‘লিবারেল ডেমোক্র্যাসি’ দেউলিয়াত্ব নিয়ে হাজির


‘লিবারেল ডেমোক্র্যাসি’ দেউলিয়াত্ব নিয়ে হাজির

গৌতম দাস

৩১ আগস্ট ২০২০, ০০:০৬ সোমবার,

https://wp.me/p1sCvy-3a7

 

Canadian & Chinese Foreign Ministers met in Rome।

কানাডা আর চীনের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী তৃতীয় দেশ ইতালির রোমে গত ২৫ আগস্ট এক বৈঠকে বসেছিলেন। তৃতীয় দেশে যখন বসতে হচ্ছে তখন কিছু জটিল সমস্য আছে বুঝাই যাচ্ছে।  বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কানাডিয়ান মন্ত্রী (Francois-Philippe Champagne) বলেছিলেন, “চীন যেকোনো বলপ্রয়োগের কূটনীতি করে কোনো কাম্য ফল পাবে না [I was very clear [with him] that coercive diplomacy is not going to lead to the desired outcome]। আর যাকে তাকে ধরে ডিটেনশন দেয়াটাও রাষ্ট্র দুটোর মধ্যে সম্পর্কের জন্য ভালো নয়”। আর সব শেষে বলেছেন, “এটি নেহায়ত-ই দুইজন কানাডিয়ানের চীনে ডিটেনশনে আটকে থাকা নয়। এরা দুইজন লিবারেল ডেমোক্র্যাসির নাগরিক এবং প্রতিটি লিবারেল ডেমোক্র্যাসির দেশ চীনের বলপ্রয়োগের কূটনীতির ব্যাপারে উদ্বিগ্ন”।’ এই হলো মূল ডায়ালগ। কিন্তু ঘটনা কী, চার্জ তো সাঙ্ঘাতিক! চীন নিজের মতো সংজ্ঞায় ‘কমিউনিস্ট’- আমরা জানি, সেটা এখানে সম্পর্কিত নয়। কিন্তু তাই বলে চীন কি এতই অভিযোগে অভিযুক্ত? ব্যাপারটা কী?

ঘটনাটা শেষের দিক থেকেই শুরু করা যাক। হ্যাঁ কথা সঠিক, দুইজন কানাডীয় নাগরিক যারা চীনের বেইজিং হয়ে কোনো তৃতীয় দেশে সফর করছিলেন, তাদেরকে চীনা সরকার বেইজিং এয়ারপোর্টে পেয়ে গ্রেফতার করে চীনের কোনো জেলে ডিটেনশন দিয়ে ফেলে রেখেছে সেই ২০১৮ সাল থেকে, আমরা জানি। এই দুইজনের একজন এক সাবেক কানাডীয় কূটনীতিক মাইকেল কোভরিগ [Michael Kovrig]। তিনি বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ- এই নামের এক থিঙ্কট্যাঙ্কের কর্তাব্যক্তি। যেকোন দেশের কোনো রাজনৈতিক সঙ্কটে যদি তা জাতিসঙ্ঘ পর্যন্ত গড়ায় আর তাতে যদি ইস্যুটা নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক পর্যন্ত চলে যায় তবে ওই বৈঠকে পশ্চিমা শক্তিগুলো সবাই মিলে কী সমন্বিত অবস্থান নিতে পারে এরই আগাম খসড়া গ্রাউন্ডওয়ার্ক তৈরি করা – এই কাজটাই ক্রাইসিস গ্রুপ নিয়মিত করে থাকে। এই প্রতিষ্ঠান পশ্চিমাস্বার্থ সংশ্লিষ্টদের সাথে আগাম কথা বলে লবি করে এক সমন্বিত অবস্থান রেডি করে রাখে, যাতে পশ্চিমা অবস্থান একটাই হয়। চীন সরকার এই “ক্রাইসিস গ্রুপের” এক কর্তাব্যক্তিকেই গ্রেফতার করে গত ডিসেম্বর ২০১৮ সালে। এছাড়া এর কয়েক দিন পরে আরেক শাঁসালো কানাডীয় ব্যবসায়ীকেও [Michael Spavor]  গ্রেফতার করেছিল চীন সরকার। চীনের অফিসিয়াল অভিযোগ – এ দুইজন কানাডীয়  চীনে “গোয়েন্দাগিরিতে লিপ্ত” ছিলেন। এখনো তারা দুইজন চীনের জেলে আটক।  তা হলে অভিযোগ সত্য। কিন্তু চীন কেন এমন বেমক্কা গ্রেফতার করতে গেল?

কারণ চীন সরকারের এ’দুই কানাডিয়ানকে ‘ইচ্ছামতো’ গ্রেফতার ছিল এক পাল্টা ব্যবস্থা। কিন্তু কিসের পাল্টা ব্যবস্থা?

এবার আমরা মূল ঘটনায় প্রবেশ করব। চীনা বিখ্যাত মোবাইল কোম্পানি হুয়াওয়ে [Huawei]। কোন মোবাইল কোম্পানির ব্যবসা বলতে তা তিন ধরণের হতে পারে। আমাদের পরিচিত একটা ধরণ যেমন – গ্রামীণফোন বা বাংলালিংকের মত মোবাইল কোম্পানি। এরা আসলে এন্ড-ইউজার বা প্রান্তিক ফোন ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের কাছে ইন্টারনেট ডাটা ও ফোনসার্ভিস বিক্রি করে থাকে এমন কোম্পানি। আবার এসব কোম্পানিকে মূল টেকনিক্যাল যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা আরেক ধরনের মোবাইল কোম্পানি হয় যারা গ্রামীণফোন ধরনের কোম্পানিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে  টেকনিক্যাল দিক থেকে সাজিয়ে দেয়, টিকিয়ে রাখে বা খাড়া করে দেয় যাতে তারা ফোনসার্ভিস বেচতে সক্ষম হয়। যেমন- হুয়াওয়ে, নোকিয়া, এরিকসন, এলকাটেল প্রভৃতি। অর্থাৎ এরা মূল যন্ত্রপাতি ও টেকনোলজি উৎপাদন, প্রস্তুত ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। আবার তৃতীয় আরেক ধরনের মোবাইল কোম্পানি হতে পারে যারা এন্ড-ইউজার যে ফোনসেট ব্যবহার করে, কেবল সেই ফোনসেটের উৎপাদন ও সরবরাহকারী। যেমন- অ্যাপল, স্যামসাং, অপ্পো, হুয়াওয়ে, নোকিয়া প্রভৃতি।
তার মানে মোবাইল ব্যবসা বলতে ব্যাকটেক (ব্যাকগ্রাউন্ড টেক যন্ত্রপাতি), ফোনসেট আর সার্ভিস – এই তিন ধরনের কোম্পানি হতে পারে। আর হুয়াওয়ে হল  ব্যাকটেক আর ফোনসেট এদুই ধরণের পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের কোম্পানি। বলাবাহুল্য, এরা শ’ শ’ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি। এমনকি ব্যাকগ্রাউন্ড টেক যন্ত্রপাতির কোম্পানি হিসেবে হুয়াওয়ে তার সমতুল্য নোকিয়া, এরিকসন ইত্যাদি সব কোম্পানির চেয়েও অনেক বড়। বিনিয়োগের আকার, বড় মার্কেট শেয়ার ও টেকনিক্যাল দিক থেকেও উঁচু প্রভাবশালী কোম্পানি। তবে হুয়াওয়ের সমতুল্য আরেক চীনা কোম্পানি আছে জেডটিই (ZTE), যেটা আবার চীনা সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি।

হুয়াওয়ে ও ফাইভ-জিঃ
বাংলাদেশে ফোন সার্ভিসে ব্যবহারকারীদের কাছে  টু-জি, থ্রি-জি ও ফোর-জি সার্ভিস দেয়া হচ্ছে বলে কোম্পানিগুলো দাবি করে থাকে। তাতে কিছুই ফারাক বোঝা যায় না। কারণ সার্ভিস কোম্পানির বসানো সব টাওয়ার থেকেই ফোর-জি উচ্চমানের গতির সার্ভিস দেয়া হচ্ছে বাস্তবে এমন কোন কোম্পানি বাংলাদেশে নেই। এমনকি সব টাওয়ার থ্রি-জি পর্যায়ের কি না সেই নিশ্চয়তাও নেই। লোক দেখানোর জন্য কয়েকটা টাওয়ার এমন থাকে আর যা থেকে মিছা দাবি করে কোম্পানিগুলো টিকে আছে। কিন্তু যেসব দেশে এসব ধাপ্পাবাজি নেই, যা সার্ভিস দেবে বলে দাবি করে তাই দিতে হয়; এর জন্য তদারকি মনিটরিং ও শাস্তিবিধান আছে সেখানে টু-জি, থ্রি-জি না ফোর-জি – কত স্পিডের সার্ভিস তা গুরুত্বপূর্ণ। সেই জগতেরই লেটেস্ট টেকনোলজি হল – ফাইভ-জি টেকনোলজি। ফাইভ-জি একেবারেই ব্যতিক্রমী ও আলাদা; এমনকি ফাইভ-জি ফোন সেটও আলাদা হবে, যা এখনো বাজারে আসেনি।
কেন আলাদা? কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা [artificial intelligence, AI] বা এআইয়ের কথা শুনেছেন অনেকে। তারা বুঝবেন আগামী দিনে কারখানা ম্যানুফাকচারিং থেকে শুরু করে অটো ড্রাইভিং মোডে গাড়ী চালানো এমনকি রেস্টুরেন্টে খাবার বিতরণের কাজ করবে রোবট। দূর থেকে বা নির্দিষ্ট রেঞ্জের মধ্যে বসে দূর থেকে রোবটকে নির্দেশ দিয়ে চালাতে হলে যে হাইস্পিডের মোবাইল টেকনোলজি লাগবে সেটাই ফাইভ-জি পর্যায়ের হতে হবে। আর হুয়াওয়ে হল ফাইভ-জি টেকনোলজিতে সবার চেয়ে আগে বা পাইওনিয়ার কোম্পানি।  আর এক্ষেত্রেই টেকনোলজিতে এবং বিনিয়োগ অর্থে আমেরিকাঙ্গেই প্রথম কয়েক বছর পেছনে পড়ে গেছে, কিছু টেকনোলজি-বিষয়ক সিদ্ধান্ত সময়মত আমেরিকান রাষ্ট্র ও এই খাত নিতে না পারায়। তাই এই খাতে ইউরোপীয় অরিজিনের নোকিয়া, এরিকসন, এলকাটেল কমবেশি থাকলেও আমেরিকান অরিজিন কোনো কোম্পানি এখন আর প্রতিযোগিতাতেই নেই। এর কারণ হিসেবে আমেরিকাতেই বলা হয়, মূলত সেখানকার কোম্পানিগুলো একসময় তাদের সবাইকে একই টেকনোলজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলতে হবে এমন সরকারি বাধ্যবাধকতা বা স্ট্যান্ডার্ড বলে কিছু  থাকা উঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।
গত নব্বই এর দশক জুড়ে এর সুযোগে জিএসএম, সিডিএমএ প্রভৃতির অন্তত পাঁচ ধরনের টেক স্ট্যান্ডার্ড একই সাথে আমেরিকায় ব্যবহৃত হত বা চালু হয়েছিল। এরই খেসারত এখন আমেরিকাকে দিতে হচ্ছে। কেন?  বাংলাদেশে আমাদের গ্রামীণসহ সব কোম্পানিই এখন এই জিএসএম [GSM] স্ট্যান্ডার্ড, আর  এখন বন্ধ হইয়ে যাওয়া কোম্পানি কেবল আমাদের সিটিসেল ছিল সিডিএমএ[CDMA] স্টান্ডার্ড। এখন এক দেশে স্ট্যান্ডার্ড ভিন্ন ভিন্ন হওয়া – এতে অসুবিধা হল , মোবাইল টেকে ক্রমাগত গবেষণা ও উন্নয়নে প্রচুর বিনিয়োগ লাগাতে হয়। নইলে আপটুডেট থাকা যায় না। অর্থাৎ একটা দেশে টেক স্ট্যান্ডার্ডের বালাই না থাকলেতসে দেশে পাঁচ ধরনের টেক স্ট্যান্ডার্ডের প্রচলিত থাকা মানে হবে, নতুন গবেষণা ও উন্নয়নে পাঁচগুণ বিনিয়োগ লাগবে। অথচ দেশের মোট বাজার তো একই, বাজার তো পাঁচগুন হবে না। অথচ দেশে একটাই স্ট্যান্ডার্ড মানতে সবাইকে বাধ্যতামূলক করে দেয়া থাকলে গবেষণা ও উন্নয়নে ওই একই বিনিয়োগ পাঁচ কোম্পানি শেয়ার করে নিতে পারত। আমেরিকায় পুরো নব্বইয়ের দশক এই স্ট্যান্ডার্ডহীন থাকার সুযোগে বা দুর্যোগেই কোম্পানিগুলো কমতে বা ডুবতে থাকে। একপর্যায়ে ইউরোপের নকিয়া বা এরিকসন ধরনের কোম্পানির মধ্যে বিক্রি হয়ে এরা সবাই বিলীন হয়ে যায়। এককথায়, স্ট্যান্ডার্ডের বালাই না থাকাটাই এর খরচ বইবার অক্ষমতাই এক পর্যায়ে আমেরিকার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর ঠিক এর উল্টোটা করে উঠে আসে হুয়াওয়ে, যে আমেরিকার ওই পিছিয়ে পড়াটাকেই টার্গেট করেছিল। আজ অবস্থা এমন যে, নোকিয়া বা এরিকসনও কিছু কিছু যন্ত্রাংশে হুয়াওয়ের ওপর নির্ভরশীল। কারণ বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, এর অন্যতম কারণ হুয়াওয়ের যন্ত্রাংশ দামে অনেক সস্তা।  তাইই নিজে সব ধরণের যন্ত্রাংশ উতপাদন না করে নোকিয়া বা এরিকসনও কিছু কিছু যন্ত্রাংশে হুয়াওয়েরটা ব্যবহার করে থাকে[Ericsson, Nokia are more Chinese than meets the eye]। কারণ মূল সুত্রটা হল, ব্যবসায় কোন পণ্য শস্তায় পাওয়া গেলে সেটা না কিনে এর লোভ সামলানো খুবই কঠিন।
মনে করা হয়, আমেরিকার মোবাইল খাতে পিছিয়ে পড়া ব্যবসায়ীরাই নিজেরা প্রবল দুর্দশায় পড়ে মার খেয়ে এরপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘাড়ে এক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে সওয়ার হয়েছিলেন। তত্ত্বটা হল, হুয়াওয়ে চীনা সরকারের পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করে, বিশেষত গোপনে হুয়াওয়ের যন্ত্রপাতি দিয়ে। এই ভুয়া তত্ব তারা ট্রাম্পকে খাওয়াতে সক্ষম হয়েছিল। তাই আমেরিকার সরকারি কোনো ক্রয়ে হুয়াওয়ে বা জেডটিই কোম্পানির থেকে কোন কিছু কেনা নিষিদ্ধ করে ট্রাম্প আইন করেছেন। আর এ নিয়ে এরপর ইউরোপের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয় ট্রাম্প প্রশাসনের। এক্ষেত্রে মূলত সবচেয়ে ভোকাল ছিলেন জার্মান চ্যান্সেলার এঞ্জেলা মার্কেল। তিনি দাবি করেন আমেরিকা যদি চীনা গোয়েন্দাগিরির কোনো প্রমাণ দেখাতে না পারে তাহল ইউরোপ ট্রাম্পের দাবি মানবে না। ইউরোপ-আমেরিকার এই বিবাদে ইউরোপও শেষে আর একতাবদ্ধ থাকতে পারেনি। মূলত সস্তা হুয়াওয়ের টেকনোলজি কেনার হাতছানি এক দিকে। অন্য দিকে নাকি নিজেদের বিনিয়োগে যেতে হবে এর অনিশ্চয়তা, আর যতই দিন চলে যাচ্ছে ততই তারা ব্যবসায় পিছিয়ে পড়ছেন – এভাবে সব মিলিয়ে গ্লোবালি এই খাত এক ব্যাপক এলোমেলো বিশৃঙ্খলায় এখনো ডুবে আছে, আরো যাচ্ছে ক্রমেই।

হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আরেক অস্ত্রঃ
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন শুধু এখানেই নয়, আরো এক অস্ত্র ব্যবহার করেছে হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে। বলা উচিত- অপব্যবহার করেছে। হুয়াওয়ে তার টেকনোলজি আর সবার কাছে যেমন তেমন ইরানের কাছেও বিক্রি করেছে। আর স্বভাবতই এতে আমেরিকার মাতব্বরি হিসেবে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ ভঙ্গ করে তা হয়েছে। কিন্তু আমেরিকা অবরোধ আরোপ করার কে? তার কী আন্তর্জাতিক অথরিটি আছে?   জবাব হল – সে কেউ নয়, এর কোনো বৈধ অথরিটি তার নেই। কোন আন্তর্জাতিক আইন নাই ফলে অথরিটি নাই – ইরান-চীন পণ্য বিনিময়ে। যেকোনো দুই দেশের পণ্য কেনাবেচায় আমেরিকার বাধা দেয়ার কোন অথরিটি নাই, এক্তিয়ার নাই। জাতিসঙ্ঘের দিক থেকে ইরানের ওপর যে পুরানা এক অস্ত্র ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা ছিল তার মেয়াদও সম্প্রতি শেষ হলে একা আমেরিকা ছাড়া আর কেউ আবার নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে ভোট দেয়নি। ফলে এখন জাতিসঙ্ঘের কোনো ধরণের অবরোধই আর ইরানের উপর নাই।
কিন্তু  পড়ে পাওয়া এক অসৎ সুযোগ নিচ্ছে আমেরিকার।  যেহেতু ডলার একই সাথে আমেরিকান রাষ্ট্রের মুদ্রা, এটাই সেই পড়ে পাওয়া অসৎ সুযোগ।  কারণ ইরান-চীন কোন পণ্য বিনিময়ের ইনভয়েস যদি ডলার মুদ্রায় করে থাকে তবে সেটা করতে মানে ঐ পেমেন্ট ডলারে ক্যাশ করতে একটা বাধা দিবার সুযোগ আমেরিকার হাত এসে লেগে যায়। কারণ আমেরিকান সরকারের সমস্ত আমেরিকান ব্যাঙ্কের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ঐ পেমেন্ট ডলারে ক্যাশ করা অবৈধ বা নিষেধ করা কাজ বলে ঘোষণা করতে পারে।

কিন্তু হুয়াওয়ে আর ইরানের কেনাবেচা ডলারে করা হয়েছে আর হুয়াওয়ের নামে না করে অন্যনামে তা করা হয়েছে এই অজুহাতে হুয়াওয়ের কর্মীদের বিরুদ্ধে আমেরিকা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে রেখেছিল।
হুয়াওয়ে কোম্পানির জন্ম ও বিকাশও বড়ই নতুনত্বের। এখানে সকল এমপ্লয়ীই কোম্পানির কিছু না কিছু শেয়ারের মালি হয়ে যায়; তিনি স্রেফ কর্মচারীওই না। আবার এটা চলে একোটা চেয়ারম্যান প্যানেলের মাধ্যমে, এতে ঘুরে ঘুরে প্যানেলের সকলেই একবার করে কিছুদিন চেয়ারম্যান থাকেন। যদিও এর মূল উদ্যোক্তা চেয়ারম্যান একজন, তিনিও আছেন অবশ্যই। আর তারই মেয়ে মেং ওয়ানজু; তিনি হুয়াওয়ের প্রধান ফাইন্যান্স অফিসার [CFO]। তিনিi গত ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার হয়ে অন্য কোথাও ল্যাটিন আমেরিকায় যাচ্ছিলেন। ভ্যাঙ্কুভার ছিল তার উড়োজাহাজ বদলানোর জায়গা বা এয়ারপোর্ট। আর এই সুযোগে কানাডা সরকার ট্রাম্প প্রশাসনের হয়ে তাকে গ্রেফতার করে ঐ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে। সেই থেকে সব ঘটনা- দুর্ঘটনার সূত্রপাত। কানাডার সাথে আমেরিকার এক্সট্রাডিশন চুক্তি আছে, যার বলে কানাডা সরকার কানাডার আদালতের অনুমতিসাপেক্ষে, কাউকে আমেরিকার হয়ে গ্রেফতার করে আমেরিকার কাছে তাঁকে হস্তান্তর করতে পারে। হুয়াওয়ের প্রধান ফাইন্যান্স অফিসার মেং ওয়ানজু তাকে গ্রেফতারের পরে কানাদার আদালতে হাজির করলে আদালত তাকে আপাতত জামিন দেয় কিন্তু কানাডাতেই থাকতে হব এই শর্তে। তাই এখন তিনি কানাডাতেই জামিনে আছেন। আর কানাডার আদালত এখনো সিদ্ধান্ত দেয়ার অপেক্ষায় বিচারাধীন যে, আমেরিকায় তাকে হস্তান্তর করা হবে কি না!

এটা পরিষ্কার, ওই দুইজন কানাডীয়কে ইচ্ছামতো উঠিয়ে আনা আর ডিটেনশন দিয়ে ফেলে রাখা- এটা চীন সরকার করেছিল পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে, মেং ওয়ানজুকে কানাডায় আটকের ৯ দিন পরই। যদিও ঐ দুজনকে গ্রেফতার কেন করা হয়েছে এর কারণ হিসাবে  একটা আবছা অস্পষ্ট [Vague] কারণ দেখিয়ে বলেছে তারা “চীনে গোয়েন্দাগিরি” করছিল। এসব পালটা ব্যবস্থা নিবার ক্ষেত্রে কোন রাষ্ট্র এমনই আবছা কারণ দেখিয়ে থাকে।
তবে এই প্রথম না হলেও দ্বিতীয় এনিয়ে রোমে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক। এই ইস্যুতে কথাবার্তা, ডায়ালগ করা খুবই ঠিক কাজ হয়েছে। সন্দেহ নাই। কারণ এটাই এমন পরিস্থিতি থেকে উভয় রাষ্ট্রের বের হওয়ার একমাত্র পথ। কিন্তু গোল বাধিয়েছে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি চীনের বিরুদ্ধে দাবি করতে গিয়েছেন যেআমেরিকা-কানাডার কাজ ও পদক্ষেপ যা কিছু নিয়েছে তা খুবই ন্যায়সম্মত ও আদর্শ – আর সেই আদর্শ হল নাকি কথিত “লিবারেল ডেমোক্র্যাসি”!  যারা নিজ অযোগ্যতাকে গর্বের বিষয় মনে করে তাদেরকে কী বলা যায়?

কানাডিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাঙ্কো-ফিলিপ, তিনি জ্ঞানবুদ্ধিতে এতই নিচা যা অকল্পনীয়!  ‘লিবারেল ডেমোক্র্যাসি’ নিয়ে এসব তথাকথিত জ্ঞানের কথা, দর্শনের সাফাই- এগুলো আসলে ছেঁদো কথা। ফুটা হয়ে যাওয়া কথা। এগুলো খুবই বিরক্তিকর, এসব তাদের বাদ দেয়া উচিত। আর এটাই বুঝি তাদের লিবারেল ডেমোক্র্যাসি?

আচ্ছা, ইরানের সাথে ব্যবসা করা যাবে না, পণ্য লেনদেন কেনাবেচা করা যাবে না, এটা কি লিবারেল ডেমোক্র্যাসি? ইরানের ওপর অবরোধ আরোপে আপনারা কারা? না এটা লিবারেল, না এটা কোনো ডেমোক্র্যাসির কিছু। এর মধ্যে তো কোনো আইনেরই কিছু নেই, ন্যায্যতা নাই। পড়ে পাওয়া সুবিধা নেয়া আছে যেটা ঘোরতর অসততা। আপনারা একটা অসততাকেও অস্ত বলে বুঝতে পারেন না! স্বীকার করতে পারেন না, এতই নিচে নেমে গেছেন আপনারা! ফলে এটার স্বপক্ষে কোন আন্তর্জাতিক আইনি সাফাই-ই নাই।  তো  কোন আইনে এই অবরোধ আরোপ করা হয়েছে? এর এখতিয়ার কে দিয়েছে? এটা তো সবাই মানে, কিংবা মানতে বাধ্য এমন কোনো আন্তর্জাতিক আইন-ই নয়? আর কানাডীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসেছেন এটাকে ‘লিবারেল ডেমোক্র্যাসি’ বলে দাবি করতে? আর এই দুস্থ রাজনীতি দিয়ে আপনি দুনিয়ার মন জয় করবেন? আপনাদের চিন্তার এতই দেউলিয়া অবস্থা?

ডলারকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ১৯৪৪ সালে আইএমএফের জন্মের সময় গ্রহণ করা হয়েছিল। কাজেই আইএমএফের সব সদস্য রাষ্ট্রই ডলারে কেনাবেচা করার এখতিয়ার রাখে। কিন্তু ডলার আমেরিকার নিজেরও রাষ্ট্রের কারেন্সি বলে এটাকে সেই সুযোগ হিসেবে নেয়া, ডলারে কেনাবেচার ওপর অবরোধ দেয়া – এটি তো পুরোপুরি অপব্যবহার! আর এই অপব্যবহার করে, এর পক্ষে সাফাই দিয়ে এটি কোন লিবারেল ডেমোক্র্যাসি কায়েম করতে এসেছেন কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী? আগামি দিনে যখন কোনদিন ডলার প্রধান আন্তরজাতিক মুদ্রার মর্যাদা হারিয়ে ফেলবে তখন আপনারা কোথায় মুখ লুকাবেন?

আমেরিকা মোবাইল ব্যবসায় প্রতিযোগিতায় হেরে গেছে যেকোনো কারণে, এটাই এক কঠিন এবং বাস্তব সত্য। এটা মেনে নিতে শিখেন, অন্তত! কিন্তু আপনারা এখন সেটাকে কাভার দিতে, লুকাতে চেয়ে আপনারা  ‘ডলার অবরোধ’ দিবেন – এটি কোন লিবারেল ডেমোক্র্যাসি? কোন মুল্যাবোধ এটা? ধিক্কার দেই আপনাদের এমন লিবারেল ডেমোক্র্যাসিকে! এটা কী কোন সুস্থ বা লিবারেল প্রতিযোগিতা? এরা তো মুক্ত ব্যবসার প্রতিযোগিতাই মানে না, দেখা যাচ্ছে!

সোজা কথাটা হল – পশ্চিমা মন রাজনৈতিক চিন্তায় দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। কাজেই আবার “লিবারেল ডেমোক্র্যাসির” গান গেয়ে – এই দেউলিয়াত্ব ঘুচবে না। এভাবে আমেরিকার পতন ঠেকানো যাবে না।  এভাবে আমেরিকা বা কানাডা সারভাইভ করবে না।  ন্যায় মানে ন্যায় এবং ন্যায্য – এখানে ফাঁকি চলে না। এজন্য এটা কোন ভিত্তি হতে পারবে না।   আমেরিকান অর্থনৈতিক দিকের পতনকে রাজনৈতিক দিকেরও পতন বানায়েন না, অন্তত! বরং ইতিবাচকভাবে নেন। নতুন করে সবাইকে দুনিয়ার সব কর্ণারকে কাভার করে নিয়ে দুনিয়ার নতুন ভিত্তি তৈরি করার কথা চিন্তা করেন। এটাই একমাত্র পথ বা সমাধান!। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নতুন ন্যায়ের ভিত্তি লাগবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা  গত  ২৯ আগষ্ট ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  ‘লিবারেল ডেমোক্র্যাসি দেউলিয়াত্ব” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s