করোনার মধ্যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দেখা


করোনার মধ্যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দেখা

গৌতম দাস

০৬ এপ্রিল ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Wv

BBC Image, https://www.bbc.com/bengali/news-52171393

যেদিকেই যাই যেকোনো দু’জনের মধ্যে আলাপের সাবজেক্ট একটাই- করোনাভাইরাস। মনে হচ্ছে এটা চলতি এপ্রিল মাস তো বটেই, এমনকি যতটুকু দূরে অনুমান করে দেখা যায় তাতে অন্তত আগামী জুন মাসের শেষ পর্যন্ত এমনটাই চলবে। বরং ভাইরাস পরিস্থিতি আরো মারাত্মক হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

বাংলাদেশে ভাইরাস বিস্তার কেমন মাত্রায় ঘটেছে, কত দূর ঘটেছে, আমরা কোন অবস্থায় আছি, সে চিত্রটা দেখানোর ক্ষেত্রে এখনো কেউ পাবলিকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারেন নাই। মুল কারণ, আমাদের কাছে যথেষ্ট তথ্য বা ডাটা সংগৃহীত নাই।  আমরা যথেষ্ট  সংখ্যক সম্ভাব্য আক্রান্তদেরকে টেস্ট করি নাই। কোন নিশ্চিত আক্রান্ত রোগী থেকে তিনি কতদুর ছড়িয়েছেন এর নিশ্চিত বিশ্বাসযোগ্য তথ্য নাই, একই কারণে।  তাই ডাটাও সংগৃহীত হয় নাই।  ডাটা নাই তো সত্য বা আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্য ধারণাও নাই।  যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিং ও ডেইলি সরকারি আপডেট দেয়া জারি আছে – যতটুকু টেস্ট করা হচ্ছে সেই ভিত্তিতে।  তবে, নতুন খবর এসেছে যে, ভাইরাসের আরো পরীক্ষা কেন্দ্র ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে মোট ১৪টা স্থানে স্থাপনের উদ্যোগ চলছে  বা কোনটা চালু করা হয়েছে। যেটা সবমিলিয়ে মোট ২৮টা পর্যন্ত করা হবে সম্ভবত। মনে হচ্ছে টেকনিক্যাল সক্ষমতা বা ইকুইপমেন্ট-গুলোর স্টক বাড়ার সাথে এর সম্পর্ক আছে। তবে ইকুইপমেন্ট ঘাটতি ছাড়াও ডাক্তার ও টেকনিশিয়ানের মধ্যে জড়তা বা উৎসাহ কম হবার পেছনে যদি ভয়ও একটা ফ্যাক্টর হয়ে থাকে তবে তা কাটাবার সবচেয়ে ভালো উপায় হতে পারে কিছু কার্যকর ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা।

 করোনার পিক পিরিয়ডঃ
এ পর্যন্ত অনেকের মধ্যে দেখেছি কী হতে যাচ্ছে এনিয়ে এক উদ্বিগ্নতা। বিশেষ করে, সরকার কি এগারো এপ্রিল তারিখের পরে সব অথবা আংশিক খুলে দেবে? যেমন ধরা যাক, গার্মেন্টস-সহ ছোটবড় কারখানা উৎপাদন ও যানবাহন খুলে দেয়া হবে? আর একবার যদি খুলে দেয়, মানুষ ঢাকায় ফিরে আসবে এরপর সম্ভবত তাঁরা আবার ফিরে যেতে বা ঘরে বন্ধ থাকতে চাইবে না।  তখন কী হবে? মূল কথাটা হল, বাংলাদেশের ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে এর পিক পিরিয়ড মানে সর্বোচ্চ আক্রমণ ও ক্ষয়ক্ষতির কাল কী আমরা পেরিয়ে গেছি? মানে আমাদের নতুন আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা কি কমতে শুরু করেছে? তা জানা নেই। কারণ পিক পিরিয়ডের সময়ের পরে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমতে থাকে বা হঠাৎ করে একসাথে অনেক নিচে নেমে যায়। এটাই পিক আওয়ার পেরিয়ে যাওয়ার লক্ষণ। সেক্ষেত্রে এসব দিকের স্টাডি থেকে সুবিধা পেতে গেলে উপযুক্ত, অবাধ ও প্রচুর ডাটা সংগ্রহে থাকতে হয়। কেবল তবেই এথেকে কোন অর্থপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব যে, করোনাভাইরাসের প্রভাব কমতে শুরু করেছে বা তা চলে যাচ্ছে। কিন্তু যারা টেস্টই কম করে করেছে তাই ডাটাই নাই তাদের পক্ষে লকডাউন তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের নিতে হবে স্রেফ আন্দাজে, কোন ভিত্তি ছাড়াই হয়ত তা ব্যবসার সুবিধার দিকে তাকিয়ে, স্বভাবতই যার ফল হতে পারে করুণ এবং আত্মঘাতি। সেটা এমনও হতে পারে  যে দেখা গেল লকডাউন তুলে নেওয়ার পরেপরেই সত্যিকারের পিক পিরিয়ডটা শুরু হয়েছে আর তাতে না আবার লকডাউন কায়েম বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে, না তাতে ব্যাপক সংক্রমণ শুরু হওয়াতে তা মোকাবিলার সক্ষমতা বা বাস্তবতা আছে।

এর বিপরীতে বাংলাদেশের তথ্যহীন আনাড়ি পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ক্ষতি একটু বেশি হলেও একটা উপায় হতে পারে লকডাউন অতিরিক্ত বাড়িয়ে দিয়ে সম্ভাব্য মানুষ মারা যাওয়ার রিস্ক কমানো।  গতকাল ৪ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত মনে হচ্ছিল সরকার সম্ভবত এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। কিন্তু রাত আটটার পর থেকে গার্মেন্টস মালিকদের কারখানা খোলার তোড়জোড় দেখে বুঝা যাচ্ছিল মালিকদের লোভ আর দায়িত্বজ্ঞানহীনতা চরমে [BGMEA’s cruel joke] উঠতেছে আর তাদের  লোভের কাছে সরকার হেরে যাচ্ছে।

যেখানে পরিস্থিতিটা হল, আমাদের সংক্রমণের পিক পিরিয়ড আর জানার সুযোগ নাই। কাজেই যত তাড়াহুড়া করে কারখানা খুলব ততই বেশি সম্ভাব্য লোক আক্রান্ত হয়ে মারা যাবার রিস্ক নেওয়া হবে।  এছাড়া টেস্ট করার কথিত ২৮ কেন্দ্র খুলে সজ্জিত হতে যেখানে এপ্রিলের পুরা মাসটাই লেগে যেতে পারে বলে সরকার থেকে ধারণা দেয়া হচ্ছে।

আবার গত ০৩ এপ্রিল রাতের একটা ডেভেলবমেন্ট জেনে মনে হচ্ছিল সরকার বোধহয় ভাল সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। আমাদের লকডাউনের কাল সরকার বোধহয় বাড়াচ্ছে। এমন অনুমান হবার  কারণ, গত ০৩ এপ্রিল রাত সাড়ে দশটার বাংলাভিশন টিভির খবরে দেখা গেল ঢাকা মেডিক্যালের অধ্যক্ষ মতামত রাখছেন যে, আগামী দুই সপ্তাহ বাংলাদেশের জন্য খুবই বিপজ্জনক নির্ধারক সময়। তাই ১১ তারিখ পর্যন্ত ছুটি যেটা আছে সেটাকে এপ্রিলের চতুর্থ সপ্তাহ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দিতে তিনি সরকারের কাছে পরামর্শ রেখেছেন। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিবেচনা করার মতো অন্যান্য ইস্যু থাকতে পারে: সেগুলো সাথে নিয়েই তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন।’ এগুলোই ছিল তার কথার সারাংশ। ফলে মনে হচ্ছিল সরকারি সিদ্ধান্ত এমনটাই হতে যাচ্ছে। এটা হলে একটা ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারত। কিন্তু না তা হয় নাই।

যদিও এর আবার অন্য পরিণতি আছে। যেমন ঐ ৩ এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ঢাকারই নিম্ন আয়ের মানুষের যেসব নিউজ দেখা গেছে তা এক কথায় খুবই উদ্বেগজনক। রাস্তায় রাস্তায় দান-সদকা টুকিয়ে চলতে তারা রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে, এজন্য মরিয়া ভাব আছে তাদের মধ্যে, যারা কাজকাম হারা এবং দিন এনে খায়, তারা নিরুপায় – এটাই এর সার কারণ। কিন্তু দান খয়রাতে এরা দু-চার দিন চলতে পারে কিন্তু বেশি দিন চলতে পারবে না। পুরো এপ্রিল বলতে গেলে এ নিয়ে শক্ত ও কমিটেড বিনামূল্যের সরকারি রেশন ধরনের ব্যবস্থা সেক্ষেত্রে তাদের লাগবেই। ইতোমধ্যে রাজশাহী শহরের বাসিন্দাদের অবস্থা নিয়ে যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে [রাজশাহীতে ত্রাণের আশায় মোড়ে মোড়ে গৃহবধূরা] তা রীতিমত গভীর এলার্মিং। এটা সব জেলাগুলোর জন্যই কমবেশি এক প্রতীকী চিত্র। এটাকে সাবধান হবার এবং একশন নিবার খবর হিসাবে না নিলে চরম মূল্য দিতে হতে পারে। এব্যাপারে বিশ্বব্যাংক কী কোন কাজে আসতে পারে?

আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সহায়তাঃ
হা অবশ্যই পারে। কারণ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক আগে থেকেই করোনার সম্ভাব্য ক্ষতিতে সদস্য দেশের মধ্যে বিতরণের জন্য পায় তিনশ বিলিয়ন ডলার  আলাদা করে রেডি করেছে। ইতোমধ্যেই আশিটারও বেশি দেশ এর সুবিধা নিতে আবেদল জানিয়েছে। সুনির্দিষ্ট করে বাংলাদেশের ব্যাপারে নিউজ হল, আমরা ইতোমধ্যে ১০০ মিলিয়ন ডলারের অনুমোদন পেয়েছি। তবে এই অর্থের খাতটা মুলত টেকনিক্যাল সক্ষমতা বাড়ানো বা শক্তিশালী করার কাজে ব্যয়ের জন্য […to help upgrade selected health facilities and laboratories to detect, manage and treat suspected and confirmed COVID-19 cases ] এমন ফান্ড। অর্থাৎ এটা মূলত, medical and testing facilities, and the national health system বাড়ানো ও শক্তিশালী করার জন্য। তবে এটা ছাড়াও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি বা রিকভারির জন্য যেমন,  দুস্থ ও গরীবদের [15 months to protect the poor and vulnerable] সুরক্ষার জন্য আলাদা করে মোট ১৬০ বিলিয়ন ডলারের আরেক ফান্ড আছে। কিন্তু এই ফান্ড থেকে সহায়তা চাওয়া হয়েছে কিনা তা এই রিপোর্টে স্পষ্ট নয়।

‘জীবন না জীবিকা’, কোনটার অগ্রাধিকার
গত বছর অর্থনীতিতে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন সম্মিলিতভাবে তিনজন। এদের মধ্যে কলকাতায় জন্ম নেয়া আমেরিকান নাগরিক ‘অভিজিত ব্যানার্জি’ ও ফ্রান্সের ‘এস্থার দুফলো’ এরা দু’জন ঘটনাচক্রে সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। আর সাথে তৃতীয় অর্থনীতিবিদের নাম মাইকেল ক্রেমার। তাদের মধ্যে প্রথমে দু’জন করোনাভাইরাস নিয়ে এক কথোপকথন বা প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আলাপ করেছেন; যার ভিডিও ক্লিপ ও বাংলায় ট্রান্সস্ক্রিপ্ট ছাপিয়েছে কলকাতার ‘আনন্দবাজার’। সেখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ ছিল এই ভাইরাস আক্রমণের প্রেক্ষিতে কোন রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান – আজকের এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে জীবন না জীবিকা কোনটার ওপর বেশি জোর দিবেন?  কোনটা করা ঠিক হবে? কারণ অর্থনীতির দিকে বেশি প্রায়োরিটি বা মনোযোগ দিতে পারলে ভাইরাস-পরবর্তী সময়ে মানুষের বিশেষ করে জীবিকা বাঁচানো সহজ হতে পারে। যদিও অভিজিতের শেষ কথা হল ” আমি জানি না” [ তিনি বলেছেন, “প্রাণ বাঁচানোর কাজে একটু খারাপ করলে অর্থনীতিকে বাঁচানোর কাজটা হয়তো একটু সহজ হতে পারে … আমি জানি না। বলছি না যে বেছে নেওয়া সহজ কাজ হবে”]।

অর্থাৎ কেউ যদি সেক্ষেত্রে লকডাউন কম সময় রাখা বা শিথিল করে রাখা হতে পারে – এই লাইন ফলো করে তাতে কিন্তু বিপরীতে আবার খোদ জীবনই সঙ্কটে পড়ে যেতে পারে এবং বেশি মানুষ মারা যেতে পারে। তাহলে?
এখন পর্যন্ত্ প্রকাশিত বাংলাদেশের ঝোঁকটা হল, বিজনেসের স্বার্থকে যথেষ্ট প্রায়োরিটি দেওয়া। এমনকি সময়ে স্বাস্থ্য-ঝুঁকিতে ফেলে হলেও এর বিনিময়ে বিজনেস স্বার্থের পক্ষে থাকা। যেমন, গত দুদিন ধরে গার্মেন্টস খুলে দিবার চেষ্টা করে কর্মিদের জীবনকে দুর্বিষহ করে ফেলা হচ্ছিল। অথচ সরকার শিথিলতা দেখিয়ে এখানে নিজে কোন নির্দেশ দেয় নাই, হস্তক্ষেপ করে নাই। উলটা মালিকদের হাতে সব সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিয়েছে। য়ার এতেই বিশৃঙ্খলা চরমে পৌচেছে। এরই মধ্যে আজ ৫ এপ্রিল কিছু কারখানা খুলে উতপাদনেও গিয়েছে। বিশেষ করে আশুলিয়া ইপিজেড। অথচ এতে গভীর স্বাস্থ্য-ঝুঁকি তৈরি করেছে, আর তা কোন কেয়ার করা হয় নাই। আবার কিছু মালিক কর্মিদের ঢাকায় ডেকে এনেও নিজেরা কারখানা না খুলেই (কেউ কেউ আবার দুপুর একটা পর্যন্ত কাজ করিয়ে) বিনা বকেয়া বেতনে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে।

এদিকে আবার সরকার  ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বলবত লকডাউন আবার বাড়াবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। যদিও  [ঘোষণা না করা] একটা ঝোঁক হল, লকডাউন আর না বাড়ানো, অন্তত কারখানা ও যানবাহন খুলে দেওয়া।  শেষে এটা ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত অল্প বাড়ানো ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বাড়ানোর এই ধরণটাই সরকারের সিদ্ধান্তের ঝোঁক কোনদিকে তা নির্দেশ করে। যদিও দেশি-বিদেশি টেকনিক্যাল বা ডাক্তারদের পরামর্শ হল বাংলাদেশে  লকডাউন একমাস বাড়ানো অন্তত পুরা এপ্রিল মাস জুড়ে জারি রাখা। বিশেষ করে যখন আমরা আমাদের পিক পিরিয়ড সম্পর্কে কোন ধারণা রাখার সুযোগ নাই।

সারকথায় যত দ্রুত লকডাউন তুলে নেওয়া হবে ততই আমরা মানুষকে তত বেশি স্বাস্থ্য-ঝুঁকিতে ফেলব।  তাই যত দেরি সেটাই ভাল। এই ভিত্তিতে এরপর দরকার একটা ‘অপটিমাম’ অবস্থান। বলাই বাহুল্য তাতে সেটা অবশ্যই জীবন বাঁচানোকে প্রায়োরিটি দিতে হবে।  অভিজিতও বলছিলেন, একজন ভালো নির্বাহী প্রধানের জন্য – জীবন না জীবিকা প্রশ্নে এভাবে বিবেচনা করে একটা ভারসাম্যের সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া খুব সহজ কাজ নয়। তাই এখানে প্রুডেন্সি ও দুরদর্শিতা হতে পারে একটা ভাল গাইড। কারণ, এ ক্ষেত্রে কোনো ভুল সিদ্ধান্তের জন্য বড় খেসারত দিতে হতে পারে। [বাংলাদেশের কিছু ওয়েব পত্রিকাও আনন্দবাজারের রেফারেন্স দিয়ে লেখাটা ছেপেছে।]

ভালো অর্থনীতির মুলাঃ
কেউ কেউ ইতোমধ্যে ভাইরাস-উত্তর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অপেক্ষা করছে যেন এক ‘স্বর্ণযুগ’ না হলেও “ভাল সময়” আসবে বলে দেখছেন ও দেখানো শুরু করে দিয়েছেন। এ ধরনের মন্তব্যগুলো নেহায়েতই চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে কথার কথা হিসেবে হলে সে ক্ষেত্রে তাদের এমন কথাগুলো না বলাই ভাল হত। ধরে নিচ্ছি, এগুলো নিছক চাঙ্গা করার জন্য কথার কথা নয়। সে আলোকে : প্রথমত, ব্যাপারটা হল, উত্তর পরিস্থিতিতে ভাইরাস থেকে কে কী দশায় সার্ভাইভ করে আর তা কত কম ক্ষতিতে ইত্যাদি- সেই সার্ভাইভালের গুরুতর প্রশ্ন আছে। সেই পরিস্থিতিটা ভালো দশা হবে কি না তা নিশ্চিত না হয়ে কোনো স্বপ্ন দেখার মানে হয় না। বরং আগেই ‘স্বপ্নে পোলাও-কোরমা খাওয়া’ই মানসিক আঘাত হয়ে উঠতে পারে। কারণ, ভাইরাস-উত্তর সার্ভাইভাল বা বেঁচে থাকা যদি মারাত্মক লোকসংখ্যার হানি ঘটিয়ে হয় তবে এরপর সেই শক কাটিয়ে থিতু হওয়াই অনিশ্চয়তায় ডুবে যাওয়া অবস্থা হয়ে যেতে পারে। তাতে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যতই আকর্ষণীয় হয়ে হাজির থাকুক তাতে কিছু আসবে যাবে না।

অতএব প্রথম টার্গেট-কাজ-সফলতা হতে হবে যত কম প্রাণহানি ও মানুষের ক্ষতি কম ঘটিয়ে সার্ভাইভ করা বা টিকে যাওয়া। এটা খুবই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর ওপর নির্ভর করছে আমাদের নিজেকে পুনর্গঠনে লিপ্ত হওয়ার যোগ্য থাকব কি না আর সেটা কতটা। এছাড়াও গ্লোবাল পরিসরকে গ্লোবাল ইকোনমি কতটা আর কত দ্রুত চাঙ্গা হতে পারবে আমরা জানি না। এর চেয়েও বড় কথা আমাদের নিয়ন্ত্রণে এটা একেবারেই নাই। বরং আমরা এরই শিয়ার। যেমন। পশ্চিমের ক্রেতা বাজার কত দ্রুত স্বাভাবিক ও থিতু হবে আর এর চেয়ে বড় কতটা ক্রয়ক্ষমতা ফিরে পেয়ে ফিরবে আমরা জানি না। অথচ এটাই আমাদের রপ্তানি, মুদ্রা আয়ের নির্ণায়ক। অর্থাৎ এর জোনটা পুরাই আমাদের নিয়ন্ত্রণহীন ও অনিশ্চিত।   কাজেই অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দিকে বেশি মনোযোগ দেয়ার সুযোগ নেয়াতে সুফল বেশি আসার সম্ভাবনা বরং বেশি।

এদিকে দেশে বলা শুরু হয়েছে, এক-দেড় মাসের মধ্যে বোরো ধান উঠবে। গতবার ধান সংগ্রহের পারফরমেন্স ছিল খুবই খারাপ। ‘গোডাউনে জায়গা নেই’ অজুহাতে ধান প্রায় কেনাই হয়নি। পরে তা যতটুকু কেনা হয়েছে সেটাও মিলমালিক থেকে। সব মিলিয়ে সংগ্রহ মূল্য কম ছিল বলে ধান উৎপাদকদের অসন্তোষ উঠেছিল চরমে। এবারের বাস্তবতাটা হল, এক দিকে নিম্ন আয়ের মানুষকে ঘরে আটকে রাখতে হলে বিনামূল্যে এক-দু’মাসের রেশন দিতে হবে, অন্য দিকে বোরো সংগ্রহের জন্য গুদামে জায়গা থাকতে হবে, বাজার থেকে ধান সংগ্রহ করে উৎপাদকদের একটা ভালো দাম দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে ইত্যাদি। এসব দিক ছাড়াও বিবেচনার বিষয় থাকতে পারে। সব মিলিয়ে এ নিয়ে একটা ‘ভালো সিদ্ধান্ত’  সরকারকে একটা ভালো ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে। আবার এ থেকে পাবলিকের মনে এমন ধারণা হতে পারে যে, তাদের জন্য একটা সরকার আছে।

এর উল্টোটাও আছে। পাবলিকের মনে হতে পারে- তাদের জন্য কেউ নেই। আবার ভাইরাস থেকেও পরিত্রাণ নেই। কেউ তাদের জন্য কিছু করার নাই। আবার ভাইরাসে মরব তো, পরে যদি খেয়ে বেঁচে থাকতে পারি। কাজেই ভাইরাসের কথা ভুলে আগে খাবার সংগ্রহে নামি। এ ছাড়া যাদের খাওয়ার সমস্যা নেই তারা ভাবতে পারে সরকার কিছু করতে পারবে না, কেউ কারো জন্য নয়। কাজেই সরকারের ভরসায় না থেকে অন্যের ঘাড়ে চড়ে তাঁকে মেরে হলেও নিজেই ভাইরাস থেকে আগে বাঁচার চেষ্টা করি। এর মিলিত ফলাফল হতে পারে এক বিশৃঙ্খলা; চরম আস্থাহীনতায় নিয়ম আইন সব ভেঙে পড়া। এমন অবস্থা যেন তৈরি না হয় সে জন্য আমরা কি নুন্যতম কিছু ভাল কিছু আশা করতে পারি না? সেটি কি বিরাট আশা করা হবে?

তেল সর্বনিম্ন মূল্যেঃ
জ্বালানি তেলের মূল্য নেমে তলানিতে ঠেকেছে। গ্লোবালি কলকারখানা মেশিন যান সব স্থবির হয়ে যাওয়ার আরেক বড় চিহ্ন এটা। অতএব তেলের বিক্রি নেই, দাম সর্বনিম্ন তাই। কিন্তু কত নিচে?

অ্যামেরিকান ওয়েষ্টার্ণ টেক্সাস (বেঞ্চমার্ক) মার্কা জ্বালানি তেল যেটা – এটাই ভাইরাসের প্রকোপের আগে ৫৩ ডলারে ছিল, যেখান থেকে নেমে তা মাত্র ২১ ডলারেও পৌঁছেছিল। তবে আজ তা ২৭ ডলার। গত দু-তিন বছরে তেলের দামের প্রধান নিয়ামক হয়ে আছে সৌদি আরব যার পলিসি হল, টেক্সাস ক্রুডকে চাপে রাখা। পঞ্চাশ ডলারের আশপাশে দাম রাখলেই টেক্সাস চাপে থাকে। এ ক্ষেত্রে আরেক প্লেয়ার, পুতিনের রাশিয়া এতে খুশি যা আবার কিছু দুঃখ মিশানোও। কারণ এক দিকে আমেরিকা চাপে থাকলে সে খুশি। এটাই সে লবি করার চেষ্টা করে সৌদিদের সাথে। আবার অখুশি, কারণ সে নিজেও তেল বেচে বেশি দাম পায় না। গত ২০০৮ সালের দিকে ১৭৩ ডলারের তেল- মনে হয় না সে দিন দুনিয়াতে আর কোনো দিন ফিরবে।

এক কথায় এখন গ্লোবাল সব উৎপাদন প্রায় একসাথে সব খানে স্থবির হয়ে আছে অর্থাৎ চাহিদা পড়ে গেছে। কিন্তু আগামিতে অর্থনীতি আবার চলতে শুরু করলে দাম আবার বেড়ে আগের জায়গায় যাবে। ৫০-৫৩ ডলারের আশপাশে ফিরে আসবে, অবশ্যই। অতএব, যারা এখন তেলের কম দাম এটা দেখিয়ে ভাইরাস-উত্তর আসছে দিন ভাল হবে বলে আশার বাতি দেখাচ্ছেন এটা বাস্তবত তেমন আশার কিছু নয়। এটা অপ্রয়োজনীয় ও মিথ্যা আশা। কারণ, এমনিতেও ৫০-৫৩ ডলারের তেল গ্লোবাল অর্থনীতির জন্য তেমন বেশি মনে করা হয় না। তেলের দাম নয়, আসলে মূল ফোকাস হতে হবে গ্লোবাল অর্থনীতির ভালো চলতে দেখা। যেমন ভারত। তেলের দাম যখন ৫০-৫৩ ডলারের মধ্যে ছিল, তা সত্ত্বেও এর সুবিধা ভারত তখন তেমন নিতে পারেনি। কারণ অন্য নানা কারণে ভারতের খোদ অর্থনীতিই স্থবির হয়ে আছে। অতএব, সারকথা গ্লোবাল ইকোনমি একটু ভালো হতেই (ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আসতেই) তেলের দামও আবার ৫০-৫৩ ডলারের স্তরে উঠে যাবে। কাজেই এখন তেলের দাম কম থাকা নিয়ে লোভ দেখানোর কিছু নেই। আর তেলের দাম কম থাকার চেয়েও গ্লোবাল অর্থনীতি চাঙ্গা থাকা এটা বরং আমাদের মতো অর্থনীতির জন্য একটা ভালো সময়ের নির্ণায়ক। অবশ্য সৌদি কোয়ালিটির (ব্রেন্ট) তেল সব সময় ৬-১০ ডলার বেশি থাকে, মানে সেটাও ৬০-৬৩ ডলারে চলে যাবে।

টাকার অবমূল্যায়নঃ
অনেকে করোনাভাইরাস-উত্তর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের টাকার অবমূল্যায়নের জন্য পরামর্শ রাখছেন। এটা কোন ভালো পরামর্শ না এমন মনে করার কারণ আছে। সাধারণত কোন একটা রাষ্ট্রের অর্থনীতি ধসে গেলে বা ডুবে গেলে কেবল সেই পরিস্থিতিতেই অবমূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিলে তা কার্যকর হতে পারে। অবমূল্যায়ন কথাটার খাড়া মানে হল, যেন নদীতে ডুবে যাওয়ার পরিস্থিতির মধ্যে নিজেকে ফেলে দেয়া। উদ্দেশ্য, বাজারের সবার ক্রেতাকে আমার ক্রেতা বানানো, কাছে আনা। কারণ সবাই (ধরাযাক) এক ডলারে একটা শার্ট দিলে আমি বেশি, (ধরাযাক) দুটো দেই। এটাই টাকার ‘অবমূল্যায়ন’।

এটা কাজ করে কেন? কারণ য়ামার অবমুল্যায়নে আমাকে অন্যরা তুলতে এলে আমি অন্যদের কিছু কিছু করে ডুবিয়ে বিনিময়ে অনেক দূর পর্যন্ত ভেসে উঠতে পারার সুবিধা নিতে পারি। টার্কিশ লিরা (২০০৯ সালে) ডুবে গেছিল; সেই লিরা অবমূল্যায়ন করেই নিজেকে বাচিয়েছিল। অর্থাৎ একটা রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সমস্যা হলে এটা কার্যকর হবে। একইভাবে ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে ধ্বস নামিয়েছিল জর্জ সোরেসের হেজ ফান্ড কোম্পানী। সেখানেও রিংগিতের অবমূল্যায়নে পরিত্রাণ পাওয়া গিয়েছিল। মূল কারণ, একটাই রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল তাই।

কিন্তু অবমূল্যায়ন পুরোটাই অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। কখন? যখন সময়টা গ্লোবাল রিসেশন বা মহামন্দায় আছে বা সম্ভাবনা আছে এমন সময়ে। অর্থাৎ একসাথে অনেক রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্থ এমন এক গ্লোবাল পরিস্থিতি।  দেখা গেছে, এমন সময়ে একটা রাষ্ট্র নিজের মুদ্রার অবমূল্যায়নে গেলে তার লেজ ধরে অন্য সবাই অবমূল্যায়নে চলে যেতে পারে। এতে সামগ্রিক এফেক্ট বা ফলাফল হবে শূন্য। এই অবমূল্যায়নে কোনো একটা রাষ্ট্র বা কেউ বেশি ক্রেতা পেয়ে যাবে না। কিন্তু সব পণ্যের মূল্যই পড়ে যাবে। আজ পর্যন্ত সব গ্লোবাল মহামন্দার কালেই এমন গণ-অবমূল্যায়ন ঘটানো হয়েছিল। ফলে সকলেই আরও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। তাই একালের একটা চোস্ত প্রমাণ হল, গ্লোবাল রিসেশন বা মহামন্দার বিপদের গন্ধ পেলেই আইএমএফ দ্রুত জি৭ গ্রুপের মিটিং ডাকার জন্য লবিং শুরু করে। আর সেই মিটিং থেকে প্রস্তাব পাস করিয়ে নেয় যে, কেউ অবমূল্যায়নের পথে যাবে না। কারণ এক রাষ্ট্র অবমূল্যায়নে গেলে বাকি সবাই একই পথে গিয়ে ফলাফল শূন্য করতে চাইবে। তাতে এই প্রতিযোগিতাই গ্লোবাল মহামন্দাকে নিশ্চিত করে ফেলে।

তাই, গ্লোবাল মহামন্দার আমলে আমাদের টাকার অবমূল্যায়ন করতে যাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। সার কথায়, যখন শান্ত নদী তখন ডুবে যাওয়ার চেষ্টা বা অবমূল্যায়নের চেষ্টা করা যেতে পারে এবং তা কার্যকর করা যাবে। কিন্তু যখন নদী অশান্ত, তখন ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করলে অন্যরা সবাই আমাকে তোলার বদলে অন্যকে ডুবিয়ে নিজে উঠতে চেয়ে পরিণতিতে সবাই ডুবে যায় বলে এটা অকার্যকর এবং এর পরিণতি গ্লোবাল রিসেশন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ০৫ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে  ভাইরাসের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s