চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস কী তৃতীয়পক্ষের নাগালে

 

চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস কী তৃতীয়পক্ষের নাগালে

গৌতম দাস

১৫ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2uW

ইমরান খান ও শি জিনপিং – ছবি : সংগ্রহ

পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কেমন? মানে সম্পর্ক বলতে ভেঙ্গে বললে, স্ট্রাটেজিক, ইকোনমিক বা পলিটিক্যাল সম্পর্ক কেমন, এই হল প্রশ্নটা। কোন দুই রাষ্ট্র তা ঘোষণা দিয়ে বললে  স্বভাবতই তা বুঝতে সহজ হয়। তবে না বললেও আন্দাজ অনুমান করে অনেক কিছুই প্রায় সঠিক জানা যায়। আসলে আমেরিকা এবং বিশেষ করে ভারতের সবচেয়ে গভীর আগ্রহ হল, স্ট্রাটেজিক দিক থেকে পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কী – তা জেনে ফেলার। ভারতের এই আগ্রহের তীব্রতা টের পাওয়া যায়, তাদের সব মিডিয়ায় ব্যবহৃত একটা শব্দ থেকে। সেটা হল, “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” (all weather friend); যেমন তারা খোঁচা দেওয়া মন্তব্য হিসাবে প্রায়ই লিখে থাকে যে – চীনের “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” পাকিস্তান ওমুকটা করতে যাচ্ছে……। তবে “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” লেখাটা যতটা না খোঁচা দিয়ে বলা এর চেয়ে বেশি এটা আসলে এক ঈর্ষামূলক আক্ষেপ। “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” মানে যারা খারাপ বা ভাল যে কোন পরিস্থিতিতেই বন্ধুই থেকে যায়। এছাড়াও আর একটা বিষয় হল, সাধারণভাবে স্ট্রাটেজিক দিক থেকে পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কী তা জানাবুঝা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট করে “চীন-পাকিস্তান করিডোর প্রকল্পের” [CPEC projects] পিছনে স্ট্রাটেজিক বিষয়াদি কী লুকানো আছেও তা জানতে ভারত ও আমেরিকা বিশেষভাবে আগ্রহী।

পাকিস্তানে ইমরান খানের সরকার এ’এক নতুন ধরনের ক্ষমতা। আমাদের আগের দেখা বা পুরনো অভিজ্ঞতায় যেসব ধারণা আছে তা থেকে এটা একেবারেই ভিন্ন। আমাদের মত রাষ্ট্র মাত্রই, আমরা সাধারণত দেখি এক বিশেষ কোটারি অথবা ব্যক্তিস্বার্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট ও দুর্নীতি সেখানে ঘটবেই। এটা গেল এক দিক আর অন্য দিকে থাকবে ঐ গোষ্ঠী নিজেদের কোটারি কোনো লাভালাভের লোভে বিদেশী কোনো স্বার্থের পক্ষে কাজ করবে। এগুলোই আমাদের মত প্রায় সব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই মুখস্তের মত আমরা দেখতে অভ্যস্ত। এই অবস্থায় পাকিস্তানের ইমরানের আগমন অন্তত এই অর্থে নতুন যে, এই ক্ষমতা আমাদের দেখা বা জানা থেকে একেবারেই ভিন্ন। এখানে অনেক কিছুই আমরা ভিন্ন দেখব, তা অনেকেই আশা করে।

কিন্তু কতটুকু নতুন বা ভিন্ন? সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে পাকিস্তানের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে চোখ ফিরানো দরকার। সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, পাকিস্তান পাকিস্তানের জন্য কাজ বা পদক্ষেপ নিতে পারে না। অন্তত পারেনি। পাকিস্তান আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করে এসেছে সেই ১৯৭৯ সাল থেকে, যে ধরনের যুদ্ধকে আমরা ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ বলি। মানে অন্যের স্বার্থে তার যুদ্ধের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে সেই যুদ্ধ করে দেওয়া বা নিজে ব্যবহৃত হয়ে যাওয়া। যেখানে সাধারণভাবে  প্রক্সি মানে হল, স্কুলের ক্লাসরুমে নাম ডাকার সময় অনুপস্থিত বন্ধুর হয়ে “উপস্থিত” বলার মত। আমেরিকার হয়ে পাকিস্তানের প্রক্সি যুদ্ধ খেটে দেওয়া – এবিষয়ে আদি গ্লোবাল ঐতিহাসিক ঘটনা বা শুরুর ঘটনাটা হল, ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব হওয়া, আর তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনস্ত মধ্য এশিয়ায় এই বিপ্লবের প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে এই ভয় পেয়ে  সোভিয়েত ইউনিয়নের (বাফার গড়তে) আফগানিস্তান দখল করা; আর এবার তা ঠেকাতে বা উল্টে দিতে আমেরিকা, পাকিস্তানকে দিয়ে এর বিরুদ্ধে নিজের প্রক্সি যুদ্ধ শুরু করা – মানে মোজাহিদিন লড়াই শুরু করা – এটা ছিল প্রথম পর্ব। আর এরই লেজ ধরে দ্বিতীয় পর্বে, আলকায়েদা-তালেবান বনাম আমেরিকার ওয়ার-অন টেরর যুদ্ধে এরই ময়দান হিসেবে পাকিস্তানের ব্যবহৃত হওয়া, যুদ্ধে ঝাপায় পড়ার পাটাতন হিসাবে আমেরিকাকে পাকিস্তানের ভুমি ব্যবহার করতে দিয়ে নিজে আমেরিকার যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া।

ফলে এই দুই ইস্যুতে গত ৩৮ বছর ধরে পাকিস্তান অন্যের হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। না এটা অবশ্যই পাকিস্তানের স্বেচ্ছায় করা কাজ নয়। এছাড়া এর মধ্যে তা যতটা না নিজ স্বার্থে এর চেয়ে অনেক গুণ বেশি আমেরিকান স্বার্থে আর আমেরিকার চাপের বাধ্যবাধকতায় পাকিস্তান করেছে। এই অবস্থা বিবেচনায় নিলে বলতেই হবে যে পাকিস্তান আর আমাদের মত এক আম- রাষ্ট্রের মতো থাকেনি। এ এক বিরাট ব্যতিক্রমী, বিশেষ রাষ্ট্র হয়ে গেছে। যে নিজের স্বার্থ না থাকলেও আমেরকান স্বার্থে নিজেকে ব্যবহৃত হতে দিয়েই শেষ হয় নাই। এরপর আবার আমেরিকাই অভিযোগ তুলেছে পাকিস্তান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। এই বিচারে পাকিস্তান আমাদের মত একই পাল্লায় তুলনাযোগ্য রাষ্ট্র কি না সেই প্রশ্ন অনেকে তুলতে পারেন। তবে এই আলোকেই সার কথাটা হল, গত ৩৮ বছরে পাকিস্তান পাকিস্তানের জন্য, নিজের জন্য রাষ্ট্র থাকেনি, কাজ করেনি।

কিন্তু ওদিকে আরেক সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটা হল, পাকিস্তান নিয়ে যেকোনো আলোচনার সময় বেশির ভাগ মানুষ পাকিস্তান রাষ্ট্রের যেকোন সিদ্ধান্ত যে পাকিস্তানের নয় – এই প্রক্সি-খেটে বেড়ানো, বিশেষ করে আমেরিকান স্বার্থের দায়ের বাধ্যবাধকতায় চলে বেড়ানো, সে কথা মনে রাখে না। মনে রেখে কথা বলে না। পাকিস্তান যেন স্বাধীন – এই অনুমান ধরে নিয়ে এরপর পাকিস্তানের সমালোচনা ও মূল্যায়ন শুরু করেন। সবচেয়ে তামাশার কথা হল, বুশের আমল থেকে পরের সব আমেরিকান প্রশাসন পাকিস্তানের যেকোনো সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ যে আমেরিকারই স্বার্থে প্রক্সি পদক্ষেপ সে কথা স্বীকার না করে, দায় না নিয়ে উল্টো পাকিস্তানের সমালোচনা করে থাকেন।

তবু এগুলোও মূল বিষয় নয়, আরো দিক আছে। তা হল, প্রক্সি যুদ্ধের এই কালের  পাকিস্তানের অপর দুটা রাজনৈতিক দল,  নওয়াজ শরীফের পিএমএল (PML-N) আর ভুট্টো পরিবারের পিপিপির (PPP) ভূমিকা। তারা এই প্রক্সি যুদ্ধের পাকিস্তান পরিস্থিতিতে নিজেরা যে ন্যক্কারজনক ভূমিকা নিয়েছে তা হল – যেহেতু আমেরিকান ইচ্ছা, চাহিদা বা সিদ্ধা্নতের পক্ষে থাকা তাদের আমলের সরকারের পক্ষে এড়ানো বা ভিন্ন কিছু করা সম্ভব নয়, তাই ক্ষমতায় থেকে চুরি আর লুটপাটের বন্যা বইয়ে দেয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ – কারণ আমেরিকানদের খেদমতে খেটে যাবার করার কারণে ক্ষমতা তো নিশ্চিত! আর তাতে দায় দোষারোপ সব আমেরিকার ওপর দেয়া যাবে। এই দুই দল এখান থেকে পাকিস্তানকে দেখেছে – আর এটাই পাকিস্তানের দুরবস্থায় সবকিছুর উপরে দুর্ভাগ্যের দিক। এ কারণে আজ পাকিস্তানের ক্ষমতার করিডোরের আলাপে এক চালু হিসাব হল, নওয়াজ অর্থ লোপাট করে বিদেশে রেখেছে দুই বিলিয়ন ডলার, আর ভুট্টো পরিবার রেখেছে এক বিলিয়ন ডলার।

এভাবে পাকিস্তানের অর্থনীতি ফোকলা অবস্থায়। পাকিস্তানের নির্বাচনে ইমরান এবার ক্ষমতায় এসেছেন। লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট স্বাক্ষ্য দিয়ে, ডাটা ও গ্রাফ এঁকে দিয়ে বুঝিয়ে, বলছে পাকিস্তানের চরম খারাপ অর্থনৈতিক দুরাবস্থার জন্য ইমরান দায়ী নয়। আগের সরকার নওয়াজ শরীফ দায়ী। [The economy’s troubles are not Mr Khan’s fault.]   তবে বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের দেউলিয়া এই অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে এখন ১৩ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। পাকিস্তান রুপির ডলার বিনিময় মূল্যমান গত এক বছরে ৯১ থেকে নেমে এখন ১৩৪ রুপিতে ঠেকেছে। কথাগুলো বলা হচ্ছে এ জন্য যে, ইমরানের ক্ষমতার শপথের পরের প্রথম মাস তার কেটেছে সৌদি, চীন নাকি আইএমএফ  – কার কাছ থেকে নুন্যতম ঋণ-মুক্তির অর্থ বা “বেল আউট”-এর অর্থ পেতে পারে সেই খোঁজাখুঁজিতে। সৌদিদের উপর প্রবল ভরসা করে ইমরান নিজেই প্রথম সফর হিসাবে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। কিন্তু তারা ঋণ দেওয়ার বদলে, CPEC projects এ বিনিয়োগের শেয়ার নিতে স্বেচ্ছায় এক পালটা প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ইমরানের বিবেচনায় সঠিকভাবেই এই প্রস্তাব কার্যকর করতে গেলে চীনের সাথে পাকিস্তানের  সম্পর্কে খামোখা নতুন জটিলতা দেখা দিতে পারে। কারণ সৌদি প্রস্তাবে একমত হতে চীনকেও বুঝাতে হবে, রাজি করাতে হবে ইত্যাদি অনেক ব্যাপার আছে। তাই সৌদি প্রস্তাব ফেলে রাখা ছাড়া ইমরান উপায় দেখেন নাই।  

ইতোমধ্যে সর্বশেষ খবর হল, শেষমেশে, ইমরানের সিদ্ধান্ত – পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে আইএমএফের কাছে সাত বিলিয়ন ডলারের বেল আউট ঋণ চেয়ে আবেদন পেশ করেছে। আনুষ্ঠানিক ভাষায়, এটা পাকিস্তানের “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতি” মিটানোর ঋণ। 

গ্লোবাল অর্থনীতির (Global Economic Order) দিক বিচারে এশিয়ায় এখন এটা মূলত চীন-আমেরিকার লড়াইয়ের যুগ চলছে; অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে পালাবদলে এটা আমেরিকার জায়গায় চীনের আগমন ও সেই স্থান দখলের কাল। এই লড়াইটা, আমেরিকার দিক থেকে এটা তার প্রভাব ও ক্ষমতার পতন যতদুর সম্ভব ঠেকানোর লড়াই। আর চীনের দিক থেকে নিজের প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়িয়ে নিজে উত্থান নিশ্চিত করার লড়াই। এ দিকে এই মূল লড়াইয়ে ক্রমশ হারু পার্টি আমেরিকা, একাজে বাড়তি সুবিধা পেতে  ভারতকে নিজের পক্ষে রাখার চেষ্টা করছে দেখা যায়। যদিও সবসময় আবার তা নিজ অন্য স্বার্থের দিকে তাকিয়ে সম্ভব করে তুলতে পারে না, সেকথাও সত্য।

চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্প (China–Pakistan Economic Corridor বা CPEC projects) – মোট ৬২ বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প যা উত্তর দক্ষিণ বরাবর পাকিস্তানের বুক চিড়ে করাচির গোয়াদরের গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তানের সীমানা পেরিয়ে একেবারে চীনের জিনঝিয়াং (Xinjiang Uyghur Autonomous Region) উইঘুর প্রদেশের কাশগড় পর্যন্ত এক হাইওয়ে তৈরি হচ্ছে। তাই এই প্রকল্পটা আসলে চীনকেই পাকিস্তানের করিডোর দেয়া। অর্থাৎ পুরোটাই কেবল পাকিস্তানের স্বার্থে নেয়া কোনো অবকাঠামো প্রকল্প নয়। চীনের উইঘুর প্রদেশ ল্যান্ডলকড অঞ্চল; ফলে এর বধ্যদশা ঘুচাতে, অঞ্চলটাকে সমুদ্রপথেও যোগাযোগ করিয়ে দিতে, রাজনৈতিকভাবে উইঘুর মুসলমানদের মন-জয় করতে, তাদের পিছিয়ে থাকা দশা থেকে মুক্ত করতে  – চীন এটা নিজের জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প মনে করে।

কিন্তু আমেরিকা (সাথে ভারতও) নিজেদের সন্দেহ ও স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থে চীন-পাকিস্তানের এই বাস্তব বৈষয়িক ঘনিষ্ঠতার চরমতম বিরোধিতা করে থাকে। পাকিস্তান আমেরিকার প্রভাবের হাত থেকে ছুটকারা পেয়ে যাচ্ছে এই প্রকল্পের মত তৎপরতার কারণে। ফলে এই প্রকল্প পুরোটাই আমেরিকান স্বার্থের বিরোধী বলে এরা দেখে। কিন্তু ওদিকে আমেরিকা ও ভারতের জন্য আর এক চরম অস্বস্তিকর একটা ফ্যাক্টস হল, করিডোর প্রকল্প পাকিস্তানের মূল চার প্রদেশকে এক সাথে এক জায়গায় এনেছে। এই প্রকল্প পাকিস্তানের সব প্রদেশের ওপর দিয়ে গেছে, তাই এটা কেবল কেন্দ্রের নয় পাকিস্তানের সব প্রাদেশিক সরকারও স্বাধীনভাবে নিজের স্বার্থের দিক থেকে এই প্রকল্পকে  অনুমোদন করে স্ব স্ব প্রাদেশিক পার্লামেন্টেও সিদ্ধান্ত পাশ করেছে। এমনকি বেলুচিস্তান যেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আছে তাদেরও কোনো পক্ষই এই প্রকল্পের ঠিক বিরোধী নয়।

এসব কিছুর মূল কারণ সব প্রদেশের জনগণও এই প্রকল্পকে দেখে থাকে এক হাইওয়ে ধরে রপ্তানিতে গভীর সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানোর সুযোগ, এতে রপ্তানি বাণিজ্যে সক্রিয় হতে নিজ নিজ প্রাদেশিক স্বার্থেও বিকশিত হওয়ার জন্য এই প্রকল্পকে বিরাট নিয়ামতের মত মনে করে। ফলে চার প্রদেশ অন্তত একটা ইস্যুতে পুরো পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। আবার চীনেরও স্বার্থে এই অবকাঠামো প্রকল্প ব্যবহৃত হবে বলে এর অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি নিশ্চিত করার দায়ভার এবং এর ঋণ পরিশোধের দায়ভার পাকিস্তানের সাথে চীনেরও। কিন্তু এসব বিষয়গুলো কিভাবে পারস্পরিক চুক্তিতে লেখা আছে – সেটা বিলিয়ন ডলারের এক কৌতূহল আমেরিকার (সাথে ভারতেরও) কাছে। তাদের গভীর অনুমান যে চীন-পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক সামরিক বোঝাবুঝি এই চুক্তির মধ্যে প্রতিফলিত থাকবে।

আসলে অর্থনৈতিক স্বার্থ মানেই সাথে জড়ানো থাকে সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থঃ
এই প্রকল্পের শিরোনামেই বলা আছে এটা “অর্থনৈতিক” প্রকল্প। অর্থাৎ এটা কোন সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থে নেয়া যুদ্ধ করার প্রকল্প নয়। তবুও তাতে কিছু এসে যায় না। কারণ শতভাগ যেকোন অর্থনৈতিক প্রকল্পেও ওর নিরাপত্তার দিক থাকবেই; ফলে সেই সুত্রে ওর সামরিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থের দিকও থাকেই, তা আলাদা করা যায় না। এই ব্যাপারটা আমেরিকা বা ভারতের বেলায়ও সমান সত্য। যখন চীন অর্থনৈতিক ভাবে কেবল জাগতে শুরু করছে কেবল, সেই ২০০৮ সালের একটা ঘটনা হল – মার্কিন কংগ্রেসের ফরেন এফেয়ার হাউজ কমিটির সামনে এক মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হায়ার করে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের আলোচনায় চীন উত্থানের প্রভাব কী এনিয়ে মুল্যায়ন রিপোর্ট করিয়ে নেয়া হয়েছিল। এরপর সেই প্রফেসরকে কংগ্রেস কমিটিতে শপথ করিয়ে যেমন জেরার শুনানি চলে তা চলেছিল। যেখানে প্রফেসর স্বাক্ষ্য দিয়ে বলেছিল চীনের অর্থনীতিতে বাধা সৃষ্টি করে একে ডুবিয়ে দিবার উপায় কী। চীনে জ্বালানি তেল আনা আর রপ্তানি পণ্য পাঠানোর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথে, চোকিং পয়েন্ট মানে ঠুটিই চিপে শ্বাস রুদ্ধ করে ধরা সম্ভব এমন এক চিকন হয়ে পড়া নৌচলাচল পথের অংশ আছে, (Strait of Malacca বা বাংলায় মালাক্কা প্রণালী নামে) মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার মাঝে। যা চিপে ধরলে মানে এই ৯০০ কিমি চিকন হয়ে থাকা নৌপথে – ইচ্ছা করে কোন জাহাজ ডুবিয়ে নৌচলাচল ব্লক করে দিলেই চীনের অর্থনীতি ডুবিয়ে দিতে আমেরিকাকে আর যুদ্ধ করতে লাগবে না। এই ছিল ঐ প্রফেসরের যুক্তি ও পরামর্শ। এখন আমেরিকান সিনেট যদি চীনের ক্ষতি  করতে এই আলাপ করতে পারে তাহলে চীন পালটা তার দুর্বল জায়গা – ঐ মালাক্কা প্রণালীর অনেক অনেক বিকল্প তৈরি করে রাখবে না কেন?  আর চীন তা করলেই, “চীন অর্থনীতির সাথে সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থ” মিলিয়ে ফেলছে –  আমেরিকা ও ভারতের এই ভুয়া চিৎকার অর্থহীন।  ফলে পাকিস্তানের গোয়াদর অথবা শ্রীলঙ্কার হাম্বানতোতায় [এমন কি হবু বাংলাদেশের সোনাদিয়ায়ও আর একটা ] গভীর সমুদ্র বন্দর বানিয়ে তা ব্যবহার করে – চীন মালাক্কা প্রনালীর বিকল্প ব্যবস্থায় বাণিজ্যিক পণ্য চলাচলের উপায় করে নিবে – এটাই কী সবচেয়ে স্বাভাবিক নয়? এই অবস্থায় চীন গভীর সমুদ্র বন্দর বানিয়ে কেবল “ভারতকে মুক্তা মালার মত ঘিরে ফেলতেছে”, তাই ভারতের হাসিনাকে চাপ দিয়ে  বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় আর একটা বন্দর করা ঠেকিয়ে রাখতে হবে – এসব বক্তব্য কোন এক পেত্নির নাকি-কান্না ছাড়া আর কী? তাহলে সারকথা, কোন অর্থনৈতিক প্রকল্প যত বড় হবে তাতে উল্লেখ করা থাক আর না থাক, ওর সাথে সাথে এক সামরিক -স্ট্রাটেজিক স্বার্থ জড়িয়ে থাকা ততই বেশি সম্ভাবনা তৈরি হবে। সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোন (৫ থেকে ৬২ বিলিয়ন ডলারের) বড় বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রকল্প কোন রাষ্ট্র কেন নিবে? বরং নিতেই পারে না।

কিন্তু প্রশ্ন এত দূরে কেন উঠছে? কারণ, পাকিস্তান ঋণের জন্য আইএমএফের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদনের পরে এখন আইএমএফ টিমের চলতি সপ্তাহেই পাকিস্তান সফর এবং মূল্যায়নে বসা নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে খবর হল, পাকিস্তান সফর করছে এমন আইএমএফের টিম বলেছে, তাদেরকে CPEC করিডোর প্রকল্পও ক্ষতিয়ে দেখতে হবে যাতে তারা বুঝতে পারে, পরিষ্কার ধারণা পেতে পারে যে পাকিস্তানকে ঋণ দেয়া আইএমএফের জন্য কতটা রিস্ক বা দায় নেয়া হয়ে উঠতে পারে। যদিও পাকিস্তান এই আবেদন প্রত্যাখান করেছে। কিন্তু ভারতের মিডিয়া প্রবল আগ্রহ তৈরি করেছে যে এইবার “আঙ্কেল স্যাম” তাদেরকে CPEC করিডোর চুক্তির হদিশ পাইয়ে দিবেই।

এখানেই হল আসল ইস্যু। আগেই বলেছি, আমেরিকার (সাথে ভারতও) কাছে তাদের অনুমান হল, চীন-পাকিস্তানের ওই প্রকল্পের চুক্তিতে চীন-পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক সামরিক বোঝাবুঝি কী আছে তা এই চুক্তির মধ্যে প্রতিফলিত থাকবে। তাই তাদের প্রবল কৌতূহল ওই চুক্তিতে কী আছে তা জানার।

এখন আইএমএফকে দিয়ে চুক্তির “স্টাটেজিক তথ্যের দিক হাতিয়ে”  আমেরিকা কি তার সেই প্রবল আগ্রহ আর কৌতূহল মিটিয়ে নিতে পারবে?
আমরা স্মরণ করতে পারি, ইমরান খান সরকারের শপথ নেয়ার মুহূর্তে পাকিস্তানের লোন প্রসঙ্গ উঠতেই আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেই হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠেছিলেন, “আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়ে চীনের ঋণের দায় শোধ করা যাবে না”। [Pompeo warns against IMF bailout that pays off Chinese lenders]। এটা অবশ্যই আমেরিকার কোন বুদ্ধিমান মন্তব্য ছিল না। ছিল, ডুবে যাচ্ছে এমন মরিয়া এক আমেরিকান আস্ফালন।

তাই মনে করার কারণ আছে যে, আইএমএফের প্রেসিডেন্ট লাগার্দের (Christine Lagarde) কথিত এখনকার মন্তব্য যে আমাদেরকে “CPEC করিডোর প্রকল্পও ক্ষতিয়ে দেখতে হবে” [যদিও কোন মিডিয়াই লাগার্ডে বা আইএমএফের কোন কর্ককর্তার সরাসরি বরাতে একথা বলতে পারে নাই। সবাই “সোর্স বলেছে” বলে লিখেছে। ] এটা আগের পম্পেই হুঙ্কারেরই নরম ও কারেক্ট ভার্সন। এখন দেখার বিষয় চীন-পাকিস্তান করিডোর চুক্তি পুরোটাই বা অংশ ওপেন না করেও পাকিস্তান আইএমএফের ঋণ হাসিল করতে পারে কি না!

তবে ভারত ও আমেরিকার দুটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা এখানে আলাদা করা দরকার। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণ কী, চীনা CPEC করিডোর প্রকল্পের ঋণ? এপর্যন্ত কোন দেশি বা বিদেশি মিডিয়া রিপোর্ট এই দাবি করেছে এমন দেখা যায় নাই। কিন্তু সকলেই এমন একটা অস্পষ্ট ইঙ্গিত করার চেষ্টা করে থাকে। ইমরানের পাকিস্তান সরকার এবিষয়ে নিজেই কিছু ফ্যাক্টস প্রকাশ করে এমন ইঙ্গিত ও প্রপাগান্ডাকে নস্যাতে উড়িয়ে দিয়েছে।  ইমরানের সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় – তারা বলেছে, “The CPEC deals are open and transparent,” said Noor Ahmad, a spokesman for the Ministry of Finance.

এছাড়া জানিয়েছে, পাকিস্তানের এপর্যন্ত প্রাপ্ত মোট বিদেশি ঋণ ৯৫ বিলিয়ন ডলারের, যার মধ্যে মাত্র ৬ বিলিয়ন বা ৬.৩% হল CPEC করিডোর প্রকল্পের ঋণ। [Pakistan has already brushed aside criticism on growing indebtedness of the country due to CPEC, saying the share of the CPEC loans was only $6 billion or 6.3% in total outstanding external debt of $95 billion as of end June this year.]  আর দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা হল, আইএমএফ এবারই প্নরথম নয় আগেও (২০১৪) করিডর প্রকল্পের এক মুল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি করেছিল। করিডোর প্রকল্পের কোঅর্ডিনেটর এটা জানিয়েছেন। সেই রিপোর্ট অনুসা্রে, আইএমএফ লিখেছিল,  [The IMF report has then stated that the CPEC infrastructure and transport projects are financed by long-term concessional government borrowing from China.]  অর্থাৎ  এই প্রকল্প চীনের স্বল্প সুদে (concessional) দেয়া ঋণ” বলে মনে করেছে আইএমএফ। বিশ্বব্যাংকের ভাষায় “কনসেশনাল” ঋণ মানে হল  –  (১% এর কম,) ০.৭৫% বাৎসরিক সুদ, চল্লিশ বছরে শোধ করতে হবে তবে প্রথম দশ বছর কোন কিস্তি দিতে হবে না, মাফ পাবে। এখানে “কনসেশনাল” ঋণ মানে সুনির্দিষ্ট করে কী বুঝানো হয়েছে তা জানা যাচ্ছে না। এছাড়া ঐ রিপোর্টে আর একটা মন্তব্য আছে, CPEC-related outflows would peak at about $3.5 billion to $4.5 billion per annum by fiscal year 2024-25. – মানে ঋণ শোধের দায় সবচেয়ে চড়া হয়ে উঠবে ২০২৪-২৫ সালে, যখন বছরে প্রায় চার বিলিয়ন করে কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ তখন এটা পাকিস্তানের জন্য কঠিন হতে পারে। এই বিষয়গুলো পাকিস্তানের ট্রিবিউন পত্রিকার রিপোর্ট। কাজেই আমেরিকা ও ভারতের ভুয়া ক্যাম্পেইনের পাল্লায় পড়া থেকে এবার সকলে সাবধান। 

দুনিয়ার জন্য বর্তমানে এক ইউনিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যখন চীনের উত্থান ঘটেইনি সেই পরিস্থিতি মানে, যখন দুনিয়াতে আমাদের মতো রাষ্ট্রের কোনো ঋণ পাওয়ার একমাত্র উৎস ছিল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। সেসব দিন পেরিয়ে, এখন চীন উত্থিত ও বিকল্প হিসেবে আবির্ভাবের একালে দুনিয়াকে নতুনভাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককেও  আমল করতে হচ্ছে। কারণ এখন আর সে একক ঋণদাতা নয়। শুধু তাই নয়, আইএমএফ যদি প্রফেশনাল প্রতিষ্ঠানের মত না হয়ে আমেরিকান বিদেশনীতির ভাঁড় হয়ে থাকতে চায়, ঐ বিদেশনীতি সরাসরি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হয়ে থাকতে চায় তবে এই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানও একদিন আমেরিকার সাথে শুকিয়ে ছোট হয়ে যাবে – সেটাও আশা করি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের আমল করে চলে, আমরা দেখতে পাব!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ অক্টোবর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস জানা  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements