ভারতকেই পথ বেছে নিতে হবে, সে সম্ভবত ফেল করবে


ভারতকেই পথ বেছে নিতে হবে, সে সম্ভবত ফেল করবে

গৌতম দাস

০৭ আগস্ট ২০২০, ০০:০৭ শুক্রবার

https://wp.me/p1sCvy-38a

 

       Chinese Ambassador in India, on Decoupling India-China Economy, YouTube

ভারত-চীন সংঘাত বা বিতর্ক সহসা মিটছে না। তবে আস্তে আস্তে অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। আর কী হলে তা মিটতে পারে তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ভারত কী গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার গ্লোবাল অর্ডারটা সম্পর্কে বুঝে? যদি বুঝতে পারে তবে এই অর্ডারের  নেতৃত্বে বদলের নির্ধারক সময়কাল হাজির হয়েছে। ভারত এর কোনদিকে থাকতে চায় – এনিয়ে ভারতকে এখনই সিদ্ধান্ত অবস্থান নিতে হবে। এতদিন ভারত দুদিকেই পা দিয়ে থাকার সুবিধা যা পেয়েছিল তা শেষ। তাই পুরানের সাথে গাটছাড়া বেধে শেষ হয়ে যাবে না নতুনের সাথে থেকে নিজের বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে এনিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদিও নতুন নেতা চীনের সাথে ভারতের না যাবার সম্ভাবনা এখনও বেশ বেশি দেখা যাচ্ছে। এর মূল কারণ ভারত “গ্লোবাল অর্ডার” জিনিষটা ধরতে পারে না। এর কারণ আবার হল, জাতি-রাষ্ট্র চিন্তায় বা এরই সহযোগী চিন্তা  – “স্বদেশীপনা” বা বিদেশী মাত্রই আমার অর্থনৈতিক শত্রু – এই চিন্তার উপর দাঁড়িয়ে রাজনীতি করা বিজেপি-আরএসএস, এরা কখনই গ্লোবাল অর্ডার বা খোদ গ্লোবাল শব্দটার অর্থ তাতপর্য কখনই বুঝতে পারবে না। কারণ তাদের ‘হিন্দুজাতি’ বা খোদ জাতি-রাষ্ট্র ধারণাটাই এক [fetish] কাল্পনিক রাজনীতি। এছাড়া এই “জাতি” ধারণার জন্ম ও বিকাশ ও টিকে থাকা সবই ঘটেছিল ইউরোপের কলোনি যুগে ও কলোনি শাসনের পুর্ব-পটভুমিতে। বিশ্বযুদ্ধের শেষে কলোনি শাসন লুপ্ত হয়ে গেলে এই জাতি-রাষ্ট্র ধারণা ফেলে দিয়ে ধুয়ে মুছে ইউরোপ অধিকার-ভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়ে যায়। কিন্তু কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রে অসামঞ্জস্যভাবে জাতি-রাষ্ট্র চিন্তাতে ভর করেই এগুলো বিকশিত হচ্ছে মনে করা হয়েছিল। আজ গ্লোবাল ইকোনমির প্রধান ধারা আরো বেশি করে  পারস্পরিক লেনদেন বিনিময় বাণিজ্যে গভীরে জড়িয়ে যাওয়া। কারণ এটা ভ্যালু এডিশন শেয়ারের যুগে প্রবেশ করছি আমরা। তাই এই যুগে ঐ পুরানা সুপ্ত “অসামঞ্জস্যতা” প্রকট ভাবে হাজির হচ্ছে। তাই এখকার দুনিয়ায় যে চীন-আমেরিকা বা চীন ভারত যা কিছু হবু সংঘাত  ও টেনশন – এটা জাতি-রাষ্ট্রবাদীদের চোখে নেহায়ত দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা।  এগুলো যে “গ্লোবাল” মাত্রার সমস্যা, কোন বাই-লেটারাল বা দ্বিপাক্ষিক জটিলতা নয় তা এরা টেরই পাবে না। সম্ভাবনা নাই।

কোন দুই দেশের সীমান্তঃ কিছু তত্বকথা
এনিয়ে যে কথাগুলো আমরা প্রায়ই শুনে থাকিঃ সীমান্ত বা ম্যাপ কথার আসল মানে হল – সীমান্তের দুই পক্ষের ঐকমত্যে একটাই ম্যাপ যেখানে আঁকা হয় আর ঐ একই ম্যাপের দুটি কপি দুই পক্ষের হাতে ছাড়া তখন  অন্য কোনো ম্যাপ বা এলএসি [LAC] বলে আর কিছু  থাকে না। এটি সম্ভব যখন দুই পক্ষই সীমান্তে একটি শান্ত নীরবতা একটা প্রশান্তি অর্জনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে আর সেই মেজাজে আসবে। কারণ, অপরের ভুমি দখলের কলোনি যুগ বহু আগেই শেষ হয়েছে।  বিপরীতে কোনো পক্ষ যখন মনে করবে আমি যেটা আমার রাষ্ট্রসীমা বলে বুঝি সেটাই আমাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর অর্থ সেখানে সীমান্ত চিহ্নিত করা, একটাই ম্যাপ তৈরি কখনোই ঘটবে না। আর স্বভাবতই এতে দেশের অর্থনীতিতে মানুষের জীবনমানে বাড়াতে মনোযোগে দেওয়ার বদলে নিঃস্ফলা সীমান্তেই সব সময় কেটে যাবে। এটাই ঘটবে কারণ, আপনি অন্যের দাবি উপেক্ষা করে, এর সুসমাধা না করে কোনো ভূমি দখল করে শান্তিতে থাকতে পারবেন না। কখন টেনশন আসবে আমি জানবেনও না। এখানে চিহ্নিত বা ডিমার্কেশন শব্দের আসল মানে হল – নিজেই নিজের রাষ্ট্রসীমা বলে এককভাবে কিছু দাগানো- একবারেই নয়। বরং পড়শিকে সাথে নিয়ে দাগানো। যাতে দাগাবেন একবারই। এরপর এ নিয়ে কেবল শান্তি আর প্রশান্তিই অর্জন করবেন।
এ লক্ষ্যেই আপনাকে কিছু হোমওয়ার্কও করতে হবে। কারণ ডিমার্কেশনের আলোচনা মানেই মূলত গিভ অ্যান্ড টেক। পেতে হবে আর ছাড়তেও হবে। কী কী আপনাকে পেতে হবে তা বাদে বাকি সীমানা-বিতর্কে সব খানেই ছাড় দিতে বা নিগোশিয়েট করতে রাজি আছেন এটি বুঝায় দেন। প্র্যাকটিশটা উভয়পক্ষ করলে সহজে কাজ শেষ করা সম্ভব। কিন্তু এটা তখনই সম্ভব যখন আপনি শুধু না, উভয়পক্ষেরই প্রশান্তি লাভ প্রধান লক্ষ্য। সত্যিকারের ডিমার্কেশনের লক্ষ্যে এগিয়ে এসেছেন। গিভ অ্যান্ড টেক শেষে একটি ম্যাপ আঁকতে এসেছেন। কারণ, সামরিক শক্তি দিয়ে ভূমি দখল করা যায়, ডিমার্কেশন করা যায় না।

[একটু অফসাইডে এটা মূল প্রসঙ্গের বাইরের কিছু কথা। ফলে নিচের এই প্যারা আপনি বাদ দিয়ে রেখে ব্রাকেটের শেষে আবার পড়া শুরু করতে পারেন।]

[ভারতে কিছু নতুন ডেভেলপমেন্টঃ আজকের কথা শুরু করার আগে ভারতে কিছু নতুন ডেভেলপমেন্ট, তাই গুরুত্বপুর্ণ কিছু বাড়তি কথা যোগ করব এখানে। যখন লিখছি তখন সময়টা ৫ আগষ্ট ২০২০ এর দিবাগত রাত পেরিয়ে মধ্যরাতের দিকে যাচ্ছে যাতে আইনত ৬ তারিখ শুরু হবে কিছুক্ষণের মধ্যে। আর আমার এই বাড়তি প্রসঙ্গ হল, আজকের ভারতের জন্য ঘটনাবহুল “৫ আগষ্ট”।  ৫ আগষ্ট উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জন্য নির্ধারক দুটা কারণে।
এক, কাশ্মীর যে আইনি সুত্রে  ভারতের সাথে আগে একভাবে যুক্ত ছিল বলে মনে করা হত সেই ৩৭০ ধারা বাতিল করে মোদী-অমিত গতবছর এদিন থেকে সংসদীয় ততপরতা শুরু করেছিল। আর এরপর শ্রেফ গায়ের জোরে ঘোষণা করেছিল যে কাশ্মীর এখন থেকে ভারতের সরাসরি অংশ। অতএব এদিন হল দখলদারি ও নতুন হত্যার প্রথম বার্ষিকী। আর দুই, বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে সে জায়গায় রামমন্দির বানানোর জন্য এর ভিত্তিপ্রস্তত স্থাপনের দিন;  মোদী ও তাঁর দলবলেরা এই ৫ আগষ্টকেই এর দিন হিসাবে ঠিক করেছে, যার নাম দিয়েছে ‘ভুমি পুজার” দিন।
কিন্তু এদুই দিক থেকে আজ এসবের মাহাত্ম বা তাতপর্য নিয়ে কথা বলব না, ঠিক সেটা আমার প্রসঙ্গ না।  প্রসঙ্গ হল, আমরা স্বীকার করি আর নাই করি ভারতের রাজনৈতিক জগতে বড় বড় কিছু গভীর রাজনৈতিক সংকট আছে। যেটাতে সময় না দিলে তা ভারতরাষ্ট্রের অস্তিত্বের সঙ্কট হয়ে হাজির হতে পারে।  যেগুলোকে শুধু সংকট বা ক্রাইসিস না বলেও কিছুটা ইতিবাচক শব্দে একে চ্যালেঞ্জ – ভারতের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বলা যেতেও পারে। সেই প্রেক্ষিতে, এই ৫ আগষ্টকে, ইতিহাসে লেখা হবে এই বলে যে যেদিন থেকে ভারতের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল (ও যারা এদের কোন একের সাথে জোটে সম্পৃক্ত) – বিজেপি ও কংগ্রেস এদের দিন শেষ তা লেখা হয়ে গেছিল। কী অর্থে? না, এদের হাতে আর ভারতের বর্তমান ও আসন্ন রাজনৈতিক সঙ্কটগুলোর মিটানো বা সমাধান করতে আর কোনই ভুমিকা থাকবে না, তাই নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার দিন। কেন?
তত্বগত বা কিছুটা কঠিন ভাষায় বললে, বিজেপি চীনের সাথে কথিত সীমানা লড়াইয়ে হার স্বীকার করে  নেওয়াতে এনিয়ে কোন নির্বাচনে আর এটাকে ইস্যু করে সুবিধা হবে না। তাই ফেলে পালিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর বদলে “হিন্দুত্বের বিজয় ও গর্বের” উস্কানি তুলে আগামি ২০২৪ সাল পর্যন্ত সব নির্বাচনে ভোট চাইবে মোদী ও বিজেপি। অর্থাৎ এবার মাঠের ভাষায় বললে, মোদী ও বিজেপি  – চীন, পাকিস্তান বা সীমান্ত এসব ইস্যু আর ভোট-নির্বাচনে নিয়ে আসবে না, মোদী ভোট চাওয়ার ইস্যু করবে না।  তারা প্রধানত, রামের নামে (মসজিদের উপর রামের মন্দির নির্মাণের বিজয়-সাফল্য, ফলে তারাই আসল রামভক্ত, পুজারী ইত্যাদিতে মিথিক্যাল রামকে বাস্তব বানানোর কারবার), এভাবে ভোট চাইবার রাজনীতি শুরু করবে। মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের সাফল্য হবে বিজেপির প্রধান নির্বাচনি ফোকাস বা অর্জন বলে হাজির করা। এটাই এখন থেকে হিন্দুত্বের বা হিন্দু ভোট মেরুকরণের প্রধান ফোকাস হবে।
ওদিকে ঠিক একারণের আমরা লক্ষ্য করছি এর বিপরীতে এবার, কংগ্রেসের তাতপর্যপুর্ণ সিদ্ধান্ত হল যে তারাও এখন থেকে  বিজেপির মত হিন্দুত্বের রাজনীতিই করিবে।  এনিয়েই প্রতিযোগিতায় নামবে। ৫ আগষ্ট উপলক্ষ্যে  মা সোনিয়া অথবা ভাই রাহুল নয়, প্রিয়াংকাকে দিয়ে  কংগ্রেস সিদ্ধান্ত জানিয়েছে যে মোদীর মসজিদ গুড়িয়ে এর উপর মন্দির নির্মাণের সাফল্যের  ‘ভুমি পুজার” দিন – এই হিন্দুত্বের ভাগ নিতে কংগ্রেসও এগিয়ে এসেছে। তাই কংগ্রেস মনে করছে, এদিন নাকি কথিত জাতির ইউনিটি, ভাতৃত্ব ও সাংস্কৃতিক সহমর্মিতা প্রকাশ ও উতযাপনের দিন – আর আনন্দবাজার লিখেছে প্রিয়াংকা বলছে রাম নাকি সবার করার দিন, তা সকলের উতযাপনের দিন এই ৫ আগষ্ট। সবচেয়ে ভয়ানক বোকার মত কথা তিনি বলেছেন,  ‘Rab is Ram’।

a celebration of national unity, fraternity and cultural affinity – WIRE.  “রাম সবার” – আনন্দবাজার

সোজা কথায় মসজিদ ভেঙ্গে দেয়া এখন থেকে কংগ্রেসের চোখে কথিত জাতীয় উতসব আবার ভাতৃত্বেরও নাকি দিন! এ কেমন জাতি? আর কাদের কাদের মধ্যেইবা ভাই গিরি? সে এক বিরাট বিস্ময়। মোদী-অমিত-মোহন ভাগওয়াত থেকে গোলঅওয়াকারও যেটা সাহস করে নাই, কংগ্রেস এখন থেকে সেই কথিত হিন্দু জাতি, হিন্দুত্ব এসবের ভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসাবে যাত্রা শুরু করল।  আর তাকে অনুসরণ করেছে আম আদমি পার্টিও। তাই ভারতের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে ভবিষ্যতে বিজেপির সাথে কংগ্রেসের কোন ভুমিকা থাকবে না তাই নির্ধারিত হয়ে গেল। আর মোদীর বিজয় হল এই যে এখন থেকে (মমতার মত দুএকজন বাদে) সবার রাজনীতির ভিত্তি হল সরাসরি হিন্দুত্ব। ]

সম্প্রতি ভারতে চীনের রাষ্ট্রদূত সান ওয়েদং একটি ভার্চুয়াল বা অনলাইন কথোপকথনে অংশ নিয়েছিলেন। ‘ওয়াইর’[WIRE] ভারতের এক ইংরেজি ওয়েব পত্রিকা, যেটি একালে এক ব্যতিক্রম; উগ্র জাতিবাদী যুদ্ধবাজ চিন্তাধারী ও হিন্দুত্ববাদীদের ঠিক বিপরীতে সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়ে রিপোর্ট করে যাচ্ছে। এই ওয়াইর পত্রিকাও উপস্থিত ছিল। তাদের বরাতে আমরা জানছি, রাষ্ট্রদূত সেখানে মোটাদাগে কী বলেছেন। সেই প্রসঙ্গে যাবার আগে অন্য কিছু কথা।

ভারত-চীনের বাস্তব সীমান্তঃ
সীমান্ত বা ম্যাপ নিয়ে তত্ত্বকথা থুয়ে বাস্তবে আসি।   ভারতের অভ্যন্তরে এখন প্রধান আলোচ্য বা তর্ক হল – প্রতিহিংসা – যে কী উপায়ে ‘প্রতিশোধ’ নেয়া যায়।  ভারতের ভাষায় “মুখ-তোর” বা বাংলায় বললে “দাঁতভাঙা” জবাব দেয়ার পথ খুঁজছে তারা। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, ভারতের চরম জাতিরাষ্ট্রবাদী রাজনীতির কারণে এর প্রতীক মোদী সরকারকে চীন একেবারে আউলায়ে দিয়ে চরম অপমানিত করে দিয়ে গেছে। যখন অন্তত ২০ সেনার নির্মম মৃত্যুর পর মোদীকে দিয়ে চীনারা বলিয়ে ছেড়েছে – ভারতের ভূমিতে (চীনারা) কেউ  আসেনি, বেদখল হয়নি। যার মানে দাঁড়িয়েছে অন্তত ওই ২০ জন সেনা চীনা ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করে চীনাদের হাতে মারা গেছে। এরচেয়ে বড় অপমান আর কী হতেপারে! এছাড়া এভাবেই গলওয়ান উপত্যকা পুরাটাই চীনাদের, তাও মোদীকে দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেয়া হয়েছে। যদিও আরও অন্যান্য ভূখণ্ডগুলো এখনো চীন ছাড়ল না কেন, কবে ছাড়বে, তাদের মুভমেন্ট কী – এ নিয়ে প্রতিদিন ভারতে মিডিয়া রিপোর্ট বের হচ্ছে, আর মোদীর উপর চাপ বাড়াচ্ছে। অথচ ভারতের সব মিডিয়াই জানে তারা একটা ‘জুয়াচুরি’ খেলছে। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য যদি হয় যে চীন, ভারতের কোনো ভূখণ্ডই দখল করে নাই। তবে এই যে প্রতিদিন রিপোর্ট লেখা হচ্ছে যে, চীন ভারতের ভূখণ্ড, অমুক লেক, অমুক ভূমি ছেড়ে যায়নি – এই এসবের কী কোনো মানে আছে? সত্যতা আছে?  প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষী যা দখলই হয় নাই তা আবার চীন ছেড়ে যাবে কী করে? দাবি করাই বা কেন?

তাহলে কোনটা সত্য? চীন ভারতের কোনো ভূমি দখল নেয়নি? নাকি এখনকার মিডিয়া রিপোর্ট। ফ্যাক্টস হল, সারা ভারত জানে উগ্র হিন্দু জাতিবাদের মোদী এখানে সোজা  মার খেয়ে হেরে গেছে। জাতিরাষ্ট্রবাদী চিন্তায় যা এতদিন খুবই সহজ কাজ মনে করা হয়েছে যে যেকোন সীমান্তবিরোধকে আভ্যন্তরীণ নির্বাচনে “ভুয়া হিন্দুত্বের বিজয়” বা দেশপ্রেম হিসেবে দেখিয়ে হিন্দু পোলারাইজেশন ভোট ঘটানো চলে এসেছিল অথচ, আজ এখানে প্রমাণ হয়েছে এটা কত বড় আত্মঘাতী, এরই বড় প্রমাণ আমরা এখানে পাই।

অথচ সীমান্তবিরোধকে তথাকথিত ‘জাতির’ হার-জিত হিসেবে দেখানোর কী আছে? সীমানা বিরোধকে মিটানোই দুই দেশের ডায়লগ সহ সবকিছুর লক্ষ্য, এটা তো কারো কোন “ভূমি বিজয়” একেবারেই নয়। দ্রুত যেকোনো সীমানা বিরোধ বা বিতর্ককে কথিত ‘হিন্দু জাতির’ হার-জিত হিসেবে দেখানোর মোদীর হিন্দুত্ব – এ ব্যাখ্যার কবলে পড়ে মোদীর অপমান এবং তার হিন্দুত্বের পতন বা মার খেয়ে যাওয়া এটাকেই এখন সারা ভারতের অপমান ও মার খেয়ে যাওয়া বলে হাজির করার কসরত চলছে। এছাড়া সারা ভারত জানে সামরিকভাবে  প্রতিশোধ নেয়ার অবস্থায় বা মুরোদে ভারত নাই। তাহলে?

কোয়াড’ আসছেঃ
অতএব  উপায়ন্তহীন মোদী এখন আরেক স্বপ্ন ছড়িয়েছেন – ‘কোয়াড’ [QUAD] আসছে। তারাই নাকি ভারতকে এবার প্রতিশোধ নিয়ে দেবে। এই কোয়াড কারা? কোয়াড শব্দের  এক সংস্কৃতিঘেঁষা বাংলা হবে চতুষ্টয় বা চারটা; মানে  চার মহাজন। তবে এখানে সুনির্দিষ্ট করে এর অর্থ চার রাষ্ট্রজোট – ভারত, আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু জন্ম থেকেই চলছে এর নানান উত্থান আর পশ্চাদ অপসারণ। জাপান এর জন্ম প্রস্তাব দিয়েছিল বাকিদের কাছে। কিন্তু তা দেয়ার পর ১০ বছর এর আর খবর ছিল না। এরপর ২০১৭ সালে যদিওবা এর জন্ম দেয়া হল, তাও সেটি কাকের ঘরে কোকিলের জন্মের মত করে। মানে ফিলিপাইনে ২০১৭ সালে উদ্যোক্তারা আরও অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে এক  ‘আসিয়ান সম্মেলন’ করতে এসেছিলেন। কিন্তু এর ফাঁকে মানে সাইডলাইনে বসে জন্ম দিয়ে ফেলেছিলেন কোয়াড নামে এক ব্লকের। কিন্তু তাতেও আবার জন্মাইছেন এ খবর সামনে আনতে প্রথম বিবৃতি দিতে গিয়েই ধরা। সেই মূল বিবৃতিটা চার দেশ চার রকমভাবে নিজেদের কথা ঢুকিয়ে এডিট করে ছেপেছিল। পরিণতি চারটি আলাদা ভার্সন এর, ২০১৭ সালে ভারতের দা হিন্দুর রিপোর্ট দেখেন এখানে। আর সেই সাথে এনিয়ে ততকালে আমার এক লেখা এখানে – “চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!”।

তবু এদের মুখে কোয়াড নিয়ে হামবড়া গর্বের ফেনা তোলার শেষ নেই। বলা হচ্ছে – এটি নাকি ডেমোক্র্যাসি’স বা গণতন্ত্রওয়ালাদের জোট। আসলে তারা হল চীনবিরোধী, তাই। আমেরিকার ভাষায় চীনে তো ‘গণতন্ত্র’ নাই, তাই তাদের পোয়া বারো।  আর তাতেই চীনবিরোধী  বলে ঐ চার রাষ্ট্র নিশ্চয় “ডেমোক্রেসির চ্যাম্পিয়ান”।  নিজেরা কী তা বুঝানোর এটাই তারা তরিকা হিসেবে নিয়েছে। অথচ ঘটনা হল, জন্ম থেকেই এই ডেমোক্র্যাসি শব্দটা সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নকে খাটো বা নিচা করে দেখাতে আমেরিকা জন্ম দিয়েছিল। আর রাষ্ট্র বুঝাতে ক্লাসিক্যাল মূল শব্দটা হল – ‘মর্ডান রিপাবলিক’, কখনই যাকে ডেমোক্রাসি বলা হয় নাই। তা বাদ রেখে একটু সরিয়ে সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নকে খোঁচা দিতে এই শব্দ হাজির করা হয়েছিল। তো ভালো! কী আর বলব। হিন্দু উগ্র জাতিরাষ্ট্রবাদী মোদী আর তার অনুসারীরা যদি ভারতের কোন মুসলমান নাগরিকের বুকের ওপর উঠে; তাদের বুকের হার ভেঙ্গে দিয়ে জবরদস্তিতে তাকে দিয়ে জয় শ্রীরাম বলানোকে তাদের “ডেমোক্র্যাসির” বিরাট নায়ক বলে জাহির করতে থাকেন আর মোদী ঐ ডেমোক্রাসির বিরাট নেতা হন – তাহলে বলতে হয়, হে ডেমোক্র্যাসি দূরেই থাকো, আমার লাগবে না! তা তোমাদেরই থাক। আর অমন ডেমোক্রাসিকে ধিক্কার!
এর মানে আবার অবশ্যই এও নয় যে, চীনারাষ্ট্র এর কোন অযোগ্যতা বা খামতি নাই। তবে অবশ্যই এই কথিত ‘ডেমোক্র্যাসি’র ফেরিওয়ালারা বিপজ্জনক ও ধান্দাবাজ। এমনই ধান্দাবাজ  যারা আবার নিজেরা চার রাষ্ট্র পরস্পরকেই বিশ্বাস করে না। তো এই ফেরিওয়ালারা ২০১৭ সালে জন্মের পর থেকে ঘুমিয়েই ছিলেন। কোন সক্রিয়তা ছিল না। কিন্তু গত এক মাসে আবার জেগেছে। তাতে চীনাদের হাতে অপমানিত ভারত ও মো্দী যেন তিন দিনের ক্ষুধার্ত লোক যে প্রথম রুটির দেখা পেল। সর্বস্ব হতাশায় ঢুবে যাওয়া ভারতের মনে এবার সবার মনে তাই আশা, এবার মনের জ্বালা মিটবে! কিন্তু আদৌ মিটিবে কী?
সন্দেহ আছে প্রবল। যেমন জাপানের পত্রিকা নিক্কিই-এর উপ- শিরোনাম হল, Pompeo says ‘Quad is revived’ and calls for democracies to unite। আর শিরোমানে নিজেরাই সন্দেহ রেখে বলছে এটা এমবিশাস, মানে উচ্চভিলাসী – US seeks ambitious relationship with ‘global power’ India.।
এদিকে চীন-ইরান ২৫ বছরের চুক্তি হচ্ছে এই খবর বাজারে এসে যাওয়ার পর ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (সমতুল্য) মাইক পম্পেও ইউরোপে গিয়েছিলেন। পরে অস্ট্রেলিয়াতেও যান। কিন্তু ২৯ জুলাই পম্পেওকে অষ্ট্রেলিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানালেন, “চীনবিরোধিতা প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়া আমেরিকাকে আংশিক সাপোর্ট দিবে” [Australia gives US partial support against China]। এই হল মিডিয়া শিরোনাম। শুধু তাই নয়, ভেতরে লিখছে পার্শিয়াল মানে কী। বলছে  – দক্ষিণ চীনসাগরে চীনবিরোধী জোটের মহড়ায় অস্ট্রেলিয়া যোগ দিবে না। আরো আছে। চীনের সাথে অস্ট্রেলিয়া গভীর বাণিজ্য সম্পর্ক সে অটুট […pursue policies independent of both the US and close trade ally China.] রাখবে। আর লাগে কিছু? বোঝা গেছে না!

ঘটনাটি তাহলে কী? কোয়াড ব্লক দাঁড়ায় না কেন? অথচ ইন্ডিয়ানরা এত ভরসা করে বসে আছে! এমনকি ফিলিপাইনে থাকেন এক ভারতীয় অরিজিন হায়দারিয়ান সম্ভবত খ্রিষ্টান, তিনি এশিয়া টাইমসে লিখেন। তিনিও প্রবল উৎসাহে গত সপ্তাহে ২৭ জুলাই কোয়াড নিয়ে রিপোর্ট লিখছেন এক আকাশ ফাটানো শিরোণামে Quad alliance forms ‘arc of democracy’ around China। কিন্তু লেখার মাঝখানে নিজেই লিখছেন, কিন্তু চীনের সাথে ব্যবসায় লাভালাভের স্বার্থে ইন্ডিয়া আর অস্ট্রেলিয়া এরা কখনো চীনবিরোধী এই জোটে সক্রিয় হয়নি ……India and Australia were until now often reluctant to participate in an ostensibly anti-China alliance.।

তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়?
একটা মৌলিক দিক নিয়ে কথা তুলব। সে শব্দটা হল অবজেকটিভ। কিন্তু এর মানে কী? ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প কিংবা সুনামি এধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি জানি। কিন্তু মানুষ কি কখনো এর বিরুদ্ধে, যেন দুর্যোগ থামিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে লড়াই-এর চিন্তা করছে – এমন কী আমরা কখনো দেখেছি? অবশ্যই না। বরং আমরা সবসময় দেখি এধরণের খবরটা জেনে নিয়ে মানুষ এবার এর সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া যায় কী করে; যাতে লক্ষ্য থাকে কত কম ক্ষতিতে এটি পার করা যায় কিভাবে। মানে কোনো লড়াই নয়, বরং একভাবে একে স্বাগত জানানোই বলা যায়। এগুলোকেই আমরা অবজেকটিভ ঘটনা বলতে পারি। যা অবজেক্টের উলটা  সাবজেক্ট – মানে কর্তা মানুষের কারণে ঘটে না। (যদিও লোভে অজান্তে করে বসতে পারে।)  এগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা। এই অবজেকটিভ ঘটনাগুলোর প্রতি সাবজেক্ট মানুষের আচরণ সবসময় সব কালেই পুর্বনির্ধারিত। আর তা হল  অধস্থন, অবজেকটিভিটির বশ্যতা স্বীকার করে নেয়া।  অবজেকটিভ ক্ষমতার সামনে দাঁড়ানো বোকামি। তাতে সেটাকে প্রাকৃতিকতা বলেন কিংবা স্পিরিচুয়ালিটি বলেন – এমন কোন ফারাক নাই।  তবে এপ্রসঙ্গে একজনের নাম ও পরিণতি মনে করতে পারেন  – রবার্ট ম্যাকনামারা Robert S. McNamara । আমেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী (সমতুল্য) ভিয়েতনাম যুদ্ধের কু-নায়ক ও কেমিকেল অরেঞ্জ বোমা ফেলায় আজীবন সকলের বদ-দোয়া প্রাপ্ত খলনায়ক তিনি। যার কারণে এখনও ভিয়েতনামে বিকলাঙ্গ বাচ্চা পয়দা হচ্ছে, কেউ জানে না কার বেলায় কোন হবু বাচ্চার সেটা হবে।ম্যাকনামারা ছিলেন অবজেকটিভিটির সাথে লড়তে যাওয়া কুখ্যাত বোকা। অতএব, সব সমাজের দুরছাই নিন্দা এড়াতে জীবনের শেষ বিশ বছর তিনি নিজেকে ঘরে বন্দী করে কথা না বলে কাটিয়েছেন।
তাহলে সারকথাটা হল, অবজেকটিভিটি প্রসঙ্গে সাবজেক্ট মানুষ হিসাবে আমাদের ভূমিকা নির্ধারিত। তা হল- কোনো লড়াই বা যুদ্ধ একেবারেই নয়, বরং পাশ কাটিয়ে থাকা যতটা সম্ভব যাতে ক্ষতি কম হয়। বলা যায়, তাই আমরা এ ধরনের অবজেকটিভ বা ‘প্রাকৃতিক’ ঘটনার সাথে আমরা ভুলেও লড়তে যাই না। এটি আমাদের কাজও নয়।
ওদিকে আরেকটা ধারণা হল “গ্লোবাল”; মানে – একটি গ্লোবাল সিস্টেমের প্রয়োজন শুরু হয়; যেকোনো দুটি রাষ্ট্রের পণ্য বিনিময় বাণিজ্যের লেনদেনের প্রয়োজন মিটাতে। কেন? কারণ ওই লেনদেন বাণিজ্যে দুই রাষ্ট্রের কারো মুদ্রা দিয়েও বাণিজ্য চালানো যায় না। মুদ্রামান, বিনিময় হার জানা ছাড়া বিনিময় অসম্ভব। এখান থেকেই গ্লোবাল মুদ্রা, এর মান এক ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা’ কার্যকর থাকার প্রয়োজনীয়তা্র অনুভব ও তা মিটানোর শুরু।
সময়কাল ১৬০৭-১৯৪৫, এই প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি দখলের আমলে ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা’ খুবই সীমিত ছিল। তাই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গ্লোবাল বাণিজ্যব্যবস্থা কার্যকর চালু ছিল না। কিন্তু এই ব্যবস্থা বা গ্লোবাল অর্ডার দুনিয়া প্রথম চালু হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে ১৯৪৫ সাল থেকে। আর ‘গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায়’ মেজর লেনদেনের মুদ্রা এখনো ডলার, আর এর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান মালিকানা শেয়ারও ঐ আমেরিকার হাতেই। বিগত ৭৫ বছর ধরে আমেরিকা নেতার অবস্থান নিয়ে আছে। যদিও এ প্রভাব ইদানীং কমে আসছে, বিপরীতে চীন সে জায়গা নিয়ে ক্রমেই উঠে আসছে। আমাদের বক্তব্যের ফোকাস হল – এই দুই দেশের উঠে আসা বা পড়ে যাওয়াটা যত না সাবজেকটিভ, এর চেয়ে ঢের ঢের বেশি এটা বস্তুগত, তাই অবজেকটিভ ঘটনা। দুনিয়ায় উদ্বৃত্ত সম্পদ বা পুঁজির সঞ্চিতি বা একুমুলেশন একেক সময় মুখ্যত একের দেশের হাতে, নানা কারণে ঘটেছে। এটা আবার সহসাই চলেও যায় না। আবার, কবে আসবে কবে নাগাদ যাবে তাও আন্দাজে বলা যায় না।  অতএব যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে চীনের উত্থান ঠেকানো যাবে না। চীনের উত্থানের বড় দিকগুলোই এক অবজেকটিভিটি।
কিন্তু এরপরও মোদীরা জিদে ধরা যাক যুদ্ধের দিকে ঘটনা গড়িয়ে দিল। কিন্তু আর ঘটনা বৈশিষ্ট হল যতই নাবুঝা কল্পনায় বলি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা – এগুলো কিন্তু ভুয়া আর মিছা -পুরাটাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কল্পনায় ঠাসা যখন পারমানবিক অস্ত্র কথাটাই প্রচলিত ছিল না। কিন্তু এখন প্রধান বিবদমানদের হাতে পারমানবিক অস্ত্র আছে। অতএব এখন যুদ্ধ মানে সে্টা খুবই সীমিত পরিসরে রাখতে হবে; কারণ তা কোনোভাবেই যেন পারমাণবিক উস্কানির দিকে না যায় তা দুপক্ষকেই মনে রাখতে হবে। যতই জিদ উঠে যাক সীমিত যুদ্ধে থাকতেই হবে। সীমিত যুদ্ধ মানে তা আপস মিটমাটের রাস্তায় নিতে সচেষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু তাতেও সবচেয়ে বেশি অর্থনীতির ক্ষতি হবে চীন বাদে বাকি সবার। কারণ, চীনের ক্ষতি সামলানোর দিক থেকে সবার চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকবে। কিন্তু এরপরও ঘটনা এখানেই শেষ নয়। বলা যায় শুরু। কেন?

কারণ, এই কথিত ডেমোক্র্যাসিসরা তাদের ভেঙেপড়া অর্থনীতি আবার চাঙা ও পুনর্বাসন করতে দুনিয়ায় সাহায্য পাবার মত একমাত্র শক্তি বেঁচে থাকবে চীনই। ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে দেখতে পারেন ঠিক এ ঘটনাই ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। যুদ্ধে হিটলারের জোটের বিরুদ্ধে যারাই আমেরিকার পক্ষে ছিল; সবাইকে যুদ্ধের খরচ দিয়েছে আমেরিকা, এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নকেও। আবার যুদ্ধ শেষে পুনর্বাসনের অর্থ জুগিয়েছে সকল্কে, ধার দিয়েছে সেও ঐ আমেরিকাই। এছাড়া সে যুদ্ধ শেষে আবার পরাজিত হিটলারের জার্মানি, তার বন্ধু জাপান বা ইতালি এদেরও পুনর্বাসনের অর্থ জুগিয়েছে ঐ আমেরিকাই। ইতালিতে তো দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। যে আমেরিকার বিরুদ্ধে মুসোলিনি যুদ্ধ করেছিল; ইতালীয়রা সেই আমেরিকার কাছেই ভিক্ষা চেয়েছিল, দুই হাত তুলে তাদের গডের কাছে মিনতি জানিয়েছিল আমেরিকাকে সুমতি দিতে এবং আমেরিকাও হাত খুলে সাহায্য এবং পুনর্বাসন সব কিছু অর্থ ঋণ-অনুদান দিয়েছিল। কাজেই……।

দুনিয়া খুব কঠিন জায়গা। ইতিহাস পড়েন, একই ভুল দ্বিতীয়বার করার মানে হয় না। রেললাইনে মাথা দিয়ে আবার বুঝার দরকার নেই যে মাথা কাটা যাবেই। কাজেই প্রথম কাজ বুদ্ধিমান হন। জিদ ত্যাগ করেন, প্রতিশোধের স্পৃহা ত্যাগ করেন। এটি নেগেটিভ এনার্জি। এটা কমবেশি সবার ক্ষতি করবে। মূলকথা, মানুষের স্বভাব বা কাজ না অবজেকটিভিটির বিরুদ্ধে লড়া। নিজের স্বার্থের জন্য লড়বার আরো অনেক পথ আছে, সেগুলো খুঁজেন, ইনোভেটিভ হন। রাস্তা পাবেন। কেবল সতর্ক থাকেন কোনগুলো ধ্বংসাত্মক, তা এড়ায় চলেন। আর সবচেয়ে বড় কথা (থিওলজিতে বিশ্বাসী লোকেরা বলবে আল্লা চাহে তো) আস্থা রাখেন দিন আপনারও আসবে!

কিন্তু এখনই একটি পরীক্ষা করে নেন। আমেরিকার ট্রাম্প যে কোয়াডের পিছনে তাল দিচ্ছেন তাতে তিনি নিজে থাকবেন তো? নাকি? ২০১৭ সালে জন্মের সময় ট্রাম্পের আমেরিকা কিন্তু পালিয়েছিল। কারণ সেবারই সবার আগে ট্রাম্পের চীন সফর ছিল। সমস্যা হয়েছিল চীন ঠিক কত কী বাজারসুবিধা দিতে রাজি; তা ক্যালকুলেট করতে সময় লাগছিল বলে তত দিনে ট্রাম্প ফিলিপাইনে এসে কোয়াডের জন্ম ঘোষণা করে দেয়ার পরই চীন থেকে বাজারসুবিধা দেয়ার তালিকা এসে পড়াতেই ট্রাম্প আর কোয়াডের পক্ষে থেকে শক্ত অবস্থান নিতে যা কথা হয়েছিল তা আর এমনকি যৌথ বিবৃতিতেও হাজির করতে রাজি থাকেননি। আর তা থেকেই অন্তত তাদের যৌথতায় – তাতে ভাঙনের একটি কারণ।

তাহলে এবার? এবারো আমেরিকাকেই পরীক্ষা করতে বলছি। মূলত ট্রাম্প চীনবিরোধী যত গরম গরম কথা বলেছেন – সেগুলার মধ্যে আমেরিকার রাষ্ট্রের নীতি-পলিসি এর কোনগুলো বা কত শতাংশ আর কতটা ট্রাম্পের নির্বাচনী ভোট টানতে চেয়ে বলা হচ্ছে –  তা আগে পরিষ্কার হতে নেন। কেন?

সাংবাদিকরা প্রশ্ন করে ট্রাম্পকে তাড়া করে বেড়াচ্ছেন যে “কিছু দিনের মধ্যেই লকডাউন থেকে তড়িঘড়ি করে সব খুলে ফেলার চাপের কারণেই মূলত ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে”। এ জন্যই দেড় লাখের বেশি আমেরিকানের মৃত্যু হয়েছে। এটা ট্রাম্পের চরম ব্যর্থতা কী না? তাই ট্রাম্প প[আলিয়ে বেড়াচ্ছেন।  ট্রাম্পের প্রতি ঠাট্টাগুলো লক্ষ্য করেন, আর কত লোক মরলে পরে আমেরিকা মহান (great) হবে?  আর ততই তিনি ভোটারদের মধ্যেও এই মনোভাব বেড়ে যাওয়ার কারণে তিনি এখন উঠতে বসতে  চীনবিরোধি গরম কথা বলছেন। “চীনা ভাইরাস” বলে নিজের সব দুর্ভাগ্যের জন্য সব কিছুর জন্য চীন দায়ী বলে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা তুঙ্গে নিচ্ছেন। কাজেই কোনটা চীনবিরোধী রাষ্ট্রের পলিসি অবস্থান আর কোনটা ট্রাম্পের ভোটের বাক্স ভরানোর প্রপাগান্ডা তা একমাত্র আলাদা হয়ে যাবে নভেম্বরের ৩ তারিখের নির্বাচনের পর। এর আগে পর্যন্ত এটা মাখামাখি হয়েই থাকবে।  কাজেই মোদী যে আমেরিকার উপর আস্থা বিশ্বাস রাখছেন ঢালছেন – এর ভিত্তি ঠিক আছে তো?

আবার দেখেন ট্রাম্প সরকারের আয়ু মূলত আর তিন মাস। কারণ নির্বাচনী ফল হয়ে যাওয়ার পর সেটা মূলত রুটিন সরকার। তাহলে এই তিন মাসের জন্য পম্পেও এর এত দৌড়াদৌড়ি, কোয়াডের প্রপাগান্ডা এটি কি একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না, অসঙ্গতিপূর্ণ নয়? এগুলো একমাত্র সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে যদি এগুলো সবই নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করতে করা হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে পম্পেওর দৌড়াদৌড়িও – সেটাও খুবই পারফেক্ট টাইমিং। কিন্তু মোদীর জন্য তাহলে কী হবে? হিন্দু জাতিবাদী মোদী ও তার সকল সমর্থকরা এদের জন্য কী হবে? হতাশায় আত্মহত্যা বাড়াবেন? এটা হতেও পারে!

ওদিকে আরেক ঘটনা তৈরি হচ্ছে। এখন ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক জাতীয় বিদ্বানেরা কিভাবে চীনের বিরুদ্ধে খোঁচাখুঁচি লাগানো যায় তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্ক করে তাদের দিন যাচ্ছে। এতে সবচেয়ে উপরের জনপ্রিয় আলাপটা হল, চীনের একচীন নীতি বা তিব্বত বা হংকং নীতি ভারত না মেনে ভাঙলে চীন কেমন শায়েস্তা হবে – এই হল তাদের আলোচনার প্রসঙ্গ। অর্থাৎ তাইওয়ান, হংকং বা তিব্বত এদেরকে স্বাধীন রাষ্ট্রের মত খাতির আচরণ করা বা মর্যাদা দেয়া। অথচ এতে প্রধান ভায়োলেশনটা হবে, চীন যেকোনো দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক পাতানোর আগে এক পূর্বশর্ত স্বীকার করিয়ে নেয় যে – তাইওয়ান, হংকং বা তিব্বত ইত্যাদি এগুলো কোনো স্বাধীন ভূমি নয়, চীনেরই অংশ বলে গণ্য করতে রাজি হতে হবে। অর্থাৎ এই বিদ্বানেরা বলতে চাইছেন; তারা মোদীর ভারতকে পরামর্শ দিচ্ছেন – যার সোজা মানে মোদী যেন চীনের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। কিন্তু এত দূর পরিণতি কী তারা মেপে কথা বলছেন? আমরা নিশ্চিত নই।

যাই হোক, উপরে ভারতের চীনা রাষ্ট্রদূতের কথা বলছিলাম। তিনি ওই আলাপে এ প্রসঙ্গগুলো নিজেই এনে পরিস্থিতি সম্পর্কে পাকা বোঝাবুঝি রেখে কাজ করতে পরামর্শ রেখেছেন। ভদ্র ও বক্তব্য নরম রাখতে বলেছেন। উভয় পক্ষেরই উচিত হবে পরিস্থিতি সম্পর্কে উভয় পক্ষ (মানে চীনা পক্ষও) যেন ভালো আর পুরো বোঝাবুঝি করে এরপর পদক্ষেপ নেয়। তবে ভারতের সাথে সীমান্ত নিয়ে তিনি কিছু সোজা ইঙ্গিত দিয়েছেন, সে্টার প্রসঙ্গে বলেই আজকের লেখা শেষ করব।

মায়েদের দুষ্ট সন্তানকে সামলানোঃ
কথাগুলো অনেকটা দুষ্ট সন্তানকে সামলাতে মায়েরা অনেক সময় শর্ত দিয়ে কথা বলেন। বলেন যে, পায়েস তিনি আজ রেঁধেছেন, তুলেও রেখেছেন বাটিতে। কিন্তু শান্ত ও বুঝমান সন্তানের মত আচরণ যারা করবে তারাই কেবল ঐ পায়েসের বাটির হকদার হবে। ঠিক এইকথা মনে রাখলে আমরা চীনের পদক্ষেপগুলোর অর্থ বুঝতে পারব।
চীনের সাথে ভারতের এবারের সঙ্ঘাত মূলত লাদাখ অঞ্চলে। কাশ্মীরেরই ভারত-চীন সীমান্তের অংশ এটা।  কিন্তু এখানেই কেন? কারণ ভারত গত বছর এই ৫ আগস্টই লাদাখেরই স্ট্যাটাস বদলিয়েছে। কেন? ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মির ভারতেরই অঙ্গীভূত করে নেয়ার সময়। এই ঘটনাটা বিজেপির হাতে পড়ে কাশ্মির মোদীর কাছে জাস্ট একটা হিন্দু পোলারাইজেশন ঘটিয়ে ভোট পাওয়ার ইস্যু। যাতে মোদী ব্যাপারটাকে ‘হিন্দুজাতির বীরত্ব’ হিসেবে দেখিয়ে আরো বেশি ভোট পেতে পারেন, এরই লক্ষ্য। এতে কাশ্মিরিদের কী পরিণতি হবে অথবা পড়শিদের কাছে কী ম্যাসেজ যাবে এ নিয়ে তিনি পুরো বেপরোয়া থাকবেন।

যেমন ম্যাসেজ কী গেছে?
চীন-ভারত যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৬২ সালে। ওই যুদ্ধের আগে ও পরে লাদাখ অঞ্চলের বহু অংশই চীন দখলে নিয়ে নিয়েছিল। পরে আস্তে আস্তে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করলে ১৯৯৩-৯৬  এই সময়টা ভারতের জন্য ছিল খুবই নির্ধারক। এ সময়কালেই লম্বা সময় ধরে চীন-ভারত সীমান্ত আলোচনা চলেছিল। পুরনো ১৯৫৮-৬০ সালের সেই এলএসি দেখিয়ে চীন যেসব ভূখণ্ড দাবি করত সেসব দাবির বড় বড় অংশ ১৯৯৩-৯৬ সালের আলাপের সময় চীন ভারতকে ছেড়ে দিয়েছিল। আসলে সেটা চীনের ভাষায়,  শান্ত ও প্রশান্তির কামনা ও আকাক্ষায় ভারতকে পেয়েছিল বলে  দুই দেশের সীমান্ত আলাপে এভাবে এগিয়ে এসেছিল চীন। কিন্তু গত বছর কাশ্মির ও লাদাখের স্ট্যাটাস মোদীর খেয়ালি একক ইচ্ছায় বদলে দেওয়াতে – এটা ওই ১৯৯৩-৯৬ আলোচনার সময়ে তৈরি হওয়া যে পারস্পরিক বোঝাবুঝি তা পুরো উপেক্ষা ও ভেঙে ফেলা হয়েছে বলেই চীন মনে করছে। আর ঠিক একারণেই এখন ১৯৫৮-৬০ সালের দাবির এলএসি মোতাবেক সব পুরানা ছাড় দেওয়া ভুখন্ড চীন আবার দখল করে নিয়েছে। সেই ধারণাতে ফিরে গেছে। তাই চীন এখানে পরামর্শে ও ইঙ্গিতে বোঝাতে চায় যে, ভারত যদি ফের শান্তি চায় বিশ্বাস করাতে পারে – আর যেসব বিষয়ে পারস্পরিক বোঝাবুঝিতে সম্পর্কের অনেক অগ্রগতি হয়েছিল তা ফিরিয়ে আনে, তবেই  চীন একমাত্র ১৯৯৩-৯৬ সালের বুঝাবুঝি সীমানা বা এলএসিতে আবার ফিরে চলে যাবে। ভারতকে ভূখণ্ড ছাড় আবার দেবে। নইলে না। আর যদি উল্টা ভারত আমেরিকার কোলে গিয়ে উঠে আর এক-চীন নীতি ভাঙাসহ নানা হুমকি দিতে থাকে তবে সীমান্ত ১৯৫৮-৬০ সালেরটাই বহাল থাকবে। শান্তি চাওয়া সৎ প্রতিবেশী হলে একরকম আর উল্টাটা হলে আরেক রকম। সারকথা, সিদ্ধান্ত ভারতের। ভারতকেই ঠিক করতে হবে সে কোন পথে যাবে, ঠিক কী চায়!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত ০৭ আগষ্ট ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  ভারতকে বেছে নিতে হবে কোনদিকে যাবে– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

One thought on “ভারতকেই পথ বেছে নিতে হবে, সে সম্ভবত ফেল করবে

  1. শেষ প্যারা মোদ্দা কথাটি বলে দিল। ভাল বিশ্লেষণ, তবে আমাকে কয়েকটি কথা বলতে হয়। আপনার লেখা আমি নিয়মিত পড়ি। লেখাগুলোর কলেবর খুব বড়ো হয়ে যায়। কিঞ্চিৎ ছোট করলে ক্ষতি হবে না মনে করি, বুঝতেও অসুবিধে হবে না, বরং সুখপাঠ্য হবে। আমি আপনার মত বিজ্ঞ নই এ বিষয়ে, তবে নিয়মিত পাঠক হিসাবে এ অনুরোধ করতে পারি। ধন্যবাদ

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s