আফগানিস্তান সবাইকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে


আফগানিস্তান সবাইকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে

গৌতম দাস

০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

 

The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.” –Josep Borrell, ইইউর ফরেন পলিসি চিফ, the European Union’s top diplomat;

 

গত ৩১ আগষ্টের দুদিন আগেই শেষ পর্যন্ত আমেরিকা আফগানিস্তান ছেড়ে গুটিয়ে চলেই গেল; আর তা পক্ষ-বিপক্ষের সবাইকে অবাক করে। বিশেষ করে পক্ষের লোকেরা নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, আমেরিকারও দিন শেষ হয় তাহলে! এবার এতে সবাই বুঝে গিয়েছিল এটা শুধু আফগানিস্তান ছেড়ে আমেরিকার গুটিয়ে চলে যাওয়া বা পালিয়ে যাওয়া নয়। এটা শুরু। এটা শুধু আমেরিকার আগফানিস্তান ছেড়ে যাওয়া নয়, এটা গত কমপক্ষে ৫০০ বছরে ধরে অন্যের দেশে গিয়ে সে দেশ দখল, লুটপাট, ক্ষমতার রুস্তমি দেখানো আর সভ্যতা শেখানোর যে ভণ্ডামি চলেছিল, এখন থেকে এই পুরো প্রক্রিয়াটারই গোটানো, বন্ধ বা সমাপ্তির ইঙ্গিত করছে এটা। আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের দিন শেষ – মানে পশ্চিমের নেতৃত্বের দিনও শেষ! এটাই হল সেই অবিশ্বাসের ঘটনা যা এখানে বাস্তবায়িত হয়ে গেছে!

“রাষ্ট্র আর রাজনীতি” সাধারণত আমার লেখার মূল প্রসঙ্গ হয়ে থাকে। তবে রাষ্ট্র আর রাজনীতির দেশীয় দিকের চেয়ে বৈদেশিক বা গ্লোবাল দিকটা এ লেখায় অনেকসময় ভারী থাকে বলে অনেকে আমাকে আন্তর্জাতিক ইস্যুর লেখক বলে মনে করে; যদিও আমার লেখার মূল প্রসঙ্গ রাষ্ট্র আর রাজনীতিই।

গত ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তির প্রভাব’ নিয়ে একটা সিরিজ লিখেছিলাম। ফলে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন আমি আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে লিখছি। আসলে তখন থেকেই মূলত যে কথা বলতে চেষ্টা করেছি তা হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দুনিয়ায় প্রথম একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম তৈরি হতে সুযোগ পেয়েছিল, আমেরিকা যার প্রথম নেতা। যদিও এই সিস্টেমে কে নেতৃত্ব দেবে তা নির্ভর করে অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্নে সেসময়ের যে দেশ শীর্ষে থাকে তার ওপর। আবার যতই এই শীর্ষ অবস্থান ঢলে পড়ার দিকে যেতে থাকবে ততই তার নেতাগিরির দিনও শেষ হবে। আবার ওই ঢলে পড়া শীর্ষ অবস্থান বিপরীতে ক্রমেই অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে, যার দখলে যাবে, সেই-ই নতুন গ্লোবাল নেতার আসন নেবে। তবে সাবধান, অর্থনৈতিক সক্ষমতার বৃদ্ধির ব্যাপারটা সামরিক ক্ষমতার বলে অর্জনের বিষয়ই নয়। আমার লেখার প্রসঙ্গ ঠিক এই গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলও নয়। বরং জানা যে, এই পালাবদলের কালে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী কী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে অথবা নতুন কী কী ফ্যাক্টরের আবির্ভাব হয়ে থাকবে, এসব।

২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে এ কথাগুলোই আমি বলে আসছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, মানুষের পুরনো চিন্তার ফ্রেম তাকে আমার কথাগুলো বুঝতে বাধা দিয়ে গেছে। বিশেষত যেমন এক প্রধান বাধা হল কমিউনিস্ট চিন্তার ফ্রেমে ফেলে আমার কথা বুঝতে চাওয়া। দুই. যারা আবার নিজেদের কমিউনিস্ট ফ্রেমের বাইরের চিন্তার লোক মনে করেন তারাও আমার কথা মানতে চাননি। কারণ আমি বারবার দেখিয়েছি, এখনকার পালাবদলে আমেরিকার অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর ওদিকে তাদের আমেরিকা-প্রীতি বা শক্ত আস্থা ততই দুর্বল হলেও তারা আমার কথা অস্বীকার করে থেকেছে। যদিও সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হয়েছে এক প্রপাগান্ডা যে, আমি ‘চীনের পক্ষের লোক’; অতএব এ কারণে নাকি আমি আমেরিকাবিরোধী। আমি যতই বলি, আমি অবজেকটিভ দর্শক-পূর্বাভাসদাতা মাত্র। তারা মানেনি। বিশেষ করে ভারতের প্রপাগান্ডা যে, আমারটা নাকি চীনা ভাষ্য।

অথচ একমাত্র আমিই গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম তৈরি হওয়ার ইতিহাসটা প্রসঙ্গ করে সবার সামনে এনেছি। এভাবে গ্লোবাল নেতৃত্ব ব্যবস্থা, আবার এই নেতৃত্বের পালাবদলের প্রসঙ্গটাও এনেছি। ইতিহাসে এ ঘটনাটা প্রথমে ঘটেছে আমেরিকার নেতৃত্বেই। ফলে অকৃপণভাবে বাস্তবের সেই আমেরিকান গৌরবের কথাই আমাকে সতভাবে তুলে ধরতে হয়েছে। বাংলাদেশে আমার চেয়ে বেশি সেই ইতিহাসের আমেরিকান গৌরবের কথা আর কেউ তুলে আনেনি, তাদের এটা অজানা থাকার কারণে। কলোনিয়াল কারণে আমরা ইউরোপিয়ান-ব্রিটিশ ইতিহাস পড়ে ও ফলো করে অভ্যস্ত, আমাদের একাডেমিগুলোতে পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসুচিও তাতেই ভারাক্রান্ত। যেমন অনেক কমিউনিস্টকে দেখেছি, যারা এখনও মনে করেন গ্লোবাল নেতা বা  এক নম্বর পরাশক্তি হল নাকি ব্রিটিশ রাষ্ট্র, আমেরিকা নয়।

যাই হোক, আমার দিক থেকে সেটা ছিল গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমটা (ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতাসহ) তৈরির পেছনে আমেরিকান অবদানটাকে তুলে এনে ওর জন্ম ইতিহাসের দিকটা দেখানো। কিন্তু সেটা আমেরিকান-প্রীতি দেখানো জন্য অবশ্যই নয়। ইতিহাসের ফ্যাক্টস বলার জন্য বলতেই হয়েছিল। আবার উল্টো দিকে পালাবদলে চীনের নেতা হওয়ার ক্ষেত্রে তার যোগ্যতা-সহ বড় অযোগ্যতাগুলো কী – এর তালিকা আমিই সবার আগে ও বিস্তারে লিখেছি। কারণ মূল বিষয়টা আমেরিকা বা চীন এর কোনটাই একেবারেই না। ব্যাপারটা হল – আমাদের সময়কালকে আমরা ঠিকভাবে বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে পারছি কি না! এটাই মূল বিষয়। কিন্তু সেসব প্রসঙ্গ এখানে আবার কথা তুলেছি কেন?

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস এর সাক্ষাৎকারঃ
বাইডেনের আমেরিকার আফগানিস্তান ছেড়ে পালানো দেখে বর্তমান ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস [Ben Wallace ]  দ্বিতীয় বিশযুদ্ধের পরে এই প্রথম  সবদায় আমেরিকা ঘাড়ে ফেলে হাত ধুয়ে ফেলেছেন।  অথচ ওয়ার অন টেররের শয়তানির প্রথম যুগে, প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে এক নিশ্বাসে যার নাম উচ্চারণ হত তিনি হলেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার! মিঃ ওয়ালেস কী এখন এই মিথ্যাবাদী [সাদ্দামের ইরাকের কাছে weapon of mass destruction (WMD) আছে এই মিথ্যা কথা ] প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার এর দায় নিতে চাচ্ছেন না।  ঐ  সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী ওয়ালেস  বলেছেন, তিনি “আমেরিকাকে আর কোনো পরাশক্তি মনে করেন না” [It is certainly not a global force, it’s just a big power,]। কেন? আসলে সাক্ষাৎকারটা নিয়েছিল ব্রিটিশ ‘স্পেকটেটর’ নামে ম্যাগাজিন। সেটি নিয়ে লন্ডন ‘গার্ডিয়ান’ পরে এক রিপোর্ট করেছে। মূল সাক্ষাৎকারে ব্রিটিশ মন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘গ্লোবাল রঙ্গমঞ্চে আফগানিস্তান থেকে প্রস্থানটা ব্রিটিশ শক্তিরও সীমাবদ্ধতা প্রদর্শন করে কি”? [whether the exit from Afghanistan demonstrated the limits of British power on the world stage] মন্ত্রী এই জিজ্ঞাসার জবাবে প্রথমে স্বীকার করে নেন যে, ‘ব্রিটেন স্পষ্টতই একটি পরাশক্তি নয়”। এরপর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে মনোযোগ দিয়ে চেপে ধরেন। ওয়ালেস বলেন, ‘যে দেশ বা শক্তি যেকোনো একটা কিছু করব বলার পরে আর সেটি করবেই বলে আঁকড়ে থাকার মুরোদ রাখে না সে আসলে পরাশক্তিই নয়।’
কিন্তু এত কঠিন করে আমেরিকাকে নিচু দেখানো কথা মন্ত্রী বললেন কেন?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) মাঝামাঝি ১৯৪২ সাল থেকে ওই যুদ্ধসহ গ্লোবাল নেতৃত্বই আমেরিকার হাতে চলে গিয়েছিল। আমেরিকা-পরাশক্তি হওয়ার দিকে যাত্রা তখন থেকে। অর্থাৎ ১৯৪২ সালের আগের টানা ৩০০ বছর সারা দুনিয়া ছিল ইউরোপের কলোনি; ইউরোপের পাঁচ রাষ্ট্রের অধীনে কলোনি দখলে চলে যাওয়া দেশ। আর এই পাঁচের মধ্যে ব্রিটিশ-ফরাসি ছিল সেরা – যে দুয়ের মধ্যে আবার ব্রিটিশরা সবার সেরা। আর বিশ্বযুদ্ধ শেষে সারা ইউরোপকে স্বেচ্ছায় কলোনি শাসন ত্যাগ করতে হয়েছিল। কারণ আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

তবু বিশ্বযুদ্ধের পরে পরাশক্তি  আমেরিকার আড়ালে থেকে তারই ছোট পার্টনার হিসেবে অন্তত ব্রিটিশ-ফরাসি ভাব ধরে চলেছে। কিংবা ন্যাটো-জোটের সদস্য হিসেবে থাকার কারণে তারাও পরাশক্তি ভান করার সুযোগ পেয়ে এসেছে। করে গেছে। অথচ এসব কমন বাহিনী (যেমন- ন্যাটো) অথবা জার্মানি, জাপানে বা দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যারাক গড়ে সেখানে আমেরিকান সেনাবাহিনী পেলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেই ১৯৪৫ সাল থেকে এসবের খরচের বেশির ভাগ এখনো একা আমেরিকা বহন করে আসছে। খুব সম্ভবত আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের পরে এখন আমেরিকা এসব খরচ বইতে অপারগতা দেখাবে, ফলে ইউরোপের যে ক্ষমতার জৌলুস সেসব কিছুতে এখন টান পড়বে।

ইইউর ফরেন পলিসি চিফঃ
তাই ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফরেন পলিসি ও নিরাপত্তা পলিসি ইস্যুতে প্রধান প্রতিনিধি জোসেপ বোরেলের [Josep Borrell] মন্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলছেন, বাইডেনের দুর্বল পরিকল্পনায় আফগানিস্তান ত্যাগ করার পর সারা মহাদেশজুড়ে এ নিয়ে সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। ‘এটা পশ্চিমা দুনিয়ার জন্য বিরাট পরাজয় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে সবকিছু ওলটপালট করে খেলা বদলে দেয়ার মতো এক ঘটনা। “ইইউ’র এখন ‘আপন স্বার্থ বুঝে নিতে সক্ষম হতে নিজেই এগিয়ে আসা ও সক্ষম হওয়া উচিত, বিশেষত যখন আমেরিকা আর সংশ্লিষ্ট থাকতেই চাচ্ছে না” [The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.]”।

But after Biden’s ill-planned exit from Afghanistan, criticism exploded across the continent. “It’s a failure of the Western world and it’s a game-changer for international relations,” said Josep Borrell, the European Union’s top diplomat. “The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.”

আর ওদিকে বাইডেন সম্ভবত ভাবছেন, ‘গত ৭৫ বছর ধরে তোমরা কেউ খরচের দেও নাই। কাজেই যেখানে আমেরিকার একার পক্ষেই আর খরচ বইবার ক্ষমতা নেই সেখানে তোমাদের সাথে কথা বলে আমার কী লাভ?’
কথাগুলো সত্য বটে! কিন্তু ট্রাম্প যখন আগে একইভাবে ও ভঙ্গিতে ইইউ এবং ন্যাটো পর্যায়ে কথা বলেছিলেন; আর ট্রাম্পের আমল থেকেই ইতালি-জার্মানি ও পরে ফরাসিদের উদ্যোগে সারা ইইউ-ই চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে ফেলেছিল। আর তাতে ইইউ-চীনের কম্প্রিহেনসিভ ইনভেস্টমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট [EU – China Comprehensive Agreement on Investment (CAI)] স্বাক্ষর শেষ হয়ে গিয়েছিল। অথচ বাইডেন শপথ নেয়ার পরই ইইউ’র সাথে ট্রাম্প সম্পর্ক খারাপ করে ফেলেছেন – একথা বলে অভিযোগ তুলে এরপর দাবি করেছিলেন, তিনি ২০০১ সালের আগের আমেরিকা-ইইউ পারস্পরিক সম্পর্কের সবকিছুই তিনি আবার গড়বেন – এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কেন? আর ইইউ এই প্রতিশ্রুতিতে এতই আস্থা-বিশ্বাস রেখেছিল যে, চীনের সাথে তাবত চুক্তি ও কথাবার্তা সবকিছু [(CAI) চুক্তিসহ] সেই মুহুর্ত থেকে স্থগিত রাখা হয়েছিল ; তারা এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল চীনকে! এখন সেসবের তাহলে কী হবে?

অর্থাৎ বুঝাই যাচ্ছে, ইইউ-আমেরিকা  সম্পর্কের পারস্পরিক আস্থা কত নিচে নেমে গেছে। আসলে মূল ঘটনা হল  – বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একাই। ব্রিটেন বা ন্যাটোকেও সাথে নেননি, একবার জিজ্ঞাসাও করে নাই। কেবল প্রত্যাহারের শেষদিন, ৩১ আগস্টের কদিন আগে জি-৭ পর্যায়ে একটা নামকাওয়াস্তে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছিল। যেখানে ইউরোপের কোন সদস্যের কারো কোনো অনুরোধ-পরামর্শ বাইডেন একেবারেই আমল করেননি।

এক কথায় বললে, কার্যত দু’দিন আগেই আমেরিকা সব ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাওয়ার পর সারা পশ্চিমা দুনিয়ায় প্রচণ্ড হতাশা আর ক্ষোভ নেমে আসে এবং সর্বগ্রাসী এক ‘লস্ট’ [LOST] মানে সব হারানো অনুভব তাদের সবাইকে একেবারে ‘খেয়ে ফেলেছিল’। ফলে এসব চরম হতাশামূলক বক্তব্য-মন্তব্য সেসবেরই বহিঃপ্রকাশ। এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস কত চেষ্টা করেছিলেন,এসময়ে তার সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম সফরকে বিরাট হাইলাইট করবেন। কিন্তু আফগানিস্তানের পরাজয়সম প্রত্যাহার সব কিছুকেই ছাপিয়ে গিয়েছিল, আর তাতে গ্লোবাল মিডিয়া থেকেই এই সফর আউট হয়ে গেছে। গ্লোবালি বাহাদুরি করে বেড়ানো আমেরিকা এমন হতাশায় হারিয়ে যেতে পারে এটা এর আগে কেউ কল্পনাও করেনি।

সবার নিচে খারাপ অবস্থায় ইন্ডিয়াঃ
“অবশেষে সব দোলাচল, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও দোটানার অবসান। ঢাকঢাক গুড়গুড়ের ঘোমটা সরিয়ে গত মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় ভারতীয় দূতাবাসে তালেবানের মুখোমুখি হলেন রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তাল এবং ভারতের ‘উইশ লিস্ট’ বা ইচ্ছা তালিকা তিনি পেশ করলেন। গোপনীয়তার ঘেরাটোপ সরিয়ে নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে তা প্রচারও করল। সন্ত্রাস বন্ধে সন্ত্রাসীদের সাথে সরাসরি দর-কষাকষির এক নতুন অধ্যায়ও শুরু হলো। ‘আগামী দিনে এই গতিপথের চরিত্র কী হবে, এখনই অনুমান করা কঠিন”।

উপরের প্যারাটা – না এটা কোন অ-ভারতীয়ের লেখা নয়। বরং, বাংলাদেশী প্রথম আলো পত্রিকায় দিল্লির প্রতিনিধি সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এর পাঠানো রিপোর্ট এটা। যিনি সব সময় ভারতীয় উগ্র দেশপ্রেমের রঙে লেখা লেখা পাঠিয়ে থাকেন। অথচ এই লেখায় তিনি মোদির ভারতের দেউলিয়া হয়ে পড়া “আফগান নীতি” থেকে নিজের দূরত্ব রচনা করে, এরপর লিখেছেন। তার সব চেয়ে কড়া সমালোচনার বাক্য ওই “সন্ত্রাস বন্ধে সন্ত্রাসীদের সাথে সরাসরি দর-কষাকষির এক নতুন অধ্যায়ও শুরু হল” [ভারতকে নীতি বদলাতে বাধ্য করল তালেবান]।

সৌম্য এমন করে কেন লিখেছেন? কারণ আট বছরে পা দেয়া মোদি সরকারের পাকিস্তান-আফগানিস্তান নীতি হল – মুসলমানবিদ্বেষ; একে ততই চরমে নাও আর মুসলমান ঘৃণা ছড়াও যত বেশি সম্ভব। কারণ এতে ততই হিন্দুত্ববাদ ফলবতী হয়ে ভোটবাক্স ভরাবে। কিন্তু এটা করতে গিয়ে ভারত-রাষ্ট্রের ক্ষতি হলেও সে্টা সেকেন্ডারি ও তুচ্ছ। কারণ সহজে ক্ষমতায় থাকতে পারাটাই মোক্ষ!

এখান থেকেই সাজানো মোদি-নীতি নাকি হল, “সন্ত্রাসবাদী সংগঠন বা ব্যক্তি বলে ভারত সরকার যাদেরকে ঘোষণা করেছে তাদের সাথে কোনো কথা বা যোগাযোগ করা যাবে না”।  কিন্তু এই নীতিই মোদির গলায় এখন ফাঁস হয়েছে। মোদী সরকার এতদিন এই নীতির কারণে, তালেবানের সাথে কোনো ফরমাল ডায়ালগ করতে পারছিল না। কারণ তারা আগেই তালেবানকে “সন্ত্রাসবাদী” বলে নিষিদ্ধ করে রেখেছে। সেই ২০১৪ সালে সুষমা স্বরাজ যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী!

কিন্তু গত আগস্টের শুরুতে বা তারও আগের দু-একবার তাই ভারত কাতারে তালেবানের সাথে কথা বলার সুযোগ নিয়েছে। কিন্তু প্রকাশ্যে তা কখনো স্বীকার করেনি। ফলে ডায়ালগের বড় কোনো কার্যকর ফল ভারত পায়নি। আবার গত ১৫ আগস্ট তালেবানদের কাবুল দখলের পর এয়ারপোর্ট পার হতে গিয়ে আটকেপড়া ভারতীয়রা বুঝে যায়, ভারতে‘মোদিকে ফোন করে কান্নাকাটি করেও কোনই লাভ হচ্ছে না। এর চেয়ে কাছের তালেবান কমান্ডারই নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য আসল ভরসা।’ তা ইতোমধ্যে  আমরা কলকাতার বাঙালি তমালের ভাইরাল হওয়া বয়ানে দেখেছি। কাজেই এখানেও প্রমাণিত যে, ইসলামবিদ্বেষ বা তালেবান-ঘৃণা ভারতেরই নিজস্বার্থের বিরোধী। কাজেই চরম নিরুপায় হয়ে আর নিজের পায়ে দেয়া নিজের বেড়ি ভেঙে এবার কাতারে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তাল তালেবান নেতা শের মোহাম্মদ আব্বাস স্ট্যানিকজাইয়ের সাথে বৈঠক করেছেন, প্রকাশ্যেই। তবে যে উসিলায় বৈঠক করেছেন তা ঝুটা। কারণ ঐ রিপোর্টার লিখেছেন, “জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ৩-২ বিভাজনে যে প্রস্তাব পাস করে…’, এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা। কারণ, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সাজানো হয়ে আছে এভাবে যে  এর পাঁচ ভেটো সদস্যের যেকোনো এক সদস্য যদি ভেটো দেয় তো ওই যেকোন প্রস্তাব বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ একটা না-ভেটো ভোটই সভার সবকিছু উলটে দিবার জন্য যথেষ্ট। সোজা কথা, চার ভেটো সদস্য একদিকে ভোট দিয়েও  বিপক্ষে এক না-ভোট কে উল্টাতে পারবে না। এমনকি তাতে মোট ১৫ সদস্যের ১৪ সদস্য কোন প্রস্তাবের পক্ষে আর এক ভেটো-সদস্য বিপক্ষে থাকলেও ওই প্রস্তাব গৃহীত হবে না। এটাই তো ‘ভেটো’র অর্থ। অথচ লেখা হয়েছে ‘জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ ৩-২ বিভাজনে যে প্রস্তাব পাস করে’, অর্থাৎ যেন পাঁচ ভেটো সদস্যের তিন সদস্য পক্ষে আর দুই সদস্য বিপক্ষে থাকলেই প্রস্তাব পাস করা যায়; যেন নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটো-সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই প্রস্তাব পাস হয়। আসলে এ কথাটাই ভিত্তিহীন। কাজেই দীপক মিত্তাল নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া কোনো প্রস্তাবের ভিত্তিতে তৈরি করা ভারতের কোনো দাবিনামা নিয়ে তালেবান নেতার সাথে দেখা করতে যাননি। দেখা করেছেন, ভারতের নিজের এক কামনা-নামা নিয়ে।

তবে জেনে না জেনে ওই রিপোর্টার পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, আফগানিস্তানে আমেরিকার স্বার্থ আর ভারতের স্বার্থ একেবারেই আলাদা। তাই আমেরিকা তালেবানের সাথে ডিল করেছে এবং চুক্তি করে তা বাস্তবায়ন করেও ফেলেছে। অথচ ভারতের সামনে কোনো দিশা নেই। আসলে ভারতই এখনো তালেবানদের সাথে সম্পর্ক করবে কি না, সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

আর ভারতের সিদ্ধান্ত না নিতে পারার প্রধান কারণ ইসলামবিদ্বেষ ও গভীর মুসলমান- ঘৃণা। কারণ এ দু’টাকে মোদি ও তার দল, হিন্দুত্ববাদের পক্ষে ভোট জোগাড়ের চাবি বলে ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছে এবং সহসাই এখান থেকে সরে আসতে পারবে না, তা চায় না।

যদিও মুখে বলছে তালেবানদের হাক্কানি গ্রুপে তার আপত্তি, কারণ এরা পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত। বাস্তবতা হল – তালেবান মূল লিডারের তিন ডেপুটি আছেন যার একজন হাক্কানি গ্রুপের প্রধান সিরাজুদ্দিন হাক্কানি। আর ভারত দাবি করছে যে, তাকে মানে ওই গ্রুপকেই বাদ দিতে হবে! অর্থাৎ ভারত নিজেকে তালেবানদের কাছে নিজেকে এতই ওজনদার মনে করে?
আসলে ঘটনাটা উল্টো। ভারত তালেবানদের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। ফলে কোনো গ্রুপ-কে বাদ দেয়ার কথা তালেবানদেরও ভাবতেই হবে না।

তালেবানের নিজের সমস্যাঃ
‘তালেবানের নিজের সমস্যা অন্যখানে এবং সেটা হল, আফগানিস্তানে রাষ্ট্রপ্রধান কেউ থাকল নাকি ১০ জনের কোন কমিটি ক্ষমতায় থাকল তা একেবারে নয়। মূল কারণ, এগুলো তো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাদের নিয়ে, কেমন হবে সেনিয়ে প্রশ্ন। এমন সরকার গঠিত হলে সেটা  সাময়িক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলে তা তো এক-দু’বছর ক্ষমতায় থাকতেই পারে – তাতে কোনটা একা প্রেসিডেন্ট  কেউ অথবা একটা কমিটি যাই হোক। মূল সমস্যাটা হল – এরপর স্থায়ী সরকার যেটা হবে সেটা কেমন হবে ব- এটা আগে বলতে পারতে হবে!

এ পর্যন্ত দুনিয়ায় দেখা গেছে, শাসনক্ষমতা হয় মূলত দু-ধরণের, হয় রাজতন্ত্রের না হয় রিপাবলিক (প্রজাতন্ত্র)। সাধারণত রাজতন্ত্রগুলো তাকে শাসনক্ষমতা কে দিয়েছে তা বলতে পারবে না, এমন ধরনের হয়। যেমন কোন আমিরের আমিরাত তেমনই এক শাসনক্ষমতা যা আসলে এক ‘রাজতন্ত্র’, যদিও শব্দটা ব্যবহার করেনি। তবু এটা রাজতন্ত্র বা মনার্কিই। এমনকি সমাজের কিছু এলিট যেমন ধরুন গুলশান-বারিধারার বাসিন্দাদের নিজেদের মধ্যে ঠিক করা এক শাসনক্ষমতা বা সরকার – এরাও কে তাদের ক্ষমতা দিয়েছে তা বলতে পারবে না বা ফলে চায় না।

আসলে কে তাদের ক্ষমতা দিয়েছে বা দিবে- এই প্রশ্নের জবাব তাদের কাছে থাকতে হবে। নিজেকেই নিজে দিতে পারতে হবে। এর জবাব যার কাছে নেই, দিতে চায় না; এর মানে হবে এটা রাজতন্ত্র অথবা একটা এলিট গ্রুপ এদের রাজতন্ত্র।

তবে এই প্রশ্নটারই আরেকভাবে জবাব দেয়া যেতে পারে। তা হল, শাসন ক্ষমতায় ঐ দেশে পাবলিক বা জনগণের ভূমিকা কী হবে? সরকারের সাথে পাবলিকের সম্পর্ক কী হবে কিভাবে হবে? পাবলিক কি ভোট দিতে পারবে? ভোটের ব্যবস্থা কি আদৌ  ঐদেশে থাকবে? (কারণ, রাজার দেশে ভোট দেয়া থাকে না।) এসব প্রশ্নের জবাব থাকতেই হবে।

নিজেকেও প্রশ্ন করা যেতে পারে, আমাদের দেশে রাতের ভোটের সরকার হলে আমরা এতে আপত্তি দেখাই কেন? সরকারের জবাবদিহিতা না থাকলে, ইচ্ছামতো গুম-খুন করা হলে আপত্তি করি কেন?

আর আরেক বড় সমস্যা হল, নিজেকে  রিপাবলিক রাষ্ট্র ও সরকার বলে নিজেকে ঘোষণা না করলে জাতিসঙ্ঘের অনুমোদন পাওয়া অসম্ভব। তাতে ‘ইসলামী রিপাবলিক’ ঘোষণা দিলেও ওসুবিধা হবার কথা না।  ইরান বহাল তবিয়তে এক ইসলামি রিপাবলিক যে জাতিসঙ্ঘের সদস্যও।  এটা না হলে, ক্রমশ উঠে যাওয়া অজস্র প্রশ্নের ঠেলায় বিভেদ শুরু হবে। যারা আমেরিকা বা পশ্চিমের বিরুদ্ধে তালেবানদেরকে চীন-রাশিয়াসহ  যারা স্ট্রং সমর্থন জানিয়ে আসছে, তারাও দুর্বল হয়ে যাবে একপর্যায়ে।

আসলে ব্যাপারটা হল,  আ্মরা যেমন ইচ্ছা তেমন শাসনক্ষমতার রাষ্ট্র ও সরকার গড়তে পারি না। এর আরেক মূল কারণ, একালের গ্লোবাল বাণিজ্য। আপনার দেশকে গ্লোবাল বাণিজ্যে অংশ নেয়া সদস্য হতে হবে। না হয়ে দেশ চালানো একালে খুবই কঠিন। অনেকটা অবরোধে পড়ে থাকা ইরানের তেল আছে; কিন্তু তা অন্যদেশে বেচে আরেক অন্য দেশ থেকে অন্য পণ্য কিনতে পারবে না – এ ধরনের সমস্যা হবে; যেটা মারাত্মক। এটা অনেকটা গ্রামে আপনাকে একঘরে করে ফেলে রেখে দেয়ার মতো হবে। আপনার দেশের মাটির নিচে বহু কিন্তু হবু  মুল্যবান সম্পদ থাকতে পারে। কিন্তু যখন আপনি তা কাউকে বেচতে পারেন না, তখন আর সেটা সম্পদ নয়। ওটা আর মুল্যবান নয়।

তবে এরপরেও যদি এতে আপনার কোনো সমস্যা না হয়, সহ্য হয়, তবে ঠিক আছে। আপনার যা ইচ্ছা শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে অন্য দেশ থেকে কিছুই কিনতে বেচতে পারবেন না যার সোজা মানে, গ্লোবাল পণ্যবিনিময় মানে মুদ্রাব্যবস্থায় আপনি সদস্য না হয়েই থাকতে চাওয়ার পথ বেছে নিলেন। একবার করে দেখতে পারেন, জীবন যাপনের কষ্টটা জানা থাকা খারাপ না, খারাপ কেন হবে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা  গত  ০৪ সেপ্টেম্বর আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “আফগানিস্তান নিয়ে সবাই প্রশ্নের মুখোমুখি “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s