আমেরিকায় সম্পত্তি-কেনা অর্থপাচারকারীর কী হবে?


 

আমেরিকায় সম্পত্তি-কেনা অর্থপাচারকারীর কী হবে?

গৌতম দাস

১০ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-3Sm

 

     US vows to crack down on money laundering in homebuyers

 

খবরটা একটু পুরনা, গত মাসের। ইস্যুটাকে গ্লোবাল অর্থপাচার- এই “দুর্নীতিরোধক” এক পদক্ষেপ বলা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে খবরটার গুরুত্ব মার্কিন অবরোধের চেয়ে কম নয়। হয়তো এর দৃঢ় প্রভাব অনেক বেশিই হবে। কিন্তু টাইমিং আর সম্ভবত আমাদের মিডিয়া এর তাৎপর্য যথাযথ টের না পাওয়ার কারণে এটা সামনে মানে উপর তলায় আসেনি। বিষয়টা আবার অবরোধ আরোপের মতোই আমেরিকান এক তৎপরতা। তফাত এই যে, অবরোধ দিয়ে বাইডেন দাবি করেছেন, এটা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে। আর এটাও বাইডেনের নেয়া পদক্ষেপ যা করাপশন বা দুর্নীতিকেন্দ্রিক। তবে তা গ্লোবাল নেচারের এবং প্রস্তুতি পর্যায়ে আছে মানে মাঠে এখনো অ্যাকটিভ হয়নি। তবে এটা বাংলাদেশের দুর্নীতি আমেরিকাকেও ছুঁয়েছে ধরনের। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই প্রসঙ্গকে আমেরিকান দলিল বা রিপোর্টে ব্যাখ্যা করা হয়েছে criminals, kleptocrats শব্দ দিয়ে। তাদের বিরুদ্ধে নেয়া পদক্ষেপ হিসেবে। কাদের বিরুদ্ধে? ‘kleptocrat’। ইংরাজি ক্লেপটোক্র্যাট শব্দটার অর্থ হল, সরকারি ক্ষমতা অপব্যবহার করে যে শাসক পাবলিক অর্থ-সম্পত্তি আত্মসাৎ করেজন-সম্পত্তি চোর শাসক

এ নিয়ে রয়টার্সের করা গত মাসে একটা রিপোর্ট আছে।  এই রিপোর্টে (বাংলাদেশের মত অনেক দেশকে মাথায় রেখে) অনেক পরিকল্পনার কথা বলা আছে। কিন্তু এর দুদিন পরেই ৯-১০ ডিসেম্বরের গণতন্ত্র সামিট [Democracy Summit] – এই গুরুত্বপুর্ণ কর্মসুচির কারণে kleptocrat ধরে আনার পরিকল্পনা থেকে মিডিয়া মনোযোগ কমে যায়। তবে ঐ রিপোর্টের  প্রথম বাক্যটা হল এ’রকমঃ “বাইডেন প্রশাসন গত ৬ ডিসেম্বর শপথ নিয়েছেন যে, (বিভিন্ন) দেশের সরকারি সম্পদ চুরি-লুটকারী অপরাধী শাসক ও এমন অন্যদের তারা কড়া পদক্ষেপ নিয়ে তাদের তছনছ করে দেবেন; যারা মানিলন্ডারিং করে আনা নগদ অর্থে ঘরবাড়ি (রিয়েল স্টেট) কেনাবেচায় জড়িত এবং একাজটা আসলে (তখনকার) আগামী সপ্তাহে আহূত আমেরিকার ‘গণতন্ত্র সামিট’-এর সাথে বৃহত্তর অর্থে দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ হিসেবে সম্পর্কিত” [“The Biden administration on Monday vowed to crack down on “criminals, kleptocrats and others” paying cash for houses to launder money as part of a broader anti-corruption drive linked to this week’s U.S. Summit for Democracy.”]।

এখন একটা উদাহরণ দিয়ে বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে ব্যাপারটা আরেকটু স্পষ্ট করা যাক। ধরা যাক, বাংলাদেশের এক মন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের জন্য সরকারি বার্ষিক বাজেটের প্রায় অর্ধেক অর্থ আত্মসাৎ করেছেন, সেই অর্থ  এবার মন্ত্রী নিজের ছেলেকে দিয়ে আমেরিকায় ট্রান্সফার করে নিয়ে গেছেন। এরপর ছেলে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছে ও ওই অর্থ দিয়ে হাউজিং প্রকল্প কিনেছে বা গড়েছে। বাইডেন সরকার বলতে চাইছে্ন “এটা মানিলন্ডারিং করে আমেরিকায় আনা অর্থ”। তাই  অর্থের কোনো বৈধ উৎস বলতে না পারা এই চক্রকে তিনি আইনের আওতায় আনবেন”। কথা সত্য। বাইডেন যা বলছেন তা যদি উনি সিরিয়াসলি বাস্তবে করে দেখান তবে এটা বাংলাদেশের সরকারের জন্য বিরাট আঘাত করা ঘটনা হবে।

এবারের (৯-১০ ডিসেম্বরের) ‘ডেমোক্র্যাসি সামিটের’ সাথে এই দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সম্পর্কটাকে আরেকটু পিছনের পটভূমিতে বলা যাক। ঐ একই রয়টার্স রিপোর্ট আমাদের জানাচ্ছে, “বাইডেন ক্ষমতার শপথের (২০ জানুয়ারি ২০২১) পরে জুন মাসেই তাঁর সহকারীদের তিনি এ’ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন [President Joe Biden ordered officials in June to step up the fight against corruption.]। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই কাজকে তারা আমেরিকান ‘জাতীয় নিরাপত্তার কৌশলপত্রের’ অংশ করে নিয়েছিলেন। আর তাই একাজে ‘৩৮ পৃষ্ঠার এক প্রাথমিক প্রস্তাব’ তৈরি করা হয়েছিল। [সেটার পিডিএফ কপি ঐ লিঙ্কে]  যার শিরোনাম ‘দুর্নীতি রুখতে আমেরিকান জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্র’ [ Pursuant To The National Security Study Memorandum On Establishing The Fight Against Corruption As A Core United States National Security Interest]। অনলাইনে এই দলিল উন্মুক্ত করা হয় ওই ৬ ডিসেম্বরেই।

যা চীনা ব্যাবস্থায় নাই বা দিতে পারবে না; সেটাই বাইডেনের ইস্যুঃ
যা চীনের নাই বা দিতে পারবে না বাইডেন তাই করবেন ও এমনই নীতি-পলিসি নেবেন – এবারে বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর তিনি এই বিশেষত্বকে যেন নিজের সাইনবোর্ড করেছেন। তাই, মানবাধিকার রক্ষার নীতি ও দুর্নীতিবিরোধী নীতি এভাবে গ্লোবাল অভিযানে হাতে নেয়া আর তাতে যত বেশিসংখ্যক দেশ ও ওসব দেশের জনগণের সমর্থন তাতে শামিল না হলেও আকৃষ্ট করা- এভাবেই তিনি আগাচ্ছেন। এটাই তার চীন ঠেকানোর কায়দা!

যদিও এনিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা অনেকটাই ভিন্ন। আমরা আগে দেখেছি দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এর আগেও অন্য আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিয়েছিলেন। আর তাতে যা তারা করবেন বলে মাঠে নামেন, তাই তারা করেন বা সফল হয়েছিলেন ব্যাপারটা এমন সত্য নয়। আমরা মনে করতে পারি আমাদের দেশের বেলায় ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের কথা বলে এই একইভাবে বাংলাদেশে আমেরিকার প্ররোচিত-সমর্থিত এক ক্ষমতা দখল হয়েছিল। ফলাফল কী হয়েছিল আপনারা সবাই কমবেশি জানেন। আর তাতে ফলাফল হল, তখনকার দুর্নীতি শত-কোটিতে গণনা করা হত বা চল ছিল। আর এখন বাংলাদেশে দুর্নীতির সেই গণনা হয় হাজার-কোটিতে; এই হল আমেরিকার দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের পরিণতি। অর্থাৎ যা আমেরিকা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিল তা করে নাই। সেদিকে ঘটনা নেয় নাই। আবার যেমন বলা হয়েছিল, আমাদের রাষ্ট্রকে ‘ওয়্যার অন টেরর’ মোকাবেলার উপযোগী ও যোগ্য করে সাজাতে নাকি ঐ ক্ষমতা দখল। কিন্তু আমরা দেখেছিলাম আমাদের রাষ্ট্রকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ আমেরিকা যা করব বলে গল্প শোনায় তা শুনতে ভালো লাগে হয়তও অনেকের। কিন্তু তা সে পূরণ না করে উল্টা নিজের বদ-উদ্দেশ্য কায়েম করে ভেগে যায়। এবং কোনো দায়দায়িত্ব নেয় না এবং কখনো নিজের আকামকে ফিরে দেখে না, ভুল বা অপরাধের মূল্যায়ন বা স্বীকার করে না। এক কথায়, এরা দায়দায়িত্ব-জ্ঞানহীন। ফলে স্বভাবতই, এখন বাইডেন প্রশাসন কী করছে ও কী বলতে চাইছে তা নিয়ে পাবলিক মনে কোনো আশাবাদ তৈরি করতে চাই না। আবার আগাম নিরুৎসাহিত বা হতাশা ছড়ানোও আমার কাজ নয়। বরং বাস্তবে যা হচ্ছে ও হবে তা যেন পাবলিক নিজেই সতর্ক থেকে চোখ-কান খুলে দেখে বুঝে নেয় এর সব রাস্তা খোলা থাকুক- এটাই ভালো!

৩৮ পৃষ্ঠার এক প্রাথমিক প্রস্তাবঃ
উপরে উল্লিখিত ৩৮ পৃষ্ঠার এক প্রাথমিক প্রস্তাবে, মানে ঐ রিপোর্টের কিছু বাক্য যা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। যেমন চতুর্থ পাতায় বলা হয়েছে, “গত ৩ জুন বাইডেন বলেছেন, ‘দুর্নীতিবিরোধী লড়াইকে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ বলে বিবেচনা করতে হবে” [On June 3, 2021, President Biden established the fight against corruption as a core national security interest of the United States.”]।’ এখন মনে হতে পারে, দুর্নীতিবিরোধী কাজে তিনি ভিন রাষ্ট্রের জন্য ত্রাতা হতে চাচ্ছেন, তবে তাতে এটা খোদ আমেরিকার ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ হচ্ছে কিভাবে? তিনি বলছেন, ‘গ্লোবাল দরিদ্র-মানুষ কমিয়ে আনার কাজে লড়াই এবং উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের বিকাশ এগুলোই পরোক্ষে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করে” [“corruption threatens United States national security, economic equity, global anti poverty  and development efforts, and democracy itself….[B]y effectively preventing and countering corruption and demonstrating the advantages of transparent and accountable governance, we can secure a critical advantage for the United States and other democracies.” ]।’ [ লেখকের নোট হল, এখানে সবই ভাবানুবাদ করা হয়েছে, তাই ছোট হয়েছে অনেক সময়। যাদের আগ্রহ তারা মুল ইংরাজিটা দেখে নিতে পারেন। ]

খুবই আদর্শবাদী কথা হয়তো এগুলো। তবু এখন এসব কথা শুনে আমরা এতটুকু বলতে পারি যে, এতে আমেরিকান নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করে বা হয় কি না তা আমরা না, আমেরিকাই সবচেয়ে ভালো বলতে পারে। তবে এটুকু আমরা বুঝি, কখনো দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নেয়া অথবা কখনো চুপ থাকার অবস্থান নেয়া – যেটাই আমেরিকা করুক তাতে ঐ সময় অবশ্যই তা আমেরিকার স্বার্থের পক্ষে যাবে অনুমান করেই আমেরিকা এমন একেকটা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। ফলে এককাট্টা কোন নীতি না রাষ্ট্রস্বার্থের ভিত্তিতেই আমেরিকা চলে – এদিকটা খেয়াল রেখেই আমেরিকার বাতচিত বুঝতে হবে বা নেয়া উচিত। নইলে হুদাই ভরসা করার কিছু নাই। যেমন  ২০০৭ সালে আমরা দেখেছিলাম আমাদের রাষ্ট্রকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল কারণ আমেরিকান বিবেচনায় ওটাই আসলে তার একান্ত স্বার্থ ছিল। যেটা এখন সম্ভবত আর তার স্বার্থ নয় যদিও ওর স্বাদ মানে আমাদের জিব পোড়ার অভিজ্ঞতা এখনো বর্তমান! যেমন সে সময়ে  ভারতকে চীন-ঠেকানো বা কনটেইনমেন্ট [containment] এর কাজে ব্যবহার করা বা এমন কাজ করিয়ে নেয়া আমেরিকার স্বার্থ ছিল। আর এই কাজের বিনিময়ের বমাল ভাগাভাগির হিসাবটা ছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া, ভারতের বাংলাদেশ থেকে করিডোর ও বাজার-সুবিধা নেয়া ইত্যাদি। অতএব এখনো এবার আমেরিকা বিনিময়ে কী উসুল করবে বা কিছু একটা চাইবার স্বার্থ নিশ্চয় আছে সেটা আগাম অনুমান করে নেয়াই সঠিক হবে। যদিও সেটা কী তা এখনো অস্পষ্ট।

তবে আমাদের জন্য যা বুঝবার আছে তা হল, এবারের “দুর্নীতিবিরোধী লড়াইকে আমেরিকার নিজের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ বলে বিবেচনা করা’ মানে হল আমরা বুঝতে পারি যে এটা আমেরিকার দিক থেকে বেশ বড়সড় এক আমেরিকান স্বার্থ। কোনো মামুলি স্বার্থ নয়।
দ্বিতীয়ত, ওই ৩৮ পৃষ্ঠার প্রস্তাবনায় আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। বলা হয়েছে, আমেরিকায় এই হাউজিং সেক্টরের (ওদের ভাষায় রিয়েল এস্টেট[real estate]) মোট কেনাবেচায় এক-তৃতীয়াংশ লেনদেনই হয় নাকি নগদ অর্থে [ “All-cash real estate deals, which currently account for about one-third of all U.S. home sales, according to the National Association of Realtors.”]।

All-cash real estate deals, which currently account for about one-third of all U.S. home sales, according to the National Association of Realtors.

এটা আমেরিকান রিয়েল এস্টেট এসোসিয়েশন থেকে পাওয়া ডাটা। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ডাটা সন্দেহ নেই। কেন?
আসলে ‘অল-ক্যাশ রিয়েল এস্টেট ডিল’ [All-cash real estate deals] এই শব্দ কয়টার মধ্যে অনেক কথা বলা আছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে সরকারি বা জনগণের অর্থ চুরি করতে দেয়া আর সেই অর্থ-পাচারকারীরা কেন আমেরিকায় গিয়ে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় ঢুকে বা কেনাবেচায় সামিল হয় এমন আগ্রহের কারণটা এখন সবার কাছে পরিষ্কার হবে। বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া এবং স্বভাবতই তা অর্থের উৎস বলতে না-পারা অর্থ, ফলে এগুলো নগদ অর্থ থাকা অবস্থায় থেকেই রিয়েল এস্টেট প্রপাটি কিনবার জন্য সুযোগ বেশি তাই এটা আদর্শ জায়গা। এখন প্রশ্ন হল, বাইডেন কী সেই মুরোদ দেখাতে পারবেন? মুরোদ রাখেন বা কতটা পারবেন? তিনি কি আমাদের মত দেশ থেকে পাচারকারীদেরকে তাদের অর্থের উৎস দেখাতে বাধ্য করতে পারবেন এবং পাচারকারীরা তা না দেখাতে পারলে সেই প্রপার্টি যেন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট বাজেয়াপ্ত করে নিতে পারে এমন ‘প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাহী আদেশ’ কি জারি করতে পারবেন?
স্পষ্টতই আমি সন্দেহ করছি। কেন?

কারণ, ২০১৬ সালে ওবামা আমলে এমনই প্রায় একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এনিয়ে আরেক রয়টার্স রিপোর্ট পাবেন এখানে [U.S. targets money laundering in all-cash home sales in Miami, Manhattan]। তখন এধরণের সংশ্লিষ্ট ইন্সুরেন্স কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে এমন ‘অল-ক্যাশ বাড়িক্রেতাদের’ পরিচয় ট্রেজারি বিভাগে রিপোর্ট করতে [Treasury Department ordering title insurance companies to report the identities of people paying cash for high-end properties ]। কিন্তু তাতে তো এতদিনে অন্তত বাংলাদেশ বিরাট কিছু হৈচৈ পরে যাবার কথা ছিল। আমাদের মানুষ না চাইলেও তা জেনে যেত! কিন্তু এমন কিছু হয় নাই তা আমরা জানি। তাই,  এরপরও এই “নির্দেশ থেকে” এতে খুব বড় কোনো অগ্রগতি হয়েছে বলা যাবে না। তবে কখনও কখনও প্রায়ই আমরা একটা প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট দেখে থাকব যে, ‘গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি’ [Global Financial Integrity ] নামের এক নন-প্রফিট প্রতিষ্ঠান পাচার হওয়া বিভিন্ন দেশের অর্থের কিছু হদিস ও হিসাব প্রকাশ করেছে। যেমন, সাড়া ফেলা ‘প্যান্ডোরা পেপারস’ [Pandora Papers] (যেখানে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নওয়াজ শরীফের অর্থপাচারের তথ্য ছিল। আর এটাই তাঁর পাকিস্তানের আদালতের রায়ে শাস্তি হবার কারণ) ধরনের লিকেজ তথ্য বাইরে এসেছিল। এসব তথ্য ওই উদ্যোগের কিছু ইতিবাচক ফল মাত্র। যদিও সাধারণত ওখানে যে অর্থপাচারের তথ্য থাকে তা কোন দেশ থেকে মোট কত অর্থপাচার হয়েছে – ফোকাস সেদিকেই থাকে। তাতে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির তথ্য কমই থাকে। কিন্তু আরেকটা দিক হল যে, আবার বলা যায়, যেমন ঐ উদ্যোগ থেকে বাংলাদেশের কোনো কিছু প্রকাশ পায়নি। আমরা জানতে পারিনি। আর সবচেয়ে বড় কথা, এগুলো সুস্পষ্ট নাম ও প্রমাণও নয়। বরং অর্থপাচারের ট্রেন্ড বা অভিমুখ হল,  ২০১৬ সালের পরে বাংলাদেশ থেকে আরো বেশি করে আমেরিকাসহ বিদেশে অর্থপাচার হয়েছে বাধাহীনভাবে; আমাদের ব্যক্তিগত জানাশোনা থেকেই যা দেখা যায়। ফলে বাইডেন-ওবামাদের  আইন করা আর তা মাঠে প্রয়োগ করে অপরাধীদের ‘ন্যাংটা’ করা আসলে অনেক দূরের ঘটনা। এছাড়া যদি না এর মাঝে আবার কোনো “আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ” নামে কিছু ঢুকে বসে! আমরা তাই দেখতে চাইব সুনির্দিষ্ট কিছু।  এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল,  সেসব ব্যক্তি ও তাদের পাচারকরা অর্থ দুটোই ফেরত আনা দেখতে চাইব। কারণ, আমেরিকাকে মনে রাখতে হবে তারা “আইনগতভাবে” শব্দটা ব্যবহার করেছে – ‘kleptocrat’ বলে। যার বাংলা মানে যারা ব্যক্তিগত পাচারকারী তারা নয় বরং সুনির্দিষ্ট করে ক্ষমতাসীন শাসক যারা ‘পাবলিক মানি’  আত্মসাৎ ও পাচারকারি। বাংলাদেশের পাবলিক মানি এর হকদার বাংলাদেশের মানুষ – তাঁর ‘জনস্বার্থ’ এটা। অতএব আমেরিকান ট্রেজারি এই আইনগত কারণে উদ্ধারকরা অর্থ বাংলাদেশের ট্রেজারি হস্তান্তর করবে এটাই কাম্য! তবেই বাংলাদেশের মানুষের কাছে বাইডেনের এই-সেই ততপরতা মিনিংফুল হতে পারে! নইলে আরেকটা ১/১১ দেখার সাধ আমাদের নাই, তা সরাসরিই বলা দেয়া যায়!

এবারের আরো কিছু বৈশিষ্টঃ
তবে এবারের মানে ৬ ডিসেম্বরের মিডিয়া যতটুকু যা হইচই করা; এর অন্যতম কারণ হল, বর্তমানে বাইডেন প্রশাসনের ট্রেজারি বা রাজস্ব বিভাগের ডেপুটি মন্ত্রী ওয়ালী আদেইমো [Wally Adeyemo]; তিনি সম্প্রতি এক আমেরিকান থিংকট্যাংক ‘ব্রুকিং ইনস্টিটিশনের’ অতিথি বক্তৃতায় কথা দেন যে, তিনি এ বিষয়ে খুব আগ্রাসীভাবে চাপ দিবেন যাতে বৈধ উৎস দেখাতে না পারা যারা আমেরিকায় নগদে বাড়ি কিনেছেন তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার কাজ ত্বরান্বিত করা হয়। তিনি অবশ্য সেখানে স্বীকার করেন যে, “উপস্থিত আইনে নগদ অর্থেই রিয়েল এস্টেট প্রপার্টি কিনতে কোনো বাধানিষেধ নেই”। সাথে এও স্বীকার করে বলেছেন, “আমাদের রিয়েল স্টেট ব্যবসা এ ধরনের চোর শাসকদের বিদেশে সম্পত্তি কিনতে সাহায্য করে নিজেরই বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে”।

[Another of these dark corners is the real estate market. Today, certain all-cash real estate transactions are not subject to permanent anti-money laundering rules or requirements for beneficial ownership disclosure. As a result, our real estate markets are at risk of becoming a safe haven for criminals, kleptocrats, and others seeking to park corrupt profits.]
_ Remarks by Deputy Secretary of the Treasury Wally Adeyemo on Anti-Corruption at the Brookings Institution

তবে আমাদের জন্য বটম লাইন হল, “খাওয়ার পরে হাত না ধোয়া পর্যন্ত বিশ্বাস নাই যে, আসলেই খেতে দিবে”। অর্থাৎ আশ্বাস না, কাজে বাস্তবায়ন দেখতে চাই। ফল দেখতে চাই। যেমন তিনি ঐ বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন আইএমএফের এক হিসাব মতে, সারা দুনিয়ার সরকারগুলো অর্থপাচার-দুর্নীতির কারণে প্রতিবছর প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার (একহাজার বিলিয়ন) ট্যাক্স-রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। তাই আবার স্বপ্নও অবশ্যই দেখতে চাই। যেমন, আমেরিকায় এমন প্রেসিডেন্সিয়াল এক্সিকিউটিভ অর্ডার আর এর বাস্তবায়ন শুরু হলে তা কানাডার ওপর ছড়াবে, চাপ তৈরি করবে। অর্থাৎ আমেরিকায় কেনা সম্পত্তি কানাডায় সরিয়ে নেয়ার সুযোগ হবে না। এমনিতেই আমেরিকার সাথে কানাডার একটা আইনের ইউনিফর্মিটি রাখার চেষ্টা হয়। কানাডায় পালিয়ে থাকা আমেরিকার আসামিকে কানাডাই গ্রেফতার ও পরে প্রত্যাবর্তন করাতে পারে। এ ছাড়া খেয়াল করলে দেখা যাবে, আমেরিকার ঘোষিত (বাংলাদেশসহ অনেক দেশের ওপর) অবরোধ আরোপ, এটা ব্রিটেন ও কানাডাও সমর্থন করে [“Our actions today, particularly those in partnership with the United Kingdom and Canada, send a message that democracies around the world will act against those who abuse the power of the state to inflict suffering and repression.”]।

এজন্য বিপরীতে যেমন দেখা যায়, মালয়েশিয়া কেন লুট ও অর্থপাচারকারীদের ‘সেকেন্ড হোম’ হতে পেরেছে? কারণ, মালয়েশিয়ার আইনে আগেই বলে দেয়া হয়েছে যে মালয়েশিয়ায় অর্থ নিয়ে প্রবেশ করলে বাড়ি-প্রপার্টি কেনাসহ নাগরিকত্ব পাবে, সহজেই। কারণ মালয়েশিয়ায় আনা অর্থের উৎস জানতে চাওয়া হবে না। আর এ ধরনের রাষ্ট্রগুলো নিজের এমন আইনের সাফাই হিসেবে বলে, তারা নিজ দেশের জন্য বিদেশী পুঁজি সংগ্রহের উপায় হিসেবে এটা করেছে। যদিও আমার দেশের সম্পদ চোরকে কেন এমন উৎসাহ ও সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে; যা প্রকারান্তরে আমাদের দেশের শাসককে লুটপাট ও অর্থপাচারে উৎসাহিত করা – এই ব্যাপারে তারা নিশ্চুপ থাকে।

কাজেই বাংলাদেশী ‘All-cash real estate deals’ ক্রেতা, এদের নিয়ে অগ্রগতি কই?  ০৬ ডিসেম্বরের পরে এক মাসের বেশি হয়ে গেছে, স্বভাবতই আমরা অগ্রগতি জানতে চাইব। কেবল তখনই একমাত্র এসবের ওপর পাবলিকের আস্থা-বিশ্বাস অল্প করে হলেও জাগতে পারে। শুধু গল্পে কিছু হবে না। আমরা তো চোদ্দবছর আগে একবার ধোকা-খাওয়া ঘরপোড়া জনগোষ্ঠির মানুষ!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ০৮ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “অর্থপাচারকারীর কী হবে?”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s