কেলি কেইডারলিং-কে জানতে হবে, বাংলাদেশে আমেরিকা বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে!


কেলি কেইডারলিং-কে জানতে হবেঃ
বাংলাদেশে আমেরিকা বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে!
গৌতম দাস
২৬ নভেম্বর ২০২১
                              Ambassador Kelly Keiderling
আমেরিকান এক কূটনীতিক ও উপ-মন্ত্রী কেলি কেইডারলিং [Kelly Keiderling] বাংলাদেশে এসেছিলেন তাঁর অফিসিয়াল সফরে।  তবে সেটা এক বহুরাষ্ট্রীয় সম্মেলনে [Indian Ocean Rim Association ministerial meeting – IORA] , ঠিক বাংলাদেশের সাথে নয়। অর্থাৎ তাই সম্ভবত সরকারের উপদেষ্টা হিসাবে কেবল এক সালমন এফ রহমানের সাথে সাক্ষাতের কথা দেখেছি।  যাবার আগে তিনি ডেইলি স্টারের সাথে কিছু কথা বলেন, যা নিয়ে একটা রিপোর্ট ছাপা হয়েছে গত ২১ নভেম্বর। এই কেলি কেইডারলিং আসলে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া (বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা এই পাঁচ দেশ) বিষয়ক ব্যুরোর ডেপুটি অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি, যা আমাদের উপমন্ত্রী তুল্য।
কেলির যে কথার উপর জোর দিয়ে এই সাক্ষাতকার তা হল – তিনি বলছেন, “সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার বাকী ৫টি দেশ থেকে ভারতকে আলাদা করতে বাইডেন প্রশাসন স্টেট ডিপার্টমেন্টে আমলাতান্ত্রিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে”। তিনি আরও বলেছেন, “অর্থনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ে” বাংলাদেশের আমেরিকার কাছে গুরুত্ব বেড়েছে। আর এই “ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ সম্পর্কে পুরনো ধারণা থেকে সরে আসছে যুক্তরাষ্ট্র”।
সোজা করে বললে আগে দক্ষিণ এশিয়ার একই ডেস্কের মাধ্যমে ভারতসহ আরও পাঁচ দেশ বিষয়ক আমেরিকান স্বার্থ একসাথে দেখাশুনা করা হত। আর এখন এই “পাঁচ দেশকে ভারত থেকে আলাদা ডেস্কে নিয়ে, ভারতের নিচে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলা থেকে এদের মুক্ত’ করা হয়েছে। একথাই তিনি জানালেন।
আর সমস্যা হয়েছে এখান থেকে। কেন?
অনেকে এটাকে পড়েছে এভাবে যে এতে আমেরিকা ‘বাংলাদেশকে ভারতের চোখ দিয়ে দেখা থেকে’ আমাদের নিজেকে মুক্ত হয়েছে বলে।
সরি, এটা একেবারেই ভুল রিডিং!
বরং প্রধান ও প্রথম কথা হল, আমেরিকা বাংলাদেশে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। অন্তত, ২০০৭ সালের শুরু থেকেই। কাজেই বাংলাদেশে ‘আমেরিকান মূল সংকট বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকার’।
কথা অনেকঃ
১। কেন ২০০৭ সালে ক্ষমতা দখলঃ
কেন এই ক্ষমতা দখল করানো হয়েছিল এর কোন ‘গ্রহনযোগ্য’ ব্যাখ্যাও আমেরিকা আমাদেরকে দেয় নাই। হয়ত নিমরাজি ভাবে মেনে নেয়া যেত যদি ফলাফল খুবই প্রয়োজনীয় ও কাজের বা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ লাভজনক মনে হত। যার কোনটাই হয় নাই, তা ছিলও না। শুধু তাই না বরং মানুষ মনে করে, আজকের সরকারের বিরুদ্ধে যা কিছু মুখ্য বড় বড় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এর ভিত্তি তৈরি হয়েছে সেসময়ে। যেভাবে সরকারকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল আর পরে বিরোধিদের দমনকে ও করার পদ্ধতিকে উতসাহ ও অনুমোদন দেয়া হয়ে এসেছে। এব্যাা্পারে শক্ত শব্দে বলব, প্রধান আসামি বেপরোয়া আমেরিকা! জঙ্গিদমন, চোরাচালানি দমন, মাদক পাচারকারি দমন ইত্যাদি এসবের উসিলায় রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করতে দেয়া হয়েছে।
২। বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছেঃ
আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর’ এই একান্ত উদ্দেশ্য হাসিলের পক্ষে ভারত কাজ করে দিবে। আর এর বিনিময় পাওনা মিটাতে ভেট হিসাবে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। কেন? এর দায় কে নিবে? আর কেন এই আমেরিকাকে বাংলাদেশ আবার বিশ্বাস করবে?
আমেরিকা তুল্যহীন গ্লোবাল শক্তি ছিল। ছিল বলেছি। সেই শক্তি সে দায়িত্বজ্ঞানহীন বেপরোয়াভাবে ব্যবহার করেছে। এটা এতই বেপরোয়া যে এভাবে অপব্যবহার করে আমেরিকার নিজের কী লাভ হয়েছে হচ্ছে কিনা তাও যাচাই করা হয় নাই। এর কোন মুল্যায়ন আজ এক দশক পেরোলেও তা কোথাও দেখা যায় নাই। কে দায়ী, কী জবাবদীহিতা এর – এসবের কোন বালাই নাই।
৩। তাহলে আমেরিকা যদি এমন বেপরোয়া যা খুশি করতে থাকে তাকে বাংলাদেশের জনগণ নুন্যতম আস্থা-বিশ্বাস রাখবে কেন?
এই শতকে চীনা উত্থান প্রসঙ্গে আমেরিকার সরকারি [DNI বা Office of the Director of National Intelligence] স্টাডি গবেষণা রিপোর্ট গত ২০০৮ সাল থেকে প্রতি পাঁচবছরে যতগুলা Global_Trends_Final_Report প্রকাশিত হয়েছে – এর এমনকি যা ২০০৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বের হয়েছে তাতে কোথাও এমন পরামর্শ নাই যে
ক. চীন ঠেকানো, মানে চীনের এই অর্থনৈতিক উত্থান ঠেকানো আদৌ সম্ভব। বরং irreversible মানে কখনও তা পুর্বের জায়গায় ফিরবে না – বলা হয়েছে।
খ. ভারতকে চীন ঠেকানোর ঠিকা দিলে আমেরিকার কোন লাভ হবে, বাস্তবতা বদলাবে।
গ. সর্বশেষ 2040 Global_Trends_Final_Report যা ২০২১ সালে প্রকাশিত সেখানেও এমন পরামর্শের কথা জানা যায় না।
৪। অযোগ্য আমেরিকান প্রশাসনঃ
গত ২০১২ সালে আমরা দেখেছিলাম আমেরিকার বিশ্বব্যাংকের দিয়ে পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলা দায়ের। কিন্তু কোন কিছু আদালতে প্রমাণ হবার আগেই ২০১৭ সালে সেই মামলা বিশ্বব্যাংক আদালত থেকেই প্রত্যাহার করে নেয়। প্রশ্ন হল এই কাজ কে করেছিল? এত কাঁচা কাজ? দুর্বল ইমান?  এর মানে তো আমেরিকান উদ্দেশ্যই প্রশ্নের সম্মুখীন! মামলার যদি মেরিট-ই না থাকে সে মামলা কেন করতে যাওয়া? এ তো এক অযোগ্য আমেরিকান প্রশাসন!
এতে ফলাফল এই যে চীন তো এরই অপেক্ষায় ছিল যে অবকাঠামো ঋণ নিয়ে সে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প হয়ে বাংলাদেশের মত সব দেশেই ঢুকবে। চীন সেই সুযোগ পেয়েছে ও নিয়েছে।  তবু বাংলাদেশ ঢুকতে একটু সময় লেগেছে। গত ২০১৬ সালে চীনের মহাপ্রবেশ ঘটে যায়। যোগ্য হিসাবেই। তবে এতে আগে হত অন্তত টেন্ডারে কাজ, এখন কিছুর বালাই নাই। এই আর কী? তাহলে একোন আমেরিকা দুনিয়ায় একালে হাজির এবং সে আবার বাংলাদেশে উত্থিত হতে চাচ্ছে?
৫। বাংলাদেশের জন্য আজ সবচেয়ে চরম ক্ষতিকর ঘটনাঃ
বাংলাদেশের জন্য আজ সবচেয়ে চরম ক্ষতিকর ঘটনা যেটা আমেরিকা ঘটিয়েছে বা আমেরিকার কারণে ঘটেছে তা হল ভারতের হাতে বাংলাদেশকে তুলে দেওয়া এবং ওর পরের যাবতীয় পরিণতি। যা বাংলাদেশ এখনও চরমভাবে ভুগতেছে। গণভবনে কোন রুম বাকি নাই যেখানে সঙ্গোপনে কোন সভা করা যায়, এই হল দুর্গতির সর্বশেষ। ভারতকে ছাড়তে ছাড়লেও কম্বল ছাড়ে না।
এর প্রধানতম দায় এক চরম দায়ীত্বজ্ঞানহীন বেপরোয়া আমেরিকার। যে মনে করে সে সব কিছু করতে পারে। মানুষের রাষ্ট্র এখান থেকেই বিপদ্গামি হয় যখন সে ভাবতে শুরু করে সে সব পারে। প্রকৃতিগত বা অবজেকটিভ বাধা-নিষেধ যাকে কমন মানুষের ভাষায় আল্লাহর বাধা নিষেধও বলে এমন কোনকিছুকেও যে আর পরোয়া করে না – এর ধ্বংস তো অনিবার্য!
সেই আমেরিকা নাকি আবার উঠে দাড়াতে ফিরে আসতে চাইছে? এর কী কোন আপিল আছে না থাকতে পারে? সময় থাকলে আমেরিকান নেতারা দুদন্ড ভেবে দেখতে পারেন।
৬। আমেরিকা এখনও ভারতকে বগলে নিয়েই এশিয়াতে দাঁড়িয়ে আছে। অন্তত পাশে ভারত নিজের পায়ে দাঁড়ায় আছে, আমেরিকা এটাও পারে নাই। এমন দুরত্বের ইঙ্গিতও কোথাও দেয় নাই। তাহলে কেন বিশ্বাস করব? কোন আমেরিকাকে বিশ্বাস করব? আমেরেইকার স্ট্রাটেজিক বন্ধু হিসাবে ভারত থাকতেই পারে। কিন্তু এটা তো বাংলাদেশকে ভারতের হাতে বন্ধক দেয়া আমেরিকা! এমন ভারত-আমেরিকান সম্পর্কের বিনাশ ও ধবংস তো যেকোন ট্রু (true) বাংলাদেশি সবার নুন্যতম কাম্য।

উপসংহারঃ

কাজেই আমেরিকা বাংলাদেশকে আলাদা ডেস্কে দিয়েছে কিনা হু কেয়ারস? আগে বাংলাদেশের প্রায় নব্বইভাগ মানুষের মনের খবর নেন। কেন এটা একালে এত ভারতবিরোধী? এটা সেই দেশভাগের বিরোধিতা একেবারেই নয়। এটা তো ২০০৭ সালের আগে কখন এমন পর্যায়ের ছিল না। কেন ২০০৭ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে এমন হল? ২০১৪ সালের আগে তো মোদির হিন্দুত্ববাদ ছিল না!
লক্ষ্য করবেন আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের দিক থেকে কথাগুলো তুলি নাই। তাহলে?
আসলে আমেরিকারই জবাবদীহিতা নাই। তাই সে চরম দায়ীত্বজ্ঞানহীন বেপরোয়া। আমেরিকানদের এদিকটাই মুখ্য করে বলেছি এটাই এর ধবংসের কারণ হবে, যদিনা এর আগে নিজেকে সংশোধন, নিজের প্রায়শ্চিত্ত শেষ করতে সুযোগ পায় বা নিতে পারে।
চীনা উত্থান হয়েছে – সেটা ঠিক আছে। কিন্তু আমেরিকান গ্রহণযোগ্যতা তাই বলে কেন থাকবে না? যদিনা সে বেপরোয়া হয়!

সাহস থাকলে আমেরিকা নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে পারে কেন মুসলমানেরা এমন পর্যায়ের আমেরিকাবিরোধী!

বাংলাদেশে আমেরিকা বিশ্বাযোগ্যতার সংকটে! এটাই মূলকথা।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s