এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

গৌতম দাস

৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Qz

_

চারদিকে বলাবলি শুরু হয়েছে, আমেরিকা নাকি ফিরে আসছে। অন্তত চেষ্টা করছে। ফিরে আসার অর্থ হল, দুনিয়াজুড়ে পরাশক্তিগত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রভাববলয় ছিল আমেরিকার। চলতি শতকের শুরু থেকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান চোখে পড়ার পর্যায়ে গেলে এর প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার প্রভাববলয় ভেঙ্গে পড়া শুরু করেছিল। সেই পুরানো প্রভাবে আবার ফিরে আসার চেষ্টার কথা বলা হচ্ছে এখানে। তাও সেটা আবার বিশেষ করে এশিয়ায়; মানে এশিয়ান প্রভাববলয় ফিরে গড়ে নিতে চায় আমেরিকা। কিন্তু সমস্যা হল, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয়ের নিজ আয়ু শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকা যদি নিজেই নিজের আয়ু ধরে টানাটানি করে, তাহলে সেটা ঠেকাবে কে? আসলে সেই টানাটানিতেই আমেরিকান প্রভাব বলয়ের আয়ুর অকালমৃত্যু ঘটেছিল।

বাস্তবতা হল, অন্য মহাদেশের অবস্থা যাই হোক, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয় বজায় থাকার শর্ত এখনো আছে, নিঃশেষিত হয়নি সম্ভবত। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রভাব নেই বা চোখে পড়ে এমন লেবেল থেকে নিচে নেমে গেছে। আর তা মূলত আমেরিকার নিজ ভুল নীতি-পলিসির কারণে। এককথায় সেই নীতিটা হল – দক্ষিণ এশিয়ায় নিজ কথিত “নিরাপত্তা স্বার্থ” ভারতের চোখ দিয়ে দেখার আমেরিকান সিদ্ধান্ত। বিশেষত এশিয়ায় তথাকথিত আমেরিকান নিরাপত্তা্র স্বার্থও নাকি আমেরিকা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে। চলতি শতকের প্রথম দশক থেকেই এটা শুরু হয়েছিল। ভারত নিজের সিকিউরিটি স্বার্থ দেখলে তাতে নাকি আমেরিকান সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা স্বার্থও, মানে ওয়্যার অন টেররের জন্য প্রয়োজনীয় ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ দেখা হয়ে যাবে। ভারত-আমেরিকার বুঝাপড়া নাকি এত গভীর মাত্রার!

কিন্তু এটা আমেরিকার ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ বলে চালিয়ে দিলেও এটা কোনো “নিরাপত্তা” স্বার্থই ছিল না। তাহলে কী স্বার্থ এটা? এটা আসলে ছিল আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর’ [china containment] স্বার্থ। এই এসাইনমেন্ট সে ভারতকে দিয়ে করাতে গিয়ে বিনিময়ে সে ভারতকে এশিয়ায় ভারতের পড়শি কিছু রাষ্ট্রে একটা মাতবরি করতে দিয়েছিল বা প্রশ্রয় দিয়েছিল। যেটা ব্যবহার করে ভারত আজ আসামের জন্য বিনা পয়সার করিডোর ইত্যাদি লুটছে, এটা এর একটা উদাহরণ। কিন্তু আজ সেটাও কমপক্ষে ১২ বছর হয়ে গেল। এর পরিণতি ও ফলাফল কী হয়েছে? সেই স্টক টেকিং বা তাতে আমেরিকার লাভ-ক্ষতি কী হয়েছে, সেই হিসাব বুঝাবুঝি করে নেয়ার সময় হয়ে গেছে।

আমেরিকার বারাক ওবামার দুই মেয়াদ, অর্থাৎ আট বছরের (২০০৯-১৬) সময়কালে উল্লেখযোগ্য দু’টি গুরুত্বপূর্ণ নীতি-পলিসি নেয়া হয়েছিল। এর এক. আরব স্প্রিং আর দুই. চীন ঠেকানো (কন্টেইনমেন্ট)। এর মধ্যে আরব স্প্রিং যা ছিল আল কায়েদা ফেনোমেনার বিস্তার কালে মূলত মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রগুলোতে নির্বাচিত সরকার কায়েম ও এক লিবারেল শাসন কায়েম করার প্রোগ্রাম। সাধারণভাবে এর পরিণতি কী হয়েছে তা এককথায় বললে, আমেরিকার আরব স্প্রিংয়ের প্রোগ্রাম ফেল করেছে। যেটা সামগ্রিকভাবে অন্তত মিসরে ফেল করেছে, একমাত্র তিউনিসিয়া তা এখনো টেকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর বাকি সব মুসলিমপ্রধান দেশেই মূলত আমেরিকার মারাত্মক কিছু “অসততা” প্রয়োগের জন্য তা ফেল করেছে।

এমনিতেই আমেরিকান পলিসি মাত্রই যেন সেটা ঘোষিত পলিসির সাথে সাথে আড়ালে দুই-একটা লুকানো এজেন্ডাও থাকবেই, এটাই হয়ে গেছে আমেরিকান প্রাকটিস। এই লুকানো এজেন্ডা মাত্রই এগুলো মূলত আমেরিকা ন্যূনতম স্বচ্ছতা ও সততা বজায় রাখে না বা পারে না এমন কিছু বাড়তি তৎপরতা। যেমন- লিবিয়ায়, আরব স্প্রিংয়ের নামে গাদ্দাফিকে প্রত্যক্ষভাবে খুন করাই ছিল এর লুকানো লক্ষ্য। অথচ বাইরে বলেছে, আরব স্প্রিংয়ের সংস্কার এর লক্ষ্য। ফলাফল কী হয়েছে? গাদ্দাফিকে নৃশংসভাবে পাবলিকলি খুন করা হয়েছে। কিন্তু তাতে আমেরিকার তেমন কিছুই সফলতা কি এসেছে, তা কেউ বলতে পারবে না।

বরং লিবিয়া এখন হয়েছে রাষ্ট্রহীন এক ভুখন্ড। কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বিভক্ত হয়ে গেছে আর ওয়ার লর্ডদের শহর হয়ে আছে লিবিয়া এখন। আর শুধু তাই না, সেকালের ওবামা-হিলারি ভেবেছিলেন তারাই একমাত্র ও খুবই বুদ্ধিমান আর দক্ষ। কিন্তু না, তা একেবারেই নয়। গাদ্দাফি লিবিয়া থেকে ক্ষমতাচ্যুত ও খুন হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ওবামা-হিলারির কাফফারা দেয়া শুরু হয়েছিল সেই থেকে। পাল্টা চার আমেরিকান – রাষ্ট্রদূত ও তাঁর সহকারী আর সাথে দুই সিআইএ অপারেটর সবাই বেনগাজি এম্বাসির ভিতরেই খুন হয়ে গেছিলেন। আর তা হয়েছিল যারা ওই খুনের পরে আইএস নামে আত্মপ্রকাশ করছিল সেই হবু আইএস, তাদেরই হাতে। ওদিকে প্রায় একইভাবে সিরিয়াও ছারখার হয়ে গেছে। যদিও পুতিনের কারণে প্রেসিডেন্ট আসাদ টিকে গেছে, কিন্তু তার দেশ-রাষ্ট্র সব শেষ, নরক হয়ে গেছে।

এরপরেও এখন কী সব থিতু হওয়া আর পুনর্গঠন কী শুরু হয়েছে? না, তা আসার কোনো আশু সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এমন সিরিয়া থেকেও কোনো লাভালাভ কিছুই আমেরিকা নিজের ভোগে লাগাতে পারেনি। তাহলে এই আরব স্প্রিংয়ের আমেরিকার লাভ হল কী? এদিকে শেষবেলায় এসে ন্যাটো সদস্য তুরস্ক এখন খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধেই সদর্পে দাঁড়িয়ে গেছে। তাহলে স্টক টেকিং এর ফলাফল হল এই যে, আমেরিকান এই প্রকল্পের সবটাই পানিতে গেছে। আর তা গেছে মূলত লুকানো এজেন্ডার কারণে।
তবে অন্য কথা হল, আরব স্প্রিংয়ের তৎপরতার সব বলতে এতটুকুই নয়। আরো যেসব স্টান্ডিং প্রোগ্রাম ছিল ও আছে, সেগুলো রুটিনমাফিক এখনো চলছে বিশেষত, যেসব এম্বাসি-ভিত্তিক প্রোগ্রাম আছে যেগুলো ‘লিডারশিপ’ বা ‘ইয়ুথ’ [Leadership, Youth]- এই শব্দ দুটো সেখানে আছে বা থাকবেই এমন ইউএসএইড ফাইন্যান্সড, এনজিও প্রোগ্রাম সেগুলো।  এগুলো আসলে আরব স্প্রিং প্রোগ্রামের আরও কিছু দিক।  তবে মোটা দাগে বলা যায়, আমেরিকান কোনো পলিসি লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না, মূলত তার ভেতরে প্রায়ই কিছু লুকানো এজেন্ডাও সাথে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে যাওয়া হয়, মূলত এর দায় নিতে যায় বলে।

দ্বিতীয় আমেরিকান পলিসির নাম বলেছিলাম-  চীন ঠেকানো বা কন্টেনমেন্ট। বুশের হাতে শুরু হয়ে দুই বছর চলার পর এটা ওবামার আট বছর ধরে চলে শেষে এই পলিসিও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়। কিসের ভিত্তিতে এই পলিসিকে ব্যর্থ বলছি? প্রথমত, ‘চীন ঠেকানোর’ পলিসি মানে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা চীনের উত্থান ঠেকানো। বুশ-ওবামা এমন উত্থিত চীনের গায়ে ফুলের টোকাও লাগাতে পারেননি। ঠিক যেমন আমেরিকা উত্থিত হয়েছিল উনিশ শতকের শেষ ভাগে (১৮৮৩ সালের দিকে) এবং তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) আগেই;  আজকের চীনের মতই ছিল সেই আমেরিকার উত্থান  – সেকালের কলোনি মালিক ব্রিটেন বা ফরাসিরা এদেরকে ছাড়িয়ে আমেরিকান উত্থান ঘটে গিয়েছিল। অর্থাৎ তারাও আমেরিকার উত্থান কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। সেকালের বুদ্ধিমান আমেরিকানরা বলত এটা এক আমেরিকান সেঞ্চুরির দিন আসতেছে! তাসত্বেও এথেকে কোন শিক্ষা না নিয়ে একালে চলতি শতকে বুশের আমলে আমেরিকার কিছু ‘আবেগি ইমোশনাল ফুল” – নীতিনির্ধারক ভেবেছিলেন তাদের প্রাণপ্রিয় আমেরিকা বুঝি চীনের উত্থান ঠেকিয়ে রাখতে পারবে; অন্তত বেশ কিছুদিন, তাতেই অনেক ফায়দা হবে, আমেরিকার। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় গাধা বা বোকাটা ছিল বারাক ওবামা। আয়ারল্যান্ড সফরে (মে ২০১১) গিয়ে এক পাবলিক বক্তৃতায় তিনি দাবি করেছিলেন “দুনিয়াকে আমরাই এখনও শাসন করে যাব”।  সে যাই হোক, এশিয়ার দুটা রাইজিং ইকোনমি চীন ও ভারত, এদের একটাকে দিয়ে অন্যটাকে ঠেকিয়ে দিতে হবে – আমেরিকা এই কুটনীতির কথা তখনকার তাদের প্রধান শান্ত্বনা ছিল।  মনে করা হয়েছিল, এতে চীনের বদলে এশিয়ায় সবখানে না হোক, অন্তত ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে  চীনের বদলে ও তুলনায় ভারতের প্রভাব বাড়বে, প্রভাব বেশি করা সম্ভব হবে। এতেই চীন ঠেকবে, দমে যাবে ইত্যাদি।

না, বাস্তবে সেসব কিছুই করা সম্ভব হয়নি তা আমরা এখন দেখতেই পাচ্ছি। না আমেরিকা, না ভারত এনিয়ে কিছু করতে পেরেছিল। এর কিছুই হয়নি। ফলে চীনা উত্থান ঠেকানোর দিক থেকেও এই পলিসিও ব্যর্থ অবশ্যই। আবার আমেরিকান পলিসির দিক থেকে এটা শুধু ব্যর্থ হয়ে শেষ হলেও তাও হত। না তা নয়। ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে এখন বাংলাদেশ সহ অন্য যেকোন পড়শি দেশে ভারতের প্রভাব যেমনই থাক এসব রাষ্ট্রের উপর অন্তত আগে আমেরিকার যে ট্র্যাডিশনাল প্রভাব ছিল, সেসবেরও কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। কারণ আমেরিকা তার যাঁতা-কাঠি (আমাদেরকে চাপ দিয়ে করিয়ে নিবার জন্য আমেরিকার যা সক্ষমতা ছিল এরই হাতিয়ার) নিজের কথা ভুলে ভারতকে দিয়ে দিয়েছিল। আর ভারত সেই আমেরিকান ক্ষমতা পেয়েও তা নিজের প্রভাব তৈরিতে কাজে লাগাতে বা নিজের বলয় তৈরিতে তা কাজে লাগানো বা ধরে রাখতে পারেনি। মূলত প্রভাব ফেলতেই পারেনি। চীনের কাছে বারবার প্রায় সবক্ষেত্রেই ভারত হেরে গেছে মূলত দু’টি কারণে। এক বিনিয়োগ সক্ষমতার দিক থেকে চীনের মত ভারত চীনের ক্ষমতার সমান কেউ নয়, এর ধারেকাছের কেউ নয়। আর দ্বিতীয়ত, ভারতের জন্ম থেকেই নেহরু অনুসৃত ‘কলোনিয়াল চিন্তার’ অনুসৃত নীতি ও ব্যুরোক্রাটদের নেহেরু-মানসিকতা। এর সবচেয়ে পারফেক্ট উদাহরণ হল নেপাল।

নেপালে মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সাল থেকে, যা ২০০৭ সালে নেপালি রাজতন্ত্র উৎখাত করে শেষে নতুন নেপাল রিপাবলিকের কনস্টিটিউশন রচনার সমাপ্তির ঘোষণা দিতে  পেরেছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। [আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইয়ের প্রসঙ্গ এটাই ]। এই পুরো সময়ের মধ্যে চীন নেপালের কোন কিছুতেই কেউ ছিল না; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কোনভাবেই সম্পর্কিত কেউ ছিল না। অথচ হঠাত করে ২০১৬ সালের শুরু থেকে চীন নেপালের এক বিরাট ত্রাতা হিসেবে হাজির হয়ে যায়। কারণ, ভারত নেপাল অবরোধ করে বসেছিল। মানে ল্যান্ডলক নেপালকে এতদিন ভারতের উপর দিয়ে সমস্ত আমদানি করা অনুমতি ছিল তা ভারত নিষিদ্ধ করে দেয় এক সীমান্ত অবরোধ আরোপ করে।  মূলত এটাই ভারতের চরমতম ভুল নাড়াচাড়া আর তা থেকে নেপালি প্রতিটা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ভারতকে প্রচণ্ডভাবে সবচেয়ে ক্ষিপ্ত ও ঘৃণা  অপছন্দ করতে শুরু করেছিল। কারণ নেপাল জ্বালানিতে বিশেষ করে রান্নার গ্যাসে শতভাগ ভারতের উপর নির্ভরশীল। তাই পণ্য অবরোধে জ্বালানির অভাবে গরীব মানুষ ও নারীদের জীবন সবচেয়ে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। অথচ মাওবাদীদের কাজ ও রাজনীতি – “নতুন নেপাল” গড়া  – এই কাজটা সহজ করে দিয়েছিল কিন্তু আমেরিকান সরকারই।

নেপালের শেষ রাজা ও তাঁর অকেজো প্রশাসনের সাথে  পুরনো সব রাজনৈতিক দলের সবার সাথেই রাজার ওয়ার্কিং রিলেশন ভেঙে পড়ায় ত্যক্ত-বিরক্ত অবস্থায় আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিশ্চান রাকা নেপাল সফরে এসেছিলেন। আর সেখানেই তিনি পাল্টা মাওবাদীদেরকেই পছন্দ করে বসেন। কেন? কারণ এরা বাস্তববাদী ও কাজবুঝা লোক, বোকা কমিউনিস্ট নয়। এমনকি সেখান থেকেই, আমেরিকানদের কারণে ও তাদের মধ্যস্থতায়  ভারতকে দিয়েও মাওবাদীদের  গ্রহণ করানো কাজটা সহজ করে দিয়েছিল। আমেরিকান সেই উদ্যোগের কারণের ২০০৬ সালে মাওবাদীরা সশস্ত্রতা থেকে গণ-আন্দোলনের ধারায় শিফট করে ফিরে এসেছিল এবং নেপালের সব দল মিলে গণ-আন্দোলনে রাজাকে পরাস্ত করে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। তবে আমেরিকা মাওবাদীদের সাথে কাজ করা সম্ভব মনে করেছিল মূলত যে কারণে তা হল, এরাও মাওবাদী বটে কিন্তু অন্তত কম্বোডিয়ার খেমাররুজ নয়। কেউ কিছুর মালিক মাত্রই তাঁর গলা কাটতে হবে এটা তাদের নীতি ছিল না। এছাড়া কথিত “সমাজতন্ত্র” ধারণার কোন ফ্যান্টাসিও এদের নেই। বাস্তবে এরা  রাজতন্ত্র উতখাত করে নাগরিক অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়। এই শেষের লক্ষ্যটাই আমেরিকানদের আকৃষ্ট করে ধারণা বদলে যায়। আর সম্ভবত তা কিছুটা ভারতকেও। যদিও এখনও ভারতের মাওবাদীরা নেপালি মাওবাদীদের থেকে এলাবারেই আলাদা থেকে যায়।

এসব কারণেই  আমেরিকান মধ্যস্থতা মেনে এমনকি ভারতও পুরানো রাজার হাত ছেড়ে মাওবাদীসহ নেপালি অন্যান্য দলের পক্ষে বিরাট ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল। যেমন মাওবাদীরাসহ রাজাবিরোধী সব দলের নিজেদের মধ্যে রাজা উতখাতের কর্মসুচী ফাইনালের রফা-চুক্তির গোপন বৈঠকগুলো সব ভারতের আয়োজনে ও নিরাপত্তায় এবং ভারতে সম্পন্ন হয়েছিল। সেটা ছিল ভারতের দিক থেকে দেওয়া এক ব্যাপক ও খুবই ক্রুশিয়াল সহযোগিতা। কিন্তু রাজা উৎখাতের পরে নেপালে রাষ্ট্রগঠনের কালে ভারত কাকে নিজের প্রভাবাধীন করে নেয়া যায়, এমন দল বা গোষ্ঠী খুঁজতে লেগে গিয়েছিল। এ ছাড়া রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক লাভালাভের উইন-উইন সিচুয়েশনের পথে না গিয়ে ভারত কলোনিয়াল মাস্টারের ভূমিকা ও সম্পর্ক চেয়ে বসেছিল। অথচ ভারতের জন্য এগুলোর কোন প্রয়োজনই ছিল না। কিন্তু তাতে কী? ভারতের মাথায় মডেল হিসেবে ঘুরছিল ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তিটা।

কারণ, সেটা ছিল আসলে এক কলোনি-চুক্তি। সেভাবেই এটা লেখা হয়ে আছে। ভারত বুঝতেই পারল না ১৯৫০ সাল আর ২০১৫ সাল এক নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়া থেকে কলোনি উঠে গিয়েছিল কেন? অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকা কেন ব্রিটিশদের কলোনি মাস্টারের ভূমিকাতেই নিয়ে মাঠে নেমে যায় নাই কেন? আমেরিকা কী বোকা ছিল? আর নেহেরু খুব চালাক! আসলে জাতিসঙ্ঘ কেন ও কিসের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, এটাও নেহরুর কখনোই বোঝা হলো না, বুঝতেই পারেননি তিনি। ফলে পরবর্তীকালের সারা ইন্ডিয়ারও পলিটিক্যাল জগৎটাও নেহেরু-বুঝের দুনিয়া হয়ে থেকে গেছে। আর এখন তো সবকিছুই বুঝাবুঝির বাইরে চলে গেছে। বরং উল্টো ভারতের নেহরু ডিপ্লোমেসির চোখে  – তারা নেপাল বা ভুটানের সাথে ব্রিটিশ কলোনিয়াল শক্তিদের মতোই ভারত চুক্তি করতে সফল হয়েছিল – এটাকেই সাকসেস মনে করা হয় এখনও।

নেপাল ২০১৫ সালে নতুন কনস্টিটিউশন চালু ঘোষণা করলে কলোনি-মডেল মনের ভারত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। তারা ভারতের উপর দিয়ে নেপালের পণ্য আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল। আর সেকালে ভারতের ওপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া নেপালের মানুষের বাইরে বের হওয়ার আর কোন বিকল্প পথ ছিল না। আর সেই থেকে প্রথম দৃশ্যপটে চীনের আগমন। ভারতের উলটা দিকে নেপালের অপর সারা উত্তর সীমান্তে চীন ছিল-আছে বটে, কিন্তু সেদিকে রাস্তাঘাট বলতে তেমন কিছু ছিল না। যেটুকু টিমটিমা ছিল তাও ঐ জমানায় ঘটা ভুমিকম্পের পরে পাথর চাপায় বন্ধ হয়ে গেছিল। বরং সেকালে চীনের অভ্যন্তরে যেসব নতুন হাইওয়ে রেল নেটওয়ার্ক সুবিধা তৈরি হচ্ছিল, তাতে যুক্ত হতে গেলে রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় শত কিলোমিটার নতুন কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ তৈরি করে নিতে হবে – এই ছিল অবস্থা । ২০১৫ সালের পরে ভারতের বেকুবিতে সেসব কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ একালে এখন তৈরি করে নেয়া হয়েছে। ভারত থেকে একটা দিয়াশলাইও আমদানি না করে নেপাল এখন সহজেই চীনের বন্দর ও চীনের ভেতর দিয়ে বা চীন থেকে জ্বালানিসহ সব পণ্য আনতে পারে। আবার নেপালের নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে ভারত ছাড়া অন্য কাউকে।

ভারতের হাতে সব দিয়ে দিয়ে, সব প্রভাব হারানো আমেরিকা গত মাস থেকে এখন নতুন করে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও নেপালের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক তৈরি করার চেষ্টা শুরু করেছে। যদিও সম্প্রতি নেপাল আমেরিকার ৫০০ মিলিয়ন ডলারের অনুদান প্রস্তাব অনুমোদন করে নাই। অর্থাৎ সেই আমেরিকা এখন সব হারিয়ে আবার নেপালে প্রবেশ করতে স্ট্রাগাল করছে। যেটা মূলত চীনের প্রভাব টপকাবার জন্য আমেরিকার এক স্ট্রাগল। তবে অবশ্যই এবার আর ভারতের হাত দিয়ে খাওয়া নয় অথবা ভারতের চোখ দিয়ে দেখা নয়- সবই আমেরিকার নিজের ও সরাসরি উদ্যোগ। বরং চীনের সাথে একটা প্রতিযোগী মুডে আমেরিকা লড়তে চাইছে। এই ঘটনার প্রমাণ থেকে মনে হচ্ছে, আমেরিকা ফেরত আসার চেষ্টা করছে অবশ্যই। আর ভারতের হাত দিয়ে খেতে চাওয়া পুরনো আমেরিকার একটা ভাল শিক্ষা হয়েছে এতে, তা দেখাই যাচ্ছে। একই রকম আবার ওদিকে শ্রীলঙ্কা?

শ্রীলঙ্কায় নির্বাচনে সরকার বদলের সাথে সাথে সেখানে খুবই নোংরাভাবে ওদেশের দলগুলো চীন অথবা ভারতমুখী হয়ে যাচ্ছিল। যেটা স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মেরুদণ্ডহীন দুর্দশাকেই প্রকাশ করে আসলে। এরপর গত সরকারের শেষ দিকে তারা সেবার ভারত-চীন ছেড়ে আবার আমেরিকামুখী হয়ে যায়, মানে আমেরিকাকেও উন্নয়ন প্রজেক্ট দিয়েছিল। আগের চীনা-পছন্দ রাজা পাকসে – তাঁর ভাই এবারের নির্বাচনে জয়ী হন ও সরকার গড়েন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসার পর, এখন আমরা রিপোর্ট দেখছি নতুন সরকার আমেরিকান প্রজেক্ট স্থগিত করে দিয়েছে [চীনমুখি শ্রীলঙ্কা এখন, আমেরিকার মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প স্থগিত] করেছে। প্রায় একই দশা দেখা গেছে মালদ্বীপেও। আসলে এগুলো মূলত দুর্বল সরকার ও সরকার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির লক্ষণ।

মূল কথাটা হল – রাষ্ট্রস্বার্থকে দল বা ব্যক্তিস্বার্থের অধীন করে ফেলা অথবা সেকেন্ডারি করে ফেলা থেকে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। কোনো বিদেশী সরকারকেই নিজের সরকার ও ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ এই স্তরে ঢুকে পড়তে এলাও করা একেবারেই অনুচিত। নিজের ক্ষমতায় থাকা বা ফিরে আসার সুবিধার কথা ভেবে কোন সরকার একবার এ কাজ করে বসলে- চীন, ভারত বা আমেরিকা এ তিন রাষ্ট্রকে দূরে রাখা ঐ রাষ্ট্রের জন্য খুবই কঠিন হয়ে যায়। তবে আমাদের জন্য এখন প্রাসঙ্গিক বিষয় হল, আমেরিকা নিজের কর্তৃত্ব-আধিপত্যের দণ্ড একবার ভারতের কাছে দিয়ে দেয়া অথবা খোয়ানোর পর এখন এসব দেশেই নতুন করে নিজের ক্ষমতার বলয় বানাতে চেষ্টা করতে নেমেছে আমেরিকা। এগুলোও আমেরিকার ফিরে উঠে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টার নমুনা বলা যায়।

তবে ২০১৬ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আগের ওবামা সরকারের আমেরিকার ভারতকে দেয়া বিশেষ সুবিধা (যেমন চীন ঠেকানোর জন্য খোদ বাংলাদেশকেই ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল)। এছাড়া যেমন- আমেরিকায় শুল্কমুক্ত রফতানির সুযোগ পেত ভারত। সেগুলো সুবিধা সব সমূলে প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প। উল্টা শাস্তিমূলকভাবে ভারতের রপ্তানির উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করেন যা কার্যত আমেরিকায় ভারতের রফতানির সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প।

আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সবকিছুই এখন ভারতের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু কোন কর্তৃত্বই আর আমেরিকার হাতে বা ভাগে নেই বললেই চলে। তবে গত অক্টোবরে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমান্ত বরাবর ভারতকে রাডার বসানোর চুক্তি করার পর থেকে আমেরিকা কিছুটা তোলপাড় দেখানো শুরু করেছিল। কিন্তু সেটাও হঠাৎ করে এ বিষয়ে আবার সবকিছু নিশ্চুপ দেখা যাচ্ছে। তবে সারকথায় – নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব ফিরে পেতে আমেরিকা আবার সব দেশেই তৎপর হতে চেষ্টা করছে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

ওদিকে আমেরিকাকে পালটা শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল সম্ভবত পাকিস্তান। আর মূলত সেই পাকিস্তানেই এখন আমেরিকা আবার ফিরে যাচ্ছে। আগের মতই সামরিক সহযোগিতা ও ট্রেনিং দেয়ার এক লম্বা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।

গত ২০১৬ জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথ নেয়ার পর থেকে পাকিস্তানের ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা নিয়ে প্রায় তেড়ে এসেছিলেন ট্রাম্প। অবস্থা এমন যেন আমেরিকা নিজেই না বরং পাকিস্তানই আমেরিকাকে আফগানিস্তানে হামলা করতে ডেকে নিয়েছিল। তাই পাকিস্তান আমেরিকার সব দুঃখের জন্য দায়ী এমন ভাব ধরেছিল ট্রাম্প। অর্থাৎ আমেরিকা না, পাকিস্তানই সব কথিত “টেররিজমের” জন্য দায়ী। যেন আফগান তালেবানের তৎপরতা বহাল আছে; পাকিস্তানের কারণেই। এমনই ছদ্ম অভিযোগে আমেরিকান প্রতিশ্রুতির ৬০০ মিলিয়ন ডলার হঠাৎ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প। আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্ক সবচেয়ে নেতি ও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছিল। এসব ঘটনা সবই পাকিস্তানের গত নির্বাচনের (জুলাই ২০১৮) আগের ঘটনা। কিন্তু পাকিস্তানও শক্ত অবস্থান নিয়ে আমেরিকা থেকে দূরে সরেছিল আর তা পাকিস্তানের সেনা-সিভিল ক্ষমতা্র এক সাথে নেয়া সিদ্ধান্তে। আর ততই আমেরিকা পাকিস্তানকে দোষারোপ করে চলেছিল চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতার জন্য, গোয়াদর বন্দর প্রকল্পের জন্য।

আসলে গত সরকারের (২০১৮ সালের আগের) আমল থেকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা খুবই খারাপ জায়গায় ঠেকেছিল। তাই নতুন নির্বাচিত ইমরান খানের  উপর আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রধান মাইক পম্পেও যেন গোলা ছুড়ছিলেন, যখন তিনি বললেন, আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের থেকে লোন নিয়ে ইমরান খান চীনের লোন পরিশোধ করতে পারবে না। ক্যাম্পেইন তখন এমনই চরমে উঠেছিল। অথচ চীনা লোনের কিস্তি পরিশোধের সময়কাল শুরুই হয়নি এখনো, হবে ২০২৩ সাল থেকে। যা হোক, শেষে সবই থিতু হয়েছে এখন। পাকিস্তানের প্রয়োজনীয় সব ঋণ সে একাই চীনের থেকে পেতে পারত, কিন্তু ইমরান খান এর পুরাটা নিতে চাননি। কারণ, পশ্চিমা বাজার এই খবরটা ভালোভাবে নিবে না। বাজারকে আস্থায় আনা সমস্যা হবে, এছাড়া আমেরিকান প্রপাগান্ডার ত উপস্থিত থাকবেই। তাই বাজারের আস্থা পেতে লোনের একটা অংশ প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার  পাকিস্তান সেটা আইএমএফের থেকেই সংগ্রহ করেছিল। কারণ আইএমএফ জড়িত ও তার রেকমেন্ডেশন হলে বাজার আস্থা পাবে। হয়ে ছিলও তাই। তাই আজ? গত পরশুর রিপোর্ট – আইএমএফ, পাকিস্তানি সরকারের উদ্যোগের উচ্ছসিত প্রশংসা করে বলছে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সঠিক রাস্তায় উঠে পড়েছে [Pakistan’s economic reform program is on track. ]। কিন্তু মনে রাখতে হবে  ইমরান খান এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আমেরিকার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই।

তবে আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের সব উত্তেজনা ঠাণ্ডা হয়ে যায় মূলত আমেরিকার আফগানিস্তান থেকে শেষ সৈন্যকে নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থেকে। ওবামা ২০১৪ সালে মূল অংশটা নিয়ে গেলেও দশ হাজারেরও বেশি একটা সামরিক ব্যাচকে রেখে গেছিল ট্রেনিং এর নামে। এবার ট্রাম্প এদেরকেও আরামে দেশে ফিরিয়ে নিতে  আমেরিকার তালেবানদের সাথে চুক্তি করতে গিয়ে দেখেছিল যে পাকিস্তানের সহযোগিতা ছাড়া এটা অসম্ভব। আর এই চুক্তি আমেরিকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করাতে তাদের আমেরিকা-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সমপর্ক আবার উষ্ণ করে নিতে চায় ট্রাম্প। পাকিস্তানের উপর আস্থা রাখা যায় ও তা খুব গুরুত্বপুর্ণ, এই হুঁশ থেকে আমেরিকা পাকিস্তান সম্পর্ক নরমাল হতে শুরু করেছে। আর সেখান থেকে সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে গভীর হতে চলেছে। এটাকেই ‘দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন নীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন’ বলছেন অনেকে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টও তা সরাসরি নিজেও বলছে [U.S. to resume military training program for Pakistan: State Department]।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়ানো, আবার পুরো কর্তৃত্ব নেয়া, সবাইকে সাহায্য করা ছাড়াও আর যেসব নীতিগত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আমেরিকা যুদ্ধের নেতৃত্ব নিতে রাজি হয়েছিল সেটা হল – নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ভুখন্ড শাসক কে হবে এর নির্ধারণের হকদার একমাত্র ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দা কোন রাজা বা কলোনি দখলদার নয় – এই নীতির ভিত্তিতে জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া। পাঁচ ভেটো সদস্যের জাতিসঙ্ঘের সবাই (ফ্রান্স বাদে সে তখন হিটলারের দখলে ছিল তাই, পরে স্বাক্ষর দিয়েছিল) এসব কথা লেখা এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সম্মতি দিয়েছিল ১৯৪২ সালে্র ১ জানুয়ারি। এটাকেই পরবর্তিকালে “জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা” বা Declaration বলে মানা হয়। কিন্তু নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকার মেনে চলার বাধ্যবাধকতা কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মাওয়ের চীন (যারা ঐ পাঁচের মধ্যে দুই ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন সদস্য) পরবর্তীকালে মানেনি বা নিজ রাষ্ট্রে কখনো চর্চা  করেনি।  একালে এখন চীনা অর্থনৈতিক উত্থান একটা বাস্তবতা, দুনিয়ার অর্থনৈতিক নেতা সে। কিন্তু চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রসঙ্গ? এর ভবিষ্যত অন্ধকার!

স্পষ্ট করেই বলা যায়, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকারের বাইরে থাকা বা থেকে চীনের পক্ষে দুনিয়াকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়া অসম্ভব। বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে শুরু হওয়া আমেরিকার নেতৃত্ব  – এর সেই ভূমিকা ঠিক একারণেই সহসা দুনিয়া থেকে চলে যেতে গিয়েও যাবে না, যাচ্ছে না। এটাই বারবার আমেরিকার নেতৃত্বে ফিরে আসার শর্ত জাগিয়ে রাখছে, রাখবে।

তাহলে আমেরিকা কি আগের মতোই বাংলাদেশেও কোন প্রভাব কর্তৃত্ব নেবে, এমন ভূমিকায় ফিরে আসবে? অন্তত নিজেও চীনের পাশে একটা শেয়ার নিবে?  আর বলাই বাহুল্য- জুতা খুলে ঘরে ঢোকার মত এবার ভারতকে বাইরে রেখে আসবে; এবার আর ভারতকে ভুলেও সাথে আনবে না? বিষয়গুলো এখনো আনসেটেল্ড, অবশ্যই! তবে বড় অক্ষরে এর একটা শর্ত লিখে দেওয়া যেতে পারে – এশিয়ায় আমেরিকা ফিরতে চাইলে ভারতের হাত ছেড়ে দিয়ে আসতে হবে। যাতে সবাই বুঝে যে আমেরিকা আগের সিদ্ধান্তের ভুল কারেক্ট করছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে এশিয়ায় আমেরিকার ফিরে আসা এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

মোদী-অমিতের হারের চিহ্ন স্পষ্ট হচ্ছে

মোদী-অমিতের হারের চিহ্ন স্পষ্ট হচ্ছে

গৌতম দাস

২৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2PW

Modi-Amit from swarajyamag.com

নেক হয়েছে। এই অঞ্চলকে অনেকদূর বেপথে নিয়েছেন। এবার মোদী-অমিত, আপনাদের হার শুরু। আপনাদের হারের  চিহ্ন চারদিকে ফুটে উঠতে শুরু করেছে! আপনি পেছন ফিরে পালাতে চাচ্ছেন, নরেন্দ্র মোদী! মোদি-অমিতের সেই পিছু হটে পালানোর চিহ্ন চারদিকে ফুটে উঠছে, মানুষ মুখ ঘুরিয়ে নেয়া শুরু করেছে। আপনারা হার মানছেন এমন সব চিহ্ন ফুটে উঠছে। বুঝব কিভাবে?

চিহ্ন একঃ মোদী-অমিতের সরকার এবার পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসে.) সকালে অনেকগুলো উর্দু ও হিন্দি পত্রিকায় সরকারি বিজ্ঞাপন ছাপানো হয়েছে – শিরোনামে “গুজব ও অসত্য তথ্য ছড়ানো হচ্ছে” (“rumours and incorrect information being spread”.) । কিন্তু কোনটা গুজব আর অসত্য? বলতে পারছে না।  দাবি করছে যে, ভারতজুড়ে এনআরসি করা হবে – এমন কোন সরকারি ঘোষণা নাকি এখনও দেয়া হয়নি।  এই ডিটেইলটা ছাপা হয়েছে  ভারতের ইংরাজি ওয়েব পত্রিকা scroll.in. লিখেছে, [On Thursday morning, the Modi government put out advertisements in multiple Hindi and Urdu papers alerting people about “rumours and incorrect information being spread”.]

এতে মিডিয়াজুড়ে তোলপাড়ে প্রায় প্রত্যেক মিডিয়ার প্রতিক্রিয়া হয়েছে এই যে, আগে কবে কোথায় অমিত শাহ ‘ভারতজুড়ে এনআরসি করা হবে’ বলে ঘোষণা করেছিলেন সেসবের রেফারেন্স প্রমাণ তুলে এনে রিপোর্ট ছাপানো শুরু হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বরাত দেয়া হয়েছে অমিত শাহের নিজের টুইট অ্যাকাউন্ট থেকে করা টুইটকে। সেখানে বলা হয়েছিল, “ভারতজুড়ে এনআরসি আমরা নিশ্চিত করব”।
এরপরও ঘটনার এখানেই শেষ নয়। আবার অমিত শাহরা আরও বড় করে নিজেদের বেইজ্জতি ডেকে আনতে তাঁরা এবার সেই পুরান ১১ এপ্রিলের টুইটই মুছে ফেলেছে। আসলে বিরাট এক কেলেঙ্কারির অবস্থায় এখন বিজেপি। আনন্দবাজার থেকে টুকে আনা সেই টুইটটা [নিচে স্কান কপি দেখেন] ছিল এরকমঃ “We will ensure implementation of NRC in the entire country. We will remove every single infiltrator from the country, except Buddha, Hindu and Sikhs: @Amitshah #NaMoForNewIndia

চিহ্ন দুইঃ মমতার তৃণমূল কংগ্রেস দলের হয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদের নেতা হিসাবে সংসদে দলের স্বার্থে লিড ভুমিকা নেন আর ইস্যুগুলো দেখাশোনা করেন তৃণমূল এমপি ডেরেক ও ব্রায়েন। তিনি টুইট করে লিখেছেন, “বিজেপির আইটি সেল টুইট মুছে দিতেই পারে। কিন্তু সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সব রাজ্যে এনআরসি হবেই। তা মুছতে পারবে না ওরা”। কথা সত্য, সংসদের রেকর্ড মুছবার ক্ষমতা কোনো একটা দলের নেই।

উপরের এই টুইট-টাই এখন মুছে দেয়া হয়েছে যা ছিল গত ১১ এপ্রিলে লেখা।   আর প্রায় কাছাকাছি একই ভাষ্যের ২২ এপ্রিল লেখা অমিতের আর এক টুইট  এর কপি বরাত দিয়ে  স্ক্রোল [scroll.in] পত্রিকা দেখাচ্ছে সেখানেও অমিত শাহ সারা ভারত জুড়ে এনআরসি করার কথা বলছেন। যেমন নিচে  দেখেন তা হল,
First, we will bring Citizenship Amendment Bill and will give citizenship to the Hindu, Buddhist, Sikh, Jain and Christian refugees, the religious minorities from the neighboring nations.
Then, we will implement NRC to flush out the infiltrators from our country.

এছাড়া গত অক্টোবরের ১ তারিখে কলকাতায় বক্তৃতা দিতে এসে অমিত শাহ বলেছিলেন, সারা ভারতে এনআরসি করে খুঁজে খুঁজে কিভাবে তেলাপোকা উইপোকা অনুপ্রবেশকারী (মুসলমান) মেরে তিনি  তাড়িয়ে দিবেন। সেই বর্ণনা দিয়ে ভোটার উত্তেজিত করার সহজ পথ নিয়েছিলেন। আজ মিডিয়াগুলো সেই রেফারেন্সটাই বের করে সরকারকে আরও বেইজ্জতি করেছে।

তাহলে এত জায়গায় রেফারেন্স থাকা সত্ত্বেও এবং এমন রেফারেন্স যা লুকানো বা মুছে ফেললেও, তা জানাজানি হয়ে যাবে – এসব জানা সত্ত্বেও মোদী-অমিতের সরকার এমন মিথ্যা কথা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বলতে গেল কেন?

এর সোজা মানে হলে মোদী-অমিতেরা এমন বিপদের জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে তাদের হাতে কিছুই নাই। তাই “যদি লাইগা যায়” ধরণের কামকাজ শুরু করেছে – এমনই দশা।  খড় কুটো আঁকড়ে ধরছে।  বিশেষ করে এনআরসির সাথে নাগরিক বিলের কোন সম্পর্ক নাই একথা যদি পাবলিককে বিশ্বাস করাতে পারে আর তাতে যদি একথা মেনে নিয়ে রাস্তার আন্দোলন কিছু থিতু হয় এই হল অমিতদের শেষ আশা।
অর্থাৎ পাবলিক ঠান্ডা করার এর চেয়ে ভাল ও আস্থাবাচক কোনো বক্তব্য-হাতিয়ার বিজেপির কাছে নেই। আর এটাই মোদী-অমিতের হেরে যাবার সবচেয়ে বড় চিহ্ন। মোদি-অমিত এতই ফেঁসে গেছেন যে, এর চেয়ে ভাল বা বেশি বিশ্বাসযোগ্য বক্তব্য তাদের হাতে নেই। এ ছাড়া সরাসরি মিথ্যা বলা বা প্রপাগান্ডা করে সদর্পে মিথ্যা বলার দিকে বিজেপির ঝোঁক আগেও ছিল আমরা দেখেছি। তারা মনে করে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করে অনেকদূর যাওয়া যায়, কেবল পাক্কা ব্যবহারকারি হতে হয়। যেমন সেই অর্থে ভারতের মুসলমানেরা বিজেপির আসলে কোনো শত্রু না, তা তারা জানে। বরং অ্যাসেট। কিভাবে? কারণ মুসলমানদের নামে ঘৃণা ছড়িয়েই তো কেবল হিন্দু-ভোট পোলারাইজ করে বিজেপি নিজের বাক্সে ঢুকাতে পারে! মুসলমানেরা না থাকলে সে কার ভয় দেখাত বা কার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াত। আর এটাই তো বিজেপির রাজনীতির কৌশল।

বোকা অমিতের স্ববিরোধী দাবি
সবাই জানি বিজেপির চোখে আমরা মুসলমানেরা সব উইপোকা তেলাপোকা, তুচ্ছকিট; তাই সারা ভারত জুড়ে এনআরসি করে মুসলমানদের খুঁজে খুঁজে বের করে তাড়িয়ে দিবে। বিশেষ করে কেন তাড়িয়ে দিবে? কারণ নাকি মুসলমানেরা স্থানীয়দের কাজ বা চাকরি সুযোগ নিয়ে নিচ্ছি। তা ভাল, কী আর বলা। এনআরসির সপক্ষে আপাত চোখে যুক্তির বিচারে সবচেয়ে ভাল যুক্তির বক্তব্য মনে হয় এটাই।
কিন্তু অমিত শাহ আপনার কপাল খারাপ। কারণ আপনার দিল সাফ নাই। অনৈতিক ও অসততার উপর দাঁড়ানো আপনার কথা। তাই আজ না হলে কাল আপনি ধরা পড়ে যাবেন। এবং গেলেন। কীভাবে?
আপনি এখন বলছেন বাংলাদেশসহ আরও তিন দেশ থেকে মূলত হিন্দুদের নিয়ে এসে আপনি ভারতের নাগরিকত্ব দিবেন এজন্য নতুন বিল এনেছেন। যদিও ঐ তিন দেশ থেকে কোন মুসলমান আসলে এই সুবিধা আপনি তাদের দিবেন না। মুসলমানবিদ্বেষী আপনি আমরা জানি তাই এনিয়ে এখানে কোন কথাই তুললাম না।
কিন্তু লক্ষ্য করেন আপনাদের দাবি হল কেউ মুসলমান হলেই সে ভারতের বাইরের লোক, আর এবার দাবি করতে থাকা যে এরা ভারতের বাসিন্দাদের চাকরি বা কাজ নিয়ে নিচ্ছে বলে আপনারা এনআরসি করছেন তাদের তেলাপোকার মত তাদের ভাগাবেন বলে তোলপাড় করে তুলছেন। তাহলে আবার বাংলাদেশসহ তিন দেশ থেকে সেখানকার হিন্দুদের নিতে চাইছেন কেন? হিন্দুরা কী ভারতে গিয়ে মূলত হিন্দুদের কাজ চাকরিতে ভাগ বসাবে না? তাহলে এনআরসিতে লোক খেদানো আবার নাগরিকত্ব বিলে লোক আমদানি এদুইয়ের রহস্য কী বা এই স্ববিরোধীতা কেন? তাহলে অন্তুত এতটুকু সৎ হয়ে বলেন যে “বিদেশিরা কাজ-চাকরি নিয়ে নিচ্ছে” একথা সত্য না। সত্যিই, হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক মাহাত্ব সাংঘাতিক!

আসলে এখনকার ভারতের পরিস্থিতি নিয়ে বিজেপির ভিতরের মূল্যায়ন হল, একটু কৌশলে ভুল হয়ে গেছে, সেটা সংশোধন করে নিতে পারলে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। সেই ভুলটা হল, সারা ভারতে এনআরসি করার কথা আগে না বলে আগে কেবল নাগরিকত্ব সংশোধিত বিল পাস করে নিতে হত, বিজেপিকে। এতে মুসলমান বাদে সব ধর্মের বললেও মূলত অন্যদেশের হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিয়ে নিলে এরপরেই কেবল সারা ভারতে এনআরসি করার কথা তুলতে হত। তাহলে আজ যেভাবে ভারতের শহরের পর শহর নাগরিকত্ব বিল নিয়ে উত্থাল হয়ে উঠছে সব উপড়ে ফেলতে শুরু করেছে, সেটা নাকি হত না। এই হল তাদের মুল্যায়ন। কিন্তু  এটা অবশ্যই তাদের মন-সান্ত্বনা!
বাস্তবতা অনেক গভীরে চলে গেছে, যার খবর আর বিজেপি নিতে পারবে না। কেন? ভারতের সাধারণ মানুষই বা মোদী-অমিতের উপর এত খেপে গেল কেন?

সমাজতন্ত্র নিয়ে আমরা জানি অথবা আমাদের অনেক প্রত্যক্ষ আছে। এর গালগল্প শুনিয়ে আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ বিশেষ করে একেবারে গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ হয়েছিল এর সবচেয়ে ভুক্তভোগী, কষ্টভোগী এবং ভিকটিমও বলা চলে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দাঁড়িয়ে বললে, উনিশশ ষাট সালের মধ্যেই যাদের জন্ম বা চুয়াত্তর সালের মধ্যেই যাদের টিনএজে প্রবেশ ঘটেছিল এদের সরাসরি সচেতন অভিজ্ঞতা আছে কিছু শব্দের যেমন রেশন, টিসিবি, আর কিছু স্মৃতি – ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের হাহাকার। এক পিস সাধারণ লাইফবয়  সাবান কিনতে পারার জন্য কয়েক ঘণ্টার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। আর তাতে রেশন, লাইনে দাঁড়ানো আর সমাজতন্ত্র হয়ে উঠেছিল প্রায় সমার্থক শব্দ। আর মানুষের জীবনীশক্তি কেড়ে নিয়ে তাকে হতাশ করে ফেলার জন্য এর চেয়ে সহজ উপায় আর হয় না।  মানুষ ভাত জোগাড়ের চেষ্টা করবে না লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবে? জীবনের উদ্দেশ্যই বা আসলে কী? কোন কিছুর সদুত্তর কারও জানা ছিল না।
সৌভাগ্যবশত মোটামুটি পঁয়ষট্টি সালের পরে যাদের জন্ম এরা টিনএজে এসে এদের আর রেশন, লাইন দেখতে হয়নি। জিয়ার আমল প্রায় শেষ করে এসে এটা আস্তে আস্তে এর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। এতে অন্তত  রাষ্ট্র  পরিচালনাকারি সরকার আর সাথে গরিব জনগণও সবারই বুঝাবুঝিতে আক্কেল হয়ে যায় যে রেশন-সমাজতন্ত্রে দেশ চালানো কী জিনিস! আর একালে এসে ট্রাকে করে চালবিক্রির চাল কেনাতে মানুষ উৎসাহী হয় তখনই যখন এতে যে পরিমাণ পয়সা বাঁচে তা অতিরিক্ত সময় ব্যায়ের তুলনায় লাভজনক বিবেচিত হয়, কেবল তখন। আসলে সেকালে পরিবারে বাড়তি সদস্য থাকত যাদের লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে অফুরন্ত সময়ও সম্ভবত থাকত ফলে পোষাত; কিন্তু এমন দিন আর এখন সমাজের ভিতরেই তেমন নেই। কিন্তু লক্ষ করা গেছে যে, কোনকালের নীতিনির্ধারকেরা মানুষের এই কষ্টের দিকটা আমল করেছেন, গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছেন – না, কোনোকালেই এমনটা দেখা যায় নাই।
বরং দেখা যাচ্ছে, এ বিষয়ে ভারতের মোদীর সরকার সবচেয়ে গোঁয়াড় আর দানব। একালে এই ২০১৬ সালে নোট বাতিলের ঘটনাটাকেই দেখেন। এই নোট বাতিলকে কেন্দ্র করে মোদী মানুষকে বাধ্য করেছিল – কাজকাম ধান্ধা ফেলে সকলে ছুটেছিল নোট বদলাবার জন্য ব্যাংকে লাইন ধরতে। মানুষের মুল ওয়ার্কিং আওয়ার নষ্ট করে দেয়া মানেই গরীব মানুষের সরাসরি আয়-ইনকামে ক্ষতি করে দেয়া। অথচ এই ক্ষতিটাই অবলীলায় করা হয়েছে। বিশেষ করে গরিব-মেহনতি মানুষের যে আয়ে ক্ষতি এর কোনোই ক্ষতিপূরণ নিয়ে কারও কোন বিকার নাই – ব্যাপারটা মোদী বা তাঁর নীতিনির্ধারকদের আমলেই নেই। অথচ কথাটা হল, সরকার যা দিতে পারে না, মুরোদ নেই, তা সরকার অন্তত কেড়েও নিতে পারে না। যোগ্যতা থাকতে পারে না। চাকরি বা আয়ের সুযোগ দেয়ার কথা সরকারের। তা না দিতে পারলে অন্তত আয়ের সুযোগ কেড়ে নেয়া সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাজ হতে পারে না। অথচ মোদীর সরকার-প্রশাসন এদিকটা আমল না করেই, কোন বিকল্প বা ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা না করেই  নোট বাতিলের পথে গেছিল।
আর ঠিক একই সেই জিনিস ঘটিয়েছে  আসামের প্রশাসন ও মোদী । এনআরসির নামে দীর্ঘ ছয় বছর (২০১৩-১৯) ধরে মানুষকে প্রায়শই তাদের জীবন লাইনে দাঁড় করিয়ে পার করেছে। এখনও যা শেষ হয় নাই, সমাধান নাই। আর এর চেয়েও বেশি কষ্টকর অমানবিক অবস্থায় ফেলেছে ডকুমেন্ট জোগাড়ের ছোটাছুটি আর মানসিক অনিশ্চয়তা – যদি তালিকায় নাম না উঠে? একে তো গরিব মানুষ ভাত জোগাড়ে সব সময় হিমশিম খায়, সেখানে তাঁদের কোনমতে বেচে থাকা জীবনে এর চেয়েও প্রধান শঙ্কা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তালিকায় নাম ঊঠানো বা, নাগরিকত্ব হাসিল করা!  ভাতের অভাবের চেয়ে এ’এক কঠিনতর শাস্তি! অথচ যে এই শাস্তির আয়োজক সে একেবারেই নির্বিকার!

সারকথাটা হল, এনআরসির বেলাতেও এরা গরিব মেহনতিদের কষ্ট  – দিনভর লাইনে দাঁড়ানো, অনিশ্চয়তা, ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখার ভয় ও শঙ্কা, আয়-ইনকাম বন্ধ ইত্যাদি কোন কিছুর দিকটাই নীতিনির্ধারকরা আমল করেনি। বরং বিজেপির ভোটের বাক্সে হিন্দুভোট পোলারাইজেশন ছিল এর একমাত্র লক্ষ্য। তাই নির্বিকার লক্ষ্য।

তাহলে কেন এবার সাধারণ মানুষ নাগরিকত্ব বিলের পক্ষে থাকবে? কেন এর ভেতর দিয়ে প্রতিবাদের সুযোগ পেলে সেটাকে প্রবলে সে কাজে লাগাবে না? মোদী-অমিত তাঁদের সীমাহীন কষ্টের দিকটা দেখেননি, দলের স্বার্থ আর ভোট ও ক্ষমতার লালসায়  সবকিছুকে উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে গেছে।  আজকে পাবলিক মোদী-অমিতকে উপেক্ষা করার একটু সুযোগ দেখেছে। সেটা তুলে নিয়ে কাজে লাগাবে না কেন? এটাই তো সব দানব সিদ্ধান্তগুলো উপড়ে ফেলার ভাল সুযোগ!
আবার এতদিন সবকিছুতে সর্বক্ষণ হিন্দুত্বের জোয়ার তোলা হয়েছে। সেটা গরীব মানুষকে ভাল না লাগলেও খারাপ লাগেনি হয়ত, তাই পাশ কাটিয়ে থাকা শ্রেয় ভেবেছে। হয়ত ভেবেছে এটা আমার কী, এটা কেবল মুসলমানের সমস্যা হয়ত। কিন্তু এবার আসামের এনআরসিতে? এবার এতদিনে সকলেই বুঝে গেছে ব্যাপারটা স্টেডিয়ামে গ্যালারিতে আরামে বসে বসে কেবল মুসলমানের কষ্ট দেখার ব্যাপার নয়। বরং ব্যাপারটা সবারই। ডকুমেন্ট, আধার কার্ড [AADHAAR card, আমাদের ন্যাশনাল আইডি কার্ডের সমতুল্য] ইত্যাদি জোগাড়ের অসম্ভব ছোটাছুটির অনিশ্চয়তা। আবার ভারতের আধার কার্ড মানে এই ন্যাশনাল আইডি দেয়া ও দেখাশুনা করা হয় তাদের পোস্ট-অফিসগুলো থেকে। ইতোমধ্যে নাগরিকত্ব বা এনআরসির ক্যাচালে সবাই ছুটছে পোস্ট-অফিসে অথচ, পোস্ট অফিসে সেজন্য মোদী-অমিতেরা স্টাফ বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করেনি, হয়নি। হিন্দু-ভোট পোলারাইজ করে বিজেপি নিজের বাক্সে আনার কাজের বাইরে অন্য কোন দিকে মনোযোগ দিবার সময় কই তাদের? এনিয়ে আনন্দবাজার একটা ভাল বিস্তারিত রিপোর্ট করেছে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন এখানে। লিখেছে, প্রায় সকলেই জানিয়েছেন, এনআরসি-র ভয়েই আধার কার্ড ঠিক করার জন্য লোকজন মরিয়া। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কোথাও কারও তারিখ দু-তিন মাস পরে, কারও আবার বছরখানেক পরে। অর্থাৎ অমিত শাহের নিজনিজ ভোটের বাক্সের স্বার্থে মানুষকে সীমাহীন কষ্ট ও ভোগান্তিতে ফেলছে অথচ স্টাফ বাড়ানো, কাজটা সহজ করতে বাড়তি স্টাফ দেয়ার আগ্রহ তাদের নেই। ব্যাপারটা তাঁদের মনোযোগের ভিতরেই আসে নাই। তাহলে কেন সাধারণ মানুষ নাগরিকত্ব বা এনআরসি বিরোধিতার সুযোগ পেলে তা উপড়ে ফেলে দিতে চাইবে না? এছাড়া এতদিতে তাঁরা বুঝে গেছে বিজেপির হিন্দুত্ব জিনিষটা এত মিঠা না!

সার কথায় বললে, পাবলিক পারসেপশন এখন আগের তুলনায় পরিপক্ব রূপ নিয়েছে মনে হচ্ছে।  একারণে, হিন্দুত্বের রুস্তমিতে হিন্দুগিরি বা হিন্দু-সুরসুরি তুললেই তা আর সমাজে তেমন কাজ করছে না সম্ভবত, ঢিলা দিয়েছে। নিজের ব্যক্তিস্বার্থের দেনাপাওনার চোখ দিয়ে নাগরিকত্ব বা এনআরসি ইস্যুতে সরাসরি নিজের লাভক্ষতি দিতে বুঝতে চাচ্ছে মানুষ; বিশেষ করে গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ।  আর এর সাথে এসে যোগ দিয়েছে  স্টুডেন্ট আর সাধারণ মানুষ। তাই তাঁরা নাগরিকত্ব বা এনআরসি বিরোধিতার সুযোগ পেয়ে পুরা ষোল আনা কাজে লাগাচ্ছে, বলে মনে হচ্ছে। জীবন এমনিতেই প্রচন্ড ভারী, সেই ভারকে আর বাড়তি ভারী না করে নাগরিকত্ব বা এনআরসি থেকে মুক্ত করতে চাইছে সবাই!

অতএব প্রশ্নটা এনআরসির বাস্তবায়ন এটা মোদী-অমিতেরা  হিন্দুত্বের ক্ষমতার লালসায় নাগরিকত্ব বিলের আগে না পরে হবে সেটা তাদের কাছে এখানে কোনো ইস্যুই নয়। পাবলিক পারসেপশনের লেবেলে এর কোনো ফারাক নেই। বিজেপি সম্ভবত মুখরক্ষার জন্য এমন “সারা ভারতে এনআরসি বিজেপি চায়নি” বলে ক্ষিপ্ত পাবলিকের মনোযোগ সরানোর অজুহাত খুঁজছে। কিন্তু বিজেপির মুল সমস্যা হল মোদী-অমিতের উপর পাবলিক বিলা হয়ে গেছে। আস্থা হারিয়ে গেছে বা বিশ্বাস তুলে নিয়েছে মনে হচ্ছে। কাজেই এনআরসি না নাগরিকত্ব বিল কোনো ইস্যুতেই পাবলিক আর সরকারকে বিশ্বাস করছে না। যার সোজা মানে হল, মোদী-অমিতের বিজেপি সরকারকে – এনআরসি আর নাগরিকত্ব বিল – এদুটোকেই প্রত্যাহার  করা হয়েছে এই ঘোষণা করানোর দিকেই আগাচ্ছে।

বাংলাদেশের চলতি সরকারকেও বিজেপি বিক্রি করেছে
ইদানীং লক্ষণীয় যে, ভারতের মিডিয়া এবার প্রকাশ্যেই লিখছে বাংলাদেশের সরকার নাকি ‘খোলাখুলিভাবে কাজে ও বাক্যে বছর দশেক ধরে প্রো-ইন্ডিয়ান’ [Prime Minister Sheikh Hasina, who has been openly pro-India in word and deed since coming to power a decade ago]। কথাটা দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় লিখেছে একজন এমন ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ সরকারকেও অমিত শাহ অপব্যবহার করেছে তা বুঝাবার জন্য। কথা সত্য। অমিত শাহ ভারতের সংসদে  নতুন নাগরিকত্ব সংশোধিত বিলের পক্ষে সাফাই দেয়ার জন্য বাংলাদেশে সরকার হিন্দুদের ‘নির্যাতন করছে’, ‘সুরক্ষা করে নাই’  – এসব কথা সরাসরি বিলের ভাষায় অথবা সংসদে অমিত শাহের কথায় এই অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের নাম সরাসরি বিলের ভাষায় পর্যন্ত উঠে এসেছে। সেটা আসায় এর অর্থ দাঁড়িয়েছে ভারত সরকারিভাবে বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করছে। তাহলে এর তথ্য ও প্রমাণাদি কই?   একথা খুবই সত্য যে অমিত শাহের নাগরিকত্ব বিল দাঁড়িয়ে আছে “বাংলাদেশ সরকারের হিন্দুদের উপর ধর্মীয় নির্যাতন করে চলেছে” একথা যদি নিশ্চিত ভাবে ধরে নেই একমাত্র তাহলেই।
অথচ কূটনৈতিক করণীয় অর্থের দিক থেকে বললে, এ নিয়ে আগে কোন আলোচনার এজেন্ডা সেট করা, কোনো আলাপ আলোচনা অথবা কোনো প্রমাণ পেশ ইত্যাদির কিছুই করা হয়নি। আবার বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করার বিনিময়েই এমন ভাষ্যের উপরের এই বল আনার যৌক্তিকতা ও সাফাই দাঁড়িয়ে আছে। আবার এটাই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে বিজেপির এর ফলাফলে হিন্দুভোট পোলারাইজেশনে বাক্স বোঝাইয়ের পরিকল্পনা ও উপায়। মানে হল ভারতের বিজেপি সরকার নিজের ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ সরকারকে বেঁচে দিয়ে একে নিজের ভোটের ক্ষমতা পোক্ত করার উপায় হিসেবে হাজির করেছে। এটা পানির মতই পরিস্কার।
আবার ওদিকে আসামের রাজ্য সরকার সেটাও বিজেপি দলের সরকার। আসাম সেই দেশ ভাগের সময় থেকে বাংলাদেশের কথিত  ‘অনুপ্রবেশকারী’ মুসলমানদেরকে  তাঁদের সব দুঃখের জন্য দায়ী করে আসছে। তাঁরা নাকি স্থানীয়দের চেয়ে সংখ্যায় বেড়ে অসমীয়দের সমাজ-সংস্কৃতি সব ধবংস করে দিচ্ছে। অথচ এনআরসি তালিকাতে দেখা গেল তাদের এই অসমীয় পারসেপশন ভিত্তিহীন। ছিটেফোঁটাও সত্যি নয়। এনআরসিঢ় ফাইনাল তালিকা প্রকাশের পর এখন জানা যাচ্ছে  আসামের মোট প্রায় তিন কোটি জনসংখ্যার ১%-এর (প্রায় পাঁচ লাখ মাত্র) মত মুসলমান জনগোষ্ঠী তালিকায় নাম তুলতে পারেনি। অর্থাৎ একটা মিথ্যা পারসেপশনের উপরে তারা এখনো চলছে আর মুসলমানবিরোধী ঘৃণা ছড়িয়ে চলছে।  [আমরা যেন না ভুলে যাই অরিজিনাল মুসলমানবিদ্বেষী ঘৃণা ছড়ানোর শুরুকর্তা কিন্তু এই অসমীয়রা যারা তাদের মথ্যা পারসেপশন প্রমাণ করতে না পারলেও এখনও তা জারি রেখেছে। আর বিজেপি পরে এই দাবিটা কুড়িয়ে নিয়ে সারা ভারতে ছড়িয়ে রাজনীতি করছে।] আর এবার নাগরিকত্ব বিলের পরে অসমীয়দের ফোকাস গেছে বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর যে, তারা এবার নাগরিকত্বের লোভে আসাম দৌড়াবে হয়ত। তবে এটা অবশ্যই মোদি-অমিত সরকারের ভোটবাক্স ভরবার ইস্যু। এই অর্থে  সেটা সত্যি সত্যিই ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু।
কিন্তু তামাসাটা হল,  বিজেপির এই আসাম সরকারকেই আবার বাংলাদেশ সরকার ফ্রিচার্জে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বের হতে ট্রানজিট আর বন্দর ব্যবহার সুবিধা দিতে যাচ্ছে। আসামের সরকার ও জনগণ কোন ন্যায্যতার ভিত্তিতে ও সাফাইয়ের বলে এই সুবিধাগুলো নেবে? সম্প্রতি নাগরিক বিলবিরোধী জনঅসন্তোষ চলার সময় আসামে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সিলর অফিসের সাইনবোর্ড ভাঙচুর ও গাড়িতে হামলা হয়েছে। এগুলো কী বিনা পয়সায় বাণিজ্যিক সুবিধা সহযোগিতা নিবার ও পাবার নমুনা?
আসলে বলাই বাহুল্য, অসমীয় জনগণ ও তাদের সরকার আসলে বাংলাদেশ থেকে ঠিক কী চায়, কেমন সম্পর্ক চায় সেটা স্পষ্ট করে বলার হাই-টাইম চলে যাচ্ছে। আর বাংলাদেশ থেকে যেকোনো ট্রানজিটসহ, পোর্ট ফেসিলিটি ব্যবহার নিয়ে কোনো কথা শুরুর আগে ‘বাঙালি খেদাও’-এর ঘৃণাচর্চা নিয়ে তাদের মনোভাব স্পষ্ট করা উচিত নয় কী? যার প্রতি এত ঘৃণা তার কাছ থেকে কিছু নিবে্ন কেমন করে আর সে দিবেই-বা কেন, এমনকি আপনারা সঠিক চার্জ পুরাটা দিলেও দিবে কেন? সেও এক জেনুইন প্রশ্ন!

তাহলে মো্দী-অমিত সরকারবিরোধী আন্দোলনে ক্রমেই উইকেট পতন চলছে। আগামী সাত-দশ দিনে আর কয়টা রাজ্য বা শহরে আন্দোলনে প্রভাবিত হয়, বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে- এর ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। বলা হচ্ছে ইতোমধ্যে বড়ছোট মিলিয়ে ভারতের ২৮ রাজ্যের মধ্যে ১৬ রাজ্য আন্দোলন ছড়িয়েছে। অন্তু একবার সরকারবিরোধী মিছিল হয়েছে। এমনকি বিজেপি রাজ্য সরকারে আছে এমন রাজ্যেও তা হয়েছে।  অর্থাৎ প্রায় সব রাজ্যে বামেজর রাজ্যে বিক্ষুব্দ আন্দোলন হতে দেখলে সেক্ষেত্রে মোদী-অমিতের জন্য সেটা খুবই বিপদের কিছু হবে। কিন্তু সাবধান। কারণ বিশেষ করে মোদী-অমিতরা যত অসহায় হবেন ততই তাদের পরিকল্পিত দাঙ্গা বাধাবার সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে। এছাড়া পাকিস্তানের সাথে সীমান্ত সংঘাত বাধানোর সম্ভাবনাও বাড়বে। যেমন আমরা হাতে নাতে দেখেছিলাম নির্বাচনের আগে। এছাড়া সবার উপরে আমেরিকান জেনোসাইড ওয়াচের ভাষায়, ভারত ধাপে ধাপে সেদিকেই আগাচ্ছে, ‘ভারতে গণহত্যার প্রস্তুতি চলছে” – সেটা তো আছেই!’

শেষে বাড়তি কিছুঃ
এখানে একটা ছোট তথ্য ও রিপোর্টের খবর দিয়ে রাখি। আজ মানে ২২ ডিসেম্বর আনন্দবাজারের অগ্নি মিত্রের লেখা একটা রিপোর্ট আছে, শিরোনাম – “প্রিয়ঙ্কা নিয়েই ক্ষোভের শুরু ঢাকা-দিল্লিতে”। সেখানে সারকথাটা যা বলা হয়েছে তা হল, ইন্দিরা গান্ধীর নাতি প্রিয়ঙ্কা গান্ধীর সাথে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা গত অক্টোবরে ভারত সফরের সময় দেখা  করা থেকেই মনোমালিন্য “ক্ষোভের” শুরু হয়েছিল। প্রথমত, এই রিপোর্টে যতটা অতিনাটকীয়তা আছে ততটাই সত্যতা নাই। আনন্দবাজারি রিপোর্ট অবশ্য এমনই ঝোঁকের সাধারণত হয়।  তবে গান্ধী পরিবারের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা দেখাতে যাওয়াটা – ঠিক সেটা এখানে ইস্যু না। মূল ইস্যু বা শুরুর ইস্যু হল, বাংলাদেশের হিন্দুরা বিজেপি-আরএসএস করুক বা সেদিকে ঝুকুক এব্যাপারে  ভারতের আরএসএস আমাদের সরকারের কাছে সহযোগিতা চাইলে অন্তত ২০১৮ সালে বা তারও  আগের কালে সরকার সম্মতি দিয়েছিল। কিছু কাজ ও প্রশ্রয় দেওয়া করেছিল। যার খেসারত হল প্রিয়া সাহার ট্রাম্পের কাছ পর্যন্ত গিয়ে অভিযোগ তোলা। গোবিন্দ প্রামাণিকের ঢাকায়  “আরএসএস” খুলে বসা, সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে কথা বলা। রানা দাসগুপ্তের বেচাইন হয়ে খোদ মোদীর কাছে নালিশ পরে অস্বীকার ইত্যাদি। এছাড়া আগে থেকেই আবুল বারাকাতকে সরকারি তেল ঘি খাইয়ে পেলেপুষে তাঁর যে “ঐকিক নিয়মের বিশেষ পরিসংখ্যান” বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল তাই এখন বিজেপির পক্ষের অস্ত্র য়ার আমাদের বিরুদ্ধের হাতিয়ার হয়ে হাজির হয়েছে। এসব কিছু বুঝতে বুঝতে হাসিনা সরকার বেশ কিছু ক্ষতি করে ফেললেও সবছিন্ন করে শেষমেশে শক্ত সিদ্ধান্তের কথাটা তিনি অক্টোবর সফরে পরিস্কার করে এসেছিলেন।
ঐ অক্টোবর সফরকালে তাই বলে বা বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল হাসিনা সরকার আগে যা কথাই হোক সেখান থেকে এই বিষয়ে নো কমিট্মেন্টে” ফিরে যাচ্ছে। সরকার যে একথা বুঝিয়ে দিয়েছিল এর দুটা চিহ্ন আমরা বাইরে থেকে দেখতে পাই।  এক. শাহরিয়ার কবিরের কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকা সাক্ষাতকারে সে ইঙ্গিত রেখেছেন। [এনিয়ে সেকালে আমার লেখাটার লিংক এখানে। ] তার দাবি করে বলা  -বাংলাদেশে আরএসএস বলে কিছু নাই, “তাদের কোন ততপরতা নাই” ইত্যাদি – সে প্রমাণ।  আর দুই. রানা দাসগুপ্ত সেই থেকে এখন অনেক বেশি স্বচ্ছভাবে হিন্দু নেতা হিসাবে “সরকারের অবস্থান” বহন করেন। কোন বেচাইনি রাখেন না। তিনি গত মাসদুয়েক আগে ভোলার ঘটনার সময় হেফাজতের শফি হুজুরের সাথে দেখা করে এসেছেন যেটা ফলাও করে প্রচার পেয়েছিল – সম্প্রীতির প্রতীক হিসাবে। এককথায় সরকারের অবস্থান হল – “আরএসএস-কে আর পৃষ্টপোষণ নয়”।  আর এখান থেকেই মোদী-আরএসএসের আমাদের সরকার প্রধানকে অসহযোগিতা , প্রকাশ্য অসম্মান করা ইত্যাদি। এক শুস্ক টেনশ্নের শুরু।

এদিকে এসবের মাঝেই মোদী-অমিতেরা এনআরসি-নাগরিকত্ব নিয়ে নিজেরাই নিজের জনগণের কাছে গ্যাড়াকলে পরে গেছেন। আর এই সুযোগটা ভাল্ভাবেই নিতে পেরেছে হাসিনা সরকার। নেওয়াটাই স্বাভাবিক ও উচিত। নড়বড়েরা যে এটা পারছে সেটাই শুকরিয়া। আবার এনিয়ে মোদী-অমিতের বলারও বিশেষ কিছু নাই। কেবল ভারতের মাস-পাবলিকের মুডের উঠানামার দিকে খেয়াল করে চললে, সে অনুসারে কখন মোদীকে আবার গুরুত্ব দিবে বা দিবেনা  তা  আগা-পিছা করলে আমাদের সরকারের অসুবিধা হবার কথা নয়। কাজেই সরকারের সিদ্ধান্ত সঠিক। কেবল একটাই সমস্যা, আমাদের নেতারা ভুলে থাকতে চায় যে তারা নিজেকে সম্পুর্ণ দান করে দিয়ে ভারতের সাথে  বিশাল ব্যক্তিগত সম্পর্কের জগত গড়তে ভারতের পায়ের কাছে শুয়ে থাকলেও ওদের চোখ আমরা কেবল নিচা “মুসলমান” – এটাই থাকব।  তারা তুচ্ছ করবে। যেন এখনও আমরা জমিদারের প্রজা যারা কখনই বন্ধু বা সমান হতে পারবে না। এই কথাগুলো আমাদের মনে থাকে না।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে মোদি-অমিতের হারের চিহ্ন এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

রাষ্ট্র জাতিগঠন নয়; কিন্তু তাই মনে করা হয়েছিল

রাষ্ট্র জাতিগঠন নয়; কিন্তু তাই মনে করা হয়েছিল

গৌতম দাস

১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Pa

 

[সার সংক্ষেপঃ জিন্নাহকে সব দোষে দোষী করার লোকের অভাব নেই, বিশেষত সাতচল্লিশের পরের জমিদারি হারানো কমিউনিস্টদের চোখ ও ভাষ্যে। অথচ ঘটনা হল, রামমোহন থেকে গান্ধী-নেহরুর আমল পর্যন্ত এসব মহারথীদের চিন্তাকে অনুসরণ ও  মুল্যায়ন করতে খুটিয়ে দেখার চিন্তাগত মুরোদ খুব কমজনেরই থাকতে দেখা যায়।  এদের চিন্তার মৌলিক ত্রুটি ও তা থেকে বিভ্রান্তির কারণ  হল মূলত “জাতি” ধারণা। যেমন এর একটা নমুনা হল, এই মহারথীরা  সবাই “রাষ্ট্র গঠন” বলতে “জাতি গঠন” বুঝতেন। অথচ যেখানে জাতি মানে আসলে “রাষ্ট্র” কখনোই নয়। এছাড়া একটা অপ্রয়োজনীয় এবং বিভ্রান্তিকর ভুল ধারণা হল জাতি [Nation]।   আবার কথা হল, ‘জাতি’ বলতে তারা কেবল আবার “ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ” বুঝতেন। যেমন তাদের বেলায় “হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ” বুঝতেন তাঁরা। অর্থাৎ মুল কথাটা হল, ধর্ম ছাড়া জাতি হয় কেমনে! – এই ছিল তাদের প্রবল ভুল অনুমান।

রাষ্ট্র মানে জাতি আর, ধর্ম ছাড়া জাতি হয় না –  এই হল তাঁদের ‘দুই ভুল অনুমান। এর উপর দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত হল বৃটিশেরা চলে গেলে তাঁদের একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদ ভারত “জাতি” চাই। অথবা এভাবে বলা যেতে পারে যে, হিন্দু জাতির একটা ভারত ছাড়া আর কীইবা তারা চাইতে পারে! কারণ তাদের চোখে এর অন্যথা কিছুই তো হতে পারে না।  ভারতবর্ষের “হিন্দু জাতি” তো একটা  “হিন্দু জাতির” ভারত ছাড়া অন্য কিছু চাইলেও কায়েম করতে বা হতে পারবে না – এই ছিল  সারকরে তাদের ভুল অনুমান।  রামমোহনের মূল কর্মততপরতার কালের শুরু ১৮১৫ সাল থেকে ১৯৪৮ সালে গান্ধীর মৃত্যু পর্যন্ত এই একশ ত্রিশ বছর হিন্দু জাতি বুঝের তাদের জার্নিটাই ছিল এমন।

লক্ষ্যণীয় উপরের প্যারায় শুরুতে রাষ্ট্র শব্দটা একবারই ব্যবহার হয়েছে, তাও সম্পর্ক দেখানোর জন্য। মূলত “রাষ্ট্র” শব্দটাই তাদের কোন চিন্তা বা অনুমানের মধ্যে থাকত না। রাষ্ট্র শব্দটাই তাঁরা তখনও শিখেনি অথবা এই শব্দের উপযোগিতা কী, কাম কী তারা বুঝে উঠতে পারে নাই।  কারণ তাদের চোখে দিনের আলোর মত পরিস্কার লাগত যে “স্বাধীন ও দেশপ্রেমিক এক হিন্দু জাতি হিসাবে নিজেদের গঠন” – এর বাইরে তারা আর কি করতে পারে।  এজন্য সেকালে রাজনীতি বলতে তারা তিনটা শব্দ বুঝত – স্বাধীনতা, দেশপ্রেম আর জাতি। রাজনীতি বলতে এই তিন শব্দ বুঝার ক্ষেত্রে কংগ্রেস আর হিন্দু মহাসভার বুঝাবুঝিতে আলাদা কিছু ছিল না।
এতে অসুবিধা কী?
অসুবিধা হল রাষ্ট্র ধারণা তখনও কারও মাথায় নাই অথবা কারও মাথায় আসেনি মানে রাষ্ট্রের গাঠনিক উপাদান নাগরিক বলে কোন ধারণাই নাই। তাই রাষ্ট্র নাই মানে নাগরিক ধারণাই নাই।  আর, নাগরিকের অধিকার ধারণা নাই। অথচ জাতি ধারণা আছে। মানে জাতি বলে বড়জোড় একট কমন স্বার্থের জনগোষ্ঠিগত স্বার্থ বলে ধারণা আছে। এটাই হিন্দু জাতি ধারণা।
তাহলে দেখা যাচ্ছে জিন্নাহ বৃটিশ-ভারতের হবু রাজনৈতিক জগতে জিন্নাহ’র আবির্ভাবের আগে থেই হিন্দু জাতি ধারণা হাজির আছে। তাহলে জিন্নাহ-ই প্রথম হিন্দু আর মুসলমান এই  দ্বিজাতি তত্বের ধারণা আনলেন এমন দাবি ভিত্তিহীন।
দ্বিতীয়ত, ১৮৮৫ সালে কংগ্রেসের জন্মের পরে যখন নিশ্চিত হয়ে উঠছে যে কংগ্রেস হিন্দু জাতির ভারত-ই একমাত্র কায়েম করতে চায়,  তাহলে কংগ্রেস ও গান্ধীর হিন্দু ‘জাতি গঠন ধারণাকে’ অস্বীকার করে ফেলে দেয়া ছাড়া জিন্নাহর উপায় কী ছিল! এটাই তাদের মুসলমান জাতীয়তাবাদ করতে চলে যাওয়া। অথচ মুলচিন্তায়  জটিলতার কেন্দ্র হল জাতি ধারণা, কাজটা কোন  জাতি গঠন নয়। বরং রাষ্ট্রগঠন। নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্রকে কনষ্টিটিউট করা এই অর্থে রাষ্ট্রগঠন।  এভাবে ব্যাপারটা হলো আসলে ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিক, সবাই অভেদ নাগরিক এবং সমান নাগরিকের ভিত্তিতে বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্রগঠন ও কায়েম হল সব কিছু সমাধান।
আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিক। জিন্নাহ হিন্দু-মুসলমান দুই জাতি একথা তিনি এনেছেন। একথা পেরেছেন অবশ্যই। কিন্তু কেন? হিন্দু জাতিগঠন যারা মানবে না তারা যেন আলাদা রাষ্ট্র চাইতে পারে, এই ব্যাপারটার পক্ষে যুক্তি সাজানোর জন্য।  কিন্তু জিন্নাহ লক্ষ্যচ্যুত নন। তিনি নাগরিকত্ব মানে রাষ্টড়-নাগরিক বিষয়ক মৌলিক শিক্ষা ভাঙ্গেন নাই। কিভাবে? তিনি ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব করবেন না। তিনি ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিক, সবাই অভেদ নাগরিক এবং সমান নাগরিক হবেন এই পাকিস্তানের কথা বলেছেন।

তাই, ১১ আগস্ট ১৯৪৭ সালের বক্তৃতায় জিন্নাহ বুঝিয়ে রেখে যেতে পেরেছিলেন, ধর্মীয় স্বাদের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব এই পাকিস্তান কায়েমের লোক জিন্নাহ নন। যদিও পরবর্তিতে কনষ্টিটিশনের পাকিস্তান – এমন পাকিস্তান হলেও বাস্তবের পাকিস্তান জিন্নাহর স্বপ্ন হতে পারেনি সেকথাও সত্য। একালের ইমরান খান আবার অনেক কিছুই নতুন চোখে দেখবার আশা করতে উসকানি দিচ্ছেন। কিন্তু অমিত শাহ? আগে ছিল যেগুলো গান্ধীর হিন্দুজাতির ভারত কায়েমের চিন্তা বিষয়ক ভুল। আজ অমিত সেই হিন্দুজাতির আরও বড় ভারতের কলঙ্ক হতে রওনা দিয়েছে। বৈষম্যহীনতার সমান নাগরিকই যেখানে সব কিছুর সমাধান। তবু অমিত শাহরা হিন্দুর স্বার্থ কেবল হিন্দু পরিচয়ের মধ্যে খুজে এক মিথ্যা ভিত্তিহীন কথা ছড়িয়ে ভোটবাক্স ভর্তি করতে চাইছেন।]

 

রাষ্ট্র মানে জাতিগঠন নয়। বৈষমহীন নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মামলা।
কাজেই জিন্নাহর, গান্ধীর ‘হিন্দুজাতি’ গঠন ধারণাকে উপড়ে ফেলে দেওয়া ছাড়া কী করার ছিল?

বাসায় চোর পড়লে অনেক সময় এরপর দেখা যায় চোরকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে চুরিতে নিরাপত্তার ফাঁকফোকরগুলোর দিকে নজর ও সংস্কার কাজ শুরু করে দিতে। কারণ, চুরিটা না হলে নিরাপত্তার ঘাটতির দিকগুলোতে আমাদের মনোযোগ যেত না। এই বিচারে আমরাও বাংলাদেশ থেকে এখন অমিত শাহকে আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে নিজের ঘর সুরক্ষার কাজে নামতে পারি। কারণ তিনি আমাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতাগুলোর দিকে নজর ফেলতে পরোক্ষে সুযোগ করে দিয়েছেন, যদিও তা আমরা কতটা কাজে লাগাতে পারব তা এখনই একেবারে নিশ্চিত নই আমরা।
ভারতের নাগরিক সংশোধনী বিল ২০১৯ [Citizenship Amendment Bill, 2019 (CAB)] উভয় সংসদে পাসের পর রাষ্ট্রপতির সই নিয়ে এখন চালু হয়ে গেছে। অমিত শাহের উচ্চারণ স্পষ্ট, “মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো”। আনন্দবাজার আশা করে লিখেছে – “রাজ্যসভায় শাহের রাখঢাক নেই”। পত্রিকাটা বলতে চেয়েছে এর আগে লোকসভায় যেভাবে অমিত যেভাবে ঢেকে রেখেছিলেন সেভাবে কেন ঢেকে রাখেন নাই।
কিন্তু তবু অমিতবিরোধী কারও কোন পক্ষ থেকে এর বিপক্ষে কী জবাব দেবে, এর তেমন জোরালো বয়ান দেখা যায়নি। কেন এটা এমন, কেন?
ব্যাপারটা হল এত দিনের যে প্রচলিত “হিন্দুজাতির” ভারত, সেখানে কেউ মুসলমান হলে ও নাগরিকত্ব পালার ইস্যু থাকলে হিন্দুদের পক্ষ থেকে তাকে নাগরিকত্ব না দিতে চাওয়া – এটাই কি স্বাভাবিক ছিল না?  ভারতের সামাজিক পরিসরে রাষ্ট্র বিষয়ে এমন বোধবুদ্ধি, বুঝাবুঝির লজিকই তো ভারতের সমাজে এত দিন ধরে ছড়িয়ে রাখা আছে। অন্তত নেহেরু-গান্ধীর আমল থেকেই।  এটা তো অমিত শাহ হঠাৎ করে বলছেন তা তো না। আর সে জন্যই তিনি স্পষ্ট করে বলতে পারছেন। আর যারা শুনছেন তাদের কাছেও এটা নতুন, অনভ্যস্ত বা প্রথম মনে হচ্ছে না। তাই তেমন প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়াও নাই

অথচ সোজা ঘটনাটা হল এই যে, অমিত বলতে চাইছেন ভারত রাষ্ট্রের মন কেবল কেঁদে উঠবে অন্যদেশের একমাত্র মুসলমান ছাড়া বাকি সবার বেলায়। এমনকি খ্রীশ্চান হলেও কাঁদবে! এই বক্তব্যের পিছনের অনুমান হল যে,.১. যে ভারত রাষ্ট্রের “কমন মন” বলে একটা কিছু এখানে ধরে নেয়া হয়েছে সে মুসলমানবিদ্বেষী অথবা এর ভিতরে কোন মুসলমান নাই। ২. এই বক্তব্যে সার্বজনীন সবার নাগরিকের অধিকারের জন্য হওয়া উচিত স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এটাকে হাজির করা হয়েছে মুসলমানবিদ্বেষী ভাবে আর মুসলমান বাদে ভারতে দেখা যায় এমন সব ধর্মের জন্য প্রযোজ্য করে। এর অর্থ তারা ভারতকে একটা ধর্মনির্বিশেষে নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র মনে করে নাই।  আসলে এটাই তো গান্ধীর “হিন্দুজাতি” ধারণা।

আবার আসাম, ত্রিপুরাসহ নর্থ-ইস্টে যা দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখছি আমরা, সেটা মোদী-অমিতের সরকারের বিলের বিরুদ্ধে অবশ্যই। কিন্তু  সেটাও  ধর্ম-নির্বিশেষে সকলের সমান নাগরিকত্ব থাকা উচিত সে অবস্থানের জন্য নয়। বরং বাংলাদেশেরই বিরুদ্ধে। তবে অমিতের পক্ষে নয়। তাহলে? এই নাগরিক সংশোধনী বিল মানে ক্যাব [CAB] বিল ইস্যুতে, সাধারণভাবে নর্থ-ইস্ট মনে করে ও তাদের আশঙ্কা এই যে অমিতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের ফলে এখন নর্থ-ইস্টের লাগোয়া বাংলাদেশের সীমান্তের এপারে বাংলাদেশের হিন্দু যারা আছে, তারা এখন সদলবলে নর্থ-ইস্টের আট রাজ্যে প্রবেশ করে নাগরিকত্ব নিতে চাইবে। মূলত এর প্রবল বিরোধিতা করতেই তাদের মোদী সরকারবিরোধী দাঙ্গা-হাঙ্গামা। আর ত্রিপুরার ক্ষেত্রে এসব ছাড়াও  তাদেরবাড়তি একটা ইস্যু হল, সেখানের মোট জনগোষ্ঠির (সম্ভবত এক-তৃতীয়াংশ) আমাদের চাকমা, গাড়োরা সহ এদেরই মত মোট আট পাহাড়ি গোষ্ঠির। যারা ইতোমধ্যেই এক ধরণের স্বায়ত্বশাসন ভোগ করে জেলাভিত্তিক। এরা এখন এই সুযোগে আলাদা রাজ্য চাওয়ার দাবি জোরালো করে তুলেছে। সার কথাটা হল সারা নর্থ-ইস্টেই সমতল (মূলত বাংলাদেশ) থেকে বাঙালিরা তাদের জেলায় এসে পড়া ও আশ্রয় নেয়ার বিরোধী তারা।

অমিত শাহ এই বিল আনার মাধ্যমে জেনে বা না জেনে দীর্ঘদিনের চাপা পড়ে থাকা দেশভাগের প্রায় সব বিতর্ককে আমাদের সামনে আবার জাহির করে দিয়েছে। এর মূল কারণ নেহরু-গান্ধীর জমানা থেকেই ভারতরাষ্ট্র যে নাগরিকে-নাগরিকের মধ্যে ফারাক বা বৈষম্য করতে পারে না। এটা যে হারাম তা তো কখনোই বাস্তবায়ন করতে গেছে তা আমরা দেখিনি। যদিও ভারতের কনষ্টিটিউশনে সেটা যেভাবেই লেখা থাক। যেকোন আধুনিক রিপাবলিক ভিত্তিমূলক যেসব মূলনীতি ধারণা থাকে এ দিক থেকে ভারতের রাজনীতিতে কখনই ভারত-রাষ্ট্রকে বুঝা বা বুঝানো ও প্রাকটিশ করার চেষ্টা করা হয়নি।

যেমন মোদীর শাসনের চলতি এই গত ছয় বছরকেই বিচার করলে আমরা পাই  – এখানে মুসলমানদের ওপর যা খুশি জোর তো করাই যায়, বৈষম্য তো করাই যায়। মোদি-অমিত চাইলেই করতে পারে। তাই কি সারা ভারতবাসী দেখে আসেনি? মুসলমানকে জোর করে জয় শ্রীরাম বলানো অথবা গরু খাওয়া, গরু বহণ করা ইত্যাদি অভিযোগে রাস্তায় রাস্তায় তা চেক করতে বিজেপির ভিজিলেন্স পার্টি তো বসানোই যায়; আর বসিয়ে এমন মুসলমানের খোঁজ পেলে তাকে রাস্তাতেই পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়- এটাই কি ভারতবাসী দেখেনি?

শুধু তা-ই নয়, এ নিয়ে সারা ভারতে কোথায় মামলা-বিচার কোথাও কিছু হয়নি। সর্বশেষ আবার এমন পিটিয়ে [তাবরিজ আনসারী খুনের ঘটনায়] মামলা হয়েছে যদিও কিন্তু সেটা খুনের না হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যর মামলা বলে।  গরু পালা দুধের ব্যবসায়ী পহেলু খানের হাট থেকে গরু কিনে আনাতে হাটের রশিদ দেখানোর পরেও লিঞ্চিং খুন হলে এর আসামিরা দুর্বল মামলা দেওয়ায় আসামীরা সবাই বেকসুর খালাস হয়ে গেছে। মএব্যাপারে মোদীর দ্বিতীয়বারের চলতি সরকারের আনুষ্ঠানিক সরকারি অবস্থান হল, ভারতে রাস্তায় পিটিয়ে মারা লিঞ্চিংয়ের কোনো ঘটনাই ঘটেনি, সবই গুজব, সাজানো আবার আরএসএস নেতা ভগত বলেছেন, পিটিয়ে মারা বা লিঞ্চিং শব্দ ব্যবহার না করতে। সারা ভারতে এভাবে এমনকি সাধারণ নাগরিককে বটেই, এক মুসলমান এমপিকে আর এক হিন্দু এমপি জয় শ্রীরাম বলাতে জোর খাটাতে, জনসমক্ষে তর্ক করতে দেখা গেছে।

মজার কথা হল, এসব নিয়ে কোনো জনস্বার্থবিষয়ক মামলা অথবা আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত মামলা বলে কোনো কিছু হতে দেখা যায়নি; বরং সোস্যাল প্রাকটিস এর বয়ান হল উল্টাটা। যেমন মমতা নাকি মুসলমানদেরকে লাই দিয়ে মাথায় তুলেছেন, তাই পশ্চিমবঙ্গে মুসমানদেরকে দাবিয়ে রাখা নাকি দরকার – এমন ভাষ্য ফেসবুক সোস্যাল মিডিয়ায় ডমিনেটিং পারসেপশন।

সারা দুনিয়াতে আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র প্রসঙ্গে সকলের একেবারে প্রাইমারি ঐক্যমত্যের বৈশিষ্ট্যগুলো হল –
১. এটা অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র আর এখানে সব নাগরিক সবার অধিকার সমান।
২. নাগরিক মাত্রই রাষ্ট্র বৈষম্যহীনভাবে সকলকে সমান চোখ দেখতে ও আচরণ করতে বাধ্য।

কাজেই এটা জাতিগড়া বা জাতিগঠনের বিষয়ই নয়। রাষ্ট্রের এটা নাগরিককে তার  নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মামলা। যেখানে নাগরিক আর রাষ্ট্রের সম্পর্ক হল – নাগরিকেরা হল রাষ্ট্রের গঠনের উপাদান (constituent)। রাষ্ট্র নাগরিক দিয়ে তৈরি (constituted)। আর দলিল অর্থে তৈরি জিনিষ হল constitution। এখানে ‘জাতি’ [nation] বা হিন্দু জাতিগঠন বলে জিনিষটাকে বিভ্রান্ত করা বা বিভ্রান্তি ছড়াবার অন্তত একালে আর কোন সুযোগ নাই।
একারণেই এখানে রিপাবলিক রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট ব্যবহৃত শব্দগুলো হয় – মানবাধিকার, সমানাধিকার, বৈষম্যহীনতা, সাম্য ইত্যাদি। কিন্তু ভারতে? না এখানে সব কিছুর উপরে এক আজিব শব্দ আছে ‘সাম্প্রদায়িক’। (অথবা একই ধারণায় বিপরীত অর্থে ‘অসাম্প্রদায়িক’।)

প্রথমত, আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার সাথে সম্পর্কিত ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে সংশ্লিষ্ট কোনো শব্দ-ধারণা দুনিয়ার কোথাও নেই; কিন্তু ভারতে এটা আছে। আর এটা হল মূলত হিন্দু জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে সংকীর্ণভাবে কেবল তাদের দিক থেকে বলা শব্দ। তারা যাকে বা যে আচরণ বা রীতিকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে দায়ী করবে, সেটাই সাম্প্রদায়িক। সাধারণত মুসলমানদের অভিযুক্ত করতে তাদের এই সংজ্ঞা তারা ব্যবহার করে। যেমন ইসলামী চিহ্ন প্রকাশ হয়ে পড়ে (যেমন টুপি) এমন কোনো কিছু দেখিয়ে রাস্তায় চলাফেরা করা যাবে না। এটা নাকি সাম্প্রদায়িক। মুল কথাটা হল হিন্দু ডমিনেটিং সমাজে এটাকে তারা তাদের কর্তৃত্ব আধিপত্যকে ঢিলা করে ফেলা বা যেন অস্বীকার করার সুযোগ হিসবে কেউ না নেয়, সেটা নিশ্চিত করতেই এই “সাম্প্রদায়িক” নামে শব্দ ও বয়ান দিয়ে শাসন করা। কিন্তু সকালে পূজা-অর্চনা করে কপালে ফোঁটা বা ড্রয়িং তিলক এঁকে কাজে বা সংসদেও যাওয়া যাবে।

কিন্তু সারা দুনিয়াতে ‘সম্প্রদায়’ বা ‘কমিউনিটি’ কথাটা খুবই ইতিবাচক। এটা নিচা, হেয় বা খারাপ বুঝানোর শব্দ না।  যেমন ইউরোপের যেকোন শহরে সমাজের জন্য যে কাজ করে, স্বেচ্ছাশ্রম দেয় সে সম্মানিত ‘কমিউনিটি’ ওয়ার্কার। কিন্তু ভারতে কমিউনিটির রুট শব্দ কমিউন [commune] – এটা ব্যবহার করা হয় নেগেটিভ অর্থে। কমিউন থেকে ‘কমিউনাল’[communal] বলে ইংরেজিতে আর এক শব্দ বের করে আনা হয়েছে যেটাr অর্থও ইতিবাচক; ‘সমাজ সম্পর্কিত’ অর্থে। কিন্তু ভারতে এর অর্থ করে নিয়েছে খুবই জঘন্য। আর এরই বাংলা করা হয়েছে “সাম্প্রদায়িক”। মানে এটাই ভারতে সবচেয়ে ঘৃণিত ও নেতিশব্দ। সাধারণত এটা মুসলমানদের উপর ব্যবহার করা হয়। যার আসল অর্থ হল, হিন্দু সামাজিক কর্ত্তৃত্ব মানতে যে অস্বীকার করে।

আসল কথাটা হল, ব্রিটিশ আমল থেকেই হিন্দু-জমিদারি ক্ষমতায় (এর তৎপরতা কার্যক্রমের শুরু মোটা দাগে বললে ১৮০০ সাল থেকে যেখানে তখন ১৭৯৩ সাল থেকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি আইন চালু করা হয়ে গেছে কেবল) এর যে সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্য তৈরি করেছিল, তা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল সে সময়ের কোনো শব্দের কী অর্থ হবে। বিশেষ করে তাদের সাজানো সেই আধিপত্য যেন মুসলমানরা ভঙ্গ না করে সেই লক্ষ্য সাজানো সামাজিক অনুশাসন। মুসলমানরা ছিল সেই সময়ের সামাজিক স্তরভেদে নিচে ধরে নেয়া স্তরেরও সবার নিচের স্তরে বলে, এটাই মনে করানো ছিল এর উদ্দেশ্য।

মনে রাখতে হবে, মোটা দাগে ১৮০০ সাল থেকে পরের দেড় শ’ বছর ধরে এই হিন্দু জমিদারি-কেন্দ্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্য এটাই প্রজা নিয়ন্ত্রণের বয়ান ও এর সংজ্ঞার নির্ধারক ছিল। কৃষি সে সমাজের মূল অর্থনৈতিক কার্যক্রম। তাই কৃষি মালিকানা ব্যবস্থা হিসাবে চিরস্থায়ী জমি দেয়ার বন্দোবস্ত, যা আমরা জমিদারি বলি বুঝি আর সেখানে বেশির ভাগ জমিদার ছিল হিন্দু, মানে সবমিলিয়ে এরাই মূল রুলিং ক্লাস। এ কারণে তাদের এটাই ছিল সব কিছুর ওপর ডমিনেটিং ফ্যাক্টর, সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের উৎপত্তি এখান থেকেই। আর এই ক্ষমতাটাই সব সময় নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে ভয়-শঙ্কায় শশব্যস্ত হয়ে থাকত। তাদের ভয় ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদের জাতপ্রথার কথা তুলে জারি রেখে ক্ষমতার এই জার-স্তর তৈরি করে তারা এই সামাজিক অনুশাসন তৈরি করেছে। কাজেই মুসলমানেরা ভিন্ন ধর্মের – এই যুক্তি তুলে যদি তারা সাজানো শাসন ব্যবস্থা – মানতে অস্বীকার করে? আর এর মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতার এই সাজানো বাগান ভেঙ্গে দেয় – এই সম্ভাব্য ভঙ্গকারী যারা এরাই “সাম্প্রদায়িক”। তবে সাম্প্রদায়িক নাম দিবার পিছনের কারণ সম্ভবত এই যে এই হিন্দু আধিপত্য বলতে চায় যে এই সামাজিক অনুশাসন নিয়ম ও কর্তৃত্ব দিয়ে আমি আমার এক সম্প্রদায় খাড়া করেছি। তুমি মুসলমান এর ভিতরে আবার তোমার ভিন্ন নিয়ম ভিন্ন কেন্দ্র চালু করে ফেলতে পার, তা আমি হতে দিব না। তাই তোমাকে আমি তোমার সম্প্রদায়ের বলে আলাদা কোন ক্ষমতার কেন্দ্র বানাতে দিব না। একারণে উলটা আমি তোমাকে বিভেদ আনার শক্তি হিসাবে প্রচার করব। তুমি আলাদা সম্প্রদায় গড়ে ফেলবার সম্ভাব্য শক্তি – অতএব তোমার নাম দিলাম “সাম্প্রদায়িক”। তুমি আমার ক্ষমতাকে ভেঙ্গে দিতে বা চ্যালেঞ্জ করতে যাতে না পার তাই আগেই তুমি নেতিবাচক, তুন্মি খারাপ এই ট্যাগ লাগিয়ে এক প্রচার চালিয়ে রাখব।
সারকথায়, এই আধিপত্যেরই আবার যা কিছু অপছন্দনীয় বা যা তার নিজ ক্ষমতাকে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ করতে পারে অথবা যাকে (মুসলমান) সে আগাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, সেসব কিছুই ‘সাম্প্রদায়িক’ ট্যাগ পাবে। মানে তার সাজানো রাজত্ব এর ভেতরে একটা ভিন্ন ‘সম্প্রদায়’ যেন যে তার সাজানো অর্ডার বিনষ্ট করতে চায়। এমন সব কিছুকে সে আগাম ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে, এই অধিপতি শ্রেণী নিজের সম্ভাব্য শত্রুকে চিনিয়ে রাখে। অনেকটা হিন্দু-জমিদারের নিজের মতো করে তার সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের সাজানো বাগান এটা সম্ভাব্য আগামীতে যে’জন তছনছ করতে পারে, সেই হলো সাম্প্রদায়িক। এই হলো সাম্প্রদায়িকতার আসল সংজ্ঞা ও উৎপত্তি।
এ কারণে ইংরেজি ‘কমিউনাল’ শব্দটা ইংলিশ সমাজে কেবল ইতিবাচক অর্থে সমাজ-সম্প্রদায় বুঝাতে এর ব্যবহারটাই কেবল দেখতে পাবেন। বিপরীতে কেবল ভারতীয়রাই শব্দটাকে নেতিবাচক ও বিশেষ ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করে। এই সোজা মানেটা হলো, ১৮০০ বা উনিশ শতকের শুরু থেকেই যে হিন্দু জমিদারি সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণী আধিপত্যের তৎপরতা শুরু হয়েছিল, এরই স্বার্থের বিরোধী যেকোনো কিছুই (সাধারণত মুসলমান) বোঝাতে ‘কমিউনাল’ শব্দ ব্যবহার শুরু হতে দেখা গেছিল।

কিন্তু কোন আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র কিভাবে বলে আমার বৈশিষ্ট হল ‘অসাম্প্রদায়িক’? যেখানে তার দেখার চোখ হতে হবে ধর্ম নির্বিশেষে সকলে সমান এবং সমান নাগরিক? খাড়া কথাটা হল, হিন্দু ধর্মীয়-সামাজিক গোষ্ঠির মানে বাস্তবে অপসৃয়মান হিন্দু জমিদারি সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণী আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য শব্দ সাম্প্রদায়িক – এই শব্দ বা বৈশিষ্ট তো কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্টই হতে পারে না – যেখানে ধর্ম-নির্বিশেষে সবার অধিকার সমান গণ্য রাষ্ট্রকে করতেই হবে! আর এই অধিকার কেউ ভেঙ্গেছে কিনা সেটা বিচার করাই কেবল রাষ্ট্রের কাজ। কাজেই সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক নয়, রিপাবলিক রাষ্ট্রে অধিকারে সমান না বৈষম্য করা হয়েছে এটাই একমাত্র বিবেচনার বিষয় এবং এর নির্ণায়ক।  হিন্দু আধিপত্য মানে হিন্দু জমিদারি সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণী আধিপত্য টিকিয়ে রাখা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের কাজ একেবারেই নয়। কাজেই সাম্প্রদায়িক এই শব্দটা দিয়েই আসলে নাগরিক অধিকারের বৈষম্যহীন করবার ধারণাটাকে চর্চায় সামনে আসনে দেয়া ঠেকায় রাখার ক্ষেত্রে ভুমিকা আছে।

এর পাশাপাশি আমরা এখন রামমোহনের (১৭৭২-১৮৩৩) জমানায় যাবো। কেন রামমোহন? ভারতের প্রগতিবাদী বিশেষত সেকালের (বলতে ১৯২৬ সালের পরের বুঝতে হবে) খোদ কমিউনিস্ট পার্টির চোখে রাজা রামমোহন রায় হলেন ‘বেঙ্গল রেনেসাঁ’ এর আদিগুরু। মানে রামমোহন যিনি ব্রিটিশদের হাত ধরে ইন্ডিয়াতে আসা বা আনা ‘ইউরোপীয় রেনেসাঁ’কে সবার আগে ভারতে পরিচয় করান এবং এর চর্চা ও প্রয়োগ শুরু করেছিলেন, সেই আদি শুরুকর্তা। রামমোহন সুনির্দিষ্ট একাজটা শুরু করেছিলেন ১৮১৫ সালে, তার “আত্মীয় সভা” নামে সামাজিক সংগাঠনিক তৎপরতায়। এর পাশাপাশি আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৮৩৫ সালকে যখন ব্রিটিশরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তারা ‘ইন্ডিয়ান এডুকেশন অ্যাক্ট ১৮৩৫’ চালু করবে।
এটাকে “এডুকেশন অ্যাক্ট” বলে অথবা এটাই হল ব্রিটিশ ‘কলোনি প্রশাসন’ এর শুরু করার আইন বলে বুঝতে পারি। এটাই ভারতীয় নেটিভ বা স্থানীয়দেরকেই ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষায় শিক্ষিত করে কলোনি প্রশাসন সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত মনে করেও পাঠ করা যেতে পারে। অর্থাৎ ইংল্যান্ড থেকে শিক্ষিত ব্রিটিশদের ব্যয়বহুল পথে (বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া) তাদের এখানে এনে আর নেয়া হবে না। স্থানীয় নেটিভদের শিক্ষিত করে নেয়া এক প্রশাসন গড়তে হবে। আর বলাই বাহুল্য, সেটা আধুনিক শিক্ষা মানে রেনেসাঁর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব ফেলার শুরু হয়েছিল এখান থেকেই।
রামমোহনের মূল গুরুত্ব হল তিনি ব্রিটিশ মাস্টারের অনুকরণে সেকালের ব্রিটিশ-ভারতে, আমাদেরকে একটা “আধুনিক রাষ্ট্র” করতে হবে – প্রথম তিনিই এমন গড়ার স্বপ্ন দেখে ও এঁকেছিলেন। আবার ঠিক একই কারণে এতে তাঁর করা সব ভুল বা ধারণায় ঘাটতি বা তাতে অস্পষ্টতায় বিপথে যাওয়া এমন ধারণায় সব খামতির উৎপত্তিও তিনি। যদিও আধুনিক প্রগতিবাদীরা বা পরবর্তীকালে বিশ শতকে এসে কমিউনিস্টরাও রামমোহনকে তাদের আদিগুরু নেতা মানেন। বিশেষ করে যারা হিন্দু জমিদারীর “স্বদেশি ইতিহাসের ধারা” রচয়িতা।

কিন্তু তিনি প্রথম নেতা হলেও আধুনিক রিপাবলিক ধারণার মুখ্য বৈশিষ্ট্য যে তা নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র, নাগরিক মাত্রই অধিকার সমান এক বৈষম্যহীন সাম্য ইত্যাদি – এসব মৌলিক ধারণাকে তিনি আমল করতে সক্ষম ছিলেন এর প্রমাণ নাই।  আসলে নাগরিক সাম্য নয়, সম্ভবত রেনেসাঁ তার মুল আগ্রহের বিষয় হয়েই তিনি আটকেও গেছিলেন। অধিকার বা রাষ্ট্র পর্যন্ত আর নিজ চিন্তাকে প্রসারিত করতে পারেন নাই।  এমন চিহ্ন আমরা দেখি না। আরও বড়  কারণ কী?
মূল কারণ হল, রামমোহনদের কাছে কাজটা (উচিত অর্থে) হওয়ার কথা ছিল “রাষ্ট্রগঠন”। কিন্তু তাঁরা বুঝেছিলেন “জাতি গঠন” বলে।  এখানে সবচেয়ে ক্ষতিকর ও বিভ্রান্তিমূলক ধারণা ছিল “জাতি” [nation]। খেয়াল করলে দেখা যাবে, তারা রাষ্ট্র কথাটাই ব্যবহার করতেন না। এর বদলে ব্যাপারটাকে “জাতি” বলে কিছু একটা বুঝতে চাইতেন। এই হলো প্রথম ভুল। তবে পরের ভুলটা আরো মারাত্মক। জাতি গঠন বা জাতীয়তাবাদ বলতে তারা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বুঝতেন। তারা নিশ্চিত হয়ে থাকতেন যে জাতির মূল বৈশিষ্টই তো ধর্ম।  আর ধর্মই তো জাতিকে “জাতি” হয়ে উঠতে আঠার মত সকলকে ধরে রাখতে প্রধান ভুমিকা রাখে। কিন্তু এখনই খুশি হয়ে যেয়েন না, সাবধান হন। পরের বাক্যটার দিকে খেয়াল করেন।
অতএব এত বড় আর প্রাচীন হিন্দু ভুখন্ডে বৃটিশ শাসন-পরবর্তিকালে এক “হিন্দুজাতির ভারত” – এটাই আমাদের কাম্য। কারণ যে “বৃটিশ জাতি” আমাদেরকে শাসন করতে আমরা দেখছি সেটাও একটা ক্রিশ্চানিটিতেই আবদ্ধ, এক বৃটিশ “জাতিগঠন” হয়েই করেই দাঁড়িয়ে আছে।  সেকালে রামমোহন এন্ড গং তাদের বুঝাবুঝির মোটা ভাষ্যটা  সাজিয়ে লিখলে তা হবে এরকমই।
এই একই বুঝ বজায় ছিল অন্তত মহাত্মা গান্ধী পর্যন্ত; ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় ভুমিকা (১৯১৪-৪৮) এই সময়কালে। অর্থাৎ স্বাধীন দেশপ্রেমিক এক ভারত বলতে তিনিও এক ভারতীয় “জাতিগঠন” করার কর্তব্য ও এর রাজনীতি বলে বুঝতেন। অর্থাৎ হিন্দুজাতি গঠন বা হিন্দু জাতীয়তাবাদ গড়া বুঝতেন। ঠিক এ কারণেই তাদের কাম্য রাষ্ট্র নাগরিকের রাষ্ট্র হল কিনা অথবা অধিকারে বৈষম্যহীন হলো কি না, নাগরিক মাত্রই সমান অধিকারের রাষ্ট্র হলো কি না- ইত্যাদি এগুলো কখনও  তাদের এজেন্ডা ছিল না।

উল্টো এটা ধর্মীয় জাতিগঠনের জাতীয়তাবাদের বলে আধুনিক রাষ্ট্রকে বোঝার কারণেই এখনো – “মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো”, কথাগুলো এখনো অবলীলায় উচ্চারিত হতে পারছে। কারও কানেও খটকা লাগছে না।

তাহলে রামমোহন থেকে গান্ধী সবার কাছেই ভারত রাষ্ট্র মানে কোনো বৈষম্যহীন নাগরিক রাষ্ট্র নয়, এ দিক থেকে রাষ্ট্র বোঝাই হয়নি।
দ্বিতীয়ত, বাস্তবের যে ভারত -রামমোহন থেকে গান্ধী- এরা কল্পনা বা বাস্তবে দেখেছিলেন এটা আবার সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক বুঝের হিন্দু জমিদারের সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের রাষ্ট্র বলেই বুঝেছেন, দেখেছেন, পেয়েছেন।

এ কারণে যারাই রাষ্ট্রের মধ্যে “অসাম্প্রদায়িকতা” বৈশিষ্ট্য খুঁজে তাদের কাছে নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা অর্জন হয়েছে কি না তা কোনো কাম্য বিষয়ই নয়।

অতএব, গান্ধী-নেহরুরা যে ভারতের জন্ম দিয়ে গেছে সেটাই বা সেখানেই তো মোদী-অমিতের হিন্দুত্বের রাষ্ট্র কায়েমের উপযুক্ত জায়গা। অবলীলায় ‘মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো’ বলতে পারার মতো দেশ-রাষ্ট্র।  এখানে নাগরিক ধারণাটাই পোক্ত না বরং এখনও অপুষ্ট। তাই নাগরিক অধিকারও। এর আকাঙ্খার ভেতরেও তাই নাগরিক বৈষম্যহীনতার আকাঙ্খাই নাই, অনুপস্থিত। একই কারণে সুপ্রিম কোর্টের চর্চাতেও তেমন নাই। নির্বাচন কমিশনের কাছেও নেই। সে কারণে বিজেপির মত দলও কনষ্টিটিউশন মোতাবেক রাজনৈতিক ততপরতা চালাবার জন্য যোগ্য দল বলে অনুমোদন দিয়ে দেয় নির্বাচন কমিশন। সুপ্রীম কোর্টও এর মধ্যে কোন সমস্যা দেখে না। অথচ যে রাজনৈতিক দলের চিন্তা বৈষম্যমূলক নাগরিক অধিকারের সেই দল তো অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন পাওয়ারই কথা হয়। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন বা সুপ্রীম কোর্টও এটা কোন সিরিয়াস দিক মনে করে না। শেষ নির্বাচনে এদিকটা অবস্থা আরও ভয়াবহ। কোন নির্বাচনি ভায়োলেশনের অভিযোগ আমলে নিয়ে মোদীর গায়ে ফুলের টোকা দিতেও তারা রাজি হয় নাই। অবশ্য তারা বলতে চায় একজিকিউটিভ ক্ষমতার গায়ে হাত দিয়ে আমাদের খুব খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে। বিগত ১৯৭৫ সালের জুনে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি আইন যেখান থেকে ঘটেছিল সেই ইস্যুতে। সেই থেকে আদালতের অবস্থান হল, কোন নির্বাচনে যদি এক আগ্রাসী একজিকিউটিভ ক্ষমতা – নির্বাচিত হয়ে আসে তবে সে যতই আগ্রাসী আদালত ততই সংঘাত এড়িয়ে তাকে জায়গা করে দিবে।
কিন্তু তাই বলে কি “নাগরিক বৈষম্যহীনতা করা যাবে না”- একথা ভারতের কনস্টিটিউশনে লেখা নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু আছে কনস্টিটিউশনে লিখা থাকতে হয় তাই। এর ইমপিলিকেশন কী, ব্যবহার কী এবং কোথায় – কেন থাকতে হয়, গুরুত্ব কী সেসব দিক থেকে কিছুই বুঝা হয়নি, চর্চায় নেয়া হয় নাই। এর মূল কারণ সম্ভবত – “হিন্দুজাতি গঠনের এক ভারত” গড়া হয়েছে – এটাই তো ভারতের জন্ম থেকেই ছিল মূল বিবেচ্য!
তাহলে একালে ভারত কেন “হিন্দুজাতির ভারত” – এই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী কেন? এটা যদি কেউ দেখিয়ে প্রশ্ন তুলে তখন তারা আড়াল খুঁজে বলে – কেন তারা তো অসাম্প্রদায়িক। অর্থাৎ এটা ‘অসম্প্রদায়িক’ ও ‘হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী’ ভারত, কাজেই কোনো আর অসুবিধাই নেই।

আচ্ছা রামমোহনের রাষ্ট্রচিন্তা যে জাতিগঠন-বাদী চিন্তা, আর এই জাতিবাদ যে ধর্মীয় এমন দাবির প্রমাণ কী? এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল রামমোহনের ‘ব্রাহ্মধর্ম’ চালু করার তাগিদ। [রবীন্দ্রনাথের দাদু দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন রামমোহনের বন্ধু, অনুসারী। সেই সুত্রে তিনিও ছিলেন ‘ব্রাহ্মধর্ম’ অনুসারী ও প্রধান পৃষ্টপোষক। রবীন্দনাথও  ব্রাহ্ম অনুসারি আর এই সুত্রে তাঁর কালেও পুনর্বার মুখপাত্র তত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক। ] সারা ভারতের সবাইকে এক ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী করে এরপর ব্রাহ্মধর্মীয় জাতিগঠনের  ভারত কায়েম এই ছিল রামমোহনের লক্ষ্য। পরবর্তী সময়ে সবাইকে ব্রাহ্ম করার ইচ্ছা বাস্তবায়ন করা যায়নি বলে গান্ধী পর্যন্ত  (এদের মাঝে বঙ্কিম, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ ইত্যাদি অনেক ব্যক্তিত্বও কমবেশি সামিল ছিলেন) এসে সবাই মেনে নেয় যে, ঐ স্থলে “হিন্দুজাতি গঠনের” জাতীয়তাবাদী ভারতই তাদের কাম্য।
কিন্তু এই বুঝের ভিত্তিতে ১৮৮৫ সালে এসে কংগ্রেস দল জন্ম বা গঠন করার পরে এই প্রশ্ন জোরালো হতে থাকে যে, “হিন্দুজাতি গঠনের” জাতীয়তাবাদ মুসলমানরা মেনে নেবে কেন? এর জবাব গান্ধীর কাছেও ছিল না। তিনি বড়জোর হিন্দু কথাটা ধর্মীয় না কালচারাল, এমন তর্কের কথা বলে পাশ কাটাতে চাইলেন। এছাড়া আমরা দেখি  উল্টা গান্ধীর নিজের বুঝের হিন্দু ধর্ম বলতে সেটা কেমন এটাকেই তিনি ‘হিন্দুইজম’ বলে প্রায় ৪২টা বক্তৃতা দিয়েছেন। অনলাইন আকাইভেও তা পাওয়া যায়। অথচ গান্ধীর কাছে মুসলমানরা “হিন্দুইজম কী” – তা শিখতে যাবে কেন? কোন সুখে অথবা দুখে? এমনকি অনেক হিন্দুও কেন তাকেই পছন্দ করবে, গান্ধীর “হিন্দুইজম কী” এর ব্যাখ্যা নিয়ে একমত হবে –  এই প্রশ্নের জবাব নাই  অথচ এই প্রশ্ন উঠেই থেকেছে।

সোজা কথা হল যার রাজনীতি  – রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র, সমান অধিকারের রাষ্ট্র কায়েম এমন কেউ কেন “হিন্দুইজম কী” এই মাহাত্য প্রচার করতে যাবেন? গান্ধী যদি মনে করেন যে তাঁর “হিন্দুইজম কী”  ব্যাখ্যাটাই শ্রেষ্ঠ তাহলে এর মানে তিনি ধর্মতত্বের পন্ডিত হতে চাইছেন। অন্তত রাজনীতির না। ঠিক রাজনৈতিক নেতা তিনি না, ধর্মতাত্বিক নেতা হওয়া তার ঝোঁক যদি হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে রাজনীতির নেতা সেটা বাদ দেয়াই তাঁর উচিত ছিল। কারণ “হিন্দুইজম জানা বা এর  মাহাত্য প্রচার এটা না জানা থাকলেও ফেলো যেকোন ধর্মের নাগরিকের সাথে থাকার যোগ্য বিবেচিত হতে তো কোনই অসুবিধা নাই। এছাড়া এটা তো কোন নাগরিক সাম্যের রাজনৈতিক কাজ না। এগুলাই আসলে  আরও বড় প্রমাণ যে –  নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র, নাগরিক বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্র কায়েম- এসবে গান্ধী বা নেহরুর কখনই আগ্রহ ছিল না, তারা বা তাদের ভারত এটা কখনই বুঝতেই পারেনি, তাই আমল করে নাই।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ
চলতি নাগরিকত্ব বিলের তর্কে জিন্নাহ এখন সবারই অভিযোগ দায়ের করার সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গা হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানকে আলাদা হতে দিয়ে কংগ্রেস দ্বিজাতি বাস্তবায়ন হতে দিয়েছে অমিত শাহের এই ছিল অভিযোগ, এর জবাবে বলা সুপ্রীম কোর্টের কংগ্রেসের প্রধান আইনজীবী ও এমপি কাপিল সিবালের বক্তব্য ছিল, অম্বেদকারের বরাতে যে, জিন্নাহ ও সাভারকার (হিন্দু মহাসভা নেতা) দু’জনই ধর্মের ভিত্তিতে হিন্দু-মুসলমান এরা দুই জাতি,  এই ধারণার অনুসারী।

তাহলে জিন্নাহই কি সব কিছুর জন্য দায়ী?
প্রশ্নই ওঠে না। উপরে রামমোহন থেকে অন্তত গান্ধী পর্যন্ত সবাই রাষ্ট্র বলতে ‘জাতি’ বুঝতেন, বলেছি। আবার জাতি বলতে কেবল ধর্মীয় জাতিকে বুঝতেন। এই ছিল তাদের হিন্দু জাতিগঠন এই জাতীয়তাবাদী ভারত এর ধারণা।

কিন্তু এই হিন্দু জাতিগঠনের ভারত প্রশ্নে মুসলমানদের অস্বস্তি ও আপত্তির কারণেই ২০ বছরের মধ্যেই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হয়। জিন্নাহও ক্রমশ একই ধরণের প্রশ্ন তুলে  কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন।

কিন্তু কংগ্রেস তার ‘হিন্দু জাতিগঠনের ভারত’ এই নীতি গ্রহণ করাতে মুসলিম লীগও যে জাতিবাদ করতে গেল, সেটাও মুসলিম জাতীয়তাবাদ হয়ে যেতে বাধ্য হয়ে যায়। এ ছাড়া প্রতিযোগী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে পেরে উঠতে গিয়ে ‘মুসলমানের ভিত্তিতে আলাদা এক জাতি’ এমন কথা বেশি স্পষ্ট প্রধান করে বলতে হয়েছিল। লীগ এ বক্তব্যের পক্ষে বিস্তর সাফাই গাইতে অনেকগুলো সম্মেলন হয়েছিল, যেখানে বিখ্যাত কবি ইকবালের সাফাই বক্তব্যও আমরা দেখে থাকব।

আর বিপরীতে এসব প্রশ্নের ঠেলায় কংগ্রেস ততই  ক্রমশ ছুপা-কৌশল গ্রহণ করে যে, তারা যে কৌশলগতভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারত চায় এ কথা মুখে কোথাও স্বীকার করবে না। এর ফলে দ্বিজাতিতত্ত্ব বা ধর্মের ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদ চাওয়ার সব দায় একা জিন্নাহর আর এ জন্যই অখণ্ড ভারত রাখা যায়নি- ভারতের সেই প্রপাগান্ডা সেই থেকে আজো প্রবল। একালে মানে ১৯৪৭ সালের পরে বিশেষ করে এই প্রপাগান্ডার দায় নিয়েছে কমিউনিস্টরা। যদিও তাদের ভাষ্যের প্রধান ফোকাস হলো, রাষ্ট্রের সাথে ধর্মকে মেশানো খুবই গর্হিত কাজ,কাজেই মূল পাপে পাপী হলো জিন্নাহ।

কিন্তু সব জিনিষ লুকানো যায় না। কিন্তু মুল কারিগর কমিউনিস্ট, তাদের যুক্তিটাই সবকিছু উদোম করে দিয়েছে। কমিউনিস্টদের পয়েন্ট হল, রাজনীতিতে ধর্ম হারাম অথচ জিন্নাহ সেই ধর্মের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র গড়ার কথা খোলাখুলি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন। কিন্তু কমিউনিস্টরা এতে নিজেই যেন নিজের জন্য ফাঁদ পেতেছে এমন হয়ে গেছে।  সেকালের সক্রিয় কমিউনিস্ট, পারিবারিকভাবে ব্রাহ্ম ও ইতিহাসের অধ্যাপক সুশোভন সরকার রামমোহন রায়কে রেনেসাঁর আদিগুরুর ভুমিকায় দাবি করে বসানোর জন্য দায়ী মনে করা হয়।  এতে সমস্যা হল যে সুশোভন হয়ত ধর্মের উপর তত ক্ষেপা নয় কিন্তু সাধারণ কমিউনিস্টরা বিশেষত সাতচল্লিশের পরের কমিউনিস্ট চরম ইসলামবিদ্বেষী হয়ে পড়েছিল। এই কমিউনিস্টদের এখন সাফাই ও জবাব দিতে হবে রাজনীতিতে ধর্ম যদি এতই হারাম হবে তাহলে রামমোহন রায় নতুন করে নিজেই আর একটা ধর্ম – ব্রাহ্মধর্ম, চালু করেছেন কেন? অন্তত জিন্নাহকে প্রশ্নের সম্মুখীন করার আগে এটা নিজেরাই লক্ষ্য করে নিজেরাই এর জবাবটা দিয়ে রাখা উচিত ছিল। আর কোন কমিউনিস্ট আজ পর্যন্ত রামমোহনের দিকে আঙুল তুলে নাই কেন?

মজার কথা হল গান্ধী জিন্নাহর তত সমালোচনা করেন নাই, যতটা একালের কংগ্রেসি কিন্তু কমিউনিস্ট-ছাড়ানি প্রগতিধারী কেরালার এমপি শশীথারুর জিন্নাহর সমালোচনা করেছেন। কমিউন্সট পয়েন্টই তার পয়েন্ট, সিপিএমের সীতারাম ইয়াচুরিও একই দশা। ঠিক যেমন বাংলাদেশের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরি। এককথায় এরা সকলেই কখনও  খেয়ালই করেছেন যে  “হিন্দুইজম কী” বলে সংকলিত গান্ধীর  ৪২ আর্টিকেল আছে – বলে মনে হয় না। রামমোহন রায়ের কথা আর বললাম না। কাজেই এরা মনোযোগী পাঠক এমন ধরে নেওয়া আর ঠিক হবে না।

এককথায় বললে এরা জিন্নাহর সাথে অবিচার করেছেন।  উপরে  রামমোহন আর গান্ধীর জাতিগঠন ধারণা তারা আমল করেছেন জানা যায় না। কিন্তু এর চেয়েও বড় প্রমাণ এখন হাজির করব।

সম্পতি পাকিস্তানের এক সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট YASSER LATIF HAMDANI সব তথ্য সাবুদ জড়ো করে একটা আর্টিক্যাল লিখেছেন ভারতের এক পত্রিকায় দ্যা প্রিন্ট – এখানে তা ছাপা হয়েছে। , যার বড় একটা অংশ আবার বিবিসির নিজের করা রিপোর্ট। যার সার কথা জিন্নাহর ১১ আগস্ট ১৯৪৭ সালে প্রথম গণপরিষদের উদ্বোধনী বক্তৃতার, আগে যেখানে পাকিস্তানের যোগেন মণ্ডল তাতে সভাপতিত্ব করেছিলেন। আর ওই সভা থেকেই যোগেন মণ্ডলকে পরে প্রথম আইনমন্ত্রী বানানো হয়েছিল। জিন্নাহ এই বক্তৃতার রেকর্ড ফলে রেফারেন্স হারিয়ে ফেলা বা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। যেটা পরে ভারতের আর্কাইভে পাওয়া যায়। যা ভারত আবার একমাত্র রাইট-টি-ইনফরমেশন আইনে  এক ভারতীয় নাগরিককে অনেক পরে সরবরাহ করেছিল।

সেই সভায় জিন্নাহর বক্তৃতা সেটা। বিশেষ করে নাগরিকত্ব সম্পর্কে জিন্নাহর মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। এর সবচেয়ে মৌলিক অংশটা নিচে বাংলায় অনুবাদ করে দেয়া হলো :

মুল ইংরাজিটাঃ
We are starting in the days where there is no discrimination, no distinction between one community and another, no discrimination between one caste or creed and another. We are starting with this fundamental principle that we are all citizens and equal citizens of one State.
আমার অনুবাদঃ
‘আমরা একটা এমন দিন শুরু করতে যাচ্ছি- যেখানে আজ থেকে কোনো বৈষম্য, সম্প্রদায়গত ভেদাভেদ, জাত চিহ্ন বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি নিয়ে কোনো ভেদাভেদ গণ্য করা হবে না। আমরা সবাই নাগরিক এবং সমান নাগরিক- এই নাগরিক সাম্যের মৌলিক নীতিতে এক রাষ্ট্রে আমাদের দিন শুরু করতে যাচ্ছি’।

কিন্তু সবখানেই যে সমস্যাটা থাকে তা হলো, কথাটা বলা আর বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করে দেখানো এর ফারাক সেটা পাকিস্তানের বেলাতেও আছে। কিন্তু অন্য সবার চেয়ে জিন্নাহ এই জায়গাতেই আলাদা যে তিনি জীবদ্দশাতেই তার ইমাজিন করা রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব প্রসঙ্গে বৈষম্যহীনতা বা নাগরিক সাম্যের নীতির প্রতি তার প্রবল সমর্থন তিনি উচ্চারণ করে যেতে পেরেছিলেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে জিন্নাহর নয়, গান্ধীর ভুল থেকেই…এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

মোদী-অমিতের নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল

মোদী-অমিতের নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল

গৌতম দাস

০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2OV

 

 

_https://indianexpress.com/article/north-east-india/tripura/tripura-citizenship-bill-protest-northeast-india-tribal-parties-6150368/

এবার নাগরিকত্ব বিল। মানে ভারতের নাগরিকত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে আনা এক সংশোধনী বিল [Citizenship Amendment Bill, 2019 (CAB)]। এর সোজা অর্থ হল আসামে এখন এবং ভবিষ্যতে অন্য রাজ্যে এনআরসি তালিকা করার পর মুসলমান যারা বাদ পড়বেন, তাঁরা একেবারেই বাদ। আর তাঁরা বাদে বাদ পড়া অন্য সব ধর্মের সবাইকে যেন আবার ভারতের নাগরিকত্ব সহজেই দেয়া যায়; এরই এক খোলাখুলি নাগরিক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা হবে এটা। এই লক্ষ্যে মোদী সরকার আগামী সপ্তাহে ভারতের নাগরিকত্ব আইনের ওপর একটা সংশোধনী বিল আনতে যাচ্ছে, যা ইতোমধ্যে মোদীর মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে। আগামি সোমবার (৯ ডিসেম্বর) লোকসভায় পেশ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল।

বিজেপি-আরএসএসের একেবারে ওপরের নেতারা জানেন, মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো এটাই তাদের রাজনীতি। কেন? মুসলমানরা খারাপ আর হিন্দুরা ভাল – না, ঠিক এটা প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠা করা তাদের কাজ বা রাজনীতি নয়। তাদের মূল কাজ হল পোলারাইজেশন, মানে ভোটার মেরুকরণ। অন্য ভাষায় কাজটা হল হিন্দুদের আলাদা করা, হিন্দুরা আলাদা, ভালো আর সব কিছু তাদেরই- এটা সব সময় প্রমাণ করে চলা ও এই দাবি তাতিয়ে রাখা। কেন? কারণ এমনটা শুধু প্রমাণ করে রাখা তাদের কাজ নয়। বরং কাজের লক্ষ্য হল, হিন্দু হিসেবে তারা যেন এরপর দলবেঁধে কেবল বিজেপির প্রার্থীকেই ভোট দেয়। মানে বিজেপির বাক্সে সব হিন্দু-ভোট যেন এসে ঢুকে।

এই শেষ বাক্যটাই হলো আসল লক্ষ্য। অর্থাৎ মুসলমানরা খারাপ আর হিন্দুমাত্রই ভাল, এটা প্রমাণ প্রতিষ্ঠার সময় আধা সত্য বা মিথ্যা যা খুশি কিছু প্রচার করা হল। এতে ধর্মীয় পোলারাইজেশন বা হিন্দু মেরুকরণ ঠিকঠাক করা হলো। কিন্তু কোনো কারণে বিজেপির প্রার্থীর বাক্সে সব হিন্দুর ভোট ঢুকল না। তাহলে কিন্তু এটা আর বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি হবে না। বিজেপির প্রার্থীর বাক্সে সব হিন্দুর ভোট এই হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে ফেলা- এটাই বিজেপির উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনীতির চর্চা করার মূল লক্ষ্য।

স্বাধীনতা, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদ
এদের রাজনীতির বুঝও আজীব; মূলত তিনটি শব্দের- স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম বলে এ দুই শব্দের অর্থহীন কিছু আবেগী সুড়সুড়ি তুলে ফেলা আর তৃতীয়টা হল জাতীয়তাবাদ : মানে উগ্র-হিন্দু জাতীয়তাবাদ। অর্থাৎ রাষ্ট্র, অধিকার, নাগরিক, রিপাবলিক, কনস্টিটিউশন ইত্যাদি এসবই এদের কাছে একেবারে অপ্রয়োজনীয় সব শব্দ ও ধারণা। রাষ্ট্র বলে কোন ধারণা এদের কাছে অপ্রয়োজনীয় থাকে, তাই এর কোনো নীতিগত দিক যেমন নাগরিকের কিছু মৌলিক অধিকার থাকবে; যা রক্ষা করতে, সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে- এটা বিজেপির রাজনীতিতে কোনো বিষয় নয়। অথবা ধরা যাক, রাষ্ট্র নাগরিকদের মধ্যে কোনো অধিকারবৈষম্য করতে পারবে না, আইনের চোখে সবাইকে সমান দেখবে ও আচরণ করবে ইত্যাদি বিষয়গুলো? রাষ্ট্রের এমন পালনীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার ব্যাপারটাও বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতিতে কোন আমলযোগ্য ব্যাপারই নয়। কেবল কেউ বিজেপি কি না, সে হিন্দুত্ব চিন্তার লোক কি না – সেটার দিকে চোখ রেখে চলে বিজেপির বাক্স ভরানোই এই রাজনীতিতে যথেষ্ট।

কিন্তু তাই বলে বিজেপি-আরএসএস বা তাদের কর্মীরা কি কেবল এক হিন্দুত্বের আবেগের মধ্যেই তীব্রভাবে ডুবে থাকে- যেন কেবল এক হিন্দুত্বের ভাবাবেগের সুড়সুড়িই তাদের জন্য সব কিছু, ডুবে বুঁদ হয়ে থাকা? তাই কী? না, সম্ভবত তা একেবারেই নয়। যেমন আমরা পরীক্ষা করতে পারি এবার ভারতে পেঁয়াজ-উৎপাদক অঞ্চল বা রাজ্যে বন্যায় তা নষ্ট হওয়াকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজসঙ্কট খাড়া করেছে। বাংলাদেশের মত ভারতেও নিজের বাজারেও পেঁয়াজের সঙ্কট চলছে। চড়া মূল্যের বাড়াবাড়ি হয়ত বাংলাদেশের মত না। কিন্তু মজার ঘটনাটা হল, তুরস্ক ভাল সহনশীল দামে ভারতকে পেঁয়াজ দিতে রাজি হওয়ায় সেই তুরস্ক ভারতের কাশ্মির নীতির কঠোর সমালোচনা করে ধুয়ে দিলেও এ ব্যাপারে মোদীর ভারত সরকার চুপচাপ। যেমন ভারতের অনলাইন ‘দ্য প্রিন্ট’ পত্রিকায় একটা খবরের শিরোনাম হলো, ‘মোদি সরকার তুরস্কের কাশ্মির সমালোচনা শুনেও চোখ বুজেছে; কারণ ভারতের এখন তুরস্কের পেঁয়াজ দরকার” [Modi govt ignores Turkey’s Kashmir criticism — because India needs its onions]।

আবার প্রায় একই রকমভাবে মালয়েশিয়ার মাহাথির গত সেপ্টেম্বরে জাতিসঙ্ঘ অধিবেশনে ভারতকে কাশ্মিরে ভারত ‘দখলদার বাহিনী’ বলে অভিযুক্ত করেছেন। তাতে ভারত প্রথমে ছদ্মরাগ দেখিয়েছিল যে, তারা আর মালয়েশিয়ার পামঅয়েল কিনবে না। কিন্তু দামে সস্তা পাওয়ায় ভারত এখন আগের মতোই মালয়েশিয়ার পামঅয়েল আমদানি করতে শুরু করেছে। তাহলে অর্থ দাঁড়াল, উগ্র হিন্দুত্বের তথাকথিত আবেগ নয়, এমনকি মুসলমানবিদ্বেষ বা ঘৃণা ছড়িয়েও নয়; সুখ বলতে তা এখনো তাদের কাছে বিষয়-আশয়ের বস্তুসুখের মধ্যেই, সেখানে হুঁশ জাগ্রত রেখে খাড়া বৈষয়িক লাভালাভেই তাদের সুখ।

কাজেই ভুয়া হলেও বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি হল বাছবিচার হুঁশহীন এক উগ্র হিন্দুত্বই। যদিও সম্প্রতি তাদের পরপর দুইটা বড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। একটা হল মোদী সরকারের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির মাপ জিডিপিতে ধস নেমেছে। আসলে বলতে হবে, এবারের ধস আর লুকিয়ে রাখা যায়নি। দুই বছর আগে যেটা  ৮ শতাংশ বলে মোদী দাবি করেছিল, কিন্তু সেটা আসলে আড়াই পার্সেন্ট বাড়িয়ে বলা হচ্ছিল।  সেই বাড়ানো ফিগারটাও এখন কমতে কমতে এবার ৪.৫ শতাংশ হয়ে গেছে। এটা সমাজের সব কোনায় হাহাকার তুলে ফেলেছে। কাজেই এটা ঢাকা দিতে এখন আবার কোনো এক জবরদস্ত মুসলমানবিদ্বেষ-ঘৃণার ইস্যু দরকার।

এ ছাড়া তাদের আরেক বিপর্যয় ঘটেছে আসামের এনআরসি ইস্যুতে। তারা হিন্দুমনকে খুব তাতিয়েছিল যে, নিশ্চয় লাখ লাখ নাগরিকত্ব অপ্রমাণিত মুসলমান থেকে যাবে এমন-তারা তালিকায় দেখতে পাবে আশা করেছিল। কিন্তু হিন্দুদেরই হাহাকার উঠেছে কারণ নাগরিক-প্রমাণে ব্যর্থ হওয়া মোট ১৯ লাখের ৭৫ শতাংশ হলো হিন্দু। এখন উঠতে-বসতে বিজেপিকে বদ দোয়া দেয়া আসামের এই হিন্দুদেরকে সামলানোই কঠিন হয়ে গেছে বিজেপির। অন্যের জন্য খুড়ে রাখা গর্তে পড়ে এখন উলটা বিজেপিরই জান যায় অবস্থা।
তাই বিজেপি এখন অছিলা খুঁজছে দু’টি- ১. তৈরি হওয়া আসামের এনআরসি তালিকাই বাতিল বলে ঘোষণা করে দিতে আর ২. ভারতের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন।

বিজেপির মূল লক্ষ্য আসলে ‘বিদেশী’ বলে বা ‘মুসলমান’ বলে একটা কল্পিত স্থায়ী শত্রু খাড়া করে ফেলা; যারা সব সময় নাকি ভারতের ‘হিন্দুস্বার্থের বিরোধিতা’ যাচ্ছে এভাবে এমন একটা গল্প ও ইমেজ বিজেপি খুজছে যা দিয়ে সে একটা স্থায়ী শত্রুরূপ দান সম্পন্ন করতে চাচ্ছে। বিজেপির ইচ্ছা কল্পিত এমন শত্রুর বিরুদ্ধেই সারাজীবন সে লড়াই করে যাচ্ছে তা দেখাতে পারে। যেন সে এই চেক ভেঙে ভেঙে সব সময় খেয়ে চলতে পারে, পোলারাইজেশন ও ভোটের বাক্স ভরার রাজনীতি করে যেতে পারে। সে কাজে এমন স্থায়ী এক ইস্যু হতে পারে যেমন সেটা হতে পারে এমন যে ‘ভারত জুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো- এই শ্লোগান।

তবে আসলে এটা আর অনুমান হিসেবে নেই, গৃহীত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। ‘ভারতজুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো এই বয়ানেই একমাত্র বিজেপি রাজনীতি করবে ও করতে হবে, এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে মোদি-অমিতের দানবগোষ্ঠী।

অর্থনীতিতে ডুবে গিয়ে এরা এখন এমন অবস্থায় যে ‘ভারতজুড়ে এনআরসি’ আর, বিদেশী খুঁজতে হবে- এটাই তাদের একমাত্র বাঁচার সম্ভাবনার রাজনীতি হয়ে গেছে। ব্যাপারটা আঁচ করে দক্ষিণী প্রাচীন পত্রিকা দা হিন্দু এডিটোরিয়াল লিখে বলেছে The Centre should focus on the economy and address issues of real concern] কেন্দ্র সরকারের উচিত অর্থনীতির দিকে যেটা প্রকৃত উদ্বেগের ইস্যু সেদিকে মনোযোগ দেয়া উচিত।
যেমন এখন ঝাড়খণ্ড রাজ্যের নির্বাচন চলছে, সেখানে অমিত শাহ নির্বাচনী জনসভা বক্তৃতা করেছে- “ভারতজুড়ে এনআরসি করতে হবে”, এই লাইন নিয়ে। আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং- “আপনার পাশের লোকটা বিদেশী নয়তো, চেক করেছেন কী”- এমন বিদেশীভীতি বা জেনোফোবিয়া ছড়ানোর উদ্যোগ-রাস্তা ধরেছে। এটাকে এক মানসিক অসুস্থতা বললেও খুব কমই বলা হবে।

কিন্তু এর আগে ইতোমধ্যে আসামে যে ড্যামেজ ঘটে গেছে, তা হলো এনআরসি মোট ১৯ লাখ বাদ পড়াদের মধ্যে ১৪ লাখই হিন্দু। তাই এখন উলটা আসামের সমাজ থেকে এদের বাদ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে হবে বিজেপিকে। তাই, এদেরকে বাঁচানোর ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে আগামী সপ্তাহে আনা হচ্ছে, ১৯৫৫ সালের পুরনো নাগরিকত্ব বিলের এক সংশোধনী। এটাই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ২০১৯। যাতে তাদেরকে আবার নতুন করে নাগরিকত্ব দেয়া যায়। সেই উদ্দেশ্যে এই বিলে বলা হবে, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ বা পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিষ্টানরা (কিন্তু মুসলমানরা বাদ) অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে থাকলেও তারা ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে বিবেচিত হবে না; বরং উল্টো যেমন বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ হিন্দু অভিবাসী এবং বৈধভাবে আসা অভিবাসী (কিন্তু যাদের ভিসার মেয়াদ পেরিয়ে গেছে), তারা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

আসলে আগের ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুসারে কোনো অবৈধ অভিবাসী (ভিসা ছাড়াই ঢুকে পড়া বা ভিসার মেয়াদ শেষেও থাকা) বিদেশী ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারে না। সোজা কথায় মোদী নতুন আইনে এই বাধা তুলে দিতে চাইছে; কিন্তু মূলত মুসলমান ছাড়া বাকি সব ধর্মের মানুষের জন্য সুযোগ রেখে দিয়ে- এভাবে আনা হবে এই সংশোধনী। এটাই এর প্রত্যক্ষ মুসলমানবিদ্বেষ এবং মুসলমানবৈষম্য।

এমন এই বিদ্বেষ ও বৈষম্য তৈরি করা – এটাই হবে বিজেপি-আরএসএসের রাজনৈতিক পুঁজি। স্থায়ী ঘৃণাবিদ্বেষ তৈরি ও ছড়ানোর উৎস; যাতে এটা কেনাবেচা থেকেই স্থায়ীভাবেই পোলারাইজেশনে বিজেপি প্রার্থীর বাক্স ভরার রাজনীতি করে যাওয়া যায়। এক দিকে ‘ভারত জুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো- এর রাজনীতি চালিয়ে অস্থির ঘৃণাবিদ্বেষ উত্তেজনা তাতিয়ে রাজনীতিতে টিকে থাকা, মুসলমান তাড়িয়ে খাঁটি হিন্দুদের ভারত কায়েম করা- এ এক বিরাট মাইলেজের স্থায়ী ইস্যুর রাজনীতি বিজেপি-আরএসএস নিজের জন্য তৈরি করতে চাইছে। আর এ কাজ করতে গিয়ে কোনো হিন্দু এতে ফেঁসে নাগরিকত্ব খোয়ালে তাকে আবার নাগরিকত্ব দিয়ে আগের মতোই ভারতে রেখে দেয়া যাবে। এই সুবিধা তৈরি করতে চাইছে বিজেপি। অর্থাৎ বিজেপি-আরএসএস-কে তাদের ঘৃণ্য-রাজনীতির ইস্যু সরবরাহের নিয়মিত খোরাক হয়ে থাকতে হবে, আর স্থায়ীভাবে নাগরিকবৈষম্যের শিকার হতে থাকতে হবে ভারতের মুসলমান নাগরিকদের।

কিন্তু বিজেপি-আরএসএসের এই মুসলমান ‘বলি’ দিয়ে দেয়ার রাজনীতি- তা আবার ‘ভারত জুড়ে এনআরসি’ বা বিদেশী খোঁজো যে নামেই আসুক তা কি টিকেই যাবে? বিজেপি-আরএসএস এরাই কি একমাত্র সত্য হয়ে যাবে? আগাম কোনো কিছু শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যাবে না। কিন্তু ইতোমধ্যে যেসব অভিযোগ দেখা যাচ্ছে তা নিয়ে কিছু কথা এখানে বলা যায়।

এনআরসি নামে মোদি-অমিতের দানব শয়তানি শুরু ও শেষ হলে পরিণতি কী হয় তা মুসলমান-অমুসলমান নির্বিশেষে আসামের সবার তা দেখার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যে নেয়া হয়ে গেছে। অহমিয়া বা বিজেপি যতই এটা ‘বিদেশী’ বা মুসলমানরাই কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে খুশিতে থেকেছিল বটে, কিন্তু সবশেষে এটা তাদের নিজের জন্যই খানাখন্দ খুঁড়ে রাখার মতো কাজ হয়েছে। এখন হাহাকার উঠেছে। শুধু তাই নয়, পড়শি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গেও এ বিষয়ে পক্ষ-বিপক্ষের তর্কে ওই বাংলাও এখন বুঝে গেছে যে, নাগরিকত্বের ডকুমেন্ট সার্টিফিকেট আর কার্ড জোগাড়ের জন্য দৌড়াদৌড়ি কী জিনিস। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের যারা ইতোমধ্যে বিজেপিতে যোগ দিয়ে হিন্দুত্বে সুবিধা খাওয়া আর মুসলমানের রাস্তায় গড়াগড়ি যাওয়া ব্যালকনিতে বসে আরামে দেখা যাবে বলে ভেবেছিল, এরা নিজেই ইতোমধ্যে বুঝে গেছে এনআরসি কী জিনিস। এটা যে হিন্দু-মুসলমান বাছবিচার ছাড়াই নির্বিশেষে যে কাউকে চরমতম হয়রানির শিকার বানিয়ে ফেলতে পারে, সেটা এখন আসামের পরিণতি দেখে সবাই বুঝতে পেরেছে।

এনআরসিতে নাগরিক প্রমাণের দায় নাগরিকের, রাষ্ট্রের না। অথচ একটা ডকুমেন্ট ব্যক্তিপর্যায়ে রক্ষা সংরক্ষণ যতটা কঠিন রাষ্ট্রের হেফাজতখানা, সেটা রক্ষা উল্টো ততই সহজ। ব্যক্তি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হতে পারে সবচেয়ে সহজে। তাই স্বাভাবিক ছিল, কেউ নাগরিক নয় তা প্রমাণের দায় থাকা রাষ্ট্রের কাঁধে। ইন্দিরার আমলে একসময় এটা তাই ছিল।

এ ছাড়া এমনিতেই দুনিয়া এখন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের- এর প্রধান স্বভাব বৈশিষ্ট্য তাই এমন যে পুঁজি আর শ্রমের (মানুষের) মাইগ্রেশন এখানে হবেই, তারা নিরন্তর ঘুরে বেড়াবে। শুধু মানুষ নয়, পুঁজিও এখানে দেশী-বিদেশী পরিচয় নেবে, ঘটবে। তাই ব্যাপক ইকোনমিক মাইগ্রেশন মানে বৈধ-অবৈধ লেবার মাইগ্রেশন সবচেয়ে কমন ঘটনা হবে এখানে। এর ওপর ভারতবর্ষের দেশভাগ- এটা নিজেই সবচেয়ে স্থায়ী এক রাজনৈতিক মাইগ্রেশনের ফেনোমেনা। যা কখনই একেবারে শেষ হয়নি, হবে না। ফলে এখানে একটা নিচু মাত্রার বা কিছু মাত্রার মাইগ্রেশন সব সময় আছে এবং আশা করি আরো অনেক দিন থাকবেই। একমাত্র বদ মতলব থাকলেই কেবল এটাকে কেউ ইস্যু হিসেবে হাজির করতে চাইবে, আর কেবল মুসলমানবিদ্বেষ হিসেবে এটাকে ব্যবহার করতে চাইতে পারে।

‘মাত্র ছয় মাস। তার মধ্যেই ভগ্নমনোরথ দশা কাটিয়ে নিমেষে চাঙ্গা হয়ে উঠল তৃণমূল। তিনটি বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চমকে দেয়া পুনরুত্থান ঘটালেন নিজের দলের। তৃণমূলের ২১ বছরের ইতিহাসে কোনো দিন জয় মেলেনি যে দুই আসনে, সেই কালিয়াগঞ্জ এবং খড়গপুর সদর আসনও ছিনিয়ে নিল ঘাসফুল। আর লোকসভা নির্বাচনে করিমপুরে যে ব্যবধানে এগিয়ে ছিল তৃণমূল, এবার জিতল তার চেয়ে অনেকটা বেশিতে।’ এটা এ মাসের শুরুর দিনে আনন্দবাজারের এক রিপোর্ট টুকে এনেছি।

গত মে মাসে মোদির আরো বেশি আসন নিয়ে দ্বিতীয়বার বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার পর ছয় মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে তিনটি প্রাদেশিক আসনে উপনির্বাচনের ফলাফল এসেছে। তাতে এর তিন আসনই পেয়েছে মমতার দল। অথচ এ তিনটির দু’টিতে মমতার দল গত ২১ বছরে কখনো জিততে পারেনি। এই তিনটি আসনই হয় মুসলমান প্রধান অথবা বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া নয়তো বা আসাম লাগোয়া আসন। আর এসব সত্ত্বেও এগুলোর দু’টি ছিল সিপিএম বা কংগ্রেসের দখলে। আর একটি এমন রাজ্য বা বিধানসভা আসনের উপনির্বাচন, যা গত কেন্দ্র নির্বাচনে প্রথম বিজেপি দখলে যাওয়া আসনের অন্তর্গত। তাই এবারের নির্বাচনের শেষে ফলাফল দেখে সব পক্ষই একবাক্যে স্বীকার করেছে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা সবাই এনআরসি আতঙ্কে দৌড়াচ্ছে, ভুগছে। এনআরসি তাদের আক্রমণ করে ফেলেছে। কলকাতার বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষও স্বীকার করে নিয়েছেন বলে রিপোর্ট বলছে, Dilip Ghosh on Saturday identified “fear and confusion over NRC” ।

তাই সেই আতঙ্কের একমাত্র ত্রাতা হিসেবে মমতা তাদের আশ্রয় হয়ে ধরা দিয়েছে। তাই মমতার বিজয়। আগে তারা ভেবেছিল বিজেপির উত্থানে মুসলমানের কোণঠাসা হওয়া দেখতে তাদের খারাপ লাগবে না হয়তো। কারণ, ‘মমতা নাকি চাপে থাকা মুসলমানদের রশি আলগা করে মাথায় তুলেছিল।’ আর এখন বেলকনিতে বসে “মুসলমানদের কষ্ট পাওয়া দেখার মজা” দেখতে চাওয়ারা বুঝে গেছে, ব্যাপারটা এমন মজা-তামাশার নয়। এনআরসি মানে নিজেই নিজের জন্য হয়রানি ডেকে আনা, পকেটের পয়সা খরচ করে দুঃখ কেনা। তারা প্রত্যেকে ছোট চাকরি বা ব্যবসায় স্বল্প আয়-ইনকামে অস্থির থাকতে হয় এমন জীবন যাপন করেন। সেখানে উটকো নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের টেনশন? এই হয়রানি ডেকে আনা তাদের জীবনের অর্থ কী! কলকাতায় ইতোমধ্যে রেশন কার্ড বা ডকুমেন্ট ইত্যাদি জোগাড়ের নীরব দৌড়াদৌড়ি কেউ কেউ শুরু করে দিয়েছেন। কাজেই কেউ পারলে তাদের সেই ত্রাতা হতে পারেন মমতা- এই মেসেজই তারা হাজির করে ফেলেছেন!

ইতোমধ্যে আর একটা বড় ডেভেলপমেন্ট আছে। গত মে মাসে শেষ হওয়া নির্বাচনে এক ব্যাপক কারচুপি হয়েছে আর তা মূলত ডিজিটাল ব্যালট-কেন্দ্রিক ব্যবস্থার সুযোগে। এটা বিজেপি ছাড়া মূলত সব আঞ্চলিক দল বিশ্বাস করে। যদিও হাতেনাতে দেয়ার প্রমাণ হাজির করা মুশকিল। এ ধারণা আরো জোরদার এ জন্য যে, নির্বাচন কমিশন বা সুপ্রিম কোর্ট গত নির্বাচনে খোদ মোদি বা বিজেপির বিরুদ্ধে নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। যায়নি। পাশ কাটিয়ে চলেছে। সেটিও আবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল যে, যদি তা করতে হয়, তবে আগ্রাসী মোদির নির্বাহী ক্ষমতার সাথে সঙ্ঘাতে যাওয়ার রিস্ক তাদের নিতেই হতো। যদিও কনস্টিটিউশনালি সে ক্ষমতা তাদের দেয়াই আছে। কিন্তু কেউই আসলে সঙ্ঘাতে যেতে চায়নি। এমনকি একজন সক্রিয় আপত্তিকারী কমিশনার এখনো মোদির নির্বাহী ক্ষমতার হয়রানির শাস্তি ভোগ ও মোকাবেলা করে চলেছেন।

তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, ইতোমধ্যে তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে সংসদে ১৯টা বিজেপি-বিরোধী পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয়েছে। ‘নির্বাচনী সংস্কার, ব্যালট ফেরানোর প্রস্তাবকে সামনে রেখে’ রাজ্যসভায় স্বল্পমেয়াদি আলোচনার জন্য যৌথভাবে নোটিশ দিয়েছেন এ দলগুলোর নেতারা। এমন ইস্যুগুলো আস্তে ধীরে বড় ও সফল হয়ে উঠতে পারে, যা বিজেপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে হাজির হতে পারে। আপাতত আগামী সপ্তাহের উত্তেজনা নাগরিকত্ব আইন সংশোধনী বিল নিয়ে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা গত  ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

মোদীর অর্থনীতিতে ধ্স আর লুকানো গেল না

মোদীর অর্থনীতিতে ধ্স আর লুকানো গেল না

গৌতম দাস

০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2Os

ভারতের অর্থনীতির দুরবস্থা আর লুকিয়ে রাখা গেল না। এবছর মোদীর দ্বিতীয়বারের সরকার ক্ষমতায় বসার পর দ্বিতীয়-ত্রৈমাসিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৯) রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে গত ২৯ নভেম্বর। এবারও জিডিপি আরো অর্ধশতাংশ কম। অর্থাৎ গত কোয়ার্টারে ছিল ৫ শতাংশ, সেই জিডিপি এবার হয়েছে আরো কমে, ৪.৫ শতাংশ। অর্থাৎ এটা আগের তিন মাসের চেয়েও আরো কম।

গত ২০১৬ সাল থেকে তথ্য লুকিয়ে বা আড়াল করে না হলে, গণনার ভিত্তিবছর বদলানো বা অন্য কোনো ছলে আড়ালে দিয়ে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নিয়ে মোদী সরকার যে খেলা করে আসছিল  সেসব এবার আর অস্বীকার করার বা লুকিয়ে ফেলে পালাবার সুযোগ অনেক কিছুই আর থাকল না। তবে শেষে এসে এখন তর্কটা হল, জিডিপি ৪.৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে, সেটা তো লুকানোর নাই। তাই এখন বিরোধীদের সাথে তর্কের পয়েন্ট হল, অর্থনীতি ধীরগতি বা শ্লথগতির এটা স্বীকার করে নিয়েও মোদীর অর্থমন্ত্রী গলাবাজির করে বলছে এটা এখনও অর্থনৈতিক “মন্দা” [recession] বলে ডাকা যাবে না। ভারতের পার্লামেন্টে এই তর্কই চলছে এখন।

রাষ্ট্রের অর্থনীতির দিকে নজর বা খেয়াল রাখার মূল কাজটা হল “মনিটরিং”। উৎপাদনের সামগ্রিক এবং ঘুঁটিনাটিতেও তথ্য-পরিসংখ্যানে অর্থনীতি কোথায় কমল না বাড়ল এবিষয়গুলো যেকোন রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নিয়মিত চোখে চোখ রাখা হয়। এই চোখ রাখা বা মনিটরিং ডাটা সংগ্রহের ব্যাপারটার সাধারণ স্ট্যান্ডার্ড হল প্রতি বছর এটা চারবার মানে প্রতি তিন মাস শেষের ডাটা সংগ্রহ করে পুরো হিসাবনিকাশ গণনা প্রক্রিয়া শেষ করা হয় একবার করে, এভাবে বছরে চারবার বা চার কোয়ার্টারে। আর প্রতি বছর এই চারবারের গড়টাই আবার বছরের জিডিপির মান বলে প্রকাশিত হয়। গতকাল ২৯ নভেম্বর ভারতের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক বা কোয়ার্টারের (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৯) জিডিপির হিসাব প্রকাশিত হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সেকেন্ড কোয়ার্টারের জিডিপি ৪.৫ শতাংশ। কিন্তু এর তাৎপর্য কী?

প্রথমত, বাইরে প্রকাশ্যে যা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে এই অর্থে, কথাটা হল, এক বিরাট ধরনের হতাশা ছেয়ে বসেছে ভারতের  অর্থনৈতিক জীবনে, সর্বত্র। ইংরেজি দ্যা প্রিন্ট পত্রিকা থেকে টুকে আনা কিছু তথ্য দেখা যাচ্ছে, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৯ এই কোয়ার্টারে ম্যানুফ্যাকচারিং কমেছে ১ শতাংশ, কৃষিতে বেড়েছে মাত্র আড়াই শতাংশ হারে, স্থাপনা-কাঠামো ৩.৩ শতাংশ বেড়েছে ও বিদ্যুৎ বেড়েছে ৩.৬ শতাংশ, ইত্যাদি। [Data released by the National Statistical Office showed that while manufacturing contracted by 1 per cent in the July-September quarter, agriculture grew by 2.1 per cent, construction by 3.3 per cent and electricity generation by 3.6 per cent.]।

এছাড়া ইন্ডিয়া রেটিং ও রিসার্চ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ইকোনমিস্ট সুনীল কুমার সিনহার উদ্ধৃতি দিতে একই পত্রিকা লিখেছে, এবারের জিডিপি এমন কমে যাবার পিছনে তিনি দুটা কারণ উল্লেখ করেন – “কেনাকাটা কমিয়ে দেয়া মানে ভোক্তাদের ব্যয়সংকোচন আর রপ্তানিতে ধবস নামা”  […slowdown in GDP growth is largely on account of the slump in consumption expenditure and de-growth in export]।

এসব আবার অবশ্যই হঠাৎ করে ঘটে নাই। যেমন কারখানা উৎপাদনের মধ্যে গত তিন মাস ধরে প্রাইভেট কার উতপাদনের কোম্পানিগুলোর অবিক্রীত গাড়ির তথ্য ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছিল বানের জলের মত। অবিক্রীত গাড়ির সংখ্যা সেখানে দেখিয়েছিল বছরের উৎপাদিত গাড়ি্র ৪৫ শতাংশই  অবিক্রীত।

আসলে ভারতের জিডিপির পরিসংখ্যানের হিসাবে এর ধারাবাহিক পতনের শুরু হতে দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালের মার্চের পর থেকে। মানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের শেষ কোয়ার্টার জানুয়ারি-মার্চ -এর পর থেকে, সেবারই ছিল শেষ উঁচু জিডিপি ৮.১ শতাংশ। এর পর থেকে গত দেড় বছর ধরে চলছে টানাভাবে ওই শেষ উঁচু জিডিপিরই পতনের কাল। এটাই ধারাবাহিকভাবে প্রতি কোয়ার্টারে কমতে কমতে এসে এবার হয়েছে সাড়ে চার শতাংশ। যেটা এর আগের কোয়ার্টারে (এপ্রিল-জুন ২০১৯) ভারতের জিডিপি ছিল ৫ শতাংশ।

জিডিপিকে আবার উপমহাদেশের ভিত্তিতে ভাগ করে দেখে এর ভিন্ন কিছু তাৎপর্য বুঝা যেতে পারে। যেমন, এখানে বলে রাখা যায়, এশিয়ান জিডিপি হিসাবে সাড়ে চার শতাংশ হওয়ার অর্থ এটা খারাপ জোনের মধ্যে পড়ে যাওয়া, মনে করা হয়। সে হিসাবে পাঁচ বা এর বেশি শতাংশকে ভাল জিডিপির শুরু মনে করা হয়। আবার তুলনায় ইউরোপ-আমেরিকা্‌ সেখানে কোন রাষ্ট্রের চার শতাংশ জিডিপি হয়ে যাওয়া মানে এটা খুবই ভাল উন্নতি। সাধারণত ইউরোপ-আমেরিকা এই জোনের দেশ এক-দুই শতাংশের জিডিপিতেই আটকে থাকে। মূল কারণ পুরনো কলোনি মালিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রের অর্থনীতি বা উন্নত অর্থনীতির আমেরিকা বলতে এরা আসলে পুর্ণ-সম্পৃক্ত বা স্যাচুরেটেড [saturated] অর্থনীতি বলে মানা হয়। তাই এটা যা আছে তাতে টিকে থাকতে পারা সেটাকেই অনেক সাফল্য মনে করা হয়।

তুলনায় এশিয়ান যেকোনো অর্থনীতি মানেই  কয়েক শত বছর ধরে থেকে উদ্বৃত্ত সম্পদ বা পুঁজি পাচার হয়েই চলে গেছে এমন অর্থনীতিই হবে সেটা। এই কারণে কলোনিমুক্ত স্বাধীন হওয়া পরেও একালে এসব দেশে অবকাঠামো ও উৎপাদনে বিনিয়োগের ব্যাপক পিছিয়ে থাকা ঘাটতি মেটাতে বিদেশী পুঁজি ধারে নিয়ে তা সুদসহ ফেরত দিয়েও এসব রাষ্ট্রের অনেক আগানো-উন্নতির পটেনশিয়াল থাকে। এরই থ্রেসহোল্ড জিডিপি মানে ন্যূনতম পা-রাখার জায়গা হল ৫ শতাংশ জিডিপি। আবার দেশ যোগ্য দল ও নেতৃত্ব পেলে এরা এর চেয়েও অনেক উপরে উঠতে পারে। কিন্তু এসব দেশের জিডিপিকে ন্যূনতম আট শতাংশের উপরে না নিতে পারলে বিরাট পরিবর্তনের স্বপ্ন আশা করা, স্বপ্ন দেখা অবান্তর। আবার ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারলে যেমন চীন, ১৯৯০-২০০৭ এই সময়কালে অনেক বারই ডাবল ডিজিট বা ১৩.৬ শতাংশ পর্যন্ত নিজের জিডিপি উঠিয়েছিল।

আবার ওদিকে আরেক ফেনোমেনা দেখা দিয়েছে একালে। দেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানগত ফ্যাক্টস ফিগারের মধ্যে  বাইরে থেকে হাত ঢুকিয়ে দেয়া –  বিভিন্ন দেশে আজকাল এটা অনেক বেশি হতে দেখা যাচ্ছে। এভাবে আজকাল তথ্য-পরিসংখ্যান সাজিয়ে-বানিয়ে নেয়া ও ভাল পরিসংখ্যানের দাবি করা হচ্ছে অনেক বেশি। অনেকে এমন দাবি উঠে আসা কেন – এর মূল কারণ হিসাবে – ভোট বা পপুলার রাজনীতিকে দায়ী করেন। মানে এই প্রবক্তারা বলতে চায় রাজনীতিতে ‘পপুলারিটি’ বা ভোটের রাজনীতি আজকাল এতই প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ এরা বলতে চাচ্ছে আগে এটা এত বড় বিষয় ছিল না। এই প্রবক্তারা যেন বলতে চায়, আগে পাবলিক অনেক রয়েসয়ে ভোটের সিদ্ধান্ত নিত। আর এখন হয়েছে উল্টো। এই কথাটা সত্য যে, খারাপ পারফরম্যান্স বা খারাপ অর্থনীতিতেও ওর তথ্য ঠিকঠাক লুকিয়ে রেখে অনেক শাসক অনেকদূর তথ্য আড়াল করে কাটিয়ে দিতে পারে ও পারতে দেখা যাচ্ছে।

অবশ্য আমাদের নিজের দেশে ভোট না হলেও এখানে পপুলারিটি মানে মিথ্যা যেকোনো কিছু পরিসংখ্যান দাবি করার সুযোগ কত বেশি- সেটা বুঝতে হবে। তবে আমাদের দেশের মতই ভারতেও তথ্য-পরিসংখ্যান লুকানোর একটা ভালো উপায় হল, গণনার ভিত্তিবছর বদলে দেয়া। অর্থনীতির পরিসংখ্যান গণনা প্রক্রিয়ায় বিরাট অংশটাই তুলনামূলকভাবে বলা হয় এমন ভাষ্য। অর্থাৎ কোন কথা বলার সময় তাতে কোন একটা বছরকে ভিত্তি বছর ধরে এর ধারণা তৈরি করে কথা বলা হয়। কিন্তু এখনকার প্রবল প্রচলন হল ভিত্তি বছর কিভাবে কোন বছরকে ধরলে আমার আমলের পরিসংখ্যানগুলো বড় ফিগার দেখাবে, উজ্জ্বল্ হয়ে উঠবে সেভাবে ভিত্তি বছর বদলে নেয়া হচ্ছে। এমন মিথ্যা বলার সহায়ক পরিসংখ্যানবিদও আজকাল অনেক বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এটা আমাদের দেশে হচ্ছে, মনমোহনের আমলে অভিযোগ ছিল, মোদীর আমলে সে অভিযোগ আরো বেশি।

গতকালের (৩০ নভেম্বর) আনন্দবাজার,  জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এক অধ্যাপিকা জয়তী ঘোষের বরাতে মনে করাচ্ছে, “মোদী জমানায় জিডিপি মাপার পদ্ধতি বদলে দেওয়া হয়। সেই পদ্ধতি নিয়েই বিতর্ক রয়েছে”।  পত্রিকা আরও লিখেছে, “বস্তুত, মোদী সরকারের প্রাক্তন মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যনই বলেছিলেন, নতুন পদ্ধতিতে জিডিপি মাপায় তা ২ থেকে ২.৫ শতাংশ অঙ্ক বেশি হচ্ছে। তাঁর কথা মানলে আদতে আর্থিক বৃদ্ধির হার ২ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে”। অর্থাৎ পরশু যে জিডিপি ফিগার ৪.৫% বলে দেখানো হয়েছে এটাও আগের প্রকৃত হিসাবে এখন এটা মাত্র ২%।

ভারত চেম্বারের সভাপতি সীতারাম শর্মার আশঙ্কা, কেন্দ্র ব্যবস্থা না-নিলে দেশকে মন্দার হাত থেকে বাঁচানো কঠিন। তাঁর দাবি, ‘‘আর্থিক হাল ফেরানোর কোনও ব্যবস্থাই ফল দেয়নি। চাহিদা বাড়ানোর ব্যবস্থা চাই।’’ অনেকেরই আশঙ্কা, বৃদ্ধির হার আর যদি না-ও কমে, তবু বছর দুয়েকের মধ্যে তার মাথা তোলার সম্ভাবনা কম।

সে যাই হোক, ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর নরেন্দ্র মোদীকে অর্থনীতিতে প্রথম নেতি প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয় ‘ডিমনিটাইজেশন’ [demonetization] নিয়ে। মানে প্রচলিত ভাষায় যাকে সরকারের “নোট বাতিলের” সিদ্ধান্ত বলা হয় সেটা।  মানে ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় হঠাত, মোদীর পাঁচশ ও হাজার রুপির নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছলেন সেকথাই বলা হচ্ছে। এটা ছিল অর্থনীতিতে নেতি প্রতিক্রিয়া-পরিস্থিতিকে যেন মোদীর নিজেই ডেকে আনার এক কাজ।

যেন এতে মোদীর সরকার বিপুল পরিমাণ কালো টাকা ধরে ফেলতে পারবেন, আর তাতে একক হাতে বিরাট ছক্কা মেরে দেবেনই, এই মিথ্যা লোভে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু এই নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে ভারতের অর্থনীতি উলটা বিরাট ধাক্কা খেয়েছিল। বিরাট ইতিবাচক ফলাফলের আশা অথবা অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠবে ইত্যাদি এমন কিছু আশা ছড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন মোদী।  কিন্তু না, এমন কোনো কিছুই আসেনি, এমন কোনো কিছু মোদির কপালে জোটেনি। উলটো ভারতের অর্থনীতি প্রবলভাবে ধাক্কা খেয়েছিল। সেই থেকে মোদী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আর কখনো তার কোনো অর্থনৈতিক সাফল্য আছে এ কথা বলতে পাবলিকলি সামনে যান নাই।

‘ইনফরমাল সেক্টর’ [informal sector] বলে একটা কথা আছে। অনেক ঝকমারি কথা মনে হলেও আসলে তা নয়। ফরমাল সেক্টর কথাটার সোজা অর্থ হল, একটা গ্রামে যদি একটা গাড়ির কারখানা বসিয়ে ধরা যাক ৬০০ লোককে কারখানার ভেতরে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া যায় তবে ওই এলাকায় ঐ শ্রমিকদের একেকজন পিছু আরও ছয়জন করে মোটামুটি প্রায় আরো ছত্রিশ শত লোকে বিভিন্ন কাজ পাবার অবস্থা হবে, এটা ধরা হয়। এতে ৬০০ জনের ফরমাল চাকরি হলে, মানে তাদের জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজ সৃষ্টি করলে এতে অপরিকল্পিতভাবে আর বাকিরা (ছত্রিশ শত) ইনফরমাল শ্রমিক হিসেবে কাজ পাবে।  যদিও এরা কারখানার ভিতরে কাজ পাবে না। বাইরে নানা সহায়ক পেশা যোগাড় করে নিবে। এদের মধ্যে বাদামভাজা বেচতে আসা অথবা শ্রমিকদের ভাত রান্নার লোক, কিংবা চা দোকানি, সবজি বা মুদি দোকানি বা হকার ইত্যাদি – এরা এমন বিভিন্ন পেশার লোক হবে।

মোদির ডিমনিটাইজেশনের ঘোষণায় সয়লাব করা সবচেয়ে বড় নেতি প্রভাব হল, মোদীর নোট বাতিলের ঘোষণায় কাজ হারিয়ে ‘বলি’ হয়ে গিয়েছিল ভারতের এই ইনফরমাল সেক্টর। ভারতের শিল্পে অগ্রসর রাজ্য বলতে মুম্বাই, গুজরাটকে ধরা হয়। এ কথার আরেক প্রমাণ হল, ২০১৬ সালের আগে এখানের নিম্ন মধ্যবিত্তের হাতে  আয়-ইনকাম ভাল হওয়াতে কিছু বাড়তি সঞ্চয়ও আসত। আর তা আসত বলেই সেই সূত্রে কলকাতার স্বর্ণকাররা প্রতি ওস্তাদ সাথে তার ছয় সগরেদকে নিয়ে মুম্বাই বা গুজরাটে সেখানে দোকান দিয়ে বসতে দেখা যেত।

এতে স্বর্ণকার ওস্তাদ-সাগরেদরা নিয়মিত কলকাতায় পরিবারে টাকা পাঠাতে পারত। মানে সব পক্ষেরই আয়-ইনকাম নিয়ে বেচে থাকা একটু ভাল হচ্ছিল। কিন্তু হঠাত সবই ডুবে গিয়েছিল মোদীর ঐ ‘নোট বাতিলে’। কারণ সবারই আয়-ইনকাম এলোমেলো হয়ে যায় এতে। বিশেষ করে বাড়তি কাজ বা আয়ের সুযোগ যেখানে ছিল সেখানে সব, সবার আগে ছেঁটে পড়েছিল। তাই সেই শকিং ফলাফল বাস্তবতার মুখে ওস্তাদ-সাগরেদেরা সবকিছু গুটিয়ে কলকাতায় ফিরে চলে গেছিল। অর্থাৎ ফরমাল কাজ দিতে না পা্রার ব্যর্থতা ভারতের অর্থনীতির বহুদিনের। কিন্তু তা থাকলেও ইনফরমাল কাজ যোগাড় করে আধপেটে খেয়ে হলেও নিজের সারভাইবাল মানুষ কষ্ট করে যোগাড় করে নিচ্ছিল। কিন্তু মোদীর   ডিমনিটাইজেশন খুবই অবিবেচক সিদ্ধান্ত বলে হাজির হয়েছিল। ডিমনিটাইজেশন গরীব জীবনকে আরও অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছিল। মূল কারণ বাজারে লেনদেন করার মত মুদ্রার অভাব আর তা থেকে ছড়িয়ে পড়া অনাস্থা। সেখান থেকে শঙ্কা। সার কথায় মোদীর অর্থনীতিও মানুষকে ফরমাল চাকরি তো দিতেই পারে নাই, কিন্তু মোদী ডিমনিটাইজেশন করে মানুষের ইনফরমাল কাজ-চাকরিটাও খেয়ে ফেলেছিল।

ভারতের অর্থনীতির আরেক পুরানা মূল সমস্যা হল, এখানে ফরমাল সেক্টরে যে কাজ পেল পরের ছয় প্রজন্মের সন্তানেরও হয়ত আর ফরমাল চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।  কথাটা অন্যভাবে বললে, কষ্ট করে কোন সরকারের একটা টার্ম অর্থনীতি ভালো চললেও পরেরবার এটা শেষ, ঢলে পড়বেই। মনমোহনের আমলে তাই হয়েছিল। তাই দ্বিতীয়বার কংগ্রেস-জোট (২০০৯) আবার জেতার পর মনমোহন সরকারের অর্থনীতির ঢুবে সব শেষ হয়ে গেছিল। আবার পরে ২০১৪ সালে মোদী প্রথমবারই ক্ষমতায় আসার দু’বছর পরে (২০১৬) খারাপ দিন চলে এসেছিল। আর এখন তো খারাপ দিন শুরু হয়ে গেল সম্ভবত।

এ দিকে, গতকালই মনমোহন সিং এক বিরাট বাণী দিয়েছেন মোদীকে। সেটা ঠিক বিরোধী রাজনীতিকের বক্তব্য নয়, যেন পেশাদার অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরামর্শ, এমন মানে দেয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। প্রায় ৮০০ শব্দের এক পরামর্শ বক্তব্য। না অবশ্যই, সব সমস্যার ধনন্বরি সমাধান মনমোহন বা তার কংগ্রেস দলের কাছে এখন আছে অথবা তাদের আমলেও হাতে ছিল ব্যাপারটা তা একেবারেই নয়। বরং সেকালে মনমোহনের দ্বিতীয় টার্মের যে অর্থনৈতিক ধস নেমেছিল, দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া কোনো সমাধান সে সময় মনমোহনের হাতেও ছিল না। কেবল মোদী তখন উলটো মনমোহনের বদলে তিনিই পারবেন কারণ গুজরাট চালানোর অভিজ্ঞতা তার আছে এই ভুয়া আশ্বাস তৈরি করে তিনি পরে (২০১৪) ক্ষমতায় জিতে আসতে মনমোহনের সেই ব্যর্থতাকে পুঁজি করতে পেরেছিলেন কেবল।

গতকালের মনমোহনের সেই লিখিত বক্তৃতার সার কথাটার শিরোনাম হল ‘ভয়ের রাজত্ব’ [“climate of fear” ]। মনমোহন আসলে অভিযোগ তুলে বলছেন যে, মোদী এখন ভারতে এক ‘ভয়ের রাজত্ব’ সৃষ্টি করে রেখেছেন। অনুবাদ করা সেই দু’লাইন হল এ রকমঃ
“উল্লেখযোগ্য ভয় ও অবিশ্বাস আছে অর্থনীতিতে নানান অংশগ্রহণকারীদের মনে। রাষ্ট্রের থেকে তুলনামূলক স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন, গণমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষগুলো, তদন্ত-গোয়েন্দা দফতরগুলো ইত্যাদি – এদের উপর আমাদের জনআস্থার সব কিছু ক্ষয়ে গেছে। আমাদের সমাজের এক গভীর অনাস্থা, চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা ভয় ও অসহায়ত্ববোধ – এসবের বিষাক্ত মিশ্রণে আমাদের অর্থনৈতিক তৎপরতার দমবন্ধ হয়ে আসছে, আর তা থেকেই অর্থনৈতিক উন্নতিও দমবন্ধ হয়ে আসছে” [“There is profound fear and distrust among our various economic participants. Public trust in independent institutions such as the media, judiciary, regulatory authorities, and investigative agencies has been severely eroded. This toxic combination of deep distrust, pervasive fear and a sense of hopelessness in our society is stifling economic activity and hence economic growth,” ] ।

অর্থাৎ মূলত এক পলিটিকো গভীর অভিযোগ তুলে মনমোহন মোদীকে ভাল বিধিঁয়েছেন।

কিন্তু এগুলো সম্ভবত ঘটনার আসল দিক নয়। কারণ, আগামী আরো চার বছর তাহলে মোদী-আরএসএস রাজ্য নির্বাচনগুলো করবে কিভাবে, কী হাতে নিয়ে? আরো বেশি করে হিন্দুত্ববাদ নিশ্চয়! – মানে এনআরসি, সিটিজেনশিপ, গরু বা লিঞ্চিং ইত্যাদির তাণ্ডব দিয়ে! তাই নয় কি?

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত  ৩০ নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে মোদির অর্থনীতির ঘণ্টা বেজে গেল!এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]