আমরা কী এনআরসির শিকার হতে যাচ্ছি?


আমরা কী এনআরসির শিকার হতে যাচ্ছি?

গৌতম দাস

২২ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2D0

 

ভারতের এনআরসি মানে ‘ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স’ (National Register of Citizens (NRC))। কিন্তু এটা কেবল আসামের এক ইস্যু। ভারতের নর্থ-ইস্টে সাত রাজ্যের বড়টা হল আসাম। আসলে উল্টাটা। বড় আসামকে ভেঙ্গেই পরে সাত রাজ্য (ত্রিপুরাকেও সাথে ধরে) বানানো। নানান জনগোষ্ঠীর ট্রাইবাল পরিচয়ের ভিত্তিতে আগের আসাম রাজ্যকে বিভক্ত করার কাজটা হয়েছিল মূলত ১৯৭২ সালে, ভাগ করে মোট সাতটি আলাদা রাজ্য করা হয়েছিল। এরপরের যে আলাদা নতুন আসাম কেবল তারই এনআরসির সোজা মানে হল, কেবল আসামের নাগরিকদের জাতীয় তালিকার রেজিস্টার। তাই, ‘জাতীয়’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও এটা দিয়ে সারা ভারতের নাগরিক তালিকা বুঝানো হয়নি, কেবল ‘আসামের নাগরিকদের তালিকা’ বুঝতে হবে। কিন্তু কেবল আসামে কেন?

এনআরসির তৈরির কাজ শুরুর পর থেকে এর ফাইনাল তালিকা করা কবে শেষ হবে ও প্রকাশিত হবে এনিয়ে বহু মোচড়ামুচড়ির পরে ঘোষণা করার সর্বশেষ তারিখ ছিল, চলতি মাসের শেষে, ৩১ জুলাই। কিন্তু আবার গড়িমসি করা শুরু হয়ে গেছে। আবার আদালতে তারিখ পেছানোর দরখাস্ত পেশ করা হয়েছে। আর খুব সম্ভবত এবার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে “মুসলমানেরা দায়ী”, “মুসলমান অনুপ্রবেশকারীরা দায়ী”- এ কথাগুলো প্রবল করার বিজেপি-আরএসএসের জল্পনা-পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।  তাই একটা চাপ তৈরি করার চেষতা হচ্ছে। এদিকে, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপেশাদার আচরণও ইস্যুটাকে আরও বিপজ্জনক  করে তুলছে। এমনিতেই ভারতের কিছু মিডিয়া বলা শুরু করেছে যে, এনআরসির তালিকা তৈরি করার কাজটা শেষে ত্রুটিপূর্ণ হয়ে থেকে অম্পুর্ণ ও ব্যর্থ হবে। শেষ করতে পারবে না ইত্যাদি। কেউ কেউ চার-পাঁচ সম্ভাব্য কারণও ছাপিয়ে ফেলেছে [5 reasons why NRC implementation is bound to fail] । অথবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের লেখা, “এনআরসি তালিকা প্রকাশের পর ভারত কি সত্যিই কাউকে ফেরত পাঠাতে পারে”। আর ভারতের এমন মিডিয়ার তালিকায় নতুন যুক্ত হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার নাম। এদের সর্বশেষ রিপোর্টের শিরোনাম ‘এনআরসি বিপর্যয় : প্রক্রিয়ার ত্রুটি স্বীকার করে নিয়েছে কেন্দ্র ও আসাম” [NRC Disaster: Center and Assam virtually admit flaws in the process – এটা প্রকাশিত হয়েছে দুদিন আগে ১৭ জুলাই।

কেবল আসামে কেন- সেই প্রশ্ন থেকে শুরু করতে প্রথমে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়ে রাখি। নাগরিক তালিকা তৈরির কাজটা অবশ্যই প্রশাসনিক, মানে নির্বাহী সরকার করবে। কিন্তু আসামের ক্ষেত্রে এই এনআরসি তৈরির কাজটা চলছে মোদী অথবা তার আগের কোনো কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছা বা আদেশে নয়। তাহলে কী এটা রাজ্য বা প্রাদেশিক সরকারের আদেশে বা ইচ্ছায় হচ্ছে? না, তা-ও নয়। এটা আসলে চলছে বিচার বিভাগের নির্দেশে। না, এনআরসি তৈরিতে কাজে নেমে পড়ার আদেশ বলতে, একটা আদালতের রায় যেমন হয়, এটা ততটুকুই নয়। রায় তো দিয়েছেনই, সেই সাথে খোদ আদালতই এনআরসি কাজের তদারককারী, তত্ত্বাবধায়ক। তা-ও আবার “আদালত” বলতে আসাম রাজ্যের হাইকোর্ট নয়, একেবারে দিল্লির সুপ্রিম কোর্ট, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে। তবে ‘সমন্বয়কারী’ নামে পদে এক হেড বুরোক্র্যাট (প্রতীক হাজেলা, [Prateek Hajela]) আছেন বটে, কিন্তু তিনি সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের কাছে জবাবদিহির অধীনে। অর্থাৎ তিনি কেন্দ্রের মোদীর (বা আসাম রাজ্যের) নির্বাহী সরকারের হুকুমের অধীনস্থ কেউ নন। সোজা কথায় বিচার বিভাগ, এব্যাপারে নির্বাহী বিভাগের কাজকাম নিজের দখলে নিয়েছে। যেমন ধরেন, বাংলাদেশের ন্যাশনাল আইডি তৈরির কাজ আমাদের নির্বাচন কমিশনের অধীনে সম্পন্ন হয়েছে। আর নির্বাচন কমিশন শেষ বিচারে নির্বাহী বিভাগের অন্তর্গত। কারণ এটি কনস্টিটিউশনে উল্লেখ থাকা প্রতিষ্ঠান বলে রাষ্ট্রপতির অধীনে, আর সেই সূত্রে সে রাষ্ট্রপতির অফিস ঘুরে সেই নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই। এখন বাংলাদেশে এটা যদি সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি তদারকিতে সম্পন্ন হলে যা হত, তাই হচ্ছে আসামের এনআরসিতে।

এতে একটা অসুবিধা বললাম যে, সাধারণত রাষ্ট্রের ক্ষমতা নির্বাহী আর বিচার বিভাগের মধ্যে ভাগ করা থাকে, সে নিয়ম এখানে ভঙ্গ করা হয়েছে। ফলে, নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। যেমন নির্বাহী ক্ষমতা মানে তো সরকার, মানে রাজনীতিবিদদের কাজ বা দায়িত্বের এরিয়া। কিন্তু সেই এরিয়ায় বিচারপতিরা কেন ঢুকবেন? বা ঢুকলে কী বিপদ হবে? সমাজের রাজনৈতিক তর্ক-ঝগড়া রাজনীতির মাঠে সমাধান হতে হয় – সঙ্ঘাত, আপস ইত্যাদির মাধ্যমে। অথবা অমীমাংসিত থাকলে সেটাও রাজনীতির মাঠে-পরিসরেই পরে থাকবে; উঠবে পরবে – এভাবেই চলবে। মানে সবকিছু সেখানেই। কারণ যা রাজনীতিক স্বার্থের প্রশ্ন তা তো রাজনৈতিকভাবেই ফয়সালা হতে হবে – সংঘাতে না হয় আপোষে। রাজনৈতিক সমস্যার আইনি সমাধানই হয় না। ওর কাজ না সেটা। এ জন্য রাজনীতিকদের এরিয়ায় বিচার বিভাগ কখনো আসবে না, তার কজ এটা না তাই। আদালত তাই নিজেকে গুটিয়ে রাখবে যেন  সমাজ রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো ফয়সালা করতে দিবার জন্য এবং একে নিজের ভুমিকা ও ফাংশনগুলোকে কাজ করার সুযোগ করে দেয়ার জন্য। কিন্তু এনআরসি করাটাই আসাম সমাজের রাজনৈতিক সমাধান কি না- এ নিয়ে রায় দিয়ে দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। এটাই সবেচেয়ে বড় ব্লান্ডার। এরপর আবার তা বাস্তবায়নের কর্তৃপক্ষ হয়ে গেছেন আদালত নিজেই, যা আরেক ব্লান্ডার। এটা বিশাল অকাজ, অনধিকার চর্চা। নিজের সীমা, কাজের ধরণ না বুঝে কাজ করা হয়েছে। ধরেই নেয়া হয়েছে আদালত রাজনৈতিক বিতর্ক, স্বার্থ-দ্বন্দ্ব সমাধান দিতে পারে। বা এটা তার কাজ। এখন যদি মিডিয়ার আশঙ্কা অনুসারে এনআরসি প্রকল্প সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয় [যেমন চলতি মাসে আসাম রাজ্য ও কেন্দ্র যৌথভাবে (যার দুটোই বিজেপির দলের সরকার) সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে, যাতে ফাইনাল তালিকা প্রকাশ করার শেষ তারিখ ৩১ জুলাই থেকে পিছিয়ে তা অনির্দিষ্টকাল করা হয়।] যার অর্থ এটা ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় কোর্টের। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট নিজেই যেন একটা রাজনৈতিক পক্ষ হয়ে উঠবে, যার বিরুদ্ধে অন্য রাজনৈতিক পক্ষ বা স্বার্থগুলো সোচ্চার হবে। অথচ এটা অকল্পনীয় যে, আদালত বা বিচারকেরা নিজেই এক রাজনৈতিক পক্ষ হবেন! এ কারণেই দুনিয়ার আদালতগুলো সব সময় বুদ্ধিমানের মত [Jurisprudence বা জুরিসপ্রুডেন্সের] প্রুডেন্ট হয়ে, দূরদর্শিতা দেখিয়ে আগাম কোনো রাজনৈতিক পক্ষ বা বিপক্ষ হওয়া থেকে দূরে থাকে। তাই আদালতের কাছে কেউ মামলা নিয়ে গেলেই আদালতের তাতে আমল করে রায় দিতে ঝাপায় পড়া – এটা দুরদর্শী আদালত কখনও করে না। ওর প্রথম বিবেচনা ইস্যুটা রাজনৈতিক কিনা। যদি দেখে হা তবে একে আমল না করে  ততক্ষণাত সমাজের রাজনৈতিক পরিসরে, মাঠে ফেরত নিয়ে যেতে অনুরোধ করে। মামলা ফিরিয়ে দেয় এই যুক্তিতে। কোন সমাজের সব সমস্যা আইনি না। সমাজের নানান সমস্যার  সবকিছুর সমাধান দেওয়ার আদালতই একমাত্র প্রতিষ্ঠান নয়। আদালত সবকিছুতে নাক গলানোর মানে সবকিছুকে আইনি সমস্যার হিসাবে ও চোখে দেখে নামিয়ে এনে সেই খাপে ভরে দেয়া। আর এতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভুমিকা রাখা ফাংশনাল হওয়ার সুযোগ নষ্ট করে দেয়া হবে। তাই আদালতকে এসব দিক বিবেচনা করে দেখার মত যোগ্য আর বুদ্ধিমান হতে হয়। আইডিয়ালি এটাই হওয়ার কথা।

এনআরসি করার দাবিকে কেন আসাম সমাজের ‘রাজনৈতিক সমস্যা ও দ্বন্দ্ব’ বলেছি?
ভৌগোলিকভাবে এই নর্থ-ইস্ট এবং বাকি মুল ভারতের মাঝখানে আছে বাংলাদেশ। যদিও একেবারেই এক প্রান্তের শিলিগুড়ি করিডোরের এক “চিকন গলা” দিয়ে নর্থ-ইস্ট এবং বাকি মুল ভারত সংযুক্ত অবশ্যই।  এখন যদি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সরাসরি যাওয়া হয় (যদি বাংলাদেশ যেতে দেয়) তবে কলকাতা থেকে আসামের সবচেয়ে কাছের জেলার দূরত্ব ৩৫০ কিলোমিটার। কিন্তু বাংলাদেশ অনুমতি না দিলে ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ হয়ে ঘুরে কলকাতা আসতে সেই দূরত্ব বেড়ে হয়ে যায় এক হাজার ৭০০ কিলোমিটার। ১৯৪৭ সালের পর থেকে পাকিস্তান (ততকালীন পুর্ব পাকিস্তান) আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতে  ১৭০০ কিলোমিটার দুরত্বের ফ্যারে পরে যায় আসাম। এটাই আসামের দুঃখের মূল উৎস। আসামের সাথে বাকি ভারতের সহজ যোগাযোগ ‘নাই’ হয়ে যায়। যোগাযোগ খারাপ তো লেনদেন বিনিময় ব্যবসা খারাপ। মানে ‘মানি সার্কুলেশন’ নাই, অর্থনীতি নাই, অবকাঠামো নাই, এভাবে সব কিছু নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিল। তবু ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতের নেহরু সরকার এভাবে আসামকে স্থবির ফেলেই রেখে দিয়েছিল। কেন?

কারণ তার ভয় আসাম নেহেরুর ভারতকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। আসামের আরও উত্তরের সীমান্ত হল – চীন সীমান্ত। আসামের স্বার্থে ভারত বাংলাদেশের সাথে কোনো ‘ফেয়ার ডিল’, এক “উপযুক্ত পালটা সুবিধার বিনিময়” করে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আসাম-কলকাতা যোগাযোগ সহজ করে নিতে পারে অবশ্যই।  কিন্তু জন্ম থেকেই ভারতের কেন্দ্র বা নেহেরু সরকার এতে আগ্রহ দেখায় নাই। কারণ, তাদের ভয় হল, আসামের জন্য বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া করিডোর পাওয়া গেলে এতে একই সাথে এবার বৃহত্তর আসাম সীমান্তের লাগোয়া অপর পাড়ের চীনের প্রদেশগুলোও আসামের ওপর দিয়ে, বাংলাদেশ হয়ে কোনো সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানো সহজ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ বা চীন তখন আসামের উপর দিয়ে চীনের জন্য করিডোর পাওয়া – এই প্রবেশাধিকার, ভারতকে দেয়া বাংলাদেশের সুবিধার বিনিময়ে শর্ত হিসেবে হাজির করে ফেলতে পারে? এটা ভারত একেবারেই চায় না। এব্যাপারে আনন্দবাজার ঠিক এই প্রসঙ্গে না বিসিআইএম [BCIM] প্রকল্প নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লিখেছে ,“বাংলাদেশ এবং মায়নমারের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এই প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত। অথচ (এই প্রকল্প নিয়ে)ভারতের আপত্তির প্রধান কারণটি নিরাপত্তাজনিত। বিসিআইএম রূপায়িত হলে ‘ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল [মানে আসাম] চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে।’ ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত”।

সারকথায় চীনকে এসব আলোচনার ভিতরে ঢুকতে দিতে চায় না ভারত, কারণ আলোচনায় একবার ঢুকে পড়লে শেষে চীন আসামের ওপর দিয়ে করিডোর না পেয়ে যায়। সম্ভবত ভারতের মনে ভয়, নর্থ-ইস্ট কখনো যদি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যেতে চায়, একই ভারত রাষ্ট্রে যদি না থাকতে চায়, তাহলে কী হবে? যদি স্বাধীন হতে চায় বা চীনের সাথে যুক্ত হতে চায় তাহলে কী হবে? সারকথা বিষয়টা হল, ভারত থেকে আসামের বেরিয়ে যাওয়ার ভয়। ভারতের শাসকেরা এপর্যন্ত তাদের মনের এই ভয়কেই প্রাধান্য দিয়ে গেছে সব সময়। আর তাতে ব্যাপারটা হয়ে গেছে অনেকটা,  নিজের সন্তানকে হাত-পা ভেঙে পঙ্গু করে রাখার মত, যাতে সে পালিয়ে না যায়, তাকে দিয়ে ভিক্ষা করানো যায়। আর সে জন্য পুরো নর্থ-ইস্টকে জন্মের পর থেকেই ভারত যোগাযোগ অবকাঠামোর দিক দিয়ে প্রায় অচল করে রেখেছে।

তাই কেবল গত দশ বছরের ঘটনা হল, এবার ভারত একা সব সুবিধা হাসিল করেছে। এই সুযোগ সুবিধা মানে বিনা পয়সার বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোরের একক সুবিধা ভারত এখন নিয়েছে। কারণ এটা আমেরিকার “চীন ঠেকানো” স্বার্থে ভারতের ভাড়া খাটার বিনিময়ে পাওয়া  বাংলাদেশ এখন মোস্ট ভারত-ফেভারেবল বাংলাদেশ পেয়েছে।  এখানে বাংলাদেশে করিডোরের বিনিময় চাওয়ারই কেউ নাই। এটা একপক্ষীয় করিডোরসহ সব সুবিধা। এমনকি মেজর অবকাঠামো তৈরির দায়ও বাংলাদেশের। আনন্দবাজার লিখছে, আসামে উপর দিয়ে চীন বাংলাদেশে আসুক সেটা চায় না। মানে, ভারত একপক্ষীয় করিডোর চায়।

কিন্তু এতদিন আসামের মানুষের একারনে জীবনযাপনে যে গরিবি হাল হয়ে আছে এর কারণ কাকে দেখানো হবে? এটাকে আড়াল বা দায়ী করার জন্য বয়ান তৈরি করা হয়েছে যে, আসামে বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তানের) অনুপ্রবেশকারী, এদের ( বিদেশীরা) ঢুকে পড়া সবকিছু জন্য দায়ী। কথাটা আসলে উল্টোভাবে সত্য। কারণ ব্রিটিশ আমলে ধান ফলাতে বৃহত্তর রংপুর বা টাঙ্গাইল থেকে দক্ষ বাঙালি গৃহস্থকে আসামে জমি দেয়ার লোভ দেখিয়ে নিয়েছিল ব্রিটিশরা, যাতে সেখানে ধানের উৎপাদন বাড়ে। বিশেষত চল্লিশের মহাযুদ্ধের সময়ে সেনাদের জন্য খাদ্যশস্যের খুবই বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ সেই মাইগ্রেশনটা অভাবে পড়ে মাইগ্রেশনও ছিল না এই অর্থে যে, এটা একই ব্রিটিশ কলোনির মধ্যেই এক প্রদেশ থেকে অন্য আর এক প্রদেশে মাইগ্রেশন ছিল। এছাড়া বৃটিশ শাসকেরা নিজে কর্মসূচি নিয়ে এটা ঘটিয়েছিল।

কিন্তু ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে এ ব্যাপারটাকে দেখানো হল, আসামের ‘সব দুঃখের মূল কারণ’ হিসেবে – এই বলে যে বাঙালি বা মুসলমানেরাই দায়ী। আসামের মূল জনগোষ্ঠী হলো অসম (বা অহমীয়), বাঙালি (মুসলমানসহ) আর ট্রাইবাল বোড়ো। এ ছাড়া সাথে ছোট ছোট অনেক ট্রাইব বা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীও আছে। ‘বিদেশী’ বা কথিত পূর্ব বাংলার লোক, এদেরকে বের করে দিতে হবে- এই অছিলায় সেকালে কংগ্রেস আন্দোলন করেছিল। কথা বিদেশি বলে ঘুরিয়ে দিতে সেই প্রথম ১৯৫১ সালে নাগরিক তালিকা [NRC 1951] বা প্রথম এনআরসি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা ফাইনালি হয়েছিল আসলে আসামে বসবাসকারী সব বাসিন্দার আনুষ্ঠানিক তালিকাভুক্তি। অর্থাৎ এ থেকে কাউকে কী পদ্ধতিতে বের করে দেয়া হবে, কী করে বুঝবে সে বিদেশি ইত্যাদি সেই পর্যন্ত আর আগানো হয়নি। আর এই ক্ষোভ জমতে জমতে তা থেকেই পরে ১৯৭৯ সালে মূলত মাঠের ছাত্র আন্দোলন হিসাবে অতি উগ্র “অসমীয় জাতীয়তাবাদীরা” সাথে বোড়োদের সমর্থনে মূলত বাঙালিদের বিরুদ্ধে ‘বাঙালি খেদাও’ বলে আন্দোলন শুরু করেছিল। এটাই একপর্যায়ে চরমে উঠে, আসামেরই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অবস্থা তৈরি করলে তা ঠেকাতে রাজীব গান্ধীর সরকার দ্রুত আপসে ১৯৮৫ সালে ‘আসাম অ্যাকর্ড’ [Assam accord, 1985] নামে ছাত্রদের সাথে এক আপোষচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। সেখানেই বলা ছিল, ১৯৫১ সালের এনআরসিকে বিদেশী চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে আপডেট করা হবে। তাতে কে বিদেশী তা চিহ্নিত করে ওদের বের করে দেয়া হবে। এর পর থেকে ওই ছাত্ররাই এবার রাজনৈতিক দল খুলে বসে ‘অহম গণপরিষদ’ [AGP] নামে বা ‘বোড়োল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট’ নামে।

ওদিকে ১৯৮৫ সালের ‘আসাম অ্যাকর্ড’ চুক্তি হলেও এর বাস্তবায়ন ২০০৯ সাল পর্যন্ত কিছু না হওয়াতে একটি স্থানীয় দাতব্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান  – নাম ‘আসাম পাবলিক ওয়ার্কস’ – এই ইস্যুটাকে সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যায়, তারা রিট পিটিশন করে। ব্যাপারটা যেন খুবই গর্বের, দেশের কাজ আর বিরাট দেশপ্রেমের কাজ হয়েছে এই ভাব ধরে গত বছর কলকাতার ইংরাজি টেলিগ্রাফ এই রিপোর্ট ছাপছিল [Couple who set NRC ball rolling]।  আর ঐ রীট মামলার নিষ্পত্তি করতে গিয়ে শেষে সুপ্রিম কোর্ট নিজেই হয়ে গেছিল আসাম সমাজের রাজনৈতিক বিরোধ ও বিতর্কের নিষ্পত্তির নির্বাহী বাস্তবায়ক।  এনআরসি তৈরির কাজের নিয়মকানুন কী হবে সেটাও আদালত ঠিক করে দেয়। বিচারকদের পা-পিছলানির ঐতিহাসিক ঘটনা এটা। কিন্তু এটা কেন “রাজনৈতিক ইস্যু”, যাতে বিচারকেরা পা পিছলে ঢুকে পড়েছিল – একথা বলছি?

মাইগ্রেশন মানে কাজ বা পেশায় সুবিধা পেতে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে অন্য দেশে গিয়ে বসবাস; এর মূল কারণ বা চালিকাশক্তি হল অর্থনীতি। কেউ চাইলে এটাকে বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্থানীয় লোকাল ক্যাপিটালিজমের গ্লোবাল হয়ে ওঠা, এমন “গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ফেনোমেনা” বলতে পারেন। একটা দেশে যেকোনো কারণে ব্যাপক উদ্বৃত্ত বাড়তি সঞ্চয় ঘটে গেলে আর সেই সঞ্চয় অর্থনীতিতে আবার বিনিয়োজিত হতে চাইলে তাতে এবার ওই দেশে প্রাপ্ত জনসংখ্যার (লেবার) চেয়ে লেবারের চাহিদা বেশি হয়ে গেলে কী হবে? ঐ দেশে তখন অন্য দেশ থেকে মাইগ্রেশন হবেই। আর সেই দেশের আইনকানুন ও সীমান্তও চাইবে বিদেশী লেবার মানে শ্রমিক আসুক, তারা খুবই স্বাগত। কিন্তু  পরবর্তিকালে কখনও কোন কারণে যদি ঐ অর্থনীতি ভালো না? ভুবতে থাকে, মন্দা দেখা দেয়? তাহলে এবার, সেখানে বিদেশীবিরোধী আন্দোলন শুরু হবে, মাইগ্রেশনবিরোধী দল ক্ষমতায় আসবে ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, বিদেশীরা কত খারাপ, কত বেশি বেশি পয়দা করে বা মাইগ্রেটেড এরা তো স্থানীয় জনসংখ্যার চেয়েও বেশি হয়ে যাচ্ছে, ওরা বেশি পয়দা করে, ওরা অসভ্য, ওদের ধর্ম নৃশংসতায় ভর্তি ইত্যাদি কত কিছু খুত আবিস্কার করে এসব বয়ান বলে এদের কুপিয়ে কেটে গণহত্যা করে ভাগাও- এসবই হবে ওদের সমাজের পপুলার রাজনীতির বয়ান। সাম্প্রতিককালে নিউজিল্যান্ডের শুটিং গণহত্যা বা ফ্রান্সের উগ্রপন্থী লি-পেনের দলের কাণ্ডকারখানা অথবা আমেরিকায় ট্রাম্পের ইমিগ্রেশনবিরোধীতা ( বিদেশীবিরোধী) ও মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল তোলার বয়ান  – সবকিছু এই একই কারণে।

এগুলোই আসলে বিদেশী বা মাইগ্রেশনবিরোধিতার আড়ালে চরম নোংরা বর্ণবাদ। ওমুকেরা জাতে খারাপ, এমন বয়ান। ১৯৭৯ সালের পর থেকে আসামের পুরো সমাজ এমন বাঙালি বা বিশেষত মুসলমান বিরোধি ঘৃণাতেই ভেসে চলছিল।

আবার মনে করিয়ে দেই, আসামের মূল সমস্যা বা শুরুটা কিন্তু ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে আসামের দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যা এবং যা থেকে তৈরি খুবই খারাপ ও অবকাঠামোহীন, বিনিয়োগহীন এক স্থবির জনজীবন। এখন ধরা যাক, আসামে যাদের কথিত বাংলাদেশী বলা হচ্ছে যদি এদের সংখ্যা একই রকম থাকে, আর কালকেই যদি কোনো জাদুতে আসামের যোগাযোগ অবকাঠামো সহজ, বিনিয়োগের অভাব নেই, অর্থনীতি প্রবল চাঙ্গা ইত্যাদি – এমন এক অবস্থা হয় যাতে প্রাপ্ত লেবার যা আছে তা-ও কম পড়েছে দেখা যায়, তবে ঐ ঘাটতি পুরণে সেই আসামই আবার আরও নতুন মুসলমান ‘বিদেশীদের’কেও দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনবে। তাই বলছি, আসামের মূল সমস্যা আসলে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক। অথচ সবাই ভাবছে, বিশ্বাস করে বসে আছে আসামের প্রধান ইস্যু এখন এনআরসির ফাইনাল তালিকা কবে ঘোষণা হবে; যেন এটা হয়ে গেলেই অসমিয়াদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। অথচ এটা এমনি হিংসা ঘৃণায় ঢুবে থাকা জনজীবন যে ঐ সমাজে কারও বাস্তবতায় চোখ মেলার মুরোদ নাই, কারণ এটা তো আসলে এক অলীক স্বপ্ন মাত্র। এরা অভিবাসী বা মাইগ্রেশন জিনিষটা নিয়ে কখনও বুঝে দেখেনি।  এরা আসলে চিন্তা করে দেখেনি যে, আসামের অর্থনীতি আরো খারাপ হলে তারা নিজেরাও অভিবাসী হতে ঘর ছাড়বে। যেমন ইতোমধ্যেই গুজরাত বা মুম্বাইয়ের মত শিল্প-শহরগুলোর অর্থনীতি আসামের চেয়ে প্রবল সচল। তাই ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষিত আধা শিক্ষিত অসমিয়া ওসব রাজ্যে ছুটছে, এই হার বেড়ে গেছে।

এ অবস্থায়, ৩১ জুলাই ফাইনাল তালিকা ঘোষণা হওয়ার আগে বিজেপি সভাপতি ও কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কী চাচ্ছেন? তিনি চাচ্ছেন মূলত অনির্দিষ্টকালের জন্য ফাইনাল তালিকা ঘোষণা পিছিয়ে দিতে। এই আবেদন আদালতে করা হয়েছে যৌথভাবে, কেন্দ্র ও রাজ্য মিলে। ইতোমধ্যে মিডিয়ায় লোকজন নামানো হয়েছে যেন এই লাইনের পক্ষে কথা বলে [OPINION | Why the Deadline For Final NRC Draft Should be Extended Beyond July 31]। যার সার আর্গুমেন্ট হল, যে তারা খুবই খাটিবাদী। কোনকিছু খাটি না হলে তাদের চলেই না। তাই তারা খুবই সঠিক নির্ভুল একটা তালিকা চান।

তাই, অমিতের কথিত যুক্তি হল, ২০ শতাংশ রি-ভেরিফিকেশন। মানে তালিকায় যাদের উঠানো হয়েছে অথবা বাইরে ফেলা হয়েছে এমন সব ডাটারই ২০% আবার খুলে চেক করা। এই কাজের জন্য তিনি কেন্দ্র্রের অ্যাটর্নি জেনারেলকে (এজি) দিয়ে তিনি যুক্তি দেয়াচ্ছেন যে, এনআরসি তৈরি “আগে কল্পনা করা যায় নাই এমন জটিল কাজ” [“unprecedented large scale of complexities” involved in the NRC process]। তাই এইটা আসামের পাবলিকের ধারণা, এই তালিকা সঠিক নয়। গত বছর প্রকাশিত প্রথম ড্রাফট তালিকাতে আসামের প্রায় সাড়ে তিন কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেনি। তাই এক শুদ্ধ তালিকা পেতে.২০% ডাটা আবার খুলে চেক করতে সময় বাড়াতে হবে।

এদিকে অনেক রাজনীতিবিদ দাবি করছেন, এই ৪০ লাখের মধ্যে ২৫ লাখই হিন্দু। হতে পারে অমিত শাহের তারিখ পিছাতে চাওয়ার পিছনে এটা একটা উদ্বেগের কারণ। তবে সরকারি হিসাবে ৈ ৪০ লাখের মধ্যে ধর্মীয় ভাগের অনুপাত নিয়ে কিছুই জানানো হয়নি। এই সুযোগে অমিত শাহ এজিকে দিয়ে বলাচ্ছেন যে, ২০ পার্সেন্ট ডাটা আবার চেক করে দেখতে হবে। আর তা বিশেষ করে ঘটাতে হবে সীমান্ত জেলাগুলোতে। মানে বাংলাদেশের সীমান্তে। কারণ সেখানে নাকি (মুসলমান) জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কোন তাল-ঠিকানা নেই। এভাবে যেভাবেই হোক বিচারকদের কিছু একটা বুঝ দিয়ে হলেও তারিখ পেছাতে এজি একেবারেই মরিয়া। কিন্তু আদালত এখনো রাজি না হয়ে ২৩ জুলাই তারিখ পর্যন্ত আরও শুনানি – এটা মুলতবি রেখেছে।

ওই দিকে আরেক কাণ্ড ঘটিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ভারতের স্ক্রোল [SCROLL] পত্রিকা বলছে, তিনি নাকি কোনো স্থানীয় টিভিতে বলেছেন, “যদিও আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা নয়, তবু পত্রিকার রিপোর্ট দেখে আমাদের কিছু উদ্বেগ রয়েছে”। এভাবে আমাদের উদ্বিগ্নতা আছে, আবার নাই – এমন মাজা শক্ত না করা হা-না করে কথা বলছি কেন আমরা? এ ছাড়া গত বছর আগস্টে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ইনুর এক বিবৃতির রেফারেন্স দিচ্ছে ভারতের স্ক্রোল অন লাইন মিডিয়া। ইনু বলেছিলেন, “প্রথমত এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আসামের স্থানীয় সমস্যা” [“Firstly, we see this as an internal, local political issue with Indian state of Assam, ]। আরো বলেছিলেন, “এ নিয়ে তাই বাংলাদেশের কিছু করার নেই। ভারত সরকার আমাদের সাথে কখনো এ নিয়ে কথা বলেনি। তাই আমাদের কোনো অভিপ্রায় নেই বন্ধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ইস্যু নিয়ে তাদের সাথে কথা তোলার”[“It has nothing to do with Bangladesh. The Indian government has not discussed this issue with us, nor do we have any intention to take it up with India as it is an internal matter of India, our friendly neighbor”.] আসলে এই কথাগুলো ইনু বলেছিলেন ১ আগষ্ট ২০১৮তে মূলত কলকাতার হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকায়। সেটাই রেফারেন্স করা হয়েছে। ঐ বক্তব্যে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা বাক্যটা হল, আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র হবার ৪৮ বছর হয়ে গেল কিন্তু ভারত কখনও এনিয়ে প্রশ্ন তুলে নাই, আমাদের সাথে কথা বলে নাই। যার সোজা পরের অর্থ হল,  তাহলে এনিয়ে এখন আসছে কেন?  এর আমরা কিছুই জানি না, সংশ্লিষ্টই নই। কাজেই এখনও যদি কখনও তুলে তাতেও আমরা এটা আমল করব না।

তাহলে ইনুর ইনুর এই কথার পর এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনের “আমাদের কিছু উদ্বিগ্নতা রয়েছে” বলার দরকার পড়ল কেন? এর কোন ব্যাখ্যা নাই।  মোমেন বলছেন, “যারা দীর্ঘ ৭৫ বছর ধরে ওখানে আছে তারা ওদের নাগরিক, আমাদের নয়”। এই কথা থেকে পরিষ্কার, এ কথার চেয়ে আগে ইনুর- ‘এটা আমাদের ইস্যু নয়, কোনো দায়দায়িত্ব নেই’- বলা অনেক ভালো ছিল। সে তুলনায় এখন এক দুর্বল অবস্থান নেয়া হল। কারণ, ভারতে কেউ ৭৫ বা ১০০ বছর ধরে আছে কি না তাতে আমাদের কী? আর তারা কোথাকার নাগরিক তা নিয়ে আমাদের বলারও কিছু নেই। এর চেয়ে বরং “ভারতের কোনো সরকার এ নিয়ে আমাদের সাথে কখনো কথা তোলেনি’- এটাই সবচেয়ে ভালো ডিফেন্স, ভাল যুক্তি ছিল। এক কথায় বললে মোমেনের কথা ইনুর কথা থেকে সরে গেছে। এ ছাড়া বোকা কিসিমের আরেক কথা বলেছেন মোমেন। তিনি বলেছেন, “আমরা ইতোমধ্যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে ঝামেলায় আছি। তাই আমরা আর নিতে পারব না। বাংলাদেশ দুনিয়াতে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, “We are already in much difficulty with the 11 lakh [Rohingya refugees], so we can’t take anymore. Bangladesh is the most densely populated country on the planet.”]।

এত কেলাস কোন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্ভবত এর আগে দুনিয়া দেখে নাই। আমরা আগে রোহিঙ্গা শরণার্থী নিছি তাই আর নিতে পারব না- এটা কি কোনো ডিপ্লোমেটিক কথা হল? এটা কী আরও নিব কিনা সেই কথা উঠে গেছে? প্রথমত, তিনি যেচে শরণার্থী নেয়া-না নেয়ার কথা কেন তুলছেন? ভারত কি এ প্রসঙ্গ তুলেছে আমাদের সাথে? তোলেনি।  ডিপলোমেসি খাউজানি আলাপ না, যে একটু অকারণে চুলকায় নিলাম। এখানে প্রতিটা শব্দ গুরুত্বপুর্ণ ও মাপা ও প্রয়োজনীয় হতেই হয়। আর এরচেয়ে ার এক গুরুত্বের বিষয় “ডকুমেন্ট” বা রেফারেন্স’। আগে কী বলেছি এর বাইরে যাওয়া যাবে না। যখন যেমন এটা তো চলবেই না। তাই এখানে আগে কী আছে এর রেফারেন্স খুবই গুরুত্বপুর্ণ। এছাড়া মোমেনের কথায় মানে হয়েছে যেন, আমরা যদি কোনো রোহিঙ্গা শরণার্থী না নিয়ে থাকতাম তাহলে কি এখন আসামের শরণার্থী নিতাম- ব্যাপারটা কি এটাই? আবার, দুনিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ দেশ না হলে আমরা আসামের শরণার্থী নিতাম, তাই কি? সবচেয়ে বড় কথা, এ পর্যন্ত আমাদের সাথে কখনো ভারতের এ নিয়ে কথা হয়নি- এটা ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান। অথচ প্রশ্ন এবং প্রসঙ্গ না বুঝেই অতিরিক্ত কথা বলা ও অকূটনীতিসুলভ কথা বলা নির্বুদ্ধিতা বটে। তাঁর প্রফেশনাল যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। সম্ভবত তিনি আমাদের আরো বড় বিপদে ফেলে দিবেন!

সর্বশেষঃ
চলতি জুলাই মাসের শুরুতে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কাউন্সিলের (UN-OHCHR) স্বাধীন এক্সপার্টেরা ভারতের আসামে এনআরসির ততপরতা নিয়ে বিরাট উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে [UN experts: Risk of statelessness for millions and instability in Assam, India]। এনআরসি নিয়ে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ আপত্তির পয়েন্ট হল, আসামে নাগরিকত্ব নির্ণয়ের পদ্ধতি ঠিক নয়। কারণ কেউ নাগরিক নয় সেটা প্রমাণের দায় সবখানে হয় রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু আসামে এটা চাপানো হয়েছে নাগরিকের উপর, [“In nationality determination processes, the burden of proof should lie with the State and not with the individual,” said the experts, noting the discriminative and arbitrary nature of the current legal system.]। তাই এটা বৈষম্যমূলক ও খামখেয়ালিমূলক আইনি ব্যবস্থা বলে চিহ্নিত করেছে।

লন্ডন ইকোনমিস্ট পত্রিকা এটাকে সরাসরি মুসলমানদের টার্গেট করা এক প্রক্রিয়া বলে চিহ্নিত করেছে [India’s hunt for “illegal immigrants” is aimed at Muslims]।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বাংলাদেশ কি এনআরসির শিকার হতে যাচ্ছে? এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s