মিনিংফুল হিউম্যান রাইটও যুদ্ধের খরচের মত জরুরি 


মিনিংফুল হিউম্যান রাইটও যুদ্ধের খরচের মত জরুরি 

গৌতম দাস

২৬  জুন ২০২১, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-3BI

 

(গত সংখ্যার পরে শেষ পর্ব, বাইডেন জি৭ ইস্যুতে।)

কলোনিদখলদারি (মোটামুটি ১৫০০-১৯৪৫) ব্যবসার যুগেই শেষের দিকে ১৮৮০ এর দশকে  আমেরিকা উদ্বৃত্ত সঞ্চিত সম্পদের জোরে বড় অর্থনীতি হিসেবে কলোনি দখলদারদের সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছিল। তবে এক ঝাপটায় আমেরিকা সাথে  নেতা হয়নি। আর কারও নেতা হওয়া বা দুনিয়াতে অর্থনীতিতে কেউ নেতা হওয়া এসব বিষয়গুলো তখনও শুরুই হয় নাই। মূল কারণ গ্লোবাল পণ্যবিনিময় বাণিজ্য দূরে থাক দুটা কলোনি মালিক দেশের মধ্যে বিস্তর পণ্য বিনিময় বা অর্থনৈতিক নীর্ভরশীলতা বিষয়টাই তখনও সুনিয়াতে হাজির হয় নাই।  তাই সব মিলিয়ে  আমেরিকাকে  আরো প্রায় ৫০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সেটাই  দুই দুটা বিশ্বযুদ্ধের কাল।  মূল কারণ দুনিয়া তখনও মূল একটিভিটি বলতে  কলোনি দখলের রামরাজত্বে মজেছিল, যার অবসান ঘটানো আগে  করে নেওয়ার দরকার ছিল আমেরিকার জন্য।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮) ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) দুনিয়ার কলোনি দখলদার শক্তিগুলা যারা দুনিয়ার ওপর একচ্ছত্র খবরদারি চালিয়ে বেড়াত তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই (২০১৪) সবাই এক এক করে দেউলিয়া হয়ে গেছিল, মূলত যুদ্ধের খরচসামলাতে ফেল করাতে। আর এরই সবচেয়ে বড় চিহ্ন হল রথশিল্ড ব্যাংক [Rothschild Bank]  যেটা মূলত এবং একমাত্র সেকালের মুদ্রা কনভার্ট বা বিনিময় করে দিবার ব্যবসায়ে ছিল; এর বন্ধ হয়ে যাওয়া।  কারণ এই ব্যাংকটা কার্যকর ছিল সে সুত্রের ভিত্তিতে তা হল, ব্যাংকের ভল্টে সমতুল্য মানের সোনা রেখে কাগুজে মুদ্রা ছাপানোর ব্যবস্থা তখন ওসব দেশে চালু আছে।  এটা চালু থাকলে ঐ ব্যাংকের কাছে কোন দেশের পণ্য আমদানি / রফতানির হিসাব রাখা মানে ঐদেশে সোনা এসে ঢুকেছে বা বেরিয়ে গেছে কতটা তা জানায় বিশ্বাসযোগ্য উপায়।  কিন্তু যুদ্ধের সময়  সোনাজমা না রেখে মুদ্রা ছাপানোর সস্তা পথে যুদ্ধের খরচ সামলাতে যাওয়াতে এইবার মুদ্রার মানের (অবমূল্যায়ন) ঢলে পড়ে যাওয়ায় রথশিল্ডের ব্যাবসা বন্ধ রাখতে হয়।

প্রথম আমেরিকান ঋণগ্রহিতা ইউরোপঃ
ফলে এইবার কলোনিমালিক ইউরোপের দেশগুলোর  কাছে ঋণ পাবার একমাত্র বিকল্প মনে হয় আমেরিকাকে। তবে মূলত এই ট্রেন্ড শুরু হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯১৮ সালের পর থেকে। আর আমেরিকান থেকে বলতে আমেরিকান প্রাইভেট ব্যাংক থেকে রাষ্ট্রগুলো যেমন বৃটেন সরকার এবং ব্যবসায়ীরাও – এরা  ঋণ পাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল।  যদিও এনিয়ে আবার আমেরিকায় আভ্যন্তরীণভাবে মারাত্মক রাজনৈতিক বিতর্ক ও বিভক্তি শুরু হয়েছিল যে আদৌও ইউরোপকে  ঋণ দিতে যাওয়া ঠিক কিনা। কারণ এতে ক্রমশ ইউরোপের যুদ্ধে খোদ আমেরিকাই সামিল হয়ে পড়ে যেতে পারে। এটাই সেকালের আমেরিকার  বিচ্ছিন্নপন্থি বনাম আন্তুর্জাতিক-পন্থি বিতর্ক  [America’s isolationist Vs internationalist debate] বলে পরিচিত। এই বিতর্ক ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত গড়িয়েছিল। যারা এনিয়ে বিস্তারে বুঝতে চান তারা রুজভেল্টের Cash & Carry Law 1939 এবং এবং সাথে এই আইনের আগের সব ভার্সান। আর সবমিলিয়ে – Neutrality Act of 1939, Lend-Lease সহ বহুকিছুর ভিতরে ঢুকতে পারেন বা ঢুকতে হবে।

ওদিকে ১৯৩২ সালের পর থেকে হিটলারের উত্থান শুরু হয়েছিল। এতে ক্রমশ নেতা হিটলার সাথে মুসোলিনির ইতালি আর মার্শাল তেজো জাপানসহ অন্যদের মিলে গ্রুপ বড় হতে থাকে। কিন্তু এই গ্রুপের ঋণ বা বাজেট সংকটের কথা জানা যায় না।  ফলে একদিকে হিটলার ও তার সঙ্গিদের গ্রুপ  আর অন্যদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে বাকিরা এভাবে এক পোলারাইজেশন ঘটতে পেরেছিল।  আর মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খরচ বইবার ক্ষেত্রে আমেরিকান সক্ষম অর্থনীতি ও বিপুল উদ্বৃত্ত সঞ্চিত সম্পদের জোরে্র সক্ষমতার বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি আমেরিকার নেতৃত্বে আসে আর এই অংশই যার সেকালের ডাকনাম এলায়েড ফোর্স বা মিত্রশক্তিই যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল।
কিন্তু  এই যুদ্ধের আসল ফ্যাক্টর যে যুদ্ধে  আমেরিকান সক্ষমতার পোলারাইজেশন এবং তা এমন কেন হয়েছিল ও কিসের ভিত্তিতে; এসব কিছু আমাদেরকে  মানে বৃটিশ-ভারতের আমাদেরকে পরিষ্কার জানতে দেয়া হয়নি। তাই দুটো শক্তি বৃটিশ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন – এরা  ঘটনা যেভাবে ব্যাখ্যা করে দিয়েছিল আমরা খাপছাড়াভাবে তাই জানতাম।
এরই একটা হল, ব্রিটিশ বা ইউরোপীয়রা  যেন এদের মত “ভাল মানুষদের” নেতৃত্বে মানে প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের নেতৃত্বে তাঁরা বিপরীতে খারাপ মানুষ হিটলার আর তার বন্ধুদেরকে  চার্চিল  পরাজিত করেছিল। এই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গল্প। এছাড়া ওদিকে আরেক ব্যাখ্যা চালু ছিল কলোনি-ভারতের কমিউনিস্টদেরও। এটিও আরেক ভালভালাইয়া; মানে চার দিকে সব খালি ভাল আর ভাল। ভাল মানুষ সোভিয়েত ইউনিয়নের স্টালিনের হাতে জর্মানির হিটলারের পরাজয় ঘটেছিল। তিনি ভাল লড়েছিলেন বলেই হিটলার পরাজিত হয়েছিলেন। কাজেই সব ক্রেডিট কমিউনিস্টদের, এটাই নাকি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল গল্প।  যেমন এই গল্পের প্রভাব এতই মারাত্মক যে এখনো অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পাশ কমিউনিস্ট – এখন এনজিও নেতা  মনে করে – পড়তি গ্লোবাল নেতা আমেরিকা নয়, এটা ইউকের বৃটিশেরা। এককথায় বৃটিশেরা আমেরিকার চেয়ে অর্থনীতির শক্তিতে সেরা। যাক, সেসব কথা। তবু  আমরা খুবই সরি, স্টালিন বা চার্চিল  বা তাদের সমর্থকদের একটারও বয়ানের ভিত্তি নাই। কারণ এদের বয়ানে বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস – আমাদেরকে  যুদ্ধের পোলারাইজেশনে মুখ্য ফ্যাক্টর কী ছিল তা বলতে পারে না। কেন?

প্রধান ধারা হিসাবে আমরা  চার্চিলকে দিয়ে বিশ্বযুদ্ধ বুঝতে গেছিলাম আর সেটা এজন্য যে তারাই তো আমাদের কলোনি মালিক।  আর তাই একমাত্র তাদের মাধ্যমেই তো সব তথ্য ও উতস। আমাদের ইউরোপকে চিনি-মানি আর বুঝাবুঝি ঘটেছিল। তারাই আমাদের প্রভু ছিল। ইউরোপের ভাষাগুলোর মধ্যে একমাত্র ইংরেজিই আমাদের এলিটরা বুঝত আর তারা কেবল ব্রিটিশ মিডিয়া পড়ে সেখান থেকে এগুলো অনুবাদ করত। এভাবে গ্লোবাল কাহিনীর যতটুকু বাংলার নাগালে আসত তা দিয়েই কেবল আমরা বিশ্বযুদ্ধ যতটুকু যা বুঝতাম। তাই আমেরিকা বলে কোনো দেশ আছে কি না বা কেমন তারা সেটাই তো তখনও আমরা ঠিকমত বুঝতাম না; অর্থাৎ চার্চিলের চোখ দিয়েই নিরুপায় আমরা  দ্বিতীয়  বিশ্বযুদ্ধ বুঝেছিলাম। তাই আমাদের চোখ এই বীর চার্চিল যে আমেরিকার কাছে দাসখত দিয়েছে সেটা আমাদের চিন্তারও বাইরে ছিল। স্টালিনের সোভিয়েত দেশকেও যে অ্যামেরিকা যুদ্ধের খরচ ধার দিতে পারে এসব আমাদের কমিউনিস্ট মনে চিন্তার অতীত।  স্টালিনসহ বিপ্লবীদের চোখে কলোনি বা উপনিবেশ তো উঠেই নাই। তাই তো সেটা এখনও কমিউনিস্টদের চোখে “নয়া-উপনিবেশবাদ”।  যার মানে কী একমাত্র স্টালিনই জানে…।  যেখানে একালে আমাদের হাসিনাই বাইডেনকে চোখ উলটে তাকাতে পারে এটা সম্ভব (যদিও  হাসিনার ক্ষমতার স্বৈরাচারি বলতে পারেন তবু সে স্বাধীন আর এরপরেও এখনও তাঁর বড় বড় সীমাবদ্ধতা আছে )  – সেখানে দুনিয়াটা এখনও নয়া উপনিবেশের দুনিয়ায় আমরা আছে এই কথার অর্থ কী?

অথচ হার্ডকোর সত্যটা এই যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমাদের মত কলোনি হয়ে থাকা দেশগুলো আর ইউরোপের কারো না কারো কলোনি  হয়ে শাসনে থাকবে কি না- এটাই ফয়সালা করে দিয়েছিল। কঠিন সত্যটা ছিল, চার্চিল আমাদের ত্রাতা বা মুক্তিদাতা ছিলেন না। কলোনি থেকে মুক্তি –  আমাদের আসল মুক্তিদাতা ছিল আমেরিকা, তাতে আমরা যতই তখন বা আজও আমেরিকাকে ঘৃণা বা অপছন্দ করি না কেন। এটাই ফ্যাক্টস।  যদিও তা আমেরিকার নিজ স্বার্থেই ঘটতে পেরেছিল। কীভাবে?

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট দুনিয়ার সব কলোনি দখলদার চার্চিলসহ সব কুতুবকে দাসখত দিতে বাধ্য করেছিল যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজয়ে শেষ হলে পরে তাদের সবাইকে দুনিয়া থেকে কলোনি ব্যবস্থা উঠিয়ে ফেলে দিতেই হবে। কেন? যাতে দুনিয়া কলোনিমুক্ত প্রায় শ দুয়েক স্বাধীন রাষ্ট্রের এক দুনিয়া হয়।  আসলে মূল কথাটা হল, আমাদের স্বার্থের দিক থেকে দেখলে চার্চিলও আসলে আমাদের জন্য ভিলেন ও এনিমি ছিল। কিন্তু হিটলারের মারের মুখে নিজের যুদ্ধের খরচ চালানোর মুরোদ ছিল না বলে সারা ইউরোপ আমেরিকান ঐ শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। অতএব যুদ্ধ শেষে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন-আমেরিকায় ১৯৬৫ সালের মধ্যে সবচেয়ে অসংখ্য দেশের কলোনিমুক্তি ঘটে গিয়েছিল। সর্বশেষটা দক্ষিণ আফ্রিকা ১৯৯৪ সালে। আর বলাই বাহুল্য ভারত বা পাকিস্তান কলোনিমুক্ত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে।

অখণ্ড ভারতের দিক থেকে দেখলে বিশ্বযুদ্ধের এটাই ছিল আসল বিশ্ব-ইতিহাস, আমাদের কলোনিমুক্তির ইতিহাস। গ্লোবাল ইতিহাসের দিক থেকে বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আসল ও একচ্ছত্র নেতৃত্ব ছিল আমেরিকার হাতে আর তাই স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধশেষে প্রথম “গ্লোবাল অর্থনীতি” বলে কোন কিছুর নেতা হয়েছিল আমেরিকা। আর এই ইতিহাস জানার একমাত্র পথ হল সরাসরি  আমেরিকান হিস্ট্রি পড়া। তবে এখন ইন্টারনেটের কল্যাণে আমেরিকা নিজেই সেসব ডকুমেন্ট অনলাইনে দিয়ে রেখেছে। তাই যে কেউ চাইলে আর পড়তে জানলে নিজেই জেনে নিতে পারে।

এখন এই আমেরিকান নেতৃত্ব মানে কী? এর মানে আর আবছা রেখে লাভ নেই, যা স্টালিন বা চার্চিল আমাদেরকে সেকালে জানতে দেয়নি (কারণ তা নিজেদের অযোগ্যতা বিবেচিত হতে পারে) তা হল, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের নেতৃত্বে গঠিত মিত্রবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে খরচের বড় অংশটি একাই [মোট ২৭০ বিলিয়ন ডলার আর একে ৫১গুণ করলে আজকের ডলার হবে] বহন করেছিল আমেরিকা। মানে ইউরোপ এমনি এমনি আমেরিকান নেতাগিরি মেনে নেয়নি।

এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে আরেক যে ব্যাখ্যা- আমাদের দেশের রাজনীতি ভাল  বুঝে এমন ভাব ধরে থাকা কমিউনিস্টদের মুখ থেকে যা জানি, সেটিও আসলে সোভিয়েত ভাষ্য। আর সেখানেও যুদ্ধের বড় খরচদাতা ঐ এক ও অদ্বিতীয় আমেরিকা হলেও কমিউনিস্টদের ইতিহাস ভাষ্যে সেটাও এড়িয়ে যাওয়া হয়ে এসেছে।

তবে অন্যদিকের ফ্যাক্টস হল, আমেরিকাও দাসখত বা ‘সহযোগিতা’ চুক্তিতে স্তালিন বা চার্চিলকে অপমানজনকভাবে শামিল হতে বাধ্য করেননি। এসব চুক্তিতে অপরপক্ষ হিসেবে প্রথম ও একক স্বাক্ষরদাতা ছিলেন চার্চিল আর সেটার নাম আটলান্টিক চুক্তি, ১৪ আগস্ট ১৯৪১। আর পরে সেই ড্রাফটটাই কিন্তু এবার চার রাষ্ট্র  – ব্রিটেন, আমেরিকা চীন ও সোভিয়েত মিলে আবার স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে। তবে এবার ওই চুক্তির নাম দেয়া হয়েছিল “জাতিসঙ্ঘের জন্ম ঘোষণায়” স্বাক্ষর এই নামের আড়ালে। সাথে একই দিনে আরো ২৬ দেশ ঐ একই ডকুমেন্টে প্রতি-স্বাক্ষর করেছিল। এটাই আমেরিকার নেতৃত্বে হিটলারবিরোধী জোটের মুলভিত্তি দলিল। কিন্তু তবু কোথাও “কলোনি শাসন ছেড়ে দিতে চলে যেতে হবে” – এই ভাষায় বা শব্দ কোথাও নেই। তবে  কথাটা ঘুরিয়ে বলা হয়েছে – “যেকোনো ভূখণ্ডের বাসিন্দারাই একমাত্র নির্ধারক হবে যে ওই ভূখণ্ডের শাসন কিভাবে চলবে; অর্থাৎ কলোনি করা নিষিদ্ধ হলেও তা এই ভাষায় বলা হয়ে আছে।

এ’প্রসঙ্গকথা এবার গুছিয়ে সম্পর্ক-দেখিয়ে দিয়ে বলে শেষ করা যাক। তা হলে আমেরিকা কিভাবে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল সেটা আমাদের মতো দেশের কোন এলিট বা কুতুবরা কেউ সেকালে বা একালে জানতেন বা টের পেয়েছিল তা মনে হয় না। এর কাহিনী বা ঘটনার দিক এটাই। আর এটাই এখন আমাদের জন্য খুব প্রাসঙ্গিক।

কারণ গত ১১-১৬ জুন ২০২১ সাল জুড়ে বাইডেন জি-৭ আর ন্যাটোর মিটিংয়ে গিয়ে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উসকানি বা হুমকি তুলেছিলেন। অথচ আসল কথাটা এই যুদ্ধের খরচ কে দেবে সেটা নিয়ে অন্তত প্রকাশ্যে কিছুই  বলেননি। আর আমরা উপরে দেখলাম যুদ্ধের খরচই যুদ্ধের হুমকি বা যুদ্ধ যেই করুক এর মুখ্য ও নির্ধারক  বিষয়।  আর এই খরচ  সেকালে ঐ পরিস্থিতিতে একমাত্র বহন করতে সক্ষম ছিল রুজভেল্টের আমেরিকা। তাই ইউরোপ হিটলারের হাতে দখল ও বিলীন হওয়ার বদলে আমেরিকান নেতৃত্বকেই মেনে ওর অধীনে পরিচালিত হওয়াটাকেই বেটার বিকল্প বোধ করেছিল সকলে। তাহলে একালে বাইডেনের স্বপ্ন্বের যুদ্ধ ও এই যুদ্ধের খরচ বইবার মত দাতাটা কে হবে?  এই ভাসুর বা স্বপ্নে দেখা দাতার নাম জানান না দিলে বাইডেনের হুঙ্কারের অর্থ কী?

কেন আমেরিকার জন্য বিশ্বযুদ্ধ-২ এর নেতা হওয়া এত জরুরি ছিলঃ
তবে কথা আরেকুটু আছে।  আমেরিকা এমনি ওমনি যুদ্ধে সবার নেতা হতে নিশ্চয় চায় নাই। কিন্তু সেটা কী?  তা হলে? আমেরিকার স্বার্থ শুধু গ্লোবাল নেতা হওয়া ছিল তা নয়, মূলত তার হাতে জমা থাকা বিপুল সারপ্লাস বা উদ্বৃত্ত সম্পদ তখন বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ হয়ে উঠেছিল, অথচ ঋণ-খাতক বা গ্রহিতা দেশ আমেরিকা খুজে পাচ্ছিল না।  কারণ দুনিয়া তখন  কলোনিদখল হয়ে থাকা দুনিয়া। আর ১৯০৫ সালের এই হিসাবে দুনিয়ার কলোনি হতে  বাকি আছে এমন ভুমি বা কোন দেশ আর  খালি ছিল না। ফলে এটা ছিল আমেরিকান   স্বার্থ যে সে দুনিয়াকে এক কলোনি দখল বা শাসন মুক্ত এক স্বাধীন দেশের দুনিয়া হিসাবে যেন দেখতে পায়। যাতে স্বাধীন কলোনিমুক্ত দেশগুলো –  এরা সবাই তখন আমেরিকার ঋণের সরাসরি অথবা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে খাতক হতে পারে। যাতে আমেরিকা এসব স্বাধীনমুক্ত দেশকে আমেরিকান ঋণের খাতক হিসেবে পেয়ে যায়।
কাজেই একালে বাইডেনের ভাবি যুদ্ধের খরচের সংস্থান না করে চীনকে যুদ্ধের হুমকি দেখানো এগুলোকে কী বলা যায়? এর মানে কি আমেরিকা-চীনের ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ নামে যে বিরোধ প্রকাশ্যে বাজারে হাজির আছে, তা বাইডেন এখন যুদ্ধের মাধ্যমে সমাধান করতে চাইছেন? হ্যাঁ তাই। সে জন্যই এটাকে ছেলেমানুষি চিন্তা বলছি। কারণ এক তো খরচের ব্যাপার আছে; সেটি ছাড়াও চীনের সাথে আমেরিকান বিরোধ মূলত হাতে থাকা উদ্বৃত্ত সম্পদ না থাকা থেকে উদ্ভূত বিরোধ  – এমন বিরোধকে বাইডেন যুদ্ধে গিয়ে সেটাকে নিজের পক্ষে জিতে আনবেন কী করে?

যেমন ধরা যাক, যুদ্ধ একটা হল আর আমেরিকা তাতে জিতেও গেল। কিন্তু তার পরে এতে কি আমেরিকার হাতে যথেষ্ট ‘সঞ্চিত উদ্বৃত্ত সম্পদ’ না থাকার সঙ্কট, যেটা এখনই প্রকট হয়ে আছেও তা আমেরিকার কেটে যাবে?  আর এই বিপুল সম্পদটা আসবে কোথা থেকে? কিভাবে?

আসলে তখনো দুনিয়ায় সম্ভাব্য একমাত্র উদ্বৃত্ত সম্পদের উৎস দেশ হয়ে থাকবে এই চীনই। আর সেই চীনের কাছে হাত পেতে আমেরিকা তার জনগণকে খাওয়াবে, দুনিয়া রুল করবে – এমন কল্পনা এবসার্ড বলারও সুযোগ দেখি না। এ জন্য বলেছি, হাতে বিপুল সঞ্চিত সম্পদ থাকা না থাকার সঙ্কট এটাই মূল সংকট – অথচ এই সংকট  কী যুদ্ধে জিতেও কেটে যাওয়ার বিষয়???

তা হলে অথর্ব ন্যাটোকে সামনে আনা কেন?
বাইডেন ন্যাটোকে সামনে রেখে হুমকিটা দিয়েছেন। ন্যাটোকে দিয়ে তিনি আর্টিকেল পাঁচ চালু করার সামরিক ইঙ্গিত দিয়েছেন। আবার হাসির এক কথা হল, চীন-রাশিয়া নাকি পারমাণবিক অস্ত্রে আমেরিকা ও তার বন্ধুদের সমান হয়ে যাচ্ছে। আর  ন্যাটো সেক্রেটারি এটাকে আমেরিকার জন্য হুমকি দেখছেন। আচ্ছা খোদ পারমাণবিক অস্ত্রই যেখানে সবার জন্যই হুমকি, সে্টা  আপনার বন্ধু বা শত্রু   যার হাতেই থাকুক; সেখানে ওরা আমার সমান হয়ে যাচ্ছে কেন  – এটা কী নাকিকান্নাময় যুদ্ধের অজুহাত তোলা নয়!

কিন্তু  ন্যাটো নিয়ে ঘরের কথাটা হল – সেই ওবামা আমল থেকে, চাক হেগেল [Chuck Hagel] যখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী (২০১৩-১৫), তখন থেকেই ন্যাটো যে একটি খরচের ডিব্বা, আর সেই খরচের বেশির ভাগ (প্রায় ৯৫ শতাংশ) কেন আমেরিকা একা বইবে- এসব প্রশ্ন আর অজুহাত তুলে কি চাক হেগেল সেকালেই ইউরোপকে খরচের দায় নেয়না ওথচ বড় কথা বলে – এই বলে অপমান করেনি?   ট্রাম্পও তো একই প্রশ্ন তুলেছিলেন।  ইউরোপকে খরচের দায় নিতে হবে বলে হুমকি দিয়েছিল। আরো এগিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, একালে ন্যাটো একটি অপ্রয়োজনীয় সংগঠন। আফগানিস্তানের পর ন্যাটোর আর দুনিয়ায় কোনো ভূমিকা নেই। বিশেষ করে জঙ্গিবাদ কমে আসছে তাই – ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এমন সব ঘোষণা দেয়নি কি? এমনকি তিনি ইউরোপে (জার্মানিতে) ও জাপানে সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে এখনো আমেরিকান সৈন্যের সামরিক ব্যারাক মেনটেন করে যাওয়ার খরচ এবার থেকে ইউরোপকে দিতে হবে বলে ট্রাম্প দাবি করেননি?
তাহলে সেসব প্রশ্নের সদুত্তর কী? উঠে থাকা এসব প্রশ্ন যা ন্যাটোর ভবিষ্যতই এলোমেলো করে রেখেছে সেসব পাশ কাটিয়ে বাইডেন কতদুর কোথায় যেতে পারবেন?  বাইডেনের কাছে এসব খরচের ব্যয়ভার প্রসঙ্গে সমাধান কী আছে? অর্থাৎ খরচ বইবার প্রশ্নে ন্যাটো এখন একটি পর্যদুস্ত সংগঠন হয়ে আছে! অথচ এসব নিয়ে কোনো কথা না বলে, এক দিনের ন্যাটো বৈঠকে গিয়ে চীনকে হুমকি দিয়ে এলেন বাইডেন! এটি কি তামাশা না ছেলেখেলা?

Bantonglaoatang

অভ্যন্তরীণ ভিন্নমতের বিতর্কও আছে গভীরেঃ
তবে মনে হচ্ছে, ইউরোপের সবাই এখনো বোকা ধামাধরা নেতাদের দেশ হয়ে যায়নি। তাই খোদ সিএনএন খবর দিচ্ছে কানাডা বাদে ইতোমধ্যেই জি-৭ এর বাকি নেতাদের মধ্যে বাইডেনের চীনের প্রতি আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়ে অস্বস্তি ও আপত্তি দেখা দিয়েছে। গরম তর্ক-বিতর্কও হয়েছে। এতে সবচেয়ে বড় অস্বস্তি প্রকাশ করেছে ইতালি। এ নিয়ে চীনা ব্যাখ্যা হল, ইতালিই ইইউর প্রথম দেশ যে চীনের বেল্ট-রোডে প্রকাশ্যে অংশ নিয়েছে।  উপরের কার্টুনটা আমি নিয়েছি চীনা গ্লোবাল টাইমস ম্যাগাজিনের এক আর্টিকেল থেকে। ঐ আর্টিকেলে কার্টুনের চরিত্রগুলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে ইটালিকে কুমড়া নাম দেয়া হয়েছে যার আবার “শার্প টাং” মানে কাউকে কিছু বলতে যার মুখে কিছু আটকায় না এমন নির্দয়ভাবে ক্রিটিক্যাল। সেই ইটালি সম্পর্কে যা বলা হয়েছে,   The grey wolf image shows Italy, the first European country that joined China’s Belt and Road Initiative (BRI), is reluctant to collaborate with the US in suppressing China, commented “sharp-tongued pumpkin.” 

তবে সামগ্রিকভাবে বললে, চীনের বিরুদ্ধে কামান দাগানো যৌথ বিবৃতি ধরনের কাগজে চীনকে কী ভাষায় কতটা অভিযুক্ত করছে মূলত এই প্রশ্নেই ভিন্নতাগুলো দেখা দিয়েছে। স্বভাবতই সবচেয়ে শক্ত ভাষায় বাইডেন ওই সব ড্রাফট দেখতে চাচ্ছেন। কিন্তু কেউই চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত যাতে না হয় ততটুকুতেই থাকতে চায়। যেমন জাপান টাইমস, যৌথ বিবৃতি ড্রাফট করতে গিয়ে বড় মতভেদের কথা তুলে ধরেছে। বিশেষ করে মানবাধিকার প্রসঙ্গে চীনকে কতটা সমালোচনা করা হবে সে বিষয়ে [G7 …….to counter Chinese influence in the world may prove a daunting challenge… ]।

এ দিকে ভয়েস অব আমেরিকা লিখেছে, [G-7 Split on Biden’s Anti-China Push]। ইতালি জার্মানি আর ইইউ প্রতিনিধিকে দেখা গেছে, চীনের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দিতে এরা অনিচ্ছুক; বরং সহযোগিতামূলক সম্পর্কের মধ্যে থাকতে আগ্রহী। আবার এসব প্রশ্নে কানাডা, ফ্রান্স, ব্রিটেন আর আমেরিকা নিজে এভাবে এরা চারজন আবার চার মাত্রায় চীনের বিরোধিতা করতে চায়। আর জাপান যে কোন দিকে অবস্থান নেবে, তা সে সবচেয়ে অনিশ্চিত।

“There were some interesting discussions and a little bit of a differentiation of opinion,” said a senior Biden administration official……Italy, Germany, and the European Union appear reluctant to take as tough a stance on China, and instead would rather focus on the “cooperative nature of the relationship.” …… The U.S., Britain, Canada, and France, on the other hand, want to be more “action-oriented” to different degrees. Japan appears to be the most ambivalent of the group.

সিএনএন লিখছে, এক আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট তাদেরকে জানিয়েছেন, বিশেষ করে ইতালি ও জার্মানি খুবই অস্বস্তিতে ছিল বিবৃতির ভাষা নিয়ে [….US officials said Italy and Germany were uneasy with potential communique language that China might view as provocative. ]। যেন চীন এটিকে কোনোভাবেই উসকানিমূলক হিসেবে না দেখে। চ্যান্সেলর মার্কেল তো বলেই বসেছিলেন যে, চীন আমাদের প্রতিদ্ব›দ্বী বটে কিন্তু আবার অনেক ইস্যুতে আমাদের পার্টনারও তো বটে [Angela Merkel said that “China is our rival in many questions but also our partner in many aspects.” ]। ফরাসি নেতা ম্যাক্রোঁও যোগ করেছেন, জি-৭ কে তো ওই চীনের সাথেই আবার জলবায়ু, বাণিজ্য, উন্নয়ন ও অন্য অনেক ইস্যুতে ভিন্নমত থাকলেও একসাথে কাজ করতে হবে। তাই তিনি পরিষ্কার করে রাখার পক্ষে যে, তাদের জি-৭ কখনো চীনবিরোধী কোনো ক্লাব হতে পারে না. “I will be very clear: The G7 is not a club hostile to China,” the French President said।

সারকথায়, ভেতরে বড় মাত্রায় বাইডেন বিরোধিতা বজায় আছে। তবে সবচেয়ে মজার অবস্থানে ভারত। ভারতের মিডিয়াই ভেতরের বিরোধের খবরগুলো বড় করে সামনে এনেছে। যেমন হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে, জি৭ লিডারেরা কত শক্ত করে চীনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাবে এনিয়েই তাদের মধ্যে বড় তর্কবিতর্কটা শুরু হয়েছিল। [The leaders of Group of Seven (G7) debated how strongly they should respond to China’s growing clout around the world and alleged forced labour practices in the Xinjiang region.] আর উইঘুর ইস্যুতে আরো মারাত্মক কথা বলেছে ঐ একই রিপোর্টে, ……there was no immediate consensus on how forcefully they should call out Beijing over the alleged human rights abuses। অর্থাৎ কত জোর দিয়ে উইঘুর ইস্যুতে অভিযোগ তুলবে তা নিয়ে এখনি নেতসাদের মধ্যে ঐক্যমত নাই। কিন্তু কেন এমন লিখল, কারণ, ভারতই চায় না এটা। কারণ সেক্ষেত্রে এখানে কাশ্মীরের প্রসঙ্গ না চলে আসে। এছাড়া চীনের নেজেরই লিক হয়ে যাওয়া রিপোর্ট রেফার করে হিন্দুস্তান টাইমস লিখছে ঐ চীনা রিপোর্টে “struggle against terrorism, infiltration and separatism.” চীন লিখেছে তারা (উইঘুরের) সন্ত্রাসবাদ, অনুপ্রবেশ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে তাদের লড়তে হচ্ছে। মনে হচ্ছে একথাগুলো ভারতের মনে দাগ ফেলেছে।

এছাড়া আরেক নিরপেক্ষ মিডিয়া ওয়াইর [WIRE]  লিখেছে,  ন্যাটো মিটিংয়ে একসময় এমন উত্তপ্ত ভাষায় বাইডেনের সাথে ইউরোপীয়দের বিতর্ক শুরু হয়েছিল যে কমিউনিকেশন সুইচ অব করে রাখতে হয়েছিল, যাতে বাইরে মিডিয়ার কাছে তা না পৌঁছায়। আবার আরেক ভারতীয় মিডিয়া খবর দিয়েছে, মানবাধিকার প্রসঙ্গে বিবৃতিতে কিছু অবস্থান প্রসঙ্গে খোদ ভারতেরই অস্বস্তি দেখা দিতেছে। তবে অভ্যন্তরীণভাবে সবচেয়ে বড় অস্বস্তির প্রশ্ন ছিল, উইঘুর বা ফোর্সড লেবার ইস্যুতে কতটা চাপ দিয়ে তা বলা হবে, এ নিয়ে বিতর্ক।

 বাংলাদেশের প্রসঙ্গঃ
এসব প্রসঙ্গে বাংলাদেশেরও বলার আছে। প্রথমত, বাইডেন আমাদেরকে যে পটেনশিয়াল বিপদের মধ্যে হাজির করে ফেলেছেন তা হল, সত্যিই যদি তিনি চীন-আমেরিকার বাণিজ্য-বিরোধকে যুদ্ধের দিকে ঘুরিয়ে দেন বা টেনে নিয়ে যান, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমি হয়ে উঠতে পারে তাদের দুই দেশের যুদ্ধের রণভুমি। এছাড়া অনেকের মনে আশা যে বাংলাদেশে কেমন ধরনের সরকার থাকবে বা কে থাকবে- এ প্রশ্নে বাইডেন তাদেরকে সাহায্য করবে বা তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করবে। যেমন করেছিল ১/১১ এর সময়ে। কিন্তু সে আশায় কী আমরা বাংলাদেশকে চীন-আমেরিকার রণক্ষেত্র হিসেবে দেখতে চাইতে পারি? এমন আশার কোন মানে হয় না। এরা বাংলাদেশের হত্যাকারী।  ঠিক যেমন ১/১১ পরিণতি হয়েছিল আমাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।  যার ফলে আজ প্রায় ১৪ বছর হয়ে গেল আমরা ভোগ করছি কিন্তু বের হতে পারি নাই।  আমরা আমেরিকার স্বার্থের ওই যুদ্ধের বলি হতে পারি না। যেমন ভাবে বার্মা নিয়েও তাদের স্বার্থের লড়াইয়ের কোনো অংশ হয়ে যেতে পারি না। এ ব্যাপারে আমাদের দেশেও নানা পক্ষ আছে স্বাভাবিক। তাদের সবার প্রতি পরামর্শ থাকবে আমরা যাই করি আমরা কারো হাতিয়ারে যেন পরিণত না হই। একবার হওয়াতেই আমাদের শিক্ষা হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত।  বিশেষত বাংলাদেশকেই না তাদের বার্মা-বিবাদের রণক্ষেত্রে বানিয়ে ফেলি সেটা আমাদের খেয়াল রাখতেই হবে।

আর উইঘুর বা মানবাধিকার প্রশ্নে স্বাভাবিকভাবে আমাদের অবস্থানটা হবে সবাইকেই হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স অবস্থানে যেতে হবে। আমরা কি উইঘুরে সত্যি মানবাধিকারের বাস্তবায়ন দেখতে চাই? নাকি এ নিয়ে চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ নিতে চাই, যাতে সেটি আমেরিকার বাণিজ্য সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হয়? এ দুয়ের মধ্যে ঠিক কোনটা চায় তা আমেরিকাকে স্পষ্ট করতে হবে।

কথিত ডেমোক্র্যাসি বনাম অটোক্র্যাটঃ
এবার দাবি করা হচ্ছে, এবারের জি-৭ মিটিং নাকি কথিত ডেমোক্র্যাসি বনাম অটোক্র্যাটের লড়াই। আচ্ছা এই জি-৭ এটি কী এককালে জি-৮ করে নেয়া হয়নি? রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়ে। পরে যদিও ইউক্রেন-ক্রিমিয়া প্রশ্নে এক বিবাদে ২০০৭ সালে আবার রাশিয়াকে বের করে দেয়া হয়েছিল এবং সেই থেকে রাশিয়ার ওপর আমেরিকান অবরোধ আরোপ হয়ে আছে আজও। তা হলে সেসব সময় রাশিয়া যখন ভেতরে ছিল, তখন সবাই জি-৮ এর সবাই ডেমোক্র্যাসির লোক হয়ে গেছিল?  তার মানে রাশিয়া ভিতরে থাকলে জি হল ডেমোক্রেসির উদাহরণ আর তারা বের করে দিলে  রাশিয়াই হয় অটোক্রাসি! হায়রে ডেমোক্র্যাসি!

আবার  প্রনবল আমানবিকভাবে ইয়েমেন তছনছ করতে সৌদিদেরকে   আমেরিকান সমর্থন এটিও কি ডেমোক্র্যাসির তাণ্ডব অথবা ওদিকে দেখেন, দুই দিন পরে পরে নিয়মিত গাজায় ইসরাইলি হামলা এটাই বা কোন ডেমোক্র্যাসি? আমেরিকার এসব “ডেমোক্র্যাসি-বিক্রির” বক্তব্য আসলে  আমাদে্র  জন্য এক চরম বিরক্তিকর জায়গায় পৌঁছেছে।

তবে চীনের প্রসঙ্গেও অন্তত দুটো কথা বলার আছে। বিশেষ করে বাইডেনের সমালোচনা করছি বলে ভুল বোঝার সুযোগ নেই। হিউম্যান রাইট ইস্যুটা জাতিসঙ্ঘের জন্মের সময় ও পরে ১৯৪৮ সালের সম্মেলনে উঠলেও এর অগ্রগতি খুবই হতাশজনক। অথচ এরই মধ্যে গ্লোবাল অর্থনীতির নেতৃত্বে বদলের সময়কাল আসন্ন। এত দিন কমিউনিস্টদের রাজনীতি ও তাদের দেশ যেভাবেই চলুক, এখনকার প্রশ্ন আলাদা।

অন্তত গ্লোবাল নেতা হওয়ার স্বার্থে  মানবাধিকার  রক্ষা প্রসঙ্গে চীনের ন্যূনতম একটি অবস্থান গ্রহণ পূর্বশর্ত। নইলে প্রতি পদে এই ইস্যুতে সঙ্ঘাতে গ্লোবাল সব কাজ বাধাগ্রস্ত হতে থাকবে। চীনকেই অযথা বিব্রত হতে হবে প্রায়ই।  চীন নিশ্চিত থাকতে পারে হিউম্যান রাইট ইস্যুতে ন্যূনতম একটি অবস্থান ছাড়া চীনের নেতা থাকা খুবই কঠিন হবে। ফেলও করতে পারে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত ২৪ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “যুদ্ধের খরচ জরুরি, হিউম্যান রাইটও – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s