প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে


প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে

গৌতম দাস

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২১ ২০ঃ২৩ পিএম

https://wp.me/p1sCvy-3Qi

 

The War That Changed The Course of History | The First World War

ইতিহাস পড়ার অনেক পদ্ধতিই হতে পারে। এর মধ্যে একটা উল্লেখ করা যায় যেমন, কোন বিষয়ের আগে-পরের তুলনা করে বা এদুই সময়ের পার্থক্য জেনে পড়া। এভাবে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে আর পরে – এর মধ্যে পার্থক্য কী দেখা দিয়েছিল? আগে কী কী ছিল, যা পরে পরে আর থাকে নাই – এমনই বিষয়ে কিছু কথা বলব।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালটা হল ১৯১৪-১৮ সাল। সেসময়ের দুনিয়ায় বাণিজ্য ব্যবস্থা কেমন ও তা কতদূর বিকশিত হয়েছিল; এ ছাড়া বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পড়ে এর হাল কী হয়েছিল? মুলত এখানে সেই বাণিজ্যের দিকটা ফোকাস করে আগাবো।  এ’নিয়ে সবার আগের কথাটা হল, ১৯১৪ সালের আগে পর্যন্ত মানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগের জমানায়  গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের কথা যদি বলি, এটা নিজেই তেমন কিছুই বিকশিত ছিল না। কেন? এবং কী দেখে বুঝলাম?

প্রথমত,  বিশ্বযুদ্ধের আগের পরিস্থিতিতেই এটা সারা ইউরোপের সমস্যা। কথাটা আরেকটু ভেঙ্গে বললে, গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বলতে বুঝাচ্ছি, দুনিয়াজুড়ে ছোট-বড় যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কোন বাণিজ্য বা পণ্য লেনদেন বিনিময় কিছু ছিল কী না?  জবাব হল, তেমন কিছু ছিলই না। এই না থাকার প্রধান কারণ প্রথমত ও প্রধানত যা ছিল তা হল যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন ছিল না।  আমরা কিন্তু যোগাযোগ বলতে সবকিছুকে বুঝাই। যেমন পথঘাট মানে আকাশ, সড়ক রেল এবং  সব ধরণের জলপথ। আবার আরেক যোগাযোগ মানে হল, কথা বলা। মানে হল, সরাসরি দেখা করে কথা বলা থেকে টেলিগ্রাফ, ফোন থেকে একালের ইমেল থেকে ফেসবুক ইত্যাদি সব। এছাড়া আরেকটা আগাম কথা বলাই হয় নাই – তা হল ভাষা। পরস্পরকে বুঝা আর বুঝানোর মত কমন ভাষা বা জানা ভাষা থেকে কত দূরে ছিল, এটা এক বড় পয়েন্ট। আবার, আমরা জাস্ট চিন্তা করেন এখন বাংলাদেশে এক যোগাযোগ বলতে – সড়ক, সেতু, রেল, বিমান নৌ ইত্যাদি থেকে টিএন্ডটি বা আইসিটি ইত্যাদি সব মন্ত্রণালয়কেই বুঝাবে।  তাই মূল কথাটা হল, সেকালে এক মহাদেশের সাথে অন্য মহাদেশের কোন ধরণের যোগাযোগই ছিল না। এইটা হল বেজ ফ্যাক্টস। তাহলে যোগাযোগটা কে প্রথম ঘটালো? আর এখানে যে “সেকালে” বলছি এই সেকালে বলতে কোন সময় বা কোন বছর-কালের কথা এটা?

সরাসরি প্রথম কথাটা আগে বলেও নেই। পরে তা ব্যাখ্যা করে বলি। সেকথাটা হল, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের বা আসলে মহাদেশের সাথে মহাদেশের যোগাযোগটা সর্বপ্রথম ও একমাত্র ঘটতে পেরেছিল কলোনি দখলদারদের হাতে। যতটুকু যা প্রথমে ঘটেছিল তা তাদের  অন্যদেশ দখল করে তা লুটতে বেরিয়ে পড়া ও সম্পদ লুটে নিজ দেশে ফিরে আসা এই ছিল কাজ বা লক্ষ্য। আর এটা করাই হত একটা কোম্পানি খুলে ব্যবসা হিসাবে। একাজ প্রথম শুরু করেছিল  ইউরোপের কিছু রাষ্ট্র। আর তাদের কলোনি দখলের স্বার্থেই এই নেতি কাজের সুত্রেই তাদেরই প্রয়োজন মিটাতে গিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। সোজাকথা, এর আগের দুনিয়ায় এই লুটেরাদের দাঁড় করানো যোগাযোগ ব্যবস্থাটাও ছিল না।
কাজেই কলোনি শাসক মানে ব্যবসায়ী  মালিক যিনি মানে আমাদের বেলায় যেমন বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এরা তাদের কলোনি লুটের স্বার্থের যেটুক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়েছিলেন তা খুব খারাপ তা বলা যাবে। কিন্তু সেটুকুও কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিস্তারে কাজে লাগে নাই। কেন?
কারণ,  কলোনি লুটেরা স্বার্থ আর বাণিজ্য স্বার্থ এক জিনিষ নয়। এনিয়ে আরও বিস্তারিত পরে আসছি।

তাই গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য কেন চালু হয় নাই সেটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরে বলে কথা নয়। কারণ, কলোনি লুটের কাজ ও স্বার্থ  এটা বাণিজ্য করতে আসাই নয়। মূলত একারণের যতদিন কলোনি অর্থনীতি টিকে ছিল (১৯৪৫ সাল পর্যন্ত) ততদিন  গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য তেমন বিকশিত কিছু ছিল না। তাতে সেটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই হোক বা পরে।
তাই এটা ঠিক বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরে বলে নয়। বরং আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য নিজেই ছিল অবিকশিত ও বাধাগ্রস্থ। এই বাধার পেছনের মূল কারণ বলেছি ‘কলোনি ব্যবস্থা’। অর্থাৎ ইউরোপজুড়ে একটা ক্যাপিটালিজম বিকশিত হয়েছিল ঠিকই; আর এর সময়কাল ধরতে পারি মোটামুটি ১৬০৭ -১৯৪৫, এই প্রায় সাড়ে তিনশ বছর। কিন্তু তা  অবশ্যই এক ‘কলোনি ক্যাপিটালিজম’। এটা কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণভাবে বিকশিত ক্যাপিটালিজম নয়, এমন কি তা বিদেশের সঙ্গে ব্যবসা করেও অর্জন করা নয়। এটা এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে কলোনি দখল করে সেই বেপরোয়া লুটে ইউরোপে এনে জড়ো করা সম্পদ সংগ্রহে হাজির করা এরই এক প্রায় একমুখি এক  ‘কলোনি ক্যাপিটালিজম’।  এজন্য বলছি, আমরা যদি ১৬০৭ সালের পর থেকে বিচার করি মানে যখন থেকে সংগঠিত কলোনি দখল ব্যবসা একেবারে কোম্পানি খুলে তাতে আমাদের বেলায় বৃটেনে বিনিয়োগ ঢেলে অর্থনীতির প্রধান খাত হিসেবে শুরু হয়েছিল তখন থেকে পরের প্রায় সাড়ে তিনশ বছর এই সময়কালকে কলোনি যুগ বলতে পারি।
তবু আবার এ’সময়ের শুরুতে ধরে নেওয়া যায় যে, কোয়ালিটি স্টিল ও যুদ্ধজাহাজ তৈরির জ্ঞানবুদ্ধি আবিষ্কার ততদিনে চালু ও সহজপ্রাপ্য হয়ে গেছে। এককথায় ততদিনে ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী বিনিয়োগের ব্যবস্থা দাঁড়িয়েও গেছে জাহাজ বহর কিনে চারদিকে কলোনি দখল করতে বেরিয়ে পড়া।

পরের তিন-সাড়ে তিনশ’ বছর ইউরোপ এইভাবেই কলোনি দখল ব্যবসায় লিপ্ত থেকেই কাটিয়েছিল। তবে তাতে এমন দখলদার কোম্পানিগুলোর পরস্পরের মধ্যে লড়াই প্রতিযোগিতার ফলে কেবল যতটুকু যা পরিবর্তন এসেছিল। যেমন প্রথমত, কোম্পানিগুলোর লড়াই ও প্রতিযোগিতা আর শেষে তা আর কোম্পানিগুলোর মধ্যে না থেকে সংশ্লিষ্ট দেশের মধ্যে লড়াই ও প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর তাতে একেকটা কলোনি লুটেরা কোম্পানি বা তার নিজ দেশ একেকটা মহাদেশে শক্তিশালী ফোকাস করে নিজেকে গড়ে নিয়েছিল। যেমন প্রথমে ইউরোপের কলোনি দখলদার দেশের সংখ্যা সীমিত হয়ে যায় কেবল ইংলিশ, ফ্রেঞ্চ, ডাচ, পর্তুগিজ ও স্প্যানিস এই পাঁচ রাষ্ট্রের মধ্যে। তাও আবার তাদের লড়াই ও প্রতিযোগিতায়ও নিজেরা তারা  মহাদেশে ভাগ হয়ে যায়। যেমন, পর্তুগিজ ও স্প্যানিস কলোনি দখলদার কোম্পানি নিজেদের নিবদ্ধ করে কেবল ল্যাটিন আমেরিকা এই মহাদেশের মধ্যে। আর এদিকে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে ব্রিটিশ আর ফরাসি কলোনি দখলদার কোম্পানিগুলো নিজেদের নিবদ্ধ করেছিল। আর ডাচ কোম্পানি নিজেদের জড়ো করেছিল ইস্ট এশিয়ায় যেমন ফিলিপাইন বা ছোট কোন দ্বীপে।

এজন্যই বলেছি,  কলোনি দখলদারী যুগ শুরু হবার আগে, মানে মোটামুটি ১৬০৭ সালের আগের দুনিয়ায় দেশ-রাষ্ট্রগুলো পরস্পর পরস্পরকে তেমন চিনত না। অন্য ভাষায় বললে, মূলত যোগাযোগ ছিল না। ফলে বিনিময় বাণিজ্য-সম্পর্ক অনেক দূরের কথা ছিল। ফলে কলোনি দখলদারী শুরু হলে এর মাধ্যমে এই প্রথম তাদের মধ্যে যোগাযোগ ঘটে তবে সেটা এক কলোনি-সম্পর্ক, এটাই তৈরি হয়। এটা ঠিক বাণিজ্য সম্পর্ক একেবারেই নয়। যেমন আজকের দিনের মত (১৯৪৫ সালের পরে) আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বলতে যা বুঝায়, সেটা কখনই তৈরি হয়নি।
এর পিছনের মূল কারণ বলেছি, সম্পর্কটা যেখানে লুটের সেখানে দেশ-রাষ্ট্রের পরস্পরের মধ্যে কোনো আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্পর্ক হতে পারে না। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটা এক পক্ষীয়। আর যেটা হল, কলোনিকৃত দেশ থেকে সম্পদ ও পুঁজি-পণ্য পাচার (উদ্বৃত্ত সঞ্চয় বা সারপ্লাস পাচার)। ফলে এটা ঠিক বাণিজ্য না, তবে সম্পদ পাচারের সম্পর্ক।

কমিউনিস্ট চোখঃ
এখানে আরো একটা মজার অবজারভেশনের কথা বলা যায়। কোনো কমিউনিস্ট চোখ কখনো বাণিজ্য নিয়ে বুঝাবুঝিতে আগ্রহী নয়। বরং যা নিয়ে সে আগ্রহী তা হল, উদ্বৃত্ত সঞ্চয় বা সারপ্লাস পাচার নিয়ে। তাই আসলে সে নিশ্চিতভাবে বলতেও পারে না যে বাণিজ্য করা কী হারাম, না হালাল বলবে। ব্যবসা বা মুনাফা করা নিয়েও তাদের একই দ্বিধা। তবে মুনাফা নিয়ে সম্ভবত তারা প্রায় নিশ্চিত যে, এটা প্রায় সারপ্লাস চুরি করার মত। তাই এটাকে তাদের চোখে হারাম বা অগ্রহযোগ্য মানতে দেখা যায়। তাই শেষ বিচারে সামগ্রিকভাবে বাণিজ্য জিনিসটা তাদের চোখে অননুমোদিত বা অনাগ্রহের বিষয় হয়ে আজও থেকে গেছে। অথচ দেশ-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্য মানেই তো পণ্য বিনিময় লেনদেন এবং সব ধরনের বিনিময় ভাষা, ভাব-ভালোবাসাসহ সবকিছুর বিনিময়ের শুরু এখান থেকেই। আর সর্বোপরি এটাই সবচেয়ে দক্ষ, মানে কম শ্রম খাটিয়ে নানান পণ্য পাবার পথের উপযুক্ত ও একমাত্র উপায়; কিন্তু বাণিজ্য নিয়ে নিশ্চুপ থাকলে এর কোনো সম্ভাবনা নাই। তবে সার কথাটা হল, কলোনি যুগের প্রায় সাড়ে ৩০০ বছরে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্পর্ক তাই দুনিয়ায় তেমন বিস্তৃত হতে পারে নাই, মূলত সেটা কলোনি যুগ বা একপক্ষীয় সম্পর্কের কারণে। তবুও একটা খুবই সীমিত পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য চালু ছিল। যদিও তা আবার কেবল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত কার্যকর ছিল। আমরা এখন সেপ্রসঙ্গে যাব।

কিন্তু কীভাবে তা বোঝা গেল যে “খুবই সীমিত পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য” চালু ছিল? এর ভালো প্রমাণ আছে কী?
হ্যাঁ আছে। ‘রথশিল্ড ব্যাংক’ [Rothschild bank]। এটা মূলত জার্মানির এক পারিবারিক মালিকানাধীন ব্যাংক, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ময়োর আমশেল রথশিল্ড (Mayer Amschel Rothschild) যার জীবনকাল (১৭৪৪-১৮১২)। তিনি ইউরোপের অন্তত পাঁচ বড় শহরে তার সন্তানদের দিয়ে ব্যাংকের শাখা খুলে পুরা ব্যবসাটা পরিচালিত করতেন। আর জর্মানিতে নিজে বসে সেগুলোর সমন্বয় করে আসলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন  এক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা। মানে ইউরোপের একমাত্র প্রধান মুদ্রাগুলোর মধ্যে এক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা; কিন্তু সীমিত পণ্য-বিনিময় বা সীমিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু থাকার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?

মূল সম্পর্কটা হলো, আসলে মুদ্রা মানেই কোনো না কোনো দেশ-রাষ্ট্রেরই মুদ্রা। দেশের ভেতরে বিনিময় ওই একই মুদ্রার মাধ্যমে ঘটে থাকে, আর তা সহজও; কিন্তু আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিনিময় হতে হলে তা কোনো এক দেশীয় মুদ্রায় করা সম্ভব না। সেক্ষেত্রে সবার আগে আন্তঃরাষ্ট্র মুদ্রাগুলোর মধ্যে ‘বিনিময় যোগ্যতা’ থাকতে হয়। আর বিনিময় যোগ্য হওয়া মানে সবার আগে তাদের ‘বিনিময় হার’ জানতে হয়; বা বলা যায় সাব্যস্ত হতে হয়। যার সোজা মানে হলো, কেউ বিনিময় হার সাব্যস্ত করে দিতেই পারে, কিন্তু তিনি বিশ্বাসযোগ্য ও আস্থার হতে হবে। তবেই তা কাযর্কর ও এর এই বিনিময় হার অর্থপুর্ণ হবে!

ঠিক যেমন মুদ্রা মানেই আসলে আস্থা, বিশ্বাস। যেমন আমাকে কেউ একটা ১০০ টাকার নোট দিলে, যদি আমি নিশ্চিত হই সেই নোটটা এরপরে অন্যকে দিলেও অনায়াসে এটাকে ১০০ টাকার নোট বলে সে গ্রহণ করবে- তবেই আমি তা নিব। ঠিক যেমন যদি রটে যায় যে একশ টাকার নোট ব্যাপক নকল হচ্ছে, তাহলে ব্যাংক থেকে আসা নয়া নোটও বাজারের কেউ আর নিতে চাইবে না বা দ্বিধা করবে।

সেকালে ইউরোপের এই আস্থাভাজন বিশ্বস্ত লোকটাই হয়ে উঠেছিলেন আমশেল রথশিল্ড। প্রতিদিন সকালে তিনি ওই দিনের ইউরোপের প্রধান মুদ্রাগুলোর বিনিময় হার টানিয়ে দিতেন। কিন্তু সেটা কী কাজে লাগত? কেউ ধরা যাক জার্মানি থেকে ইংল্যান্ডে এসে কোনো পণ্য কিনে তার দেশে গিয়ে বিক্রির ব্যবসায়ী। তাহলে তিনি বিনিময় হার জেনে সেই পণ্যের পাউন্ডে দামের তুল্য পরিমাণ জার্মান মার্ক পরিশোধ করে কিনতে পারতেন। তবে রথশিল্ড ব্যাংকের কারণে একমাত্র বিনিময় হার জানা থাকাতেই এই বিনিময় সহজেই সম্ভব হত।

কিন্তু রথশিল্ড নিজে জানতেন কীভাবে যে আজকের বিনিময় হার কী রাখতে হবে? তার পদ্ধতি ছিল সোজা। সেকালে যেকোন দেশের মুদ্রা বলতে যে পরিমাণ কাগুজে নোট ছাপা হবে তা ছাপার আগে সমমান পরিমাণ সোনা ভল্টে জমা রাখা হত। যাতে সত্যি সত্যিও নোটের বাহক চাইলে সমপরিমাণ আসল সোনা তাকে দিয়ে দেয়া যায়।  কথা আরো আছে। সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক বলতে ধারণাটা আসে ১৯৪৫ সালের পর থেকে।  ফলে ব্যাংক ব্যবসা করত একমাত্র প্রাইভেট কোম্পানী। ব্যবসায়ীরা সরকারকে কখনও বাজার ব্যবস্থায় ঢুকতে দেয় নাই বা দেওয়ার সাফাই খুজে পায় নাই।  এসবই শুরু হয়েছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থা চালু বিশেষ করে প্রত্যেক সদস্য দেশে একটা করে কেন্দ্রীয় ব্যংক থাকার প্রয়োজন মিটাতে গিয়ে।  যেমন ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ব্যাংক অব ইংল্যান্ড” এক প্রাইভেট ব্যাংক ছিল। একে ইংল্যান্ডের কেন্দ্রিয় ব্যাংক করতেই সরকার এই প্রথম এই ব্যাংককেওধিগ্রহণ বা মালিকানা নিয়ে নিয়েছিল। এর আগে সরকারের অনুমতি নিয়েই ওই ব্যাংক মুদ্রা ছাপাত। ফলে চাহিবামাত্র সোনা ফিরিয়ে দিবার দায় ছিল ঐ ব্যাংকের। এজন্য ঐ মুদ্রাব্যবস্থাকে বলা হত, “গোল্ড ব্যাকড মানি”। অর্থাৎ যে ব্যাংক কাগুজে নোট বা মুদ্রা ছাপাবে সেইই কোন মুদ্রার হোল্ডার বা ধারক মালিক তিনি সোনা ফেরত চাইলে তাঁকে তা দিতে বাধ্য থাকত।
যেকথা বলছিলাম, মুদ্রা গোলড় ব্যাকড মুদ্রা হত বলে দেশের সোনার প্রবেশ বা বের হয়ে যাওয়া এর একাউন্টিং ভিত্তিক ছিল এই মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ ব্যবস্থা।  তাই   প্রতিদিন সকালে তিনি খবর নিতেন গত দিনে ধরা যাক পাউন্ডে মোট কেনার চেয়ে বিক্রি কত কম/বেশি হয়েছে। বিক্রি বেশি হওয়ার অর্থ হলো, তাহলে অন্য দেশের বেশি সোনা ইংল্যান্ডে এসে ঢুকেছে। তাই এটা পরদিন সমান করতে গেলে  যার অর্থ বিক্রি কমাতে হবে। বিক্রি কমানো মানে অন্যদেশের কম সোনা এসে ইংল্যান্ডে আগের দিনের চেয়ে কম ঢুকা। অর্থাৎ এটাই ছিল তার পরদিন হার সমান করার উপায়। এখন কতটা কমাবেন বা বাড়াবেন এটা অভিজ্ঞতা দিয়ে নির্ধারণ করে নিতেন। আর তাঁর পাঁচ ছেলের কাজ ছিল ওসব দেশের মুদ্রার হার নিয়ে একই খবরা খবর পিতার সঙ্গে দেয়া-নেয়া করা। এভাবে একটা আস্থা-বিশ্বাসের ওপর মানে রথশিল্ডের ভরসায় সীমিত আকারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সেকালে চালু ছিল।

কিন্তু ১৯১৪ সালে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে পর থেকে এই ব্যবস্থাটাও আর টিকে থাকতে পারেনি। যদিও পেছনের মূলকারণ যুদ্ধ-বিশৃঙ্খলা ঠিক তা নয়। মূল কারণ, মুদ্রাস্ফীতি। অর্থাৎ যুদ্ধে খরচ যোগাতে বা মিটাতে গিয়ে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করেছিল। যে কারণে, নিজ দেশেই সোনা ভল্টে রেখে সমপরিমাণ নোট ছাপানোর রেওয়াজ বজায় থাকেনি, মানে ‘গোল্ড ব্যাকড কারেন্সি’ বলে য়াসলে কিছু বজায় না থাকা শুরু হয়েছিল।  পরিণতিতে ‘গোল্ড ব্যাকড কারেন্সি’ ব্যবস্থার ওপর দাঁড়ানো মুদ্রা বিনিময় হার নির্ণয়ের রথশিল্ডের ব্যবস্থাটাও আস্থা-বিশ্বাস হারিয়ে অকেজো হয়ে গেছিল। আমরা মনে রাখতে পারি  মুদ্রাস্ফোত শব্দটার খাস মানে হল  সোনা আগাম ভল্টে না রেখে মুদ্রা ছাপানো। যুদ্ধের খরচ মিটাতে ইউরোপের সব মাতবর দেশই এভাবে মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়ে ছিল। এরই ফাইনাল প্রতিক্রিয়া হল আমেরিকার। ১৯৩৩ সালের ২০ জানুয়ারি এফডিআর [Franklin Delano Roosevelt ] বা  প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট প্রথমবার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেন। শপথের পরেই তার প্রথম সিদ্ধান্ত ছিল ডলারের মুদ্রাস্ফীতি ঘটানো। তার যুক্তি ছিল সারা ইউরোপ ঘটিয়েছে তাই তাদের সাথে সমান করতে তার এই সিদ্ধান্ত।  তিনি আগের এক আউন্স সোনার দাম ছিল ২৫ মার্কিন ডলার। তা বাড়িয়ে তিনি করেন ৩৫ ডলার। পরে ১৯৪৫ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থা চালু করার সমও গোল্ড ব্যকড কারেন্সি ব্যবস্থা চালু ছিল আর ১ আউন্স সোনা ৩৫ ডলারের এই রেটই বজায় ছিল।  দুনিয়ায় গোল্ড ব্যকড কারেন্সি ব্যবস্থা ভেঙ্গে যায় আসলে ১৯৫৮ সালে যা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থায় প্রয়োগ করে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থাকে পুণঃজন্ম দেয়া হয় ১৯৭৩ সালে। সে প্রসঙ্গ আলাদা, তাই এখানেই ইতি।
১৯১৪ সালে বিশ্বযুদ্দ্ধধে যে রথশিল্ডের ব্যবস্থা ভেঙ্গে যায় তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও এটা আর কখনো ফিরে কার্যকর হতে পারেনি। বরং কলোনি ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ায় আর ইউরোপের প্রবল অনুরোধে আমেরিকার নেতৃত্বে রথশিল্ডের কাজটিই আরও ব্যাপকভাবে করতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান গড়ে নেওয়া হয় ব্রেটেনহুড সম্মেলনে ১৯৪৪ সালে। দুনিয়ায় ব্যাপকভাবে গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের শুরু হয় তখন থেকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে কেন্দ্র করে।

লেখক- রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা  সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকার  ০৪ ডিসেম্বর ২০২১ ওয়েবে  আর  ০২ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে প্রিন্টে   “প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরের ফারাক”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s