বেহায়া রাজামোহন ও ইসরাইলকে স্বীকৃতি


বেহায়া রাজামোহন ও ইসরাইলকে স্বীকৃতি

গৌতম দাস

০৭ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০৬  সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-3hD

 

 

রাজামোহন বলছেন, ইসরায়েল শক্তিশালী; তাই আমাদের একে স্বীকৃতি দেয়া উচিত! কে এই রাজামোহন?
সি রাজামোহন (সিলামকুরি রাজামোহন, Chilamkuri Raja Mohan) একজন ভারতীয় একাডেমিক, জার্নালিস্ট ও ফরেন পলিসি এন্যালিস্ট – এভাবেই তার পরিচিতি দেয়া আছে উইকিপিডিয়াতে। রাজামোহন  তেলেগুভাষী, ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের বাসিন্দা। সেখানকারই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে মাস্টার্স। কিন্তু পরে দিল্লি জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) থেকে “আন্তর্জাতিক সম্পর্ক” বিষয়ে মাস্টার্স ও পিএইচডি করেন। সেখানে তাঁর পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল,  ‘স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ ও আর্মস কনট্রোল’ [Strategic Studies and Arms Control)]। পরে জেএনইউ বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষকতা শুরু করে প্রফেসর হন তিনি। কিন্তু ক্রমেই তিনি নজরে পড়েন এবং হয়ে পড়েন ভারতে “আমেরিকার বন্ধু”। এতে পরবর্তী সময়ে অবস্থা এমন হয় যে ভারতে এমন কোনো আমেরিকান ফান্ডেড এনজিও বা থিংক ট্যাংক আর বাকি নেই যার পরিচালনার সাথে তিনি সংশ্লিষ্ট নন। এসবই চলতি শতকের প্রথম দশকের ঘটনা। যখন গ্লোবাল ইকোনমিতে চীনা উত্থান ক্রমশ বড় জায়গা নেওয়াতে সবার চোখে পড়তে শুরু করেছিল। ফলে চায়না কনটেইনমেন্ট [China Containment] বা ‘চীন ঠেকানো’ এর জন্য কাজ করা যখন থেকে আমেরিকান ফরেন পলিসির জন্য গুরুত্বপূর্ণ শুধু নয়, প্রায় প্রধান প্রোগ্রাম হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আমেরিকা নিজেরই নানান গবেষণা ও স্টাডি এবং সেসবের রিপোর্টে পরিষ্কার করেই নির্দেশ করছিল যে, চীনের উত্থান ও অর্থনীতিতে এর আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাওয়া ও চীনের নেতার আসনে বসাটা অনিবার্য। এটা রোধ করা যাবে না এমন অনিবার্য।
তবু এশিয়াতে আমেরিকার প্রধান কাজ হিসাবে দাঁড়ায় চীন ঠেকানোর কাজে নেমে পড়া। আমেরিকার সমস্ত এশিয়ান নীতি-পলিসিকে “চীন ঠেকানো” এই অভিমুখ করে সাজানো হয়। আর তাতেই একাজে ভারতের একাডেমিক জগতে স্থানীয় ভাবাদর্শ ও চিন্তাকে চীনবিরোধী করে প্রভাবিত করার কিছু কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল। দিল্লি হয়ে ওঠে যার কেন্দ্র। তখন ভারতের ট্রাডিশনাল (সোশ্যাল বা সামরিক-স্ট্রাটেজিক) গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময়ই স্থানীয় ও সরকারি সীমিত ফান্ডের মধ্যে কোনো মতে খুঁড়িয়ে চলছিল। তারা নিজেদেরকে থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানও বলত না, তখনো চালু হয়নি এ পরিভাষা। আমেরিকা এসব প্রতিষ্ঠানকে পাশে ফেলে এসবেরই প্যারালাল ধারা হিসেবে আমেরিকান থিংক ট্যাংকের ভারতীয় শাখা খুলে অথবা সরাসরি এনজিও ফান্ড ঢেলে ভারতে চিন্তা ও ভাবাদর্শে দখল তৎপরতা শুরু করেছিল। তেমনি সবচেয়ে প্রভাবশালী এক থিংক ট্যাংক হল, ‘কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’, যা ওয়াশিংটনভিত্তিক [Carnegie Endowment for International Peace, Washington DC.]। সংক্ষেপে এটাকে কার্নেগি এন্ডোমেন্ট অথবা শুধু কার্নেগি বলে অনেকে। যেমন ভারতে এরই শাখা খোলা হয়েছে “কার্নেগি ইন্ডিয়া” নামে। আর এরই প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর হন সি রাজামোহন। শুধু তাই নয়, ভারতের আগেকার ট্রাডিশনাল ও পরের আমেরিকা ফান্ডেড থিংক ট্যাংকগুলো এবং ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় মিলে একটা নীতি-পলিসির সমন্বয় করার দায়িত্বও নেয় এই ‘কার্নেগি ইন্ডিয়া’। এছাড়া কোনো থিংক ট্যাংকের প্রোগ্রামে ফান্ডের সংস্থান অথবা চীন ঠেকানো সংশ্লিষ্ট নানান ইস্যুতে মাস্টার্স ও পিএইচডি করতে বিদেশে পড়তে যাওয়ার বৃত্তি যোগানোর কাজটা ভারতে করে থাকে মূলত এই কার্নেগি ইন্ডিয়া। অবশ্য ভারতে এখন দেশী-বিদেশী সব ধরনের থিংক ট্যাংকের নেয়া যেকোনো প্রোগ্রামের লিখিত অনুমোদনদাতা প্রতিষ্ঠান ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়। তবু এক কথায় বলা যায়, গত প্রায় ২০ বছরের বেশির ভাগ সময় ধরে ওয়ার অ্যান্ড টেরর প্রোগ্রামসহ ভারত-আমেরিকার কৌশলগত সব তৎপরতার প্রধান বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ের কাজ হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে।
কিন্তু ব্যতিক্রম ছিল গত চার বছরে ট্রাম্পের আমল। কারণ ট্রাম্পের ধারণা এসব গ্লোবাল প্রভাব তৈরি করে তা দিয়ে আমেরিকার আর কোনো কাজ নেই, মানে এসব আর কাজে আসবে না। বরং আমেরিকান জাতিবাদী-অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে চীনবিরোধিতা বা চীনের সাথে বাণিজ্যযুদ্ধ করা ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” ধরণের চিন্তা ও তৎপরতার জন্য বেশি লাভজনক ও উপকারী। ফলে এসব কাজের যত প্রস্তাব পেন্টাগন বা স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে অনুমোদনের জন্য হোয়াইট হাউজে গেছে তার সবই ট্রাম্প ডাটবিনে ফেলে রেখেছিলেন। ফলে সেই থেকে ভারতে রাজামোহন বা তার থিংক ট্যাংকের কাজ একেবারেই সীমিত হয়ে পড়েছিল, যদিও একেবারে বন্ধ হয়নি। রাজামোহন এখন কার্নেগি ত্যাগ করে সাময়িকভাবে যুক্ত আছেন সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাথে।

রাজামোহনের নতুন এসাইনমেন্ট ইসরাইলের স্বীকৃতি জোগাড়ঃ
রাজামোহনের নতুন অ্যাসাইনমেন্ট হল ইসরাইলের পক্ষে এজেন্সি নিয়ে মাঠে নামা। উপরের যে রাজামোহনকে বর্ণনা করা হল তিনি এবার দেখা যাচ্ছে, আবার তৎপর হয়েছেন। তার এবারের এসাইনমেন্ট হল এশিয়ায় ইসরাইলের জন্য স্বীকৃতি আদায় করে দেওয়ার দালালিতে নেমে পড়া। সরাসরি বললে, পাকিস্তান এবং সেই সূত্রে বাংলাদেশও যেন ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়, এর পক্ষে ওকালতি করা। রাজামোহন এই স্বীকৃতি দেয়ার ‘ফায়দা’ বেচতে এসেছেন, তবে সাথে হুমকি-ভয়ও দেখাচ্ছেন।
রাজামোহন নিয়মিত ভারতের “ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস” ইংরেজি দৈনিকে কলাম লিখেন। এর সর্বশেষ ভাষ্যে তিনি যে রচনাটা পাঠিয়েছেন এর শিরোনাম হল, “পশ্চিম এশিয়ায় বদলে যাওয়া ভূরাজনীতি বাস্তবতাকে ইন্ডিয়া, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অবশ্যই মোকাবেলা করতে হবে” [India, Pakistan and Bangladesh must deal with changed geopolitical realities in West Asia]।

তাঁর লেখার এই শিরোনাম ঘোরতর চাতুরীতে পূর্ণ। এখানে “পশ্চিম এশিয়া” মানে কী? তিনি আসলে ইরানের নাম না নিয়ে বলছেন, পশ্চিম এশিয়া। ইরান যেন তার ও ইসরাইলের ‘ভাসুর’! তাছাড়া এমন কোনো কাজের এরিয়া কী আমরা দেখাতে পারব  যেখানে ইন্ডিয়া, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ এই তিন দেশেরই একই নীতি-পলিসি গ্রহণ সম্ভব বা এর কোন সুযোগ আছে? ইন্ডিয়া এমন কোনো কমন স্বার্থ-অবস্থানের ইস্যু বলে কিছু অবশিষ্ট রাখেনি; সবকিছুতে উগ্র হিন্দুত্ব বা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের ধারণা মাখিয়ে সব তিতা করে ফেলেছে। কারণ ভারতের আচরণ হল – মনে মনে দাবিও বলা যায়- যেন ভারত বলতে চায়, ‘আমেরিকা এখন আমি ভারতের পিঠে হাত রেখেছে, কাজেই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের চেয়ে আমি অনেক উঁচুতে”। ফলে সে তো বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের উপরে নিজেকে কোন প্রভাব বিস্তারযোগ্য শাসক মনে করে । ভারত নিজেকে যখন থেকে এমনই এক ‘মুই কী হনু রে’ জায়গায় নিজেকে অনুভব করে সেদিন থেকে সম্পর্কটাই তো অসম, কাজেই কমন স্বার্থ বলে এখানে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। ফলে এমন বাস্তবতায় রাজামোহনের তিন দেশকে এক নিঃশ্বাসে হাজির করাটাই সন্দেহজনক।

আসলে রাজামোহন এখন ‘ইসরাইলের এজেন্সি’ নিয়ে এসেছেন। তাই আকার ইঙ্গিত নয় একেবারে সরাসরি বলছেন, আমরা এই তিন দেশ যেন ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিই। কিন্তু তিনি ভান করছেন ভারত যেন এখনও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় নাই। এই ভান করার বদ উদ্দেশ্যটা হল, এটা একটা যেন আঞ্চলিক স্বার্থ এই ভাব ধরা। অথচ যেটা ভারত ইতোমধ্যে সেই পঞ্চাশের দশকেই [September 17, 1950] করে ফেলেছে, স্বীকৃতি দিয়ে ইসরাইলের কোলে উঠে বসেছে। কাজেই রাজামোহনের ভান ও নখড়া খুবই চাতুর্যপুর্ণ।

কিন্তু এই কথাটা রাজমোহন আবার তুলেছেন অত্যন্ত আরেক ধূর্ততায় ও অনৈতিকভাবে। তার লেখা রচনার প্রথম প্যারার অনুবাদ হল এরকমঃ – “তেহরান থেকে বাইরে গত সপ্তাহে ইরানি এক পরমাণু বিজ্ঞানীকে (মোহসেন ফাখরিজাদাহ) নির্লজ্জ ও বেপরোয়া খুনের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিচিত রাজনৈতিক বয়ানকেই গুরুত্ব আরোপ করে যে, আপনি ভুল না সঠিক অবস্থানে তাতে কিছু যায় আসে না। বরং আপনি দুর্বল না শক্তিশালী, এটাতেই আসলে সবকিছু যায় আসে। ফাখরিজাদেহর গুপ্তহত্যাটা প্রমাণ করে ইরানের বেড়ে চলা মারাত্মক ‘স্ট্রাটেজিক দুস্থ’ অবস্থা। এ অঞ্চলে ইরানকে উপেক্ষা করে কিছু আরব দেশ ও ইসরাইলের মধ্যে সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে স্বাভাবিকীকরণে পুনঃসজ্জিত করা চলছে- এ দিকটাই উল্লেখযোগ্য”।

এখন লক্ষণীয়, শুরুতে তিনি ফখরিজাদাহের গুপ্তহত্যাকে বর্ণনা করতে ইংরেজিতে ‘ব্রাজেন’ [brazen] বলে একটা শব্দ ব্যবহার করেছেন; যার অর্থ নির্লজ্জ ও বেপরোয়াভাবে যে কাজ করা হয় – অর্থাৎ এই গুপ্তহত্যাটা এক নিন্দাসূচক কাজ এটা; তিনি তাই বলছেন। অথচ পরের বাক্যেই আবার গুপ্তহত্যার পক্ষে সাফাই দিয়ে বলছেন, এসব কাজকে ঠিক-বেঠিক দিয়ে বুঝা যাবে না; (মানে দুনিয়াতে ন্যায়-অন্যায় বলে যেন কিছু নাই) বুঝতে হবে আপনি দুর্বল না শক্তিশালী সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। মানে পরের এই বাক্যে এবার তিনি খোলাখুলি বলছেন, “ফাখরিজাদেহর গুপ্তহত্যাটা প্রমাণ করে, ইরানের বেড়ে চলা মারাত্মক ‘স্ট্রাটেজিক দুস্থ’ অবস্থা।”

ফখরিজাদেহ খুন হয়েছেন আর তাতেই নাকি ইরানের স্ট্রাটেজিক দুরবস্থা প্রমাণিত হয়েছে, কাজেই এখন দল বেঁধে আমাদের ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে হবে  – এমন কথা যিনি বলেন তিনি তো নিম্ন শ্রেণীর কোনো দালালের চেয়েও ইতরোচিত অধম!

এক কথায় রাজামোহন বলতে চাচ্ছেন, ইসরাইল যেহেতু ‘শক্তিশালী’ এবং ‘এটাই ম্যাটার করে’ অতএব ভয়ে এখন আমাদের ইসরাইলের ‘পা’ চাটতে হবে’। আসলে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, রাজামোহন ধরনের লোকের মধ্যে সমস্ত মনুষ্যগুণাগুণ লোপ পেয়েছে। তাদের মধ্যে ন্যূনতম কোনো নৈতিকতা আর অবশিষ্ট নেই।

আচ্ছা, কালকে যদি ইরান প্রতিশোধমূলক কোনো একশন নেয় যেটা সে ইতোমধ্যেই প্রতিজ্ঞা করেছে এবং যেটা সে ট্রাম্পের ক্ষমতা ত্যাগের পরে নেবে বলে অনুমান করা হচ্ছে – তাহলে কী হবে?

আসলে এখন রাজামোহন চিন্তার সক্ষমতার দিক থেকে একেবারে দেউলিয়াত্বের কিনারে চলে গেছেন, দেখা যাচ্ছে। তাই এ’অবস্থায় তাঁর প্রথম কাজ হতে হবে পড়াশোনায় ফেরত যাওয়া। আর সেখানে  ‘ক্ষমতা’- এই ইস্যুটা নিয়ে তিনি যেন আবার পড়াশোনা শুরু করেন। তাতে তিনি দেখবেন, ক্ষমতা নেয়াই যায়, এটা বড় ঘটনা নয়। বড় দিকটা হল, ক্ষমতার সপক্ষে একটা নৈতিকতা, একটা সাফাই হাজির করে দেখাতে পারা। এটা না পারলে ঐ ক্ষমতা তাকে সবসময় পীড়া দিতেই থাকবে। আর সাফাই হাজির করতে না পারলে ঐ ক্ষমতা তাঁর হাত থেকে চলে যাবে এবং তাঁরই বিরুদ্ধে হাজির হতে থাকবে। চাই কী, যাওয়ার আগে তাকেই মেরে ফেলে দিয়ে যেতে পারে!

আর ইসরাইল রাষ্ট্র-টা সম্পর্কে কেবল একটা কথা বলা যায়। যেদিন আমেরিকা গ্লোবাল নেতৃত্ব হারিয়ে ফেলবে (মানে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতার আসনে আসীন হয়ে যাবে), সেদিন ইসরাইল রাষ্ট্র একই কারণে নৈতিকতাহীন বা সাফাইহীন এক ইসরাইল রাষ্ট্র এমনই একটা ক্ষমতা খাড়া করার কারণে নিজ অস্তিত্বটা আরও টেকানোর সঙ্কটে পড়বে। তবে এসবের আগেই আমাদের কাজ হবে অর্থপুর্ণভাবে এখন আমরা যে দিকে চোখ রাখতে পারি তা হল, চীন-ইরানের ২৫ বছরের হবু চুক্তি

এদিকে সৌদি আরবের বাদশাহ-রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভাব ও টিকে থাকা আমেরিকার সাথে সৌদিদের সম্পর্কের সমান বয়সী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নায়ক-নির্ধারক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট আর সৌদি বাদশাহর চুক্তি (১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৫) হয়েছিল। সৌদি আরবের এখনো মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্র হয়ে থাকার ভিত্তিও সেইটাই; যদিও তা এখন শেষ বয়সের দিকে পৌঁছাচ্ছে বলে অনুমান করা হয়। চীনের গ্লোবাল নেতৃত্ব নেয়া আর চীন-ইরানের ২৫ বছরের চুক্তি কার্যকর হওয়া – হবু এসব ঘটনারই সোজা পরিণতি হবে, আজকের সৌদি অবস্থানটা তখন নেবে ইরান। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অনেক কিছুরই নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে। মধ্যপ্রাচ্য বা জিসিসির প্রতিটি আমিরাতের  (আমীর রাষ্ট্রের) অস্তিত্ব সঙ্কটাপন্ন হবে। যার আলামত এখনই ফুটে উঠতে শুরু করেছে আমেরিকার গত নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয়ের পর থেকেই। আর মূলত ঠিক একারণের সিলামকুরি রাজামোহন ইসরায়েলের হয়ে দালালি করতে ছুটে এসেছেন – পাকিস্তান বাংলাদেশ যেন স্বীকৃতি দেয়।

চীন-ইরানের হবু চুক্তির খবর চাউর হয়ে গেলে গত  সেপ্টেম্বরে ২০২০ -এ বিবিসি বাংলা এক রিপোর্ট করেছিল। সেখানেই এসব নতুন পরিস্থতি নিয়ে বিস্তারিত আছে। সেখান থেকে এখানে চারটা বাক্য তুলে এনে এখানে পরপর লিখব। এগুলো মূলত দিল্লির এক অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদোয়াজের মন্তব্যঃ

“পর্যবেক্ষকদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই যে চিরশত্রু চীন এবং হালে পাকিস্তানের সাথে ইরান যেভাবে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে ভারত তাতে গভীর উদ্বিগ্ন।”
“দিল্লির জওহারলাল নেহেরু ইউনিভারসিটির (জেএনইউ) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদোয়াজ বিবিসি বাংলাকে বলেন, চীনের সাথে ইরানের অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত যে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে ভারতের মাথাব্যথা বাড়ছে।”
“গত ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা যত বেড়েছে, ইরানের সাথে ততই দূরত্ব বেড়েছে। সেই শূন্যতা পূরণে ঝড়ের মত ঢুকে পড়েছে চীন”।
“মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে রাশিয়া এবং চীনের দৃষ্টিভঙ্গি এখন একইরকম। তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে পাকিস্তান, ইরান এবং তুরস্ক। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যে সব দেশের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হচ্ছে – ইউএই এবং সৌদি আরব- তারা ইরানের বড় শত্রু।“

অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে সব হারানো ভারতের পক্ষে এখন আছে কেবল সৌদি আরব আর ইউএই [UAE] (দুবাই, আবুধাবিসহ সাত আমিরাতের জোট)।  তাই এই ডুবন্ত ভারতকে বাঁচাতে রাজামোহন  ছুটে এসেছেন পাকিস্তান ও ভারতের কাছে – ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়ার দালালি নিয়ে । তিনি ভেবেছেন আমরা ঘাসে মুখ দিয়ে চলি, তাই মধ্যপ্রাচ্যের আসন্ন ব্যাপক উল্টপালট আমরা খবর রাখি না, বুঝব না। সেকারণে রাজামোহনকে বিশ্বা করব। অথচ  সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সৌদি আরব আর ইউএই (দুবাই, আবুধাবি ইত্যাদি)। তবে আরেক আমিরাত হওয়া সত্ত্বেও সবচেয়ে ভালো অবস্থানে যাবে কাতার। আর এর কারণ সে আগে থেকেই সৌদিবিরোধী এবং নিজের নিরাপত্তা তুরস্কের সেনা নিয়ে এসে নিশ্চিত করেছে কেবল সেজন্যই না।  ঐ এলাকায় সবার আগেই তেলেবেচা আয়ের বদলে  ভারী-শিল্পে নিজের অর্থনীতির ভিত গেড়েছে কাতার।  একারণে একধরনের ব্যাপক ওলটপালট যা ঘটবে যার আছর সবচেয়ে দ্রুত সামলে নিতে পারবে কাতার। যদিও সবচেয়ে বড় কথা, মধ্যপ্রাচ্যে রাজতন্ত্র টেকানোই মুশকিল হয়ে যেতে পারে, তবে কাতারকে ছাড়া। এ ছাড়া আরো বড় সঙ্কট সবার জন্য (আমাদেরসহ) অপেক্ষা করছে। সেটি হল – ২০৩০ সালের পরে মাটির নিচের তেলভিত্তিক শিল্পসভ্যতা দুনিয়া আর থাকছে না, বিদায় নিতে যাচ্ছে।  আসলে বাইডেন ক্ষমতাগ্রহণের পর থেকেই পরিবেশসম্মত জ্বালানিতে জ্বালানির উৎস বদলে যাওয়া ব্যাপক ত্বরান্বিত হবে। যেটা এতদিন গোয়াড় ও দেউলিয়া ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরিপুর্ণ দায়ীত্ব-জ্ঞানহীনভাবে  তছনছ করে রেখেছিল।  মধ্যপ্রাচ্যের এই তেল অর্থনীতি শুকিয়ে আসলে এর প্রভাবে আয়-ইনকামের সঙ্কট যেটা দেখা দেবে, এর বিকল্প যা এত দিনে বাদশাহদের তৈরি করে ফেলা দরকার ছিল, বলতে গেলে এর কিছুই করতে তারা সক্ষম হয়নি। তাই সঙ্কট ধেয়ে আসবে।
আগামি ২০২৫ সাল থেকেই এই সঙ্কট দৃশ্যমান হওয়া একটু একটু করে শুরু হতে থাকবে। ওদিকে বাংলাদেশের যারা মধ্যপ্রাচ্যে কষ্টকর শরীর-ঘাম বেঁচে আয় করা বৈদেশিক মুদ্রার যে আরামে আমরা এখন আছি, ৪২ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভের গরম অনুভব করছি, এসব বদলে যাবে। বসে বসে মাটির নিচের তেল বেঁচে আয়েশ করার দিন শেষ হয়ে যাবে। বরং এবার শিল্পভিত্তির উপরে অর্থনীতিকে দাঁড় করানোর প্রতিযোগিতায় ইরান প্রতিটি রাজতন্ত্রকে হয়ত বুঝিয়ে দেবে কে কতটা যোগ্য, কতটা মুরোদ রাখে!

আর বলাই বাহুল্য  চীন মধ্যপ্রাচ্যের এসব ওলটপালটে ইরানকে পুর্ণ ও সক্রিয় সমর্থন দিয়ে যাবে। আর এতেই মধ্যপ্রাচ্যে ভারত নিজ গুরুত্ব হারাবে। ভারত যেন ইরানের দুর্দিনে ইরানের তেল কেনা বন্ধ না করে মুখ না ঘুরিয়ে নেয় – এমন শত আবেদন ভারত পায়ে মাড়িয়ে বুক ফুলিয়ে হেটে গেছিল, ট্রাম্পের আমেরিকার কোলে গিয়ে উঠেছিল। ভারতের এসব দিনের প্রতিদান/প্রতিশোধ তখন ইরানের কাছ থেকে পাওয়ার সময় হবে। ভারত ব্যবসা, একসেস সব হারাবে। এমনকি ইরানে চাবাহার বন্দরের ভারতের শেয়ার মালিকানা – এই বিনিয়োগও বেকার হয়ে যাবে। কারণ, চাবাহার পোর্ট পাকিস্তানের গোয়াদর ডিপ সি পোর্টের সাথে সমন্বয় করে ব্যভারকারি ভাগাভাগি করে চলতে শুরু করবে।  ওদিকে চাবাহার বন্দর ব্যভার করে ভারতকে আর আফগানিস্তানে যাবার দরকার কমে আসবে। হয়ত উতখাতি হয়ে যেতে পারে, সেখানে চীন-পাকিস্তানের প্রভাব অর্থাৎ তালেবানদের সাথে চীন-পাকিস্তানের সম্পর্ক সবার চেয়ে উন্নত হবার কারণে।  কিন্তু চীন এই পুরা উল্টপালটে ইরানের পাশে শক্ত হয়েই দাঁড়াবে। কেন?

কারণ চীনকে আগামি সেসময়ের মধ্যপ্রাচ্যের লেনদেন-বিনিময় বাণিজ্যের শীর্ষ মুদ্রার ভূমিকায় ডলারের বদলে ইউয়ানকে বসাতে হবে। একারণে মধ্যপ্রাচ্যের সব ওলটপালট ঢেলে সাজানোতে চীনের প্রবল সক্রিয় সমর্থন থাকবে।

চীন-ইসরায়েল সম্পর্কঃ
বর্তমান বাদশা-আমিরাতদের যে আগামি দুরস্থার কথা টানলাম, এরা সকলে বিশেষ করে দুবাই-সৌদি এরা কী আপোষেই সব হার স্বীকার করে নিবে? এটাই হল সেন্ট্রাল প্রশ্ন! আসলে, এই বাদশাতন্ত্র বাঁচাতেই রাজামোহন আমাদের কাছে ইসরায়েলে বেঁচতে এসেছেন।  আইডিয়াটা হল, এটা তো কেবল দুবাই-সৌদি রাজাগিরি  টিকানোর সঙ্কটই নয়, এটা ইসরায়েলেরও অস্তিত্বের সংকট। তাই চক্ষুলজ্জা ভুলে দুবাই-সৌদিদের বাদশারা ইসরায়েলের সাথে গাটছাড়া বেঁধেছে আর সেটা এই অনুমানে যে  ইরানের উত্থানে একই সঙ্কটে থাকা ইসরায়েলের সাথে গাটছাড়া বাঁধলে  সামরিক শক্তি দিয়ে ইসরায়েল তাঁদের রক্ষা করবে। কিন্তু এই অনুমান ভিত্তিহীন। কারণ দুবাই-সৌদি রাজাগিরির সমস্যাটা মূলত সামরিক নিরাপত্তার নয়, মূল সমস্যা অর্থনীতির। তেল-বেচা আয়ের বাইরে নতুন অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি বা তাতে শিফট করে নিবার। শোনা যাচ্ছে দুবাইয়ের তেলের রিজার্ভ শেষের দিকে। তবে দুবাই সিঙ্গাপুর না হলেও ওর চেয়ে ছোট হলেও একধরণের পাইকারি গোডাউন বটে। জেবল আলী ধরণের ইপিজেড আছে, কিন্তু কোনটারই পণ্য বা কাঁচামাল চীনের সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ লিঙ্কেজে যুক্ত নাই। দুবাই আফ্রিকার (৫০-৬৫) দেশের জন্য একটা হাব বটে। কিন্তু তা এশিয়ান পণ্যের জন্য নয়। বরং চীনের কারণ এশিয়ার সাথে আফ্রিকার যোগাযোগ প্রবলে বাড়ছে আর তা দুবাইকে ছাড়াই সরাসরি। তাই দুবাইয়ে ইতোমধ্যেই হাহাকার শুরু হয়েছে। কাজেই ইসরায়েল দুবাই-সৌদি রাজাগিরি  টিকানোর সঙ্কটে কেউ নয়। তবে হয়ত কিছু নুইসেন্স বা উপদ্রব তৈরি করতে পারবে। যেমন ইরানের পরমাণুবিজ্ঞানিকে গুপ্তহত্যার যে অভিযোগ আসছে এরকম কিছু। কিন্তু মূলকথা অর্থনীতিগত সঙ্কট মিটানো ইসরায়েলকে দিয়ে হবে না, ইসরায়েলের অস্ত্র দিয়েও হবে না।
ওদিকে আজো চীনের সাথে ইসরাইল এদুই রাষ্ট্রের মধ্যে কোন প্রত্যক্ষ বা বড় কোন স্বার্থবিরোধ নেই। কিন্তু তা না থাকলেও, এখন থেকে নতুন বা হবু মধ্যপ্রাচদচ্য যেটা আকার নিতে যাচ্ছে তাতে ইসরাইল চীনের স্বার্থের বিরোধী হয়ে উঠবে। কারণ ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে ওলটপালটের ঢেলে সাজানোতে, রাজতন্ত্রগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা নেবে যা চীনের জন্য বাধা। এ কারণেই প্রকাশ্যে বা গোপনে আমিরাতগুলো ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে রাখতে চায় যাতে ইসরাইল তাদের প্রটেক্ট করে, নিরাপত্তা দেয়। অর্থাৎ চীন-ইসরায়েল মুখোমুখি হতে চলেছে ক্রমশ।  অতএব চীন কিছুই চিন্তা না করে মধ্যপ্রাচ্য কাভার করতে কেবল ইরানের সাথেই গাঁটছড়া বাঁধেনি বা ২৫ বছরের স্ট্রাটেজিক অ্যালায়েন্স গড়েনি, এটা বুঝতে হবে।

অতএব, রাজামোহন সাহেব, আপনি হারু পার্টি ইসরায়েলের এজেন্সি নিয়ে এসেছেন। অন্তত বাংলাদেশ আপনার সাথে যাবে না। এছাড়া, আপনার কোনো অনুমানই নেই যে, আমাদের সমাজে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে হবে- এ কথায় প্রতিক্রিয়া কী হবে? এ ছাড়া এ কথাটা টেবিলে তুলবে কে? যে তুলবে সে সব নৈতিকতা হারানো এক লোক বলে সমাজে চিহ্নিত হয়ে যাবে, এর দায়ে তার সামাজিক অস্তিত্ব সঙ্কটগ্রস্ত হবে। ফলে ব্যতিক্রম হিসেবে দু-চারজন কেউ কেউ নিশ্চয়ই থাকবেন, কিন্তু তারাও অপ্রকাশ্য থাকবেন। এমনকি প্রগতিশীলরাও তাদের এত দিনের অবস্থান ছেড়ে ইসরাইলের পক্ষ নিচ্ছেন, এমন দেখা পাওয়া খুবই কঠিন হবে। বাংলাদেশে কমন অবস্থান যেটা দেখা যায় তা হল, ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল ও তাদের জীবনের ওপর সব ধরনের অত্যাচার নির্যাতনের প্রতীক হল ইসরাইলিরা। এটাই আমাদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক তা নির্বিশেষে আমাদের সাধারণ পারসেপশন। আর নৈতিকতা জিনিষটা আমাদের সমাজের সব কর্ণারে এখনও যথেষ্ট শক্ত; এর দায়বোধ দল নির্বিশেষে সকল পক্ষই গুরুত্ব দিয়ে দেখে।

অথচ রাজামোহন পরামর্শ দিচ্ছেন বাংলাদেশ যেন ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়। বুঝা যাচ্ছে, তিনি নিজ পেশাতেও কোনো দক্ষতা রাখেন না, বোঝাবুঝির পড়াশোনাতেও দুর্বল। তাকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশ ধান্ধাবাজ দেশ নয়। বাংলাদেশে এখনো একটা কাজের পক্ষে ন্যূনতম নৈতিক অবস্থান, সামাজিক অবস্থান থাকা ম্যাটার করে অনেক। পুওর রাজামোহন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

[এই লেখাটা  গত  ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “রাজামোহন ইসরাইল বেচতে এসেছেন!” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s