বাইডেনের কলোনি ‘মূল্যবোধের’ বড়াই শুরু


আটল্যান্টিক মানেই কলোনি,
বাইডেনের কলোনি ‘মূল্যবোধের’ বড়াই শুরু

গৌতম দাস

০৪ জুলাই ২০২২, ০০ঃ০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-49m

NATO declares China a security challenge for the first time

 

ন্যাটোঃ  এটা ইউরোপ-আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর এক বৃহৎ সামরিক জোট যার পুরো নাম- ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন’। গত সপ্তাহে ২৮-৩০ জুন ২০২২, স্পেনের মাদ্রিদ শহরে বহুদিন পরে ন্যাটো হৈচৈ ফেলে এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত করেছে, অথচ এতদিন এমন অনুষ্ঠানগুলো ন্যাটো যেন প্রায় সবার অলক্ষ্যেই কোনোমতে সেরে ফেলা হয়ে আসছিল। এখানেই শেষ না। আবার যেখানে একদিক থেকে দেখলে  ন্যাটো এখন ভেঙ্গে ফেলা উচিত; অথবা আমেরিকার ন্যাটো ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত – ধরণের কথাবার্তা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট এর মুখ দিয়ে উঠে আসা শুরু হয়েছিল সেখানে এখন উলটা হাওয়া। রাখঢাক ফর্মালিটি না করে সরাসরি বললে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন হঠাত ন্যাটো, জি-৭ ইত্যাদি পশ্চিমা রাষ্ট্রজোট খাড়া করে শেষ চেষ্টা হিসাবে উঠে দাড়াতে চাচ্ছেন। গ্লোবাল ইকোনমিক ও ততসহ এককথায় সংশ্লিষ্ট “প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্ব” কোন চিরস্থায়ী জিনিষ না। একটা সময়ের পরে এগুলোর আয়ু আপনাতেই শেষ হয়ে যায়। চাইলে তা বুঝাও যায়। জ্ঞানী ও বুঝমানেরা তা অনুসরণ করে সময় থাকতে উপযুক্ত জায়গা বেছে নিয়ে সরে যায়।  কারণ সামর্থ ও সক্ষমতা অনুসারে যথোপযুক্ত নেতৃত্ব-অবস্থান নিতে হয়, তার মধ্যে থাকতে হয়। নইলে শেষে অপমানিত হতে হতে পারে।  কিন্তু প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই প্রাকৃতিক দিকটা মানবেন না ঠিক করেছেন মনে হচ্ছে। যেন বলতে চাইছেন, বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা-শক্তি গ্লোবাল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নেতৃত্ব নিজের কোলেই রেখে দিবে। তারা ধরে নিতে চান আবার তাদের এনিমি (শত্রুতা বা মূলশত্রু) মূলত চীনের সাথে; ইউরোপের প্রেক্ষিতে যেটা রাশিয়ার সাথে। এই ধরে নেওয়ার ভিতরে একটু ভুল আছে। চীনের সাথে তাদের ঠিক এনিমিটি না প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। অনেকে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে জিদের চোখে দেখে একে শত্রুতা হিসাবে। এখানে তাই ঘটেছে।
দুনিয়ার ইতিহাসের শেষ ৫-৬শ বছর ন্যায়-অন্যায় যেভাবেই হোক জনগোষ্ঠি হিসাবে পশ্চিমের সাদা ককেশীয়দের হাতে সারা দুনিয়া শাসিত হয়েছে; তারা দুনিয়ার উপর ঘুরে ফিরে রুল করে এসেছে, আধিপত্য বিস্তার করে এসেছে। ব্যাপারটাকে ঘটনাচক্র হিসাবে দেখাই সঠিক ছিল। দুনিয়াতে কোন ধর্ম-এথনিক জাতি দুনিয়া আজীবন শাসন করে যাবে এমন কোন চুক্তি বা শর্ত কোথাও লেখা নাই। অন্য এথনিক জনগোষ্ঠিও তা মেনে নিবার কোন কারণ নাই। কোন জনগোষ্ঠিরই এমন ধরে নিবার কোন ভিত্তি নাই যে যেহেতু তারা শাসক ছিল তাই তারা তা থেকেই যাবে আজীবন!   এই জবরদস্তির কর্তাগিরির চোখ সরিয়ে ব্যাপারটাকে অবজেকটিভ দিক থেকে যেমন বস্তুগত যোগ্যতা ও সামর্থ সক্ষমতার দিক থেকে দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ হত।

কিন্তু বাইডেন বুদ্ধিমান হতে চান নাই। তিনি এবার এককালের বড় অর্থনীতির সাত দেশ যা জি-৭ বা গ্রুপ সেভেন কান্ট্রি – এই জোটকে আবার বুড়া হারে রঙ চড়িয়ে সাজাতে চেয়েছেন। তিনি এই জি-৭ আর ন্যাটো  কেগত সপ্তাহে সাজিয়ে এনেছেন, বুড়া হাড়েই জোর দেখাতে চেয়েছেন। অথচ  বাস্তবতা হল চলতি নয়া শতক থেকে জি-৭ নিজেকে বিগতযৌবনা বলে মেনে নিয়েছে। এটা আমার দাবি নয় বাস্তবতা। যেকারণে, এককালের জি-৭ গেলে তারা নিজেই এখন জি-২০ নামে নয়া গ্রুপ আকারে সাজিয়েছে। জি-২০ মানে যেখানে এই বুড়া সাত রাষ্ট্র আর সাথে নয়া রাইজিং অর্থনীতির দেশগুলোকে বেছে সাথে নিয়ে জি-২০ বানিয়ে নেয়া। মুল কারণ, বুড়া অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো স্থবির হয়ে গেছে। পুনরুতপাদন, পুন-বিনিয়োগের সক্ষমতা ও সামর্থ  অথবা কম্পিটিটিভনেস ঢলে পড়েছে। আর উলটা বসে বসে আয়েসে খাওয়া এমন ভোগের ঢিব্বা হয়েছে সেকারণে। “ওয়াল স্ট্রিট  বিনিয়োগ পাড়ার” কঠোর সমালোচনা এই বুড়ারা সহ্য করতে না পেরে অনেক আগেই তাই রাইজিং-দেরকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে জি-২০ গ্রুপ বানিয়ে নিয়্বেছিল। তাহলে  জি-২০ হিসাবে ঢেলে সাজানো ও এর উত্থানটাই কী যথেষ্ট প্রমাণ নয় যে জি-৭ গ্রুপ বা ন্যাটো এর নামে বাইডেন এর আবার আমেরিকার নেতৃত্বকে জাগানোর চেষ্টাটা একটা প্রতারণা!! অথচ বাইডেন চীন-কে বাইরে দূরে রাখতে চান। কেন? কী যুক্তি?

আমেরিকার নেতৃত্বে ‘পশ্চিমা শক্তির’ ভ্যালুজ [Values] মানে মুল্যবোধ নাকি চীনের চেয়ে উন্নত!!! তারা উচুজাতের ও  জাত-শ্রেষ্ঠ তাই তারা চীন-রাশিয়া ইত্যাদিদের সাথে চলতে পারবে না। এককথায় বললে, অর্থনৈতিক ততপরতায় একুমুলেশন [accumulation] বা সঞ্চয় ও সম্পদ সৃষ্টির বিচারে  চীন এখন সবার উপরে – ঠিক যেমন এককালে আমেরিকা সারা ইউরোপকে ছাড়িয়ে উপর দিয়ে গেছিল। আর সেটাও ইউরোপের পছন্দ-অপছন্দ করার ব্যাপার ছিল না, থাকেও নাই। অথচ বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমাদেশ এখন অজুহাত তুলেছে তাদের খায়েশ তারা মূলত চীনকে একঘরে করবে। বাণিজ্য সম্পর্ক অর্থে কোনঠাসা বা একঘরে। যেখানে অজুহাত তাদের মুল্যবোধ নাকি নিচা!! আর এভাবেই তাদের ঢলে পড়া সামর্থ ও নেতৃত্ব তারা ছলনা করে হলেও ধরে রাখতে পারবে।

কিন্তু নেতৃত্ব নিজের কাছে রেখে দেওয়া মানে কী? এটা কী সামরিক সক্ষমতার কথা বলছেন তারা? পশ্চিম এখানেই খোদ নিজেকেই বিভ্রান্ত করে রাখতে চায়। কোন রাষ্ট্রের মুল সক্ষমতা আসে অর্থনীতি থেকে। পরে ওর ভরসায় আরও আসে রাজনৈতিক, সামরিক, স্ট্রাটেজিক ইত্যাদি সবকিছু। যার আবার একমাত্র অর্থনৈতিকটাই অবজেকটিভ অর্থাৎ বস্তুগত সক্ষমতা। এটাকে কোন বা কর্তা ব্যক্তি-আমির ইচ্ছা মনে করাটা ভুল। অথচ বাইডেন এন্ড গং এটা জেনেও ভুল করেছে বলে দেখাচ্ছে। ওথচ সবাই জানে, কোন দেশ নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতাটা দেখাতে পারলে বা হাজির হয়ে গেলে এরপর এর ভরসায় অন্যান্য সব কর্তা বা ইচ্ছানির্ভর  যেমন  রাজনৈতিক, সামরিক, স্ট্রাটেজিক ইত্যাদি সব ইচ্ছা হাসিল করা যায়।  অথচ বাইডেন দেখাতে চাইছেন সবটাই তাদের যেন তাদের ইচ্ছা!!
অতএব বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিম উন্নত মুল্যবোধের  – এই মিথ্যার আড়ালে,  নিজেদের হাতে দুনিয়ায় নেতৃত্ব ধরে রাখবে বলে হুঙ্কার তুলতে দেখছি আমরা!! গত ২৮-৩০ জুন ২০২২, এবারের  ন্যাটো সম্মেলনের তাতপর্য এটাই!!

ন্যাটো উত্থানের পটভুমিঃ
বাংলায় লেখা হয় ন্যাটো আর ইংরাজিতে NATO; অথবা খুলে ইংরাজিতে বললে তা – North Atlantic Treaty Organization।
আর “পশ্চিমা” শব্দটা বলতে আমরা মূলত একটা জাতিগত পরিচয়কেই তুলে ধরতে চাই। যদিও সহসা সবাই তা বুঝি না, সাথে উহ্য থাকে বলে। কিন্তু কাদের? মূলত ইউরোপের যারা সবচেয়ে প্রভাবশালী এথনিক-জাতি মনে করা হয় তারা হল ককেশীয় [Caucasion]।  এসব মোটাদাগে বলা ভাষ্য; কোন গজ-ফিতা নিয়ে বসে মেপে বলা কথা নয়। কারণ ঐ একই ইউরোপে ককেশীয় ছাড়াও অসংখ্য এথনিক জনগোষ্ঠির বসবাস ছিল ও আছে। তবে যাদের প্রভাব বেশি এই অর্থে কথাটা প্রচলিত ও বলা। আসলে “আমরা সাদা চামড়ার লোক’ ফলে উন্নত – এই বলে অকথিত কিন্তু টের পাওয়া যায় যে আঁচ ও আওয়াজ এর কথা আমরা এশিয়া বা আফ্রিকার মানুষেরা জানি বা অভিজ্ঞতা রাখি, এগুলো সেসব কথা। এজন্য বলছি বাস্তবে গজ-ফিতা দিয়ে মেপে প্রমাণ পাওয়া যাবে না এসব উগ্রজাতিবাদি ভাষ্য। কিন্তু এসব ভাষ্য ও চর্চা আছে। বাইডেনের কথাগুলোর ভিতরে এর সুক্ষ ইঙ্গিত আছে!

“…Beijing’s ambitions and its ‘coercive policies’ challenge the Western bloc’s ‘interests, security and values’ ”.  aljazeera

এখন এই ন্যাটো নিজেই নিজেকে চেনায় এই বলে যে তারা এক “পশ্চিমা ব্লক” রাষ্ট্র বা “পশ্চিমা শক্তি”। সর্বশেষ চলতি ন্যাটো সম্মেলনে এভাবেই তারা নিজেদেরজে পরিচিত করেছে Western bloc’s” বলে।  আর এটা বলতে তারা আরো ভেঙ্গে বলে তারা হল সারা ‘ইউরোপ এবং আমেরিকা’ মিলে এক শক্তি। এই কথাটা ভৌগলিকভাবে ভেবে দেখলে বুঝা যাবে ইউরোপ এবং আমেরিকা বলতে এরা আসলে আটল্যান্টিক মহাসাগরের দুই তীর। একারণে লক্ষ্য করব ন্যাটো শব্দের ভিতরে ‘আটল্যান্টিক’ বলে একটা শব্দ আছে; ওর ‘এ’ -মানে আটল্যান্টিক। যদিও এর দুপাড়ের ফারাকটা হল  এক মহাসাগরের আর যার দৈর্ঘ গড়ে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার। অর্থাৎ যেকোন পুকুর বা নদীর দুপাড়ের মানুষের মধ্যে যেমন স্বভাব বা ভাষা ইত্যাদিতে মিল আমরা খুঁজে পাই তেমনই এক নিশ্বাসে – ইউরোপ এবং আমেরিকা – বলে মিল খুঁজা আমাদের করার কথা নয়।  কিন্তু আমরা খুঁজছি এমনকি কী খুঁজতে খুঁজতে আমরা ন্যাটো এসে পড়েছি! তাহলে মুখ্য প্রশ্ন দাড়াল, আমরা এক নিশ্বাসে – ইউরোপ এবং আমেরিকা  বলি কেন? মূলত কারণটা একেবারেই বাহ্যিক। অর্থাৎ আটল্যান্টিকের দু-পাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে বাইরে থেকে মিল ঘটানো হয়েছিল। কারণ তাদের মধ্যে কোন মিল থাকার কথা নয়, সুযোগও ছিল না। তাহলে সেটা কিভাবে?

বেশিদিন আগের কথা নয়, এই তো মাত্র ১৬০৭ সাল থেকে। ইউরোপ এবং আমেরিকা, এভাবে প্রায়ই আমরা বলে ফেলি এর মুল কারণ হল – ইউরোপের প্রথম ও জবরদস্ত কলোনিই হল আমেরিকা। এমনকি ভারতবর্ষেরও আগে খোদ আমেরিকা ইউরোপের হাতে কলোনিদখল হয়েছিল। এটাই তাদের পারস্পরিক মূল সম্পর্ক।  আর এটাই ইউরোপের মূলত বৃটিশ-ফরাসিরা দখল করা শুরু করেছিল ১৬০৭ সাল থেকে শুরু করে; আজ যেটা আমেরিকার ভার্জিনিয়া রাজ্য সেটা দখল করার মাধ্যমে ১৬০৭ সালে। পরবর্তিতে আজকের আমেরিকার সব রাজ্য একইভাবে দখল হয়ে শেষে এককালে আমেরিকা (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) নামে আধুনিক রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল।  অর্থাৎ ব্যাপারটা এরকমঃ

প্রথমে এক বৃটিশ, ধরা যাক নাম তাঁর কোন লর্ড ক্লাইভ, তিনি আজকের আমেরিকার কোন রাজ্য-ভুমি দখল করেছিলেন। যা আসলে ছিল আমেরিকার সেখানেকার স্থানীয় ট্রাইবাল বা এবরিজিন [aborigine] জনগোষ্ঠির বসবাসের ভুমি। কিন্তু পরবর্তিতে ক্লাইভ সাহেব জাহাজ ভরে গরীর বৃটিশ মানুষ নিয়ে গেছিলেন ভার্জিনিয়ায় এই বলে যে ওখানে গেলে তোমরা গরীব বৃটিশ বিনা পয়সায় বিস্তর জমি পাবে আর সাথে  উপকরণও দেয়া হবে। জমির লোভে তারা স্থানীয়দের মেরে-ভর্তা করেছে বা মাথা কেটে নিয়ে ফুটবল খেলেছে। আর নয়ত ভাল উর্বর জমিগুলো বৃটিশদের ছেড়ে দিয়ে  আরো গহীন বনে অনুর্বর জমিতে তারা নিজেদের স্থানান্তরিত করে নিতে বাধ্য হয়েছে।
কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ে এই গরীব বৃটিশ কৃষক তারাই পালটা সমবেত প্রতিরোধ গড়ে ক্লাইভ এন্ড গং বৃটিশদেরকে আমেরিকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছিল। আর সেটাই ১৭৭৬ সালের আমেরিকান স্বাধীনতা। ঐ স্বাধীন আমেরিকানরাই আজকের আমেরিকান জনগোষ্ঠির এমনকি বাইডেন সাহেবের পুর্বসুরি। কেবল একটাই কালোদিক  থেকে গেছিল যেমন, এবরিজিন [aborigine] জনগোষ্ঠি তারা নিশ্চয় কোথাও চিপায় পড়ে থাকা মার্জিনালাইড হয়ে আছে।
তবে এতে আরো কিছু নতুন মাত্রাও আঁকা হয়েছে বিশ্বযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশেষষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই সময়কালে আমেরিকাই উলটা এই প্রথম সারা ইউরোপের উপর প্রভাবশালী রাষ্ট্র অর্থনীতি ও জনগোষ্ঠি হিসাবে হাজির হয়েছিল। সেসময়ের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এর হাতেই সিদ্ধান্ত মেনেই সারা ইউরোপ এরপর তাদের বিশ্বযুদ্ধ কোন অভিমুখে গিয়ে শেষ হবে অথবা, পক্ষ-গুলো কেমন ও কে হবে তা নির্ধারিত হয়। কারণ যুদ্ধের খরচ যে যোগায় সেই তো এসব বিষয়গুলো নির্ধারণের কর্তা হয়ে যায়!  আর শুধু তাই না,  যুদ্ধ শেষে দুনিয়া থেকে কলোনি ব্যবস্থা ও শাসন  উচ্ছেদ এর কাজটা সারা ইউরোপ স্বেচ্ছায় প্রত্যাহার করে নেয়।  রুজভেল্টের শর্তে ইউরোপ দুনিয়াকে কলোনিমুক্ত করে দিয়েছিল।  সেই থেকে থেকে আমেরিকা গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার নেতা হিসাবে হাজির হয় যেখানে ইউরোপ আমেরিকান আধিপত্য মান্য করে নেওয়ার বিনিময়ে ছোট তরফের কর্তা হবার সুযোগ পায়। এরপরই  ইউরোপ এবং আমেরিকা শব্দদুটো পাশাপাশি লেখার রেওয়াজ শুরু হয়েছিল। কালক্রমে (১৯৪৯ সাল থেকে) সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধজোট হিসাবে ন্যাটো গড়ে তুলেছিল ছিল তেমনই একটা কাজ!

এবার একালে আরেকটু বিস্তারে আগাই। একালে মানে পরে ১৯৯১ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবারও পরে চলতি শতকের কথা বলছি। বারাক ওবামা আমল থেকেই বলা যায় আগের মতোই একের পর এক আমেরিকান নয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন, আর আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের আয়ু আর কত দিন থাকবে এ-জাতীয় প্রশ্ন আকার-ইঙ্গিতে জবাব দেয়া শুরু হয়েছিল। এটা সেই আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পরিসমাপ্তিতে। তবে চলতি শতকের শুরুতে সেসব সময় থেকেই আমেরিকার জন্য এসব অস্বস্তিকর প্রশ্ন প্রবল হতে থাকে, বলা যায় যা প্রথম মুখোমুখি হয়েছিলেন ওবামা।

কিন্তু তখন অথবা এখন, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট মানেই যেন তা একটা চরম অবস্থান! তখন মানে ২০১৯ সালের কথা বলছি আর এখন মানে ২০২২ সালের চলতি সময়। আর তখন ও এখন যে কমন প্রসঙ্গের কথা বলছি তা হল – এই ন্যাটো।  আগে বলেছি, ন্যাটো মানে আমেরিকা-ইউরোপ মিলে ১৯৪৯ সালে গঠিত এক যুদ্ধজোট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পরের নয়া পরিস্থিতিতে সোভিয়েত ও তার প্রভাবাধীন পূর্ব-ইউরোপ, এ অংশটা বাদ দিলে এর বাইরে আমেরিকার নেতৃত্বে বাকি ইউরোপীয় দেশের সামরিক জোট এটা। সংক্ষেপে বললে সেকালে (কোল্ডওয়ার আমলে [১৯৫০-৯১] ) যা আমেরিকা-সোভিয়েত লড়াই প্রতিযোগিতা, তাকে কেন্দ্র করে গঠিত পশ্চিমের মূল সামরিক জোট ছিল এটা। যদিও সেকালে ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তার পক্ষে সাফাই দিতে অনেকে একালে বলে থাকেন যে, সেকালের আমেরিকা-সোভিয়েত এ দুই জোটকে একটা “কোল্ডওয়ারের মধ্যে” আটকে রাখা সম্ভব হয়েছিল  নাকি এই ন্যাটো জোটের উপস্থিতির কারণে। মানে দুই পক্ষেই গোছানো সামরিক জোট-প্রস্তুতিতে ছিল বলেই নাকি ওই আমলে তারা মুখোমুখি কখনোই যুদ্ধে নামেনি বা করে নাই।

যা হোক, ১৯৯১ ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ায়, এর পর থেকে ন্যাটো নিজেই কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ওবামার দ্বিতীয়বারের প্রেসিডেন্সির আমল (২০১৩-১৬) থেকে ন্যাটো মোচড় দিয়ে উঠেছিল – যেখানে মূল ইস্যুটা হয়ে উঠেছিল ন্যাটোর খরচ কে বইবে? যার মূল কারণ আসলে, আমেরিকার জন্য ন্যাটো-কে পরিচালনের ব্যয় তখন থেকে আমেরিকান অর্থনৈতিক  সামর্থ ও বা ইকনমির সক্ষমতার তুলনায় বিরাট বোঝা হয়ে গেছিল। কারণ ন্যাটো জন্ম থেকেই এর খরচের প্রধান দায়ভার আমেরিকা একাই ব্যয় করে আসছে; যেন অনেকটা আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা হিসেবে উত্থিত হওয়ায় ইউরোপের সবাই ধরে নিয়েছিল যে, ন্যাটো গঠনের সব উদ্যোগ ও খরচের ভার তো ‘ওস্তাদ’ আমেরিকাই নেবে। স্বাভাবিক। কিন্তু ওস্তাদ এখন বয়বৃদ্ধ, রমরমা অর্থনীতির সেই দিন আর নাই!

ফলে  ন্যাটোর জন্মের সময় আমেরিকা যা হাসতে হাসতে নিয়েছিল তা ২০১৫ সালের আশাপাশের সময় থেকে আর একই না। আর সেই থেকে শুরু করে একেবারে ২০১৫ সালে ওবামার প্রথম প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল ন্যাটোর এক মিটিংয়ে ইউরোপকে খরচের দায় শেয়ার নেয়ার প্রসঙ্গ তুলে কড়া ভাষা ব্যবহার করেছেন, আর এতে পারস্পরিক খুবই মুখ কালো করা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল।

কিন্তু অতটুকুই নয়, আমেরিকার জন্য আসলে খারাপ দিন ও যুগ এসেই পড়ছিল সেই থেকে। আর সেটা ওবামার পরে ট্রাম্পের আমলে এসে। ডোনাল্ড ট্রাম্প, তিনি সরাসরি ন্যাটো আর টিকিয়ে রাখার দরকার কী, এপ্রশ্নই তুলে বসেন; অন্য আরো অস্বস্তিকর বিভিন্ন আরো প্রশ্নের মত। এমনকি আফগানিস্তানের জন্যও আর ন্যাটো দরকার  নয় অথবা ‘ওয়ার অন টেররের’ জন্যও আর ন্যাটোর মতো প্রতিষ্ঠান রাখা ও এর খরচ বহনের প্রয়োজন তিনি দেখেন না বলে সরাসরি মন্তব্য করেছিলেন। পরে ২০১৯ সালে শুরু হয়েছিল লন্ডনে আরো মনকষাকষি তো বটেই।

ট্রাম্প পার্সোনাল এক আলোচনায় বলেছিলেন, তিনি ন্যাটো থেকে আমেরিকার সদস্যপদ প্রত্যাহার করতে চান। নিউ ইয়র্ক টাইমসে তার এক সহকারীর বরাতে খবর ছাপা হয়েছিল, সেখানে তিনি ন্যাটো সম্পর্কে বলেছিলেন, এটি অবসলিট বা ‘পরিত্যক্ত বোঝা’। লাগাতার পঁচাত্তর বছরের গ্লোবাল নেতা আমেরিকা-এরই এক প্রতিনিধি ট্রাম্পের কথা ভেবে এসব শব্দ হজম করতে অনেকেরই এ কথা মানতে কষ্ট হয়েছিল। তাই অনেকেরই মনে হয়েছিল, এটি হয়তো একটা পাগলা ট্রাম্পের ‘চরমবাদ’।

গত সপ্তাহে জুনের শেষ তিন দিনে এবার আমরা আবার আরেক চরমবাদের মুখোমুখি। এবার নায়ক জো বাইডেন- তিনি এবারের ন্যাটোর তিন দিনের সম্মেলনে আরেক চরমপ্রান্তে। ব্যাপারটা এক কথায় বললে, তা যেন আমেরিকার নেতৃত্বে ইউরোপ মানে সারা পশ্চিমা জগৎ যা চায়, এর বিরোধী বা তাদের পছন্দ নয় এমন কোনো কিছু চীন ও রাশিয়া করতে পারবে না। তাদের ভাবখানা এমন যে, তারা চাইলে তাদের ইচ্ছার বিরোধী চীনসহ সবাইকে তারা গ্লোবাল বাণিজ্যের বাইরে রেখে দিতেই পারে। এতই ক্ষমতা তাদের! যেনবা মাথায় করে এক ঝুড়ি গোবরও চীন-রাশিয়া চাইলেও বেচতে পারবে না!

ওই ন্যাটো সম্মেলন থেকে এই প্রথম ঘোষণা দেয়া হয়েছিল যে, ‘চীন ন্যাটোর জন্য হুমকি’! আলজাজিরা লিখেছে, ন্যাটো মনে করছে, চীন তার জন্য হুমকি তাই সে চীনকে স্ট্রাটেজিক গুরুত্ব দিয়ে বলছে ‘চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ ও ‘চাপে ফেলে বাধ্য করার নীতি’- এগুলো ‘পশ্চিমা ব্লকের রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ, নিরাপত্তা ও মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ করছে’।

NATO has listed China as one of its strategic priorities for the first time, saying Beijing’s ambitions and its “coercive policies” challenge the Western bloc’s “interests, security and values”.

এরই মধ্যে ইউক্রেনের যুদ্ধ প্রায় চার মাস হল। এ প্রসঙ্গে বাইডেন পুরো ইউরোপকে তাতিয়ে রাশিয়াকেই এদের সবার শত্রু বলে হাজির করছিলেন। চীন এসব ক্ষেত্রেই আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। কিন্তু চীনকে আমেরিকার শত্রু বলা  আর প্রতিযোগী বলা এক অর্থ নয়। অথচ কেন ন্যাটো সম্মেলনে কোনো এক উছিলায় চীনকে ন্যাটোর হুমকিদাতা-শত্রু বলে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে এ কথারও কোনো যথোপযুক্ত সাফাই ন্যাটো এখনো হাজির করেনি? আবার এত দিন শত্রু দেখানো হচ্ছিল রাশিয়াকে, অথচ এখন হঠাৎ করে খোদ চীনকেই হুমকিদাতা বলা শুরু হচ্ছে।

চীন বড় রাইজিং ইকোনমির দেশ। ফলে এখনো চীনে সবার চেয়ে পুঁজি সঞ্চয় ও সম্পদ গঠনের হার অনেক বেশি হবে। এর অর্থনৈতিক প্রকাশ ও প্রভাব তো প্রকাশিত হয়ে পড়বে এবং স্বভাবতই এর অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিদের মন খারাপ-অসন্তুষ্ট হবে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও এটা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, তাই এটা ফেয়ার। এছাড়া, এটা কোন সামরিক তৎপরতা নয়। তাহলে চীন চ্যালেঞ্জটা কোথায় করল? আর চ্যালেঞ্জমাত্রই তো খারাপ নয়। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কখনোই খারাপ নয়।

তার মানে দাঁড়াল, চীন ‘কেন ন্যাটোর হুমকিদাতা’ তা বর্ণনা বা ব্যাখ্যা দিয়ে বলার আগেই চীনকে শত্রু বানিয়ে দেয়া হয়েছে!! এ ছাড়া মতবিরোধ মানেই কি শত্রু? এমনকি কোনো কাজে গিয়ে আমেরিকা চীনের সাথে মুখোমুখি হয়েছে সেই বিরোধের কথা কেউ জানায়নি! আবার যদি তা হয়ও চাইলে তা নিরসনের আইনি উপায়ও বের করে নেয়া সম্ভব। যদি চায়।

অথচ ন্যাটোর সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত বোলচালে মনে হচ্ছে, বাইডেনের নেতৃত্বে মানতে রাজি হওয়া ইউরোপ-আমেরিকা এসেছে যেনবা বাইডেনকে সারা দুনিয়ার পালনীয় কর্তা বলে প্রতিষ্ঠিত করতে যা আমাদের যেন মানতেই হবে!

বাইডেনের মনে রাখা উচিত ‘অবরোধ’ (মার্কিন ডলার ব্যবস্থার ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা) ও ‘হিউম্যান রাইটের’ কথা তুলে তিনি ইচ্ছামত যেসব দেশের উপর দাবড়ে বেড়াতে চাইছেন, তা আইনগতভাবে মানতে জাতিসঙ্ঘ-সদস্যপদপ্রাপ্ত কোনো দেশ মানতে বাধ্য? আইএমএফের চোখে এই অবরোধ বৈধ নয়, বড় জোর এটা আমেরিকার পড়ে পাওয়া অবৈধ কর্তৃত্ব। এটা আমেরিকা-রাষ্ট্রের নিজস্ব সিদ্ধান্ত কেবল। তাই এই অবরোধ আরোপ করার কারণে যারাই  ক্ষতিগ্রস্ত হবে ফলে আমেরিকা যা যা আচরণ ও অপব্যবহার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনীতির বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে, এর প্রতিটি আগামীতে আমেরিকার বিরুদ্ধে আরোপিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবেই।

আমেরিকান মূল্যবোধঃ
সবচেয়ে বড় কথা এটা কোন, কারও একার ‘মূল্যবোধের প্রশ্ন’ একেবারেই নয়। অর্থনৈতিক অবরোধ জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত হিসেবে কখনো আরোপিত হয় বটে। কিন্তু বর্তমানে বাইডেন প্রশাসনের দেয়া অবরোধ একান্তই আমেরিকার আরোপিত। সুযোগ পেলে ও মুরোদে কুলালে তা উপড়ে অন্য দেশ ফেলে দেবেই!

ফিরে মূল্যবোধের কথা তুলা যাক, বর্তমান জাতিসঙ্ঘের এই রাষ্ট্রের দুনিয়ার এক রাষ্ট্রের সাথে অপর রাষ্ট্রের মূল্যবোধের সঙ্ঘাত দেখা দেয় তাহলে কী হবে?
আসলে সব মূল্যবোধের পেছনেই থাকে ভিন্ন ভিন্ন ইডিওলজি, যে কারণে মূল্যবোধের ভিন্নতা দেখা দিতেই পারে। আর মূল্যবোধে ভিন্নতা দেখা দিলেও ভিন্নদের হলেই সেই মূল্যবোধটা খাটো আর নিজ মূল্যবোধটা শ্রেষ্ঠ এই আচরণ ও বয়ান এক কথায় বললে, তা এক রেসিজম বা ঘৃণিত জাতশ্রেষ্ঠত্ববোধ হতে পারে। আসলে এসব বকোয়াজ কথাবার্তা তাই সরিয়ে রাখাই ভালো! মূল কথাটা হল, জাতিসঙ্ঘ জন্মের আগেই বা এর সদস্যপদ নেয়ার ক্ষেত্রে মৌলিক কি কোনো মূল্যবোধ আছে? থাকলে কী? বা আদৌ বাইডেনের মূল্যবোধ যা সবাইকে মানতে হবে এমন কিছু ছিল নাকি? তাহলে আসেন প্রশ্ন তুলি, যেমন ইরাকের ওপর ২০০৩ সালে বুশের হামলা ও দখল – এটা আমেরিকা কোন মূল্যবোধ মেনে করেছিল? নিশ্চয় খুবই উন্নতমানের, বাইডেন বলতে পারবেন। বলা উচিত!

প্রথম কথা, বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো এককভাবে এমনকি একত্রে কি জাতিসঙ্ঘের মা-বাপ বা মালিক? একেবারেই নয়। তবে আমেরিকার বাইডেনের যদি মনে হয়, অমুক দেশ মূল্যবোধ মানছে না, তাহলে কী হবে? তাহলে জাতিসঙ্ঘের উপযুক্ত স্থানে গিয়ে, যদি থাকে, সেখানে গিয়ে বাইডেন নালিশ রুজু করতে পারেন। সেটিই সমীচীন হবে। তাই না কি?? এর বাইরে পশ্চিমাদের আলাদা মুল্যবোধের স্টান্ডার্ড কী? তাতে কী এসে যায়?

সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নঃ
সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৫ সালের আগে, মানে সেই ১৯১৭ সাল থেকেই বিপ্লব করে ক্ষমতায় আসা কমিউনিস্ট দেশ ছিল। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এসব জানা সত্বেও তিনি সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্তালিনকে সম্মানের সাথে যুদ্ধে নিজপক্ষের পার্টনার হিসাবেই গ্রহণ করেছেন। কোন মুল্যবোধের সমস্যা দেখেন নাই। সোভিয়েত নেতা স্তালিন আপাদ্মস্তক এক কমিউনিস্ট এবং কমিউনিস্ট স্যহিরোমনি তি৯নি তাতে দুনিয়ার কারও কোন সন্দেহ নাই। তাহলে যুদ্ধে নিজপক্ষের এক পার্টনার গণ্য করতে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট তো কখনও কোন মুল্যবোধের অমিল বা অসুবিধার কথা কেউ শুনে নাই।স্তালিনের সাথে মিলেই হিটলারের বিরুদ্ধে রুজভেল্ট বিশ্বযুদ্ধ করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। এখন কি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেন আমাদের বলবেন, মূল্যবোধের সঙ্ঘাত তখন কোথায় ছিল? তাহলে এখন এসব নখড়া করছেন কেন?

যুদ্ধ শেষে স্তালিনকে সাথে নিয়েই রুজভেল্ট ভেটো-সিস্টেম ওয়ালা এক জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং আলোচনায় স্তালিনকে রাজি করিয়ে জাতিসঙ্ঘ গড়ে নিয়েছিলেন। আর এতে জাতিসঙ্ঘ গড়ার যে ভিত্তি তখন উদ্যোক্তারা মিলে সেট করেছিলেন, সেটাই এখনো একই আছে। গ্লোবাল পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক সিস্টেমগুলোর মৌলিক কাঠামো হয়েই আছে; যদিও এতে এসব সিস্টেম ও কাঠামোগুলো সবই আমাদের একালের সব বিবাদ মেটাতে সক্ষম, তা নয়। খামতি আছে, ঘাটতি আছে, এসব নিয়ে আরো ও আবার কথা বলতে হবে, সামনে এগোতে হবে আর এসবই সবচেয়ে স্বাভাবিক।

কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে আমেরিকা-ইউরোপ ভাব ধরছে, নেতা বাইডেনের সাথে তারা হলেন দুনিয়ার সবচেয়ে একচ্ছত্র মূল্যবোধ বা শ্রেষ্ঠ মূল্যবোধের কেউ একেকজন। অথচ এমন কথা ভিত্তিহীন ও গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল ধরণের। জাতিসঙ্ঘ বা কোনো গ্লোবাল সিস্টেম গড়ে তোলার পথ কখনো এটা ছিল না, নয়ও। তাহলে তো কমিউনিস্ট হওয়া সত্বেও স্তালিনের সাথে মিলে রুজভেল্ট জাতিসংঘ গড়তে পারতেনই না!!! তাহলে একালে বাইডেন এন্ড গং কোথা থেকে উদয় হলেন??  এরা আগেভাগে নিজের মূল্যবোধকে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করে একলাই রাজা হতে চান। তাতে অন্য কেউ তাদের মানুক আর নাই মানুক!! এরপর অন্যের ুপর নিজআধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করা- এটা একালের বাইডেনের ভুয়া পথ। অন্তত আমেরিকার অন্যতম ফোরফাদার রুজভেল্ট এমন নিকৃষ্ট কাজ বা পথে এগোননি – এসব নিয়ে তাদের পরামর্শকদের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

সেকালের মাওয়ের চীনঃ
আবার চীনের প্রসঙ্গটাই দেখেন। আজকের যা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চীন। এতে একালে অর্থনীতিতে গ্লোবাল নেতার হকদার বা দাবিদার তিনি। কিন্তু এর উত্থান এটা তো মাত্র ১৯৭৮ সাল থেকে উত্থিত।  আমেরিকার সাথে এই চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের যাত্রা শুরু ১৯৭৮ এর ১ জানুয়ারি থেকে। মাওয়ের চীন ১৯৪৯ সাল থেকেই চীনে (নয়াচীন) ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু তবু ১৯৭১ সালের অক্টোবরের আগে পর্যন্ত এই নয়াচীন জাতিসঙ্ঘের কেউ ছিল না। কারণ ১৯৪৯-৭১ এ বছরগুলোতে নয়াচীনের জাতিসঙ্ঘে সদস্যপদ ছিল না, স্বীকৃতি ছিল না। শুধু তা-ই নয়, চীনের নামে দেয়া জাতিসঙ্ঘের জন্ম থেকে বরাদ্দ ভেটোওয়ালা সদস্যপদটা ছিল তাইওয়ানের হাতে।

আসলে মাওয়ের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই বিতর্ক ছিল জাতিসঙ্ঘে চীনের নামে দেয়া (ভেটোসহ) সদস্যপদের হকদার কে? তাইওয়ান না মাওয়ের বিপ্লবী নয়াচীন? নয়াচীন – মানে এটাকে এখনো অনেকে ‘মেনল্যান্ড চীন’ বলে থাকে। আর বস্তুত জাতিসংঘ সদস্যপদের হকদার কে এই প্রশ্নে আমেরিকা তাইওয়ানকেই হকদার মনে করত তখন। তাই আমেরিকার সেই অবস্থানের বিরুদ্ধে সবাই মিলে ভোট দিলেও আমেরিকার অবস্থানকে নাকচ করার সুযোগ ছিল না কারণ আমেরিকার হাতে ভেটো ক্ষমতা ছিল।  বলে যেকোন ভোটাভুটিতে আমেরিকার হকদার তাইওয়ানের পক্ষে; নয়া চীনের পক্ষে নয়।

২৫ অক্টোবর ১৯৭১, জাতিসঙ্ঘের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবঃ
১৯৭১ সালের অক্টোবরের জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ‘চীনা সদস্যপদটা কে পাবে’- এই প্রশ্নটা আবার এক ভোটাভুটিতে তোলা হয়েছিল।  সেবার কিন্তু হঠাৎ  ইস্কযুটা তোলা হয় নাই। তবে ততপরতা বা অগ্রগতিগুলো বেশির ভাগ ছিল আন্ডারগ্রাউন্ডে সঙ্গোপনে।

ঘটনা সংক্ষেপে বললেঃ
১. মাওয়ের চীন, ১৯৫৮ সাল থেকে “কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব  এক ক্যাপিটালিজমের পথে”  –  যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আর এরই বাইরের ডাকনাম ছিল “১৯৫৮ সালের চীনা সাংস্কৃতিক বিপ্লব’। আমাদের এখনকার জন্য মূল প্রসঙ্গ – এসিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে চীনে ব্যাপক বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যা বলাইবাহুল্য। পশ্চিমা দেশের বা এক কথায় প্রতীকীভাবে আমেরিকার বিনিয়োগ পুঁজিবাজার ওয়ালস্ট্রিটের জন্য এটা ছিল এক বিরাট সুযোগ। আর এ সুযোগ দেয়ার আগে মাও এটা নিয়েই নিক্সন-কিসিঞ্জারদের সাথে দরকষাকষি করেন ও তাদের রাজি করান। মাও কী চেয়েছিলেন বিনিময়ে?

জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ নয়া চীনের পক্ষে দিতে হবে, আমেরিকা ভেটোপ্রদান করতে পারবে না – এই দেয়ার মাধ্যমে তবেই মাওয়ের চীন আমেরিকার জন্য তিনি চীনে বিনিয়োগের দুয়ার খুলে দিতে রাজি হয়েছিলেন। এই ছিল ডিল!

জাতিসঙ্ঘের ঐ ’৭১ সালের অক্টোবরে যে ভোটাভুটি হয়েছিল তাতে চীনে বাজার-বিনিয়োগে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ার লোভে আমেরিকা ভোটাভুটিতে ভোটদানেই বিরত ছিল; অর্থাৎ কোনদিকেই ভোট দেয় নাই। আর এতটুকু হলেই নয়া চীনের চলে। কারণ, এর আগে সবসময় সব ক্ষেত্রে আমেরিকা ভেটো দিয়ে তাইওয়ানকে ভোটাভোটিতে জিতিয়ে টিকিয়ে দিত। আর নয়া চীনের পক্ষে প্রস্তাব উঠলে আমেরিকার এক ভেটোতেই সব শেষ হয়ে যেত। এছাড়া আমেরিকা তার প্রভাবাধীন জাতিসঙ্ঘের সাধারণ সদস্যদের সেবার ১৯৭১ সালে আর বিরত থেকে নয়, বরং নয়া চীনের পক্ষে ভোট দিতে লবী অনুরোধ রেখেছিল।

আর তাতেই মাও সেতুংয়ের চীনই আসল চীনের জাতিসঙ্ঘের (ভেটো ক্ষমতাসহ) সদস্যপদ একমাত্র হকদার, এ সিদ্ধান্ত পাস হয়েছিল ২৫ অক্টোবর ১৯৭১, ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবে। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে সাত দিনের চীন সফরে গিয়ে সব আলাপ-আলোচনা শুরু করেছিলেন, যা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে চীন-আমেরিকার সম্পর্ক স্বীকৃতি যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৭৮, ১ জানুয়ারি থেকে।

তার সোজা মানে সেই ২৫ অক্টোবর ১৯৭১, ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাব থেকে তাইওয়ান-ই হয়ে যায় নয়া চীন- এই মূল ভূখণ্ডের অংশ। তাইওয়ান আর স্বাধীন নয়, কোনো আলাদা প্রদেশ নয়। কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামে তাইওয়ান স্বাধীন কোনো দেশ আর নয়। জাতিসংঘের চোখে, তাইওয়ান আইনত পিপলস রিপাবলিক অব চায়না (PRC) এর অংশ।

এখন তাহলে তাইওয়ানকে নিয়ে বাইডেনের দরদ- এর অর্থ কী? এটা তো শঠতা! অবশ্যই তাই!

এমনকি ১৯৭১ সালের পর থেকে চীন যখনই কোনো দেশের সাথে স্বীকৃতি বিনিময় করে সেখানে সে শর্ত রাখে যে, তাইওয়ান যে চীনের অংশ, এটা সে আগে স্বীকার করলে তবেই তারা পারস্পরিক স্বীকৃতি বিনিময় আরো আগিয়ে নিতে পারে। এটাকেই চীন ‘একচীন নীতি’ বলে থাকে। একচীন নীতি’ মেনে চলতে তাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বলে থাকে। সেই থেকে আমেরিকা একচীন নীতিতে স্বাক্ষর করা দেশ। কিন্তু তবু বারবার এটা নিয়ে সে প্রায়ই আমেরিকা উসকানি তৈরি করে চলছে। এমনকি গত বছর ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি,  বাইডেন ক্ষমতার শপথ নেয়ার পরও একই পিছলাপিছলি শুরু করেছিলেন। শেষে চীন হুমকি ও চাপ দেয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাইডেন আবার এবার সত্তরের দশকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে পাঠিয়েছিলেন।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০২ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   বাইডেনের মূল্যবোধ– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

One thought on “বাইডেনের কলোনি ‘মূল্যবোধের’ বড়াই শুরু

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s