মোদী-হাসিনার ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’, কে কী পেল


মোদী-হাসিনার ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’, কে কী পেল

গৌতম দাস

২১ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০৫  সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-3iQ

নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বৈঠক

[আগের কথা সবার আগে। যারা এই ভার্চুয়াল বৈঠককে হাসিনা আবার ভারতের কোলেই উঠতে যাচ্ছে কিনা অথবা, উঠল কিনা সেটা বুঝতে চোখ-কান খাড়া করেছেন, তাঁদের বলে রাখি পরিস্থিতি আবার সেদিক কোন পক্ষ থেকেই নিবার জন্য এই বৈঠক ছিল না। সে অর্থে এটা বলা যায় রুটিন। এখন বাস্তবতাটাই আর তেমন নাই, ফেবারেবলও নয় তা দুপক্ষই মনে মনে স্বীকার করে নিয়েছে। এটাই সবচেয়ে বড় ঘটে যাওয়া  পরিবর্তন। বাইডেনের জিতে আসাটাই এসব পরিবর্তনের মূল কারণ। বাইডেন উত্থান ফেস করতে হাসিনার জন্য কাজে লাগবে – ভারত এখন তেমন কোন শক্তিই নয়। বরং, চীনই কিছু কাজে আসতে পারে, তুলনামূলক অর্থে এক বেটার সম্ভাবনা। এই হল সেই নির্ধারক রিডিং। যা সবকিছুকে বদলে দিয়েছে এমন, এক ড্রাইভিং ফোর্স!  দুই, এটা খুব সহসাই আর পুনরায় ভারতমুখি সেদিকে যাচ্ছেই না। তিন, ঘটনা-পরিস্থিতি সম্ভবত আর কোনদিনই ২০১৮ সালের আগের মত হবে না, যাবে না। “ও দিন গুজর গয়া! ফুলষ্টপ! ]

গত ১৭ ডিসেম্বর মোদি-হাসিনা দুই প্রধানমন্ত্রীর এক ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’ অনুষ্ঠিত হয়েছে; মানে কার্যত যার যার দেশের অফিস রুমে বসেই ঐ বৈঠকটা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তারা পরস্পর কথা বলেছেন। যদিও দু’দেশের পাবলিক টিভিতে এই অনুষ্ঠান যেভাবে ও যতটুকু আমাদের সামনে আনা হয়েছে তাতে পুরাটাই কাঠপুতলির শো-এর মত খুবই আড়ষ্ট আর যান্ত্রিক মনে হয়েছে। এদিকে ভার্চুয়াল হলেও তা ‘শীর্ষ বৈঠক’ বা সামিট যখন বলা হচ্ছে তখন দু’পক্ষেরই চাওয়া-পাওয়াও অবশ্যই ছিল অন্তত ‘কিছু’।

বাংলাদেশের দিক থেকে বললে, ভারতের প্রতি আমাদের সরকারি অবস্থান ও সময়টা যাচ্ছে এখন ভারতের জন্য খুব ‘করুণ’ এবং ‘দুঃসময়ের’ বলা যায়। এমন অভিমুখের শুরু ২০১৮ সালের শুরুর দিক থেকেই; আমাদের সরকারেরও ‘মন-বাঁধা’ সে সময় থেকেই। আর এর স্পষ্টতা অ্যাকশনে প্রকাশ পেতে থাকে ২০১৮ ডিসেম্বরের “নৈশ-ভোটের” সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই। কথাটা এভাবে বলা যায়, শেখ হাসিনা চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে চলতি সরকারের আমলের শুরু থেকেই কখনো পিছপা হননি। সেই ২০১০ সাল থেকেই তিনি লেগে আছেন, চীন সফর করে যাচ্ছেন। সফর বিনিময়ও হচ্ছে। তবে সম্পর্কের মাত্রার দিক বিচারে প্রধানমন্ত্রী এগিয়েছেন ততটুকু যতটুকু ভারত এলাও করেছে অথবা ভারতের কড়া আপত্তি পেরিয়ে তিনি ‘ছাড়’ আনতে পার পেয়েছেন। সেটাই তিনি এবার গত ২০১৯ জানুয়ারির শুরু থেকেই অবাধে করা শুরু করে গেছেন যেন; যতটুকু বাস্তব কাজকর্ম দেখে অনুমান করা যায়- এই অর্থে বলা যায়, বর্তমান সরকার যা কিছু ভারতকে দেয়ার ব্যাপারে সরকারি কমিটমেন্ট দিয়ে রেখেছিলেন কেবল তাই শেষ করা হচ্ছে, কিন্তু নতুন কমিটমেন্টে তেমন আগ্রহ নেই। অবস্থাদৃষ্টে ব্যাপারটা এমনই মনে হচ্ছে। এ ছাড়া ঘটনার ফোকাস আসলে এদিকটায় নয়, বরং উল্টা দিকে। ব্যাপারটা বাজারে আসছে বরং এভাবে যে, সরকার কতটা গভীরভাবে চীন-ঘনিষ্ঠ এর খোলাখুলি বহি:প্রকাশ থেকে। এথেকেই এবার অর্থ তৈরি হচ্ছে যে তাহলে সরকার প্রধান আর আগের মত ততটা ভারত ঘনিষ্ঠ থাকতে চাইছেন না। তবে এ ছাড়াও আরেকটা বিবেচনা সম্ভবত তিনি আমলে নিচ্ছেন। আমরা জানি, মুজিব খুন হয়ে যাওয়ার পরে একসময় শেখ হাসিনা নিরাপত্তার তাগিদে প্রায় পাঁচ বছর ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলে কৃতজ্ঞতা বা আগামীর দিক বিবেচনা যেমন মানুষের মধ্যে কাজ করে তেমন কিছু একটা হয়তো আছে বলে মনে হয়েছে। ফলে একধরনের সফটনেস এখনো থাকলেও সেটা অবশ্য কোনোভাবেই ২০০৯ সালের মত আর নয়। সেই পাতার পাঠ পার হয়ে গেছে, আর ফিরে পাবার সুযোগও নাই। তবু সর্বোপরি আমাদের পরিষ্কার থাকা ভাল যে, প্রতিবেশী ভারতের সাথে একটা স্বাভাবিক বা রুটিন সম্পর্ক তো থাকবেই যেটা নিয়ে আলোচনার তেমন কিছু নাই। ভারতের সাথে বাড়তি বা “বিশেষ সম্পর্কটা” আর থাকবে কি না- এটাই কেবল আলোচনার।

সম্পর্ক ঢলে পরছে, নতুন এক বাস্তবতার অনুভবঃ
তবে আমাদের সবাইকেই মানতে হবে এবারের  ‘ভার্চুয়াল বৈঠকে’ একটা নতুন ব্যাপার উঠে এসেছে। তা হল, এবারের কয়েক ঘন্টার আনুষ্ঠানিকতায় একটা নতুন অনুভব সব সময় বজায় থেকেছে যে, ভারত বাংলাদেশের মন পাওয়ার চেষ্টা করছে (দ্য প্রিন্টের জ্যোতি মালহোত্রা নিজেই এটা স্বীকার করে বলেছেন, ভারত তার “দেমাগ” বা ওভারউয়েনিং ইনফ্লুয়েন্স খুইয়েছে’ [replaced India’s overweening influence in the region] )- যেটা এবার সব ঘটনার সারফেসে হাজির হচ্ছিল। যদিও এই অঞ্চলে ভারতের নাকি প্রভাব ছিল বলে যে গল্প দেয়া হচ্ছে তা শত্ভাগ ভিত্তিহীন। চীন ঠেকানোর মজুরি হিসাবে আমেরিকার দেয়া উপহার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া – এই এটা ছাড়া এশিয়ায় ভারতের প্রভাব বলতে কোনদিনই কিছু ছিল না।  তবে নেহেরুর কিছু স্বপ্ন-কল্পনায় পোলাও-কোরমা খাওয়ার গল্প ছিল আমরা শুনেছিলাম যে, বৃটিশেরা ভারত ছেড়ে চলে গেলেও যেনবা নেহেরু সাব’কে কল্পিত ভাইস-রয় বা রাণীর প্রতিনিধিত্ব দিয়ে গেছিলেন। কল্পনায় নেহেরু এমন ভাব ধরে চলতেন অবশ্যই। আর তা থেকে নেহেরুর মধ্যে কলোনি-দখলদার এটিটুড এর যাত্রা! কাজেই এশিয়ার ভারতের প্রভাব বলতে এক মিছা স্বপ্ন-প্রভাব কথাটাই আমরা অনেকবার শুনেছি। নিজ বা অন্যদেশে প্রচুর বিনিয়োগের ক্ষমতা এটাই কোন রাষ্ট্রকে অন্যদেশের উপর প্রভাব-ধারী রাষ্ট্র হিসাবে হাজির করে। আর ঠিক এই  বিনিয়োগ সক্ষমতা জিনিষটাই ভারতের কোনদিন ছিল না, হয় নাই।

‘ভার্চুয়াল বৈঠক’ থেকে আশা করার আমাদের তেমন কিছু ছিল নাঃ
এসব দিক বিচারে ভার্চুয়াল বৈঠক থেকে বাংলাদেশের বিরাট কিছু পাওয়ার আশা হাসিনার ছিল তা মনে হয় না। কেবল স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পুর্তিতে ও তা পালনে ভারতের সাথে একটা অনুষ্ঠান করে আনুগত্য-প্রতিদান জানানো। আর আনুষ্ঠানিকভাবে যেটাকে সাত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা বলা হয়েছে এরই একটা হল, “নয়া দিল্লি জাদুঘরের সাথে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের সহযোগিতা”- এ নিয়ে একটা সমঝোতা স্মারকে হাসিনার আগ্রহ থাকতে পারে। এমন এক ব্যবহারিক কাজের প্রতি সম্ভবত সরকারের যা আগ্রহ ছিল। সেটার আর বিস্তারিত দিক হল, মহাত্মা গান্ধীর সমান্তরালে শেখ মুজিবকে নিয়ে এসে একটা ‘জাদুঘর শো’-এর আয়োজনের ব্যাপার আছে এখানে তাই। এ ধরনের কিছু ছাড়া ছাড়া বিষয় ছাড়া ঢাকা বা হাসিনার পক্ষ থেকে খুব কিছু আশা ছিল তা মনে হয়নি। বাকিগুলো সবই সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর ডেকোরেশন পিস।
তবে স্পষ্ট করেই আমরা সবাই নিশ্চিত থাকতে পারি, তিস্তার পানিতে আমাদের দেশের ভাগ বুঝিয়ে দেয়ার কোনো ইচ্ছা-পরিকল্পনা ভারতের কোনো দিন ছিল না, আজও নাই, আগামীতেও হয়তো হবে না যদিনা আমরা তাদের বাধ্য করার মেকানিজম বের করতে পারি।

বিপরীতে দিশা-হারানো ভারতঃ
এর বিপরীতে ভারতের অবস্থা ছিল বেদিশা, অপ্রস্তুত। তারা হয়ত বুঝছেন, না-বুঝার কারণ নাই বলে যে, এ’আমলে এসে বাংলাদেশ ক্রমশ তাদের ‘হাতের বাইরে’ চলে যাওয়া শুরু করে দিয়েছে এবং যাবেই। যেমন মিডিয়ার কথা যদি ধরি, ভারতের নিজের মিডিয়াগুলো একমত হতে পারেনি – কেন এই ভার্চুয়াল বৈঠক হচ্ছে। বরং অনেককেই মন্তব্য করতে দেখা গেছে যে, তারা লিখেছেন, গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের শীর্ষপর্যায়ের সাথে বাংলাদেশের তেমন যোগাযোগ বা সাক্ষাৎ নেই। অন্ততপক্ষে সেটা তো ভেঙেছে, এটাই নাকি ‘অনেক অর্জন’। এমন প্রায় একই অবস্থা বাংলাদেশেরই এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের। বুঝা যাচ্ছে তিনি ঢাকার এমবেসির ভালই প্রভাবাধীনে উটে বসেছেন। তাই যেন তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন কথা যে তাঁর কথার তালমিল  না থাকলেও জোর করে হলেও ভারতের স্বার্থের পক্ষে তাঁকে কথা বলতেই হবে। ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক ভাল হতেই হবে; এমনকি ভাল না হলেও ভাল বলতেই হবে। এমনই করুণার দশা তাঁর। বিবিসিকে তিনি বলছেন, “,……পানি বণ্টন, সীমান্ত প্রাণহানি, রোহিঙ্গা সংকট এবং করোনাভাইরাস মোকাবিলার মতো বিষয় আলোচনায় উঠতে পারে……তবে সেটা হোক বা না হোক, নানা ইস্যুতে দুই দেশের সমঝোতা স্বাক্ষর, বৈঠক ইতিবাচকভাবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন। তিনি আরও বলছেন,

“যে সমঝোতাগুলো স্বাক্ষরের কথা বলা হচ্ছে, আপাত: দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বা স্পর্শকাতর যে বিষয়গুলো রয়েছে, তার তুলনায় এগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে আমরা যে ট্রেন্ড দেখেছি,সেটা হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা। সেটা কিন্তু অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ”।

অথচ ঘটনা হল উলটা। ভারতের সাথে আমাদের অধীনস্ততার সম্পর্ক সেটা তো “দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ” না হলেই তো বরং ভাল! তাই নয় কি? বাস্তবতা হল, ভারত-বাংলাদেশের কথিত “ভাল সম্পর্কের” তাল কেটে গেছে অনেক আগেই। বড় কথা হাসিনা আর সেটা নিয়ে আমলও করছেন না। এখন সবকিছু চলছে “দেখন শোভা” আকারে। এই হল বাস্তবতা।
ওদিকে দ্য হিন্দু লিখেছে, “অবকাঠামো ও কানেক্টিভিটি প্রজেক্ট এই ভার্চুয়াল বৈঠকের ফোকাস” [Modi-Hasina summit to highlight infrastructure, connectivity projects]। এরাও আসলে দিবাস্বপ্নে আছেন। কারণ বাস্তবে এনিয়ে তেমন কোন উচ্চবাচ্যই হয়নি। আর আসলে এটা ছিল আসামকে রেলওয়ে করিডোর আরো পোক্তভাবে দেয়ারই একটা প্রকাশ, যেটা প্রকৃতপক্ষে শেখ হাসিনারই আগের কমিটমেন্ট এখন বাস্তবে পূরণ করে দেয়া। ভারতের বাকিরা, মানে সরকার ও মিডিয়া- এরা যেমন বাড়িয়ে বলা ছাড়া কোন ছাড়া কোনকথাই বলতেই পারেন না, তেমনি কিছু একটা যার যার মন-মত বলেছেন।
যেমন আরেকদল অন্ধের হাতি দেখার মত বলছেন, মোদীর ভারতের ‘পড়শির গুরুত্ব’  নাকি সর্বাগ্রে বা (Neighbor First) – এই বলে নাকি মোদীর এক নীতি আছে, আর এর উপরেই নাকি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দাঁড়িয়ে আছে। এসব শিরোনাম করেছেন অনেকে যেমন, দ্য প্রিন্ট [The Print], ওয়াইর [WIRE], ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস [Indian Express] বা থিংকট্যাংক ওআরএফ [ORF] এর মতন যারা তারা শিরোনাম করেছে, “নেইবার ফাস্ট” কথার মিথ্যা বাকচাতুরী থেকে। অথচ মোদীর এই নীতির ব্যবহারিক কার্যকারিতা কোথায় আছে আর সেটা  কী তা তারা কেউ বলতে পারবেন না। এমনকি এটাও তারা দেখতে পান না যে, তাদের “মহান ভারত” সামান্য কয়েক মাসের জন্য কয়েক টন পেঁয়াজের বাড়তি শুল্কের লোভও ছাড়তে পারে না; আগে থেকে বলতেও পারে না ঠিক কী করতে চায় পেঁয়াজ নিয়ে; বাংলাদেশের সাথে এনিয়ে একটা নিয়ম বা কমিটমেন্টেও আসতে পারে না। অথচ বাংলাদেশের দিকে দেখেন, যে আসামের জন্য বিনা পয়সায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের আসামে তেল পাইপলাইন, গ্যাস পৌঁছে দেয়া, বিদ্যুতের করিডোর, সড়ক, নৌ-করিডোর, বিনা পয়সায় বাংলাদেশের তিন বন্দর আসামে ব্যবহার করা হবে এবং প্রায়োরিটিসহ ইত্যাদি। অথচ সেই আসামই আবার ‘মুসলমান খেদাও’ এর আন্দোলন করবে, এনআরসি করবে! কিন্তু এরা সকলে মুখে বলবে সবই নাকি ‘পড়শি আগে’ বলে মোদীর নাকি এক নীতি আছে সে অনুযায়ী চলছে। আসলে তামাশার আর শেষ নেই! তারা কি কেবল তামাশাই ভালোবাসেন?
আর এ ব্যাপারে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে দ্যা প্রিন্ট বলে এক ওয়েব মিডিয়া। এখন করোনাকালে ভারতে মিডিয়ায় কর্মীদের বেতন দেয়াই কঠিন হয়ে গেছে। তাই যেন এই মিডিয়া এবার সরকারি মুখপাত্র সেজেছে। এছাড়া, সাথে পেজ বিক্রি বা সরকারি (গোয়েন্দা) প্রপাগান্ডার খেপ মারার কাজে লেগে পড়েছেন। ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’ প্রসঙ্গে এরা কমপক্ষে তিনটা রিপোর্ট করেছেন। এর মধ্যে একটা মারাত্মক ভুল এবং না বুঝা তথ্য দিয়ে লিখেছেন জ্যোতি মালহোত্রা [Jyoti Malhotra]।
সাধারণভাবে বললে, ভারতীয় মিডিয়া-কর্মীদের আত্ম-জিজ্ঞাসাও নাই। কোনো যাচাই বা জিজ্ঞাসাই নেই যে ভারত কী কোন গ্লোবাল অর্থনৈতিক শক্তি? তা কিভাবে বা কবে থেকে? আসলেই কী ব্যাপারটা সত্যি – এই যাচাইয়ের সাহস নাই। বরং উলটা তাদের ধারণা এটা যেন দাবি করার ব্যাপার। তারা জোরসে দাবি করলে বা ভাব ধরলে যেন তারা তা হয়েই যাবে! অথচ স্বাধীনভাবে যাচাই করলে বা সামান্য একটু চোখ-কান খুলে রাখলেই তাদের না বোঝার কোনো কারণ নাই যে, ভারত নিজেই অবকাঠামো ঋণ-গ্রহণকারী দেশ, এখনো। এই গণ্ডিই পার হয় নাই ভারত। আর সবচেয়ে বড় পরিমাণ এমন ঋণ তারা এখনো পেয়ে চলেছে চীন থেকে। অথচ ভারতের সরকার ও মিডিয়া ভাব করতে চায় উলটা – যেন ভারত বাংলাদেশের বিরাট ঋণদাতা। ব্যাপারটা যে কারও বুঝতে পারার সহজ উপায়টা হল, বাংলাদেশে ভারতের কোন প্রকল্প – এর মূল্যের দিকে নজর ফেলা। কারণ, দশটাকার হলেও সেটা প্রকল্প আর দশ বিলিয়ন ডলারের হলেও সেটা প্রকল্প। এমনিতেই গত ১০ বছরে ভারতের এমন প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে এর (কমিটমেন্ট দেয়া) দশভাগ অর্থও এখনো ছাড় করা হয়নি। ভারত-প্রিয় প্রথম আলো লিখছে, “তিন দফায় ৭৩৬ কোটি ডলার ঋণচুক্তির মধ্যে এখন পর্যন্ত অর্থছাড় হয়েছে মাত্র ৭০ কোটি ডলার”।  এছাড়াও এসব ভারতীয় ঋণের মুখ্য শর্ত হল, প্রায় সমস্ত পণ্য ও সেবা (মানে শ্রমিকও) ৮৫% ভারত থেকেই কিনতে হবে। মানে দাদা “…খেয়ে এসেছেন না গিয়ে খাবেন” তত্বের একদম খাঁসা প্রয়োগ।  মূলত একারণের ঋণের অর্থছাড়েও অগ্রগতি নাই। ফলে ভারতের সবদিকেই লাভ আর লাভ! এছাড়াও ভারতের এমন প্রকল্পে দেখা যাবে, প্রকল্পের মোট মূল্য ভারত হিসাব করে থাকে হাজার ডলারে। অথচ চীনের কথা বাদই দিলাম পশ্চিমাদেশের সবচেয়ে কম সামর্থের রাষ্ট্রটাও মিলিয়ন ডলারে ছাড়া দাতা বা ঋণ-প্রকল্পের কোন মূল্য হিসাব করে না। মানে হল, ইত্তেফাকের আনোয়ার হোসেন মঞ্জু যদি নিজ ভান্ডারিয়া উপজেলায় পানির ট্যাপকল বসানোতে ভারতের ৫ কোটি টাকা ব্যয়কে “বাংলাদেশে ভারতীয় প্রকল্প” বলেন,  সেটা তো যার আত্ম-লজ্জাবোধ নাই তাকে ঠেকানো যাবে না। শুধু তাই না এজন্য মঞ্জু সাহেব তিনি নিজে যদি হাইকমিশনারকে সাথে নিয়ে ভান্ডারিয়া ভ্রমণ করেন, তাতে এনিয়ে কিছু বলতে আমাদেরই লজ্জা লাগবে।

এক জ্যোতি মালহোত্রাঃ
দ্যা প্রিন্টের জ্যোতি মালহোত্রা তাঁর লেখায় বাংলাদেশের পদ্মা ব্রিজ তৈরি সম্পন্ন করার প্রসঙ্গ তুলেছেন। কথা সত্য, পদ্মা ব্রিজ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাথে প্রথম দিকে দুর্নীতির অভিযোগ (অনেক পরে বিশ্ববাংক নিজেই ঢাকা সরকারের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ কানাডার আদালত থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল।) তারা তুলেছিল। আর সেই তোলার পর থেকে শেষে পদ্মা প্রকল্পই বাতিল হয়ে গেলে সে সময় ভারত নিজেই আগ বাড়িয়ে বাংলাদেশকে এক বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অথচ এখন পর্যন্ত এনিয়ে ভারত আর পরে কখনো কথা এগোয়নি। কিন্তু জ্যোতি মালহোত্রা নিজে থেকেই তাদের রাজনীতিবিদ ও সরকারের প্রতি এমন গাধামির কমিটমেন্ট করা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু তা করেছেন সাথে কিছু ভুয়া তথ্যসহ। জ্যোতি তাঁর লেখায় শিরোনাম করেছেন, ‘ভারত না, চীন বাংলাদেশে ব্রিজ বানিয়েছে; কিন্তু মোদী সরকার মনে করছে সবকিছু এখনো হাতছাড়া হয় নাই” [China, not India, builds a bridge in Bangladesh, but Modi govt believes all is not lost yet”]। মালহোত্রার ধারণা ও ভাবটা হল তিনি এমন শিরোনাম করে বিরাট এক “বুদ্ধিদীপ্ত জ্ঞানের কথা” বলেছেন।
এখানে ‘ব্রিজ’ বলতে তিনি পদ্মা ব্রিজ বুঝিয়েছেন। কিন্তু সত্যটা হল, চীনা অর্থে বাংলাদেশ পদ্মায় মূল ব্রিজটা বানায়নি। বরং এই মূল অংশের পুরোটাই বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থ। অবশ্য এর নির্মাণ ঠিকাদার চীনা এক কোম্পানি China Railway Major Bridge Engineering Group Co, Ltd (MBEC)। কিন্তু সাবধান। তারা এই মূল ব্রিজের কেবল ঠিকাদার, কোনো অর্থদাতা নয় আমরা আশা করব ও ধরে নিচ্ছি যে ভারতের বাকি মিডিয়াকর্মীরা ঠিকাদার আর ঋণদাতার ফারাক নিজে বুঝতে পারেন, এমন যোগ্যতা তাঁদের আছে। এছাড়া মূল ব্রিজের উপর দিয়ে গাড়ি চলার ব্যবস্থা থাকলেও  এর নিচ তলায় আলাদা করে কেবল রেল প্রকল্পের (রেললাইন পাতা) কাজ সম্প্রতি শুরু হয়েছে। কিন্তু এই অংশের কাজটার জন্য বাড়তি প্রায় ২.৬৭ বিলিয়ন ডলার চীনা ঋণ নেয়া হয়েছে [$2.67b loan deal signed with China]। কিন্তু রেলওয়ের ঠিকাদারও আবার ওই মূল ব্রিজ বানানোর ঠিকাদারই। কাজেই জ্যোতির বক্তব্য সঠিক নয়।
আবার লক্ষণীয় এই যে, ভারতকে চীনের সাথে তুলনা করা আরেক আহাম্মকি। যদিও সবসময় ভারতের সাংবাদিকেরা সব সময় এটাই করে থাকে। যেমন এনিয়ে শিরোনামে “সবকিছু এখনো হাতছাড়া হয় নাই” জ্যোতির  এমন কথার অর্থ কী? তিনি কী মোদীকে অভিযোগ করে বলছেন, ভারত আমাদেরকে চীনের মত ব্রিজ বানায়ে দেয় না কেন? বা এখনও দিতে পারে? এর মানে ব্যাপারটা কী এতই সহজ যে, মোদী সরকার চাইলে এখনো বাংলাদেশের উপর চীনের মতোই প্রভাব বিস্তার ঘটাতে পারে। অথচ জ্যোতি কথাটা বলছেন কোনো রকম স্টাডি বা পড়ালেখা না করে। প্রভাব-বিস্তারের সক্ষমতা ভারতের কেন নাই তা নিয়ে কোন বুঝাবুঝি না জড়ো করেই। এটাই ভারতীয় সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
আবার, এই ‘প্রভাব বিস্তার’ কথার মানে কী? পড়শি রাষ্ট্রকে চাপ দিয়ে যেনতেন একটা চুক্তি করিয়ে নেয়া? ভারত-নেপাল অথবা ভারত-ভুটান চুক্তির মত? অথচ কথাটা হল, বড় অর্থনীতির যে রাষ্ট্র চলতি সময়ে সারপ্লাস একুমুলেশন বা উদ্বৃত্ত সঞ্চয়  সবাইকে ছাড়িয়ে বেশি করে চলেছে, সেই আসল প্রভাবশালী রাষ্ট্র। এখনকার ভারত এমন কোন রাষ্ট্র নয়। এটা না হলে সে কখনো দুনিয়ায় প্রধান প্রভাব-বিস্তারি এবং গ্লোবাল অর্থনীতির নেতারাষ্ট্র হতে পারবে না; হবে না। টানা গত ৭৫ বছর ধরে আমেরিকা এসব শর্ত পূরণ করে তবেই নেতা হয়ে টিকে ছিল। এটা জোর খাটিয়ে নেপাল বা ভুটানের উপর নেহরুর নয়া কলোনিশাসক হওয়ার চেষ্টা নয়। সে জন্য পড়াশুনা না করলে ‘প্রভাব বিস্তার’ কথাটার অর্থ বোঝা যাবে না। এরই পরিণতি হল, ভারতে একেকটা নেহরুর জন্ম ও তার ‘কলোনি শাসক’ হওয়ার চিন্তা। যে নেহরুরা মনে করেন দুইটা রাষ্ট্রের মধ্যে একমাত্র সম্পর্ক হল, একটা আরেকটার ওপর প্রভাব বিস্তার করে সেটাকে অধীনস্থ করা বা কলোনি বানানো। তুরস্কের নিউজ-এজেন্সি টিআরটি ভারতকে এই ‘কলোনি বুঝ’ ত্যাগ করতে পরামর্শ দিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ভারত কী এখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় সারপ্লাস একুমুলেশনের রাষ্ট্র? একেবারেই না, মোটেও নয়। এটা জানা ভারতের মিডিয়া বা নেতাদের জন্য কোনো কঠিন কাজ নয়। আর ভারতের সাংবাদিকেরা এর ভাব ধরলে বা ভান করলে এই অর্জনটা হয়ে যাবে না, হওয়া যাওয়ার অইথ এ যায় নয়। তাহলে?

এ ছাড়া আরো এক বড় অসঙ্গতি হলো, এ যুগে (হিন্দু) জাতিবাদী রাষ্ট্র হয়ে এটা অর্জন করা যাবে না। কারণ (হিন্দু) জাতিবাদ মানেই হলো, ব্রাহ্মণ্যবাদ ও এর জাতপ্রথায় সক্রিয় থাকা এক সমাজ। কারণ এটা দুনিয়ার চরম বৈষম্যের প্রকাশ। তাই এই সামাজিক রীতি বৈষম্যহীন নাগরিক-সাম্য রাষ্ট্রের সাথে স্ববিরোধী সংঘাতপূর্ণ ধারণা। এ ছাড়া জাতিবাদী চিন্তার বড় অনুষঙ্গ হলো, জাতিরাষ্ট্র বা কথিত ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের’ ধারণা। জাতীয় স্বার্থ যে অনুসরণ করে তার পক্ষে সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। কারণ সাংবাদিকতায় ফ্যাক্টসের ওপর দাঁড়াতে হবেই। কথিত জাতির (রাষ্ট্রের) স্বার্থকে প্রধান বিবেচ্য বলে গণ্য করে ফ্যাক্টসের ওপর দাঁড়ানো না-ও হতে পারে। সাংবাদিকতা ক্যাডার সার্ভিসের চাকরি নয়। অথচ ভারতে সবচেয়ে বড় করে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েই ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের সাংবাদিকতা’ করেন দ্য প্রিন্টের সম্পাদকসহ ওই মিডিয়ার সবাই। খবরের সত্য-মিথ্যা নয়, দেশপ্রেমের নামে মালহোত্রাসহ সবাই সাংবাদিকতা করছেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী হিন্দুত্ববাদ যেটাকে জাতির স্বার্থ মনে করবে সেটি প্রকৃত রাষ্ট্রস্বার্থ নাও হতে পারে। কারণ এটা তো আসলে একটা কূপমণ্ডূক দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি। সেটিকে ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলে সাংবাদিকরা মানতে বাধ্য হতেই পারেন না।

জ্যোতি মালহোত্রা আরেক কী কারণে আমাদের ডেইলি স্টারের সম্পাদককে খুব পছন্দ করেছেন মনে হচ্ছে। তিনি এই সম্পাদকের সাক্ষাৎকার (যেটা আসলে সাক্ষাতকার না বলে অনধিকার ও অত্যাচার বলা ভাল) নিয়েছেন। আমরা এর একটাই কারণ অনুমান করতে পারি, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মাহফুজ আনাম বাংলাদেশে আমেরিকার হস্তক্ষেপের পক্ষের সক্রিয় প্রবক্তা ছিলেন। হয়ত সেই সূত্রে। এছাড়া আনাম সাহেব পদ্মা সেতুর মূল কাঠামোর কাজ সমাপ্তির দিনে এবার তিনি প্রধানমন্ত্রীকে এক দেবীর আসনে বসিয়ে গত ১১ ডিসেম্বর এক মন্তব্য-কলাম লিখেছিলেন। সেসব কথাগুলোই আবার জ্যোতি মালহোত্রা তাঁর লেখায় ‘কোট’ করেছেন। যাই হোক, মাহফুজ আনামকে জ্যোতির প্রশ্নে বা সেই উছিলায় দাবি হল – ভারত বাংলাদেশকে ১৯৭১ সালে স্বাধীন হতে সাহায্য করেছে। কাজেই আমরা ভারতকে ফেলে চীনের প্রভাবে যাচ্ছি কেন বা চীনা ঋণে ঢুকতে যাচ্ছি কেন? জ্যোতি সাক্ষাতকার এমন আগ্রাসী ও অসৌজন্যতাপুর্ণ আদব-হীন প্রশ্নে ভরপুর ছিল। যেন তিনি ভারতের হয়ে আমাদেরকে জবাবদিহিতা চাইতে এসেছেন! সোজা করে বললে, এটা আসলে জ্যোতি মালহোত্রার এক দিকে গাধামি প্রশ্নের উছিলায় করা এক বেয়াদবি। অপর দিকে এটা মারাত্মক অনধিকার চর্চা।

“১৯৭১ সালে সাহায্য” বলে যে ইঙ্গিত জ্যোতি দিচ্ছেন এর মানে কী? আমরা একাত্তর সালে ঐ কথিত সাহায্য নিয়ে ভারতের কলোনি হয়ে গেছিলাম? জ্যোতি কি তাই দাবি করছেন? তাহলে তো আমাদের অভিযোগ-মুল্যায়ন সঠিক যে, নেহরু আমল থেকেই ভারত আদতে একটা কলোনি দখলদার হতে চাওয়া মনোভাবের ও নীতির রাষ্ট্র। অথচ ভারতকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ নিজে একটা সার্বভৌম রাষ্ট্র তাই সে কেন কী করবে, এর জবাবদিহিতা কাউকেই দিবে না। সে প্রশ্নই উঠে না। কাজেই জ্যোতির তার অনধিকার আর গাধামি প্রশ্ন করা বন্ধ রাখা উচিত। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা যত ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ বিষ ভিয়েতনামে বিমান থেকে ছিটিয়েছে, এর কোনো তুলনা নেই। যার কারণে এখনো ভিয়েতনামি মা-বাবাদের  বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হয়। অথচ এখনকার ভিয়েতনাম-আমেরিকা সম্পর্ক সে সময়ের চীন-ভিয়েতনামের ঘনিষ্ঠতম সম্পর্কের চেয়েও ভালো। কাজেই কলোনি মানসিকতা অবিলম্বে ত্যাগ করে ভারতের সাংবাদিকদের বরং আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে তাদের উচিত চোখ কান খুলে পড়াশোনা করা।

তাহলে মোদী কেন ভার্চুয়াল বৈঠকে এসেছিলেন?
বাস্তবত এটা আর তার অজানা নয় যে বাংলাদেশ ক্রমেই ভারতের মুঠো থেকে বের হয়ে যাচ্ছে এবং যাবেই। কিন্তু মোদীর সবচেয়ে বড় সমস্যা হল তিনি সেকথা তাঁর ভোটার কনস্টিটিউয়েন্সির কাছে স্বীকার করতে পারবেন না। কারণ তিনিই তার সরকারের সব বৈদেশিক সম্পর্ককে আভ্যন্তরীণ নির্বাচনি ইস্যু করে হাজির করেছেন। বলা ভাল মাখায় ফেলেছেন। তিনি এপর্যন্ত  নিয়মিত দাবি করে গেছেন যে তাঁর হিন্দুত্ববাদের চরম দেশপ্রেমের কারণে তার সরকারের বৈদেশিক সম্পর্কগুলোতে তিনি চ্যাম্পিয়ান। অতেওব এখন তার ধরা খাওয়ার সময়। তাই বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ক ঢিলা হয়ে গেছে এটা স্বীকার করার সোজা ফল হবে রাহুল গান্ধীসহ বিরোধীদেরকে সাহায্য করা, ফলাফলে তিনি নিজে ভোট হারাবেন। তাই এই ভার্চুয়াল বৈঠক করে তিনি আবার তার ভোটারদের কাছে এটা তুলে ধরে দাবি করবেন যে, না বাংলাদেশ আগের মতোই “ভারতের প্রভাবাধীনে” আছে। তার লাভ এতটুকুই। তবে ভোটে এর প্রভাব মোদীর জন্য অনেক মূল্যবান! সার কথায়, এটা তাই পরস্পরের ‘পিঠ চুলকে দেয়া’র ভার্চুয়াল বৈঠকও বটে!

তবে “ফুটানির ভাণ্ডটা ফুটা” করে দিয়েছেন তৌহিদ হোসেন। বিবিসিকে তিনি বলেছেন, “…… পানি বণ্টন, সীমান্ত সঙ্ঘাতের মত ইস্যুতে আলোচনা বা সমঝোতা না হলে অন্য এসব ইস্যু ততটা গুরুত্ব বহন করে না” – এমনটাই  মনে করছেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো: তৌহিদ হোসেন।’

ধুর্ত মিথ্যাবাদী জ্যোতি মালহোত্রাঃ
জ্যোতি লেখা আর্টিকেল দেখে মনে হবে মোদী যেন তাকে বাংলাদেশে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডার করার জন্য ভাড়া করেছেন। জ্যোতিকে যেন দেখাতেই হবে বাংলাদেশের ভারতের তথা মোদী সরকারের প্রভাব কমে নাই মোদী এখনও ফাইট করে যাচ্ছেন। তাতে কূট, ধুর্তামি বা মিথ্যা বলে হলেও জ্যোতি তা করতে হবে। জ্যোতি লেখার শিরোনামের একাংশে লেখা ছিল এখনও সব শেষ হয়ে যায় নাই [Still, all is not lost]।  এটা বলে তিনি কী বুঝাতে চাচ্ছেন?
সেটা জ্যোতি তার লেখার ভিতরে বলেছেন এভাবেঃ
Bangladesh has recently told China to get lost or pay up for the trials of the Chinese Covid vaccine in Bangladesh, while signing an agreement with India’s Serum Institute to buy three crore doses. অর্থা্ৎ তিনি দাবি করছেন – যে চীনা ভেকসিন [SINOVAC বা সাইনোভ্যাক] বাংলাদেশেরও পরীক্ষায় অংশ নেয়া ও শেষে তা পাবার কথা ছিল সেই প্রসঙ্গে – জ্যোতি মালহোত্রার দাবি বাংলাদেশ নাকি চীনকে (বা সাইনোভ্যাক) বলেছে  “হয় দূর হও নাহলে টাকা দেও”। অথচ ফ্যাক্টস হল জ্যোতি তাঁর এই দাবির পক্ষে কোন প্রমাণ দিতে পারেন নাই। এমনকি কোথায় এমন কথা বলেছে তাও তিনি দেখাতে পারেন নাই।  অর্থাৎ তিনি সরাসরি  মিথা প্রপাগান্ডা করেছেন। তাহলে ব্যাপারটা আসলে কী?

কথাটা হল, সাইনোভ্যাক একটা চীনা প্রাইভেট কোম্পানি হলেও চীনা সরকারের কো-অরডিনেশনে বাংলাদেশের ওর ট্রায়ালের শেষ বা তৃতীয় পর্যায়ে সামিল হবার প্রস্তাব পেয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এই প্রস্তাবের পক্ষে  সময়ে সাড়া দিতে না পারায় সাইনোভ্যাক অন্য দেশকে ঐ জায়গায় সামিল করে নিয়েছে। ফলে বাংলাদেশে অনেক দেরি করে সাড়া দেওয়াতে এবার ফান্ড যোগাড়ের সমস্যা দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশ সাইনোভ্যাকের ভ্যাকসিন পাওয়া থেকে বাদ পরে যায়।

এরপরে শুরু হয়ে যায় কার ভুল বা ব্যর্থতায় বাংলাদেশ বাদ পড়ল এনিয়ে দোষ ঠেলাঠেলি। আর ওদিকে ভারত ও আমেরিকান মিডিয়াও আগ্রহী হয়ে উঠে চীনকে দায়ী বা ব্যর্থ প্রমাণ করার জন্য। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীও প্রকারন্তরে বাংলাদেশের দায় ঠেলার জন্য  ভারতের মিডিয়াকে নিজের স্বার্থে ফেবারেবল ভাবতে থাকে।

রয়টার্স সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য গ্লোবাল নিউজ এজেন্সির একটা, কিন্তু ইন্ডিয়ান রয়টার্স এটা বাদে। কারণ, যেকোন ইস্যুতে ভারত সরকারের ভাষ্যের সাথে সাংঘর্ষিক হয় এমন নিউজ তারা তারা যতই সত্য হোক প্রচার করতে পারে না।  তাই এই সাইনোভ্যাক ইস্যুতে ভারত সরকার প্রভাবিত যে নিউজটা বাজারে এসেছে সেখানেও ইন্ডিয়ান রয়টার্স লিখেছেঃ

Sinovac informed the health ministry in a letter, seen by Reuters, that a delay in approvals in Bangladesh had resulted in funding getting reallocated to trials in other countries.

ঠিক এই কথাটাই উপরে আমার ব্যাখ্যায়ও আছে। মূল কথা delay in approvals, আমরা সাইনোভ্যাককে অনুমোদন দিতে দেরি করেছি। আর সেই সাথে এতে funding getting reallocated  অর্থাৎ ফান্ড অন্যদেশের নামে স্থানান্তর হয়ে যায়। এদুই কথার সোজা মানে আমাদের সময়ে সিদ্ধান্ত না পারাই সব ব্যররথতার উৎস।

কিন্তু ইন্ডিয়ান রয়টার্স-সহ ইন্ডিয়ান ও আমেরিকান বেনার নিউজ এই সুযোগে শিরোনাম বা নিউজ করেছে – Bangladesh will not co-fund Sinovac’s vaccine trial। কেন? 

অনুমান করা যায় বাংলাদেশ বাদ পরার পর বিকল্প কী আছে জানতে কৌতুহল হবে। এর জবাবে ফান্ড যেহেতু নয়া পরিস্থিতিতে মুল সমস্যা তাই ফান্ড যোগাড়ের কথাই তো সবদিক থেকে আসবে। তাই এবার নিজের মান বাঁচাতে ও দোষ ঠেলতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অজুহাত খাড়া করে ভারত ও আমেরিকান মিডিয়াকে অনেক কথার সাথে বলছেন, “বাংলাদেশ সাইনোভ্যাককে কো-ফান্ড করব না” । এতে ভাবটা এমন যেন  সব প্রস্তাব ভেস্তে গেছে হঠাত করে সাইনোভ্যাকের অর্থ চাওয়াতে। এভাবে খবরটা উপস্থাপন করলে ঐ দুই মিডিয়াই চীনবিরোধী মিথ্যা প্রপাগান্ডার সুযোগ তারা নিতে পারে ও তারা নিয়েছে। আর এমন ব্যাখ্যা না হোক এমন কথা টুইস্ট করার কারণে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজের দায় এড়ানোর কিছু সুযোগ পেয়ে যান। কিন্তু তবু ইন্ডিয়ান রয়টার্সকে স্বীকার করতেই হয়েছে মূল সমস্যা – “বাংলাদেশের সময়ে সিদ্ধান্ত না পারা”।
আর এথেকেই ধুর্ত মিথ্যাবাদী জ্যোতি মালহোত্রা সিদ্ধান্তে গিয়েছেন ভারতের জন্য এখনও সময় আছে [Still, all is not lost]।  আর একেবারেই  বানানো কথা যে বাংলাদেশ নাকি চীনকে বলেছে ,হয় দূর হও নাহলে টাকা দেও। জ্যোতি তবু রেফারেন্স দিয়েছে  ভারতের এক ছোট ওয়েব মিডিয়া লাইভ-মিন্ট থেকে। সেখানে সরাসরি “told China to get lost or pay–  এমন কোন শব্দ বা বাক্য নাই।

তো এখন তাহলে বাংলাদেশে ভারতের জন্য সবকিছু হারায় না – কথাটার জ্যোতি মালহোত্রার বিশেষ অর্থ কী হতে পারে? যে ভারত এখন তাহলে ভারত বাংলাদেশকে ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে? তাই কী? এটাই কী জ্যোতি মালহোত্রা মোদীকে ম্যাসেজ দিচ্ছেন?

আগেই বলেছি ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী দেশপ্রেমের মিথ্যা নাটক তাদেরকে বাস্তব থেকে দূরে রাখে। কোন কিছু শিখতেও দেয় না, আগ্রহীও করে নাই। তথ্যের ব্যাপারে তারা গাধা-গরুই থেকে যায়। তথ্য সামনে তাকলেই নিজেই শিখে নেয় না। জ্যোতি মালহোত্রা কী জানেন না ভারতের হয়ে আসা বাংলাদেশকে দুলাখ শিশি কিন্তু কেবল একলাখ মানুষকে দেয়া যাবে এমন ভ্যাকসিনে কী হয়েছে? তিনি নিশ্চয় জানবেন ঐ ভ্যাকসিন ভারতের না, ইউরোপ থেকে প্রতিটা তিন ডলারে কিনে তা তারা বাংলাদেশকে পাঁচ ডলার করে বেচবেন। এই হল ভারতের বাংলাদেশকে কথিত ভ্যাকসিন দানে ভারতের কৃতিত্ব!

বাস্তবতা হল, দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতা হয়ে থাকার প্যারা বা হেপাও প্রচুর।  চীন হবু নেতা, এছাড়া ফান্ডও যোগাড় করা তার জন্য তুলনামূলক সহজ। তাই একটা আশা থাকবে তবে বাংলাদেশকে পারসু করতে হবে মানে চীনকে হেদায়েত করতে জানতে হবে যেন সে বাংলাদেশের ভ্যাকসিন ফান্ড যোগাড় বা পাবার ব্যাপারটাতে নজর দেয়। আমাদেরকে সাহায্য করে।  আরেকটা হতে পারে পশ্চিমা দাতব্য ফান্ড – বিল গেটস সহ আর যারা এব্যাপারে দাতব্য ফান্ড যোগাড়ের চেষ্টা করছেন, তাঁদের টা।

আর জ্যোতি মালহোত্রাকে বুঝতে হবে এই হল বাস্তব দুনিয়া যারা বা যেটা ফান্ডের সম্ভাব্য উৎস। বাংলাদেশের ফান্ড লাগবে মানেই বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব বাড়ানোর জন্য দুয়ার খুলেছে তা সত্যি না, বাস্তব নয়। প্লিজ হুশে আসেন! এছাড়া শকুনের বদ-দোয়া বা অভিশাপে সমাজে বেশি বেশি করে গরু মারা যায় না!  যাবে না! কোনদিন তা হবে না!  আপনি বা আমি পছন্দ-অপছন্দ যাই করি কিংবা নাই করি না কেন, তবু চীন গ্লোবান নেতা হবে; চীন সামর্থবান হয়েছে আরও পোক্তভাবে হবে। কারণ এটাই নৈব্যক্তিক (objective reality) বাস্তবতা! কাজেই ঈর্ষা বা হিংসা শেষ করেন, ইতি টানেন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত ১৯ ডিসেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “মোদি কী পেতে ভার্চুয়াল বৈঠক” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s