ট্রাম্প কি আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে নিতে যাচ্ছেন

ট্রাম্প কি আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে নিতে যাচ্ছে্ন

গৌতম দাস

২৯ আগস্ট ২০১৭,মঙ্গলবার, ০০:০১

http://wp.me/p1sCvy-2hm

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প জানাচ্ছেন তিনি আমেরিকাকে আবার  নতুন করে আফগানিস্তানের যুদ্ধে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।  গত সপ্তাহে ২১ আগষ্ট তিনি নতুন করে দেয়া তার আফগান পলিসি ঘোষণা করেছেন, আর তাতে  নতুন করে আবার আরও সৈন্য পাঠানোর ইচ্ছা জানিয়েছেন।  স্বভাব সুলভ হামবড়া ভাবে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প প্রায়শই নিজেকে এক মশকরার পাত্র বানিয়ে ফেলেন। এখানেও ট্রাম্প তার নতুন ‘আফগান নীতি’ তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, “আমরা এবার সেখানে আর আফগান রাষ্ট্র গড়তে যাচ্ছি না, আমরা যাচ্ছি টেররিস্ট মারতে”। [“We are not nation building again. We are killing terrorists.”] বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক মিডিয়া ট্রাম্পের আফগান যুদ্ধে নবপ্রবেশকে ঠাট্টা তামাশা করে বা খোঁচা দিয়ে হাজির ধরেছে। প্রকারন্তরে যার অর্থ তারা কেউই যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারটা সিরিয়াসলি দেখছেন না।

“I provide my input through the chain of command,” Gen. John Nicholson said during a news conference in Kabul on Thursday. Credit Rahmat Gul/Associated Press

তাহলে কী খোদ ট্রাম্পের কথার ভিতর সিরিয়াস-নেসের অভাব আছে? হা, সম্ভবত তাই। আর সেজন্য এই প্রশ্নও জাপানের  থিঙ্কট্যাঙ্ক  ম্যাগাজিন ডিপ্লোমেটিক পত্রিকার এক আর্টিকেলে তোলা হয়েছে। এই পত্রিকায় ছাপা হওয়া দুটা আর্টিকেলই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে নেতিবাচকভাবে নিয়েছে। ফলে সবমিলিয়ে  আবার আমেরিকাকে আবার আফগানিস্তানে নিবার ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত – এর মানে আফগানিস্তান কী টেররিজমের ইস্যু না ব্যবসা বাগিয়ে নিবার ইস্যুই সে প্রশ্নও উঠেছে।

গত ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে আফগান যুদ্ধ থেকে সব সৈন্য ফিরিয়ে নিবার প্রেসিডেন্ট ওবামার সিদ্ধান্ত ও তা বাস্তবায়নের পরেও ফেলে ছড়িয়ে আফগানিস্তানে এখনও আসাড়ে আট হাজার সৈন্য আছে। আমেরিকান এক জেনারেল জন নিকলসনের নেতৃত্বে এই সৈন্যরা সেখানে আছেন। ওদিকে  ট্রাম্পের ক্ষমতাগ্রহণও অষ্টম মাসে পড়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত  ঐ জেনারেলের সাথে ট্রাম্পের কোন সাক্ষাত ঘটে নাই। যদিও ট্রাম্প নতুন আফগান নীতি দিয়ে দিলেন। ব্যাপারটাকে নিয়ে তাই নিউইয়র্ক টাইমসের প্রচ্ছদে ঐ জেনারেলের ছবি দিয়ে প্রশ্ন রেখেছে, এমন আফগান নীতিতে – “এ’এক আজীব সম্পর্ক!” সিএনএনও এক মশকরা রিপোর্ট ছেপেছে, “আফগানিস্তান সম্পর্কে ট্রাম্পের চিন্তার ইতিহাস” এই শিরোনামে।  গত ২০১১ সাল থেকে চলতি সময় পর্যন্ত ট্রাম্প আফগানিস্তান নিয়ে যত মন্তব্য করেছেন তার ক্রমিক ইতিহাস এটা।  সেখানে ট্রাম্পের মন্তব্যগুলো হল যেমন,  ‘অর্থ বরবাদের জায়গা আফগানিস্তানে’ বা  ‘আফগানিস্তান এক বিপর্যয়ের নাম’, অথবা ‘আমাদের  এখনই আফগানিস্তান ছেড়ে আসা উচিত’ ইত্যাদি থেকে শুরু হয়ে শেষে ২০১৭ সালে এসে গত ১৯ আগষ্ট তিনি টুইট লিখছেন, “ট্যালেন্টড জেনারেলদের সাথে ভাল সময় কেটেছে আফগানিস্তানসহ অনেক ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছি”। অথচ এই ট্রাম্প নিজেকে এতদিন ন্যাশনালিস্ট অবস্থান নিয়েছেন মনে করে তিনি আফগানিস্তানে আমেরিকান সৈন্যের যুদ্ধ করাসহ এমনকি বিভিন্ন দেশে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে) আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি বজায় রাখবার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এসব রাষ্ট্রিয় খরচের উদ্দেশ্য- ন্যায্যতা জানতে চেয়ে এসেছেন। তার আগেকার টুইটগুলোই সেসবের প্রমাণ। তাই তিনি নিজের ‘আফগান পলিসি’ ঘোষণা করতে গিয়েও স্বীকার করছেন যে নিজের ব্যক্তি অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি এটা করছেন।

আমেরিকার আফগানিস্তানে হামলার আর ‘ওয়ার অন টেরর যুদ্ধের নেতা ছিলেন জর্জ বুশ। কিন্তু এতে তিনি আমেরিকাকে এক অসীম এবং কখনও শেষ হবে না এমন যুদ্ধের ভিতর ঢুকিয়ে ফেলেছিলেন। নিজেও আটকে পড়েছিলেন। আফগানিস্তানে আমেরিকান হামলার মুল লক্ষ্য কি ছি তা স্মরণ করিয়ে দিতে সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক কমেন্টেটর পন্ডিত লিখছেন মূলত, “আফগানিস্তান থেকে আলকায়েদা ততপরতা ও তাদের নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা, তাদের শীর্ষ নেতাদেরকে হত্যা করা, তাদের অর্থ সরবরাহ ও লেনদেনের নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা ইত্যাদি ছিল আফগানিস্তানে আমেরিকান সামরিক হামলার মৌলিক লক্ষ্য উদ্দেশ্য”। কিন্তু ১৬ বছরের এই যুদ্ধে সেই লক্ষ্য উদ্দেশ্যের কিছুই অর্জিত হয় নাই। অথচ ইতোমধ্যে যুদ্ধে প্রত্যক্ষ জীবন দিয়ে ফেলেছে ২৪০০ আমেরিকান সৈন্য, এই পর্যন্ত ১৬ বছর ধরে  বহণ করা হয়েছে ঐ যুদ্ধের খরচ, আর তাতে মোট ব্যয় হয়ে গেছে প্রায় ১.০৭ ট্রিলিয়ন বা ১০৭০ বিলিয়ন ডলার। শুধু তাই নয় আমেরিকান অর্থনীতির যে বিরাট ক্ষতি হয়েছিল যেটার আঁচ গ্লোবাল অর্থনীতিতে গিয়ে লেগেছিল তাতে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দাও দেখা দিয়েছিল।  এর আগে বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৩০ সালে ঘটা প্রথম গ্লোবাল মহামন্দার পরে সেটাই ছিল দ্বিতীয়বার ২০০৭-৮ সালের মহামন্দা। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল ইউরোপ আমেরিকা। ফলে পুরা পশ্চিমাসহ এর প্রভাবে দুনিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো মহামন্দায় কম-বেশি ডুবে গেলেও তখনও আলোর বাতি হয়ে টিকেছিল চীন; যদিও চীনের ডাবল ডিজিটের জিডিপি সেখান থেকে নেমে সিঙ্গেল ডিজিটে, অর্থাৎ কম হারে এসে গেলেও তা ভালর দিকে অর্থাৎ তখনও চীনের অর্থনৈতিক গ্রোথ ছিল ইতিবাচক। অবশ্য  ততদিনে আমেরিকান এক সরকারি গবেষণা, এক সার্ভে ষ্টাডিতে এটা পরিস্কার হয়ে গেছিল যে আমেরিকা আর একক পরাশক্তি থাকতে পারছে না। তবে অন্য আর চার বা পাঁচ পরাশক্তির অন্যতম একটা হতে যাচ্ছে মাত্র। আর চীনের অর্থনীতি এবার আমেরিকান অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে চলে যাবে। এসব আগাম অনুমানগুলোর বাস্তব লক্ষণ দেখতে পাওয়া শুরু হয়েছিল আমেরিকান অর্থনীতির ঐ পতন শুরুর কালে। ফলে বুশকে যদি বলা হয় আমেরিকাকে এক অনন্ত যুদ্ধে প্রবেশের রূপকার তবে এথেকে আমেরিকাকে বের করা আনার ত্রাতা হলেন বারাক ওবামা। গত ২০০৭ সাল মানে বুশের আমল থেকেই যুদ্ধ করে কী লাভ-ক্ষতি হল এর নানান মুল্যায়ন শুরু হয়েছিল। বলা বাহুল্য অর্জন বা লাভক্ষতির এসব মুল্যায়ন হিসাবগুলোতে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে আমেরিকা অর্থহীন ততপরতার এক বিশাল ফাঁদে আটকা পড়েছে। কোন লক্ষ্যই মূলত অর্জিত হয় নাই। ফলে  এখান থেকে আমেরিকাকে বের করা উদ্ধার করার সিদ্ধান্ত আসে বা তা নিতে হয় ততদিনে নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে। তিনি আমেরিকান সৈন্য ফিরিয়ে আনার জন্য উলটা হিসাব করে আগে একটা তারিখ ঠিক করেছিলেন। না সেটা, আর কত দিনের যুদ্ধে বা কবে কবের মধ্যে  কী কী অর্জন করতে হবে এর তালিকা না। তিনি মাপলেন যুদ্ধ চালিয়ে যাবার সামর্থ  আমেরিকান অর্থনীতির আর কতদিন আছে যাতে সেফ থেকে অর্থনীতির বড় ক্ষতি না করে যুদ্ধ সমর্থন করেও সহি সালামতে ফিরে আসা যাবে। সেই হিসাবে ২০১২ সালেই তিনি যুদ্ধের কাট-অফ তারিখ ঘোষণা করে দিয়েছিলেন; আর সে তারিখ হল ২০১৪ সালের ডিসেম্বর। অর্থাৎ এই তারিখের মধ্যে যুদ্ধের লক্ষ্য কিছু অর্জিত হলে ভাল; কিন্তু তা না হলেও সৈন্যরা বাড়ি ফিরে আসবেই – এটা নির্ধারিত করে ফেলেন তিনি। তবে কেবল সামরিক কাঠামোটা ধরে রাখার জন্য আর কেবল কিছু ট্রেনিং এর উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ দশ হাজার আমেরিকান সৈন্য আফগানিস্তানে রেখে দিবার সিদ্ধান্ত নেন। বাস্তবে সেটাই হয়ে আছে, এখন সাড়ে আট হাজার সৈন্য আছে। এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারার জন্য ওবামা সেই থেকে বুশের ত্রাতা হয়ে আছেন। এই প্রেক্ষিতে বলা যায় ট্রাম্পের ত্রাতা কে হবেন তা কী তিনি আগে ঠিক করেছেন?

গত ১০ জুলাই রয়টার্স এক মন্তব্য প্রতিবেদন ছেপেছিল। কারণ ততদিনে ট্রাম্পের নতুন আফগান নীতি কেন আসছে না তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়ে গেছিল। ঐ রিপোর্টর তার প্রথম বাক্যে লিখেছে, “বিদেশ নীতি সার্কেলে প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিস, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাকমাস্টার আর সেক্রেটারি অফ স্টেট টিলারসন – ট্রাম্প প্রশাসনের এই তিনমুর্তি যে  আফগানিস্তান ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবার সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেক, এই নীতির পক্ষে প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করার বড় মুরুব্বি, এটা সবাই জানে। মাত্র তিন বছরের মাথায় এরা চায় আমেরিকা তার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলুক”। অর্থাৎ এরা হলেন যুদ্ধের দামামা বাজানোর পক্ষে মুল হোতা।  রয়টার্সের ঐ রিপোর্টে লিখছে একমাত্র ট্রাম্পের প্রাক্তন চীফ ষ্ট্রাটেজিষ্ট স্টিভ ব্যানন যাকে গ্লোবালাইজেশন বিরোধী ন্যশনালিস্ট, ‘সাদাচামড়া্দের শ্রেষ্ঠত্বতা ফেরি করার  নেতা ইত্যাদি বলা হয় একমাত্র তিনি ছিলেন সঠিক নীতির লোক।  কারণ তিনিই একমাত্র ছিলেন এর বিপক্ষে। তিনিই ট্রাম্পকে আফগানিস্তানে ফিরে যাবার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সাবধান করেছিলেন। আসলে ঐ রিপোর্ট বলতে চাইছে যে ট্রাম্পের এই আফগান নীতি ঠিক হয় নাই। স্টিভ ব্যাননকে অনেক আগেই ট্রাম্প হোয়াইট হাউস থেকে বের করে দিয়েছেন। ফলে ঐ রিপোর্টের ভাষ্য হল আমরা স্টিভ ব্যাননের বাকি সব ইস্যুতে একমত না হতে পারি কিন্তু তিনিওই পারতেন প্রেসিডেন্টকে আফগানিস্তানে ফেরত যাবার সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকতে।

আসলে যুদ্ধবাজদের প্রেসিডেন্টকে  প্রভাবিট করে ফেলার  ঘটনার স্পষ্ট হতে শুরু হয়েছিল বর্তমান আমেরিকান ‘সিনেটের আর্মস সার্ভিস কমিটির’ শুনানি বৈঠকে গত জুন মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিস সেখানে সাক্ষ্য দিতে আসার সময় থেকে।  আফগানিস্তানে আমেরিকার সৈন্যদের নেতা জেনারেল নিকলসন তিনি ঐ শুনানিতে স্পষ্ট করে বলেন যে, “সামর্থের অভাবে আমরা সেখানে ‘স্টেলমেটে’ মানে কেউ জিতে নাই এমন একটা স্থবিরতার মধ্যে আটকে আছি”। ফলে একথার পরে  সেখানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিসও তার স্বাক্ষ্যে বলা সহজ হয়ে যায় যে “আমরা আফগানিস্তানে জিততে পারছি না। তবে আমরা এটা সংশোধন করব”। এই সংশোধন করার কথা  থেকেই ঐ সিনেট কমিটি চেয়ারম্যান ম্যাককেইন ম্যাট্টিসকে ধরে বসেন যে জেনারেলদেরকে তাহলে এখন যুদ্ধের একটা নতুন স্ট্রাটেজি দিতে বলেন; না হলে তো সিনেট থেকে কোন থিতু মিলিটারি বাজেট দেয়া সম্ভব না। কিন্তু জেনারেলদের জন্য আসল সমস্যা হল অন্যখানে। এই যুদ্ধের মূল যে লক্ষ্য ছিল যে “আলকায়েদার সব কিছু উপড়ে ফেলা বা সমাপ্তি ঘটানো” সেটা কী জেনারেলদের পক্ষে দিন তারিখ দিয়ে বলা ও করা সম্ভব যে কবে এই লক্ষ্য অর্জিত হবে! যেই লক্ষ্য বিগত ১৬ বছরে কিছুই অর্জিত হল না তা এখন জেনারেলদের পক্ষে কী দিন তারিখ আর যুদ্ধকৌশলসহ বয়ান করে বলা সম্ভব। সেকথা এখানে আমল করা হয় নাই। যেমন  একটা কথা। আফগানিস্তানে আমেরিকার সর্বোচ্চ সেনাবাহিনী একসময় ছিল একলাখ চুয়াল্লিশ হাজার। অথচ এখন যে সৈন্য বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্প বলছেন এটা তারা প্রকাশ করবেন না। কিন্তু ইনফরমালি সেই সংখ্যা হল আগের সাড়ে আট হাজারের উপর আরও বড়জোর মাত্র পাঁচ হাজার। তাহলে তাতে হবে সাড়ে তের হাজার। অথচ এই সাড়ে তের হাজার সৈন্য এরা কী একলাখ চুয়াল্লিশ হাজার সৈন্যের সমতুল্য ফলাফল  আনতে পারে? পারা সম্ভব? তা ভেবে দেখা হচ্ছে না। তাহলে এখনই নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজানো হচ্ছে কেন? ব্যাপারটা কী এমন যে, খুব সম্ভবত যুদ্ধ শুরু হলে ছোটবড় যে সব ঠিকাদারি কাজ বা সরকারি ব্যয় সচল হয়ে উঠবে তার সুফলভোগী সংশ্লিষ্ট লোকজনের স্বার্থের ততপরতা এগুলা। তাই এপ্রসঙ্গে জাপানের ডিপ্লোম্যট ম্যাগাজিনের এক আর্টকেল প্রশ্ন রেখেছে যুদ্ধের লক্ষ্য কী, আর এর টাইমটেবিল ও বাজেট কী সে সম্পর্কে যথেষ্ট যাচাই না করে কেন এই অনুমোদন দেয়া হচ্ছে।[the President “has given in to the Pentagon’s incessant demand of ceaseless war in Afghanistan and linking troop drawdown to conditions rather than an arbitrary timeline”.]

সবশেষে ট্রাম্পের এই প্রসঙ্গে পাকিস্তানকে দেয়া এক হুমকি কথা বলে শেষ করব। ট্রাম্প পাকিস্তানকে অনেকটা ‘ভাল হয়ে যেতে’ বলেছেন। আর বলা বাহুল্য তা শুনে ভারত খুবই খুশি হয়েছে, স্বাগত জানিয়েছে। বিষয়টা হল, হাক্কানি নেটওয়ার্ক এই আফগানি তালেবানদের ব্যাপারে নাকি পাকিস্তান কঠোর না – এই অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা। ব্যাপারটা অনেক পুরানা এবং গভীর। যদিও এপ্রসঙ্গে ভারতের সহজ ব্যাখ্যাটা হল এরকম যে, পাকিস্তান বা এর জেনারেলেরা সব সময় জঙ্গীবাদকে প্রশ্রয় দেয় সেটা এবার ট্রাম্পও বুঝেছে ও তিনি সরব হয়েছে। কিন্তু খুব সম্ভবত ব্যাপারটা এত সরল না। আর এসব বিষয়ের জট মোকাবোলা করার পথ এটা নয়।  আফগানিস্তানের তালেবানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নন-একশন থাকার অভিযোগ তা সত্য হলে খুজে দেখতে ও পরিস্কার করে বুঝতে হবে যে পাকিস্তানের কোন কৌশলগত কারণে ও স্বার্থে সে এমন করছে। এব্যাপারে আমেরিকার স্বার্থ যা তাই পাকিস্তানেরও স্বার্থ হতেই হবে তা ধরে নেয়া ঠিক নয়।  পাকিস্তানের স্বার্থ বলেও তো আলাদা কিছু থাকতে পারে, আছে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ ফলে তা থেকে ভিন্ন ভিন্ন ষ্ট্রাটেজি থাকে। তবে চাইলে সেগুলো একসাথে  সমন্নিত করে একটা একই কৌশল নির্ধারণ করা সম্ভব যার ভিতর সবাইকে নিয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু এই সমস্যা হুমকি দিয়ে মিটবে না। স্ট্রাটেজিক স্বার্থের ফারাক তো ধমক দিয়ে মিটবে না।  আর আমেরিকার এক পুরান খাসলত হল আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের বিরোধ আমেরিকা এতদিন পাকিস্তানকে অর্থ সাহায্যের লোভ দেখিয়ে ভুলে থাকতে বলেছিল। কিন্তু  এবার পাকিস্তান সে অর্থও নেয় নাই, স্বার্থও ছাড়ে নাই। মোট বরাদ্দ ছিল ৮০০ মিলিয়ন। এপর্যন্ত ৫০০ মিলিয়ন বতরণের পরে বতর্ক লেগে আর বাকিটা পাকিস্তান নেয় নাই বা আমেরিকা আর ছাড় করে নাই। আর মূল কারণের কথা যা জানা যায় তা হল, পাক-আফগান সীমান্তে  কলোনি বৃটিশ যে ডুরান্ড লাইন টেনেছিল তা নিয়ে আফগান আপত্তি আছে বলে প্রায়ই কথা উঠে।  ফলে তালেবান ইস্যু ঠান্ডা হয়ে গেলে আফগানিস্তান সীমান্ত ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে বিরোধে মনোযোগি হয়ে উঠবে বলে পাকিস্তানের আশঙ্কা আছে। তাই সে আফগান তালেবান পুরাপুরি ঝেটিয়ে বিদায় করতে আগ্রহি নয়। এমন এক ব্যাখ্যা ইনফরম্যালি জানা যায়। ঘটনা যদি এটা হয় তাহলে আমেরিকার উচিত হবে সীমান্ত চিহ্নিত করা প্রসঙ্গে পাক-আফগান বিরোধ নিয়ে কথা তোলা। অন্কাতত একটা মোটাদাগের ডিলে পৌছানোর চেষ্টা করতে মধ্যস্থতার পথে যেতে পারে।   এটা ছাড়া আমেরিকার কখনই পাকিস্তানকে পুরাপরি নিজের ষ্পট্ক্ষেরাটেজির পক্ষে পাবে না। এটা কোনভাবেই পাকিস্তানী জেনারেলদের জঙ্গীবাদ ভালবাসার ব্যাপার নয়।

আবার ট্রাম্প এক মজার আবদার রেখেছেন ভারতের কাছে। বা বলা উচিত আলকায়েদা বা তালেবান ইস্যুটা আমেরিকার কাছে আসলে যে ব্যবসার ইস্যু তাই যেন এতে স্পষ্ট হয়েছে।  ট্রাম্প বলেছে, ভারত আমেরিকার সাথে ব্যবসা করে প্রচুর ডলার কামিয়েছে ফলে আমেরিকা চায় ভারত সে অর্থ আফগানিস্তানে ব্যয় করুক। কিন্তু ভারত আফগানিস্তানে এই ব্যয় কিসে করবে ব্যবসায় না যুদ্ধে? নামকাওয়াস্তে না হয়ে যদি আফগানিস্তানে অর্থপুর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে ভারতের ব্যয়ের কথা ট্রাম্প বলে থাকেন তাহলে বুঝা গেল ট্রাম্প আসলে সিরিয়াস না। কারণ ভারত সেই সামর্থের অর্থনীতি কোথায়, তা তো সে এখনও নয়। আর যদি ব্যবসা বুঝিয়ে থাকেন তার অর্থ  আফগানিস্তান ট্রাম্পের কাছে আসলে টেররিজমের ইস্যু নয়। ব্যবসার ইস্যু।

মূলকথা ট্রাম্পকে সবার আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আফগানিস্তান তার কাছে কী ইস্যু – টেররিজম না ব্যবসা!  ট্রাম্প ভারতকে সংশ্লিষ্ট করবে ব্যবসায় আর পাকিস্তানকে ধমক দিবে, আবার খোদ নিজে আফগানিস্তানে কেন সৈন্য পাঠাবে এব্যাপারে দিশেহারা নন-সিরিয়াস থাকবে ফলে এগুলা একটাও তো আসলে কোন কাজের কথা নয়। যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট কিছু লোকের পেটি স্বার্থ ছাড়া, আর কিছু নয়। ফলে স্বভাবতই  ট্রাম্পের আমেরিকার যুদ্ধের নামে আর একবার অনন্ত খরচের মধ্যে জড়িয়ে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। আবার ট্রাম্পকে মনে রাখতে হবে ইরান ও রাশিয়ার সাথে তালেবানদের সম্পর্কে দিনকে দিন ভাল হচ্ছে।  এই আফগানিস্তান অথবা এই তালেবান আর আগের আফগানিস্তান অথবা তালেবান নাই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২৮ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

গৌতম দাস

২২ আগস্ট ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০০ঃ১১

http://wp.me/p1sCvy-2hc

 

সম্প্রতিকালে সামগ্রিকভাবে চীনের সামরিক শক্তি বিশেষত নৌশক্তি চোখ টাটানোর মত বেড়েছে। আর তা নিয়ে আমেরিকার মধ্যে উদ্বিগ্নতা তৈরি করেছে। সাপ্তাহিক লন্ডন টাইমসের ভাষায়, চীনের শক্ত নেভি সক্ষমতা গড়ে তোলা আমেরিকার অফিসিয়ালদের উদ্বিগ্ন করেছে। “China’s naval build-up worries American officials”। কিন্তু একই নিঃশ্বাসে ইকোনমিস্ট বলছে, আমেরিকার এতে উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে বরং স্বাগত জানানো উচিত। কেন?

ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল পরিসরে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র- এ তিন শক্তির মাঝে পারস্পরিক শত্রুতা আছে। আবার সেই সাথে বন্ধুত্ব না হলেও কে কার কতটুকু কাজে আসে, আসছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতোমধ্যে চীনের পিএলএ মানে ‘পিপলস লিবারেশন আর্মির’ ৯০ বর্ষপূর্তি খুবই ঘটা করে পালিত হলো গত ৩০ জুলাই। এই পিএলএ (PLA) হল চীনের রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর নাম। বিগত ১৯২৭ সাল থেকে ক্ষমতা দখলের জন্য চীনা কমিউনিস্ট পার্টির গঠিত সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগঠনই হল এই পিএলএ। জন্মের ২২ বছর পরে ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবের বিজয়ের পরে ঐ সংগঠনই নয়াচীনের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী হিসেবে জায়গা নেয়। সেই পিএলএ’র ৯০তম বার্ষিকী এবার খুবই ঘটা করে পালন করা হল।

এর প্রধান উদ্দেশ্য, চীনের এতদিনের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হওয়ার পর সে ফলাফল ও সক্ষমতা ব্যবহার করে একটু একটু করে চীনের সামরিক সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছিল। কিন্তু এই নিজের সামরিক সক্ষমতা কী কী অর্জিত হয়েছে, এরই এক প্রদর্শনী করা হল। এর বিশেষ তাৎপর্য আছে। ইতোমধ্যে যুদ্ধবিমান বহনকারীর কোন যুদ্ধজাহাজ চীনের ছিল না, যেটা সে অর্জন করেছে। এরকম আরও বহু কিছু যেগুলো আগে আমেরিকার আছে দেখে নিজেদেরও একদিন হবে বলে চীনারা স্বপ্ন দেখেছিল।  আসলে পিএলএ এবারের ৯০তম বার্ষিকী জাঁকজমক করে পালন করে এটাই দেখাতে চেয়েছে যে, গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তারা চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ রেখেছিল  এবং ইতোমধ্যেই তা অর্জিত হয়েছে। এবার সেই সামর্থ্য খরচ করে সামরিক শক্তি কতটুকু হয়েছে তাই প্রদর্শন করতে নেমেছে তারা।

গত ২৯ জুলাই লন্ডনের ইকোনমিস্ট সাময়িকী এসব বিষয় নিয়ে দুটো বিশেষ আর্টিকেল ছেপেছে।  যার প্রথমটা মূলত এই ইস্যুতে তবে চীন-আমেরিকা সম্পর্কে ফোকাস করে। আর পরেরটা চীন-রাশিয়ার সম্পর্কের দিক থেকে।  ইকোনমিস্ট লিখেছে, ‘ চীনা নেভির এই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমেরিকা উদ্বিগ্ন। কখনো কোনো একটা সপ্তাহ বাদ যায়নি যে, চীনাদের একটা না একটা সামরিক সক্ষমতার অগ্রগতির খবর সেখানে নেই। গত এপ্রিলে তারা স্থানীয়ভাবে তৈরী এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার যুদ্ধজাহাজ ভাসিয়েছে। আর জুনে আমেরিকার সমতুল্য ১০ হাজার টনের এক ডেস্ট্রয়ার ভাসিয়েছে। আর এ মাসে চীনা সৈন্য বোঝাই করে যুদ্ধজাহাজ সুদূর আফ্রিকার জিবুতি রওনা হয়েছে। জিবুতিতে জায়গাজমি লিজ নিয়ে এই প্রথম নিজ সীমানার বাইরে চীনা এক সামরিক ঘাঁটি চালু করা হল। আর এই সপ্তাহে রাশিয়ার সাথে যৌথভাবে বাল্টিক সাগরে (সুইডেন, ডেনমার্ক বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো যার উপকূলে) যৌথ সামরিক মহড়া করেছে চীন।’ ইকোনমিস্টের মতে, স্বভাবতই এটা চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তির মহড়া প্রদর্শন। [নিচের এক প্যারা জিবুতি সম্পর্কে নোটটা বাড়তি আগ্রহিদের জন্য। যারা সময় বাঁচাতে চান তাদের না পড়লেও চলবে।]

[জিবুতি প্রসঙ্গে একটা ছোট নোট দিয়ে রাখা ভাল। জিবুতি (Djibouti) আফ্রিকা মহাদেশের অংশ। লোহিত সাগর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যেকে ভাগ করেছে, মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে। মধ্যপ্রাচ্য অংশে ইয়েমেন আর এপারে জিবুতি। আফ্রিকার অংশ সোমালিয়ার উপরের জিবুতির অবস্থান। প্রাচীন সোমালিয়ার আরব মুসলিম জনগোষ্ঠির অংশ ছিল জিবুতি, পরে ফরাসী উপনিবেশ হয়। আর তা থেকে স্বাধীন হয় ১৯৭৭ সালে। খুবই ছোট ভুখন্ড জিবুতির, বাংলাদেশের চারভাগের একভাগ।  আর জনসংখ্যা মাত্র নয় লাখ। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভুমির মত গরমের দেশ বলে দুপুরে সব কাজকর্ম ১২টা থেকে বিকেল চারটা বন্ধ রাখতে হয়, পরে আবার সব খুলে। গুরুত্বপুর্ণ যেটা তা হল এই জিবুতিতে একা চীনের ঘাঁটি নাই, বরং চীনের ঘাটিটাই সবার শেষে স্থাপিত হল। সবার বড় আর আগের ঘাটি যাদের তারা হল, আমেরিকার ও ফ্রান্সের। পরে একালে সৌদি আরবের আর শেষে চীনের। এককথায় বললে এই ঘাঁটি স্থাপন নিয়ে চীনের উদ্দেশ্যে নিজের নৌ-চলাচল – এই বাণিজ্য স্বার্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।  তা নৌদস্যু বা জলদস্যু হতে পারে কিংবা অন্য রাষ্ট্র এসে চীনের নৌ-চলাচল পথ অবরোধ করতে চাইতে পারে। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে গেলে এসব সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন বাণিজ্য স্বার্থের অংশ হয়ে যায়। আমেরিকা জিবুতিতে তার ঘাঁটি রাখার জন্য জিবুতিকে  বছরে লিজের ভাড়া দেয় ৮০ মিলিয়ন ডলার, আর চীনারা একালে চুক্তি করেছে বলে সে দেয় ১০০ মিলিয়ন ডলার। ওদিকে সোদিরা ইরানের ভয়ে ভীত হয়ে ঐ জিবুতিতে ছোট ঘাটি তৈরি করেছে একালে। ইয়েমেনের হুতিদের সাথে ইরানের যোগাযোগ স্থাপন সাথে রসদ এবং নানান টেক ইকুইপমেন্ট পাঠানো হচ্ছিল এই পথে তা রুখে দিতে সৌদি অবস্থান।  আর আমেরিকার ইরাক-আফগানিস্তানের যুদ্ধে অনেক যুদ্ধবিমান জিবুতি থেকে অপারেট করিয়েছিল। ওদিকে ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া এক রাষ্ট্র ছিল ১৯৯৩ সালের আগে পর্যন্ত। প্রতিশ্রুতি অনুসারে ইথিওপিয়া আপোষে ইরিত্রিয়াকে আলাদা হতে দিলে তাদের দুইটা বন্দরই ইরিত্রিয়ার ভুখন্ড ভাগে পড়ে। ক্যাচালে না থাকতে চেয়ে ইথিওপিয়া দুইটা সমুদ্র বন্দরের দাবি ছেড়ে দেয়। আর জিবুতির বন্দর ব্যবহারের জন্য জিবুতি-ইথিওপিয়া  এক স্থায়ী চুক্তি করে। জিবুতি ইথিওপিয়াকে পেশাদার পোর্ট সার্ভিস দেওয়ার জন্য নিজের পোর্ট পরিচালনার দায়িত্বে দুবাই পোর্ট অথরিটিকে ভাড়া করে এনেছে। সব মিলিয়ে এতে জিবুতির ভালই আয় হয়। এই হল সংক্ষেপে জিবুতি।]

কোল্ডওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা স্বদেশপ্রেম একালে অচল কেন?
সাধারণত আমাদের মধ্যে যে জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম কাজ করে, তা গড়ে উঠেছে গান্ধীবাদীদের ‘বিদেশী কাপড়ে আগুন লাগাও আর দেশী চরকায় সুতা কাটো’ এর অনুসরণে। অর্থাৎ মনে করা হয়, বিদেশী মানে খারাপ, দেশী মানেই ভালো বা কাম্য। কোন জটিল জিনিষ নয়, ব্যাপারটা সহজেই বুঝা যায়।  এই চিন্তা কাঠামোতেই কোল্ড ওয়ার যুগেও (১৯৫০-১৯৯২) জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম চর্চা হয়েছে। আর ওদিকে  কোল্ড ওয়ার মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়াকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা এই দুই পরাশক্তির দুই ব্লকে ভাগ করে সব রাষ্ট্রকেই কোন না কোন ব্লকের সমর্থক হতে বাধ্য করা। আর এরপর পরস্পর ঠিক যুদ্ধ নয়, কিন্তু সব সময় একটা যুদ্ধের রেষারেষি জীবন্ত রেখে তারা চলত, ফলে তা এক ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধ’ যেন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে এই ব্লক পরিস্থিতির অবসান হয় এবং দুনিয়া আমেরিকার ‘একক’ পরাশক্তির কবলে চলে যায়। ফলে এর পর থেকে স্বজাতিবোধ ও দেশপ্রেম আর কোল্ড ওয়ারের পটভূমিতে তৈরি নয়, হয় নাই। আর তাতে আগে ও পরের জাতীয়তাবোধ, স্বদেশপ্রেম মধ্যে বহু ফারাক এসে গেছে।

যেমন- কোল্ড ওয়ারে কেউ যদি  শত্রুরাষ্ট্র হয়, এর মানে তার সাথে আর কোনো সম্পর্ক নাই; অর্থনৈতিক বাণিজ্যসহ কোনো ধরনের সামাজিক লেনদেন নেই। কোল্ড ওয়ারে দুনিয়া মূলত তা বিভক্ত হয়ে থাকত দুনিয়া ব্যাপী দু’টি আলাদা অর্থনীতির ব্লকে। কিন্তু যখন থেকে কোল্ড ওয়ার ভেঙ্গে গেছে, এমন দুনিয়ায় আমরা বাস করতে শুরু করেছি, তখন থেকে  অর্থনীতির দুই ব্লকও ভেঙ্গে গেছে। বদলে সব রাষ্ট্রের অর্থনীতিই  একই- ‘এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে’ অন্তর্ভুক্ত ও কানেকটেড হয়ে গেছে। ফলে সেই থেকে বাণিজ্য বিনিয়োগের কেনাবেচাসহ সব ধরনের লেনদেনের এক গ্লোবাল সমাজে আমরা ঢুকে গিয়েছি, বাস করছি। ফলে একালে অন্য কোন রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য বিনিয়োগে খুব ভাল সম্পর্কের পাশাপাশি ঐ রাষ্ট্রের সাথে আবার যুদ্ধ লাগার মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে বটে।

তবে সে ক্ষেত্রে স্বভাবতই যুদ্ধ বড় বাস্তবতা হয়ে উঠলে বাকি সব সম্পর্ক অন্তত সাময়িকভাবে স্থগিত ও চাপা পড়ে যাবে, সব বন্ধ হয়ে যাবে। তবে ভবিষ্যতে যদি তা থিতু হলে আবার সব সম্পর্ক শুরু হতে পারে। আবার একালে কোনো যুদ্ধ লেগে যাওয়া পরিস্থিতি দেখা দিলে ঐ সম্ভাব্য যুদ্ধকে  দেরি করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্ক একটা  ভুমিকা থাকতে পারে, উছিলা হিসাবে দাঁড়ায় যেতে পারে। এছাড়া যে দেশে বোমা ফেলা দরকার মনে করছি, সে দেশে আমার নিজেরই ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ থাকলে বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে হবে। এসব সমস্যাগুলো কোল্ড ওয়ারের যুগে ছিল না। ফলে যুদ্ধ লড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া তখন সহজ ছিল। একালে যুদ্ধ লাগিয়ে দিব নাকি বাণিজ্য স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দেখব, কোনটা আসলে নিজের জন্য উত্তম, এসব বিবেচনা করে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে একালে এবং স্বভাবতই তা জটিল কাজও; অনেক চিন্তাভাবনা করে সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একালে নিজ দেশের স্বার্থ কোনটা তা ঠিক ঠিকভাবে বুঝতে পারা সহজ হয় না। অনেক চিন্তাভাবনা করার দরকার হয়। আমরা সবাই এখন এমন দুনিয়াতে বসবাস করি। ফলে পুরনো বোধ নিয়ে চলে দেশের ভাল করতে চেয়ে উল্টো খারাপ করে ফেলারও সম্ভাবনা আছে। তাই কোল্ড ওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম একালে অচল।

অতএব একালে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার সম্পর্ক এক দিকে বাণিজ্য বিনিয়োগের, একই সাথে তা সম্ভাব্য যুদ্ধেরও হতে পারে- এই আলোকে দেখতে ও বুঝতে হবে। এখানে একই সম্ভাব্য শত্রুর সাথে গভীর বাণিজ্য-স্বার্থের সম্পর্ক হয়, থাকতে পারে এবং থাকাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। ইকোনমিস্ট বলছে, চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু হল পশ্চিমা স্বার্থ, বিশেষ করে কমন শত্রু হল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকা এখনও গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের পুরনো বা চলতি যে ব্যবস্থা, এর নেতা, তুলনায় চীন নতুন সাজানো হবে যে ব্যবস্থা ধীরে ধীরে জাগছে যে এর নেতা। ফলে আমেরিকার নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জকারী হলো চীন ও তার সহযোগী রাশিয়া। তবে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জের মুরোদ রাশিয়ার অর্থনীতির নিজের নয়, নেইও। তবে চীন বিজয়ী হলে তাতেই রাশিয়ারও লাভ, এই হলো সূত্র। ফলে এক ‘কমন এনিমি’র ধারণা। তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমের অবরোধ চলছে, তা জারি আছে; এখানে ইকোনমিস্ট সে বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

পশ্চিমের বিশেষ করে আমেরিকার অভিযোগ, রাশিয়া জবরদস্তি করে ইউক্রেনের ভূমি দখল করে আছে। তাই আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জগৎ রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। অবশ্য এখানে ইউক্রেনের ভূমি বলতে তা সরাসরি ইউক্রেন নয়, এ ক্ষেত্রে আসলে ক্রিমিয়া বলে আলাদা প্রদেশের কথা বলা হচ্ছে। সোভিয়েত ভেঙে (১৯৯১) যাওয়ার পরে আপোষ আলোচনায় ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের সাথে যোগ করে দেয়া হয়েছিল, যদিও সেটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ থাকবে বলা হয়। ফলে আইনি সম্পর্কের দিক থেকে ক্রিমিয়া ইউক্রেন রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। পরে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিলেও কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু পশ্চিমারা জোর দেয়, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে রাশিয়া বাদে যে ১৪টি রাষ্ট্র হয়েছে, সেগুলোর ওপর রাশিয়ার প্রভাব শূন্য করে দিতে হবে। আমেরিকা ও ইউরোপের এই কৌশলগত অবস্থান সব জটিলতা তৈরি করেছে।  এই নীতির ফাঁদে ইউক্রেন ঝুঁকতে চাইলে রাশিয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপ নিজের দখলে নিয়ে নেয়। আর রাশিয়া নিজের পক্ষে ক্রিমিয়ায় একটা কথিত গণভোট করিয়ে নেয়। ফলে সারকথায় অন্যের ভুমি দখল বলতে যা বুঝায় এটা তেমন কোন সোজাসাপ্টা ‘ইউক্রেনের ভূমি’ দখল নয়।

কিন্তু ইকোনমিস্ট বলছে, রাশিয়াকে পশ্চিমের অবরোধ আরোপ করে রাখার এক পালটা কাফফারার দিক আছে। এটাই রাশিয়াকে চীনের সাথে লেপ্টে থেকে যেতে বাধ্য করেছে। কারণ চীনের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, রাশিয়ার গ্যাস-তেল চীনকে বিক্রি করা আর চীনা বিনিয়োগ নিয়ে আসা- এভাবেই রাশিয়া সেই থেকে অর্থনৈতিকভাবে টিকে আছে। কিন্তু ইকোনমিস্ট ‘ চীন কেন ইউক্রেন নিয়ে কথা বলে না’, অপর দিকে ‘রাশিয়া কেন দক্ষিণ চীন সাগর চীনা দখলে রাখার বিরুদ্ধে কথা বলে না’, এগুলো উল্লেখ করে  একটা ‘নৈতিকতা ভঙ্গ হয়েছে’ বলে পশ্চিমের স্বার্থের পক্ষে সাফাই দিতে চেয়েছে। ব্যাপারটাকে পুরান কমিউনিস্টদের উপরে ইকোনমিস্টের  পুরান রাগ-বিরাগ অথবা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতি ব্যবস্থার প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব – এর বেশি অন্য কোনভাবে ব্যাখ্যা করার মত কিছু পাওয়া যায় না।

এভাবে ইকোনমিস্ট চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বকে ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু সবশেষে আপাত উল্টো এক কথা বলেছে। বলছে, চীনের সামরিক সক্ষমতা বিশেষ করে নেভির সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং তা প্রদর্শনে আমেরিকার ভীত হওয়া উচিত নয়। কেন? অনেকের কাছে ব্যাপারটা স্ববিরোধী মনে হতে পারে। কিন্তু ইকোনমিস্টের যুক্তি কী? আর কেনই বা এ কথা বলছে?

ইকোনমিস্ট নিজেই সাফাই দিয়ে বলছে, ‘রাশিয়া চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে কথা সত্য, কিন্তু একই ধরনের অস্ত্র চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকেও বিক্রি করে। আবার চীনা প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার ওপর পশ্চিমের আরোপিত অবরোধ উপেক্ষা করে রাশিয়াকে সাহায্য, বাণিজ্য সম্পর্ক করে থাকেন। কিন্তু তা তিনি করেন কারণ চীনের পুরনো বড় পড়শি রাশিয়ার সাথে চীন একটা থিতু সম্পর্ক চায় বলে।  অতএব চীন কোন সুদূরে ইউরোপের বাল্টিক সাগরে রাশিয়ার সাথে নৌ-মহড়া করেছে বলে তাতে ভয় না পেয়ে আমেরিকার বরং স্বাগত জানানো উচিত। চীনের যুদ্ধজাহাজ কোন সুদূরে গিয়ে অপারেট করলেো তা এক সম্পূর্ণ সঠিক কাজ। কারণ “গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ার” হিসেবে এটা চীনের এক বৃহত্তর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া; বাণিজ্যের নৌচলাচল পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে চীনেরও কিছু গ্লোবাল ভূমিকা ও দায় নেয়া উচিত। কারণ এই নিরাপত্তা প্রদানের ওপরই গ্লোবাল অর্থনীতি বাণিজ্য নির্ভর করছে।

ইকোনমিস্ট নিজেই আরও সাফাই দিয়ে বলছে যেমন – “চীন ইতোমধ্যেই জিবুতির ঘাঁটি থেকে জলদস্যুবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এভাবে এডেন উপসাগরের আশপাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে”। ইকোনমিস্ট তার লেখায় এই অংশের উপশিরোনাম দিয়েছে ‘দায়িত্ববোধের চর্চা’  বা (Exercising responsibility)। তবে সবশেষে ইকোনমিস্ট আমেরিকার এম্পায়ার ভূমিকার পক্ষে থেকেছে। বলেছে, “চীন  এখন এই সুদূরে নৌবহর নিয়ে এসেছে। ফলে এখন আমেরিকা কেন এশিয়ায় নৌ-উপস্থিতি রেখেছে বা রাখে, তা এখন চীনারা সহজে বুঝবে। গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিয়োগের বৃহত্তর দিক এই স্বার্থরক্ষার দায় তো নিতেই হবে”।

তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? ইকোনমিস্ট আসলে কী বলতে চায় ? কথা খুব সহজ। প্রথমত, তারা আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে কথা বলছেন না।

আমাদের অনেকের কাছে ব্যাপারটা আজব লাগছে হয়ত। কারণ আমরা ধরে নিয়েছি, ইকোনমিস্ট ত আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থে কথা বলছে ও বলবে। না তা বলছে না।  তাহলে কার পক্ষে কথাগুলো বলছে?  ইকোনমিস্ট এখানে  দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কার্যকর ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে কথা বলছে। এটা সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রস্বার্থ নয়। এ জন্য সে বারবার ‘বৃহত্তর’ বা ‘গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ারের লার্জার পার্টের’ ভূমিকার কথা টানছে।

একই ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ ভেতরে এখানে কাছাকাছি বা দেখতে একই মনে হয়, কিন্তু তা নয় এমন তিনটা  আলাদা স্বার্থ আছে। সেগুলো হল যেমন – রাষ্ট্রস্বার্থ (যেমন আমেরিকান রাষ্ট্র), কোনো সুনির্দিষ্ট করপোরেশন বা ব্যক্তি পুঁজি মালিকের স্বার্থ আর সাধারণভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম এই ব্যবস্থার স্বার্থ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সাধারণভাবে নিজস্ব অভিন্ন এই স্বার্থ, যেটা অনেকটাই গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থের ভেতর দিতে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। অর্থাৎ আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ আর ওয়াল স্টিটের গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থ সব সময় এক নয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটের  নেতা বড় প্রভাবশালী কোম্পানী গোল্ডম্যান স্যাসে (Goldman Sachs) এর  পরামর্শেই চীন (আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী) ব্রিক ব্যাংক (BRICS) চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল।

ওয়াল স্ট্রিট তাই আসলে আমেরিকায় অবস্থিত হলেও সে কোনো রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে নয়; এমনকি রাষ্ট্রস্বার্থ, সীমানা, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি সব উবে যাক যাতে পুঁজি অবাধ চলাচল করতে পারে – এটাই এর মনোভাব।

ইকোনমিস্ট ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তার এই স্বার্থ, চীন পাহারা দিচ্ছে না আমেরিকা, তাতে তার কিছু আসে-যায় না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২১ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

“চীন-ভারতের পাওয়ার গ্যাপের দিকে তাকান”

“চীন-ভারতের পাওয়ার গ্যাপের দিকে তাকান”

গৌতম দাস

১৭ আগস্ট ২০১৭,  বৃহষ্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-2h7

 

 

চীন-ভারত সামরিক সংঘর্ষ কী আসন্ন? সারা দুনিয়ার মিডিয়ায় এটা নিয়েই জল্পনা-কল্পনা চলছে। ভুটানের  ডোকলাম উপত্যকায় মুখোমুখি হয়ে থাকা ভারতীয় ও চীনা সেনাদের এই অবস্থান আরো উত্তেজনাময় হয়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত মুখোমুখি অবস্থান ছেড়ে কেউ ফেরত যায় নাই। যদিও সৈন্য সমাবেশের সংখ্যা কমানো-বাড়ানো ঘটেছে সময়ে। কুটনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে চীনা দাবি হল, ভারতীয় সেনাদেরকে সবার আগে ঐ অবস্থান ছেড়ে  ফিরে যেতে হবে। এরপর ভারতের সাথে কথা হতে পারে, এর আগে নয়।  কারণ চীনের ব্যাখ্যা হল, বৃটিশ ও চীনা রাজশক্তির ১৮৯০ সালের  সীমান্ত চুক্তি  অনুসারে সেই থেকে ঐ স্থান আর কোন বিতর্কিত ভুখন্ড নয়, বরং চিহ্নিত ভাবে চীনের ভুখন্ড। তাই ভারত চীনা ভুখন্ডে ‘অনুপ্রবেশকারি’। এই প্রসঙ্গে গত ১১ আগষ্ট আনন্দবাজার লিখেছে, “চিন দাবি করছে, অতীতে ভুটান লিখিত ভাবে তাদের জানিয়েছে ডোকলামের ভূখণ্ডটি চিনের অধীনে। সুতরাং ডোকলামে ভারতীয় সেনা পাঠানো সম্পূর্ণ অবৈধ। বিষয়টি যখন চিনের সঙ্গে ভুটানের তখন ভারত নাক গলাচ্ছে কেন, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে”।

বিপরীতে ভারতীয় কুটনৈতিক অবস্থান হল, ঐ স্থান চিহ্নিত নয় বিতর্কিত, এবং তা ভুটানের দাবিকৃত ভুখন্ড। ভারত ভুটানের পক্ষ থেকে চীনাদেরকে বাধা দিয়েছে। কিন্তু এরপর ভারত আরও বলতে চাইছে, আসলে ওগুলো কথা আর ভারতের জন্যও আর কোন গুরুত্বপুর্ণ বিষয় নয়। গুরুত্বপুর্ণ হল, ‘আসেন চীনা ভাইয়েরা’, “একসাথে” বরং সেনা প্রত্যাহার করি। ভারতের এই বদল অবস্থান কেন?

চীনা অবস্থান কত কড়া তা  বুঝা যায় গত জুলাই মাসে জর্মানিতে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদী চিনের প্রেসিডেন্ট শি চিনফিং-এর সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলেও চীন রাজি হয়নি। এমনকি এখনও চীন তার নিজের অবস্থান থেকে একচুল সরে নাই।  ওদিকে আনন্দবাজার আরও লিখেছে, “তাতপর্যপুর্ণ ভাবে আজ ডোকলামকে চিনা এলাকা বলে মেনে নেওয়ার কথা (এখন) অস্বীকার করেছে ভুটান। থিম্পু জানিয়েছে, ডোকলাম তাদেরই এলাকা। সেখানে রাস্তা তৈরি করে চিনা সেনা ভুটানের সার্বভৌমত্বে হাত দিয়েছে। ভারতের চাপেই ভুটান এই পদক্ষেপ করেছে বলে ধারণা কূটনীতিকেরা”। অর্থাৎ ভারত চেষ্টা করছে নিজের অন্যের ভুখন্ডে “অনুপ্রবেশকারি” হওয়ার যে আন্তর্জাতিক আইনি দায় তা থেকে নিজের নাম কাটাতে।

আর ওদিকে এখন আর রাস্তা তৈরিতে চীনকে বাধা দেয়া ভারতের কাছে কোন ইস্যু নয়। ভারত চাইছে যত দ্রুত মানুষ ভুলে যাক যে ভারত চীনকে বাধা দিতে গিয়েছিল। ভারতের মূল ইস্যু এখন ‘সম্মানজনক পশ্চাৎ অপসারণ করা’। এর সুযোগ সে পেতে চাচ্ছে। অর্থাৎ ভারতীয় সেনা যে এখনই ফিরে যেতে চায়, এ ব্যাপারে তারা একপায়ে রাজি। কিন্তু চুপচাপ ফিরে গেলে নিজের বেইজ্জতি হয়, তাই ভারতের মুখ রক্ষার স্বার্থে ভারত-চীন একসাথে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে  ভারত চীনকে যে প্রস্তাবে  রেখেছে,  চীন তাতে রাজি হলে ভারতের ইজ্জত বাঁচে। বিপরীতে চীনের অনড় ভূমিকা এবং তারা অনবরত হুমকি দিয়ে বলে চলছে, ভারতীয়রা বিতর্কহীন চীনা ভূখণ্ডে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী। অতএব সবার আগে তাদেরকে চুপচাপ ফিরে যেতে হবে। সারকথায়, সব বাদ দিয়ে ভারত এখন মরিয়া হয়ে একটা সম্মানজনক পশ্চাৎ অপসারণের সুযোগ খুঁজে ফিরছে। কিন্তু তাদের দশা এমন দুস্থ অবস্থায় পৌঁছল কেন?

কারণ এক. নির্বাচনী অভ্যন্তরীণ ইমেজ তৈরির কথা ভেবে মোদি সরকার পরিকল্পনা করেছিল, আগের যেকোনো সরকারের চেয়ে চীনের বিরুদ্ধে মোদি বেশি তৎপর – এটা দেখানো। এই উগ্র জাতীয়তা প্রদর্শন করাই মোদির লক্ষ্য ছিল। এমনটা দেখাতে পারলে আগামী ভোটে এটা তাকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বেশি সুবিধা দেবে বা আগিয়ে রাখবে, এই ছিল বিজেপি এবং মোদির হিসাব। ভুটান-চীন সীমান্তে চীন রাস্তা তৈরি করতে গেলে তাই মোদি সরকার অন্য কোনো উপায়ে প্রতিক্রিয়া প্রকাশের পথ না খুঁজে এটাকে সুযোগ হিসাবে নিয়ে  সরাসরি নিজ সৈন্য পাঠিয়ে উগ্রতা প্রদর্শন করতে গিয়েছিল। কিন্তু মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা এতটাই কাঁচা ছিল যে, ঘটনা তিন সপ্তাহে না গড়াতেই তৈরী করা টেনশন সামলাতে না পেরে আপসের পথে যেতে অস্থির হয়ে উঠেছে। এ কারণে, মোদি ভারতীয় সংসদের সব দলকে ডেকে এক সর্বদলীয় পরামর্শ বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। ওই সভায় সবার কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যায়, মোদি সরকার সেনা পাঠিয়ে অযথা সামরিক টেনশন তৈরি করেছে অথচ, কূটনৈতিক পদক্ষেপে হিসাবে সম্ভাব্য বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে তেমন কোন প্রস্তুতি নেয়নি। যেমন জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে যদি ডোকলাম প্রসঙ্গ উঠে বা ইস্যু হয়ে যায় তবে সেখানে রাশিয়া কি ভারতের পক্ষে অবস্থান নেবে – এমন কোনো আগাম প্রস্তুতি বা রাশিয়ার সাথে আলোচনা করে কোন নিশ্চয়তা নেয় নাই , মোদির সরকার। বরং অনুমান করা যায়,  সে পরিস্থিতিতে রাশিয়া সম্ভবত চীনের দিকে তাকিয়ে অবস্থান নেবে।

অপর দিকে এত আশা-ভরসাস্থল, বন্ধু মনে করা আমেরিকার ট্রাম্প প্রশাসন কি ভারতের পক্ষে অবস্থান নেবে? এরও কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। নেয়া হয় নাই। আর আমেরিকা সম্ভবত ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে দেখবে। ইতোমধ্যেই নানা উছিলায় প্রকাশিত আমেরিকান অবস্থান এটাই। সারকথায় আমেরিকা দূরে দাঁড়িয়ে বলবে, তারা মিটসাট করে নেক।  ফলে ভারতের বিরোধী দল, বিশেষ করে কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী মোদিকে এই বলে অভিযুক্ত করেন, তার আমলে এসে আমাদের ট্র্যাডিশনাল বন্ধুরা দূরে অনিশ্চিত অবস্থানে চলে গেছে। এসব মিলিয়ে ওই সর্বদলীয় মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত হয় সরকার যেন সম্মানজনক সেনা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয়। এতে অবশ্য মোদির লাভের গুড় ঠিক থেকেছে। অন্তত সম্মানজনক সেনা প্রত্যাহারের অবস্থান নেয়ার দায় একা মোদির নয়, সবার বা সর্বদলীয় – তাই হয়ে গেছে। আসলে মোদির লক্ষ্য ছিল, নিজের আগামি নির্বাচনের জন্য অভ্যন্তরীণ ইমেজ তৈরি। সে কাজ ইতোমধ্যে যা অর্জন  হবার তা হয়েই গেছে। যদিও এখন বিরাট সমস্যা হল, চীন তাকে সম্মানজনক সেনা প্রত্যাহারের অবস্থান নিতে দিচ্ছে না, বরং এর বদলে সীমিত আকারে যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে অনবরত চীনা হুমকি দিয়ে।

ভারতের থিংকট্যাংক ডোকলাম ইস্যুকে কিভাবে দেখছে?
প্রত্যেক সামর্থ্যবান রাষ্ট্র, মানে এমন রাষ্ট্র যে এক বা একাধিক থিঙ্কট্যাঙ্ক চালানোর খরচ জোগাতে সক্ষম –  তার জন্য একাধিক থিংকট্যাংক গড়ে তোলা খুবই প্রয়োজনীয় কাজ বলে বিবেচিত হয় একালে। থিঙ্কট্যাঙ্কের মানে হল, এ কালের রাষ্ট্রের কৌশলগত বহুবিধ স্বার্থ থাকে, সেসব স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কোন খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা চালানো এবং এতে পাওয়া ফলাফল ব্যবহার করা হয়। ঐ গবেষণার ফলাফল সমাজে একাদেমিক দুনিয়ায় খোলা থাকে, চর্চা আলোচনায় আরও সমৃদ্ধ হয়। এসব থেকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা ওই গবেষণার ফলাফল বা সুপারিশের আলোকে সঠিক নীতি গ্রহণে তা ব্যবহার করতে পারে। যেহেতু রাষ্ট্রস্বার্থে এই গবেষণা ফলে এসব থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় বা দাতব্যভাবে সাধারণত নিজের খরচ জুগিয়ে থাকে। কিন্তু কখনই তা রাষ্ট্রের বাইরের অর্থের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গড়ে উঠতে পারে না বলে সাধারণত মনে করা হয়। যেমন আমেরিকার রেওয়াজ হল, বেশির ভাগ থিঙ্কট্যাঙ্ক  অভ্যন্তরীণ দান দাতব্যে অর্থ সংগ্রহ করে চলে।

কিন্তু এ ক্ষেত্রে ভারত এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে। সে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের পয়সায় নিজের থিঙ্কট্যাঙ্কের এক্সপার্ট ও গবেষক তৈরি করছে। অর্থাৎ এখানে ধরে নেয়া হয়েছে, আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ভারতের স্বার্থে কাজ করতে পারে। এটা কি সম্ভব? খরচ অন্যের উপর চাপিয়ে দিবার নেশায় তা এখন সম্ভব-অসম্ভবের উর্ধে এক বাস্তবতা। গত  ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশের ভারত সফর থেকে  আমেরিকা-ভারত প্রথম পারস্পরিক কৌশলগত স্বার্থের প্রয়োজনে কাছে আসা শুরু হয়েছিল। যদিও আমেরিকার তাগিদে ‘ওয়ার অন টেরর’ ইস্যুতে তা শুরু হয়েছিল, কিন্তু খুব দ্রুত আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ ইস্যুতেও ভারতের সাগরেদ হয়ে যাওয়ায় এটাই মুখ্য ইস্যু হয়ে যায়। ‘চীন ঠেকাও ইস্যুতে দোস্তালির’ দিন শুরু হয়ে যায়।  সেকালে অবশ্য থিঙ্কট্যাঙ্কের ধারণাই ভারতে তেমন একটা প্রতিষ্ঠিত ছিল না; কেবল যুদ্ধ-কৌশল অর্থে গবেষণার কিছু প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু বুশের ওই সফরের ফলে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো তাদের ভারতীয় শাখা খুলতে শুরু করে দেয়। সত্যি সে এক আজব ঘটনা। না আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোর শাখা বাংলাদেশে নাই তা নয়। অথবা আমেরিকান সরকার বা  এনজিও ফান্ডেড লোকাল থিঙ্কট্যাঙ্ক বাংলাদেশে নাই, ব্যাপারটা এমন নয়। কিন্তু সেগুলোর ভুমিকা বাংলাদেশের সরকারকে গবেষণা দিয়ে নীতি নিতে সাহায্য করা নয়। বরং বাংলাদেশে আমেরিকান নীতি কী হলে আমেরিকান স্বার্থের জন্য সঠিক হবে  তা আমেরিকান সরকারকে বুঝতে বা তথ্য সংগ্রহ করে দিতে কার্যকর থাকাই এদের লক্ষ্য।

প্রেম, রোমান্স – এগুলো কি করে করতে হয় থেকে তা নিয়ে কারও কাছ থেকে কোচিং বা ট্রেনিংয়ে তা শিখার বিষয় কখনও নয়। কারণ সেক্ষেত্রে নিজের প্রেমিক বা প্রেমিকার সাথে না, বরং ঐ কোচ বা ট্রেনারের সাথে প্রেম রোমান্স হয়ে যাবার সম্ভাবনা।  তাই প্রেমিক-প্রেমিকারা বাইরের কারো কাছ থেকে কোনো ট্রেনিং নেয়া ছাড়াই এটা নিজেরা নিজেরা ‘সরাসরি স্টেজে পারফর্ম করতে করতে ব্যাপারটা শিখে ফেলার বিষয়। এ জন্যই নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের কৌশলগত নীতি-পলিসি কী হবে, সে গবেষণার খরচ রাষ্ট্রের অভ্যন্তর থেকেই সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু তা না করে নানান আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের অর্থ ও গাইডে ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক গড়ে তোলা হয়েছে। আমেরিকানরা খরচ বহন করছে, ভারতীয় মধ্যবিত্তকে আমেরিকায় নিয়ে যাচ্ছে পিএইচডি, মাস্টার্স করাতে- এতেই তারা খুশি। আর ভাবছে, আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান যেন ভারতের কৌশলগত স্বার্থ দেখবে। ব্যাপারটা দাঁড়ায় এমন, যেন আমেরিকার স্বার্থচোখ দিয়ে কেউ ভারতের কৌশলগত স্বার্থ দেখছে। এ’এক সোনার পাথরের বাটি! ফলাফল হয়েছে যে আমেরিকান শিখানো বুলিই তারা প্রায়ই আউড়ায়।

গত ১০-১২ বছর আগে থেকে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ভারতে গড়ে তোলা শুরু হওয়ার পর এ ব্যাপারে প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে। ভারতীয় থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক এর অন্যতম প্রভাবশালী এমন এক ব্যক্তিত্ব হলেন সি রাজামোহন। বর্তমানে তিনি আমেরিকান থিংকট্যাংক ‘কার্নেগি ইন্ডিয়া’র ডিরেক্টর। এ ছাড়া ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় ‘রাজা মন্ডলা’ (Raja Mandala) শিরোনামে তিনি নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন। এক্সপার্ট হিসেবে তিনি বাংলাদেশেও আসেন। ডোকলাম ইস্যুতে তার লেখা কয়েকটি কলাম  আছে। এর একটি হল – ‘মাইন্ড দ্যা পাওয়ার গ্যাপ’ (Mind the power gap)। অর্থাৎ প্রভাব-ক্ষমতার দিক থেকে চীনের সাথে ভারতের তুলনীয় সক্ষমতার অর্থে, ভারত পিছিয়ে পড়া দেশ, এক বিরাট পাওয়ার গ্যাপ আছে দুই দেশের মধ্যে, ফলে সাবধানে পা ফেলো! এটাই বলতে চাইছেন তিনি।

তার এই কলামের প্রথম বাক্য হল, “উপমহাদেশে একের পর একটি ক্ষেত্রে চীনের ঢুকে পড়ার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নবাবি চিন্তা করার অবস্থায় ভারত নেই”। (As India settles into an extended military standoff with China in the Himalayas, it can’t afford to take its eyes off Beijing’s maritime forays in the Indian Ocean….। India no longer has the luxury of contesting Chinese strategic incursions into the Subcontinent one piece at a time.)   তিনি শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার আর ভুটানের ডোকলাম, এ তিন ইস্যুতে চীনের সাথে ভারতের নিজেকে তুলনা করার কথা ভাবাকে “নবাবি চিন্তা” বলছেন। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় নির্মিত গভীর সমুদ্রবন্দর চীনা মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অপর দিকে মিয়ানমারও চীনা সহযোগিতায় একটা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে যাচ্ছে; উদ্দেশ্য ওই পোর্ট থেকে চীনের কুনমিং পর্যন্ত পাইপলাইনে জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। এটাই এর মূল উদ্দেশ্য, তবে মায়ানমারও তা ব্যবহার করবে।

রাজামোহন বলতে চাইছেন, ওই দুই পোর্টের মাধ্যমে চীনা প্রভাব যেভাবে ভারতের পড়শি রাষ্ট্রের ওপর বাড়বে, সে তুলনায় ডোকলামে কিছু জায়গাজমির মারামারি খুবই তুচ্ছ ঘটনা। অর্থাৎ পোর্ট ইস্যু ভারতের অনেক বড় স্বার্থ হারানোর বিষয়। আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোর কাজ হল – নিজেদের ‘চীন ঠেকাও’ বুলি ভারতীয় শাখায় জড়ো হওয়া ইন্টেলেক্টদের মনে গেঁথে দেয়া। সে কাজে যেসব বয়ান ভারতীয়দের মনে তারা গেঁথে দিয়েছে, সেটা হল অবাস্তব কিছু হাহাকার। যেমন – ‘সব চীন নিয়ে গেল’, ‘চীন ভারতকে ঘিরে ধরছে’ ইত্যাদি। ভারত যেন চাইলেই চীনা অর্থনৈতিক প্রবল প্রভাব উপেক্ষা বা অস্বীকার করতে পারে। এটা যেন ভারতের সাবজেকটিভ ‘ব্যক্তি ইচ্ছার’ ব্যাপার।  অথচ চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব বা সক্ষমতা এগুলো অবজেকটিভ, বাস্তবতা। চীনের কিছু ব্যক্তি এমন দাবি করেন বলেই এটা সত্য, তা এমন একেবারেই নয়। এটা হল অনস্বীকার্য বাস্তবতা।

ধরা যাক, চীনের “সব নিয়ে যাওয়া” বা “ঘিরে ধরা” বয়ান শতভাগ সত্য। কিন্তু এসব তৎপরতা কি বেআইনি, অবৈধ কাজ? মোটেও তা না। এমনকি ভারতও তা দাবি করে বলতে পারছে না। অর্থাৎ অভিযোগ করছে না। কিন্তু তাহলে অভিযোগটা কী? বাস্তবতা হল, চীনের পরাশক্তিগত সক্ষমতার সাথে ভারতের সক্ষমতা তুলনাযোগ্য নয়। কিন্তু সেটা তো চীনের অপরাধ নয়। পরাশক্তিগত সক্ষমতা মানে যার মূল ভিত্তি হল, নিজ অর্থনৈতিক অগ্রসরতা।

রাজামোহনেরই ওই লেখায় তিনি স্বীকার করে বলছেন, ‘চীনের বর্তমান জিডিপির আকার ভারতের চেয়ে পাঁচগুণ বড় এবং চীনের সামরিক খাতে ব্যয়ও ভারতের চেয়ে চারগুণ বেশি”। অর্থাৎ গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের শেয়ার সবচেয়ে বড়, চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত সবার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। ফলে তার বিনিয়োগ সক্ষমতার সাথে কেউ তুলনীয় নয়। ফলে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এশিয়ায় চীনের প্রভাব ভারতের চেয়ে অনেক বেশি হবে এবং এটা স্বাভাবিক। এমনকি যারা ভারতের পড়শি রাষ্ট্র তাদের ওপর চীনা প্রভাব, তাদের অর্থনীতিতে চীনের বিনিয়োগ অনেক বেশি হবে এবং তা বিরাট ভূমিকা নিবে। কিন্তু এরপরই আবার রাজামোহনসহ ভারতীয়দের আহাজারি আমরা শুনতে পাবো – “ভারতের প্রভাবাধীন এলাকায়”, ভারতের ‘পড়শি রাষ্ট্রে’ চীন ঢুকে পড়ছে।

এখানে ভারতের প্রভাবাধীন এলাকা কথাটি বড়ই তামাশার। এর অর্থ কী? যেন এর অর্থ হল, সেটা ভারতেরই তালুক। আসলে তারা বোঝাতে চান, ভারতের বাপ-দাদা হল ব্রিটিশেরা। আর ওইসব এলাকা ১৯৪৭ সালের আগে ব্রিটিশদেরই তো ‘তালুক’ ছিল, কাজেই ভারতের বাপ-দাদা বৃটিশদেরগুলাই এখন ওগুলো যেন ভারতের তালুক!  এছাড়া আর এর অন্য মানে কী?  একই ব্রিটিশ শাসকের অধীনে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ছিল। কিন্তু সে জন্য কি ১৯৪৭ সালের পর এসব দেশের ওপর নেহরুর ভারতের কোনো মৌরসি তালুক-প্রভাব বর্তায়? অথচ ভারতের ইঙ্গিত এমন যেন কলোনিয়াল ব্রিটিশ-প্রভাবের উত্তরসূরি হল নেহরুর ভারত। ব্রিটেন যেন ভারতের বাপ-দাদা। অথচ ‘প্রভাবাধীন এলাকা’ কথাটির একটিই মানে হতে পারে আর তা হল, অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রভাব আশপাশে যতটুকু। এটা লিগ্যাল প্রভাব না, কোনো বৈধ মালিকানাবোধও এখানে নাই, থাকে না।

এছাড়া আরও বলা যায়, আজ আমার অর্থনীতি প্রভাবশালী বলে এর প্রভাব থাকলেও কাল যদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমে যায়, তবে প্রভাব কমে আবার শূন্যও হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া অন্য কেউ আমার চেয়ে অর্থনীতিতে বড় প্রভাবশালী হিসেবে হাজির হয়ে গেলে স্বভাবতই আমার প্রভাব নেমে যাবে, শূন্য হয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভারতের কাছে তার পড়শি মানেই ব্রিটিশ কলোনি সূত্রে নেহরুর ভারতের কল্পিত “স্থায়ী প্রভাবাধীন এলাকা’ বলে কিছু একটা। সবচেয়ে আজব ব্যাপার হল, এত যুক্তিবুদ্ধি নিজেই দেয়ার পরও খোদ রাজামোহন একইভাবে চীনের বিরুদ্ধে হা-হুতাশ করার বাইরে না। অথচ ব্যাপারটা হল, আগামীতে যদি ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা চীনের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে কখনো, তবে ‘ভারতের প্রভাবাধীন’ কথাটি অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেটা এখনই আগেই হয়ে গেছে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। এসব বালক- সুলভ আবদার করার মানে হয় না।

এ ছাড়া আর একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট আছে। যখন দুনিয়া কলোনি দখলের প্রতিযোগিতার যুগে ছিল, আর ব্রিটিশরা অর্থনৈতিক সক্ষমতায় সবার শ্রেষ্ঠ ছিল, সে যুগের পড়তি দিকে ১৮৮০-এর দশকে আমেরিকা প্রথম অর্থনৈতিকভাবে ব্রিটিশ অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু খেয়াল করতে হবে, তবু দুনিয়ার মাতবর হয়ে উঠতে আমেরিকার আরো ৬০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। কার্যত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালের পর আমেরিকা দুনিয়াকে নিজের নেতৃত্বের অধীনে নিতে পেরেছিল। আরো লক্ষণীয়, এই ৬০ বছরে আমেরিকানরা কোনো বড় যুদ্ধে নিজেকে বিরাটভাবে জড়ায়নি। তবে যুদ্ধ একবারই করেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেটা নির্ধারক যুদ্ধ, যার শেষে আমেরিকা ‘দুনিয়ার রাজা’ হয়েছে। এর মাঝে আমেরিকা কোনো নাকি কান্না করেনি, সব নিয়ে গেল বলে হাত-পা ছোড়েনি। আজকের চীনের কাছে তার উত্থানের মডেল সেই আমেরিকা, তাকেই অনুসরণ করে।

কিন্তু ভারত? আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতির সমর্থক হওয়ায় বড় ভাই পিঠ চাপড়ে দিয়েছে আর ভারত মনে করছে – সে পরাশক্তি হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা গায়ে-গতরে খেটে অর্জন করার জিনিস। বড় ভাই পিঠে হাত রাখলেই এটা অর্জিত হয়ে যায় না, কখনও যাবে না। অতএব ভারতের একেবারে পড়শির ওপর চীনের লংটার্ম কোনো অর্থনৈতিক প্রভাব যদি এসে হাজিরও হয়, তবে এ নিয়ে নাকিকান্নার সুযোগ নেই। এছাড়া এটা বেআইনি বা অবৈধও নয়। আর চীনের এই প্রভাব ছুটানোর জন্য ভারতের একটাই করণীয়, চীনের চেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করে ফিরে আসতে পারা। কিন্তু পড়শি দেশের রাজনীতিতে, নির্বাচনে হাত ঢুকিয়েও এই পাল্টা প্রভাব অর্জন করা যায় না। যা প্রায় প্রত্যেকটা পড়শি দেশ নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ সবখানে ভারত করে যাচ্ছে, আর ঘৃণা অর্জন করছে। এমন শর্টকাটে কিছুই অর্জন হয় না, বরং এই কূটকৌশল পুরোটাই ভারতের বিরুদ্ধে যেতে বাধ্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ১৬ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মধ্যপ্রাচ্য এখন প্রিন্সদের কর্তৃত্বে, রাজতন্ত্রের সমাপ্তি কি আসন্ন

মধ্যপ্রাচ্য এখন প্রিন্সদের কর্তৃত্বে, রাজতন্ত্রের সমাপ্তি কী আসন্ন

গৌতম দাস

০৮ আগষ্ট ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2h3

 

ইউরোপের রাজতন্ত্রের (monarchy) শেষ যুগের দিকের এক ঘটনা হল, প্রিন্সরা ক্ষমতা ও রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল, বিশেষ করে রেনেসাঁস (1350-1700) যুগের প্রিন্সেরা। বলা বাহুল্য রেনেসাঁস পিতার চেয়ে পুত্রকেই বেশি প্রভাবিত করবে। তাই পুত্রের সঙ্গে পিতার প্রায়শ তাদের দৃষ্টিভঙ্গীর ভিন্নতার কারণ  অথবা তাঁরা ‘ভাল বুঝে’ বলে অনেক মুরব্বিরা জায়গা ছেঁড়ে দেয়া – এসব থেকেই তারা নতুন ভিত্তির ক্ষমতা তৈরি করতে শুরু করেছিল। ইউরোপের রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হলঃ বিখ্যাত ‘ওয়েষ্টফেলিয়া চুক্তি ১৬৪৮’;  যা সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে প্রিন্সদের এক বড় ইতিবাচক ভুমিকা ছিল।  যদিও এই চুক্তি পরে রাজতন্ত্রের অবসানেই বেশি ভুমিকা রেখেছিল। আর প্রিন্সরা রেনেসাঁসের সমর্থক হয়েও রাজতন্ত্র টিকাতে পারে নাই, বিলুপ্তই হয়ে গিয়েছিল। আর একালের মধ্যপ্রাচ্য কোন রেনেসাঁসের কাল না হলেও, গুরুত্বপুর্ণ হল তারা পশ্চিমের “ওয়ার অন টেররের” কালে পড়েছে। তাই একালে মধ্যপ্রাচ্যের প্রিন্সরা তাদের সক্ষমতা যার যাই থাকুক রাজনীতি ও ক্ষমতা বিষয়ে তারা এখন খুবই সক্রিয়।  তাদের এই সক্রিয়তা কী শেষ পর্যন্ত আসলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রের অবসানের ইঙ্গিত বয়ে নিয়ে আসছে? এমনই কিছু বিষয় পরীক্ষা করব এখানে।

সৌদি আরবের বর্তমান বাদশা হলেন সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদ, সংক্ষেপে সালমান। আর গত ২০ জুন ২০১৭ সালের আগে পর্যন্ত তাঁর উত্তরসুরি বাদশা হিসাবে ঘোষিত ক্রাউন প্রিন্স ছিলেন মোহম্মদ বিন নায়েফ। কিন্তু গত ২১ জুন সকালে সৌদি আরবসহ সারা দুনিয়া জানতে পারে যে উত্তরসুরি বাদশা হিসাবে ক্রাউন প্রিন্সের নাম বদল করা হয়েছে।  আগের ঘোষিত ক্রাউন প্রিন্স  মোহম্মদ বিন নায়েফ ছিলেন বাদশা সালমানের ভাইয়ের ছেলে। তার বদলে এখন উত্তরসুরি ক্রাউন প্রিন্স হয়েছেন মাত্র ৩১ বছর বয়সের মোহম্মদ বিল সালমান, (এখন থেকে এখানে সংক্ষেপে মোহম্মদ লিখা হবে), যিনি বর্তমান বাদশা সালমান এর আপন বড় ছেলে। এমনিতেই তিনি আগে (২০১৫ সালে বাদশা সালমান ক্ষমতাসীন হবাব সময় থেকেই) থেকেই ছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। এবং একই সঙ্গে তিনি ক্ষমতাবান সৌদি ইকনমিক কাউন্সিলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তা যে সংগঠনের প্রধান কাজ হল অধীনস্থ ‘সৌদি আরামকো’ দেখাশুনা করা। সৌদি আরবের সব তেলের মালিকানা যে রাজকীয় কোম্পানীর অধীনে তার নাম ‘সৌদি আরামকো’। সৌদি ট্রাডিশন অনুসারে চলতি বাদশা জীবিত থাকতেই, তিনি মারা গেলে পরের  বাদশা কে হবেন সেই, উত্তরসুরির নাম আগেই ঘোষিত করা থাকে। তিনিই ‘ক্রাউন প্রিন্স’ নামে ভুষিত হন। সে হিসাবে নায়েফের নাম ক্রাউন প্রিন্স হিসাবে ঘোষিতই ছিল। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে মধ্য টার্মে নতুন উত্তরসুরি হিসাবে বড় ছেলে মোহম্মদ বিন সালমান বা মোহম্মদ এর নাম ঘোষিত হল।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে এটা কী একেবারেই স্বাভাবিক ঘটনা, না কী আসলে এটা একটা প্রাসাদ আভ্যন্তরীণ, রক্তপাতহীন ক্যু। কারণ এই ঘটনার সাতদিন পর ২৮ জুন আমেরিকার নিউ ইয়র্ক টাইমস এক রিপোর্ট প্রকাশ করে যে এটা স্বাভাবিক ঘটনা নয়। সেখানে বলা হয় ঐ ক্রাউন প্রিন্সের নাম বদলের পর থেকেই প্রিন্স নায়েফকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। প্রাসাদ থেকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না, ভিতরেরও তার নড়াচড়া সীমিত। টাইমসে এই খবরের উৎস হিসাবে বলা হয়েছিল রাজপরিবারের সাথে আগের বা বর্তমান আমেরিকান প্রশাসনের সম্পর্ক বা বন্ধুত্ত্ব আছে এমন চারজন আমেরিকান অফিসার এদের কাছ থেকে তারা পেয়েছেন। এই খবরের তিন সপ্তাহ পরে ১৮ জুলাই, নিউ ইয়র্ক টাইমস আবার আরও বিস্তারিত এবং খোলাখুলি রিপোর্ট করে জানায় যে ওটা আসলে এক রক্তপাতহীন ক্যু ছিল। ঐ খবরের শিরোনাম ছিল, “প্রতিদ্বন্দ্বিকে সরানোর জন্য সৌদি বাদশার ছেলের ষড়যন্ত্রের প্লট”। কীভাবে জোর করে ক্রাউন প্রিন্স নায়েফের (নায়েফ ও মোহম্মদ পরস্পর কাজিন) পদবি কেড়ে নেওয়া মেনে নিতে নাইফকে বাধ্য করা হয়, কেন তিনি চাপের মুখে রাজি হয়েছিলেন সে রাতের দীর্ঘ ও বিস্তারিত বর্ণনাও সেখানে দেয়া হয়।

কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা নিউ ইয়র্ক টাইমসের ঐ রিপোর্টে সিআইএর প্রসঙ্গ প্রথম আসে; পাঠককে জানানো হয় যে,এই পরিবর্তনে সিআইএ ‘খুবই অখুশি’। কেন? এর অনেক কারণ। তবে সেসব ঘটনার মূল প্রসঙ্গ হল ‘সন্ত্রাসবাদ’; অর্থাৎ আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ বলতে যা বুঝে তাই। আমেরিকা ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্কের শুরু সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে। তবে সেসময় সম্পর্কের ক্ষেত্র হয়েছিল জ্বালানি তেল (মানে আমেরিকা তেলের ভোক্তা আর সৌদিরা এর সরবরাহকারী), যেটা এখন আর তেমন ইস্যু নয়। কারণ মূলত আমেরিকার নিজেরই বিকল্প তেলের (fracking shale oil) উৎস পাওয়া গেছে প্রচুর। এ ছাড়া, গ্লোবাল ইকোনমিতে তেলের চাহিদা মারাত্মকভাবে পড়ে গেছে এবং দাম কমে গেছে। কিন্তু আমেরিকা ও সৌদি আরবের  সম্পর্কের মধ্যে আগের মতই প্রায় সমান গুরুত্বের জায়গা এখন  নিয়ে আছে, টেররিজম বা সন্ত্রাসবাদ। এই ইস্যুতে বিশেষ করে নাইন-ইলেভেনের পর থেকে, আমেরিকার একাজে খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করার দরকার হয়ে উঠেছে সৌদি আরবকে। অপসারিত প্রিন্স নায়েফ অবশ্য ছিলেন সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। আর তা থাকলেও, আমেরিকার কাছে তিনি ছিলেন খুব গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু।  মধ্যপ্রাচ্য কাউন্টার-টেররিজমে আমেরিকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মূল ব্যক্তিত্ব, আমেরিকার ভাষায় মূল ‘কনট্রাক্ট’ ছিলেন তিনি। কাউন্টার-টেররিজম মানে যাকে টেররিজম বলা হচ্ছে, ঠিক তার কায়দায় পাল্টা টেররাইজ বা সন্ত্রাস সৃষ্টি করে সব ভণ্ডুল করে দেয়া।  নায়েফকে আমেরিকা বহুবার কাউন্টার টেররিজম তৎপরতা প্রসঙ্গে নিজ দেশে নিয়ে ট্রেনিং দিয়ে এনেছে। আর শুধু তাই নয়, শুধু সৌদি আরবেও নয়, সারা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার নানাবিধ কর্ম-পরিকল্পনায় আমেরিকা তাকে অংশীদার করে রেখেছিল, একসাথে কাজ করেছিল। সারকথায়, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কাউন্টার-টেররিজম প্রোগ্রামের মূল ‘কনট্রাক্ট’ ছিলেন তিনি। নায়েফকে আমেরিকা এভাবেই গড়ে তুলেছিল। ফলে সেই নায়েফকে এখন সরিয়ে দেয়াতে সিআইএ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে কথা তারা হোয়াইট হাউজে রিপোর্ট করে বলেছে বলে নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট আমাদের জানিয়েছে। এছাড়া আরও আছে।

টাইমসের বর্ণনা অনুযায়ী নিউ ইয়র্কের একজন আমেরিকান অফিসিয়াল ও সৌদিরাজের একজন পরামর্শকের মতে, কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বে যে  অবরোধ আরোপ করা হয়েছে, প্রিন্স নায়েফ আসলে  এর বিরোধী ছিলেন। এটাও তাঁকে অপসারণের একটা কারণ। এ ছাড়া সিআইএ’র সংক্ষুব্ধ হওয়ার আর একটা বড় কারণ হল, নায়েফের সাথে তার অনুগত বহু সৌদি সিভিল এবং সামরিক অফিসার যাদের কাউন্টার টেররিজমের ট্রেনিং দিয়ে আমেরিকা একটা ওয়ার্কিং গ্রুপ বানিয়েছিল, নায়েফের অপসারণের সাথে সাথে তাদেরকেও চাকরিচ্যুত বা বন্দী করে রাখা হয়েছে। যেমন, নায়েফের খুবই ঘনিষ্ঠ সামরিক জেনারেল আবদুল আজিজ আলহুয়াইরিনিও বন্দী হয়ে আছেন।

এ তো গেল আমেরিকার তরফে খবর। কোল্ড ওয়ারের আমল থেকে সোভিয়েত ইনটেলিজেন্স সিআইএ এর পালটা দুনিয়ার সব জায়গাতেই ছড়িয়ে ছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার সাথে সাথে সেই অবকাঠামোর অনেকটাই ভেঙে গিয়েছিল, উত্তরসূরি রাশিয়া এর পরিচালনা খরচ আর জোগাতে না পারার কারণে। কিন্তু পুতিনের আমলে সেগুলো আবার খাড়া করা হয়েছে, আর পুতিন সেগুলোকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করেছেন। অথবা অন্যের কাছে নানা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ইনটেলিজেন্স বিক্রি অথবা অন্য রাষ্ট্রের সাথে শেয়ার করে, অনেক সময় নিজ বহু স্বার্থ উদ্ধার করেছেন। যেমন গত বছর তুরস্কে, ‘গুলেন পার্টি’ আমেরিকায় ও তুরস্কে বসে এরদোগানের বিরুদ্ধে কী কী ষড়যন্ত্র করেছিল, আর আমেরিকারইবা তাতে কী ভূমিকা ছিল সেই সব ইনটেলিজেন্স পুতিন এরদোগানকে জানিয়েছিলেন। এতে করে এরদোগানের আস্থা অর্জন করে পুতিন তুরস্কের সাথে রাশিয়ার আগে ভেঙে থেকে যাওয়া বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরায় চালু করেছিলেন। তবে পুতিনের রাশিয়ার সংগৃহীত ইনটেলিজেন্স বিক্রি বা শেয়ার বহুভাবেই করা হয়ে থাকে, এমনকি অনেক সময় তা পুতিনের প্রপাগান্ডায়ও ব্যবহার করা হয় ও হয়েছে। আবার অনেক সময় কোন ইস্যুতে এক পাল্টা মিডিয়া রিপোর্ট করে দেয়া হয়, বাজারে ফ্যাক্টস জানিয়ে দেয়ার জন্য। এমন এক ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক, আমেরিকাবিরোধী এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত, কলাম লেখক হলেন পেপ এস্কোবার। তবে তিনি রাশিয়ার দিকে তাকিয়ে অনেক সময় ভাষ্য তৈরি করেন। যদিও এতে আমাদের মত পাঠকের সুবিধা হল, যেহেতু রাশিয়ান ইনটেলিজেন্সে ঘনিষ্ঠতা থাকায় তিনি নিজে সংগৃহীত ইনটেলিজেন্স পেতে বা দেখতে তার একসেস আছে, তিনি জানতে পারেন আর তা তিনি লেখায় শেয়ার করেন, ফলে তার লেখা পাঠ করায় আমরা মেন-স্ট্রিমের বিপরীত বহু তথ্য ও ভাষ্য পেয়ে থাকি।

সৌদি আরবের এ ঘটনায় এস্কোবার দুটো রিপোর্ট লিখেছেন। একটি রাশিয়ান স্পুটনিক পত্রিকা, অন্যটি সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত সিরিয়াস পত্রিকা ‘এশিয়া টাইমস’-এ। সৌদি আরবের ইস্যুতে প্রায় একই ধরনের রিপোর্ট তিনি লিখেছেন দুজায়গাতেই;কথিত ‘প্রাসাদ ক্যু’র রদবদলের চার দিনের মাথায় ২৪ জুন স্পুটনিকে। আর ‘এশিয়ান টাইমসে’ লিখেছিলেন প্রায় এক মাস পরে ২০ জুলাই

ওদিকে প্রকাশিত বিদেশি প্রায় সব মিডিয়া ভাষ্যে নতুন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান চিত্রিত হয়েছেন একজন কম বয়সী, বেপরোয়া, দায়িত্বজ্ঞানহীন, উচ্চাভিলাষী, হামবড়াভাবের মানুষ ইত্যাদি হিসেবে। এসবের ভিতর তাদের মূল অভিযোগ হল,  তিনি কাজের গুরুত্ব ও দায়দায়িত্ব না বুঝেই সব কাজে মধ্যমণি থাকতে চান। সেদিকে ইঙ্গিত করে তাই,  গ্লোবাল বিনিয়োগ জগতের গুরুত্বপূর্ণ টিভি ও অনলাইন মিডিয়া ‘ব্লুমবার্গ’(Bloomberg) তার নাম দিয়েছে ‘মি. এভরিথিং’

এস্কোবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করে দাবি করেছেন যে, সিআইএ নায়েফের অপসারণে প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট। কারণ তারা মনে করে নতুন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ নিজেই ‘টেররিজম স্পন্সর’ করেন। দাবি করা হচ্ছে আল-নুসরা সংগঠনের সাথে তিনি সম্পর্ক রেখেছেন। আর এসব কারণে,গত এপ্রিল ২০১৪ সালে টেররিজম ইস্যুতে আমেরিকার সিআইএ সৌদি আরব ও আমিরাতের (বিশেষ করে আবুধাবির প্রিন্স জায়েদ, তিনি মোহাম্মদের মেন্টর/বড়ভাই বলে কথিত আছে) ক্ষমতাসীনদের ওপর প্রচণ্ড নাখোস হয়ে পড়েছিল। এমনকি তাদের অপসারণের কথা পর্যন্ত ভেবেছিল। পরে এক আপস ফর্মুলায় সাব্যস্ত হয় যে, বাদশা বদল করে নায়েফকে ক্ষমতায় এনে এর সমাপ্তি টানা হবে। এস্কোবার তার ইনটেলিজেন্স সোর্সকে উদ্ধৃত করে দাবি করেছেন, ওই ফর্মুলা সাব্যস্ত হওয়ার আগে আমেরিকা বা সিআইএ একপর্যায়ে সৌদি বাদশাহ’র বিরুদ্ধে নাকি আমেরিকান সৈন্য পাঠানোর কথাও ভেবেছিল। এটা ভাবার কারণ আছে যে, ওই ফর্মুলাটাই প্রিন্স মোহাম্মদ ও তার বাবা বাদশাহ সালমানকে আরো মরিয়া হতে উৎসাহিত করেছিল। ইতোমধ্যে খবর বেরিয়েছে, প্রিন্স মোহাম্মদ ও আবুধাবির প্রিন্স জায়েদ মিলে ভাড়াটে আমেরিকান সৈন্য (ব্ল্যাকওয়াটার) দিয়ে কাতারের তরুণ আমির শেখ তামিম আল থানিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এটা সিআইএ নাকি টের পেয়ে ভণ্ডুল করে দিতে সমর্থ হয়। কিন্তু তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রিন্স মোহাম্মদ ও বাদশাহ সালমান সিআইএ ’র পছন্দের হবু বাদশা নায়েফকেই সরিয়ে ফেলে দিতে সক্ষম হলেন। এটাই হল এস্কোবারের ব্যাখ্যা।

এসব ব্যাখ্যা হয়ত সবটা সত্যি নয়,কিন্তু ফেলনাও নয়। নয়। গত ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের দুই তারিখে জার্মান ইন্টেলিজেন্স এর বরাতে লন্ডন টেলিগ্রাফ এক রিপোর্ট ছেপেছিল।  শিরোনাম ছিল ‘সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলছে’। সেখানে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদের নাম ও ছবিসহ উল্লেখ করে, তাকে এক মহা ‘গ্যাম্বলার’, বিপজ্জনক ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছিল যে, সিরিয়াতে আলকায়েদার সাথে সম্পর্ক রয়েছে তাঁর। সৌদি আরবকে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা আনার জন্য দোষারোপ করা হয়েছিল। এস্কোবার বলছেন, আসলে এই অভিযোগটাই পরে কাতার অবরোধের সময় সৌদি আরব ও অন্যরা কাতারের বিরুদ্ধে তুলেছিল। অথচ  এই অভিযোগের সবটাই আসলে সৌদি বাদশাহ ও বর্তমান ক্রাউন প্রিন্সের বিরুদ্ধে এনেছিল সিআইএ এবং জার্মান ইনটেলিজেন্স।

লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ০৭ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীন-ভারত ডোকলামে মুখোমুখি দশার কারণ রাস্তার বাইরে!

চীন-ভারত ডোকলাম মুখোমুখি দশার কারণ রাস্তার বাইরে!

গৌতম দাস

০১ আগষ্ট ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2gF

 

ডোকলাম ভুটানের এক উপত্যকা। উপরে ছবিতে দেখুন নেপাল ও ভুটানের মাঝে কা্লো অংশ, যেটা আসলে সিকিম, যা এখন ভারতের অংশ। এই অর্থে নেপাল-ভুটানের মাঝে ভারত আছে। কিন্তু পুরাটাই ভারত নয়। এর কিছু অংশ আবার চীনের ভুখন্ড। চীনের ঐ ভুখন্ডের লাগোয়া এক অংশ হল ভুটানের ডোকলাম উপত্যকা। অর্থাৎ সারকথায় ডোকলাম ভুখন্ডের বিতর্ক মূলত ভুটান-চীনের মধ্যে সীমান্তের বিতর্ক। ভারতের কোন ভুখন্ড এটা নয়। এটা তাই কোনো মতেই চীন-ভারতের কোনো সীমান্ত-ভুখন্ডই নয়। চীন সেই সীমান্ত বরাবর থাকা কাঁচা রাস্তাকে ৪০ টন ভারবহনে সক্ষম এমন পাকা রাস্তায় উন্নীত করার কাজ শুরু করতে গেলে বিতর্ক শুরু হয়।

ভুটানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুসারে গত ১৬ জুন ২০১৭ ডোকলামের ডোকলা থেকে সীমান্তবর্তি যে রাস্তা যোমপেলরিতে ভুটানিজ আর্মি ক্যাম্পের দিকে গেছে, সীমান্তবর্তি সে রাস্তার পাশেই কাজ করতেই চীনারা এসেছিল। চীনা ভাষ্যও প্রায় এরকমই যে, সীমান্ত বরাবর ওই রাস্তাতেই চীনের পরবর্তী সীমান্ত ক্যাম্প পর্যন্ত রাস্তা তৈরি ছিল তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনী আমাদের সামনে কাজে বাধা সৃষ্টি করে বসে যায়।

তবে ভারতীয় সেনা কেন? সীমান্ত বিতর্ক তো ভুটান-চীনের মধ্যে। এ ব্যাপারে ভারতের যুক্তি হল, ভুটান স্বাধীন রাজার রাষ্ট্র (যা এখন কনস্টিটিউশনাল রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র) বটে। কিন্তু ব্রিটিশেরা চলে যাওয়ার পর ১৯৪৯ সালে ভূমিবেষ্টিত ভুটানের বিদেশনীতির বিষয়াদি দেখার জন্য ভারত-ভুটান এক চুক্তি হয়েছে। এ ধরনের দাসখত চুক্তিগুলোর গালভরাভাবে নাম রাখা হয় ‘শান্তিচুক্তি’ বা ‘বন্ধুত্বচুক্তি’; এখানেও তাই হয়েছিল। এটা হল অন্যের ভূমিবেষ্টিত অবস্থার প্যাঁচে পড়াকে কেন্দ্র করে তার দুরবস্থার সুযোগ নেয়া। নেহেরুর ভারত ল্যান্ডলকড ভুটানের দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাকে ঐ চুক্তি করতে বাধ্য করেছিল।  ১৯৪৯ সালের ওই চুক্তির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ভুটানের বিদেশনীতি ভারতের পরামর্শে গাইডেড হতে হবে। [“……Bhutan agrees to be guided by the advice of the Government of India in regard to its external relations.”]

যদিও ১৯৭৯ সালে ভুটানের রাজার এক সাক্ষাৎকারের রেফারেন্সে অনেকে দাবি করেন যে, ভুটানের রাজা মনে করেন ওই অনুচ্ছেদে বলা ভারতের পরামর্শ ভুটানের জন্য ‘অবশ্য পালনীয়’ এমন কথা লেখা নেই। [“India’s advice in the conduct of foreign affairs was welcome but “not binding” on Bhutan, he said.] তবে ডোকলাম ইস্যুতে ভারতীয়রা ওই চুক্তির অজুহাতে “ভুটানের অনুরোধে” সেখানে সেনা হাজির করেছে বলে জানায়। ফলে স্বভাবতই চীনারাও পরে সেখানে পাল্টা সেনা সমাবেশ ঘটায়। দুই সেনাবাহিনী মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়।   আর সেই থেকে ব্যাপারটা চীন-ভারত সম্ভাব্য সীমান্তযুদ্ধের টেনশন হয়ে হাজির হয়ে পড়েছে। স্বভাবতই চীনের দিক থেকে জানানো হয় তারা নিজ ভূখণ্ডেই তৎপরতা করছে; ফলে নিঃশর্তভাবে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করার দাবি করে চীনারা।

অবস্থা এখন এমনই যে ভারতেরই এক প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত কূটনীতিক পি স্তবগান (P stobdan) লিখছেন, ভারতের ভুটান নীতি একটা কলোনিয়াল চিন্তা ভাবনা। ভারতের আসল সমস্যা তার ভুটান নীতি, ভুটানের সীমান্ত নয়।  নী  শিরোনামে একটা উপসম্পাদকীয় লিখে বলছেন,  ভারতের ভুটান নীতি কলোনিয়াল কাঠামো চিন্তা। এটা কাজ করবে না, টিকবে না, এটা বুদ্ধিমান বিদেশনীতির চিহ্ন নয়। (This approach was not sustainable; nor was it a sign of prudent foreign policy.) সে তুলনায় গত কয়েক বছরে চীন অনেক বেশি গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করে ফেলেছে।

তবে এই প্রথম চীনের দিক থেকে এক তাৎপর্যপূর্ণ যুক্তিও দেয়া হয়। বলা হয়, চীন-ভুটান সীমানা বিতর্কে যদি ‘শান্তিচুক্তির’ অজুহাতে ভারত নাকগলায় তবে কাশ্মির ইস্যুতেও পাকিস্তানের পক্ষে তৃতীয় রাষ্ট্র (মানে ইঙ্গিতে চীনের কথা বলা হলো) নিজের সেনা নিয়ে হাজির হয়ে যেতে পারে। চীনের এই যুক্তিতে দম আছে বলতেই হয়। এই বয়ানে মধ্যে ভারতের জন্য বিপদের কথা বুঝে ভারত অন্য এক যুক্তির দিকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। ভারত এবার যুক্তি তুলে যে শিলিগুড়ির নিজের ‘চিকেন-নেক’ এলাকার নিরাপত্তার কথা ভেবে ভারত ঐ  রাস্তা পাকা করার কাজ করতে চীনকে বাধা দিয়েছে।

চিকেন-নেক সম্পর্কে সংক্ষেপে বলে নেয়া দরকারঃ ব্যাপারটা হল, ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান মানে আজকের বাংলাদেশ ভারত থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই আলাদা হয়ে যাওয়ার কারণে ধরা যাক কলকাতা থেকে কোনো ভারতীয় আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ইত্যাদি ভারতের উত্তর-পুর্ব অঞ্চলের রাজ্যে যেতে চাইলে তার আর (ভিন্ন রাষ্ট্র বলে) বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকল না। তাদের যেতে হবে পুরা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত একটা চক্কর ঘুরে। যেন বেনাপোল থেকে যে কুমিল্লা যেতে চায় তাকে বেনাপোল থেকে দিনাজপুর তেঁতুলিয়া, রংপুর, সিলেট হয়ে এরপরে কুমিল্লা- এভাবে। সরাসরি বেনাপোল থেকে ঢাকা হয়ে কুমিল্লা নয়। শুধু তাই নয়, তাঁকে যেতে হবে ভারতীয় ভূখণ্ড ধরে যা পাহাড়ি দুর্গম শুধু নয় এরচেয়ে এক বড় বিপদ আছে।  কলকাতা থেকে সাত রাজ্যে যেতে যাত্রাপথে শিলিগুড়িতে সবচেয়ে চিকন (চওড়া মাত্র ১৮-২০ কিলোমিটার, যার একদিকে নেপাল অন্যদিকে বাংলাদেশ) এক অংশ পাড় হতে হয়। ওই অংশকেই চিকেন-নেক বলা হচ্ছে। কারণ কম চওড়া বলে ওই চিকন অংশ রুদ্ধ করে দেয়া গেলে (কয়েকটা নষ্ট গাড়ি বা ভারী কিছু ফেলে রাস্তাগুলো ব্লক করে দিলেই হল) ভারতের, অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের সাথে সাত রাজ্য যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে যাবে। উপরে ছবিতে চিকেন নেককে  ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এখন  এই ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ এর অজুহাত তুলে ডোকলাম ইস্যুতে ভারত বলতে চাচ্ছে, ডোকলাম ভারতের ভূখণ্ড না হলেও সে চীনকে রাস্তা তৈরিতে বাধা দিয়েছে নিজের ঐ ‘চিকেন-নেকের’ নিরাপত্তার কথা ভেবে। এটাও খুবই দুর্বল যুক্তি, প্রায় যুক্তিহীন ভাসাভাসা কথার মত। শিলিগুড়ির চিকেন-নেক ভারতের জন্য ষ্ট্রাটেজিক অর্থে দুর্বল জায়গা সে কথা বুঝা যায়। কিন্তু ওই রাস্তা তা ভুটানের বা চীনের যারই অংশ হোক না কেন, আর তা পাকা বা কাঁচা রাস্তা যাই থাকুক, ‘চিকেন-নেক’ অংশ ভারতের সবসময় জন্য দুর্বলতা। রাস্তাটা পাকা হয়ে যাওয়াতে এরপর ওটা ভারতের জন্য দুর্বলতা হয়ে দাড়ায় তা তো নয়।

আচ্ছা আরেকটা প্রশ্ন : ভারত কি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমেরিকার সাথে গলাগলি করে চীনে সমুদ্রপথে প্রবেশের পথের ‘চিকেন-নেক’ সিঙ্গাপুরের ‘মালাক্কা প্রণালি’ কোথায় আছে তা খুঁজে বের করেনি? এটা ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়ার মধ্যে সমুদ্রপথ তুলনামূলক চিকন হয়ে আসা একটা অংশ। এই ইস্যুতে আমেরিকান সিনেটের শুনানিতে প্রফেসরদের সাক্ষ্য দিয়ে বলা পিডিএফ নোট এখনো নেটে যে কেউ পেতে পারে।  [ US CONGRESS HEARING ON INDIA-US RELATIONSHIP  – চোদ্দ পৃষ্ঠার এই ডকুমেন্টে ষষ্ঠ পৃষ্টায় ‘চিকেন-নেক’ ‘মালাক্কা প্রণালির’ ছবি দিয়ে চিনানো আছে।  এখানে কোনো জাহাজ ডুবিয়ে দিলেও এই সমুদ্রপথ (চীনে প্রবেশপথ) ব্লক হয়ে যেতে পারে। প্রণালি বা ইংরেজিতে strait মাত্রই সমুদ্রপথে এটা চিকন গলার সমস্যা। কিন্তু মালাক্কা প্রণালি ভারতের ত্রিসীমানার কোনো স্থান নয়। তবু আমেরিকার প্ররোচনায় ভারত কী আমেরিকার কৌশলগত পরিকল্পনায় শামিল হয়নি? গত ২০০৫ সাল থেকে ভারত আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ কাজে শামিল হয়েছে। তখন থেকেই কে কার চিকন গলা ধরতে পারে বা এর মজা কি সে কথা আমরা শুনে আসছি। কাজেই ‘কারো চিকন গলা চেপে ধরা কোন খারাপ কাজ না’- এমন নৈতিকতা বা আইন তো ভারতই মানে নাই। এমন পদক্ষেপ সে চীনের আগেই চীনের বিরুদ্ধে অভ্যাস নিয়ে ফেলেছে।  কাজেই চীন যদি ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরে চিকন গলা চেপে ধরে আসে সেটাকে অন্যায় বলার নৈতিকতা ভারতের নাই।  তবুও আমরা মনে করি এসব কাজ সবার ছেড়ে দেয়া উচিত। কোনো রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পণ্য চলাচলে অন্য রাষ্ট্রের বাধা তৈরি করা অন্যায়, নীতিগতভাবে সবার এই অবস্থান বাস্তবায়নে আসা উচিত।

ইতোমধ্যে এখানে আর এক মজার কাণ্ড ঘটে গেছে। ডোকলাম বিরোধ ঘটনার তিন সপ্তাহের মধ্যে খোদ ভারতেই মোদি সরকার নিজের সিদ্ধান্তের কারণে একঘরে হয়ে যায়। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ভারতের মিডিয়ার রিপোর্ট। এমন একটা রিপোর্ট হল, ১৫ জুলাইয়ের আনন্দবাজার পত্রিকা; যার শিরোনাম ‘ভুটানের আর্জিতে দুশ্চিন্তা, দাদাগিরির মাশুল গুনছে দিল্লি’। ওর সারকথা ছিল, ডোকলামে সৈন্য সমাবেশের দায়, সামরিক উত্তেজনা তৈরির দায় একা মোদি ও তার সরকারের বলে সব বিরোধী দল আর একাডেমিশিয়ানদের মধ্যে এক বড় অংশ সবাই হাত ধুয়ে ফেলেছিল। মোদি সর্বদলীয় সভা ডেকেছিলেন পরামর্শ নেয়ার জন্য সেখানকার ঘটনা এটা। অথবা বলা যায়, সম্মানজনক পশ্চাত-অপসারণের উপায় খুঁজতে সর্বদলীয় সভা ডেকেছিলেন মোদি। ওই সভার সিদ্ধান্ত, আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে সেখানে একটাই কথা, সৈন্য প্রত্যাহার করে কূটনীতির পথ হাতড়ানোতেই সমাধান।

কিন্তু সবাই বলতে চেয়েছে বিশেষ করে কংগ্রেস নেতা রাহুল  ও তৃণমুলের মমতা যে, মোদি উসকানিদাতা, খুঁচিয়ে ঘা করেছেন তিনি। কিছু সুনির্দিষ্ট শব্দ ও বাক্য নেয়া যাক ঐ রিপোর্ট থেকে। খোদ আনন্দবাজারই মোদির নীতিকে “দাদাগিরি” বলেছে। লিখেছে, “হিমালয়ের কোলের এই একমুঠো রাষ্ট্রকে তার তাঁবে থাকা দেশ বলেই মনে করে দিল্লি”। এতদিন এসব কথা আমরাই সবসময় আমাদের মূল্যায়নে বলে এসেছি, এখন আনন্দবাজারও বলছে বাধ্য হয়ে; এটা আমাদের মুল্যায়নকে স্বীকৃতি দেয়। আসলে, নেহরুর হাতে আকার পাওয়া, ভারতের আমলা-গোয়েন্দাদের চিন্তা কাঠামো মূলত কলোনিয়াল। ফলে ভিন্ন দুই জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রের মধ্যে কলোনি ধরনের অধীনতার বাইরে আর কোনো ধরনের সম্পর্কের কথা এরা চিন্তা করতে পারে না। এজন্য যেকোন বিদেশনীতি বিষয়ক চিন্তায় এটা প্রতিফলিত, প্রকাশিত হয়ে পড়ে।

নেহরু নিজেকে একটা স্বাধীন রিপাবলিকের প্রধানমন্ত্রী এটা অনুভবের চেয়ে নিজেকে যেন কোন ব্রিটিশ ভাইসরয় ভাবতে বেশি পছন্দ করতেন। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ নেপাল বা ভুটানের সাথে ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতের তথাকথিত ‘শান্তিচুক্তিগুলো’। এরই আলোকে একালে ভারত তার প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে চেয়ে এসেছে, এখনো করে যাচ্ছে। যার ফলাফলে ভারতের সব প্রতিবেশীর সাথে তার সম্পর্ক অন্তত আনন্দবাজার ভাষায় বললে, ‘দাদাগিরির’। আমাদের এই দাবির পক্ষে প্রমাণ হলো খোদ আনন্দবাজারেরই শিরোনাম- ‘দাদাগিরির মাশুল গুনছে দিল্লি’।

ওই একই রিপোর্টের ভেতরে আনন্দবাজার আরও লিখছে, ‘১৯৪৯ সালে ভুটানের সাথে শান্তিচুক্তি করেছিলেন জওয়াহের লাল নেহরু। সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, বিদেশনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভুটান ভারতের পরামর্শ মতোই চলবে। ২০০৭ সালে ভুটান যখন পুরোদস্তুর রাজতন্ত্র থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে হাঁটে, তখন চুক্তিপত্র থেকে এই ধারাটি বাদ দেয়া হয়। যদিও কার্যক্ষেত্রে থিম্পুর ওপর দিল্লির প্রভাব খুব একটা খর্ব হয়নি। ডোকলাম নিয়ে ভারতের চাপের মুখে চীনকে ডিমার্শেও পাঠিয়েছে ভুটান। তার পরেও তার এই বেসুর সাউথ ব্লকের কানে বাজছে।’

এখানে দেয়া দুটো তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভুটান এখন এক কনস্টিটিউশনাল রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র, সেখানে আইন প্রণয়নের এখন জননির্বাচিত সংসদ আছে। কিন্তু আনন্দবাজারই সাক্ষ্য দিয়ে বলছে, ভুটান সংসদীয় সরকার হওয়ার পর ২০০৭-এর সংশোধিত চুক্তিপত্রে আগের মতো ভারতের ‘দাদাগিরির অনুচ্ছেদটা’ নেই। অথচ দাদাগিরি চলছে। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, ‘ডোকলাম নিয়ে ভারতের চাপের মুখে চীনকে ডিমার্শেও পাঠিয়েছে ভুটান’। এখানে একটু ব্যাখ্যা করে বলা দরকার। ডিমার্শে হল কূটনৈতিক ইংরেজি শব্দ démarche; যার বাংলা অর্থ হল, আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় কোন আপত্তি অভিযোগ বা মনোভাব জানানো। ভুটান ডোকলাম ইস্যুতে চীনের কাছে আপত্তি জানিয়েছে ‘ভারতের চাপে পড়ে’, নিজে থেকে নয়। এটাই আনন্দবাজারের দাবি। তাই এখন খোদ ভুটান ভারতকেই সৈন্য প্রত্যাহার করতে বলাতে ভারত প্রমাদ গুনছে। এটাই আনন্দবাজারের রিপোর্ট। ওদিকে, ভারত সবার আগে সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে; তাই চীন, সবার আগে ভারতের সেনা প্রত্যাহারের শর্ত রেখেছে। আর এ অবস্থায় ভারতের সব বিরোধী দল মোদির সাথে দূরত্ব তৈরি করেছে। মোদিকে উসকানিদাতা, খুঁচিয়ে ঘা করা লোক বলেছে। সুযোগ বুঝে কংগ্রেস নেতা রাহুল প্রশ্ন তুলেছে,  ভারতের বন্ধু অনেক রাষ্ট্র ছিল (সম্ভবত রাশিয়ার কথা বলতে চাইছেন) তারা কেন এখন দূরে- এই প্রশ্ন তুলেছে। তবে শেষে ‘সৈন্য প্রত্যাহার আর কূটনীতিক আলাপ’ এই সীমায় মোদি্র ফিরে আসার শর্তে সমর্থন জানিয়েছে। আর, সব মিডিয়া ‘কূটনীতি চাই’ বলে সম্পাদকীয় লিখেছে। যেমন আনন্দবাজারের ১৯ জুলাইয়ের রিপোর্টের শিরোনাম, ‘যুদ্ধ নয়, চাই কূটনীতি’। বেচারা!

মোদির অবস্থা একঘরে শুধু নয়, একেবারে বেইজ্জতি হওয়ার দশা। কারণ চীনের কঠোর অবস্থানে দাঁড়িয়ে দাবি করেছে আগে এককভাবে ভারতের সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। আর মোদির সরকার উঠেপড়ে লেগেছে যে, একসাথে প্রত্যাহার টাইপের একটা কথা যদি চীনের কাছ থেকে বের করা যায়। গত ২৭-২৮ জুলাই ছিল চীনে ব্রিকস রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা কাউন্সিল বা উপদেষ্টা স্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক। ভারত চেষ্টা করছিল ওই সভার সাইড লাইনে চীনের প্রতিনিধি স্টেট কাউন্সিলরের (Chinese state councillor Yang Jiechi) সাথে যদি একটা বৈঠকের সুযোগ করে নিতে পারেন। মাত্র গত ২৯ জুলাই দুপুরে ভারতের কোনো কোনো মিডিয়া খবর দিচ্ছে যে, ওই মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কী কথা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো রিপোর্ট কোথাও ছাপা হয়নি।

ইতোমধ্যে রাশিয়ান ডিপ্লোম্যাট সূত্রে অনেক খবর আসছে, যেগুলোর ফরমাল ভার্সান এখনো রিলিজ হয়নি। সেখানে বলা হচ্ছে- ১. অন্তত দু’সপ্তাহ আগে চীন ভারতকে জানিয়েছিল যে তারা নতুন রাস্তা বানাতে নয়, রাস্তা আগে থেকেই যেটা ছিল সেটা চওড়া করতে যাচ্ছে। কিন্তু ভারত সে নোটিফিকেশন উপেক্ষা করেছে। ২. চীনারা যেখানে অবস্থান ও কাজ করছিল সেটা ইতোমধ্যে ভুটানের সাথে আলোচনায় বিবাদ নিরসিত হিসেবে চিহ্নিত চীনের অংশ। ৩. তাই চীন এখনো প্রমাণ চাচ্ছে ও দাবি করছে যে ভুটান কখনোই ভারতকে কোনো সামরিক অ্যাকশন নিতে অনুরোধ জানায়নি।

ভারতের কোনো কোনো জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তাই প্রস্তাব রেখেছেন ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের উচিত এখনই, আসলে কী ঘটেছে তার ঘটনাক্রম কী সে বিষয়ে ভারতে অবস্থিত সব কূটনীতিকদের কাছে ব্রিফিং দিয়ে ভারত অবস্থান পরিষ্কার করুক। এমন একজন হলেন ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সাঈদ নকভি। তিনি দাবি করছেন, তার জানা মতে ভারতীয় সরকার এক আমেরিকান কূটনীতিক ছাড়া আর কাউকেই এখন পর্যন্ত আসলে কী ঘটেছে তা জানিয়ে কোনো ব্রিফিং কাউকেই দেননি।

চীন-ভারত সংঘাতে  সময়ে সময়ে আমরা বিভিন্ন ইস্যুতে তা হাজির হতে দেখি। তা সত্ত্বেও যদি বলা হয় এগুলোর মধ্যে খটর মটর লাগার সবচেয়ে অমসৃণ বিষয়টা কী? সে প্রসঙ্গে সংক্শেষেপে কিছু বলে শেষ করব।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সেটেল হওয়া চলতি গ্লোবাল অর্ডার আমেরিকার নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে চালু হয়েছিল। সেটা তার আয়ুর শেষ করতে যাচ্ছে। আর একই সাথে ধীরে ধীরে চীন উঠে আসছে সে জায়গা নিতে। গ্লোবাল পরিবর্তনের এই অভিমুখকে স্বীকার করে নিয়েও মানতে ইচ্ছা করে না দশা আমেরিকার। ফলে কম করে হলেও যতটা সম্ভব সে আসন্ন পরিবর্তনকে দেরি করিয়ে দেয়ার নীতি নিয়েছে আমেরিকা। তবে কম-বেশির ফারাক আছে। ওবামা  প্রশাসন যতটা এব্যাপারে এগ্রেসিভ হয়ে ততপর ছিল, ট্রাম্প প্রশাসন ততটা চেয়ে বলা ভাল একই কৌশলে ততপর নয়। যদিও ঘটনা শুরু করে দিয়ে গিয়েছিল  সেকেন্ড টার্মের (2005-9) বুশ প্রশাসন। মূল ব্যাপারটা হল আমেরিকা ভারতকে প্রলুব্ধ করে, লোভে ফেলে নতুন গ্লোবাল ব্যবস্থার নতুন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন AIIB, BRICS, SCO ইত্যাদি) গড়ে উঠতে দেরি করিয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। কারণ নতুন গ্লোবাল ব্যবস্থাগুলো তৈরিতে চীন ভারতকে সাথে নিতে চায়, আর একাজে চীনের প্রধান সহযোগী পুতিনের রাশিয়া। কিন্তু ভারত গাছেরও খেতে চায় আবার তলার গুলোও কুড়িতে নিতে চায় – নীতি নিয়েছে। সে চীন, রাশিয়ার সাথে মিলে নতুন ব্যবস্থা গড়তে ভাল অবস্থানগুলো নিতে চায় আবার আমেরিকার দেয়া লোভের অফারগুলোও পেতে চায়। ভারতের এই দ্বৈততা, দ্বিমুখি ঝোঁক – এটাই সব সমস্যা সংকটের উতস এখানে।

এর ফলে ভারত তার যেসব বিরোধে কোন সংঘাত  তৈরি না করে সমাধান করার কথা তা মুখ্য সংঘাত বানিয়ে ফেলছে। আর যেখানে বড় সংঘাতই হবার কথা তা নিয়ে কোন উচ্চবাচ্যই করছে না।  আর এর সাথে যুক্ত হয়েছে সস্তা জাতীয়তাবাদের চিন্তা। অথচ কমিউনিস্ট বা জাতীয়তাবাদীরা যাকে ‘জাতীয়তাবাদ’ বলে মনে করে আসছিল সেটা আসলে কোল্ড ওয়ার কালে বুঝের জাতীয়তাবাদ, যা একালে অচল। যেমন দেশের ব্যবহার্য সব পণ্য দেশেই বানাতে হবে এমন গোঁ ধরা জাতীয়তাবাদ কীনা নিজ জনগোষ্ঠির তাতে আসলে একালেও লাভ হয় কীনা ভেবে দেখতে হবে। নিজ মুদ্রার অবমুল্যায়ন একালে সময়ে ইতিবাচক হতে পারে। নাহলে আমেরিকার বিষয়টাকে  অভিযোগ আকারে আনত না যে চীন নিজের মুদ্রা অবমুল্যায়িত রেখেছে। ইত্যাদি।

আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ভারতের বর্তমান স্বার্থ হলে চীন-রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ভারতের ভবিষ্যত। ফলে ভারতের  বুদ্ধিমান অবস্থান হল, এদুইয়ের মধ্যে এক সুক্ষ হিসাব করা ভারসাম্য রচনা করে পা ফেলা। কিন্তু কথাটা ভারত প্রায়ই ইচ্ছা করে ভুলে যায়। অনেক বাচ্চা নিজ অভিভাবককে ব্লাকমেল করে পকেটমানি বাড়িয়ে নেয় – বাচ্চারা এভাবে অনেক সময় দায়িত্বজ্ঞানহীন  আচরণ করে সাময়িক সুবিধার মজা উপভোগ করতে চায়। ভারতের অবস্থা এরকম। কিন্তু বাস্তবে ভারত কোন বাচ্চাসন্তান নয়, আবার চীন বা রাশিয়া (নতুন ব্যবস্থার মূল উদ্যোক্তা কারিগরেরা) এরাও ভারতের অভিভাবক কেউ নয়। ফলে ভারতেরও উদ্যোক্তাদেরকে এমন জায়গায় ঠেলে দেওয়া উচিত না যে উদ্যোক্তারা ভারতের আশা ছেঁড়ে ভিন্ন পরিকল্পনা করে বসে। ভারতের উপর ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে যায়।

চীনের গ্লোবাল টাইমস যেখানে চীনের সরকারি অবস্থান কড়া ভাষায় কিন্তু ইনফরমালি চীন প্রকাশ করে বলে মনে করা হয়, সেখানে ডোকলাম ইস্যুটাকে শিরোনাম লিখা হয়েছে, ভারতের সাংহাই কর্পরেশন সংস্থার (SCO) সদস্যপদ পেয়ে পশ্চিম চীনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে চাইছে। (India’s SCO membership threatens West China security)। চীন শান্তিপুর্ণ অর্থনৈতিক উত্থানের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করতে  শিকাগোর এক আমেরিকান প্রফেসরের তত্ত্ব যে, চীন নাকি ভারতকে মুক্তামালার মত ঘিরে ফেলেছে, চীন ভারতের জন্য হুমকি  এইসব  তত্ত্ব আঊরায়।   আসলে মোটাদাগে বললে ভারতের চীন বিরোধী সংঘাত এটা আসলে আমেরিকার চীনা নীতির আলোকে সাজানো। ইন্ডিয়া শুধু আমেরিকার সাথে সামরিক অস্ত্রের চুক্তি করেছে তাই নয়, বরং চীন-ভারত সীমান্ত বরাবর সামরিক ঘাটি বানিয়েছে। (In fact, India’s confrontation with China is, by and large, backed by America’s China policy. India has not only sealed arms deals with the US, but also established strategic military bases along the China-India border. ) সে নিজ জনগণকে চীন বিরোধী প্রপাগান্ডায় সামিল করেছে।

এটাকে আমরা বলতে পারি চীনের  দুঃখ করে বলা (আবার হুমকিরও)  কথা যা খুব সম্ভবত রাশিয়াকে স্মরণ করিয়ে দিবার উছিলায় সবাইকে জানানো। কারণ রাশিয়ার উতসাহেই চীন ভারতকে এই নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বিষয়ক জোটে (পাকিস্তানসহ) ভারতকেও সদস্যপদ দিতে রাজি হয়েছে কয়েকমাস আগে।

ভারতের অজিত ডোভাল চীন থেকে ফিরেছেন, কিন্তু ভারতের মিডিয়ার গান সম্পুর্ণ ভিন্ন। এখানে কেবল কিছু শিরোনাম আনছি যার ভিতরে অনেক ইঙ্গিত আছে। চীনে ভারত কী শিক্ষা পেয়েছে  সম্ভবত এর ইঙ্গিত আছে এখানে। আনন্দবাজার পত্রিকা ২৯ জুলাই,  “বেজিংকে না চটাতে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী মোদীর”। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ২৯ জুলাই,  “Doklam is not about a road”।  অর্থাৎ ভারতের মিডিয়ার আর ডোকলাম অচলাবস্থার কারণ ডোকলামে না, বাইরে খুজতে শুরু করেছে। একটু দেরি হয়ে গেছে অবশ্য।  মনে হচ্ছে মোদি ভুলে মাটি খেয়ে ফেলেছেন বা মুখে মাটি গেছে। খুব সম্ভবত গাছের খাওয়া আর তলেরও কুড়ানোর দিন ভারতের জন্য শেষ হয়ে আসছে। কোন একটা বেছে নিতে হবে। এশিয়ায় পড়শিদের উপর ভারতের প্রভাব দাবরানি আর কূটচাল দিয়ে, কলোনি চিন্তা কাঠামো দিয়ে, বৃটিশ বাপ-দাদাদের ছিল ফলে একই স্টাইলে তা আমারও শাসনে থাকবে এই যুক্তিতে এখন টিকানো অসম্ভব, তাই সেগুলো সবই শেষ হয়ে আসছে, যাবে। সে জায়গায় চীনের যে প্রভাব বাড়ছে তা চীনা অর্থনীতির সক্ষমতার কারণে, এই অর্থে এটা অবজেকটিভ। চীনের সাবজেকটিভ ইচ্ছার কারণে এটা হয় নাই, হচ্ছে না এবং  হয় না। এই অর্থে আমেরিকান যাতাকাঠি হাতে ভারতের বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এর মাসুলও দিতে হবে চড়া।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ৩০ জুলাই ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ৩১ জুলাই তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]