গ্লোবাল ও লোকাল প্রেক্ষিতে বাইডেন পাঠ


গ্লোবাল ও লোকাল প্রেক্ষিতে বাইডেন পাঠ

গৌতম দাস

১৬ নভেম্বর ২০২০, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-3gc

US  President-elect Joe Biden

গত কমপক্ষে সত্তর বছর ধরে রাজত্ব করা গ্লোবাল নেতা আমেরিকা শেষকালে এসে ট্রাম্পের হাতে পড়ে এক ঝটকায় সেটা  লোকাল-আমেরিকায় পরিণত হয়ে গেছিল। লোকাল মানে গ্লোবাল নেতার মফস্বলি হয়ে যাওয়া। যে মফস্বলি বলতে এখানে জাতিবাদি আমেরিকা বা ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ যেটা, সেটাই বুঝানো হয়েছে। অথচ যে আমেরিকা দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশনের দিকে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে গেল, সেই নেতা – সেই আমেরিকা কি করে “সংকীর্ণ ও আমি আগে” এই মফস্বলি অবস্থান নেয়? আবারীখন বাইডেন জিতেছে বলে, আমেরিকার আগের গ্লোবাল নেতা হয়ে থাকা অবস্থানে ফিরে যাওয়া সেটা কী আদৌ সম্ভব? সম্ভবত একেবারেই না। এছাড়া আমেরিকা যখন নেতা ছিল সে তো তখন আত্মভোলা  নিজের স্বার্থ-অবস্থান ভুলে থাকা কোন আমেরিকা ছীল না। বা কোন খেপা মাজারের পাগল ধরণের কেউ তো ছিল না। তাহলে জাতিবাদী, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ – এটাও কী ট্রাম্প আসলে আমেরিকাকে নিতে পেরেছিল?  আসলে আমেরিকার নেতৃত্বে যেখানে আশির দশক থেকে শুরু হয়ে যাওয়া গ্লোবালাইজেশন – বিশেষত গ্লোবাল পণ্য বিনিময় বাণিজ্য সেটা দুনিয়ায় চালু হয়ে গেলে তা থেকে ফিরে গিয়ে খোদ আমেরিকাই আবার জাতিবাদী হবে এটাই তো সম্ভবই না। তাহলে আমেরিকার জন্য গত চারবছরের ট্রাম্প কে ছিল?

ডোনাল্ড ট্রাম্প ছিল একটা মশকরার নাম, একটা তামাসা। অনেক সময় কিছু কঠিন সত্যিকথা থাকে যা সরাসরি তা প্রকাশ করা যায় না, উচ্চারণও করতে চায় না অনেকে। যদিও সেটা ঘটে গিয়েছে। সেকথাটা হল, আমেরিকা  – গ্লোবাল নেতৃত্ব হারিয়েছে।  এই তিন শব্দের ছোট বাক্যটা আমেরিকার জন্য উচ্চারণ কঠিন বলে যেন একথাটাই আরেকভাবে ঘুরিয়ে বলা হয়েছিল যে জাতিবাদী  ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এর একজন ট্রাম্পের উত্থান ঘটেছে। একারণে ট্রাম্পের আরেক নাম “পাবলিক ন্যুইসেন্স” (Public nuisance)! ন্যুইসেন্স মানে কী?  মানে হল, আপনি যদি একবার নিজের পোষাক খুলে ফেলতে পারেন, শহরের প্রধান রাস্তায় ন্যাংটা হয়ে হাটতে পারেন তবে এরপর এর কোন দায় আর আপনার না। বরং তাঁদের সব দায় যারা আপনাকে ন্যাংটা দেখছে। আপনার পোষাক খুলে ফেলার মানে অন্য সব মানুষকে এবার  চোখেমুখে পোষাক এঁটে, ঢেকে চলাচল শুরু করতে বাধ্য করা। এটাই নিজের একার দায়দায়িত্ব অন্য সবার ঘাড়ে চড়িয়ে দেয়া! এটাই বেস্ট ন্যুইসেন্স! আমেরিকায় এই ন্যুইসেন্সের নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প;  তাঁর উত্থান ও চার বছরের শাসন। আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব হারিয়ে যাওয়া সরাসরি সে স্বীকার করতে পারেনি বা চায়নি বলে, আমেরিকা যেন ট্রাম্পের ন্যুইসেন্স দেখিয়ে সেটাই প্রকাশ করেছিল। সারা ইউরোপ  ট্রাম্পের আমেরিকার এই জাতিবাদ একেবারেই পছন্দ করে নাই। আর এখন বাইডেনের চ্যালেঞ্জ হল, সেই আস্থাহারানো ইউরোপকে আবার আস্থায় ফিরিয়ে আনা, যেটা প্রায় অসম্ভব। যেমন একজন বলছে, বাইডেন পুর্বাবস্থায় ফিরে যাবার প্রতিশ্রুতি দিলেও “US could swing back to Trump-ism, so they’re wary” – আমেরিকা যে আবার কোনদিন ট্রাম্পএর জাতিবাদে ফিরে যাবে না এর নিশ্চয়তা কী?

এছাড়াও ইউরোপে ১৯৪৫ সালের পর থেকে আমেরিকান সেনা গ্যারিসন রেখে এসেছে এপর্যন্ত নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য। কিন্তু ট্রাম্পের আমেরিকা ২০১৮ সালে এসে হঠাত করে এজন্য ৪০০% হায়ার চার্জ চেয়েছিল ইউরোপের কাছে। সেটা কী আমেরিকা আবার চাইবে না? নিশ্চয়তা কী?

“German Chancellor Angela Merkel also warned in 2018 that the European Union could no longer depend on the US, while core Asian allies, such as South Korea and Japan, suddenly found themselves faced with demands for up to 400% higher payments for the presence of US troops.”

তাহলে এখন প্রশ্ন উঠবে, এখন আবার জোসেফ বা জো বাইডেন – তিনি কে? আগে ট্রাম্প-জোকার জাতিবাদী আমেরিকা  হয়ে তা  প্রকাশ করেছিল এবার বাইডেন এবার প্রকাশ্যে সরাসরি স্বীকার করে নিবেন যে আমেরিকা আর গ্লোবাল নেতা নাই। বড় জোর এটাই হবে।

বাইডেনের আমেরিকাই যতটুকু যা শেষ নেতাগিরিঃ
প্রভাবশালী সিএনএন একটা আর্টিকেল ছেপেছে যার শিরোনামঃ “সমমনা জোটবন্ধুদের আস্থা ফিরে অর্জন করা হবে বাইডেনের বিদেশনীতির কঠিনতম চ্যালেঞ্জ“(Biden’s toughest foreign policy challenge may be regaining allies’ trust)। তিন স্টাফ লেখকের এক যৌথ রিপোর্ট এটা। লেখায় বলতে চাওয়া হয়েছে, ট্রাম্প গত চার বছরে ইউরোপকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে আমেরিকা আর গ্লোবাল নেতা নয়। ইউরোপের দায় এবং ওর ভালমন্দ চিন্তা আর ট্রাম্পের নয়। ট্রাম্প হল – আপনি বাঁচলে বাপের নাম – এমন এক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট। কাজেই সেই আমেরিকাকে এবার বাইডেন আবার তুলে এনে আগের জায়গায় কতটুকু বসাতে পারবে, নেতৃত্ব ফিরে আসবে কী করে? এছাড়া বাইডেনও আবার ট্রাম্পের মত ফেলে পালাবে না তো? এই আস্থা অর্জন বাইডেনের প্রধান চ্যলেঞ্জ। কিন্তু লেখাটা আসল যে কথাটা দেখতেই পারে নাই তা হল, এখন এটা একেবারেই এক ফ্যাক্টস হল, আমেরিকা আর আর নেতৃত্বে ফিরে আসবে না। পারবেই না।

সারকথায়, আসলে ট্রাম্প আর বাইডেন একই ঘটনার দুইটা প্রকাশ। দুজনই বলছে,  আমেরিকা আর নেতা নয়। তবে ট্রাম্প কথাটা বলছে আমেরিকার সেসব লোকের হয়ে যেন যেমন, এক পরিবারের পিতা জীবনের শেষ বয়সে এসে বলছে আমি কেবল আমার জন্য ভাত রাধব, সবার ভাত যোগাড় করতে পারব না বলে, এভাবে। অন্যদিকে বাইডেন হচ্ছে সেই আশ্বাসবাদী যে ভাবধরতে চায় আমরা এখনও নেতা আছি; অথচ এটা সত্যি না। তবু এমন বলে সবাইকে আশ্বাস সে দিচ্ছে বটে কিন্তু কেউ তারকথায় আস্থা রাখছে না, রাখবে না।

ট্রাম্পের ন্যুইসেন্স তৈরির ক্ষমতা আরো দুমাস আছেঃ
এমাসের গত ৭ নভেম্বরের দিকে প্রথম জানা গেছিল যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল হিসাবে জো বাইডেন অন্তত ২৭৯ [এখন সর্বশেষ গণনা অনুসারে এটা ৩০৬] ইলেক্টোরাল কলেজের আসন পেয়ে বিজয়ী হতে যাচ্ছেন । কিন্তু তা সত্ত্বেও নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে বিতর্ক, আপত্তি বা মামলার নিষ্পত্তি এখনো খতম হয়নি। তবে ধীরে ধীরে প্রতিটি মামলা বা ঘটনায় ট্রাম্প-ক্যাম্পের তোলা আপত্তি বা অভিযোগের কোনো “প্রমাণ পাওয়া যায়নি” বলেই তা খারিজ হয়ে ক্রমে অনেক কিছুর নিষ্পত্তি হয়ে চলেছে [US election security officials reject Trump’s fraud claims]। তবু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল প্রসঙ্গে আমেরিকার আকাশের কালো মেঘ ও অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। এর পেছনের প্রধান কারণ সম্ভবত, খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু ঘোষণা ও পাল্টা পদক্ষেপ। যেমন- তিনি নিজেই হুমকি দিয়েছেন যে- ‘তিনিই এই নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন অথচ তাদেরকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তারা হেরেছেন বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে”। এটা তিনি মানেন না।  এতে এবার সংশ্লিষ্ট কিছু পদক্ষেপ বিপদজনক হয়ে উঠছে বলে মনে করা হচ্ছে। যেমন, জেনারেল সার্ভিস এডমিনিস্টেশন (জিএসএ) বলে হোয়াইট হাউজের একটা সেকশন আছে। এই অফিস নতুন প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর শপথ ইত্যাদির প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো করে থাকে। ট্রাম্পের বিশেষ নির্দেশে এই অফিস নড়াচড়াহীন বসে আছে। বিবিসি লিখছে এই অকার্যকারিতা আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকির ইস্যু হয়ে উঠতে পারে [could access “pressing national security issues”.]।
কিন্তু ট্রাম্প-ক্যাম্প অনড়। তারা মূলত নানান ইস্যুতে  প্রমাণসহ অভিযোগ তুলে ধরতে আগ্রহী হওয়ার চেয়ে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা ছড়ানোর চেষ্টা করছে অনেক বেশি। ট্রাম্প স্টেট ডিপার্টমেন্টের পম্পেইকে দিয়ে ঘোষণা করিয়েছেন যে, আগামী ২০ জানুয়ারির (দেশের নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ নেয়ার দিন) পরে ট্রাম্পের সরকার কার্যক্রম অব্যহতভাবে চালু রাখবে। তাই নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অজানা আশঙ্কা যা আগে কখনো আমেরিকা দেখেনি তা এখন থেকেই তাদের সমাজে ছেয়ে বসে আছে। যদিও সেটা বাড়ছে, ঠিক এমনটাও বলা যাবে না।
বরং ছোট ছোট পদক্ষেপে ক্রমে অভিযোগগুলো আদালতে বা নির্বাচনী কর্তাদের হাতে প্রত্যাখ্যান বা নাকচ হয়ে যাচ্ছে। ১৪ নভেম্বরের শুরুতে, ভোর রাতের হিসাবে কয়েক ঘণ্টা আগে প্রকাশিত কয়েকটা খবরের শিরোনাম এ রকম- ১. পেনসিলভানিয়ার নির্বাচনী কর্তারা নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে আদালতে ট্রাম্পের মামলার ফেডারেল বিচারককে জানিয়েছেন, তিনি মামলা বাতিল ঘোষণা করে দিতে পারেন এখন – রয়টার্সের প্রকাশিত রিপোর্ট। ২.আমেরিকার নিবার্চনী কর্তারা ট্রাম্পের কারচুপির অভিযোগ বা দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন- বিবিসি ইংরেজির রিপোর্ট। তারা আরো বলেছেন, ‘এবারের ভোট ব্যবস্থায় কোনো ভোট বাতিল হয়েছে বা হারিয়ে গেছে, পরিবর্তন করা হয়েছে অথবা কোনো ধরনের কালোদাগ লেগেছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’ বরং আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ‘ভালো নির্বাচনগুলোর অন্যতম এবারের ভোট”। ৩. বাইডেন এরিজোনার আসনগুলোও পেয়ে নিজের ইলেক্টোরাল কলেজ আসন ২৯০ তে নিয়ে আরো পোক্ত হতে যাচ্ছেন- রয়টার্সের প্রকাশিত রিপোর্ট। ৪. এটা বিবিসি বাংলার ফ্যাক্ট চেক টিমের গবেষণা; মানে, তাদের ভাষায় ‘বিবিসির রিয়েলিটি চেক টিম’-এর ১০ নভেম্বরের রিপোর্ট। তারা বলছেন, “কোনো তথ্যপ্রমাণ না দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বক্তৃতা-বিবৃতিতে বেশ কয়েকটি পোস্টের কথা উল্লেখ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রচারণা শিবির”।
এভাবেই ট্রাম্পের অভিযোগের পাটাতন ক্রমে নিজ পায়ের নিচের মাটি হারিয়ে চলেছে। তবু সব অভিযোগ শেষ হয়েছে এমন নয়। এর প্রধান কারণ, আমেরিকার নির্বাচনী ব্যবস্থায় আমাদের মতো কোন কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল নির্বাচনী অফিস বলে কিছু নেই। ভোট নেয়া, তদারকি ও ফলাফল ঘোষণা প্রত্যেকটা রাজ্যের দায়িত্ব এবং তা তাদেরই নিজ নিজ আইনে পরিচালিত হতে হয়; যাতে আবার রাজ্যে রাজ্যে কিছু আইনগত ভিন্নতাও আছে। তাই এখন ট্রাম্পের অভিযোগগুলো নিষ্পন্ন হচ্ছে, প্রতিটি রাজ্যে এবং মূলত নির্বাচন অফিস ও আদালতে। তবু একটা ধারণা হিসেবে বলা যায়, এগুলো নিষ্পত্তি করতে আগামী ২৩ নভেম্বরের মধ্যে রাজ্যের নির্বাচনী কর্মকর্তারা ফলাফল ঘোষণার কাগজে স্বাক্ষর করা শেষ করতে পারেন। তখন এই ফলাফল ‘অফিসিয়ালি ঘোষিত ফলাফল’ বলে বিবেচিত হবে।
আর তখন ট্রাম্পের অফিস ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করতে বাধ্য হয়ে যাবে। তা না করলে আদালত ট্রাম্পের অফিসকে অকার্যকারিতার জন্য অভিযুক্ত করতে পারবেন এবং পাল্টা করণীয় নির্দেশ জারি করতে পারেন। অর্থাৎ ক্রমে ট্রাম্পের জন্য, ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করার বাধ্যবাধকতা কঠিন ও শক্ত হয়ে আসছে।
এভাবে অনুমান করা যায়, ট্রাম্প যতই হুমকি দেন তবু, ২০ জানুয়ারির আগেই ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু ও সম্পন্ন করতে ট্রাম্প বাধ্য হবেন। আর সবার উপরে আমেরিকার মানুষ স্থিতিশীলতা চায়, দেশে একটা ফাংশনাল সিস্টেম দেখতে চায়; মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো হতাশাগ্রস্ত জীবনের কোনো দেউলিয়া ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট হয়ে বলবেন, ‘আমি ক্ষমতা হস্তান্তর করব না’-এই দায়দায়িত্বহীন বাক্য কিংবা বিশৃঙ্খলা মানুষ দেখতে চায় না। জীবন ইতিবাচক এবং জীবন এমন আশা-ভরসা নিয়েই চলে। তাই আমরা বরং এখন জো বাইডেনের বিজয়ে ও হবু বাইডেন প্রশাসনের চলার পথের নীতি-পলিসি কী হতে যাচ্ছে আলোচনা সেদিকে নিচ্ছি।

বাইডেন প্রশাসন সম্ভাব্য অবস্থান-বৈশিষ্ট কেমনঃ
প্রথমত এ্তদিন ট্রাম্প গত চার বছরে যত ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন, এর উল্টা যাত্রায় বাইডেন এখন যতটা সম্ভব আগের ওবামা আমলের অভিমুখী হবেন। সাধারণভাবে যা “ডেমোক্র্যাট আইডিয়াল অবস্থান” মনে করা হয় তেমন অভিমুখে যাবে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটা আরো প্রো-পাবলিক হতে চেষ্টা করবে, সাধারণ জনমত ঠিক যা আশা করে। যেমন- পরিবেশ ইস্যুতে ‘প্যারিস চুক্তিতে’ ফেরত যাওয়া আর হিউম্যান রাইটস ইস্যুতে অনেক কড়া অবস্থান নিয়ে আসছেন বাইডেন।
তবে সব কিছুর উপরে যা প্রধান দ্বন্দ্ব, যার নিরসন হবে বাইডেনের মুখ্য ইস্যু – যা অনেকটা পরস্পর সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো চাকার মধ্যে প্রথম যে চাকাটা ঘুরে বাকি সব চাকাকে ঘুরতে বাধ্য করে, এমন সেই ‘প্রাইম মুভার’ ইস্যু হবে চীনের সাথে ‘বাণিজ্য ইস্যু’ নিয়ে আলোচনা (যাকে গত চার বছর বাণিজ্যযুদ্ধ বলে ডাকা হয়েছে) তা শুরু করা। সেকারণে, আগামি ২০ জানুয়ারি বাইডেনের শপথ নেয়ার পরেই এক নম্বর প্রায়রিটি হবে এই ইস্যু।

যদিও ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের আমলেই তা তিন পর্বে মিটিয়ে ফেলার একটা পরিকল্পনা ছিল যার প্রথম পর্ব ট্রাম্পই আলোচনা ও ঐকমত্য শেষে স্বাক্ষরও সমাপ্ত করেছিলেন। কিন্তু আর অগ্রগতিতে না গিয়ে সব স্তব্ধ করে রেখে দিয়েছিলেন। সেসবই এবার ফাংশনাল হতে শুরু করবে। এটাই হবে বাইডেনের ‘প্রাইম মুভার’ ঘটনা। এ জন্য যে, ট্রাম্প বাণিজ্য আলোচনাকে বাণিজ্যযুদ্ধের জায়গায় নেয়াতেই আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব যা গত ৭৫ বছর ধরে রাজত্ব করার শেষে এর পালাবদলটা মসৃণ হওয়ার বদলে তা যুদ্ধপরিস্থিতির দিকে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ঠেলে দেয়ার দিকে নিচ্ছিলেন ট্রাম্প। আর এটাই এখন অভিমুখ বদলাবে, যেটা দুনিয়াজুড়ে সবার আশা। এই অর্থে, বাইডেনের বিজয়ের প্রাথমিক খবর মানুষকে এক সম্ভাব্য গ্লোবাল যুদ্ধপরিস্থিতি এড়াতে এক মুক্তির সূচনা করল মনে করেছে। এক সম্ভাব্য গ্লোবালযুদ্ধ এড়াতে পারা অর্থে এটা এক নাজাত।

তাহলে এখন কী হতে পারে?
খুব সম্ভবত বাণিজ্য আলোচনায় আসলে যা হবে চীনের দিক থেকে দেখলে তাকে বলা যায়- এটা হবে, যত বেশি সম্ভব আমেরিকাকে বাজার ছাড় দিয়ে এর বিনিময়ে চীন নিজের গ্লোবাল নেতৃত্ব নেয়া- এই হস্তান্তর মসৃণ ও বাধাহীন করার নিশ্চয়তা ‘কিনে নেয়া’। বাণিজ্য আলোচনায় এই দেয়া-নেয়াই সম্পন্ন হতে পারে। যদিও  এটা আবার দুইভাবে ঘটতে পারে। এক, মুখে স্বীকার করে নিয়ে শুরু করা যে, আমরা পরস্পর এটাই বিনিময় করছি। অথবা তা হতে পারে মুখে স্বীকার না করে দুইপক্ষই মনে মনে এটা ধরে নিয়ে। তবে মুখে স্বীকার না করে নেয়ার কৌশলগত সুবিধা বেশি।
এভাবে বাণিজ্য আলোচনা-নেগোসিয়েশনের আগের পথেই দ্বিতীয় পর্ব একটা চুক্তিতে পৌঁছালেই এরপর জো বাইডেন-শি জিনপিংয়ের যৌথ সামিট অনুষ্ঠিত হতে পারবে ও হবে। আর দুইপক্ষের উপরই দ্রুত এমনটা করার জন্য গ্লোবাল অর্থনীতি ও বাজারের চাপ থাকবে প্রচন্ড। কারণ করোনাকালে দ্বিতীয়বারের আক্রমণের ধাক্কাও আসন্ন। ফলে নিরন্তর মন্দা বাজারে মধ্যে ইতিবাচক মেসেজ পেতে সবাই আগ্রহী যাতে বাজার চাবুক খেয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এতে গ্লোবাল বাজার ও ক্ষমতার করিডোরে কী মেসেজ যাবে?
সামগ্রিকভাবে মূল মেসেজটা হবে ইন্দো-প্যাসিফিক এবং কোয়াড [QUAD] উদ্যোগ ও স্ট্র্যাটেজিকে কেন্দ্র করে। ট্রাম্প মূলত মরিয়া হয়ে এদুটাকে একই সাথে সামরিক জোট ও বাণিজ্য জোট হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়ে চলেছিলেন। ট্রাম্প জানতেন এটা ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের পরে অকেজো দিশেহারা স্থবির হয়ে যাবে, কারণ নির্বাচনে পরাজিত হয়ে গেলে তো এমনই দশা হওয়ার কথা।
চীনের সাথে বাণিজ্য আলোচনায় একবার প্রথমপর্বের আলোচনার শেষে  ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে এবং প্রকাশ্যে প্রেসের সামনে বলেছিলেন, চীন বাকি নেগোসিয়েশন আর করল না, আগালোও না – বাইডেনের ভরসায়। মানে নিজ ক্ষমতাসীন থাকার দু’বছরের মধ্যেই সে সময় ট্রাম্প বুঝাতে চেয়েছিলেন আগামীতে রিপাবলিকান প্রার্থী বাইডেন জিতে আসবে, এই ভরসায় আছে চীন। আর তারা তখন বেটার সুবিধা পাবে ও নিবে (ট্রাম্পের কাছে পাচ্ছে না) চিন্তা করে এখন ট্রাম্পের সাথে কম্প্রোমাইজ ডিলে যাচ্ছে না। তাই তিনি ওখানে ঘোষণা করেন, আগামীতে বাইডেনের ক্ষমতাসীন হওয়া বন্ধ করতে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন। তাই ধীরে ধীরে চীনবিরোধী জোট গড়া – আর সেটা খাঁড়া করা খুবই কঠিন হলেও তিনি ইন্দো-প্যাসিফিক ও কোয়াড গড়ে এটাতে সামরিক জোট ও বাণিজ্য জোট এ দুই লক্ষ্য জুড়ে দিয়েছিলেন।
আর এখন ঠিক এ জায়গাটাতেই বাইডেন বদল ঘটাবেন। কৌশলগতভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক ও কোয়াড উদ্যোগ ভেঙে না দিয়ে বরং এখন এটা কেবল বাণিজ্যের জোট এমন ধারণা সেট করে দেবেন। অর্থাৎ চীনের সাথে বাইডেন কী দেয়া-নেয়া করতে যাচ্ছেন বা করে ফেলবেন এর ছাপ-ইঙ্গিত তিনি এভাবে প্রকাশ করবেন।
স্বভাবতই, আড়াই লাখ আমেরিকানের কোভিড-১৯-এ মৃত্যু আর প্রায় ৯ কোটি বেকারের আমেরিকায় বাইডেনের চীনা ডিল বা সম্ভাব্য এই ‘দেয়া-নেয়া’ – এটা একটা ইতিবাচক আবহাওয়া তৈরি করবে। যেকোনো অর্থনীতিই বেকারত্ব ও মহামারী থেকে বের হয়ে আসতে চায়। কারণ ‘উহান ভাইরাস’ বলে ট্রাম্পের নিজের সব শোচনীয় ম্যানেজমেন্ট ব্যর্থতা চীনের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া নির্বাচন পার হওয়ার জন্য হয়তো চলে। কিন্তু বাস্তবতা খুব কঠিন। তাই, না আমেরিকান অর্থনীতি না বেকার মানুষ এসব কথাকে এতদিন ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে। অতএব, যদি এভাবেই আগানো হয় তবে বাইডেন-শি জিনপিংয়ের সামিট তখন আমেরিকায় এক শীতল-পরশের মতো ভূমিকা নিয়ে হাজির হবে বলে অনুমান করা যায়।

তাহলে ভারত তখন কোথায় যাবে?
সীমান্তে চীন ভারতের সব দখল করে ১৯৫৯ সালের পুরনো সীমান্তকে ভিত্তি করে বসে পড়াতে ভারতের ইন্টেলিজেন্সিয়া বিশেষত মিডিয়া ফোরফ্রন্টে যারা আছেন তারা বুঝে গেছেন, মোদি তাদের সবাইকে বেইজ্জতি করে ফেলেছেন। কিন্তু তবু তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত ইজ্জত ও নিরাপত্তা হারানোর অসহায়ত্ব একালে ফুটে উঠেছে। তারা পরিষ্কার জানেন, কেন চীন ১৯৫৯ সালের পুরনো সীমান্তকে ভিত্তি মেনে ভারতের সব কেড়ে নিয়েছে। কেন ‘এলএসি’ [LAC] বলে এখন কিছুই নেই। মোদীর হামবড়া ভাব আর পুরা কাশ্মির ভারতের বলে দখলের দাবি – এসব অবিবেচক অবস্থাই ভারতে তাদেরকে ইজ্জত ও নিরাপত্তা হারানোর অসহায়ত্ব অনুভবে ফেলে দিয়েছে, তা তারা কমবেশি সকলেই জানেন। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত হল – তবু কথিত ‘জাতীয় স্বার্থের’ নামে মিথ্যা কথার জার্নালিজমই তাদের করতে হবে। অথচ যা মিথ্যা তা কখনই জার্নাজিলম-ই নয়। তাই তাদের দেখে  বাইরে থেকে মনে হবে তারা মোদীর পক্ষেই দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু আসলে এটা তাদের ইজ্জত ও নিরাপত্তা হারানোর অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি পাবেন, তাদের রিলিফ দিবে মনে করেই এই মিথ্যার চর্চার মহড়া যাতে তারা এখন যুক্ত ও মত্ত হয়েছেন।

এ কারণে আগামীতে বাইডেন-জিনপিংয়ের সামিট যতই আসন্ন হয়ে উঠবে ভারত ততোধিক অস্থির হয়ে ভারত-চীন সম্পর্ক আবার আগের মত অবস্থায় ফিরে পেতে মরিয়া ও ন্যাংটা হয়ে উঠবে। চীনের সাথে ৫ আগস্ট ২০১৯ সালের কাশ্মিরের স্ট্যাটাস বদলে দিবার আগের সময়ের চীন-ভারত সম্পর্ক যে জায়গায় ছিল সেখানে ফিরে যাওয়ার জন্য অস্থির ও মরিয়া হয়ে উঠবে। অবশ্য একালের মোদীর ভারত জানবে যে, বাইডেনের আমেরিকা ভারতকে আর ‘চীন ঠেকানোর’ কাজের কোনো ঠিকা দেবে না। ফলে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া- সেই ঠিকা ফেরত পাওয়া – না, এরও কোনো বালাই থাকবে না। তবু চীন-আমেরিকার সম্পর্কের টেনশনের আড়ালে ভারত নিজেকে লুকায় রাখার কৌশল নিবে যাতে বাইডেনের “ঝারি” একটু কম ভারতের গায়ে লাগে।

আর এটাই মোদীর সবচেয়ে বড় “বাইডেন-অস্বস্তি” ইতোমধ্যেই মোদীকে কঠিনভাবে অস্থির করে তুলেছে। সে কারণে বাইডেন আসছে এই খবর পাওয়ার পর থেকে ভারতীয় মিডিয়ার সুর বদলে গেছে।  ট্রাম্পকে বাপ ডাকা আক্ষরিক অর্থেই পুজা করা মোদীর ভারতের জন্য বাইডেন জিতাতে এখন আঙুর ফলে একেবারেই টক হয়ে গেছে! যেমন আনন্দবাজার লিখছে, “অ্যামেরিকায় গদি বদলালে ভারতের কী”! যেন সমাজ-সংসারে নিরাসক্ত এক যোগী কথা বলছে। মানে তারা এখন ভেক ধরে বলছে, “আমেরিকার নির্বাচনে কে জিতল তাতে ভারতের কিছুই যায় আসে না”। অর্থাৎ তারা আসলে যেন বলতে চাইছে,  “হে মহান বাইডেন সাব, আমরা ভুল করেছি; আমাদের মাফ করে দাও। আমাদের মোদি ‘হাউ ডি মোদী’ করেছিল, হিউস্টনে আর গুজরাটে। যেখানে মোদী নিজে মুখে সমস্ত প্রটোকল ইজ্জত সম্মান ভেঙ্গে “আব কি বার ট্রাম্প সরকার” (পরের নির্বাচনে ট্রাম্পই জিতবেন) বলে স্লোগান ধরেছিল। এটা গর্হিত কাজ, অসৌজন্যমূলক। কারণ একজন সিটিং প্রধানমন্ত্রী এভাবে পক্ষপাতিত্বপূর্ণ অবস্থান প্রকাশ্যে নিয়েছে। ফলে এখন বাইডেন-মোদী কখনো সাক্ষাৎ হলে (বা একারণেই হয়ত সাক্ষাত হতে অনেক দেরি হবে) মোদী মুখ দেখাবেন কী করে, সেই অস্বস্তি এড়াবেন কী করে? এমন ন্যূনতম হুঁশজ্ঞান নেই এমন লোকই এখন ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার প্রধান। আর সেসব ঢাকতেই মোদী এখন মিডিয়াকে কিনে-বশ করে এমন রিপোর্ট ছাপানোর তোড়জোড়। বিবিসি বাংলার ট্রাম্পের নামে আগেভাগে ‘আব কি বার ট্রাম্প সরকার’ জয়ধ্বনি দিয়ে মোদি কি এখন বিড়ম্বনায়?’ এই শিরোনামের রিপোর্টটা বলে দেয়, মোদী কোন বেইজ্জতিতে আছেন। ভারতের কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মী দুই সপ্তাহ আগে যারা ট্রাম্পকেই তাদের নিরাপত্তাদাতা মনে করতেন এরাই এখন বলছেন, বাইডেনের সাথে ভারতের সম্পর্ক যেন কতকাল আগের। আসলে তামাশার বোধ হয় কোনো সীমা থাকে না!

এদিকে চীন-ভারত লাদাখ সীমান্তে সেনা প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা ইতোমধ্যেই হঠাৎ গতি পেয়েছে, মনে হচ্ছে।

কিন্তু বাংলাদেশে?
কিন্তু বাইডেন জিতবার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশে সম্ভবত হবে সবার চেয়ে ভিন্ন। এর মূল কারণ, হিউম্যান রাইট মেনে চলার প্রশ্নে বাইডেনের কড়া অবস্থান নিবেন অনুমান করা হচ্ছে তাই। এটাই মোদীর জন্যও সবচেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ার কারণ হয়েছে ইতোমধ্যেই। বাইডেন আগেই তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে কাশ্মিরে রাইট ভায়োলেশন নিয়ে সোচ্চার হবেন জানিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও হিউম্যান রাইট ইস্যুতে কড়া অবস্থানের কারণ হল,  সাধারণভবে এটা ছিল সবাইকে দেয়া, মূলত হেনরি কিসিঞ্জারের পরামর্শ যে, একালে চীনকে বেকায়দায় রাখতে চাইলে হিউম্যান রাইট মেনে চলার প্রশ্নে আমেরিকার নিজ প্রশাসনের কড়া অবস্থান জরুরি। তাই ব্যবসা পাওয়ার লোভে আমেরিকার মানবাধিকারে ছাড় দেয়া যাবে না। এই নীতি অবশ্য ডেমোক্র্যাটরা তুলনামূলক বেশি অনুসরণ করেছেন। বাইডেনের কড়া অবস্থানের পেছনে এটাই কারণ।

আর এটাই হাসিনা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। অনেকে বলতে পারেন, এটাই একই সাথে চীনের উপরেও চাপ, যাতে হাসিনা-চীন ঘনিষ্ঠতা কমে। এক থিঙ্কট্যাঙ্ক কনসালট্যান্ট কুগেলমানের [Michael Kugelman] বরাতে বাংলাদেশের একটি পত্রিকা লিখেছে, এই “ঘনিষ্ঠতা কমানো হবে” বাইডেনের বাংলাদেশ অবস্থানের মূল নির্ণায়ক।

“I do imagine that he will view Bangladesh through the lens of US-China rivalry, and he will aim to engage with Dhaka in order to encourage it to distance itself from Beijing.

কিন্তু কুগেলমানের একথা আসলে ‘ওভার এস্টিমেশন’। কারণ ‘বেসিক ফ্যাক্টস’ হল – অবকাঠামোর- ঋণদাতা বিনিয়োগকারী  হিসাবে আমেরিকা বাংলাদেশে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী একেবারেই নয়, এমনকি চাইলেও তা হতে পারবে না। আমেরিকার এমন বিনিয়োগ সক্ষমতা নাই বলেই তো গ্লোবাল নেতা হবার পদ হারাচ্ছে, চীন সে জায়গায় বসতে যোগ্য হয়ে গেছে। তাই আমেরিকার বাংলাদেশের ‘চীনা ঘনিষ্ঠতা’ ছুটানোর কোনো মুরোদই নেই। মনে রাখাই ভাল ধমকিয়ে কারো মন পাওয়া যায় না, এর সম্ভাবনা নেই। সে জন্য মন পাওয়ার ‘তরিকা’ ধরতে হয়। তবে অবশ্য বাংলাদেশে ইন্টারভেন করার মুরোদ আমেরিকার এখনো শেষ প্রান্তে হলেও আছে এবং খুব সম্ভবত এই বাইডেন প্রশাসনই হবে বাংলাদেশে ইন্টারভেন করার ব্যাপারে আমেরিকার শেষ প্রশাসন। আরেক বটম লাইন হল – চীন বাংলাদেশের কাছে অবকাঠামো-ঋণদাতা বিনিয়োগকারী থাকবেই, তাতে বাংলাদেশে যেই ক্ষমতায় থাক অথবা একটা নির্বাচিত সরকার থাকুক কি না থাকুক কিংবা ওই ঋণ থেকে অর্থ সরানোর সুযোগ কারো থাকুক আর নাই থাকুক। কাজেই কুগেলমান যেভাবে কথাটা চীনকে জড়িয়ে হাজির হয়েছেন তাতে ব্যাপারটা এক “সস্তা ভয় দেখানো’  হয়েছে। ভদ্র ভাষায় বলতে হয়, এটা কুগেলমানের “অতিসরলীকৃত এক বুঝ” বলা যায়।

কিন্তু বাংলাদেশে হিউম্যান রাইট মেনে চলার রেকর্ড সঠিক করার চাপ আসন্ন, একথা বাস্তব ও সত্য। ট্রাম্প নয়, এটা বাইডেন জিতেছে বলে, ভারত আর বাইডেনের পিঠে চেপে চলা বা আসা কোনো ‘ব্যাগেজ’ নয়। তাই সরাসরি আমেরিকান চাপই আমাদের সরকারের এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছে। কিন্তু তাই বলে ভারতের কোন চাপ নয়। হবার সম্ভাবনাও নাই। আবার ওদিকে রাতারাতি বাংলাদেশের সরকার ভাল হয়ে যাবে, হিউম্যান রাইটের সব রেকর্ড ভালো করে ফেলবে – তা সম্ভবই নয়। করা যায় না। তবে বাইডেন হিউম্যান রাইট মেনে চলার জন্য সরকারকে চাপ দিলে এর ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষের একটা সমর্থন আমেরিকার পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়াবে অবশ্যই। ঠিক যে অর্থে হাসিনা সরকারের জনসমর্থন বা পাবলিক রেটিং প্রায় নেই বলে, বাইডেনের চাপের বিরুদ্ধে, ইন্টারভেনশনের বিরুদ্ধে জনমতকে সরকার কাজে লাগাতে ব্যর্থ হবে।

তবু ‘কী হতে যাচ্ছে’ তা নিয়ে এসব আসলে অনুমানের কথা। বাস্তবে কিভাবে ব্যাপারটা ঘটবে, তা দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। যদিও চ্যালেঞ্জগুলো বাস্তব!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা  গত  ১৪ নভেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “গ্লোবাল ও লোকালি ‘বাইডেন পাঠ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s