ইমরানের পাকিস্তান কী আরব বসন্তের নতুন মডেল

ইমরানের পাকিস্তান কী আরব বসন্তের নতুন মডেল

গৌতম দাস

২৮ জুলাই ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2t0

 

ইমরানের পাকিস্তান কী আরব বসন্তের নতুন মডেল হতে যাচ্ছে? – ছবি : সংগৃহীত

পাকিস্তানে নির্বাচন সমাপ্ত হয়েছে। পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ দলের (Movement for Justice) নেতা প্রাক্তন ক্রিকেটার ইমরান সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়েছে। ২৭ জুলাই সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রকাশিত শেষ খবর পর্যন্ত পাকিস্তানের ডন পত্রিকা বলছে, ২৭২ আসনের পার্লামেন্টে ইমরানের যোগাড় করেছে ১১৫ আসন। [bagging 115 of the total 270 seats on which elections were held, according to the preliminary results announced by the Election Commission of Pakistan (ECP).]অর্থাৎ সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় ১৩৭ আসনের থেকে ২২ আসন দূরে। যেটা তারা আশা করছে অন্য প্রধান দুই দল  ৬৩ আসন পাওয়া নওয়াজ-মুসলিম লীগ অথবা ৪৩ আসন পাওয়া ভুট্টো পরিবারের পিপিপির কোন সহযোগিতা ছাড়াই ছোট দলের সহযোগিতায় পূরণ করে নিতে পারবে। অর্থাৎ তেহরিক-ই ইনসাফ (পিটিআই) দলের প্রেসিডেন্ট ইমরান খান সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন এটা প্রায় নিশ্চিত।

নির্বাচনের পরের দিন ২৬ জুলাই নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, “ইমরান খান ও মিলিটারি বসেরা ভাবতে শুরু করেছেন যে তারা একসাথে কাজ করবেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইমরান মিলিটারি বসদের একই দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করেন যে, পাকিস্তানের আমেরিকার সাথে যো-হুজুর করে পড়ে থাকা অবস্থা কমিয়ে ফেলতে হবে আর তালেবান বা অন্যান্য চরমপন্থিদের সাথে ডায়লগে আরও কথা বলে দ্বন্দ্ব-বিরোধ কমিয়ে ফেলতে হবে”। [Mr. Khan, on the other hand, was someone the military bosses seemed to think they could work with. Analysts said he shared their worldview, in which Pakistan would kowtow less to the United States and talk more with the Taliban and other extremist groups.]

ইমরান মনে করেন, পাকিস্তানে চরমপন্থার রাজনীতি আছে কথা সত্য, কিন্তু মূল সমস্যা রাষ্ট্র শাসনের বা গভর্নেসের চরম ব্যর্থতা। [“In Pakistan, the main problem is not extremism,” he said in a recent interview with The New York Times. “We are a governance failure. And in any third world country, the moment the governance collapses, mafias appear.”]
এই হল মোটা দাগে সর্বশেষ, পাকিস্তানে কী হতে যাচ্ছে এর সংক্ষিপ্ত ধারণা। এবার মুল প্রসঙ্গে ফিরে যাই।

“পাকি” অথবা “পাকিস্তানে পাঠানো’
অন্য কারও মধ্যে নিজের অপছন্দের ধর্ম বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের কিছু দেখলেই তাকে “পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার” হুমকি দিতে দেখা যায় আজকাল হামেশাই – সেই পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন বা পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ২৫ জুলাই। একালের বাংলাদেশেও ভারতের মতোই ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ হুমকি সমান হাজির; আর সেটা প্রায় সমান ভারতীয় অর্থে – প্রায় একই ভাষা ও বয়ানে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ থেকে হুমকিদাতা যেন বুঝানোর চেষ্টা করে যে ভারত, আমরা তো তোমাদের মতোই। কিন্তু এই ‘তোমাদের মতোই’ মানে আসলে কী? প্রগতিশীল? অবশ্যই না। সেটা এককালে ছিল। তাহলে কি একই রাষ্ট্রনীতির কারণে? সম্ভবত হ্যাঁ। বাংলাদেশের সরকারকে প্রবল সমর্থন করা ভারত, এ দুই সরকারের পাকিস্তাননীতি একই। বাস্তবে এই দুই সরকারের পাকিস্তাননীতি এক হোক আর নাই হোক, পাকিস্তান প্রশ্ন এলেই চলতি আমলে আমাদের সরকারের ঝোঁক থাকে এটা দেখানোর যে, আমাদের অবস্থান ভারতের মতোই। কিন্তু তাতেও আবার সেই কথা, ভারতের মতোই মানে কী?

প্রথমেই বলে নেয়া যায় যে, ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ বুলি এটা মূলত এক “হিন্দু জাতীয়তাবাদী” রাজনীতির বয়ান। যার প্রত্যক্ষ খাতক মোদীর বিজেপি। যদিও সেই সাথে বকলমে অন্য অনেক দলই। তবে তার চেয়েও বড় কথা এই বুলির বয়ান আদতে বর্ণবাদিতার বা রেসিজমের। অথবা বিশেষ করে কাউকে “পাকি” বলে ডাকা বা ব্যঙ্গ করা। কেন? কারণ, কোনো নির্দিষ্ট আমলের পাকিস্তান সরকারের নীতি পলিসি এখানে রেফারেন্স তো নয়ই, বরং পুরো পাকিস্তানি জনগোষ্ঠীকেই অভিযুক্ত করা হয়, ঘৃণা-বিদ্বেষ প্রকাশ করা হয়ে থাকে এখানে এই ইঙ্গিত দিয়ে যে  ‘তাদের রক্তই খারাপ’। যেন তারা  “রক্ত খারাপ” এক জনগোষ্ঠি। এটা এক ধরনের হিটলারি বর্ণবাদী যুক্তির বয়ান। তাই তারা দোষী। আসলে এটা এক ভয়ঙ্কর প্রবল ঘৃণা ছড়ানোর কর্মসূচি। তবে অনেকে এতসব জেনে বা না জেনে সহজেই এতে সামিল হয়ে যান, আর রেসিস্ট উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের শিকার হয়ে পড়েন। ভারতে একালে এই বয়ান প্রবল করেছে বিজেপি-আরএসএসের মোদি সরকার; যদিও এর আগেও এটা কম-বেশি ছিল। ফলে উঠতি তরুণ যারা রেসিজমের রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চান তাদের এ ব্যাপারে সচেতন হতেই হবে। আমার অপছন্দের কিছু হলেই আমরা কাউকে ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ কথা বলতে পারি না। কারণ এটা রেসিজম। বরং কোন পাকিস্তান সরকারের সুনির্দিষ্ট সেই নীতি বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরাসরি সমালোচনা নিন্দা করাই সঙ্গত হবে। অজান্তে প্রগতিবাদিতার নামে হিন্দুত্বের পৃষ্ঠপোষক হয়ে যাওয়াটাই কোনো কাজের কথা নয়।

“পাকিস্তান মানেই সামরিক শাসন”
পাকিস্তান- এই শব্দটা দিয়ে এছাড়াও এই অঞ্চলে আমরা আরও অনেক কিছু ইঙ্গিতে মানে করি। যেমন পাকিস্তান মানেই সামরিক শাসন- এটা সমার্থক। একজন ‘প্রগতিশীল’ রাইটার আজ লিখছেন, ‘পাকিস্তানে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হল।’ অর্থাৎ তার আগাম অনুমানটা হল পাকিস্তান মানে তো সেখানে ‘সামরিক অভ্যুত্থান হবারই কথা’, সেটা না হয়ে নির্বাচন হয়েছে। কেন? কারণ, জুড়ে দেয়া ট্যাগিং অর্থটা হল, পাকিস্তানের জেনারেলরা নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা ছাড়া থাকতেই পারে না। এখানেও আগাম ধরে নেয়া অনুমানটা হল যে, জেনারেলরা যেন খুবই ক্ষমতালোভী, সে কারণেই নিজ ইচ্ছায় তারা অভ্যুত্থান করে থাকেন। আর ঘটা এ ধরনের অভ্যুত্থানগুলোতে বোধহয় পাকিস্তানের বাইরের গ্লোবাল পরিস্থিতির ও পরাশক্তি রাষ্ট্রের কোনো সংযোগ ও ভূমিকা নেই। সবই যেন স্থানীয় জেনারেলরা লোভী বলেই কেবল তারা ক্ষমতা নিয়ে নেন। এই হল প্রপাগান্ডা অনুমানগুলো।

এসব অনুমান বাস্তবতা বিবর্জিত ও ভিত্তিহীন। ফ্যাক্টস হল, পাকিস্তানের ক্ষমতা দখলগুলো হয়েছে আমেরিকান ইচ্ছায়, ঐ রাষ্ট্রের নীতি-পলিসির কারণে। জেনারেলদের নিজের ইচ্ছায় মানে, আমেরিকার ইচ্ছা অমান্য করে পাকিস্তানে ক্ষমতা দখল একবারই হয়েছে; সেটা ১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বেলায়। তাও সেটার পিছনে বিশেষ কারণ আছে। শ্রীলংকা থেকে দেশে ফিরতে  বাণিজ্যিক বিমানে রওনা করেছেন মোসাররফ। আর ঠিক এর পরেই ভ্রমণরত অবস্থায় মোশাররফকে সেনাপ্রধান থেকে সরানো এবং তার বিমান মাটিতে নামতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা জারি করেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ। এর বিরুদ্ধে সেনা সদস্যদের মিলে পালটা যৌথ অবস্থান নিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। মাত্র পাঁচ মিনিটের জ্বালানি থাকা অবস্থায় বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তারা মোসাররফের বিমান মাটিতে নামিয়ে আনেন।  কোন বাণিজ্যিক বিমানকে নামতে না দেওয়ার নির্দেশ জারি এটা ক্রিমিনাল অফেন্স। মূলত ভারত-পাকিস্তানের কারগিল যুদ্ধের দায় প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের অপ্রয়োজনীয়ভাবে আর্মিকে দায়ী করা এবং বিশেষত মোশাররফের ওপর তা চাপানো আর প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের তাতে মৌন সম্মতিতে ঘটেছিল এমন হাতছুট ঘটনা ও এর পরিণতি। তাও এর দু’বছর পরে ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেন, টুইনটাওয়ার হামলার পরের দিনই আমেরিকা মোশাররফ সরকারকে মেনে নিয়েছিল। আর দ্বিতীয় ঘটনাটা হল, সদ্য স্বাধীন সেকালের পাকিস্তানে, ১৯৫১ সালে প্রথম যে সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টা করেছিল তা করেছিল পাকিস্তানের কমিউনিস্টরাই। “রাওয়ালপিন্ডি কন্সপিরেসি” নামে যা পরিচিত। ফলে জন্ম থেকেই, ইসলাম-পাকিস্তান-সামরিক ক্যু, এগুলো সব সমার্থক শব্দ, এ কথা বলে যে প্যারালাল টানা হয় এই কথারও কোন ভিত্তি নাই।

আসল কথাটা অর্থাৎ যে জায়গায় বসে পাকিস্তান বা সামরিক বিষয়টাকে দেখতে হবে তা হল কোল্ড ওয়ার; মানে ১৯৫০-১৯৯১ সাল, এই সময়কাল ধরে চলা আমেরিকা বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে লড়াইয়ের যুগ। এইকালে এশিয়ার বেশির ভাগ দেশ ক্যু হয়েছে আমেরিকান ইচ্ছায় ও নীতিতে সামরিক শাসনে চলেছে। মূলত কমিউনিস্টদের পপুলার প্রভাবে আমেরিকার পক্ষে এসব দেশে কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সরকার দূরে থাক, নামকাওয়াস্তে কোনো লিবারেল দুর্বল সরকারও টিকিয়ে রাখতে পারেনি সেকালে। ফলে আমেরিকার প্রভাব-স্বার্থ টিকাতে সামরিক ক্ষমতা দখলই ওর একমাত্র ভরসা ছিল ।

কোল্ড ওয়ার মানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে (১৯৪৫) কলোনি উত্তর সময়ে কলোনিমুক্ত দেশগুলোকে নিজ বলয়ে নিতে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পাল্টাপাল্টি প্রভাব বিস্তারের লড়াই, তাদের নিজ নিজ রাষ্ট্র-ব্লকে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে আসার টানাপড়েন – এটাই কোল্ড ওয়ার যুগ-বৈশিষ্ট্য। এবং অবশ্যই সেগুলো কমিউনিস্ট ও এন্টি-কমিউনিস্ট মতাদর্শের মধ্যকার লড়াই, এই উছিলায় ঘটেছিল। এতে কে সঠিক ছিল, সেটা আমরা যার যার পছন্দের মতাদর্শের ভিত্তিতে জবাব দেব আর এভাবে বিভক্ত হয়ে যাবো কোন সন্দেহ নেই। ফলে সেদিকে না গিয়ে, বরং সেই সময়ের আমেরিকান নীতি সম্পর্কে চলতি শতকে এসে আমেরিকানদের ব্যাখ্যা বা মূল্যায়ন কী- সেই প্রসঙ্গে কিছু কথা তুলব। তবে মূল কথা হলো, অনেক হয়েছে আর কত, পাকিস্তানের ঘটনাবলি বুঝতে কোল্ড ওয়ারের চিন্তা-ফ্রেম তো লাগবেই  সাথে লাগবে আমাদের পরিপক্কতা। হিন্দু অথবা মুসলমান জাতীয়তাবাদের বাইরেও দুনিয়া আছে। ফলে বাইরে যেতে হবে। পাকিস্তানের ঘটনাবলির কারণ সেখানেও দেখতে হবে। অন্তত, দুই জাতীয়তাবাদের কোনো একটার ঘরে বসে অন্যটাকে কোপানো – এগুলোর দিন শেষ করতে হবে। পারস্পরিক ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করতে হবে।

RAND ও আরব স্প্রিং
র‌্যান্ড করপোরেশন (RAND Corporation) – এটা আমেরিকান আর এক থিঙ্কট্যাঙ্কের নাম। বহু পুরানা, বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এর জন্ম। যখন সে আমেরিকান এয়ার ফোর্সকে নিজের নীতি গবেষণার কাজ দিয়ে সহায়তা দিত। কারণ, যুদ্ধবিমান তৈরি করে এয়ারফোর্সকে বিক্রি করে এমন এক কোম্পানি থেকে র‍্যান্ডের চলার ফান্ড আসত। বর্তমানে (১৯৪৮ সালের পর থেকে) এটা নিজেই এক থিঙ্কট্যাঙ্ক হিসাবে রেজিষ্টার্ড। এই দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ই আছে, পিএইচডি প্রোগ্রাম অফার করে থাকে। যেখান থেকে এর বিস্তর একাডেমিক তৎপরতা – স্টাডি, গবেষণার কাজ চলে। স্বভাবতই এর মূল লক্ষ্য হল, অ্যাকাডেমিক তৎপরতা- স্টাডি, গবেষণার মাধ্যমে আমেরিকান সরকারগুলোকে সম্ভাব্য তার পলিসি কী হওয়া উচিত, তা ঠিক করতে সহায়তা করা। এই অর্থে আমেরিকান রাষ্ট্র ও সরকারের স্বার্থ দেখাটাই তার কাজ। তার অনেক কাজের মধ্যে একালে এক প্রভাবশালী কাজ – পপুলারলি যেটাকে ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’ নামে চেনানো যায়। বড় পরিসর থেকে বললে, ২০০১ সালে টুইনটাওয়ার হামলার পরে বুশের ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নীতিটা ছিলঃ মুসলমানমাত্রই শক্ত হাতে দমন, তাদের ধর আর মার। এই নীতি নিষ্ফলা পরাজিত হয় ও অনন্ত সমাপ্তিহীন এক যুদ্ধের ভেতর আমেরিকাকে টেনে নিয়ে যায়। সেই থেকে, আমেরিকান অর্থনীতির পতনের পিছনে এটা মূল কারণ।  ২০০৬ সালের মধ্যে আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের গবেষণা মূল্যায়নে পাওয়া ফল হিসেবেই এই নিষ্ফলা পরাজয় আর অর্থনীতির পতনের ঘটনাবলি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। আর এই ফলাফল থেকে শিক্ষা নিয়ে আর আগে থেকে চলে আসা র‌্যান্ডের এক গবেষণার ফলাফল – মূলত এই দুই থেকে তৈরি নীতি হল ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’। ওবামা প্রশাসন ২০০৯ সালে ক্ষমতা নিলে এটা স্থায়ী ও রুটিন বিদেশ নীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছিল।

সার কথায় বললে, এটা হল নির্বিচারে আর মারধর-দমন নয়, ইসলামের সাথে আমেরিকার এনগেজমেন্ট বা সংশ্লিষ্ট করার নীতি। সশস্ত্র ইসলামি ধারাগুলোর সাথে আমেরিকার আগেরই মারধর-দমন চলেছে তা বাদে ওর বাইরে বাকি সব ইসলামি ধারার সাথে আমেরিকার রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়া, রাষ্ট্র-সরকারে তাদের আসতে অংশগ্রহণে সহায়তা, সহযোগিতা করা। এরই প্রথম সবল প্রচেষ্টা ছিল মিসরে মোবারকের পতন ও পপুলার নির্বাচিত এক সরকার সৃষ্টি – আরব স্প্রিং। আর এই কাজে ইসলামি ব্রাদারহুডের সাথে কাজ করা, এটাই ছিল আমেরিকার ইসলামের সাথে এনগেজমেন্টের প্রথম উদ্যোগ। দুঃখজনক হল এটা ফেল করে যায় বা কাজ করেনি। না করলেও ওবামা আরো কিছু চেষ্টা করতে রাজি ছিলেন। কিন্তু মূলত ব্রাদারহুড সম্পর্কে সৌদিরাজের ভীতি, বিশেষত প্রেসিডেন্ট মুরসির ইরান সফর করা থেকে সেই ভীতি আরো ট্রিগার করে প্রবল হওয়া থেকে, এরপর সৌদি উদ্যোগে জেনারেল সিসির আগমন উত্থানে ওবামা এতে নীরব বা উপায়হীন সমর্থকে পরিণত হয়েছিল। ফলে মুরসির পতন ঘটে। মিসর এক্সপেরিমেন্টের এখানেই সমাপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে ইজিপ্ট ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’-এর একটা মাত্র। এই প্রজেক্ট মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার সব দেশেই চালু তো আছেই, ফলে বাংলাদেশেও আছে। এমনকি ইন্ডিয়াতেও আছে। কারণ এটা সাধারণভাবে ২০০৯ সাল থেকে আমেরিকান ফরেন পলিসির চলমান অন্যতম মুখ্য বৈশিষ্ট্য।

আমেরিকার যুদ্ধের ময়দান পাকিস্তান
যুদ্ধটা শতভাগ আমেরিকার। নিজ দেশের ভুমিতে সে যুদ্ধ না করে পাকিস্তানকে যুদ্ধের ময়দান বানানো ও ব্যবহার করা, পাকিস্তানকে এক গজব বানিয়ে ফেলার শতভাগ দায় আমেরিকার। সশস্ত্র ইসলামি রাজনীতির সাথে আমেরিকান যুদ্ধের ময়দান হল পাকিস্তান। পাকিস্তানকে আমেরিকার হয়ে এই ময়দান হতেই হবে। নইলে পাকিস্তানকে বোমা মেরে মাটির সাথে মিটিয়ে ‘পুরান প্রস্তর যুগে’ ফেরত পাঠানো হবে – এটাই ছিল আমেরিকান প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী রিচার্ড আর্মিটেজের প্রেসিডেন্ট মোশাররফকে টেলিফোন কথোপকথনে দেয়া পরামর্শ বা হুমকি। মোশাররফের ‘ইন দা লাইন অন ফায়ার’ বইতে এর বিস্তারিত বয়ান আছে। তাই জেনারেলদের সিদ্ধান্তের পাকিস্তানের সব ‘টেররিজম’ ঘটনা ঘটছে- এ কথাগুলো অর্থহীন। আমেরিকান ওয়ার অন টেরর যুদ্ধের প্রেক্ষিতে পাকিস্তানকে বাধ্য হয়ে নিজেদেরকে ব্যবহৃত হতে দেওয়া এই বৃহত্তর দিক বাদ দিয়ে কেবল জেনারেলদের দায়ী করার সংকীর্ণ চোখ – এটা ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের ফরেন পলিসি।  তা যাই হোক, আমেরিকান রুটিন পলিসি হিসেবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার রাষ্ট্র বলে পাকিস্তান ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’-এর এক বড় খাতক, এই প্রকল্পের শুরু থেকেই।

আমরা বেশির ভাগই না আরব স্প্রিং পলিসির যথেষ্ট খবর নেই না পাকিস্তানের। এই প্রচারণার কাছে পাকিস্তান মানে হল ঘৃণা। এটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের চোখে দেখা ১৯৪৭ এর দেশভাগ অথবা সত্য সত্যই ১৯৭১ এর পাকিস্তানি শাসকদের গণহত্যা নৃশংসতাও এর কারণ বটে। যদিও এরপর এরা আবার জিয়াউল হকের আমলে এসে থেমে যায়।  বুঝতে চায়না অথবা দেখতে পায়না ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল – এই ট্রিগার পয়েন্ট সব ঘটনার আরম্ভ-বিন্দুকে। যেখানে মুল বিষয় হল, রাশিয়ান জার-সাম্রাজ্য সেন্ট্রাল এশিয়াকে নিজ বিস্তারের প্রকল্প হিসেবে নিজ সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করে আর এরপর তা রক্ষা করতে গিয়ে ১৮৮৯ সালে আফগানিস্তানের মাটিতে ব্রিটিশ-জার এ দুই সাম্রাজ্য লড়াই করেছিল। এরই পুনরাবৃত্তি হল, ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল। যার আবার পিছনের মূল কারণ ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব হয়ে যাওয়ায় এর প্রভাব-ভীতি। ইরান বিপ্লব ছিল এক গ্লোবাল ঐতিহাসিক তাতপর্যময় ঘটনা এই অর্থে যে সোভিয়েত ব্রেজনেভ-আফগানিস্তান-আমেরিকা-পাকিস্তান-টেরর-আলকায়েদা-তালেবান-আইএস ইত্যাদি সব শব্দাবলীতে এরপর থেকে এক চেন রিয়াকশন ঘটে গেছে এখান থেকে। একালের দুনিয়ার সবঘটনার আরম্ভ বিন্দু এখানে। । মূলত ইরান বিপ্লবের প্রভাবে মুসলিম সেন্ট্রাল এশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের হাত ছাড়া হয়ে যায় কিনা আগাম সেই ভয় মনে এসেছিল সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভের। আর তা থেকে তিনি ‘সমাজতন্ত্র নামের আড়ালে’  কলোনী দখলগিরিতে করতে নেমে পরেন। আফগানিস্তানের ভৌগলিক অবস্থান ইরান আর সেন্টাল এশিয়ার (সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ) প্রায় মাঝখানে। ফলে আফগানিস্তানকে বলি চড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন ব্রেজনেভ এই মনে করে যে বাফার হিসেবে আফগানিস্তান দখল করে আফগানিস্তানকে  বাফার রাষ্ট্র হিসাবে ব্যবহার করতে হবে।  পুরানাকালে রাশিয়ান জারের তৎপরতায় ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ভয় পেয়ে এর বিরুদ্ধে লড়েছিল, একালে সেই একই ভয় পায় পাকিস্তান। তবে পাকিস্তান যুদ্ধের দায়টা নিয়েছিল আমেরিকার হয়ে, কোল্ড ওয়ারের লড়াই লড়তে। যে যুদ্ধের শেষটায় এখান থেকেই আল-কায়েদা ও তালেবান উত্থান-পতনে, এখনও যা চলমান।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও তা ভেঙে গেলে এর আমেরিকার থিঙ্কট্যাঙ্ক একাদেমিক মহলে প্রধান তাৎপর্যময় বিষয় হয়ে উঠে যে “কোল্ড ওয়ারের” তাহলে এখন কী হবে! কারণ বাস্তবত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও নাই মানে মাঠে এবং বাস্তবে কোল্ড ওয়ার নাই হয়ে যাওয়া। ফলে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোতে প্রবল তর্কাতর্কি উঠেছিল যে কোল্ড ওয়ারের পুরা যুগে আমাদের মত দেশে আমেরিকা সামরিক ক্যু’র করানোর পথ অনুসরণ, সেটা এবার তাহলে ফরেন পলিসি থেকে বাদ দিতে হবে।

আমেরিকা কোল্ড ওয়ারের যুগে সামরিক ক্যু’র পথে যেত কেন
কিন্তু আমেরিকা কোল্ড ওয়ারের যুগে সামরিক ক্যু’র পথে যেত কেন? এ প্রসঙ্গে র‌্যান্ড রিপোর্টের দেয়া একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তা হল, আমেরিকান পলিসি মেকারদের চোখে সমাজতন্ত্র এক এবসার্ড (বাস্তবায়ন অযোগ্য) আইডিয়া। না, এটা তাদের অপছন্দের মতাদর্শ বলে নয়। কারণ এটা এমন এক প্রজেক্ট যার সাথে আমেরিকানদের এনগেজমেন্ট বা কোনো দেয়া-নেয়া, রাষ্ট্র বা সরকারে পাশাপাশি থাকা, দুটো আলাদা দল হিসেবে থাকা, অথবা সরকারে বা বিরোধী হিসাবে থাকারও কোনো সুযোগ নেই। ব্যাপারটা হয় তারা না হলে আমরা। এছাড়া কমিউনিস্টদের “সব মালিকানা উচ্ছেদ করে দিতে হবে” – এটা মধ্যবিত্ত ও গরিবদের মধ্যে খুবই পপুলার দাবি। অথচ আমেরিকার চোখে এটা বাস্তবায়ন অযোগ্য এমন এক এবসার্ড দাবি। তবে এবসার্ড হলেও কিন্তু তা পপুলার দাবি বলে এর সামনে আমেরিকা অসহায় এবং উপায়ন্তহীন। তাই আমেরিকা এশিয়ায় আমাদের মতো দেশে কোল্ড ওয়ারের পুরা ৪২ বছরে কোনো লিবারেল সরকারও কায়েম করতে পারেনি। এরই পরিণতি হল সামরিক ক্যু ফেনোমেনা।

এই কথাগুলো এখানে বলা হল, আমেরিকান নীতি বুঝার জন্য কেবল। তা মেনে নেয়ার জন্য এটা কোনো সুপারিশ নয়। অথবা এটাকে সাফাই হিসেবে নেয়ার জন্য নয়, তা ভুল হবে। আমেরিকানদের ভালো বা মন্দ কাজের সাফাই দেয়ার দায় আমেরিকার।

তাই সোভিয়েত ভেঙ্গে পড়ার (১৯৯১) পরে এবার আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোতে প্রবল তর্কাতর্কি উঠেছিল এবং শেষে নীতিগতভাবে আমেরিকা সিদ্ধান্ত অবস্থান নেয় যে আর সামরিক ক্ষমতা দখলকে নিজের স্বার্থ হাসিলের উপায় হিসেবে আর দেখা হবে না। সেটা ছিল প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন (১৯৯৩-২০০১) প্রশাসনের শুরুর আমল। বিল ক্লিনটনের ২০০০ সালের মার্চে বাংলাদেশ সফর ছিল সেই বার্তা পৌছানোর যে আমরা এখন থেকে আর সামরিক ক্যু নয় লিবারেল নির্বাচিত সরকারের পক্ষে।  আর ঠিক এই কারণে অর্থাৎ আমেরিকান ‘ক্যু-বিরোধী’ নতুন পলিসি কমিটমেন্টের পর জেনারেল মোশাররফের ক্যু এই সাময়িক দুর্ঘটনাটা ছাড়া পাকিস্তানে আর সামরিক ক্ষমতা দখল ঘটেনি। মূল কারণ আমেরিকান নীতিগতভাবে সামরিক পথে না যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত প্রতিশ্রুতি। ফলে যারা কিছু হলেই পাকিস্তানে সামরিক ক্ষমতা দখল নিয়ে শঙ্কা তোলেন তারা মুখস্থ বলেন। তারা আমেরিকার পলিসির হাল-হকিকত সম্পর্কে খোঁজ রাখেন তা মনে হয় না।

আবার আমরা বেশির ভাগই একালের পাকিস্তান, নতুন প্রজন্মের পাকিস্তান সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকেবহাল নই। বিশেষ করে আরব স্প্রিংয়ের প্রভাব পাকিস্তানে কেমন পড়েছিল। ঠিক যেমন বাংলাদেশে আমাদের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমনকি আমাদের বেসরকারি মেয়েদের স্কুল ভিকারুন্নিসা পর্যন্ত আরব স্প্রিং ছড়িয়ে আছে, আমরা কী জানি! মনে হয় না। অবশ্য ধরতে পারারও একটা ব্যাপার আছে। এই ততপরতাগুলোকে চেনার একটা সহজ উপায় হল, ‘ইয়ুথ’ বা ‘লিডারশিপ’ – এসব শব্দে প্রকাশিত কোনো তৎপরতা দেখতে পেলেই বুঝতে হবে এটাই সেই। বাইরে থেকে দেখতে এটা আমাদের পরিচিত ‘শিক্ষার্থীদের কোন ক্লাব’ (ডিবেটিং) ধরনের এমন নানা তৎপরতা, যেগুলো যে কোনো অ্যাকাডেমিতে এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটি বলা হয় তেমনই ধরনের।
র‌্যান্ডের ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’ঙ্গামেরিকান ফরেন পলিসি হিসাবে গৃহিত হওয়া আসলে আমেরিকারই সামরিক ক্যু’র পথে আর না যাওয়ারই আরেক পরিপূরক অবস্থান, আরেক এক্সটেনশন।

তাহলে মূল কথাটা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়াতে তাই আমেরিকাকে এরপর দেখানো জরুরি হয়ে পড়ল যে, এখন তাহলে রাষ্ট্র গঠনে, রাষ্ট্রীয় কনস্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠানগুলো গড়া, মৌলিক অধিকার সম্পর্কে মাস লেভেলে সচেতনতা তৈরি ইত্যাদি নিয়ে আমেরিকার এগিয়ে আসা উচিত। এ্টাই ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’ এর কোর লক্ষ্য । যুক্তির শুরু এখান থেকেই। তবে মূলত এর মাঝে টুইনটাওয়ার হামলা ঘটে যাবার কারণে, মূল প্রজেক্টকে মুসলমান জনসংখ্যার জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য এমন বিশেষ আর এক মাত্রা দিয়ে সাজিয়ে নেয়া হয়েছিল যাতে তা ‘ইসলামের সাথে আমেরিকার এনগেজমেন্টের ইচ্ছার’ প্রকাশ হিসাবেও কাজ করতে পারে।

টার্গেট হিসাবে এই প্রজেক্ট মূলত এটা তরুণদের মধ্যে বেশি কাজ করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক তৎপরতা দিয়ে, পপুলারও হতে চায়। এটা মূলত আধুনিক রাষ্ট্র, কনস্টিটিউশন, প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের অধিকার প্রসঙ্গে এবং সমাজকে নেতৃত্ব দেয়া ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির আমেরিকান প্রকল্প।

“Youth leadership”
পাকিস্তানে এই প্রকল্প তৎপরতা খুব সম্ভবত ২০১০ সাল থেকে ব্যাপকতা লাভ করে। ইমরান খানের দলের নাম পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ, সংক্ষেপে পিটিআই। যার মানে হল (Movement for Justice) বা ইনসাফের লড়াই।  যদিও পিটিআইয়ের জন্ম ১৯৯৬ সালে আরব স্প্রিংয়েরও বহু আগে থেকে। তবে আরব স্প্রিংয়ের তৎপরতা ধীরে ধীরে জমে ওঠার পর গত ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে দিয়ে সমাজে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে থেকে তারা একটা দল বেছে নিয়েছিল। সেটা ইমরান খানের দলের সাথেই, সেখান থেকে তাদের বুঝাপড়া ও এক সাথে কাজ করার ঐক্য হয়েছিল। এমনিতে আরব স্প্রিংয়ের প্রকল্পগুলো মাঠে হাজির থাকে এনজিও প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা হিসেবে। তবে বাইরে আমরা দেখি কেবল তাদের সুবিধালাভ যারা যারা করে এমন শিক্ষার্থীদেরকেই। সরাসরি ইউএস এইডের সরকারি ফান্ড এটা; অন্য কোন সামাজিক দাতব্যের ফান্ড নয়। আমেরিকান প্রায় ৯টি এনজিও প্রতিষ্ঠান সাধারণত এ কাজ-ততপরতায় জড়িত।   ফলে তারা সরাসরি স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে কাজ করতে পারে না, করেও না। তবে তাদের তৎপরতা থেকে সুবিধা-লাভকারি স্থানীয় জনগণ বা শিক্ষার্থী নিজেরা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের সাথেও কাজ করতে পারে। তবে “youth leadership” নামে চলা কর্মসুচিগুলো কবে কখন স্থানীয় রাজনৈতিক দলের কর্মিদের সাথেও সম্পর্ক কাজ করবে এটা ভ্যরি করে। সাধারণত এটা অনেক দেরি করে ঘটে। মিসরের “সিক্সথ অক্টোবর লিডারশীপ গ্রুপ” শেষে নিজেই রাজনৈতিক দল হয়ে যায়। তবে কোন কারণে তা নির্বাচনের পরে হয়েছিল।

“youth leadership” ্ধরণের কাজের মাধ্যমে গত বিশ বছরে তরুণ পাকিস্তানিরা, পাকিস্তানের পরিচিতি অনেক বদলে দিয়েছে। এরা মূলত শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত।  ইমরানের দলের গত পাঁচ বছরের তৎপরতায় মনে করার কারণ আছে যে, এসব তরুণ নেতৃত্বেও কিছু যোগ্যতা অর্জন করেছে। পাকিস্তান সমাজের এই অংশটার কথাই বাইরের আমরা খুবই কম জানি কারণ আমাদের পরিচিত পাকিস্তান যেটা ছিল সেটা মূলত বড়জোর সত্তরের দশকের; সেটা দিয়েই একালের পাকিস্তানকে বুঝতে চাই বলে সমস্যা হয়। নিরন্তর যুদ্ধ, রিফুইজি, অস্ত্র  বোমা আর ইসলামের হরেক রক্ষণশীল বয়ান- ইত্যাদি এসবের পালটা এসব কিছুতে ত্যক্তবিরক্ত এসব তরুণেরা এক ব্যাপক মডার্নাইজেশন বা রুপান্তরের ভেতর দিয়ে পার হয়ে গেছে। যার প্রধান উপায় হিসেবে কাজ করেছে এনজিও তৎপরতা। এরই সবচেয়ে ভাল প্রকাশ হল ব্যাপক  ও একটিভ নারী ভোটার এর ততপরতা। পাকিস্তান রক্ষণশীল সমাজ তা সত্বেও নারীরা সক্রিয়ভাবে সবকিছুতে তাদের উপস্থিতি আজ দেখতে পাওয়া যায়। এই নির্বাচনে শিখ, হিন্দু, খ্রীশ্চান ও নারী এমনকি ট্রান্সজেন্ডারেরা প্রার্থী হয়েছে। কয়েকজন সম্ভবত নির্বাচিতও হয়েছেন। এর পিছনে মূল যে বাস্তবতা কাজ করেছে তা হল, নারীরা বাইরে বের না হওয়ার মানে কঠিন কষ্টকর জীবন সংগ্রামে পরিবারের আয়ের তাবত দায় কেবল পুরুষ সদস্যদের নিতে হবে। স্বভাবতই তা পরিমাণেও কম হবে। অনটন বাড়বে। ফলে এই কঠিন বাস্তবতার ফলাফল হল নারীদেরকে বাইরে দেখতে পাওয়া। সমাজে তা গ্রহণযোগ্যও করে নেয়া হয়েছে, হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি আমরা আফগানিস্থানের সাথে তুলনা করলে দেখি সেখানে নারীরা পুরুষ অভিভাবক ছাড়া (তা আটবছরের বালক হলেও) এখনও বাইরে বের হতেই পারেন না। এসব কিছু মিলিয়ে এক পরিবর্তন – পরিবর্তিত পাকিস্তান – এরই প্রতীক ইমরান।

এরা নিঃসন্দেহে একেবারেই নতুন প্রজন্ম, নতুন তাদের অভিজ্ঞতা। তাদের তৎপরতার প্রথম ফলাফল দেখার সময় সম্ভবত এই নির্বাচন।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে পিটিআই সবার চেয়ে এগিয়ে। এর পেছনের একটা বড় কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী নওয়াজ শরিফ পরিবারসহ তার অর্থ পাচারের দুর্নীতির মামলার রাজনৈতিক তৎপরতা করার অযোগ্য ঘোষিত হয়ে যাওয়া, এর নৈতিক প্রভাব। মনে হচ্ছে পিটিআই অথবা তাদের নেতৃত্বের এক জোট, সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। রিগিংয়ের অভিযোগ আছে। বিদেশি অবজারভাররা নির্বাচন ভাল হয় নাই বলেছে কারণ নির্বাচনের আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছিল না তারা বলছে। তবু সব কিছু যতটা সম্ভব আমল করে, প্রতিকার করে কাটিয়ে ইমরান খান সরকার গড়তে যাচ্ছেন – এটাই  ডমিনেটিং পাবলিক মনোভাব ও আকাঙ্খা। এই তথ্য আলজাজিরার পাকিস্থানের স্থায়ী সংবাদদাতা কামাল হায়দারের বরাতে বলছি।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) পাকিস্তানে আরব বসন্তের নতুন মডেল”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

গৌতম দাস

২২ জুলাই ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2sO

Indo-Nepal relations,India's neighbours,Foreign policyPrime Minister Narendra Modi with his Nepali counterpart KP Sharma Oli during delegation level talks in Kathmandu earlier this year(PTI)

তার নাম ব্রক্ষ্ম চেলানি (Brahma Chellaney)। রাষ্ট্র পরিচালনের মূলত নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা তার পেশা। আর গুছিয়ে বললে, তিনি স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক, বিশেষত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে তার বিশেষজ্ঞ খ্যাতি আছে বলে তিনি দাবি করেন। নয়াদিল্লির “সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ” নামে এক থিঙ্কট্যাঙ্ক পরিচালন করেন তিনি। পশ্চিমের বড় ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর সাথে তার যোগাযোগ সম্পর্কের কথাও তিনি আমাদের জানিয়ে থাকেন। স্বভাবতই তাকে প্রো-আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের একজন একাডেমিক বলা যায়। যদিও আবার, এক কথায় তার মূল পরিচয় হবে সম্ভবত তিনি এক পাঁড় জাতিবাদী ভারতীয়। তিনি ততটাই পাঁড় যতটা একজন একাডেমিকের জন্য বিপজ্জনক; ফলে যে সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া অনুচিত; তবু ততটাই তিনি জাতিবাদী। একাডেমিকেরও চিন্তার সততার কিছু দায় থাকে। ইমোশনের আড়াল নিয়ে তিনি নিজেকে বেচে দিতে পারেন না বা উগ্র জাতিবাদী হয়ে যেতে পারেন না। তবে একাদেমিকের অবশ্যই সুনির্দিষ্ট চিন্তাগত অবস্থান থাকবে, তা কারও সাথে মিলুক আর নাই মিলুক, তিনি নিজের কথাই বলে যাবেন। আইডিয়ালি এমনই হওয়ার কথা। যেমন এমনই এক সুনাম বা ক্রেডেন্সিয়ালের একাডেমিক তিনি! তিনি মনে করেন, নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দেওয়ার আন্দোলনে সাথ দিয়ে ভারত ভুল করেছে! আজিব ব্যাপারটা হল, এখন আপসোস করে  তিনি কী করে একালে এসে কোনো রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি দিতে পারেন? অথচ তিনি তাই করেছেন!

তার সাম্প্রতিক লেখা এক কলাম, যা গত ৬ জুলাই ভারতীয় দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমসে ছাপা হয়েছে। সেখানে তিনি নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিতে ভারতের অংশগ্রহণ ও ভুমিকা থাকায় এখন আপসোস করেছেন। ঐ লেখার শিরোনাম হল, “India’s mistakes have allowed China to make inroads into Nepal”। তিনি এখন দাবি করছেন, ভারতের ঐ ভুমিকা আসলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে।

কেন এই সময়ে তিনি এটা লিখলেন স্বভাবতই সে আপসোসের পটভূমি আছে। তা হল সবাই জানে, ল্যান্ডলক্ড নেপালের সমুদ্রপথে বের হওয়ার কোন যোগ-সুযোগ না ছিল না। আর এই ভৌগোলিক আবদ্ধতার ফলে নেপালের যে অর্থনৈতিক অসুবিধা – সেটাকেই ভারত নিজের সুবিধা হিসেবে এতদিন পুরোপুরি উসুলি নিয়ে গেছে। নেহরুর ভারত ১৯৫০ সাল থেকে নেপালকে এক দাসত্ব চুক্তিতে বেঁধে রেখে একে নিজের পক্ষের সুবিধা হাসিল করে গেছে। এতদিন ভারতের ভেতর দিয়ে ছাড়া নেপালের পক্ষে কোন সমুদ্রের নাগাল পাওয়া তো নয়ই এমনকি সড়ক পথেও বাইরে কোনো দেশে  যাওয়া সম্ভব ছিল না। আর একচেটিয়াভাবে এর ফায়দা তুলে গিয়েছে ভারত-রাষ্ট্র ও এর ব্যবসায়ীরা। ব্যাপারটা ছিল অনেকটা, নেপালে ব্যবসায়ের সুযোগ মানেই তা ভারতের সুযোগ। আর ওদিকে যেটা ভারতে তাদের যে সুযোগ তা তো কেবল ভারতীয়দের জন্য আছেই – এই নীতিতে। যেমন, এখনো ভারতের অনুমতি ছাড়া নেপাল বিদ্যুৎসহ তার কোনো উৎপন্ন পণ্য তৃতীয় দেশে (যেমন বাংলাদেশে) বিক্রি করতে পারে না। আর ভারত তাতে অনুমতি দেয় সাধারণত তা কেবল ভারতীয়দেরই বিনিয়োগ ও ব্যবসা হলে পরেই। অথচ বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া ভারতের ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিটকে দেখেন, এখানে ভারত তার কেন্দ্র দিল্লি অথবা কলকাতাসহ যেকোন প্রদেশ থেকে কোন কোন পণ্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারত ট্রানজিট হিসেবে উত্তর-পূর্ব ভারতে নিতে পারবে অথবা কোনটা পারবে না তা নিয়ে ভারত আমাদের থেকে কোনো অনুমতিই নেয় নাই। এসবের বালাই-ই নাই।

এবার ভারতের কাছে নেপালের সেই অসহায়, একক সমর্পণের দিন সম্ভবত শেষ হয়ে যাচ্ছে। নেপাল এখন ভারত ছাড়াও আর একটা বিকল্প হিসেবে চীনকে পেতে যাচ্ছে। চীন নেপালকে নিজের ভূমি ব্যবহার করে এবং চীনের বন্দর বা সমুদ্রপথ ব্যবহারের অনুমতি বা ট্রানজিট দিতে সম্মত হয়েছে। এখন এর বিস্তারিত চুক্তি ও প্রটোকল প্রস্তুতের কাজ চলছে, কয়েক মাসের মধ্যে এই ‘ট্রানজিট চুক্তি’ চূড়ান্ত হবে।

ওদিকে, চীন সংলগ্ন নেপাল, অর্থাৎ নেপালের সারা উত্তরের সীমান্ত হল ওপাশে চীনের তিব্বত; এর উঁচু ও শক্ত প্লাটো, পুরাটাই পাহাড়ি উপত্যকা অঞ্চল। রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে সরাসরি পণ্যবাহী লং কনটেইনার ট্রেনে চীনের কোনো সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত নেপাল ট্রেন ট্রানজিট পেতে এখন তিব্বত-কাঠমান্ডু এই শেষের কয়েক শত কিলোমিটার রেললাইন পাতা হচ্ছে, যা বাকি আছে। এক কথায় বললে নেপালের বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর একক নির্ভরশীলতার দিন এবার চিরতরে শেষ হতে চলেছে। এবার ১৯৫০ সালের দাসত্বের নিগড় চুক্তি থেকে বের হওয়ার বাস্তব শর্ত পূরণ হতে চলেছে, তা এখন কাঠমান্ডুর নাগালে আসতে চলেছে।
নেপাল ভারতের হাত ছুটে যাচ্ছে, আর এটাই মূলত ব্রক্ষ্ম চেলানির মতো অধ্যাপককে অস্থির ও চঞ্চল করে তুলেছে। তিনি দিকবিদিক ভুলে বলে বসেছেন নেপালের রাজতন্ত্র অর্থাৎ আগেকার ‘হিন্দু রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে নেপালের থেকে যাওয়া সেটা হলে সেটাই নাকি ভালো ছিল। সোজা বললে, হিন্দু-রাজতন্ত্র উতখাত করে, নেপালের নতুন করে প্রজাতান্ত্রিক নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র, ফেডারেল নেপাল- এই রাষ্ট্র হওয়া, এটা খুবই খারাপ কাজ হয়েছে বলে চেলানি আমাদের জানাচ্ছেন। তামশাটা হল, একালের নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা একজন থিঙ্কট্যাঙ্ক একাডেমিক এমন কথা বলছে! কেন? কারণ সেটাই নাকি “ভারতীয় জাতিবাদী” স্বার্থ।

তিনি যদি ‘একাদেমিক’ হিসাবে একালে নিজের পরিচয় বজায় রাখতে চান তবে তাকে কোন স্বঘোষিত রাজা নয়, গণমানুষের ক্ষমতার রাষ্ট্রের পক্ষে দাড়াতে হবে। ‘মানুষ কেবল নিজেই নিজের শাসক হতে পারে’ কোন স্বৈরাচার বা কোন রাজতন্ত্র নয় – চিন্তার এমন মৌলিক মুল্যবোধ ও নীতি অনুসরণ করে – একটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের পক্ষেই তাকে দাড়াতে হবে। অথচ তিনি এখানেই তাঁর একাদেমিক দায় ভুলে একে ছাপিয়ে উতখাত হয়ে যাওয়া রাজতন্ত্রের ভিতর ভারতের জাতিবাদী স্বার্থ খুজতেছেন!

শুধু তাই নয়, তিনি এখনকার নেপালের প্রধান দোষ হিসেবে মনে করেন, এই রাজতন্ত্র উতখাতের আন্দোলনের এবং এখনকার ক্ষমতাসীন নেতারা হলেন কমিউনিস্ট। নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কে পি অলি, তার দলসহ প্রধান দুই বড় দল যারা দুটোই হচ্ছে কমিউনিস্ট। প্রধানমন্ত্রী অলি ছাড়া তার অপর দলটা আবার মাওবাদী কমিউনিস্ট, পুষ্পকমল দাহালের মাওবাদী সেন্টার দল। এছাড়া এই দুই দল আবার এক দল হতে, এক ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। আর সবার উপরে ভারতের চক্ষুশূল আর এক ঘটনা আছে। তা হল, এই কমিউনিস্ট দুই দল ও অন্যান্য আঞ্চলিক মাধেসি দলসহ মিলিয়ে তাদের এক জোট – এখন ক্ষমতাসীন সরকার, যারা এখনই নেপালের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন তাদের দখলে আছে। আর ওদিকে মোট সাত প্রদেশে বিভক্ত নেপালের ছয়টাতেই প্রাদেশিক সরকারও তাদের এই জোটের। ফলে স্বভাবতই নেপালের এই কমিউনিস্টরা চেলানির খুবই খুবই অপছন্দের। তিনি অভিযোগ তুলে বলছেন, নেপাল রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কমিউনিস্টদের হাতে পড়ে টিকবে কি না, এটা অনিশ্চিত। তিনি বিরাট নেপাল-দরদি হয়ে বলছেন, চারিদিকে এত কমিউনিস্ট এটাই নাকি “কালো অশুভ ছায়া” ফেলেছে।  “casts an ominous shadow over Nepal’s sputtering democratic transition.”।

তাঁর আরো আপত্তি হল গুরুত্বপুর্ণ সরকারি পোস্টের অনেকেই কমিউনিস্ট।  [From constitutional functionaries, such as the president and vice president, to key officials, including the chief of police services, are today card-carrying communists.]। আসলে তাঁর এই বক্তব্যগুলোওই খুবই ‘কালো’ এবং ভারতের “অশুভ ছায়াময়”।

অপছন্দ আর বিদ্বেষ দুটা পরিস্কার আলাদা জিনিষ। আপনি একটা চিন্তা – কমিউনিস্ট অথবা  ইসলামি – চিন্তাকে অবশ্যই অপছন্দ করতে পারেন। ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করতে পারেন না। এই পরেরটার পুরাপুরি দায় একান্তই আপনার। এমনকি ‘ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ’ করা, এটা অপরাধের সীমায় নিয়ে ফেলে আপনাকে।

তিনি মনে করছেন, “এটা স্পষ্ট, ভারতের নিরাপত্তার জন্য নেপাল হুমকি হয়ে উঠেছে”।  কেন এমন মনে হচ্ছে তাঁর? কারণ “কমিউনিস্টদের হাতে গণতন্ত্র টিকে কি না” তিনি  এটা অনিশ্চিত। বাহারে গণতন্ত্রী! [Whether democracy will survive under communist rule is uncertain. What is clear is that Nepal is impinging on Indian security.] আর এটাই নাকি ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য হুমকি!

তার মানে রাজতন্ত্রী-নেপাল রাষ্ট্র যখন ছিল তখন ভারতীয় চেলানি ভারতের জন্য এটাকে নিরাপত্তার হুমকি মনে করেন নাই। এখন কমিউনিস্টরা নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করেছে এবং ক্ষমতায় আছে বলে তিনি হুমকি দেখছেন। বাহ রে বা! চেলানির কথার ধরনের ব্যাপারটা অনেকটা নেকড়ে-ভেড়ার গল্পের মতো যে, ভাটিতে থেকে তুই না হলে তোর দাদা উজানে আমার পানি ঘোলা করেছিস। অতএব আমি এখন তোর ঘাড় মটকাব…।

চেলানিকে আসলে এখানে চ্যালেঞ্জ জানানো যায়। রাষ্ট্র গঠন বৈশিষ্ট ও নীতি হিসাবে একটা রাষ্ট্রকে কিভাবে বিচার করব – এর মাপকাঠি কী? এই আলোকে চেলানির চিন্তায় ঘাটতি আছে তা বলা যায়। হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রাষ্ট্র রিপাবলিক বৈশিষ্ট এনেছে, নিজেকে সাজিয়েছে। অন্যদিকে বিপরীতে, ভারত-রাষ্ট্র যে জন্ম-খুত নিয়ে সাতচল্লিশে জন্ম নিয়েছে আর এখনো প্রধান কারণ হিসাবে যা তাকে দগ্ধাচ্ছে তা হল, এর ফেডারল বৈশিষ্ট নাই বা অসম্পুর্ণ। বরং নেহেরু  এন্ড গংয়েরা সেকালে জোর দিয়েছিল, ভারতকে এক রাখবে কী করে সেটাকে সমস্যা হিসাবে দেখে। কতগুলো ফেডারল প্রদেশের ভারত রাষ্ট্র নয় বরং কী করে জবরদস্তি জোর খাটিয়ে ভারতের প্রদেশগুলোকে এক করে রাখা যায়; এই “জবরদস্তির ভারত” এটাই তাদের চোখে একমাত্র সমাধান মনে হয়েছিল। এখনও ভারতের কোন একাদেমিক ভারতের জন্য এক ফেডারল রাষ্ট্র ধারণা কেন গুরুত্বপুর্ণ তা নিয়ে একাদেমিক আলোচনা করেছেন তা দেখা যায় নাই। আবার রাজনীতিকেরা, নেহেরুর জমানা থেকেই ভারতের রাজনীতিকরা ফেডারল অর্থে রাষ্ট্র ধারণা বুঝেছেন (যেমন  আমেরিকার ফেডারল বৈশিষ্ট) এমনটা জানা যায় না। রাষ্ট্র কী করে এক জায়গায় সবাইকে ধরে রাখে, কোন জবরদস্তি ছাড়াই  রাখা যায় ও সম্ভব – এই প্রশ্নে তারা সবসময় একটা ‘আঠা’ বা গ্লু (glue) খুজে ফিরেছেন। আর সেই গ্লু হিসাবে পেয়েছে হিন্দুত্ব। চিন্তার এই মারাত্মক গলদ ও ঘাটতির কারণে ‘হিন্দুত্ব’  – একেই উপযুক্ত গ্লু মনে করে ভারতের সকল রাজনীতিবিদ। হিন্দুত্ব ছাড়া ভারত অচল, “এক ভারত” হয়ে ভারতকে ধরে রাখার বেকুবি মহামন্ত্র। এটা বিজেপি বলে প্রকাশ্যে আর অন্যেরা মন বাসনায় ও কাজে বলে থাকে; এই প্রশ্নে কংগ্রেস বিজেপি-কমিউনিস্টসহ সকলে এখানে এক।  নিশ্চিত করে বলা যায়, নেপালের ফেডারল বৈশিষ্ট ও হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রিপাবলিক বৈশিষ্ট – অন্তত এই দুই প্রশ্ন বর্তমান নেপাল ভারত-রাষ্ট্রের চেয়ে শতগুণে উন্নত, চিন্তায় পোক্ত। রাজতান্ত্রিক নেপাল-ই যার কাছে আপন সেই চেলানি আসলে কোন রাষ্ট্র-বৈশিষ্ট বিচার করার অযোগ্য – “রাজতান্ত্রিক নেপাল” কামনা করে এই প্রমাণ উনি নিজেই আমাদের জানিয়েছেন। আমাদের কিছু বলার নাই!

সামনে আরো যাওয়ার আগেই বলে নেয়া যায়, চেলানির লেখার মধ্যেই বিরাট বিরাট স্ববিরোধীতায় ভরা। যেমন, একদিকে তিনি বলছেন, নেপালের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্টরা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আবার লেখার মধ্যে তিনি নিজেই লিখছেন, ভারতের জন্য যে চ্যালেঞ্জ নেপাল তৈরি করেছে সেটা আসলে ভারতেরই নিজ-সৃষ্ট। [Simply put, Nepal represents a critical challenge for India. But, to a significant extent, this is a self-created problem. ]। তাহলে কী দাঁড়াল? ঘটনা যদি ভারতেরই সেলফ ক্রিয়েটেড বা নিজ সৃষ্ট হয়ে থাকে, চেলানি তাই মনে করে থাকেন; আর ঘটনার বড় প্রভাবক যদি ভারত নিজেই হয়ে থাকে তবে আবার সেটার জন্য নেপালকে দায়ী করার সুযোগ কই? ব্রহ্ম চেলানির এই বক্তব্যই তো স্ববিরোধী। এ ছাড়া তিনি ওই রচনার শিরোনাম দিয়েছেন এভাবে; লিখছেন, “ভারতের ভুলের কারণে তা চীনকে নেপালে জায়গা করে নিতে সুযোগ করে দিয়েছে”।

অর্থাৎ নিজেই যেচে ভারতের দায় স্বীকার করে নিচ্ছেন। ভারতের শাসকদের দায়ী করছেন। এরপর তিনি নিজেই পরের বাক্যে এবার এক তালিকা দিয়ে বলছেন, ভারতের তিনটা ভুল কী কী? বলছেন, ‘ভারতের তিনটা ব্লান্ডারের প্রথমটা হল, নেপালি রাজতন্ত্র অবসানের ক্ষেত্রে ভারতের মূল চালিকাশক্তি হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়টা হল, দাহালের দল মাওবাদীরা ছিল আন্ডারগ্রাউন্ড গোপন সশস্ত্র দল। ভারত তাদের নেপালের রাজনীতিতে মধ্যমণি হতে দিয়েছে। আর তৃতীয়টা হল, নেপালের সমতলে বাস করা মাধেসি জনগোষ্ঠীকে ভারত উস্কানি দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে হাত ছেড়ে দিয়েছে।

[Three Indian blunders since the mid-2000s have proved very costly for India — spearheading the abolition of Nepal’s constitutional monarchy; bringing the underground Maoists to the centre-stage of Nepali politics; and, more recently, aiding the plains people’s revolt against the new, 2015-drafted Nepali Constitution and then abandoning their movement and pressuring them (Madhesis) to participate in the 2017 elections, thus legitimising a Constitution it said was flawed.]

তৃতীয় ব্লান্ডারের বিস্তারিত দিকটা হল, গত ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালের নতুন কনস্টিটিউশন প্রক্লেমেশন বা ঘোষণা করে দেয়ার পরে ভারত প্রকাশ্যে এর বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা জানায়। তারা মাধেসিদেরকে বিদ্রোহী হয়ে ‘মানি না বলে’ উঠতে উসকানি দিয়েছিল। এটা চেলানিও স্বীকার করেই কথা বলছেন। নেপালে রান্নার জ্বালানিসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্য সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর তারা শতভাগ নির্ভরশীল। আর এই উস্কানির অর্থ ছিল,  সেই ভারত থেকে নেপালে সব পণ্য আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করেছিল ভারত, অজুহাত দিয়েছিল যে এটা মাধেসিদের বাধা। যা বাস্তবে ছিল নেপালে ভারতেরই পণ্য-অবরোধ। কিন্তু এতে নেপালের গরিব-ধনী নির্বিশেষে সকলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সব জনগোষ্ঠী চরমভাবে ভারতবিরোধী হয়ে যায়। সমতলের বাসিন্দা মাধেসিদেরকেও তারা ভারতের হাতের পুতুল হয়ে পড়ার জন্য দায়ী করে। প্রায় পাঁচ মাস পর এই পণ্য অবরোধ চরমে ওঠে। আর ফলাফল পরিস্থিতি চরমভাবে উলটো ভারতবিরোধী দিকে চলে যাওয়াতে, ভারত এবার সব দায় মাধেসিদের ওপর চাপিয়ে তাদের পরিত্যাগ করে। ফলে পরবর্তিতে, ২০১৭ সালের নির্বাচনে মাধেসিরা ভারতের সংশ্লিষ্টতা পুরো ত্যাগ করে মূল ধারার রাজনীতির মধ্যে ফিরে যায়। তারা, মূল ধারার রাজনীতিকদের সাথে একসাথে মিলে বিরোধ মিটিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। শুধু তাই নয়, মাধেসিদের মূল বিরোধ বিতর্ক ছিল, মাধেসিদের প্রদেশ একটি নয় দুটি নিয়ে হতে হবে, আর এর সীমানাইবা কী হবে আর প্রদেশের ক্ষমতা কী হবে এসব ছিল বিতর্কের ইস্যু। এ প্রসঙ্গে সমস্ত বিরোধ তারা আপস মীমাংসায় মিটিয়ে ফেলে। এব্যাপারে সব ভুলে সবচেয়ে বড় হাত বাড়ানো ভূমিকা পালন করে কমিউনিস্ট দাহাল। ফলে আপসে বিরোধগুলোর মীমাংসা এরপর কনস্টিটিউশনে সংশোধনী লিখে পাস করে নেয় সবাই। আর সবশেষে এখন মাধেসিরা ক্ষমতাসীন সরকারের জোটের অংশ হয়ে আছে। মাধেসিদের উসকানি দিয়ে অবরোধের রাস্তায় নামিয়ে পরে তাদের হাত ছেড়ে পরিত্যাগ করা- ব্রহ্ম চেলানি নিজে এটাকেই ভারতের তৃতীয় ভুল বলছেন!

তাহলে ঘটনা হল, ভারতের সব অপরাধই চেলানি নিজেই তালিকা দিয়ে স্বীকার করে নিচ্ছেন। অথচ নেপালের কমিউনিস্টদের দায় দিচ্ছেন, অনাস্থা রাখছেন। আসলে এখানে ঘটনাটা হল, শকুনের বদদোয়ায় গ্রামের গরুগুলো কখনোই মারা যায় না। আর শকুন অভুক্ত শকুন হয়ে থাকলে তাই হয়ে থেকে যায়।

ভারতের পাপ বা অপরাধ এতই বিশাল ও দৃশ্যমান যে চেলানি তা লুকানোর চেষ্টা না করে বলছেন, ‘ভারতের উচিত অতীতে নেপালের জনগণের জন্য কষ্টদায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য নেপালের জনগণের কাছে ভারতের উচিত হবে ক্ষমা চাওয়া। পরিস্থিতিটা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে, আর এরই সুযোগ নিয়েছে চীন।’

[New Delhi indeed owes an apology to Nepal’s citizens for its past meddling, which, as if to underscore the law of unintended consequences, boomeranged on India’s own interests. India’s mistakes set in motion developments that seriously eroded its clout in Nepal and helped China to make major inroads.]

এই পুরো বিপর্যয় ঘটানোর জন্য তৎকালীন কংগ্রেসের মনমোহন সরকারকে চেলানি দায়ী করেন। কিন্তু এবার কথার ফাঁক সৃষ্টি করতে শুরু করেন তিনি। বলেন, “২৩৯ বছরের নেপালি রাজতন্ত্র ছিল নেপালের স্থিতিশীলতার প্রতীক। ভারত সরকার নেপালের রাজতন্ত্রকে উৎখাত করেছে আর মাওবাদীদের ক্ষমতার কেন্দ্রে এনেছে”। আসলে কী বলা যায় চেলানির রাজতন্ত্র প্রীতি দেখে – নেপালের প্রাক্তন রাজারাও লজ্জা পাবে। আসলে ব্যাপারটা হলো, রাজতন্ত্রের আমলে নেপালে ভারতের স্বার্থ যেভাবে রক্ষিত হচ্ছিল এখন আর তা রক্ষিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু সে জন্য ভারতের কোনো একাডেমিক কি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন? অথবা এর দরকারই বা কী? অথচ চেলানি সেটাই করছেন!

ভারতের নিজের স্বার্থ দেখবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা কী করে? সেটা একটা বিষয় অবশ্যই। কিন্তু সে জন্য কোনো একাদেমিক রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে যাবেন কেন? অর্থাৎ চিন্তার সততা নয়, চরম উগ্র জাতিবাদী এক ভারতীয়ই থাকতে চাইলেন ব্রহ্ম চেলানি বেছে নিলেন!

একালে যেটা চেলানির মতো একাডেমিকদের প্রো-আমেরিকান ভারতীয় ধারা, এই ধারার জন্ম ও শুরু করে দিয়ে গেছিলেন সাতচল্লিশের প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তার দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল এটা। যেমন, সাধারণভাবে নেহরু কলোনি শাসনকে খারাপ মনে করতেন না। ভারতের ওপর ব্রিটিশ কলোনির যে শাসনটা চড়ে ছিল সেটা মৌলিক স্বভাব বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে খারাপ ছিল না। এই ছিল তার অভিমত। তবে তা ভারতের ওপর চড়ে ছিল বলে একে খারাপ ভাবতেন তিনি। অর্থাৎ ব্রিটিশের ভারত ত্যাগে, ভারতের কলোনি মুক্তির পরে এবার ভারতই যদি নেপালকে কলোনি করার সুযোগ পায় তবে সেই সুযোগ নেয়ার চেষ্টাই ভারতের করা উচিত – এই ছিল নেহরুর কলোনি শাসন কী জিনিস সে সম্পর্কে বুঝ ও মনোভাব। তা বুঝার জন্য সবচেয়ে বড় তাতপর্যপুর্ণ হল ১৯৫০ সালের নেপাল চুক্তি। আর তাই নেপালের সাথে ভারতের তথাকথিত ঐ বন্ধুত্ব চুক্তি করে নেপালকে দাসত্বে বেঁধে ফেলা জায়েজ মনে করেই নেহরু ওই চুক্তি করেছিলেন। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে দুনিয়ায় নতুন যে পরিবর্তন এসেছিল : ১. দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন উঠে যাওয়া এবং তা অন্যায্য মনে করার প্রতিশ্রুতি দুনিয়া পেয়ে যায়। ২. দুনিয়া কলোনি ইউরোপের শাসকদের নেতৃত্বের কবজা থেকে মুক্ত হয়ে এবার আমেরিকান নেতৃত্বে নতুন এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও নিয়মে সাজানো হয়ে যায়।

এসব মৌলিক পরিবর্তনের তাৎপর্য ও গাঁথা নেহরুর চোখ-কান-মগজে ঢুকে ছিল এমন প্রমাণ দেখা যায় না, বরং তার কাজ দেখে বলা যায়, কোনো প্রভাবই পড়েনি। নেপালের সাথে নেহরুর করা ১৯৫০ সালের কলোনি চুক্তি এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ। নেহরু ধরে নিয়েছিলেন কলোনি শাসন ব্যাপারটা চিরন্তন। ওটাই দুনিয়ার নিয়ম। দুনিয়া ভাগ্য চিরকাল কলোনি শাসন দিয়েই লেখা হবে। তাই কথিত ‘সমাজতন্ত্রী নেহরু’ অবলীলায় পুরানা বৃটিশ-নেপাল চুক্তিতে (১৯২৩) ব্রিটিশের জায়গায় নেহরুর ভারতকে আসীন করে নেন। আর এভাবে নেপালে নেহরু-ভারতের কলোনি শাসন কায়েম করে নেন।
আর আজকের ব্রহ্ম চেলানি ওই নেহরু-ভারতের কলোনি শাসনই ফেরত দেখতে চাচ্ছেন। কারণ কলোনি হয়ে থাকা নেপালি অংশের অপর নাম হল নেপালি রাজতন্ত্র। চেলানি নেপালি রাজতন্ত্র এর পক্ষে সাফাই দিয়ে একালে বলছেন সেটাই নাকি ভারতের জন্য ভালো ছিল। নেপালে ভারতের স্বার্থ একমাত্র রাজতন্ত্রী নেপাল হলেই আদায় হবে – এই চিন্তাটাই একটা অযোগ্য, দেউলিয়া চিন্তা।

না ভুল বোঝা যাবে না। এখানে, ভারতের কোনো স্বার্থ থাকতে পারবে না বা ভারতকে স্বার্থ-ভোলা অবস্থান নিতে হবে- এমন কোনো সুপারিশ করা হচ্ছে না। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ঠিক যেমন বিশ্বযুদ্ধের কালে সারা দুনিয়াকে ইউরোপের কলোনি শাসনের অধীনে রাখার বিরুদ্ধে ১৯৪০-এর দশকের আগে থেকেই আমেরিকা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট  বাধ্য করেছিলেন কলোনি শাসন ত্যাগ করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে। এবং তিনি তা আদায় করেছিলেন। কিন্তু তার মানে কী আমেরিকা নিঃস্বার্থ বা আত্মভোলা ছিল? মোটেও না। কলোনি শাসনের বদলে আমেরিকা নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিল এবং তা করেছিল। যেটা কলোনি শাসনের চেয়ে তুলনায় ঢের গুণে অগ্রসর সেই ব্যবস্থা – নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে এর মাধ্যমে দুনিয়ার নেতা হয়ে আমেরিকা নিজের স্বার্থ হাসিল করেছিল। আমেরিকার কায়েম করা সেই  ব্যবস্হাটারই শেষ দিনগুলোতে আমরা এখন আছি।তুলনায় এটা অবশ্যই বৃটিশ কলোনি শাসনের চেয়ে অনেক ভাল এবং তুলনায় মুক্ত।

আবার এই বিচারে বলা যায়, আগামীতে আমেরিকার বদলে দুনিয়া চীনের অর্থনৈতিক নেতৃত্বে চলে গেলে সেটাও এখনকার আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়ার চেয়ে তুলনামূলকভাবে অগ্রসর দুনিয়াই হবে।

বিশ্বযুদ্ধের শেষে সেকালের দুনিয়ার গতি-প্রকৃতি যেমন নেহরুর চোখে ধরা পড়েনি, পুরনো কলোনি শাসনই তিনি অনুকরণীয় ভেবেছিলেন, আজো তেমনি ব্রহ্ম চেলানির চোখেও আমেরিকার নেতৃত্বটাই ভালো বোধ হচ্ছে অথচ সেটা তো এখন বিগতযৌবনা। অপসৃয়মান সেটা, ফলে চাইলেও এর সমাপ্তি চেলানি ঠেকাতে পারবেন না, ঠেকানো যাবে না।

ব্রহ্ম চেলানির চোখে ধরাই পড়ছে না যে চীন যেখানে নেপালকে শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে ট্রানজিট দিতে রাজি হয়ে যাচ্ছে সেই মুরোদ গত সত্তর বছরে ভারতের হলো না কেন, ভারত চিন্তাও করতে পারেনি কেন?

কিন্তু সাবধান, এটা নেপালের জন্য চীন এক বড়ই মহান – এমন ঢোল পিটানির কথা মোটেও বলা হচ্ছে না। ব্যাপারটা হল, শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে নেপালকে ট্রানজিট দিলে তাতে চীনেরই লাভ বেশি। এই হলো নতুন বাস্তবতা। আর অবাধ ট্রানজিট দিলে তাতে নেপালে চীনের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য স্বার্থ আরো ভালোভাবে রক্ষিত হয়। ঠিক যেমন দুনিয়ার বিশ্বযুদ্ধের সেকালে কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি কলোনি বানিয়ে না রাখাতেই ছিল আমেরিকার স্বার্থ। বরং তারা কলোনি শাসন মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র কিন্তু আমেরিকান পণ্য বিনিয়োগ খাতক হলেই তাতেই সেকালে আমেরিকার স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষিত হয়েছিল। তাই আমেরিকাই দুনিয়ার নতুন নেতা ছিল।

আর কমিউনিস্টদের সম্পর্কে একটা কথা।  চেলানি হয় জানেন না অথবা স্বীকার করতে চান না যে সেকালে ভারত মাওবাদীদের পক্ষে এবং নেপালি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়েছিল, মূলত আমেরিকার পরামর্শে, ক্রিস্টিনা রাকার নেপাল সফর থেকে যার শুরু। [এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইতে আলোচনা করেছি, সেখানে দেখা যেতে পারে। ] এছাড়া, গত ২০০৫ সালে বুশ প্রশাসনের ‘চীন ঠেকাও’ পলিসির মধ্যে ভারত গোনার ধরার মধ্যে নিজের জায়গা পেয়ে ভারত ভেবেছিল এটাই তার সর্বোচ্চ পাওয়া। সে বুঝতেই পারেনি যে, আমেরিকা একটা ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। যার হাত সে ধরতে যাচ্ছে। আমেরিকা ভারতের কাঁধে চড়ে চীনের আগমন ও উত্থান ঠেকিতে রাখতে এসেছে। সে নিজে জানে এই উত্থান নিশ্চিতভাবে ঠেকানো যাবে না। তাই যতদূর পারা যায় নিজের পতন দীর্ঘায়িত করতে চাচ্ছে সে কেবল।

তাই প্রো-আমেরিকান একাডেমিক মানে ডুবন্ত শক্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে যে কেবল সঙ্কীর্ণভাবেই নিজের স্বার্থ খুঁজতে অভ্যস্ত। আর সেটা যেনবা হিন্দুত্বেরই আর এক নাম।

তাই ব্রহ্ম চেলানি ভারতের শাসকদের দোষারোপ করেন আর নাই করেন;  নেপালি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই দেন বা না দেন – এখনকার বটম লাইনটা হল, নেপাল ভারতের হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। এখন এই নতুন নেপাল, এটা আগের চেয়ে তুলনামূলক মুক্ত এক নেপাল। এ’আর ফিরবে না। বাংলাদেশও এমন প্রথম সুযোগে বের হয়ে যাবেই। আমরা কেউ পিছনে ফিরে যাই না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নেপালে রাজতন্ত্র ভেঙে দেয়া ভারতের ভুল ছিল”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের মিথ্যা সার্ক-দরদি সাজ ধরা খেয়েছে

ভারতের মিথ্যা সার্ক-দরদি সাজ ধরা খেয়েছে

গৌতম দাস

১৬ জুলাই ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2sE

File photo of 1st China-South Asia Cooperation Forum ((CSACF), Fuxian Lake Initiative – ORF

ভারতের অন্যতম বেসরকারি দাতব্য থিংকট্যাংক বা বেসরকারি পলিসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলো ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ বা সংক্ষেপে ওআরএফ (Observer Research Foundation, ORF)। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে অনেকেই থাকেন রিসার্চ ফেলো হিসেবে, যারা সাধারণত হন দীর্ঘ পেশাদার জীবন কাটানো কোনো কূটনীতিক, জার্নালিস্ট বা একাডেমিক ইত্যাদি পেশাজীবী। কিন্তু ওআরএফ রিসার্চ ফেলোদের নিয়ে এক আজব ঝোঁক দেখা যাচ্ছে যে, তারা তাদের সহকর্মী একই বিষয়ের কী নিয়ে কাজ করছে, কোথায় কী বলছে, সেসবের খবর রাখে না। তাই একই প্রতিষ্ঠান ওআরএফের এক সহকর্মী যা বলছেন, অপর সহকর্মী ঠিক এর উল্টো বলছেন।

২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য খারাপ নাম কামিয়ে বাংলাদেশের চোখে পড়ে যাওয়া ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। পরবর্তী সময়ে কূটনীতিক চাকরির জীবন শেষ করে তিনি ২০১৬ সালে ভারতের ওআরএফ নামের থিংকট্যাংকের ফেলো হয়েছিলেন। এমনিতেই ভারতের থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাধারণ ঝোঁক হলো প্রো-আমেরিকান পলিসি অনুসরণ করা অথবা তাদের জন্মই হয় আমেরিকান অর্থে আমেরিকান নীতি-পলিসি প্রচারের জন্য। আরো স্পষ্ট করে বললে, বিপুল উদীয়মান চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ পলিসির পক্ষে প্রচারণা চালাতে ভারতের প্রায় সব থিংকট্যাংকই ভাড়া খাটে। এর মূল কারণ, এদের বেশির ভাগেরই জন্ম এবং প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডিং এ কারণে। তেমনই, প্রো-আমেরিকান পলিসির পক্ষে ভাড়া খাটা, আর আমেরিকান বলে বলীয়ান এক সোচ্চার কণ্ঠস্বর হলেন পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। যদিও কপাল খারাপ, এখন ট্রাম্পের জমানা, আর তাতে এসব ভাড়াটেদের অবশ্য অবস্থা খুবই শোচনীয়। ট্রাম্পের চলতি “বাণিজ্য যুদ্ধের” নীতির ঠেলায় আমেরিকান পলিসির পক্ষে দাঁড়ানো ও ওকালতি তারা করুক এব্যাপারে ট্রাম্পই তেমন আগ্রহী না, গুরুত্ব দেয় না। সময়ে বেইজ্জতি করে দেয়। আর ভারতের বিরুদ্ধেও যে আমেরিকা বাণিজ্য যুদ্ধের ঘোষণা করে দিয়েছে সেই প্রো-আমেরিকান পলিসির পক্ষে ভাড়া খেটে ইজ্জত রক্ষা করা অসম্ভব। অর্থহীন এক দালালিতে পরিণত হয়েছে একাজ।  কিন্তু তা হলেও সেই ২০১৬ সালেও পিনাক রঞ্জনদের ডাটফাট ছিল আলাদা, খুবই আক্রমণাত্মকভাবে আমেরিকান ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে তারা চোটপাট করে যেতেন।

দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র-জোট সার্কের (SAARC) ২০১৬ সালে অক্টোবরের সম্মেলন ভণ্ডুল করে দিতে সক্ষম হয় ভারত। সেবারের সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল পাকিস্তানে। ভারতের প্ররোচনায় বাংলাদেশও পাকিস্তানে ওই সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করার পক্ষে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছিল। প্রথম আলোর ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ রিপোর্ট ছিল, সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যাচ্ছে না বাংলাদেশসহ চার দেশ । সার্ক ভন্ডুল করার ক্ষেত্রে ভারতের সফলতা হিসাবে প্রথম আলো লিখেছিল, সার্কের ভবিষ্যৎ গভীর সংকটে।

ভারতের কূটনৈতিক লবিতে অবজারভার সদস্য আফগানিস্তানসহ চার রাষ্ট্র (বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তান ও ভুটান) পাকিস্তানের সার্কের সম্মেলনে যেতে অপারগতা জানায়। আনন্দবাজার লিখেছিল ভারতের মনের গোপন কথাটা। অক্টোবর ২০১৬ তে লিখেছিল, পাকিস্তানকে এড়িয়ে ‘সার্ক-টু’ করতে চায় নয়াদিল্লিভারতের অমিত বসু কালের কন্ঠে কলাম লিখে ছিলেন, “ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক সুতোয় ঝুলছে। ছিঁড়ে পড়তে পারে যেকোনো সময়। দুই দেশের মৈত্রী উধাও”। শুধু তাই নয়, আবার কবে সার্ক সচল হবে, সেটাও অনিশ্চিত করে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ভারতের উদ্দেশ্য ছিল একটাই- তার জন্মজন্মান্তরের শত্রু পাকিস্তানকে একঘরে করা।

ইতোমধ্যে ১৯৯৭ সালে এক ‘বে অব বেঙ্গল উদ্যোগ’ হিসেবে এবং ‘বিমসটেক’ (BIMSTEC) নামে আর এক রাষ্ট্র জোট গঠন হয়েছিল। যেখানে পাকিস্তান ছাড়া সার্কের বাকি পাঁচ রাষ্ট্র আর সাথে বাড়তি নতুন মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড এ দুই রাষ্ট্র, এভাবে মোট সাত রাষ্ট্র নিয়ে এটা গঠিত ছিল।

ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী সার্কের বিরুদ্ধে ভারতের বিদেশনীতির পক্ষে ২০১৬ সালে প্রচারণার কাজ হাতে নেন। সে সময় তার বক্তব্য ছিল এ রকম- ‘সার্কের দিন শেষ’। ফলে পাকিস্তানও একঘরে হয়ে শেষ। এখন থেকে এর বদলে, এর জায়গায় এখন সবাইকে ‘বিমসটেক’ নিয়ে ভাবতে হবে। গত ৪ অক্টোবর ২০১৬ যুগান্তর লিখেছিল,  এখন সার্কের কথা ভুলে যান। বিমসটেকের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে আমি বাংলাদেশকে আহ্বান জানাই।’

আসলে ব্যাপারটা হয়েছিল এমন যে, এ ঘটনার প্রায় একই কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশের কিছু প্রো-গভর্নমেন্ট সাংবাদিক ভারত সফরে গিয়েছিলেন। তাদের সফরসূচির অংশ হিসেবে তারা ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জনের সাথে দেখা করেছিলেন। দেশে ফিরে ওসব সাংবাদিকরা পিনাক রঞ্জনের বরাতে বিরাট নিউজ করেছিলেন, ‘সার্ক ভুলে বিমসটেকে নজর দিন’। উপরে যুগান্তরের রিপোর্টের ঐ সাংবাদিকও ছিলেন ঐ সফরে। এছাড়া, ৪ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে অনলাইন বিডিনিউজ২৪-এর রিপোর্টের শিরোনাম দেখতে পারেন। বিডিনিউজের রিপোর্টারও ছিলেন ঐ ভারত সফরে। আর তাতে মূল খবরটি ছিল এভাবে- ‘সার্ক ভুলে বঙ্গোপসাগর-ভিত্তিক দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের ওপর জোর দিতে বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক এক ভারতীয় কূটনীতিক।’

তাহলে এতক্ষণের সার কথা হল, গত ২০১৬ সালেই সার্কের “কবর দিতে” বা “ভুলিতে দিতে” ভারত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল। এবং এর পালটা হিসাবে ‘বিমসটেক’ (BIMSTEC) কে হাজির করার সিদ্ধান্ত সকলকে প্রকাশ্যেই ভারত জানিয়েছিল।

কিন্তু, আসলে সবই ভাগ্যের পরিহাস। নীতিগত অবস্থান পলিসি দিয়ে নয়, ঈর্ষা আর প্রপাগান্ডা দিয়ে অথবা ভাড়া খেটে থিংকট্যাংকের রিসার্চ ফেলোর কাজ করা যায় না, এটাই প্রমাণিত হলো। সার্ক প্রসঙ্গে ভারতের ঘৃণা ও প্রচারণায় এই ফেলা থুথু এখন সেই ভারতকেই এখন ফিরে চাটতে হইতেছে।

কারণ, বেশি দিন লাগেনি, প্রায় দেড় বছর না যেতেই গত ১০ জুলাই ২০১৮ ওই একই ওআরএফের সাইটে এবার আরেক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে, ‘সার্ক কোমায়, চীন আর এক নতুন আঞ্চলিক জোট হাজির করেছে।’ [SAARC in coma, China throws another challenging regional initiative]। তার মানে এই রিপোর্ট এখানে সেই সার্কের প্রতি ভারত এখন কত সহানুভুতিশীল তাই দেখাতে চাইছে। একেবারে পুরা উল্টা-রথ।

যদিও এবারের রিপোর্টটা আর পিনাক রঞ্জনের করা নয়, করেছেন আরেক রিসার্চ ফেলো ‘এন সত্য মূর্তি’। আর এখানে এবার বিশেষ করে লক্ষণীয় হল, দেড় বছর আগে যে ওআরএফ একই ‘সার্ক’ এবং সাথে পাকিস্তানের ‘ডুবে যাক’ চাচ্ছিল, সবারই ‘ভুলে যাওয়া’ চাচ্ছিল; এবার সেই একই সার্কের পক্ষে ওআরএফের দরদ ও প্রীতি ঝরে পড়তে শুরু করেছে। অর্থাৎ ভারতের এখন বিপরীত মুডে, সার্কের পক্ষে ভারতের প্রীতি এখন উপচানো। সত্যি এ’এক বড়ই আজব ঘটনা! ভারতের এই উল্টো যাত্রা কেন? ঘটনা কী?

ঘটনা হল, গত মাসে চীনের গুয়াংজুতে চীনা উদ্যোগে এক আঞ্চলিক জোট গঠনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। জোটের নাম চীন-দক্ষিণ এশিয়া সহযোগিতা ফোরাম, [China-South Asia Cooperation Forum] (CSACF)। নামের মধ্যেই উদ্দেশ্য পরিষ্কার। আগের সার্ক আর সাথে উদ্যোক্তা চীন। দক্ষিণ এশিয়া রাষ্ট্র জোটের সাথে চীনের সহযোগিতার নতুন প্ল্যাটফর্ম এটা। অর্থাৎ এটা মূলত (সেই ভারত-পাকিস্তানসহ) সার্ক প্লাস চীনের জোট।

এখন তাহলে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন বা সংক্ষেপে ওআরএফের আগে কি আগে স্বীকার ও ব্যাখ্যা দেয়া উচিত ছিল না যে, ২০১৬ সালে ‘সার্ককে ডুবিয়ে দেয়ার পক্ষে’ ভারতের যে বিদেশনীতি ছিল আর যেটা ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জন প্রশংসা ও সমর্থন করেছিলেন, সেটা থেকে এখনকার ওআরএফ সরে এসেছে? এবং কেন এই সরে আসা, সে ব্যাখ্যাই বা কী? নাকি ওআরএফ এর আরেক রিসার্চ ফেলো ‘এন সত্য মূর্তি এখনো জানেনই না যে, পিনাক রঞ্জন এবং ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ২০১৬ সালে এমন একটি অবস্থান ছিল?

তবে এটা হওয়াও অসম্ভব নয়, এখন নতুন চীনা উদ্যোগে আগের ‘সার্ক +’ জোট একটা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে দেখে রাতারাতি ভোল বদলে ওআরএফ এখন সার্কের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর অবস্থান নিচ্ছে? অর্থাৎ এই সহানুভূতিও ফাঁপা, ওআরএফের দরকার চীনের বিরুদ্ধে খোঁড়া হলেও একটি যুক্তি (নিজের স্ববিরোধিতা প্রকাশ হয়ে গেলেও তা) হাজির করা। কিন্তু তাতেও, প্রশ্ন আরো আছে।

কারণ, ওআরএফ এবার নিজেই জানাচ্ছে, চীনে এই সম্মেলনের খবর ভারতে খুব বেশি প্রচারিত হয়নি। (এমনকি বাংলাদেশের কোনো মিডিয়ায় এসেছে চোখে পড়েনি, অথচ বাংলাদেশের প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিল।) কিন্তু ভারতে প্রচার হয়নি কেন?

এছাড়া, আরো বেশ কিছু সিরিয়াস ‘কেন’ প্রশ্ন আছে?
কারণ, ওআরএফ ছদ্ম সার্ক-দরদি সেজে এক খোঁচামারা মন্তব্য করে বলেছে, “চীনা উদ্যোগের এই CSACF ফোরাম কি আসলে চীনের বেল্ট রোডেরই এক সহযোগী উদ্যোগ, যার ভেতর দিয়ে সার্কের মৃত্যুঘণ্টা বাজবে?” [The parallel, yet unasked question, either at or outside the CSACF venue, was if the new Chinese initiative, alongside the more-visible Belt and Road Initiative (BRI) could ring the death-knell for the South Asian Association for Regional Cooperation (SAARC), where it had failed to go beyond the ‘Observer’ status, to obtain full membership.]

ওআরএফের এ কথা শুনে মনে হচ্ছে, যেন সার্কের মৃত্যু হলে ভারতের জান চলে যাবে। এতই পতিপ্রাণা, অথচ কারপেটের নিচে লুকিয়ে ফেলা কথাটা হল,  ২০১৬ সালে ঘোষণা দিয়ে ভারত আগেই সার্কের মৃত্যু ঘটিয়ে দিয়েছে। আর এখন দরদি সাজছে। কুমিরের চোখে যেন জল।

এ ছাড়া, আরেকটা খোঁচা দিয়ে ওআরএফ বলছে যে, সার্ক থেকে চীনকে কখনোই অবজারভারের বেশি মর্যাদা ভারত দিয়ে দেয়নি। আর যেন তা ভারতের বিরাট সাফল্য ছিল? এতে পরিষ্কার যে, ভারত কখন কী চেয়ে কী করে আর তাতে লক্ষ্যই বা কী- এসবের পেছনে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করার কোনো পরিকল্পনাই থাকে না।

এবারের চীনা উদ্যোগের এই CSACF ফোরামের সভায় খুব ভালোভাবেই ভারতের প্রতিনিধিত্ব ছিল। প্রতিনিধিত্ব করেছেন গুয়াংজুতে ভারতের কনসাল জেনারেল সাইলাস থাংগেল (Sailas Thangal)। ভারতের প্রতিনিধি ওই সভায় এই জোট উদ্যোগকে বহুল প্রশংসা করেছেন, বলেছেন এই উদ্যোগ এ অঞ্চলকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে হাজির করবে। [Praising Beijing’s initiative, Indian Consul General in Guangzhou, Sailas Thangal said the CSACF boasts of the world’s biggest market. But the region also boasts of being home to millions of poor people.] শ্রীলঙ্কার এক অনলাইন পত্রিকা দ্য আইল্যান্ড এই খবর দিয়েছে। এ ছাড়া, চীনের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের এক ডিরেক্টর জেনারেল লি জিমিংয়ের বরাতে আইল্যান্ড লিখেছে, ‘CSACF’ ফোরাম আসলে বেল্ট রোড উদ্যোগেরই অংশ, যেটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে চীনের ভৌগোলিক নৈকট্য ও সাংস্কৃতিক বন্ধন গাঢ় করবে।’ [He declared that the CSACF was a part of the BRI, “which is expected to bring together South Asian countries that share a geographical vicinity and cultural affinity with China” ]

মজার কথা হলো এসব খবর ওআরএফ নিজেই নিজের রিপোর্টে লিখে জানাচ্ছে। তাহলে এর মানে কি এই এক ফাইন মর্নিংয়ে আমরা উল্টো প্রশ্নের সম্মুখীন হব যে, ভারত তখন উল্টো আমাদের জিজ্ঞেস করবে, ভারত কবে চীনা বেল্ট রোড উদ্যোগের বিরোধী ছিল?

এসব কারবার দেখে মনে হয় থিংকট্যাংক, রিসার্চ, পলিসি ইত্যাদি এসব শব্দ এসব ব্যক্তি এখনো গুরুত্বের সাথে নেয়নি। যথার্থ ওজন বুঝে ব্যবহার করে না। আসলে নীতিগত অবস্থান পলিসি দিয়ে নয়, ঈর্ষা আর প্রপাগান্ডা দিয়ে অথবা ভাড়া খেটে থিংকট্যাংকের রিসার্চ ফেলোর কাজ করা যায় না, এটা তাদের বোঝানোর কেউ নেই।

তবে তামাশার কথাটা হল, ভারত চীনা উদ্যোগের এর CSACF সভায় ঠিকই পাকিস্তানের সাথে ও পাশে বসতে পেরেছে। বস্তুত CSACF  ফোরামটা হল আগেরই সার্ক + চীন। তাহলে, সার্ককে চলতেই না দিলেও এবার চীনা দাবড়ে এই ফোরামে ঠিকই পাকিস্তানের পাশে অবলীলায় বসতে পারছে ভারত! আসলে ভারত হল শক্তের ভক্ত, তাই কী?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৪ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের সার্ক দরদের স্বরূপ”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীন কী চায়, চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়

চীন কী চায়, চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়

গৌতম দাস

০৭ জুলাই ২০১৮, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2sw

 

রাষ্ট্রসংঘসহ শীর্ষ চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায় – ছবি : সংগৃহীত বাংলানিউজ থেকে

বাংলাদেশ জুলাই মাসটা শুরু করেছে গ্লোবাল মিডিয়ায় ব্যানার হেডলাইন হয়ে, কারণ রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেলসহ পাঁচ সংগঠনের প্রধান একসাথে একই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে এসেছিলেন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তেনিও গুতেরেস (Antonio Guterres), বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম (Jim Yong Kim) ও আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রেসিডেন্ট পিটার মরা (Peter Maurer) এবং সাথে রাষ্ট্রসঙ্ঘের বৃহত্তর অধীনেই কাজ করা আরো দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর -এর হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি (Filippo Grandi ) ও মিয়ানমারের মানবাধিকার-বিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ের ইয়াংহি লি বাংলাদেশে গত ৩০ জুন তিন দিনের বাংলাদেশ সফরে পৌঁছে গেছিলেন। বলাবাহুল্য হবে না যে রোহিঙ্গা  ইস্যুতে এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থান হল, মূলত তিন বিষয়ে। এক : রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে সাময়িক অবস্থানের সময়ে দেখভালের ন্যূনতম ব্যবস্থার সব বিষয় নিশ্চিত করতে কাজ করা। দুই : রোহিঙ্গাদের মর্যাদা, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আদরের সাথে বার্মায় ফেরত পাঠানোর একটা ব্যবস্থার পক্ষে কাজ করা। আর তিন : যারা রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ও ধর্ষণসহ মানবেতর অবস্থার জন্য দায়ী তাদেরকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনা। সারকথায় এ সফরে তাই মূল উদ্দেশ্য বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের এবং আশ্রয়দাতা দেশ বাংলাদেশকে রাজনৈতিক সমর্থন জানানো, পাশে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা। এছাড়া আশ্রয় দেয়ার অর্থনৈতিক দায় গ্লোবালি শেয়ার করা, তাই বিশ্বব্যাংক নিজেই ৪৮০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনার কথা জানাল। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট তাই বলছেন ইতোমধ্যেই “উদার জনগোষ্ঠি বাংলাদেশিরা” রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে “বিপুল বোঝা নিজের কাধে” নিয়েছে। “তাদেরকে আর শাস্তি না দিয়ে তাদের বোঝা আমাদের শেয়ার করা উচিত”। ইংরাজি দৈনিক ডেইলি স্টার লিখেছে, “Generous humane country like Bangladesh shouldn’t be punished: WB”।

দুনিয়ায় মানুষ, সাধারণভাবে সব মানুষের জন্য ও পক্ষে কাজ করবে এমন “বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন” (Multi-lateral) গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত চলে আসা দুনিয়াতে মানুষের অর্জন কম নয়। এমন অনেক প্রতিষ্ঠানই আজকাল পাওয়া যাবে যারা সাফল্যের সাথে দুনিয়ার মানুষের সম্ভাবনা, মানুষের সাফল্যের ও অর্জনের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। বহুরাষ্ট্রীয় শব্দটাকে ইংরাজিতে মাল্টি-ল্যাটারেল (Multi-lateral) বলা হয়। কারণ তা, এ কথা মনে রেখে যে, আধুনিক যেকোনো ছোট বা বড় রাষ্ট্র মাত্রই সার্বভৌম রাষ্ট্র; যার সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের উপরে ক্ষমতাশালী অন্য কেউ থাকতে পারে না, পারবে না। ফলে ‘রাষ্ট্রগুলোর অ্যাসোসিয়েশন’ ধরনের অন্য কোনো সংগঠনও এর উপরে থাকতে পারে না, কর্তৃত্বাধীন করতে পারে না। তাই ‘রাষ্ট্রগুলোর অ্যাসোসিয়েশন’ ধরনের সংগঠন যেমন রাষ্ট্রসঙ্ঘ, বিশ্বব্যাংক, রেডক্রস ইত্যাদির মতো সংগঠনগুলোর জন্ম হয়েছে এমনভাবে, যেন এসব সংগঠনের সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সুপ্রীম, তা অলঙ্ঘনীয় এ মূলনীতিকে মাথায় রেখে। তাই ল্যাটারাল ধারণাটা পাশাপাশির, কেউ কারো ওপরে নয়; না কোনো সদস্য আর এক সদস্য রাষ্ট্র, না কোনো অ্যাসোসিয়েশন সংগঠন নিজে সদস্য রাষ্ট্রের ওপরে কর্তৃত্ববান। এই কারণেই ল্যাটারাল শব্দটা যার আক্ষরিক বাংলাটা হল “বহু বাহু” বিশিষ্ট।

তবু বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন গড়ার বেলায় সার্বভৌমত্বও এখানে ঠিক মূল বিষয় নয়। বরং মূল বিষয় মূল্যবোধ (values)। ঠিক কিসের বা কী সংক্রান্ত মূল্যবোধ? এককথায় বললে মানুষ সংক্রান্ত। মানুষ কে, কারা, কী এসব বিষয়ে মৌলিক ধারণা সংক্রান্ত মূল্যবোধ।

লক্ষ্য করার মতো একটি বিষয় হল, মূল্যবোধের ওপর দাঁড়ানো বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন যেমন রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে “রাষ্ট্রসংঘ”, যুদ্ধে দুতয়ালি, ত্রাণ আশ্রয় সুরক্ষা চিকিৎসা সেবা দেওয়া ইত্যাদি বিষয়ক এবং যুদ্ধকেই কিছু নীতি কনভেনশনের অধীনে আনার সংগঠন “রেডক্রস” ইত্যাদির জন্ম বেশি দিন আগের নয়। মাত্র গত শতাব্দীতে, তাও বিশেষত ১৯০০-১৯৫০ এই প্রথম অর্ধের মধ্যে। এর মূল কারণ একটি অভিন্ন মূল্যবোধের উপরে দুনিয়ার সবাইকে নিয়ে একমতে দাঁড়ানো সহজ ছিল না। কেন? কারণ, দুনিয়ার নিয়ম যখন থাকে অপর রাষ্ট্রকে সরাসরি জবর দখল ও কলোনি করে রাখা, সেখানে মানুষের আর মূল্য কী? মূল্যবোধই বা কী? তবু গত ১৯১৯ সালে রেডক্রসের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল।

তবে বুঝার সুবিধার জন্য একটা কথা আগে বলে রাখা ভাল। বুঝার সূত্র। কলোনি দখল যুগের শুরু হয়েছিল মোটামুটি ১৭০০ সালের পর থেকে ফলে সেটা ঐ কলোনি দখলের যুগের কারণেই সম্ভবত মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে কোনো অভিন্ন মূল্যবোধ দাঁড়ানোর সম্ভাবনা সেকালে নেই। কিন্তু মজার কথা এর প্রথম দুই শ’ বছর যুদ্ধবিগ্রহ চলেছিল কলোনি দখল মাস্টারদের মধ্যে তবে সেটা তাদের নিজ  ইউরোপীয় দেশে নয়। বরং যে দেশ-রাষ্ট্র দখল করা হবে এশিয়া, আফ্রিকা ল্যাটিন আমেরিকার সেসব প্রান্তীয় অঞ্চলে সেখানে, কলোনি দখলকারদের মধ্যে। ফলে এসব গরীব দেশের লোক মরলে তা দেখে দুঃখ মনোকষ্ট পাওয়ার কেউ ছিল না। কিন্তু দিন একভাবে যায়নি। হঠাৎ ১৯০০ সালের পরে এসে দেখা গেল যুদ্ধ এবার হানা দিয়েছে ঘরের মধ্যে, খোদ ইউরোপের কলোনি দখলের মাস্টারদের নিজ দেশে, দেশগুলোর মধ্যে। তাই এবার এটাকে বিশ্বযুদ্ধ বলা হচ্ছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল ১৯১৪-১৮ সাল। ইউরোপের সেই যুদ্ধ যার মূল বিষয় ছিল আসলে কলোনি দখলদার ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কামড়াকামড়ি, তবে মরণ কামড়াকামড়ি। কিন্তু যেহেতু ঘটনায় এবারের ভিকটিম খোদ মালিক মহাজনের ঘর ফলে এবার এখান থেকে সুফল এসেছিল। কলোনি মাস্টার ভিকটিম ফলে এলিট, তাই অমানবিক, মানবেতর, নৃশংস, ঘৃণিত ইত্যাদি এসব মূল্যবোধযুক্ত শব্দের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। তবে আর একটা বিষয় অবশ্যই বিরাট প্রভাব রেখেছিল বলা যায়। তাহলো ইতোমধ্যে সারা ইউরোপে আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট মানব-অধিকারের ধারণা ও মূল্যবোধের ব্যবহার ও চর্চা অন্তত নিজ ঘর থেকে শুরু হয়ে গেছিল। ফলে মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা, বেঁচে থাকা, জীবিকা নির্বাহ, ইনসাফ পাওয়া ইত্যাদির অধিকার এবং সাধারণভাবে মানুষের অধিকার ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রিপাবলিক এবং মানুষ নিজেই, অন্য কেউ না, একমাত্র নিজেই নিজেকে শাসন করার হকদার এসব মূূূল্যবোধগুলো গেড়ে বসা শুরু হয়ে গিয়েছে। ফলে ঘটনাবলির শেষে রাষ্ট্রসংঘ, এসব মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু হয়েছিল, আর রাষ্ট্রসংঘ জন্ম নিয়েছিল ১৯৪৪ সালে।

একটি ডিসক্লেমার জানিয়ে রাখার সময় বোধহয় পেরিয়ে যাচ্ছি। তাহলো, এখানে সাধারণভাবে সব পরিচয় ভিন্নতার ঊর্ধ্বে যেকোনো মানুষের জন্য ও পক্ষে কাজ করবে এমন বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন গড়ে তোলা প্রসঙ্গে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে কথা বলছি। এর মানে এই নয় যে এসব সংগঠনগুলো সব আদর্শ ও ধোয়া তুলসীপাতা ও চরম সব অর্জনের সংগঠন এরা। না এমন আগাম অনুমান ধরে নেয়া ভুল ও তা ভিত্তিহীন। তবে, জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠান “এটা এক চরম অর্জনের” – এ কথা মারাত্মক ভুল। আবার এর কোনো অর্জনই নেই এটাও মারাত্মক ভুল। বাস্তবতা হল, তাদের অনেক অর্জন থাকলেও এর বিরাট বিরাট ঘাটতি ও খামতি আছে সেগুলো পূরণের জন্য কাজ করতে হবে, লড়তে হবে এখনো অনেক, এটাই হল সঠিক মূল্যায়ন। এখানে জাতিসংঘ বলতে মানবাধিকার সনদ ১৯৪৮ সহ যত আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, নিয়ম রেওয়াজ ইত্যাদি মানব-অধিকার ও মূল্যবোধ যা এ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে সেসব ধরে নিয়ে কথা বলেছি।

সেকালে এসব যা কিছু অর্জন এর পেছনে এক শীর্ষ ভূমিকা ছিল আমেরিকার। যেমন রাষ্ট্রসঙ্ঘ গড়া এটা আমেরিকারই এক দ্বিতীয় উদ্যোগ প্রচেষ্টা ছিল, আর তা প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের। আর রাষ্ট্রসঙ্ঘ গড়ার প্রথম তবে ব্যর্থ হয়ে যাওয়া প্রচেষ্টাটা ছিল যার নাম হল “লিগ অব নেশন”, (রাষ্ট্রসঙ্ঘের আগের উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানের নাম )। সেকালে এর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষের সময়কালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন। এছাড়া, মনে রাখতে হবে কোনো জনগোষ্ঠী নিজেই নিজেকে একমাত্র শাসন করবে অর্থাৎ কলোনি শাসকের শাসন নয়, এই ভিত্তিতেই সদস্য রাষ্ট্রদের নিয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘ গঠিত হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলো গড়তে আমেরিকা নিজের অবদান ও ভূমিকা যা রাখা সঠিক ও সম্ভব মনে করেছিল অথবা যা পারেনি করেছে, আর এভাবে আমেরিকা দুনিয়া শাসন ও নেতৃত্ব দিয়ে যেতে পেরেছিল গত প্রায় ৭০ বছর। কিন্তু সময় এখন পালাবদলের। অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এবার এখন নতুন নেতা চীনা।

কিন্তু সেই সাথে আমরা কী দেখছি?
একটা উদ্যোগ যদি হয় জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবসহ পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানের রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ সফর। তাহলে অপর দিকে এক উদ্যোগ, প্রায় সমান্তরাল আর এক তৎপরতা আছে চীনের নেতৃত্বে। স্পষ্ট করে বললে, বার্মা, বাংলাদেশ ও চীনের এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ত্রয়ের চীনে বৈঠক হয়েছে। এ তৎপরতাটা বিপরীত উদ্যোগ হিসেবে হাজির আছে।

এমনিতেই আন্তর্জাতিক অভিন্ন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়ানো বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের তৎপরতায় মানুষের মর্যাদা রক্ষার পক্ষে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সবসময় প্রধান বাধা এসে যা হাজির হয় তাহল, সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রের বৈশ্বিক স্বার্থ অথবা  ঐ রাষ্ট্র পরিচালক ব্যক্তির ব্যক্তিগত ক্ষমতায় থাকার স্বার্থ। বাংলাদেশের ভূমিকা কী তাই হতে যাচ্ছে?
এ ছাড়া স্বভাবতই মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গাদের মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা চীনকে বিপক্ষীয় ক্যাম্পে দেখতে পছন্দ করব না হয়ত। কিন্তু আমরা অপছন্দ করলেও চীন আমাদের হতাশ করার দিকে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। অর্থাৎ চীন মনে করছে এ ব্যাপারে সে আমেরিকার আমলের স্টান্ডার্ডও ধরে রাখার চেষ্টা করবে বা, নিচে পড়ে থাকবে। অথচ দুনিয়ার নেতা হওয়ার খায়েশ চীনের ষোলোআনা। এটা স্ববিরোধী। এ বিষয়ে, এককথায় এখনই বলা যায় –  গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ত হতে পারবে কিন্তু  দুনিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্বে চীনের আসা অসম্ভব। এমনিতেই কমিউনিস্ট ব্যাকগ্রাউন্ড হওয়ার কারণে চীনের পক্ষে ‘পলিটিকস’ ও ‘রাইট’ শব্দগুলো অর্থ তাৎপর্য বুঝার ক্ষেত্রে তা এক বিরাট প্রতিবন্ধক। কারণ এখানে কমিউনিস্ট চিন্তার দুর্বলতা ও ফাঁকফোকর প্রচুর। ‘রাজনৈতিক’ ও ‘অধিকার’ কথার অর্থ তাৎপর্য বুঝতে কার্ল মার্কসের ঘাটতি আছে কি না সে প্রশ্ন না তুলেও বলা যায় ৭০ বছরের পরিচিত চর্চার “মার্কসবাদ”, সেই মার্কসবাদ এর অর্থ তাতপর্য বুঝতে অক্ষম। সে এখনো অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান এগুলোর বাইরে ‘রাজনৈতিক’ ও ‘অধিকার’ শব্দগুলোর অর্থ বুঝতে অক্ষম। অথচ ঐ শব্দগুলো সবই বৈষয়িক ও অর্থনৈতিক সুবিধা সংক্রান্ত। রাজনৈতিক ক্যাটাগরির শব্দ বা ধারণাই নয় ওগুলো। যেমন মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের অধিকার নয় বরং এগুলোর বাইরে রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করেছে, বঞ্চিত করেছে।

এছাড়াও, কথা পরিস্কার রাখতে হবে; রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের এক্ষেত্রে তার সুনির্দিষ্ট স্বার্থ আছে তা হল, রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বার্মার রাখাইনে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা। একবার ও শেষবারের মতো। আর সেক্ষেত্রে, বাংলাদেশের সরকার নিজের কোনো এক সঙ্কীর্ণ স্বার্থে এর বিরুদ্ধে গেলে বা এই স্বার্থকে রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো আপস করলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। আজ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশ প্রশংশিত হচ্ছে। আমরা ভুলতে পারি না আর ঠিক সেই কারণেই এর আগের বছর কোন রোহিঙ্গা যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সে কথা ভুলে যেতে পারি না। পরের বছরও শুরুতে ভারতের প্ররোচনায় সীমান্ত সিল করে দিবার নীতি নীতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আভ্যন্তরীন নিজ জনগণের সহানুভুতি ও আশ্রয় না দিবার ক্ষোভ আঁচ করে পরে সীমান্ত খুলে দেয়াওয়া হয়।

এমনিতেই, বল গড়ানো শুরু করেছে দুইটা জায়গা থেকে। এক সাংগ্রিলা বৈঠক। সাংগ্রিলা মূলত এশিয়ার নিরাপত্তাবিষয়ক এক রাষ্ট্রজোট। সিঙ্গাপুরের  “সাংগ্রিলা নামের এক হোটেলে” তা প্রতিবছর আয়োজিত হয়ে থাকে। যেখানে সদস্য হিসেবে আমেরিকাও আছে, চীনও আছে। ইউরোপের মাতব্বর রাষ্ট্রেরা আছে, আছে মিয়ানমারও। গত জুন ২ তারিখের এবারের সিঙ্গাপুরের বার্ষিক বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করতে আসেন মিয়ানমার সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাউং তুন (National Security Adviser Thaung Tun)। মায়ানমার বা বার্মার গলার স্বর নামা শুরু হয় সেখান থেকে। তিনি সাত লাখ রোহিঙ্গাদেরকে ফেরত নিতে নিজে প্রস্তাব দেন ও সম্মতি জানান। তিনি আবেদনের স্বরে সেখানে প্রশ্ন রেখেছেন, “স্বেচ্ছায় যদি ৭ লাখকে ফেরত পাঠানো যায় তাহলে আমরা মায়ানমার তাদের গ্রহণে আগ্রহী। এরপরেও এটাকে কি জাতিগত নিধনযজ্ঞ বলা যায়”?

“Myanmar is willing to take back all 700,000 Rohingya Muslim refugees who have fled to Bangladesh if they volunteer to return, the country’s National Security Adviser Thaung Tun said on Saturday”.

এবিষয়ে রয়টার্সের  এক ডিটেলড রিপোর্ট দেখা যেতে পারে এখানে। দেখা যাচ্ছে, তিনি এ প্রস্তাব দেন কারণ ওই সাংগ্রিলা সম্মেলনে মিয়ানমারের নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি কি মিয়ানমারকে জাতিসঙ্ঘের আরটুপি (রেসপন্সিভিলিটি টু প্রটেক্ট) ফ্রেমওয়ার্ক চালুর দিকে নিয়ে যাবে? কথিত এই আরটুপি ফ্রেমওয়ার্কটি ২০০৫ সালে জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব সম্মেলনে গ্রহণ করা হয়। [Shangri-La Dialogue, a regional security conference in Singapore, where he was asked if the situation in Myanmar’s Rakhine state, where most Rohingya live, could trigger use of the Responsibility to Protect framework of the United Nations.]

এর মধ্য দিয়ে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নিধনযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে নিজ দেশের জনগণকে রক্ষা এবং এই প্রতিশ্রুতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে ব্যর্থ হলে এক দেশ অন্য দেশকে সহযোগিতা করবে। [The so-called R2P framework was adopted at the 2005 U.N. World Summit in which nations agreed to protect their own populations from genocide, war crimes, ethnic cleansing and crimes against humanity and accepted a collective responsibility to encourage and help each other uphold this commitment.]

আর ওদিকে দ্বিতীয় ব্যাপারটা হল, এই মুহূর্তে জোকের মুখে নুনের মতো এক উদ্যোগ। সেটা হল, আইসিসির  ( International Criminal Court, ICC) প্রধান প্রসিকিউটর ফাতোহ বেনসুদার উদ্যোগ। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের কারণে তিনি যে অভিযোগের তদন্ত করতে চাইছেন তা হচ্ছে, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়-‘জনগোষ্ঠীকে বিতাড়ন বা জোর করে অন্যত্র ঠেলে সরিয়ে দেয়া’ (অনুচ্ছেদ ৭ [১] [ডি])। এই অনুচ্ছেদ অনুসারে তিনি অভিযোগ দায়ের করতে চান। আপাতদৃষ্টে অভিযোগটি হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ বা লুটপাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে না হলেও এর তাৎপর্য এবং গুরুত্ব কম নয়, কেননা এই অভিযোগের শাস্তি ওইসব অভিযোগের চেয়ে কম নয়, প্রায় একই।

অর্থাৎ মিয়ানমারের জেনারেলদেরকে আইসিসির আদালতে তুলতে সক্ষম হতে পারার ইঙ্গিত। এই উদ্যোগের বিশেষ দিকটা হল, এতদিন  চীন বা রাশিয়ার দেয়া সবকিছুতে ভেটো মেরে মিয়ানমারের জেনারেলদেরকে আইনের আওতায় আনার সব কিছুকে আটকে ফেলা যত সহজ মনে হচ্ছিল এই প্রথম বার দেখা যাচ্ছে সেটা সম্ভবত এবার অকেজো হবে।

এমনিতেই শুরু থেকেই (ARSA) আরসা জঙ্গিদের গল্প বার্মার জেনারেলেরা সবাই কে খাইয়েছিল। আর তা ভারত, চীন এবং আমেরিকাসহ সবাই আনন্দের সাথে খেয়েছিল। কারো অরুচি লাগেনি।  বার্মার দেয়া বৈষয়িক সুবিধা বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্টের লোভে সবার কাপড় উদোম হয়ে গেছিল। সবাই জেনারেলদের ভক্ত হয়ে উঠেছিল। তাদের বানানো (ARSA) আরসা জঙ্গিদের গল্প কার আগে কে বেশি বিশ্বাস করবে সে এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছিল।  সবাই গল্প সহজেই মেনে নিয়েছিল যে আরসা সন্ত্রাসীদের হামলাই সব কিছুর জন্য দায়ী। কিন্তু  কেউ নিজেকে প্রশ্ন করে নাই যে তাহলে হত্যা ও ধর্ষণের ভিতর দিয়ে  সাত লাখ রোহিঙ্গাকে দেশ ছাড়া হতে হল কেন? বার্মার সেনাবাহিনীকেই বা কেন রোহিঙ্গাদেরকে বিতাড়ন করতে হবে – এই প্রশ্ন চীন বা আমেরিকাসহ কেউই তখন তুলতে চায়নি। কিন্তু আগে যেমন অসহায়ভাব দেখা যাচ্ছিল, যে কেউ একটা জঙ্গি হামলার গল্প রান্না করলেই দুনিয়ার মা-বাপ যারা তারা সবাই তাকে বিশ্বাসযোগ্যতা দেয়, কোনো প্রশ্ন করে না। এখন দেখা যাচ্ছে সেসব গল্প সবার এবার বদহজম হয়ে গেছে।

চীনের গ্লোবাল টাইমসে দাবি করা হয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে, ‘চীনের নীতি ধারাবাহিকতায় সুসামঞ্জস্যপূর্ণ’। [On the issue of the Rakhine State, China’s position is consistent]। আসলে এটা একটা মুখরক্ষার কথা, কিন্তু অসত্য কথা। তাই যদি হয় তবে চীন তখন (২০১৭ সালে) কথিত আরসা জঙ্গি হামলাকে দায়ী করে জেনারেলদের গণহত্যা ও ধর্ষণ ও বিতারণ কাজের পক্ষে সাফাই দিয়েছিল কেন? আর এখন সে সাফাই কোথায়? এখন জেনারেলেরা আপস করতেই বা রাজি কেন? কেন অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে, এই ইস্যুতে চীন নিঃশ্চুপ?

[We believe that the issue should be solved through dialogue and consultations between Myanmar and Bangladesh, and the international community should act according to the two countries’ wishes,]

এ ছাড়া এখন রোহিঙ্গাদের তাদের মর্যাদা, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আদরের সাথে বার্মায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থার পক্ষে কাজ করা। এ ছাড়া যারা রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ও ধর্ষণসহ মানবেতর অবস্থার জন্য দায়ী তাদের আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনা চীন কী এ দুই কাজ ও তৎপরতার বিরোধী? তাহলে কেন মায়ানমার আর বাংলাদেশের ডায়লগে সব সমাধা করতে চায় চীন?

গত চল্থ্বালিশ বছরে বার্মার সামরিক শাসকদের এই একই নিরবিচ্ছিন্ন নীতি চলে আসছে তাদের সাথে নতুন করে ডায়লগের ভিত্তি ও ভরসা কী?

বার্মার চরম মানবাধিকারের লঙ্ঘনকে আড়াল করতে চীন জেনারেলদেরকে আইনের আওতায় আনার কথা উঠলেই বার্মায় বাইরের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মনে করছে কেন? চীন অপরাধীদেরকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনতে চায় না, না করলে কেন তা স্পষ্ট ভাষায় চীনের বলা উচিত।

চীন কী মনে করে বার্মায় মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নটা কী সেখানে চীনের বৈশ্বিক স্বার্থের নিচে, কম গুরুত্বপুর্ণ? দেখা যাচ্ছে প্রশ্নটাকে চীন বরং দানব শাসকের ব্যক্তি ইচ্ছায় পর্যবসিত করে রাখবে, আর ওই ব্যক্তিশাসকের ইচ্ছাই রাষ্ট্রের (বার্মা বা বাংলাদেশ) সার্বভৌমত্ব বলে চালিয়ে দেবে তবে, এ চীন অচিরেই গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে অপসৃত হবে তা আগাম বলা যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
৫ জুলাই ২০১৮
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৫জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) জাতিসঙ্ঘসহ শীর্ষ চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]