ইজিপ্ট ১: মোরসির ক্ষমতা কতদূর প্রশ্ন কেন উঠছে?

ইজিপ্ট ১: মোরসির ক্ষমতা কতদূর প্রশ্ন কেন উঠছে?

গৌতম দাস || Wednesday 27 June 12 || বিষয় অনুসারে পড়ুন : ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য

https://wp.me/p1sCvy-2tI

 

[এই লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ২০১২ সালে। এখানে হুবহু সেটাই তুলে রাখা হয়েছে আর্কাইভ করে রাখার উদেশ্যে আগষ্ট ২০১৮ সালে। দুই পর্বে লেখাটার এটা প্রথম পর্ব।]

ইজিপ্টের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মানে দ্বিতীয় দফার রান-অফ নির্বাচন শেষ হবার পর, আরও তাৎপর্যপূর্ণ এই যে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় ২৫ জুন সন্ধ্যায় ব্রাদারহুডের প্রার্থী মোহম্মদ মোরসিকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। তবু দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় সব জায়গায় মূল আলোচনার বিষয় মোরসির ক্ষমতা কি কি, কত দিনের প্রেসিডেন্ট, কি তাঁর কাজ এবং কাজের সীমা ইত্যাদি। কোন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী (প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট) বলতে প্রচলিত যে ধারণা দুনিয়ায় আছে সেই রকম একটা ভাবের মধ্য দিয়ে এই নির্বাচন ঘটেছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোন রাষ্ট্রের বেলায় নির্বাহী প্রেসিডেন্ট বলতে দুনিয়াতে প্রচলিত ভাবটা কে কি বুঝে তা দিয়ে কোন কাজ চলতে পারে না, বরং ঐ সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বেলায় নির্বাহী প্রেসিডেন্ট-এর মানে কি, কি তাঁর ক্ষমতা, কোনটা তার নয়, কতদিনের জন্য ক্ষমতা ইত্যাদি স্পষ্ট করে বলা থাকতে হয়। তা বলা থাকতে হয় কনষ্টিটিউশনে এবং নির্বাচনের আয়োজন শুরুরও আগেই । একটা কনষ্টিটিউশন কোন রাষ্ট্রের থাকার মানে হল ঐ রাষ্ট্রের নাগরিক-জনগণ রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত (কনষ্টিটিউটেড) হয়েছে; এভাবে হলে, হয়ে গিয়ে থাকলে সেটাকে রাষ্ট্র বলা চলে। অন্যভাবে বললে জনগণ রাজনৈতিকভাবে কনষ্টিটিউটেড হওয়া আর রাষ্ট্রের জন্ম হয়ে যাওয়া একই কথা। আর সেই সাথে জনগণ কিসের ভিত্তিতে একত্র হলো, কনষ্টিটিউটেড হলো সেই ভিত্তি – জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার কোন ভিত্তি – সেকথার লিখিত দলিলটা হলো কনষ্টিটিউশন। ঐ কনষ্টিটিউশনে বলে দেয়া থাকে, রাষ্ট্র যে পরিচালনার করবে সেই নির্বাহী প্রধান রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী কাজ, ক্ষমতা কি, কতদিনের, রাষ্ট্র কিভাবে পরিচালনা হবে ইত্যাদি। এরপর সেই কনষ্টিটিউশনের অধীনস্ততা মেনে রাষ্ট্রের বাকি সমস্ত  প্রতিষ্ঠান এমনকি খোদ নির্বাহী প্রধান, পার্লামেন্ট অথবা বিচার বিভাগ সবাই আনুগত্য প্রকাশ করেই একমাত্র তারা যার যা ভুমিকা পালন করতে পারে। ফলে রাষ্ট্র দৃশ্যমান হয়। খেয়াল রাখতে হবে আমি রাষ্ট্রের কথা বলছি, দেশ না। দেশ বলতে ওর মাটি সীমানা মানুষ ইত্যাদি সবই থাকতে পারে – এতে দেশ হয়ে থাকলেও তা রাষ্ট্র নাও হতে পারে। সোমালিয়া একটা দেশ বটে কিন্তু রাষ্ট্র নয় সেটা। আবার কোন দেশ একই থাকে কিন্তু ওর রাষ্ট্র আবার কনষ্টিটিউট বা গঠন করে নেবার দরকার হতে পারে। দরকারের মূল কারণ, পুরানা রাষ্ট্র আর জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে না তাই। রাজনৈতিক শব্দে একে কোন দেশের নতুন করে রিপাবলিক গড়া বলে। আবার অনেকের মনে হতে পারে এতক্ষণ রাষ্ট্র বা রিপাবলিক (গণ)রাষ্ট্র বলতে আমি বোধহয় আগাম ধরেই নিয়েছি যে আমি “গণতন্ত্র” ধরনের রাষ্ট্রের কথাই বলছি। না আমি তা বলছি না। আমি  রাষ্ট্রের কথা বলছি, রিপাবলিক রাষ্ট্রের কথা বলছি। এই রাষ্ট্র ইসলামি, কমিউনিষ্ট, লিবারেল ইত্যাদি অথবা এসবেরও বাইরে নতুন কোন রাষ্ট্র হতে পারে। আর এসব রাষ্ট্র শব্দের আগে বিশেষণে রিপাবলিক কথাটা যোগ করেছি এজন্য যে এটা অন্তত রাজা, বাদশা সম্রাটের রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্য নয়; এসবের বিপরীতে জনগণের কর্তৃত্বের রাষ্ট্র কেবল সেটা পরিস্কার রাখার জন্য।

  • ইজিপ্টের ক্ষেত্রে  রাষ্ট্রের কোন কনষ্টিটিউশন বর্তমানে নাই।  মোবারকের পুরানা কনষ্টিটিউশন বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে গত পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর, পার্লামেন্ট বসার আগে এবং SCAF (সুপ্রীম কাউন্সিল অফ আর্মড ফোর্স)-এর ঘোষণায় নিজস্ব নির্বাহী ক্ষমতার জোরে ।
  • এর মানে ইজিপ্ট একটা অন্তর্বতীকালিন বা মধ্যবর্তী অবস্থায় আছে, পুরানা রাষ্ট্র নাই আবার নতুন রাষ্ট্র কনষ্টিটিউট করা হয়নি – এদুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থা।
  • তাহলে নতুন কোন কনষ্টিটিউশনের আগেই একটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ইজিপ্টে ঘটেছে, ঘোড়ার আগে গাড়ীর মত। আবার এর আগে একটা পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে গত এপ্রিলে; ব্রাদারহুড যেখানে সংখ্যাগরিষ্ট আসন পেয়েছে। সাথে ইসলামি সালাফি রাজনীতির নূর পার্টি (২৫%) মিলিয়ে মোট ৫৪% আসন এই দুই ইসলামী ব্যকগ্রাউন্ডের রাজনীতিক দলের হাতে। সাধারণভাবে পার্লামেন্ট নির্বাচন মানে আগাম একটা কনষ্টিটিউশন আছে; সে কনষ্টিটিউশনের অধীনে সীমায় থেকে প্রতিদিনের নানান প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ওর কাজ। কিন্তু ইজিপ্টের বিশেষ ক্ষেত্রে নামে বলা হচ্ছে এটা সুরা কাউন্সিল বা পার্লামেন্ট কিন্তু এর কাজ হবে একটা কনষ্টিটিউশন খাড়া করা। কিন্তু তাও আবার সরাসরি নয়। পার্লামেন্টের দ্বারা একশ মনোনিত (নির্বাচিত নয়) সদস্যের এক কমিটি ইজিপ্ট রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশন (খসড়া বা প্রস্তাবিত) খাড়া করবে। যেটা পরে হয়ত পার্লামেন্ট পাশ বা অনুমোদন করলেই হবে; অথবা আবার গণভোটে দেয়া হবে।(“হয়ত” বলে আমাকে বাক্য লিখতে হচ্ছে এজন্য যে এগুলোর কোনটাই পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে পরিস্কার করা হয় নাই।) কিন্তু তাই যদি হয় তবে পুরানা বা নতুন কোন কনষ্টিটিউশনই না থাকা অবস্থায় পার্লামেন্ট নির্বাচনের কাজ, উদ্দেশ্য লক্ষ্য কী? কেনই বা কথাটা সুরা কাউন্সিল বা পার্লামেন্ট বলা হচ্ছে; যেখানে হবার কথা একটা কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বী (কনষ্টিটিউশন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সভা) বা আমাদের বাংলায় সমতুল্য প্রতিশব্দ ‘গণ পরিষদ’; ফলে ঠিক পার্লামেন্ট মেম্বার বা নির্বাচন নয়, বরং গণ পরিষদের সদস্য কে হবেন তাঁর নির্বাচন – এটাই হবার কথা। এটা পার্লামেন্ট নির্বাচনেরও আগের কাজ। প্রথম কাজ কনষ্টিটিউশন বা রাষ্ট্র গঠন – জনগণের কনষ্টিটিউটেড হওয়া – সেটা ঘটানো। এরপর ঐ কনষ্টিটিউশনের অধীনে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন। ফলে বড় ধরনের এক গোজামিল এখানে চলছে আমরা দেখতে পাচ্ছি। উপরে বারবার দেখিয়েছি কোন কিছুই স্পষ্ট না করে পার্লামেন্ট নির্বাচনের আওয়াজে ঘটনা চলছে। এমনকি ঐ একশজন কারা কিভাবে মনোনিত হবেন তাও স্পষ্ট করে রাখা হয় নাই। ফলাফলে আমরা দেখেছি, ঐ পার্লামেন্ট এনিয়ে বিরোধ মীমাংসা শেষ করতে না পেরে ঝুলন্ত অবস্থায় ফেলে রাখে। ব্রাদারহুড সালাফি বাদে সমাজের বাকি সবাই পার্লামেন্ট থুয়ে আবার তাহরির স্কয়ারমুখী জমায়েত হয়। এই অবস্থা অবশ্য পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগেও হয়েছিল। নির্বাচন বর্জনের ডাক এসেছিল। কিন্তু এর ভিতরেই পার্লামেন্ট নির্বাচন ঘটেছিল। আর পরে দেখলাম পার্লামেন্টের বিরোধ মীমাংসা যখন হলো না তখন ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় এসে যাওয়ায় সবাই তাতেই মত্ত হয়ে গেল এই ভেবে যে কে প্রেসিডেন্ট হবে তা দিয়েই তারা সব বিরোধের মীমাংসা করে নিবেন।

গণ আন্দোলনে গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে বা যেকোন বিপ্লব সফল করতে গেলে কনষ্টিটিউশন থাকা আর না থাকার মাঝের অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা কার হাতে থাকছে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বলা যায় সব কিছুর নির্ধারক এবং লক্ষণও বটে। র‍্যাডিকাল কোন পরিবর্তন বিপ্লবের ভাব তুলে এর বদলে তা উদারতাবাদী লোক দেখানো কোন ঘটনা হিসাবে গণ আন্দোলনে পরিণত হয়ে যাবে কি না তা সহজে বুঝবার উপায় হলো অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতাটার দিকে লক্ষ্য রাখা। উপরে পার্লামেন্ট নির্বাচনের নামে তামাশা আর পরে একইভাবে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের নির্বাচনের নামে যে রহস্য ইজিপ্টের আমরা দেখছি – মোরসি নির্বাচিত এটা জানার পরও সাথে সাথে যে প্রশ্ন উঠছে যে তাঁর ক্ষমতা কি কি, আর সমানে পিছন থেকে SCAF সমানে প্রম্পট করছে, এক এক সময় এক এক ভাবে ফরমান জারি করে প্রেসিডেন্টকেই সাইজ করছে – এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা কার এটা কত গুরুত্বপূর্ণ, সেন্ট্রাল পয়েন্ট। কিন্তু SCAF কিভাবে কেন অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা হয়ে গেল? এরমানে আরব জাগরণ আন্দোলন বা বিপ্লবের আওয়াজই কি  SCAF কে ক্ষমতায় আনে নাই? ঘটনা ১০০ ভাগ সত্যি। কিন্তু এই সত্যি ঘটনা ঘটতে পারল কেন? কেন এমন হলো, এদিকটা এখন বুঝাবুঝির দিকে যাব।

ইজিপ্টের ঘটনায় মূল তিন প্লেয়ার – ১) SCAF, ২) স্থানীয় ব্রাদারহুড আর ৩)পশ্চিমের লিবারেল ইসলাম (RAND প্রজেক্ট বা গ্লোবাল কারযাভি ধারা)। এর বাইরে সেকুলার, কমিউনিষ্ট বা লিবারেল ধারার ছোট টুকরা যারা আছে এরা ঠিক গোনায় ধরা প্লেয়ার হতে পারেনি তাই এদের নিয়ে বিশেষ আলোচনা না করে তাহরিরের মাঠের সাধারণ গণ আন্দোলনের কর্মীদের ভিতরে ধরেছি, সবমিলিয়ে যারা চতুর্থ ধারা বলতে পারি।

[এই লেখাটা শুরু করেছিলাম ১৬-১৭ জুনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক আগে। লেখার প্রসঙ্গ ক্রমশ বিস্তার হতে থাকে কারণ, যেটাকে গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম বলছি – এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টরটা কোথাও আলোচনা হতে দেখিনি। “আরব স্প্রিং” বা গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম জিনিষটা কি কেন, এর প্রভাবে ইজিপ্টের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর সম্পর্কটা কি এটা বাদ  রেখেই সব আলোচনা চলছে। মিডিয়াগুলোর ফোকাস হলো ব্রাদারহুড ইসলাম নিয়ে তেড়ে আসছে এবার কপটিক খ্রীশ্চানদের কি দশা ঘটে এটাই যেন মূল বিষয়। অথচ তুলনায় এটা সবচেয়ে তুচ্ছ দিক। ফলে কেন তুচ্ছ বলছি সেকথাগুলো ব্যাখ্যা করে বলতে গিয়ে লেখা শেষ করতে পারিনি। এদিকে পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার দিকে গড়িয়ে যাচ্ছিল। এই দেখে ঐ ২৫ তারিখেই ঘন্টা দুইয়ের মধ্যে তাড়াহুড়া তবে আলাদা করে “কয়েক ঘন্টা পর ইজিপ্ট – কি ঘটতে পারে? কি হতে যাচ্ছে?” শিরোনামে লেখাটা দিয়ে দেই। এখন মুল লেখাটা আবার সাজিয়ে লেখার চেষ্টা করছি, কয়েক পর্বে। ]

 

বিপ্লবী রাজনীতি না উদারবাদী রাজনীতি

কোন গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে, বিপ্লব সফল করতে গেলে পুলিশ-মিলিটারীর মার নির্যাতন সহ্য করা, অঙ্গ হারানো, নিহত বা গুম হয়ে যাওয়া ইত্যাদিতে দমনের সব পথ মোকাবিলায় পাড়ি দিয়েই একমাত্র সেটা ঘটতে পারে—এটা কমবেশি সবাই জানেন। কিন্তু কোন প্রতিরোধ আন্দোলন সেটা গণঅভ্যুত্থান, বিপ্লব হলো বা হবে কি না, পৌছাবে কি না তা – কতটা মাত্রার দমন নির্যাতন সহ্য করা হয়েছে তা মেপে ঠিক হয় না; বলা ভাল নির্যাতনের মাত্রা আর বিপ্লব – এদুটোর আসলে কোন সম্পর্কই নাই, সম্পর্ক আছে মনে করে কোন মনবুঝ দেয়াটাও বেকুবি, নিজেকে ধোকা দেয়া। বাংলাদেশেও তরুণ রাজনৈতিক কর্মীরা ১৯৯০ সালে নিজেদের সাথে এমন ধোকাবাজি করেছিল, দাবি করেছিল প্রেসক্লাবের রাস্তায় বসে বাদাম চিবাতে চিবাতে তারা নাকি এক গণঅভ্যুত্থান করে ফেলেছিল। ইজিপ্টের আরব জাগরণের বিপ্লবীরা একই সমস্যায় পড়েছে। গত আঠারো মাস ধরে আন্দোলনে তাদেরও ধারণা হয়েছিল তারা বিপ্লবের স্বাদ পেয়েছে, নিচ্ছে। আজ (১৬-১৭ জুন) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় রাউন্ড মানে রান-অফ চলছে। দুমাস আগের নির্বাচিত পার্লামেন্ট সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল (সামরিক নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রিত এক ধরণের কনষ্টিটিউশনাল কোর্ট) “অবৈধ” ঘোষণায় ভেঙ্গে দিয়েছে ঠিক এর দুদিন আগে ১৪ জুন। দিন দশেক আগে ঐ একই আদালত (প্রায় একই বিচারকেরা তবে কোর্টের নাম আলাদা) হোসেনী মুবারক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং ছয়জন সিনিয়র পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক আন্দোলনে নিহত ৮০০ এর মত আন্দোলনকারীকে হত্যার অভিযোগ থেকে “প্রমাণাভাবে” তাদের খালাস বলে রায় দিয়েছে। অর্থাৎ এই ৮০০ জনকে কারা মেরেছে, কাদের হুকুমে পুলিশ গুলি ছুড়েছে তা আইনের চোখে আন-আইডেনটিফায়েড”, তাই বেকসুর খালাস। কিন্তু সাথে এক তামাশা আছে এখানে। ঐ ৮০০ জনকে হত্যা রাষ্ট্র কেন প্রটেক্ট করতে পারেনি এই অভিযোগে কেবল প্রেসিডেন্ট ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে। এর আগে এতদিন ইজিপ্টের বিপ্লবী তরুণেরা খুশিতেই ছিল বিপ্লবের কিছু একটা হচ্ছে মনে করে। বিপ্লব প্রায় শেষ মনে করে, বিপ্লবের গাথা লিখাতেও তারা উদ্যোগী হয়ে গিয়েছিল। গান ছড়া, কার্টুন ডকুমেন্টারীতে সমাজ সয়লাব হচ্ছিল, যেমন হয়। কিন্তু এই রায়ের পরেই কেবল তারা প্রথম টের পাওয়া শুরু করে যে তারা প্রতারিত, ঠকেছে তারা। সবকিছু হাতছাড়া তাদের, আঙ্গুলের ফাঁক গলে সব বেরিয়ে গেছে। কবে কিভাবে বের হয়ে গেছে টেরও পায়নি। এতদিন খুশিতে আশা ভরশায় বুঁদ হয়ে মগ্ন থাকছিল আর ভেবে ছিল মোবারক আর তার সঙ্গী সাগরেদদের বিচার হচ্ছে, হবে। আসলে তরুণ আত্মত্যাগী রাজনৈতিক কর্মীরা নিজেদেরই ঠকিয়েছে; কারণ বিপ্লব কি, কি করে বুঝা যায় বিপ্লব হচ্ছে কি না, হবে কি না সে সম্পর্কে তাদের ভাবনা কত নাদান সে খবর রাখতে চায়নি। প্রতিরোধ আন্দোলন সময়ের নির্যাতন কম হয় নাই, ৮০০-৯০০ এর মত বিপ্লবী মারা গেছে এই ১৮ মাসে, ফলে অনুমান করে নেয়া যায় নিহতের সাথে আহত পঙ্গু হয়ে যাবার সংখ্যাটাও অনুপাতে কত হতে পারে এবং যারা নির্যাতনে ট্রমাটাইজ মানসিক বিকলাঙ্গ সদমা নিয়ে আছেন হয়েছেন এই সংখ্যাটাও। ফলে পুরা সমাজে উথাল পাথাল করা ১৮ মাসের এই আন্দোলন সংগ্রাম মানে সামাজিকভাবে গণ-মনকে ঝাকুনি দেয়ার ঘটনা এটা। এতেও ঝাকুনি খায়নি বাইরে রয়ে গেছে  এমন লোকজন সমাজে খুব কমই অবশিষ্ট আছে। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি নির্যাতন হত-নিহত হওয়া আর সবার উপরে সামাজিক ঝড়ের প্রভাব আন্দোলিত হয়ে যাওয়া এর সব শর্তই এখানে পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু দুঃখের কথা এত কিছুর পরও সবাই টের পাচ্ছে এটা বিপ্লব হয় নাই; বিপ্লবের দেখা নাই। আর তরুণেরা সেটা টের পাচ্ছে এখন। এখানে তরুণ বলতে সবাই, এককথায় সামরিক কাউন্সিল SCAF বাদে রাজনৈতিক কমিউনিটি, সমাজের সব অংশে সব দল মতের সব জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক বুঝিয়েছি। বিপ্লব যে ঘটেনি এটা আমি এখানে বলছি বলে না, ইজিপ্টের সবার মুখে আর মনের অনুভবের কথা, কারও বুঝতে বাকি নাই। সারা রাজনৈতিক কমিউনিটি হতাশ শুধু নয়,  নতুন করে সমাগত নির্যাতন নিপীড়নের দিন আবার ফিরে আসছে এটা ভেবে সবাই আতঙ্কিত হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যেটা সবার আগে ঘটে রাজনৈতিক পাড়ায় পরস্পরকে ব্যর্থতায় দোষারোপ করা, বিভক্তি বড় হওয়া, যা আগেও ছিল এখন তা আরও বড় হতেও শুরু করেছে।

তাহলে মূল কথাটা, ব্যাপারটা কি এই যে, বুঝব কি করে ঘটনা বিপ্লবের দিকে হাটছে নাকি উদারবাদী রাজনীতির দিকে যাচ্ছে—এটা কেবল ঘটনা ঘটার শেষে  কি দাড়ালো সেটা দেখার পরে জানতে পারা ছাড়া আগাম বুঝবার কোন উপায়  নাই যে বিপ্লব হচ্ছে কি না? বিপ্লব কী আগে বুঝার কোন উপায় আছে?

অবশ্যই আছে। কিন্তু কি সেটা? লেনিন সাহেব বলেছিলেন, বিপ্লব করা নাকি একটা আর্ট। এবং অভুত্থান নাকি উপযুক্ত দিন তারিখের আগেও করা যায় না পরেও না। আরও এগিয়ে বলা কথাও আছে। পুরান রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রব্যবস্থা যদি ভেঙ্গে না পরে তাহলে বুঝতে হবে বিপ্লব হয় নাই ইত্যাদি ইত্যাদি আনুষাঙ্গিক অনেক কথাবার্তা। তবু আমি সেদিকে যাব না, কোন চর্বিত চর্বন বা আপ্তকথা আউড়াব না, সেসব আশ্রয় করে আমার কথা সাজাব না। কিছু খাস কথা খাসভাবে বলার চেষ্টা করব।

 

Advertisements

ইজিপ্ট ২: ইসলামি রাজনীতিতে রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ভাবনার সঙ্কট

ইজিপ্ট ২: ইসলামি রাজনীতিতে রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ভাবনার সঙ্কট

গৌতম দাস || Sunday 01 July 12 || বিষয় অনুসারে পড়ুন : ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য

https://wp.me/p1sCvy-2tF

 

[এই লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ২০১২ সালে। এখানে হুবহু সেটাই তুলে রাখা হয়েছে আর্কাইভ করে রাখার উদেশ্যে আগষ্ট ২০১৮ সালে। দুই পর্বে লেখাটার এটা দ্বিতীয় পর্ব।]

 

আগের পর্বে বলেছিলাম, গণ-আন্দোলনের চাপে মোবারকের সরে যাওয়ার পর ট্রানজিশনাল বা অন্তর্বতীকালিন সরকার কে হচ্ছে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বতীকালিন সরকার হিসাবে যা তৈরি হবে তা গঠন করার সময় ও পরে এর উপর রাস্তার আন্দোলনের যদি একক কোন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্বই না থাকে তবে বুঝতে হবে গণ-আন্দোলন একটা গর্ভস্রাবে পরিণত হতে যাচ্ছে। অন্তর্বতীকালিন সরকারে কে থাকবে, কারা সদস্য হবে তা নিয়ে গণ-আন্দোলনের কাউকেই প্রকাশ্যে বা ড্রয়িং রুমে ডেকেও মতামত চাওয়া হয় নাই। অন্তর্বতীকালিন সরকার কিভাবে হচ্ছে সেই পুরা ব্যাপারটাই ঘটেছে, বলা ভাল ঘটতে সক্ষম হয়েছে মোবারক ও সামরিক কাউন্সিলের কর্তৃত্বে, নিয়ন্ত্রণে। মাঠের আন্দোলনের নেতাদেরকে গোনায়ও ধরা হয় নাই। আর একভাবে বলা যায় তাদেরকে গণায় ধরতে বাধ্য করা যায় মাঠের আন্দোলন নিজেকে সে তীব্রতায় এবং উচ্চতায় নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে সামরিক কাউন্সিলের পক্ষে কেবল মোবারককে সরিয়ে দিয়ে পুরা ক্ষমতা ও ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানগুলো (সামরিক কাউন্সিল SCAF আর এর দুই সহযোগী—আদালত কেন্দ্রিক সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আর এরই বর্ধিত রূপ সুপ্রীম ইলেকশান কাউন্সিল) ঠিক যেমন ছিল সেভাবে অটুট রেখে নতুন করে পুরানা ক্ষমতাটাই আবার সাজিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছিল। পুরান ক্ষমতা অথবা এর নব উত্থানকে দমন করে এর উপর গণ-আন্দোলন নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে নিবে এমন কোন কাজ, ইচ্ছা, আলামত কিছুই ঘটতে দেখা যায় নাই। কেবল মোবারকের সরে যাওয়া—এই দাবি আদায়ের খুশিতে জনগণকে মাতোয়ারা রাখার কাজেই গণ-আন্দোলনের শক্তিকে সীমিত রাখা হয়েছিল। গণ-আন্দোলন কেবল একটাই প্রতীকী কাজ করেছিল—মোবারকের রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল ডেমোক্রাটিক পার্টির সদর দপ্তর জ্বালিয়ে দেয়া। জনগণের এই ক্ষোভের প্রতিকী অর্থ হলো, কেবল একটা শত্রুকে চিনানো তা হলো, মোবারকের ছেলে গামালকে কেন্দ্র করে মোবারকের বউয়ের যে খায়েস, যে ছোট ছেলেকে প্রেসিডেন্ট বানাবে, সেই ইচ্ছার সম্ভাবনা চিরতরে নাকচ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে এই ইচ্ছা কেবল গণ-আন্দোলনের নয় এটা সামরিক কাউন্সিল SCAF-এরও ইচ্ছা ও স্বার্থ ছিল। ফলে সহজেই ঘটানো গিয়েছিল। ফলাফলে পুলিশ বাহিনী প্রত্যাহার করে ট্যাঙ্কে চড়ে সামরিক বাহিনী শহরের দখল নিয়েছিল। আর রাস্তার জনগণ তাদের স্বাগত জানিয়েছিল। এর অর্থ হলো গণ-আন্দোলনের কাঁধে সওয়ার হয়ে সামরিক কাউন্সিল SCAF নিজের খায়েস পূরণ করে নেয়া । এই অর্থে তথাকথিত বিপ্লবে সামরিক কাউন্সিল SCAF-এরও ভাগীদারী প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।

কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হতে পেরেছিল

ক্ষমতা হস্তান্তরের আইনী বা লিগ্যাল দিক বিবেচনা করলে, মোবারকের কনষ্টিটিউশন অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের অপারগতায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়ার কথা ভাইস-প্রেসিডেন্টের হাতে, তিনিই একটিং প্রেসিডেন্ট হবেন এবং মোবারকের মতই তার সব ক্ষমতা ব্যবহার করবেন। কিন্তু মোবারক কোনভাবেই কোন সামরিক কাউন্সিলের কাছে ক্ষমতা দিয়ে যেতে পারেন না। কনষ্টিটিশন তাকে সে ক্ষমতা ও এক্তিয়ার দেয় নাই। এটা হলো পুরানা কনষ্টিটিউশনের দিক থেকে ক্ষমতাকে বুঝা ও বিচারের মানদণ্ড, বলবৎ আইনী সীমার মধ্যে থাকছে কিনা তা বুঝার কষ্টিপাথর। কিন্তু কোন গণ-আন্দোলনের বিপ্লব হিসাবে নতুন স্তরে (গণ-আন্দোলন উদারবাদী সীমায় থাকবে না বিপ্লবী র্যা ডিক্যাল হবে তাঁর প্রথম পরীক্ষা এটা ) আবির্ভাবের ন্যূনতম শর্ত হলো, নিজেই নিজেকে নতুন ক্ষমতা হিসাবে হাজির করা, কোন পুরান কনষ্টিটিউশন থেকে তাঁর ক্ষমতা উৎসারিত হচ্ছে এমন কোন ধারণা তৈরি হতে দেয়া বা ভুলে তা মেনে নেওয়া মানেই গণ-আন্দোলনের বিপ্লবী সম্ভাবনার ইতি টেনে দেয়া। ক্ষমতা থেকে বা আয়ত্বে থাকলে কনষ্টিটিশনের জন্ম দেয়া যায় কিন্তু কোন তৈরি কনষ্টিটিশন থেকে ক্ষমতা ডিরাইভ করা যায় না, উৎস মনে করে ভুল করা যায় না, পাওয়া যায় না। ক্ষমতা বিষয়ক এই মৌলিক ধারণা হাতের কড়ায় গুনে সবসময় নিজের কাছে পরিস্কার রাখতে হয়। কিন্তু আমরা দেখেছি, মোবারক জেনারেল সোলায়মানকে ভাইস প্রেসিডেন্ট বলে ঘোষণা দিলেন বটে কিন্তু সুপ্রীম কাউন্সিল অফ আর্মড ফোর্স বা SCAF বলে কিছু একটা খাড়া হয়ে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের সব ক্ষমতা নিয়ে জেঁকে বসে গেল। গণ-আন্দোলন নিজেই নিজেকে ট্রানজিশনাল ক্ষমতা বলে দাবি করার বদলে হয়ে গেল SCAF-এর ট্রানজিশনাল ক্ষমতা নিয়ে নেয়া; আবার এটা অবশ্যই এক নতুন ক্ষমতা কারণ কার্যত সে আর পুরানা কনষ্টিটিউশন মেনে নিজেকে তৈরি করে নাই, নিজেই নিজেকে ক্ষমতা বলে দাবি করেছে। এটাই হলো তামাশার দিক। গণ-আন্দোলনের সম্ভাব্য ক্ষমতাটা ছিনতাই হয়ে যাওয়া। SCAF যে ট্রানজিশনাল ক্ষমতাটা দখলে নিল এটা তাঁর নিজের তৈরি না, ছিনতাই করে নেয়া ক্ষমতা, এটা SCAF-এর অজানা নয়। এর প্রমাণ হলো, টিভিতে ক্যামেরার সামনে মানে দেশবাসীর সামনে জেনারেল সোলায়মান একেবারে সামরিক কায়দায় তাহরির স্কয়ারকে বিশাল এক স্যালুট ঠুকে বিপ্লব বিপ্লব বলে চিৎকার শুরু করে দিতে দেখলাম আমরা। কারণ তারা বুঝে তাহরির স্কয়ারের কারণেই SCAF নামে তারা ক্ষমতায়। তারাই তাহরির স্কয়ারের (চোরাই করে আনা) ক্ষমতা। এটা SCAF-এর পক্ষে ক্ষমতা ছিনতাই করে আনার এক বিপ্লবই বটে। SCAF-এর ক্ষমতার ভিত্তি কোন পুরানা কনষ্টিটিউশন না, চুরি করে আনা ক্ষমতাটাই তাঁর ভিত্তি। আর নতুন ক্ষমতা তো কনষ্টিটিউশন থেকে আসে না, আসার কথাও না।

আমার এই লেখা পড়ে যারা ব্রাদারহুডের রাজনীতি ভালবাসেন তারা ফ্যাকচুয়াল যুক্তি তুলতে পারেন যে ব্রাদারহুড তো আন্দোলনের শুরু থেকে শামিল ছিল না। তারা বড়জোর বাইরে থেকে ধাত্রির ভূমিকায় ছিল যেন গন-আন্দোলনটা (বিপ্লব?) প্রসব করে, তারা আন্দোলনের আহতদের মেডিক্যাল সেবা বা খাবারদাবার সরবরাহের ভূমিকা নিয়েছিল, মোবারকের এনডিপি সদর দপ্তরে আগুন দিয়ে এটাকে গণক্ষোভের প্রতীকে প্রতিষ্ঠার কাজটা করেছিল, ঘোড়া উটে বা উটের গাড়ি চড়ে এনডিপি-সামরিক মদদে গুন্ডারা তাহরির স্কয়ারের জমায়েতের উপর দিয়ে বিপ্লব মাড়িয়ে দাবড়ানোর যে গুন্ডামী করতে এসেছিল তা প্রতিরোধের সময় ব্রাদারহুড নির্ধারক ভূমিকায় প্রতিরোধের দেয়াল তৈরি করেছিল। এছাড়া আর একটা যুক্তি তাদের হতে পারে, যে মোবারকের পতনের পর নির্বাচন দেবার ব্যাপারে ব্রাদারহুডের বাইরে আন্দোলনে যে সব রাজনৈতিক ধারা আছে [সেকুলার কমিউনিষ্ট ও আমেরিকার ফ্রিডম হাউস জাতীয় এনজিও এর উৎসাহ প্রভাবের লিবার্টির শ্লোগান দেয়া তরুণেরা, যেমন সিক্সথ এপ্রিল গ্রুপ ইত্যাদি; এছাড়া সাধারণ জনগণ] তাদের চাপেই SCAF ট্রানজিশনাল ক্ষমতা তৈরি করে জেঁকে বসার পরপরই নির্বাচন দাবি করা যায় নাই। তাদের ধারণা ছিল যত দ্রুত নির্বাচন হবে ততই ব্রাদারহুডের (আগে থেকেই সংগঠিত সংগঠন হয়ে থেকেছে বলে) জিতে আসার সম্ভবনা।

এই যুক্তির অসার দিকটা হলো, এটা ট্রানজিশনাল ক্ষমতাটা কে কিভাবে তৈরি করছে এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটা নজর করতে অক্ষম, এটা কোন বিষয়ই না এদের কাছে; বিষয় হলো মোবারকের সরে যাওয়া মানে একটা নির্বাচন আর নির্বাচন হলেই সেটা মোবারক বা SCAF-এর বিরুদ্ধে ও বাইরে একটা ক্ষমতা তৈরি করবে। এটাই ব্রাদারহুড এর দৃষ্টিতে ক্ষমতা পাবার ধারণা, ক্ষমতা ধারণা। ফলে ট্রানজিশনাল সময়ে ক্ষমতাটা কে নিচ্ছে কার হাতে যাচ্ছে তাতে কিছুই যায় আসে না। ক্ষমতা ধারণার কোন ন্যূনতম বুঝ না থাকার জন্য নির্বাচনে দেরি করিয়ে দেওয়াটাকে ক্ষমতা না পাওয়া, ক্ষমতা পেতে দেরি হওয়ার কারণ বলে মনে করছে।

উপরে আমি বারবার জোর দিয়েছি কেন ট্রানজিশনাল ক্ষমতা বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ, তার উপর। কারণ এই নতুন ক্ষমতাটাই ঘটনা পরবর্তী সমস্ত ঘটনার গতি, অভিমুখ ঠিক করে দিবে। এটা স্রেফ এক নতুন ক্ষমতা নয়, এটা আসলে সব ঘটনা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। ইজিপ্টে আজ পর্যন্ত এটা তাই ঘটিয়েছে। SCAF-এর ট্রানজিশনাল ক্ষমতা অর্থাৎ ক্ষমতাসীন হওয়াটাই আজ পর্যন্ত সব ঘটনা আর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক। এমনকি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কেউ হয়ে আসলেও সে ক্ষমতা নাও পেতে পারে, নির্বাচিত পার্লামেন্ট হলেও সে পার্লামেন্ট এক ঘোষণা দিয়ে তুড়ি মেরে অবৈধ বাতিল বলে দিতে পারে, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কি হবে তা সে ঠিক করে দিতে পারে, প্রেসিডেন্ট নিজে সরকার গঠন—মন্ত্রীসভা গঠন করার আগেই SCAF নিজেকে নিজেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলে ঘোষণা দিতে পারে ইত্যাদি। এককথায় প্রেসিডেন্ট বা পার্লামেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতার যে প্রাতিষ্ঠানিকতা তৈরি হবে সেটা SCAF ক্ষমতার অধীনস্ততা মেনেই ডিকটেশনে কেবল একটা সীমিত ক্ষমতা চর্চা করতে পারবে।

কথাগুলো সোজা-সিদা করে বললে, ক্ষমতা কি জিনিষ, এর কোন ধারণার বালাই এদের নাই। ট্রানজিশনাল ক্ষমতা বিষয়টাকেই বুঝতে পারেনি। আর তৃতীয়ত, ধরে নিয়েছে নির্বাচনের মাধম্যে ক্ষমতা পাওয়া যায়।

নির্বাচন ক্ষমতা তৈরি করে না। বরং নির্বাচনেরও আগে নির্বাচন আহবান করার মুরোদ—এটাই ক্ষমতা; [আলোচ্য ক্ষেত্রে SCAF যেটা আগেই হাসিল করে নিয়েছে।] গণ-অভ্যুত্থান বিপ্লবী এই ক্ষমতার উৎস, সেটাই ট্রানজিশনাল বা সাময়িক ক্ষমতা। সাময়িক কেন? এরপর নির্বাচন ইত্যাদিতে যেটা তৈরি হয় সেটা হলো এই ক্ষমতা কি করে বাস্তবে পরবর্তীকালে ব্যবহার করা হবে, বাইরের কেউ নয় বিপ্লবের ভিতরকার কেউঁ প্রতিনিধি হয়ে কেবল ঐ ক্ষমতা সবার পক্ষ থেকে প্রয়োগ করবে এরই নিয়ম, আইন কানুন ইত্যাদির জন্য প্রতিনিধি কে হবে তারই নির্বাচন। নির্বাচন নিজে ক্ষমতার উৎস নয়, ক্ষমতা সে জন্ম দিতে পারে না। ক্ষমতা থাকলে, অর্জিত হলে, নিয়ন্ত্রণে আসলে তবে নির্বাচন আয়োজন বা আহবান করা যায়। অর্জিত ক্ষমতা কি করে ব্যবহার প্রয়োগ করা হবে এরই নির্বাচন। ক্ষমতা এক্সারসাইজের পথে [প্রতিনিধি] নির্বাচন এক উপায় মাত্র, নির্বাচন নিজে ক্ষমতা নয়।

এই লেখা শুরু করেছিলাম এই প্রশ্ন রেখে যে কি করে বুঝা যাবে ঘটমান বিপ্লবের অভিমুখ ঠিক আছে কিনা? গণ-আন্দোলন যদি নিজেই ঐ দেশ বা রাষ্ট্রের প্রচলিত সব ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজেকে একমাত্র প্রাধান্য বিস্তারি ক্ষমতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, পুরানা সব ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানকে সবাইকে অধীনস্ত হতে বাধ্য করতে পারে তবে বুঝতে হবে অন্তত অভিমুখ ঠিক আছে। কিন্তু আর এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আছে, কাঠামোর দিক থেকে পুরানা ক্ষমতা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যে কারণে দাড়িয়েছিল, ফাংশনাল থাকতে পেরেছিল [ সামরিক, আদালত, সংসদ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে] সেগুলো ভেঙ্গে দিতে হবে। এই ভেঙ্গে দেয়া মানে ব্যক্তিগতভাবে তাদের হত্যা করা একেবারেই নয়। প্রথম কথা, আগের মত করে নির্বাহী রাষ্ট্রপ্রধানের অধীনে আর ফাংশনাল থাকা নয়, তাঁরা তখন থেকে নতুন মাঠের ক্ষমতা [তাহরির স্কয়ার] কাছে আনুগত্য প্রকাশ করবে এবং সীমিতভাবে সাময়িক কাজ চালিয়ে যাবার মত ফাংশনাল থাকবে কিন্তু মাঠের নতুন ক্ষমতার ইচ্ছা সাপেক্ষে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, পুরান ক্ষমতার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান পুরানা কনষ্টিটিউশন ভেঙ্গে দিয়ে বাতিল ঘোষণা করে দিতে হবে। এতে মাঠের নতুন ক্ষমতা যেটাকে বলছি এটাই ট্রানজিশনাল ক্ষমতা। ট্রানজিশনাল ক্ষমতা নিজে ঘোষণায় কনষ্টিটিউশন সহ পুরানা সব ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠাঙ্গুলোকে নিজের আনুগত্যে নিতে পারতে হবে। তবেই জেনারেল সোলায়মান বা SCAF এর স্যলুট ঠুকে দেওয়াটা মিনিংফুল হবে। কিন্তু ইজিপ্টের ক্ষেত্রে এটা হয়েছে মাঠের ক্ষমতা হাইজাক করে SCAF নামে নিজেই নিজে ট্রানজিশনাল ক্ষমতা কায়েম করে ফেলেছে। ফলে স্যালুট নিজেই নিজেকে করেছে, ওর সাথে জনগণের কোন সম্পর্কই আর নাই।

মোরসির প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেবার সময়ে প্রধান বিচারপতি শপথ পড়ানোর আগের উদ্বোধনী বক্তৃতায় একটা মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, “এই অনুষ্ঠিতব্য শপথের পর থেকে ইজিপ্ট এক দ্বিতীয় রিপাবলিক হিসাবে জন্ম নিতে যাচ্ছে”। রাষ্ট্রতত্ত্বের দিক থেকে এটা একটা খুবই সঠিক উচ্চারণ। তিনি আসলে বলতে চেয়েছেন একই ইজিপ্ট দেশ, নতুন করে এক রাষ্ট্রে [আগের একই দেশ কিন্তু একই রাষ্ট্র নয়] নিজেকে কনষ্টিটিউট করতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের রি-কনষ্টিটিউশন মানে জনগণের নিজের নতুন শপথ নতুন করে রি-কনষ্টিটিউশন পুনর্গঠন এবং নাগরিক-জনগণের এই পুনর্গঠিত হওয়া মানে রাষ্ট্রে পুনর্গঠিত হওয়া – একই কথা। এই হলো মোরসির শপথ কথার তাৎপর্য। কিন্তু এত তাত্ত্বিক তাৎপর্য থাকা এবং এর প্রকাশ্য উচ্চারণ সত্ত্বেও এটা একটা তামাশার বেশি কিছু নয়। কারণ, ঐ তথাকথিত কনষ্টিটিউশনাল কোর্ট যারা শপথ পড়াতে এসেছেন তারা কারা? মোরসি যদি নতুন রিপাবলিকের ক্ষমতা হয়ে থাকেন, নির্বাচিত নির্বাহী প্রেসিডেন্ট হয়ে থাকেন, তাহরিরের মাঠের ক্ষমতার প্রতিনিধি হয়ে থাকেন তবে ঐ তথাকথিত কনষ্টিটিউশনাল কোর্টের আনুগত্য সেই মাঠের ক্ষমতা, জনগণের ক্ষমতার কাছে নেই কেন? কেন তাঁর আনুগত্যের উৎস SCAF? SCAF-এর ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে তিনি তথাকথিত কনষ্টিটিউশনাল কোর্টে হয়ে হাজির আছেন, শপথ পড়াতে এসেছেন। তাদের তাহরির মাঠের ক্ষমতার প্রতি কোন আনুগত্য নাই। ফলে তাত্ত্বিক তাৎপর্যপূর্ণ কথা উচ্চারণের আগে ঐ তথাকথিত কনষ্টিটিউশনাল কোর্ট প্রধান বিচারকের নিজের আনুগত্য কোথায় সেই প্রশ্ন নিজেকে নিজে করতে হত। SCAF-এর আনুগত্য মেনে কোন বিচারক সেকেন্ড রিপাবলিক বলে তাত্ত্বিক তাৎপর্যপূর্ণ কথায় নিজের জনগণের সাথে ঐতিহাসিক গাদ্দারি ঢাকা দিতে পারবেন না। তাই এই তামাশার নাটক আমরা ওখানে মঞ্চস্থ হতে দেখেছি। এই পর্যায়ে এসে মোরসি বেচারা আসলে, ঘ্যাতঘোত করতে পারেন কিন্তু এর বাইরে কিছুই করার আর অবশিষ্ট তিনি নিজেই রাখেননি। কারণ তিনি আগেই জনগণের ক্ষমতা, ট্রানজিশনাল ক্ষমতাটা SCAF-এর হাতে তুলে দিয়েছেন, মেনে নিয়েছেন। তিনি একমাত্র SCAF অনুগ্রহেই প্রেসিডেন্ট হতে পারেন, এটা বহু আগেই মেনে নেয়া হয়ে আছে।

সে কথা থেকে শুরু করেছিলাম, ব্রাদারহুডের যুক্তি যে SCAF-এর ট্রানজিশনাল ক্ষমতা কায়েমের পর বাম সেকুলারদের কারণে নির্বাচনটা তাড়াতাড়ি হতে পারে নাই, ফলে আজ মোরসির এই দুর্গতির কারণ সেটা। উপরের আলোচনায় আমরা দেখলাম সমস্যাটা নির্বাচন কত আগে ডাকা হবে তাতে কিছুই আসে যায় না, এমনকি SCAF-এর ট্রানজিশনাল ক্ষমতা কায়েমের পরেরদিন কোন নির্বাচন হলেও ওর পরিণতি আজকের মতই হত, বাস্তবতা থেকে আমাদের কারোই পালানোর কোন পথ নাই। মূল ট্রানজিশনাল ক্ষমতাটা SCAFকে দিয়ে দেয়া বা মেনে নেবার পর পরবর্তী সব অভিমুখ গতিপথ নির্ধারিত হয়ে গেছে ওখানেই। সারকথায় নির্বাচন কবে এটা বিষয়ই নয়, বিষয় হলো ক্ষমতা, ক্ষমতা কি তা আঙুলে গুণে বুঝা, মনে রাখা—এই কাজে অযোগ্যতা ব্যর্থতা। যেটা ব্রাদারহুড শুধু নয় ওর বাইরের সব রাজনৈতিক শক্তিরও অযোগ্যতা, ব্যর্থতা।

আমি বহু লেখায় এই দিকটা নিয়ে কথা তুলেছি যে ইসলামি রাজনীতি যেটা জাগছে এদের রাষ্ট্র ধারণা ও ক্ষমতা ধারণা নিয়ে চিন্তা ভাবনা হোম-ওয়ার্ক একেবারেই অপরিণত। সবটাই ষ্টেজে দেখা যাবে, উপস্থিত সময় কিছু একটা করে ফেলা যাবে ধরনের। আবার অনেকের ধারণা রাষ্ট্র ক্ষমতা ধারণাগুলো তো পশ্চিমের ঘরে জন্ম নিয়েছে, চর্চায় বড় হয়েছে। ইসলামি রাজনীতিতে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়। সাধারণভাবে ইসলামি রাজনীতি বড় জোর একটা খেলাফত রাষ্ট্র করব [যেটা আসলে বৃটিশ সাম্রাজ্য-রাষ্ট্রের মত কলোনী মাষ্টারীর সাথে বেশি খাপ খায় ধরনের অটোমান সাম্রাজ্য-রাষ্ট্রের এক ভাসাভাসা ধারণার বাইরে গিয়ে কিছু বুঝায় কিনা সেটা স্পষ্ট করতে পারে না] ধরনের এক স্বপ্ন কাজ করে। এমনকি ঐ যুগে সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র জন্ম ও টিকিয়ে রাখার পূর্বশর্ত ছিল অন্য অনেক দেশকে ঐ সাম্রাজ্যের অধীনে কলোনী হয়ে থাকতে হবে। অর্থাৎ সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র নিজেই নিজ ক্ষমতায়, নিজ জনগণের এবং নিজ রাষ্ট্র সীমানার কোন রাষ্ট্র না। অন্য দেশ দখল ও তাদেরকে কলোনী বানিয়ে রাখা সাপেক্ষে একটা সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র এ যুগে আবার বাস্তবে কায়েম সম্ভব। তাঁর মানে কি ইসলামের নামে মুসলমান জনগোষ্ঠির দেশগুলো ইসলামি রাজনীতিতে কোন একটা রাষ্ট্রের সবাই কলোনী হয়ে যাবে? খুব জোরালো না হলেও এক খলিফার নেতৃত্বে [ইসলামি রাজনীতিতে এটাকে গাইডেন্স বলা হয়] খেলাফত কায়েমের ভাসাভাসা স্বপ্নটা এরকম বলেই আমার ধারণা হয়েছে। এসব দেখে পঞ্চাশের দশকে কমিউনিজমের শ্লোগানের আড়ালে দলে দলে সদ্য কলোনীমুক্ত দেশগুলোর সোভিয়েত ব্লকের সদস্য হয়ে যাওয়া আমরা দেখেছি সেই মিলের দিকটা মনে পড়ে যায়। আজ ইসলামি রাজনীতিতে যে সঙ্কট, রাষ্ট্র কি সে ধারণা বুঝবার চিন্তায় সঙ্কট সেই একই ঘাটতি কাজ করেছিল সদ্য কলোনীমুক্ত কমিউনিষ্ট প্রীতির ন্যাশনালিষ্ট রাজনীতির দেশগুলোতে। রাষ্ট্র কি সে ধারণা বুঝবার চিন্তার হোম-ওয়ার্ক কেউ করতে চায়নি। প্রায় সবাই যেটা মনে করেছিল, রাষ্ট্রভাবনা? সেটা আবার কি? এসব বুর্জোয়াদের গরীবদের দমিয়ে রাখার চাতুরি ব্যাপার স্যাপার। [তুলনায় ইসলামি রাজনীতিতে একই কথা তবে ভিন্ন ভাষায়, “রাষ্ট্র বা ক্ষমতা ধারণাগুলো তো পশ্চিমের ঘরে জন্ম নিয়েছে, চর্চায় বড় হয়েছে; ইসলামি রাজনীতিতে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়” ধরনের।] কমিউনিষ্টরা ভেবেছিল, “পুজিবাদ বা ধনিক শ্রেণী” কে মুছে ফেলতে পারলেই মোক্ষ লাভ হবে। আর এর পরিণতি হয়েছিল এক খোদ সোভিয়েত রাষ্ট্রকে সুরক্ষা, প্রতিরক্ষা দিয়ে টিকিয়ে রাখার কাজে ওর নিজস্ব ষ্ট্রাটেজিক বৈদেশিক স্বার্থ অনুযায়ী ব্লকের বাকি সব রাষ্ট্রের নিজ নিজ স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে, পিছনে ফেলে সোভিয়েত ইউনিয়নের এক স্যাটেলাইট রাষ্ট্র হিসাবে নিজেকে নামিয়ে নেয়া। পরবর্তীতে ষাটের দশকে নয়া-চীন এটাতে বিদ্রোহ করে বসল, অভিযোগ তুলল এটা সোভিয়েত রাষ্ট্রের “সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ” হয়ে যাওয়া। কিন্তু মজার কথা হলো, আবার সে নিজেই চীনা বলয়ের এক ব্লক তৈরি করে নিজের ব্রান্ডের কমিউনিজমের নামে একই চীনা রাষ্ট্রের ষ্ট্রাটেজিক বৈদেশিক স্বার্থ রক্ষার ভূমিকায় নেমে পড়েছিল । এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ, ১৯৭১ এর বাংলাদেশের নিজ স্বার্থ এভাবেই স্থানীয় চীনা কমিউনিষ্ট পার্টিগুলোর হাতে চীনা রাষ্ট্রের স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে বলি হয়ে গিয়েছিল।

আমার সার কথা হলো, রাষ্ট্র ধারণা – কি রাষ্ট্র আমরা চাচ্ছি গ্লোবাল পরিস্থিতিতে সে ধারণার মানে কি দাঁড়ায় সেসব নিয়ে বিস্তর চিন্তাভাবনা হোমওয়ার্ক তত্ত্বীয় প্রস্তুতির কাজটা আমরা কেউ এড়াতে পারব না। এটা ষ্টেজে মেরে দেবার বিষয় না। ফলে ইসলামি রাজনীতিও কি একই “কমিউনিষ্ট” অভিজ্ঞতা ও পরিণতি নিতে যাচ্ছে? ইজিপ্টের পরিস্থিতি পরিণতি দেখে, ব্রাদারহুডের রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণা বুঝবার অপরিণত রাজনীতি দেখে এই আশঙ্কা আমি দেখি। এমনিতেই ইসলামি রাজনীতিতে রাষ্ট্র প্রসঙ্গে এক অমীমাংসিত বিতর্ক আছে যে, কোন মুসলমান রাষ্ট্রের [রুলার বা শাসক অর্থে] আনুগত্য করতে পারে কি না? সংক্ষেপে একে “আনুগত্য বিতর্ক” নামে ডাকতে পারি। এটুকু বুঝি, যুগের পর যুগ ব্যাপারটাকে অমীমাংসিত করে ফেলে রাখতে পারি না। এটা আত্মঘাতি। তাই তর্ক-বিতর্ক উস্কে দেবার জন্য আমি মোরসির একটা বক্তৃতা যেটা গত শুক্রবার তাঁর শপথ নেবার আগের দিন তাহরির স্কয়ারের জমায়েতে তিনি দিয়েছিলেন সেটা সামনে আনতে চাই। এই বক্তৃতার গুরুত্ব অনুভব করে ফেসবুকে আমি এর ভিডিও লিঙ্ক দিয়েছি। যাতে বডি ল্যাঙ্গুয়েজসহ তা বুঝা যায়। আগ্রহীরা তা দেখতে পারেন। ওর সারকথা হলো,

In the context before sworn in as Egypt’s president Mohamed Morsi : “I am here because of you. No institution, no Authority none can be above this will, the will of you, your will. You are the source of power. The nation is the source of power. The nation is the one to decide, the nation is the one to give unity, nation is the one to give appoint and hire and the nation is the one to fire…….” – Historical speach in Tahrir square.

এই বক্তৃতায় মোরসি প্রতীকীভাবে তাহিরর স্কয়ার ও ঐ মাঠের জনগণকে তাঁর ক্ষমতার উৎস বলে সকলকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি জনগণের ক্ষমতার প্রেসিডেন্ট। জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক তিনি। ফলে যে রাষ্ট্রের তিনি প্রেসিডেন্ট সেই রাষ্ট্র জনগণের নিজেরই ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা। ফলে “রাষ্ট্র মানে আনুগত্য” এই আনুগত্য কথার এক বিশেষ অর্থ তিনি দাড় করিয়ে ফেলেছেন ইতোমধ্যেই। ব্যাপারটা হয়ে গেছে নিজের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার প্রতিরূপের প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ। যেটা মুসলমান পরিচয়ে বা ইসলামের চোখে অসঙ্গতির নয় এমন একটা মানে করা যায়। ফলে আনুগত্য বিতর্কের এক প্রাকটিক্যাল সমাধান মোরসি নিজে এবং তাঁর মুসলমান জনগণের সম্পর্ক আর এর ভিতর দিয়ে নিজেকে, নিজের ক্ষমতাকে ব্যাখ্যা করার উপায় বের করতে হয়েছে তাঁকে; বিতর্কের এক প্রাকটিক্যাল সমাধান, পথের ইঙ্গিত এখানে এসেছে আমরা দেখতে পাচ্ছি।

যদিও প্রশ্ন উঠতে পারে, এটা কি মোরসির কৌশলী কথা, নাকি ক্ষমতা রাষ্ট্র আনুগত্য প্রসঙ্গে তাঁর নীতিগত অবস্থান? আবার এই অবস্থান কি কেবল তাঁর নিজের? ব্যক্তিগত ও প্রেসিডেন্ট হিসাবে, বিশেষ পরিস্থিতি SCAF-এর অধীনের প্রেসিডেন্ট তিনি তাই? এর সাথে পার্টি ব্রাদারহুড এই অবস্থান নিজেরও বলে স্বীকার করে কি না? এসব বহু প্রশ্নের জবাব কি তা আমরা এখনও জানি না।

রাষ্ট্র ও ক্ষমতা প্রসঙ্গে ইসলামি রাজনীতির সঙ্কট নিয়ে মূল কথা আপাতত এতটুকুই। তবে একটা সহযোগী প্রশ্ন আছে। প্রশ্নটা হলো, ব্রাদারহুডের SCAF-এর হাতে ট্রানজিশনাল ক্ষমতা ছেড়ে দেয়া ও মেনে নেওয়া – এই ব্যাপারটা কি শ্রেফ রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণা না বুঝা হোমওয়ার্ক না করার থেকে জন্ম নেয়া? আমার জবাব হবে, না; অন্য আরও বড় কারণ আছে। সেদিকটা এখানে এখনও আনিনি। সেটা গ্লোবাল দিক বা ফ্যাক্টর। সেটা আমরা খুজে পাব, আমেরিকান চলতি ষ্ট্রাটেজিক ও বৈদেশিক নীতি, ইসলাম ইস্যুটাকে নিজের নিরাপত্তার ইস্যু হিসাবে মনে করা (আগের বুশের আমল থেকে চলে আসা ওয়ার অন টেররের সেকুলারিজমের আড়ালে দুনিয়াকে নিজের পক্ষে নিয়ে নিজ রাষ্ট্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায় করে নেবার লাইন – যেটা ছিল এর বিপরীত লাইন) সেই সুত্রে RAND এর ইসলামি প্রজেক্ট বা গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম প্রসঙ্গের ভিতরে। এনিয়ে আলাপ করতে করতে পরের পর্ব শুরু করার ইচ্ছা রাখি।

 

গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণে আসে কবে থেকে

গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণে আসে কবে থেকে

গৌতম দাস

  আগস্ট ৩১, ২০১৮, 00:0২

https://wp.me/p1sCvy-2tv

 

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) মূল তাত্পর্য কী?  এই প্রশ্নের জবাবে দক্ষিণ এশিয়ায় মানুষজনের মধ্যে এক অদ্ভুত মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। এই যুদ্ধে হিটলার-মুসোলিনির ‘অ্যাক্সিস পাওয়ার’ বা ‘অক্ষশক্তির’ কথা সবাই ঠিক ঠিকই জানে। কিন্তু এই শক্তির বিপরীতে কথিত মিত্রবাহিনীতে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রধান ভূমিকায় কে ছিল— আমেরিকা না ব্রিটেন? এ প্রসঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশীয় ধারণা হলো, এটা ব্রিটেন। অথবা একই কথা আরেক প্রশ্ন করে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার ভূমিকা কী? মানে কেমন ছিল? সেটা কি গুরুত্বের দিক থেকে ব্রিটেনের ভূমিকার চেয়ে খাটো বা নিচে? এরও একই জবাব হবে — আমেরিকান ভুমিকা ছিল ব্রিটেনের চেয়ে নিচে। এছাড়া এ কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে তারা তখনকার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিলের নেতৃত্ব ও নানা গুণের কথা তুলে প্রশংসাও শুরু করবে।

কিন্তু এগুলো একেবারেই ডাহা অসত্য তথ্য। ফ্যাক্টস হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে কেউ যদি নিজেদের পরিকল্পনামাফিক গ্লোবাল মেরুকরণ (অক্ষশক্তি বনাম মিত্র) করে একে পরিণতি ও পরিসমাপ্তির দিকে নিয়ে গিয়ে সফল হয়ে থাকে, তবে সেটা আমেরিকা ও এর সে সময়ের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট করেছেন। এর সমস্ত ক্রেডিট তাঁর ও তাঁর সহযোগীদের। আসলে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে কলোনি প্রভু ব্রিটিশদের বাইরে “পশ্চিম” বলতে আর কেউ আছে বলে আমরা সে সময়ে খুব কমই জানতাম। আর কাউকে আমরা চিনতামই না। বৃটেন মানে যদি বড়জোড় ইউরোপের ধরি তবে এর বাইরে আমেরিকা কী, কোথায়, কী তার বৈশিষ্ট, কেমন রাষ্ট্র সেটা ইত্যাদি এত সব নিয়ে আমাদের শিক্ষিতজনদেরও কোন আগ্রহ ছিল না।

শিরোনাম যেভাবে দেয়া হয়েছে, তাতে যা বলতে চেয়েছি, এক. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে “গ্লোবাল অর্থনীতিক ব্যবস্থা” বলে কোন কিছুর অস্তিস্ত ছিল না বললেই চলে। অন্য ভাষায় গ্লোবাল অর্থনীতিতে “গ্লোবাল পণ্য  বিনিময় ব্যবস্থা” বলতে কিছু ছিল না বললেই চলে।  দুই. গ্লোবাল মুদ্রা ব্যবস্থা ছাড়া গ্লোবাল পণ্য বিনিময় অসম্ভব। সেকালে কোন গ্লোবাল বা বহুরাষ্ট্রীয় পরিচালিত আইএমএফ এর মত কোন প্রতিষ্ঠান ছিল না, ফলে গ্লোবাল কোন মুদ্রা ব্যবস্থা ছিল না। ফলে স্বভাবতই বাস্তবে একটা “গ্লোবাল পণ্য বিনিময় ব্যবস্থা” অসম্ভব ছিল। তিন. পণ্য বিনিময়ও ছিল খুবই সীমিত এবং তা কেবল কলোনি প্রভু (যেমন বৃটেন) দেশের সাথে তার কলোনি দেশের (বৃটিশ-ইণ্ডিয়া) মধ্যে। তাও সেটা মূলত একপক্ষীয় কেবল কলোনি দেশ থেকে প্রভুর দেশে লুটের আয় যাওয়া।   ফলে আইএমএফের মাধ্যমে (ভাল অথবা খারাপ তা যেটাই হোক) – প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণে আসে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম হয় অর্থাৎ একট গ্লোবাল পণ্য বিনিময় ব্যবস্থা বিকশিত ও তা বাস্তবায়িত হয়। আরও স্পষ্ট করে বললে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে মানে কলোনি যুগে, ফাংশনাল যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছিল এর উপর কোন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণই ছিল না। রাষ্ট্রীয় মালিকানার কোন ব্যংকের ধারণাই ছিল না। ফলে সেন্ট্রাল ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক যেমন) বলে কোন ধারণাও ছিল না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাত্পর্য এক: কলোনি যুগের অবসান
কলোনিয়ালিজম বা উপনিবেশবাদের ছুটির ঘণ্টা বাজে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে। এই বিচারে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত সময়কালকে কলোনি যুগ বলা যায়। আর ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি পর থেকে উপনিবেশ-উত্তর স্বাধীন রাষ্ট্রের যুগ শুরু হয়েছিল। ফ্যাক্টস দেখে অনেকে তর্ক তুলতে চেষ্টা করতে পারেন, এশিয়ায় কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদ্বয় – তা হতে শুরু হওয়া  মোটাদাগে পঞ্চাশের দশকে ঘটনা ফেনোমেনা। যদিও ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া সম্ভবত এমন অভ্যুদ্বয়ে সব শেষের দিকের ঘটনা। ওদিকে আফ্রিকায় একইভাবে বেশির ভাগ কলোনি-রাষ্ট্র স্বাধীন হয় ষাটের দশকের শেষের দিকে, অল্প কিছু সত্তরের দশকে আর সর্বশেষ সম্ভবত দক্ষিণ আফ্রিকা, ১৯৯৪ সালে। লাতিন আমেরিকা এরকমই ষাট-সত্তরের দশকের মধ্যে বেশির ভাগ স্বাধীন হয়েছিল। তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত উপনিবেশ যুগ আর পরে সমাপ্তিতে মুক্ত স্বাধীন যুগ— এমন এক ‘বিভক্তি লাইন’ টানা যায়। কিন্তু ঠিক কীসের ভিত্তিতে এই লাইন টানা হবে, সে ভিত্তি কী?

আসলে সুনির্দিষ্ট করে বললে বিভক্তি লাইন নয় বরং আরও স্পষ্ট করে বিভক্তির দিনক্ষণই বলে দেয়া যায়। মানে কলোনি শাসন সমাপ্তি টানার ঘণ্টা বাজার দিনটা হবে ১৯৪১ সালের ১৪ আগস্ট। কেন?

কারণ ওইদিন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের সঙ্গে “আটলান্টিক চার্টার” নামে এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। আর আট দফা এ চুক্তিতে স্বীকার করে নিয়েছিলেন, তারা উভয়ই মানুষের নিজ ভূমিতে বসবাস করা এবং সেই ভূমিতে কী ধরনের শাসনের অধীনে কারা তার শাসক হবে তা নিজেই বেছে নেবে— এ অধিকারকে সম্মান করে। এছাড়া তারা উভয়ে যেকোন ভুখন্ডের জনগোষ্ঠি মানুষের নিজ দেশে সার্বভৌমত্বের অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রিত সরকার পুনরুদ্ধার করা গেছে এটাই দেখতে চায়, যা থেকে ওসব জনগোষ্ঠিকে বলপ্রয়োগে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে বলে তাঁরা উভয়ে মনে করে।

অর্থাৎ চার্চিল এই চুক্তিতে রুজভেল্টের চাপের মুখে স্বীকার করে নিচ্ছেন যে অবিভক্ত ভারতবাসীকে নিজ ভূমির ওপর শাসনের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু তাহলে তো চার্চিলের আর নিজের উপনিবেশগিরি থাকে না। এটা জানা সত্ত্বেও কলোনি শাসন ত্যাগের এ নীতিগত অবস্থানপত্রের আট দফায় চার্চিল স্বাক্ষর করেছিলেন। মানে নীতিগতভাবে কলোনি শাসন আর বজায় রাখবেন না — এ প্রতিশ্রুতি তিনি অন্তত আমেরিকাকে দিয়েছিলেন ওই চুক্তিতে বাধ্য হয়ে। কেন? কারণ হিটলারের আক্রমণে  এরই মধ্যে ফ্রান্স হিটলারের দখলে চলে গেছে এবং এরপরে ব্রিটেনও দখল হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। তাই এই ভয়ে আমেরিকার সহায়তা পেতে চাইছেন তিনি। তাই “কলোনি শাসন ত্যাগের এ নীতিগত অবস্থানপত্রের” এই শর্তেই চার্চিল রুজভেল্টের মন পেয়েছিলেন। আর এথেকেই রুজভেল্ট চার্চিলের সঙ্গে মিলে হিটলারবিরোধী “মিত্রশক্তি” গড়তে রাজি হয়েছিলেন। ফলে বিশ্বযুদ্ধে হিটলার ও সহযোগীদের পতন নিশ্চিত করেছিল।

রুজভেল্ট ‘মিত্রশক্তির’ ইউরোপকে শুধু সামরিক সহায়তাই করেননি; যুদ্ধে প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানীয় বা পোশাক থেকে শুরু করে যুদ্ধজাহাজসহ যেকোন সামরিক সহায়তা ইত্যাদি না কোন জাহাজ রিপেয়ার, নতুন সরবরাহ অথবা নগদ সাহায্য করেছিলেন। আর তা করেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নসহ মিত্রশক্তির সব রাষ্ট্রকে। যুদ্ধ শেষে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের এক হিসাবে দেখা যায় মিত্রশক্তির রাষ্ট্রগুলোর সবাইকে দেয়া সাহায্য, এর মোট পরিমাণ ছিল ২৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। এখনকার মুদ্রামানে যা হবে এর আরো ৩৫ গুণ। কারণ সেকালে স্বর্ণের আউন্স ছিল ৩৫ ডলার, যা আজকের সোনা ১ হাজার ২৩০ ডলারের আউন্স ধরলে সেটা এখন ৩৫ গুণ হয়। অর্থাৎ সেকালের ২৭০ বিলিয়ন ডলার হবে একালে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার। এখানেই শেষ নয়।

ওদিকে আবার যুদ্ধ শেষে সারা ইউরোপের (সঙ্গে পুরা জাপান ও চীনেও কিছু) অবকাঠামো পুনর্গঠনের “মার্শাল প্ল্যানে” আবার নতুন করে অবকাঠামো গড়ে দিতে নতুন বিনিয়োগ করতে হয়েছিল আমেরিকাকে। নতুন এ বিনিয়োগ প্রায় বিশ্বযুদ্ধের ব্যয়ের সমান।

সেই থেকে আমেরিকা হয়ে যায় দুনিয়ার নতুন নেতা। আমেরিকান নেতৃত্বের দুনিয়া অথবা আমেরিকান নেতৃত্বের এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল। আজ প্রায় সত্তর বছর পরে এবার আমেরিকাকে পেছনে ফেলে সে জায়গা নিতে যাচ্ছে গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতা চীন। সেকালে আজকের রাইজিং অর্থনীতির চীনের মতোই উদ্বৃত্ত সঞ্চয় ছিল আমেরিকার হাতে। বিশ্বযুদ্ধের আগের সেকালে দুনিয়াকে কলোনি করে রাখাই ছিল রীতি; আর এর ভেতর নতুন উত্থিত অর্থনৈতিক শক্তি হচ্ছিল আমেরিকা, ১৮৮০ সালের পর থেকেই। বলা যায়, এরই পূর্ণতা তারা পাওয়া শুরু করেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) পর থেকে। চলতি নতুন শতকে এসে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতার ভুমিকায় উঠে আসছে।

তাত্পর্য দুই: অর্থনীতিক ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকতা, গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিকতা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরেক তাত্পর্য হলো, এ যুদ্ধ শেষের নতুন দুনিয়ায় এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হওয়া শুরু হয়।

এর মানে কী? প্রথমত. এর আগে দুনিয়ায় ক্যাপিটালিজমের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চলত ঠিকই, কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণের একটা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যেমন — কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠান সেখানে ছিল না। ফলে এ রকম কোনো নিয়ন্ত্রণও ছিল না। বিচ্ছিন্নভাবে নানা ধরনের ক্যাপিটাল মালিকদের প্রতিষ্ঠান, সেটা কোনো ব্যাংক বা কারখানা বা বাণিজ্যিক মালিকানা প্রতিষ্ঠান যা-ই হোক, তা নিজ নিজ মালিকানার পুঁজিকেই কেবল নিয়ন্ত্রণ করত, যেটা সব পুঁজি মালিকই নিজের স্বার্থে করে।

প্রথম কথা হলো, কলোনি যুগের অর্থনীতিতে কোনো ইনস্টিটিউশন— যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে মোটাদাগে নিয়ন্ত্রণ করে — এমন প্রাতিষ্ঠানিক কিছু ছিল না; তেমন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান দূরে থাকে, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান মানে যেকোনো রাষ্ট্রের অধীনে ও ভেতরে নিজস্ব রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। আজ সব রাষ্ট্রেরই একটা ‘সেন্ট্রাল ব্যাংক’ থাকে, যা দিয়ে সে নিজ অর্থনীতিকে মোটাদাগে নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া ‘সেন্ট্রাল ব্যাংক’ যেমন সময়ে সময়ে ফিসক্যাল ও মনিটারি পলিসি ঘোষণা করে। বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ করে। সরকারি বা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে, বাজারে অর্থের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু এটা কত আগে থেকে, কবে থেকে শুরু হয়েছিল?

এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে কোনো ফেনোমেনা ছিল না। ‘ব্যাংক অব ইংল্যান্ড’ ১৬৯৪ সালে জন্মের পর থেকে এটা প্রাইভেট ব্যাংক ছিল এবং ফাংশন করত। আর ১৯৪৬ সালে এসে এটা ন্যাশনালাইজড বা সরকারি মালিকানায় নেয়া হয়, সেই থেকে এটাই ইংল্যান্ডের “সেন্ট্রাল ব্যাংক” হিসাবে কাজ করছে। ১৯৪৬ সালের আগে আসলে ‘সরকারি ব্যাংক’ বলে কোনো ধারণাও ছিল না। রাষ্ট্র, সরকার, এমনকি রানীর অফিস — এসব প্রতিষ্ঠানের সব অ্যাকাউন্টের হিসাব-কিতাব ব্যাংক অব ইংল্যান্ডই দেখাশোনা করত। ব্যক্তি ক্লায়েন্টের মতোই। তবে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড মুদ্রা ছাপানোর অনুমতি পেয়েছিল, সরকারের থেকে তা নিতে হতো সমতুল্য পরিমাণ স্বর্ণ জমা রেখে।

তবে এ প্রসঙ্গে একটু ব্যতিক্রম আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক, যার জন্ম ১৯১৩ সালে। এটা আমেরিকার ৫০ স্টেটের মধ্যকার মুদ্রা ও অর্থনীতির সমন্বয়ের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কারণ ১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা লাভের পর থেকে প্রতিটি স্টেট আলাদা আলাদা নোট ছাপত। শুধু তাই নয়, প্রত্যেক স্টেটের প্রত্যেক ব্যাংক আলাদা নোট ছাপত। এছাড়া এক স্টেট অন্য স্টেটে বিনিয়োগ করতে পারত না। পরবর্তীতে প্রত্যেক স্টেটের পুঁজি সঞ্চয় এর পরিমাণ বেড়ে গেলে এ বাধা উ্ঠিয়ে দেয়া হয়, আর পরস্পরের  পুঁজি ও সঞ্চয়  বিনিয়োগ ইত্যাদির সমন্বয়ের দরকার দেখা দেয়। সেখান থেকেই ১৯১৩ সালে ফেড রিজার্ভের জন্ম। আরো পরে এটা আর পাঁচটা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো ভূমিকায়ও নামে।

কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের পরেই কেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারণার জন্ম? বিশ্বযুদ্ধের আগে নয় কেন?

এতক্ষণ সাধারণভাবে প্রাতিষ্ঠানিকতার কথা বলেছি, তবে তা রাষ্ট্রীয় সীমানার ভেতরেই কেবল এখতিয়ার— এমন প্রতিষ্ঠানের কথা।
কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরেক তাত্পর্য হিসেবে যে প্রাতিষ্ঠানকতার কথা বলছি, তা আসলে গ্লোবাল অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিকতা; রাষ্ট্রীয় সীমানার বাইরে সর্বত্র যার এখতিয়ার।

মূলত ১৯৪৪ সালে আইএমএফ (তবে সঙ্গে বিশ্বব্যাংক) গ্লোবাল অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু করে। আর আইএমএফের গ্লোবাল তত্পরতা সক্রিয় করার জন্য এরই নানা ডানার মতো সদস্য দেশগুলোয় ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ গড়ে তোলা হয়। আইএমএফের সদস্য হতে হলে কোনো রাষ্ট্রে আগে না থেকে থাকলে এবার এক কেন্দ্রীয় ব্যাংক খুলে নিতে হয়। আর কীভাবে কী কী অর্থনৈতিক তথ্য আইএমএফকে দিতে হবে সেই ফরম্যাট ও এর ট্রেনিং আইএমএফ দিয়ে দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত কনস্টিটিউশনাল স্টাটুটরি প্রতিষ্ঠান হয়, তবে স্বায়ত্তশাসিত।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, আগের কলোনি ক্যাপিটালিজম যা নিয়ন্ত্রণবিহীন চলত তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণেই নয়, বরং ক্যাপিটালিজমের অর্থনীতি এবার সারা দুনিয়ার একক গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান আইএমএফের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতে থাকল।

এই প্রথম দুনিয়া একটা নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচিত হলো— গ্লোবাল অর্থনীতি। তাহলে গ্লোবাল অর্থনীতি মানে কী দাঁড়াল, যুদ্ধের আগের কলোনি যুগে গ্লোবাল অর্থনীতি বলে কিছু ছিল না? হ্যাঁ, ঠিক তা-ই। কিছু ছিল না। তাহলে কী ছিল?

আসলে বিশ্বযুদ্ধের পরের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি শুরু হওয়া মানেই হলো তা গ্লোবাল অর্থনীতি। যেমন — একটা রাষ্ট্র সীমানার ভেতরে বাণিজ্যিক লেনদেন হলে তা একই নিজস্ব মুদ্রায় করা যায়। ওই মুদ্রার মান কত, মানে অন্য মুদ্রার সঙ্গে এর বিনিময় হার কত, তা সেখানে অবান্তর, অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন। কিন্তু যেকোনো দুই রাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যিক পণ্য বিনিময় লেনদেনের বেলায় মুদ্রা বিনিময় হার কত তা নিশ্চিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তাদের নিজ নিজ মুদ্রার মান মানে, বিনিময় হার সেখানে জানতেই হবে। কিন্তু তা নিশ্চিত জানার উপায় কী? কথাটা আরেকভাবেও বলা যায়। বাণিজ্যিক বিনিময় যদি রাষ্ট্রসীমার বাইরে হয়, মানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিনিময় লেনদেন হয়, সেই বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটা আন্তর্জাতিক মুদ্রাও তো লাগবে। এই প্রয়োজন মেটাতে যে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা, এরই প্রতিষ্ঠান হলো আইএমএফ। এক ম্যান্ডেট অনুযায়ী এর কাজ দুটো। এক. আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময় হার ঠিক করা, যাতে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র তা থেকে নিজের মুদ্রার সরকারি হার জেনে বুঝে নিতে পারে। দুই. কোনো রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক লেনদেনের অ্যাকাউন্টে ব্যালান্সের ঘাটতি দেখা দিলে তা পূরণে লোন দেয় আইএমএফ। তবে ওই ঘাটতি আর যাতে দেখা না দেয়, সেজন্য যা কিছু পরামর্শ ও করণীয় আইএমএফ দেবে, তা পালন করতে রাজি থাকা সাপেক্ষে ঐ ঋণ অনুমোদিত হবে। তবে ্মনে রাখতে হবে আইএমএফ অন্য কোন ঋণ দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। সেকাজ সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংকের, যা মূলত অবকাঠামো ঋণ বিতরণ করে থাকে।

গ্লোবাল অর্থনীতি কথাটা সেই থেকে অর্থপূর্ণ হতে শুরু করেছিল। যদিও এর ভেতর আবার চড়াই-উতরাই ক্রাইসিস সবই ছিল এবং এখনো আছে। এটা আরো অর্থপূর্ণ হয়ে উঠে আশির দশক থেকে অর্থনৈতিক গ্লোবালাইজেশন শুরু হলে। আর সবচেয়ে ইতিবাচক অর্থে গ্লোবালাইজেশন মানে হল, প্রত্যেক রাষ্ট্র যেসব পণ্য উৎপাদনে সবার চেয়ে দক্ষ, কেবল সেগুলোই সেসহ যারা তার মতনই দক্ষ, তারা মিলে সেসব পণ্য দুনিয়ার সবার জন্য উৎপাদন ও রফতানি করবে। বিনিময়ে অন্যান্য পণ্যের বেলায় সেগুলোরও দক্ষ উৎপাদকের থেকে তা আমদানি করবে।

এক অব=জারভেশন হিসাবে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ এ পর্যন্ত সব গ্লোবাল পরিবর্তনে দেখা  গেছে, কেবল সেগুলোই বাস্তবায়ন হয়েছে যেগুলোয় ‘ওয়াল স্ট্রিট’ প্রতিষ্ঠানগুলোরও সম্মতি ছিল। যেমন— কলোনি যুগের সমাপ্তি টানতে হবে রুজভেল্টের এ সিদ্ধান্তের মূল প্রভাবক ওয়াল স্ট্রিট প্রতিষ্ঠানগুলো। ওয়াল স্ট্রিট প্রতিষ্ঠানগুলো মানে হলো, যেকোনো ব্যাংক বা করপোরেট মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি অথবা কোনো বড় ম্যানুফ্যাকচারার ইত্যাদিসহ যেখানেই বড় বিনিয়োগ লাগে সেখানে বাণিজ্যিক ঋণ দেয় এমন প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ আমাদের মতিঝিলের শেয়ারবাজার পাড়ার মতো আমেরিকার নিউইয়র্কের ম্যানহাটন সিটিতে ওয়াল স্ট্রিট নামের পাড়ায় অবস্থিত বলে সেখান থেকে এমন নাম। সেখানকার সবচেয়ে এক বড় প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হল, গোল্ডম্যান স্যাকস। এরই এক গবেষক হলেন জিম ও’নিল। তিনি সাবেক ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী ও পলিসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাজকীয় চেথাম হাউজের চেয়ারম্যান। তার গবেষণার সবচেয়ে প্রভাব ফেলা কাজ হল, চীন যে ব্রিকস উদ্যোগ বা ব্যাংক বানিয়েছে, সেটা তিনি ও তাঁর দলের পরামর্শ থেকে।

সম্প্রতি তিনি খুবই ভোকাল হয়ে উঠেছেন। তার প্রসঙ্গ হলো গ্লোবাল অর্থনীতি, চাইলে যেটাকে আমরা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমও বলতে পারি। তার আর্গুমেন্ট হলো বিশ্বযুদ্ধের পর যে গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারটা তৈরি হল, এর ওপরও একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়ের প্রয়োজন, বিশেষ করে ক্রাইসিসের সময়গুলোয়। এ কাজে বড় অর্থনীতির সাত রাষ্ট্রের যে জি৭ গ্রুপ তৈরি হয়েছিল, সেটা গ্লোবাল ক্রাইসিসের সময় যথাযথ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। তার ভাষায়, জি৭ এখন জিরো, মানে অথর্ব অকেজো। এছাড়া ট্রাম্পের আমেরিকার এখন যে অবস্থান, সেটা অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের। ফলে এখন আরও যারা রাইজিং অর্থনীতির সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র— এমন টপ ২০টিকে নিয়ে জি২০ গ্রুপ গড়তে হবে।

সারকথা, গ্লোবাল অর্থনীতি কথাটা এখনো কাজে পরিপূর্ণতা পায়নি। সে লক্ষ্যে অনেক কাজ বাকি, যেখানে আমাদের মনোযোগী হতে হবে।

লেখক: রাজনৈতিক অর্থনীতি বিশ্লেষক

goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৯ আগস্ট ২০১৮ দৈনিক বণিকবার্তা পত্রিকায় বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ কবে থেকে  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

শিক্ষার্থীদের শ্লোগানের ভাষার সমাজতত্ব

শিক্ষার্থীদের শ্লোগানের ভাষার সমাজতত্ব

গৌতম দাস

০৪ আগস্ট ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2ti

 

 

শিক্ষার্থীদের স্লোগানের ভাষা – ছবি : ফেবু থেকে সংগৃহীত

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যে স্লোগান উচ্চারিত হচ্ছে, তা নিয়ে চার দিকে তুমুল অলোচনা চলছে। এ স্লোগানগুলোতে দেশের পরিস্থিতির নানা চিত্র উঠে এসেছে। গত চার দিনের চলমান রাস্তার আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদের দেয়া স্লোগানের ভাষা কী অশ্লীল, প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। এক কথায় বললে এর প্রথম জবাব হবে ‘কে আপনি’, প্রশ্নটি তুলতেছেন। আপনি যদি ক্ষমতাসীন দানব ক্ষমতার মানে দানব এস্টাবলিসমেন্টের পক্ষের লোক হন কিংবা জেনে – নাজেনে এই দানব ক্ষমতাকে সম্মতিদাতা হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার অভিযোগ হবে শিক্ষার্থীদের ভাষা ‘অশ্লীল’। আপনি দানব ক্ষমতার সুবিধাভোগী হলেও বলবেন, এটা ‘অশ্লীল’ ভাষা। ক্ষমতাসীনদের সাগরেদ হলে ‘এথিক্যাল পুলিশের’ ভূমিকায় নামতে ইচ্ছে করবে আপনার কিংবা নেমেই যাবেন। কারণ আপনি হারতেছেন – লুজিং। চ্যালেঞ্জড হয়েছেন – এরই দিশাহারা প্রতিক্রিয়া এটা!

আসলে এটাকে শ্লীল-অশ্লীলের বিষয় না বলে মানে ‘নৈতিকতার পুলিশগিরি’ পজিশন না নিয়ে বরং এটা ফরমাল বনাম ইনফরমাল ভাষার তর্ক – এভাবে বর্ণনা অর্থে সেটি বলাই সম্ভবত সঠিক হবে। স্ল্যাং (slang) বা অশ্লীল ভাষা সব সমাজে থাকে, চর্চাও হয় সমানে। [স্ল্যাংয়ের ডিকশনারি অর্থও আরও সহজ – very casual speech or writing।] মানে স্যুট-কোর্ট থুয়ে হাফ প্যান্ট পড়ে কথা বলা। এমন সমাজ দুনিয়ায় পাওয়া যাবে না যেখানকার ভাষায় স্ল্যাং শব্দ নাই বা এই শব্দের চর্চা নাই। তবে স্বভাবতই এই চর্চা হয় মূলত সমাজের ইনফরমাল পকেটগুলোতে – চায়ের দোকানে, ক্লাব আড্ডায়, সমবয়সী ও বন্ধু মহলে। তবে ফরমাল জায়গাগুলোর ভাষা যেহেতু আলাদা হয়, তাই সেখানে এই ভাষা দেখা যায় না। কিন্তু একটা কথা মানতে হবে, ভাষার মুখ্য কাজটা হল মনের কথা ঠিক ঠিক-ঠিকভাবে বাইরে আনা, যেটাকে আমরা বলি এক্সপ্রেশন বা প্রকাশ ঘটানো। লক্ষ করবেন, ইনফরমাল শব্দ মানে যার ভিতর স্ল্যাং শব্দ অন্তর্ভুক্ত – এই শব্দ অন্য যেকোন কিছু চেয়ে খুবই সফল ও সাবলীলভাবে এক্সপ্রেশন ঘটায়, অন্তত ফরমাল ভাষার তুলনায় এবং ওর চেয়ে সহজে। তুলনায় এই চমৎকার প্রকাশগুণ, এটাই ইনফরমাল ভাষা কদর পাওয়ার একটি অন্যতম কারণ। আমাদের মধ্যে খুব কম মানুষই প্রকাশগুণসম্পন্ন হয়, তাই ইনফরমাল আবহের সুযোগ পেলেই তা নিয়ে আমরা এই ভাষায় নিজেদের প্রকাশ করার সুযোগ নিয়ে নেই। মূল কারণ, সহজে এখানে নিজের মনের ঠিক ঠিক ভাব তুলে ধরা বা বাইরে আনা যায়।

তবে মনে রাখতে হবে, মূলত যেমন ধরেন রেগে গেলে বা রাগে, ক্ষোভে অথবা দীর্ঘদিনের চাপা থাকা অবস্থার মন অসহ্য হয়ে পড়লে সাধারণত আমাদের প্রকাশভঙ্গির শব্দ ইনফরমাল হয়ে যায়। অর্থাৎ ফরমালিটির কন্ট্রোল তখন অকার্যকর হয়। মনে হতে থাকে, রুলিং পাওয়ার বা শাসকসমাজ আমাকে আমল করছে না, আমার ব্যথা বুঝছে না, বুঝতেই চাচ্ছে না; তাহলে আমি কেন একপক্ষীয় তাকে আমল করার দায় নেব! ফলে ইনফরমাল শব্দ ব্যবহারকারির মানসিক অবস্থা থাকে এরকম। আর আমরা সবাই জীবনের নানান চড়াই-উতরাইয়ের স্তরে পরে কখন না কখনও ইনফরমাল স্তরে যাবার সদুযোগ নিয়ে নিজেকে হাল্কা অনুভব করার সুযোগ নিয়েই থাকি।

তার মানে দাঁড়াল ফরমাল-ইনফরমাল ভাষা বলে সমাজে একটা ফারাক, সব দেশ-সমাজে আছে আর তা বজায় বা ধরে রাখা হয় বা থাকে। ফরমাল সমাজের আড়ালে থেকে থাকা ভাষা আসলে ‘দোস্ত-বন্ধু সার্কেলের ভাষা;’ যাকে ইনফরমাল ভাষা বলছি তা সফল আয়ু নিয়ে টিকে থাকে, ফরমাল ভাষার পাশাপাশি হেঁটে চলে।

তা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু এর মানে কি এটা যে এখন থেকে দেশে ফরমাল-ইনফরমাল ভাষার আলাদা আলাদা জগৎ, ভাষার ফারাক এগুলো কি এখন থেকে উঠে যাবে? এই আন্দোলনে যারা বেশির ভাগ বা সংখ্যায় ভারী এরা মূলত ১৬-১৭ বছরের কিশোর বা তরুণ। এই ১৬-১৭ বছরের তরুণ, এরা ইনফরমাল ভাষা অবলীলায় ব্যবহার করছে – এর মানে কী এখন থেকে বাসার ড্রয়িংরুমে, ডাইনিং টেবিলে কিংবা ক্লাসরুমে এরা নিয়মিত ইনফরমাল ভাষায়ই কথা বলা শুরু করবে? পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ভাষা কি সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে? না, একেবারেই না। আসলে ঘটনা খুবই সিম্পল। আগে ফরমাল-ইনফরমাল ভাষার আলাদা আলাদা জগৎ যতটা আপনা-আপনিই বজায় রাখা যেত বা থাকত, এখন সেখানে একটা ব্যত্যয় ঘটেছে। তা ঘটিয়েছে সোস্যাল মিডিয়া। সোস্যাল মিডিয়ার কারণে ইনফরমাল জগৎ ও এর ততপরতা ফরমাল দুনিয়ায় হাজির হয়ে গেছে। অর্থাৎ ইনফরমাল ভাষা তাদের বন্ধুমহল ছেড়ে মিডিয়ার কল্যাণে সবার সামনে চলে এসেছে। আর তাতেই এত তর্ক উঠেছে। খেয়াল করলে দেখব, ফেসবুকই এ ধরনের ইনফরমাল ভাষার প্ল্যাকার্ড বা এর ছবি সবার কাছে প্রকাশ করে দিচ্ছে, ফেসবুক এর প্রধান সোর্স। পাশাপাশি তুলনা করলে দেখব, আমাদের মেন স্ট্রিম বা প্রচলিত মিডিয়া এমনকি টিভি মিডিয়ারও যাদের কাছে এমন প্ল্যাকার্ড ও এর ছবির কথা অজানা থাকার কথা নয়। কিন্তু তাদের মিডিয়ায় ইনফরমাল ভাষার খবর, এটা অনুপস্থিত। তারা কিন্তু ফরমাল জগতে একে প্রবেশাধিকার দেয়নি।

তাহলে এই ফরমাল-ইনফরমাল জগৎ ও ভাষার যে ভেদ এখন দেখা যাচ্ছে তাতে কিছু ছিদ্র দেখা গেছে, এই হল কথা। এখন এই ছিদ্র দেখা দেয়ায় আগামীতে এর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? প্রথমত, এই ভাষার ফরমাল-ইনফরমাল ভেদ কখনই উঠে যাবে না। যদিও ঠিক যেমন, অন্তত মা জানে তার সন্তান সিগারেট খায়, কিন্তু তা নিয়ে নাড়াচাড়া করার কায়দাও কেমন নরম-গরমে রাখতে হয় তা মায়েরা জানে। বাড়াবাড়ি করে না। এরকম হয়ে থেকে যাবে। ফলে হয়তো সেভাবে সোস্যাল মিডিয়ায় এটা জানাজানি ঘটা অবস্থাতেই তা থাকবে, কিন্তু আবার এই তথ্য ফরমাল সমাজ উপেক্ষা করতেও থাকবে, ফরমাল সমাজে তা আনবে না। আর সম্ভবত এটা নির্ধারিত হবে অভিভাবক মা-বাবারা সন্তানদের এই আন্দোলনের প্রতি কী মনোভাব পোষণ করছে ও করবে তা দিয়ে।

এখন পর্যন্ত যা প্রকাশিত তাতে মনে করার কারণ আছে যে, এটা কেবল ১৬-১৭ বছরের তরুণদের আন্দোলনই নয় এর পাশাপাশি এটা তাদের মা-বাবারও সম্মতির আন্দোলন। বিশেষ করে মায়েরাই মূলত সন্তানদের স্কুল-কলেজে পৌঁছে দিতে আসে সেই মায়েদেরও সম্মতিতে সন্তানদের আন্দোলন। এর একটা বড় কারণ সড়ক ও যানবাহনের অনিরাপত্তা। এমনিতেও তারা চিনায় দিচ্ছে যে নিরাপদ সড়ক – এটাই তাদের আন্দোলনের ইস্যু। তাই আমরা ধরে নিতে পারি যে এই মায়েদের পূর্ণ সম্মতি আছে পড়ুয়াদের আন্দোলনের প্রতি। অন্তত নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, আশির দশকেও তখনকার আন্দোলনে এমনটা কোনো অভিভাবককে পাওয়া যেত না যে সন্তানের আন্দোলনে অংশ নেয়াকে সম্মতি দিত। কিন্তু এখনকার পড়ুয়াদের আন্দোলনে অভিভাবকদের পূর্ণ সম্মতি আছে, এর বড় প্রমাণ হল গত চার দিনে তরুণেরা তারা লাগাতার মাঠে উপস্থিত থাকছে; বাসায় বাধা তেমন পায়নি শুধু তাই না, মায়েরা নিজেই পরের দিনও ছেলেমেয়েদের স্কুলে আনছে বা তাদের আসতে দিচ্ছে। সম্ভাব্য এর মূল কারণ হল, চরম অনিরাপদ বেপরোয়া যানবাহন আর এই নৈরাজ্যকে গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে এমন ‘পাবলিক জবাবদিহিতাহীন’ সরকার ও এর ক্ষমতা- এসবের  প্রতি মায়েদের গভীর অনাস্থা। বেপরোয়া এই ব্যবস্থা রাজীব ও মীমকে হত্যা আর সাথে আরো দশজনকে মারাত্মকভাবে পিষে মেরে ফেলার অবস্থায় আহত করেছে। কিন্তু এই বীভৎসতার অভিজ্ঞতা কেবল শিক্ষার্থীদের নয়, এটা কেবল রাজীব বা মিমেরও নয়, রাজীব অথবা মিমের ভেতর দিয়ে আসলে প্রতিটি শিক্ষার্থী ও  অনিরাপদ সড়ক তাদের নিরাপত্তা দিতে আসা মায়েরা প্রত্যেকে নিজেকেই দেখতে পেয়েছেন। ঘাতক বেপরোয়া পরিবহনের সরাসরি শিকার এখন মা এবং সন্তানেরা। তাদের সাথে রাজীব-মিমের ফারাক হল এই যে, এরা দু’জন পরিবহন নৈরাজ্যে হত্যার শিকার হয়েছে; আর এই মা-সন্তানেরা এক্সিডেন্টলি মারা যায়নি, তাই বেঁচে আছে। ফলে চরম নৈরাজ্যের বিপরীতে একটা সুস্থ সিস্টেমের এক নির্বাহী সরকার পরিচালনার অবস্থায় দেশকে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখতে মা বা সন্তান কাউকেই দাওয়াত দিতে হয়নি। এটি ভুক্তভোগীদের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের প্রকাশ। এ কারণে সোস্যাল মিডিয়ায় দেখা গেছে অনেক মা-বাবা নিজের সন্তানকে নিজেই মাঠে আইডেন্টিফাই করে বাহবা দিতে। অর্থাৎ পড়ুয়া সন্তানের সাথে সমান সরাসরি ভুক্তভোগী বলেই অভিভাবকেরা এই আন্দোলনে সম্মতি দিয়ে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে।

এই আন্দোলনকারী কারা? অনেকে এদেরকে স্কুলপড়ুয়া বাচ্চা ছেলে বলে সম্বোধন করছেন। এটা সম্ভবত অসতর্কতা অথবা আন্দোলনকারীদের প্রতি সহানুভূতি বোঝাতে ‘বাচ্চা ছেলে’ কথা যতটা না তাদের বয়স বোঝানোর শব্দ, এর চেয়ে বেশি তাদের প্রতি সহানুভূতিসূচক শব্দ। তবুও সেটি যাই হোক, বয়সের বিচারে এদের বেশির ভাগেরই বয়স ১৬-১৭ বছর। অর্থাৎ টিনএজের শেষার্ধে। এই বয়সের মূল বৈশিষ্ট্য হল, পরিবার ও সমাজকে তারা এটা জানান দিতে চায় যে, “আমি এখন স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারি, আমার চিন্তা করার ক্ষমতা যথেষ্ট বিকশিত হয়েছে, মনে বুঝাবুঝির ফ্যাকাল্টি ডেভেলপ করে গিয়েছে  ও ন্যূনতম পরিপক্বতা এসেছে। ফলে প্রতিটি বিষয় আমি কিভাবে চাই অথবা দেখতে চাই তা আমাকে আমার মত করে দেখতে ও তাকে প্রকাশ করতে দিতে হবে; আর সেই সাথে অন্যদের তা আমল করতে হবে। আপনার আইডিয়ার তলে আমাকে চেপে দেয়ার সুযোগ আর নাই”।

এরপর ১৮ বছর হয়ে গেলে এ ভাবটাকেই তো আইনসিদ্ধ মতামত জানানোর মত পোক্ত বলে মানা হয়, আমরা মেনে নেই যে তারা রাজনীতি ও নির্বাচনে ভোট বা মতামত দেয়ার যোগ্য বিবেচিত। এ জন্য উল্টো এক কমন ট্রেন্ড দেখা যায় এদের মধ্যে তা হল, তাদের মতামত প্রকাশ করতে না দিলে বা এদের ওপর চাপিয়ে দেয়া অবস্থান নিলে এরা ভয়ঙ্কর বিদ্রোহ করে, এদের প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায় জীবন দিয়ে দেওয়ার মত মরিয়া। এরা নিজেদের আমল করানো, তাদের কথা শোনানোর জন্য কোনো ২৫ বা ৩৫ বছর বয়সী মানুষের চেয়েও বহু দূর যেতে রাজি থাকে। তবে ঠাণ্ডামাথায় বুঝিয়ে বলেই একমাত্র যদি তাদের মানানো যায় বা যেতে পারে।

এসব কারণে তাদের দাবি খুবই চিন্তা করে বলা যার মূল সুর হল অনিরাপদ সড়কের তাদের আপত্তি ও অভিযোগ, সড়ক নিরাপত্তা তাদের মূল ইস্যু। দানব ক্ষমতার নৈরাজ্যের এক প্রকাশ পরিবহন নৈরাজ্য – এটা তাদের সব ক্ষোভের কেন্দ্র। পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা আজ সড়কে আহত নিজের কোনো বাসযাত্রীকে চিকিৎসা দেয়ার ঝামেলা এড়াতে নদীতে ছুড়ে ফেলে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে – পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা আজ এই ভয়ংকর অবিশ্বাস্য অমানুষের জায়গায় চলে গেছে। কেউ আর মানুষের গুণ স্বভাবে নেই। এমনকি এ ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর সরকার-মালিক-শ্রমিক নেতা কারো দিক থেকে কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বরং নতুন করে আবার দায় এড়ানোর বুদ্ধি আঁটছে তারা।

এক কথায় বললে ১৯৮৩ সালে পরিবহন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BRTA) গঠনের সময় থেকেই পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা সোজাসাপ্টা চেয়েছে – তারা লাইসেন্স কিনে নিতে পারে এমন ব্যবস্থা চায়। কোন ট্রেনিং শেষে যোগ্যতা পরীক্ষার প্রমাণ দেয়া নয়, সরাসরি কাগজ কেনা এমন একটা লাইসেন্সিং-অনুমোদন ব্যবস্থা যেন কায়েম হয়। আর সেকাজে প্রগতি বা অ-প্রগতিবাদী পরিবহণ নেতারা সকলেই এই ব্যবস্থায় সায় দিয়েছে এই অজুহাতে যে ট্রেনিং-পরীক্ষার যে ব্যবস্থাকে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া বলে এটা নাকি ‘আমলাতান্ত্রিক’। কারণ আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে গালি দিতে পারা চরম বিপ্লবীপনা মানা হয়। ফলে তারা এই আমলাতন্ত্রের অজুহাতের আড়ালে সকলেই চেয়েছে পয়সা দিয়ে কেনা যায় এমন এক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কায়েম হোক। আর আমলারাও এমন ব্যবস্থা হলে সহজেই পরিবহণের কাঁচা পয়সার ভাগ মিলবে বলে এতে সামিল হয়েছিল। এভাবে পয়সা দিয়ে কিনে নেয়ার এই ব্যবস্থায় তারা সরকারকেও শামিল করে নিয়েছিল। সেটাই এখন ভয়াবহ দানব মহীরুহ হয়েছে। তাই গরু-ছাগল চিনলেই লাইসেন্স দিতে হবে- এটা মন্ত্রী এখন প্রকাশ্যেই দাবি করছেন। অথচ মূল ব্যাপারটা হল, লাইসেন্স বা অনুমোদন যদি কিনেই নেয়া যায়, এরপর তা কি আর ‘লাইসেন্স’ বলে বিবেচ্য হতে পারে? না সেটা লাইসেন্স থাকে? সেটা তো তখন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষালব্ধ দলিল অর্থে লাইসেন্স নয়, এক টুকরো কাগজ মাত্র। এটা চিন্তা করা অবস্থায় সরকার-মালিক-শ্রমিকেরা কেউ নেই। আসলে সরকার-মালিক-শ্রমিকের মিলিত এক সিন্ডিকেট বিআরটিএ’র মাধ্যমে মানুষ মারার ‘লাইসেন্স’ কেনাবেচা করছে মাত্র। আর অন্যদিকে পরিবহনের এই মন্ত্রী-মালিক-শ্রমিকদের গুণ্ডামির এরা এক কোটারি ক্ষমতা, এটাকে দানব সরকার নিজের ক্ষমতায় থাকার ক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে বলে তাদের মধ্যে এই দেয়া-নেয়ার সম্পর্কের সিন্ডিকেট, সে আরো চরম বেপরোয়া। অর্থাৎ সরকার মালিক-শ্রমিকদের এই সিন্ডিকেট প্রমাণ করেছে বিআরটিএ আসলে একেবারেই অপ্রয়োজনীয় এক সংগঠন। কার্যকর কোনো রাষ্ট্র-সরকার ও বিআরটিএ সব কিছু একেবারেই বাস্তবত অপ্রয়োজনীয়, খামোখা। এই জায়গা থেকে দেখলে বোঝা যায় টিনএজ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন আমাদের বলতে চাচ্ছে, তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য আসলে নতুন রাষ্ট্র-সরকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠন।

তাহলে ব্যাপারটা শুধু পরিবহন নৈরাজ্য নয়, খোদ রাষ্ট্র ও সরকারই এক নৈরাজ্যের দানব, প্রধান পৃষ্ঠপোষক। এরই প্রধান প্রতিভূ যাকে মাঠের লড়াকু তরুণেরা সম্মুখ মোকাবেলা করছে, তারা হলো পুলিশ। পুলিশ হয়ে উঠেছে নৈরাজ্যের দানবীয় প্রতীক।

ফলে তরুণদের স্লোগানের টার্গেট মূলত পুলিশ ও ক্ষমতা। কিন্তু এই পুলিশ ও ক্ষমতা এটা নষ্টা, বিচ্যুত ও অধঃপতিত। “পুলিশ তুই কোন চ্যাট@র বা@…”। অর্থাৎ তুই আমার কাছে, আমার চোখে তুচ্ছ – এটাই আন্দোলনকারীদের বক্তব্য-বয়াত্নের সার কথাটা। সারকথায়, তাই একে তুচ্ছজ্ঞান করে দেয়া। কারণ, নষ্টা ক্ষমতা, despotic বা ‘দাগী’ ক্ষমতা সে তো পশমের মতোই তুচ্ছ। এই বয়ান হাজির করাই তরুণদের আন্দোলনের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চরম রাগ-ক্ষোভে বিক্ষুব্ধ হয়ে কাউকে তুচ্ছ জ্ঞান করে দেয়া- সে কিছুই না, তাকে সে মানে না পাত্তা দেয় না; এটা বোঝানোর ক্ষেত্রে ইনফরমাল ভাষা- এক্সপ্রেশন হিসেবে অতুলনীয়, আনপ্যারালাল। তাই পুলিশ সম্পর্কিত সব স্নোগানই তাদের তুচ্ছ জ্ঞান করার ভাষা। ইনফরমাল ভাষা যাকে বলি। এখন আপনি দানব ক্ষমতার বেনিফিসারি হলে ওর সাথে থাকলে, আত্মীয় হলে তো এই ভাষার বয়ান নিজের স্বার্থে আঘাত খেয়ে প্রতিক্রিয়ায় নিচা দেখাতে একে ‘অশ্লীল’ বলতে চাইবেনই। তাহলে দেখা যাচ্ছে শেষ বিচারে শ্লীল-অশ্লীল ব্যাপারটা পৌঁছাল যে, এটা আসলে ক্ষমতার প্রশ্ন। আপনি দানব ক্ষমতার আত্মীয় হলে দানব ক্ষমতার চ্যালেঞ্জকারীকে অশ্লীলই বলবেন।

একটা ১৬-১৭ বছরের ছেলে বা মেয়েও ওপর পুলিশ লাঠি তুলছে, পেটাচ্ছে বা ভয় দেখাচ্ছে – এমন অনেক ছবি মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। কিন্তু সব ছবিতেই দেখবেন তরুণদের ভিতর কোনো ভয় পাওয়ার চিহ্ন নেই, সটান দাঁড়িয়ে আছে, একটুও হেলেনি, মার থেকে বাঁচার চেষ্টা নেই। অথচ ঐ উদ্যত লাঠির বাড়ি পড়লে মাথা দুভাগ হবার সম্ভাবনা। তবু সে ভয়ডর কারও ভিতর কাজ করছে মনে হয় না। কেউ একজন ১৬-১৭ বছরের ছেলে বা মেয়ে – এরই হুবহু প্রতীক হল এ ছবিগুলো। সে বলতে চায়, সে স্বাধীন চিন্তা করতে সক্ষম। ফলে তাকেও আমল দিতে হবে। তার কথা শুনতে হবে।

গ্রীক এক প্রবাদ আছে, যা আপনি কাউকে দিবার যোগ্যতা রাখেন না মুরোদ নাই তা কারও থেকে কেড়ে নিবারও আপনি কেউ না, আপনার সে অধিকার নাই। সুর্যের আলো আপনি কাউকে দিতে পারেন না, সে যোগ্য আমরা কেউ নই। তাহলে কারও সুর্যের আলো পাওয়ার পথে আপনি বাধা হতে পারেন না। সে অধিকারই নাই। মীমের বাবা-মার কথাই ধরা যাক। তারা নিম্ন মধ্যবিত্ত, বড় জোর ২৫ হাজার টাকার মধ্যে নিরন্তর কষ্ট করে সংসারে মাসের সব খরচ চালাতে বাধ্য হন এমন পরিবার। আশা করার মত তাদের কিছু নাই। কিন্তু এধরণের জীবন নিয়ে মানুষ বেচে থাকে কেন? বাকি জীবনে এর পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা নাই। তাহলে কী আছে যা তাদের বাঁচিয়ে রাখে? আত্মহত্যা করতে দেয় না, বাঁচতে আগ্রহ যোগায়? সেই উসিলাটা কী? ঘনিষ্ট হয়ে বসে এদের যদি জিজ্ঞাসা করেন তাহলে শুনবেন “বাচ্চাদের মুখের দিকে চেয়ে বেচে আছি”। এক স্বপ্ন আছে যা তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখে, বেঁচে থাকতে প্রেরণা দেয়। অর্থাৎ মা-বাবারা বুঝে গেছে তাদের প্রজন্ম গেছে। কিন্তু পরের প্রজন্মের সময়ে জীবনমান অবস্থা বদলের স্বার্থে নিজের প্রজন্মকে বলি দিতে রাজি আছে।  যেমন আশা করে থাকে যে মীম পড়ালেখা করে বড় হলে একটা (সরকারি) চাকরি পেলে তাদের চির দুঃখের অবসানে তাদের জীবনযাত্রার মান এক নতুন স্তরে উতীর্ণ হতে পারে। কিন্তু মীমের মৃত্যু তাদের পাচজনের পরিবারের সবস্বপ্ন ভেঙ্গে চুড়মার করে দিয়েছে। জীবন ও এতদিনের দাতচেপে ধরে করা কষ্ট সব এখন অর্থহীন হয়ে গেছে। রাষ্ট্র তাদেরকে একটা নুন্যতম অভাবপুরণের জীবন দিতে পারে নাই। তাহলে রাষ্ট্র-সরকারের কী অধিকার আছে তাদের স্বপ্ন ছিনিয়ে নিবার? কিন্তু এর জবাব দিবার কেউ নাই। কারণ মীমের পরিবারের সংগ্রাম আর তাদের দিক থেকে জীবনকে একবার দেখারও কেউ নাই! আমরা এমন সমাজ-রাষ্ট্রে বসবাস করছি।

তাহলে আগামীতে কী হবে? প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা কী বুঝবেন বা বুঝেছেন- তারা কার মুখোমুখি হয়েছেন, কার সাথে ডিল করছেন? এর জবাব সম্ভবত হতাশাব্যঞ্জক হবে! তারা বুঝবেনই না; অথচ  কী শক্তি ছিল অদমনীয় ১৬-১৭ বছরের এই তরুণদের ভিতর। কাজেই মাননীয় ক্ষমতা- আপনি পরাজিতই হবেন। আপনারা নো বডি, তুচ্ছ! তাহলে আমরা কি একটা ম্যাসাকার দেখতে যাচ্ছি। এক কঠিন সময়ের প্রান্তে আমরা।

[এই রচনাটা লিখতে যাদের ফিল্ড রিপোর্ট আমাকে খুবই সাহায্য করেছে, বিশেষ করে আলনোলনরত মা-সন্তানদের তথ্য আর অথবা রাজীব ও মীমের পারিবারিক তথ্য – এসবগুলোকে আমার ইমাজিনেশনে নিতে পেরেছি, তা নিয়েছি দৈনিক প্রথম আলো থেকে। তাদের রিপোর্টিং সত্যিই ছিল প্রফেশনাল যা আমাকে খুবই সহায়তা করেছে। তারা জানে তারা কি করছে। আর আমার দিক থেকে, কারণ সমাজতত্বের আলাপ তুলতে গেলে যে ধরণের নুন্যতম তথ্য দরকার হয় তা একমাত্র প্রথম আলোতেই ছিল। তাদের সকলকে তাই আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। ]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০২ আগস্ট ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “শিক্ষার্থীদের স্লোগানের ভাষা”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]