিপাবলিকান, যারা সবাই পার্টিলাইনে মন্তব্য করেছেন। ডেমোক্র্যাটরা বলেছেন, তারা আকাঙ্খা যা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট তার চেয়ে খারাপ করেছেন। বিপরীতে রিপাবলিকানরা বলেছেন, তারা আকাঙ্খা যা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ‘তার চেয়ে ভালো’ করেছেন। তবে ইকোনমিস্ট বলছে, এটা আসলে প্রেসিডেন্টের পক্ষে জনমত কেমন (যেটাকে রেটিং বলে) তার প্রকাশ। ট্রাম্প বর্তমানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের আমেরিকার প্রেসিডেন্টদের মধ্যে সবচেয়ে কম রেটিংয়ের প্রেসিডেন্ট। তবে এই রেটিং একেবারে দলভিত্তিক। রিপাবলিকানদের মধ্যে ৮৮ শতাংশ রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টকে অনুমোদন করেছেন। ওদিকে ডেমোক্র্যাটদের ৮২ শতাংশ প্রেসিডেন্টকে অনুমোদন করেন নাই।

এখন এসবের বাইরে, আমেরিকার রাজনীতির প্রত্যেকটি ইস্যুভিত্তিক বিচারে যদি আসি, তবে এই ১০০ দিনে সেগুলোর হাল-দশা কী, এই বিচারে বলতে হয়,
০১. মেক্সিকো প্রাচীর : স্বভাবতই শুরুতেই ট্রাম্পের সাথে এই ইস্যুতে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের বিরোধ ঘটেছিল। যে দুই রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাথে ট্রাম্পের প্রায় প্রকাশ্যে বিরোধ হয়েছে সে দুটো হল, অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকো। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের সাথে ট্রাম্পের অন্য বিরোধের ইস্যুও আছে। ট্রাম্পের দাবি মতে, বলা বাহুল্য ওই প্রাচীর বানানোর খরচ দিতে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট অস্বীকার করেছিলেন। আর মেক্সিকান পাবলিকের দিক থেকে দেখলে তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিলেন; কারণ মাইগ্রেট করে আমেরিকায় প্রবেশের ওপর কড়াকড়ি তাদেরকেই ক্ষতিগ্রস্থ করে। এই বিরুদ্ধে চলে যাওয়া, এটাই আবার মেক্সিকার প্রেসিডেন্টের পক্ষে দেয়া নাগরিকদের সমর্থন হিসেবে হাজির হয়েছিল।  এ’ব্যাপারে সর্বশেষ হল, নিজ খরচে “প্রাচীর গড়ে পরে মেক্সিকোর কাছ থেকে অর্থ কেটে” নিবেন ট্রাম্প – এরও কোনো খবর নেই। কারণ কংগ্রেস এক ট্রিলিয়ন ডলারের যে বাজেট পাস করেছে, সেখানে পরিষ্কার উল্লেখ করে দিয়েছে, এর অর্থ দিয়ে ঐ প্রাচীর নির্মাণ করা যাবে না।

০২. মুসলিম নিষেধাজ্ঞা (মুসলিম ব্যান) : সবচেয়ে বেশি প্রচারিত ট্রাম্পের এই উদ্যোগ নেয়া এবং ব্যর্থ হওয়ার খবর আমরা প্রায় সবাই দেখেছি। ট্রাম্প এ বিষয়ে দু’বার নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু দু’বারই তা ফেডারেল আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে এর কার্যকারিতা স্থগিত হয়ে যায়। আদালতে তা চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবার পক্ষে  মূল যুক্তি ছিল “কেবল মুসলমানদের” টার্গেট করে এই নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। ফলে তা বৈষম্যপুর্ণ, সুতরাং  কনস্টিটিউশন বিরোধী। অর্থাৎ এই ইস্যু এখন আদালতের হিমঘরে। মনে হয় না আর কখনো এটা জাগবে।

০৩. ন্যাটো একটা অচল প্রতিষ্ঠান : নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছিলেন, ন্যাটো কোল্ড ওয়ার যুগের প্রতিষ্ঠান; যখন সোভিয়েত ইউনিয়নকে পশ্চিম নিজের জাতশত্রু মনে করে এর বিরুদ্ধেই ন্যাটো বানানো হয়েছিল। কোল্ড ওয়ার আর সোভিয়েত ইউনিয়ন দুটোই এখন ‘নাই’ হয়ে গেছে। ওদিকে, ‘গ্লোবাল ওয়ার অন টেরর’ এখন মুখ্য ইস্যু। ফলে এত পয়সা খরচ করে ন্যাটো রাখার কী দরকার! এই বুঝের ওপর দাঁড়িয়ে তাই শপথ নেয়ার মাত্র ১৩ দিনের মাথায় তিনি বলে বসেন, ন্যাটো একটি অচল প্রতিষ্ঠান। আর এই গত মাসে ১২ এপ্রিল তিনি উল্টা বলেন, “ন্যাটো আর অচল প্রতিষ্ঠান নয়”। কেন এমন করলেন? ব্যাপারটা পাবলিকলি আনা হয়নি। তবে ইউরোপের দিক থেকে ব্যাপক দেনদরবার হয়েছে বলে এই ‘উলটো কথা’। তবে ন্যাটোর সেক্রেটারী জেনারেলের সঙ্গে মিটিং শেষ করে প্রেসের সামনে ট্রাম্প বলেন, আপনারা (ন্যাটো সদস্যরা)  সিরিয়ায় আমার ৫৯ টা মিসাইল নিক্ষেপে হামলার কাজ ও সিদ্ধান্ত সমর্থন করেছেন সেজন্য ধন্যবাদ। এবং “ন্যাটো আর অচল প্রতিষ্ঠান নয়”
যদিও এমন ধরণের কথার পেছনে মূল কারণ হল – খরচের বিষয়, এসব প্রতিষ্ঠান চালানোর  সিংহভাগ  খরচ আমেরিকাকে একা বইতে হয়। এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অন্য রাষ্ট্রে যেখানেই মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আছে (জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া. অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি) এর খরচও আমেরিকা একা বহন করে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে সেই থেকে আমেরিকা এক এম্পায়ার আমেরিকা, দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মাতব্বর হিসেবে উঠে এসেছিল। মাতব্বরদের বহু অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হয়, কমিউনিটি-দুনিয়ার দায় একা বহন করতে হয়। ফলে এভাবেই এতদিন চলে আসছিল। এ ছাড়াও একটা এম্পায়ার- সাম্রাজ্য মোড়লিপনা চালানো বেশ জটিল। যেমন দক্ষিণ কোরিয়াকে উদাহরণ হিসাবে নেয়া যাক। সেখানে আমেরিকা নিজের (THAAD) থাড অ্যান্টি মিসাইল ব্যবস্থা বসিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার হাত থেকে দক্ষিণ কোরিয়াকে, অর্থাৎ নিজ মিত্রকে রক্ষার জন্য। কিন্তু এটা বসানোর জায়গা দেয়া ছাড়া অ্যান্টি মিসাইল ব্যবস্থা বসানোর আর কোনো খরচ কোরিয়া বহণ করে না, সব খরচ আমেরিকাই বহন করে। বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমেরিকা চাইছে, এই ‘ঐতিহাসিক’ দায় থেকে বেরিয়ে আসতে। কিন্তু একথার মানে কি, আমেরিকার মাতব্বরিও ত্যাগ করতে চাইছেন তিনি? অবশ্যই ঠিক তা নয়। তবে তাঁর প্রথম বিবেচনা হচ্ছে, আমেরিকাকে এই খরচের বোঝা কমাতে হবে। তাতে মাতব্বরি কিছু কমে যাবে কিনা সেটা পরে দেখা যাবে। মাতব্বরি কমলে কী হবে, সেটা যুক্তরাষ্ট্র মানতে তৈরি কিনা, তা দ্বিতীয় বিবেচনা। কিন্তু বাস্তবতা হল, চাইলেও ট্রাম্প সে খরচ তুলে আনতে পারছেন না। কারণ থাড অ্যান্টি মিসাইল ব্যবস্থার পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা এখন পুরাপুরি আমেরিকান বাহিনীর হাতে। ট্রাম্প সম্প্রতি এর এক বিলিয়ন ডলার দাম চেয়েছেন কোরিয়ার কাছে; কিন্তু এটা কি আমেরিকা বিক্রি করতে চাইছে, নাকি এটা বিক্রিযোগ্য বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে? জবাব হলো, না। এই সিরিয়াস টেকনোলজি আমেরিকা কোনো ঘনিষ্ঠ মিত্রকে বা আসলে কাউকেই বিক্রি করতে চায় না। এদিকে, দঃ কোরিয়া বলছে, আমরা চাইলেও তো অর্থ দিতে পারছি না। আগে তোমরা বিক্রির সিদ্ধান্ত নাও। তবেই না! এ ধরনের বহুবিধ টেকনিক্যাল সমস্যা আছে, যেসবের কারণে শুরু থেকেই আমেরিকা নিজে থেকেই যেচে এর খরচ বহন করে থাকে। তাই ট্রাম্পের আমেরিকা চাইলেই এখান থেকে আমেরিকাকে বের করে নিতে পারবে না। অন্তত সেটা একেবারে সহজ কোন কাজ নয়। তাই ট্রাম্পের ১০০ দিনের অন্যতম ব্যর্থ ইস্যু এটা।

০৪. চীন ইস্যু : চীনকে ‘ঝাড়ি’ মারতে গিয়ে ট্রাম্প এখন উলটো ‘কেঁচো’ হয়ে গেছেন। আসলে ট্রাম্প এখন উলটো চীনকে দেখছেন তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাফল্য আনার এক উপায় হিসেবে। চীনকে যতটা সম্ভব পক্ষে নিয়ে উত্তর কোরিয়া ইস্যুর যদি একটা সুরাহা করা যায় তবে সেটা সত্যি সত্যিই আগের প্রেসিডেন্টদের তুলনায় ট্রাম্পের একটা বিরাট সাফল্য বলে বিবেচিত হবে। ট্রাম্প পাগলা হলেও এটা বুঝতে তাঁর দেরি হয় নাই। কিন্তু এটা তো ১০০ দিনের অর্জনের বিষয় নয়। সম্ভাব্য অর্জনের তালিকায় নাই। বরং ওখানে চীনকে যেভাবে ভিলেন হিসেবে হাজির করে লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল, চীনের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে উগ্র জাতীয়তাবাদী আমেরিকা খাড়া করানো হবে বলা হয়েছিল- সেটা তো একেবারেই হয়নি। করা যায়নি।  কারণ শত্রু ঠাহর করায় ভুল ছিল। ট্রাম্প এখন চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে তার সম্পর্কের ‘ভালো কেমিস্ট্রির’ কথা বলছেন। কিন্তু তবু তাতে তো এটা আর- ‘আমেরিকা ফাস্ট’-এর অবস্থান থাকল না। এটা হয়ে গেছে আসলে উলটা – ‘গ্লোবাল আমেরিকা’র পক্ষে অবস্থান। মানে, ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির হার।

০৫. বাণিজ্য জোট (নাফটা, টিপিপি) ত্যাগ : ঘোষণা দিয়ে বাণিজ্য জোট ত্যাগের ঘটনা ঘটানো সহজ, আর তা ঘটেছে। ফলে ১০০ দিনের কাজ হিসেবে এই ইস্যু সফল। কিন্তু এর ফলাফল কি সুখপ্রদ? এর জবাব হল, না। আসলে এই তর্কে গোড়ার প্রশ্ন যদি করি, বিজয়ী ট্রাম্প জাতিবাদী আমেরিকা হিসেবে হাজির হয়েছিলেন। এর অর্থ, খোদ আমেরিকাই আর গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে থাকবে না, এই সিদ্ধান্ত। এই বিচারে এখন বলা যায়, তিনি নিজে গ্লোবালাইজেশনের পক্ষেই থেকে গেছেন। অবস্থান তিনি একচুলও সরাতে পারেননি। বরং তার নীতির প্রায় সব ঝোঁক ওবামার নীতি অবস্থানে ফেরত যাওয়ার দিকে (বিশেষ কতগুলো ছাড়া)। সিএনএন মানি জানাচ্ছে,   নতুন করে নাফটা নিয়ে কথা বলা আর নতুন নিগোশিয়েশন শুরু করতে চাইছে ট্রাম্পের আমেরিকা। আর ট্রাম্পের উপদেষ্টারা এখন বিতর্ক করছেন কত দ্রুত নাফটা আলাপ শুরু করা যায়, এর সম্ভাব্য উপায় কী।  আর ‘বিশেষ কতগুলো’ কথাটা ভারতের সাথে বাণিজ্য-বিনিয়োগ সম্পর্কের দিকে তাকিয়ে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের হাত থেকে আমেরিকানদের চাকরি উদ্ধার বা কাজ ফেরানো এবং সে লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন, তা কিন্তু এগিয়েই চলছে; আগের মতই। এজন্য মোদি আগামী মাসের মধ্যে ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাতের জন্য খুবই চেষ্টা করছেন।

০৬। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা প্যারিস চুক্তি থেকে বের হয়ে আসা : বের হয়ে আসার প্রক্রিয়া চলছে বটে; তবে ধীরগতিতে আর ভাষা নরম করে। তবে কানাডা থেকে পাইপলাইনে (পরিবেশগতভাবে নোংরা এবং বিপর্যয়ের হুমকির কারণে বিপজ্জনক) তেল আনার বিষয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, পাইপ প্রস্তুতে আমেরিকান স্টিল সেখানে ব্যবহার করাবেনই। অর্থাৎ আমেরিকা ফাস্ট নীতি কার্যকর করবেনই তিনি এখানে। কিন্তু না, এখানে ট্রাম্প ব্যর্থ। তিনি আমেরিকান স্টিল ব্যবহার করাতে পারেননি। বরং এবিষয়ে নিজের নির্বাহী আদেশ বদলাতে হয়েছে তাঁকে।
আরো এমন অনেক পয়েন্ট তোলা যায় কিন্তু এখানেই শেষ করছি। এক কথায় বললে,  শপথ গ্রহণের দিনের বক্তৃতায়  ট্রাম্প যেভাবে পূর্বসূরি প্রেসিডেন্টদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বা বোকা ভেবে তাদের নীতির তুলোধুনা করেছিলেন, আর ক্ষমতা পেলেই সব বদলে ফেলার হুঙ্কার দিচ্ছিলেন, তা ১০০ দিন বা সাড়ে তিন মাসেই ফানুসের মতো চুপসে গেয়েছে। বলা যায়, চাপাবাজি আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবের মাটিতে পা দিতেই সব ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

অনলাইন ‘মিডলইস্ট আই’ পত্রিকা ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলছে, ট্রাম্পের উল্টামুখিতার আংশিক ব্যাখ্যা হিসাবে বলা যায়-  এর কারণ হোয়াইট হাউজের ভেতরের রেডিক্যালেরা যেমন স্টিভ ব্যানন, মাইক ফ্লিন, কেটি ম্যাকফারল্যান্ড- এরা হয় পদত্যাগ করেছেন, না হলে সাইডলাইনে চলে গেছেন। ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে ম্যাকমাস্টার আসাতে তিনি বহু কিছুকেই ফ্যাক্টবেজ করে ফেলেছেন। ফলে “রেডিক্যাল বা রাইট উইং দের” এই পতনকেই আমরা ট্রাম্পের উল্টোমুখিতা হিসেবে বাইরে থেকে দেখছি। আর এর আর এক বিপরীতের ঘটনা হল, “ট্রাম্পের মেয়ে ইভাঙ্কা, ট্রাম্পের জামাই কুশনার আর শীর্ষ অর্থনৈতিক পরামর্শক গ্রে কোহেন যারা মূলত গ্লোবালিস্ট; এদের অবস্থান ক্রমেই উঁচুতে জেঁকে বসছে। তবে ট্রাম্প পরিবর্তনের এই অভিমুখ নেয়াতে তিনি রিপাবলিকান দলের ধূর্তদের বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন ওরাই কিন্তু তাকে নির্বাচনী লড়াইয়ে বিজয়ী হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন”। খুবই খাটি কথা গুলো এখানে তুলে আনা হয়েছে। দেখা যাক এটা ট্রাম্পকে কোথায় নিয়ে যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় ০৭ মে ২০১৭ (প্রিন্টে পরের দিন)। আজ এখানে তা আবার আপডেট, এডিট করে থিতু ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s