মোদীর এখন “টেররিজমেই” লাভ ও ভরসা

মোদীর এখন “টেররিজমেই” লাভ ও ভরসা

গৌতম দাস

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2xP

 

কাশ্মিরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের এক জেলা শহর পুলওয়ামা(Pulwama)। সেই ‘পুলওয়ামা’ শব্দ এখন ভারত ছাড়িয়েও দেশে-বিদেশে বহুল আলোচিত। কিন্তু ঘটনা কী? গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামাতে ভয়াবহ এক আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনাক্রম খুবই পুরনো – ভারতের জন্মের সমান বয়সী নিরন্তর এক রাজনৈতিক অস্থিরতার নাম কাশ্মির; আর তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার কোন কারণ নাই কাশ্মিরি জনগণের। কাশ্মিরে কেন্দ্রীয় সরকারের বলপ্রয়োগের মাত্রা কেমন তা বুঝাতে বলা হয় – সেখানকার জনসংখ্যার চেয়েও সেখানে জড়ো করা ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যা বেশি। আর এই বিপুল সেনা সমাবেশ মানেই গণ-নিপীড়ন, হত্যা, গুম ইত্যাদি দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অজস্র এবং নিয়মিত ঘটনা। বিরাজ করছে রাজনৈতিক স্বাধীনতাহীন এক মারাত্মক পরিস্থিতি। আর এসবের বিপরীতে আছে গণ-আন্দোলন, এমনকি সশস্ত্র প্রতিরোধও।

বিপরীত দিক থেকে দেখলে এটাই ভারতের সরকারি ভাষ্যে ‘সন্ত্রাসবাদ’।অথবা প্রাক্তন বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর ভাষায় – ‘সীমা পার কি আতঙ্কবাদ’। মানে হল বলা হচ্ছে, কাশ্মীরের আসল সমস্যা হল “সন্ত্রাসবাদ”।  আর এই সমস্যা পাকিস্তান থেকে এসেছে; ভারত কিছুই করেনি”। ভারতের কোন দায় বা ভুমিকা নাই। ভারত সরকার যেন কাশ্মীরে আদরণীয়। যেন ভারতের জন্মের সময় কাশ্মীরকে ভারতে অন্তর্ভুক্তি খুবই শীতল সংঘাতহীন ঘটনা, কোন জবরদস্তি বলপ্রয়োগ সেখানে ছিল না। অথচ ভারতের কনষ্টিটিউশনের ভাষায় বললে, এই ‘অন্তর্ভুক্তি’ [accession] সম্পুর্ণ নয়। একারণে ফ্যাক্টস হল,১৯৪৭ সাল থেকেই কাশ্মীর ভারতের অংশ হবে কি না তা অমীমাংসিত। এভাবেই এটা চলে আসছে। যেটাকে আজ “সন্ত্রাসবাদ” বলা হচ্ছে মানে সরকারি বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে পালটা হামলা তা ১৯৮৯ সালের আগে ছিল না। কাজেই ভারত বা পাকিস্তানের কাশ্মীরীদের “সন্ত্রাস” নয় কাশ্মীরের মূল সমস্যা তার ভারতভুক্তির অমীমাংসিত থেকে যাওয়া; আর কোন ডায়লগ নয় বরং এর বদলে ভারতের নিরন্তর বলপ্রয়োগে টিকে থাকার চেষ্টা।

অথচ দেখে বুঝবার বা জানার উপায় নাই, কেউ জানে না কাশ্মীর নিয়ে সমাধানে ভারতের পরিকল্পনা কী। কাশ্মীরের সংঘাতের সমাপ্তি টানার পথ কী! সরকারি কড়া দমন নীতিতে ভীতি ও সরকারি সন্ত্রাস জারি রেখে,দাবড়ে দিয়ে কাশ্মিরে স্থিতিশীলতা কখনও আসবে না। আবার স্থানীয় জনগণ এর পালটা, ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ দাঁড় করাতে সক্ষম হলেও তাঁরা নিজ সশস্ত্রতায় ভারত সরকারকে পরাজিত করতে পারবে এমন কোন বাস্তবতা নাই। ওদিকে আবার কাশ্মীরের আর এক অংশ,যা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত অংশ হয়ে আছে। সেই সুত্রে সেটাও বা পুরা কাশ্মীর দখল করতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কোন যুদ্ধে কেউ কারও কাছে পরাজিত হয়ে কাশ্মীর-সমস্যার সমাধান হবে সে সম্ভাবনাও নাই। ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী রাষ্ট্র। ফলে তাদের মধ্যে কোন নির্ধারক যুদ্ধ নয় কেবল একটা খুবই সীমিত ধরণের যুদ্ধই সম্ভব;যা আসলে আবার পারমাণবিক বোমা নিয়ে খেলাই,এমনই রিস্কি।

তবু এসব কিছু সত্বেও বলপ্রয়োগের পথই একমাত্র,এমন বোধ ও নীতি আকড়ে বসে আছে ভারতের শাসকেরা। বিশেষ করে বিজেপির মোদীর সরকারের নীতি হল আরও হার্ড লাইন। এরই আর এক মানে যুক্তি-বুদ্ধিতে কাশ্মীরকে ভারতে অংশ দাবি করা কঠিন বলে প্রকারন্তরে বিজেপি মেনে নিচ্ছে। তাই কঠোর বলপ্রয়োগের পথ ধারণ করেছে। আর মোদী সরকারের হার্ড লাইন নীতি মানে হল – শক্ত বল প্রয়োগ,দমন আর ভয়ের রাজত্ব কায়েম আর মুসলমান মানেই এরা অধস্তন বা আধা-নাগরিক – এসব নীতি ও অনুমানের উপর দাঁড়ানো। এছাড়া আর্টিকেল ৩৭০ বাতিল করে দিবে বলে না বুঝে গোয়া্র চিতকারের বিজেপি – সে তো আছেই।

ভারতের কনষ্টিটিশন কাশ্মীরের উপরও প্রযোজ্য হবার যে আইনি সুত্র তা হল কনষ্টিটিশনের আর্টিকেল ৩৭০। বা উলটা করে বলা যায় কাশ্মীর অন্যান্য রাজ্যের মত ভারতের কোন রাজ্য নয়, সেটা নেহেরুর স্বীকার করে নেয়ার চিহ্ন। এছাড়া ফ্যাক্টস হল কাশ্মীর এক বিশেষ স্বাধীন স্টাটাস-ওয়ালা এক রাজ্য – যার নিজের আলাদা কনষ্টিটিউশন ও পতাকা ইত্যাদি আছে, আর  – এই বিশেষ স্টাটাসের কথাগুলোর স্বীকৃতি আছে ঐ আর্টিকেলে। ফলে মোদীর বিজেপির সরকার আর্টিকেল ৩৭০ মানে না বা বাতিল করে দিবে,অথবা আর্টিকেল ৩৭০ একটা অস্থায়ী প্রভিশন তাই এটা এখন নাল এন্ড ভয়েড – ইত্যাদি যা দাবি বিজেপির আছে তা খামোখা – অহেতুক ও অচল। আর্টিকেল ৩৭০ একটা অস্থায়ী প্রভিশন যা এখন অকার্যকর – এই দাবিতে করা এক রিট ভারতের সুপ্রীম কোর্ট গত বছর ৩ এপ্রিল ২০১৮ নাকচ করে দিয়েছে। তবু এরা এতই গোয়াড় যে এসব সত্বেও এখনও বিজেপির সমর্থকেরা একই দাবি করে চলেছে। এই হল মোদীর বিজেপি।

সম্প্রতি আমরা দেখছি, কাশ্মীরের আর এক ব্যবহার মোদীর হাতে চালু হতে দেখা যাচ্ছে। উগ্র জাতীয়তাবাদ দেখানো বা উগ্র দেশপ্রেম প্রদর্শন এর সবচেয়ে ভাল জায়গা বা ইস্যু হিসাবে কাশ্মীরকে ব্যবহার এর আগেও ছিল। এবার ভারতের আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির ফল খারাপ করার আশঙ্কা চারদিকে ফুটে উঠাতে বিজেপি নিজের ভাঙ্গা ইমেজকে চাবকে খাড়া করার উপায় হিসাবে কাশ্মীরকে ব্যবহার করতেই পুলওয়ামা ইস্যুকে মোদী ব্যবহার করল কী না তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ভারতে এখন তুঙ্গে।

গত সপ্তাহে আমরা দেখেছিলাম নির্বাচনী ইস্যুগুলো এমনভাবে খাড়া হয়ে গেছে যার বেশির ভাগটাই ক্ষমতাসীন মোদীর বিজেপির বিরুদ্ধে যায়। এই অবস্থায় এক বিদেশি গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে – নির্বাচনের আগে নিজের পড়ে যাওয়া পাবলিক রেটিং চাঙ্গা করতে মোদী কোন পরিকল্পিত দাঙ্গা লাগাতের পারে – সেই থেকে এমন আশঙ্কা বাড়ছিল। যদিও কাশ্মীরের এবারের পুলওয়ামা ইস্যুটা হল এক সুইসাইড বোমারু হামলার ঘটনা। কিন্তু মোদী কী এই ঘটনাটাকেই নিজ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চেষ্টা করছেন – এই প্রশ্ন প্রবলভাবে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে একারণেই বিজেপি-আরএসএসের অঙ্গ সংগঠনগুলো হামলা ঘটনা পরবর্তিতে সারা ভারত জুড়ে “পাকিস্তানের উপরে প্রতিশোধের হামলা” করতে হবে বলে জিগির তুলে এই দাবি উঠিয়েছে। কিছু রাজ্যে কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে বিজেপির এই অসৎ ততপরতা এখন প্রমাণিত। আজ ২৪ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার লিখেছে, “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিজে থেকে হস্তক্ষেপ করে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির রিপোর্ট চেয়েছে বৃহস্পতিবার। আর দুই, সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র ও ১০ রাজ্যকে কাশ্মীরিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে”। এদিকে রাজস্থানের জনসভায় মোদী এখন ভোল পালটে বলছেন, “কাশ্মীরিদের পাশে দাঁড়াতে হবে”।

যদিও ভারতের যেকোন সরকার জানে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ ভারতের জন্য কোনই অপশন নয়। এছাড়াও ওদিকে কাশ্মীরি যারা অন্যান্যে রাজ্যে ব্যবসা বা শিক্ষার সুযোগ নেয়া ইত্যাদির উদ্দেশ্যে আছেন বা এসেছেন [যেমন দেরাদুনে যারা পড়তে এসেছেন অথবা কলকাতায় যারা ব্যবসা করতে এসেছেন] তাদের উপর পরিকল্পিত উস্কানি দিয়ে হামলা-আক্রমণ করেছে বিজেপি। এতে মোদীর সরকারি উগ্র দেশপ্রেমের বয়ান যে-ই নিতে চায় নাই,অথবা উগ্রতা নরম করতে চেয়েছেন – মোদীর লোকেরা তাদেরকে দেশদ্রোহী আখ্যায়িত করেছে। তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং পাবলিক লিঞ্চিং করেছেন। এমনকি জনমত সমীক্ষা করার কথিত এক উদ্যোগের মতে নাকি ৩৬% লোক পাকিস্তানে এখন হামলার পক্ষে।

পুলওয়ামার ঘটনা-সংক্ষেপ হল, সিআরপিএফ (CRPF) বা সেন্ট্রাল পুলিশ রিজার্ভ ফোর্স – ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনের এক বিশেষ পুলিশ বাহিনী। প্রাপ্ত ট্রেনিংয়ের ধরণ আর প্রাতিষ্ঠানিক গঠনের বিচারে এরা সেনাবাহিনী নয়; তবে আমাদের র‍্যাবের মত তারাও স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে এক বিশেষ বাহিনী। এই সংগঠনের জন্ম বৃটিশ আমলে হলেও সত্তরের দশকে ভারতে নকশাল আন্দোলন প্রবল হবার মুখে একে ঢেলে আরও গুছিয়ে নেয়া হয়।  বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মত নকশাল সন্ত্রাসে আক্রান্ত রাজ্যগুলোকে সহায়তা করতে বিশেষ ট্রেনিং পাওয়া বাহিনী দিয়ে কেন্দ্রীয় ইন্দিরা সরকার এই প্রাতিষ্ঠানিক পুণর্গঠন করেছিলেন। তবে কোন রাজ্যেই এই বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি নাই। তবে কোন রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছে নিজের পুলিশের বাইরে অতিরিক্ত ফোর্সের সহায়তা চাইলে কেন্দ্রীয় সরকার কাছাকাছি কোন জোনাল স্থায়ী ক্যাম্প থেকে এই বাহিনী পাঠিয়ে থাকে। ফলে প্রায় সবসময়ই এক মুভমেন্ট বা চলাচলের মধ্যে থাকে এই বাহিনী। তেমনি ৮০টা বাসে করে প্রায় আড়াই হাজার বাহিনী সদস্য স্থানান্তরে  – পুলওয়ামা জেলা পার হবার সময় সেই গাড়ী বহরের ভিতর আর একটা জীপ গাড়ী ঢুকিয়ে আত্মঘাতি বোমা হামলা চালানো হয়। এতে প্রায় ৪০ এর বেশি জন জওয়ানের মৃত্য হয়। এই ঘটনায় আহত-নিহতের সংখ্যা দেখে যে স্বাভাবিক জন-অসন্তোষ তাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলতে মাঠে পরিকল্পিতভাবে নেমে পড়েছিল বিজেপি-আরএসএস এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বজরং দল,বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এরা। একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী মমতাকেই দেখা গিয়েছে তিনি এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার।

আর ওদিকে মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির এক ভয়াবহ প্রতিনিধির ভুমিকা দেখিয়েছেন এমন ব্যক্তি হলেন তথাগত রায়। তিনি এখন মেঘালয় রাজ্য গভর্নর, তিনি প্রাক্তন ত্রিপুরার গভর্নরও আর কলকাতা বিজেপির প্রাক্তন নেতা তথাগত রায়। গভর্ণর ভারতের প্রেসিডেন্টের মতই কনষ্টিটিউশনাল পদ, যার মুলকথা তিনি দল মত নির্বিশেষে সবার প্রতিনিধি। কিন্তু এই গভর্নর কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বাকি ভারতের নাগরিকের কাছে আহবান জানিয়েছেন যে “যা কিছু কাশ্মীরি,তা বয়কট করুন” – এই বলে এক  টুইট বার্তায়।  এর আগেও তিনি কাশ্মীরীদেরকে কঠোর নির্যাতন নিপীড়নের ভয় দেখিয়ে বাগে আনার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। গত ২০১৬ সালের এক বিবিসি রিপোর্টে তা দেখা যায়। রাজনীতিকদের মধ্যে একমাত্র মমতাকেই দেখা গেল প্রশ্ন তুলে বলতে যে একজন গভর্ণর – কনষ্টিটিউশনাল পদে থাকা ব্যক্তি কোন একদল নাগরিকের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ান কী করে?  যদিও তথাগত রায়ের দুর্ভাগ্য এমনই আর তাঁর মন্তব্যের কনষ্টিটিউশনাল দায়-অপরাধ এত বেশি যে মোদী সরকারের তথ্যমন্ত্রীও তাঁর কাজের দায় নেন নাই। একাজের সাথে তিনি “একমত নন” বলে জানিয়েছেন।

তবে মমতা আরও কিছু মুখ্য প্রশ্ন তুলেছেন। হামলা হতে পারে “মুখ্যমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেন, ভোটের আগে ভারতজুড়ে দাঙ্গা লাগানো হতে পারে বলে মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে প্রকাশ করা হয়েছিল,তা কি ঠিক? আগাম খবর থাকা সত্বেও কেন সেনা সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কেন সিআরপিএফের অনুরোধ সত্ত্বেও এয়ারলিফ্ট করা হল না? এতবড় ব্যর্থতা কেন হল? এরপরও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হল না কেন?” – এগুলোই তাঁর এখন অভিযোগের আঙুল।

এমন অভিযোগ উঠাই স্বাভাবিক। কারণ যে হাইওয়েতে গাড়িবহরে হামলা হয়েছে সেখানে কয়েকশ গজ পরে পরে চেকপোস্ট আছে,বলা হচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে গাফিলতি না থাকলে ৩৫০ কেজি বোমা নিয়ে একটা গাড়ি কিভাবে সেনা গাড়িবহরের ভিতরে ঢুকতে পারল? এনিয়ে কংগ্রেসের প্রশ্ন, “নরেন্দ্র মোদীজি ৩ কেজি গোমাংসের খোঁজ পেয়ে যান, আর ৩৫০ কেজি আরডিএক্স এর খোঁজ পান না” – কেন?

আমেরিকায় ভারতীয় অধ্যাপক সুমিত গাঙ্গুলী এক লেখা ছাপিয়েছেন আমেরিকার ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে। তিনি মোদী সরকারের কাশ্মীর পলিসির খামতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলছেন মোদীর কঠোর কাশ্মিরী নীতির কারণেই এই আমলেই হামলা ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আর – তা দুপক্ষেই, নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যায় আর কাশ্মীরি জনগণ বিশেষ করে মৃত তরুণের সংখ্যা।

কিন্তু এসবকে পাশ কাটিয়ে এটা “টেররিজমের সমস্যা” বা পাকিস্তানের দায়-প্রশ্রয়ের দিকে আঙুল তুলে মোদী নিজের উদ্দেশ্য ও দায় এড়িয়েছেন। অথচ এই ঘটনায় কথিত হামলাকারি ‘আদিল আহমেদ দার’ – তিনি ভারতীয় কাশ্মীরের পুলওয়ামারই বাসিন্দা, হামলার ঐ গাড়িও ভারতীয়। কেবল যে সংগঠনের ভারতীয় শাখার হয়ে তিনি কাজটা করেছেন তার হেড অফিস পাকিস্তানে। আর এথেকে সব পাকিস্তানের দায় বলে মোদী আঙুল তুলে নিজের হাত ধুয়ে ফেলতে সুযোগ নিতে চেয়েছেন।

তবে আর একটা বড় জটিলতা হল কোনটা টেররিজম বা সেই সুত্রে কে টেররিজম করেছে? – সেই অমীমাংসিত প্রশ্ন। প্রথমত, এখন পর্যন্ত “টেররিজম” বললেই সবচেয়ে বড় ঘটনার রেফারেন্স হল ২০০১ সালে আমেরিকার ৯/১১ এর টুইন টাওয়ারে হামলা। মানে প্রায় ১৮ বছর গত হয়েছে। কিন্তু এখনও টেররিজমের কোন কমন সংজ্ঞা নাই। সব রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য, মেনে নিয়েছে টেররিজম বলতে এমন কোন কমন সংজ্ঞা বলে কিছুই নাই। এমনকি আমেরিকার কাছে কিংবা জাতিসংঘের হাতে বা তাদের দলিলেও তা নাই। তাই হাতে অস্ত্র নিলেই সে টেররিস্ট  – না বিষয়টা এমন সহজ তাও নয়। তাহলে এত বাতচিত চলছে কী করে?  আমেরিকার নীতিতে বা জাতিসংঘের কাছে সন্ত্রাসী দলের একটা তালিকা বলে একটা বই আছে। ঐ বইয়ে কোন ভিত্তি ছাড়া সংশ্লিষ্ট সব সদস্য যাকে খুশি টেররিস্ট বলে দেখাতে একমত হয়েছে, মনে করে; নাম ঢুকানো হয়েছে; সুতরাং এই সুত্রে সে টেররিস্ট। আসলে এককথায় বললে –কেউ কাউকে টেররিষ্ট বলবে কিনা সেটা ঐ রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক স্বার্থে এমন ভিত্তিতেই নির্ধারিত। মানে যার যার “রাষ্ট্রস্বার্থ” ওর নির্ণায়ক। আমার নিজের রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে হলে সে “টেররিস্ট” – এই হল সেই সুত্র। ফলে বেলুচিস্তানের আন্দোলন ভারতের চোখে ‘স্বাধীনতাকামী’ বা (Separatist Movement) আর পাকিস্তানের চোখে তাঁরা “টেররিস্ট”। এটার জন্যই যয়েশ-ই-মোহম্মাদ বা ভারতের চোখে যেগুলো টেরর সংগঠন বলে চিহ্নিত তাদেরকেই আবার পাকিস্তানে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে দ্বিধা করে না। আর এর সাফাই হল এটা পাকিস্তানের রাষ্ট্রস্বার্থ – এই যুক্তিতে। সারকথায় সেজন্য কারও বিরুদ্ধে টেররিজমের অভিযোগ আসলে এখন যেভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাঠ গরমের চেষ্টা করছেন মোদী – এটা শেষবিচারে হল, যার যার রাষ্ট্রের প্রপাগান্ডায় জিতবার ইস্যু। অতএব মূলত কেউ “টেররিস্ট” কিনা সে দাবি বা তা বুঝতে যাওয়া এখানে অর্থহীন।

সবশেষে এটা এখন দেখবার বিষয় যে  এই হামলা ইস্যুকে মোদী নিজের ভোটবাক্সে কতটা কাজে লাগাতে পারেন। ভারতীয় আম ভোটারদের জ্ঞান-বুদ্ধি আসলেই কতটা – কিছু আছে নাকি সবই সস্তা আবেগ,সেন্টিমেন্ট!
যদিও ইতোমধ্যে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দাঙ্গার অভিযোগে মামলা খাবার ভয়ে, আর পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধের অবাস্তবতা মেনে মোদী ইতোমধ্যে অনেকটাই ব্যাকফুটে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “টেররিজমেই’ কি মোদির লাভ ও ভরসা? – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

মোদীর পাশে মমতার মুখ ভেসে উঠছে

মোদীর পাশে মমতার মুখ ভেসে উঠছে

গৌতম দাস

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2xI

ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট বা লোকসভা নির্বাচন হওয়ার সময় আরও কাছে ঘনিয়ে এসেছে। গত ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের অভিজ্ঞতার কথা মনে রাখলে বলা যায়, পুরো এপ্রিল-মে মাসজুড়ে এবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং তা হবে কয়েকটা পর্বে, যেমন গতবার হয়েছিল নিরাপত্তার স্বার্থে পাঁচ পর্বে দুই মাস ধরে বিভিন্ন দিনে। আর সবশেষে মে মাসের মাঝামাঝি একসাথে ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি নতুন সরকারও গঠিত হয়ে শপথ নিয়েছিল মে মাসের মধ্যেই। অর্থাৎ সেই হিসাবে কথা বললে আর এক মাস পর থেকেই ভারতে নির্বাচনী আমেজ শুরু হয়ে যাবে। নির্বাচন কমিশনের আওতায় চলে যাবে প্রশাসনিক কাঠামো।

আর সেই সাথে সরকার চালানো আর রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর কমিশনের বিভিন্ন বাধানিষেধ বা গাইডিং নানা নিয়ম আরোপিত হতে শুরু করবে – মানে এবিষয়গুলোও নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। মোদির সরকারের ‘ফ্রি হ্যান্ড’ মাতবরিতে  বিরোধীদলের উপর রাষ্ট্র-প্রশাসনকে অপব্যবহারে প্রয়োগের সুযোগ ইদানীং প্রবল হয়েছে; যেমন- অপছন্দের বিরোধী দলকে বেকায়দায় ফেলতে বা বিজেপির কাছে নত হতে বা কোণঠাসা করতে বাধ্য করছে। সেসবের সুযোগ আর থাকবে না। দুর্নীতি বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের নামে ভারতের কথিত সিবিআই (Central Bureau of Investigation – CBI) বা ইডি (Enforcement Directorate, ED) -কে ব্যবহার করে মমতার মত মোদীবিরোধীদের হয়রানি করার অভিযোগ যা ইদানিং প্রবল, মোদীর সেসব কাজ করার সুযোগ শেষ হয়ে পরিস্থিতি নির্বাচন কমিশনের অধীনে ও নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।

ফলে ওদিকে ইতোমধ্যেই আসন্ন নির্বাচনে কী কী ইস্যু প্রধান হয়ে উঠবে, তাও পরিষ্কার হয়ে গেছে। যে কথা বলছিলাম, সিবিআই-ইডির কথা। ‘মোটা দাগে’ বললে, এর গঠন আমাদের দুদকের মত না হলেও এটা বরং ভারতের কেন্দ্রীয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে তবে পুলিশ প্রশাসনের ( Delhi Special Police Establishment Act, 1946.) এক আইনী ক্ষমতায় পরিচালিত বিশেষত দুর্নীতিবিরোধী এক বিশেষ তদন্ত-অনুসন্ধানের সংস্থা। আর ইডি হল, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে অর্থনীতিবিষয়ক আইন প্রয়োগ ও সম্পর্কিত অপরাধের বিরুদ্ধে লড়বার সংগঠন।  এসবের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাইরের যেকোনো হস্তক্ষেপ বা প্রভাবমুক্ত থেকে আদালতের নির্দেশ-সিদ্ধান্তে এর হাতে দেয়া কোনো ঘটনা-মামলার নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত-অনুসন্ধান রিপোর্ট পাওয়া এবং তা আইনের আওতায় আনা। বাংলাদেশের দুদকের মত প্রতিষ্ঠান কাজের নামের মিল ছাড়া আর কোনদিক থেকেই সিবিআই তুলনীয় নয়। আর সিবিআই অনেক বেশি সফল, শক্তিশালী ও পেশাদার ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের দুদক দেখে মনে হয় কেবল সরকার বিরোধীদের সাইজ করার ওর কাজ। আর ওদিকে ভারতের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, তবুও সিবিআইয়ের মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটে চলছে; তাই অপব্যবহারমুক্ত প্রতিষ্ঠান বলা যাচ্ছে না।

এর সবচেয়ে বড় প্রকাশ ছিল গত ০৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী মমতার রাজ্য পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে মোদীর সিবিআই লেলিয়ে দেয়া – যা আসলে আক্ষরিক অর্থেই রাজ্য পুলিশ বনাম কেন্দ্রের সিবিআই অফিসের লড়াইয়ের ঘটনা। এতে মাঠের চেহারা দাঁড়ায় এমন যে, কলকাতায় এসে রাজ্য পুলিশ কমিশনারকে গ্রেফতার বা জিজ্জাসাবাদ করতে তার বাসায় কেন্দ্রের সিবিআই দল পৌছালে তাদেরকেই রাজ্য পুলিশের বাধা দেয়া শুধু নয়, উল্টো সিবিআই অফিসারদের গ্রেফতার করে গাড়িতে তুলে কাছের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

মোটামুটি ঘটনা-সংক্ষেপটা হল, আমাদের ডেসটিনির মত মানুষের টাকা নিয়ে সুদসহ ডাবল ফেরত দেয়া বা এমএলএম করবে বলে শেষে পুরা টাকাই মেরে দেয়ার ঘটনা। ঘটনাকাল মমতার জমানার আগে এবং ধরা পড়া মমতা-কালীন। তবে এখানে মমতার দলের কিছু নেতা সহ অনেক কয়টা রাজনৈতিক দলের (কংগ্রেস, সিপিএম অথবা আগে তৃণমুলের নেতা এখন বিজেপি করা এমন সকলে অভিযুক্ত) নেতাকেই মাসোহারা বা নিয়মিত চাঁদা দিয়ে সম্পর্কিত করে নেয়া ছিল। মমতার আমলে এই কেলেঙ্কারি প্রকাশ হয়ে পড়লে তিনি রাজ্য-পর্যায়ে যে তদন্ত কমিটি করেছিলেন ও রিপোর্ট দিয়েছিলেন তা হয়েছিল এই আলোচ্য পুলিশ কমিশনার রাজীবের নেতৃত্বে। এদিকে কেন্দ্র সরকারও সিবিআইকে দিয়ে ঘটনা তদন্ত, মামলা ও চার্জশীট দেওয়ায়। তাহলে এখন ইস্যু কী? সেটা হল সিবিআইয়ের দাবি তারা পরে জেনেছে রাজীব তদন্তের সময় কথিত এই ডাইরি পেয়েছিলেন যা তিনি সিবিআইকে দেন নাই বা জানান নাই। যদিও আসামিরা বলছে এমন ডাইরির কথাটাই ভুয়া। কিন্তু এখানেই নির্বাচনের আগে মোদীর ইচ্ছা তিনি এই কথিত (দুর্নীতি) অনিয়মের কথা তুলে মমতাকে একটু বেকায়দা ফেলে ভোটারের স্মৃতিতে বছর দশের আগের ঘটনাটা মনে করিয়ে দেয়া এই অনুমানে যে তাহলে আসন্ন নির্বাচনে্র ভোটে কিছু মাইলেজ বা বাড়তি সুবিধা তিনি পেয়েও যেতে পারেন। মামলা ইতোমধ্যেই রাজ্য হাইকোর্ট ছেড়ে ভারতের সুপ্রীম কোর্টে বিচারাধীন। বাকি বিষয়টা কী হল তা সংক্ষেপ করার জন্য এনিয়ে দুপক্ষই এবার আদালতে গেলে প্রধান বিচারপতি কী নির্দেশ দিলেন তা দেখব। বিচারকের সারকথাটা ছিল, রাজীবকে সিবিআইয়ের গ্রেফতার করতে পারবে না, এটা অপ্রয়োজনীয়। তবে   সিবিআইয়ের রাজীবকে কোন জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইলে সে অবশ্যই সহযোগিতা করে মুখোমুখি বসবে, তবে তৃতীয় নিরপেক্ষ জায়গায়। ইতোমধ্যে শিলং শহরে সিবিআই আর রাজীব মুখোমুখি সাক্ষাতও ঘটে গেছে, শান্তিপুর্ণভাবে। রাজীব এখন নিজের কাজে। এর মানে, প্রধান বিচারপতির এই রায় বা নির্দেশই প্রমাণ করে যে মোদী সিবিআই লেলিয়ে রাজীবকে গ্রেফতারে উঠায় নিয়ে যেতে আর তাতে নির্বাচনের আগে মমতাকে এনিয়ে অস্বস্তিতে ফেলতে চেয়েছিল। যেমন এক প্রাক্তন সিবিআই প্রধান মন্তব্য করছেন, রাজীব সিবিআইয়ের সাথে সহযোগিতা না করলে তাকে তো সহজেই আদালতের মাধ্যমে বাধ্য করা যেত। সিবিআই সে পথে না গিয়ে হাঙ্গামা বা মিডিয়া ইস্যু তৈরির পথে গেল কেন? খুব জেনুইন প্রশ্ন। যার সহজ জবাব মোদী তো আসলে এক হাঙ্গামা বা মিডিয়া ইস্যুই চেয়েছে। আর এটাই তো অপব্যবহার। তবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘটনা হল, মমতাও কম যান না। রাজীবের বাসায় যে সন্ধায় সিবিআই যায় সেই তখন থেকে এর প্রতিবাদে রাস্তায় অবস্থান ধর্মঘট করতে বসে যান, আর তা চলে লাগাতর তিনদিন যতক্ষণ না আদালতে প্রধান বিচারপতি নির্দেশ জারি করেন। আর এই তিন দিনে সব বিরোধীদলের নেতাই  বিবৃতি দিয়ে ও ব্যক্তি প্রতিনিধি পাঠিয়ে মমতার ঐ অবস্থান ধর্মঘটে স্ব স্ব দলের সমর্থন ও সহ-অবস্থান জানান দিলেন। তাতে সবার কমন এক স্বরে অভিযোগ ছিল যে মোদী নিজ দলের সংকীর্ণ স্বার্থে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোকে লেলিয়ে অপব্যবহার করছেন। সারকথায় সব মিলিয়ে এতে হাঙ্গামা বা মিডিয়া ইস্যু অবশ্যই একটা হয়েছে। কিন্তু সেটা মমতার পক্ষে গিয়েছে।

কিন্তু ঘটনার অন্য এক মাত্রার দিক আছে। সাদা চোখে দেখলে ব্যাপারটাকে  মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে মোদীর সিবিআই-ঘটিত নেহায়েতই এক অপব্যবহার মনে হলেও এর ভেতরে জন্মের সময় থেকে ভারত রাষ্ট্র-এর এক গাঠনিক দুর্বলতা [ফেডারল রাষ্ট্রক্ষমতা না হয়ে ভুতুড়ে কেন্দ্রের কুক্ষিগত ক্ষমতা] আর তাতে ভুতুড়ে ক্ষমতার শিকার হওয়া ইস্যু আরো উদোম হয়ে সামনে আসাও নজরে আসবে। এটাই মূলত ভারত রাষ্ট্রক্ষমতার ‘কেন্দ্র বনাম রাজ্যের লড়াই’ – মমতা যে লড়াইয়ের সোচ্চার অগ্রসেনানি। ভারত রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার সময়ের মৌলিক ও গভীর দুর্বলতা এটাই।

ভারত এখন মোট ২৯টি রাজ্যের দেশ। কিন্তু ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা মূলত কোন রাজ্যের হাতে? সে রকম কোনো একটা রাজ্য অন্যান্য রাজ্যের ওপর ছড়ি ঘুরাচ্ছে কি না। এসব প্রশ্নকে ভারতের জন্মের সময় থেকেই পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ এভাবেই বাস্তবতা হল। কথিত এই “কেন্দ্রীয় ক্ষমতাটাই” এক ভুতুড়ে [না বলা কওয়া, অ-সংজ্ঞায়িত (un-defined power) লুকানো ক্ষমতা ] ক্ষমতা হিসেবে থেকে গেছে। এই ক্ষমতা কার হাতে এবং কেন এর জবাব খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ‘হিন্দি-বলয়’ বা ‘হিন্দিতে কথা বলা’ রাজ্য নামে একটি পরিভাষা দিয়ে বলা হয়েছে, এদের হাতেই ভারতের কথিত কেন্দ্রীয় ক্ষমতা এ পর্যন্ত বিরাজ করে এসেছে। আর অন্য সব রাজ্যের ঘাড়ের ওপর কর্তৃত্ব চালিয়ে গেছে। রাষ্ট্রের আদায়কৃত রাজস্ব কাকে কতটা দেবে কেন্দ্রীয় এই ক্ষমতা তা নিয়ন্ত্রণ করে, বরাদ্দ দেয়। আর এই বরাদ্দ নিয়ে বিরোধী দলের রাজ্য সরকার (যেমন মমতা) নিয়মিত হৈ চৈ করে তুলছেন। এভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের নামে এই ভুতুড়ে ক্ষমতা রাজ্যগুলোর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতার ভাষায়- ক্ষমতার কেন্দ্র বনাম রাজ্যের বৈষম্যের বিরুদ্ধেই তার মূল লড়াই, এটাই তার রাজনীতি। এরই একটা প্রকাশ হল সিবিআই প্রতিষ্ঠানকে রাজ্যের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের অপব্যবহার করা।

আর সব রাজ্যই অনুভব করে ‘কেন্দ্র’ নামে এক ভুতুড়ে ক্ষমতা তার ঘাড়ে চেপে আছে। কিন্তু কী করে এর বিরুদ্ধে লড়বে, তাদের কাছে তা এখনো অস্পষ্ট। মমতাই একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী যিনি কেন্দ্র-রাজ্যের ক্ষমতার বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তবে, কী করলে এর সমাধান আসবে তা তিনিও সুনির্দিষ্ট করে বলার ক্ষেত্রে তিনিসহ পুরা ভারতের রাজনীতিবিদ, একাডেমিকসহ সমাজের সবাই অস্পষ্ট। বলা যায়, একাডেমিক স্তরেও ইস্যুটি নিয়ে আলোচনাই শুরু হয়নি। সকলেই ভীত যে এতে না ভারত বিভিন্ন রাজ্যে টুকরা হয়ে যায় শেষে। যদিও মমতা বৈষম্যের কথা তুলে ধরার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু আসল কথা, সমাধান কী? এর এক কথার জবাব হলো কথিত, ভারত রাষ্ট্রের কথিত কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ভেঙে দিয়ে এক ফেডারেল কাঠামোর রাষ্ট্রব্যবস্থায় চলে যাওয়া। এমন রাষ্ট্র হিসাবে যার আদর্শ উদাহরণ আমেরিকা, তার ফেডারেল স্টেট কাঠামো। এ কারণে ৫০ রাজ্যের আমেরিকার কখনও এমন অভিযোগ নাই যে কোন এক-দুইটা রাজ্য বাকি সব রাজ্যের ঘাড়ে চড়ে মাখন তুলে নিয়ে খাচ্ছে, বা মাতবরি করছে। এমন অভিযোগ আজ আমেরিকার জন্মের আড়াই শ’ বছর পরও উঠেনি। একারণেই বলা যায় আমেরিকা রাজ্যগুলোর সত্যিও এক স্বাধীন ইউনিয়ন। কেউ বা অন্য রাজ্য তাদের বাধ্য করে নাই। নিজের স্বার্থে বুঝে বুঝে নিয়ে তেমন নিয়ম আইন করেই একই ফেডারল রাষ্ট্রে সকলে সামিল হয়েছে।  কথিত ইউনিয়ন-ভারত আসলে নেহেরুর বলপ্রয়োগে বাধ্য করা এক ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ভারত; যেখানে বহু ক্ষমতার উৎসের হদিস নাই, কেন এই ক্ষমতা তার – এর কোন ব্যাখ্যা নাই,  এমন ক্ষমতা। বরং ইতোমধ্যেই সমালোচক ও বিরোধীদের দাবি, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও প্রতিরক্ষা খাতেও “রাজনৈতিক দলাদলি ঢোকাচ্ছে মোদির সরকার“।

তবে এখনকার সারকথা হল, কেন্দ্র ও রাজ্যের ক্ষমতার বৈষম্য, এ বিষয়টিকে মমতা নির্বাচনে ইস্যু হিসেবে হাজির করতে সফল হয়েছেন। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা অপব্যবহারের দায়ে মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তিনি বাকি সব বিরোধী দলকেও একাট্টা করতে সক্ষম হয়েছেন। এটাই আসন্ন নির্বাচনে একটা মুখ্য ইস্যু হিসেবে রূপ পেয়েছে।

আসন্ন নির্বাচনের দ্বিতীয় ইস্যু,
এই নির্বাচনের দ্বিতীয় ইস্যু হল, চাকরি বা কাজ সৃষ্টি। গত ২০০৪ সাল থেকে পরের ১৫ বছরে ভারতের তিন সরকারের আমলে প্রথম প্রধান ইস্যু ছিল এটা। অন্য ভাষায়, ইস্যুটার নাম সরকার “অর্থনীতিতে ভাল” করেছে বা সাফল্যের সাথে তা চালাতে পেরেছে কি না। এর জবাব বা আসন্ন নির্বাচনের আগের মূল্যায়নে বলা যায়, এই ইস্যুতে মোদী ইতোমধ্যেই প্রকাশিত যে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। আর এর সর্বশেষ প্রমাণ হল, এক পরিসংখ্যান রিপোর্ট। মোদির সরকার নির্বাচনের আগে এর স্বাভাবিক প্রকাশ ঘটতে দিতে বাধা দিয়েছে – এই অভিযোগে জাতীয় পরিসংখ্যান কমিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধানসহ দুই সদস্য পদত্যাগ করেছেন। [কেন্দ্রের বিরুদ্ধে এই রিপোর্ট চেপে রাখার অভিযোগ তুলে ইতিমধ্যেই ইস্তফা দিয়েছেন ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল কমিশন-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান পি সি মোহনন।সে রিপোর্ট বলেছে, কাজ সৃষ্টি বা চাকরির সংস্থান এই সরকারের আমলে গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এই পরিসংখ্যানের মধ্য দিয়ে যে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে তা ভারত রাষ্ট্রের জন্য আরেক কারণে খুব খারাপ ইঙ্গিত। ১৯৮৫ সালের পর থেকে ভারতের ‘কেন্দ্রীয় সরকার’ (যেটা ভুতুড়ে বা অস্পষ্ট সাফাইয়ের ক্ষমতা বা হিন্দি বলয়ের কোটারি ক্ষমতা) ধারণাটাই দুর্বল হতে শুরু করেছিল। কেন? কারণ, কংগ্রেস বা বিজেপির মত কোনো সর্বভারতীয় দলের আর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয় লাভ করে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা  আসীন হতে আর সক্ষমতা পারে নাই। মানে এ’দুই দল ভুতুড়ে ক্ষমতাতেও আসতে সক্ষমতা ছিল না- এ দৃশ্যই প্রধান ফেনোমেনা হিসেবে সামনে আসতে শুরু হয়েছিল। এর বদলে আমরা দেখছিলাম, সর্বভারতীয় দল দু’টি আর এককভাবে নয়, বরং আঞ্চলিক দলের সাথে জোট করে কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করা – এই নতুন ফেনোমেনা শুরু হয়ে গিয়েছিল।

কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএ বা বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ জোট  – এভাবে কোয়ালিশন গড়া – এভাবে সরকার গঠনঅই প্রধান ধারা বলে হাজির হয়েছিল। তবে আবার গত ৩০ বছরের এই ফেনোমেনার বিরুদ্ধে ব্যতিক্রম হল, ২০১৪ সালের বিজয়ী চলতি মোদী সরকার। যদিও এটাও একটা এনডিএ কোয়ালিশন সরকার, সে কথা সত্য। কিন্তু এই এনডিএ জোট গঠন ছাড়াই মোদীর বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতাও আছে। মোদীর বিজেপি সেবার এই ব্যতিক্রম ঘটাতে পেরেছিলেন কেন? কারণ, মূলত কাজ সৃষ্টির ইস্যু। ২০১৪ সালের মোদি প্রবল প্রচারণা চালিয়ে হতাশ [এর আগে কংগ্রেসের দ্বিতীয় ইউপিএ জোটের সরকারের অর্থনীতিক ব্যর্থতায় ] ভোটারদেরকে ফিরে আস্থায় নিতে পেরেছিলেন যে, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী মোদি সেবার কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করতে পারলে (অর্থনীতিতে ভালো করে) ব্যাপক কাজ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু পাঁচ বছর শেষে এবার ২০১৯ সালে হতাশ ভোটাররা দেখছেন, সেই আস্থা এখন আবার ধুলায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। অর্থাৎ মোদীর চাকরি সৃষ্টিতে ব্যর্থতা-হতাশার মানে হল, এবারে ভারতের নির্বাচনে আবার সর্বভারতীয় দল দু’টির ওপর প্রবল অনাস্থা (কেন্দ্রীয় ভুতুড়ে ক্ষমতার ওপর অনাস্থা) – এটাই স্থায়ী হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। অর্থাৎ বিজেপি বা কংগ্রেস বাদে কেবল আঞ্চলিক দলগুলোর কোন এক কোয়ালিশন সরকার – এটাই মুখ্য ফেনোমেনো বলে এখন থেকে হাজির হয়ে যেতে পারে।

এর সোজা অর্থ আরো ব্যাপকভাবে, এবার বিজেপি অথবা কংগ্রেসের নেতৃত্বের আঞ্চলিক দলগুলোকে সাথে নিয়ে কোনো কোয়ালিশন সরকার আর নয়, বরং (১৯৯৬ সালের দেবগৌড়া সরকারের মত) কেবল আঞ্চলিক দলগুলোরই কোয়ালিশন সরকার গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। মোদির ‘কাজ সৃষ্টিতে’ চরম ব্যর্থতার প্রভাবে এমন ঘটার সম্ভাবনা প্রবল হয়েছে।

আসন্ন নির্বাচনের তৃতীয় ইস্যু,
গরু, গো-মাতা বা গো-রক্ষক মোদি ইস্যু! হিন্দুত্বের হুজুগ বা জোয়ার তুলে সমাজে মেরুকরণ ঘটিয়ে ভোটের বাক্স ভরতে হবে- এটাই বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতির সারকথা। এই উদ্দেশ্যে গরুকে হিন্দুত্বের রাজনৈতিক প্রতীক বানিয়ে গত পাঁচ বছর ধরে  কথিত মুসলমানেরা মাংস বহন করেছে বা ফ্রিজে রেখেছে অথবা গরু কেটেছে ইত্যাদি হুজুগ তুলে পাবলিক লিঞ্চিংয়ের ব্যাপকতা দেখা গেছে। এমন সামাজিক তাণ্ডবে মোদী নিজেকে গরু-পূজারী, গো-মাতা বা গো-রক্ষক হয়ে হাজির করে গেছেন। কিন্তু মোদী এই ‘গরুর রাজনীতি’তেও পরাজিত। মোদী ভেবেছিলাম গরুর রাজনীতির জজবা দিয়ে বাক্স ভরবেন। কিন্তু সেটা আগেই ব্যাকফায়ার করে গেছে। কীভাবে?

যেকোনো দলীয় কর্মসূচি তা অর্থনৈতিক দিক থেকেও টেকসই বা বাস্তবায়িত (viability) করা সম্ভব কি না তা আগাম যাচাই করে নিতে হয়। মানে, সেদিক থেকেও টিকে থাকার সক্ষমতা থাকতে হয়। মোদির গরুর রাজনীতির অর্থনৈতিক দিকও টেকসই কি না তা আগেই পরীক্ষা করে নেয়া হয় নাই এবং তা টেকসই নয়। তা না করাতে, এর ব্যর্থতা থেকেই মোদী এখানে হেরে গিয়েছেন। যে সমাজে গরু কৃষির উপকরণ সে সমাজে মাংস হিসেবেও গরুর ব্যবহার থাকতে হবে বা থাকবেই। এর বিরুদ্ধে যাওয়ার চিন্তা অবাস্তব। এমনকি ধর্মীয় বা কোনো কারণে, মাংস নিজেরা না খেলেও, অন্তত মাংস রফতানি করতেই হবে। এই সত্য মোদি মানতে চাননি, বোঝেননি- তাই তিনি ব্যর্থ।

মূল ব্যাপারটি হল, একটা বয়সের পরে গৃহপালিত গরুকে আর কৃষিতে বা মাল টানার কাজে ব্যবহার করা যায় না। তখন থেকে গরুকে আর বসিয়ে খাওয়ানো মালিকের পক্ষে অসহনীয় দায় হয়ে যাবেই। এটাই হিন্দুত্বের রাজনীতি বুঝতে অক্ষম। অথচ এর সামাজিক সমাধান ছিল, গরুকে বিক্রি করতে দেয়া। যার সোজা অর্থ হল, গরু নিজে না কাটলেও, অন্যকে মাংসের উৎস হিসেবে  গরুকে ব্যবহার করতে দিয়ে দেয়া, যার মাধ্যমে গরুর জীবনচক্রের একটা পরিসমাপ্তি টানা। কিন্তু মোদীর রাজনীতি হিন্দুত্বের জোশে –  মাংসের জন্য গরুকে বিক্রি করতে দেয়া যাবে না বলে অবিবেচক বাধা তৈরি করেছিল। কিন্তু গরুকে সেই পর্বে খাওয়াবে কে, এর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করলেন না। নামকাওয়াস্তে কিছু গো-শালা বানালেও তা রক্ষণাবেক্ষণ আর গরু্কে খাওয়ানোর অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করলেন না।

আসলে বাস্তবে কতগুলোই বা গো-শালা বানাবেন? বাড়ি থেকে গো-শালা বেশি দূরত্বের হলে গাড়ি ভাড়া করে কেউ গরু গোশালায় দিতে যেতে চাইবে না। এতে যেহেতু গরুকে খাওয়ানোর দায়িত্ব নিতে  কৃষক/ গরুমালিক অপারগ, তাই সে – এবার গরুর দড়ি খুলে ছেড়ে দেয়াকেই একমাত্র ও সহজ উপায় মনে করল। কিন্তু তাতেও ‘গরু খাবে কী’ ব্যাপারটা শেষ হলো না। গরু তাই এবার ব্যাপক হারে কৃষকের ফসলি জমিতে গিয়ে হামলে পড়ল। ফলে রাত-দিন জমি পাহারা দিয়ে ফসল বাঁচানো এক বিরাট মাথাব্যথা আর খরচের নতুন খাত হিসেবে হাজির হল। ব্যাপারটা এতই মারাত্মক হয়ে গেছে যে, গত ডিসেম্বরে রাজস্থানের রাজ্য নির্বাচনে ‘ছাড়া গরু’ মোকাবেলা করা নির্বাচনী ইস্যু হয়ে হাজির হয়েছিল। অর্থাৎ ছাড়া গরু ইস্যু উল্টো মোদির ভোটকেটে দিয়ে রাজস্থানে বিজেপি পরাজিত করেছিল। তাই এখন চাকরি সৃষ্টি না করতে পারার ব্যর্থতা, না ছাড়া গরুর সমস্যা- কোনটা মোদির প্রধান ব্যর্থতা বলে হাজির হবে, তা নিয়ে এখন জল্পনা-কল্পনা। এমনই এক আর্টিকেল আছে এখানেলোকসভা নির্বাচনে মোদির বিজেপি’র জন্য বিপর্যয়ের কারণ হবে কোনটি – গরু না বেকারত্ব?

আসন্ন নির্বাচনের চতুর্থ ইস্যুঃ
চতুর্থত, হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিল। নতুন এই আইন লোকসভায় বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টে বিজেপির আনা বিল হলেও এটা মোদী এনেছিলেন মূলত সারা ভারতে এটা প্রযোজ্য হবে- তেমন ভেবে নয়। বরং বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ নর্থইস্ট – এদুই পকেটের রাজ্যগুলোর জন্য। তারা আবার মোট আট রাজ্যের (নর্থইস্ট সাত রাজ্য আর পশ্চিমবঙ্গ) হলেও এখানে লোকসভার মোট আসন হলো ৬৬টা। ভারতের লোকসভার মোট ৫৪০ আসনের মধ্যে সরকার গড়ার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় আসন পেতে হয় ২৭২টা। আর, এই পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ নর্থইস্টের মোট ৬৬ আসনের কথা মাথায় রেখেই মোদী নাগরিকত্বের বিলটা এনেছিলেন। কিন্তু তার কপাল এখন একেবারেই ফাটা, যেখানে হাত দেন সব ব্যর্থ।

তার অনুমান ছিল এই বিল তাকে নির্বাচনের ৬৬ আসনে বিজেপির পক্ষ জিততে বাড়তি সুবিধা বা মাইলেজ দেবে। অথচ এটা ছিল তার সবচেয়ে ভুল অনুমান। ফলাফলে ইতোমধ্যেই তিনি ব্যর্থ। কারণ, নর্থইস্ট সাত রাজ্যের বেলায় তা ‘ব্যাকফায়ার’ করেছে। এই বিল আনার কারণে মোদীর ভোট পাওয়া দূরে থাক, ওই সাত রাজ্যে তারা এখন ইউনিয়ন ভারতের সাথে থাকবে কী না সেই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। প্রতিদিন এখন এনিয়ে ভারত ছেড়ে, ‘ভেগে যাওয়া’র আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে। আর এদিকে আসামে? সেখানে এখন রাজ্য সরকারে আছে বিজেপি। কিন্তু আসামের মূল নাগরিকদের সব দল ও পক্ষই এখন সেই বিজেপির প্রবল বিরুদ্ধে। জনসম্মতির রেটিংয়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় বিজেপি। এই বিল আনার কারণে বিজেপিকে ১৯৮৫ সালের চুক্তির সাথে প্রতারণার কৃতিদার হিসাবে বিট্রেয়ার মনে করছে। বাকি থাকল পশ্চিম বাংলা। সেখানেও মোদীর বিরুদ্ধে মমতার সংগ্রাম ও বিরোধিতা প্রবল আর সফলই বলা যায়। বরং উলটা, মমতা তার নেতৃত্বে আঞ্চলিক দলগুলোকে বিজেপির এবং মোদীর বিরুদ্ধে একাট্টা করতে সক্ষম হয়েছেন, আর স্বভাবতই এতে মোদীর বিরুদ্ধে “বাংলার স্বার্থের আসল ধারক” হলেন মমতা – এ কথা বলে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ ভোটারের সহানুভূতি মমতা নিজের ব্যাগে তুলে ফেলেছেন।

তাহলে কী দাঁড়াল? কারা এই বিলের পক্ষে? বাংলাদেশের মতো পড়শি দেশের যেসব হিন্দু আছেন, এদের অনেকে মোদীর চরম ভক্ত। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতির প্রধান ধারা এখন আরএসএস-মুখি অথবা ডমিনেটেড। কিন্তু তাতে মোদীর কোনো লাভ নেই এ জন্য যে, তারা খুব কম জনই মোদীর ভোটার। কাজেই পড়শি দেশের হিন্দুদের স্বার্থে পশ্চিম বাংলার হিন্দুরা কতটা মোদীর ভোটের বাক্সে ভোট দিতে য়াগিয়ে আসবেন তা এখন প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ, মমতার কারণে কেন্দ্র ও রাজ্য ক্ষমতার লড়াই ব্যাপারটাকে মুখ্য করে তোলাতে এখন পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ভোটারেরা স্থানীয় স্বার্থে তারা এখন হিন্দিবলয় বিরোধী; মমতা সেখানে মোদীকে “ভিলেন” হিসেবে দেখাতে পেরেছেন।

মোদীর আরও বিপদ আছে। কারণ  মোদী সরকারের দায় খোদ আরএসএস আর নিতে চাচ্ছে না। বরং তাঁরা এখন মোদী সরকারের বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষের পক্ষে সহানুভূতি দেখিয়ে নিজের ইমেজ বাঁচাতে ব্যস্ত। আনন্দবাজারের শিরোনাম- “বেকারত্ব বাড়ছে, বিরোধীদের সুরে সঙ্ঘ প্রধান, অস্বস্তিতে মোদি’। ওদিকে বিজেপি দলের ভেতরেই মোদী-অমিত গ্রুপের বিরোধিতাকারীরা- যেমন- মন্ত্রী নিতিন গডকড়ী মোদীর থেকে নিজের দুরত্ব তৈরি করতে চাইছেন। এদিকে শত্রুঘ্ন সিনহা বা যশবন্ত সিনহা ও অরুণ সুরি- এরা প্রকাশ্যেই বিরোধিতায় নেমেছেন।  এমনকি মোদীবিরোধী মমতার সমাবেশ র‌্যালিতেও অংশ নিচ্ছেন।

তাই সব মিলিয়ে আমরা লক্ষ করছি- আসন্ন নির্বাচনী ফলাফলের সম্ভাব্য ঝোঁকটা হল, মোদির বিজেপির ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে কমছেই আর কমছেই। কিন্তু এর মানে কী? তা সত্ত্বেও আবার বিকল্প হিসেবে কংগ্রেসের নেতৃত্বে কোনো কোয়ালিশন ক্ষমতার দাবিদার তারাও নয়। বরং কেবল আঞ্চলিক দলগুলো – এদেরই কোনো কোয়ালিশন সরকারের সম্ভাবনা ক্রমেই জেঁকে বসা, এটাই প্রবল হচ্ছে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মোদির ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা কতটুকু?” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের কী হাসিনাবিরোধী অবস্থান আসন্ন!

ভারতের কী হাসিনাবিরোধী অবস্থান আসন্ন!

গৌতম দাস

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2xv

সম্প্রতি ‘বিবিসি বাংলা’ হঠাৎ নড়েচড়ে জেগে উঠেছে। তারা ভারতের পক্ষ হয়ে হাসিনাকে তোয়াজ করতে, মন গলাতে এক আর্টিকেল ছেপেছে যার শিরোনাম হল, “বিএনপিকে নিয়ে ভারতের সমস্যাটা ঠিক কোথায়?”

তাতে মনে হয়েছে বিবিসি যেন শেখ হাসিনা সরকারের এক কড়া সমালোচক – এই মর্মে নিজের একটা পরিচয় তাকে দাঁড় করাতে হবে, যেন এমন পণ করেছে বিবিসি। গত দশ বছরে আমরা বিবিসির এমন ভূমিকা দেখিনি। এ সময়টায় আমরা দেখে চলেছি যখন আমাদের প্রায় সব মিডিয়া হাউজগুলো সরকারের মুখ চেয়ে রিপোর্ট করে চলেছে। সেখানে গত নির্বাচনের সময় থেকে হঠাৎ করে এখন বিবিসি যে সরকারবিরোধী, ধারাবাহিকভাবে তা প্রমাণে এবার তারা উঠে পড়ে লেগেছে। যদিও এবার বাড়তি আর একটা দিক লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে মূলত ভারতের হয়ে কিছু কাজ করে দেয়ার দায়িত্ব বিবিসি নিয়েছে। তাই কয়েকদিন আগে ২৯ জানুয়ারি ঐ রিপোর্ট তারা ছেপেছে।

দেখা গেছে, মূলত ভারত “বিএনপিকে যে কত গভীরভাবে অপছন্দ করে” এরই প্রমাণ-দলিল হতে চেয়েছে এই রিপোর্ট। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতাদের, বিশেষ করে ‘বাংলা’র নেতাদের সাথে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয় বিবিসি-বাংলার এমন সাংবাদিক হলেন শুভজ্যোতি ঘোষ। এই রিপোর্ট তারই লেখা।

এটা যেন এক অর্ডার দেয়া রিপোর্ট, এমন মনে করার কারণ আছে। কেন? ব্যাপারটা হল, বিএনপি সম্পর্কে ভারতের বিজেপি সরকারের “শক্ত রিজার্ভেশন” বা আপত্তি আছে, এই কথাটা বলবার অছিলা হিসাবে ভারতের থেকে যেন খেপ নিয়েছে বিবিসি। বিবিসি যেন ভান করে যে, তারা নিজের উদ্যোগেই ভারতের কাছে জানতে চেয়েছে বিএনপি প্রসঙ্গে ভারতের (বা বিজেপির) সরকারি অবস্থান কী? আর তা জেনে এর ভিত্তিতে এই রিপোর্ট করছে। এটাই শুভজ্যোতি ঘোষের রিপোর্ট। এতে ভারতের লাভালাভ হল যে, তারা বিএনপির বিরুদ্ধে কটু কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন ও নিচ্ছেন। এ ছাড়া দেখানো গেল যে, বিএনপিবিরোধী কথা তারা নিজে যেচে বলেননি, বরং বিবিসি জানতে চাওয়াতে তাদের বলতে হয়েছে।

কিন্তু মোদি সরকার বা বিজেপিকে এখন এই রিপোর্ট করতে হচ্ছে কেন? এটাই সেই তাতপর্যপুর্ণ প্রশ্ন।

আমরা ইতোমধ্যে সবাই কমবেশি জানি, নির্বাচনের আগে কৌশলগত কারণে বিএনপি ভারতের সাথে একটা ‘ওয়ার্কিং টার্ম’ বা একসাথে কাজ করার ন্যূনতম কিছু বোঝাবুঝি সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। ভারতও তাতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিল। আর  ৯৭% আসন নিয়ে বিজয়ী হাসিনার ভয়ে ভারত এখন সেটাই প্রবল অস্বীকার করতেই বিবিসি দিয়ে করিয়েছে এই রিপোর্ট। যদিও বিএনপির দিক থেকে বোকামি আর অদূরদর্শী নেতৃত্ব বা পাঠানো প্রতিনিধিদের নাদান পারফরম্যান্সের কারণে ভারতের সাথে বিএনপি কথা বলতে গিয়ে ব্যাপারটা অনেকটা নিজের ‘বাবা-মাকে গালি দেয়ার’ মতো অবস্থা করে ফেলেছিলেন তারা। অথবা সময়ে কখনও তারা দৃশ্যত ভারতের ‘অধীনস্থতার’ পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন। তবে নির্বাচনের আগে বিএনপি কৌশলগত কারণে ভারতের দিকে আগোনোতে বা কথা বলাতে সেটা ভুল হয়েছে বা সমস্যা তৈরি করা হয়েছে – এমন মনে করা ভুল হবে। যেকোনো দল কৌশলগত কারণে এমনই করে থাকে। অনেক সময় ক্রিটিক্যাল প্রতিপক্ষকে আস্থায় নিতে বা ‘ঠাণ্ডা’ রাখার জন্য ভিন্ন রাষ্ট্রকে অনেক রকম কথা বলতে হয়, জড়াতে হয়।

যদিও খেয়াল রাখতে হয় যে আমরা এমন কোনো দাগের নিচে নামতে পারি না, যে দাগ আগেই টেনে নিয়ে একাজে নামতে হয়; আর সেটা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, হোমওয়ার্ক (আমরা কী বললে প্রতিপক্ষ কী কী বলতে পারে এর আগাম অনুমান আর জবাব প্রস্তুত করা) সাথে করে রাখতে হয় আগেই। তদুপরি দক্ষ পেশাদার লোককে প্রতিনিধি বেছে নিয়ে কাজে নামতে তো হয়ই। এমন সব ক্ষেত্রেই বিএনপির মারাত্মক কিছু ত্রুটি ছিল। এ ছাড়া ভারতের সাথে এই আলাপে বিএনপির দিক থেকে মূল কী মেসেজ দিতে চাওয়া হচ্ছে- এর ভাষা, ভঙ্গি আর উপস্থাপন দক্ষতা আগেই নিজের কাছে স্পষ্ট করে নিতে হয়। এককথায় বললে, এ ক্ষেত্রে বিএনপির বড় রকমের কিছু অগ্রহণযোগ্য ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা ছিল।

ভারতের দিক থেকে বললে, তারা ভেবেছিল বিএনপির এই এগিয়ে আসা, এটা তাদের ‘উপভোগের সময়’। ব্যাপারটা যেন হাতি হয়ে আয়েশে বসে নত বিএনপির সালাম নেয়ার সময় তাদের। যেন তারা বুঝাতে চাইছে, বাংলাদেশে ভারতপ্রীতির সরকার কায়েম থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের বিরোধী দল নিজেই ভারতের মন পাওয়া বা গলানোর চেষ্টা করছে। ফলে বিএনপিকে এবার ‘বাগে পেয়েছি’ ধরনের আচরণ ভারতের জন্য সঠিক প্রতিক্রিয়া বলে তারা মনে করেছে। যেন বোঝাতে চেয়েছিল, “বাংলাদেশের রাজা ঠিক করার ক্ষমতা আমাদের হাতে, বুঝেছ!”। অথচ তখন নিজেই বুঝেনি, এই নির্বাচন ভারতের জন্য কোন দুর্ভাগ্য বয়ে আনছে। এ প্রসঙ্গে আরো আলোচনায় আমরা পরে আবার আসব। তবে বিএনপি প্রসঙ্গে ভারতের আচরণ, কেবল এটাই বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে ভারতের পুরা অবস্থান নয়। বরং বলা যায়- একেবারেই বাইরের দিক, “শো আপ” অংশ এটা।

আসলে ভেতরে রূপটা ছিল খুবই উদ্বিগ্নতার। আমাদের এবারের নির্বাচনে কী হয়, কোনদিকে যায় কী ফল আনে এসব অনিশ্চয়তা নিয়ে ভারত ছিল উদ্বিগ্ন। এর বড় কারণটা হল – তাদের গোয়েন্দা অনুসন্ধানভিত্তিক স্টাডি রিপোর্ট। এসংক্রান্ত বিশ্বাস ছিল, নির্বাচনে কী হতে পারে, ফলাফল ও পরিস্থিতি ইত্যাদির রিপোর্ট। সবখানেই তারা নিশ্চিত হচ্ছিল,”এবার হাসিনার আর খবর থাকবে না”, “আওয়ামী লীগ খারাপভাবে হারবে”। আর বারবার নানা দিক থেকে অনুসন্ধানের একই ফল আসাতে তারা খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। এককথায় তারা দেখছিল হাসিনার “পাবলিক রেটিং” খুবই শোচনীয়। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা যে তারা কী এজন্য নতুন করণীয় পদক্ষেপ ঠিক ভাবে নয়েছে? নাকি তা করতে পিছিয়ে পড়ে যাচ্ছে? অর্থাৎ রেটিং” খুবই শোচনীয় হলে তো হাত ছেড়ে দিতে হবে; নতুন বিকল্প খুঁজতে হবে……ইত্যাদি। ফলে শেখ হাসিনার ওপর থেকে আস্থা একেবারে তুলে না নিলেও ঢিলা দিয়ে ফেলেছিলেন। অথবা বলা যায়, এরই এক প্রকাশ ঘটতে আমরা দেখেছিলাম – বিএনপির প্রতিনিধিদের সাথে দেখা করতে আগ্রহী হওয়া। এভাবে আলাপ করার সুযোগ নেয়া হয়েছিল যে, বিএনপি কী চায় সেটা মন দিয়ে শুনতে হবে। আর এগুলো তারা করেছিল আসলে আগ্রহের সাথেই। অথচ এখন এই বিবিসি রিপোর্টে সেসব আগ্রহের কথা এড়িয়ে হাত সব ধুয়ে ফেলার প্রয়াস চলছে। সারকথায়, সে সময়ে বিএনপির সাথে তারা সম্পর্কটা এমন জায়গায় উঠিয়েছিলেন যাতে, যদি শেখ হাসিনার পতন হয়েই যায় সে ক্ষেত্রে সেখান থেকে যেন শুরু করা যায়। যাতে অন্ধকার বা একটা শুধু আঁচড়ের দাগ থেকে তখন শুরু না করতে হয়। অথবা, সেক্ষেত্রে নির্বাচনে সম্ভাব্য “জয়ী নায়ক বিএনপির” ভারতের কাছে একেবারেই অপরিচিত বলে না হাজির হয়, বা ভারতকে “সেই” বিএনপির পেছনে ঘুরতে না হয়।

ভারতের দিক থেকে দেখলে, এটা নিঃসন্দেহে তাদেরকে একটা বড় রিস্ক নেয়া। শুধু তাই নয়, আরও কিছু দিক আছে। যেমন বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনে মোদি সরকার শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে সমর্থনের অনুরোধ পেয়েও তা রাখতে পারেনি। এমনকি,  ভারতকে হাসিনার “দেয়ার ভাণ্ডার সব খুলে ধরা” সত্ত্বেও ২০১৪ সালের মতো একজন ‘সুজাতা’ পাঠিয়ে হাসিনার পক্ষে ভারতের প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে পারেনি। বরং উলটা; অর্থাৎ মোদীর ভারত বিএনপির সাথে বাতচিতের খাতা খুলেছিল; যার সোজা মানে হল, বিএনপি ক্ষমতায় এসে যেতেও পারে এমন সম্ভাবনাকে ভারত তখন স্বীকার করেছিল।

কিন্তু পরবর্তিতে যদি ফলাফলে দেখা যায় বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারেনি, তবে সে ক্ষেত্রে এটা হবে শেখ হাসিনাকে অখুশি করার বিরাট এক রিস্ক নেয়া। ভারত সেই রিস্কটাই নিয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত নিতে ভারত উদ্বিপ্ত হয়েছিল কারণ রেটিং সম্পর্কে ভারতের নিজেদের গোয়েন্ডা অনুসন্ধান রিপোর্ট। অথচ নির্বাচনের পরে ফলাফল পেয়ে ভারত দেখেছিল আসলে বাস্তবেই বিরাট রিস্ক নেওয়াই হয়েছে। কোন অনুমান ফলে নাই।

আবার, কূটনৈতিক রীতি নীতি ভেঙে নির্বাচনে আওয়ামি লীগকে এবারও প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে না পারায় সেটাও আর এক বাড়তি রিস্ক ছিল। বাড়তি রিস্ক এ জন্য যে, আগের বার কূটনৈতিক রীতি ভেঙে সমর্থন করার “সুজাতা স্টান্ডার্ড” তো ভারতেরই সৃষ্টি। এমনকি নির্বাচনের আগে গত বছর মে মাসে শেষ ভারত সফর থেকে ফিরে শেখ হাসিনার হতাশা প্রকাশ আর তখন হাসিনার সেই তাতপর্যপুর্ণ  মন্তব্য “আমরা ভারতকে যেটা দিয়েছি দেশটিকে তা সারা জীবন মনে রাখতে হবে” আমরা স্মরণে রাখতে পারি। হাসিনা কথাটা বলেছিলেন, মঞ্জুরুল ইসলাম বুলবুলকে (বর্তমানে ২১শে টিভির সিইও) দিয়ে করানো এক প্রশ্নের জবাবে।

মোটকথা, ভারত একটা চরম বাজি ধরেছিল। এখন বলাই বাহুল্য ভারত তাতে হেরে গেছে। সারাংশে বললে, ‘শেখ হাসিনা আবার না-ও জিততে পারেন, এর বেশ সম্ভাবনা আছে’ ভারতকে এই অবস্থান নিতে হয়েছিল তার নিজ গোয়েন্দা অনুসন্ধান বিশ্লেষণের কারণে, আর এটাই ছিল তার ‘বাজি’। তবে এটা জুয়ার মতো নয় যে, চরকির কাঁটা কোথায় গিয়ে থামে, এমনটা দেখতে হয়। কিন্তু তাহলে ভারত কোথায় পরাজিত হয়েছিল? যেসব অনুমানের উপর ভারতের গোয়েন্দা অনুসন্ধান বিশ্লেষণ দাড়িয়েছিল এর একটা না ঘটলে কী হবে অথবা তা মিথ্যা হয়ে যেতে পারে – এটা হতেই পারে না ধরে নেয়া হয়েছিল। আর তাই হয়েছিল। মানুষ তো ভোট দিবেই। তাই “যদি মানুষ ভোট দিতে পারে’- ভারতেই সিদ্ধান্ত ছিল এই অনুমানের ওপর দাঁড়ানো। মানে, ২০০৬ সালের আগের বাংলাদেশের স্টান্ডার্ডে অবাধ-নিরপেক্ষ কোনো ভোট এখানে হলে। সেটা ধরে নেয়া হয়েছিল।

কিন্তু যদি আগের দিনই ‘ভোট হয়ে যায়’, আর সে অনুযায়ী ফলাফল আসে, সে ক্ষেত্রে কী হবে? খুব সম্ভবত, ধরে নেয়া যায় এমন সম্ভাবনার কথা তাদের মাথায়ই আসেনি, তাই ভারতের কোন অনুমানেই এটা ছিল না। ভারতের চন্দন নন্দীর টুইট বলছে, গোয়েন্দারা এমন তথ্য জেনে পাথর (stunned by the outcome) হয়ে গেছিলেন। আর খুব সম্ভবত তা, ভোটের মাত্র চারদিন আগে।

মানে তাদের কোন অনুমানও ছিল না যে,  মানুষ যদি ভোট দিতে না পারে, অথচ ফলাফল ‘রেডি’ পাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে কী হবে? এজন্যই বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা অনুমান-বিশ্লেষণ মেলেনি। মানে, গোয়েন্দাদের তথ্য সংগ্রহের ব্যর্থতা, সব কিছুর মূলে। ফলে এখন মুখপোড়া অবস্থা। আর সেখান থেকে স্বীয় অবস্থান পুনরুদ্ধারের জন্য ভারতীয় তাগিদের প্রমাণ হল, বিবিসি বাংলার আলোচ্য রিপোর্ট।

নির্বাচনের ফলাফল বা পরিণতি নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা বিশ্লেষণজাত উপসংহার আর এর ওপর দাঁড়িয়েই এটা তাদের কতটা গভীর নির্ভরতা / নিশ্চয়তা দিয়েছিল এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল – ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে লেখা পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর নিবন্ধ। এটা ভারতের গোয়েন্দা বিশ্লেষণের ওপর দাঁড়িয়ে লেখা নিবন্ধ বলে সহজেই অনুমান করা যায়। পিনাক রঞ্জন সেখানে লিখেছিলেন, “… ক্রমেই এমন অভিমত জোরালো হচ্ছে যে, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে আওয়ামী লীগ আগামী সংসদ নির্বাচনে লজ্জাজনক সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে”। অর্থাৎ তিনি ওই লেখায় ভারতের দিক থেকে শেখ হাসিনার ওপর আর কোন আশা-ভরসা দেখেন নাই না রাখেন নাই।

তাই ভারত হাসিনার আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখেননি; এমন ধারণা-অনুমানের ভিত্তিতে পিনাক রঞ্জন লিখেছেন। সেই কারণে আরও সাহস দেখিয়ে আগ বাড়িয়ে হাসিনার বিরুদ্ধে তিনি “মানবাধিকার লঙ্ঘনের” অভিযোগ, “হিন্দু সংখ্যালঘুদের হয়রানি ও বৈষম্যের” [সবচেয়ে মজার অভিযোগ ছিল এটা] অভিযোগের মত মারাত্মক বিষয়গুলো এনেছিলেন। সবচেয়ে মারাত্মক দিকটা হল, পিনাক অভিযোগ তুলেছেন, হাসিনা  “গুলি করে হত্যার” নীতি নিয়েছেন। পিনাক লিখেছেন, “মাদকের বিরুদ্ধে কথিত জাতীয় অভিযানটি গুলি করে হত্যার’ নীতিতে পর্যবসিত”। তবে এটা অন্যের অভিযোগ যা তিনি কেবল ব্যবহার করছেন, বলেছেন। এই ছলের আড়ালে পিনাক কথাটা বলার সুযোগ নিয়েছেন। এ ছাড়াও তাঁর লেখার শেষের বাক্য আরও মারাত্মক বলে প্রতীয়মান। তিনি লিখছেন, “শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও তাঁর প্রতি ভারতের সমর্থন অনিবার্য মনে করাটা ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয়। ভারতের নীতিনির্ধারণী-পর্যায়ে ক্রমেই এমন অনুভূতিও জোরালো হচ্ছে’। অর্থাৎ ইন্টারেস্টিং অংশটা হল, সবশেষে শেখ হাসিনাকে ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের একটা হুমকিও দিয়ে ফেলেছেন পিনাক রঞ্জন। তিনি হাসিনাকে ক্ষমতায় আনার সময়ে বাংলাদেশে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত। তিনিই ভারতের নীতিনির্ধারণী-পর্যায়ে একসেস রাখেন এবং থিঙ্কট্যাঙ্ক ওআরএফ [ORF] এর ফেলো।

আগেই বলেছি, ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্ট তাদেরকে এভাবে পরিচালিত করেছে। আর রিপোর্ট হয়ত ভুল ছিল না। কিন্তু যদি আগের দিনই ‘ভোট হয়ে যায়’ এই তথ্য বা অনুমান তাদের ছিলই নয়া। এজন্যই তারা পরাজিত হন। এছাড়া আর এক বিষয় তাদেরকে বিভ্রান্ত করেছে।

বিএনপিকে সাথে নিয়ে কামাল হোসেনের জোট ঐক্যফ্রন্ট গঠনঃ এর গঠনের সাথে সাথে এর খুবই দ্রুত উত্থান ঘটেছিল। এই ফেনোমেনাটাকে ভারত নিজের গোয়েন্দা রিপোর্টের সাথে মিল খায়, এমন ঘটনা হিসেবে দেখেছিল। বলা যায়, “নির্বাচনের আগে থেকে ক্ষমতাসীন হাসিনার পতন আসন্ন” ধরনের একচোখের অনুমান ভারতকে শেষে করে দেয়। এতে বড় বিভ্রান্তিতে পড়ে এবার ভারত সব হারানোর দিকে আগানোর ষোলকলা পূর্ণ হয়ে যায়।

তাই বাংলাদেশের নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকে ভারতের “দিন খারাপ যাওয়া” শুরু হয়েছে, বলা যায়। “চিরদিন, কাহারো সমান নাহি যায়”। বলা যায় আসলে সংসদ নির্বাচনের পরদিন, ৩১ ডিসেম্বর থেকে পরের ছয় দিনে অর্থাৎ নির্বাচনের পরের দিন থেকে মন্ত্রিসভা নির্ধারণের আগের দিন -এর  মধ্যেকার সময়ে বহু কিছু ঢেলে সাজানো হয়ে গেছে। সেই ফেনোমেনাটার নাম দেয়া যায়- এটা ছিল “চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা আর ভারতের সাথে দূরত্ব” তৈরির শুরু। মন্ত্রিসভা সাজানোর ক্ষেত্রে যার প্রথম প্রকাশ ঘটতে আমরা দেখেছি।

আরও লক্ষণীয় হল, ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষক (যারা ভারতের সরকারি অবস্থান অনুসরণ করে চলেন) জয়িতা ভট্টাচার্য আর শ্রীরাধা দত্তের প্রবন্ধেও আমারই এক আগের লেখায় আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম আর এক নতুন রূপবৈশিষ্ট্য। আগে ভারতের একাডেমিক জগতের প্রায় সকলেই বাংলাদেশে চীনের ততপরতা ও ঘনিষ্ঠতা বাকাচোখে দেখত। চীনের বিনিয়োগ বা ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যাওয়াকে, ভীষণ নেতিবাচক উপস্থাপন করে এই বিষয়গুলোকে দেখতেন। তাদের সকলেরই কল্পিত এক ভারতের “এরিয়া অব ইনফ্লুয়েন্স” বলে এক এলাকা ছিল। আর বাংলাদেশ হল সেই এরিয়ার অন্তর্গত সুতরাং বাংলাদেশে কেউ ঢুকতে পারবে না, এমন উদ্ভট তালুকদারি-দাবি তাদের থাকত। তাঁরা বোঝাতে চাইতেন এখানে ভারত ছাড়া অন্য কারও ঢুকা – এটা ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থবিরোধী – এ্মন “গাঁয়ে মানে না” ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে তাঁরা লিখে চলতেন। অথচ এখন তারা ভোল বদলিয়ে ফেলেছেন।  শ্রীরাধা [VIF] এখন চীনের ভূমিকার বাস্তবতা মেনে নিয়ে নির্বাচনের পরে লিখছেন – “চীন ও ভারত উভয়েই আর বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ককে নিজ নিজ দ্বিপক্ষীয় সীমার মধ্যে রেখে দেখে না… তাই হাসিনার নির্বাচনী বিজয়ের পাশে চীন ও ভারতের শক্ত হয়ে দাঁড়ানো অযাচিত নয়”।  [Interestingly, both India and China have viewed Bangladesh not only through the prism of bilateralism but also amidst the landscape of the growing regional framework] অর্থাৎ চীন যে এ সরকারের ঘনিষ্ঠ হয়েই গেছে এটা মেনে নিয়েই তাঁরা এখন কথা শুরু করছেন। অবশ্য এর সাথে বোঝানোর চেষ্টা করছেন “তবে, চীনের পাশাপাশি ভারতও আছে”। প্রশ্ন হলো, আসলেই কি ভারতও আছে?

বাস্তবে নেই। আর সেটা আমার কথা নয়, ভারতের আচরণ এর প্রমাণ। চীনের মত নয় বড়জোর সাথে ভারতও আছে হয়ত কিন্তু তা আর একই সমতলে পাশে দাঁড়িয়ে নেই। বরং পাত্তা না পাওয়া, টানাটানি শুরু হওয়ার এক দুরবস্থা শুরু হয়ে গেছে যার প্রতিক্রিয়াটাই হলো বিবিসির এই রিপোর্ট।

এবার, শেষের কথাটা আগে বলে দিয়ে শুরু করি। ভারত এত দিন বাংলাদেশ সরকারের মুখটা এক দিক থেকে দেখে এসেছে, এবার আরেক দিকটা দেখবে। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ২০১৪ সালের জুন মাসে চীন সফরে গিয়েও শেষ পর্যন্ত সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন নাই। অনির্দিষ্টকাল তা পিছিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের মুখের দিকে চেয়ে। তবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, ৬৫ এর বেশি রাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করা এই গ্রান্ড প্রকল্পে বাংলাদেশেরও অন্তর্ভুক্তি, কর্ণফুলীতে টানেল ব্রিজ, বার্মা হয়ে রেল ও রোডে চীনের কুনমিং যাওয়া ইত্যাদিসহ বহু প্রকল্প চুক্তিতে সই করেন বা সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ শুরু করে আসেন তিনি। এগুলো পরে অক্টোবর ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর বাংলাদেশ সফরের সময়ে ফাইনাল হয়। সব মিলিয়ে সেসময় অবকাঠামো বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল ২৪ বিলিয়ন ডলারের।

অর্থাৎ ২০১৪ সালে নির্বাচনে ‘সুজাতা স্ট্যান্ডার্ডে” ভারতের সমর্থনের মাশুল ভারত সেবার উসুল করেছিল এভাবে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর চুক্তি না হতে হাসিনাকে রাজি করিয়ে। এছাড়া পরে ভারত আমাদের বেল্টরোডে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রবল আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু এবারের ২০১৮ নির্বাচনে? এই লেখায় আগেই বলেছি “ছয় দিনের” কথা। আমাদের নির্বাচনের পরবর্তীতে হাসিনার একদম খাড়া পদক্ষেপ হল , গত ২০ জানুয়ারি ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএন নিউজ এইটিনকে [CNN-NEWS18] বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সাক্ষাৎকার, যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বলা যায় এই প্রথম বাংলাদেশ ভারতকে ডিকটাট করতে সক্ষমতা দেখিয়েছেন।

[CNN-NEWS18] এটা আমেরিকার CNN এর সাথে ভারতের Network 18 এর জয়েন্ট ভেঞ্চার, ভারতের এক টিভি মিডিয়া।

আসলে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে এত দিন যেসব ক্ষেত্রে হাসিনা ভারতের স্বার্থের দিকে চেয়ে আর আগান নাই, এখন সেখান থেকেই আবার উদ্যোগ নিয়া তিনি সেই “খাতিরদারির” সমাপ্তি টানছেন। এই খাতিরদারি তার নড়বড়ে অ-অভিষিক্ত ক্ষমতার খামতি পূরণের দিক থেকে এসেনশিয়াল – এমন এক ধারণা তাঁর ভিতরে কাজ করে বলে মনে হয়। যেটা খুব সম্ভবত সমাপ্ত এখন। হাসিনার ঐ সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে বিবিসির আর এক রিপোর্ট ২৩ জানুয়ারি ছাপিয়েছে ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে দেয়া । দৃশ্যত, ভারতের স্বার্থের অনুকূলে দাঁড়িয়ে লেখা সে রিপোর্ট। যার ভাষ্য হল, “ভারতকে হাসিনা তাঁর “নিজ দেশের অগ্রাধিকারের” ব্যাপারটাই আরেকবার মনে করিয়ে দিয়েছেন”। অর্থাৎ এখানে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে যে হাসিনা এতদিন নিজ দেশের স্বার্থ বলি দিয়ে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। আর এখন হাসিনা নিজ দেশের স্বার্থকে আর পিছনে ফেলতে রাজি না – এটা বুঝাতে চেয়ে বিবিসি লিখেছে – “নিজ দেশের অগ্রাধিকারের” ব্যাপারটাই ……। কথা ঠিক; এবার দরকার হলে ভারতের বিরুদ্ধে তিনি যাবেন, রাজি আছেন। কারণ এবার “বেল্টরোডে অন্তর্ভুক্তির”  ব্যাপারে তিনি শক্ত করে মন বেঁধে ফেলেছেন। তদুপরি চীনের অবস্থানের সাথে তাল মিলিয়ে বলছেন, “বেল্টরোড নিয়ে ভারত দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় (চীনকে সাথে নিয়ে) কথা বলতে পারে”। আসলে এই প্রস্তাবটা মূলত চীনের।  গত ২০১৭ সালের মে মাসে বেইজিংয়ে প্রথমবারের মত  BRI (“Belt and Road Initiative”) সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে অংশগ্রহণ করতে ভারতকে চীনের দাওয়াত দেওয়ার পর সেই প্রথম ভারত এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান আপত্তি তুলে ধরেছিল। আর তখন থেকেই চীনের প্রস্তাব হল, আসেন “কথা বলে” নিগোশিয়েট করি। চীনের সেই কথা বলার প্রস্তাবই এবার সাহসের সাথে হাসিনা ভারতের মুখের উপর ছুড়ে দিল। বা বলতে পারি, হাসিনা বুঝিয়ে দিল যে তার সিদ্ধান্ত ফাইনাল। এবার আর ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের প্রকাশ্যে সমর্থনের মত ভারতের মুখ চেয়ে সিদ্ধান্ত নিবার কোন দায় হাসিনার নাই। তি এবার সমর্থন পান নাও অথবা নেন নাই – তাই। তাই মন শক্ত বেঁধে তিনি বেল্ট-রোড প্রকল্পে ঢুকে পড়বেন। বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্ক [Bangla-China Relation] নতুন মাত্রায় উত্থিত হবে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে  বেল্ট-রোড প্রকল্প বলতে বুঝতে হবে – সোনাদিয়া বন্দর সহ, সড়ক ও রেল পথে বার্মা হয়ে চীন যাওয়ার অবকাঠামোসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রকল্প এমনকি এর বাইরেরও চীনের সাথে বাংলাদেশের সব প্রকল্প। অর্থাৎ ভারতের স্বার্থ পরোনা করে উপেক্ষায় হাসিনার বাংলাদেশ চীনের কোলে উঠে যাবে এখন। [ সাক্ষাতকারের YOUTUBE LINK এখানে]  ঐ সাক্ষাতকারে হাসিনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ – ইঙ্গিত দিয়েছে হাসিনা এবার জানেন তিনি পিছনে ফিরবেন না। খুব সম্ভবত – ভারতের মুখ চেয়ে চলার দিন ঘুরে গেছে বা শেষ হয়ে গেছে – এমন অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তিনি পথ চলতে শুরু করেছেন। মুখ চেয়ে চলায় তিনি কত ডেস্পারেট ছিলেন তা বুঝতে আমরা মনে রাখতে পারি – তিতাস নদী আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে ভরাট করে তিনি ত্রিপুরায় লং-হুইল ট্রাকে মালামাল কনটেইনার চলাচলের রাস্তা করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীটা এখন মরেই গেছে, ধান চাষাবাদ হয়েছে এবার।    

এখন এই “দৃঢ় প্রতিজ্ঞ” হাসিনাকে নিয়ে ভারত কী করবে? কোথায় রাখবে? প্রথমত, কোন বিশেষ গায়েবি চমক না ঘটলে, ভারতের পক্ষে বেল্ট-রোড বা এর সংশ্লিষ্ট কোন কিছু মেনে নেয়া প্রায় অসম্ভব। বরং চীনে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত কান্থা [Ashok K Kantha] (যিনি বেল্ট-রোড প্রকল্পে ভারতের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভোকাল) এখন অবসরে ভারতে বসেই “চীনা স্টাডিজ” থিঙ্কট্যাঙ্ক খুলেছেন। তিনি আগে আমাদের যা জানিয়েছিলেন ওর সারকথাটা ছিল – “বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দেয়ার চীনে দাওয়াত এটা মেনে নেয়া ভারতের জন্য সম্ভব না কারণ, তাতে ভারত চিরদিনের মত চীনের পিছনে পড়ে যাবে”। কিন্তু গ্লোবাল অর্থনীতিতে ভারতের কী চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া, উপরে থাকা সম্ভব – সে মুরোদ কী আছে? না কী এটা অসক্ষমতার কোন “ফ্যান্টাসি আকাঙ্খা” – এনিয়ে কোন কথা জানা যায় নাই। তবে  নিশ্চয় এখন বেল্ট-রোড প্রকল্প বিরোধী আরও শক্ত যুক্তি আছে তাঁদের কাছে।  অতএব এর সোজা মানে হল, ভারতের পক্ষে আগের মত হাসিনার ‘খাতিরের লোক’ হিসেবে ট্রিটেড বা আলগা খাতিরের লোক হতে চাইলে হাসিনার পরামর্শ মেনে ভারতকেই এখন বেল্ট-রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। আর তা নইলে, ভারতকে কেবল চীন নয়, ঢাকার হাসিনা সরকারেরও বিরুদ্ধে খোলাখুলি অবস্থান ও পদক্ষেপ নিয়ে সরাসরি মাঠে হাজির হতে হবে! যেভাবে নির্বাচনের পরে মাত্র ২২ দিনের মাথায় আমরা হাসিনাকে CNN-NEWS18 সাক্ষাতকার দেখেছি তাতে – অচিরেই ভারতকে কী এমন নতুন অবস্থানে দেখব আমরা?

তাহলে মানে দাঁড়াল, এই নির্বাচনের ফল ভারতের জন্য আর আরামের “শান্তি নাই”; বরং এক ব্যাপক উদ্বিগ্নতা নিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয়, যেটা আরো বাড়তে পারে। কারণ ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন সময়গুলোতে কোন দেশের বেলার মত বাংলাদেশ সরকারপ্রধানেরও স্বাভাবিক ঝোঁক হয় – এখন ক্রমেই তিনি ড্রাইভিং সিটে বসে পড়তে চাইবেন। বা বলা যায়,মূল কারণ পরিস্থিতি এখন তার অনুকূলে।  ওদিকে ভারতের অবস্থান দেখা যাচ্ছে খুবই করুণ। যেন সেই করুণ দশা বলেই সেটাকে কিছুটা হালকা করার জন্য ভারতের মোদীর নীতিনির্ধারকেরা বিএনপির বিরুদ্ধে কিছুটা বিষোদগার করে হাসিনার মন গলাতে চাইছেন । তাই বিবিসির এহেন রিপোর্ট। ভারত এখন বিএনপিকে মুখরোচক তবে অর্থহীন ইস্যু ‘জামায়াত ছাড়া’র কথা  – হঠাত করে শর্ত হিসেবে খাড়া করছেন। অথচ ভারতের এটা করার বেস্ট সময় ছিল নির্বাচনের আগে বিএনপি যখন ভারত সফরে-লবিতে ছিল তখন তুলে ধরা। অথচ এখন ভারত বলছে বিএনপি  ‘জামায়াত ছাড়া’ না হলে এখন বলছে, না হলে সম্পর্ক হবে না – এমন ভাব ধরছেন।  যার সোজা মানে ভারত পথ হারিয়েছে। এটা তার মুখরক্ষা ততপরতা; সে সিরিয়াস নয়। অথচ বিপরীতে ইতোমধ্যে বিএনপিই ভারতকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী চরম যে ক্ষোভ-আপত্তি আছে  এখন সেগুলোরই প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি করতে ফিরে যাবে বিএনপি। এটাই কী স্বাভাবিক নয়!

আসলে জামায়াত ইস্যু, জঙ্গি বা উলফা ইস্যু ইত্যাদিতে বাংলাদেশের হাসিনার সহায়তার যেসব ইস্যু তুলে আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠতা আর বিএনপি ভারতের কেউ নয় বলে যে লাইন টানতে চাইছে ভারত, খোদ প্রধানমন্ত্রী হাসিনার কাছেই এগুলো আর গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু না, সেসব আর এখন মুখ্য নয়, হিসেবে থাকছে না। বরং চীনের সাথে  হাসিনা সরকারের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা গড়তে ভারতের আপত্তিগুলোর নিরসন না হলেও সেসব কিছু উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়াই ক্ষমতাসীন নেত্রীর কাছে এখন বড় ইস্যু। ভারতের জন্য কঠিনতম বিপদ এখানেই।

বিশেষত, গভীর সমস্যার দিকটা হল, ভারতের জন্য সময় এখন উলটা হাসিনাকে তুষ্ট করার, মন পাবার। কিন্তু ঘটনা হল, হাসিনাকে তুষ্ট করতে ভারতকে যা করতে হবে তা দেশটি করতে পারবে না। এটা বিবিসির এসব তুচ্ছ রিপোর্ট দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হবে না। বরং ক্রমেই ভারতকে স্বীয় স্বার্থে নতুনভাবে হাসিনা-বিরোধীতার রাজনীতি ও অবস্থানে  উঠে আসতেই আমরা দেখব, আর সে সম্ভাবনা প্রবল হচ্ছে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারত কি হাসিনাবিরোধী হয়ে যাবে? – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

‘বাম-ডান’ ভাবনার পিছনে

বাম-ডান’ ভাবনার পিছনে

গৌতম দাস

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2xm

 

ডান-বামের রাজনীতির কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি, শুনেছি। কিন্তু এর পিছনের কথা কী? প্রথমত বাম ও দান বলে শ্রেণী ভাগ করা তা বামপন্থীদের করা, তাদের চোখে দেখে চালু করা হয়েছিল। প্রায়ই আমরা বলতে শুনি, অমুকে বামপন্থী রাজনীতি করেন। যেমন, কেউ কাউকে অপছন্দ করলে, তার গায়ে “কালো দাগ” লাগিয়ে দিতে চাইলে শোনা যায়, সে লোকের নামের আগে তিনি ‘ডানপন্থী’ শব্দ বসিয়ে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। অথবা দাবি করে বলেন, “উনি তো ডানপন্থী”। আসলে বলতে চান ইনি নেতি বা খারাপ চিন্তার লোক। অর্থাৎ শেষে সার কথা দাঁড়াল, যারা ‘ডানপন্থী’ বা ‘বামপন্থী’ কথাগুলো ব্যবহার করেন তারা বলতে চাচ্ছেন- বামপন্থী মানে ভাল আর ডানপন্থী মানে খারাপ লোক। কিন্তু এই নামকরণ কী সঠিক? আর কিসের ভিত্তিতে এই নামকরণ? কাকে ডান বলব আর কাকে বাম? এই ডান-বাম কোথা থেকে এল?

এ প্রসঙ্গে এমন অনেক প্রশ্ন আমাদের মাথায় আসে বটে; কিন্তু এর জবাব আমরা যথার্থ পাই আর না পাই, শেষ বিচারে পুরো ব্যাপারটা স্পষ্টই রয়ে যায়। তবে, ইতিহাসে এমন ধারণার প্রথম উদ্ভব কবে, কখন, কিভাবে – এই বিচারে বলা যায়, ১৭৮৯ সালের ঐতিহাসিক ‘ফরাসি বিপ্লবের’ পর তার সোস্যালিস্ট প্রতিনিধিরা সংসদে স্পিকারের বামদিকে সদলবলে একসাথে বসতেন। ফলে বাম দিকে যারা বসেন তাদের রাজনীতি অর্থে বামপন্থা শব্দের উদ্ভব। আর সেখান থেকেই পরে বামপন্থী (left), লেফটিস্ট (leftist), লেফট উইং (left wing) ইত্যাদি বাম-বিষয়ক নানা নামের পরিচিতি চালু হয়ে যায়। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাও এই ব্যাখ্যাকে মেনে সায় দেয়। আর যারা বামেদের বিরোধী, স্বভাবতই বামপন্থীরা তাদের ডানপন্থী নামে ডাকার রেওয়াজও এখান থেকে চালু করে দেন। তবে সাধারণভাবে বললে, এভাবে ডান-বাম শ্রেণীকরণ করা খুবই হালকা চিন্তা বা লুজ টক (loose talk) ধরণের কথা; মানে যথেষ্ট না ভেবে চিন্তা করা বা দুর্বল-চিন্তার ভিত্তিতে দাঁড় করানো বক্তব্য।

এই নামকরণের  ভিতর অনেক ধরনের চিন্তাগত সীমাবদ্ধতা আছে। সেগুলোর মধ্যে প্রধান হল, এই বাম-ডান শ্রেণীকরণ (category) করা – এটা এক ‘বাইনারি’ (binary) ভাবনা। অর্থাৎ যার কেবল দুইটা রূপই হতে পারে বলে আগের সীমা টেনে রাখা হয়। এজন্য অঙ্কের ভাষাতেও বাইনারির অর্থ – শূন্য আর এক এই দুই অঙ্ক। মানে আমাদের পরিচিত (এক দুই থেকে নয় আর শুন্য) এভাবে দশটা অঙ্ক দিয়ে সংখ্যা লেখা নয়। কেবল শুন্য আর এক ব্যবহার করে সংখ্যা লেখা। এই ‘বাইনারি’ কথার সোজা মানে হল – হয় এটা, না হলে ওটা; এর বাইরে কিছু নাই, একথা বলা। হয় তুমি আমার বন্ধুর দলে আসো নইলে, তুমি আমার শত্রু – সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ ও তাঁর বন্ধুরা এমন বাইনারি বিভাজনের ভাষায় কথা বলতেন। অর্থাৎ এমন দুই অবস্থার বাইরে অন্য কিছু হতে পারে না বলে আগে থেকেই ধরে নেয়া হয়। অথবা বলা যায়, কাউকে হয় সাদা না হলে কালো হতে হবে- এমন মনে করা। অথচ বাস্তবে সাদা আর কালোর মাঝখানে অনেক রঙ আছে, হতে পারে। কারণ হরেক অনুপাতের সাদা ও কালোর মিশ্রণে আলাদা আলাদা বহু রঙ হতে পারে। তাই কেউ কালো না হলে তা সাদা হবেই, এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই; তা সহজেই বুঝা যায়। কোনো কিছু সাদা অথবা কালো না হলে, মিশ্রণের হলে তাকে ধূসর বলা যায়। আর ধূসর বলতে আবার একটা নয় অনেক ধরনের ধুসর হতে পারে – যাকে আমরা সাদা-কাল মিশ্রণের নানা শেড (shade) বলি, এমন অসংখ্য শেডের ধূসর আছে, হতে পারে। কম সাদা কিন্তু বেশি কালো, অথবা বেশি সাদা কিন্তু কম কালো এমন বিভিন্ন ধরন বা শেডের ধূসর হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে পুরা ব্যাপারটাকে কেবল ‘সাদা না হলে কালো’ বলে জোর করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা – এটাই বাইনারি দাবি করার চেষ্টার মতই অস্পষ্ট কাণ্ড হল – কাউকে ‘বামপন্থী না হলে, ডানপন্থী’ বলা বা নাম দেয়ার মত।

তবে এটা ঠিক যে, ফরাসি বিপ্লবের কিছু বৈশিষ্ট্যও এই ধরণের শ্রেণীকরণের ক্ষেত্রে কাজ করেছে। এমনিতে ফরাসি বিপ্লবের এক বৈশিষ্ট্য হল, সেটা ছিল গরিব ও সাধারণ মানুষের প্রাধান্যে ঘটা একটা বিপ্লব-বিদ্রোহের ঘটনা; আর বিশেষত তা ঘটেছিল সমাজের এলিট, অবস্থাপন্ন, ক্ষমতাবান ও বড়লোকেদের বিরুদ্ধেও। তবে গুরুত্বপূর্ণ হল, এই বিদ্রোহ অভিমুখ-বিহীন ছিল না। আবার অনেকেরই ধারণা, “মডার্ন রিপাবলিকান রাষ্ট্রের” সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল ফরাসি বিপ্লব। যদিও উল্লেখ করার মত ব্যাপার হল, আমেরিকান বিপ্লব (১৭৭৬) মানে যেটা কলোনিবিরোধী চরিত্রের প্রথম রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েমের বিপ্লব, সেটা ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) চেয়ে তা অন্তত ১৩ বছর আগের ঘটনা। আর রিপাবলিক বা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রধারণার মধ্যে যেসব ভিত্তিমূলক চিন্তা – এমন ভিত-উপাদান খুঁজে পাবার দিক থেকে আমেরিকান বিপ্লব যথেষ্ট সমৃদ্ধ; অন্তত ফরাসি বিপ্লবের সাথে তুলনায়। আমেরিকান বিপ্লব এক্ষেত্রে তা কোথাও কোথাও অনন্য ও চমৎকার বটে। তবু অনেকে বিশেষত কমিউনিস্টরা ফরাসি বিপ্লবের রেফারেন্স দেন প্রায়ই এবং সহজেই; এর তুলনায় আমেরিকান বিপ্লবের নাম প্রায় নেয়াই হয় না, তাদের। বাস্তবতা হল, রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার ভাবনা ও এর বাস্তবায়নের দিক থেকে আমেরিকান বিপ্লব ফরাসি বিপ্লবের চেয়ে কোনো অংশেই কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়।

ফরাসি বিপ্লবের ফলে বাম-ডান ক্যাটাগরি করে কথা বলার ভাবনা আসার পিছনের সম্ভাব্য কারণ হল – গরিব বনাম বড়লোক, এমন ভাবনা ফরাসি বিপ্লবের মধ্যে ছিল। তাই সেখানে স্বভাবতই গরিব পক্ষকে আপন ও কাম্য বা ইতিবাচক বলে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। বিপরীতে, দেখা যায় আমেরিকান বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ বা কেন্দ্রীয় বিষয় হল – অধিকার (ইংরেজিতে right); মানে, মানবিক-নাগরিক অধিকার (human rights) মানে নাগরিকের মৌলিক অধিকার। [এটাই ফরাসি বিপ্লব আর আমেরিকান বিপ্লবের মুল ফারাকও বটে]। বলা যায়, সাধারণভাবে নাগরিক মাত্রই তাঁর “অধিকার” ধারণার চেয়ে বাম বা কমিউনিস্টদের চিন্তা (গরিব-বড়লোক এমন ভাগে) গরিব দশার প্রতি বেশি আগ্রহী, সহানুভূতি বেশি। এটাই মৌলিক পার্থক্য। যদিও বাম-ডান বলে ভাগ করে মানুষের নামের আগে বিশেষণ লাগানো নিঃসন্দেহে খুবই অস্পষ্ট ও দুর্বল-চিন্তায় আচ্ছন্ন।

আর একটু সরাসরি এবং স্পষ্ট করে বললে, ফরাসি বিপ্লবের সারবস্তু যদি সমাজের এলিট, অবস্থাবান, ক্ষমতাবান ও বড়লোকেদের বিরুদ্ধে গরিবদের উঠে দাঁড়ানো হয় এবং এই অর্থে একে বিপ্লব বলি – তা বলতে পারি অবশ্যই। কিন্তু এই দ্বন্দ্ব নিরসন করতে, সমাধান পেতে চাইলে কেমন রাষ্ট্র চাই এই অর্থে, “অধিকার” ভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের দরকার – এই বোধ সেখানে অস্পষ্ট করে রাখা ছিল। যাদের ভেতর এই বোধ অস্পষ্ট, তারাই মূলত বাম-ডান ভাগের ভক্ত। অথচ নাগরিক হিসেবে মানুষের অধিকারের ভিত্তিতে এবং নাগরিক সাম্যের নীতিতে একটি রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন – এটাই রিপাবলিক ধারণার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

আগেই বলেছি, বাম-ডান হল এক বাইনারি চিন্তাব্যবস্থা। এর মানে কোন ‘বামপন্থীর’ চোখে আপনি তার গ্রুপের নন, এ কথার মানে হল তিনি বলবেন, আপনি ডানপন্থী। সবকিছুই যেন বাম অথবা ডান হতেই হবে। যদিও বাম ও ডান উভয়েরই আবার উপবিভাগ আছে, করা হয়ে থাকে। যেমন – চরম বাম (extreme left), অতি বাম (far left) – বা ultra left। বাংলায় এখান থেকে ‘চরমপন্থী’ শব্দটা এসেছে। তাই আসলে, বাম-ডান বলে একটা শ্রেণীকরণ আগে আছে- এই বলে আগেই ধরে নেয়া একটা ধারণা আছে বলে ধরে নিলে এর ওপর ‘চরমপন্থী’ শব্দটা দাঁড়ানো পাওয়া যাবে। বামপন্থা ধারণাটার চরম রূপটাকে বুঝাতে এর নাম হয়েছে ‘চরমপন্থী’ (এক্সট্রিমিস্ট, extremist)। এই হল বামপন্থার উপবিভাগ। ওদিকে একইভাবে অতি-ডান (far right) বা চরম ডান (ultra right)- এগুলো ডানেরই নানা উপবিভাগ। এজন্য বামপন্থীদের করা এই চিন্তাব্যবস্থায় ডানের বেলায় – কোনো ধর্মীয় গণতন্ত্রী দল, রক্ষণশীল, জাতীয়তাবাদী ইত্যাদিকে তারা ডানপন্থী খাপে ফেলেছে। এ ছাড়া রেসিস্ট (racist) বা ফ্যাসিস্টদের (facist)  বামপন্থিরা ‘চরম ডানপন্থী’ বলে মনে করে খাপে ফেলেছে। আবার সোশ্যালিস্ট, লিবারেল বা কমিউনিস্ট- এদেরও বামের উপবিভাগ বলে মনে করা হয়েছে।

লক্ষণীয়, ‘বাম-ডান এই শ্রেণীকরণের’ প্রবক্তারা রেসিজম (বর্ণবাদ) এবং ফ্যাসিজমকে ‘ডানপন্থী’ ভাগে ফেলেছেন। কিন্তু এতে চিন্তার বিরাট ঘাপলাটা হল, কমিউনিস্টদের মধ্যে কি রেসিজম এবং ফ্যাসিজমের ছায়া নেই? মুখের দাবিতে তারা হয়ত কমিউনিস্ট, নিজেদের বাম বলে দাবি করছেন। অথচ বাস্তব কাজ ও পদক্ষেপ পরিচয়ে কি তাদের কেউ রেসিস্ট অথবা ফ্যাসিস্ট নন? সাধারণভাবে বললে, কমিউনিস্ট রাষ্ট্রক্ষমতা মাত্রই তাদের বিরুদ্ধে অথরিটেরিয়ান বা কর্তৃত্ববাদিতার কিংবা এমন ক্ষমতার অভিযোগ আছে। অতএব রেসিজম এবং ফ্যাসিজমকে ডানপন্থী ভাগে ফেলা – এটাই আর এক জোরালো প্রমাণ যে, বাম-ডানে ভাগ করা মূলত বামপন্থীদের চালু করা পদ্ধতি। অর্থাৎ বামপন্থীরাই মূলত এই শ্রেণীকরণের প্রবক্তা।

এর আর একটা প্রমাণ হল, যাদেরকে কোন কোন মিডিয়া বা বামপন্থীরা  ডানপন্থী বলে পরিচয় করিয়ে দেয়, বিশেষণ লাগায়- কথিত সেই ডানপন্থীরা কিন্তু নিজেদের ‘ডানপন্থী’ বলে অভিহিত করেন না। এছাড়া, আমেরিকার ভেতরে বাম-ডান বলে কাউকে ডাকার, বিশেষণ লাগানোর সাধারণত তেমন চল নাই। বরং আছে উদার (লিবারেল বা liberal) আর এর বিপরীতে রক্ষণশীল (কনজারভেটিভ বা conservative) বলে ভাগ ও চিহ্নিত করার রেওয়াজ। আবার সেখানে উদারেরা নিজেই নিজেকে উদার এবং তাদের বিপরীতে রক্ষণশীলেরা নিজেকে রক্ষণশীল বলেই পরিচয় দিতে কোনো আপত্তি করেন না। শেষ বিচারে বাম-ডান বলে ডাকার আর এক বড় নেতিবাচক দিক হল – এটা ‘নাগরিক-মানবিক’ অধিকার বিষয়টাকে গৌণ, এমনকি অনেক সময়ে তুচ্ছই মনে করে।

ওদিক আর এক মজার দিক হল – লক্ষ করলে আমরা দেখব, বামপন্থী বা কমিউনিস্টদের রাষ্ট্রের নামের সাথেও কিন্তু ‘রিপাবলিক’ শব্দটা আছে। কিন্তু তাদের রাষ্ট্রের নামের মধ্যে (যেমন “চীনের পিপলস রিপাবলিক” অথবা “ইউনাইটেড সোভিয়েত সোসালিষ্ট রিপাবলিক” ) এই ‘রিপাবলিক’ শব্দটা লিখে রাখা আসলে তা যেন অভ্যাসবশত, নেহায়েত এক রেওয়াজ যেন। এর কোনো সুনির্দিষ্ট বা বিশেষ অর্থ তাতপর্য নেই। তবে এর চেয়েও আরও বড় গুরুত্বের দিকটা হল, কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের নামে ‘রিপাবলিক’ শব্দ থাকলেও ঐনামের ভিতর ‘অধিকার’ বলে অর্থ অন্তর্ভুক্ত নাই। মানে, “নাগরিকের অধিকার” বলে কোনো ধারণাকে রাখা হয় নাই বা অনুসরণ করে লিখা হয়নি। কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার বা মৌলিক অধিকার বলে আদৌ কোনো ধারণা আছে কি না তাই অস্পষ্ট এবং বাস্তবত তা নেই। বরং “শ্রেণীর” কথা তুলে এগুলো সব ঢেকে ফেলা হয়েছে। বরং কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে দেখা যায় নাগরিকদের বহু বস্তুগত জিনিষ পাওয়ার বা ভোগের “অধিকার” আছে। অন্ন, বস্ত্র শিক্ষা চিকিতসা বাসস্থান যোগানো এগুলো সবই যেন রাষ্ট্রের দায়।  কিন্তু গুম-খুন অথবা নিপীড়িত হওয়া – এগুলো থেকে রাষ্ট্র সুরক্ষা দিবে কিনা এমন নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা নেই। আর এমন চিন্তাভাবনা প্রসূত ধারণারই এক অনুষঙ্গ হল ‘বাম-ডান’ বলে শ্রেণীকরণ।

‘বাম-ডান’ বলে শ্রেণীকরণ বা কমিউনিস্ট আইডিয়ার আধিপত্য – এটা গত শতক পর্যন্ত ভালই দর্পের সাথে চলতে পেরেছিল বলা যায়। গত শতক ছিল মূলত ‘জাতীয়তাবাদী’ চিন্তার শতক। যদিও “জাতীয়তাবাদের রাজনীতি” বলে এর চলা শতকের শুরু থেকে শুরু হয় নাই। কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এর প্রবল উপস্থিতি শুরু হয়। কারণ এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল পরিণতিতে উপনিবেশ ব্যবস্থা দুনিয়া থেকে উঠে গিয়েছিল। এর পর থেকে উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর কমন আইডিয়া বা ভাবনা হল নানা কিসিমের ‘জাতীয়তাবাদের রাজনীতি’।  আসলে (কমিউনিস্টসহ) যেকোন সার্বভৌম রাষ্ট্র মাত্রই, জাতিবাদের ইঙ্গিত সেখানে থাকবেই। আবার এই সময়ের রাজনীতিতে  মূলত রিপাবলিক রাষ্ট্র হতেই হবে এই মূলসুরের সাথে অনেক জায়গায় আবার অনুসঙ্গে ইসলামও ছিল। তবে তা “জাতীয়তাবাদী ইসলাম” এই ধরনের জাতীয়তাবাদ অর্থে [যেমন, ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান (১৯৪৭) অথবা ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান (১৯৭৯)]। তবে সবার উপরেই চিন্তাধারা হিশাবে ‘ডান-বাম বলে চিন্তায় শ্রেণীকরণ’- গত শতক পর্যন্ত এটা ভালোভাবেই ছিল। কিন্তু এখন চলতি নতুন শতকে?

এই শতকের শুরুতে আমরা দেখেছি ‘আলকায়েদা’ ফেনোমেনা। মানে ইসলামও কোন বিপ্লবী তত্ত্বের এক উৎস হতে পারে, এই দাবি। যদি এর viable বা টিকে যাবে এমন রূপটা এখনই পাওয়া গেছে কি না তা স্পষ্ট নয় বা প্রমাণিত হয়নি। তবে এর ফলে মোটের উপর  দুনিয়ার সব রাজনৈতিক চিন্তাতেই “ইসলাম প্রশ্ন” – একটা নতুন শক্ত অনুষঙ্গ হয়ে হাজির হয়ে গেছে। সব রাজনৈতিক চিন্তাকেই এখন  “ইসলাম প্রশ্নে” তার অবস্থান দৃষ্টিভঙ্গি বলতে পারতে হবে – এই বাড়তি দিকটা তৈরি হয়েছে। তাই এই কালে এসে ম্রিয়মান হয়ে পড়া বা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়া অস্পষ্ট আরো অনেক চিন্তার মত ‘ডান-বাম’ বলে চিন্তায় শ্রেণীকরণ – ক্রমশ ম্লান হয়ে  যাচ্ছে। এর যৌবনের সেই ধার বা সক্ষমতা আর নেই। এর বড় কারণ খোদ ‘আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র’ ধারণাটাও এখন অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেছে, এর পর্যালোচনার দাবি উঠে গেছে। ‘ইসলাম প্রশ্ন’কে আমল কতে নিবার দাবি উঠে গেছে। এভাবে এক ‘রিভিউড’ বা ‘ক্রিটিক্যাল রিপাবলিক রাষ্ট্র’ ধারণা পুনরায় হাজির করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করা হয়। এদিকে, বাম-ডান বলাসহ কোনো অস্পষ্ট বা আধো বোলের কোনো ধারণা – একালে এদের খাতক একেবারেই কমে গেছে, যাচ্ছে।

বরং একালে এসে কেউ যদি কেবল বাম-ডান প্রগতিতে আঁকড়ে পড়ে আছে, থাকে এমন দেখি, সর্বোচ্চ প্রগতির চিন্তা বলে বড়াই করতে দেখি তবে বুঝতে হবে এই শতকে দুনিয়া কোথায় চলে গেছে এই খবর সে রাখে না। দুনিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তাদের চিন্তাব্যবস্থায় প্রগতির বড়াইয়ে বুঁদ হয়ে, এর বাইরে কোন খোঁজ না রাখায় যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে সেই হিশাবে শীর্ষে উঠে আসা এমন রাষ্ট্র হল ভারত।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বাম-ডান’ ভাবনার তাৎপর্য – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ডাকসু নির্বাচনে ইসলামি সংগঠন নিয়ে আপত্তি ভিত্তিহীন, এক বিদ্বেষ মাত্র

ডাকসু নির্বাচনে ইসলামি সংগঠন নিয়ে আপত্তি ভিত্তিহীন,এক বিদ্বেষ মাত্র

গৌতম দাস

0১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:৫৬

https://wp.me/p1sCvy-2xd


‘প্রগতিশীলতার’ ইসলামবিদ্বেষ সমস্যা এবার অনেকটা হাতেনাতেই ধরা পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের আয়োজন চলছে। সেটা ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মত হয় কী না তা অনেকেরই শঙ্কা। সে শঙ্কা থাক। কিন্তু এই আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রগতিশীলদের জ্ঞানবুদ্ধির দৌড়, খামতি উদাম হয়ে গেছে। তারা চিন্তায় কত খাটো আর অস্পষ্ট তা আমরা সবাই জানলাম।

এই নির্বাচনে আরও সবার মত ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাও অংশ নিতে ইচ্ছুক। প্রথম আলো ২৪ জানুয়ারিতে লিখেছে, “ডাকসু নির্বাচনে নিজেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি নিয়ে মঙ্গলবার বিক্ষোভ করেছিল। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম ছাত্র সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলছে এ ঘটনা তাদের হতবাক করেছে”।

কেন? তাদের হতবাক হওয়া কেন? অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, যেন নমশুদ্র নিচুজাতের কেউ বামুনের রান্নাঘরের আঙিনায় ঢুকে পড়েছে! তাই কী? দলের নামের আগে “ইসলামী” লেখা আছে, এটাই কী প্রগতিবাদী আপত্তির কারণ?

তাদের এমন বক্তব্যের পিছনে দুইটা খামতি বা অভাবের দিক আছে। এক, রাষ্ট্র, ক্ষমতা আর কনষ্টিটিউশন সম্পর্কে সীমাহীন অজ্ঞাত থাকা। আর দুই, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের গভীর ইসলামবিদ্বেষ।

কনষ্টিটিউশন কী কাজে লাগে? খায় না মাথায় দেয়? মূলত প্রাকটিসিং কমিউনিস্ট চিন্তায় এই ব্যাপারটা একেবারেই অস্পষ্ট, অপরিস্কার। এমনকি নতুন কোন কমিউনিস্ট রাষ্ট্র কায়েম হলে তাদেরও “বুর্জোয়া” রাষ্ট্রের মত কোন কনষ্টিটিউশন থাকে কিনা; তা গঠন-রচনা করতে বসতে হয় কীনা – এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে অনেক তাবড় নেতা মাথা চুলকাতে থাকবে, জানি। মুখে জবাব আসবে না।

প্রগতি-ওয়ালাদের অজুহাত হল, প্রথম আলো লিখেছে, প্রগতি “সংগঠনগুলো বলছে,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দল কর্মসূচি পালন করতে পারবে না বলে অলিখিতভাবে নিয়ম রয়েছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় সবগুলো ছাত্র সংগঠন ও প্রশাসনের সমন্বয়ে গঠিত পরিবেশ পরিষদের বৈঠকে তাঁরা এ বিষয়ে একমত হয়েছিলেন”।

লিখিত, অলিখিত বা গোপন তাদের চিন্তায় এটা যেখানেই থাক – এমন নিয়ম যেকোন মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশন বিরোধী।

ব্যাপারটা হল, একটা দলের নামে ইসলাম থাকা সত্বেও সেই দল দেশের মর্ডান রিপাবলিক ধরণের কনষ্টিটিউশন মেনে রাজনীতি করতে চাইছে – অথচ প্রগতিবাদীদের মন ভরছে না। দুঃখের কথা তাদের ইসলামবিদ্বেষ উদাম হয়ে উপচায়ে উঠছে! কারণ আপত্তি কী করে তুলতে হয় বা নিরসন করতে হয় এটা তাদের জানা নাই। ফলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে যেন তাদের রাজনীতি করতে তারা ইসলামি দলের কাছে দাবি করছে।

আচ্ছা, বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলোর বা মাদ্রাসাভিত্তিক ছাত্র সংগঠনগুলোও কোনভাবে এক ভিসিকে হাত করে আর একটা “পরিবেশ পরিষদের বৈঠক” আয়োজন করে ফেলে এরপর তাঁরা যদি এ বিষয়ে একমত হয় যে প্রগতি-সংগঠনের ততপরতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলবে না – তাহলে কী হবে? ব্যাপারটা কেমন হবে? হজম হবে?

অনুমান করি এমন হলে ব্যাপারটার শেষে গড়াবে মানে আসল ফয়সালা হবে লাঠালাঠি-মারামারির গায়ের জোর দিয়ে। না, ভয় পাবার কিছু নাই, লাঠির জোরের ফয়সালার পরামর্শ দেওয়া আমাদের কাজ না। বরং বলার বিষয় হল, তার মানে একখানা নিজ নিজ প্রভাবাধীন “পরিবেশ পরিষদ” এই বিতর্ক মীমাংসার আসল অথরিটি নয়। “পরিবেশ পরিষদ” এই বিতর্ক নিরসনের কর্তা বা প্রতিষ্ঠান নয়।

বলাই বাহুল্য কোন আইডিওলজি ভাল, “আগায় আছে মানে প্রগতিশীলতার” দাবিদার এই ভিত্তিতে অথরিটি ঠিক হয় না। তা কার্যকর করাই যায় না। আচ্ছা, করলে কী হবে?

করলে সেটা আর যুক্তিবুদ্ধি বা চিন্তার ভিত্তিতে অথরিটি কে তা সাব্যস্ত হবে না, হবে লাঠির জোরে।

তাহলে মূল যে প্রশ্নের জবাব পেতে হবে তা হল, কোন “পরিবেশ পরিষদের” সিদ্ধান্ত ইসলামি অথবা প্রগতিবাদী নির্বিশেষে সকলের কাছে মান্য হবে? অর্থাৎ নিজ নিজ প্রভাবাধীন এক একটা “পরিবেশ পরিষদের” দাবিদার হওয়া কাজের পথ নয়। বরং এর সরল জবাব হল যে “পরিবেশ পরিষদ” কনষ্টিটিউশন মেনে, অনুসরণ করে তৈরি হতে হবে। আমরা আরও আগাতে পারি। জেনে নিতে পারি কোন বৈশিষ্ঠের কনষ্টিটিউশন?

স্বাধীন মন বা চিন্তার দিক থেকে কথা বললে, আমাদের প্রচলিত কনষ্টিটিউশন আমরা কেউ নাও মানতে পারি, যদিও আইনি বাধ্যবাধকতার দিক থেকে আমরা তা মানতে বাধ্য। তাই প্রশ্নের জবাবটা সাধারণভাবে দিব। কনষ্টিটিউশন ‘রিপাবলিক’ বৈশিষ্ঠের এমন হতে হবে। আর এছাড়াও গুরুত্বপুর্ণ হল যা নাগরিক-সাম্য ও ইনসাফের ভিত্তিতে রচিত। এমন কনষ্টিটিউশন মেনে বা এর কথা মাথায় রেখে ‘পরিবেশ পরিষদ’ বানালে তা সব পক্ষই সহজে মেনে নিবে।

রিপাবলিক বৈশিষ্ঠের মানে হল যা কোন রাজা-সম্রাটের রাষ্ট্র নয়, যা কোন এক কর্তৃত্ববাদী, একনায়ক স্বৈরাচার বা ফ্যাসিজমের রাষ্ট্র নয় বা এর কনষ্টিটিউশন নয়। নাগরিক গণস্বীকৃতির রাষ্ট্রই রিপাবলিক রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতার উৎস পাবলিক, ফলে যা নাগরিকের গণস্বীকৃত ক্ষমতা। পাবলিক যে ক্ষমতাকে অনুমোদন করে।

এছাড়া নাগরিক-সাম্য কথাটার মানে হল, নাগরিক পরিচয় নির্বিশেষে আপনি ইসলামি হন কী প্রগতিবাদী বা পাহাড়ি-সমতলি, কোন বিশেষ ফ্যাকড়ার ইসলাম বা অন্য যা কিছু হন না কেন সকল নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্যহীন আচরণ করবে, সমানভাবে আইন প্রয়োগ করবে – এই ভিত্তির রাষ্ট্র।

তাহলে সারকথা দাড়াল যে নিজ নিজ প্রভাবাধীন “পরিবেশ পরিষদের” দোহাই দিয়ে কারও রাজনৈতিক ততপরতা নিষিদ্ধ বলা যাবে না। এটা কোন পথ নয়। কারণ তাতে মানে হয়ে যাবে যেন আওয়ামি লীগকে বলা যে তাকে বিএনপির রাজনীতি মেনে রাজনীতি করতে হবে। অথবা উলটা। মানে, বিএনপিকে বলা যে তাকে লীগের রাজনীতি করতে হবে।

বরং ডাকসু নির্বাচনে দাঁড়াতে গেলে ছাত্র সংগঠনগুলোকে নুন্যতম কী বৈশিষ্ঠের হতে হবে – সেই নির্ণায়ক শর্ত বা ক্রাইটেরিয়া আগে বলে রাখতে হবে। যেসব ছাত্র সংগঠন সেসব শর্ত পুরণ করবে তারা সবাই নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। ঠিক যেমন নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলের রেজিষ্ট্রেশনের শর্ত আরোপ করে, অনেকটা সেরকম। তবে স্বভাবতই আমাদের কনষ্টিটিউশনে [Constitution] যা কিছু অনুমোদিত এর বাইরে গিয়ে কোন শর্ত আরোপ করা যাবে না। মোট কথা রিপাবলিক বৈশিষ্ঠ আর নাগরিক-সাম্য ও ইনসাফের ভিত্তি এসবের মধ্যেই থাকতে হবে সব শর্তকে। এসব শর্ত মেনেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন করে থাকে।

ঠিক সেরকম এমন শর্ত মানলেই যে কোন ছাত্র সংগঠন ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। তাতে সে সংগঠনের নামের মধ্যে ইসলাম থাকুক বা না থাকুক কিংবা কমিউনিস্ট থাকুক কি সেকুলার – কিছু এসে যাবে না। কাউকে আর বাধা দেয়া যাবে না।

আসলে রাষ্ট্র প্রসঙ্গে যথেষ্ট স্টাডি না থাকার কারণে বরং এর বদলে ইসলামবিদ্বেষী টনটনে থাকার কারণে প্রগতিবাদীতার নামে রাজনীতিতে এসব ঘৃণার চাষাবাদ হতে দেখা যায়।

আচ্ছা, আজকাল হিন্দু রাজনৈতিক দল খোলার কিছু হিড়িক দেখা যাচ্ছে। হাসিনা না থামালে তা হয়ত আরও বাড়ত। যেমন, হিন্দু ঐক্য জোট, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট, জাতীয়তাবাদী হিন্দু কল্যাণ দল ইত্যাদি নানান কিসিমের নামে এসব দল আছে দেখা যায়। এছাড়া ওদিকে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ তো আছেই। এখন এসব দলগুলো যদি ছাত্র সংগঠন খুলে বসে আর যদি তারা ডাকসু নির্বাচন করতে চায় তাহলে এসব প্রগতিবাদীদের প্রতিক্রিয়া কী হবে?

রাজনীতিক ততপরতা মানে তা বিদ্বেষের নয় বরং ইতিবাচক এপ্রোচে করার বিষয় – একথা মনে রাখলে অনেক প্রশ্নের সহজ মীমাংসা পাওয়া যায়।

%d bloggers like this: