নেহেরু থেকে প্রণব বা মোদীর জাতিসঙ্ঘ পাঠ


নেহেরু থেকে প্রণব বা মোদীর জাতিসঙ্ঘ পাঠ

গৌতম দাস

০৫ অক্টোবর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-3cY

প্রতি বছর ২৫ সেপ্টেম্বরের আগে-পরের দিনগুলোতে সাধারণত দেখা যায় সরকার প্রধানেরা নিউইয়র্কমুখী হচ্ছেন। তখন তারা জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের [UNGA, UN General assembly] সভায় যোগ দিতে ব্যস্ত দিন কাটান। সাধারণ পরিষদের সভা মানে, বছরে এই একটাই গুরুত্বপুর্ণ অনুষ্ঠান যা সব সদস্যরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্র এখন প্রায় ১৯৩ টি। এখানে সবার হাজিরা বাধ্যতামূলক না হলেও জাতিসঙ্ঘের এই জমায়েতেকে যেন এক ‘বিশ্বসভা’। মানে যা দুনিয়ার সব জনগোষ্ঠীর হাজির থাকার এক প্রতিনিধিত্বমূলক বিশ্বফোরাম বা বিশ্বদরবার ধরনের ধারণা – সেটা কোথাও ঘোষণা করা না থাকলেও, ক্রিয়াশীল থাকে বলে মনে করা যায়, এখানেই এর গুরুত্ব। এ’বছরও সেপ্টেম্বরে এর ব্যতিক্রম হয়নি। যদিও ফারাক এতটুকুই ছিল যে এবার কোন সরকারপ্রধানই কোভিডের কারণে জাতিসংঘে নিজ সশরীরে হাজির হননি, আগাম রেকর্ড করা বক্তব্য পাঠিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদীও বক্তব্য পাঠিয়েছিলেন।

জাতিসঙ্ঘ কেমন ধরনের প্রতিষ্ঠান আর কী তার ক্ষমতার এখতিয়ার ও সীমা? এটা কী পারে বা পারে না? এ নিয়ে সাধারণ্যে প্রচুর বিভ্রান্তি আছে, এমনকি সরকারপ্রধান বা অনেক দেশের একাডেমিক পর্যায়েও।

সাধারণত কোনো পাবলিক প্রতিষ্ঠান আর সাম্য ধারণাটা প্রায় হাত ধরাধরি করে চলে। এজন্য সংগঠন বা সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান মানেই তা মাস (ইংরেজি mass বা বাংলায় গণ) অর্গানেইজেশন বলে ধরে নেয়া হয়। আর কোন গণসংগঠন মানেই সেখানে সদস্যরা সবাই সমান; এমন সাম্যতাই সেখানে ভিত্তি বলে সবাই মেনে নিয়ে থাকে। তবে গণপ্রতিষ্ঠান মানেই সবাই সেখানে সমান – এটা আধুনিক কালের ধারণা। কিন্তু এটারইবা আসল মানে কী?

তা হল, যখন রাজা বা সম্রাটের শাসন বা রাজবংশের দিন ফুরিয়েছে আর এর বিপরীতে পাবলিক বা জনগণের শাসন বলে ধারণার উদ্ভব ঘটেছে। কোনো ব্যক্তি বা রাজা নয়, সব রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস পাবলিক বা জনগণ।  প্রতিটা নাগরিক তবে সম্মিলিতভাব ক্ষমতার উৎস, একথা থেকে যেখানে সবকিছুর শুরু। আর ঐ সমাজে ও সংগঠনে ‘রাজকীয় মর্যাদার’ কোন বিশেষ বলে কেউ থাকে না। বরং পাবলিকের রাষ্ট্রটাই হল সমাজের সবচেয়ে বড় বা প্রধান গণপ্রতিষ্ঠান। তাই কোন ব্যক্তি বা রাজার খামখেয়ালি না, পাবলিক আর পাবলিকের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব মাধ্যমে এখানে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। অন্তত হওয়ার কথা।
এই সূত্রে পাবলিকের রাষ্ট্র বা ‘রিপাবলিক’ [republic] কথাটা এসে গেছে সেখানে রাষ্ট্রসহ যেকোনো গণপ্রতিষ্ঠান মানেই ধর্ম নির্বিশেষে নাগরিক সবাই সমান, এমন বৈষম্যহীনতার এক সাম্য ধারণা ও নীতি বজায় থাকতে হবে।

এখন এই বিচারে তাহলে ১৯৪৫ সালে জাতিসঙ্ঘের ম্যান্ডেট লিখে যখন জন্ম হয়েছিল সেকালে এর সব সদস্য রাষ্ট্রই সমান এমন ধারণার ভিত্তিতেই একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটা যাত্রা শুরু করেছিল। যদিও ব্যতিক্রম আছে। যেমন- সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সদস্যরা সবাই সমান আর সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। কিন্তু জাতিসঙ্ঘেরই আরেকটা ফোরাম আছে নিরাপত্তা পরিষদ [UNSC, UN Security Council] যা এক অর্থে সাম্যনীতির ফোরাম নয়। তাহলে কী এটা পাবলিক প্রতিষ্ঠানের নীতি ভঙ্গ করে গড়া হয়েছে? জবাব হবে, না। ঠিক তা নয়; আর সেটা জরুরিও নয়। তাহলে? ব্যাপারটা কী, কিভাবে এটা ব্যাখ্যা করব?

আমরা এ বিষয়ে অনেক ফতোয়া পাবো, এমনকি অনেক একাডেমিক প্রতিষ্ঠানেও; যেখানে হয়ত স্টুডেন্টরা শিখছে – জাতিসঙ্ঘ ‘অগণতান্ত্রিক’ প্রতিষ্ঠান। গণতান্ত্রিক শব্দটা এখানে আনলাম অনেকে ব্যবহার করে বলে।  প্রথমত ‘গণতন্ত্র’ খুব ভালো শব্দ নয়, বরং চাতুরীর শব্দ।
পাবলিকের ক্ষমতার রাষ্ট্র বা রিপাবলিক ধারণার বিকল্প বা সমতুল্য ধারণা ‘গণতন্ত্র’ নয়। যেমন এতে অনেকে কোন একটা দেশের বেলায় হয়ত বলবে,  “সেদেশে নির্বাচন হয়, চাইকি সেটা নিশীথভোট হয়ত, অতএব গণতন্ত্র আছে” – টাইপের কথা বলে রিপাবলিক ধারণাকে অর্থ তাৎপর্যহীন করে ফেলতে পারে। তাই এখানে দুটি পয়েন্টে কথা বলব।

প্রথম পয়েন্টঃ আমরা জাতিসংঘের প্রসঙ্গে কথা বলছি মানে প্রসঙ্গটা এখানে ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রবিষয়ক; আর আমরা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে একাকার করে দেখছি। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই এক করে দেখলেও কোনো ভুল হয় না, এ কথাও সত্যি। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক ভুল হয় ও হবেই। লক্ষ্যণীয়, এছাড়াও আমরা নিরাপত্তা পরিষদ নিয়ে কথা বলছি মানে এটা একটা রাষ্ট্রের ভিতরের বা অভ্যন্তরীণ দিক নিয়ে কথা বলছি না, বলছি রাষ্ট্রের বাইরে বা ঊর্ধ্বের বিষয় নিয়ে। রাষ্ট্রের বাইরে বা ঊর্ধ্বের বিষয় মানে এখন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কথা খেয়াল রেখে তা লঙ্ঘন যাতে না হয় এভাবে কথা বলতে হবে। সোজা কথাটা হল, জাতিসঙ্ঘ বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর কোনো সমিতি বা এসোসিয়েশন এমনটা বুঝে নিয়ে,এরপর প্রশ্ন হল,  জাতিসঙ্গে বসে নেয়া সবার সিদ্ধান্ত কী কোনও একটা সদস্য রাষ্ট্রের উপর প্রয়োগ করা যাবে? কারণ তা করতে গেলে তো ঐ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হবে? এজন্য, যেকোনো রাষ্ট্রের ওপর আরেক রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রগুলোর কোনো সিদ্ধান্ত যেমন কার্যকর মনে করা যায় না, তেমন জাতিসঙ্ঘেরও। অর্থাৎ সার্বভৌম বাংলাদেশের উপর জাতিসংঘ কোন সুপার-স্টেট হতে পারে না; কিংবা আরেক বড়ভাই রাষ্ট্র বলে কিছু থাকতেই পারে না। (তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে করা যায়।) কাজেই ব্যক্তিদের নিয়ে একটা সমিতি বা ক্লাব ব্যক্তির উপর ক্লাব বা দলের সিদ্ধান্ত দিতে পারলেও এই ব্যাপারটা রাষ্ট্রের বেলায় খাটতে পারে না। রাষ্ট্রগুলোর কোনো সমিতি বা কোন জাতিসংঘ তার কোন সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করতে পারে না। রাষ্ট্রই শেষ কথা এর উপর আর কেউ কর্তা থাকতে পারে না। তাই, এখানে এসে যা ব্যক্তির বেলায় সত্য ও প্রযোজ্য মনে করা যায় তা রাষ্ট্রের বেলাতেও সত্য ও প্রযোজ্য বলে একাকার করে দেখা যাবে না, ভুল হবে।

তাহলে কী জাতিসঙ্ঘের কোন সিদ্ধান্ত সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সদস্য রাষ্ট্রের  উপর প্রযোজ্য নয় বা করা যাবে না? তাহলে হয়ে আছে কী করে? সেটা বুঝার জন্য সার্বভৌমত্ব কথাটা খেয়াল রেখে – একটা কায়দা করা হয়েছে – সেদিকে তাকাতে হবে। যেমন ধরা যাক, সব রাষ্ট্র বসে কোন নতুন আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন তৈরি করতে লাগলো। বাংলাদেশের প্রতিনিধি ধরা যাক তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দলিল প্রস্তুত শেষে ওই দলিলে স্বাক্ষর দিয়ে এলেন। এখন ঐ আইন মানতে বাংলাদেশকে বাধ্য করানো কী যাবে? কারণ সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হবে। আমাদের সংসদের বাইরের কোন আইন আমাদের কেন মানতে হবে? তাই এই জটিলতা এড়িয়ে যেতে বা এথেকে বিরত থাকতে যা করা হয় তা হল, জাতিসংঘের ঐ মিটিংয়ে পাশ হওয়া ওই আইন বা কনভেনশনটাই এবার দেশে নিয়ে এসে সরাসরি আমাদের সংসদে পেশ করা হয়। যেন আমরা আমাদের সংসদে কোনো প্রস্তাব পেশ করছি এভাবে। এইবার সেই প্রস্তাব আমাদের সংসদে পাস হওয়ার পর সেটা আর জাতিসঙ্ঘের আইন বা কনভেনশন বলে বাংলাদেশ মেনে চলছে এমন নয়। সেটা আমাদের সংসদে পাস হয়ে যায় যদি তবে তা আমাদের সংসদে গৃহীত আইন বলে মানতে কোন আর অসুবিধা নাই। এই প্রক্রিয়াটাকেই র‌্যাটিফিকেশন [ratification] বা অনুসমর্থন করে নেয়া বলে।  আর এই হল সার্বভৌমত্ব বাঁচিয়ে আর জাতিসঙ্ঘের সাথে দেশের সম্পর্ক রক্ষার সমাধান।

দ্বিতীয় পয়েন্টঃ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ১৯৩৩-১৯৪৫ সালের এ সময়ে একনাগাড়ে চারবারের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। জাতিসঙ্ঘের আইডিয়া বা ইমাজিনেশনের উদ্গাতা মূলত তিনি। এর পেছনের কারণ, তিনি হলেন সেকালের কলোনি শাসন উচ্ছেদ করে দেয়ার পক্ষের লোক। যাতে এরপর স্বাধীন হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রগুলো নিজ অর্থনীতি পরিচালনা করতে গিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে আমেরিকান পুঁজিবাজারের ঋণখাতক হতে চাইলে হতে পারে। মানে নিজ প্রয়োজনীয় ঋণের গ্রহীতা অর্থে পুঁজিবাজারের ক্রেতা হয়ে উঠে। যাতে দুনিয়ায় কলোনি দখল শাসনের চেয়ে তুলনামূলক অনেক ভাল স্বাধীন রাষ্ট্রের ব্যবসা-বাণিজ্যের এক আন্তঃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। একাজে তিনি আবার যুদ্ধের বিপক্ষের লোক। এজন্য সবাইকে নিয়ে আগে আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন তৈরি করে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্বার্থ বিরোধ মীমাংসার ব্যবস্থা হিসেবে জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ার পক্ষের লোক। কারণ তাঁর অনুমান যুদ্ধে পুঁজি-সম্পদ বিনষ্ট হয় মারাত্মক, তাই এমন বাস্তবতা থেকে তিনি সরতে চাচ্ছিলেন। [যদিও তার স্বপ্ন বা আইডিয়া আর পরবর্তিতে বাস্তবের আমেরিকা ১৯৫৩ সাল থেকেই আর এক থাকে নাই। তবে তা নিয়ে কথা আজকের প্রসঙ্গ নয়।] যদিও সেকালে তার প্রস্তাব ইউরোপের নেতারা সহজেই মেনে নিয়েছিল কারণ হিটলারের আক্রমণের মুখে  তাদের তখন  আমেরিকার অধস্তন হয়ে পড়া এবং পুরা মুখাপেক্ষি হয়ে থাকার দশা তাই। কিন্তু তখনকার  সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্তালিন তা মানতে চাননি। স্তালিনের সোজা আপত্তির দিকটা ছিল, যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য রাষ্ট্রের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয় ও  চলে এমন এক জাতিসঙ্ঘ গড়ার পর ঐ প্রতিষ্ঠান আমেরিকান কলকাঠির প্রভাবে কোন সময় সেই জাতিসঙ্ঘ তার কোন সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত যদি সংখ্যালঘু বলে সোভিয়েত ইয়নিয়নের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে তখন কী হবে?
আবার স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সোভিয়েত রাষ্ট্র ওর ঊর্ধ্বে বা বাইরের জাতিসঙ্ঘ বলে কারো সিদ্ধান্ত কেন বাধ্য হয়ে মানবে? অতএব স্তালিন তা একেবারেই মানতে নারাজ।

ভেটো ধারণার আবির্ভাবঃ
এই জটিলতা সমাধান করতেই আসে ‘ভেটো’ সিস্টেমের আইডিয়া। এর সোজা ব্যবহারিক মানে হল, সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই ভেটোওয়ালা সদস্য রাষ্ট্রের একটাও যদি আপত্তি করে, না ভোট দেয় (না-ভোটটাই ভেটো) তবে সেটা আর সিদ্ধান্ত হতে পারবে না। সেজন্য এটা আলাদা করে নিরাপত্তা পরিষদ এই ফোরাম, এখানে পাঁচ রাষ্ট্রের একটাও যদি কোন ইস্যুতে আপত্তি করে তাতে আলোচনার প্রস্তাব ভোটাভুটির আগেই বাতিল হয়ে যাবে। তবে এটা গেল ভেটো ব্যবস্থার নেগেটিভ দিক থেকে ব্যাখ্যা। এটাকে উল্টা ইতিবাচক করে বলা যায়, উপস্থিত দুনিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতাগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পাঁচটা পরাশক্তি বা বিশেষ রাষ্ট্র একমত না হলে সেটা নিয়ে এরপর আর সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত হতে পারবে না। দুনিয়ার ক্ষমতা-ভারসাম্যের জন্য সবার আগে পাঁচটা বিশেষ রাষ্ট্রের একমত হয়ে থাকা জরুরি একথাটা সবার মেনে নেওয়ার ভিত্তিতেই আসলে জাতিসংঘের জন্ম। এই আইডিয়া হাজির করেই রুজভেল্ট স্তালিনকে নিজের নৌকায় তুলতে পেরেছিলেন, জাতিসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়িত হয়েছিল।

মফস্বলি মোদীর এবারের জাতিসংঘঃ
এবারের সেপ্টেম্বরে মোদি নাকি খুবই সফল এক প্রধানমন্ত্রীর মত জাতিসঙ্ঘে বক্তৃতা রেখেছেন। অন্তত কলকাতার আনন্দবাজারের চোখে তাই। উগ্র হিন্দুজাতিবাদী অবস্থানের আনন্দবাজার এবার প্রকাশ্যেই হিন্দুত্ব জাতিবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।  ভারতের “সীমান্ত সঙ্ঘাতের” এই “মোক্ষম সময়ে” প্রধানমন্ত্রী মোদী নাকি ভারতের “নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা আরো জোরালো ভাবে তুললেন”- এভাবে লিখেছে আনন্দবাজার। মানে আনন্দবাজারের কথা শুনে মনে হচ্ছে রুজভেল্টসহ সবাই নিজের নিজের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা আরো জোরালো তুলেছিল” বলেই যেন জাতিসঙ্ঘ গড়ে উঠেছিল! মফস্বলি আর কাকে বলে! আনন্দবাজার আর, নেহেরু থেকে প্রণব মোদী এভাবে সকলেই যদি মফস্বলি হয়ে যায় তো ভারতের ভবিষ্যত কী? একটু পড়াশুনা ও তথ্য সংগ্রহ আর বুঝাবুঝি ভারতকে কে করাবে? কঠিন এক পরিস্থিতি! আনন্দবাজারসহ এসব উগ্র হিন্দুজাতিবাদের ধারণা হল যে ঐ নিজের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা এক উদগ্র হিন্দুজাতি হয়ে মোদীর মত যুদ্ধবাজ-দেশপ্রেমিক [jingoist] নেতার নেতৃত্বে জোরালো করে তোলা – এটাই হল চাবিকাঠি! যেটা একেবারেই হিটলারের জর্মানির নীলচোখের জর্মান জাতশ্রেষ্ঠত্ব চিন্তা। সে ভিত্তিতেই এবারের মোদীর বক্তৃতার স্ক্রিপ্ট [Full text of PM Modi] লিখেছেন সম্ভবত হিটলারকে গুরু মানা কোন আরএসএস নেতা!

কিন্তু জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি কী? কোন বক্তব্য? আর সেটা ভারতের কোনো রাজনীতিবিদ, কী মিডিয়া ঠিক কী বুঝেছে এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে কেবল আনন্দবাজারও বুঝেনি তাও নয়। আসলে এযুগে এখনো যারা “জাতিরাষ্ট্র চিন্তার” রাজনীতিতে আছেন কোন জাতিসংঘ বা এর চেয়েও কোন উন্নত প্রতিষ্ঠান বা দুনিয়া গড়া তাদের বুঝের বাইরেই থেকে যাবে, আমরা ধরে নিতে পারি। এছাড়াও উলটা এরা যদি হিটলারের মত আরো উগ্র-জাতি চিন্তার কেঊ হন তাহলে তো কথাই নেই। যেমন ছিল জাতিসঙ্ঘে মোদীর এই বক্তব্য। বাস্তবত জন্ম থেকেই ভারত জাতিসঙ্ঘ কী তা বুঝে উঠতে পারে নাই। অন্তত নিচের কয়েকটা পয়েন্ট থেকে তা বুঝে নেয়া যায়।

এক. জাতিসঙ্ঘের জন্ম হল সেই পথচিহ্ন-মার্ক যখন “জাতিরাষ্ট্র” [nation state] ধারণার নিকৃষ্ট পরিণতি হিসেবে হিটলারের জার্মানির উত্থান ও যুদ্ধের ধ্বংসলীলা যা সারা ইউরোপ দেখেছিল। দেখার পরে জাতিসঙ্ঘের জন্ম ততপরতার সমান্তরালে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্র এক কনভেনশন ডেকে (১৯৫০ সালে স্বাক্ষর নেয়া শুরু আর ১৯৫৩ সালে কার্যকর) জাতিরাষ্ট্রভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র ত্যাগ করে অধিকারভিত্তিক ও নাগরিক বৈষম্যহীনতার প্রতিশ্রুতিতে নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছিল। আর ভারতের কোনো রাজনীতির ধারাই বা রাজনীতিবিদ তা টেরও পায়নি। একাডেমিকরাও এর খবর এখনো পেয়েছেন এমন জানা যায় না। বরং উলটা ভারতে ‘জাতীয় স্বার্থ’ কথাটা রীতিমত দানব হয়ে উঠেছে। এই শব্দ দিয়ে আপনি প্রধানমন্ত্রী বা সম্পাদক যেকোনো ডাহা মিথ্যা বলে যেতে পারেন। কেবল জাতীয় স্বার্থের খাতিরে এটা বলছেন এই সাফাই দিলেই সব জায়েজ থাকবে। এমনকি মুসলমান বা দলিতের ওপর সব জুলুম অত্যাচার হত্যা সব করতে পারবেন। এই হলো বর্ণহিন্দুর চরম রেসিজমের একালের ভারত। হতে পারে এই ‘জাতীয়স্বার্থ’ ভঙ্গের ভয়ে একাডেমিকেরাও ভারত জাতিরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু বলতে চান না।

দুই. জাতিসঙ্ঘ জাতিরাষ্ট্র ধারণার ওপর কখনোই দাঁড়ানো নয়। এজন্য জাতিসঙ্ঘ কাশ্মিরের সমাধান করতে বলেছিল রাজার ইচ্ছা নয়, কোন কথিত জাতির ভিত্তিতেও নয়। কাশ্মির ভূখন্ডের বাসিন্দা নির্বিশেষে তাদের ভোটের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য, রায় দিয়েছিল। নেহেরু তা করেন নাই, মোদি পর্যন্তও তা কেউ করেন নাই। সারা ভারতের রাজনীতি মনে করে হিন্দুত্ব ও জাতিরাষ্ট্র ধারণার উপর ভিত্তি করেই তাদের রাজনীতি ও মহান ভারত রাষ্ট্র খাড়ায় আছ। রাম মোহন রায় থেকে শুরু করে (হিন্দুত্বের) জাতিরাষ্ট্র এখনও তাদের রাজনীতির মূলভিত্তি। তাতে কেউ হিন্দুত্বের ভিত্তি কথাটা গলা নামিয়ে বলে বা মুখে উচ্চারণ না করেও ধরে নিয়ে কথা শুরু করে। আর মোদীর মত যারা এরা সবাই গলা চড়ায় প্রকাশ্যে বলে, এই যা ফারাক। নেহেরুও তাই কাশ্মীরের রাজা খুজে বের করেছে। অথচ কাজটা সহজ ছিল কাশ্মীরের ধর্ম নির্বিশেষে সব ধরণের জনগণের কাছে এপ্রোচ করতে পারতেন, তাদের সমর্থন চাইতেন যেই রাজনীতিতে নেহেরু যেতেই পারেন নাই, বা করতেন না।
আর এছাড়া সুযোগ পেলেই অন্য বা পড়শি রাষ্ট্রকে অধস্থন কলোনিকৃতের মত রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। কলোনি করে নেয়া ছাড়াও যে দ্বিপাক্ষিক ব্যবসা বাণিজ্য করে লাভবান হওয়া যায় এটা ভারতের বুঝে দেখা হয় নাই। কলোনিচিন্তাই তার কাছে পথ থেকে গেছে। ভারতের ধারণা এটাই নিজরাষ্ট্র পরিচালনার খাসনীতি (নেপাল-ভারত চুক্তি এর খাস উদাহরণ)। অথচ এর উলটা কলোনিদখল হারাম – এই ধারণার উপর জাতিসংঘ দাঁড়ানো।

তিন. একালের জাতিসঙ্ঘে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার লোভ জেগেছে ভারতের। আর মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে তা জাগিয়েছে আমেরিকা। চীন ঠেকানোর খেপ মারতে ভারতকে নিয়োগ করার জন্য এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমেরিকা। তামাসা হলো ভারত সেটা বিশ্বাস করেছে। কারণ ভারত খবরই রাখে নাই যে আমেরিকার সেই মুরোদ এখন আর রাখে না। যা ছিল জাতিসঙ্ঘের জন্মের আগে। যা এখন আর কিছুই নাই। এখন কেউ কাউকে সদস্যপদ পাইয়ে দিতেই পারে না।
তাই আমেরিকান ঝুলানী মুলা খেয়ে বিশ্বাস করেছিল প্রণব মুখার্জি। গত ২০১০ সালে হাসিনার প্রথম ভারত সফরের যৌথ ঘোষণায় প্রণব তাই লেখিয়ে নিয়েছিল যে বাংলাদেশ ভারতে ভেটো সদস্যপদ পায় যেন তা সমর্থন করে। প্রণবের জাতিসঙ্ঘ পাঠ এমনই যে তিনি বুঝেছিলেন হাসিনার মত অনেক দেশের সমর্থন বাগানো যেন জাতিসংঘে ভারতের ভেটোসদস্যপদ হাসিলের উপায়।
ব্যাপার হল, ভেটো সদস্যপদ দেয় কে? ব্যাপারটা ভারতের আর জানাই হলো না। একালে মোদীও তাই বিশ্বাস করে বলছেন, “আর কত দিন রাষ্ট্রপুঞ্জের সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়ার বাইরে থাকবে ভারত?”। মোদী পুরাই বেকুবি আরো ধারণাটা হল, এই কথাটা জোর দিয়ে উদগ্রভাবে বললে বোধহয় কেউ শুনবে বা কাজ হবে। মোদী বক্তৃতায় এবার সেটাই করেছেন। আর আনন্দবাজার আরেক বেকুব হয়ে এটারই প্রশংসা করে ছেয়ে ফেলেছে। কিন্তু কথা হল, মোদী এটা কার কাছে চাচ্ছেন? জাতিসঙ্ঘ না আমেরিকা নাকি চীন? নাকি কারও কাছে এটা চাওয়ার জিনিষ কিনা সেটা মোদী বা তার পরামর্শকেরা নিশ্চিত হয়েছেন? উগ্র জাতিবাদীর কাছে আসলে সব কিছুই জোর দাবি করে নেওয়ার জিনিষ! এর বাইরে কোন ভাবনা তাদের কাজ করে না!

প্রথম কথা, এটা এককালের মানে জাতিসঙ্ঘের জন্মের আগের সময়ের কোন রাষ্ট্রের মুরোদের প্রশ্ন  ছিল যে কে কাকে সদস্যপদ দিতে পারে। যা সেকালে একমাত্র আমেরিকারই ছিল। এমনকি সেকালের স্টালিনেরও ছিল না। ইউরোপেরও কারোই না; তারা হিটলারের মার খেয়ে ১৯৪১ সালের আগষ্টের পর থেকে একেবারেই আমেরিকার মুখাপেক্ষি। ফলে এরা নিজের ভেটো সদস্যপদটা ঠিকঠাক মত হাসিল হয়েছে কিনা কেবল এতেই সন্তুষ্ট ছিল। যেমন পঞ্চম দেশ চীন এর মধ্যে ঢুকে নিজ ভেটো সদস্যপদ পেয়েছিল কী করে?

[যারা পড়তে কম সময় দিতে চান তারা নিচের প্যারাটাই বাদ দিয়ে পড়তে পারেন।]

চীন কিভাবে ভেটো সদস্যপদ পেয়েছিলঃ
এর জবাবটা একালে যে জানে সে-ই সেকালের পুরা ব্যাপারটা বলতে পারবে। চীন আসলে ছিল সেকালের পুরা সময়জুড়েই  জাপানের কলোনি, পুরাটা না হলেও চীনের অন্তত ২৫% এর মত ভুমি সমসময়ই জাপানের দখলে ছিল।  বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের জর্মান ইতালি ও জাপানের বিরোধী যে মিত্রশক্তিজোট গড়ে উঠেছিল আমেরিকার রুজভেল্ট তার মূলনেতা হিসাবে নিজ স্বপ্নের আগামি দুনিয়া যার হবু গ্লোবাল নেতা হবে আমেরিকা, সেই দুনিয়ায় এশিয়ান কলোনিশক্তি হিসাবে জাপানকে ধবংস করে চীনকে এশিয়ার হবু নেতা ও আমেরিকার পক্ষের দেশ হিসাবে দেখতেন তিনি। মূলত রুজভেল্টের সে স্বপ্ন-কল্পনার কারণে চীন ভেটো সদস্যপদ পেয়ে গেছিল। এমনকি এটা চীনও তা চেয়েছিল বা কল্পনা করেছিল কখনও তা জানা যায় না।
কিন্তু একটা আসল কথা এখনও এখানে বলা হয় নাই। আমাদের জেনে নিতে হবে। আমরা এতক্ষণ  যে চীনের কথা বলছি সেটা মাওয়ের চীন নয়। মাওয়ের চীন তখন উদয় হয় নাই, হয়েছিল আরও চারবছর পরে ১৯৪৯ সালে। তাই এতক্ষণ চীন বলতে বুঝিয়েছি – চীনা ন্যাশনালিষ্ট রাজনীতির নেতা চিয়াং কাইসেকের চীনের কথা। কিন্তু রুজভেল্ট ও কাইসেকের কপাল পোড়া দুঃখটা হল, ১৯৪৫ সালে কলোনিশক্তি জাপানের পতন হলে এর মাত্র চারবছর পরেই ১৯৪৯ সালে মাওয়ের বিপ্লব চীনে ক্ষমতা দখল করেছিল। আর চিয়াং কাইসেক পালিয়ে সেকালেও চীনেরই ভুখন্ড কিন্তু আলাদা দ্বীপ তাইওয়ানে, আশ্রয় নিয়েছিল। এরপর একদিকে মাওয়ের বিল্পবীদের লংমার্চের ক্লান্তি অন্যদিকে সেকালের হবু বিশ্বশক্তির দুই নেতা স্তালিন ও প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান (১৯৪৫ সালে রুজভেল্টের স্বাভাবিক মৃত্যু হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট এই ট্রুম্যান প্রেসিডেন্ট হন) এদের চাপাচাপিতে “যুদ্ধের বদলে শান্তির” কথায় মাও আর ফিরে তাইওয়ান দখলে যান নাই, পরে দেখবেন বলে ছেড়ে দেন। এতে পরবর্তিতে চিয়াং কাইসেক তাইওয়ানেই ঘাটি গেড়ে বসে যায়। যেটা এখনও আছে। এটা পরে আরও পোক্ত হয়ে যায় আমেরিকার কারণে। কারণ মাওয়ের চীনই আগের জাতিসংঘে রেজিষ্টার করা ভেটো সদস্যপদের চীন হিসাবে নিজের প্রতিনিধিত্ব চাইলে আমেরিকা এতে সমর্থন দিতে এবার গড়িমসি শুরু করেছিল। স্তালিনও কিছুই করতে পারে নাই। মাওয়ের চীন নিচু স্বরে মনে করে স্তালিন চায় নাই তাই হয় নাই। তবে সেসময় মাও চাইলে হয়ত আলাদা নতুন চীন হিসাবে সদস্যপদ পেতে পারত কিন্তু সেক্ষেত্রে আগের ভেটো সদস্যপদ চিরদিনের মত হাতছাড়া হয়ে তাইওয়ানে হাতে থেকে যেত। তাই মাওয়ের  চীন এরপর জাতিসংঘের সদস্যপদ নাই এভাবে এমন চীন হয়েও রয়ে গেছিল। কিন্তু কতদিন?
একনাগাড়ে (১৯৪৯-১৯৭১) এই সময়টা। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর অর্থাৎ যখন আমরা উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে আশ্রিত, খাওয়া না খাওয়া হয়ে আছি আর নির্যাতন, হত্যায় নিত্যসঙ্গি হয়ে দিন যাচ্ছে; ১৯৭১ মার্চের পরের সেই ঐবছরেরই সেপ্টেম্বরের  জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ঘটেছিল প্রকাশ্যে অনেক কিছু। সেখানে এক প্রস্তাবে উপর ভোটের সময় সংখ্যাগরিষ্টতার ভোটে “এতদিনের তাইওয়ানের ভোগ করা ভেটো সদস্যপদ” এর আসল হকদার মাওয়ের চীন বলে ঐ সিদ্ধান্ত প্রস্তাব পাশ হয়ে যায়। আর এর চেয়েও বড় কথা এটা সম্ভব হয়েছিল কারণ ঐ ভোটাভুটির সময়ে আমেরিকা ছিল আধারাজি কিন্তু আবার বাধাও দেয় নাই, এমন অবস্থান নিয়েছিল সেকারণে। কেন? এর পিছনের লম্বা কারণ হল, এটাই ছিল বিগত ১৯৬৮ সাল থেকে চলে আসা গোপনে চীন-আমেরিকান আলোচনা-বুঝাবুঝি-আলাপের প্রথম প্রকাশ। যেটা সেসময়ে ঘটেছিল পুর্ব পাকিস্তানের স্বার্থের বিনিময়ে, আয়ুব-ইয়াহিয়ার শাসন কাল জুড়ে তাদের মধ্যস্ততায়। আর সাথে আরও সবচেয়ে নির্ধারক ঘটনাটা ছিল – ১৯৭১ সালের এপ্রিলে কিসিঞ্জার পাকিস্তান সফরে যাচ্ছেন একথা বলে মাঝের দুদিন গোপনে কিসিঞ্জার সেই প্রথম মাওয়ের চীন সফর করেছিলেন। সেসময়েরই একমত হওয়া ডিলের প্রথম সাক্ষাত আলাপ ও আতাঁত ছিল সেটা। মূলত মাওয়ের চীন আমেরিকান পুঁজি ও ব্যবসা বাণিজ্য চীনে প্রবেশ করতে দিবে যদি নিক্সনের আমেরিকা বিনিময়ে  চীন নামের ভেটো সদস্যপদ তাইওয়ানের বদলে এটা তখন মাওয়ের চীনের হাতে এনে দিবে তাতে রাজি হয়। এই ছিল ডিল। এভাবেই মাওয়ের চীন জাতিসংঘের ভেটো সদস্যপদ লাভ করেছিল। আর মাঝের সময়ে লম্বা আলোচনা ও বুঝাবুঝি করে নেওয়ার পর ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকা পরস্পরকে স্বীকৃতি দিয়ে উভয় দেশে এমবেসি খুলে গভীর বাণিজ্য সম্পর্ক শুরু করেছিল।

গ্লোবাল নেতা হিসাবে আমেরিকা আর কাউকে এখন ভেটো সদস্যপদ পাইয়ে দিবার বা এমন কোন নেতাগিরি মাতব্বরি করারই মুরোদ রাখে না; সব এখন প্রায় শুকিয়ে আসছে। এটা বুঝা কী খুব কঠিন? দ্বিতীয়ত আগামিতেও  জাতিসংঘের কোন সংস্কার হওয়া অথবা এমনকি ভেটো সদস্যের পাঁচ দেশের তালিকাও বদলাবে না,  যতক্ষণ না নতুন গ্লোবাল নেতা কেউ এসে বসছে। সেটা এখনই বলে দেয়া যায়। কারণ, এটা হবে সেই হবু নেতার নতুন করে জেগে উঠা প্রভাব ইচ্ছা বা এখতিয়ার। অন্যভাবে বলা যায়, তার সাথে অন্যরাষ্ট্রের সম্পর্কের মাত্রার ওপর নির্ভর করবে আর কোন রাষ্ট্র নতুন করে জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা পাবে, নাকি কেউই পাবে না অথবা বাদ যাবে। এখন যদি হবু সে নেতা চীন হয়, তবে তাই! সমস্যা হচ্ছে জাতিসংঘের উত্থানের সময়ের ঘটনাবলী নিয়ে আপনার স্টাডি বা পরিস্কার বুঝাবুঝি না থাকলে আপনি মফস্বলি চিন্তাই তো করবেন, আমেরিকার টাউটারি মিথ্যা আশ্বাসই আপনার  কাছে সত্যি মনে হবে। আর এই বেপুথে যেতে আপনাকে আরও টানবে আপনার জাতিরাষ্ট্র চিন্তা। অথচ ১৯৪৫ সালের পর থেকে এই কলোনিচিন্তাটাই, এই জাতিরাষ্ট্র চিন্তা যে  মৃত সে খগবর আপনি রাখেন নাই।

আজকের ভারত মানে এই হিটলার-অনুসারি হিন্দুত্ববাদী ভারত, একে  চীন আগামিতে নতুন নেতা হলে  কেন একে ভেটো সদস্যপদ দিতে যাবে, না অন্য কেউ দিবে? আর এমন সদস্যপদ পাওয়ার প্রাথমিক যোগ্য হবার জন্য তবু অন্তত কিছু রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও কমিটমেন্ট তো ভারতের লাগবে! কেবল হিন্দুত্বের জন্য যে ভারত নিজ দেশের অন্যান্য অ-হিন্দু সকল নাগরিকের প্রতি চরম বৈষম্য করে, কোন সাম্য আচরণের কথা চিন্তাও করতে পারে না সেই ভারতকে কে এবং কেন ভেটো সদস্যপদে টেনে তুলবে?

আবার মোদীর ধারণা দেখেন, তিনি বক্তৃতায় বলেছেন, ‘জাতিসঙ্ঘ এবং ভারতের মূল আদর্শ নাকি এক।’ ‘বসুধৈব কুটুম্বকম (গোটা বিশ্বই আত্মীয়) এই মন্ত্র রাষ্ট্রপুঞ্জের সভায় বার বার’ নাকি জাতিসঙ্ঘে উচ্চারিত হয়ে থাকে। অথচ মোদীর ভারত হল এমন, যে হিন্দু নয় বা যার হিন্দুত্ব নাই এমন কাউকে সে সহ্য করতে পারে না। সেই মোদী এমন ফাঁপা আওয়াজ দিচ্ছে!
দেখা যাচ্ছে এটাই এখনও ভারতের জাতিসঙ্ঘ রিডিং!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত  ০৩ অক্টোবর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “মোদি-প্রণবের জাতিসঙ্ঘ পাঠ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s