কোল্ড ওয়ার ও রুজভেল্ট

কোল্ড ওয়ার রুজভেল্ট

গৌতম দাস

১৭ জানুয়ারি ২০১৮,  রবিবার, ১৮:৫১

 

 

কোল্ড ওয়ার বা ঠাণ্ডা যুদ্ধের যুগ বলে একটা কথা আমরা প্রায়ই শুনি। এটা বলতে মোটা দাগে ১৯৫০-৯০ সাল, এই সময়কালকে বলা হয়, বিশেষত আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ঠিক যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়া নয়, তবে দুনিয়াটাকে দুই ব্লকে ভাগ করে নিয়ে এদের দু’জনের মধ্যে সব সময় প্রায় সব বিষয়ে রেষারেষি, উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ ইত্যাদিকে বলা হতো ঠাণ্ডা যুদ্ধ। তবে সরাসরি যুদ্ধ লাগানোর পরিস্থিতি দু’পক্ষই এড়িয়ে চলেছিল আর পরস্পরকে হুমকি-ধমকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পেরেছিল। কারণ উভয়েই জানত সঙ্ঘাত মুখোমুখি জায়গায় নিয়ে গেলে সেটা অন্তত ‘হাতছুট’ ঘটনা হিসেবেও পারমাণবিক যুদ্ধের স্তরে চলে যেতে পারে। ঠিক এ কারণেই সম্ভবত দু’পক্ষের মধ্যে রেষারেষি, উত্তেজনা,পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ যতই থাকুক না কেন তা যেন শেষ বিচারে ‘ঠাণ্ডা’ই থাকে, গরম হয়ে মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে যায়, সেদিকে উভয় পক্ষেরই প্রচেষ্টা থাকত। এ কারণে সময়টাকে ঠাণ্ডা যুদ্ধ বা ইংরাজিতে কোল্ড ওয়ার বলার চল দেখা যায়। তবে এটা শুধু দুনিয়াটাকে দুই জোটে ভাগ করে নেয়া নয়, অর্থাৎ সব রাষ্ট্রকেই এই দুই ব্লকের কোনো একটাকে বেছে নিয়ে যোগ দিতে হতো তাই নয়; বরং এটা ছিল আসলে সেকালের প্রচলিত দুনিয়াতে প্যারালাল দুই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা; যাদের দুইয়ের মাঝে পণ্য, পুঁজি অথবা ভাব বা চিন্তা কোনো কিছুরই লেনদেন অথবা বাণিজ্য বিনিময় ধরনের মতো কোনো সম্পর্কও ছিল না। সব রাষ্ট্রকেই কোনো না কোনো একটা ব্লকে যোগ দিতে হতো এ জন্য যে, নইলে অস্ত্রশস্ত্রের উৎস বা সরবরাহ কোনো ব্লক থেকেই পাওয়া যেত না। ব্লকে যোগ দেয়া ছিল আনুগত্য বা বিশ্বস্ততা প্রদর্শনের উপায়, প্রাথমিক শর্ত পূরণ। আরো কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা বলা যেতে পারে। এমন কোনো রাষ্ট্র ছিল না, যে একই সাথে সোভিয়েত অস্ত্র এবং আমেরিকার অস্ত্র পেত বা জোগাড় করতে পারত। একটা পেলে অপরটা পাওয়ার আর সম্ভাবনা থাকত না। অর্থাৎ ক্রস সোর্স বা অস্ত্রের দুই উৎস মাখিয়ে ফেলার পরিস্থিতির সম্ভাবনা ছিল না। আজ ব্লকে ভাগের যুগ বা কোল্ড ওয়ারের কাল শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এটা এতই সিরিয়াস ছিল যে, একই রাষ্ট্রের দুই সোর্সের অস্ত্রের সরবরাহ পাওয়ার বা জোগাড়ের সম্ভাবনা কম ছিল। এটা কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এখনো প্রচ্ছন্নভাবে কাজ করে থাকে। আবার অনেকের মনে হতে পারে, সেকালে ‘জোট নিরপেক্ষ রাষ্ট্র’ বলেও তো দুই ব্লকের বাইরে কেউ কেউ ছিল। তা অবশ্য ছিল। কিন্তু মজার কথা, এদের অস্ত্রের উৎসের দিকে তাকালেই তাদের নিরপেক্ষতার ভুয়া দিকটি নজর করা সম্ভব। যেমন- নেহরুর ভারত, এটা ‘জোট নিরপেক্ষ রাষ্ট্র’-এর প্রবল প্রবক্তাদের একটি। কিন্তু এর অস্ত্রের উৎস ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। এমনকি ১৯৯১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরও না, একেবারে ২০০১ সালে আলকায়েদা ফেনোমেনা দুনিয়াতে আবির্ভাবের পর ২০০৫ সালে বুশের ভারত সফরের পর থেকে ভারত এই প্রথম একই সাথে আমেরিকান অস্ত্রেরও সরবরাহ পাওয়ার ‘যোগ্য’ হয়। ওদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়াও এর আগে কখনো পাকিস্তানকে অস্ত্র দেয়নি। জন্মের শুরুতে পাকিস্তানের এককভাবে সরবরাহদাতা ছিল আমেরিকা, পরবর্তীকালে তাতে চীন যুক্ত হয়েছিল। এবার একালে এই প্রথম সোভিয়েত বা রুশ অস্ত্রও পাকিস্তান জোগাড় করতে সক্ষম হয়েছে। এই হলো, ঠাণ্ডা যুদ্ধ সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু ধারণা। এই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা এখন ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে বোঝার চেষ্টা করব, কেন এমন কোল্ড ওয়ারের পরিস্থিতি সে সময় তৈরি হয়েছিল, পেছনে কী কারণ কাজ করেছিল।

আমাদের কাছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালের ইতিহাস পাঠ সে সময় থেকে আজ পর্যন্ত ব্রিটিশদের চোখে দেখা ও লেখা ইতিহাস পাঠ হয়ে আছে। এর কারণ সম্ভবত একটাই, আমরা ব্রিটিশ কলোনির অংশ ছিলাম। সে কারণে আমাদের সাথে আমেরিকান পণ্য ও পুঁজি বিনিময় তেমন ছিলই না। এ ছাড়া যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায় ভাববিনিময় অথবা আমেরিকার চোখে দেখা ও লেখা ইতিহাসের বয়ানের সাথে পরিচয় থাকা সীমিত থাকায় এর সুযোগও হয়নি। যেমন- সে সময়ে আমাদের কলোনির মালিক প্রভু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল, তিনি আমাদের চোখে বিশাল ভূমিকার গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা। এমনকি তুলনায় আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের নাম আমরা অনেকেই জানার বা মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করিনি। কথাটা বলছি এ কারণে যে, রুজভেল্টের সাথে যদি চার্চিলের তুলনা করি, তবে রুজভেল্ট ছিলেন সাহায্যদাতা আর চার্চিল গ্রহীতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু ধরা হয় ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর। হিটলারের জার্মানি প্যারিস দখল করে ১৯৪০ সালের জুন মাসে ফরাসি সরকারকে বশ্যতা স্বীকার এবং ক্ষতিপূরণ চুক্তি করতে বাধ্য করেছিল। অর্থাৎ চার্চিলের ইংল্যান্ড থেকে হিটলার ছিলেন মাত্র ইংলিশ চ্যানেলের অপর প্রান্ত দূরে। ফলে চার্চিল শেষ আশ্রয় হিসেবে রুজভেল্টের কাছ থেকে সহায়তা চেয়েছিলেন। আমেরিকা তখন পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধে নিজেকে কোনো পক্ষের সাথে জড়ায়নি। তবে চার্চিলের ইচ্ছা ছিল, আমেরিকা ইংল্যান্ডের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে জড়াক। অর্থ ও অস্ত্র সব ধরনের সাহায্য সহায়তা প্রার্থী তিনি। কারণ, ১৯৩০ সালের মহামন্দার পর থেকে ব্রিটিশ অর্থনীতি আর কখনো সচ্ছলতার মুখ দেখেনি। ধারদেনা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ইত্যাদি করে কোনো মতে চলছিল। এর বিপরীতে আমেরিকান অর্থনীতির অবস্থা ছিল সটান। অর্থনৈতিক সুপার পাওয়ার হিসেবে আমেরিকার ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাওয়া শুরু হয় ১৯২০ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই। আজ যেমন চীনের অর্থনীতি আমেরিকাকে ছাড়িয়ে গেছে, অনেকটা সে রকম। ফলে চার্চিলকে সহায়তা করার সামর্থ্য বা ক্ষমতা আমেরিকার ছিল। কিন্তু রুজভেল্ট চার্চিলকে বলছিলেন, তিনি সাহায্যই করতে চান, তবে যুদ্ধ তিনি একবারই করতে চান। তাই যুদ্ধের পরের পরিস্থিতিতে দুনিয়াটা দেখতে কেমন হবে সে চিত্র আমেরিকা যেভাবে দেখতে চায়, সে বিষয়ে চার্চিল রাজি না হলে রুজভেল্ট সে যুদ্ধে জড়াতে চান না। কী সে চিত্র? সরাসরি বললে তা হলো- এক. দুনিয়াতে কোনো রাষ্ট্রকে কলোনি করে রাখার অবসান ঘটাতে হবে। দুই. যুদ্ধে বিশেষত বড় যুদ্ধে বা বিশ্বযুদ্ধে বিপুল পরিমাণে পুঁজি বা সঞ্চিত সম্পদের ক্ষতি হয়। ফলে রুজভেল্ট এমন এক শেষ যুদ্ধে জড়াতে চান, যার পরে সহসাই আর যুদ্ধের দরকার না হয়। তা তিনি নিশ্চিত করতে জাতিসঙ্ঘের মতো একটি প্রতিষ্ঠান গড়তে চান, যার অধীনে সদস্য রাষ্ট্রের ঐকমত্যে কিছু কনভেনশন, সবাই একমত হয়েও পালনযোগ্য আইন আরবিট্রেশন চালু করতে চান, যাতে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার যেকোনো স্বার্থবিরোধ মীমাংসার ভিত্তি হিসেবে ওইসবের আলোকে আপসে বিচার-আচার, কূটনৈতিক সংলাপ ইত্যাদির মাধ্যমে সমাধান করা যায়; সব না হলেও অনেক বিরোধ এভাবে এড়ানো সম্ভব। আমেরিকার এই অবস্থান আকস্মিক ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) সময় থেকেই আমেরিকান রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী বিশেষত পুঁজিবাজারে পুঁজির ব্যবসায়ীদের প্রভাবশালী অবস্থান ছিল এটা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন এই অবস্থান নিয়েই ইউরোপে গিয়েছিলেন। অবশ্য ইউরোপ তখনকার বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানিকে শাস্তি দিতে, আর যুদ্ধে ক্ষতিপূরণ জার্মানির কাছ থেকে আদায় করতে উন্মত্ত ছিল। ফলে উইলসন ইউরোপের নেতাদেরকে নিজের অবস্থান বুঝিয়ে স্বপক্ষে নেয়ার সুযোগ বের করতে পারেননি। তবে একটা আপস হয়েছিল। জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ার আইডিয়া তখনো উইলসন বোঝানো এবং এর পক্ষে আনার চেষ্টা করেছিলেন। ফলে যুদ্ধ শেষের ক্ষতিপূরণ আদায় বা বিপারেশন বিষয়ক ভার্সাই চুক্তির দুই অংশ করা হয়। প্রথম অংশ জার্মানি কাকে কী ক্ষতিপূরণ দেবে বিষয়ক। আর শেষ অংশ হলো লিগ অব নেশনস নামে এক প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া, যার কাজ হবে ক্ষতিপূরণ আদায় ও তা বিতরণে কাজ করা। পরবর্তী সময়ে ওই চুক্তি বাস্তবায়ন করা যায়নি।
অপর দিকে (১৯৪০-৪১ সালে চার্চিলের সাথে আলাপের সময়) দুনিয়া থেকে কলোনি তৈরির ব্যবস্থা উঠানোর পক্ষে আমেরিকার শক্ত অবস্থান নেয়ার কারণ নিশ্চয়ই আমেরিকান রাষ্ট্র বা রুজভেল্টের কোনো বিপ্লবীপনা নয়। আসলে পুঁজিবাজারে পুঁজি ধার দেয়া কোম্পানিগুলোর ধার দেয়ার সক্ষমতা যতটা বেড়েছিল, সে তুলনায় বাজারে পুঁজি ধার নেয়ার ক্রেতা বাড়ছিল না। এর মূল কারণ কলোনিকৃত দেশ আর কলোনি মাস্টারের মধ্যকার সীমিত লেনদেনই ছিল অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রধান ধরন। যেমন, ব্রিটিশ-ভারতের সাথে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিল একমুখী উদ্বৃত্ত পাচারের। ফলে পুঁজির পূর্ণ বিনিয়োগ, পণ্য, পুঁজি বিনিময় ইত্যাদি সব কিছুই একটা সীমিত বাজারের মধ্যে আটকে ছিল। এর বিপরীতে আমেরিকান পুঁজি বাজার যা প্রতীকীভাবে ‘ওয়াল স্ট্রিট’ নামে পরিচিত, সেই ওয়াল স্ট্রিট চাইছিল, দুনিয়া থেকে কলোনি সম্পর্ক উঠে যাক। ফলে উপনিবেশমুক্ত রাষ্ট্রগুলো সরাসরি রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের পণ্য, পুঁজির লেনদেন, বিনিময় বাণিজ্য ঘটাতে থাকবে। এরই সার ফলাফল, বিনিয়োগ পুঁজির চাহিদা বৃদ্ধি। পুরনো কলোনি ধরনের সম্পর্কটাই ওয়াল স্ট্রিটে পুঁজির বাজারে পুঁজির চাহিদা ব্যাপক না হওয়ার পথে প্রধান প্রতিবন্ধক। তাই অনেক আলোচনা ও দরকষাকষির পর ১৯৪১ সালের আগস্টে চার্চিল-রুজভেল্ট যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল সেটাকে আটলান্টা চার্টার বলে। ওই চার্টারের প্রথম দফাই হলো দুনিয়ার সব জনগোষ্ঠী নিজেই ঠিক করবে, সে কিভাবে কার দ্বারা শাসিত হতে চায়, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বিষয়ক এই কালজয়ী ধারণার পক্ষে দাঁড়ানো। এর অর্থ, সব জনগোষ্ঠী নিজেই নিজেকে শাসন করার অধিকার পাবে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার মানেই হলো কলোনি সম্পর্কের অবসান। তবে তামাশার ব্যাপার হলো, কলোনি মাস্টার চার্চিল যখন এই চার্টারে দাসখতের স্বাক্ষর দিচ্ছেন, তখনো ব্রিটিশ ইন্ডিয়া তাদের কলোনি। অর্থাৎ চার্চিলকে পরোক্ষে স্বীকার করতে হচ্ছে যে, কলোনি রাখা ভুল, তা করা ঠিক নয়। কেন এই বেকায়দায় পড়া? কারণ হলো, নইলে হিটলার ফ্রান্স দখলের মতো এরপর ইংল্যান্ডও দখল করে নেবে।
পরপর চারবার প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়ানো এবং জিতে আসা সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডেমোক্র্যাট রুজভেল্ট। ১৯৩২, ১৯৩৬, ১৯৪০ ও ১৯৪৪- এভাবে চারবার তিনি জিতেছিলেন। আর ১৯৪৫ সালে চতুর্থবার শপথ নেয়ার মাত্র চার মাস পরে এপ্রিল ১৯৪৫ সালে তিনি মারা যান। তার ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুুম্যান প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুরো সময় পার করেছিলেন। পরের বার ট্রুম্যান সরাসরি প্রার্থী হন এবং জিতে আসেন। অর্থাৎ প্রায় আট বছর ট্রুম্যান প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আর এই পুরো সময়টা তিনি রুজভেল্টের নীতিই অনুসরণ করেছিলেন। বিশেষত জাতিসঙ্ঘকে গড়ে তোলা এবং তা রাষ্ট্রগুলোর পরস্পরিক স্বার্থবিরোধ অবসানের ডায়ালগ আর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ঐকমত্যে তৈরি কনভেনশন, চুক্তি, আইন, আরবিট্রেশন ইত্যাদির মাধ্যমে। তবে এগুলো ছিল এক ধরনের প্রস্তুতিমূলক এবং তত্ত্বীয় কাজ। এটা প্রথম পরীক্ষার সম্মুখীন হয় ব্রিটিশ-ইরান তেলবিষয়ক স্বার্থ সঙ্ঘাতে।
ইরানের তেল প্রাপ্তির নিশ্চয়তা এবং সেই তেল তোলার চুক্তি প্রথম সম্পন্ন হয়েছিল ১৯০১ সালে। স্বভাবতই সেটা টেকনোলজির গরমে প্রায় একমুখী বা একপেশে চুক্তি। এরই পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে ইরানি প্রধানমন্ত্রী রাজমারা খুন হয়ে যান ১৯৫১ সালের ৭ মার্চ, আর সর্বসম্মতিক্রমে ড. মোসাদ্দেক মে মাসে প্রধানমন্ত্রী হন। ২৯ এপ্রিল আর পয়লা মে সে দেশের সব তেলের খনি জাতীয়করণ করা হয়। ব্রিটেনের সাথে সঙ্ঘাতের শুরু এখান থেকেই। প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান এই বিরোধে ভূমিকা নেন মধ্যস্থতাকারীর, যেটা রুজভেল্টের স্বপ্নের জাতিসঙ্ঘের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্রিটেনের সাথে বিরোধ মীমাংসায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা দেয়া হয়। ট্রুম্যান বহু চেষ্টা করেছিলেন আপসে বিবাদ মেটাতে। তার প্রচেষ্টায় ব্রিটেন ইরানের সার্বভৌমত্বের খাতিরে জাতীয়করণের অধিকার মেনে নেয়। কিন্তু নিজের বিনিয়োগের ক্ষতিপূরণ দাবি করে। এসব বিতর্ক শেষ করার আগেই আমেরিকায় নতুন নির্বাচনে এবার রিপাবলিকান আইসেনহাওয়ার (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান মিত্রবাহিনীর কমান্ডার) জিতে আসেন। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে শপথ নেয়ার পর থেকে পুরনো রুজভেল্ট-ট্রুম্যানের নীতি সম্পূর্ণ বাতিল করে দেন। ইরান-ব্রিটেন ঝগড়ায় ব্রিটিশদের পক্ষ নিলেন। এটা ঠিক যে, ওই তেল তোলার অনুমতি সোভিয়েত ইউনিয়নকে দেয়ার জন্য স্টালিন আগ্রহ প্রকাশ করলেও মোসাদ্দেক তা প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু তবু রাশিয়ানরা সুবিধা নিতে পারে এই অজুহাতে নতুন প্রেসিডেন্ট সিআইএ পাঠিয়ে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে সরিয়ে শাহকে ক্ষমতায় আনা এবং এবার তেলের খনি ব্রিটিশ, ডাচ, ফ্রান্স ও আমেরিকান কোম্পানির এক কনসোর্টিয়ামের হাতে তুলে নেয়া হয়েছিল। এক কথায়, রুজভেল্ট-ট্রুম্যানের মধ্যস্থতাকারী আমেরিকার সেই থেকে হয়ে পড়ল ইম্পেরিয়াল এক ক্ষমতা; তেল কোম্পানির দখলের জন্য যে খুনোখুনি করতে প্রস্তুত।
বলা হয়, সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকার কোল্ড ওয়ারের যুগের শুরু সেখান থেকেই।

goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ ডিসেম্বর ২০১৫ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “কোল্ড ওয়ার ও রুজভেল্ট”, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

‘মুসলমান’ ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে আসাম

‘মুসলমান’ ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে আসাম

গৌতম দাস
১১ জানুয়ারি ২০১৮, বুধবার, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2pL

আসামে ‘বাংলাদেশী’ বা ‘মুসলমান’ নামে আর এক ক্লিনজিং ও নিধন, নারী, শিশু ও বয়স্কদের সবচেয়ে সীমাহীন দুর্দশা আর শরণার্থীর ঢল – এসব দৃশ্য কী আমাদের দেখতে হবে? হলে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের কাঁধে বন্ধুক রেখে এই হত্যাকান্ড ঘটবে? এর দায়ভার কী আদালত বইতে পারবে? ভারত হিন্দুত্বের রাজনীতিতে ডুবে শেষ হয়ে যাবে। ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন হতে আর মাত্র ১৬ মাস বাকী। মোদীর অর্থনীতির ডুবে যাওয়া আর কাজ সৃষ্টিতে ব্যর্থতা আর লুকানো নয়, গত সপ্তাহে এবার এটা একেবারে ষ্টাটিস্টিক্যালি প্রকাশিত। সেখানে দেখা যায় মোদীর গত চার বছরের শাসনের মধ্যে সর্বনিম্ন জিডিপি এবার, সাড়ে ছয় পারসেন্টে নেমেছে। ফলে ধরে নেয়া যায় আগামী নির্বাচনের মোদীর অস্ত্র হবে একটাই – উগ্র হিন্দুত্ব ও মুসলমানবিদ্বেষ। আর তাতে এখান থেকেই অনুমান করা যাচ্ছে পরিণতি কী হবে!

রোহিঙ্গা সমস্যার দৃশ্যমান কোনো সুরাহার দেখা পাওয়া যায় নাই এখনও, অথচ এর আগেই প্রায় একই ধরনের নতুন আরেক ফেনোমেনা ‘আসাম মুসলমান নিধন নিপীড়ন’ – ব্যাপকভাবে উঠে আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আসামের মুসলমান জনগোষ্ঠীকে তারা কথিত ‘বাংলাদেশী’, ‘মুসলমান’, ‘ফরেনার’, ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইত্যাদি বলে অত্যাচার-নির্যাতন নিয়মিত শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই। আসলে এক কথায় বললে আসাম বা অসমিয়রা এক চরম জেনোফোবিয়াতে ভুগছে। ইংরেজি জেনোফোবিয়া (Xenophobia) শব্দের ‘জেনো-‘ এর তুল্য প্রচলিত বাংলা হবে – ফরেনার বা বিদেশী। এভাবে পুরো শব্দের অর্থ হল – ফরেনার বা বিদেশী ভীতি। যদিও এই শব্দের আসল গভীর অর্থ হল – ‘অ-পর’; যে আমার মতো নয়, এমন অপর-ভীতি। ফলে তাকে দেখতে পারি না, ঘৃণা করি। যেমন – কেউ আমার মতো নয়, সে আমার ধর্মের নয়, অথবা আমার মত অহমিয়া নয়, অথবা আমার মতো এশিয়ান নয় ইত্যাদি। ফলে সে আমার ‘অ-পর’। “অসমে বসবাসকারী বাঙালিরা অসমিয়াদের ভাষা-সংস্কৃতিসহ সব গ্রাস করে ফেলছে” – এই হল অসমিয়াদের সবচেয়ে কমন আক্ষেপ ও বিদেশ- বিরোধী প্রপাগান্ডা। এই ‘অপর-ভীতি’ বা জেনোফোবিয়াতে ভুগছে আসাম। অথবা সম্ভবত বলা ভালো, জেনোফোবিয়াতে ভোগানো হচ্ছে। কারা ভোগাচ্ছে, কারা এরা?
বলাবাহুল্য, ‘অপরে আমাদের সব গ্রাস করে ফেলল’ – এই আক্ষেপের বয়ান তৈরির পেছনে আধা সত্য-মিথ্যা অনেক গল্প তারা জড়ো করেছে, অনুমান করা যায়। এখানেই সবচেয়ে বড় মিল দেখা যাবে বর্মিজদের সাথে। বর্মিজদের অপর-ভীতি রোহিঙ্গা নিধনের পিছনের মূল কারণ। এদিকে এখানে বর্মিজদের আসাম দখল থেকে অসমিয়াদের অপর-ভীতির সুত্রপাত। দ্বিতীয় এঙ্গলো-বার্মিজ যুদ্ধ হয়েছিল ১৮৫১ সালে। এর আগেই, (১৮২৪-১৮৩৮) সালের মধ্যে অহম রাজা ও আশপাশের অন্যান্য রাজা যেমন কাছাড় রাজ্য মিলিয়ে পুরো আসামই ব্রিটিশ কলোনির দখলে ও শাসনাধীন চলে যায়। বার্মিজ রাজার আসাম অঞ্চল দখল নিতে যাওয়া থেকে এর সূত্রপাত হয়েছিল।  তাই অসমিয়াদের একালের আক্ষেপের বয়ানে গল্পের একটি উপাদান হল – ব্রিটিশ কলোনি তাদের দখল করে নিয়েছিল। আগে তারা কত সুন্দর দিন কাটাইত। যদিও এর জন্য এখনকার বাংলাদেশ বা এর কোনো বাসিন্দা আমরা কেউ দায়ী নই। তবু এক জেনোফোবিয়ায় ভিকটিম-বোধের গল্প এখান থেকে শুরু হয়েছে। এর ওপর আদি পাপ আমরা তো মুসলমান, সেটা তো আছেই, যা জুড়ে দেয়া হয়েছে। ফলে যেকোনো সমস্যার জন্য মুসলমানদের দায়ী করা সহজ। তবে আমাদের আরেক অপরাধ ছিল যে, যেহেতু ব্রিটিশ দখলে যাওয়ার পর আসামকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির প্রশাসনিক অধীনে একটি ব্রিটিশ কমিশনারেটের কর্তৃত্বে রেখে শাসন করা হয়েছিল, আর তা হয়েছিল ১৯০৫ সাল পর্যন্ত। ফলে বৃটিশেরা নয়, বাঙালিরাই যেন এতে দায়ী। আর এর জন্য যেন বাংলাদেশ, মুসলমান বা বাঙালিরা দায়ী, এমন বলে নানান অনুমান ও গল্পও তাদের ঝুলিতে আছে। ভিকটিম-হুড যারা বিক্রি করে, তারা এমনই করে।
আর ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগ হলে আসামকে পুরা বেঙ্গলের সাথে আর না, বরং সরাসরি পূর্ববঙ্গের সাথে যুক্ত করে নতুন প্রদেশ করা হয়। তাতেও তারা আরো বেশি অখুশি  হয়েছিল। যদিও (১৯০৫-১৯১১) মাত্র এই ছয় বছর আসাম পূর্ববঙ্গের সাথে ছিল। তবে ততদিনে আসাম ব্রিটিশদের চোখে নগদ অর্থকরী ফসল, চা উৎপাদনের এক খনি যেন, এভাবে হাজির হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেকালের চা উৎপাদনের শ্রমিক কারা হবে, সে বিষয়ে ব্রিটিশেরা স্থানীয় অসমিয়াদের পছন্দ না করে বিপুল শ্রমিক মাইগ্রেট করে এনেছিল। ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার এক রিপোর্টের মতে, এই শ্রমিকেরা মূলত ট্রাইবাল, তবে ছোটনাগপুর উপত্যকা মানে সেকালের বিহারের ছত্রিশগড়, ঝাড়খণ্ড (যে দুটোই এখন আলাদা রাজ্য) থেকে এবং বিহারের বাকি অংশ থেকে। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা (তেলেঙ্গনা, কয়েক বছর আগে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে আলাদা হওয়া রাজ্য) এসব অঞ্চল থেকে মাইগ্রেট করে আনা হয়েছিল। এ ছাড়া লর্ড কার্জনের বিশেষ আগ্রহ ছিল যেন পূর্ববঙ্গ থেকেও আনা হয়। সম্ভবত পড়শি ও দক্ষ কৃষিকাজ জানা লোক বলে। [People – mostly tribals – were brought in from the Chota Nagpur plateau and its adjoining areas covering present-day Jharkhand, Chhattisgarh, and parts of Bihar, West Bengal, Odisha, Telengana and Andhra Pradesh to work in the newly-opened tea plantations from the mid 19th century; the British encouraged the migration of Muslim farmers from East Bengal after Lord Curzon became Viceroy of India (1899-1905). ]
তবে এর আরেকটা বড় কারণ আছে। ব্রিটিশ-ভারতের ‘ভারত শাসন আইন-১৯৩৫’ অনুসারে, ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা প্রথম স্থানীয় নেটিভদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। তবে এর আগেও মন্ত্রিসভা বা স্থানীয় শাসনে সিলেক্টেড স্থানীয় নেতা নেয়া হত। তার পুরো আনুষ্ঠানিক নাম মৌলবি সাইদ স্যার মোহম্মদ সাদদুল্লাহ। গৌহাটির সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান সাদদুল্লাহ পরে কলকাতা হাইকোর্টের উকিল ও সরকারি প্লিডারও ছিলেন। তিনি ১৯৩৭ সালের আসাম প্রদেশের প্রথম নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী হন (তখন প্রধানমন্ত্রী বলা হত)। এর আগে তিনি ১৯১৯ সালের সরকারেও সিলেক্টেড প্রতিনিধি ছিলেন। মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন। রাজনীতিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আসাম প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি গোপীনাথ বরদোলাই। এমনকি স্বাধীন ভারতের কনস্টিটিউশন রচনার কাজে যে ৯ সদস্যের খসড়া কমিটি হয়েছিল, তিনি সেখানে একজন ছিলেন। তিনিও পূর্ববঙ্গ থেকে কৃষক নিয়ে গেয়েছিলেন, ধান চাষে বাংলার অভিজ্ঞতায় বেশি ফসল এরা ফলাতে পারে এই বিশ্বাসে। এসব মিলিয়ে আসামে মুসলিম জনসংখ্যা জাম্প করেছিল। তবে তা সবই ১৯৪১ সালের মধ্যে, এরপরে নয়। যেমন ১৯০১ সালে আদমশুমারিতে মুসলমান ছিল আসামের মোট জনসংখ্যার ১২.৪ শতাংশ। এরপর বিপুল মাইগ্রেটেড হয়ে আসা জনসংখ্যার কারণে পরের ৪০ বছরের মধ্যে ১৯৪১ সালে তা দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকেছিল, ২৫.৭২ শতাংশে। তবে এটাই ছিল প্রথম ও শেষ সবচেয়ে বড় মুসলিম মাইগ্রেশন। মনে রাখতে হবে এটা হয়েছিল, ব্রিটিশ-ভারতে যখন দাওয়াত দিয়ে জমি ও সুযোগ সুবিধা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে পুর্ববঙ্গ থেকে মাইগ্রেট করে বাঙালি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরের ৩০ বছরে দেখা যায় ১৯৭১ সালের শুমারিতে মুসলিম জনসংখ্যা ১ শতাংশ কমে ২৪.৫৬ হয়েছিল। এরও পরের ১০ বছরে এই প্রথম মুসলিম জনসংখ্যা ১৯৮১ সালে ৪ শতাংশ বেশি হয়ে ২৮.৪৩ শতাংশ হয়। এর পরের ১০ বছরে জনসংখ্যা ১৯৯১ সালে আরো ২ শতাংশ বেড়ে হয়েছিল ৩০.৯৩ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১১ সালের শুমারি অনুসারে এখন মুসলিম জনসংখ্যা ৩৪ শতাংশ।
নিচের গ্রাফ নেওয়া হয়েছে, সাথে দেয়া লিঙ্ক ফলো করেন। 
ASSAM muslim population
তাই সবচেয়ে হইচই শুরু হয় ১৯৭৮ সালে এক উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সেখানে আওয়াজ উঠেছিল, ‘বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক মুসলমান অনুপ্রবেশ’ হচ্ছে। কিন্তু প্রমাণ করে এমন কোন তথ্য না থাকলেও একথা বলা হয়েছিল। এখনও হচ্ছে। এই বিচারে এটা একটি মিথ, একটি পারসেপশন মানে ভোটে জেতার পারসেপশন। এ ছাড়া অনেক গবেষক দেখিয়েছেন এর কোনো অস্বাভাবিকত্ব নেই। বিশেষত, যেখানে ১৯৭১ সালের শুমারিতে দেখা গেছে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়েনি। এ ছাড়া অন্য যেসব ‘রাজনৈতিক পারসেপশনের অভিযোগ’, যেমন – বাংলাদেশের সাথে আসামের সীমান্ত এলাকায় মুসলিম জনসংখ্যা নাকি বেশি। অথচ কোন শুমারির গণনাতে দেখিয়ে এটাও প্রমাণ করা হয়নি। আবার এমনই আরেক অভিযোগ হল, অন্যান্য রাজ্যের মুসলমানদের তুলনায় আসামের মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নাকি বেশি, মানে “মুসলিম অনুপ্রবেশকারী” এসেছে। সেটাও তুলনীয় ফিগার দিয়ে গ্রাফ একে তুলনা করে দেখা গেছে, এই অভিযোগও ভিত্তিহীন। অর্থাৎ আদমশুমারির তথ্য ‘অনুপ্রবেশকারী’ ধারণাকে সমর্থন করে না। তবে এটা হতে পারে যে, আসামের ভেতরেই ১৯৮১ সাল থেকে হিন্দুদের চেয়ে মুসলমানদের শতকরা হার বেশি দেখতে পাওয়া শুরু করেছে। কিন্তু এর অর্থ মুসলমান মোট জনসংখ্যা বেড়েছে তা নাও হয়ে পারে। কারণ মোট জনসংখ্যার মধ্যে মুসলমানদের শতকরা হার যেহেতু এটা একটা শতকরা হিসাব অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার শতকরা যোগফল ফিক্সড বা ১০০ থাকতে হবে, তাই। এতে কোন কারণে হিন্দুদের জন্মহার কমাটাও তুল্যপরিমাণ মুসলিম জনসংখ্যা বেড়েছে বলে দেখাবে। অথচ মুসলমান মোট জনসংখ্যা আসলে হয়ত বাড়েই নাই – এমন হতে পারে।
এমনিতেই সাধারণভাবে কোন জনগোষ্ঠির শতকরা হার এর বাড়া-কমা ঘটার পিছনের কারণ হিসাবে দেখা যায় – আরবানাইজেশন বা শহরায়নের হার বেশি হলে জন্মহার কমে। হিন্দুদের শহরায়ন বা শহুরে চাকরিজীবী পেশা গ্রহণ মুসলিমদের তুলনায় বেশি হলে হিন্দু জন্মহার কমেছে – এর একটা কারণ হতে পারে। মূল কারণ হল, কৃষিকাজ বা প্রত্যক্ষ শ্রম বেচে খাওয়া বাবা-মায়েদের সন্তান বেশি নেয়ার ঝোঁক থাকে। কারণ সেক্ষেত্রে সন্তান কম বয়স থেকেই নিজেই আয় করতে পারে বা উল্টা বাবাকে শ্রম-আয় দিয়ে সাহায্য করতে পারে। যেটা শহুরে বা শিক্ষিত চাকুরে পেশার বাবা-মায়ের বেলায় উল্টা হয়। কারণ তাদের সন্তান শিক্ষিত করতে গিয়ে সন্তানের পিছনে খরচ করতে হয়। তাদের মানুষ করার এই খরচ কমাতে বাবা-মায়েরা জন্মহার কম রাখার পথে যায়। মুসলিম জন্মহারের তুলনায় বেশি দেখানোর সম্ভাব্য কারণ এটিই। আরও একটা সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, আসাম ভেঙ্গে আরও নতুন চারটা প্রদেশ করা হয়েছে। আর ঐ প্রদেশগুলো হওয়ার কারণে পুরান আসাম প্রদেশ থেকে (মুসলমান জনসংখ্যার তুলনায়) বেশি হিন্দু জনসংখ্যাই বের হয়ে গেছে। তুলনায় মুসলমান জনসংখ্যা কম বের হওয়াতে মোট সংখ্যাটা একই থাকলেও শতকরা হারের দিক থেকে মুসলমানের শতকরা হার বেশি দেখতে পাওয়া সম্ভব। তবে মূল কথা, কেন শতকরা হিসাবে মুসলমানের পার্সেন্টেজ বেশি দেখাচ্ছে এর আসল কারণ পরিসংখ্যান ফিগার ঘেঁটে বের করা যেত। কিন্তু সেদিকে না গিয়ে এটাই মুসলমান ‘অনুপ্রবেশকারীর’ উপস্থিতির প্রমাণ – এদিকে অনুপ্রবেশের রাজনীতি, মুসলমানবিদ্বেষী রাজনীতি করার সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে চায় নাই। অথচ এটা একটা অপ্রমাণিত বা ভিত্তিহীন কথা।
আসলে ১৯৪৭ সালের পর থেকেই এক মুসলিম বিদ্বেষের ঝড় উঠেছিল। এরই সাক্ষ্য হয়ে আছে ১৯৫১ সালের ‘NRC 1951’ (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন অব সিটিজেন)। এটা এই প্রথম ভারতের একটাই প্রদেশে যাচাই করে নাগরিক তালিকা তৈরি করা। ভারতে নিয়মিত প্রতি দশ বছর পরপর আদমসুমারি হয়ে থাকে। সে হিসাবে ১৯৫১ সালের আদমশুমারির পরই সেই ডাটা থেকে সারা ভারতের মধ্যে একমাত্র আসাম প্রদেশেই “রেজিস্টার্ড নাগরিকদের তালিকা” তৈরি করা হয়েছিল; অর্থাৎ অন্য কোনো রাজ্যে তাদের কোন NRC করা হয় নাই। আসামে ‘মুসলমানেরা বেড়ে গেল কি না’ এই উছিলা তুলে মুসলিমবিদ্বেষী উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদের চর্চা তখন থেকেই। এমনকি এই ‘উগ্র অহমিয়াবোধ’ আসামের হিন্দু বাঙালিদেরও বিপক্ষে। বিশেষ করে সিলেটের লাগোয়া আসামের তিন জেলার (কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি) হিন্দু বাঙালি যাদেরকে বরাক উপত্যকা বিধৌত অঞ্চলের লোক বলা হয়। আর শুরুতে এই ‘উগ্র অহমিয়াবোধের’ রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়েছিল আসাম প্রদেশ কংগ্রেস। তাই বরাক অঞ্চলের লোকেরা এখন ‘উগ্র অহমিয়াবোধের’ বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে, প্রথম আলোতে প্রকাশিত নাগরিকত্ব নিয়ে সোচ্চার বরাকের বাঙালিরা” এই রিপোর্ট এখনও আসামের বরাকের তিন জেলার হিন্দু বাঙালির প্রতিবাদ। যদিও এরাই ১৯৪৭ সালে সিলেট নিয়ে ভোটাভুটিতে আসামের পক্ষে পতাকা উড়িয়েছিল। এদের মোহভঙ্গ হয় ১৯৪৭ সালের পর থেকেই। বিশেষত ১৯৫১ সালে কংগ্রেসের গোপীনাথ বরদোলাই যখন মুখ্যমন্ত্রী এবং  ১৯৬১ সালে, যখন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা ‘অসমিয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা’ বলে ঘোষণা দেন। অর্থাৎ ‘উগ্র অহমিয়াবাদের’ শুরুর দিকে এর নেতৃত্বে ছিল প্রদেশ কংগ্রেস।
যদিও খোদ নেহরু বা পরে ইন্দিরা গান্ধী এই উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদ পছন্দ করেননি। আবার এদের দুজনের কেউই প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বকে থামাতেও পারেননি। এর নিট ফলাফল হল – এর পর থেকে আসামের উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদের নেতৃত্ব কংগ্রেসের দেখানো পথেই থাকে কিন্তু নেতৃত্ব অন্যান্য দল বা গোষ্ঠির হাতে চলে যায়। আর সেটাই এখন বর্তমানে বিজেপির হাতে। ভারতের স্বাধীনতার পর থেকেই ‘অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন’ সংক্ষেপে আসু [AASU] এটাই আসামের বড় ছাত্র সংগঠন। অন্য রাজ্যের সাথে তুলনা করে বললে, ভারত স্বাধীনের পরে কংগ্রেস আর কমিউনিস্টদের ছাত্র সংগঠন সব রাজ্যে আলাদা হয়ে যায়। ব্যতিক্রম আসাম। এখানে ভাগ না হওয়া সংগঠনটাই হল আসু। সম্ভবত ‘উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদ’ সেকালে উত্তাল হয়ে উঠা – এমন অবিভক্ত থেকে যাওয়ার কারণ।  AASU এই সংগঠন ১৯৭৯ সালে (NRC) এনআরসির নাগরিকের তালিকা তৈরি শেষ করে এর ভিত্তিতে ‘কথিত অনুপ্রবেশকারীদের’ বের করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। অর্থাৎ কোনো রাজনৈতিক দলের বদলে ছাত্র সংগঠনের তরফে এমন দাবির তোলা হয়েছিল। এর অর্থ তাতপর্য হল, কংগ্রেস দলের কেন্দ্র বা হাই কমান্ড, প্রদেশ কংগ্রেসের উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদে মোড় নেয়ার বিপক্ষে তাদের মুখ বন্ধ রেখেছিল, এরই প্রতিক্রিয়া। এজন্য পরিণতিতে আমরা দেখি পরবর্তিতে এই ছাত্র সংগঠনই নতুন রাজনৈতিক দল (অসম গণ পরিষদ) খুলেছিল, যেটা তখন জন্ম হয় নাই। ১৯৭৯ সালের আসুর আন্দোলন শুরুর পরে ১৯৮৩ সালে রাজ্য সরকার বা বিধানসভার নির্বাচনের আয়োজন শুরু হয়েছিল। কিন্তু আসু এই নির্বাচন বর্জনের ডাক দেয়। ফলে কংগ্রেস ছাড়া এতে আর কোনো দল অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু মুসলমান ভোটারেরা কংগ্রেসের প্ররোচণায় ভোট দিতে গিয়েছিল। এখান থেকে এক মহা-বিপর্যয়ের শুরু।
আসামের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রধান চারটির একটি – বোড়ো (Bodo) ট্রাইব, অনেকে এদেরই আদি অহমিয়া মনে করে। ট্রাইবের নামে এক আঞ্চলিক দল (National Democratic Front of Bodoland) আছে তাদের (পরে অবশ্য দুটা ভাগ হয়ে গেছে)। বিজেপির বাজপেয়ি সরকারের আমলে ২০০৩ সালে বোড়ো সংখ্যাগুরু চারটি জেলা (Kokrajhar, Baksa, Chirang and Udalguri ) নিয়ে এক  স্বায়ত্তশাসিত এলাকা ও আলাদা নির্বাচিত প্রশাসন, Bodoland Territorial Council (BTC) গঠন করে দেয়া হয়েছে। সেই সাথে BTC তে মোট ৪০ আসনের মধ্যে ৭৫ ভাগ সংসদীয় আসন বোড়োদের জন্য সংরক্ষিত করে দেয়া হয়েছিল। আর এতেই সমস্যা উল্টা হয়। কারণ সর্বসাকুল্যে বোড়ো জনসংখ্যা ৪৮% এর কম। আর পরের বড় অংশ হল ২৭% মুসলমান, এছাড়া অন্যান্য ধর্ম বা ট্রাইব ইত্যাদির লোক আছে। অর্থাৎ ঐ চার জেলাতেই মুসলমানসহ অন্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীও আছে। বোড়োরা এখন এসব কোন সংখ্যালঘুদেরকে ক্ষমতায় কোন প্রতিনিধিত্ব দিতে চায় না।  উল্টা রুখে দিতে চায়, রাজনৈতিক অধিকারবঞ্চিত করতে চায়। এমনকি নির্বাচনে ক্যান্ডিডেট দিতে বাধা দেয়, হত্যা ম্যাসাকার করে ইত্যাদি। আগ্রহিরা এই রিপোর্টের পুরাটা পড়ে দেখতে পারেন। এটা ইন্ডিয়ান আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিলের অধীনে করা হয়েছেন। সেখান থেকে, [ This year 2014, between May 1 and May 3, nearly 50 unarmed Muslims were shot dead in three separate incidents in the Bodo Territorial Administered Districts. These killings, according to the report, were a retaliation by Bodo militants because a host of non-Bodo communities, including Muslims, had collectively put up an election candidate from the United Liberation Front of Assam to contest for the Kokrajhar Lok Sabha election seat against Bodo candidates.] এরাই ১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারিও নিলা ম্যাসাকার (Nellie massacre) ঘটিয়েছিল। প্রায় হাজার খানেক বোড়ো অধিবাসী দল বেধে প্রায় মোট প্রায় তিন হাজার (অফিসিয়ালি দুহাজারের কম) মুসলমান জনগোষ্ঠির লোককে হত্যা করেছিল।  ১৯৮৩ সালের নির্বাচনে আসামের নওগাঁ জেলার নিলা ও এর আশেপাশের গ্রাম এলাকায় মুসলমানকে হত্যা করার সাথে শিশু ও নারীদের আহত এবং নির্যাতিত হয়, এটাই নিলা ম্যাসাকার নামে এটি পরিচিত। পরবতিতে একটা ডকুমেন্টারি সিনেমা হয়েছে এই হত্যাকান্ডের সার্ভাইভারদের নিয়ে। পরে ২০১২ ও ২০১৪ সালের জুনেও (মোদি এই নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর) একইভাবে আক্রমণ নিপীড়ন করা হয়েছিল।

১৯৮৩ সালের মুসলমান নিধন হলেও এ নিয়ে আজো কোনো বিচার আদালত কিছু হয়নি। তবে ইন্দিরা গান্ধীর (তিনি তখনো বেঁচে, নিহত হয়েছেন অক্টোবর ১৯৮৪) প্রতিক্রিয়া কিছু টের পাওয়া যায় তার এক কাজে। তিনি এই হত্যার ব্যাপারটা যতদুর সম্ভব চেপে গিয়েছিলেন, কথা সত্য। কিন্তু একটা কাজ করেছিলেন। ভারতের ভুখন্ডে কোন ‘বিদেশির অনুপ্রবেশ’ ইস্যু ডিল করতে সাধারণত ব্যবহার করা হয় “১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্ট” [The Foreigners Act, 1946.] এই আইন। তা সত্ত্বেও ঐ হত্যাকান্ডের পরে কেবল আসামে প্রয়োগের জন্য ‘ইলিগ্যাল মাইগ্রেন্ট (ট্রাইব্যুনালে সাব্যস্ত) আইন-১৯৮৩’ [Illegal Migrants (Determination by Tribunal) Act, 1983] বলে নতুন আইন করেন তিনি। এই আইনের সারকথা হল – কেউ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী কি না সেটা প্রমাণের দায়িত্ব অভিযোগকারীর। এ ছাড়াও অভিযোগকারীকে কথিত অনুপ্রবেশকারির বাসার ১০০ গজের মধ্যে বসবাস করতে হবে ইত্যাদি। অর্থাৎ অনুপ্রবেশকারি বলে কাউকে ভারত থেকে বের করে দেয়া খুবই কঠিন করে দেয়া হয়েছিল।

ইন্দিরা গান্ধী  (৩১ অক্টোবর ১৯৮৪) মারা গেলে  পরে রাজীব গান্ধী ক্ষমতায় আসেন। তিনি এবার ‘আসু’র সব দাবি মেনে নিয়ে ১৯৮৫ সালের আগষ্টে  ‘আসাম চুক্তি বা আসাম অ্যাকর্ড’ সই করেন। অর্থাৎ NRC ১৯৫১ তালিকা আপডেট করে এর ভিত্তিতে অবৈধ বাংলাদেশীদের বের করে দেয়ার আন্দোলনকারিদের দাবি মেনে এর বাস্তবায়নে চুক্তি করেন তিনি। এছাড়াও তিনি ১৯৮৩ সালের রাজ্য নির্বাচন বাতিল করে দিয়ে ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিতব্য নতুন নির্বাচন দেন। অর্থাৎ রাজীব গান্ধী যা করলেন এর অর্থ তাতপর্য হল, তিনি স্বেচ্ছায় চাইলেন আসু এরপরে নিজেদের নতুন দল খুলুক, নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জিতে আসু সরকার গড়ুক। এবং ১৯৮৫ সালে তাই হয়েছিল। আর  আসুর নতুন গড়া স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নাম হল ‘অসম গণ পরিষদ’ (Asom Gana Parishad, AGP) আর আসুর নেতা প্রফুল্ল কুমার মোহান্ত এই দলের সভাপতি ও ১৯৮৫ সালের নির্বাচনে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। কারণ রাজীব গান্ধীর অনুমান ও ভীতি ছিল একটাই, এমন না হতে দিলে আসাম ভারত থেকে বেরিয়ে স্বাধীন হয়ে যেত। অতএব রাজীব গান্ধী টাইম বায়িং বা সময় কেনার পথ ধরেছিলেন। আর মোহান্তর কি হয়েছিল পরে? পরের বারের (১৯৯০) নির্বাচনে মোহান্ত গোহারা হেরে যান। তবে কোনোমতে তার পরের বার (১৯৯৫) জিতেছিলেন । আর সেটাই শেষ। এখন ঐ দল ভেঙ্গে দুইটা, আর প্রতিবারের রাজ্য নির্বাচনে আসামের মোট ১২৬ আসনের রাজ্য সরকারে দলের অর্জনে থাকে ১০-১৪ আসন।

এদিকে এখনকার আসাম সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হলেন সর্বানন্দ সনোয়াল, তিনি আসলে ছিলেন AGP নেতা এবং আসুরও নেতা সভাপতি (১৯৯২-৯৭)। তিনি ২০০৫ সালে, নিজ নামে ‘ইলিগ্যাল মাইগ্রেন্ট (ট্রাইব্যুনালে সাব্যস্ত) আইন-১৯৮৩’-কে [IMDT এক্ট] কোর্টে চ্যালেঞ্জ করে  একটি রিট করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট এই আইনকে  ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ ঘোষণায় বাতিল করে দেন। ফলে এখন অনুপ্রবেশকারি বলে কাউকে বের করে দেয়া সহজ। আসলে এই পরিকল্পনাগুলো ছিল বিজেপির। এবার সে পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে তিনি AGP ছেড়ে প্রকাশ্যে ২০১১ সালে এবার বিজেপিতে যোগ দেন। রাজ্য নির্বাচনে সেই প্রথম তিনি বিজেপির পক্ষ থেকে এর আগে যেটা ছিল অনুপ্রবেশ বা বাঙালি বা বাংলাদেশি খেদাও এর ইস্যু সেটাকে তিনি সরাসরিভাবে এবার “মুসলমান খেদাও” বলে প্রচার শুরু করেছিলেন। সর্বানন্দ পরে ২০১৪ সালের বিজেপি থেকে লোকসভা নির্বাচনে জিতে কেন্দ্রে প্রতিমন্ত্রী হন। আর ২০১৬ সালের আসাম রাজ্য নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসাবে ২০১৪ সালের ঐ নতুন ভাষ্যে ‘মুসলমান খেদাও’ এতে প্রায় ৫০ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল বলা হয়।  এদিকে আসামে কংগ্রেস এর মাঝের (২০০৬, ২০১১)  আবার দুইবার মুখ্যমন্ত্রী ও সরকার গড়েছিল।  তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছিল এই যে, ১৯৮৫ সালের পর থেকে রাজীব গান্ধীর দলসহ সকলে অনুপ্রবেশ বা মুসলমান ইস্যুকে ব্যবহার করেছে ক্ষমতায় যাবার জন্য। যারাই রাজ্য সরকারে এসেছে সবাই এটা ব্যবহার করেছে। কিন্তু সবাই জানে এর বাস্তবায়ন কী কঠিন ও ভীষণ বিপদের। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পর থেকে বাঙালি খেদাও অথবা অনুপ্রবেশকারী অথবা বিদেশী মাইগ্রেন্টের কোনো না কোনো একটি আসাম রাজনীতির ইস্যু ছিল। আর সবসময়ই ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে এই ‘বাংলাদেশী’ ইস্যুটি ব্যবহার করতে কেউ দ্বিধা করেনি। কিন্তু এক স্থানীয় এনজিও ইস্যুটাকে সেবার সুপ্রীম কোর্টে নিয়ে যায়,  আর এর বাস্তবায়ন দাবি করেছিল। সেই থেকে এটা কোর্টের মনিটরিংয়ে বাস্তবায়নের চেষ্টা হচ্ছে। অর্থাৎ আদালতও ঐ মিথ বিশ্বাস করেছে যে একটা বড় বাংলাদেশের মুসলমান জনগোষ্ঠি ১৯৮১ সালের পরে আসামে এসেছে।

কিন্তু এরপর কী?
সবচেয়ে ভয়াবহ এক অবস্থার জন্য যেন আসামের সব দল বা পক্ষ অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও।  কেন? কারণ আসামের নাগরিকের তালিকা কী হচ্ছে, কতদূর হচ্ছে এর বাস্তবায়ন ‘নির্বাহী সরকার’ নিজে করছে না। সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধানে, নির্দেশ ও মনিটরিংয়ে এটা সরকার বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু ঘটনা হল যদি ‘কেউ ভারতের নাগরিক’ এটা প্রমাণ করতে পারল না – এর মানেই সে অ-ভারতীয় হয়ত, কিন্তু সে বাংলাদেশের নাগরিক প্রমানিত হল না, হবে না। কিন্তু সেক্ষেত্রে কারও কাছেই যার জবাব নেই তা হল, তাহল, এই কথিত ‘অ-ভারতীয় বা অবৈধদের’ কোথায় ঠেলে ফেলা হবে? এর জবাব সুপ্রিম কোর্টের কাছেও নেই। কেউ অ-ভারতীয় এটুকু বলেই আদালত পার পেতে চায়। কিন্তু আদালত এ নিয়ে কিছু না বললে অন্যেরা, কোন না কোন রাজনৈতিক শক্তি এরা কী বসে থাকবে? সুযোগসন্ধানীরা কেউ বসে থাকবে না। বরং ‘বাংলাদেশীদের বের করে দেয়ার ক্রেডিট’ নিজে নিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে যেকোনো সময় দাঙ্গা লাগিয়ে দিতে পারে। এর দায় কে নেবে? সবচেয়ে আজব ব্যাপার, সুপ্রিম কোর্টসহ পুরো আসামের সবাই মনে করছে, নাগরিক তালিকা পূর্ণ হলেই ওটাই সব সমাধান। অথচ এটাই হবে দাঙ্গার উৎস। নতুন ও গভীর ক্ষত তৈরি ও সঙ্কটের শুরু। ভারতের এক গবেষণা থিংক ট্যাংকও (দিল্লির থিঙ্ক ট্যাংক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো জয়িতা ভট্টাচার্য।) এতে সায় দিয়ে বলছে, আসামের এই তালিকা একটি ‘টাইম বোমা’। তবে ভিন্ন কারণে।

ঘটনার আসল দিকটা হল, আসামের প্রধান সমস্যা পিছিয়ে পড়া অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের অভাব। আসাম ঠিক ল্যান্ডলকড ভুখন্ড নয়। প্রবেশ বা একসেস আছে কিন্তু সেগুলো কেবল এক কোনা, আসামের কেবল পশ্চিম দিক শিলিগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হবে, ফলে সহজ না। কখনও পাচগুণ পথ ঘুরতে হয়, পুর্ব দিক থেকে আসলে। অথচ সব রিসোর্সে আসামের সহজে প্রবেশের উপায় হতে পারে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের সাহায্য ও সুসম্পর্ক হতে পারত এর জন্য সবচেয়ে কাঙ্খিত বস্তু। কিন্তু মিথ্যা মিথ ও ভ্যানিটি আর ‘অ-পর’ ঘৃণা, মুসলমানবিদ্বেষ নিয়ে পাহাড় ও মনের ঘেরার ভেতর আটকে গেছে অসমিয়রা। অসমিয়াদের যদি মিথের তালাশে দিন কাটে, বিদেশি বা অ-পর’ ঘৃণা, মুসলমানবিদ্বেষ এর মুডে থাকে তবে এই অসমিয়াদেরকে কোন বাংলাদেশ সহায়তা করবে? কেন করবে? কেউ বিদেশি মানে সে আমার জনগোষ্ঠির স্বার্থ-বিরোধী – এসব ধারণা ও কথা বার্তা বড় জোর সত্তর দশক পর্যন্ত টিকে ছিল। এরপর আর নাই। বুঝমান মানুষ বুঝেছে এটা ডাহা মিথ্যা আর ভিত্তিহীন কথা। যে মানুষ ‘বিনিময়’ শব্দটার অর্থ তাতপর্য শুনে নাই, খেয়াল করে বুঝে নাই সে তো অচল। দুনিয়ার বাকী সবার জন্য সে এক অচল সিকির মত দায়!

যে ‘বিদেশী’ ঘৃণা করে বাইরের সব রিসোর্সে তাকে অ্যাকসেস দেবে কে? আসামের আসলে ত্রাতা হতে পারে কথিত এই ‘মুসলমানের বাংলাদেশই’, অথচ আসাম মুসলমান ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে। তাকে কে বাঁচাবে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৯ জানুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “আসাম পাহাড়ে আর মনের ঘৃণায় আটকে গেছে সঙ্কট“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীনের ‘ভাত-কাপড়ের’ হিউম্যান রাইট বুঝ

চীনের ‘ভাত-কাপড়ের’ হিউম্যান রাইট বুঝ

গৌতম দাস
০৪ জানুয়ারি ২০১৮, বৃহষ্পতিবার, ০০:১৮

চীন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যু দিনকে দিন মুখোমুখি হয়ে ওঠা বাড়ছে। তবে চীনের ভেতরে মানবাধিকার আছে কি না তা নিয়ে চীনকে পশ্চিমের খোঁচা দেয়া কিংবা বিব্রত করার যে নিয়মিত প্রচেষ্টা আছে, আমরা সেটার কথা বলছি না। যদিও দুটার মধ্যে কোথাও একটা সম্পর্ক আছে, তবুও এখানে প্রসঙ্গ সেটা নয়। প্রসঙ্গ খোদ চীনের অভ্যন্তরীণ নয়, বাইরের। অর্থাৎ চীনের দিক থেকে যেগুলো বাইরের দেশ যেমন, আমাদের মতো রাষ্ট্র বা মিয়ানমার –  সেখানে হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের পরিস্থিতি। চীনের আভ্যন্তরীণ নয় বাইরের ভিন্ন রাষ্ট্রে হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের ঘটনায় চীনের দায় কী?কী অর্থে? যেমন আমাদের মতো দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকা, নির্বাচিত সরকার থাকা কী রাষ্ট্রের জন্য জরুরি? আবার কিংবা ধরুন বিরোধী দল মানে সরকারে থাকা দলটা ছাড়াও এর বাইরের কোনো দল দেশে থাকা জরুরি কি না? অথবা সরকারের কোনো সমালোচক থাকা কতটা দরকার? অথবা ধরেন, কোন বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যা ও সাফাই মানে না, ভিন্ন চোখে দেখতে চায় – এমন লোক কি দেশে থাকতে পারবে না গুম হয়ে যাবে, ইত্যাদি। অথবা কথাটা আরেকভাবে তোলা যায়। গণতন্ত্র না উন্নয়ন, কোনটা চান? মানে, যেন মানবাধিকার ও উন্নয়ন- এ দুটোর কোনো একটা বেছে নিতে হবে। এর একটা যেন অপরটার বিকল্প! যেন পথ দু’টি কিন্তু একই ফল পাওয়া যায় এমন। এমন কথা বলা কী ঠিক? এগুলো তো দানব সরকারের কাজ!  এছাড়া এখানে আরও অদ্ভুত ব্যাপার হল যে দানব সরকার এমন দানবীয় সাফাই দিচ্ছে তাই না। বরং খোদ চীন সরকার এব্যাপারে এখন সাফাই দিয়ে এগিয়ে এসে যাচ্ছে।

এটাই হল এসবের সাথে চীনের সম্পর্ক। বিতর্ক অন্য রাষ্ট্রের ভেতরের হলেও গুরুত্বপূর্ণ হল, চীন বিষয়গুলোতে জড়িয়ে যাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে নিজেই একটা সাফাইদাতা হয়ে উঠছে। লজ্জ্বার মাথা খেয়ে এভাবে চীন সেই সব স্বৈরশাসক রাষ্ট্রের পক্ষে প্রকাশ্য মঞ্চে সাফাই বা জাস্টিফিকেশন দিতে শুরু করেছে। বলছে, এটা হচ্ছে নাকি যার যার রাষ্ট্রের ‘নিজস্ব উন্নয়নের পথ’ বা ‘নিজস্ব গণতন্ত্রবোধ’। এখানে অন্যের কিছু বলার নাই। সবাইকে একই বুঝ ও বোধের হিউম্যান রাইটে চলতে হবে এমন কোনো মানে নাকি নেই! চীনের ধারণা, হিউম্যান রাইটের বোধ যেহেতু একেকটা রাষ্ট্রে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, ফলে ‘গণতন্ত্র’বোধ একেকজনের একেক রকম হতে পারে। আর সেই সূত্রে কোনো রাষ্ট্র হিউম্যান রাইট রক্ষা মুখ্য কাজ হিসাবে নিতে পারে। আবার কেউ নাকি উন্নয়নের পথ বেছে নিতে পারে। এমনকি “উন্নয়নের স্বার্থে” কোনো রাষ্ট্রের কাউকে গুম, খুন করতে হতে পারে! দুর্নীতিও পুষতে হতে পারে! এটাও কোনো এক ‘বুঝের বা বোধের গণতন্ত্র’। এটাই যেন বা ‘কোনো রাষ্ট্রের নিজস্ব উন্নয়নের পথ’। এটা নিয়ে অন্যের কথা বলার কিছু নেই। যেমন চীনের অন্য রাষ্ট্রে মাথা গলানোর কিছু নেই বলে চীন বড় গলায় দাবি করে।

চীন বলছে এই যে, প্রত্যেক রাষ্ট্রের ‘নিজস্ব উন্নয়নের পথ’ এটাতে চীন কোনো মাথা গলাতে চায় না। এর কারণ চীনের সাধারণ নীতি হচ্ছে অন্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যাপারে, মানে তার ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়ার ব্যাপারে চীন মাথা ঘামায় না। সাধারণভাবে বললে, ‘রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের’ ধারণার দিক থেকে দেখলে এটা অনেক পুরনো কথা, ফলে চীন নতুন কিছু বলেনি। কিন্তু চীন এ কথা বলে আসলে যেসব রাষ্ট্রের স্বৈরাচার শাসক নিজের আকামগুলাকে ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নিয়েছে বলে চালিয়ে দিবার চেষ্টা করছে – চীন এসব রাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজকে সাফাই সরবরাহকারি ও স্বৈরশাসকের ‘রক্ষক’ হয়ে উঠতে চাইছে। এক কথায়, অন্যের রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করি না – এ কথা বলে চীন আসলে স্বৈরশাসকদের বন্ধু আর এমন শাসকদের ক্লাবের নেতা ও সংরক্ষক হতে চাইছে।

কিন্তু চীনের এটা হওয়ার দরকার কী? দরকার হচ্ছে কেন? দরকার হচ্ছে এ জন্য যে, ‘অধিকার’ কথাটা সার্বজনীন, আর সেকথার পক্ষে এক গ্লোবাল স্বীকৃতিও আছে। চীন দুনিয়ার নেতা হয়ে উঠতে চাওয়া এমন হবু গ্লোবাল নেতা। কিন্তু তাঁর এমন আকাঙ্ক্ষার আগে থেকেই ‘অধিকার’ কথাটা সার্বজনীন হয়ে আছে। আর এই গ্লোবাল স্বীকৃতি পেয়ে গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে নতুন দুনিয়া গড়ার কাল থেকে। জাতিসঙ্ঘ বলে প্রতিষ্ঠান ১৯৪৫ সালে গড়ে ওঠে আর ১৯৪৮ সালে ‘ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস চার্টার’ ঘোষণা করা হয়। এই ঘটনার ভিতর দিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার বিষয়টা সার্বজনীন স্বীকৃত। এটা ছিল প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই নাগরিকদের জন্য অধিকারের সনদ। আর চীনকে আজ একথা মানতে হবে যে, ১৯৪৮ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত কোন রাষ্ট্রে মনে করা হয়নি বা কেউ এমন কথা তোলেনি যে, ওই চার্টারের কারণে ঐ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হয়েছে বা এতে কোনো রাষ্ট্রের মধ্যে জাতিসঙ্ঘের হস্তক্ষেপ ঘটছে। আর সবচেয়ে বড় কথা ‘রাইট’ বা ‘অধিকার’ কথাটা কেবল বিশেষ একটি রাষ্ট্রের জন্য পালনীয় ধারণা নয়, বরং এটা বিশ্বজনীন ধারণা।

আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, এটা রাষ্ট্রসংঘের সদস্য ও অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে সব রাষ্ট্রেরই পালনের এক ধরনের বাধ্যবাধকতাও আছে। যেমন রাষ্ট্রসংঘের আর এক কনভেনশন হল, International Covenant On Civil And Political Rights 1966 । সদস্য ইচ্ছুক রাষ্ট্রগুলোর স্বাক্ষর শেষে এটা কার্যকর হয় ১৯৭৬ সাল থেকে। স্বাক্ষরের পরে নিজ নিজ সংসদে এতে অনুস্বাক্ষরের প্রস্তাব পাশ করে ফেলার পরে ঐ রাষ্ট্র ঐ কনভেনশনে বর্ণিত ভাবে নিজ নাগরিকের সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইট রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে যান। মজার কথা হচ্ছে, চীন এতে অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। আর আগামী বছর এতে চীনের স্বাক্ষরের ২০ বছর পূর্তি পালন করতে হবে।  তাই চীনেরও বাধ্যবাধকতা আছে। অতএব আমরা ধরে নিতে পারি, চীনের এই স্বাক্ষরের কারণে রাষ্ট্র হিসেবে চীনের ওপর বাইরের বা রাষ্ট্রসংঘের কারও কোন হস্তক্ষেপ ঘটে নাই বলেই চীন বিশ্বাস করে।

তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? হিউম্যান রাইট বা মানবাধিকার বিষয়টা এমন না যে যার যার মত করে এর একটা সংজ্ঞা দেয়া যায়। নিয়মিত হিউম্যান রাইট লঙ্ঘন করে এরপরে আবার সেটাকে যার যার ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়ার ঘটনা বলে চালানোর সুযোগ নাই। আমার হিউম্যান রাইট বুঝের সংজ্ঞা আলাদা তাই আমার ইচ্ছামতো স্বৈরশাসক হওয়ার সুযোগ আছে। এই ব্যাপারে, চীন যা বলছে তা সত্য নয়। স্বৈরশাসকদের ক্লাব বানানো ও চীনের এদেরকে আগলে রেখে পেলে পুষে এদের নেতা হওয়ার সুযোগ আসলেই নেই। যেমন মিয়ানমারের সু চি এবং ওর জেনারেলদের হিউম্যান রাইট লঙ্ঘন ততপরতা অথবা কম্বোডিয়ার স্বৈরশাসক হুন সেন – এদের হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের কাজকে চীন ওদের  ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেওয়া বলে সাফাই দিয়েছে। অথচ এই সাফাইয়ের কোন সুযোগ নাই। আর এই উসিলায় এদেরকে নিয়ে চীনের আলাদা স্বৈরশাসক ক্লাব বানানো অথবা তাতে বাংলাদেশকে যোগ করানোর চেষ্টা করা – এগুলোর কোনো সুযোগ আসলে নেই। তবু এই প্রবণতা দিন দিন বাড়তে দেখছি আমরা।

কিন্তু কেন বাড়ছে, গোড়াটা কোথায়? ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রসংঘের এই চার্টার গঠন ও অনুমোদনের সময়কালে বা পরে কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র এই চার্টার মানি না অথবা এর অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হবো না – এমন কথা বলেনি। যদিও কোনো কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হিউম্যান রাইট কথাটার একটা ভিন্ন সংজ্ঞা, একটা ‘কমিউনিস্ট ব্যাখ্যা’ আগলে নিয়ে সময় সময়ে তা আউরেছে। সেই কমিউনিস্ট ব্যাখ্যাটাই সব ত্রুটি আর বিভ্রান্তির উৎস। স্বৈরশাসকের পক্ষে সাফাই ওখান থেকে আসছে।

কমিউনিস্টদের এক বিশাল আত্মতুষ্টি যে, তারা মনে করেন- রিপাবলিক রাষ্ট্র বিষয়ে ‘পশ্চিমের রাজনৈতিক সাম্য ও নাগরিকের মৌলিক মানবিক অধিকার ধারণা’- এগুলো খামাখা এবং ভিত্তিহীন। তারা মনে করেন, ‘অধিকার’ ব্যাপারটাকে রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে দেখা ও বোঝাটাই এক ‘বুর্জোয়া প্রতারণা’। কেন? কারণ, কমিউনিস্টদের চোখে বরং অধিকারের আসল অর্থ হল ‘বৈষয়িক অধিকার’। এই বিচারে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান – এই বৈষয়িক অধিকারগুলোই আসলে কমিউনিস্ট বুঝ, বিকল্প বুঝের ‘অধিকার’-এর অর্থ। পশ্চিমের ধারণার বিরুদ্ধে ‘অধিকার’ শব্দের কমিউনিস্ট অর্থ ও সংজ্ঞা এটাই। বলা বাহুল্য এটা খুবই অধপতিত ধারণা।

তাই ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়া – এই কথার আড়ালে স্বৈরশাসকদের কথার সারার্থ হল, তারা রাজনৈতিক অধিকার বা মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার কথা মানেন না। কারণ তারা কমিউনিস্ট হন বা না হন, তারা কমিউনিস্টদের ইচ্ছামত বানানো হিউম্যান রাইটের নতুন সংজ্ঞা গ্রহণ করতে চান। আড়ালে থাকতে চান। কারণ চীনের মত কমিউনিস্টরা রাজনৈতিক অধিকার মানেন না।  এটাকেই ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়া বলে চালাতে চান। আর এই নতুন বক্তব্যের ভিত্তিতে চীন স্বৈরশাসকদের ‘নতুন ক্লাব’ গড়ার উদ্যোগ নিতে চাচ্ছে দেখছি আমরা। এক কথায় বললে, এটা  কমিউনিস্টদের ‘অধিকার’-সম্পর্কিত ভিত্তিহীন ধারণা। কমিউনিস্টদের চোখে অধিকার মানে বৈষয়িক সুবিধাদি পাওয়ার অধিকার। ফলে যে স্বৈরশাসক দাবি করবেন- আমি ‘গণতন্ত্র না উন্নয়নের’ বিতর্কে ‘উন্নয়ন’ এর পক্ষে আছি- এর মানেই হলো সেই স্বৈরশাসক বলতে চাইছেন, অধিকার সম্পর্কিত পশ্চিমা ধারণার বিরুদ্ধে আমি। তাই আমাকে পশ্চিমের ধারণা দিয়ে মাপলে হবে না। আমি আমার ব্যাখ্যা সহি আছি।

তবে বাংলাদেশ কি চীনের এই ক্লাবে জয়েন করবে? কিছু তোড়জোড় দেখা গিয়েছিল। সিপিবিসহ চার দল নিয়ে চীনা মন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছিল, আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সম্ভবত বেশি সুবিধা হয়নি।

অনেকে ভাবতে পারেন, এগুলো তো ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগের কমিউনিস্টদের ধারণা। ফলে সেই পুরান দায় দিয়ে এখনকার চীনকে ব্যাখ্যা করা কি ঠিক হবে? হ্যাঁ অবশ্যই সঠিক হবে। কেন? ওয়েন জিয়াবাও ২০০৩ সাল থেকে ১০ বছর ধরে চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার বাণী শুনুন। তিনি বলেছেন, “সবচেয়ে বড় হিউম্যান রাইট হল ১.৩ বিলিয়ন লোককে খাওয়ানো। ফলে সিভিল নাগরিকের ধারণা- পশ্চিমের এই ধারণা আসলে বাতিল বলে পরিত্যক্ত হয়ে গেছে”। [……Jiabao, when premier, said the biggest human rights issue was feeding 1.3 billion people. Civil liberties were rejected as Western ideals…….]

চীনের আরেক আলোচিত প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিন। ২০০৬ সালে তার এক বিখ্যাত মন্তব্য, ‘পেট ভর্তি থাকছে কি না আর গরম কাপড় পরা আছে কি না – এসবের ভিত্তিতে চীনের হিউম্যান রাইটকে সংজ্ঞায়িত করে দেখতে হবে।’  [Former president Jiang Zemin famously said in 2006 that having a full stomach and warm clothes was how human rights should be defined in China.] এর সোজা অর্থ পুরান কমিউনিস্টদের হিউম্যান রাইটের ‘বিকল্প সংজ্ঞা’ চীন এখনো ত্যাগ করেনি, বরং আঁকড়ে ধরে আছে। আর একালে এসে স্বৈরশাসকদের ক্লাব গড়ে সেখান থেকে চীন নিজেই সাফাই সরবরাহকারী হতে চাচ্ছে। চীন যদি ভেবে থাকে এই নতুন সাফাইয়ের ভিত্তিতে  দুনিয়ার সব স্বৈরশাসকদের নিয়ে চীন নিজের ‘স্বৈরশাসক ক্লাবের মেম্বার’ বানাবে, বুঝতে হবে মানুষ ও দুনিয়া সম্পর্কে চীনের কোন ধারণাই হয় নাই।

মানুষ কি কেবল  খাওয়া আর বাথরুম করার একটা মেশিন? কেবল এক বৈষয়িক ভোগের মেশিন মাত্র? নাকি তার এসবের বাইরেও বহু উন্মেষ আছে এবং তা দরকারও! মানুষ আসলে রক্তমাংসের জীবন্ত সত্তা, আবার এক স্পিরিচুয়াল সত্বা সে। দুনিয়ায় সে কেন এসেছে, কিভাবে দুনিয়ার আর সব কিছুর সাথে সে সম্পর্কিত, কী তার দায়-কর্তব্য- এসব বোঝাবুঝি এবং তদনুযায়ী অ্যাক্ট-রিঅ্যাক্ট করার নামই মানুষ। একথাগুলোকেই আরেক ভাষায় আমরা বলি মানুষের রাজনৈতিক সত্ত্বা আছে। এমনকি সে অবজেকটিভ সত্ত্বা না, কর্তা সত্ত্বা আছে। এজন্যই তাঁর রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করে এমন বৈশিষ্টের রাষ্ট্রও লাগে। কেবল খাওয়া-পরায় বাঁচায় রাখার রাষ্ট্র হলে চলে না, সন্তুষ্ট হয় না সে।

অপর দিকে, রাষ্ট্রসংঘের হিউম্যান রাইট চার্টারই শেষ কথা নয়। চার্টারেরও নানান ঘাটতি আছে ও ত্রুটি আছে। সবচেয়ে বড় ফাউন্ডেশনাল ত্রুটি হল, এটা ইনডিভিজুয়ালিজম বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ওপর দাঁড়িয়ে সাজানো। অথচ মানুষ মানেই সামাজিক মানুষ। কিন্তু সেদিকটা ফেলে, ভুলে মানুষের ব্যক্তিবোধের দিকটাই কেবল সত্য ধরে নিয়ে ‘চার্টার’ সাজানো হয়েছে।  ফলে এটাও ভেঙ্গে চুড়ে নতুন কিছু লাগবে, এরও আরও অনেক উন্মেষ লাগবে। কিন্তু সেই ‘আরো ভালো কিছু’ পাওয়ার আগে কিছু শুরু করার বিন্দু হিসেবে এখনো চার্টারের ভূমিকা আছে। ফলে একালে এসে, মানুষ রাজনৈতিক না বৈষয়িক- এই বিতর্কটা এমন নয় যে, মানুষ হয় কেবল রাজনৈতিক না হয় কেবল বৈষয়িক সত্ত্বা। কমিউনিস্টরা ‘অধিকার’ বলতে রাজনৈতিক অধিকারের বদলে বৈষয়িক অধিকার বলে বুঝাকেই সহি মানতে চেয়েছে। কিন্তু এটা ডাহা ভুল ও এবসার্ড।

একারণে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের আর এক দগদগে স্ববিরোধীতা আছে।   ইউরোপের মর্ডানিটির ফসল আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রকে কমিউনিস্ট চিন্তার বিচারে এটা এক ‘বুর্জোয়া প্রতারণা’ বা ‘বুর্জোয়া কান্ডকারখানা’ বলে তুচ্ছ করা হয়।  রাজনৈতিক অধিকার বা রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা – এগুলোকে কোন অর্জন বলে মানা হয় না, গুরুত্ব দেয়া হয় না। খেয়াল করলে দেখা যাবে সোভিয়েত ইউনিয়নে বা চীনে বিপ্লবের পরের নতুন রাষ্ট্রের নামের মধ্যে ‘রিপাবলিক’ শব্দটা রেখে দেয়া হয়েছে। USSR অথবা PRC নাম দুটার মধ্যেই ‘R’ এর অর্থ রিপাবলিক। রাজনৈতিক অধিকার বা রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা যদি তুচ্ছ এবং অপ্রয়োজনীয় হয়ে থাকে তবে রাষ্ট্রের নামের মধ্যে রিপাবলিক শব্দ বয়ে বেড়ানোর ন্যায্যতা কী?

এখন রাষ্ট্রসংঘের ‘চার্টারে’  ‘অধিকার’ বলতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ হয়ে গেছে – এই ভয়ে ও অভিযোগে অধিকারের রাজনৈতিক অর্থের দিক – মৌলিক মানবিক অধিকারের দিকটা তুচ্ছজ্ঞান করা্র কোন সুযোগ নাই। এটা ভিত্তিহীন ও মারাত্মক অন্যায়। ফলে ‘পেট ভর্তি খাবার আর গরম কাপড়’ সর্বস্ব অধিকারের বৈষয়িক ধারণাই মুখ্য – এমন মনে করাও বোকামি। মনে রাখতে হবে মানুষ ও দুনিয়া সম্পর্কে চীনের এই বৈষয়িকতাসর্বস্ব চিন্তার কারণেই – চীন বার্মায় ব্যবসা করতে গিয়েছে, অথচ পাশে একটা বিরাট (রোহিঙ্গা) জনগোষ্ঠী নিধন হয়ে যাচ্ছে। তবু চীন বে-খবর। কারণ চীনের শাসকেরা মানুষ নয়, একটা বৈষয়িক বিষয়-আশয় বোধের ডিব্বা। তাই চীন নিজের ‘পেট ভর্তি খাবার আর গরম কাপড়ের’অধিকার’ রাজনীতিতে বুঁদ হয়ে আছে। হয়ত বিশাল উন্নতি করছে চীন! কিন্তু এই বিশাল উন্নীত চীন ‘লইয়া দুনিয়া কী করিবে!’

গৌতম দাস
লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০২ জানুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীনের পেট ভর্তিআর গরম কাপড়ের মানবাধিকার“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]