নির্বাচনকে সাফাই দিতে ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্কের বিপদ

নির্বাচনকে সাফাই দিতে ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্কের বিপদ

গৌতম দাস

৩১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2×5

[সার সংক্ষেপঃ বাংলাদেশের সদ্যসমাপ্ত সংসদ নির্বাচন ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক-গুলোকে বেশ বিপদেই ফেলেছে, মনে হচ্ছে। তারা সাধারণ ও সোজা যুক্তিবুদ্ধি সাজিয়ে অর্থপূর্ণ একটি লেখা দাঁড় করাতেও হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে এর আগে একটা লেখা ছাপিয়েছিলাম যেগুলো মূলত ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্কের বাইরের লেখকদের লেখা নিয়ে। সেসব লেখায় দেখেছিলাম – সেখানে এ জাতীয় সমস্যা দেখা যায়নি। থিঙ্কট্যাঙ্কের বাইরের লেখকেরা স্বাধীনভাবেই তাদের মনের কথা পরিষ্কার বলেছিলেন।  কিন্তু থিঙ্কট্যাঙ্কের ভিতরের লেখকেরা? বুঝা যাচ্ছে থিঙ্কট্যাঙ্কের লেখকেরা ভারত সরকারের অবস্থানের সাথে মিল রেখে কথা বলার দায় রেখে লিখছেন। তাতেই অর্থপুর্ণ বাক্যগঠন ঠিক রাখতে পারছেন না। অথচ যেভাবেই হোক নির্বাচনের ফলাফলের পক্ষে সাফাই খাঁড়া করতে চাইছেন। এতেই এলোমেলো সব বিপদ ভেসে উঠছে। ]

এমনিতেই ভারতে বিদেশের (মূলত আমেরিকা) সাথে সম্পর্কিত থিঙ্কট্যাঙ্ক (Pro-US Think Tank) আর অপর দিকে ভারত থেকে প্রকাশিত বিদেশি মিডিয়া  (পাবলিশিং অথবা এজেন্সি, যেমন রয়টার্স)- এদেরকে নিয়ে এক বিরাট সমস্যা। বোঝা যায়, ভারত থেকে এগুলো প্রকাশিত হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের বিদেশনীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখা অথবা এদের অবস্থান যেন সরকারি অবস্থানের বিপরীত হয়ে না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে, সম্ভবত অলিখিত কোনো শর্তে, তা প্রকাশিত হতে গিয়ে এসব সমস্যা হাজির হয়। যেমন- কিছু থিঙ্কট্যাঙ্কের দৌরাত্ম্যের প্রাবল্য এত দিন যা নিয়ে ভরপুর ছিল তা হলো চায়নাব্যাশিং বা চীন ঠেকানোর জন্য আমেরিকার থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা থেকে প্রকাশিত নানান প্রপাগান্ডা। অর্থাৎ তারা আর মূলত থিংকট্যাংক থাকতে চাইছিলেন না বা ছিল না। আমেরিকার স্বার্থে চীনের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডার ‘ঘেঁটু’ হয়ে উঠতে চাইছিল এরা। বাক্যে মিল থাকুক আর না-ই থাকুক, অর্থপূর্ণ যুক্তি সাজানো হোক আর না-ই থাক, চীনবিরোধী প্রপাগান্ডায় সরব থাকতে হবে – এই ছিল তাদের কান্ডকাখানা।

তবে এই সমস্যা থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের স্বস্তি দিয়ে বাঁচিয়েছেন। ভারতে বসে আমেরিকান থিংকট্যাংকের চীন ঠেকানোর প্রপাগান্ডায় অর্থ ঢালা অথবা ভারতকে এর বিনিময়ে কোনো বাণিজ্য সুবিধা দেয়া – এসবের মধ্যে তিনি আগের প্রেসিডেন্টদের মত তিনি নাই, থাকতে চান না – এটা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। সম্ভবত সে কারণে ভারতের কিছু থিংকটাংকের খামাখা চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা ইদানীং আর দেখা যায় না। বিশেষ করে, এপ্রিল ২০১৮ সালে চীনে অনুষ্ঠিত মোদি-শি জিনপিং এর মধ্যে  য়ুহান সামিটের [Wuhan Summit] পরে। বলা যায় এই সামিট থেকেই আমেরিকার হয়ে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা করা থেকে ভারত সরে আসতে শুরু করে।  তবে এ ছাড়াও এর আরেক কারণ, বুদ্ধিমান মোদী সরকার চীনের সাথে ঐ সামিট-সুখালাপের সময় যাতে কোন বিরূপভাব তৈরি না হয় তা নিশ্চিত করতে চীনবিরোধী এধরনের থিংকট্যাংকগুলোর তৎপরতা বন্ধ করতে তাদেরকে সভা-সেমিনার করার অনুমতি না দেয়াকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এতে এগুলোর অনেকেই তৎপরতা গুটিয়ে গিয়েছিল বা সরাসরি গুটিয়ে ফেলতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তবুও ভারতের সরকারি নীতির পক্ষে প্রচারে থাকা কিছু থিংকট্যাংক এখনো আছে। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে লিখতে গিয়ে এরাই সমস্যায় পড়েছে।

সাধারণভাবে  মানুষের পক্ষে লেখা ও চিন্তা করা সমান্তরাল কাজ, যা প্রায় সমার্থক। এ জন্য দরকার মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারা; এ কারণে, এক দিকে ফরমায়েশি সরকারি অবস্থানের পক্ষে থাকতে হবে আবার নিজ মনে (ফ্রি আরগুমেন্টে) লিখতে হবে – এ দুই কাজ এক সাথে করা কঠিন। প্রায় অসম্ভব। তবুও চাকরি বাচাতে অনেককে এমনটা করতেই হয়। সেক্ষেত্রে ফরমায়েশি সে লেখা শেষ করলেও এটা যে ফরমায়েশি, এর ছাপ লেখাতেই থেকে যায়। এ জন্য বলা হয়, চিন্তাকে বন্ধক রেখে গবেষক বা  একাডেমিক হওয়া যায় না। থিংকট্যাংক “অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন” বা ওআরএফের [ORF] ফেলো ডঃ জয়িতা ভট্টাচার্য আর বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন বা ভিআইএফের [Vivekananda International Foundation (VIF) ] ফেলো ডঃ শ্রীরাধা দত্তের বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে দুটা আলাদা আর্টিকেল রচনায় তাদের সেই হাল হয়েছে। ভারতের মিডিয়ায় ভিআইএফ -কে বিজেপির মোদী সরকারের থিঙ্কট্যাঙ্ক বলা হয়েছে।

এমনিতেই কোন একাডেমিক পরিচয়ধারী যদি আবার আনক্রিটিক্যাল হন – এটা খুবই অযাচিত কম্বিনেশন। আন-ক্রিটিক্যাল মানে যে ক্রিটিক্যাল নয় অর্থাৎ আগে থেকেই সব জানার অজুহাতে, যেকোনো জিনিসকে পুনরায় উল্টেপাল্টে নানান দিক থেকে দেখে না, যাচাই-বাছাই বা সন্দেহ করার দৃষ্টি যার তৈরি হয়নি, এদের পক্ষে নিজের একাডেমিক পরিচয়ের প্রতি সুবিচার করা কঠিন। কিছু একাডেমিকের “ভারতীয় সেকুলারিজম” বিষয়ক ধারণা ও এর ব্যাখ্যার প্রতি আস্থা-বিশ্বাস এতই আনক্রিটিক্যাল যে, এটা পোপের বাইবেলের উপর আস্থা-বিশ্বাসকেও হার মানায়। অনেকের ধারণা – থিওলজিতে কারও ক্রিটিক্যালনেস বলে কিছু নেই; কিন্তু সেটিও আসলে ভিত্তিহীন। আধুনিকতাতেই শুধু ক্রিটিক্যালনেস বা উল্টেপাল্টে নানান দিক থেকে দেখা ও যাচাই করা আছে, এ কথা সত্য নয়। থিওলজিতেও ক্রিটিক্যালনেস দেখা যায়। এর ভালো প্রমাণ হল, থিওলজির ইন্টারপ্রিটেশনে বা তাফসিরে ভিন্নতা। আর সেখান থেকেই একই ধর্মের নানান ইস্যুতে বিভিন্ন ব্যাখ্যার উৎপত্তি। আর তা অনুসরনের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধারা বা Sect দেখতে পাওয়া যায়, যা খুবই স্বাভাবিক। তবুও ভারতীয় সেকুলারিজম ও এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কোন ক্রিটিক্যাল অবস্থান দেখা যায় না।

জয়িতা ভট্টাচার্য, বাংলাদেশের এবারকার নির্বাচনের আগেই ২৬ ডিসেম্বর এক নিবন্ধ লিখেছিলেন। ঐ লেখার প্রথম তিন অনুচ্ছেদ ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন নিয়ে। এর মধ্যে এক উপশিরোনাম আছে, তা হল- “নির্বাচন কমিশনে ৭০টা রেজিস্টার্ড দলের মধ্যে ১০টাই ধর্মীয় রাজনৈতিক দল” [10 Out of 70 Religious Political Parties Registered With EC]। কিন্তু তাতে জয়িতা সমস্যা দেখছেন কোথায়? মানে তিনি এটাকে বাংলাদেশের জন্য ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখছেন কেন? ওরা ধর্মীয় রাজনৈতিক দল বলে? আর এখানে ধর্মটার নাম ‘ইসলাম’ বলে? তাই কী?

কিন্তু ব্যাপার হল, ইসলামি দল হলেই এমন খড়্গহস্ত হওয়া অপ্রয়োজনীয়। বরং এমন চিন্তার মানে, দেখা যাবে হয়ত কথিত এই ‘সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গি” আসলে নিজেই ইসলামোফোবিক। আবার ভাবনা-চিন্তা করা দরকার যে এই ১০টি ইসলামী রাজনৈতিক দলের সাথে ভারতে হিন্দুত্বের দল বিজেপির ফারাক কিসে? জয়িতা বিজেপিকে সহ্য করতে পারলে বাংলাদেশের এই ১০টি ইসলামী দলকে করতে পারছেন না কেন? আরও সিরিয়াস কথায় আসা যাক। জয়িতার সম্ভাব্য আপত্তি বা বিচার করার ক্রাইটেরিয়া কী? স্বভাবতই আগে ক্রাইটেরিয়া বা মাপকাঠি ঠিক না করে কথা বলতে গেলে ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব বা ফোবিক [-phobic] অথবা বিদ্বেষী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আসল কথায় আসি। জয়িতা জানাচ্ছেন – এই ১০টি দল নির্বাচন কমিশনে রেজিস্টার্ড। আমরা নিশ্চয়ই বুঝি ‘রেজিস্টার্ড’ শব্দের মানে। এর সোজা অর্থ হল – বাংলাদেশের রিপাবলিক কনস্টিটিউশনকে মেনে সে অনুসারে রাজনৈতিক দলের যা যা বৈশিষ্ট্য থাকতে বাধ্য বলে (দলটা নয়) নির্বাচন কমিশন মনে করে, সেসব শর্ত এই দলগুলো পূরণ করেছে। সে কারণে এরা রেজিস্টার্ড দল, সার্টিফায়েড। এখন এসব রেজিস্টার্ড দলের গায়ে গন্ধ, চিহ্ন, শব্দ ও রঙের মধ্যে যতই স্পষ্ট করে ইসলাম প্রকাশ পাক না কেন, যেহেতু বাংলাদেশের কনস্টিটিউশন মেনেই এরা রেজিস্টার্ড হয়েছে, রাজনীতি করতে চাইছে, তাতে আর সমস্যা কী? একে এরপরও সমস্যা ভাবার কারণ কী? বরং এরপরও কারো কাছে ‘সমস্যা’ মনে হলে সেটি তারই ইসলামবিদ্বেষ মানে, মনের ফোবিয়ার সমস্যা হতে পারে। যেখানে এমনকি আগামীতেও নির্বাচন কমিশন যদি বাড়তি কিন্তু কনস্টিটিউশন কাভার করে, এমন কোনো নতুন শর্ত আরোপ করে, সেটাও তো এসব রাজনৈতিক দল মানতে বাধ্য থাকবে। তাহলে এরপরে আর আপত্তির কী আছে? আপনি আর কী চাইতে পারেন? আসলে সবার আগে আমাদেরকেই “চাইতে” জানতে হবে। একটা ইসলামী দল রিপাবলিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই থাকতে চাইছে, আর কী চান আপনারা? আসলে এর পরের স্তর হল, রজনীকান্তের সেই গানের কলি- “ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়”। আসলে রিপাবলিক বৈশিষ্ট্য অথবা রাষ্ট্র কী, তা জানা বোঝা সম্পন্ন না হয়ে মানে, বাকি রেখে কোনো আপত্তি প্রকাশ করতে গেলে তা শেষে ‘ফোবিয়া’ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকবে।

জয়িতা ভট্টাচার্যের ওই রচনায় আর একটা উপশিরোনাম হল – তিনি বলছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনে “ধর্মভিত্তিক দলের ভোট-শেয়ার গুরুত্বপূর্ণ নয়” [Vote-Share of Religion-Based Parties Not Too Significant]। বাস্তবে জয়িতার এই দাবি ভিত্তিহীন। কারণ, যেমন বলা যায় গত ২০১৩ সালের ৫ মের পরে প্রথম নির্বাচন ছিল ঢাকার বাইরের গাজীপুরসহ কিছু শহরের “মেয়র নির্বাচন”। ঐ নির্বাচনে সরকার সবখানেই গো-হারা হেরে যায়। কেন? কারণ, জামায়াত নয় এমন কিছু ধর্মীয় দল নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাদের প্রার্থীকে ভোট না দিতে ক্যাম্পেইনে নেমেছিল; মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরেছিল। আর তাতেই ঐ ফলাফল হয়েছিল। তাই কেউ নিজে ভোটে দাঁড়ালে কয়টা ভোট পাবে সেটাই নয়, বরং অন্যের ভোট কত কাটতে পারবে, সেটাও এক বিরাট সক্ষমতা ও নির্ধারক ফ্যাক্টর। আর এরপর থেকে, “নির্বাচনের মা মারা যাওয়াতে” সেই শোকে ঐ নির্বাচনের পর থেকে (আগের মানের) “অবাধ নিরপেক্ষ” নির্বাচন বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যায়; তা আর কখনো হয়নি। বুদ্ধিমান জয়িতা নিশ্চয়ই এসব কথা বুঝবেন। এছাড়া আরও বিস্তারে জানা ও যাচাই করতে তিনি গোয়েন্দা লাগাতে বা খোঁজ নিতে পারেন। আসলে বাংলাদেশে ধর্ম আর রাজনীতির সম্পর্ক বুঝা, তা বিশেষ করে ভারতীয় সেকুলারিজমের বুঝ দিয়ে বুঝতে যাওয়া, আরও অসম্ভব।

জয়িতা নির্বাচনের পরেও গত ৩ জানুয়ারি আমাদের নির্বাচন প্রসঙ্গে আর একটা নিবন্ধ লিখেছেন । তা প্রকাশিত হয়েছিল ওআরএফের ওয়েবসাইটে।

জয়িতা ভট্টাচার্য এবং রাধা দত্তের রচনায় এক অভিন্ন ত্রুটি হল, তাঁরা আগে বলে নিচ্ছেন না যে, তারা কেবল নির্বাচন কমিশনের হাতে প্রকাশিত ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে লিখছেন। কারণ, এই নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ আদৌ ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে কি না, তা অবাধ ছিল কি না, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এখন কেমন ইত্যাদি আনুষঙ্গিক দিক সম্পর্কে চারদিক থেকে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে এরা সেসবের কোন খোঁজ নিয়েছেন, তাদের জানাশোনা আছে, তা মনে হয় নাই। তাঁরা দাবিওও করেন নাই। কেবল সব জায়গায় “নিষ্ঠাবান যুধিষ্ঠির” (পুরাণে যে কখনও মিথ্যা বলেন নাই বলে মনে করা হয়) ভেবেছেন আমাদের নির্বাচন কমিশনের বচনকে।  বলা যেতে পারে, কমিশনের বয়ানের বাইরে্র কোন উৎস ও তথ্যকে তাদের বিবেচনায় তারা কোন কারণে আনতে পারেননি বা আনেননি। এ অবস্থাতেই তাদের ওই রচনা লিখিত হয়েছে।

জয়িতার দ্বিতীয় এই লেখায়, তৃতীয় প্যারা থেকে পরের চার প্যারা মিলিয়ে তিনি একটা বয়ান সাজিয়েছেন। এর প্রথম প্যারায় বলেছেন, “বিএনপি ভোটে কারচুপির অভিযোগ করেছে”। এর পরের প্যারায় বলছেন, “কিন্তু নির্বাচন অবজারভারেরা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করেনি”। [অর্থাৎ পাঠককে ইঙ্গিত ও সাজেশন হল, বিএনপির অভিযোগ বাতিল হয়র গেল।] এবার পরের প্যারায় জয়িতা বলছেন, “১৯ জন লোক মারা গেছে। সুতরাং নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়নি”। এর শেষে বলছেন, “নির্বাচনের আগে বিরোধীরা আওয়ামি লীগের ক্যাডারদের সন্ত্রাস ও হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেছে। আর একইভাবে লীগও বিরোধীদের বিরুদ্ধে পালটা অভিযোগ এনেছে”। [পাঠককে ইঙ্গিত ও সাজেশন হচ্ছে, তাহলে মামলা ডিসমিস]। অথচ এরপরেই আবার লিখছেন, “নির্বাচনপূর্ব ভায়োলেন্সের মাত্রা দেখে মানুষ ভোট দিতে আসে কিনা এনিয়ে আশঙ্কা ছিল”। কিন্তু ভোটের শেষে কমিশন বলেছেঃ আশি ভাগ ভোট পড়েছে; তাই ওই ভয়-আশঙ্কা ছিল ভুয়া”। [মানে এখানেও সাজেশন হচ্ছে, তাহলে মামলা ডিসমিস]

আসলে এসব বাক্যের মাধ্যমে জয়িতা নিজের পরিচয়  “থিংকট্যাংক গবেষক” থেকে “প্রপাগান্ডিস্টের” স্তরে নিজেই নামিয়েছেন। কারণ এটা কোনো গবেষকের কাজ নয়, কাজের পদ্ধতিও নয়। সাধারণ বিবেচনা হল, দু’টি বিবদমান পক্ষের বেলায় কার কথা গ্রহণ করা হবে, তা ঠিক করতে হয় স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় ওয়াকিবহাল পক্ষের কাছ থেকে। কিন্তু তিনি আগেই একটা পক্ষ বেছে নিয়েছেন। এটা গবেষকের উচিত নয়, কাজও হতে পারে না। কথিত কিছু নির্বাচন “অবজারভারদের” বরাতে জয়িতা বলছেন, “ভোটে কারচুপি হয়নি, কারণ অবজারভারেরা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি”। কিন্তু খোদ “অবজারভারদেরই” গ্রহণযোগ্যতা কী ছিল? তা কি তিনি জেনে নিয়েছিলেন? সম্প্রতিকালে ঐ “অবজারভারদের” অনেকেই এখন “তওবা” পড়ছেন, বড় ভুল হয়ে গেছে বলছেন। তাহলে জয়িতা এখন কী বলবেন?

শেষের প্যারায় তিনি একবার ভায়োলেন্সের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ তুলে এটা ‘ডিসমিস’ করছেন। অথচ পরের বাক্যেই বলছেন, ভায়োলেন্সের মাত্রা দেখে [Considering the level of pre-poll violence] ভোটার আসে কি না সে শঙ্কা ছিল। এর মানে জয়িতাই আবার মেনে নিচ্ছেন যে, আসলে উল্লেখযোগ্য মাত্রারই ভায়োলেন্স সেখানে হয়েছিল। তাহলে? মোট কথা, তার গল্পটা এখানে এসে আর মিল রাখতে পারল না।

আবার লক্ষণীয়, ১৯ জন মারা গেছে দাবি করে তিনি সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, এর মানে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়নি। আসলে এ কথার মানে হয় না। কারণ, ঠিক কতজন মারা গেলে কোনো নির্বাচন ‘শান্তিপূর্ণ’ হবে? কোথাও এমন কোন মাপকাঠি কী আছে? আর এই মাপকাঠি কে দিয়েছে? ওদিকে আবার এই ১৯ জন কারা? কিভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে? এটা কেবল লীগের দেয়া ফিগার। এদের মধ্যে আওয়ামিলীগেরই অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মৃত্যু কয়জনের? সে খোঁজ কি নেয়া হয়েছে? অথচ ‘১৯ জন মরেছে – মানে শান্তিপূর্ণ ভোট হয়নি” – এসব মুখস্থ বলছেন তিনি। কোনো সিরিয়াস মানুষ বা গবেষক এভাবে মুখস্থ কথা বলার কথা না।

আবার তার লেখায় (শেষের দিক থেকে গণনায়) চতুর্থ প্যারায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে “মানবাধিকার লঙ্ঘনের এবং ‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনে বাধা’ তৈরির অভিযোগ তুলেছেন জয়িতা। অথচ এর আগে আমরা দেখেছি বিরোধীদের তোলা অভিযোগ নাকচ করেছিলেন জয়িতা। কেন? সে ব্যাখ্যা অনুপস্থিত। তাহলে শেষে দাঁড়ালো কী? জয়িতার লেখা পড়ে মনে হয়েছে সরকারি “ব্রিফিং ঠিক রাখতে আর, ভাষ্য ব্যালেন্স করতে গিয়েই তিনি তাল হারিয়ে ফেলেছেন। অথচ কারও ভাষ্যের ব্রিফিং ঠিক রাখা, সেই তালে কথা বলা কোনো গবেষকের কাজ হতে পারে না। এভাবে তিনি নিজেই নিজের কাজের মান প্রকাশ করলেন।

শ্রীরাধা দত্তের লেখা :
আমাদের নির্বাচনের পরে তাঁর লেখা দেখেছি একটাই। আর সে লেখার চার ভাগের তিন ভাগই হল, আমাদের প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ভারতের নর্থইস্টকে করিডোর দিয়ে ভারতের কত কী উন্নতি করে দিয়েছেন, এরই ফিরিস্তি। অথচ এই লেখার মূল প্রসঙ্গ আমাদের নির্বাচন কাভারেজ। অর্থাৎ এই লেখার সাথে বাংলাদেশের নির্বাচন বা শেখ হাসিনার বিজয়ের সম্পর্ক কী? অথবা এটা কি বাংলাদেশের কোনো উন্নয়নের গল্প? হাসিনা ভারতের নর্থইস্টকে করিডোর উন্নয়ন করে দিয়েছেন, তাই কী? সেটা যাই হোক ব্যাপারটা অপ্রাসঙ্গিক।

শ্রীরাধার লেখায় শেষের একটা প্যারায় এক অদ্ভুত কথা আছে। তিনি লিখেছেন- “বিএনপি নিজেই দায়ী”। কোথায় কী বিষয়ে আমরা তা দেখব। তবে রাধা সবচেয়ে কড়া এক বাক্য লিখেছেন। সে কথাটি হল – আওয়ামী লীগের জোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি পেল আর বিএনপি জোট মাত্র সাতটি পেল; এটা ”মনে হচ্ছে আমি মানতে পারলাম না”[looks unconvincing]

কিন্তু তিনিই শেষের দিকে বলছেন, “২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি ওয়াকওভার দিয়েছে”। কিন্তু এবারের ফলাফলের জন্য অন্য কেউ নয় তাঁরা নিজেরাই দায়ী। এমনকি যদি কেউ মেনেও নেয় যে নির্বাচনে নির্বাহি ক্ষমতার বিরুদ্ধে সর্বত্র হাত ঢুকানোর অভিযোগ, হাসিনার অসহিষ্ণুতা, আর যেকোন ভিন্নমতের প্রতি তাঁর দমনের নীতি তবুও সরকার বিরোধীরা নিজেই আসলে নিজেদেরকে কোণায় চিপার মধ্যে ফেলার জন্য দায়ী। […this time around they have none to blame for their dismal performance. Even if one accepts the allegations of executive overreach, Hasina’s intolerance, and her increasing repressive ways towards any contrarian views, the opposition had really bound themselves into a corner]।

অর্থাৎ বলছেন- “এবারো খারাপ ফলাফলের জন্য বিরোধীরা অন্যকে দায়ী করতে পারে না। যদি নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ, হাসিনার অসহিষ্ণুতা, ক্রমবর্ধমান বিরোধী মত দমন এসব অভিযোগ যা-ই ঘটুক তা সত্ত্বেও বিরোধীরা নিজেই নিজেদের এক কোনায় বন্দী করেছে”।
এটি কি নুন্যতম অর্থপূর্ণ কোন কথা? না পুরাটাই স্ববিরোধী? দুঃখিত, আসলেই বুঝতে অপারগতা জানাচ্ছি। পাঠক নিজেকে সাহায্য করেন……।
এ কারণেই, শুরুতে বলেছি বাংলাদেশের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন ভারতের থিংকট্যাংকগুলোকে অর্থপূর্ণ অন্তত কয়েকটা বাক্যও লিখতেও বিশাল বিপদেই ফেলে দিয়েছে, দেখা যাচ্ছে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২১ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নির্বাচনঃ ভারতের থিংকট্যাংকের বিপদ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিলঃ আসাম ও বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া

হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিলঃ আসাম ও বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া

গৌতম দাস

২২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2wW

 

আবার হেডলাইনে আসাম। তবে এবার বিজেপি প্রধানমন্ত্রী মোদীর নতুন “নাগরিকত্ব বিল”। যদিও সম্প্রতিকালে আসাম বলতে বাংলাদেশের মানুষ চিনে এনআরসি-এর আসাম। NRC বা এনআরসি মানে ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস; অর্থাৎ আসামে এখন বসবাসকারী সবাইকে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিয়ে এক নাগরিকত্বের তালিকায় নাম তুলতে হচ্ছে। যার মূল কথা – ‘পড়শি’ দেশ থেকে যারা আসামে ২৪ মার্চ ১৯৭১ এর পরে আসামে এসেছে তাদের চিহ্নিত করা, যারা আসামের নাগরিক গণ্য হবেন না। তাদের অনুমান ছিল যে ইতোমধ্যে এক ব্যাপক সংখ্যক লোক আসামে এসে ঢুকেছে। যদিও নানা কারণে অনেকে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ দিতে পারেনি; যেমন সন্তান পেরেছি কিন্তু পিতা কোন ডকুমেন্ট দেখাতে পারেন নাই এমনও হয়েছে। তবু এসব অপ্রমাণিত থেকে যাওয়া কিন্তু চিহ্নিত নাগরিকদের নিয়ে এরপর তাদের নিয়ে ঠিক কি করা হবে তা “আনুষ্ঠানিক” ভাবে কেউ বলছে না। রাজনৈতিক বক্তৃতাবাজিতে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে হুমকি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের কাছে প্রদত্ত ভারতের সরকারি অবস্থান হল যে এটা ভারতের “অভ্যন্তরীণ বিষয়”  – এই বলে চালাতে চাইছে। ঠিক যেমন ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলক ভাবে চালু হচ্ছে বলে শুরু করলেও তা আর কখনই বন্ধ করা হয় নাই। এদিকে এক গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস হল। এই তালিকা তৈরির নির্দেশ কিন্তু ভারতের নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী নয়, সুপ্রিম কোর্ট থেকে এসেছে। তা সত্ত্বেও সেই কোর্টও স্পষ্ট করে বলছে না যে, ‘নাগরিক প্রমাণ দিতে না পারলে’ সেসব ব্যক্তিদের নিয়ে কী করা হবে। কারণ, কারও ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণিত না হওয়া মাত্রই এটা আপনাতেই প্রমাণ হয়ে যাবে না যে, সে বাংলাদেশের নাগরিক। আর মূল কথা সে ক্ষেত্রে ঐ নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ইস্যু নিয়ে কোন ততপরতার শুরুর আগে বাংলাদেশের সাথে কূটনৈতিকভাবে ফরমাল কথা বলতে হবে। বাংলাদেশকে রাজি করাতে হবে। বাংলাদেশ যদি রাজি হয় তবেই এরপরেই কেবল আসামে নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারবে।

তবে সে কথা এখন থাক। কারণ, ইস্যু এখন তার চেয়ে আলাদা এবং ভয়াবহ। হিন্দুত্বের মোদী এবার আবার আর এক নতুন দানবীয় ইস্যু নিয়ে হাজির হয়েছে। এটাকে আসামে নতুন করে আগুন লাগানোর লক্ষ্যে মোদীর ‘নাগরিকত্ব বিল’ বলা যায়। যার আঁচ বাংলাদেশেও টের পাওয়া যাবে এমনই ভয়ঙ্কর। এই বিলের আনুষ্ঠানিক শিরোনাম হল – সিটিজেনশিপ (সংশোধনী) বিল ২০১৬ (Citizenship (Amendment) Bill, 2016)। এই বিলটা বিজেপি ভারতের পার্লামেন্ট লোকসভায় পেশ করেছিল ১৯ জুলাই ২০১৬ সালে। তাই বিলের নামের সাথে ২০১৬ শব্দটা লেগে আছে। এতদিন সেটা এক যাচাই কমিটিতে ইচ্ছা করে ফেলে রাখা হয়েছিল। আসলে মোদী এটা সময়-সুবিধামত বের করবেন তাই গত দু-আড়াই বছর এটা আটকা ছিল। এখন গত সপ্তাহে ৮ জানুয়ারি ২০১৯, ঐ শিরোনামের আইনটা ভারতের লোকসভায় শেষ অধিবেশনে পাস হয়েছে।

সার করে বললে, মূলত এটা এর আগে ভারতের “নাগরিকত্ব বিল ১৯৫৫” (Citizenship Act, 1955) এর কিছু ধারায় আনা সংশোধনের পরের নতুন রূপ। সংশোধিত হবার পর ঐ বিলের সারকথাটা হল – বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান এই তিন দেশ থেকে (মুসলমান বাদে) হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিষ্টান এই ছয় ধর্মের লোক ভারতে আশ্রয় প্রার্থী হলে – আর ভারতে আশ্রয় প্রার্থী হিসেবে তাদের ছয় বছর বসবাস পূর্ণ হলে পরে এবার তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেয়া যাবে। এই লক্ষ্যে এমন কেউ ভারতে প্রবেশ করলে যা আগের (১৯৫৫) সংজ্ঞা অনুসারে ‘অবৈধ ইমিগ্রান্ট’ (illegal immigrant) বলে বিবেচিত হতেন, এখন এই বিল পাশের পরে তারা “আশ্রয়প্রার্থী নাগরিক” বলে বিবেচিত হবেন। ফলে তারা ভারত থেকে বহিস্কৃত (deported) হবেন না, বা অবৈধ প্রবেশের দায়ে আদালতে পঁচে মরবেন না। বরং ভারতে থাকার পারমিট পাবেন। আর এভাবে টানা সাত বছর (আগের আইনে এটা ১২ বছর ছিল) থাকার পরে আবেদন করলে, ভারতের নাগরিক বলে বিবেচিত হবেন।

যদিও (মুসলমান বাদে) শব্দগুলো সেখানে লেখা নেই, কিন্তু অর্থ তাই। আর বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান শব্দগুলো স্পষ্ট করে লেখা আছে, আর ছয় ধর্মের নামও পরিস্কার উল্লেখ করা আছে। এমনকি ভারতের মিডিয়া বারবার ছয় ধর্মের উল্লেখ করার ঝামেলা এড়াতে েদের বদলে একটা শব্দ লেখা শুরু করেছে – ‘অ-মুসলমান”। যেমন ভারতের এক মিডিয়া রিপোর্টের শিরোনাম হল, (Lok Sabha passes Citizenship Bill amid protests, seeks to give citizenship to non-Muslims from 3 countries)। অর্থাৎ মোদী সরকার আসলে যা বুঝাতে চেয়েছে, মিডিয়াগুলো তাই লেখা শুরু করেছে।

কেন এই আইন আদালতে অবৈধ ও রদ (null & Void) হয়ে যাওয়া উচিত
যে লিগাল ত্রুটির কারণে এই বিল অবৈধ ও রদ (null & Void) হয়ে যাওয়া উচিত মূল সে যুক্তিটা হলঃ এটা বৈষম্যমূলক। অর্থাৎ এটা কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের মৌলিক “সাম্য নীতি” ভঙ্গ করেছে। ঐ বিলে বলা হয়েছে – ঐ তিন দেশে ‘ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হয়ে থাকারা ভারতে আশ্রয়প্রার্থী যারা, তারা এ সুযোগ নিতে পারবে। কিন্তু তা সাধারণভাবে সব ধর্মের লোক না বরং ‘মুসলমান বাদে’ ভারতের ছয় ধর্মের কথা সুনির্দিষ্ট বলা হয়েছে, যাদের বেলায়ই কেবল এটা প্রযোজ্য হবে। এটা স্পষ্টত এক বৈষম্যমূলক আইন। ‘নাগরিক সাম্য’ প্রতিষ্ঠা থাকা ও বাস্তবায়ন – এটা রিপাবলিক রাষ্ট্রের এক মৌলিক ভিত্তি।  এখানে সাম্য কথাটা ইতিবাচকভাবে বলা হয়। যেখানে মূল ভাবটা হল, বৈষম্য – নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না, কোন আইন করা যাবে না যার মাধ্যমে কোন নাগরিকের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। মানে রাষ্ট্রকে এক “নাগরিক বৈষম্যহীনতার” নীতি অনুসরণ করতেই হবে। বৈষম্যহীনতা মানেই ত সাম্য – তাই শব্দটাকে ইতিবাচক ভাবে নিয়ে “সাম্যের” নীতি বলা হয়ে থাকে। এই কারণে, কোনও রিপাবলিক রাষ্ট্র কেউ মুসলমান বলে বা হিন্দু বলে যেকোন নাগরিক এমন কারও প্রতি রাষ্ট্র কোন বৈষম্যমূলক আচরণ করতেই পারে না। এটাই নাগরিক সাম্য বা Equility এর মৌলিক নীতি, অথবা রাষ্ট্রের বৈষম্যহীন থাকার প্রতিশ্রুতির সরাসরি লঙ্ঘন। এই যুক্তিতে কোন সুপ্রীম কোর্ট এই বিলকে বাতিল ঘোষণা করতে পারে।

এছাড়া, আর একটা কথা হল কখন কোন জিনিষ আইন বলে গণ্য হবে – এই প্রসঙ্গে আইনের ভিতমূলক প্রস্তাব বলে থাকে যে কোন বিষয় আইন বলে তখনই মানা হবে যদি তা নাগরিক-নির্বিশেষে সবার উপর প্রযোজ্য করা হয় তবেই। নইলে তা কোন আইনই নয়। সোজা কথা যা সবার উপর প্রযোজ্য করা যায় না তা কোন আইনই নয়। মোদীর নাগরিক বিল এই যুক্তিতে কোন আইনই নয়। ফলে ভারতের আদালতে রিট হলে আর  সৎ ও দুরদৃষ্টির যেকোন পেশাদার বিচারক এই আইনকে অবৈধ ও রদ (null & Void) করা হল – বলে রায় দিবেন।

ওদিকে বিল পাশের আগের সপ্তাহে ০৪ জানুয়ারি আসামের শিলচর গিয়ে মোদী এক পাবলিক মিটিং করেছিলেন। সেখানে আবেগী বক্তৃতায়  দিয়ে মোদী বলছেন, ভারত মাতার সন্তানদের প্রতি ভারতের দায় আছে (আগ্রহীরা ইউটিউবে শুনে দেখতে পারেন। 15:58 মিনিটের এই ক্লিপে 05:30 মিনেটের পর থেকে মোদীর “ভারতমাতার” সে কাহিনী শুনা যেতে পারে।)। সেই দায় থেকে ঐ তিন দেশের ঐ ছয় ধর্মের যারা ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হচ্ছেন তাদেরকে আশ্রয় দেয়া মোদীর দায়িত্ব – এটাই মোদীর সারকথা। কিন্তু এখন মোদীর এই যুক্তি অনুসারেই মুসলমানদের বাদ পড়ার কোন কারণ নাই। এটা এমনই উদাম এক মুসলমান-বিদ্বেষী আইন।  যেখানে এমনকি পারসি, খ্রীশ্চান ধর্মও মোদীর ধর্ম-তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।  যেমন, আরএসএস-বিজেপি তাদের উদাম বিদ্বেষ ঢাকতে প্রায়ই বলে থাকে, “ইসলাম বা মুসলমানেরা ভারতে বহিরাগত”। এখন এসব বিদ্বেষী-ভাষ্য যদি এটা মেনেও নেই তাহলে খোদ আর্যরা কী বহিরাগত নয়? তারা কোন ভারতের ঘরের লোক? এছাড়া প্রাক-ইসলামি যুগের পারস্য বা ইরানের পারসিক অথবা ইউরোপীয় খ্রীশ্চান এরা কীভাবে ভারতের ঘরের? আরএসএস-বিজেপির মুসলমান-বিদ্বেষ কত তীব্র তার প্রমাণ এগুলো। না তবে সাবধান। কোন ধর্মের বিরুদ্ধে বলবার জন্য একথাগুলো বলা হচ্ছে অজান্তেও তা মনে করা যাবে না। সেটা আর এক বিরাট বে-ইনসাফি হবে। যেমন মোদী যদি বলতে পারতেন “যে কোন ধর্মের” আর “যে কোন দেশের” নাগরিক যারা ধর্মের কারণ নির্যাতিত তাদের জন্য এই আইন – তবে সেটাই হত সবচেয়ে মানবিক আর সবার জন্য কাম্য ও আদরের এক নাগরিকত্ব আইন।

এখন তাই মোদির নাগরিক বিল পাস হওয়ার দিন, ৮ জানুয়ারি এক উল্লেখযোগ্য নতুন বৈষম্যের দিন হয়ে থাকল। কারণ, একে তো এমনিতেই আসামে আগের নাগরিক তালিকা তৈরির – এনআরসি তাতে, ইতোমধ্যেই ৪০ লাখ হিন্দু-মুসলমানকে আসামের অপ্রমাণিত নাগরিক বলে চিহ্নিত করেছিল। যার মধ্যে আবার ১৮ লাখই হিন্দু। অর্থাৎ এনআরসি তৈরির উদ্যেশ্য বা পেছনের অনুমান ছিল যে প্রমাণ করতে না পারা অর্থে অবৈধ নাগরিকের বেশির ভাগ হবে মুসলমান। আর মুসলমান মানেই ধরে নিতে হবে, তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে এই দুই অনুমানই ভিত্তিহীন প্রমাণ হয়ে যায় যখন হাজির হয় যে এর মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যাই বেশি। ফলে তাদের নিয়ে কী করা হবে সেই টেনশন বাড়ছিল। এর ভেতর নতুন করে আর এক দিকে উত্তেজনা ঘুরিয়ে বিজেপির দলীয়করণ করে নেয়া হল।

১৯৮৫ সালের চুক্তি বনাম মোদীর বিল
অহমিয়াদের সাথে রাজীব গান্ধী সরকারের ১৯৮৫ সালের চুক্তিতে হিন্দু-মুসলমান বলে কোন ভাগ ছিল না। বলা ছিল, যারাই ২৪ মার্চ ১৯৭১ সালের পরে আসামে প্রবেশ করেছে বলে জানা যাবে তাদেরকে আসামের নাগরিক মানা হবে না – এই ছিল চুক্তি মূল কথা।  এই কারণে, NRC এর ভিত্তিও একই। কিন্তু বিজেপি এই ৪০ লাখ  হিন্দু-মুসলমান, এমন অপ্রমাণিত-নাগরিক তালিকা প্রকাশ হবার বাস্তবতায় হিন্দুদেরকে সুবিধা আর মুসলমানদেরকে বঞ্চনা দিয়ে এক বৈষম্য করে এতে মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দুদের খাড়া করতে চাইছে।  এমনিতে বিজেপির সবখানের কমন রাজনৈতিক কৌশল হল – সাধারণভাবে “নাগরিক অধিকার” রক্ষা নয়, বরং একে পাশ কাটিয়ে হিন্দুত্বের আওয়াজ তুলে এর ভিত্তিতে সমাজে ভোটের মেরুকরণ তৈরি করা। আর এই সুযোগে হিন্দুত্বের নামে নিজদলের ভোটের বাক্স ভারি করা। ভারতের আসন্ন নির্বাচনের আগে সেই কাজটাই করা হল; তাতে সমাজে খামোখা বিভক্তি রেষারেষি বৈষম্য বাড়ল কীনা, রাষ্ট্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে গেল কিনা – এসব কিছু ফেলে এখন পাঁচ বছরের মোদীর শাসনের শেষে উল্লেখযোগ্য সবই হারানো বিজেপি এখন বেপরোয়া।

এই বিলের প্রভাব ও পরিণতি
প্রথমত, আমাদের সুস্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে যে, মোদির এই বিল আসামের এনআরসি বিতর্কের কোনো সুস্থ সুরাহা করার দিকে তাকিয়ে করা হয়নি। বরং এর মূল উদ্দেশ্য এ বিতর্ককে ব্যবহার করে বিজেপির নিজের বিভাজনের রাজনীতিকে বিস্তার ঘটান। তাই বেপরোয়া হয়ে অর্ধজ্ঞানের গোয়াঁর বিজেপি নেতারা [আসামের মন্ত্রী ও সারা নর্থ-ইস্টে বিজেপির মুল সংগঠক Himanta Biswa Sarma, আসামের মুখ্যমন্ত্রী Sarbananda Sonowal ] মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক এই আইন করে তারা দাবি করছে এটা নাকি তাদের তথাকথিত “সভ্যতার লড়াই”। বলছে – ……They want us to be slaves of a particular civilisation. However in this civilisational fight we must win. যদিও নেপথ্যে তারা বলছেও তারা নিরুপায়। অন্য সব ইস্যু বা অর্জন হারানো বিজেপি এখন তাই আসন্ন নির্বাচনে মূল ফোকাস শ্লোগান করবে তথাকথিত হিন্দুস্বার্থ, হিন্দুত্ব বা কথিত সভ্যতার লড়াই……।

এভাবে বিভাজন ঘটিয়ে তাদের শেষ আশা যে এভাবেই তারা আসন্ন নির্বাচন পার হবে। খেয়াল করলে দেখা যাবে,  সাধারণভাবে ভারতীয় “নাগরিক” এমন পরিচয়ের রাজনীতি বিজেপি করে না বরং এক বিভক্ত পরিচয় হিন্দুত্ব – এমন হিন্দু পরিচয়ের রাজনীতিই বিজেপি করে। এই হিন্দুত্ব পরিচয়ে ভোটারদের জন্য সে হিন্দুত্বের রাজনীতিতে কেবল তথাকথিত হিন্দু স্বার্থের আওয়াজ তুলে মেরুকরণ করা ও ভোট বাক্সে তা পৌঁছান- এই হলো বিজেপির রাজনীতির কৌশল। তাই মোদির নাগরিকত্ব বিল সাধারণভাবে ভারতের সব রাজ্যের দিকে তাকিয়ে করা বলে মনে হলেও তা আসলে আড়াল সৃষ্টি করা। আর এই আড়ালে তাঁর বিশেষ টার্গেট রাজ্য হল – আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ। যেমন এ বিলের মাধ্যমে আসলে বলা হয়ে গেছে যে, আসামের তাদের এনআরসি-ইস্যুতে অপ্রমাণিত নাগরিকদের মধ্যেকার ১৮ লাখ হিন্দুকে ভারতীয় বৈধ নাগরিকত্ব দেয়ার দায়িত্ব বিজেপি নিয়ে নিল। আর এভাবেই আসামকে এখন হিন্দুত্বের ভিত্তিতে মেরুকরণের রাজনীতি শুরু করল বিজেপি।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে এতদিন বিজেপি অভিযোগ করত,  পশ্চিমবঙ্গে ১৯৪৭ সালের পর পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া হিন্দু বাঙালি [পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের ভাষায় যারা ‘বাঙাল’], কংগ্রেস আর সিপিএম, কেবল এদের স্বার্থ নিয়েই রাজনীতি করে গেছে। ‘বাঙালদের’ রেশনকার্ড আর ভোটার বানিয়ে দিয়ে নিজের দল-ভারী করার সহজ রাজনীতি করে গেছে। এমন ধরণের পাল্টাপাল্টি বয়ান অনেক আছে। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হল এমন অভিযোগ – কংগ্রেস, সিপিএম অথবা বিজেপি – এরা কেউই মমতার তৃণমূলের বিরুদ্ধে কখনো করে না। তাহলে কী উল্টা? মানে, মমতা “বাঙালদের” বিরুদ্ধের রাজনীতিটা করে? না, সেটাও না। এমন অভিযোগও দেখা যায়নি। তবে মজার ব্যাপারটা হল এখন এ বিলের মাধ্যমে এবার বিজেপি নিজেই “বাঙাল” মনোরঞ্জনে সবার ওপরে এগিয়ে থাকার রাজনীতিতে নামল। যে অভিযোগ সে এতদিন অন্যদের বিরুদ্ধে করত।

সাধারণভাবে পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া ধর্ম-নির্বিশেষে যে কেউই হোক, তাকে ভারতে নাগরিক হিসাবে “ন্যাচারালাইজ” করে নেয়া – এটা কোনোই খারাপ বা অন্যায় কাজ নয়। আপত্তি করারও কিছু এখানে নাই। যদিও আগে আইন বানিয়ে আইনসম্মত ভাবে তা করলে সেটা তো আরও ভাল। কিন্তু ঘোরতর বে-ইনসাফি অন্যায় ও খারাপ কাজ হবে যদি বৈষম্য করা হয় যে, “কেবল অমুক ধর্ম” হলেই তাকে স্বাগত। মানে হিন্দুত্বের রাজনীতির সঙ্কীর্ণ স্বার্থে যখন “মুসলমান বাদে” বলে নীতি-পদক্ষেপ নেয়া হবে। বিজেপি সেই ভয়ঙ্কর বীজ বপনের কাজ শুরু করল। আসামের ঐ ১৮ লাখ হিন্দুর কথা তুলে বিজেপি আগামী নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে তার প্রধান নির্বাচনি ফোকাসের বক্তব্য করতে চায়। যাতে সাধারণভাবে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু আর বিশেষ করে “বাঙাল” হিন্দুরা সহানুভূতিশীল হয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভোটের বাক্সে আসে, প্রতিফলিত হয়। তাই মোদীর এই বিলের বিরুদ্ধে অহমীয়দের প্রধান আপত্তি হল এই বিলটা আসলে মূলত “বাঙালি-হিন্দুমুখি” করা করা হয়েছে – অহমীয়াদের স্বার্থদের বিরুদ্ধে। এই হল নাগরিকত্ব বিল থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনি টার্গেট। মোদী তান্ডব আর ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর এই বিলের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের মমতাই এখন প্রধান প্রতিরোধকারি ও ভরসা।

তবে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, এমনকি এর সাথে পশ্চিমবঙ্গেও আর এক  বিজেপি প্রপাগান্ডাও চলবে যে, আসামের মত পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি বা “নাগরিক তালিকা” তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আবার অপপ্রচার শুরু করা হবে যে, তারা তুচ্ছ তেলাপোকা ও অনুপ্রবেশকারী মুসলমান এভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে নির্বাচনী অপপ্রচার এবং এই চরম ঘৃণা ছড়ান উন্মাদনা, এটাও বিজেপি পাশাপাশি চালাবেই। এটাই হবে, হিন্দুমনে জাগানো ঘৃণা-বিদ্বেষ কাজের মূল ফোকাস বয়ান। তার নির্বাচনি মুখ্য বয়ান।

যদিও এখানে খেয়াল রাখতে হবে আসামের মূল এনআরসির দাবি বা চলমান নাগরিক তালিকা তৈরির কাজে বিদেশি বা অ-নাগরিক বলতে আইনত তারা ঠিক কেবল মুসলমান বুঝায় নাই। এটা তেমন ভিত্তির ওপর দাঁড়ান নয়। ফলে তারা কেবল মুসলমানদের বের করে দিতে এ কাজ করছে তা নয়, বরং স্পষ্ট করে বলছে – ২৪ মার্চের পরে ধর্ম-নির্বিশেষে যারাই আসামে এসেছে তাদের বিদেশি বা অ-নাগরিক বলতে হবে। কিন্তু বিজেপি বা মোদি এই সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে। তাদের সোজা ভাষ্য ও অর্থ হল – এনআরসির কর্মকান্ড বলতে কেবল ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারী’ বুঝতে হবে।

আসামে এই বিলের প্রতিক্রিয়া
কেবল আসাম নয় উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যেই এই বিলের বিরুদ্ধে প্রবল সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আসাম ছাড়াও যেমন মনিপুরে, এমনকি ত্রিপুরায়ও। অনুমান করা যায় – তাদের মূল উদ্বেগের কারণ হল, এই সাত রাজ্যের মধ্যে যাদের সীমান্তের অপর পাড় বাংলাদেশ, তারা তো বটেই, এমনকি যারা নয়, তাদের এলাকাতেও বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুরা এবার নাগরিকত্বের বৈধতা নিয়েই এসে গেড়ে বসে যাবে – এই হল তাদের মুল উদ্বেগ। সাধারণভাবে এখানে আগে থেকেই থাকা সবচেয়ে বড় টেনশনের ইস্যু হয়ে ছিল, সমতলি-পাহাড়ি। আসামেরও মূল দ্বন্দ্ব, টেনশনও এটা। [আমাদের দেশে যেটা পাহাড়ি সেটা নর্থ-ইস্টের ভাষায় জনজাতি বা ট্রাইব।]  কারণ এই অঞ্চলের বড় বৈশিষ্ট হল পাহাড়ি বাসিন্দা অথবা ‘জনজাতি’ বাসিন্দা। ফলে এই অঞ্চলের সমতলি-পাহাড়ির মধ্যে সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন আর তা থেকে উদ্ভুত উচ্চ বা নিম্নস্বরে প্রকাশিত দ্বন্দ্ব, উত্তেজনা সেখানে সবসময় কাজ করে থাকে। এরই মধ্যে আবার “বাঙালি-হিন্দুমুখি” করে তৈরি করা নাগরিকত্ব বিল এটাকে তারা দেখছে যে এর ফলে বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের (তারা বলতে চাচ্ছে এতে সমতলিদের সংখ্যা বেশি হয়ে যাবে) নতুন করে আসার সম্ভাবনা প্রবল হবে আর স্বভাবতি তা ঘটলে তাতে আগের টেনশন আরও বড় নতুন মাত্রা পেতে পারে।

তবে সুনির্দিষ্ট করে আসামের প্রতিক্রিয়া হবে খুবই মারাত্মক, তা অনুমান করা যায়। যেমন এমনিতেই আসামের এনআরসিতে যে ৪০ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব অ-প্রমাণিত থেকেছিল, তাদের মধ্যকার ১৮ লাখ হিন্দু নিজেদের ভাগ্য মোদী ফিরাবে একটা গতি হবে এই ভরসায় ইতোমধ্যেই তাঁরা বিজেপির নাগরিকত্ব বিলের ও মোদীর ভক্ত হয়েছিলেন। সেটা কেবল ওই ১৮ লাখে সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা আসামের বাঙালি হিন্দুমাত্রই তাঁরা ক্রমেই সহানুভূতিশীল হয়ে উঠছিলেন। এককথায় বললে, মোদীর হিন্দুত্বের ভিত্তিতে পাবলিক মেরুকরণ এর রাজনীতি এখানই বিভক্তির প্রভাব তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিল। আর তাই এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক ইঙ্গিত।এই বিলের বিরুদ্ধে অহমীয়দের প্রধান আপত্তি হল এই বিলটা আসলে মূলত “বাঙালি-হিন্দুমুখি”।

কেন? এখন এই ১৮ লাখ হিন্দুই হবেন আসামের পাহাড়ি বা যারা নিজেদের অহমিয়া পরিচয় দাবি করেন তাদের হাতে আক্রান্ত হবার প্রধান টার্গেট। আসামের পাহাড়ি বা অহমিয়া পরিচয়ধারীদেরই মূল রাজনৈতিক দল হল – অহম গণ পরিষদ ও বোরোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট। যারা বিজেপির সাথে মিলে বিজয়ে গত ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচন থেকে আসামের প্রাদেশিক জোট সরকারে ছিল। মোদীর নাগরিকত্ব বিল পাসের প্রতিবাদে এরাই এখন জোট-সরকার থেকে বের হয়ে গেছে। বিজেপির জোট শরিক অহম গণপরিষদের তিন মন্ত্রী রাজ্য মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিয়ে নয় জানুয়ারি সারা আসাম ছাত্র সংস্থা বা আসু নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এরাই ১৯৮৫ সালের চুক্তির মুল দাবিদার পক্ষ যে চুক্তির মূলকথা হল, অ-অহমিয়দের আসাম থেকে বের করে দিতে হবে। এরা এর প্রধান প্রবক্তা ও রক্ষক। এর আগে বাঙালি-নিধনের বহু রেকর্ড এদের আছে, এবং সম্প্রতি আসামের তিনসুকিয়া জেলায় পাঁচ বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে, যা ওই ১৮ লাখ হিন্দু বাঙালির ভাগ্যে এখন কী হবে এর ইঙ্গিত বলেছেন অনেকেই।

এ দিকে, আর এক অদ্ভুত ফেনোমেনা দেখা যাচ্ছে। তা হল – ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ মোদীর এই বিল পাসে খুশি হয়নি মনে হচ্ছে, অন্তত ভাল কাজ মনে করছে না। যদিও পেশাদার হিসেবে তাঁরা তাঁদের আপত্তি মনে মনে রেখেছে। তবে সেই সাথে আর একটা কাজ করেছে। তা হল, তাদের সাথে সম্পর্কিত বা এসাইনড লোকেদের হাতে প্রকাশিত কিছু আর্টিকেল থেকে তাদের আপত্তি বা যুক্তিগুলো জানা গেছে। তাদের মূল উদ্বেগের বিষয় হল, এই বিল পাসের ফলে এতে গত ছয় বছরে উলফার (ULFA, আসামে এটা উচ্চারিত হয় আলফা বলে) কমে আসা তৎপরতা যা এখন পরেশ বরুয়া অংশের নামে আছে কিন্তু স্তিমিত তাদের পুরনো সেসব তৎপরতা আবার বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখে তাঁরা। এমনিতেই জটিল পরিস্থিতি ও সমীকরণের আসামে আবার নতুন উত্তেজনা ও সঙ্ঘাতের ফলে তাদের এতদিনের আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে যা কিছু অর্জন এত দিনে হয়েছিল তার উপর পানি ঢেলে দেয়া হবে বলে তারা মনে করে। তাই অশান্তি আর তাদের কাজ বাড়বে।

বাংলাদেশে সম্ভাব্য প্রভাব প্রতিক্রিয়া
এবারের ভারতের আসন্ন নির্বাচনে বিজেপি ও মোদীর রাজনীতি হবে বাংলাদেশের জন্যও ভয়ঙ্কর। এমনিতেই বাংলাদেশের স্থানীয় হিন্দু রাজনীতির অনেকটাই এখন আরএসএসের মুঠোয়। এই বিল “বাঙালি-হিন্দুমুখি” বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের “বাঙালদের” মনোরঞ্জন-মুখি এই অভিযোগ অনেকের।  ফলে মোদীর নাগরিকত্ব বিলের রাজনীতি হাজির করে বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতির অনেকটাই আরএসএসের মুঠোয় ভরতে তাদের সাহায্য করেছে। যদিও নিকট আগামিতেই বাংলাদেশের হিন্দুদের এই সিদ্ধান্ত সবচেয়ে আত্মঘাতি বলে চিহ্নিত হবে। বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য যে ম্যাসেজ অপেক্ষা করছে তা হল, এই বিল এক বিশাল মরিচিকা।

ওদিকে অর্থনীতিক ‘উন্নয়ন ও বিকাশে’ রাজনীতিতে মোদী ইতোমধ্যেই ফেল মেরেছে। আসলে সেকারণেই মোদীর এই নাগরিকত্ব বিলের প্রতি এত সিরিয়াস-নেস। আর একেই বিকল্প ইস্যু ভাব ধরে হাজির করার উদ্যোগ। মানে তার এখন একমাত্র সম্ভাব্য ইস্যু হবে হিন্দুত্ব, যার বিশেষ ফোকাস হবে ‘নাগরিকত্ব বিল’। আমরা ইতোমধ্যে – মুসলমানেরা তুচ্ছ তেলাপোকা, পিসে মেরে ফেলা হবে, বেছে বেছে খুঁজে খুঁজে উপড়ে ফেলা হবে, ইত্যাদি এসব বলে গত নভেম্বর পাঁচ রাজ্য নির্বাচন লড়েছে বিজেপি দেখেছি।

সেই মহড়ার পর এবার আবার মুসলমান-বিদ্বেষ আর অনুপ্রবেশকারী বলে সরাসরি বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডায় নামতে হবে মোদীকে। আমাদের সরকার গতবার কেবল তথ্যমন্ত্রী ইনুকে দিয়ে এই ইস্যুতে ভারতের কাছে আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু এবার নাগরিকত্বের বিল পাস করার পরে মুসলমান-বিদ্বেষ আর অনুপ্রবেশকারী বলে সরাসরি বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডা আরও তীব্র হবে বলে অনুমান করা যায়। কারণ এবার এটা আরও বড় স্টেক; মোদী নির্বাচনে জেতার মামলা যেখানে আবার নাগরিকত্ব বিল মুল ইস্যু।

এছাড়া ওদিকে আবার বিশেষ করে আসামে যেখানে অহমিয়া-বাঙালি সঙ্ঘাত উসকে গেল সে পরিপ্রেক্ষিতঅও তৈরি হচ্ছে। হাসিনা সরকার তার প্রথম পাঁচ বছরেই উলফা দমনে যে ভূমিকা ও সহায়তা দিয়েছিল এর প্রশংসায় ভারতের গোয়েন্দা-আমলা থেকে রাজনীতিক সবাই পঞ্চমুখ। যদি তাই হয় তবে একদিকে এখন সেই অর্জন ভেঙে ফেলতে পরোয়া করছে না মোদীর নির্বাচনে জিতবার স্বার্থ। আর অন্যদিকে বাংলাদেশের মুসলমানদের তেলাপোকা বলে ঘৃণা আর গালির জোয়ার তুলছে। এটা কতটুকু ফেয়ার? মোদীকেই জিতাবার স্বার্থে আমাদের সরকার কী মোদীর অত্যাচার, অনাচার জুলুমের দায়ীত্ব নিজের কাধে নিবে? আমাদের সরকারের নিজেকে আরও ভারতমুখি পরিচয়ে আর নিজেকে গণবিরোধী করার রিস্কের মধ্যে ফেলা ঠিক হবে? মনে হয় না।

ভারতের হবু নির্বাচনে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের দুই দিকে দুই রাজ্যে থেকেই মোদীর সম্ভাব্য বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডায় (যা ইতোমধ্যে আমরা রাজস্থান, ছত্তিসগড় নির্বাচনে দেখেছি) দেখতে হবে আমাদেরকে। বলা বাহুল্য এতে বাংলাদেশে এর বিরুদ্ধে পাল্টা সরব প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। আর সম্ভাব্য সে পরিস্থিতির কথা আঁচ করে আগে থেকেই ভারতকে সাবধান করে নিজেদের স্বার্থ-প্রতিক্রিয়ার কথা তুলে না ধরা হবে আমাদের সরকারের আর এক বড় ভুল।

গুরুতর প্রশ্ন, এ নাগরিকত্ব বিল পাসের পরে আসাম্র ‘নাগরিকত্ব অ-প্রমাণিত থেকে যাওয়া’ প্রায় ১৭ লাখ মুসলমানের কী হবে? রোহিঙ্গাদের মত তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হবে? অথবা মোদীর উসকানি ও ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্যের কারণে জীবনের ভয়ে তারা আসাম ছেড়ে বাংলাদেশের দিকে ঢল নামাবে, নাকি তাদের বাধ্য করা হবে?

আমাদের উচিত হবে এমন যেকোনো কিছুর আগে এনিয়ে মোদীর সাথে ‘ডায়লগ ওপেন’ করা। মোদীকে আগে থেকেই সংযত করা, আমাদের উদ্বেগের কথা বলা এবং প্রতিশ্রুতি আদায় করা হবে আমাদের প্রাথমিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ। অন্যথায় আমাদের সরকারকে অজনপ্রিয় হওয়ার অপ্রয়োজনীয় ভারতমুখি পরিচয়ের রিস্ক নিতে হবে।

শেষ কথাঃ
শেষ কথাটা হল এই বিল পুরাপুরি আইনসিদ্ধ হবার প্রক্রিয়া এখনও বাকী। কারণ লোকসভায় পাশের পর এবার ভারতের উচ্চ-কক্ষ, রাজসভাতেও তা পাশ হতে হবে। তবেই প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর তা পরিপুর্ণ আইন হবে। রাজ্যসভা বসবে আগামি ৩১ জানুয়ারি। সবচেয়ে বড় কথা কিন্তু এখানে বিজেপি জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাই। এর অর্থ এই বিল এখানে পাশ হবার কোন সম্ভাবনা নাই। ২৪৫ সদস্যের রাজ্যসভায় বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএর জোট এখনো ৮৮ জন সদস্য। বিপরীতে বিজেপি বিরোধী শিবিরের এই মুহূর্তে সদস্যসংখ্যা ১৫৬। তাই পাস হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। 
তাহলে এটা জানার পরেও মোদী এত উদ্যোগী কেন? কারণ, আপাতত তাঁর “বাঙালি-হিন্দুমুখি” প্রেমের প্রকাশ – আর কিছু পারুক না পারুক  মোদীর মূল উদ্যোগ হল – এটা দেখিয়েই সে কাজ সারতে চায়। এটাই তাঁর পশ্চিমবঙ্গ, আসাম-ত্রিপুরাসহ পুরা নর্থ-ইস্টে (মোট ৬৬ আসনে) নির্বাচনে লড়বার লক্ষ্যে মেরুকরণে হিন্দুত্ব রাজনীতির একমাত্র কৌশল।  আর এই মেরুকরণে এই অঞ্চলের প্রাণ-বেড়িয়ে যাবার অবস্থা তৈরি হলেও সংকীর্ণ স্বার্থপর বিজেপি ও মোদী নির্বিকার; যেভাবেই হোক তাঁকে ক্ষমতা পেতে হবে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) মোদির নতুন বিল: আসাম ও বাংলাদেশ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

“ভূমিধস বিজয়” দেখে ভারতের মিডিয়ায় শঙ্কা

“ভূমিধস বিজয়” দেখে ভারতের মিডিয়ায় শঙ্কা

গৌতম দাস

১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2wO

 

বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে; অফিসিয়াল ফলাফল প্রকাশ, শপথ নেয়াসহ মন্ত্রিসভা গঠন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়ে গেছে। সরকারের দেশি-বিদেশি সুবিধাভোগীরা এই বিজয়কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইংরেজি শব্দ ‘ল্যান্ড-স্লাইড ভিক্টরি’ [Land Slide Victory], বা বাংলায় “ভূমিধস বিজয়” শব্দ দিয়ে নির্বাচনী ফলাফল ব্যাখ্যা করছে। কারণ, দাবি অনুযায়ী এই ফলাফলে  ২৯৮ আসনের মধ্যে ২৮৮ আসন আওয়ামী জোটের ব্যাগে এসেছে। অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ আসন পেয়েছে সরকার। তাই অফিসিয়ালি ফলাফলে ৯৭ শতাংশের বিজয়কে ব্যাখ্যা করতে গেলে ভূমিধস ধরনের শব্দ খুঁজে এনেই সম্ভবত একমাত্র এমন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করা যায়।

কিন্তু ভারতের মিডিয়ায় বিস্ময়কর এক “কিন্তু” আমরা লক্ষ করছি। নির্বাচনী ফল প্রকাশিত হওয়ার অন্তত এক দিন পর থেকেই ভারতের মিডিয়ায় এই ফলাফল নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ শুরু হতে দেখা যাচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে ততই তারা বিভিন্ন মত ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে তাদের অস্বস্তিকর মন্তব্যগুলো প্রকাশ করে যাচ্ছে। আর এতে প্রায় প্রত্যেকের রিপোর্টের শিরোনামে ‘যদি’, ‘কিন্তু’ ধরনের শব্দ দেখা যাচ্ছে। যে বক্তব্যগুলোর সারকথা হল, তাদের অনুমান এই নির্বাচনী ফলাফল ভারতের স্বার্থের জন্য অন্তত লং টার্মে বা শেষ বিচারে শুভ ইঙ্গিত নয়। খারাপ কিছুর কু-ইঙ্গিত। তাই এখান থেকেই ফলাফল গ্রহণে অস্বস্তির শুরু। ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত এমন মন্তব্য-প্রতিক্রিয়াগুলো থেকে কয়েকটা এখানে তুলে এনে আলোচনা করা হল।

একঃ কাঞ্চন গুপ্ত
যেমন ভারতের এমন ‘কিন্তু’ দৃষ্টিভঙ্গির মন্তব্যের এক লেখক হলেন কাঞ্চন গুপ্ত। তিনি সবার চেয়ে আগে, অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর, নির্বাচনের পরের দিনই কাঞ্চন গুপ্তের লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। আর তার লেখা ছেপেছে আবার ভারতের প্রভাবশালী বেসরকারী থিঙ্কট্যাঙ্ক “অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন”। যদিও কাঞ্চন গুপ্ত তাদের নিজেদের স্টাফ নন, তাই বাইরের লেখকের লেখা হিসেবে তারা ছেপেছে। কাঞ্চন গুপ্তের পরিচয় খুবই কম করে বললেও তা হল, তিনি একসসময়ের বাংলাদেশ (পুরানা পুর্ববঙ্গের) এক ব্রাক্ষ্মসমাজ পরিবারের সদস্য, এখন দিল্লি-নিবাসী এক প্রবীণ সাংবাদিক; যার আবার চলতি শতকের শুরুতে বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ি বা মন্ত্রী আদভানির টেকনিক্যাল এইড বা মিডিয়াসংক্রান্ত সহকারী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে। তারই লেখার শিরোনাম হল, “বাংলাদেশে এখন একদলীয় গণতন্ত্র’[Bangladesh now one-party democracy] । একদিক থেকে দেখলে এটা কোন খাতির বাছবিচার ছাড়া খুবই খাড়াভাবে তাঁর বক্তব্য হাজির করা হয়েছে। এছাড়া ঐ লেখার ভেতরের বিশেষ জোর দেয়া কিছু বুলেট বক্তব্য আছে। সেখান থেকে তুলে আনা এমন চারটা বক্তব্য হলঃ
যেমন- ১. “সব ব্যবহারিক অর্থে বাংলাদেশ এখন একটা একদলীয় রাষ্ট্র, যদিও ঐ দেশে এখনও “কিছু আসে-যায় না” ধরণের কয়েকটি দল রয়ে গেছে – যেন এটি প্রমাণ করার জন্য যে কনস্টিটিউশনাল বর্ণনায় বাংলাদেশ বহুদলীয় রাষ্ট্র”। [For all practical purposes Bangladesh is now a single-party state with inconsequential parties keeping alive the country’s constitutional description as a multiparty democracy.]
২. ” অভিযোগ হল, আওয়ামি লীগ ভিন্নমতকে নিশ্চুপ করে এক নির্বাচন আয়োজন করেছে যেটা না প্রভাবমুক্তভাবে স্বাধীন না ন্যয়নীতিতে পরিচালিত – এখন সেই অভিযোগকারিদেরকে অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলা হয়েছে”। [Equally irrelevant are those who accuse the Awami League of silencing dissent and organising an election that was neither free nor fair.]

৩. “নিজস্ব কায়দায় চালানো শেখ হাসিনার এক ওয়ার অন টেররের তৎপরতা আছে। এই ততপরতায় টার্গেট করে হত্যা করা বা গুম করে দেয়ার অভিযোগ সম্পর্কে অনেক কথা লেখা হয়েছে, বলা হয়েছে। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের ক্রমেই ভায়োলেন্ট রেডিক্যালিজমের দিকে গড়িয়ে পড়া থেমেছে – এ কথার পক্ষে যায় এমন কোনো প্রমাণ নেই বললেই চলে”। [Much has been said and written of Sheikh Hasina’s own war on terror through targeted killings and alleged disappearances. There is little evidence to suggest that has halted Bangladesh’s slide towards violent radicalism.]
কাঞ্চন গুপ্তের এই বাক্যটা সম্পর্কে একটা মন্তব্য করা জরুরি যে, তাঁর একথাগুলো রাখঢাক না করে আবেগহীন ভাবে বলা সত্য, যা ভারতের স্বার্থের পক্ষে গেল কী না এই বিবেচনা না রেখেই তিনি বলেছেন।

তবে সব ছাড়িয়ে কাঞ্চন গুপ্তের গুরুত্বপূর্ণ তিন মন্তব্য আছে যা এখানে এখন আনা হবে। এর প্রথমটা হল তাঁর লেখার প্রথম বাক্য। খুবই চাচাছোলাভাবে তিনি আমাদের বলছেন, “প্রথম ভোটটা বাক্সে পড়া বা বাক্স গণনা শেষ হওয়ার আগে জানাই ছিল ফলাফল কী আসবে। কেবল বাকি ছিল এ কথা জানা যে, তিনি কত আসন সাথে নিয়ে আসবেন – যা প্রমাণ করবে হাসিনার আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে যোগ্য কেউ নাই”। [The results of the 11th parliamentary election in Bangladesh were known even before the first vote was cast last Sunday or the first ballot was counted in the evening on the same day. It was only a question of how many seats would Sheikh Hasina Wajed’s Awami League tote up to prove its point that it faces no opposition worth its name.]

এ ছাড়া কাঞ্চন গুপ্তের প্রথম মন্তব্য শুনে যাতে পাঠক আবার আশাবাদী না হয়ে যান সেটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাঁর দ্বিতীয় মন্তব্য হলঃ “বিরোধী দল এখন যতই ফ্রেশ নির্বাচনের দাবি জানাক সেটা ঘটবে না; তাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা আমেরিকা এর পক্ষে কোনো আগ্রহ নিয়ে হাজির হবে বলে মনে হয় না”।’ [The opposition can keep demanding fresh elections but that will never happen. It is unlikely that either the US or the EU will strike a particularly harsh posture on the quality of Sunday’s election …… ]

এই হলেন কাঞ্চন গুপ্ত ও ভারতের মিডিয়ায় তাঁর আবেগহীন পর্যবেক্ষণ, যেটা এক অস্বস্তিকর প্রকাশও বটে।আর তার নিচের বাক্যটা হল চীনভীতি হতাশার। বলছেন, হাসিনা যেভাবে ব্যাখ্যা করছেন যে, ভোটাররা উন্নয়নের পক্ষে রায় দিয়েছে। এ কথাটি অনুসরণ করে সবার চেয়ে বেশি খুশি হবে আসলে চীন। [……would bear testimony to her claim that Bangladeshis have voted for development and progress. China would be more than willing to oblige.] তিনি বলতে চাইছেন এই বাক্য ত চীনের পক্ষে গেল!

দুইঃ ‘এশিয়ান এজ’ পত্রিকায় ভরত ভূষণ
এবার দ্বিতীয় মিডিয়া মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া হল, ৩ জানুয়ারিতে ‘এশিয়ান এজ’ পত্রিকায় ভরত ভূষণের লেখা। তার লেখার শিরোনাম, “গণতন্ত্রের জন্য বা ভারতের স্বার্থের জন্য এটা কোনো অর্জনই নয়”।[No gain for democracy, or for India’s interests]। এছাড়া পরে বিস্তারে ভেঙে বলছেন, “বাংলাদেশের নির্বাচনী ফলাফল ঐ দেশের গণতন্ত্র অথবা দক্ষিণ এশিয়া বা বাইরে ভারতের লংটার্ম স্বার্থের জন্য কোন অগ্রগতি বয়ে আনবে না”। [The Bangladesh election results are neither going to further democracy in that country nor India’s long-term interests in South Asia, and beyond.]
তবে একটা মিলের দিক হল, ভরত ভূষণও উপরের কাঞ্চন গুপ্তের মত মনে করেন, “বিরোধীদের পুনর্নির্বাচনের দাবি বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন যাকে বিরোধীরা সরকারি দলবাজ বলছেন, সেও আমল করবে না”। কিন্তু ভরত ভূষণের অভিযোগ আরও খাড়া এই অর্থে যে তিনি খোদ হাসিনা সরকারের দিকে সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। তিনি মনে করেন, “সরকারের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে দেশটার বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন তাদের ইমেজ হারিয়েছে। মিডিয়াও সরকারি খবরদারির বয়ানের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে। সরকার ও সরকারের বাইরে যারা আছেন তাদের মানে, এমন কর্তাব্যক্তিদের রেকর্ড আছে যে তারা বিরোধীদের ওপর হামলা করেছেন। এ অবস্থার মুখে গণস্বার্থ নিয়ে কথা বলা বুদ্ধিবৃত্তির লোকেরা ও স্বাধীন ব্লগাররাও জীবনের ভয়ে ভীত হয়ে উঠেছে”।’ [Due to political manipulation by the State, the judiciary and the Election Commission have also lost their sheen in the country. The media has fallen in line with state diktats. Given a history of attacks by both state and non-state actors, public intellectuals and independent bloggers fear for their lives.]

তবে ভরত ভূষণের মূল উদ্বেগের পয়েন্ট হলঃ তিনি লিখছেন, “ভিন্নমত প্রকাশ হতে দেয়ার সুযোগ না রাখায় দমবন্ধ পরিবেশে আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভিন্নমতের লোকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাতে এটা এই রাষ্ট্রের জন্য খুবই বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলা হচ্ছে, যেখানে ইতোমধ্যেই ইসলামী রেডিক্যালদের তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থিতি আছে। দেশে সুস্থ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বজায় না রাখার ব্যর্থতা – এটাই যেকোনো ধরনের রেডিক্যাল রাজনীতির জন্ম ও বিস্তারের জন্য তা খুবই উর্বর ভূমি হিসেবে হাজির হয়। এধরনের অবস্থা-পরিস্থিতিগুলোই মানুষকে ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়তে ঠেলে দেয়, ঠিক যেমন মিসর বা আলজেরিয়ায় ঘটেছিল। [The absence of democratic safety valves and with institutions of the state “weaponsied” against dissent, is a particularly dangerous situation for countries which have a significant presence of Islamic radicals. The failure of political processes creates a fertile ground for the expansion of radical politics. The people can then easily turn to Islamic radicalism, as happened in Egypt and Algeria.]।

তিনি সঠিকভাবেই মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করে বলছেন, রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপগুলোকে অকেজো করে ফেলা হচ্ছে তড়িত নগদ কিছু ফল পাবার আশায় অথচ ক্ষমতাসীনেরা যারা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকতে চায় ইয়াদের হাতেই এটা হচ্ছে”। [The democratic institutions of Bangladesh have been eroded for short-term gains by those in power for a long time.]

শেষ কথা হিশাবে তিনি বলছেন, “এ ছাড়া এই নির্বাচনী ফলাফল থেকে আসন্ন স্ট্র্যাটেজিক প্রভাব যা নিয়ে আসবে তা শেষ বিচারে এর ফসল চীনের পক্ষেই যাবে আর তাতে বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ শুকিয়ে চিপার মধ্যে পড়ে কি না, সেটাই দেখার বিষয় হবে। [China wants a strategic foothold in Bangladesh to counter the United States, and secondarily, India…….As this great game unfolds, it remains to be seen whether or not Indian intersts will get squeezed out of Bangladesh.]

তবে সবচেয়ে চোখে পড়ার মত তার মারাত্মক ক্রিটিকাল পয়েন্ট হল, তিনি এমন একতরফা নির্বাচনের নিন্দা বা অসম্মতি প্রকাশ করতে বলছেন, “ভারতের জন্য নিরন্তর যেটা ভয়ের বিষয় বাংলাদেশে কোন ইসলামি রেডিকেলের উত্থান আর সীমান্ত পেরিয়ে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা – এমন একপক্ষীয় নির্বাচন সেই আশঙ্কাকেই আয়ু দিবে। ভারতের দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থের দিক থেকে দেখলে পকেটে গানপাউডার নিয়ে ঘুরা এক বাংলাদেশের চেয়ে সুস্থির নিয়মতান্ত্রিক বাংলাদেশই ভারতের জন্য কাম্য”। [As for India’s primary bugbear, the rise of Islamic radicals in Bangladesh and its consequences across the border, a one-sided election may have given it a new  breath of life. In the long run, it might be easier to deal with a stable and democratic Bangladesh than one that may become a powder keg.]

তিনঃ একাডেমিক স্কলার সুমিত গাঙ্গুলী
আমাদের তৃতীয় উদাহরণ হল, একাডেমিক স্কলার সুমিত গাঙ্গুলির লেখা এক রচনা। সুমিতের পরিচয় হল, তিনি রাজনীতি বিজ্ঞানের প্রফেসর। এ ছাড়া, তিনি আমেরিকান ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় কালচার ও সভ্যতা বিষয়ের রবীন্দ্র চেয়ারের অধ্যাপক। আর তাঁর লেখা ছাপা হয়েছে আমেরিকান ‘ফরেন পলিসি’(Foreign Policy)  পত্রিকায় ৭ জানুয়ারিতে।

তার লেখার শিরোনাম হল, ‘বিশ্বের বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যর্থতার দিকে নজর করা উচিত”। [The World Should Be Watching Bangladesh’s Election Debacle]। আর এই লেখার দ্বিতীয় শিরোনাম হল, “ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন প্রক্রিয়াকে একটা তামাশা বানিয়ে ছেড়েছে, ইসলামী চরমপন্থার অসুস্থ ইচ্ছাকে প্রলুব্ধ করেছে আর দেশকে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেছে”। [The ruling party is making a mockery of the electoral process, pandering to Islamic extremists, and turning the country into an authoritarian state]। তাঁর অস্বীকৃতি প্রকাশের লক্ষ্যে খুবই কড়া কড়া শব্দ প্রয়োগ সন্দেহ নাই। যদিও এই লেখকের দেখার অবস্থান একজন ইসলাম-বিদ্বেষী আন-ক্রিটিক্যাল সেকুলারের। কিন্তু সেদিকটাকে পাশে ফেলে রেখে আমরা তাঁর কথা আমল করব এখানে।

প্রথমত, তিনি একে ‘প্রশ্নবিদ্ধ ফলাফলের (questionable results)’ নির্বাচন মনে করেন। তাঁর লেখা শুরুর দ্বিতীয় বাক্য হল এরকম  The questionable results ended in a sweeping victory …।] এবার তাঁর লেখা থেকে তিনটি বুলেট বাক্য উঠিয়ে আনব এখানে।

তিনি মনে করেন- ১. ‘সস্তা রাজনৈতিক লাভালাভের স্বার্থে এই দল (মানে আওয়ামী লীগ) ধর্মীয় সহিংস দলের উত্থানের বিরুদ্ধে কার্যকর কৌশল গ্রহণের বদলে ধর্মীয় ভোটারদের [হেফাজতের সাথে আপোষ সম্পর্ককে বুঝিয়েছেন] সাথে আপস করেছে। [For reasons of political expediency the party has failed to fashion a concerted strategy to curb the rise of such religious militancy; it prefers to court religious voters.]
২. আওয়ামী লীগের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনী বিজয় বাংলাদেশের জন্য খারাপ খবর, যেখানে গণতন্ত্রের আলখাল্লায় ঢেকে এটা এক কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি পয়দা ও সংহত হতে সাহায্য করবে। [The Awami League’s questionable electoral victory is bad news for Bangladesh, where it will aid the consolidation of an authoritarian political order with a democratic facade.]
৩. এই দানব ক্ষমতার বিরোধীদের ওপর আগ্রাসী আক্রমণাত্মক ভূমিকা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আমল না করার একমাত্র চিহ্ন নয়। [The regime’s hostility toward the opposition was not the only marker of its disregard for democratic procedures.]

উপরের বাক্যগুলো নিজেই নিজের ব্যাখ্যা, তাই বিস্তারে যাওয়া হল না। তবে এছাড়া, সবশেষে সুমিত গাঙ্গুলিও মনে করেন, “ট্রাম্প বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলের অন্যান্য জায়গায় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছে না। এর বদলে আফগানিস্তানে আমেরিকার ভবিষ্যত নিয়েই সে বেশি চিন্তিত। ফলে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তথা বাংলাদেশের সুস্থ নির্বাচন প্রক্রিয়া সঠিক করা বা ঘাটতি পুরণের জন্য শক্তি খরচ সে করবে বলে মনে হয় না”। [Finally, the Trump administration, to the extent it has devoted any attention to South Asia, has mostly been preoccupied with the future of the U.S. involvement in Afghanistan. It has paid little attention to political developments in Bangladesh or elsewhere in the region. Consequently, it seems highly unlikely that Washington will expend much energy, let alone political capital, to address the shortfalls of this election.

চারঃ প্রাক্তন সচিব অভিজিত চক্রবর্তী
চতুর্থ ও শেষ উদাহরণ টানব অভিজিত চক্রবর্তীর লেখা। অভিজিত ভারত সরকারের কেবিনেট সেক্রেটারিয়েটের সাবেক বিশেষ সচিব ছিলেন বলে লিখেছেন। অনুমান করা হয়, এ ধরনের বিশেষ সচিবের মানে এরা আসলে গোয়েন্দা বিভাগের কর্তা হয়ে থাকেন। সে যাই হোক, তার লেখা ছাপা হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার ইকোনমিক টাইমসে, (Economic Times), ৭ জানুয়ারি।

তার লেখার শিরোনাম, “বাংলাদেশের রাজনৈতিকতা রেডিক্যাল হয়ে যাচ্ছে ভারতের শঙ্কিত হওয়া উচিত”। [India should be wary of radicalisation of Bangladesh’s polity]। রেডিক্যাল বলতে আমরা সাধারণভাবে সব ধরনের “সশস্ত্র রাজনীতি” বলে  বুঝতে পারি। যদিও তিনি এখানে সুনির্দিষ্ট করে ইসলামি রেডিক্যাল বুঝাতে চেয়েছেন। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি এক মারাত্মক হাতেগণা অকাট্য প্রমাণ দেখিয়েছেন। বলছেন, “আওয়ামী লীগের ৯০ শতাংশের বেশি আসনে বিজয় এবং সাঙ্ঘাতিক রকমের সংখ্যার ব্যবধানে বিজয় দেখানো, এই নির্বাচন পরিচালনাকে প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে; বিশেষত যদি, আমরা বিএনপি ও জামায়াতের নিশ্চিত সমর্থক ভো্টার ভিত্তির কথা মনে রাখি”। [The win in over 90% of the seats contested by the Awami League and some with astounding victory margins have contributed to the questionable conduct of the elections, given the committed vote base of the BNP and JeI. অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন, এই ৯০% এর বিজয় যদি মানি তাহলে একা বিএনপির প্রায় স্থায়ী ভোটার বেজ ৩০-৩৫% যা বলা হয় সেটাকে ব্যাখ্যা করব কী করে? এছাড়া জামাতের ভোট ত আছেই!

এছাড়া তিনি আরও বলছেন, ‘এই নির্বাচন শুধু বিরোধীরা নয় আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছেও প্রশ্নবিদ্ধ; তারা এর তদন্ত দাবি করেছেন”। [The latest election falls short of widespread acceptability as not only the opposition parties, but also the EU and US have questioned the process and demanded investigation into the reports of harassment, intimidation and violence.]

এরপর তিনি সবশেষে একটা মন্তব্য জুড়ে দিচ্ছেন, “এসব ফ্যাক্টর একটা দেশে স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দিক থেকে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে, যে দেশ অতীতে ধারাবাহিকভাবে বিরতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ দেখে এসেছে”। [All these factors may pose a challenge to the establishment of a stable democracy in a country that has seen periodic military interventions in the past.]।
স্যরি, অভিজিত চক্রবর্তীকে বলতেই হচ্ছে, এই শেষ বাক্য তিনি না জুড়ে দিলেই ভালো হত। সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে এই মন্তব্য খুবই হাল্কা ও উস্কানিমূলক হয়েছে। এতে তিনি নিজের বিদ্যাবুদ্ধি, পেশা, তথ্য যোগাড় ও দক্ষতার মান নিচে নামিয়ে দিলেন।

সে যাই হোক তিনি হেফাজতের সাথে আওয়ামি লীগের আপসে চরম ক্ষুব্ধ। তিনি বলছেন, “গত দশ বছর তিনি শাসন ক্ষমতায় একনাগাড়ে থাকলেও ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। এতে সমাজে দেশের ইসলামী পরিচয়কে মুখ্য করে তোলার রাজনীতির সামাজিক সুবাতাস পেয়েছে”। [The wooing of radical elements by all the political parties is an indication that despite 10 years of the Awami League government, the societal winds continue to favour a strong Islamist identity in the country. ] এটা বেশ ইন্টারেস্টং যে তিনি হাসিনার বিরুদ্ধে “ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতিকে” প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
তবে তিনি মূলত বলতে চাচ্ছেন, “এই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে বাংলাদেশকে রেডিক্যাল রাজনীতির দিকে ঠেলে দেয়া হল”। এ ছাড়া সেকুলারিজমের মৌলিক বীজ ও চিহ্নগুলোকে ক্ষয়ে ফেলা হয়েছে। [The erosion of secular ethos will not only affect minorities, ………. ] ফলে তিনি এবার এক সাঙ্ঘাতিক কথা বলেছেন। বলছেন, সব মিলিয়ে “এটা ভারতের নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারত”।  [These developments could pose security challenges for India, especially in the northeast.] অর্থাৎ তার কথা সঠিক বলে মানলে হাসিনার এ নির্বাচনী ফলাফল ও পরিচালনা ভারতের জন্য নিরাপত্তার ক্ষতি বয়ে এনেছে বা আনবে।
এসব কথার সূত্র ধরে তিনি এবার নতুন হাসিনা সরকারে চীনের প্রভাব বেড়ে যাবে বলে দেখছেন। তাই তার শেষ কথা “ভারত এসব দেখে শঙ্কিত না হয়ে” ব্যাপারটাকে উপেক্ষা করতে পারে না।
তার পু্রা কথার মধ্যে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল, এটাকে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন বলছেন আর এতে তিনি ভারতের জন্য বিপদ দেখছেন।

সবশেষেঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
আনন্দবাজার পত্রিকার উদাহরণ দিয়ে শেষ করব। এটা ১ জানুয়ারির রিপোর্ট, শিরোনাম হল– ‘ভোটে জিততে মুখ চাই, কংগ্রেসের হারের সাথে বিএনপির মহাবিপর্যয়ের তুলনা টানলেন হাসিনা।’ আনন্দবাজারের শিরোনাম এমন পেঁচানো হয় যে, খবরটা আগে পড়া শেষ না করলে শিরোনামের অর্থ জানা যায় না। এই রিপোর্টেরও সারকথা – আনন্দবাজারেরও একই উদ্বেগ, জয়লাভের পারসেন্টেজ বেশি হয়ে গেছে- বিরোধী দল থাকল না।

লিখেছে, “ঘোষিত ২৯৮টি আসনের মধ্যে, জাতীয় পার্টি এবং আরও ৬টি দলকে নিয়ে শেখ হাসিনার মহাজোট পেয়েছে ২৮৮টি”।  অর্থাৎ সরকারি জোট একাই ৯৭% আসন পেয়ে গেছে। “সেই অর্থে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আর তেমন কোনো অস্তিত্বই থাকল না”। এই হল আনন্দবাজারের উদ্বেগ। এখন এখানে এক তামশা দেখলাম আমরা। আনন্দবাজারের এই উদ্বেগ তাড়াতে একপর্যায়ে উপায় না পেয়ে হাসিনাকেই বলতে হল, “আগামীতে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এসে যেতে পারে”। এর উদাহরণ হিসেবে বললেন, “আজকের বিজেপিও তো একসময় ভারতের সংসদে মাত্র দু’টি আসন পেয়েছিল”। এ ছাড়া, হাসিনাকে বিএনপির হারের ব্যাখ্যাও নিজেই কান্ধে নিয়ে দিতে হয়েছিল। হাসিনা ব্যাখ্যায় বলেছেন, বিএনপি জিতলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, সেটি না বলাতেই নাকি তারা মূলত হেরেছে।
যা হোক সারকথাটা হল, ৯৭ শতাংশের মত আসন পেয়ে আওয়ামি লীগের শান্তি ছুটে গিয়েছে। উল্টো আওয়ামী লীগকেই বিএনপির আগামী সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে আপাতত নিজের জিতবার সাফাই দিতে হয়েছিল।

তবে এর বাইরেও অনেক রিপোর্ট, মন্তব্য, কলাম আছে পাওয়া যাবে; যা এখানে আনা হয়নি। যেমন সরাসরি ট্রাম্পকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপের আহবান জানিয়েছে এমন রচনাও আছে। তবে ভারতের এসব মুল্যায়ন প্রকাশের সাধারণ সুরটা হল, এই নির্বাচনে ৯৭ শতাংশ আসনে আওয়ামী লীগের বিজয়কে ভারত আগামী দিনে নিজ দেশের জন্য লুকানো বিপদ বলে মূল্যায়ন করছে। সে কারণেই এত অস্বস্তি।
আর একটা সোজা ফ্যাক্ট হল, আমেরিকার মুখ ফিরিয়ে নেয়া। এতে যে ঐ খালি জায়গার দখল পাচ্ছে সেই লাভের ফসল যাচ্ছে মূলত চীনের ঘরে। কারণ, রাজনৈতিক অধিকারের (Political Right) বদলে “উন্নয়নের রাজনীতির” – হাসিনার এই রাজনীতিতে বিজয়ের সোজা অর্থ -ক্রমশ  হাসিনার কাছে আপন হয়ে উঠবে চীন যেখানে ভারত হবে তুচ্ছ, পরাজিত পার্টি! যার অন্তত কিছু কারণ ভারতের কোনো বিনিয়োগ সক্ষমতা নাই। আর আমেরিকার হবু কোন হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা প্রায় নাই বলে এর বিরুদ্ধে  ভারতের সুপারিশ আর জরুরি না।  যার ফলাফল, চীনের সাথে আরো ঘনিষ্ঠ এক বাংলাদেশ। আর তাতে ততই শিরশিরে ঠাণ্ডা চিলিং অনুভুতির এক ভারত – হতে দেখছি আমরা।
এ ছাড়া মানুষের রাজনৈতিক অধিকার  দাবড়ে রেখে হেলমেট বাহিনী আর গুম-খুন দিয়ে রাষ্ট্র চালানো, “উন্নয়নের রাজনীতির” আওয়াজে সব আড়াল করা এসব কিছুর ফলে  সত্যি সত্যিই  রেডিক্যাল – শুধু ইসলামের নয় যেকোন – রাজনীতি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা, সেটা তো আছেই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ‘ভূমিধস’ বিজয়ে ভারতের মিডিয়ার শঙ্কা – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

গৌতম দাস

১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2wJ

যেমনই হোক, বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তবে আগামী দিনের ইতিহাস অন্য এক কারণে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন মনে করবে। কিন্তু কিসের? গ্লোবাল নেতা ও নেতৃত্ব বদলে যাবার। বলা হবে, বাংলাদেশের দিক থেকে দেখা দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল টের পাওয়া গিয়েছিল এই নির্বাচন থেকে। আমেরিকার দিন শেষ, গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে তাঁর ছুটি হয়ে গিয়েছিল। হেরে গিয়েছিল। আর বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে চীন গ্লোবাল নেতার আসন গ্রহণ করে নিয়েছিল। মুরোদহীন সোভিয়েত কমিউনিস্টরা সত্তরের দশকে একটা স্লোগান দিত – হাত গুটাও মার্কিন। তাই যেন হয়ে গেল; এসবেরই মাইলস্টোন এই নির্বাচন। আর এখান থেকেই বাংলাদেশ-সম্পর্কিত গ্লোবাল সম্পর্কগুলোর মধ্যে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে নতুন ধরণের এক স্ট্রাটেজিক ভারসাম্যে প্রবেশ করে গেল।

আমরা যে দুনিয়াকে “গ্লোবাল রাজনৈতিক দুনিয়া” অথবা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া” বলে আজ চিনি, এর বয়স খুব বেশি না হলেও তা সর্বোচ্চ ‘সত্তর থেকে ছিয়াত্তর বছরের’। এর মানে এর আগে দুনিয়ায় কি স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল না? হ্যাঁ ঠিক তাই; ছিল না। আর সে দুনিয়া মানে ছিল এক কলোনি সম্পর্কের দুনিয়া। এখানে সম্পর্ক  কথাটা বুঝতে হবে বহুরাষ্ট্রীয় (শুধু পণ্য নয়) ভাব-ভাষাসহ  সব কিছুর লেনদেন বিনিময় – এক গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ হিশাবে। যেমন আগের সে দুনিয়ায় আমাদের নাম ছিল ব্রিটিশ-ভারত; মানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কলোনি-দখল-ভূমি হয়ে থাকা, তাদের মালিকানায় থাকা এক ভারতবর্ষ; “ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া” নাম ছিল আমাদের। এই অবস্থাটা বজায় ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত; সেকালের যার গ্লোবাল রূপটা ছিল – এক দিকে উপনিবেশ মালিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মত তবে ছোট-বড় সব মিলিয়ে ছয়-সাতটা সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র, যারা সারা দুনিয়াকে নিজেদের মধ্যে দখল-মালিকানায় ভাগ করে নিয়ে রেখেছিল। ফলে স্বাধীন রাষ্ট্র বলতে কিছুর অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। সোজা ভাষায় তাই স্বাধীন রাষ্ট্র বা কলোনিমুক্ত রাষ্ট্রের ফেনোমেনা শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পর থেকে।

যেমন ১৯৪৫ সালের পরে ১৯৪৭ সালে এসে আমরা উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েছিলাম। তবে সেটি অবশ্য আর কোন অর্থেই আগের অখণ্ড ভারত নয়, বরং ভারত আর পাকিস্তান দুই আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা মুক্ত হয়েছিলাম। তবে বড় কথা, সেটি আবার শুধু ভারতবর্ষেরই ফেনোমেনা নয় বরং সারা দুনিয়াতেই উপনিবেশ হয়ে থাকা বেশির ভাগ রাষ্ট্র পরের ২০ বছরের মধ্যে সবাই মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যায়। তাই কথাটি এভাবে বলা যায়, ১৯৪৫ সালের আগের দুনিয়া হল – উপনিবেশ হয়ে থাকা দুনিয়া বা কলোনি মাস্টার-প্রজা সম্পর্কের দুনিয়া।

আর এর বদলে বিশ্বযুদ্ধ শেষে এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়া হল, কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের দুনিয়া; যেটি আসলে আমেরিকার নেতৃত্বে এক নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দুনিয়া। আগের প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি শাসনের শেষে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার কথাই বলছিলাম যার বয়স মাত্র প্রায় ৭০ বছর। তবে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার প্রায় শেষ পর্বে দাঁড়িয়ে আমরা এখন কথা বলছি। এখন শুরু হবে বা হয়ে গেছে তৃতীয় পর্ব। চলতি একুশ শতকে এসে মোটামুটি এখান থেকেই শুরু হয়েছে পুরনো আমেরিকার নেতৃত্বের দিন শেষ আর বদলে তার জায়গা নিতে – বাংলাদেশের প্রেক্ষিত থেকে বলা যায়, এই নির্বাচনকালীন সময় হল সেই চিহ্ন যে চীন নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের দিক থেকে অনুভবে চীন আর আসন্ন নয়, চীন গ্লোবাল নেতৃত্বের আসন নিয়ে নিল।  তৃতীয় এই পর্বে দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলে কবে কী ঘটেছিল – আগামী দিনের লেখা ইতিহাসে তা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে আমাদের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে মনে করা হবে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন।

এই পথচিহ্ন নির্দেশ করবে যে, এই নির্বাচন থেকেই পুরনো নেতা আমেরিকার বাংলাদেশে নেতাগিরি সমাপ্ত হতে দেখা গিয়েছিল। আমেরিকার প্রভাব-আধিপত্যের মধ্যে বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগের মধ্যে যে বাংলাদেশ এত দিন ছিল, সেটি এখন বদল হয়ে নতুন সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা, চীনের নেতৃত্ব প্রভাবের যুগে প্রবেশ করল। যদিও অনেক আগে থেকেই চীনা প্রভাব ক্রমেই বাড়ছিল কিন্তু আমেরিকার হস্তক্ষেপের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাও পাশাপাশি থেকে গেছিল বলে এত দিন সেটাকে চীনের নেতৃত্বের যুগে প্রবেশ বলা যাচ্ছিল না। এত দিনের পরিচিত আমেরিকার প্রভাব আধিপত্য ও হস্তক্ষেপের সক্ষমতা এই প্রথম পুরাপুরি অকার্যকর হতে ও থাকতে আমরা দেখলাম আর এভাবেই যেমনই হোক বাংলাদেশের একটা নির্বাচন সমাপ্ত হল।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭ শতাংশ আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও পক্ষে অথবা বিপক্ষে তার কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭% (২৯৮ আসনের মধ্যে ২৮৮) আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল [imperial – imperial role of Empire] বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা অথবা পক্ষে/ বিপক্ষে কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি। আসলে নেতা বা এম্পায়ার সক্ষমতা হারিয়ে কখন উত্থান রহিত হয়ে গেছে তা বুঝার সহজ ইঙ্গিত হল – যখন দেখা যাবে নেতা বোকা বোকা কথা বলছে। আমাদের নির্বাচনের পর দেখা গেল আমেরিকা বোকা বোকা কথা বলছে। কেমন নির্বাচন হল, আদৌও সেটাকে নির্বাচন বলা যায় কী না – সেসবের খবর নাই আমেরিকা বিবৃতি দিয়ে বলছে, “নির্বাচনে সব প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণ খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি” বলে মনে করছে […… decision of all major opposition political parties to participate, a positive development…।] যেন পায়ে সাপের ছোবল খেয়ে মৃত মানুষের বাসায় এসে কেউ দুঃখে বলছে যাক, ভাগ্যিস ছোবলে চক্ষুটা কাটা পরে নাই – এমনই এক বিবৃতি। কিন্তু আমেরিকার এই অবস্থান বদল কেন?

কেন এমনটা হচ্ছে? ট্রাম্প আমেরিকাকে এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকায়” বদল করতে চেষ্টা করছে। মানে হল, গত ৭০ বছরে যে আমেরিকাকে দুনিয়া চিনে এসেছে, তা কোনো ‘ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা’ ছিল না; বরং তা ছিল গ্লোবাল এম্পেরিয়াল  আমেরিকা; অথবা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা। এই প্রথম সেই চিরচেনা ভূমিকায় আমেরিকা এবার বাংলাদেশে তার পদক্ষেপ, আচরণ রাখেনি; ত্যাগ করেছে। এটাকেই মূলত আমেরিকান হস্তক্ষেপের সক্ষমতার সমাপ্তি চিহ্ন ধরা হচ্ছে; তাতে এই হস্তক্ষেপ যে যেজায়গা থেকে দেখে ইতি বা নেতি মনে করতে পারে।

তবে এই সমাপ্তি চিহ্ন পয়দা করতে হাসিনার কোন ভুমিকা নাই বললেই চলে। ভারতেরও নাই। এমনকি, চীনসহ অন্য কারও কোন ভূমিকার চেয়ে আসলে একক ভূমিকা ছিল খোদ আমেরিকারই। মানে হোয়াইট হাউসের। সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে ট্রাম্পের অফিস – হোয়াইট হাউজকে যদি আলাদা করি তবে আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত, অবস্থান ও ভূমিকা এককভাবে ট্রাম্পের অফিস হোয়াইট হাউজের।

ট্রাম্পের ক্ষমতা নেয়া বা শপথ চলতি জানুয়ারিতে দুই বছর পূর্ণ হবে। গত ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকেই অর্থাৎ শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলে আসছেন যে, তিনি এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকার” অবস্থান নিবেন; নেতা হবেন, সেভাবে আমেরিকাকে সাজাবেন। অর্থাৎ গ্লোবাল এম্পায়রাল বা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া – এরই এক সাম্রাজ্যের নেতা হিসেবে ওর ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা আর থাকবে না। আমেরিকার যে চেহারাটা আমরা ৭০ বছর ধরে অভ্যস্ত হয়ে দেখেছি। ট্রাম্পের নতুন আমেরিকা কেমন হবে সে সম্পর্কে নতুন চিহ্নবাচক শব্দগুলো ট্রাম্প বলেছিলেন যেমন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ [AMERICA FAST] বা ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ এক ইকোনমি [TRUMP’s Anti-Globalization] অথবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যাদের ডমিনেটিং স্বার্থের সরকার তিনি হবেন – সেটা (গত সত্তর বছরের মত) ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ কোম্পানিগুলোর মত গ্লোবাল স্বার্থের হবে না, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোরও নয় [কারণ তাঁর শ্লোগান ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ ] – বরং তিনি হবেন – আমেরিকান স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারারদের যারা আমেরিকানদের চাকরিদাতা। এমন সব ফিচারের এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” গড়তে ট্রাম্প উদ্যোগী এবং রওনা দিয়েছেন।

সে কারণে এই ম্যানুফ্যাকচারারদের স্বার্থে এক বাণিজ্যযুদ্ধ, আমেরিকানদের চাকরি বাঁচানো ইত্যাদি হল আমেরিকার এখনকার সেই ক্যাচি ওয়ার্ড। এসব কথা যে চিরচেনা আমেরিকার আগের গ্লোবাল ভূমিকা বদলের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত তা আমরা অনেকেই বুঝিনি, বুঝতে চাইনি অথবা যারা বুঝেছি তারা বিশ্বাস করিনি – সম্ভবত পুরনো অভ্যাসের কারণে। এই পুরনো অভ্যাস এতই তীব্র যে, সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন বলতে যা বুঝায় বলা হয় সেও ভুল করে। মনে করে ট্রাম্পের আমেরিকা যেন আগের গ্লোবাল আমেরিকাটাই – গ্লোবাল স্বার্থের নেতা আমেরিকা। এটাই হোয়াইট হাউজ আর বাদবাকি ট্রাম্প প্রশাসনের এক না থাকা, এক আপাত-ভিন্নতা। মূল কারণ আমেরিকান আমলা ব্যুরোক্রাসি গ্লোবাল আমেরিকা দেখতে দেখতেই বড় হয়েছে, হাত পাকিয়েছে। তাই এটাই রুটিন আমেরিকান প্রশাসন। আর সম্ভবত একারণেই ট্রাম্প যাকেই মন্ত্রী-উপদেষ্টার বা কর্মকর্তার নিয়োগ দেন না কেন তারা নিয়মিত ক্রমান্বয়ে পদত্যাগ করছেন, স্থিরভাবে পদে না থাকতে পারার অস্থিরতাি এখন নিয়ম মানে “নিউ নরম্যাল” হয়ে গেছে। যেটাকে আমরা “পাগলা ট্রাম্পের কান্ড” মনে করছি।

অথচ আমেরিকা আর কখনো কোন গ্লোবাল (ইতি বা নেতি) ভূমিকা পালন করবে না – যেন সত্যিই বিড়াল এবার প্রতিজ্ঞা করছে যে সে আর মাছ খাবে না – দুই বছর ধরে এই হলো ট্রাম্পের হাতে সেট হওয়া অভিমুখ। আফগানিস্তান থেকে আরও সৈন্য প্রত্যাহার (ওবামা দশ হাজার বলে প্রতিজ্ঞা করেও শেষে ১৪ হাজার রেখে যাওয়া – সেটা থেকে আরও পাঁচ হাজার প্রত্যাহার করবেন ট্রাম্প), তালেবানদের সাথে কথা-আলাপ শুরু করেছেন সব ফেলে পালায় আসার লক্ষ্যে,  সিরিয়ায় ISIL মরে শেষ হোক আর না হোক সেখান থেকে প্রত্যাহার শুরু হয়ে গিয়েছে, জাতিসংঘে প্রদেয় আমেরিকান বার্ষিক অবদান আট থেকে  সাত বিলিয়নে নামিয়ে এনেছেন, প্রায়ই জাতিসংঘ থেকেই প্রত্যাহারের হুমকি দিচ্ছেন, ন্যাটো থেকে ফিরে যেতে চাচ্ছেন, বিশ্বযুদ্ধের পরে ‘শত্রুশক্তিকে’ রাজনৈতিক কব্জায় রাখতে জার্মানি আর জাপান আমেরিকার স্থায়ী ব্যারাকে সৈন্য রাখা আছে। স্ব স্ব দেশকে এর খরচের ভার নিতে বলছেন নইলে গুটিয়ে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন ইত্যাদি অসংখ্য প্রত্যাহারের ঘটনা আমরা বলতে পারা যাবে। এইসব প্রতিষ্ঠান গাড়া হয়েছিল গ্লোবাল নেতা আমেরিকার উদ্যোগে ও একক খরচে। ট্রাম্পের “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” মানে তো আসলেই আমেরিকার সব প্রত্যাহার, গুটিয়ে নেয়া ভুমিকা – এটাই ট্রাম্পের সেট করা আমেরিকার নতুন অভিমুখ। অতএব  এটা এখন আমাদের সু অথবা দুর্ভাগ্য যে, এই সেট করা পথে আমেরিকা আগামীতে অন্তত আরো দুই বছর থাকবে। অর্থাৎ ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হলে এরপর সম্ভবত ডেমোক্র্যাট কোনো প্রেসিডেন্ট আসলেও সেক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে আবার আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার জায়গায় ফিরে বসানোর সম্ভবত বেচে থাকবে না। তাই “ন্যাশনালিস্ট ট্রাম্পের নীতি” – এটাই আমেরিকান ভুমিকা পরিবর্তনের প্রধান ও একক নিয়ামক।  ট্রাম্পের এই নীতিই – চীনের গ্লোবাল ভূমিকা ও নেতৃত্বে এখনই বসা নিশ্চিত করছে এবং আগামীতে আরো নিশ্চিত করে চলবেন। তাই আমেরিকান গ্লোবাল ভূমিকার সমাপ্তি ঘটাতে এটা চীনের কোন লিড নয়। তবে এমন লিড না থাকলেও এই ভুমিকা সমাপ্তিতে যে নতুন পরাশক্তিগত স্ট্র্যাটেজিক ভারসাম্য তৈরি হবে, এটার মূল সুবিধাভোগী বা কোলে এসে পড়া সুবিধা যাবে এখন মূলত চীনের ভোগে।

বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে এ থেকে বাংলাদেশে ভারত নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে ভারত বাংলাদেশে নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমতে থাকবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

ঐক্যফ্রন্ট ফেনোমেনাঃ  হাসিনার ক্ষমতায় দাঁত বসানোর দিক থেকে বিচারে ঐক্যফ্রন্টকে অনেকে হয়ত অসফল বলবেন। কিন্তু অন্তত ভারতকে পাগল করে দেওয়ার জন্য খুবই সফল। আসলে বিএনপি একা না পারলেও ঐক্যফ্রন্ট ভারতকে বিভ্রান্ত ও পাগল করে দিয়েছিল। প্রাইম ঘটনাটা হল, গত একবছর ধরে হাসিনা অনুরোধ করে গেছিল যে ২০১৮ এর নির্বাচনে ভারত যেন ২০১৪ সালের মত প্রকাশ্য সমর্থন জানায়। কিন্তু ভারত তা উপেক্ষা করে গিয়েছে। কেন? অনেক বিবেচনা নিশ্চয় ছিল। কিন্তু সেসবের মধ্যে হাসিনার ‘পাবলিক রেটিং’ সম্পর্কে ভারতের নিজের মূল্যায়ন ছিল মুখ্য নিয়ামক। যা খুব ইতিবাচক ছিল না। তবে এ সম্পর্কে ভারতের মাপ-অনুমান যাই থাক, সেটা নিয়ে ক্রমশ একটা শঙ্কা বড় হচ্ছিল। সেটাকে আরো বড় করে ফেলে ঐক্যফ্রন্টের জন্ম ও আবির্ভাব। এসবের সবচেয়ে বড় চিহ্ন ও প্রকাশ হল, পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর বিখ্যাত উল্টা গান রচনা- হাসিনা ব্যাসিং। কারণ ভারতের সবচেয়ে ভয় হচ্ছিল “ঐক্যফ্রন্ট যদি এসে যায়” কারণ ততদিনে তাদের সব রেটিং অনুমান সেকথাই বলছিল। তাই হাসিনার অনুরোধ উপেক্ষা করা। তবে উপেক্ষার আরো কারণ হিসেবে অন্যান্য কম প্রভাবের ফ্যাক্টরগুলোও ছিল। যেমন হাসিনা চীনের বেল্টরোড প্রকল্পে ঢুকবেই আর ‘বোকার মতো’ সে কথা আবার ভারতকে বুঝাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবকে পাঠিয়েছিলেন, তিনি ভারতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েই সে কথা তুলেছিলেন।

এ ছাড়া আরও বলা যায়, মোদী চান নাই এক্ষেত্রে তিনি সোনিয়ার কংগ্রেস হবেন যাতে তার সচিব গোখলে আগের সুজাতা সিংয়ের মত অ্যাগ্রেসিভ, প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ ও রিস্কি কূটনীতিক তৎপরতার বাজে উদাহরণ তৈরি করে। এসব মিলিয়ে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের চার থেকে সাত দিন আগেই কেবল ভারত জানতে পারে যে, নির্বাচনে লীগের নির্বাচনে নিশ্চিত জিতবার স্ট্র্যাটেজি কৌশল ও মেকানিজম কী। কিন্তু এটা জেনে ততদিনে ভারতের অবস্থান বদলের সুযোগ ছিল না বা তা কোন অর্থ বহন করত না।  ফলে ভারত হাসিনার অনুরোধে নতুন করে আর এতটুকুও হেলেনি।  কিন্তু ভারতের কাফফারা শুরু এখান থেকে হচ্ছে এবং আগামিতে তা আরও বিরাট হবে। এসব থেকে এখন এমন এক এত বিশাল থাপ্পড় খেতে যাচ্ছে ভারত, যা এর আগে কখনো কল্পনাও করেনি। শুধু তা-ই নয়, বলা যায় শুরু। হাসিনা-ভারতের সম্পর্ক গত দশ বছরেরও বেশি, এত দিন হাসিনা ছিল ভারতকে তুষ্ট করে রাখতে ব্যস্ত এক অনুগ্রহ প্রার্থী। আর এখন, সম্পর্ক অবশ্যই থাকবে কিন্তু সম্পর্কের ডিকটাট এই প্রথম চলে গেছে ও আরও আসবে হাসিনার হাতে। বাংলাদেশের হাতে যদি না-ও হয় তবুও সুদে-আসলে বহু কিছু শোধ হতে থাকবে। আর ওদিকে সোনাদিয়া বা বেল্টরোড নিয়ে কোনো কথাই তোলার অবস্থায় থাকবে না ভারত।

না, আবারও বলছি – এগুলো ভারত অথবা চীনের ক্রেডিট অথবা ডিসক্রেডিট কোনোটাই নয়। মূল কারণ বাংলাদেশের ওপর আমেরিকার প্রভাব, আর তা থেকে হস্তক্ষেপের ভয় আশঙ্কায় থাকত যে হাসিনার। তাই মূলত এটা কাউন্টার করতেই ভারতমুখিতা।   ভারত-আমেরিকার মধ্যে চীন ঠেকানোসহ বিশেষ কিছু বোঝাবুঝি সম্পর্কের কারণে সেই সুবিধায় ভারত হাসিনার ভয় আশঙ্কাকে নিস্তেজ অথবা ব্যালেন্স করে দিত বলে একটা অনুমান কার্যকর ছিল। এছাড়া ২০১৪ সালে অনির্বাচিত সরকার গঠন পরবর্তিতে  কূটনৈতিক অস্বীকৃতির সমস্যায় হাসিনার বড় সহায় ছিল ভারত। দুনিয়াব্যাপী ভারতের কূটনৈতিক উপস্থিতি আর জাতিসঙ্ঘসহ বহুরাষ্ট্রীয় সব কূটনৈতিক ফোরাম-লবিতে ভারতের হাসিনা সরকারের পক্ষে সমর্থন ও সাফাই গেয়ে যাওয়া হাসিনার জন্য খুবই কার্যকর ও জরুরি ছিল। তাই কাছাখোলা সুবিধা দিয়ে গিয়েছে ভারতকে।

বিপরীতে ট্রাম্পের আমেরিকার কাছ থেকে হিউম্যান রাইটস বা অন্য অজুহাতের চাপ বা হুমকি এখন থেকে হাসিনার ওপর না থাকার মতো থাকবে। মানে হাসিনার জন্য আমেরিকার হস্তক্ষেপের ফ্যাক্টর দুর্বল, প্রায় নাই হয়ে থাকবে। তাই এখন থেকে ভারতকে খাতির-তোষামোদ করে, বাংলাদেশ হস্তক্ষেপের সব সুযোগ দিয়ে, দেখেও না দেখা করে রাখার যে দরকার এতদিন হাসিনার ছিল সেটা আর তাঁর কাছে অন্তত অনিবার্য মনে হবে না। এটাকেই হাসিনা-ভারত সম্পর্কের ডিকটাট হাসিনার হাতে আসবে বলছি।

এ ছাড়া অন্য কিছু ফ্যাক্টরও আছে, আগামী মে মাসে ভারতের নির্বাচন। এই নির্বাচন বিজয়ে মোদীর সম্ভাবনা খুবই কম, কংগ্রেস কোয়ালিশনেরও বিজয় সম্ভাবনা কিছু আছে তবে অনেক কম। আঞ্চলিক দলের ফেডারল জোটের সম্ভাবনা বাড়ছে। ধরা যাক যদি কংগ্রেস কোয়ালিশন জিতে তাহলেও সেই সরকার এখনকার মোদির চেয়েও বেশি চীনা-বন্ধু এক সরকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। যদিও সম্প্রতি উত্তর প্রদেশে দুই আঞ্চলিক দলের জোট গড়তে সক্ষম হয়ে যাওয়া মোদীর বিজেপি এবং রাহুলের কংগ্রেস দুজনের জন্যই খুবই খারাপ সঙ্কেত।  সবচেয়ে বেশি আসনের (৮০) রাজ্য, উত্তর প্রদেশ মোদী বা রাহুল এদের দুই দলেরই হাতছাড়া হয়ে গেল বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ ফেডারল জোটের বিজয় সম্ভাবনা বেড়ে গেল।

সব মিলিয়ে হাসিনার নতুন সরকারে ভারতের ভূমিকা শুকিয়ে যাবে অনেকটাই। আর ভারতকে কাফফারা দিতে হবে, উল্টো ডিকটাট মানতে হবে। হাসিনার মন্ত্রিসভায় সিনিয়ররা না থাকা বা রাখাতে এরই ইঙ্গিত প্রকাশ পেয়েছে। চীনের আগবাড়িয়ে হাসিনাকে সমর্থন জানানোতে এমনটি হয়েছে তা সত্যি নয় বরং খোদ আমেরিকারই গুটিয়ে যাওয়া সব কারণের কারণ।

চীনা ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তাদের পরিস্থিতির পাঠ ও মনোভাব ব্যক্ত করেছে। খুবই পুওর ‘বেচারা ধরনের’ এক মনোভাব, পুরাটাই সরাসরি ‘তেল মারা’ এক রচনা এটা। যেমন এখানে দাবি করা হয়েছে বিরোধিদের নির্বাচনি ফলাফল প্রত্যাখান পশ্চিমাশক্তির উস্কানিতে হয়েছে – [ …further fueling the opposition uproar.]। বস্তুত চীনের এমন মনে করার কোন কারণ নাই যে ‘কোনটা কেন হয়েছে’ সেটা প্রধানমন্ত্রীর জানা নাই। যদি চীনা এই ভাষ্য দিয়ে যেন তারা বুঝানোর চেষ্টা করেছে যে তারাও সরকারের মন পেতে মাখন লাগাতে আগ্রহী। মনে হয় না এই নিম্ন বিবেচনা প্রধানমন্ত্রী আমল করতে পারবেন না। তবে চীনের  এমন অনুমান ও মনোভাবের মূল কারণ, নাগরিককে রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা ও এর নিশ্চয়তা দিতে হবে এটা কোন কমিউনিস্ট রাজনৈতিক এজেন্ডাই নয়। অথবা রাষ্ট্র কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে কেবল চীন নয়, সাধারণভাবে কমিউনিস্টদের চিন্তা-ভাবনার রেকর্ড খুবই দুর্বল। সোজাসাপ্টা বললে রাজনৈতিক অধিকার, মানে নাগরিক গুম বা খুন হয়ে যাবে না, এর নিশ্চয়তা বা সুরক্ষার আইনি ও মাঠের প্রতিশ্রুতি – এগুলো কোনো কমিউনিস্ট রাজনীতির বিষয় মনে করা হয় না। তারা রাজনৈতিক অধিকার বুঝে না বা আমল করে না, কেবল বোঝে নাগরিকের ‘বৈষয়িক’ লাভালাভ। যেমন অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান লাভ তারা বুঝে। তাও ‘নাগরিক’ শব্দটি দিয়ে সেটা বুঝতে তারা রাজি নয়। কারণ নাগরিক বুঝলেই নাগরিক ‘রাজনৈতিক অধিকারের’ প্রসঙ্গ এসে পড়ে। যা হোক, চীনের মনোভাব হিসেবে লেখা ঐ রচনায় বয়ানের সারকথা হল, লীগ-বিএনপির ঝগড়ার কারণের নাকি আমেরিকা বাংলাদেশে হাত ঢুকানোর সুবিধা নিচ্ছে। আর চীন ভাল সে এমন হাত ঢুকায় না। ব্যাপার হল, রাজনীতি বা অধিকার – যা চীনের বিষয় বা প্রসঙ্গ নয় তা নিয়ে চীনের কথা বলতে যাওয়ার দরকার ছিল না। তাই এই বাজে কথাগুলো চীন না বললেই পরিস্থিতি তার পক্ষে যেত বেশি। তবে নিঃসন্দেহে চীনের বিনিয়োগ স্পৃহা আর হাসিনার উন্নয়নের রাজনীতি এদুইয়ের পরস্পর পরিপূরক হয়ে উঠার সুযোগ আছে। আর যেটা নিয়েই ভারতের বুদ্ধিবৃত্তির লোকেদের শঙ্কা ও হতাশা আছে। বাড়তি বিষয় হল, বেল্টরোড বা সোনাদিয়া ইস্যুতে বাংলাদেশের নিজেরই লম্বা ও গভীর স্বার্থ আছে।

কিন্তু কথা অন্য দিকে। সরকার যেমনই হোক, যে মাত্রারই চোর বা সাধু হোক, চীনের নীতি হলো সব উপেক্ষা করা – জাজমেন্টাল বা ইথিকস বা পুলিশিং অবস্থান না নিয়ে কাজের সম্পর্ক করা। এই অবস্থান আমেরিকার চেয়ে ভালো না মন্দ সে বিবেচনা করতে বসা ভুল ট্রেনে চড়া হবে। আসলে চীনের এই নীতির মানে হল, রাজনৈতিক অবস্থা না, বৈষয়িক লাভালাভের সুবিধাতেই চীনের এখনকার লাভ-মতলব বেশি তাই অন্য দিকে মন না দেয়া। এই নীতিই এখনকার জন্য তার স্বার্থ উদ্ধারে বেস্ট হাতিয়ার। যেটা আবার কালকে বদলাতেও পারে। তাই ঘুষ কমিশন ছাড়া নড়ে না এমন সরকারের সাথে বেস্ট পার্টনার হতে পারে চীনা বিনিয়োগ ও চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ।। চুরির সব ব্যবস্থা সে করে দেবে। আবার কালকে ঐ দেশে তুলনামূলক ভালো সৎ, স্বচ্ছ টেন্ডার জবাবদিহিতার সরকার এলেও চীন তার সাথেও পরিচ্ছন্নভাবেই কাজ-সম্পর্ক গড়বে। মনে রাখতে হবে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প চীনের দুই বিকল্প বিশ্বব্যাংক উদ্যোগ আছে (BRICS , AIIB), যার প্রধান বিনিয়োগ খাতক হল ভারত। ফলে ভারতের স্টান্ডার্ডে সেখানে চীনকে স্বচ্ছতা, টেন্ডার বা জবাবদিহিতার বিষয়গুলো বজায় রাখতে হয়। অর্থাৎ অবস্থায় পড়লে চীন সেটাও পারে। এটা প্রমাণ করে আপনি চোর-গুণ্ডা অথবা সাধু যা হতে চান, সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে কমিশনের টাকা রাখতে চান, সব ব্যবস্থাই করে দেবে চায়না, সবকিছুরই পক্ষে আছে চীন।

এ দিকে আমাদের নতুন সরকার গঠন হয়েছে ইতোমধ্যে। কিন্তু মনে হচ্ছে যে, সে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছ নয় – তার ভিতরে এমন সত্য বা মিথ্যাভাবে এক অনুতাপ যেন দেখা দিয়েছে মনে হচ্ছে। ভালো ইমেজ গড়ার সক্ষমতা তার থাক আর না-ই থাক, নতুন অর্থমন্ত্রী খায়েশ প্রকাশ করেছেন- ‘এক টাকাও খেলাপি ঋণ হবে না’।
সারকথা কোনো সরকার কি নিজেই নিজের সমর্থক ভিত্তি বদলাতে পারে? মনে হয় না। তাই হেলমেট বাহিনী আর গুম-খুনই  চালু থাকতে হবে। তবুও এই নির্বাচনের পর দেশী বা বিদেশী সম্পর্কের সবখানেই নতুন ভারসাম্য হাজির হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নির্বাচনের পরে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

রাষ্ট্র কোন পৌরসভা নয়

রাষ্ট্র কোন পৌরসভা নয়

গৌতম দাস

০৭ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2wC

 

 

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন যেভাবেই হোক, শেষ হয়েছে। সেই সাথে শেষ হয়েছে এ নিয়ে ইতি বা নেতিবাচক বিভিন্ন উচ্ছ্বাসও। এই নির্বাচনে বিদেশী মিডিয়ার নজর পড়া যথেষ্টই ছিল বলা যায়। নির্বাচনি খবর সংগ্রহ করতে এসে তাদের তৎপরতা দেখা গিয়েছিল নির্বাচনের আগে-পরে মিলিয়ে মোট প্রায় দশ দিনের মত, যা এখন আস্তে আস্তে কমে আসছে বা নেই।

নির্বাচনের আগে বা ফল প্রকাশের পরে বিদেশী মিডিয়া বিশেষ করে যারা অর্থনীতি-ফোকাসের মিডিয়া যেমন, লন্ডন ইকোনমিস্ট বা আমেরিকার ব্লমবার্গ– এদের রিপোর্ট হল মুখ্যত জিডিপি-দেখা কেন্দ্রিক। আর এদের সাফাইয়ের সরল বয়ান কাঠামোটা হল – ‘বাংলাদেশের জিডিপি ভাল মানে, বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়েছে, অতএব হাসিনা আবার জিতবে’, অথবা ‘জিতেছে’। এ ছাড়া  আরও যারা বাংলাদেশে নির্বাচনি ইস্যুতে এসেছিলেন এমন অন্যদের মধ্যে ছিল যেমন, লন্ডনের গার্ডিয়ান, আমেরিকার ভোয়া, গ্লোবাল বার্তা সংস্থা রয়টার্স, দক্ষিণ ভারতের দ্য হিন্দুর সম্পাদকীয় অথবা নিউইয়র্ক টাইমসের কলাম ইত্যাদি- এরা সবাই অন্য যে বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছে তা হল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মানুষের নাগরিক অধিকারহীনতার দুর্দশা। অর্থাৎ নাগরিক অধিকারের খবর নাই, জিনিষটাই অনুপস্থিত বা গায়েব। ফলে এর অনুষঙ্গ – গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা তথা বিরোধী দল বা সরকার-বিরোধীদের গায়েবি মামলা থেকে পালিয়ে বেড়ানো বা গ্রেফতার; অথবা কোনমতে নির্বাচনে থাকলেও  সমান সুযোগ না পাওয়া ইত্যাদি। অর্থাৎ এরাই মূলত রাজনৈতিক দিক মুখ্য করে লেখা রিপোর্ট বা আসল রিপোর্ট করেছে।  যদিও এই দ্বিতীয় তালিকার মিডিয়াগুলোও তাদের দ্বিতীয় পয়েন্ট হিসাবে “ভাল জিডিপি” বিষয়টাকে সরকারের পুনর্বার জিতবার ক্ষেত্রে প্লাস পয়েন্ট হিসাবে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ কমবেশি সব বিদেশী মিডিয়া যে তর্কের চক্কর তৈরি করে রিপোর্ট লিখেছে তা পশ্চিমের ভাষায় বললে – ‘ডেমোক্রেসি বনাম ডেভেলপমেন্ট’- এর নির্বাচন। অর্থাৎ রাষ্ট্রে ‘নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার’ [Political Right] থাকাটা জরুরি নাকি ‘উন্নয়ন’ হলেই চলে – এভাবে তর্কটাকে হাজির করে এবার দাবি করা যে ‘উন্নয়নের’ কারণে হাসিনার জেতা উচিত বা জিতবে। এই হলো বয়ান।

খুবই চাতুরি তর্ক সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেক রূপে এই তর্কের হাজিরা অনেক পুরনো, সেই পাকিস্তান আমলের। আইয়ুব খানের শাসনের দশককে (১৯৫৮-৬৮) প্রশংসা আর সাফাই যোগান দিতে তখন যা বলা হত ওর সার কথা ছিল – পাকিস্তানের জন্মের পর থেকে ঠিকমত কখনই ওর একটা কনস্টিটিউশন রচনা করতে ক্ষমতাসীনরা সক্ষমতা দেখাতে না পারলেও সেকালের শাসক আইয়ুব খান প্রচুর ‘উন্নয়ন’ করেছিলেন। সুতরাং আইয়ুবের শাসন জায়েজ। আর তাই ঢং করে বলা হত “আয়ুবি ডেভেলবমেন্ট ডিকেড”। পুরনো সেই তর্কটাই এবার আবার বাংলাদেশে ভেসে উঠেছে। কিন্তু কবে থেকে? অনেকে আবার সেটা খেয়াল করেনিই হয়ত।

ব্যাপারটা ঘটেছিল গত ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনে সরকার গড়ার পরে। আসলে সে সময় হাসিনার ওই “বিশেষ নির্বাচন ও সরকারের” পক্ষে একটা সাফাই যোগাড় ও খাড়া করে দেয়া খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। তাই আমরা দেয়ালে চিকা মারা দেখেছিলাম যে “হাসিনা হলেন বাংলাদেশের মাহাথির”। মাহাথির-এর নাম নেয়া এজন্য যে,যারা উন্নয়নের আড়ালে সব রাজনৈতিক দুর্বলতা ও খামতি ঢেকে ফেলতে দক্ষ তাঁরা বলেন মালয়েশিয়ার “উন্নয়নের” প্রতীক মাহাথির, তবে তাঁরা সাবধান থাকেন যাতে তা নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকারের নেতা বলে কেউ ভুলে না বুঝে। তবে বাংলাদেশে এবারের নির্বাচন শুরুর এক বছর আগে থেকেই উন্নয়নের স্লোগান দিয়েই হাসিনা আসন্ন ভোট বা পাবলিক মোকাবেলা বা তাঁর সমালোচনা মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন।

সব জিনিসের বিকল্প হয় না, আমরা করি না। একটার বদলে অন্য একটা হলেও চলে এই অর্থে বিকল্প খুঁজি না বা সন্তুষ্ট হই না। মানুষের জীবন চাহিদায় এমন বহু কিছু বিষয় আছে। এ রকম বিষয়টা বুঝাতে ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে ‘নন-নিগোশিয়েবল’(non-negotiable)। মানুষের জীবনের যেসব বিষয়ের বিকল্প হয় না বলে মনে করা হয়, আমরা বিকল্প খুঁজিই না, সেগুলোই আসলে নন-নিগোশিয়েবল । যেমন ‘মায়ের ইজ্জত’ নিয়ে নিগোশিয়েশন চলে না, তাই এটা নন- নিগোশিয়েবল। ঠিক তেমন কোন রাষ্ট্রে নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার বা মৌলিক মানবিক অধিকার একেবারেই  নন-নেগোশিয়েবল। কথাটার বইয়ের ভাষা থুয়ে, ব্যাপারটা আর ভেঙে বলা যাক। যেমন বলা হল – রাষ্ট্র আপনাকে পেট পুরে খেতে দেবে, চাকরি, আরামসহ আরো বহু কিছু দেবে এবং একদম নিশ্চয়তার সাথে। কিন্তু আপনি বেমালুম গুম, খুন হয়ে যেতে পারেন সে সম্ভাবনাও সাথে আছে; রাষ্ট্রের দিক থেকে এসব থেকে কোন সুরক্ষার নিশ্চয়তা নেই, প্রতিশ্রুতি নেই। এখন আপনি কি রাজি আছেন? এটাই উন্নয়ন দিয়ে নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারকে নেগোশিয়েবল করা বা ভাবার প্রশ্ন। আসলে রাজনৈতিক অধিকারকে নেগোশিয়েবল করে ফেলা যায় মনে করা আর এর বিকল্প হিসাবে উন্নয়ন, জীবনমানের উন্নতিকে মুখ্য ও বিকল্প কাম্য মনে করা – এটাই ‘উন্নয়নের রাজনীতির’ ভাবনা। দুনিয়ার সব স্বৈর শাসকের কমন লক্ষণ এটা।

বস্তুত নাগরিক রাজনৈতিক অধিকার নন-নেগোশিয়েবল। আমরা উন্নয়ন খেয়ে এর বিনিময়ে গুম-খুন হয়ে যেতে রাজি হতেই পারি না।  তাই এটা নেগোশিয়েবল বলে মনে করার সোজা মানে হল, আসলে আপনার রাষ্ট্রটাই নাই। কারণ রাষ্ট্র- এই প্রতিষ্ঠানের মুখ্য উদ্দেশ্য ও কাজ হল নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারের প্রতিশ্রুতি দেয়া, বাস্তবে এই সুরক্ষা দেয়া, প্রতিরক্ষা বাস্তবায়ন করা। রাষ্ট্র যদি তা না করতে পারে, না দেয় তাহলে সে রাষ্ট্র অপ্রয়োজনীয়, খামোখা। এর বদলে রাষ্ট্র হয়ে যায় তখন বড়জোর একটা পৌরসভা। কিন্তু রাষ্ট্র কখনই পৌরসভা নয়। রাষ্ট্রের কাজ ও ভুমিকা – পানি বিদ্যুত ড্রেনেজ রাস্তা ইত্যাদির মত উন্নয়ন দেয়া নয়। সেকাজের জন্য একটা পৌরসভা বা মিউনিসিপাল্টিই যথেষ্ট। রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা, ইনসাফ দেয়া, সিরক্ষা এগুলোর নিশ্চিতের জন্যই মূলত আমাদের রাষ্ট্রগঠন নির্মাণ দরকার। তাই উন্নয়ন এর কথা বলা মানেই রাষ্ট্রকে পৌরসভায় নামিয়ে আনা। অথচ রাষ্ট্র [State] কোনভাবেই পৌরসভা নয়।

কাজেই কোনো দেশের নির্বাচনের আসরে এসে বিদেশী বা দেশী মিডিয়ায় সরকারের নাগরিক রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার রেকর্ডের আলোচনাকে পেছনে ফেলা বা আড়াল করে ফেলাটা খুবই খারাপ ধরণের চাতু্রি। জেনে বা না জেনে নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারকে নেগোশিয়েবল বিষয় করে ফেলা – বিকল্প হিসাবে উন্নয়ন বা জিডিপির ফিরিস্তি তোলার মিডিয়া রিপোর্ট – এটা সেই বিরাট চাতুরী। তারা অর্থনীতির মিডিয়ার লোক তাই রাজনীতি বোঝে না – এমন বুঝে নাই ভাব ধরে এরা পিঠে ছুরি মারে।
অথবা এই চাতুরী যেন উট আর বিড়ালের গল্প। যেমন একবার এক হাটে এক উট বিক্রেতা উটের দাম চাচ্ছে মাত্র এক টাকা। কিন্তু শর্ত হল ওই উটের সাথে একটা বিড়াল নিতেই হবে; যে বিড়ালের দাম পাঁচ লাখ টাকা।

এই ব্যাপারগুলো বিদেশী প্রভাবশালী মিডিয়াতেই বেশি হচ্ছে ও হয়ে থাকে। এর পেছনের মূল কারণ, এই মিডিয়াগুলো মূলত আমাদের মত দেশে দেখতে আসে বিদেশী ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের চোখ – এমন মিডিয়া হিসাবে। বিদেশী ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের পয়সাতেই তাদের আয় ও জীবিকা। তাই উন্নয়ন ও জিডিপি দিয়ে তাদের একটা নির্বাচন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করার ঝোঁক দেখা যায়।
বাংলাদেশে নির্বাচন উপলক্ষে প্রকাশিত যাদের রিপোর্ট আমাদের নজরে এসেছে এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হিসেবে অনেকে ব্লমবার্গকে (Bloomberg) মনে করেন। কারণ এই মিডিয়াটা “ওয়াল স্ট্রিট” ধরণের বিনিয়োগ কোম্পানীর সরাসরি মালিকানা বা বিনিয়োগ আছে। এবারের বাংলাদেশ নির্বাচনের আগে, তাদের রিপোর্টের সার কথাকে শুরুতে দেয়া দুই বুলেট বাক্য হল – ১. দ্রুত বেড়ে চলা অর্থনীতি হাসিনাকে তৃতীয়বার ক্ষমতায় আনতে পারে। ২. বিরোধী নেতা জেলে বলে ভায়োলেন্স নতুন করে বাড়তে পারার শঙ্কা।

  • Fast-growing economy may propel Hasina to third term in power
  • Fears of fresh violence grow as opposition leaders jailed

অর্থাৎ এখানে সরাসরিই বলা হচ্ছে, রাজনীতিক অধিকারের দশা পরিস্থিতি নয়, জিডিপিই নির্বাচনে বিজয়ের একমাত্র নির্ণায়ক – এই আগাম অনুমানের ভিত্তিতে কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া এখানে আবার বলে রাখা ভালো যে, ব্লমবার্গ- এই মিডিয়া গ্রুপ না হলেও অন্য অনেকে আবার অনেক সময় ‘পেজ-বিক্রি’ করার কারণেও এমন রিপোর্ট করে থাকে।

কিন্তু তবুও জিডিপিভিত্তিক আগাম অনুমানের এমন রিপোর্ট – যেটা দাবি করছে যে বাংলাদেশের জিডিপি ভাল এর মানে এটা হাসিনা মেলা উন্নয়ন করেছে তার প্রমাণ – একথা কী গ্রহণযোগ্য? সম্ভবত না।  এটাও যথেষ্ট সাফাই নয় বলে মনে করা যেতে পারে। কারণ জিডিপি বাড়লেই তা সরকারের সাফল্য কি না, এর সপক্ষে ঐ রিপোর্টে সরাসরি কোনো সাফাই নাই। কারণ, বাংলাদেশের অর্থনীতি    খুবই ব্যতিক্রমী ধরণের। তাই জিডিপি বাড়া মানেই তা সরকারের প্রত্যক্ষ সাফল্য এটা নাও হতে পারে। বাংলাদেশ  বিশেষ বৈশিষ্ট্যের তাই গতানুগতিক চোখে কেবল জিডিপির বাড়া-কমা দিয়ে সাফল্য মাপতে যাওয়া, হদিস করা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা। যেমন, দেখা গেছে, বাংলাদেশে বছরে ১৭০ দিন হরতাল থাকলেও জিডিপিতে এর প্রভাব নেই। জিডিপি একই রকম থেকেছে।

যদিও এর সম্ভাব্য কারণ কী, এ নিয়ে কোনো ফরমাল স্টাডি নাই। তবুও এর সম্ভাব্য কারণ বলে যা অনুমান করা হয় সেই ফ্যাক্টরটা হল – রেমিট্যান্স। খুব কম দেশের অর্থনীতিতে রেমিটেন্স এমন ফ্যাক্টর হয়ে থাকে। তাই এটা আমাদের অর্থনীতিতে বিশেষ বৈশিষ্ট বা ব্যতিক্রম। বিদেশে গরিব শ্রমিকের শ্রম বেচা অর্থ – বিদেশী মুদ্রা নিয়মিত আসে। এটা বলাই বাহুল্য, যে দেশের হরতালের সাথে এই আয়ের কম-বেশি হওয়ার কোন সম্পর্ক নাই। এ ছাড়া আরেক গুরুত্বপর্ণ দিক হল, ৯০ শতাংশের বেশি বৈদেশিক মুদ্রার আয় আসে গার্মেন্টস থেকে। এখন এর থেকে কাঁচামাল, মেশিনারিসহ ইত্যাদি্র বৈদেশিক মূল্য পরিশোধে বাদ দেয়ার পর যা নিট বৈদেশিক মুদ্রা আয় থাকে; দেখা যায় প্রতি বছর এর পরিমাণ যদি ১৪ বিলিয়ন ডলার হয়, তবে মোট রেমিট্যান্স থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও দেখা যায় আরও ১৪ বিলিয়ন ডলার, মানে প্রায় এর সমান। অর্থাৎ রেমিটেন্স আর রপ্তানি আয় প্রায় কাছাকাছি।

এখন যদি রপ্তানি আয়ের জন্য সরকারকে ক্রেডিট দেই তাহলে ঠিক আরও সমপরিমাণ রেমিট্যান্স আয়ের অবদানের জন্য তো কাউকে ক্রেডিট দিতে হয়! অথচ ফ্যাক্টস হল,  রেমিট্যান্স আয় লাভের সাথে সরকারের পারফরমেন্স খুব কিছু সম্পর্ক নাই। মূলত এ কারণেই আমাদের অর্থনীতিকে বলা হয় রুটিন অর্থনীতি, মানে বিশেষ সরকারের খুবই বিশেষ ভূমিকা এখানে থাকে না। বিদেশি সাংবাদিকেরা এসব দিক আমল না করে যেকোনো দেশের মত শুধু জিডিপি দেখে ধারণা বা অর্থনীতি বুঝতে চাওয়া তাৎপর্যহীন। তবে কোন মিডিয়া রিপোর্ট যদি জিডিপি ফিগারকে দেখিয়ে তা সরকারের প্রত্যক্ষ পারফরমেন্স বলে দাবি করতেই চায়, সে ক্ষেত্রে তাকে সবার আগে – সম্পর্ক বা প্রমাণ দেখাতে হবে যে সরকারের অমুক বিশেষ নীতি-পলিসি-পদক্ষেপের কারণে জিডিপি বেড়েছে। এমন দেখানোর আগে কোন দাবি হবে অমূলক ভিত্তিহীন। আমরা কোথাও এমন প্রমাণ এখনও দেখি নাই। তাই জিডিপি বৃদ্ধিকে সরকারের পারফরমেন্স এর সাথে সম্পর্কিত বলে দাবি করা ভিত্তিহীন।

তাই সার কথাটা দাড়াচ্ছে, জিডিপি বা উন্নয়নের সাফাই দিয়ে বিদেশি মিডিয়ার নির্বাচনী রিপোর্ট- এগুলো সারবত্তাহীন প্রপাগান্ডা; কোন ভিত্তি প্রতিষ্ঠা আগে না করে করা উড়া দাবি মাত্র।

সবশেষঃ
এক বিরাট স্ববিরোধী বিষয় আমরা দেখেছি লন্ডন ইকোনমিস্ট গ্রুপের ইকোনমিস্ট ইকোনমিক গ্রুপের ফলাফল প্রেডিকশন। বোঝাই যাচ্ছিল এটা পেজ বিক্রি ধরণের কান্ড। তবে নির্বাচনের পরে সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট পত্রিকার রিপোর্টই এর সাক্ষ্য বা প্রমাণ। এই রিপোর্টে কি ধরণের নির্বাচন হয়েছে এর বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সারকথায়, ইকোনমিস্ট গ্রুপের এক মিডিয়া অপর মিডিয়ার বক্তব্যকে নাকচ করেছে, স্ববিরোধী ফাইন্ডিং হাজির করেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত 0৫ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বিদেশী মিডিয়ার নির্বাচনী কাভারেজ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]