প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের সঙ্কটে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের সঙ্কটে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক

গৌতম দাস

 ২০ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2RG

‘Don’t worry about NRC’, Modi tells Hasina – New York, Sept 27 (UNB)

ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে উত্তেজনার পারদ চড়ছেই, তাতে যতই এটাকে সুপ্ত করে ফেলে রাখা অথবা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন! এটা লুকিয়ে থাকছে না। এর চেয়ে বড় কথা, সব হারানো মরিয়া মোদীর হাতে আমাদের বিক্রি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দরজায় কড়া নাড়ছে। বিগত ২০০৯ সালে এই সম্পর্ক শুরু হয়েছিল ‘বন্ধু-রাষ্ট্র’ বলে সোনার-পাথরের বাটি ধরনের এক অর্থহীন শব্দ দিয়ে। অথচ যা সোনার তৈরি তা আবার পাথরেরও, এমন হওয়ার সুযোগ কোথায়? অর্থাৎ রাষ্ট্রস্বার্থ মাত্রই তো তা আপনা-আপনা। যদি না দলীয় বা ক্ষমতায় থাকার স্বার্থের সাথে একে মাখিয়ে ফেলা হয়। একালে এসে যেটা আবার হয়েছে ‘স্বামী-স্ত্রী’ বলে আরেক ফালতু শব্দে। কূটনীতির জগৎ সম্পর্কে মন্ত্রীদের ন্যূনতম ধারণা থাকলে এসব শব্দ ব্যবহার আমাদের শুনতে পাওয়ার কথা নয়। সরকারকে কৌশলগত কাভার দেয়ার জন্য অনেক শব্দ অনেকসময় ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু তাই বলে এভাবে এসব শব্দ দিয়ে নিজেই নিজেকে খাটো নিচা করে দেখানো, বেইজ্জত করা কাম্য নয়। তবে কথিত স্বামী-স্ত্রীর অধস্তনতার সম্পর্ক যে এখন বড় ধরণের সঙ্কটে মুখোমুখি হয়েছে আর মতবিরোধ প্রকাশ্য হয়ে যাচ্ছে এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল দুবাই থেকে প্রকাশিত এক ইংরাজি দৈনিক গালফ নিউজ পত্রিকায়  সম্প্রতি দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাতকার [শিরোনাম “Citizenship Amendment Act is India’s internal matter, Sheikh Hasina says”]। বলতে গেলে তিনি সেখানে সরাসরি ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধিত আইন [Citizens Amendment Act, CAA] বা সিএএ-কে সমালোচনা করে “অপ্রয়োজনীয়” বলেছেন, “We don’t understand why [the Indian government] did it. It was not necessary,” । এটা আমাদের জন্য খুবই কৌতুহলের যে গত দশ বছরে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা সম্ভবত এই প্রথম ভারতের বা মোদী সরকারের খোলাখুলি ও প্রকাশ্য এমন সমালোচনা করলেন, নিজের অসম্মতি অপছন্দের দিক প্রকাশ করলেন। নিঃসন্দেহে এটা প্রকাশ্য মতবিরোধ বা স্বার্থবিরোধে। তবে এটাকে তিনি এখন কোথায় কোনদিকে কতদুর নিতে চান তা বুঝতে আমাদের অপেক্ষা করতে ও চোখ খোলা রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এই সাক্ষাতকারকে একই সাথে আন্তর্জাতিকভাবে আম-পাবলিকের কাছে মোদীর বিরুদ্ধে জনসমক্ষে বিচার দেয়া হিসাবেও পড়া যেতে পারে। ব্যাপারটা হল, ভারত সরকারের সিএএ বা এনআরসির কারণে ভারতের সম্ভাব্য বিতারিত মুসলমানেরা বাংলাদেশ অভিমুখে লাইন লাগিয়ে রওনা দিবে না। কারণ সিএওএ বা এনআরসি এগুলো ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়। একথাগুলোই হাসিনার গত অক্টোবর ২০১৯ সালে ভারত সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন [… Modi has in person assured me]। এই কথাগুলো গালফ নিউজে সাক্ষাতকারের মুখ্য ফোকাস হয়ে হাজির করা হয়েছে। তাই এটা মোদীর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ নালিশ অবশ্যই, কিন্তু নিজ সরকার টিকানোর ফ্যাক্টর ভারত – এই অধস্থন ও নির্ভরশীলতার সম্পর্কের দশ বছর পার হবার পর এখন এর কোন মুল্য তাতপর্য কী আছে? নাকি তাতপর্য বা সব মানে হারিয়েছে বলেই এটা এখন আম-পাবলিকের দ্বারস্ত – আমরা কি এভাবে পড়ব?

সিএএ বাস্তবায়নঃ
ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ অফিসিয়ালি গত ১০ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গেজেট হয়েছে। আর এদিকে কঠিন বাস্তবতা এমন যে বিজেপি বা মোদী সরকারকে এই সিএএ বাস্তবায়ন করতে যেতেই হবে। মোদী এমনই কোণের এক চিপায় পড়েছে। বিজেপির জন্য মরি আর বাঁচি ধরনের এক মরিয়া নিরুপায় অবস্থা এটা। কেন? কারণ, ভারতের অর্থনীতির নিম্নগতির মুখে আর বিশেষ করে সহসা এর রিকভারির সম্ভাবনা কম বলে, সরকারের ইমেজের প্রশ্নে আর সরকার চালানো ও লাগাতার আগামি রাজ্য নির্বাচনগুলোতে পাবলিকের মুখোমুখি হতে হলে বিজেপির কাছে আর কোনো বিকল্প নেই। ফলে এমনিতেই চরম হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির হাতে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সামাজিক পোলারাইজেশন উসকে তুলে টিকে যেতে পারলে তবেই হয়ত তার রক্ষা – এখন সে এই অনুমানে গিয়ে ঠেকেছে। নইলে জন্ম থেকেই বিজেপি-আরএসএস যেমন সারা জীবনে ক্ষমতার ধারে কাছে যেতে পারেনি সেই রকমের দিনগুলোতে তাকে চিরদিনের মত আবার ফিরে যেতে হবে।
তাহলে অবজেকটিভ বাস্তবতাটা হল, বিজেপি বা মোদী সরকারকে মরিয়া হয়ে যেভাবেই হোক সিএএ বাস্তবায়ন করতেই হবে, হিন্দুত্বের হুজুগ তুলতে পারতে হবে।

কিন্তু সিএএ বাস্তবায়ন মানে আসলে কী? ঠিক কী হবে এতে এখানে? ব্যাপারটাকে খুবই সিরিয়াসলি নিয়েছে এমনকি কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকাও। তারা সরাসরি কথাগুলো নিজের পত্রিকার কোনো রিপোর্ট হিসেবে নয়, সম্পাদকীয় হিসেবে মানে নিজেদের কথা হিসেবে দায়িত্ব নেয়া ভাষ্য হিসেবে প্রকাশ করেছে। সেখানে বলেছে, “নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ ১০ জানুয়ারি গেজেটে বিজ্ঞাপিত হল অর্থাৎ সরকারিভাবে চালু হল। কৌতুহলের বিষয়, তার পাঁচ দিন আগেই উত্তরপ্রদেশ সরকার ঘোষণা করে, তারা আইনটি কার্যকর করতে শুরু করেছে। জেলা প্রশাসকদের বলা হয়েছে (একটি রিপোর্ট অনুসারে কেবল মৌখিকভাবে) এই আইনে উপকৃত ব্যক্তিদের, অর্থাৎ নির্দিষ্ট তিন দেশ থেকে আগত ছয়টি ধর্মের ‘শরণার্থী’দের, শনাক্ত করতে; সেই সঙ্গে সপ্তম যে ধর্মটি ছাড় পাচ্ছে না, তার ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ চিহ্নিত করতে”। আনন্দবাজারও ব্যাপারটা টের পেয়ে সহ্য করতে না পেরে সরাসরি লিখেছে – তবে কি দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটাই প্রধান,অর্থাৎ ‘বেআইনি’ মুসলিম বাসিন্দাদের চিহ্নিত করা?

তাহলে এটা হল, ভারতের ‘মুসলমান খেদানোর’ প্রোগ্রাম। অর্থাৎ সরাসরি বললে, ভারতের মুসলমান বিতাড়নের প্রোগ্রামে নেমে পড়েছে বিজেপি সরকার আর আশা করছে এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতে সামাজিক-রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটবে, পরিণতিতে ব্যাপকভাবে হিন্দুত্বের উত্থান-জাগরণে ভোটের বাক্স ভরে উঠবে। তাতে ওই বিতাড়িত মুসলমানদের কী হবে, তারা কোথায় যাবে, তাতে বাংলাদেশের কী হবে ইত্যাদি দিক নিয়ে ভাবার দায় নেয়ার অবস্থায় বিজেপি বা মোদি-অমিতেরা নেই। মনে হচ্ছে, তাদের এখন আপনি বাঁচলে বাপের নাম অবস্থা!

এই অবস্থার বিপরীতে বাংলাদেশের সরকারের হাতে কী আছে? আছে এক ‘আশ্বাস’। গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ভারত-বাংলাদেশ দুই প্রধানমন্ত্রীর দু’বারের সাক্ষাতে ‘মোদী আশ্বাস’ দিয়েছিলেন বলে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল।  উপরে গালফ নিউজে ছাপা সাক্ষাতকারেও আমরা একই রেফারেন্স দেখলাম। কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই আশ্বাস কী এখন কার্যকর আছে অথবা থাকবে? এর বাস্তব মূল্য কী? প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সমালোচনা দেখে মনে হচ্ছে তিনিও ভরসা পাচ্ছেন না!

আসলে, কঠিন বাস্তবতাটা হল, এটা “ভরসা অযোগ্য” হয়ে গেছে। আমরা যখন দেখতে পাই ও বুঝি যে বিজেপি বা মোদী সিএএ বাস্তবায়নে মরিয়া দশায়, অর্থাৎ আমাদের আশ্বাসদাতারই মরি-বাঁচি অবস্থা – তখন আশ্বাসের মূল্য অনুমেয়! উত্তরপ্রদেশে সিএএ বাস্তবায়ন নিয়ে কী হচ্ছে তা আনন্দবাজারের সম্পাদকীয়তে আমরা দেখলাম। উত্তরপ্রদেশে বিজেপির কট্টর হিন্দুত্ববাদী মুখ্যমন্ত্রীর সরকার ক্ষমতায়। আর উত্তরপ্রদেশ ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য যেখানে মুসলমান জনসংখ্যা প্রায় ২০%।

এছাড়া, মোদীর আশ্বাসের ভাষ্যের একটা টেকনিক্যাল দিক আছে। ‘মোদীর আশ্বাস’ ছিল এই বক্তব্য যে “এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু” হয়ে থাকবে। তাই মোদী এখন কি বলে বসতে পারেন যে, তিনি এনআরসি ইস্যুতে আশ্বাস দিয়েছিলেন কিন্তু সিএএ ইস্যুতে দেননি? তা অবশ্য আমরা এখনো জানি না। তবে ভারতেই অভ্যন্তরীণভাবে মোদী সরকার তার বিরোধীদের সাথে এখন একটা বড় বিতর্ক করছে যে, “এনআরসি আর সিএএ আলাদা” ইস্যু। আর এনআরসি নিয়ে মোদী সরকার নাকি এখনো কোনো ‘কাজই শুরু’ করেনি। আরও পয়েন্ট তুলে বলতে পারেন, বাংলাদেশকে দেয়া কথিত আশ্বাস যখন দেয়া হয়েছিল তখনো ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী (সিএএ) তাদের সংসদে আনাই হয়নি।

আর এখন পানি অনেক দূর গড়িয়ে সব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মোদি সরকার যেভাবেই হোক সিএএ বাস্তবায়নে মরিয়া হবে তা আমরা সবাই দেখতেই পাচ্ছি। কারণ মোদী এটাকে তার দলের অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে হাজির করে ফেলেছে। কাজেই ‘আশ্বাসের’ ওপর যে ভরসা রাখা যাচ্ছে না অথবা যায় না সেটা বাংলাদেশ সরকারের কাজ-কারবারেও স্পষ্ট যে সে এটা ওয়াকিবহাল। যেমন ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের উত্তেজনা যে আছে ও বাড়ছে তা নিয়ে প্রকাশ্যে যতই আড়ালে রাখা হোক তা আড়ালে থাকছে না। দেশে-বিদেশে তা চর্চার বিষয় হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে ভারত-বাংলাদেশের মন্ত্রী-পর্যায়ের সাক্ষাৎ সব একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে। অন্তত এই তথ্যকে কেন্দ্র করে এটা এখন দেশী-বিদেশী মিডিয়ায় ইস্যু। এ নিয়ে ভারতের মিডিয়াতেই বেশি প্রকাশিত রিপোর্ট এটা, যার সর্বশেষ হল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের ভারত সফর বাতিল। যদিও এখানে কারণ বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর মধ্যপ্রাচ্য সফরে সঙ্গী হতে গিয়ে সেই প্রায়োরিটিতে প্রতিমন্ত্রীর এই সফর বাতিল করা হয়েছে।

এখন বলাই বাহুল্য, সিএএ বাস্তবায়নের পরিণতি ও প্রতিক্রিয়া কী হতে যাচ্ছে বা হতে পারে তা নিয়ে গ্লোবাল পরিসরে রাজনৈতিক (হিউম্যান রাইট) দিক ছাড়িয়ে তা এখন অর্থনৈতিক দিক থেকেও শঙ্কা সৃষ্টি করবে, এটাও স্বাভাবিক। কারণ কোন ইকোনমিই আর লোকাল নয়, ইকোনমি মাত্রই তা গ্লোবাল ও কানেকটেড। যেমন এত দিন জাপান ছিল অবকাঠামো খাতে কম সুদে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বড় ঋণদাতা- সরাসরি দ্বিপক্ষীয় বা এশিয়ান-দাতা আইডিবির মাধ্যমে ঋণদাতা। গত তিন বছরের ফেনোমেনা হল, এর সাথে আরও যোগ হয়েছে – ব্যাপক ‘ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট’ মানে বাংলাদেশে ব্যবসায়ে বিনিয়োগ নিয়ে জাপান এখন হাজির।

বাংলাদেশে তুলনামূলক সস্তা আর ভাল মানের শ্রমের লোভে জাপানি ম্যানুফ্যাকচারিং এখন স্থানান্তর হচ্ছে এখানে। তাই সোজা ভাষায় বললে, স্বাভাবিকভাবেই মোদীর এসব দায়িত্বজ্ঞানহীন অধিকার-লঙ্ঘনের তৎপরতার খবরে যা সবাংলাদেশকে সম্ভাব্য অস্থিতিশীল করে ফেলার ইঙ্গিত – এটা নিয়ে, এসব বিনিয়োগকারীরা শঙ্কিত। এরই একটা ঝলক আমরা দেখতে পাই জাপানি মিডিয়ায়। বিনিয়োগকারীদের পছন্দের এমন এক মিডিয়া হল – ‘নিক্কি এশিয়ান রিভিউ [Nikkei Asian Review ]। সেখানেই প্রকাশিত এক রিপোর্টে শঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়েছে – এটা কী বাংলাদেশে ‘আরেক রোহিঙ্গা সঙ্কট’ তৈরি করতে যাচ্ছে? ওই রিপোর্টের শিরোনাম হলো, “আরেকটি রোহিঙ্গা-সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে ভারতের নাগরিকত্ব আইন, আশঙ্কা বাংলাদেশের”।
ওই রিপোর্টে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সারোয়ার মাহমুদের কিছু বক্তব্যও ছাপা হয়েছে। তিনি বলেছেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার বাংলাদেশী প্রতিপক্ষ শেখ হাসিনাকে যে আশ্বাস দিয়েছেন তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মনে করেন যে ভারতের এনআরসি বাংলাদেশে কোনো প্রভাব ফেলবে না”। তবে শেষে তিনি বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি।’
নিক্কি রিভিউয়ে যদিও লেখা হয়েছে যে, এর মানে হল ওই মহাপরিচালক “এই আশঙ্কাকে পাত্তা দিচ্ছেন না”। হ্যাঁ, সে কথা সত্য। কিন্তু বুঝতে হবে মহাপরিচালকের ভাষ্যটা বাংলাদেশের ‘অফিসিয়াল’ কূটনীতিক ভাষ্য। অফিসিয়ালি বাংলাদেশ সরকার এখনও ‘মনের শঙ্কার’ কথা অফিসিয়ালি বাইরে আনার সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে নিক্কির ওই রিপোর্ট বাংলাদেশের এক সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৈহিদ হোসেনের বক্তব্যও এনেছে। সেটা হল, তৈহিদ হোসেন সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, “বাংলাদেশের মাথার ওপর সিএএ একটি খাঁড়ার মতো ঝুলে আছে। যেকোনো সময় এটা সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে”। আসলে এটাই জেনুইন ভাষ্য। আমাদের সরকার এই ‘প্রাক্তন’ মুখগুলোকেই অ্যাক্টিভ করে মনের কথাগুলো আরো বেশি করে ইনফরমালি বাইরে আনার চেষ্টা করতে পারে।

বাংলাদেশের সরকার বিষয়টা নিয়ে ওয়াকিবহাল। কিছু প্রস্তুতির প্রকাশ্য দিকটাও আমরা সাদা চোখে দেখতে পাই। যেমন সীমান্তের এক কিলোমিটার এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক চাইলে যেন বন্ধ করে রাখা যায়, এর কার্যকারিতা ইতোমধ্যে এক মহড়ায় টেস্ট করে রাখা হয়েছে। কিন্তু কিছু সঙ্কীর্ণ নির্বুদ্ধিতাও আছে। এ ছাড়া সরকারের কিছু স্থায়ী নিজ দুর্বলতা আছে, যা ফলাফলে সরকারকে ভারতের সাথে তোষামোদকারীর ভুমিকায় হাজির করে রাখে বা রেখেছে। এটাই স্থায়ী সমস্যা, যা সমালোচকরা অনেকসময় বাংলাদেশকে ভারতের বাঁদী-রাষ্ট্র বা ভেসেল রাষ্ট্র বলে মূল্যায়ন করে দেখিয়ে থাকে।

নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ- এই আইনটা দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মূলত হিন্দুরা সরকার বা রাষ্ট্রের নিপীড়নে বা ‘পারসিকিউশনে’ [Persecution] আছে – এটা স্পষ্ট করে লিখে দাবি করে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের এই দাবির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হল, “এটা বিএনপি আমলে হয়েছে”। আর শাহরিয়ার কবিরকে দিয়ে বলানো হয়েছিল যে, বাংলাদেশের হিন্দু জনসংখ্যা নাকি ২% বেড়েছে। কারণ তারা ভারত থেকে ফিরে এসেছে। সরকারের এসব প্রতিক্রিয়াকে নির্বুদ্ধিতা বললেও কম বলা হবে।
প্রথমত, ভারত সিএএ আইনে অভিযোগ করছে বাংলাদেশ হিন্দুদের ‘পারসিকিউশনের’। তাহলে, ভারত ফেরত পাঠানোর সময় সেই হিন্দুদের না পাঠিয়ে কেবল এবং একমাত্র মুসলমানদেরই আনছে কেন? এই প্রশ্ন ওদের মুখে ছুড়ে দেয়া উচিত ছিল। এ ছাড়া ভারত যদি নিশ্চিত চিহ্নিত করেই হিন্দুদের ‘পারসিকিউশনের’ কথা জানে তাহলে তো কাজটা সহজ। তাহলে এর প্রমাণগুলো বাংলাদেশের কাছে বুঝিয়ে দিলে বাংলাদেশ বিনাবাক্যে তাদের ফিরিয়ে নেবে, পুনর্বাসিত করবে এই প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশ দিতে পারে, প্রতিকার হিসাবে দেয়া উচিতও। ফলে দিয়ে দিক। আর যে নিপীড়িত হিন্দু ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছে এখন আগেই তাদের সীমান্তে পাঠিয়ে হয়রানি না করে তাদের সেসব ‘নিশ্চিত চিহ্নিত’ ডকুমেন্ট আগেই বাংলাদেশের কাছে পেশ করে তাদের ফেরত নেয়ার একটা মেকানিজম তৈরিতে বাংলাদেশ রাজি আছে সে প্রস্তাব দিলেই তো হয়।
এখানে ‘গায়েবি’ অভিযোগের সুযোগ বন্ধ করাই হতে পারে বাংলাদেশের মূল স্বার্থ। সেখানে বাংলাদেশও ‘বিএনপি আমলে হয়েছে’ আর ‘২% ফেরত’- এসব গায়েবিভাবে বক্তব্যে তুলে ধরেছে। এটা আত্মঘাতী ও নির্বুদ্ধিতা। আবার দেখা যাচ্ছে,  সরকার ধরেই নিয়েছে এই ইস্যুতে যাদের শুনানোর জন্য এই ভাষ্য সরকার দিচ্ছে, তারা যেনবা বাংলাদেশের পাবলিক। অথচ সরকার বাস্তবে এই ভাষ্যের খাতক হবার কথা ভারতের মোদী-অমিত। কিন্তু আবার এর মানে কি সরকার ভারতের কাছে বিএনপির নামে বিচার দিচ্ছে? সে ক্ষেত্রে এটা কি কোনো সরকারের কাজ হতে পারে, না সাজে? সরকার চালানো কি খেলাপাতি খেলা! যে কীছু হলেই আমি না বিএনপি! বলতে হবে?
উল্টোদিকে, বাংলাদেশে ২০০১ সালে নির্বাচনের পরে পরে ‘আওয়ামী লীগকে কেন হিন্দুরা ভোট দেয়’ এই অজুহাতে হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগ সেকালেরই অনেক লিডিং মিডিয়ায় এসেছিল। কিন্তু আমাদের অনেকের ধারণা সরকারের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগের তদন্ত করালে এবং একেবারে বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ তদন্ত করালে সেটা বোধহয় সরকারের বিরুদ্ধেই যায়!  এটা স্বল্পবুদ্ধি ও কূটচিন্তার মানুষের ধারণা।  বিএনপিও এটাই বুঝেছিল। অথচ বিএনপি সরকার যদি সেকালে ওই অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ তদন্ত করে রাখত, তাহলে আজ না ভারত না বর্তমান সরকারের পক্ষে ইচ্ছামত কোনো অভিযোগ তোলা সম্ভব হত। কাজেই তদন্ত না করাটা সবসময় কোন সরকারের পক্ষেই যাবেই এই অনুমান ভিত্তিহীন।
নিরপেক্ষ তদন্ত করা সেকালে হয়ে থাকলে সেই ভাষ্যটাই এখন সব আটকে দিতে পারত। মূল কথাটা হল, সরকারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে পালালে তো হবে না, মুখোমুখি হতে হবে। বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে। প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। দায় নিতে হবে। উপযুক্ত প্রতিকার দিতে হবে। এতে কমপক্ষে পুরা দল নিজেকে পরিষ্কার আর অভিযোগমুক্ত রাখতে পারবে। যেটা আসলে একটা দলের জন্য বিরাট অ্যাসেট। বিএনপি নিশ্চয়ই আজ মানবে সে কথা। সেকালে দলের বিশেষ কিছু লোকের কুস্বার্থে আজ অন্যের সব আবর্জনা আর খারাপ উদ্দেশ্যের দায় বিএনপির মাথায় আসছে।

দ্বিতীয়ত, ভারতের সংসদের বক্তৃতায় অমিত শাহ্ দাবি করেছিল বাংলাদেশে নাকি ‘হিন্দু পারসিকিউশন’ স্বাধীনতার পর থেকেই হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো সরকারের আমলকেই তিনি বাদ দেননি। এমনকি বিজেপি-আরএসএসের প্রতিনিধি বাংলাদেশের হিন্দু মহাজোটের নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক বা প্রিয়া সাহার অভিযোগও তো তাই। কাজেই মোদী-অমিতের কাছে বিএনপির নামে অভিযোগ দিয়ে বাংলাদেশের সরকার কোথায় পালাতে চায়? সরকার চালানো খেলাপাতি না যে সব মুখে অস্বীকার করে অন্যের ওপর দায় দিতে হবে- এসব কোনো বুদ্ধিমান মানুষের কাজ নয়। আজ অবস্থা তৈরি হয়েছে এমন যে মোদী-অমিত আমাদের সরকারের ‘আমরা না, বিএনপি’ টাইপের ছেলেখেলাকেই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে বলবে যে, বাংলাদেশের সরকার বলেছে যে ‘হিন্দু পারসিকিউশন’ হয়েছে। অর্থাৎ অমিত শাহরা চাইলে বলতে পারবে যে নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ বিলে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করে রাখা জায়েজ আছে।
এ কারণেই আমাদেরকে অন্য সরকারের অভিযোগ সিরিয়াসলি নিতে হবে, প্রমাণ চাইতে হবে। প্রমাণিত হলে দায় নিতে হবে। প্রতিকার দিতে হবে। আর প্রমাণ না দিতে পারলে মাফ চাইতে বাধ্য করতে হবে।

সরকারের স্থায়ী দুর্বলতাঃ
সাধারণভাবে আমরা সবাই বুঝতে পারি ভারতের মোদী-অমিতের এসব ন্যুইসেন্স আর ইসলামবিদ্বেষ জাগিয়ে ভারতের ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, মেজরিটি মানুষ খুবই বিক্ষুব্ধ। অথচ এটাকে নিজের ক্ষমতার উৎস হিসেবে নিতে বা এই বিক্ষোভের ভয়েস ও প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে হাজির করতে সরকার অপারগ। কারণ গত ১০ বছর এর উল্টা লাইনেই হেঁটেছে সরকার। নির্বাচনের মাধ্যমে নিজের গণভিত্তি তৈরি করে নেবে সে পথেও সরকার নেই। সম্ভবত সে পথে ফেরার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। ওদিকে, সরকারের অনুমান তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফেলতে পারার ক্ষেত্রে বিদেশীরা (মূলত আমেরিকা) বিরাট হুমকি। ঠিক যেমন করে ২০০৭ সালে বিদেশীরা এক সরকার এনেছিল। পরিণতিতে এই সরকার বসেছিল। অতএব এই হুমকি কাউন্টার করতে ভারতকে পাশে রাখতে হবে, তোষামোদ করতে হবে – ভারত নির্ভরশীলতা এখান থেকেই – সরকারের অনুমান এমন বলে মনে হয়। ফলাফলে, মোদী-অমিতের সব ন্যুইসেন্সের বিরুদ্ধে জনগণ তৈরি হলেও সরকার তা ব্যবহার করার ‘জনপ্রতিনিধি’ হওয়ার সুযোগ নিতে পারছে না। এই হলো বাংলাদেশের বাস্তবতা ও সঙ্কট।
আজ এটা পরিষ্কার মোদী-অমিতের এখন আর নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প কিছু হাতে নেই। মোদি-অমিতের বিচারে ‘মুসলমান খেদানো’র প্রোগ্রাম এখন তাদের একমাত্র সম্ভাবনা -আয়ু ও বাঁচোয়া! বাকি সব হারিয়েছে তারা। এখন জায়গা মত সুযোগ পেলে বাংলাদেশের সরকারকেও তাদের লক্ষ্যে বেচে দেয়ার চেষ্টা করবে, এমনই তলানিতে ঠেকেছে তারা! একারণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এনআরসি বা সিএএ ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু হিসাবে রাখবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্বেও অমিত শাহ্‌ ২০১৮ সাল থেকে নিয়মিত যে কোন নির্বাচন এলেই  “অনুপ্রবেশকারী” মানে “মুসলমান খেদানো”, আর তেলাপোকা বা উইপোকা বলে গালি দিয়ে তুচ্ছ করে তাদের পিষে মারার কথাই বেপরোয়া বলে চলেছেন। এটাই প্রমাণ যে কোন প্রতিশ্রুতি রক্ষার অবস্থায় বিজেপি বা মোদী-অমিতেরা নাই। অসুস্থ, বর্ণবাদী এরা এমনই বেপরোয়া!

কিন্তু আমাদের সরকার নিজে বা খোদ বাংলাদেশ কী মোদী-অমিতের ন্যুইসেন্স থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে? আমরা আশঙ্কিত! কারণ, সরকার ভুল রাস্তায় হাঁটছে। এছাড়া, আমাদের সরকারগুলো স্বাধীনতার পর থেকেই ‘হিন্দু পারসিকিউশন’ করে থাকলে নির্যাতনের শিকার সেই হিন্দুদের বদলে মুসলমানদের সীমান্তে জড়ো করা হচ্ছে কেন? এই সাধারণ স্ববিরোধিতাটাকেও প্রশ্ন করতে ভুলে গেছে আমাদের সরকার!

এরই ভিতরে সরকারের মুজিববর্ষ পালনের গুরুত্বপুর্ণ  “মুলবক্তা” অতিথি হয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।  মুসলমানবিদ্বেষী এত ঘৃণার চাষাবাদ যার মনের কোণে কোণে তিনি আরও প্রায় তিন মাস সিএএ বাস্তবায়ন করে কত কিছু যে করে আসবেন কে জানে? আবার আসার পর বাংলাদেশে তার কেমন লাগবে, কাটবে; আর আমরাই বা তাকে কীভাবে নিব? ভাববার আছে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ১৮ জানুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে মোদির নিজ সঙ্কটে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

মোদী-অমিতের গন্তব্য কী জরুরি আইন জারি

মোদী-অমিতের গন্তব্য কী জরুরি আইন জারি

গৌতম দাস

 ১৩ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Rl

অমিত শাহ্ যে গুজরাটের দাঙ্গাবাজ পুরান গুণ্ডা, দিল্লিতে এসেও তিনি সে প্রমাণ আবার রাখলেন।
ভারতের একাডেমিক জগতের ও হবু শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় কোনটা? ভারতের অভ্যন্তরীণ বিচার ও চোখে নামকরা, উঁচু প্রেস্টিজের বিশ্ববিদ্যালয় বলতে সম্ভবত সবাই বলবে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, সংক্ষেপে জেএনইউ [JNU]

সেই জেএনইউতে গত ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যার অন্ধকারে রাস্তার আলো নিভিয়ে সব গেটে পুলিশি সহযোগিতায় পাহারা বসিয়ে কেবল বিজেপি সমর্থকদের লাঠিসোটা নিয়ে প্রবেশ ঘটানো হয়েছিল। এরপর তাদের দিয়ে হলে হলে ঢুকে বিরোধী শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে স্টুডেন্ট ইউনিয়নের নেতাদের নির্বিচারে হামলা করে পিটানো হয়েছে। আবার কয়েক ঘণ্টা পর হামলাকারীদের অবাধে জেএনইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়া নিশ্চিত করে, সব রাস্তার বাতি জ্বেলে দিয়ে সব গেট থেকে পুলিশ প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তিতে এসব হামলাকারীর কিছু ছবি মিডিয়াতে দেখা গেছে। তাতে হামলাকারী সবারই মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা দেখা ছিল। এই হামলায় ছাত্র সংসদের ভিপি ঐশী ঘোষ ও কয়েকজন শিক্ষকসহ প্রায় ৩০ জন গুরুতর আঘাতের শিকার হয়েছেন। আনন্দবাজার লিখেছে, ‘প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮ জন পড়ুয়াকে (পিজি) এমস-এ ভর্তি করা হয়েছে। অন্তত দু’জনের অবস্থা গুরুতর। শুধু হস্টেল নয়, ক্যাম্পাসে গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। পাথর ছোড়া হয়। মেয়েদের হস্টেলে এসিড নিয়েও হামলার চেষ্টা হয় বলে অভিযোগ” [গেরুয়া’ হামলায় রক্তাক্ত জেএনইউ]। “প্রতিবাদ করতে গিয়ে মার খেতে হয় জেএনইউয়ের ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব রিজিওনাল ডেভেলপমেন্ট’-এর অধ্যাপিকা সুচরিতা সেন-সহ একাধিক শিক্ষক-শিক্ষিকাকে। সুচরিতাকে এমস-এ [AIIMS] ভর্তি করতে হয়েছে”। এখানে লক্ষণীয়, হামলাকারীরা এসিডও বহন করছিল আর তা নিয়ে হামলা হয়েছে।

ইংরেজি ওয়েব মিডিয়া ‘দ্য স্ক্রল [THE SCROLL]’ চারটি প্রশ্ন তুলে এক আর্টিকেল লিখেছে। এক. ফুটপাথের আলো নিভিয়ে রাখা হয়েছিল কেন? দুই. কেন গেটের পুলিশ বেছে কাউকে ঢুকতে দিয়েছিল, আর কাউকে দেয়নি? তিন. যারা আগ্রাসীভাবে ও সশস্ত্র হয়ে ঢুকছিল পুলিশ কেন তাদের আটক করে রাখেনি? চার. গেটেই সন্ত্রাসী গ্যাংটাকে পুলিশ কেন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেনি?

বলা বাহুল্য, এই চার প্রশ্নেই সব জবাব ও পুলিশের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ আছে।

তবে মূল কথা, মুখ ঢেকে মুখোশ পরে হামলা করলেও মিডিয়ায় বা সামাজিক স্তরে হামলাকারীরা আর ‘অজ্ঞাত’ নয়। মিডিয়াতেই এটা প্রতিষ্ঠিত যে হামলাকারীরা আরএসএসের ছাত্র সংগঠন এবিভিপি (অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ, ABVP), তাদের নেতৃত্বই এই হামলা হয়েছে। আনন্দবাজার লিখেছে, “বিকেল থেকেই ক্যাম্পাসে ভিড় জমতে শুরু করে। মুখোশধারী গুণ্ডারা প্রথমে সাবরমতী ধাবার বাইরে জড়ো হয়। পড়ুয়াদের অভিযোগ, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এবিভিপি নেতা-নেত্রীরা ভাড়াটে গুণ্ডাদের নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢোকে। রড, লাঠি, বাঁশ নিয়ে পড়ুয়াদের ওপর চড়াও হয় তারা। হস্টেলের আলো নিভিয়ে দিয়ে হামলার পাশাপাশি সাবরমতী, কাবেরী, পরিয়ার হস্টেলে ভাঙচুরও চলে। পড়ুয়াদের অভিযোগ, আরএসএস-ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের চিনিয়ে দিয়েছিলেন”। ……”ভিতরে যখন হামলা চলছে, তখন গেটের বাইরে স্লোগান ওঠে ‘গোলি মারো শালো কো’, ‘ভারত মাতা কি জয়’, ‘জয় শ্রী রাম’ “।   এছাড়া আর এক রিপোর্টে লেখা হয়েছে, “বিরোধীদের অভিযোগ, মোদী-অমিতের তত্ত্বাবধানেই হামলাকারীরা বাইরে থেকে জেএনইউয়ে ঢুকেছিল। হামলার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে বিজেপি ও সঙ্ঘের স্থানীয় নেতাদের চিহ্নিত করে নাম প্রকাশ করে দিয়েছে কংগ্রেস। প্রকাশ্যে আসা ভিডিয়োগুলো সঙ্ঘের অস্বস্তি বাড়িয়েছে”।

জেএনইউ নিয়ে গর্ব বা একে নামকরা বলার পেছনে অনেক কারণ বা বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন এর সাবেক ছাত্ররা ভারতের একাডেমিক বা কর্মজগতে বড় বড় জায়গা নিয়ে আছেন। আবার অনেক গরিব বা সামাজিক স্ট্যাটাসের বিচারে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীও এখানে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে থাকেন। মূলত মেধাবী হওয়ার কারণে এখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে নিজের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে গড়ে নিতে পেরেছেন। বলা যায় চেপে বসা সামাজিক স্ট্যাটাস বা স্তরভেদ তারা উলটে দিয়েছেন তাতে, তিনি মুসলমান বা দলিত অথবা গরিব যাই হোন না কেন! এসব মিলিত কারণে জেএনইউতে সাবেক স্টুডেন্ট বা সাবেকি শব্দটাও বেশ গর্বের। কিন্তু সেটা এই হামলার ঘটনায় বিজেপির বিরুদ্ধে গেছে। হামলা চলাকালীন বা পরে বা দূরে থেকেও এই সাবেকরাই ঘটনার নিন্দা করে পাশে এসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। আর তাতে এমনকি মোদি সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী নিজের সাবেকি পরিচয়ের গৌরব টিকিয়ে রাখতে গিয়ে হামলার নিন্দা করে বিবৃতি দিয়ে বসেন। এমনকি কেন্দ্র সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর ও অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ হামলার নিন্দা করেন। যেটা অন্য অনেক মন্ত্রী আর সাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছকাছি বা পক্ষের মতো শোনায় এমন বিবৃতি দিয়েও ভারসাম্য আনা সম্ভব হয়নি। হামলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ এমন প্রাক্তন স্টুডেন্টদের কিছু প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করে একটা রিপোর্ট [মনোবল চুরমার করতেই কি হস্টেলে হামলা] এখানে আছে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন।

কেন  জেএনইউ’র বিরুদ্ধে অমিত শাহের এত রাগ ক্ষোভঃ
সাধারণভাবে জেএনইউতে কমিউনিস্ট চিন্তা এখনো তুলনায় প্রভাবশালী ও ডমিনেটিং ধারা। সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি তার আমলে জেএনইউ স্টুডেন্ট ইউনিয়নের (সংসদ) প্রেসিডেন্ট ছিলেন। গত তিন সেশনে এখানে স্টুডেন্ট ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট কমিউনিস্ট। এমনিতেও শাসক-চিন্তা বা শাসক-বয়ান বিরোধিতা করে চলার এক ঐতিহ্য জেএনইউতে ছিলই। তবে এটা সম্ভব হয়েছে জেএনইউ “স্বায়ত্তশাসিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়” আইনে চলা ও শুরু থেকেই তা চর্চা করা হয়ে আসছে বলে। তাই এটা কমিউনিস্ট চিন্তা-চর্চারও এক সেন্টার হতে সুযোগ পেয়েছিল, এমনকি এর কমিউনিস্ট নকশালী অপর ধারাও। তবে এমন কমিউনিস্ট প্রভাব কেবল ছাত্রছাত্রীদের কারণে নয়, মূলত ফ্যাকাল্টি মেম্বাররাও অনেকে “প্রগতিশীল ও বামপন্থার” অনুসারী বলে। এভাবেই চলছিল। কিন্তু গত ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর সারা দুনিয়াতেই ‘প্রগতিশীলতা’ বা ‘বামপন্থা’ সবচেয়ে অগ্রসর চিন্তাধারা মনে করার এই ভ্যানিটি ভেঙে পড়তে শুরু করেছিল। ফলে দুনিয়াজুড়ে এই চিন্তার আধিপত্য ভেঙে পড়ার শুরু এঘটনা থেকে। এছাড়াও পরে তা আবার আরেক বড় ধাক্কা খেয়েছিল। নতুন শতাব্দীতে ২০০১ সালের পর আল কায়েদা ফেনোমেনার কারণে গ্লোবাল নতুন মস্ত ইস্যু হাজির হয়ে যায় – ‘ইসলাম প্রশ্ন’। ‘ইসলাম ইস্যু’ এমন অজস্র গুরুত্বপূর্ণ ও সিরিয়াস প্রশ্ন তুলে এনেছিল যেমন ধরা যাক, স্পিরিচুয়ালিটি কী? শুধু তাই নয়, আরো দিক হল এই প্রশ্নের জবাব পাওয়াটা কী খুব এসেনসিয়াল মানে অনিবার্য প্রয়োজন? এসব গুরুতর প্রশ্নের জবাব কোনো প্রগতিশীলের কাছে তৈরি ছিল না। বরং এগুলো অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন মনে করে তারা ফেলে রেখে দিয়েছিল। কিন্তু সমসাময়িক প্রধান প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে না পারলে, তৈরি না থাকলে যেকোনো চিন্তার আধিপত্য ভেঙে পড়তে বাধ্য। আসলে, শুধু তাই নয়, এক ধর্মবিদ্বেষ বিশেষত ইসলামবিদ্বেষ দিয়ে এই জবাবহীনতার খামতি ঢেকে রাখা হয়েছিল এতদিন। তবে অবশ্যই আবার ব্যাপারটা এমন নয় যে, প্রশ্নকর্তাদের কাছেও জবাবটা আছে বা ছিল। তাই সার-অবস্থাটা হল, যে বুঝতে বা আমল করতে চায় সে বুঝবে চিন্তা-জগতের বিরাট ঘাটতির গর্তটা কোথায় লুকিয়ে আছে! কারণ এটাও পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, আসলে ঘাটতি লুকাতে চাইলে এই দুর্দশাকে ‘টেরর বা সন্ত্রাসীদের’ কারবার বলে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বুশের কোলে উঠে পড়ার রাস্তা খোলা ছিল। তাই অনেকে সেকালের ‘আমেরিকান প্রেসিডেন্ট’ বুশের কোলে উঠেও নিজেকে প্রগতিশীল বলে দাবি করছিল।

আর যারা নিজেকেই ফিরে দেখা – মানে রিভিউ আর ক্রিটিক্যাল চোখ ফেলে মানে নিজেরই পর্যালোচক হয়ে নিজেকে ঢেলে সাজিয়ে নেয়ার সাহস রাখে তারা নিজেকে পুনর্গঠনের পথ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু লক্ষণীয় যে, এই পথে বাংলাদেশও যতটা এগিয়েছে ভারত এর ধারেকাছেও আসেনি। খুব সম্ভবত এর একটা কারণ ভারতের রুলিং বা শাসক শ্রেণীর বয়ান। নিজের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন কম্বিনেশন ও বিকাশের কারণে ভারতের একাডেমিক জগতও এখানে স্বাধীনভাবে না বরং শাসক-বয়ানের নিরিখে সমস্যাটাকে দেখেছিল। এই বড় গুরুত্বপুর্ণ দিকটা আমল না করে পাস কাটাতে চেয়েছিল। তাই নিজ চিন্তার খামতি নয় বরং ব্যাপারটাকে ‘টেররিজম’ হিসেবে দেখার বয়ান মেনে নিয়েছিল। তাই ‘ইসলাম প্রশ্ন’ ভারতের  বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ কোনো একাডেমিক দুনিয়ায়, এখনো তেমন জবাব না জানা প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে – স্টাডি খোঁজাখুঁজি গবেষণা চলছে এমন জানা যায় না। যদিও ভারতের স্ট্রাটেজিক ইনস্টিটিউট অনেকগুলোই আছে যেখানে রাষ্ট্রের ডিফেন্সের চোখে ক্ষমতাকে রক্ষার আলাপ সেখানে চলে, তা দরকারিও হয়ত। কিন্তু নিজ চিন্তার দোষত্রুটি, নিজ ইসলামবিদ্বেষের বোঝা বা নিজ চিন্তায় ঘাটতি বুঝার বিষয়টা সেখানে ইস্যু হওয়ার সুযোগ পায় নাই। তা না হওয়ারই কথা, অবশ্য। এক কথায় এসবের মিলিত কারণে ভারতের একাডেমিক ভ্যানিটি এখনো প্রগতিশীল ও বামপন্থার অনুসারী হয়েই আটকে আছে। তবু ভারতের অন্তত দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন প্রগতিশীলতা ও বামপন্থার প্রভাব দেখা যায়- জেএনইউ আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। তবে জেএনইউ তুলনায় অনেক বেশি প্রভাবশালী।

কিন্তু বিজেপি-আরএসএসের চোখে, তাদের হিন্দুত্ববাদের চোখে তাকে বধ করতে, তার বয়ান ফুটো করে দিতে, তাকে প্রভাবহীন করতে প্রশ্নে জর্জরিত করে ফেলার এখনো ক্ষমতা রাখে ও পারে এই প্রগতিশীল ও বামপন্থার বয়ান। তাই বয়ানের সক্ষমতা এ’প্রসঙ্গে বিজেপি তাকে চ্যালেঞ্জ করা প্রতিপক্ষ হিসাবে কংগ্রেসের চেয়েও কমিউনিস্টদের প্রধান শত্রু মনে করে। এর অবশ্য অন্য একটা বড় কারণ আছে। বিষয়টা ভোট বাক্সের, বয়ানের তত নয়।

ভারতের প্রধান ধারার সব রাজনৈতিক দলই একটা পর্যায় পর্যন্ত কমবেশি মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদী। তা চিনার উপায় হল, যারা-ই ‘জাতি’ ধারণাটা অনিবার্য ভেবে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে গ্রহণ করেছে মানে রাজনীতিকে রাষ্ট্র-নাগরিক-অধিকার এই ফ্রেমে না ভাবতে পারে না। বুঝে না বা বুঝতে চায় না বা বুঝেনি, বরং  ব্যাপারটাকে রাষ্ট্র নয় “জাতি” হিসেবে বুঝেছে। যেমন ভারতীয় “জাতি” বা হিন্দু “জাতি”  হিসেবে- এমন এরা সবাই এই দলের এই ধারার। যে অর্থে কমিউনিস্টরাও জাতীয়তাবাদকে সহযোগী মনে করে ও পাশে রেখেই হাঁটে। তুলনায় কংগ্রেস মূলত হিন্দুইজমের জাতি-বাদী রাজনীতির ধারক এবং আগের তুলনায় কম প্রকাশ্য এই অবস্থান একালে বিজেপির হিন্দুত্ববাদের সাথে মোকাবিলা করতে  গিয়ে রাহুল গান্ধী হিন্দু ভোট হারাবার ভয়ে বিজেপিকে “হিন্দুত্ববাদকে সমালোচনা করতে ভয় পায়, এড়িয়ে চলে। বরং নিজেই নিজেকে “সফট হিন্দুত্ববাদী” বলে লেভেল দেয়। এর বিপরীতে কেউ হিন্দু বলে কমিউনিস্টদের ভোট দেবে তা অবশ্য কমিউনিস্টদের মনে আশা নাই বলে তাদের পরোয়াও নাই। এ কারণে বিজেপির হিন্দুত্বের সমালোচনায় কমিউনিস্টরা তুলনায় অন্তত কংগ্রেসের চেয়ে এগিয়ে ও বেপরোয়া। এ কারণেই কমিউনিস্ট প্রভাব অমিত শাহের বিশেষভাবে চক্ষুশূল। এ জন্যই কমিউনিস্টদের “টুকরে টুকরে গ্যাং” বলে নাম দিয়ে তুচ্ছ করা শুরু করেছেন অমিত শাহ্। বিজেপির চোখে ‘হিন্দু-জাতির’ জন্য ‘দেশপ্রেম’ একটা আবশ্যিক বৈশিষ্ট্য আর যাদের তা নেই তারা দেশদ্রোহী- এই বিচারে কমিউনিস্টরা নাকি “দেশদ্রোহী”। মুখ ঢেকে অন্ধকারে হামলার সময় তাই বিজেপি কর্মীদের স্লোগান ছিল- এই “দেশদ্রোহীদের” বিরুদ্ধে। এই প্রতিহিংসা এটা নাকি তাদের আসলে ‘মরাল-শক্তি’ যোগানদার উৎস।

অমিত শাহের দৃঢ়বিশ্বাস ভারতে মোদী-অমিতের যে বাধাহীন তাণ্ডব বা প্রভাব বাড়ছিল তা হঠাৎ নাগরিকত্ব ইস্যুতে পা-হড়কে পড়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ এই কমিউনিস্টরা, অন্যেরা ততটা না। সংখ্যায় এরা কিছুই না কিন্তু ‘এরা গ্যাং’। বিরাট উসকানিদাতা, যা হিন্দুত্ববাদের সুড়সুড়ি বা বিজেপির তৈরি পোলারাইজেশন উল্টে দিতে পারে। অতএব, এদের দৈহিকভাবে হামলা করো, ভয় দেখাও, যেভাবে পারো দমাও।

অমিত শাহের এই হিসাবটাও ভুল। বর্তমানে নাগরিকত্ব ইস্যুতে বিজেপিবিরোধী এই আন্দোলনের আসলে এখন পর্যন্ত মূল শক্তি ঠিক কমিউনিস্টরা নয় বরং বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক শিক্ষার্থীরা যাদের মধ্যে কমিউনিস্টরাও আছে অবশ্য। একজন মানুষ কেবল মুসলমান বলে তাকে অধিকারবঞ্চিত করতে হবে, আর এর দায় বিজেপি ঐ শিক্ষার্থীদেরও নিতে ও সমর্থন করতে বলবে – এটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে শিক্ষার্থী তরুণদের কাছে।  বিজেপির এই ঘৃণার মূল্যবোধ তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে অগ্রহণযোগ্য আর তা হওয়াই স্বাভাবিক। পশ্চিমবঙ্গ আর আসাম (নর্থ-ইস্ট) বাদে (এদুটো স্ব স্ব সমাজের মেজরিটি অংশ বলে ফোরফ্রন্টে) বাকি রাজ্যে এবারের আন্দোলনের মূল শক্তি কিন্তু এই তরুণ শিক্ষার্থীরাই। সম্ভবত এটা বলা সেফ হবে যে, গত প্রায় ছয় বছর মোদী-অমিতেরা মুসলমানদের “জয় শ্রীরাম” বলানোর বল প্রয়োগ বা লিঞ্চিং-এর হুজুগে যে তরুণদের সংগঠিত করেছিল তারা আলাদা, তারা অন্য সেটের তরুণ। লিঞ্চিংয়ের তরুণরা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক তরুণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় সমাজের কম শিক্ষিত ও কম শহুরে অংশের। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক তরুণ শিক্ষার্থীরা এখনো কম শিক্ষিত ও কম শহুরে তরুণদের রিপ্লেস করে নিজের ডমিনেটিং জায়গা ধরে রাখতে পারছে, লিঞ্চিংয়ের তরুণদের মাঠছাড়া করে রাখতে পারছে।

তবে কম শিক্ষিত ও কম শহুরে আগের তরুণদের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক তরুণ শিক্ষার্থীদের সমর্থক ও পাশে এসে দাঁড়ানোর মত জনগোষ্ঠী সমাজে সংখ্যাগরিস্ট মনে হচ্ছে। যেমন এমন জনগোষ্ঠির মধ্যে সমাজের মুসলমানরা তো আছেই সেই সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে যারা বিজেপিবিরোধী এমন সবাই এদের সাথে শামিল হয়েছে।

কাজেই নাগরিকত্ব ইস্যুতে যারা মোদী-অমিতের সরকারের বিরোধী, যারা প্রতিবাদের সংগঠক বা পালটা বয়ানদাতা তারা সবাই-ই কমিউনিস্ট এমন ধারণা সত্য নয়। তবে মূল গোষ্ঠিটা যারা – সাধারণভাবে বললে এরা “আধুনিক মনের ফ্রিডম”’ পছন্দের তরুণ বলা যায়। যাদের সাথে বিজেপির মূল্যবোধের ফারাক বা গ্যাপ অনেক বড়।

তবে কেউ শাসক হিসেবে সামনে গণপ্রতিরোধ দেখলে তাদের পিটিয়ে, ভয় দেখিয়ে ঠাণ্ডা করতে হবে – এই চিন্তা, এটা হিটলারি চিন্তা চর্চা করার পথ। এতে মনের প্রতিহিংসা কিছু মিটে বা কমে হয়ত, এছাড়া আরও কোন লাভ নাই লাভ হয়নি কোনদিন, লাভ হয় না। তাই নিরাপদেই বলা যায়, বিজেপির মুল্যবোধ আসলে প্রতিহিংসা মাখানো মানে প্রতিহিংসা-সম্পন্ন। বিজেপির ভবিষ্যত আটকে আছে অন্তত এখানেই।  কিন্তু আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি একারণে বিজেপি এখন জবরদস্তি মানে বল্প্রয়োগের রাস্তা ধরার সম্ভাবনা বাড়বে। তাহলে সব মিলিয়ে অমিত শাহের চোখে এসব কিসের ইঙ্গিত?

পরিকল্পিত দাঙ্গা করে সেখান থেকে নিজেই নিজের লক্ষ্য বের করে আনাতে অমিত শাহ্ নিজেকে সিদ্ধহস্ত মনে করেন। ২০০২ সালে গুজরাটে মুসলমান মেরে হাত পাকিয়ে তার এই গভীর আস্থা অর্জনের শুরু। সেই অমিত শাহ্ এখন কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আর ওদিকে জেএনইউ দিল্লির কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অন্তর্গত। অর্থাৎ জেএনইউ দিল্লির রাজ্য সরকারের এখতিয়ারের এলাকা নয়। এই সুযোগ নিয়ে অমিত শাহ্ দিল্লির পুলিশ কমিশনার অমূল্য পট্টনায়কের অধীনে জেএনইউয়ের তাণ্ডব ঘটিয়েছেন। ক্যাম্পাসে এবিভিপিকে ঢুকিয়ে গুণ্ডামি করে আবার তাদের সেফ এক্সিটের ব্যবস্থাও করে দিয়ে পুলিশ ফিরে গেছে। কিন্তু তবু অমিত শাহ্ এখানে পরাজিত। এখনও জেএনইউয়ে ছাত্র-শিক্ষক পেটানো নিয়ে টুঁ শব্দ করেন নাই প্রধানমন্ত্রী মোদী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত। তবুওও তারা পরাজিত এবং এই হামলার কিছুই লুকানো থাকবে না। কেন?

কারণ ইতোমধ্যেই পরের দিন মানে সাত জানুয়ারির এক টিভি টকশোতেই সব ফাঁস হয়ে যায়। ভারতের টকশো বাংলাদেশের টকশোর মতো নয়, ভয়ের কোন খাঁড়া ঘাড়ের ওপর ঝুলছে- ঠিক এ রকম নয়, তুলনামূলক অর্থে স্বাধীন। আর ভাল টকশো মানে ভার টিআরপি- এটা প্রতিযোগিতামূলক টিভি-মিডিয়ার ভারতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ঐ কথিত টকশোতে, এক টিভি চ্যানেলে বিজেপির পক্ষ থেকে ছিলেন এবিভিপির দিল্লি শাখার এক যুগ্ম সম্পাদক অনিমা সোনকর। টকশোতে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে চাপ সামলাতে না পেরে একপর্যায়ে ওই মুখোশ-হামলার পক্ষে সাফাই দিতে গিয়ে তিনি সব স্বীকার করে ফেলেন। তিনি বলেন, “সেদিন এমনই ‘ভয়ের পরিবেশ’ তৈরি হয় যে, ‘আত্মরক্ষায়’ রড, লাঠি এমনকি এসিড সাথে রাখার পরিকল্পনা করেছিলেন তারা। নির্দেশও তেমনই ছিল-” এটা আনন্দবাজার লিখেছে। আরো লিখেছে, “অনিমার দাবি, বামপন্থী পড়ুয়াদের ‘লাগাতার আক্রমণের’ মুখে এবিভিপির সদস্য ও নেতারা এত ‘ভীত-সন্ত্রস্ত্র’ ছিলেন যে, ঘর থেকে বাইরে বেরোলে সাথে আত্মরক্ষার সরঞ্জাম রাখতে বলা হয়েছিল প্রত্যেককে। লাঠি, রড, গোলমরিচ গুঁড়ার স্প্রে, এসিড – যে যা হাতে পেয়েছেন, তা-ই সাথে নিয়ে রেখেছিলেন বলে জানান তিনি। টিভি চ্যানেলে তিনি এ-ও মেনে নিয়েছেন যে, বিকাশ এবিভিপির কর্মী [যাকে বিভিন্ন মিডিয়ায় ছবিতে স্পষ্ট চেনা যাচ্ছিল।] বেফাঁস বলছেন বুঝতে পেরেই অবশ্য বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় লাঠি হাতে যাকে দেখা যাচ্ছে, তিনিই বিকাশ কি না, তা নিশ্চিত করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। বলেন, ‘কোনো হস্টেলে এসিড আক্রমণের ঘটনাও তার জানা নেই”।

এক কথায় বললে, অমিত শাহ্ এখন পুরা ধরা খেয়েছেন। সব কিছুই এখন ওপেন সিক্রেট। ঘটনা এখন আদালত পর্যন্ত যদি যায় বা যখন যাবে তাতে পুলিশ অফিসারসহ অনেকেই নিজেকে শাস্তি বা চাকরিচ্যুতি থেকে বাঁচাতে পারবেন মনে হয় না। তাতে পুলিশ তদন্ত রিপোর্ট এখন অমিত শাহ্ যেভাবেই লেখান না কেন!

তাহলে এখন অমিত শাহ্ এ ঘটনা থেকে কী শিক্ষা নেবেন? এটা বলাই বাহুল্য, মুখোশ পরে এমন বেধড়ক মারের দেয়ার উদ্যোক্তা অমিত শাহকে সামনে আরও অনেকবার করতে হবে, বুঝাই যাচ্ছে। এছাড়া তার পক্ষে আরো চার বছর ক্ষমতায় থাকা মুশকিল হবে। তাহলে উপায়?

একটাই সহজ উপায় আছে। আর অমিত শাহ্ ধীরে ধীরে তাই গ্রহণ করতে যাচ্ছেন সম্ভবত!
সেটা হল – জরুরি আইনকরে দেওয়ার ‘ঘোষণা দেয়া। না, ভারতে জরুরি আইন কোন অপ্রচলিত বা নতুন তা নয়। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫ সালের জুনে এর নমুনা রেখে গিয়েছেন। জরুরি আইন মানে এতে বিরাট সুবিধা হল, সমস্ত “নাগরিক মানবিক অধিকার” স্থগিত করে রেখে দিতে পারে রাষ্ট্র ও সরকার। তাতে মিডিয়াসহ বহু কিছুই এখানে নির্দেশ দিয়ে বন্ধ করে দেয়া যায়। যেমন, মিডিয়ায় টকশো চালু রেখে জেএনইউ’র মত মুখোশ-হামলা ঘটনা চালাতে যাওয়াতেই তো সব সমস্যা, অমিতের বিরাট ভুল হয়েছে।   আগেই যদি জরুরি আইন জারি কথা থাকত তাহলে মিডিয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করে রাখা যেত। কাজেই যুগ্ম সম্পাদক অনিমা সোনকরকে টিভি টকশোতে জবাবদীহীতা করতে আসতে হত না।  কাজেই জবরদস্তি বা বলপ্রয়োগ করতে চাইলে ‘জরুরি আইন’ জারি করে নেয়ার চেয়ে ভালো বিকল্প নেই। যেমন এছাড়া এবার সবই তো ঠিক ছিল কিন্তু যুগ্ম সম্পাদক অনিমা সোনকর টকশোতে কথা বলতে গিয়েই সব কেঁচে গিয়েছে। কাজেই এই টকশোটা বন্ধ থাকলে এসবের ফাঁস হওয়ার কোনো সুযোগই থাকত না। তাহলে নিশ্চয় অমিত শাহ্ এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাখবেন।
অতএব মোদী-অমিত কী এখন জরুরি আইন ঘোষণার গন্তব্যের দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে গেলেন?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ১১ জানুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “ মোদি-অমিত কি জরুরি আইনের দিকে?”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

নাগরিকত্ব ইস্যুতে ভারতের বিদেশী কূটনীতিক

নাগরিকত্ব ইস্যুতে ভারতের বিদেশী কূটনীতিক

গৌতম দাস

০৬ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০৬,  সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2QS

           https://gulfnews.com/photos/news

ভারতের “নাগরিকত্ব ইস্যু” ব্যাপারটা অনেক বড় পরিসরে ছড়িয়ে গেছে। যেমন আগে এটা এনআরসি [NRC বা নাগরিক তালিকা প্রণয়ন]  বলেই নিজে বুঝা বা অন্যকে বুঝানো যেত।  এনআরসি ব্যাপারটা ছিল কেবল আসামে আর সেখানে কে নাগরিক কে নয় এরই এক বাছাই প্রক্রিয়া চলছে বলে বুঝলেই চলত।  কিন্তু বিজেপি-আরএসএসের গোপন লক্ষ্য ও পরিকল্পনার দিকটা ক্রমশ পুরাটাই উদোম হতে শুরু করেছে। এতে পরবর্তিতে তা আর এক নতুন মাত্রার দিকে গেলে সেই বিষয়টা বলা হচ্ছে সিএএ (CAA, Citizen Amendment Act) । যার সোজা মানে হল সংশোধনী বিলে  আফগান, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ এভাবে নাম ধরে উল্লেখিত দেশ থেকে মূলত হিন্দুধর্মের লোকদেরকে ডেকে নিয়ে এসে নাগরিকত্ব দেয়ার পরিকল্পনা এটা। যদিও তা আদৌও বিজেপি বাস্তবায়ন করতে পারবে তা আমরা নিশ্চিত নই। এতে এখানে গুরুত্বপুর্ণ দিক যেটা স্পষ্ট করে বলে রাখা হল ঐ তিন দেশের মুসলমানেরা এই সুবিধা পাবে না।  অর্থাৎ ঐ তিন দেশে কোন কারণে  মানবাধিকার হারানো যে কেউ “নাগরিক” নয়, কেবল মূলত হিন্দুধর্মের লোকের জন্যই এই সুবিধা। এটা এতই স্পষ্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো বৈষম্যমূলক আইন।
আর এবছর থেকে এবার আরও এক নতুন ইস্যু এনপিআর (NPR বা জাতীয় জনগণনা) এর সাথে যোগ হচ্ছে। ভারতে প্রতি দশ বছর পরপর নিয়ম করে জনগণনা হয়। সেটা শুরু হবে এবছরের এপ্রিল থেকে আর তা কাজ শেষে প্রকাশ হবে ২০২১ সালে।  কিন্তু এবার জনগণনাতে বাড়তি প্রশ্ন ও তথ্য সংগ্রহের কিছু দিক থাকবে এমনভাবে যেন তা পরের এনআরসি ও সিএএ-এর বদ মতলবের কাজকে সাহায্য ও সহজ করে। তাই এখন থেকে ভারতের “নাগরিকত্ব ইস্যু” বলতে আমাদেরকে – NRC, CAA & NPR – এই তিনের কোন একটাকে না বুঝা তিনের সমন্বয়ে ‘পুরাটাই একটা’ এভাবে বুঝাই সঠিক হবে। তাই এখন থেকে ব্যাপারটাকে একসাথে “নাগরিকত্ব ইস্যু” লিখব।

অনেকের ধারণা, সম্প্রতিকালের “নাগরিকত্ব ইস্যুতে” ভাল সাড়া ফেলা বিরোধী আন্দোলনের পর এখন বোহয় এর সমাপ্তি ঘটেছে। না, এমন মনে করা একেবারেই ভুল হবে। আর বাস্তবে এটা থেমেও যায়নি। বরং আসলে নতুন নতুন মাত্রা ও অভিমুখ নিয়েছে আর সেসব দিকে ছুটে চলেছে। আর এটা থেমে যেতে পারে যদি একমাত্র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কোন ঘোষণা আসে যে, পুরা ‘নাগরিকত্ব ইস্যুর’ সব কিছুই পরিত্যক্ত এবং আইনগুলো বাতিল ঘোষণা করা হল। এর আগে নয়। যদিও ব্যাপারটা বিড়ালকে মাছ খাওয়া ছেড়ে দিতে বলার মত। বিজেপি তা করতে পারবে না, বাধ্য না হলে। কারণ, বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতিই তো এটা যে, ইসলামবিদ্বেষ ছড়ানো, আর এর মাধ্যমে সাধারণভাবে সবাই নাগরিক বলে গণ্য না করা, বৈষম্যহীন সম-অধিকারের নাগরিক – সেটা নয়; বরং হিন্দুধর্মের লোকেরা শ্রেষ্ঠ এবং উপরে – এই হিন্দুত্ববাদের প্রচার তুঙ্গে তোলা যাতে এভাবে সমাজে ধর্মীয় পোলারাইজেশন ঘটে যায় আর তাতে হিন্দু ভোটে একা বিজেপির ভোটের বাক্সই ভরিয়ে তোলা যায়। কাজেই নাগরিকত্ব ইস্যু নরেন্দ্র মোদীর সরকার কখনই ত্যাগ করতে চাইবে না, যদি না তাকে আন্দোলনের মাধ্যমে বাধ্য করা না যায়।

যদিও এটা ঠিক যে, স্বাভাবিকভাবেই এই আন্দোলনের তীব্রতা সময়ে কমবে সময়ে তুঙ্গে উঠবে, কখনো সরকার পিছু হটবে, মিথ্যা বলবে আবার মোদী সরকার কিছু সুযোগ পেলেই দ্বিগুণ বেগে ফিরে আসবে – অনুমান করা যায় সাধারণভাবে এটা এভাবেই চলবে। আর তা চলবে অন্তত চলতি সরকারের স্বাভাবিক আয়ু, ২০২৪ সাল পর্যন্ত। এমন হওয়ার অনেক কারণ আছে। এক নম্বর কারণ হল, বিজেপি সরকারের হাতে এ ছাড়া নিজের মুখরক্ষার আর কোনই ইস্যু নেই। অথচ ভারতের অর্থনৈতিক দুরবস্থা খুব খারাপ আর তা দীর্ঘায়িত হতে যাচ্ছে। ফলে এই দুর্দশা ঢাকতে উপযুক্ত ইস্যু দরকার। পেটের চিন্তা থেকে আম পাবলিকের মন সরানোর মত অন্য ব্যস্ততায় তাদের মাতিয়ে রাখার মত ইস্যু দরকার; যেটা গত ২০১৬ থেকেই মোদী করে আসছে। এ ছাড়া আরও বড় বিষয় হল, সরকারের বাকি চার বছরের আয়ুতে প্রতি বছরই গড়ে চার-পাঁচটা করে রাজ্য নির্বাচনে জনগণের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। সেখানে বলার মত নির্বাচনী ইস্যু পেতে হবে এমন জোশ তুলতে পারতে হবে সরকারকে।

এমন অনেক কিছুর মধ্যে আগামী বছর (২০২১) দু’টি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নির্বাচন আছে – পশ্চিমবঙ্গ আর আসাম রাজ্যে। এ দুটোতে কী হবে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে; তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এতে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির (অমিত শাহ্ বলেছেন দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জিতবে) হার হলে, তা ‘নাগরিকত্ব ইস্যু’ নিয়ে এর পরে বিজেপির কোনদিন কথা বলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শামিল হবে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন আসামের আগে হবার কথা। আর পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম দু’রাজ্যেই হেরে গেলে ভারতে খোদ হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি বিপন্ন হয়ে যাবে। “মুসলমানবিদ্বেষী জিগির তুলে বিজেপির ভোট বাক্সে হিন্দু পোলারাইজেশন” – এই ফর্মুলা চিরতরে অকেজো হয়ে যেতে পারে। এমনিতেই এদুই রাজ্যে হারলে মোদী সরকারের সব হিন্দুত্ব-বয়ানেরই নৈতিক [moral] পরাজয় ঘটে যাবে। হিন্দুত্ববাদ-ভিত্তিক কোন বয়ান অনুসারে ব্যাখ্যা বক্তব্য নিয়ে পাবলিকের কাছে গেলেই মানুষের “দূর দূর” করা শুরু হতে পারে।  ফলে বাকি তিন বছর ক্ষমতায় থাকা তখন দুঃসহ হয়ে উঠতে পারে। অতএব, বিশেষ করে এ’দুই রাজ্যে অন্তত রাজ্য নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত নাগরিকত্ব ইস্যু থাকবে প্রধান ও সবচেয়ে প্রভাবশালী ইস্যু হয়ে।

ইতোমধ্যে, অমিত শাহ আরেক ধাপ পিছু হটে নিজ মুখেই “এনআরসি ‘এখন’ নয়” – বলেই পিঠটান দিয়েছেন। এনিয়ে দৈনিক আনন্দবাজারের এক শিরোনাম হল, “এনআরসি নয় ‘এখন’, শাহের কথায় ফের ধন্দ”। মানে হল, মিডিয়াগুলো এখন মোদী-অমিতের কোনো কথাকেই আর বিশ্বাস না করার লাইন নিয়েছে তাই এদের কোন কথাকে স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে না। মিডিয়া তাই পাবলিকের মনের সাথে মিল রাখতে  প্রতিদিন ও সবসময় সন্দেহ করছে আর খুঁটিয়ে প্রশ্ন করে চলেছে। কেন? কারণ, ভারতের এখনকার “পপুলার পাবলিক মুডটা এ রকম”- আসলে সেই ইঙ্গিতই তুলে ধরছে মিডিয়াগুলো। ভারতের রাজনীতিতে সহসা এমন ক্ষিপ্ত মুড তৈরি হতে দেখা যায় না। বরং প্রত্যেক পঞ্চম বছরে, মানে কেন্দ্রের নির্বাচনের বছর ছাড়া অন্য বছরগুলোতে বড় মিছিল-মিটিং আয়োজন করে দলগুলো পয়সা খরচ করতে চায় না, তেমন কোনো ফল এতে নেই বা হবে না মনে করে বলে। কিন্তু ব্যতিক্রমে এমন ক্ষিপ্ত মুড কখনও  তৈরি হয়ে গেলে মিডিয়ায় রিপোর্ট লেখার সময় সেই পাবলিক মুডের সাথে তাল না মিলিয়ে লিখলে পত্রিকাই বাজার হারানোর রিস্কে পড়ে যাবে। আনন্দবাজারসহ  এখনকার সব মিডিয়া রিপোর্ট তাই এই মুডে লেখা। এক কথায়, বিজেপির বয়ানের প্রতি কোনো সহানুভূতি প্রকাশ করে ফেলা মিডিয়াগুলোর জন্য রিস্কি হয়ে গেছে। তবে অবশ্যই সেটা ‘টাইমস নাউ’ বা ‘রিপাবলিক’ ইত্যাদি বিজেপি ঘরানার দলীয় মিডিয়াগুলো বাদে।

উত্তরপ্রদেশ বাসা থেকে সোনাদানা লুট শুরু হয়েছে
নাগরিকত্ব ইস্যুতে এখন আরেক তোলপাড় চলছে উত্তরপ্রদেশে। মোট ২৩ কোটি জনসংখ্যার বিরাট রাজ্য উত্তরপ্রদেশে মুসলমান প্রায় ২০ শতাংশ। এবারের নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে আন্দোলনে প্রাণহানিতে সারা ভারতে মোট মৃতের সরকারি সংখ্যা ২৫ জন, যার ১৭ জনই এই প্রদেশের। আন্দোলনের মুখে রাজ্যসরকার পিছু হটেছিল, আর এখন ঘোষণা দিয়ে প্রতিশোধ নেয়া শুরু করেছে। এই রাজ্যের একটা আইন ছিল, কোনো আন্দোলনে সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হলে রাজ্য সরকার এর জন্য  – দায়ী কে, তা সুনির্দিষ্ট চিহ্নিত করে, তাঁর থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবে। কিন্তু পরে আবার রিট হওয়াতে সেবার হাইকোর্ট আরও স্পষ্টভাবে বলে দেয় যে, রাজ্য সরকার নয়, হাইকোর্টে প্রমাণ সাপেক্ষে তা কোর্ট আদায় করে দিবে। অর্থাৎ হাইকোর্টের মাধ্যমে রাজ্য সরকার তা আদায় করতে পারবে; নিজেই সরাসরি কাউকে দায়ী করে নয়। সোজা কথায় নির্বাহী ক্ষমতা নিজের মত করে কিংবা আদালতে প্রমাণ হওয়া ছাড়া নিজেই নয়। অথচ উত্তরপ্রদেশ রাজ্য-পুলিশ এখন হাইকোর্টের মামলা করা অথবা রায়ে তা প্রমাণের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই বেছে বেছে বেশির ভাগ মুসলমান নাগরিকের বাড়িতে প্রবেশ করে হয়রানি ও লুটপাট করে চলেছে- একেবারে সোনাদানা নিয়ে যাওয়া শুরু করেছে। বিবিসি সরেজমিন রিপোর্ট করেছে এ নিয়ে। যার শিরোনাম – “যোগী অদিত্যনাথের ‘বদলা’: বাড়ি বাড়ি সম্পত্তি ক্রোকের নোটিস”।
তাই বলা যায় এক ‘খাঁটি প্রতিশোধ’ আদায়ের পালা চলছে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে।

ভারতের বিদেশী কূটনীতিক
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা “নাগরিকত্ব ইস্যুতে” সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট ছেপেছে। ভারতে অবস্থানরত বিদেশী কূটনীতিকেরা নাগরিকত্ব ইস্যুতে মোদী সরকারকে কেমনভাবে দেখছেন, এই হল ওর বিষয়। এ নিয়ে তিন মহাদেশেরই প্রায় ১৬ জন কূটনীতিকের সাথে কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রিপোর্টার। এর শিরোনাম, “দ্রুত বন্ধু হারাচ্ছে ভারত : সিএএ কেউ সমর্থন করছে না, বিদেশী কূটনীতিকদের হুঁশিয়ারি” [No outreach on CAA, foreign diplomats warn: India fast losing friends]। সেখানে এক কূটনীতিকের মন্তব্য খুবই প্রতিনিধিত্বমূলক। ভারতে তিন বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন, এমন সেই কূটনীতিক বলেছেন, “মোদী পুনর্র্নিবাচিত হয়ে এসেছিলেন বলে নিজের স্বপক্ষে যে একটা ‘ফিল-গুড’ বা ‘স্বস্তির-ইমেজ’ [“feel-good” factor ]  তৈরি করতে পেরেছিলেন এত দিন, তার পুরোটাই এখন চলে গেছে” [“feel-good” factor about the re-elected government has “vanished”. ]।

তবে তাঁরা মূলত সবচেয়ে অখুশি এ জন্য যে, নাগরিকত্ব ইস্যু বা এর সামাজিক প্রতিক্রিয়ায় বিরোধী আন্দোলন কিংবা জনবিভক্তিতে ক্ষোভ ইত্যাদি – এসব নিয়ে নরেন্দ্র মোদী সরকার আজও কোন কূটনৈতিক ব্রিফিং বা সরকারি ভাষ্য প্রদান করেননি। না, কূটনীতিকদের এই আকাঙ্খা এটা অনধিকার নয় বা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ঢুকে পড়া নয়। কারণ, ইতোমধ্যে মোদী সরকার এ ধরনের কাজকে এর আগেি নিজের সরকারের জন্য রুটিন করে ফেলেছেন। যেমন- ‘পুলওয়ামা-বালাকোট হামলা’র পর, আগস্ট থেকে অক্টোবরে কাশ্মির নিয়ে সিদ্ধান্তের পর এবং এমনকি সুপ্রিম কোর্টের ‘অযোধ্যা মামলা’র রায়ের পরও তারা কূটনীতিকদের ব্রিফিং করেছিলেন অথচ এখন নাগরিকত্ব ইস্যুতে চুপ- এ কারণে এবার তারা খুব অবাক হয়েছেন, [They recalled that through 2019, the Ministry of External Affairs (MEA) held several briefings, mostly after Pulwama-Balakot in February-March, followed by Kashmir from August to October — and, to their surprise, even once on the Supreme Court’s Ayodhya verdict.]।

ওদিকে সবচেয়ে বড় কথাটা হল, বিদেশী মিডিয়াতে যেভাবে বিক্ষোভ ও সরকারের সাঁড়াশি অভিযানের ছবি ও প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছে, তা ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলোর ভারতের পক্ষে দাঁড়ানোটাকে কঠিন করে তুলেছে। কারণ ওইসব দেশের অনেকেই ‘অভিন্ন মূল্যবোধ’ নিয়ে ভারত সরকারের প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। ‘অভিন্ন মূল্যবোধ’ মানে নাগরিক অধিকার এবং নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্যহীনতা রক্ষা করে চলার প্রতিশ্রুতি, যা যেকোনো রিপাবলিক রাষ্ট্র করে থাকে, তা ভারতে কোথায় গেল সেই প্রশ্ন তুলছেন তারা, [“With each passing day, the government’s position is getting weakened, as these images are not going away. And the action against the protesters and the latest reports of torture and intimidation are giving more credence to the view that the government is intolerant of criticism and dissent,”……. “It doesn’t speak well of the world’s largest democracy,” a diplomat from a G-20 country said”…….The State Department spokesperson had earlier urged India to “protect the rights of its religious minorities” in keeping with its “Constitution and democratic values”.

আসলে, এটা হল হিন্দুত্ববাদের রাজনীতির মৌলিক সঙ্কট, যেকোন অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে এ জন্য এমন মতবাদ অগ্রহণযোগ্য। সোজা কথাটা হল, বিজেপি অথবা আরএসএসের রাজনৈতিক চিন্তায় ‘নাগরিক অধিকার’ বলে কোন ধারণা নেই। কেবল ‘হিন্দু-জাতি’ আছে; নাগরিক বলে কোনো কিছু নেই। খাঁটি হিন্দুরা কেবল কথিত অলীক কোন হিন্দু-জাতির স্বার্থ দেখবেন, এ ধারণা আছে। দরকার হলে এ জন্য তারা অপর অন্যের মাথা ফাটিয়ে দেবেন। সেকারণে তাদের মনে হয়, ‘নাগরিক’ অথবা ‘অধিকার’ এসব শব্দ আবার কী?

দুনিয়া যতদুর পরিক্রম করে পেরিয়ে যে জায়গায় এসেছে তাতে আমরা পছন্দ করি আর নাই করি একালে গ্লোবাল সমাজের মৌলিক ভিত্তি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র ও মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি। এমনকি তা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ রাষ্ট্রও অন্তত মুখে এই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে তা বলবার সুযোগ নাই। এবং তা বিরাট ভুল সিদ্ধান্ত হবে বলে মানে। তাই এককথায় বললে ভারতের আজকের অবস্থা হল আন্তর্জাতিক জগতে সে একঘরে, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে ক্রমাগত। এ’কথারই প্রতিধ্বনি দেখা গিয়েছে আগের কংগ্রেস আমলের প্রাক্তন সেই সরকারের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা শিব শঙ্কর মেননের মুখে। তিনি বলছেন, আমাদের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে “শত্রুপক্ষকে আমরা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছি’।  “দেশের বাইরে থেকে যারা সমালোচনা করছেন, তাদের তালিকা সত্যিকার অর্থেই দীর্ঘ। প্রেসিডেন্ট মখাঁ (ফ্রান্স) ও চ্যান্সেলর মার্কেল (জর্মানি) থেকে নিয়ে ইউএন হাইকমিশনার ফর রিফিউজিস এবং নরওয়ের রাজার মত ব্যক্তিরাও এর সমালোচনা করেছেন, যারা সাধারণত এ ধরনের বিষয়ে ভদ্র অবস্থানে থাকেন”।

তবুও হয়ত ‘নাগরিক অধিকার রক্ষা”- রাষ্ট্রের এই অভিন্ন প্রতিশ্রুতি (বা মূল্যবোধ) দেয়া বা রক্ষার কথা বিজেপি বা আরএসএস নিজে মানুক না মানুক তাদের দিয়ে মুখে স্বীকার করানো যেত, যদি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন নিজ নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন ও কঠোর হতেন। কিন্তু মনে হয়, সে আশাই আর নেই। কারণ, ও দুই অফিসের নীতি হল, মোদির নির্বাহী ক্ষমতা আগ্রাসী হয়ে ধেয়ে এলেই তারা সবাই গুটিয়ে সরে যাবে। নাগরিককে সুরক্ষা দিতে কিংবা নাগরিককে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা ও প্রতিকার দিতে গেলে নির্বাহী বিভাগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে- এমন পরিস্থিতির উদয় হলেই কোর্ট বা কমিশন এরা পাশ কাটাতে শুরু করবেন। কখনো পাশ কাটাতে তারা বছরওয়ারি শুনানির সময়ও ফেলতে থাকেন। যেমন, উত্তরপ্রদেশে রাজ্য সরকারের যেখানে এখতিয়ারই নেই সরাসরি ক্ষতিপূরণ আদায়ের, তা সত্ত্বেও নাগরিককে সীমাহীন হয়রানি করে চলছে, ঘোষিতভাবেই ‘প্রতিশোধ’ নেয়া হচ্ছে।

বিজেপি নেতা অমিত শাহের কঠোর সমালোচনা শুরু হওয়াতে দল থেকেই তাঁকে কিছু দিন চুপ থাকতে বলা হয়েছিল। ছিলেনও। কিন্তু আবারো তিনি সরব হয়েছেন। এবার পশ্চিমবঙ্গে হুঙ্কার দিয়ে তিনি বলছেন, দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচনে (২০২১) ক্ষমতায় আসবে নাকি বিজেপি। এমনকি মমতার সাথে যদি কংগ্রেস ও বামফ্রন্টও জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করে তবুও এই ফল হবে। এতে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটা হল, নাগরিকত্ব ইস্যু যখন তৈরি ও হাজির ছিল না, তখন অমিত এমন বললে মমতা ছাড়া অন্যরা (মানে কলকাতার কংগ্রেস বা বামফ্রন্ট) কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া শ্রেয় মনে করে এসেছে আমরা দেখেছি। কিন্তু এবার বিরোধীরা সবাই অমিতের মন্তব্যের কড়া প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। অর্থাৎ গত বছরের (২০১৯) কেন্দ্রীয় নির্বাচনে ক্ষুব্ধ সিপিএম যেমন মমতাকে হারিয়ে দিতে বেনামে অঘোষিতভাবে বিজেপির পক্ষে কাজ করেছিল এবার আর সে অবস্থা নেই, তা বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, বিজেপির অবস্থা আর তেমন ভালো নেই- এটা অমিত শাহেরই স্বীকারোক্তি। যেমন অমিত বলছেন, এনআরসি নয় ‘এখন’; মানে তার দল কলকাতার নির্বাচনে ব্যাকফুটে। হয়ত, এনআরসির কথা আর ভোটের আগে বিজেপি তুলে ধরবে না, এ ব্যাপারে পিছিয়ে যাবে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ক্ষেপে গেছে, তা অমিত শাহ এভাবে পরোক্ষে স্বীকার করে নিচ্ছেন।

পশ্চিমবঙ্গের লোক কেমন ক্ষেপে থাকতে পারে, এর এক নমুনার সরেজমিন রিপোর্ট আছে আনন্দবাজারে – আধারের জন্য সারা রাত লাইনে ১১ হাজার।  [এখানে “আধার” মানে AADHAAR – এটা আমাদের ন্যাশনাল আইডি কার্ডের মতন সমতুল্য ডকুমেন্ট। ] আর ওদিকে, আমাদের কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তের অপর পারে নদীয়া জেলা (ব্রিটিশ আমলে কুষ্টিয়া নদীয়া জেলার এক মহকুমা ছিল), এখনকার নদীয়ার এমন আরেক মহকুমা হল তেহট্ট – এই হল ঘটনাস্থল। সেখানকার একটা ঘটনা হল এই তীব্র শীতে বৃষ্টির রাতে আধার কার্ড সংশোধনের জন্য সারা রাত ১১ হাজার লোক লাইন দিয়ে বসেছিলেন। লোকের মনে আতঙ্ক যে, কার্ড না থাকলে যদি নাগরিকত্ব প্রমাণ না করতে পারার অপরাধে ভারত থেকে বের করে দেয়া বা ক্যাম্পে ফেলে রাখা হয়! নাগরিকত্ব ইস্যু হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবার মনে কী পরিমাণ আতঙ্ক জন্ম দিয়েছে, এর জলজ্যান্ত প্রমাণ এই ১১ হাজার লোকের লাইন। এই লোকগুলো অথবা যারা এদের দুর্দশা দেখছেন, তারা কেউ বিজেপিকে কি আগামীতে ভোট দিবে মনে হয়?  তবে মনে হচ্ছে না অমিত শাহ এই সাধারণ মানুষগুলোর আতঙ্ক আর অমানুষিক কষ্টের দিকটা দেখতে পাচ্ছেন। বুঝা যাচ্ছে মোদী-অমিতেরা নিজের ভোটবাক্সে হিন্দু-ভোট পোলারাইজ করে আদায় ছাড়া আর কোন দিকেই তাদের হুশ নাই, এমনই নিষ্ঠুর অমানুষের চিন্তায় পৌছে গেছে তারা।

তাহলে এখন অমিত শাহ এত বিরাট দাবি করে বললেন, তারা জিতবেনই- এই দাবির মাজেজা কী?
ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থায় মোদীর কোনও কারচুপির মেকানিজম আছে এমন অনুমান ও অভিযোগ অনেকের। তাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মমতা এবং উত্তরপ্রদেশের মায়াবতীর সবচেয়ে বেশি। এটা কি সেই ইঙ্গিত যে, অমিত শাহের এখন শেষ ভরসা সেখানে? এই প্রশ্ন দানা বাঁধছে। মমতা ইতোমধ্যে ভোটব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আলোচনার জন্য ভারতের উভয় সংসদে নোটিশ দিয়েছেন। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের একজন কমিশনার আছেন; তিনি গত নির্বাচনে মোদির নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের জন্য ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিলেন বলে পরে তার পরিবারের সদস্য সন্তান ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে সিবিআই (আমাদের দুদকের সমতুল্য তবে তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীন ও ক্ষমতাবান। ) লেলিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠে আছে। মোট কথা, অমিত শাহের দাবি অস্বাভাবিক!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ০৪ জানুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ভারতের বিদেশী কূটনীতিক ও নাগরিকত্ব ইস্যু এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]