ফেসবুক অসহিষ্ণুতার বিপদের পথে হাটছে!


ফেসবুক অসহিষ্ণুতার বিপদের পথে হাটছে!

গৌতম দাস

১৬ আগষ্ট ২০২১

 

আফগানিস্তানের পুতুল সরকারের পলায়ন ঘটেছে। রাষ্ট্রক্ষমতা  জিনিষটা মুরোদ-র।  তালেবানদের মুরোদ ছিল ও আছে। তাই তারা কাল কাবুলে ক্ষমতা দখল করেছে। আফগানিস্তান প্রসঙ্গে  আমার গত শেষ লেখায় আমি তাদের ক্ষমতা দখলের পক্ষে কলম ধরেছিলাম।  বলেছিলাম তালেবানেরা ক্ষমতা দখল করতে পারে। আসলে, যে ক্ষমতা দখলের মুরোদ রাখে সে কিন্তু আমি না বললেও ক্ষমতা দখল করবেই।  এজন্যই শুরুতে লিখেছি – রাষ্ট্রক্ষমতা জিনিষটা মুরোদ-র। এরপরেও আমি লিখেছিলাম এজন্য যে সেক্ষেত্রে হবু ক্ষমতাদখলই ঘটে  যাবার পরের দৃশ্যগুলোতে  ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখতে হবে তাই ছিল আসলে আমার বলবার বিষয় বা সাজেশন।  তবে বলেছিলাম এরপরে ট্রয়কার (রাশিয়ার উদ্যোগে আমেরিকা ও চীনের মিলিত অবস্থান) পরামর্শ শুনতে। আরো পরিস্কার করে বলেছিলাম ক্ষমতা দখলের পর ক্ষমতা নিজের হাতে রাখতে। তবে ট্রয়কার পরামর্শ শুনে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠাতায় কাবুলে সবপক্ষকে সাথে নিয়ে অন্তর্বর্তি সরকার গঠন করতে। এটা করা সম্ভব। একটা ঐক্যমত্যের রাজনীতির কমন মূলভিত্তিতে নয়া আফগানিস্তান রাষ্ট্র গড়ে তোলা।  অর্থাৎ ট্রয়কার সমর্থন সাথে যোগাড় করে রাখতে পারলেই তালেবানেরা টিকে যাবে। একটাই শব্দ তাদের মনে রাখতে হবে “দায়ীত্ববান” সরকার!

বলেছিলাম, “গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেম” বলে একটা কিছু আছে সেটাকে যেন আন্ডার-এস্টিমেট বা উপেক্ষা না করে তালেবানেরা। তাহলে এই সিস্টেমই, ২০০১ সালের মত অবলীলায় আবার তাদেরকেই তুলে ছুড়ে ফেলে দিবে। তবে তালেবানদের চিন্তায়  ভাল-মন্দ ও আমাদের কারও অপছন্দের যাই থাক, সমস্ত সীমাবদ্ধতা সত্বেও, তারাই বর্তমানে আফগানিস্তানে টিকে যাওয়া সংগঠিত রাজনৈতিক  শক্তিগুলোর মধ্যে  একমাত্র শক্তি যা আফগানিস্তানকে থিতু-করা বা স্টাবলাইজিং ফোর্স; যতটুকু যা তারাই।  তাই আদর্শ হয়ত নয়, কিন্তু একমাত্র এভেলএবেল সম্ভাবনা।  যার বিকল্প হল আফগানিস্তানে এক অনিশ্চিত ও নিরন্তর গৃহযুদ্ধ!

বহুদিন পরে আবার আমেরিকা গতকাল পরাজয়ের স্বাদ পেল। অনেকদিন থেকেই ব্যাপারটা পাওনা হয়ে উঠেছিল।  ঘটনার বড়দিকটার দিকে তাকিয়ে বললে, কেবল আফগানিস্তান নয় সারা দুনিয়া থেকেই গত পঁচাত্তর বছরে যে আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্ব, দুনিয়াজুড়ে রুস্তমি জারি আছে – তা যে ক্রমশ ক্ষয়ে পতনের দিকে আগানো শুরু করে দিয়েছে এরই আরেক বিরাট ইঙ্গিত প্রমাণ নিয়ে হাজির ছিল গতকালটা।

আফগানিস্তানে আমেরিকা গত ২০বছর ধরে পুতুল সরকার বসিয়ে নিজের দখল চালিয়ে গেছে। আশরাফ ঘানির প্রেসিডেন্টশিপে সর্বশেষে এমনই এক পুতুল সরকারকে দিয়ে আমেরিকা আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করে ছিল। এর অবসান ঘটেছে গতকালকে তাই গতকাল ছিল সেই বিশেষদিন। এর পুরা সরকার দেশত্যাগ করে পড়শিদেশে পালিয়েছে। আমেরিকান এক মাতবর থিঙ্কট্যাঙ্ক হল  আটল্যান্টিক কাউন্সিল।  তার ফেলো বা বাংলাদেশ এক্সপার্টেরা এখন স্বীকার করে নিচ্ছে যে   দুনিয়ার মানুষ “আমেরিকাকে বিশ্বাসঘাতক” হিসাবে দেখছে

কিন্তু চরমতম ইসলামবিদ্বেষী আমেরিকান বন্ধুরা যেমন ভারতের সরকার, ও ভোকাল হিন্দুত্ববাদী “মন সাজানো” মানুষ এমনকি মিডিয়া এরা এই পরাজয় মেনে নিতে পারছে না।  তারা এখনও আকড়ে ধরে বসে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে আছে তাদের পুরান বয়ানে যে, “ইসলাম ধর্মটাই খারাপ” ধরণের রেসিজমের চর্চা, কিংবা মুসলমানেরা নিষ্ঠুর এমন নিকৃষ্ঠতম বয়ানের রেসিজম।  জনগোষ্ঠির মধ্যে খারাপ-ভাল লোক থাকে, কিন্তু যখন সারা “জনগোষ্ঠিটাই খারাপ” এজাতীয় বয়ান কেউ হাজির করে তখন বুঝতে কষ্ট হয়না যে হিটলারের রেসিজমের অনুসারীদের পুণঃউদয় ঘটেছে।

তেমনই, শুধু ভারতেই নয় বাংলাদেশেও যারা এমন গোষ্ঠি আছে তাদের অন্যতম হল মিডিয়ায় প্রথম আলো গোষ্ঠি। তালেবানেরা কাবুল দখল করতে যাচ্ছে এটাই ছিল গতকালের মূল নিউজ।  তাই দুটা মিডিয়াকে লক্ষ্য মানে মনিটর করছিলাম প্রথম আলো আর ভারতের দা প্রিন্ট পত্রিকা। যারা বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগান্ডা শুরু করে দিয়েছে।  আর প্রথম আলোর বেলায় জানার চেষ্টা করছিলাম তাদের প্রবল ইসলাবিদ্বেষী মন কীভাবে এমন ভোল বদলায়, কিভাবে বদলাতে পারে…।

রাত নয়টার দিকে প্রথম আলো নতুন এক রিপোর্ট ছাপে যোদ্ধাদের কাবুলে ঢোকার নির্দেশ দিল তালেবান। স্বভাবতই চোখ আটকানোর মত শিরোনাম।

তাই ততক্ষণাত এটা নিয়ে চারশব্দের একটা ফেসবুক স্টাটাস দিয়েছিলাম।  সেটা ছিল নেহায়তই আমার একটা অবজারভেশন। যে প্রথম আলো বদলে যাবার সুযোগ নিচ্ছে কিনা তা নিয়ে।  আর তাতে তালেবানেরা ভাল-মন্দ কেমন কী তা নিয়ে একেবারেই কোন কিছুই বলা হয় নাই।

বুঝিয়েছিলাম প্রথম আলো আর বোধহয় তালেবানদেরকে ‘জঙ্গী’ বলে চিনাচ্ছে না। বলছে “যোদ্ধা” অর্থাৎ একটা নিউট্রাল জোনে যাবার চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে। যেটা গত ২০ বছরে বহু আগেই প্রথম আলোর করা উচিত ছিল। কারণ সেটাই জার্নালিস্টিক স্বাভাবিক পজিশন।  তালেবানেরা ‘জঙ্গী’ কিনা এমন উস্কানিমূলক মুল্যায়ন বা ভিউজ ও বিশেষণ লাগানো মিডিয়ার কাজ না। এটা জার্নালিজম নয়। কোন বিশেষ কারও মতামত হতে পারে, নিউজ হতে পারে না।

এদিকে ঠিক একই রকমভাবে ইসলামবিদ্বেষী প্রপাগান্ডা করে যাচ্ছে গ্লোবালি আরেক সোশাল মিডিয়া – ফেসবুক।  তারা “তালিবান” শব্দটাকেই (সম্ভবত) টার্গেট করেছে। আমি এর আগে শুনেছিলাম কথাটা। কিন্তু পরখ করা হয় নাই। আমার কাজ সেসব নিয়ে নয় তাই সম্ভবত।  আমার সাথে বা আমাকে কখনও ফেসবুকের এমন ‘শয়তানি’ বা ‘ইতর ততপরতার’ মুখোমুখি হতে হয় নাই যে কমুউনিটি স্টান্ডার্ডের কথা তুলে সে আমাকে কোন কোপ দিয়েছে। মানে কোন শাস্তি আরোপ করেছে। যদিও আমি জানি এমন চরম বায়াসড কান্ড,  যাকে ইচ্ছা তাকে কোপানির কাজ ফেসবুক করে থাকে।  মানে ঢাকার ফেসবুক যেন ভারতের হিন্দুত্ববাদের চোখ লাগানো একটা রাডার। যে স্বয়ং ঢাকার আকাশকে জঙ্গী বা তালেবানি ততপরতা থেকে মুক্ত রাখার মহান ও পবিত্র দায়ীত্ব একাই নিজের কাধে তুলে নিয়েছে!
ব্কেযাপারটা সিম্উপল।  স্টাটাসে “তালেবান” শব্দটা ব্যবহার করলেই   তাকে কোপাতে ছুটতে হবে? লেখা মুছে দিতে হবে, অথবা নানান ধরণের শাস্তি দিতে হবে? সবচেয়ে ইতরোচিত ঘটনা হল লেখককে তাদের শাস্তি দেয়ার একশন যে জায়েজ হয়েছে এটা জবরদস্তিতে তারা স্বীকার করিয়ে নিতে চাইবে!

বিচার-বিবেচনাহীন বিদ্বেষী বুদ্ধিতে অপরাধমূলক কান্ড করছে তারা অথচ দোষী সাব্যস্ত করছে উলটা ভিকটিম-কে।

গতকাল সবচেয়ে ছোট কয়েকশব্দে একটা স্টাটাস দিয়ে লিখেছিলাম,  …   “তালিবানেরা জঙ্গী থেকে যোদ্ধা হয়ে উঠছে – প্রথম আলোর চোখে”

এরপর আগেপিছে আর কিছু লিখি নাই। আর কেবল মন্তব্যে প্রথম আলোর খবরের লিঙ্কটা জুড়ে দিয়েছিলাম। আর তাতেই ফেসবুক আমাকে হুমকি দেয় যে  কথিত কমুউনিটি স্টান্ডার্ডের ভায়োলেশনের জন্য আমার বিরুদ্ধে একশন নিবে। আর আমাকে তাদের একশনের পক্ষে সম্মতি দিতে হবে।
আমি বিরক্ত হয়ে কোন কিছুই করি নাই। ফেলে রেখেছিলাম। একটু পরে তারা আমার স্টাটাসটা মুছে দেয়। যদিও জানি না এতেই আমাকে শাস্তি দেয়া শেষ কিনা।

কেন যখন একমাত্র নিজেকেই বাংলাদেশকে জঙ্গীমুক্ত রাখার ত্রাতা ভেবে বসে সমস্ত জটিলতা ও আত্মহত্যার শুরু হবেই সেখান থেকে!

যেমন আমরা চাই না চাই, আফগানিস্তানের আমেরিকার পতনের মত, দুনিয়ার নেতাগিরি থেকেও আমেরিকান ক্ষমতার অবসান ঘটবে এবং তা রওনা দিয়েছে……।

আফগানিস্তানের পুতুল সরকারের পলায়ন  গতকাল সারাদিনে দুনিয়াজুড়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে জড়িয়ে ছিল ফেসবুকও!
স্বেচ্ছাচারি, অন্যধর্মবিদ্বেষী বা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা নিজেই নিজের করব খুঁড়ে!  এই আত্মহত্যা থেকে আমরা তাদের বাঁচাতে পারব না!

ফেসবুক কার স্বার্থ রক্ষা করতে চাইছে – আমেরিকা বা ভারতের? এটা কী তার কাজ, না পথ?
অন্যের ধর্ম, অন্যের বয়ান ইত্যাদি আপনার অপছন্দের হতে পারে। তা আপনার চায়ের কাপ নাই হতে পারে! তাই অপছন্দ করেন, কোন অসুবিধা নাই!  সেটা কোনই সমস্যা নয়। কিন্তু সেজন্য আপনি নিজেই তার ধর্ম বা তাঁর বয়ানের “বিদ্বেষী” হতেই পারেন না। নিজের সীমা বুঝতে হবে আমাদের!

গৌতম দাস
রাজনৈতিক বিশ্ল্বেষক

One thought on “ফেসবুক অসহিষ্ণুতার বিপদের পথে হাটছে!

  1. সহমত।প্রার্থনা করি ইসলামী এমিরেটস অফ আফগানিস্তানের সফলতা।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s