‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ


‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ
প্রথম পর্ব

গৌতম দাস

২৫ মার্চ ২০২১

https://wp.me/p1sCvy-3n4

 

সাতচল্লিশের দেশভাগ মানে যখন নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছিল আর সেকথার সোজা মানে হল এমন রাষ্ট্রজন্ম হওয়াতে বৃটিশ জমিদারি ব্যবস্থাটাই উচ্ছেদ হয়ে যায়।  আর এথেকেই সারা পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রজারা জমির ভোগদখল (কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে) লাভ করে। ফলে বাস্তবত পুর্ববঙ্গ আলাদা নিজেই (এক পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ অর্থে)  এক রাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতে আগের জমিদারদের হাতে জমিদারী থাকার কাগজপত্র থেকে গেলেও কার্যত তারা সব জমিই হারিয়ে ফেলেছিল। মূল কারণ, এবার  জমিদারেরা আর রাষ্ট্রক্ষমতার কেউ নয়। মুসলীম লীগ এর ক্ষমতায়। ফলে আক্ষরিক অর্থেই এটা জমিদারী-উচ্ছেদের এক বিপ্লব ছিল।  যদিও আইনিভাবে এই জমিদারি উচ্ছেদ হয় পরে ১৯৫১ সালের ১৬ মে East Bengal State Acquisition and Tenancy Act of 1950 এই আইনে, পুর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক সংসদে তা পাশ হওয়াতে। সবচেয়ে মনে রাখার মত ঘটনাটা হল এই বিপ্লব ঘটেছিল তথাকথিত কোন কমিউনিস্ট পার্টির হাতে নয়। বরং যাকে প্রগতিবাদীরা উঠতে বসতে “সাম্প্রদায়িক দল বলে গালাগালি করে”, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করল বলে নিন্দা ও তুচ্ছ করে  সেই মুসলিম লীগের নেতৃত্বে। তবে মুল কথা আজকের বাংলাদেশের সারা ভুখন্ডের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে (ততকালীন প্রজারা যারা আমাদের দাদা নানা বা পুর্বপুরুষ) জমির মালিক হয়েছিল যারা যে যেই জমি প্রজা হিসাবে চাষাবাদ করত সেই জমির খাজনা নতুন পাকিস্তান সরকারকে পরিশোধ করা সাপেক্ষে সেই সেই জমির মালিক এবং ভোগ-দখল ও উত্তরাধিকারিকে হস্তান্তরকারি মালিক হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। ঐ ১৯৫১ সালের আইন এখন বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের অংশ গণ্য করা হয়।

কিন্তু বিরাট ট্রাজেডিটা হল, এভাবে ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই জমি পেয়েছিল কিন্তু কেউ অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক সংগঠন বা ব্যক্তি, গ্রুপ কেউ পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম যে সঠিক হয়েছিল অন্তত জমিদারি উচ্ছেদের ফলে যে তারা বাসিন্দারা জমির মালিক হয়েছিল এই কারণে অথবা, এই কৃষি-বিপ্লবের তাতপর্যকে স্মরণ করে – এমন সাফাই-বয়ানের ভিত্তিতে কোন ইতিহাস, কেউ লেখে নাই। স্কুলে পাঠ্যপুস্তক রচনা করে নাই। এর বদলে স্কুলে পড়ানো হয়েছে প্রগতিশীলতা, জমিদারদের বয়ানে লেখা  ইতিহাস ইত্যাদির যা কলকাতায় পড়ানো হত সেই ইতিহাস বই। 

উনিশশো সাতচল্লিশ সালের দেশভাগ;  মানে কলোনি ‘বৃটিশ-ইন্ডিয়া’ ত্যাগ করে চলে যাবার সময় বৃটিশ শাসকদের এই কলোনিকে ভারত ও পাকিস্তান এ’দুই স্বাধীন রাষ্ট্রে ভাগ ও ক্ষমতা হস্তান্তর করে দিয়ে যেতে হয়েছিল। এঘটনাই সাধারণ্যের মুখের ভাষায় ‘দেশভাগ’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান ছিল হিটলারের জর্মানের পক্ষশক্তি,  কিন্তু যুদ্ধে তারা উভয়ে (সাথে মুসোলিনি-সহ)) মিলে হয় পরাজিত শক্তি। আর ঐ  পরাজয়ের পর জাপানের ফাইনাল সারেন্ডারের দিন ছিল ১৫ আগষ্ট ১৯৪৫। তাই এঘটনার সাথে মিল রেখে, এর দ্বিতীয় বার্ষিকী ১৫ আগষ্ট ১৯৪৭, এই দিনেই স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বাধীনতা দিবস বা ক্ষমতা হস্তান্তর দিবস হবে বলে ঠিক করা হয়েছিল।

দেশভাগ কী খারাপ কাজ, নেতি ঘটনাঃ
দেশভাগ মানে সেটা একদিক থেকে বিচারে বৃটিশ “ভাইসরয়” এর ক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে যাওয়াও বটে। ইংরাজিতে ব্যবহৃত Viceroy বা Vice-roy শব্দটা ফরাসি “vice-king” থেকে এসেছে। কিন্তু ভাইস-রয় আমাদের প্রেক্ষিতে অর্থ কি?
ভারতে বৃটিশ শাসনের প্রথম প্রায় একশ বছর (১৭৫৭-১৮৫৮) আমরা ছিলাম “বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির” দখল-শাসনে। আর পরে ১৮৫৮ সালের ২ আগষ্ট, থেকে ঐ দখল-শাসন শেষ পর্যন্ত সরাসরি বৃটিশ রাজসরকারের শাসনের অধীনে চলে যায়। শেষের সেই শাসন ছিল আরও প্রায় নব্বই বছরের, ১৯৪৭ এর আগষ্ট পর্যন্ত। আর ঐ বৃটিশ-শাসকপক্ষের সর্বোচ্চপদ বা রাজা/রানীর মুখ্য প্রতিনিধির পদকে বলা হত “ভাইসরয়”। কথাটা আসলে ভাইস-রয় (রয়েল শব্দকে ছোট করে নেয়া অংশ হল ‘রয়’ সম্ভবত সেজন্য; অথবা অনেকে মনে করেন ফরাসি ভাষায় আরওআই (roi) – এই ‘রয়’ মানে রাজা;  সেখান থেকে) অথবা বাংলা করে বললে, ভাইসরয় মানে রাজা/রানীর প্রতিনিধি। ভারতের শেষ বৃটিশ ভাইসরয় ছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটন। তিনি চেয়েছিলেন নতুন দুই স্বাধীনদেশেরই ক্ষমতা হস্তান্তরের অনুষ্ঠানে তিনি নিজে উপস্থিত থাকবেন। তাই একই দিনে অনুষ্ঠান না করে একদিন আগে ১৪ আগষ্ট ১৯৪৭ পাকিস্তানে ক্ষমতা হস্তান্তর অনুষ্ঠান উৎযাপন করা হয়েছিল। আর পরদিন ১৫ আগষ্ট ভারতে তা করা হয়েছিল।
এরপর ভারত ও পাকিস্তান নামে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দুইদেশ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটাকেও প্রচলিত জনপ্রিয় ডাকনাম হিসাবে ‘দেশভাগ’ বলে ডাকার চল শুরুও হয়। অনেক সময় একাদেমিকভাষাতেও “দেশভাগ’ শব্দটা ব্যবহার হতে দেখা যায়। যদিও এর সাথে এক অনুষঙ্গ অনুমানও থাকতে দেখা যায়।  অল্পকিছু  ব্যতিক্রমে সেই অনুমানটা হল, “দেশভাগ” জিনিষটা একটা খুবই নেগেটিভ ঘটনা বা খারাপ কাজ। মানে দেশভাগ শব্দ ব্যবহারকারি বক্তা যেন বলতে চান যে দেশভাগ হওয়াটা ভাল হয় নাই, না হলে ভাল হত। ফলে যাদের কারণে দেশভাগ হয়েছে তারা যেন খারাপ লোক। এদিকটা আমরা এখানে পরখ করে দেখব আসলে তা  সত্য কিনা বা কতটা সত্য।

কিন্তু দেশভাগ ঘটনাটা কেন ঘটল আর ঘটনাটা খারাপ বা নেতিনাচক ঘটনা কিনা সে আলাপে একটু পরে যাব। এর আগে, দেশভাগ খারাপ – একথার মানে কী? এটা বলে ঠিক কী বুঝাতে চায়? ব্যাপারটা কী এরকম যে এই দেশভাগ কেউ চায় নাই, চাওয়ার পক্ষে কেউ ছিল না, এমন? কিন্তু না, এটা তো হতেই পারে না!  কারণ চাহানেওয়ালা পক্ষ কেউ যদি নাই থাকে তবে দেশভাগ বা বৃটিশ-ইন্ডিয়া ভাগ হল কেন? তাই ভাগ যেহেতু হয়েছে অতএব চেয়েছে এমন জনগোষ্ঠিও অবশ্যই ছিল এবং তারা উপেক্ষিত হবার মত অল্প জনসংখ্যার তা মনে হবারও কোন কারণই নাই। তাহলে এরা কারা? এখান থেকেই আমরা কথা শুরু করব।

কথাটা উলটা করে বললে, কারা মনে করেন দেশভাগ ইতিবাচক এবং কী নির্ণায়ক-বৈশিষ্ট দিয়ে তাদেরকে আলাদা করা বা চিনা যাবে? অনেকের মনে অনুমান হতে পারে অন্তত যারা নবগঠিত স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েছিলেন নিশ্চয় তারা সকলে দেশভাগ হওয়াকে সঠিক ও আপন ভাবতেন! না খুবই সরি। এই অনুমানও ভিত্তিহীন, অন্তত পুরা না আংশিক সত্য। যদিও একেবারে জন্মের পরপরই পাকিস্তানের মুসলমান জনগোষ্ঠীর কাছে দেশভাগ আপন ঘটনা ছিল অবশ্যই। তবে, এটা পুর্ব পাকিস্তানে যতটা না পশ্চিম পাকিস্তানে তার চেয়ে শতগুণই  আপন মনে করা হয়েছিল।  পশ্চিম পাকিস্তানের যারা বাসিন্দা হলেন তারা ভারত থেকে আলাদা রাষ্ট্র হওয়াটাকে নিজেদের জন্য একটা বড় অর্জন বলে মনে করে এসেছে, এখনও করে। যে কারণে, পশ্চিম পাকিস্তানের বাইরে যারা আমরা, এই আমরা যাই মনে করি না কেন ঐ পাকিস্তানের ভিতরে সর্বত্র আজও তাদের পাকিস্তান রাষ্ট্রলাভের প্রতীক হয়ে আছেন জিন্নাহ। এবং তা অবিতর্কিত “জাতির পিতা” পরিচয়ে; তিনি পাকিস্তানের সকল দলের রাজনীতিতে ও দলের কাছে এক অবিতর্কিত গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। যদিও পুর্ব-পাকিস্তানে ব্যাপারটা একবারেই ভিন্ন। সে প্রসঙ্গে ধাপে ধাপে আসছি।

পাকিস্তানের পুব আর পশ্চিমের জমির মালিকানা ধরণ একেবারেই ভিন্ন ছিলঃ
এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার। পুর্ব-পাকিস্তান আর পশ্চিম-পাকিস্তানের জনগোষ্ঠির মধ্যে দেশভাগ ব্যাপারটা নিয়ে অনুভব-অনুভুতির প্রতিক্রিয়ায় মধ্যেও একটা বড় ভিন্নতা ছিল। যে ভিন্নতার মূল কারণ হল ভুমি মালিকানা ব্যবস্থার দিক থেকে পুব ও পশ্চিমের অবস্থা একই ছিল না। দুশ বছরের বৃটিশ শাসনামল জুড়েই পুর্ববঙ্গ (মানে আসলে এখনকার পশ্চিমবঙ্গসহ সারা-বঙ্গও) ছিল ভুমি মালিকানা ব্যবস্থা্র দিক থেকে বৃটিশ শাসনের প্রবর্তিত “জমিদারি” মালিকানা ব্যবস্থা । যার আবার  বেশিরভাগ জমিদার মালিকেরা ছিল হিন্দু। মানে মুসলমান জমিদার কিছু ছিল বটে;  কিন্তু সেটা যেন ব্যতিক্রম। যেমন এভাবে বলা যায় জমিদারদের নিজেদের ‘কমন স্বার্থ’ কী হবে তা নির্ধারণে মুসলমান জমিদারদের কখনও কোন ভুমিকা বা বক্তব্য ছিল এমন জানা যায় না। আর এর বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানে ভুমি মালিকানা ব্যবস্থাটা ছিল ট্রাডিশনাল;  যেটা মোগল আমল থেকে চলে আসছিল। যেটার মূল বৈশিষ্ট হল,  মোগল শাসক অথবা তার প্রতিনিধিকে আপন  ভোগদখলে থাকা জমির খাজনা দেয়া সাপেক্ষে আপনিই জমির মালিক। আর মালিক বলতে, খাজনাদাতার নামেই জমির টাইটেল জারি হত। তাতে কোথাও কোথাও বিশাল বিশাল জোতদার যাদের স্থানীয় ভাষায় ‘জাঠ’ এথনিক গোষ্ঠি বলা হয়, এদের দখলি জমির পরিমাণ আকাশ ছোয়া। যেমন পাকিস্তানের ৬৪% জমি ৫% জোতদারের মালিকানায়, এমন ইউটিউব বর্ণনা দেখতে পারেন। আবার পশ্চিম পাকিস্তানের প্রথম জমির সিলিং [ceiling, জমির মালিকানা থাকার পরিমাণ]  বেধে দেয়া হয়েছিল। আয়ুবের হাত ধরে ১৯৫৯ সালে সেখানে আরোপিত সিলিং দেয়া হয়েছিল সেচ সুবিধার জমির বেলায় ৫০০ একর আর না থাকলে ১০০০ একর পর্যন্ত জমির মালিকানা বৈধ। এর মানে এই সিলিং আরোপের আগে কেমন জোতদারি ছিল তা অনুমেয়। সারকথায় জমির মালিকানার প্রশ্নে  এসবই ছিল পাকিস্তানের পুব আর পশ্চিমের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফারাক। তবে জমিদারি ব্যবস্থা থাকা আর না থাকা ছিল এক বড় রাজনৈতিক ফারাকের কারণ। তবে আমাদের এখানকার আলোচনার জন্য মুল কথা পুর্ব পাকিস্তানে জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থা।

কাদের কাছে দেশভাগ কাম্য ছিলঃ
আমরা কথা বলছিলাম, দেশভাগকে ইতিবাচক বা কাম্য – এভাবে দেখার লোক কারা ছিল তা নিয়ে। সারা ভারতের প্রেক্ষিতে হিন্দু জনসংখ্যা সেকালে সংখ্যাগরিষ্ট ছিল। যেমন ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে পর্যন্ত সারা ভারতে মোট মুসলমান জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২৫%।  তাই সব মিলিয়ে এসবের কারণে বৃটিশ আমলে – হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক আধিপত্য ছিল সমাজের প্রায় সর্বত্র। এমনকি কেবল পুর্ববঙ্গকে বিচারে নিলে হিসাবে মুসলমানেরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ট হলেও এখানেও সেই একই – হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক আধিপত্য পুর্ববঙ্গেও বজায় ছিল। এর পিছনের আরও কারণ  – যেভাবে বৃটিশ-ভারতের রাজধানী কলকাতার উত্থান ঘটেছিল, সেদিকে তাকাতে হবে।

তত্বগত কথা হল,আধুনিককালের যেকোন রাজধানী মানেই যেখানে তুলনায় তা অন্যান্য প্রদেশ বা জেলাগুলো রাজধানীর চেয়ে অবকাঠামোর দিক থেকে হয় কম উন্নত বা পিছিয়ে পড়া। তাই পিছিয়ে পড়া এলাকার রাজধানীমুখি হওয়া খুবই কমন ঝোঁক। গ্রামে জমি থেকে উতখাত হওয়া লোকেরা রাজধানীতে কাজ-পাওয়ার সুযোগ-সুবিধা নিতে ও ভাগ্য-অন্বেষণে রাজধানীতেই এসে ভীড় করে থাকে। ফলাফলে রাজধানী এক নতুন ধরণের মিশ্র জনগোষ্ঠির নতুন (আধুনিক) ভাষা্র শহর হয়ে উঠে। কিন্তু কলকাতা সেদিক থেকে বেশ ব্য্যতিক্রম। কলকাতা বৃটিশ সংস্পর্শে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগা প্রথম প্রহরের ঘটনা এমন রাজধানী কলকাতা বলে সুবিধা পেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু আবার এর বাইরে আরেক দিক হল, কলিকাতার সাথে বাকি ভারত তো বটেই এমনকি বাকি বঙ্গের সবধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই দুর্বল, পিছিয়ে পড়া ও অবিকশিত। এমনটা বজায় থাকার কারণে কেবল মূলত স্থানীয় বাংলা প্রেসিডেন্সির শাসক শ্রেণীই এখানে রাজধানীতে প্রভাব-আধিপত্য জমিয়ে বসার সুযোগটা নিয়েছিল। কিন্তু এরাই বা কারা?

সারা বাংলা সমাজের প্রধান উতপাদন ব্যবস্থা ছিল কৃষিকাজ আর পরে (১৭৯৩ থেকে) ভুমি মালিকানা ব্যবস্থা জমিদারি বলে, জমিদার হিন্দুরাই বৃটিশ-কলোনি ক্ষমতার কোলে বসে ও ঔরসে কলকাতার শাসক শ্রেণী হয়েছিল। আর সেখান থেকেই কলকাতা মানে তা হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের কলকাতা শহর হয়ে উঠেছিল। আবার আরেক দিক থেকে বলা যায় ভারত মানে সবসময় বর্ণহিন্দুর জাতপ্রথার [cast system] শাসনটাই যেন আবার “জমিদার হিন্দু” এই নতুন নামে ও জমিদার-প্রজা সম্পর্কের ঢংয়ে চেপে বসেছিল। যদিও আবার এর ভিতরেও আরেক ভাগাভাগি বজায় থাকতে দেখা যেত। প্রজা বলতে সারা বাংলার হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধরণেরই প্রজা থাকলেও তাঁদের মধ্যে আরেক বড় ভাগাভাগি ছিল। সেটা কেমন বা কেন?

প্রজাদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান ভাগ থাকলেও হিন্দু প্রজারা জমিদার হিন্দুদের সাথে ‘কালচারাল নৈকট্য’ অনুভব করত। মানে জমিদারদের কালচারাল হেজিমনি বা আধিপত্য আছে তা হিন্দু-প্রজাদেরও সুবিধা নেওয়ার সুযোগ আছে অনুভব করত। ফলে তাদেরও মুসলমান প্রজাদের উপর (অর্থনৈতিক স্টাটাসে সমগোত্রীয় হলেও) আধিপত্য আছে –  জমিদারদের এই কালচারাল ক্ষমতার শেয়ার হোল্ডার তাঁরাও এবং তাঁরা সম্বন্ধযুক্ত বলে অনুভব করত। তারা মুসলমান প্রজাদের চেয়ে সামাজিক মর্যাদায় উপরের বলে স্থান ও বিবেচনা নিজেরা মনে করত এবং তা দাবি ও চর্চা করত। জমিদারের বৈঠকখানায় আগত হিন্দু প্রজারা মুসলমান প্রজাদের তুলনায় আলাদা ভাল ট্রিটমেন্ট পেত বলে এমন অনুভবের পিছনে এটা একটা কারণ মনে করা যায়। যেমন মুলমান-প্রজাদের মাটিতে বসানোর বন্দোবস্তের বদলে হিন্দুপ্রজাদের আলাদা শতরঞ্জিপাতা আসন, মুসলমান প্রজাদের দেয়া সস্তা নারকেলের মালার হুকার বদলে পিতলের হুকা,ভাল তামাক ইত্যাদি পেত। অর্থাৎ জাতপ্রথার প্রবল বলবত থাকার প্রভাব ও অজুহাতে মুসলমান প্রজাদের সামাজিক মর্যাদা-অবস্থান হিন্দু নমশুদ্র বা চর্মকারেরও চেয়েও অন্তত আরেক ধাপ নিচে বিবেচনা করা হত।
আর এভাবেই কেবল জমিদার হিন্দুর দাপট ও পরিচয়ে সে একমাত্র শাসক ও শ্রেণীর আধিপত্য, এই ধারণা বলবত রেখেছিল। যদিও   কলকাতার জয়া চ্যাটার্জির ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত মূল ইংরাজি বই “Bengal Divided” [Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932-1947] , যার অনুবাদ বইয়ের নাম  “বাঙলা ভাগ হল”,সেখানে এদেরকেই “বাংলার হিন্দু ‘ভদ্রলোক’ বা এলিট” বলে তিনি চিনিয়েছেন।

কেন কলকাতা ব্যতিক্রম কী অর্থেঃ
কিন্তু কেন কলকাতা ব্যতিক্রম হতে পেরেছিল? এর আরেকটা বড় ফ্যাক্টর ছিল। এখানে জমিদার হিন্দু যাদেরে বলছি ইংরাজী [race] রেস এবং [ethnic] এথনিক এই দুই অর্থেই জাতি বুঝলে এই জমিদার এরা কোন ‘জাতি’? এর জবাব হল, জমিদারি ব্যবস্থা চালু হওয়াতে যে শাসক-ক্ষমতা সে ক্ষমতার বলে এরা নিজেদের ‘বাঙালি’ বলে এক নতুন পরিচয় নির্মাণ করেছিল ও পরিচয় দিত। কথাটাকে ‘তারা বাঙালি ছিল’ এতটুকু না বলে, এভাবে সরাসরি না বলে ঘুরিয়ে বলার কারণ আছে। পুব-পশ্চিম বঙ্গ এবং এই সারা ভুখন্ডের হিন্দু ও মুসলমান মিলে যে সারা বঙ্গ অঞ্চল, তারা সকলে মিলেই যে ‘বাঙালি রেস’, সারা দুনিয়া বাঙালি বলতে এদেরকেই চিনে, তাই একথাটাতে অস্বীকার করার কিছু নাই। তাই তো হবারই কথা।

কিন্তু কলোনি-ক্ষমতা্র ঔরসে উত্থিত কলকাতা, জমিদারের কলকাতা সেটা মেনে উত্থিত হয় নাই। প্রথমত,আগেই বলেছি কলকাতা – সমাজের ক্লাসিক্যাল ডেভেলবমেন্ট যেমন কোন স্বাভাবিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও পরিণতির অর্থে যেমন বলা হয় – ‘একুমুলেশন অব ক্যাপিটাল’ বা সারপ্লাস যেখানে সঞ্চিত হয় এমন নদীতীরের কোন গঞ্জ বা শহর অর্থে কলকাতা কোন শহর নয়, ছিল না। যে অর্থে কলকাতা কলোনি প্রভাব ও সংস্পর্শের বাইরে গড়ে উঠা অর্থে ভারতেরই কোন শহর নয়। যেমন মোগল আমলেই  মানে প্রাচীন ভারত কলোনি মাস্টারের হাতে পড়বার আগেই – হায়দ্রাবাদ, লক্ষ্ণৌ বা দিল্লি বড় মোগল শহর হিসাবে হাজির ছিল। কিন্তু কলকাতা তা ছিল না। মানে  কোন কলোনিদখলকারির ছোঁয়া লাগার ছাড়াই, সুনির্দিষ্ট করে বৃটিশেরা ভারতদখলের আগে থেকেই ভারতে অনেক বড় শহরের জন্ম হয়ে গেলেও কলকাতা সে তালিকার কেউ নয় বা তালিকায় ছিল না। তাই হায়দ্রাবাদ, লক্ষ্ণৌ বা দিল্লি মোগল আমলেই বড় শহর, এগুলোকেই স্বাভাবিক পরিণতির শহর বলছি। আর বিপরীতে  কলকাতা এসবের বাইরে ছিল বৃটিশের হাতে গড়ে উঠা শহর। অর্থাৎ যেমন আফ্রিকায় কলোনিদখলের ফেনোমেনা। ওখানে কলোনিদখলের আগে আফ্রিকায় নিজ শহর বলতে যা বুঝায় এমন কিছু কোন আফ্রিকান দেশে ছিল না। বরং প্রায় সবদেশের বেলায় তারা কলোনি মাস্টারের হাত ধরে আফ্রিকানেরা প্রথম শহর কি তা  গড়েছিল ও চিনেছিল। আমাদের কলকাতার বেলায় তার অনেকটাই সত্য।

এই সুবিধাটাই কলকাতার জমিদার হিন্দুরা নিয়েছিল। এই শহরের স্থানীয় শাসক শ্রেণী হিসাবে নতুন উত্থিতরা হল এই জমিদারেরা । যেটাকে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনের (জমিদারি আইন ) ফলাফল বলা যায়। এছাড়াও এতে দুটা জিনিষ এই জমিদার হিন্দুরা নতুন আকার ও সংজ্ঞা দিয়ে নিয়েছিল। তা হল, একটা হিন্দুস্বার্থের চোখে কারা বাঙালি? আর কারা নয়? আর বাংলা ভাষা কোনটা বলতে কোনটা বুঝাবে? এদুটাই তারা একক হাতে ও সংকীর্ণ স্বার্থের চোখে  নির্ধারণ করে নিয়েছিল।

না একথা বলা বাতুলতা হবে যে বৃটিশেরা আসার আগে অতীতে বাংলার কোন কোণে ভাষা কী কী কতদুর বিকশিত হয়েছিল সেটা কেমন, আর্কিলজি বা প্রাচীন ইতিহাসে কী পাওয়া গেছে অথবা চাই কী চর্যাপদ কী ইত্যাদি। না, আমি এসবের কথা  এখানে তোলা হচ্ছে না। বরং আগেই বলেছি জমিদার হিন্দু শাসকেরা এরা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবার আগে বাংলায় কি ছিল সেটা যাই থাক সেটা এখানে আলোচনার প্রসঙ্গ নয়। আসলে তাদের কলকাতায় তাঁরা মূলত বাঙালি কারা এর এক নতুন আকার ও সংজ্ঞা দিয়ে নিয়েছিল, তাতে বৃটিশেরা আসার আগে আমরা কী, কেমন ছিলাম বলে যে যাই বুঝি না কেন। আর এখান থেকে জমিদার হিন্দুর তত্বাবধানে নির্ধারিত হয়েছিল এক নতুন আকার ও সংজ্ঞা যে, বাঙালি কারা, বাংলাভাষা কোনটা। আর এদেরই স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল –  “মুসলমানেরা বাঙালিই নয়”। এটাই কলোনি-কলকাতার বাঙালির সংজ্ঞার মৌলিক দিক। আর সংস্কৃত ঘেঁষা করে আর সংস্কৃত-ব্যকরণ-সম্মত করে (সাথে ইংরেজ পাদ্রী ধর্মপ্ররচারকদের স্বার্থে ও তাদের হাতে) যে বাংলা গদ্যভাষা খাঁড়া করা হয়েছিল তা নিয়ে এমনকি রবীন্দ্রনাথেরও আপত্তি ছিল।

আধুনিক শব্দটা অদ্ভুত, এটা সবচেয়ে ভাল অপ-ব্যবহার হয় কাউকে আধুনিক নয় বলে দাবি করে কোন ফতোয়া দেয়া হয়। এরপর অতএব সে নিশ্চয় “পশ্চাতপদ”, এটা প্রমাণ হয়ে গেছে বলে দাবি করা যাতে বিপরীতে, বক্তা নিজেকে ‘প্রগতিশীল’ বলে প্রমাণ করতে ও তুলে ধরতে সক্ষম হয়। এসব বদ-মতলবের বাইরে বর্ণনা অর্থে “আধুনিক ভাষা” বলে একটা ধারণা-শব্দ ব্যবহার করব। বলাই বাহুল্য এটা রেনেসাঁর পরিণতি অর্থে যে আধুনিক ধারণা,  সে অর্থেও ব্যবহার করা হচ্ছে না।

আইডিয়েল চোখে যখন আমাদের ভুখন্ডের সকল অংশের, সকল জেলা বা অঞ্চলের প্রতিনিধি সকলকে রাজধানিতে হাজির রেখে কমবেশি সকলের প্রভাব ও মিশ্রণে একটা ভাষা উত্থিত করার চেষ্টা করা হয় সেটাকে আধুনিক বাংলা ভাষা। তবে এর সাথে  আরেকটা বড় ফ্যাক্টর অর্থনৈতিক বিকাশও থাকে। যে অর্থে শহর বা নগর মানে  হাঁটুরে গঞ্জের চেয়েও আরো বড় ‘গঞ্জ’ মানে accumulation of Capital  বা উদ্বৃত্ব সঞ্চয়ের কেন্দ্র যেখানে ঘটে বা হয়ে উঠে সেটাই শহর বা নগর। এটাই বুর্জোয়া [bourgeois] সিভিল সোসাইটি জন্মাবার বৈষয়িক পুর্বশর্ত। যা এরপর নগর রাষ্ট্র, রিপাবলিক ইত্যাদির হওয়ার দিকে রওনা দিতে পারে যদি না তা বিদেশি কলোনিদখলদারদের হস্তক্ষেপের খপ্পরে না পড়ে।

তবে এখানে আলোচনায় এটাকে আধুনিক বলার সুত্র এটাই যে সারা বাংলাদেশের সব জেলা অঞ্চলকে রাজধানীকেন্দ্রিক করে বসবাস শুরু করানোটা চাট্টিখানি কথা নয় যে এটা চাইলেই করা যায়। যেমন এখনকার ঢাকাকে বলা যায় তুলনামূলক পারফেক্ট রাজধানী। কারণ অন্তত ১৯৮২ সালের পর থেকে আস্তে আস্তে বাংলাদেশের সব অঞ্চলের সাথেই এর যোগাযোগের সব ব্যবস্থাই ভাল বলে সব অঞ্চলের লোক এখন ঢাকায় পাওয়া যাবে। বর্তমানে ঢাকার কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় একাদেমিক ও কালচারাল পাড়াগুলোর অলিগলি পর্যন্ত দেশের সব অঞ্চলে লোকেদের একসেস বা যাতাযাত আছে; পৌছাতে পারে। ফলে সব আঞ্চলিক ভাষারই ঢাকায় প্রবেশ ও পৌছানো এখন অনেক সহজ। ফলে ঢাকায় বাংলা ভাষা বলে যেটা ক্রমশ দাঁড়াচ্ছে তাকে প্রভাবিত করার সুযোগ এখন বাংলাদেশের সব অঞ্চলের ভাষার হাতের কাছে আছে। এখন যেকোন অঞ্চলের ভাষার বা কোন একটা অঞ্চলের শব্দে এর ভাবপ্রকাশের সক্ষমতা যত প্রবল  বা তা যত ‘কমিউনিকেটিং’ (এক্সপ্রেসিভ অর্থে) সেই ভাষা বা শব্দ অন্যদের উপর প্রভাব ফেলবে তত বেশী। অন্য সকলে সেই আঞ্চলিক শব্দ আপন করে নিবার সম্ভাবনা তত বেশি। এমন এই আদর্শ সুযোগটা ১৯৮২ সালের আগে বাংলাদেশে ছিলই না। এরপর ইকোনমিক বা কাঠামোগত প্রশাসনিক সংস্কারের কারণে আস্তে ধীরে এটা বদলাতে শুরু করে আজ  এই জায়গায় এসেছে।

আর ঠিক এর উল্টাটা ঘটেছিল কলকাতায় মোটাদাগে সেই ১৮০০ সালের আশেপাশের সময় থেকেই। সেসময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থাটাই পুরাটাই যেন এমন প্রিমিটিভ স্তরে ছিল যে ফলে অব্যবস্থার সুযোগটা কাজে লাগিয়ে জমিদার হিন্দু শ্রেণী যাকে ইচ্ছা বাদ দিয়েছে, বাঙালি জাত ও ভাষা কোনটা তা নিজের একক ইচ্ছা ও খেয়ালে হস্তক্ষেপ ও নির্ধারণ করে নিতে পেরেছিল।

সারকথায় যার পরিণতি, এটাকে আমরা বলতে পারি বাংলার সমাজের প্রায় অর্ধেক অংশকে শাসক জমিদার হিন্দু “মুসলমানেরা বাঙালি নয়” বলে তাদেরকে জমিদার হিন্দুর মার্জিনালাইড প্রজা মাত্র করে রাখার সুযোগ নিয়েছিল।

মানুষের রেস (জাতি) পরিচয় বিষয়টা ডিএনএ সংশ্লিষ্ট যাকে প্রচলিত কথায় ‘রক্তের সম্পর্ক বলি’ সেই সম্পর্কিত ও জাত। তুলনায় ধর্মীয় পরিচয় যেটা এথনলজিক্যাল বা নৃতাত্ত্বিক অর্থে যুগ যুগে তৈরি সামাজিক পরিচয়। কারও রেসিয়াল পরিচয় বদলানো যায় না, তুলনায় ধর্মীয়-সামাজিক পরিচয়গুলোর খুবই স্বল্প কিছু বদলে যেতে পারে। কাজেই জাত পরিচয়ে যে বাঙালি সে আবার মুসলমান ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণের কারণে রেসিয়াল বাঙালি থেকেও মুসলমান মানে বাঙালি-মুসলমান হতে পারে। পুরা বাঙালি জনগোষ্ঠির এই অর্ধেক  ছিল মুসলমান-বাঙালি যার মধ্যে আবার পুর্ব বাংলায় তারা সংখ্যাগরিষ্ট। অথচ এদেরই কোনঠাসা করতে জমিদার হিন্দুরা তাদেরকে বাঙালি রেসের (race) অংশ মানতে অস্বীকার করেছিল। কিন্তু কী এসে যায় যেখানে কোন রেস পরিচয় যা আসলে মূলত বদলানো বা অস্বীকারেরই অযোগ্য। সেই জবাব তারা জমিদার হিন্দু বা এইচিন্তার উত্তরসুরিদের পরবর্তিতে দিয়েছিল। পুর্ববঙ্গ বা একালে বাংলাদেশে এরাই ১৯৭১ এক সশস্ত্র যুদ্ধ করে এই মুসলমানেরা  নিজেদের “বাঙালি” এবং একই সাথে মুসলমান বলে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিল ব্যাপকভাবে নাড়া ফেলে দিয়ে। কারণ মা আর সন্তানের প্রথম কথোপকথন কোন ভাষায় শুরু হবে সেটা যেমন বদলানো যায় না এটা তেমনই বদলানো যায় না। কলোনি-জমিদার আমল থেকেই মুসলমানদেরকে বাঙালি বলতে অস্বীকৃতি যতটা তীব্র হয়েছিল ১৯৭১ সালে এটাই ততোধিক বেগে – মুসলমানেরাই সেই প্রকৃত বাঙালি যারা ভাষার জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে পারে তা প্রমাণ করে ছেড়েছিল। ফলে তারা রেসিয়াল ও এথনোলজিক্যালি বাঙালি কীনা এই স্বীকৃতি কারও থেকে চায় নাই। নিজেই প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে।

কিন্তু তবু, একালে আরএসএসের উত্থান, গায়ের জোর খাটিয়ে সব ইচ্ছামত করে ফেলবে এমন এক জবরদস্তির হিন্দুত্বের যুগ। তেমনই সময়কালে এবছর ছিল বিদ্যাসাগরের জন্মশতবার্ষিকী। ওদিকে হিন্দু সংহতি বলে আরএসএসের এক অঙ্গসংগঠন যারা গত অন্তত চার বছর ধরে প্রকাশ্যে জনসভা করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নাম ধরে উস্কানি তৈরি করে চলেছে। ফেসবুক পেজে তাঁদের ভারচুয়াল উপস্থিতি দিয়ে তারা এবার সেপ্টেম্বরের ২০২০ এর শেষে বাংলাদেশিদের কাছে পৌছে গিয়ে আক্রমণ শুরু করেছিল। তাঁদের শ্লোগান ও বক্তব্য ছিল এমন যেন তা সেই কলোনিযুগে জমিদার হিন্দুর বয়ানেরই পুনঃআবির্ভাব। বক্তব্য গুলো এমনঃ
ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ হ‌ওয়ার পরে এই পশ্চিমবঙ্গ হল বাঙ্গালী হিন্দুর ন্যাচারাল হোমল্যান্ড। অর্থাৎ এই মাটির মালিক হল হিন্দু বাঙ্গালীরা। তাই পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় সম্পদের উপরে অধিকার সর্বপ্রথমে হিন্দু বাঙ্গালীর। পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ক্ষমতার স্বাভাবিক উত্তরাধিকার হিন্দু বাঙ্গালীর”।
“বাংলাদেশী ভাষা পৃথক করো, সনাতনী বাংলা রক্ষা করো।
বিদ্যাসাগরের বাংলাকে বিকৃত করে যে ভাষা আজ বাংলাদেশে চলছে তাকে কি বাংলা ভাষা বলা যায়?”
May be an image of text that says '২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, রাত ৮-૦૦ বাংলাদেশা ভাষা পৃথক করো সনাতনী বাংলা রক্ষা করো আলোচনাসভা: বিদ্যাসাগরের বাংলাকে বিকৃত করে যে ভাষা আজ বাংলাদেশে চলছে তাকে কি বাংলা ভাষা বলা যায়? বক্তা: দেবতনু ভট্টাচার্য দেব চট্টোপাধ্যায় মিতালি মুখার্জী স্মৃতিলেখা চক্রবর্তী সপ্চালক: রজত রায় হिনদू সংগতি আয়োজনে: হিন্দু সংহতি f LIVE'

আরএসএস-এর  অঙ্গসংগঠন “হিন্দু সংহতি”  নামে এই সামাজিক সংগঠন, উপরে এই সংগঠনেরই ফেসবুক লিঙ্ক দেয়া হয়েছে। তাদের এসব কথার জবাব একটাই, যে পুর্ববঙ্গ বা একালে মুসলমান অধ্যুসিত বাংলাদেশ একে,  কলকাতার জমিদার হিন্দুরা কোন কালেই তারাও “বাঙালি” এই স্বীকৃতি দেয় নাই; আমরা তা চাইও না, অপেক্ষাও করে নাই। বরং আমরা তাদের কেয়ার করি নাই কখনও। আমরাই আমাদের রেসিয়াল ও এথনিক পরিচয় নির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে যা নিজেই এখন এক স্বাধীন রাষ্ট্র। অর্থাৎ আমরা তো বিদ্যাসাগরের বাংলা বলে যদি কিছু থেকে থাকে এর থেকে বাইরে এবং অছ্যুত। আর আমরাও কী কলকাতার স্বীকৃতি কখনই চেয়েছি? বরং আমরা নিজেই প্রজা-বাঙালির বাংলাদেশ গড়ে নিয়েছি। অতএব বিদ্যাসাগরের বাংলা বলে আরএসএসের কোন প্রকল্প থাকলে আমরা একে কেয়ার করি না, পাত্তা দেই না। বরং পরামর্শ থাকবে দূরে থাকেন। দাদাগিরি করতে এসেন না। চাইলে হিন্দুগিরি করেন কিন্তু কেবল কলকাতার উপরে সীমাবদ্ধ থেকে, যদি কলকাতার তা সহ্য হয়। এদিকে আমরা নিজেকে নিয়ে খুবই ভাল আছি। আর ভারতীয় হিসাবে  কলকাতার সমস্ত দায় এবং আবর্জনা সবই কলকাতারই!

সব ক্রিয়ারই নাকি প্রতিক্রিয়া থাকে,থেকে যায়।  আসলে কথাটা হল ফোলানো বেলুন টিপাটিপির মত। এর কোন  একদিকটা চাপ দিয়ে ধরলে তাতে প্রতিক্রিয়ায় অন্যদিকটা বেশি ফুলে যাবে। প্রতিক্রিয়া ঘটতে অনেক সময় হয়ত তা ফেবারেবল সুযোগের অপেক্ষা করে। আপনি কাউকে যেমন ট্রিট করবেন, নিচা দেখাবেন কী পায়ের নিচে পিষবেন, অপমানে কোনঠাসা মার্জিনালাইজ করবেন তার পুরাটা না হলেও এরই বড় কিছু প্রতিক্রিয়া এরপরে আপনার উপর পালটা আসবেই। সেটা চিন্তা করে তাই এর মুখোমুখি হতে আগেই তৈরি থাকতে পারেন! আপনি হয়ত তখন নাকিকান্না করবেন, কী ভিকটিম হিসাবে পুরান সেই দাপুটে আপনি এবার নিজেকে ভিকটিম হিসাবে ভিকটিমহুড দেখিয়ে তুলে ধরে দেখিয়ে উলটা সহানুভুতি তৈরির চেষ্টা করবেন, এমনটাই সাধারণত দেখা যায়। ঠিক এই জিনিষটাই যেন ঘটেছিল পাকিস্তান আন্দোলনের পরিণতিতে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েমের পরে। কারণ পাকিস্তান মানে তার পুর্ব-পাকিস্তান অংশে মানে, আগের পুর্ব-বঙ্গে স্থানীয় শাসক যে জমিদার হিন্দু ছিল, পরে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে বলাই বাহুল্য এবার আগের ঐ জমিদার হিন্দুদেরই এতদিনের আয়েস ও লালিত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য যুগের অবসান ঘটেছিল, অন্তত পুর্ববঙ্গে বা পুর্ব-পাকিস্তানে। আরও এতে বিশাল রাজনৈতিক এক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল। যা এই অঞ্চলের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল পুর্ববঙ্গীয় বাসিন্দাকে উল্টপালট প্রভাবিত করেছিল। তবে পরিবর্তন মূলত সবই পুর্ববঙ্গে। দেশভাগে পুর্ববঙ্গে যখন জমিদার-হিন্দু শাসন ক্ষমতা ও আধিপত্য হারিয়েছিল তখনও বাংলার অপর অংশ পশ্চিমবাংলায় তাঁদের আধিপত্য কিন্তু আগেরর মতই অটুট ছিল। তাই প্রথম প্রতিক্রিয়া হিসাবে তারা পুর্ব-পাকিস্তান থেকে পশ্চিমবঙ্গে মাইগ্রেশন বা স্থানান্তরিত হয়ে যায়। আর এটা শুধু জমিদার হিন্দু বা এলিট হিন্দুরাই নয় বরং জমিদারের ব্যাপক প্রজা-হিন্দুরাও এথেকে বাদ পরে নাই। আর তা মূলত এতদিন  প্রজা-হিন্দুরা যারা জমিদার-হিন্দুর সাথে “কালচারাল নৈকট্য” অনুভব করে  মুসলমান-প্রজার উপরের স্তরের জাতবিভাগের অবস্থানের অজুহাতে সব সুবিধা নিয়েছিল সেসব – বলা যায় এবার কাফফারা হিসারে যেন সুদে-আসলে উসুল হয়ে এসেছিল। ফোর্স মাইগ্রেশন অবশ্যই খারাপ, কখনই তা কাম্য নয়। কিন্তু পুর্ববঙ্গের প্রজা-হিন্দুরা সাময়িক “কালচারাল নৈকট্য” এর আধিপ্ত্যের মজা খেতে গিয়ে লং-টার্মে নিজেদের জন্য নিজেই এর ভিকটিমে পরিণত করেছিল।  এরপর  আজও যে ৮-১০% হিন্দু বাংলাদেশ অবশিষ্ট আছে তারা সেই থেকে নিজের দুঃস্থ অবস্থা এই ভিকটিমহুডকে বিক্রি করে যতটা প্রভাব তৈরি করা যায় এর উপর দাঁড়িয়ে বেচে থাকার চেষ্টা করে চলেছে। পাকিস্তান পেরিয়ে আজ বাংলাদেশ রাষ্ট্র – এটাও নেহেরু-গান্ধীর ভারতের মতই আরেক নেশন স্টেট যার সারকথা হল, ব্যাপক নাগরিক বৈষম্য। বিশেষত ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যবহারিকভাবে এই চরম অসাম্য চর্চা হতে দেখা যায়।  যার একমাত্র সম্ভাব্য সমাধান জাতি-রাষ্ট্রের বদলে নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নিয়ে পুণর্গঠন। যদিও রাষ্ট্রগঠনের এসব দিক নিয়ে সচেতনতা এখনও রাজনীতিতে এমনকি একাদেমিক পাড়াতেই নাই, কোথাও নাই।  এবং বিশেষত এই না থাকার আসল কারণ কমিউনিস্ট চিন্তার ক্ষতিকর আধিপত্য। বিশেষত ষাট থেকে আশির দশক পর্যন্ত কমিউনিস্ট আধিপত্য। যারা আজও রাষ্ট্রগঠনের এদিক নিয়ে আলোচনা বা বুঝাবুঝি করতে অযোগ্য। কারণ তারা এসব আলোচনাকে “বুর্জোয়া” বা “ডানপন্থি” বলে দেখিয়ে এসেছিল। সেসব এক অবুঝ ও নাদানদের  দুর্দশা হয়ে আছে এখনও।  আর মূলত “শ্রেণী রাষ্ট্রের” বা রাষ্ট্রের শ্রেণী বৈশিষ্টের কথা জোর দিয়ে তুলতে গিয়ে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণার মৌলিক দিক নাগরিক অধিকার ও নাগরিক সাম্য প্রতিষ্ঠার  কাজটাই তুচ্ছজ্ঞানে বাদ দিয়ে গেছে। কেবল রাষ্ট্রের শ্রেণী বৈশিষ্টের বুঝ খোদ রাষ্ট্রচিন্তা বলতেই তা এক দানবীয় স্বৈর এমনকি কখনও অবলীলায় এক ফাসিজমের ধারণায় পরিণত হয়েছে। কমিউনিস্টরা জনপ্রতিনিধিত্ব বা পাবলিক রিপ্রেজেন্টেশন ধারনাটাই তুচ্ছ ও অপ্রয়োজনীয়-জ্ঞান করে হারিয়ে ফেলেছে।  বাস্তবে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে কমিনিস্ট-প্রগতিশীলতার নামে এরাই আজ অচল “জাতি-রাষ্ট্র” ধারণার প্রধান প্রবক্তা।

এভাবে কী হতে হবে সেয়ালাপে আপাতত ছেদ দিয়ে একটু পিছনে ফিরা যাক। আসলে ১৯৪৭ এর দেশভাগ বলে যা পরিচিত, এতে পুর্ববঙ্গের জমিদারি ছেড়ে কলকাতা চলে যাওয়াতে তার ফেলে আসা জমিদারি বা জমি সেটা তো তখন আরেক রাষ্ট্র বা ওর অংশ হয়ে গেছে। সারকথায় যার উপর পশ্চিমবঙ্গ কেন ভারতেরও আর ওন কর্তৃত্ব বা এক্তিয়ারই নাই হয়ে গেছিল। ইতোমধ্যে কালক্রমে পুর্ব-পাকিস্তানের প্রাদেশিক পার্লামেন্টে ১৭৯৩ সালের পুরানা জমিদারি আইন (চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন) বাতিল করে ১৯৫১ সালের ১৬ মে নতুন প্রজাস্বত্ব আইন (ল্যান্ড একুজেশন এন্ড টেন্যান্সি এক্ট ১৯৫০) পাশ হয়ে যায়। এই জমিদার উচ্ছেদ আইন এখনও বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের অংশ হয়ে আছে। আর এতে জমিদারির শেষ ক্ষমতাটুকু অন্তত পুর্ব-পাকিস্তানে তা বাতিল ও চিরসমাপ্তি লাভ করেছিল। আর এরই ফলাফলে পুর্ববঙ্গে আগে যারা প্রজা বা ভাগচাষী ছিল তারা তখন থেকে সরকারকে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে আগের চাষাবাদের জমিরই মালিক বলে আইনি স্বীকৃতি পায়, তাঁদের নামেই টাইটেল জারি হয়। জমিদারি ব্যবস্থা চালুর আগে যে টাইটেল প্রজাদের নামেই ছিল। আর এই আইনটা তৈরির সময় যে সাধারণ ফর্মুলা অনুসরণ করে তৈরি বা মেনে করা হয় তা হল, (এখনও বাংলাদেশের জমি অধিগ্রহণ আইন আছে এটা সেটাই) অধিগ্রহণ আইন  অনুসারে পাবলিক ইন্টারেস্টে বা জনস্বার্থে, সরকার যেকোন জমি “অধিগ্রহণ করা হল” বলে ঘোষণা দিতে পারে। সেই আইন দিয়েই প্রথমে সারা পুর্ব-পাকিস্তানের সব জমি অধিগ্রহণ (ল্যান্ড একুজেশন) করে নেয়া হল বলে ঘোষণা জারি করা হয়। আর এর ফলে আগের সব জমিদারি মানে, জমিদারের মালিকানা টাইটেল বাতিল হয়ে যায়। ফলে এবার যে প্রজা যে জমি চাষাবাদ করত এবার সেই প্রজাই ঐ জমির জন্য সরকারকে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে তাকেই জমির মালিকানা টাইটেল জারি করে দেয়া হয়েছিল। আর এই হল আজকের বাংলাদেশের সকল ভুমি মালিক যাদের পুর্বপুরুষের জমির টাইটেল কেড়ে নিয়ে বৃটিশ শাসনের শুরুর দিকে জমিদার নামে নতুন একটা শ্রেণীর কাছে তাঁদের জমি নতুন টাইটেল করে দেয়া হয়েছিল, দুশবছর পরে হলেও এই জবরদস্তির অবসান ঘটেছিল। পুর্ব পাকিস্তানের ‘প্রজারা’ জমির মালিকানা টাইটেল ফেরত পেয়েছিল তখন থেকে। সোজা কথায় পাকিস্তানের জন্ম মানে পুর্ব-পাকিস্তানের আগের প্রজাদের এবার নিজের নামে জমি ফিরে পাওয়া। অতএব সারা পুর্ববঙ্গের প্রজা-কৃষকেরা (হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে) স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে ডাইরেক্ট বেনিফিশারি হয়ে যায়, কারণ তারা জমি পেয়েছিল। এরাই ছিল পাকিস্তান আন্দোলন আর পাকিস্তান কায়েমের সরাসরি বেনিফিসিয়ারী ফলে নিট সমর্থক। যদিও এই অবস্থাটা পরবর্তিতে দুএক বছরের মধ্যে একই রকম আর থাকে নাই। কিছুদিনের মধ্যেই বিভ্রান্ত ও উলটে যায়। কেন?  [দ্বিতীয় পর্বে দেখেন আগামী কাল শুক্রবার]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল এই পত্রিকা গ্রুপেরই এক ভগ্নি, আরেক ত্রৈমাসিক সাময়িকী পত্রিকাও আছে।  কিন্তু মূলত সেটা প্রিন্টেড পত্রিকা, যার  সাথে কেবল এক ই-পেপার ভার্সান আছে।  এই লেখাটা ঐ ত্রৈমাসিক দেশকাল পত্রিকার গত অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২০  সংখ্যায়, সাতচল্লিশের দেশভাগের তাতপর্য ও  অতঃপর ……” এই নামে ছাপা হয়েছিল।  তা প্রায় পাঁচ হাজার অক্ষরের অনেক বড় লেখা  ছিল। সেই লেখাটাকে এবার আবার এডিট করে আরো সংযোজন-বিয়োজন করে তিনপর্বে তা  এবার নতুন নামে  নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।

ওদিকে ত্রৈমাসিক দেশকাল পত্রিকার  ই-পেপার পাঠক ফেন্ডলি নয়।  তাই আগের লেখাটার এক পিডিএফ ভার্সান এখানে পেতে পারেন। নামিয়ে নিতে হবে। ]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s